০৯/০৬/১৯৮৭-৪ মর্টার থেকে ৬ ফিল্ডে

আজ নতুন ইউনিট ৬ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারীতে যোগদান করলাম। মীরপুর সেনানিবাস, ঢাকাতে। লেঃ কর্নেল দাউদ আমাদের সিও। কয়েকদিন মেজর হান্নান উপ-অধিনায়ক ছিলেন, আমি আসার পর পরই উনার পোস্টিং হয়ে যায়। মেজর খলিল নতুন উপ অধিনায়ক। শোনা যায় অধিনায়কের সাথে উপ অধিনায়কের কোনো কিছুতেই মিল না হওয়ায় অধিনায়ক তদবির করে হান্নান স্যারকে কিছু একটা বরাতে শাস্তি দিয়ে অন্যত্র পোস্টিং করে দিয়েছেন। নতুন ইউনিট, তাই কোনো কিছুই নাই। এই ইউনিটে অফিসার আছেন লেঃ সাদাত স্যার, ক্যঃ শিহাব, (এই দুই জনেই আবার তারা কোর্সমেট), ব্যাটারী কমান্ডার হিসাবে আছেন মেজর সালেহ স্যার। এরশাদ সাহেবের সাথে তিনি কাজ করেছেন। বিষেষ করে বর্তমান চীফ জেনারেল আতিক স্যারের খুব প্রিয় মানুষ তিনি। ১৪ লং কোর্সের ২ লেঃ মুনীর আছে।

মীরপুর বাসা হওয়াতে আমার একটু লাভ হয়েছে। সময় আর সুযোগ পেলে মীরপুরেই বদি ভাইয়ের বাসায় যাওয়া যায় কিন্তু আমি খুব বেশি কম্ফোর্ট ফিল করি না ঘন ঘন যেতেও। কোথাও আমার ঢাকায় যাওয়ার যায়গা নাই, তারপরেও ঢাকার ছেলে যেহেতু, ঢাকাতে থাকলে মনটা ভালো লাগে। বদি ভাইয়ের বাসা আমার কখনোই নিজের বাসা বলে মনে হয় নাই। এখানে আমার জন্য ডেডিকেটেড কোনো রুম নাই, আমি এসে যে কিছু বন্ধু বান্ধব নিয়ে এখানে আড্ডা দেবো এসবের কোনো বালাই নাই। অন্য দশ জনের মতো আমিও এখানে একজন গেষ্টই বলা চলে। এটা তাদের দোষ নয়। আর আমার এই রকম আবদার করাও সমীচিন নয় যে, এখানে আমার কোনো অধিকার আছে। তারপরেও অন্য দশ জন থেকে হয়তো আমার প্রায়োরিটি একটু বেশি এখানে, এটুকুই। ফলে এখানে আসার জন্য আমি একেবারে পাগল থাকি না। এরপরেও তো একটা জায়গা আছে বলা যায়। বলতে পারি কাউকে যে, আমার বাসা মীরপুর। এতাই বা কম কিসের?

পাশেই আছে ৪৫ ইষ্ট বেংগল। ওখানে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের আমাদের ব্যাচের সমান আরেক অফিসার আছে। লেঃ রাকীব। নতুন হোন্ডা কিনেছে, ডেলহীম বাইক। নতুন হোন্ডা কিনলে যা হয়, বাইরে ঘুরাঘুরি একটু বেড়ে যায়। আমরা সবাই অস্থায়ী অফিসার মেস নামে ইউনিটের পাশেই ৪ তালা বিল্ডিং এ থাকি। আসলে কোনো মেস নাই এখানে স্থায়ীভাবে। আর যেটা আছে সেটা এএ আর্টিলারী ব্রিগেডের একটা মেস, খুব বেশি কিছু নাই। আমরা ঐ মেসের আন্ডারেই আছি, খাওয়া দাওয়া ওখান থেকে আসে, কিন্তু রুমেই বেশির ভাগ সময় খাই।

অধিনায়ক লেঃ কর্নেল দাউদ খুব সাংঘাতিক একরোখা মানুষ। খুব ছোট ছোট ভুলের কারনেও যে কোনো সৈনিক অথবা অফিসারদেরকে বড় বড় শাস্তি দেওয়ার পক্ষপাতি। ফলে সবাই অধিনায়কের উপর ভীষন ক্ষেপা। তাকে কোনো অফিসারই লাইক করেন না। উপঅধিনায়ক খলিল স্যার মাঝে মাঝে অধিনায়কের বিরদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু আগের উপঅধিনায়কের দফা দেখে খুব বেশি মাতামাতিও করতে পারেন না। কারন লেঃ কর্নেল দাউদের রেকর্ড খুব ভালো না। তিনি ব্রিগেড কমান্ডার কিংবা জিওসি কাউকেই নাকি পরোয়া করেন না।

আমরা যদিও মীরপুর থাকি কিন্তু আমরা ৯ম আর্টিলারী (সাভার) ব্রিগেডের অধীনে। এই সুবাদে আমরা মাঝে মাঝেই সাভার ক্যান্টনমেন্টে যাই। আমি ৪ মর্টার রেজিমেন্টে থাকতে এডজুটেন্টের দায়িত্তে ছিলাম, কিন্তু এই ৬ ফিল্ডে আসার সাথে সাথে আমাকে কোয়ার্টার মাষ্টার বানানো হলো। আমি এই নিয়োগটাকে খুবই অপছন্দ করি। রেশনের হিসাব, গাড়ী, অস্ত্র আরো খুটিনাটি বিষয় নিয়ে সুক্ষ হিসাব করতে হয়। দেওয়ালে কখন চুনকাম করাতে হবে, কিংবা সৈনিকের পায়খানা কখন কখন পরিস্কার করাতে হবে এইসব আমার একদম ভালো লাগে না। তার মধ্যে রেশনের হিসাব তো একটা চুরির খনি।

সকালে পিটিতে সবাইকে আসা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মাঝে মাঝে সিনিয়র ব্যাটারী কমান্ডারগন আসতে চান না। আর অধিনায়ক প্রতিদিন আসেন। কি ঝামেলা একটা। প্রতিদিনই আমাকে কারো না কারো নামে মিথ্যা বলতে হচ্ছে। অধিনায়ক জিজ্ঞেস করেন কেনো অমুক অফিসার আসে নাই, হয়তামি বানিয়ে কিছু একটা বলে দিয়ে আপাতত খালাস হচ্ছি। কিন্ত অধিনায়ক সাহেব আমার কথা ঠিক আছে কিনা, কিংবা অনুপস্থিত অফিসার ঠিক কথা আমাকে বলেছেন কিনা এটা উনি বিভিন্ন মাধ্যমে যাচাইয়ের চেষ্টা করেন বিধায় আমিও ধীরে ধীরে অধিনায়কের কাছে খারাপ হয়ে যাচ্ছি। এখানে উল্লেখ থাকে যে, সাদাত স্যারকে ইউনিটের এডজুটেন্ট বানানো হলেও তিনি ইউনিটে সকালে হাজির থাকেন না, তাই কোয়ার্টার মাষ্টার সকালে এডজুটেন্টের দায়িত্ত পালন করি। সাদাত স্যার ইন্ডিয়ায় যাবেন পিটি কোর্স করতে, তাই তিনি প্রি-কোর্সে আছেন অন্য একটা ইউনিটে।

বড্ড মানষিক কষ্টে দিনপাত করছি অধিনায়কের অধীনে। ব্যাটারি কমান্ডারদের হাতে অধিনায়ক কোনো ক্ষমতাই রাখতে চান না। ফলে ব্যাটারী কমান্ডারগন কোনো কাজও করছেন না। আর সবদোষ পরছে আমাদের উপর। ওদিকে স্যাররা এতো সিনিয়র মানুষ, কিছুই বলতে পারছি না। মাঝে মাঝে আমি স্যারদের অফিসে যাই, দুক্ষের কথা বলি কিন্তু স্যাররা আমাকে আদর করলেও তারা কোনো ব্যাপারেই কিছু করতে পারবেন না এটা আকার ইঙ্গিতে বলেন। সালেহ স্যার তো ফান করে মাঝেই মাঝেই বলেন, যে, ঐ মিয়া, অধিনায়কেরে বুঝাও, এতো ঠেলাঠেলী ভালো না। কিন্তু আমি তো কর্নেল দাউদের কাছে পোকামকড়ের সমান।

মেজর সালেহ স্যার যখন সচিবালয়ে কাজ করতেন, সে সুবাদে তিনি নতুন ইউনিট ৬ ফিল্ডের জন্য অনেক অনেক জিনিষপত্র ফ্রিতে এনে এই ইউনিটে দিয়েছেন। যেমন টাইপ রাইটার, আল্মারী, অনেক নতুন ফাইলপত্র, চেয়ার টেবিল, ফ্যান, আরো অনেক কিছু। কিন্তু অধিনায়ক তাতে খুব একটা খুশী নন সালেহ স্যারের উপর। তার ধারনা, সালেহ স্যার অধিনায়কের যে কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখেন।

মেজর সালেহ ভাবী অনেক স্মার্ট একটা মহিলা। হাতাকাটা জামা পড়েন। খুব ভালো ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। তিনি ইউনিটের অন্যান্য ভাবীদের সাথে খুব একটা মিশেন না। এতেও মনে হয় সালেহ স্যার কিছুটা সমস্যা পড়ছেন বিশেষ করে অধিনায়কের নজরে।কেনো সালেহ ভাবী সবার সাথে মিশেন না, কেনো এই, কেনো সেই ইত্যাদি।

অধিনায়ক আসলে আদার র‍্যাঙ্ক থেকে এই পর্যন্ত এসেছেন। তার চরিত্রের মধ্যে সেই ভাবটা কিছুটা রয়ে গেছে। শুনেছি তিনি তার প্রথম বউ মারা যাওয়ার পর তার শালিকে বিয়ে করেছেন। এটাও শুনি যে, তিনি এবং তার শালী নাকি যৌথ ভাবে ১ম স্ত্রীকে মেরে ফেলেছেন। বাকীটা কে জানে?  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *