১২/০৬/২০২১-রোস্তমের টাকা চুরি-২

আমরা যখন জীবিত অর্থাৎ যখন জীবন আছে আমাদের, তখন আমাদের কাছে জীবন এমনভাবে চলতে থাকে যেনো আমাদের জীবনের সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্কই নাই। কিন্তু যখন মৃত্যু একেবারেই কাছে চলে আসে, তখন এ রকম মনে হয় যেন জীবনের কোনো গুরুত্বই নাই। এক নিমিষে, চোখের পলকে সব শেষ হয়ে যায়। এই মৃত্যু না সময় দেখে আসে, না জায়গা দেখে। যে কোনো সময়ে যে কোনো স্থানে সে চলেই আসে। তখন আশেপাশের সবাইকেই চমকে তো দেয়ই উপরন্ত আশেপাশের সবাইকে নাড়িয়েও দেয়। আর এর রহস্যও কেউ জানতে পারেনা। কিন্তু যখন মৃত্যু নিজে আসে না, তাকে ডেকে আনা হয়, তখন তার সময়, জায়গা এবং কারন এই তিনটাই মানুষ ঠিক করে দেয়। আজ আমি এমনি একটা ট্র্যাজেডির কথা বলবো যা ঘটেছিল রস্তম নামে এক লোকের সাথে।
রুস্তম আমার ড্রাইভার ছিলো। প্রায় বছর পাচ বা তারও বেশী একনাগাড়ে রুস্তম আমার ব্যক্তিগত গাড়ী ড্রাইভিং করতো। তাহলে এখানে রোস্তমের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরি।
রুস্তম ড্রাইভার হিসাবে ততোটা অশিক্ষিত ছিলো না যা সচরাচর ড্রাইভারেরা হয়ে থাকে। পুরানো দিনের সাহিত্যিকদের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস ছিলো তার। একটু আধটু ডায়েরীও নাকি লিখতো। ভাল পল্লীগীতি গাইতে পারতো রোস্তম। গলার সুরও ভালই ছিলো। মাঝে মাঝেই আমি ওকে গারি চালানর সময় রেডিও না শুনে ওর নিজের গলায় গান শুনতাম। বিবাহিত ছিলো বটে কিন্তু মাঝে মাঝে নেশা করার কারনে রোস্তমের প্রথম স্ত্রী তাকে একটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা রেখে লন্ডনে চলে যায়। রোস্তম কখনোই তার স্ত্রীর ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করতো না। সে খুব মিস করতো তার স্ত্রীকে। গাড়ী চালাতে চালাতে রোস্তম প্রায়ই সে তার স্ত্রীর কথা বলতো। বলতে বলতে কখনো সে খিলখিল করে হেসে উঠত, কখনো কখনো খুব উদাসিন হয়ে যেতো আবার কখনো কখনো চুপ থেকে চোখের জলও ফেলতো। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একবার আমি রোস্তমকে দ্বিতীয় বিয়ের তাগিদ দিলে সে আমার কথা মেনে বিয়েও করেছিল। কিন্তু এবার স্ত্রীটাই খারাপ ছিল। বিয়েটা টিকে নাই। রুস্তম খুব বিশ্বস্ত ছিলো। চুরি চামারীর কোন অভ্যাস ছিলো না। তবে মাঝে মাঝেই রোস্তম দরকারে আমার কাছে এমনভাবে টাকা চাইতো যে, আমি কখনো ওকে না করতে পারিনি। দিতাম। রোস্তম ছিলো খুবই বিশ্বস্ত ছিলো। এমনি বিশ্বস্ত ছিলো যে, মাঝে মাঝে এমনো হতো, শুধু ওকে একা গাড়ি পাঠিয়েই আমাদের ফ্যাক্টরী থেকে অন্য ফ্যাক্টরীতে কোটি টাকাও পাঠিয়েছি। আর রুস্তম সেটা জানতো। কখনোই সে এদিক সেদিক করে নাই।
কিন্তু একদিন………
একদিন রুস্তম আমার অন্য আরেকটি ফ্যাক্টরির মাত্র তিন লাখ টাকার শ্রমিকদের সেলারি নিয়ে গাড়ী রেখে কোথায় যেনো উধাও হয়ে গেলো। বিকেল থেকে রাত অবধি কোথাও খুজে না পেয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, রুস্তম তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। ওর মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিলো। টাকাটা চুরি করে রুস্তম পালিয়েছে এই কষ্টে যতোটা না কষ্ট পেয়েছি, তার থেকে বেশী কষ্ট লেগেছে রুস্তমের কাছ থেকে এটা আমি কখনোই আশা করিনি। রুস্তমকে আমি সেলারীর বাইরেও যে কতটাকা দিতাম সেটা আমি কখনো হিসাব করিনি। ওকে আমি দ্বিতীয়বার বিয়ে করার সব খরচপাতিও দিয়েছি;লাম। রুস্তম গাড়ি চালালে আমি নিশ্চিন্তে মনে গাড়িতে ঘুমাতে পারতাম। কারন জানি, রুস্তম যেমন ভালো ড্রাইভার ছিলো তেমনি আমি ঘুমিয়ে পড়েছি দেখে আমার শরির যেনো ঝাকুনি না খায় এবং ঘুম ভেংগে না যায় সেটাও সে নজরে রাখতো।
রুস্তম আমাদের এলাকায় প্রায় ৩০ বছর যাবত বাস করতো। চুরির পরে রুস্তম সেই পুরাতন জায়গায় আর কখনো ফিরে আসেনি। আমি অনেক খুজতাম ওকে, আশেপাশের লোকজন এমনিতেই জেনে গিয়েছিল যে, রস্তম আমার কিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। ফলে আমি জানতাম, কেউ ওকে কোথাও দেখলে খবরটা আমার কাছে আসবেই। কিন্তু সে রকমের কোন খবর আমি আর কখনো পাইনি।
অনেকদিন পর, প্রায় মাস চারেক হবে। হটাত করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে আমার কাছে একটা চিঠি আসে। বেশ বড় একটা চিঠি। প্রায় ২২ পাতার। চিঠিটি খুলেই আমি কে লিখেছে সেটা পরীক্ষা করার জন্য চিঠির শেষে কার নাম লেখা পড়তে গিয়েই আমি থমকে গিয়েছিলাম। রুস্তমের চিঠি। হটাত করে বুকটা আতকে উঠেছিলো। রুস্তমের চেহারাটা আমার চোখের সামনে পরিষ্কার ভেসে উঠলো। মুখ ভর্তি পান, কালো ঠোট, বেটে মানুষ, মাথায় হালকা চুল, মুখে হাসি। এটাই রুস্তম ছিলো। ওর পুরু চিঠিটা এখানে লিখলাম না কিন্তু ওর কিছু চুম্বকঅংশ এই রকম ছিলোঃ (বিশেষ দ্রষ্টব্য যে, রুস্তম বেশ গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারতো, আর যুক্তির কথাও বলতো)।
আমার প্রিয় স্যার,
........................ জীবনে সে সব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলে সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যারা আমাদের সুখের জীবনের জন্য নিঃস্বার্থভাবে তাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলতে গিয়ে কিংবা তাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে কিংবা কোনো লোভে পড়ে নিজের অজান্তে ভুল করে ফেলে, হয়তো সেটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে সেটা হবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যারা আমাকে ভালোবেসে, স্নেহ করে অথবা আমাদের দরিদ্র মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পাশে এমনভাবে দাঁড়ান যা হয়তো তাদের দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়ান। তাদের সাথে আমাদের করা এরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ আমাদের সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হয়ে দাড়ায় যা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করে দেন, তারপরেও বিশ্বাসের যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা আজীবন দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন তাদের প্রতিনিয়ত মনে হবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি আমাদের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, তাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। এই সময় হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে কেউ ঘৃণা করতে শুরু করে, তখন তার আর বেচে থাকার কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের কোনো মানুষকেই আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকে যায়। অথবা সে এমন পথ বেছে নেয়, যা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুৎসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোনো সময়ে তাদের সুযোগ এসেছিলো কিন্তু তারা না বুঝবার কারনে সে সুন্দর জীবন হাতছাড়া করেছে। পাপ কাজ করে কেউ কখনো বড় হতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাদের হয়তো টাকার পাহাড় থাকতে পারে কিন্তু তাদের তিরোধানে সমাজ দুঃখবোধও করে না। তারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বেচে থাকে।
আমার প্রিয় মেজর স্যার,
আমি এই মুহুর্তে ঠিক সে রকম একটা সময় পার করছি। আমি আপনার কাছ থেকে যে তিন লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছিলাম, টাকাগুলি আমার কোনো কাজেই লাগে নাই। মদ খেতে খেতে কখন বেহুস ছিলাম বুঝি নাই, যখন হুস হয়েছে, দেখলাম সবগুলি টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কে নিয়েছে, কখন নিয়েছে সেই জ্ঞানটুকুও আমার ছিলো না।
(রোস্তমের চিঠির ১৩ তম পাতার কিছু অংশ)............
জীবনকে ভালোবাসবার অনেক নাম আছে। কখনো এর নাম চেলেঞ্জ, কখনো এর নাম সততা আবার কখনো এর নাম বিশ্বাস। স্যার, সব হাসিই হাসি নয়। যেদিন আমি টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলাম, সেদিন আমি হেসেছিলাম আনন্দে। অথচ আজ আমি কাদতেছি কেনো আমি টাকাটা নিয়ে পালালাম। আসলে আমার এই কান্না কান্না নয়। এই কান্নার নাম হয়তো ভয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমে যায়, একসময় দেহ মন দুটুই ভেংগে যায়। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না। খুব কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে স্যার আমি চলে যাচ্ছি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এর গাছ পালা, আকাশ, নদী, পাহাড় সব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন স্যার আপনি। আমি আপনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসবো। খুব বাচতে ইচ্ছে করছিলো স্যার কিন্তু যারা সাহসী নয়, তাদের বেচে থাকবার কোনো প্রয়োজন নাই এই পৃথিবীতে। আমি আসতে চেয়েছিলাম আবার আপনার কাছে কিন্তু সম্ভব হলো না। যদি কখনো পারেন- আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যে তিন লাখ টাকায় আমার এতো হিসাব ছিলো, জীবন সুখের হবে, নিজের গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে, সেই তিন লাখ টাকাই আসলে আমার জীবন একেবারে পালটে দিলো। আপনার সাথে আমার জীবনটা তো ভালোই ছিলো। বিশ্বাস করেন স্যার, আজ ঠিক মৃত্যুর আগ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিষ শিখে গেলাম, জীবনে সব মানুষের সাথে ছল চাতুড়ি করতে হয় না, এই দুনিয়ায় টাকাই সব নয়। আপনার মতো এমন একটা মানুষের পাশে শুধু থাকলেই হতো। বট বৃক্ষের মতো ছিলেন।
৯১৬ তম পাতার কিছু অংশ...............)
আমি আপনার থেকে এখন অনেক দূরে। পরিচিতজন মানুষের আশেপাশেও আমি নাই। ড্রাইভিং চাকুরী করতে পারতাম, কিন্তু করতে সাহস করি নাই। কখন আবার আমি আপনার সামনে পড়ে যাই, তাই। প্রতিটা ক্ষন আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছি। কখনো ক্ষুধা পেটে কোনো এক পরিত্যাক্ত বিল্ডিং এর মশাদের সাথে, কখনো কোনো গাজার আসরে, কখনো একেবারে একা কোনো এক নদীর ধারে সময় কাটিয়েছি। এমন কোনো একটা মুহুর্ত আমার যায়নি, যখন আপনার কথা আমার মনে পড়ে নাই। বারবার ভেবেছি- কি দরকার ছিলো এমনটা করার? যখন যা চেয়েছি, আপনার কাছ থেকে আমি পাইনি এমন ছিলো না। তারপরেও আমার এমনটা করার কোনো দরকার ছিলো না। খুব বেকুফ মনে হয়েছে আমাকে।
চিঠিটা পড়তে পড়তে আমারো খুব খারাপ লাগছিলো। রোস্তমের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছিলো। আমি আসলে রোস্তমকে খুব স্নেহই করতাম। যাই হোক, অনেক বড় চিঠি। সব কিছু এখানে হয়তো লিখা সম্ভব নয়। ১৯ পাতার কিছু অংশে এসে আমি একদম নিসচুপ হয়ে গেলাম। রুস্তম লিখেছে-
আমার স্যার, এ কয়দিন বারবার শুধু একটা কথাই আমার মনে হয়েছে। যখন আপনি গাড়িতে উঠতেন, প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, আমি খেয়েছি কিনা। আজ অবধি কেউ আমাকে এ কথাটা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। আজ প্রায় ৩ দিনের উপরে পার হয়ে গেছে, আমি একটি দানাও খাই নাই। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোসলের কোনো জায়গা নাই, এলোমেলো মাথার চুল, নোংরা আমার জামা। আমার সাথে রাস্তার পাগলের মধ্যে কোনো তফাত নাই। যখন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিতাম, বলতেন-বাসায় গিয়ে রেষ্ট করো, সকালে নাস্তা খেয়ে চলে এসো। আজ আমাকে কেউ বলে না-সকালে চলে এসো। অথচ মনের ভিতরে অদম্য ইচ্ছা, যদি আবার আপনার কাছে চলে আসতে পারতাম? কোথাও আমার কেউ নাই। সম্ভবত আপ্নিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসতাম, আবদার করতাম, জিদ করতাম কিন্তু খুব পছন্দও করতাম। আপনার মেয়েরাও আমাকে খুব সম্মান করতো। কখনো ওরা আমাকে ড্রাইভার হিসাবে দেখে নাই। কি লক্ষী মেয়েগুলি। আংকেল ছাড়া কখনো ডাকতো না। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে- ইশ, যদি আবার ফিরে আসতে পারতাম!! কিন্তু আমার মনের সাহস নাই, শরীরে বল নাই, আর আপনার সামনে দাড়াবার আমার কোনো জায়গাও নাই। এ কয়দিন মাথায় শুধু একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে-কি লাভ এ জীবন রেখে? কিন্তু মরার জন্যেও কিছু উপকরন লাগে। ফাসি দিতে হলে দড়ি লাগে, বিষপান করে মরতে হলে বিষ কিনতে হয়, কিন্তু আমার কাছে বিষ কেনারও পয়সা নাই। আর সাতার জানা মানুষ নদীতে ঝাপ দিলেও মরে না। কিন্তু আমি জানি, আপনার সাথে আমার আর কখনো দেখা হবে না। আমার জিবনে সত্যি বলতে আপনি ছাড়া আর কেউ ছিলো না। আপনি গাড়িতে ঘুমালে আমি আয়নায় দেখতাম, কি অসম্ভব একটা রাগী মানুষ কত নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ঘুমুচ্ছেন, খুব মায়া হতো আমার। আমার উপরে ভরষা করে আপনি ঘুমুচ্ছেন ভেবে আপনার ঘুম ভেংগে যাবে এই ভয়ে আমি গাড়ির স্পীডকে রিক্সার পিছনেও চালিয়ে নিতাম। আমি আপনাকে অনেক মায়া করি, ভালবাসি। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিয়েন।
ইতি- আপনার স্নেহের অপরাধি রোস্তম।
চিঠিটা পাওয়ার পর আমি রোস্তমের ব্যাপারে তারই এক আত্তীয়ের কাছে (যিনি ভাড়া থাকেন আমার মহল্লায়) জানতে পেরেছি যে, রোস্তম পথের ধারে কাটা তারের বেড়া থেকে তার কেটে গলায় পেচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মৃত্যুর তারিখটা জেনে আরো খারাপ লেগেছিলো। রস্তম তার মৃত্যুর চারদিন আগে সে আমাকে এই চিঠিটা পোষ্ট করেছিল।
খবরটা শুনে মনের ভিতরে অসম্ভব ব্যথা অনুভুত হয়েছিলো। খুব করে ভাবলাম, ইশ যদি রোস্তম একবার সাহস করে আবার আমার সামনে আসতো, ইশ যদি রোস্তমকে আমি আবারো খুজে পেতাম, আমি আবার ওকে আমার ড্রাইভার হিসাবেই রাখতাম। রোস্তম আমার বাসা চিনতো, আমার অফিস চিনতো, সে আমাকেও চিনতো। অথচ মনের ভিতরের সাহসটাকে সে একত্রিত করে আমার সামনে আসার মনোবলটা ছিলো না। আমি আজো মাঝে মাঝে রোস্তমের কথা ভাবি। আর ভাবি, কতটা যন্ত্রনা নিয়ে রোস্তম কাটাতার পেছিয়ে আত্মহত্যা করেছে, আর কতোটা যন্ত্রনায় সে মারা গেছে। খুব ভাবি যে, কাটাতারে যখন রোস্তম মারা যাচ্ছিল, তখন কি সে আবারো বাচতে চেয়েছিল?
সম্ভবত, বাচতে চেয়েছিল কিন্তু তখন মৃত্যু তার এতোটাই কাছে ডেকে আনা হয়েছে যে, তার আর ফিরে যাবে কোন অবকাশ ছিলো না। রস্তমকে নিয়েই যমদূত এই দুনিয়া থেকে চলে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *