০৬/১২/১৯৯৮-মা পরিবারের বন্ডেজ?

রবিবার, মাঝিরা সেনানীবাস, রাতঃ ১১টা ২৩ মিনিট

মাঝে মাঝে আমি একটা অদ্ভুদ ব্যাপার নিয়ে ভাবি। কিন্তু আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার মাঝে মাঝে বেশ ভাবতে ইচ্ছে করে। আমরা দুই ভাই, পাচ বোনের মধ্যে এখন চারজন বেচে আছেন। মাও বেচে আছেন। মা গ্রামে থাকেন, আমরা সবাই মাকে কেন্দ্র করেই প্রকৃতভাবে আসলে ঈদে, পর্বে কিংবা যে কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে একত্রিত হই। আমি বগুড়ায় আছি, মিতুলকে ছাড়াও আমি যখন ছুটি নিতে চাই, তার মাঝেও মায়ের সাথে দেখা করার প্রবনতায় আমার ছুটি যেতে ইচ্ছে করে। হাবীব ভাই আমেরিকায় থাকেন, তার সাধারনত সবসময় বাংলাদেশে আসা হয় না। উনি আসতেও হয়তো চান না। হাবীব ভাইয়ার এই যে না আসার অনীহা, কোনো একদিন হয়তো উনাকে এর বড় মাশুল দিতে হতে পারে। এর কারন একটাই। আজ হাবীব ভাই যে সব কারনে তার অনীহা হচ্ছে, যেমন, বোনদের প্রতি উনার আস্থা নাই বললেই চলে, গ্রামের প্রতি উনার অনেক অনীহা কারন গ্রাম তার স্ট্যান্ডার্ড নয়। থাকা অসুবিধা, খাওয়া অসুবিধা, পায়খানা প্রস্রাবে অসুবিধা। পরিবেশ তার মনের অনুকুলে নয়। তার উপর তার সমসাময়ীক কোনো বন্ধুরাও নাই যে, উনি কোথাও আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে পারবেন। একদিক দিয়ে ভাবলে ব্যাপারটা মনে হয় ঠিকই আছে। আবার যদি সুদূরপ্রসারী ভাবনায় ভাবি, এই বিচ্ছিন্নতা কোন একদিন হাবীব ভাইকে হয়তোবা মাশুল দিতে হবে। কেনো বলছি, তার একটা ব্যাখ্যা আছে। মানুষ বড় হয়, তার সম্পদ হয়, একদিন সম্পদের চাহিদা আর থাকে না। তখন দরকার হয়, আসলে দরকার না, এটাই হবে যে, ইচ্ছে হবে সেই চেনা পরিচিত বাল্যকালের জায়গাগুলিতে ফিরে যাই, তারপর সেখানে সেই গ্রাম, সেই আদি নদী, মেঠো পথের ধারে হাটতে হাটতে সময় কাটানোর বাসনা হবে। সবাই ওই সময় একসাথে জীবিত নাও থাকতে পারে, কিন্তু এই সমসাময়ীক বন্ধুদের ডালপালারা অর্থাৎ তাদের বাচ্চা কাচ্চারাও এক সময় বন্ধুতে পরিনত হতে পারে। কিন্তু এটা সম্ভব তখনই যখন অবিচ্ছিন্ন একটা সম্পর্কের মধ্যে কেউ থাকে।

যাই হোক, আমি ঢাকার বাইরে থাকি বিধায় মায়ের উপর সন্তানের যে প্রাত্যাহিক দায়িত্ত, বাজার সদাই, দেখভাল ইত্যাদি করা সম্ভব হয় না। কিন্তু আমাদের বদি ভাই অত্যান্ত আন্তরীকতার সাথেই মায়ের এই যত্নটা করেন। যদিও তিনি আমার আপন সহোদর ভাই নন। মাসে মাসে এককালীন বাজার করে দিয়ে আসেন, মায়ের খোজ খবর নেন। মাকে তিনি মা বলেই জানেন। এই রকম একজন নিঃসার্থবান মানুষ যুগে যুগে পাওয়া যায় না। বদি ভাইয়ের সাথে আমার বোনদের দেখা হয়, কথা হয়, যেদিন তিনি গ্রামে যান, সেদিন সবার সাথেই উনার দেখা সাক্ষাত হয়। এমন কি আমাদের গ্রামের অনেকের সাথেই উনার এখন ব্যক্তিগত পরিচয় আছে। সবাই উনাকে স্যার বলেই সম্বোধন করেন।  

কিন্তু সবচেয়ে বড় ভয় হয় আমার যে, হাবীব ভাই দেশে না আসার কারনে যেমন তার সন্তানদের সাথে আমাদের অন্যান্য ভাই বোনদের সন্তানদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠছে না, তেমনি বদি ভাইও তার সন্তানদেরকে আমাদের এই সম্পুর্ন পারিবারিক সিস্টেমের সাথে বহুমুখী বন্ধনের চেষ্টা করছেন না। ফলে আমাদের বোনদের সন্তানেরা যেমন বদি ভাইয়ের সন্তানদের সাথে বন্ধুত্ত গড়ে উঠছে না, তেমনি হাবীব ভাইয়ের সন্তানদের সাথেও একই অবস্থা। এই বন্ধনটা ছাড়া ছাড়া ভাবের। সতস্ফুর্ততা নাই। আমি যখন ঢাকায় যাই, বেশীর ভাগ সময়ই আমি খেয়াল করেছি যে, আমার সময় কাটে কিছু অংশ মানিকগঞ্জে, কিছু অংশ গ্রামে আর মাঝে মাঝে মীরপুর বদি ভাইয়ের বাসায়। আর সেটাও বেশ অল্প সময়ের জন্য।

হাবীব ভাইয়ের ছেলে মাসুদের সাথেও কারো কোনো সখ্যতা গড়ে উঠছে না। এমনকি আমার সাথেও না। তাতে যেটা হচ্ছে তা হলো, কোনো একদিন, আমরা হয়তো এভাবেই ছাড়া ছাড়া ভাবেই দুনিয়া ত্যাগ করবো। কে যে কখন দুনিয়া থেকে চলে যাবে, তখন পরিবারের অনেকেই হয়তো পাশে থাকবে না। এটা মর্মান্তিক।

আমার কাছে মনে হচ্ছে, মাকে কেন্দ্র করে এখনো কিছুটা বন্ডেজ আমাদের সবার মধ্যে আছে। কিন্তু এই বন্ডেজটা কি খুব শক্ত একটা বন্ডেজ? এই বন্ডেজের সবচেয়ে দূর্বল দিক হচ্ছে, যেদিন মা থাকবেন না, সেদিন এই সেনটার পয়েন্ট "মা" এর অভাবে বাকী সব বন্ডেজ নিমিষেই ভেংগে যেতে পারে। কিন্তু এটা তো কোনো পারিবারিক সম্পর্ক হতে পারে না?

কিন্তু আজ যদি আমরা এমন একটা বন্ডেজ তৈরী করতে পারতাম যেখানে "মা" সেন্টার পয়েন্ট নয়, তাহলে মা যেদিন থাকবেন না, সেদিনও এই পারিবারিক বন্ডেজটায় কোনো প্রকার হুমকীর সম্মুখীন হতো না। কিন্তু আমার ধারনা, আমরা সেটা করছি না। আর এর ফলাফল দূর্বিসহ। আমাদের পরবর্তী জেনারেশন একে অপরের কোনো খোজ রাখবে না, চিনবে না, হয়তো কখনো জানবেও না যে, অতীতে কোনো একসময় আমাদের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক বিরাজ করেছিলো। অথচ তখনই হয়তো এই বন্ডেজটার অনেক প্রয়োজন।

একটা সময় আসবে, হাবীব ভাইয়ের সবকিছু থাকা সত্তেও তিনি অনিরাপদ ফিল করবেন, পাশে কাউকে হয়তো পাবেন কিন্তু তারা তার পরিবারের কেউ না। আমিও হয়তো ভাববো, আহা যদি এই মুহুর্তে আমার পাশে কেউ থাকতো যাদের শরীরে আমার রক্ত বা যারা আমার একান্ত লোক। আমার পরিবারের বাচ্চারাও হয়তো একদিন প্রশ্ন করবে, আমাদের অতীতের জেনারেশন ছিলো না? তারা কোথায়?

আজ আমি একটা হাইপোথিসিস ডায়াগ্রাম তৈরী করে বুঝতে চেয়েছি, আসলে মা সেন্টারড বন্ডেজ কি আর মা ছাড়া বন্ডেজ কি। গা শিউরে উঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *