দ্বিমুখী জীবন (আপডেটেড অন 05 May 2023)

মুক্তার সাহেব ‘পরকীয়া’ করছেন। খবরটি চারিদিকে এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, সেটা নিয়েই সবাই মুখরোচক আলাপে মত্ত। চায়ের দোকানে, পাড়ার মহল্লায়, আশেপাশে মানুষের মুখে মুখে যেনো খবরটা একটা ব্রেকিং নিউজের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঝড়ো দমকা বাতাসে ছাই ঊড়ার মতো চারিদিকে রটিয়ে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটার সত্যতা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিলো না এ কারনে যে, মুক্তার সাহেবের স্ত্রী আসমানী বেগমই এর প্রথম নালিশদাতা। অতঃপর দিন গড়িয়ে সপ্তাহ আসার আগেই এ বিষয়ে আসমানী বেগমের ঘোর নালিশের কারনে শেষ পর্যন্ত পারিবারিক আইন ও সালিসি আদালতে ঘটনাটি বিচারের সাব্যস্থ হয়। আমি সে সময়ে পারিবারিক আইন ও সালিসি অধিদপ্তরে কাজ করছিলাম। মুক্তার সাহেবের পরকীয়ার ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্ত করার ব্যাপারে আমার উপরে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরকীয়ার ব্যাপার স্যাপার, তদন্ত করা খুব সহজ কাজ নয়। তারপরেও এমন একটা স্পর্শকাতর ব্যাপারে আভ্যন্তরীন তথ্যাদি উদঘাটনের জন্য কাজটি হাতে নিয়েছিলাম। তারই ধারাবাহিকতার জের ধরে ঘটনায় জড়িত মুক্তার সাহেব, সাবিত্রি এবং আসমানী বেগমের জবানবন্দীসমুহ লিপিবদ্ধ করি। তাদের সবার জবানবন্ধী লিপিবদ্ধ করে এর পুরু সারমর্ম পড়ে আমি নিজে কোনো শুদ্ধ রায়ে উপনীত হতে পারিনি। যদিও আমার রায় দেবার ইখতিয়ার ছিলো না। আমার কাজ ছিলো শুধু তাদের জবানবন্ধী নেয়া। তারপরেও যখন শালিশী বোর্ড আমাকে এক কথায় কার কি অপরাধ সংক্ষীপ্ত সারমর্ম দিতে বলেছিলেন, আমি সেটায় উপনীত হতে পারিনি। কারন এই জবানবন্ধী নিতে গিয়ে আমি একটা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি যে, অবহেলা যখন দীর্ঘ হয়, উদাসীনতা যখন মানুষের জীবনে একটা কাল হয়ে দাঁড়ায়, ফেরার পথটা তখন হয়তো বন্ধই হয়ে যায়। তখন যে সুরটা বেজে উঠে তা হলো বিচ্ছেদের সুর। বিচ্ছেদ সবসময় শুধু বেদনার হয় এটা সবসময় সত্য নয়, মাঝে মাঝে বিচ্ছেদের মধ্যে মানুষ মুক্তির স্বাদও পায়। সেই স্বাদের মধ্যে পরিপুর্ন শান্তি না থাকলেও কখনো কখনো কোনো এক একাকী সময় অতীতের সেই কিছু বেদনার স্মৃতি  বা রঙ মানুষের জীবনকে কষ্টের মাঝে একটু অন্য রকমের আবেগ হয়তো জীবনের অনেক কিছুই বদলে দেয়।

আমি আরো একটা অনুভুতি উপলব্ধি করেছি, আর সেটা হলো বস্তুবাদ।

এ যুগে এখন আর সেইদিন নেই যে দূরে বসেও মা তার সন্তানের গলার স্বর শুনে বলে দিতে পারেন সে ক্ষুধার্ত। কিংবা কোনো স্ত্রী যদি হেসেও দরজা খোলেন তখন স্বামী তার এই হাসির অন্তরালেও বুঝেন যাবেন তার ভিতরে কোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে। এখন আর সেটা হয় না। এখন ভাবনার জায়গা, আবেগের জায়গা সবকিছু বস্তুবাদ দখল করে নিয়েছে। আমরা একে অপরের সাথে একই জায়গায়, একই ছাদের তলে থাকি বটে কিন্তু বেচে থাকি একা। এই অবস্থা সবাইকে একে অপরের থেকে এত দূরে ঠেলে দেয় যে, সবাই একটা একাকীত্বের জগতে প্রবেশ করে যা হয়ত কেউ আন্দাজও করতে পারে না। ফলে শুরু হয় হতাশা আর মনোকষ্টের প্রবনতা। চোখের সামনে আমরা যা দেখি, কিংবা আমাদেরকে যা দেখানো হয়, বাস্তবে হয়তো তারসাথে অনেকাংশেই মিল নাই। এই দেখা আর না দেখার মাঝে যে আবেগী আর বস্তুবাদী জীবন, সে দ্বৈত জীবনটাই আসলে আমরা।

সত্যি কথা বলতে কি, বস্তবাদ শুধু মানুষকে হতাশার মধ্যে একাকিত্তেই ফেলে যায় না, এটা বড় শহরে বড় বড় মানুষের দুনিয়াকেও ছোট করে নিয়ে আসে যেখানে নিজের হাতের উপর, নিজের মাথার উপর কারো হাত থাকা সত্তেও হাত খালিই থেকে যায় বলে মনে হয়, ভরষার স্থান শুন্যই রয়ে যায় বলে মনে হয়। আমরা এখন সবাই কোনো না কোনোভাবে বস্তুবাদের নিয়ন্ত্রনে বাস করি। কিন্তু যারা এই বস্তুবাদ জীবনে নতুন করে প্রবেশ করছি, তাদের বেলায় বিষয়টি অনেক কঠিন। তারা না পারেন বস্তুবাদী হতে, না পারেন সেই আগের আবেগী জীবন থেকে বের হতে। এমনি এক ক্রান্তিলগ্নে কোথাও না কোথাও কেউ বিচারের সম্মুখীন হন, হোক সেটা নিজের কাছে, হোক সেটা সমাজের কাছে কিংবা আদালত। সেই বিচার হয়তো শেষ হয় কিন্তু সেটা ন্যায় পায় কিনা কিংবা সেই রায় কেউ নাড়াচাড়া করে কিনা সেটার আর বিচার হয় না।  আজকের গল্পটি তাদের সেই জবানবন্দীর অনুলিপি মাত্র।

মুক্তার সাহেব একজন নামকরা শিল্পপতি, মোটামুটি বেশ সবার কাছে তার সুনাম আছে। কখনো দানবীর, কখনো কঠিন শাসক, কখনো বা জনহিতকর কাজের নেতা ইত্যাদি নামেই পরিচিত। মুক্তার সাহেবের বিবাহিত স্ত্রী আসমানী বেগমও স্বনামধন্য একজন প্রতিষ্ঠিত নারী। তাকেও সমাজের অনেকেই চিনেন এবং ভালো পরিচিতি আছে তার নিজের। মুক্তার সাহেবের মাধ্যমে স্ত্রী হিসাবে পরিচিতির বাইরেও তিনি একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। অপরদিকে, সাবিত্রী, অল্প বয়সের একজন নারী যার না ছিলো কোনো নামধাম, না ছিলো কোনো সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা, একজন গ্রাম্য এলাকার মেয়ে যে মুক্তার সাহেবের থেকেও প্রায় ৩০ বছরের ছোট। এই সাবিত্রীর সাথে মুক্তার সাহেবের পরকীয়া চলছে বলে চারিদিকে শোনা যাচ্ছে। আজকের ঘটনাবলী তার উপরেই।

আমি কেনো এই তদন্তটা হাতে নিয়েছিলাম সেটারও একটা কারন ছিলো। প্রায় ৩৩ বছর ঘর করার পর, সুখে শান্তিতে একত্রে বসবাস করার পর, ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে যাওয়ার পরে কেনো এই পরিবারের মধ্যে এমন একটা রহস্য ঢোকে গেলো, সেটা আমার জানার খুবই শখ ছিলো। এই কারনেই আমি এই কেসটার ব্যাপারে উৎসাহী হয়েছিলাম। তবে একটা কথা সত্যি যে, মুক্তার সাহেবের সাথে সাবিত্রী নামের মেয়েটার মধ্যে আমাদের তথাকথিত রীতিতে সংজ্ঞায়িত করলে যাকে আমরা পরকীয়া বলি, সেটার সুষ্পষ্ট প্রমান ছিলো। আর এই প্রমানের জন্য কোনো গোয়েন্দা কাহিনীর প্রয়োজন ছিলো না। কারন এটা মুক্তার সাহেব নিজেও অকপটে স্বীকার করেছেন কোনো রাখঢাকা ছাড়াই। ব্যাপারটা যেনো এমন ছিলো যে, তিনিই যেনো চেয়েছেন সবাই এটা জানুক।

তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ৩৩ বছর একসাথে ঘর করার পর কি কারনে মুক্তার সাহেব আসমানী বেগমের অলক্ষ্যে একান্তে সময় কাটানোর জন্যে সাবিত্রীর সাথে গোপন প্রনয় শুরু করেন?  সেই ইতিহাস না জানলে মনে হবে, হয়তো মুক্তার সাহেব আসলেই একজন চরিত্রহীন এবং দায়িত্বহীন কোনো এক সামাজিক কিট। সমাজে মুক্তার সাহেবই প্রথম ব্যক্তি নন যিনি ঘরে ভালোবাসার সুন্দুরী আসমানিদের রেখেও তার থেকে অনধিক সুন্দুরী বা অনধিক শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী এই সাবিত্রীদের সাথে প্রনয় করেন। কিন্তু অন্য সবার ব্যাপারে এই জাতীয় ঘটনা খুব মুখরোচক না হলেও, মুক্তার সাহেবদের মতো বিখ্যাত মানুষদের এসব খবর যখন নড়েচড়ে উঠে, তখন অনেকে বাসীরুটিও গরম করে খান। সবসময় গরম গরম পরোটাই যে মজাদার তা কিন্তু নয়, মুক্তার সাহেবদের মতো মানুষদের এসব ঘটনা চারিদিকে যখন রটায় তখন গরম গরম পরোটার চেয়েও এ ধরনের বাসীরুটির কদর অনেকগুন বেড়ে যায়। যখন মুখরোচক খবরের ক্ষিদে পায়, তখন রুটি, পরোটা, লুচির মধ্যে আর কোনো তফাত করা যায় না। কিন্তু মুক্তার সাহেবরা তাদের এই ঘটনার জন্য নিজ থেকে কোনো সংবাদের শিকার হতেও চান না। কারন, একদিনের মুখরোচক সংবাদ হবার জন্য কিংবা এই নশ্বর পৃথিবীতে জোরালোভাবে নামডাক থাকুক, ইতিহাস হোক, অথবা বিখ্যাত হোক এ লোভে কেউ এসব কাহিনীর নায়ক হতে চান না। এটা তো ঠিক যে, এই ‘বিখ্যাত হবো’ ধরনের ক্ষুধার জন্য কেউ সারা জীবনের তৈরী করা শব্জীক্ষেত জালিয়ে দেয় না। পাশ্চাত্যের ব্যাপার স্যাপার আলাদা। আমাদের এই দেশে এটা মানানসই নয়। তারপরেও কারনে অকারনে কারো কারো শব্জী বাগান জ্বলে। আর সেটা ভুলেই হোক, আর ইচ্ছায়ই হোক, কিংবা অন্য কারো দ্বারাই হোক, জ্বলতেই থাকে। আর এর প্রধান কারন একটাই, আবর্জনা যেমন সবসময় সাদা কাপড়েই বেশী ফুটে উঠে, তেমনি কিছু কিছু অপবাদও এই মুক্তার সাহেবদের মতো সাদা কাপড়েই বেশী চোখে পড়ে।

হাওয়া যখন কারো নামে গরম হয়, তখন আমরা অনেকেই বলি, শনির দশা চলছে। কিন্তু শনি এমন এক হাওয়ার নাম, যে, এই হাওয়ায় কারো নাম ভাসতে থাকলে তার পিছনের কি ইতিহাস, কি আচরন, সত্য-মিথ্যার চকলেটে মোড়ানো বোরহানীর মতো ঝাল-মিষ্টি-টক সবকিছুই তখন একসাথে যেনো উড়ে বেড়ায়। যে যেটা পছন্দ করে, তখন সে সেটাই ব্রেকিং নিউজের মতো লুফে নিয়ে যতো দ্রুত সম্ভব বাতাসের সাথে মাটিও গরম করে দেয়। তখন চায়ের কাপে, বাজারের দোকানে, কিংবা নদীর ঘাটেও এর পরিব্যপ্তি আর বিস্তার কম হয়না। আর যে বলীর পাঠা হয়, তার যত নামডাকই থাকুক না কেনো, সে তখন হয়ে উঠে বিষাক্ত খাবার। বিষাক্ত খাবার যতো দামিই হোক, তা ফেলেই দিতে হয় হয়ত। কারন যদি তা গোড়া থেকে উপড়ে  ফেলে না দেওয়া যায়, তখন তার মুল্য শুধু বিপদের আশংকাই বাড়িয়ে দেয় তা নয়, সেটা সমাজে একটা আইনের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

কিন্তু মুক্তার সাহেবের মতো ব্যক্তিত্তকে বিষাক্ত খাবার মনে করে আসমানী বেগমেরা তাকে ফেলেও দিতে চান না। তারা চান, কিভাবে এই বিষাক্ত খাবার আবার সিদ্ধ করে পুনরায় ঝলমলে পরিপাটি খাবারের টেবিলে পরিবেশন করা যায়। কারন তাদের ভ্যাল্যু আলাদা, সাথে থাকলে সবারই লাভ। তাই হয়তো এমন গুরুতর অভিযোগের পরেও আসমানী বেগম চান যে, মুক্তার সাহেব ফিরে আসুক, আর সাবিত্রীরা ধংশ হোক। তাতেই হয়তো আসমানী বেগমেরা খুসি।

এসব পরকীয়ার কাহিনীর সাথে সাথে যেহেতু সে ব্যাক্তির পিছনের ইতিহাস, তার আচরন নিয়ে রমরমা পান্ডুলিপি এক হাত থেকে আরেক হাতে ছড়ায়ই, তাই এই মুক্তার সাহেবের অতীত ইতিহাস, কিংবা তার আচরন সম্পর্কে তার কাছ থেকেই জানা ভালো। এতে হয়তো কিছুটা রাখঢাক থাকতে পারে অথবা থাকতে পারে কিছু প্রচ্ছন্ন লুকানো তথ্য। সিংহভাগ তথ্য যখন একে একে সারিবদ্ধভাবে জোড়া লাগানো হয়, আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি কোথায় কোন জায়গায় মুক্তার সাহেব কিছু ছেড়ে গেলেন, আর কোথায় কোন তথ্য নতুন করে আমদানী করলেন। সঠিকতার বিচার পাঠকের উপর। যে যেভাবে পারেন, তিনি তারমতো করে সেসব গড়মিল জায়গাগুলি নিজের মতো তথ্য যোগ করে প্রতিস্থাপন করলেই পূর্নাজ্ঞ গল্পটি নিজের মানসপটে ফুটে উঠবে। সবার বিচারিক ক্ষমতা আলাদা, সবার গ্রহনযোগ্যতাও আলাদা। আমি এই ত্রিপক্ষীয় ত্রিভুজ প্রেমের মধ্যে কার যে কতটা দোষ বা কে যে কার ক্ষতি কতটা করছিলো, নির্ধারন করতে পারিনি। মনে হয়েছে-প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গায় সঠিক। তাহলে শুনি তার নিজের মুখে দেয়া বিচারকের কাছে দেয়া তাঁর পরকীয়ার জবানবন্দী। বিচারকের পক্ষে আমিই সেই ব্যক্তি যে মুক্তার সাহেবের জবানবন্দী রেকর্ড করেছিলাম।

মুক্তার সাহেবের জবান বন্দি-১ম পর্ব

আমি মুক্তার সাহেবের কাছে তার জবানবন্দি নেয়ার জন্য যেদিন যাই, সেদিন বুঝেছিলাম, মুক্তার সাহেবের মধ্যে আমাদের অন্য দশজনের মতোই জীবন। আলাদা কিছু ছিলো না। তারপরেও অনেক কিছু আলাদা ছিলো যা আমরা সাহসের সাথে বলি না, করি না, কিন্তু মুক্তার সাহেব সেটা অকপটে বলেন, করেন এবং স্বীকার করেন।

মুক্তার সাহেবকে আমি তার কিছু বক্তব্য জবানবন্দি আকারে লিখতে বলায় তিনি একটু হেসে দিয়ে বললেন-আপনার যা জানার বা বলার আমাকে অকপটে বলবেন, আমি সব বলে যাবো। আপনিই আমার জবানবন্দি লিখে নিন, আমি সেথায় নিজের দস্তখত করে দায়মুক্তি দিয়ে দেবো।

বললাম- অসুবিধা নাই। আপনি বলুন, আমি নিজেই নোট করে নেবো।

বাইরে একটু একটু গরম বাতাস বইছে। গ্রীষ্মকাল। মাঝে মাঝে আকাশ মেঘলা করে, আবার মাঝে মাঝে অদ্ভুদ আকারের কয়েক ফোটা ব্রিষ্টিও হয়, সাথে দিনের সুর্যকে কোনো প্রকার আড়াল না করে। আমরা গ্রামে ছোটবেলায় এটাকে বলতাম ঃশিয়াল ব্রিষ্ট”। কেনো একে আমরা শিয়াল ব্রিষ্টি বলতাম আজো আমি তার কোনো যৌক্তিক কারন খুজে পাই নাই। যাই হোক, এমন একটা দিনে আমি মুক্তার সাহেবের বাসায় বসে তারই জীবনের পরকীয়ার একটা অধ্যায় নিয়ে কথা বলতে বসেছি।

আমি চুপচাপ বসে আছি মুক্তার সাহেবের মুখ থেকে কথা শোনার জন্য।

মুক্তার সাহেব তার কথা বলার আগে তিনি শুধু বললেন, আমার পুরু জীবনের ঘটনা না জানলে আপনি এই জাবানবন্দির মধ্যে অনেক গড়মিল পাবেন। তাই অনেক আগ থেকেই শুরু করি। কি বলেন? আপনার সময় হবে তো?

বল্লাম-আচ্ছা।

-আমার বয়স তখন সবেমাত্র কুড়ি পেড়িয়েছে। টকবকে যুবক। স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় ঠিক সে রকম। সব প্রকারের মানসিকতা নিয়েই আমি সমাজের প্রতিটি স্তরে অনায়াসেই যাতায়ত করতে পারি। সবার সাথেই ছিলো আমার বন্ধুত্ব। গাজার আসরে যেমন আমি ছিলাম মুক্তার মতো, তেমনি পড়াশুনায় ভালো করার কারনে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তদের কাছে ছিলাম মুক্তোর হারের মতো। আর নিম্নবিত্ত মানুষদের কাছে যতোটা না ছিলাম আদর্শগত মডেল তার থেকে বেশী ছিলাম গোপন হিংসার একটা অদেখা আলাপের বিষয়বস্তু। একটা জিনিষ কি কখনো জেনেছেন যে, কোনো এক সময়ের জমিদার বাড়ির সন্তান যখন নিম্নবিত্ত পরিবারের মতো বেড়ে উঠে, তখন তার প্রাচীন উদ্ধত্তভাবের সাথে দেমাগ আর জিদটা হয়তো বেচেই থাকে যদিও সামর্থ বলতে কিছুই থাকে না। আমার ছিলো সেরকমের একটা জিদ আর দেমাগ। পিতামাতার অঢেল সম্পত্তি থাকা সত্তেও সেগুলি কোনো কাজেই আসেনি আমাদের কারো জীবনে। আমাদের পূর্ব পুরুষদের জীবন বিলুপ্তির পরে সবই চলে গিয়েছিলো অন্যের দখলে। ফলে অর্ধাহারে, কিংবা অনাহারেও আমরা বেড়ে উঠেছি এই বৈষম্যমূলক সমাজে। আর সেটা আমাদের মতো করেই। অভিযোগ ছিলো কিন্তু সামর্থ ছিলো না তার প্রতিবাদের। যাই হোক, লেখাপড়ার প্রতি অনেক ঝোক ছিলো আমার, তাই, গ্রামের আর দশটা যুবকের থেকে আমি ছিলাম একেবারেই আলাদা। অদুর অতীতে কি ছিলো আর ওসব থাকলেও এখন কি হতে পারতাম, এই চিন্তাটা মাথায় একেবারেই ছিলো না, বা না ছিলো কোনো আফসোস যে, কেনো অন্যদের অনেক কিছু আছে আর আমাদের থেকেও নাই। কিন্তু আখাংকা ছিলো অনেক, যেভাবেই হোক নিজের পরিশ্রমে সৎপথে অনেক বড় কিছু হবার। শুনেছিলাম, সুন্দুরী অনেক যুবতীর সফলতা বড় লোকের বেডরুম দিয়ে আসলেও কোনো বেকার যুবকের সফলতা কোনো বড় লোকের ঘরজামাই থেকে আসে না। আর যাদের আসে, তারা হয় নেহায়েত ভাগ্যবান নয়তো তারা জীবনের জন্য আজীবন মৃৎপ্রায় লাশের মতো সব শর্তাবলী গলায় নিয়েই ভোগবিলাস করেন। আমার এই ধরনের না ছিলো কোনো মানসিকতা আর না ছিলো এর সুযোগের সন্ধান।

২১ বছর বয়সেই আমি, আমার মেধার কারনেই হোক আর শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাইয়েই হোক, দেশের একটি অত্যান্ত প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানজনক সেক্টরে অফিসার পদে চাকুরী পেয়ে যাই। যদিও আমার অন্যান্য সেক্টরে চাকুরী পাবার সম্ভাবনা ছিল আরো ঢের বেশী এবং সেসব সেক্টরেও প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হবার জন্য যে কোর্ষ এবং ডিগ্রী দরকার তার সিলেকসনেও আমি ছিলাম অনেকের থেকে অনেক উপরে। কিন্তু সেই সিলেকশনের পর কোর্ষ বা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাবার মতো মসলা বা জোগান হাতে ছিলো না যা বর্তমান সেক্টরে সরাসরি পাওয়া যায় বিধায় আমাকে অনেক সিদ্ধান্ত নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও পালটাতে হয়েছে। ফলে অন্যান্য সেক্টরের সপ্ন বাদ দিয়ে আমি বর্তমানকেই প্রাধান্য দিলাম যাতে আমি নিজেকে সাপোর্ট দিতে পারি এবং জীবন নিজের মতো করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

-আমি মুক্ত্রা সাহেবের কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। একবার ভাবছিলাম, নোট করি, আবার ভাবলাম, নাহ থাক, নোটের হয়তো প্রয়োজন পড়বে না, আগে পুরু ইতিহাসটা শুনি।

মুক্তার সাহেব কথা চালিয়ে যেতে লাগলেন।

বললেন, একটা জিনিষ আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, মাথার উপর ছাদ না থাকলে,  যে দুফোটা বৃষ্টি আকাশ থেকে প্রথমেই ঝরে পড়বে, সেটা আমার মাথায়ই প্রথম পড়বে। আমার না ছিলো কোনো ব্যাকআপ সাপোর্ট, না ছিলো কোনো অবলম্বন। আমাকে সাহায্য করার আসলে কেহই ছিল না তখন। ভেবেছিলাম তখন যে, এখন না হয় আমি একা, পরিবার হয় নাই, বিয়েটাও করি নাই, ফলে দুশ্চিন্তা হয়তো একটু কম, কিন্তু কখনো যদি আমার পরিবার হয়, সন্তান হয়, তখনো আমি জানি, আমাকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার অসময়ে বা দুঃসময়ে সাহাজ্য করার কেউ নাই। এই কঠিন বাস্তবতাটা আমার মাথায় এমনভাবে গেথে গিয়েছিলো যে, আমার কখনো ভুল হয়নি এটা মনে রাখবার যে আমি একা। আমার বিকল্প আমিই, আর কেউ নয়। আর মজার ব্যাপারটা হলো- এ সত্যটা আজ অবধি সত্যই।

-এই অবস্থায় আমার সাথে দেখা হয় এই আজকের আসমানীর। কথা থেকে চিঠি, চিঠি থেকে আরো ঘনিষ্ঠতা, আর সেই ঘনিষ্ঠতা থেকে একসময় প্রনয়। আমার কিংবা আসমানীদের পরিবারের অনেকেই আমাদের এই ঘনিষ্টতা পছন্দ করে নাই। এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমি কিন্তু এতিম ছিলাম না। আমারো মা ছিলো, ভাই ছিলো, বোনও ছিলো, ছিলো শুভাকাংখিও। কিন্তু তাদের অবস্থা এরকম নয় যে, আমার কোনো প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে কোনো আর্থিক সহায়তা করতে পারবেন, আমার পাশে দাড়াতে পারবেন বরং তারা তাদের আর্থিক দুরাবস্থার কারনে আমার দিকেই যেনো তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু এসব শুভাকাংখির একটা বড় সমস্যা হলো যে, নিজেরা কোনো কিছু সাহাজ্য করতে না পারলেও, তারা বিজ্ঞের মতো এমন কিছু মতামত, বা উপদেশ দেন যেনো ওরাই না জানি আমার অভিভাবক বা তাদের পরামর্শ না শুনলে আমার জন্য একটা বড় অপরাধ কিংবা ঘোরতর বিপদের আশংকা আছে। কিন্তু ওই যে বললাম, আমি বরাবর স্বাধীনচেতা মনের মানুষ, আর আমার চিন্তাধারার সাথে কারো চিন্তাধারা মিলুক বা না মিলুক সেটা আমার কাছে বড় কোনো বিবেচ্য বিষয় ছিলো না। আমি শুধু ভাবতাম, আমার সমস্ত কিছুর জন্য আমিই দায়ী। হোক সেটা উত্থানের বা পতনের। আমার উত্থানে হয়তো তখন তারা তাদের ভুল পরামর্শের কারনে চুপ থাকবেন, না হয় আমার পতনের কারনে তারা আরো কিছু শুনিয়ে দেবেন যে, তাদের পরামর্শ না শোনার কারনে আজ আমার এতো অধোপতন। কিন্তু এটাও জানি, সেই অধোপতন থেকে আবার আমাকে টেনে বের করে কোনো এক সঠিক রাস্তায় দাড় করিয়ে দেবার মতো তাদের না আছে সামর্থ বা না আছে কোনো মানষিকতা।

-যাই হোক, আসমানীর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হবার পর আমি নিজেও বুঝতে পারলাম, আমার অবস্থা থেকে আসমানীর অবস্থা আরো গুরুতর। আমি ছেলে মানুষ, কোনো না কোনোভাবে হয়তো অনেক কিছু থেকেই পার পেয়ে যাবো। কিন্তু আসমানী মেয়ে মানুষ, তার অবস্থা আরো শোচনীয় থাকায় তার অবস্থা আরো বিপদজনক। তারও না আছে তেমন শক্ত কোনো অভিভাবক, না আছে বাবা, না আছে এমন কেউ যাকে নির্ভর করে সে তার মেয়েলী জীবনের একটা সুখের স্বপ্নের কথা ভাবতে পারে। তার শুধু একটা ভরষাই ছিল। আর সেটা হলো আগত ভবিষ্যতে তার স্বামীর উপর। তার চাওয়া পাওয়া, আবদার, আর যতো অভিমান যেনো লুকায়িত আছে সেই অনাগত স্বামীকে ঘিরে। আসমানী এটাও জানতো যে, জীবনে এই আদর্শগত স্বামী পেতে হলে তাকেও একটা লেবেল পর্যন্ত যেতে হবে, বিশেষ করে পড়াশুনার দিক দিয়ে। তাই, আসমানীর লক্ষ্য যেমন ছিলো ভালো একটা জীবনের জন্য, তেমনি লক্ষ্যকে সফল করার জন্য তাকে এই সমাজ সংসারে এমন করে পরিশ্রম করতে হবে যেখানে সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে ভালো কিছু করা যায়। সরকারী ইউনিভার্সিটি হলো সেই লক্ষ্যভেদের একটা সহজ কৌশল। আসমানি তার পূর্ন সদ্ব্যবহার করেছিলো। ফলে একদিকে আসমানী লেখাপড়া চালিয়ে যেতে লাগলো অন্যদিকে আমাকেও সে ধরে রাখলো।

-একটা সময় এলো যে, আমি আর আসমানী একা একাই জীবনসাথী হয়ে গেলাম। আমি আসমানীকে আমার জীবনের বাইরে কখনো ভাবি নাই। আর এই ভাবার মধ্যে ব্যাপারটা এমন ছিলো যে, আমার মতো আসমানীরও কেউ নাই। আমিই আসমানীর দেবতা, আমিই আসমানীর আত্তা, আমিই আসমানীর সর্বত্র। ওর রাগ অভিমান, চাওয়া পাওয়া, সুখ আহলাদ, হাসি কান্না, সবকিছুই আমি। আর আমার বেলায়ও আমি জানি কাউকে আমার কষ্টের কথা, ব্যাথার কথা, কিংবা পরিকল্পনার কথা আসমানিকে ছাড়া কারো সাথেই শেয়ার করা সম্ভব ছিলো না। আমরা আসলে আক্ষরীক অর্থেই অর্ধাংগিনি রুপে একে অপরের জন্য স্থির হয়ে গেলাম। ভাবলাম, একদিন আমাদের সব ঠিক হয়ে যাবে, আমরা সব কিছু আমাদের মতো করেই তৈরী করবো।

মুক্তার সাহেব কিছুক্ষনের জন্য থামলেন। একটা দীর্ঘশাস ছাড়লেন। কিছুক্ষন চুপ করেও রইলেন। আমি বুঝলাম, তিনি ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন। মুক্তার সাহেব সিগারেট খেতে পছন্দ করেন। একটা বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেটে আগুন ধরিয়ে তারপর আবার শুরু করলেন-

-একটা জিনিষ জানেন? আমরা সবাই সুখী হতে চাই। ভাবি, ‘একদিন’ আমরা সুখী হবোই। এই “একদিন”, অদ্ভুত একটা সময়। সবসময় আমরা ভাবি, ‘একদিন’ আমার সবকিছু আমার মতো করে হবে, ‘একদিন’ আমি সবকিছু নিজের মতো করে পাবো, ‘একদিন’ আমি সবকিছু ছেড়ে নিজের মতো করে এই পৃথিবীকে দেখবো, দেখবো এর বিশালত্ব, এর সৌন্দর্য, এর অপূর্ব রহস্যময়তা। কিন্তু আমি জানি না কবে সেই আমার ‘একদিন’। আমি জানিও না আমার সেই ‘একদিন’ আসলে কবে সেইদিন। আমি কিভাবে জানবো, সেই ‘একদিন’টা কবে আসবে আমার জীবনে? ছোট এই সমাজে যেখানে আমরা দৈনিন্দিন সবাইকে নিয়ে বসবাস করি, আমরা সেখানে চাইলেই সবকিছু করতে পারি না।  শিশুকাল থেকে কৈশোর পার করা অবধি আমরা সবাই ওই ‘একদিন’ এর অপেক্ষায়ই থাকি যেদিন আমার সব ইচ্ছা পূরন হবে, আমি মুক্ত পাখীর মতো এই বিশাল আকাশে হাওয়ায় উড়ে উড়ে মেঘ দেখবো, নীচের সবুজ গাছপালা দেখবো, সাগর দেখবো, পাহাড় দেখবো। কিন্তু ক্রমেই যতো একেকটা স্তর পার করে যখন আরেকটা স্তরে পা রাখি, ততোই সামনে চলে আসে কোনো না কোন দায়িত্ব, কোনো না কোনো নতুন আরেকটা চ্যালেঞ্জ। সেটাকে মোকাবেলা করতে করতেই জীবনের বেশ কয়েকটি স্তর, ধাপ পার হয়ে যায়। আমাদের কারোই সেই ‘একদিন’ সময়টা যেনো আর আসে না। আজ আমরা নিজের সংসারের জন্য বাচি, কাল আমরা স্বামী বা স্ত্রীর জন্য বাচি, তারপর হয়তো সন্তানের জন্য বাচি, আর এভাবেই সামাজিক, পারিবারিক ইত্যাদির দায়বদ্ধতা আর জীবনের তাগিদে আমরা ক্রমশই জীবন নামক নদীতে শুধু ক্লান্ত হয়ে ভাসতেই থাকি। আর ভাবী, নিশ্চয় ‘একদিন’ আমার সব চ্যালেঞ্জ, সব ক্লান্তি কিংবা সব ঝামেলা শেষ হবে, আর তারপর ‘একদিন’ আমার আর কোনো ঝামেলা, সমস্যা কিংবা আমার সুখের নিমিত্তে কোনো বাধা থাকবে না। সেই ‘একদিন’ নিশ্চয় আমি আমার মতো করে সারা দেশ ঘুরতে পারবো, পার্টিতে নাচতে পারবো, পাখীর মতো যেদিকে খুশী মনের আনন্দে উড়ে বেড়াতে পারবো। কিন্তু আমার সেই ‘একদিন” যেনো আর কখনোই আসে না। বারবার কোনো না কোনো বাধা এসেই দাঁড়ায়। আসলে কি জানেন? এই ‘একদিন’ কখনোই আমাদের জীবনে আসে না। কিন্তু যদি জীবনের সবসুত্র, সব মায়াজাল, সব জটিল সমীকরন ছিন্ন করে প্রকৃতির সাথে চলমান ধারাবাহিকতায় সার্থপরের মতো দেখি, তাহলে এটাই চোখে পড়বে যে, আসলে, ‘একদিন’ হচ্ছে আজকের এইদিন, আজই। এই আজকের দিনটাই আসলে আমার সেই ‘একদিন’। আজকের দিনটার জন্যই আমি বাচি। আজকের দিনের পর হয়তো আমার জীবনে আরো একটি দিন নাও আসতে পারে। তাহলে সেই আগামীর একদিনের জন্য আমি কেনো আজকের দিনটাকে বিসর্জন দেই? হয়তো আরো ‘একদিন’ আর কখনোই আমার জীবনে আসবে না। আমার কাছে শুধু ‘একদিন’ই বাকী-আর সেটা আজ। যদি আমার সারাটা ক্যালেন্ডারেকে একটা একটা করে দিন ভাগ করে সিডিউল বানাই, দেখা যাবে, আজকের দিনটাই আমার বাস্তবতা। আর এই আজকের দিনটাই সেই ‘একদিন’। আর বাকী দিনগুলি আমার হাতেও নাই, আর যেগুলি চলে গেছে তাদের আমি কখনো ফিরিয়েও আনতে পারবো না। যেটা আছে আমার কাছে, সেটা আজ- আর এটাই সেই ‘একদিন’। তাই আমি শুধু আজকের দিনটার জন্যই বাচতে চাই। হাসতে চাই, খেলতে চাই, আকাশটা দেখতে চাই, বৃষ্টিতে ভিজতে চাই, পৃথিবীর সব গাছপালা, সব পাহাড় পর্বত, নীল আকাশ, সবকিছু দেখে প্রানভরে বাচতে চাই। আমি শুধু আমার জন্যই আজ বাচতে চাই। কালটা থাকুক অন্য সবার জন্য। আর এটা বুঝতে বুঝতে আমার সময় পেরিয়ে গেছে অনেক অনেকগুলি বছর।

কথাগুলি বলার সময় মুক্তার সাহেব কেমন অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছিলেন। যে মুক্তার সাহেব তাঁর অফিসে এতো বড় একজন কর্তাবাবু, সবাই তাকে যেমন সমীহ করে, তেমনি তাকে সবাই খুব কঠিন মানুষও মনে করে। অথচ আমার সামনে যিনি বসে আছেন, তাকে দেখে একবারের জন্যও মনে হয় না তিনি ভিতরে এতো কঠিন একজন মানুষ। মানুষ কত বিচিত্র। মুক্তার সাহেবের এই ‘একদিন’ এর ভাবনাটা আমাকে যেনো আজ নতুন করে ভাবিয়ে তুললো। এটা কি আমারো নয়? আমিও কি ঠিক এটাই ভাবি না? আমিও তো ভাবি, একদিন আমি সব পাওয়ার শান্তিতে শুধু রেষ্ট করবো, ঘুরবো, বেড়াবো, আনন্দ করবো। কিন্তু আমিও তো সেই ‘একদিনের’ নাগাল পাইনা। আসলেই তো, তাহলে আমার সেই একদিনটা কবে? মুক্তার সাহেব ঠিকই বলেছে, হয়তো সেই দিনটা আজই। কিন্তু আমি কি পারি ‘আজ’ ঠিক এই মুহুর্তে সবকিছু ছেড়েছূড়ে কোথাও একা চলে যেতে? কিংবা সবকিছু ছেড়ে বেড়িয়ে যাই যতোদিন খুশি ততোদিনের জন্য? অভিনব অতৃপ্তির জীবনে এই ‘একদিন’ একটা মরিচিকা ছাড়া আর হয়তো কিছুই না। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত হয়তো আমরা এই ‘একদিন’ এর জন্যই বাচি কিন্তু সেই ‘একদিন’ কারো জীবনেই আসে না। হয়তো কারো কারো জিবনে আসে, কিন্তু সেটা আমরা উপ্লব্ধি করি না।

-মুক্তার সাহেব একটু দম নিয়ে বললেন, যাই হোক, একটু ইমোশনাল কথা বলে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না। যেটা বলছিলাম, আসমানীর কথা। মুক্তার সাহেব আরো একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর কথা বলতে লাগলেন।

-আমি আসমানীকে পেতে সবাইকেই ছেড়েছিলাম। আমি যে আমার পরিবারের সবাইকেই ছেড়েছিলাম তারা হয়তো কোনোদিন জানতেও পারে নাই কবে থেকে আমি তাদের মন থেকেই ছেড়ে পর করে দিয়েছি। এই ছেড়ে দেয়া আর পর করে দেয়াটা এমন ছিলো যে, না কারো সাথে আমার খারাপ সম্পর্ক, না কারো সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। কিন্তু সম্পর্কটা আছে। সম্পর্কটার চরিত্র এমন ছিলো যে, না আমি তাদের জন্য দায়িত্তশিল, না ওরা আমার জন্য। শুধুমাত্র আমার মা ছিলেন এই নির্বিকার সম্পর্কের বাইরে যিনি প্রকাশ্যেও আমাকে সাপোর্ট করেছিলেন এবং অপ্রকাশ্যেও। আসমানীর সাথে আমার সম্পর্ক স্থায়ী হবার পরে আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, নিজেদেরকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। আর এই প্রতিষ্ঠার একটা বৈশিষ্ট ছিলো। সেটা হলো যে, যদি কোনো কারনে আমার জীবনের হিসাবের সব হোমওয়ার্ক শেষ না হয় এবং তারপুর্বেই আমার মৃত্যুবরন হয়, তাহলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়বে আমার এই আসমানী। তাই যেভাবেই হোক, আমার বর্তমানকে কাজে লাগিয়ে আমার প্রথম দায়িত্ত হবে আসমানীকে সাবলম্বি করে তোলা। আমার পক্ষ থেকে যা যা করা দরকার সেটা আমার শক্তির পুরুটা দিয়ে এবং আসমানীর নিজের দক্ষতায় আমি সে চেষ্টায় ব্রত হয়েছিলাম। ওই যে আবারো সেই ‘একদিন’। ‘একদিন’ সব ঠিক হয়ে যাবের মতো। ফলে অনেকটা সময় আমার জীবনে সেই “একদিন” কখনোই আসেনি।

-আসমানী আমার একটা প্রোজেক্ট ছিলো।

আমি পরক্ষনেই জানতে চাইলাম, প্রোজেক্ট ছিলো মানে? এখন কি আর তাহলে সেই প্রোজেক্ট নাই?

মুক্তার সাহেব আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন-

-আগে সবটা শুনুন, তাহলে আপনি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।

-প্রোজেক্ট যেভাবে কেউ তার সর্বশক্তি দিয়ে আর সামর্থ দিয়ে সফল করে, আমি আসমানীকে ঠিক সেভাবেই তিলে তিলে গড়ে তুলছিলাম। কিন্তু আমার একার আর্থিক সচ্চলতার উচ্চতা এমন ছিলো না যে, অচিরেই পাহাড়ের মতো একটা সাবলম্বি পরিস্থিতি তৈরী করে ফেলি। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, আমি আসমানিকে তার নিজের যোগ্যতায় গড়ে তুলতে সক্ষম হই আর সেই সক্ষমতায় আসমানিও একটা সরকারী চাকুরীর সুবাদে প্ল্যাটফর্ম পেয়ে যায়। আসমানীর এই প্লাটফর্মে আরো একটা বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়েছিলো আমার অন্যান্য আত্তীয়সজনের সাথে। যদিও আমার পরিবারের কারো সাথেই আমার তেমন সম্পর্ক টেকসই ছিলো না, তারপরেও আসমানীর চাকুরীটাকে অনেকেই সহজ করে মেনে নিতে পারে নাই। সবসময় তাদের অভিযোগ ছিলো, কেনো আমি আসমানীকে মহিলা হয়েও চাকুরী করার অনুমতি দিলাম, বিশেষ করে এই ইগোতে যে, স্ত্রীর রোজগারের উপর আমার লোভ কিংবা ভরষা, স্ত্রীরা ঘরের বাইরে গেলে তাঁর চরিত্রস্খলনের সম্ভাবনা ইত্যাদি ইত্যাদি।

-আসমানীর উপর আমার শতভাগ আস্থা ছিলো। আজকালকার ছেলেমেয়েদের লাইফ ষ্টাইলের মতো আসমানীর লাইফ ষ্টাইল ছিলো না। আজকাল ছেলেমেয়েরা ওদের জীবনটাকে টাইম পাস মনে করে আর টাইম পাসকে জীবন মনে করে। কাল পর্যন্ত যে গার্লফ্রেন্ড ছিলো আজ সে বোন, আর আজ যে বোন সে কাল হয়ে যায় গার্লফ্রেন্ড। চোখের পলকে প্রেম হয়ে যায়, আবার চোখের পলকে প্রেম ভেঙ্গেও যায়। আসমানির চরিত্র কখনোই এমন ছিলো না। আর আসমানীর উপর আমার সেই আস্থা একদিনে গড়ে উঠে নাই। তার মানসিকতা, তার ভালোবাসার গভীরতা আমাকে কখনো এটা সন্দেহ করার অবকাশ দেয় নাই যে, আসমানী কোনো না কোনো অবস্থায় তার নিজ গন্তব্য আর ভালোবাসা থেকে ছিটকে পড়বে। আর সে ছিটকে পড়েও নাই কখনো। বরং ছিটকে পড়েছিলাম আমি।

-খুব ভালোভাবেই চলছিলো আমাদের। আমাদের সন্তান হলো, সংসারে খরচ বাড়লো বটে কিন্তু দুজনের মিলিত চেষ্টায় আমাদের অন্তত প্রাত্যাহিক জীবনধারনের নিমিত্তে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছিলো না। আমরা ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে শুরু করলাম। ওইযে বললাম, আমার মাথা থেকে কখনো এটা সরে যায় নাই যে, আমার অবর্তমানে আমার নিজস্ব পরিবার যেনো থাকে সুরক্ষিত এবং সাবলম্বি। সেই লক্ষ্যটা থেকে আমি কোনোদিন বিচ্যুত হয় নাই। আগে শুধু আসমানীকে নিয়ে ভাবনা ছিলো, এখন তাঁর সাথে যোগ হলো আমার সন্তানেরা। তাই তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বাড়ি, নিরাপদে চলার জন্য গাড়ি, কিছু স্থায়ী আর্থিক উৎস যা যা লাগে আমি সেটার ব্যবস্থা করছিলাম। সময়ের সাথে সাথে সেটা আসলেই একটা স্থায়ী রুপও নিয়েছিলো। আর এই লম্বা সময়টার দৈর্ঘ ছিলো প্রায় ২৫ বছর। এই ২৫ বছরে আমি চড়াও উতড়াই পার হয়েই এখানে এসেছি। কেউ আমাকে সাহাজ্য করে নাই। না আমি কারো সাহাজ্যের জন্য পথ চেয়েছিলাম। এখন আমার আসমানি জানে সে সাবলম্বি, আমিও জানি আমার আসমানি সাবলম্বি। সে নিজে নিজে চলতে পারবে। তার একটা স্থায়ী আর্থিক উৎস আছে। এই বিশাল অবস্থানটা করতে আমাকে আমার জীবনের বহু মুল্যবান সময় পার করতে হয়েছে বটে কিন্তু এরই মধ্যে আমি আমার যৌবন পেরিয়ে মধ্য বয়স্ক পুরুহীতে পরিনিত হয়ে গেছি। আমি অনেক খুসী। কিন্তু তারপর…।

এই পর্যায়ে এসে মুক্তার সাহেব আবারো একটা বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেট ধরালেন। জবানবন্দি নেবার সময় আমরা মুক্তার সাহেবকে সর্বপ্রকার সুযোগ দিয়েছিলাম যাতে তিনি সাবলীল্ভাবে তাঁর মনের কথা বলতে পারেন। তিনি তার কাজের বুয়া সেলীকে এককাপ করে কফি দিতে বললেন। কফির কাপে চুমু দিলেন। তারপর আমাকে তিনি প্রশ্ন করলেন-

-বলুন তো, একটা মানুষের জীবন সুখী হয় কি কি জিনিষ থাকলে?

আমি বললাম, টাকা থাকলে, সম্পদ থাকলে, সমাজে একটা ভালো পজিসন ইত্যাদি থাকলে আর যদি শরীর সুস্থ থাকে, তাহলে তো সে সুখী মানুষ বলেই গন্য হয়।

মুক্তার সাহেব একটু মুচকী হাসলেন। তারপর বললেন,

-তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন, রাস্তায় যে সব মানুষ ভিক্ষা করে, তারা কেউ সুখী নয়? কিংবা যাদের একফোটা সম্পদ নাই, তারা কি সুখী নয়? অথবা সমাজে যারা অনেক বড় বড় পজিশন নিয়ে বাস করেনা, তারা কি সুখী নয়? অথবা যদি বলি, বিছানায় অবশ হয়ে পড়ে থাকা সব মানুষই কি দুখী? তারা কি কোনো না কোনো স্তরে সুখী না? যদি এমন হতো যে, টাকা আছে, পয়সা আছে, অঢেল সম্পদ আছে, সমাজে মানসম্মান প্রতিপত্তি আছে আবার শারীরকভাবে সুস্থও আছে, তারা তাহলে কিসের নেশায় নিজের ঘরে থাকা সুন্দুরী স্ত্রীকে রেখে পুনরায় পরকীয়ায় মেতে উঠেন? সবাই কি পারভার্ট? নাকি যৌনতাই প্রধান? অথবা যদি বলি যে, ৯০ বছরের এক বৃদ্ধ যখন তার অঢেল টাকা পয়সা ব্যাংক ব্যালেন্স থাকার পরেও নিজের ৮৫ বছরের স্ত্রীর বিয়োগে আরেকটা বিয়ে করতে মানিসকভাবে প্রস্তুতি নেন, যখন তার যৌনতায়ও কোনো ক্ষমতা নাই, সে তাহলে এটা কিসের নেশায় করে? আমি অবিশ্বাস করছি না যে, সবক্ষেত্রেই আমার এই প্রশ্ন সঠিক বা সঠিক নয়, তবে এর অন্তরনিহিত গুররহস্য খুজতে গেলে দেখা যাবে, এসবের কোনটাই এর উত্তর  নয়। উত্তর লুকিয়ে আছে শুধুমাত্র না দেখা একটা অনুভুতিতে। আর সেটা হচ্ছে- একাকীত্ত বা নন একোম্প্যানিয়ন।

আমি কিছু বলতে চেয়েছিলাম, আরে, ব্যাপারটা তো এমন করে কখনো ভেবে দেখিনি? আমি কিছু একটা বলতে গিয়ে মুক্তার সাহেব তার হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে আবার বলতে লাগলেন-

-হ্যা, হয়তো আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, এই একাকীত্ত কি বা এই নন-একোম্প্যানিয়ন এর মর্মার্থ কি। এটা বুঝবার জন্য আপানাকে কিছু সুক্ষ জিনিষের ভিতরে ঢোকতে হবে। আর সেটা হচ্ছে-অনুভুতি, আবেগ, তার সাথে মানবিক চাহিদা। মানবিক চাহিদার সাথে শারীরিক চাহিদার একটা যোগসুত্র থাকতে পারে যা আমি পরে বল্বো। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি আপনাকে ছোট একটা উদাহরন দেই। কখনো কি উপলব্ধি করেছেন যে, A person can be lonely in a crowdy city? অথবা কখনো কি ভেবেছেন যে, an one-month infant baby who has no idea about the world or even does not know how to talk, does not understand our any of the language, but can be a good accompanist as well!! অর্থাৎ একটা কোলাহলপুর্ন জনসমুদ্রের মধ্যেও কেউ একা থাকে। আশেপাশে হাজার হাজার লোক ঘুরছে, ফিরছে, খাচ্ছে, তামাশা করছে, আনন্দ করছে অথচ কোনো একজন এই ভীড়ের মধ্যেও একা। এই উপলব্ধিটা কখনো ভেবেছেন? আবার অন্যদিকে দেখবেন, অনেক আপন লোকজন আপনার আশেপাশে আছে, কথা শুনার মতো লোকজনও আছে, কিন্তু তাদের থেকে আপনার কাছে মনে হবে একটা অবুঝ বাচ্চা যে কথাই বলতে শিখে নাই, যে আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝে না, তারসাথেও আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারছেন। আপনি তাঁর কাছে একা নন। সে যেনো আপনার একাকীত্তের একজন ভালো সাথী। তারসাথে আপনি বিজ্ঞান নিয়ে আলাপ করতে পারেন, মহাকাশ নিয়া আলাপ করতে পারেন। হয়তো সে এসবের কিছুই বুঝে না। আপনি একাই তাঁর সাথে অনর্গল কথা বলে সময় অতিবাহিত করতে পারবেন। সে হয়তো কখনো কোনো কারন ছাড়াই কেদে দেবে, কখনো সে চার হাত পা নেড়ে নেড়ে কি জানি ভাব প্রকাশ করবে যার সাথে আপনার বিষয়বস্তুর কোনো মিল নাই, অথচ আপনি খুব ভালো সময় কাটাচ্ছেন। এই নবজাতক এক মাসের বাচ্চাটাও আপনার খুব ভালো সংগি হয়তো। এই অনুভুতি কি বুঝেন? আর এখানেই মানুষের সুখ এবং সাথীর সাথে আপনার চিরবন্ধন। এই বন্ধন থেকে আপনি কখনোই টাকার বিনিময়ে, সম্পদের বিনিময়ে, কিংবা আপনার সামাজিক উচ্চতার মাপকাঠিতে মুক্ত হতে পারবেন না। যতো বিপদই আসুক, যতো খারাপ সময়ই আসুক, এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না।

কি অবাক করার মতো কথা মুক্তার সাহেবের। ফেলে দেয়া একেবারেই অসম্ভব। যদিও মুক্তার সাহেবের এই যুক্তি বুঝতে আমার বেশ অনেক সময় লেগেছিলো। কিন্তু তার উপলব্ধিটা তো ঠিক। হয়তো আমি আমার ছোট এই মস্তিষ্কে ব্যাপারটা তখনো ধারন করে উঠতে পারি নাই। কিন্তু যখন তিনি তার কাহিনিটার প্রায় শেষে, তখন আমার কাছে ব্যাপারটা কিছুটা যেনো ঝাপসার মধ্যে হালকা পরিষ্কার হয়েছিলো। কারন মুক্তার সাহেব খুব সুক্ষভাবে বলছিলেন-

-যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, অথবা থাকে ভিতরের কিছু কথা যা বলার জন্য মন ছটফট করে, তাহলে সে সবসময়ই চাইবে যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুঃখটা, কষ্টটা, কিংবা অনুভুতিটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক বা না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাঘব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই ব্যাপারগুলি শেয়ার করা দরকার। যখন এই লোকগুলি তার কাছে বসে তাকে আর সময় না দেয়, কিংবা যদি এমন হয় যে, তার এই ব্যাপারগুলি সে কারো কাছে আর শেয়ার করতে পারলোই না, তখনই সে অনুভব করে, সে একা। আর এই একাকিত্ত মানুষটাকে ‘সময়’ নামক দানব বা বাহক ধীরে ধীরে সবার থেকে আলাদা করে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে খোজে কে আছে তার এই আবেগগুলি শোনার? আর যে শুনবে, তারই জিত, আর যারা শুনবে না, তারাই আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় এই মানুষটার গন্ডি থেকে। সে যেই হোক, হোক তার স্ত্রী, হোক তার প্রানের সন্তান অথবা প্রিয় বন্ধুবান্ধব। অন্যদিকে, আরেকদল, যারা এই সুযোগ লুফে নেয়, সে যতোই অশিক্ষিত হোক বা অসুন্দর, কিংবা তুলনামুলকভাবে নিম্নধাপের, তাতেও কিছুই যায় আসে না, তারাই হয়ে উঠে তার মনের মানুষ, কাছের মানুষ। আর তাই বারবার তার এই একাকিত্তে ভোগা মন ছুটে যায় তাদের কাছে যারা তাকে সময় দেয়, দেয় একটা কম্প্যানিয়ন। আর সেই কম্পেনিয়নের মানুষদের মধ্যে যদি জেন্ডারের পার্থক্য থাকে, তখনই সেটাকে আমরা তৃতীয় নয়নে বলি ‘পরকীয়া’। পরকীয়া মানে শুধু শারিরীক কিছু না। পরকীয়াতে আরো অনেক কিছু থাকে যা অনেক মুল্যবান কিন্তু আমরা একটা শব্দেই তাকে নোংরা করে ফেলি।

মুক্তার সাহেবের লজিক অত্যান্ত ধারালো। মানি বা না মানি, তাকে অগ্রাহ্য করার মতো উলটা লজিক আমার কাছে ছিলো না। তবুও আমি মুক্তার সাহেবকে প্রশ্ন করলাম, তাহলে কি এমন একাকিত্তে আপনি ভোগছিলেন যেখানে শেষ অবধি মনে হলো যে, এই ৩৩ বছর একসাথে থেকেও আপনি আসমানীর থেকে একা? অথবা কি এমন কারন ছিলো যা আপনাকে সবার থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়েছে এই সাজানো সংসার, পাতানো সুখী জীবন থেকে?

মুক্তার সাহেব আবারো মুচকী হেসে বললেন,

-কই নাতো? আমি তো এই সাজানো সংসার বা পাতানো জীবন থেকে সরে যাইনি। ওই যে আপনাকে আগেই বলেছিলাম যে, বলীর সব পাঠা সবসময় বিষাক্ত হয় না। আর যদি হয়ও, আর যদি পাঠাটাকে বলী দিতে গেলে অনেক বিপদের কিংবা অনেক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেই পাঠা বিষাক্ত হলেও তাকে কোনো না কোনোভাবে পুনরায় শুদ্ধ করে ঝলমলে পরিপাটি খাবারের টেবিলেই পরিবেশন করা হয়ই। আমিও ঠিক সেরকম ঝলমলে টেবিলেই এখনো আছি। তবে এই ‘আছি’র মধ্যে অনেক অংশ জুড়ে আছে  আসলেই ‘নাই’ আর অনেক অংশ জুড়ে আছে কিছু দায়িত্তবোধে। আমি ‘আছি’ আর আমি ‘দায়িত্তে আছি’ এই দুয়ের মধ্যে ফারাক বুঝেন? বিস্তর ফারাক। জেলখানায় বন্দি কয়েদির পাশে জেলখানায় বন্দি নয় এমন কোন এক মানুষ যখন বলে, ‘আমি আছি’ তোমার পাশে, এর মানে কি, সেটা তো আপনি নিশ্চয় বুঝেন। এর মানে, কখন তার কি করলে এই জেলখানা থেকে কয়েদির মুক্তি মিলবে তার একটা প্রতিশ্রুতি, অথবা অসুস্থ হলে দূরপাল্লা পথ অতিক্রম করে সে তখন চোখে জলভরা চাহনীতে আপনাকে দেখতে আসবে তার একটা নিশ্চয়তা, আপনার কষ্টে সে ব্যাথিত হবে, আপনাকে সে প্রতিনিয়ত মিস করবে ইত্যাদি। অথবা জেলখানায় বন্দি থাকা অবস্থায় সে আপনার একাকিত্তকে মিস করবে ইত্যাদি। কিন্তু সেই প্রহরী যে কয়েদির দায়িত্তে আছে, সেও কিন্তু কয়েদির পাশেই থাকে। কিন্তু তাঁর ভুমিকা নিশ্চয় এক নয়। কয়েদির দায়িত্তে থাকা প্রহরীর কাজ যেনো কোনোভাবেই এই বন্দিদশা থেকে কয়েদি পালাতে না পারেন, এটাই তার প্রথম দায়িত্ত।  কাছে থাকা আর দায়িত্তে থাকা কখনোই এক নয়। আমার কাজ যেনো সেই দায়িত্ত যাতে আমার এই সাজানো সংসার ভেংগে না যায়, আমার দায়িত্ত সেটা যাতে আমার অন্তত এই জীবদ্দশায় আমার আসমানীর জীবনে কোনো কষ্ট না আসে, আমার সন্তানের কোনো বিপর্জয় না আসে।

মুক্তার সাহেব আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা আগে দিলেন। তারপর তিনি শুরু করলেন আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর। আমি তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি বাক্য এতো তন্ময় হয়ে শুনছিলাম যে, মনে হচ্ছিলো আমি কোনো ফিলোসোফির ক্লাশে উচ্চমানের কোনো তত্তকথা শুনছি। বারবার মনে হচ্ছিলো, মুক্তার সাহেব জীবনকে যেভাবে দেখেন, আমরা হয়তো এর বাইরের প্রাঙ্গণ থেকে দেখি। আমরা যখন অন্দর মহলের আগরবাতির গন্ধটা আনন্দ করি, তখন মুক্তার সাহেব এই আগরের গন্ধের সাথে সাথে আগরের জ্বলে পড়ে ছাই হবার কষ্টটাও দেখেন। আমরা সাধারনভবে যাকে প্রকৃতি বা ন্যাচার বলি, মুক্তার সাহেব এটাকে শুধু ন্যাচার বলে ঘটনাপ্রবাহ এড়িয়ে যান না। তিনি এর অন্তরনিহিত কারনগুলি খোজেন। আর সেই কারনের মধ্যেই যেনো আসল রুপ আর ঘটনা ঘটার সবগুলি উপাদান খুজে পান।

বাইরে কিছুটা সূর্যের আলো কমে আসছিলো। বাতাসের গরম আবহাওয়াতা যেনো ধীরে ধীরে কমে এসছে। কাজের বুয়া আবারো একবার কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতে এলো। মুক্তার সাহেব, বিকালের নাস্তা দিতে বললেন। তারপর আবার তার কথায় ফিরে এলেন।

-জীবন একটাই। আজ থেকে শতবর্ষ আগে সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজের জন্য যখন তাজমহল তৈরী করেন, তার ওই তাজমহল কতটা ভালোবাসা প্রকাশ করেছে সেটা জানার চেয়ে আমরা কি কখনো এভাবে ভেবে দেখেছি যে, সম্রাট কতোটা কষ্ট থেকে এই তাজমহল বানিয়েছেন? তাজমহলের ইমারতে কি সেই কষ্ট আমরা দেখতে পাই? আমরা যা দেখি, তা হচ্ছে শাহজাহানের ভালোবাসার নিদর্সন। যা দেখতে পাই, তা হচ্ছে মুল্যবান রত্নে খচিত একটা দামী প্যালেস। কিন্তু আমি যদি বলি এটা সম্রাট শাহজাহানের ভালোবাসার মৃত্যুর নিদর্সন? তাহলে কি ভুল হবে? যদি বলি এটা ভালোবাসার কষ্ট থেকে নির্বাসিত একাকি এক রাজার মনের কষ্টের আকুতি বা অনুভুতি? তাহলে কি ভুল কিছু বলা হবে? হয়তো দুটুই ঠিক। এখন আমার অনেকগুলি প্রশ্ন জাগে, সম্রাট শাহজাহানের ২য় স্ত্রী ছিলেন এই আরজুমান্দ বানু বেগম ওরফে মমতাজ। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন কান্দাহারী বেগম। রানী মমতাজ ছাড়াও সম্রাটের জীবনে আরো আটজন রানী এসেছিলো। তাহলে সম্রাট শাহজাহান শুধুমাত্র মমতাজের জন্যই এতোবড় একটা বিশ্বনন্দিত মহল তৈরী করলেন কেনো? আর কারো জন্যে নয় কেনো? এর অন্তর্নিহিত অনুভুতি হয়তো শুধু জানেন শাহজাহান নিজে। আমার মাঝে মাঝে এরকম প্রশ্নও জাগে যে, এতো বড় বড় নাম যাদের, তারা কেনো একটিমাত্র নারীকে নিয়ে জীবনে সুখী হতে পারলেন না? শারীরিক চাহিদার কথা যদি বলি, তাহলে এক নারী কি দেয় না যা অন্য নারী দেয়? এর মানে হয়তো শারীরিক চাহিদাই সেখানে মুখ্য নয়। তাদের তো কোনো টাকা পয়সা, ধনদৌলত মান-ইজ্জত, প্রতিপত্তি, ক্ষমতার দাপট কোনো কমতি ছিলো না। তাহলে আবারো আমার ওই যে সেই আগের কথা ফিরে আসতে হয়। শুধু টাকা পয়সা, ধনদৌলত মান-ইজ্জর সম্মান প্রতিপত্তিই সুখী বা খুসী জীবনের একমাত্র ভিত্তিপ্রস্তর নয়। এর বাইরেও কিছু আছে যা যুগে যুগে কারো কারো ক্ষেত্রে প্রমানিত হয়েছে আর বেশীরভাগ মানুষের জীবনে তা প্রমানিত হয়ই নাই।

-আরেকটা ছোট তত্ত আমাদের সবার জানা থাকা দরকার যে, মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছুই মেনে যায়। আর সেই মেনে যাওয়া আর মেনে নেয়ার মধ্যেও একটা ফিলোসোফি থাকে। মানুষ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো কিছুর আশায় হয়তোবা অনেক কিছুই নিজের মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানিয়ে নেয়। কিন্তু যখন মানুষ সেই আশার সফলতা পেয়ে যায়, যখন সে নিরাপদ দুরুত্তে পৌঁছে যায়, তারমধ্যে তখন ‘আমিত্ত’ কাজ করে। তারমধ্যে তখন বৈতরনি পার হয়ে নিরাপদ জোনে চলে আসায় সে তখন  অনেক কিছুই আর আগের মতো অনুগত নাও থাকতে পারে। তখন ‘মেনে যাওয়া’ বা ‘মেনে নেয়ার’ বাধ্যবাধকতায় সে আর আটকে থাকে না। হয়তো ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে আমার আসমানির মধ্যে। আমি বলছি না যে, সে সীমা অতিক্রান্ত করে আমাকে হেয় করছে অথবা সে আর আগের মতো নাই এমন না। কিন্তু একটা ব্যাপার তো সবার জীবনেই আসে, যার নাম ‘শ্লথ’। এই শ্লথ থেকে শুরু হয় নিয়মের মধ্যে নিয়ম ভাংগার সুক্ষ কিছু কর্ম। অর্থাৎ সময়ের সাথে পিছিয়ে যাওয়া, ডিমান্ডের সাথে ক্যাপাসিটির সমন্নয় না হওয়া। আমরা অনেকেই এটাকে বুঝি না। তখন যে কোনো পক্ষের কাছে এটা মনে হয়, মানুষটা যেনো আর আগের মতো নাই। ‘এই আগের মতো নাই’ ব্যাপারটাকে আমরা অনেকেই ভেবে থাকি তাচ্ছিলোতা। আর এটা যে আসমানীর মধ্যে ছিলো না সেটা ফেলে দেবার মতো নয়। আপনি আবার এটা ভাববেন না যে, আমি আসমানীর বিপক্ষে অভিযোগ তুলছি। না, এটা কখনোই হবে না। আসমানীও একজন মানুষ। তাঁর নিজের একটা জীবন আছে, সকীয়তা আছে, সে দাস নয়। আমি তাকে ক্রয় করে আনি নাই। তাহলে আমি আসলে কি বলতে চাচ্ছি?

-কোনো একদা যে আসমানীকে আমি যাই উপদেশ দিয়েছি, বিনা বাক্যে, বিনা দ্বিধায় সে সেটা বেদবাক্য মনে করে অন্ধবিশ্বাসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালন করেছে। কখনো কখনো আমি আসমানীকে নিয়ে ভরদুপুরে একই বিছানায় শুয়ে কার্টুন ছবি দেখেও খিলখিল করে হেসেছি। অনেক পয়সা ছিলো না, তারপরেও পাশের কোনো এক অখ্যাত রেষ্টুরেন্টে গিয়ে ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়েও তৃপ্তি পেয়েছি। গাড়ি ছিলো না, রিক্সায় ঘুরে বেড়িয়েছি ঘন্টার পর ঘন্টা। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ পড়তে পড়তে কখন আমি অপূর্ব আর আসমানী লাবন্য হয়ে যেতো বুঝতেই পারতাম না। কিন্তু আজ হাতে প্রচুর পয়সা আছে, গাড়ি আছে, কিন্তু আমি সেই আসমানীকে খুজে পাই না। হয়তো আসমানীও সেই মুক্তার সাহেবকে খুজে পান না। এরমানে এইটা নয় যে, সে আমার কথা শুনে না বা শুনতে চায় না। কিন্তু তারমধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যখন আমাদের অনেক কিছু ছিল না, তখন একটা রিক্সায় করে মাইলকে মাইল ঘুরেও আমাদের আনন্দ হয়েছে যা এখন এসি গাড়িতেও পাওয়া যায় না। একটা সময় ছিল যখন আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা কি করলে কি হবে, কি করলে আরো ভাল হবে, সেটা নিয়ে কোনো তর্কবিহীন আলাপ আলোচনা শলাপরামর্শ হয়েছে। আজ যেটা করা তো দুরের কথা, আলোচনা করার জন্য পরিবেশও নাই। আমি বলতে চাইলেও তার হয়তো সময় নাই শোনার। এরমানে এই নয় যে, সে আমাকে অগ্রাহ্য করছে। আমি বলতে চাচ্ছি, এটা নিয়ে আর কোনো শলাপরামর্শ হয়না। একটা সময় ছিলো যখন, আমার প্রিয় খাবারগুলিই শুধু টেবিলে শোভা পেতো, যা এখন আমাকে বলেই দিতে হয় হয়ত এটা নয় ওটা খাইলেই মনে হয় ভালো লাগতো। কখনো কখনো ইচ্ছে না থাকলেও তাদের পছন্দের খাবারের তালিকাটাই এখন আমার খাবারের তালিকা করে নিতে হয়। এরমানে এই নয় যে, আমি বললে সেটা তৈরী করা হবে না। কিন্তু আগে এটা বলতে হয় নাই। পরিবর্তন সবখানেই আসে, আমাদের সম্পর্কের মধ্যেও এসছে। আর এটার জন্য অভিযোগ করা বোকামী। সমৃদ্ধ জীবনের চেয়ে অভাবী জীবনে অনেক বেশী প্রেম আর ভালোবাসা থাকে। যদিও সেখানে ঝগড়াও থাকে, তবে সেই ঝগড়াটাও একটা ভালোবাসার অন্য রকমের বহির্প্রকাশ।

আমি অবাক হয়ে মুক্তার সাহেবের কথা শুনছিলাম, তার প্রতিটি কথায় আমি যেনো শীতের প্রথম সকালের ঝির ঝির বাতাসের কেমন একটা কটু অনুভুতি অথবা একটা মিষ্টি  আস্বাদন অনুভব করছিলাম। পাশে পুষ্করিনী তীরের পাড়ে দম নেয়া একটা কোলা ব্যাং যেমন তার সমস্ত ধ্যান ধারনাকে একদিকে পাশ কাটিয়ে সেই আগত শীতের রোদের আস্বাদ নিয়ে চোখ বুঝে থাকে, ঠিক তেমন আমিও যেনো মুক্তার সাহেবের তাঁর অনাগত কাহিনীর মর্মটা আস্বাদন করার নিমিত্তে অনেকটা দম নিয়েই বসেছিলাম। আসলে সব চোখ সব কিছু দেখে না, সব আত্মা সবকিছুর আস্বাদন পায় না। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে আমাদের চাওয়া পাওয়ার সাথে সময়ে ব্যব্ধানে এমন অনেক কিছু এমন ধীরে ধীরে পালটে যায় যে, পরিবর্তনটা চোখেই পড়ে না অথচ প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক দিন অন্তরালে হয়তো আমাদের চোখে এই বিশাল পরিবর্তনটা যখন গুচরে আসে, তখন পিছনে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকে না। সেই পরিবর্তন তখন স্থায়ী রুপ ধারন করে ফেলেছে। এটাই হয়তো প্রকৃতির সবচেয়ে নির্দয় অভ্যাস।

 মুক্তার সাহেব তাঁর কথা বলতে থাকেন-

-জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন আপনি জানেন আপনাকে নিয়ে কেউ আর হৈচৈ করেনা, আগের মতো সর্বত্র আপনার সেই ভূমিকার প্রয়োজন নাই কিংবা আপনি যদি চানও সেখানে আপনার উপস্থিতি বা বক্তব্য আর আগের মতো তেমন জায়গা করে নেয় না তখন আপনার এটা মানতে অবশ্যই কষ্ট হয় যে, আপনার প্রয়োজন হয়তো তাদের কাছে ফুরিয়ে গেছে। আপনি যেনো আছেন শুধুমাত্র কারো কারো বিশেষ প্রয়োজন মিটানোর জন্য। আপনার কখন একটু ছাদে হাওয়া খেতে ভাল লাগবে, সেই হাওয়া খাওয়ার সময় আগে তো একজন আসমানীর সংগ পাওয়া যেতো কিন্তু এখন তার জগত অনেক বিশাল। এখানে আপনিই একমাত্র মানুষ নন যাকে ঘিরে তার দিনের সিংহভাগ সময় ব্যস্ততায় কাটবে। এরমানে আবার এই নয় যে, আসমানি অন্য কাউকে মন দিয়ে বসে আছে। আগে আপনার অনুপস্থিতি হয়তো তাকে একা করে দিতো বটে কিন্তু এখন সেটা সেরকম নয়। কেনো যেনো মনে হয় কি যেনো মিসিং। এখন সম্পর্কটা যেনো একটা ডকুমেন্টের মধ্যে নেমে গেছে। মানসিক টর্চারের মতো মনে হয় কিছু কিছু সময়। অল্পতেই যেনো সবকিছু ঘোলাটে হয়ে যায়। সবাই যেনো কেনো অনেক অস্থির। কাউকেই যেনো কেউ সহ্য করতে পারছেন না। সবার মতামত ভিন্ন, সবাই সঠিক, আপনি একাই সঠিক আর সবাই ঠিক নয় এটা আর এমন না। আর এর ফলে আমার কাছে এটাই মনে হয়েছে যে, দূর্বল সময়টা ওরা সবাই পেরিয়ে গেছে বলেই হয়তো এখন আর আগের মতো সব কিছুতেই বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে এমনটা না। ব্যাপারটা জানি কেমন, সব না মানলেও তো সমস্যা তেমন নাই। উত্তর আর প্রতি-উত্তরের জামানা মনে হয় এখন, যেটা আগে ছিলো না। কম্প্রোমাইজ আর সাইলেন্ট থাকাই যেনো এখন সময়। কিন্তু এটা তো আমি চাইনি? আর এখান থেকেই সম্ভবত শুরু হয়, ‘অনীহা’ নামক একটা অনুভুতি।

-একটা জিনিষ সবসময় কারো মনে রাখা উচিত যে, ভালোবাসার যেমন একটা শক্তি আছে, অনিহারও একটা বিপদ আছে। অনিহার অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইমোশন যখন ধীরে ধীরে বুদবুদের মতো অন্তরে জমা হতে থাকে, একসময় সেটা সারা অন্তর জুড়েই এমনভাবে বিচরন করে যেনো ভালোবাসার বুদবুদের আর কোনো স্থানই থাকে না। অথচ আপনি জানেন, আগের সে ভালোবাসার বুদবুদগুলি তখনো মরে যায় নাই, বেচেই আছে কিন্তু কোনঠাসা হয়ে। তখন এই কোনঠাসা ভালোবাসার অতৃপ্ত বুদবুদগুলি জলবিহিন মাছের মতো অতি অল্প পরিসরে ছটফট করতে করতে একসময় কোনো এক দূর্বল ছিদ্র দিয়ে মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসে। যখন এই ভালোবাসার বুদবুদগুলি একসাথে ঝাকেঝাকে বেরিয়ে আসে, তখন সেটা খুজতে থাকে কিছু নিরাপদ আশ্রয়। তার তো কোথাও একটা জায়গা দরকার। আর সেই নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাড়ায় সাবিত্রীর মতো কিছু অসহায় মানুষ যারা একে স্থান দেয় সেই পূর্বেকার আসমানীদের মতো যখন আসমানীরা একসময় দূর্বল ছিলো, সাবলম্বি ছিলো না। সেই স্থানটা তখন দখল করে নেয় সাবিত্রীরা। তখনই ঘটে এক বিপ্লব। যে বিপ্লবের নাম, ওই যে বললাম, ‘আমি আছি’ আর  আমি দায়িত্তে আছি’র মতো বিপ্লবে। কেউ কেউ এসব সাবিত্রীদেরকে ডাকে-নোংরা মেয়ে মানুষ, আর যারা এই নোংরা মেয়ে মানুষদের সাথে সময় কাটায় তাকেই আমাদের সমাজ বলে ‘পরকীয়া’। এবার, আপনিই বলেন, এই অতৃপ্ত আত্তা, এই শুষ্ক হৃদয় কখন কোথায় ভিজে আবার উজ্জিবিত হয় সেটার নির্ধারন করে কে তাহলে?

মুক্তার সাহেবের এহেনো প্রশ্নে আমি যেনো রেডি ছিলাম না। একটু ইতস্তত হয়ে সময় নিয়ে বললাম, তাহলে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, এর জন্য শুধু আসমানীরাই দায়ী? তারা কি এটা জেনে শুনে করছে? নাকি তাদের মধ্যে এই সংশয় নাই বলে সুযোগটা আমরা যারা পুরুষ, তারাই গ্রহন করছি?

-না এটা হয়তো আসমানিদের দোষও নয়, না আমাদের মতো মুক্তার সাহেবদেরও। এটা সময়ের একটা চক্র যখন কোনো মরুভুমি আচমকা কোনো অঝর ধারায় বৃষ্টির জলে সবুজ ঘাসের মাঠে রুপান্তিত হয়। তপ্ত বালিকনায়ও তখন সবুজ ঘাসের জন্ম হয়। প্রকৃতি মনে হয় এরকমই। সাবিত্রীরা আসলে দূর সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ। আর সেই দ্বীপের চারিধারে যেমন নোনাজল থাকে, থাকে তাঁর সাথে সবুজ গাছরাজীরাও। শাখায় শাখায় পাখীরা কিচির মিচির করে, সন্ধ্যে বেলায় সব শান্ত হয়ে যে যার মতো ঘরে আসে। কখনো বাউল বাতাসে তাদের ঘর ভেংগে যায়, কখনো আচমকা ছিটকে পড়ে অথৈ নদীতে হাবুডুব খেতে থাকে। তখন কোনো এক ঘটনাচক্রে আমার মতো মুক্তার সাহেবেরাও সেই সাবিত্রীর কাছে এসে নির্ঝুপ শান্ত একরাতে চোখের অবশিষ্ট জল ফেলে হয়তো নিদ্রায় নিপতিত হয়। সুখ থাকে কিনা সেটা হয়তো মুখ্য ব্যাপার নয়, কিন্তু নিজকে আবিষ্কার করা যায়, আসলে আমরা কারা, আর কিসের নেশায় আমাদের ছুটে চলা। অথবা কোথায় আমরা কি পাই না।

মুক্তার সাহেব তাঁর চশমাটা খুলে একটু মুছে নিলেন, হয়তোবা তাঁর চোখের কোনে কিছু একটা ঝাপসা মনে হয়েছে। মুক্তার সাহেব অনেক শক্ত মানুষ, অল্পতেই তাঁর চোখ ভিজে আসে না হয়তো কিন্তু কষ্টটা তো কোথাও না কোথাও আছে। এতোক্ষন আমি মুক্তার সাহেবের কথাগুলি খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। কেনো জানি আমার কাছেও মনে হলো, মুক্তার সাহেব যেনো চোখে আংগুল দিয়ে আমাদের অনেকের জীবনের কথাগুলিই বলে যাচ্ছেন। আমিও তো মাঝে মাঝে খুব একা, মাঝে মাঝে তো আমারো মনে হয়, কি যেনো মিসিং! আমার গিন্নীর সাথে, আমার পরিবারের সাথে, আমার অন্য সব সম্পর্কগুলির সাথেও তো আমি এ রকম একটা অনুভুতি পেয়েছি যেখানে আমিও মনে করেছি, আমার প্রয়োজন হয়তো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে, আমি কারো কারো মনের বাসনা আর আগের মতো সফল করতে পারছি না। আমার হয়তো সাবিত্রি নাই, কিন্তু আমার তো কেহই নাই। কোথাও আমি মুক্তার সাহেবের অপরাধ হয়েছে বলে ধরতে পারছিনা। আবার এটাও মানা যায় না যে, কেনো এতো বছর পর আসমানিরা বদলে যায় কিংবা মুক্তার সাহেবেরা ছিটকে পড়ে যায় আরো একটা আসমানীর কাছে যাদের নাম সাবিত্রী। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। বিশ্বাস আর ভরষার যখন মৃত্যু হয়, তখন শারীরিক দুরুত্ত অনেকগুন বেড়ে যায়। আর এই দুরুত্ত বাড়ার সাথে সাথে তখন ‘সময়’ নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। এই সময় ইচ্ছা থাকুক আর নাইবা থাকুক, অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মুক্তার সাহেবদেরকে যখন শত ব্যর্থতার কারনেও আসমানীরা ছাড়তে চায় না, তখন হয়তো মেনে নেয় আসমানীরাও, আবার আসমানীরা আছে, এটা জেনেও মেনে নেয় সাবিত্রীরাও। মেনে নিতে শিখতে হয়। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ দুজন মানুষের মধ্যে যখন ভালোবাসার এই অপুর্নতার সৃষ্টি হয়, তখন কোনো একজন তার কাংখিত সুখ কিংবা একাকিত্ত কাটানোর জন্য সেই সম্পর্কের বাইরে যেতেই পারে। এটা কারো নিজের ইচ্ছায় যে সবসময় হয় তাও না। আর যখনই পা একবার বাইরে ছুটে, তখন, তাকে আর বিয়ে নামক অলিখিত বায়বীয় সম্পর্কটা শক্ত ভীত তৈরী করতে সক্ষম হয় না। প্রবল স্রোতে তীরভাংগা পাড়ের মতো প্রতিটা ক্ষনে এর ভাংগনের শব্দ পাওয়া যায়। আর যখন এই ভাংগা একবার শুরু হয় তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। হয় তাকে মুক্ত করে দিতে হয়, আর তা না হলে মেনেই নিতে হয়। কাউকে জোর করে কিছুক্ষনের জন্য হয়তো চুপ করিয়ে রাখা যেতে পারে কিন্তু সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। ফলে একদিকে যেমন আসমানীরা তাদের অধিকার ছেড়ে দিতে চায় না, আবার অন্যদিকে  মুক্তার সাহেবদের ধরেও রাখা যায় না। অগাধ সম্পত্তির বিবেচনায় একটা কথা ঠিক যে, পৃথিবীতে এমন কিছু সম্পর্ক আছে যা সব সম্পত্তির থেকেও বড়। আর সে সম্পর্কটা হচ্ছে অনুভুতির সম্পর্ক। আর মুক্তার সাহেবরা হচ্ছেন এমন এক সম্পর্কের নাম, যারা সাফল্যের সিড়ি বেয়ে বেয়ে উপরের তলায় স্থান করে নিয়েছেন। তাদের এই সাফল্যের একটা ফেসভ্যালু থাকায় তাদেরকে সবাই ছেড়েও যেতে চায় না। মুক্তার সাহেবের মতো বলতে গেলে বলতে হয়, সীমা লঙ্ঘন আর সীমা শেষ এক জিনিষ নয়। আসমানি, সাবিত্রী আর মুক্তার সাহেবদের এই ত্রিমাত্রার সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে সিমা লংগন হয়েছে কিন্তু সীমা শেষ হয়ে যায় নাই। তারা সবাই যেনো দুঃখের খাচায় বন্দি। আর এটাই সত্যি। সত্যিটা কখনো কল্পনা হয় না। আর কোনো  কল্পনাকেও সত্যি বলা যায় না। সত্যি কখনো কারো এজেন্ডা হতে পারে না। সত্যি সেটাই যেটা বাস্তব। আসমানী বেগম যেমন বাস্তব, সাবিত্রীও বাস্তব। আর এই দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন মুক্তার সাহেব। সেটাও বাস্তব।

মুক্তার সাহেব চশমাটা মুছলেন, আমার দিকে একটু হাস্যোজ্জল নেত্রে তাকিয়ে আরো একটা কাপে কিছু কফি আর আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলতে লাগলেন,

-একটা জিনিষ কখনো উপলব্ধি করেছেন? আপনি যখন অনেককেই ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন তারা ভালো আছেন, কিন্তু তারা জানেন তাদের সময়টাই ভালো যাচ্ছে না। সত্যি কথাটা বলার জন্যে সাহস থাকলেও সেটা আসলে পুরুপুরি কাউকে যে বুঝাবেন, সেটা মুখের কথায় বুঝানো যায় না। আয়নায় হয়তো আপনি কাউকে চেহারাটা দেখাতে পারবেন, কিন্তু কষ্টটা দেখাবেন কিভাবে? ভিতরের কষ্টটা কাউকে দেখানো যায় না। আর ভিতরটা কেউ দেখেও না, যদিও সত্যিটা ভিতরেই থাকে। সেই কষ্টেভরা সুর শুধু নিজের কান থেকে নিজের অন্তরেই ঘুরাঘুরি করে প্রতিধ্বনি করতে থাকে। অন্য কারো অন্তর কিংবা হৃদয়ে সেটা কোনোভাবেই আপনি পুশ করতে পারবেন না। আসলে একটা কথা আছে-কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট যে কষ্টের কোনো নাম নাই, যে কষ্টের রুপ কাউকে দেখানোও যায় না।

-যেদিন আমি প্রথম আসমানীকে দেখেছিলাম, ঠিক একই রকমভাবে আমি দেখেছিলাম এই সাবিত্রীকে। সাবিত্রীকে আমার খুজে বের করতে হয় নাই। সাবিত্রী ধরনীর ভাসমান এই পৃথিবীর কোন এক অসমতল প্লাটফর্মে একাই দাড়িয়েছিলো। তার কি অতীত কিংবা কি ইতিহাস সেটা আমার জানা ছিলো না। আর আমি জানতেও চাইনি। একটা জিনিষ জানবেন, অনেক সময় এমনটা হয়, কারো মুখ দেখে কারো ভিতরের যন্ত্রনাকে উপলব্দি করতে পারবেন আপনি হয়তো। তখন কারো হয়তো মন চাইবে যে, তার কাছে যেতে, তার মনের কথা জানতে, কিন্তু আমাদের সমাজটা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে সচেতন মানুষের মন বলে উঠে ‘মাথা ঘামিও না, যদি কোনো সমস্যায় পড়তে হয়!! যদি বিপদে জড়িয়ে পড়ো?’ এই উপলব্ধিটা হয়তো সবাই করে। সবার মনকেই হয়তো ছুয়ে যায়। কেউ কেউ এগিয়ে আসেই না, আবার কেউ কেউ বিপদ জেনেও ঝাপিয়ে পড়ে। পাখীদের বেলায় কিংবা অন্য কোনো প্রানীদের বেলায় এটা কতটুকু, সেটা আমরা না কখনো ভেবে দেখেছি, না কখনো উপলব্ধি করেছি। ওরা দিনের শুরুতে আহারের খোজে বেরিয়ে যায়, পেট ভরে গেলে কোনো এক গাছের ঢালে বা পাহাড়ের কোনো এক ছোট সুড়ঙ্গে রাত কাটিয়ে দেয়। তাদের অট্টালিকার দরকার পড়ে না, ওরা কেউ কারো শত্রুতা করে না, কোনো পর্বনে বিশেষ কোনো কিছুর আয়োজনেরও দরকার মনে করেনা। কবে ছুটির দিন, কবে ঈদের দিন কিংবা করে কোন মহাযুদ্ধ লেগেছিলো সে খবরেও ওদের কিছুই যায় আসে না। ওদেরও সন্তান হয়, ওরাও দলবেধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়, ওদের কোনো ভিসা বা ইমিগ্রেশনেরও দরকার পড়ে না। টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী ওদের জন্য কোনোদিন দরকার পড়ে নাই, আগামীতেও দরকার পড়বে না। ওরাও কষ্টে কিছুক্ষন হয়তো ঘেউ ঘেউ করে, কিংবা চিন্তিত হয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে চলে যায়, কিন্তু তাকে আকড়ে ধরে বসে থাকে না। ওদের সারাদিনের কর্মকান্ডের জন্য না কারো কাছে জবাব্দিহি করতে হয়, না কারো কাছে ধর্না দিতে হয়, এমনকি ওরা ঈশ্বরের কাছেও তাদের অপকর্মের কিংবা ভালোকর্মের কোনো জবাব্দিহিতা করতে হয় বলে মনে হয় না। কোনো ট্যাক্স ফাইল নাই, কোনো ভ্যাট ফাইল নাই, না আছে কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, না দরকার তাদের গাড়িঘোড়ার। তাহলে তো ওরাই আসলে শান্তিতে থাকে, মানুষের থেকে অধিক। পশুপাখীরা ওদের জীবনের ব্যর্থতা কিংবা সফলতার ডেবিট-ক্রেডিট করে না। কিন্তু মানুষের বেলায় এটা একেবারেই প্রজোয্য নয়। তাদের বিপদে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হয়, কারো না কারো সাহাজ্য লাগে। যখন বিপদের এমন মূহুর্তে সে সেটাই পায় যেটা সে মুহুর্তেই দরকার, হয়তো তাতেই তাঁর জীবনটা ঘুরে যায় অন্যদিকে। যখন পায় না, তখন হয়তো আরো অতল গহব্বরে তলিয়ে একেবারেই হারিয়ে যায়।

-সাবিত্রীকে সেদিন দেখে এটাই আমার মনে হয়েছিলো-জীবনের সাথে তাঁর বোঝাপড়ায় সে ব্যর্থ হয়েছে। অদ্ভুদ মায়াবী এক অপলক নেত্রে সে দাড়িয়েছিলো, পরে লক্ষ্য করেছিলাম, ওর মা ওর সাথেই ছিলো ভাষাহীন এক মুর্তির মতো, হয়তো শুধু সঙ্গ দেয়ার জন্যই। এই এমন একটা পরিস্থিতিতে আমার আর সাবিত্রীর মাঝখানে বয়ে যাচ্ছিলো নাম না জানা একটা কৌতূহল। আমি সাবিত্রীর কাছে গিয়ে এমনভাবে দাড়িয়েছিলাম যেনো আমি তার অনেক চেনা একজন মানুষ। সাবিত্রী হয়তো আশাই করে নাই আমার হাত বাড়িয়ে দেবার ব্যাপারটা। মনুষ্যত্তের অবনমন যেমন আছে, মনুষত্যের উত্তোরনও তেমন আছে। সন্দেহের বশে অসুবিধায় রয়েছে এমন মানুষকে দেখে কোনো প্রশ্ন করা মোটেই অহেতুক হস্তক্ষেপ নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেসব সচেতন মানুষ সামাজিক লাঞ্ছনার ভয়ে সেই কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাড়াতে ভয় পায়। কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি। অসহায় নির্লিপ্ত আমার থেকেও প্রায় ৩০ বছরের ছোট এই সাবিত্রীকে আমি সমাজের ভয়ে একা ছেড়ে দেইনি। তার কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, তার মুখে লুকিয়ে থাকা কষ্টের কথা অথবা তার সাথে ঘটে যাওয়া কোনো অত্যাচার কিংবা লাঞ্ছনার কোনো লুকানো কাহিনীর কথা। আর সেখান থেকেই শুরু হয় আমাদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কের অদৃশ্য বন্ধন। আসমানীর সাথে আমার প্রথম পরিচয়ে আমরা ছিলাম শান্ত দীঘির মতো। অনেক দূরের পথের সংগীর মতো। ধীরে হাটলে অসুবিধা নাই। কিন্তু সাবিত্রির সাথে আমার প্রথম পরিচয়ে আমি ছিলাম অশান্ত। মনে হয়েছিল, সময়টা দ্রুত কোথায় যেনো ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমাকে দ্রুত চলতে হবে। আমি ওকে সেই অবহেলিত বিকালে একা ছেড়ে আসতে পারিনি। প্রতিবারই মনে হয়েছে, জলস্রোতের পাশে দাঁড়িয়ে জলের গতিকে আমি থামাতে পারবো না কিন্তু এই খরস্রোতা জলের ধারা থেকে অন্তর কাউকে একটু দূরে সরিয়ে কিছুটা নিরাপদ আশ্রয়ে তো নিতেই পারি। আর সেখানেই ছিলো আমার আর সাবিত্রীর মধ্যে একটা প্রাথমিক দেনা। আর এই দেনার পরিষধ যে এক সময় এতো বট পাওনায় আমাকে পরিশোধ করবে সাবিত্রি আমি সেটা সেদিনের পড়ন্ত বিকেলে কখনোই বুঝতে পারিনি। আমি আমার একাকীত্তকে হয়তো কিছুটা হলেও লাঘব করতে পেরেছি। তাঁর কাছে আমি নিছক মুক্তার সাহেব নই, আমি হয়তো তাঁর কাছে এমন  একজন যাকে আপনি বলতে পারেন-‘অলিখিত ভগবান’।

মুক্তার সাহেবের কথা শুনতে শুনতে আমি যেনো ফিলসোফির ক্লাসের কোনো লেকচার কিংবা রহস্যে ঘেরা জীবনের চর্চাবিহীন কোনো অধ্যায়ের যুক্তিতর্কের তত্ত শুনছিলাম এটাই মনে হচ্ছিলো। মাঝে মাঝে তিনি এমন কিছু কথা বলছিলেন, যার সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত নই কিন্তু তাকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতাও ছিলো না আমার। আমরা ঈশ্বরের কথা বলি, ভগবানের কথা বলি। কিন্তু কে সেই ঈশ্বর কিংবা ভগবান তাকে আমরা কখনো দেখি না। কিন্তু মনেপ্রানে এ বিশ্বাস থেকে প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের সমস্যার কথা, আমাদের আবেগের কথা গোপন প্রার্থনার সাথে তাঁর কাছে বলে হয়তো মনের ভিতরের কষ্ট বেদনা দূর করার চেষ্টা করি। কিন্তু সবসময় কি তা আসলেই লাঘব হয়? দূর্বলই হোক কিংবা সবল, আমরা আমাদের ভাবাবেগের সবউত্তর যখন পাই না, তখন সেই ঈশ্বর কিংবা ভগবানের কাছে সমর্পন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না জেনেও সেই ঈশ্বরের কাছেই আবার ফেরত আসি। এটা একটা সাইকোলজি। আমরা অনেক কিছু মেনে নেই কিংবা মেনে নিতে হয়। হয়তো সবাই সেটা মেনে নেয় না। মুক্তার সাহেবের বেলায় ব্যাপারটা কোন স্তরের তা নিরুপন করা কঠিন। তিনি যেমন ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন, তেমনি বিশ্বাস করেন মানুষ ঈশ্বরের একটা হাতিয়ার।

অলিখিত ভগবান? এটার ব্যাখ্যা কি? আমি মুক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমার এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি কথা চালিয়ে গেলেন।

-কিছু কিছু সময় আসে মানুষের জীবনে, যখন সবকিছু হাতের কাছে থাকলেও মনের অজান্তে মনে একটা না পাওয়ার আক্ষেপ তৈরী হয়। কি চেয়েছি, আর কি চাইনি, বা কি পেয়েছি আর কি পাইনি এই দুয়ের মধ্যে একটা টানাপোড়েন তৈরী হয়। এই টানাপোড়েন আসলে একটা হতাশা। কিন্তু যিনি বাস্তববাদী, যিনি ঈশ্বর বিশ্বাসী, তিনি এই টানাপোড়েনের ব্যাপারটা সমাধান করেন অন্যভাবে। তিনি ভাবেন-ভগবান মানুষের জন্য প্রতিটি দিন একই রকম করে পরিকল্পনা করেন না। আজ যে রবিবার আপনি হাসছেন, আগামী রবিবার আপনি নাও হাসতে পারেন, হয়তো সেদিন চোখের জলে প্রতিটি মুহুর্ত ভরে থাকবে আপনার। এই সপ্তাহটা হয়তো আপনার জন্য ভয়ানক অস্থির যাচ্ছে, কে জানে আগামী সপ্তাহটা হয়তো হবে একেবারেই সুন্দর ঝরঝরা। তাই হতাশ হবার কোনো কারন নাই। প্রতিটি ঝড় কিংবা বিপদের মাঝেও কিছু না কিছু সুসংবাদ থাকে, কিছু না কিছু ভালো জিনিষ আসে। একটা মৃত ঘড়ির দিকে তাকান, দেখবেন নষ্ট ঘড়িটাও দিনে দুবার একদম সঠিক সময় প্রকাশ করে। অপরিষ্কার জল খাবারের অনুপোযোগী হলেও সেটা আগুন নেভানোর কাজে লাগে। বোবা কিংবা বোকা বন্ধুও আপনার অন্ধ জীবনে রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারে। এ রকম আরো অনেক বিকল্প উপায়ে মানুষ হতাশার অন্ধকার থেকে বাচার জন্য সঠিক ঘাটের সন্ধান করেন। যখন তিনি সেখানেও ব্যর্থ হন, তখন তিনি স্থাপিত হন সেই ঘাটে যার আরেক নাম ‘তৃতীয় নদীর ঘাট’। কখনো কি এই “তৃতীয় নদীর ঘাটের” কথা শুনেছেন?

না, আমি তৃতীয় নদীর ঘাটের কথা কখনো শুনিনি। অনেক উপন্যাসে কিংবা সাহিত্যিকরা ‘নদীর তৃতীয় ঘাটে” এর কথা সিম্বলিক হিসাবে কোথাও কোথাও ব্যবহার করেছেন সেটা আমি শুনেছি। তাও আমি ভালোমত এর ব্যাখ্যা দিতে পারবো না। তবে, তৃতীয় নদীর ঘাটের কথাটা আজই আমি প্রথম আপনার কাছে শুনলাম। আমি জানি না এর দ্বারা আপ্নিইবা কি বুঝাতে চেয়েছেন।

আমি বোকার মতো মুক্তার সাহেবকে বললাম, জানেন মুক্তার সাহেব, আমি আপানার কেসটায় না এলে অনেক কথাই বুঝতে এবং জানতে পারতাম না। জীবনে অনেক সাইকোলজিক্যাল কিংবা ফিলোসোফিক্যাল ধারনা আছে যা মানুষের জীবনকে অনেকভাবে প্রভাবিত করে। এটা এতোদিন আমি বইয়ে বা গল্পে শুনেছি, কিন্তু আজকে আমি আপনার সাথে কথা বলে এমন কিছু ব্যাপার খুব কাছ থে উপলব্ধি করতে পারছি, যা আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে অনেকভাবেই প্রভাবিত করে কিন্তু আমরা বুঝি না কিভাবে করে।

সন্ধ্যা নেমে এসছে ইতিমধ্যে। কাজের বুয়া আমাদের রুমের বাতিগুলি জালিয়ে দিয়ে গেলেন। সাথে সন্ধ্যার কিছু নাস্তা। কিছু পাকুড়া ভাজার সাথে ছোলাভুনা আর সদ্য গরম কিছু জিলাপী। পাশেই কফির একটা কেটলী রেখে গেলো।

মুক্তার সাহেব সম্ভবত একটি এলশেশিয়ান কুকুর পালেন। এতোক্ষন পর আমি একটা বিদেশী কুকুরের ঘেউ ঘেউ এর আওয়াজ শুনলাম।

-আসলে আমি প্রতিদিন আমার কুকুরকে নিয়ে বাইরে একটু হাটতে বেরোই। আজ আর যাওয়া হয় নাই। কুকুর নিজেও জানে এখন তাকে নিয়ে বাইরে বেরোবার কথা। হয়তো দেরী হয়ে যাচ্ছে বিধায় কুকুর নিজেই তার মালিককে আওয়াজ দিলো। বড্ড পোষ্মানা একটি কুকুর।

-যাই হোক, যেটা বলছিলাম। ঘাটের কথা।

-মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম হচ্ছে সে প্রতিনিয়ত একটা সঠিক ঘাটের সন্ধ্যান করে। মেয়েরা বিয়ের ব্যাপারে সঠিক পাত্র, ছেলেরা সঠিক পরিবার এবং নিজের পছন্দের পাত্রি, বয়ষ্করা নিজেদের মতো পরিবেশ আর বন্ধু, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ। এসবই এক প্রকারের ঘাট। যতোক্ষন আপনি সঠিক ঘাটের সন্ধান না পাবেন, ততোক্ষন পর্যন্ত আপনি উদ্দেশ্যহীন একজন মাঝি। নৌকা আছে, বৈঠা আছে, আর সেই নৌকা চলার জন্য পর্যাপ্ত নদীও আছে, কিন্তু আপনি ঘাট খুজে পাচ্ছেন না। যতোক্ষন আপনি আপনার মনের মতো সঠিক ঘাট খুজে না পাবেন, তখন মন ছুটে যায় এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে। এই সাবিত্রীর মতো। নিজের মনের মতো করে কেউ যখন কোনো ঘাটের সন্ধান পায়, তখন মন আর অন্য কোনো ঘাটে ফিরে আসতে চায় না। পুরানো ঘাটে ফিরে আসা আর সেই পুরানো ঘাটে নোঙ্গর করার মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। হতে পারে আপনি যে ঘাটকে সঠিক ঘাট ভাবছেন, সেটাও ভুল। হতে পারে, সেই ভুলঘাটও আপনাকে ভুলপথে নিয়ে যেতে পারে। এই ভুলঘাট সবসময় একটা বিপদের সংকেত দেয়, কারন কেউ যখন একবার ভুলঘাটে তাঁর মন নোঙ্গর করে, সেখান থেকে হয়তো ফিরে আসার রাস্তাই আর তার জানা থাকে না। রাস্তাটা একেবারেই অচেনা মনে হয়।

-মজার ব্যাপার কি জানেন? অচেনা রাস্তায় অচেনা মানুষের কাছে আপনার চোখের জলের কোনো মুল্য নাই। আর মুল্যহীন জীবনে স্বপ্ন তো দূরের কথা বেচে থাকাই দূরুহ। কষ্ট থেকে বেরিয়ে যাবার তরে আরেক অচেনা দূরুহ রাস্তায় যখন মানুষ বেদনা নিয়ে বেচে থাকে, তখন সে জীবনের প্রতি মায়া হারিয়ে ফেলে, ভগবানের উপর সে আস্থা হারিয়ে ফেলে। ঈশ্বর আছে এটাই তখন আর বিশ্বাস করতে চায় না। কিন্তু সময় এমন এক জিনিষ, সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু পালটায়। তবে আপাতদৃষ্টিতে বিবেচিত সঠিক ঘাটেই যেনো সেই মনের সুখ আর শান্তি বিরাজ করে, এটা ভেবেই মানুষ দ্বিতীয়বার নোঙ্গর করে। সাবিত্রীর সাথে আমার দেখা হবার পর, আমার কাছে সাবিত্রীকে আমার একটা বিকল্প ঘাটের সন্ধান বলেই মনে হয়েছিলো। এটা হয়তো সাবিত্রীর বেলাতেও একই উপলব্ধি। ঠিক, বেঠিক, ন্যায়, অন্যায় ইত্যাদির ব্যাপারে আমি কোনো প্রশ্ন করতে চাইনি। হতে পারে সাবিত্রীর কাছেও আমার ঘাটটাই সঠিক বলে মনে হয়েছে। আমরা দুজনেই জানি-এই ঘাটে আরো অনেক সম্পর্ক জড়িত কিন্তু সেই সম্পর্কগুলি যেনো পুরানো সুতায় সব পেচিয়ে দিশেহারা হয়ে আছে। তা দিয়ে আর নতুন জাল বুনানো সম্ভব নয়। আবার যে এলোপাতাড়ি বুনন আছে সেটাও চিরতরে ধংশ করা সম্ভব নয়। এই সম্ভব আর অসম্ভবের মধ্যেই যেনো নতুন আরেকটি বুনন বেধে গিয়েছিলো আমার আর সাবিত্রীর।

মুক্তার সাহেব একটু থামলেন। আরেকটা সিগারেট ধরালেন। নাস্তাটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, নিজেও নিলেন। মুক্তার সাহেব একবার পাকুড়ায় কামড় দিচ্ছেন, সাথে সিগারেট ও ফুকছেন। যেনো সিগারেটের ধুয়াটাও একটা রেসিপি। বাইরে গাছের ঢালে কয়েকটা পাখী কিচির মিচির করছে। কুকুরটা তখনো থেমে থেমে ঘেঊ ঘেঊ করছে। মুক্তার সাহের উঠে গেলেন তার কুকুরের কাছে। সাথে কয়েকটা জিলাপিও নিলেন। কয়েকমিনিট পর যখন মুক্তার সাহেব ফিরে এলেন, দেখা গেলো, কুকুরটা আর কোনো ঘেউ ঘেউ করছিলো না। মুক্তার সাহেব কি কথা বললেন তার কুকুরের সাথে আর তার এক্সেসিয়ান কুকুর কি বুঝলো তারাই শুধু জানে কিন্তু মনে হলো যে বার্তা মুক্তার সাহেব তার কুকুরকে বুঝাতে চেয়েছেন, তার সেই এলসেশিয়ান কুকুর সঠিকভাবেই বুঝেছে। মুক্তার সাহের ফিরে এলেন। আমার মনের ভিতরে ঘুরপাক খাওয়া সেই কথাটার ব্যাপারে জানতে খুব ইচ্ছে করছিলো। ‘অলিখিত ভগবান’ বা  ‘তৃতীয় নদী’। জিজ্ঞেস করলাম, আমরা নদীর তৃতীয় তীরের কথা অনেক সাহিত্যিকের লেখায় পড়েছি। যেমন হুয়াও হুইমারেস রোসার  ‘দি থার্ড ব্যাংক অফ দি রিভার’। কিন্তু তৃতীয় নদীর তীরটা কি? আমি যেনো বোকার মতো একটা প্রশ্ন করেছি এমনভাবে মুক্তার সাহেব একটা অট্টহাসি দিয়ে একমুখ ধোয়া বের করে বললেন-

-হুয়াও হুইমারেস রোসার সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি থার্ড ব্যাংক অফ দি রিভার’টা তাহলে পড়েছেন? গল্পটা কি মনে আছে আপনার? যাক, মনে না থাকলেও সমস্যা নেই। আমি পড়েছি। একটু ঝালাই করি তাহলে।

-হুয়াও হুইমারেস রোসা একজন দক্ষিন আমেরিকার বিখ্যাত ছোট গল্পলেখক। এই গল্পে এক পরিবারের খুব দায়িত্বশীল একজন পিতা একদিন একটা ডিঙি নৌকা তৈরি করেন। ছোট ডিঙি। গলুইতে শুধুমাত্র এক চিলতে জায়গা। একজনের বেশি মানুষ সেখানে বসতে পারবেনা। বিশাল এবং সুগভীর একটা নদীর তীরে পরিবারের বসতি। নদীটা এতোই বিশাল এবং প্রশস্ত যে, অন্য তীর দেখাই যায়না। অতঃপর একদিন তিনি নদীপাড়ের বাড়িতে তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিশাল, সুগভীর নদীতে তার ডিঙি ভাসিয়ে দিলেন। কোন খাবার বা অন্য কোন রসদও সঙ্গে নিলেন না। এমনকি শেষবারের মত পরিবারের কাউকে কোন উপদেশও দেবার চেষ্টা করলেন না। অদ্ভুত ব্যাপার হলো তিনি আর কখনো ফিরেও আসলেন না। কিন্তু আবার কোথাও চলেও গেলেন না। মাঝ–নদী বরাবর অনির্দিষ্টভাবে ঘোরাফেরা করতে লাগলেন। কখনো উজানে। কখনোবা ভাটিতে। কিছু কিছু সময়ে তিনি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যান। কিন্তু কখনই এমন দূরে নয় যে তার উপস্থিতিটা পরিবারের সদস্যরা অনুভব করতে সক্ষম না। … মৃত্যুই কি নদীর তৃতীয় তীর? এটাই ছিলো তাঁর কথার সারমর্ম। কিন্তু আমি তাঁরসাথে একমত নই। কেনো জানেন?

আমি উত্তরে বললাম, না জানি না। আপনি বলুন।

-আসলে এই তীর কি, কোথায় তার অবস্থান, কিংবা এটা কি এমন কোনো নদী যার তীর সচরাচর গোচরীভুত হয় না, অথচ আছে? অথবা এই নদীর কি আরো তীর আছে যার নাম হয়ত ‘চতুর্থ তীর’? সবুজ গাছ-পালা, আকাবাকা মেঠোপথের শেষপ্রান্তে প্রাকৃতিক বড় সৌন্দর্য পরিবেষ্টিত বিশাল জলাধারের চলমান স্রোতের প্রাবাহমান যদি কোন নদী হয়, সেই নদীর তীর হয়তোবা কখনো এই বিশাল জনরাশির সবার জন্য একই। এখানে সবার রোমাঞ্চ, আশা, বেদনা, সবার কাহিনীর এক মহাপুস্তকের মতো। হয়তোবা এটা কখনো সভ্যতার জীবনধারার বাহকরুপী কোনো সময়ের রাজত্ব হলেও হতে পারে কিংবা কখনো সেই দৃশ্যমান নদী অতীত বর্তমানের সুখ দুঃখের এই বিশ্বভ্রমান্ডের সাক্ষীর ধারকবাহক হলেও হতে পারে। আর সেটাকেই আমরা কখনো নদী, কখনো উপসাগর অথবা কখনো সাগর থেকে মহাসাগরের স্তরে বিন্যাস করে কতোইনা উপমা করে থাকি। এই নদীর স্রষ্টা আছে, এর নিয়ন্ত্রণকারী আছে, আর তার উপর সমগ্র মানবকুল একটা মিশ্র বিশ্বাস নিয়েই কেউ এর স্রষ্টাকে পুজা করে, কেউ তাকে অস্বীকার করে আবার কখনো কখনো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মায়াজালে আশা-নিরাশার ভারদন্ড নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। হয়ত এরই নাম “জীবন”, হয়তবা এরই নাম “সভ্যতা”। এই নদীর কিনারা থেকে পালিয়ে বেড়ানো মানে এই নয় যে, জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো কিংবা সভ্যতা থেকে হারিয়ে যাওয়া। এই বিশ্বভ্রমান্ডের কোথাও না কোথাও আরেক নদীর তীর আছে যেখানে তার কিনারা পাওয়া যায়। সেখানেও নতুন করে সভ্যতা, জীবন এবং নতুন কাহিনীর রচনা হতে পারে এবং হয়।

-কিন্তু সমগ্র বিশ্ব থেকে যখন আমরা মানবকুল সবকিছু ছেড়ে ছোট একটা গন্ডি শুধুমাত্র গুটিকতক আপনজনের পরিসীমায় আবদ্ধ করে একটা মায়াজাল আবিষ্ট করি, তখন দিনের সবকাজ শেষ করে যখন নীড়ে ফিরে এসে হিসাব কষি, তখন সামনে এসে দাঁড়ায় আরেকটি নদী। হয়ত তাঁর নাম “মন-নদী’। এই নদীতে চলমান জলের প্রবাহ নেই, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাহার নেই, পাহাড় নেই, আকাশ নেই, কিন্তু তারও আছে অনেক তীর। যা কখনো শান্তির মহাখুশিতে জলের ধারা বইয়ে চিকচিক করে জানান দেয়, ‘যা চেয়েছি তাই পেয়েছি’। আবার কখনো কখনো দুঃখের সীমাহীন যন্ত্রনায় সেই একই নদী তার দুই তীর জলের ধারায় শিক্ত করে নীরবে বলে যায়, ‘বড় যন্ত্রনায় আছি’। হয়ত তখন আমরা বলি, দুই নয়নের ধারা। নিজস্ব গন্ডির এই পরিসীমায় এই নদীর একক ধারকবাহক শুধু কিছু আপনজন, নিজে আর ব্যক্তিসত্তার অজানা উপাদানের সব সমীকরন। এখানে ঈশ্বর বাস করেন ক্ষনেক্ষনে, আবার ঈশ্বর উধাওও হয়ে যান ক্ষনেক্ষনে। এখানে ছোট গন্ডির গুটিকতক আপনজনের সার্থকতা, ব্যর্থতা, ভালোবাসা, দায়িত্বশীলতা, নির্ভরতা সবকিছু একেবারেই নিজস্ব। সমগ্র মানবকুলের হিসাব কিতাবের সাথে, সুখ দুঃখের সাথে, চাওয়া পাওয়ার সাথে, লাভ লোকসানের সাথে সব কিছু মিশে থাকে।

-এই নদীতে বাস করে “আমি”, আমার আমিত্ত আর আমার চারিধারের সব আমারত্ত। আর কেউ নেই। এখানে ঈশ্বর আমি, এখানে নিয়মের কোন বালাই নেই। এখানে আকাশের রঙ আমার নিজের মতো করে বানানো, আমার নদীর জল আমার ইচ্ছায় যখন যেভাবে খুশি প্রবাহিত হয়। এখানে আমার ইচ্ছাটাই সব। এখানে আমার ছোট ডিঙ্গী কখনো উজানে, কখনো ভাটিতে, কখনো নিরুদ্দেশে, কখনো জনসম্মুখে, কখনো কাছে কখনো দূরে যেথায় খুশী সেখানে আমার বিচরন। কাউকে আমার কিছু যেমন বলার নেই, কারো কোনো কিছুই আমার পরোয়া করারও কোন প্রয়োজন নেই। এখানে আমার কোন দায়িত্ববোধ নেই, আমার দায়িত্বও কারো উপর নেই। এখানে আমার সব নদীর উপস্থিতি যেমন আছে, তেমনি কোনো নদীর উপস্থিতিও আমাকে বিচলিত করে না। একদিক থেকে দেখলে এই নদীর কোন তীর নেই আবার আরেক দিক থেকে অনুধাবন করলে হয়ত দেখা যাবে এর আছে অজস্র তীর। কখনো উল্লাশের তীর, কখনো আনন্দের তীর, কখনো ব্যর্থতার তীর, কখনো সব হারিয়ে এক অবসন্ন জীবনের তীর। এখানে এই তীরে কেউ প্রবেশের অধিকারও নেই। এখানে আমার রশদের কোনো প্রয়োজন নেই, এখানে সর্বত্র আমি। আমি কি করতে পারতাম, কি করা উচিত ছিলো, কে কি করতে পারতো, কোথায় আমি ভুল করেছি, কোথায় আমার সার্থকতা ছিলো, কি আমার ভুমিকা হতে পারতো, কিংবা কি কারনে আমি আমার সবকিছু নিঃস্বার্থভাবে ছেড়ে আমি আমার তৃতীয় এই নদীতে একা পড়ে আছি, তার কোনো ব্যখ্যা আমি আর খুজতে চাই না। হয়ত কেউই এর কোনো উত্তর মেনেও নিবে না।

-এখন আরেকটি প্রশ্ন মনে আসে। তাহলো, এই তৃতীয় নদীটি কোথায়? কারো কাছে এই তৃতীয় নদীটি হয়ত বাস্তবের কোনো এক বিশাল জলপ্রবাহমান নদীর বুক, কারো কাছে হয়তবা ঘন গাছপালায় পরিবেষ্টিত এক নির্জন জঙ্গল, কারো কাছে হয়তবা এই বিশাল মানবকুলের ঘনবস্তির মধ্যেও একা কোনো জগত। কেউ বিশ্বাস করুক আর নাইবা করুক, এই নদী সবার আছে, কেউ তাকে গ্রহন করে, কেউ এর সন্ধান জানেও না। এই নদীতে ঝাপ দেওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। কারন এর যেমন কোনো দৃশ্যমান তীর নেই, আবার সব তীরের ঘাটও এক রকম নয়। এর জলের রঙ সবনদীর মতো নয়। এর কোনো ঋতু নেই, যখন তখন বৃষ্টি, ঝড়, উল্লাস, আনন্দ, কান্না, পরিহাস সবকিছু ঘটে। আর এর একচ্ছত্র অনুভুতি, আস্বাদ, ইতিহাস শুধু নিজের আর কারো নয়। এই তৃতীয় নদীর কিনারে বসে শতবর্সী বয়োবৃদ্ধা তাঁর বাল্যকালের স্বপ্ন দেখেন, আবার কারো কারো অজান্তেই এই নদীর বালুচরে হেটে হেটে কোনো এক উদাসীন কিশোর তাঁর কল্পনার জগত পেড়িয়ে শতবর্ষ পরের কোনো এক জনবসতীর সপ্নজাল বুনন করেন। কেউ ফিরে আসে, কেউ আর ফিরে না। এই নদীর তীরে বসা সবাই একা, সবাই সুখী, আবার সবাই বিরহীর মতো। অথচ এতো কাছাকাছি থেকেও এদের মধ্যে কেউ সখ্যতা করেন না, কেউ কাউকে সম্মোহনও করেন না। যেদিন এই মন-নদী অবশান হয়, সেদিন সব তীরের ধারা একসাথে মন-নদীর সাথে তিরোধানও হয়। হয়ত তখন হুয়াও হুইমারেস রোসা্র লেখা “নদীর তৃতীয় তীর”টি আর কারো গোচরীতভুতও হয় না। সময়ের বিবর্তনে আমরা সবাই ঐ জেলের মতো হয়ত কোনো কোনো তীর থেকে খসে পড়ি। বৃন্তচ্যুত কলির তীরখসা জীবনের অজস্র তীরের যখন একচ্ছত্র ভীড় ঘনীভুত হয় মহামিলনে বা মহাবেদনায় অথবা মহাপ্রলয়ে, তখন চৈত্রমাসের তাপদাহের পর বৈশাখের কালো হিংস্র ঝড়ে তান্ডবের মতো আমরা শুধু সেটাই দেখি যা শ্রাবনের অঝোরধারায় এই মাটির ধরায় সবার পায়ে, মনে, ঘরে বা মানসপটে ভেসে উঠে।

উফ কি অসম্ভব সুন্দর উপস্থাপনা মুক্তার সাহেবের। জীবন সম্পর্কে তাঁর চিন্তাধারা সবার থেকে যেনো অনেক আলাদা কিন্তু অবাস্তব মনে হচ্ছে না। আমি মুক্তার সাহেবের কথা যতোই শুনছি, ততোই যেনো অভিভূত হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে-এগুলি তো আমারো ফিলোসোফি। এসেছিলাম, মুক্তার সাহেবের পরকীয়ার ব্যাপারে জবানবন্দী নিতে। কিন্তু আমি যেনো এখন জবানবন্দী নিচ্ছি জীবনের ফিলোসোফির। কত হাজার প্রকারের ধারনা এই পৃথিবীতে চলমান বায়ুর সাথে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুর্নীপাকের মতো হারিয়ে যাচ্ছে, আবার নতুন ঘুর্নীপাকে নতুন নতুন উপলব্ধি ভেসে আসছে, কেউ আমরা কিছু বুঝি, কেউ না বুঝেই পাস কাটিয়ে যাই আবার কেউ হয়তো বুঝিই না, কি গেলো আর কি এলো। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিলো মুক্তার সাহেবের সাথে কথা বলতে বলতে। রাতের খাবারের সময় ঘনিয়ে এসছিলো। মুক্তার সাহেব যেনো আজ আর কথা বলতে চাচ্ছিলেন না এমন একটা ইংগিত দিচ্ছিলেন। আমিও ভাবলাম, আজ তো অনেক কথা হলো, অন্য আরেকদিন অনেক সময় নিয়ে আবার কথা বল্বো।

আমি মুক্তার সাহেবকে বললাম, আজ উঠি। আরেকদিন আবার আসবো। বুঝেনই তো, আমাকে আপনাদের ব্যাপারে কিছু কথা আমাকে জানতে বলা হয়েছে। হতে পারে এটা অফিশিয়াল কোনো ইন্টারভিউ কিন্তু আমি জানি আমি যতোটা না আপনাকে ইন্টারভিউ করছি, তার থেকে ঢেড় বেশী যেনো আমি আপনার সাথে কথা বলতে সাচ্ছন্দবোধ করছি। আজ আর আপনাকে বিরক্ত করবো না, তবে কাল বা পরশু আমি আবার আসবো। তবে যাবার আগে আমার মনে খুব একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে আপনার সেই কথাটা জানার। ‘অলিখিত ভগবান’। এটার ব্যাপারে মুক্তার সাহেবের ফিলোসোপিটা কি আসলে? জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু এবারো তিনি সেটা এড়িয়ে গেলেন। বললেন-এই বাক্যটি যার মুখ থেকে প্রথম আমি শুনেছি, হয়তো সেইই আপনাকে এর সঠিক মর্মার্থটা বলতে পারবেন। আমিও এর সঠিক ব্যাখ্যা জানি না।

অফিসে অনেক কাজ ছিলো এ কয়দিন। দুদিন পরেই মুক্তার সাহেবের কাছে আমার আসার কথা ছিলো কিন্তু আসা হয় নাই। গতরাতে আমি মুক্তার সাহেবকে ফোনে জানিয়েছিলাম, আমি আসবো, তার কোনো আপত্তি আছে কিনা। মুক্তার সাহেব কোনো আপত্তি করেননি।

আজ সকাল সকালই আমি মুক্তার সাহেবের বাসায় এসে হাজির হলাম। তিনি বাগানে গাছে পানি দিচ্ছিলেন। আমাকে দেখেই বাগানের কাজটা সংক্ষিপ্ত করে আমাকে তার ড্রইং রুমে বসতে বলে ভিতরে চলে গেলেন। কাজের বুয়া এক কাপ চা আর সাথে কিছু ফল দিয়ে গেলেন।

মুক্তার সাহেব চলে এসেছেন। কিছু কূশল বিনিময়ের পর আমরা দুজনেই তার বাগানের এক কোনে বসে চা পান করছি আর দেশের আনাচে কানাচের কিছু বিক্ষিপ্ত খবর নিয়ে সময় কাটালাম। আমি মুক্তার সাহেবের বাসায় আজ তার সাথে কি কি নিয়ে আলাপ করবো তার একটা ছোট নোট লিখে এনেছিলাম যার মধ্যে আমার মনে ঘুরপাক খাওয়া সেই ‘অলিখিত ভগবান’ এর মানে কি জানতে চাওয়া। প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতেই মুক্তার সাহেব হাসতে হাসতে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন

-আপনি দেখি একটুও ভুলেন নাই। থাক সে কথা। আজ না হয় শুধু আপনার কি কি জানার দরকার সেগুলি নিয়ে কথা বলি।

আমি বললাম, আপনিই শুরু করেন কি দিয়ে শুরু করবেন। আমার কোনো পরিকল্পনা মাফিক প্রশ্ন নাই। তবে কয়েকটা ব্যাপারে জানবো যদি আপনি বিশদ ব্যাখ্যা দেন। আর বাকী কথাবার্তা শুনে আপনার কথা থেকেই আমি আমার মতো করে তথ্য সাজিয়ে নেবো। মুক্তার সাহেব আবারো সেই আসমানী এবং সাবিত্রীর প্রসঙ্গ আনলেন। কারন এখানে আসমানী এবং সাবিত্রীর ব্যাপারটা নিয়েই আমাদের সব আলোচনা করার কথা।

মুক্তার সাহেব বললেন-দ্বৈত জীবনের নাম শুনেছেন কখনো?

দ্বৈত জীবন? দারুন একটা ব্যাপার। কোনো ভুতুরে টুতুরে ব্যাপার নাতো আবার? আমি বললাম।

মুক্তার সাহেব হেসে দিলেন।

-আরে না। আমি ভুত প্রেতাত্তা এগুলিকে কখনো বিশ্বাস করিনি। এখনো করিনা। দ্বৈত জীবন, একে অন্য নামেও অনেকে চিনে-‘দিমুখী জীবন’। এই দ্বৈত জীবনের সবচেয়ে বড় গুন কি জানেন? ডান হাত জানে না বাম হাত কি করছে। মন জানে না, অনুভুতি কি করছে, শরীর জানে না তাঁর মস্তিষ্ক কি করছে। সবকিছু থেকে সবকিছু আলাদা। একটা জীবনের দুটু আলাদা আলাদা অধ্যায়। একে অন্যের অপরিচিত এই অধ্যায়গুলি। এই দুটি জীবনের মধ্যে যখন একটা জীবন অতি দুঃখেকষ্টে ভরে উঠে, তখন আরেকটা জীবন হয়তো এর ঠিক বিপরীত দিকে থাকে। হয়তো সেখানে কোনো কষ্টই থাকে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো-এটা কখনোই সম্ভব নয় যে, দ্বৈত জীবনের মধ্যে এক জীবনের প্রভাব অন্য জীবনের উপর পড়বে না। আসমানী ছিলো আমার একটা জীবন আর সাবিত্রী ছিলো দ্বৈত জীবনের আরেকটা। আসমানী ছিলো আমার স্ত্রী কিন্তু সাবিত্রী ছিলো আমার আরেক উপলব্ধি। কখনো স্ত্রী, কখনো মেয়ে, কখনো বন্ধু, কখনো খেলার সাথী, কখনো পাঠক, কখনো অস্তিরতা, কখনো আবার শুধুই একজন বহুদূর পর্যন্ত হেটে যাওয়া কোন কম্পেনিয়ন। জীবনের গাড়ি একটা চাকার উপর টানতে টানতে অনেকেই যখন হাপিয়ে যায়, তখন এর জন্য দরকার হয় আরেকটা চাকার। আর সেই চাকাটার নাম হচ্ছে হয়তো স্ত্রী। কিন্তু মানুষ যখন নিঃসঙ্গতায় ভোগে, আর সেটা কাউকে অনেক বেশী কুড়ে কুড়ে খায়, তখন দরকার হয় একজন সঙ্গীর। যখন ওই সঙ্গীর নেহায়েত প্রয়োজন হয় অথচ তাকে সংগী করা যায় না, তখন সে কিছু একটা তো করেই। আর সেটা যে কেউ শুনলেও কখনো বিশ্বাস করবে না, অথচ ব্যাপারটা সত্যি। সাবিত্রী ছিলো তেমন একটা মানুষ। সে ছিলো আমার দ্বিমুখী জীবনের বাস্তব সত্তা।

আমি মুক্তার সাহেবকে বললাম, জানেন মুক্তার সাহেব, আমি আপনার অনেক কথার অর্থ আমার এই ক্ষুদ্র জ্ঞানে ধরতে পারিনা। কেনো যেনো মনে হয় ব্যাপারটা আমি বুঝতেছি কিন্তু ধরতে পারছিনা। আপনি কি সব সময় এভাবেই সবকিছু দেখেন? আমরা যারা ছাপোষা কেরানীর মতো জীবন চালাই, তাদের কাছে আসলে এই ধরনের অভিজ্ঞতা নাই। হয়তো আমরা সঠিক ব্যাখ্যার বদলে নিছক একটা ভুলভাল অর্থে জ্ঞানকে চালিয়ে দেই। যেমন ধরুন, আমি হয়তো এখন আপনাকে প্রশ্ন করবো, তাহলে আপনি কি এই দ্বিমুখী জীবনে বাস্তব জীবনের থেকেও বেশী সুখী ছিলেন? কিংবা আপনি কি আসমানীর সাথে সেই জীবনে কোনো কারনে আফসোসে ছিলেন?

-কেউ সুখী না। আমিও না, এমনকি আপ্নিও না। আবার সবাই সুখী, সেখানে আমিও সুখী। এই মাত্রাটা সময়ের সাথে সাথে কখনো প্রখর হয় আবার কখনো বুঝাই যায় না সুখের কোন স্টেজে আমরা অবস্থান করছি। এর ফলে যেটা হয় যে, কখনো কখনো নিজের সন্তানকেও নিজেরা চিনতে পারি না, আবার কখনো কখনো আমাদের সন্তানেরাও আমাদের চিনতে পারে না। সবার স্বকীয়তা আলাদা, সবার চিন্তাধারা আলাদা, সবার পছন্দ আলাদা, সবার সুখের সংজ্ঞাও আলাদা। এই আলাদা আলাদা স্বকীয়তা, চিন্তাধারা আর পছন্দের ভীড়ে কারো সাথেই কারো কিছুই মিল নাই বিধায় কোনো না কোনো সময়ে এরা একটি বিন্দুতে এসে কনফ্লিক্ট বা সংঘর্ষ তৈরী করে। এই কনফ্লিক্ট তৈরির বিন্দুটি যদি কেউ খুব সহজে অতিক্রম করে বেরিয়ে যেতে পারে, তারা অন্যের থেকে সুখী। কিন্তু এই বিন্দুটি এড়িয়ে যেতে লাগে অনেক আত্মত্যাগ আর কম্প্রোমাইজ। যতো বেশী ছাড়, ততো বেশী সহজ জীবন। কিন্তু এটা সবসময় পারা যায় না। একটা সময় গিয়ে আপনি আর কতটুকু ত্যাগ করতে পারেন? কতটুকু কম্প্রোমাইজ করতে পারেন? যখন এটা সীমার বাইরে চলে যায় বলে মনে হয়, কেউ সুখী নয়, আপনিও না, আমিও না, কেউ না। তখনই তৈরী হয় এবং শুরু হয় দ্বিমুখী আত্মার। এদিকেও আছি, আবার নাই। অন্যদিকেও আছি আবার সেটা নাইও। এর কারনে, এই পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষই কোনো না কোনো সময়ে দ্বিমুখী জীবনে বসবাস করে। কেউ জেনে করে, কেউ না জেনে। এই দ্বিমুখী জীবনের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে এর কোনটা আগা আর কোনটা মাথা তার হদিস পাওয়া যায় না। কখনো এর শেষ থেকে শুরু আবার কখনো মাঝপথ থেকে। যাদের দ্বিমুখী জীবন তাদের জীবনের প্রারম্ভেই শুরু হয় তাদের বেলায় এটা বলা অনেক কঠিন তাদের আসল অবয়াববটা কি। এই দ্বিমুখী জীবনের মানুষগুলি সর্বদা একটা বর্নচোরা রুপে এই সমাজে, এই সংসারে এমন করে বাস করেন যাদের মুখ এবং মুখোস কোনোটাই আলাদা করা যায় না। তাদের প্রতিটি দৃষ্টিভংগীতে থাকে আবছা আবছা কিংবা পরিকল্পিত কোনো ছায়ার রুপরেখা যেখানে সামনে থাকা মানুষগুলিকে তারা কখনোই সাধারন মানুষ হিসাবে দেখেন না। তারা যা দেখেন আর যা দেখান পুরুটাই একটা মুখোশ বা মাস্ক। যেদিন এই মাস্ক আলাদা করার মতো পরিস্থিতি আসে, তখন হাজারো রকমের প্রশ্ন মনে জেগে উঠে-কেনো, কিভাবে, কার জন্যে কিংবা কি প্রয়োজনে এই দ্বিমুখী জীবনের আবশ্যকতা? অনেকেই তখন মাস্ক পরিহিত মানুষটাকেই আসল মনে করে আসল মানুষটাকেই আর চিনতে পারেন না। পাশাপাশি কয়েক যুগ একত্রে বসবাস করার পরেও অনেক ক্ষেত্রেই এই দ্বিমুখী জীবনের সন্ধান পাওয়া যায় না অথচ ব্যাপারটা ঘটছে। ঘটছে প্রকাশ্যে, দিবালোকে আর সবার অজান্তেই। এটা যেনো সেই কচুরীপনা যা স্রোতের মধ্যে স্রোতের বিপরীতে চলমান। হটাত করে চোখে পড়ে না কিন্তু যখন নিজের অবস্থান থেকে সেই কচুরীপানা অনেক দূর অবধি চলে যায়, তখন হয়তো ব্যাপারটা দৃশ্যমান হয় কিন্তু তখন সেই কচুরীপানা আর হাতের বা দৃষ্টির মধ্যে থাকে না। সে চলতেই থাকে তারমতো। চলমান সমুদ্রে কিংবা ভরা নদীর বুকে ভেসে থাকলেও এই কচুরীপানা তার নিজের প্রয়োজনে একপেট জল সর্বদা নিজের করে ধরে রাখে যা তার হয়তো প্রয়োজনই নাই। কিন্তু দ্বিমুখী জীবনের মানুষগুলির এই প্রয়োজন আছে বলেই তারা কোনো সুযোগ নেয় না, তারা তাদের প্রয়োজনটাই আগে বিবেচনা করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। পিছনে কার কি হলো, তাতে তাদের ভাবার কোনো আবশ্যকতা মনে করে না। দ্বিমুখী জীবনের ভালোবাসায় প্রচুর খাদ যেমন থাকে তেমনি নিখুত ভালোবাসাও থাকে। ভালোবাসার এই খাদের উপরের চাকচিক্য এমনভাবে প্রতিফলিত হয় যা আসল সোনার রংটাকেই আরো আসল বানিয়ে চোখ ঝলসে দেয়, অন্যের মন আকর্ষন করে তাঁকে আরো কাছে আসার সুযোগ করে দেয়। আর এটাই সেটা যেখানে সমাজের মানুষগুলি প্রতিদিন প্রতারিত হয়। আর যখন নিখুত ভালোবাসার রঙ এর প্রলেপ থাকে, তখন যিনি দেখেন বা পান, তার কাছে সোনার বা পিতলের রঙ এর কোনো পার্থক্য থাকে না। কারন সেটাকে আপনি যে নামেই ডাকেন না কেনো, সেটা মুল বা অরিজিনাল। এখানে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো-দ্বিমুখী জীবনের সব মানুষগুলি আবার এ রকমের মুখোশ পড়ে থাকে না। তারা মুখোশের আড়ালেও বাস্তব। প্রতারনা নাই। আমরা কেহই একক সত্তায় বসবাস করি না। কখনোই এটা সঠিক নয় যে, আমরা শিশুকাল থেকে মরার আগ পর্যন্ত একই সত্তার আচরন নিয়ে বসবাস করেছি। আপনিও না। ফলে যেটা হয়, মেনে নেই, মানিয়ে নেই, সামলিয়ে নেই, কম্প্রোমাইজ করি ইত্যাদি। নিজের উপরে অনেক কিছু চাপিয়ে দেই, অন্যের উপরেও আমরা অনেক কিছু চাপিয়ে দেই।

তাহলে দ্বিমুখী জীবনটা আসলে কি? এটা কি এমন যে, আমরা ক্ষনেক্ষনে পরিবর্তনশীল? যখন কারো সাথে আমাদের বিবেচনা মিল থাকে না, সেটাই কি তাহলে দ্বিমুখীতা?

-না, দ্বিমুখীতা সে রকম কিছু নয়। দ্বিমুখী জীবনেও একে অন্যের সাথে চিন্তায় পার্থক্য থাকে। সেটাও আরেকটা জীবন। আমাদের সাভাবিক জীবনের মতোই আরেকটা লুকায়িত জীবন। দ্বিমুখী জীবনের সত্তা আসলে একের ভিতরেই অন্যটা দ্বিধা বিভক্ত। তাদের দুটুই পাশাপাশি বিচরন করে-ঘৃণা আর মাত্রাতিরিক্ত ভরষা, সত্যতা আর মিথ্যার বেশাত, কঠিনতা আর দূর্বলতা, মায়া এবং হিংসা। এই দ্বিমুখী জীবনের সময় আর অসময় বলে কিছু নাই। যখন প্রয়োজন তখন তারা উভয়ই ব্যবহার করতে কোনো দিধাবোধ করেন না। ফলে দেখা যায় যে, যাকে কেউ কোনোদিন এমন কোনো কাজ, এমন কোনো ভয়ংকর ঘটনা ঘটাতে পারে বলে ভাবেনও নাই, তারাই সেটা করে ফেলে। তখন তারা সবাইকে এমনভাবে তাক লাগিয়ে দেয় যে, সবার মনে এই প্রশ্ন জাগে এটা কিভাবে সম্ভব সেই তার দ্বারা যে কিনা একটা তেলাপোকা দেখলেও ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে থাকতো?

-এখন প্রশ্ন জাগে, যদি সবাই তাদের জীবনে কোনো না কোনো সময়ে এই দ্বিমুখী জীবনে বসবাস করেই থাকেন, তাহলে দ্বিমুখী না কারা? আসলে এর উত্তর খুব কঠিন নয়। সবার দ্বিমুখী জীবনের সংগা এক নয়। কেউ কেউ অতি অল্প বিষয়েই তার দ্বিমুখী জীবনের শুরু আর শেষ আবার কারো কারো এই বৈশিষ্ট এমন যে, প্রতিটি বিষয়েই তারা দ্বিমুখী। কারো দ্বিমুখী জীবনের ধারা শুধুমাত্র বৈষয়িক, আবার কারো কারো দ্বিমুখী জীবন ব্যক্তিগত। কেউ দ্বিমুখী জীবন দিয়ে সমাজকে কলুষ্মুক্ত করেন, আবার কেউ দ্বিমুখী জীবন দিয়ে সমাজকে কলুষিত করেন। দুটু দ্বিমুখী জীবন একসাথেও চলতে পারে যদি তাদের সেই দ্বিমুখী জীবনের গতিপথ হয় একই রেলের উপর। যখন এই দ্বিমুখী জীবনের সাথে ভিন্ন ধারার দ্বিমুখী জীবনের সংযোগ হয়, তখন ভয়ংকর পরিনতি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না। যেটা আপনারা দেখছেন আমার আর আসমানীর মধ্যে সাবিত্রীকে নিয়ে।

মুক্তার সাহেবের কথার মারপ্যাচে আমি এক রকম দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলাম। কি নোট করবো, আর কি লিখবো না সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। আমার তো এমন কিছু নোট করা আবশ্যইক যা আমি আমার প্রতিবেদনে উল্লেখ করবো। আমি যা শুনছি তা যেনো সবই অন্য ধারার কথা। অথচ কোনোটাই ফেলে দেয়ার মতো নয়। আমি মুক্তার সাহেবকে নিছক প্রতিবেদকের মতো আবারো প্রশ্ন করি- তাহলে দাম্পত্য জীবনে এই দ্বিমুখী জীবনের প্রভাব কি? এই দ্বিমুখী জীবন কি ভয়ংকর নয় যখন আমরা জানি এটা একটা মুখোশধারী সততার মতো?

-মুক্তার সাহেব বলতে থাকেন

-দাম্পত্য জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন মানুষ পরিস্থিতির কারনে কখনো কখনো দ্বিমুখী চরিত্রে ঢোকে যায়। যখন কোনো মহিলার স্বামী তার স্ত্রীর প্রয়োজনটা বুঝতে না পেড়ে বড়গাড়ি, বড়বাড়ি বড়বড় সপ্নে বিভোর হয়ে সার্বোক্ষন তার নিজের সংসারে উদাসীন থাকে আর অন্যত্র ব্যতিব্যাস্ত হয়ে সময় কাটাতে থাকে, তাহলেই তার নিজের স্ত্রীর দ্বিমুখী জীবনে প্রবেশ করার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায় আর সেই মহিলাও দ্বিমুখী জীবনে তার নিজের অজান্তেই ঢোকে যায়। কারন, যখন একটা মেয়ে একা হয়ে যায়, নিজের ঘরে স্বামীর সংস্পর্শও ধীরে ধীরে অবহেলায় পরিনত হয়, যখন সারাদিন কাজকর্ম করার পর যখন মনে হয় কেউ শুধু হাতটা ধরুক। অথচ কেউ আর পাশে থাকে না, তখন তার একাকিত্ত বাইরে বেরিয়ে আসে। তখন তার চলাফেরা, আচার আচরন, মনোভাব দেখে কারো সন্দেহ থাকে না যে, সে একা। এরপরেই শুরু হয় ভয়ংকরতা। সমাজ তাঁকে স্পর্শ করার জন্য মুখিয়ে থাকে। একসময় সে তাঁর নিজের অজান্তেই দ্বিমুখী চরিত্রে প্রবেশ করে ফেলে। যদি পুরুষের বেলায় বলি-সেটাও একই রকম। পুরুষের বেলায় তখন সাবিত্রিদের আগমন হয়। সাবিত্রিরা শুধু আপনার দেহকেই মুলধন মনে করে না। ওরা মুলধন মনে করে আপনার অসহায়ত্বকে, আপনার একাকীত্বকে, আপনার আফসোসের উপলব্ধিকে। ইতিহাস খুজে দেখলে দেখবেন, বড়বড় মনিষীরা, বড়বড় ব্যবসায়ীরা কিংবা বড়বড় জ্ঞানীরা তাদের শেষ জীবনে এসেই এই আফসোসের সন্ধানটা পান। আর মৃত্যুর বিছানায় শুয়ে শুধু একটা কথাই বলে যান সবার উদ্দেশ্যে যে, আমি কি কারো জন্যেই কিছু করি নাই? কিংবা আমি তাহলে সারাজীবন কাদের জন্য এতো পরিশ্রম করলাম যখন আমার এই মুমুর্ষ সময়ে কেউ পাশে নাই কিংবা আমি যা চাই সেটা আর পাই না? অথবা আমার অনেক অতৃপ্ত কথা শোনার কি কেহই ছিলো না? এটাই মূল কথা। জীবনের শেষ সময়ে কেউ কারো কাছেই থাকে না কারন সবাই আলাদা। সবাই ব্যস্ত। তখন শুধু সামনে থাকে সাবিত্রীরা। হতে পারে এক সাবিত্রী থেকে নতুন আরেক সাবিত্রীর পরিবর্তন হয়। কিন্তু সাবিত্রীরাই শেষ একম্পেনিয়ন। ব্যতিক্রম নাই যে তা নয়। কিন্তু দ্বিমুখী জীবনের বেলায় এটাই ঘটে।

মুক্তার সাহেবকে আমি অনেকভাবেই যেভাবেই প্রশ্ন করছি না কেনো, আমি এখনো ঠিক কি কারনে আর কোন অপরাধে আসমানী বেগমের থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে গিয়েছিলেন, সেই একাকীত্তের পুরু চিরাচরিত ধারনাটা মনে হয় পাইনি। আমি তাই আবারো মুক্তার সাহেব কে প্রশ্ন করলাম, আপনি বলছেন, আসমানী বেগম আপনার কথার অবাধ্য হয় না, তিনি কোনো পর পুরুষের সাথেও খারাপ কিছু করেন না, আবারো বলছেন, তিনি ঠিকই আছেন, তাহলে কোন জায়গায়টায় আপনি একটা দুরুত্ত দেখছেন যেখানে আপনার মনে হয় আপনি বঞ্চিত বা আপনাকে সঠিক আগের মতো আর মুল্যায়ন করছে না?

মুক্তার সাহেব সদাহাস্যের মানুষ। বেশ মিশুক আর জোরালো তার অকপট বক্তব্য। তাঁকে ডাইরেক্ট প্রশ্নও করা যায়। মুক্তার সাহেব আমার এমন ডাইরেক্ট প্রশ্নে আমাকেই উলটা একটা প্রশ্ন করলেন-

-বাংলা একটা সিনেমা আছে। ইন্ডিয়ান। বেলাশেষে। দেখেছেন মুভিটা?

আমি বললাম, আমি খুব একটা মুভি দেখিনা। ছোট বেলায় দেখতাম, তাও কখনো এটা নেশার মতো ছিলো না। আর এখন তো কাজের চাপে সংবাদও দেখা হয় না। সম্ভবত আমি বেলাশেষে মুভিটা দেখি নাই। কি ছিলো এই মুভিতে?

মুক্তার সাহেব বলতে শুরু করলেন

-তাহলে ‘বেলাশেষে’র মুভিটার একটু কাহিনী বলি। হয়তো ব্যাপারটা আপনাকে আরো পরিষ্কার ধারন দিতে পারে।

-৬৫ বছরের স্বামী আর ৬০ বছরের স্ত্রী। অনেক নাতি-নাত্নি, মেয়ের জামাই, ছেলেরা মেয়েরা সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়েছেন গুরুতর এক সমস্যা নিয়ে। সমস্যাটা হল, স্বামী বলেছেন তিনি এই বয়সে এসে তার স্ত্রীর সঙ্গে পৃথক হতে চান এবং আরেকটি বিয়ে করতে চান। এই বুডো মানুষটির এমন অবাক করা সিদ্ধান্তে অনেকেই, বিশেষ করে তার মেয়েরা, মেয়ের জামাইরা, নায় নাতুকুররা হতবাক হলেও কেউ কেউ রাজি আবার কেউ কেউ রাজি নয়। যারা এই সিদ্ধান্তে রাজী না, তারা হতবাক হচ্ছেন, এই বয়সে কেন তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অথচ স্বামী কিছুতেই কারনটা বলছেন না। ওদিকে তার স্ত্রী এটাকে একটা নিছক কৌতুক মনে করে ব্যাপারটা উড়িয়েই দিচ্ছেন। মাঝে মাঝে তার মেয়ে, নাতী নাতনিদের সাথে খোজ মেজাজে হাস্যরসও করছেন। কিন্তু যেদিন সত্যি সত্যিই কোর্ট থেকে স্বামীর আপীল করা ডিভোর্স লেটার তার স্ত্রীর কাছে এলো, ব্যাপারটা এখন সবার কাছে মহাচিন্তার ব্যাপার হয়ে দাড়ালো। ব্যাপারটা আর হাস্যরসের মধ্যে রইলো না। এবার সবাই কারনটা জানতে চান কেনো স্বামী এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। অথচ স্বামী কারনটা বলতে চাচ্ছেনই না। তখন সবাই এই গোপন কারন কি জানার জন্য নায়নাতকুর, ছেলেমেয়ে, মেয়ের জামাই সবাই মিলে একটা পরিকল্পনা করলেন। ঠিক আছে অসুবিধা নাই। তারা স্বামীকে একটা প্রস্তাব দিলেন যে, সেপারেট হবার আগে তারা নিজেরা সবাই কোনো এক জায়গায় ভ্রমনে যাবেন, একসাথে হইহুল্লুর করবেন ইত্যাদি। তারা সবাই পরিকল্পনা করলো যে, এই বুড়ো বুড়িকে তারা এই ভ্রমনের সময় একঘরে রাখবেন। তারা তখন কি নিয়ে আলাপ করে, কি নিয়ে কথাবার্তা হয় সেটা থেকে কিছুটা হলেও আচ করা যাবে আসল রহস্যটা কি। বুড়া-বুড়িও সম্মতি দিলেন, ঝগড়াতো আর হয় নাই, স্বামী স্ত্রীই তো। তাদের জন্য আলাদা ঘর দেওয়া হল, একদম নিরিবিলি পরিবেশ। কেউ তাদেরকে বিরক্ত করার নাই। কিন্তু সবাই এর মধ্যে একটা কাজ খুব গোপনে করে রাখলো। আর তা হচ্ছে তাদের রুমে গোপন একটা ক্যামেরা লাগিয়ে দিল এই দুই বুড়া বুড়ি কি কথা বলে তা দেখার জন্য। আর সেই ক্যামেরার স্ক্রীন সেট করলো আরেক পাশের ভবনে যেখানে সবাই থাকে। যখনই এই দুই বুড়া বুড়ি তাদের কথাবার্তা বলেন, তখনই দলবেধে অন্য বাড়ি থেকে সবাই মিলে ভিডিওতে তা প্রত্যক্ষ করেন।

-চল্লিশ বছরের বিয়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা, ভাল লাগার কথা, একসঙ্গে কষ্টের কথা, দুঃখের কথা, তাদের মিল অমিলের কথা, রাগের কথা, ভালোবাসার কথা একের পর এক তারা দুইজনে নিরিবিলি একত্রে বসে আলাপ করেন। আর সবাই তাদের এইসব অভিজ্ঞতার কথা শুনে অন্য সবাই কখনো হাসেন, কখনো চোখ মুছেন, কখনো অবাক হয়ে চুপ করে থাকেন। তারা সবাই একটা জিনিষ বুঝতে পারেন যে, সব স্বামীর কাছে তার সংসারটা এক রকমের, আর স্ত্রীর কাছে তার সংসারটা আরেক রকমের। কিন্তু কেউই যে ভুল নন তা ঠিক। স্বামীর কাছে দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসাটা এক রকমের আর স্ত্রীর কাছে স্বামী আর সংসারের জন্য ভালোবাসাটা আরেক রকমের। একজন মায়াবী স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন, তার অবর্তমানে তার আদরের স্ত্রীর যেনো কোনো কষ্ট না হয়, সে যেনো কারো কাছে হেয়ালীর পাত্র না হন, তার আদুরী স্ত্রী তার অবর্তমানে কোনো অর্থকরী কিংবা সুন্দর জীবন চালানোর জন্য কারো কাছে হাত না পাতেন। সেই দিকটা খেয়াল করে এই ভরষাযুক্ত স্বামী সবসময় চান তার স্ত্রীকে সাবলম্বি করে তুলতে। ফলে স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন তার স্ত্রী এটা জানুক যে, তার স্বামী কোথায় কিভাবে কত রোজগার করেন, কত সঞ্চয় করেন, আর কিভাবে সেই কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে কিভাবে তিনি তার স্ত্রীর মংগলের জন্য কি করছেন এবং তার পুরুপুরী এই পরিকল্পনার অংশ হয়ে যেনো তার স্ত্রী এটা খেয়াল করে সে মোতাবেক প্রস্তুতি নেন এবং তার উপর নিজেও পারদর্শী হন। অন্যদিকে এই স্বামী দেখছে, তার স্ত্রী তার এইসব ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন হয়ে তাদের সংসারে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়ে, নাতি নাতকুর কিভাবে মানুষ হবে, কিভাবে আরামে থাকবে, কিভাবে নিরাপদ থাকবে ইত্যাদি নিয়েই বেশি নজর। স্বামীর কাছে ভালো লাগা ছিল বউকে নিয়া কোথাও রোমাঞ্চের উদ্দেশ্যে একা একা বেরিয়ে পড়া, কিন্তু স্ত্রীর কাছে যেনো সেই রোমাঞ্চের থেকে বেশী জরুরী ছিলো ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা, তাদের কোচিং ক্লাস, তাদের স্বাস্থ্য, তার নিজের ঘরকন্নার কাজ, আত্মীয় সজনদের সেবা শশ্রুসা ইত্যাদির মধ্যে একটা বন্ধন স্রিস্টির লক্ষে সবাই মিলে পারিবারিক সময় কাটানো। স্বামী চেয়েছেন স্ত্রীর কাছ থেকে অনেকটা সময় যে সময়টা তারা ভালোবাসার কথা বলবে, পুরানো দিনের কথা বলবে, কোনো একটা সিনেমা দেখতে দেখতে মনভরে আনন্দ করবে, বিখ্যাত কোনো কবির কবিতা পড়ে পড়ে তার অন্তর্নিহিত ভাবধারায় সিঞ্চিত হবেন। কিন্তু স্ত্রী তার পরিবারের সবার দিকে একসঙ্গে খেয়াল রাখতে গিয়ে, ছেলেমেয়েদের পরাশুনার দেখভাল করতে গিয়ে, অসুস্থ শ্বশুর শাশুড়ির দিকে নজর দিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়টাই চলে গেছে, স্বামীর জন্য অফুরন্ত সময়টা আর তিনি বের করতে পারেন নাই। কেউ দুষী নন, কারো চাওয়ার মধ্যেই অতিরঞ্জিত ছিলো না। অথচ তারা যেনো কোথায় সুখি নন। তারপরেও তারা বহুকাল এই কম্প্রোমাইজের মধ্যেই একটু রাগ, একটু অভিমান, একটু গোস্যা আর বিস্তর জায়গা জুড়ে পরস্পরের ভালোবাসাটা এক সময় অভ্যাসে পরিনত হয়, তখন অভ্যাসটাই যেনো ভালোবাসা। স্বামীর টয়লেট করে আসার পর যে গন্ধটা একদিন স্ত্রীর কাছে দূর্গন্ধ মনে হতো, স্বামীর ঘামের গন্ধে ভরপুর যে গেঞ্জীটা একদিন নাকের কাছে নিলে একটা শুকনা বাজে গন্ধ বলে মনে হতো, একদিন সেই টয়লেটের গন্ধ, ঘামের দূর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ মনে হয় না। অন্যদিকে স্ত্রীর ঘুমের মধ্যে ডাকা নাকের শব্দ যখন কোনো একদিন এতোটাই অসহ্য মনে হতো, বিরক্তিকর মনে হতো, চুলে আধা ভেজা তেলের যে গন্ধ একদিন স্বামীর নাক বুঝে আসতো, সময়ের এতোটা পথ বেয়ে যখন সবগুলি ভালোবাসা একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে যায়, তখন স্ত্রীর সেই নাক ডাকা, আধাভেজা চুলের গন্ধ যেনো একটা সুখের পরশ মনের ভিতর প্রবাহিত হয়ে যায়। এই তো সে তো কাছেই আছে। ৯০ বছরের কোনো এক প্রোড় বুড়ো, ৮৫ বছরের কোনো মহিলার সাথে যখন এক সাথে স্বামী স্ত্রী হিসাবে বসবাস করেন, তখন তাদের এই বয়সে এসে আর সেই যুবক যুবতীর মতো শরীরের চাহিদা, রুপের চাহিদা আর কাজ করে না। কিন্তু তাদের মধ্যে ভালোবাসাটা একটা বিশাল আকার পাহাড়সম ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে সেখানে কি ফ্যাক্টরটা কাজ করে? কাজ করে নির্ভরতা, কাজ করে একে অপরের উপর শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, মায়া আর মহব্বত। কাপা কাপা হাতে যখন ৮০ বছরের বুড়ি এক কাপ চা নিয়ে ৯০ বছরের তার স্বামীর কাছে কাপখানা হাতে দেন, কিংবা পানের বাটিতে পান আর সুপারী ছেচে যখন এক খিলি পান স্বামী তার ৮০ বছরে সংগিনীর মুখে তুলে দেন, আসলে তিনি শুধু এক কাপ চা কিংবা এক খিলি পানই দেন না, দেন সারা জীবনের মহব্বত আর ভরষা যে, তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বড় বন্ধু নাই। তুমি আমার ভরষা, তুমি আমার নিরাপত্তা, তুমি আমার স্বামী, কিংবা স্ত্রী, তুমি আমার পরামর্শদাতা, বিপদে আপদে তুমিই আমার ডাক্তার কিংবা নার্স। তুমিই আমার সব। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বুক কাপে, তোমার হাত ধরলেই আমার সব কাপুনী বন্ধ হয়ে যায়। তুমি আমার মায়ার সংসার। বুকের সব পাজরে পাজরে তুমি গেথে থাকা আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস আর চোখের প্রতিটি বিন্দুজলে নীল আকাশের গাংচিলের মতো তুমি খেলা করো আমার  অন্তরের এমন এক কোটরে যেখান থেকে তোমাকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা আমার নাই। বেলাশেষে তুমিই আমার আর আমি সেই তোমার। কিন্তু সংসারের অতীব ভিন্ন ভিন্ন চাপে আবেগের এই জায়গাগুলিতে কেউ না কেউ সময় কেড়ে নিচ্ছে। কেড়ে নেয় বিকেলের রোদ, সন্ধ্যার আমেজ কিংবা ব্রিষ্টির দিনে মুড়ি মাখা কোনো একটা দুপুর।

-এই যে কাহিনীটা, এটা আসলে আমাদের মতো এই বয়সের মানুষের। আমরা আমাদেরকে আবার সেই প্রথম দিনের মতো করে পেতে চাই, পেতে চাই অফুরন্ত সময়ের তোমাকে। কিন্তু সেই অফুরন্ত সময়ে তুমি আর নাই। আমি একাই খাই, খাবার টেবিলে আছে, তুমি ব্যস্ত অন্য কিছুতে, আমি একাই ঘুমাই, তুমি ব্যস্ত অফিশিয়াল কাজে হয়তো ফোনে, নয়তো মিটিং এ, আমি একাই সারাদিন ছুটি কাটাই, কারন তোমার আর সেই সময়টা হাতে নাই। আমার আজকে অনেক খুশীর দিন, অফিসে ভালো কাজ হয়েছে, সবাই প্রশংসা করেছে, অথচ তোমার সেই আগের উচ্ছাস নাই, হুম বলেই হয়তো এমন একটা গুরুতর সংবাদ নিমিষেই হালকা হয়ে যায়। গল্প করতেও আর গল্প এগোয় না। ফলে এমন একটা পরিবেশে স্বামী ভাবলেন, নতুন করে আবার জীবন শুরু করি। কিন্তু এই নতুন জীবনের মাঝে যেনো তার স্ত্রী কোনো কষ্ট না পায়, তার ব্যবস্থা, তার সুরক্ষা, তার নিরাপত্তা যেনো বিঘ্নিত না হয় সেটাও তিনি করে যাচ্ছেন। মুভিটার শেষটা অবশ্য আরো সুন্দর। যিনি বিচারক ছিলেন, তিনি যেনো কিছুতেই কার কোনো দোষ ধরতে পারছিলেন না। দুজনেই দুজনের দিক দিয়ে সঠিক মনে হয়েছে। তারপরেও মুভিটায় বিচারক একটা রায় দিয়েছিলেন যা ছিলো দুজনের জন্যই শিক্ষামুলক। এবং অবশেষে আবারো মিলন। আমার কাছেও মাঝে মাঝে এরুপটাই মনে হয়। আসমানী আমাকে ঠকায় নাই, আসমানীর কোনো দোষ নাই কিন্তু আমিও তো তাকে কখনো ঠকাই নাই। আমি তো ঠিক এখানেই থেকে যেতে চেয়েছিলাম ঠিক সেই আগের মতো। কিন্তু সেই আগের মতো “সময়”টাই তো আর কাছে নাই। তাহলে আমার সময়টা কাটে কিভাবে? হয়তো এ কারনেই সাবিত্রীরা সময় বিক্রি করে দেয় আমাদের মতো মানুষের কাছে।

আমি এবার মুক্তার সাহেবকে আরো একটা সরাসরি প্রশ্ন করি- কখনো কি আপনার মনে এটা উদ্ভব হয় নাই যে, আপনার মতো এমন একজন ব্যক্তিত্তশীল মানুষের নামে এমন একটা পরকীয়া বিষয়ক খবর যদি রটে যায়, আপনার কেমন লাগবে বা কি হতে পারে?

মুক্তার সাহেব তার যথারীতি খুব স্বাভাবিক বাচনভংগীতে আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন

-আপনার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমি কিছু যোগ করি। আপনি কি মনে করেন না যে, একই খবর কারো কাছে শুভ আবার কারো কাছে অশুভ হতে পারে? এটা একটা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার কে কিভাবে দেখে। একই জায়গায় মিলিত হওয়া মানুষের রাস্তা আলাদা আলাদা হতে পারে। একই পরিস্থিতিতে একজন জীবনে এগিয়ে চলে, আবার আরেকজন জীবনের অসহায় অবস্থার সাথে বোঝাপড়া করে। কেউ কেউ বিন্দু বিন্দু অর্থ সঞ্চয় করে নিজের সপ্ন পুরন করে, অন্যজন তার গড়া সপ্ন বিন্দু বিন্দু ভুলের কারনে নিরুপায় অবস্থায় জন্য তার সপ্ন ভাংতে শুরু করে। কোনো অপরাধই রাতারাতি জন্ম নেয় না। যখন কোনো অপরাধ হয়, তখন আমরা শুধু তার উপরের রুপটাই দেখতে পাই। কিন্তু তার শিকড় অন্য কোথাও অনেক গভীরে হয়। আর শিকড়ের সন্ধান হয় পুলিশ করে অথবা কোনো সচেতন মানুষ, যেমন এখন আপনি করছেন। পুলিশ যখন তদন্ত করে তখন প্রতিটি মানুষকে সে যেভাবে দেখে তা হল, সবাই মুখোশ পড়া ক্রিমিনাল। আর যখন কোনো সচেতন মানুষ অপরাধের সন্ধান করেন, তিনি চারিপাশ ভাবেন, দেখেন, বুঝেন, তারপর মন্তব্য করেন। প্রথমেই সবাই তাঁকে ক্রিমিনাল ভাবেনা। ব্যাপারটা আর কিছুই না, একটা পদ্ধতিগত আর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। আমাকে যারা জানে, যারা চিনে, তারা হয়তো ব্যাপারটায় আমাকে না যতোটা দোষী ভাববেন, তার থেকে অনেক বেশী সহমর্মিতা নিয়ে নিজেরাও কষ্ট অনুভব করবেন। এটা শুধু আমার বেলায় নয়, আসমানীর জন্যেও। কারন আমার সেই পরিচিত গন্ডি না আমাকে না আসমানীকে কষ্টে দেখতে চায়। তারপরেও ঘটনা তো ঘটেই। একটা সময় আসে, দুজনকে একই পরিমান ভালোবাসা, শ্রদ্ধা কিংবা সম্মান দেখাতে চাইলেও তারা কোনো না কোনো পক্ষ অবলম্বন করবেই। আর সেটা নির্ভর করে তাদের নিজস্ব পার্সোনালিটির উপর। আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমার মন্তব্য আর কিছুই না, শুধু জেনে রাখুন যে, জীবনের চেয়ে আর কোনো কিছুই বড় নয়। এ জীবন আছে বলেই আকাশ এতো সুন্দর, পাহাড় এতো ভালো লাগে, বৈশাখের ঝড় কিংবা টিনের চালের বৃষ্টির ধ্বনি এতো রোমান্টিক মনে হয়। যদি জীবনটাই দূর্বিসহ হয়ে উঠে, তাহলে কেউ আপনাকে সম্মান করে সুসাধু খাবার দিলেই কি, বা আপানাকে অতি সম্মানের জায়গায় বসিয়ে পুজা করলেই কি। আমি আমাকে নিয়ে ভেবেছি, অন্য কারোর জন্য আমি বাচতে চাইনি। এটা সবার বেলায় প্রযোয্য। হ্যা, মাঝে মাঝে তো খারাপ লাগেই, কিন্তু সেটা আমার ভাল সময় কাটানোর কাছে হয়তো কিছুই না। অন্তত ভালো ঘুম হয়, ভালো বোধ হয়। আমার ভালো লাগাটাই আমার কাছে জরুরী।

আমি মুক্তার সাহেবের যুক্তির মধ্যে যেনো পুরুটাই মিশে গিয়েছিলাম। উনাকে কি প্রশ্ন করবো আর কি প্রশ্ন করবো না সেটাই এখন আমার কাছে যেনো কঠিন বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। জীবনের অর্থ, জীবনের মাহাত্য, কিংবা জীবন সম্পর্কে একটা মানুষের কতো গভীরবোধ থাকতে পারে মুক্তার সাহেবের সাথে কথা না বললে হয়তো আমি বুঝতামই না। আমার এই ছোট চাকুরী জীবনে এ রকম অনেক দাম্পত্য অভিযোগ নিয়ে অনেক পরিবারের সাথে আমার কথাবার্তা হয়েছে। সেখানে যেটা দেখেছি-একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে সারাক্ষন বিস্তর অভিযোগ তুলতেই থাকেন। অভিযোগ করেন নানান বিষয়ে। তারা নিজেদের অপরাধ বুঝতে চান না, তাই তাঁর অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে হাজারো যুক্তি, পালটা যুক্তিতে তর্কবিতর্ক করতে থাকেন, লজিক দেখাতে থাকেন। অথচ এই প্রথম আমি এমন একটা দাম্পত্য কলহের অভিযোগ সামাল দিচ্ছি যেখানে না মুক্তার সাহেব একবারের জন্যেও তাঁর প্রতিপক্ষ আসমানীর কোনো দোষ দিয়ে নিজের সাফাই গাইছেন, না আসমানীর বিরুদ্ধে তিনি ন্যাক্কারজনক কোনো অভিযোগ তুলছেন। উলটা বরং যতটুকু সম্ভব তিনি কোথাও কোথাও আসমানীকে ততোটাই ডিফেন্ড করছেন যে, আসমানীর জন্যই তা অধিক জিতার কারন। কিন্তু এখানে মুক্তার সাহেব কিংবা হয়তো সাবিত্রী কেউ আসমানীকে দোষারুপ না করে জিততেও চাইছেন না। সবকিছু যেনো পৃথিবীর একটা রহস্যজনক নিয়মে একেবারে সিস্টেমের মধ্যেই হচ্ছে ভাবনাটা এরকমের। অপরাধবোধ আছে কিন্তু সেটা অপরাধ করার জন্য না। অনুতপ্ত হচ্ছেন কিন্তু সেটা তাদের কারো দোষেই নয়। এখানে যেনো আসমানী, সাবিত্রী বা মুক্তার সাহেব তিনজনেই কোনো একটা রহস্যজনক পরিস্থিতির শিকার। আমি মুক্তার সাহেবকে আজকের জন্য আর কোনো প্রশ্ন করবো না বলে মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম। তারপরেও আমি আবার মুক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম

জীবন সম্পর্কে আপনার ফিলোসোফি কি?

এতোক্ষনে মুক্তার সাহেব উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। আমি এ যাবত মুক্তার সাহেবকে মুচকি হাসি ছাড়া একবারো এতো উচ্চস্বরে হাসতে দেখিনি। তিনি আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে আমার দিকেও প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন

-নিন একটা ধরান যদি অভ্যাস থাকে।

সিগারেটে আমার অভ্যাস আছে কিন্তু মুক্তার সাহেবের সামনে অথবা অফিশিয়াল ফর্মালিটিজের কারনেই হোক আমি এখনো সিগারেট ধরাইনি। কিন্তু এবার মনে হলো, একটা সিগারেট খেতে খেতে মুক্তার সাহেবের কাছ থেকে জীবনের ফিলোসোফিটা শুনি। পাশেই কফির পট ছিলো, ফ্লাষ্কে গরম পানিও ছিলো। আমরা দুজনেই কফি খেতে খেতে আলাপ করছি। মুক্তার সাহেব কথা বলছেন।

-শোনেন, জীবন অনেক বড়। তার ফিলোসোফি আরো বড়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর ভিন্ন ভিন্ন ফিলোসোফি আছে। আমি তো আর নিজে ফিলোসোফার নই বা এ নিয়ে বিস্তর পড়াশুনাও করিনি যে, আমি সেগুলির একক মর্মার্থ বলতে পারবো। তবে আমি জীবনকে নিয়ে অনেক গবেষনা করেছি, নিজে নিজে ভেবেছি, মানুষের চালচলন লক্ষ করেছি। একটা সময় ছিলো আমি অযথা দোকানের সামনে বসে থাকতাম শুধু বিভিন্ন মানুষের আচার ব্যবহার দেখার জন্য। কে কখন কি পরিস্থিতিতে কি ব্যবহার করে সেটা প্রতিটি মানুষের বেলায় ভিন্ন। তবে যে ফিলোসোফিটা আমাকে সবচেয়ে বেশী তাড়ায় বা নাড়ায় সেটা হচ্ছে মানুষ অতিরিক্তভাবে তাঁর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করে। আর সেটা তাঁর জন্যে নয়, তাঁর প্রিয় মানুষগুলির জন্য। আর এই ভাবনার পিছনে যে অজানা একটা ভয় কাজ করে সেটা মৃত্যু।

যেমন ধরুন, আজ থেকে ১০০ বছর পর ঠিক এই সময়ে দেখতে পাবেন (যদিও আমরা কেউ সেটা দেখে যেতে পারবো না) আমাদের যুগের বেশীরভাগ অথবা প্রায় শতভাগ মানুষ আর এই পৃথিবীতেই নাই। হয়তো খুবই নগন্য কিছু সৌভাগ্যবান অথবা অন্যঅর্থে দূর্ভাগ্যবানও বলা যেতে পারে, তারা বার্ধক্যের বোঝা মাথায় নিয়ে ক্ষীনদৃষ্টি আর দূর্বল শরীরে এমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে যা কখনোই তারা চায় নাই। আর সেটাই ‘মৃত্যু’। এই শতবর্ষে ক্যালেন্ডারের পাতা প্রতিদিন পালটে যাবে, তাঁর সাথে সাথে পালটে যাবে তারিখ, মাস, বছর এবং অতঃপর যুগ। কেউ এটাকে আমরা থামাতে পারি নাই, পারবোও না, আর কেউ (হোক সে কোনো প্রতাপশালী সেনাপতি, হোক সে চৌকস কোনো রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনায়ক, কোনো বিজ্ঞান কিংবা কোনো বিজ্ঞানি, কোনো সর্বোচ্চ পদধারী ধার্মিক নেতা কিংবা দূধর্ষ সন্ত্রাসী) এই অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়মটাকে উপেক্ষা করে অগোচরেও পরিবর্তন করতে পারে নাই, আর করার কোনো ক্ষমতাও রাখে না। এটাই প্রকৃতি আর তার নিয়ম। আজ এই মুহুর্তে যারা পথেঘাটে পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে, তাদের বেশীর ভাগ মানুষকেই আমি চিনি না। এদের কেউ হয়তো কোটটাই পড়া, কেউ হয়তো ফুটপাতে নোংরা চুলে বসা, আবার কেউ হয়তো আমার মতোই স্থবির। কোট টাই পড়া মানুষগুলিকে দেখে পথের ধারে বাস্তহারা মানুষগুলি হয়তো ভাবছে-আহা কতই না সুখে আছেন তারা। আবার হয়তো এটাও ঠিক যে, সেই কোট টাই পড়া মানুষটি হয়তো এই বাস্তহারা মানুষটার থেকেও অধিক দুক্ষে আছে, কে জানে?  মজার কিংবা অবাক করার বিষয় হচ্ছে-সময়ের পথ ধরে আমার আপনার পূর্বপুরুষের কিংবা আমার আপনার প্রয়াত বন্ধুবান্ধবদের পথ ধরে এদেরই কেউ কেউ মহাশ্মশানের সারিসারি পাথরে নাম লেখা কোনো এক নাম ফলকের মধ্যেই এক সময় লুকিয়ে যাবে ঠিক সেইস্থানে যার কথা আমরা আজ ভাবতেও পারি না। সেখানে যেমন কোনো আধুনিক পোষাক বলতে কিছু থাকে না, আর না থাকে কোনো ধার্মিক ব্যক্তির আলখেল্লাটাও। অনেকের বেলায় হয়তো সেই নামফলকটাও থাকবে না। কোথায় আছেন তারা, কার জায়গায় আছেন তারও কোনো হদিস হয়তো পাওয়া যাবে না। আজ যে শরীরটাকে প্রতিদিন নোংরা মনে করে দেশী বিদেশী সাবান শ্যাম্পু দিয়ে সুগন্ধী মাখছি, তখন এই শরীরের মধ্যে হাজারো পোকা মাকড়, কর্দমাক্ত মাটি, নোনা জল, অপরিষ্কার জলের সাথে ভেসে আসা দূর্গন্ধময় আবর্জনায় সারাটা শরীর ভেসে গেলেও তাকে আর সুগন্ধী কেনো, উম্মুক্ত হাত দিয়ে সরানোর মতোও আমাদের কোনো শক্তি থাকবে না। শরীরে মাংশ পচেগলে মিশে যাবে মাটির সাথে, হয়তো কোনো এক কুকুর কিংবা শিয়াল আমাদের শরীরের অবশিষ্ট হাড্ডিটি নিয়ে দূরে কোথাও পচে যাওয়া মাংশটুকু খাওয়ার জন্য দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে। কার সেই কংকাল, কার সেই হাড্ডি, এই পৃথিবীর কোনো জীবন্ত মানুষের কাছে এর কোনো মুল্য নাই। যে ঘরটায় আমি সারাদিনের ক্লান্তি শেষে অবসাদ শরীর নিয়ে মুলায়েম বিছানায় গা হেলিয়ে দেই এখন, সেই ঘরটা হয়তো থাকবে অন্য কারো দখলে। কে তারা, কি তার পরিচয়, সেটাও হয়তো আমাদের জানা হবেনা। যে বাগানটায় আমি প্রায়ই পায়চারী করে করে আকাশ দেখতাম, গাছগাছালীর মধ্যে উড়ে আসা ভ্রমর কিংবা পোকামাকড় দেখতাম, সেই বাগানের দখল এখন কার দখলে কে জানে। বাগানের গাছগাছালীর পরিচর্যার নামে যে পোকামাকড়গুলিকে আমি বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করতাম, আমি আজ তাদেরই দখলে। যে বাচ্চাদের মুখরীত কোলাহলে আমার ঘর ভরে থাকতো, যাদের আগমনে আমার মন পুলকিত হতো, আজ সেখানে অন্য কেউ মুখরীত হচ্ছে। কতই না সাবধানতায় আগলে রেখেছিলাম আমার সেইঘর, সেই লন, কিংবা আমার যতো আয়েশী জিনিষ, আজ সেগুলি আমার কিছুই নয়। আমার সুন্দুরী স্ত্রী যখন তাঁর লাল শাড়িটা পড়ার পর কিংবা আমিই যখন নতুন কোনো একটা ড্রেস পড়ে বারবার আয়নার সামনে গিয়ে কতবার দেখতে চেয়েছি-কেমন লাগে আমাকে, অথচ আজ সেই আমি বা আমার সেই সুন্দুরী স্ত্রী তাঁর চেহাড়া কেমন দেখায় কাফনের সেই ধবল পোষাকে সেটা দেখার কোনো পায়তারাও নাই। সেই বৃহৎ আয়নাটার আর কোনো মুল্য নাই আমার কাছে। হয়তো সেখানে অন্য কেউ এখন তাঁর চেহাড়া দেখছে, হয়তো লাল শাড়ির পরিবর্তে নীল বা টাইকোট পড়া কোনো এক পুরুষ একটা ভেষ্ট পড়া ব্যাকব্রাস চুলের মহড়া দিচ্ছে। যে গাড়িটা প্রতিদিন আমাকে মাইলকে মাইল ঠান্ডা কিংবা শীততাপ হাওয়ায় বসিয়ে, মিষ্টি মিষ্টি গান শুনিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে, সেটা আর আমার কোনো প্রয়োজন নাই। না সে আমাকে আর খোজে। কি অবাক না? এখানেই লুকায়িত আছে আমাদের ক্ষনস্থায়ী জীবনের ফিলোসোফি। এখন যে যেভাবে তার ফিলোসোফি বের করে নেয়। জীবনের সব ফিলোসোপি শেষ হয় একটা মৃত্যুতে।

উফ, আমি যতোই মুক্তার সাহেবের সাথে কথা বলছি, আমার ভিতরে কম্পন শুরু হয়। উনি যা বলছেন, নতুন কিছু বলছেন না। কিন্তু এখন তো আমার কাছে সবই জাগ্রত স্পন্দের মতো মনে হচ্ছে সবই নতুন। আমার বুক কেপে উঠছে, আমার চোখ ভিজে আসছে। আমার ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে-আমিও আমার গলা ফাটিয়ে সেই ভগবানের দিকে তাকিয়ে বলি-কেনো, কেনো তুমি আমাকে এতো অল্প সময়ের জন্য এতো কিছু দিয়েও নিয়ে যাচ্ছো? মুক্তার সাহেবের কথা শেষ হয় নাই। তিনি বলেই যাচ্ছেন-

-আমার খুব কষ্ট হয় যখন ভাবি যে, কখন কোথায় কাকে কাকে নিয়ে অথবা আমার নায়নাতকুর আত্তীয়স্বজন স্ত্রী পোলাপান নিয়ে কবে কোথায় কি আনন্দে মেতেছিলাম, সেই ইতিহাস আর কেউ কখনো মনেই রাখবে না। যেমন মনে রাখিনি আমি নিজেও। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কতটা পথ হেটেছিলাম, আর সেই হাটাপথে আমি কতটুকু ঘাম ঝড়িয়ে চূড়ায় উঠে কি তৃপ্তি পেয়ে কি আনন্দে কতটুকু আত্তহারা হয়েছিলাম, সেই তথ্য না কেউ জানবে, না কেউ জানার কোনো আগ্রহ দেখাবে। কার সাথে কি নিয়ে আমার মনোমালিন্য হয়েছিলো, বা কে আমাকে কতটুকু ভালোবেসে কি অবদান রেখেছিলো অথবা কার কোন আগ্রহে আমি কোথায় কি করেছিলাম, কার কারনে আমার অন্তরে জালা উঠেছিলো আর কার কারনে আমার দিন আর রাত একহয়ে গিয়েছিলো, সেই ইতিহাসের কোনো মুল্য আজ বেচে থাকা মানুষগুলির কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। না তাদের কাছেও যাদের জন্য এসব অন্তর্জালা ঘটেছে। নতুন প্রজন্ম নতুন পরিবেশ, নতুন সব কাহিনীতে ভরে থাকবে বর্তমান আর আগামীর প্রজন্ম। সেই পুরাতন পরিবেশের কোনো স্থান থাকবে না আজকের এই পরিবর্তীত বন্ধুমহল পরিবেশে। হয়তো কোনো এক ছোট বালিকা আমাদের কথা শুনে, অথবা ভালোবেসে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে আমাদের সেই সমাধিতে দাঁড়িয়ে একটু অন্যমনষ্ক হয়ে পুষ্পস্তবক দিতেও পারে কিন্তু সেটা নিছক একটা মুহুর্তের ইমোশনাল কারনে। সবার বেলায় এটা আবার নাও হতে পারে। কিংবা জন্ম জন্মান্তরের শেষে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শেষে আমি এমন করে বিলীন হয়ে যাবো যে, সেই অবুজ বালিকার পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো আর একটা বাসী ফুলও নিয়ে আমার সেই সমাধিতে দাঁড়াবে না। কারন আমি তাদের কোনো ইতিহাসের মধ্যেই নাই। চিরতরেই বিলীন।

মুক্তার সাহেব যখন কথা বলার নেশায় থাকেন, আমি একবারের জন্যেও তাকে কথার ফাকে বাধা দেই না। কারন তার প্রতিটি কথা শোনার জন্য আমার কান, অন্তর যেনো মুকিয়েই থাকে। তারপরেও বললাম, জীবন সম্পর্কে আপনার এমন রুড় বাস্তব চিন্তাধারা কি সেই ছোট বেলা থেকেই লালন করতেন নাকি চড়াই উৎরাই পার হয়ে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে?

-নাহ, এটা একটা ধারনামাত্র। আমি যা দেখছি, আমি যা ভাবচি তার মধ্যকার একটা চিত্র। যাই হোক যেটা বলছিলাম, আপনি কি জানেন যে, আজ যে সেলফীটা অনেক যত্ন করে তোলা হয়েছে, হাসিমাখা মুখ, চুলের বাহার, পোষাকের পরিপাটিতা, সবকিছু ধীরে ধীরে সেই শতবর্ষ পরে এমন করে মলিন হয়ে যাবে, হয়তো দেখা যাবে, সেই ছবি পরে আছে এমন এক কোনায় যেখানে থাকে পরিত্যাক্ত কোনো কাগজ বা ময়লার বাক্স। কোনো একদিন সেটা হয়তো অপ্রয়োজনীয় হয়েই বেরিয়ে যাবে আমার সেই শখের ঘরের দরজা পেরিয়ে। আমার প্রতিদিনের নেশা সেই সোস্যাল মিডিয়া, হোয়াটসাপ, ইত্যাদি সবকিছু এক নিঃশ্বাসে বন্ধ হয়ে যাবে সারাদিনের আপডেট আর কাহিনি। যে অর্থের জন্য আমি প্রতিদিন সারাটা সময় শুধু পরিশ্রমই করে গেছি, যাদের জন্য আমার সারাটাদিন বাহিত হয়েছে, সেই অর্থ কিংবা মানুষগুলি আজ আমার কোনো কাজেই আসবে না। শতবছর পরে তো আমার অর্থে গড়া কোনো এক ইমারতের কোনো একটা ইটের মধ্যেও আমার কোনো নাম বা অস্তিত্ব থাকবে না। হোক সেটা আমার পরিশ্রমে গড়া কিংবা আমার নিজের। সেখানে হাত বদলে বদলে আমার অস্তিত্তের শেষ পেরেগটুকু মেরে সেখানে হয়তো কোনো এক লোকের নাম লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যেটা আজ আমার নামে পরিচিত, শত বছর পর সেটা আমার আর নাই, না সেটা আমার নামেও অহংকার করে। কি অদ্ভুত না?

-শত বছরের হিসাবে যেমন আমি আর নাই, হাজার বছরের হিসাবে তো আমি কখনোই নাই। তারপরেও আজ আমি অনেক ব্যস্ততায় দিন কাটাই আগামিকালের জন্য, প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অন্যের ধন প্রকাশ্যে অথবা গোপনে চুরি করে বিত্তবান হবার পার্থিব জগতে সুখী হবার নিমিত্তে আগামীকালের শান্তির জন্য মগ্ন। অথচ আগামিকালটাই আমার না। এই পৃথিবী আমাকে কখনোই মনে রাখবে না। কারন সে আমাকে ভালোই বাসে নাই। অথচ আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম আমার জীবনের থেকেও বেশী। আর এটাই এই পৃথিবী। আমার থেকেও অনেক নামীদামী রাজা, মহারথী সময়ের পথ ধরে বিশ্বকে দাপিয়ে গেছেন, তাদেরকেও এই প্রিথিবী মনে রাখে নাই। আসলে এই পৃথিবীর কোনো বর্ষাই আমার না, কোনো শরতই আমার না। এর গাছপালা, এর নীলাকাশ, এর সুগভীর সমুদ্র কিংবা ঘনসবুজ পাহাড় কোনো কিছুই আমার না। এই আসমানি, এই সাবিত্রীও আমার না। আমার ঘরটাও আমার না।

-একবার ভাবুন তো? শতবছর পরে, আমি এক অচেনা, নামহীন, অস্তিত্বহীন মানুষ যে আজকের দিনে বহু ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটিয়ে কিছুটা সময় এই নীল আকাশ, ঘন সবুজ পাহাড় অথবা পাখীদের কিচির মিচির শুনেছিলাম, সেই আমি আর নাই। অথচ এই সময়ে এসে কোনো এক সন্ধ্যায় খুব জানতে ইচ্ছে করে কেউ কি কখনো এটা জানার জন্য উম্মুখ হয়ে জানতে চাবে আজ থেকে শত বছর আগে কি ঠিক এখানে কেউ বসেছিলো কিনা যেখানে আমি এখন বসে আছি? খুব জানতে ইচ্ছে করে-কে সেই ভাগ্যবান যুবক আজ থেকে ঠিক শতবর্ষ পরে এখানে বসে চা কিংবা কফি পান করছে? হয়তো দেখা হবে সবার সাথে কোনো এক নাম না জানা ময়দানে।

তাহলে আরেকটা অনেক বড় প্রশ্ন মনে জেগেই রইলো-আমার স্রিষ্টিকর্তা আমাকে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তাহলে এই বিশ্ব ভ্রমান্ডে পাঠিয়েছিল? What was the purpose of my life to be created by my Lord? সেটাই আসলে একটা রহস্যময় ফিলোসোফি। আমার সেটা জানা নাই। তাকে পুজা করার জন্যই যদি আমাকে এতোসব কলেরব করে এখানে পাঠালেন, তাহলে আমাকে এতো অনুভুতি, এতো জ্ঞান, এতো সাধ আহলাদ দিয়ে কেনো পাঠালেন? ঈশ্বর হয়তো আমাদের থেকে আরো রশীক।

ড্রইং রুম থেকে মুক্তার সাহেবের বাসার আংগিনার বাগানটা দেখা যায়। আকাশটাও। বেশ মেঘ করেছে আকাশে। একটু আগেও বেশ রোদ ছিলো। এখন আবার মেঘ জমতে শুরু করেছে। ঘরের ভিতরে সম্ভবত একটা গান বাজছে। চমৎকার একটা গান।

‘সাজিয়ে গুজিয়ে দে আমায় ও সজনী তোরা’

সাজিয়ে গুজিয়ে দে মোরে

বরই পাতার গরম জলে, শুয়াইয়া মশারীর তলে,

আতর চন্দন গোপাল মেখে দে সজনী তোরা

সাজিয়ে গুজিয়ে দে মোরে।

কি কঠিন শব্দাবলী গানের কথাগুলিতে। মরনের কথা, শেষ দিনগুলির কথা। মানুষ আসলেই কেনো অল্প সময় নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়?

মনটা খুব ভারাক্রান্ত হয়ে এসছিলো। মুক্তার সাহেব ভিতরে চলে গেছেন। আমি তখনো একাই বাইরের ড্রইং রুমে বসেছিলাম। ভাবলাম, আজকে আর কোনো ব্যাপারে মুক্তার সাহেবের সাথে আলাপ করবো না। আরেকদিন।

প্রায় সপ্তাহখানেক পরে আবার আমি মুক্তার সাহেবের সাথে যোগাযোগ করলাম। আমি নিজেই ফোন করেছিলাম। এমনিতেই এ কয়দিনে তার সাথে একান্তে কথা বার্তা বলায় আমি যেনো তার খুব পরিচিত একজন বন্ধুই হয়ে গিয়েছিলাম। আমি বাসায় আমার স্ত্রীর সাথে মুক্তার সাহেবের ব্যাপারে কোনো কথাই বলি নাই। কিন্তু মুক্তার সাহেবের সাথে কথা হলে বা দেখা হলে আমার পরের দিনগুলিতেও মন কেমন যেনো অন্য রকম থাকে। জীবনের প্রতি, মানুষের আচরনের প্রতি আবার কখনো কখনো নিজের উপরেও যে আমার একটা উপলব্ধি ভিন্ন রকম প্রভাব ফেলে সেটা আমি বুঝতে পারি। তারপরেও কেনো জানি আমার বারবারই মুক্তার সাহেবের সান্নিধ্য পেতে খারাপ লাগে না, বরং একটা টান আসে তার সাথে কথা বলার।

আজ আবারো আমি মুক্তার সাহেবের সাথে বসে আছি। আজকে আমি আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলাম, আসমানীর ব্যাপারে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো না। আজ শুধু তার সাথে আমি জীবন নিয়ে, জীবনের দর্শন নিয়ে আলাপ করবো। আমি মুক্তার সাহেবের বাসায় ঢোকতেই তিনি আমাকে সেই চিরাচরিত বারান্দা ঘেষা বেলকনিতে আপ্যায়ন করলেন। এখান থেকে বাইরের আকাশ দেখা যায়, রাস্তায় দূরে লোকজনের চলাচল দেখা যায়। গাছপালায় বসে থাকা পাখীদের কিচির মিচির শোনা যায়।

টি টেবিলে মুক্তার সাহেবের কাজের বুয়া আমাদের জন্য আগেই ফ্লাস্কে গরম পানি আর চা পানের জন্য বাকী সরঞ্জাম রেখে দিয়েছিলো। মুক্তার সাহেব নিজে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আমার জন্যেও আরেককাপ হাতে দিলেন। চা পান করতে করতেই আমি আমার পরিকল্পনার কথাটা মুক্তার সাহেবকে বললাম, আজ আমরা কারো ব্যাপারেই কোনো আলাপ করবো না। নিছক গল্প করার জন্যই আজ আসা।

-আপনি ব্যস্ত মানুষ। সরকারী কাজে অনেক ব্যস্ত থাকেন। শুধুমাত্র গল্প করার সময় কি আপনাদের আছে? মুক্তার সাহেব ঈষত মুচকী হাসিতে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন।

না, সে রকম না। আজ আমার অফ ডে। ভাবলাম, বাসায় বসে রিপোর্টগুলি সাজাবো কিন্তু সেটা করতে ভালো লাগছিলো না। তাই, একবার ভাবলাম, আপনার সাথে গল্প করলে ভালো লাগবে। তাই আসা।

-তো কি নিয়ে গল্প করতে চান আজ?

আসলে, আমি এ যাবত অনেকের ব্যাপারে অনেক ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে অনেক জটিল তথ্যেও কোনো না কোনোভাবে জোড়াতালী দিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখতে পেরেছি কিন্তু আমি যখন আপনাদের ব্যাপারটা জানছি এবং আরো গভীরে ঢোকছি, আমি ততোটাই যেনো মানুষের ভিন্ন একটা দিক আবিষ্কার করছি। যদিও ব্যাপারটা নিছক কোনো নতুন আবিষ্কার না। অথচ ব্যাপারগুলি কিংবা অনুধাবনাগুলি চলমান বাস্তব। জীবনের ফিলোসোপি, সমাজ নিয়ে ভাবনা, সম্পর্ক নিয়ে নতুন চিন্তা ইত্যাদির যেনো একটা খোরাক আমি আবিষ্কার করছি। আমি নিজেও এই চিন্তা, ভাবনা আর ফিলোসোফির বাইরের কেউ না।

-আসলে, আমরা আমাদের চারিপাশ নিয়ে এতোটাই মহাব্যস্ত থাকি যে, আমরা আমাদের জীবন নিয়ে খুব সামান্য সময়ই ব্যয় করি নিজেকে বুঝার, নিজের ব্যাপারে চিন্তা করার। যখন নিজের ব্যাপারে চিন্তাটার জন্য সময় আসে, তখন দেখা যায়, অনেক অনেক দেরী হয়ে গেছে সবকিছু।

জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের এই ফেলে আসা জীবনে আপনার কি চাওয়া পাওয়া ছিলো যা আপনি এখনো মনে করেন পান নাই? কিংবা আপনি কি মনে করেন, কোথাও কোনো কিছুর জন্য আফসোস হয়?

-নাহ, তেমন কোনো আফসোস আমার নাই। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, সময়টাকে বুঝে উঠার আগেই সময়টা পেরিয়ে গেলো। আজ এই বয়সে এসে যদি ‘সময়’ টাকে যেভাবে উপলব্ধি করি সেটা আরো কয়েক যুগ আগে করতাম, হয়তো জীবনের এই স্তরে এসে অনেক কিছুর মধ্যে আফসোস কম থাকতো। আপনি কি নিজেও এটা স্বীকার করেন না যে, ছোট বেলার চার আনায় পাওয়া এক ডজন চকলেট থেকে একশত টাকায় একটা চকলেট এই সময়ের ব্যবধানে আপনিও অনেক পালটে গেছেন, বুড়ো হয়ে গেছেন? এই যে সিগারেটটা খাচ্ছি, এক সময় এটা লুকিয়ে খেতাম, আর এখন প্রকাশ্যে খেয়েও সেই আনন্দটা পাই না, অথচ এই সময়ের ব্যবধানে আমরাও সবাই অনেক পরিবর্তনের সাথে বিশাল একটা সময়কে হারিয়ে ফেলেছি? কখন যে সেই ছোটবেলা, শৈশবকাল মাঝে যুবক থেকে আজ বৃদ্ধ বনে গেলাম, এটাই তো বুঝতে পারলাম না। অথচ পুরু সময়টা আমার চলেই গেলো। একটা সময় শিশু ছিলাম, কখন যে বাবা হয়ে গেলাম, আবার কখন যে শশুড় হয়ে যাচ্ছি, জীবনের প্রথম দিকে বাবা মায়ের, তারপর স্ত্রীর, অতঃপর ফের বাচ্চাদের কথা মতো চলতে চলতে কখন যে আমার সমস্ত দিনের সময়টা ফুরিয়ে গেলো, বুঝতেই তো পারলাম না। এখন আমার খেলনা কেউ ভেংগে দিলে যতোটা না কষ্ট অনুভব করি, তার থেকে অনেক অনেক কষ্ট অনুভব করি যখন কেউ আমার মন ভেংগে দেয়।

-আসলে কি জানেন? মানুষ যখন জন্মায়, তখন তার নাম, যশ, খ্যাতি কিছুই থাকে না। থাকে শুধু শ্বাস প্রশ্বাস। আর মানুষ যখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তখন তার নাম, যশ, খ্যাতি সবই থাকে, থাকে না শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসটা। এই যে, নাম আর শ্বাসপ্রশ্বাস এর মাঝের অংশটুকুই হলো আমাদের জীবন। কি আজব না? এর মধ্যে কত সম্পর্ক তৈরী হয় একের সাথে অন্যের, সমাজের সাথে, পরিবার, সন্তান, বন্ধু বান্ধবদের সাথে, অথচ আমরা এমন কোনো একটা সম্পর্ক আজো তৈরী করতে পারি নাই যা আমাদের চোখের মতো একসাথে কাদে, একসাথে হাসে, একসাথে খোলে, একসাথে বন্ধ হয়, একসাথে ঘুমায় অথচ তারা সারাজীবনেও একে অপরকে দেখে না। আমরা প্রায়ই ভুল ট্রেনে উঠে যাই, আর যখন আমরা যে ভুল ট্রেনে উঠে গেছি এটা বুঝার পরেও নামতে ভুল করি। আর এই ভুলে ভুলেই আমরা এমন এক জায়গায় গিয়ে হাজির হই যেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথ অনেক দূর। জীবনের শেষ বেলায় এসে আবার সেই ছোটবেলার দিনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, আবার নতুন করে শুরু করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইরেজার বলতে জীবনে কোনো পেন্সিল নাই। এটাই জীবন।

মুক্তার সাহেবের প্রতিটি কথা আমাকে নাড়িয়ে যায়। কাল বৈশাখীর ঝড়ের আন্দোলিত বাতাসের মতো আমি নড়ে উঠি। মনে হয়, উনি যেনো আমাদের সবার কথা বলছেন, বলছে জীবনের কাছে পরাজয়ের কোনো এক যুদ্ধার কথা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সাবিত্রির সাথে দেখা না হলে কি আপনি কখনো আফসোস করতেন কিংবা আসমানীর কিছু কিছু জায়গায় উদাসীনতায় কি আপনি আফসোস করেন?

-আজ না আপনি আসমানী বা সাবিত্রিদের ব্যাপারে কোনো প্রসঙ্গ তুলবেন না বলে গল্প করতে এসেছেন। তাহলে আবার ওর কথা বললেন যে!! যাই হোক যেহেতু আরেকটি প্রশ্নের অবতারনা করলেন, ‘আফসোস’, তাহলে সেটা নিয়েই কথা বলি।

– আচ্ছা, আপনি কি কখনো কোনো কারনে এ যাবতকাল কোনো বিষয়ে আফসোস করেছেন? হোক সেটা নিজের জন্য, হোক সেটা আপনার পরিবারের জন্য কিংবা অন্য যে কোনো কারনে?

আমি একটু হচকচিয়ে গেলাম মুক্তার সাহেবের পালটা প্রশ্নে। এমন করে তো ভাবিনি যে, কি কারনে কোথায় কার জন্যে বা কিসের জন্যে আমার কনো আফসোস আছে কিনা? বললাম, আসলে এই আফসোসের ব্যাপারটা আমি কখনো ভেবে দেখিনি। হয়তো কথায় কথায় আমি শুধু আপনার কাছ থেকে আপনার কনো আফসস আছে কিনা জানতে চেয়েছি। তবে আমাদের যে আফসস নাই, সেটা বললে অবশ্যই মিথ্যা বলা হবে। হয়তো আছে।

-শোনেন, আমাদের জীবনে সবার, প্রায় শতভাগ মানুষের বেলায় যদি বলি, সবার কারো না কারো আফসোস থাকেই। সেটা হোক বৈষয়িক কিংবা জাগতিক কিংবা স্বপ্ন পুরনের। যেমন, কিছু কথা আছে যা বলতে চাই নাই কিন্তু বলা হয়ে যায়, কিছু কথা ছিলো, বলতে চেয়েছি, অথচ বলা যায় নাই, কিছু সপ্ন ছিলো যা দেখতেই চাই নাই কিন্তু দেখতে হয়েছে আবার কিছু এমন সপ্ন ছিলো সবসময় দেখতে চেয়েছি কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় নাই। এমন কিছু শখ ছিলো সারাজীবন লালন করেছি কিন্তু জীবনের শেষ তীরে এসেও সেটা ধরা দেয় নাই আবার এমন কিছু ভয় ছিলো যা একেবারেই কাম্য নয় অথচ তা আমি এড়িয়ে যেতেই পারিনি। এটা আমার দোষ নয়। না আমার অপারগতা। আমি এই আফসোসের ব্যাপারটা নিয়েও বহুবার গবেষনা করেছি কেনো, এবং কী কারনে আবার এই কিছু কথা বলা হয় নাই, কিছু কথা না বলতে চেয়েও বলতে হয়েছে, কিছু সপ্ন আমাকে দেখতেই হয়েছিলো অথচ সেটা আমার কাম্য ছিলো না, আবার কিছু স্বপনের ধারে কাছেও আমি যেতে পারিনি। এই দুনিয়ায় অনেক পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ী, অনেক নামীদামী মানুষের জীবন কিংবা সার্থক কিছু মানুষের জীবনী আমি খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেছি এজন্য যে, আমি যাদেরকে সুখী আর খুসী দেখছি, তাদের সব চাওয়া পাওয়া কি পূর্ন হয়েছে যা তারা আমার মতো ভেবেছেন এভাবে যে, যা তারা করতে চেয়েছেন সেটা তারা পেরেছেন, কিংবা যা তারা দেখতে চান নাই সেটা আসলেই তারা দেখেন নাই বা যেটা তাদের আজীবনের শখ ছিলো সেটা তারা পেয়েছেন?

না, এটা একেবারেই সত্যি নয়। তারাও পারেন নাই। কারো জীবনে কখনোই এটা হয় নাই, হবেও না। এর একটাই কারন। আর সেটা হচ্ছে সে তার মতো, আর এই পৃথিবীর অন্যান্য সবাই যার যার মতো। সবাই যার যার থেকে আলাদা। কিন্তু একটা জায়গায় সবার সবার সাথে মিল রয়েছে। আর সেটা হলো, সবাই একা। দলবদ্ধ সমাজই বলি, আর একক পরিবারই বলি, সারাটা জীবন প্রতিটি মানুষ একাই ছিলো আর একাই থাকবে। এই একাকীত্ততা মানুষের জীবনে একটা আফসোস। তবে এটার পাশাপাশি এই একাকীত্ব একটা সুখের অনুভুতিও নিয়ে আসে যখন সে ভাবে যে সে যা করতে চায় না, সে সেটা করেই না। আবার সে যেটা করতেই চায়, সে সেটাই করে। আর ঠিক এ কারনেই কেউ দলবদ্ধভাবে সুখীও নয় আবার এককভাবেও নয়। এভাবেই একটা চরম আফসোস নিয়ে মানুষ এই নীল আকাশের রুপ, এই নির্জন পাহাড়ের মাদকতা কিংবা কনকনে শীত অথবা বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টির টুং টাং শব্দের মুর্ছনা ছেড়েই বিদায় নেয় যাকে কেউ আর কখনোই মনে রাখে না। এটাও কিন্তু একটা আফসোস।

-মজার ব্যাপার হলো-প্রতিটি মানুষের মূল্যায়ন তার জীবন শেষ হয়ে যাবার পর শুরু হয়। আর যাদের মূল্যায়ন তাদের জীবদ্দশায় হয়, তারা শুধু জানতে পারেন না যে, তাদেরকে চাটুকারীতা করা হচ্ছে। আর চাটুকারীতা হচ্ছে এটা না জানার কারনেই মনে মনে তারা একটা আলাদা জগতে আরামবোধ তথা গর্ববোধ করেন বটে কিন্তু যখন তিনি আর থাকেন না, তখন কোনো পলিথিনের ভিতরে ঠেসে আটকানো একটা বহুদিনের পচা গলিত মাংশের টুকরার মতো ভিন্ন গন্ধ কিংবা বহুদিন যাবত আটকানো একটা আতরের শুন্য বোতলের মতো যে কোনোটাই ছরাতে পারে। কিন্তু তার তখন কিছুই যায় আসে না। তখন তার সব হিসাব কিতাব শুধু তার আর বিধাতার মধ্যে।

-এ রকম একটা জীবনে আমি তাই আফসোসের ব্যাপারটা খুব মামুলী একটা ঘটনা বলেই চালিয়ে দেই। এতে একটা মজা আছে। আর সে মজাটা হলো এমন- ধরুন আপনার এখন খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করলো, গিন্নীকে বললেন, গিন্নী একটা অজুহাত দেখিয়ে এখন খিচুড়ি খাওয়া যাবে না বলে পাশ কাটিয়ে গেলেন। আপ্নিও ধরে নিন, আপনার ভীষন ইচ্ছাটা খিচুড়ি খাওয়ার দিন আজ নয়। আজ আপনার খিচুড়ি খাওয়ার দরকারই নাই। কোনো আফসোস থাকবে না। অথবা আপনার সাথে আপনার সন্তানের কোনো একটা বিষয়ে মতের অমিল হলো যা আপনি মানতে চান না। কারন আপনি চান আপনার সন্তান আপানার কথামত কাজ করলে তার ভবিষ্যৎ ভালো হবে। কিন্তু সেটা সে মানতে নারাজ। ধরে নিন, আপনি আপনার কাজ করে ফেলেছেন তাঁকে গাইড করার মাধ্যমে। কিন্তু আপনি জানেন এটা হয়তো সময়পোযোগী না। কি আছে? সেটা তার জীবন। তাকেই সাফার করতে দিন। আপনি তো আর সেটা ভোগ করবেন না। অথবা ধরুন, আপনি চান বিশাল কিছু একটা আর্থিক অবলম্বন থাকুক যাতে আপনার অবর্তমানে আপনার আপনজনেরা ভালো থাকে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে এই “বর্তমান” সময়ে আপনি কারো কাছে কিপটা, কারো কাছে কঠিন ইত্যাদিতে ভূষিত হবেন। কি দরকার? ছেড়ে দিন তাদের ভবিষ্যৎ তাদের উপর। আপনি তো আর থাকবেনই না। তখন তারা কি করবে, আর কি করবে না সেটা তাদের ব্যাপার। ঐ যে বললাম, তখন আপনার মূল্যায়ন হবে এইভাবে যে, আহা, বাবা কিংবা স্বামী তো ঠিকই করতে চেয়েছিলেন। আপনি মুল্যায়িত হবেনই। আফসোসের কোনো প্রয়োজনই নাই। আফসোস শেষ হয় জীবনের পরে।

–  আমি মনে করি, আপনার আফসোস হবে তখন যখন আপনার সব কিছু থাকতেও আপনি আপনার নিজস্ব পছন্দকে মূল্যায়ন করেন নাই, আপনার আফসোস হবে তখন যখন আপনি যেটা করতে চেয়েছেন আর করতে পারতেন নিজে মনের সুখের জন্য কিংবা আনন্দের জন্য অথচ আপনি সেটা করেন নাই। সেই আফসোস এর দোষ আপনার। আমি সেটা মানতে নারাজ। আমি জীবনের কাছ থেকে অনেকবার শিক্ষা নিয়ে দেখেছি- আমি যেনো কন আফসোপ্স নিয়ে এই ইহধাম ত্যাগ না করি। কিন্তু সেটা অন্যকে ক্ষতি না করে।

-আপনার ব্যবসায়ীক কোনো পার্টনারের সাথে কোথায় যেনো একটা অমিল হচ্ছে যার জন্য আপনি শান্তিতে নাই। ছেড়ে দিন ততোটুকুই যতোটুকুতে আপ্নার ব্যবসায়ী খুসি থাকে। আপনি শুধু মিলিয়ে নিন, আপনি অতটুকু ত্যাগে কতটুকু ক্ষতিতে পড়লেন। যদি সামলে নেয়া যায়, এটাই ভালো মনে করে শান্তিতে থাকুন। ভালো ঘুম হবে আর ভালো ঘুম একটা আরামের লক্ষন। আপনি তো সাথে করে কিছুই নিতে পারবেন না। যেহেতু নিতেই পারবেন না, তাহলে অযথা সেগুলিকে ধরে রাখার কি ফায়দা? সব তো অন্য কেউই ভোগ করবে!! যদি তাইই হয়, অতটুকুই আপনার দরকার যতটুকুতে আপনি ভালো থাকেন। বাকীটা অন্যের। আফসোসের কোনো কারন নাই। ঐ যে একটু আগে বলেছিলাম, বড় বড় মনিষীরা, বড় বড় ব্যবসায়ীরা কিংবা আরো বড় বড় জ্ঞানীরা তাদের শেষ জীবনে এসেই এই আফসোসের সন্ধানটা পান।

মুক্তার সাহেবের একটা ভালো গুন সব সময়ই খেয়াল করেছি যে, তিনি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন। তার কথা শেষ না হওয়া অবধি অন্য কনো প্রশ্ন আমি নিজেও করতে চাই না। আমি তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখছি। শিখছি জীবনের মুল্যবোধ, শিখছি আমরা যারা আমজনতা যেভাবে জীবনকে দেখি, এই পৃথিবীতে অনেক হাজারো হাজারো মানুষ আছে যারা জীবনকে আমাদের মতো করে দেখে না, ভাবে না।

এই মুহুর্তে মুক্তার সাহেবের কাছ থেকে আমার অনেক কিছু আর জানার নাই। যে বিষয়টা আমি পরিষ্কার করতে চেয়েছিলাম তিনি বিবাহ বহির্ভুত কোনো সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন কিনা কিংবা আসমানীর অভিযোগ মুক্তার সাহেবের ব্যাপারে কতটুকু সত্য সেটা। আর এই বিষয়টা মুক্তার সাহেব কখনোই অস্বীকার করেন নাই যে, তিনি সাবিত্রিকে সামাজিক আইনের মাধ্যমে বিয়ে করেছেন, স্ত্রী বানিয়েছেন ইত্যাদি। কিন্তু এটাও তিনি স্বীকার করেছেন যে, সাবিত্রির সাথে তার সম্পর্ক আছে এবং এখনো চলমান। হোক সেটা আইনসিদ্ধ কিনবা আইনের বহির্ভুত। বৈধ আর অবৈধের মাত্রায় তিনি তার এই সম্পর্ককে বিচার করেন না। তার কাছে যেটা মুক্ষ্য বিষয় সেটা হচ্ছে জীবন একটাই, আর এ জীবনে সমাজের ছুতা দিয়ে কিংবা আইনের বাহানায় নিজেকে কষ্ট দেয়ার কোনো বাধ্যবাদকতায় তিনি সীমাবদ্ধ নন।

অসীম এবং সীমাহীন ধনের রাজ্যে একাকী বাস যেমন একটা বিষাদময় জীবন, তেমনি প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা পরিবারে নিজে একাকীত্ব জীবনও প্রায় সেরকমই। যে জীবনের আরামের জন্য আমরা কিশোর, যুবক বয়স পার করে জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও দেখি ‘একদিন’ আমি আনন্দ করবোই অধরা থেকে যায়, সেই জীবন মুক্তার সাহেবের কাছে গ্রহনযোগ্য নয়। তিনি তার মতো করে কাউকে কোনো বিরক্ত না করে নিজের মনের আনন্দে বাচতে চান। তার এই বাচার পলিসিতে কারো কারো সময় খারাপ যেতে পারে, কারো কারো কষ্ট হতে পারে কিংবা কেউ কেউ অন্তরের জ্বালা নিয়ে হয়তো একই ছাদে বাচতে পারেন, তাত মুক্তার সাহেবরা কোনো বিচলিত নন। অন্যদিকে, যে মানুষটি তার সারা জীবনের পরিশ্রম দিয়ে একটা আধুনিক পরিবার গড়ে তোলেন, তার দিকেও অন্য সবার যথেষ্ট পরিমান মনোযোগী হওয়া খুবই দরকার যাতে যার জন্যে অন্য সবার জীবন এতো সাঞ্ছন্দ্যের, তার সঠিক দেখভাল, তার প্রতি আরো মনোযোগ এবং তাকে প্রাধান্য দেয়া। গাছের শিকর যখন দূর্বল হতে থাকে, গাছ তখন তার কান্ডের প্রতি ততোটা শক্তি জোগান দিতে পারে না যতোটা কান্ডের দরকার। একদিন অবশেষে সব কান্ডই শুকনো বাতাসেও ভেংগে পড়ার উপক্রম হয়।

সাবিত্রীর জবানবন্দি

আমি মুক্তার সাহেবের সাথে গত গোটা সপ্তাহ কথা বলার পর বুঝেছিলাম, ঘটনার একটা পিঠের হয়তো কিছু অংশ আমি দেখছিলাম। আরো দুটু অধ্যায় আমার দেখার বাকী ছিলো। একটা পক্ষ ছিলো সাবিত্রী নিজে, আর আরেকটা পক্ষ ছিলো স্বয়ং আসমানী। যেহেতু অভিযোগটা এসেছিলো আসমানীর পক্ষ থেকে, ফলে আমি এবার সিদ্ধান্ত নিলাম, আসমানীর জবানবন্দি নিবো সবার শেষে নিবো। সাবিত্রীর জবানবন্দীর পরে যদি আরো কিছু জানার আমার প্রয়োজন হয় মুক্তার সাহেবের কাছ থেকে, তাহলে সেটাও সেরে ফেলবো।

তাহলে এবার সাবিত্রীর পালা। সাবিত্রীকে খবরটা জানাতেই সাবিত্রী আমার সাথে কথা বলতে রাজী হলো। দিন ক্ষন সাভস্থ্য করলাম কবে কখন কোথায় সাবিত্রীর সাথে আমাদের আলাপ হবে। সাবিত্রী তার নিজের বাসাতেই থাকেন। তাই সাবিত্রী তার বাসাতেই আমাকে আমন্ত্রন জানালেন। সকাল হতেই আমার মনটা বেশ উৎকণ্ঠায় ভরে ছিলো, কিন্তু কেনো আমার সেই উতকন্ঠা কিংবা কেনো আমি এতোটা চঞ্চল অনুভব করছিলাম সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম না। এমনই একটা আবেশে আমি সাবিত্রীর বাসায় হাজির হয়েছিলাম।

সাবিত্রী নীল একটা শাড়ি পড়েছিলো। লম্বা গড়নের একজন মানুষ। আমাদের দেশের স্বাভাবিক মেয়েদের চেয়ে সাবিত্রীর শারিরীক গড়ন এবং উচ্চতা অনেকটাই বেশি। বেশ ফর্সা একজন মেয়ে। বয়স প্রায় ২৬ কিংবা ২৭ হবে। মাথায় একটা স্কার্ফ পড়া, নীল শাড়ির সাথে লাল একটা ব্লাউজ। আমার কলিং বেল টিপতেই সাবিত্রী তার ঘরের দরজা খুলে দিলো। আমি একটু অবাক হলাম প্রথমে এই ভেবে যে, সাবিত্রী কি আমাকে চিনে?

আমার মুখের অবয়ব দেখে সাবিত্রীই আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো যে, সাবিত্রী আমাকে না চিনলেও তার ব্যাপারে মুক্তার সাহেব বলেছেন। আর যেহেতু আমি ঠিক সময়েই হাজির হয়েছিলাম, ফলে সাবিত্রীর বুঝতে ভুল হয় নাই আমিই সে। যাই হোক, আমরা সাবিত্রীর বাসার সামনে ছোট একটা পোর্চের সামন এ খোলা হাওয়ায় বসলাম। প্রাথমিক কিছু হাই-হ্যালো হবার পর আমিই সাবিত্রীকে বললাম, আমার কিছু জানার ছিলো আপনার কাছ থেকে। সাবিত্রী অবলীলায় যে কোনো কিছু আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারি বলে উত্তরও দিলেন।

সাবিত্রীর কাছে আমার প্রথম যে প্রশ্নটা ছিলো-আপনি কি মুক্তার সাহেবের সাথে আপনার পরকীয়ার অভিযোগ স্বীকার করেন যা আসমানী বেগম করেছেন?

সাবিত্রী আমার এমন প্রশ্নে একটু মুচকী হেসে দিয়ে বল্লো-

-পরকীয়ার আসল সংগা আমি জানি না, তবে মুক্তারের সাথে আমার সম্পর্ক আছে সেটা অবাস্তব না। আর সেটা কোন অবৈধ সম্পর্ক বললে ভুল হবে। অন্তত আমি আমাদের এই সম্পর্ককে কখনোই অবৈধ সম্পর্ক বলতে চাই না। যদি আপনি আমাদের এই সম্পর্কের গোড়াপত্তন জানতে চান, তাহলে আপনাকে শুরু করতে হবে সেইদিন থেকে যেদিন আমার জীবন বলি দেয়া হয়েছিলো এই সমাজের আষ্টেপিষ্ঠে বাধা কিছু জঞ্জাল আইন কানুনের মাধ্যমে।

আমি সাবিত্রীকে তার সেই প্রথম দিন থেকেই শুরু করতে বললাম যেনো আসলেই আমি এর গোড়াপত্তন থেকে ব্যাপারটা বুঝতে পারি।

-সেই দিনটা আমার জীবনে যেমন খুবই একটা স্পর্শকাতরের দিন ছিলো, আবার অন্যদিকে এই পুরুষশাসিত নারীর প্রতি একতরফা ভারসাম্যহীন সমাজ টিকিয়ে রাখার জন্যেও আমার জীবন বলি দেয়ার একটা দিন ছিলো। আবার যদি বলি, এটা এমন একটা দিন ছিলো যা কিনা কখনোই আমি হয়তো চাইনি। অথচ আমাকে এইদিনে সেই কাজটাই করতে হয়েছিলো যা আমি নিজের ইচ্ছায় করতেই চাই নাই। কারন আমি ইতিমধ্যে এই সমাজের মুখোসের আড়ালে যে মুখাবয়ব দেখেছিলাম। সেদিন আমি কোনো এক সিড়ি থেকে এমনভাবে পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম এমন একটায় জায়গায় যেখান থেকে না আমি নিজে বা না আমার পরিবার অথবা আমার কেউ সজ্জন টেনে আবার সেই রাস্তাটায় তুলে দিতে পারে যেটা সঠিক রাস্তা। অবশ্য এর জন্য আমি কাউকে এর জন্য দোষারুপ করতে চাই না। কারন মেয়েরা আজো আমাদের এই সমাজে একটা অলিখিত বোঝা। এই বোঝাটাই আমাদের অনেকে মানতে চাননা। এটাই আমাদের বর্তমান সমাজ। আর এই সমাজের বিপক্ষে ‘আমরা মেয়েরা পরিবারের বোঝা না’ এটা বলার সেই সক্ষমতা বা সাহস আমার পরিবারের, এমন কি অনেক পরিবারেরও কারো ছিলো না, আজো নাই। তাহলে কি ছিলো সেই ঘটনা? আপনি কি তাহলে সেখান থেকে শুনতে চান? আমার পুরু জবানবন্দী শুনে আপ্নারা কে কি বিচার করবেন সেটা নিয়ে আমি মোটেই দুসচিন্তাগ্রস্থ নই, না আমি ব্যথিত। কিন্তু কোন ঘটনা কোনদিকে কিভাবে মোড় নিয়ে কোথায় কোন ঝড়ে পরিনত হয় কিংবা কোথায় তা টর্নেডোর রূপ নেয় সেটা হয়তো আপনি উপলব্ধি করলেও করতে পারেন, আর না করলেও আমার জীবনের কোথাও এর প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না।

আমি বুঝতে চাইলাম তাঁর সেই ঘটনা যেখান থেকে আজকের পরিস্থিতির সৃষ্টি। বললাম, আমার হাতে অঢেল সময় আছে, আপনি সময় নিয়ে বলতে পারেন।

সাবিত্রী এবার তাঁর গল্পে মনোযোগ দিলেন-

-আমি তখন সবেমাত্র কিশোরী, কত হবে বয়স? হয়তো পনেরো কিংবা ষোল! আপনাদের শহুরে জীবনের সমাজের সাথে আমাদের গ্রামের জীবনের সমাজের মধ্যে এতো বিস্তর ফারাক যে, একই দেশ, একই আইন, একই সংবিধান তবুও কিছুই যেনো এক না। আপনি আপনার আদরের মেয়েকে লালন পালন করে ততোটুকু বড় করতে চান, কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান, যতটুকুতে আপনি ভাবেন, ততোটুকু করতে আপনি পিছপা হন না। যখন তাঁর সময় হয়েছে বিয়ে দেয়ার মনে করেন কিংবা ভাবেন-আপনার মেয়ে এবার নিজের পায়ে দাড়িয়েছে, তাঁর পাত্র খোজা দরকার, তখনই তাঁর জন্য যোগ্য পাত্র দেখা শুরু করেন। ছেলেপক্ষ থেকে শুরু করে পাত্রের চৌদ্দ গোষ্ঠীই শুধু নয়, তাঁর ইহকাল পরকালের সমস্ত বৃত্তান্ত ঘেটে অতঃপর মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজী হন। শুধু এখানেই শেষ নয়, মেয়ের মন নির্বাচিত পাত্রের জন্য রাজী কিনা সেটাও কয়েকবার তাকে প্রশ্ন করেন। আর পদ্ধতির বিস্তর সময়টা নেহায়েত কম নয়। হয়তোবা বিশ একুশ তো অতিক্রম করেই। কারো কারো বেলায় পচিশও অতিক্রম করে। আপনাদের সমাজে এই পচিশ বছরের অবিবাহিত মেয়েটিকে নিয়ে কেউ অশালীন মন্তব্য করে না, অন্যরকম চোখেও দেখে না। বরং সে যেনো একটা অধ্যাবশায়ের মধ্যে আছে, নিজেকে তৈরী করার পর্বে আছে, এমনটাই সবাই ভাবে। তাকে সম্মান করে, তাকে কেউ ঘুনাক্ষরেও বোঝা মনে করেনা। কিন্তু আমাদের বেলায়? আমাদের গ্রামের একটা মেয়ের বয়স যখন এগারো থেকে পনেরোতে উঠে যায়, সে তখন হয়ে উঠে লক্ষাধিক টন ওজনের একটা বোঝা। আমরাই আমাদের নিজের বোঝা বহন করতে পারি না। আমরা স্কুলে যাই শুধু পাশে একটা স্কুল আছে বলে, তাই। সেই স্কুলে যাওয়ার পিছনে আমার ক্যারিয়ারের কোনো পরিকল্পনা থাকে না, পড়াশুনা করে জজ ব্যারিষ্টার কিংবা ডাক্তার উকিল হবার স্বপ্ন থাকে না। যেটা থাকে সেটা যেনো কোনো রকমে বাজার সদাই করার হিসাবটা জানা। ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমরা চাই না বড় হতে। এমন না যে, আমরা উন্নত জীবনের মর্ম বুঝি না। কিন্তু তাতে কি আসে যায়? আমাদের নিজস্ব কোনো চয়েজ নাই, নিজের কোনো স্বপ্ন নাই, না আছে কোনো শক্তি। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমাদের অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। আমিও সেটাই করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার বিয়ে হয়ে গেলো এমন এক মানুষের সাথে যাকে আমি চিনতাম আমার জন্ম লগ্ন থেকেই। সে আমার খালাতো ভাই। তার সাথে আমার কখনোই এমন কোনো সম্পর্ক ছিলো না যাকে আমরা বলি-ভালোবাসা বা প্রেম। হয়তো তার পরিবারের উদারতা কিংবা আমার রুপের মুগ্ধতায় সে আমাকে বরন করতে চেয়েছিলো। কোনো অবস্থাতেই তার সাথে আমার যায় না, অন্তত বিয়ে করে সংসার করার মতো ব্যাপারে তো নাইই।

আমি সাবিত্রীকে কোনো প্রশ্ন করছিলাম না। আমি শুধু সাবিত্রীর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম আর শুনছিলাম সাবিত্রীর জীবনের গল্প।

-ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েই হোক আর সামাজিকতা রক্ষার জন্যই হোক, আমি তার সাথে শেষ পর্যন্ত বিয়ে নামক সম্পর্ককে মেনেই নিয়েছিলাম। পড়াশুনার প্রতি আমার প্রচন্ড একটা আকর্ষন ছিলো। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয় নাই। এখানে আরো একটা ব্যাপার না বললে হয়তো আমার অবস্থার কথাটা আপনি বুঝবেন না। আমার আরো তিনটা বোন ছিলো। আর ছিলো একটা ছোট ভাই। ভেবেছিলাম, আর যাইই হোক, আমার এই মেনে নেয়ার সিদ্ধান্তে আমার পরিবার বেচে যাবে একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে, আমি বেচে যাবো একটা অপয়া অপবাদ থেকে, কারন আমি সমাজকে ভয় পাই। কিন্তু তখনো আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারি নাই যে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো সম্পর্ক জুড়তে যাওয়া একটা ভয়ংকর পরিবেশের জন্ম দেয়। অনেক সময় প্রতিবেশি বা সমাজের সম্মান বাচানোর জন্য অনেক সময় এই ইচ্ছের বিরুদ্ধে সম্পর্ক গড়ে তোলতে হয় বটে কিন্তু সময়ের পাল্লায় এই সম্পর্ক একটা বোঝা হয়েই দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে আজো এমন অনেক বিয়ে হয়ে থাকে যা শুধু পরিবারকে খুশি করার জন্য। যাকে অন্যের বাড়িতে পাঠানোর জন্য আমরা অনেক কিছু করতে পারি। আমরা তখন হাসিখুশী অববয়ব নিয়ে বিয়ের সব ফরমালিটিজ করে সুখী হবার ভান করি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমরা আসলে কেহই সুখী নই।

আমি সাবিত্রীকে এবার প্রশ্ন করি-তাহলে আপনি বিবাহিতা? কিন্তু আপনার এই বিবাহের খবর কি সবাই জানে? কারন, আমি যতটুকু শুনেছি- আপনি কখনোই বিবাহ করেন নাই। এমনটাই শোনা যায়।

সাবিত্রী আমার দিকে না তাকিয়েই ঘরের পূর্ব পাশের জানালা দিয়ে ওই দূরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুধু মাথানেড়ে উত্তর দিলো আর মুখে শুধু বল্লো

-ডিভোর্সী।

সাবিত্রী একটু চুপ থেকে আবার বলতে লাগলো

-একটা জিনিষ কি কখনো উপলব্ধি করেছেন? বিয়ের সময় দেখানো খুসি আর ভালোবাসার অভিনয়ে এটা কখনোই প্রমানিত হয় নাই যে, ভবিষ্যতে এই সুম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা বা ঘৃণা আসবে না। কখনো কখনো দেখা যায়, এই দেখানো ভালবাসা আর অভিনয় তাদের মধ্যে প্রকাশ্য ঘৃণা মারাত্তক বিষে রুপান্তরীত হয়। কেনো এমন হয়, আর কি না করলে এমন হতো না এটা আর আমাকে নতুন করে আপনাকে ব্যাখ্যা করার দরকার মনে করি না। এ সমাজের এমন ঘটনা বিরল তো নয়ই বরং অহরহ ঘটে যাচ্ছে আমাদের চারপাশে। এই মারাত্তক বিষ যখন ঘৃণার রুপে সম্পর্কের মধ্যে ঢোকে পড়ে, তখন সম্পর্কটায় তিক্ততার সীমা এমনভাবে ছাড়িয়ে যায়, যেখানে থাকে শুধু রাগ, জিদ আর আফসোস। ভিন্ন সমাজে কি হয় জানি না, তবে আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে যে, যখনই এই সীমা বাড়তে বাড়তে অনেক বড় হয়ে সীমার বাইরে চলে যায়, তখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে এখন এই সম্পর্ককে শেষ করা উচিত। বুঝেশুনে বেরিয়ে আসা উচিত। যাতে তার আগে কোনো মারাত্তক অঘটন না ঘটে। কেননা প্রায়ই তিক্ত সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে বুদ্ধির জায়গায় হিংসা ঢোকে পড়ে, আর তখন কিসের সমাজ আর কিসের জীবন সেটার শোচনীয় পরাজয় ঘটে। নিজেকে শেষ করে দেয়া বা নিজের ঘৃণার মানুষটাকে শেষ করে দেয়াই যেনো মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এমন অনেক কিছু হয় যে, সেই দম্পতি যে একদিন ভালোবেসে কিংবা উদার মন নিয়ে খুব কাছে এসেছিলো, তারাই সম্পর্কের তিক্ততায় একজন আরেকজনকে চাকু, বন্ধুক চালাতে পিছপা হয় না। আমি সেটা পর্যন্ত আমার এই অসম দাম্পত্য জীবন চালিয়ে নিতে চাই নাই। কিন্তু আমার বাবা মা কখনোই আমার এই মনের ভিতরের আবেগটা বুঝতে চায় নাই। একটা বাবা মা যখন সন্তানের জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ এটা বুঝতে পারেন না, তাহলে সেই পরিবারে সেই সন্তান একটা অসুস্থ্য পরিবেশেই বড় হতে থাকে। আর অসুস্থ্য পরিবেশ শুধু সাস্থ্যকেই ক্ষতি করে না, মনকেও। আমি আমার নিজের মনের আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম। এই জীবনে শুধুমাত্র একটা থাকার জায়গা হলেই হয় না, জীবনে বাচার জন্য নিঃশ্বাস ফেলার একটা জায়গাও লাগে। আমার কাছেও সেটাই একদিন চরমভাবে মনে হয়েছিলো যে, কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সেসব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তরে মানসিক কষ্টটা আর থাকে না।

-আমার জীবনের প্রতিটি দিন যেনো চলছিলো ঠিক এরকম যে, এক শিফটে উনুন, আর আরেক শিফটে বিছানায় কারো জন্যে অপেক্ষা করা যে কখনোই না আমার ছিলো, না আমি তার ছিলাম। এটাই কি গরিবের লাইফ। শ্বশুর বাড়িতে যে খালা আমার শাশুড়ি হিসাবে নতুন জন্ম হলো, তিনি ছাড়া আর কেউ যেনো আমার নয়। স্বামী সারাক্ষন বাইরে বাইরে থাকে, নেশার জগতে তাঁর এতোটাই বিচরন যে, কবে কি দিন, সেটার নাম পর্যন্ত তাঁর মনে থাকে না। যখন সে রাতে বাসায় আসে, মনে হয় শুধু শারিরীক চাহিদাটাই তাঁর প্রধান। সেটাও আমার স্বামীর পুরুপুরি ছিলো না। তারপরেও আমি চেষ্টা করেছিলাম মানিয়ে নেওয়ার। কিন্তু বারবার একটা কথাই আমার মনে, মাথায়, অন্তরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো-আমার এই যৌবনের দাম, আমার এই জীবনের দাম যদি শুধু শরীর দিয়েই হয়, তাহলে আমি কেনো এমন জীবন বেছে নেই না যেখানে আমি অন্তত আমার মতো করে বেচে যেতে পারি? আর সেই বাচায় যদি কেউ আমাকে নিঃশ্বাস ফেলার একটা অবকাশও করে দেয়? কে চায় না তার জীবন আরো ভালো থাকুক?

-খুব বেশীদিন টিকে নাই আমার এই বৈবাহিক সম্পর্ক। আমি বদ্ধপরিকরভাবে একতরফা এবার নিজের জন্যেই নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যে জীবনকে সমাজ প্রোটেকশন দেয় না, যে সমাজ ব্যবস্থা আমার মতো কোনো নারীর দায়ভার গ্রহন করে না, যে সমাজে আমি নারী হয়ে একটা বোঝা ছাড়া আর কিছুই না, সে সমাজের কোনো আইন কিংবা নীতি আমার জন্যে না। আমার জীবন আমারই। আমি যদি বেচে থাকি, তাহলে সমাজ আছে, যদি আষ্টেপিষ্ঠে আমি প্রতিনিয়ত আমার সমস্ত অধিকার থেকে নিপীড়িত মানুষের মতো একটা পাশবিকবন্ধি জীবনই এই সমাজের নীতির কারনে মেনে নিয়ে সামনে এগুতে হয়, আমার সে জীবনের কোনো প্রয়োজন নাই, না সেটা আমার জীবন। আমার এ রকম সিদ্ধান্তের কারনে আমি ডিভোর্স চাইলাম। আমার এ সিদ্ধান্তে বারংবার বড় ছোট সবার কাছ থেকেই হরেক রকমের উপদেশ আর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়েছিলাম। কিন্তু সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর যখন কারো জীবনের নাশ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেই উত্তরের শেষ পরিনতি সম্পর্কে উত্তারদাতার অনেক ভেবেচিন্তে দেয়া উচিত। আমি আমার এই সম্পর্কের শেষ পরিনতি ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছিলাম যে, সমাজের চাপের কারনে নেয়া আমার সেই সম্পর্ক একদিন আমাকে অনেক চড়ামুল্য দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। তখনো এই সমাজ আমার পাশে দাঁড়াবে না। তাই সবকিছু আমি অনেক ভেবে চিন্তেই আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।

সাবিত্রী আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে এবার প্রশ্ন করলো- আচ্ছা বলতে পারেন বিয়েটা আসলে কি? এটা কি শুধু সহবাস? কিংবা জন্মদানের একটা পদ্ধতি? নাকি এর বাইরেও কিছু আছে?

সাবিত্রীর এই প্রশ্নের উত্তর আমি কিভাবে এতো অল্প পরিসরে দেই? সাবিত্রী আমার উত্তরের জন্য বসে রইলো না। আমি উত্তর দিতে উদ্যত হলেও সাবিত্রী যেনো সেই উত্তরের জন্য অপেক্ষায় ছিলো না। হয়তো সে জানে এর উত্তর। সাবিত্রী তাঁর নিজের হাতের বালাটায় একবার সামনে, একবার পিছে করতে করতে বলতে থাকলো-

-এমনিতেই প্রত্যেকটা মানুষ নিজের মতো করে বাচতে চায়। আর এই বাচার জন্য হয়তো অনেক আর্থিক ক্ষমতা না থাকলেও মানুষ যতটুকু ক্ষমতা আছে সেটার উপরেই ভরষা করে নিজের মতো করে নিজে বাচতে চায়। কিন্তু কিছু মানুষের মধ্যে কর্তৃত্ব করার প্রবনতা এমন বেশী থাকে যে, এই ধরনের প্রবৃত্তির কারনে অন্য কিছু মানুষ ধীরে ধীরে সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে থাকে। এক সময় তারা একাই হয়ে যায়। আমিও এক সময় মনে হলো-একাই আমি। আমি যদি আসলে একাই হই, তাহলে পরাজয়ের গ্লানী টানবো কেনো?

-আমি জানি, দুটু মানুষকে জুড়ে দিয়ে একটা নতুন জীবন দেয়ার এই প্রথার নাম বিয়ে। বিয়েও কিন্তু একটা কন্ট্রাক্ট, দায়িত্তের কন্ট্রাক্ট, সরকারী অনুমোদিত একটা কন্ট্রাক্ট। হতে পারে এই কন্ট্রাক্টের মাধ্যমেই দুটু পরিচিত বা অপরিচিত মানুষ একজন আরেকজনের হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শপথ করে। কিন্তু কারো হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু উন্নতির দিকে যাওয়া সেটা কিন্তু নয়। আগে খুব জানা দরকার, হাত ধরা মানুষটি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। সাফল্যের সপ্ন, জীবনের আশা আর পরিশ্রমের পথ যদি যাত্রার পথ একদিকে না হয়, তাহলে আর যাই হোক, সাফল্যকে হাতে পাওয়া যায় না। আই লাভ ইউ বললেই শুধু ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসার বহির্প্রকাশ হয় তার কাজে আর বাস্তবে। অনেকে হয়তো আই লাভ ইউ বললেই ভাবে ভালোবাসা হয়ে গেলো, কিন্তু সেটা কি অন্তরের না শরীরে তা যাচাই করার কোনো দরকার মনে করে না। ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যা কাছে থাকলে এর প্রয়োজন অনুভব করা যায় না, মনে হয় আছেই তো। কিন্তু যখনই চোখের আড়ালে যায়, মন শুধু আনচান করে আর প্রতীক্ষায় থাকে, কখন কাছে আসবে। ভালোবাসা, কোনো ড্রেস বা জুতা তো নয় যে ফিটিং হলো না আর শপিংমলে গিয়ে ফেরত দিয়ে আসবো। একটুখানি ময়লা হলো বা ফেটে গেলো তো আলমারীর ভিতর লুকিয়ে রাখলাম। কিন্তু ওই ড্রেস বা জুতু যদি ফিটই না হয় তো তাহলে আমরা কি করবো? আমরা তো সেটা পড়তেই পারবো না। আর যদি পড়তেই না পারি আবার ফেলতেও না পারি তাহলে তো আলমারী ছাড়া আর কোথায় রাখবো? তখন হয়ত অন্যদের মতো আমরা আরেকটা শার্ট বা ড্রেস কিনে পড়ে নেবো যা একদম ফিটিং। কিন্তু যেদিন আমি সমস্ত কিছু একপাশে রেখে ওর সাথে জীবন বেধেছিলাম, সেদিন থেকেই আমি পন করেছিলাম, যাইই হোক, আমি থাকবো। সেদিন থেকে আমি তো অন্য কারো কাছে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি নাই। কারো চোখে তাকানোর কথা ভাবতেই পারি নাই। অন্যের সাথে থাকা, অন্যের হাসি, অন্যের জন্য আমি তো কোনো সপ্নই দেখতে পারি নাই। কিন্তু পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে আমার ভাগ্যকে নিয়ে দাড় করিয়েছিলো যে, আমি হয়তো ওর হাতটা আজীবন ধরেই রাখতে পারতাম, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে, সেক্ষেত্রে আমার হাতটাই হয়তো কাটা যাবে।

-আমি আমার হাত কাটতে চাইনি। আমি আমাদের সম্পর্কটাকে কেটে দিয়েছিলাম। আর সেটা ছিলো শুধুমাত্র আমার একার সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমি জানতাম না, এর পরের কাহিনীটা কি। আমার কাছে কোনো আগাম পরিকল্পনা ছিলো না, না ছিলো কোনো উপায়। আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম অজানা কোনো এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আমার মা আমার এরুপ সিদ্ধান্তে অনেক শংকায় ছিলেন। আমার বাবা আমার এহেনো সিদ্ধান্তে আমাকে তাঁর মেয়ে বলেই পরিচয় দিতে যেনো অস্বীকার করছিলেন। আমার বাকী বোনেরা খুব ছোট ছিলো না যে, তারা বুঝে নাই আমার কি অবস্থা। কিন্তু তাদেরই বা কি করনীয় ছিলো? তারাই তো আমার থেকে আরো বেশী অসহায়। আমার বেরিয়ে যাবার সাথে আমার মা আমাকে একা ছাড়তে চান নাই। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেই ষ্টেশনের প্লাটফর্মে। আমি আমার গন্তব্য কোথায় আমি জানি না। আমার মা পাশের দোকানে এক বোতল পানির জন্য অপেক্ষায় ছিলো। আকাশ ভর্তি সাদা সাদা মেঘ এক জায়গা থেকে অন্যত্র উড়ে যাচ্ছিলো, দুপুরের রোদ তখন হালকা হয়ে আসছিলো, শান্ত এক অপরাহ্ণ কিন্তু আমার ভিতরে তখন চলছিলো ভয়ানক ঝড় যার নাম ভয়। কেউ কেউ আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিলো যার চাহনী আমি বুঝি। আমি নারী, আমি যুবতী, আমি তাদের নেশার চোখের অর্থ বুঝি। কেউ দয়ার অন্তর নিয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় নাই। না কেউ জানতে চেয়েছে, আমি এতো বিষন্ন কেনো। ঠিক এই সময়ে যে মানুষটি আমার দিকে এগিয়ে এসেছিলো- তাঁর নাম এই মুক্তার। প্রায় পঞ্চাশ বছরের একজন মানুষ কিন্তু বুঝার কোনো উপায় নাই তাঁর বয়স। পরিপাটি একটা জমকালো নীল শার্ট পড়া ভদ্রমানুষ এই প্রথম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-কে তুমি?

সাবিত্রী কথা বলতে বলতে যেনো হটাত একেবারেই থেমে গেলেন। ভরা নদীর জোয়ারের বানের মতো অকস্মাৎ সাবিত্রীর চোখের কোনে চিকচিক করা অশ্রু ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়তে দেখলাম। সাবিত্রী কাদছে। আমি সাবিত্রীকে কিছুই বললাম না। সাবিত্রী তাঁর গায়ের ওড়না দিয়ে চোখের অশ্রুটা মুছলেন। চোখের পানির কোনো রঙ নাই। অন্তর পোড়া চোখের পানির রঙ যেমন, কষ্টে ভরা বেদনায় ঝরে পড়া চোখের পানিও একই রঙ এর। কে জানি বলেছিলো- বেদনার রঙ নাকি নীল। কিন্তু আমি সাবিত্রীর কষ্ট কিংবা বেদনায় সেই নীল রঙ দেখি নাই, শুধু দেখেছিলাম, আকাশটা বড্ড গোমরা আর সাবিত্রীর ভেজা চোখের দলায়িত পাপড়ি। আচ্ছা, সাবিত্রীরা কেনো কাদে?

বললাম-তারপর?

-সেদিন সেই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে মুক্তার সাহেবের প্রশ্নের উত্তর কি দিয়েছিলাম, আমার আজ ষ্পষ্ট মনে নাই। কিন্তু আমার গলা ফাটিয়ে যেনো বলতে চেয়েছিলাম, আসলেই কে আমি? আমার অস্তিত্তই বা কি? আমার পরিচয়টাইবা কি? কারো মেয়ে? কারো বোন? কারো স্ত্রী? নাকি একটা শরীর যাকে ছিন্নভিন্ন করতে কাক, চিল, শকুনেরা তৈরী? আমার বর্তমানই যখন এতো ভয়ংকর, তাহলে ভবিষ্যত কি হবে আমার? হয়তো  আমি এই পৃথিবীর মধ্যে ভিনগ্রহের নাম না জানা এক অদ্ভুদ কেউ যা আমি নিজেও জানি না। তবে মুক্তার সাহেবের সেই ‘কে আমি’ এই প্রশ্নের মধ্যে যেনো সত্যিই একটা অবাক করার মতো সুর দেখেছিলাম। আমি তাঁর এই প্রশ্নের মধ্যেই যেনো ‘আমি’ লুকিয়েছিলাম। আমি তাঁর চোখের চাহনী পড়তে চেয়েছিলাম, আমি তাঁর আবেগের ভাষা পড়তে চেয়েছিলাম। অপরিচিত এককন্ঠ যেনো আমাকে চারিদিক থেকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। খুবই অবাক হয়েছিলাম, মুক্তার সাহেবের জন্য। কিন্তু আমার অবাক হবার আরো অনেক কিছুর বাকি ছিলো। মা পানির বোতল নিয়ে আমার পাশে এসে মুক্তার সাহেবকে দেখে আমার মা এমন একটা উত্তর দিলেন যা আমি কখনো ভাবি নাই। আমার মা যেনো এই সমগ্র অসহায় পৃথিবীতে এমন কাউকে দেখলেন যেনো অন্ধকার রাতের দিকবিদিক হারানো কোনো নাবিকের সঠিক দিক পাবার এক আলোকবিন্দু। আমার মা অনেকটা বিহব্বল নেত্রে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন-

-ভাই এটা আমার মেয়ে, সাবিত্রী। কোথায় যাচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে, কি নিয়ে যাচ্ছে, কিছুই জানি না। শুধু এইটুকু জানি যে, সাবিত্রী ঘর ছড়ছে। এই যুবতী মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, আমি ভয় পাচ্ছি, না জানি আবার কোথায় কি বিপদের মধ্যে পড়ে।

-সেই থেকে মুক্তার সাহেবের সাথে আমার পরিচয়। তাকে আমি আগে কখনোই দেখিনি। নাম শুনেছিলাম অনেক কিন্তু তাদের মতো মানুষেরা সবার সাথে যেমন মিশেন না, তেমনি অনেকেই তাদের অবস্থানের কথা ভেবে তারাও মিশতে হয়তো দ্বিধা করেন। তিনি আমাদেরই গ্রামের এক বড় ব্যবসায়ী। আমার মা তাকে চিনতেন। আমার মা মুক্তার সাহেবকে একটু আড়ালে নিয়ে কি যেনো বললেন বা বুঝালেন সেটা আমি জানি না। একটু পর তিনি আমাকে আমার নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বললেন এই ভরষা দিয়ে যে, খুব অচীরেই তিনি আমাকে আমার মতো করে বাচার একটা সুযোগ করে দিবেন, আমি আবার পড়াশুনা করতে পারবো, নিজের পায়ে দাড়াতে পারবো। ব্যাপারটা ঘটে গিয়েছিলো একেবারে সবার অলক্ষ্যে। মুক্তার সাহেবের চোখে আমি অন্য কিছু কি সেদিন দেখেছিলাম যা অন্য দশটি পুরুষের মধ্যে দেখি? এটাও ভেবেছিলাম। কিন্তু আমার ভাবনায় একটা কঠিন ছেদ পড়েছিলো। আমি আজো সেই দিনটির কথা ভাবি আর মনকে এটা বুঝাতে সক্ষম হই, জীবন আমার, সমাজ আমার নয়, জীবনের সব দুঃখ আমার আর সেটা আমি সমাজ থেকে পেতে চাই না, জীবনের সুখ আমার আর সেই সুখ আমি নিজের জন্য তৈরী করবো, সমাজের কোনো নিয়মের মধ্যে নয়। কোনো এক ঝড়ের সময় আমার উপড়ে যাওয়া ঘর যখন ঝড়ের শেষে বিলীন হয়ে যায়, সমাজের প্রতিটি মানুষ পাশে এসে শুধু মুখে আর ঠোটেই আহাজারী করে কিন্তু পুনরায় মেরামত করে যে, একটুখানী সহায়তা করবে সেটা আমার এই সমাজ নয়। বরং আমার সেই অসহায়ত্তকে কেন্দ্র করে আমাকে লুটে পুটে খাওয়ার একটা প্লট তৈরী করবে। যদি সেটাই হয়, তাহলে তো আমার সেটাই করা উচিত যা আমার সেই বন্ধুটি আমাকে সম্মানের সাথে বাচাতে চেয়েছিলো। প্রতিদান একটা মনুষত্যের ব্যাপার, আমার যা আছে তার বিনিময়ে সে যদি সত্যিকারভাবেই আমাকে সমাজের বাইরে গিয়ে এমন একটা জীবন দান করে যেখানে এই সমাজেই আমি একজন প্রগতিশীল মানুষ, শুধু নারীই নই, আমি একজন নীতিনির্ধারকও বটে, অথবা এমন একটা জীবন যেখানে সমাজের সব আইন আর কানুন আমার পায়ের নীচে পদায়িত, তাহলে কেনো আমি শুকনো রুটি দিয়ে গলা ফাসাবো? আর জল চাই, আমার ভালো পরিবেশ চাই। জীবন তো একটাই। সেতো আমাকে এটাই বলেছিলো যে, “আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ।“ আমি যেনো সম্বিত ফিরে পেয়েছিলাম।

আমি সাবিত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম-তাহলে আপনি প্রথম থেকে নিজের ইচ্ছায় জেনে শুনেই কি মুক্তার সাহেবের সাথে একটা পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে যাচ্ছেন এটা জানতেন?

সাবিত্রী আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকী হাসি দিয়ে বললেন-

-‘সময়’ নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। আবার “সময়” পুরানো সম্পর্ককে নতুন করে সাজিয়েও দেয়। তখন ওই সম্পর্ক যে আকার আর যে রুপ নিয়ে ফিরে আসে, সেখানে থাকে নতুন চেহারা, নতুন আবেগ, আর নতুন চরিত্র নিয়ে। কষ্টের সময় যারা পাশে থাকে, তারাই হয়তো নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। সে এখন আমার প্রকৃত পরিবার। আমি ফিরে তাকাতে চেয়েছিলাম সেই গ্রামে, কিন্তু দেখেছি বারবার, গাছটা কেটে গিয়েছিলো হয়তো শিকরটা কেউ কাটতে পারে নাই সত্য। তারপরেও সেই শিকড়ের মায়ায় ঢালপালাহীন বৃক্ষ হয়ে ফিরে যাইনি সেখানে। গ্রামের সাথে আমার সাময়িক বিচ্ছেদ হয়ে গেলো।

আমি বললাম, তাহলে তো আপনি এখন একাই থাকেন। আর এখানে মুক্তার সাহেব নিশ্চয় আসেন, দেখা করেন এবং সময় কাটান, তাই না? আপ্নারা কি বিয়ে করেছেন দুজনে?

সাবিত্রী আমার প্রশ্নগুলি যেনো আগে থেকেই জানে এমন মনে হলো। আমার এমন প্রশ্নে সাবিত্রী না চমকালো, না নার্ভাস হলো। সাবিত্রীর কাছে মুক্তার সাহেবের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল সে ব্যাপারে সাবিত্রী যেনো ঝকঝকে পরিষ্কার ধারনায় ছিলো। কোনো রাখঢাক না করে সাবিত্রী বলতে থাকলো-

-একটা ব্রেকআপ শুধুমাত্র একটা ইংগিত যে, জীবনে রোমান্স ছাড়াও আরো অনেক সুন্দর উপহার আছে। যেগুলিকে আমাদের চিনতে হবে, খুলতে হবে, আর পুরু উপভোগ করতে হবে। আমার জীবনে সে ছিলো ঠিক সে রকমের একটা ব্যক্তিত্ত। আমি নারী, আমার মুল্য কারো কাছে হয়তো ঠিক ততোটা যতোটা আমি সক্ষম অবস্থায় দিতে পারবো। কিন্তু তার কাছে “নারী” ছিলো একটা দায়িত্ত, একটা অপরুপ মায়ার ভান্ডার। কতোটা আমি দিতে চাই, অথবা দিতে ইচ্ছুক সেটা তার কাছে জরুরী ছিলো না, তার কাছে জরুরী ছিলো সেটা যেটা আমার দরকার। একটা সম্মানীত জীবন। সমাজের কাছে আমার মাথা উচু করে দাড়াবার সিড়ি। কিন্তু আমি জানি আমার কি দেবার ক্ষমতা ছিলো। আসলে আমার কাছে কিছুই দেবার ছিলো না তার জন্যে। যা দিতে পারি সেটা তার হাতের কাছেই সারাদিন গড়াগড়ি যায়।

-একটা জিনিষ কি জানেন? জীবনে কাকে কতটা জায়গা দেবো সেটা ঠিক করে ফেলতে পারলে জীবনে আর কোনো সমস্যাই থাকে না। আর কার সাথে কি কমিটমেন্ট করা দরকার তার যদি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তখন জীবনের স্রোত সবসময় একই থাকে। পিছুটানের আর ভয় থাকে না। আর যখন পিছুটানের ভয় থাকে না, তার সামনে দ্রুত গতির শক্তিটাও ধীর গতি হয় না। যতোক্ষন যেটা ভালো লাগবে, ততোক্ষন সেটা চালিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আর যদি কখনো তাতে কোনো উলটা স্রোতের আভাষ পাওয়া যায়, হয় তাকে সমাধান করতে হবে, নতুবা নিজের পায়ের শক্তিকে জোরদার করতে হবে। কখনো কখনো বিয়েটার দরকার পড়ে না, দরকার হয় একটা সম্পর্কের। আর এই সম্পর্কে তখন গজে উঠে একটা বন্ধুত্তের অভ্যাস, মায়া। তখন যেটা হয়, একজন আরেকজনের কষ্টে বা বিপদে অন্য জন ততোটাই কষ্ট আর বিপদে থাকে যতোটা সে থাকে। অনেক সময় ঠিকানা ভুল হয় কিন্তু ওই ঠিকানায় যারা থাকে তারা হয়তো ঠিক লোক। আর এটাই সেই ঠিকানা যেটা ভুল কিন্তু সেখানে যিনি আসেন বা থাকেন, তিনি আমার জীবনের জন্য সঠিক। ভুল ঠিকানায় আমার সমস্ত জীবনের সঠিক মানুষটি বাস করে।

-আপনি আমাদের বিয়ের কথা জানতে চেয়েছিলেন, তাই না? তাহলে শুনুন। সামাজিক রীতির মাধ্যমে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ দুজন মানুষের মধ্যে কোনো একদিন তারা বিচ্ছেদ ঘটিয়ে মুক্ত হতে পারেন বটে, কিন্তু যখন সেটা ঘটেই না, তাহলে আপনি কিভাবে তা ভাংবেন? আমি এই সমাজের রীতির বাইরে গিয়ে তাঁরসাথে এমন এক সম্পর্কে নিজে চিরদিনের মতো আবদ্ধ হয়ে গেলাম, যেখানে আমি আছি আমার মতো করে, তিনি আছেন তাঁর মতো। অতীত ভুলে যাওয়া যায় না বটে কিন্তু সেই অতীত আমাকে যেনো আর কখনো দুক্ষে ভারাক্রান্ত না করতে পারে সেই বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আজকের দিনের মানুষটি আমাকে সম্মানের সাথে গলায় পড়িয়ে দিয়েছে। আমি সুখে আছি। আজ সমাজ আমাকে ঘিরে নীতির ব্যাপারে পরামর্শ করতে চাইলেও আমি এই সমাজকে পরিবর্তনের কোনো উপদেশ দেই না কারন এই সমাজ কারো কোনো উপদেশ শুনে না, এই সমাজ কারো জন্যই কিছু করে না। যদি কেউ কিছু করতে দেখেন, বুঝবেন তাঁর সেই মহৎ উদ্দেশের পিছনে আছে কোনো সার্থপরতা। হতে পারে নাম ফলানোর জন্য, হতে পারে তা প্রচ্ছন্ন কোনো রাজনীতির এজেন্ডা বা হতে পারে তা তাঁর নিছক কোনো নেশা। অসহায় মানুষ গুলি সব সময় অসহায়ই ছিলো, আছে এবং থাকবে। কিন্তু ভগবানের একটা মজার কৌশল হলো-অসহায় মানুষ একদিন কারো না কারো হাত ধরে ঘুরে দাড়ায়ই, এটা সেই ভগবানের একটা লীলাখেলার ক্ষুদ্র অংশ। মুক্তার সাহেব ছিলেন, আমার ‘অলিখিত ভগবান’।

আমার স্পষ্ট মনে পড়লো, মুক্তার সাহেব তাঁর জবানবন্দীতে ঠিক এ রকম একটা শব্দ ব্যবহার করেছিলেন- ‘অলিখিত ভগবান’। সাবিত্রী নিজেও আজ ঠিক এ শব্দটাই ব্যবহার করলেন। খুব জানতে ইচ্ছে করলো এই ‘অলিখিত ভগবান’ কথাটার অর্থ আসলে কি? মুক্তার সাহেবের কাছ থেকে ব্যাপারটা জানতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাঁর কথার তোড়ে ব্যাপারটা আর জানা হয় নাই। ভালোই হলো, অন্তত সাবিত্রীর কাছে এটার বিশদ ব্যাখ্যা জানা যাবে। আমি সাবিত্রীকে প্রশ্ন করলাম, এই অলিখিত ভগবান মানে কি?

অনেক ক্ষন হলো আমি সাবিত্রীর বাসায় এসেছি। সাবিত্রী নিজেও আমাকে এ যাবত কোনো চা পানি দিয়ে আপ্যায়ন করে নি আর আমিও ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। কিন্তু এখন মনে হলো, এক কাপ চা কিংবা কফি হলে ভালো হতো। সাবিত্রী আমার মনের কথা বুঝতে পারলো কিনা জানি না, কিন্তু সে আমাকে কথার এই ফাকে বল্লো- চলুন, এক কাপ চা খাই আর কথা বলি। ব্যাপারটা একেবারে কাকতালিয় হলেও আমার মনে হলো, সাবিত্রী আমার চায়ের তেষ্টাটা বুঝতে পেরেছে। কি জানি, আমার মুখের মধ্যে চায়ের চেষ্টা ফুটে উঠেছিলো কিনা আমি জানি না, আর কারো মুখে ক্লান্তির ছাপ বুঝা গেলেও চায়ের তেষ্টা কখনো ফুটে উঠে কিনা আমার জানা নাই। আমি মুচকী হেসে বললাম, কিভাবে বুঝলেন যে, আমার আসলেই চা পান করতে একটু ইচ্ছে হচ্ছিলো?

সাবিত্রী কিছুই না বলে রান্না ঘরের দিকে হেটে গেলো। আমি সাবিত্রীর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে বারান্দায় বসে অন্য এক ভাবনায় যেনো ডুবে গেলাম। কি অবাক করার মতো এক সম্পর্কে জড়িয়ে আছে এই দুটু মানুষ। কারো কোনো আফসস নাই, কষ্ট নাই, কনো দুঃখবোধ নাই। তারা নিজেকে নিয়ে নিজেরা খুব ভাল আছে। তারা আশেপাশের কোনো মানুশকে বিরক্ত করে না, কাউকে তাদের এই কষ্টের কিংবা সুখের সাথে ভাগাভাগিও করে না। এমন নয় যে, মুক্তার সাহেব তাঁর নিজের পরিবারকে সময় দেন না বা তাঁর দায়িত্তে কোনো অবহেলা করছেন। তাঁর ব্যবসায়িক কাজেও তিনি যে হেরে যাচ্ছেন তাও না। কোথাও কোনো গড়মিল নাই কিন্তু ব্যাপারটা সাভাবিক ভাবেও সমাজ মেনে নিচ্ছে না। হটাতই মনে হল, আমার কি এই তিনজনের বাইরেও অন্য কোনো কারো সাথে তাদের এমন সম্পর্কের ব্যাপারটা নিয়ে আরো গভীর তথ্য নেয়া দরকার? যেমন, মুক্তার সাহেবের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কিংবা সাবিত্রীর বন্ধু মহলের কাউকে? হতেও তো পারে যে, মুক্তার সাহেবের সাথে সাবিত্রীর এই সম্পর্কের কারনে অন্য কোথাও কিছু না কিছু প্রভাব ফেলছেই? ব্যাপারটা মাথায় এবং আমার নোট বইয়ে লিখে রাখলাম।

-এই নিন চা। সাবিত্রী চা বানিয়ে নিয়ে এসছে। সাথে কয়েকটা ভাজা কিছু।

আমরা ভাজা পুড়ি খেতে খেতে চায়ে চুমুক দিচ্ছিলাম।

সাবিত্রী কথা শুরু করলো আবার।

-অলিখিত ভগবান নিয়ে কি যেনো বলছিলেন আপনি?

আমি বললাম, এই শব্দটা আমি মুক্তার সাহেবের কাছ থেকেও একবার শুনেছিলাম। আবার আপ্নিও ঠিক একই শব্দ ব্যবহার করলেন। ব্যাপারটা আমার কাছে খুব রহস্যময় মনে হলেও খুব ইন্টারেষ্টিং বলে মনে হচ্ছে। যদি আপনি এই ‘অলিখিত ভগবান’ মানে কি বলতেন, তাহলে হয়তো আরো ভালো করে আমি আপনাদের সম্পর্কটার ব্যাপারে বুঝতে পারতাম।

সাবিত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- মুক্তার সাহেব আপনাকে এই ‘অলিখিত ভগবান’ নিয়ে কি ব্যাখ্যা দিয়েছে, আগে সেটা শুনি।

আমি বললাম, মুক্তার সাহেব এই অলিখিত ভগবান শব্দটার কোনো ব্যাখ্যা দেন নাই। এড়িয়ে গেছেন।

সাবিত্রী হাসলো। তারপর বলতে থাকলো,

-দিন হোক আর রাত হোক, প্রাকৃতিক দূর্যোগ থাকুক আর নাইবা থাকুক, কোনো এক “লক্ষ্য”কে সফল করার জন্য যখন কেউ যাত্রা করে, আর যাত্রার পথে যখন সে কোন এক চৌরাস্তার মধ্যে এসে দাড়ায়, তখন লক্ষ্যের দিকে যেতে সে কোন রাস্তা বেছে নিবে সেটা নির্ভর করে রাস্তাটা সে চিনে কিনা বা তার ধারনা আছে কিনা। যদি জানা থাকে, তাহলে মুল লক্ষ্যে যেতে কোন অসুবিধা নাই, কিন্তু যদি সঠিক নিশানা জানা না থাকে, তাহলে তার ভুল রাস্তা বেছে নেবার কারনে তার মুল লক্ষ্য তো দূরের কথা ভুল রাস্তায় গিয়ে আরো কতই না বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে, সেটা সে ঐ চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে কল্পনাও করতে পারে না। যে যাত্রার উদ্দেশ্য ছিলো মুল লক্ষ্যে পৌঁছানো, তখন আর তার সেই মুল জায়গায় পৌঁছানো হয়ত হয়ে উঠেই না, বরং এরপর থেকেই শুরু হয় প্রতিটি পদক্ষেপ ভুলে ভরা বিড়ম্বনা।  আর সেখানে পৌছতেই যদি না পারা যায়, তাহলে সেই সব যাত্রার কোন মুল্য নাই। তাই চৌরাস্তায় এসে কোনটা নিজের মুল গন্তব্যের রাস্তা তা জানা খুবই প্রয়োজন। নিজের এই চৌরাস্তার সঠিক দিক না জানার কারনে চলার পথে অনেকের কাছেই হয়তো আপনি সঠিক নিশানার দিক জানতে চাইতেই পারেন, কিন্তু সবাই যে আপনাকে সঠিক নিশানা দিতে পারবেন এটাও সঠিক না। হতে পারে কিছু আনাড়ি অপরিপক্ক আর অনভিজ্ঞ জ্ঞানহীন মানুষ সর্বজান্তার মতো মনে মনে আন্দাজ করে আর বুদ্ধিদীপ্ত কালো মুখোশ নিয়ে জ্ঞান গম্ভীর বিবেচনায় আপনাকে একটা ভুল রাস্তার দিকে প্রবেশ করিয়ে দিল। তার তো কোনো ক্ষতি হলো না, কিন্তু তাকে আপনি বিশ্বাস করে আপনি যে ক্ষতির মুখে পতিত হলেন, সেটার মাশুল অনেক বড়। আপনি না জানার কারনে ইচ্ছেমতো আন্দাজ করে যদি ভুল রাস্তায়ও যেতেন আর যতোটা ক্ষতিগ্রস্থ হতেন, এসব বিবেকহীন মানুষের কারনে আপনি একই রকম ক্ষতিগ্রস্থ হবেন সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। তাই, কোন পথটা সঠিক আর কোন পথটা সঠিক নয়, এটা জানা অতীব জরুরী মুল লক্ষে পৌঁছানোর জন্য। এখানে আরো একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, আপনার গন্তব্যস্থানের দিক সঠিকভাবে দেখিয়ে দেয়ার জন্য যে সবসময় বয়স্ক আর বুদ্ধিজীবি মানুষেরই দরকার তা কিন্তু নয়, হতে পারে একটা আনাড়ি বাচ্চাও আপনাকে সঠিক দিকটা দেখিয়ে দিতে পারে যা কোনো বয়স্ক ব্যক্তি যার ঐ রাস্তাগুলির সঠিক গন্তব্য দিক সম্পর্কে কোনো ধারানাও নাই। যেহেতু আপনি চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, এবং আপনি জানেন না কোনটা আপনার রাস্তা, সেহেতু কারো উপর না কারো উপর আপনাকে নির্ভর করতেই হবে। আমার নিজ গন্তব্যের রাস্তা জানা ছিলো না কিন্তু লক্ষ্যটা জানা ছিলো। আর সেটা হল, আমি ভালোভাবে বাচতে চাই। আমি এই ক্রান্তিলগ্নে সবচেয়ে যার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলাম, সেটা আমার ঈশ্বর, আমার ভগবানের উপর। আর ঠিক সেই সময়েই আমার দেখা হয়েছিলো এই মুক্তার সাহেবের সাথে। তিনি হয়তো ভগবান নন, কিন্তু হয়তো আমার ঈশ্বর কিংবা ভগবান তাকেই প্রথম আমার পথের নিশানা খুজে দেয়ার লক্ষ্যে পাঠিয়েছিলেন। আমি ভুল গন্তব্যে পদার্পন করিনি। আমি অনেকবার মুক্তার সাহেবকে এ কথাটা বলেছিলাম যে, তিনিই আমার অলিখিত ভগবান। আমি ঈশ্বর দেখি নাই, আমি ভগবান দেখি নাই, কিন্তু আমি মুক্তার সাহেবকে দেখেছি। জানেন? আমি একবার মুক্তার সাহেবকে প্রশ্ন করেছিলাম-তিনি কি আমার শরীরের জন্যই আমাকে ধরে রেখেছেন? উনি খুব মন খারাপ করেছিলেন। অনেক দিন আর তিনি আমার কাছে আসেন নাই। কিন্তু যোগাযোগ রেখেছেন, আমার সব দিক মাথায় রেখেছেন, আমার কোনো কিছুতেই কোন অসুবিধা হোক সেটা তিনি হতেই দেন নাই। কিন্তু অনেকদিন আর আমার কাছে আসেন নাই। আমার মনে অনেক বেদনা জমেছিলো, আমি পানিশুন্য বৃক্ষের মতো মরুভূমিতে শুকিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি প্রতিদিন আমার অদৃশ্য ভগবানের কাছে শুধু একটা প্রার্থনাই করেছি-আমাকে আবার আরেকটা সুযোগ দাও হে ঈশ্বর। মুক্তার সাহেব আবার এসেছিলেন যেনো আমার ঈশ্বর আমার সাথে কথা বলছেন, আমাকে জড়িয়ে ধরছেন, সমস্ত মায়া, মহব্বত আর আবেগের চাদর দিয়ে মুড়িয়ে দিয়ে বলেছেন-আমি আছি তো। কিন্তু আমি তোমাকে একটুও ভালোবাসি না।

সাবিত্রী থামলেন। চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিলো আমার। খালী কাপটা নিয়ে সাবিত্রী আবারো রান্না ঘরে চলে গেলেন। আমি বারান্দায় বসে সাবিত্রীর রান্না ঘর থেকে টুং টাং শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। কিছুক্ষন পর সাবিত্রী ফিরে এলো। আমি সাবিত্রীকে কোনো কিছু বলার আগেই প্রশ্ন করলাম- যদি মুক্তার সাহেব আপনাকে ভালোই না বাসে, তাহলে উনি এখানে কিসের টানে আসতেন?

সাবিত্রী এবার আমার সামনের চেয়ারটায় বসতে গিয়েও বসলেন না। আমাকে কিছুক্ষনের জন্য অপেক্ষা করতে বললেন। এই বলে সাবিত্রী তাঁর অন্য একটি ঘরে প্রবেশ করলেন। প্রায় পনেরো বিশ মিনিট পর সাবিত্রী আবার ফিরে এলেন। তাঁর হাতে একটি কাগজ। বুঝা যাচ্ছে, খুব যত্ন করে রাখা একটি কাগজের বান্ডেল। সাবিত্রী কাগজটা আমার হাতে দিয়ে বললেন,

-নিন এটা পড়ুন। যখন মুক্তার সাহেব অনেকদিন আর আমার কাছে আসেন নাই, তখন তিনি আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। এটা আসলে চিঠি না, এটা মুক্তার সাহেবের ডায়েরীর একটা পাতার অংশ। তিনি সবসময় ডায়েরী লিখেন। যখন তিনি অনেকদিন আমার কাছে আসা বন্ধ করলেন, তখন আমি একবার তাঁর অফিসে গিয়েছিলাম। তিনি অফিসে ছিলেন না। পরে তিনি এই লেখাটা আমাকে পাঠিয়েছিলেন। আমি অনেক যত্ন করে এই লেখাটা রেখে দিয়েছি। তিনি কাকে উদ্দেশ্য করে এই লেখাটা লিখেছিলেন, আমার জানা নাই, তবে এটা তাঁর মনের ভিতরের একটা কষ্টের অনুভুতি ছাড়া আর কিছুই না। আমার যখন ম%