১০/০৯/২০০৪-২য় বার সুপারসিডেড

৪ ফিল্ডের মেইন বডি এরই মধ্যে মীরপুর চলে এসেছে। লেঃ কর্নেল ফেরদৌস অন্যান্য বাকী অফিসারদেরকে নিয়ে মীরপুরে চলে এসেছিলেন। ইউনিটে মেজর আলি, মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন মাহিফুজ, তাহমিনা এবং অন্যান্য সবাই চলে এসছে। ভরপুর ইউনিট। ৪৬ ব্রিগেডের দায়িত্ব অনেক, তারমধ্যে সেনাপ্রধানের বাসভবনের পাহাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের পাহাড়া ছাড়াও ঢাকায় যতো প্রকারের ইন এইড অফ সিভিল পাওয়ারের কাজ হয়, তাঁর সিংহ ভাগ কাজ আমাদের দায়িত্তের মধ্যে পড়ে। মেজর আলী আমার ৬ ফিল্ডের অফিসার। আমার হাত দিয়েই ওর রেজিমেন্টেশন হয়েছিলো। অমায়িক ছেলে। তাঁর উপর আবার আমার সাথে হাইতিতে মিশন করেছে। এখন আমার ইউনিটে আবার ব্যাটারী কমান্ডার। আমি ওদের সাথে একেবারেই মিলিটারী কমান্ড প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না। অন্য দিকে মেজর হায়দার তো পোলাপানের মতো, সারাক্ষন 'বড়দা" বড়দা" বলেই কথা বলতে থাকে কারন মেজর হায়দার আমার মীর্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ছোট ভাই। ওর বাবা ছিলো আমার আর্টের শিক্ষক। ফলে ওর প্রতিও আমি কিছুইতেই উপ অধিনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না। আরো দুইজন মেজর আছে, ওরাও আমার সাথে এমন একটা সম্পর্ক করে ফেলেছে যে, এখন মনে হচ্ছে, আমি একটা হাসের মা। যেখানেই যাই, ওরাও দল বেধে আমার পিছু পিছুই যায়। খারাপ লাগে না। ভালই লাগে।

                                                                  

বাসা পাই নাই। তাই অফিসার্স মেসের তিন তলার ব্যারাকে আমরা সবাই অর্থাৎ বিবাহিত অফিসারগন দুইটা করে রুম নিয়ে নিয়ে থাকি। ফেরদৌস স্যারের পরিবার থাকে দোতালায়, আমি তিনতালায়, মেজর আলী আর মেজর হায়দার বাসা নেয় নাই কারন ওদের বাসা ঢাকায় আছে। অন্যান্য অফিসাররাও আমাদের বিল্ডিং এর মধ্যেই থাকে। প্রায়ই আমরা ওদেরকে ডেকে ডেকে দাওয়াত করে একসাথে খাই। কখনো আবার তরকারী কিংবা ভালো খাবার পাক করলে পাঠিয়ে দেই। ইউনিট হলো আসলে একতা পরিবার। আমাদের অফিস একদম আমাদের বাসার সাথে লাগোয়া। প্যারেড গ্রাউন্ডও একদম লাগোয়া। ব্যাপারটা এই রকম যে, ১০০ গজের মধ্যে সবকিছু। অনেক ব্যস্ত থাকতে হয় অফিশিয়াল কাজে কিন্তু তারপরেও একটা ভালো সময় যাচ্ছে।

প্রোমোসন বোর্ড শুরু হয়েছে। বেশ ৪/৫ দিন লাগবে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ স্যার অনেকবার আমাকে ডেকেছিলেন। আমার সাথে কথা বলেছেন। একতা জিনিষ কমান্দার বুঝেছিলেন যে, আমাকে হয়তো এর আগেরবারই প্রোমোশন দেয়াটা উচিত ছিলো, কিন্তু কেনো দেয় নাই, এ ব্যাপারে তিনি অনেকবার আমাকে প্রশ্ন করলেও আমি আসলে ভালো কোনো উত্তর দিতে পারি নাই কারন আমাকে কখনো আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে লিখিত কিছুই জানানো হয় নাই কেনো আমার প্রোমোশনটা হয় নাই। ৪৬ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের প্রায় সব সিও, উপঅধিনায়ক, বিএম, ডিকিঊ, এবং অন্যান্য আশেপাশের ইউনিটের অফিসারগন ইতিমধ্যে আমার ডিভিশনাল লেবেলের এক্সারসাইজ, টিউট (TEWT, Technical Exercise Without Troops), মডেল ডিস্কাসনে মেধা আর যুক্তি দেখে, আমার শিক্ষার যোগ্যতা দেখে এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, আমি একজন যোগ্য কোয়ালিফাইড শিক্ষিত অফিসার যাকে প্রথমবারই প্রোমোশন দেয়াটা জরুরী ছিলো। যাই হোক, এবার সবাই আশা করছেন যে আমার প্রোমোশনটা হবে। কিন্তু আমার মন বলছিলো অন্য কথা।

প্রোমোশন বোর্ড আরম্ভ হবার আগে আমাকে অনেকেই একতা পরামর্শ দিয়েছিলো যে, আমার উচিত কিছু কিছু পরিচিত জেনারেল সাহেবদের বাসায় ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার। কিন্তু আমার কাছে এটা খুব অপমানজনক মনে হচ্ছিলো। কারন, প্রোমোশন হবে আমার যোগ্যতা দিয়ে, আমার মেধা দিয়ে, আমার পারফরমেন্স দিয়ে, আমি কেনো বিভিন্ন জেনারেলদেরকে পটাতে যাবো বা অনুরোধ করতে যাবো? ফলে আমি কারো সাথেই দেখা করার অভিপ্রায় হলো না। যদি আমাকে এই আর্মি যোগ্য মনে না করে, যদি এই আর্মি মনে করে যে, আমার থেকেও আরো কেউ যোগ্যতা রাখে আমাকে টপকিয়ে প্রোমোশন পাবার, তাতে আমার কোনো কৈফিয়ত নাই বা দুঃখও নাই। কিন্তু কাউকে আগে থেকে আমি অনুরোধ করবো, তারপর তাদের দয়ায় আমার প্রোমোশন হবে এটা আমি চাই না।

বোর্ডের প্রথম দিন শেষে আমার সিও সাহেব ফেরদৌস স্যার বললেন যে, আজ যাদের নাম পর্যন্ত বোর্দে আলাপ হয়েছে, সে পর্যন্ত নাকি আমাদের নাম আসে নাই। বোর্ড আরো ৩ দিন চলবে, হয়তো আলাপ হয়ে যাবে, ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে বুঝলেন যে, আমাদেরতা হয়ে যাবে? ফেরদৌস স্যার আমাকে জানালেন যে, তিনি নিজ উদ্যোগে জেনারেল আমিনুল করিমের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছেন, এবং জেনারেল আমিনুল করীম আমাকে খুব ভালো করেই চিনেন, আমার ব্যাপারটা নাকি খুব স্ট্রং ভাবে দেখবেন। আমার কাছে ব্যাপারটা খুব জোরালো মনে হয় নাই, তারপরেও ফেরদৌস স্যারের কথা আমি বিসশাস করি।

বোর্ডের দ্বিতীয় দিন পার হয়ে গেলো, কোনো খবর পেলাম না। রাতে ব্রিগেড কমান্দারকে দিনের শেষের ফলাফল জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, যে পর্যন্ত নাম মুটামুটি ড্রাফট হয়েছে সেখানে আমার নাম আছে। অর্থাৎ আমার আপাতত প্রোমোশন বোর্ডে নাম পাশ হয়েছে। কেনো জানি একটু সস্থি পেয়েছিলাম, কমান্ডার তো আমাকে অযথা মিথ্যা কথা বলবেন না। আর মোশাররফ স্যারের সাথে আমার সম্পর্কটা অত্যান্ত ফ্রেন্ডলী। আমি কাউকেই কোনো আগাম খবর দিতে চাই না। আমি আমার বউ মিটুলকেও কোনো খবর দিলাম না। কারন এখন যদি একটা আশা দিয়ে রাখলাম, আর পরে যদি সেটা নেগেটিভ হয়, তাহলে একটা ভালো সংবাদের যে আনন্দ সেটা থেকে বিচ্যুত হয়ে আরেকটা নেগেটিভ খবরের কারনে মনের ভিতর যে বেদনার সৃষ্টি হবে, সেই চাপ মিটুল নিতে পারবে কিনা সন্দেহ। ফলে আমি ওকে না ভালো, না খারাপ কোনোটাই দিতে চাই নাই ফ্রেস এবং চুড়ান্ত ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত।

এভাবে ৩/৪ দিন পেরিয়ে প্রোমোশন বোর্ড পার হল। প্রোমোশন বোর্ড শেষ। এবার ফলাফল প্রকাশিত হবে। সেই চুরান্ত ফলাফলে আমাকে জানানোও হলো যে, আমার এবারো কোন প্রোমশন হয় নাই। তবে আগেরবারের মতো আমাকে অন্ধকারে রাখা হল না। আমি কমান্ডারের কাছে জানতে চাইলাম, আমার কোথায় ঘাটতি ছিল? তিনি উত্তরটা দিতে গিয়ে নিজেও খুব লজ্জিত বোধ করছিলেন। কমান্ডার আমাকে জানালেন যে, ১৯৮৮ সালে কোনো এক ষান্মাসিক পিইটি (ফিজিক্যাল এফিসিয়েন্সী টেষ্ট) তে নাকি আমি জয়েন করি নাই। তাই আমার প্রোমোশন হয় নাই। কমান্ডার বোর্ডকে বলেছিলেন যে, যদি মেজর আখতারের একটা পিইটি ঘাটতি থাকে, তাহলে ওকে ডেকে আনি, সে ওই ঘাটতিটা এখন পুরা করে দিক, তাই বলে আজ থেকে ১৬ বছর আগের একটা পিইটির দোহাই দিয়ে এ রকম একটা চৌকষ অফিসারকে প্রোমোশন না দেয়াটা অন্যায়। এতে অনেক বদনাম হবে এই আর্মির প্রোমোশন বোর্ডের চেহারার। তাছাড়া উনি আরো ন্নাকি বলেছিলেন যে, এই গত এক বছরে তাহলে উনাকে কেনো জানানো হয় নাই যে, মেজর আখতারের একটা পি ই টি ঘাটতি আছে? তাহলে তো আমিই সেটা নিয়ে নিতে পারতাম? কিন্তু সেই গল্পের মতো বলতে হয় যে, যদি কারো দোষ ধরতে চান, তাহলে লক্ষাধিক কারন তো খুজেই পাওয়া যায়। আর সেই লক্ষাধীক দোষের যে কোনো একটা আপাতত এপ্লাই করলেই তো হয়। তাতে বোর্ডের তো আর দোষ দেয়া যাবে না। বাঘ আর হরিনের সেই পানি খাওয়ার গল্পের মতো।

বাঘ হরিন দুটুই একটা ঝর্নার মধ্যে পানি পান করছিলো। হরিন ভাতার দিকে আর বাঘ উজানের দিকে। বাঘের মনে হলো হরিনের একটা দোষ বের করে সেই দোষে ওকে ভক্ষন করা। তাই বাঘ হরিনকে বল্লো, ওই বেটা হরিন, পানি খাইতেছিস তো ঘোলা করতেছিস ক্যান? তোর ঘোলা পানি তো আমার দিকে আসতেছে। তখন হরিন বল্লো, বাঘ মামা, আমি তো ভাটায়, আর আপনি তো উজানে। পানি তো আপনার দিকে থেকে আমার দিকে আসতেছে। আমি আবার ঘোলা জল আপনার দিকে দিলাম কিভাবে? বাঘ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বল্লো, আরে বেটা তুই না হয় ঘোলা জল দিচ্ছিস না, কিন্তু তো আগে তোর দাদা একবার এই রকম করছিলো, তাই তোর দাদার দোষ মানে এখন তর দোষ। এই বলে হরিনকে ঘায়েল করে দিলো বাঘ মামা।

বোর্ড যে কোনো কারনেই আমাকে বা ১৩ লং কোর্সের অফিসারদেরকে প্রোমোশন দেবে না, তাই আজ থেকে ১৬ বছর পূর্বের কোনো এক পিইটি দেয়া হয় নাই, এই দোহাই দিয়ে আমার প্রোমোশন বন্ধ। কি তাজ্জব ব্যাপার।

বাসায় এলাম অফিস থেকে। বউ জিজ্ঞেস করলো, তোমার মন খারাপ দেখলেই বুঝা যায়, বুঝেছি, তোমার প্রোমশন হয় নাই। মিটুলেরও খুব মন খারাপ হলো। আম মিটুলকে শান্তনা দিলাম না। ফেরদৌস স্যার বাসায় এলেন। অন্যান্য অফিসাররাও বাসায় এলেন। আমার মন এম্নিতেই ভালো ছিলো না, তারপরে আবার অফিসাররা এসেছেন আমাকে শান্তনা দিতে। এটা আমার জন্য কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য বোর্ডের সিদ্ধান্ত মনে হয় নাই, আমি মেনে নিতে পারি নাই।

আরো খারাপ সংবাদ পেলাম যে, আমার ইউনিটের সিও হিসাবে যে আসতেছে, সে হচ্ছে ১৪ লং কোর্সের মজিদ যে কিনা কোনো ষ্টাফ কলেজ করে নাই, গানারী ষ্টাফও করে নাই, অন্যদিকে মেডিক্যালী সে ক্যাটেগরী সি। অর্থাৎ আনফিট। এমন একটা অফিসারের প্রোমোশন হয় কিভাবে? সে কথা আরেকদিন বল্বো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *