০৭/০১/১৯৮৬ রুপদিয়া অনুশীলন ক্যাম্প

এর মধ্যে আমার নতুন পোষ্টিং হয়ে গেলো। ছিলাম রোমিও ব্যাটারীতে, এখন পোষ্টিং করা হলো হেড কোয়ার্টার ব্যাটারীতে। আর সেখানে আমাকে ইউনিটের আইও (ইন্টিলিযেন্স অফিসার) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মজার একটা নিয়োগ। এটা শুনতে যতোটা গোয়েন্দা গোয়েন্দা মনে হচ্ছে, আসলে এটা তার ধারে কাছেও নাই। আমি এই আইও হিসাবে আসলে অধিনায়কের সরাসরি রানার হিসাবে কাজ করছি। রোমিও ব্যাটারী থেকে হেড কোয়ার্টার ব্যাটারিতে পোস্টিং হ ওয়ায় সব কিছু তে একটু বদল হলো, তার কারনটা পরে বুঝেছি যে, যেহেতু আমি সারাক্ষন অধিনায়কের রানারের মতো, ফলে একটু আধটু যেনো সবাই বেশী সমীহই করে। তাবু তাবুর জায়গায়ই তাবু থাকলো। মানে সৈনিকদের কাতারে। জনবলের হিসাবে আমি শুধু এখন হেডকোয়ার্টার ব্যাটারীতে সামিল। সিও সাহেব কখন কোথায় যাবেন, তার সিগারেট প্যাকেট নিয়েছেন কিনা, চশমাটা তিনি চোখের বদলে অন্য কোথাও রেখেছেন কিনা, তার হাতের লাঠিটা ঠিকমতো হাতে আছে কিনা, তার ফাইলপত্র বাহক হিসাবে আমি ফাইল পত্র নিয়েছি কিনা, কেউ তাকে কিছু দিলে সেটা আমি ক্যারি করছি কিনা। আবার সেটা ইউনিটে এসে কন্সার্ন লোকের কাছে দিচ্ছি কিনা, এইসব আসলে আইও সাহেবের কাজের প্রধান অংশ। সিও আনিস স্যার খুব রিজার্ভ মানুশ, অহেতুক খাটায় না। আদরই করেন। তার বড় মেয়ের নাম ফাতেমা। বেশী বয়স নয়। হয়ত ক্লাস এইটে পড়ে। কথায় কথায় জেনেছিলাম।

ব্যস্ততার শেষ নাই। আবার কোনো কাজ যে করছি সেটাও না। ছুটি ছাটাও নাই। আর আমি ছুটি ছাটার জন্য কোনো পেরেশানও করি না। কারন ঢাকায় গেলে আমার নিজেরও তো কোনো স্থায়ী ঠিকানা নাই। সেই গ্রাম। আর গ্রামে গিয়ে বেশীদিন থাকতেও ইচ্ছে করে না। বস্তুত একা মানুষের জীবনের চাহিদা কম। তবে তাদের বেচে থাকার জন্য অনেক পেরেশানী থাকে। এইজন্য এইসব একা মানুষ সারাক্ষন একটা মানষিক ক্লান্তিতে থাকে। আমারও তাই।

যখন কোনো অফিসারকে যে কোনো কারনেই হোক, কোনো এপয়েন্টমেন্ট দেয়া যায় না কিন্তু একটা তো কিছু দিতেই হবে, তখন এই আইও এপয়েন্টটা বড় জ্যাক একটা। লাগানো যায়। এই ব্যাপারটা ইউনিটের মোটামুটি সবাই জানে আর বুঝে। স্পেয়ার প্লাগ আর কি। তবে ২লেঃ এর উপরে আইও আজো আমি কাউকে দিতে দেখি নাই।

যদিও আমি অধিনায়কের আইও, কিন্তু কোচিং বন্ধ নয়। প্রতিদিন গান ড্রিল, টি এ (ট্যাকনিক্যাল এসিষ্টেন্ট), আর বোর্ড প্লটিং সহ বিভিন্ন লগারিদমের বৈ নিয়া বড় বড় অংক সাথে গানের এলিভেশন, ডিফ্লেকশন সুচারু রুপে বের করা চলছেই। আর আমার এন সি ও কোচিং শিক্ষকরা যতো পারে রাতে ব্যস্ত রাখার জন্য এমন এমন ভারী ভারী হোমওয়ার্ক দিতে থাকে যে, সারাদিনের পরিশ্রমের পর রাত ২ টা ৩ টা বেজে যায় শুধু এসব হোমওয়ার্ক করতে করতেই। ওদেরই বা দোষ দেই কিভাবে? পরেরদিন ব্যাটারী কমান্দাররা, উপ-অধিনায়ক সাহেব রাজার হালে নাস্তা করে ডিপ্লয় মেন্ট এরিয়াতে এসেই জিজ্ঞেস করে- প্রশিক্ষনের অগ্রগতি কি? হোম ওয়ার্ক দিয়েছে কিনা, আর সেই হোম ওয়ার্ক আমি শেষ করেছি কিনা, করলে আমার জ্ঞান কতটুকু, আমি কি বোধাই নাকি একটু মনোযোগী এই ফিডব্যাক তো তাদের দিতে হয়। আমার প্রশিক্ষক হলো হাবিলদার বারেক আর মন্ডল। বারেক পাতলা পোতলা মানুষ, এরা যদিও নন মেট্রিক কিন্তু এল্গোরিদম, লগারিদম, ইত্যাদিতে বেশ পাকা। আর মন্ডল কখন যে পান চিবায় না সেটা খুজে বের করা সম্ভব না। সারাক্ষন হাসি খুশিতেই থাকে। ভারিক্কি একটা ভাব আছে কিন্তু আমি যে একজন অফিসার সেটা তার কখনো ভুল হয় না। এস এম হাসেম সাহেব মাঝে মাঝে খোজ খবর নেয়, আর বলে, স্যার, কষ্ট হবে, চিন্তা কইরেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে। কি ঠিক নাই আর কি ঠিক হয়ে যাবে সেটাও আমি মাঝে মাঝে বুঝি না। তবে সে যে একজন ফাদারলী মানুষ, দেখলেই বুঝা যায়। রোমিও ব্যাটারির বিএইচএম (ব্যাটারী হাবিলদার মেজর) ছিলো সাইদুর রহমান। ভারিক্কি মেজাজ তবে বেশ ভালো। যদিও আমি আর রোমিও ব্যাটারিতে নাই, তারপরেও আমার বেশ খোজ খবর রাখে।

দিন চলে যাচ্ছে এক এক করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *