২৪/০২/২০১৬-আমার প্রিয় মা জননীর দল,

 আমার প্রিয় মা জননীর দল,

আমি জানিনা যখন তোমরা আমার এই পত্রখানা পড়িবে তখন তোমাদের কত বয়স হইবে কিংবা আদৌ তোমরা এই পত্রখানা পরিতে পারিবে কিনা কিংবা পড়িলেও কখনো এর মর্মার্থ তোমরা বুঝিতে পারিবে কিনা। আর বুঝিতে পারিলেও কিভাবে এর অর্থ বুঝিবে তাও আমি জানি না। তবুও আজ মনে হইল তোমাদের উদ্দেশে আমার কিছু কথা বলা দরকার যাহা আমার মা আমাকে প্রায় দুই যোগ আগে বলিয়াছিলেন। আমি আমার  "উচ্ছিষ্ট সময়ের ডায়েরি" নামক ব্যক্তিগত ডায়েরিতে এই মুহূর্ত গুলি লিখিয়াছিলাম। তাহা আমি আজ তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করিতে চাই।

"............আজ হইতে প্রায় দুইযুগ আগে আমি যখন আমার মাকে আমার প্রথম ভালবাসার মেয়ের কথা জানাইয়াছিলাম, তখন তিনি মুচকি হাসিয়া আমাকে বলিয়াছিলেন, কে কাহাকে কত বেশি ভালবাসে তাহা কি তুমি ভাবিয়াছ? তুমি কি তাহাকে বিবাহ করিতে চাও? নাকি শুধু মনের আবেগে তোমার একাকীত্বকে দূর করিবার আখাংকায় তাহার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাইতে চাও? মজার ব্যাপার হইল, আমার মা মেয়েটি কতখানি সুন্দর, তাহার বাবার কি পরিমান সম্পদ বা সম্পত্তি আছে, তাহারা কয় ভাইবোন কিংবা তাহার পারিবারিক আর কোন তথ্য উপাত্ত কিছুই জানিবার জন্য আমাকে প্রশ্ন করিলেন না। শুধু বলিলেন, ব্যাপারে আমি কাল তোমার সঙ্গে আবার কথা বলিব এবং তোমার মনোভাব জানিব

আমার মায়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল এবং আমি তাহার সঙ্গে সব কথাই অকপটে বলিতে পারিতাম। মা কথাগুলি খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলিয়া আমাকে আমার মত করিয়া ভাবিবার সময় দিলেন আমার মা।  আমার মা শিক্ষিত নন। তিনি হয়ত তাহার জীবনে প্রাইমারী স্কুল পার করিয়াছেন কিনা তাহাও আমার জানা নাই। কারন তাহার বিয়ে হইয়াছিল যখন তাহার মাত্র ১০ বছর বয়স। নিতান্তই একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে।  কিন্তু তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমতী এবং প্রাক্টিক্যাল একজন মা। আমার বড় প্রিয় মানুষ তিনি

 

পরেরদিন আমি আর আমার মা আমাদের বাড়ির আঙিনায় বসিয়া আছি। বিকালের রোদ অনেকটাই কমিয়া গিয়াছে। সন্ধ্যা হইতে আরও কিছু বাকি। আমাদের বাড়ির বড় বরই গাছের মাথায় অনেক পাখির বাসা আছে। পাখিদের কিচির মিচির শব্দ হইতেছে অহরহ। কিচির মিচির করিয়া পাখিদল যে কি কথা কাহাকে বলিতেছে তাহা বুঝিবার ভাষা বা ক্ষমতা আমাদের কাহারো নাই। এইদিক সেইদিক উরাউরি করিতেছে আর যার যার বাসায় তাদের স্থান করিয়া নিতেছে।  দূরে গাছ গাছালিগুলি আস্তে আস্তে সন্ধ্যার ক্ষিন আলোতে ধুসর থেকে আরও কালো বর্ণের রঙ ধারন করিতেছে, বাড়ির গৃহস্থালিরা তাহাদের নিজ নিজ গরু ছাগল ভেড়া লইয়া গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিতেছে। কেউ কেউ আবার মনের আনন্দে সেই আব্দুল আলিমের ভাটিয়ালী কিছু গানের সুরে গানও গাইতেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠ হইতে খেলা ছারিয়া কেউ জোড়ায় জোড়ায় আবার কেউ দল বাধিয়া বাড়ির অভিমুখে হারাইয়া যাইতেছে। কিছু বয়স্ক মানুষ মাথায় কিছু মাল সামানা লইয়া হয়ত বা শহর কিংবা কাছের বাজার হইতে সদাই করিয়া তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়া যাইতেছে। দিনের শেষলগ্নে গ্রামের কিছু উঠতি বয়সের বধুরা অদুরে আমাদের ধলেশ্বরী নদী হইতে কাঁখে জল তুলিয়া কলসি ভরতি পানি লইয়া, ভিজা কাপড়ে হেলিয়া দুলিয়া মুচকি মুচকি হাসিতে আবার কখনো কখনো উচ্চস্বর আওয়াজে নিজেদের ঘরে আগমন করিতেছে। অদুরে কোন এক সদ্য প্রসব করা গাভি তাহার অবুঝ বাছুরটির সন্ধান না পাইয়া অবিরত হাম্বা হাম্বা করিতেছে। এমন একটি পরিবেশে আমি আর আমার মা মুখুমুখি বসিয়া আছি। বেশ সময় কাটিতেছে আমার। 

 

মা সর্বদা পান খান, মায়ের পানের বাটি যেন তাহার দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মত একটি অংশ। যেখানে যাইবেন, সেখানেই তিনি তার এই অতিব প্রয়োজনীয় সম্পদটি সঙ্গে রাখিবেন। পানের বাটিটি ব্যতিত যেন মায়ের কোন কিছুই আর এত মুল্যবান সম্পদ আমাদের ঘরের মধ্যে নাই। পানের বাটিতে মা তাহার ছোট পিতলের ডান্ডা দিয়া পান পিষিতেছেন, যেন অনেক যত্নের সহিত তিনি একটি খাদ্য রিসিপি বানাইতেছেন। পানের বাটির সঙ্গে পিতলের ডান্ডাটি ঠক ঠক আওয়াজে এক রকম টুং টাং শব্দ হইতেছে। এই রকম একটি পরিবেশে মা আমার দিকে না চাহিয়াই প্রশ্ন করিলেন, "কে আগে ভালবাসার কথা বলিয়াছিল? তুমি না সে?" মা আমাকে নিতান্ত সহজ সুরে যেন কিছুই হয় নাই এমন ভাব করিয়া প্রশ্নটি করিলেন। আমি বলিলাম, "কে আগে ভালবাসার কথা বলল, এতে কি আসে যায় মা? আমরা দুজন দুজনকেই তো ভালবাসি? সে আমাকে ভালবাসে আর আমিও তাকে ভালবাসি"। মা বলিলেন, আমার উপর ভরসা রাখ। আমি তোমাদের দুইজনকেই ভালবাসি যদিও আমি তাহাকে দেখি নাই কিন্তু তুমি তাহাকে ভালবাস। আর তুমি তাহাকে ভালবাস বলিয়াই আমি তাহাকেও ভালবাসি। কিন্তু তুমি তো আমার প্রশ্নের উত্তর এরাইয়া যাইতেছ বলিয়া আমার মনে হইল।"

আমি বললাম, "না মা। আমি তোমার কোন প্রশ্নের উত্তর এরাইয়া যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি না। তবে আমি প্রথম তার কাছ থেকে পত্র পাইয়াছিলাম সেইটা বলিতে আমার কোন দ্বিধা নাই। আমি পত্র পাইয়া বুঝিয়াছিলাম, যে, আমি ওকে ভালবাসি কিন্তু আমি বলিতে পারি নাই। সে বলিতে পারিয়াছিল। তাহার মানে এই নয় যে, আমি তাহাকে কম ভালবাসি  বা আমি তাহাকে ভালবাসি নাই।"

মা আমার মাথায় হাত বুলাইয়া, আমার পিঠে তাহার একটি হাত চালাইয়া আমার নাকের ডগায় আলতো করিয়া টীপ দিয়া বলিলেন, "তুমি তোমার জায়গায় ঠিক আছ তো? যদি ঠিক থাক, আমি চাই তুমি তাহাকে শাদি কর। তুমি সুখী হইবে"। 

 

আমি অবাক বিস্ময়ে আমার মায়ের দিকে তাকাইলাম, সন্ধ্যার অল্প অল্প আলোতে আমি তাহার চোখে মুখে যেন এক প্রশান্তির ছায়া দেখিতে পাইলাম, তিনি একদিকে তাহার ঘাড় বাকা করিয়া পানের বাটি হইতে পান লইয়া কিছু পিষিত পান নিজের মুখে পুড়িয়া আর বাকি কিছু পান আমার গালে পুড়িয়া দিয়া বলিলেন, "নে পান খা, ভাল লাগিবে। মায়ের দোয়ায় সন্তান সুখী হয়, তুইও জীবনে সুখী হইবি।" 

আমি পান মুখে লইয়া অবাক দৃষ্টিতে মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, "মা, তুমি কিভাবে আমার পছন্দের মেয়েকে না দেখিয়া, তাহার পরিবারের কারো কোন তথ্য না শুনিয়া, তাহার পরিবারের কোন ইতিহাস না জানিয়া এই সন্ধ্যায় এক নিমিষে জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিয়া আমাকে সুখী হইবে বলিয়া আশীর্বাদ করিলে?"

মা পানের পিক ফালাইতে ফালাইতে আমার মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন, " ভালোবাসার স্থায়িত্ব তাহার উপর নির্ভর করেনা, যাহাকে সে ভালবাসে, নির্ভর করে তাহাকে যে ভালবাসে তাহার উপর। সে তোমাকে ভালবাসিয়াছে প্রথম, তোমাকে ছাড়িয়া যাওয়ার কোন কারন না থাকিলে সে তোমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিবে এইটাই হওয়ার কথা। তুমি যাহাকে ভালবাস তাহাকে নয়, তোমাকে যে ভালবাসে তাহাকে তুমি তোমার জীবন সঙ্গিনী কর। তাহা হইলেই তুমি সুখী হইবে। আর ইহাই হইতেছে দাম্পত্য জীবনের সত্যিকারের রূপরেখা।'

আমি আমার মায়ের এত বড় দর্শন শুনিয়া খুব অবাক হইয়াছি। কি অদ্ভুত দর্শন।

মা বলিতে থাকিলেন, কাউকে কখনো তুমি তোমাকে ভালবাসার জন্য জোর করিবে না, বরং তোমাকে কেউ ত্যাগ করুক সেই ব্যাপারে কাউকে জোর করিতে পার। যখন জোর করিয়াও তাহাকে তুমি ত্যাগ করাইতে পারিবে না, নিশ্চিত থাকিবে যে, সে তোমাকে সত্যি ভালবাসে। তাহাকে তুমি তখন আরও বেশি করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিবে কারন সে তোমাকে ভালবাসে। যে তোমাকে সত্যিকার ভাবে ভালবাসে, শত কারন থাকা সত্তেও সে তোমাকে কোনদিন ছাড়িয়া যাইবে না। বরং সে একটিমাত্র কারন খুজিবে যে কারনের দ্বারা সে তোমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিতে পারে, ত্যাগ করিবার জন্য নয়। আর ইহাই হইতেছে প্রকৃত ভালবাসার দুর্বলতা। তুমি তাহার সঙ্গে জীবনে সুখী হইবে।

আজ এত বছর পর আমি উপলব্দি করিতে পারিতেছি যে, আজ হইতে প্রায় দুই যুগ আগে আমার সেই অশিক্ষিত মা যে দর্শন শুনাইয়াছিলেন, তাহা কতখানি সত্য এবং খাটি। আজ আমি আমার জীবনে এক অদ্ভুত সুখ আর আনন্দ লইয়া প্রতিটি দিন অতিবাহিত করি। কারন আমার সঙ্গে আছে সেই মানুষটি যে আমাকে ভালবাসিয়াছিল এবং আমিও তাহাকে ভালবাসিয়াছিলাম। কিন্তু সে আমাকে প্রথম ভালবাসার কথাটি বলিয়াছিল।

মা আরও একটি আস্ত পান তাহার অতি প্রিয় পানের বাটিতে সুপারি আর মশলা দিয়া পিষিতে লাগিলেন। আমার দিকে না তাকাইয়াই তিনি বলিতে থাকিলেন, তুমি নিশ্চয় জানো, একটা ব্রিজ বানাইবার জন্য যা যা লাগে আর একটা দেওয়াল বানাইবার জন্য যা যা লাগে তা একই উপকরন। কিন্তু একটি ব্রিজ দুইটি প্রান্তকে সংযোগ করে আর একটি দেওয়াল দুইটা প্রান্তকে পৃথক করিয়া দেয়। তোমাদের এই যুগলমিলন হইতে হইবে একটি ব্রিজের সমতুল্য। দেওয়াল নয়। এখন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হইবে তুমি কোনটা চাও এবং কিভাবে চাও আর কখন চাও। দাম্পত্য জীবনে এমন কিছু সময় আসিবে যখন তোমার কাছে মনে হইবে, সবাই ভুল আর তুমি ঠিক। হয়ত বা তুমিই ঠিক আবার তুমি ঠিক নাও হতে পার। তোমারও ভুল হইতে পারে। মা পানের বাটিতে তাহার পিতলের ডান্ডা দিয়া পান পিষানো একটু সময়ের জন্য থামাইয়া আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, একটা হাদিসের কথা বলি, 'যে ভুল করে সে মানুষ, আর যে ভুল করিয়া তাহার উপর স্থির থাকে সে শয়তান, আর যে ভুল করিয়া আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে মুমিন। ফলে অন্যের কোন কথা শুনিবামাত্রই তাহার উপর উত্তেজিত হইয়া কোন কিছু করিতে যাইও না। কারন, তাহার কথার সত্যতা যাচাই করা তোমার কাজ। তোমার জানা উচিৎ সে তোমাকে ঠিক কথাটিই বলিয়াছে কিনা। সে তোমাকে প্ররোচিতও করিতে পারে। কোন কিছুই বিচার বিবেচনা না করিয়া কোন মন্তব্য করা হইতে সবসময় বিরত থাকিবে। মনে রাখিবা, একবার একটা কথা কিংবা মন্তব্য বলিয়া ফেলিলে উহা আর ফেরত নেওয়ার কোন অবকাশ নাই। তখন শুধু হয় নিজেকে অপরাধী হিসাবে ক্ষমা চাইতে হইবে আর অন্যজন তোমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখিবে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখ। নিজের শক্তিকে বিশ্বাস কর। নিজের মানুষদের উপর বিশ্বাস রাখ। বিশ্বাস কর যে, তুমি পার এবং তুমি যা পার তা অনেকেই পারে না। আর অনেকেই যা পারে তুমিও তা পার।

আমার মায়ের কথাগুলি আমার কাছে এক অসামান্য দর্শনের মত মনে হইতেছিল। এত কথা মা কোথা হইতে জানিল, বা কে তাহাকে এইসব দর্শনের কথা বলিল আমি আজও ভাবিয়া কুল পাই না।

অনেক্ষন হইল সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। কিন্তু পশ্চিমের আকাশে এখনো লাল আভা দেখা যাইতেছে। খোলা উঠানে বসিয়া আছি বলিয়া চারিদিকের অনেক মশারাও তাহাদের উপস্থিতির কথা জানাইয়া দিতাছে। আমার মা তাহার দ্বিতীয় পানটি মুখে লইয়া কিছুক্ষন চাবাইয়া লইলেন। এবং তাহার চর্ব্য পান হইতে একটু পান বাহির করিয়া আমার মুখে গুজিয়া দিলেন। আমার মায়ের চাবানো পান আমার বড় প্রিয়।   

মা আজ অনেক কথা বলিতেছেন যা আমার কাছে এক নতুন অধ্যায়।

মা বলিতে থাকিলেন, শোন বাবা, জীবনে বড় হইতে হইলে জীবনের সব কয়টি কুরুক্ষেত্রকে তোমার মুখুমুখি হইতে হইবে। তুমি তো অনেক বড় বড় মানুষের জিবনি পড়িয়াছ, তাহাদের দর্শন তথ্য পড়িয়াছ।  আজ তাহলে তোমাকে একটা গল্প বলি। একদিন এক ঈদের দিনে আমার বাবা আমাকে একটা নতুন ফ্রক কিনিয়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি তা আমাকে আর দিতে পারেন নাই। হয়ত তাকা পয়সা ছিল না। তাই। আমার খুব মন খারাপ হইয়াছিল। সারাদিন আমার মন আর ভাল হইতেছিলনা। আমার মন খারাপ হইয়াছে দেখিয়া আমার বাবারও মন খারাপ হইয়াছিল। হয়ত তাহারও আমার মত ভিতরে ভিতরে একটা কষ্ট হইতেছিল তাহার এত আদরের মেয়ের মন খারাপ বলিয়া। কি জানি কি হইল আমি জানি না, আমার বাবার এক বন্ধু বিকাল বেলায় আমাদের বাসায় বেড়াইতে আসিলেন। হয়ত বাবাই নিমন্তন্ন করিয়াছিলেন। তিনি আমার বাবার খুব কাছের মানুষের মধ্যে একজন। হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি আমাকে অনেক আদর করিলেন, কেন আমার মন খারাপ তাহা জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি মুচকি হাসিয়া এক বিখ্যাত লেখকের উদ্দ্রিতি দিয়া আমাকে বলিলেন, "আমরা অনেক সময় একজোড়া জুতা না পাওয়ার বেদনায় চোখের পানি ফেলি কিন্তু কখনো কি একবার ভেবে দেখেছ যে, অনেকের তো পা ই নেই?" বলিয়া তিনি আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া খুব আদর করিয়া দিলেন। বলিলেন, কালই তিনি আমার জন্য নতুন একটি ফ্রক কিনিয়া দিবেন। তিনি এমন করিয়া আমাকে এই কথাটি বলিলেন, যে, আমি যেন ঐ পা বিহিন মানুষটির চেহারা দেখিতে পাইলাম।  তাই তো, কথাটা আমার খুব মনে ধরিয়াছিল। আমার আর মন খারাপ হয় নাই। আমি আর নতুন ফ্রকের জন্য কখনো মন খারাপ করি নাই। আমি বুঝিতে পারিলাম আমার নিজের অবস্থানটা নিয়ে সন্তুষ্ট না হইলে পৃথিবীর কোন কিছুই আমাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিবে না। আমি আমার বাবাকে জরাইয়া ধরিয়া অনেক কাদিয়াছিলাম। দুঃখে নয়, এতক্ষন যে বেদনাটা আমাকে খুব কষ্ট দিতেছিল, সেইটা যে বাবার বাবার বুকের ভিতরে গিয়া বাবাকেও কষ্ট দিতেছিল এই মনে করিয়া আমার চোখ আরও আবেগপ্রবন হইয়া উঠিতেছিল। আমার ছোট্ট বালিকা হৃদয়ের এই অফুরন্ত নিস্পাপ সাবলিল ভালবাসার চোখের জলে আমি আমার বাবাকেও কাদিতে দেখিয়াছিলাম। তাহার কান্নাও কোন কষ্ট হইতে নয়। নিছক ভালবাসার। এইটার নামই পরিবার। এইটার নামই হচ্ছে ভালোবাসা। নিজকে লইয়া সন্তুষ্ট থাক। ইহাতে সুখের পরিমান বাড়িবে। সবসময় একটা উপদেশ মনে রাখিবা যে, নিশ্চয় তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে কোন উদ্দেশ্যবিহিন এই পৃথিবীতে প্রেরন করেন নাই। তার উদ্দেশ্য আমাদের স্বপ্নের চেয়ে অনেক উত্তম এবং তাহার রহমত আমার হতাশার থেকেও অনেক বেশি। ঈশ্বরকে বিশ্বাস কর। তিনি তোমাকে কোন কিছুই না থেকে অনেক কিছু পাইয়ে দেবেন, যা আমার তোমার চিন্তা জগতেরও বাইরে। আর কাউকেই অবহেলা কর না। তোমার অবহেলা করার একটাই অর্থ দাঁড়াইবে, আর সেটা হচ্ছে তুমি তাহাকে তোমাকে ছাড়া চলিতে পারার অভ্যস্থ করিয়া তুলিতেছ। সবাই তোমার মতবাদ পছন্দ নাও করিতে পারে, সবাই তোমার মত করিয়া ভাবিতে নাও পারে। তুমি যে শার্টটা পছন্দ কর, সেই শার্টটা অন্য একজনের পছন্দ নাও হইতে পারে। এই পৃথিবীতে কিছু কিছু লোক তোমার জীবনে আসিবে আশীর্বাদ হইয়া, আবার কিছু লোক আসিবে শিক্ষণীয় হইয়া। আর এইটাই জীবন। তুমি আমাকে কিছুক্ষন আগে একটা প্রশ্ন করিয়াছিলে না যে, আমি তোমার পছন্দের মেয়েটির কোন কিছুই না জানিয়া, তাহার পরিবারের কি আছে আর কি নাই এই সব কিছুই না জানিয়া কিভাবে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিলাম? জীবনে শুধু টাকা পয়সা দিয়াই সব কিছুর মাপকাঠি হয় না। টাকা পয়সা সব কিছু কিনিতে পারে না। টাকায় তুমি আচরন কিনিতে পারিবে না, টাকায় তুমি সম্মান কিনিতে পারিবে না, টাকা দিয়া তুমি চরিত্র কিনিতে পারিবে না, টাকা দিয়া তুমি বিশ্বাস, ধৈর্য, শ্রদ্ধা, বিনয় এইগুল কিছুই কিনিতে পারিবা না। টাকা দিয়া তুমি ভালবাসাও কিনিতে পারিবা না। আর এইসব গুণাবলীগুলো তো আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের সবচেয়ে জরুরী বিষয়। যে ভালবাসিতে জানে, তাহার টাকার দরকার হয় না। আধামুঠো অন্ন খাইয়াই তাহার মন ভাল থাকে, তাহার দেহ ঠিক থাকে, তাহার আত্মা তৃপ্ত থাকে। ইহার পরেও আরও কথা থাকে। তোমার এই তৃপ্ত জীবনে তোমার পথে অনেক ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মত মানুষজনও পাবে। জীবনে যদি বড় হইতে চাও, এই সব চরিত্র হইতে সাবধান থাকিতে হইবে। কারন সব কুকুরকে তোমার মনোযোগ দেওয়ার সময় তোমার নাই। এরা শুধু তোমার মনোযোগই নষ্ট করিবে না, তোমার বড় হওয়ার পথে এরা সবচেয়ে বড় বাধা হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবে। ইহাদের মধ্যে অনেকেই এই সমাজের কেউ কর্ণধার বলিয়া মনে হইবে, কাউকে আবার সমাজের বিবেচক বলিয়া মান্য করিবে, কেউ আবার প্রথম সারির লোক বলিয়াও গর্ব করিয়া এইদিক সেইদিক প্রচারনা করিয়া বেড়াইবে। উহারা কেউই তোমার শুভাকাঙ্ঘি নহে। শুভাকাঙ্ক্ষী শুধু তোমার একান্ত পরিবার যাহারা তোমার ব্যথায় ব্যথিত হয়, তোমার আনন্দে আনন্দিত হয়, আর তুমি যখন দিশেহারা হইয়া সঠিক সিদ্ধান্ত লইতে অপারগ হওঁ, তখনো তাহারা তোমাকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না।

তোমাদের জন্য রইল আমার অফুরন্ত ভালোবাসা আর দোয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *