ভূমিকা
আমার ব্যক্তিগত এই ডায়েরীটার আমি নাম দিয়েছি- 'উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব"। নামটা আমার নিজের থেকে নেয়া বা দেয়া নয়। আমার এক বন্ধু মেজর মিজানুর রহমান যাকে সবাই কবি মাইক বলে জানে, তার থেকে ধার করা। হয়তো সে নিজেও জানে না কখন কিভাবে আমি ওর এই চমৎকার নামটি চুরি করেছি। যাই হোক, নিরন্তর এই পৃথিবীতে কেউ যখন আসলেই একা থাকে, যখন তার কথা শোনার কেউ থাকে না বা সে কাউকে তার নিজের কথাগুলি বলতে পারে না অথচ বলা দরকার, কিংবা শেয়ার করা দরকার, তখনই বিকল্প হিসাবে মানুষ তার নিজের সাথে নিজে কথা বলে। আর সেটারই বহির্প্রকাশ ডায়েরী। সম্ভবত আমিও ঠিক সে রকমের একটা পরিস্থিতিতেই ছিলাম যাকে বলে Lonely in the Crowdy City আর সেই শহরের মধ্যে আমি আসলেই একা ছিলাম। প্রতিটা বছর পেরিয়ে গেছে আমার, আর আমি সেই ফেলে আসা বছরগুলির দিকে তাকিয়ে দেখেছি- কি ভেবেছিলাম, কি হয়েছে আর কি হতে পারতো এর মত বিশ্লেষন।
যখনই আমি সময় পেয়েছি, লিখার চেষ্টা করেছি। মানুষের মন আবহাওয়ার মতো প্রতি ক্ষনেক্ষনে পরিবর্তনশীল। জ্যোৎস্না রাতের নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে মন কখনো কখনো একাই হাসে, চৈত্রের দাবগাহনে আবার সেই মন কখনো কখনো অলস সময়ে কি যে ভাবে সেটা মানুষের মন নিজেও জানে না। কোনো এক ক্ষুদ্র ইদুরের খাদ্য চুরির লুকুচুরী দেখে হটাতই মুচকী হাসিতে মুখাবয়ব বিকষিত হয়ে উঠে কিংবা পথের ধারে কোনো এক রোগাকীর্ন শতায়ু বৃদ্ধাকে দেখে মন অতীব দুমড়ে মুচড়ে উঠে। প্রেয়সীকে না দেখলে যেমন মন উতালা হয়ে উঠে আবার তেমনি তার সাথে কখনো কখনো এমন ভাবের সৃষ্টি হয় যেনো তার সাথে আজীবনের আড়ি থাকলেই মন শান্ত হতে পারতো বলে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র অভিমানের সৃষ্টি হয়। এতো বিচিত্র এ পৃথিবী যার প্রতিটা ঋতুতে এর চেহারা ভিন্ন, কখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টির সাথে চোখের ধারা প্রবাহিত হয়, কখনো কখনো হিমালয়ের চুড়ায় জমে থাকা অদৃশ্য জলীয় বাষ্পের মতো জলকনাকে পাথরের মতো শক্ত করে বুকে ধারন করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে মন কোনো এক সীমাহীন উচ্চতায়। কেউ তাঁকে ধরতে পারুক বা না পারুক তাতে ঐ হিমালয়ের হয়তো কিছুই যায় আসে না, তারপরেও কোটি কোটি জলকনারা বন্দি হয়েই থাকে সবার নাগালের বাইরে।
যুদ্ধ দেখেছি, শান্তি দেখেছি, অপমান দেখেছি, দুশ্চিন্তা দেখেছি, ভালোবাসা দেখেছি, ঈশ্বরের মহিমা দেখেছি, অবুঝ শিশুর বায়নায় অঝোর ধারায় কান্না দেখেছি, নীতি দেখেছি, দূর্নীতি দেখেছি, কষ্ট দেখেছি, সুখ দেখেছি, দেখেছি অবারিত অজস্র রঙের ছড়াছড়িতে জলকেলীতে মগ্ন গভীর জলের ভিতরে প্রানীদের খেলা। মৃত্যু দেখেছি, মৃত্যুর কান্না দেখেছি আবার কিছু মৃত্যুর শান্তিও দেখেছি। লোভাতুর মানুষের বেচে থাকার আর্তনাদ দেখেছি, শোষিত হৃদয়ের ভাষাহীন কষ্টের অশ্রুবিন্দু দেখেছি। কিন্তু কোথাও কারো "সব পাওয়ার" সুখ দেখিনি। দেখিনি কোনো মানুষের আজীবনের ইতিহাসের শেষ অধ্যায়টুকু। চোখের জল দেখেছি বটে কিন্তু যে ব্যথায় জল গড়িয়ে পড়েছে সেই ব্যথা দেখিনি, খিলখিল করে আনন্দের ঢেউ দেখেছি বটে কিন্তু আনন্দের কি রং সেটা আজো দেখিনি। আদ মৃত সন্তানের জন্য কোনো মায়ের আহাজারী দেখেছি কিন্তু তার অন্তরের ভিতরের ক্ষতের পরিমান দেখিনি। কতটুকু কান্নায় কতটুকু রক্তক্ষরন হয় তার পরিমাপ আমার জানা হয় নাই। ককেসাসের মতো বৃহৎ পাহাড়কুঞ্জের সেই নির্গম গিড়িতে কেনো এতো মনোরোম ফুলের সমাহার বিধাতা তৈরী করে রেখেছেন, গভীর জলে নাম না জানা বৃহৎ মস্যের কেনো এতো দলাদলি কিংবা গভীর থেকে গভীরে কেনো বিধাতা এতো সম্পদ লুকিয়ে রেখেছেন তার খতিয়ান কিংবা হিসাব কিংবা রহস্য আমার জানা নেই। সব কিছুই ছিলো এক রহস্যের বেড়াজালে আবৃত বিধাতার কোনো এক বৃহৎ খেলার অনাবিষ্কৃত ছক। তারপরেও যতোদিন এই অবিনশ্বর পৃথিবীতে ছিলাম, ভালো লেগেছে, এর সকাল ভালো লেগেছে, রাতের নিঝুম নিস্তব্দতা ভালো লেগেছে, কোলাহল ভালো লেগেছে, শিশুদের, পাখীদের কিচিরমিচির ভালো লেগেছে। অবুঝ শিশুদের কোনো কারন ছাড়া খুন্ঠুসি দেখে মুচকী হাসিতে মন ভরে গেছে, আলুটিলার সেই উচু পাহারের উপর নির্জনে একা অস্ত্র হাতে কুড়েঘরে বসে দূরের সবুজ গাছালী দেখতে দেখতে কখন যে আনমনা হয়ে গিয়েছি, আর তখন আমি কি ভেবেছি, কার কথা ভেবেছি, সেই এলোমেলো ভাবনা আমাকে আলোড়িত করেছে। আমার এই ছোট একটা জীবনে হাজারো কত অভিজ্ঞতা যে হয়েছে, তার প্রতিটি ঘটনা আমাকে সময় অসময় ভাবিয়ে তুলেছে, মন খারাপ হয়েছে কখনো, আনমনা হয়েছি কখনো, উদাসীন হয়েছি কখনো। কখনো নিজের অজান্তেই চোখ ঝাপ্সা হয়ে এসছে, আবার কখনো আনন্দের উচ্ছাসে চোখের পাপড়ি ভিজে এসেছে। কি বিচিত্র ছিলো আমার সে জীবন। আজ এতোদিন পর এই শেষবেলা এসে মনে হচ্ছে- মাকে খুব মিস করি, মাকে আমি সব সময় মিস করি আসলে। বাবাকে দেখিনি, কিন্তু বাবা থাকলে হয়তো তাকে নিয়ে পাশে বসিয়ে তার অতীতের স্মৃতি নিয়ে রোমন্থন করতে পারতাম।
আমি জানি, আমাকে মনে রাখার মতো এমন কোনো ঘটনা আমি করিনি, তারপরেও কেউ কেউ হয়তো কিছুটা সময় আমাকে মনে রাখবে। কেউ মনে রাখবে আমার সান্নিধ্যের কারনে, কেউ হয়তো মনে রাখবে আমার ভালোবাসার জন্যে, কেউবা ঘেন্নায় আবার কেউ পরম মমতায়। কখনো নিজের জানামতে কারো কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা তো করিইনি, বরং নিজের ক্ষতি করে হলে অন্যের ভালো হোক চেয়েছি। যদি কেউ কখন আমার কারনে মনের ভিতর কষ্ট নিয়ে বেচে থাকে, তার কাছে আমি করজোড় করা ছাড়া আর কোন কিছুই নাই। কেউ আমার কাছে ঋণী নয়, হয়তো আমিই সবার কাছে ঋণী এই ধারনা নিয়ে আমি এই সুন্দর পৃথিবীতে বেচেছিলাম। আমি কারো কাছ থেকে বেশী জ্ঞানি ছিলাম না, আমি সব সময় সবার কাছ থেকে কিছু শিখতে চেয়েছি। শিখেছিও। আমি জানতাম, আমি চিরস্থায়ি নই, যেতেই হবে একদিন। অতীতের দুক্ষভরা স্মৃতি আমার কাছে সবচেয়ে বড় বোঝা মনে হতো, তাই সেই বোঝা আমাই কখনোই টানতে চাইনি। আজ এই ক্ষনে এসে পিছনে তাকিয়ে দেখি, বেলা অনেক। সময় প্রায় যায় যায়। সময়ের বিবর্তনে আমরা সেই পূর্বসূরীদের মতোই শতভাগ হারিয়েই যাবো। কেউ হয়তো মমী হয়ে ইতিহাসে বেচে থাকে, কেউ বেচে থাকে কল্যানে আবার কেউ বেচে থাকে তার কর্মফলে। তারপরেও সবাই মরার পরেও বাচতেই চায় যার কোনো কারন আমি আজো বুঝিনি। কেনো বাচতে চায় তখনো? কি আছে সেই বেচে থাকার মধ্যে যখন তার অন্তর মৃত, যখন তার চোখ বন্ধ, যখন তার কোনো অনুভুতিই আর নাই। যখন এই পৃথিবীতে তার আর আগমনের কোনো সম্ভাবনাই নাই? না সে আর এই পৃথিবীর আকাশ দেখতে পারে,না সাগরে সাতার কেটে কেটে মনের আনন্দ উচ্ছাসে ভেসে থাকতে পারবে, না কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে নীলগগনে উড়ে যাওয়া কোনো পাখীর লীলাময়ী দৃশ্য দেখতে পাবে। কিংবা না সে কোনো নারীর বা তার সন্তানের অথবা মনুষ্যকুলের কারো ভালোবাসাতেই আর সিক্ত হবে। তাহলে কিসের সেই নেশা যা তাকে লক্ষ বছর বেচে থাকার প্রনোদনা জোগায়? আসলে জীবন একটাই। আর সেই জীবন হচ্ছে সেটা যা আমরা এই পৃথিবীতে কাটিয়ে যাচ্ছি। পরজনমে কি আছে, সেই জীবনে কে কোথায় কি পজিশনে থাকবে, কিংবা আদৌ এই মানুষ রুপেই থাকবে কিনা কেউ জানে না এক ঈশ্বর ছাড়া। তাই, আমি বারবার জীবনটাকে সব দৃশ্যপট থেকে ভাববার চিন্তা করেছি। একা থেকে দেখিছি, সবার সাথে মিলিত বসবাস করে দেখেছি, ভিক্ষুকের সাথে বন্ধুত্ব করে দেখেছি, বড় বড় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পন্ডিত, সবার সাথেও বন্ধুত্ব করে দেখেছি, কেহই তাদের নিজের সার্থের উর্ধে উঠতে পারেনি, পারেনি মনুষত্যকে আপন করে ভাবতে। অথচ সবাই শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই হারিয়ে যায়। পরকীয়া থেকে শুরু করে নিবিড় ভালোবাসাতেও সেই একই কৌশল। সবাই একা। সবাই সত্যিই একা। তারপরেও সবাই সব কিছুকে তাদের সামর্থের বাইরে গিয়ে হলেও নিয়ন্ত্রন করতে চায়।
আসলে এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নাই। আবার সব কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে বলে মনে হয়। কেউ কবি হতে চায়, কেউ বৈজ্ঞানিক হতে চায়, কেউ অনেক ধনী হতে চায়, কেউ রাজনীতিক হতে চায়। আসলে এইগুলি ইচ্ছের উপর কিছুই নিরভর করে না। আবার এইগুলি যে ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না, তাও ঠিক নয়। কারন কোথাও না কোথাও এর একটা রদ বদলের পালা আছে। কোথাও না কোথাও এই যোগসূত্রের একটা টার্ন আছে। যা কিছুদুর পর্যন্ত দেখা যায়, আর বড় অংশটাই আমাদের নজরের মধ্যে নাই। সবচেয়ে ট্যালেন্টেড ছাত্রটি আজ হয়ত কোথাও কোনো এক বড় অফিসের কেরানীর চাকুরী করে। অথচ যে সময়ে তাকে ট্যালেন্টেড ভাবা হয়েছিলো, সেটার গতিপথ পাল্টে আরেক দিকে টার্ন নেওয়ার কারনেই আজ সে সাফল্যের যে চূরায় উঠার কথা ছিলো তার থেকে অনেক দূরে। আবার এমনো হতে পারে, ব্যাকবেঞ্চে বসে থাকা সবচেয়ে নিরীহ ছাত্রটি আজ পৃথিবীর কাছে এতোটাই সমাদৃত যে, কোনো সুত্রই মিলছে না। এই সুত্রটাই মানুষ কেনো যেনো জানা সত্তেও মিলাতে চায় না। অথচ এই হিসাবটাই মিলানো খুব জরুরী। কারন কোন কিছুই হতাত করে হয়ে উঠে না। প্রকৃতি তার ধর্ম কখনোই পাল্টায় না। সেই একইভাবে, যে বালকটি একদিন কবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ সবচেয়ে বড় সমাজসেবি, যে একদিন সমাজসেবি হতে চেয়েছিলো, সে হয়ত আজ কারো কারো জন্যে ত্রাস। যা ঘটে তা সময়ের বিবর্তনের পালাক্রমে কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই ঘটে। আজ যে রুপের কারনে আমি আপনি অহংকারী, মনে হয় পৃথিবী বুঝি আমার চরনতলে আছড়ে পড়লো। শত শত হিরো, শত শত সুশ্রী মানবীগন না জানি কতদিন কতরাত তাদের ঘুম হারাম করে রাত জেগে জেগে আমার কথা ভাবছে। এটা ভাবা সহজ। হয়ত এমনো হতে পারে, আমাদের এই আজকের দিনের সম্ভাব্য সবকিছু দেখেই কারো চোখ, কারো বুক, কারো লালসার অন্তরালে এমনই ভালবাসার জাল বানিয়ে অক্টোপাসের মতো ঘিড়ে ফেলেছে, যে, কোনটা ভালোবাসা আর কোনটা ছলনা, বুঝাই দায়। যাকে তোমার আরধ্য, হয়তো দেখা যাবে তোমার চেয়েও অতি কুৎসিত কোনো রমনী তোমার আরধ্য কোনো পুরুষ তার শয্যাশায়ী। ব্যাপারটা হারজিতের নয়, ব্যাপারটা মতবাদেরও নয়, ব্যাপারটা অনেকাংশেই বৈষয়িক, আর কিছুটা তপ্ত বাসনা। ব্যাপারটা পছন্দেরও না অনেকাংশে। যে জামাটি আমি অপছন্দ করে দোকানে রেখে দিয়েছি, হয়তো ওই জামাটাই আরেকজন হন্যে হয়ে খুজছেন। মানুষ বড় বিচিত্রময়। ঈশ্বর এই মানুষকে এতো বৈচিত্র্যময় বিসাদৃশ্য একে অপরের থেকে সৃষ্টি করেছেন যে, সব রমনীর সব কিছু একই থাকা সত্তেও পুরুষ জানি কেনো প্রতিটি ভিন্ন নারীর প্রেমেই পড়ে। এটা নেশা নয়, এটা এক রহস্য।
আমি আমার এই 'উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব" ডায়েরিতে যা লিপিবদ্ধ করেছি, তার কোনো কিছুই কাল্পনীক নয়, এগুলি কোনোটাই কল্পনার ফসল নয়। সব ঘটনার মূলে কেউ তো ছিলো। হয়তো প্রকাশ্যে অথবা গোপনে। যারা প্রকাশ্যে ছিলো তারা আমার জগতে সারাক্ষন গোচরীভুতই ছিলো আর যারা অপ্রকাশ্যে ছিলো, তারাও প্রকাশ্যেই ছিলো কিন্তু ছদ্দবেশে। তারাও সবার চোখের সামনেই ছিলো। তারা জানতো কেউ তাদের চিনে না, আবার সবাই তাদেরকে অন্য কেউ বলেই জানতো। এটা ছিলো একটা সামাজিক সিস্টেমের কঠিন ঝামেলাযুক্ত একটা জটিলতা। তারপরেও সবাই যার যার জায়গা থেকে সবাই খুশীই ছিলো। আমি কারো উপরেই কখনো অন্যায় কিছু করিনি, না আমি তাদের কোনো কাজে, নীতিতে বা দায়িত্তে ঠকিয়েছি। সবাইকেই আমার প্রয়োজন ছিলো, আবার আমাকেও হয়তো সবার না হলেও কারো কারো তো প্রয়োজন ছিলোই। সম্ভবত প্রয়োজনটাই ছিলো সবার মাঝে বন্ধন। কেউ তাদের নিজের সার্থে হটাত করে এই বন্ধন থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে, কেউ আবার হাজার অসুবিধার মাঝেও বন্ধনটা টিকিয়ে রেখেছিলো। আমি কখনো কোনো বন্ধনে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিলাম না।
পাঠকের পড়ার সুবিধার্থে আমি হয়তো একই লেখা বিভিন্ন সেগমেন্টে ভাগ করেছি। কখনো "ফ্যামিলি" কখনো "লিটারেচার" কখনো "ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস" মেন্যুতে। হয়তো এটার প্রয়োজন ছিলো না। আবার একদিক থেকে কারো কারো জন্য হয়তো প্রয়োজন ছিলো। সবার দৃষ্টি এক নয়। কেউ হয়তো শুধু ভ্রমনের দিকেই আকৃষ্ট হবেন, কেউ আবার আমার উপর, কেউ হয়তো সাহিত্য নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেন, আবার কেউ শুধু কল্পনার রাজ্যে কে কি ভাবছে তার আবিষ্কারে মগ্ন থাকেন। তাই যার যেটা প্রয়োজন সে বিন্নাসেই আমি কিছু কিছু একই লেখা বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে সাজানোর চেষ্টা করেছি।
কোনো কোনো লিখায় কেউ কেউ তাদের নিজের চরিত্রের সাথে যদি মিল খুজে পান, সেটা হয়তো আপনাকে নিয়ে লেখা নয় এটা নিসচিত থাকতে পারেন। হতে পারে এটা কোনো কাকতালীয় ব্যাপার। এ দুনিয়ায় সবসময় সবকিছুই পুনরাবৃত্তি হয় এবং হচ্ছে। ইতিহাস সেটাই বলে। আমরা হয়তো ব্যাপারগুলিকে সে রকম করে ভাবি না। তারপরেও কাউকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বা কাউকে অতিরঞ্জিত আবেগ দেখানোর কোনো চেষ্টা আমার এই ডায়েরিতে করা হয় নাই। যতটুকু আবেগতাড়িত হয়েছি, বা কষ্ট ধারন করেছি বা আনন্দ পেয়েছি পুরুটাই আমার নিজের মধ্যে। এরপরেও যদি কেউ আমার কোনো লিখায় কষ্ট পান, আমি তার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
জীবনের জার্নিটা আসলে কেমন ছিলো
সময়কাল- ১৯৮৩-১৯৮৭
যে বিষয় নিয়ে মানুষ যতো বেশী আশংকা করে, যা নিয়ে মানুষ বেশী দুশ্চিন্তা করে, হয়তো সেটা সবসময় ঘটবে না জেনেও যদি ঘটে যায় এই ভাবনায় মানুষ কখনো কখনো বাস্তব জীবনের অনেক হিসাব নিকাশে এমন কিছুর পরিবর্তন আনে যা তার নিজেরই পছন্দ নয় অথবা সে নিজেই সেই পরিবর্তনের পক্ষে ছিলো না। কিন্তু বেচে থাকার জন্য, নিরাপত্তার এবং নিরাপদ জীবনের জন্য হয়তো সেই পরিবর্তন তার পছন্দ না হলেও মেনে নিতেই হয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে যখন এই পরিবর্তন হয়তো যখন আর ঘটেই না, তখন আগের দুশ্চিন্তায় মগ্ন মন এটাই বলতে থাকে যে, রিস্ক তো নিতেই পারতাম, তাহলে আর হয়তো এই অপছন্দনীয় পরিবর্তীত পরিকল্পনাটা আর কাজে লাগানো দরকার হতো না। কিন্তু এই "যদি" বড় অদ্ভুদ একটা যুক্তি। এই "যদি" যদি আবার রিস্ক হয়ে যায়, তখন আবার নিজেকে এমনি বোকা মনে হয় যে, সম্ভাব্য কারন জানার পরেও কেনো আমি আমার পরিবর্তীত পরিকল্পনা কাজে লাগালাম না? তাই বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে, সবসময় ব্যাকআপ সাপোর্ট রেখে উভয় পরিকল্পনা থেকেই সম্ভাব্য এডভান্টেজ আর ডিজএডভান্টেজগুলি খতিয়ে নিয়ে সবচেয়ে ভালো অপসনটা বেছে নেয়া। কখনো কখনো কিছু ছাড় দিতে হয় বটে কিন্তু সমুলে পতন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সাফল্য নাও আসতে পারে কিন্তু তখন অন্তত নিজেকে এই বলে শান্তনা দেয়া যায় যে, চেষ্টা তো করেছি।
আমার সেই বাল্যকাল থেকেই আমি যে অসুবিধায় আছি বা আমার যে শক্ত ব্যাকআপ নাই এটা আমি খুব ভালোভাবেই টের পেয়েছিলাম। আর এ কারনে আমি যেনো সব সময় সুপ্ত, দূর্বল এবং শান্ত থাকতাম। ১৯৮৩ এর শেষের দিক থেকে তার পরবর্তী সময়টায় যখন আমি ম্যাচিউরড, তখন আমার এই দুসচিন্তাটা যেনো আমাকে চারদিক থেকে গ্রাস করে ফেলেছিলো। সেই ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল অবধি ক্যাডেট কলেজে পড়ার কারনে আমি একটা ছকের মধ্যে ছিলাম। পড়াশুনা চলছে, ডেইলী কাজকর্ম চলছে, একটা গ্রুপের সাথে, একটা ভালো আস্তানায় ছিলাম। কিন্তু ১৯৮৩ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা হয়ে যাবার পর আমার আর সেই ক্যাডেট কলেজের আস্তানাটা, সেই গন্ডীটা ছিলো না। তখন নিজের পায়ে দাড়াবার বা পরবর্তী নতুন ধাচের আরেকটা সিস্টেমে ঢোকার সময় হয়ে গিয়েছিলো। হয় আমাকে উচ্চতর শিক্ষা নেবার জন্য কোনো ইউনিভার্সিটি, বা কোনো মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে নিজের ক্যারিয়ার তৈরী করতে হবে, অথবা এসব কিছুই যথাযোগ্য না হলে আমাকে নিজের পায়ে দাড়াবার জন্য কোন একটা চাকুরী, হোক সেটা সরকারী অথবা বেসরকারী, ঢোকতেই হতো। পরিবারের প্রধান যখন নিজের বাবা বা মা না হন, তাহলে সেই পরিবারের সন্তানদের হয় তার বড় ভাই কিংবা বোনদের উপরই নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বাবা আর মা এর ভুমিকা যতটা সন্তানের জন্য গ্যারান্টেড, সেই সদসদের জন্য তার বড় ভাই কিংবা বড়বোনগন ততোটা নির্ভরযোগ্য যে হবেন, তার কোনো গ্যারান্টি নাই। আর যদি সে রকম কিছু হয় তাতে সেই বড় ভাই কিংবা বোনদেরকে দায়ী করাও যাবে না। এই দুদুল্যমান পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী সদস্যের উচিত যতোটা দ্রুত নিজে সাবলম্বি হওয়া যায় তার চেষ্টা করা। আমি সে রকম একটা পরিস্থিতির মধ্যেই ছিলাম বলে একটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। "যদি" যা ভাবছি সেটা না হয়? "যদি" যেটা ভাবছি সেটাই হয় তো, ভালো, কিন্তু "যদি" না হয়? তাহলে মাঝপথে আমার একুলও নাগালের বাইরে, আবার ওই কুলেও যাওয়ার রশদ বন্ধ। মাঝপথে হাবুডুবু খাওয়া ছাড়া কোনো গত্যান্তর থাকবে না।
এমন একটা পরিস্থিতিতে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে, বুয়েটে এবং সেনাবাহিনির কমিশন পদে চাকুরী পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে সব গুলিতেই সাফল্য পাই। আর এই সাফল্য যেনো আমাকে আরো বিচলিত করে ফেলেছিলো। কোন লাইনে আমার যাওয়া উচিত সেটা নিয়ে খুবই একটা কনফিউশনে ছিলাম। কারন শুধুমাত্র আর্মির লাইন ছাড়া বাকী সবগুলিতে কারো না কারো অর্থনৈতিক নির্ভরতার উপর দাঁড়িয়ে ছিলো যার কোনো গ্যারান্টেড শর্ত ছিলো না। শেষ অবধি, আমি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমাকে নিজের পায়েই যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব দাড়াতে হবে, আর সেটা একমাত্র সম্ভব আর্মির কমিশনে যাওয়া। যদিও আমার একেবারেই পছন্দের অপশন এটা ছিলো না, কিন্তু ওই যে, প্রথমেই বলেছিলাম-পছন্দ হোক বা না হোক, নিরাপত্তা আর নিরাপদ জীবনের জন্য হিসাব নিকাশ আমুল পরিবর্তন করতেই হয়। সেটাই করলাম।
এই ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল অবধি আমার জীবনে অনেক কিছুই ঘটে গেল। জীবনের কঠিন সামরীক প্রশিক্ষন থেকে শুরু করে নতুন চাকুরী, প্রেম, সবই ঘটে যায়। কঠিন সামরীক ট্রেনিং এর সময় বারবার মনে হয়েছে, জীবনে মনে হয় একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর্মিতে এসে। আবার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, ঠিক কাজটাই করেছি, যদি ওটা না করতাম, তাহলে বাচতাম কিভাবে? এই দোলাচলে আমার অনেকটা সময় ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে অনেক আলসেমি ছিলো। এই সময়ের মধ্যে আমি কখনো আশাবাদী, কখনো হতাশায় লিপ্ত ছিলাম। চাকুরীটাকে কখনো মনে হয়েছে, এটা আমার জন্য নয়, আবার কখনো মনে হয়েছে, এ ছাড়াতো আমার কোনো উপায়ও ছিলো না, তাই এটাকেই ধরে রাখতে হবে। মনে হয়েছে, আমার এই ঘোর অমাবশ্যা চিন্তাধারার একদিন সমাপ্তি হবে, মন শান্ত হবে, হয়তো আর কোনো দুশ্চিন্তা আমাকে গ্রাস করবে না। কিন্তু অমাবশ্যার রাত বড় লম্বা। কখন যে এটার শেষ হয় বলা বড় কঠিন। এই ঘোর অমাবশ্যার রাতের প্রতিটি ক্ষন মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, খারাপ সময় ধীর গতির কাটায় চলে। যেনো চলতেই চায় না। একেকটা দিন মনে হয় একেকটা আলোক-বর্ষ।
আমি আমার এই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ সময়ের জন্য কাউকে দোষারুপ করি না। আসলে দোষারুপ করার জন্য আমার কোনো লোক ছিলো না। কাকে দোষারুপ করবো? আমার মাকে? সম্ভব না, আমার ভাইকে বা বোনকে? তাও সম্ভব না। সবাই যার যার পজিশন থেকে যা যা পেরেছে করেছে। ফলে কাউকেই আমি কখনো ব্লেইম করিনি। এটা আমার দূর্ভাগ্য যে, আমার বাবা ধনী ছিলেন বটে কিন্তু সেই ভাগ্য আমার হয় নাই যে, তিনি আমার ভাগ্যকে একটা সেইপে দিয়ে যেতে পেরেছিলেন। আমার ভাইকে উনি একটা সার্টেইন লেবেল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু আমাকে উনি কিছুই করে যেতে পারেন নি। অথচ দায়িত্বটা ছিলো ওনারই। জীবনের বলয় যখন কঠিন স্তরে থাকে, তার ভাত সহজ নয়। কিন্তু যার কাছে আমার ফরিয়াদ করার ছিলো, সে স্বয়ং স্রিষ্টিকর্তা। তাই আমার এই সময়ের লিখাগুলির মধ্যে আমি প্রায়ই সেই স্রিষ্টিকর্তার কাছে কখনো নালিশ করেছি, কখনো ফরিয়াদ করেছি, কখনো তাকেই আবার দোষারুপ করেছি। আমি জানি, স্বয়ং তিনি ছাড়া আমার পাশে আর কেউ ছিলো না। আমি একটা জিনিষ স্পষ্ট আকারে বুঝেছিলাম, সৃষ্টিকর্তার মতো বড় গার্জিয়ান মানুষের আর কেউ নেই। যতোক্ষন এই সৃষ্টিকর্তার উপর নির্ভর করা যায়, যতোটা বেশী নির্ভর করা যায়, মন ততো শান্তিতে থাকে, আশা ততো বেশী সাফল্য লাভ করে। এ জন্য মাঝে মাঝে আমি বলতাম- আই লাভ গড বিকজ হে হেজ গিভেন মি দি পাওয়ার টু হেইট হিম।
সময়কাল-১৯৮৮-১৯৯২
বারবার মনে হয়েছে-আর্মমির চাকুরীটা আমি আর করতে চাই না। কিন্নেতু মনের ভিতরে অনেক চাপা কষ্ট নিয়েও আমি সামরীক বাহিনির এই চাকুরীটাতে থেকেই যাই। কখনো কখনো চাকুরীটা ছাড়ার জন্য প্রায় এমন মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম, যে, তাতে আমার সামরীক চাকুরীর অনেক ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি নিরাশার জালের মধ্যে পেচিয়ে থেকেই এই সামরিক বাহিনিতেই আবার রয়ে গিয়েছিলাম। কারন আমার কোনো উপায়ই ছিলো না। অনেকগুলি কারনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম নিজের উপর। কোথাও যেনো কেউ ছিলো না আমার। খুব অসহায়ের মতো লাগছিলো। ইউনিটের লাইফ, আর্মির লাইফ, আমার অর্থনৈতিক অবস্থা সব কিছু মিলিয়ে বাইরে থেকে বুঝবার কোনো উপায় ছিলো না আমি কতটুকু ভিতরে ভিতরে কুকড়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু প্রকৃত সত্য ছিলো খুব কঠিন এক অনিশ্চয়তায় আমার দিন কাটছিলো।
মিটুল ধীরে ধীরে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছিলো। একটা জায়গায় মিটুল যেনো আমার শক অবজার্ভারের মতো কাজ করছিলো। তবে মিটুলের সাথে যতো রাগ, গোস্যা কিংবা অভিমানই আমি করি না কেনো, আমি জানি মিটুল নিজেও ঠিক আমার মতো একটা পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ছিলো। মিটুলের বর্তমান কিংবা ভবিষ্যত সবকিছুই আমার মতো কারো না কারো অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি না হয় ডেস্পারেটলী আর্মিতে গিয়ে কিছুটা স্বনির্ভরতা পেয়েছি, কিন্তু মিটুলের অবস্থাটা কোনো অবস্থাতেই প্লিজেন্ট নয়। মিটুল নিজেও তার ব্যাপারে সে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ছেলেদের পিতাহীন জীবনের চেয়ে মেয়েদের পিতাহিন জীবন আরো দূর্বিসহ। তবে মিটুল এমন একটা ক্যারেক্টার যে, তার সাহস আছে, যে কোনো কিছু ফেস করার মানসিকতাও আছে যদি সে রকমের কোনো শক্ত এবং সিকিউরড প্ল্যাটফর্ম পায়। শেষ অবধি একটা বিষয় আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, আমার সব সমস্যা সাথে মিটুলের, একা আমাকেই সমাধান করতে হবে। আমিই সব, বাবা, মা, ভাই বোন সব আমিই। সিদ্ধান্ত সব আমার। বাচতে হলেও আমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আর মরতে গেলেও তাই। আসলে আমি নিজে খুব একা একাই ছিলাম। আমার খুব বেশী কেউ সংগী কিংবা সাথী ছিলো না যাদের সাথে আমি আমার সব কিছু শেয়ার করতে পারি। মাত্র ২২ বছর বয়সেই সমস্ত প্রতিকুলতা জেনেও আমি মিটুলকে বিয়ে করে ফেললাম। কঠিন আর্মির নিয়ম জেনেও। আর্মির নিয়ম অনুযায়ী আমি কোনোভাবেই এই বয়সে বিয়ে করার অনুমতি প্রাপ্ত নই। তাছাড়া গোপনে বিয়ে করার কারনে আমার শাস্তি হিসাবে চাকুরীচ্যুতও হতে পারে। তারপরেও আমি এই রিস্কটা নিয়েছিলাম। এখন আমার উপর আরেক জনের চাপ বেড়ে গেলো। মিটুলের ইউনিভার্সিটির খরচাদি, খাওয়া দাওয়া এবং অন্যান্য খরাচি আমি চাইনি আমাকে ছাড়া অন্য কেউ বহন করুক। কিন্তু আমার অর্থনৈতিক প্রসারের কোনো উন্নতি ছিলো না। মাত্র ৮৫০ টাকা মাসে বেতনের একটা চাকুরী। এই টাকা থেকেই আমি মিটুলকে শতভাগ সাপোর্ট করতাম, যা কষ্ট করার আমার এন্ডে হচ্ছিলো কিন্তু আমি মিটুলকে কোনোভাবেই সাফার করতে দেইনি। আমি আর্থিক অসচ্চলতার চাপটা এক নাগাড়ে বেশীদিন নিতে পারছিলাম না। অনেকটা ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ছিলাম।
মিটুলকে পেলাম বটে কিন্তু আমার সাথীও আমার মনের ভিতরের কি পরিমান হতাশা ছিলো সেটা আমি কখনো বুঝতে দেই নাই কারন সে নিজেও আমার মতো একই প্রকারের একটা পরিবেশ থেকেই যেনো আমাকে পেয়ে হাফ ছেড়ে বেচেছিলো। সুতরাং তাকে আবার নতুন করে আমার কাহিনি বলে বা আমার পরিস্থিতি বলে তার জীবনকে দুর্বিসহ করতে চাই নাই। যেহেতু বিয়টা করেছি একান্তই আমার ইচ্ছায় এবং আমার পরিবারের সমস্ত সদস্য, এমন কি তার পরিবারের বেশীরভাগ সদস্যদের সিদ্ধান্তের বাইরে। ফলে আমার কাছে নতুন আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরী হয়েছিলো, আর সেটা হচ্ছে- আমার এবং আমার স্ত্রীর জীবনকে সার্থক করে তোলা। অন্তত তাদের থেকে বেশী সার্থক করা, যারা মনে করেছিলো আমার সাথে আমার স্ত্রীর বিয়ের কারনে ওর জীবন যেমন নষ্ট হলো সাথে আমারো। আমার এই চেলেঞ্জটা নিতে ভালই লেগেছিলো। ফলে, আর কোনো "যদি"র উপর আমার নির্ভর করার কোনো উপায় ছিলো না। বর্তমান সময়টাকেই এবং বর্তমান পরিস্থিতিটাই আমাকে অবলম্বন করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে এবং সাফল্য পেতে হবে দৃঢ় সংকল্প করে ফেললাম। এই সময়ের মধ্যে আমার বৈষয়িক চিন্তা প্রবল হয়ে উঠে। আর এই চিন্তাগুলির মধ্যে সর্বোপ্রথম যেটা মাথায় ছিলো সেটা হচ্ছে- ঢাকায় একটা স্থায়ী ঠিকানা তৈরী করা। আল্লাহর উপর আমার ভরষা সব সময়ই ছিলো। আর তাঁর উপর নির্ভর করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ও ছিলো না।
মানুষ যখন পাহাড় সমান অসুবিধায় থাকে, তখন সে যদি জানতে পারে যে, সেই পাহাড় সমান অসুবিধার পাহাড়ের উচ্চতা থেকে কোন প্যারাস্যুট ছাড়াই লাফ দিয়ে অস্থির সমুদ্রে লাফ দিলে হয়তো তার অসুবিধাগুলি দূর হয়ে যাবে অথবা কিছুটা হলেও রিলিফ হবে, তাহলে মানুষ তাইই করবে। আমিও ঠিক তাই করেছিলাম। আর্থিক সচ্চলতা বাড়ানোর জন্য আমাকে এমন একটা সুইসাইডাল সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো যার নাম- চট্রগ্রাম হিল ট্র্যাক্স। হিল সম্পর্কে অনেক গল্প, অনেক কাহিনী শুনেছি, শুনেছি এর লোমহর্ষক কথিত বা বাস্তব অনেক অপারেশনের কথা যেখানে মিলিত ছিলো জীবন আর মৃত্যুর মতো অধ্যায়। কোনো সামরীক কর্মকর্তা কিংবা সদস্য তার নিজের ইচ্ছায় এই মৃত্যুর ফাদে পা রাখতে চায় না, অথচ সব জেনেও আমি জীবিনের একটা তাগিদে সেচ্ছায় আমি এই হিলে আসার পরিকল্পনা করেছিলাম। যদি বেচে থাকি, তাহলে জীবন বেচে গেলো, আর যদি ফিরে না আসি, তাহলেও জীবন বেচে যাবে। নিজের ইচ্ছায় হিল ট্র্যাক্সে পা রাখলাম। মিটুল আমার এই মৃত্যুসম ঝুকির ব্যাপারে খুব একটা অবগত ছিল না। মিটুলের সাথে আমার পুরু প্রায় ৬/৭ মাস একেবারেই কন্টাক্টবিহিন লাইফ পেরিয়ে গেলো। কন্ট্যাক্ট ছিলো একমাত্র একটা দুইটা পত্রের মাধ্যমে। কিন্তু এখানে এসে আমি জীবনের কয়েকটি দিক দেখলাম যেখানে যারা ভয় দেখায় আর যারা ভয় পায় তারা উভয়েই ভীত। কেউ বাচার জন্য লড়ে আবার কেউ লড়াই করে বাচে। এখানে শাসক যেমন শোষিত তেমনি শোষিতও শাসক। অদ্ভুদ সব অভিজ্ঞতা। মিথ্যা আর সত্যতার কোনো যাচাই বাছাই নাই এখানে। বাঘ আর হরিনের খেলার মত। সফল হয়েছি। অতঃপর আর্মির ক্যারিয়ার নির্মানে যথা সম্ভব মনোযোগী হলাম, আমার স্ত্রীর পরাশুনা শেষ হলো, তারপর সরকারী চাকুরীতেও সে সুযোগ পেলো। এবারো আমার পরিবারের অনেকেই আমার স্ত্রীর চাকুরিতে বাধা প্রদান করার চেষ্টা করেছে এই কারনে ঘরের বউ আবার চাকুরী করবে কেনো? আমি এই মতবাদে বিশ্বাসী ছিলাম না। যে কোনো মেয়ের শতভাগ অধিকার আছে তাঁর জীবনকেও সাবলম্বি করে গড়ে তোলার। এতা এ কারনে নয় যে, সে তো আমার উপরই নির্ভরশীল। এমনো তো হতে পারে, আমিই আর এই দুনিয়ায় নাই। তখন সে তো তাঁর নিজের যোগ্যতায় অন্তত সমাজে মাথা উচু করে দাড়াতে পারবে।
সময়কাল-১৯৯৩-১৯৯৭
সেই বহুদিন যাবতই সময়টা কখনোই আমার মতো করে ছিলো না, পুরুপুরি ভাগ্যের হাতেই খেলছিলো আমার জীবন। কিন্তু এই সময়কালটায় আমার জীবনে দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন এসেছিলো। অলিখিত বিবাহ বন্ধনকে লিখিত দালিলিক এবং রেকর্ডীয় ব্যবস্থাপনায় চলে এসেছিলো বিধায় মিটুলকে নিয়ে এক ছাদের তলায় আমি বাস করতে পেরেছিলাম। আমার বড় মেয়ের জন্ম আর মিটুলের বিসিএস পরীক্ষার ভালো খবরে আমার জীবনটা যেনো কিছুটা থিতু হতে শুরু করছিলো। এছাড়া ইউনিট ঢাকায় থাকায় আমার এতদিনের অপরিচিত পরিবেশের অচেনা বাতাসের গন্ধ থেকে নিজের শহরের চেনা বাতাসের গন্ধে যেনো অনেকটা সস্থি ফিরে পাচ্ছিলাম। সবচেয়ে বড় যে আশীর্বাদটা আমার ঈশ্বর আমাকে এই সময়কালটায় উপহার দিলেন সেটা যেনো ভগবান আমার ভাগ্যটাকে একটু ঘুরিয়ে দিলেন। জাতীসংঘে হাইতিতে আমার নাম অন্তর্ভুক্ত হলো। আমার কোনো মামা চাচা ছিলো না এই আর্মিতে। যা করেছি নিজের যোগ্যতায়। বাইরে থেকে আমি বরাবর একটা স্মার্ট লুকেই ছিলাম আর এটার প্রথম কারন ছিলো আমার চৌকষতা। ষ্টাফ কলেজের জন্য পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে আমি অনেকেরই নজরে পরেছিলাম। আমি ষ্টাফ কলেজের এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিতে গিয়ে আমি জানতাম, আমি চান্স পাবো। কারন আমার প্রিপারেশন যাইই ছিলো না কেনো, আমার ইনোভেটিভ আইডিয়া খুব ভালো ছিলো। এর সাথে সাথে আরো অনেকেই ব্যাপারটা জানতেন বিধায় আমার ভাগ্য কিছুটা হলেও এক্সপোজড হয়েছিলো সিনিয়ারদের কাছে। আর এই সিনিয়ার অফিসারগুলিই আমাকে এই ধাপে পুশ করতে পেরেছিলেন।
এবারই প্রথম দেশের বাইরে যাওয়া হয় আমার জীবনে। তাও আবার জাতীসংঘের মতো একটা মিশনে। হাইতিতে। সেখান থেকে গেলাম আমেরিকায়। আমার সেই সপ্নের আমেরিকা। ১৯৮৩ সালে কার্ক্সভাইল ইউনিভার্সিটিতে আমার এন্ট্রির সুযোগ এসেছিলো কিন্তু যে কোনো কারনেই আমি সেই সুযোগ গ্রহন করিনি। মনে হয়েছিলো সেটা আমাকে কেউ ফ্রি দিচ্ছে, দয়ায় দিচ্ছে। নিজের ইগোতে লেগেছিলো অনেকগুলি কারনে। আর এই কারনের পিছনে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা ছিলো আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রী। ফলে আমেরিকায় না গিয়ে আমি চলে গিয়েছিলাম আর্মিতে। অনেকটা পালিয়েই যেনো গিয়েছিলাম। যাই হোক, এবার নিজের যোগ্যতায় আমেরিকা দেখলাম, চিনলাম, বুঝলাম। প্রথম জীবনে আমেরিকায় যাওয়ার জন্য যতোটা ব্যাকুল ছিলাম, এবার আমেরিকায় এসে দেখলাম, এটা সেই দূরের কাশবনের মতো। দূর থেকে দেখতে ভালোই লাগে, গল্প শুনতে ভালো লাগে কিন্তু যখন কাশবনের কাছে যাবেন, তখন আর আগের মতো এটাকে সুন্দর লাগবে না। আমেরিকায় এসেও বুঝলাম, আমেরিকা আমার জন্য নয়। এই আমেরিকায় কেউ আসে তার ক্যারিয়ার গড়তে, কেউ আসে সম্পদ করতে আর কেউ আসে তারাও জানে না কেনো আসে। ভাইয়ার জীবনের কাহিনী আমার জানার কথা নয় কিন্তু এই বিস্তর সময় পেরিয়ে এবার আমেরিকায় এসে বুঝলাম, সম্পদ যেমন সুখের হয়, আবার তেমনি সম্পদ থাকলেও সেটা সুখের নয়। সুখ হচ্ছে সে জিনিষ যা মনের ভিতরের শান্তি। আর শান্তি হচ্ছে যে মুল উপলব্ধি যা কিনা ঘুমের জন্য সময় ক্ষেপন হয় না, আবার সুর না জানলেও গুনগুন করে অন্তর গান গায়। সুখ হচ্ছে সে জিনিষ, যা নিজের মন বুঝে আর অন্তর সেটা উপলব্ধি করে। আমি এবার এমন কিছু জানলাম যার জীবনে যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো কিছুই ছিলো না। এক সময় যুদ্ধ ছিলো অর্থের জন্য, আর এখন যুদ্ধ হচ্ছে নিজের সাথে নিজের। কিন্তু সমাধান নাই বললেই চলে।
অনেক অভিজ্ঞতা হলো এই সময়টায়। জাতীসংঘের মহাসচীবকে দেখলাম, আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্টকে একদম কাছ থেকে দেখলাম এবং তাঁর জন্য নিরাপত্তা বিধান করলাম, হাইতীর প্রেসিডেন্ট এরিস্টিড, ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনে প্রেভালের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হলো। আরো সৌভাগ্য হলো বড় বড় ব্যক্তিত্তদের সাথে কাজ করার। এই সময়টায় আমার জীবনে একটা মস্ত বড় অধ্যায় তৈরী হল।
সময়কাল-১৯৯৮-২০০২
হাইতিতে থাকতেই আমি আর্মি ষ্টাফ কলেজে চান্স পেয়েছিলাম তবুও বাংলাদেশ সরকার আমাকে ফেরত আনেনি বিধায় মিশনটা সম্পুর্ন করতে পেরেছিলাম। মিশনটা সম্পুন্ন করতে পারায় আমার আর্থিক যে সচ্ছলতায় বেশ একটা সাস্থকর অবস্থায় ফিরে এসেছিলো। আর্মিতে আসার পর এ যাবতকাল কখনোই আমার একাউন্ট কালো বা নীল ছিলো না, এটা সব সময়ই ওভারড্রনের কারনে লালই থাকতো। মিশনের কারনে এইই প্রথম আমার একাউন্ট আর লাল থাকলো না। দেশে এসে ষ্টাফ কলেজ করলাম। খুব মনোযোগ ছিলো না আমার। আসলে আমি আর্মিটাকে আজো আমার চয়েজেবল ক্যারিয়ার হিসাবে নিতেই পারলাম না। তারপরেও স্বাভাবিক নিয়মে অনেকের নজরে ছিলাম। একেবারে খারাপ রেজাল্ট করিনি। কিন্তু চেষ্টা করলে অনেক ভাল ফলাফল করতে পারতাম। চেষ্টা ছিলো না।
যাই হোক, স্টাফ কলেজ শেষ করলাম, স্টাফ কলেজের বদৌলতে প্রথম সরকারী হাই প্রোটকলে ইন্ডিয়া বেড়াতে গেলাম। অনেক সুন্দর সুন্দর স্থাপত্য দেখার সৌভাগ্য হলো। তাজমহল, কুতুবমিনার, আকবরের প্যালেস, দিল্লী, কলিকাতা আরো অনেক। নতুন অভিজ্ঞতা হলো। ইন্ডিয়ার টপ ম্যানেজমেন্টের অনেকের সাথেই পরিচয় হলো। কর্নেল ফজলে এলাহী আকবর তখন ইন্ডিয়ায় ডীপ কাভারে ছিলেন, অনেক কিছু জানলাম স্যারের কাছ থেকে। ষ্টাফ কলেজ শেষে ভালো একটা পোষ্টিং পেলাম জিএসও-২ (অপারেশন) হিসাবে ১১ পদাতিক ডিভিশনে। সরাসরি জেনারেল পদবীর কয়েকজন অফিসারের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হল। সে সুবাদে সরকারী বড় বড় প্রশাসনিক পদের হোমরা চোমড়াদের সাথে মেলামেশা হলো। এখান থেকেই আবার আর্মির ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ধাপে গানারী স্টাফ কোর্স করলাম। এর সাথে একটা সার্টিফিকেটও লাভ করলাম। ষ্টাফ কলেজ করার কারনে একটা মাস্টার্স ইন ডিফেস স্টাডিজ (এমডিএস) সার্টিফিকেট পেয়েছিলাম। আর গানারী ষ্টাফ করার কারনে পেলাম এমএসসি সার্টিফিকেট।
হতাশা ছিলো, আশাও ছিলো। কিন্তু এই পাচ বছরে আমার অর্জন অনেক বেশী ছিলো বাকী বছর গুলির তুলনায়। দেশে বড় বড় প্রাকৃতিক দূর্জয় ছিলো, সেই দূর্জয়ে নিজেকে সামিল করতে পেরে অনেক ভালো লেগেছে। মানুষের জন্য অনেক কিছু করতে পেরেছি। লোভের থেকে নিজেকে বাইরে রাখতে পেরে আরো ভালো লেগেছে। দেখলাম, যতো বড় পদ, দূর্নীতির ব্যাপকতা ততো বড়। কেউ সামাল দেয়, কেউ সামাল দিতে চায় না, আবার কেউ কেউ প্রশ্রয় দেয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামো যখন দূর্নীতির জন্য সহায়ক হয়, তখন সব দূর্নীতি হয়ে উঠে একটা অবৈধ উপার্জনের বৈধ পথ। আমি এই বৈধ আর অবৈধ কার্যকলাপ খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু আমি নিজে অটল ছিলাম।
মিটুল বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে চাকুরী পেয়েছে। ১৪তম বিসিএস। কারোরই সায় ছিলো না মিটুলের চাকুরী করা নিয়ে। কিন্তু আমি নারী স্বাধীনতা এবং সাবলম্বিতা পছন্দ করি। তার থেকে সবচেয়ে বড় কন্সেপ্ট কাজ করেছে আমার যে, যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে মিটুলের পাশে দাড়ানোর কেউ নাই। তাই যদি মিটুল একটা ভালো চাকুরী করে, অন্তত আমি এইটুকু ভেবে শান্তি পাবো যে, আমার অবর্তমানে অন্তত মিটুল এই সমাজে খরকুটার মতো ভেসে যাবে না। মিটুলের চাকুরীর সুবাদেই আমি মিটুলকে আমার সাথে বগুড়ায় নিতে পারিনি। কষ্ট হয়েছে, অসম্ভব ধইর্য্যচুত্যি হয়েছে, চাকুরীটার প্রতি তখনো মায়া আনতে পারছিলাম না। তারপরেও কোনো রকমে মনকে বুঝিয়ে জীবনের জন্য রয়েই গিয়েছিলাম। একা জীবনের মতো কঠিন নিঃসঙ্গতা আর নাই। এই সময়েই আমার বড় ভাই আমেরিকা থেকে দেশে এসেছিলেন তার বড় ছেলে মাসুদকে নিয়ে। কিছুটা সময় কাটিয়েছি বগুড়ায় তাদের সাথে। একটা ব্যাপার আমি তখনো লক্ষ্য করেছিলাম যে, মিটুলকে আমার পরিবারের বিশেষ করে বদি ভাই আর হাবীব ভাই মেনে নেন নাই। কিন্তু আমি ছিলাম অটল।
বগুড়া থেকে গানারী ষ্টাফ পরীক্ষা দিয়ে চলে এসেছিলাম হালিশহর আর্টিলারী সেন্টারে। সময়টায় এবারে খুব মনোযোগ দিতে পারি নাই। সাটল জার্নিতেই বেশীরভাগ সময় কেটেছে আমার মিটুল আর উম্মিকাকে দেখার জন্য। হালিশহর থেকে কোর্ষ শেষ করে এবারেও আমার ভালো একটা পোষ্টিং হলো আর্মি হেড কোয়ার্টারে জিএসও-২ (ট্রেনিং), এমটি ডারেক্টরে। এবার ঢাকায় থাকার পালা। নতুন অতিথী আসবে আমার ঘরে।
সময়কাল-২০০৩-২০০৭
এই সময়ে আমি সবচেয়ে আপন যিনি আমার মা, আমি তাকে হারালাম। এর আগেরবার হারিয়েছিলাম আমার আরেক মাকে যিনি আমার শাসুড়ি। এই দুজনেই ছিলো আমার এতোটা প্রিয় মানুষ যে, আমার আর কোনো গার্জিয়ান যেনো থাকলো না। আমার মাঝখানে জাতীসংঘ মিশনে নাম আসার কথা ছিল মধ্যপ্রাচ্যে। আমি তখন আর্মি হেডকোয়ার্টারে এমটি ডাইরেক্টরেটে কর্মরত। মেজর আকবর (আমার কোর্সমেট) এ সময় এমএস ব্রাঞ্চে কাজ করছিলো। তাই কোথায় কার মিশন হবে এটা কোর্সমেটের সৌজন্যে আগেই জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু মা বললেন, এখন না যাওয়ার জন্য। মা হয়তো বুঝেছিলেন, মা বেশিদিন আর থাকবেন না। ঠিক তাই হলো। মা চলে গেলেন।
আর্মি হেড কোয়ার্টারে চাকুরী করা কালেই আমার দ্বিতীয় বারের জন্য মিশনে সংযুক্তি হলো। এবার রাশিয়ার জর্জিয়ায়। প্রথমবার মিশনে গিয়েছিলাম হাইতিতে। ওয়েষটার্ন হেমিস্ফেয়ার। এবার ইউরোপের কাছে। প্রায় একবছর জর্জিয়া মিশন করার মাধ্যমে ঘুরে এলাম রাশিয়া, তুরষ্ক, আরো দেশ। অনেক নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। জর্জিয়া মিশনে থাকার সময় আমি দুটু ভিউ পয়েন্ট খুব কাছ থেকে জাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিলো। ইউরোপের মানুষ গুলি ওয়েষ্টার্ন মানুষদের থেকে অনেক বেশি ফ্রেন্ডলি। বিশেষ করে রাশিয়ানরা। অনেক অনেক নেগেটিভ ন্যারেটিভ শুনতাম রাশিয়া সম্পর্কে, এবার রাশিয়া এসে বুঝতে পারলাম, মিডিয়া একটা শুধু যুদ্ধই না, এটা একটা কালচারকে অযথা পচিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। সচি দেখলাম, রাশিয়ার ক্যাপিটাল সিটি, সেন্ট পিটার্সবার্গ, ছাড়াও পাশের দেশ আজারবাইজান, বাকু, ইউক্রেন সবই দেখা হল। বড্ড সুন্দর একটা মহাদেশ। মানুষগুলিও চমৎকার।
মিটুলকে ঢাকা সেনানীবাসেই রেখে চলে গিয়েছিলাম জর্জিয়াতে। মিটুলের সাথে ছিলো বড় মেয়ে উম্মিকা আর ছোট মেয়ে কনিকা। মা তো আর বেচেই নেই। জর্জিয়াতে নতুন অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। দেশে ফিরে এলাম ২০০৩ সালে। প্রোমোশন হবার কথা ছিলো কিন্তু হলো না কারন বিএনপি ক্ষমতায়। তারা মনে করলেন, আমরা সবাই আওয়ামীলীগ করি কারন মেজর ওয়াকার (আমার কোর্ষমেট) যিনি আওয়ামীলীগের পরিবারের সদস্য থাকায় বিএনপি ধরে নিলো ১৩ লং কোর্ষ সবাই বুঝি আওয়ামীলীগ করি। বেশীর ভাগ ১৩ লং কোর্ষের (প্রায় ৯৯%) কারোরই কোনো প্রোমোশন হলো না। এমনিতেই চাকুরীটার প্রতি কখনো মায়া জন্মাতে পারিনাই, তার মধ্যে আবার নেপোটিজম। ভালো লাগলো না। মিশন থেকে ফেরতের পর পোষ্টিং হলো খোলাহাটি। রিমুট সেনানীবাস। পরিবার নিতে পারলাম না আবারো। আবারো নিঃসঙ্গতা। এই নিঃসঙ্গ অতীব কষ্টের মধ্যে একটা ভালো সংবাদ ছিলো যে, প্রায় ১ বছর খোলাহাটিতে কাজ করার পর ইউনিট মীরপুরে স্থায়ীভাবে আসায় আমি এডভান্স পার্টি নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। সময়টা ২০০৩। প্রোমোশনের ব্যাপারটা আর মাথায় নিলাম না। ঢাকার ৪৬ ব্রিগেডের আন্ডারে কাজ করছি।
এবার সত্যিকারের জন্যই চেষ্টা করতে লাগলাম কিভাবে আর্মি থেকে বেরিয়ে গিয়ে সেকেন্ড ক্যারিয়ার করা যায়। আর সেই টার্নিং পয়েন্ট এলো আমার জীবনে। সেই ১৯৮৪ সাল থেকে এই আর্মি ছাড়ি ছাড়ি করে যে একটা হাহুতাশ ছিলো, এই বছরেই আমি সেটা করতে পারলাম। কেনো করলাম, কিভাবে করলাম, করার দরকার ছিলো কিনা, সব চেষ্টা করেছি লিখে যাওয়ার। আমি ২০০৫ সালে সামরীক বাহিনীর চাকুরীটা নিজ ইচ্ছায় ইস্তফা দিয়ে বেসামরীক লাইফের বিশাল পরিবেশে পা দিলাম।
বেসামরিক জীবনে ভালো থাকার জন্য যা করা দরকার, তার প্রথম উপাদান একটা ভালো কর্মসংস্থান। আমি জানি না শেষ পর্যন্ত আমার চরিত্রের সাথে আমার মনের আশংকা এক করে মিশিয়ে ভবিষ্যতের কক্ষপথে চলতে পারবো কিনা। তবে, আর কারো গোলামী করার ইচ্ছা নাই অন্তরে। হয় নিজেই নিজের গোলামী করবো, নতুবা একেবারে পূর্ন বিশ্রামে বাকীটা সময় কাটাবো। অনেক অনুরোধ পাচ্ছি চাকুরী করার। এমন কি অনেক লোভনীয় অফারসহ। কিন্তু মন টানছে না। এবার আমি চাই নিজের জন্য যুদ্ধটা করতে। হতে পারে এটাই আমার সর্বশেষ যুদ্ধ। যদি টিকে যাই তো ভাল, আর যদি টিকে না যাই, তাহলে বীরত্তের যে চরিত্র আমি দেখিয়ে সব কিছু পিছে ফেলে চলে এলাম তারজন্য আমাকে একাই আফসোস করতে হবে কিন্তু আমি আফসোস করতে শিখি নাই। বাকী যুদ্ধটা শুধু আমার একার।
আর্মি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে মিশন থেকে প্রাপ্ত টাকায় একটা বাড়ির কাজে হাত দিলাম যাতে আর্মি থেকে বেরিয়ে গেলেও আমার থাকার ব্যাপারে কোন দুশ্চিন্তা না হয়। অন্তত থাকার একটা স্থায়ী ব্যবস্থা হয়। মীরপুরে আগেই একটা ছোট প্লট কিনেছিলাম সেই ১৯৯৮ সালে। সেটার উপরই একটা আপাতত কয়েক তালা বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলাম ২০০৪ সালে। আমার মিশনের টাকা, মিটুলের মালয়েশিয়া ট্রেনিং থেকে জমানো প্রায় লাখ পাচেক টাকা আর আমার পেওনশনের থেকে কিছু টাকা এডভান্স নিয়ে বাড়ির কাজে হাত দিলাম। হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা লন নিতে পারায় যেনো আমার বাড়িটা তরতর করে ৪ তালা পর্যন্ত উঠে গেলো। এবার এর পরের ধাপে আমি কর্মসংস্থানের বিকল্প খুজতে গিয়ে দেখা হলো আমাদেরই গ্রামের এলাকার নাজিমুদ্দিন চেয়ারম্যানের সাথে। তার একটা সুয়েটার ফ্যাক্টরী ছিলো যা তিনি চালাতে পারছেন না। নাম-রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড। প্রোপোজাল এলো যদি আমি চালাতে চাই, আমার জন্য অপশন আছে। ব্যাপারটা লুফে নিলাম। অথচ ফ্যাক্টরী চালানোর কোন অভিজ্ঞতাই আমার নাই। তাও সাহস করেছিলাম। এই ফ্যাক্টরীতে আগে কাজ করেছে এমন লোক খুজতে গিয়ে মোহসীন এর সাথে আলাপ এবং শেষে মোহসীন সাহেবকে বিনে পয়সায় ৩০% শেয়ার দিয়ে ব্যবসা করতে মনোস্থির হলাম। নতুন আরেক চ্যালেঞ্জ এবং নতুন আরেক ক্যারিয়ার।
সুয়েটার ফ্যাক্টরী নিলাম বটে কিন্তু যার উপর ভরষা করে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সেই মোহসীন সাহেবই আমার ব্যবসায়িক কাল হয়ে দাড়ালো। মোহসীন সাহেব আসলে ব্যবসাটার প্রতি যেভাবে মনোযোগী হওয়া উচিত ছিলো, সেভাবে কিছুতেই সে মনোযোগী হয় নাই। বিনে পয়সায় কেউ যখন ব্যবসায়িক অংশিদার হয়, তখন সে সেখান থেকে শুধু লাভ চায়, সেটা বাচলো কিনা তার ব্যাপারে কোন চিন্তা থাকে না। আমি এই প্রেক্ষাপট থেকে একটা শিক্ষা নিয়েছি-কখনোই কাউকে লিখিতভাবে বিনে পয়সায় ব্যবসায়ীক পার্টনার করা উচিত না। অলিখিত ভাবে রাখা যেতে পারে কিন্তু সেটাও হতে হবে নিজের টোটাল নিয়ন্ত্রনে। যাই হোক, ক্রমাগত লস আর লসের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিলাম ফ্যাক্টরী নিয়ে। অনেকের কাছে লোন নিয়ে নিয়ে জর্জরিত হয়ে পড়ছিলাম। এটা যেনো কড়ই থেকে উনুনে পরার মতো অবস্থা আমার। কিন্তু অচীরেই বুঝতে পেরেছিলাম যে, সঠিক পার্টনার আর সঠিক রশদ না থাকলে বড় বড় কাজের জন্য নিজের মনোবল নিয়ে যুদ্ধ করা যায় না। মোহসীন সাহেবকে নিয়ে পার্টনারশিপে আমি প্রায় ব্যর্থ হয়েছিলাম। প্রায় ৩ বছর কোনো রকমে টেনে টুনে ফ্যাক্টরী চালানোর পর তাই এখান থেকে উত্তোরনের একটা এক্সিট প্ল্যান চিন্তা করছিলাম।
সময়কাল-২০০৮-২০১২
সময়টা ছিলো আমার জন্য একটা অগ্নি পরীক্ষা। কেনো বলছি কথাটা? দিন হোক আর রাত হোক, প্রাকৃতিক দূর্যোগ থাকুক আর নাইবা থাকুক, কোনো এক "লক্ষ্য"কে সফল করার জন্য যখন কেউ যাত্রা করে, আর যাত্রার পথে যখন সে কোন এক চৌরাস্তার মধ্যে এসে দাড়ায়, তখন লক্ষ্যের দিকে যেতে সে কোন রাস্তা বেছে নিবে সেটা নির্ভর করে রাস্তাটা সে চিনে কিনা বা তার ধারনা আছে কিনা। যদি জানা থাকে, তাহলে মুল লক্ষ্যে যেতে কোন অসুবিধা নাই, কিন্তু যদি সঠিক নিশানা জানা না থাকে, তাহলে তার ভুল রাস্তা বেছে নেবার কারনে তার মুল লক্ষ্য তো দূরের কথা ভুল রাস্তায় গিয়ে আরো কতই না বিড়ম্বনায় পরতে হয়, সেটা সে ঐ চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে কল্পনাও করতে পারে না। যে যাত্রার উদ্দেশ্য ছিলো মুল লক্ষ্যে পৌঁছানো, তখন আর তার সেই মুল জায়গায় পৌঁছানো হয়ত হয়ে উঠেই না, বরং এর পর থেকেই শুরু হয় প্রতিটি পদক্ষেপ ভুলে ভরা বিড়ম্বনা। আর সেখানে পৌছতেই যদি না পারা যায়, তাহলে সেইসব যাত্রার কোন মুল্য নাই। তাই চৌরাস্তায় এসে কোনটা নিজের মুল গন্তব্যের রাস্তা তা জানা খুবই প্রয়োজন। নিজের এই চৌরাস্তার সঠিক দিক না জানার কারনে চলার পথে অনেকের কাছেই হয়তো আপনি সঠিক নিশানার দিক জানতে চাইতেই পারেন, কিন্তু সবাই যে আপনাকে সঠিক নিশানা দিতে পারবেন এটাও সঠিক না। হতে পারে কিছু আনাড়ি অপরিপক্ক আর অনভিজ্ঞ জ্ঞানহীন মানুষ সর্বজান্তার মতো মনে মনে আন্দাজ করে আর বুদ্ধিদীপ্ত কালো মুখোশ নিয়ে জ্ঞান গম্ভীর বিবেচনায় আপনাকে একটা ভুল রাস্তার দিকে প্রবেশ করিয়ে দিল। তার তো কোনো ক্ষতি হলো না, কিন্তু তাকে আপনি বিশ্বাস করে আপনি যে ক্ষতির মুখে পতিত হলেন, সেটার মাশুল অনেক বড়। আপনি না জানার কারনে ইচ্ছেমতো আন্দাজ করে যদি ভুল রাস্তায়ও যেতেন আর যতোটা ক্ষতিগ্রস্থ হতেন, এসব বিবেকহীন মানুষের কারনে আপনি একই রকম ক্ষতিগ্রস্থ হবেন সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। তাই, কোন পথটা সঠিক আর কোন পথটা সঠিক নয়, এটা জানা অতীব জরুরী মুল লক্ষে পৌঁছানোর জন্য। এখানে আরো একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, আপনার গন্তব্যস্থানের দিক সঠিকভাবে দেখিয়ে দেয়ার জন্য যে সবসময় বয়স্ক আর বুদ্ধিজিবী মানুষেরই দরকার তা কিন্তু নয়, হতে পারে একটা আনাড়ি বাচ্চাও আপনাকে সঠিক দিকটা দেখিয়ে দিতে পারে যা কোনো বয়স্ক ব্যক্তি যার ঐ রাস্তা গুলির সঠিক গন্তব্য দিক সম্পর্কে কোনো ধারানা নাই।
এমনি এক ক্রান্তিলগ্ন পার করতে করতে আমি যখন খুব ক্লান্ত, তার একদিন কোনো এক সময় ছোট কিন্তু অনেক শক্ত সিদ্ধান্তে উতরে গেলাম জীবনের বড় একটা যুদ্ধে। যে দৃঢ়তা নিয়ে সামরীক জীবন থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছিলাম, এই ৫ বছরের প্যাকেজে মনে হলো, একটা শক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরী করতে পেরেছি। নিজের কাছে নিজেকে বেশ গর্বিত মনে হয়। মাঝে মাঝে মনে হতে পারে, "ঠিকানাটা ভুল, অথবা মানুষগুলি ভুল, কিন্তু ওই ঠিকানায় যারা থাকে হয়তো মানুষ গুলি ঠিক অথবা মানুষগুলি ভুল হলেও ঠিকানাটা ঠিক" এটাই ঘটে গেলো আমার জীবনে। ফ্যাক্টরী বিক্রি করার সিদ্ধান্তে ক্লায়েন্ট খুজতে খুজতে পেলাম মুর্তজা আর প্রিয়ান্থাকে। তারা যদিও ১০০% শেয়ার নেবার ক্ষমতা ছিলো কিন্তু লোকাল কারনে ৯০% শেয়ার কিনে বাকী ১০% শেয়ার আমার কাছে রেখে আমাকেও পার্টনারশিপে রাখলেন। গার্মেন্টস ব্যবসায় থাকতে চাইছিলাম না কিন্তু মুর্তজা আর প্রিয়ান্থার বারংবার অনুরোধে শেষ অবধি ১০% এর টাকা কম নিয়ে বাকি ৯০% শেয়ার মুর্তজা আর প্রিয়ান্থাকে ছেড়ে দিলাম। এই সময়ে বেসিক্যালী আমার এই ১০% শেয়ার ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। ফলে একটা নাজুক পরিস্থিতিতে ছিলাম আমি। একটা বিকল্প ব্যবসায়ীক ব্যবস্থা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছিলাম। এই লক্ষ্যে আমি কখনো ডেভেলোপারের, কখনো প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবসায়ও জড়িত হয়ে পড়েছিলাম। ২০০৮ সালে কদমতলিতে ৫ কাঠা জমিতে ডেভেলোপারের কাজ শুরু করি, কিন্তু অভিজ্ঞতা একটা ব্যাপার। খুব ধীর গতি আর ক্লায়েন্টের অভাবে মনে হচ্ছিলো এই ব্যবসাটা শুধু তাদের জন্য যাদের অঢেল আইডেল মানি আছে। কিন্তু আমি তো তেমন ব্যবসায়ী নই। আমার দরকার ফাষ্ট মানি। ২০১০ সালে ওয়ান টাইম প্লাষ্টিকও করেছিলাম। এই প্লাষ্টিক করতে গিয়ে ব্যংকে অনেক টাকা লোন নিতে হয়েছিলো। আমার সমন্ধীর ছেলে মুবীনের পাল্লায় পড়েছিলাম এবং সেই মোহসীনের মতো একই ভুলটা আমি এবারো করেছিলাম। বিনে পয়সায় মুবীনকে ১০% শেয়ার দিয়ে ফ্যাক্টরী চালানোর সুযোগ দিয়ে আবারো লস আর লসের দোড়গোরায় হাজির হলাম। আসলে আমি একটা ডিপ সাগরের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম নিজেকে কোথাও একটা স্থির জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে। কোনোটাই সাফল্য আনতে পারছিলাম না। রিভার সাইডে এমডি হিসাবেই বসি। আপাতত এটাই একটা বসার জায়গা আমার। মুর্তজা আর প্রিয়ান্থা একা একা ফ্যাক্টরির সমস্ত কিছু করেন। আমি লোকাল প্রশাসন দেখি। কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রিয়ান্থা ২০১১ সালে পরলোক গমন করলে আমরা (আমি আর মুর্তজা) প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ার দুজনে ২৫% আর ২০% করে কিনে নেই। এতে আমার ১০% শেয়ার থেকে বেড়ে ৩৫% আর মুর্তজার ৪৫% শেয়ার থেকে ৬৫% শেয়ার হলো। এবার আরো নজর দিয়ে কিছুটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করছিলাম। আল্লাহ আমার উপরে সব সময়ই সহায় ছিলেন। আসলে যার কেউ নাই, তার এক মাত্র সহায় আল্লাহ। আমার পরিবার আমার কোনো পরিস্থিতি আচ করতে পারে নাই, আমি আচ করতে দেইও নাই। কারন এতে ওরা আমাকে না সাহাজ্য করতে পারবে, উলটা দুশ্চিন্তায় থাকবে যেটা আমি চাই নাই। মুর্তজা ভাইকে নিয়ে আমরা ফ্যাক্টরীর আরো উন্নতির জন্য অনেক পদক্ষেপে কখনো রাশিয়া, কখনো চীন আবার কখনো অন্যত্র খোজ করতে করতে ডায়েরীটাই আর লেখা হয়ে উঠে নাই।
সময়কাল-২০১৩-২০১৭
জীবনে সাফল্য পেতে হলে অন্য কারো সহানুভুতির চেয়ে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস অনেক জোড়ালো থাকা অত্যাবশ্যকীয়। কঠিন পরিশ্রম যদি হয় কোনো সাফল্যের মূলশক্তি, নিজের আত্মবিশ্বাস হলো সেই শক্তির মুলচালিকা উপাদান। অতীতে কি হয়েছে, কি কারনে কি ব্যর্থ হয়েছে, কি করলে কি হতে পারতো এসব বিস্লেশন করা আবশ্যক বটে, তবে তা একটি শিক্ষা হিসাবে ভবিষ্যতে কাজে লাগিয়ে সাফল্যের সকাল দেখতে হবে। একটা ব্যর্থতাই জীবনের সবকিছু নয়। যার জীবনে ব্যর্থতা নাই, তিনি সাফল্য পেলে কি অনুভুতি হয় তা বুঝতে পারবেন না। এইজন্য, প্রতিটি কাজে নিজের বিবেচনা খাটাতে হয়। স্বপ্ন সার্থক হবার পিছনে যতো না ব্যর্থতা কাজ করে, তার অধিক ব্যর্থতা আনে যখন কোনো কিছু সন্দেহ নিয়ে কেউ কাজ করে। আমি আমার লক্ষে অবিচল ছিলাম। তাই গুটি গুটি পা ফেলে ফেলে আজ আমি এমন এক জায়গায় এসে হাজির হয়েছি, যেখানে সেই ২০০৫ সালের পর যে অনিশ্চয়তাটা ফিল করেছিলাম, সেটা আজ আর অনেক করে মনে পড়ে না।
এই লম্বা সময়ের মধ্যে আমিও জীবন থেকে অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি, অতি আপনজনও যখন তাদের সার্থে ঘা লাগে, তারা আপনাকে ছেড়ে কথা বলবে না, যখন আপনি এমন এক দোষে দোষী হবেন যা হয়তো এড়ানো যেতো, সেখানেও কেউ আপনাকে ছাড় দিতে নারাজ। কিন্তু আপনার জস, প্রতিপত্তি ছাড়তে নারাজ। এই সময় আমি আরো একটা প্রখর বাস্তবতা উপলব্ধি করেছি যে, এই পৃথিবীতে সবাই একা, হোক কেউ যদি বলে আপনার জীবননাশের কারনে তারা বাচবে না, বা আপনি ছাড়া তাদের কেউ নাই ইত্যাদি, এসব একটা বইয়ের বা নাটকের ডায়ালগ। বাস্তব হচ্ছে, সবাই একা। এই একা জীবনে সবার যা করা উচিত তা হচ্ছে, নিজের জন্য অন্তত কিছু করা যা অসময়ে যখন আর কেউ পাশে থাকে না বা থাকবে না, তখন যেনো পঙ্গুত্ব বরন না করেন।
এই কতগুলি বছরে আরো কত কিছু মানুষকে বাস্তব উপলব্ধি দিয়ে এমন কিছু শিক্ষা দিয়ে গেলো যে, বাস্তবতা মানুষ গ্রহন করুক বা না করুক, এই বাস্তবতা মানুষকে অনেক ম্যাচিউরড করে দেয় আর দেয় শিক্ষ। কেউ শিক্ষা নেয়, কেউ নেয় না। ২০১৬ সাল আমাকে বুঝিয়েছে প্রেম আর মহব্বত। ২০১৭ সাল শিখিয়েছে আমার সুস্থতা। শরীর খারাপ হয়ে গেলে কতগুলি মুহুর্ত অকালে ঝরে যায়, সেটাও বুঝেছি এই পাচ বছরের মাঝের একটা বছরে যখন আমার অপারেশন হয়। দিন আর রাতের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে বুঝেছি, কোনোটাই আমার নয়।
কিছু কিছু সময় আছে, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না বুঝেই। তেমন ভুল সিদ্ধান্তও আমি নিয়েছি। কিন্তু সেসব ভুল সিদ্ধান্ত আমার কারনে হয়নি। মানুষ চিনতে ভুল হলে কোনো কোনো মানুষকে নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত চলে আসে। তবে আমি আশাবাদি মানুষ, ভুলের পরেই আবার হয়তো এমন কিছু আশীর্বাদের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে যা আমি নিজেও ভাবি নাই কিন্তু ঘটে। উম্মিকার ব্যাপারে আমি এই বছরে মারাত্তক একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। অভিজ্ঞতা ছিলো না, তাই ব্যাপারটা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষন না করেই বাহ্যিক আচরন দেখেই এক তরফা বিবেচনায় উম্মিকাকে রানার সাথে বিয়ে দিয়েছিলাম। ওদের আশেপাশের, আত্তীয়সজনের কিংবা বন্ধু বান্ধব্দের কাছ থেকে কোনো প্রকার ফিডব্যাক না নিয়েই বিয়েতে রাজী হয়ে গিয়েছিলাম। আমার জীবনে এটা ছিলো মারাত্তক একটা ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত। উম্মিকার বিয়ের আগ থেকেই আমি যেহেতু একটা ব্যাপারে খুব সন্দিহান ছিলাম যে, আমার অনুপস্থিতিতে আমার এই ব্যবসা বানিজ্য কার হাতে তুলে দেবো? প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কিছুতেই সাভাবিক হতে পারছিলাম না। যে কারনে এই ব্যবসায় জড়ানো, সেই দুশ্চিন্তাতেই আবার ফিরে এসেছিলাম। প্লাষ্টিক ইন্ডাসট্রি আমাকে ভালো কিছু দেখাতে পারেনি। প্রচন্ড চেষ্টা করছি কিন্তু সাথীরা বা পার্টনাররা আমাকে ততোটাই শক্ত করে পিছন থেকে টেনে ধরছে যে, আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়েও সামনে এগুতে পারছি না। মুবীন গেলো, মান্নান এলো, মান্নান গেলো সাকী এলো, রউফরা এল। এর মধ্যে উম্মিকার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো এবং ভেবেছিলাম এবার নিজের মানুষ এসেছে উম্মিকার হাজবেন্ড। ভেবেছিলাম উম্মিকার হাজবেন্ড হয়তো আমার এই ব্যবসাগুলি হাতে নিয়ে অন্তত তাদের জন্যে হলেও ভেবেচিন্তে সামলে রাখবে। কিন্তু এমন একটা অথর্ব ক্যারেক্টারের জামাই নির্বাচন করেছি উম্মিকার যে, সে নিজেই যেনো একটা প্রতিবন্ধী। অলস, কিন্তু লোক দেখানো ভাব কম নাই, নিজের কিছু নাই কিন্তু শশুড়ের সব চাই কিন্তু কোনো কাজ না করে। মেয়েকে বিয়ে করেছি এতেই যেনো সব কিছু করে ফেলেছি। ভালো লাগছে না আর ছেলেটাকে। ভালো লাগছে না পরিবারটাকেও। আমাদের পরিবারের সাথে কোনোদিক দিয়েই যেনো ম্যাচ করছে না। ছেলেটার চারিত্রিক বৈশিষ্ঠে এমন একটা ছলচাতুরীর ভাব লক্ষ্য করা গেছে যা আমাদের পরিবারের বিশেষ করে আমার এবং আমার ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত রিস্ক মনে হলো। সে অনেকটা আমাদের পরিবারের সমস্থ ফেসিলিটি ভোগ করবে অথচ আমাদের পরিবারকে অউন করবে না এমন একটা লক্ষন। শেষ পর্যন্ত উম্মিকার জীবনটাই না আবার নষ্ট হয় এই রকম একটা দুশ্চিন্তায় আছি।
এ যাবত যতো বড় বড় ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে, তাঁর উল্লেখযোগ্য ঘটনার বেশীরভাগ যেনো এই পাচটি বছরের প্যাকেজে। কখনো প্রকাশ্যে, আবার কখনো অপ্রকাশ্যে। এই সময়টায় আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু ব্যর্থতাও দেখেছি, আবার আমি আমার ব্যক্তিগত সাফল্যও পেয়েছি। সন্তানদের কিছু ব্যর্থতা দেখেছি, আবার তাদের অনেক বড় সাফল্যও দেখেছি। তেমনি দেখেছি পরিবারের কিছু ভুল বা ভুল সিদ্ধান্ত আবার পেয়েছি এমনসব সস্তি যা আমার জীবনে এনে দিয়েছে শান্তি। অনেক প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছি, কোনো প্রোজেক্ট ব্যবসায়ী, আবার কোনো প্রোজেক্ট শুধু মানুষ। ব্যবসায়ী প্রোজেক্ট যতোটা সাফল্য আসে, শুধু মানুষ-প্রোজেক্ট ততোটা সাফল্য আসে না। তবে যে সাফল্য নিতে চায়, তাঁর সাফল্য তাঁর অজান্তেই আসে, আমি শুধু একটা উছিলা মাত্র। এমনি কিছু নামবিহিন মানুষ উঠে এসছে আমার লেখায়। তারা কালপনিক নয়। শুধু নামটাই হয়তো কাল্পনিক।
অরুন্ধুতি, মাধুরী, হ্যাপি কিংবা মনিকা বা আখী আসলে বাস্তবে কেউ আছে কি নাই সে প্রসঙ্গে না যাওয়াই ভালো। তবে হ্যাপি একটা মানুষের নাম। আখী একটা চরিত্রের নাম। জ্যোৎস্না যেখানে আকাশকে আলোকিত করে, তেমনি মাঝে মাঝে মানুষের জীবনকেও আলোকিত করে। হ্যাপিরা নিজে হ্যাপি না হলেও হ্যাপি হ্যাপিই থাকে। আখী আখীর জায়গাতেই থাকে। শুধু পরিবর্তন হয় অরুন্ধুতির। কারন সে থাকে চাদের একেবারে নিকটে। এই অরুন্ধুতি কখনো কখনো চাঁদ থেকে ছিটকে যেতে চাইলেও আবার সে তার গন্ডিতেই ফিরে আসে। কারন, অরুন্ধুতি নামটাই এসেছে এই চাদের কারনে। তার যাওয়ার অনেক জায়গা আছে, বড় পরিবেশে কিংবা আরো বড় মহাকাশে। কিন্তু সেখানে তার অবস্থান কি হবে এটা না জেনেই অরুন্ধুতিরা মাঝে মাঝে তাদের কহহপথ হারিয়ে ফেলে। চাদের মহব্বতে হয়তো আবার অরুন্ধুতিরা সেই চাদের কক্ষপথেই আবার ফিরে আসে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, চাদকে অতিক্রম করে আবার অরুন্ধুতিরা হারিয়ে যাবে না। এর জন্য চাঁদ ও সব সময় তৈরী ই থাকে। আর এর বড় কারন, চাঁদ অরুন্ধুতির উপর নির্ভরশীল নয়, যেমন নির্ভরশীল অরুন্ধুতি চাদের উপর।
আমাদের অনেকের লাইফের সাথে যারা জড়িত, তারা অনেকেই বড় লেবেলের ভালো মানুষ হিসাবে পরিগনিত হলেও জীবনের সিদ্ধান্তে অনেক কনফিউজড, এমন মানুষের সাথেও আমার পরিচয় হয়েছে। তাদের অনেক সিদ্ধান্ত এমনভাবে ভুল প্রমানিত হয়েছে যে, তারা ভবিষ্যত দেখে না, তারা দেখে দিনের শেষে মাত্র সন্ধ্যার চাদ, কিন্তু এক ঋতুর পর আরেক ঋতুতে কি হতে পারে তারা সে খবর জানে না বলেই অনেক হোমওয়ার্ক তাদের হাতে থাকে না। এসব লোকেদের চেনার জন্য আমার বেশ অভিজ্ঞতাও হয়েছে। ঠকেছি কিন্তু আবার ঠকি নাই কারন তারা আমাকে অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে। এই ৫ বছরের প্যাকেজে আমি অনেক আপন জন হারিয়ে ফেলেছি। তারা হয়তো এই পৃথিবীর মধ্যে আর কোনো কাউন্টেবল দ্রব্যের মধ্যে পড়ে না। তারা ধীরে ধীরে মানুষের বলয় থেকে চিরতরে মুছে যাবেন, এটা শুধু কিছু সময়ের জন্য হয়তো এখনো নামের মধ্যেই বেচে থাকবেন। এই ৫ বছরের প্যাকেজে সবচেয়ে কঠিন করে যে উপলব্ধিটা আমি জেনেছি, তা হচ্ছে, জীবন আসলেই ক্ষনস্থায়ী। এর পার্থিব কোনো মুল্য নাই। যাদের জীবন অনেক দামি তারাও যেমন, আর যাদের জীবন মুল্যহীন, তারাও সেই সব দামী মানুষের মতোই ক্ষনস্থায়ী। এটা বুঝবার জন্য কোনো রকেট সায়েন্স লাগে না, লাগে শুধু বয়স আর অভিজ্ঞতা। সবার শেষে গন্তব্য একটাই-আর সেটা হচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। এই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মধ্যে গরীব আর ধনীর পার্থক্য হচ্ছে শুধু কিছুটা সময়। কারো বেশী সময় এই পৃথিবীর মানুষ মনে রাখে আর কাউকে যেদিন সে চলে যায় তার পক্ষকাল পরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু সবাই নিশ্চিহ্ন হবেই।
এই ৫ বছরের প্যাকেজে আরো একটা জ্ঞান আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়েছে যে, সমাজ রোগে ভোগে না, ভোগে হতাশায়। আর সমাজের এই হতাশা থেকে জন্ম নেয় সামাজিক রোগের যার নাম অপরাধ, লোভ, পাপ আর অনৈতিকতা। সমাজে যখন এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে, তখন সমাজের প্রতিটি মানুষ তার আসল চরিত্র হারিয়ে ফেলে। তখন যেটা হয়, ভালোবাসা, মহব্বত, আদর, মায়া সব হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়া জিনিষগুলি যখন আর ফিরে আসে না, তখন শুরু হয় নির্যাতন আর নির্যাতিত সমাজ তার প্রতিটি উপাদানকে বিষাক্ত করে তোলে। তখন এই উপাদান গুলির আসল চরিত্র আর বুঝা যায় না। কালোকে আর কালো মনে হয় না, সাদাকে আর সাদা মনে হয় না। জোড়া লাগা আর জট পাকা এক জিনিষ নয়। এই নির্যাতিত সমাজে যা হয় তা জোড়া লাগা নয়, সব কিছুতেই তখন জট পাকে। আর জট পাকা সমাজে কোনো কিছুই সাভাবিক নয়। তখন জীবনের নাটকে সব চরিত্রের স্ক্রীপ্ট তখন আর এক থাকে না।
এই ৫বছরের প্যাকেজে আরো একটা জিনিষ খুব ভালো করে উপলব্ধি করেছি যে, ফ্রড লোকের যেমন কোনো ক্যারিয়ার হয় না তেমনি ফ্রড লোকের কোনো "যদি" থাকে না। তারা এইটা কখনোই আর বলতে পারে না যে, "যদি" এইটা না করে ওইটা করতাম, কিংবা "যদি" ওইটা না করে ওইটা করা হতো, তাহলে হয়তো সাফল্য আসতো। কিন্তু তাদের সেই সাফল্য কোনোভাবে এলেও এই বাস্তব জীবনের নাটকের শেষ অংকটা একটাই। গারদের ভিতর বসবাস। কখনো কখনো এই গারদ দেখা যায়, কখনো কখনো আবার এই গারদ নিজের ভিতরেই। এই ৫ বছরের প্যাকেজে আমার আরো কিছু অভিজ্ঞতা বেড়েছে। কারন বয়সটা ঠিক সেই পর্যায়ের যেখানে আমি এখন শুধু উপদেশ গ্রহীতাই না, উপদেশ দাতার বয়সেও দাঁড়িয়ে ছিলাম। ফলে একটা অনুভুতি আমার কাছে মনে হয়েছে যে, প্রকৃতির কাছে মৃত্যু এবং জীবন এই দুই এর মধ্যে কোনো তফাত নাই। ফলে মৃত্যুর বেদনা অথবা জীবনের উচ্ছাসের আবেগ প্রকৃতিকে একটুও বিচলিত কিংবা ব্যতিব্যস্ত করে তোলে না। তার কাছে চলমান পিপড়া কিংবা উড়ন্ত পাখী যেমন খেয়ালি,তেমনি স্তুপীকৃত কাঠ আর সবুজ জংগলও তেমনি খেয়ালি। তার কাছে সদ্য জন্ম নেয়া নবজাতকের প্রস্থান কিংবা রোগাকীর্ন শতবর্ষী বৃদ্ধ্যের বেচে থাকার মধ্যেও কোনো অমুলক যুক্তির সৃষ্টি করে না। আমরা যারা কিছুটা বিবেকবান মনে করে এই পৃথিবীর রুপ, সৌন্দর্য, সম্পদ আর সম্পর্ক নিয়ে আবেগিত থাকি তারাই হয়ত মৃত্যুকে বিচ্ছেদ ভেবে সাময়িক অচল হয়ে মন খারাপ করি। তবে যারা বিধাতাকে মানেন, তার উপর শতভাগ নির্ভর করেন, তাদের এই বিচ্ছেদ একটা সাময়িক রুপান্তর মনে করে কিছুটা হলেও আরামবোধ করেন।
সময়কাল-২০১৮-২০২২
জীবনে সাফল্য পেতে হলে অন্য কারো সহানুভুতির চেয়ে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস অনেক জোড়ালো থাকা অত্যাবশ্যকীয়। কঠিন পরিশ্রম যদি হয় কোনো সাফল্যের মূলশক্তি, নিজের আত্মবিশ্বাস হলো সেই শক্তির মুলচালিকা উপাদান। অতীতে কি হয়েছে, কি কারনে কি ব্যর্থ হয়েছে, কি করলে কি হতে পারতো এসব বিস্লেশন করা আবশ্যক বটে, তবে তা একটি শিক্ষা হিসাবে ভবিষ্যতে কাজে লাগিয়ে সাফল্যের সকাল দেখতে হবে। একটা ব্যর্থতাই জীবনের সবকিছু নয়। যার জীবনে ব্যর্থতা নাই, তিনি সাফল্য পেলে কি অনুভুতি হয় তা বুঝতে পারবেন না। এইজন্য, প্রতিটি কাজে নিজের বিবেচনা খাটাতে হয়। স্বপ্ন সার্থক হবার পিছনে যতো না ব্যর্থতা কাজ করে, তার অধিক ব্যর্থতা আনে যখন কোনো কিছু সন্দেহ নিয়ে কেউ কাজ করে। আমি আমার লক্ষে অবিচল ছিলাম। তাই গুটি গুটি পা ফেলে ফেলে আজ আমি এমন এক জায়গায় এসে হাজির হয়েছি, যেখানে সেই ২০০৫ সালের পর যে অনিশ্চয়তাটা ফিল করেছিলাম, সেটা আজ আর অনেক করে মনে পড়ে না।
এই লম্বা সময়ের মধ্যে আমিও জীবন থেকে অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি, অতি আপনজনও যখন তাদের সার্থে ঘা লাগে, তারা আপনাকে ছেড়ে কথা বলবে না, যখন আপনি এমন এক দোষে দোষী হবেন যা হয়তো এড়ানো যেতো, সেখানেও কেউ আপনাকে ছাড় দিতে নারাজ। কিন্তু আপনার জস, প্রতিপত্তি ছাড়তে নারাজ। এই সময় আমি আরো একটা প্রখর বাস্তবতা উপলব্ধি করেছি যে, এই পৃথিবীতে সবাই একা, হোক কেউ যদি বলে আপনার জীবননাশের কারনে তারা বাচবে না, বা আপনি ছাড়া তাদের কেউ নাই ইত্যাদি, এসব একটা বইয়ের বা নাটকের ডায়ালগ। বাস্তব হচ্ছে, সবাই একা। এই একা জীবনে সবার যা করা উচিত তা হচ্ছে, নিজের জন্য অন্তত কিছু করা যা অসময়ে যখন আর কেউ পাশে থাকে না বা থাকবে না, তখন যেনো পঙ্গুত্ব বরন না করেন। এই কতগুলি বছরে আরো কত কিছু মানুষকে বাস্তব উপলব্ধি দিয়ে এমন কিছু শিক্ষা দিয়ে গেলো যে, মহামারী মানুষের জন্য শুধু অপকারই না, এটা মানুষকে মানুষের নিজের অবস্থান বুঝতে সাহাজ্যও করে। কেউ শিক্ষা নেয়, কেউ নেয় না। অর্থনীতি কি জিনিষ এই ২০২০ সাল মানুষকে বুঝিয়েছে। আর ১৬ সাল আমাকে বুঝিয়েছে প্রেম আর মহব্বত। মাঝে শরীর খারাপ হয়ে গেলে কতগুলি মুহুর্ত অকালে ঝরে যায়, সেটাও বুঝেছি এই পাচ বছরের মাঝের একটা বছরে যখন আমার অপারেশন হয়। দিন আর রাতের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে বুঝেছি, কোনোটাই আমার নয়। কিছু কিছু সময় আছে, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না বুঝেই। তেমন ভুল সিদ্ধান্তও আমি নিয়েছি। কিন্তু সেসব ভুল সিদ্ধান্ত আমার কারনে হয়নি। মানুষ চিনতে ভুল হলে কোনো কোনো মানুষকে নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত চলে আসে। তবে আমি আশাবাদি মানুষ, ভুলের পরেই আবার হয়তো এমন কিছু আশীর্বাদের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে যা আমি নিজেও ভাবি নাই কিন্তু ঘটে।
এ যাবত যতো বড় বড় ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে, তাঁর উল্লেখযোগ্য ঘটনার বেশীরভাগ যেনো এই পাচটি বছরের প্যাকেজে। কখনো প্রকাশ্যে, আবার কখনো অপ্রকাশ্যে। এই সময়টায় আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু ব্যর্থতাও দেখেছি, আবার আমি আমার ব্যক্তিগত সাফল্যও পেয়েছি। সন্তানদের কিছু ব্যর্থতা দেখেছি, আবার তাদের অনেক বড় সাফল্যও দেখেছি। তেমনি দেখেছি পরিবারের কিছু ভুল বা ভুল সিদ্ধান্ত আবার পেয়েছি এমনসব সস্তি যা আমার জীবনে এনে দিয়েছে শান্তি। অনেক প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছি, কোনো প্রোজেক্ট ব্যবসায়ী, আবার কোনো প্রোজেক্ট শুধু মানুষ। ব্যবসায়ী প্রোজেক্ট যতোটা সাফল্য আসে, শুধু মানুষ-প্রোজেক্ট ততোটা সাফল্য আসে না। তবে যে সাফল্য নিতে চায়, তাঁর সাফল্য তাঁর অজান্তেই আসে, আমি শুধু একটা উছিলা মাত্র। এমনি কিছু নামবিহিন মানুষ উঠে এসছে আমার লেখায়। তারা কালপনিক নয়। শুধু নামটাই হয়তো কাল্পনিক।
অরুন্ধুতি, মাধুরী, হ্যাপি কিংবা মনিকা বা আখী আসলে বাস্তবে কেউ আছে কি নাই সে প্রসঙ্গে না যাওয়াই ভালো। তবে হ্যাপি একটা মানুষের নাম। আখী একটা চরিত্রের নাম। জ্যোৎস্না যেখানে আকাশকে আলোকিত করে, তেমনি মাঝে মাঝে মানুষের জীবনকেও আলোকিত করে। হ্যাপিরা নিজে হ্যাপি না হলেও হ্যাপি হ্যাপিই থাকে। আখী আখীর জায়গাতেই থাকে। শুধু পরিবর্তন হয় অরুন্ধুতির। কারন সে থাকে চাদের একেবারে নিকটে। এই অরুন্ধুতি কখনো কখনো চাঁদ থেকে ছিটকে যেতে চাইলেও আবার সে তার গন্ডিতেই ফিরে আসে। কারন, অরুন্ধুতি নামটাই এসেছে এই চাদের কারনে। তার যাওয়ার অনেক জায়গা আছে, বড় পরিবেশে কিংবা আরো বড় মহাকাশে। কিন্তু সেখানে তার অবস্থান কি হবে এটা না জেনেই অরুন্ধুতিরা মাঝে মাঝে তাদের কক্ষপথ হারিয়ে ফেলে। চাদের মহব্বতে হয়তো আবার অরুন্ধুতিরা সেই চাদের কক্ষপথেই আবার ফিরে আসে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, চাদকে অতিক্রম করে আবার অরুন্ধুতিরা হারিয়ে যাবে না। এর জন্য চাঁদও সব সময় তৈরী ই থাকে। আর এর বড় কারন, চাঁদ অরুন্ধুতির উপর নির্ভরশীল নয়, যেমন নির্ভরশীল অরুন্ধুতি চাদের উপর।
আমাদের অনেকের লাইফের সাথে যারা জড়িত, তারা অনেকেই বড় লেবেলের ভালো মানুষ হিসাবে পরিগনিত হলেও জীবনের সিদ্ধান্তে অনেক কনফিউজড, এমন মানুষের সাথেও আমার পরিচয় হয়েছে। তাদের অনেক সিদ্ধান্ত এমনভাবে ভুল প্রমানিত হয়েছে যে, তারা ভবিষ্যত দেখে না, তারা দেখে দিনের শেষে মাত্র সন্ধ্যার চাদ, কিন্তু এক ঋতুর পর আরেক ঋতুতে কি হতে পারে তারা সে খবর জানে না বলেই অনেক হোমওয়ার্ক তাদের হাতে থাকে না। এসব লোকেদের চেনার জন্য আমার বেশ অভিজ্ঞতাও হয়েছে। ঠকেছি কিন্তু আবার ঠকি নাই কারন তারা আমাকে অভিজ্ঞতার ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে।
এই ৫ বছরের প্যাকেজে আমি অনেক আপন জন হারিয়ে ফেলেছি। তারা হয়তো এই পৃথিবীর মধ্যে আর কোনো কাউন্টেবল দ্রব্যের মধ্যে পড়ে না। তারা ধীরে ধীরে মানুষের বলয় থেকে চিরতরে মুছে যাবেন, এটা শুধু কিছু সময়ের জন্য হয়তো এখনো নামের মধ্যেই বেচে থাকবেন। এই ৫ বছরের প্যাকেজে সবচেয়ে কঠিন করে যে উপলব্ধিটা আমি জেনেছি, তা হচ্ছে, জীবন আসলেই ক্ষনস্থায়ী। এর পার্থিব কোনো মুল্য নাই। যাদের জীবন অনেক দামি তারাও যেমন, আর যাদের জীবন মুল্যহীন, তারাও সেই সব দামী মানুষের মতোই ক্ষন স্থায়ী। এটা বুঝবার জন্য কোনো রকেট সায়েন্স লাগে না, লাগে শুধু বয়স আর অভিজ্ঞতা। সবার শেষে গন্তব্য একটাই- আর সেটা হচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। এই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মধ্যে গরীব আর ধনীর পার্থক্য হচ্ছে শুধু কিছুটা সময়। কারো বেশী সময় এই পৃথিবীর মানুষ মনে রাখে আর কাউকে যেদিন সে চলে যায় তার পক্ষকাল পরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু সবাই নিশ্চিহ্ন হবেই।
এই ৫ বছরের প্যাকেজে আরো একটা জ্ঞান আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়েছে যে, সমাজ রোগে ভোগে না, ভোগে হতাশায়। আর সমাজের এই হতাশা থেকে জন্ম নেয় সামাজিক রোগের যার নাম অপরাধ, লোভ, পাপ আর অনৈতিকতা। সমাজে যখন এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে, তখন সমাজের প্রতিটি মানুষ তার আসল চরিত্র হারিয়ে ফেলে। তখন যেটা হয়, ভালোবাসা, মহব্বত, আদর, মায়া সব হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়া জিনিষ গুলি যখন আর ফিরে আসে না, তখন শুরু হয় নির্যাতন আর নির্যাতিত সমাজ তার প্রতিটি উপাদানকে বিষাক্ত করে তোলে। তখন এই উপাদান গুলির আসল চরিত্র আর বুঝা যায় না। কালোকে আর কালো মনে হয় না, সাদাকে আর সাদা মনে হয় না। জোড়া লাগা আর জট পাকা এক জিনিষ নয়। এই নির্যাতিত সমাজে যা হয় তা জোড়া লাগা নয়, সব কিছুতেই তখন জট পাকে। আর জট পাকা সমাজে কোনো কিছুই সাভাবিক নয়। তখন জীবনের নাটকে সব চরিত্রের স্ক্রীপ্ট তখন আর এক থাকে না।
এই ৫বছরের প্যাকেজে আরো একটা জিনিষ খুব ভালো করে উপলব্ধি করেছি যে, ফ্রড লোকের যেমন কোনো ক্যারিয়ার হয় না তেমনি ফ্রড লোকের কোনো "যদি" থাকে না। তারা এইটা কখনোই আর বলতে পারে না যে, "যদি" এইটা না করে ওইটা করতাম, কিংবা "যদি" ওইটা না করে ওইটা করা হতো, তাহলে হয়তো সাফল্য আসতো। কিন্তু তাদের সেই সাফল্য কোনোভাবে এলেও এই বাস্তব জীবনের নাটকের শেষ অংকটা একটাই। গারদের ভিতর বসবাস। কখনো কখনো এই গারদ দেখা যায়, কখনো কখনো আবার এই গারদ নিজের ভিতরেই।
এই ৫ বছরের প্যাকেজে আমার আরো কিছু অভিজ্ঞতা বেড়েছে। কারন বয়সটা ঠিক সেই পর্যায়ের যেখানে আমি এখন শুধু উপদেশ গ্রহীতাই না, উপদেশ দাতার বয়সেও দাঁড়িয়েছিলাম। ফলে একটা অনুভুতি আমার কাছে মনে হয়েছে যে, প্রকৃতির কাছে মৃত্যু এবং জীবন এই দুই এর মধ্যে কোনো তফাত নাই। ফলে মৃত্যুর বেদনা অথবা জীবনের উচ্ছাসের আবেগ প্রকৃতিকে একটুও বিচলিত কিংবা ব্যতিব্যস্ত করে তোলে না। তার কাছে চলমান পিপড়া কিংবা উড়ন্ত পাখী যেমন খেয়ালি,তেমনি স্তুপীকৃত কাঠ আর সবুজ জংগলও তেমনি খেয়ালি। তার কাছে সদ্য জন্ম নেয়া নবজাতকের প্রস্থান কিংবা রোগাকীর্ন শতবর্ষী বৃদ্ধ্যের বেচে থাকার মধ্যেও কোনো অমুলক যুক্তির সৃষ্টি করে না। আমরা যারা কিছুটা বিবেকবান মনে করে এই পৃথিবীর রুপ, সৌন্দর্য, সম্পদ আর সম্পর্ক নিয়ে আবেগিত থাকি তারাই হয়ত মৃত্যুকে বিচ্ছেদ ভেবে সাময়িক অচল হয়ে মন খারাপ করি। তবে যারা বিধাতাকে মানেন, তার উপর শতভাগ নির্ভর করেন, তাদের এই বিচ্ছেদ একটা সাময়িক রুপান্তর মনে করে কিছুটা হলেও আরামবোধ করেন।
যদি বৈষয়িক দিক থেকে কথা বলি, এই পাঁচ বছরের প্যাকেজে সম্ভবত আমার জীবনে সবদিক থেকেই চরম মোড় নেয়া শুরু করেছিলো। জীবনের দর্শন, জীবনের চাওয়া পাওয়ার ডেবিট ক্রেডিট, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নতুন বন্ধুত্ব, পুরানো রিলেশনশীপের ইতিটানা, কিংবা আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সব কিছুতে গুরুতর একটা মোড় নিচ্ছিলো। ৫৫ বছরের একটা মানুষের জীবনে এই সময় এসে অনেক হিসাব নিকাশের ব্যাপার যেনো চোখের সামনে এসে এটাই বলে যায়, সময় দ্রুত ফুড়িয়ে যাচ্ছে, হয়তো খুব বেশী সময় ধরে আর এখানে থাকার অবকাশ নাই। জীবনে যা করার করেছো, এখন গুছিয়ে নাও। আজীবন যখন আমরা শুধু বলেই এসছি, “একদিন” আমি আনন্দ করবো, সেই “একদিন” আমি আমার মতো করে দিন কাটাবো। এই “একদিন” “একদিন” করেই যেনো পেড়িয়ে যাচ্ছে সবগুলি দিন। “একদিন”টা যেনো নাগালেই আসছে না। মেয়েরা বড় হয়ে গেছে, ওদের নিয়ে আর আগের মত ছেলেমিপনা ভাবনা চলে না। এখন ভাবনা ওদের নিয়ে পুরুপুরি বৈষয়িক। বড় মেয়ে উম্মিকা ডাক্তারী পাশ করে ফেলেছে। ছোট মেয়ে দেশের বাইরে পড়াশুনার জন্য ইতিমধ্যে ভর্তি হয়ে গেছে। আমার ব্যবসা অন্য সব সময়ের থেকে এখন অনেক সাবলম্বি। কিছু ব্যবসায় ব্যর্থতায় পরিনত হয়েছে আবার নতুন কিছু ব্যবসা যোগও হয়েছে। ডেবিট আর ক্রেডিট ব্যালেন্স হিসাব করলে পজিটিভ দিকেই আছি হয়তো। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অন্য সব বছরের মতো আর দুশ্চিন্তায় পড়তে হচ্ছে না। তারপরেও দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। এই দুশ্চিন্তার একটা দিক হলো, দুশ্চিন্তারাও আমাদের মতো বড় হয়। এদেরও শিশুকাল, যৌবনকাল থাকে। আমাদের সাথে সাথে ওরাও বেড়ে উঠে। এরা অলক্ষ্যে থাকে, আবার অলক্ষ্যেই বেড়ে উঠে। মজার ব্যাপার হলো-দুনিয়ার ক্যালেন্ডার সব বছরে এক থাকলেও তার ইভেন্ট সমুহ কখনোই একে অপরের সাথে মিলে না। সপ্তাহের সাত দিনের নাম এক থাকলেও কোনো রবিবার কিংবা কোনো সোমবার কখনোই অন্য আরেকটি রবিবার কিংবা সোমবারের মতো নয়। অনেক অঘটন, অনেক সুখবর, অনেক মৃত্যু সংবাদে ভরপুর ছিলো এই প্যাকেজের প্রতিটিক্ষন।
উম্মিকার জীবনে একটা মারাত্তক দাগ পড়ে গেছে আমার একটা ভুল সিদ্ধান্তে। মেয়েটি সহজ সরল, আমার মতো। তাই কিছু হায়েনার মতো লোভী পরিবার আমাকে আর আমার পরিবারকে কোথা থেকে সন্নাসীর মতো রুপ ধরে হায়েনার মতো আচরন করে গেছে। ভুল ছিলো, কিন্তু শোধরে নিয়েছি। আর এই সংশোধন আমাকে আমার বড় মেয়ের কাছেও মাঝে মাঝে অপরাধী করে তোলে। নিশ্চয়ই উম্মিকার জীবন আরো সুন্দর হবে। অনেক আপনজনেরা যারা আমাদের মাঝে ছিলো, কোনো অগ্রীম সংবাদ ছাড়াই তারা অনেকেই ওপারে চলে গেছেন। বদি ভাই, নূরজাহান আপা, নাসির দুলাভাই, ছোট ভাবী, বড় ভাবী, দুদু ভাই, সেফালীর স্বামী এ রকম অনেক আপনজন আমাদের থেকে চিরতরে চলে গেছেন। অথচ ওরাও ভাবে নাই ওদেরকে এতো তারাতাড়ি সব চুকিয়ে চলে যেতে হবে।
এই সব মানুষের কথা বারবার মনে হলে, খালী মৃত্যুভয় কাজ করে। কেনো জানি মনে হয়, খুব বেশী সময় যেনো আমারো নাই। তাই, আমি হোমওয়ার্ক করে ধীরে ধীরে সব গুটিয়ে একটা জায়গায় আনতে চাচ্ছি যাতে আমার অবর্তমানে আমার পরিবার কোনো অবস্থাতেই অসচ্ছল অবস্থায় না থাকে। জীবনের অনেক হিসাব পালটে ফেলার চেষ্টা করছি। সবকিছু আমার নয়, আর আমার সবকাজ শেষ করতে পারবো এটারো কোনো গ্যারান্টি আমার কাছে নাই। হাজার একর জমি চাষের উপযোগী করতে গিয়ে কোনো বীজই যখন আর লাগানো শেষ হয় না, তার থেকে সীমিত কিছু জমিতে ফসল লাগিয়ে তার থেকে উতপাদিত ফসলের আনন্দই যেনো এখন মুল চিন্তা হয়ে দাড়িয়েছে আমার। মায়ের কথা মনে পড়ে, বাবার কথা মনে পড়ে। ওনারাও একদিন এমন করেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কিন্তু আমাদেরকে নিয়েও তাদের দুশ্চিন্তার কোনো শেষ ছিলো না।
পুরু দুনিয়া এই সময়ে একটা ধাক্কা খেলো করোনার মতো মহামারীর কবলে। অনেক শুনেছি মহামারী সম্পর্কে, শুনেছি কিভাবে পৃথিবী আমুল পরিবর্তন হয় কোনো এক মহামারীর কবলে। এই কভিড-১৯ যেনো পৃথিবীর মানুষকে একটা চরম শিক্ষা দিয়ে গেলো-“কেউ কারো নয়। যার যার জীবন তার তার। হোক সেটা সম্রাট কিংবা পথের ফকির”। এই মহামারী সবচেয়ে বেশী চিন্তিত করেছে আমাকে এইজন্য যে, আমার অনেক হোমওয়ার্ক বাকী। যে কাজগুলি অসম্ভব জরুরী, আমি এখন সেইসব কাজগুলি নিয়েই যেনো ব্যস্ত। নতুন ব্যবসা আমাকে এখন আর টানে না, ক্ষমতা আমাকে আর আপ্লুত করে না। নিজেকে বড্ড একা মনে হয়। এই একাকীত্ত আসলে সবার। নিজের ঘরেও আমাকে আজকাল একাই মনে হয়।
অন্তরে অনেক দয়া, মায়া, ভালোবাসা, পার্থিব জীবনের প্রতি লোভ আর অনেককাল বেচে থাকার প্রবল ইচ্ছা যেনো আমাকে আলোড়িত করে আজকাল কিন্তু আমি জানি এই পৃথিবী কারো জন্যই না। এরপরেও এসেছে অনেকে আমার জীবনে। কেউ আবেগ নিয়ে, কেউ প্রেম নিয়ে, কেউ যাতনা নিয়ে, কেউ দুশ্চিন্তা নিয়ে। এমন কিছু মানুষও এসেছে যাদের জন্য আমার অনেক দায়িত্ত আছে কিন্তু প্রকাশ করবার ক্ষমতা বা পরিবেশ নাই। হয়তো ওরাই সবচেয়ে বেশী মিস করবে যখন আমি আর এখানে থাকবো না। তারপরেও আমি ওয়াদা করে যাচ্ছি- যতটুকু সময় আমি পাই, আমি তোমাদের সবার জন্য আমার ক্ষমতাবলে এই পৃথিবী তোমাদের জন্য বাসযোগ্য করে যাবো। এই পৃথিবীটা আসলেই অনেক সুন্দর। এর আকাশ সুন্দর, এর বাতাসের শিহরন সুন্দর, এর ঝড়ো হাওয়া সুন্দর, চৈত্রের খড়তাপ সুন্দর, তৃষ্ণার সময়ে জল সুন্দর, গাছের ছায়া সুন্দর, একা থাকাও অনেক সুন্দর। অথচ আমি জানি, আমি চলে যাবো এই সব ছেড়ে। আমি লক্ষ্য করেছি- এই সময়টায় আমার সব লেখাতে যেনো একটা প্রবল বেচে থাকার আকুতি, ভালোবাসার আকুতি কাজ করছে। সম্ভবত- এরই নাম জীবন সায়াহ্ন। কনিকা বিদেশে একটা ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাবে সেটায় আমি খুবই খুশী কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, এই যে মেয়েরা বেরিয়ে যাচ্ছে বাসা থেকে। বহুদুর। ওদের আর ফেরা হবে না। আবার কবে ওদেরকে নিয়ে এক সাথে খাওয়া হবে, আড্ডা দেয়া হবে কে জানে। আসলে এটাই জীবন। এক জীবনে কত কিছু পালটে যায় সময়ে স্রোতে। উম্মিকা বিসিএস দেয়ার চেষ্টা করছে। বরাবরের মতোই উম্মিকা সবসময়ই কনফিউজড থাকে পাসের ব্যাপারে। উম্মিকার এই কনফিউজড থাকাটাই ওকে আত্তনির্ভরশীল হয়ে উঠতে দিচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নিতে উম্মিকার অনেক কষ্ট হয়। এটাই ওর সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার। আমি ভাবছি, যদি উম্মিকার বিসিএস না হয়, তাহলে ওকেও বিদেশে পাঠিয়ে দেবো। তাহলে দুইবোন এক সাথে থাকতে পারবে। এর জন্য আমাকে একটা বড় ধরনের তহবিল আগে থেকেই তৈরী করে ফেলতে হবে।
আমার ধারনা, আমি এদেশে জমি জমা কোনো কিছুই রাখা ঠিক হবে না। মা ইন্ডাস্ট্রিজের জমিটা বিক্রি করতেই হবে। তাতে আমার বাকি সবগুলি ঝামেলা একবারেই শেষ হবে ইনশাল্লাহ। সিদ্ধান্তটা মুটামুটি চুড়ান্তই করে ফেলেছি যে, আমি মা ইন্ডাস্ট্রিজের রেকর্ডিয় জমিটা পুরুটাই বিক্রি করে দেবো। সমস্যা হচ্ছে মুর্তজা ভাই তার জমিটা একবার বেচতে চায়, আবার আরেকবার বেচতে চায় না। মুর্তজা ভাইয়ের প্রেক্ষাপটে হয়তো উনি ঠিকই আছেন কিন্তু আমার প্রেক্ষাপটটা একটু ভিন্ন। আমার দুই মেয়ে আল্টিমেটলী দেশে থাকবে না, আর থাকলেও ঐ মেয়ের জামাইরাই এইসব সম্পত্তি ভোগ করবে। তখন তারা এইসব সম্পত্তি আদৌ টিকিয়ে রাখবে কিনা আমি জানি না। তাই ভাবছি আমার সময়েই আমি এইসব সম্পত্তির একটা ফাইনাল বিহিত করতে হবে। আমার মাথার ভিতরের এই পরিকল্পনা কতটা জটিলতায় ভরে আছে, সেটা আমি ছাড়া আমার পরিবারের কেউ জানে না। ফলে আমার অনুপস্থিতি সব হোমওয়ার্কেই বাধাগ্রস্থ করবে। অপ্রকাশ্য মানুষগুলিও আমার অনুপস্থিতিতে এক মহা প্রলয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের নিজস্ব পৃথিবীর ধংশলীলা দেখতে হতে পারে। তাদেরকে নিয়েও আমি কম দুশ্চিন্তায় নই।
সময়কাল-২০২৩-২০২৭
এই সময়টায় আমার জীবনে অনেক রকমের অভিজ্ঞতা, তিক্ততা, হ্যাপিনেস, শিক্ষা যেনো একঝাক মৌমাছির মতো উড়ে এসেছিলো। ২০২১ গেছে আমার সবচেয়ে কষ্টের একটা বছর যখন আমার বড় মেয়েকে আমি অশুভ একটা পরিবার থেকে চিরতরে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। ধইর্জের চরম পরীক্ষা দিয়েছিলো আমার বড় মেয়ে। আবার সে বছরই আমার বড় মেয়ের জীবনে আরেকটা সাফল্য আমাকে অতীব খুশী করেছিলো যে, সে ডাক্তার হয়ে ঘরে ফিরেছে। ২০২১ ই আবার আমাকে ছাড়তে হয়েছে আমার ছোট মেয়েকে সেই সুদুর আমেরিকায়। আর্থিক কোনো অসচ্ছলতা ছিলো না। মাশআল্লাহ পরিকল্পনামাফিক সব কিছুর যোগান দেওয়ার সামর্থ ফিরে এসেছিলো। আর্থিক কোনো টানাপোড়েন নেই। মা ইন্ডাস্ট্রির যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেয়েছি। ব্যাংকের লোন থেকে মুক্ত হয়েছি। ছোত মেয়েকে এডভান্স টিউশন ফি সহ নতুন গাড়ি, নিজের বাসা ভাড়া এবং হাত খরচ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থে কোন প্রকার চাপ ফিল করিনি। রিভার সাইড ফ্যাক্টরীও মাশআল্লাহ ভালোভাবেই চলছে।
এই প্যাকেজের মধ্যে আমার পারিবারিক সাফল্যটা আলহামদুলিল্লাহ অনেক বেশী। বড় মেয়ের আবারো বিয়ে হয়ে গেলো ডাঃ আবিরের সাথে। প্রথমবার যে ভয় পেয়েছিলাম, এবার আর সেই ভয়ে ছিলাম না। প্রথমবারের ব্যর্থতা থেকে শিখেছিলাম কিভাবে একটা নতুন সম্পর্ক করতে হয়। আবিরদের বাসার, আত্তীয় সজনের এবং বন্ধু বান্ধব্দীর সবার কাছ থেকে যতটুকু ফিডব্যাক নেয়া সম্ভব সব নিয়েই এগিয়েছিলাম। শুধু তাইই নয়, একে একে ছেলে মেয়ে ছেলেদের পিতা মাতা, অতঃপর আবারো সবার একসাথে ইন্টারভিউ নিয়ে আমি নিজেকে বুঝাতে পেরেছি যে, আবিরের সাথে উম্মিকাকে বিয়ে দেয়া সম্ভব। (চলবে) .........











