২৯/০৩/২০১২-মূর্তজা ভাই এর সাথে চীন ভ্রমন

Categories

বৃহস্পতিবার, ১৫ চৈত্র ১৪১৮

গত ২০  মার্চ আমি পঞ্চম বারের মত চীন গিয়েছিলাম। চীন দেশটা বড় সুন্দর, রাস্তা ঘাঁট খুব সুন্দর, মানুষ গুলো ভাল, সারকার খুব কঠিন বলে মনে হল। ঢাকা এয়রপোর্ট থেকে রাত ১২৪০ মিনিটে সাউদারন বিমানে ফ্লাইট । ২০ মার্চ বাংলাদেশ আর ভারতের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা ছিল, বাংলাদেশ জিতল। ২২ তারিখে বাংলাদেশ আর পাকিস্তান ফাইনাল খেলা খেলবে। আর সেদিন বাংলাদেশ মাত্র ২ রানে হেরে গেল।

 আমি  চীনে এসে HUA CHEN BUSINESS HOTEL এ উঠেছি। RUIN CITY  র Wenzhou town এ ।এবারই এই হোটেলে প্রথম ওঠলাম। খুব ভাল না  ভেবেছিলাম প্রথমে কিন্তু পরে দেখলাম, হোটেল তা একেবারে Mr Zhang Xuan এর office এর কাছে এবং হোটেলের কর্মচারী গুলো খুব ভাল। এখানে মনে রাখার মত অনেক কিছু আছে। এই হোটেলের একজন মেয়ে (চাইনিজ) রিসেপসনিস্ত হিসাবে কাজ করে। আমার রুমটা ঠিক তার উল্টা দিকে। আমার একটা সুবিধা হয়েছে। যখনি যা লাগে, শুধু ডাক দিলেই হয়। কিন্তু সে ইংরেজি ভাষা কিছুই বুঝে না। আবার আমি তাদের চাইনিজ ভাষা কিছুই বুঝি না। তারপরেও একটা ভাষা আছে, সেটা বডী লেঙ্গুয়েজ। ও আমাকে ভীষণ আদর করল। ও আমাকে খুব পছন্দ করেছে। অথচ আমি ওর নামটাই জনি না। আবার যদি আমি কখন চায়না যাই আমি আবারো এই হোটেলেই উঠবো। আর উঠবো শুধু ওর জন্য। 

    

 Auto Bricks Industry করার কাজে এসেছি। এর আগে Mr Zhang Xuan এর কাছ থেকে মা পলাস্তিক ইন্ডাঁশ্রি করার কাজে এসেছিলাম। আমার গার্মেন্টস এর পারটনার মুরতুজা ভাই ও এসেছে কিন্তু ওঁনি হংকং থেকে চীনে এসেছে। Mr Zhang Xuan আমাকে যেঁ পরিমান সমীহ করে এবং ভালবাসে আমি তার এক অংশ ফেরত দিতে পারব না । সব সময় সে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে আমাকে এখানে ওখানে নিয়ে যাচ্ছে, কোন খাবারের বিল দিতে দেয় না, কি যেঁ কারবার !

 ২১ তারিখে চীন পৌঁছেছি, ২১ তারিখেই HUA CHEN BUSINESS HOTEL এ মনে রাখার মত ঘটনা ঘটল। ভাল লেগেছে। ২২ তারিখে আগে  Mr Zhang Xuan এর office এ অনেক কাজ করলাম,  Auto Bricks Industry র জন্য অনেক খবর নিলাম, আজ  মুরতুজা ভাই আসবেন। ২২ তারিখে মুরতুজা ভাই আসলেন, খুব ভাল লাগল।

 ২২ তরিখে আমি, মুরতুজা ভাই, কেরল এবং Mr Zhang Xuan সবাই মিলে HANZHOU গেলাম। হাই স্পীডট্রেন। কত সুন্দর ওদের ট্রেন বেবস্থা।  HANZHOU শহরটাও সুন্দর। রাত হয়ে গেল ওখানে পৌছতে। বেশ শীত।  রাতে খাবারটা  খেলাম।  চাইনিজ খাবার, মাফ চাই, প্রায়ই কাচা। আমি যেহেতু আরও কয়েকবার এসেছি, তাই আমি বেশি করে সুধু  সবজি খেলাম।  অন্তত সবজী কাচা হলে ও খাওয়া যায়। খাবার পর  মুরতুজা ভাই একটু মার্কেটে যেতে চাইলেন। গেলাম। কিছুই কেনা হল না।  ফিরে এলাম রুমে, ঘুম আসছিল না। তাই, আমি আর মুরতুজা ভাই মিলে একটা সিনেমা দেখলাম টিভিতে Inkheart. মজার সিনেমা। বেশ রাত হল ঘুমাতে। সকালটায় ওঠতে হবে, একটা প্রজেক্ট দেখতে যেতে হবে।  ঠিক   যা ভেবেছিলাম, তাই হল, আমরা ঘুম থেকে ওঠতে দেরি হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি Restaurant এ  গেলাম খেতে, নাশতা শেষ।  Restaurant এর মহিলা যেভাবেই হোক নাস্তার  ব্যবস্তা করলেন। নাস্তার পর আমরা চলে গেলাম প্রজেক্ট দেখতে।

১৮/০৩/২০১২-রাশিয়ায় ব্যবসায়ীক ভ্রমন

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

মার্চ 

১৮ 

সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে স্টল গুছিয়ে ভাবলাম আবারেকবার রাশিয়া ঘুরে যাই। ফলে আমি, রাজীব ভাই (ওরফে সজীব ভাই) আর মূর্তজা ভাই তিনজনেই আমরা ট্রেনে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে সরাসরি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। এমন একটা সময় যে, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে রাশিয়ায় যাওয়ার জন্যে খুব ভালো ট্রেন সূচী তো নাইই, বরং মারাত্তক ট্রেন বিপর্যয় হয়েছে এই সময়। তারপরেও বিদেশী হিসাবে অনেক কষ্ট করে আমরা তিনটা টিকেট জোগাড় করতে পারলাম। এখানে একটা জিনিষ খুব নজরে পড়লো যে, এমন কি যারা রাশিয়ার নাগরীক, সবাই রাশিয়ায় যেতে পারেন না, আর পারলেও তারা কয়েকদিনের জন্য এমনভাবে সরকারী অনুমতি লাগে যে, তিন দিন বা চারদিনের জন্য। ফলে রাশিয়ায় প্রবেশ করার এবং বের হবার সময় এটা খুব কড়াকড়িভাবে সরকারী কর্মচারীরা চেক করেন যেনো কেউ অনির্দিষ্টকালের জন্য রাশিয়ায় থাকা চলবে না। এটা সম্ভবত রাশিয়ায় যাতে অন্য শহরের মানুষ এসে অযাচিত ভীর না করে এবং ঘন বসতির সৃষ্টি না করে সেজন্য। ব্যাপারটা আমার কাছে কিছু মন্দ লাগেনি। আমাদের ঢাকা শহরের জন্যেও এমন ব্যবস্থা হলে অন্তত ঢাকা একটা বসবাসের শহর হিসাবে গড়ে উঠতো।

যাই হোক, আমরা একটা হোটেল খুজতে গিয়ে খুবই বিড়ম্বনায় পড়লাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার একবার এই হোটেলে, আরেকবার ওই হোটেলে নিয়ে যেতে লাগলো, কোথাও ভালো রুমের হদিস পাচ্ছিলাম না। অনেক পর্যটক সম্ভবত এই সময়, কোথাও খালি পাচ্ছিলাম না। অতঃপর একটা স্বাভাবিক মানের হোটেলেই উঠলাম। আমরা তিনজনেই একরুমে উঠলাম। রাত তখন প্রায় ৩টা। কিছু খাবার সাথেই ছিলো, সেটাই আমরা তিনজনে ভাগ করে খেয়ে নিলাম। তারপর ঘুম। আগামীকাল এই রাশিয়ান এয়ারপর্ট থেকেই আমরা ফিরে যাবো ঢাকায়, বিকেল ৪ টায় ফ্লাইট। এর মধ্যেই যতোটুকু রাশিয়ার আশেপাশে দেখা যায় সেটাই ভালো।

সকালে রাজীব ভাই অন্যত্র চলে গেলেন। আমি আর মূর্তজা ভাই পায়ে হেটে অদূরে ক্রেমলিন দেখতে যাবো। যেহেতু ভালো মতো চিনিনা, তাই একটা গাড়ি ভাড়া করলাম। পরে দেখলাম, আসলে আমাদের হোটেল থেকে ক্রেমলিন অতো কাছে নয়। আমরা যখন ক্রেমলিনের চত্তরে পৌঁছলাম, তখন মাত্র সকাল ১০ টা হবে। বিশাল চত্তর সামনে। অনেক নাম শুনেছিলাম এই ক্রেমলিনের, আজ নিজের চোখে দেখে মনে হলো, এটা পরাশক্তির একটা হেড কোয়ার্টার। জীবনে আল্লাহ অনেক কিছু দেখালেন। আমেরিকা দেখেছি, এবার রাশিয়ার ক্রেমলিনও দেখলাম।

ক্রেমলিনের সামনেক্রেমলিনের সামনে অনেক সিকিউরিটির লোক থাকে, কিন্তু তারা কাউকে কিছুই বলেনা। যারা দর্শানার্থী, তারা নির্বিঘ্নে ক্রেমলিনের বাইরের বিশাল চত্তরে আনাগোনা করছে। মনে মনে ভাবলাম, এদের অনেকেই আছে গুপ্তচর যাদের হয়তো আমরা চিনি না কিন্তু তাদের কাজের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা।

অনেকক্ষন থাকলাম, দেখলাম, ছবি নিতে কোনো বাধা নাই তবে মাঝে মাঝেই লেখা আছে, 'এই এলাকায় ছবি তোলা নিষেধ"। খুব গোপনেই কয়েকটা ছবি নিলাম, বলা যায় না কোথায় কোন ক্যামেরা ফিট করা আছে, আবার কেউ আমাদের সন্দেহ করে ধরেও নিয়ে যেতে পারে এই ছবি তোলার জন্য। আশেপাশে কোনো দোকান পাট নাই, ভীষন পানির পিপাসা লেগেছিলো, সাথে অল্প একটু পানি ছিলো, তাতেই পানির পিপাসা মিটাতে হলো।

ক্রেমলিন থেকে আমরা পায়ে হেটে আশেপাশে বেশ দূরে কিছু শপিংমল আছে। সেখানে গেলাম। মূর্তজা ভাই একটা স্পোর্টস দোকানে ঢোকলেন, তাঁর বাচ্চাদের জন্য কিছু স্পোর্টস গিয়ার কিনবেন। আমিও ভাবলাম কিছু কিনি। ওরে ভাই, এতো দাম? তারপরেও পকেটে ডলার ছিলো বেশ, আর এগুলি ঢাকায় ফিরিয়ে নেবার ইচ্ছা ছিলো না। তাই প্রায় ১৫০০ ডলার দিয়ে আমিও কিছু স্পোর্টস গিয়ার কিনলাম মুর্তজা ভাইয়ের দেখাদেখি। হয়তো আমার পরিবার এগুলি ব্যবহার করে কিনা জানি না, আবার করতেও পারে। ব্যবহার করলে ভালো লাগবে আর না করলে পুরা টাকাটাই গচ্চা।

একটা রেষ্টুরেন্টে ঢোকে আমরা কিছু খেয়ে নিলাম। বিকাল ৩ তাঁর দিকে এয়ারপোর্টে গেলেই হবে। ওই সময় রাজীব ভাইও আমাদের সাথেই ঢাকায় ফিরবেন। আমরা খাওয়া দাওয়া করে বিকাল তিনটার আগেই এয়ারপোর্টে চলে এলাম, বিশাল এয়ারপোর্ট। চমৎকার জায়গা। খুব ভালো লাগলো। অনেক দেশ ঘুরে একটা জিনিষ বুঝেছি যে, আমাদের দেশের এয়ারপর্ট বিদেশের লোকাল এয়ারপোর্টের থেকেও খারাপ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায়, ডেকোরেশনে, সুযোগ সুবিধা সবকিছু মিলিয়ে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপর্ট কোনো অবস্থাতেই ইন্তারন্যাশনাল পর্যায়ে পড়ে না। যাইহোক, আমরা চেকিং করে ফেললাম। আমাদের সাথে যে স্যাম্পলগুলি সেন্ট পিটার্সবার্গে নিয়ে এসেছিলাম, সেগুলি আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গেই দান করে এসেছিলাম। ওগুলি আর দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো মানে হয় না। কারন তাতে আমাদের অনেক লাগেজ খরচ বহন করতে হতো।

একটা কথা না বললেই নয় যে, আমরা যে উদ্দেশ্যে এই সেন্ট পিটার্সবার্গে স্টল খুলেছিলাম, আসলে এটার কোনো সাফল্য আসে নাই। আমরা ভেবেছিলাম যে, এখানে বায়াররাও আসে। ফলে আমরা অনেক অর্ডার পাবো দেশ বিদেশ থেকে। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম যে, আসলে এখানে খুচরা ক্রেতা বেশী। অর্থাৎ এক পিস দুই পিচ কেনার ক্রেতা। আমরা তো এটা চাই নাই। পুরুটাই আসলে একটা অসফল ফেয়ার ছিলো। আমি মুর্তজা ভাইকে বললাম, যে, এরপরে এভাবে আর আমরা কোনো স্টল দেয়া উচিত না। তাতে খুব লাভ হয় না।

আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম।

১৭/০৩/২০১২-সেন্ট পিটার্সবার্গ

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

মার্চ 

১৭ 

গত কয়েকদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম এই সেন্ট পিটার্সবার্গে ফ্যাশন মেলায় আসার জন্য। 39th International Exhibition of Textile and Light Industry এর মেলাটার সময়কাল ১৫ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত।  কোনো পরিকল্পনা ছিলো না আগে থেকে। হটাত করেই মূর্তজা ভাই বললেন, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে একটা মেলা হচ্ছে, বাংলাদেশের অনেকেই যাবে, আমরা যাবো কিনা?

সেন্ট পিটারসসবার্গের কথা অনেক পড়েছিলাম আমাদের বই পুস্তকে সেই ছোট বেলা। যখন ছাত্র ছিলাম তখন আবার রাজপুটিনের গল্প শুনতে শুনতে এই সেন্ট পিটার্সবার্গের ব্যাপারে অনেক বাসনা ছিলো মনে। আমাদের ক্লাস এইটের একটা বইয়ের মধ্যে একটা ছোট বালকের গল্প পড়েছিলাম যে, তাঁর বাবাকে রাশিয়ার কোনো এক রাজা শাস্তিসরুপ এই সেন্ট পিটার্সবার্গে পাঠিয়েছিলো। কারন সাইবেরিয়ার মতো নাকি এখানে প্রায় সারা বছর বরফ থাকে আর যাতায়তের তেমন কোনো ভালো ব্যবস্থা নাই। তারপর সেই বাবাকে দেখার জন্য তাঁর ছোট ছেলে একাই পরিকল্পনা করে যতো বরফই থাকুক আর যতো খারাপ রাস্তাই হোক, সে তাঁর বাবার সাথে দেখ করবেই। যখন গল্পটা পড়েছিলাম, তখন আমারও একবার এই সাইবেরিয়া অথবা সেন্ট পিটার্সবার্গে যাওয়ার খুব শখ হয়েছিল।

মূর্তজা ভাই যখন আমাকে ব্যাপারটা বললেন, আমি যতোটা না ব্যবসার প্রসার হবে তাঁর থেকে বেশী আগ্রহী ছিলাম এই সেন্ট পিটার্সবার্গ দেখার ব্যাপারে। খরচ কত হবে সেটা জিজ্ঞেস করতেই পুরু প্যাকেজের দাম পড়বে প্রায় লাখ বিশেক টাকা ভেন্যু ভাড়া, এয়ার টিকেট, হোটেল ভাড়া, অন্যান্য সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখের মত। কম না। তারপরেও আমরা আমাদের ফ্যাক্টরীর বাজেট পর্যালোচনা করে দেখলাম, সম্ভব প্ল্যান করা। ব্যবসা কতটুকু পাবো জানি না, কিন্তু যাওয়া যেতেই পারে।

গতকাল আমরা সেন্ট পিটার্সবার্গে অনেক স্যাম্পল নিয়ে এসেছি। সারাদিন বুথ সাজানোর কাজে ছিলাম। প্রুচুর ঠান্ডা। তবে দেশটা এতো সুন্দর, সেটা আমার কল্পনায়ও ছিলো না। সারাদিন কাজের শেষে আমি আর মুর্তজা ভাই সাথে বাংলাদেশের আরেকজন সজীব ভাই, একসাথে বের হলাম। আমরা বাংলাদেশ থেকে অনেকেই এখানে এসেছি। কেউ জ্যাকেটের ব্যবসা, কারো শার্ট প্যান্টের ব্যবসা, কারো আমাদের মতো সুয়েটার্স এর ব্যবসা।

সারাদিনই গুড়ি গুড়ি বরফ পড়ছে বাইরে। এটা অনেকটা গুড়িগুড়ি বরফ পরার বৃষ্টির মতো। রাস্তাঘাট সারাক্ষনই ভিজা, গাছের পাতাগুলি ঝরে পড়ে পড়ে গাছের নীচে একটু একটু পচন ধরায় কেমন জানি একটা গন্ধ আসে। রাস্তায় সবাই গাড়ি, কিংবা বাইক বা স্কুটি নিয়ে চলে। সবার হাতেই ছাতা আছে। রাশিয়ান মেয়েরা অনেক সুন্দর হয়, সেন্ট পিটার্সবার্গ সে রকম।অনেক লম্বা হয় এদেশের মেয়েরা।

এসেই একটা মোবাইল ফোন কিনেছিলাম। খুব ছোট একটা মোবাইল ফোন, দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। আসলে আমার কেনার দরকার ছিলো না, কনিকা ছোট ছোট জিনিষ পছন্দ করে, তাই এটা কেনা। রাতের সেন্ট পিটার্সবার্গ দেখতে গিয়ে যা চোখে পড়লো, সেটা অভাবনীয়। প্রতিটি রাস্তায় পর্যাপ্ত পরিমানে লাইট। মানুষজন খুব কম কিন্তু যারা বাইরে বেরিয়েছেন, তাদের বেশীরভাগ মানুষই পর্যটক। লোকাল লোকজন বেশ কম। প্রচন্ড বাতাস। সন্ধ্যা হলেই সব অফিস আদালত বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু সবগুলি বিল্ডিং এর বাইরের দিকে এমনভাবে আলোকিত যে, মনে হয় অভিনব রকমের সুন্দর। যেখানেই তাকাই, সবকিছুই এতো চোখ জুরানো সুন্দর, ভাবাই যায় না। যেসব জায়গায় পার্ক আছে সে গুলিতে গাছে গাছেও বেশ চমৎকার করে আলোকিত করা। গাড়ির তেমন ভীড় নাই, আবার কিছু কিছু ট্যাক্সি ক্যাব আছে, যারা ছোট ছোট ট্রিপ দেয়।

আমরা একটা নদীর ধারে দাড়ালাম। নদীর দূর প্রান্তের ওপারে যে ছোট শহরের মতো দেখা যায়, মনে হচ্ছে একটা ছবি। আমরা গুড়ি গুড়ি বরফের কুচিতে ভিজে যাচ্ছিলাম বটে কিন্তু আশ্রয় নিতে ইচ্ছে করছিলো না। সিগারেট ধরিয়েছি, খুব সাবধানে টানছি যাতে সিগারেট ভিজে না যায়। সজীব ভাই আর মূর্তজা ভাই একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছেন। আমিও মাঝে মাঝে তাদের সাথে জয়েন হচ্ছি কিছু ছবি তোলার জন্যে। বেশ ভালো সময় যাচ্ছে।

রাত প্রায় বারোটা বাজে। সাথে আমাদের গাড়ি নাই। যখন বেরিয়েছিলাম, সাথে গাড়ি ছিলো, ভারা করা গাড়ি। এবার হোটেলে ফিরে যাবো, এমন সময় একটা ট্যাক্সী ক্যাব আমাদের সামনে এসে দাড়ালো। যুবক একটা ছেলে। ভালো ইংরেজি বলে। জিজ্ঞেস করলাম, সে ভাড়ায় যাবে কিনা। সে বেসিক্যালি ভাড়ায় যায় না, এমনিতেই সে ঘুরতে বেড়িয়েছিলো। আমাদের এতো রাতে এই নির্জন জায়গায় দেখে গাড়ি থামিয়েছে। সে একজন আইটি বিভাগের লোক। ব্যক্তিগত একটা ছোট ফার্ম আছে। সে বল্লো যে, সেন্ট পিটার্সবার্গে অধিক রাত নিরাপদ নয়। আমাদের হোটেলে ফিরে যাওয়া উচিত। কারন এখানে অনেক খারাপ লোক রাতে বিচরন করে। আমরা সবাই একটু ভয় পেয়ে গেলেও যেহেতু সবাই একসাথে আছি, ফলে মনে সাহস ছিলো।

বললাম, কি নাম তোমার?

সে তাঁর নাম আলেক্স বল্লো।

আমরা বললাম, আলেক্স, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিতে পারবা? আমরা তোমাকে যা ভাড়া আসে সেটাই দিয়ে দেবো। সে একটু হেসে দিয়ে বল্লো, তাঁর ভাড়া লাগবে না, কিন্তু সে যে ইংরেজীতে আমাদের সাথে কথা বলতে পারছে এটাই তাঁর লাভ। কারন এখানে সে কারো সাথে ইংরেজিতে কথা বলার মানুষ পায় না। অথচ সে ভালই ইংরেজী বলতে পারে। আমরা তাঁর গাড়িতে উঠে গেলাম, অনেক ফান করলাম তাঁর সাথে, সেও খুব মজা পেলো বলে মনে হলো। সে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে বল্লো যে, যদি তারা আগামীকাল আরো সুন্দর সুন্দর জায়গায় যেতে চায়, তাহলে তাঁর নাম্বারে ফোন দিলে বিনে পয়সায়ই সে আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবে। আলেক্স ছেলেটাকে ভালো লাগলো। বললাম, ঠিক আছে, আগামীকাল বিকাল পাচতার পর আমরা ফ্রি হবো, আলেক্স যদি ফ্রি থাকে সে যেনো আমাদেরকে আবার এইখান থেকেই পিক করে নিয়ে যায়। কথামতো সে রাজী হলো।

পরেরদিন ঠিক সময়েই আলেক্স চলে এলো। আমরা আলেক্সকে বললাম, কোথায় কোথায় যাওয়া যায় সে যেনো আমাদেরকে নিয়ে যায়। আলেক্স বল্লো, বেশি জায়গা হয়তো সে ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে না, তাহলে অনেক রাত হয়ে যাবে তবে দিনের আলোয় যে কয়টা দর্শনীয় স্থান দেখা সম্ভব সেটা সে প্ল্যান করে রেখেছে, আর রাতে একটা ব্রিজ দেখাতে নিয়ে যাবে যা দেখার জন্য অনেক মানুষ এখানে আসে। ব্রিজটা রাত দেড়টার পরে খোলা শুরু হয় আর ভোর পাচটার আগেই আবার বন্ধ করে দেয়া হয় যাতে স্বাভাবিক গাড়ি ঘোড়া আবার চলতে পারে। মানে ব্রিজটা দিখন্ডিত হয়ে যায় রাত দেড়টার পর। আমি কখনো এই ধরনের ব্রিজ দেখি নাই। ব্রিজটি নেভা রিভারে।

আলেক্স আমাদেরকে প্রথমেই নিয়ে গেলো, সেন্ট আইজাক ক্যাথেড্রালে, ভীষন সুন্দর দেখতে। তারপর গেলাম চার্চ অফ দি সাভিউর অন স্পিল্ড ব্লাড এ, তারপর নিয়ে গেলো আলেক্সজান্ডার কলাম ইন পেলেস স্কোয়ারে। প্রতিটি জায়গা সুন্দর। এর মধ্যেই রাত প্রায় আটটা বেজে গিয়েছিলো।

সেন্ট আইজাক ক্যাথেড্রালঃ 

আলেক্সজেন্ডার-১ এর আমলে, সেন্ট আইজাক ডালমাটিয়ার নামে উতসর্গকৃত এই ক্যাথেড্রালটি 'পিটার দি গ্রেট' এর চীফ পেট্রোন 'সেন্ট আইজাক' এর নামে করা। এটা বর্তমানে মিউজিয়ামে রুপান্তরীত করা হয়েছে। ১৮৫৮ সালে তৈয়ারি করা এই ক্যাথেড্রালটি সন্ধ্যার পরে বন্ধ হয়ে যায় বিধায় আমরা এর ভিতরে ঢোকতে পারি নাই কিন্তু বাইরেও বহু দর্শানার্থির জন্য দেখার বেশ কিছু আছে। আমরা বেশীক্ষন এখানে থাকতে পারি নাই কারন আমরা এমনিতেই বেশ দেরী করে বের হয়ে আরো বেশ কিছু জিনিষ দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। আর আমরা এই সেন্ট পিটার্সবার্গে দিনের বেলায় বের হবার সম্ভাবনা নাই কারন আমাদের মেলায় আমাদের সারাক্ষন থাকতে হয়। কিছু ছবি তুলে বেরিয়ে গেলাম আলেক্সজেন্ডার পেলেসের উদ্দেশ্যে। কারন ওখানে আবার বেশী রাতে ঢোকার অনুমতি নাই।

আলেক্সজেন্ডার কলাম ইন প্যালেস স্কোয়ার দর্শনঃ

ফ্রান্সের নেপোলিয়ানের সাথে যুদ্ধবিজয়ের পর আলেক্সজেন্ডার-১, এটা তৈরী করেন। প্রায় ১৫০ ফুট উচু এই কলামের উচ্চতা। এতো বিশাল খালি জায়গা এর সামনে, দাড়ালেই মন ভরে যায়। খুব পরিষ্কার করে রাখা জায়গাটি। একদম উপরে একটা এঞ্জেল একটা ক্রস ধরে আছে। কেনো এই ক্রস কিংবা কিসের কারনে এই সিম্বল দেয়া, সেতা আমাদের গাইড আলেক্স ভালো বলতে পারলো না। তবে একটা কথা আলেক্স বল্লো যে, এঞ্জেলের মুখখানা আলেক জেন্ডার-১ এর মুখের আকৃতি স্বরূপ করা। কিছুক্ষন থাকার পর আমরা আরেকটি দর্শনীয় জায়গার জন্য র ওয়ানা হয়ে গেলাম। আসলে কোনো স্থানই আমাদের ভালো করে দেখা হচ্ছিলো না কারন এমনিতেই রাত হয়ে যাচ্ছিলো আবার আমাদের হাতে দিনের বেলাতেও সময় নাই। অন্যদিকে আর এখানে এসেছি মাত্র ৪/৫ দিনের জন্য।

চার্চ অফ দি সেভিউর অন স্পিল্ড ব্লাডঃ প্রকৃত পক্ষে এটা একটা ইমোশনাল জায়গা রাশিয়ানদের জন্য। আলেক্সজেন্ডার-২ কে হত্যা করা হয়েছিলো তারই কোনো প্রতিপক্ষের মানুষ। 'নিহিলিস্ট' মুভমেন্টের সময় আলেকজান্ডার-২ কে হত্যা করা হয় যার কোনো বেসিক ভিত্তি ছিলো না। এই সেই একই জায়গায় রুমানভ ইম্পেরিয়াল পরিবার আলেকজান্ডার-২ এর স্মৃতি রক্ষায় একটি মনুমেন্ট তৈরী করেন যা এখন চার্চে পরিনত হয়েছে।

নেভা রিভার ব্রিজঃ

এই নদীতে একটা ব্রিজ রয়েছে যা গভীর রাতে বড় বড় শিপ, একপাশ থেকে আরেক পাশে যাওয়ার জন্য খুলে দেয়া হয়। স্বয়ংক্রিয় ভাবে এটা খুলে যায় দুইধারে। আবার ভোর পাচটার আগেই পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয় যাতে দিনের বেলায় স্বাভাবিক গাড়ি ঘোড়া চলতে পারে। আমরা যখন এই নেভা নদীর তোরে এলাম, দেখালম, প্রচুর লোকজন এই ব্রিজ কখন খুলবে সেটা দেখার জন্য বেশ ভীড়। আমরা প্রচন্ড বাতাসের মধ্যে দাড়িয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বৃষ্টি বা গুড়ি গুড়ি বরফের কোনো কুচি ছিলো না। অনেক শীত। প্রায় রাত দুটুর দিকে একটা বেশ বড় সড় সাইরেন বাজলো। বুঝলাম এখন হয়তো ব্রিজ খুলবে। ব্রিজ খোলার আগে তারা একতা জিনিষ নিশ্চিত করেন যে, দুই পারের কোনো গাড়ি আছে কিনা বা ব্রিজের উপরে কোনো গাড়ি আটকা পড়লো কিনা। ব্রিজ খোলার আগে তারা সমস্ত এন্ট্রি বন্ধ করে দেয় এবং একটা সাইরেন বাজানো হয়। যদি কোনো গাড়ি খুব কাছাকাছি থাকে যাদের পার হবার জন্য ব্রিজের দিকে আসবে, তারা ওই সাইরেন বাজার ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে এসে গেলে পার হবার সুযোগ পাবে আর এর পরে ভোর পর্যন্ত গাড়ি পারাপারের কোনো সুযোগ নাই। এই টাইম টেবিলটা এখানকার মানুষজন জানে বিধায় সেভাবেই চলাফেরা করেন। দেখলাম, ব্রিজটা খুব ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যস্থল থেকে দিখন্ডিত হয়ে দুই পাশে একদম প্রায় ৬০/৭০ ডিগ্রী খারা হয়ে যায়। ফলে যে কোনো বড় বড় শীপ ও এই দুই ফাক দিয়ে ক্যানাল্টায় প্রবেশ করতে পারে। অদ্ভুদ টেকনোলোজি। আমরা বন্ধ্যের ব্যাপারটা আর দেখতে চাই নাই কারন তাতে প্রায় রাত পার হয়ে যাবে। সেখান থেকে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় তিনটা বেজে গেলো।

পুটিনের বাবার বাড়ি পরিদর্শনঃ

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্লাদিমির পুতিন আসলে এই সেন্ট পিটার্সবার্গের ছেলে। সেন্ট পিটার্সবারকে বলা হতো এক সময় লেনিনগ্রাড। এটাই এখন সেন্ট পিটার্সবার্গ। ব্লাদিমির পুতিনের বাড়িতা খুব সাধারন গোছের একতা বাড়ি। চারিদিকে বেশ গাছপালা, পাশেই নদী। ভাবছিলাম, দুই পরাশক্তির একজন এই ব্লাদিমির পুতিনের আজ থেকে প্রায় ৪০/৪৫ বছর আগেও এই এলাকার অনেকেই ভাবেন নাই যে, পুতিন একটা সদাহারন বালক এই রকমের পরাশক্তির চেয়ারে বসে দুনিয়া কাপিয়ে তুলবেন। অনেক কিছুর সাক্ষি এই সব জায়গার মানুষ গুলি। ব্লাদিমির পুতিনের বাবা ছিলেন একজন অতি সাধার ফোরম্যান, আর মা ছিলেন গৃহিণী। ভাবাই যায় না এই রকমের একটা পরিবার থেকে ব্লাদিমির পুতিনের মতো এতো বড় পরাশক্তির হেড হয়। তারপরেও ইতিহাস বলে কথা। আর এটাই বাস্তবতা। পুতিন এখানে থাকেন না, তিনি এখন মস্কোর বাসিন্দা।

২০/০৪/২০০৯-বাসাবোতে ডেভেলোপার

রিভার সাইডে আমার বিলুপ্তির শেষের দিকে আমি যখন অন্য আরেকটি বিকল্পের কথা চিন্তা করছিলাম, তখন বাসাবোতে তারেক নামে এক ভদ্র লোকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো। আর সেটা মোহসীন সাহেবের মাধ্যমেই। তারেক সাহেব আমাদের ফ্যাক্টরিতে এক্সেসরিজ সাপ্লাই দিতেন। বরিশালের মানুষ, খুব চালাক। তার মাধ্যমে আমি বাসাবোতে আরাই কাঠার একটা প্লট বায়না করেছিলাম এবং যেভাবেই হোক, টাকাটাও এক প্রকার পরিশোধ করেই দিয়েছিলাম। পাটোয়ারী নামে এক লোকের জমি যিনি নিজেও গার্মেন্টস লাইনে ছিলেন। পাটোয়ারী সাহেবের স্ত্রীর নামেও আরো আড়াই কাঠা জমি ছিলো একই দাগে। ফলে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ডেভেলোপারের কাজের একটা বুদ্ধি করলেও পাটোয়ারী সাহেব থাকতে পারেন নাই। ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে কিস্তি কিস্তি করেই টাকা নিয়ে গার্মেন্টস চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এক পর্যায়ে গিয়ে আমি পুরু ৫ কাঠা জমিই নিয়ে নেই আর সেখানে হাউজিং করার জন্য উদ্যোগ নেই।

এতো চড়াই উতড়াই যাচ্ছিলো আমার জীবনের উপর দিয়ে। তারপরেও কিভাবে যে আল্লাহ আমাকে এসব বীভৎস পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছেন, ভাবলেও শরীর কেপে উঠে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি। আমার মাথায় একটা বিষয় সব সময় কাজ করতো যে, যে কোনো মুল্যে আমার পরিবার যেনো সাফার না করে। আমি ওদেরকে বুঝতেই দেই নাই আমার ভিতরে কি চলছে বা আমি কি অবস্থায় আছি।  

সারাক্ষন চিন্তায় থাকি, কিভাবে মানুষের লোন গুলি শোধ করবো, কিভাবে সম্মানের সাথে একটা ব্যবসায় টিকে থাকবো। যার কেউ নাই, আসলে তার মতো মানুষের অনেক বড় সপ্ন দেখা অপরাধ। কিন্তু আমার তো সামর্থ না থাকলেও যোগ্যতা ছিলো। আর সেই যোগ্যাটা গুলি আমি আমার সহজ সরল মনের কারনে হারিয়ে ফেলেছিলাম এই সিভিলিয়ানদের ভীড়ে। একটা সময় ভাবলাম, বাসাবোর ৫ কাঠার উপরে যদি বিল্ডিং বানাই আর সেই ফ্ল্যাট গুলি বিক্রি করি, তাতে হয়তো একটা সেক্টর খুলবে। তারেকের এক বন্ধু হারুন নামের এক ভদ্র লোক সামিল হলেন। ভালো মানুষ। বুদ্ধি দিলেন যে, তার এক পরিচিত ভাই আছে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনে। লোন নিয়ে হয়তো কাজে হাত দেয়া যায়। হাউজ বিল্ডিং ফাইনেন্সে গিয়ে জানতে পারলাম, গ্রুপ লোনে বেশী টাকা পাওয়া যায়। ফলে আমার টাকায় কেনা ৫ কাঠা জমি আমি নির্ভয়ে মোট পাচ ভাগে সাক কবলা করে গ্রুপ লোন হসাবে ৬০ লাখ টাকা নিয়ে নিলাম। তাদের মধ্যে একজন লেঃ কর্নেল ফেরদৌস, আমার ভাতিজা মান্নান, আমার স্ত্রী মিটুল চৌধুরী, হারুন সাহেব আর আমি। মোট ৫ জন, ৫ কাঠা। এটাও একটা ভালো বুদ্ধি ছিলো না। কিন্তু আমাকে হয়তো আল্লাহ ভালোবাসেন, তাই মাথায় একটা বুদ্ধি এটে দিলো যে, সাব কবলা করার সাথে সাথে আমি সবার কাছ থেকে আম মোক্তার নিয়ে নিলাম যাতে কেউ আমার সাথে আবার ছল চাতুরী করতে না পারে।

১৮/০৩/২০০৯-প্রিয়ান্থার শেয়ার হস্তান্তর

প্রায় এক বছর। আমি, মুর্তজা ভাই আর প্রিয়ান্থা এক সাথে কোনো রকমে কাজ করছিলাম। তারাই ফ্যাক্টরীর একাউন্ট হ্যান্ডেলিং, অর্ডার নেয়া, শিপমেন্ট করা, সবকিছু করেন। আমি জাষ্ট থাকি। কোনো প্রশ্নও করি না। আর করিই বা কিভাবে? আমার শেয়ারে থাকাটা তো ছিলো এক প্রকার দয়ার মতো। কিন্তু এরমধ্যে আমি একটা কাজ করতে পেরেছিলাম যে, আমি পার্টনার হিসাবে অতোটা ক্রিটিক্যাল নই। মানুষ হিসাবেও সহজ সরল। তাই ওনারা আমাকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করতেও পারছিলেন না। আমি ফ্যাক্টরীর এমডি হিসাবেই ছিলাম।

প্রিয়ান্থা ২০০৯ সালে হার্ট এটাকে মারা গেলেন। মাত্র ৪১ বছর বয়সে। প্রিয়ান্থার শেয়ার ছিলো ৪৫% আর মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ার ছিলো ৪৫%। আমার ১০%। প্রিয়ান্থার মৃত্যুর কারনে প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ার এখন অন্য কারো নেয়ার কথা। কিন্তু মুর্তজা ভাই চালাক মানুষ, তিনি চান নাই যে, অন্য আরো কেউ এই ফ্যাক্টরিতে ডাইরেক্টর হয়ে আসুক। ফলে মুর্তজা ভাই একটা প্রোপোজাল দিলেন যে, প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ার আমরা ভাগ করে নিতে পারি কিনা, বিনিময়ে প্রিয়ান্থার ইনভেষ্টেড প্রায় ৭৫ লাখ টাকা তার স্ত্রীকে ক্যাশ প্রদান করতে হবে। আমার তো আর কোনো টাকাই ছিলো না। কিভাবে আমি শেয়ার নেবো? শেষতক আমি মুর্তজা ভাইকে পলাশপুরের ৫৮ শতাংশ জমির বিনিময়ে যার দাম ধরা হলো ৫০ লাখ টাকা, এর বিনিময়ে আমি ২৫% শেয়ার নিলাম আর মুর্তজা ভাই নিলেন ২০% শেয়ার। তাতে এটা দাড়ালো যে, আমার হয়ে গেলো ৩৫% আর মুর্তজা ভাইয়ের শেয়ারে দাড়ালো ৬৫%। এখন কেনো যেনো মনে হয় যে, সম্মান জনক একটা পজিশনে আছি শেয়ারের কথা ভেবে। আমি এমডিই রয়ে গেলাম আর মুর্তজা ভাই হয়ে গেলেন ফ্যাক্টরীর চেয়ারম্যান।

০৫/০৪/২০০৮-প্রিয়ান্থা/মুর্তজার অংশীদারিত্ত

মোহসীন সাহেবের সাথে অনেক ভেবে চিনতে আমি পার্টনারশীপ করি নাই। ব্যবসায়ীক জগতে যেহেতু আমার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না, আর ২০ বছরের অধিক কাটিয়েছি সেনানীবাসে, ফলে খুব যে মানুষ চিনতে পারি সে রকমও নয়। সবাইকেই বিশ্বাস করি, সবাইকেই আপন মনে হয়। কিন্তু মানুষগুলি আমার এই সরলতা আর বিসশাসকে পুজি করে বারবার ঠকিয়েই যায়। ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই আমার যা হারাবার তা নিঃশেষ হয়ে যায়। রিভার সাইডের ব্যবসাটাও প্রায় এমনই মনে হলো। ডিপিএস, সঞ্চয়, অন্যদের কাছে লোন নিতে নিতে আমি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলাম। অন্যদিকে মোহসীন সাহেব যে খুব একটা সিরিয়াসভাবে ব্যবসাটা করছেন, তা মনে হলো না। একটা সময় এলো আমি বুঝতে পারলাম, মোহসীন সাহেবকে দিয়ে আমার এই গার্মেন্টস ব্যবসা হবে না। এরমধ্যে প্রায় কোটি টাকার উপর ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছি। ছোট ভাই (মোস্থাক ভাই) এর কাছে একাই লোন নিয়েছিলাম প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, ব্যবসাটা আর করবো না। এর থেকে বেরিয়ে যাওয়াই উত্তম।

ক্লায়েন্ট খুজতে থাকলাম যদি অন্য কারো কাছে রিভার সাইড হস্তান্তর করে অন্তত যেটুকু লোন আছে সেটুকু দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়, বিশেষ করে ব্যাংকের লোন। শ্রীলংকান অধিবাসি প্রিয়ান্থা আর তার বাংলাদেশী বন্ধু মুর্তজা ভাই আমাদের ফ্যাক্টরী ২ কোটি টাকার বিনিময়ে ১০০% কিনে নিতে আগ্রহী হলেও পরবর্তীতে এলাকার সিচুয়েসন এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তারা অন্তত ১০% শেয়ারের বিনিময়ে হলেও আমাকে রাখতে চান। প্রাথমিকভাবে আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু বের হয়ে যাচ্ছি, তাহলে আর থাকা কেনো? আমি অন্য অনেকগুলি সেক্টরে ব্যবসার লাইন খুজলেও টাকা পয়সার টানাটানিতে আসলে কোনোটাতেই প্রবেশ করতে পারছিলাম না। খুব রাগ হচ্ছিলো নিজের কাছে। ডেভেলোপারের কাজে হাত দিলাম। কুমা নামে একটা কোম্পানিও ফর্ম করলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, মুর্তজা ভাই আর প্রিয়ান্থা আসলে আমাকে পার্টনার হিসাবে নন, একটা নিরাপত্তার চাদর হিসাবে ব্যবহার করে তাদের ব্যবসাটা নির্বিঘ্নে চালাতে চাচ্ছিলেন। যার কেউ নাই, যার হাতে কিছু নাই, তার কোনো চয়েজ থাকে না। ভাবলাম, এই ১০% নিয়েও যদি আমি মাসিক একটা সেলারী পাই, আর একটা অফিস পাই, তাতেই বা কম কিসের? শেষ অবধি সিদ্ধান্তটা মেনে নিয়েছিলাম। কখনো আসি, কখনো আসি না। আসলে আমার আসা যাওয়া নিয়েও তাদেরও কোনো মাথা ব্যথা ছিলো না। তাদের শুধু একটাই চাওয়া ছিলো, আর সেটা লোকাল কোনো ঝামেলা না থাকা যেটা আমি পারি।

খুব চুপচাপ একটা লাইফ লিড করছি, পরিবারের কাউকেই বুঝতে দেই না আমি কোন অবস্থায় আছি। আমি শুধু এইটুকু নিশ্চিত করতে চাই যে, ওরা যেনো ভালো থাকে। মীরপুরে বাড়িটা সম্পন্ন হওয়াতে একটু স্বস্তি পাচ্ছিলাম যে, অন্তত বাড়ি ভাড়া লাগবে না। মিটুলের চাকুরী আছে, হয়তো না খেয়ে তো আর মরবো না। তদুপরি, ১০% শেয়ার নিয়ে হলেও তো আছি একটা ব্যবসায়, মন্দ কি? মুর্তজা ভাই, আর প্রিয়ান্থা যেনো এক বোটায় দুটি ফুল, একে অপরের উপর খুবই ডিপেন্ডেন্ট। কিন্তু আমার সাথে চলমান একটা সম্পর্ক রাখেন। আমিও তাদের ব্যবসায়িক কোনো কাজে নাক গলাই না। দরকারও মনে করি না। আমি জানি কি ভুমিকা নিয়ে আমি এই রিভার সাইডে আছি। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, তারাও আমাকে ছাড় দেন নাই। যতটুকু ব্যবসায়ীক ফায়দা লুটার বা দরকার পুরুটাই তারা আমার কাছ থেকে করে নিয়েছেন। তাতে আমার কত লস হলো বা কি কারনে আমি এমন একটা ফ্যাক্টরী দিয়ে দিলাম, সেটা তাদের কাছে বিবেচ্য ছিলো না বা থাকার কথাও না। ফ্যাক্টরীর অডিট, কাষ্টম ক্লিয়ারেন্স, অন্যান্য দেনা পাওনা, সবই তারা আমাকে ঐ ১০% এর শেয়ারের মুল্যের উপর আর কিছুটা আমার উপর লোন লিকঝে কাজগুলি সমাধা করে নিয়েছেন। কিছু বলার অবশ্য আমার ছিলো না।

মোহসীন সাহেবকে আমি বিনা পয়সায় শেয়ার দিলেও যখন শেয়ারটা ফেরত চাইলাম, দেখলাম, কেউ নিজের সার্থের উর্ধে নয়। তিনিও আমাকে এক প্রকার জিম্মির মতো করে ফেলেছিলেন শেয়ার ফেরত না দেয়ার কথা বলে। খুব কঠিন একটা পরিস্থিতিতে ছিলাম। কিন্তু যেভাবেই হোক, আমি শেষ পর্যন্ত ছলে বলে কৌশলে মোহসীন সাহেবের কাছ থেকে শেয়ারগুলি লিখিয়ে নিতে পেরেছিলাম।