২৪/০৯/১৯৮৬-একজন পরিত্যাক্ত মুক্তিযোদ্ধা

প্রচন্ড শক্তিশালী জীবের রাহু থেকে মুক্তি পেয়ে একটী ক্ষুদ্র প্রানির যা হয়, আজকে আমার অবস্থাটা যেন সেই রকম মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার মাথা থেকে একটা বোঝা কমে গেল। কিন্ত কেন মনে হচ্ছে একটা বোঝা কমে গেল এবং কি একটা বোঝা কমে গেল তাও বুঝতেছিনা। সারাদিন ঘুমে কাটাতে চাইলাম কিন্তু ভাল ঘুম হলো না। গতকাল Firing থেকে ফিরে এসেছি। ‘ফায়ারিং’ এর একটা অর্থ আছে। আর সেটা হলো, প্রতি বছর আর্টিলারী ইউনিট গুলি তাদের ‘আর্টিলারী গানগুলি’  লং রেঞ্জ টেষ্টিং করে এবং সাথে অফিসারগনও তাদের বিদ্যা চর্চা করে। আর এই ফায়ারিং একমাত্র হাটহাজারী পাহাড়ি এলাকাতেই করা হয়।

যাই হোক, হাট হাজারী Firing এ গিয়ে এবার একটা দৃশ্য দেখেছি । দৃশ্যটি আমাকে খুব ব্যথিত করেছিল। শুয়ে শুয়ে যেন ঐ কথাগুলো আমার কানে বারবার বেজে উঠছিল। আমি চট্টগ্রামের ভাষাটা বলতে পারি না, তাই আমার মতো করে ঘটনাটা লিখছি।

হাট হাজারী Firing range এর প্রবেশ মুখেই পশ্চিম পাশে একটা চায়ের দোকান আছে। ওখানে চা খেতে গিয়েছিলাম আমি আর আমার এক বন্ধু লেঃ তারেক (ভাল নাম হচ্ছে তারেক মোঃ ভাওয়ালি, ভাওয়ালী সুন্দর গান গায়, বিশেষ করে কাওয়ালী গান, তাই আমরা ওকে ভাওয়ালাই না ডেকে কাওয়ালি বলেও ডাকি অনেক সময়)। চায়ের দোকানে ঢোকতেই চোখে পড়লো, চায়ের দোকানে আরো কিছু অচেনা লোকও বসে আছে। হয়ত এই এলাকার কেউ হবে। দোকানীর বয়স প্রায় ৫০, বানাচ্ছে। মুখে তার ঘন সাদা দাড়ি, খালী গা, গলায় একটা গামছা জড়ানো। বুকের যতোগুলি পশম আছে, সবগুলিই পাকা। মাথায় চুল নাই বল্লেই চলে। দোকানের সাইজের তুলনায় খুব বেশি কাষ্টমার নাই, আমরা যারা এখানে ফায়ারিং করতে আসি, মূলত তারাই তার বেশীরভাগ খদ্দের। আর যারা হাটহাজারী ফায়ারিং রেঞ্জের এই রাস্তাটা ব্যবহার করে, বিশেষ করে স্থানীয়রা, তারাই এই চা দোকানের খদ্দের। আমি আর তারেক চায়ের জন্য বসে আছি। আর এই ফাকে দুজনেই দুজনের অজান্তে বুড়ো লোকটিকে দেখছিলাম। এক সময় তিনজনই একসঙ্গে ব্যাপারটা মার্ক করাতে সবাই যেনো একটু মুচকীতে হেসে দিলাম।

আমার একটা বদ অভ্যাস আছে। বুড়োমানুষ দেখলেই আমার গল্প শুনতে ভাল লাগে। তার অতীত গল্প। আমি এমন অনেক বুড়ো মানুষের সাথে নিছক গল্প করতে করতে এমন কিছু সত্যি কাহিনী জেনেছি, যারা একদা আমাদের সমাজের বা দেশের বড় একটা কাজের সাথে হয়ত জড়িত, অথবা এমনো দেখেছি, যতো নামীদামী মানুষের কথা আমরা জানি তাদের ঐ সব ইতিহাসের পিছনে এসব লুকিয়ে থাকা মানুষের কত কন্ট্রিবিউশন। আমি বুড়ো লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম,

"চাচা আপনার বাড়ি বুঝি এখানেই?" বুড়ো আমার উত্তর না দিয়ে পাল্টা বলতে শুরু করলেন, পোয়া এর আগে আমাকে এখানে দেখো নাই? "

তাঁর এই কথায় প্রথমে একটু খটকা লাগলো এই ভেবে যে, আমাদের বয়স যতো কমই হোক, যখন সবাই জানে আমরা সামরিক বাহিনীর লোক, অজান্তেই তারা আমাদেরকে ‘স্যার’ সম্বোধন করে। কিন্তু কেউ না করলেও আমার তেমন অসুবিধা হয় না। আমি ব্যাপারটাকে আমলেও নেই না। কিন্তু চা ওয়ালা কোনো কিছু ভাবার আগেই সে আমাকে ‘তুমি’ করেই সম্বোধন করলো। আমার কাছে ব্যাপারটা ভালই লাগলো। যতই হোক, তিনি আমার থেকে তো বয়সে প্রায় দিগুন হবেন।  

আমার প্রশ্নের উত্তরে দোকানী পাল্টা যে প্রশ্ন করলেন, তাতে আমি কি উত্তর দেবো? এবারই তো প্রথম এলাম এই ফায়ারিং রেঞ্জে। আমার সামরীক জীবনটাই তো বেশী দিনের না। আগে এলে হয়ত আমার সাথে তার পরিচয় নিশ্চয় হতো।  আমার আগে যারা এখানে এসেছেন, তারা নিশ্চয় এই বুড়োকে ভালোভাবেই চিনে। হয়তো অনেকের সাথে তার পরিচয়ও আছে। এতো কিছু না বলে আমি শুধু চাচাকে বললাম, না চাচা, আমি এর আগে এখানে কখনো আসি নাই। তাই হয়তো আপনাকে আমি আগে দেখিনি।

চাচা আমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বললেন, এখানে অনেক অফিসাররা আসে, চা খায়, কিন্তু আজ অবধি কেউ আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কি করতাম আগে, আমার নাম কি ইত্যাদি কেউই কখনো জিজ্ঞেস করে নাই তুমিই মনে হয় এই প্রথম আজ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলা তবে এইটুকু বলি যে, আমি এলাকার লোক নই আর কখনো এই এলাকায় বাস করবো এটা আমার সপ্নেও ছিলো না তারপরেও নিয়তি বলে একটা কথা আছে, আমরা তাকে কখনোই হাত দিয়ে দূরে ফেলে দিতে পারি না কেউ এটা বিশ্বাস করুক আর নাই বা করুক আমি অন্তত এখন এই ৫০ বছর বয়সে এসে সেটা মনে প্রানে বিশ্বাস করি 

চাচা, কোনো দিকে আর না তাকিয়েই চা বানাতে বানাতে বলতে থাকে-শোন, তোমাদের মতো আমিও একদিন জোয়ান ছিলাম, আজ থেকে ৩০ বছর আগে আমি তোমাদের থেকেও দ্রুত গতিতে দৌড়াতে পারতাম, আমার মাথায় ভর্তি কালো চুল ছিল সারাক্ষন এই গায়ের কোথায় কি হচ্ছে, আমার নজর কখনই এড়িয়ে যায় নাই আইউব খানের বিরুদ্দে যুদ্ধ করেছি, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কত শ্লোগান দিয়েছি সবাই ভাগছে, রাজাকারেরা জয় করতে পারে নাই এদেশ, মুক্তিযোদ্ধা আছিলাম দেশটারে স্বাধীন করছি তবে এখন মনে হয় জীবনে অনেক হিসাব কিতাব ঠিকমত করা হয় নাই আইউব খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোন দরকার ছিল না, ব্রিটিশদের বিপক্ষে এত কথা বলারও দরকার ছিল না, অথবা রাজাকার বলে যাদেরকে আমরা পাত্তাই দেই নাই, তারাই এখন  আমাদেরকে দেখে হাসে সবাইরে খেদাইছি ঠিকই কিন্তু এখন যারা আছে তাগো ভাগাইব কে? আগে তো বাঁচার জন্য চায়ের দোকান দিতে হয় নাই, এখন তো বাঁচার জন্য চায়ের দোকান ছাড়া আর কোন গতিও নাই  যখন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, আমার বয়স  ছিল ৩২ কি ৩৩ বউ আঁকড়িয়ে ধরেছিলো যেনো যুদ্ধে না যাই। সেদিন বউরে কইছিলাম, ভয় পাইস না বউ, ফিরে আসবো কি লাভ হইছে ফিরে এসে? বউ এখন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না  ঔষধের অভাবে বিছানাতেই ছটফট করে। ভাতই দিবার পারি না আবার ঔষধ

 বুড়া লোকটি একটু থামলেন। আমি চায়ে চুমুক দিচ্ছি আর খুব মনোযোগ সহকারে তাঁর কথা শুনছি।

যে পোশাকটা তোমরা পড়ে আছো, এটা পাবার জন্য অনেক জাবিউল মারা গেছে, অনেক জাবিউল চা  বিক্রি করে বেঁচে আছে, অনেক রাহিমারা এখন বিছানায় শুয়ে আছে, তাঁদের দেখার কেউ নাই তোমাদের উপর আমাদের কোন দুঃখ নাই, তোমরা আমাদের নাতিনাতকুরের মতো কিন্তু আমাদের কি কেউ দেখার নেই?”

 বুঝলাম, তাঁর নাম জাবিউল, তাঁর স্ত্রীর নাম হয়ত রাহিমা।  তারপর? একটা বেন্সন সিগারেট আমি নিজে নিলাম আর আরেকটা সিগারেট তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম। নেন, একটা বেনসন খান।

জাবিউল বলে চললেন, আরেক কাপ চা খাইবা?”

আমার চা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিলো। বল্লাম, দেন।

আমার শুনতে ভাল লাগছে জাবিউলের কথা। জাবিউল একজন মুক্তিযোদ্ধা, এটা ভাবতেই আমি যেনো উদাসীন হয়ে কল্পনায় ফিরে যাই সেই ছোটবেলায়। আমি তখন খুব ছোট, মুক্তিযুদ্ধ কি, কারা কি কারনে কি নিয়ে গন্ডোগোল করছে সেটা আমার কাছে কিছুতেই বোধ গম্য হয়নি। কিন্তু দেখতাম, মাঝে মাঝেই গ্রামের সবাই এক সাথে নদীর ওপারে শুকনা খালে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পালিয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে রাতও পার হয়ে যেতো। আসলে সে সময়টাই ছিলো মুক্তিযুদ্ধ। মাদের গ্রামেও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলো কিন্তু হটাত করে তারা যেনো কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলো। আমি যখন ব্যাপারটা বুঝতে শিখেছিলাম, তখন আসল ফ্রন্ট লাইনার মুক্তিযোদ্ধারা কেহই গ্রামে ছিলো না। তারা কোথায় ছিলো বা আছে সে খবরটাও আমি জানি না। হয়তোবা তারা অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলো যুবক, অবিবাহিত, আবার কেউ কেউ সেই যুদ্ধ থেকে ফিরেও আসেনি। এখন হয়তোবা আর বেশি জাবিউলরা নাইও এ দেশে। হয়তো কালের ঘুর্নিপাকে একদিন আর কোন জাবিউলকে খুজে পাওয়া যাবেও না। ইতিহাস কতো জায়গায় কতোভাবে চাপা পড়ে আছে, কে রাখে তাঁর খবর? আজ সেই তাদের মধ্যের একজন ফ্রন্ট লাইনার মুক্তিযোদ্ধাকে পেলাম।

জাবিউল বলে যাচ্ছে আর চা বানাচ্ছে-

দেশ স্বাধীন হল, কি আনন্দ চারদিকে আমরা এখন শুধু আমরা ব্রিটি গেছে, পাকিস্তান গেছে আমরা  যারা ফিরে এলাম, তারা খুব ভাগ্যবান মনে হলেও এখন মনে হয় যারা ফিরেনি তারা বেশি ভাগ্যবান ওদের বেঁচে থাকার জন্য চা বেচতে হয় না ওদের বেঁচে থেকে রাহিমাদের কষ্ট দেখতে হয় না  একটা চাকরীর জন্য অনেক দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট কোন কাজে আসেনি পরে ওই সার্টিফিকেট আগুণে পূড়ে ফেলেছি কি হবে একটা অযৌক্তিক সার্টিফিকেট রেখে? আমার বাড়ি ছিল ঢাকার পাশে বছিলা নামে এক গ্রামে কত বছর আগে যে গ্রামটা ছেড়ে এসছি মনে পড়ে না এখন। সেখানে যেতে ইচ্ছে করে কিন্তু আমার ওখানে গেলে মন খারাপ য়ে যায় পাশে একটা গনকবরের সমাধি আছে খালি যুদ্ধের কথা মনে ড়ে খালি মানুষের লাশের গন্ধ আসে নাকে যেতে চাইলেও মন, শরীর যেতে চায় না তাই এই জঙ্গলের কাছে ড়ে আছি, বলতে পারো পালিয়ে আছি জানো কার কাছ থেকে পালিয়ে আছি? নিজের কাছ থেকে নিজে পালিয়ে আছি"

আমি প্রশ্ন করলাম, পালাতে পারছেন? জবিউল আমার প্রশ্নের আগেই সে উত্তর দিল, "কিন্তু আমি জানি আমি পালাতে পারি নাই নিজের কাছে নিজে কেউ পালাতে পারে না"

জবিউল আর কথা বলতে পারে না। তার গলা ভেঙ্গে আসছে, হয়ত তার চোখে পানিও এসে থাকতে পারে কিন্তু সন্ধ্যার নিকষ কালো অন্ধকার সেই অশ্রু সবার চোখ থেকে আড়াল করে রাখলো। সূর্য অনেক আগেই ঢলে পড়েছে।  সন্ধ্যা নেমে গেছে। আমি আরও একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে দেখলাম, জাবিউল তাঁর গামছাটা দিয়ে চোখ মুছছে। জাবিউল একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারা নাকি এ দেশের সর্বকালের সর্বর্শ্রেষ্ঠ সন্তান। কে বলেছিল এ কথা? জাবিউলরা বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে রাজাকারেরা। এখন দেশে রাজাকার আর রাজাকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। অনেক রাজকার ৭১ এর পরেও জন্মেছে। রাজাকাররা শুধু দেশের স্বাধীনতায় বাধা দেয় না, যারা এ দেশের মানুষের স্বাধীনতাকে হরন করে, যারা গরিবের ধন চুরি করে, যারা ন্যায় অন্যায় কিছুই বুঝতে চায় না, যারা মানুষের ঘরবাড়ি দখল করে, যারা বিনা অপরাধে মানুষ খুন করে, মেয়েদের ধর্ষণ করে, যারা মানুষের মতামতের কোন সম্মান করে না, যারা জনগনের ট্যাক্সে বেতন পেয়েও তাদের জন্য কাজ করে না, যারা নিজের দেশের টাকা লুট করে অন্য দেশে জমিয়ে পাহাড় বানায়, যারা ভোটেরর অধিকার হরন করে জনগনের অধিকার বিলুপ্ত করে, তারা সবাই রাজাকার। 

এই জাবিউলের সামনে আমার ইউনিফর্মটাকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। রাত  নেমে এসছে, মেসে ফিরতে হবে, জাবিউলকে শুধু একবার জড়িয়ে ধরা ছাড়া আমার আর কোন কিছুই দেবার নাই। আমি জাবিউলকে তাঁর অজান্তে একটা স্যালুট দিয়ে ফিরে এলাম। মনে হল আজ অন্তত একটা মুক্তিযোদ্ধাকে আমি প্রানভরে ইউনিফর্ম পড়ে স্যালুট করলাম যে আমার এই স্যালুটের জন্য বসে নেই। তাঁরপরেও সে একজন ইতিহাস রচনাকারী মুক্তিযোদ্ধা, যার জন্য আমি আজ একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক এবং যার জন্য আমি আজ একটা স্বতন্ত্র ইউনিফর্ম পেয়েছি। আমি জাবিউলের কাছে ঋণী, দেশ হয়তো নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *