২২/১১/২০২৩-মানুষের জীবন মৃত্যু

মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত। যতোক্ষন জীবিত আছে, তাকে নিয়ে কেউ না কেউ সব সময়ই ব্যস্ত থাকে। হোক সে স্বনামধন্য কোনো ব্যক্তি বা সবার অগোচরে পালিয়ে বেড়ানো কোনো মানুষ। যারা এই সমাজের উঁচু স্তরে থাকেন, তাদের বেলায় সবার ব্যস্ততা একটু বড় পরিসরে আর যারা কোনো স্তরেই নাই, তারা হয়তো সীমাবদ্ধ শুধুমাত্র তার ঘরে বা পরিবারের মধ্যে। যখন কেউ আর এই দুনিয়ায় থাকেন না, সবার পরিনতি প্রায় একই রকমের, অর্থাৎ মুছে যাওয়া। তদুপরি সবার সব মুছে না গেলেও তাদের কিছু কিছু কৃতকর্মের জন্য মাঝে মাঝে আলোচনার বিষয়বস্তুতে চলেই আসেন।

এই কথাগুলি বলার কারন হচ্ছে-গতকাল ২১ নভেম্বর উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াতে সেনাকুঞ্জে গিয়েছিলাম। প্রতিবছরই যাই। সেখানে এবার দেখেছি, গত বছরে যারা অনেক হোমরা চোমড়া ব্যক্তিদের তালিকায় সচল ছিলেন, তারা আজ কারো না কারো দ্বারা রিপ্লেসড এবং তারাও প্রায় মৃত কোনো মানুষের মতোই। সেই আগের হাল হকিকত নাই, সেই দাপট নাই, সেই আচরনও নাই। অথচ সেই আগের মানুষটাই আছেন, আগের নামটাতেই আছেন শুধু নাই স্তরের পজিশনটা। এখন সেখানে প্রতিস্থাপিত হয়েছেন নতুন কোনো মুখ, নতুন কোনো চরিত্র, নতুন কোনো নাম।

কথা হচ্ছিলো এককালের মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সাথে। উনি মন্ত্রী ছিলেন, কথা হচ্ছিলো সাবেক তিন সেনাপ্রধানের সাথে-জেনারেল বেলাল, জেনারেল মুবীন এবং জেনারেল আজিজ। কথা হচ্ছিলো নেভীর সাবেক প্রধান শাহীন সাহেবের সাথে। এ ছাড়াও কথা হচ্ছিলো আরো কিছু জ্বলন্ত সাবেক ব্যুরুক্রেটদের সাথে। তারমধ্যে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী পরিষদের ক্যাবিনেট সচীব ইত্যাদি। ওনারা এর আগেও এই প্রোগ্রামে এসেছিলেন, আজকেও এসেছেন কিন্তু স্তয়াটাস এক নয়। এরই মধ্যে অনেকে আবার গত হয়েছেন যারা গত বছরে এসেছিলেন কিন্তু এবার আর আসার কোনো সুযোগই নাই। কারন তারা এ বছরের সশস্ত্র বাহিনী দিবস উদযাপনের হায়াত পান নাই। আবার অনেকেই ছিলো যারা ইচ্ছে করেই আজকের দিনের এমন একটা মহাগ্যাদারিং অনুষ্ঠানে ইচ্ছে করেই আসেন নাই কারন তারা আর এই অনুষ্ঠানে আসার মত পরিস্থিতিতে নাই। কারো নামে বদনাম, কারো নামে নিষেধাজ্ঞা, কারো নামে দূর্নিতির অভিযোগে তারা প্রায় সমাজে মুখ দেখাতেও ভয় পান।

এই যে একটা পরিস্থিতি, একটা পরিবর্তন এটা শুধু করতে পারে “সময়” নামক ফ্যাক্টর। “সময়” সবকিছু পালটে দেয়। পালটে দেয় নামের আগে পরের স্ট্যাটাস। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে গত বছরের ২১ নভেম্বরের ঘটনা। মনে পড়ে তার আগের অনেক ঘটনা যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা আজ জীবন্ত থেকেও অনেকের কাছে খুবই অ-জীবন্ত। তখন সময়টা ছিলো তাদের ঘিরে, আজ তারা একই স্থানে একই ব্যক্তি একই অনুষ্ঠান হওয়া সত্তেও আজ তারা ততটাই অবহেলিত হচ্ছেন যতোটা তারা অবহেলা করেছিলেন অন্যদেরকে সেই সময়ে যখন তাদের কাধ ভারী ছিলো ব্যাজে। যখন তাদের হাতে ছিলো চেয়ারের ক্ষমতা।

দেখলাম, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ এককোনে একটা চেয়ারে বসে আছেন। কেউ তার সাথে কথাও বলার সুযোগ নিচ্ছে না। দেখলাম রাশেদ খান মেননকে, এতিমের মতো একটা জায়গায় দাড়িয়ে কার সাথে যেনো কথা বলছেন। বুঝা যাচ্ছিলো যে, তিনি কথার ছলে সময়টা পার করছেন। দেখেছি আরো বড় বড় ব্যুরুক্রেটদেরকে। তাদের এই সাবেক হিসাবে আর আগের মতো কদর যেমন নাই, তেমনি কারো কারো ঘেন্নায় দাড়িয়ে আছেন সবার মাঝে। নিশ্চয় তাদের এখন খারাপ লাগে, নিশ্চয় ভাবেন তারা যে, কেনো আর আগের মতো মানুষ তাদেরকে সেই মুল্যায়নটা করছেন না? তিনি তো আর মরে যান নাই? মাত্র সাবেক হয়েছেন শুধু। আসলে, ক্ষমতা আর অবসর বড় অদ্ভুত জিনিষ। যখন কেউ ক্ষমতায় থাকেন, তারা যদি সেই সময়টায় সেই ক্ষমতাটা ইনভেষ্টমেন্ট করতেন মানুষের কাছে, আজ যখন আর ক্ষমতায় থাকেন না, এখন তিনিরা এই সময়টায় এসে দেখতে পেতেন, প্রচুর মানুষ এখনো তাদের পিছু ছাড়ছেন না।

আমার ঘুরে ঘুরে এসব দেখতে খুব ভাল লাগে। দেখি আর ভাবি, কত অদ্ভুত সব মানুষজন। মানুষ সবদিক থেকেই চরম সার্থপর। কেউ আজকে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে, কেউ কাউকে ঠকালে এর প্রতিদান আজ না হোক, আগামিকাল এর প্রভাব হারে হারে পাবেনই। আজকে যাদের নামে রাস্তায় রাস্তায় অলিতে গলিতে ব্যানারের মাধ্যমে বন্দনা দেখি, ঠিক তার প্রস্থানে আগামিকাল তার সব ব্যানার খুলে আরেকজনের নামে বন্দনা শুরু হয়। আগেরজন এই পৃথিবীতে ছিলো কিনা এটাই মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়। আমার এলাকায় গত ৪০ বছরে একের পর এক রাজনৈতিক এমপি, মিনিষ্টার দেখেছি যাদের নামে আর ছবিতে ব্যানারে ব্যানারে রাস্তার গাছপালাও ঢেকে গিয়েছিলো। কিন্তু তাদের মৃত্যুতে কিংবা ক্ষমতা থেকে চলে যাবার পর সেইসব রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আর কোথাও দেখা যায় নাই। আমজনতা ইন্সট্যান্টলি ভুলে যায় তাদের। তারা কোটি কোটি টাকা রেখে যায় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বটে কিন্তু সেই অবৈধ আয় তার নিজের কোনো কাজে লাগে না বরং এই অবৈধ টাকার জন্য ইহকালের শাস্তির একটা বড় বোঝা কিয়ামত পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হয়।   

3 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *