১৯/১২/১৯৮৫-১৩ লং পাসিং আউট

আজ আমাদের পাসিং আউট প্যারেড হয়ে গেলো। গত কয়েক মাস যাবত নিরবিচ্ছিন্ন পাসিং আউট প্যারেডের প্র্যাকটিস করতে করতে এক রকম রোবোটের মতোই হয়ে গিয়েছিলাম। সকাল থেকে শুরু হয় প্র্যাকটিস আর সেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। জেন্টেল্ম্যান ক্যাডেট থেকে কমিশন অফিসার হয়ে যাওয়ার এই বিশাল মেকানিজমে যা দেখেছি তা এক জীবিনের অভিজ্ঞতা।

              

যেদিন প্রথম বি এম এ তে ঢোকেছিলাম, সেদিন গেটে ঢোকেই হতভাগ হয়ে গিয়েছিলাম। এই কারনে যে, আমরা সবাই খুব সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় পড়ে এসেছিলাম। কেউ টাই পড়ে, কেউ কোট পড়ে, কেউ আবার বিদেশী স্টাইলের হেট পড়ে। সবার ভাবখানা এই রকম, জেনারেল সাহেব বনে গেছি ইতিমধ্যে। এই রকম একটা ভাব সবার মধ্যেই ছিল। আমি বি এম এ স্টাফ বাসে করে চিটাগাং থেকে হালি শহরের মধ্যে ঢোকি। যেই না গেটের ভিতরে ঢোকেছি, অমনি এক দল স্টাফ হটাত করে অতর্কিতে খাস আজরাইলের মতো গাড়ির সামনে এসে দাড়ালেন আর হুংকার ছাড়লেন, গেট ডাউন, নো টাইম।

আরে টাইম তো কিছু লাগবেই নাকি? এটা আবার কেমন কথা, নো টাম গেট ডাউন। সরু বাসের গেট, তারাহুরা করতে গয়ে গেটের মধ্যেই অনেকে আমরা আটকা পড়ে গেছি। তারমধ্যে কারো কারো হাতে আবার ছোট ছোট ব্যাগ। কিসের কি। স্টাফ রা এমন করে আমাদের সাথে আচরন করতে লাগলেন যেনো আমরা সবাই আসামী, আর দাগী কিছু।

কে শুনে কার কথা। শুরু হয়ে গেলো আজরাইলের মতো ব্যবহার। কেউ ধাক্কা দিচ্ছে, কেউ আবার টানাটানি করছে। কেউ আবার সুটকেস নামানোর জন্য একটু অপেক্ষা করছিলো, তাদেরকে ওই সুটকেসসহই কুলিমুজুরের মতো বসিয়ে দিয়ে সুটকেস সহকারে দৌড়াতে আদেশ দেওয়া হল। বসে বসে দৌড়ানো আমি এই প্রথম শুনলাম। প্রতিবাদ করবেন? কোনো উপায় নাই। এখানে কেউ কারো কথা শুনেও না, বুঝেও না। আপনি যদি না বুঝেন, সেটা আপনার সমস্যা এবং এর সমাধান- একটাই- কন্টিনিউয়াস রগড়া।

১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে আমরা সবাই বিশাল বিশাল ড্রেনের ভিতর সাতার কাটতে থাকলাম। ব্যাপারটা যেনো এই রকম, সবাই মাছ ধরছি, তাও আবার মনের আনন্দে। পায়খানা, পচা ময়লা, পলিথিন, আর কি যে আছে, তাও জানি না। এর মধ্যেই মাথা ভিজিয়ে ডুব দিয়ে কি যে রত্ন খোজা, কে জানে। উপরে দাঁড়ানো আজরাইল গুলি আবার মাঝে মাঝে এই রকম রংগ করছেন যে, “কি সাহেব, কিছু পেলেন? এখনো পান নাই? খুজতে থাকেন”

এই যে একটু আগে টাইটুই পড়ে বাবু হয়ে সেজেগুজে এসেছিলাম, এখন কাউকে দেখলে বুঝার কোনো উপায় নাই, কোনটা টাই আর কোনটা আমার মুখ। সারা বছর এই নোংরা পানি আর মল মুত্রের আড্ডাখানা ড্রেনটা আমাদের নদীর সাতারের একটা বদ্ধ খালের মতো মনে হলো। দূর্গন্ধ আর নোংরা পানিতে একাকার। ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মহামান্য রথীগন। কেউ টু শব্দ করলেই নতুন আইটেম। যা আরো ভয়াবহ। চল্লো এইভাবে প্রায় ৩০/৪০ মিনিট। তার পর পরের আইটেম।

দয়া পরবশ হয়ে মহারথী স্টাফ গন আমাদেরকে গলা অবধি ডুবে থাকা ড্রেন থেকে উঠে আসার আদেশ করলেন। আমরা হাসের বাচ্চার মতো সবাই কোনো টু শব্দ না করেই একে একে উঠে এলাম। এখানেও তাড়াহুড়া। কেনো আমি ওর আগে উঠতে পারলাম না, তাই, ওই দূরের গাছটাকে দৌড়ে গিয়ে একবার টাচ করে আসতে হবে। কি এক মহাজজ্ঞ।

এইভাবে প্রায় সারাটা বিকাল আর প্রায় রাত ১টা পর্যন্ত চল্লো আমাদেরকে সিভিলিয়ান থেকে ফৌজের ধারায় মোটিভেট করার কৌশল। কোনো খাওয়া দাওয়া নাই, কোনো রেস্ট নাই, কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত টর্চারে বমিও করে দিচ্ছে। মহারথী স্টাফগন এর মাঝে আবার কৌতুক করে বলছেন, কেউ কি ক্ষুধার্থ? যে বলেছে, সে ক্ষুধার্থ, তাকেই ওই বমির কাছে নিয়ে গিয়ে বলছেন, খেতে পারেন। উফ, কি অমানুষ। কিন্তু কিছুই করার নাই। হয় ক্ষুধা নিবারন করবেন, না হয় ক্ষুধা আছে এটা বলা যাবে না।

রাত ৮টার পরে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো নাপিতের দোকানে। বিএমএ এর নাপিতও অনেক সেয়ানা।  মাথাটা ধরলেন, বাটির মতো করে ঘ্যাচাং করে চারিপাশ এমন করে কাটলেন, যা আমি আজো এই রকম বাটিছাট দেখি নাই। না আছে এর কোনো স্টাইল, না আছে কোনো ক্যারিশমা, না আছে কোনো মহব্বত। কোনো কথা বলবেন নাপিতের সাথে? ওরে বাবা, সেও আরেক দফা সামরীক জেনারেল। তবে চুল কাটার সময় মনে হইলো, আহা, কি শান্তি। অন্তত কিচুক্ষন সময় তো আজরাইলদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া গেলো। আরামে চোখ বুজে আসে কিন্তু নাপিতের ঝাকুনিতে তন্দ্রা ভেংগে যায়। এইভাবে রাত শেষ হয়ে কখন যে ভোর হয়ে যায় টুকরো টুকরো শাস্তির বিনিময়ে বুঝতেই পারি নাই।

১ম টার্মকে বলা হতো শিটপট, মানে পায়খানার সমান এরা। ২য় টার্মকে বলা হয় বদনা। অন্তত কিছুটা সলিড বস্তূ, ৪র্থ টার্ম মানে মহারাজা। সর্বত্র তার রাজত্ব। শিটপটেরা কোনো সিনিয়রকেই আজ পর্জন্ত চোখে দেখে নাই। সিনিয়র দেখলেই চোখ বন্ধ। ভাবখান এই রকম যে, না জানি কোনো এক মহারাজারা যাচ্ছেন পাশ দিয়ে। বি এম এর ইতিহাস লিখে শেষ করা যাবে না। প্রতিদিন নতুন ইতিহাস, প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা।

এইভাবে ২ বছর পার করে আজ সেই কাঙ্ক্ষিত পাসিং আউট। কি যে অনুভুতি ভাষায় বুঝানো যাবে না। যে স্টাফগন একদিন আমাদেরকে কারনে অকারনে ট্রেনিং করানোর জন্যে অনেক বাজে ব্যবহারও করেছেন, আজ সেই সব স্টাফগনই র‍্যাংক পড়ার পর সামনে এসে স্যালুট দিয়ে বললেন, স্যার, কত ভুল করেছি, কিছুই মনে রাইখেন না। জড়িয়ে ধরলাম।

কাল চলে যাবো বিএমএ থেকে। এতো ছাড়তে চেয়েছিলাম এই স্থানটি, এর উপর কত রাগ, কত গোস্যা, আজ যখন আমাকে এই জায়গাটি ছাড়তেই হবে, তখন মনে হচ্ছে, এটা তো আমার জায়গা। ছেড়ে যেতে কিছুতেই মন চাইছে না। এই রাস্তা, এই পাহাড়, এই ডরমেটরী, এই পিটি গ্রাউন্ড, এই সব গাছপালা সব কিছু আমার চেনা। এখানে প্রতিটি জায়গায় আমার পায়ের চিহ্ন আছে, প্রতিটি মোড়ে মোড়ে আমার ঘামের গন্ধ আছে। তবু আমাকে যেতেই হবে নতুনকে স্থান দেওয়ার জন্য।

১০ দিনের ছুটি। এসেছিলাম সিভিলিয়ান হিসাবে, আজ বের হচ্ছি সামরীক মানুষ হিসাবে। ভবিষ্যৎ কি, কেমন, কোথায় আমার কিছুই জানা নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *