১১/০৫/২০১৭-অনেকদিন পর লিখতে বসেছি

Categories

 

অনেকদিন পর লিখতে বসেছি। মনটার চেয়ে শরীরটা আরো বেশি খারাপ বলে মনে হচ্ছে। অধিক পরিশ্রমের চেয়ে মানসিক টেনসনের কারনেই শরীরটা বেশি খারাপ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সারাদিনই ক্ষুধা থাকে, কিন্তু ভালো খেতে পারছিনা, সিগারেট খাওয়ার পরিমানটা অনেক অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

জীবনের এতোগুলো বছর চারি পার্শের সমস্ত কুরুক্ষেত্র জয় করে যখন একটা জায়গায় স্থির হয়েছি, ঠিক সেই সময়ে ইদানিং মাঝে মাঝে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে এমন কোনো জায়গায় হারিয়ে যাই, যেখানে আমাকে কেউ চিনবেনা, আমিকে, কোথা থেকে এসেছি, কেউ জানবে না আমার আসল পরিচয় কি। আমিও আমার আগের সব স্মৃতি, পজিসন, জীবনধারা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সব ভুলে গিয়ে কোথাও একদম একা একা বাকি সময়টা কাটিয়ে দেই। না থাকুক আমার চাকুরি কিংবা ব্যবসা, না থাকুক আমার এসিরুম, না থাকুক আমার বসগিরি, কি যায় আসে? হয়ত কারো বাসায় দিন মজুর হিসাবে খেটে দেওয়ার বদলে তিনবেলা খাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেলেই হলো। অন্তত রাতে মানসিক যন্ত্রনা ছাড়া ঘুমাতে পারবো। নাহোক সেটা কোন খাট অথবা তোষকেমোড়ানরম বিছানা। হোক না সেটা পরিত্যক্ত কোনো গ্যারেজের অংশ। হয়ত মনিব জান্তেই পারবেনা, কি মানুষটি কি অবস্থায় কি কারনে কেনো এইভাবে দিনযাপনে জীবনটাকে বেছে নিয়েছেন। কোন দুঃখ নাই। কারন, কোনো দায়িত্ব নাই মনে করে আমি পরেরদিনের শুধু আকাশটাতো নিরিবিলিতে বিকালের কোন এক মেঘলা দিনে দেখতে পারবো। তৃতীয় নদীর ধারে বসে আমি অন্তত “নদীর তৃতীয় তীরের” ওপারের নীলদিগন্ত তো দেখতে পাবো। আমার কোনো কিছুই মনে পড়বেনা যে, কেউ আমার জন্য বসে আছে, কেউ আমাকে মিস করছে ইত্যাদি। এই ভাবনা থেকে আমি যখন অনেক দূরে বসে কচিকচি পাতার শিশির বিন্দুর ছোঁয়ায় পায়ের পাতা ভিজিয়ে দেবো, কিংবা উত্তরের হাওয়ায় ভেসে আসা ছাই রঙের মেঘ যখন আমার মুখাবয়ব ভিজিয়ে দিয়ে যাবে, আমার অতিতের কথা মনে করে গড়ে পড়া চোখের পাতার জল আর কারো চোখে পড়বে না। আমার দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, আমার কাছে মানুষের চাহিদা, আর ঐ চাহিদাপুরনে আমার ব্যর্থতার জল আমাকেও আর পীরা দিবেনা যে, কেনো আমি এতোকিছুর পরে হেরে গেলাম। মানুষ নিজের কারনেই শুধু হেরে যায় না, মাঝে মাঝে নিজের সামর্থ্য থাকাসত্তেও মানুষ হেরে যায়। আর তার এই হেরে যাওয়া যখন শুরু হয়, তখন নিজের চোখের সামনে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। এই অসহায়ত্ব একটা শাস্তি। নিজের কাছে নিজের শাস্তি। ছায়ার মতো সারাক্ষন লেগে থাকে। যার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া বড় কঠিন।

ইচ্ছে ছিলো, অনেক বড় হবো, ইচ্ছে ছিলো আমার চারপাশের আপনজনদেরকে নিয়ে হৈ হুল্লুর করে নেচে গেয়ে শ্রাবনের বৃষ্টিতে কাক ভেজায় ভিজবো, ইচ্ছে ছিলো শীতের কোন এক সকালে দল বেধে পিঠে ব্যাগ নিয়ে কোন এক পাহাড়ের চুড়ায় বসে প্রাকৃতিক বনজংগলে বসে গরম গরম পিঠা খাবো। এতা একটা স্বপ্ন। কিন্তু এই সপ্নটা একা সপ্ন দেখলেই হবেনা। এই সব সপ্ন দলবদ্ধ সপ্ন। এই সব স্বপ্ন একে অপরের সাথে একটা চেইনের মতোবাধা। কোথাও ছিড়ে গেলে এর আর কোনো বাস্তবায়ন থাকেনা। পুরুটাই শিশিরবিন্দুর মতো উবে যায়। তখন আর বুঝা যায় না এইখানে কোনো একজলের বিন্দু থেকে কখনো শিসির জমে ছিলো কিনা।

জীবনটা এতো ছোট যে, এক জিবনে মানুষ তার কোনো কিছুই শেষ করতে পারে না। কিন্তু মানুষ যখন হেরে যায়,  তখন সে আরেকটি জীবনের জন্য আশা করেনা। উত্থানের থেকে পতনের গতি সবসময় বেশি। ফলে জীবনের অধিকাংশ সময় ধরে যখন কেউ শুধু উত্থানের দিকে যেতে থাকে, পতনের সময় তার তখন কোন কিছুতেই ভারসাম্য থাকে না। একদিকে ভারসাম্য রক্ষায় চেষ্টা তো, আরেক দিকে ভারসাম্য হারিয়ে যায়। ওইদিকে নজর দিলে, অন্যদিকে আবার ভারসাম্য হারিয়ে যায়। আর এভাবেই দ্রুত ভারসাম্য হারাতে হারাতে হটাত নিজেকে খাদের অনেক নীচে দাঁড়িয়ে আছি বলেই আবিস্কার করে। তখন আশেপাশে যারা থাকে, তারা হয় সবাই অচেনা, নয় প্রানিকুলের কেউনা। নিজের আপনজনদেরকেও তখন বড় অপরিচিত বলে মনে হয়। উত্থানের ভারসাম্য আর পতনের ভারসাম্য একনয়। তাদের মিলিত বিন্দু একজায়গায় নয়। তাদের ভারসাম্যের কেন্দবিন্দুও একনয়। উত্থানের কেন্দ্রবিন্দু যদি হয় আকাশের চুরায়, পতনের কেন্দ্রবিন্দু হয় পাতালের নীচে।

১৩/০২/২০১৭- ফাল্গুন মাসের মাহাত্য

Categories

ফাল্গুন মাসের কোনো মাহাত্য আমি আজো খুজে পাই নাই। কেনো এই ফাল্গুন মাসবাঙ্গালীর জীবনে অনেক অতিশায়ী আদরের একটা মাস, তাও আমার মনে কখনো জেগে উঠেনাই। ফলে ফাগুনের আগমনে আমার মন কখনো পুলকিত হয়ে জেগে উঠে নাই। কবিদের কথাআলাদা।

বাংলার অন্যান্য মাসের মতোই এই ফাল্গুন মাস আমার কাছে একটাস্বাভাবিক মাসের চেয়ে আর বেশী কিছু নয়। তবে যখন ছোট ছিলাম, বৈশাখ মাসটাকিছুটা হলেও আমার মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতো, কারন এই বৈশাখ মাসেআমাদের গ্রামে মেলা হতো, মেলায় হরেকপদের জিনিসের কেনাবেচা হতো। পকেটে পয়সাথাকুক আর নাই বা থাকুক, দলবেধে অন্তত ঐ মেলায় গিয়ে কিছুটা সময় হলেও আনন্দকরতে পারতাম। অন্যদিকে কালবৈশাখী ঝড়ের কারনেও মাঝে মাঝে কালো আকাশের চেহারাদেখে নিজে আতংকিত না হলেও বড়দের চোখে ঝড়ের আতংক দেখে ভয় পেতাম। কখনো কখনোঝরের তান্ডবলীলায় কচিকচি আম কুড়াবার যে একটা হিরিক পরতো সেটা একেবারেনেহায়েত মন্দ না। হয়ত এইসব কারনেই বৈশাখ মাসটি আমার কাছে ফাল্গুনের থেকেওবেশি মনে পড়ে।

বর্ষাকালও ফাল্গুন মাসের থেকে আমার জীবনে অনেক বেশীমনে রাখার মতো অনেক কারন ছিলো। আমাদের নৌকা ছিলো না, স্কুলে যেতে হতো হাটুপানি ভেঙ্গে। কখনো কখনো পলিথিনের ভিতরে বইপত্র ঢোকিয়ে বৃষ্টির মধ্যে একগাদাকচিকচি পোলাপান মাইল কে মাইল ভিজে স্কুলে যেতে হতো। কখনো কখনো তুমুলবৃষ্টির মধ্যে নাড়ার আটি দিয়ে পেচিয়ে নকল ফুটবল বানিয়ে ইচ্ছেমতো ফুটবলখেলতাম। বকা খেয়েছি বড়দের, শাসন করেছে বারংবার এই বৃষ্টিতে ভিজে খেলার জন্যকিন্তু কে শুনে কার কথা। আর শীতকালের কথা তো সব সময়ই মনে পড়ে। এখনো মনে পড়ে।

এতোকিছুর পরেও আমি কখনো ফাল্গুন মাস যে একটা আলাদা কোন মাস এবংএটা যে একটা আলাদা কোন বিশিষ্ট আছে তা আমি খুব আলাদা করে কখনো বুঝি নাই।হতে পারে এই মাসে গ্রামের সেই চিরাচরিত সর্ষেফুলের বাহার, জংলীফুলেরসমাহার, কাশবনের সাদা ফুলের প্রাকৃতিক বাহার বড় সুন্দর কিন্তু এইগুলিতোছিলো গ্রামের নিত্যদিনের সৌন্দর্য। যা সবসময় চোখে পড়ে সেটা আর নতুন কি।কবিদের মন আলাদা। তারা বিড়াল দেখলে কবিতা লিখে, গ্রামের মেয়ে কলশী কাঁখেনদী থেকে পানি আনা দেখলেই কবিতা লিখে কিংবা টিনের চালে টাপুর টুপুর বৃষ্টিহলেই কবিতা লিখে। কিন্তু আমি কবি ছিলাম না। বৃষ্টির দিনে আমাদের টিনেরচালের সেই টাপুর টুপুর শব্দ তো আমার কানে লাগতোই না বরং আমাদের চালের কোনফুটা দিয়ে অনর্গল বৃষ্টির পানি ফোটায় ফোটায় পরে ঘরের মেঝ নষ্ট করে দিচ্ছে, কিংবা কাথা বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে বলে হাড়ি দিতেই দিতেই সময় কেটে যেতো। এদিকদিয়ে পানি পড়ে তো এইদিকে হাড়ি লাগাও, ওইদিক দিয়ে পানি পড়ে তো ওইদিকেও হাড়িলাগাও, হাড়ি নাই তো বদনা, বালতি যা আছে তাই লাগাও ইত্যাদি। একদিকে হাড়িদিলে আরেক দিকে হাড়ি দেওয়ার হাড়ি অবশিষ্ট থাকে না। এই অবস্থায় কি আরবৃষ্টির টাপুর টুপুর শব্দ কানে আসে? অথবা ঋতুর চাকচিক্য নিয়ে কি কবিতালিখার বা পুলকিত হবার কোনো কারন থাকে? ফলে আমারও ছিলো না, আবার কখনোউপলব্ধিও করি নাই।

এখন বয়স হয়েছে। গ্রামের সেই ফুটা টিনের বাড়িতেআর থাকা হয় না। ফলে বৃষ্টির দিনে বাড়ির সেই ফুটা দিয়ে পানি যে ঘরের খাট, বইয়ের তাক, মেঝের মাটি ভিজে যাবে সেই ভয়ও নাই, আর ভাঙ্গা হাড়ি ধরার আর কোনঅবকাশও নাই। টিনের চালের টাপুর টুপুর শব্দটা হয়ত এখন মনে নাই। তবে এইঅট্টালিকায় বসে কখনো মনে হয়, আহা, যদি আবার সেই কালবৈশাখী ঝড়টায় আরো কিছুকচি আম গাছের নীচে পড়ে থাকতো, আহা, যদি এমন হতো যে, সেই বৃষ্টির দিনেহাফপ্যান্ট ভিজিয়ে আবার যদি সেই কচি বেলার বন্ধুদের নিয়ে হাটু পানি ভেঙ্গেমাইল কে মাইল পার হতে পারতাম। যে ফাগুন মাসের সেই প্রাকৃতিক কাশবনেরসাদাফুল, জংলিবাহার কিংবা সর্ষেফুলের মনমাতানো হলুদ ক্ষেত কখনো ই আমার চোখেধাধা মিশায় নাই, সেই সৌন্দর্য যদি এখন আবার ফিরে আসতো!! হয়ত এখন তা আমারচোখে পড়তো।

মনে হয় যদি আবার সেই জগতে চলে যেতে পারতাম, হয়ত এখন আমিঅন্যমনস্ক হয়ে ভাবতাম, পরুক না হয় কিছু বৃষ্টির পানি, ভিজিয়ে দিক না আমারকাচা মাটির মেঝ। হয়তো আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে আমার সেইটিনের চালের ঢেউ দিয়ে গড়িয়ে পরা পানির সাথে আমার ভিজে আসা চোখের পানিও নাহয় আমার কাচা মাটির মেঝ একটু ভিজিয়ে দিয়ে যাক। আজ আমি শহরের কোনো একঅট্টালিকায় বসে সববয়সি মেয়েদের হলুদ শাড়ির বাহার দেখে বুঝতে পারি, আমাদেরগ্রামে এখন সর্ষেফুল চারিদিকে বাতাসে দোলা খাচ্ছে, আমাদের বাড়ির পাশে সেইজংলীফুল গুলিও বাতাসে নেড়ে চেড়ে উঠছে। হয়ত এখন সেখানে ফাগুন মাস। কিন্তুআমি নেই। তাই এই বিশাল পৃথিবীর অগনিত মানুষের থেকে একেবারে নেই হয়ে যাবারআগে কাল বৈশাখী ঝড়ের মাস, বৃষ্টির মাস, শিটের মাসের মতো আজ এই ফাগুন মাসকেওআমার বড় আপন মনে হলো।

স্বাগতম তোমায় হে ফাগুন মাস। তুমি আমারজিবনে প্রায় ৫০ বছর পর আবির্ভূত হতে পেরেছো। আজ মনে হয়, ফাগুন মাসটাও একটামাস, যাকে আমি কখনো দেখি নাই।

আচ্ছা, ফাগুন মাসে কি চোখ ভিজে? কি জানি, হয়ত ভিজে না। কারো কারো চোখ হয়ত এমনিতেই ভিজে।

০৮/০৯/২০১৬- শুভ জন্মদিন তোমায়

Categories

 

সকাল বেলায় অনেকগুলি এসএমএস দেখে নিজেই খুব মনে মনে হাসছিলাম। কোন এক পল্লিগ্রামে আজ থেকে প্রায় ৫১ বছর আগে আমি আমার এক গ্রাম্য মায়ের কোল জুড়ে নাকি মানিকসোনা হয়ে জন্ম নিয়ে সবার মনে হাসি ফুটিয়েছিলাম। আমি কত জোরে কেদেছিলাম, আর কে কত জোরে হেসেছিল, সেটা আমার কস্মিনকালেও মনে নাই, কিন্তু যারা তখন অনেক অনেক খুশীতে খুশিতে আটখানা হয়ে পুরু গ্রাম, সারা বাড়ি মাতিয়ে তুলেছিলেন, তাদের অনুভুতি আজ এতো বছর পরে এসে আমার বুঝতে একটুও বাকি নাই। ওই যে বিখ্যাত মানুষ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম সাহেব বলেছিলেন, “যেদিন তোমার জন্ম হয়েছিল, সেইদিনই নাকি তোমার মা তোমার কান্নায় শুধু হেসেছিলেন”। মায়েরা সন্তানের কান্নায় কখনো হাসেন না, কিন্তু সন্তানের জন্মেরদিন সন্তানের কান্নায় নাকি মায়েরা আনন্দে হাসেন। কি অদ্ভুদ কথা। তাদেরকে আমি আমার অন্তর থেকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাই। দোয়া করি যেনো তারা স্বর্গীয় হন। 

তাদের অনেকেই আজ এই মিস্টি পৃথিবীতে নাই, কিন্তু আমার সেইদিনের জন্ম নেওয়াক্ষনটিকে আমার উত্তর সুরীরা, আশে পাশের বন্ধুবান্ধবরা, আমার অনুজ, আমার সন্তান, বা সন্তান তুল্য মিস্টি মিস্টি দুষ্টু পোলাপান গুলু বড় মজা করে পালনের নিমিত্তে কেউ গোচরে, কেউ অগোচরে, কেউ এসএমএস দিয়ে, কেউ কেক নিয়ে বসে থেকে আমার অখ্যাত এইজন্মদিনটাকে এমন করে সাজিয়ে দিল যে, বড় আনন্দ হল। আনন্দ করার জন্য কোনো উপলক্ষ লাগে না, আনন্দ পাওয়ার জন্য অনেক পয়সাও খরচ করতে হয়না। কিন্তু একটা নিছক উপলক্ষ থাকলে মানুষগুলুকে কাছে পেতে সুবিধা হয়। আজ সেটাই হল।

আমি যখন বাসায় ফিরেছিলাম, তখন জন্ম তারিখটা পার হয়ে পরের দিনের তারিখ চলে এসেছিলো। কাজের চাপ ছিলো অনেক। জন্মদিন পালনের চেয়ে বাস্তব কাজের চাপে সারাদিন আর মনেই ছিলো না ব্যাপারটা। অত্যন্ত ক্লান্ত শরিরে, ঘুম ঘুম চোখে যখন রাত সারে বারোটায় বাসায় পৌঁছলাম, দরজা খুলতেই হতাত করে একগুচ্ছ মিস্টি কচিকণ্ঠে সুর বেজে উঠলো, “হ্যাপি বার্থ ডে বাবা”। আমার মেয়েরা আর মেয়ের জামাই। সারপ্রাইজ দেওয়ার চোখের মধ্যে চিক চিক করা একটা ভাব থাকে। আমি সেটাই দেখলাম এই পিচ্চিগুলির মধ্যে। মানুষ যখন একটা ধাপ পার হয়ে অন্য ধাপে বিচরন করে, তখন সেই ছোট বেলায় ঘুড্ডি, লজেন্স, চকলেট, কিংবা ফেলে দেওয়া কোনো নিছক পাথর খন্ড অথবা নিজের জন্ম দিন যা এক সময় নিজের কাছে সম্পদ মনে হত, নিজের কাছে একটা বিশাল আবেগের অনুষ্ঠান মনে হত, সেটা আর মাথায়ও থাকে না। কিন্তু সেই এক ই অনুভুতির যখন পুনরাবৃত্তি ফিরে আসে আমাদের উত্তরসুরী প্রজন্ম থেকে, তা দেখে মনে হয়, আমিও তোমাদের মতো একদিন এই রকম উচ্ছল, আবেগতাড়িত বয়স তা পার করে এসেছি। ভাবতে বড্ড ভালো লাগে। ওরা আজ তাই করলো। 

আর রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার বউ, মিটমিট করা চোখে, মোনালিসার হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে বল্লো, “হ্যাপি  বার্থডে মনি।” কিছুই না কিন্তু। কিন্তু মনে হলো, বাহ, কি আনন্দ, কি প্রশান্তি।

ক্লান্ত শরীর, চোখ ভর্তি ঘুম, রাত অনেক, পেটে ভীষণ ক্ষুধা, কিন্তু তারপরও মনে হলো, মন ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। এটাই আসলে “পরিবার”। “পরিবার” মানুষের জীবনে বড় একটা আশ্রয়স্থল এবং শান্তির প্রয়াশ।

এই ক্লান্ত শরীরেও ওদের আনন্দটাকে ধরে রাখতে চাইলাম। কেক কাটলাম, কেক পাঠিয়েছেন আমার মেয়ের শাশুড়ি। ব্যাপারটা দেখলে কিচ্ছু মনে হবে না, আবার ভাবলে অনেক কিছু। কোনো বড় কিছু আয়োজন নাই, অনেক মানুষের ভিড়ও নাই, মাত্র দুইমেয়ে, মেয়ের জামাই আর আমার বউ। তাতেই মনে হলো, একটা আয়োজন।

পরেরদিন শুক্রবার। জন্মদিন পেরিয়ে একদিন চলে গেছে। মনে হলো, আরো কিছু মানুষ তো আছে, যাদেরকে নিয়ে এই ছোট আনন্দটা বড় করা যায়। সোমা এসেছে শুনলাম, রাজুও এসেছে। মেয়েটা দেশের বাইরে থাকে। ও আমার মেয়ের ননদিনী আর ননদিনীর স্বামী। আমার পরিবারের একটা অংশ এবং আমার ভাল লাগার মানুষগুলুর মধ্যে একজন। খুব শীঘ্রই ওরা আবার বাইরে চলে যাবে। সুতরাং ওদের সঙ্গে ঘরোয়া পরিবেশে দেখা হওয়ার সুযোগ কম। ভাবলাম, হয়ে যাক না একটা ছোট খাটো গেট টুগেদার। সেই গেট টুগেদারের অংশই হচ্ছে আজকের এই ছবিগুলুর ইতিহাস। এটা আমার জন্মদিনের পার্টি কিনা আমি জানি না, কিন্তু এটা একটা ফ্যামিলি গেট টুগেদার বললেই আমি অভিহিত করতে চাই। দিনটা বেশ কেটেছে।

ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে, আর ধন্যবাদ ওই দুইজন মানুষকে, (আমার বিয়াই আর বিয়াইন) যারা সবসময় আমাকে খুশীতে অনেক আনন্দিত হন। সবাইকে আমার প্রাণঢালা ভালোবাসা। অনেক অনেক ভাল রাখুক আমার এই অনবদ্য, ছোট পরিবারের সব সদস্য গুলিকে। আমি তোমাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। 

১৮/০৮/২০১৬- এইচ এস সি পরীক্ষার ফলাফল

শুনলাম, আজ এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে। সবাই (ছেলেমেয়ে, পিতামাতা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যগন) একযোগে টেনসনে আছেন। যার পরীক্ষা ভালো হয়েছে, সেও টেনসনে আছে, যার পরীক্ষা একটু মনপুত হয় নাই, সেও টেনসনে আছে। আর এটাই হবার কথা। তাই তোমাদের এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আমিও কিছু মুরুব্বিপনা করতে চাই, হয়ত ভালো লাগতেও পারে।

আজ থেকে প্রায় ৩৩ বছর আগে আমি তোমাদের মতই একজন পরীক্ষার্থী ছিলাম। তখন এই যুগের মত জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন-৫ নামক কোনো কিছু ছিলো না। তখন ছিল “স্টার মার্ক” আর বোর্ডে “স্ট্যান্ড” করার মাত্র ২০ জনের তালিকা। কে বা কারা এই দুর্লভ ফলাফলের অধিকারী হন, তাদের অনেককেই অনেকে চিনেন না। কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে, তখনকার সময়ে ঢাকা বোর্ডে যে ২০ জন তালিকাভুক্ত মেধাবী ছাত্র ছিলো তাদের ১৮ জনই ছিল আমাদের ক্লাসমেট এবং আমাদের কলেজের। পরবর্তীতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এই ১৮ জনই আবার ঘুরে ফিরে মেধা তালিকার মধ্যে বা তার আশেপাশে ছিলো। কেউ বা ডাবল স্ট্যান্ড আবার কেউ একটা। আমি তার কোনোটার মধ্যেই ছিলাম না।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর আমরা ক্যাডেট কলেজ থেকে বিভিন্ন সেক্টরে যে যেখানে যোগ্যতা মতো চান্স পেয়েছি ঢোকে গেছি, কেউ মেডিক্যাল, কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং, কেউ বা আর্মিতে, কেউ বা মেরিনে, কেউ ইউনিভার্সিটিতে ইত্যাদি। তখনো ক্যারিয়ার গড়ার জন্য লেখাপরার মধ্যেই ছিলাম। কে কোনটায় ভর্তি হয়েছি, কিংবা কে কোনটায় গিয়ে কতটুকুন লাভ হয়েছে, তার হিসাব বা পরিসংখ্যান নেবার মতো তখন আমাদের যেমন পরিপক্কতা ছিলো না আবার যাচাই করার সুযোগও ছিলো না। কিন্তু আমরা আমাদের সুযোগ কাজে লাগানোর চেস্টা করেছি যার যার লেবেল থেকে। আজ এই বয়সে এসে কেউ আমাকে Aim in Life রচনা লিখতে বলবে না। বা বলার কারনও নাই। আজ সেগুলো ইতিহাসের মতো। চাকুরী নেবার জন্য আজ আমাকে আর কোথাও ইন্টারভিউ দেওয়ার দরকার পরে না বলে হয়ত কেউ আমাকে আমার লেখাপড়ার যোগ্যাতা নিয়েও প্রশ্ন করবে না। তারপরেও আমরা আমাদের লেখাপড়ার উচ্চতা বাড়ানোর চেষ্টা সব সময়ই করেছি। ওটাও একটা নেশার মতো। যাই হোক।  

আজ প্রায় ৩৩ বছর পর যখন পিছনে তাকাই, তখন একটা মুল্যায়নের কথাই সামনে ভেসে আসে। ৩৩ বছর আগে যারা খুব ভালো করেছিলো তারা যেমন বর্তমানে ভালো জায়গায় আছেন, ভালো চাকুরী করেন, সম্মানের সহিত আছেন, আবার যারা তুলনামূলকভাবে একটু কম ভালো ফলাফল করেছিল (মানে স্ট্যান্ড বা স্টার মার্ক পায় নাই), তারাও খারাপ অবস্থায় নাই। এই দ্বিতীয় দলের অনেকেই আবার প্রোফেসনাল লাইফে হয়ত আরো অনেক বেশি সাফল্য লাভ করেছে প্রথম দলের থেকে বেশী যদিও তারা ওই সময় বোর্ডে স্ট্যান্ড করে নাই কিংবা স্টার মার্ক পায় নাই। আবার এমনও দেখা গেছে যে, অনেক ভালো ফলাফল করেও মধ্যম গোছের যে ছাত্রটি যে কাজে আজকে অধিষ্ঠিত আছেন, সেই একই জায়গায় ওই সময়ে তুলনামুলকভাবে খারাপ ফলাফল করেও সেই ছাত্রটি আজ একই স্তরে অধিষ্ঠিত আছেন। তারমানে এই যে, স্কুল কলেজের ক্যারিয়ার আর প্রোফেসনাল লাইফের ক্যারিয়ার দুটি একেবারে ভিন্ন জিনিষ। প্রোফেসনাল লাইফের ক্যারিয়ারের সাফল্য একমাত্র শুধু পড়াশুনার ফলাফলের উপরই নির্ভর করে না। তারসঙ্গে সুযোগ, পরিস্থিতি, পারিবারিক প্রচেষ্ঠা, নিজের বুদ্ধিমত্তা, ম্যাচিউরিটি, আর তারসঙ্গে লাগে লেখাপড়ার মিনিমাম যোগ্যতা। আজ যারা জিপিএ-৫ বা গল্ডেন-৫ পেয়েছো তারা তো অবশ্যই ভালো একটা যোগ্যতা অর্জন করেছো তাতে কোনো সন্দেহ নাই, তারজন্য তোমাদেরকে সাধুবাদ না জানালে কৃপণতাই হবে, কিন্তু যারা চেষ্টা করেছো কিন্তু জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন-৫ পাও নাই, তাদেরও কোনো রকম মন খারাপ করার অবকাশ নাই। কারন প্রোফেসনাল লাইফে সাফল্য পাওয়ার জন্য মিনিমাম যে যোগ্যতাটা দরকার তা ইতিমধ্যে তোমরা অর্জন করেছো অবশ্যই। এমনও অনেক উদাহরন আছে, যে, মিনিমাম কোয়ালিফিকেসন (অর্থাৎ ফলাফলের দিক দিয়ে) ধারি কোনো এক ছাত্র অনেক মেধাবী ছাত্রকে টপকিয়েও সমাজের অনেক উচূ স্তরের সিড়িতে আসীন আছেন। প্রোফেসনাল ক্যারিয়ার একটা বহুমাত্রিক যোগ্যাত্র বহিরপ্রকাশ। সেখানে নিজের মেধার সাথে নিজের চরিত্র, চালচলন, আচার ব্যবহার, বুদ্ধি বিবেচনা, পরিস্থিত সামাল দেওয়ার ক্ষমতা, ইনোভেটিভ আইডিয়া ইত্যাদির সংমিশ্রণ থাকে। পড়াশুনার মেধার সাথে যখন এই আনুষঙ্গিক মেধাগুলি মিলিত হয়, তখন সে হয়ে উঠে একজন অতি উচ্চমানের প্রোফেসনাল। কিন্তু যারা শুধু পরাশুনার মেধাটাই প্রাধান্য দিয়ে অন্যান্য মেধাগুলিকে চর্চা না করেন, তাদের বেলায় সর্বদা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য নাও আসতে পারে। আবার এই তথ্যটাই সব সময় যে ঠিক তাও নয়। কারন, পরিস্থিতি এবং সুযোগও অন্যান্য মেধাবলির সাথে ম্যাচ করতে হবে। সুযোগ এলো না, পরিস্থিতি ও অনুকুলে নাই, এই অবস্থায় অনেক মেধাবী ছাত্রও ক্যারিয়ার নির্মাণে হেরে যান। আর এইজন্য দরকার স্রষ্টার কাছে সর্বদা সাহাজ্য প্রার্থনা করাও। পৃথিবীর নাম করা নাম করা অনেক মানুষের জীবনী অধ্যায়ন করলে যা দেখা যায় যে, সাফল্য আসে পরিশ্রমের হাত ধরে। পরিশ্রমই আসলে সুযোগ তৈরী করে দেয়। অলস মানুষের জন্য সুযোগ সবসময় আসে না। তারা মিস করে।

আজ যারা জিপিএ-৫ পাও নাই অথচ আশা করেছিলে, অথবা আজ যারা একটুর জন্য জিপিএ-৫ মিস করেছো, তাদের জন্য বলছি সেই কথাটা যা আমি একবার কোথায় যেনো পড়েছিলাম যে, “জীবনে তুমি কতবার ফেল করেছো সেটা দিয়ে সাফল্য নির্ভর করে না, সাফল্য নির্ভর করে তুমি কতবার ওই ফেল করা পরিস্থিতি থেকে সাফল্যের সহিত বের হয়ে আসতে পেরেছো তার উপর।”

১৪/০৮/২০১৬- ৯/১১ এর ফল রাইস ভুইয়া

Categories

 

৯/১১ এর আসল হোতা কে বা কারা, এই তথ্যটা আজো পর্যন্ত জানা না গেলেও বিশ্ববাসী জানে যে, এটার পিছনে মুল পরিকল্পনাকারি যিনি তিনি একজন মুসলমান নামধারি ব্যক্তি। ফলে, ৯/১১ এর পরে হতাৎ করে সারাবিশ্ব মুসলমানদের প্রতি একটা খারাপ ধারনা করে নেয়। কেউ এটাকে কিছু বিচ্যুত ধার্মিক লোকের কাজ বলে মনে করেন, কেউ আবার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এটাই ইসলাম সমর্থন করে বলে মনে করেন ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, ৯/১১ এ যারা প্রান দিয়েছেন, তারা আর যাই হোক, তারা নিরীহ এবং শান্তিপ্রিয় মানুষ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তারা তাদের নিজের ধর্ম নিজের মত করেই পালন করতেন, সেখানে কারো সঙ্গে কারো বিরোধ ছিলোনা। ওইসব নিরীহ মানুষগুলুর অসময়ের প্রানত্যাগ আমাদের সবাইকে অনেক অনেক ব্যথিত করে তুলেছিল এবং এখনো ব্যথিত করে। যারা ওইসব মানুগুলুর নিকটাত্মীয় ছিলেন, বন্ধু বান্ধব ছিলেন, যাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিলো তাদের কাছে ওইসব মানুসগুলুর প্রানত্যাগ তো কোনোভাবেই সহ্য করার মত ছিলো না। ফলে কারো মনে ঘৃণা, জিদ, আক্রোশ যে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আর এই আক্রোশ, ঘৃণা, কিংবা জিদ যাইই বলি না কেনো, তার থেকেই ঘটনা পরবর্তী অনেক কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। যেমন, মার্ক স্ট্রুম্যানের কিলিং মিশন।

৯/১১ এর ১০ দিন পর, রাইস ভুইয়া মার্ক স্ট্রুম্যানের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন এবং মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে থাকেন। এখানে রাইস ভুইয়া সম্পরকে কিছু না বললে ভুল হবে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন নাগরিক। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে বাংলাদেশ এয়ার ফোরসেও যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কম্পিউটার টেকনোলোজি পড়ার জন্য আমেরিকার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। প্রথমে তিনি নিউইয়র্ক পরে তুলনামূলকভাবে কম খরচের স্ট্যাট ডালাসে চলে যান এবং সেখানে তিনি তার এক বন্ধুর গ্যাস স্ট্যাসনে পার্টনারশিপ ব্যবসায় যোগ দেন।

এবার আসি, মার্ক স্ট্রুম্যান সম্পরকে কিছু কথা। মার্ক স্ট্রুম্যান একজন দৈনিক শ্রমিকের কাজ করতেন ওই ডালাস শহরেই। ৯/১১ ঘটনার পরে মার্ক স্ট্রুম্যান এতোটাই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন মুসলমানদের উপর যে, তিনি আরব বংসোউদ্ভুত কিংবা মধ্যপ্রাচ্য, কিংবা মুসলমান যে কোনো দেশের অধিবাশিই হোক, তাদেরকে খুন করাই ছিলো তার নিশানা।

এই কিলিং মিশন এর এজেন্ডা হিসাবে মার্ক স্ট্রুম্যান ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে ডালাসের এক শব্জি দোকানে ওয়াকার নামে এক পাকিস্থানিকে এবং তার ৬ দিন পর রাইস ভুইয়াকে সরাসরি গুলি করেন। ভাগ্য চরম ভালো যে, জনাব রাইস ভুইয়া প্রানে মারা যান নাই কিন্তু তার ডান চোখের দৃষ্টি হারিয়ে যায় এবং এখনো তার দেহে প্রায় ৩৫টি প্যালেট বিদ্যমান যা অস্ত্রপ্রচারেও বের করা সম্ভব হয় নাই। অবশেষে মার্ক স্ট্রুম্যানকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং বিচারের সম্মুখীন করে।

সবশেষে মার্ক স্ট্রুম্যান এর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু জনাব রাইস ভুইয়া এই মৃত্যুদণ্ডের বিপরিতে আপীল করেন যাতে মার্ক স্ট্রুম্যানকে হত্যা না করা হয়। জনাব রাইস ভুইয়া টেক্সাস এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর ডেথ পেনাল্টি আবোলিসন ক্যাম্পেইন এর মাধ্যমে, কোর্টের মাধ্যমে, এমনকি নিজে সশরীরে আদালত প্রাঙ্গনে হাজির হয়ে মার্ক স্ট্রুম্যানের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করানোর জন্য দাঁরে দাঁরে ঘুরেছেন। এইভাবে প্রায় ১০ বছর পার হয়ে গেছে মার্ক স্ট্রুম্যানের বিচার কার্যকরী করতে।

বিশ্বের সবাই অবাক হয়ে শুধু একটা প্রশ্নই জনাব রাইস ভুইয়াকে করেছেন, কেনো তিনি তার ঘাতককে ক্ষমা করে দিচ্ছেন, শুধু ক্ষমাই না, তাকে মুক্তজীবন দান করতে চাচ্ছেন? জনাব রাইস ভুইয়া যা বলেছেন তা আমি হুবহু লিখছি যাতে কোনো কিছু ব্যত্যয় না ঘটে।

Q: Mr. Stroman has admitted trying to kill you. Why are you trying to save his life?

A: I was raised very well by my parents and teachers. They raised me with good morals and strong faith. They taught me to put yourself in others’ shoes. Even if they hurt you, don’t take revenge. Forgive them. Move on. It will bring something good to you and them. My Islamic faith teaches me this too. He said he did this as an act of war and a lot of Americans wanted to do it but he had the courage to do it — to shoot Muslims. After it happened I was just simply struggling to survive in this country. I decided that forgiveness was not enough. That what he did was out of ignorance. I decided I had to do something to save this person’s life. That killing someone in Dallas is not an answer for what happened on Sept. 11.

প্রশ্ন ছিলোঃ মার্ক স্ট্রুম্যান স্বীকার করেছেন যে তিনি আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনি কেনো তাকে বাচাতে চাইছেন?

জনাব রাইস ভুইয়ার উত্তর ছিলো; আমি আমার পিতামাতা এবং শিক্ষকদের দ্বারা অতি উত্তম শিক্ষায় মানুষ হয়েছি। তারা আমাকে নীতির মধ্যে এবং শক্ত বিশ্বাসের উপর মানুষ করেছেন। তারা আমাকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে তাদের দিকটা বিবেচনা করার শিক্ষা দিয়েছেন। তারা আমাকে শিখিয়েছেন, কেউ যদি তোমাকে দুঃখ দেয়, প্রতিশোধ নেওয়ার দরকার নাই, এবং নিও না। তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। সামনে এগিয়ে চলো। এতে তোমার এবং অন্যের উভয়ের মঙ্গল হবে। আমার ধর্ম ইসলামও তাই শিক্ষা দেয়। মার্ক স্ট্রুম্যান যা করেছে, তা একটা যুদ্ধের পরিস্থিতির মতো মনোভাব এবং এই মনোভাবটা অনেক আমেরিকানরাই মনে মনে পোষণ করে যা স্ট্রুম্যান করেছে। হয়ত তারা (আমেরিকানরা) করার সাহস পাচ্ছিলো না কিন্তু মার্ক স্ট্রুম্যান করার সাহস পেয়েছিলো। এই ঘটনা ঘটার পর আমি শুধু নিজেকে এই দেশে বেচে থাকার জন্য সামলে নিয়েছি, অনেক কস্ট করেছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, শুধু তাকে ক্ষমা করাই একমাত্র সমাধান নয়, মার্ক স্ট্রুম্যান যা করেছে তা সে তার নির্বুদ্ধিতার কারনে করেছে, সে বুঝে নাই। এখন আমার কাজ তাকে বাঁচানো। ডালাসে বসে কাউকে খুন করাই সেপ্টেম্বর ১১ তে কি হয়েছে তার সমাধান হবে না।

শেষ পর্যন্ত আদালত মার্ক স্ট্রুম্যানের পূর্বের রেকর্ড, তার চরিত্রের বৈশিষ্ট সবকিছু চুলচেরা বিস্লেসন করে মৃত্যুদণ্ডই বহাল রাখেন এবং ২১ জুন ২০১১ তে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী করেন। মৃত্যুর আগে মার্ক স্ট্রুম্যানকে প্রশ্ন করা হয়েছিলোঃ

Q: How are you doing, Mr. Stroman?

A: “I ’ve only 25 days left until Texas Straps me to a gurney and pumps me full of toxic bug juice, But then again, we all face an ending at some time or another. All is well, Spirits are high, I sit here with a cup of coffee and some good ole classic rock playing on my radio, how Ironic, the song ‘Free Bird’ by Lynyrd Skynyrd…”

Q: What do you think of Rais Bhuiyan’s efforts to keep you from being executed? A: “Yes, Mr Rais Bhuiyan, what an inspiring soul…for him to come forward after what I’ve done speaks volume’s…and has really touched my heart and the heart of many others World Wide…especially since for the last 10 years all we have heard about is how evil the Islamic faith can be…its proof that all are Not bad nor evil.”

Q: Tell me what you are thinking now, a few weeks before your scheduled execution.

A: “Not only do I have all my friends and supporters trying to save my life, but now I have The Islamic Community Joining in…Spearheaded by one very remarkable man named Rais Bhuiyan, who is a survivor of my hate. His deep Islamic beliefs have gave him the strength to forgive the un-forgiveable…that is truly Inspiring to me, and should be an example for us all. The Hate, has to stop, we are all in this world together. My jesus faith & Texas Roots have deepened my understanding as well. Its almost been 10 years since the world stopped turning, and we as a nation will never be able to forget what we felt that day, I surely wont, but I can tell you what im feeling today, and that’s very grateful for Rais Bhuiyan’s efforts to save my life after I tried to end his. A lot of people out there are still hurt and full of hate, and as I sit here on Texas Death watch counting down to my own death, I have been given the chance to openly express whats inside this Texas mind and heart, and hopefully that something good will come of this. We need more forgiveness and understanding and less hate.” Mr. Stroman signed off, “Texas Loud & Texas proud…TRUE AMERICAN…. Living to Die – Dying to Live.”

বাংলায় অর্থঃ

মৃত্যু পথযাত্রি মার্ক স্ট্রুম্যানকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো,

(১) আপনি এখন কেমন আছেন?

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “টেক্সাস আদালতের রায় অনুযায়ী বিষ প্রয়োগ করে আমাকে মেরে ফেলার আর মাত্র ২৫ দিন বাকি আছে। সবাই মরবে, আজ অথবা কাল। সব কিছুই ভাল, বিধাতাও ভালো। আমি এখন এখানে এক কাপ কফি আর কিছু খেলার সরঞ্জামাদিসমেত কিছু কিছু রক মিউজিক শুনছি রেডিওতে। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে একটা গানের কলি শুনি, আর তা হচ্ছে, পাখিকে মুক্ত করে দাও……”

(২) মার্ক স্ট্রুম্যানকে ২য় প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, আপনাকে বাচিয়ে রাখার জনাব রাইস ভুইয়ার আপ্রান চেস্টা আপনাকে কি মনে করিয়ে দেয়? বা আপনি কিভাবে ভাবছেন জিনিষটা?

উত্তরে মার্ক স্ট্রুম্যান বলেছে, “হ্যা, সত্যি কি স্পিরিচুয়াল (আধ্যাত্মিক) একজন মানুষ। আমি যা করতে চেয়েছিলাম তা তিনি জেনেও কি অবাক যে তিনি আমাকে বাচানোর জন্য আপ্রান চেস্টা করে যাচ্ছেন যা আমাকে এবং আমার মত অনেক আমেরিকানদের তথা বিশ্বাসীর হৃদয় পর্যন্ত ছুয়ে যাচ্ছে। এই গত দশ বছরে আমরা যত খারাপ খবর কিংবা মিথ্যা দর্শন শুনেছি ইসলাম সম্পরকে এবং ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের সম্পরকে, তা আসলেই সঠিক নয়। এখন এটাই প্রমান হয় যে, সবাই খারাপ না, সবাই শয়তান নয়।

মার্ক স্ট্রুম্যানকে ৩য় প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, তিনি মৃত্যুর এই কয়েক সপ্তাহ আগে কি ভাবছেন?

উত্তরে মার্ক স্ট্রুম্যান বলেছিলেন, ” এখন শুধু আমার আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধু বান্ধবই আমাকে বাচানোর চেস্টা করছে না, বরং আমার ঘৃণার কারনে আমার দ্বারা গুলিবিদ্ধ এবং গুলিবিদ্ধ মৃত্যু থেকে বেচে আসা জনাব রাইস ভুইয়ার মাধ্যমে পুরু ইস্লামিক কমিউনিটিকে সঙ্গে পাচ্ছি যেনো আমি আমার জীবন আবার ফিরে পাই। তার(জনাব রাইস ভুইয়ার) ধর্মের পরম যে শিক্ষা যে, ক্ষমা করো এমন কি তাকেও যে ক্ষমার জন্যও যোগ্য নয়, তার এই বিশ্বাস আমাকে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছে এবং এটা পৃথিবীর কাছে একটা উদাহরন হয়ে থাকবে। এখন আর ঘৃণা নয়, এটাকে থামাতে হবে। আমরা সবাই একই পৃথিবীর লোক। যীশুর এবং টেক্সাস রুটের উপর আমার বিশ্বাস আরো গভির হয়েছে। আজ থেকে ১০ বছর আগে যা ঘটেছিলো তা আমি এবং আমার দেশ কেহই হয়ত কখনো ভুলে যাবে না। এটাও ঠিক যে, ওই সময় আমরা নাগরিক হিসাবে কি ভেবেছি তা এই মুহূর্তেও বলা কঠিন কিন্তু এটা ঠিক যে, আজ এই মুহূর্তে আমি জনাব রাইস ভুইয়ার কাছে কৃতজ্ঞ যাকে আমি ঘৃণার কারনে মারতে চেয়েছিলাম। আমি এটাও জানি যে, আজো অনেক দেশবাসীর মনে কষ্ট আছে, দুক্ষ আছে, যন্ত্রনা আছে, ঘৃণাও আছে। কিন্তু এই ঘৃণা কমাতে হবে, আমাদের আরো সহনশীল হতে হবে। আমি খুব ভাগ্যবান যে, আমি মৃত্যুর আগে অন্তত আমার মনের কথাগুলি এই টেক্সাসবাসিকে বলতে পারলাম। আমি চলে যাচ্ছি। Living to Die – Dying to Live.”

জনাব রাইস ভুইয়ার সঙ্গে আমার কয়েকবার ফেসবুকে কথা হয়েছে। খুব ভালো লেগেছে তার এই মনোভাবের জন্য। তিনি একটা ওয়েব পোর্টাল খুলেছেন, নামটাও সুন্দর, WORLD WITHOUT HATE. আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার ওই ওয়েবপোর্টালের পাচ আঙুলের আইকন দিয়ে তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন। মিনিংটা আরো সুন্দর। আমি অবশ্য এখন তার ওয়েব পোর্টালের একজন সদস্য বটে। সবশেষে তিনি গত রোজায় ওভাল অফিসে দাওয়াত খেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামার দাওয়াতে। বিশেষ ইফতারির আয়োজন করা হয়েছিলো জনাব রাইস ভুইয়ার সম্মানে। শুনেছি এখন তাঁকে নিয়ে এই প্রেক্ষাপটে একটা বিশ্বব্যাপি ম্যাসেজ দেওয়ার জন্য ছবি বানানো হবে যেখানে আমাদের রাইস ভুইয়া নিজেই থাকবেন। আমি তার একজন প্রাক্তন সিনিওর ক্যাডেট ভাই হিসাবে নয়, বাংলাদেশী হিসাবে বড় গর্ববোধ করি। আমি তার সুস্বাস্থ্য কামনা করি।

(নোটঃ রাইস ভুইয়াকে বলছি, তোমার অনুমতি ছাড়াই আমি এই কথাগুলি আমার ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। আশা করি অপরাধ মার্জনীয়। আর তুমি এটাই করো)।

১২/০৮/২০১৬-কেনো জেনারেশ গ্যাপ হচ্ছে?

Categories

 

জেনারেশন গ্যাপ কেনো হচ্ছে এটা জানতে পারলে আমাদের সমাজের সব শ্রেনির বাবা মায়েরা অন্তত তাদের কি করা উচিত সে ব্যাপারে একটু সচেতন হতে পারতেন। আমরা যারা বারবার বলছি যে, পরিবারে সচেতনাতা বাড়াতে হবে, সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনাতা বাড়াতে হবে, তাহলে সেই কিসের উপর সচেতনতা বাড়াতে হবে জানা দরকার, তাহলেই সচেতনতাটা বাড়বে। চলুন দেখি তাহলে জেনারেশন গ্যাপ কি কি কারনে হচ্ছে সেটা আগে খুজে বের করি। তারপর এর বিপরিতে আমাদের কি করা উচিত, সেটা বের করা যাবে, হোক সেটা পরিবারের জন্য, হোক সেটা সামাজিকভাবে আর হোক সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে। সেই কার্যপ্রণালী বের করা কঠিন হবে না।

প্রকৃতপক্ষে মোদ্দা কথায় যদি বলি, তাহলে ব্যাপারটা আর কিছুই না, মানুষের পৃথক পৃথক ইন্টারেস্টের কারনে, তাদের নিজস্ব ভ্যালু বিশ্লেষণের কারনে, বয়সের তারতম্য, বাকস্বাধীনতা, মুক্তচিন্তার প্রসার, লাইফ স্টাইল, এস্পিরেসন, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাব্যবস্থা, সাইকোলোজিক্যাল ডেভেলপম্যান্ট, ফিজিক্যাল পরিবর্তন, ইত্যাদি সবের কারনেই এই জেনারেশন গ্যাপটা তৈরি হয়। আর এইটা একদিনে বা এক সপ্তাহে বা এক মাসের মধ্যেই ঘটে না। এটা ঘটে ধিরে ধিরে, সামস্টিকভাবে, লম্বা সময় ধরে।

ব্যাপারটা আরো সহজ করে যদি বলি, যেমন ধরুন, ৪০ কিংবা ৬০ এর দশকে এমন কি ৭০ কিংবা ৮০ এর দশকেও শিক্ষা ব্যবস্থাটা এমন ছিলো যেখানে চরিত্র গঠন, ডিসিপ্লিন এবং ইউনিফর্মিটি ছিল মুখ্য বিষয়। মুখস্থবিদ্যা দিয়ে অনেকে না বুঝেই অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছেন। তাদের নিজস্ব চিন্তাধারা বিকশিত হতে হতে ইতিমধ্যে তারা একটা এডাল্ট মানুসের রূপ নিয়ে নিয়েছেন। যে সময়টায় এখন ইয়াং জেনারেশন বিপথগামিতে হাটছেন, ওই সময় তারা এই কঠিন ডিসিপ্লিন, নিয়মানুবর্তিতার কারনে সময়টাই পার করে দিয়েছেন। কিন্তু আজকাল শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র গঠনের কিংবা ডিসিপ্লিন তথা ইউনিফর্মিটির ব্যাপারটা আর মুখ্য নাই। এখানে মুক্তচিন্তা ধারায় এক ধরনের বিশ্লেষণধর্মী স্বাধীনতা এবং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আদলে সে নিজে যা সেন্সিব্যাল মনে করে সেটাই শেষ কথা। ফলে সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে আগের যুগের মানুষের থেকে বর্তমান যুগের ইয়াং জেনারেশনের কাছে মেথডটাই আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ইয়াং জেনারেশনের ভিসন আর ওল্ড জেনারেশনের ওই একই বয়সের তুলনায় ভিসনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বনে যাচ্ছে। এটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ত্রুটি বলতে হবে। এই ব্যাপারে হয়ত আমরা রাষ্ট্রীয় সচেতনতার কথা মাথায় আনবো পরবর্তী পর্বে।

আরেক দিক দিয়ে বলি, ধরুন, ওয়ার্ক প্যাটার্নে ওল্ডার জেনারেশন তাদের সময়ে জব সল্পতার কারনেই হোক আর কাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই হোক, তাদের জবটাকে আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য নিরবিচ্ছিন্ন এবং সততার সহিত দিনের পর দিন অফিস সমুহের যাবতীয় আইনকানুন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও মেনে শেষতক চালিয়ে গেছেন যা আজকালকের ইয়াং জেনারেশন এটার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। ফলে আইনের বাধায় তারা খুব একটা বিদ্ধ হতে চায় না। তারা স্বাধীন, ইচ্ছে হলো কাজ করবেন, ভালো লাগলো তো থাকবেন, আর পছন্দ হয় নাই, কিচ্ছু যায় আসে না, পরের দিনই জব ছেড়ে দিলেন। এই যে একটা খামখেয়ালীপনার মতো স্বাধীনতা, একটা ছিঁড়া ছিঁড়া ভাব, তাতে অনেক কিছুই আর সংঘবদ্ধ থাকে না। না কর্মক্ষেত্রে না বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে না পারিবারিক দায়িত্ববোধে। ধিরে ধিরে এই কোহেসিভনেসটা কমতে থাকে। বন্ধন কমতে থাকে। এর মধ্যে আবার যোগ হয়েছে হাই-টেক। এই হাই-টেকের জন্য ইন্টার-পারসোন্যাল রিলেসনটা হিউম্যান এলিম্যান্ট থেকে আরো দূরে চলে গেছে। এতে বড়দের সাথে গ্যাপটা আরো বেশি বেড়েছে। পরামর্শের জায়গাটা কিংবা মতাদর্শের আদান-প্রদান গুলি আস্তে আস্তে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এই সচেতনতার বিরুদ্ধে হয়ত আমরা পরবর্তীতে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে সচেতনতার কথা বলবো।

আরেকটা বিষয় না বললেই না। আর সেটা হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়ার মাধ্যমে যদিও আজকালকের ইয়াং জেনারেশনকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়ে মার্কেটে কম্পিটিটিভ করে তুলছে কিন্তু অন্যদিকে তাকে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে আনপ্লিজেন্টও করে তুলছে। ইয়াং জেনারেশন সবাইকে এই মিডিয়া এক কাতারে নিয়ে এসে প্যারেন্টাল গাইডেন্সের থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়ে একই সমসাময়িক বয়সের গাইডেন্সে আবেশিত করে দিচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। ফলে ট্র্যাডিশনাল ভ্যালুগুলু থেকে ইয়াং জেনারেশন গ্লোবাল হাইপোথিসিসে বা কন্সেপ্টে বেশি করে ঝুকে পড়ছে। আর যখনই ইয়ং জেনারেশন তাদের ট্র্যাডিশনাল ভ্যালুগুলু থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখনই হচ্ছে বেশি করে বিপত্তি। কালচার, সামাজিক আস্থা, পারিবারিক অবস্থান, নিজস্ব ক্যাপাবিলিটি ইত্যাদির উপর তার তখন নিয়ন্ত্রণ লোপ পেতে থাকে। আর এই লোপ ধিরে ধিরে তাকে তার অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরিয়ে প্রতিনিয়ত বিপথগামি অথবা অবাস্তব একটা কোহেলিকার দিকে ঠেলে দেয় যা সে নিজেও বুঝে না।

এর মধ্যে যোগ হয় আবার পরিবারের ইরেসনাল এক্সপেকটেশন। আর এই ইরেসনাল পারিবারিক এক্সপেক্টেসনটা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে জেনারেশন গ্যাপের বেলায়। আর এটা শুরু হয় একেবারে ছোট বয়স থেকেই। যেমন ধরুন, পিতামাতার স্বপ্নের চাহিদা তারা তাদের সন্তানের ইচ্ছা বা খুশির বিনিময়ে হলেও তা তাদের উপর চাপিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেন না। সন্তানের চাহিদার থেকে অভিভাবকের চাহিদা পুরুন করতেই ইয়াং জেনারেশনের জীবন হিমসিম খেতে হচ্ছে। তার ইচ্ছা থাকুক আর নাই বা থাকুক, সে পারুক আর নাই বা পারুক। তার ভাল লাগুক আর নাই বা ভালো লাগুক। সন্তান আর্ট করতে ভালবাসেন, তাকে ডাক্তারি পড়তেই হবে, সন্তান গান শিখতে ভালোবাসেন, তাকে জিওগ্রাফী নিয়ে পড়তেই হবে। পিতামাতারা ভুলেই যান যে, তাদের সন্তানের একটা এস্পিরেসন আছে, তার একটা ভাল লাগার ব্যাপার আছে কিংবা তার নিজস্ব একটা পরিমন্ডল আছে। আর যখনই কোন ইয়াং জেনারেশন তাদের ইচ্ছার এই প্রতিফলনের জন্য বেকে বসবে, তখনই শুরু হবে দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা অলিখিত কনফ্লিক্ট। গ্যাপ তো তখনই সৃষ্টি হয়ে গেলো। এই গ্যাপ থেকে তৈরি হয় আরো গ্যাপের। যেমন, পিতামাতা মনে করেন যে, তারা এই বয়সে তাদের বাবা মায়ের সঙ্গে কিভাবে আচরন করেছেন তার তুলনা, তারা এই বয়সে ঐ সময়ে কি ধরনের কাপড় পরিধান করেছেন তার তুলনা, তারা কি কি স্বাধীনতা পেয়েছেন তার একটা খতিয়ান, কিংবা সপ্তাহান্তে বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে যেয়ে রাত্রি যাপনের অনুমতি দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপারে তুলনা, এমন কি কি ধরনের হেয়ার কাট নিতেন আমাদের ওল্ডার জেনারেশন ইত্যাদি যখন পিতামাতা দিতে শুরু করেন, তখন এই দুই জেনারেশন এমন একটা অবস্থায় দাড়ায় যে, মনে হয় একে অপরের বিপরিতে অবস্থান নিয়েছেন, মনে হয় তারা একে অপরের ভাষাই বুঝতে পারছেন না। ফলে পরিবারে সমঝোতা নষ্ট হচ্ছে, শান্তি নষ্ট হচ্ছে আর বেড়ে চলছে একে অপরের থেকে দুরত্ত।

সামাজিক ক্লাস বিভক্তিও কিন্তু ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে গ্যাপ তৈরির একটা ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। একটা সময় ছিলো যে, আমাদের দেশে বিখ্যাত গায়িকা রুনা লায়লা আর সাবিনা ইয়াসমিন কখনো একসঙ্গে এক স্টেজে গান করতেন না। কারন কে কার থেকে বড় সেটা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে? ঠিক এমনিভাবে, নিম্নক্লাসের বা গরিব মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঙ্গে উচ্চবিত্ত ক্লাসের সঙ্গে একটা ক্ল্যাশ সবসময়ই ছিলো। কিন্তু ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে এই ক্লাসভিত্তিক শ্রেনিবিন্যাশ এর প্রবনতাটা অনেকটাই কম। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একজন ছাত্র যদি ভাল ফলাফল করে বা একজন ভাল গীটার বাজাতে পারে তাকে গানের দলের মধ্যে নেওয়ার মধ্যে কোণ দ্বিধাবোধ করে না। কারন ওল্ডার জেনারেশনের মতো ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে এই নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত সংস্কারে তাদেরকে কোন নেগেটিভ অনুভুতির খোরাক জোগায় না। এই জায়গাটা থেকে ওল্ডার জেনারেশন এখনো সরে আসতে পারে নাই। ফলে ছেলেমেয়ের প্রেম ঘটিত এফেয়ারস নিয়ে, বন্ধুত্ত তৈরি করতে গিয়ে কিংবা একই টেবিলে তাদের সঙ্গে খাবার খাওয়া নিয়ে পরিবারে ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে তার ওল্ডার জেনারেশনের মধ্যে একটা অলিখিত কনফ্লিক্ট তো বাধতেই পারে আর বাধেও।

এই রকম হাজারো হাজারো উদাহরণ টানা যাবে যেখানে খুব সুক্ষ কিন্তু গ্যাপ তৈরির জন্য ঐগুলু যথেষ্ট ভুমিকা রাখে। ধরলাম যে, এই গ্যাপগুলু দুই জেনারেশনের মধ্যে তৈরি হলো। তাতে কি হয়েছে? দেশ নষ্ট হয়ে যাবে? পরিবার নষ্ট হয়ে যাবে? কিংবা সমাজ? কি হবে যদি দুই জেনারেশন আলাদা আলাদা বাস করে? কেউ তো কাউকে ডিস্টার্ব করছে না। তাহলে কি দরকার দুই জেনারেশনের মধ্যে জোর করে আবার মিল করার? ওল্ডার জেনারেসন মরে গেলে তো আর কোনো কনফ্লিক্ট থাকে না। তখন তো শুধু ইয়াং জেনারেশনই থাকলো। তাহলে এতো কথা কেনো?

আছে, কথা আছে। কারন এই গ্যাপের কারনে কি কি ইমপ্যাক্ট হয় তাতো সার্বজনীন। সুদূরপ্রসারী। আর ওখানেই তো সব বিপত্তি। চলুন, আমরা সবাই এই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট গুলু ধিরে ধিরে বের করি। সবাই কন্ট্রিবিউট করি আমাদের প্রয়োজনে। আমরা এই নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট গুলি বের করতে পারলেই আমরা সহজে বের করতে পারবো আমাদের কোথায় কোথায় সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং কাকে কাকে এই কাজে অংশ গ্রহন আবশ্যক।

 ……… (চলবে পরবর্তী ইমপ্যাক্ট অনুসন্ধানে, আপনিও কন্ট্রিবিউট করুন মতামত দিয়ে)

১০/০৮/২০১৬-জেনারেশন গ্যাপ

Categories

 

আমি একটা জার্নালে একবার একটা আরটিক্যাল লিখেছিলাম, “জেনারেশন গ্যাপ” এর উপর। আজ মনে হচ্ছে, এই জেনারেশন গ্যাপটা আমাদের অনেকদূর নিয়ে যাচ্ছে এবং খুব দ্রুত। আমি আমার সেই আরটিক্যালটার কিছু চুম্বক অংশ আজ আমাদের বন্ধু ফোরামে তুলে ধরতে চাই।

…… জেনারেশন গ্যাপটা আসলে হচ্ছে আধুনিক সময়ের ইয়াং বয়সের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের ওল্ড জেনারেসনের মানুষগুলুর মধ্যে চিন্তাধারা, জীবনযাত্রা, অভ্যাস, এবং দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্যগুলি। এই জেনারেশন গ্যাপ থাকবেই, আগেও ছিল এবং এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু ভয়ংকর বিষয়টি হয়ে দাড়ায় যখন এই জেনারেশন গ্যাপটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, কালচার, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, এবং সাধারন দৃষ্টিভঙ্গিটায় একটা বিস্তর জাম্প করে। তখন যেটা হয় তা হচ্ছে প্রতিনিয়ত যুবক বয়সের জেনারেসনের সাথে ওল্ড জেনারেশনের মধ্যে মিসম্যাচ, এডজাস্টম্যান্ট, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইত্যাদির সবকিছুতেই কনফ্লিক্ট করে। অতিতে এই গ্যাপটা ছিলো এবং মাঝে মাঝে যে বিস্তর জাম্প করে নাই তা কিন্তু নয়। সেই পরিস্থিতিতেও জেনারেশন গ্যাপটা কোনো না কোনোভাবে সহনীয় পর্যায়ে সামাল দেওয়া গেছে কারন তখন দুইপক্ষই একটা জায়গায় এসে এডজাস্টমেন্টের মধ্যে সহঅবস্থান করতে চেয়েছিলো এবং পেরেছিল।

এখানে আরো একটা তথ্য সহজ করে বলা ভাল যে, এই জেনারেশন গ্যাপটার মানে কি দাদাদের বয়সের সঙ্গে নাতীদের বয়সের যুগের পার্থক্য? অথবা এইটা কি ৩০ বছর সময়ের কোনো পার্থক্য? কিংবা ৫০ বা ৭০ বছরের সময়ের? আসলে তা না। এটা পিতামাতার এবং সন্তানের তাতক্ষনিক সময়ের মধ্যেও হতে পারে আবার দাদাদের বয়সের সঙ্গে নায়-নাতকুরের বয়সের ফারাকের মধ্যেও হতে পারে। এটা একটা স্পেসিফিক জেনারেশন থেকে আরেকটা স্পেসিফিক জেনারেশনের মধ্যেও হতে পারে।

যেমন উদাহরনসরুপ যদি বলি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পরে এবং রিপাবলিক অব জর্জিয়া যখন স্বাধীনতা পেলো, তখন সোভিয়েত আমলের বাবামায়ের সঙ্গে তাদের ঘরের সন্তানদের মধ্যে বিশাল একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর তফাত সৃষ্টি হলো। জর্জিয়ার উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা পুরুটাই পাশ্চাত্য ধাঁচের আদলে বদল হয়ে গেলো কিন্তু তাদেরই পিতামাতারা আগের দিনের সোভিয়েত কালচার, সভ্যতা নিয়ে ধরে থাকলো। এদের মধ্যে সময়ের পার্থক্যটা ছিলো মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধান। হয়ত ৫ থেকে ১০ বছরের। অথচ কিন্তু এতো অল্প সময়ের ব্যবধানের দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা বিস্তর জেনারেশন গ্যাপের সৃষ্টি হয়ে গেলো। এবং দেখা গেলো, একই পরিবারের মধ্যেই এই ঘটনাটা ঘটে গেলো। এই দুই জেনারেশনের মধ্যে তাদের চিন্তাধারা, জীবনযাত্রার দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষাদীক্ষার লেবেল, আচরন, ভবিষ্যৎ চিন্তাধারা, আর্থসামাজিক ভাবধারা সবকিছুই আমুল পালটে গেলো। বর্তমান জেনারেশনের জীবন যাত্রায় চলে এলো মুক্তধারার স্বাধীনতার শক্তি, স্বাধীন চলাফেরা, নাইট ক্লাব, ইন্টারনেট, কম্পিউটার গ্যাম, বিনোদন, মুক্ত-রাজনীতির চর্চা এমন কি বিয়ে সাদির ব্যাপারেও আধুনিক কালের যুবকদের চিন্তাধারা অনেক পার্থক্য। তাদের চাকুরী পছন্দের বিষয়ে, চাকুরি ছাড়ার বিষয়ে, এমন কি অবসর প্লানের বিষয়ে কোনো কিছুই ঘরের পিতামাতাদের সহিত মিলছে না। অন্যদিকে পুরানো দিনের অভ্যাসে গড়া বাবা মায়েরা ধরে থাকলেন ট্র্যাডিসনাল সমাজ ব্যবস্থা। তারা বর্তমান যুগের ছেলেমেয়েদের অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গেই একমত হতে পারছে না, তাদেরকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে চাইছেন না কিংবা দিতে চাইছেন না বলে বললে ভুল হবে, তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না যে, তাদের সন্তানেরা ঠিক হ্যান্ডেল করতে পারবেন কিনা, কিংবা শেষতক আবার তাদের সন্তানেরা দিশেহারা হয়ে যায় কিনা ইত্যাদি।

এর ফলশ্রুতিতে যা হচ্ছে তা হলো বিশাল এক গ্যাপ। আর এই গ্যাপের কারনেই একই পরিবারের মধ্যে যুবক এবং মধ্যবয়সী সদস্যদের মধ্যে বিশাল গ্যাপের সৃষ্টি হচ্ছে। আর সৃষ্টি হচ্ছে ফাটল, সৃষ্টি হচ্ছে সন্দেহ, তিক্ততা ইত্যাদি। ফলে কিছুতেই সুতা এক জায়গায় আবদ্ধ হয়ে নতুন জাল তৈরি না করে শুধু নৈরাজ্যসরুপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবারে কোনো কিছুই অভাব নাই আবার কোনো কিছুতেই ইয়াং বয়সের সদস্যদের মন টানছে না। তারা সস্থিতে নাই। তারা বিসন্ন। যাদের কাছ থেকে সহযোগিতার হাত পাওয়ার কথা তাদের সাথেই তাদের বিরোধ। যাদের কাছে তারা অসহায় মনের ভাব শেয়ার করবে, তারাই তার অসহয়ের কারন। সে কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? ফলে একই মানসিকতার বন্ধু, বান্ধবি, কিংবা তাকে বুঝতে চেস্টা করছে এমন কেউ, সেখানেই সে পায়ে পায়ে হেটে চলে যাচ্ছে তার অভাবহিন ঘর ছেড়ে, তার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে কোনো একটা জায়গায় যেখানে সে আর কিছুই না পাক, পাচ্ছে মানসিক শান্তি। সেটা ভুল না ভালো না শুদ্ধ, তা তার জানার অপেক্ষা করছে না। আমরা বারবার বলছি পরিবারের সচেতনার কথা, বারবার বলছি কিছু একটা করা দরকার, বারবার বলছি সরকার কেনো দেখছে না, বারবার বলছি কেনো এই রকম এয়াবনরমাল অবক্ষয় হচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটার ভিতরে কেউ প্রবেশ করছি না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, সমস্যাটা আসলে কোনো রাজনৈতিক কিংবা পার্শ্ববর্তি দেশ, কিংবা কোনো একটা বিশেষ মতবাদের উপর দোষ চাপিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। কিংবা চাপিয়ে দিয়েও কোনো লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না যতক্ষন না পর্যন্ত এই সুক্ষ কিন্তু বিস্তর গ্যাপটা সমাধান হচ্ছে।

আমার মনে হচ্ছে এই জেনারেশন গ্যাপটাই এখন আমাদের অত্যান্ত বুদ্ধিমানের সহিত হ্যান্ডেল করে পরিস্থতি আয়ত্তে আনা সম্ভব। এখন কথা হচ্ছে কি কারনে এই জেনারেশন গ্যাপটা হচ্ছে আর কিভাবে এই দুই জেনারেশনের গ্যাপ কমিয়ে এনে সার্বজনীন মতাদর্শ, আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ, ইত্যাদি একটা প্লাটফর্মে আনা যায় তার হিসাব করা। বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা আসলে আমাদের পরিবার থেকে শুরু করে যার যার আওতায় বাধতে হবে। কিছু পরিবারের পক্ষে, কিছু সরকারের, কিছু সমাজের কিছু আমাদের চারিপাশের জনগনের। কেউ দায়িত্ব এরাইয়া যাওয়ার কোনো স্কোপ নাই। (চলবে…)

১৬/০৭/২০১৬- মিস ক্যালকুলেশন?

Categories

 

আমার একটা জায়গায় কিছুতেই ক্যাল্কুলেসন মিলছে না। মনে হচ্ছে, কোথায় যেনো একটা ভুল হচ্ছে। তার আগে একটা গল্প বলি। বহুদিন আগে আমি একটা সিনেমা দেখেছিলাম, সম্ভবত পোলিশ সিনেমা। এটা প্রায় ৯০ দশকের দিকে। সিনেমাটার কাহিনি এই রকম যে,

সিনেমাটায় মোট ১২ জন লোক খুন হয়। ১২তম ব্যক্তি খুন হয় ১১তম ব্যক্তির দ্বারা, ১১তম ব্যাক্তি খুন হয় ১০তম ব্যক্তির দ্বারা, ১০তম ব্যক্তি খুন হয় ৯ম ব্যক্তির দ্বারা এবং এইভাবেই খুনগুলু চলতে থাকে এবং সর্বশেষ ২য় ব্যক্তিটি খুন হয় ১ম ব্যক্তির দ্বারা। অথচ এই ১২ জনই ছিলো একটা সংস্থার অধীনে এবং কেউ আড়াল থেকে এই ১২ জনকেই পৃথক পৃথক ভাবে নির্দেশনা দিত। মজার ব্যাপার হলো এই ১২ জনের মধ্যে কেউ কাউকে কখনোই চিনতো না। আর খুন গুলু হয়েছে বিভিন্ন বিভিন্ন কারনে। কোনো খুন কোণ খুনের কারনের সঙ্গে এক ছিলো না। যখন ১২ থেকে খুন হতে হতে ১ম ব্যক্তিটি খুন হয়ে যায় তখন স্ক্রিনটা একেবারে ব্ল্যাক হয়ে যায়। ভাবলাম, মনে হয় স্ক্রিনে কোনো সমস্যা হয়েছে বা সিনেমার রিলে কোন সমস্যা হয়েছে। কিন্তু না, একটু পরে দেখা গেলো, স্ক্রিনে একটা মেসেজ এসেছে, Cycle will continue and The End. জানা গেলো না, কে সেই অদৃশ্য নির্দেশনাকারী। ওরা অনেক বড় এবং অদের ব্যাপারে কেউ কখনো জানতেও পারবে না।

আজকে বিশ্ব ব্যাপি যে সমস্ত খুন, টেরোরিস্ট এটাক, কিংবা ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, কখনো কারন হিসাবে দেখছি ধর্ম, কখনো দেখছি পাওয়ার পলিটিক্স, কখনো দেখছি বিশ্বায়ন, কখনো দেখছি গনতন্ত্র, রাজতন্ত্র আরো অনেক বিষয়। আসলে হচ্ছেটা কি?  এটা যুদ্ধ নয় আবার যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি। পূর্বে একদেশ আরেকদেশ দখল করার জন্য সৈন্যসামন্ত, হাতি ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিমান বাহিনি, নৌ বাহিনি, স্থল বাহিনি সব নিয়ে একে অপরকে এটাক করতো, কিন্তু এই কয়েক বছর যাবত দেখছি, কোন দেশ নয়, কিছু ইন্ডিভিজুয়াল চরিত্র একা একাই পুরু পৃথিবীর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। যেমন লাদেন একাই যেনো একটা সংস্থা, কিংবা আইএস, ইত্যাদি। এখন কোনো ইন্সটিটিউশন দরকার পরছে না, জাস্ট নিছক ব্যক্তি পর্যায়ের মধ্যে যুদ্ধটা চলে এসেছে। একটা লোকই এনাফ একটা চরম আকারের কেওয়াস তৈরি করার জন্য। এইটাকে সামাল দেওয়া খুব সহজ বলে মনে হচ্ছে না। আজকে আমরা যখন আমাদের দেশে আক্রান্ত হচ্ছি, কেউ কেউ পাশের দেশকে ব্লেম করছি বা আমাদের প্রতিপক্ষকে ব্লেম করছি, আবার যখন পাশের দেশ আক্রান্ত হচ্ছে অথবা আমাদের প্রতিপক্ষ আক্রান্ত হচ্ছে, তখন তারা আরেক দেশকেবা তাদের প্রতিপক্ষকে ব্লেম করছে, আবার ওই দেশও যখন আক্রান্ত হচ্ছে, তারা তাদের পাশের কোন দেশ বা গোত্রকে ব্লেম করছে, ঠিক যেনো ওই সিনেমার মত। কিন্তু আসলে এইসব কিছুর নেপথ্যে কে বা কারা? খুব গভিরভাবে ভাবা দরকার। সবার শেষ কি ওই ব্ল্যাক স্ক্রিন যা আমরা কখনো জানতে পারবো না বা জানা সম্ভব না?

আরেকটা বিষয় চোখে পড়ছে। ইন্সট্রাকশনটা যেনো এমন নয় যে, Do or Die, ইন্সট্রাকশনটা যেনো এই রকম যে, Do and Die.

খুব আতংকের ব্যাপার আসলে।

১৩/০৬/২০১৬- সরল রেখার হিসাব

Categories

 

কোন একটা কারনে আমি আজ একটু মর্মাহত। মর্মাহত এই জন্য যে, আমি একটা সরলরেখার হিসাব বুঝতে পারি নাই। আমি বুঝতে পারি নাই যে, আমি একটা অবিভক্ত সরলরেখার অংশ যাকে ভাঙবার চেষ্টা চলছে। আমি বুঝতে পারি নাই যে, শত্রু বন্ধুর মত ব্যবহার করলেই সে বন্ধু হয়ে যায় না। বুঝতে পারি নাই যে, শত্রুর শত্রুরাও একসময় তাদের বড় শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য একজোটে বন্ধু হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি নাই যে, নিজের ইচ্ছাগুলো, শখগুলো রক্ষা করার জন্য কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ নয়। আমি এখন বিছানায় শুয়ে আছি আর ভাবছি। মনে হচ্ছে আমি কষ্টে আছি, যত না শারীরিক কষ্ট, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট মনের ভিতরে। নিজের কাছে নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে এইজন্য যে, কেন আমি এতোটা অবুঝ ছিলাম, কেন আমি ঐ হায়েনাটাকে এতোটাই কাছের লোক বলে মনে করেছিলাম, কেন মনে হয় নাই, সে ওঁত পেতে আছে। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে আজ, নিজের কাছে লজ্জাবোধও কম মনে হচ্ছে না। এই পৃথিবীতে আমি আজ অন্তত একটা মানুষরূপী হায়েনাকে তো চিনতে পারলাম যে আমারই আস্তানার কাছে ঘুপ্টি মেরে বাস করে, সাধু হয়ে চলাচল করে অথচ সে হায়েনার চরিত্র লুকিয়ে রাখে।   জীবনের মানে বুঝবার জন্য অনেক দূর যাওয়ার প্রয়োজন নাই। এই হায়েনাটাকে দেখলেই সব বুঝা যাবে। এই হায়েনারা বন্ধু হয়ে অন্তরের ভিতরে কোকিলের কণ্ঠের মত সুর নিয়ে প্রবেশ করে, সে আসলে সুর নিয়ে নয়, সে জহর নিয়ে প্রবেশ করে। এদেরকে বুঝবার জন্য একটু গভীরে যাওয়া দরকার। তা হলে জীবনের মানে কি তার হিসাব বুঝা যাবে। জন্মের পর যাদের আস্তানার কোন হিসাব ছিল না এবং এখনো নাই, কে বা কারা তার অভিভাবক কিংবা কি নিয়ে তারা পরিচিত হতে হবে এই জনসম্যখ পৃথিবীতে, তাই যখন তাদের নাই। বস্তির ঐ অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে যাদের শ্বাসপ্রশ্বাস চলে, জীবনের মুললক্ষ্য ঠিক করার জন্য অপরের সাহায্য লাগে, পেট পুরে খেতে না পেরে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে জীবন চলে, রাত নামলেই কোথায় একটু ঘুমানো যাবে সেই ভরসায় পরিচিত কারো বাড়ীর পরিত্যাক্ত ঘরে, বা বারান্দায়, কিংবা ঝুল বারান্দায় থাকতে পারলেই নিজেকে বড্ড সুখি মনে করে, তাদের আবার স্তর কি? ল্যাবেল কি? স্ট্যাটাস কি? তারা আর যাই হোক, কারো বন্ধু হতে পারে না। আর বন্ধু হলেও তাদের বন্ধু তাদের স্তরেরই। আমাদের স্তরের তো নয়ই। এদের প্রতিটি চিন্তায়, প্রতিটি অনুভবে, আর সমগ্র ভাবনায় থাকে কিভাবে কোথায় কি ফায়দা লুটা যায়। তাই তারা কখনো চোখের জলে মানুষকে দেখিয়ে একটা সহানুভুতি, কখনো অতি বন্ধুভাবাপন্ন চরিত্রের রূপধরে মনের খুব কাছাকাছি আসার আকুতি, আবার কখনো সাধু সন্নাসির মত গোবেচারা সেজে মানুষের মনের ভিতরে ঢোকার প্রাণান্ত চেষ্টা, এটাই এদের চিরাচরিত অভ্যাস। এরা ভিক্ষা করে না কিন্তু ভিক্ষার টাকায় চলে, যাকাতের টাকায় চলে, এরা পরিত্যাক্ত কিন্তু ভাবে ভাবে চলে, এরা নামহীন, বংশহীন, গোত্রহীন, কিন্তু এরা বড়বড় নামের লোকের দোহাই দিয়ে চলে, অথচ যাদের নামে ওরা চলে, সেই ওরা এই বংশহীন, নামহীন, গোত্রহীন উচ্ছিষ্ট মানুসগুলকে হয়ত চিনেই না। হয়ত বাপের নামটা পর্যন্তই এরা জানে তাদের আদি এবং শেষ পরিচয় হিসাবে। পিতৃকুলের না আছে কেউ, মাত্রিকুলের না আছে কেউ। এদের রূপ যাই হোক না কেন, এদের অন্তরের ভিতর থাকে সর্বদা জহর। এই জাতীয় মেরুদণ্ডহীন হায়েনারা রাগের চেয়ে হাস্যুজ্জল থাকার চেষ্টা করে থাকে বেশি, অপমানেও ওদের দাতকপাটি বন্ধ হয় না, অপমানিত বোধ না থাকায় নির্লজ্জ তোষামোদি লক্ষণীয়। আর অন্তরের ঐ জহরেই অন্যের সব কিছু নস্ট করে মানসিক শান্তিতে থাকতে চায় এই বিকৃতি মানুষগুলো।  

আমিও আজ এমনি একটা বন্ধুরুপে পাশে থাকা হায়েনার জহরসমেত দংশনের জর্জরিত ব্যথায় কাতরাচ্ছি। আমি বুঝতে পারি নাই আমার পাশে দাড়িয়ে থাকা এই হায়েনাকে। এরা সবাই হায়েনার বংশধর। ছেলে হোক মেয়ে হোক, হোক ওদের পরবর্তী বংশধর, সবাই মানুষের অববয়ব কিন্তু হায়েনার আদর্শ ছাড়া কিছুই নাই তাদের মধ্যে। এটা আমার জন্য একটা শিক্ষা হয়ে রইল। তবে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমি কেন আমার অবিভক্ত সরলরেখার ঐ প্রান্তে দাড়িয়ে থাকা আমার প্রানপ্রিয় শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে এই নিয়ে আলাপ করি নাই? আমি সেটাও বুঝতে পারি নাই। কি চক্রাকার বিপদের সঙ্গে আমি বসবাস করছিলাম। তবে শান্তিরবার্তা এই যে, কিছুটা রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিছুটা আঁচর তো লেগেছেই, কিন্তু আজ অন্তত কিছুটা হলেও জীবনের সাথে জীবনের কোথায় অমিল, সেটা বুঝতে পেরেছি। ফারা কেটে যাবে, আবার বর্ষা আসবে, আবার শরত আসবে, শুধু আসবে না হায়েনাদের জন্য সুজুগের সংবাদ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হিসাব থেকে আমি শিক্ষা নিয়েছি। আমাকে শিক্ষা নিতে হয়েছে, যদি শিক্ষা না নেই, তাহলে জীবনের আরও অনেক পর্ব আসবে, যেখানে মনে হবে ঐ পথ আরও কঠিন এবং উত্তরনযোগ্য নয়। পতন নির্ঘাত নিশ্চিত।  

আজ যারা আমার সঙ্গে অসঙ্গতিমুলক আচরন করেছে, তারা ভাল কি মন্দ এই বিচার হবে সময়ের পথ ধরে ভবিষ্যতে। আমি তৈরি হচ্ছি। আপনারাও তৈরি হউন। আর ঐ হায়েনাটাকে বলছি, তুমিও তৈরি হও। তুমি আর যাই কিছু করো না কেন, তোমার রক্তের পরিচয়, বংশ, সেটা আর নতুন করে গজিয়ে তুলতে পারবে না। তুমি এর চেয়ে ভাল কিছু করে দেখাতেও পারবে না তোমার পরবর্তী হায়েনাদের কাছে। হায়েনা হায়েনাই। আর তৈরি হও ঐদিনের জন্য, যেদিন তুমি তোমার চোখের জলের সব ভান্ডার ঢেলে দিয়েও আমার রোষানল থেকে বেচে যাবার কোন সম্ভাবনাই নাই, আর সমস্ত সুরালয়, কিংবা জরালয় দিয়েও প্রমান করতে পারবে না যে, তুমি হায়েনার বংশধর নও। তুমি আমার কাছে বিষধর সাপের চেয়েও খারাপ।

০৫/০৬/২০১৬- বেলাশেষে

Categories

“বেলাশেষে” একটা বাংলা ছায়াছবির নাম। সংক্ষিপ্ত কাহিনীটা এই রকম-

৬৫ বছরের স্বামী আর ৬০ বছরের স্ত্রী। অনেক নাতি-নাত্নি, মেয়ের জামাই, ছেলেরা মেয়েরা সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়েছেন গুরুতর এক সমস্যা নিয়ে। সমস্যাটা হল, স্বামী বলেছেন তিনি এই বয়সে এসে তার স্ত্রীর সঙ্গে পৃথক হতে চান এবং আরেকটি বিয়ে করতে চান। এই বুডো মানুষটির সিদ্ধান্তে অনেকেই হতবাক হলেও কেউ কেউ রাজি আবার কেউ কেউ রাজি নয়। যারা এই সিদ্ধান্তে রাজী না, তারা হতবাক হচ্ছেন, এই বয়সে কেন তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফলে নায়নাতকুর, ছেলেমেয়ে, মেয়ের জামাই সবাই মিলে পরিকল্পনা করলেন, ঠিক আছে অসুবিধা নাই, তবে তারা নিজেরা একঘরে কয়েক সপ্তায় নিজেরা নিজেরাই আলাপ আলোচনা করুক, ভাবুক, দেখুক তারপর নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক কোনটা করা উচিৎ। বুড়া-বুড়িও সম্মতি দিলেন, ঝগড়াতো আর হয় নাই, স্বামী স্ত্রীই তো।

তাদের জন্য আলাদা ঘর দেওয়া হল, একদম নিরিবিলি পরিবেশ। কেউ তাদেরকে বিরক্ত করার নাই। কিন্তু সবাই এর মধ্যে একটা কাজ খুব গোপনে করে রাখলো। আর তা হচ্ছে তাদের রুমে গোপন একটা ক্যামেরা লাগিয়ে দিল এই দুই বুড়া বুড়ি কি কথা বলে তা দেখার জন্য। যখনই এই দুই বুড়া বুড়ি তাদের কথাবার্তা বলেন, তখনই দলবেধে অন্য বাড়ি থেকে সবাই মিলে ভিডিওতে তা প্রত্যক্ষ করেন।

পঞ্চাশ বছরের বিয়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা, ভাল লাগার কথা, একসঙ্গে কষ্টের কথা, দুঃখের কথা, তাদের মিল অমিলের কথা, রাগের কথা, ভালোবাসার কথা একের পর এক তারা দুইজনে নিরিবিলি একত্রে বসে আলাপ করেন। আর সবাই তাদের এইসব অভিজ্ঞতার কথা শুনে কখনো অন্য সবাই হাসেন, কখনো চোখ মুছেন, কখনো অবাক হয়ে চুপ করে থাকেন। তারা সবাই একটা জিনিষ বুঝতে পারেন যে, সব স্বামীর কাছে তার সংসারটা এক রকমের, আর স্ত্রীর কাছে তার সংসারটা আরেক রকমের। কিন্তু কেউই যে ভুল নন তা ঠিক। স্বামীর কাছে দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসাটা এক রকমের আর স্ত্রীর কাছে স্বামী আর সংসারের জন্য ভালোবাসাটা আরেক রকমের। একজন মায়াবী স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন, তার অবর্তমানে তার আদরের স্ত্রীর যেনো কোনো কষ্ট না হয়, সে যেনো কারো কাছে হেয়ালীর পাত্র না হন, তার আদুরী স্ত্রী যেনো কোনো অর্থকরী কিংবা সুন্দর জীবন চালানোর জন্য কারো কাছে হাত না পাতেন। সেই দিকটা খেয়াল করে এই ভরষাযুক্ত স্বামী সব সময় চান তার স্ত্রীকে সাবলম্বি করে তুলতে। ফলে স্বামী সব সময়ই চেয়েছেন তার স্ত্রী এটা জানুক যে, তার স্বামী কোথায় কিভাবে কত রোজগার করেন, কত সঞ্চয় করেন, আর কিভাবে সেই কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে কিভাবে তিনি তার স্ত্রীর মংগলের জন্য কি করছেন এবং তার পুরুপুরী এই পরিকল্পনার অংশ হয়ে যেনো তার স্ত্রী এটা খেয়াল করে সে মোতাবেক প্রস্তুতি নেন এবং তার উপর পারদর্শী হন। অন্যদিকে এই স্বামী দেখছে, তার স্ত্রী তার এইসব ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন হয়ে তাদের সংসারে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়ে, নাতি নাতকুর কিভাবে মানুষ হবে, কিভাবে আরামে থাকবে, কিভাবে নিরাপদ থাকবে ইত্যাদি নিয়েই বেশি নজর। স্বামীর কাছে ভালো লাগা ছিল বউকে নিয়া কোথাও রোমাঞ্চের উদ্দেশ্যে একা একা বেরিয়ে পড়া, কিন্তু স্ত্রীর কাছে যেনো সেই রোমাঞ্চের থেকে বেশী জরুরী ছিলো ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা, তাদের কোচিং ক্লাস, তাদের স্বাস্থ্য, তার নিজের ঘর কন্নার কাজ, আত্মীয় সজনদের সেবা শশ্রুসা ইত্যাদির মধ্যে একটা বন্ধন স্রিস্টির লক্ষে সবাই মিলে পারিবারিক সময় কাটানো। স্বামী চেয়েছেন স্ত্রীর কাছ থেকে অনেকটা সময় যে সময়টা তারা ভালোবাসার কথা বলবে, পুরানো দিনের কথা বলবে, কোনো একটা সিনেমা দেখতে দেখতে মন ভরে আনন্দ করবে, বিখ্যাত কোনো কবির কবিতা পড়ে পড়ে তার অন্তর্নিহিত ভাবধারায় সিঞ্চিত হবেন। কিন্তু স্ত্রী তার পরিবারের সবার দিকে একসঙ্গে খেয়াল রাখতে গিয়ে, ছেলেমেয়েদের পরাশুনার দেখভাল করতে গিয়ে, অসুস্থ শ্বশুর শাশুড়ির দিকে নজর দিতে গিয়ে অধিকাংশ সময়টাই চলে গেছে অকাহ্নে, স্বামীর জন্য অফুরন্ত সময়টা আর তিনি বের করতে পারেন নাই।

কেউ দুষী নন, কারো চাওয়ার মধ্যেই অতিরঞ্জিত ছিলো না। অথচ তারা যেনো কোথায় সুখি নন। তারপরেও তারা বহুকাল এই কম্প্রোমাইজের মধ্যেই একটু রাগ, একটু অভিমান, একটু গোস্যা আর বিস্তর জায়গা জুড়ে পরস্পরের ভালোবাসাটা এক সময় অভ্যাসে পরিনত হয়, তখন অভ্যাসটাই যেনো ভালোবাসা। স্বামীর টয়লেট করে আসার পর যে গন্ধটা একদিন স্ত্রীর কাছে দূর্গন্ধ মনে হতো, স্বামীর ঘামের গন্ধে ভরপুর যে গেঞ্জীটা একদিন নাকের কাছে নিলে একটা শুকনা বাজে গন্ধ বলে মনে হতো, একদিন সেই টয়লেটের গন্ধ, ঘামের দূর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ মনে হয় না। অন্যদিকে স্ত্রীর ঘুমের মধ্যে ডাকা নাকের শব্ধ যখন কোনো একদিন এতোটাই অসহ্য মনে হতো, বিরক্তিকর মনে হতো, চুলে আধা ভেজা তেলের যে গন্ধ একদিন স্বামীর নাক বুঝে আসতো, সময়ের এতোটা পথ বেয়ে যখন সব গুলি ভালোবাসা একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে যায়, তখন স্ত্রীর সেই নাক ডাকা, আধাভেজা চুলের গন্ধ যেনো একটা সুখের পরশ মনের ভিতর প্রবাহিত হয়ে যায়। এই তো সে তো কাছেই আছে।

৯০ বছরের কোনো এক প্রোড় বুড়ো, ৮৫ বছরের কোনো মহিলার সাথে যখন এক সাথে স্বামী স্ত্রী হিসাবে বসবাস করেন, তখন তাদের এই বয়সে এসে আর সেই যুবক যুবতীর মতো শরীরের চাহিদা, রুপের চাহিদা আর কাজ করে না। কিন্তু তাদের মধ্যে ভালোবাসাটা একটা বিশাল আকার পাহাড় সম ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে সেখানে কি ফ্যাক্টরটা কাজ করে? কাজ করে নির্ভরতা, কাজ করে একে অপরের উপর শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, মায়া আর মহব্বত। কাপা কাপা হাতে যখন ৮০ বছরের বুড়ি এক কাপ চা নিয়ে ৯০ বছরের তার স্বামীর কাছে কাপ খানা হাতে দেন, কিংবা পানের বাটিতে পান আর সুপারী ছেচে যখন এক খিলি পান স্বামী তার ৮০ বছরে সংগিনীর মুখে তুলে দেন, আসলে তিনি শুধু এক কাপ চা কিংবা এক খিলি পানই দেন না, দেন সারা জীবনের মহব্বত আর ভরষা যে, তুমি ছাড়া আমার আর কোনো বড় বন্ধু নাই।

তুমি আমার ভরষা, তুমি আমার নিরাপত্তা, তুমি আমার স্বামী, কিংবা স্ত্রী, তুমি আমার পরামর্শদাতা, বিপদে আপদে তুমিই আমার ডাক্তার কিংবা নার্স। তুমিই আমার সব। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বুক কাপে, তোমার হাত ধরলেই আমার সব কাপুনী বন্ধ হয়ে যায়। তুমি আমার মায়ার সংসার। বুকের সব পাজরে পাজরে তুমি গেথে থাকা আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস আর চোখের প্রতিটি বিন্দুজলে নীল আকাশের গাংচিলের মতো তুমি খেলা করো আমার  অন্তরের এমন এক কোটরে যেখান থেকে তোমাকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা আমার নাই।

বেলাশেষে তুমিই আমার আর আমি সেই তোমার।

০১/০৬/২০১৬-গল্পটা যদি এমন হতো?

Categories

 

এক যে ছিল রাজকুমার, আর এক যে ছিল রাজকুমারি। রাজকুমার রাজকুমারিকে আর রাজকুমারি রাজকুমারকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু হটাত করে কোন এক দিন রাজকুমার হারিয়ে যায়। দিন যায়, রাত যায়, মাস যায় বছর আসে, বর্ষা যায় শিত আসে, রাজকুমারি পথ চেয়ে বসে থাকে। কিন্তু রাজকুমারের কোন হদিস মেলে না। চোখের সবগুলো স্বপ্ন নিয়ে আর অশ্রুভরা নেত্রে রাজকুমারি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জস্না দেখে, চাদের পানে চেয়ে ঐ চাদের বুরির সঙ্গে একাই কথা বলে।  কত রাজ কুমার এলো গেলো। কিন্তু রাজকুমারীর কোন রাজকুমারের প্রেমেই পরতে পারলেন না। তার রাজ্য চাই না, জহরত চাই না, সোনার পালঙ্ক চাই না। তিনি শুধু রাজকুমারের জন্য পথ চেয়ে থাকেন।

একদিন হটাত কোন এক বসন্তের সকালে মাথা ভর্তি এলো মেলো চুল নিয়ে, উসুখুসু খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি নিয়ে রাজকুমার এসে হাজির। রাজকুমারি তার জীবনের সব আনন্দ আর ভালবাসা দিয়ে রাজকুমারকে জরিয়ে ধরে শুধু বললেন, আমাকে একা ফেলে তুমি কোথায় গিয়েছিলে রাজকুমার? আমি তো তোমার পথ চেয়েই এতটা দিন, এতটা সময় পার করে দিয়েছি, একবারও কি মনে পরে নাই আমায়? তুমি কি আমার ভালোবাসার স্নিগ্ধ ঘ্রান কখনোই পাও নাই রাজকুমার? এই বুকে কান পেতে দেখ, কি উত্তাপ আর কি যন্ত্রনা নিয়ে আমি এই এতগুল বছর তোমার প্রতিক্ষায় অপেক্ষা করে আছি! আমাকে তুমি তোমার বুকের ভিতরে একটু জায়গা দাও রাজকুমার। আমি বড় ক্লান্ত, আমি আজ অনেক অবসন্ন। আমাকে জোর করে ধরে রাখ এবার। আমি তোমাকে আর কখনো হারাতে চাই না কুমার।

রাজকুমার তার পকেট থেকে একটি ছোট ঘাস ফুল বের করে রাজকুমারির ঘন কালো চুলের খোঁপায় গুজে দিয়ে বললেন, এই হোক সাক্ষী আজ তোমার আর আমার প্রেমের আলিঙ্গনের। আমাদের সুতীব্র ভালোবাসার।

দিন যায়, রাত যায়, বড় ভাল জীবন কাটছিল রাজকুমারের আর রাজকুমারির। একদিন হটাত রাজকুমারের অন্তর্ধান হয়। রানী আবারো একা বসে থাকেন ঐ বেলকনির রেলিং ধরে। সন্ধায় চিল কাতুরের ডাকে তার মন ভারি হয়ে আসে। জোনাকির ডাকে তার সব অতিতের কথা মনে হয়। মনে হয় রাজকুমার তার পাশেই হাত ধরে বসে আছেন। কিন্তু না। সব আশা, আহ্লাদ, সব স্মৃতি মলিন করে দিয়ে তার গরভের অনাগত সন্তানের নড়াচড়ায় সম্বিত ফিরে আসে।

আজ নতুন রাজকুমার এসেছে তার জীবনে। হাটি হাটি পা পা করে ছোট রাজকুমার বড় হতে থাকে। একদিন সে কথা বলতে থাকে। ছোট রাজকুমার কে মা রাজকুমারি কতই ই না গল্প শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে দেন। কিন্তু রাজকুমারি সব সময় একই গল্প বলতে থাকে……… এক যে ছিল রাজা আর এক যে ছিল রানী। তাদের ছিল এক রাজপুত্তর। রাজপুত্রকে নিয়ে রাজা আর রানী বড় ভালবাসায় জীবন কাতাইতেছিলেন। একদিন হটাত করে রাজা হারিয়ে যান কোন এক গহিন জঙ্গলের ভিতর। রাজপুত্র ধীরে ধীরে বড় হয়। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে, মা আমার বাবা কই? রানী চোখের জল মুছে ছোট রাজপুত্রের কপোলে চুমি খেয়ে বলেন, তোমার বাবা একদিন ঘোড়ায় চরে টকবক করে ঐ গহিন জঙ্গল থেকে আমাদের নিতে আসবেন। তুমি বড় হও। রাজা ফিরে না এলে আমরাই তাঁকে খুজে আনবো। ছোট রাজপুত্র ঐ গহিন জঙ্গলের রহস্য বুজে উঠতে পারেন না। শুধু মাকে জরিয়ে ধরে থাকে আর বলে, মা আমি তোমায় খুব ভালবাসি।

৩১/০৫/২০১৬-যেদিন আকাশের মেঘমালা

Categories

 

যেদিন দেখবেন আকাশের মেঘ মালা আপনার জগতের কাছে শেষ বর্ষণ হয়ে আপনার পায়ের কাছে টাপুর টুপুর করে লাফিয়ে পরছে, যেদিন দেখবেন ঐ পাশের জঙ্গলের ভিতর অবহেলায় কোন এক রজনি গন্ধার সুবাস আপনার নাশারন্দ্রে ভেসে আসছে, যেদিন দেখবেন চারিদিকের মানুষ গুলো আপনাকে দেখে কোন কারন ছারাই আর আপনাকে সেই আগের মত করে দেখছে না কিন্তু মিটি মিটি করে হাসছে আপনার নতুন ভালোবাসার অববয়বে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীতে আরও অনেক বছর বাচতে ইচ্ছে করবে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীর সব রঙ সুন্দর, যেদিন মনে হবে আপনার হাসতে ভাল লাগে, কাদতে ভাল লাগে, একাকী বসে জানালায় পাখি দেখতে ভাল লাগছে, অথবা যেদিন দেখবেন চোখের জলের মধ্যে অফুরন্ত কষ্টের মাঝেও মন বড় উতালা হয়ে আছে কোন এক অস্পৃশ্য মানুষের জন্য, যেদিন দেখবেন সোনালী রোদ আপনাকে উদ্ভাসিত করে, যেদিন দেখবেন জোড়া শালিক না দেখেও আপনার মনে হবে এই বুঝি আজকে ও আসবে, সেদিন আপনার এই অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে দেখবেন মাঘের পরে ঐ দিগন্তে দাড়িয়ে আছেন তিনি যাকে আপনি এতদিন ধরে খুজছেন। আপনার আর কোন কিছুর জন্যই কাউকে কিছুই বলার নাই। শুধু আপনি আর থাকবে বনলতা সেনের মত সেই মানুষটি, বলবেন তখন, ………এতদিন কোথায় ছিলেন? 

বলুন না কোথায় তাঁকে দেখেছেন প্রথমবার?

৩০/০৫/২০১৬-সপ্তাহের সাত দিন

Categories

 

ভগবান যদি সপ্তাহের সাত দিনই মানুষের জন্য শুধু আনন্দ অথবা শুধু কষ্টের জন্যই বরাদ্ধ করতেন, তাহলে মানুষের জীবনটা হয়ে যেত এক চরম দুর্বিষহ। আর তাই সব রবিবার একরকম নয়, সব মঙ্গলবারও একরকম নয়। কোন কোন শনিবার সুখের বার্তা নিয়ে আসে আবার কোন কোন মঙ্গলবার অনেক কষ্টের বার্তাও নিয়ে আসে। বর্ষার কোন এক শনিবার যেমন মেঘলা নাও হতে পারে আবার শীতের কোন এক শনিবার চরম বৃষ্টিপাতে ধরনি একাকার হয়ে যেতে পারে। আর এটাই হচ্ছে জীবন।

গতকাল থেকে একটা জিনিস লক্ষ করছি য, তুমি রাতে ঘুমাতে পার নি কোন এক অপেক্ষার পালা বদলে। শুধু তোমার মনে হয়েছে কখন আসবে সেই প্রতিক্ষিত মুহূর্তগুলো যেখানে তার আনন্দের ধারা বইয়ে ভাসিয়ে দেবে তার আহরিত মন আর শান্তিতে ভরিয়ে দেবে এই ধরা। আজ লক্ষ করলাম, তার সেই আনন্দ যথার্থই সুখের বার্তা দিয়ে দিনটিকে স্মরণীয় করে রেখেছে হয়ত। আমি জানিনা কি সেই আনন্দ অথবা কি সেই কাঙ্ক্ষিত কিন্তু অনাবিষ্কৃত আনন্দের বিজলী ধারা।

তবে সুখানুভূতি হচ্ছে এই ভেবে যে, যেভাবে মন আশা করেছিল যদি তা পেয়ে থাকে এর চেয়ে বড় কোন আশীর্বাদ বা উপহার হতে পারে না। নিশ্চয় তা ভগবান শুনেছেন। ভাল থেক সব ঋতুতে, সবদিনে, গাড় নীল বৃষ্টিতে, অথবা সোনালী রোদ্দুরের চিকচিক করা স্বর্ণালি আভায় অথবা কোন এক অস্পৃশ্য মানুষের তৃপ্তিময় ছোঁয়ায়।

জীবনের সবগুলো আনন্দ যেমন এক নয় আবার সবগুলো কষ্টও এক নয়। কোন কষ্ট জীবনকে সামনের দিকে এগিয়ে চলার পথ দেখায় আবার কিছু কিছু সুখ জীবনের সব সুখগুলোকে ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ করতে থাকে। আজ এমন এক মানুষের জীবনের গল্প শুনলাম যার বেশিরভাগ দিনগুলই কেটেছে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মত। কখনো নিজের সঙ্গে নিজে প্রতারনা করেছে, কখনো নিজেকে বাচিয়ে রাখার জন্য প্রতারিত হয়েছে। তারপরেও তার লক্ষ ছিল এক এবং অটুট।

৩০/০৫/২০১৬-অপেক্ষার অনেক নাম

Categories

অপেক্ষার অনেক নাম। কখনো কষ্ট, কখনো সুখ, কখনো উদাসীনতা আবার কখনো শুধুই ভালবাসা। আজ আপনার এই অপেক্ষার নাম কি সুখ আর ভালবাসা? সার্থক হোক সে মিলন, আর সার্থক হোক আপনার চিত্ত। অহংকারীরা দেখুক আপনার দিবসের মুখদ্ধকর সীমাহীন আনন্দের চ্ছটা আর নিন্দুকেরা জ্বলে পুড়ে মরুক নিজ দাবগাহনে। আপনার ইচ্ছাই আপনাকে নিয়ে যাবে স্বর্গের ঐ নীল জানালায় যেখানে বসে আপনি রাতের কালো আকাশে ধ্রুবতারা দেখবেন আর নিজেকে অস্পৃশ্য কোন এক মানুষের পাশে ঠায় দাড়িয়ে অরুন্ধতী হয়ে কাল পুরুষকে ছারিয়ে সকালের লাল সূর্যের দিগন্ত রেখা ছুয়ে দেবেন। আমার সকল শুভ কামনা রইল আপনার জন্য। আপনার সবার জন্য।

২৯/০৫/২০১৬-এই নীলাকাশ ভেদ করে যেমন

Categories

 

এই নীলাকাশ ভেদ করে যেমন ভগবানকে পাওয়া যায় না, আবার সমুদ্রতল মেথুন করেও কোন দেবদেবির দেখা পাওয়া গেছে এর তেমন কোন হদিসও পাওয়া যায় না। ঠিক তেমনি অন্তরভেদ করে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলেও এক ফোঁটা ভালোবাসার আলামত পাওয়া যায় না। অথচ কেউ কষ্ট দিলে বুকে ব্যথা লাগে, আনন্দ দিলে অন্তরে সুখের আচ্ছাদন অনুমিত হয়। অনেকদিন ভালোবাসার মানুষকে না দেখলে বুক শুন্য শুন্য মনে হয়। তাহলে এই ভালোবাসার উৎসটা কি বা কোথায়?

“আমি তোমায় ভালবাসি” এর মানে অনেক ব্যাপক। আর এই ব্যাপক অর্থের কারনেই হয়তবা শতবর্ষী যুবকের চোখ অষ্টাদশী বৃদ্ধার জন্য কাদে, কাছে না থাকলে মনে হয় কি যেন নাই তার পাশে। শেষ বিকালে অথবা অষ্টাদশীর চাঁদনী রাতে কিংবা শীতের কোন এক কাকডাকা ভোরে পাশাপাশি বসে এক কাপ চা অথবা গরম গরম কোন ঝাল মিষ্টি টক খাওয়া, অমাবশ্যার রাতে কোন এক শ্মশানের পাশ দিয়ে হেটে যাওয়ার অজনা ভয়ে কুকড়ে থাকা হাত দিয়ে তাকে ধরে রাখার যে ভরসা। এই সবই ভালবাসা। একসময় এই ভালবাসা পরিনত হয় একটা অভ্যাসে। তখন অভ্যাসটাই ভালবাসা।

আজ যে শুধু তোমার মুখ দেখে ভালবাসল, তোমার রূপকে দেখে ভালবাসল, তোমার যৌবনকে দেখে শুধুমাত্র লোভের লালসায় ভালবেসে গেলো, সে আর যাই হোক তার সঙ্গে তোমার ভালোবাসার অভ্যাস হবেনা। কারন ভগবানকে ভালবাসা, একটা গাছকে ভালবাসা অথবা মাকে ভালবাসা আর সেই অপরিচিত মানুষটাকে মনের ভিতরে নিয়ে ভালবাসা এক নয়। তার সঙ্গে জরিয়ে থাকে নিঃশ্বাস, তার সঙ্গে জরিয়ে থাকে ভূতভবিষ্যৎ, তার সঙ্গে জরিয়ে থাকে জীবনের প্রতিটি সুখদুঃখের হাসিকান্নার সবগুলো অধ্যায়। 

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর তোমার অনুপস্থিতিতে যে তোমাকে মনে করে চোখের জল ফেলবে, আজ থেকে আরও শত বছর পর যে তার উত্তরসূরিদের কাছে তোমার নাম স্মরণ করে সেই অতীত জীবনের রোমান্সের কাহিনী শুনাবে, তোমার জীবদ্দশায় অসহায়ত্তের কারনে যে তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে না, যাকে দেখলে মনে হবে, সে তোমাকে নয় তোমার জীবনটাকে ভালবাসে, হোক তুমি পঙ্গু, হও তুমি বিরঙ্গনা অন্তঃসত্ত্বা, হও তুমি বোবা কিংবা বধির, সেটা তার কাছে ভাল না বাসার কোন কৈফিয়ত হতে পারে না। এখানে ভালবাসাটা শুধু শ্রদ্ধার, ভালবাসাটা অন্তরকে বুঝবার আর চারিদিকের হায়েনাদের থেকে ভালোবাসার মানুসটিকে নিরাপদে রাখার আপ্রান চেষ্টা। লম্বাপথ পারি দেওয়ার কোন সঙ্গি নাই তো কি হয়েছে, সে তোমার জন্য অপেক্ষা করবে, নৌকায় আর একজনেরও জায়গা আছে তোমার যাওয়ার জায়গা নাই, তো কি হয়েছে, সে তোমার জন্য নৌকা ছেড়ে পাশে এসে দারাবে, তোমাকে কেউ বিরঙ্গনা করেছে? তো কি হয়েছে? সে তোমার সবকষ্ট ধুয়ে মুছে নিজের ভালবাসা দিয়ে আদর দিয়ে কাছে টেনে নেবে। চিনেছ কি তাঁকে? যদি চিনে থাক, তাহলে নিশ্চিত জেনো, সে তোমাকে ভালবাসে। 

আমরা ভালোবাসার কথা বলি, আমরা স্নেহের কথা বলি, আমরা পারিবারিক বন্ধনের কথা বলি। কখনো কি দেখেছেন, আমাদের কাছ থেকে কে কিভাবে ভালবাসা চায়? আমাদের কাছে থেকে কিভাবে স্নেহ চায়? অথবা কখনো কি খুব কাছ থেকে ভেবেছেন, কেন অনেক আদরে গড়া সোনার সংসার কেন ভেঙ্গে যায়? তার সব গুলো কারন যদি যোগ করেন, দেখবেন, একটাই উত্তর, আমি যেমন ভালবাসা চাই তেমনি সবাই আমার কাছ থেকে ভালবাসা চায়। নিবেন অথচ দিতে জানবো না তাহলে তো একবার পাব আর সেটাও হারিয়ে যাবে ২য় বারের বেলায়। সোনালী, আপনি সুখি হবেন আমার ধারনা। ভাল বাসুন যাকে আপনি ভালবাসেন, ঐ দূর পাহারের প্রতিধ্বনির মত আপনার দেওয়া ভালবাসাও চারিদিকের পাহার থেকে শত গুনে আপনার কাছে বিভিন্ন সুরে, বিভিন্ন রঙে আপনার কাছে ফিরে আসবে।

২৮/০৫/২০১৬-আশ্বিন মাসের ভোরবেলায়

Categories

 

আশ্বিন মাসের ভোরবেলায় অতি ঈষৎ নবিন শীতল বাতাশে নিদ্রোত্থিত দেহে তরুপল্লব যেমন শিহরিত হয়, ভরা গঙ্গার উপর শরত প্রভাতের কাচা সোনা রোদ যেভাবে চাপা ফুলের মত ফুটে উঠে, আজ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার দুরন্ত যৌবন জোয়ারের জলের মধ্যে রাজ হাসের মত ভেসে উঠেছে। আপনি এতদিন হয়ত দিনের আলো কিংবা রাত্রির ছায়ায়তা  দেখতে পান নাই, কিন্তু আজিকার এই বর্ষণ আপনার পঞ্জরে পঞ্জরে ঘৃতকুমারি নৌকার মত চারিদিকে ঘুরপাক খেয়ে আপনার চারিগাছি মল অনবদ্য এক প্রেমের সুচনা করেছে। অপেক্ষা করুন সে আসবে, আর সে আপনার জন্যই আসবে। যখন সে আসবে, দেখবেন ঐ দুরের ঘাটে যে ফিঙেটি বাসা বেধেছে সে কোন এক ভোরে উসুখুসু করে জেগে মৎস্যপুচ্ছের ন্যায় তার জোড়াপুচ্ছ দুই চারিবার দ্রুত নাড়াইয়া শিস দিয়া আকাশে উড়িয়া যাইবে। অথবা পাশের বাসায় কোন এক কোকিল উচ্চস্বরে ডাকিয়া কুহু কুহু গানে কলরব করিবে। তখন আপনার এই ইচ্ছা, এই সাধ বৃষ্টিতে ভিজার জন্য আর অপূর্ণ থাকবে না। 

২৬/০৫/২০১৬-নাম না জানা মানুষ

Categories

 

আমি আপনার ভাল নাম জানি না। জানলেও যে খুব একটা লাভ হবে বা আমার চিন্তার মধ্যে কোন পরিবর্তন আসবে তাও না। আপনার নাম সোনালী না হয়ে রুপালী হলেও যা, পিংকি, সিন্থিয়া, কিংবা সাথী অথবা কবিতা হলেও তা। যাই হোক না কেন, আমি এখন আপনাকে ঐ সোনালীর আদবে একজন অপূর্ব সুন্দর,  বা সুন্দরী (যদি মেয়ে হয়ে থাকেন) লক্ষি, আর ভক্তের ন্যায়ই দেখব। আপনার সাথে আমার মনের মিল আছে কিনা আমি জানতেও চাইব না, আপনার কি রঙ পছন্দ, কি গান আপনি পছন্দ করেন কিংবা কিসে আপনার কষ্ট হয়, অথবা কিসে আপনার কস্ট লাঘব হয় তার কোন দায়দায়িত্বও আমি নিতে চাইব না। কারন আমি প্রকাশ্য কোন মানবের কাছে প্রকাশ্য হতে চাই না। তবে যেটুকু আমার কাছে মনে হয়েছে আপনি রবিঠাকুর এর লেখা পছন্দ করেন, আপনি বনলতাকে ভালবাসেন, আপনি সোনালী রোদ ভালবাসেন। গ্রীষ্মের উষ্ণতা আপনি ভালবাসেন কিনা আমি জানি না, শ্রাবনের ধারা আপনাকে শিহরিত করে কিনা আমি জানি না, অথবা গ্রামের সেই বুড়িমার আচল ধরে পায়ে পায়ে হেটে নদীর ধারে গোসলের আগে কচিকচি পাতা তুলে মিথ্যে মালা গাথতে পছন্দ করেন কিনা আমি জানি না। তবে যে অপূর্ব নামে ছেলেটির মৃন্ময়ীর ভালবাসায় আপ্লূত হয়ে মন্তব্য করতে পারে, যে নাটোরের বনলতাকে বরন করে নিজেকে বনলতার মত গুনগুন করে গান গাইতে পারে, সে আর যাই হোক শ্রাবন নিশ্চয় তার প্রিয় ঋতুর মধ্যে একটা, অথবা বসন্তের বিকালে পায়ে পায়ে না হোক, ছলছল নেত্রে বুড়িমাকে দেখতে যাওয়ার ছলে অস্পৃশ্য কিছুর দেখা হোক তা নিশ্চয় মন থেকে ফেলে দেওয়া যায় না।

অস্পৃশ্য কোন কিছুর দিকে কখনো হাত বারাবেন না। ঐ অস্পৃশ্য জিনিসে যে একবার হাত বাড়িয়েছে, তার নির্ঘাত হয় মৃত্যু হয়েছে প্রেমের দিশানলে, না হয় সে দেবদাসের পার্বতীর মত বাস করেছে রানী হয়ে কিন্তু মন পরে ছিল ঐ কৃষ্ণকুন্ড গ্রামের দেবদাসের ঘরে। আর যদি তার থেকেও আপনি এককাঠি শক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি নিস্চিত থাকুন, আপনার যোগ্য কোন প্রেমিক বা পেমিকা এখনো এই পৃথিবীতে জন্ম নেয় নাই। আপনাকে ঐ অস্পৃশ্য মানুষের আত্তাকে নিয়েই চিরকুমার বা চিরকুমারি হয়ে থাকতে হবে।

ভয় আপনার রয়েই গেলো। ভয় কি আসলেই রয়ে গেলো? ক্ষমা করে দিবেন যদি আমার এই লেখা আপনার চরিত্রের সাথে মিলে গিয়ে থাকে, আর মাফ করে দিবেন যদি আমার এই অনুভুতি আপনার চরিত্রের কথাও না মিল খায়। সবটাই কল্পনা। আর কল্পনার রাজ্য থেকে কারো কোনদিন ফাসি হয়েছে এই তথ্য কোন আদালতে প্রমান পাওয়া যায় নাই।

২৫/০৫/২০১৬- একটা কোয়ালিটি পূর্ণ সময়

Categories

 

একটা কোয়ালিটি পূর্ণ সময় অতি অল্প হলেও এর মুল্য অনেক বেশি। যেমন, আপনার মন খারাপ? বাইরের বারান্দায় খোলা হাওয়ায় নীল আকাশের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকুন, মন ভাল হয়ে যাবে। অথচ দিনের পর দিন আগুনের মত উষ্ণ চুলার পাশে বসে থাকলেও আপনার মন ভাল হবে না।

বড্ড মন খারাপ হচ্ছিল এ কয়দিন। লম্বা একটা বিরহের মত সময়টা কাটছিল, মনে হচ্ছিল আকাশের নীল আমার চোখে পড়ে না, প্রাকৃতিক গাড় সবুজের গাছগাছালি আমার নজরে পড়ে না, আশেপাশের ছোটছোট ছেলেমেয়েদের কলকাকলিও আমার কানে পৌঁছে না। ভরদুপুরকেও মনে হচ্ছিল মেঘলা আকাশের মত ধূসর।

অথচ আজ মাত্র এক ঘণ্টার একটা অস্পৃশ্য সোনালী মিলন আমার এতোদিনের সব অস্থিরতা, আমার সব অবসাদ, ক্লান্তি দূর করে দিল। প্রান ঠাণ্ডা হয়ে গেলো, মন সতেজ হয়ে গেলো। সোনালী রোদ্দুরের মত দিনটা একেবারে ফিক করে হেসে দিয়ে বল্ল, এখন খুশি তো?

২৫/০৫/২০১৬- জেগে থাকার অনেক নাম

Categories

 

জেগে থাকার আরও অনেক নাম আছে, কখনো এর নাম কষ্ট, কখনো এর নাম ভালবাসা, কখনো এর নাম আতংক, আবার কখনো এর নাম উদাসীনতা, আবার কখনো এর নাম শুধুই ভাললাগা। আপনি কোন সেই নামের কারনে জেগে আছেন? তবে আমি চাই না আপনার জীবনে ঐ কোন একটা নামের কারনে জেগে থাকেন যা মানুষকে আতংক গ্রস্থ করে তোলে, কিংবা কষ্টে রাখে। আর আমার প্রোফাইলের ছবির কথা বলছেন? এটা কোন কাল্পনিক ছবি নয়। এই ছবির মধ্যে আমার অস্পৃশ্য ছোঁয়া আছে, অস্পৃশ্য নান্দনিক কল্পনা আছে। আর ঐ লকেটের দুই ধারে যে চেইনটা দেখছেন, সেটা দিয়ে বাধা একটা হৃদয় যার দুইটা ধারের এক্তায় আমি আর আরেকটায় সে। ভাল থাকবেন

২৪/০৫/২০১৬-ইচ্ছাবিহীন ভুল

Categories

 

ইচ্ছাবিহিন ভুলের কারনে অথবা নিছক একটা মজা করার কারনে আজ আমি তার সহিত অত্যন্ত কষ্টের একটা অনুভুতি উপহার দিয়েছি। এটাকে আমি উপহার বলব উপহাস হিসাবে। ভগবানের কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি কিন্তু মৃদু মৃদু হাসেন আর বলেন, আমি তোমাকে ভালবেসে সৃষ্টি করেছি বলেই তোমার সব অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিতে পারি আর তাই দিলাম। আমরা মানুষেরা ভগবান নই, তারপরেও অনেকে ভগবানের এই বৈশিষ্ট অনুকরন করে মহত্তের উদাহরন রাখেন। তুমিও কি পার এই এমন একটা উদাহরন তৈরি করে আমাকে তোমার বন্ধু বলে মেনে নিতে? আমি তোমার কাছে কখনোই এই আকুতি করতাম না যদি না আমি ঐ নিষ্পাপ অরুন্ধতীর মত সোনালীকে ভাল না বাসতাম, কিংবা কোন এক রোদ্দুরের আভায় আমি কোন সোনালী আকাশকে না দেখতাম। সেও কষ্টে আছে তোমার এই কঠিন এক সময়ের অনুভুতিকে ঘিরে। অস্পৃশ্য এই অনুভুতির জন্য অস্পৃশ্য স্নেহ ছাড়া আমার কাছে তোমাকে দেওয়ার কিছুই নাই।

১৫/০৫/২০১৬-রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে

Categories

 

রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে মৃন্ময়ীর বাল্য আর যৌবনকাল কিভাবে দ্বিখণ্ডিত হইয়া গিয়াছিল তার চমৎকার একটা বর্ণনা করিয়াছিলেন ঠিক এইভাবে-” নিপুন অস্ত্রকার এমন সূক্ষ্ম তরবারি নির্মাণ করিতে পারে যে, তদ্বারা মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করিলেও সে জানিতে পারে না, অবশেষে নাড়া দিলে দুই অর্ধখন্ড ভিন্ন হইয়া যায়। বিধাতার তরবারি সেইরূপ সূক্ষ্ম, কখন তিনি মৃন্ময়ীর বাল্য ও যৌবনের মাঝখানে আঘাত করিয়াছিলেন সে জানিতে পারে নাই। আজ কেমন করিয়া নাড়া পাইয়া বাল্য- অংশ যৌবন হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িল এবং মৃন্ময়ী বিস্মিত হইয়া ব্যথিত হইয়া চাহিয়া রহিল।”

আমিও যেদিন এই অস্পৃশ্য পুরুষটাকে প্রথম আমার অন্তরদৃষ্টি দিয়া দেখিয়াছিলাম, তখন আমিও ব্যথিত হৃদয়ে বুঝিতে পারিলাম, আমার আর বাল্যকাল বলিয়া কিছুই অবশিষ্ট নাই। আমার বাল্যকাল আমার অজান্তেই আমা হইতে কবে বিদায় নিয়া চলিয়া গিয়াছে, আমি বর্ষার কিংবা শরতের অথবা শীতের কোন ঋতুতেই তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। যখন বুঝিতে পারিলাম, তখন আমার শুধু এইটুকু মনে হইল আম্র কাননের শুভিত কোন পুস্পের জন্য যখন মৌমাছিরা দূর দূরান্ত হইতে উড়িয়া আসে, আমিও তাই। কিন্তু আমার ভ্রম কাটিতে বেশি সময় লাগিল না। আমি যাহাকে পুস্প বলিয়া এতদূর উড়িয়া আসিয়াছি, উহা আসলে অন্য কাহারো বাগানের মৌমাছিমাত্র। সেই বাগানে পুস্প আছে, তাহার সহিত মৌমাছির সঙ্গে তাহার দলবলও আছে। বাগানের মালিও আছে, মালিকও আছে। আমি উহাতে বিচরন করিতে পারি কিন্তু উহা আমার নয়। আমি তাহাকে দূর হইতে আপন ভাবিতে পারি কিন্তু কাছে গিয়া বলিতে পারি না, ইহা আমার। আমি ইহাকে অনুভব করিতে পারি কিন্তু জড়াইয়া ধরিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে পারি না, এই পৃথিবীতে আমি আসিয়াছি শুধুমাত্র ইহার পাজর হইয়া।

আমি যাহা দেখিতে পাইতেছি জগতে তাহা হইতে আরও অধিক সৌন্দর্যের আর অধিক আকর্ষণীয় হয়ত কিছু আছে কিন্তু যাহাকে একবার মনে ধরিয়াছে, তাহা হইতে আরও কোন দামী, আকর্ষণীয় অথবা মূল্যবান হাতের কাছে আনিয়া দিলেও মনে হইবে, আমি উহা চাই নাই। আমি চাহিয়াছি শুধু উহা যাহা আমার কাছে এখন অস্পৃশ্যই। তারপরেও সে আমার। মনের ভিতরের যে জগত সেখানে তো আর এই বায্যিক পৃথিবীর কোন আইন বা আদালতের অস্তিত্ব নাই। তাই নীলিমার আকাশের দিকে তাকাইলেও আমি তাহাকে দেখি আবার ঘন বর্ষার বৃষ্টির ছায়াতলেও আমি তাহাকে দেখি। কখনো সে আমাকে জলের মত ভাসাইয়া লইয়া যায় অতল সমুদ্রের গহিনতলে আবার কখনো সে আমাকে জলের স্রোতে ভাসাইয়া দেয় আমার দুই নয়নের ধারা।    

১৪/০৫/২০১৬-বহুবছর আগে যখন

Categories

 

আজ থেকে বহু বছর আগে যখন তোমার এই পৃথিবীতে আগমন হইয়াছিল, তারও অনেককাল পরে আমি এই পৃথিবীর নীল আকাশ দেখিয়াছিলাম, লাল সূর্য দেখিয়াছিলাম, বাতাসের গন্ধ শুকিয়াছিলাম। কিন্তু তখন আমার কাছে ঐ নীল আকাশ শুধু নীলই ছিল, সূর্য তখন একটা জলন্ত অগ্নিপদার্থ হিসাবেই ছিল, বাতাসের গন্ধ আমি ভাল করে মনেও করিতে পারি নাই। কিন্তু যেদিন তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হইয়াছিল, আমি নীল আকাশের মাঝে নীলমেঘ দেখিয়াছিলাম, ঐ মেঘেরা কিভাবে একস্থান হইতে ভাসিয়া ভাসিয়া অন্যত্র চলিয়া যায় তাহা দেখিয়াছিলাম, ঐ প্রখর সূর্যের আলো আমার অপেক্ষার পালাকেও যন্ত্রনা দিতে পারে নাই, বাতাসের গন্ধের সঙ্গে আমি আরও একটা গন্ধ শুকিয়াছিলাম। আর সেটা তোমার গায়ের গন্ধ, তোমার সুগন্ধির গন্ধ, তোমার ক্লান্তির ঘর্মাক্ত শরীরে গন্ধ।

আজ অনেক বছর হইয়া গেলো, আমি এখনো সূর্যকে দেখি, আমি ঐ নীলাকাশ দেখি, ঐ নীলাকাশের নীল মেঘগুলি দেখি, দক্ষিনা বাতাসের গন্ধও শুকি। সবকিছু আগের মতই আছে বলিয়া মনে হয়। শুধু মনে হয় ঐ বাতাসের সাথে তোমার গায়ের গন্ধটা নাই, তোমার সুগন্ধির গন্ধটা নাই, তোমার গায়ের সেই ক্লান্তির ঘর্মাক্ত গায়ের গন্ধটাও নাই।

আমি অনেক খুজেছি তোমায়, ” শিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে…… “

আচ্ছা তুমি কি কোথাও নাই?

১৩/০৫/২০১৬- কোন একরাতে হটাত

Categories

 

কোন একরাতে হটাত যদি বাইরের আকাশের মুষলধারার বৃষ্টির শব্দে কখনো ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি আমার বেলকনিতে এসে দারাই। উম্মুক্ত সেই বেলকনি, বৃষ্টিরচ্ছটা আমার মুখের চারিদিকে এসে আমাকে ভিজিয়ে দেয়। চোখের চশমাটা ঝাপ্সা হয়ে আসে। আমি মুছতে চাইনা সেই কাচের চশমাটা। আকাশের বিদ্যুৎ ঝলকানিতে আমি অন্ধকারে গাছের ঢালগুলি দেখি, পাতাগুলি দেখি, ভিজে ওরা শিতল হচ্ছে ধরণির তটে। গাছের মগঢালে বাবুই পাখির বাসাগুলি অনবরত এদিক সেদিক হেলেদুলে ঢুলছে। পাখিরা নিশ্চিতে হয়ত জেগে আছে তাদের ছোট ছোট কচি কচি বাচ্চাদের নিয়ে। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হয়ত এখন বৃষ্টি নাই, আবার কোথাও না কোথাও হয়ত আরও অঝোর ধারায় ঘূর্ণিপাক হচ্ছে। আমি ঠায় দাড়িয়ে আছি আমার এই ছোট্ট বেলকনির একেবারে কার্নিশের কাছে। সব মানুষেরা এখন ঘুমিয়ে আছে। আমি জেগে আছি। মনে পরছে আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে কোন একদিন তোমার সঙ্গে আমিও এমন একরাতে ঘনকালো আকাশের এই বৃষ্টির ধারা দেখেছিলাম। তখন তুমি ছিলে আমার পাশে আমাকে জরিয়ে ধরে বলেছিলে, আমি সব সময় থাকবো ঠিক এমন করে এই জলের ধারার সঙ্গে।

আজ আমি কিন্তু একা।

…………… তুমি কি আছো এখানে?  

১১/০৫/২০১৬- কিছুক্ষন আগে আমি

Categories

 

কিছুক্ষন আগে আমি তোমার সাথে কথা বলে আমার মন খুব শান্তি পেল। শান্তি পেল এই কারনে যে, গতকালের সব ধারনাতা আমার ভুল। অন্তত এই মুহূর্তে আমি জানলাম যে, আমি যা সন্দেহ করে বার বার মন খারাপ করছি, তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নাই। যদি তার গলার স্বর ঠিক হয়ে থাকে, যদি তার কথার ভাষা ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আমি এটুকু নিশ্চিত যে সে আমাকে ঠকাচ্ছে না। আমি তার সাথে কথা বলার সময় বুঝতেছিলাম, তার গলা ধরে আসছে কষ্টে, তাকে আমি চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না কিন্তু মনে হচ্ছিল তার চোখের কোনা ভিজে আসছিল। আর বার বার সেই এক্টাই প্রতিজ্ঞা খুব জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছিল, যে, আমাকে পারতেই হবে। আমি তোমার আর কারো ই না। যদি তা না হত তাহলে আমি কেন ১ ঘণ্টার মধ্যে আমি আমার টেলিফোন পালটিয়ে ফেললাম? আমি তো আমার আগের নাম্বারটাই ব্যবহার করতে পারতাম। এই কারনে করেছি, আমি আমার জীবনটাই পাল্টিয়ে ফেললাম, আর সেটা তোমার কারনে।

কেন আমাকে এই একই কথা বলে কষ্ট দাও? কেন আমাকে নিয়ে তোমার এতো ভয়? আমি কি কোন ভয়ের কাজ করেছি? তুমি আর আমার মা যদি কখনো আমাকে আবার বিয়ের কথা বল, তাহলে আমি তোমাদের কাউকেই কখনো কিছু বলব না, শুধু কেদে কেদে এক সময় সবার কাছ থেকে হারিয়ে যাব। আমাকে আর তোমরা কোথাও খুজে পাবে না।

আমি তো সুখি, তাহলে কেন আমাকে বারবার এই কথাটা মনে করিয়ে দিচ্ছ যে, আমার এই সুখটা আসলে স্থায়ী নয়, হয়ত তোমরা আমার সঙ্গেই প্রতারনা করছ আমাকে আপাতত ভাবে খুশি এবং সুখি করার জন্য? আমি তো আমার জীবনের সব কথা গুলুই বলেছি, আমি কি বলি নাই? আমাকে আমি যা নিয়ে আছি, তা নিয়েই বাচতে দাও না প্লিজ। আমি আর কারো হতে পারবো না। আমি তো এক জনের হয়েই গেছি। আবার কেন আমাকে জোর করে কস্ট দিচ্ছ?

আমি বুঝতে পারলাম, আমার সব দ্বিধা র অবসান হয়েছে। আমি যা দেখছিলাম, যা ভাবছিলাম, তা আসলে সত্যি না। তুমি আমাএ আছো আর আমারই থাকবে। মহান ভগবান তোমার মঙ্গল করুক। আমি তোমাকে ভালবাসি। 

১১/০৫/২০১৬- খুব শান্তি পেল মন।

Categories

 

খুব শান্তি পেল মন। শান্তি পেল এই কারনে যে, কালের সব ধারনাতা আমার ভুল। অন্তত এই মুহূর্তে আমি জানলাম যে, আমি যা সন্দেহ করে বার বার মন খারাপ করছি, তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নাই। যদি গলার স্বর ঠিক হয়ে থাকে, যদি কথার ভাষা ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আমি এটুকু নিশ্চিত যে  কেউ আমাকে ঠকাচ্ছে না। কথা বলার সময় যখন কারো গলা ধরে আসে কষ্টে, তাকে আম্মিরা চোখে দেখতে পাই বা না পাই, তার চোখের কোনা ভিজে আসবেই। আর বার বার সেই এক্টাই প্রতিজ্ঞা খুব জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছিল, যে, আমাকে পারতেই হবে। আমি তোমাদের কারোরই না। আমি আমার জীবনটাই পাল্টিয়ে ফেললাম, আর সেটা তোমার কারনে নয়, আমার কারনে। কেন আমাকে এই একই কথা বলে কষ্ট দাও? কেন আমাকে নিয়ে তোমার এতো ভয়? আমি কি কোন ভয়ের কাজ করেছি?  

আমি তো সুখি, তাহলে কেন আমাকে বারবার এই কথাটা মনে করিয়ে দিচ্ছ যে, আমার এই সুখটা আসলে স্থায়ী নয়, হয়ত তোমরা আমার সঙ্গেই প্রতারনা করছ আমাকে আপাতত ভাবে খুশি এবং সুখি করার জন্য? আমি তো আমার জীবনের সব কথা গুলুই বলেছি, আমি কি বলি নাই? আমাকে আমি যা নিয়ে আছি, তা নিয়েই বাচতে দাও না প্লিজ। আমি আর কারো হতে পারবো না। আমি তো এক জনের হয়েই গেছি। আবার কেন আমাকে জোর করে কস্ট দিচ্ছ?

আমি বুঝতে পারলাম, আমার সব দ্বিধার অবসান হয়েছে। আমি যা দেখছিলাম, যা ভাবছিলাম, তা আসলে সত্যি না। তুমি আমায়  আছো আর আমারই থাকবে। মহান ভগবান তোমার মঙ্গল করুক। আমি তোমাকে ভালবাসি। ৩০ বছর নির্ভর করে শেষে না বাকী জীবন পরনির্ভরতায় কাটাতে হয়। আমি সেই ভয় টাই পাই এখন। বিশ্বাস ভেঙ্গে নদীর কুলের খরস্রোতা ঢেউ দেখতে যেও না। অসাবধানতায় হারিয়ে যেতে পারো।  

২১/০৪/২০১৬-নবাবের কবরে একদিন

Categories

হ্যালো নবাব, কেমন আছো তুমি?

দেখো কি অবাক করার কান্ড। কোনোদিন কি কখনো ভেবেছো কিংবা আমিই কি ভেবেছি যে, তোমার মতো একজন নবাবের সামনে আমি এভাবে দাঁড়িয়ে সম্ভাষন করবো? তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কোন সম্ভাবনাই তো ছিল না। তুমি যখন এই পৃথিবীতে জন্মেছিলে তখন আমার পূর্ব পুরুষেরাও হয়ত জন্মগ্রহন করে নাই। কি করে তাহলে তোমার সাথে আমার দেখা হতো? তারপরেও আজ আমার সঙ্গে তোমার দেখা হলো। আমি দাড়িয়ে আছি ঠিক তোমার পাশে, তুমি শুয়ে আছ একদম একা, যদিও সেটা একটা কবর। তোমাকে একা পাবো এবং তোমার মত মানুষের সাথে একা দেখা করা যায় এটা আমার কেন এই ভারতবর্ষের কোন জনগনই তো বিশ্বাস করবে না। তোমার রানী(দের) যেখানে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য অনুমতি লাগতো সেখানে আমরা কোন ছাড়! কিন্তু দেখো, অদৃশ্য বিধাতার কি ক্ষমতা, তিনি সব পারেন।  তাও আবার প্রায় চারশত বছর পর আমার সঙ্গে তোমার দেখা। আমি জীবিত আর তুমি মৃত। জীব-মৃতের এই খেলা শুধু একজনই পারেন, আর সেটা বিধাতা। তাঁর কাছে সময় যেমন স্থবির, জীবন ও স্থবির। জীবিত আর মৃতের মাঝখানে তিনি শুধু ফারাক রাখেন অদৃশ্য কোনো এক জাল, যা আমরা চোখে দেখি না, কিন্তু শেষে এক জায়গাতেই মিলিত করেন।

যাক সে কথা, ঈশ্বরের ক্ষমতা নিয়ে আমি তোমাকে কোনো প্রশ্ন করতে চাই না, না তোমার কাছে এর কোনো উত্তর আছে। যেহেতু তোমার সঙ্গে আমার আজ দেখা হয়েই গেলো, আমার কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল তোমাকে নবাব। তোমাকে সব কিছুর উত্তর দিতে হবে এমন কোন কারন নাই, কারন তুমি নবাব, অনেক কিছু তুমি আমাদের মত সাধারন মানুষকে নাও জানাতে পার। তবুও যদি সম্ভব হয় শুনতে পারলে হয়ত ভাল লাগবে।

আমি তোমাদের আমলের সেই উপমহাদেশের রাজনীতি বুঝি না, কিভাবে দেশ চালাতে হয়, তাও আবার উপমহাদেশের মত একটি সাম্রাজ্য, তারও কোন আইডিয়া আমার নাই। তারপরেও আমি খুব অবাক হই কি করে তুমি এতবড় একটা উপমহাদেশ তুমি তোমার নিয়ন্ত্রনে রেখেছিলে? তুমি কি কোন ক্যাডার বা রাজনৈতিক দলের মত দল করতে যারা তোমার এইসবে সাহাজ্য করতো? তোমার কোন বিরুধী দল ছিলো কি নবাব? তোমার সম্পদের হিসাব আমি জানি না কিন্তু শুনেছি তোমার নাকি অনেক সম্পদ ছিল। তুমি কি কোন ব্যবসা করতে নাকি নবাবীই তোমার পেশা ছিলো? তুমি কি কখনো কোন বেতন নিয়েছো? আর নিলে কত টাকা করে বেতন নিতে? আচ্ছা নবাব, তোমার কি কোন ব্যাংক একাউন্ট ছিল? সুইস ব্যাংক বা বিদেশী কোন ব্যাংক? তোমার কোনো ক্যাশ টাকা পয়সা লাগতো না? রানীরা তোমার কাছ থেকে কখনো ক্যাশ টাকা পয়সা চাইতো না? প্রজারা কি তোমাকে খুব ভালবাসতো? তোমাকে কি কেউ ঘৃণা করতো কখনো? আর কেউ যদি তোমাকে কখনো ঘৃণা করতো, তাহলে তুমি তাকে কি করতে? মেরে ফেলতে? গুম করে ফেলতে? নাকি বিরোধী মতবাদের কারনে তাকে রাজ্য ছাড়া করতে? তোমাদের সময় কি কোন টক শো হতো? সেই টক শো তে কি কেউ বিজ্ঞজনের মতো তোমাকে বা তোমার শাসন কালকে প্রশ্নবিদ্ধ করতো? নাকি সভাসদ পরিষদে তুমিই শুধু একা কথা বলতে? তুমি কি কখনো ভেবেছিলে তুমি একদিন এই পৃথিবীতে থাকবে না? কখনো কি তোমার এই উপলব্দি হয়েছিল যে তোমার মরনের পর তোমাকে নিয়ে জনগন সমালোচনা করবে? কখনো কি ভেবেছিলে যে, তোমার গড়া এই অট্টালিকা, এই সাম্রাজ্য, তোমার চেয়ার, তোমার খাট, তোমার সবকিছু অন্য একজন ব্যবহার করবে আর তুমি অন্য সবার মত এই ভিজা মাটির নিচে স্যতস্যতে জায়গায় কোন এক অন্ধকার পরিবেশে শুয়ে থাকবে? কখনো কি তোমার জীবদ্দশায় এই উপলব্ধিটা হয়েছিল যে, তুমি আর কখনই এই পৃথিবীর আলো বাতাস, গাছ, ফল মুলাদি, আতর সুগন্ধি, রানী রমণী, সোনা দানা, ক্ষমতা, কোন কিছুই উপভোগ করতে পারবে না? এমন কি তুমি আর ফিরেও আসতে পারবে না? এমন কখনো কি তুমি একবারের জন্যও ভেবেছিলে?

তুমি কি এখনো আগের মত দেশি বিদেশী অনেক পানীয়, রাজ্যের সব সুন্দরীদের সমন্নয়ে বাইজীর আসর, শ্বেত পাথরের কিংবা কষ্টি পাথরে গড়া মোজাইক ফ্লোর, সোনার পালঙ্ক, অনেক মহামুল্যবান হিরের আংটি, জহরতের মালা, আর্দালি, পাইক পেয়াদা যে সব তোমার এখানে একসময় ছিল, তা পাও ওখানে নবাব? তোমার আশেপাশে কি তোমার অতি প্রিয় সেনাপতি, মন্ত্রী মহোদয়, উজির নাজির আছে যারা এক সময় তোমার অংগুলীর ইশারায় সারা দেশ কাপিয়ে দিতো? তোমার একা থাকতে এখন কষ্ট হয় না? তোমার কি আবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে তোমার সেই রাজকীয় প্যালেসে কিংবা ঘুমাতে ইচ্ছে করে ঐ সোনার খাটে যা তুমি পারস্য রাজ্য থেকে ছিনিয়ে এনেছিলে একদিন? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে সব।

জানো নবাব, আমার মাঝে মাঝে তোমাকে বেশ বোকা বোকা বলে মনে হয়। তুমি এতকিছু বুঝতে পেরেছিলে, উপমহাদেশ কিভাবে চালাতে হয়, কিভাবে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্য দখল করতে হয়, কেমন করে বিনা ব্যবসায় হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিজের করে নিতে হয়, অমর হয়ে থাকার জন্য কত বিশাল বিশাল প্যালেস বানাতে হয় কিন্তু তোমার মরনের পর তোমাকে কে দেখভাল করবে, তোমার এই সিংহাসনে যেন কেউ না বসতে পারে, শুধু তোমার আদেশই যেন আজিবন চলে, সেই ব্যবস্থাটা কেন করে যেতে পারলে না নবাব? বিধাতার দেওয়া ধর্ম পাল্টে তুমি ‘দ্বীনে এলাহি’ও করে ফেললে, কোন পরোয়া করলে না। তুমি তোমাকে তাঁর সমকক্ষ ভাবতে পারলে, অথচ তুমি তাঁরসঙ্গে আরও একটু সমঝোতা করলেই কিন্তু তুমি অনেক কিছু করতে পারতে। এটা কিন্তু তুমি বোকামী করেছো।

নবাব থাকা অবস্থায়ন ন্যায় অন্যায়, সৎ অসৎ কোনো কিছুই পরোয়া করলে না, এর মধ্যে কোন ব্যবধান করলে না, মানবাধিকার, ভদ্রতা, সৌজন্যতা, বিচার-অবিচারের মধ্যে তুমি কিছুই ফারাক করলে না, তোমার যা ইচ্ছে তাই তুমি করতে পারলে কিন্তু তুমি কি একবারো ঐ অদৃশ্য বিধাতে কিছু ঘুস দিয়ে তুমি অমরত্ব নিতে পারলে না নবাব? তোমার তো কোন কিছুরই কমতি ছিল না। কি হত যদি উপমহাদেশের কিছু জায়গা, জমি, অথবা সোনা দানা, জহরত, হিরা, সুন্দরি রমণী দিয়ে ঐ অদৃশ্য ভগবানকে বশ করতে? তাহলেই তো তুমি আজ বেচে থাকতে পারতে, তোমার সঙ্গে আজ আমার সরাসরি জীবন্ত শরীরে দেখা হতো।

আচ্ছা নবাব, তুমি তো প্রায় চারশত বছর আগে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছো। তুমি দেখতে কি এখনো আগের মত আছো? তোমার গলায়, তোমার হাতে যেসব সোনাদানা হীরা জহরত ছিল সেগুলি কি তোমার সেনাপতিরা, তোমার উপদেষ্টারা তোমার সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিলো? তুমি কি ওগুলো এখনো হাতে গলায় মাথায় পড়ে থাকো? নাকি খুলে রেখেছো? কোথায় রেখেছো এখন এগুলো? তুমি কি আরও বৃদ্ধ হয়েছো? নাকি যেহেতু কোন টেনশন নাই, ফলে তুমি আরও সুন্দর হয়েছো? তোমার সেনাপতিরা, তোমার সুন্দুরি রমণীরা তোমার অসংখ্য ছেলেপুলেরা, নাতি নাতকুরেয়াও আজ অনেকেই এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে যাদেরকে তুমি খুব ভালবাসতে। তোমার সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে? শুনেছি, মানুষ মরার পরে নাকি কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর সারা শরীর পচন ধরে, পোকারা খেয়ে বিনাশ করে শরীর, তারপর ধীরে ধীরে হাড়ও মাটির সাথে মিশে যায়। মাথার খুলিটা কেউ দেখলে এটাও বুঝা যায় না, সে কি রাজা ছিলো নাকি প্রজা? নাকি মহিলা অথবা পুরুষ? তোমারো কি একই হাল হয়েছে নবাব? নাকি তুমি অনেক শক্তিশালী ছিলে বলে পোকারাও তোমাকে বিনাশ করতে পারে নাই?

জানো নবাব, আমি মাঝে মাঝে খুব অবাক হই এই ভেবে যে, তোমার অনেক বংশধরেরা কিন্তু এখনো এই পৃথিবীতে বেচে আছে। কিন্তু কে কোথায় কিভাবে বেচে আছে তাদের কোন হিসাবও আমরা জানি না। আর তারাও যে কেনো বলে বেড়ায় না যে তারা নবাবের বংশের লোক! কেনো নবাব? কি জানি হয়ত তোমার বংশের লোক বলে জানাজানি হয় গেলে না জানি আবার কি বিপদ হতে পারে এই ভেবে হয়ত বলে না। হয়ত এমনও হতে পারে, তুমি জনগনের উপর টর্চার করেছো এই অভিযোগে তারা এখন তোমার বংশের উপর খুব রাগান্বিত, হয়ত এমনো হতে পারে যে তোমার অবিচার, অন্যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন, তোমার বেহিসাবি খরচের তালিকা ইত্যাদির কৈফিয়ত তারা দিতে পারবে না বলেই এখন নিসচুপ জীবন বেছে নিয়েছে। আবার এমনও হতে পারে তোমার অন্তর্ধানের পর তোমার এই বিশাল সাম্রাজ্য ধরে না রাখার কারনে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় অগোচরে থাকাই ভাল এই যুক্তিতে প্রকাশিত হয় না, আবার এমনও হতে পারে আসলেই কেউ আর বেচে নেই তারা। বড় অবাক লাগে যে, এককালের এতো প্রতাপশালী নবাবেরা এভাবেই বংশসহ হারিয়ে যায় এই পৃথিবীর বুক থেকে। ওদের শুধু ইতিহাস বেচে থাকে কিন্তু বংশ বেচে থাকে না। অথচ তোমার আশেপাশে যারা ছিল তাদের অনেকের বংশধরেরা এখন অনেক বড় লোক, কেউ আবার রাজনীতি করে, কেউ বড় বড় ব্যবসায়ী, ওদের অনেক টাকা, সুইস ব্যাংকে, বিদেশী ব্যাংকে, আরও অনেক দেশের ব্যাংকে। ওরা এক দেশের সরকারের আরেক দেশের সরকারের সঙ্গে বসে গল্প করে, তাস খেলে, মদ খায়, ফুর্তি করে, আরও কত কিছু? কিন্তু তোমার বংশের কোন লোককেই আমি চিনি না নামও জানি না আদৌ ওরা কেউ আছে না নাই।

যাক, নবাব, আমাকে এখানে অনেক সময় থাকতে দিবে না কারন তুমি নবাব, তোমার পাশে অনেক্ষন দাড়াতেও আমাকে দিবে না। আবার কখনো যদি তোমার এখানে আমার আসা হয়, তোমার সঙ্গে আমার আবার কথা হবে, যদি পারো আমাকে একটু জবাবগুলো দিও।

তুমি ভাল থাকো নবাব।      

১৫/০৪/২০১৬- পহেলা বৈশাখের উপলব্ধি

Categories

মীরপুর গোলারটেক, ঢাকা 

শহরের পহেলা বৈশাখ আমার কাছে ভাল লাগুক আর নাই বা লাগুক, যখন দেখি আমার সন্তানেরা তাদের ভাই বোনদের নিয়ে, কাজিনদের নিয়ে কিংবা ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এক আনন্দের পরিবেশে হৈচৈ করছে, মনে হয় পহেলা বৈশাখই হোক আর চৈত্র মাসের গরমের অনুষ্ঠানই হোক অথবা কারো জন্ম-বিবাহ কিংবা ক্লাসে ভাল রেজাল্ট করার উপলক্ষই হোক, খারাপ কি? অন্তত পরিবারের মানুষগুলো তো আনন্দ করছে। সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। মন ভাল হয়ে যায়, যাই রান্না হোক তৃপ্তির সাথে ভাগাভাগি করে হৈহুল্লুর করে সময়টা কেটে যায়। অনেক ব্যস্ততার মধ্যে সবাই কিছুক্ষন সময়ের জন্য হলেও একসঙ্গে থাকা যায়।

আমাদের এই ব্যস্ত সময়ের মধ্যে তিন চার বছরের বাচ্চাটাও তার লেভেলে ব্যস্ত। অংক কোচিং, বাংলা কোচিং, ইংরেজি কোচিং, ক্লাস পরিক্ষা, ফাইনাল পরীক্ষা, পরাশুনা, রুটিন ক্লাস, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, আহ আরও যে কত কিছু। সবাই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মাঝে তবুও তো ভেলেন্টাইন্স ডে এর নামে, ফাদারস ডে নামে, মাদারস ডে নামে, যেই নামেই হোক না কেন, কিছু তো সময় পরিবারের মানুষগুলো একটা সময় বেছে নেয় যেন পরিবারের সবার সঙ্গে একসাথে একটা সময় কাটানোর উপলক্ষ নিয়ে ছুটে চলে আসে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, দেশ থেকে অন্য দেশে, নিজের মানুষদের দেশে, নিজের পরিবারের দেশে। আগে তো আমরা বড়দের সালাম করতাম আর সালামের জন্য মনে একটা বাসনা থাকতো সালামি পাব, আদর পাব, আদরটা তখন খুব বেশি বুঝতাম না, সালামিটাই ছিল মুখ্য বিষয়। আজ আমি সালামি কেউ না চাইলেও সালামি দিতে পছন্দ করি। আমি আমার সেই ছোট বেলার অনুভুতি গুলোকে মনে করে বিষণ্ণ হলেও মনে এক আনন্দ পাই।

আজকে আমাকে ‘তুই’ বা ‘তুমি’ করে বলার লোকজনও কমে যাচ্ছে, এক সময় হয়ত আসবে ‘তুই’ করে বলার লোকগুলো আর কাছাকাছি থাকবেই না। হয়ত এই ইলিশওয়ালা পহেলা বৈশাখের জন্যই হোক আর যে কোন ডে এর উপলক্ষেই হোক, এইসব আপনজনগুলো তো একটা সময় করে কাছে আসে। আর এই কারনেই কোন ডে এর বিপক্ষে আমি না। নির্মল আনন্দটাই আমি খুজে নিতে চাই এইসব উপলক্ষগুলোর মধ্য থেকে। কোনটা ক্রিস্টিয়ান আর কোনটা এরাবিক কিংবা কোনটা হিন্দুয়ানী আর কোনটা বাঙ্গালির সেভাবে আমি দেখতে চাই না। আমি চাই এই ছবিগুলোর মধ্যে সবার মনে যে আনন্দ, যে ভালবাসা আর যে তৃপ্তির চেহারা ফুটে উঠেছে, সেটাই সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান আমার কাছে। এরা কেউ বিদেশ থেকে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য সময় বেছে নিয়েছে, কেউ পরাশুনা আগে থেকেই শেষ করে নিরঝলা আনন্দের জন্য ভাইবোন, শ্বশুর শাশুড়ি, খালা, খালু, ননদ ননদিনী, দুলাভাই, শ্যালক, সব বয়সের এক অপরূপ পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে ছুটে এসেছে। এর থেকে আর বড় কি অনুষ্ঠান হতে পারে? হোক সেটা পান্তা ইলিশের পহেলা বৈশাখ অথবা হোক সেটা ভ্যালেন্টাইন্স ডে। বেলা শেষে এই আনন্দটুকুই দরকার। সবার জন্য আমার ভালবাসা। 

১৪/০৪/২০১৬-পহেলা বৈশাখ

Categories

৬৮/৬, মীরপুর গোলারটেক, ঢাকা-১২১৬ 

আজকাল পহেলা বৈশাখ আমাকে খুব বেশি পুলকিত করে না। কিংবা পহেলা বৈশাখের জন্য আগের দিন বাজার ঘুরে ঘুরে দেশি বা বিদেশী ইলিশ কিনে এনে পরের দিন পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত খেতে হবে এই অনুভুতিতে আমার মনে খুব আনন্দের শিহরন জাগায় না। কিংবা লাল বা হলুদ পাড়ের শাড়ীর অপরূপ সৌন্দর্যে শহরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা রমণীদের দলবেঁধে হাটাহাটি, পার্কে ময়দানে মেলায় ঘুরাঘুরি আমার মনকে যে পুলকিত করে তাও না। এর মানে এই নয় যে পহেলা বৈশাখ আমি মানি না বা কেউ মানলে সেটা আমার পছন্দের নয়। কিন্তু আমি যা মিস করি তা হচ্ছে-পহেলা বৈশাখের দিনে আমার সেই ছোট বেলার আনন্দের মেলার অনুভুতি, মেলার সকালের আয়োজন আর হৈচৈয়ের মুহূর্ত গুলো। হতে পারে এই কারনে যে, এখন বয়স হয়ে গেছে, আমাদের সেই পহেলা বৈশাখের মেলার অনুভুতি এখন আর সেই অনুভুতি নাই কিংবা মেলার ধরন পালটে গেছে এই কারনে।

সকাল থেকে মেলার জায়গায় হরেক রকমের দোলা, কাছের নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন, হাটে হাটে মাঠে ময়দানে মাটির তৈরি পুতুল, বাঁশি, খেলনা, আরও যে কত কিছুর আয়োজন দেখেছি তার কোন পরিসীমা নাই। সকাল হতেই আমরা যারা ছোট ছিলাম, মেলায় যাব এই আনন্দে নদীতে গিয়ে কেউ উলঙ্গ হয়ে কেউ বা আবার কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে কিছুক্ষন কি যে লাফালাফি করতাম এখন ভাবলে সত্যি হাসি পায়। আমার মনে পরে না পহেলা বৈশাখের জন্য আমরা বাসায় ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা খেয়েছিলাম কিনা। জীবনের অনেকগুলো বছর আমি আমার গ্রামে কাটিয়েছি কিন্তু কোনদিন দেখি নাই ইলিশ মাছ পহেলা বৈশাখের একটা প্রধান উপকরন হয়েছিল। বরং পুটি মাছের শুটকি দিয়ে মা ঝাল ভর্তা বানাতেন, গরম গরম দেশি চালের ভাত রাঁধতেন, আলু ভর্তা কিংবা ঘরের চালে, গাছের ঢালের ফলন্ত কিছু সবজি কেটে গরম গরম ভাজি দিয়ে মা আমাদের নাস্তা করিয়ে দিতেন। সারাদিন কোথায় থাকি কি খাই, কখন খাই, এই চিন্তায় মা আমাদেরকে পেট পুরে খাওয়াইয়া দিতেন যাতে আনন্দের ছলে কোথাও কিছু না খেলেও ক্ষুধা না লাগে। পান্তা ভাত তো সব সময়ই খাই, এটা কোন বিশেষ উপকরন নয় যে, ঘটা করে পান্তা পেতে রাখতে হবে আর সেই ভাত পহেলা বৈশাখে খেয়ে মেলায় যেতে হবে। চাইনিজ নববর্ষে যেমন চাইনিজরা চাইনিজ তৈরি করে পহেলা চাইনিজ পালন করে না, ইংরেজি নববর্ষে যেমন ইংরেজরা ইংলিশ খাবার তৈরি করে পহেলা জানুয়ারি পালন করে না, তেমনি বাংলাদেশের মুল ধারার বাঙালিরাও পান্তা ভাত খেয়ে পহেলা বৈশাখ পালন করতে আমি দেখি নাই।

এই দিনে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পন্য নিয়ে আমাদেরই গ্রামের চেনাজানা লোকেরা মাথায় বেতের ঝুরি নিয়ে হরেক রকমের মাটির খেলনা, বেতের খেলনা, প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে মেলার মাঠে চলে আসতেন। দেখা যেত আমাদেরই ক্লাসে পরে কোন এক বন্ধু তার বাবার সঙ্গে অই সব সামগ্রী নিয়ে দোকানে বসে গেছে। আমরাও তার সঙ্গে ক্রেতা বিক্রেতা হয়ে যেতাম। বাড়ীর গিন্নীদের বাড়িতে তৈরি গাছের বিভিন্ন ফল মুলাদি দিয়ে বানানো মিস্টি আচার, তেঁতো আচার, কিংবা ঝাল ধরনের আচার বানিয়ে মহিলারাও কেউ কেউ মেলায় নিয়ে আসতেন। আমাদের পকেটের বাজেট হয়ত বা চার আনা, আট আনা, কিংবা বেশি হলে এক টাকা দু টাকাই থাকতো। সেতা আবার পহেলা বৈশাখের অনেক আগে থেকেই বরদের কাছ থেকে চেয়ে কিংবা মায়েদের কাছ থেকে অনুনয় বিনয় করে নিতে হত। নাগরদোলায় উঠার জন্য কত যে লাইন ধরে থাকার অপেক্ষা। পরিচিত কোন এক বড়রা হয়ত আদর করে কাউকে কাউকে বিনা পয়সায়ই দু একবার নাগর দলায় আমাদেরকে সুযোগ করে দিতেন। কোন পয়সা নিতেন না।

চারিদিকে বাঁশীর উচ্ছৃঙ্খল শব্দ, যার যার মত করে যা খুশি বাজিয়েই চলছে, হৈচৈ এর শেষ নাই। যে বাচ্চাটি এক বছরেরও বয়স, পহেলা বৈশাখ না বুঝলেও সেও হয়ত তার বাবা, মা কিংবা বোনের ভাইয়ের কোলে চরে মেলায় চলে এসেছে। হারিয়ে যাওয়ার ভয় নাই, বাড়ীতে ফেরার জন্য পরিচিত লোকের কোন অভাব নাই, চুরি ডাকাতির বালাই নাই, ছিনতাইয়ের কোন মনোভাব নাই, এক অনাবিল আনন্দ আর মেলা।

মেলাশেষে ঘরে ফেরার আরেক রূপ। দলবেধে পাশাপাশি গ্রামের আইল ধরে বাড়ি ফেরা। হাতে হাতে বাঁশি, পুতুল কিংবা অতি নগন্য অথচ মনে হয় অতি প্রিয় কিছু খেলনা হাতে নিয়ে নিয়ে গ্রামের মেঠো পথ ধরে দিনের শেষ বিকালে কিংবা সন্ধার আবছা আলোছায়ায় ঘরে ফেরা, ঘরে ফিরে একে অপরের নব্য কেনা সরঞ্জামাদি দেখাদেখি করে কখনো মন খারাপ করার মত অনুভুতি, যেন, আহা আমি কেন ঐ জিনিসটা কিনতে পারি নাই, কিংবা আহা আমি কেন দেরি করে মেলায় গেলাম যে আমার বন্ধু রহিমের কেনা বাশিটা আমি কেনার আগেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

বোনদের কেনাকাটা একরকম, আমাদের ছেলেদের কেনাকাটা ছিল অন্য রকমের। বোনেরা কেউ লিপিস্টিক, মাথার ফিতা, তিব্বত ব্রান্ডের স্নো পাওডার, আলতাও মিস যায় নাই। কেউ কেউ আবার কাছে হরেক রকমের চুড়ি, পায়ে পরার অদ্ভুত ডিজাইনের পায়রা কত কিছুই না কিনত আমাদের বোনেরা। আমার মনে পরে মেলা থেকে কেনা সরঞ্জামাদি আমরা কেউ কেউ ঘুমানোর সময় পাশে বালিশের কাছেই রেখে ঘুমাতাম যেন কতই না মুল্যবান সম্পদ। আবেগটাই আলাদা।

বড়রা কেউ কেউ পাঞ্জাবি পরে একে অপরের সঙ্গে চা বিড়ি টানতে টানতে দিনের অনেকটা সময় পার করে দিয়েছেন। দিনশেষে তারাই হয়তা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কেনা কাটার সামগ্রীর আনন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামের কিছু জোয়ান ছেলেপেলের দ্বারা আয়োজিত কোন এক গানের আসর কিংবা মল্লযুদ্ধের অনুষ্ঠান করতেন। নৌকা বাইচের শেষে উঠতি বয়সের ছেলেরা পাড়ার মুরুব্বিদের সঙ্গে জিতে আনা পুরুস্কারের সঙ্গে বীর বীর অনুভুতির একটা ভাব থাকতো। এ এক মেলা যার মাধ্যমে এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের ভাবের সৃষ্টি হত, বন্ধন মজবুত হত, নতুন নতুন সম্পর্কের হাল ধরে আরেক বছরের হালখাতা তৈরি হত। হালখাতা তৈরি হত ব্যবসার, হালখাতা তৈরি হত নতুন নতুন সম্পর্কের। এভাবেই আমি আমার সেই ছেলে বেলার বৈশাখী মেলার আনন্দটা উপভোগ করেছিলাম।

আজ আমি সেটা খুব মিস করি।

১২/০৪/২০১৬–সাফল্য এবং তার পথ নির্দেশনা

Categories

সাফল্যের পথ কখনোই ইস্পাতের মতো এতো নিখুত নয়। এই সাফল্যের দরজায় যেতে হলে অনেক কঠিন দূর্গম পথ বেয়ে বেয়েই উপরে উঠতে হয়। আর এটা একদিনেই হয়ে যাবে এটা আশা করা শুধু বোকামিই নয়, এটা একটা মূর্খতাও। সাফল্যের শেষ প্রান্তে যেতে যেতে পথে কত যে কুকুর, কত যে হিংস্র পশু, কত যে দাবানলের মতো অগ্নিজলা বন, আর প্রাকৃতিক ঝড় পেরুতে হয়, তার কোনো ইয়াত্তা নাই। যারা আজ বড় হয়েছে, তাদের প্রতিটি জীবনের কাহিনী কোথাও না কোথাও এক। সাফল্যের এই গন্তব্যপথে যেতে যেতে একটা কথা মনে রাখা অতীব বাঞ্চনীয় যে, কেউ বন্ধু হয়ে শত্রুর আচরন করতে পারে আবার কেউ শত্রু হয়েও শত্রুর মতো আচরন নাও করতে পারে। অনেক কুকুররুপী মানব, কিংবা অনেক মানরুপী কুকুরও সারাক্ষন ঘেউ ঘেউ করতেই পারে, কিন্তু এসব কুকুরদেরকে, হায়েনাদেরকে প্রতিটি ক্ষেত্রে পাথর মেরে মেরে যদি সামনে এগুতে হয়, তাহলে সাফল্যের গন্তব্যপথের নিশানা ভুলে যাবার সম্ভাবনা থাকে। থাকে দিক নির্দেশনা হারিয়েও যাওয়ারও। তাই, কুকুর থাকবে, কুকুরের ঘেউ ঘেউ থাকবে, তার মানে এ নয় যে, প্রতিটি কুকুর, আর প্রতিটি বাধাকে মনোযোগ দিতে হবে। জানতে হবে ঠিক সথিকভাবে, কোন বাধাকে সরাতে হয়, আর কোন বাধাকে কোনো মনোযোগ দেবার কোনই প্রয়োজন নাই। 

সাফল্যের এই চাবিকাঠির আরেকটা প্রধান দিকনির্দেশনা হচ্ছে, নিজের মুখকে নিয়ন্ত্রন করা। মুখ এবং এর দ্বারা ছুড়ে দেয়া ভাষা এমন এক অস্ত্র যা একবার ছোড়া হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না। আর এর ফলে টার্গেটে কতটা ক্ষতি হলো তার থেকে বেশি ক্ষতি হয়ে আসে নিজের ফলাফল। যে কোন পরিস্থিতিতেই কেউ যখন এমন এক অবাধ্য যন্ত্রের মতো মুখের বুলি বুলেটের মতো কেউ ছুরে দিয়ে ভাবে, সে অনেক ভাল কাজ করে ফেলেছে, এটা হয়তো মনের শান্তনার জন্য যথেষ্ট কিন্তু সাফল্যের বড় অন্তরায়। ফিরিয়ে নেয়ার কোনো পথা খোলা থাকে না বলে হয় তার জন্য ক্ষমা চাওয়া নতুবা ব্যর্থতার গ্লানি মাথায় নেয়ার সামিল হয়ে উঠে। শুধু তাইই নয়, এটা চিন্তা করাও বোকামি যে, সবাই ছুড়ে দেয়া পরিত্যক্ত বানীর বিপরীতে ক্ষমা মেনে নেবে বা ক্ষমা করে দেবে। এ চিন্তাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই এই সুলভে পাওয়া যন্ত্র দ্বারা অসুভ কোন নির্মম কথাও আমাদের চিরদিনের স্বপ্নের উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে অনেক ভেবে চিনতে এর প্রয়োগ করা উচিত।

সাফল্যের পথে যতো বেশী পরিমান বিশ্বস্ততা অর্জন করা যায়, ততো সহজ হয়ে উঠে দূর্গম গিরিপথের সেই সাফল্য ভ্রমন। আর এই বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য সবচেয়ে বেশী যা কার্যকরী ভুমিকা রাখে তা হল, প্রতিনিয়ত সত্যকে আকড়ে ধরে থাকা। একটা মিথ্যা বা একটা অর্ধ মিথ্যাই যথেষ্ট সব বিশ্বস্ততা হারিয়ে ফেলার জন্য। আর একবার যদি এই মিথ্যার জালে কেউ বাধা পড়ে, তখন আর যাইই হোক সাফল্যের দেখা পাওয়া অনেক আওহজ হয়ে উঠে না।  

আরো একটা অদৃশ্য শক্তি সবার অগোচরে প্রতিনিয়ত কাজ করে। আর সেই মহাশক্তিধর গোপন শক্তিটি হচ্ছে, নিগূড় ভালবাসার বহিরপ্রকাশ। ভালোবাসা হচ্ছে একটা আংটির মতো। এর যে কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ কেউ বলতে পারে না কিন্তু এর উপস্থিতি সার্বোক্ষনিক উপলব্দি করা যায়। ভালোবাসার বহিরপ্রকাশ যতো বেশী প্রখর, বিশ্বস্ততা অর্জন ততো সহজ, বিশ্বস্ততা যতো বেশী সহজ অনিয়ন্ত্রিত ভাষা ততো নিয়ন্ত্রিত। আর এই ভাষা যতো নিয়ন্ত্রিত, ভালো বন্ধুর সংখ্যা ততো বেশী। ভালো বন্ধুর সংখ্যা যতো বেশী, দূর্গম গিরিপথে সহচর ততো বেশি। দূর্গম পথে যতো বেশি ভাল সহচর, পথ ততো সহজ। আর এখানেই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।  তবে একটা ভয়ের মতো উপসর্গ থেকেই যায় এখানে। কেউ কেউ ভাল বন্ধু হতে পারে বটে কিন্তু সবাই ভাল ভ্রমনসংগী হয় না। এই সংগী নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ক্রাইটেরিয়া জানা থাকা বড্ড বেশী জরুরী। যেমন, সৌন্দর্য এবং সুন্দর চেহারার সব মানুষই ভাল হবে এই কথাটা ঠিক নয় কিন্তু সব ভাল মানুষই সুন্দর মনের।

সাফল্য যখন ধীরে ধীরে কাছে আসতে থাকে, এর একটা রুপ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। আর সেটা হচ্ছে ক্ষমতা। সাফল্যের ওজন যতো বেশী, ক্ষমতার ভার ততো বেশী। তাই, যখন ক্ষমতার ধার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, নিজের উপর নিয়ন্ত্রন যদি ততোতা না রাখা যায়, এক সময় অনিয়ন্ত্রীত ভারে তা চুরান্ত রুপ পাবার আগেই ভুমিতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য সবসময় মনের মধ্যে এই ভাবনা থাকা খুব জরুরী যে, ক্ষমতা শুধু মানুষকে ক্ষমতাই দেয় না, এটা দিয়ে মানুষকে ক্ষতিও করা যায়। তাই ক্ষমতার সাথে ভালবাসার শক্তিকে বেধে ফেলা অনেক দরকার। কারন ভালবাসা দিয়ে কোনো মানুষের কখনো ক্ষতি হয়েছে এমন নিদর্শন ইতিহাসে নাই। তাই শুধু ক্ষমতা নয়, ভালবাসার ক্ষমতা প্রয়োগ হচ্ছে সাফল্যের সেই গোপনশক্তি যার দ্বারা জগত সুন্দর হয়। এর দ্বারা সুখী আর আরামদায়ক ফলাফল হাতের মূঠোয় আসে। তাতে আনন্দের সাথে আসে সুখ। সুখী হতে গেলে তাই জীবনে এমন অনেক অপ্রয়োজনিয় জিনিষ ভুলে যেতে হয়।

আমি সব সময় সক্রেটিসের সেই কথাটার সাথে একমত হতে পারি নাঃ যার কাছে টাকা আছে তার কাছে আইন খোলা আকাশের মত আর যার কাছে টাকা নাই তার কাছে আইন মাকড়শার জালের মত। এটা হয়তো কিছু সাময়িক সময়ের জন্য ঠিক কিন্তু লম্বা ইতিহাসে এর সত্যতা অনেকাংশেই বিলুপ্ত হয়েছে। এমন কি সক্রেটিসের বেলায়ও।

২৪/০২/২০১৬-আমার প্রিয় মা জননীর দল,

 আমার প্রিয় মা জননীর দল,

আমি জানিনা যখন তোমরা আমার এই পত্রখানা পড়িবে তখন তোমাদের কত বয়স হইবে কিংবা আদৌ তোমরা এই পত্রখানা পরিতে পারিবে কিনা কিংবা পড়িলেও কখনো এর মর্মার্থ তোমরা বুঝিতে পারিবে কিনা। আর বুঝিতে পারিলেও কিভাবে এর অর্থ বুঝিবে তাও আমি জানি না। তবুও আজ মনে হইল তোমাদের উদ্দেশে আমার কিছু কথা বলা দরকার যাহা আমার মা আমাকে প্রায় দুই যোগ আগে বলিয়াছিলেন। আমি আমার  "উচ্ছিষ্ট সময়ের ডায়েরি" নামক ব্যক্তিগত ডায়েরিতে এই মুহূর্ত গুলি লিখিয়াছিলাম। তাহা আমি আজ তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করিতে চাই।

"............আজ হইতে প্রায় দুইযুগ আগে আমি যখন আমার মাকে আমার প্রথম ভালবাসার মেয়ের কথা জানাইয়াছিলাম, তখন তিনি মুচকি হাসিয়া আমাকে বলিয়াছিলেন, কে কাহাকে কত বেশি ভালবাসে তাহা কি তুমি ভাবিয়াছ? তুমি কি তাহাকে বিবাহ করিতে চাও? নাকি শুধু মনের আবেগে তোমার একাকীত্বকে দূর করিবার আখাংকায় তাহার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাইতে চাও? মজার ব্যাপার হইল, আমার মা মেয়েটি কতখানি সুন্দর, তাহার বাবার কি পরিমান সম্পদ বা সম্পত্তি আছে, তাহারা কয় ভাইবোন কিংবা তাহার পারিবারিক আর কোন তথ্য উপাত্ত কিছুই জানিবার জন্য আমাকে প্রশ্ন করিলেন না। শুধু বলিলেন, ব্যাপারে আমি কাল তোমার সঙ্গে আবার কথা বলিব এবং তোমার মনোভাব জানিব

আমার মায়ের সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল এবং আমি তাহার সঙ্গে সব কথাই অকপটে বলিতে পারিতাম। মা কথাগুলি খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলিয়া আমাকে আমার মত করিয়া ভাবিবার সময় দিলেন আমার মা।  আমার মা শিক্ষিত নন। তিনি হয়ত তাহার জীবনে প্রাইমারী স্কুল পার করিয়াছেন কিনা তাহাও আমার জানা নাই। কারন তাহার বিয়ে হইয়াছিল যখন তাহার মাত্র ১০ বছর বয়স। নিতান্তই একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে।  কিন্তু তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমতী এবং প্রাক্টিক্যাল একজন মা। আমার বড় প্রিয় মানুষ তিনি

 

পরেরদিন আমি আর আমার মা আমাদের বাড়ির আঙিনায় বসিয়া আছি। বিকালের রোদ অনেকটাই কমিয়া গিয়াছে। সন্ধ্যা হইতে আরও কিছু বাকি। আমাদের বাড়ির বড় বরই গাছের মাথায় অনেক পাখির বাসা আছে। পাখিদের কিচির মিচির শব্দ হইতেছে অহরহ। কিচির মিচির করিয়া পাখিদল যে কি কথা কাহাকে বলিতেছে তাহা বুঝিবার ভাষা বা ক্ষমতা আমাদের কাহারো নাই। এইদিক সেইদিক উরাউরি করিতেছে আর যার যার বাসায় তাদের স্থান করিয়া নিতেছে।  দূরে গাছ গাছালিগুলি আস্তে আস্তে সন্ধ্যার ক্ষিন আলোতে ধুসর থেকে আরও কালো বর্ণের রঙ ধারন করিতেছে, বাড়ির গৃহস্থালিরা তাহাদের নিজ নিজ গরু ছাগল ভেড়া লইয়া গ্রামের ভিতর প্রবেশ করিতেছে। কেউ কেউ আবার মনের আনন্দে সেই আব্দুল আলিমের ভাটিয়ালী কিছু গানের সুরে গানও গাইতেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাঠ হইতে খেলা ছারিয়া কেউ জোড়ায় জোড়ায় আবার কেউ দল বাধিয়া বাড়ির অভিমুখে হারাইয়া যাইতেছে। কিছু বয়স্ক মানুষ মাথায় কিছু মাল সামানা লইয়া হয়ত বা শহর কিংবা কাছের বাজার হইতে সদাই করিয়া তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়া যাইতেছে। দিনের শেষলগ্নে গ্রামের কিছু উঠতি বয়সের বধুরা অদুরে আমাদের ধলেশ্বরী নদী হইতে কাঁখে জল তুলিয়া কলসি ভরতি পানি লইয়া, ভিজা কাপড়ে হেলিয়া দুলিয়া মুচকি মুচকি হাসিতে আবার কখনো কখনো উচ্চস্বর আওয়াজে নিজেদের ঘরে আগমন করিতেছে। অদুরে কোন এক সদ্য প্রসব করা গাভি তাহার অবুঝ বাছুরটির সন্ধান না পাইয়া অবিরত হাম্বা হাম্বা করিতেছে। এমন একটি পরিবেশে আমি আর আমার মা মুখুমুখি বসিয়া আছি। বেশ সময় কাটিতেছে আমার। 

 

মা সর্বদা পান খান, মায়ের পানের বাটি যেন তাহার দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মত একটি অংশ। যেখানে যাইবেন, সেখানেই তিনি তার এই অতিব প্রয়োজনীয় সম্পদটি সঙ্গে রাখিবেন। পানের বাটিটি ব্যতিত যেন মায়ের কোন কিছুই আর এত মুল্যবান সম্পদ আমাদের ঘরের মধ্যে নাই। পানের বাটিতে মা তাহার ছোট পিতলের ডান্ডা দিয়া পান পিষিতেছেন, যেন অনেক যত্নের সহিত তিনি একটি খাদ্য রিসিপি বানাইতেছেন। পানের বাটির সঙ্গে পিতলের ডান্ডাটি ঠক ঠক আওয়াজে এক রকম টুং টাং শব্দ হইতেছে। এই রকম একটি পরিবেশে মা আমার দিকে না চাহিয়াই প্রশ্ন করিলেন, "কে আগে ভালবাসার কথা বলিয়াছিল? তুমি না সে?" মা আমাকে নিতান্ত সহজ সুরে যেন কিছুই হয় নাই এমন ভাব করিয়া প্রশ্নটি করিলেন। আমি বলিলাম, "কে আগে ভালবাসার কথা বলল, এতে কি আসে যায় মা? আমরা দুজন দুজনকেই তো ভালবাসি? সে আমাকে ভালবাসে আর আমিও তাকে ভালবাসি"। মা বলিলেন, আমার উপর ভরসা রাখ। আমি তোমাদের দুইজনকেই ভালবাসি যদিও আমি তাহাকে দেখি নাই কিন্তু তুমি তাহাকে ভালবাস। আর তুমি তাহাকে ভালবাস বলিয়াই আমি তাহাকেও ভালবাসি। কিন্তু তুমি তো আমার প্রশ্নের উত্তর এরাইয়া যাইতেছ বলিয়া আমার মনে হইল।"

আমি বললাম, "না মা। আমি তোমার কোন প্রশ্নের উত্তর এরাইয়া যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি না। তবে আমি প্রথম তার কাছ থেকে পত্র পাইয়াছিলাম সেইটা বলিতে আমার কোন দ্বিধা নাই। আমি পত্র পাইয়া বুঝিয়াছিলাম, যে, আমি ওকে ভালবাসি কিন্তু আমি বলিতে পারি নাই। সে বলিতে পারিয়াছিল। তাহার মানে এই নয় যে, আমি তাহাকে কম ভালবাসি  বা আমি তাহাকে ভালবাসি নাই।"

মা আমার মাথায় হাত বুলাইয়া, আমার পিঠে তাহার একটি হাত চালাইয়া আমার নাকের ডগায় আলতো করিয়া টীপ দিয়া বলিলেন, "তুমি তোমার জায়গায় ঠিক আছ তো? যদি ঠিক থাক, আমি চাই তুমি তাহাকে শাদি কর। তুমি সুখী হইবে"। 

 

আমি অবাক বিস্ময়ে আমার মায়ের দিকে তাকাইলাম, সন্ধ্যার অল্প অল্প আলোতে আমি তাহার চোখে মুখে যেন এক প্রশান্তির ছায়া দেখিতে পাইলাম, তিনি একদিকে তাহার ঘাড় বাকা করিয়া পানের বাটি হইতে পান লইয়া কিছু পিষিত পান নিজের মুখে পুড়িয়া আর বাকি কিছু পান আমার গালে পুড়িয়া দিয়া বলিলেন, "নে পান খা, ভাল লাগিবে। মায়ের দোয়ায় সন্তান সুখী হয়, তুইও জীবনে সুখী হইবি।" 

আমি পান মুখে লইয়া অবাক দৃষ্টিতে মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, "মা, তুমি কিভাবে আমার পছন্দের মেয়েকে না দেখিয়া, তাহার পরিবারের কারো কোন তথ্য না শুনিয়া, তাহার পরিবারের কোন ইতিহাস না জানিয়া এই সন্ধ্যায় এক নিমিষে জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিয়া আমাকে সুখী হইবে বলিয়া আশীর্বাদ করিলে?"

মা পানের পিক ফালাইতে ফালাইতে আমার মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন, " ভালোবাসার স্থায়িত্ব তাহার উপর নির্ভর করেনা, যাহাকে সে ভালবাসে, নির্ভর করে তাহাকে যে ভালবাসে তাহার উপর। সে তোমাকে ভালবাসিয়াছে প্রথম, তোমাকে ছাড়িয়া যাওয়ার কোন কারন না থাকিলে সে তোমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিবে এইটাই হওয়ার কথা। তুমি যাহাকে ভালবাস তাহাকে নয়, তোমাকে যে ভালবাসে তাহাকে তুমি তোমার জীবন সঙ্গিনী কর। তাহা হইলেই তুমি সুখী হইবে। আর ইহাই হইতেছে দাম্পত্য জীবনের সত্যিকারের রূপরেখা।'

আমি আমার মায়ের এত বড় দর্শন শুনিয়া খুব অবাক হইয়াছি। কি অদ্ভুত দর্শন।

মা বলিতে থাকিলেন, কাউকে কখনো তুমি তোমাকে ভালবাসার জন্য জোর করিবে না, বরং তোমাকে কেউ ত্যাগ করুক সেই ব্যাপারে কাউকে জোর করিতে পার। যখন জোর করিয়াও তাহাকে তুমি ত্যাগ করাইতে পারিবে না, নিশ্চিত থাকিবে যে, সে তোমাকে সত্যি ভালবাসে। তাহাকে তুমি তখন আরও বেশি করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিবে কারন সে তোমাকে ভালবাসে। যে তোমাকে সত্যিকার ভাবে ভালবাসে, শত কারন থাকা সত্তেও সে তোমাকে কোনদিন ছাড়িয়া যাইবে না। বরং সে একটিমাত্র কারন খুজিবে যে কারনের দ্বারা সে তোমাকে আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিতে পারে, ত্যাগ করিবার জন্য নয়। আর ইহাই হইতেছে প্রকৃত ভালবাসার দুর্বলতা। তুমি তাহার সঙ্গে জীবনে সুখী হইবে।

আজ এত বছর পর আমি উপলব্দি করিতে পারিতেছি যে, আজ হইতে প্রায় দুই যুগ আগে আমার সেই অশিক্ষিত মা যে দর্শন শুনাইয়াছিলেন, তাহা কতখানি সত্য এবং খাটি। আজ আমি আমার জীবনে এক অদ্ভুত সুখ আর আনন্দ লইয়া প্রতিটি দিন অতিবাহিত করি। কারন আমার সঙ্গে আছে সেই মানুষটি যে আমাকে ভালবাসিয়াছিল এবং আমিও তাহাকে ভালবাসিয়াছিলাম। কিন্তু সে আমাকে প্রথম ভালবাসার কথাটি বলিয়াছিল।

মা আরও একটি আস্ত পান তাহার অতি প্রিয় পানের বাটিতে সুপারি আর মশলা দিয়া পিষিতে লাগিলেন। আমার দিকে না তাকাইয়াই তিনি বলিতে থাকিলেন, তুমি নিশ্চয় জানো, একটা ব্রিজ বানাইবার জন্য যা যা লাগে আর একটা দেওয়াল বানাইবার জন্য যা যা লাগে তা একই উপকরন। কিন্তু একটি ব্রিজ দুইটি প্রান্তকে সংযোগ করে আর একটি দেওয়াল দুইটা প্রান্তকে পৃথক করিয়া দেয়। তোমাদের এই যুগলমিলন হইতে হইবে একটি ব্রিজের সমতুল্য। দেওয়াল নয়। এখন তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হইবে তুমি কোনটা চাও এবং কিভাবে চাও আর কখন চাও। দাম্পত্য জীবনে এমন কিছু সময় আসিবে যখন তোমার কাছে মনে হইবে, সবাই ভুল আর তুমি ঠিক। হয়ত বা তুমিই ঠিক আবার তুমি ঠিক নাও হতে পার। তোমারও ভুল হইতে পারে। মা পানের বাটিতে তাহার পিতলের ডান্ডা দিয়া পান পিষানো একটু সময়ের জন্য থামাইয়া আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, একটা হাদিসের কথা বলি, 'যে ভুল করে সে মানুষ, আর যে ভুল করিয়া তাহার উপর স্থির থাকে সে শয়তান, আর যে ভুল করিয়া আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে মুমিন। ফলে অন্যের কোন কথা শুনিবামাত্রই তাহার উপর উত্তেজিত হইয়া কোন কিছু করিতে যাইও না। কারন, তাহার কথার সত্যতা যাচাই করা তোমার কাজ। তোমার জানা উচিৎ সে তোমাকে ঠিক কথাটিই বলিয়াছে কিনা। সে তোমাকে প্ররোচিতও করিতে পারে। কোন কিছুই বিচার বিবেচনা না করিয়া কোন মন্তব্য করা হইতে সবসময় বিরত থাকিবে। মনে রাখিবা, একবার একটা কথা কিংবা মন্তব্য বলিয়া ফেলিলে উহা আর ফেরত নেওয়ার কোন অবকাশ নাই। তখন শুধু হয় নিজেকে অপরাধী হিসাবে ক্ষমা চাইতে হইবে আর অন্যজন তোমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখিবে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখ। নিজের শক্তিকে বিশ্বাস কর। নিজের মানুষদের উপর বিশ্বাস রাখ। বিশ্বাস কর যে, তুমি পার এবং তুমি যা পার তা অনেকেই পারে না। আর অনেকেই যা পারে তুমিও তা পার।

আমার মায়ের কথাগুলি আমার কাছে এক অসামান্য দর্শনের মত মনে হইতেছিল। এত কথা মা কোথা হইতে জানিল, বা কে তাহাকে এইসব দর্শনের কথা বলিল আমি আজও ভাবিয়া কুল পাই না।

অনেক্ষন হইল সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। কিন্তু পশ্চিমের আকাশে এখনো লাল আভা দেখা যাইতেছে। খোলা উঠানে বসিয়া আছি বলিয়া চারিদিকের অনেক মশারাও তাহাদের উপস্থিতির কথা জানাইয়া দিতাছে। আমার মা তাহার দ্বিতীয় পানটি মুখে লইয়া কিছুক্ষন চাবাইয়া লইলেন। এবং তাহার চর্ব্য পান হইতে একটু পান বাহির করিয়া আমার মুখে গুজিয়া দিলেন। আমার মায়ের চাবানো পান আমার বড় প্রিয়।   

মা আজ অনেক কথা বলিতেছেন যা আমার কাছে এক নতুন অধ্যায়।

মা বলিতে থাকিলেন, শোন বাবা, জীবনে বড় হইতে হইলে জীবনের সব কয়টি কুরুক্ষেত্রকে তোমার মুখুমুখি হইতে হইবে। তুমি তো অনেক বড় বড় মানুষের জিবনি পড়িয়াছ, তাহাদের দর্শন তথ্য পড়িয়াছ।  আজ তাহলে তোমাকে একটা গল্প বলি। একদিন এক ঈদের দিনে আমার বাবা আমাকে একটা নতুন ফ্রক কিনিয়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি তা আমাকে আর দিতে পারেন নাই। হয়ত তাকা পয়সা ছিল না। তাই। আমার খুব মন খারাপ হইয়াছিল। সারাদিন আমার মন আর ভাল হইতেছিলনা। আমার মন খারাপ হইয়াছে দেখিয়া আমার বাবারও মন খারাপ হইয়াছিল। হয়ত তাহারও আমার মত ভিতরে ভিতরে একটা কষ্ট হইতেছিল তাহার এত আদরের মেয়ের মন খারাপ বলিয়া। কি জানি কি হইল আমি জানি না, আমার বাবার এক বন্ধু বিকাল বেলায় আমাদের বাসায় বেড়াইতে আসিলেন। হয়ত বাবাই নিমন্তন্ন করিয়াছিলেন। তিনি আমার বাবার খুব কাছের মানুষের মধ্যে একজন। হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি আমাকে অনেক আদর করিলেন, কেন আমার মন খারাপ তাহা জিজ্ঞাসা করিয়া তিনি মুচকি হাসিয়া এক বিখ্যাত লেখকের উদ্দ্রিতি দিয়া আমাকে বলিলেন, "আমরা অনেক সময় একজোড়া জুতা না পাওয়ার বেদনায় চোখের পানি ফেলি কিন্তু কখনো কি একবার ভেবে দেখেছ যে, অনেকের তো পা ই নেই?" বলিয়া তিনি আমাকে জড়াইয়া ধরিয়া খুব আদর করিয়া দিলেন। বলিলেন, কালই তিনি আমার জন্য নতুন একটি ফ্রক কিনিয়া দিবেন। তিনি এমন করিয়া আমাকে এই কথাটি বলিলেন, যে, আমি যেন ঐ পা বিহিন মানুষটির চেহারা দেখিতে পাইলাম।  তাই তো, কথাটা আমার খুব মনে ধরিয়াছিল। আমার আর মন খারাপ হয় নাই। আমি আর নতুন ফ্রকের জন্য কখনো মন খারাপ করি নাই। আমি বুঝিতে পারিলাম আমার নিজের অবস্থানটা নিয়ে সন্তুষ্ট না হইলে পৃথিবীর কোন কিছুই আমাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিবে না। আমি আমার বাবাকে জরাইয়া ধরিয়া অনেক কাদিয়াছিলাম। দুঃখে নয়, এতক্ষন যে বেদনাটা আমাকে খুব কষ্ট দিতেছিল, সেইটা যে বাবার বাবার বুকের ভিতরে গিয়া বাবাকেও কষ্ট দিতেছিল এই মনে করিয়া আমার চোখ আরও আবেগপ্রবন হইয়া উঠিতেছিল। আমার ছোট্ট বালিকা হৃদয়ের এই অফুরন্ত নিস্পাপ সাবলিল ভালবাসার চোখের জলে আমি আমার বাবাকেও কাদিতে দেখিয়াছিলাম। তাহার কান্নাও কোন কষ্ট হইতে নয়। নিছক ভালবাসার। এইটার নামই পরিবার। এইটার নামই হচ্ছে ভালোবাসা। নিজকে লইয়া সন্তুষ্ট থাক। ইহাতে সুখের পরিমান বাড়িবে। সবসময় একটা উপদেশ মনে রাখিবা যে, নিশ্চয় তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে কোন উদ্দেশ্যবিহিন এই পৃথিবীতে প্রেরন করেন নাই। তার উদ্দেশ্য আমাদের স্বপ্নের চেয়ে অনেক উত্তম এবং তাহার রহমত আমার হতাশার থেকেও অনেক বেশি। ঈশ্বরকে বিশ্বাস কর। তিনি তোমাকে কোন কিছুই না থেকে অনেক কিছু পাইয়ে দেবেন, যা আমার তোমার চিন্তা জগতেরও বাইরে। আর কাউকেই অবহেলা কর না। তোমার অবহেলা করার একটাই অর্থ দাঁড়াইবে, আর সেটা হচ্ছে তুমি তাহাকে তোমাকে ছাড়া চলিতে পারার অভ্যস্থ করিয়া তুলিতেছ। সবাই তোমার মতবাদ পছন্দ নাও করিতে পারে, সবাই তোমার মত করিয়া ভাবিতে নাও পারে। তুমি যে শার্টটা পছন্দ কর, সেই শার্টটা অন্য একজনের পছন্দ নাও হইতে পারে। এই পৃথিবীতে কিছু কিছু লোক তোমার জীবনে আসিবে আশীর্বাদ হইয়া, আবার কিছু লোক আসিবে শিক্ষণীয় হইয়া। আর এইটাই জীবন। তুমি আমাকে কিছুক্ষন আগে একটা প্রশ্ন করিয়াছিলে না যে, আমি তোমার পছন্দের মেয়েটির কোন কিছুই না জানিয়া, তাহার পরিবারের কি আছে আর কি নাই এই সব কিছুই না জানিয়া কিভাবে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দিলাম? জীবনে শুধু টাকা পয়সা দিয়াই সব কিছুর মাপকাঠি হয় না। টাকা পয়সা সব কিছু কিনিতে পারে না। টাকায় তুমি আচরন কিনিতে পারিবে না, টাকায় তুমি সম্মান কিনিতে পারিবে না, টাকা দিয়া তুমি চরিত্র কিনিতে পারিবে না, টাকা দিয়া তুমি বিশ্বাস, ধৈর্য, শ্রদ্ধা, বিনয় এইগুল কিছুই কিনিতে পারিবা না। টাকা দিয়া তুমি ভালবাসাও কিনিতে পারিবা না। আর এইসব গুণাবলীগুলো তো আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের সবচেয়ে জরুরী বিষয়। যে ভালবাসিতে জানে, তাহার টাকার দরকার হয় না। আধামুঠো অন্ন খাইয়াই তাহার মন ভাল থাকে, তাহার দেহ ঠিক থাকে, তাহার আত্মা তৃপ্ত থাকে। ইহার পরেও আরও কথা থাকে। তোমার এই তৃপ্ত জীবনে তোমার পথে অনেক ঘেউ ঘেউ করা কুকুরের মত মানুষজনও পাবে। জীবনে যদি বড় হইতে চাও, এই সব চরিত্র হইতে সাবধান থাকিতে হইবে। কারন সব কুকুরকে তোমার মনোযোগ দেওয়ার সময় তোমার নাই। এরা শুধু তোমার মনোযোগই নষ্ট করিবে না, তোমার বড় হওয়ার পথে এরা সবচেয়ে বড় বাধা হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবে। ইহাদের মধ্যে অনেকেই এই সমাজের কেউ কর্ণধার বলিয়া মনে হইবে, কাউকে আবার সমাজের বিবেচক বলিয়া মান্য করিবে, কেউ আবার প্রথম সারির লোক বলিয়াও গর্ব করিয়া এইদিক সেইদিক প্রচারনা করিয়া বেড়াইবে। উহারা কেউই তোমার শুভাকাঙ্ঘি নহে। শুভাকাঙ্ক্ষী শুধু তোমার একান্ত পরিবার যাহারা তোমার ব্যথায় ব্যথিত হয়, তোমার আনন্দে আনন্দিত হয়, আর তুমি যখন দিশেহারা হইয়া সঠিক সিদ্ধান্ত লইতে অপারগ হওঁ, তখনো তাহারা তোমাকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না।

তোমাদের জন্য রইল আমার অফুরন্ত ভালোবাসা আর দোয়া।

২৩/০২/২০১৬- বগুড়ার পথে

Categories

বগুড়া যাওয়ার পথে

দুরন্ত গতিতে কখনো আমাদের গাড়ি ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত বেগে চলছে, আবার কখনো কখনো অধিক গাড়ির জটিলতায় একেবারে থেমেই যাচ্ছে। থেমে গেলেও খারাপ লাগছে না। কারন আমি রাস্তার দুই ধারে গ্রামের কি এক অপূর্ব সবুজের রাজত্ব, অনেক দূরে গ্রামের কিনারা দিয়ে বয়ে যাওয়া চিকন চিকন খালের ধারে হরেক রঙের গরু ছাগল, ভেড়া, কচি কচি ঘাস খাওয়ায় মগ্ন, ঐ খালের নোংরা জলে কিছু দুর্দান্ত বালক বালিকা কেউ কাপড় পরে আবার কেউ একেবারে দিগম্বর হয়ে খালের কিনারা থেকে লাফ দিয়ে তাদের বীরত্ব দেখানোর তাগিদে কে কত টুকু দূরে লাফিয়ে পরতে পারে তার প্রাণপণ চেষ্টা করছে ইত্যাদি দৃশ্য আমার মনে এক আনন্দের জয়ার দিচ্ছে। আমি দেখছি, ঐ সব ছোট ছোট বালক বালিকাদের মধ্যে মাঝে মাঝে মধ্য বয়সী কোন অভিভাবক সন্তানের অনিষ্ট না হয় এমন লাফের পায়তারা থেকে উচ্চস্বরে ধমকও দিচ্ছেন। কিন্তু কে কার কথাই বা শুনে। এদের যে বয়স, তাতে দুরন্তপনাই হচ্ছে মূললক্ষ। আমি অনেকক্ষন ধরেই এই অভাবিত দৃশ্য গুলো দেখছি আর আমার সেই শৈশবকালের একই প্রকৃতির দুরন্তপনাগুলো মনে করছি। আহ কি সুন্দর ছিল সেই সব দিনগুলো।

আমার সঙ্গে আমার মেয়েরা আছে। ওরা আধুনিককালের প্রজন্ম। এরা এই সব দৃশ্যের আনন্দের মুহূর্তগুলো বুঝে না। ওরা গাছের সবুজের নিচের আলো বাতাসের খবর রাখে না। ওরা চৈত্রের দুপুরে হেটে হেটে স্কুল থেকে এসে পান্তা ভাতের স্বাদ বুঝে না। ওরা কালবৈশাখী ঝড়ের দিনে আধাপাকা আম কুড়ানোর মজাটা বুঝে না। কিংবা শিলা বৃষ্টির মধ্যে অযথা ছোটখাট বরফের মত শিলা কুড়ানোর মজাটা বুঝে না। ওরা সারাক্ষন ট্যাব আর মোবাইল ফোন নিয়ে রক মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত কিংবা কম্পিউটারে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে গ্রামের কিছু কিছু অতি সুন্দর পোট্রেট দেখেই মুগ্ধ। কিন্তু সত্যিকারের গ্রামের গা থেকে সোঁদা মাটির যে গন্ধ, পচা বাঁশ পাতার যে একটা টক টক ঘ্রান, কিংবা সন্ধ্যায় শিয়ালের যে ডাক, তারা ওগুলোর কোন স্বাদ বুঝে না। গ্রামের রাস্তা ধরে ক্ষেতের আইল ভেঙ্গে হাটার যে এক অদ্ভুদ রোমান্স, আধাকালো সন্ধ্যায় ভয় ভয় হৃদয়ে শ্মশানের পাশ দিয়ে যাওয়ার যে অনুভূতি তার কোন কিছুই এদের ইন্দ্রিয় বুঝে না। ওরা সুকান্তকে চিনে না, ওরা রবিন্দ্রনাথকে চিনে না, ওরা নজরুলের প্রেমের কবিতা পরেনা। ওরা অনেক কিছুই জানে না। ওরা টাইটানিক দেখে অভিভুত হয় কিন্তু ওরা জ্যাকের ঐ ঐতিহাসিক কথাগুলো বুঝে না যখন সে বলে, “পার্টি? পার্টি যদি মজা করতে হয় তাহলে আস আমার সঙ্গে আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর কামরায়, দেখ কিভাবে পার্টির স্বাদ গ্রহন করতে হয়।” রোজ বুঝেছিল কিন্তু আজকের দিনের “রোজেরা” এটা বুঝে না, বুঝতেও চায় না।

যাই হোক, আমরা চলছি আর আমি দেখছি দুই প্রজন্মের মধ্যে কত ফারাক হয়ে যাচ্ছে এই পৃথিবী। আমার কাছে এখনো ঢেঁকি ছাটা চাল খেতে মন উতলা হয়ে উঠে, আমার এখনো বরই গাছের নিছে এবড়ো থেবড়োভাবে পরে থাকা আধাপাকা বরই একদম একটু লবন দিয়ে আবার লবন পাওয়া না গেলে খালি খালিই খেতে মন চায়, আমার কাছে কয়েক টুকরা ধনিয়া পাতা হাত দিয়ে মুচড়ে কাচা মরিচ দিয়ে এক প্লেট পান্তা ভাতের আনন্দ এখনো পেতে ইচ্ছে করে। কি সব দিনগুলো আমি হারিয়ে ফেলেছি, ভাবতেই আমার মন যেন একেবারে ব্যথায় মুচড় দিয়ে উঠে। আমি কি বলি আমার সন্তানেরা বুঝে না, আমার সন্তানেরা কি বলে আমার বুঝতে ভাল লাগে না। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা এখন আর আজকের দিনের ছেলেমেয়েদের কাছে কোন কাব্যই মনে হয় না। রক্তকরবি দেখে ওদের মনে হয় কি সব আবোল তাবোল লেখা লিখে রবিন্দ্রনাথ এত বিখ্যাত হয়ে গেলেন? নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ যেন এক কাল্পনিক কথা, এর কোন রোমান্স আজকের দিনের প্রজন্মের কাছে কোন স্বপ্নই মনে হয় না। ম্যাক্সিম গোরকির “মা” উপন্যাশটি পরার জন্য আমি কতবার পরিক্ষার পড়ায় ছেদ দিয়েছি তার কোন ইয়ত্যা নেই, অথচ আজ যখন আমি আমি আমার প্রজন্মের কাছে এই সব উপন্যাশের কথা বলতে চাই, তারা ম্যক্সিম গরকিকে তাই জানে না।

গান বাজছে আধুনিক। কি সব কথাবার্তা, কোন ভাব গম্ভীরতা নাই, সুর আছে ড্রাম পিটানোর মত, বুকে লাগে এর প্রতিটি আছাড়। কিন্তু হৃদয় ছুয়ে যায় না। (…চলবে) 

২৩/০২/২০১৬- বগুড়ার পথে (২)

Categories

বগুড়া যাওয়ার পথে (২য় পর্ব) 

বগুড়া শহরে এই আমার প্রথম আসা নয়। কর্মস্থল হিসাবে আমি এই অঞ্চলে প্রায় পাঁচ বছর কাটিয়েছি। গ্রামের অধিকাংশ অলি গলি, আনাচে কানাচে ঘুরেছি, কখনো দায়িত্ব পালনের জন্য রাত অবধি জেগে থেকেছি। কখনো আবার নিছক মনের তাগিদে ঘুরে প্রকৃতির সৌন্দর্য আহরণের জন্য দিকবিদিক ঘুরেছি। কখনো আমি গভির রাতে, কখনো রাতের শেষ প্রহর জেগে থেকে শুক্ল পক্ষের চাঁদ দেখেছি। কখনো আমি দেখেছি অমাবশ্যায় আকাশ তার কি রূপে পৃথিবীর কাছে প্রেম নিবেদন করে। কখনো আবার ঘোর বৃষ্টির রাতে যখন সব মানুসেরা তাদের নিজ নিজ আস্তানায় ফিরে গভির ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, যখন পাখীরাও আর কিচির মিচির করে না, আমি তখনও চাঁদহীন মেঘলা আকাশের মুসলধারে বৃষ্টির চ্ছটায় বারান্দায় বসে দেখেছি গাছগুলো কিভাবে বৃষ্টির জলে একা একা খেলা করে, কিভাবে হেলেদুলে একে অপরের আরও কাছে চলে আসে। কোন কথা নাই, নিঃশব্দে নিরবে অবিরত বৃষ্টি এই ঘুমন্ত ধরাকে কিভাবে স্নিগ্ধ চুম্বনে আলিঙ্গন করে। আকাশ মাটি আর বৃষ্টির এই প্রেমের লীলা এক অদ্ভুত রহস্য ঈশ্বরের। শরৎচন্দ্রের সেই বিখ্যাত শ্রীকান্ত উপন্যাসের কিছু অভিব্যাক্তি আমার মনে পরে। ……”অন্ধকারেরও রূপ আছে” । আসলেই আছে। মানুষ দিনের আলোয় যা দেখে না, অন্ধকারে সে টা উপলব্ধি করে, মানুষ দিনের আলোয় যা বিশ্বাস করে না, অন্ধকারের ঘোর নিশানায় সে সেটা বিশ্বাস করে। এখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। গাড়ির আলোতে আমি সামনের রাস্তা দেখছি কিন্তু পাশে ফেলে যাওয়া অনেক কিছুই এখন আর আমার নজরে পরছে না অথচ এই ফেলে যাওয়া রাস্তার ধারেও কতই না সৌন্দর্য পরে আছে। মাঝে মাঝে লাইট পোস্টের কিছু আলোতে কিছু কিছু লোকালয়ের বস্তি চোখে পরে। ওখানেও অনেক অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনের অনেক কাহিনি লুকিয়ে আছে যার ইতি বৃত্ত আমাদের অনেকেরই জানা নাই।

অনেক দূর চলে এসছি আমরা। বগুড়া শহর আর বেশি দূরে নাই। গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেছে প্রায়, তেল নিতে একটি তেল পাম্পে ঢোকতেই হচ্ছে। ইচ্ছা না থাকা সত্তেও গাড়ি থামাতে হল। আমি নেমেই একটা সিগারেট ধরালাম। একটি ৬-৭ বছরের বাচ্চা সহ একজন মহিলা আমার কাছে এসে বল্ল, স্যার আমার এই ছেলেটার একটা চোখ অন্ধ, আর একটা হাত অবশ। দিন না আমাকে কিছু। বড় মায়া হল। মা তার অন্ধ এবং পঙ্গু ছেলের জন্য কোথায় না ঘুরছে? আমার মায়ের কথা মনে পড়ল।  মনে হল কতকাল আমার মা আমাকে আর আদর করে না, কতকাল আমার মা আমাকে আর খোকা বলে ডাকে না। আমাকে আর শাসনও করে না। অথচ আমি জানি আমার মা আমার কাছে আছেন, আমাকে দেখছেন। আজ আমি বাবা, আমার মেয়েরা আস্তে আস্তে তাদের আরেক জীবনে প্রবেশ করছে। হয়তবা আমিও আর ওদেরকে আর আগের মত শাসন করতে পারবনা, আমি আর আগের মত বুকে জরিয়ে ধরে বলতে পারব না, মা তোমার কি মন খারাপ? হয়ত বা তার সত্যি মন খারাপ, হয়তবা সেও কোথাও বসে কোন এক অমাবস্যার রাতে বৃষ্টির ঘন চ্ছটায় আমাদের কথা মনে করছে, অথচ আমি তার পাশে নাই। তাই মাঝে মাঝে অদেরকে মিস করব বলে আজ এই দিনে অনেক অগোছালো আব্দার আমি মেনেই নিচ্ছি।

যাই হোক, ছেলেটার জন্য প্রচন্ড মায়া হল। মায়ের জন্য আমার বুকটা কোথায় যেন একটু ব্যাথা অনুভব করলাম। বললাম, এটা কি তোমার একমাত্র সন্তান? মা সময় অপচয় না করে বিনা দ্বিধায় উত্তর দিল, “হ্যা গো স্যার, হামাক একটাই পোলা, হামাক বড় আদরের পোলা গো স্যার।” একটা মা, জাস্ট একজন মা। তার পরিচয়, মা। মাকে নিয়ে অনেক কবিতা পড়েছি, মাকে নিয়ে অনেক ইতিহাস রচিত হয়েছে। মাকে নিয়ে ধর্মগ্রন্থেও অনেক বানি রয়েছে। আমি নিজেও মাকে নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছি যদিও আমি কবি নই। আমার কবিতা কোথাও ছাপা হোক সেটাও আমি চাইনি। তারপরেও মনের আবেগে আমি মাকে নিয়ে অনেক কবিতাও লিখেছি। আজ মনে হচ্ছে মাকে খুব মিস করছি। কোন এক সময় মাকে মিস করে একটা কবিতাও লিখেছিলাম…

আমি এক দস্যুরানীর প্রেমিক
কি এক অদ্ভুদ তার চাহনি, কখন মায়াবতী
কখন বা কঠোর স্পাত কঠিন ভিতি
কি অবাক এক জীবনীযোগে
অতন্দ্র ঘোর অন্ধকারে আমার পানে চাহিয়া সে আলেয়ারে খোঁজে

আবার কখনো টকটকে রৌদ্র স্নানে
কোন এক অজানা ভয়ে কম্পিত হয় শিহরনে
কখনো ভালবাসায় আমাকে ছুরে দেয় অসীম আকাশের দিকে
আবার যদি হারিয়ে যাই এই ভয়ে ঢেকে রাখে তার শারির আচলে

কি অদ্ভুদ সে।
কখনো গাল ভরে চুমু
আবার কখনো ইশা খার মত করা শাসনের ঝুমু
সকাল সন্ধ্যা দিন রাত আমার কোন স্বাধীনতা নাই
আবার আমার কোন কাজে তার কোন বাধাও নাই

মাঝে মাঝে আমার বড় রাগ হয়
আর সে খিলখিলিয়ে হাসে,
আমি যখন হাসি, সে তখন অপরূপ দৃষ্টিতে অশ্রু নয়নে ভাসে
আর বলে, আমি নাকি পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর।
অথচ আমার একটা চোখ নাই, আমি দেখতেও ফর্সা নই।
একদিন অনেক রাতে সেই অমাবশ্যার অন্ধকারে চুপি চুপি আমি তারে প্রশ্ন করেছিলাম

কে গো তুমি আসলে?
সিক্ত নয়নে আমার কাধে হাত রেখে বলেছিল
“তুমি যখন এই পৃথিবীতে প্রথম আস
তখন আমার নতুন পরিচয় হয়েছিল
আমার নতুন নাম হয়েছিল, “মা”

(…… হয়ত চলবে)

১৮/২/২০১৬-আমার বড় মেয়ের সঙ্গে

গত দুইদিন যাবত আমি আমার বড় মেয়ের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটানোর চেষ্টা করছি। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে। এখনো ছেলেমেয়ের মধ্যে কোন রাত যাপনের সুযোগ আমরা দেই নাই যদিও এটা আমাদের ধর্মের রীতির মধ্যে পরে না কিন্তু আমি খুব বিস্ময়ের সহিত লক্ষ করছি আমাদের এই দুইজন সন্তানও কোন প্রকারের দাবি তুলে নাই তাদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করছি বলে। ওরা নিষ্পাপ মানুষগুলোর মধ্যে একজন।

কিন্তু আমি একটা জিনিস লক্ষ করছি আমার মধ্যে যে, আমার বুকের ভিতর কোথায় যেন একটা ফাকা ফাঁকা ঠেকছে। অথচ কোন কিছুই আমি হারাই নাই। বরং আমি আরও একজন নতুন মানুষ পেয়েছি, আমি আরও একজন সুসন্তান পেয়েছি, অন্যভাবে বলতে হয় যে, আমার যে একজন ছেলে সন্তানের অভাব ছিল আজ মনে হয় যেন আমি একজন ছেলে সন্তান পেয়েছি। কখনো কোনদিন কোনভাবেই আমার অগোচরেও আমার মনে আমার একজন ছেলে সন্তান দরকার এই ভাবনাটা আসে নাই। আজ আমার মেয়ের জামাইকে পেয়ে মনে হল, আমি যেন আজ নতুন করে বাবা হয়েছি। একজন ছেলের বাবা। যে অভিজ্ঞতাটা আমার কখনো ছিল না। কিন্তু তারপরেও প্রতিনিয়ত আমার কাছে মনে হচ্ছে আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে। কি সেই পরিবর্তনটা? কাজের ফাকে কারনটা খুজতে চেষ্টা করেছি, অবসরে খুজতে চেষ্টা করেছি, একাএকা ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি, চোখ বুঝে ভাবার চেষ্টা করেছি, চোখ খুলে দিনের আলোয় বুঝার চেস্তা করেছি, আমার কোথাও কোন কোন হারায় নাই। অথচ ব্যাপারটা ঘটছে আমার মাথার ভিতর, আর ব্যাথাটা পাচ্ছি অন্তরের ভিতর। এরই মধ্যে আমার মেয়ের বিয়ের কারনে আমার যেন নতুন করে একটা আনন্দ হচ্ছে আমার সর্বত্র। তাহলে কি হয়েছে আমার? ইন্ডাস্ট্রি চলছে আগের মত, ব্যবসা চলছে ঠিক আগের মত, আমি অফিসে যাচ্ছি ঠিক সময়মত, আমার কোন কাজেই আমার কোন হেরফের হচ্ছে না। তারপরেও একটা অনুভূতি কাজ করছে। সেই অনুভুতিটা আজ যেন আমার কাছে কিছুটা স্পষ্ট হল। সম্ভবত এই কারনে যে, একদিন কোন এক শরতের সন্ধ্যায় কিংবা বর্ষার এক ঘনমেঘের দিনে আমার এই মেয়ে আমাকে অঝোর অশ্রু জলে ভাসিয়ে আমারই চোখের সামনে পরিবারের অতিতের সমস্ত আদর আপ্যায়ন ভালোবাসা রাগ গোস্যা, অভিমান, ঝগড়া সব ছেড়ে তার দুই নয়ন ভাসিয়ে আমার হাত ছেড়ে আজকের এই নতুন ছেলের হাত ধরে অন্য কোথাও বাসা বাঁধবে। আমার সব অধিকার থাকা সত্তেও, আমার সব ভালোবাসা ঠিক আগের জায়গায় রেখেই আমার মেয়ে তার আরেক নতুন পৃথিবী তৈরি করবে অন্য এক স্থানে। এই ভাবনা আসতেই যেন আমার চোখের পাতা ভিজে আসে কখনো আনন্দে আবার কখনো মিস করার এক কষ্টে।  আমার বুকে একটা সুখের অনুভুতির সঙ্গে আবার একটা অন্য রকম কষ্টের অনুভূতিও অনুভব হয়।  এটা আসলে কষ্ট নয়, এটাও একটা সুখের কষ্ট। ঐ যে ঐ রকম একটা অনুভুতির মত "তোমার মা তার জীবনে তোমাকে কাদতে দেখে একবারই হেসেছিল, যেদিন তোমার জন্ম হয়েছিল।" কি দারুন কথা না!!

আজ আমার মনে হচ্ছে আমিও হয়ত তোমার চলে যাওয়ার সময় তোমার কান্না দেখে আমি অশ্রুজলে হেসে হেসে আমার অন্তরের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে বলব, তুমি সব সময় ভাল থাকবে আমার এই নবাগত ছেলের হাত ধরে। তাকে তুমি শক্ত করে ধরে রেখ মা, আমিও ওর হাত ধরে রেখেছি যেন ও কোথাও হারিয়ে না যায়। আমার কাছে তো আলো আছে মা। আমি তোমাদের জন্য এক বাসযোগ্য পৃথিবীর আবাসস্থল গড়ে দিয়ে যাব, এই আমার প্রতিজ্ঞা ঈশ্বরের কাছে।

১৪/২/২০১৬-বিশ্ব ভালবাসা দিবস-বিয়ে 

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

ফেব্রুয়ারী 

১৪ 

আজ তোমার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যা একজন মেয়ের জীবনের বাকি সব পরিচয় সম্পন্ন করার লক্ষে সামাজিক এক প্রত্যায়ন পত্র আর ধর্মীয় রীতিতে মহান আল্লাহতালার আদেশ পালনের মহাজ্ঞা। আর এই প্রত্যায়ন পত্রের মাধ্যমে তুমি আজ সাধারন এক বাবার মেয়ে থেকে অন্য এক পুরুষের স্ত্রী হয়েছ, একটি পরিবারের বউ হয়েছ, কারো ভাবী, কারো ননদিনী এবং আরও অনেক নতুন সম্পর্কের সৃষ্টি করেছ। সময়ের পরিবর্তনে আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন তুমি মা হবে, তারপর ক্রমান্বয়ে শাশুড়ি থেকে দাদী এবং তারপরে হয়ত বড়মা ইত্যাদি। আর এইসব সার্থক জীবনের জন্য যা প্রয়োজন তারমাত্র একটি সিঁড়ি তুমি আজ পার করলে। বাকি অধ্যায়গুলো পাওয়ার জন্য তোমাকে আরও অনেক কঠিন কঠিন দিন, সময় এবং ক্ষন পার করে এক অনবদ্য এবং নিরবিচ্ছিন্ন জীবন পার করতে হবে এবং তা পার করতে পারলেই কেবল সার্থক মা, সার্থক শাশুড়ি, সার্থক দাদী কিংবা সার্থক বড়মা হওয়ার যোগ্যতা তুমি অর্জন করতে পারবে। আর তার সঙ্গে তুমি পাবে সামাজিক এক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান এবং হয়ে উঠবে সবার কাছে এক দৃষ্টান্তমুলক ব্যক্তিত্ব।  

এখন যে প্রশ্নটা আসে, এই অনবদ্য এবং নিরবিচ্ছিন্ন জীবন বলতে কি বুঝায়? অনবদ্য জীবন মানেই সমস্যাবিহিন জীবন নয়। বরঞ্চ সমস্যা নিরসনকল্পে কিভাবে কখন কোথায় কেমন করে তা সমাধান করা যায় তার হিসাব। এই জীবনে অনেক সমস্যা আসবে, আর এই সমস্যা সমাধান করার জন্য অনেক চেনা-অচেনা মানুষের ভীর তোমার আশেপাশে দেখতে পাবে। কাউকে মনে হবে তোমার অতি পরিচিত এক বন্ধু, কেউ আসবে তোমার জীবনে এমন বেশ ধরে যে মনে হবে তোমার দুঃখে সে অতি দুঃখিত, কেউ আবার এমন করে তার অনুভুতি তোমার কাছে মেলে ধরবে যেন ঠিক এটাই তুমি চাচ্ছ। এই দলটি প্রথমে তোমাকে ভালবাসার কথা শুনাবে, ভাললাগার কথা বলবে, কাজ না হলে নিজেদের চোখের জলে তোমাকে দুর্বল করার চেষ্টা করবে, এমনও হতে পারে তারা তাদের অসহায়ত্তের কথা বলে তোমার কোমল হৃদয়ে জায়গা করার চেষ্টা করবে, আর কিছুতেই কিছু না হলে তখন তোমার মন কিভাবে পিশিয়ে উঠবে সে চেষ্টা করবে। এই দলটি কখনো বালকসুলভ ভদ্র আচরনে আবার কখনো সে অত্যাচারির রুপে তোমাকে দেখা দেবে, এবং তোমাকে বিপথে নিয়ে যাবে। সাবধান থেক এদের থেকে। মনে প্রানে বিশ্বাস রেখ যে, এরা আসলে কেউ তোমার প্রকৃত বন্ধু নয়। একজনও না। আর এটাই এই অদ্ভুত এই পৃথিবীর আচরন। যখনই তুমি এদের সাথে তোমার জীবনের ব্যক্তিগত সমস্যাবলী শেয়ার করেছ, ঠিক তখনি তুমি সমস্যার আরও জটিল গহব্বরে আটকে যাবে। তোমার সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তোমার সমস্যা আরও গভির থেকে গভিরে নিয়ে যাবে এবং এক সময় তোমার জীবনটা এরা কুপরামর্শ দিয়ে এতটাই অতিষ্ঠ করে তোলবে যে, আজ যারা তোমার সত্যিকারের বন্ধু, যারা তোমার জিবনটা সুন্দর হয়ে উঠুক বলে প্রতিনিয়ত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, তাদেরকে তোমার কাউকেই আর বন্ধু মনে হবে না। যেদিন তোমার কাছে এই সব শুভাকাঙ্ক্ষী লোকজনকে আর তোমার আপনজন বলে মনে হবে না, সেদিন তোমাকে মনে রাখতে হবে যে চাটুকারের দল তোমাকে ঘিরে ফেলেছে এবং তোমার জীবনের সব সাধ-আহ্লাদ ধ্বংসের পথে। তোমার আর ঐসব পর্ব, সার্থক মা, সার্থক শাশুড়ি কিংবা সার্থক দাদী হওয়ার পথে এক বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। ঐসব বিপথগামী মানুষরূপী শয়তান গুলো এইটাই চেয়েছে। এর মানে এই যে, তোমাকে প্রতিনিয়ত ঐসব চাটুকার, ঐসব হায়েনা, ঐসব বন্ধুতুল্য অপরিচ্ছন্ন মানুষরূপি খারাপ মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। দূরে থাকতে হবে তোমার নিজের ভাল থাকার জন্য, দূরে থাকতে হবে সামাজিক সম্মান আর পরিচ্ছন্ন জীবনের জন্য। আর ঐসব হায়েনাদের কাছ থেকে দূরে থাকার একটাই পথ, আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজের মানুষদের উপর বিশ্বাস রেখে নিজেকে সঠিক পথে এবং নিজের আত্মবিশ্বাসকে বিশ্বাস করে। তোমার যা আছে, তাতেই তোমাকে সন্তুষ্ট হয়ে থাকতে হবে। তোমার থেকেও অনেক মানুষের অনেক কিছু নাই, কারো হাত নাই, কারো পা নাই, কারো বাবা মা নাই, কারো থাকার ঘর নাই, কারো আবার কিছুই নাই। তোমার তো অন্তত আমরা আছি, তোমার স্বামী আছে, তোমার খুব ভাল শশুর শাশুড়ি আছে, তোমার উকিল বাবা আছে, তোমার জা, ননদিনী, ভাসুর সবাই আছে। তোমার সুন্দর ঘর আছে, তোমার কি নাই? আল্লাহ তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসে বলেই আজ তোমাকে এই রকম একজন সুন্দর মানুষের হাত ধরতে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে যাকে তুমি নিজে ভালবেসেছ এবং তুমি তাকেই পেয়েছ। তোমার জন্য এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত ঈশ্বরের কাছে দোয়া করে, তোমার ভাল চায়। তাদের ভালবাসার মুল্য শুধু একটাই, তোমরা সুখে থাক, তোমরা ভাল থাক। আর কিছুই চায় না এই স্বার্থহীন মানুষগুলো। নিজের স্বামীর কাছে তুমি কতটুকু গ্রহনযোগ্য তা নির্ভর করবে তুমি নিজের কাছে কতটুকুন সৎ এবং তুমি কতটুকুন নিজেকে ভালবাস তার উপর।  

মনে রেখ ভয়, ঘৃণা এবং লোভ কখনো মরে না। এটাকে প্রথম থেকে দূরে রাখতে হবে। আর এর প্রধান উপায় হচ্ছে যখনই কোন ভয়ের উদ্রেক হবে, যখনই কোন ঘৃণার কারন সামনে এসে দারাবে, যখনই কোন লোভের বশবর্তী হবে, ঠিক যার কারনে এইসব ভয়, ঘৃণা এবং লোভের উদ্রেক হবে তা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং তার সঠিক ব্যাখ্যা ঠিক লোকের কাছ থেকে সরাসরি জেনে মন পরিস্কার করে নিতে হবে। তাতেই তুমি জয়ি হবে। আর যদি তা না কর, নিশ্চিত জেনো তোমার পরাজয় নিশ্চিত। আর এটাই চেয়েছে ঐসব বন্ধুসুলভ তোমার হায়েনার দল। তুমি যদি জয়ি হওঁ, তবেই তুমি পাবে নিরবিচ্ছিন্ন জীবনের স্বাদ আর তারপরেই পাবে তুমি জীবনের ঐ সব পর্যায়ের সব কিছু। অর্থাৎ সার্থক একজন মা, সার্থক একজন স্ত্রী, সার্থক একজন শাশুড়ি কিংবা দাদির পরিচয়।  

আজ তোমাকে একটি সত্য কথা বলি। তোমার মা আমার জীবনে এক আশীর্বাদ। এটা তুমি নিজেও জানো। এর মানে এই নয় যে তোমার মা একমাত্র সবচেয়ে গুণী ব্যক্তি, তোমার মা একমাত্র সুন্দরী মহিলা। তার মধ্যেও অনেক গুনাবলির অভাব রয়েছে, তার মধ্যেও অনেক দোষ রয়েছে, তার সঙ্গে আমারও অনেক সময় কারনে অকারনে এবং খুব তুচ্ছ জিনিস নিয়েও মনের অমিল হয়। অন্য দিকে আমিও একমাত্র আদর্শবান ব্যক্তি নই, আমারও ১০০% গুনের সমাহার নাই, আমার অনেক ব্যবহারেও তোমার মায়ের রাগ হয়। কিন্তু তারপরের অধ্যায় হচ্ছে যে, আমরা অনেক কিছু কম্প্রোমাইজ করি, আমরা স্বাভাবিক জীবন জাপনের জন্য আমরা উভয়ে কোথায় কোন কারনে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে, কি কারনে আমাদের মনের ভিতরে কষ্ট হচ্ছে তা মিলেমিশে কথা বলে নিজের মন পরিস্কার করি বলেই আজ তোমরা আমাদেরকে এই পর্যায়ে দেখতে পাচ্ছ। আমরা সুখী পরিবাবের অংশ। আমি ও চাই তোমরা সুখী হওঁ এবং সার্থক জীবন পার কর।  

নিজেদের শুভাকাঙ্ক্ষী ছাড়া দুইজনের মাঝে তৃতীয় পক্ষ যে আসবে সে আর কেউ না, সে হচ্ছে শয়তান। আর শয়তান কখনোই আমার তোমার বন্ধু নয়। সে শুধু ধোঁকা দেয় সে কখনো আসে বন্ধু হিসাবে, কখনো আসে ঠিক তোমার মন যা চায় সে কথাগুলো নিয়ে, সে আসে এক চতুর বুদ্ধি নিয়ে, যা তোমার আর তোমার পরিবারের শুধু ধ্বংসই চয়, মঙ্গল নয়। তোমার আজকের এই পবিত্র দিনটি মঙ্গলময় হোক, তোমার দাম্পত্য জীবন সুখের হোক এটাই আমার সব সময়ের জন্য প্রার্থনা। আমরা তোমাকে ভালবাসি।

চাঁদ সূর্যের প্রতিস্থাপক নয়, শিশির বৃষ্টির প্রতিস্থাপক নয়, পুকুরের ঘোলা জল নদী বা সাগরের প্রিতিস্থাপক নয় তোমার স্বামী তোমার কাছে সূর্য, তোমার পরিবার তোমার কাছে সাগর, আর তোমার প্রতি তোমার পরিবারের অফুরন্ত ভালবাসা হচ্ছে তোমার উপর ভালবাসার বৃষ্টি।এদের কোন প্রতিস্থাপিক হওঁয় না। শয়তানের দলমাঝে মাঝে তোমাকে চাদের কথা বলে, শিশিরের কাব্য দিয়ে অথবা কর্দমাক্ত পুকুরের ঘোলা জল দিয়েই বিপথগামী করে দিতে পারে। আমি তোমাদের জন্য ঐসব হায়েনাদের কাছে থেকে আমার ইসসর তোমাদের রক্ষা করুক সেটাই দোয়া করি।

 You were not an accidental baby in my life, you are my wanted girl from the Almighty and I prayed for you for almost 5 long years before you were born and then I was blessed with you from HIM. I always wanted a girl, you are that girl in my life. I love you all the time and with all my breath. May Almighty Allah listen to my prayer for your happiness and prosperity in your life.

১৯/০২/২০১৬- বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট

অনেক অনেক দিন পর বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে এলাম। প্রায় ১২ বছর পর। অনেক পরিবর্তন হয়েছে এর চেহারা। শুধু বগুড়া ক্যান্ট এর চেহারা কেন, পুরু বগুড়া শহরের চেহারাই পরিবর্তন হয়েছে অনেক। কোন কিছুরই প্রতিদিনের পরিবর্তন চোখে পরে না কিন্তু কেউ হটাত করে দেখলে পুরু পরিবর্তনটা এক নিমিষেই বলা যায়। আমার কাছে তাই পুরু পরিবর্তনটাই ধরা পরল।

বগুড়া শহরে আসার আমার একটি মাত্র কারন ছিল- আমার মেয়েকে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজে রেখে যাওয়া। সদ্য বিবাহিতা আমার মেয়ে তার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, ভাসুর, ভাসুরের বউ, এবং আমাদের পরিবার সবাই একসঙ্গে এসেছি। অত্যান্ত চমৎকার একটা সময় কাটাচ্ছি সবার সঙ্গে। গতকাল গিয়েছিলাম আমার মেয়ের মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে। চারিদিকে সব ডাক্তার, কেউ  এক বছরের অভিজ্ঞতার ডাক্তার, কেউ দুই বছরের, কেউ বা বা আবার এক প্রফের অভিজ্ঞ ডাক্তার, কেউ আবার দুই হয় নাই তবে প্রায় দুই প্রফের সমান অভিজ্ঞ ডাক্তার। আমার মেয়ের ব্যাচের সবাই এখন প্রায় পৌনে দুই প্রফের অভিজ্ঞ সব ডাক্তার। আমি আমার মেয়ের মেসে এসেছি পুরু পরিবার নিয়ে। আমার মেয়ের বিয়ের মিষ্টি নিয়ে।

ছেলেদের মেসের পরিবেশ আমার জানা আছে কারন প্রায় দেড় যুগের বেশি আমি মেস লাইফ কাটিয়েছি। কখনো কোন মেস মেম্বার মেসের খাবার খেয়ে খুশি হয়েছে কিংবা মেসের খাবারের উপর মন খারাপ করে নাই, এই ইতিহাস মোঘল আমল থেকে খুজলেও কোন বরাত পাওয়া যাবে না। মেসের আমার মেয়ের বান্ধবিদেরও সেই একই অবস্থা। তাদেরও মেসের খাবারের উপর অনেক অভিযোগ আছে, আছে কতই না কষ্টের মনোভাব। সব কিছুই ভাল এখানে শুধু মেসের খাবার নিয়ে যত কষ্ট। তারপরেও আমি জানি একদিন ওরা এই মেস লাইফটা মিস করবে। আর আজকের দিনের এই মেসের খাবারের কষ্টের বিষয়টিই ভবিষ্যতের মজার কাহিনি গুলর মধ্যে একটা হয়ে উঠবে। কারন আমার এই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি যে, ঐ মেস লাইফটা খুব মিস করছি।

পিচ্চি পিচ্চি আমার সব মেয়েরা সবাই ডাক্তারি পরছে, দেখেই শান্তি লাগে। এক গুচ্ছ ডাক্তার চারিদিকে। হৈ চৈ কিচির মিচির আনন্দের উল্লাস এই সব উঠতি ডাক্তারদের কণ্ঠে। বড় ভাল লাগে এদের বাচ্চামি, এদের চালচলন। একদিন ওরাই দেশের সব স্বনামধন্য ডাক্তারদের সাড়িতে দারিয়ে থাকবে, কারো হাত দিয়ে অনেক মানুষের জীবনের পাল পরিবর্তন হয়ে যাবে, অনেক মানুষের ভরসার স্থান হবে এরা। এতগুলো ডাক্তারদের পেয়ে আমারও খুব ভাল লাগছিল। এদের মাথায় এখন সব এনাটমি, ইত্যাদি সব কঠিন কঠিন সাব্জেক্ট মাথায় ঢোকে যাচ্ছে। খাটের নিচে রাখা ট্রাঙ্ক ভরতি সব বই এর লেখা খাটের নিচ থেকে উবে গিয়ে একেবারে মাথার ব্রেনে চলে যাচ্ছে, বইগুল আবার কদিন পর খাটের নিচেই জমা হয়ে যাচ্ছে।

তোমরা সবাই খুব ভাল। ভাল থেক তোমরা। জীবনে তোমরা সবাই সফল হবে।

০৫/০২/২০১৬-জেলফেরত মান্নানকে চিঠি

আমি তোমার উপর রাগ এখনো করি নাই।

কিন্তু আমার জানা ছিল না যে, আমাকে কোন এক সময় তোমার সঙ্গে এইভাবে হিসাব করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে আমি তোমার জন্য কি করেছি আর আমি কি করি নাই। একটা জিনিস সর্বদা মনে রাখবা যে, ব্রান্ড নামের একটা মুল্য আছে। আমি তোমার জীবনে একটা ব্রান্ড নাম। এটা তোমার বুঝার ক্ষমতা আছে কিনা আমি জানি না। তবে বুঝাটা উচিৎ। মান্নান আমার জীবনে কোন ব্রান্ড নাম নয়। এটা নিশ্চয় তুমি বুঝতে পারবা। আমার জীবনে হাবিবুল্লাহ কিংবা হোসেন মাদবর একটা ব্রান্ড নাম।

আমি খুব অবাক হয়েছি যে, ইদানিং জেল থেকে ফেরত আসার পর তোমার মধ্যে অনেক অবাস্তব চিন্তার উদ্ভব হয়েছে যা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় নাই। এর অনেকগুলো কারন থাকতে পারে, কিন্তু আমার ধারনা ঐ সমস্ত প্রধান কারনের মধ্যে একটা কারন হতে পারে তোমার মেয়ে মাহিদা (সম্ভবত)। তুমি কতটা ভাল বাবা বা কতটা ভাল স্বামী সেটা তুমি ভাল বলতে পারবে, আমি সেটা নিয়ে কখনো তোমাকে সাজেসনও দেব না।  কিন্তু তোমার মেয়ে মাহিদা তোমার জন্য কতটা ভাল মেয়ে সেটা আমি জানি কারন মাহিদা আমাকে তোমার ব্যাপারে কি কি বলেছে সেটা আমি তোমাকে কখনোই বলতে চাই নাই। কারন তোমার মন খারাপ হয়ে যাবে। তোমার সম্পরকে তোমার মেয়ের ধারনা খুব যে ভাল তা আমি বলব না, বরং তার ধারনা যে সম্পূর্ণ ভুল সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু মাহিমা অত্যন্ত একটা ভাল মেয়ে এবং এই কারনেই সব কিছুর পরেও আমি চেয়েছিলাম মাহিমার একটা ভাল ঘরে বিয়ে হোক এবং তোমাদের বলয় থেকে ও বের হয়ে যাক। আর তার জন্যই আমি মাহিমার বিয়েতে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা দিয়ে আমি ওর জীবনটাকে উপহার দিতে চেয়েছিলাম এবং দিয়েছিও। আমি এর আগেও মাহিমার ১ম বিয়েতে গিয়েছিলাম এবং এবার তো আমার যাওয়ার অনেক প্রয়োজন ছিল অবশ্যই। কিন্তু তুমি আমার কিংবা আমার পরিবারের যাওয়ার পথ এমন করে বন্ধ করে দিলে যে আমার সঙ্গে আর যে সব গনমান্য ব্যাক্তিবর্গ যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল আমার না যাওয়ার কারনে সম্ভবত তারাও আর যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে নাই। আমি অবশ্য কাউকে কিছু বলিও নাই। হয়ত কেউ গেছে হয়ত অনেকেই যায় নাই। আমি আর সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই নাই।

মান্নান, একটা কথা মনে রাখা খুব দরকার যে, পরিবারের বা বংশের লোকদের থেকে আপন কেউ কখনো হয় না। হ্যা, হয়ত পরিবারের মধ্যে অন্তরকলহ থাকে কিন্তু সেটা আবার সমঝোতাও হয়ে যায়। আমি একটা জিনিস লক্ষ করেছি যে, তুমি জেলে থাকার সময় থেকে যে কোন কারনেই হোক (সেটা তোমার অনুপস্থিতির কারনেই হোক আর তাদের সাহসের কারনেই হোক) আমাদের সমস্ত বংশের লোকজন সরাসরি আমার এবং হাবিব ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে এবং তার মধ্যে অনেকেই সান্নিধ্যেও আসতে পেরেছে। এতে আমি দেখেছি যে, আমাদের বংশের অনেকেই তোমার উপর ঠিক যথোপযুক্ত সন্তুষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গটা এখন টানছি না, এটা তোমার বা আমাদের নিতান্তই ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যাপার ধরে নিতে পার।

মান্নান, আমি অসৎ নই এটা তুমিও জান। "আমি অসৎ এবং আল্লাহ আমাকে কখনো সাহায্য করবে না আর তোমার কারনেই আজ আমি এতদুর পর্যন্ত আসতে পেরেছি ইত্যাদি ইত্যাদি" তোমার এই কথাটা আমার কোনভাবেই ভাল লাগে নাই। আর আমি কারো উপর নির্ভর করে এই পর্যন্ত আসি নাই। এটা আল্লাহ আমাকে করেছেন। এটা নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না। আমার সমাজ আলাদা, তোমার সমাজ আলাদা, আমার জগত আলাদা তোমার জগত আলাদা। কে কাকে কিভাবে মুল্যায়ন করবে সেটা যার যার জগতের ব্যাপার। তোমার এসএমএস এর এই ভাবনাটা ভুল। আমি তোমাকে এই ভুল ভাবনা থেকে সরাতেও চাই না, সেটা তোমার হিসাব কিংবা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর তোমার কাছে এটা সত্য বলে মনে হয়েছে বলেই হয়ত তুমি বলতে পেরেছ। এটা নিয়ে আমি তোমাকে আর কৈফিয়তও দিতে চাই না। সৎ এবং অসৎ ব্যাপারটা নিতান্তই নিজস্ব ব্যাপার।  

আমি জানি আমার কি প্ল্যান ছিল তোমাকে নিয়ে আর আমি আমার পুরু প্ল্যানটা আমি তোমাকে বিস্তারিত বলেছিলামও। আমি এটাও বলেছিলাম যে, অচিরেই কোন একটা ছোটখাট ব্যবসা শুরু করতে যেখানে আমি তোমাকে সাহায্য করব আমার সাধ্যমত। আবার এটাও বলেছিলাম যে, যতদিন তোমার কোন গতি না হচ্ছে, আমি মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে তোমাকে দেব যাতে তোমার সংসার চলে।

একটা জিনিস মনে রাখবা মান্নান, কোন কালেই আমার জমির উপর লোভ ছিল না এবং এখনো নাই। তুমি যদি মনে কর যে, কিছু জমিজমা পেয়েই আমি অনেক কিছু হয়ে গেছি সেটা একদম ভুল ধারনা। তুমি কি বলতে পার, আজ পর্যন্ত কোন জমিটা আমার ব্যক্তি জীবনে কাজে লেগেছে? বলতে পার কোন জমিটার উপর ভরসা করে আমি ব্যবসা করছি? একটাও না। আর ভবিষ্যতে ওগুলো কোন কাজে আসবে কিনা তাও আমার জানা নাই। বরঞ্চ আমি তোমাকে একটা কথা বলেছিলাম যে, একদিন যে মাদবর বাড়ি ম্লান হয়ে গেছে সেই মাদবর বারিটা আমি আবার অমলদের জমির উপর স্থাপন করে তোমাকেই ওখানে স্থাপন করে দিয়ে যাব। আমার যেহেতু কোন ছেলে নাই, আমি সবসময় মনে করেছি তোমরাই আমার ছেলে আর তোমরাই আমার সব ব্যবসা বানিজ্যের তদারকি করবে। কিন্তু ওটা হয়ত হয় নাই আর হবে কিনা ভবিষ্যতে আমার জানা নাই। যাই হোক, তুমি যদি মনে করে থাক যে, আমি শুধুমাত্র কিছু জমি জমার কারনে তোমাকে আমি আমার কাছে টেনে নিয়েছি, সেটা মারাত্মক ভুল ধারনা। আর এই ভুল ধারনাটা তোমার কাছেই থাকুক। আমি তোমার ভুল ধারনাটা ভাঙ্গাতে চাইও না। তোমার যদি এখনো মনে হয় তুমি আমাকে জমি জমা দিয়ে অনেক সাহায্য করে ফেলেছ, তাহলে বিক্রি করে দাও এবং আমার টাকাগুলো প্লিজ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা কর, আমি বরং তোমাকে অনুরোধই করছি। I want to get out of everything in future.

তোমার ধারনা আমি তোমাকে অবিশ্বাস করা শুরু করেছি কিনা। এই ধারনাটা তোমার কেন এসেছে আমি জানি না। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে মাহিমার বিয়ের টাকা নেওয়ার আগে ফ্যাক্টরি কর্তৃক মানি ভাউচারে তোমাকে সাইন করতে বলেছে বলে তোমার এই ধারনাটা হয়েছে। আমি অবাক হয়েছি এই জন্য যে, এতদিন যখন তোমাকে আমি টাকা দিয়েছি (সেটা যে কারনেই হোক না কেন), আমি তোমার পক্ষে সাইন করেছি কিন্তু আমাদের সর্বশেষ ফ্যাক্টরি পলিসি মোতাবেক, আমাদের অবর্তমানে যিনি টাকা নিচ্ছেন এখন থেকে উক্ত ব্যক্তিই ফ্যাক্টরি মানি রিসিপ্টে সাইন করে টাকা নিতে হবে, আর এই কারনেই তোমাকে সাইন করতে বলেছে। তাছাড়া তখন আবার অডিট চলতেছিল বলে কোন অবস্থায়ই মানি রিসিপ্ট সাইন করা ছাড়া ফ্যাক্টরি টাকা দিতেও পারতো না। আমার অবাকই লেগেছে যে, মুর্তজা সাহেব যদি টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারে, আমি যদি টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারি, তুমি মুরতুজা ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সময় যদি সাইন করতে পার, তাহলে তুমি কেন টাকা নেওয়ার সময় সাইন করতে পারবে না? আর সাইন করতে গিয়েই যদি তুমি মনে কর যে, আমি তোমাকে অবিশ্বাস করছি, তাহলে ত আমার কোন কথা থাকে না।

তুমি DBBL ব্যাংক থেকে ৬০ লক্ষ টাকা লোণ নিয়ে ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ। আমি সত্যি সত্যি খুশি হয়েছি যে তুমি একটা ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ এবং নিজের উদ্যোগে তুমি নিজের ফাইন্যন্স দিয়ে ফ্যাক্টরি করতে চেয়েছ, এটা খুবই ভাল পদক্ষেপ। তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে ব্যাংকের লোণ প্রতি মাসে পে করতে পার। আর পদ্মা ব্রিজের বালুর সরবরাহ পাচ্ছ যেনে আমি আরও খুশি হয়েছি যে অন্তত একটা ভাল কাজের অফার পেয়েছ। আমি তোমার জন্য দোয়া করি তুমি নিজের উদ্যগে ভাল থাক। এবং মানুস তোমাকে তোমার নিজের নামে চিনুক। তোমার এসএমএস টাই ঠিক যে একটা পাখি তার নিজের ডানার শক্তিতে বেচে থাকার নামই স্বাধীনতা, গাছের ঢালের উপর নয়। আর তুমি আরও লিখেছ যে, এখন থেকে তুমি আর মেজরের সঙ্গে নাই। আমি কিছু মাইন্ড করি নাই তাতে। এটা নিতান্তই তোমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং অভিলাষ।

আমি জানি তুমি তোমার কথার বরখেলাপ কর না। আর এই জন্যই আমি কখনো তোমাকে নিয়ে কখনো অবিশ্বাস করার কোন কারনও দেখি নাই। তোমার হয়ত মনে হতে পারে যে আমি এমসিসির জমি নিয়ে চিন্তিত কিনা কিংবা হাবিব ভাইয়ের ৪৭ শতাংশ জমি নিয়ে চিন্তিত কিনা ইত্যাদি। হ্যা, আমি এমসিসির ৩৫ শতাংশ জমি নিয়ে চিন্তিত এই কারনে যে, এই ইজিএম এ যদি কোন কারনে পুরু বোর্ড পরিবরতন হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে একটা নতুন করে ঝামেলা হতেই পারে কিন্তু যারা পাওয়ার অফ এটর্নি দিয়েছে সবাই যেহেতু আমার বন্ধু, সেক্ষেত্রে হয়ত অনেক অসুবিধা হবে না। আর তুমি তোমার দায়িত্ব সম্পর্কে যথেস্ট পরিমানে ওয়াকিবহাল। সেটা আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলার অবকাশ রাখে না। তবে আমি বুঝতে পারি নাই যে, ঐদিন তোমার আন্টির সামনে তুমি এমন একটা ব্যবহার করবে। শেষ পর্যন্ত আমি তোমার আন্টির কাছে অপদস্থই হয়েছি এই কারনে যে, সে হাস্পাতাল থেকে অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজটা করতে এসেছিল, আর যখন কাজটাই হল না, সে আমাকে চার্জ করতেই পারে। এটা নিয়েও আমি তোমাকে আর বিব্রত করব না। তুমি সৎ, তুমি মানুষের বিচার কর, সমাজ তোমাকে অনেক আদর্শবান ব্যক্তি হিসাবে দেখে, তুমি ন্যায্য বিচার কর বলেই তুমি আমাকে এগুলি জানিয়ে এসছো এবং আমিও তাই জানি। কিন্তু তুমি ঐদিন কতটা ন্যায্য করেছ, কিংবা কতটা বিচারিক হিসাবে কাজটি করেছ তা তোমার কাছেই থাকুক। 

যাই হোক মান্নান, আমি যে কাজটা কখনো করতে চাই নাই, কখনোই চাই নাই,  তুমি আমাকে সেই কাজটাই করতে বাধ্য করেছ। আর সেটা হচ্ছে তোমার রাখা হিসাব অনুযায়িই আমি একটা ক্যাল্কুলেসন করেছি। আমি তোমার ব্যাপারে অনেক হিসাব অনেক সময় লিখে রাখি না কিন্তু আমার ফ্যাক্টরি রাখত, আর তার উপরে বেজ করেই একটা হিসাব আমি তোমাকে পাঠাচ্ছি। সব হিসাবের বিপক্ষে বিস্তারিত এক্সকেল শিট আছে, রেজিস্ট্রি খাতা আছে, তুমি যদি চাও, আমি সেগুল ফটকপি করে দিতে পারব। এর মানে এই নয় যে, আমি তোমার কাছে কোন টাকা পয়সা চাচ্ছি পাওনা হিসাবে। এটা শুধু তোমার জানার জন্য দেওয়া। এই হিসাব দিয়ে আমি তোমার কাছ থেকে কোন কিছুই প্রত্যাশা করছি না। কোন টাকা পয়সাও দাবি করছি না। শুধু তোমাকে জানানোর জন্য এই হিসাব পাঠানো। তুমি মাইন্ড করতে পার কিন্তু যেহেতু তুমি বিচার সাল্লিশি কর, তোমার মধ্যে অন্তত একটা বিচারিক ক্ষমতা আছে বলে আমার ধারনা এবং তোমার মাইন্ড করার কথা নয়।  অন্তত সত্যি  জিনিসটা তোমার জানা থাকল। তোমাকে কিছু দিতে হবে না আমাকে, এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাক। আর আমি আমার এই চিঠির উপর কোন মন্তব্য ও আশা করি না। যদি ক্যালকুলেসনে ভুল থাকে শুধু ওটা আমি তোমাকে নিয়ে বসতে পারি, তাছাড়া আমার অন্য কোন মন্তব্যে আমি কোন মন্তব্য আশা করি না। 

 আর একটা ব্যাপার আমার কাছে অবাক লাগছে যে, তুমি আমার এই দুঃসময়েও শুধু নিজের ব্যাপারটাই দেখছ, তোমার কি একটা ফ্রেন্ড ও নাই, একটা কলিগ ও নাই, কিংবা একজন আত্তিয়ও নাই যে তোমাকে কিছু আর্থিক সাহায্য দিয়েও সাহায্য করতে পারে? এই অবস্থাটা ভাল নয়। সব মানুষের বিপদের সময় কেউ না কেউ এগিয়ে আসার জন্য কিছু ফ্রেন্ড, কলিগ, আত্মীয়সজন তৈরি করে রাখতে হয় যারা বিপদের সময় কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারে। আমার কাছে মনে হচ্ছে তোমার এই সার্কেলটা তুমি তৈরি করতে পারন নাই। যাই হোক।  

ভাল থেক। চিঠিটা লম্বা করলাম না। দরকার হলে পরে আবার লিখব। রিভার সাইডের লসের ব্যাপারটা নিয়ে আমরা অনেক চিন্তিত এবং এটা নিয়ে আমরা অনেক অসুবিধায় আছি সন্দেহ নাই। তারপরেও আল্লাহ আছেন। ধন্যবাদ। নিচে একটা সামারি করে দিলাম হিসাব নিকাশের। তুমি তোমার অবসর সময়ে দেখে নিও। আমি জানি তুমি বিচার কাজ কর এবং নিরপেক্ষ কাজ কর। নিজের বিরুদ্ধে কোন ইনফরমেশন গেলেও যে তা মেনে নেয় তাকে বলা হয় নিরপেক্ষতা। এটা তোমাকে আমার শিখানোর দরকার মনে করি না। তুমি আমার থেকেও বুদ্ধিমান, সেটা তুমি নিজেই বলেছ। এবং আমারও তাই ধারনা যে, তুমি আমার থেকে বেশি বুদ্ধিমান।

আখতার

  

মা ইন্ডাস্ট্রিজে প্রতিদিনের কালেকশন আকারে টাকা জমা হয়েছে মোট (Collection) 48231540
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে মান্নান পেটি ক্যাশ আকারে নিয়েছে (Loan to Mannan) 10004618
মান্নান মা ইন্ডাস্ট্রিজকে ফেরত দিয়েছে (Loan Refunded by Mannan) 5328531
মান্নানের কাছে মা ইন্ডাস্ট্রিজ পাবে 4676087
মেজর আখতার কর্তৃক মান্নানকে রিভার সাইড/ব্যাংক থেকে জমি এবং ব্যক্তিগত খরচের জন্য প্রদান করা হয় 2039919
হাবিব ভাইয়ের ২৪৪ এবং ৫৮ শতাংশ, তানির ২৬ শতাংশ, শওকতের ১ বিঘা জমির মোট মুল্য সমন্নয় পূর্বক মান্নান অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে 438900
১৭/১/২০০৮ থেকে ১৮/১২/২০১২ পর্যন্ত (৬/২/২০০৯ ৯/৬/২০১২ তারিখের হিসাব ছাড়া) মান্নানকে মেজর আখতার বিভিন্ন সময়ে অমলদের জমি, ইদ্রিসের জমি, বেলা বুয়ার জমি, এবং অন্যান্য বাবদ ক্যাশ প্রদান করেন  4241500
নভেম্বর ২০১৫ জেলে যাওয়ার সময় থেকে জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত (মাহিমার বিয়ে, মান্নানের স্ত্রীদের জমি রেজিস্ট্রেসন সহ) ইত্যাদি বাবদমেজর আখতার মান্নানের জন্য খরচ করেন 2024000
নোট-১ এখানে উল্লেখ থাকে যে, ফ্যাক্টরির সর্বশেষ বিদ্যুৎ বিল মোট ১৫ লক্ষ টাকা (বিদ্যুৎ লাইন কাটার পর চেকের মাধ্যমে ১১ লক্ষ টাকা এবং জানুয়ারি ২০১৩ মাসের বিদ্যুৎ বিল ৪৪১০০০ টাকা), ফ্যাক্টরির বকেয়া বেতন ২ লক্ষ টাকা, আবু বকরের দানার বকেয়া বাবদ ৩ লক্ষ টাকা (যা এখনো প্রি মাসে দিচ্ছি), ফ্যাক্টরিতে রক্ষিত সর্বশেষ ফিনিসড মালের দাম সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), মার্কেটে বাকি ৫ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), ক্রাশ মাল এর দাম ২ লক্ষ টাকা (মান্নানের হিসাব অনুযায়ি), কাইউমের লোহা লক্কর বিক্রির প্রায় ১ লক্ষ টাকা,  আল্লার দান দোকানে বাকি ৩০ হাজার টাকা, ফজল সাহেবের বাকি প্রায় ৪৫ হাজার টাকা, সর্ব সাকুল্যে সোয়া ৩৬ লক্ষ টাকা হয়। 3625000
বর্তমানে মেজর আখতার মান্নানের কাছে পাবে 17045406
নোট-২: মান্নান যদি বর্তমানে আমিরদের জমি ২০৪ শতাংশ, বেলা বুয়ার জমি ২৯ শতাংশ, মান্নানের নিজস্ব জমি ৫৪ শতাংশ, এবং ইদ্রিসদের জমি ৬৬ শতাংশ যা মেজরের নামে কেনা হয়েছে, অমলদের ৪০০ শতাংশ মোট প্রায় ৭০০ শতাংশ জমির মুল্য বাবদ হিসাব করে উক্ত পাওনা সমন্নয় করেও তাতে প্রতি বিঘার জমির মুল্য দাড়ায় 803569.14
এখানে উল্লেখ থাকে যে, এক্সেল শিটে কখন কোন জমির জন্য কত টাকা দেওয়া হয়েছে তা বিশদ ভাবে বিবরন দেওয়া আছে।
অন্যান্য হিসাব
মেসার্স রাবেতা থেকে ২৯ কিস্তিতে মান্নান মোট অগ্রিম এবং মালের সমন্নয় পূর্বক টাকা নিয়েছে (রাবেতার কাছ থেকে অগ্রিম ১০ লক্ষ টাকা নেওয়ার কোন হিসাব মা ইন্ডাস্ট্রিজের রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ নাই) 305900
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে ৭ কিস্তিতে মান্নান নতুন পিকআপ এর ইন্সটলমেন্ট দিয়েছে 360000
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে মাহিদার জন্য ক্যাম্ব্রিয়ান কলেজের জন্য খরচ করা হয়েছে 347000
দুলালের বিদেশ যাওয়ার জন্য মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে 463000
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে আলি ভাইকে টাকা দেওয়া হয়েছে 60000
মা ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে কন্সট্রাকসন কাজের জন্য ফজল ভাইকে টাকা দেওয়া হয়েছে 76100

২৯/১২/২০১৫- মালয়েশিয়া ভ্রমন

খুব হাপিয়ে উঠেছিল আমার পরিবারের সদস্যরা। কোথাও বেড়াতে চাচ্ছিল সবাই এক সঙ্গে। বিশেষ করে আমার বড় মেয়ে ডাক্তারি বই পড়তে পড়তে তার আর ভাল লাগছিল না। সব বই, প্র্যাক্টিকেল ক্লাস, আর পরীক্ষা টরিক্ষা এক পাশে ঠেলে রেখে একদম নিরিবিলি কোথাও বেরিয়ে আসার জন্য প্ল্যান করতে চাইলে আমার বউ বলল ” চল মালয়েশিয়ায় যাই, ওখানে আমি যেহেতু অনেকদিন ছিলাম, অনেক জায়গা আমার চেনা, গেলে খারাপ লাগবে না”। কোন দেশে যাব, এটাতে আমার কোন বাড়তি চয়েস ছিল না, কোথাও যাওয়াটাই ছিল আমার কাছে মুখ্য ব্যাপার। আমার অনেকগুলু সমস্যা হাতে ছিল যদিও, (আমার বড় ভাই অনেক বছর পর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসবেন ২৬ ডিসেম্বর, আমার ভাইয়ের বউ বাংলাদেশে ইতিমধ্যে আছেন এবং ২৩ ডিসেম্বর তারিখে আবার চলেও যাবেন, আমি মালয়েশিয়া গেলে ২৩ তারিখে, সেক্ষেত্রে আমার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না তার যাওয়ার দিন, আমার মেয়ের দুইটা কার্ড পরীক্ষা মিস হবে, আমার ফ্যাক্টরির উদ্দেশ্যে বায়ার আসবে আমার অবর্তমানে ইত্যাদি ইত্যাদি)। তারপরেও আমি ব্যাপারটা এড়িয়ে প্ল্যানটা জারি রেখেছিলাম কারন, সর্বদা সমস্যা থাকবে আর এই সমস্যা নিয়েই আমাকে কোন না কোন দিন সময় যোগাড় করতেই হবে, আমি অনেক ভেবেচিন্তে ২৩ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সে টিকেট কনফার্ম করে ফেললাম।

আমার ছোট মেয়ে কখনো প্ল্যানে উঠেনি, তার যেমন একটা প্ল্যানে উঠার কৌতূহল ছিল আবার কয়েকদিন আগে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন মিসিং হওয়ার কারনে সে একটা ভীষণ ভয়ের মধ্যেও ছিল। কি হয় কি হয় না, সে ভীষণ ভয়ের মধ্যে প্লেনে উঠেছিল। তার চিত্তের ভিতরে কতটা ভয় কাজ করছিল সেটা আমি বুঝতে পারলাম যখন আমরা সবাই প্লেনে উঠলাম। আমার ছোট মেয়ে কোন এক অজানা ভয়ে একদম চুপসে যাচ্ছিল, তার বিদেশ যাওয়ার খায়েশ যেন আর থাকছিল না। সে বারবার তার মাকে শক্ত করে ধরেছিল, আমাকেও তার পাশে বসিয়ে আমার কোট আর হাত এমন করে ধরেছিল যেন সে কোন এক উচু পাহারের একদম ধারে গিয়ে দারিয়ে কোন মানুষ যা করে সে তাই করছিল। আমার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা কোন লজিক তার ভয়ের উপশমের লাঘবের উপাথ্য হয়ে কাজ করছিল না। তার চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি পরছিল আর মুখটা এতটাই ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল যে, আমার বড় মায়া হল। ১৩ বছরের একটা ছোট মেয়েকে আমি কি বললে যে তার চিত্ত ঠাণ্ডা হবে বা ভয় কেটে যাবে তার কোন কিছুই আমার জানা ছিল না। এই ব্যাপারটা যাওয়ার সময়ই শুধু হয়নি, বরং ব্যাপারটা আরও কঠিনরুপ ধারন করল যখন এয়ার এশিয়ার একটি প্লেন ২৫ তারিখে ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে হারিয়ে গেল। আমি আমার পরিবারের সময় বাঁচানোর জন্য যেখানে বাসে বা ট্রেনে গেলেও চলে, তার পরিবর্তে আমি সেখানে প্লেনের টিকেট আগেই করে ফেলেছিলাম। যেমন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে লঙ্কাউই, লঙ্কাউই থেকে পেনাং, আবার পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর, এই পুরু ভ্রমণগুলোতে আমি বাস বা রিভার ক্রুজ বা ট্রেন বাদ দিয়ে সব স্থান থেকে এয়ারে টিকেট করেছিলাম। এরমধ্যে আবার একটা পরেছে এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট। তো বুঝতে আমার অসুবিধা হল না নেক্সট ভ্রমনগুল আমার ছোট মেয়ের জন্য আনন্দের না হয়ে মোটামুটি কষ্টের সময় পার হবে। ভয় এমন একটা জিনিস যাকে একবার ধরে বসে, সে বুঝতে পারে তার ভিতরে কি হয়। এটা বাইরের কেউ তার পরিধি আঁচ করবার উপায় থাকে না। যাক, তারপরেও আমি সিডিউলগুল প্লেনেই ঠিক রাখার চেস্টা করেছিলাম একমাত্র পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর ছাড়া। শেষ অবধি পেনাং থেকে কুয়ালালামপুর পর্যন্ত প্লেন বাদ দিয়ে বাসে আসতে হয়েছিল। সেটাও আরেক অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ার যাওয়ার প্রথম দিনের ঘটনাটা বলি।

সকাল ১১ টায় ফ্লাইট। সম্ভবত আমরাই সবার শেষে ফ্লাইটে উঠলাম। কুয়ালালামপুর পৌঁছলাম লোকাল টাইমে প্রায় তিনটার দিকে। কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে লোক ছিল। ফলে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। কোন অসুবিধা হয় নাই। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় আমাদের সবার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল একটা কারনে।  আমাদের ঠিক সামনে একজন বাঙালি ছিল যে কয়েকদিন আগে মালয়েশিয়ায় এসে ইমিগ্রেসন থেকে কোন এক অজ্ঞাত কারনে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে জানে না কেন তাকে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেসন থেকে মালয়েশিয়ায় ঢোকতে না দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত  পাঠিয়েছিল। ফলে সে ১৫ দিনের তফাতেই আবারো একটা এটেম্পট নিয়েছিল মালয়েশিয়ায় ঢোকার জন্য। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম এবারো তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। নেহায়েত গরিব মানুষ, গ্রাম থেকে বোধহয় মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে। আমি ইমিগ্রেসন অফিসারে সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম এই জন্যে যে কি কারনে তাকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে তা সঠিক তথ্যটা জানার জন্য। ইমিগ্রেসন অফিসার আমাকে জানালেন যে, কিছু সমস্যা আছে, সিকিউরিটির ব্যাপার। আগেরবার তাকে ওই কারনেই ফেরত পাঠানো হয়েছিল, এবারো তাই। লোকটা ভালভাবে তার অবস্থাটা ব্যাখ্যা করতে পারছিল না ভাষার কারনে। বুঝাই যাচ্ছিল যে সে বড় অসহায়। আমাকে দেখে যেন তার আত্মায় পানি এল। বলল, স্যার, আমাকে একটু সাহায্য করেন। অরা কি বলে আমি ঠিক বুঝতে পারি না আর কি বলতে কি উত্তর দিচ্ছি তাও ভাল মত বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমার এই সাহায্যটা ওনার কাজে লাগলো না ইমিগ্রেসন অফিসারের কারনে। অফিসার আমাকে শুধু প্রশ্ন করল, ওই ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গের কিনা। আমি সত্যি কথাই বললাম যে, সে আমাদের সঙ্গের কেউ না। ফলে ইমিগ্রেসন অফিসার আমাকে রিকুয়েস্ট করলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু না বলার জন্য। আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম, তাকে পুনরায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে কিনা এবং কেন। সে আমাকে জানাল যে, তাকে ফেরত পাঠানো ছাড়া কোন বিকল্প নাই। তার সিকিউরিটির সমস্যা আছে। আমরা চলে এলাম কিন্তু আমাদের সবার মনটা একদম খারাপ হয়ে গেল এই ভেবে যে, নেহায়েত একটা গ্রামের গরিব মানুষ কি কারনে মালয়েশিয়ার কোন নিরাপত্তার হুমকি হয়ে গেল সে নিজেও জানে না অথচ সে হয়ত তার সব কিছু বিক্রি করে তার স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় এসেছে কিন্তু ওই স্বপ্নের দেশে সে ঢোকতে পারছে না। দেশে গিয়ে এখন সে কি করবে বা কি করবে না এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর আমার মেয়েরা আমাকে করেছিল কিন্তু সে উত্তরগুলু আমার জানা ছিল না। লেখাপড়া করাটা যে কত জরুরি, অন্তত নিজের কথাগুলু অন্যকে বুঝানো এবং অন্যের কথাগুলো সঠিকভাবে বুঝা যে কত জরুরি সেটা তখনই সম্ভব যখন কেউ অন্তত ওই টুকুন লেখাপড়া করা দরকার। হয়ত ইমিগ্রেসন অফিসার এমন কোন প্রশ্ন তাকে করেছিল যার প্রশ্ন সে না বুঝেই হ্যা বলেছে আর সে হ্যা উত্তরটাই তার কাল হয়ে দারিয়েছে। বড় দুঃখের ব্যাপার। আমাদের কিছুই করার ছিল না।

এয়ারপোর্ট থেকে আমরা বেরিয়ে গেলাম। বড্ড সুন্দর একটা দেশ। খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, অনেক ফ্লাই ওভার, অনেক রাস্তাঘাট, সুন্দর সুন্দর দালান কোঠা। অনেক দূর থেকে টুইন টাওয়ার চোখে পরে। যে কোন উন্নত দেশের সঙ্গে মালয়েশিয়াকে এখন তুলনা করা চলে। কোন রিক্সা নাই, বাসও চলে না দিনের বেলায়। চারিদিকে ট্যাক্সি আর প্রাইভেট কারের সমারোহ। কোন হর্ন বাজে না। জ্যাম থাকলেও সেটা সাময়িক। বড় ডিসিপ্লিনড দেশ। রাস্তার পাশের বনজঙ্গল গুলুও বেশ গুছানো। নাপিতের ক্ষুরে যেমন মানুসের অতিরিক্ত চুল ছেটে সুন্দর করে রাখা হয়, মালয়েশিয়ার রাস্তার পাশের ঘাসগুলুও যেন সেভাবে সাজানো। অনেক ক্লিনার কাজ করছে, যার যার কাজ সে সে করছে। তাদের উপর কোন তদারকি করছে না কেউ। খুব গুছানো একটা শহর। প্রায় ৩০ মিনিট গাড়িতে থাকার পর হোটেলে এলাম। খুব বেশি খরচ না। থ্রি স্টার স্ট্যান্ডার্ড। প্রতিটি রুম মাত্র ২০০ রিঙ্গিত এর মধ্যে বা তার থেকে একটু বেশি। আমরা দুই ফ্যামিলি তিনটা রুম নিলাম, মাঝখানে কানেক্টেড। আমার ছোট মেয়ের ভয়টা এখন আর নাই, তার চোখে মুখে হাসি আছে, আর আমার বড় মেয়ে কতক্ষণে মোবাইল সিম কিনবে, ফেসবুক ব্রাউজ করবে, তার মালয়েশিয়ার ভ্রমনের ছবি সম্বলিত ম্যাসেজ ট্যাগ করবে, সেই ভাবনায় বারবার কোথায় মবাইলের সিম পাওয়া যায় তার জন্য অস্থির করে ফেলছে। রাত নয়টায় খেতে বের হয়েছি। আমাদের সঙ্গে ড্রাইভার আছে, গাড়িও আছে। একটা পাকিস্তানি হোটেলে খেতে ঢোকলাম। প্রায় বাঙালি খাবার। আমি স্রেফ ভাত ডাল আর সবজি খেয়েই তৃপ্ত বোধ করলাম। মেয়েরা আধুনিক মানুসের ডিজিটাল ধাচের। মুরগি আর বিরিয়ানি ছাড়া তারা কিছুই পছন্দ করে না। সুতরাং তারা ঐটাই খেল আর আমি আমার মেনু।  খাওয়ার পর একটু আশে পাশের মার্কেটে ঘোরাফেরা করলাম, কিছু কেনাকাটাও করলাম। একটা জিনিস খেয়াল করলাম যে, আমার মেয়েরা যা যা জিনিসের প্রতি কেনার খেয়াল তা হচ্ছে সব গিফট, কোন বন্ধুরে কোন গিফট দেয়া যায় সেটা নিয়ে মহা জল্পনা কল্পনা। আমার মেয়ে এবং বউ সিম কিনতে ভুল করল না। অনেক পদের সিম কার্ড। অফারের ছড়াছড়ি। রাত প্রায় ১ টায় আমাদের হোটেলে পৌঁছলাম। সারাদিন ফ্লাইট আর ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফিরে এসে বড্ড ক্লান্ত মনে হল। বিছানায় যেতেই ঘুমিয়ে পরলাম।

পরদিন ২৪ ডিসেম্বর।

সকালে নামাজ পরে নাস্তা করে বেরিয়ে গেলাম কতগুলো বিশেষ স্থান দেখার জন্য। তার মধ্যে প্রথম ছিল গেন্টিং আইল্যান্ড। গেন্টিং আইল্যান্ড সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ২০০০ মিটার উঁচুতে। জায়গাটা সুন্দর। পাহারি এলাকা, তার এক জায়গায় স্ট্রবেরি চাষ হয়। বড্ড সুন্দর। হরেক রকমের স্ট্রবেরি। সবুজ, লাল, মেরুন সাদা আরও কত প্রকারের যে স্ট্র বেরির রঙ। এটাকে একটা স্ট্রবেরির মিউজিয়াম বলা চলে আর কি। ওখানে অনেক বাঙালি ছেলেরা কাজ করে। একটা জিনিস খেয়াল করার মত যে, যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই কোন না কোন বাঙালি লোক পেয়েছি, তাও আবার একজন করে নয়, অনেক বাঙালি। স্ট্রবেরির মিউজিয়ামটা দেখার জন্য আগে থেকে কোন প্ল্যান ছিল না। এটা দেখা হয়েছে গেন্টিং আইল্যান্ডে যাওয়ার কারনে। সারাদিন মেঘে ভরা থাকে জায়গাটা। অনেক দূর থেকে পাহারের কোল ঘেসে মেঘ বলে মনে হলেও কাছে গেলে ওটা কুয়াশাই হয়ে যায়। অত্যন্ত ঘন কুয়াশায় জায়গাটা সারাক্ষন ভিজাই থাকে। খুব সাবধানে গারি চালাতে হয়।  এমনিতেই পাহারি এলাকা, আর তার উপর আবার ভিজা রাস্তা ঘাট। সবার হাতে ছাতি। শুধু আমাদের হাতে কারো কোন ছাতি নাই।

স্ট্রবেরি দেখে পাশেই স্কাই রেল। দারুন জিনিস। শুন্যে ভেসে ভেসে প্রায় কয়েক কিলোমিটার রাস্তা ক্যাবল কার দিয়ে পাহারের উপর দিয়ে উরে যাওয়ার মত। এটাকে ওদের ভাষায় বলে গেন্টিং স্কাই ড্রাইভ। এটাকে আবার “গন্ডলা লিফট”ও বলে। প্রায় ৪ কিলোমিটার লম্বা পথ। এই জায়গাটার নাম করন করা হয় কোন এক প্রাইভেট কম্পানির নামে। ঐ কম্পানির নাম ছিল “গেন্টিং হাই ল্যান্ডস বারহ্যাড” ১৯৬৫ সালে। উক্ত কোম্পানিকে তখন মোট ১৪০০০ হাজার একর জমি ১০০ বছরের জন্য লিজ দিয়েছিল। বেশ মজার একটা ব্যাপার। যাদের হার্টের সমস্যা আছে, বা হাইট ফুবিয়া আছে তাদের না যাওয়াই ভাল, তবে যারা একটু থ্রিল পছন্দ করে, তারা স্কাই ক্যাবলটা আনন্দ পাবে। এই ক্যাবল কারটাকে বর্তমানে “World’s Fastest Mono Cable Car System” নামেও পরিচিত with a maximum speed of 21.6 kilometres per hour (13.4 mph) and the “Longest Cable Car in Malaysia and Southeast Asia maybe”. এখানে 20th Century Fox World কোম্পানির বর্তমানে লোকেশনের কাজ চলছে যা ২০১৬ তে শেষ হবে। তখন দেখা যাবে আরেক চমক। চারিদিকে ঘন জঙ্গল, অনেক উঁচুতে এক একটা ক্যাবল কারে সর্ব মোট চারজন করে করে পাহারের উপর দিয়ে ভেসে পাহাড়ের অনেক উঁচুতে চলে যাওয়ার যে একটা মজার অনুভুতি, মন্দ না। আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে আবারো একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। যাওয়ার সময় সে কিছুতেই চোখ খুলছিল না, কিন্তু আসার সময় মনে হল, একটু সাহস সঞ্চয় করে চোখ খুলে কিছুটা হলেও পাহাড়ের দৃশ্যটা দেখেছে আর কি।  কিন্তু কেউ একটু নড়লেই তার চিৎকার শোনা যায়। “এই বাবা, তুমি নরাচরা করছ কেন? কিংবা ঐ আপি তুমি ছবি তোলার জন্য নরাচরা করছ কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি”। অসংখ্য ছবি আর ছবি তুলেছে আমার বড় মেয়ে, সঙ্গে তাদের মা। ফ্যামিলি নিয়ে ঘোরাফেরার মধ্যে একটা মজা আলাদা। আমি অনেকবার বিদেশ গিয়েছি কিন্তু তা নিতান্তই ব্যবসার কাজে অথবা চাকুরির কাজে। এবারই প্রথম আমার সপরিবারে সবাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়া। মেয়েদের উচ্ছ্বাস দেখে আমার বেশ ভাল লাগছিল। অনেকবার সবাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার প্লান করলেও কারো না কারো স্কুল বা কলেজের বা পরিক্ষার কারনে আমাদের যাওয়া হয় নাই।  

ঐ ক্যাবলকার দেখে আমরা সবাই আবার চলে গেলাম পুত্রজায়া দেখার জন্য।  পুত্রজায়া জায়গাটা দেখার মত একটা জায়গা। পুত্র জায়ার প্রধান কনসেপ্টটা হচ্ছে যে, “City in the garden and Intellegent City” পুত্র জায়ায় এখন সরকারি সব অফিস আদালত ট্র্যান্সফার করা হয়েছে (একমাত্র Ministry of International Trade and Industry, Ministry of Defence and Ministry of Works ছাড়া)। কুয়ালালামপুরে জ্যামের কারনে পুরু প্রশাসনিক অফিসগুলো সব এখন এখানে অবস্থিত। ডঃ মহাতিরের মাথায় প্রথম এই কনসেপ্টটা আসে যে, কুয়ালালামপুর থেকে সর ধরনের অফিস এই পুত্রজায়ায় স্থানান্তর করা হয়। মালয়েশিয়ান ভাষায় পুত্র মানে “প্রিন্স” আর জায়া মানে “সাকসেস”। অর্থাৎ প্রিন্সের সাকসেস বা ভিক্টরিই হচ্ছে পুত্রজায়ার অর্থ। ইন্টেলিজেন্স সিটি বলতে বুঝায় যে, এটা একটা ডিজিটাল সিটি। এখানে বলা বাহুল্য যে, ডিজিটাল সিটি বা স্মার্ট সিটিগুলোর মধ্যে Chicago, Boston, Barcelona and Stockholm রয়েছে। As of 2010 Census the population of Putrajaya is 97.4% Muslim, 1.0% Hindu, 0.9% Christian, 0.4% Buddhist, and 0.3% other or non-religious

পুত্র জায়ায় নিম্ন বর্ণিত অফিসগুলো রয়েছেঃ

 পারদানা পুত্র অর্থাৎ office of the Prime Minister

সেরি পারদানা বা official residence of the Prime Minister

শ্রী সাত্রিয়া বা official residence of the Deputy Prime Minister

প্যালেস অফ জাস্টিস

পুত্র জায়া মিনিস্ট্রি অফ ফাইন্যান্স

অইস্মা পুত্র বা Malaysian Ministry of Foreign Affairs.

ম্যালাওাতি জাতীয় প্যালেস

Putrajaya Convention Centre

Perdana Leadership Foundation

Heritage Square

Selera Putra

Souq Putrajaya

Pusat Kejiranan Presint 9

Pusat Kejiranan Presint 16

Putra Mosque

Tuanku Mizan Zainal Abidin Mosque (Iron Mosque (Masjid Besi))

এখানে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক কনভেনশনাল সেন্টার অবস্থিত। লোকেশনটা সত্যি দেখার মত। যেমন সুন্দর তেমনি মনোরম। এখানে অনেক রাজকীয় জায়গা আছে, আছে চমৎকার একটা মসজিদ, আছে লেক, আছে বিশাল বিশাল বিল্ডিং, আর আছে অনেক বিদেশি পর্যটক। প্রতিটি লাইট পোস্ট, প্রতিটি গাছপালা, প্রতিটি বিল্ডিং ডিজাইন, এমন কি প্রতিটি টাইলস প্ল্যান করে সাজানো। যে বা যারাই এর পিছনে কাজ করুক না কেন, তাদের জবাবদিহিতা ছিল এর সৌন্দর্য এবং সমাপ্তির লক্ষে। কোন একটা জায়গা খামাখা ব্যবহার করা হয় নাই, কোন না কোন লক্ষ্য নিয়ে এর নির্মাণ কাজ হয়েছে, আবার যে জায়গাগুলো ব্যবহার করা হয় নাই, সেগুলোও অত্যান্ত প্লান মাফিক খালি রাখা হয়েছে। যত্রতত্র কোন কিছুই করা হয় নাই। স্পেসের সুষম বন্টন, আর রিসোর্সের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার চোখে পরার মত। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে, আমাদের দেশের অনেক নামি দামি মন্ত্রি, মিনিস্টার, অনেক হাই অফিসিয়ায়ালগন কত বার না এদেশ ভ্রমন করেছে কিন্তু ওদের কি ইচ্ছে করে না আমাদের দেশটাকে এইভাবে সাজানোর? খুব অবাক হয়েছি আমাদের দেশের নেতাদের ইচ্ছা শক্তি আর রুচির অভাব দেখে।

পুত্রজায়ায় নামাজ পরে কিছু খাবার খেয়ে আবারো আমরা কুয়ালালামপুরে হোটেলে চলে এলাম। রাতে খাবার খেয়ে কিছু শপিং করে রাতে আবারো কিছুক্ষনের জন্য বিশ্রাম। পরদিন যেতে হবে লঙ্কাউই আইল্যান্ডে। লংকাউই আইল্যান্ডে যাওয়ার আগে আমরা টুইন টাওয়ার দেখে যাবার প্ল্যান, তাই সকাল সকাল খেয়ে দেয়ে ব্যাগ পাট্টা গুছিয়ে প্লেনের টিকিট পকেটে করে টুইন টাওয়ারের চলে গেলাম। কোন টিকিট নাই আগামি ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে টুইন টাওয়ারে উঠতে পারলাম না, বাইরে থেকেই দেখে আর ছবি টবি তুলে বেরিয়ে গেলাম লংকাউই এর উদ্দেশে এয়ারপোর্ট। যাবার আগে ৩০ ডিসেম্বর তারিখের টিকিটটা কিনে নিয়ে গেলাম যেন লঙ্গাকাউই থেকে ফিরে টুইন টাওয়ারের ভিতর ঢুকতে পারি। এখানে একটা জিনিস বলতে ভুলে গেছি যে, এর আগের দিন পুত্রজায়ায় যাওয়ার আগে আমরা বার্ডস মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। এটা একটা চিরিয়াখানার মত।  কিন্তু শুধু পাখিদের। এই জু তে ছোট বুলবুলি পাখি থেকে শুরু করে প্যাচা, ইগল, বক কাক, আরও অনেক নাম না জানা পাখির সমারোহ। পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য বটে। ওরা সুখেই আছে, খাওয়া দাওয়ার চিন্তা নাই, সময়মত খাবার পাচ্ছে, উড়ে বেড়ানোর যথেষ্ট জায়গাও আছে, আর সবচেয়ে যেটা আছে তা হচ্ছে এরা নিরাপদ। হেটে হেটে দেখতে হয়, পা ব্যাথা হয়ে যাচ্ছিল আমার। টুইন টাওয়ার সম্পর্কে কিছু বলি।

টুইন টাওয়ারকে বেসিক্যালি পেট্রনাস টাওয়ার বা পেট্রনাস টুইন টাওয়ার বলা হয়। মালয়েসিয়ান ভাষায় একে বলা হয় মিনারা পেট্রনাস। এটা ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার হওয়ার আগ পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বচ্চ টাওয়ার ছিল। সাত বছর লেগেছিল এটা তৈরি করতে। পুরুটাই রেইনফরসড কনক্রিটে করা। পরে এর বাহিরের দিকে ষ্টীল এবং গ্লাস দিয়ে মোড়া হয়। প্রায় ৬ লক্ষ স্কয়ার ফিট জায়গা নিয়ে এই টুইন টাওয়ার। ৪১ এবং ৪২তম টাওয়ার দ্বারা দুইটা মিনার এক সঙ্গে যুক্ত। আর এইটাও বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কানেক্টেড ব্রিজ কোন টুইন বিল্ডিং এর মধ্যে। প্রতিদিন ১০০০ জন লোককে এই টুইন টাওয়ার দেখার জন্য টিকেট বিক্রি করা হয়। দর্শকগন এই ৪১/৪২ এবং ৮৬ তলায় শুধু যেতে পারে, আর অন্য গুলোতে যাওয়ার অনুমতি নাই। এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, টুইন টাওয়ারটা কি কারনে করা হয়েছিল। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত আম্পাং (যেখানে বর্তমানে টুইন টাওয়ারটা অবস্থিত) থেকে সেলানগর টার্ফ ক্লাব (এখন যেটা কেএল সিটি নামে পরিচিত) পর্যন্ত এতটাই ট্রাফিক জ্যাম হত যে, ঘন্টার পর ঘন্টা কোন গাড়ীঘোরা চলতে পারত না। এই অচলবস্থা নিরসন কল্পে মালয়েশিয়ার ৪র্থ প্রেসিডেন্ট ডঃ মহাতির এই প্রজেক্ট হাতে নেন। সেলানগর টার্ফ ক্লাবটা ছিল একটা রেসিং ক্লাব যা ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল এমেচার রেসিং হিসাবে চালু করেন। এক পর্যায়ে এই রেসিং ক্লাব থেকে মালয়েশিয়া হাজার হাজার মিলিওন ডলার আয় করতে শুরু করে বেদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে। পর্যায়ক্রমে এই সিলানগর টার্ফ ক্লাব হয়ে উঠে রেসিং কাম স্পোর্টস সেন্টার। এমনকি এটা পরবর্তীতে কমনওয়েলথ স্পোর্টস ক্লাব হিসাবে রানি এলিজাবেথ-২ এর সময় চালু হয়। কিন্তু শুধুমাত্র জ্যামের কারনে অনেক অসুবিধা হচ্ছিল এর আয়ের উৎসে। ১৯৯৪ সালে এটা (সেলানগর টার্ফ ক্লাবকে) অফিসিয়াল স্পোর্টস ক্লাব হিসাবে মর্যাদা দেয়া হয় যা এখন বিদ্যমান।  

The entire master plan for KLCC project development around freehold prime property (KLCC: 40.5 hectares – Petronas Twin Towers & Retail: 5.8 hectares with 18,000 m2 each tower – 994,000 m2 total Petronas complex) was focused into seven main sections. i.e. Office Buildings, Hotels, Retails, Convention Centre, Residential, Recreational facilities and Infrastructure. The conceptual redevelopment project was to covert site of the former Selangor Turf Club, a 100-acre horse race track located in the center of Kuala Lumpur’s “Golden Triangle, into an integrated, self-contained modern city as well as creating a new landscape for the capital city of Malaysia

The reallocation of the Turf Club was also occurred back in 1992/3.

Today, Petronas has evolved into a turnover of $25.7 billion with a pretax profit of $9.9 billion for the financial year ended on March 31, 2004 – and it was one of the respectful top Fortune 500 company. Four of its subsidiaries are listed on the Malaysian Stock Exchange (renamed as Bursa Saham Malaysia in 2005).

এই গেল টুইন টাওয়ারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

এখানে একটা জিনিস আমার চোখে পড়ল ভীষণভাবে। সব গুল এক্সিট শেষ হয় গিফট দোকান ঘুরে ঘুরে। কেউ কিনুক আর নাই বা কিনুক, তাকে ঐ সব দোকান দিয়েই বের হতে হবে। এটা একটা বিজনেস চালাকি। ছোট ছোট বাচ্চারা সঙ্গে থাকে, সুতরাং কিছু না কিছু কেনা কাটা তো হয়ই।  আর এই সব জায়গায় দাম একটু চরা থাকে।   

যেটা বলছিলাম। আমরা টুইন টাওয়ার বাইরে থেকে দেখে লংকাউই দেখার উদ্দেশ্যে এয়ারপোর্ট চলে এলাম। এটাও একটা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। বড় সুন্দর। আমার ছোট মেয়ের আবার দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেছে। কারন তাকে আবার প্লেনে চরতে হবে। তবে এবার বেশিক্ষন সময়ের জন্য নয়। মাত্র ৪০/৪৫ মিনিট সময়। দেখতে দেখতেই পার হয়ে গেল। আমরা লঙ্গাউইতে পৌঁছলাম যখন তখন রাত ১০টারও বেশি। এখানে যে কোন লোক যারা গাড়ী চালাতে পারে তারা যে কোন দিনের জন্য গাড়ী ভারা নিতে পারে এবং সেলফ-ড্রাইভিং করতে পারে। সস্তাও বেশ। আমরা দুই দিনের জন্য একটা প্রাইভেট গাড়ী ভারা নিয়ে নিলাম। বেশ ভাল। লংকাউই এর একটা সুন্দর নামকরনের ব্যাখ্যা আছে। কেউ কেউ বলে যে, লঙ্কা অর্থ হচ্ছে “সুন্দর” আর “উই” এর অর্থ হচ্ছে “অফুরন্ত”। এর মানে এই যে, লংকাউই মানে “অফুরন্ত সুন্দরের অধিকারি”। আবার কেউ কেউ বলে যে, এটা প্রাচিন থাইল্যান্ডের কেদাহ সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস ছিল যারা লাঙ্কাসু প্রভিন্সের বাসিন্দা। এই লংকাসু হচ্ছে প্রাচিন থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার আন্তসংযোগ স্থল। বর্তমানে এটা মালয়েশিয়ার অংশ। আবার অনেকে বলে যে, “লাংক” মানে ইগল এবং “উই” মানে মার্বেল। এর মানে হচ্ছে এই লংকাউই তে প্রুচুর পরিমানে ইগল এবং মার্বেল পাওয়া যায়। এখানে লোকমুখে আরও একটা মিথ চালু আছে। আর সেটা হচ্ছে About 200 years ago, according to the folklore, a young woman, name Mahsuri, was accused of adultery and was executed by the people in spite of her earnest innocence. Just before her death, Mahsuri laid a curse on the island that it will remain barren for seven generations.

এই এলাকায় থাই ভাষা মোটামুটি সবাই বলতে পারে। আসলে কোণটা যে কি তা আমার জানার দরকার নাই, আমি আসলে জায়গাটার সুন্দরের কারনে বিমোহিত।

লংকাউই তে আমরা এবি হোটেল নামে একটা হোটেলে উঠলাম। আগে থেকেই বুক করা ছিল। গিয়ে দেখলাম, আমাদের রুমটা একদম বীচের সঙ্গে লাগানো। খুব ভাল লাগলো। প্রায় অর্ধরাত অবধি আমরা ঐ প্রাইভেট কারে করে প্রায় আশেপাশের এলাকাটা ঘুরলাম। কিন্তু আমাদের জানা ছিল না যে, রাত ১১ তার পর সব খাবার হোটেল বন্ধ হয়ে যায়।  “টমেটো” নামে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, সারারাত খোলা থাকে, প্রায় রাত ১২ টার পরে গিয়ে মোটামুটি আমাদের পছন্দের খাবারগুল খেতে পারলাম। এই টমেটো হোটেলে বাংলাদেশের অনেক লোক কাজ করে, দাম ও প্রায় রিজন্যাবল। প্রথমে মনে হয়েছিল শহরতা মনে হয় ছোট্ট একটা দ্বীপের মত, যেমন আমাদের সেন্ট মারটিন দ্বীপ। ভুলটা ভাঙল তার পরেরদিন।

সকাল থেকে আমরা সারাদিন (অর্থাৎ বিকাল ৩ টা পর্যন্ত) বীচে অনেক আইটেম করলাম, প্যারাসুট দিয়ে এক পাহার থেকে আরেক পাহাড়ে গেলাম, স্পিড বোটে করে রিভার ক্রুজ করলাম, সাতার কাটলাম, সবাই মিলে সত্য দারুন কাটল বীচের সময়টা। বেশ এক্সপেন্সিভ সব আইটেম। বীচের বালুগুলো এত মসৃণ যে মনে হয় সারাক্ষন হাতে নিয়ে পাউডারের মত পিসাপিসি করি। বালুর রঙ খুব সুন্দর।

এখানে একটা মজার কান্ড ঘটলো। আমরা সবাই ব্যানানা বোটে উঠেছিলাম এক সঙ্গে। এটা বেসিক্যালি একটা স্পিড বোট দিয়ে অনেক স্পিডে টেনে আরেকটা ব্যানানা সাইজের ভেলাকে সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনে। কলার শেপে বানান একটা বোট, প্রায় ৬ জন একসঙ্গে বসতে পারে। আমরা খুব ভাল করে ব্যানানা ট্যুরটা শেষ করেছি মাত্র, পাড়ে এসে নেমে পড়ব পড়ব ভাব। কিন্তু ঠিক শেষ পয়েন্টে এসে হটাত করে সামনের স্পিড বোটটা এমন করে বেঁকিয়ে টান দিল যেন ব্যানানা বোটে যারা থাকে সবাই এক ঝটকায় পানিতে পরে যায়। আমরাও পরে গেলাম। আমার ছোট মেয়ে সাতার জানে না, বড় মেয়ে কিছুটা জানে। কিন্তু সবার লাইফ জ্যাকেট পরা ছিল। এটা আমাদের জানা ছিল না যে ওরা এই এমন একটা কাজ করবে। ওরা অবশ্য এমন একটা জায়গায় এই কাজটা করে যেখানে সাতারের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু হটাত করে ঝটকা দিয়ে ফেলে দেয়ায় সবাই একটা আতঙ্কে পরে যায়। ব্যাপারটা আমিও জানতাম না। আমাদের বেলায় এই কাজতা হওয়াতে আমার ছোট এবং বড় মেয়ে সঙ্গে আমার বউ এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, মনে হয়েছিল এই বুঝি সবাই ডুবে মরছি। কিন্তু ২০-৩০ সেকেন্ড পর যখন পায়ের তলায় মাটি ঠেকে তখন ব্যাপারটা একটা মজার ঘটনায় পরিনত হয়। হটাত আতংক, আবার হটাতই সস্তি।

বিকালের দিকে খেয়ে দেয়ে আমরা “আন্ডার ওয়ার্ল্ড সি” তে গেলাম। এটাও একটা মিউজিয়াম কিন্তু শুধু মাছের। কি নাই এখানে। সব পদের মাছ, গুল্ম, হাঙ্গর, আরও কত কি!! আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এগুলো সব জীবিত। খুবই সুন্দর একটা জায়গা। দেখার মত। এখানে প্রায় ৫০০০ হাজার পদের মাছের প্রজাতি আছে। ১৯৯৫ সালে এটা তৈরি করা হয়েছিল। The concept and theme of Underwater World Langkawi are geared towards Knowledge, Education and Entertainment. It is built to raise awareness on the importance of conserving our precious aquatic life forms, thus creating understanding of the deep and inseparable bond between man and nature.

প্রতিদিন এই একুরিউয়ামের মত জলাধারগুলোতে ৫ লাখ পরিমান পানি ঢালা হয় ফ্রেশ। এখানে ফটো গ্যালারী আছে, বন্য প্রাণীর গ্যালারী আছে, আর আছে মাছের প্রজাতিদের হরেক রকমের গ্যালারী। হেটে হেটে দেখতে হয়। প্রায় ১৫ মিটার চওরা হাটার পথ। খুব সুন্দর। দেখতে দেখতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল, আমরা সময় করে উঠতে পারছিলাম না সবগুলো আইটেম দেখার জন্য। তার মধ্যে আবার শুরু হয়েছে বৃষ্টি। মালয়েশিয়ায় প্রায়ই বৃষ্টি হয়। তবে আবহাওয়াটা শিতের নয়। এটা সামারের মত একটা সময়।

এই আন্ডার ওয়ার্ল্ড সি শেষ করে আমাদের প্ল্যান ছিল ইগল স্কয়ারে যাওয়ার। এই ইগল স্কয়ারটা কুয়া জেলায় অবস্থিত। লংকাউইটা কত বড় এটা ঐ ইগল স্কয়ারে না গেলে হয়ত বুঝতাম না। এটা প্রথম দিন মনে হয়েছিল আমাদের সেন্ট মারটিন দ্বীপের মত, কিন্তু ইগল আইল্যান্ডের জন্য যেতে গিয়ে বুঝলাম এটা নিতান্তই একটা বড় শহরের সমান। প্রায় ১ ঘন্টা গাড়িতে জার্নি করে ইগল স্কয়ারে পৌঁছলাম। দেখার মত একটা স্কয়ার। ওখানে অনেক বড় আকারের (প্রায় ১২ মিটার) একটা ইগলের ভাস্কর্য করা। খুবই সুন্দর। ইগলের ছবিটা দেখলে মনে হবে ঈগলটা উড়ে যাওয়ার জন্য টেক অফ করছে প্রায়। ঐ যে আগেই বলেছিলাম যে, লোক মুখে একটা মিথ চালু আছে যে, এই লঙ্কাউই একটা অভিশাপের রাজ্য হিসাবে চিহ্নিত আছে কোন এক মহিলার দ্বারা। ডঃ মহাতির এই কন্সেপ্টটাকে ঢেকে দেওয়ার জন্য আর এই শহরটাকে পর্যটকসমৃদ্ধ করার  লক্ষ্যে এই ইগল ভাস্কর্য এবং অন্যান্য সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করে ফেলেন। চারিদিকে বিশাল খোলা জায়গা। আশেপাশে একটা জেটি আছে। এটা জেটি পয়েন্ট নামে পরিচিত। বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু তারপরেও বের হয়ে গেলাম স্কয়ারটা দেখার জন্য। বেশ সুন্দর। আসলে মালয়েশিয়ায় সব কিছু অত্যন্ত প্ল্যান করে সব কিছু করা হয়েছে আর এটা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। কোন কিছুর কমতি নাই। অনেক রাত হয়ে গেল ফিরতে ফিরতে। আগামিকাল আবার যেতে হবে পেনাং আইল্যান্ডে। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি আমরা বিছানায় যেতে চাইলেও পারা গেল না। কারন আবারো মার্কেটিং। অনেক রাত অবধি কেনা কাটায় ব্যাস্ত হয়ে গেল আমার পরিবার। অনেক পদের গিফট আইটেমের মার্কেটিং। ভাগ্যিস সঙ্গে ভিসা কার্ড ছিল। তা না হলে যে কি হত আল্লাহ মালুম। আমার পরিবার তো ধরেই নিয়েছে বিশ্বব্যাংক সঙ্গে আছে, মার্কেটিং এ কোন সমস্যা নাই। আমার কাছে তাই মনে হচ্ছিল আর কি। রাত ২ টা পর্যন্ত যে যেভাবে পারে তাদের পছন্দ মত মার্কেটিং করল, আর আমার পায়ের অবস্থাটা এমন মনে হচ্ছিল যে, “আর পারছি না ভাই, এবারের মত মাফ কর” অবস্থা। সঙ্গে সিগারেট ছিল বলে রক্ষা, অন্তত সিগারেট খেয়ে হলেও কিছুটা সময় কাটাতে পারছিলাম আর আমার পরিবারের পিছন পিছন ওদের মার্কেটিং দেখছিলাম।

পরের দিন সকাল, পেনাং বিমান বন্দর। খুব সুন্দর একটা বিমান বন্দর। বেশ গোছালো। গাড়ীখানা হ্যান্ডওভার করে আমরা আবারও পেনাং আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে বিমানে উঠে গেলাম। পেনাং শহরটির নামকরন আসলে হয়েছে সম্ভবত পেং লাং উ থেকে যার অর্থ হচ্ছে সুপারির আইল্যান্ড। এটা এক সময় যখন ব্রিটিশরা ইন্ডিয়ায় রাজত্ব করছিল, তখন এটা তাদের অধিনে ছিল। পরবর্তীতে এটা সরাসরি ব্রিটিশদের অধিনে চলে যায়। সেথেকে ব্রিটিশরা চলে যাবার পরও এরা সায়ত্তশাসিতই থেকে যায় যদিও এটা এখন মালয়েশিয়ার অধিনে। এই অঞ্চলটা আসলে টিন এবং রাবারের জন্য বিখ্যাত। ১ম এবং ২য় বিশ্ব যুদ্ধে এই পেনাং এর উপর অনেক বড় বড় অপারেশন হয়েছে। জাপান যখন যুদ্ধে জরিয়ে পরেছিল, তখন তারা এই পেনাং এর পোতাশ্রয়গুলো অনেক ব্যবহার করত। আর এই কারনে ব্রিটিশ বাহিনি বারবারই এই পেনাং পোতাশ্রয়ে ঘনঘন আক্রমন চালায়। জাপানিজরা এই অঞ্চল ত্যাগ করার সময় তা ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। পেনাং জেটি হল সেই বিখ্যাত পোতাশ্রয়। ব্রিটিশরা চলে যাবার পর এটা মালয়েশিয়ার অঙ্গরাজ্য হয়ে যায়। যাক ইতিহাস বলে লাভ নেই। আমার ভ্রমন এর অন্যান্য দিকগুলো বলি।

আমার ছোট মেয়ে সব জায়গায়তেই আনন্দ করছিল কিন্তু একমাত্র বিমান জার্নি ছাড়া। প্লেনে উঠতে হবে এই কথা মনে হলেই তার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল।  কিন্তু তারপরেও সে চেষ্টা করছিল স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু তার মুখ, চোখ দেখে বুঝা যায় সে প্লেন জার্নিতে মজা পাচ্ছে না। আমরা প্রায় সকাল ১১ তার দিকে পেনাং আইল্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। অদ্ভুত সুন্দর একটা শহর। চারিদিকে পাহাড়, আর সাগরের পাশ দিয়ে রাস্তাগুলো সাংঘাতিক সুন্দর একে বেকে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। খুবই এক্সপেন্সিভ একটা শহর। তারপরেও দেখার মত। এই শহরটা স্বায়ত্তশাসিত। মালয়েশিয়াতে দুইটা শহর স্বায়ত্ত শাসিত। এক পেনাং আরেকটা হচ্ছে মেলাক্কা।

এখানে দেখার মত অনেক কিছু আছে। তার মধ্যে পেনাং-হিল হচ্ছে একটা। এই পেনাং হিলে উঠতে প্রায় কিছু কিছু জায়গায় একেবারে ৯০ ডিগ্রি খাঁড়া উঠতে হয়। কোথাও কোথাও ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত বাক আছে। ১৯০৬ থেকে ১৯২৩ সাল লেগেছে এই সিস্টেমটা চালু করতে। আর তারপর ১৯২৩ সাল থেকে এই পেনাং হিলে উঠার প্রচলন রয়েছে। ট্রেনের মাধ্যমে উঠতে হয়। দেখার মত একটা ব্যাপার। প্রায় এক হাজার মিটার এর চেয়েও বেশি উচু। উঠতে মোট ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে। একটি ট্রেনে প্রায় ১০০ জন লোক উঠতে পারে। আমার খুব কৌতূহল হয়েছিল কি করে এই কাজটা তারা করল? এত খাঁড়া এবং এত উচু একটা ট্রেন কিসের বলে উঠে যাচ্ছে আসলে? পরে জানলাম যে এটা একটা সায়েন্টিফিক ফর্মুলা। যাকে বলে “ফানিকুলার ট্রেন”। ফানিকুলার ট্রেনটা আসলে কি তাহলে?

The basic idea of funicular operation is that two cars are always attached to each other by a cable, which runs through a pulley at the top of the slope. Counterbalancing of the two cars, with one going up and one going down, minimizes the energy needed to lift the car going up. Winching is normally done by an electric drive that turns the pulley. Sheave wheels guide the cable to and from the drive mechanism and the slope cars.

চুরায় উঠে আমার মনটাই ভরে গেল। ওখানে একটা মসজিদ আছে, মন্দির আছে, অনেক লোকজন ওখানে বসবাস করে। ওদের কোন এসি লাগে না, ফ্যানও লাগে না। পুরু মালয়েশিয়া দেখা যায় ঐ পেনাং হিল থেকে। পেনাং হিলটা  “এয়ার আইটাম (Air Itam) এলাকায় অবস্থিত। Air Itam মানে হল কাল পানি। কেন এটার নাম কাল পানি হল তা আমি জানার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু লোকাল লোকজন খুব একটা বলতে পারেনি।

চুরায় উঠে আমি এক ইন্ডিয়ান মালয়কে পেলাম যিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করে। দুই রিঙ্গিত দাম এক একটা কোন/কাপ আইস্ক্রিমের। বেশ স্মার্ট ছেলে। তার একটা ছেলে আছে, স্কুলে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, কিভাবে ওরা স্কুলে যায়? ওদের জন্য সরকার একটা ভাল ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এই ফানিকুলার ট্রেন দিয়ে বাচ্চারা কাছের একটাই স্কুল, সেখানে যেতে পারে, এতে মাসিক একটা ভারা বলে দেওয়া আছে। আর অন্যান্য কাজের জন্য ওরা সরু একটা কংক্রিটের রাস্তা আছে, ওটা দিয়ে শুধুমাত্র গুটিকয়েক রেসিডেন্ট যারা ওখানে বসবাস করে তারাই আসা যাওয়া করতে পারে, কোন টুরিস্ট ঐ রাস্তা ব্যবহার করতে পারে না। ঐ রাস্তা তৈরির আরও একটা কারন আমি মনে করি তা হল, কোন কারনে যদি ইমারজেন্সি যাতায়ত করতে হয়, তাহলে সরকার বাহিনির রেস্কিউ পার্টি ঐ পথ ব্যবহার করতে পারবে।

পেনাং হিল থেকে বেরিয়ে গেলাম এবং হোটেলে চলে এলাম। আসতে আসতে দেখলাম আমাদের হোটেলের ঠিক সামনে অসংখ্য দোকান বসেছে যারা রাত ১ টা পর্যন্ত থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এদের অধিকাংশ ই হচ্ছে বাঙালি। অনেক কথা হল বাঙালি ভাইদের সাথে। অনেক কষ্টের কথা আবার অনেকের সাফল্যের কথা। আমরা সবাই মিলে প্রায় রাত ১ টা পর্যন্তই ওখানে বিভিন্ন প্রকারের শপিং করলাম। শপিং শেষে হোটেলে ফিরে এসে আবারো ব্যাগ গুছায়ে সবাই শুয়ে পরলাম, কারন পরদিন আবার কুয়ালালামপুর যেতে হবে। এবার আর প্লেনে নয়। আমার মেয়ে এয়ার এশিয়া হারিয়ে যাবার পর থেকে সে আর প্লেনেই উঠতে চাচ্ছিল না। অগত্যা আমরা প্লেন টিকিট বাতিল করে বাসে আসার প্ল্যান করলাম। ডাবল ডেকার বাস। বাস ছাড়ার কথা সকাল ১১৩০ মিনিটে আর সেই বাস ছাড়ল গিয়ে দুপুর ২ টায়। সবচেয়ে বিশ্রী ব্যাপার হল, যার যার মাল সে সে লোড করতে হয় এবং কোন টিকিট (লাগেজ টিকিট) দেয়া হয় না। কুয়ালালামপুর পৌঁছানোর কথা বিকাল ৫ টার মধ্যে আর সেই বাস পৌঁছল গিয়ে রাত ১০টায়। মাঝে আবার কোন খাবারের বিরতিও নাই। বাস জার্নিটা ভাল হয় নাই আসলে। বিরক্তি লাগছিল এত লম্বা একটা সময় বসে থাকতে।

ঐ দিন আর আমরা কোথাও বের হই নাই। কারন এক দিকে বৃষ্টি হচ্ছিল আবার রাতও হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং পরেরদিন ২৯ তারিখ ছিল গিয়ে আমাদের আসম শপিং এর দিন। সারাদিন আমার পরিবার এই মার্কেট, ঐ মার্কেট ঘুরে ঘুরে হরেক রকমের গিফট আইটেম কিনছে। ব্যাপারটা এমন যেন আমরা অন্য কারো জন্য মার্কেটিং করতে এসেছি। আমার ছোট মেয়ের আগে থেকেই বায়না ছিল সে একটা ট্যাবলেট কিনবে। এবং কোন কনফিগারেশনের ট্যাবলেট কিনবে তাও সে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল। সারাদিন ঘুরলাম, এর পরেরদিন ছিল ৩০ ডিসেম্বর। মানে আমাদের টুইন টাওয়ার ভিজিটের দিন। ডঃ মহাতির তার ২২ বছরের শাসনামলে সে মালয়েশিয়ার জন্য যা করে গেছে, এই অকল্পনীয় কাজ আর কেউ করতে পারবে কিনা আমার জানা নাই। সম্ভবত এই টুইন টাওয়ারের জন্যই সারা বিশ্ব বারবার মালয়েসিয়াকে স্মরণ করবে। ১৯৮১ থেকে মালয়েশিয়া নতুন এক মালয়েশিয়া হিসাবে ২০০৩ পূর্ণ সুন্দররুপ পেয়েছে। ব্যাক্তি মহাতির তার পারিবারিক জিবনে কত টুকুন সার্থক টা আমার জানা নাই তবে দেশের একজন নেতা হিসাবে তাকে আজিবন স্যালুট না করে কোন মালয়েসিয়ানকে উপায় নেই। কোন একটা কাজও সে অপূর্ণ রাখে নাই। সব কিছু করে দিয়ে তারপর সে নিজ ইচ্ছায় প্রধান মন্ত্রী থেকে বিদায় নিয়েছে। সারা বিশ্ব তার এই ক্ষমতা হস্তান্তরের পালা টা দেখেছে। যে দেশে এই মহাতিররা জন্ম নেয়, সেদেশ ধন্য।

এবার এই ভদ্র লোক সম্পর্কে আমি কিছু বলি। আমার দুইজন বিশিষ্ট পছন্দের ব্যাক্তিদের মধ্যে মহাতির একজন। তিনি আসলে জন্ম গ্রহন করেছিলেন কেদাহ শহরের আলোর সেতার নামে এক গ্রামে ১৯২৫ সালে। তিনি মালয়েশিয়ার ৪র্থ প্রেসিডেন্ট। মোট ২২ বছর তিনি রাজত্ব করে সেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে বের হয়ে যান যার ক্ষমতা হস্তান্তর লাইভ টেলিকাস্ট করেছিল সমস্ত বিশ্ব ২০০৩ সালে। তার বাবা ছিলেন একজন শিক্ষিক। তিনি বাস্তব জিবনে ছিলেন ডাক্তার এবং আর্মির ডাক্তার। ওনার প্রথম জিবনে তিনি যখন রাজনিতিতে প্রবেশ করেন, তখন কয়েকটা বই লিখে সাং ঘাতিক বিতর্কিত হয়ে যান এবং তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান তার সব গুলো বই ব্যান্ড করে দিয়ে রাজনিতিতে তাকে নিষিদ্ধ ঘসনা করেন। ১৯৭০ সালে মিঃ রাজ্জাক প্রধান মন্ত্রী হলে পুন্রায় তিনি মহাতির কে পার্টি তে নিয়ে নেন। এর পর সম্ভবত ১৯৮১ সালে থেকে তিনি কোন প্রতিযোগিতা ছারাই পর পর ৫ বার প্রেসিডেন্ট নিরবাচিত হয়েছিলেন যেটা একটা ইতিহাস। তার প্রথম ইলেকসনে তিনি তদানিন্তর প্রেসিডেন্ট হোসেন কে মাত্র ৫০ ভোটের ও কমে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট হন। প্রকৃত পক্ষে এই বিজয়টা কোর্ট করত্রিক ফয়সালা হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট হবার পর, তার ৯ম দিনে একটা দারুন কাজ করে ফেললেন। নতুন একটা পার্টি ফর্ম করে ফেললেন যার কোন ম্যান্ডেট পাব্লিকের কাছ থেকে ছিল না। তার নতুন পার্টি র নাম হল, ইউএনএমও (বারু)।  তার প্রথম কয়েকটা কাজের মধ্যে একটা ছিল, সব সরকারি সংস্থা গুলোকে তিনি প্রাইভেট সেক্টরে হস্তান্তর করেন এবং এতে দারুন ফলাফল আসে। ১৯৯০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ার পার ক্যাপিটা ইনকাম প্রায় ডাবল হয়ে যায়। মহাতির কে প্রধানত আমেরিকা এবং ব্রিটিশ রা একেবারেই পছন্দ করছিল না, ফলে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রকায় তার নামে অনেক নেগেটিভ মন্তব্য করার কারনে তিনি সারা দেশে এই দুইট পত্রিকা সারা জিবনের জন্য ব্যান্ড করে দেন। তার ভিসন-২০২০ এর মধ্যে প্রথম তিনটা ফরমুলার কথা বলি।

(১) মহাতির তার প্রথম ক্ষমতার সময় যত সংখ্যক লোক তিনি পেরেছিলেন, বাইরে পাঠিয়েছেন উচ্ছ শিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে এই সর্তে যে, ঐ লোকগুলো পরবর্তীতে মালয়েশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে লোকাল মালয়েসিয়ান্দেরকে পরাবেন এবং ফারদার কোন লোক আর বিদেশ পাঠানো হবে না। ফলে যদি তোমরা খেয়াল কর দেখবা, ১৯৯০ দসকে অনেক মালয়েসিন রা আমাদের দেশেও এসেছিল উচ্চ শিক্ষা নিতে যেটা এখন অনেক কম রেসিও তে আছে এখন।

(২) তার এই প্ল্যানের পাশাপাশি তিনি যে কাজটা করলেন তা হল, দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার কাজ। তিনি মালয়েশিয়ার প্রতিটি আনাচে কানাচে, দোকানে, মাঠে ঘাটে, বাজারে, স্যালুনে, বাসে, ট্রেনে, বাসার অয়ালে অয়ালে, সর্বত্র একটা শ্লোগান লিখে রাখতে হবে যে, “আমি মালয়েশিয়ান, আমি মালয়েশিয়ান”। এটা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার জন্য প্রযোজ্য যে যে যেই ধর্মেরই হক, সে শুধু মালয়েশিয়ান। সবার কানে কানে, মনে প্রানে, দিলে হৃদয়ে শুধু “আমি মালয়েশিয়ান” এই কথাটা মনে রাখতে বললেন।

একে বলে জিকিরের মত দেশ প্রেমের ছবক। ঐ সময় ই অনি বললেন, দেশের অর্ধেক লোক বিশেষ করে মহিলারা কাজ না করার কারনে ওরা বাকি অর্ধেক লকের রোজগারের উপর নির্ভরশীল এবং এটা তিনি বুঝাতে সক্ষম হলেন যে মহিলারা কাজ করলে সংসার এবং ব্যাক্তিগত জিবনে ও সচ্ছলতা আসবে। ফলে সর্বত্র যেমন অপারেটর হিসাবে, দোকানি হিসাবে বা সেলস গার্ল হিসাবে, গ্যাস ষ্টেশনে, ক্লিনার, মানে যেখানে যেখানে মেয়েরা কাজ করতে পারে সর্বত্র ওদের অগ্রাধিকার দেয়া হল। একটা রেভুলিসনের মত শুরু হয়ে গেল পুরু ব্যাপারটা। মালয়েশিয়ানরা ও পছন্দ করলেন।

(৩) কিন্তু তিনি আরেকটা জিনিষ নিশ্চিত করতে চাইলেন যে, প্রতিটি হোটেল, দোকান, বাস, বাজার সর্বত্র আরেক টা শ্লোগান লিখার জন্য বাধ্য করলে, ” We will not talk about three things in public place: Woman, Politics and Religion” যে কেউ এই গুলো নিয়ে আলাপ করবে পাব লিক প্লেসে, তার শাস্তি হবে।

বাইরে থেকে যত পদের ইনভেস্টর আছে সবার জন্য দ্বার উম্মুক্ত করে দিলেন।

মহাতির মোহাম্মাদ মালয়েশিয়ার যত পদের করাপসন ছিল সেগুলোর মধ্যে থেকেই তিনি নিজে ডেভেলপ মেন্টের কাজগুলো করিয়ে নিয়েছেন। তার নামে যে খালি ভাল ভাল খবর আছে তা কিন্তু নয়। তার নামে অনেক বিপদ জনক তথ্যও আছে। যেমন, সবাই মনে করে তার পরিবারের কাছে ৩ বিলিওন রিঙ্গিত পরিমান সম্পদ গচ্ছিত আছে। তার তিন ছেলে প্রায় ২০০ টি কোম্পানির মালিক যেখান থেকে তারা প্রায় বছরে কয়েক বিলিওন রিঙ্গিত কামাই করে। তার ২য় ছেলে একাই প্রায় আরাই বিলিওন রিঙ্গিতের মালিক।

শুধু এখানেই শেষ ছিল না। তার প্রথম ৯ দিনের মাথায় তিনি যে পার্টি টা ফর্ম করেছিলেন, সেটা কোর্টের কাছে তার পক্ষে রায় টা হয়ত যাচ্ছিল না। মহাতির এই একটা জায়গায় দারুল বোল্ড এক সনে গেলেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচার পতিকে এবং পুরান সব জাদ্রেল রাজিনিতি বিদ যারা তার পার্টিতে ছিল সব গুলোকে বহিস্কার করে দিলেন। বিতর্কিত হয়ে গেলেন মহাতির। কিন্তু দমে জায় নাই ব্যাটা। তার সবচেয়ে ট্রাম কার্ড টা ছিল, ১৯৯৭ সালে যখন এশিয়ায় অর্থনৈতিক মন্দার সুচনা হল, মহাতির তখন এমন একখান চাল দিলে যে, মালয়েশিয়ার অর্থনিতিতে এশিয়ার কোন মন্দা ভাব পরল না। তিনি যে কাজটা করেছিলেন তা হচ্ছে ডলার রেট ফ্লাকচুয়েট করা যাবে না, স্থিতি থাকতে হবে। আইএমএফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক এটাকে নিন্দা করলেও পরে তারা বুঝেছিল মহাতির ঠিক ছিল। মালয়েশিয়া ঠিক এই সময়টায় ই উত্থান করল। পাব লিক তাকে তার সব প্লান কে ধরে নিল মহাতির যা করছে ঠিক করছে।

এর পরেও অনেক স্ক্যান্ডেল আছে মহাতির সম্পর্কে, যা শুনলে অনেকের ই ভাল লাগবে না। সে যত টা ভাল মানুসের মত কাজ করেছে, তার ভিতরে ও অনেক সেলফিস ইচ্ছা টা ও ছিল। বিশেষ করে তার ডেপুটি আনোয়ার এর ব্যাপারে। তাকে নারি কেলেংকারিতে পাওয়ার থেকে নামান হয়েছিল যা প্রকৃত পক্ষে সত্য ছিল না। এটা ইন্দনেশিরার সুহার্থ কে দেখে তার এই ভয় টা আসলে হয়েছিল যে ডেপুটি তাকে হয়ত তার পাওয়ার থেকে বিতারিত করতে পারে, তাই আনয়ারকেই বিতারিত হতে হয়েছিল।

তার শেষ টেনিউরটা আরও ১৮ মাস ছিল, ওনি ইচ্ছে করলে থাকে পারতেন কিন্তু তিনি তা আর করতে চান নাই। কেউ কেউ বলে যে, এটাও একটা রাজনিতির দর্শন। For many younger voters, Mahathir was like a voice from another generation. For many non-Malays, he was the leader of the right-wing brigade and a reminder of all the excesses of the Mahathir era.

যাক এ নিয়ে পরে আরও বিস্তারিত আলাপ করা যাবে।

অনেকক্ষণ বসে ছিলাম এই টুইন টাওয়ারের পাশে। বড় ভাল লাগছিল।

আজ ৩০ তারিখেই আবার ব্যাক করতে হবে। এখন ও আমার দোস্ত নওরোজের বাসায় যাওয়া হয় নাই। বিকাল ৭ টায় ফ্লাইট। এখন বাজে প্রায় বিকাল ২ টা। নওরোজের বাসা সেন্টুলে, যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্সট্রাকশন নওরোজ ফোনে আমাকে দিয়ে দিয়েছে এবং আরও সহজ করার জন্য মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের আগেই কিভাবে বোর্ডিং করে নিতে হয় এয়ারপোর্টে না গিয়ে, সেই বুদ্ধিটাও ও আমাকে দিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক কাজ সহজ হয়ে গিয়েছে।

আমরা বিকালের মধ্যেই আমাদের সব লাগেজ পত্র মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সে দিয়ে নওরোজের বাসায় গেলাম। নওরোজই আমাদেরকে কেএলসিটি থেকে নিয়ে গেল।

আমি নওরোজের অপেক্ষায় কে এল সিটির লবিতে অপেক্ষা করছিলাম। আর দেখছিলাম কখন আমার বন্ধুটি আসে। নও রোজ ও মনে হয় আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য একটু ক্যামুফ্লাজ করার চেষ্টা করেছিল এবং খুব সন্তর্পণে লোকদের ভিরের মধ্যে দিয়ে আমার পিছন থেকে আমাকে “হাই” বলার জন্য আসতেছিল। কিন্তু নও রোজ তা আর পারে নাই কারন এর আগাএই আমি অকে দেখে ফেলেছিলাম।

নওরোজের সঙ্গে আমার আর্মির জিবনে খুব বেশি ঘনিস্টতা হয়ত বেশি ছিল না কারন ও ছিল ইনফ্যান্ট্রি তে আর আমি ছিলাম আর্টিলারিতে। তারপরেও কোর্সম্যাট হিসাবে ওর সঙ্গে আমার অন্যান্য ইনফ্যান্ট্রি বন্ধুদের থেকে অনেক বেশি ঘনিস্টতা ছিল। আমি ওকে দেখে মনে হল কত দিন পর যে একজন আপনজনকে দেখলাম। মনে হল পথ হারা শিশুর মাকে খুজে পাওয়ার মত আর কি। আমি কবি নই, বা সাহিত্যক ও নই। কিন্তু মানুষ মাঝে মাঝে ঐ ধরনের কোন একটা ভাবের মধ্যে চলে আসে। আমার ও মনে হয়েছিল, If I were a poet, I woiuld write a poem standing on the platform of KLCC regarding a feelings of meeting someone who has the same pulse and nurves of my mind and heart. অনেক বাঙালি দেখেছি, অনেক বন্ধুদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কিন্তু নও রোজের বাসায় যাওয়ার জন্য আমি আসলেই উদগ্রীব ছিলাম।

কিন্তু কবিতাটা লিখা হল অনেকক্ষণ কোলাকোলির ভাষায়। পরে ওকে নিয়ে ওর বাসার দিকে রয়ানা হলাম। কমুতার ট্রেন। নওরোজের বাসায় যাওয়ার উছিলায় কমুটার ট্রেনেও চড়া হল। সাংঘাতিক সময় মেইন্টেইন করে চলে এই কমুটার ট্রেন অথচ ভারা মাত্র ১ রিঙ্গিত। কাটায় কাটায় আমরা প্রায় ২৫ মিনিট থাকতে পেড়েছিলাম নওরোজের বাসায়। খুব সুন্দর একটা বাসা। আধুনিক এবং চমৎকার। বাচ্চাদের জন্য প্রিথক প্রিথক রুম, সুন্দর। খুব নিরাপদ, সব কিছুই আছে ওখানে। দেখলাম গার্ড আমার বন্ধুকে খুব ভাল করেই স্যালুত করে আমাদের সবাইকে সাদন সম্ভাসন জানাও। খুব ভাল একটা সময় কেটেছে নওরোজের বাসায়। অদ্ভুত একটা ফিলিংস হয়েছিল আমার। অনেক বছরের বন্ধুত্ব। খুব কাছের না হয়ে কি পারে? অনেক দিন পর বাংলাদেশি স্টাইলে ডাল খেলাম, ভাত খেলা, দেশি মুরগি খেলাম, অদ্ভুত পাক করেছিল নওরোজ ভাবি। আর সবচেয়ে ভাল লাগছিল এই জন্যে যে, ওরা খুব ভাল আছে মালয়েশিয়ায়। যে কারনে দেশ ছেড়ে এত দূর যাওয়া, সেটাই যদি না হয় তাহলে কষ্টের আর সীমা থাকে না। ওদের বেলায় এটা ঘটে নাই, ওরা ভাল আছে এটাই সবচেয়ে ভাল লাগলো।  নওরোজ ভাবি আর নওরোজ আমাদেরকে কে এল সিটি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। মনে হল খুব একজন আপনজনকে ছেড়ে যাচ্ছি। আমার প্রায়ই ঐ পোস্টমাস্টার গল্পটা মনে পরছিল, আমরা কমুটার ট্রেনে উঠে গেছি, নওরোজ আর নওরোজ ভাবি কে এল সিটি তে একা বসে আছে, মনে হল আরও একদিন থেকে যাই। অনেক গল্প করতে পারব, একটু আড্ডা মারতে পারব। কিন্তু আমার তো টিকেট করা হয়ে গেয়েছে। চেঞ্জ করার সময়ও পেরিয়ে গেছে। দেখলাম, আমাদের কমুটার ট্রেনটা অনেক স্পিডে সামনের দিকে শত শত যাত্রি নিয়ে কুয়ালালামপুর এয়ার পোর্টের দিকে দ্রুত গতিতে চলছে। তার সময় মত পৌছাতে হবে, তা না হলে মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সের অনেক যাত্রি ও আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। কারন আমাদের বোর্ডিং পাশ তো আমাদের হাতে। আমরা না গেলে তো প্লেনটাও ছারতে পারবে না। আর অনেক বেশি দেরি হয়ে গেলে হয়ত আমরাও প্লেনে করে দেশে ফিরে আসতে পারব না। সময় বড় আজব জিনিষ। সময় কারো জন্য কখনো অপেক্ষা করে না, সে তমার সঙ্গে থাকবে অতক্ষণ যতক্ষন তুমি তার সঙ্গে আছ। টা না হলে সে একাই চলতে থাকে, তার কোন সঙ্গির প্রয়োজন নাই।

ওর ছেলেমেয়রা অনেক বাস্তববাদি হয়ে উঠেছে। নিজেদের কাজ ওরা নিজেরাই করে এবং সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে যে, ওরা এখন বুঝতে পারে পরিবার কি জিনিষ। এই জিনিসটা আমরা এখনও আমাদের বাচ্চাদেরকে শিখাতে পারি নাই যা ওরা শুধুমাত্র বিদেশে থাকার কারনে জানে, কোনটা নিজেদের কাজ আর কোন কাজটায় বাবা মা কে সাহায্য করার দরকার। ওরা খুব ভাল ভাবে গরে উঠছে। কত টাকার মাইনে পাবে কিংবা কোথায় কত বড় অফিসার হবে সে ভবিষ্যৎ আমাদের কারোই জানা নাই কিন্তু যারা বাস্তবকে চিন্তে শিখছে তাদের কোথাও কোন সমস্যা হবার কথা নয়। ওর বাচ্চারা ঠিক সেভাবেই বড় হচ্ছে। ওরা আসলে একদিন অনেক বড় হবে ইনশাল্লাহ। আমি কুয়ালালামপুর এসে নামাজ পরে সবার জন্য দোয়া করেছি এবং বাই নেম আমি অর পরিবারের জন্য এবং যারা ঐ কুয়ালালামপুরে আছে, সবার জন্য আল্লার কাছে দোয়া করেছি। আল্লাহ আমার দয়া নিশ্চয় কবুল করবেন।   

তারপরের কাহিনি তো বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট। এতা আর নাই বা বললাম। যেখানে সর এয়ারপোর্টে আমরা পৌছার আগেই বেল্টে মাল চলে এসেছিল, সেখানে আমরা বাংলাদেশ এয়ারপোর্টে এসে প্রায় আড়াই ঘন্টা অপেক্ষার পর ও বেল্টে মাল পাই নাই। কাকে বলব এই ব্যর্থতার কাহিনি? এটা আমার জন্মভুমি বাংলাদেশ। এখানে মানুষ আছে, মনুষ্যত্ব নেই, অফিসার আছে, দায়িত্ত জ্ঞ্যান নেই, স কিছু আছে এখানে, কিন্তু নাই শুধু ভাল হবার লক্ষন। আমরা সবাই বলি, ক্যান দেশটা ভাল হচ্ছে না? কিন্তু আমি ভাল হতে হবে এই কথাটাই কেউ বলে না।তারপরেও এই দেশ টা আমার এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের।

কাস্টম অফিসার প্যাসেঞ্জার দেখলে তার পকেট চুল্কায়, পুলিস অফিসারের দায়িত্ত যেন অনেক বেরে যায় যাতে বেশি বেশি তার ইউনিফরমের পকেত ফুলে উঠে। কিন্তু ওরা জানে না কোন একদিন এই সব অপকরমের হিসাব দিতে হবে নিজকে একা। ডুবন্ত টাইটানিকের পাশে দারিয়ে যে লোক ঘুস খেতে চায়, ও ঐ ডলার নিয়ে মরে কিন্তু ঐ ডলারে কোন কাজ আর হয় না।

৯/০৪/২০১৫- ওমরা

Categories

গত ২৬ মার্চ ২০১৫ তারিখে আল্লাহর নাম নিয়ে আমি আর আমার স্ত্রীকে নিয়ে ওমরা করার জন্য সরাসরি প্রথমে মদিনা এবং পড়ে মক্কা শরিফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। যদিও আমরা ২০০৬ সালে হজ্জ করেছিলাম, তখন প্রথমবার হজ্জ করার কারনে অনেক কিছু দেখার সুযোগ হয় নাই কারন হজ্জের অনেক ফরমালিটিজ থাকে যা পালন করতে গিয়ে ইসলামের অনেক আনুষঙ্গিক ব্যাপারগুলো দেখার বা মনোসংযোগ করার সময় থাকে না বা আমি নিজে পাইনি। এবার নিয়ত করেছিলাম যে, আমি ওমরার পাশাপাশি আরও বেশি কিছু দেখবো এবং ওগুলো নিয়ে পরাশুনা করব।আল্লাহ অনেক সহায়তা করেছেন এবং মন ভরে তা করতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ।

নবী করিম (সঃ) এর নামে দরূদ শরিফ পড়লে কি হয় তা আমি জানতাম। যেমন, আবু বকর (রাঃ) বলেছেন যে, দরূদ শরীফ পড়লে পানি যেমন আগুনকে ক্রমাগত দুর্বল করতে করতে এক সময় আগুনকে নিভিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি, দরূদ শরীফ পড়লে আমাদের পাপেরও তা ক্রমাগত মুছন শুরু হয়। যতবার এই দরূদ শরীফ পড়া হবে ততবার আমাদের পাপের বিরুদ্ধে এই দরূদ শরীফ পাপ মুছনের কাজ করতে থাকে। তাই বেশি বেশি করে দরূদ শরীফ পড়তে হবে। এটা একটা দাসকে মুক্ত করার চেয়েও বেশি সম্মানিত আল্লাহর কাছে। আরেকটা হাদিসে আছে যে, শুক্রবার দিন দরূদ শরীফ পড়ার আরও কিছু বেশি লাভ আছে। আর তা হচ্ছে, বেহেশত থেকে কিছু ফেরেশতার উপর এই নির্দেশ দেয়া আছে যে, যারা যারা আমাদের নবীর নামে দরূদ শরীফ পরবেন, তাদের নাম সোনার কলমে সিলভারের কাগজের উপর তারা লিখে রাখবেন এবং তা আল্লাহর কাছে পেশ করবেন। আমি আমাদের নবীর রওজা মোবারক দর্শন করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ক্রমাগত দরূদ শরীফ পড়ে যাচ্ছিলাম। অবশেষে আমাদের নবীর রওজায় এসে পৌঁছলাম। মদিনায় তখন সন্ধ্যা। মাগ্রেবের আজান চলছে। 

নবীর রওজা মোবারক।

আমাদের নবীকে আর মা আয়েশা (আঃ) এর ঘরেই শায়িত করানো হয়েছে। ওটা ছিল মা আয়েশার ঘর। এবার এটার কিছু তথ্য বলি।

আমাদের নবী যখন ওফাত হলেন, তখন অনেকেই তাঁকে জান্নাতুল বাঁকিতে কবর দেওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু আবু বকর (রাঃ) বললেন যে, তিনি আমাদের নবীর কাছে শুনেছিলেন, রাসুলগন যেখানে ওফাত হন, তাঁদেরকে সেখানেই কবর দেওয়ার নির্দেশ। ফলে মা আয়েশার ঘরেই তার কবর দেওয়া হয়। নবীর ওফাত হওয়ার ২ বছর পর (সম্ভবত) আবু বকর (রাঃ) মারা যান এবং তিনি তখন তার মেয়ে (মৃত্যুর আগে) আয়েশাকে অনুরোধ করেন যেন তাঁকে নবীর পাশে কবর দেওয়া হয়। মা আয়েশা তার অনুরোধ রেখেছিলেন। মা আয়েশার ইচ্ছে ছিল যে আমাদের নবীর কবরের পাশে যেন তার কবর হয় এবং সে মোতাবেক তিনি তার কবরের স্থান নির্ধারণ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওমর (রাঃ) যখন এক ক্রিস্টিয়ান দ্বারা তার নাম ছিল ফিরোজ, (আবু লুলু) স্টেবড হন তার ঠিক মৃত্যুর আগে তিনি তার ছেলে আবদুল্লাহকে পাঠান মা আয়েশার কাছে এই বলে যে তাঁকে যেন আমাদের নবীর পাশে কবর দেওয়া হয়। ওমরের এই অনুরোধ তিনি রেখেছিলেন মা আয়েশার নির্ধারিত কবরটা তার জন্য ছেড়ে দিয়ে। তিনি মোহররমের ১ তারিখে মারা যান। ঠিক তার পরপরই মা আয়েশা তার ঘরের সঙ্গে সব কবরের মাঝে একটা পারটিশান দেন। কারন ওমর তার কাছে গায়েরে মোহররম ছিলেন।

এখানে একটা ঘটনার বর্ণনা দেওয়া আবশ্যক। আমাদের নবী প্রতিদিন আসর নামাজের পর সব স্ত্রীদের কাছে তাঁদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য যেতেন। কিন্তু তার ৪র্থ স্ত্রী মা জয়নবের কাছে গেলে মা জয়নব তাঁকে তার প্রিয় মধু খেতে দিতেন। ফলে কিছুটা সময় বেশি কাটাতেন তিনি তার ঘরে। এই ব্যাপারটা মা আয়েশা এবং মা হাফসা পছন্দ করতেন না। ফলে তারা একদিন পরামর্শ করলেন যে, নবী যখন মা হাফসার ঘর থেকে তাঁদের ঘরে আসবেন, তখন তারা বলবেন যে, তার (আমাদের নবীর) মুখ থেকে ভাল গন্ধ আসছে না। এই কথা শুনে নবী বুঝতে পেরেছিলেন তাদের মনের ইচ্ছা এবং প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি আর মধু খাবেন না। এটা আল্লাহতালাহ পছন্দ করেন নি। তার ঠিক এর ফলে কোরআনে এক আয়াত নাজিল হয়েছিল যার অর্থ এই রকমঃ

O Prophet! Why holdest thou to be forbidden that which Allah has made lawful to thee? Thou seekest to please thy consorts. But Allah is Oft-Forgiving, Most Merciful. Allah has already ordained for you, (O men), the dissolution of your oaths (in some cases): and Allah is your Protector, and He is Full of Knowledge and Wisdom. —Quran, surah 66 (At-Tahrim), ayat 1-2[51]

Word spread to the small Muslim community that Muhammad’s wives were speaking sharply to him and conspiring against him. Muhammad, saddened and upset, separated from his wives for a month. ‘Umar, Hafsa’s father, scolded his daughter and also spoke to Muhammad of the matter. By the end of this time, his wives were humbled; they agreed to “speak correct and courteous words”[52] and to focus on the afterlife.[53]

চার নম্বর কবরটি এখন খালি আছে, এবং বলা হয় যে, ওখানে ইশা (আঃ) কে কবর দেওয়া হবে।

আমার দেখা এবারের কিছু জায়গার বর্ণনা দেই।

মদিনায় আমি মোট পাঁচ ছয় জায়গায় ভিজিট করেছি। তারমধ্যে ওহুদের পাহাড় যেখানে হামজা (রাঃ) শহিদ হয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ঐ যুদ্ধে মোট ৬৯ জন সাহাবা শহিদ হয়েছিলেন এবং হামজার কলিজা খেয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ। মোট ৬৭ সাহাবার কবর এক জায়গায় এবং মাত্র ২ জনের কবর (একজন হামজা এবং অন্যজন আরেক সাহাবা) একটু দূরে। পুরু জায়গাটি চারিদিকে ওয়াল দিয়ে ঘেরাও করা এবং কবরগুলো শুধুমাত্র কয়েকটি পাথর দিয়ে মার্ক করা। এটা ঠিক যেখানে যুদ্ধটা হয়েছিল ওহুদের সময়, সেই জায়গায় করা হয়েছে। স্থান পরিবর্তন না করে। জায়গাটা দেখলে মন কম্পিত হয়ে উঠে। পরবর্তীতে কিন্তু আবু সুফিয়ান এবং তার স্ত্রী হিন্দ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন কিন্তু আমাদের নবীর একটা অনুরোধ ছিল হিন্দের প্রতি যে, কখনো যেনো হিন্দ তার জীবদ্দশায় আমাদের নবীর সামনে না আসেন। কারন হিন্দকে দেখলে আমাদের নবীর কষ্ট হত তার চাচা হামজার কলিজা খাওয়ার ঘটনা মনে করে।

ওইখান থেকে আরও ২০-২৫ মাইল দূরে গেলে একটা জায়গা পাওয়া যায় যার নাম হচ্ছে ওয়াদি-ই-জীন। বলা হয় যে, ঐ এলাকাটা জীনদের বসত করার জায়গা হিসাবে পরিচিত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, ওখানে গেলে গাড়ি কোনো পাওয়ার ছাড়া এবং কোনো গিয়ার ছাড়া ব্রেক ছেড়ে দিলে প্রায় ৯০-১২০ কিমি স্পীডে পাহাড়ের আপহিলেও গাড়ি চলে। ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না। অনেকভাবে পরিক্ষা করে দেখেছি যে ব্যাপারটা সত্য। প্রায় ৭ কিমি কিংবা আরও বেশি মাইল এই ব্যাপারটা ঘটে। ওটা শুধু একদিকে ঘটে, অন্যদিকে হয় না। তাও আবার আপহিলের দিকে হয়। ব্যাপারটার মধ্যে বৈজ্ঞানিক কোন থিওরি কাজ করে কিনা আমি জানি না। তবে ব্যাপারটা নিয়ে আমি সারাক্ষনই ভেবেছি। ব্যাপারটা কি আসলেই মিরাক্যাল? সম্ভবত না। এখানে কোন বিজ্ঞানভিত্তিক লজিক থাকতে হবে। সবাই বলে, জীন গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে যায়। আমি যেহেতু ব্যাপারটা সুরাহা করতে পারি নাই, তাই কোন মন্তব্যও করছি না। তবে আমি দেখেছি যে, কোন পাওয়ার ছাড়া এবং গাড়ি একদম অফ করে দিয়ে নিউট্রালে রেখে গাড়ি প্রায় ৯০ থেকে ১২০ কিমি স্পীডে চলছে। এবং এটা আপহিলেই শুধু যাচ্ছে বলে মনে হয়। কিন্তু এখন আমি জানি কেন এটা হয়। এটা আসলে আপহিল নয়, আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় এটা আপহিল, কিন্তু আসলে এটা প্রায় ১১ ডিগ্রি ডাউনহিল। আর এ কারনেই আপাতত দৃষ্টিতে যেটা আপহিল মনে করা হচ্ছে সেটা আসলে ৭ কিমি পরিধি নিয়ে ১১ ডিগ্রি ডাউন হিল। আর এ কারনেই গাড়ি, পানির বোতল কিংবা পানি সব আপহিলে যায় বলে মনে হয়। বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য পড়ে আলাপ করা যাবে। আমি এইটার পুরু ব্যাখ্যা এখন জানি। এটা কোন জিনের কাজ নয়।

ঐখান থেকে আমরা খন্দক পাহাড়, এবং মক্কায় এসে আমাদের নবী প্রথম যেখানে মসজিদ করেন তার স্থানটি দেখলাম। ওটার নাম “তুবা” মসজিদ। ৩৫০ কিমি পথ আমাদের নবী শুধুমাত্র রাতে রাতে ভ্রমন করে মাত্র ৮ দিনে মদিনায় পৌঁছেন। এর মধ্যে আরও একটা জায়গা আমি দেখতে গিয়েছিলাম। সেটা হচ্ছে, মক্কার উদ্দেশ্যে অপারেশন করার পূর্ব মুহূর্তে আমাদের নবী কর্তৃক ব্যবহৃত অপারেশন ব্রিফিং রুমের স্থানটি। এই স্থানটি আগে আবিষ্কৃত হয়নি কিন্তু মিনায় নতুন করে স্থাপনা করতে গিয়ে পাহাড় কাটার সময় এটা আবিষ্কৃত হয়। ঘরটির কোন ছাদ নাই বর্তমানে এবং শুধু ঐতিহাসিক কারনে এটা এখন একইভাবে সংরক্ষন করা হয়েছে। একতলা একটি বাড়ীর সাইজ। এটা এখন open-roofed mosque in Muzdalifah  নামে পরিচিত। প্রকৃতনাম Masharul Haram (the Sacred Grove).

খন্দকের যুদ্ধটা কেন হয়েছিল তা আমরা অনেকেই জানি। এটলিস্ট প্রমোশন পরিক্ষার আগে এই ব্যাপারে অনেকেই আমরা পড়াশুনা করতে হয়েছে। তবু একটু হিন্টস দেই। 

খন্দকের যুদ্ধটাকে বলা হয় সবচেয়ে বেশি ট্যাক্টিক্স সমৃদ্ধ যুদ্ধ। এখানে ডিপ্লোম্যাসি, রিউমার, এবং ফলস তথ্য দ্বারা যুদ্ধ জয় হবার ন্যায়সঙ্গতা রয়েছে। যুদ্ধটা হয়েছিল ত্রিপক্ষ বেসিস। মানে হল এই যে, আমাদের নবী যখন ইহুদী বংশের নেতাদেরকে (বনু নাদির গোত্র) মদিনা থেকে খায়বারে বিতাড়িত করেন তখন এই নেতাগন (তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সালাম বিন আবু হুকায়েক, সালাম বিন মিশকাম,  কিন্নাহ বিন আর রাবি) মক্কায় কুরাইশ বংশের বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে হাত মিলান নবীকে পরাস্ত করার জন্য। একইভাবে এই ইহুদীগন গাতাফান ট্রাইবদের কাছেও তাঁদের সাপোর্ট এর কথা জানিয়ে আমাদের নবীর বিরুদ্ধে প্রলুব্ধ করেন। তারা সবাই এক হয়ে যায়। আবু সুফিয়ান এই যুদ্ধে লিড দেন। সালমান আল ফার্সি এই প্ল্যানের (অর্থাৎ ট্রেঞ্চ) উদ্যক্তা। মদিনাকে পূর্ব পাশ থেকে ডিচের মাধ্যমে আইসোলেট করা হয়, ডিচের মাধ্যমে শত্রু পক্ষের পানির সাপ্লাই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মদিনা তখন মহিলাদের দ্বারা নিরাপত্তা দেওয়া হয়। যুদ্ধে যারা অংশ নেয় তারা হচ্ছেন, বনু নাদির, বনু ঘাতাফান, বনু সুলাইমান, বনু মোররা, বনু সুজা, বনু খোজা ইত্যাদি। বনু কোরায়জা যদিও শত্রু পক্ষের লোক ছিল কিন্তু তারা ইসলামের প্রতি কিছুটা ঝোঁক ছিল বিধায় তারা আমাদের নবীকে সাপোর্ট করেছিলেন। তাছাড়া বনু কোরায়জার সাথে আমাদের নবীর একটা গোপন প্যাক্টও হয়েছিল যে তারা আমাদের নবীকে সাপোর্ট দেবেন। আর এই দলটি ছিল মদিনার ভিতরে একেবারে ডিফেন্সিভ লাইনের ভিতরে। মদিনার রক্ষার জন্য এরাও একটা অংশ পাহাড়া দিচ্ছিল।

এখানে আমাদের নবী আগে থেকেই একটা জিনিষ আল্লাহ তাঁকে জ্ঞ্যান দিয়েছিলেন যে, মদিনায় যে সময় শস্য হয় তার আগেই তিনি লাগিয়েছিলেন যেন, শত্রু পক্ষ মদিনায় এসে কোন খাবার না পায়। সব শস্য ইতিমধ্যে মদিনাবাসি ঘরে তুলে ফেলেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে কোরায়েশরা যখন তাঁদের ঘোড়ার কোন খাবার যোগাড় করতে পারছিলেন না এবং ঘোড়াগুলো খাবার না পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছিল, তখন এই ডিচ কোরায়েশ বংশের আমর বিন উদ (যাকে একাই ১০০ সৈনিকের শক্তির সমান মনে করা হত) একমাত্র কোনভাবে ঐ খন্দক অতিক্রম করেন কিন্তু তিনি ল্যান্ড করেন জলাভুমির মত এক জায়গায় যার নাম ছিল “সালা” পাহাড়ের পাদদেশ। যেহেতু তিনি গুটিকতক সৈনিক  নিয়ে ঐ খন্দক অতিক্রম করেন, ফলে আমাদের নবীর বাহিনির সঙ্গে যুদ্ধ করার অবকাশ ছিল না। তাই, আমর বিন উদ মল্যযুদ্ধ্যের আহ্বান করেন। তখন আমাদের নবী আলিকে মল্য যুদ্ধে পাঠানোর মনঃস্থির করেন। যখন মল্যযুদ্ধ শুরু হয়, তখন এক বিশাল ধুলি ঝড়ের আবির্ভাব ঘটে এবং কে যুদ্ধে জিতছেন আর কে হারছেন বুঝা যাচ্ছিল না। হটাত করে যখন “আল্লাহু আকবার” শব্দ আসে তখন দেখা গেল হযরত আলি আমর বিন উদকে পরাস্ত করেন। আর ঠিক এই ধ্বনিতে শত্রু বাহিনী পিছু হটে যায়।

এবার শত্রু পক্ষের নজর চলে যায় এই বনু কোরায়জার দিকে যারা মদিনার ভিতরে নিরাপত্তায় লিপ্ত ছিল।। কোনভাবে যদি বনু কোরায়জাকে কনভিন্স করা যায় যে তারা আর আমাদের নবীর পক্ষে কাজ করবে না, তাহলে আবার শত্রুপক্ষ জিতে যাবে। এই ধারনা থেকে খায়বারিয়ান নেতা এবং বনু নাদিরের গোত্রের হুয়ায় ইবনে আখতাব কোরায়জার কাছে আসেন। রিউমার ছড়ানো হয় যে কোরায়জা বংশ এখন আমাদের নবীর পক্ষে নাই। আসলেও তারা নবীর বিপক্ষে কাজ শুরু করে দিয়েছিল মদিনার ভিতরে। এই খবরে আমাদের নবী শঙ্গিত হয়ে উঠেন। তার কারন হল তিনি তাঁদের উপর নির্ভর করে ঐ অংশে কোন প্রকার ডিফেন্সিভ পেরিমিটার গড়ে তুলেন নাই। চারিদিকে রিউমার ছড়িয়ে পড়ে যে, কোরায়জাররা মদিনায় আমাদের নবীর বিপক্ষে কাজ শুরু করেছেন এবং এতে মদিনাবাসি খুব বিপদের মধ্যে পড়ে যায়। এর বিপক্ষে আমাদের নবী ১০০ সাধারন আনসার এবং ৩০০ ঘোড়াবিহিন আনসার মোট ৪০০ জন আনসার মদিনায় মোতায়েন করেন যারা রাত্রে বেলায় অতি উচ্স্বরে নামাজ পরতেন যাতে এটা প্রমানিত হয় যে অনেক অনেক আনসার ইতিমধ্যে মদিনায় প্রবেশ করেছে। কিন্তু সত্য বলতে কি আমাদের আনসারগন ইতিমধ্যে তাঁদের শারীরিক কার্যক্ষমতা অনেকটা হারিয়ে ফেলছিলেন ক্রমাগত যুদ্ধের  কারনে। আমাদের নবী তখন ঘাতাফানকে এইমর্মে একটা চুক্তিতে আহবান করেন যে, তারা যদি মদিনা থেকে চলে যায়, তবে মদিনায় যে পরিমান খেজুর উৎপন্ন হবে তার তিন ভাগের এক ভাগ তাদেরকে ক্ষতিপুরন দেয়া হবে। কিন্তু মদিনার নেতারা আমাদের নবীর এই শর্ত মানতে রাজি হলেন না এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অটল থাকলেন। এই সময় এক অভুতপূর্ব ঘটনা ঘটে গেল।

আরবের একজন নেতা যাকে সবাই খুব সমিহ করতেন এবং মানতেন তার নাম নয়াম ইবনে মাসুদ। তিনি গোপনে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে যা কেউ জানত না শত্রুপক্ষ। সবার কাছে তিনি একজন গ্রহনযোগ্য মানুষ ছিলেন। তিনি প্রথমে গেলেন বনু কোরায়জার কাছে এবং বললেন, শত্রুপক্ষ (অর্থাৎ যারা আমাদের নবীর বিপক্ষে যুদ্ধ করছেন তারা), যদি কোন কারনে হেরে যায় তাহলে বনু কোরায়জাকে মোহাম্মাদের (সঃ) কাছে ফেলে রেখেই চলে যাবে এবং সেক্ষেত্রে সব কিছু যা মোহাম্মাদ (সঃ) বলবেন তাই হবে। তখন মদিনাবাসি শুধু বনু কোরায়জাকেই শাস্তি প্রদান করবে। সুতরাং বনী কোরায়জার উচিৎ অন্যান্য বংশের নেতাদেরকে এখন বনী কোরায়জার কাছে হস্টেজ হিসাবে রাখা যাতে যদি কোন কারনে তারা হেরে যায়, ঐ গোত্ররা বনী কোরায়জার লোকদের বিপদে ফেলে চলে যেতে না পারে।  একইভাবে তিনি শত্রু পক্ষের লোকদেরকেও এই বলে খবর দিলেন যে, বনী কোরায়জার লোকজন তাঁদের কিছু গোত্র নেতাদেরকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হস্টেজ হিসাবে চাইতে পারে এবং না দিলে তারা মদিনার সাপোর্ট হিসাবেই থাকবে। এই তথ্য কাজে লাগলো, যদিও কোন তথ্যই সত্য নয়। এই দিকে আমাদের আনসারগন ধিরে ধিরে বনু কোরায়জার দলকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলল। ইতিহাস বলে যে, বনু কোরায়জাকে আমাদের দল প্রায় ২৫ দিন ঘিরে রেখেছিল এবং শেষমেশ তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং শত্রুপক্ষের জন্য আর কাজ করে নাই। কিন্তু চুক্তি ভাঙ্গার কারনে বনু কোরায়েজের নেতাদেরকে হত্যা করা হয় এবং মহিলা ও শিশুদেরকে দাস হিসাবে গ্রহন করা হয়।

যাক সে ইতিহাস। সবাই আমরা তা জানি। এখন আর নাই বা বললাম আর।

তারপর আরাফায় গিয়েছিলাম। অবাক হওয়ার মত ব্যাপার যে, আমাদের নবী যেখান থেকে তার বিদায়ী ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটা একটা উচ্চ পাহাড় আর নাম হচ্ছে জাবালে রাহমাহ। অর্থাৎ রহমতের পাহাড়। প্রথমবার হজ্জের সময় আমার এই জায়গাটা দেখার সুযোগ হয় নাই কারন অনেক ভীড় ছিল এবং আমি আরাফার দিন যেখানে ছিলাম তার থেকে এই জাবালে রাহমাহ অনেক দুরেও ছিল। এবার হেটে হেটে ঐ জাবালে রাহমাতে উঠলাম। শরির শিউরে উঠে ঐ সময়কার কথা মনে করলে। কারন আমাদের নবী ঠিক যে জায়গাটায় দাড়িয়ে এই মানব উদ্দেশ্যে তার শেষ বিদায়ি ভাষণ দিয়েছিলেন তার স্থান দেখা এবং ঐ ভাষণ সম্পর্কে ভাবা একটা অদ্ভুত শিহরণ জাগে মনে। জানা যায় যে, প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল ঐ ভাষনের সময় অথচ কোন মাইক ছিল না, এরপরেও সবাই আমাদের নবীর প্রতিটি কথা স্পষ্টভাবে শুনেছিলেন। এবার ওখানে গিয়ে আরও নতুন একটা তথ্য জানলাম। নবী করিম (সঃ) এর আগমনের বহু পূর্বে প্রায় হাজার বছর পূর্বে বাদশাহ হারুনের স্ত্রী একবার এই আরাফার ময়দানে এসেছিলেন কোন এক ধর্মীয় কারনে। তখন ঐ অঞ্চলে পানির খুব অভাব ছিল। বাদশাহ হারুনের স্ত্রী যখন এই পাহাড়ে এলেন তখন ঐ এলাকার বাসিন্দারা তাঁকে পানির ব্যবস্থার কথা জানালে তিনি তার স্বামী বাদশাহ হারুনকে পানির ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বাদশা হারুন তার স্ত্রির এই অনুরোধ রক্ষার জন্য সুদুর ইরাক থেকে পানির লাইন টেনে এনে এই এলাকায় পানির ব্যবস্থা করেন যা এখন অবধি লাইনটা রয়ে গেছে। ওটা ছিল এক বিশাল কাজ কিন্তু বাদশাহ কাজটি করেছিলেন। বিকল্প পানির ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই পানির সাপ্লাই জারি ছিল এবং বর্তমানে ইরাক থেকে পানি আসছে না বটে কিন্তু ঐ একই পানির লাইন সউদি সরকার ব্যবহার করে সউদি থেকেই পানির সরবরাহ করে থাকে। বলা হয় যে, এই আরাফার ময়দান নাকি হাশরের ময়দানের সঙ্গে যুক্ত একটা ময়দান। হজ্জের সময় আরাফার ময়দানে থাকা ফরজ এবং মাগ্রেব পর্যন্ত এখানে অবস্থান করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু মাগরেব নামাজ এখানে পড়া নিষেধ। এই মাগ্রেব নামাজ পরতে হয় মুজদালেফায় এশার নামাজের সঙ্গে একত্রে। আমি আমর পুরান এক মেইলে হজ্জের বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিখেছিলাম কেন কোন রিচুয়াল কিভাবে করা হয়। এখন আর এগুলো এখন লিখছি না।

জাবালে রাহমাহ থেকে আমরা চলে গেলাম মিনায়। যেখানে শয়তানের উদ্ধেস্যে পাথর মারা হয়। আমি জায়গাটা আগেই দেখেছিলাম হজ্জের সময় কিন্তু এবার যে দুইটা জায়গা নতুন করে দেখলাম তা হচ্ছে আবাবিল পাখির দ্বারা পাথর মারার স্থানটি। আবাবিল পাখির ঘটনাটি নিশ্চয়ই আমরা সবাই জানি। তারপরেও আমি একটু পিছনের কাহিনি টানতে চাই সবার মেমোরি ফ্রেশ করার জন্য। ঘটনাটির অবতারনা ঘটে এইভাবে।

আমরা জানি আবু তালিব যদিও শেষ পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন নাই কিন্তু তিনি ইসলামের অন্যতম একজন প্রটেক্টর ছিলেন। তিনি আমাদের নবীকে সর্বত্র সাহায্য করেছেন এই ইসলাম সম্প্রসারণের জন্য। একদিন তিনি তার এই ভাতিজাকে বললেন, হে ভাতিজা, তুমি কি শুধুমাত্র আমাদের কুরাইশ বংশের জন্য প্রেরিত হয়েছ নাকি সমগ্র মানব জাতির জন্য? আমাদের নবী বললেন, আমি সমগ্র মানব জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছি হোক সে সাদা, বা কালো, বলুক সে আরবি ভাষা অথবা অন্য কোন ভাষা, থাকুক সে পাহাড়ে বা সমুদ্রের নিচে, হোক সে বিধর্মী বা না কোন ধর্মের, হোক সে ধনী বা গরিব, আমি সবার জন্য প্রেরিত হয়েছি। এই কথা শুনে কুরাইশ এক সদস্য আবু তালিবকে বললেন, শুনেছ তোমার ভাতিজার কথা? যদি এখন পার্সিয়ান বা রোমের লোকজন এই কথা শুনে তাহলে তো এখনই তারা আমাদের সবকিছু ধংশ করে নিয়ে নিবে এবং তারা আমাদের এই কাবা ঘর যাকে উদ্দেশ্য করে আমাদের ব্যবসা পরিচালিত হয় তারা তা ভেঙ্গে দিবে। তখন এই সুরার আবির্ভাব হয় এবং তার ইতিহাস জানানো হয়।ইতিহাসটা এই রকমঃ

আমাদের নবীর জন্মের কিছুদিন আগে এই হাতি এবং আবাবিল পাখীর ঘটনাটি ঘটে।

ইয়েমেনের আশেপাশের এক রাজা যার নাম ছিল ঢু-নয়াজ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বদমেজাজি এক রাজা এবং জুলুমকারী। তিনি ছিলেন ইহুদী ধর্মের। তিনি চেয়েছিলেন যে, তার রাজ্যে সব অধিবাসী যেনো ইহুদী ধর্মে দিক্ষিত হয়। আর যারা দিক্ষিত না হবে, তাদেরকে তিনি বিখন্ডিত করেন। এর মধ্যে ছোট এক বালক যার বাড়ি ছিল ইয়েমেনেরই দেশে নাজরান প্রদেশে। পিতামাতা তাঁকে যাদুবিদ্যা শিখার জন্য এই ছোট বালককে নাজরান থেকে ইয়েমেনের শহরে পাঠাতেন প্রতিদিন। পথিমধ্যে এই বালক ক্রিস্টিয়ান এক বৃদ্ধের দেখা পান যিনি খুব ভাল যাদুবিদ্যা জানতেন এবং সব ধরনের রোগ মুক্তির মন্ত্র জানতেন। ফলে ঐ বালকটি গোপনে ঐ বৃদ্ধার কাছে যাদুমন্ত্র এবং রোগমুক্তির বিদ্যা অর্জনে ক্রিস্টিয়ানিটিতে দিক্ষিত হওয়া শুরু করে। এই খবর দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যায়, ফলে রাজা ঢু নুঅয়াজ অতি দ্রুত ঐ বৃদ্ধাকে বিখন্ডিত করেন এবং এই ছোট বালকটিকেও বিখন্ডিত করার আয়োজন করেন। বালকটিকে বাঁধা হয় এবং তীরন্দাজ দ্বারা তাঁকে তির মারা শুরু হয় কিন্তু কোন তীরই তাঁকে স্পর্শ করতে পারছিলো না। ওখানে যতলোক জড়ো হয়েছিল, এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেল, সঙ্গে রাজা নিজেও। তখন বালকটিকে জিগ্যেস করা হল, কেন তাঁকে তীর দিয়ে মারা যাচ্ছে না। বালকটি তখন উত্তর করেছিল যে, তাঁকে মারা একমাত্র সম্ভব যদি ক্রিস্টিয়ান লর্ডের নাম ধরে তাঁকে মারা হয় এবং রাজ্যের অধিকাংশ লোক যদি তার এই তীর মারার দৃশ্য অবলোকন করে তাহলেই তাঁকে মারা সম্ভব। তার এই নির্দেশনা মোতাবেক প্রায় ২০ হাজার লোক অবলোকন করে এবং যারা যারা এই দৃশ্য অবলোকন করে তারা প্রায় সবাই এক সঙ্গে বালকটির নতুন ধর্ম ক্রিস্টিয়ানিটিতে রূপান্তরিত হয়। রাজা ঢু নুঅয়াজ ক্ষিপ্ত হয়ে ঐসব ২০ হাজার মানুষকেই একসঙ্গে গর্ত করে মেরে ফেলেন। কোরআনে এই “People of the Ditch” উপাখ্যানে একটি আয়াত আছে। এই সময় একলোক ঐ স্থান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং সে রোমের রাজার কাছে আশ্রয় চান। রোমের রাজা ছিলেন ক্রিস্টিয়ান। তিনি এই তথ্য জেনে খুব রাগান্বিত হন এই জন্য যে, শুধুমাত্র ক্রিস্টিয়ান ধর্মে দিক্ষিত হওয়ার কারনে রাজা ঢু নুঅয়াজ এতগুলো লোককে মাটিতে পুতে মেরে ফেললেন? তিনি আবিসিনিয়ার রাজাকে চিঠি (তিনিও ক্রিস্টিয়ান ছিলেন) লিখেন যাতে তিনি রোমের সঙ্গে এক হয়ে ইয়েমেনকে আক্রমন করে প্রতিশোধ নেয়। তাই হলো। আবিসিনিয়ার রাজা (আবিসিনিয়া বর্তমানে ইথিওপিয়া নামে পরিচিত) নাজাশি এবং রোমের রাজা একত্রে ইয়েমেন আক্রমন করার পরিকল্পনা করেন। এই কম্বাইন্ড যুদ্ধের জেনারেল ছিলেন রোমের জেনারেল আরিয়াত। আক্রমণ ঠেকাতে না পেরে ইয়েমেন হেরে যায় এবং রাজা ঢু নুঅয়াজ নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। জেনারেল আরিয়াতের (রোম জেনারেল) দখলে চলে আসে ইয়েমেন। রোমের এই জেনারেল ছিল অত্যন্ত কঠিন লোক এবং তিনি ইয়েমেনের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলেন। কিন্তু আবিসিনিয়ার আরেক জেনারেল যিনি এই যুদ্ধে রোমের জেনারেল আরিয়াতের সঙ্গে যুদ্দ করেছেন তিনি জেনারেল আরিয়াতের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয়ে উঠেন, তার নাম আব্রাহা। তিনি রাজা নাজাশির লোক। পুরু সেনাবাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং প্রায় আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই আত্মঘাতী পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য জেনারেল আরিয়াত এবং জেনারেল আব্রাহা মল্যযুদ্ধে রাজি হন। শেষ পর্যন্ত আব্রাহা জয়ী হয়। কিন্তু রাজা নাজাশি তার জেনারেল আব্রাহার এই কর্মে খুশি হননি এবং নিজে আরও বেশি সেনাবাহিনী নিয়ে জেনারেল আব্রাহা উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। রাজা নাজাশি বার্তা পাঠালেন যে, যখন তিনি জেনারেল আব্রাহার সঙ্গে দেখা হবে, তখন তিনি তার মাথার চুল ছেটে দেবেন এবং ইয়েমেনের রাজা হওয়ার শখ তিনি মিটিয়ে দেবেন ইয়েমেনের মাটিতে তার মাথা পুতে। জেনারেল আব্রাহা ছিল খুব বুদ্ধিমান। তিনি এই খবর শুনে তিনি নিজেই আগে ভাগে তার মাথার চুল ছেটে ইয়েমেনের মাটি তার মাথায় মেখে একটি ছোট বার্তা পাঠালেন যে তিনি সব সময় রাজা নাজাশির অনুগত আছেন এবং তিনি যা বলবেন সেটাই চূড়ান্ত। এই বার্তায় রাজা নাজাশি খুব খুশি হলেন এবং রাজা নাজাশি জেনারেল আব্রাহাকে ইয়েমেনের শাসক বানিয়ে দিলেন। রাজা নাজাশিকে জেনারেল আব্রাহা খুশি করার জন্য নতুন শাসক জেনারেল আব্রাহা ঘোষণা করলেন যে, তিনি ইয়েমেনে রাজা নাজাশির নামে এক নতুন কাবা ঘর তৈরি করবেন (বহু বছর যাবত আমাদের এই কাবা ঘর ছিল সব ধর্মের কেন্দ্রস্থল এবং ব্যবসার কেন্দ্র)।  ইয়েমেনের নতুন রাজা জেনারেল আব্রাহা নতুন এক কাবাঘর তৈরি করলেন এবং সব ধর্মের লোকদেরকে এই নতুন কাবা ঘরের মধ্যে তাদের উপাসনালয় স্থাপন করে দিলেন এবং এটা হয়ে উঠল ব্যবসার আরেক কেন্দ্রস্থল। এতে আরববাসি খুব খুশি হলেন না।

এই অখুশির জের ধরে এক আরব একদিন ঐ নতুন চার্চের ভিতরে পায়খানা করে তার প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করলেন। রাজা আব্রাহা এতে এতটাই ক্ষিপ্ত হলেন যে, তিনি আরবের পুরাতন কাবা ঘর ভেঙ্গে দেবার পরিকল্পনা করলেন। তিনি বিরাটকায় হাতিসমেত (এই হাতিগুলোর নাম ছিল “মামুদ”) পুরাতন কাবা শরীফ ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে মক্কায় রওয়ানা হলেন এবং কোন শক্তিই তাঁকে থামাতে পারছিল না। কিন্তু কাবা এলাকার কাছাকাছি এসে তিনি কাবাবাসির কাছ থেকে কোন প্রকার সাহায্য পেলেন না। এবং তিনি কাবার প্রকৃত লোকেশনও জানতেন না। শেষে তাইফের এক বাসিন্দার সাহায্য নিয়ে তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তাইফের এই বাসিন্দার নাম ছিল আবু রজাল। তাঁকে নিয়ে যখন আব্রাহা মক্কার দিকে আসছিলেন, পথিমধ্যে আবু রজাল মারা যায় এবং তাঁকে মক্কা ও তাইফের মাঝামাঝি জায়গায় কবর দেয়া হয়। বর্তমানে যে কোন লোক যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে আবু রজালের ভাই বলে আরবে সম্বোধন করা হয়। আমাদের মিরজাফরের নামের মত।

যে কোন ভাবেই হোক, আব্রাহা মক্কার কাছাকাছি চলে আসেন এবং প্রায় ৬-৭ কিমি দূরে তিনি তার ক্যাম্প স্থাপন করেন রাত্রি যাপনের জন্য এবং তিনি আদেশ দেন যে, তাদের খাবার মজুত করার জন্য মক্কার আশেপাশের যত হাস মুরগি, উঠ, গরু, ছাগল আছে তা হস্তগত করো। এই হস্তগত অপারেশনের জেরে আমাদের নবীর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ২০০ উঠও আব্রাহার বাহিনী ক্যাপচার করেন। আব্দুল মুত্তালিব তার ২০০ উঠ ফিরে পাবার জন্য আব্রাহার ক্যাম্পে যান। আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন দেখতে খুব সুন্দর, লম্বা এবং ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক। তাঁকে দেখে আব্রাহার মধ্যে একটা সম্মান দেখানোর মনোভাব তৈরি হল এবং আব্রাহা তার রাজ আসন থেকে নেমে এসে মাটিতে বসে আব্দুল মুত্তালিবের সঙ্গে কথা বললেন। আব্রহা জানতে চাইলেন কি কারনে আব্দুল মুত্তালিব তার কাছে এসেছে। আব্দুল মুত্তালিব বললেন যে, আব্রহার লোকজন তার ২০০ উঠ নিয়ে এসেছে, সেটা তিনি ফেরত চান। এটা শুনে আব্রহা খুবই অবাক হলে এই কারনে যে, এত ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে আব্দুল মুত্তালিব তার কাছে এসেছে? যেখানে এতলোক কাবাঘর রক্ষার প্রানপন চেষ্টা করছে আর সেখানে আব্দুল মুত্তালিব কাবাঘর নিয়ে কোন প্রকার অনুরোধ বা সংশয় প্রকাশ না করে শুধুমাত্র তার ২০০ উঠের জন্য অনুরোধ করছে? আব্রহা আব্দুল মুত্তালিবকে বললেন, আমি খুব অবাক হচ্ছি যে, সবাই যেখানে কাবাঘর রক্ষায় মারা যাচ্ছে, সেখানে আব্দুল মুত্তালিব কাবাঘর রক্ষার কোন অনুরোধ করলেন না কেন? আব্দুল মুত্তালিব বললেন, আমি ২০০ উঠের মালিক, ঐ ২০০ উঠের নিরাপত্তা আমার উপর বর্তায়। আর কাবাঘরের মালিক “লর্ড” নিজে। লর্ড যদি তার কাবাঘর রক্ষা করতে না পারেন, আমার কি করার আছে? আব্রহা তার ২০০ উঠ ফেরত দিলেন এবং বললেন যে, সবাইকে বলে দিন, আগামিকাল আমি কাবা ঘর গুড়িয়ে দেব, কেউ যেন আশেপাশে না থাকে।

আব্দুল মুত্তালিব তার ২০০ উঠ নিয়ে ফিরে এলেন এবং সবাইকে আব্রাহার ঘোষণা শুনিয়ে নিকটবর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন পরদিন কি হয় দেখার জন্য। পরদিন আব্রাহা তার হাতিগুলোকে কাবাঘরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন কিন্তু হাতি সামনের দিকে এক কদমও এগুলো না। সবদিকে হাতি যেতে পারছে কিন্তু কাবার দিকে অগ্রসর হতে চাইছিল না। অনেক চেষ্টা করার পরও যখন হাতি নড়ছিল না। তখন হাতিগুলোকে আব্রাহা পাথর দিয়ে আঘাত করতে শুরু করল, তাতেও কোন কাজ হচ্ছিল না। দুপুরের দিকে হটাত করে আবাবিল পাখি মেঘের মত উড়ে এল, সবার দুই পায়ে দুইটা এবং ঠোটে একটা করে মাটির ঢিলা। এই তিনটা করে মাটির ঢিলায় সমস্ত হাতি এবং সৈন্য সামন্ত পরজদুস্থ হয়ে উঠল। শুধু তাই নয়, তারপর শুরু হল বৃষ্টি। মাটি গলে গিয়ে সবাই কাদামাটিতে পুতে গেল এবং তারা আর ওইখান থেকে ফিরে আসতে পারেনি। আব্রাহাসহ সব বাহিনী মারা যায়। আমাদের নবী যখন মাতৃগর্ভে দুই মাসের বয়স, তখন এই ঘটনা ঘটে।

বর্তমানে মিনায় যাওয়ার পথে এই জায়গাটা পড়ে এবং একে অভিশপ্ত জায়গা বলে উল্লেখ করা হয়। সাধারনত কেউ ঐ জায়গা দিয়ে যাতায়ত করতে চায় না। আর অগত্যা করলেও খুব ভয়ে এবং ঘৃণায় যায়। ঠিক এর পরেই ইয়ামেনকে দখল করে পার্সিয়ানরা। 

মদিনা থেকে ৩০ তারিখে আমরা মক্কায় চলে গেলাম। ঐ রাতেই আমি ওমরা শেষ করেছি। মদিনা থেকে এহরাম বেঁধে নিয়েছিলাম।  আমি খুব ভাগ্যবান যে আমার হোটেলটি ছিল, সেটা মক্কার সঙ্গে একদম লাগোয়া। মানে আমার রুম থেকেও মক্কার জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা যায়। হোটেল জমজম। আমার রুম থেকে কাবার ঘর সরাসরি দেখা যেত। এরজন্য আমাকে একটু বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছিল বটে কিন্তু আমি খুব আনন্দে ছিলাম এইজন্য যে, হারাম ভিউ পেয়ে। খুব বেশি নড়াচড়া করিনি, সবগুলো নামাজ মক্কা শরিফে গিয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছে। মোট পাঁচ বার ওমরা করেছি এই সময়ে। আর প্রতিদিন কয়েকবার করে তাওয়াফ করেছি পবিত্র কাবাঘরকে। মন ভরে এবাদত করেছি যতক্ষন মন চেয়েছে। সবার জন্য দোয়া করেছি।

একদিন শুধু বের হয়েছিলাম মক্কায় বিখ্যাত ইসলামিক জায়গাগুলো দেখার জন্য। তার মধ্যে ছিল আরাফার ময়দান, মুজদালিফা, মিনা, তায়েফ শহর, হেরা গুহা। ইত্যাদি। তায়েফ শহরে গিয়ে আমি ঐ জায়গাগুলো দেখার চেষ্টা করেছি যেখানে ঐ বুড়ি যিনি আমাদের নবীর পথে কাটা বিছিয়ে রাখতেন, ঐ মসজিদ যেখানে আমাদের নবীকে আহত হতে হয়েছিল।

তায়েফের ঘটনা আমরা সবাই হয়ত জানি। সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছেন আমাদের নবী এই তায়েফ শহরে ইসলামকে প্রচার করতে গিয়ে। তার সঙ্গে তার পালক পুত্র জাইদ (রাঃ) ছিলেন তায়েফে ইসলাম প্রচারের জন্য। তায়েফের লোকজন সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিলেন আমাদের নবীকে। তার সারা শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, তার দন্ত মোবারক শহিদ হয়েছিল এই তায়েফে। তার কষ্ট দেখে জিব্রাইল (আঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি শুধু প্রকাশ করেন এবং অনুমতি দিন, আমি আল্লাহর কাছ থেকে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছি, আপনার অনুমতি পেলে আমি নিমিষের মধ্যে এই তায়েফের লোকজনসহ তায়েফ নগরীকে ধ্বংস করে দেই। তখন আমাদের নবী জিব্রাইলকে বলেছিলেন, যদি সব মানুষদেরকে ধংশই করে দেই, তাহলে আল্লাহকে এবাদত করবে কে? একদিন এই তায়েফ নগরির সব মানুষ ইসলাম গ্রহন করবে। তায়েফ শহরটি খুব সুন্দর এবং সত্যি দেখার মত। পাহাড়ের উপরে একটা চমৎকার শহর। 

মক্কায় অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া (কবর স্থান) দেখলাম। হজ্জের সময় খুব ভাল করে দেখার সুযোগ হয় নাই। এখন বর্তমানে অনেক কিছু পরিবর্তন এসেছে। মহিলাদের যাওয়ার সুযোগ নাই। কবর গুলোর ব্যাপারে কিছু বলি।

এখানে যাদের কবর দেওয়া হয় তাদের জন্য আগে থেকেই ইটের কবর বানানো আছে। প্রতি ওয়াক্তেই দাফন করার কাজ চলে। আমি যেটা শুনেছি যে, একটা কবর প্রায় এক বছর পর্যন্ত ইনট্যাক্ট অবস্থায় রাখা হয়। পরের বছর ঐ কবরটা আবার খোলা হয়। যদি কোন লাশ অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তাহলে ঐ কবরটা একেবারে শিল্ড করে দেওয়া হয়, ঐ কবরের মধ্যে আর কোন লাশ দাফন করা হয় না। ধরে নেওয়া হয় তিনি শহিদ বা তাঁকে আর কোন ডিস্টারবড করা যাবে না। আর যেগুলোতে লাশ পচে যায়, শুধু সেগুলোতে আবার নতুন লাশ দাফন করা হয়। এইভাবে অনেক কবর একদম বন্ধ করে দেওয়া হয়ে গেছে।  আমি কয়েকটা ছবি দেখাই। তাহলে বুঝতে পারবে। কোন কবরের কোন প্রকার ডেকোরেশন নাই।

৮ তারিখে আমরা ঢাকায় ফিরে আসার জন্য জেদ্দায় রওয়ানা হলাম। দুপুরের দিকে জেদ্দায় আমার এক বন্ধুর বাড়িতে উঠলাম। সে খুব সাদরে আমাদের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখালো তার গাড়ি দিয়ে। তাঁকে আমি আগে থেকে চিনতাম না। ঢাকার উত্তরার মসজিদের খতীব জনাব মামুন সাহেবের পরিচিত। আমাদেরকে ঐ ভদ্রলোক তার নিজের গাড়ি পাঠিয়ে মক্কা থেকে নিয়ে গেলেন। তিনি বিন লাদেন কোম্পানির একজন এনলিস্টেড কনট্রাক্টর ইঞ্জিনিয়ার। অনেক জায়গা দেখালেন। শেষমেশ নিয়ে গেলেন মা হাওয়ার কবর স্থানে। বিশাল একটা কবরস্থান। খুব ভাল লাগলো দেখে। জেদ্দায় যেখানে শিরচ্ছেদ করা হয় কোন আসামির, সেই মসজিদে নিয়ে গেলেন এবং যেখানে শিরচ্ছেদ করানো হয় সেই জায়গাটা দেখালেন। ভয় লাগছিল ভাবতে। প্রতি শুক্রবারে এই স্থানে কোন আসামিদের শিরচ্ছেদ করার রেওয়াজ আছে এখানে এবং প্রকাশ্যে।

রাত ৩;৪৫ মিনিটে আমরা এয়ারপোর্ট আসলাম এবং তারপর ঢাকায়। আলহামদুলিল্লাহ। 

১২/১১/২০১৪- লুতফর আমার বন্ধু

বৃহস্পতিবার, গোলারটেক, মিরপুর

গত তিন চার দিন আগে আমার ক্যাডেট কলেজের এক বন্ধুর জন্মদিন ছিল। ওর নাম লুতফর রহমান। আজকাল মেইল থাকার কারনে কেউ আর জন্মদিনের কার্ড পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানায় না, মেইল বা এসএমএস দিয়েই কাজটা শেষ করে ফেলে। অত্যাধুনিক সিস্টেম। কুলজাত দুটুই রক্ষা হয়। কুলজাত দুটুই রক্ষা হলেও বন্ধুত্তের মাঝে এই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে আগের মত আর আবেগের স্থানটুকু থাকে না। কেউ ফিরতি একই ম্যাসেজ দিয়ে দায়িত্তটা পালন করে বড় একখান থ্যাংস জানিয়ে এমন একটা ভাব প্রকাশ করে যেন না জানি কত খুশি হয়েছি। যাক সে কথা, যুগ পাল্টেছে, যুগ আরও পাল্টাবে, ভবিষ্যতে আরও কি হবে তা আর গবেষণার প্রয়োজন বোধ করি না আমার এই লিখার ভিতরে। কিন্তু লুতফরের জন্মদিনে ওকে মেইল করলেও ও আর এগুলোর ধার ধারে না। ও মেইল খুলে না, মেইল পাঠায় না, মেইল পরেও না। ও আর জন্মদিনই পালন করে না। ও পালন করে মৃত্যু দিন। ও হয়ত তাও করে না।

বিডিয়ারের সেই ভয়াবহ এক নৃশংস হত্যাকান্ডে ওর মধ্যবয়সী জীবনটা বলি দিতে হয়েছে। সেদিন ছিল ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখ ২০০৯ সাল। আমি যথারীতি অন্যান্য দিনের মত মাত্র ফ্যাক্টরিতে এসেছি। অন্যান্য দিনের মত আমার পিওন এক কাপ ব্ল্যাক কফি দিয়ে বলল, “স্যার, আজকে কি আপনার মেহমান দুপুরে খাবে নাকি সন্ধ্যায় নাস্তা খাবে, কোনটা?” আমি কিছুটা কনফার্ম না করেই বললাম, “দুটুই মাথায় রাখ”  আসলে মেজর হায়দার আমার এখানে আসবে, আজ ওদের দরবার আছে, দরবার শেষ করেই হয়ত আমার এখানে আসার কথা। 

সকাল নয়টার দিকে আমার আরেক বন্ধু আমাকে ফোন করে জানতে চাইল পিলখানায় বিডিআর হেডকোয়ার্টসের ভিতর কিছু হচ্ছে নাকি? ব্যাপারটা আমারও জানা ছিল না। আমি জেনে জানাচ্ছি বলে ফোন কেটে দিয়ে অনেককেই ফোন করলাম। কিন্তু কারো কোন ফোনের মধ্যে ঢোকতে পারছিলাম না। লুতফরকে ফোন করলাম, আবতাবকে ফোন করলাম, না পেয়ে ১৯ লং কোর্সের মেজর হায়দারকেই ফোন করলাম, কারো ফোনই খোলা নাই। একটু অবাক হচ্ছিলা, আবার একটু শঙ্কিতও হচ্ছিলাম। কাউকে না পেয়ে আবার আমি আমার ঐ বন্ধুকেই ফোন করলাম যে একটু আগে আমাকে ফোন করেছিল। ওকেই জিগ্যেস করলাম, আসলে কি শুনেছে ও। ও যা বলল, তাতে আমার একটুও ভাল লাগলো না বরং একটা সাংঘাতিক শঙ্কায় পরে গেলাম। বিডিআর পিলখানায় নাকি সৈনিক আর অফিসারদের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। একি কথা!! কি করে সম্ভব এটা? মাঝে মাঝে যে কি হয় মানুষগুলোর, কি কারনে যে হটাত করে সব ভেঙ্গেচুরে তছনছ করে একে অপরের উপর এমন আচরন করে যে, গতকাল যে মানুষটির সঙ্গে এক সাথে চা খাওয়া হয়েছিল, যার সঙ্গে এক বিছানায় বসে গল্প করা হয়েছিল, যে তাঁর নিজের সুখের বা দুঃখের কতই না কথা একে অপরের কাছে অকপটে ভাগীদার করেছিল, সে আজ কেন বা কি কারনে একেবারে অচেনা হয়ে হিংস্র বাঘের মত, উম্মাদ সিংহির ন্যায় উম্মত্ত আচরনে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়ে একে অপরের প্রান নিতেও অনুশচনা করছে না। মানুষ এমনি এক প্রানি যার পাশে একটা মাত্র “অ” যোগ করলেই তাঁর আমুল সব চরিত্র বদল হয়ে যায়। সে আর মানুষ থাকে না, হয়ে উঠে “অমানুষ” যার সংজ্ঞা প্রানিকুলের কারো কাছেই নাই।

বিডিআর এর হেডকোয়ার্টার এর ভিতর সৈনিক বনাম অফিসারের মধ্যে প্রানঘাতি সংঘাত হচ্ছে বলে টিভির স্ক্রলে দেখাচ্ছে কিন্তু কি হচ্ছে, কার কি অবস্থা, তাঁর কেউ সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারছে না। সবাই তো স্বসস্ত্র, সবাই তো ট্রেনিংপ্রাপ্ত। আমার খুব টেন্সন হতে লাগলো। এই তো গত ২৩ তারিখে আমি বিডিআর এর ভিতরে গিয়েছিলাম। দেখা হয়েছে লুতফরের সঙ্গে। ওর অফিসে চা খেলাম, গল্প করলাম। আমি গরম গরম পুড়ি পছন্দ করি, তাই কোথা থেকে যে ঐ অবেলায় পুড়ি নিয়ে এলো, ভাবাই যায় না। লুতফরের ভবিষ্যতের কত প্ল্যান শুনলাম। সঙ্গে মেজর হায়দার ছিল। এই ছেলেটি কখনো আমাকে স্যার বলত না। বলত “বড়দা”। এক সঙ্গে ৭ ফিল্ড রেজিমেন্টে কাজ করেছি প্রায় দুই বছরের বেশি। সাভারে থাকাকালীন আমি ৬ ফিল্ডে আর হায়দার ১৫ ফিল্ডে। সিনিয়রদের সঙ্গে ন্যায় অন্যায় নিয়ে তর্কের কোন শেষ ছিল না তাঁর। কিন্তু জুনিয়রদের বেলায় ঠিক আমার মতই উদার, সেই উদারতার কোন শেষ লিমিট ছিল বলে আমার জানা ছিল না। গল্পের টেবিলে হায়দার আমাকে বলল, “বড়দা, এই পাসিং আউট প্যারেড শেষ হলেই আমার চাকুরির জীবন ইতি করবো, অফিসে আমার জন্য একখান চেয়ার রাখবেন।” আমি এই ছেলেটাকে যা বলতাম, কোন প্রশ্ন ছাড়া, কোন তর্ক ছাড়া, কোন লজিক ছাড়া মানতে কখনো দিধাবোধ করত না। আমার বড় প্রিয় একজন অফিসার ছিল এই হায়দার। আমাদের আর্ট টিচার শুজা হায়দার স্যারের ছেলে।

সারাদিন খুব টেনশনে থাকছি আর ক্ষনেক্ষনে এখানে সেখানে ফোন করছি জানার জন্য কোথায় কি হচ্ছে। শুনলাম, বিডিআর এর ভিতর সৈনিকেরা অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। অনেক অফিসারদেরকে নাকি জিম্মি করে তাঁদের পরিবারের উপর নির্যাতন করছে। কোন কিছুই ভাল লাগছিল না। দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ পেলাম। মেজর হায়দারের ফোন থেকে। ”স্যার, মাফ কইরা দিয়েন”। আমার সারা শরীর একটা কাপুনি দিয়ে উঠল। আমি যেন কিছুই পরতে পারলাম না। কি লিখেছে হায়দার? ও কি বলতে চেয়েছে? আমি ফোনব্যাক করলাম। কোন রিস্পন্স পেলাম না, ফোনটা বন্ধ আবারও। বড় অসহায় মনে হল আমাকে। কোথায় যেন একটা ভীষণ ব্যাথা অনুভব করছি। কাকে বলব? কি বলব? কেউ তো কিছুই বলতে পারছে না। এই টেনশনের মধ্যেই আমি আমার অফিসিয়াল কাজের জন্য সেই গাজীপুর আছি। প্রায় রাত হতে যাচ্ছে। কোন খবর পাচ্ছি না।

হায়দারের প্রসংগটা পরে আসি। যা বলছিলাম তা হচ্ছে লুতফরের জন্মদিনের মেইল। আমার এক বন্ধু তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে একটা মেইল করেছে, “লুতফর, আমি জানি তুমি ভাল আছ, ঈশ্বরের কাছে আছ, তারপরেও আজ তোমার এই জন্মদিনে তোমাকে জানাই একরাশ শুভেচ্ছা। ভাল থেক। আমরা সবাই ভাল আছি।” লুতফর আদৌ এই মেইলটা পরার আর কোন সুযোগ বা অবকাশ আছে কিনা আমার জানা নাই তবে ওর জন্মদিনে আমারও খুব ওকে শুভেচ্ছা জানাতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু সেটা হবে নিতান্তই একটা লেখা, ও ওটা পরার কোন অবকাশ আর নাই।

জীবন যখন বিদ্রোহি মৃত্যুর কাছে পরাজয় বরন করে, তখন স্বপ্ন গুলি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠে না। তাদের কবর রচিত হয় সেই অপ মৃত্যুর সাথে যা কেউ কখনো ভাবে নাই, বা কোনো হোমওয়ার্কও করে নাই। আমরা সবসময় হোম ওয়ার্ক ছাড়াই দিন শুরু করি।

১১ মে ২০১৪-হাসনাবাদ, ইকুরিয়া, ঢাকা

অনেকদিন পর আবার একটু ডায়েরি লিখতে ইচ্ছে হল। এই অভ্যাসটা আমার এক কালে ছিল এবং প্রায়ই ডায়েরি লিখতাম। কিন্তু ইদানিং কাজের চাপে, কম্পিউটার যুগে আর ঘটা করে ডায়েরি লিখা হয় না।

আজ সারাদিন মোটামোটি বেকারের মত দিনটা কাটাচ্ছি। কাজ আছে কিন্তু ঐ রকম প্রেসার নেই। খবরের কাগজ বাসায় ও পরেছি আবার অফিসে এসে অন্য একটি খবরের কাগজও পড়লাম। সামনে অডিট, অনেকগুলো অডিট। কুয়ালিটি অডিট, ACCORD এর অডিট, আবার SGS অডিট। কোনটাই কারো থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আজ মুর্তজা ভাই অফিসে আসেন নাই। ওনি এলে কথাবার্তা বলা যায়, আবার অনেক কাজও হয়। একা একা আসলে কাজে মন জুড়ে না। মুর্তজা ভাই ইদানিং শারীরিক ভাবে একটু অসুস্থ থাকছেন প্রায়ই। এটা ভাল লক্ষন নয়। তবে খুব গুরুতর কিছু না মনে হয় ইনশাল্লাহ, ঠিক হয়ে যাবে।

লাক্সমা নিয়ে একটু ঝামেলায় আছেন, আমরা আবার রিভার সাইড নিয়েও বেশ ঝামেলায় আছি। আমার সবচেয়ে বেশী চিন্তা হয় লাক্সমাকে নিয়ে। মুর্তজা ভাই যাদের কে নিয়ে লাক্সমায় ব্যবসা করেছিলেন, তিনি হয়ত তাদেরকে পূর্বে ভাল করে স্টাডি করতে পারেন নি, এখন টার বুঝার কোন বাকী নেই কখন একজন মানুষ হটাত করে অমানুষ হয়ে যেতে পারে। আমি সর্বাত্মক চেস্টা করছি যেন, মুর্তজা ভাই এই অনাকাঙ্ঘিত সমস্যা থেকে দ্রুত রেহাই পান।     

০৩/০৯/২০১৩-মাসুদ রিমুনাকে চিঠি

০৩/০৯/২০১৩- মাসুদ এবং রিমুনাকে লিখা চিঠি

 

Dear Masud and Rimona

It was indeed a great time for me and my family to have you within us even for a short time. We thank Almighty that we had the blessings to have kid like you in our family who gave us peace in mind with your good gestures and attitudes. Definitely it was a nice and remarkable tour that you presented us. In fact, after all this hassle and many disturbances in your present tour in Bangladesh, I will like to address it as a big lessons both for you and us. Let this mail be read by your great mom and Dad whom I always wanted as part of my souls and in deed they are.

Masud, this mail is very important to let you know about yourself from me and as well as from my family though I didn’t talk to other members while writing this mail on behalf of them. But I know if they read my mail, they will never accuse me about what I posses inside me. Before I write you anything, let me write something about my own experiences in my life.

I told you that after I married your aunty, literally I broke up with whole of my family and it was the most crucial event in my life because in one side I was loving them and in another side I was unable to let your aunty go away from my life. It was a state of anxiety both in mental and physical. I didn’t know if I am taking the right decision. I wasn't sure if I was in the right path. Constantly I was monitoring myself both from a perspective of Major Akhtar and from the perspective of non-Major Akhtar.

I clearly understood that many people love me for many reasons, and not only for beauty or anything. Some loved me fearing God, someone loved me as I was a good person, someone loved me because I help them, and some one loved me because I was a loveable person. All these loves were no meaning to me except the love I always wanted from your Dad and from my family. Still I had the prayer for them to God that I get back the love from them. It took almost 25 years time to understand that they truly loved me even they never expressed it open. I have no confusion now about their loves and sympathy. But within these time frame, I learnt something. , my life had changed; I learnt growing experience for me. It posed as opportunity for learning and growing coz I learned to do things by myself. I learned to have fun by myself. I discovered things I like doing and ways I could be of help to others. And I had been able to distinguish my priorities. The most wonderful thing that happened was that I learned how to be a whole person. I was able to find meaning in life. I learned my lessons well and I believed that when we've learned our lessons well, we moved on to higher or more advanced stages of development. Those events lead me to where I am now. But I was never a complete man without a family where there is a brother for whom I am here, there are sisters for whom I grew well, there is a village from where I stood up. After all this, I felt truly alone. Even many are beside me but still I was alone. A surge of fear gripped me. I was scared to be alone because I was used always to of having them around me all the way, in dreams, in thoughts, in imagination and what not. I didn't know how I would be able to cope life without them. I didn't know what life would be without them especially my mother and your dad and his family where you were also a part, Yusuf is also a part.  I felt like something had been torn from me, like I was no longer whole because I always found my other half when I was with my family. I was hurting so bad. But I had faced the reality knowing that I will, possibly, never again share a joke with them, ask a question only that they can answer, talk to then, be with them or even make loving smile with them. I had faced those things in order to survive and cope life even if it was utterly heart-wrenching.

Through that event, I realized that life is unstable. That life is unsure because I never thought I would be able to survive and cope. I never thought I would be able to overcome that crisis. I never thought that it would lead me to where I am now. It made me aware that I am not in control of all the situations in life. It made me realized that I am capable of being hurt. I was able to understand that life does not totally consist of happiness and unhappiness. Life is unfair as they say because I realized that the more I try to be happy, the more it eludes me. I realized that life is really uncertain; we’ll never know what will happen next. It leads me to a realization to the confrontation of fundamental problem of human existence in a way that I had been able to survive the crisis in the event of my life. I had been able to surpass the critical points because I was determined, strong-willed and had strong faith in God to re-direct my life. I had been able to confront the need of power to defend my life's purposes because I was able to change my life. It brought new meaning to my life. I realized that there was more meaning to it than just a mere experience of hurt and pain.

You know Masud?  The ultimate measure of a man is not where he stands in moments of comfort and convenience, but where he stands at times of challenge and controversy. It's easy to say sorry for what we have done. It's also easy to forgive and forget, but one thing will never be easy, is to trust again after the disappointment. I learnt that happiness comes to those who give love freely and who don't demand that others love them first. It’s like the sun that is just generous which shine without asking first whether people deserve their warmth or not. I got it from your dad and Mom. They are like Sun and give people lights the way they gave you everything you and me needed even we didn’t know their hearts and their pains but they did their parts.

The definition of love is so varieties and so much big in horizon that many things can be derived from single word “LOVE”. Great love can make a weak man strong. True love can make a brave man fall to his knees. But if I like to define its opposite side, it has tremendous set back also. Failure in Great Love can make strong man weak and brave man as apathy in life. No one is important to him then. In such dismissal courses I learnt Masud that LIFE in this world is the hardest course we could ever take and we need someone or bunches of people who loves us unconditionally without any returns. Its hard to judge them always but they are there. Its our responsibility to find them in right time. And most sad part is that to judge and find them is not easy when we are emotional or outraged. But it is always there. Frankly speaking Masud, it could only be taken once. No review, no masteral, no doctorate. We don't have any other DEAN or GOD to find them but heart and soul. And once we have graduated from this school, we are done and gone. Only eternity can tell our rating: PASSED or FAILED. So I will advice you to judge them correctly and also advice you to live each day as if it's your baccalaureate service, because in this course we'll never know the exact date of our closing ceremony. There were hundreds of YESTERDAYS that passed and more TOMORROWS still to come but there's only one TODAY to enjoy. I always live for TODAY Masud and I will advice you to live for only TODAY with whom you are always missing out. You must figure it out whom we miss constantly and truly. I always miss your dad though he is the only person with whom I can be an arrogant and also submissive. I am thankful to Almighty to have your Dad and Mom in my life.

You know Masud? Any relationship apart from what God had planned for us is like the beautiful horizon. It may appear that the sea and the sky meet at some point but we know they are not. You think you are meant for each other only to find out that you are not and you will never be. It is nothing but a mere appearance of an illusion--beautiful yet deceiving... That’s how now I take this relationship Masud. Its like if you paint a good painting, others will enjoy looking at it, but you in painting it, will have learned how to paint. I am just painting everything in my imagination and I have all the choices how I wanna see them and paint. Everything is a trial where a trial can be a success or a failure both. But remember Masud, trials are not reasons to give up or live with, but a challenge to improvement or rejects. Life at times are like a mountain. You know Masud? Mountains aren't easy to climb, but the view from the top is usually the best. I am not mountain or you but within our altitudes of attitudes, we both are like a mountain. A mountain never climbs another mountain, they stay side by side and never meet unless someone bridges them in between. May be your Dad is that bridge where we are both connected. I always consider and ponder to see as a fresh beginning for everthing. Why go on thinking about what had happened, or about what we did yesterday? Life is a river, flowing constantly onward. No drop of it will ever pass the same bridge twice. Now is your chance to do things in new ways, better than ever before. I am doing my best. We always look at our scars as ugly marks. But sometimes, let's try to consider it as a nice thing, as a symbol that something painful in the past had been healed. Do you understand what I meant all through Masud? To be more clear about what I want to mean is that always remember that two things we define our successful life, the way we manage when we have nothing and the way we behave when we have everything. I appreciate your dad when he managed everything well when he had nothing but its your or my turn to manage things well when we have everything ready-made.

Let me cut a joke at the end to flare a smile in your lips, eyes and motions.

There were two friends from Philippines and China. But the Philippines man never speaks Chinese and the Chinese man never speaks English or tagalong. But they were very good friends indeed. With their body language, they could express many feelings. At one time, the Chinese friend got sick and the Phil man went to see him. When the Phil man saw the Chinese friend, he found his condition was really bad with oxygen tube in his nose, many needles in his body and with life support. The Phil friend sat beside the Chinese friend when the Chinese friend was in hospital with such a disastrous condition of health. Suddenly the Chinese friend told him, “ “Li kay wang ki guan” and died. The Phil friend didn’t understand what the Chinese friend meant. So the Phil friend tried to find out actually what his best friend Chinese man wanted to mean. After many years, the Phil friend found another Chinese man and wanted to know what his BEST friend told him before he died. The new Chinese man translated that his friend told him, “Please you are seating on my oxygen tube and I cant breath, Remove yourself from the tube.”

So let we understand our minds and body languages of the family where we all are the BEST friends of everyone. I miss you Masud and I felt truly sad when you left Bangladesh. I am not your biological father but I know you are just like my son masud. My family thinks you are my next kin and you have lots of responsibilities to perform in absence of me and your dad. You are our boy no matter who loves you more but we love you more than anything and without any conditions Masud.

Keep always link and make two steps forward towards the bed where you had lots of memories you left that you will never remember because you were so small to remember those times.

Akhtar

প্রিয় মাসুদ এবং রিমুনা

এটা আমার জন্য খুব ই ভালো সময় ছিল যখন থেকে তোমরা অল্প সময়ের জন্য হলেও বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলে এবং আমাদের সাথে সময় কাটিয়েছো। মহান আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ যে তিনি তোমাদের মতো বাচ্চাদেরকে আমাদের পরিবারে ব্লেসিং হিসাবে দিয়েছেন। তোমার এই অল্প সময়ের সান্নিধ্য টা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের ছিলো। তবে, এই অল্প সময়ের ভ্রমনের উপর ভিত্তি করেই আজকে ...

(চলবে)

১০/০৫/২০১৩-এ জার্নী বাই কার  

“এ জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা“।

তাহলে আমার জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা লিখে ফেলি. এই মাত্র পাসপোর্ট অফিস ক্রস করলাম, খুব একটা জ্যাম মনে হচ্ছে না। রাস্তা ফাকা ফাকা মনে হচ্ছে। রাস্তা ফাকা ফাকা দেখলে আবার মাঝে মাঝে ভয় করে, এমন ফাকা ক্যান? হরতাল মরতাল নাই তো? অথবা সামনে কোন অঘটন>?ফৌজি মানুষ তো!! বেশি ভয় পাই। সাধারন পাবলিকের একটা ভুল ধারনা আছে, সবাই ফৌজকে খুব সাহসি মনে করলেও আসলে ফৌজ কিন্তু খুব ভিতু। এই গোপন রহস্যটা জানে খালি ফৌজ নিজে আর কেউ না। যাক, এখন একটু জ্যাম দেখতে পাচ্ছি, মনে শান্তি লাগলো, কোন হরতাল মরতাল নাই মনে হয়। গুড। অন্তত হরতালের থেকে জ্যাম ভাল। আমার পাশে একটা ছোট এক্স করলা গাড়ী দারিয়ে আছে। জ্যাম সবাইকে দারাতেই হবে। ভিতরে একটা অবুঝ এক দেড় বছরের বাচ্চা। একটু একটু দারাতে পারে মনে হয়। গারির বাইরে উকি ঝুকি দিচ্ছে।খুব সুন্দর তার আচরন। মনে হয় সব কিছুতেই তার চিত্তাকর্ষণ। কিছুই বুঝে না। আর কি যে বুঝতে চাচ্ছে তাও বুঝে না। ওর মা মাঝে মাঝে কোন কারন ছারাই একটা করে চুমু দিচ্ছে। ব্যাপারটা মজার। একটু হাত নাড়বো নাকি? বাহ, ভালই তো। হেসে দিল। একখান দাতও উঠে নাই। ছোট বাচ্চাদের দন্ত বিহিন হাসি খুব মজার কিন্তু বুড়াদের দন্ত বিহিন হাসি অন্য রকম। বাহ বাচ্চাটা আমার হাত নারাতে মনে হয় একটা খেলনা পেয়ে গেল, ও কিন্তু আমারে চিনে না। কিন্তু ভাবখানা এই রকম, আমি আরও অনেক দিনের চেনা। কেন যে আমরা বাচ্চাদের মত হই না। আহারে জ্যামটা কেটে গেল। একটানে চলে এলাম  র‍্যাংস। আমি প্রাইম মিনিস্টার অফিসের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাব কারন এই রেংসের ভিরটা অনেকক্ষন ধরে রাখে পুলিস। পুলিশ তো আর মানুষ না। ওরা বুঝে না কোনটা মানুষের গাড়ী আর কোনটা প্রাইম মিনিস্টারের গাড়ী। ওরা খালি বুঝে প্রাইম মিনিস্টারের পথ ক্লিয়ার রাখতে হবে সে যেই যাক। আমার সামনে একটা লেগুনা। প্রায় সবগুলো পুরুষ মানুষ, একজনকে দেখা যাচ্ছে মহিলা। বেচারির অনেক অসুবিধা হচ্ছে বলে আমার ধারনা, আর সব পুরুষ গুলো কিন্তু সবাই এখন মনে মনে নিজেকে রুমিও ভাবতাছে। এই মুহূর্তে কোন গারমেন্টের কর্মীকে রাস্তায় পাওয়া যাবে না। এটা তোমার ভুল।

তুমি সময় মত অফিস কর আর না কর, প্রাইম মিনিস্টার সময় মত অফিস করুক আর নাই করুক, ওরা সময় মত অফিসে যায়।পার হয়ে গেলাম সে বিখ্যাত রেংস। আমি এখন ফার্ম গেটের পুলিস ফারির সামনে। সমরেশ পুলিস আমার পাশে ডিউটি করছে ট্রাফিকের। চোখে একটা নকল রেবনের সানগ্লাস। এখন আমি আনন্দ সিনেমার বরাবর। আসতে আসতে গাড়ীর গতি থেমে গেল। সামনে অনেক হাইলাক্স, পাজেরো, নুহা গাড়ী। আমি এখন ঠিক তেজগাও সরকার বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে।ডানে একটা মিল্ক ভিটার জরুরি শিশু খাদ্য নিয়ে বিপাকে পরেছে মনে হয়। কারন ড্রাইভার ঘন ঘন বিরি ফুকছে। তার ঠিক পিছনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ী। নিশ্চয়ই চারিদিকে গন্ধ ছরাচ্ছে। আশপাশে লোক জনের নাকে ধরা দেখে মনে হয় তাই। অসুবিধা নাই, আমরা এই গন্ধে অভ্যস্ত। গন্ধের শহর ঢাকা শহর। ঢাকা শহরের অনেক বৈশিষ্ট আছে যেমন, গন্ধের শহর ঢাকা শহর, রিক্সার শহর ঢাকা শহর, জ্যামের শহর ঢাকা শহর, ইয়াবার শহর ঢাকা শহর। ১০০% স্বাধীনতার সহর ঢাকা শহর (এখানে যার যা খুশি করতে পারে, কোন আইন মানার দরকার নাই, বাম লেন বন্ধ করলে ট্রাফিক পুলিস ধরে না, উলটা পথ দিয়ে গাড়ী এলে কেউ কিছু বলে না ইত্যাদি)। ঢাকা শহরে অনেক ভবন আছে যারা এক কালে প্রাচ্যর সভ্যতার মত সভ্য কালচার গুলোর যেমন সাক্ষী আবার এই যুগে এসে আধুনিক আইন না মানা যুগেরও সাক্ষী। ভবনের ইটেরা কথা বলে না। তাই অনেক ইতিহাস আমাদের জানা হয় না। যেমন ধর, হোটেল সুপার স্টার (যার পাশে আমি এখন দারিয়ে আছি) ৫০ বছর আগে নিশ্চয়ই এখানে এই হোটেলটা ছিল না। হয়ত বা ডাহুকের পদচরন ছিল এখানে। সেই ডাহুকের হয়তা বা মৃত্যু হয়েছে আরও ৪০ বছর আগে, তার সন্তান সন্ততিরা ইচ্ছে করলেই আর তাদের দাদা নানা দেড় এই জায়গায় পুনর্মিলনের কোন সুযুগ নাই, কারন এখানে এখন কপোত কপোতীর মত জুগল মানব বসে সুপার স্টার হোটেলে সময় কাটাচ্ছে।কিংবা ধর, TK ভবন (যার পাশে এখন আমি দারিয়ে) এটা নিশ্চয়ই ১০০ বছর আগে ছিল না। অথবা আজ থেকে আরও ২০০ বছর পর এটা থাকবেও না। সময় শুধু বয়ে যায়, কি থাকবে আর কি থাকবে না, সময় শুধু বলে দেবে। সময়টা এমন এক অদ্ভুত জিনিস কোথায় যেন পরেছিলাম যে, এটা সবার সঙ্গে হাটে কিন্তু সে কারো বন্ধু নয়। সে কারো জন্য অপেক্ষা করে না, তুমি তার সঙ্গে যাবে কি যাবে না, তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সময়ের পিতার নাম সময়, মাতার নাম সময়, সন্তানের নাম ও সময়। এ এক অদ্ভুত পরিবার। তার কোন দিক জ্ঞ্যান নাই, তার কোন বংশ পরিচয় নাই, তার না আছে ক্লান্তি, না আছে অবসর, সে শুধু চলেই যায়, শুধু রেখে যায় কিছু ফুট প্রিন্ট। কেউ তার থেকে কিছু শিখে আবার কেউ এর তোয়াক্কাও করা না। যেমন এই মুহূর্তে আমি কিছু ফুট প্রিন্ট রেখে গেলাম।

আমি এহন হোটেল সোনারগাঁও। এর কত যে ইতিহাস আছে ভিতরে ভিতরে কে জানে। কত মানুষের আশা, হতাশা, সম্ভ্রম, কষ্ট, কত কিছুই না এর ভিতরে জমা হয়ে আছে কে জানে!! কারো কারো ইতিহাস এখান থেকে হয়ত রচনা হয়েছে আবার কারো কারো ইতিহাস এখানেই শেষ হয়ে গেছে। কেউ হয়ত এর পাশ দিয়ে যাবার সময় মুচকি মুচকি হাসে আবার কেউ হয়ত চোখের পানি ফেলে। কিন্তু এই ভবন যে নামেই ডাকা হোক, সাক্ষী সে রয়েই যাবে।আমি এখন প্রধান বিচাপতির বাস ভবনের সামনে । একে বাসভবন না বলে সরাইখানা বললেই যেন ভাল হত।কত বিচারপতি এখানে থেকেছেন, কত বিচারপতিগন আবার এখানে থাকবেন, তার কোন ইয়ত্তা নাই। এই সরাইখানা এমন জিনিস যখন যে আসে সবাই একে নিজের মনে করলে ও এটা তার নয়। তাকে একদিন না একদিন ছেরে যেতেই হবে। কেউ সেটিছফেক সন নিয়ে বের হয় আবার কেউ বের হয় নেক্কার জনক ভাবে। বিচার পতিদের কে নাকি আল্লাহ দুই বার বিচার করবে, আল্লাহ কি করবেন এটা অবশ্য বিচার পতিরা ভাবেন না। তারা ভাবেন, প্রাইম মিনিস্টার কি করবেন। মরার পর কি হবে এটা ভাবার জন্য এখনো কোন আইন করা হয় নাই বলেই হয়ত তারা এটা ভাবতে পারেন না।কবে যে এই আইন টা করা হবে যে মরার পর কি হবে। তাহলে মনে হয় কিছু কিছু আইন আর দরকার পরত না যেমন ঘুস খাওয়ার কারনে শাস্তি, র্যাপ করার কারনে শাস্তি, কারো হোক কেরে নেওয়ার জন্য শাস্তি ইত্যাদি। আচ্ছা আমি এই বিচারপতিদের নিয়ে কেন মন্তব্য করছি? আমি তো লিখছি ঢাকা কাহিনি তাও আবার এ জার্নি বায় কার ফ্রম মিরপুর তো পোস্তগোলা। বিচারপতিরা জানলে আবার কোর্ট অবমাননা করার কারনে আমার এই রাস্তাটা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।যাক বিচারপতিদের আবাস স্থল পার হয়ে এসেছি ভাই, এবার আমি কাকরাইল তব্লিক অফিস। বকসির প্রিয় জায়গা।

তবলিক করে বহু মানুষ উপকৃত হয়েছ নিজে নিজে। তবে শুনেছি এতে ব্যক্তিগত ভাবে উপকৃত হলেও অনেক পরিবার এতে উপকৃত হয় নাই। তারা কিভাবে চলবে, কিভাবে চলছে, এটা অনেকেই ভেবে দেখে না। কোন টা যে কার হক অনেকেই তার সঠিক মানে বুঝে না।যাক এটা আমার গবেষণার বিষয় নয় এখন। আমি চলছি ঢাকার রাস্তায়। আমি ঠিক বকসির অফিসের সামনে। কিন্তু ঘুরে আসার জন্য সাহস পাচ্ছি না । অনেক জ্যাম।

ইশা খা হোটেল। আমি তো ঢাকার রাস্তায় দোস্ত। আমি শুধু রাস্তার চারিপাশের বর্ণনা দিচ্ছি আর মাঝে মাঝে কমেন্ট করছি দোস্ত। এটা কি আঙ্গুল ঢোকানো বলে? তবে তাই হোক। রাজমনি সিনেমা হল, বাহ, বিশাল পোস্টার। “ভালবাসার তাজমহল”। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম, দেখলেই ভয় লাগে। এখানে নাকি সব বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে। আচ্ছা বেওয়ারিশ লাশ কি? যার কোন পরিচয় নাই সে? এই পৃথিবীতে কে এমন আছে যার কোন পরিচয় নাই? বাপ মা নাই? ভাই বোন নাই? কে যে কেমন করে কখন বেওয়ারিশ হয়ে যায় বা কেন হয়ে যায়, আমি বুঝতে পারি না।আমি জানি আমার পরিচয় আছে, আমার বাবা ছিল , আমার মা ছিল, আমার পরিবার আছে, আচ্ছা আমি কি কখনো বেওয়ারিশ হতে পারি? হয়তবা…… কারন আমি বেওয়ারিশের সংজ্ঞা এখনো বিঝি না।আচ্ছা কেউ কি এখন ভাইবারে নাই? খালি আমি ই কথা বলে যাচ্ছি!! আমার এখন অফুরন্ত সময়।

তুমি আজ হারিয়ে গেলে আমরা তোমারে খুজব, কিন্তু তুমিও কোন একদিন বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যেতে পার,। অথচ আমরা তোমারে খুজছি। তবে বেওয়ারিশ লাশ না থাকলে অনেক অসুবিধা হত। যেমন আমার মেয়ে ডাক্তারি পড়ে, তার একটা কঙ্কাল দরকার। কে দেবে এই কঙ্কাল? বেওয়ারিশ লাশ । কে জানে হয়তবা আমারই কোন এক জেনারেসন আমার কঙ্কাল নিয়েই হয়ত পরাশুনা করবে, সে জান্তেও পারবে না, কোন একদিন আমি ওদের পরিবারের একজন ছিলাম। আমার হাড়ের কোন এক অংশই হচ্ছে সে। মানুষ কখনো মানুষ, কখনো লাশ, আবার কখনো কঙ্কাল , কি আজব না?

আমি এখন প্রেসিডেন্টের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছি। পাশে নবনির্মিত হানিফ ফ্লাই অভার। অনেক পুলিশ পাহারায় থাকে প্রেসিডেন্ট সাহেবের জন্য। অনেক বড় জায়গা। আচ্ছা কবরের মাপ কি সবার জন্য সমান? তাহলে অনারা ওই ছোট্ট কবরে সখিনার সমান মাপের কবরে কেমন করে ঘুমাবেন? সখিনা, তোমার জন্য সুখবর আছে, তোমার কবরের মাপ আর আমাদের প্রেসিডেন্ট সাহেবের কবরের মাপ নাকি সমান। তখন তোমার উপর কেউও ন্যায্য কাজ করতে পারবে না। না বিচারপতিরা, না দেশের স্বাধীনতা, না সময় না কেউ। আমি এখন “দয়া গঞ্জের” মোড়।

কয়েকদিন আগে এখানে আগুন লেগেছিল, অনেকগুলো বস্তিবাসী মারা গিয়েছিল।পরেরদিন খবর হয়েছিল, “বস্তিতে আগুন লেগে ৫ বস্তিবাসি পুরে ছাই”। আমি ওদেরকে চিনি না। কিন্তু যেহেতু আমি প্রতিদিন এইখান দিয়ে যাই, কে জানে হয়তা বা আমি ওদের কোন একজনের সঙ্গে হয়তবা আমার দেখা হয়েছিল!! এই ইতিহাসটা আমার জানা নাই। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে এই স্থানটা পার হবার সময় আমার এই কথাট প্রায়ই মনে পড়ে। হয়তবা কোন একদিন আমিও আর এই স্থানটি দিয়ে আর কখনো আসব না। আমার এই গারিটিতে অন্য একজন বসবে, আমি আর এই রাস্তার উপর দিয়ে যাব না। আমার এই রাস্তার উপর দিয়ে যাওয়ার অধিকার হারিয়ে যাবে। আমার স্থান হবে এই রাস্তার মাটির নিচে। খুব কস্টের না? আর এভাবেই শেষ হয়ে যায় আমার “এ জার্নি বাই কার ফ্রম মিরপুর টু পোস্তগোলা”। নাহ বকসি ভাই, আমি শুধু আমার আজকের দিনের পার্থিব কিছু ফিলিংস এর কথা বললাম। এর মাঝে অনেক আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আছে, অনেক অবিচারের কোথা আছে, অনেক ন্যায্য তার কোথা আছে, অনেক হতাশার কথা আছে। কিন্তু এর প্রতিটি কথার অনেক বিশ্লেষণ আছে যা আমি এই মুহূর্তে করতে চাইনি বকসি ভাই। চলে এসেছি। আমার সেই পুরানো ফ্যাক্টরিতে। এখানে আমি বড় সাহেব। আমাকে হাসতে হয় মেপে মেপে, কথা বলতে হয় অনেক ভেবে চিনতে। আমি এখানে সাধিন নই কন্তু আমাকে কেউ কমান্ড করে না।

দেখা হবে পড়ে আবার। ভাল থেক সবাই।

১৩/০৪/২০১৩- প্রধান মন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

মীরপুর, গোলার টেক, পাল পাড়া রোড, ঢাকা-১২১৬ 

 প্রধান মন্ত্রী,

তুমি নিশ্চয়ই ভগবানের থেকে বড় না। আমি ভগবানকে তুমি করে বলি। আমি তোমাকেও তুমি করে বলতে পারি। তুমি খুব ভাগ্যবতি, কারন তুমি দেশের প্রধানমন্ত্রী । ভগবান তোমাকে সুস্হ করে বানিয়েছেন, তোমার কোন অঙ্গহানি নাই, তুমি সবল। তুমি কথা বলতে পার, তুমি প্রিথিবির রূপ দেখতে পার, তুমি সূর্য দেখতে পার, তুমি চাঁদ দেখতে পার, তুমি একা একা চলতে পার, তুমি হাযার হাযার মানুষের থেকেও ভাল আছ।  তুমি মেয়ে মানুষ অথচ তুমি অনেক ছেলেদের থেকেও পাওয়ারফুল। তুমি এতিম কিন্তু তুমি এতিমের মত না, তোমাকে মানুষ সম্মান করে, তুমি এদেশের সবচে সিনিওর। ভাবত একবার প্রধানমন্ত্রী! অথচ তুমি অনেক মানুষের সপ্ন বাস্তব দিতে পারছ না।  কেন? তুমি কি চোর? তুমি আমাকে বল তুমি যদি চোর না হও তবে কেন তুমি চোর পাল? কি তোমার ভয়? তুমি হ্মমতা হারাবে? নাহ। তুমি হ্মমতা হারাবে না। এদেশের মানুষ অনেক চালাক, তারা  বুঝতে পারে কি হচ্ছে  কোথায়। তোমাকে আমি মাঝে মাঝে বুদ্ধিমতি বলে মনে করি কিন্তু অনেক সময় তুমি বুদ্ধিমানের মত কাজ কর না। কি তোমার সমস্যা? বলনা  দেশবাসিকে? ওরা তোমাকে ভালবাশে, তুমি কি এটা জান? তুমি কেন হিটলার হতে পার না? তুমি কেন স্তালিন হতে পার না? তুমি কেন আরেকটা মুজিব হতে পারনা? মুজিব তো বলেছিল, আমার কম্বল কই? তুমি কি সে কোথা ভুলে গেছ? মুজিব তো বুলেটের সামনে এসে বলেছিল, কিরে তোরা কি চাস? আহ কি দারুন কথা। তুমি কি তার মেয়ে নও? তুমি বল না আমাদেরকে যে, তোমার পরনে কাপড় নাই, আমরা আমাদের কাপড় তোমাকে দিয়ে দেব, তুমি বলনা, তোমার ঘরে খাবার নাই, আমি  তোমাকে বলছি, আমি খাব না, আমার খাবার আমি তোমাকে দিয়ে দেব। সুধু দেশটাকে বাচাও প্রধানমন্ত্রী । তুমি সমুদ্র জয় করেছ, এর জন্য তোমাকে আমরা পুজা করব, এর জন্য তোমাকে অনুস্টান করে মালা নেবার দরকার নাই। তুমি এত বোকা কেন? তুমি প্যাপার পরনা? তুমি দেখ না যুবক সমাজ কি বলছে? সময় পাল্টে যাচ্ছে, চোখকান খোলা রাখ প্লিয। আমার জীবনে আমি কখন ভোট দেই নাই, এবার প্রথম আমি সুধু তোমার জন্য ভোট দিয়েছি। আমি কি ভুল করেছি ? আমি জানি, আমাদের ভালবাসা তোমার আয়ুস্কাল নির্ভর করে না, কিন্তু  তোমার ভালবাসায় আমদের আয়ুস্কাল নির্ভর করে । তুমি কি ভাল আছ?  তুমি ভাল নাই। কেন তুমি এমন কিছু লোক নাওনা যারা দেশের ভাল করবে, হোক না তারা তোমার শত্রু, কিন্তু তারা যদি দেশটাকে ভালবাসে, নাও  না ওদের। তুমি কেন নেলসন মেনডেলার মত একটা ইতিহাশ তৈরি করনা? তুমি ইতিহাশ হয়ে যাও। তোমার পথ ধরে তোমার সন্তানরা আসবে, তোমার পথ ধরে আমরা আসব, কেন, কেন তুমি পারনা? 

তুমি অগ্নিকন্যা কিন্তু তোমার অগ্নি মানুষকে পোড়ায় না। তাহলে তুমি কেমন আগ্নিকন্যা? আমি রাজনীতি করি না কিন্তু আমি রাজনীতির সব খবর রাখি, আমার ব্যথা লাগে, আমার কষ্ট হয়, তুমি দেখনা প্রধানমন্ত্রী, তুমি পারবে না? তুমি পারবে। তুমি আমাকে খুজনা, আমি রাজনিতিকে ভয় পাই, আমি সুধু চাই আমি অনেক লোকের ভার নিতে চাই না। ওরা তোমাকে চায়, অথচ আমরা তোমার হয়ে কাজ করছি। আমরা তোমাকেও কষ্ট দিতে চাই না। তুমি অনেক ব্যস্ত। সধু তুমি সৎ থাক। এ দেশের মানুষগুলো ভাল, ওরা বাচতে চায়, ওরা তোমার কাছ থেকে টাকা চায় না, ওরা তোমার কাছ থেকে করুনা চায় না, ওরা চায়, ওদের কাজে বাধা দিও না, হরতাল, অবরোধ, ওরা ভয় পায়, তুমি জান এটা? আমি বিরোধী দলকেও ভয় পাই। ওরা আরও অনেক কঠিন কাজ করতে পারে। কিন্তু ওরা কি আমাদের ভালবাসে না? ওরা কার জন্য রাজনীতি করে? যদি রাজনিতি হয়ে থাকে আমাদের জন্য তবে আমদের কথা শোন। আমি অনেক দেশ ঘুরেছি, দেখেছি, নেতা অনেক বড় জিনিস। আমি তোমাদেরকে নেতা মানতে চাই। কে জয়, কে তারেক, এতে আমার কোন  দুঃখ নাই, আমি সুধু চাই, শান্তি আর উন্নতি। তোমারা দুইজন এক সংগে বসনা প্লিয। দেখেবে দেশটা ভাল হয়ে যাবে। এ কাজটা তোমার। ওরা বসবে না, তুমি ওদের বস্তে বাধ্য করবে। না বসলে ওদের লাভ, বসলে তোমার লাভ। 

   

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তুমি কি বোঝতে পারছ দেশের মানুষের কথা? এ দেশের ৫৫% শতাংস লোক তোমাকে ভোট দেয় নাই, কিন্তু তুমি এখন তাদের ও প্রধানমন্ত্রী। তুমি এখন আর তোমার পার্টির কেও নও। তুমি এখন জনগনের সম্পদ। তোমার শরীর খারাপ হলে দেশের প্রত্যেকে জানবে, বিশ্ব জানবে। তুমি কি এটা বুঝ? তাহলে দেশের লোকের শরীর খারাপ হলে, তাদের মন খারাপ হলে, তুমি জানবে না কেন? মানুষ এখন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। ঘরে নিরাপত্তা নাই, রাস্তায় নিরাপত্তা নাই, অফিসে নিরাপত্তা নাই। যে কোন লোক যখন তখন কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। ওরা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী? তুমি কি কিছু জান? আর না জানলে কেন জানার চেষ্টা করছ না? আর জানলে কেন একসান নিচ্ছ না? কি হল তোমার? সাগর-রুমি মরে গেল, ইলিয়স মিয়া লাপাত্তা, বাসে বাসে রাজনিতির লাশ, বিশ্বজিত সবার সামনে কিভাবে খুন হয়ে গেল, হাজার হাজার কোটি টাঁকা মানুষ লোটপাঁট করে ফেলছে, সবাই তোমার ছাত্রলীগের নামে কলংক দিচ্ছে। তুমি কি পেপার পর না? তুমি কি কিছুই বুঝতেছ না? তুমি আমলাদের, মন্ত্রীদের কথা বলার লাগাম টেনে ধর, ওরা যা তা বলে। মানুষ বিরক্ত হয়। মাঝে মাঝে তুমি ও কথার বেলেন্স হারিয়ে ফেল। আরও সাবধান হওয়া দরকার। সামনে তো তোমার বিরাট পরিক্ষা!! এ দেশের মানুষ বড় বিচিত্র। এরা সময় মত ছুরি মারে। আর একবার ঠিক মত ছুরি মারতে পারলে উঠতে সময় লাগে। তুমি কি ভুলে গেছ যে, ২১ বছর লেগেছিল তোমার উঠতে, এবার কিন্তু আরও বেশি সময় লাগতে পারে। কারন যুবক সমাজ যুদ্ধ দেখেনি, মুজিবকে দেখেনি, এদের মায়া মহব্বত কম। বাপমাকেই এরা জবাব দেয় আর তুমি তো প্রধানমন্ত্রী।   

১৬/০২/২০১৩- রাজপুত্রের “প্রজন্ম চত্বর”

গোলার টেক, পাল পাড়া রোড,  মীরপুর–১২১৬

আমি খুব ভয়ে আছি এই কয়েকদিন যাবত। আর এই ভয়টা জাগিয়ে তুলেছে শাহ্‌বাগের “প্রজন্ম চত্বর”।  কি সুন্দর নাম “প্রজন্ম চত্বর”।

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই বীরবাঙ্গালী জাতী যতবার আন্দোলন করেছে, যতবার ঘর থেকে রাস্তায় নেমেছে, সবসময় সুফল নিয়েই ঘরে ফিরেছে বারবার। আর এই জন্য আমরা একটা স্বাধীন ভাষা পেয়েছি, একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, স্বাধীনতা পেয়েছি। বিশ্বময় আমরা মাথা উচু করে বলতে পারি, আমি বাংলাদেশের ছেলে। আমার দেশের রাজধানীর নাম ঢাকা। কিন্তু ১৯৭১ সলের পর থেকে যতবারই যে কোন আন্দোলন হয়েছে, কোন না কোন ভাবে সেটা কোন না কোন ব্যক্তি বা দলের দখলে চলে গেছে এবং সেটা আবার ছিনিয়ে আনতে নতুন করে আন্দোলন করতে হয়েছে।

১৯৭১ থেকে ২০০০ এর পর যতসব ঘটনা সবার চেহারা এক। আশা ভাঙতে ভাঙতে এখন আর আশাহত হইনা, আশাহীন হয়ে পরেছি। সবসময় ভেবেছি, মিশর বদলিয়ে দিল একদল তরুন, ৪২ বছরের ইতিহাস এক বছরে পাল্টে গেল, লিবিয়া স্বৈরশাসক মুক্ত হয়ে গেল কয়েক দিনের মধ্যে। সিরিয়া, তিউনেসিয়া, আরও অনেক দেশ এখন পাইপ লাইনে চলে এসেছে, সেখানে গনতন্ত্র ছাড়া আর অন্য কোনভিত্তিক শাসন দিয়ে সারা দেশ চালানো সম্ভব নয়। বিশ্ব এখন শুধু হাওয়া বইছে পজিটিভ পরিবর্তনের। অথচ আমরা শুধু “খবর” হয়েছি সারা বিশ্বে হয় বন্যা, না হয় দুর্নীতি, না হয় ক্রসফায়ার, না হয় আভ্যন্তরিন রাজনীতির হিংসাত্তক কর্মকাণ্ডের কারনে। যদিও নোবেল বিজয়ের মত ঘটনাও এ দেশে ঘটেছে, বিজ্ঞান বিষয়ক নতুন উদ্ভাবনী হয়েছে, গারমেন্টস শিল্প  অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু একই সময় আবার এক পদ্মা সেতু সব অর্জন যেন এক নিমিষে সারা পৃথিবীতে আমাদেরকে আরও এক ধাপ পিছিয়ে দিয়ে গেছে। পিছিয়ে দিয়ে গেছে দেশের উন্নতির একটা ধারাবাহিক স্বপ্নের, পিছিয়ে দিয়ে গেছে সারা  বিশ্বের কাছে আমাদের মাথা উচু করে দাঁড়াবার প্লাটফর্মটা। এটা শুধু একটা লোণ নয়, এটা একটা কলঙ্ক জনক ঘটনা। এটা একটা দেশের চরিত্র, এটা একটা দুঃস্বপ্ন। এই স্বপ্ন ভঙ্গের ব্যথায় কেউ সোচ্চার হলনা, অথচ আমি জানি এটা নিয়ে দেশের ১ম মানুষ থেকে শুরু করে আপামর সব চেয়ে ছোট মানুষটারও বুকে কস্ট আছে। আমি জানি না কেন এমন হল, আমি জানি না কি করলে কি হত। আমার জানা নাই এখানে কার কতটা দোষ বা কার কতটা গাফিলতি। শুধুজানি, স্বপ্নটা সার্থক হতে আরও অনেক সময় পেরিয়ে যাবে। উদ্ধারকারী খুব কাছে কেউ নেই আমাদের।

ঘর থেকে বের হই খুব ভয়ে ভয়ে। এ ঘরে আবার ফিরে আসা হবে তো? নাকি পথে কোন কারন ছাড়া আমি হয়ে যাব লাশ বা বিশ্বসন্ত্রাসী? উচিত কথা বলবার আমার সাহস নাই, এটা আমার দুর্বলতা নয়, এটা আমার একাকিত্তের ফসল। আমি যেন একা। আমার মত সবাই যেন একা। সবাই যেন কোন এক উদ্ধারকারীর অপেক্ষায় আছে, কবে আসবে সেই বীরপুরুষ? আর কেই বা সেই বীর পুরুষ? চারিদিকে নৈরাজ্য, মারামারি, দুর্নীতি, চাপাবাজি, অবিশ্বাস, চারিদিকে হাহাকার, এখানে একটা লাশ এক ভাগ পুঁটি মাছের দামের থেকেও কম, এখানে একটা যুবতির সম্ভ্রম শকুনের ভাগাভাগি করে খাওয়া গলিত শিয়ালের লাশের থেকেও কম গুরুত্তপূর্ণ।

এমন একটা কঠিন সময়ের মধ্যে হটাত করে শাহ্‌বাগের “প্রজন্ম চত্বর” যেন গহিন সমুদ্রের মধ্যে একছটা আলোর মত মনে হয়। আমার মন আবেগে ভরে উঠে। আশায় ভরে উঠে। দেশের আনাচে কানাচে ভিয়েনামের যুদ্ধের মত সব যৌবন আজ জেগেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের মত সব যৌবন আজ টগবগ করে ফুটছে, এখানে ভোর, সকাল, দুপুর, রাত যেন এক হয়ে গেছে। সময় থেমে গেছে। এখানে আজ ৯০ বছরের থুরথুরে বুড়িও যেন আর বুড়ি নয়, এখানে সব দাত পরে যাওয়া ১০০ বছরের দৃষ্টিহীন বুড়ো যেন তোমাদের স্পর্শে ২৫-৩০ বছরের যুবক বনে গেছে। আমি এখন রাস্তায় বেরোলে আমি জানি তোমরা পাহারায় আছ, আমি জানি তোমাদের সামনে কোন বাধায়ই বাধা নয়। কে আছে আমাকে এখন কটু কথা বলবে? কার এমন দুঃসাহস আছে আমাকে ভয় দেখাবে? আমার পাশে তো “প্রজন্ম চত্বর” আছে। তোমরা তো এখন আমার ক্যাপ্টেন। তোমরাই কি সেই বীর পুরুষ নও? মিশরের মত? লিবিয়ার মত? চেগুভার এর মত? নাকি আবারো হতাশায় ভোগাবে? কোনো উদ্আদেশ্মিয নিয়ে এই প্রজন্ম চত্তর নামে সবার হৃদয়ে আবার শুল চালাবে না তো?

আর কাঁদতে চাই না, আমাকে আর আশাহত কর না, আমি বিশ্বাস করতে চাই, ওই আলো আমাদের, ওখানে কোন আর হায়েনারা নাই, দল নাই, ব্যক্তি নাই, তোমরা জেগে থাক একটা একটা সপ্ন নিয়ে, তোমাদের আর ঘুমিয়ে থাকার অবকাশ নেই। তোমরা কি সেই আলো?  তোমরা কি সেই উদ্ধারকারী? হয়ত বা তাই, আমি তাই বিশ্বাস করতে চাই।  এখন আমাকে তোমরা প্রশ্ন করতে পার, তাহলে আমি ভয় পাই কেন? আমি ভয় পাই এই ভেবে যে, যে আলো তোমরা দেখাচ্ছ, সে আলো কি তোমরা ধরে আছ কিনা, যে আলোর তাপ তোমরা বিকিরন করছ, সে আলোর মিছিল একান্তই আমাদের কিনা। আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমার মাথা আঁচড়ানোর সময় নাই, আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমার গায়ে ঘামের গন্ধ, আমার ভাল লাগে যখন দেখি তোমরা যা অ-গ্রহনযোগ্য তা নিমিষে বর্জন করতে পার এবং সত্যিটাকে আগলে রাখ। কিন্তু ভয় লাগে যখন দেখি দেশি-বিদেশি বর্ণচোরা হায়েনারা তোমাদের পাশে ঘুরঘুর করে সুযোগ খুজছে, আমার ভয় করে যখন দেখি তোমার মাথার চুল আর এবড়ো থেবড়ো নয়, বেকব্রাশ করা পরিপাটি চুল, আমার ভয় করে যখন দেখি তোমার ঘর্মাক্ত সার্ট  আর ঘামে ভিজে নেই, অনেক অসাধু সুযোগ সুন্ধানী হায়েনাদের মত ইস্ত্রি করা। আমি তোমাদের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে চাই, তোমাদের অনেক কাজ। একটা একটা করে করতে হবে, এখানে আশা ভঙ্গ করা মানে, শেষ তলয়ার শেষ হয়ে যাওয়া। তোমরা কি শুনতে পাও ঐ স্বামীহারা স্ত্রীর কান্না যে একা একা গত ৪০ বছর ধরে পরাধীনের মত গ্লানি টেনেছে?  তোমরা কি শুনতে পাও ঐ স্বামীহারা স্ত্রীর স্বামীহীন অসহায় জীবনের একাকীত্ব? তোমারা কি শুনতে পাও কত বিরঙ্গনার আর্তনাদ যারা তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে মরনের আগে শুধু তার সতিত্তের বিচার পাওয়ার জন্য? এরা কেউ তোমার মা, কেউ তোমার বোন, কেউ তোমার মেয়ে। ওরা কারো কাছেই কোন বিচার পাবে বলে আর আশা করে না। আর যারা ঐ ৩০ লাখ তরুন মানুষ তোমাদের ভবিষ্যৎ সুখের জন্য তাদের যৌবন ত্যাগ করেছে, বর্তমান ত্যাগ করেছে, তাদের জন্য কি সুসংবাদ দিবে তোমরা? তোমরা শুধু একটা কাজ করে যাও, তোমরা তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর বাংলাদেশ রেখে যাও যা তোমাদের পুর্বসূরিরা তাদের জীবন ত্যাগ করে তোমাদের জন্য করে গেছেন। 

আমি ৭১ দেখেছি কিন্তু ৭১ কি আমি তখন কিছুই বুঝিনি। আমি দেখেছি আমার মা শুধু রাত জেগে বসে থাকতেন কখন আমার বাবা চুপে চুপে রাতের আধারে মার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, দিন পার হয়ে গেছে, মাস পার হয়ে গেছে, বাবা আর ফিরে আসেন নি। আমার ভাই কতই বা বয়স তার, ১৯ কি ২০ ! কি অদম্য সাহসের সাথে কোন এক রাতে মাকে না বলেই চলে গেলেন ৭১ এর যুদ্ধে। কি হয়েছিল তার? দেশ তো স্বাধীন হয়েছে, কই আমার ভাই কি আর ফিরে আসবে না? হয়ত বাবা আর আমার ভাই এখন এক সঙ্গেই আছেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমার বাবা কি আমাকে মিস করে? আমার ভাই কি আমাকে মিস করে? আমি তাদের খুব মিস করি। আমার মা আমাকে প্রতিদিন হাতির গল্প, ভুতের গল্প, রাজা রানীর গল্প শুনাতেন। ৭১ এর পর আমার মাকে আর কখন কোন দিন আর হাতির গল্প, ভুতের গল্প বলতে শুনিনি। আমার মাকে গল্প বলতে বল্লে শুধু একটা গল্পই বলতেন, “এক ছিল এক রাজা, রাজার ছিল রানী। রাজা-রানির ছিল এক রাজপুত্র। এক দিন রাজা যুদ্ধে মারা গেলেন, রানীও কয়েক বছর পর মারা গেলেন রাজার শোকে। বেঁচে রইল রাজপুত্র”। মা এখনেই গল্পটা শেষ করে দিতেন। আমি বলতাম, তারপর কি হল মা? মা বলতেন, “রাজপুত্র বড় হবে, সেও যুদ্ধ করবে রাজার মত কারন রাজার রক্ত যে রাজপুত্র বহন করে”। আমি বলতাম, কোথায় মা সেই রাজপুত্র? মা কিছুই বলতেন না। আমি আজ তার উত্তরটা জানি। সে এখন “প্রজন্ম চত্বরে”।  

আবার আমার শতভাগ ভুল হলেও হতে পারে। হতেও পারে, যা দেখছি, পুরুটাই ভুল। 

বাঙালি বড় অসহায়।