০৮/১০/২০০৩- জর্জিয়া ত্যাগ

Categories

সেই পহেলা অক্টোবর ২০০২ তারিখে আমি জর্জিয়ার জাতীসংঘ মিশনে এসেছিলাম। আজ সেই জর্জিয়া থেকে চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছি। আর কখনো এই দেশে ফিরে আসা হয় কিনা জানি না। যেদিন প্রথম এদেশে ল্যান্ড করেছিলাম, সেদিন দেশটাকে যতোটা না আপন মনে হয়েছিলো, আজ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছে, কিছুটা মায়া ধরেছে, অনেক লোকের সাথে পরিচয় হয়েছে, অনেক পরিবারের সাথে অনেক সখ্যতা হয়েছে, তাদের কারো কারো মুখখানা একেবারে চোখের সামনে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলজ্বল করছে। এদের সাথে হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না।

সোরেনা গামছাখুরদিয়ার পরিবারটা ছিলো আমার সবচেয়ে কাছের একটি পরিবার। ওর সাথে দেখা হলো না। দেদুনা বুকিয়া, রুসুদিন, কিংবা ওদের আরো অন্যান্য সদস্যরাও যেমন সালোমী, তামারা সবাই জানে আজ আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু দেখা করবার মতো কোনো উপায় নাই। ওরা কেউ কেউ থাকে সেই সুদূর টিবলিসিতে, কেউ আবার জুগদিদিতে, আবার কেউ গালীতে। যুদ্ধ বিপর্যস্ত এলাকায় আসলে কোনো কিছুই সঠিক নিয়মে চলে না।

এদেশের মানুষগুলি খুব ভালো ছিলো। ছোট ছোট বাচ্চারা বেশ মিশুক, মেয়েগুলি ওয়েষ্টার্নদের মতো ড্রেস পড়লেও উচ্ছৃঙ্খল নয়। তারা আমাদের দেশের মেয়েদের থেকেও অনেক রুচিশীল এবং পরিবারকেন্দ্রিক। এরা একটি মাত্র বিয়েতেই সুখী। পরিবার নিয়ে সুখে বসবাস করার জন্য যেভাবে স্বামীকে মেনে চলতে হয়, যেভাবে বাচ্চাদের নিয়ে চলতে হয়, ঠিক সেটাই করে। মেয়েরাই বেশীরভাগ সময় সংসারের হাল ধরে রাখে, আর পুরুষগুলি মদের নেশায় পড়ে থাকে।

একটা সময় ছিলো, রাশিয়ার আমলে এরা খুবই সাবলীল এবং বিলাসবহুল লাইফ লিড করেছে। কিন্তু পোষ্ট কোল্ড ওয়ার এর পরে রাশিয়ার অর্থনইতিক বিপর্যয়ের সাথে সাথে ওরা সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের মতো হয়ে গেছে কিন্তু আচার ব্যবহার রয়ে গেছে সেই আগের বিলাসবহুল পর্যায়ের। জুগদিদিতে থাকার সময় আমার ল্যান্ড লেডি ছিলো জুলি। তার দুইটা ছেলে আছে, নাম গোগা আর লেবানী। জুলির স্বামী আলেক একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু একটু ট্রিকি। একসময় প্রুচুর পয়সাকড়ি ছিলো। এখন হাতে কোনো পয়সাকড়ি আসে না। আমরা যে ভাড়াটা দেই, তাতেই ওদের সংসার চলে। গালী সেক্টরে থাকার সময় ল্যান্ড লেডি ছিলো মানানা। আর তার স্বামী ছিলো জামাল। ওদের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জরিয়ে আছে। জুলির বয়স প্রায় পঞ্চাশ। মায়ের মতো। একদম ইংরেজী পারে না কিন্তু যেভাবে ইংরেজী বলে তাতে ওর কথা বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না।

এইতো গত ৪ অক্টোবর ২০০৩ তারিখে আমি আবারো জুলির বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। এক রাত থাকলাম। জুলি জানে আমি এক সপ্তাহ পরেই দেশে ফিরে আসবো। রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। খুব সকালে ঘুম ভাঙ্গলো একটা চমৎকার ছোয়ায়। আমি চোখ খুলতেই দেখলাম, জুলি আমার কপালে ঘুমন্ত অবস্থায় চুমু খেলো। আমার ঘুম ভেংগে গেলো। চোখ মেলতেই দেখলাম, জুলি আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখ তার ছলছলে। আমি তার দিকে তাকাতেই সে ফিরে যাচ্ছিলো। আমি বললাম, মামা, এদিকে আসো। মামা মানে মা, জুলি আমাকে জড়িয়ে ধরে একেবারে কান্নায় ভেংগে পড়লো। বল্লো, নো সি, নাহ? কাম এগেইন সন। অর্থাৎ তোমার সাথে আর কখনো কি দেখা হবে না? আবার এসো আমার ছেলে। কিছুই বলা গেলো না। সকালটাই একটা কষ্টের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিলো। ওরা খুব ভালো মানুষ। আমি আমার অনেক মালামাল কিছুই আনলাম না। একটা টেপ রেকর্ডার কিনেছিলাম, দিয়ে এলাম, অনেকগুলি গিফট কিনেছিলাম দেশে আনবো বলে। সব কিছু দিয়ে দিলাম। ওরা এক সময় অনেক ধনী ছিলো, ওদের এসবের কোনো প্রয়োজন ছিলো না রাখার, কিন্তু আমিই জোর করে দিলাম। খুব খুসি হলো। জুলি তার আলমারী থেকে ৬ টা গ্লাস সেট বের করে অতি যত্নের সাথে একটা পুরানো পেপারে প্যাক করে আমাকে দিয়ে বল্লো, "ওয়াইফ, গিভ, আই গিভ ওয়াইফ, লাভলু" অর্থাৎ এর মানে হলো, এটা তুমি তোমার বউকে দিবা। বল্বা আমি দিয়েছি। আর বল্বা, আমি তাকে ভালবাসি। কি অদ্ভুদ ফিলিংস। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য অনেক ভাষা জানার দরকার নাই। মানুষের ভালবাসা কথা বলে চোখ, কথা বলে মুখ, কথা বলে অন্তর। আর তার বহির্প্রকাশ সারাটা শড়ির তার নিজের ভাষায় প্রকাশ করে।  

আজ এই চলে যাওয়ার দিনে মনটা ভীষন খারাপ হচ্ছে। সকাল থেকেই সমস্ত জিনিষ্পত্র গুছিয়ে রেখেছিলাম। আমি গালীতে আছি, আমাকে যেতে হবে প্রথমে জুগদিদি সেক্টরে। ওখানে জাতীসংঘের প্রশাসনিক দপ্তর থেকে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নিয়ে, মালামাল ট্রান্সপোর্ট সেকসনে হস্তান্তর করে শুধুমাত্র আমার একটা হ্যান্ডব্যাগ সাথে নিয়ে সুখুমী থেকে আমাদের নিজস্ব প্লেনে তুরষ্কের এয়ারপোর্টে আসতে হবে।

গালীতে আমি যে রুমটায় থাকতাম, তার ঠিক পাশের রুমেই থাকতো মানানার স্বামী জামাল। অত্যান্ত ভালো একজন মানুষ। মানানাও খুব ভালো একজন মহিলা। সারাক্ষন কাজ করে। আমাদের জন্য রান্না করে, বাজার করে, কাপড় চোপড় ধুয়ে আবার ইস্ত্রী করে রাখে। জামাল কোনো কাজ করে না। ওদের একটা ছেলে আছে। আমি কখনো দেখি নাই। সে থাকে বাকুতে, তার স্ত্রীসহ। মাকে ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু কখনো আসে না। না আসার কারন একটাই, ওর পাস্পোর্ট নাই।

(চলবে)  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *