১৫/০৮/২০২৩-ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ফাটল

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ক্ষোভের বহির্প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তাঁর কিছু নমুনা যদি বলি-

(১)       রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়ার মুল কারন ছিলো যেনো রাশিয়ার তেল, গ্যাস, খাদ্য সামগ্রীসহ অন্যান্য মৌলিক উপাদান রপ্তানী থেকে আয় ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয়ের একটা সোর্স না হয়ে উঠে এবং আরেকটা কারন ছিলো যাতে রাশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেংগে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা বুমেরাং হয়েছে বলে এখন বিশ্বনেতাদের ধারনা। কারন কি? কারনটা দৃশ্যমান, রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল, গ্যাস, খাদ্য সামগ্রী আমদানী না করায় ইউরোপ নিজেই এখন ডি-ইন্ডাস্ট্রিলাইজেশন, ডি-ডলারাইজেশনের এর শিকার। প্রতিটি ইউরোপিয়ান দেশে এখন জীবনমাত্রা এতোটাই শোচনীয় যে, তারা আর আগের মতো লাইফ লিড করতে পারছে না। জনগন বিরক্ত তাদের শাসকদের উপর। প্রাথমিকভাবে যে আকারে এবং যে গতিতে ইউক্রেন উদ্ভাস্থদেরকে ইউরোপিয়ানরা গ্রহন করেছিলো থাকার জায়গা দিয়ে খাবারের খরচ, হাত খরচ, স্কুলিং ইত্যাদি দিয়ে, এখন তারা এটাকে একটা বোঝা মনে করছে। সেই আগের আবেগ কিংবা সহায়তার মনমানসিকতা তারা আর ধরে রাখতে পারছে না। তারা নিজেরাই এখন বিরক্ত ইউক্রেনের উদ্ভাস্তদের নিয়ে, শাসকদের কমিটমেন্ট নিয়ে।

(২)       ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিধর অর্থনৈতিক দেশ জার্মানীর প্রায় ৪৫% এর উপরে ইন্ডাস্ট্রিজসমুহ বন্ধ শুধুমাত্র গ্যাস এবং তেলের সংকটে। শুধু তাইই নয়, হিটিং ব্যবস্থার আমুল সংকটে দেশটি। দেশের এনার্জি মিনিষ্টার এবং বিরোধী দল এই মুহুর্তে যে বিষয়টির উপর সবচেয়ে বেশী জনমত তুলে ধরছেন তা হলো-পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে জার্মানি এখন তেল গ্যাসের অভাবে তাদের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ইন্ডাস্ট্রিজসমুহ যেমন ক্ষতিগ্রস্থ তেমনি সাধারন জনগনের অবস্থা চরম খারাপ। ঠিক এই মুহুর্তে অচীরেই রাশিয়ার উপর সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আবারো তাদের কাছ থেকে আগের মতো সব পন্য যেনো আমদানী করা হয় সেই দাবী উঠছে। এখানে বলে রাখা উত্তম যে, জার্মানী ৪০% নির্ভরশীল রাশিয়ার গ্যাস এবং তেলের উপর। জার্মানীর উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়েই উঠেছে রাশিয়ার সস্তা কমোডিটির উপরে। তারমধ্যে নর্ডস্ট্রিম-১, ২ উভয়ই এখন অকেজো হবার কারনে অদূর ভবিষ্যতেই রাশিয়া থেকে এতো সহজে আর আগের মতো তেল বা গ্যাস আমদানী করা সম্ভব না। জার্মানীর এহেনো খারাপ পরিনতির কারন হিসাবে সাধারন জনগন, বিরোধী দল, সরকারী আমলা এবং বেশ কিছু প্রতাপশালী মন্ত্রী মিনিষ্টার খোদ পশ্চিমাদের দায়ী করছেন যে, পশ্চিমারা এক ঢিলে দুই পাখী (জার্মানীর অর্থনীতিকে ধংশ এবং রাশিয়াকে পিউনিটিভ শাস্তি) মেরেছে। নর্ড স্ট্রীম নষ্টে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে জার্মানীর আর সবচেয়ে লাভ হয়েছে পশ্চিমাদের। জার্মানীর উলফ শলাজ নিজেও এখন চাচ্ছেন যে, ইউক্রেনের যুদ্ধ যেভাবে হোক বন্ধ হোক। দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা এখন জার্মানীর।

(৩)      এবার আসি ফ্রান্সের ব্যাপারে। নিজারে (Niger) ফ্রান্স এবং আমেরিকার উভয়ের প্রায় দুই হাজারের বেশী করে সামরিক বাহিনীর সদস্য আছে এবং বেশ অনেকগুলি সামরিক ঘাটিও আছে তাদের। মজার ব্যাপার হলো নিজার (Niger) শুধুমাত্র ফ্রান্সের বাহিনীকে সেখান থেকে তাড়ানোর বিক্ষোভ করছে, সাথে অভ্যুথান। আমেরিকানদের বিরুদ্ধে নয়। ফ্রান্স নিজার (Niger) থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলন করে তাঁর দেশের পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি সচল রাখতো। সবার সাথে তাল মিলিয়ে ফ্রান্স রাশিয়ার গ্যাস, তেল ইত্যাদি বয়কট করলেও তাদের বিকল্প ব্যবস্থা চালূ ছিলো এই ইউরেনিয়াম চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গুলি দিয়ে। এবার নিজার (Niger) সেই ইউরেনিয়াম এবং গোল্ড উত্তোলন এবং রপ্তানী পুরুপুরি বন্ধ করায় ফ্রান্সের বিদ্যুতায়ন এখন প্রশ্নের সম্মুক্ষে। ঠিক এই মুহুর্তে হয়তো যথেষ্ঠ পরিমান ইউরেনিয়াম মজুত আছে বলে ইম্প্যাক্টটা বুঝা যাচ্ছে না কিন্তু এটার প্রভাব হয়তো বছরখানেক পর অনুভুত হবে। ফ্রান্স তাঁর বেজগুলি এবং সামরিক উপস্থিতি ছাড়তে নারাজ। তাই তারা একোয়াসের (ECOWAS) সাথে সুর মিলিয়ে ক্যু সরকারকে মিলিটারিলি উৎখাত করার সিদ্ধান্তে অটল। একোয়াসও (ECOWAS) চেয়েছিলো নিজারে (NIGER) কাউন্টার অফেন্সিভের মাধ্যমে পূর্বর্তী প্রেসিডেন্ট বাজোমকে আবার স্থলাভিষিক্ত করে। কিন্তু একয়াসের (ECOWAS) সামনে দুটো বড় প্রশ্ন এসে হাজির হয়েছে

(ক) রাশিয়া নিজারে (Niger) কোনো প্রকার মিলিটারী অভিযানের পক্ষে না। আর রাশিয়ার এই অবস্থানে একোয়াস (ECOWAS) নিজেরাও ক্রান্তিলগ্নে। কারন আফ্রিকার দেশসমুহে রাশিয়া যে পরিমান অস্ত্র, খাদ্যশস্য এবং ইকোনোমিক্যাল সাপোর্ট দেয়, যদি রাশিয়ার কথার বাইরে কেউ যায়, সেটা রাশিয়া হয়তো বন্ধ করে দিতে পারে। আফ্রিকার দেশ গুলি এম্নিতেই গরীব, তারমধ্যে রাশিয়ার এই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে তাদেরকে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। রাশিয়াই একমাত্র দেশ যে আফ্রিকায় বিনামুল্যে এই যুদ্ধের মধ্যেও আফ্রিকার খাদ্য ঘাটতির কারনে ৯০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য সরবরাহ করেছে, ২৪ বিলিয়ন ডলার সমপরিমান ঋণ মওকুফ করে দিয়েছে এবং বিনামুল্যে আরো ৫০ মিলিয়ন টন সার দেয়ার কথা বলেছে। অন্যদিকে পশ্চিমারা বা ইউরোপ বা ফ্রান্স কিংবা তাদের মিত্র দেশগুলি সাহাজ্য তো দূরের কথা তারা মালি, গিনি, বারকুনো ফুসু, নিজার, চাঁদ, এবং আরো কিছু আফ্রিকান দেশসমুহে নিষেধাজ্ঞা আরোপন করেছে। ফলে আফ্রিকান দেশগুলি স্বাভাবিক কারনেই রাশিয়ার কথার বাইরে যেতে পারার কথা না। একোয়াসে আফ্রিকার মোট ১৫টি দেশ। এরমধ্যে কয়েকটিতে চলছে মিলিটারী শাসন। তারা হচ্ছে গিনি, নিজার, মালি, বারকিনো ফুসু, গিনিয়া বিসাও, লাইবেরিয়া সবেমাত্র বেরিয়ে গেছে। একোয়াসের মধ্যে বাকী যে কয়টা দেশ আছে, তাদের সামরিক ক্ষমতাও খুবই নগন্য। সক্ষমতার দিক দিয়ে একোয়াস মিলিটারী কোনো দেশের জন্যই কোনো হুমকী না।

(খ)       ফ্রান্স যেহেতু মনে প্রানে চাচ্ছে যে, একোয়াস (ECOWAS) মিলিটারী অপারেশন করুক নিজারে (Niger) কারন সেক্ষেত্রে ফ্রান্স একোয়াসের বাহানায় সেইই মিলিটারী অপারেশনটা করবে যাতে ফ্রান্সের দোষ না হয়, দোষ হয় একোয়াসের। কিন্তু একোয়াস অনেক ভেবেচিন্তে দেখছে এটা করা ওদের সমুচীন হবেনা। অন্যদিকে ফ্রান্স এটাও ভেবেছিলো যে, তাদের ইউরোপিয়ান মিত্র হিসাবে আমেরিকা অবশ্যই নিজারের ( Niger)ব্যাপারে জোরালো কিছু করবে। কিন্তু আমেরিকা সেটা না করে তারা যেটা করেছে সেটা হলোঃ আমেরিকা থেকে প্রতিনিধি হিসাবে ন্যুল্যান্ডকে নিজারে (Niger) পাঠিয়েছে অভ্যুথানের কমান্ডারদের সাথে এক মিটিং করার জন্য। তাঁর বক্তব্য ছিলো নিজার (Niger) যাতে ভাগনার নামক ভাড়াটে বাহিনীর কোনো সহায়তা না নেয় এবং প্রয়োজনে আমেরিকা অভ্যুথানকারীদের সাথে সমঝোতা করতেও ইচ্ছুক। অভ্যুথানের কমান্ডারদের সাথে ন্যুল্যান্ডের এমন বৈঠকে ফ্রান্স খুব ক্ষুদ্ধ এবং কিছুতেই খুশী না তারা। তারা মনে করছে-আমেরিকা ঠিক সেই কাজটাই করেছে যেটা ফ্রান্সের সার্থের বিপরীত। তারা অবশ্য এটাও বলেছে যে, আমেরিকার সামরিক বেজগুলি নিজারে (Niger) রাখার সার্থেই ন্যুল্যান্ডের এই ভিজিট।

তাহলে কি দাড়ালো? একদিকে জার্মানী নাখোশ, অন্যদিকে ফ্রান্স নাখোস। ইতালী তো আগে থেকেই নাখোস, তুরষ্কের ব্যাপারটা আমরা সবাই জানি। সে না ন্যাটোর ঘরে, না ন্যাটোর বাইরে, না সে ইউরোপে না সে এশিয়ায়। হাংগেরী তো বহু আগে থেকেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের গলার কাটা। পোল্যান্ড গত কয়েকমাস যাবত ইউক্রেনের উপর ভীষন ক্ষিপ্ত। কারন পোল্যান্ড তাঁর নিজের দেশের কৃষকদের বাচানোর জন্য ইউক্রেনের শস্য আমদানীতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় পোল্যান্ডের সাথে ইউক্রেনের সম্পর্ক এখন চরম খারাপ। একদিকে পোল্যান্ড বেলারুশকে নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে ভাগনার গ্রুপ যে কোনো মুহুর্তে পোল্যান্ডে প্রবেশ করার পায়তারা করছে। ফলে চরমপন্থি পোল্যান্ড এখন নিজের ঘর সামলাবে নাকি ইউরোপিয়ান জোটের সার্থে সে ইউক্রেনকে সাপোর্ট করবে নাকি পশ্চিমাদেরকে খুশি করবে, সেটা নিয়েই সন্দিহান। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আরেক শক্তিধর যুক্তরাজ্য তো আরো ক্ষেপা এই ইউক্রেনের উপরে যার প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেসের এক কথায় যে, ইউরোপ বা ন্যাটো কোনো আমাজন নয় যে ইউক্রেন যখন যা চাইবে তাকে তখনি সেটা দিতে হবে।

উপরের কয়েকটা বিশ্লেষণে যেটা খালী চোখেই ধরা পড়ে সেটা হচ্ছে যে, ন্যাটো বা ইউরোপিয়ান জোট ধীরে ধীরে নেতিয়ে যাচ্ছে এবং এদের সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাসের একটা ফাটলের সৃষ্টি হচ্ছে। আর এই ফাকে পুরু দুনিয়ায় একটা বিশাল পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে বেড়াচ্ছে- মাল্টিপোলারিটি, ডি-ডলারাইজেশন, ব্রিক্সের উত্থান এবং চীন-ভারত-রাশিয়ার সাথে ইরান-সৌদি-সিরিয়া- ব্রাজিল- সাউথ আফ্রিকা ইত্যাদি মিলে একটা ভিন্ন জোট।

আমার কাছে যেটা মনে হয়, একসময় এই পুরু ইউরোপিয়ান জোট তাদের নিজেদের সার্থেই আবার রাশিয়ার সাথে মিলতে বাধ্য হবে। আর যদি সেটাই হয়, তাহলে ন্যাটোর পরিবর্তে এমন আরেক জোট তৈরী হবে যেটা শুধুমাত্র নতুন ইউরোপের যেখানে আধিপত্য করবে চীন, রাশিয়া এবং আফ্রিকা যদিও চীন বা আফ্রিকা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কেউ না।
সময় হয়তো বলে দেবে।