১২/১১/২০১৪- লুতফর আমার বন্ধু

বৃহস্পতিবার, গোলারটেক, মিরপুর

গত তিন চার দিন আগে আমার ক্যাডেট কলেজের এক বন্ধুর জন্মদিন ছিল। ওর নাম লুতফর রহমান। আজকাল মেইল থাকার কারনে কেউ আর জন্মদিনের কার্ড পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানায় না, মেইল বা এসএমএস দিয়েই কাজটা শেষ করে ফেলে। অত্যাধুনিক সিস্টেম। কুলজাত দুটুই রক্ষা হয়। কুলজাত দুটুই রক্ষা হলেও বন্ধুত্তের মাঝে এই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে আগের মত আর আবেগের স্থানটুকু থাকে না। কেউ ফিরতি একই ম্যাসেজ দিয়ে দায়িত্তটা পালন করে বড় একখান থ্যাংস জানিয়ে এমন একটা ভাব প্রকাশ করে যেন না জানি কত খুশি হয়েছি। যাক সে কথা, যুগ পাল্টেছে, যুগ আরও পাল্টাবে, ভবিষ্যতে আরও কি হবে তা আর গবেষণার প্রয়োজন বোধ করি না আমার এই লিখার ভিতরে। কিন্তু লুতফরের জন্মদিনে ওকে মেইল করলেও ও আর এগুলোর ধার ধারে না। ও মেইল খুলে না, মেইল পাঠায় না, মেইল পরেও না। ও আর জন্মদিনই পালন করে না। ও পালন করে মৃত্যু দিন। ও হয়ত তাও করে না।

বিডিয়ারের সেই ভয়াবহ এক নৃশংস হত্যাকান্ডে ওর মধ্যবয়সী জীবনটা বলি দিতে হয়েছে। সেদিন ছিল ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখ ২০০৯ সাল। আমি যথারীতি অন্যান্য দিনের মত মাত্র ফ্যাক্টরিতে এসেছি। অন্যান্য দিনের মত আমার পিওন এক কাপ ব্ল্যাক কফি দিয়ে বলল, “স্যার, আজকে কি আপনার মেহমান দুপুরে খাবে নাকি সন্ধ্যায় নাস্তা খাবে, কোনটা?” আমি কিছুটা কনফার্ম না করেই বললাম, “দুটুই মাথায় রাখ”  আসলে মেজর হায়দার আমার এখানে আসবে, আজ ওদের দরবার আছে, দরবার শেষ করেই হয়ত আমার এখানে আসার কথা। 

সকাল নয়টার দিকে আমার আরেক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানতে চাইল পিলখানায় বিডিআর হেডকোয়ার্টসের ভিতর কিছু হচ্ছে নাকি? ব্যাপারটা আমারও জানা ছিল না। আমি জেনে জানাচ্ছি বলে ফোন কেটে দিয়ে অনেককেই ফোন করলাম। কিন্তু কারো কোন ফোনের মধ্যে ঢোকতে পারছিলাম না। লুতফরকে ফোন করলাম, আবতাবকে ফোন করলাম, না পেয়ে ১৯ লং কোর্সের মেজর হায়দারকেই ফোন করলাম, কারো ফোনই খোলা নাই। একটু অবাক হচ্ছিলা, আবার একটু শঙ্কিতও হচ্ছিলাম। কাউকে না পেয়ে আবার আমি আমার ঐ বন্ধুকেই ফোন করলাম যে একটু আগে আমাকে ফোন করেছিল। ওকেই জিগ্যেস করলাম, আসলে কি শুনেছে ও। ও যা বলল, তাতে আমার একটুও ভাল লাগলো না বরং একটা সাংঘাতিক শঙ্কায় পরে গেলাম। বিডিআর পিলখানায় নাকি সৈনিক আর অফিসারদের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। একি কথা!! কি করে সম্ভব এটা? মাঝে মাঝে যে কি হয় মানুষগুলোর, কি কারনে যে হটাত করে সব ভেঙ্গেচুরে তছনছ করে একে অপরের উপর এমন আচরন করে যে, গতকাল যে মানুষটির সঙ্গে এক সাথে চা খাওয়া হয়েছিল, যার সঙ্গে এক বিছানায় বসে গল্প করা হয়েছিল, যে তাঁর নিজের সুখের বা দুঃখের কতই না কথা একে অপরের কাছে অকপটে ভাগীদার করেছিল, সে আজ কেন বা কি কারনে একেবারে অচেনা হয়ে হিংস্র বাঘের মত, উম্মাদ সিংহির ন্যায় উম্মত্ত আচরনে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়ে একে অপরের প্রান নিতেও অনুশচনা করছে না। মানুষ এমনি এক প্রানি যার পাশে একটা মাত্র “অ” যোগ করলেই তাঁর আমুল সব চরিত্র বদল হয়ে যায়। সে আর মানুষ থাকে না, হয়ে উঠে “অমানুষ” যার সংজ্ঞা প্রানিকুলের কারো কাছেই নাই।

বিডিআর এর হেডকোয়ার্টার এর ভিতর সৈনিক বনাম অফিসারের মধ্যে প্রানঘাতি সংঘাত হচ্ছে বলে টিভির স্ক্রলে দেখাচ্ছে কিন্তু কি হচ্ছে, কার কি অবস্থা, তাঁর কেউ সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারছে না। সবাই তো স্বসস্ত্র, সবাই তো ট্রেনিংপ্রাপ্ত। আমার খুব টেন্সন হতে লাগলো। এই তো গত ২৩ তারিখে আমি বিডিআর এর ভিতরে গিয়েছিলাম। দেখা হয়েছে লুতফরের সঙ্গে। ওর অফিসে চা খেলাম, গল্প করলাম। আমি গরম গরম পুড়ি পছন্দ করি, তাই কোথা থেকে যে ঐ অবেলায় পুড়ি নিয়ে এলো, ভাবাই যায় না। লুতফরের ভবিষ্যতের কত প্ল্যান শুনলাম। সঙ্গে মেজর হায়দার ছিল। এই ছেলেটি কখনো আমাকে স্যার বলত না। বলত “বড়দা”। এক সঙ্গে ৭ ফিল্ড রেজিমেন্টে কাজ করেছি প্রায় দুই বছরের বেশি। সাভারে থাকাকালীন আমি ৬ ফিল্ডে আর হায়দার ১৫ ফিল্ডে। সিনিয়রদের সঙ্গে ন্যায় অন্যায় নিয়ে তর্কের কোন শেষ ছিল না তাঁর। কিন্তু জুনিয়রদের বেলায় ঠিক আমার মতই উদার, সেই উদারতার কোন শেষ লিমিট ছিল বলে আমার জানা ছিল না। গল্পের টেবিলে হায়দার আমাকে বলল, “বড়দা, এই পাসিং আউট প্যারেড শেষ হলেই আমার চাকুরির জীবন ইতি করবো, অফিসে আমার জন্য একখান চেয়ার রাখবেন।” আমি এই ছেলেটাকে যা বলতাম, কোন প্রশ্ন ছাড়া, কোন তর্ক ছাড়া, কোন লজিক ছাড়া মানতে কখনো দিধাবোধ করত না। আমার বড় প্রিয় একজন অফিসার ছিল এই হায়দার। আমাদের আর্ট টিচার শুজা হায়দার স্যারের ছেলে।

সারাদিন খুব টেনশনে থাকছি আর ক্ষনেক্ষনে এখানে সেখানে ফোন করছি জানার জন্য কোথায় কি হচ্ছে। শুনলাম, বিডিআর এর ভিতর সৈনিকেরা অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। অনেক অফিসারদেরকে নাকি জিম্মি করে তাঁদের পরিবারের উপর নির্যাতন করছে। কোন কিছুই ভাল লাগছিল না। দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ পেলাম। মেজর হায়দারের ফোন থেকে। ”স্যার, মাফ কইরা দিয়েন”। আমার সারা শরীর একটা কাপুনি দিয়ে উঠল। আমি যেন কিছুই পরতে পারলাম না। কি লিখেছে হায়দার? ও কি বলতে চেয়েছে? আমি ফোনব্যাক করলাম। কোন রিস্পন্স পেলাম না, ফোনটা বন্ধ আবারও। বড় অসহায় মনে হল আমাকে। কোথায় যেন একটা ভীষণ ব্যাথা অনুভব করছি। কাকে বলব? কি বলব? কেউ তো কিছুই বলতে পারছে না। এই টেনশনের মধ্যেই আমি আমার অফিসিয়াল কাজের জন্য সেই গাজীপুর আছি। প্রায় রাত হতে যাচ্ছে। কোন খবর পাচ্ছি না।

হায়দারের প্রসংগটা পরে আসি। যা বলছিলাম তা হচ্ছে লুতফরের জন্মদিনের মেইল। আমার এক বন্ধু তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে একটা মেইল করেছে, “লুতফর, আমি জানি তুমি ভাল আছ, ঈশ্বরের কাছে আছ, তারপরেও আজ তোমার এই জন্মদিনে তোমাকে জানাই একরাশ শুভেচ্ছা। ভাল থেক। আমরা সবাই ভাল আছি।” লুতফর আদৌ এই মেইলটা পরার আর কোন সুযোগ বা অবকাশ আছে কিনা আমার জানা নাই তবে ওর জন্মদিনে আমারও খুব ওকে শুভেচ্ছা জানাতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু সেটা হবে নিতান্তই একটা লেখা, ও ওটা পরার কোন অবকাশ আর নাই।

জীবন যখন বিদ্রোহি মৃত্যুর কাছে পরাজয় বরন করে, তখন স্বপ্ন গুলি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠে না। তাদের কবর রচিত হয় সেই অপ মৃত্যুর সাথে যা কেউ কখনো ভাবে নাই, বা কোনো হোমওয়ার্কও করে নাই। আমরা সবসময় হোম ওয়ার্ক ছাড়াই দিন শুরু করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *