৮/৯/২০১৯-সারপ্রাইজটা অনেক বেশী

সারপ্রাইজটা অনেক বেশী হয়ে গেলো।কি সেই সারপ্রাইজ, আর  কিভাবে হলো সেটাই বলছি।

সকাল বেলায় নাস্তা করার সময় মেয়ে আর বউ দুজনেই বল্লো, হ্যাপি বার্থ ডে।

মনে পড়লো, ও আজ আমার বার্থডে।

আমি কখনো আমার নিজের বার্থ ডে ঘটা করে পালন করি নাই। আর করার মতো পরিবেশও আসলে ছিলো না। এই মেয়েরা শখ করে, ফলে কখনো কখনো মেয়েদের চাপে পড়েই ইদানিং জন্ম দিনটা পালন হয়। কখনো ঘরোয়া ভাবে, কখনো একেবারেই নিজেরা, আবার কখনো কখনো সবাই মিলে। ফলে আমার জন্মদিন নিয়া আমি খুব একটা উচ্ছসিত থাকি না। সম্রাট আকবরের কিংবা নেপোলিয়ানের জন্ম তারিখ পরীক্ষার খাতায় ভুল করলে সেটা শুধু নম্বরের উপর দিয়েই যাবে, ঘরে শান্তি নষ্ট হবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু আমি ভুলেও আমার মেয়েদের বা বউ এর জন্মদিন ভুলি না। বুদ্ধিমান স্বামীরা এইটা ভুল করার কথা না। করলেই অনেক কথা শুনার একটা রাস্তা তৈরী হয়ে যায়, অশান্তি আসার সম্ভাবনা থাকে। ওনাদের জন্মদিন পালন না করুন, অন্তত সকালে উঠে সবার আগে বলা চাই, বউ হলে হ্যাপি বার্থ ডে জানু,, আর মেয়েদের বেলায় "হ্যাপি বার্থ ডে মা" ইত্যাদি।

যাক, যা বলছিলাম।

ঘুম থেকে উঠেই আমি সাধারনত মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি রাতে কেউ ফোন দিলো কিনা, বা কেউ ফোনে না পেয়ে ম্যাসেজ দিলো কিনা। এটাও তাঁর কোনো ব্যত্যয় হলো না। আমার রোজকার অভ্যাস। আজকে মোবাইল হাতে নিতেই দেখি অনেকগুলি ম্যাসেজ। কিছু রোটারীর বড় বড় হোমড়া চোমড়াদের অত্যান্ত চমৎকার মেসেজ। কিছু আছে ব্যাংকের তরফ থেকে। আবার কিছু আছে সার্ভিস সেন্টার গুলি থেকে। প্রায় সব গুলিই কমার্শিয়াল। খুব একটা পুলকিত হবার মতো না এইসব মেসেজে। তারপরেও খারাপ লাগে না। গালি তো আর দেয় নাই। শুভেচ্ছা দিছে।

দেখলাম, প্রথম মেসেজটাই আমার বড় মেয়ের। রাত ১২০১ মিনিটে পাঠিয়েছে। আমাকে জন্মদিনের উইশ করে চমৎকার একটা ম্যাসেজ। "Happy Birth day, my Super Hero, Dad. You are the best example of a father and all the moments I have lived with you is unforgottenable. With each passing year, I wish your happiness become double. I wonder if you know how much I love you. I  may not tell you enough but I do love you from my heart to infinity and beyond. Happy birthday Abbu. এতো চমৎকার করে বলা, সেটা যেনো হৃদয় ছুয়ে যায়। মুচকি হেসে দিলাম। সকালতাই যেনো কেমন মিষ্টি মনে হলো।

এতো বছর পরে এসে এখন আমার যদিও আর সেই ছোট বেলার মতো জন্মদিন, কিংবা এই জাতীয় কোনো কিছু আর উচ্ছাসিত করে না। তারপরেও মেয়েদের এই রকম অন্তরস্পর্শী মেসেজ মনকে বড় উতালা করে তোলে। পরিবার তখন মনে হয় আমার সবচেয়ে আনন্দের একটি জায়গা। তখন দিনটাকে আর নিছক অন্যান্য দিনের মতো মনে হয় না। যদিও অনেক সময় মনে হয়, ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েরা এগুলা নিয়ে বেশ মজা পায়, সেলিব্রেট করে, একটা ফানডে করে, কিন্তু এটা সব সময় সত্য যে, আমাদের সারা বছরের ব্যস্ত দিন গুলির ফাক ফোকর দিয়ে এইসব ছোট খাট বিষয় নিয়ে পরিবারে একটা গেট টুগেদার তো হয়। একদিক দিয়ে খারাপ না। অনেকেই আবার ধর্মের দোহাই দিয়ে এইসব করা নাজায়েজ বলে কথাও বলেন। আমি ধর্মের বিষয়টা এখানে কোনোভাবেই আলোকপাত করতে চাই না। এতা যার যার ব্যাপার।

যাক যেটা বলছিলাম, আমার জন্মবার্ষিকির কথা।

বউ এর হ্যাপি বার্থ ডে বলার উপলক্ষে বউকে বললাম, আরে, এখন কি আর সেই চমক আছে যে, জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি করার? তাঁর মধ্যে বড় মেয়ে বগুড়ায়, ছোট মেয়ের সামনে পরীক্ষা। তোমার আবার কলেজ থাকে। সব মিলিয়ে সবাই তো ব্যস্তই থাকি। কি দরকার খামাখা আবার একটা ঝামেলা করার।

তারপরেও বউ বল্লো, আরে, চলে এসো একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে। রাতে বাইরে আমরা আমরাই কোথাও ঘুরতে যাবো, খেয়ে রাতে বাসায় ফিরবো। সময়টা হয়তো ভালই যাবে। একটা ব্যতিক্রম দিন যাবে। ভাবলাম, ঠিক আছে, এই উপলক্ষে না হয় একটু যাওয়া যেতেই পারে।

অফিসে এলাম, সকাল তখন প্রায় দশটা। আমি এসে স্টাফদের বললাম, কার কি কাজ আছে আমার সাথে, একটু গুছিয়ে নিয়ে আসো, আমি হয়ত আর্লি লাঞ্চ করে বের হয়ে যাবো। সবাই মুটামুটি দ্রুত গতিতেই আমার সাথে জড়িত যার যার কাজ গুছিয়ে নিয়ে এলো। প্রায় ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সেরে ফেল্লো সব কাজ। আমি নামাজ পড়ে, আর্লি লাঞ্চ করতে বসে গেলাম। এরই মধ্যে আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার (আসলে ব্যবসায়ীক পার্টনার বললে ভুল হবে, আমরা আসলে দুজনেই দুজনকে ফ্যামিলি হিসাবেই দেখি) মূর্তজা ভাই ফোন দিলেন। ব্যবসায়ীক কাজেই ফোন দিলেন। কথা শেষে আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনি আজকে অফিসে আসবে কিনা। জানলাম, আসতে উনার দেরী হচ্ছে, একটা অফিশিয়াল কাজেই আটকা পড়েছেন। ফলে, আমি যে আর্লি বের হয়ে যাচ্ছি সেটা ওনাকে জানাতে গিয়ে কোন ফাকে যে বলে ফেলেছি যে, আজ আমার জন্মদিনের উপলক্ষে বাসায় বউ পোলাপান আগে যেতে বলেছে। মুর্তজা ভাই, হাসলেন। আমিও হাসলাম। কিছু ফান ও করলাম এই জন্মদিনের অনেক কথা নিয়ে (সেগুলি এখানে বলছি না)।

যাক, আমি প্রায় দুটোর দিকে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। রাস্তার যে অবস্থা, ট্রাফিক জ্যাম ক্রস করে করে বাসায় পৌছাতে পৌছাতে প্রায় ৪টা বেজে গেলো। এতো আগে সাধারনত আমি অফিস থেকে কখনো বাসায় আসি না। ফলে সন্ধ্যা হতে এখনো অনেক বাকী। আর আমরা তো প্ল্যান করেছি সন্ধার পরে বাইরে যাবো। এই অল্প সময়টুকুন কি করা যায় আমাকে আর ভাবতে হলো না। ছাদে আমার বাগান আছে, আমি নিজেই এর দেখাশুনা করি। ফলে ছাদে যেতে চাইলাম। বউ বল্লো, আরে, আজকে আর ছাদে যাওয়া লাগবে না। একটু রেষ্ট নাও। সন্ধ্যায় ঘুরতে গেলে ফ্রেস লাগবে।

কথাটা মন্দ লাগলো না। শুয়ে শুয়ে ক্রাইম পেট্রোল দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম। মাগরিবের আজান পড়ছে, ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বিছানা থেকে উঠে মনে হলো, আজ বহুদিন পর দিনে ঘুমিয়েছি। আশেপাশে কিছু পাখীর কিচির মিচির হচ্ছিলো। শব্দটা ভালই লাগছে। এদিকে দরজাতা বউ ডেংগুর ভয়ে সন্ধ্যার আগেই বন্ধ অরে রেখেছে। ডেংগু বড় খারাপ জিনিষ। আমরা অনেকেই সচেতন নই বিধায় মশারা আমাদের থেকে একটু চালাক। সন্ধ্যা হলেই কাম্রাইয়া কিছু রক্ত খেয়ে নেয় আর ডেংগুর জীবানু উপহার দিয়ে তারপরের ইতিহাস নাইবা বললাম। ভালো ঘুম হয়েছে, তবে ঘুমের রেওয়াজটা এখনো আছে বলেই মনে হচ্ছে। ভালই লাগলো ঘুমটা। নামাজ পড়ে বউকে বললাম, কোথায় যাবা প্ল্যান করেছো?

খুবই স্বাভাবিক স্বরে বউ জানালো, এখনো তো ঠিক করা হয় নাই কোথায় যাবো। তবে, চলো, খুজে বের করা যাবে। বের হলেই দেখা যাবে কোথায় যাওয়া যায়। আমি তাকে একটু সাজগোছ করতে দেখলাম। তাঁর এই সাজগোছে কিন্তু আমার কাছে একটা জিনিষ বারবার খুব অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, বাইরে যাচ্ছি আমি, আমার ছোট মেয়ে আর আমার বউ। একেবারেই একটা ঘরোয়া ব্যাপার। কিন্তু তারা হটাত করে এতো সাজগোছ করছে কেনো?

বউকে জিজ্ঞেস করায় সে বল্লো, আরে তোমার জন্মদিনের একটা ছোটখাটো জিনিষ মনে করি নাকি আমরা? একটু ছবি টবি তুলবো, একটা রেষ্টুরেন্টে যাবো, সেজেগুজে যেতেই ভালো লাগছে। ওদিকে, আমার ছোট কন্যাকে কোথাও নিতে গেলে তাকে সাজবার জন্য কতবার যে তাগাদা দিতে হয়, তাঁর কোনো ইয়াত্তা নাই। কিন্তু আজ দেখলাম, বাহ, নিজেই ড্রেস পছন্দ করছে, সময় নিয়ে ড্রেস পড়ছে। ব্যাপারটা খুব নিঃশব্দে হচ্ছে। আমার কাছে একটু খটকা লাগছে বটে কিন্তু একেবারেই আবার অস্বাভাবিকও মনে হচ্ছে না। হতে পারে, আজ ওদের মন খুব ফুরফুরা।

যাই জিজ্ঞেস করি, তাতেই তারা হাসে। আমার রুমে গেলাম। আমার রুম মানে আমি যেখানে কম্পিউটার নিয়ে কাজ করি সে রুমে। একটু কফি খেলাম। ভাবতেছিলাম, ওরা কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছে? ওদের কি আমাকে কিছু সারপ্রাইজ দেওয়ার প্ল্যান করছে? ওরা কি কোনো গিফট বা এই জাতীয় কিছু আগে থেকেই কিনে রেখেছে যা রেষ্টুরেন্টে গেলে হয়ত বের করবে? ইত্যাদি। আমি হেটে হুটে ঘর ময় নীরবে একটু চেক ও করলাম, চোখে এই জাতীয় কোনো কিছু পড়ে কিনা। পেলাম না। ফলে ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়েই ফেলে দিলাম কারন কোনো ক্লু পাচ্ছিলাম না। মেয়ে মানুষেরা তো সময় অসময় সব সময়ই সাজ গোছ করতে পছন্দ করে। হয়ত এতা তারই একটা অংশ।  

তো, ওরা প্রায় রেডি হয়ে যাচ্ছে দেখে আমিও রেডি হবার জন্য আমাদের মেইন ঘরে গেলাম। ভাবলাম, আমরাই তো। একটা টি সার্ট অথবা গেঞ্জি পড়ি, সাথে সেন্ডেল সু পড়ি, আরাম লাগবে। হটাত করে আমার বউ বল্লো, আরে নাহ, শার্ট প্যান্ট পড়ো। আমরা যেহেতু সবাই একটু সাজ গোছ করছি, তুমি আবার গেঞ্জী, স্যান্ডেল সু পড়লে কেমন দেখায়। বললাম, আরে, এতে কি অসুবিধা। আর আমরা কোথায় যাচ্ছি আসলে খেতে?

বউ এর উত্তর, চলো যাই, একটা কোথাও গেলেই হবে। যাক, বউ যখন সেজেগুজে শাড়িটাড়ি পড়ছে, মেয়েও যখন তাঁর পছন্দের মতো করে সেজেছে, তাহলে আমি আবার গেঞ্জীগুঞ্জী পড়ে লাভ কি? আমিও না হয় শার্ট প্যান্টই পড়ি।

কিন্তু মনের ভিতরে একটা খটকা লেগেই থাকলো। আমার এক সময় মনে হলো, ওরা কি কোনো বড় সড় গিফট কিনেছে নাকি? কিংবা এমন কিছু যা আমি দেখছি না কিন্তু ওরা লুকাচ্ছে? আমি একটা টেকনিক খাটালাম।

আমি আমার মেয়ের রুমে গিয়ে বললাম, কিরে মা, আজকের জন্মদিনে আমার জন্য কোনো গিফট কিনলি না? মেয়ে হেসে দিয়ে বল্লো, না আব্বু, সময় পাই নাই। তাছাড়া আপু বগুড়া থেকে আসুক, তারপরে দুই বোনে গিয়ে তোমার জন্য গিফট কিনবো বলে আমরা ভেবেছি। তাই আর কেনা হয় নাই।  এই বলে ছোট মেয়েও একটু মুচকি হাসলো। আমার সন্দেহের খটকাটা দূর হচ্ছিলো না। কিছু তো একটা চলছিলো যা আমি আবিস্কার করতে পারছিলাম না। কি হতে পারে? কত কিছু ভাবলাম, কত ভাবে ভাবলাম, ব্যাপারটা আমার মাথায়ই আসছে না, কি হতে পারে?

সবাই বের হলাম। আমি একটু আগেই বের হলাম। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, তোর ম্যাডাম কিছু প্যাকেট দিছে নাকি? ড্রাইভার সহজ ভাবে বল্লো, না তো স্যার। কিছু দেওয়ার কথা নাকি? কই ম্যাডাম তো কিছু বল্লো না।

আমরা সবাই গাড়িতে বসে পড়লাম। গাড়ির ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো, স্যার কোথায় যাবো। আমি কিছু বলার আগেই আমার বউ বলে উঠলো, চলো, রেডিসনের আশেপাশে ভাল রেষ্টুরেন্ট আছে, ওখানেই চলো। আমি বললাম, আরে, বড় মেয়ে আসুক, তখন না  হয় ওকে নিয়েই একবারে যাওয়া যাইতো। বড় মেয়ে শুনলে ভাববে, দেখো, আমি ঢাকায় নাই, আব্বু আম্মু, আর কনিকা সবাই আব্বুর জন্মদিনে রেডিসনে পার্টি করছে। ওর হয়ত একটু মন খারাপ হতে পারে। কি দরকার। থাক না আজকে না হয় এই করিমুল্লা বা রহিমুল্লার কোনো নরম্যাল একটা রেষ্টুরেন্টে যাই, এম্নিতেই কিছু খাওয়া দাওয়া করে চলে আসি।

আমার বউ নাছোড়বান্দা। আমার বউকে আজকে মনে হচ্ছে, বেশ সার্থপর। বড় মেয়ের জন্যও তাঁর আজকে যেনো আফসোস নাই। বল্লো, আসুক মেয়ে, তারপর ওকে নিয়ে আরেকদিন যাবো। সব তো আর শেষ হয়ে গেলো না।  

গাড়ি যাচ্ছে, হটাত দেখি আমার বউ গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। আমি দেখলাম, একটু সন্দেহ হলো কেনো সে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে? কিন্তু আবার মনে হলো, হয়ত কোনো ভালো রেষ্টুরেন্টের খোজ মনে মনে নিয়ে রেখেছে যেটা সে  ভালোমত চিনে না। তাই গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। আমরা যাচ্ছি, যাচ্ছি, যেতে যেতে রেডিসন পার হয়ে গেলাম। সামনে কূর্মিটোলা গল্ফ ক্লাব। ভালো সাজিয়েছে মনে হচ্ছে। অনেক গাড়ি পার্ক করা। হয়তোবা কারো বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, অথবা বড় কোনো পার্টি। শহরের ঝলমল আলতে কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবটা যেনো তাঁর নিজের আলতে আরো চকচক করছে। লাল নীলা, সবুজ আলো, অনেক প্রকারের স্টাইলে জ্বলছে আলগুলি। ভালই লাগছে। পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে হর্ন বাজিয়ে আবার ব্যস্ত শহরের গাড়ি ঘোরা ছুটে চলছে। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরাও সামনে এগুচ্ছি।

বললাম, চলো, কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে ঢোকি।

আমার বউ আজগুবি একটা কথা বল্লোযে, এখানে তো আমাদের আর্মির জায়গা। অনেকবারই এসেছি। চলো দেখি, আরো সামনে যাই, কি কি ভালো রেষ্টুরেন্ট আছে। সেখানেই যাই। বললাম, সামনে তো আছে রিগেন্সি, ম্যাপল লীফ, আরো অনেক কিছু। আসলে তোমরা কি প্ল্যান করেছো কোথায় যাবা?

বউ বল্লো, চলো না যাই। তুমি আর এখন ব্যস্ত না।

ঠিক আছে, দেখা যাক কোথায় নিয়ে যায় বউ।

গাড়ি আরো সামনে চলে যাচ্ছে। চলে এসেছি প্রায় রিগেন্সির কাছাকাছি। বললাম, চলো তাহলে রিগেন্সিতেই যাই। তাতেও আমার বউ খুব একটা সায় দিলো বলে মনে হলো না। বল্লো, আরে নাহ, এটাও খুব একটা ভালো মানের না। মনে হয় ১ বা ২ স্টারের মানের। এর থেকে আরো ভালোটায় যাই।

বললাম, তাহলে চলো, ম্যাপললীফে যাই। ওটায় আমি এর আগেও এসেছি। খারাপ না। এবার মনে হলো বউ রাজী। কিন্তু গাড়ি থামানোর কোনো প্রস্তাবনা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেলো না। ফলে গাড়ী ম্যাপললিফের জায়গা পার হয়ে চলে গেলো আরো দূরে। সামনে এবার লা মেরিডিয়ান।

আমার বউ বল্লো, চলো, এখানে তো তোমাদের নওরোজ ভাই চাকুরী করেন। এখানেই যাই।

বললাম, তাহলে চলো। দেখি, দোস্তরে পাই কিনা। পাইলে তো মন্দ হয় না। একটু আডদাও দেওয়া যাবে। যদিও আমি এখানে আরো কয়েকবার এসেছি। বললাম, তো তুমি তো আগে এখানে আসো নাই। খারাপ হবে না।

গাড়ি ঢোকে গেলো লা মেরিডিয়ানে। পার্ক করলাম। ড্রাইভারকে কিছু টাকা দিয়ে বললাম, যে, তুমি খেয়ে নিও কিছু। আমাদের আসতে আসতে একটু দেরী হবে।

আমার বউ আমার সামনে দিয়ে হেটে ঢোকে গেলো লা মেরিডিয়ানে। কঠিন চেক আপ। মনে হচ্ছে কোনো এয়ারপোর্টে ঢোকছি। হাত ব্যাগ, মোবাইল, পকেট, সব চেক টেক করে তারপর ঢোকতে দিলো। আমার বউ আর মেয়ের হ্যান্ড ব্যাগ টাও চেক করাতে হলো। চেকিং এর পর্ব শেষ। আমরা লবিং এ ঢোকে গেলাম।

আমি বললাম, চলো কয়েকটা ছবি তুলে দেই তোমাদের। মেয়ে আর বউ এক সাথি বলে উঠলো, আরে, চলো আগে খাওয়া দাওয়া করে নেই। পরে ছবি তোলার অনেক সময় পাওয়া যাবে। এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে। অবাক হলাম। আমার বউ ছবি তোলায় পাগল থাকে। হটাত তাঁর কি এমন তাড়া যে, ছবি তোলতেও এখন তাঁর ব্যস্ততা? সে কোনোদিকেই ভ্রুক্ষেপ না করে আমার সামনে দিয়ে এমনভাবে হেটে যাচ্ছিলো যেন সে এখানে প্রায়ই আসে, জায়গাটা তাঁর বেশ পরিচিত। একটু অবাক হচ্ছিলাম। আমি বললাম, তুমি কি চিনো কোথায় যেতে হবে?

সাথে সাথে উত্তর, হ্যা, ১৫ তালা।

একটু অবাক হচ্ছিলাম। কিন্তু যেহেতু কোনো কারন নাই তাই ব্যাপারটা আমিও বুঝতেছিলাম না আসলে কি হচ্ছে। আবার এটাও ভাবছিলাম, হয়তো ওর আগে থেকেই ইন্টারনেটে ঘেটেঘুটে জেনে নিয়েছে কোথায় কি আছে। হতেই পারে। আজকালকার যুগ। সবাই স্মার্ট। ইন্টারনেটে কোথায় লবি, কোথায় লিফট, কোথায় রেষ্টুরেন্ট, কয় তালায় রেষ্টুরেন্ট, আজকাল এক ক্লিকেই সব পাওয়া যায়।

লিফটে উঠে গেলাম ১৫ তালায়। ১৫ তালায় রেষ্টুরেন্টে ঢোকলাম। ঢোকেই দেখি-

ওরে বাবা, মুর্তুজা ভাই। একেবারে জাস্ট অবাক আমি। আমি থমকে গেলাম। ভাবলাম, হয়তো কোনো বায়ার নিয়ে এসছে, আমাকে বলার জন্য ভুলে গেছে। বললাম, কোনো বায়ার এসছে নাকি ভাই? আপনি এখানে যে?

হেসে দিয়ে বললেন, আজকে আপনার জন্মদিন না!! আমরাও এলাম আপনার জন্মদিনে। ভাবী, আনিকা, জিওন সবাই এসেছে। আমি তো রীতিমত অবাক। তাইতো বলি, আমি যাহাই বলি না কেনো, আমার বউ তাহলে এই সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই এতো গোপনীয়তা!! ছোট মেয়েও!! আমাকে সাহ্ররট গেঞ্জি না পরতে দেওয়া, গুগল ম্যাপ চালু করা, গলফ ক্লাবকে একঘেয়ে জায়গা বলা, রিগেন্সির মত ভালো মানে একটা রেস্টুরেন্ট কে ১ স্টারে নামিয়ে দেওয়া, ওদের সাজগোছ করা, সব কিছু এখন আমার কাছে লা মেরিডিয়ানের চকচকে আলোর কাছে পরিস্কার।

ভাবলাম, কে বলে, মেয়েরা পেটে কথা রাখতে পারে না? যে এটা বলেছে, সে ভুল বলেছে। 

মুর্তুজা ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন, একটা টেবিলে। ওমা, ওখানে গিয়ে দেখি আরো চমক!!

ভাবী, আনিকা, আর জিওন হাতে চমৎকার অনেকগুলি সাদা গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেওয়ার জন্য। কি অদ্ভুদ ভালবাসা। নিজেকে বড্ড সুখী এবং ভাগ্যবান মানুষের মধ্যে একজন মনে হলো। এরা সবাই আমার পরিবার। সবার হাসিখুশী মুখ, আর চাহনী দেখেই মনটা ভরে গেলো।

সত্যিই সারপ্রাইজড হয়েছি। খুবই সারপ্রাইজড। শুধু ফুল নিয়েই মুর্তুজা ভাই আসেন নাই। সাথে "কাপল ওয়াচ" মানে একটা পুরুষের ঘড়ি আর সাথে একই ডিজাইনের আরেকটা মহিলার ঘড়ি। আমাদের জন্য কিনেছেন একজোড়া আর ভাই ভাবীর জন্য ও কিনেছে এক জোড়া। অনেক দাম, ব্র্যান্ডের ঘড়ি। আমার তো চক্ষু চড়কগাছ। এতোক্ষনে বুঝলাম সেই বিকাল থেকে কি একটা গোপন জিনিষ আমার কাছে আমার বউ, আমার ছোট মেয়ে আর সবাই লুকিয়েছিল। আরো অবাক করার বিষয় হচ্ছে- আমার বড় মেয়ে নাকি জানতো জিনিষটা। সেই দুপুর থেকেই জানতো। আমি ওর সাথেও দুপুরে অনেক্ষন কথা বলেছি। কিন্তু ও নিজেও আমাকে কিছুই বলে নাই।

অজানা জিনিষের হটাত করে যখন চোখের সামনে সারপ্রাইজ হয়ে ধরা দেয়, আর সেটা যদি হয় একটা ভাল কিছু, মনের আনন্দের সাথে চোখের পাতাও সেই আনন্দে জলে ভিজে চিকচিক করে। বড্ড ভালো লাগলো সবার এ রকম একটা লুকোচুরি খেলা।

অত্যান্ত ঘরোয়া পরিবেশে আমার পরিবার আর মুর্তজা ভাইয়ের পরিবার অনেক্ষন সময় কাটালাম। ব্যবসার কোনো কথাবার্তা হলো না। পুরুটাই পরিবার নিয়ে, বাচ্চাদের নিয়ে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তাদের পছন্দ অপছন্দের জিনিষ নিয়ে। আমরা ওদের বলার চেষ্টা করেছি, আমরা এই বিশাল দুনিয়ায় এতো মানুষের ভীড়েও কখন কোথায় কিভাবে একা অনুভব করি। আর সেই একাকীত্তের একমাত্র ভরষার স্থানগুলি কোথায়। এটাই হচ্ছে পরিবার। কোনো কোনো অতীতের অনেক সময় কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। কিন্তু কিছু কিছু বর্তমানের জন্য এমন কিছু ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে, যা আজকের দিনের কোনো এক সুখদুক্ষের এমন ঘরোয়া পরিবেশেই তাঁর জন্ম হয়। এটা যেনো সেই রকম একটা ঘরোয়া পরিবেশ।

অনেক ধন্যবাদ মুর্তজা ভাইকে, অনেক ধন্যবাদ ভাবী, আনিকা এবং জিওনকে। ধন্যাবাদ আমার ছোট মেয়েকে। আর ধন্যবাদ আমার বউকে। ধন্যবাদ আমার বড় মেয়েকে যে আমাকে সব জেনেও কিছুই জানায় নাই অথচ এতো সুন্দর একটা মেসেজ রেখেছিলো সকালেই। ধন্যবাদ সবাইকে। এতো চমৎকার একটা পরিবেশ দেওয়ার জন্য।

মাঝে মাঝে অনেক কষ্টের পরিবেশে বাচতে বাচতে যখন হাপিয়ে উঠি, যখন ঞ্জেকে একা একা মনে হয়, তখন এই সব ছোট ছোট ঘরোয়া ভালবাসা আবারো মনে করিয়ে দেয়, আমরা পরিবারকে ভালোবাসি, আমরা পরিবারের জন্য বাচি। আর এই পরিবারতাই হচ্ছে আমাদের সব সুখের মুল উৎস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *