০৬/০১/২০০৫-জেনাঃ শফিক ইন্টারভিউ

আমার ব্রিগেড কমান্ডার আমার প্রোমোশন না হওয়াতে আমি বুঝতে পারছি তিনিও খুব আপসেট। যখন কোনো ব্রিগেড লেবেলের অনুষ্ঠান হয়, তিনি আমাকেও সিওদের সাথে একতা চেয়ার রাখেন, কিংবা যখন সিওদের একান্ত কোনো মিটিং করেন বা এই জাতীয় কিছু এরেঞ্জ করেন, তিনি আমাকেও ডাকেন। অনেক সময় মজিদকে ডাকেন না। কারন তিনি এইটুকু জানেন যে, আল্টিমেটলী মজিদকে বল্লেও মজিদ শেষ পর্যন্ত আমাকে এসেই বলবে। তাঁর থেকে ভালো অন্যান্য সিওদের সাথে কমান্ডার আমাকেই ডাকেন, মজিদকে নয়। ব্যাপারটা ভালো লাগে, কিন্তু তারপরেও মনের ভিতরে একটা কি যেনো খস খস করতেই থাকে। কমান্ডারকে বললাম, স্যার, আমি কি এম এস এর সাথে দেখা করতে পারি? আমার জানার খুব শখ আসলে আমার প্রোমোশন না হবার পিছনের রহস্য টা আসলে কি? এটা কি ১৩ লং কোর্সের অফিসার আমি এই জন্য? যদি সেটাই হয় তাহলে এই প্রোমোশন বোর্ডে কিছু কিছু ১৩ লং কোর্সের অফিসারদের কিন্তু প্রোমোসন হয়েছে। তাহলে ওরা কি বিএনপি ঘেষা? আমি তো কোনো রাজনীতি করি না। এমন কি আওয়ামিলীগও করি না। তাহলে ব্যাপারটা কোথায় লুকিয়ে আছে রহস্যটা? কমান্ডার শেষ পর্যন্ত এম এস জেনারেল সফিকের সাথে আমাকে দেখা করিয়ে দিলেন। সকালেই আর্মি হেড কোয়ার্টারে গিয়েছিলাম। অনেকদিন পর আসলাম আবার আর্মি হেডকোয়ার্টারে। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নতুন অফিসার, নতুন নতুন মুখ।

স্যার দেখা দিলেন। প্রথমেই আমার কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন, আমি স্যারকে চিনি আগে থেকেই, কিন্তু খুব একটা ব্যক্তিগত সখ্যতা নাই। অনেক কিছু নরম্যাল কথা বলার পর স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো কি কারনে আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছো? আমি বললাম যে, স্যার বেসিক্যালি আমি অনেক বছর আগে থেকেই একটা বিকল্প অপসন খুছিলাম কিভাবে আমার চাকুরীর ফিল্ড চেঞ্জ করা যায় কিন্তু সেটা যেভাবেই হোক ব্যাটে বলে মিলছিলো না। কিন্তু পর পর দুবার সুপারসিডেড হবার কারনে প্রক্রিয়াটা এবার আমি শুরু করতে চাই। কিন্তু তাঁর আগে আমার খুব জানার ইচ্ছা যে, আসলে কোন কারনে আমার বা আমার মতো আরো কিছু অফিসারের প্রোমোশন হয় নাই। এটা তো আমাদের জানার একটু ইচ্ছে হতেই পারে স্যার। আপনি যদি আমাকে খোলামেলা বলতেন, হয়তো নিজের কাছে একটা জবাবদিহিতার সুযোগ পেতাম।

স্যার খুব মুচকী হেসে বললেন, দেখো আখতার, আমি আসলে প্রোমোশন দেওয়ার মালিক নৈ, আমার কাজ তোমাদের ফাইলগুলি ঠিকঠাক মতো বোর্ডে দেয়া আর বোর্ডের কাজ সেগুলি বিশ্লেষন করে কাকে কিভাবে কি করবেন সেটা করা। হ্যা, প্রতিটা ফাইলে অনেক মন্তব্য থাকে, অনেক অব্জারভেশন থাকে, সেগুলি কাউকে কাউকে আবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়, বা কন্সার্ন কমান্ডাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে জানানো হয় যাতে ওই অফিসারকে তারা জানাতে পারেন। তবে তোমার ব্যাপারে পার্টিকুলার কোনো বড় ধরনের অভিযোগ বা অব্জারভেশন ছিলো না। একটা পি ই টি তোমার এ সি আর থেকে মিসিং আছে, সেটা ছাড়া আর তেমন কোনো অব্জারভেশন পাওয়া যায় নাই। কিন্তু এসব হচ্ছে মামুলি ব্যাপার, বোর্ডে অনেক জেনারেল গন আরো কিছু উত্থাপিত হয়তো করেন যা সব সময় ফাইলে লিপিবদ্ধ করেন না, হোয়াইট, গ্রে বা ব্ল্যাক মন্তব্য থাকে যা আমি তোমাকে এই মুহুর্তে সেসব বলতে পারবো না। তোমার কোর্স মেট আছে মেজর ওয়াকার। সেটা নিয়ে এক সময় সম্ভবত তুমি ওর ফাইলটা নিয়ে কাজ করেছিলা, যেখানে বেশ কিছু মন্তব্য তুমি লিখেছো।

আমি হাসলাম। আর বললাম, স্যার, এই আর্মির জন্য আমি আমার পরিবারকে পর্যন্ত সময় দিতে পারি নাই। জীবনের এই ১৮/১৯ বছরের মধ্যে প্রায় সময়ই শুধু আর্মির সার্ভিস দেয়ার জন্য ম্যারেড ব্যচলর হিসাবেই মেসে মেসে কাটিয়েছি। আজ এতো বছর পর বুঝলাম, আসলে এটা আমার কখনো আপন ছিলো না। যাই হোক, আমি আজো জানতে পারলাম না কি কারনে আসলে আমার প্রোমোশনতা হলো না। আমি স্টাফ কলেজ করেছি, গানারী স্টাফ করেছি, জি এস ও -২ (অপ্স) ছিলাম, আর্মি হেড কোয়ার্টারে কাজ করেছি, সি জি এস এর সাথে কাজ করেছি, চীফের সাথে কাজ করেছি, অন্তত ৫ থেকে ৬ টা জেনারেলের সাথে ডাইরেক্ট কাজ করেছি, বিপসটের মতো একটা জায়গায় একা প্রায় ৩৫ টা দেশের সাথে ট্রেনিং কোওর্ডিনেট করেছি একা। আসলে এসবের কোনো মুল্য ছিলো না। কিন্তু যারা সারা বছর ক্যাটেগরি সি হয়ে আরাম আয়েস করেছে, কাজে ফাকি দিয়েছে, ওরা অপদার্থ বলে কোনো সিনিয়ররা পর্যন্ত ওদেরকে কোনো কাজ দিতে চাইতো না, তারাই সময় মতো আমাদের মাথায় বসে অধিনায়কগিরি করে আর আমরা তাদের অধীনে উপ অধিনায়ক, কিংবা বড় জোড় কোনো একটা ইউনিটে বা সংস্থায় পার্মানেন্ট সুপারসিডেড হয়ে কলুর বলদের মতো কিছু বেতনের জন্য কাজ করে যাই। আমার এই বেতনের অর্ধেক তাকাই তো খরচ হয়ে যায় আমার সিগারেটের পিছনে। আর্মির বাইরের দুনিয়াটা আমি দেখি না, কিন্তু ওটা যে এই আর্মির থেকেও অনেক বড় একটা পরিসর সেটা আমার জানা। আমি স্যার এপেন্ডিক্স যে সাবমিট করলে কাইন্ডলী আমার এপ্লিকেশনটা ফরোয়ার্ড করবেন। আমাকে অন্তত এই উপকারতা করবেন। আমি আপনার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ থাকবো। সবাই এই আর্মিতে আজীবন থাকবে না। হয়তো আবার আমাদের দেখা হবে বাইরের কোনো বড় পরিসরে যেখানে আমার আপনার চেয়ারের লেবেল সমান। আমি স্যার চীফকেও বলে যাবো কিছু কথা। উনাকে একটা ডিও লিক্ষেছি, প্রধান মন্ত্রীকেও। দেশের একজন নাগরীক হিসাবে তিনি আমার প্রধান মন্ত্রী, তাঁর কাছে আমার কষ্টের কথা বলাই যায়। যদি উনি সময় দেন, তো ভালো, না দিলে হয়তো আমার কিছু করার নাই।

সফিক স্যার আমাকে শান্তনার বানী দিয়ে বললেন, দেখো আখতার, সময় পালটায়, সময় সব সবার সময় এক রকম যায় না। আরেকতা বার সুযোগ নাও, দেখো কি হয়। দুবার যখন হয় নাই, তৃতীয় বার তো হতেও পারে। কিন্তু তুমি যদি এপেন্ডিক্স-জে দাও, তখন তোমার এপ্লিকেশন থাকাকালে আমরা ইচ্ছা করলেও তোমার ফাইল পরবর্তী বোর্ডে পাঠাতে পারবো না। সেক্ষেত্রে তোমার প্রোমোশন হয়তো কন্সিডার করবে না যা একটা সুযোগ ছিলো, সেটাও তুমি হারাবা। আমি বললাম, স্যার, অফিসে যেতেই ভালো লাগে না। এতো লম্বা সময় কাটাবো কিভাবে? জুনিয়র আন কোয়ালিফাইড একজন ছেলে আমার অধিনায়ক হিসাবে মাথায় ছড়ি ঘুরাবে, আর আমি প্রতিটি মুহুর্ত এটা হজম করে করে বেচে থাকতে হয়তো পারবো না।

যাই হোক, চলে এলাম। কিন্তু জানা হলো না আমার প্রোমোশন না হবার মুল রহস্য কি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *