২০/০৯/২০১৭ -অগ্নিশর্মা বাবু

Categories

অগ্নিশর্মা বাবু সুদুর আফ্রিকার জঙ্গলে ভ্রমন করিতে গিয়া অনেক সুন্দর একখানা ফলের চারা দেখিয়া সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিলেন। ভাবিলেন, আহা, আমার বাগানে ইহা লালন পালন করিয়া আরো সুন্দর করিয়া তুলিবো। জঙ্গলে অপরিচর্যায়ই যখন এতো সুন্দর করিয়া উহা বাড়িয়া উঠে, পরিচর্যা পাইলে না জানি আরো কতো সুন্দর করিয়া আপনার বাগানকে আরো সৌন্দর্য বর্ধন করিবে। কতলোক দেখিতে আসিবে, কতলোক ইহার কাহিনী শুনিয়া তাহাকে পাইতে স্বপ্নে বিভোর হইয়া থাকিবে। কিন্তু উহা আর কারো কাছেই নাই শুধু তাহার বাগান ছাড়া। ইহাই যেনো অগ্নিশর্মা বাবুর একটি অতীব শান্তি।

-আনিলেন।
-লাগাইলেন
-শখের চারা। মালির পরিবর্তে তিনি নিজেই উহার পরিচর্যার ভার নিলেন

-প্রতিদিন উহার বাড়িয়া উঠার সব রকমের উপকরন রীতিমতো দিতে থাকিলেন। কখনো দুস্টু লোকের হাতছানীর হাত হইতে রক্ষার জন্য খাচা বানাইয়া, কখনো বৃষ্টির কবল হইতে বাচাইবার জন্য ছাউনী দিয়া, কখনো আবার উলুপোকার উপদ্রব হইতে বাচাইবার জন্য চারার গায়ে সুই ফুটাইয়া ঔষধ লাগাইয়া দিলেন।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, অগ্নিশর্মা বাবু দেখিলেন, উহা বাড়তির দিকে না যাইয়া শুধু অধোপতনের দিকে যাইতে লাগিলো। তিনি চিন্তিত হইয়া গেলেন। তাহার ঘুম নষ্ট হইতে লাগিলো, ঘুম নষ্ট হইবার সাথে সাথে সপ্নও ভাঙিতে লাগিলো। তাহার বাগানের অন্যান্য অনেক সুন্দুরী ফলের গাছ, ফুলের চারার উপর অগ্নিশর্মা বাবুর মনোযোগ ক্রমশ কমিতে লাগিলো। তাহার এই অমনোযোগের কারনে বাগানের শ্রী যেনো ধীরে ধীরে আরো খারাপ হইতে লাগিলো। সাজানো বাগানে যেনো ইদুর মরার গন্ধ বাহির হইতে লাগিলো। মরা গাছের ঢাল ক্রমেই বাড়িতে লাগিলো। কি সর্বনাশ!! এই এক আফ্রিকার চারার জন্য অগ্নিশর্মা বাবুর এতো দিনের বাগানের হাল কি হইতে কি হইয়া গেলো?

তাহার পরেও মন বলিয়া কথা। অনেক উচ্ছাস আর আবেগ লইয়া যে চারাটি অগ্নিশর্মা বাবু রোপন করিয়াছিলেন।  উহার এমন অকাল মৃত্যু হইতেছে ইহা তিনি কখনো ভাবিতে পারেন নাই। এমন নয় যে, চাড়াটিতে তিনি কম জল ঢালিয়াছেন, কিংবা তাহার তাহার যত্ন কম নিয়াছেন, কিংবা এমন নয় যে, সময়ের সাথে সাথে উহার কোনো পরিচর্যার অভাব হইয়াছিলো তবুও চারাটি মরিতে শুরু করিয়াছে। কি হইতে পারে উহার এই রকমের পতনের কারন? মনের এই খুতখুতি হইতে রেহাই পাইবার জন্য অগ্নিশর্মা বাবু অনেক গবেষণাও করিলেন।

কি কারনে ইহার অধোপতন হইতে পারে তাহার সবরকমের সম্ভাব্য কারন লইয়া ভাবিতে লাগিলেন। টব পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর টবের মধ্যে তিনি তাহা রাখিয়াছিলেন। সুতরাং টব উহার মৃত্যুর জন্য দায়ী নয়। মালী যত্ন নেয় নাই এইরূপ দোসারূপ তিনি করিতে পারিবেন না কারন মালী তিনি নিজেই ছিলেন। তদারকীর কোনো গাফিলতি ছিলো না। বিজ্ঞ নার্সারির একদল বিশিষ্ট গবেষকের দ্বারা পরীক্ষা করাইয়া দেখিলেন, উহা যেই জাতের চারা, তাহার সব কিছুই ঠিক আছে বলিয়া মন্তব্য করিলেন। তবে তাহার মন্তব্যের নীচে একটি ছোট নোট লিখিতে ভুলিয়া যান নাইঃ

“অধিককাল উহা স্বাভাবিক আলো–

বাতাস বিবর্জিত এমন এক স্যতস্যাতে গোমট ছায়াতল পরিবেশে বড় হইয়াছে, ফলে ঊহার ভিতরের শিরা উপশিরা, জীবন প্রনালীর ধারা স্বাভাবিক ধারা হইতে পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। ফলে চারাটি আর বর্তমান সুস্থ পরিবেশের সহিত খাপ খাওয়াইয়া চলিতে অপারগ। ইহার বনজ গুনাবলী পুরুপুরি পরিবর্তিত হইয়া বন্য গুনাবলিতে রুপান্তরীত হইয়া গিয়াছে বিধায় সার্বক্ষণিকপরিচর্যায়ও আর কোনো লাভ হইবে বলিয়া মনে হয় না। উহার সমগোত্রীয় চারার জন্য যে আদর্শিক পরিবেশ দরকার তাহা উক্ত চারাটির জন্য প্রযোজ্য হইবে না। তবে যদি পুনরায় উহাকে আলো–বাতাস বিবর্জিত, স্যাতস্যাতে গোমটযুক্ত পূর্বেকার পরিবেশে ফেলিয়া রাখা যায়, উহা অতি তাড়াতাড়ি বাড়িয়া উঠিবে। ইহার জন্য স্বাভাবিক বাগানের পরিবেশ প্রযোজ্য নহে। তবে সেক্ষেত্রে ইহার উপর কোনো ভার, কিংবা কোন কোন লতাপতার ভর দেওয়া যাইবে না কারন উহা এইরূপ কোন ভাড় নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে নাই। “

–মন্তব্য পড়িয়া অগ্নিশর্মা বাবু বুঝিলেন, চারাটিকে আর তাহার বাগানের অন্যান্য ফল, ফুলাদি কিংবা অন্যান্য চারাদের সাথে রাখা সম্ভব হইবে না। আর শুধুমাত্র এই চারাটিকে বাচাইয়া রাখার জন্য বাকী সব চারাদের মুল উৎপাটন করা তাহার পক্ষে সম্ভব হইবে না। রাগে দুঃখে টব সমেত অগ্নিশর্মা বাবু অগ্নিরূপ ধারন করিয়া সেই সুদুর আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা দেখিতে সুন্দর কিন্তু বিষাক্ত চারাটিকে তিনি বাগানের বহুদূরে নিক্ষেপ করিয়া রাগ সামাল দিলেন। একবার ফিরিয়া তাকাইবার ইচ্ছা হইতেছিলো বটে কিন্তু উহাকে আর দেখিতেও মন চাহিলো না। উহার আফ্রিকার জঙ্গল হইতে আনিবার পর এই বাগানের চত্তরের ইতিহাস চিরতরে নির্মূল করিয়া মালিকে উচ্চস্বরে আদেশ করিলেন, আর বলিলেন, বাগানের প্রবেশ পথে ” আফ্রিকার যতো সুন্দর গাছ কিংবা চারা, কিংবা ফল অথবা ফুলের যে কোনো চারাই হোক না কেনো, ইহা এই বাগানে প্রবেশ নিষিদ্ধ” লিখিয়া দাও।

মালি কোনো কথা না বলিয়া শুধু অবাক হইয়া অগ্নিশর্মা বাবুর দিকে তাকাইয়া তাহার প্রস্থানের দৃশ্য অবলোকন করিলেন। বাবু যাওয়ার পর মালি একটু পরে হাতের কাছে জলের বালতি লইয়া অন্যান্য গাছের গোড়ায় জল ঢালিতে লাগিলেন আর ভাবিতে লাগিলেন, আফ্রিকার জঙ্গলটি কোথায়? জঙ্গলে কি বাগান চাষ হয়?  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *