১৮/১১/২০২০-অডিট ঘর

Categories

আমি এখানে নতুন ভাড়াটিয়া অতিথি। আজই এসেছি। কারো সাথেই আমার এই এলাকার মানুষদের সাথে পরিচয় নাই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ঘর পাওয়া গেল। কি যে অবস্থা চারিদিকে। অনেকদিন হয়ত কেউ এখানে আসে নাই। বাড়ির মালিকও মনে হয় অনেকদিন পর্যন্ত এই জায়গাটার কোনো খোজ নেন নাই। চারিদিকে ঘাস জঙ্গল হয়ে একাকার। বাড়ির কেয়ারটেকারেরও যেনো জায়গাটা পরিস্কার করে রাখার জন্য খুব একটা খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। চারিদিকে দুর্গন্ধ, আবর্জনা, মশা, মাছি, সাপ, তেলাপোকা কোনটা নাই। সবই আছে।

আমি আগে যে এলাকায় থাকতাম, আমি এখানে আসার আগে, সেই এলাকার মানুষজন সবাই মিলে কিছুটা হলেও এই এলাকার ঘরটা পরিস্কার করে দিয়েছিলো। তারাও অনেক কষ্ট করেছে। মায়া মহব্বত আর অনেকদিন থাকার কারনে সবাই আমাকে বিদায় জানাতে এসেছিলো। আকাশে বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব ছিলো, বৃষ্টি নামার আগেই তারা সবাই হাতাহাতি করে কোদাল, সাবল, খুন্তি দিয়ে যে যেভাবে পারে, ঘরটা পরিস্কার করে দিয়েছিলো। এতো হৈ চই হলো অথচ আশেপাশের কোনো ভাড়াটিয়ারা কেউ এলোই না। আশেপাশের ভাড়াটিয়াদের কারো কোন কৌতূহল আছে বলে মনে হচ্ছে না। সবাই যার যার ঘরে। কোন ছোট ছোট বাচ্চা কাচ্চাদেরও খুব একটা আনাগোনা নাই। বেশ নির্জন এলাকাটা।

আমি ঢোকে গেছি আমার ঘরে। মাটির ঘর অথচ মাটির দেয়াল ভেদ করে আমি যেনো আশেপাশের সবাইকে দেখতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি আমার আগের এলাকার আকাশ, আকাশের তারা, গাছপালা আর সেই এলাকার মানুষজনদের যত্রতত্র চলাফেরা। তাদের সাথে আমার সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে।

একটু ঘাড় ঘুরাতেই দেখি, ও মা, একই! এখানে দেখি প্রায় সবার বাড়ির সামনে তাঁদের নাম লেখা!! আর এদের অনেকের সঙ্গেই তো আমার আগের এলাকায় মোটামুটি পরিচয় ছিল। ঐ যে, কাসেমের বাবার ঘর দেখা যাচ্ছে, তাঁর পরেই দেখি আমাদের মেয়রের বাসা। অনেকদিন দেখা হয় নাই কাসেমের বাবার সঙ্গে অথবা মেয়র জনাব আলমের সঙ্গে। আচ্ছা আলম সাহেবের সাথেতো সারাক্ষন সলিম উদ্দিন জোকের মতো লেগে থাকতো, সেই সলিম উদ্দিনকে দেখতে পাচ্ছি না কেনো? আরে, আলম সাহেবের শরীরের উপর কে ওটা? ওতো আমাদের সেই কালা রতন? কালা রতনের তো ফাসি হয়েছিলো জোরা খুনের দায়ে? কালা রতনও এখানে?

ইশ, কি অন্ধকার, আর চারিদিকে কি মশা, পিপড়া আর কি সব পোকামাকড়। ঘরের বাতিগুলি যে কোথায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সুইচের জায়গাটা খুজতে গিয়ে কোথাও পাওয়া গেলো না। ঘরটার কোথাও কোনো সুইচ নাই, কোথাও কোনো বাতিও নাই? দরজাটা একেবারে বন্ধ। কোনো জানালাও নাই? কি ব্যাপার, আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না কেনো?

উফ, হটাত করে শরিরটা ভিজে যাচ্ছে কেনো? একি? ছাদ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে!! মনে পরেছে কিছুক্ষন আগে বৃষ্টির লক্ষন দেখেছিলাম। এখন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু ছাদের উপর থেকে ক্রমাগত পানি আমার ঘরে পড়ে ভরে যাচ্ছে। কি পোকা মাকর!! একদিকে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আবার অন্যদিকে এইসব পোকা মাকড় এলো কোথা থেকে? ভীষন ভয় লাগছে এখন আমার।

উচ্চস্বরে নাসিমার মাকে ডাকতে থাকি। কোথায় গেলে গো তোমরা? আরে, কেউ শুনছো না কেনো? আলোটা জালাও!! কেউ কি আমার ডাক শুনতে পাচ্ছো না? আরে, করিম, ওই সগীর, কই তোরা? আমার গলার ডাক উচ্চ থেকে আরো উচ্চস্বরে চারিদিকে কেপে কেপে উঠছে। আমার আকুতিতে পাশের এলাকার কুকুর গুলীও কি করুন সুরে কাদছে, অথচ আমার ঘরের কি কেউ শুনছে না? আমি আরো জোরে আমার বাড়ির গার্ড শাহিনুরকে ডাকি। গার্ড শাহিনুরও আজ আমার কোনো ডাক শুনতে পায় না? ওই শাহিনুর, আমি তো ভিজে চুপসে যাচ্ছি!! আমার বাকী কাপড় চোপড় কই? আমার সেই ইতালীর ছাতাটা কই? আমার জার্মানীর রেইন কোটটা কইরে শাহিনুর? তোরা সবাই কই?

হটাত বিকট এক শব্দে আমার যেন মাথা ঘুরে গেল। মনে হলো আকাশ ভেঙ্গে জ্যুতির্ময় অবয়বে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো চোখ ঝলসে যাওয়া শতকোটি আলোর চ্ছটার মতো চোখ নিয়ে বিকটকায় দেহধারী আমার এই বদ্ধঘরে প্রবেশ করলেন। আমি তাদের এর আগে কখনো দেখি নাই। আমি ভয়ে চিৎকার করতে গিয়েও আমার কন্ঠনালি থেকে এক ফোটা শব্দও যেনো বেরোলো না। আমি ঠায় শুয়েই রইলাম, সর্বশক্তি দিয়েও আমি উঠে বসতে পারলাম না। আগন্তক দুজন শুধু একটা কথাই বললেন, আপনি আজ থেকে এখানেই থাকবেন। এটাই আপনার চিরকালের ঘর। আমরা ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে এসেছি। আপনার ফাইলটা আমাদের কাছে আছে। আপ্নার যাবতীয় সব হিসাব কিতাব না হওয়া পর্যন্ত আপনাকে এখানেই এই বদ্ধঘরে বাতিহীন, জানালাহীন, দরজাবিহীন, এই স্যাতস্যাতে ঘরের মধ্যেই থাকতে হবে। প্রাথমিক অডিট যদি সন্তোষজনক হয়, তাহলে আমাদের মালিকের আদেশে আপনাকে আপাতত অন্যত্র নিয়ে যাবো, নতুবা সব হিসাব এখানেই চুড়ান্ত করা হবে। আর ততোদিন আপনি এখানেই অনাহারে একা সময় কাটাবেন।

খুব ভয়ে ভয়ে অস্ফুট কন্ঠে আমি জিজ্ঞেস করলাম। ভাই, এ স্থানের নাম কি? আমার পরিবারের অন্যরা সবাই কোথায়? আমার পাজেরো গাড়িটা কই, আমার বারো তালা বাড়িটা কি এখান থেকে অনেকদূর? আমার আদরের মেয়ে নাসিমা কই? নাসিমার মা কোথায়? আমি এখানেই বা কেনো? ঘরটা বড় অন্ধকার, একটু আলো জ্বালিয়ে দিন না। কত যে মশা, মাকড়শা আর পোকা মাকড়, একটু এরোসোল দিন না।

কি যেনো ভাষায় আমাকে শুধু আগন্তক এটাই বলে গেলেন, এটা আপনার সাধের ড্রইংরুম কিংবা এসিওয়ালা অফিস ঘর নয়। না এটা কোনো আফগানিস্থা্ন, বা পাকিস্থান কিংবা কাজিকিস্থান কিংবা আমেরিকার কোনো বিলাশ বহুল রেস্তোরা। আর আপনি যেখানে শুয়ে আছেন, তার নাম অডিট ঘর। যদি আপনি প্রিপেইড কার্ডে বিদ্যুতের দাম আগেই দিয়ে থাকেন, যদি আপনি পেট্রোল অকটেন কিংবা গাড়ির জন্যে আগেই মুল্য পরিশোধ করে থাকেন, আপনার ফাইলটা চেক করে আমরা কিছুক্ষনের মধ্যেই সবকিছু, বাতি, গাড়ি, এসি কিংবা শোয়ার জন্যে খাট-পালঙ্গ সব কিছুর ব্যবস্থা করে দেবো। আর যদি আপনি যে এলাকায় আগে বসবাস করতেন, সেখান থেকে কিছুই ট্রান্সফার না করে থাকেন, তাহলে আমাদের পক্ষে আপনাকে কোনো কিছুই সরবরাহ করা সম্ভব নয়। এখানে কোনো কিছুই বিনিময় হয় না। এর নাম গোরস্থান। আর আপনার এই অডিট ঘরের আরেক নাম- "কবর"।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *