২৮/০৫/২০১৯-জে: ওয়াকার ফোর্ট্রেস হাসপাতাল

 

ওয়াকারের স্ত্রী, শাশুড়ি আর মিটুল আমি এবং ওয়াকার মিটুল আর ওয়াকারের স্ত্রী ওয়াকার, মিটুল, ওর স্ত্রী এবং শাশুড়ি

 

হরিদ্বার থেকে ফেরার পথে আমার এক বন্ধু মেজর মহিউদ্দিন ফোনে জানিয়েছিলো যে, আমার আরেক বন্ধু মেজর জেনারেল ওয়াকার ভারতেই দিল্লীর হার্ট ইন্সটিটিউটে ওপেন হার্ট সার্জারী করে ভর্তি। এবার ওয়াকার সম্পর্কে একটু বলি-

আমি যখন ১৯৭৭ সালের প্রথম দিকে ঢাকায় আজিমপুরে থাকতাম তখন হাবীব ভাইয়ের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আমার এক বন্ধু নিউটনের ভাই। আমি ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে ওখানেই থাকতাম। শরীফ ছিলো, নিউটন ছিলো, জুয়েনা আপা ছিলো আরেকজন আপা ছিলো এই মুহুর্তে নামটা আমার মনে নাই। ঐ সময় এই ওয়াকারের সাথে আমার পরিচয়। আসলে ওয়াকার ছিলো এই নিউটনদের আত্মীয়। আমি ক্যাডেট কলেজে চলে যাওয়ার পরে আর কারো সাথেই যোগাযোগ ছিলো না। অতঃপর, ক্যাডেট থেকে আমি আর্মিতে চলে যাই।

বিএমএ তে ট্রেনিং এর সময় একদিন ফার্ষ্ট টার্মের শাস্তি খাওয়ার সময় কনকনে শীতে দাঁড়িয়ে ছিলাম ‘চির উন্নত মম শীর’ পাহাড়ের পাদদেশে। সবাই মুটামুটি খালী গা। যেনো আমরা সবাই বাহাদুর, শীতের কোনো পরোয়া নেই। আর অন্যদিকে সিনিয়ারদের ভয়ে কনকনে শীতের সময় খালী গায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শরীর যেনো বরফ হয়ে যাচ্ছে। ফার্ষ্ট টার্মের ক্যাডেট আমরা, ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানীর ক্যাডেটদেরকে এখনো ভালোমতো চিনিই না। আর সবার চেহারা তো গলা ছোলা মুরগের মতো। সবার চেহারা এক।

তো আমার পাশে একজন ক্যাডেট খুব ভদ্রভাবে শীতটাকে যেনো উপভোগ করছে, কোনো পরোয়া নাই, না আছে কোনো দুঃখ কিংবা রোমান্স। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই পাশের ঐ ক্যাডেটকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হালার ক্যান যে আইছিলাম মরতে এই বিএমএ তে। বাইরে ছিলাম, ভালোই তো ছিলাম। কথায় কথায় কই আমি থাকতাম, কোথায় বাড়ি, ইত্যাদি আলাপের একসময় পরিচয় হলো যে, সে নিউটনের ভাগ্নে, ওয়াকার। আমি বললাম, আরে, নিউটন তো আমার ছোট বেলার বন্ধু!! বলতেই ওয়াকার বল্লো, আমি তো তোমারে চিনছি। তোমার সাথে তো আমার দেখা হতো সেই ১৯৭৭ সালে আজিমপুর কলোনীতে। এই সেই ওয়াকার। খুব ভালো একটা ছেলে। নামাজী, ধীর এবং সৎ। ওয়াকার শেখ পরিবারের একজন। আর আমাদের প্রধান্মন্ত্রী শেখ হাসিনার আপন ফুফা জেনারেল মুস্তাফিজ সাহেবের মেয়ের জামাই। উভয় পক্ষ থেকেই ওয়াকার একেবারে খাটি শেখ পরিবারের একজন। আর এই কারনেই আমাদের কোর্ষ ১৩ বিএমএ লং কোর্ষ বিএনপি এর শাসনামলে কেহই মেজর থেকে লেঃ কর্নেল পদে প্রোমোশন পাই নাই। রাজনীতি নিয়ে এখানে আলাপ না করি তবে বিএনপি এর জন্য আরো ৩০ বছর খেসারত দিতে হতে পারে।

ওয়াকার যখন লন্ডনে ষ্টাফ কলেজ করতে গিয়েছিলো, আমি তখন ট্রেনিং ডাইরেক্টরেটে জিএসও-২ হিসাবে কাজ করি। ওকে অনেক জালিয়েছিলো আমাদের এই আর্মি কারন সে আওয়ামীলীগের লোক ছিলো আর তখন চলছিলো বিএনপির শাসন। ওয়াকারের জন্য লন্ডনে টাকা পাঠাচ্ছিলো না আর্মি থেকে, বাধ্য হয়ে ওয়াকার অনেক কষ্ট করে শেষ করেছিলো কোর্ষটা। আমি অনেক প্রতিবাদ করেছিলাম তদানীন্তন ডিএমটি ব্রিগেডিয়ার (পরবর্তীতে চীফ অফ আর্মি ষ্টাফ হয়েছিলেন তিনি) মুবিন এর সাথে। এমনো হয়েছিলো যে, ওয়াকার আর্মি হেডকোয়ার্টারে ঢোকতে পর্যন্ত ওকে বাধা দেয়া হচ্ছিলো। কিন্তু একদিন আমি ওয়াকারকে গেটপাশ দিয়ে যখন আমার অফিসে ঢোকালাম, আমাকে ডিএমআই মাহমুদ স্যার বললেন, এটা কেনো করেছি। খুব মেজাজা খারাপ হয়েছিলো তার এই প্রশ্নে- আমি বলেছিলাম, সে আমার কোর্ষম্যাট আর ওয়াকার এখনো সার্ভিং, আর না ওয়াকার পিএনজি। তাহলে আমি আমার বন্ধুকে আমার অফিসে আসতে দিতে পারবো না ক্যান? এটা নিয়ে অনেক অসুবিধায় পড়তে হয়েছিলো আমাকে। আমি অফিস থেকে ওয়াকারকে নিয়ে ছুটির পরে বের হয়ে হেটে হেটে আসতে আসতে শুধু একটা কথাই বলেছিলাম, যতো অসুবিধাই হোক, আমরা থাকি বা না থাকি, তুই কিন্তু আর্মি থেকে ভলান্টিয়ারী চাকুরী ছারবি না। এর শেষ দেখা দরকার।

আমার প্রোমোশন না হওয়াতে আমি আর্মি ছেড়েছিলাম, ওয়াকার রয়ে গেলো। আজ আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াকার মেজর জেনারেল। আমি খুশী। সেই ওয়াকার ইন্ডিয়ায় বেড়াতে এসে হেলথ চেক আপ করাতে গিয়ে হার্টে অনেকগুলি ব্লক ধরা পড়েছে। আর এই সুবাদে ওপেন হার্ট সার্জারী।

আমি আর আমার স্ত্রী মিটুল ফোর্টেস এসকর্ট হার্ট ইন্সটিটিউটে এসে পড়লাম বেলা ১২ টার দিকে। এখানে ইন্ডিয়ার ডিফেন্স এটাশে ওর সব দেখভাল করছে। আমি রিসেপ্সনে গিয়ে ওয়াকারের কথা বলতেই একজন অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাঁকে কিভাবে চিনি। বললাম, সে আমার ব্যাচম্যাট আর আমি ইন্ডিয়ায় এসেছি অন্য একটা কাজে, শুনলাম ওয়াকার এখানে ভর্তি তাই দেখতে এলাম। আমাকে আর আমার স্ত্রীকে খুব সম্মানের সহিত একজন অফিসার ওর রুমে নিয়ে গেলো। দেখলাম, ওয়াকার পেটে একটা পট্টি দিয়ে শুয়ে আছে। আমাদের দেখে ওয়াকার খুব খুসি হলো। ওখানে ওর স্ত্রী আর শাশুড়ি ছিলো। সবার সাথেই অনেকক্ষন থাকার পর আমি কানেকানে ওয়াকারকে জিজ্ঞেস করলাম, ওর কোনো ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট লাগবে কিনা। আমার বন্ধু আমার হাত ধরে খালী বল্লো- দোস্ত, আসলে আমি জানতাম না যে, আমার ওপেন হার্ট সার্জারী করাতে হবে। জাষ্ট হেলথ চেক আপ করাতে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকটা ব্লক। পরে আমাকে ডাক্তার বল্লো, ওপারেশন করাতে হবে, আমিও রাজী হয়ে গেলাম। ব্যাপারটা একদম আকষ্মিকভাবে ঘটে গেলো। হাতে যা টাকা ছিলো তা চলবে আর আমার শাশুড়ি ঢাকা থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসেছেন, আপাতত লাগবে না। আমি জানি ওয়াকার ঠিক কথাগুলিই বলছে। খুব সৎ একজন মানুষ।

বললাম, আমিও বেশীদিন এখানে থাকবো না। আমার স্ত্রীর মেডিক্যালের বাকী কাজগুলি শেষ হয়ে গেলে আমিও দেশে ফিরে যাবো। যদি এর মধ্যে আবার আসতে পারি আসবো, আর তা না হলে আজকে এখানেই। বলে আমি আবার আমাদের হোটেলে চলে এলাম। আমার আর ওর ওখানে যাওয়ার সময় হয়ে উঠে নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *