এখানে যাদের আপ্নারা দেখছেন, এরা সবাই আমার জীবনে এসেছিলো, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আর নাই, চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আবার এমন কেউ আছেন, যারা আমার নিজের লোক কিন্তু কখনোই দেখা হয় নাই কারন তাদের সাথে তাদের জন্মের পর থেকেই আমার কোনো সাক্ষাত হয় নাই। এর মানে এই নয়, তারা আমার নয়। একটা সময় আসবে, হয়তো জেনারেশনের পর জেনারেশন পার হয়ে যাবে, তারা তাদের ইতিহাস খুজে বের করার চেষ্টা করবে, হয়তো সেদিন এই মানুষগুলির আবার নতুন করে আবিষ্কার হবে। তখগন কেউ হয়তো আর এই দুনিয়াতেই নাই। তারপরেও 'আমরা' ছিলাম, আর থাকবো। 

Categories

 

 

 

 

বিশিষ্ট কিছু চরিত্র পরিচিতি

"উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব" ডায়েরিটা পড়তে পড়তে আপনি এমন সব কিছু চরিত্রের সাথে পরিচিত হবেন, যারা বাস্তবে ছিলেন কিন্তু ভিন্ন নামে/ কেউ কাল্পনিক নন। গোপনীয়তার কারনে হয়তো আমি তাদেরকে একটা ফলস নামের সাথে এখানে যুক্ত করেছি কিন্তু তাদের অন্যান্য সমস্ত কাহিনী অবিকল ঠিক সেটাই যা এখানে বর্ননা করা হয়েছে। তবে বেশীরভাগ চরিত্রকেই আমি তাদের আসল নামে এখানে উত্থাপিত করার চেষ্টা করেছি। ডায়েরিটা পরার সময় যদি কোথাও কোনো খটকা লাগে, তাই আমি সেসব চরিত্রের একটা ছোট নোট তৈরী করে রাখলাম যাতে গল্পই বলুন আর বাস্তবতাই বলুন, এর একটা ধারাবাহিকতা থাকে এবং কাহিনী গুলি সব বুঝতে সুবিধা হয়। সেই সুবিধার কারনে ' About Us' পাতায় তাদের সংক্ষিপ্ত কিছু পরিচয় দিলাম। 

ডাঃ আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা 

আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা আমার বড়মেয়ে। জন্ম তার ১৬ জানুয়ারী ১৯৯৪ সাল। পেশাগত জীবনে সে একজন এমবিবিএস ডাক্তার। শহীদ জিয়া মেডিক্যাল সরকারী কলেজ থেকে সে ডাক্তারী পাশ করে ওখান থেকেই ইন্টার্ন করেছে। তার জন্মের আগে আমার বড় ইচ্ছে ছিলো যে, আমার যেনো একটা মেয়ে হয়। প্রথমেই আমি কখনোই ছেলে হোক চাই নাই। আল্লাহ আমার মনের আশা পুরন করেছেন উম্মিকাকে আমার ঘরে দিয়ে। সে খুব ভালো একটা মেয়ে। কিন্তু সে খুব সিম্পল। সে প্রথমে মীরপুর স্টাফ কলেজের টর্চ কিন্ডার গার্ডেনে শিক্ষার কার্যক্রম শুরু করে। অতঃপর মেথোডিস্ট ইংলিশ মিডিয়াম, তারপর শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ এবং সেখান থেকে হলি ক্রস। হলিক্রস থেকে উম্মিকা এইচএসসি পাশ করে। আমি মনে প্রানে চাচ্ছি যেনো উম্মিকা দেশের বাইরে সেটেল্ড হয়। কারন এদেশে আসলেই কোনো যোগ্যতার যেমন মূল্যায়ন হয় না তেমনি নিরাপদও নয়। বর্তমানে কভিড-১৯ এর কারনে কোনো কিছুই স্বাভাবিক নাই, তাই, সব কিছুতেই যেনো একটা মন্থর গতি চলছে। উম্মিকা ঠিক এই মুহুর্তে (২০২১) ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হসপিটালে জব করছে। বাসার কাছে, তাই ব্যাপারটা বেশ ভালো। 

 

 

 

 

সানজিদা তাবাসসুম কনিকা 


সানজিদা তাবাসসুম কনিকা আমার ছোট মেয়ে। জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর ২০০১ সাল। বর্তমানে কনিকা ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড বাল্টমোর কাউন্টিতে পড়াশুনা করছে। কনিকার প্রাথমিক শিক্ষাও ওর বড় বোন উম্মিকার মতো প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট স্কুল কলেজগুলি থেকেই শুরু হয়। তারপর কনিকা ম্যাথোডিষ্ট ইংলিশ মিডিয়ামে, পরবর্তীতে শহীদ আনোয়ার গার্লস স্কুল এবং ইন্টার পাশ করেছে আদমজী ক্যান্ট পাবলিক থেকে। বরাবরের মতো ফলাফলের দিক দিয়ে বড় বোনের মতোই সবগুলিতে এ প্লাস এবং গোল্ডেন প্লাস নিয়ে উত্তির্ন হয়েছে। একটু বেশী ক্রিয়েটিভ মাইন্ডের, ফলে মানসিক টেনশনে কম থাকে। পরীক্ষার আগের দিনেও সে পরীক্ষার সাবজেক্ট ছাড়া অন্য বিষয়ে কাজ করতে দেখা যায়। কনিকা বাল্টিমোরে মুটামুটি খাপ খাইয়ে নিয়েছে বলে আমার ধারনা। এই মাসেই (সেপ্টেম্বর ২০২১) শুনলাম, কনিকা একটা জব পেয়েছে। মাত্র এক মাস হয় নাই আমেরিকায় গিয়েছে কিন্তু পার্ট টাইম একটা জব পেয়ে গেছে। ওর নীচের ক্লাসের দূর্বল ছাত্রদেরকে কোচিং পড়ানো। এটা ওর ইউনিভার্সিটি থেকেই এরেঞ্জ করে দিয়েছে ওকে। ঘন্তায় ১৮ ডলার। প্রতি সপ্তাহে ২০ ঘন্টা করে ক্লাস নিতে পারলেও কনিকা আপাতত সপ্তাহে ৪ ঘন্টার উপর ক্লাস নিবে না কারন ওর নিজেরো পড়াশুনা আছে। কনিকার আগামী এক বছরের সমস্ত খরচ আমি এডভান্স পরিশোধ করে দিয়েছি। আগামী অক্টোবরের আগে আর কোনো টাকা পয়সা হয়তো লাগবে না। দেখা যাক কি হয়। আমি চাই, আমার মেয়েরা নিজেরা যতো দ্রুত সাবলম্বি হয়ে উঠুক। আমিও ধীরে ধীরে আমার এদিকটায় সব কিছু গুছিয়ে আনার চেষ্টা করছি। 

 

 

 

 

 

মিটুল চৌধুরী

মিটুল চৌধুরী, ডাক নাম আসমা। তার এই ডাক নামটা শুধুমাত্র ওর পরিবারের কিছু মুরুব্বী গোছের মানুষই বলে আর অন্য সব ছোটরা ওকে ডাকে মন্টি হিসাবে। মন্টি নামটা আসলে লুসীর দেয়া একটা নাম যাত অর্থ ছিলো এই রকম যে, “মিটুল আন্টি” সংক্ষেপে মন্টি। সেই থেকে সব ছোটরা মনে করে ওর ডাক নাম সম্ভবত মন্টি। তার মুল জন্মস্থান মানিকগঞ্জ। জন্ম ৩১সে ডিসেম্বর ১৯৬৮। মিটুলের বাবার নাম- আলাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মায়ের নাম-জেবুন্নেসা চৌধুরী। তারা আট বোন এবং তিন ভাই। সে সবার ছোট ভাই বোনদের মধ্যে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে র্অথনীতিতে অনার্স পাশ করে মাস্টার্স করে পরবর্তীতে ১৪ বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে জয়েন করেন। প্রথমে তিনি মাইমেন্সিং এর মোমেনুন্নেসা মহিলা কলেজে জয়েন করেন, অতঃপর ঘিউর সরকারী কলেজ, অতঃপর ঢাকা কমার্শিয়াল কলেজ থেকে রাজবাড়ি কলেজ, মাদারীপুর কলেজ ইত্যাদি হয়ে এনসিটিবি এবং তারপর সরকারী বাঙলা কলেজে চাকুরী করেছেন। তিনি বর্তমানে প্রোফেসর হিসাবে বাংলা কলেজ মীরপুরের, অর্থনীতি বিভাগের ডিপার্টমেন্টাল হেড হিসাবে  আছেন। দুই মেয়ের মা। বড় মেয়ে ডাঃ আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা আর ছোট মেয়ে সানজিদা তাবাসসুম কনিকা।  

 

 

হামিদা খাতুন 

মিসেস হামিদা খাতুন, স্বামীর নাম-মোঃ হোসেন আলি মাদবর, ঠিকানা-নতুন বাক্তার চর, থানা-দক্ষিন কেরানীগঞ্জ, ঢাকা। তিনি আমার মা। আমার মায়ের বংশ ধারাটা এই রকমের। জনাব আহাদুল এর ছেলে হাজি আসাদ উল্লাহর তিন পুত্র (১) জনাব উম্মেদ আলী মুন্সি (২) হাছান আলী মুন্সী (৩) ছলিম উদ্দিন মুন্সী। জনাব উম্মেদ আলীর ছিলো চার ছেলে সন্তান। তারা ছিলেন (১) কুদরত আলী (২) লস্কর আলী (৩) চেরাগ আলী (৪) কেরামত আলী। এই কেরামত আলী ছিলেন আমার নানা অর্থাৎ আমার মায়ের পিতা। উক্ত নানা কেরামত আলীর কোনো পুত্র সন্তান ছিলো না। তার মাত্র দুইজন কন্যা (১) আমার মা (২) আমার খালা সামিদা খাতুন।

মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় কিন্তু দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই এক ছেলের মা হয়ে বিধবা হন। খুব বড় লোকের মেয়ে নন বটে কিন্তু মাঝারী পরিবারের বনেদি ঘরের মহিলা। যেই সময়ের কথা বলছি, তখন ১৫ বছর অতিক্রম করলেই গ্রামের মধ্যে আইবুড়ি হয়ে আছে মেয়ে এই রকম একটা অপবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে যদি আবার নিয়তির কারনে কেউ এতো অল্প বয়সেই বিধবা হন, তার তো জীবনটাই যেনো কি রকম দুর্বিষহ হয়ে উঠে তা জানে শুধু যে সাফার করে সে আর জানে সেই পরিবার যেই পরিবারে এটা ঘটছে। অতঃপর দ্বিতীয় বিয়ে হয় আমার বাবার সাথে। বিস্তর বয়সের তফাত ছিলো আমার বাবার সাথে আমার মায়ের। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় কি দুই তখন আমার বাবা মারা যান। আমি আমার বাবাকে দেখি নাই, এমন কি আমাদের কারো কাছেই আমার বাবার কোনো ছবিও নাই। আমার মা যখন আমার বাবাকে বিয়ে করেন, তখন তার প্রথম পক্ষের ছেলে বিল্লাল হোসেন কে আমাদের ই গ্রামের পাশের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে পালক দিয়ে দেন। আমার মা আমার বাবার এমন একটা সংসারে পদার্পণ করেন যেখানে আমার বাবার আগের পক্ষেরই সন্তান ছিলো গোটা আট জন। তাদের সবার বয়স আমার মায়ের থেকে অধিক। এই সন্তানেরা আমার মাকে কোনদিনই আপন করে ভাবতে পারেন নাই। আমার বাবা ছিলেন মাদবর যিনি সারাক্ষনই গ্রামের মাদবরি আর তার জমিজমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এমনই এক সংসারে মা একটানা সংসার করেছেন। আমাদের এই ঘরে পরপর তিন ছেলে আর পাচ কন্যার জন্ম দেন আমার মা। সবার বড় আমার বোন, যার নাম সাফিয়া, তার ছোট শায়েস্তা, এর পরই জন্ম নেয় আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ, তারপর জন্ম নেয় আমার পর পর তিন বোন যথাক্রমে লায়লা, ফাতেমা আর মেহেরুন্নেসা। এতোগুলি মেয়ের পর আমার মার কোল জুড়ে আসে আরেক পুত্র সন্তান কিন্তু সে এই পৃথিবীতে বেশীদিন টিকে থাকতে পারে নাই। তারপরের মানুষটিই হচ্ছি আমি। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় বা দুই, তারপরে আমার বাবা জান্নাতবাসী হন। ফলে আমিই হলাম আমার পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। আমার মা আর বিয়ের সপ্ন দেখেননি। আমাদেরকে নিয়েই তিনি তার সমস্ত ধ্যান ধারনা আর সপ্ন লালিত করেছেন। আমার মা শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ। দেখতেও ছিলেন সুন্দরী। আমার মায়ের পরিবারের কাউকেই আমার মনে নাই। বরং বলতে পারেন, আমি কাউকেই দেখি নাই। আমার জন্মের আগেই সব চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমি না দেখেছি আমার দাদি, দাদা, নানা, বা নানি, কিংবা কোনো মামা, মামিকে। কি আজব, না? আসলেই আজব। এমনটা কি কখনো হয়? কিন্তু হয়েছে। আমাদের আদিবাড়ি আছে মুন্সীগঞ্জ জেলার কয়রাখোলায় যা বর্তমানে সিরাজদিখান উপজেলার অন্তর্গত। আমাদের ঐ বাড়িটি আসলে ছিলো আমার নানার প্রাপ্য জমিটাতে। কিভাবে আমার বাবা আমার নানার জমিতে এতো বড় বাড়ি করলো এবং কেনো উনি তার এতো সম্পদ থাকতেও নিজের সম্পত্তিতে কোনো বাড়ি করেন নাই সেটা আমার আজো জানা হয় নাই। পরবর্তীতে আমরা মাইগ্রেট করে কয়রাখোলা থেকে কেরানীগঞ্জ চলে আসি। ফলে আমাদের এখন দুটু গ্রামের বাড়ি- এক) কয়রাখোলা, ২) কেরানীগঞ্জ। 

সামিদা খাতুন-আমার খালা 

তিনি আমার একমাত্র আপন ফার্স্ট জেনারেশন খালা। আমার মায়ের একমাত্র আপন বোন যাকে আমার মা বোন মনে করেন নাই, করেছেন নিজের মায়ের মতো। আমার খালার সাথে কারো কোন বিবাদ হয়েছে এই রেকর্ড সারা গ্রামের মধ্যে নাই। তিনি অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী গনি মাদবরের স্ত্রী। এখানে বলা দরকার যে, গনি মাদবরকে ভয় পায় না এমন কোনো লোক আমাদের গ্রামের মধ্যে ছিলো না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তিনি সন্ত্রাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যান্ত ন্যায়পরায়ন একজন মাদবর। খুব বুদ্ধিমান। অত্যান্ত অহংকারী এবং একটা ইগো নিয়ে চলতেন। আমার খালা শেষ বয়সে কুজো হয়ে হাটতেন। যখনই শুনেছেন যে, আমি শহর থেকে গ্রামে গিয়েছি, তখনি তিনি কস্ট হলেও খুব সকালে আমাকে দেখার জন্য আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন। আমার খালারও কোন ছবি নাই কিন্তু কোন একদিন আমার ছোট ক্যামেরা দিয়ে একটি মাত্র ছবি তুলেছিলাম ১৯৮৭ সালে যা আমার কাছে একটা অমুল্য রতনের মতো মনে হয় এখন। আমার খালা যেদিন মারা যান, আমি এই খবরটা জানতেও পারি নাই। অনেকদিন পর যখন আমি গ্রামের বাড়িতে গেছি, খালা সেদিন আর আমাকে দেখতে আসেন নাই, জানতে চেয়েছিলাম খালা আসে নাই কেনো? শুনলাম যে, আমার খালা মারা গেছেন। আমার খুব আফসোস লেগেছিলো। আমার খালার ভাগ্য ভালো যে, ঊনি অনেক কস্টে পরার আগেই জান্নাতবাসী হয়েছেন। আমি মাঝে মাঝে খালাকে গোপনে কিছু টাকা দিতাম কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে কোনো কিছু কিনতে পারতেন না, ফলে ঊনি টাকা দিয়েও তারমনের মতো কোন কিছু কিনে খেতে পারতেন না। এর আগেই তার অন্যান্য নাতি নাতকুরেরা তার হাতের টাকাগুলি কোনো না কোনো ভাবে ছিনিয়ে নিতেন। বড্ড নিরীহ মানুষ বলে কারো উপর তার কমপ্লেইনও ছিলো না। খুব নামাজি মানুষ ছিলেন আমার খালা। তার কোন ছেলেরাই তাকে ঠিকমতো ভরন পোষণ করার দায়িত্ত নেন নাই। এক সময়ের প্রতাপ্সহালি মাদবরের স্ত্রী শেষ জীবনে কস্টের মধ্যেই জীবনটা অতিবাহিত করছিলেন কিন্তু আমাদের কিছু সাহাজ্য আর তার নিজের স্বামীর যেটুকু আয় ছিলো তার উপর নির্ভর করেই শেষ জীবনটা অতিবাহিত করেছেন। 

 

 

ডঃ মোহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ

তিনি আমার বড় ভাই। আমার বয়স যখন মাত্র দেড় বছর, তখন তিনি জগন্নাথ ইউনিভার্সিটিতে কলেজ পাশ করেন এবং তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে স্টাটিষ্টিক থেকে মাষ্টার্স করে সেখানেই লেকচারার হিসাবে যোগ দেন। সম্ভবত তিনিই ছিলেন আমাদের চারপাশের গ্রামের প্রথম স্কলার এবং গ্রাজুয়েট। হাবীব ভাই বাবার অন্তর্ধানের পর থেকেই পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব নেন এবং আমরা পাঁচ বোন আর আমি এবং মায়ের সমস্ত দেখভাল করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি স্কলারশীপ নিয়ে প্রথমে আমেরিকায় যান এবং উইসকনসিন ইউনিভার্সিটি (মিজউরী) থেকে তিনি পিএইচডি করে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। অতপর ১৯৮৭ সালে দেশে এসে তিনি সেহেলী সুলতানা নামে মহিলার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আমার ভাবী সেহেলী সুলতানাও পরে আমেরিকায় গমন করেন এবং তিনিও যথাযথ শিক্ষাক্রম শেষ করে শিক্ষাগত পেশায় নিয়োজিত হন। ডঃ হাবীবুল্লাহর দুই ছেলে। বড় ছেলের নাম মাসুদ হাবীবুল্লাহ আর ছোট ছেলের নাম ইউসুফ হাবীবুল্লাহ। বড় ছেলে মাসুদ হাবীবুল্লাহ নিজেও একজন ডাক্তার এবং বর্তমানে সে সাউথ ডেকোডায় তার নিজ প্রোফেশনে নিয়োজিত। ছোট ছেলে ইউসুফ হাবীবুল্লাহ শারীরিকভাবে একটু প্রতিবন্দি বটে কিন্তু অত্যান্ত ভালো একজন ছেলে যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং সবকাজ অনেকটাই সাভাবিকভাবে করতে পারে। ডঃ হাবীবুল্লাহ বর্তমানে নর্থ ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে প্রোফেসর হিসাবে শিক্ষকতা করছে। থাকেন বোষ্টনে।  তিনি নিজে আমেরিকার নাগরিকত্ত পেয়েছে প্রায় দুই যুগেরও বেশী। সেখানেই তিনি বর্তমানে বসবাস করেন। কদাচিৎ দেশে আসেন। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৬৫ এর উপরে।

 

 

ডাঃ মাসুদ হাবীবুল্লাহ

ডাঃ মাসুদ হাবীবুল্লাহ আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহর বড় ছেলে। খুবই অমায়িক এবং সহজ সরল একজন মানুষ। আমেরিকাতেই ওর জন্ম আর জন্মগতভাবেই মাসুদ আমেরিকার নাগরীক। আমেরিকার কালচারেই সে বড় হয়েছে, আমাদের বাংলাদেশের কোনো কালচার তার মধ্যে না থাকলেও অন্তত তার বাবা ডঃ হাবীবুল্লাহ তাঁকে ইসলামিক কায়দায় বড় করেছেন। ফলে মাসুদ খোদ আমেরিকায় বসবাস করেও মদ্যপান, সিগারেট কিংবা এই জাতীয় কোনো নেশায় তাঁকে স্পর্শ করেনি বরং ইসলামিক কায়দায় সে নামাজী হয়ে উঠেছিলো। অত্যান্ত নামীদামী জন হপ কিন্স থেকে ডাক্তারী পাশ করে বর্তমানে সে তার নিজ পেশায় চাকুরী রত আছে। রিমুনা নামে এক মেয়ের সাথে ওর বিবাহ হয়েছিলো কিন্তু বনিবনা না হবার কারনে মাসুদ এবং রিমুনা আলাদা হয়ে যায়। মাসুদ এখনো অবিবাহিত অবস্থাতেই আছে। ছবিটা মাসুদের ছোট বেলার ছবি। আমার বড্ড প্রিয় একটি বাচ্চা। মিষ্টি চেহারা আর ভীষন আদরের। আমি ওকে সব সময়ই মিস করতাম, এখনো করি। কেনো জানি অনেক দেরী করে দেখা হলেও ওর সাথে আমার কোথায় যেনো অনেক পুরানো একটা বন্ধুত্ব আছে। আর সেটা রিনিউ করতে মাত্র কয়েক মিনিটেই চালু হয়ে যায়। ১৯৮৪ সালে মাসুদের জন্ম হয়েছিলো। 

 

 

 

 

ইউসুফ হাবীবুল্লাহ

ডঃ হাবীব ভাইয়ের ২য় ছেলের নাম ইউসুফ হাবীবুল্লাহ। ইউসুফ হাবীবুল্লা শারীরিক ভাবে একটু অটিষ্টিক কিন্তু তার বুদ্ধি, মেধা কিংবা অন্যান্য সব কিছু যে কোনো বাচ্চার চেয়ে অনেক বেশী প্রবল। ইউসুফ খুব ভালো কোরান তেল ওয়াত করে, চমৎকার ডিভোসন নিয়ে নামাজ পড়ে, ভালো খেলাধুলা করে, অনুশীলন করে। ইউসুফ একজন নিষ্পাপ ছেলে। আজ অবধি সে কোনো পাপ কাজ করে নাই, কোনো মিথ্যা কথা বলে নাই, কারো কোনো ক্ষতি করে নাই। সে সাচ্চা আল্লাহর খুব প্রিয় বান্দা। ইউসুফের ব্যাপারে আল্লাহ নিশ্চয় কোনো না কোনো ফয়সালা রেখেছেন যা আমরা এর রহস্য বুঝতে পারি না। ইউসুফ আমেরিকার নাগরীক। আমার ভাই এই ইউসুফের জন্য অনেক চেষ্টা করছেন তার অবর্তমানে ইউসুফের কি হবে এটা ভেবে। আর আমি বলি, যে আল্লাহ ইউসুফকে সৃষ্টি করেছেন, তার থেকে বড় প্ল্যানার আর কেউ নাই, তাই ওর ব্যাপারে আল্লাহর উপর যতোদিন ভরষা না করা হবে, ততোদিন আল্লাহর ক্ষমতাকে চেলেঞ্জ করা হবে। কিন্তু পিতার মন, একটু তো অবসন্ন হবেই। ইউসুফের বয়স এখন প্রায় ২৩ বছর। আমার মতে, যদি ইউসুফকে যে কোনো একটি মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা যেতো, তাহলে ওর বংশই ওকে দেখভাল করতে পারতো। আর এটা সম্ভব হতো যদি ইউসুফকে ঘন ঘন এ দেশে আনা যেত। আমার বড় ভাই মাঝে মাঝে কিছু বিকল্প বুদ্ধি নিতে চান না।

 

 

 

 

 

মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ)

১৯৬৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আমার জন্ম। আমি নিজে এই ওয়েবসাইটের এডমিন এবং ক্রিয়েটর। গ্রামের নতুন বাক্তার চর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে স্কুল পাশ করে, যখন হাই স্কুলে পড়ি, তখন ১৯৭৭ সালে আমি ক্যাডেট কলেজের জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনা করি। সেখান থেকে ইন্টার পাশ করে সরাসরি আর্মিতে পরীক্ষা দিয়ে কমিশন পদে যোগদান করি। প্রায় ১৯ বছর আমি আর্মিতে চাকুরী করি। এর মধ্যে প্রথমবার হাইতিতে জাতীসংঘের অধীনে শান্তি মিশনে কাজ করি। অতঃপর আবার ২০০২ সালে জর্জিয়া রিপাবলিক এ জাতীসংঘ মিশনে অব জারভারের দায়িত্ব পালন করি। আমি মাষ্টার্স ইন ডিফেন্স ষ্টাডিস, এমএসসি, এমবিএ সহ পরবর্তীতে ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজমের উপর ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করি। ২০০৪ সালে আমি সেচ্ছায় আর্মি চাকুরী সমাপ্ত করে ব্যবসায় মনোযোগ দেই। প্রথমে সুয়েটার্স ফ্যাক্টরী (রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড এবং আননূর ফ্যাশন্স লিমিটেড), পরবর্তীতে প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ (মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড), অতঃপর আবার কন্সট্রাকশন রিলেটেড কোম্পানী “আননূর কন্সট্রাকসন” কোম্পানী ফর্ম করে ব্যবসা শুরু করি। একাধারে গার্মেন্টস, প্লাষ্টিক, কন্সট্রাকশন সহ ব্যবসা করার পর আমি একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার (মৌচাক কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার) চালু করি। আমার বড় মেয়ে ডাক্তারী পাশ করার পর ইচ্ছে হলো যে, যদি ম্যাডিক্যাল রিলেটেড কোনো কোম্পানী করা যায়, তাহলে মন্দ নয়। সে সুবাদে শেয়ারে আবরার মেডিক্যাল ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে শেয়ার নেই। বর্তমানে এটা মানিকগঞ্জে চালু অবস্থায় আছে। আমার স্ত্রীর নাম মিসেস মিটুল চৌধুরী আসমা, সে নিজেও একজন প্রোফেসর। আমার বড় মেয়ে আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা একজন ডাক্তার আর ছোট মেয়ে সানজিদা তাবাসসুম কনিকা বর্তমানে বাল্টিমোর কাউন্টিতে ইউএনবিসি ইউনিভার্সিটিতে গ্রাজুয়েশন করছে। আমি মীরপুর নিজের বাসায় অবস্থা করি।

 

আমার বাবার বংশের ধারাবাহিকতা 

আমি যার কাছ থেকে আমার বংশের ধারাবাহিকতা জানতে পেরেছি তিনি জনাব মোঃ জামির হোসেন মাদবর। আমাদের বংশ "মাদবর" বংশ। এই জনাব জামির এবার হিসাবদি মাদবরের ইতিহাস দিয়ে শুরু করি। জনাব হিসাবদি মাদবরের ছিলো তিন ছেলে এবং ২ মেয়ে যথাক্রমে (ক) কেরু মাদবর (খ) হোসেন আলী মাদবর এবং (গ) খলিল মাদবর। মেয়েরা ছিলেন যথাক্রমে (ক) আরশজান এবং (খ) টোকাইরমা। এই হোসেন আলী মাদবর থেকেই আমাদের বংশের ধারাবাহিকতা শুরু কারন জনাব হোসেন আলী মাদবর ছিলেন আমার বাবা। জনাব কেরু মাদবরের বংশধরেরা হচ্ছেন আমাদের রোস্তম ভাইয়ের বংশ। অর্থাৎ রোস্তম ভাইয়েরা আমাদের চাচাতো ভাই। রোস্তম ভাইয়ের এক ছেলের নামও আছে মোঃ জামির হোসেন। বর্তমানে সেও জীবিত। রোস্তম ভাই এর সাথে আমার অনেক যোগাযোগ ছিলো, তিনি মারা গেছেন প্রায় কয়েক বছর আগে। অন্যদিকে মোঃ খলিল জেঠার সন্তানেরা হচ্ছেন মোঃ মুজিবুর রহমান এবং আতাউর রহমান। তারাও এখন জীবিত আছেন। এই দুইপক্ষের কোনো মেয়ে সন্তান ছিলো কিনা আমি জানি না তবে আমাকে আরো খুজতে হবে যেনো সবার ইতিহাস গুলি আমি জানতে পারি। 

অপরদিকে জনাব কুদরত আলী দাদার এক ছেলের নাম ছিলো আড়াই মাদবর। যার বংশে জন্ম নিয়েছিলো জনাব মান্নান কোম্পানী । আমি তাদের ব্যাপারেও খুব বেশী এখনো জানি না। জেনে যাবো শিঘ্রই ইনশাল্লাহ। মান্নান কোম্পানীর এক ছেলেকে আমি চিনি যে বর্তমানে কোনো এক থানার ওসি হিসাবে আছেন, নাম জনাব আওলাদ হোসেন। তার সাথে আমার একবার পরিচয় হয়েছিলো। 

আমার দাদা তার সম্পত্তি ভাগ করার সময় একটা কাজ করে গিয়েছিলেন যে, তিনি তার সম্পত্তি তিন ছেলে এবং এক মেয়েকে সমানভাবে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সম্ভবত টোকাইরমা যিনি আমার ফুফু হন, তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। আরশজান ফুফুর ছেলের নাম ছিলো খোশাল মাদবর। খোশাল মাদবরের ছেলে আমির হোসেন মারা গেছে ২০১৪ সালে। 

জনাব হোসেন আলী মাদবর যিনি আমার বাবা, তিনি অত্যান্ত নামকরা প্রতাপশালী মাদবর ছিলেন তার সমসাময়িক আমলে। কেরু চাচা এবং খলিল চাচাও তেমনি একজন নামকরা মানুষ ছিলেন। তাদের ব্যাপারে আমার আরো বিস্তারীত জানা দরকার। হোসেন আলী মাদবরের বংশধারা দুটু কারন আমার বাবা প্রথম যে মাকে বিয়ে করেছিলেন তিনি মারা যাওয়ার পরেই বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। আমাদের ঐ ঘরে যারা ছিলেন সে ব্যাপারে উপরে স্টেপ ভাই বোনদের শিরোনামে কিছু তথ্য দেয়া আছে। আর আমাদের এই ধারায় আছি আমি মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন, আমার বড় ভাই ডঃ" প্রোফেসর হাবীবুল্লাহ, বোন আছে শায়েস্তা খাতুন, সাফিয়া খাতুন, লায়লা খাতুন, ফাতেমা খাতুন আর মেহেরুন্নেসা। তাদের ব্যাপারে উপরে বিস্তারীত কিছু তথ্যও দেয়া আছে। 

বদরুদ্দিন তালুকদার

তিনি আমাদের বংশের কেউ নন। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ সময়, গোত্র আর ধর্ম নির্বিষেসে এমন ভাবে কারো কারো জীবনে অথবা কারো কারো পরিবারের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে যান যে, তারা নিজেদের বংশের না হয়েও তারা অতি আপন জনের থেকেও বেশী হয়ে যান। বদি ভাই ছিলেন আমাদের পরিবারে ঠিক সেই রকমের একজন মানুষ। আমার বাবা মারা যাবার পর আমাদের পরিবারের অবস্থা বেশ শোচনীয় হয়ে পড়ে বিশেষ করে আর্থিক দিক দিয়ে। ঠিক তখন হাবীব ভাইয়ের সাথে ১৯৬৯ সালের গোড়ার দিকে বদি ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়। বদি ভাই আমাদের জন্য কায়িক পরিশ্রম, এবং তার মেধা দিয়ে অনেক সাহাজ্য করেছেন। উনি আমাদেরকে সব সময় ঠিক পরামর্শটা দিয়েছেন। বদি ভাই কাজ করতেন ওয়াপদা অফিসে। অত্যান্ত সৎ একজন মানুষ ছিলেন। দূর্নীতি করতে চাইলে উনি এই পৃথিবীতে শুধ টাকাই না, আরো অনেক সম্পদ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি আল্লাহকে ভয় পেতেন, তাই কোনো দূর্নীতিই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেন নাই। সর্বশেষ তিনি ডিপুটি ডাইরেক্টর হিসাবে সরকারী চাকুরী থেকে অবসর নেন। বদি ভাইয়ের এক মেয়ে আর দুই ছেলে। মেয়ের নাম তাহেরা সাইয়েদা বদ্রুন্নেসা মান্না আর ছেলে দুইজনের নাম (ক) মুক্তাদির সাকী (খ) মুক্তাদির সাদী। ঢাকার মীরপুরে থাকতেন তিনি। মান্না আমার নিজের ভাতিজির মতোই আমি তাঁকে দেখি। ওর বিয়েটা আমিই মুলত চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম সবার অমতে বিশেষ করে বদি ভাইয়ের। মান্নার কয়েকটি ছবি এখানে দেয়া গেল। 

 

 

 

 

জেবুন্নেসা চৌধুরী

জেবুন্নেসা চৌধুরী আমার শাশুড়ি। যতো গুলি মানুষ আমার অতি প্রিয় ছিলেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। আমার ঠিক আরেকটি মা তিনি। শেষ বয়সে তিনি আমার বাড়িতেই ছিলেন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আমার বাড়িতে থাকা অবস্থায়। আলাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ছিলেন তার স্বামী। তার মোট তিন ছেলে আর আট মেয়ে ছিলো। ছেলের নাম ছিলো (ক) নূর আহমদ চৌধুরী (খ) সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী (গ) মুস্তাক আহমদ চৌধুরী। মেয়েরা হচ্ছেন (১) জাহানারা চৌধুরী (২) আনোয়ারা চৌধুরী (৩) মনোয়ারা চৌধুরী (৪) নূরজাহান চৌধুরী (৫) সেলিনা চৌধুরী (৬) সামসুন নাহার চৌধুরী (৭) আফরোজা চৌধুরী লিজি (৮) মিটুল চৌধুরী আসমা ।

আমার শাশুড়ি শেষ বয়সে এসে অর্ধেক প্যারালাইসিস হয়ে গিয়েছিলেন। তার ডান হাত এবং ডান পা তিনি ভালোভাবে নাড়াতে পারতেন না। ফলে খুড়িয়ে খুড়িয়ে কোনো কিছু অবলম্বন করে ধরে ধরে হাটতে হতো। খুব নামাজী ছিলেন। আমার মায়ের সাথে আমার শাশুড়ির খুব ভালো শখ্যতা ছিলো। তিনি ২০০৫ সালের ৯ই জুন ইন্তেকাল করেন। 

 

 

নেওয়াজ আলি

নেওয়াজ আলি আমার ভাগ্নী শেফালির হাসবেন্ড। নেওয়াজ আলীর প্রায় ৩২ বছরের বিদেশ থাকা অবস্থায় ওর স্বাস্থ্যের অনেক ক্ষতি হবার পাশাপাশি যে, পরিবারের অনেক উন্নতি হয়েছে সেটাও না। অবশেসে নেওয়াজ আলি গত ২ মাস আগে চুরান্তভবে দেশে চলে আসে। এখন তার বয়স প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। ওর বড় ছেলে নাফিজ জাপানে থাকে, ছোট ছেলে নাহিদ মাত্র মেট্রিক দেবে, মেয়ে আরো ছোট। দেশে আসার পর আমার সাথে নেওয়াজ আলীর দেখা হয় নাই। মানে নেওয়াজ আলীর সাথে আমার দেখা হয় নাই প্রায় কয়েক যুগ। আজ সকালে (২/৯/২০২০) নেওয়াজ আলিকে হাসপাতালে "বারডেম হাসপাতাল" নিয়ে আসা হয়েছে। হার্টের পেসেন্ট, কেনো যে বারডেমে আনা হয়েছে সেটাও আমি জানি না। আর কেনো জানি ব্যাপারটায় আমি জানতেও মন চায় নাই। আর জানতে না চাওয়ার পিছনেও একটা কারন ছিলো, যা এখন আর বলছি না। একটু আগে লিয়াকত (শেফালীর ভাই) ফোনে জানালো যে, সম্ভবত নেওয়াজ আলি বাচবে না। তার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। খবরটা আমার কাছে অন্য দশটা খবরের মতোই মনে হয়েছিলো। তাড়াহুরা ছিলো না। আমার স্ত্রী মিটুলের শরীরটা অনেক খারাপ, তাকে নিয়ে ইবনে সিনায় গিয়েছিলাম, সেখান থেকে গিয়েছিলাম সিএমএইচে। ফেরার পথে আনুমানিক ২ টার দিকে লিয়াকত ফোনে জানাল যে, নেওয়াজ আলি আর নাই, মারা গেছে। গ্রামে লাশ দাফনের জন্য যাওয়ার দরকার ছিলো, এটা একটা প্রোটকলের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমারো কোমড়ে একটু ব্যথা ছিলো বলে যেতে চাই নাই। আর কোমড়ে ব্যথা না থাকলেও হয়তো যাওয়া হতো কিনা আমার সন্দেহ আছে। মন যেতে চায় নাই।

 

 

 

 

নূর আহমদ চৌধুরী 

আমার বড় সমন্ধী অর্থাৎ আমার স্ত্রীর সবচেয়ে বড় ভাই। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হাইকোর্টে স্ট্যাম্প রেকর্ডার হিসাবে কাজ করতেন। এই স্ট্যাম্প রেকর্ডার কি জিনিষ আমি জানি না। তবে ব্যক্তিগত জীবনে অনেক সৎ এবং ধইর্যশীল মানুষ ছিলেন। হাসমত আরা ছিলেন তার স্ত্রী। এই দম্পতির কোনো মেয়ে সন্তান ছিলো না। ছিলো ৫ ছেলে। হাসান আহমদ লিখন তার বড় ছেলে। হাসান আহমদ লিখনের ব্যাপারে বিস্তারীত আমি কিছু তথ্য লিখেছি ওর অধ্যায়ে। নূর ভাই আমার খুব প্রিয় মানুষদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করতাম, তিনিও আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। সহজ সরল মানুষ ছিলেন। সবাই বলে নূর আহমদ চৌধুরী নাকি তার বাবার মতো দায়িত্তশীল ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের মতো। আমি আমার শশুড়কে দেখি নাই ফলে তুলনাটা আমি করতে পারি নাই। বিয়ের আগে আমার তার একবারই দেখা হয়েছিলো বগুড়ায় কিন্তু বিয়ের পরে তার সাথে আমার অনেক শখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। তিনি তার সংসারের জন্য এবং চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার অবদান চৌধুরী বাড়ির সব সদস্যদের জন্য অনেক ছিলো। সব সময় তিনি চাইতেন যেনো সবাই ভালো থাকে। এই ভালো থাকার চাওয়ার কারনে তিনি একবার আমাকে একটা প্লট দেয়ার নামে তারই কোনো এক কলিগের পাল্লায় পরে আমার বেশ কিছু টাকা নষ্ট করলেও তার উপর আমার কখনো কোনো রাগ হয় নাই। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে তিনিও ঠকেছেন কাউকে বিশ্বাস করে। তার এক ছেলে মানিক গঞ্জে কোনো এক বন্ধুকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে খুন করে ফেলেছিলো। খুব সমস্যায় পড়েছিলেন। কোথাও লুকানোর জায়গা ছিলো না। আমি জানি এই খুনের ব্যাপারটা আমার সাপোর্ট করার কোনো কারন নাই কিন্তু শুধুমাত্র নূর ভাইয়ের কারনে আমি তাঁকে সহ তার সেই খুনী ছেলেকে প্রায় ২ মাস আমার বগুরার ক্যান্টনমেন্টে রাখতে হয়েছিলো কারন ক্যান্টনমেন্টে কোনো পুলিশ রেইড করে তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে আজীবন আক্ষেপে থাকবো কারন আমি একটা অপরাধকে লুকানোর সাহাজ্য করেছিলাম। নূর আহমদ ভাই ২০১২ এর দিকে মারা যান। মানিকগঞ্জেই তার দাফন হয়েছিলো।

 

হাসমত আরা

হাসমত আরা তার নাম। তিনি আমার বড় সমন্দি নূর আহমদের স্ত্রী, লিখনের মা। তার ৫ ছেলে কিন্তু মেয়ে নাই। নূর আহমদ মারা গেছে অনেক বছর আগে। তিনি বিধবা হয়েই ছেলে আর নায় নাতকোর নিয়ে দিব্যি ছিলেন। তার আসলে কোনো বাক স্বাধীনতা ছিলো না। আর থাকবেই বা কিভাবে? যখন নিজের স্বামী থাকে না, আর তার জীবন চলে ছেলেদের জীবিকার উপর, তখন ছেলের বউ রাও শাশুড়ির থেকে বেশী মাতাব্বর হয়ে উঠে। আর এটাই ঘটেছে অনেক সময়। তারপরেও আমার এই ভাবী আরো শক্ত হতে পারতেন। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, ঠিকই আছে, আবার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে একটু সার্থপর তো ছিলোই। তা না হলে নিজের বৃদ্ধ শাশুড়িকে কেউ অন্যের বাড়িতে রাখে না। অনেকবার অনেক সময় তিনি আমার টেষ্টের মধ্যে পড়েছেন, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তিনি কাং খিত ফলাফল দেখাতে পারেন নাই। তারপরেও আমি কোনোদিন এই মহিলাকে মনে কষ্ট দেই নাই। আমার কাজ ছিলো সবাইকে সম্মান দেয়া, কেউ আমাকে দিক বা না দিক। তাতে আমার কিছুই যায় আসে না। ভাবীর বাড়ি সিরাজ গঞ্জে। থাকতেন লিখনের বাসায়। শেষ অবধি তিনি করোনায় ভোগে মারা গেছেন ২৬/০১/২০২১ তারিখে। 

 

 

 

 

 

হাসান আহমদ চৌধুরী

ওর ডাক নাম লিখন। নূর আহমদ চৌধুরীর বড় ছেলে। ওরা মোট ৫ ভাই কিন্তু কোনো বোন নাই। প্রাতমিক জীবনে লিখন অনেক আর্থিক চাপে ছিলো বিশেষ করে ১৯৮৮-১৯৮৯ সালের দিকে। ওর সাথে আমার পরিচয় হয় বিয়ের পরেই। অনেক ইন্টিলিজেন্ট ছেলে কিন্তু মাঝে মাঝে ওর এই বুদ্ধিমত্তা এমন কিছু ব্যাপারে কাজে লাগায় যা স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে। যেমন একটা উদাহরন দেই, চৌধুরী বাড়ির সব সম্পত্তি সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার জিবদ্দশায় ওয়াকফ-আওলাদ করে যাওয়ায় তাদের মানিক গঞ্জের বাড়িটাও সেই ওয়াকফ-আওলাদের অন্তর্ভুক্ত। ওখানে কেউ থাকেন না শুধু লিজি আপা (আমার আরেক জেঠস) থাকেন। তিনি শারীরিকভাবে একেবারেই পংগু। লিখনের বদবুদ্ধির কারনে লিখন চেয়েছিলো পুরু বাড়িটা যেভাবেই হোক সেটা আত্মসাৎ করা। কিন্তু চৌধুরী বাড়ির অন্যান্য সব ভাইবোনেরা লিজি আপাকে অত্যান্ত স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। তারা এটাই চেয়েছিলো যেনো লিজি আপা কোনো রকমে মানিক গঞ্জের ঐ দাদার বাড়িতে একটা ছোট জায়গায় একটা ঘর তোলে আজীবন থাকতে পারেন। কিন্তু লিখন এটা কোনোভাবেই চায় নাই। মজার ব্যাপার হলো যে, ঐ দাদার সম্পত্তিতে লিখনের পিতার ওয়ারিশ সুত্রে সে নিজে ২ কাঠার ৭ ভাগের এক অংশের মালিক। সে হিসাবে লিখন পায় ২ কাঠার মধ্যে ৭ ভাগের এক ভাগ। অথচ লিজি আপা নিজেই ঐ সম্পত্তির পিতার ওয়ারিশ সুত্রে ১ কাঠার বেশী মালিক। অর্থাৎ লিখনের থেকে ঢেড় বেশী। আর এই লিখন চায় না লিজি আপা ওখানে থাকুক। উদ্ভট ভাবনা। এখানে আরো একটা ব্যাপার কাজ করছিলো যে, চৌধুরী বাড়ির মানুষেরা পরোক্ষ ভাবে লিখনকে তাদের অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতো। ফলে তার একটা অলিখিত দাপট ছিলো। সম্ভবত সেই দাপটের কারনেই লিখন একচ্ছত্র এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার হিম্মত করেছিলো। পর্দার বাইরে থেকে আমি পুরু ব্যাপারটা এমনভাবে আইনের মধ্যে থেকে কাজ করেছিলাম যেনো লিজি আপা তার ন্যায্য অংশ পায় এবং সেখানে তার যা খুসি করতে পারে। এখন ওখানে লিজি আপার জন্য ৬ তালা বিল্ডিং হয়েছে যা লিখনের নিজেরো নাই। এই ধরনের কাজ করাটা ওর কোনোভাবেই ঠিক হয় নাই। যাই হোক, লিখন লটারীর মাধ্যমে আমেরিকার একটা ইমিগ্রেশন পেয়েছিলো। সরকারী আইন মোতাবেক ওকে ওখানে ৫ বছর এক নাগাড়ে থাকতে হবে বিধায় আমেরিকার সরকার ওকে এবার আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে আটকে দিয়েছে যেনো সে আর দেশে ফিরতে না পারে। সব আল্লাহর ইচ্ছা। ওকে আমি সত্যিই একটা পজিটিভ বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে ভেবেছিলাম যা আসলে ওর মধ্যে বেশ ঘাটতি আছে। ভালো জব করতো আর্গন ফ্যাশনে, পারভেজ ভাইয়ের অধীনে। যাই হোক, ওর উপরে অনেকের ভরষাটা এখন প্রায় শুন্যের কোঠায়। ওর উপরে আমার কখনো রাগ ছিলো না। আমি ওর উকিল বাবাও বটে।

নাজিম উদ্দিন

নাজিম উদ্দিন, পিতা-মরহুম আনোর আলি, হাসনাবাদ, ইকুরিয়া, দক্ষিন কেরানীগঞ্জ। তিনি আমাদের বর্তমান রিভার সাইড সুয়েটার্স এর অরিজিনাল মালিক ছিলেন। অশিক্ষিত মানুষ। তার জীবনের প্রথম দিকের ইতিহাস অত্যান্ত খারাপ। সবাই তাঁকে নাইজ্যা ডাকাত নামেই চিনতো। কিন্তু যখন ঢাকা-মাওয়া রোড এরশাদ সাহেবের আমলে শুরু হয়, তখন তিনি এই মহাসড়কে মাটি সাপ্লাইয়ের কাজ শুরু করেন। সময়ের বিবর্তনে নাজিম উদ্দিন বসুন্ধরা গ্রুপের সাথেও তাদের প্রোজেক্টসমুহে মাটি সাপ্লাইয়ের কাজ নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি বিশাল টাকা পয়সার মালিক হয়ে যান। একে একে তিনি শ্যামলী টাওয়ার, ঢাকা টাওয়ার, হাসনাবাদ জেনারেল হাসপাতাল, পাক-বাংলা সিরামিক, নাদিম-ফাহিম ফিল্ম প্রোডাকশন ইত্যাদি আরো বড় বড় প্রোজেক্টের মালিক হন। কক্সবাজারে তিন তারা বিশিষ্ট হোটেল রিসোর্ট করেন। তার চারপাশে তখন অনেক চাটুকারের ভীড় লেগে যায়। নাজিম উদ্দিনের তিন বউ, কোনো বউই জাতের না। কাউকে তিনি বিয়ে করেছেন বেদে নৌকার কোনো এক বেদেনীকে, কেউ আবার কোনো নাট্যশালার কোনো নর্তকী ইত্যাদি। তবে অফিশিয়াল বিবাহের বাইরে তার আরো অনেক মহিলাদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক ছিলো। চলচিত্র শিল্পের সাথে যুক্ত হয়ে মহিলা বিষয়ক ব্যাপারটা আরো বেশী প্রকট হয়ে যায়। শোনা যায় যে, তার মৃত্যুর জন্য তার ছোট বউ দায়ী। অর্থাৎ তার ছোট বউওই তাঁকে বিষ্পানে মদের সাথে খাইয়ে মেরে ফেলেছেন। নাজিম উদ্দিন হাসনাবাদ ইকুরিয়ার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন কয়েক দফা। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিএনপি করতেন। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের সময় তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের পদে দাড়িয়েছিলেন এবং শোনা যায় তিনি পাশও করেছিলেন কিন্তু যে কোনোভাবেই হোক আওয়ামীলীগ সরকার তাঁকে উক্ত নির্বাচনে পরাজিত দেখিয়ে শাহীনকে জয়ী দেখিয়েছিলো। আমার সাথে নাজিম উদ্দিনের পার্টনারশীপ ছিলো এই রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেডে।

 

 

 

মোহসীন শাহীন 

আমি যখন স্বেচ্ছায় আর্মির চাকুরিটা ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, তখন বেসামরীক জীবনে এসে আর কোনো চাকুরী না করার মনোবৃত্তি করেছিলাম। তার পরিবর্তে আমি যে কোনো একটা ব্যবসার সাথে যুক্ত হবার পরিক্ল্পনা করতে গিয়ে প্রথমে সাক্ষাত হয়েছিলো নাজিম উদ্দিনের সাথে। তার একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী ছিলো যা তিনি চালাতে পারছিলেন না। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, আমি নাজিমুদ্দিনের সাথে পার্টনারশীপ করে রিভারসাইড সুয়েটার্স চালাবো। কিন্তু অভিজ্ঞতা না থাকায় আমি এমন একজন লোককে খুজতেছিলাম যিনি এই রিভার সাইড সুয়েটার্সে আগে কাজ করেছেন এবং কাজটাও বুঝেন। সেই সুবাদে আমি মোহসীন শাহীনকে খুজে পাই। আমি তাঁকে বিনে পয়সায় ৩০% শেয়ার দিয়ে মালিক বানিয়ে বাকী ৭০% এর আমার অধীনে মালিকানা রেখে প্রায় অনেক টাকা ইনভেষ্টমেন্ট করি যাতে ফ্যাক্টরীটা চালাতে পারি। কিন্তু পারিনি। মোহসীন শাহিনের উপর আমার অনেক রাগ হয়েছিলো আর ক্ষোভ হয়েছিলো আমার নিজের উপর। আসলে মোহসীন শাহীন আমাকে অনেক আর্থিক ক্ষতি করলেও একটা লাভ হয়েছিলো যে, আমি একটা বিজনেস প্ল্যাটফর্ম পেয়েছিলাম। মোহসীন শাহিন আসলে গার্মেন্টস ব্যবসাটায় মনোযোগী না থাকায় আর বিভিন্ন ধান্দায় থাকায় শেষ পর্যন্ত ফ্যাক্টরীটা আমরা প্রায় চালাইতে অক্ষম হয়ে গিয়েছিলাম। শেষতক আমি মোহসীন শাহীনকে বাধ্য হই ফ্যাক্টরীর শেয়ার নিয়ে বের করে দিতে এবং পরবর্তীতে শ্রীলংকার প্রিয়ান্থা এবং বরিশালের মূর্তজা ভাইয়ের সাথে পার্টনারশীপ করতে বাধ্য হই। মোহশীন সাহেবের বাবার নাম ছিলো জাব্বার মিয়া। মোহসীন সাহেবের দুই ছেলে আর এক মেয়ে ছিলো। শোনা যায় যে, মোহশীন সাহেব মানুষের সাথে প্রতারনা করতে করতে তার অবস্থা এতোটাই শোচনীয় হয়ে পড়ে যে, অবশেষে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মোহসীন সাহেব অতীব ধূর্ত লোক ছিলেন। নামাজী ভূষনে থাকলেও তিনি সব সময় মুনাফেকীর মত কাজেই বেশী লিপ্ত ছিলেন। তার কথা শুনলে যে কোনো বিধর্মীও ইসলামের দিকে ঈমান আনতে পারে কিন্তু মোহসীন সাহেব নিজেই ঈমানদার ছিলেন না। 

 

 

শিমুল চৌধুরী 

ছোট ভাবী হচ্ছে আমার সমন্ধী মোস্তাক সাহেবের স্ত্রী। তার বাড়ি শ্রীনগরের জয়পুরা। খুব বেশী শিক্ষিত ছিলেন না বটে কিন্তু রুপের কোনো কমতি ছিলো না। তার দুই ছেলে মেয়ে। ছেলের নাম ফয়সাল আহমদ চৌধুরী আর মেয়ের নাম জান্নাহ চৌধুরী। প্রায় ১২ বছর আগে ছোট ভাবী স্বামীর সাথে ছেলে মেয়ে নিয়ে আমেরিকায় মাইগ্রেশন করেন। ধীরে ধীরে তিনি সেখানে আমেরিকার লাইফে অভ্যস্থ হয়ে উঠেন, নিজেও আমেরিকার লাইফের সাথে তাল মিলিয়ে তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ শুরু করেন। ছোট ভাবীর সাথে আমার সম্পর্কটা ছিলো অনেক ভালো, কখনো কখনো অস্বাভাবিক পর্যায়েও ছিলো। ছোট ভাবী ছিলেন এক কেন্দ্রিক মানুষ, শুধু নিজেকে নিয়েই একা চলতে ভালোবাসতেন। আর এর জন্য তিনি তার স্বামীর কাছেও মাঝে মাঝে অনাকাং খিত ব্যবহার পেতেন। কিন্তু ছোট ভাবীর সেন্স অফ সাব্জেক্টিভিটিতে মারাত্তক ঘাটতি থাকায় যে কোনো সময় অবুঝের মতো সংসারে অসাহ্নতি সৃষ্টি করতে পারেন, করতেন ও, তাই স্বাভাবিক কারনে ছোট ভাই কি করছেন, কোথায় কি করতে হবে কিংবা এই জাতীয় অনেক বিষয় তিনি ভাবীর সাথে শেয়ার করতেন না। এভাবেই তাদের দাম্পত্য জীবন চল্লেও গত ২০২১ সালে কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে আমেরিকাতেই মৃত্যু বরন করেন।

 

 

ছোট ভাই

মোস্তাক ভাইকেই আমি আসলে ছোট ভাই হিসাবে জানি। উনি প্রথম জীবনে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকুরী করতেন। প্রায় অনেক বছর চাকুরী করার সুবাদে আর প্রোটোকল অফিসার হিসাবে থাকায় অনেক দেশী বিদেশী মানুষের সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। এক সময় তিনি আমেরিকায় পাড়ি দেন। অনেক বছর আমেরিকায় থাকার পর তিনি তার ছেলে মেয়ে স্ত্রী নিয়ে স্থায়ীভাবে আমেরিকায় সেটেল হন। অরিশ্রমী মানুষ। সব সময় যুক্তির মধ্যে কাজ করতে পছন্দ করলেও মাঝে মাঝে নিজের সার্থেও কিছু অযুক্তিক কাজকেও যুক্তির মধ্যে ফেলার অনেক চেষ্টা করেন। যখন সেই যুক্তিগুলি আর ধোপে টিকে না, তখন খুব ধীরে নিসচুপে আবার আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরিবারের মধ্যে অনেক নিয়ন্ত্রনে থাকার চেষ্টা করলেও ছেলেমেয়রা বড় হয়ে যাওয়ায়, আর স্ত্রী অনেকটা আধিপত্যের কারনে নিজেকে বেশ গুটিয়ে রাখেন। এই বছরেই তিনি তার স্ত্রীকে হারান। বর্তমানে তিনি একাই থাকেন। তার এক মাত্র মেয়ে জান্নাহ বিবাহিত হলেও ইদানিং তার মেয়ের বিবাহিত জীবন খুব একটা সুখের যাচ্ছে না। ছেলে ফয়সাল ও বউ কেন্দ্রিক। ফলে স্ত্রী বিয়োগের পর ছোট ভাই অনেকটা একাই হয়ে গেছেন বলতে হয়।

 

 

 

ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী

 

তিনি আমার চাচা শশুড় ছিলেন। অর্থাৎ আমার শশুড়ের আপন ভাই। আমার শশুড়েরা ছিলেন তিন ভাই, (১) আলাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী (২) ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং (৩) নিজাম উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ডাঃ কুতুব উদ্দিন আহমদকেও আমি দেখিনি কিন্তু যতটুকু আমি শুনেছি তার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি যে তিনি ছিলেন এ দেশের গোটা কিছু প্রোফেশনাল মানুষদের মধ্যে একজন। ডাক্তার হিসাবে যেমন তিনি খুব নামীদামী ছিলেন, তেমনি মানুষ হিসাবেও ছিলেন খুব ভালো। তিনি সর্বশেষ জীবনে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রোফেসর ছিলেন। তার একটি ছেলে (১) মকবুল আর একটি মেয়ে (নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।)। তার স্ত্রীর নাম ছিলো মেহেরুন্নেসা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নার্সের কাজ করতেন কিন্তু এই চাচার সাথে বিয়ে হবার পরে মেহেরুন্নেসা আর নার্সের জব করেন নাই। চাচী অত্যান্ত চালাক আর সার্থপর ছিলেন। তিনি চাচার বাড়ির কোনো মানুষকে তার বাসায় এলাউ করতেন না এবং এমনকি চাচার কথাও শুনতেন না। সারাক্ষন ঘরের মধ্যেই থাকতেন দরজা জানালা বন্ধ করে। এটা একটা রোগ। তার মেয়েটাকে বিয়ে দেয়ার পর মেয়েটা যেহেতু মায়ের স্বভাব পেয়েছিলো, ফলে তার ঘরে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হবার পরেই মায়ের মতো আচরন শুরু করে এবং সেখানে আর থাকতে পারে নাই। পরবর্তীতে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর মেয়েটি তার মেয়েকে নিয়ে আজীবনকাল একটা টিনের ঘরের ভিতরে এমনভাবে বন্দি হয়ে রইলো যে, কখনো তাঁকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায় না শুধুমাত্র কিছু খাবার দাবার কেনা কাটা ছাড়া। তার বাতিক হচ্ছে সে চাউলকে পাক করার আগেও সাবান দিয়ে ধোয়ে নিবে। এর মানে এই নয় যে, সে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে। তার মেয়েটিকে আমরা ঘরের বাইরে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু মেয়েটা সারাদিন ঘরের মধ্যে একটা অলিক ভাবনা নিয়ে কল্পনার রাজ্যে বসবাস করতে করতে এখন সেও প্রায় পংগু। তার যেহেতু কোনো আয় রোজগার নাই, ফলে সবাই জাকাত কিংবা দান করা টাকা দিয়েই তার জীবন চলে। তাতে তার কোনো আক্ষেপ নাই। মজার ব্যাপার হলো এই যে কেউ তাঁকে দান করছে বা টাকা দিচ্ছে, এতেও তার কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ নাই। তাঁকে ডাকলেও ঘর থেকে বের করা সম্ভব না। ডাঃ কুতুব উদ্দিন মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা তার লাশ দেখতেও ঘর থেকে বের হন নাই। আমার ধারনা, চাচা এই মহিলাকে বিয়ে করে আজীবন অনুশোচনাই করেছেন সম্ভবত। শেষ জীবনে চাচা অত্যান্ত অসুখী জীবন জাপন করেছেন। প্রায় ৪ বছর আগে স্ত্রী মেহেরুন্নেসাও ইন্তেকাল করেছেন। ডাঃ কুতুব উদ্দিন চাচার ছেলে মকবুল নিজেও খুব একটা কাজের মানুষ না। সবকিছু রেডিমেট পেতে চায়। চৌধুরী বাড়ির ওয়ারিশদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সম্পদের ভাগ মকবুল পায়, যেহেতু ওয়ারিশ মাত্র ২ জন। চাচার বাবা সোনাম উদ্দিন চৌধুরী তার সমস্ত সম্পত্তি ওয়াকফ-এ-আওলাদ করে গেছেন বলে কোনো সম্পত্তিই বিক্রি যোগ্য নয়। কিন্তু এর মাঝেও অনেক সম্পত্তি আছে যা ওয়াকফ-এ-আওলাদের বাইরে। আমি প্রায় ২ মাস নিজে কষ্ট করে সমস্ত জমি-জমার কাগজপত্র ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম জমিগুলির দেখভাল করতে আর কিছু জমি বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করতে। কিন্তু মকবুল সেটাও করতে নারাজ। সোনাম উদ্দিন চৌধুরী কোনো কারনে যখন আমার শশুরের উপর অহেতুক মেজাজ খারাপ করে প্রথমে তাঁকে ত্যাজ্য করার মতো একটা বুদ্ধি করে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিলো, এই কুতুব উদ্দিন চাচাই শেষ পর্যন্ত তার বাবা (সোনাম উদ্দিন চৌধুরী) কে বুঝিয়ে সুজিয়ে পরবর্তীতে প্রথম ওয়াকফ দলিল সংশোধন করে পুনরায় আলাউদ্দিন চৌধুরীকে তার সন্তানের প্রাপ্য অংশে বহাল রাখেন। আল্লাহ নিশ্চয়ই সব কিছুর খবরজান্তা। এখানে একটা কথা বলা দরকার যে, এই সোনাম উদ্দিনের মতোই কিছুটা চরিত্র পেয়েছে হাসান আহমদ লিখন কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে- সোনাম উদ্দিন গেম প্লে করেছে তার নিজের সম্পদ আর সিদ্ধান্ত নিয়ে কিন্তু লিখন গেম প্লে করেছে পরের সম্পদের উপর অন্যায় করে মাদবরী করতে গিয়ে। এটা আরো জঘন্য। চৌধুরী বাড়ির অসমাপ্ত গল্পের একটি চরিত্র এই চাচা নিজেও যেখানে তার ছদ্দনাম রাখা হয়েছে ডাঃ লতুব উদ্দিন চৌধুরী। 

সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু মিয়া 


দুদু মিয়ার আসল নাম সলিমুল্লাহ। উনি আমার ৪র্থ বোন ফাতেমার স্বামী ছিলেন। ১৯৭৭ সালের দিকে আমার বোন ফাতেমার সাথে দুদু মিয়ার প্রেমের এবং পরবর্তীতে সেটেল্ড ম্যারেজ হয়। ঐ সময় গ্রামের পরিস্থিতি আজকের দিনের মতো ছিলো না। ফলে সুখী হোক আর অশুখীই হোক, মেয়েদেরকে স্বামীর ঘর অনেকটা সহ্য করেই করতে হতো। দুদু মিয়া বরাবরই খুব হাতখোলা ছিলো। বইষয়ীক কোনো কালেই ছিলো না। উনি প্রাথমিক জীবনে তার বাবার ব্যবসা মনোহরদির দোকান করতেন, পরবর্তীতে অনেকবার বিদেশ গিয়েও টিকতে না পেরে আবার দেশেই চলে এসছেন। এরপর বেশ কয়েকদিন আদম বেপারী হিসাবে ব্যবসা করেছেন, লাভ হয় নাই। সব শেষে বেকার অবস্থাতেই জীবন পাত করেছেন। তার ৩ জন ছেলে আর ২ জন মেয়ে আছে। ছেলেদের মধ্যে ফরিদ বড় এবং অনেক বছর আগে থেকেই জাপানে সেটেলড। তার পরের ছেলে জামাল, একেবারেই বাউন্ডেলে আর ঠকবাজ বলা যায়। সুযোগ পেলেই ধান্দায় থাকে। কোনো কাজের মানুষ নয়। কামাল আছে বিদেশে। ছেলেটা খুবই কর্মঠ। মেয়েদের মধ্যে খালেদা ছোট আর সালেহা বড়। দুজনেই বিবাহিত। দুদু ভাই গত ১০/৬/২০২০ তারিখে ম্রিতুবরন করেন।

 

 

 

 

কার্লা ডোরাইন উইলশন ওরফে কার্লা 

কার্লা ডরাইন উইলশন তার পুরু নাম। আমার এই ওয়েব সাইটের মধ্যে আমার সাথে এক মাত্র খুব অন্তরের সম্পর্ক ছিলো এই একটি মাত্র বিদেশী মানুষের। ওর সাথে আমার যখন পরিচয় হয়, তখন আমার বয়স ছিলো মাত্র ১৪ কিংবা ১৫। আমি তখন ক্যাডেট কলেজে ক্লাশ নাইনে পড়ি। ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময় আসলে আমাকে কেউ খুব একটা চিঠিপত্র লিখতো না, কেউ প্যারেন্টস ডে তেও আসতো না। কেউ ছিলো না আসলে। মা থাকতেন গ্রামে, অভাবী মানুষ, রাস্তা ঘাট চিনেন না, বোনেরাও সেই রকম কোনো অবস্থানে ছিলো না যে, ছোট ভাইয়ের জন্য তারা কিছু করবে, তাদের ও সাংসারিক অবস্থা তেমন ছিলো না। একদিন আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ আমাকে জানালেন যে, তার এক বন্ধুর মেয়ে নাম, কার্লা আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। চিঠি লিখলে যেনো আমি তার উত্তর দেই। সেই থেকে হটাত করে কার্লা আমাকে চিঠি লিখা শুরু করে। হাতের লেখা অত্যান্ত খারাপ, এক পৃষ্ঠা চিঠিতে মাত্র ৫/৬ লাইনেই পাতা ভরে যায় এমন এক অবস্থা, ফলে ওর চিঠির ভলিয়ম হতো কয়েক পাতা করে। একটা সময় এলো আমি প্রতিদিন ওর চিঠি পাওয়া শুরু করলাম। প্রথম প্রথম আমি বুঝতেই পারি নাই যে, কার্লা আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু ক্রমেই ওর চিঠির মধ্যে ভালোবাসার কথা, ভালোবাসার সিম্বল, ইত্যাদি ফুটে উঠতে শুরু করলো। টিন এজার প্রেম। আমিও এক সময় যেনো ওর চিঠির প্রতি আসক্ত হয়ে গেলাম। ওর চিঠি না পেলে ভালো লাগতো না, আবার আমি চিঠি না লিখলেও ভালো লাগতো না। আমার সাথে সুত্র ধরেই কার্লা আমেরিকায় আমার ভাইয়ের সাথে, হাবীব ভাইয়ের বউ এর সাথে রীতিমত একটা সম্পর্ক তৈরী করে ফেলেছিলো। পাশাপাশি বাড়ি ছিলো কার্লাদের আমার ভাইয়ের বাড়ির লাগোয়া। ফলে হাবীব ভাইয়ের বউ কার্লাকে আমাদের দেশীয় কালচার, পোষাক আষাকের মধ্যেও ঢোকিয়ে দিয়েছিলো। কার্লা আমাকে এক সময় "হাসবেন্ড" হিসাবেই চিঠিতে সম্বোধন করা শুরু করলো। প্রতি চিঠিতেই আমি ওর প্রত্যাহিক জীবনের ঘটনা, তার ভাবনা, তার শখ, কিংবা কষ্টের কথা জানতে থাকলাম। প্রচুর ছবি পাঠাতো আমাকে। আজ আমার কাছে কার্লার কোনো ছবি নাই। কেনো নাই সেটাও বলি। আমি কারো কোনো কিছুই ফেলে দেই না। কার্লার চিঠি, ছবি সব কিছু আমি আলাদা করে একটা বাক্সে ভরে রাখতাম। আমার সেই বাক্সটা রেখেছিলাম বর্তমানে আমার এক জেঠষের বাসায় খুব যত্ন করে। কোনো একদিন আমি ঐ বাক্সটা আনতে গেলে শুনলাম, ওনারা ঐ বাক্সটা খুব জরুরী কোনো বিষয় না বলে তার ভিতরের সব কাগজ পত্র সহ ফেলে দিয়েছে। খুব কষ্ট লেগেছিলো, কিন্তু বলতে পারি নাই কি তারা ফেলেছিল। কার্লার এক বন্ধুর নাম ছিলো মিন্ডি। মিন্ডি সম্পর্কেও কার্লা অনেক কথা লিখতো। আমার এই ডায়েরিতে একটি মাত্র লেখা আছে যার নাম WAS IT PENFRIENDSHIP?  এটা আসলে এই কার্লাকে নিয়েই লেখা। এই লেখাটা কোনো কাল্পনিক নয়। এটা নিছক একটা এমন লিখা যা বাস্তবে ঘটেছিলো। অনেক কিছুই লিখার ছিলো কিন্তু আজ যেহেতু সে কাছেও নাই, পাশেও নাই, সেটা রহস্য হয়েই থাকুক। 

 

নীল- একটি কল্পনার পুরুষের নাম 

নীল, একটি কাল্পনিক নাম। তিনি সমাজের অতি উচু সমাজের একজন মানুষ। তাঁর সামাজিক মানদন্ড, সম্মান, আর প্রতিপত্তিতে তিনি বলিষ্ঠভাবে দন্ডায়মান একজন সুপুরুষ। জীবনের কোনো চাহিদাই তাঁর আর বাকী ছিলো না। কিন্তু তারপরেও তিনি সংসার জীবনে স্থায়ী হন নাই। মানুষের শারীরিক চাহিদার তুলনায় যখন মানসিক চাহিদার মধ্যে বিস্তর ফারাক থেকে, তখন অনেক কিছুই ভারসাম্য থাকে না। অতঃপর ধীরে ধীরে এই প্রতিতযশা ব্যবসায়ীক সুপুরুষ ধনাঢ্য নব্য শিল্পপতি নীল হটাত করেই নিতান্ত একজন গ্রাম্য সহজ সরল অসমবয়সী নারী অরুর প্রেমে পড়েন। তাঁর এই প্রেমের মধ্যে যতোটা না ছিলো মেয়েঘটিত প্রেম, তাঁর থেকে অনেক বেশী ছিলো মায়া আর স্নেহ। আর এই মায়া আর স্নেহের পিছনে সবচেয়ে বড় যে ইমোশনাল কাজ করেছিলো সেটা হচ্ছে অরুর অজানা ইতিহাসের জীবন কাহিনী। এই অরু তাঁর ২৫ বছর বয়সের মধ্যে কখনো জানতেই পারে নাই যে, যাকে সে আপন বাবা, মা, যাকে আপন ভাই আর বোন ভেবে এসছে, আসলে ওরা ওর কেউওই না। অরু অন্য কোথাও থেকে সংগৃহীত এক মানবসন্তান যার না আছে কোনো পিতৃপরিচয়, আর যাকে সে মা বলে জানে সে না দিতে পারে তাঁর আসল সত্য কাহিনীর বর্ননা। এমন একজন অসহায় অরুর জীবন কাহিনিতে এই প্রসিতযশা উঠতি শিল্পপতি নীল ভেবেছিল, জীবনে যে অরু আজ তাঁর জীবননাশের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, দেখুক না জীবন কত সুন্দর, সে উঠে দাড়াক না এই পতিত সমাজের কান্ডারিদের দলে যেখনে সংস্কার আর কুসংস্কারের মধ্যে পার্থক্য করবার পলিসি মেকারদের চোখে আংগুল দিয়ে বলুক, এই সমাজের অনেক কিছুর জন্যই আমরা দায়ী নই কিন্তু সমাজ আমাদের দায়ী করে। আর সে দায় আমি থোরাই কেয়ার করি। নীলের ডায়েরীর এই চরিত্র কোনো কাল্পনিক মানুষের নাম হলেও বাস্তবে সে ছিলো।

 

অরু -কাল্পনিক চরিত্র 

অরু নামের কোন চরিত্র বাস্তবে নাই। কিন্তু তার রুপক চরিত্র সর্বদা সমাজের চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। এই অরুদের ইতিহাস খুজতে গেলে অনেক লোমহর্ষক কাহিনী বেরিয়ে আসে। কখনো দেখা যাবে যে, তার জীবন নিয়ে অনেক মানুষ খেলা করেছে, কখনো এদেরকে কেউ তাদের বিশ্বাসের দূর্বলতাকে পুজি করে অতিমাত্রায় ঠকিয়ে অন্য কোথাও সটকে পড়েছে, আবার কখনো কেউ এদেরকে পথ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে পরম যত্নে আদর করে সমাজের ঠিক রেল লাইনটায় উঠিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, অসংখ্য অরুরা তাদের আসল জন্মের কাহিনীই জানে না, কে তারা, কোথা থেকে এসছে, কেমন করে কার কাছে বড় হয়েছে। যৌবন, কৈশোর, কিংবা বৃদ্ধকাল কেনো কার কাছে কিভাবে কাটালো তার কোনো কারনই হয়তো তাদের জানা নাই, এমনকি কেনোইবা তার কাছেই কাটাইলো, এর অনেক ব্যাখ্যা অজান্তেই থেকে যায় তাদের কাছে। যখন মাঝে মাঝে হটাত কেউ সত্যিটা জানে, তখন তার পায়ের তলার মাটিকে একটা অভিশাপ মনে হয়। মনে হয়, নিজের সমস্ত সত্তা আর সফলতা কিংবা ব্যর্থতার মাঝে কোনো ফারাক নাই। নিজের কাছে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। রাগ হয়। কিন্তু কার উপর রাগ? কিসের ভিত্তিতে রাগ? কোনো উত্তর পাওয়া খুব দুষ্কর। এই জগতে ঈশ্বর একটা রহস্যজনক জালে কত প্রকারের খেলা যে খেলে তার সঠিক ব্যাখ্যা আর কারন কোনো মানুষের জানা নাই। এরই মধ্যে অজস্র ফুলের সমাহারের বাগানে এরা একটা আগাছা হয়ে জন্মালেও তাদের একটা নিজস্ব রুপ আছে, নিজস্ব পরিব্যপ্তি আছে। আগাছা ফুলের সমাহার যখন কেউ ভালোবাসে, তখন সে আর আগাছায় থাকে না, ফুলের মধ্যে নতুন এক প্রজাতীর নাম নিয়ে সুন্দর বাগানে ঠাই করে নেয়। তার তখন নতুন একটা নাম হয়, হয়তো সেই নামটাই "অরু"। এইসব অরু নামক ফুলেরও একটা পরিচয় থাকে, কখনো এর নাম হয় মাধুরী, কখনো "মেঘলা আকাশের" মতো উড়ন্ত কালো জল, আবার কখনো "রোজেটা" নামের কোনো বিদেশী ফুল। এইসব ফুলেরা কখনো কখনো আমাদের সমাজে অতি আখাংকিত ফুলসমুহ থেকেও অধিক মুল্যাবন হয়ে উঠে। তখন গোলাপ, কিংবা  জুই, অথবা রজনী গন্ধ্যারাও এদের ধারে কাছে থাকে না।  এরা কখনো অভিশাপ হয়ে আসে না, কিন্তু এদের জীবনের মাত্রায় যা দেখা যায়, তার বেশীর ভাগই থাকে অবহেলায় ভরা কানায় কানায় জল। আমি এই রকম একজন অরুর কিছু ব্যক্তিগত উপলব্দি বুঝার চেষ্টা করেছিলাম কোনো এক নামহীন অরুর কাছ থেকে। অরুর ডায়েরীতে সেই রকমের একটা অরু উপস্থাপিত হয়েছে বটে কিন্তু আমি সেই বাস্তব অরুকে আজীবন গবেষনার মধ্যে রেখেও তার ভিতরের সমস্ত উপলব্ধিটা বুঝতে পারি নাই। সে ভীত হরিনের মতো চারিদিকে তাকায়, আবার সবল বাঘিনীর মতো ন্যায়ের পক্ষেও দাঁড়িয়ে যায়। এদের সক্ষমতা অনেক যদি কেউ তাদেরকে একটু ভরষার স্থান দিতে পারে। তাহলে এখন প্রশ্ন জাগে, অরু নামের কেউ কি আসলে আছে? হ্যা, আছে, তবে ইহা তাহাঁর ছদ্ধনামের এক নামকরন। অরুরা অন্য নামেই বেশী বেচে থাকে। এই অরু আমাকেও অনেক উদ্বেলিত করিয়াছিলো সময়ে কোনো এক অধ্যায়ে।  

 

শারমিন- একটা কাল্পনিক কালো অধ্যায়ের নাম

শারমিন একটি রুপক চরিত্র। অরুর ডায়েরী আর নীলের কাহিনীর মাঝে সে ছিলো সেই ঐতিহাসিক লোম হর্ষক ঘষেটি বেগমের মতো এক চরিত্র। নিজের কোনো ক্ষমতা ছিলো না কিন্তু গল্পের পুরু কাহিনীর সেই যেনো জন্মদাতা। সংক্ষেপে যদি তাঁকে বলি তাহলে বলতে হয় যে, অতিরিক্তি রুপবতী কিন্তু হতদরিদ্র কোনো এক নাম না জানা মফঃস্বল গ্রামের নারী, যার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে প্রায় ৮/৯ বছর দাম্পত্য জীবন পালন করছে শারমিনের স্বামী। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন নির্যাতনের শিকার এসব হতদরিদ্র শারমিনদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো কালেই আলোর মুখ দেখে না কারন তাদের সে সুযোগ নাই। নীল, এই শারমিনকে পথা চলার পথে নুড়ি কুরানোর মত করেই তাঁর হাতে তুলে নিয়েছিলো তাকে দূর্দান্ত সমাজের মধ্যখানে সাবলম্বি করে দাড় করিয়ে দিতে। ঘটনাচক্রে নীল নামের সেই সুপুরুষ অরু এবং শারমিন এই উভয় নারীকেই দুই হাতে তুলে নেন, বুকের পাজরে গেথে নেন। কিন্তু তাদের মধ্যে নীলের সুস্পষ্ট সম্পর্কের গাথুনী থাকলেও হটাত সে গাথুনীর মধ্যে একটা চির ধরা ছিদ্রেও অনুপ্রবেশ হয়। এই ক্ষুদ্র ছিদ্র পথ দিয়ে যেমন প্রথমে বাইরের সুগন্ধী প্রবেশ করেছে, তাঁর সাথে প্রবেশ করেছিলো কিছু অভিশপ্ত কুজ্জটিকা। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে নীল-অরুর দীর্ঘ কয়েক বছরের ভালোবাসায় এমন এক চিড় ধরে যে, নীল, প্রিয় এই মানুষটিকে হটাত করেই তার জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেন। আর এই অরুবিহীন নীল তাঁর মানসিক ভারসাম্য এমনভাবে হারিয়ে ফেলেন যে, না তিনি তাঁর যুগোপদ ব্যবসা, না সামাজিকতা না কোনো কাজে মনোবিষ্ট করতে পারছিলেন। অরুকে হারিয়ে নীল প্রতিটি গলিতে, হাটে বাজারে, সোস্যাল ভার্চুয়াল জগতে সর্বত্র খুজতে থাকেন তিনি। এই বিশাল জগতে, একটা মানুষকে খুজে পাওয়া যতোটা সহজ, খুজে না পাওয়াটা ততোটাই কঠিন। কোনো গতান্তর না পেয়ে শেষ অবধি নীল হাত পাতে তাঁর সেই আরেক প্রিয় মানুষ শারমিনের কাছে। তার অত্যান্ত এই পরিচিত শারমিনিকে তিনি এতোটাই বিশ্বাস করেছিলেন যে, তিনি তাকে তাঁর হারানো প্রিয় মানুষ অরুকে খুজে দিতে যারপর নাই সাহায্যের হাত পাতেন। শারমিন হাত বাড়িয়েও দিয়েছিলো। নীল শেষ পর্যন্ত অজানা জায়গা থেকে শারমিনের মাধ্যমে অন্তত অরুর একটা সন্ধান পান যা অন্ধকার গলির বহুদূরে একটা আলোর ফূতিকার মতো মনে হয়েছিলো। নীল শারমিনের উপর এতোটাই খুশী হয়েছিলো যে, হারানো প্রিয় মানুষের বদৌলতে ধনাঢ্য নীলের যেনো শারমিনের প্রতি ভাগ্য দেবী অতীব সুপ্রসন্ন হয়েছিলো। প্রকৃত পক্ষে এটাই ছিলো শারমিনের একটা অতি গোপন খেলা। নীলের নাম জস, খ্যাতি, পজিসন শারমিনকে এতোটাই সার্থপর করে তোলে যে, নীল যেনো অরুকে আর কোথাও খুজে না পায় সে ব্যবস্থা করেই আবার কিছুটা আলোর দিশারীর মতো আশায় জাগিয়ে রাখা একটা ক্ষীন আশার আলোর রেখা দেখানোর দিকেই বারবার কুট কউশল চালিয়ে  শারমিন জ্ঞাতসারে নীলের বন্ধু সেজে নীলকে পেতে চেয়েছিলেন। আসলে নীলকে নয়, তাঁর সম্পদের আর অর্থের দিকেই ছিলো শারমিনের লক্ষ্য। ফলে নীলের প্রানপ্রিয় অরুর যতোটা ক্ষতি করা যায় সেটাই ছিলো শারমিনের লক্ষ্য। ফলশ্রুতিতে শারমিন তার ব্যক্তিগত ফায়দা লুটার জন্য সে অরুর বিপক্ষে একের পর এক গোপন চাল চালতে থাকে। নীলের হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে খুজে পাইয়ে দেওয়ার পরিবর্তে কিংবা নীলের ভালোবাসার মানুষ অরুকে নীলের সাথে আবারো এক করে দেয়ার পরিবর্তে শারমিন এমন কিছু চাল চালতে থাকে যাতে নীলের ভালবাসার মানুষটা নীলকে আরো ঘেন্না করতে শুরু করে। এক সময় নীলের ভালোবাসার মানুষ অরুটা নীলকে শারমিনের কুটচালের জন্য রাগে অভিমানে ঘেন্না করতে শুরু করে, কিন্তু তার মনের ভিতরের ভালোবাসাটা জেগেই থাকে। অতঃপর, একদিন নীল, বুঝতে পারে, শারমিনই তার সমস্ত অনিষ্ঠার কারন এবং ক্ষতির একমাত্র চালবাহক। যখন নীল শারমিনের এই চাল বুঝতে পারে, তখন শুরু হয় নীলের আরেক খেলা যা শারমিনের সমস্ত সাজানো পরিকল্পনা তো বটেই শারমিনের দাম্পত্য জীবনকেও নীল অতিষ্ঠ করে তোলেছিলো। নীলের আর অরুর ডায়েরীতে তার গল্পটা পড়া যাবে। শারমিনও বাস্তবের কোনো কাল্পনিক নাম।