৩০/০৯/১৯৯৫- হাইতির এয়ারপোর্টে প্ল্যান ক্রাশ

আমি, ক্যাঃ মুনীর, আর মেজর ফরিদ আমাদের ক্যাম্পের বাইরে একটা ছোট তাবুর আউটারে বসে আছি। ক্যাঃ মুনীর মালয়েশিয়ান হালাল ফুডের একটি প্যাকেট নিয়ে ওভেনে গরম করছে। এর ভিতরে মুরগীর মাংশ, চিজ, এবং কিছু রাইচ দেওয়া। বেশ খেতে। বেস ক্যাম্প থেকে ক্যাঃ জাহিদ এসেছে কিছুক্ষন আগে।

আমাদের প্রতিটি ক্যাম্পেই একটা করে ভিডিও ক্যামেরা থাকে। প্রয়োজন হলে আমরা এতার ব্যবহার করি। ক্যাঃ জাহিদ ভিডিও ক্যাম টি নিয়ে বাইনোকুলারের মতো বন্দরে বিমান উঠানামা দেখছে। সময়টা ধরা যায়, আড্ডার মতো। ফরিদ স্যার আগামী সপ্তাহের পেট্রোলিং সিডিউল বানাচ্ছেন। মাঝে মাঝেই আমাকে কাকে কখন দিলে কার সুবিধা হয় এতা নিয়ে আলাপ করছেন আর সিডিউল বানাচ্ছেন।

হটাত করে জাহিদের উচ্চস্বরে আমরা হচকচিয়ে গেলাম। জাহিদ এমনভাবে চিৎকার দিয়ে উঠলো যেনো মারাত্তক কিছু ঘটেছে।

আসলেই মারাত্তক কিছু ঘটেছে। আমরা পোর্ট অ প্রিন্স বিমান বন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্তে আছি। কিন্তু বন্দরের আভ্যন্তরীন ইমিগ্রেশি কিংবা চেকিং অথবা এক্সিট এইসব ব্যাপারে আমরা কোনো নাক গলাই নাও। এখানে বেশ কিছু প্ল্যান সারাদিনে উঠা নামা করে। একেবারে আমাদের চোখের সামনে। দেখতে ভালোই লাগে।

ঠিক এগারোটার সময় একটা ছোট সেসনা বিমান পোর্ট থেকে কিছুদূর উড্ডয়নের পরেই হটাত করে নীচে পড়ে গেলো। বিকট শব্দ আর বিশাল আগুনের ফুলকী। আমাদের ক্যাম্প থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে এসে সেসনাটি ভুপাতিত হলো। ক্যাঃ জাহিদ আসলে এমেচার হিসাবে এই সেসনার উড্ডয়নের ভিডিও করছিলো। ফলে সেসনাটি উড্ডয়নের সময় এবং পড়ে যাওয়ার সময়ের ভিডিওটা আসলেই অর ভিডিও ক্যামে রেকর্ড হয়ে গেলো।

বিমানটি মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর বিশাল হৈ চৈ শুরু হয়ে গেলো। ক্যাম্পের সৈনিক গন ভয়ে আতঙ্কিত। আর একটু পশ্চিম দিকে এসে বিমানটি ভুপাতিত হলেই আমাদের ঠিক ক্যাম্পের মাথায় এসে পরতো। ভাগ্যিস সেতা হয় নাই। তাহলে আরো বড় ধরনের সমস্যা হতো।

আমরা সবাই দৌড়ে গেলাম ঘটনাস্থলের কাছাকাছি। তখনো আগুন জ্বলছে। কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ১ ঘন্টা পর আগুনের শিখা পরে যাওয়ার পর আমরা স্পটে ঢোকলাম। এর মধ্যে এফ বি আই, হেসিয়ান টেলিভিশন, আমাদের বেস ক্যাম্পের সিনিয়র অফিসার গন, এবং বিমান বন্দরের বড় বড় কর্তাগন সাথে হেসিয়ান পুলিশ এবং সিবপোল চলে এসেছে।

স্পটে গিয়ে দেখলাম, কেহই জীবিত নাই। মোট নাকি চার জন লোক ছিলো সেসনার ভিতর। তাঁর মধ্যে একজন মেয়ে, একজন পাইলট, আরেকজন পুরুষ এবং একজন কো-পাইলট। বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে এখানে সেখানে। মানুষুগুলি পড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোনো একটা অংশ ও নাই। কোনো বডি পার্তস পাওয়া গেলো না। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে কয়েক পিস মুরগীর মাংশ ইন্ট্যাক্ট অবস্থায় আছে, দুটু ব্ল্যাক লেবেল মদের বোতল ভেঙ্গে পড়ে আছে। আর পাওয়া গেলো কয়েক খন্ড হাড় গোড়। সেসনাটি মাত্র কয়েক মিনিট আকাশে ছিলো। আমাদেরকে অনেকে অনেক প্রশ্ন করছেন, কিন্তু ব্যাপারতা আমরাও ভালোভাবে খেয়াল করি নাই।

এর মধ্যে এভিয়েশন থেকে তদন্তের আদেশ এলো। আমরা যা দেখেছি, সেটা আগামীকাল তদন্তের কর্মকর্তাদের কাছে বলে একটা সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিতে হবে। সন্ধায় আমাদের বেস কমান্ডার কঃ ফরিদ ডেকে পাঠালেন। একটু আগে আমরা ব্যানব্যাট থেকে ফিরে এসেছি।

এখানে একটা মজার ব্যাপার কাকতালীয় ভাবে ঘটে গেলো। ক্যাঃ জাহিদ ভিডিও ক্যামের মাধ্যমে যে ভিডিও টা করেছিলো সেখানে প্ল্যানটার উড্ডয়ন থেকে শুরু করে ভুমিতে পরার ভিডিও টুকু পুরুতাই করা হয়ে ছিলো। কিন্তু জাহিদ ভয় পেয়ে যাওয়ায় ভুমিতে পরার পর আগুন সহ প্ল্যানটির আর কোনো ভিডিও নাই। তাতে কি। এতাই তো অনেক রেয়ার একটা ভিডিও। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে (এটিসি) তে হয়ত কোনো ফুল ভিডিও হয়ে থাকতে পারে কিন্তু এটিসির বাইরে আমাদের কাছে ঠিক উড্ডয়নের এবং পতনের ভিডিও টা আছে। এতা জানার সাথে সাথে আমাদের কর্তব্যপরায়নতার একোতা বিশাল প্লাস পয়েন্ত হয়ে দারালোযে, আমরা কত সিন্সিয়ার যে, এই রকম ভাবে আমরা বেশ দায়িত্তের সাথে কাজ করি। আমরা বললাম যে, সাধারনত আমরা প্রতিটি বিমানের উড্ডয়নের সময় এবং নামার সময় ভিডিও করি। দিন শেষে আবার এইগুলি মুছে ফেলি। কোনো অঘটন থাকলে সেতা আমরা উর্ধতন কর্মকর্তাকে জানাই। আর তা না হলে আমরা ভিডিও গুলি আর সংরক্ষন করি না।

আমাদের এই ভিডিও তা হাইতির টেলিভিশন চ্যানেলে দেখানো হলো। আমাদের কন্টিনজেন্টের সুনাম আরো বেড়ে গেলো যে, আমরা অনেক সচেতন আমাদের ডিউটির ব্যাপারে। বিবিসি টেলিভিশন আমার ইন্টারভিউ নিলেন, আমাদের সাথে বেস ক্যাম্পে ক্যাঃ জাহিদ, মেজর আলীর ও ইন্তারভিউ হলো বিবিসির। মেজর আলী অপস অফিসার হিসাবে কাজ করছে।

কারো সর্বনাশ আবার সেই সর্বনাশের ফলাফলে কারো আবার পুর্নিমার রাত। কারা মারা গেলো আমার জানা নাই, কিন্তু খুব অবাক হলাম যে, ওরা মদ নিয়ে চিকেন নিয়ে হয়ত বা মজা করার জন্যই আকাশে উঠেছিলো। কিন্তু স্রিষ্টিকর্তা কাকে কখন কিভাবে নিয়ে যাবেন, একমাত্র তিনিই জানেন। ওদের আর চিকেন বা মদ খাওয়া হয় নাই। তাঁর আগেই আকাশ থেকে ভুমিতে মৃত অবস্থায় ঝরে পড়েছে।

এলাকাটি পুলিশের হলুদ টেপ দিয়ে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করা আছে, ক্রাইম জোন বা নো এন্ট্র্যান্স হিসাবে। চারিদিকে পুলিশ পাহারা দিয়ে রেখেছে তদন্ত শেষ না হওয়া অবধি এটা থাকবে। তবে আমাদের প্রবেশের কোনো বাধা নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *