১০/০৯/২০১৭-পাপ্পু স্যারের মা

Categories

প্রায় ৯৫ বছর বয়সী একজন অতি সাধারন কিন্তু অসামান্য ব্যক্তিত্তের অধিকারীনি বাঙালি মহিলা যিনি প্রতিক্ষনে শুধু ধন্যবাদ নন, সম্মানও প্রাপ্য। গত কয়েকদিন আগে তিনি হতাত করে শরীরের ব্যাল্যান্স ঠিক রাখতে না পেরে তার রুমে পা পিছলে পরে যান এবং মাথায় বেশ বড় ধরনের আঘাত পান। খবর পেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম, তিনি আমার বাসার ঠিক উপরের তালায় থাকেন। ওনাকে দেখলেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। অবিকল আমার মায়ের মতো চেহারা এবং ঠিক সেই রকমের ধৈর্য। অসম্ভব প্রকারের আত্মনির্ভরশীল এবং আদর পরায়ন। কেউ তার জন্য বিরক্ত হোক তিনি তা চান না। ফলে যতোটুকু সম্ভব এই বয়সে নিজের কাজটা, পরিবারের অনেক ছোটখাটো কাজ যা তিনি করতে পারেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করেন। যদিও ওনাকে কেউ কোনো কজ করতে দিতে চান না। বাসার সবাইকে নিয়ে তিনি অনেক ভালো একজন সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেন। এমন কি কাজের মেয়ের প্রতিও তিনি এতোটাই সহানুভুতিশীল যে, কাজের মেয়েও সে এই পরিবারের একজন মুল্যবান সদস্য হিসাবে মনে করে।

তার যোগ্যসন্তান পাপ্পু স্যার। আর আরেক যোগ্য বৌমা, পাপ্পু স্যারের স্ত্রী। মায়ের প্রতি ভালোবাসা কার নাই? কমবেশী সব সন্তানই মাকে ভালোবাসে কোনো শর্ত ছাড়া। আর এই ভালোবাসা দিনে দিনে স্থায়ীই হয় যদি মা তার নীতির মধ্যে তার সন্তানকে লালন করে থাকেন। পাপ্পু স্যার ওই ধরনের একজন সন্তান। যে মা সন্তানকে ভালোবাসেন, সে মা তার সন্তানের সংসারকেও ভালোবাসেন। সে মা তার সন্তানের স্ত্রীকেও ভালোবাসেন, পরের বাড়ির মেয়েকে সন্তানের স্ত্রী হিসাবে এনে নিজের মেয়ের মতো আদর করেন, তাকে তার কোলে মাথা রাখার অধিকার দেন। ছেলেকে মা যদি ভালোবাসেন, সেই মা তার ছেলের বউকেও ভালোবাসার কথা ঠিক তার ছেলেকে যেভাবে তিনি ভালোবাসেন সেইভাবে। ছেলেকে যদি মা ভালোবাসেন, ছেলের সন্তান, ছেলের স্ত্রী, ছেলের প্রতিটি সদস্যকে ভালোবাসেন ঠিক একই রকমভাবে যেভাবে তিনি ভালোবাসেন তার ছেলেকে। আর এখানেই রহস্যটা লুকিয়ে থাকে মা-সন্তানের সংসারের বন্ধনটা। ছেলে যদি একটা নেড়ী কুকুরকেও ভালোবাসে, তাহলে দেখা যাবে, সেই ভালো মা সেই নেড়ি কুকুরটাকে অতি আদরের সাথে যত করছেন। কারন তার ছেলে ওই নেড়ি কুকুরটাকেও ভালোবাসে। এই হলো প্রক্রিত মা। পাপ্পু স্যারের মা ঠিক এই রকমের একজন আদর্শ মা। এর মানে এই নয় যে, ছেলের অলসতাকে তিনি প্রশ্রয় দিয়ে, অথবা তার অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দিয়ে তাকে নৈতিকতার বাইরে লালন করে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন। সেটাকে ভালোবাসা বলে না। পাপ্পু স্যা্রের মা ঠিক দায়িত্তটা তার ছেলের উপর পালন করেছেন বলেই পাপ্পু স্যার আজকে অনেকের কাছেই একজন আদর্শ টিচার এবং ব্যক্তিত্ত। সকালে উঠার অভ্যাস করিয়েছেন, সৃষ্টি কর্তার নাম দিয়ে দিনের কাজ শুরু করার শিক্ষা দিয়েছেন, কোথায় কি কার দায়িত্ব কিভাবে পালন করতে হবে সেই শিক্ষা দিয়েছেন। সময়কে কিভাবে কাজে লাগাইতে হবে তার পুরু দিক্ষা তিনি তার সন্তানকে দিয়েছেন। আদরের পাশাপাশি শাসন করেছেন। অন্ধ ভালোবাসা দিয়ে তার জীবন গড়িয়ে দেন নাই। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনো তাকে আদর্শের কাছে হেরে যেতে দেন নাই।

আমি পাপ্পু স্যারকে দেখেছি, মায়ের জন্য কি পরিমান পাগল। আমি এটাও দেখেছি, পাপ্পু স্যারের স্ত্রীও তার শাসুড়ির জন্য একই পরিমানে পাগল। আমি জানি না তিনি তার নিজের মাকে কতোটা তুষ্ট করেন, কিন্তু শাসুড়ির বেলায় পাপ্পু স্যারের স্ত্রী যতোটা হওয়া দরকার কখনো কখনো তার থেকেও বেশি করেন। তার শাশুড়ি তাকে যতোটা আদর করেন, তার থেকেও বেশী শাসুড়িকে তিনি সম্মানের সহিত লালন করেন। মিস্টি একটা বন্ধন। আর এই বন্ধন তৈরিতে কারিগড় হচ্ছেন পাপ্পু স্যারের মা নিজে। তিনি যেমনটি চেয়েছেন, একটি সুখি পরিবার, তিনি তেমনটি দিতে পেরেছেন বলেই আজ তিনিও তার ফলভোগ করছেন এই ৯৫ বছর বয়সে। এই রকমের একটি সন্তানই যথেষ্ট কোনো মা তার শেষ বয়সে শান্তিতে থাকার জন্য।

আমিও আমার  মায়ের জন্য এমনই পাগল ছিলাম। পৃথিবী একদিকে, আর মা যেনো আরেক দিকে। আমি ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় মাইলের পর মাইল মাকে কোলে করে গ্রামের রাস্তায় মাকে না হাটিয়ে গ্রামে নিয়ে গেছি। আমার মনে হয়েছে, মায়ের কস্ট হবে হেটে যেতে। মাকে কোলে নিয়ে হাটার কারনে আমার কম্বেট ইউনিফর্ম আমার ঘামে ভিজে একাকার হয়ে যেতো আর আমার মা আমার গলা ধরে আমার মুখের দিকে তাকিয়েই থাকতেন। কি জানি কি দেখতো আমার মা আমার মুখে এইভাবে তাকিয়ে থেকে? আমি মাঝে মাঝে মুচকি হেসে বলতাম, মা, কি দেখছো এইভাবে? মনে হতো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোনো জিনিস আমি বইয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমার একটুও ক্লান্তি লাগে নাই। আমার মা যতোদিন বেচে ছিলেন, আমি এমন কোনো রাত কাটাই নাই যেই রাতে মায়ের ঘরে মা কিভাবে আছেন, ঘুমিয়েছেন কিনা, বা মায়ের কিছু লাগবে কিনা তা দেখার জন্য গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠি নাই এবং মায়ের রুমে যাই নাই। যদি দেখতাম, মা কোনো কারনে ঘুমিয়ে নাই, মায়ের পাশে বসেই মায়ের সাথে অনেক কথা বলতাম। মায়ের সেই ছোট বেলার মজার মজার কাহিনি। মায়ের সাথে আমার বাবার প্রেমের কাহিনি। মায়ের সাথে আমাদের গ্রামের কাহিনি। মায়ের সাথে আমাদের পুরু পরিবারের কাহিনি। মা বলতেন, মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি আমাদের পরিবারে এসেছিলেন। কখনো মা তার কাহিনী বলতে বলতে খিল খিল করে হাসতেন, আবার কখনো কখনো কোনো ঘটনা বলতে গিয়ে ঢোকরে ঢোকরে কাদতেন। আমি মায়ের অন্তরটায় পৌঁছে যেতাম সেই ছোট একটা বালকের মতো। মা আমার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে খুব আদর করতেন আর বলতেন, অনেক বড় হবি তুই। আমি তখন সেনাবাহিনীতে মাত্র মেজর। মাকে বলতাম, মা, আমার কেনো জানি মনে হয় আসলেই একদিন আমি অনেক বড় হবো, আমার অনেক টাকা হবে কিন্তু আমি সম্ভবত ওই দিন তোমাকে আর পাবো না। আমার লিমিটেড আয়ের মধ্যে আমি চেষ্টা করেছি মাকে সবচেয়ে ভালো জিনিসটা দিতে। আমি কখনো মনে পড়ে না যে, মাকে ছাড়া অফিস থেকে এসে একা লাঞ্চ করেছি। অনেক অনেক দিন আমি মাকে আমার নিজ হাতে খাইয়ে দিতাম। মা বড্ড মজা করে খেতো আমার হাতে। আজ মা নেই, কিন্তু আমি তার ভালোবাসা আজো অনুভব করি। পাপ্পু স্যারের মাকে দেখে আমার ঠিক সেই রকম একজন মহিয়সীর কথাই বারবার মনে পড়ে। আর পাপ্পু স্যারকেও আমি দোয়া করি তিনি যেনো ঠিক যা করছেন তাই করে যান মায়ের শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত।

পাপ্পু স্যারের স্ত্রীর শাশুড়ির প্রতি ব্যবহার দেখে আমার স্ত্রীর আমার মায়ের প্রতি ব্যবহারের কথাই মনে পড়ে বারবার। আমি যেদিন প্রথম মাকে আমার ভালোবাসার মেয়েটির কথা জানিয়েছিলাম, মা মেয়েটি কেমন, কই থাকে, তার বাবা মা কি করে, তাদের সাংসারিক অবস্থা কি রকম কিছুই জিজ্ঞেস করেন নাই। শুধু একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। কে আগে ভালোবেসেছি। আমি নাকি মেয়েটি। বলেছিলাম, মেয়েটি সম্ভবত। কারন আমিও ভালোবেসেছি কিন্তু প্রথম চিঠিটি এসেছিলো ওর কাছ থেকে। মা আর কিছুই জানতে চান নাই। শুধু বলেছিলেন, সুখি হবি। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিভাবে এতো কনফিডেন্টলি এই কথা মা আমাকে বলতে পারলেন? মা শুধু একটা কথাই বলেছিলেন ব্যখ্যায়, যে তোমাকে ভালোবাসে, সে তোমাকে ছেড়ে যাবে না যদি তুমি না ছেড়ে যাও। সে তোমাকে ভালোবাসে।

অন্যদিকে, আমি আমার এই ছোট্ট জীবনে এমন মাকেও দেখেছি যে, তিনি ছেলেকে ভালোবাসেন, কিন্তু ছেলের বউকে হিংসা করেন, ছেলের সন্তানকে হিংসা করেন, তাদেরকে আদর করে কাছে টানেন না। ভাবেন, পরের বাড়ির মেয়ে, বেশী প্রশ্রয় দিলে যদি মাথায় উঠে যায়? ওইসব মায়েরা ভুলে যান তাদের অতিতের সেই দিনের কথা যেদিন তিনিও তার শশুড় বাড়িতে পরের বাড়ির মেয়ে হয়েই এসেছিলেন। এই সব মায়েরা ছেলে আর তার স্ত্রী, সন্তানের মধ্যে একটা ফারাক সৃষ্টি করে রাখতে পছন্দ করেন। আর শেষ বয়সে এসে এই সব মায়েরাই কোনো না কোনো ভাবে তার আদরের সন্তানদের কাছ থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়েন আর বলেন, তার সন্তানেরা মানুস হয়ে উঠে নাই। 

আবার এমন মাকেও দেখেছি, ছেলেকে তারা মুলধন মনে করে ছেলের বিয়েটাকে একটা ইনভেস্টমেন্ট মনে করেন। মনে করেন যে, পরের বাড়ির মেয়েটা হচ্ছে একটা শিকার, আর নিজের ছেলেটা হচ্ছে একটা শিকারী, আর বিয়েটা হচ্ছে একটা হাতিয়ার। এই সব মায়েরা না জানেন ছেলেদেরকে সপ্ন দেখাতে, না পারেন নিজেরা সপ্ন বুনতে। তারা একটা সময় বালুচরে অট্টালিকা বানানোর দিবা স্বপ্নে দিনশেষে শুধু একটি জিনিসই দেখতে পান, আর তা হলো, উত্থাল ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাওয়া বালুর তট। 

পাপ্পু স্যারকে আমি অনেক অনেক দোয়া করি যেনো এখন যা আছেন, তাই যেনো থাকেন। আর দোয়া করি তার মহিয়সি মাকে যিনি সংসারের লক্ষি বউমাকে পরের বাড়ি থেকে এনে নিজের মেয়ের আসনে বসিয়ে চমৎকার একটি সংসার উপহার দিয়েছেন তার সন্তানকে। এমন মায়ের পায়ের তলেই হচ্ছে আসল স্বর্গ। স্বর্গটা আসলে মরনের পরে নয়। মায়ের পায়ের তলে সন্তানের স্বর্গ শুরু হয় মায়ের জীবদ্দশায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *