৩০/০৩/২০২০-যেদিন চলে আসবো-১

আজ আমার যাওয়ার দিন প্রায় হয়ে গেলো। আমি চলে যাচ্ছি চিরতরে অন্যখানে। সামনে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে আর কি আছে আমি জানিনা। আগে যেমন সন্ধ্যা হলেই অস্থির চিত্তে সন্ধ্যাতারা দেখতাম, পূর্নিমা এলে খোলা হাওয়ায় বসে পুর্ব দিগন্তে বিশাল চাকতির মতো চাদকে দেখতাম, শীতের সকালে শরীরে কাথা মুড়ি দিয়া অগোছালো সপ্নে বিভোর থাকতাম কিংবা বর্ষার রিমঝিম ব্রিষ্টিতে গুনগুন করে একা একাই গান গাইতাম। আজ হতে আর কয়েকদিনের মধ্যে এসব আর আমার হয়ে থাকবে কিনা আমি জানি না। হয়তো ব্যস্ত হয়ে যাবো সংসারের বৈষয়িক কাজে, স্বামীর সেবা শুস্রশায় আর নিজের কিছু একান্ত বেদনাবোধ নিয়ে। তাই আজ এই যাওয়ার সময় আমার বারবার একটা মুখ আমার মানসপটে ভেসে আসছে। আর মনের অজান্তেই দুমড়ে মুচড়ে আসছে একটা কষ্টের অভিজ্ঞতা। বড় কষ্ট হচ্ছে আজ আমার এই ভেবে যে, তোমাকে আমি কষ্ট দিয়েছি। তুমি হয়তো জানলেই না কি কষ্ট আমি নিয়ে আমিও চলে গেলাম, আর আমিও হয়তো শতভাগ জানতে পারলাম না, কি কষ্ট আমি তোমাকে দিয়ে গেলাম। অপমান আর অবসাদে অবনত হয়ে আজ যাওয়ার সময় আমি তোমাকে আমার কিছু অব্যক্ত কথা এই ভাসমান মন্ডলে, ভার্চুয়াল জগতে রেখে গেলাম। যদি কখনো তোমার গোচরে আসে, যদি কখনো আমার কথা ভেবে তোমার চোখ ভিজে আসে, যদি কখনো আমার জন্য আর এতটুকু ভালোবাসা, মহব্বত আর স্নেহ জেগে থাকে, তাহলে শুধু এটুকু অনুরোধ করবো, তুমি আমাকে ভুলে যেও না। আমি ছোট ছিলাম, আমার অভিমান ছিলো, তাই অধিকার নিয়েই না বুঝে সীমার বাইরে গিয়ে এতোটাই পাগলামী করেছিলাম যা আজ কষ্টে আর অভিমানে ভরে আছে সারাটা অন্তর। কিন্তু এর পিছনে না ছিলো আমার বড় ধরনের কোনো ফাকি, না ছিলো তোমার বড় ধরনের কোনো কুট কৌশলতা। বাস্তবিক পক্ষে আমাদের এই অভিমানকে কেউ তার লালসা দিয়ে পুজি করেছিল, যা আমিও বুঝি নাই, তুমিও না।

চারটি বছর আমি তোমার সাথে ছিলাম। আমি এই চারটি বছরের প্রতিটি মূহুর্তের সময়টুকু বিচার বিশ্লেষন করে দেখেছি, জলের সাথে মাছের যে সম্পর্ক, আমার সাথে তোমার ছিলো সে রকমের একটা সম্পর্ক। আমার প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি নিঃশ্বাস বলে দেয়, আমি ছিলাম তোমার প্রতিটি চিন্তায়, এমন কি অবচেতন মনেও। আমার কোনো কিছুর অভাব ছিলো না, তুমি কোনো কিছুর অভাব রাখোনি। কোনটা সম্পদ আর কোনটা সম্পত্তি, কোনটা আমার আর কোনটা তোমার এই তর্কে আমার কখনোই যাবার যেমন দরকার ছিলো না, তেমনি ছিলো না এসব ব্যাপারে আমার কোন আলাদা হিসাব। তুমি ছিলে আমার ব্যাপারে সদাচিন্তিত, কি করলে আমার ভালো হবে, কি না করলে আমার ক্ষতি হবে। আমার ব্যাপারে আমাকে আর আলাদা করে কখনো ভাবার প্রয়োজন ছিলো না আর থাকলেও আমি এসব নিয়া চিন্তা করলেও কোনো লাভ হতনা। আমি ছিলাম গভীর সুখের ছায়াতলে তোমার সুগভীর সহিষ্ণুতার আবরনে। ফলে, কোনোদিন শোনোনি আমি তোমার কাছে কখনো সম্পদ চেয়েছি, কিংবা আমি তোমার সম্পদের পাগল ছিলাম। আমাকে তুমি আদর দিয়েছো, ভালোবাসা দিয়েছো, আর যখন যা লাগে চাওয়ার আগেই তুমি তা দিয়েছো। আমি সুখি এবং খুসি ছিলাম। আমার কোনো কিছুতেই লোভ ছিলো না।

তুমি ছিলে আমার জীবনের রুপকার, আমি জানি, তোমার অন্তরের ভাষা। কিন্তু আমি সেদিন তোমার মুখের ভাষার যে রূপ দেখেছিলাম, তা আমার কখনো দেখা হয় নাই। তোমার রাগ, তোমার চাহনী আর তোমার অভিব্যক্তি আমাকে উদ্বেল করে দিয়েছিল। এই নতুন রূপ আমার আগে কখনো দেখা হয় নাই। তুমি বারবার আমাকে সম্পদ, সঞ্চয়পত্র, সোনার গহনা, ব্যবসা, চাকুরী ইত্যাদির কথা এমনভাবে প্রশ্ন করতেছিলে, যা না ছিলো আমার মনে, না ছিলো আমার মস্তিষ্কে। আমি সঞ্চয়পত্র কি, এর লাভ কি, এর দ্বারা কি করা যায়, আমার কিছুই জানা ছিলো না। তুমিই আমাকে প্রথম সঞ্চয়পত্রের ধারনা দিয়েছো। অথচ কোনো একদিন, আমারই হয়ে আমারই মোবাইল থেকে আমারই জন্যে আমি নাকি তোমাকে আমার অধিক নিরাপত্তার জন্য তোমার কাছে সঞ্চয়পত্র কেনার বায়না করেছি। তুমি একবার ভাবোতো, আমি কি এতোটাই মানসিক রোগী হয়ে গিয়েছিলাম যে, গুটিকতক নোটের জন্য আমি আমার সারা জীবনের নিরাপত্তা আর ভালোবাসার মানুষটিকে চিরতরে হারাবো? এটা ছিলো একটা মানুষের নিম্ন মানসিকতার সর্বোচ্চ উদাহরন যেখানে ষড়যন্ত্রকারীর দুষ্টু বুদ্ধির একটামাত্র বিষের ফল। তোমার এই ষড়যন্ত্রকারিনীর নাম তুমি হয়তো এখন জানো। সে ভালোবাসার অভিনয় করে ঘরে ঢোকেছিল, কিন্তু সে না নিজেকে ভালোবেসেছিলো, না আমার এই সম্পর্ককে। আর না সে তোমাকে ভালোবেসেছিলো। ধরে নাও, আমি তার নাম দিলাম 'কুচক্রকারিনী' অথবা 'ষড়যন্ত্রকারিনী'।

হ্যা, আজ একটা জিনিষ আমি বুঝতে পারছি যে, এই বিশাল সময়ের ব্যবধানে সবার যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিমান জমতে পারে, আবার কখনো কখনো সেই অভিমান সময়ের স্রোতে রাগেও পর্যবসিত হতে পারে। আমি বুঝতে পারিনি, এই ছোট হৃদয়ে আমার কখন যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিমানগুলি বিচ্ছিন্ন রাগে পরিনত হয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিলো নিতান্তই একটা সাময়িক। কিন্তু আমি বুঝিতেই পারিনি যে, 'সমুদ্রের পানিতে নামিয়া তীরের বনরাজীমালাকে যেমন রমনীয় চিত্রবত মনে হয়, সমুদ্র থেকে তীরে উঠিয়া তা আর আগের মতো মনে হয় না' ঠিক তেমনি, আমিও সেই ষড়যন্ত্রকারিণিকে কাছে পেয়ে ভেন্টিলেশনের একটা পথ খুজে পেয়েছি মনে করে যখন আমি আমার সমস্ত রাগ অভিমান ঐ পথ দিয়ে নিষ্কৃতি করলাম, তখন বুঝলাম, রাগের মাথায় আমি যা বলেছিলাম, আমার সেই অভিমান আমার সামনে অভিনয়কারী সেই ষড়যন্ত্রকারীনির কারনে এখন আমার বিপদ হয়েছে। আমি ঘর ছেড়েছি, আমি তোমাকে ছেড়েছি। এই ষড়যন্ত্রকারিনী আমাকে ঘর থেকে পথে নামিয়ে একেবারে খাদের প্রান্তে নিয়ে এসেছে। কিন্তু আমার যখন হুশ ফিরেছে, আমি যখন আবার ফিরতে চেয়েছি, তখন আর আমার ফিরে যাওয়ার উপায় ছিলো না। আমি ঘরহারা হয়ে রাস্তার দুইধার ধার দিয়া আমার সেই অগোছালো অপরিচ্ছন্ন পুরানো বাসভুমেই আবার ফিরে আসা ছাড়া কোনো পথ খোলা ছিলো না। যখন আমি আমার সেই অতি পরিচিত কিন্তু আবার অতি অপরিচিত আবাসভুমে ফিরে এলাম, তখন বুঝলাম, ষড়যন্ত্রকারিনী তার সার্থ সিদ্ধির যা যা করার তা তাই করে সার্থক হয়ে গেলো, আমি শুধু কোনো এক অচেনা খাদের মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।

আমি একা একা ধলেশ্বরী নদীর ধারে বসে সুর্যাস্তের সর্নছায়া দেখতে দেখতে, কখন যে আমার চোখ ভিজে আসতো, আমি বুঝতে পারতাম না। জনশুন্য ধলেশরীর তীরে দিগন্ত প্রসারিত ধুধু বালুকাময় তীর আমাকে ভয়ংকর পথের দিকে ইশারা দিতো। নিস্তব্দতা যখন নিবিড় হয়, তখন কেবল একটা সীমাহীন দিশাহীন শুভ্রতা এবং শুন্যতা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। আমার বেলায় যেনো এটা একেবারে বাস্তব হয়ে চোখের সামনে ধরা দিলো।

আজ একটা কথা বলি, এই প্রিথিবীতে যারা আপন হয়ে ঘরে ঢোকে, তারা সবসময় আপন হয়েই বের হয় না। কখনো কখনো তারা আপন হবার ভান করে কিন্তু হায়েনা হয়ে ঢোকে। তাদের সুপ্ত বাসনাই থাকে অন্যের ক্ষতি করা। আমার বেলায় এই "আপন" ভেবে যাকে বুকে নিয়েছিলাম, সেই আসলে ছিলো আমার মরনের খলনায়ক। কারন, আমার জানা ছিলো না যে, আমি যাকে আপন মনে করে আমার মনের যে কিছু ক্ষোভ ছিলো তাকে বলার পর সেই ক্ষোভ যে আবার আমাকেই দংশন করবে। আমি ছোট ছিলাম, আমার মনের কথাগুলি বলার কোন লোক ছিলো না, তাই, অতীব আপন মনে করে আমি এই সেই কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারিনিকে এমনভাবে শেয়ার করেছিলাম যাতে আমার মন কিছুটা হালকা হয়। আর এই সেই কুচক্রীকারিনী তোমার কাছে আমার মনের কষ্টগুলি এমনভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে উপস্থাপন করেছিলো যা তোমাকে আমার থেকে আর আমাকে তোমার থেকে যোজন দূরে এক ঝরের গতিতে ছিটকিয়ে ফেলেছিলো। ঈশ্বর বড় সহায় যে, তোমার অন্তর আর দশটি মানুষের মতো ছিলো না। তাই, অন্তত আমি আজ মাটিবিহীন নই। কোথাও না কোথাও আমাকে তিনি ঠাই করে দিচ্ছেন। আর তার রুপকার আবারো ছিলে সেই তুমি।  

আমার জীবনের সব কাহিনী তুমি জানতে। হয়তো সেই অবহেলার কাহিনী, সেই অনাদরের কাহিনী জেনেই তুমি আমাকে আরো বেশী করে আদর করতে, আমি তোমার আদর বুঝতাম। তারপরেও আমি তোমাকে কিছু কিছু জায়গায় হয়তো ভয় পেতাম। আর এটা কোনো অমুলক ভয় ছিলো না। তোমার মতো পাহাড় সমান ব্যক্তিত্তের কাছে আমি ছিলাম অতি নগন্য। আমার এই ছোট জীবনে কখনো তুমি কেনো, তোমার থেকে অর্ধেক ব্যক্তিত্ত সম্পন্ন লোকেরও কোনোদিন দেখা হয় নাই। একদিকে তোমার পজিশন, তোমার প্রতিপত্তি, তোমার ক্ষমতা আবার অন্যদিকে আমি তোমার সেই ছোট পুতুলের মতো একটা বিড়ালসম, ভয় তো হবেই। অনেক কিছুই হয়ত ভয়ে আমি তোমাকে খোলামেলা করে বলার সাহস পাই নাই। কিন্তু আমার কখনো তোমার উপর ঘেন্না হয় নাই, তবে অভিমান হয়েছে অনেক। এই অভিমানটাকেই আমার আপাত আপন কুচক্রী মানুষটি আমাকে সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলো।

কুচক্রি মানুষ যখন কাউকে আকড়ে ধরে, তাকে সর্বোপ্রথম আক্রমন করে তার অন্তরে, তার হৃদয়ে, তার যুক্তিক ব্যবহারে তখন অনেক কিছুই অবাস্তব মনে হলেও যুক্তির মতো মনে হয়। এই কুচক্রীর কথায় আমি যেনো বারবার নিজেকে বোকাই মনে করেছিলাম। তার এই কথার যুক্তি ধরে আমারো এক সময় মনে হয়েছিল, আসলেই আমি কি পেয়েছি এ যাবত? সব কিছুই তো বিলিয়ে দিয়েছিলাম অকাতরে। তাহলে দেয়ার সাথে পাওয়ার কেমন যেনো একটা অসামঞ্জস্যই মনে হচ্ছিলো। শয়তান যখন ভর করে, তখন নীতি পালিয়ে যায়, আর দিধা ভর করে। হয়তো আমারো তাইই হয়েছিলো। শয়তান আমাকে অতি কাছ থেকে বারবার প্রলোভন দেখিয়ে আমার সমস্ত মনকে বিষিয়ে দিয়েছিলো। তখন আমাকে ভর করে এই কুচক্রিকারিনী একের পর এক তার হীনসার্থ চরিতার্থ করার জন্য কতই না পরিকল্পনা আটছিলো। লাখ লাখ টাকার সপ্নে সে ছিলো বিভোর। আর তার সাথে ছিলো একটা অভিনয়। একদিকে সে আমাকে কুড়েকুড়ে খাচ্ছিল আর আমাকে গুটির চালের মতো ব্যবহার করছিলো, অন্যদিকে সে তোমাকে একটা মিথ্যা ফেস প্রদর্শন করে এমনভাবে জালটা বিছিয়েছিলো যে, না তুমি ওকে বুঝতে পারছিলে, না আমি। অথচ আমাদের দুইজনের ভিতরে চলছিলো তখন মহাপ্রলয়ের মতো ঝড় আর কষ্ট। এই কুচক্রিকারিনী আমাকে একের পর এক তার বানানো পরিকল্পনা দিয়েই যাচ্ছে, আর সেই পরিকল্পনার অগ্রীম তথ্য তোমাকে দিয়ে সে আমাকে তোমার কাছে অমানুষের মতো চেহাড়াটা দেখিয়ে তোমার কাছে ভাল মনিষী সাজবার চেষ্টা করছে। অথচ সেই ছিলো পুরু পরিকল্পনার মাষ্টারমাইন্ড। অগ্রীম পরিকল্পনা একদিকে আভাষ, অন্যদিকে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখে তোমার এতাই মনে হ ওয়ার কথা, যে, কু চক্রী তোমাকে ভালো উপদেশ, বা তথ্য দুটুই দিচ্ছে। এহেনো পরিস্থিতিতে তার উপর তোমার ভরষা হবারই কথা। আর এর প্রধান উদ্দেশ্যই ছিলো তার, আমি চিরতরে তোমার কাছ থেকে বহিষ্কৃত হই আর সে আমার স্থানটা চিরতরে দখল করে বাকি জীবনটা আরাম আয়েশে কাটায়। ফলে সেই সঞ্চয়পত্র, সেই ২০ লাখ টাকা, সেই গাড়ির কাহিনি, সেই দোকান কেনার কাহিনী, সেই ফার্নিচার বিক্রির কাহিনী, আমার নতুন জব, খালা বুয়াদের কাছ থেকে আমার নিথ্যা আয়, আমার গোপন মিথ্যা প্রেমের উপখ্যান, ওর জন্মদিনের উপহার দেবার দাবী ইত্যাদি সবই ছিলো একটা জাল। একটা বড় পরিকল্পনার অংশ।

আমার ব্যাপারে তুমি নতুন কিছু তথ্য যা তোমাকে আমার জানানোর দরকার ছিলো বই কি কিন্তু আমার মনে হয় নাই যে, এইসব ছোট খাটো তথ্য যা আসলেই কোন কাজের তথ্য নয়, সেগুলি জানানোর দরকার। ফলে আমার এই ছোট খাটো তথ্য কুচক্রিকারিনী এমনভাবে তোমার কাছে উপস্থাপন করেছিলো যে, আমি আর তোমার বাধ্যগত ভালোবাসার মানুষটি যেনো আর নই। সব কিছু দেবার পরেও যখন তুমি জানতে পারলে যে, আমি তোমার অনুমতি ব্যতিত শুধুমাত্র টাকার লোভে অন্যত্র চাকুরী করি, কিংবা তোমা ব্যতিত আমার আরো অনেক ভালবাসার মানুষ আমার সদর দরজায় ভীড় করে, অথবা তোমার অজানা সত্তেও আমি আমার কাজের মেয়ের কাছ থেকে তার থাকা খাওয়ার খরচ হিসাবে বাড়তি পয়সা নেই যা তুমি বারন করেছিলে, এসব জানার পরে কার না মাথা খারাপ হবে? তোমারও তাই হয়েছিলো বলে সেদিন আমি তোমার রাগের যে চেহারাটা দেখেছিলাম, তা আজো আমি ভুলি নাই। তোমার রাগ হবার শতভাগ যুক্তি ছিলো, যেটা আজ আমি বুঝি। কিন্তু বিশ্বাস করো, এসবই ছিলো মিথ্যা একটা বানোয়াট কাহিনী। আমি কখনো টাকার জন্য কোথাও চাকুরী করি নাই, আমার জন্য বরাদ্ধ কাজের বুয়া থেকেও আমি তার খাওয়া থাকার ভাড়া হিসাবে কোনো টাকা পয়সা গ্রহন করি নাই, কিংবা আমার সতীত্তের দোহাই দিয়েই আজ আমি জোর গলায় বলতে পারি, তুমি ছাড়া আমার জীবনে আর কোনো দ্বিতীয় পুরুষের কখনো আগমন ছিলো না, আর হয়ও নাই। এ সবই ছিলো ঐ কুচক্রিকারিনীর বানানো সব বানোয়াট গল্পের একটা কল্পকাহিনী। সবচেয়ে বড় যে বানোয়াট কাহিনী তুমি জেনেছো, যে, আমি আমার সময়ে আমার যা করার কথা তা না করে সারাদিন উলটাপালটা কাজেই যেনো মনোনিবেশ করে থাকি। তুমি পুরুষ মানুষ, তোমার এহেন তথ্যে আমার উপর আস্থা হারানোই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি না পারছিলাম তোমাকে কিছু বুঝাতে, না পারছিলাম, আমাকে সামাল দিতে। জীবনের প্রতি আমার একটা সময় বিতৃষ্ণা চলে এসেছিলো। মনে হয়েছিলো, আমার আর একদন্ডও তোমার ভালবাসার কাছে কোন স্থান নাই। মানুষ যখন আস্থাহিনতায় ভোগে, তখন তার কোনো হিতাহীত জ্ঞান থাকে না। তখন দরকার হয় একজন মানুষের সাপোর্ট। অথচ আমার ভাগ্যটা এমন যে, কুচক্রিকারিনী কালনাগিনীকেই আমি আমার আস্থা দিয়ে বসেছিলাম। সেই কালনাগিনীকেই আমার মনে হয়েছিলো আমার আস্থার জায়গাটা। একদিকে তুমি আমার উপর প্রবল রেগেছিলে, অন্যদিকে তুমি আমার কোনো কথাই শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলে না। তাহলে আমার বিকল্প কি ছিলো? বিকল্প ছিলো একটা- কোথাও হারিয়ে যাওয়া চিরতরে। আর আমি এই কুচক্রীর উপদেশেই একদিন কিছুই না বলে সত্যি সত্যি হারিয়ে গেলাম। আমাকে বাসা বদলের পরিকল্পনা, যোগযোগের নিমিত্তে ফোন নাম্বার পরিবর্তন করার পরিকল্পনা এবং তোমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাষ্টারপ্ল্যান তো ছিলো এই কুচক্রীরই। আমি তোমার উপর রাগে অভিমানে জিদ ধরেছিলাম, আর সেই রাগ আর অভিমানকে পুজি করে এই মানুষরুপি শয়তান তোমার মন আরো বিষিয়ে তুলেছিলো। আর তুমিও আমার সেই সব সট পড়ে পড়ে যখন মন খারাপ করছিলে, আর তার প্রেক্ষাপটে খারাপ খারাপ মেসেজ করে তুমিও এই কুচক্রীকেই আপন মনে করে হয়তো কিছু রাগের কথা বলছিলে। আর এই শয়তান পুনরায় আমাকে তোমার প্রতিটি মেসেজের সট পাঠিয়ে আমারো মন আরো অস্থির করে তুলেছিলো। আমি তো তোমাকে চিনি। তোমার সারাটা শরীর জুড়ে থাকে কলিজা, সেই মানুষটির রাগ আমার উপর ভালোবাসার তুলনায় কিছুই না। আমি জানি তোমার অন্তর আর ভিতর। হয়তো শত ভালবাসার কথার ফাকে কোনো এক কষ্টের মাঝে বেরিয়ে আসা দু একটা রাগের কথা আসতেই পারে। আর সেই রাগের অবস্থানটাই এই কুচক্রী শয়তান আমাকে এবং তোমাকে বাস্তব দেখিয়ে ভালোবাসার মর্মস্পর্সী কথাগুলি গোপন করে আমাদের দুজনের মনকেই বিষিয়ে তুলেছিলো। কিন্তু তোমার মনের অস্থিরতার কান্নার মেসেজগুলি অথবা আমার মনের কষ্টের কথাগুলির মেসেজ আমাদের কাউকেই সে প্রদান করে নাই। আমার শরীর খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছিলো, অন্যদিকে আমার বিরহে তোমার শরীরও হয়তো আরো অবনতির দিকেই যাচ্ছিল। আর এটাই হবার কথা। আমি যদি জানতাম, তোমার শরীর এতোই খারাপ হয়ে গেছে, তুমি প্রায় মরেই যাচ্ছো, আমি কি পারতাম তোমার কাছে ছুটে না যেতে? আমিও এতো কষ্টে ছিলাম যে, শুধু আত্তহত্যাটাই করি নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *