১৪/০৪/২০১৬-পহেলা বৈশাখ

Categories

৬৮/৬, মীরপুর গোলারটেক, ঢাকা-১২১৬ 

আজকাল পহেলা বৈশাখ আমাকে খুব বেশি পুলকিত করে না। কিংবা পহেলা বৈশাখের জন্য আগের দিন বাজার ঘুরে ঘুরে দেশি বা বিদেশী ইলিশ কিনে এনে পরের দিন পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত খেতে হবে এই অনুভুতিতে আমার মনে খুব আনন্দের শিহরন জাগায় না। কিংবা লাল বা হলুদ পাড়ের শাড়ীর অপরূপ সৌন্দর্যে শহরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা রমণীদের দলবেঁধে হাটাহাটি, পার্কে ময়দানে মেলায় ঘুরাঘুরি আমার মনকে যে পুলকিত করে তাও না। এর মানে এই নয় যে পহেলা বৈশাখ আমি মানি না বা কেউ মানলে সেটা আমার পছন্দের নয়। কিন্তু আমি যা মিস করি তা হচ্ছে-পহেলা বৈশাখের দিনে আমার সেই ছোট বেলার আনন্দের মেলার অনুভুতি, মেলার সকালের আয়োজন আর হৈচৈয়ের মুহূর্ত গুলো। হতে পারে এই কারনে যে, এখন বয়স হয়ে গেছে, আমাদের সেই পহেলা বৈশাখের মেলার অনুভুতি এখন আর সেই অনুভুতি নাই কিংবা মেলার ধরন পালটে গেছে এই কারনে।

সকাল থেকে মেলার জায়গায় হরেক রকমের দোলা, কাছের নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন, হাটে হাটে মাঠে ময়দানে মাটির তৈরি পুতুল, বাঁশি, খেলনা, আরও যে কত কিছুর আয়োজন দেখেছি তার কোন পরিসীমা নাই। সকাল হতেই আমরা যারা ছোট ছিলাম, মেলায় যাব এই আনন্দে নদীতে গিয়ে কেউ উলঙ্গ হয়ে কেউ বা আবার কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে কিছুক্ষন কি যে লাফালাফি করতাম এখন ভাবলে সত্যি হাসি পায়। আমার মনে পরে না পহেলা বৈশাখের জন্য আমরা বাসায় ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা খেয়েছিলাম কিনা। জীবনের অনেকগুলো বছর আমি আমার গ্রামে কাটিয়েছি কিন্তু কোনদিন দেখি নাই ইলিশ মাছ পহেলা বৈশাখের একটা প্রধান উপকরন হয়েছিল। বরং পুটি মাছের শুটকি দিয়ে মা ঝাল ভর্তা বানাতেন, গরম গরম দেশি চালের ভাত রাঁধতেন, আলু ভর্তা কিংবা ঘরের চালে, গাছের ঢালের ফলন্ত কিছু সবজি কেটে গরম গরম ভাজি দিয়ে মা আমাদের নাস্তা করিয়ে দিতেন। সারাদিন কোথায় থাকি কি খাই, কখন খাই, এই চিন্তায় মা আমাদেরকে পেট পুরে খাওয়াইয়া দিতেন যাতে আনন্দের ছলে কোথাও কিছু না খেলেও ক্ষুধা না লাগে। পান্তা ভাত তো সব সময়ই খাই, এটা কোন বিশেষ উপকরন নয় যে, ঘটা করে পান্তা পেতে রাখতে হবে আর সেই ভাত পহেলা বৈশাখে খেয়ে মেলায় যেতে হবে। চাইনিজ নববর্ষে যেমন চাইনিজরা চাইনিজ তৈরি করে পহেলা চাইনিজ পালন করে না, ইংরেজি নববর্ষে যেমন ইংরেজরা ইংলিশ খাবার তৈরি করে পহেলা জানুয়ারি পালন করে না, তেমনি বাংলাদেশের মুল ধারার বাঙালিরাও পান্তা ভাত খেয়ে পহেলা বৈশাখ পালন করতে আমি দেখি নাই।

এই দিনে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পন্য নিয়ে আমাদেরই গ্রামের চেনাজানা লোকেরা মাথায় বেতের ঝুরি নিয়ে হরেক রকমের মাটির খেলনা, বেতের খেলনা, প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে মেলার মাঠে চলে আসতেন। দেখা যেত আমাদেরই ক্লাসে পরে কোন এক বন্ধু তার বাবার সঙ্গে অই সব সামগ্রী নিয়ে দোকানে বসে গেছে। আমরাও তার সঙ্গে ক্রেতা বিক্রেতা হয়ে যেতাম। বাড়ীর গিন্নীদের বাড়িতে তৈরি গাছের বিভিন্ন ফল মুলাদি দিয়ে বানানো মিস্টি আচার, তেঁতো আচার, কিংবা ঝাল ধরনের আচার বানিয়ে মহিলারাও কেউ কেউ মেলায় নিয়ে আসতেন। আমাদের পকেটের বাজেট হয়ত বা চার আনা, আট আনা, কিংবা বেশি হলে এক টাকা দু টাকাই থাকতো। সেতা আবার পহেলা বৈশাখের অনেক আগে থেকেই বরদের কাছ থেকে চেয়ে কিংবা মায়েদের কাছ থেকে অনুনয় বিনয় করে নিতে হত। নাগরদোলায় উঠার জন্য কত যে লাইন ধরে থাকার অপেক্ষা। পরিচিত কোন এক বড়রা হয়ত আদর করে কাউকে কাউকে বিনা পয়সায়ই দু একবার নাগর দলায় আমাদেরকে সুযোগ করে দিতেন। কোন পয়সা নিতেন না।

চারিদিকে বাঁশীর উচ্ছৃঙ্খল শব্দ, যার যার মত করে যা খুশি বাজিয়েই চলছে, হৈচৈ এর শেষ নাই। যে বাচ্চাটি এক বছরেরও বয়স, পহেলা বৈশাখ না বুঝলেও সেও হয়ত তার বাবা, মা কিংবা বোনের ভাইয়ের কোলে চরে মেলায় চলে এসেছে। হারিয়ে যাওয়ার ভয় নাই, বাড়ীতে ফেরার জন্য পরিচিত লোকের কোন অভাব নাই, চুরি ডাকাতির বালাই নাই, ছিনতাইয়ের কোন মনোভাব নাই, এক অনাবিল আনন্দ আর মেলা।

মেলাশেষে ঘরে ফেরার আরেক রূপ। দলবেধে পাশাপাশি গ্রামের আইল ধরে বাড়ি ফেরা। হাতে হাতে বাঁশি, পুতুল কিংবা অতি নগন্য অথচ মনে হয় অতি প্রিয় কিছু খেলনা হাতে নিয়ে নিয়ে গ্রামের মেঠো পথ ধরে দিনের শেষ বিকালে কিংবা সন্ধার আবছা আলোছায়ায় ঘরে ফেরা, ঘরে ফিরে একে অপরের নব্য কেনা সরঞ্জামাদি দেখাদেখি করে কখনো মন খারাপ করার মত অনুভুতি, যেন, আহা আমি কেন ঐ জিনিসটা কিনতে পারি নাই, কিংবা আহা আমি কেন দেরি করে মেলায় গেলাম যে আমার বন্ধু রহিমের কেনা বাশিটা আমি কেনার আগেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

বোনদের কেনাকাটা একরকম, আমাদের ছেলেদের কেনাকাটা ছিল অন্য রকমের। বোনেরা কেউ লিপিস্টিক, মাথার ফিতা, তিব্বত ব্রান্ডের স্নো পাওডার, আলতাও মিস যায় নাই। কেউ কেউ আবার কাছে হরেক রকমের চুড়ি, পায়ে পরার অদ্ভুত ডিজাইনের পায়রা কত কিছুই না কিনত আমাদের বোনেরা। আমার মনে পরে মেলা থেকে কেনা সরঞ্জামাদি আমরা কেউ কেউ ঘুমানোর সময় পাশে বালিশের কাছেই রেখে ঘুমাতাম যেন কতই না মুল্যবান সম্পদ। আবেগটাই আলাদা।

বড়রা কেউ কেউ পাঞ্জাবি পরে একে অপরের সঙ্গে চা বিড়ি টানতে টানতে দিনের অনেকটা সময় পার করে দিয়েছেন। দিনশেষে তারাই হয়তা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কেনা কাটার সামগ্রীর আনন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামের কিছু জোয়ান ছেলেপেলের দ্বারা আয়োজিত কোন এক গানের আসর কিংবা মল্লযুদ্ধের অনুষ্ঠান করতেন। নৌকা বাইচের শেষে উঠতি বয়সের ছেলেরা পাড়ার মুরুব্বিদের সঙ্গে জিতে আনা পুরুস্কারের সঙ্গে বীর বীর অনুভুতির একটা ভাব থাকতো। এ এক মেলা যার মাধ্যমে এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের ভাবের সৃষ্টি হত, বন্ধন মজবুত হত, নতুন নতুন সম্পর্কের হাল ধরে আরেক বছরের হালখাতা তৈরি হত। হালখাতা তৈরি হত ব্যবসার, হালখাতা তৈরি হত নতুন নতুন সম্পর্কের। এভাবেই আমি আমার সেই ছেলে বেলার বৈশাখী মেলার আনন্দটা উপভোগ করেছিলাম।

আজ আমি সেটা খুব মিস করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *