২৬/০৪/২০২৩-ইউরোপ অথবা রাশিয়া কি আবার একত্রে মিলিত হতে পারে?

প্রকৃত সত্যটা হলো যে, রাশিয়া সব সময়ই ইউরোপেরই একটি অংশ এবং সে একটি ইউরোপিয়ান কান্ট্রিই বটে। বিগত কয়েক বছর আগে ক্রিমিয়া আর ডোনবাসকে নিজের পরিসীমায় নিয়ে আসায় রাশিয়া ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বটে কিন্তু রাশিয়া কখনো নন-ইউরোপিয়ান কান্ট্রি ছিলো না। আমেরিকা সর্বদাই চেয়েছে যেনো রাশিয়াকে একঘরে করা যায় কিভাবে। ক্রিমিয়া বা ডোনবাসকে নিয়ে আমেরিকা ২০১৪ সালের রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যেনো একটা ভালো প্রতিশোধ নিতে পেরেছে।

যেভাবেই যে কেউ ভাবুক না কেনো, রাশিয়া এবং ইউরোপ এক সময় না এক সময় আবার রি-ইউনাইটেড হবেই। এটাই চিরসত্য কথা। কারন তারা একে অপরের প্রতিবেশী। ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং জীবন মাত্রার স্টাইল ঘাটলে দেখা যাবে যে, রাশিয়ানরা আসলে (বিশেষ করে অর্থোডোক্স এবং ইথনিক রাশিয়ান এমন কি মুসলিম সুন্নী টাটারস) তারা সবাই ইউরোপিয়ান। রাশিয়ান স্টুডেন্ট, সংস্ক্রিতিক ফিগার, আর্টিস্টস, বৈজ্ঞানিক, স্কলার্স, এমন কি অফিশিয়ালস সবার কাছেই ইউরোপের মডেল একটা পছন্দনীয় ব্যাপার। রাশিয়ান ভাষা ব্যবহার করে এমন অনেক রাশিয়ানরা ইউরোপে সেটেল্ড, মিক্সড ম্যারেজ, এমন কি বাই-কালচার সবচেয়ে বেশী দেখা যায় এদের ইউরোপে। সেন্ট্রাল এবং পূর্ব ইউরোপের মানুষদের সাথে রাশিয়ানদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না। সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায় যে, রাশিয়া আসলে ইউরোপের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা কোনো চয়েজ না, এটা ডেস্টিনি। ডেস্টিনিকে কেউ চয়েজ করে নিতে পারে না, এটা ঘটেই। অন্যদিকে যদি দেখি-রাশিয়ার অর্থনীতি আসলে ইউরোপিয়ান বেজড। ইউক্রেন যুদ্ধ এই প্যারামিটার পশ্চিমারা বর্তমানে বিধ্বস্ত করেছে বটে এবং এর ফলে রাশিয়া বিকল্প হিসাবে সে ইউরোপকে কিছুটা ছেড়ে দিলেও ইউরোপ রাশিয়াকে কোনোভাবেই ছাড়তে পারবে না। রাশিয়া ইউরোপের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং পাওয়ারফুল দেশ এটা দ্রুব সত্য। এটাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার পথ নাই। এমন একটা প্রতিবেশীকে বেশীদিন এড়িয়ে চলা সম্ভব না।পক্ষান্তরে, রাশিয়াকে ইউরোপের বেশী প্রয়োজন, যতোটা না ইউরোপকে রাশিয়ার প্রয়োজন। বর্তমানে রাশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে যে বৈরিতা, সেটার সিংহভাগ দায়ী আসলে ইউরোপ নিজে। এজন্য ইউরোপকে আরো বেশী সতর্ক থাকার দরকার ছিলো। কেউ এই ইউরোপকে তাদের ভেসেল হিসাবে ব্যবহার করার চেষতা করছে, এটা ইউরোপের অনেক লিডারগন এখনো বুঝতে অক্ষম। আজ থেকে ২০/৩০ বছর আগে তো ইউক্রেন যুদ্ধ ছিলো না, তাহলে তখনই রাশিয়াকে ইউরোপিয়ান ব্লকে আনা হয় নাই কেনো? রাশিয়া তো নিজেই ইউরোপের সাথে কিংবা ন্যাটোতে যোগ দিতে চেয়েছিলো। তাকে তখন নেয়া হয় নাই কেনো? তখন কোনো ব্রেক্সিট ছিলো না, ইউরোজোনেও কোনো মন্দা ছিলো না, ইউরোপে তখন রাইট উইং রাজনীতিও ছিলো না।  তাহলে রাশিয়াকে ন্যাটোতে কিংবা ইউরোপ ব্লকে নিতে এতো অসুবিধা ছিলো কোথায়? ইউরোপের সাথে মিলিতি হয়ে রাশিয়া গ্লোবাল পলিটিক্সে একটা পাওয়ারফুল একটর হতে পারতো। এর একটাই উত্তর- আমেরিকা চায় নি রাশিয়ার মতো একটা দেশ এই ব্লকে আসুক যেখানে আমেরিকা তখন একচ্ছত্র মোড়লগিড়ি করতে পারবে না। ইউরোপে থেকে ইউরোপকে ছাড়া রাশিয়া যেমন ওই অঞ্চলে একটা পাওয়ারফুল জায়ান্ট হতে পারবে না, তেমনি, রাশিয়াকে ছাড়াও ইউরোপ কখনোই ওই অঞ্চলে আর্থিক দিক দিয়ে উন্নতি তথা শক্তিশালী হতে পারবে না। ইউরোপের যে কয়টি দেশ নিউক্লিয়ার শক্তিধর, তাদের মধ্যে শুধু নয়, গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশী পারমানবিক শক্তিধর দেশ রাশিয়া। রাশিয়া একটি ভেটো পাওয়ারের অধিকারী, ইউএন এর স্থায়ী মেম্বার, তার অজস্র রিসোর্স, গ্যাস, কয়লা, তেল, লোহা, ফার্টিলাইজার, খাদিশস্য সবকিছুতেই রাশিয়া সবার থেকে উপরে। এমন একটা দেশকে এড়িয়ে চলা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়, অন্তত প্রতিবেশীদের। আমেরিকা এড়িয়ে চলতে পারবে, ইউকে পারবে, কানাডা পারবে কারন তারা অনেক দূরের দেশ এবং তাদের নিজ নিজ প্রাকৃতিক রিসোর্সও কম নাই। কিন্তু ইউরোপ সবসময় রাশিয়ার সস্তা রিসোর্সের উপর দাড়িয়েই তাদের অর্থনীতিকে চাংগা করেছে এবং করছে।

রাশিয়া বর্তমানে যতোই এশিয়া ঘেষা হোক, তারা কখনোই এশিয়ার সাথে এতোটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে নাই। সোভিয়েট আমলে কিছুটা কালচারাল দিক থেকে এশিয়ার সাথে কাছাকাছি এলেও অন্য সব কিছুতেই তারা এশিয়া থেকে অনেক দূরের প্রতিবেশীই ছিলো। আর বর্তমান জেনারেশন তো আরো বহুদূরে। এশিয়ান মানসিকতা একেবারেই নাই।

তাহলে এখন যে প্রশ্নটা আসে, সেটা হলো, ইউরোপ নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে কেনো? উত্তরটা একেবারেই কঠিন নয়। দুই তিন দশক আগের ইউরোপ আর আজকের সেই ইউরোপ, একেবারেই এক না। আর সেই ইউরোপকে আর ফিরিয়েও আনা যাবে না। ইউরোপের লিডারশীপে একটা বিশাল অপরিপক্কতার ছোয়া লেগে গেছে। বেশীরভাগ লিদাররা হয় ইয়াং মেয়ে এবং এদের পরিপক্কতাই এখনো আসে নাই। এরা এই বিংশ শতাব্দীতে বসে একবিংশ শতাব্দীর সমস্যা বুঝতে অক্ষম। তারা ইউরোপিয়ান স্টাইল থেকে বেরিয়ে গিয়ে পাশ্চাত্যের ধারায় ডুবে যেতে চাচ্ছে যা কোনোভাবেই ইউরোপিয়ান ভ্যালুতে যায় না। এদের অনেকেই ১ম কিংবা ২য় মহাযুদ্ধ দেখে নাই। যুদ্ধের পর ভংগুর অর্থনিতির পরিস্থিতিতে পড়ে নাই। ইউরোপের যে একটা স্তাইল আছে নিজস্ব, সেটা বর্তমান ইউরোপের নেতারাই তা জানেন না। তারা নিজেরাই ইউরোপকে বিশ্বাস করে না, তাহলে অন্য কেউ কেনো ইউরোপকে ব্যবহার করবে না?

এখন যে প্রশ্নটা মনে জাগে সেটা হলো, তাহলে রাশিয়া কিভাবে পুনরায় ইউরোপে কিংবা ইউরোপ কিভাবে রাশিয়ার কাছে ফিরে যাবে? এটাও কোনো কঠিন উত্তর নয়।

রাশিয়া এখন এশিয়ার নৌকায় উঠে যাচ্ছে যাকে বলা যেতে পারে স্প্রিংবোট। চীন, ইন্ডিয়া এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশ মিলে যখন রাশিয়া একটা গ্রেটার ইউরেশিয়ান জোট তৈরী করে ফেলতে পারবে, তখন রাশিয়া খুব সহজেই ব্রাসেলসের সাথে একটা নতুন বারগেনিং পজিশনে বসতে পারবে। ঐ সময়ে রাশিয়া নয়, ইউরোপ চাইবে যেনো সে আবার রাশিয়ার সাথে একত্রিত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *