১২/০৮/২০১৬-কেনো জেনারেশ গ্যাপ হচ্ছে?

Categories

 

জেনারেশন গ্যাপ কেনো হচ্ছে এটা জানতে পারলে আমাদের সমাজের সব শ্রেনির বাবা মায়েরা অন্তত তাদের কি করা উচিত সে ব্যাপারে একটু সচেতন হতে পারতেন। আমরা যারা বারবার বলছি যে, পরিবারে সচেতনাতা বাড়াতে হবে, সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনাতা বাড়াতে হবে, তাহলে সেই কিসের উপর সচেতনতা বাড়াতে হবে জানা দরকার, তাহলেই সচেতনতাটা বাড়বে। চলুন দেখি তাহলে জেনারেশন গ্যাপ কি কি কারনে হচ্ছে সেটা আগে খুজে বের করি। তারপর এর বিপরিতে আমাদের কি করা উচিত, সেটা বের করা যাবে, হোক সেটা পরিবারের জন্য, হোক সেটা সামাজিকভাবে আর হোক সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে। সেই কার্যপ্রণালী বের করা কঠিন হবে না।

প্রকৃতপক্ষে মোদ্দা কথায় যদি বলি, তাহলে ব্যাপারটা আর কিছুই না, মানুষের পৃথক পৃথক ইন্টারেস্টের কারনে, তাদের নিজস্ব ভ্যালু বিশ্লেষণের কারনে, বয়সের তারতম্য, বাকস্বাধীনতা, মুক্তচিন্তার প্রসার, লাইফ স্টাইল, এস্পিরেসন, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাব্যবস্থা, সাইকোলোজিক্যাল ডেভেলপম্যান্ট, ফিজিক্যাল পরিবর্তন, ইত্যাদি সবের কারনেই এই জেনারেশন গ্যাপটা তৈরি হয়। আর এইটা একদিনে বা এক সপ্তাহে বা এক মাসের মধ্যেই ঘটে না। এটা ঘটে ধিরে ধিরে, সামস্টিকভাবে, লম্বা সময় ধরে।

ব্যাপারটা আরো সহজ করে যদি বলি, যেমন ধরুন, ৪০ কিংবা ৬০ এর দশকে এমন কি ৭০ কিংবা ৮০ এর দশকেও শিক্ষা ব্যবস্থাটা এমন ছিলো যেখানে চরিত্র গঠন, ডিসিপ্লিন এবং ইউনিফর্মিটি ছিল মুখ্য বিষয়। মুখস্থবিদ্যা দিয়ে অনেকে না বুঝেই অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছেন। তাদের নিজস্ব চিন্তাধারা বিকশিত হতে হতে ইতিমধ্যে তারা একটা এডাল্ট মানুসের রূপ নিয়ে নিয়েছেন। যে সময়টায় এখন ইয়াং জেনারেশন বিপথগামিতে হাটছেন, ওই সময় তারা এই কঠিন ডিসিপ্লিন, নিয়মানুবর্তিতার কারনে সময়টাই পার করে দিয়েছেন। কিন্তু আজকাল শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র গঠনের কিংবা ডিসিপ্লিন তথা ইউনিফর্মিটির ব্যাপারটা আর মুখ্য নাই। এখানে মুক্তচিন্তা ধারায় এক ধরনের বিশ্লেষণধর্মী স্বাধীনতা এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আদলে সে নিজে যা সেন্সিব্যাল মনে করে সেটাই শেষ কথা। ফলে সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে আগের যুগের মানুষের থেকে বর্তমান যুগের ইয়াং জেনারেশনের কাছে মেথডটাই আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ইয়াং জেনারেশনের ভিসন আর ওল্ড জেনারেশনের ওই একই বয়সের তুলনায় ভিসনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বনে যাচ্ছে। এটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ত্রুটি বলতে হবে। এই ব্যাপারে হয়ত আমরা রাষ্ট্রীয় সচেতনতার কথা মাথায় আনবো পরবর্তী পর্বে।

আরেক দিক দিয়ে বলি, ধরুন, ওয়ার্ক প্যাটার্নে ওল্ডার জেনারেশন তাদের সময়ে জব সল্পতার কারনেই হোক আর কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই হোক, তাদের জবটাকে আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন এবং সততার সহিত দিনের পর দিন অফিস সমুহের যাবতীয় আইনকানুন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও মেনে শেষতক চালিয়ে গেছেন যা আজকালকের ইয়াং জেনারেশন এটার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। ফলে আইনের বাধায় তারা খুব একটা বিদ্ধ হতে চায় না। তারা স্বাধীন, ইচ্ছে হলো কাজ করবেন, ভালো লাগলো তো থাকবেন, আর পছন্দ হয় নাই, কিচ্ছু যায় আসে না, পরের দিনই জব ছেড়ে দিলেন। এই যে একটা খামখেয়ালীপনার মতো স্বাধীনতা, একটা ছিঁড়া ছিঁড়া ভাব, তাতে অনেক কিছুই আর সংঘবদ্ধ থাকে না। না কর্মক্ষেত্রে না বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে না পারিবারিক দায়িত্ববোধে। ধিরে ধিরে এই কোহেসিভনেসটা কমতে থাকে। বন্ধন কমতে থাকে। এর মধ্যে আবার যোগ হয়েছে হাই-টেক। এই হাই-টেকের জন্য ইন্টার-পারসোন্যাল রিলেসনটা হিউম্যান এলিম্যান্ট থেকে আরো দূরে চলে গেছে। এতে বড়দের সাথে গ্যাপটা আরো বেশি বেড়েছে। পরামর্শের জায়গাটা কিংবা মতাদর্শের আদান-প্রদান গুলি আস্তে আস্তে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এই সচেতনতার বিরুদ্ধে হয়ত আমরা পরবর্তীতে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে সচেতনতার কথা বলবো।

আরেকটা বিষয় না বললেই না। আর সেটা হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়ার মাধ্যমে যদিও আজকালকের ইয়াং জেনারেশনকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়ে মার্কেটে কম্পিটিটিভ করে তুলছে কিন্তু অন্যদিকে তাকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে আনপ্লিজেন্টও করে তুলছে। ইয়াং জেনারেশন সবাইকে এই মিডিয়া এক কাতারে নিয়ে এসে প্যারেন্টাল গাইডেন্সের থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়ে একই সমসাময়িক বয়সের গাইডেন্সে আবেশিত করে দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। ফলে ট্র্যাডিশনাল ভ্যালুগুলু থেকে ইয়াং জেনারেশন গ্লোবাল হাইপোথিসিসে বা কন্সেপ্টে বেশি করে ঝুকে পড়ছে। আর যখনই ইয়ং জেনারেশন তাদের ট্র্যাডিশনাল ভ্যালুগুলু থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখনই হচ্ছে বেশি করে বিপত্তি। কালচার, সামাজিক আস্থা, পারিবারিক অবস্থান, নিজস্ব ক্যাপাবিলিটি ইত্যাদির উপর তার তখন নিয়ন্ত্রণ লোপ পেতে থাকে। আর এই লোপ ধিরে ধিরে তাকে তার অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরিয়ে প্রতিনিয়ত বিপথগামি অথবা অবাস্তব একটা কোহেলিকার দিকে ঠেলে দেয় যা সে নিজেও বুঝে না।

এর মধ্যে যোগ হয় আবার পরিবারের ইরেসনাল এক্সপেকটেশন। আর এই ইরেসনাল পারিবারিক এক্সপেক্টেসনটা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে জেনারেশন গ্যাপের বেলায়। আর এটা শুরু হয় একেবারে ছোট বয়স থেকেই। যেমন ধরুন, পিতামাতার স্বপ্নের চাহিদা তারা তাদের সন্তানের ইচ্ছা বা খুশির বিনিময়ে হলেও তা তাদের উপর চাপিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেন না। সন্তানের চাহিদার থেকে অভিভাবকের চাহিদা পুরুন করতেই ইয়াং জেনারেশনের জীবন হিমসিম খেতে হচ্ছে। তার ইচ্ছা থাকুক আর নাই বা থাকুক, সে পারুক আর নাই বা পারুক। তার ভাল লাগুক আর নাই বা ভালো লাগুক। সন্তান আর্ট করতে ভালবাসেন, তাকে ডাক্তারি পড়তেই হবে, সন্তান গান শিখতে ভালোবাসেন, তাকে জিওগ্রাফী নিয়ে পড়তেই হবে। পিতামাতারা ভুলেই যান যে, তাদের সন্তানের একটা এস্পিরেসন আছে, তার একটা ভাল লাগার ব্যাপার আছে কিংবা তার নিজস্ব একটা পরিমন্ডল আছে। আর যখনই কোন ইয়াং জেনারেশন তাদের ইচ্ছার এই প্রতিফলনের জন্য বেকে বসবে, তখনই শুরু হবে দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা অলিখিত কনফ্লিক্ট। গ্যাপ তো তখনই সৃষ্টি হয়ে গেলো। এই গ্যাপ থেকে তৈরি হয় আরো গ্যাপের। যেমন, পিতামাতা মনে করেন যে, তারা এই বয়সে তাদের বাবা মায়ের সঙ্গে কিভাবে আচরন করেছেন তার তুলনা, তারা এই বয়সে ঐ সময়ে কি ধরনের কাপড় পরিধান করেছেন তার তুলনা, তারা কি কি স্বাধীনতা পেয়েছেন তার একটা খতিয়ান, কিংবা সপ্তাহান্তে বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে যেয়ে রাত্রি যাপনের অনুমতি দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে তুলনা, এমন কি কি ধরনের হেয়ার কাট নিতেন আমাদের ওল্ডার জেনারেশন ইত্যাদি যখন পিতামাতা দিতে শুরু করেন, তখন এই দুই জেনারেশন এমন একটা অবস্থায় দাড়ায় যে, মনে হয় একে অপরের বিপরিতে অবস্থান নিয়েছেন, মনে হয় তারা একে অপরের ভাষাই বুঝতে পারছেন না। ফলে পরিবারে সমঝোতা নষ্ট হচ্ছে, শান্তি নষ্ট হচ্ছে আর বেড়ে চলছে একে অপরের থেকে দুরত্ত।

সামাজিক ক্লাস বিভক্তিও কিন্তু ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে গ্যাপ তৈরির একটা ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। একটা সময় ছিলো যে, আমাদের দেশে বিখ্যাত গায়িকা রুনা লায়লা আর সাবিনা ইয়াসমিন কখনো একসঙ্গে এক স্টেজে গান করতেন না। কারন কে কার থেকে বড় সেটা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে? ঠিক এমনিভাবে, নিম্নক্লাসের বা গরিব মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঙ্গে উচ্চবিত্ত ক্লাসের সঙ্গে একটা ক্ল্যাশ সবসময়ই ছিলো। কিন্তু ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে এই ক্লাসভিত্তিক শ্রেনিবিন্যাশ এর প্রবনতাটা অনেকটাই কম। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একজন ছাত্র যদি ভাল ফলাফল করে বা একজন ভাল গীটার বাজাতে পারে তাকে গানের দলের মধ্যে নেওয়ার মধ্যে কোণ দ্বিধাবোধ করে না। কারন ওল্ডার জেনারেশনের মতো ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে এই নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত সংস্কারে তাদেরকে কোন নেগেটিভ অনুভুতির খোরাক জোগায় না। এই জায়গাটা থেকে ওল্ডার জেনারেশন এখনো সরে আসতে পারে নাই। ফলে ছেলেমেয়ের প্রেম ঘটিত এফেয়ারস নিয়ে, বন্ধুত্ত তৈরি করতে গিয়ে কিংবা একই টেবিলে তাদের সঙ্গে খাবার খাওয়া নিয়ে পরিবারে ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে তার ওল্ডার জেনারেশনের মধ্যে একটা অলিখিত কনফ্লিক্ট তো বাধতেই পারে আর বাধেও।

এই রকম হাজারো হাজারো উদাহরণ টানা যাবে যেখানে খুব সুক্ষ কিন্তু গ্যাপ তৈরির জন্য ঐগুলু যথেষ্ট ভুমিকা রাখে। ধরলাম যে, এই গ্যাপগুলু দুই জেনারেশনের মধ্যে তৈরি হলো। তাতে কি হয়েছে? দেশ নষ্ট হয়ে যাবে? পরিবার নষ্ট হয়ে যাবে? কিংবা সমাজ? কি হবে যদি দুই জেনারেশন আলাদা আলাদা বাস করে? কেউ তো কাউকে ডিস্টার্ব করছে না। তাহলে কি দরকার দুই জেনারেশনের মধ্যে জোর করে আবার মিল করার? ওল্ডার জেনারেসন মরে গেলে তো আর কোনো কনফ্লিক্ট থাকে না। তখন তো শুধু ইয়াং জেনারেশনই থাকলো। তাহলে এতো কথা কেনো?

আছে, কথা আছে। কারন এই গ্যাপের কারনে কি কি ইমপ্যাক্ট হয় তাতো সার্বজনীন। সুদূরপ্রসারী। আর ওখানেই তো সব বিপত্তি। চলুন, আমরা সবাই এই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট গুলু ধিরে ধিরে বের করি। সবাই কন্ট্রিবিউট করি আমাদের প্রয়োজনে। আমরা এই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট গুলি বের করতে পারলেই আমরা সহজে বের করতে পারবো আমাদের কোথায় কোথায় সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং কাকে কাকে এই কাজে অংশ গ্রহন আবশ্যক।

 ……… (চলবে পরবর্তী ইমপ্যাক্ট অনুসন্ধানে, আপনিও কন্ট্রিবিউট করুন মতামত দিয়ে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *