১৯/০৮/২০১৬- পৃথিবীকে বদলে দাও

Categories

উত্তর থেকে দক্ষিন, পূর্ব থেকে পশ্চিম, প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য কিংবা গ্রিস থেকে অন্য কোথাও, ছোট কিংবা বৃহৎ যেদিকেই তাকাবেন কিংবা যেখানেই যাবেন, সর্বত্র একটা লিখিত-অলিখিত শ্লোগান দেখবেন কিংবা শুনবেনঃ পৃথিবীকে বদলে দাও। অথবা চা স্টলে বসলে আলাপ আলোচনায় শুনবেন, “আচ্ছা, মানুষ গুলি বদলাচ্ছে না কেনো?” ইত্যাদি।

আমি মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করিঃ কি বদলাতে হবে? কি পরিবর্তন হয়েছে যা বদলানো দরকার? এই পরিবর্তন কি আগের কোনো এক জমানায় ফিরে যাওয়ার আকুতি? নাকি ভবিষ্যতের কোনো এক নাম না জানা টেকনোলোজির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি?

যদি বলি, আগের জামানাই অনেক ভালো ছিলো, যেখানে সব সম্প্রদায় একই জনগোষ্ঠীর আওতায় একে অপরের সঙ্গে মিলে মিশে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলেছিলেন এবং সৌহার্দমুলক এক সমাজে বাস করতেন। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হলে কুশল বিনিময় করতেন, ভালো মন্দ যা কিছু আছে তার খোজখবর নিতেন, এক বাড়ির মেয়ে আরেক বাড়িতে গিয়ে কোন এক বিয়ের আসরে বসে গ্রাম্য নৃত্যর সাথে নাচানাচি করতেন। হিন্দু মুসলমান, খ্রিষ্টান কিংবা যে যেই ধর্মেরই হোক না কেনো, তাদের মধ্যে একটা সৌহার্দপূর্ণ সদ্ভাব ছিলো। সত্যকে মিথ্যার সাথে, কিংবা আরালে আবডালে একে অন্যের সমালোচনা না করার মানসিকতা, প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশির একটা বন্ধুত্তপূর্ণ অনুভুতি ইত্যাদি দেখা যেত। আমরা কি সেটার কথা বলছি? তাহলে তো বলবো, তখনো তো পাথরযুগও ছিলো যেখানে জীবন্ত মানুষকে মানুষ মেরে ফেলতো, কিংবা মোঘল সম্রাটদের আমলে তো মানবাধিকারের কোনো বালাইই ছিল না অথবা নীল চাষদের আমলে তো মানুষ আরো খারাপ অবস্থায় না খেয়ে খেয়ে ছিলো। তাহলে কি সেই আগের জমানায় ফিরে যাওয়াই কি বদল হওয়ার কথা বলছি? অথবা এমন কিছু নতুন নতুন টেকনোলোজি যা আগামি প্রজন্মের জন্য ধীরে ধীরে উদ্ভাবিত হচ্ছে যেখানে পুরানোদের নতুনদের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত?

আসলে ব্যাপারটা সম্ভবত এই রকম নয়। অনেক জটিল, শুধু জটিল নয়, সময় সাপেক্ষও বটে।

জটিল কতটুকু সেটা না হয় পড়ে ভাবা যাবে কিন্তু সময় সাপেক্ষ ব্যাপারে বলতে পারি যে, আমার এই অল্প আয়ুর জীবনের মধ্যে দেখেছি, আমরাই এক সময় শীতের মৌসুমে ঈদ পর্ব পালন করেছি আবার বর্ষার সময়ও ঈদ পালন করেছি। কারন, ঋতুর পরিবর্তনের ফল, সময়ের তারতম্যের কারনেই এই পরিবর্তনটা হয়। আর এই পরিবর্তন নিছক এক বছর বা দুই বছরের মধ্যেই ঘটে যায় না। তারজন্য যুগের পর যুগ কেটে যায়। ছোট এই উদাহরন দিয়ে বুঝাতে চেয়েছি যে, পরিবেশ বদল হতেও যুগের পর যুগ লেগে যায়। আর মানুষের সভ্যতা তো আরো সময়ের ব্যাপার। এতে জেনারেশন থেকে জেনারেশন পার হয়ে যায়। ফলে বদল বা পরিবর্তন জিনিসটা একা একটা ফ্যাক্টর নয়। এরসঙ্গে জড়িত সময়, মানুষ, সভ্যতা, মানুষের শিক্ষা, উদ্ভাবনীর সাফল্য, নতুনত্তকে গ্রহন করার মানসিকতা ইত্যাদি। আর পরিবর্তনের জন্য এইসব ফ্যাক্টরগুলি একসঙ্গে হতে হবে। সময়ের সঙ্গে মানুষ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সভ্যতা, সভ্যতার সঙ্গে মানুষের শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে উদ্ভাবনির আবির্ভাব, আর সেই উদ্ভাবনীর সঙ্গে পুরানো রীতিনীতি ছেরে মানুষের নতুন কিছু গ্রহনের আন্তরিকতা ইত্যাদি মিলে আসে এই বদল। এর কোনো একটায় যদি বাধ সাধে, তাহলেই বাধাগ্রস্থ হয় বদল হওয়ার প্রক্রিয়া। আর যখন বদল হওয়ার মানসিকতা তৈরি না হয়, শুরু হয় বদলা নেওয়ার প্রক্রিয়া। সেটাও এক প্রকার বদল কিন্তু তা আমরা কখনোই চাই না।

প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ এই বদল হওয়ার শ্লোগান দিয়ে আসছে। বদল যে হয় নাই তা কিন্তু না। পাথর যুগের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ্য, মোঘল সম্রাটদের একচেটিয়া শাসনতন্ত্র, ইংরেজদের দস্যিপনা, বর্গিদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে “বদল” হওয়ার নিমিত্তে সব আমলেই কিছু না কিছু সাহসী মানুষ কিংবা গোত্র আন্দোলন করেছিলো এবং তার সুফল যে হয় নাই তা নয়। সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়েছে, সহমরন প্রথা বন্ধ হয়েছে, জীবিত কন্যা সন্তান হত্যা করা বন্ধ হয়েছে, বাকস্বাধীনতার উন্নতি হয়েছে, ন্যায়নীতির আইন প্রনয়ন হয়েছে, সামাজিক মুল্যবোধের পরিবর্তন হয়েছে, আরো অনেক কিছু। এগুলু হচ্ছে বৈশ্বয়ীক পরিবর্তনের বড় বড় আলোচনা। কিন্তু এই বড় বড় বৈশ্বয়ীক পরিবর্তনের সুচনা প্রকৃতপক্ষে আরম্ভ হতে হয় একেবারে ছোট ছোট পরিবার থেকে, প্রতিটি মানুষের ব্যবহার থেকে, অথবা অন্য অর্থে যদি বলি, এই পরিবর্তনগুলির প্রারম্ভিক ভিত্তি হচ্ছে প্রতিটি মানুষ। আমরা এই প্রারম্ভিক ভিত্তিতে “বদল” চাই। তাহলেই প্রকারান্তে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বয়ীক পরিবর্তন বা “বদল” কার্যকরী হবে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোঃ এই প্রারম্ভিক ভিত্তি অর্থাৎ মানুষের পরিবর্তন কিভাবে হবে সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়।

রিক্সায় উঠেছেন? দেখবেন, গল্পের ছলে হয়ত রিকশাওয়ালা বলছে, স্যার দেশটার কি কোনো পরিবর্তন হবে না? চা স্টলে বসেছেন? শুনবেন, তুমুল কথাবার্তা হচ্ছে, সমাজটা কি অধঃপতনে চলে যাচ্ছে? স্কুল কলেজে, মিটিং সেমিনারে বসেছেন? দেখবেন, একদল শিক্ষিত লোক দেশের আইন-শৃঙ্গলা, শিক্ষা-ব্যবস্থা, ছাত্র-ছাত্রদের, শিক্ষক-শিক্ষিকার আদর্শ, যোগ্যতা, ইত্যাদি নিয়ে কথা বলছেন। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে সর্বচ্চ আদালত প্রাঙ্গনে বসেছেন? শুনবেন, ন্যায় নীতির পদস্খলনের অনুতাপ। কোনো বাড়িতে বেড়াতে গেছেন? দেখবেন, প্রতিটি অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়ে বিব্রতবোধ করছেন। কেউ অভিযোগ করছেন, তাদের সন্তানগন কথা শুনছে না, কেউ কথা রাখছে না, কেউ আদব-কায়দা শিখছে না, কেউ কেউ আবার তাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝার চেষ্টা না করে বিপথে চলে যাচ্ছে, ইত্যাদি। কারো অভিযোগ স্কুল কলেজের বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে, কারো অভিযোগ সমাজের বিরুদ্ধে, আবার কারো অভিযোগ নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে। আর এই অভিযোগকারীগন সবাইকে আমরা চিনি। যিনি অভিযোগ করছেন এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, সবাই কোনো না কোনভাবে আমরাই। আমার সবাই অভিযুক্ত। আবার অন্যদিকে, আমরাই আবার এই অভিযোগগুলির সমাধান, পরিবর্তন চাই। সবাই চাচ্ছি পরিবর্তন, সবাই চাচ্ছি সস্থি, সবাই চাচ্ছি একটা “বদল”। তাহলে পরিবর্তনটা আসছে না কেনো? কোন জায়গাটায় সমস্যা তাহলে?

সমস্যা আসলে শুধু এক জায়গায়। আমরা সবাই বলছি, সব ভালো হয়ে যাক, সবাই বলছি পরিবর্তন হোক, সবাই বলছি “বদল” হোক, শুধু “আমি ছাড়া”। প্রকৃত সমাধান আসলে এই “আমি”র মধ্যে।

যখন কোনো বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কোনো এক শাশুড়ির এই কথা শুনবেন যে, আমার মেয়ের স্বামীটা অনেক ভালো, সে আমার মেয়ে যা বলে, যা আবদার করে, আমার মেয়ের স্বামী সবকিছু শুনে এবং মেনে চলে। কি লক্ষি মেয়ের স্বামী। কিন্তু আমার নিজের ছেলেটা এতো খারাপ যে, সে বউয়ের কথায় নাচে, উঠে আর বসে। তাহলে আপনি এই শাশুড়ির কাছ থেকে কিভাবে “বদল” চাইবেন? কোনো একটা বিয়ের আসরে গেছেন? পুরানো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। সে কোনো এক স্কুল কিংবা কলেজে চাকুরী করেন, কিন্তু তার সন্তান তার স্কুলে বা কলেজে পড়েন না। কারন সেখানে খুব ভালো পড়াশুনা নাকি হয় না। তাই তিনি তাদেরকে স্কুল বা কলেজে নিজের সন্তানকে পড়ান না। কিন্তু তিনি অন্যের সন্তানদেরকে ওখানে পড়ান। অন্যের সন্তানকে নিয়ে তার চিন্তা নাই, একরকম করে দিন কাটিয়ে দিলেই হল। তিনি তার সন্তানদের পড়াচ্ছেন এমন এক স্কুল বা কলেজে যেখানে ওই স্কুল কলেজের মাসিক বেতনই হাজার হাজার টাকা। ফলে এই অতিরিক্ত টাকা আয় করার জন্য তো তাঁকে বিকল্প পথ বের করতেই হবে। আর এই বিকল্প পথে টাকা আয় করার জন্য তো তাঁকে তার চাকুরীর সময় থেকেই নিতে হবে। তার সময় কই তার অধীনে অধ্যায়নরত ছাত্রকে সময় নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার? আবার তিনিই “বদল” চান এই সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার। তাহলে আপনি কিভাবে কার “বদল” চাইবেন?

পাশের বাড়ির মেধাবী সন্তান জিপিএ-৫ পেয়েছে, সরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং, সরকারী মেডিক্যাল কিংবা ভালো ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু ফাঁকি দিয়ে লেখাপড়া না করা আমার সন্তান ভালো ফলাফল করতে না পারায় হয়ত নামকরা কোনো ইন্সটিটিউটে ভর্তি হতে পারছে না, তাতে কি? প্রাইভেট ইন্সটিটিউট তো আছে? শুধু টাকা হলেই সম্ভব। কোথা থেকে আসবে এই অতিরিক্ত টাকা? আমাকে তো ভিন্ন পথে যেতেই হবে, হোক সেটা ন্যায় কিংবা অন্যায়। আমার সন্তান কে তো আর যেই সেই ইন্সটিটিউটে পড়ালে চলবে না। আমার এই অতিরিক্ত টাকার সংস্থান করতে আমাকে অন্যায় কিছু করতেই হবে, হোক সেটা ঘুষ কিংবা অন্য কিছু। আবার এই আমিই ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বলছি। তাহলে পরিবর্তনটা আসবে কিভাবে? বৃদ্ধ বাবা বা মাকে নিয়ে বাসে উঠেছেন? সিট খালি নাই। পাশে এক তরুন সিট দখল করে বসে আছেন। কোনো মায়া মমতা, কোনো আদব কায়দা, কিংবা কোনো দয়া দাক্ষিন্যতা দেখিয়েও এই বৃদ্ধ মানুষটির দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টের কথা চিন্তা করেও তরুন তার নিজের সিটটা ছেড়ে দিতে নারাজ। কিন্তু এই তরুনই যখন তার নিজের বৃদ্ধ বাবা বা মাকে কোনো একদিন ওইরকম এক পরিস্থিতির সম্মুক্ষিন হবেন, তিনি আক্ষেপ করে বলবেন, দেশটা যাচ্ছে কই? কোনো আদব কায়দা কি কিছুই নাই? এবার আসি পরিবারের ভিতরে। আমি রিপাবলিকান দল করি, কেনো আমার স্ত্রী বা ছেলেমেয়ে রিপাবলিকান দল করবে না? আমারটা খাবে, আমারটা পড়বে, অথচ আমার দল করবে না, তাতো হবে না। আমার দলের বিরুদ্ধে কথা বলবে, এটাতো হবেই না। ছেলে ভালো আর্ট করতে পারে, কিংবা খুব ভালো অংক বুঝে, তাতে কি? আমার খুব শখ আমার সন্তান ডাক্তার হবে। কেনো আমার ছেলের কথায় আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং বানাতে হবে তাঁকে? আপনি কোনো এলাকায় নাম করেছেন, হোক সেটা গ্রাম্য বিচারের বেলায়, কিংবা সালিশীর বেলায়। আপনার গ্রামে করিমুদ্দিনও আপনার মতো আরেক নামীদামী গ্রাম্য বিচারক। করিমুদ্দিন কোনো বিচারে গেলে সেখানে আপনার না যাওয়াই শ্রেয় মনে করছেন কারন দুই নামীদামী বাঘ একসঙ্গে থাকে কিভাবে? কিংবা যদি রায়ের এদিক সেদিকে আপনার মতামতের মুল্যায়ন না থাকে সেই ভয়ে আপনি ন্যায় কিংবা অন্যায় যাই হোক না কেনো, আপনি পুরু বিচার কাজটাকেই অস্বীকার করে ফেললেন। তাহলে পরিবর্তনটা আসবে কিভাবে? আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আপনার মতাদর্শের কোন এক কর্মীকে অন্যায় কাজের জন্য ধরে নিয়ে গেছে? কোনো ব্যাপার না। আপনি সরকারী দল করেন, সব কিছুর উর্ধে আপনি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনিকে প্রলুব্ধ করে ছারিয়ে নিয়ে এলেন কয়েক ঘন্টার মধ্যে। আবার যখন আপনার বিরোধী দল সরকারী দল হয়ে যাবে, আপনি যখন সেই একই প্রক্রিয়ায় নিষ্পেষিত হবেন, সেই আপনিই বলবেন, দেশে কি কোনো আইনকানুন নাই? তাহলে পরিবর্তনটা হবে কিভাবে? আজ আমি “বদল” হচ্ছি না অথচ কাল আমি সবাইকে “বদল” হতে বলছি। লাভের আশায় আপনি খাদ্যে ভেজাল মিশাবেন, ফরমালিন দেবেন, মরা মুরগী রেস্টুরেন্টে সাপ্লাই দেবেন? দিন। কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু আগামিকাল আপনার সন্তান সেই ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে কিডনী নষ্ট করবে, মরা মুরগির রোষ্ট খেয়ে লিভার নষ্ট করবে। তার শরির খারাপ করবে, অসুস্থ হবে, যাবেন ডাক্তারের কাছে, গিয়ে দেখবেন, প্রশ্নপত্র ফাস করে পাশ করা ডাক্তার, ভেজাল ঔষধ সব আপনার সামনে একত্রে হাজির। অসুখ নিরাময় হবে না। একদিন আপনার আদরের সন্তান আপনার চোখের সামনে মারা যাবে। আর এভাবেই আমরা সবাই ঠকছি। কাকে আসলে ঠকাচ্ছি?

একজন চোরও আরেকজন চোরকে পছন্দ করে না, একজন ঘুষখোরও আরেকজন ঘুষখোরকে পছন্দ করে না। মেয়ে বিয়ে দেবেন, ভালো বংশ চান, ছেলে বিয়ে করাবেন? ভালো মেয়ে এবং ভালো পরিবার চান। আমরা সবাই তাই চাই। কিন্তু আমি আমার নিজের পরিবারকে ভালো একটি পরিবার হিসাবে গড়ে তূলতে পারছি না। আমি আমার সন্তানকে ভালো নীতির শিক্ষা দিচ্ছি না। তাহলে আমি কাকে বলছি, “বদল” হউন? ঘরে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরন করবো অথচ সামাজিক সেমিনারে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলবো, নিজে বন্ধুবান্ধব্দের নিয়ে নেশা করবো কিন্তু নিজের সন্তানকে নেশা করতে বারন করবো, নিজে ঘুস নেবো কিন্তু অন্যের বেলায় প্রতিক্রিয়া দেখাবো, তাতে তো “বদল” হবে না কিছুই। আমি কারো ফেলে যাওয়া কলার খোসায় পা পিছলে তার গুষ্ঠি উদ্ধার করবো কিন্তু আমি কলা খেয়ে একটু দূরে ডাস্টবিনে না ফেলে রাস্তায় তা ফেলে যাবো, তাতে তো “বদল” কিছুই হলো না। আমি নিশ্চিত জেনেও যখন কোন অন্যায়কারীর পক্ষে ওকালতি করবো, নিশ্চিত জানবেন, অন্য কেউ আমার উপর অন্যায় করলেও আরো ভুঁড়ি ভুড়ি আইনসেবক পাওয়া যাবে যারা আমার ন্যায়কে অন্যায়ভাবে একই প্রক্রিয়ায় রায় ঘুরিয়ে দিয়ে আমাকে পরাজিত করবে। বৃষ্টির দিনে এসি গাড়ির ভিতরে বসে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে পাশে পায়ে হাটা এক পথচারীর জামা কাপর ভিজিয়ে দেবো, অথচ তারজন্য আমি অনুতপ্তও বোধ করবো না, বরং তার দিকে তাকিয়ে মুচকি তাচ্ছিলের হাসি দিয়ে অথবা “ছোট লোকের দল” বলে গাড়ী হাকিয়ে চলে যাবো, তাহলে তো কোনোদিনই “বদল” বলে কিছু আসবে না।

তাহলে এখন আরো একটি প্রশ্ন আসে। আমরা এখন সত্যি সত্যিই “বদল” হতে চাই। কিভাবে? সহজ পথ। আমরা সবাই সেটা জানি। এক কথায় যদি বলি। তাহলে সেটা দাড়ায় “ইনসাফ”। নিজের প্রতি নিজের ইনসাফ। আর এটাই করতে বলেছে ধর্ম। সেটা যার ধর্মই হোক। কোনো ধর্মই বে-ইনসাফি কাজ করতে আদেশ দেয় নাই। কোনো ধর্মই অন্যায় কাজকে প্রলুব্ধ করে নাই। কোনো ধর্মই মানুষের অধিকারকে হরন করতে বলে নাই। সব ধর্মের নিগুড় উপদেশঃ হত্যা, নিপীড়ন, ঘুষ, সুদ, অপহরণ, অন্যায়, গিবত, অহংকার, মারামারি, লোভ, অশ্লীলতা, নেশা, চুরি ডাকাতি, ভেজাল, ঠকবাজী, হটকারিতা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। আর মানুষের মঙ্গল হয় এমন কাজ করুন। আপনি করুন, মানুষ উপকৃত হবে, মানুষ করবে, আপনি উপকৃত হবেন। এই অভ্যাস এবং কাজগুলি একদিনে হয়ে উঠবে না। আবার আপনি করছেন, কিন্তু অন্য এক জন করছে না দেখে আপ্নিও বিরক্ত হবেন, কিচ্ছু যায় আসে না। আপনি আপনারটা করুন। একদিন এই সংখ্যাটা বাড়বেই। প্রতিদিন এই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। A smile can be a charity. তাই দিয়েই শুরু করুন।

কেউ কেউ হয়ত আবার প্রশ্ন করবেন, আমরা তো ধর্মকে পালন করছি। আমরা তো জানি ধর্ম কি কি বলেছে। তাহলে এর পরেও বদল হচ্ছে না কেনো? এর বিকল্প কি? এর উত্তর একটাই।

জানার নাম ঈমান নয়, মানার নাম হচ্ছে ঈমান। যদি জানার নাম ঈমান হতো তাহলে ইবলিশই হতো সবচেয়ে বেশী ইমানদার। ইবলিশ জানতো অনেক কিছু, সে মানে নাই, কিন্তু আদম অনেক কিছুই জানতেন না, তিনি মেনেছেন। আমরা ধর্ম মানছি, আমরা ধর্মের সব কিছু পালন করছি না।

সময় শেষ হয়ে যায় নাই। “বদল” সম্ভব। আজ থেকেই সম্ভব।   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *