২৩/০৪/২০২৩-ইউক্রেন এক্সিট প্ল্যান

অনেকগুলি অপারেশন দেখলাম আমার এই ছোট্ট জীবনে। সামরিক বাহিনীতে চাকুরী করার সুবাদে কিছুটা মিলিটারী ট্যাক্টিক্স বুঝতে সুবিধা হয় বলে আমি প্রতিনিয়ত আশেপাশের যুদ্ধাবস্থার খবরাখবর রাখতে পছন্দ করি। কাউকেই আমি যুদ্ধের ব্যাপারে সাপোর্ট করিনা। যুদ্ধ একটা ধ্বংসাত্মক ব্যাপার, জানমালের বিনাসের ব্যাপার। তারপরেও সময়ে সময়ে অহরহ কেউ কেউ যুদ্ধ করেই যাচ্ছে। আর সমকালীন সময়ে সবচেয়ে বেশী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে আমেরিকা নিজে।

আমেরিকার যুদ্ধের মারাত্মক নেগেটিভ সাইড হচ্ছে-তারা যুদ্ধ শুরু করতে খুবই পারদর্শী কিন্তু এক্সিট প্ল্যানে নয়। অথবা তাদের এক্সিট প্ল্যান থাকে না। সেটাই আমরা দেখেছি, ভিয়েতনাম, আফগানিস্থান, ইরাক ইত্যাদির বেলায়। সেক্ষেত্রে আমার এখন আরেকটা প্রশ্ন জাগছে- ইউক্রেনের বেলায় কি আমেরিকার কোনো এক্সিট প্ল্যান আছে যদি করতেই হয়?

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রায় ১ বছরের বেশী পার হয়ে গেছে আর এটা এখনো সেমি-স্ট্যালমেটেড অবস্থায়। দুপক্ষই তাদের দাবীতে অনড়। ইউক্রেন এই যুদ্ধে পশ্চিমাদের থেকে প্রায় শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রের সাহাজ্যে তাদের দেশকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা এবং ইউরোপিয়ানদের সরাসরি সাহাজ্য ছাড়া ইউক্রেনের পক্ষে এই যুদ্ধ চালানো কিছুতেই সম্ভব না। এই অবস্থায় একটা বিরাট প্রশ্ন জাগছে- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কি Forever War Territory তে পদার্পন করছে? ৯/১১ পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে বা আফগানিস্থানে যুগের পর যুগ আমেরিকা যুদ্ধ চালিয়ে গেছে, আর সেটার কারন অনেক। কখনো রিসোর্স, কখনো জিওপলিটিক্যাল, কখনো ওয়ার্ল্ড ডমিন্যান্স ইত্যাদি। কিন্তু ইউক্রেনের সাথে সেসব দেশের যুদ্ধের একটা পার্থক্য আছে-আর সেটা হলো-ইউক্রেনে আমেরিকার কোনো সৈন্য গ্রাউন্ডে নাই যা ইরাক বা আফগানিস্থানে ছিলো। 

প্রকৃত সত্য হচ্ছে- রাশিয়ার সাথে আমেরিকার জন্ম জন্মান্তরে শত্রুতা। এই শত্রুতার মাঝে ইউক্রেন হচ্ছে একটা ক্যাটালিস্ট। ফলে আমেরিকা যতো এগুবে, রাশিয়াও ততো এগুবে। এর শেষ হবার কথা নয়। ফলে ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির ঐতিহাসিক মিকাইল কিমাগের মতে- “This is going to be the mother of all forever wars, because of the nature of the adversary.”

৯/১১ পরবর্তীতে আল কায়েদার বিপরীতে যুদ্ধ ঘোষনা করে শেষ অবধি এটাকে ওয়ার অন টেরোরিজমে নিয়ে গিয়েছিলো আমেরিকা যা অদ্যাবধি চলছে। ইরাকেও তাই। প্রথমে ওইপন অফ মাস ডিস্ট্রাকশন, রিজিম চেঞ্জ, ন্যাশন বিল্ডিং, ইরানিয়ান ইনফ্লুয়েন্সকে কাউন্টার করা, অতঃপর আইএসআইএস এর বিপরীতে সৈন্য রাখা। এইম সব সময় বদলে গেছে শুধুমাত্র সামরিক উপস্থিতিকে জারী রাখার জন্য।

কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য কোথায় আমেরিকার? আমেরিকা না ইউরোপের কোনো দেশ, না সে এই অঞ্চলের কেউ। ফলে এখানে যেটা বলা হচ্ছে তা হচ্ছে- যুদ্ধটা গুড ভার্সাস ইভিল, ডেমোক্রেসি ভার্সাস অটোক্রেসি এই আইডলোজিতে।  টপ লেবেলের অফিশিয়ালগন একেকজন একেকবার একেক রকমের কারন দেখাচ্ছেন। বাইডেন প্রশাসন বলছেন-এটা এমন একটা কারন যাতে কেউ আর আগ্রাসি মনোভাবে অন্য কোনো দেশে মিলিটারী অপারেশন চালাতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা। ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ড বলেছেন- এটা করা হচ্ছে যাতে আমাদের সন্তানেরা এবং গ্রান্ড সন্তানেরা ইনহেরেন্ট করে এবং শিখে আমাদের কাছ থেকে। আর এভাবেই পাসচাত্যের এজেন্ডা একেকবার একেকদিকে শিফট হচ্ছে। এই রকম আইডলজিক্যাল শিফটের মধ্যে কোনো যুদ্ধ জয় করা সহজ নয়। ফলে যুদ্ধটা শেষ না হয়ে লম্বা সময়ের জন্য চলতেই থাকবে। প্রতিমাসে ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ লাগছে ইউক্রেন যুদ্ধে। আর এসব সরবরাহ করতে হচ্ছে ইউরোপিয়ান, আইএমএফ এবং আমেরিকাকে। রি-কন্সট্রাক্সন তো আরো অনেক খরচের ব্যাপার যদি যুদ্ধ থেমেও যায়। রাশিয়া এই যুদ্ধকে ইউক্রেন ভার্সেস রাশিয়া মনে করে না। সে মনে করে কালেক্টিভ ওয়েষ্ট, ন্যাটো ভার্সেস রাশিয়া। ফলে সে পিছুবে না। অন্যদিকে আমেরিকাও পিছু হটতে চাইবে না।

কিন্তু এর মধ্যে দুনিয়ার অনেক কিছু পালটে যাচ্ছে, পালটে যাচ্ছে জোট, পালটে যাচ্ছে ইকোনমি, পালটে যাচ্ছে কারেন্সী, পালটে যাচ্ছে শত্রু থেকে মিত্র আর মিত্র থেকে শত্রুতা। ইউরোপ ধীরে ধীরে ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনে পড়ে যাচ্ছে, ইকোনোমি দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। যখন আর পেরে উঠবে না, তখন হয়তো একসময় ইউরোপ নিজেই সস্তা গ্যাস আর তেলের জন্য পুনরায় প্রতিবেশী রাশিয়ার দারস্থ হতে হবে মনে হচ্ছে। আমেরিকার সাথে জোট ধীরে ধীরে লুজ হয়ে গেলে শেষ অবধি হয়তো কালেক্টিভ ওয়েষ্ট বাধ্যই হবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাবার।

সেক্ষেত্রে আমেরিকা কোন পদ্ধতিতে এই ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে এক্সিট করবে? সেটাই এখন দেখার ব্যাপার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *