১৮/১১/২০২০-ভালোবাসি না

Categories

ভালোবাসি না

ভালোবাসা কি?  ভালবাসা কি কোনো দ্রব্য বা কোনো পদার্থ যা চোখে দেখা যায়, ছোয়া যায় বা স্পর্শ করা যায় বা মাপা যায়? এটা কি এমন যে, ষোল ছটাকে এক কেজি ভালোবাসা হয় অথবা এটা কি এমন যে, চার আনা এক গন্ডায় এক শতাংশ ভালোবাসা হয়? অথবা এটা কি এমন যে, পাখীরা জেগে উঠলে, তাদের কিচির মিচির শব্দে কোনো এক সকালে বা সন্ধ্যায় সন্ধ্যতারা আকাশে উদিত হলে ভালোবাসার জন্ম হয়? কোথাও কি কোনো মহা মনিষী লিখেচ গেছেন, কি কি ভাব ভংগিতে, কোন কোন সুরে বা কোন কোন আবেগে ভালোবাসা প্রকাশ পায়? ৫৫ বছর বয়স পার হয়ে গেলো আমার, কিন্তু কোনো বিদ্যালয়, কোনো কলেজ, কোনো ধর্মালয় আমাকে কেঊ এই ভালোবাসার বিক্রয়কেন্দ্র অথবা বিনিময় শ্তলের নাম দিতে পারলো না। আমি ভালোবাসাকে আজো চোখে দেখি নাই। অনেক দেশ ঘুরেছি আমি। সম্রাট শাহজাহানের গড়া তাজমহল দেখেছি, প্রিন্স আর্চ বিশপ ডাইট্রিচের প্রিন্সেসের সালোমির জন্য গড়া মার্বেল প্যালেস দেখেছি, উইলিয়াম কেলী স্মিথের প্রথম ছেলে সন্তানের জন্য গড়া "ক্যালী কেসেল" দেখেছি। কিন্তু আমি ওখানেও কোনো ভালোবাসার শপিং মল অথবা ভালোবাসা কিনতে পাওয়া যায় এমন কোনো দোকান দেখি নি। যারা ভালোবাসা বুঝে, কিংবা ভালো বাসে, তারা কিছু না কিছু দিয়েই তাদের সেই অদেখা, অচেনা ভালোবাসার সৌধ নির্মান করে কিছু না কিছু স্মৃতি রেখেই প্রমান করে গেছেন যে, তারা ভালোবেসেছে।

এতো বড় বড় অট্টালিকা, তাজমহল, ক্যাসেল, গার্ডেন বানানোর আমার কোনো সামর্থ নাই। আচ্ছা, ভালোবাসা কোথায় খুচরা কিনতে পাওয়া যায়? কোনো সুপার শপে? বা কোনো বড় মলে? অথবা কোনো কারখানায়? আমি তো অনেক মল, অনেক সুপার সপ কিংবা অনেক কারখানায় খুজেছি এই ভালোবাসাকে। অথচ আজো আমি কারো জন্যেই এক ছটাক, এক শতাংশ কিংবা এক পাউন্ড ভালোবাসা কিনে আনতে পারি নাই!! কোথাও পাইও নাই!! তাহলে আমি কি কখনো কাউকে ভালোবাসি নাই? হয়তো তাই। আমি কাউকেই ভালোবাসি নাই হয়তো।

অথচ, আমি কি অবুঝ বারবার। আমি ওদেরকে না ভালোবেসে, বারবার শুধু ওদের জন্য দুশ্চিন্তায় দিন কাটাই। সারাক্ষন ভাবি, ওরা যেনো ভালো থাকে, ওরা যেনো আনন্দে থাকে। ওরা যেনো নিরাপদে থাকে। আর এটা ভেবেই আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুধু ওদের জন্য ঈশ্বরের কাছে ওদের সুস্বাস্থ্যের দোয়া করি। সমগ্র বিসশে যেন ওরা মাথা উচু করে নিজের সম্মানে দাড়াতে পারে তার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করে রোজগার করি। আমার অবর্তমানে যেনো ওরা থাকে সাবলম্বি, তারজন্য আমার সারাটা দিন, সারাটা মাস আর সারাটা জীবন নিজের সকল আরাম, আয়েশ, আর সৌখিনতাকে ত্যাগ করে ওদের জন্য সঞ্চয় করি। নিজের অচল হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনটা, কিংবা খষে যাওয়া জুতার সোউলটা বারবার সেলাই করে, ওদের শখের ইচ্ছাগুলি পুরনে সদা চেষ্টা করি। খাবারের টেবিলে বড় সুসাধু চিংড়ি মাছটি নিজের খেতে ইচ্ছে করলেও সেটা আমি ওদেরকে দিতে পছন্দ করি। দূর থেকে কয়েকদিন বিরহের সময়টা কাটানোর পর যখন সন্তানেরা ঘরে ফিরে, গিন্নী যখন অসুস্থ্যতা থেকে সুস্থ্য হয়ে ঘরে ফিরে, আমি তখন আনন্দে ওদের বুকে জড়িয়ে ধরি আর বুক ভাসিয়ে দেই আমার অবাধ্য চোখের জলে। কোথাও ওদেরকে একা ছাড়তে ভয় পাই। সাতার না জানা আমার ছোট মেয়েটি বা অল্প সাতার জানা আমার বড় মেয়েটি যখন নদীর জলে নামতে চায়, তখন নিজের শরীরে জ্বর নিয়েও আমি ওদের সাথে পানিতে সঙ্গ দেই যেনো ওরা পানিতে ডুবে না যায়। নাইট কোচের কোনো গাড়িতে বসে আমি সারারাত না ঘুমিয়ে গাড়ি ঠিকমত নিরাপদে চলছে কিনা সেই পাহারায় ক্লান্ত শরীর নিয়েও সারাটা রাস্তা জেগেই থাকি। অথচ, ওদেরকে আমি ভালোবাসি কিনা সেটা সবাইকে দেখানোর জন্য আমি কোনো ইমারত তৈরী করতে পারিনা। কারন, আমার ভালোবাসা হয়তো ও রকমের সুউচ্চ ভবনের মতো নয়।   

আচ্ছা, মানুষ ভালবেসে কি কখনো কাদে? অথবা মানুষ ভালোবেসে কি খিলখিল করে হাসে? এমন কি হয় যে, মানুষ ভালোবেসে কারো জন্যে মন খারাপ করে বসে থাকে? শুনেছি, ভালোবাসায় নাকি কান্না থাকে, হাসি থাকে, বেদনা থাকে, থাকে আরো অনেক কষ্ট, বিরহ, আবার থাকে আনন্দও। আমারো এ রকম হয়। যখন সে আমার কাছে থাকে না, যখন ওর শরীর খারাপ হয়, যখন ওর মন খারাপ হয়, যখন কোনো কিছুর জন্যে ওদের চোখে পানি আসে, আমারো মন খারাপ হয়, আমারো চোখেও পানি আসে। যখন আমার সন্তানেরা আমার থেকে দূরে থাকে, ওরা নিরাপদে আছে কিনা তারজন্যে আমার ভয় হয়। ওরা ঠিকমতো খেলো কিনা, ওরা ঠিকমতো ঘুমালো কিনা, ওরা ভাল আছে কিনা এই ভাবনায় আমি তখন ওদের জন্য ভিতরে ভিতরে কষ্ট পাই, ভয় পাই, চোখ ভিজে আসে কান্নায়। আমি ওদের মিস করি। যখন ভাবি, ওরা একদিন আমার থেকে দূরে চলে যাবে, ওদের সংসার হবে, আমি একা হয়ে যাবো, আমারো অনিশ্চিত বিরহে চোখে জল আসে।

এটা কি ভালোবাসা?

যদি এটাই হয় ভালোবাসা, তাহলে আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, তাজমহল নির্মান না করেও, কোনো ক্যাসেল তৈরী না করেও, কোনো অট্টালিকা, কোনো ব্যবিলনের মতো শুন্যদ্যান নির্মান না করেও, সবটুকু মহব্বত দিয়ে, আদর দিয়ে আমি তোমাদেরকে আজীবন শর্তবিহীন ভালোবাসি। যখন আমি তোমাদের উপর রাগ করি, সেটাও আমার ভালোবাসা। যখন আমি অভিমান করি, সেটাও আমার ভালোবাসা, যখন আমি গোস্যা করি সেটাও আমার ভালোবাসা। কারন, আমার সব রাগ বা অভিমানের সব কিছুতেই মিশে আছে কোনো না কোনো দুসচিন্তা, কোনো না কোনো ভয় আর মিশে আছে শতভাগ সেই শর্তহীন ভালোবাসা। আমার প্রতি আমার সেই বাবা মার এই ভালোবাসাটা বুঝতে আমি ৫৫ বছর পার করে বুঝেছি, ছোটবেলার তাদের সেই শাসনেও ভালোবাসা ছিলো, শৈশবের কোনো এক সাধ অপুরনে আমার পিতামাতার অন্তরের ভিতরের কষ্টেও ভালোবাসা ছিলো, স্কুলের পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট না করায় সেই রাগ অভিমানের মধ্যেও ভালোবাসাই ছিলো।

তারা আজ কেউ কোথাও নাই। অথচ, আমি আজ বুকভরা সেই ভালোবাসা নিয়ে বারবার ফিরে যেতে চাই সেই অজপাড়াগায়ে আমার সেই ভিটায় যেখানে কাদামাখা হাতে আমার মা একটা বেত নিয়ে দুরন্ত ছেলেটাকে নদী থেকে উঠে আসার মেকি রাগ মাখা চোখে অথচ সত্যিকারের ভালোবাসা নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। আর বলতো-

-"উঠে আয় বলছি? তা না হলে আয় একবার, এই বেতটা দিয়ে তোকে মারি"।

হয়তো তোমরাও একদিন...... বার বার ফিরে আসে যুগে যুগে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।

কি অদ্ভুত ভালোবাসা, তাই না?  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *