৩১/১/২০১৯-প্রকৃতি তাঁর নিজস্ব চরিত্র

প্রকৃতি তাঁর নিজস্ব চরিত্র, চক্র বা সত্ত্বাকে কখনো বদলায় না। শীত বা বসন্ত কিংবা শরতের আগমন বা প্রস্থান আপাতদৃষ্টিতে আগেপিছে হইলেও ইহা প্রকৃতির বদলানোর কোন হেরফেরের বিষয় নয়। আমাদের প্রয়োজনে আমরা যেমন সময়কে একটা স্ট্রাকচারের মধ্যে বন্দি করিয়া সেই স্ট্রাকচার দিয়া বহমান প্রকৃতির আসা যাওয়াকে হিসাবে কষি, প্রকৃতি সেটারও ধার ধারে না। সে তাঁহার সময়ে গ্রীষ্ম দেয়, সে তাঁহার সময়ে শীতের আবির্ভাব ঘটায়। সে তাঁহার নির্দিস্ট চক্রেই তাঁহার যাবতীয় কর্মসম্পাদন করে। ফল পাকিবার বয়স, কিংবা ঝড় আসিবার কাল, অথবা মানুষ পরিপক্ক হইবার ক্ষন সবই এই প্রকৃতি তাঁহার ঠিক সময়ের অনুচক্রে পরিবর্তন ঘটাইয়া থাকে। প্রকৃতির এই চক্রকালের সহিত মানবকুলের সৃষ্টি সময়ের অনুচক্রে অনেক সময়ই গরমিল হয় বলিয়া যে সময়টাকে যাহার জন্য আমরা পরিপক্ক বলিয়া একটা আদর্শ মাপকাঠি ধরি, তাহা আসলে প্রকৃতির অনুচক্রে হয়তো তখনো তাহা অপ্রাপ্ত বা অপরিপক্ক হিসাবেই পরিগনিত হইয়া রহিয়াছে। এইরূপ দুইটি অসামঞ্জস্য চক্র যখন একই ঘটনায় খেলিতে থাকে, তখন কোথাও অধিক পরিপক্কতার কারনে, আবার কোথাও আমাদের মাপকাঠিতে অপরিপক্কতার নিদর্শনে গড়মিল হইয়া মানব সমাজে একটা অরাজকতা আর বিশৃঙ্খলা কায়েম করে। ইহাতে মানবকুল ক্ষতিগ্রস্থ হয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাস দোলাচলে একে অপরের জন্য দুর্বিসহ পরিস্থিতির কারন ঘটাইয়া সমাজ আলোড়িত করে।

এই আলোড়িত সমাজে তখন কারো কারো জীবনে অসময়ে যেমন সাফল্য আসিতে দেখা যায়, তেমনি, সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও অনেক ক্ষেত্রে কারো কারো জীবনে শুধু ব্যর্থতাই চোখে পড়ে। আমরা তখন প্রকৃতির নিয়মটাকে অগ্রাহ্য করিয়া একে অপরের দোসারুপে মগ্ন থাকি। দর্শন তৈরী করি, উপদেশবানী প্রচারিত করি। সব উপদেশ বা দর্শন সর্বক্ষেত্রে আবার একই পরিনাম আনে না। ইহার কারন, প্রকাশ্যে ভালো মানুষের বেশ ধরে অনেকেই চলাচল করিলেও আড়ালে খারাপ কাজ করার লোকের অভাব নাই। এই খারাপ লোকদের হইতে সাবধান হইবার জন্য তখন আমরা আরো এক ধাপ আগাইয়া “লেসন” বা “শিক্ষনীয় নীতিবাক্য” জাহির করিয়া একে অপরের জন্য ভালো কিছু বলিয়া থাকি।

তবে একটি কথা ঠিক যে, জীবনে সাফল্য পাইতে হইলে অন্য কারো সহানুভুতির চেয়ে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস অনেক জোরালো থাকা অত্যাবশ্যকীয়। কঠিন পরিশ্রম যদি হয় কোনো সাফল্যের মূলশক্তি, নিজের আত্মবিশ্বাস হইলো সেই শক্তির মুলচালিকা উপাদান। অতীতে কি হইয়াছে, কি কারনে ব্যর্থ হইয়াছেন, কি করিলে কি হইতে পারিতো এইসব বিস্লেশন করা আবশ্যক বটে, তবে তাহা একটি শিক্ষা হিসাবে ভবিষ্যতে কাজে লাগাইয়া সাফল্যের সকাল দেখিতে হইবে। একটা ব্যর্থতাই জীবনের সবকিছু নয়। যার জীবনে ব্যর্থতা নাই, তিনি সাফল্য পাইলে কি অনুভুতি হয় তাহা বুঝিতে পারিবেন না। এইজন্য, প্রতিটি কাজে নিজের বিবেচনা খাটাইতে হয়। সবাইকে সবসময় বিশ্বাস করিতে নাই। মনে রাখা দরকার যে, ইবলিশও এককালে ফেরেস্তা ছিল। তবে কাউকে তাহাঁর কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে বিশ্বাস করা উত্তম। কেননা, কথা মিথ্যা হইতে পারে কিন্তু কাজ মিথ্যা আর সত্যকে পৃথক করে। কোনো মানুষের সুন্দর্জ নির্ভর করে তাঁর সময়ের সাথে সাহসীকতা, তাহাঁর রুচি আর বেশীর ভাগ নির্ভর করে তাঁর পরিপক্ক জ্ঞানের উপর।  আজকে কারো উপর আপনার নির্ভরতার মাত্রা যদি হ্রাস পায়, এটা আপনার দোষ নয়, বরং ইহা তাহাঁর দোষ যিনি আপনাকে নির্ভরতা দিতে পারে নাই। ভুল মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে কারো সাথেই বন্ধুত্ব না করা শ্রেয়। ভুল মানুষ সাথী করার চেয়ে একা আগাইয়া যাওয়া অনেক বেশী আরামদায়ক। কখনো যদি মনে হয়, আপনি ভুল মানুষের সাথে হাটছেন, তাহাঁর থেকে অতিদ্রুত পৃথক হইয়া যাইবেন। এটা সেই নড়ে যাওয়া দাতের মতো, যতোক্ষন সাথে থাকিবে ততোক্ষন যন্ত্রনায় থাকিবেন। তখন একা নিজেই আগাইয়া যাইবেন। জীবনকে নিজের দুইটি পায়ের মতো করিয়া দেখিবেন। কোন পা আপনার সামনে গেলো আর কোন পা আপনার পিছনে রহিলো তাহাতে কিছুই যায় আসে না। কারন পাদ্বয় জানে তাহাদের অবস্থানের পরিবর্তন হইবেই আগাইয়া যাওয়ার পথে। আপনি তখন নিজেই নিজের সাথি। সাফল্য বা ব্যর্থতা সবই নিজের। এই পথ চলার মাঝে শুধু একটি বিশেষ উপদেশ সর্বদা মাথায় রাখিবেন, যে, যাহারা আপনার থেকে বৃদ্ধ, তাহাদেরকে সম্মান করিবেন, আর যাহারা আপনার থেকে অধিক দূর্বল, তাহাদেরকে সাহায্য করিবেন আর যদি ভুল করিয়া থাকেন তাহা অকপটে স্বীকার করিয়া লইবেন। ইহার একটি কারন আছে যে, আপনি নিজেও একদিন বৃদ্ধ হইবেন, প্রকৃতির কোনো না কোনো ভুলচক্রে পড়িয়া হয়তো আপনি নিজেও অনেকের থেকে দূর্বল হইয়া পড়িতে পারেন এবং আপনি নিজেও কোথাও কারো কাছে ভুল করিতে পারেন। আজকের দিনের এইসব মানবিক গুনাবলী আপনাকে আগামীতে অনেকের কাছে আরো গ্রহনযোগ্য করিয়া তুলিবে এবং আপনার জীবন আরো সহজ করিয়া রাখিবে। এরই মাঝে যদি কখনো মনে হয় আপনি সাফল্য পাইলেন না, মন ভারাক্রান্ত করিয়া চোখের দৃষ্টিকে ঝাপসা করিয়া রাখিবেন না, ইহাতে অনতিদূরে অপেক্ষামান আরো নতুন সাফল্য আপনাকে পাশ কাটাইয়া চলিয়া যাইবে। স্বপ্ন সার্থক করিবার লক্ষ্যে মনে কোনো সন্দেহ লইয়া কাজ করিবেন না। স্বপ্ন সার্থক হইবার পিছনে যতো না ব্যর্থতা কাজ করে, তাহাঁর অধিক ব্যর্থতা আনে যখন আপনি কোনো কিছু সন্দেহ লইয়া কাজ করিবেন। অবিচল থাকিবেন আপনার স্বপ্নের লক্ষ্যে। মনে রাখিবেন, আজকের দিনটি কিন্তু গতকাল আপনার কাছে আগামীকাল ছিলো যাহা নিয়ে আপনি গতকাল বিচলিত ছিলেন। বিচলিত থাকিবেন না। অনেক দূর যাইতে হইবে। যদি কখনো মনে হয় যে, দ্রুত যাইবেন, তাহা হইলে একা হাটুন, কিন্তু যদি মনে করেন, অনেক দূর যাইতে হবে, তাহা হইলে কাউকে সাথে নিন। আর এই সাথী নির্বাচনে দাপট, অবস্থান এবং শক্তির উৎস খুজিবেন না। কারন এইসব দাপট, অবস্থান আর শক্তি সারাক্ষন থাকে না। শুধু বিবেচনায় নিন, সাথী নিজে পরিশ্রমী কিনা, তাহাঁর ভিতরে মানবতা আছে কিনা, আর পরীক্ষা করুন তিনি লোভী কিনা। ইহার সাথে ইহাও পরীক্ষা করুন, তিনি সত্যকে জানিয়া, সত্যকে দেখিয়া মিথ্যার জালে বাস করছেন কিনা। যদি আপনি তাহাকে ভালোবাসিয়া সাথী করিয়া থাকেন, কিন্তু বুঝিতে পারেন তিনি আপনাকে ভালোবাসেন নাই, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে আপনি অ-জায়গায় অপাত্র লইয়া ঘুরিতেছেন। তাহাঁর সহিত আপনি কিছুদুর হাটিতে পারিবেন বটে কিন্তু বেশীদিন হাটিতে পারিবেন না। আপনি যদি মেয়ে মানুষ হইয়া থাকেন, যদি দেখেন কেহ আপনাকে একটি সুবিধা লইবার পায়তারা করিতেছে বা সুবিধা লইবার পাত্র বলিয়া বিবেচনা করিতেছে, তাহা হইলে তাহাকে অতি দ্রুত ছাড়িয়া দিন। কিন্তু যদি মনে মনে এই প্রমান পান যে, আপনি মেয়ে মানুষ হিসাবে আপনার সাথী আপনাকে একটি দায়িত্ব বলিয়া ভাবে, সে আপনার প্রকৃত সাথী হইবে নিশ্চিত থাকিবেন। কোনো পুরুষ যদি তাহাকে পুরুষ মনে করিয়া আপনার থেকে অধিক সুপেরিয়র ভাবিয়া থাকে, তাহা হইলেও তাহাকে ছাড়িয়া দিন। তিনি আপনার বন্ধু হইবার যোগ্য নহেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *