১৩/০৫/১৯৮৬ “বড় বাড়ীর বউ”

আটিলারি  সেন্টার এবং স্কুল, হালিশহর, চট্টগ্রাম। 

গত ১০ তারিখে হালিশহর এসেছি। হালিশহরে এটাই আমার প্রথম আসা নয়। বি এম এ থেকে যেদিন আমাদের পোষ্টিং অর্ডার শুনিয়েছিলো, তার কয়েকদিন পরেই এই আর্টিলারী সেন্টার এন্ড স্কুল আমাদেরকে একটা সম্ভর্ধনা দিয়েছিলো। তখনো একটা বেসিক কোর্ষ চলছিলো যেখানে আমাদের ৪ মর্টার রেজিমেন্টের ২লেঃ নিজাম স্যার, লেঃ রাজ্জাক স্যার আর লেঃ আমিন স্যার বেসিক কোর্ষ করছিলেন। ইউনিটে গিয়ে আমি এই সব অফিসারগুলিকে পেয়েছিলাম।

আজ প্রায় ৩ দিন পার হয়ে গেলো এসেছি। প্রচণ্ড ব্যস্ততা গেলো এই কয়দিন। অরিয়েন্টেশন ক্লাশ, বিকালে বৈ পত্র ইস্যু করা, আর্টিলারীর কিছু বেসিক মাল্পত্র ইস্যু করা, হাতিয়ার ইস্যু করা, ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে দিন আর রাত কখনো সময় করে উঠতে পারছিলাম না ডায়েরী লিখতে। আজ লিখতে বসলাম।

এবার ঢাকায় গিয়ে একটা মজার ঘটনা হল। যশোর থেকে ছুটি পেয়ে বদি ভাইয়ের বাসায় থাকাকালীন, গত ৭ মে ১৯৮৬, পাশের বাড়ির একটা মেয়ের সংগে আমার পরিচয় হল। তার নাম আসমা। মেয়েটিকে আমি কখনো দেখেছি কিনা মনে পরে না। মেয়েদের নিয়ে আমি আসলে খুব একটা ভাবিও না। আমি এ ব্যাপারে খুব বেশি উদাসিন। গানই গাইতে পারি না আবার মেয়ে মানুষ নিয়ে প্রেম। যাকগে সে সব কথা। মেয়েটি যখন এসেছেই তাঁর সাথে কিছুটা সময় আমি কাটাতেই পারি। আমি তো আর রবিন্দ্রানাথ নই যে তারে নিয়া আমি শেষের কবিতা লিখব। আচ্ছা, রবিন্দ্রানাথ কি কখনো “শেষের কবিতা”র মতো কোন “শুরুর কবিতা”ও কি লিখেছেন? মনে হয় না। এর কোন  কারন আছে নাকি?  

যাই হোক, মেয়েটি আমার বদি ভাইয়ের বউ এর সাথে বেশ নিবিড় ভাবে বেশ কথা বলছে। বুঝলাম, যে মেয়েটি ভাবীর বাসায় নতুন নয়। মেয়েটি ভাবীর সংগে খুব মজা করে চাল বাচছে আর ভাবী সবজি কাটছে। ভাবীর সংগে আমার সম্পর্কটা অনেকটা আদর্শ দেবর- ভাবীর মতই।  সুতরাং আমার খুব একটা বেগ পেতে হল না ওদের  সংগে আড্ডা দেওয়া।

আমি ওদের আসরে গিয়ে বসলাম, ভাবী কোন কারন ছাড়াই একটু মুচকি হাসলেন। ভাবখানা এমন যে প্রেম করতেই যেন আমি ওখানে বসেছি। মেয়ে মানুষ, হাসতেই পারেন, এই গুনটা বিধাতা মেয়ে মানুষকে দিয়ে খুব রহস্যময়ি করে রেখেছেন। অবশ্য ওরা নাকি অকারনেও হাসে, আবার অকারনেও কাঁদে। কোন মেয়ে মানুষ যদি এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে আমার জেলও হতে পারে। আচ্ছা, মেয়েরা কারনে অকারনে কেন হাসে আবার কেন কাঁদে? কিন্তু আমি তো ভাবীকে কখন কাঁদতে দেখিনি। হতে পারে ওনি কাঁদতে শিখেন নি।  আর কাঁদলেও হয়ত কারো সামনে তিনি কখন কাদতে চাননি।  ভাবী তখনো মুচকি মুচকি হাসছেন। হটাত আমাকে বল্লেন, আখতার তুমি তো হাত দেখতে জানো, তাই না? দেখতো ওর হাতে কি লেখা আছে? এখানে বলা ভাল যে এই বয়সে আমার ধারনা সবাই একটু একটু  হাত দেখতে জানে, বিশেষ করে মেয়েদের হাত, আর সেটা পূরটাই মিথ্যা। এখন ভাবীর কাছে তো আর মিথ্যা হওয়া যাবে না। কাজ শুরু হল, আমি মেয়েটির হাত দেখা শুরু করলাম।

বেশ বিজ্ঞের মতো বললাম, আরে, একি?

মেয়েটি বল্লো, কি?

বললাম,রাজনীতি করার প্রবণতা আছে। 

যার সাথে প্রেম করবেন তাঁর সাথে বিয়ে হবে না।

পরীক্ষায় ভাল করবেন।

অনেক বড়লোক হবেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।  

দিলাম তো মাথা ঘুরাইয়া। রাজনিতিতে নিয়া আসলাম, প্রেমের ব্যর্থতা, এবার কি হবে?  তবে মেয়েটি নিরিহ। তাঁর সম্পরকে আমি আসলে কিছুই জানি না। যাহা বলিলাম মিথ্যা বানাইয়া বলিলাম। সে বিশ্বাস করিল কিনা আমি তাহা তলাইয়া দেখিবার  প্রয়োজন মনে করিলাম না। তবে বলিয়া যেন মজা পাইলাম।

আমাদের বাসায় টিভি নাই, ভাবী আবার কয়েকটা টিভি অনুষ্ঠান দেখার ভক্ত। আর এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য তিনি এই আসমাদের বাসায় অর্থাৎ আসমাদের বোনের বাসায় যান। সেদিন রাতে একটা বাংলা সিনেমা ছিল, “বড় বাড়ির বউ” আমজাদ  হুসেনের পরিচালনা। যেহেতু অনেক লম্বা সময় ধরে সিনেমাটা চলবে, সুতরাং আমি গেলে ভাবীর জন্য সুবিধাই হয়। বিশেষ করে ভাইয়ার পারমিশন পেতে মোটেই অসুবিধা হবার কথা নয়। গেলাম।

বেশ রাত, ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে, আর দর্শক এর সংখ্যা কমছে। অবশেষে দর্শক থাকল খালী আমি আর ওই নিরিহ মেয়েটি।

কত কথা, আমি যেন বিজ্ঞ্য ব্যক্তি বনে গেছি আর কি। প্রায় সকাল হয়ে গেছে, সারা রাত টিভি দেখলাম আমি আর ওই নিরিহ মেয়েটি। খারাপ লাগেনি। হটাত দেখলাম, মেয়েটি আর নাই। আমি টিভির সামনে একা। কিছুক্ষন কেটে গেল, দেখলাম মেয়েটি এসেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় গিয়েছিলেন? সুন্দর  উত্তর, ফযর নামাজটা পরলাম। সংগে কিছু ফল আমার জন্য। এটাকে বলে আথিথেয়তা। বাসায় ফিরে এলাম। ঘুমাব।

বাসায় এসে লম্বা একটা ঘুম দিলাম। উঠলাম প্রায় ১২ টায়। গরমের দিন, সবখানে পানি থাকে না, আমাদের বাসায় আবার পানি থাকে। আসমা মেয়েটি আমাদের বাসায় পানি নিতে এলো। খড়খড়া রোদ, বাইরের রোদ দেখলেই বুঝা যায়, গরমের তান্ডব কত শক্ত। আমার রুমের ঠিক পাশেই টিউব ওয়েল। কেউ পানি নিতে এলে আর চাপকল চাপলে আমার কানে শব্দ আসবেই। আমি ঘরের ভিতর থেকেই জানালা দিয়ে তার সাথে কথা চালিয়ে গেলাম। ফলে আমার সংগে কিছুক্ষন কথাও হল তার।

সে আমার ঠিকানা চাইলো। আমি তাকে ঠিকানাও দিলাম। একটা  কাগজে লিখে দিলাম। আমি অবশ্য তার কাছ থেকে কোনো ঠিকানা চাইলাম না। কারন আমি ওদের ঠিকানা এম্নিতেই জানি। আবার চাইবো কি? ঠিকানা দেয়ার পরেই মেয়েটা এক কলসি পানি নিয়া তার বাড়িতে চলে গেলো। আমি জানালার পাশে বসে ভাবতে লাগলাম- 

গ্যাঞ্জাম মনে হয় পাকাইয়া ফেলিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *