Home

Welcome to My Diary "Kingdom of Wasted Time"

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব

আমার ব্যক্তিগত এই ডায়েরীটার আমি নাম দিয়েছি- 'উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব"। নামটা আমার নিজের থেকে নেয়া বা দেয়া নয়। আমার এক বন্ধু মেজর মিজানুর রহমান যাকে সবাই কবি মাইক বলে জানে, তার থেকে ধার করা। হয়তো সে নিজেও জানে না কখন কিভাবে আমি ওর এই চমৎকার নামটি চুরি করেছি। যাই হোক, নিরন্তর এই পৃথিবীতে কেউ যখন আসলেই একা থাকে, যখন তার কথা শোনার কেউ থাকে না বা সে কাউকে তার নিজের কথাগুলি বলতে পারে না অথচ বলা দরকার, কিংবা শেয়ার করা দরকার, তখনই বিকল্প হিসাবে মানুষ তার নিজের সাথে নিজে কথা বলে। আর সেটারই বহির্প্রকাশ এই ডায়েরী। সম্ভবত আমিও ঠিক সে রকমের একটা পরিস্থিতিতেই ছিলাম যাকে বলে Lonely in the Crowdy City আর সেই শহরের মধ্যে আমি আসলেই একা ছিলাম।  প্রতিটা বছর পেরিয়ে গেছে আমার, আর আমি সেই ফেলে আসা বছরগুলির দিকে তাকিয়ে দেখেছি- কি ভেবেছিলাম, কি হয়েছে আর কি হতে পারতো এর মত  বিশ্লেষন। 

যখনই আমি সময় পেয়েছি, লিখার চেষ্টা করেছি। মানুষের মন আবহাওয়ার মতো প্রতি ক্ষনেক্ষনে পরিবর্তনশীল। জ্যোৎস্না রাতের নির্মল আকাশে দিকে তাকিয়ে মন কখনো কখনো একাই হাসে, চৈত্রের দাবগাহনে আবার সেই মন কখনো কখনো অলস সময়ে কিযে ভাবে সেটা মানুষের মন নিজেও জানে না। কোনো এক ক্ষুদ্র ইদুরের খাদ্য চুরির লুকুচুরী দেখে হটাতই মুচকী হাসিতে মুখাবয়ব বিকষিত হয়ে উঠে কিংবা পথের ধারে কোনো এক রোগাকীর্ন শতায়ু বৃদ্ধাকে দেখে মন অতীব দুমড়ে মুচড়ে উঠে। প্রেয়সীকে না দেখলে যেমন মন উতালা হয়ে উঠে আবার তেমনি তার সাথে কখনো কখনো এমন ভাবের সৃষ্টি হয় যেনো তার সাথে আজীবনের আড়ি থাকলেই মন শান্ত হতে পারতো বলে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র অভিমানের সৃষ্টি হয়। 

এতো বিচিত্র এ পৃথিবী যার প্রতিটা ঋতুতে এর চেহারা ভিন্ন, কখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টির সাথে চোখের ধারা প্রবাহিত হয়, কখনো কখনো হিমালয়ের চুড়ায় জমে থাকা অদৃশ্য জলীয় বাষ্পের মতো জলকনাকে পাথরের মতো শক্ত করে বুকে ধারন করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে মন কোনো এক সীমাহীন উচ্চতায়। কেউ তাঁকে ধরতে পারুক বা না পারুক তাতে ঐ হিমালয়ের হয়তো কিছুই যায় আসে না, তারপরেও কোটি কোটি জলকনারা বন্দি হয়েই থাকে সবার নাগালের বাইরে। 

যুদ্ধ দেখেছি, শান্তি দেখেছি, অপমান দেখেছি, দুশ্চিন্তা দেখেছি, ভালোবাসা দেখেছি, ঈশ্বরের মহিমা দেখেছি, অবুঝ শিশুর বায়নায় অঝোর ধারায় কান্না দেখেছি, নীতি দেখেছি, দূর্নীতি দেখেছি, কষ্ট দেখেছি, সুখ দেখেছি, দেখেছি অবারিত অজস্র রঙের ছড়াছড়িতে জলকেলীতে মগ্ন গভীর জলের ভিতরে প্রানীদের খেলা। মৃত্যু দেখেছি, মৃত্যুর কান্না দেখেছি আবার কিছু মৃত্যুর শান্তিও দেখেছি। লোভাতুর মানুষের বেচে থাকার আর্তনাদ দেখেছি, শোষিত হৃদয়ের ভাষাহীন কষ্টের অশ্রুবিন্দু দেখেছি। কিন্তু কোথাও কারো "সব পাওয়ার" সুখ দেখিনি। দেখিনি কোনো মানুষের আজীবনের ইতিহাসের শেষ অধ্যায়টুকু। চোখের জল দেখেছি বটে কিন্তু যে ব্যথায় জল গড়িয়ে পড়েছে সেই ব্যথা দেখিনি, খিলখিল করে আনন্দের ঢেউ দেখেছি বটে কিন্তু আনন্দের কি রং সেটা আজো দেখিনি। আদ মৃত সন্তানের জন্য কোনো মায়ের আহাজারী দেখেছি কিন্তু তার অন্তরের ভিতরের ক্ষতের পরিমান দেখিনি। কতটুকু কান্নায় কতটুকু রক্তক্ষরন হয় তার পরিমাপ আমার জানা হয় নাই। ককেসাসের মতো বৃহৎ পাহাড়কুঞ্জের সেই নির্গম গীড়িতে কেনো এতো মনোরোম ফুলের সমাহার বিধাতা তৈরী করে রেখেছেন, গভীর জলে নাম না জানা বৃহৎ মস্যের কেনো এতো দলাদলি কিংবা গভীর থেকে গভিরে কেনো বিধাতা এতো সম্পদ লুকিয়ে রেখেছেন তার খতিয়ান কিংবা হিসাব আমার জানা নেই। সব কিছুই ছিলো এক রহস্যের বেড়াজালে আবৃত বিধাতার কোনো এক বৃহৎ খেলার অনাবিষ্কৃত ছক। তারপরেও যতোদিন এই অবিনশ্বর পৃথিবীতে ছিলাম, ভালো লেগেছে, এর সকাল ভালো লেগেছে, রাতের নিঝুম নিস্তব্দতা ভালো লেগেছে, কোলাহল ভালো লেগেছে, শিশুদের, পাখীদের কিচিরমিচির ভালো লেগেছে। 

আমি জানি, আমাকে মনে রাখার মতো এমন কোনো ঘটনা আমি করিনি, তারপরেও কেউ কেউ হয়তো কিছুটা সময় আমাকে মনে রাখবে। সময়ের বিবর্তনে আমরাও সেই পূর্বসূরীদের মতো শতভাগ হারিয়েই যাবো। কেউ হয়তো মমী হয়ে ইতিহাসে বেচে থাকে, কেউ বেচে থাকে কল্যানে আবার কেউ বেচে থাকে তার কর্মফলে। তারপরেও সবাই মরার পরেও বাচতেই চায় যার কোনো কারন আমি আজো বুঝিনি। কেনো বাচতে চায় তখনো? কি আছে সেই বেচে থাকার মধ্যে যখন তার অন্তর মৃত, যখন তার চোখ বন্ধ, যখন তার কোনো অনুভুতিই আর নাই। যখন এই পৃথিবীতে তার আর আগমনের কোনো সম্ভাবনাই নাই? না সে আর এই পৃথিবীর আকাশ দেখতে পারে,না সাগরে সাতার কেটে কেটে মনের আনন্সাদে ভেসে থাকতে পারবে, না কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে নীল গগনে উড়ে যাওয়া কোনো পাখীর লীলাময়ী দৃশ্য দেখতে পাবে। কিংবা না সে কোনো নারীর বা তার সন্তানের অথবা মনুষ্যকুলের কারো ভালোবাসাতেই আর সিক্ত হবে। তাহলে কিসের সেই নেশা যা তাকে লক্ষ বছর বেচে থাকার প্রনোদনা জোগায়? 

আমি আমার এই 'উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব" ডায়েরিতে যা লিপিবদ্ধ করেছি, তার কোনো কিছুই কল্পনায় ছিলো না। সব ঘটনার মূলে কেউ তো ছিলো। হয়তো প্রকাশ্যে অথবা গোপনে। যারা প্রকাশ্যে ছিলো তারা আমার জগতে সারাক্ষন গোচরীভুতই ছিলো আর যারা অপ্রকাশ্যে ছিলো, তারাও হয়তো ছদ্দবেশেই সবার চোখের সামনেই ছিলো। আমি আমার আশেপাশের কারো উপরেই কখনো অন্যায় কিছু করিনি, না আমি তাদের কোনো কাজে, নীতিতে বা দায়িত্তে ঠকিয়েছি। সবাইকেই আমার প্রয়োজন ছিলো, আবার আমাকেও সবার প্রয়োজন ছিলো। সম্ভবত প্রয়োজনটাই ছিলো সবার মাঝে বন্ধন। কেউ তাদের নিজের সার্থে হটাত করে এই বন্ধন থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে, কেউ আবার হাজার অসুবিধার মাঝেও বন্ধনটা টিকিয়ে রেখেছিলো। আমি কখনো কোনো বন্ধনে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিলাম না।

পাঠকের পড়ার সুবিধার্থে আমি হয়তো একই লেখা বিভিন্ন সেগমেন্টে ভাগ করেছি। কখনো "ফ্যামিলি" কখনো "লিটারেচার" কখনো "ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস" মেন্যুতে। হয়তো এটার প্রয়োজন ছিলো না। আবার একদিক থেকে কারো কারো জন্য হয়তো প্রয়োজন ছিলো। সবার দৃষ্টি এক নয়। কী হয়তো শুধু ভ্রমনের দিকেই আকৃষ্ট হবেন, কেউ আবার আমার উপর, কেউ হয়তো সাহিত্য নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেন, আবার কেউ শুধু কল্পনার রাজ্যে কে কি ভাবছে তার আবিষ্কারে মগ্ন থাকেন। তাই যার যেটা প্রয়োজন সে বিন্নাসেই আমি কিছু কিছু একই লেখা বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে সাজানোর চেষ্টা করেছি। 

কোনো কোনো লিখায় কেউ কেউ তাদের নিজের চরিত্রের সাথে যদি মিল খুজে পান, সেটা হয়তো আপনাকে নিয়ে লেখা নয় এটা নিসচিত থাকতে পারেন। হতে পারে এটা কোনো কাক্তালিয় ব্যাপার। এ দুনিয়ায় সব সময় সব কিছুই পুনরাবৃত্তি হয় এবং হচ্ছে। ইতিহাস সেটাই বলে। আমরা হয়তো ব্যাপারগুলিকে সে রকম করে ভাবি না। তারপরেও কাউকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বা কাউকে অতিরঞ্জিত আবেগ দেখানোর কোনো চেষ্টা আমার এই ডায়েরিতে করা হয় নাই। যতটুকু আবেগতাড়িত হয়েছি, বা কষ্ট ধারন করেছি বা আনন্দ পেয়েছি পুরুটাই আমার নিজের মধ্যে। এরপরেও যদি কেউ আমার কোনো লিখায় কষ্ট পান, আমি তার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। 

ছোট একটি কথা

ঠিক এই যুগে এসে দেখতে পাচ্ছি, প্রতিদিন আমাদের সবার জীবন খুব দ্রুত পালটে যাচ্ছে। কতটা দ্রুত সেটা আজ যারা ঠিক এই সময়ে বাস করছি, হয়তো তারা বলতে পারবেন। আমাদের সময়টাই মনে হচ্ছে সেই শেষ সময় যেখানে এখনো আমরা পুরানো বন্ধু বা চেনা লোকের সাথে দেখা হলে তিনি কেমন আছেন জিজ্ঞেস করি, একটু সময় ব্যয় করি, সুখ দুঃখের আলাপ করি। সমস্যার কথা বলে কিছু উপদেশ বিনিময়ও করি। আমরাই সম্ভবত সেই শেষ যুগের কিছু মানুষ যারা এখনো পুরানো খবরের কাগজটা অন্তত কিছুদিন ঘরে রাখি, একই খবর হয়তো বারবার পড়ি। আমরা এখনো সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ভয় পাই, পাশের বাড়ির সাথে সুসম্পর্ক রাখি। আমাদের প্রাইভেসী বলতে আসলে খুব একটা মাথা ঘামাই না। যা ছিলো সবই খোলামেলা। আমরা সেই শরৎচন্দ্রের লেখা উপন্যাস পড়ে কখনো কেদেছি, কখনো হেসে গড়াগড়ি করেছি, রবী ঠাকুরের ‘বলাই’ আমাদের মনে দাগ কাটে, কিংবা ‘পোষ্টমাষ্টার’ গল্পের ছোট বালিকার কথায় বড্ড কষ্ট লাগে। ‘দেবদাস’ এখনো আমাদের অনেক প্রিয় একটা গল্প বারবার পড়ি। এখনো এই দলটি কোনো ইনভাইটেশন ছাড়াই একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যাই, বেড়াতে গেলে হয়তো কমদামী হলেও হাতে কিছু নিয়ে যাই। এখনো এরা বড়দের পা ছুয়ে সালাম করে। রাতের বা সকালের নাস্তা এখনো এরা একসাথে করার অভ্যাস রাখে। ছেলেমেয়ে, বউ পরিজন একসাথে নাস্তা করুক বা রাতের খাবার খাক, এটাই চায় তারা। ঈদের ছুটিতে তারা এখনো গ্রামের ভালোবাসার টানে সেই কাদাচে গ্রাম, সোদামাখা পরিবেশে ছুটে যেতে সব প্রকার কষ্ট করতেও আনন্দ পায়। আমাদের এই দলটি সম্ভবত খুব বেশীদিন আর নাই এই পৃথিবীতে। হয়তো আগামী ২০ বছরের পর আর কেউ থাকে কিনা কে জানে। এই দলটির মানুষগুলি সকালে উঠে নামাজের জন্য মসজিদে যায়, ঘরে এসে উচ্চস্বরে কোরআন তেলওয়াত করে, হাতে একটা প্লাষ্টিক ব্যাগ নিয়ে নিজে নিজে বাজার করে, হেটে হেটে সেই বাজার বহন করে আনে। বিকালে হয়তো কিছু মানুষ একত্রে বসে মাঠে বা কোনো দোকানের সামনে বসে গালগল্প করে। কোথাও একসাথে খেতে গেলে কে কার আগে রেষ্টুরেন্টের বিল পরিশোধ করবে তার প্রতিযোগিতা চলে। একজন বিল না দিতে পেরে আবারো হয়তো আরেকটা আড্ডার অগ্রীম দাওয়াত দিয়ে রাখে। এদেরকে আর খুব বেশী দেখা যাবে না একযুগ পরে।

তখন যাদের আনাগোনা হবে তারা সবাই আত্তকেন্দ্রিক একদল। যারা একে অপরের পাশে বসেও হাতের মোবাইলে কুশলাদি বিনিময় করবে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যেও বেশীর ভাগ গ্রিটিংস হবে শুধুমাত্র মোবাইলের মেসেজে মেসেজে। কেউ কারো বাড়িতে যেতেও আনন্দ পাবে না, না কেউ তাদের বাড়িতে এলেও খুশী হবে। সন্তানদের সাথে তাদের দুরুত্ত বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে চলে আসবে যে, কে কখন কি করছে, কেউ তার জবাব্দিহি নেওয়ার মতো অবস্থায় থাকবে না, না থাকতে চাইবে। বাজার হবে মোবাইলে, আনন্দ হবে মোবাইলে মোবাইলে, বন্ধুত্তগুলির মধ্যে বেশীর ভাগ বন্ধুই কারো চেনা জানা হবে না অথচ বন্ধুর সংখ্যা অনেক। বড়রা যেমন ছোটদেরকে স্নেহ করার কায়দা জানবে না, ছোটরাও বড়দেরকে সম্মান করার আদব জানবে না। ঘরে ঘরে সবাই একাই থাকবে একজন থেকে আরেকজন। ধর্মের চর্চা ধীরে ধীরে কমে আসবে, কমে আসবে পারিবারিক, আর সামাজিক বন্ধুত্তের গন্ডি। প্রতিবেশীদের মধ্যে কারো সাথেই আজকের দিনের সখ্যতা আর হয়তো থাকবেই না। মুখচেনা হয়তো থাকবে কিন্তু হয়তো নামটাও জানা হবে না একে অপরের। সন্তানরা বড় হবে মায়ের আদরে নয়, কাজের বুয়াদের নিয়ন্ত্রনে। বৈবাহিক সম্পর্কে চলে আসবে শুধুমাত্র একটা কাগুজে বন্ধনের মধ্যে। স্বামী স্ত্রীর আজীবন কালের ভালোবাসার সম্বন্ধ বা দায়িত্ববোধ হবে শুধুমাত্র দেয়া নেয়ার মধ্যে। ফলে না স্ত্রী স্বামীকে বা স্বামী স্ত্রীকে তার নিজের জীবনের একটা অবিবেচ্ছদ্য অংশ হিসাবে গন্য করবে। সন্তানদের মধ্যে মা বাবার ডিভিশনে তারাও একেবারেই একা হয়ে যাবে। কেউ আসলে কারোরই না। অথচ তারা একই ঘরের ছাদের নীচে বসবাস করবে। ওদের কাছে গ্রাম বলতে একটা অপরিষ্কার পরিবেশ, গ্রামের মানুষগুলিকে মনে হবে অন্য কোনো জাতের মানুষ। এই নতুন প্রজন্মের কাছে মানুষের চেয়ে কুকুর বিড়াল হবে তাদের নিত্যদিনের বন্ধু। সংসার ভেংগে যাওয়ার যে কষ্ট, বা লজ্জা, কিংবা দুঃখের এই প্রজন্মের কাছে এটা খুব মামুলী একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আজ যে তাদের বন্ধু, কাল হয়তো সে তাকে চিনেই না। আজ যে কারো পাতানো বোন, কাল হয়তো সে হয়ে যাবে তার প্রিয় গার্লফ্রেন্ড। এদের অনেক টাকা পয়সা লাগবে, হয়তো থাকবেও। কিন্তু একসাথে কোথাও আড্ডায় খেতে গেলে যার যার বিল সে সেই দিতে থাকবে। এতে কারো কোনো কষ্ট নাই। এটাই যেনো এই প্রজন্মের আড্ডার নিয়ম। জিজ্ঞেসও করবে না হয়তো বিল কে দিবে বা কেউ দিবে কিনা।

এখানে সবচেয়ে বিপদজনক পরিস্থিতি হচ্ছে যে, এই আমাদের প্রজন্ম যখন প্রায় শেষের পথে আর নতুন প্রজন্ম যখন উদিয়মানের পথে, এই ট্রানজিট সময়ে সবচেয়ে বেশী সাফার করবে আমাদের প্রজন্ম। কারন তারা তাদের সবকিছু শেষ করে যখন নতুন প্রজন্মকে তৈরী করছে, সেক্ষেত্রে আমাদের এই প্রজন্মের মানুষেরা আসলে আর্থিকভাবে নিঃস্ব। নতুন প্রজন্ম আমাদের প্রজন্মকে আর আমাদের সময়ের মতো করে দায় দায়িত্ব নিতে চায় না। ফলে এখনই পুরানো প্রজন্মের সবচেয়ে খারাপ সময় প্রবাহিত হচ্ছে। বড়রা মনে করছেন, আমাকে তো আমাদের সন্তানেরাই দেখভাল করবে, কিন্তু সন্তানেরা মনে করছেন এটা তাদের দায়িত্তের মধ্যেই পড়ে না। এই দুয়ের টানাটানিতে শেষ ট্রানজিট সময়টা বড্ড বিপদজনক মনে হচ্ছে। এহেনো অবস্থায় আমাদের প্রজন্মের খুব সতর্ক থাকা দরকার। হতে পারে আমার এই কথায় অনেকেই বিরুপ মন্তব্য করবেন, হয়তো বলবেন, সন্তানদেরকে ধার্মীক জীবনজাপন না করায় কিংবা সঠিক পদ্ধতিতে মানুষ না করার কারনে আমরা এহেনো অবস্থায় পড়ছি। আমি এরসাথে একমত নই। আমরা আজকাল সন্তানদেরকে শুধুমাত্র পরিবার থেকে যথেষ্ঠ শিক্ষা দিলেই সব শিক্ষা তারা পায় না। স্কুলের নিয়ম পালটে গেছে, শিক্ষকের আচরন পালটে গেছে, ধার্মিক লোকদের অভ্যাসও পালটে গেছে, সমাজের নীতিনির্ধারন লোকের মানও কমে গেছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও আর সেই আগের আইনের মধ্যে নাই, বিচারের ন্যায্যতা কমে গেছে, রাজনীতির কারনে মানুষে মানুষে, পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লা মহল্লায় সম্পর্কের মধ্যে চীর ধরেছে। এখন শুধু পরিবারের শাসনের উপর কিংবা আইনের উপরেই সন্তানরা বড় হয়ে উঠছে না। নতুন প্রজন্ম আমাদের হাতের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পুরানো প্রজন্মের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যেই অনেকটা সার্থপরের মতো হতে হবে। নিজের জন্য যথেষ্ঠ সঞ্চয় মজুত রাখুন যাতে কেউ আপনাকে দেখভাল করুক বা না করুক, কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, যাতে আপনি আপনার দেখভাল করতে পারেন। নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা (বেশিরভাগ) পুরাতন প্রজন্মকে বোঝাই মনে করে। মা ভাগ হয়ে যায় সন্তানদের মধ্যে ভরন পোষনের জন্য। বাবা ভাগ হয়ে যায় একইভাবে। ফলে মা–বাবা একে অপরের থেকেও ভাগ হয়ে যান শুধুমাত্র বেচে থাকার কারনে।

বৃদ্ধ বয়সে এসে কারো উপরে নির্ভরশিল না হতে চাইলে, নিজের জন্য যথেষ্ঠ পরিমান অর্থ সঞ্চয় করুন। প্রয়োজনে নিজের এসেট বিক্রি করে হলেও তা করুন। কারন, একটা সময়ে এসে আপনি সেটাও বিক্রি করতে পারবেন না। হয়তো সন্তানেরাই বাধা দেবে অথবা তাদের অংশ দাবী করবে। আর আপনি সারাজীবন কষ্ট করেও শেষ জীবনে এসে সেই অবহেলিতই থাকবেন। হয়তো কারো কারো জায়গা হবে বৃদ্ধাশ্রমে। আর সেই বৃদ্ধাশ্রমে বসে আরেক পরাজিত বুড়ো মানুষের সাথে সারা জীবনের কষ্টের কথা ভাগাভাগি করবেন, কিন্তু আপনি আসলেই আর ভালো নাই তখন। 

আমার মৃত্যুর দিন তারিখঃ 

এ দুনিয়ায় জানা অজানা হাজার হাজার রহস্য আছে। আকাশ মন্ডলীর রহস্যের কোনো কিছু তো আমরা এখনো জানতেই পারিনি। এই মাটির ভুখন্ডেই ঈশ্বর আমাদের জানার বাইরে, দেখার বাইরে কত কিছু যে রেখেছেন, তার বৈজ্ঞানিক প্রমানে তার ধারেকাছেও যেতে পারিনি। আমি এতোসবের মধ্যে যেতেও চাই না। জীবন বড্ড ছোট, আর এই ছোট্ট জীবনে অনেক রহস্য উতঘাটন না করেই যেমন আমাদের পূর্বসূরীরা চলে গেছেন, তেমনি আমাদেরকেও সেভাবেই অনেক কিছুই না জেনে চলে যেতে হবে। এটাই বাস্তবতা।

কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে বেশী আফসোসের মতো মনে হয় একটা ব্যাপার যে, ঈশ্বর আমাদেরকে তার পবিত্রগ্রন্থ এবং তার প্রিয়বন্ধু আর আমাদের রাসুলের মাধ্যমে অনেক কিছু জানালেও একটা বিষয় যেনো কোনোভাবেই খোলাসা করেন নাই। অথচ করতে পারতেন। আর সেটা হলো, কে কবে আমরা এই দুনিয়া ত্যাগ করবো সেটা। আমরা কে কবে চিরতরে বিদায় নেবো এর দিনক্ষন আমরা কেউ বলতে পারি না। আজো পর্যন্ত কোন বিজ্ঞানিক, কোনো দার্শনিক, কোন মনিষী কিংবা কোনো ধর্মযাযক কেউ আমাদের এই চলে যাওয়ার দিনক্ষন বলতে পারেননি। আল্লাহ সে ক্ষমতা কাউকে দেনইনি। কেনো দেননি? দিলে অন্তত আমরা বুঝতে পারতাম কি কখন করবো। একটা প্রিপারেশন নেয়া যেত।

ঈশ্বর কেনো এটা রহস্যজনক ভাবে গোপন রাখলেন এ প্রশ্ন যদি করি তাহলে জীবনের চাওয়া পাওয়া, ধ্যান ধারনা, হাহুতাশ ইত্যাদির অনেক কিছুর সুরাহা হয়তো হয়ে যেত। মানুষ লোভী হতে পারতো না, মানুষ স্বাধীনভাবে যা খুশী তা করতে পারতো না। খারাপ কাজ করতে পারতো না, ঘুষ, খুন, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ইত্যাদিও হয়তো কমে যেতো। অথচ কোথাও এর সমাধান নাই, কোথাও এ ব্যাপারে কোনো তথ্য বা তত্ত নাই। কবে আমার ওফাতের দিন, কবে আমি আর নিঃশ্বাস নেবো না। সেদিন আমাকে যেতেই হবে। অথচ জানি না সেটা কবে। তারপরেও মাঝে মাঝে এই প্রশ্নটা আমার মনে আসে, আসলেই কি আমাদেরকে সেই ক্ষমতা বিধাতা দেন নাই নাকি আমরা জানি কিন্তু বুঝতে চাই না? এই প্রশ্নটা আমি কাউকে কখনো করি নাই কারন আমি জানি এর উত্তর কারো কাছেই নাই। আর করলেও অনেকে হয়তো আমাকে বিদ্রুপ করা ছাড়া অন্য কোনো মন্তব্য করবেন না। কিন্তু আমাকে আমি এই প্রশ্নটা অনেকবার করেছি, করেছি শুধু জানতে, কোথায় এর আসল রহস্য লুকিয়ে রেখেছেন বিধাতা। ধরে নেই, আমি এর উত্তর জানি। তাহলে এর ব্যাখ্যা কি? এই ব্যাখ্যায় যারা বিশ্বাস করবেন, তাদের জন্য শুধু এই লেখা। আর এটা শুধুই আমার মতামত।

আমি একজন মুসলমান, তাই আমি আল্লাহর বানী, আল্লাহর রাসুল এবং রাসুলের সমস্ত কথা মনেপ্রানে কোনো প্রশ্ন ব্যতিরেকে বিশ্বাস করি এবং পালন করার চেষ্টা করি। সেই বিশ্বাস থেকেই বলছি যে-আল্লাহ বলেছেন, তিনি এই দুনিয়া সৃষ্টি করতেন না, যদি না তিনি তার হাবীব, তার বন্ধু আর আমাদের রাসুলকে সৃষ্টি না করতেন। আবার সমস্ত মানবজাতীকে এটাও বলেছেন-“কুল ইন কুন্তুম তুহিব্বুন আল্লাহ, ফাত্তা বিউনি ইউহাবীব কুমুল্লাহ”। মানে যদি তোমরা আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আমার হাবীবকে ভালোবাসো। এর মানে কিন্তু একটাই। আমাদের রাসুলের থেকে প্রিয়বান্দা তাঁর কাছে আর কেউ নেই, ছিলো না, আর থাকবেও না। আল্লাহ এটাও বলেছেন, তোমাদের জীবন প্রনালীর জীবন্ত ‘মডেল’ হচ্ছেন তাঁর এই প্রিয়বান্দা আমাদের রাসুল। তাকে এ-টু জেড ফলো করতে বলেছেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি কর্মে, প্রতিটি স্তরে। অর্থাৎ তিনি যেভাবে আচরন করেছেন, যেভাবে আরাধনা করেছেন, যেভাবে যা যা করেছেন, সমস্ত কিছুকে আমাদের ফলো করতে বলেছেন।

আল্লাহ এই রকম একজন অতীব প্রিয় মানুষকে কি ইচ্ছে করলে হাজার বছরের আয়ু দিতে পারতেন না? লক্ষ বছর জীবিত রাখতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। কিন্তু তার এতো প্রিয়বান্দাকে তিনি সেটাও করেন নাই। তাকে তিনি একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তার কাছে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। যাকে তিনি এতো ভালোবাসেন, যার জন্য তার এতোসব আয়োজন, যাকে ঘিরে তিনি পুরু বিশ্বকে সাজিয়েছেন, সেই তাকেই তিনি এই পৃথিবীতে জীবিত রেখেছিলেন মাত্র ৬৩ বছর ৪ দিন। ৯ রবিউলে তাঁর জন্ম, ১২ রবিউলে তাঁর ওফাত। ক্যালেন্ডার মোতাবেক বা চান্দ্র মাসের গননায় মতান্তরে ঠিক ৬৩ বছর। যদি এতো প্রিয়বন্ধুর জন্যই আল্লাহ মাত্র ৬৩ বছরের উপর আয়ুষ্কাল বেছে দিলেন, তাহলে আমি তাঁর তুলনায় কোথায়? আমি কি তাঁর থেকেও আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয় যে, আল্লাহ আমাকে তাঁর হাবীবের থেকেও বেশীদিন বাচিয়ে রাখবেন? রাখতেও পারেন, তবে সেটা তাঁর ইচ্ছে। আবার তার আগেই তিনি আমাকে উঠিয়ে নিতে পারেন, সেটাও তাঁর ইচ্ছে। কিন্তু আমি যেহেতু জানি না আমার সময়কালটা কতদিনের, তাই আপাতদৃষ্টিতে আমাদের রাসুলের জীবনকে ফলো করলে আমার ধরেই নেওয়া উচিত যে, আমিও ৬৩ বছরের বেশী এই নশ্বর দুনিয়াতে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নাই। কারন আমার রাসুল হচ্ছেন আমার জন্য সবক্ষেত্রে মডেল। আর তাকেই সর্বদা অনুসরন করতে বলেছেন আল্লাহ। যদি সবকিছুই আমি তাঁর ফলো করি, তাহলে তাঁর আয়ুষ্কালটাও আমাকে ফলো করতে হবে। আর এটাই ঠিক। এর থেকে কম বা বেশীর আয়ুষ্কালের আশীর্বাদ শুধু আল্লাহ ছাড়া আর কারো হাতে নাই। তাই, এই সময়ের সীমারেখা ধরেই আমার সমস্ত হোমওয়ার্ক, আমার সমস্ত প্ল্যানিং করা উচিত। যদি এর থেকে বেশীদিন আল্লাহ আমাকে রাখেন, সেটা হবে আমার জন্য বোনাস। হয়তো আমার দ্বারা আরো কিছু করিয়ে নিতে চান তিনি, অথবা আমার কিছু কমতি আছে যা পূর্ন করার জন্য আমাকে এক্সট্রা সময় দিচ্ছেন, অথবা আমাকে আরো টেষ্ট করার জন্য তিনি অতিরিক্ত সময়টা গুজে দিলেন। আর যদি এর থেকে কম সময়ের মধ্যে আমার ডাক পড়ে সেটাও আমার বিধাতার ইচ্ছা। আমি তার ইচ্ছার বাইরে এক সেকেন্ডও থাকার অধিকার রাখি না।

যদি এই হিসাব ঠিক রাখি, তাহলে আমিও আর এই দুনিয়াতে খুব বেশিদিন নাই। এরপরে কে আমাকে মনে রাখবে, কে আমার জন্য দোয়া করবে, আমার স্থান কোথায় হবে, আমার কর্মফলের কারনে কে কোথায় কিভাবে আমাকে মুল্যায়ন করবে তার দায়ীত্ত আমার আসলেই নাই। আমি সদা এভাবেই প্রিপারেশন নিতে চেষ্টা করছি। আমি গুছিয়ে ফেলার চেষ্টা করছি সব কিছু, কারন হাতে অনেক সময় নাই।

আমরা সবাই একটা ব্যাপার নিয়ে সর্বদা দুশ্চিন্তায় থাকি। আর সেটা হলো-আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারের কি হবে, আমাদের সন্তানদের কি হবে, এই দুশ্চিন্তায়। অথচ আমার কাছে বারবারই মনে হয়, এই দুশ্চিন্তার চেয়ে আমাদের সবার অনেক বেশী দুশ্চিন্তা হওয়া উচিত, আমার মৃত্যুর পর আমার কি হবে?

চলুন, আমরা রেডি হই। তাই এখানে যতো বেশী দান করে যাবো, আমি জোর দিয়ে সেদিন সেটা তাঁর কাছে চাইবো। নিশ্চয় তিনি অতীব ক্ষমাশীল এবং দয়াশীল। (আমিন)