২৯/০৬/২০২১-আমার গ্রাম (১৯৭৭ সাল)

অফিসেই ছিলাম। কেনো জানি হটাত করে খুব গ্রামে যেতে ইচ্ছে করলো লায়লা আর সফুরা খালাকে দেখার জন্য। বহুদিন গ্রামে যাই না। প্রায় এক যুগ অথচ মাত্র ১৫ মিনিট লাগে গ্রামে যেতে। মা যখন বেচে ছিলেন, তখন গ্রাম আমাকে চুম্বকের মতো টানতো। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার হলেই আমি গ্রামে ছুটতাম মাকে দেখার জন্য যখন মা গ্রামে থাকতেন। কোনো ঈদই আমি শহরে করতাম না। মাকে দেখার সুবাদে আমার গ্রামের সেই পরিচিত মানুষগুলির সাথে আমার দেখা হতো। মানুষগুলি আমাকে বুক ভরা শ্রদ্ধ্যা আর মোহনীয় একটা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ করতো। আমি যখন গ্রামে যেতাম, মায়ের সাথে বসে গল্প করতাম, বাড়িটার অবস্থা কি সেটা ভালো করে পরীক্ষা করতাম যাতে ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে মায়ের কোনো ভয় না থাকে। মা ঝড়কে খুব ভয় পেতেন। আকাশে ঝড়ের আভাষ দেখলে প্রথমেই আমার মনে পড়তো মায়ের কথা। মা বোধ হয় এখন ভয় পাচ্ছে। সেই ২০০২ সালের কথা। এখন ২০২১ সাল। এর মাঝে দু একবার গ্রামে গিয়েছি নিতান্তই একটা অতিথির মতো। এখন গ্রামে গেলে লায়লার বাসা পর্যন্ত গিয়ে ওর সাথে কথাবার্তা বলেই মনে হয় আমার গ্রামের ভ্রমন শেষ। অনেকবারই একেবারে বাড়ির আস্তানা থেকে ফিরে এসেছি, হয়তো বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছেও হয় নাই। এখন বাড়িটাতে থাকে আমার এক অবিবাহিত ভাগ্নে যে সারাদিন শুধু গাজা খায়। গাজায় কি সুখ সেটা আমি জানি, তবে বেশীদিন গাজা খেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সে তখন নিজেই গাজায় পরিনত হয়। যেতে ভালো লাগে না। চুরি ওর অভ্যাস, গাজা ওর খাবার আর মথ্যা কথা বলা ওর স্বভাব। ফলে ওখানে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, যেতে ইচ্ছে করে না।

আজ হটাত করেই আবার ইচ্ছে করে গ্রামে আসলাম। গ্রামটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। অসংখ্য বাড়িঘর যত্রতত্র এখানে সেখানে উঠে গেছে। পায়ে চলার রাস্তাটাও আর আগের মতো নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই ১৯৭৮/৭৮ সালের আমার গ্রামের বিন্যাশ। গ্রামের একেবারে পুর্ব পাশে ছিলো দৌলত মেম্বারদের বাড়ি যেখানে একটা গুচ্ছ পরিবার থাকতো। তাদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই ছিলো ইয়াকুবদের বাড়ি। পরে শুনেছি এই ইয়াকুব নাকি মেম্বার হয়েছিলো তাই ওদের বাড়ির নাম এখন ইয়াকুব মেম্বারদের বাড়ি বললেই সবাই চিনে।  ইয়াকুবদের বাড়ি পার হয়ে আরো পশ্চিমে এলে পড়ে খালেক এবং সেকান্দরদের বাড়ি। সেকান্দরকে আমি মামু বলে ডাকতাম। এই সেকান্দর মামু এমন একজন মানুষ ছিলেন যে, সবার সাথেই তিনি মিশতে পারতেন। বেশ গরীব হলেও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না। প্রতিদিন আমরা স্কুলের মাঠে খেলতে গেলে, তাঁকে সেখানে পাওয়া যেতো। স্কুলের মাঠ ছিলো বড়দের তাশ খেলার আড্ডা আর ছোটদের বল খেলার প্রতিযোগিতা। সরগরম হয়ে উঠতো স্কুলের মাঠ। যারা খেলতেন না, তারাও কেউ কেউ হুক্কা বিড়ি নিয়ে মাঠের চারিদিকে খেলা দেখতো যেনো প্রতিদিনই ম্যারাডোনার আর মেসির খেলা হচ্ছে। এই ফুটবল খেলায় আমি আর মুসা একটা ট্রিক্স সবসময় করতাম যাতে আমি আর মুসা সব সময় একই টিমে থাকি। সেটা পরে বলি। যেই না মাগরেবের আজান পড়লো, সবাই যার যার বাড়িতে যাওয়া। অদ্ভুত একটা সময় পার হয়েছে তখন।

সেকান্দর মামুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো আরজুদের বাড়ি। আরজুদের পেশা ছিলো মাছ বিক্রি করা। আরজুরা আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। আমাদের গ্রামের বেশীরভাগ মানুষেরই পেশা ছিলো মাছ ধরা আর মাছ বিক্রি করা। কিন্তু কোনোভাবেই এটা জেলেপাড়ার মতো না। আরজুদের বাড়ির উঠোন ছিলো অনেক বড় আর এই উঠোনের চারিদিকে ছিলো ওদের অন্যান্য পারিবারিক বাড়িঘর। আরজু মাঝে মাঝে এমন করে মদ খেতো যে, বাড়ির বড়রা ওকে অনেক মারলেও আরজু বেহুশ অবস্থায় উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজতো। সবাই ভাবতো মদ খেয়ে বেহুস হলে উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় মনে হয়। আরজু তখনো বিয়ে করে নাই। আরজুদের বাড়িকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিন দিকে একটু এগুলেই নতুন একটা বাড়ি উঠেছিলো। ওরা আমাদের গ্রামের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সবেমাত্র এই গ্রামে এসেছে। সে পেশায় ছিলো গ্রাম্য ডাক্তার, নাম নুরু ডাক্তার। বর্তমানে সেই নুরু ডাক্তারের বাসা রাজেন্দ্রপুর এবং তার এক ছেলে শাহীন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে রাজনীতি করে। যাই হোক, আরজুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো ফুল্মতি আপারদের বাড়ি। ফুল্মতি আপা আমার খালাতো বোন। তাদের বাড়িটা ফজলুদের বাড়ি নামে পরিচিত ছিলো। ফজলুরা তিন ভাই ছিলো। এখন তারা আর কেউ বেচে নাই। তাদেরও পেশা ছিলো মাছ বিক্রি তবে কৃষি কাজও করতো ওরা। ফুলমতি আপার জামাই এর একটা নেশা ছিলো। মাঝে মাঝেই অন্য মাইয়া লোক নিয়া মসকরা করতো। খারাপ জায়গায়ও মনে হয় যেতো। সবাই ওকে একটু অন্য নজরেই দেখতো বলে আমার ধারনা। ফজলু ভাইদের বাড়ির পশ্চিমে বেশ কিছুটা জায়গা খালি ছিলো। হেটে হেটে এলে প্রথমেই পড়তো জামাল, শাখাওয়াতদের বাড়ি। জামালকে আমি খুব বেশী দেখি নাই। জামাল ১৯৭২ সালের পরে আমাদের গ্রামে আর দেখা যায় নাই। জামাল ছিলো আসল মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে জামাল যুদ্ধে গিয়েছিলো। সম্মুখ সমরে সে অংশ নিয়েছিলো। দেখতে খুব সুন্দর ছিলো জামাল। আর স্বাস্থ্য ছিলো একদম সঠিক যুবকের মতো। অনেকে বলে যে, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছে অথবা জামাল ইচ্ছে করেই আর এই গ্রামে ফিরতে চায় নাই। আমার ধারনা, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছিলো কারন ১৯৭২ সালে তাঁকে এক পরদেশী মেয়ের সাথে একবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গিয়েছিলো। জামালের ভাই শাখাওয়াত, করিম (ডাক নাম বাছন), রুপচান এরা গ্রামেই থাকতো। বর্তমানে রুপচান বিদেশ থাকে, শাখাওয়াত মারা গেছে। করিম (বাছন)ও মারা গেছে। করিমকে সবাই বাছন বলেই ডাকতো। তিনি আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। বাছনকে আমি কাকা বলে ডাকতাম। আমি যখন আর্মিতে চাকুরী করি কমিশনড অফিসার হিসাবে, হটাত একদিন দেখলাম বাছন কাকা সোনালি ব্যাংক ক্যান্টনমেন্ট কর্পোরেট ব্রাঞ্চে সিকিউরিটির কাজ করেন। আমাকে দেখে উনি খুব খুশী হয়েছিলো যে, তারই এক পরিচিত মানুষ আর্মিতে অফিসার এবং সেই সেনানীবাসেই তার চাকুরী। খুবই সমীহ করতেন আমাকে। আমিও কাকা বলতাম, উনিও আমাকে কাকা বলতেন।

এই জামালদের বাড়ির উত্তর দিকে জরাজীর্ন একটা বাড়ি ছিলো জামালদেরই এক আত্তীয়ের, নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে। সম্ভবত শাখাওয়াতদের বাড়ি ছিলো ওটা। খুব গরীব ছিলো শাখাওয়াতরা। জামালদের বাড়ি আর ঐ শাখাওয়াতদের বাড়ির মাঝখান দিয়েই গ্রামের হেটে চলা রাস্তাটা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। জামালদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো রফিক মাষ্টারদের বাড়ি। রফিক মাষ্টারকে আমি ভাইও বলতাম আবার স্যারও বলতাম। কারন তিনি আমার বড় ভাইয়ের সমসাময়ীক আবার আমার প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একটু তোতলা ছিলেন কিন্তু খুব ভালো মানূশ ছিলেন। তার একটা ছেলে ছিলো নাম, কাজল, আর একটা মেয়ে ছিলো। রিফিক ভাইয়ের স্ত্রী খুব মিষ্টি চেহাড়ার ছিলেন। বর্তমানে কাজল একটা দূর্ঘটনায় পড়ে প্রায় প্যারালাইসিস। হামদর্দে চাকুরী করতো। রফিক ভাই চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। অনেক বয়ষ্ক মানুষ, আমার অফিসে প্রায়ই আসেন এবং গল্প হয়, ভালো লাগে। রফিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো আরদশ আলীদের বাড়ি। ওরা চার ভাই এবং কোনো বোন নাই ওদের। রফিক ভাইদের বাড়ি থেকে শুরু হয় “বড় বাড়ি”। এই আরদশ আলীর অন্যান্য ভাইয়েরা হলো সার্থক আলী, মোনজর আলী, সুন্দর আলী আর একজন, নামটা মনে পড়ছে না। এই বাড়ির সব বউরা প্রায় আসর নামাজের পর ধান বারা বানতো। ওরা বেশ সচ্ছল ছিলো। এদের বাড়ির দুই ধার দিয়া উত্তর দিকে যাওয়া যেতো। রফিক ভাইদের বাড়ি আর আরদশ আলীদের বাড়ির মাঝে দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেত আবার আরদশ আলীদের বাড়ির পশ্চিম ধার দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেতো। এই দুই ধারের যে কোনো রাস্তা দিয়েই উত্তর দিকে প্রায় ২০০ গজ হেটে গেলে দুটু বাড়ি পড়তো। একটা আমাদের বাড়ি আর তার সাথে আম্বর আলী কাকাদের বাড়ি। এই দুটু বাড়ি আসলে গ্রাম থেকে একটু আলাদা থাকায় সবাই “টেক্কা বাড়ি” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে গ্রামের দিকে তাকাইলে গ্রামের পুব পাশ থেকে শুরু করে পশ্চিম পাশের বাড়ি পর্যন্ত সব দেখা যেতো। যাই হোক, এই আরদশ আলিদের বাড়ির উঠোন ছিলো বেশ বড়। আমরা ওখানে “কুতকুত” খেলতাম। আর উঠোনের ঠিক দক্ষিনে একটা দোকান ছিলো। এই দোকানে কেউ চা খেতে বসতো, ক্রেউ বিড়ি খাইতো, আর আমি মাঝে মাঝে শুধু মানুষদেরকে লক্ষ্য করার জন্য বসে থাকতাম কারন কোন মানুষ কি কারনে বসে থাকে, বসে বসে কি কথা বলে, কেনো বলে, কার বাড়িতে কি সমস্যা, কার সাথে কার ঝগড়া, কার সাথে কে কি মজা মারতাছে, কোথায় কার কি পরিকল্পনা সব জানা যেত। আমি বেশ ছোট ছিলাম বলে আমাকে একটা বোকা বা আহাম্মক মনে করে আমার সামনেই সবাই সব কথা বলতে পারতো। আমি মনে মনে এসব ভাবতাম আর মানুষ গুলিকে বুঝবার চেষ্টা করতাম। এটা আমার এক প্রকারের নেশাই ছিলো বলা যায়।  দোকানটার লাগোয়াই হলো পায়ে চলা গ্রামের বাড়ির ভিতর দিয়ে চলা পথ। রফিক ভাইদের বাড়ির দক্ষিনে গেলে পড়তো বাহারউদ্দিনদের বাড়ি। বাহার উদ্দিন আমার ক্লাসে পড়তো। ওর বাবারা তিন ভাই ছিলো। আক্কেল আলী, বাহারের বাবা আর আলমাস। আক্কেল আলীর পেশা ছিলো “চুরি” করা, আলমাসের পেশা ছিলো “চুরি”র সাথে মাছ ধরাও। শুধু বাহারের বাবাই ছিলো ভালো মানুষ। শুনেছি আক্কেল আলীর সব ছেলেরাই নাকি এখন চুরিই করে। তার মধ্যে হাতিম আলি একজন। আলমাস, আক্কেল আলী এবং বাহারের বাবা কেউ এখন আর বেচে নাই। ওরা রফিক ভাইয়ের চাচাতো ভাই।

আরদস আলীদের বাড়ির পশ্চিম লাগোয়া যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ির দিকে সেই রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো অরিজিনাল “বড় বাড়ি”। অর্থাৎ গনি মাদবরের বাড়ি। বেশ বড় পরিবার। গনি মাদবরেরাই আসলে গ্রামকে নিয়ন্ত্রন করতো। জমিদার স্টাইলে। গনি মাদবরেরা মোট চার ভাই ছিলো। গনি মাদবর, সিদ্দিকের বাবা (নামটা মনে নাই) হাকিমের বাবা (নামটা মনে নাই), সাত্তারের বাবা (নামটা মনে নাই), ল্যাংরা রফিকের বাবা আর কাদেরের বাবা আজিজ খালু। আজিজ খালু মসজিদে মাঝে মাঝে ইমামতি করতেন। কিন্তু তার ঘরেই সব ছিলো জালিমের মতো সন্তান। কাদের, ইনসান, কুতুব, আরো একজন (নাম মনে নাই) এরা ছিলো আজিজ খালুর পোলা। এই বড় বাড়িটা ছিলো জোয়ান ছেলে দিয়ে ভর্তি। এদের মধ্যে যিনি কাদের নামে পরিচিত ছিলো, সে ছিলো বেশ শ্যামলা কিন্তু ভীষন সুইট চেহারার লোক। সরাসরি ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ছিলো। আমি সাধীনতার পরেও দেখেছি তাঁকে হাতে অস্র নিয়ে ঘুরতে। খুবই সাহসী ছেলে ছিলো। এই কাদের ভাই, সামসু ভাই, রফিক (ল্যাংরা রফিক), মাষ্টার রফিক, এরা সবাই সমসাময়িক ছিলো। সাধীনতার ঠিক পর পরই কাদের ভাই একটা ডাকাতী দল গঠন করে ফেলেছিলো। ওরা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় অস্র দিয়ে ডাকাতি করা শুরু করেছিলো। ওদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারতো না। আমার ভাই হাবীবুল্লাহ সব সময়ই ওদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতো এবং তিনি কখনো এসব কাজকে সাপোর্ট করতেন না। তখন দেশে একটা দূর্ভিক্ষ চলছিলো কিন্তু বড় বাড়ির কখনো দূর্ভিক্ষে সাফার করতে হয় নাই বরং ওদের কাছে সব কিছুই থাকতো সারপ্লাস। এই আজিজ খালু আবার বিয়ে করেছিলো গ্রামের পুর্ব প্রান্তে বসবাসকারী দৌলত মেম্বারের বোন। দৌলত মেম্বারের সাথে এই “বড় বাড়ির” সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো সাপে নেউলের মতো। একটা শক্তি আরেকটা শক্তিকে কখনোই মূল্যায়ন করতো না বরং যখনই সুযোগ পায় তখনই এক পরিবার অন্য পরিবারকে আঘাত করার চেষ্টা করতো। এই রেষারেষির ফলে দৌলত মেম্বারের ইমিডিয়েট আপন ছোট ভাই অর্থাৎ মুসার বাবা আর মুসার ছোট ভাই মাসুদকে প্রান দিতে হয়েছিলো। মানে হত্যা। মুসার ভাই মাসুদ ছিলো আমার থেকে ২/৩ বছরের ছোট। একদিন কোনো এক বর্ষাকালে মাসুদকে কুকুরে কামড়ে দিয়েছিলো। ঐ সময় খুব নামকরা ডাক্তার ছিলো একজন হিন্দু লোক, যাকে সবাই “বগা” ডাক্তার নামে চিনতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে এই বগা ডাক্তারকে। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। কিন্তু উনি বাস করতেন বিবির বাজার এলাকায়। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩/৪ কিলমিটার দূরে। তখন বিবির বাজার ছিলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। রবিবার আর বৃহস্পতিবার বসতো বাজার। মাসুদকে কুকুরে কামড়ানোর কারনে মাসুদের বাবা মাসুদকে নিয়ে বিবির বাজারের দিকে একটা ছোট কোষা নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভরা বর্ষা। পথের মধ্যে হটাত করে বড় বাড়ির সামসু, কাদের আর ল্যাংরা রফিকের সাথে দেখা। ওরাও অন্য নৌকায় ছিলো। তখন সকাল প্রায় ১০ টা। প্রকাশ্য দিবালোক। এই প্রকাশ্য দিবালোকে হটাত করে নদীর মধ্যে সামুসু ভাই এর লিডারশীপে মাসুদের বাবাকে জবাই করা হয় আর মাসুদকে পানিতে আছাড় মারতে মারতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। গ্রামের মানুষ দ্রুত অন্য নৌকা দিয়ে ওদেরকে রক্ষা করতে গিয়েও আর পারে নাই। এর মধ্যেই এরা পালিয়ে যায়। এবার “বড় বাড়ি”র সাথে দৌলত মেম্বারদের বাড়িত শত্রুতাটা একেবারে প্রকাশ্য হয়ে তীব্র আকার ধারন করে। এর ফলশ্রুতিতে মামলা হয়, কেস হয়, বড়রা গ্রাম থেকে পালিয়ে দূরে বাস করতে শুরু করে, আরো অনেক প্রানহানী হয়, সেই সাথে কাদেরও খুন হয়। কাদেরের খুন এখনো একটা রহস্যজনক অবস্থায় আছে। কিভাবে কাদের খুন হলো সেটা পরে বল্বো। এই “বড় বাড়ী’তে তাদের নিজস্ব মসজিদ এবং নিজস্ব করবস্থান ছিলো যা এখন মসজিদটা আরো বড় হয়েছে বটে কিন্তু কবরস্থানটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে প্রায় বিলীন। ঐ কবরস্থানেই শুয়ে আছেন আমার মা আর আমার খালা। এটা সিদ্দিকদের বাড়ির একেবারেই লাগোয়া আর আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০/৬০ গজ দূরে।

সিদ্দিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই লাগোয়া ছিলো পিয়ার আলী নামে ওদের বাড়ি। লম্বা মানুষ, কোনোদিন শার্ট পরেছে কিনা আমার চোখে পড়ে না। মাছ বিক্রি করতো। গ্রামের মধ্যে যে কয়জন গরীব হালের মানুষ ছিলো, পিয়ার আলিরা তার মধ্যে অন্যতম। কোনো রকমে বেচে ছিলো। ঘরটাও খুব জরাজীর্ন ছিলো। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলো অত্যান্ত ভালো। খুব সকালে দেখতাম পিয়ার আলী, মাথায় মাছের খাড়ি নিয়ে খালী গায়ে মাছ নিয়ে সদরঘাট বা শ্যামবাজারে যেতো। আমাদের গ্রামে আসলে যে কয়জন খুব সকালে দল বেধে মাছের খাড়ি নিয়ে হু হু করে খালী গায়ে ছুটতো শ্যমবাজারের দিকে তারা সবাই আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতো। আম্বর আলী কাকা, পিয়ার আলী, আরজু, আরদস আলীর বড় ভাই, আরো অনেকে। ওরা ফিরে আসতো প্রায় দুপুরের দিকে। তারপর আর ওদের কোনো কাজ থাকতো না। ফলে এই দলটা মাঝে মাঝেই বাঙলা মদ খেতো।

এই পিয়ার আলীদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো মংগল মাদবরের বাড়ি। খুব সুশ্রী একজন সুন্দর মানুষ। তার কোনো সন্তান ছিলো না। বড় বউ ছিলেন বাঞ্জা, তাই তিনি সন্তানের আশায় মংগল মাদবর আরেকবার বিয়ে করেন। দুটু বউই ছিলো অসধারান সুন্দুরী। দুই বউ ই পান খেতো। সুন্দুরী মেয়েরা পান খেলে আরো সুন্দর লাগে। গ্রামে যে কয়টা টিউব ওয়েল ছিলো গ্রামের মানুষের পানি নেয়ার জন্য, এই মংগল মাদবরের বাড়িতে ছিলো একটা। আমরা সবসময় এই বাড়ি থেকেই মাটির কলসীতে করে পানি আনতাম। বড় বউ তার সন্তান হবে না জানার পর একটি পালক ছেলে নিয়েছিলেন, যার নাম ছিলো শহীদ। শহীদ আমার ক্লাসেই পড়তো। মংগল মাদবর একবার মেম্বার পদে নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু তিনি পাশ করেন নাই। মংগল মাদবরের নির্বাচনী ক্যাম্পাসে আমরা শহিদ সহ স্লোগান দিতাম টিনের চোঙ্গায় করে। তখন শহীদ নিজেও বলতো- আমার ভাই তোমার ভাই, মংগল ভাই মংগল ভাই। আমরা শহীদকে বলতাম, ঐ মংগল মাদবর না তোর বাপ? ও বলতো, হ আমার বাপই তো। এতো বোকা একতা ছেলে ছিলো যে অনেক মায়া হয় এখন ওর জন্য। কার যে ছেলে ছিলো শহীদ আমরা জানতেই পারতাম না। যাইই হোক, মেম্বার পদে মংগল মাদবর পাশ করে নাই কিন্তু পাশ করেছিলো খুনের চরের লালচান ভাই যিনি পরে লালচান মেম্বার নামে পরিচিত ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। মংগল মাদবর নিজেও একজন সচেতন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক ধনী ছিলেন তিনি। ছোট বউ এর ঘরে পর পর চার জন মেয়ে হয়েছিলো, পরীর মতো সুন্দুরি মেয়েগুলি। তারমধ্যে নাজমা, সালমা অন্যতম। আজ ওরা কোথায় আমি জানি না। নাজমা আমার থেকে প্রায় ৩/৪ বছরের ছোট ছিলো। মংগল মাদবর আর বাহারের বাবা, রফিক মাষ্টার, আক্কেল আলী, আলমাস, বাছন, জামাল, এরা এক বংশের লোক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মংগল মাদবর ঐ সব লোকদের থেকে একটু দূরে বাড়ি বানিয়েছিলেন (প্রায় ২০/২৫টা বাড়ির পরে পশ্চিম দিকে)। ফলে বেশীরভাগ সময়ে তাদের বংশের সাথে মংগল মাদবরের অনেক কিছুই বনিবনা ছিলো না। শুনেছি, শহীদ মারা গিয়েছিলো হার্টের কারনে। সে বিয়ে করেছিলো কিনা আমার আজ মনে নাই। কারন আমি গ্রাম ছেড়েছিলাম সেই ১৯৭৭ সালে যখন আমি ক্যাডেটে ভর্তি হই। এর পরে অনেকের সাথেই আমার আর যোগাযোগ ছিলো না।

(চলবে)