০২/০৩/১৯৮৬-১ম শীত অনুশীলন সমাপ্তি

আগামীকাল আমাদের ‘শীতকালীন অনুশীলন’ বা শীতকালিন মহড়ার শেষ। ক্যান্টনমেন্ট এ ফেরার পালা। সবাই যার যার বাক্সপেটরা মোটামুটি গুছিয়ে রাখছে। আমার তেমন কিছুই নাই। আর থাকলেও রানার আছে, সে ধীরে ধীরে গুছিয়ে ফেলবে। এটা যেনো কেউ দুই মাসের জন্য কোথাও এসেছিলো, আগামীকাল তার ফেরার পালা। অনেক জায়গা দেখা হলো, অনেক অপরিচিত মানুষের সাথে কথা হলো, অনেক গ্রাম গঞ্জ চেনা হলো। হয়তো আবার এখানে কখনো আসি কিনা জানি না। এর আগেও আসা হয় নাই, আবার ভবিষ্যতে আসবো কিনা তাও জানা নাই। যে কোনো জায়গায় কিছুদিন অবস্থান করলে কিছু না কিছু স্মৃতি সাথে থেকেই যায়। কিছু স্মৃতি রেখে যাওয়া হয়। অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়, আর যাওয়ার সময় মনটা যেনো কেমন আনচান আনচান করে। জানি, এখানে থাকার জন্য আসিনি, এটাও জানি এখানে আমাদের কোনো সজন ও নাই, তারপরেও এলাকার মানুষগুলিকে কেমন যেনো ছেড়ে যেতে মনের ভিতর একটা চাপ অনুভুত হয়। সবার হয় কিনা জানি না কিন্তু আমার বেলায় এটা হয়। এখন আমি বাইরে বসে আছি, সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে অনেক আগেই। একটা ক্যাম স্টুলের মধ্যে বসে ডুবে যাওয়া সূর্যের লাল আভাটা এখনো উপভোগ করছি। অফিসাররা অনেকেই এদিক সেদিক ঘুরতে গেছে। কোনো অফিসার নাই বললেই চলে। আমার যেতে ভালো লাগেনি, তাই ক্যাম্পেই আছি। আর তাছাড়া একজন না একজন অফিসারকে ক্যাম্পে থাকতেই হয়। আমিই রয়ে গেলাম। আমি আজো যশোর সেনানীবাস দেখিনি। কাল হয়তো প্রথম দেখতে পাবো। সেটা হয়তো আরেক নতুন পরিবেশ।

রুপদিয়া গ্রামটা আমার বেশ ভালো লেগেছিলো। এর চারিধারে ক্ষেত, আখ ক্ষেত, গাছ গাছালী, মানুষ গুলি অনেক গরীব, তবে চোর মনে হয় নাই। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও দেখেছি দলবেধে স্কুলে যায়, বড়রা তাদের গরু ছাগল নিয়ে সারাদিন ক্ষেতে কাজ করে। মহিলারাও পুরুষদের সাথে মিলে মিশে ক্ষেতে কাজ করে। এলাকায় যখন ইউনিফর্ম পড়ে হাটতাম, বড্ড ভালো লাগতো। অনেক বুড়ো, জোয়ান মানুষেরা খুব সমীহ করতো। কেউ কেউ ছালাম দিতো। আবার অনেকেই তাদের গাছের পেয়ারা, কিংবা ফল মুলাদি অফার করতো। কিন্তু আমি কখনো তাদের থেকে এসব খাইতাম না, খেতে বারন নাই কিন্তু আমার ইচ্ছে হতো না।

আজ আমার ঐ বুড়িমার কথা মনে পড়লো। বুড়িমার কথা মাঝে মাঝেই আমার মনে পড়ে। বেচাড়ি হয়তো আরো অনেকদিন একা একাই সেই গভীর রাতে আখের রস জ্বাল দিতেই থাকবে, তার কোনো সাথী নাই, সংগী নাই। জীবন বড় একা তার। ভাবলাম, যাই একবার দেখা করে আসি। এই কয়দিন আসলে বিভিন্ন কাজের চাপে আর এদিকে আসা হয় নাই। ফলে বুড়িমার সাথে বেশ কদিন দেখাও হয় নাই। কাল চলে যাবো, বুড়িমাকে দেখার খুব ইচ্ছে হলো।

রাতে পিকআপের ড্রাইভারকে বললাম যে, আমি আজ রাতে নাইট গার্ড চেকিং এ যাবো। যদিও আমার ডিউটি নাই। রাত ১ টায় পিক আপ নিয়ে গেলাম সেই বরই গাছটার কাছে। কিন্তু আজ বুড়িমা আখের রস জ্বাল দিতে আসেন নাই। খুব মর্মাহত হলাম এই ভেবে যে, আমি তার বাড়িও চিনি না। নামটাও জিজ্ঞেস করা হয় নাই। তাহলে তাকে এই রাতে খুজে বের করবো কিভাবে? মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। বুঝলাম, বুড়িমার সাথে আমার আর দেখা হলো না। অগত্যা ফিরে এলাম। মনের ভিতরে একটা খচখচ করতে লাগলো, আহা, সম্ভবত বুড়িমাকে না দেখেই আমাকে কাল চলে যেতে হবে। অনেকদিন হয়ে গেলো আসা হয় নাই। নিজেকে একটা অপরাধি মনে হতে লাগলো। কিন্তু মনে আরেকটা প্রশ্ন জেগে উঠলো, বুড়িমার কোনো অসুখ বিসুখ করেনি তো? অথবা বুড়িমা বেচে আছে তো? মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। যে উদ্দেশ্যে আজ নাইট গার্ড চেকিং আমার না থাকা সত্তেও আমি এসেছিলাম, সেটা আর হলো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *