২৬/০৪/২০১১-তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন

গতকাল রাতে দশটার দিকে আমার পাশের মসজিদ থেকে মাইকে একটা ঘোষণা এল।

"একটি শোক সংবাদ...গোলারটেক নিবাসী জনাব অমুকের মা জনাবা অমুক আজ রাত আটটার দিকে ইনেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমার নামাজে জানাজা আগামিকাল সকাল দশটায় গোলারটেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।" ঘোষণাটা কয়েকবার দেওয়া হল।

আজ হরতালের দিন। আমি অফিসে যাই নাই। বাসায় বসেই অফিসের যতগুল কাজ করা যায় তাইই করছি। এখন বাজে দুপুর দুইটা। আবারও একটা ঘোষণা এল, " "একটি শোক সংবাদ...গোলারটেক নিবাসী জনাব অমুকের ভাই জনাব অমুক আজ সকাল এগারটায় ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমার নামাজে জানাজা আগামিকাল বিকাল চারটায় গোলার টেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।"

সকালের জানাজাটা কখন হয়েছিল আমার মনেও নাই। আবারও একটা জানাজার সংবাদ।

আমার বাসায় আমি প্রায় প্রতিদিন না হলেও প্রায় প্রতিনিয়ত এই মসজিদের ইন্তেকালের ফরমায়েশটা প্রায়ই শুনি। ভয় লাগে। হয়ত বা কোন একদিন এমন একটা শোক সংবাদ অনেকেই পাবে যে, " "একটি শোক সংবাদ...গোলারটেক নিবাসী জনাব মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন আজ রাত আটটার দিকে ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন (ইন্না নিল্লাহের অয়া ইন্না ইলাইহের রাজেউন। মরহুমের নামাজে জানাজা আগামিকাল সকাল দশটায় গোলার টেক ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হইবে। জানাজায় শরিক হওয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।" তখন হয়ত অনেকেই আসবে, হয়ত অনেকেই আসবে না। জানাজার নামাজটা ঈশ্বর ফরজে কেফায়া হিসাবে নির্দেশ করেছেন অর্থাৎ এটা সবার জন্য ফরজ কিন্তু যদি জানাজার জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে লোক আসে তাহলে যারা আসে নাই তারা এই আদেশের বলে অন্যায় হয়েছে বলে দোষী সাব্যস্থ হবেন না।

এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সাহেলের (১২ লং কোর্সের কিন্তু এমসিসির) জানাজার কথা মনে পড়ল।

আমি যখন আর্মি সিগন্যাল ব্রিগেডের মাঠে গেলাম সাহেলের জানাজা নামাজের জন্য। গিয়ে দেখি সাহেল শুয়ে আছে একটা খাটিয়ায়। নাকে ওর সুগন্ধি দেয়া তুলা, সারা শরির একটা সুন্দর চাদর দিয়ে ঢাকা। আমি একদম কাছে গিয়ে ওর ঠিক মুখের উপর দাড়িয়ে মনে মনে জিজ্ঞ্যেস করেছিলাম, "সাহেল, আমি জানি তোমার এখন নরন চড়নের উপায় নাই। কিন্তু তুমি কি কিছু উপলব্ধি করতে পারছ? তুমি কি দেখতে পাচ্ছ কারা কারা এখানে এখন তোমাকে শেষ বিদায় দেওয়ার জন্য এসছে? অথবা তুমি কি কাউকে ডাকছো এই মুহূর্তে? কিংবা তুমি কি তোমার অসমাপ্ত কোন কাজের পরবর্তী নির্দেশনাগুলো কাউকে দিয়ে যেতে চাচ্ছ? অথবা এমন কি কোন অনুসুচনা হচ্ছে যে কারো কাছে কোন ক্ষমা চাওয়ার? বা এমন কোন বানী যা তোমার পরবর্তী বংশধরদের বলতে চাচ্ছ? আমি অনেকক্ষন তোমার দিকে চেয়ে আছি, মনে পড়ছে আমার সঙ্গে তোমার ১৯৭৮ সালের ঐ রুম নম্বর ১০ এর কথা। তুমি প্রথম ভুতের গল্প বলে সবাইকে এমন একটা আচ্ছন্নতায় ভরিয়ে রেখেছিলে যে সারারাত আমরা কেউ ভয়ে বাথরুমে গিয়ে প্রশাবও করতে যেতে পারিনি। তুমি কি এখন কোন ভুতের ভয় পাচ্ছ? এমন কোন ভুত যা তোমার গল্পের মধ্যে ছিল না!! অথবা এমন কোন বিষয় যা তোমার গল্পের মধ্যে ছিল না যা এখন তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছো?

হটাত যেন সাহেল আমার সঙ্গে কথা বলা শুর করল।

দেখ আখতার, আমার একটা শখ ছিল, আমি আবার সেই ছোট্ট শ্যামলিময় গ্রামে চলে যেতে চাই, সেটা আমি তোমাকে গত পরশু ও বলেছিলাম। আমি আর এই যান্ত্রিকতার মধ্যে বাস করতে চাই না। আমি হাপিয়ে উঠেছি। আমার আর এই যান্ত্রিক মেইলের চিঠি পড়তে ভাল লাগে না। তোমরা আমাকে চিঠি লিখবে সেই পুরানো পোস্ট অফিসের ধারনায়। হাতে লেখা নীল রঙের খামে ভরা চিঠি। ষাট দিন লাগবে আমার হাতে পৌঁছতে, আমি আস্তে আস্তে ভাজটা খুলবো আর ভাববো তোমার চিঠি, তোমাদের চিঠি। সেই ঢাকা থেকে এসেছে। সারাদিন আমি আমার মেঠোপথের অকারন ক্লান্তি দূর করে সন্ধায় হারিকেনের বাতি জ্বালিয়ে আবার তোমাদের চিঠিটা পড়বো আর একে একে লিখে যাব আমার সারাদিনের ব্যস্ততার কথা। আমার পুকুরের মাছগুলোর কথা কিভাবে ওরা সকালে খামাখা কোন কারন ছাড়া ছুটাছুটি করে আবার কোন কারন ছাড়াই দুপুরের দিকে শিক্ষানবিস সাতারুর মত নাক উচু করে ভেসে থাকে এক স্তর পানিতে। আমি ঢিল ছুড়ি, প্রথম প্রথম ওরা আমার এই ঢিল ছোড়াকে ভীষণ ভয় পেত কিন্তু এখন আর করে না। ওরাও আমাকে আর শহরের মানুষ মনে করে না। মনে করে আমি বুঝি মাছ হয়ে গেছি। অথবা লিখব আমার সেই পালের গরুগুলিকে নিয়ে। কে যেন এক অহেতুক কারন ছাড়া ছোট্ট অবুঝ বাছুরটি কথা থেকে দ্রুত দৌড়ে এসে প্রচন্ড রক গতিতে তাঁর মায়ের বানে টান দিয়ে আবার আরেক দিকে ছুট। কি অবাক না? ওরাও হয়ত আমাদের শিশুদের মত খেলা করে কিন্তু ওদের খেলনা নেই, ওদের খেলনা শুধু ওদের পরিবার আর পারিপার্শ্বিক জগত নিয়ে। বৃষ্টি এলে ওরাও বুঝে বের হওয়া যাবে না। কোন কাজ নাই তাই অলস সময়ে যাবর কাটে। মাঝে মাঝে ডাক দেয়...হাম্বা হাম্বা। ওদের সব ডাকের উচ্চারন এক কিন্তু তাঁর মিনিং এক নয়। আমরা যেমন কখনো রাগ করলে চোখ দেখলে বুঝা যায়, হাতের নড়াচরা দেখলে বুঝা যায় আমাদের মানসিক অবস্থা কিন্তু ওদের ভাষার কোন পরিবর্তন নাই। ওরা রাগ করলে গুতা দেয়, অথবা ভয় পেলে কোন দিক না দেখেই দৌড় দেয়। অথবা লিখবো আমার মন খারাপের কথা, আমার মন ভাল লাগার কথা। তোমরা হয় ভুলেই যাবে আমার চিঠির উত্তরের কথা। হটাত কোন একদিন অলস পোস্ট মাস্টার অনেকদিন পর যেন একখান দায়িত্ব পাওয়া গেল এই মর্মে আনাচে কানাচে অনেক উল্টা পালটা গলি পার হয়ে অবশেষে তোমার বাড়ির ঠিকানা পেয়ে আমার সেই চিঠিটা তোমার হাতে পৌঁছে দেবে।

সাহেল আমাকে যেন একটা নাড়া দিয়ে বলল, "ঐ কাজল আসে নাই? কাজল কি জানে যে আমি মারা গেছি?" আমি হাসি সাহেলের কথায়। আমি জিজ্ঞ্যেস করি সাহেলকে, আচ্ছা সাহেল মরার পর তোর অনুভুতি কি? তোর ক্যামন লাগছে মরার পর? সাহেলের সহজ সরল উত্তর-ব্যাপারটা আমি এখনো ভালমত বুঝতে পারছি না। নড়াচরা করতে পারছি না। পাটা যেন অবশ হয়ে আছে, কানের কাছে কি একটা তোরা গুজে দিয়েছিস, ভাল মত শুনতেও পারছি না। হাতের কব্জির উপর একটা মশা বসেছে, বেশ লাগছে, মারতে পারছি না। নাকের কাছে এক অসহ্য দুর্গন্ধময় একটা তুলা দিয়ে তোরা আমার শ্বাস ভারি করে রেখেছিস। তুই কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?

বললাম, সাহেল তুই কোন ভাষায় কথা বলছিস এখন? আমি তো তোর কোন কথাই বুঝতে পারছি না। মনে হল সাহেলের চোখের দুই পাশে একটু ভেজা ভেজা। সাহেল, তুই কি কাদছিস? নারে ভাই আমি কাদছি না। আমার খুব মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না আর কখনো তোদের সঙ্গে আর দেখা হবে কিনা, আমি জানি না আমার সেই মাছগুলুর সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে কিনা। আমার জানা নাই, আর কখনো আমি তোদের মত এমন করে আমার সেই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে আদর করতে পারব কিনা। তুই কি দেখতে পারছিস না ওদের? ওরা কারা? ওরা সবাই আমাকে এভাবে ঘুরে আছে কেন? কেন ওরা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্চে? কথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমার এই বড় রুম, আমার এত কাপর চোপড় কিছুই নিতে দেবে না? কি খাবো আমি ওখানে? কে আছে ওখানে? আমার ভয় করছে ভাই। তোরা কেউ যাসনে প্লিজ।

 আমি সাহেলের কোন কথাই আর বুঝতে পারছিলাম না। পাশে নাজমুল দাড়িয়ে ছিল। বলল, কিরে কি দেখছিস এমন করে? আমার সম্বিত ফিরে এল। দেখলাম অনেকে চলে এসেছে। হুজুরও চলে এসেছে। সবাইকে সারি সারি হয়ে জানাজা নামাজের জন্য হুজুর তাড়া দিচ্ছে। এক সময়, হুজুর সবাইকে জিজ্ঞ্যেস করলে, "তিনি কেমন মানুষ ছিলেন? সবাই যেন গদবাধা একখান উত্তর করল, "খুব ভাল মানুষ ছিল"

মরার আগে যিনি এই খেতাবটা শুনে যেতে পারেনি, আজ তাঁর খেতাবের মধ্যে একটা হল ,"তিনি খুব ভাল মানুষ ছিলেন"

তারপর? তারপরের অনুভুতিটা আমি বাসায় গিয়ে আমার ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। শুনতে চাও? তাহলে আরেকদিন.........।      

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *