১৫/৫/২০১৯-২০ বছর আগের কিছু স্মৃতি…পর্ব-৩

আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগের কিছু দূর্লভ মূহুর্ত যা এখন অনেক অংশে ইতিহাস। এই ছবিগুলির মধ্যে অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন (আল্লাহ তাদের বেহেস্তবাসী করুন), কেউ কেউ বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন, যারা সেই সময় ছোট পুতুলের মতো পুতুল নিয়ে খেলা করেছে, তারা অনেকেই আজ সমাজে কেউ ডাক্তার, কেউ বড় বড় মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীতে কর্মরত, মেয়েদের মধ্যে অনেকেই মা হয়ে গেছে। ছেলেরাও আজ মাশ আল্লাহ খুব ভালো আছে। এইসব বাচ্চা গুলি, কিংবা বড়রা আমার অনেক কাছে মানুষ, এদের আগমন সব সময়ই আমাকে আনন্দিত করেছে। কিছুটা অবসর সময় ছিলো, তাই আগের দিনের কিছু ভিডিও আর স্থীর চিত্র নিয়ে বসেছিলাম। অতীত সামনে চলে আসে, নস্টালজিক হয়ে যাই। হয়ত কোনো একদিন, আমিও এই ভাবে ইতিহাস হয়ে যাবো, কিছুটা সময় কাছের মানুষেরা মনে রাখবে, এক সময় আমার জন্য এই পৃথিবী শেষ। গুটিকতক মনিষী ছাড়া বেশীর ভাগ মানুষেরাই অজানা ইতিহাসে মিশে গিয়ে বিলীন হয়ে যায়।

এটাই পৃথিবীর বাস্তব নিয়ম।

                         

১৩/৫/২০২২- রকি কাহিনী

আমাদের বাসায় কুকুর পালন কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু গত কয়েকমাস আগে হটাত করে কোথা থেকে এক লোকাল কুকুর আমাদের বাসার সামনে এসে হাজির। সারাদিন বাসার সামনেই থাকে, পারলে গ্যারেজের মধ্যে নিজে থেকেই যেনো সেলফ ডিক্লেয়ারড পাহারায় থাকছে। তাঁকে নরম্যাল খাবার দিলে ছুয়েও দেখে না। কয়েকদিন চেষ্টা করেছি, ভাত, রুটি, কিংবা এই জাতীয় জিনিষ খেতে দিতে কিন্তু তার এমন একটা ভাব যেনো, ধুর!! কি দিছো এগুলি?

তারপর মাংস দিয়ে লবন দিয়ে মেখে একটা পরিষ্কার পাত্রে সাথে এক বাটি পানি দিলে উনি ধীরে ধীরে খেতে আসেন। তাও আবার পুরুটা তিনি খান না। একটু পেট ভরে গেলেই বাকী খাবারটা তিনি রেখে অন্যখানে গিয়ে পেট টানটান করে শুয়ে পড়েন। অনেক গবেষনা করছি এটা কোথা থেকে এলো, আর উদ্দেশ্যটা কি? আগেই বা কই ছিলো? শুনলাম পাশেই নাকি কোনো এক বাসায় থাকতো, ওখান থেকে তিনি রাগ করে এই যে এসেছে, ওদিকে সে আর ভুলেও যায় না।

এই কুকুরের আচরনে ইদানিং দেখি আমার বউ ওনার জন্যই শুধু মাংশ পাক করে। নাম রেখেছে আবার 'রকি'। রকি বলে ডাক দিলেও আবার ফিরে তাকায়। আমার ডাক্তার মেয়ে আবার ওর জন্য মাঝে মাঝে খাবারও কিনে নিয়ে আসে। আর আমিও বাদ যাই নি। কয়েকদিন নিউ মার্কেটের "৬৫ টাকায় বিরিয়ানীর দোকান" থেকে বিরিয়ানিও কিনে এনেছিলাম। ফলে আমি যখন বাসায় গিয়া হাজির হই, ব্যাপারটা এখন এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে, গাড়ি থেকে নামলেই একেবারে পায়ের কাছে ঘুর ঘুর করে আর যেনো বলতে থাকে- 'আমার বিরিয়ানির প্যাকেট কই?'

তো গতকাল অনেক বৃষ্টি ছিলো। রকি সারাদিন গ্যারেজেই চার পা চার দিকে ছড়াইয়া নাক ডেকে মনে হয় ঘুমাচ্ছিলো। আমি বাসায় যাওয়ার পর, সে কোনো চোখ না খুলেই খালি লেজ নাড়ছিলো। ধমক দিলাম বটে কিন্তু তিনি এক চোখ খুলে দেখলো আমাকে আর লেজটা আরো একটু বেশী করে নাড়াইলো। ভাবখানা এই রকম, আরে বস, ডিস্টার্ব করো না।

গার্ডকে দিয়ে ওনার জন্য মুরগীর তরকারী আর এক প্লেট ভাত এনে খাওয়ানোর পর দেখি হটাত তার এই শারীরিক কসরত।

7/5/2022-ফেসবুকে মিটুলের লেখা ৭ ই মে

আজ ৭মে আমার ও আখতারের জীবনের একটি বিশেষ দিন।বিবাহ বার্ষিকী নয়। তার চেয়েও অনেক মূল্যবান একটি দিন। আমাদের লাভ ডে আজ।লিখতে চেয়েছিলাম না। কিন্তু না লিখে পারলাম না। কেননা আমি আজ সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি বন্ধুদের সাথে। মনে কিন্তু ঠিকই আছে!! এ কি ভোলার মত বিষয় আপনারাই বলেন!!

আমি অনেক ভালো আছি তাঁর সাথে, বর্ণনা করে বোঝাতে পারবো না।আমিও চেষ্টা করি আমার মানুষটিকে ভালো রাখবার। আসলে আমরা একে অপরকে রেসপেক্ট করি ও বোঝার চেষ্টা করি, যা মনের সুখের খোরাক জোগায় এবং খুবই দরকার। তবে আমার চেয়ে আখতারই বেশি মূল্যায়ন করে আমাকে। আমার আনন্দ গুলো যেমন অন্তর দিয়ে উপভোগ করে, তেমনি আমার মন খারাপ বা কষ্ট কোনটাই তাঁর যেন ভালো লাগে না।অনেক স্বাধীনভাবে জীবন যাপণ করছি। তাই বলে আমি কখনও অবিশ্বাসের কোন কিছু করেছি বলে মনে পড়ছে না।আমাকে সব রকম পরামর্শ দেয় সব সময়, সেটা আর্থিক বা বৈষয়িক যে কোন বিষয়ে। আমার সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গাটি আখতার।আলহামদুলিল্লাহ। আজ এই দূরে বসে সিলেটের লালা খালে তোলা বেশ কিছু ছবি আখতারের জন্য পোস্ট দিলাম।আজকের এই আনন্দগুলোও তাঁর জন্য পেয়েছি।বান্ধবীরা সিলেট যাচ্ছে বলতেই তিনি বলে বসলো-তুমিও যাও!!! অনেক বড় মনের মানুষ আখতার।মহান আল্লাহ ওকে সুস্থ শরীরে মান সম্মানের সাথে দীর্ঘজীবি করুন এবং জানমালের নিরাপত্তা দিন সে দোয়া করি। সবাই আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন প্লিজ প্লিজ।

০২/০৫/২০২২-আজ রোজার শেষ দিন, কাল ঈদ

আজ এ বছরের রমজান মোবারক শেষ হয়ে যাবে। বয়স বাড়ছে, আর জীবনের উপর ভয়ও বাড়ছে, বাড়ছে দুসচিন্তা, কমছে শরীরের শক্তি, তার সাথে কমে যাচ্ছে নিজের উপর কনফিডেন্স। যেভাবেই হোক আর যখনই হোক, একটা সময় তো আসবেই যেদিন আমি আর থাকবো না। খুব মন খারাপ হয় যখন এটা ভাবি, অন্যের জন্য কতটা মন খারাপ হয় সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু নিজের উপরেই বেশী মন খারাপ হয় যে, ইশ, এতো সুন্দর একটা দুনিয়া ছেড়ে শেষ অবধি আমাকে চলেই যেতে হবে এমন একটা গন্তব্যে যার আমি কিছুই জানি না, দেখি নাই, এবং পুরুই খালী হাতে!! আর সবচেয়ে মন খারাপের দিকটা হচ্ছে- কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি আর আমার এই পুরানো স্থানে একটি মুহুর্তের জন্য ও ফিরে আসতে পারবো না, কোনো কিছুই আর আমি কারো কাছে দাবীও করতে পারবো না, এমন কি আমার তৈরী করা অট্টালিকা, আমার রেখে যাওয়া ব্যাংক ব্যালেন্স, আমার নিজের সব কিছুর কিছুই না। যখন জীবিত ছিলাম, তখন এগুলির সত্তাধীকারী আমি ছিলাম, কিন্তু যে মুহুর্তে আমি চলে যাবো, এর কোন কিছুই আর আমারটাই আমার না। এমন একটা জীবন ঈশ্বর আমাকে কেন দিলেন? শুধু কি পরীক্ষার জন্যই? আমি তো তার এই পরীক্ষায় কোনোদিনই পাশ করতে পারবো না যদি তিনি সঠিক নিয়য়ে আমার দলিল পত্র দেখতে থাকে। যদি পুরুই হয় আমার পাশের নাম্বার তার অনুগ্রহের উপর, তাহলে তিনি আমাকে আরো লম্বা, আরো লম্বা, তার থেকেও লম্বা একটা জীবন দিলেন না কেনো?

কি জানি? হয়তো এই জীবনের পরে আরেক যে জীবন আমার ঈশ্বর বরাদ্ধ রেখেছেন, সেটা হয়তো আরেক অধ্যায় যা আমাদের কারোই জানা নাই। পরীক্ষার তো অনেক গুলি ধাপ থাকে। হয়তো এই জীবনের শেষ যেই মৃত্যু দিয়ে, হতে পারে সেখান থেকে আরো একটা ধাপ শুরু। কেউ তো আর এ যাবত সেই ধাপ থেকে ফিরে এসে বলে নাই, তার কার্যপ্রনালী কি, কি সেই ধাপের নমুনা।

যাই হোক, যেটা বলছিলাম, খুব সুস্থ্য ভাবে ৩০ টি রোজা করার শক্তি আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। আমি প্রতিবছর নিজের বাসায় দুইটা হাফেজ কে দিয়ে কোরান খতম তারাবি করি। কিন্তু গত দুই বছর করোনার কারনে সেটা পালন করা যায় নাই। আমি করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার স্ত্রী মিটুল তাতে বাধ সেধেছিলো ভয়ে। এবার আর কোনো কথা শুনতে চাইনি। হাফেজ ইসমাইল এবং হাফেজ মেহেদী নামে দুইটি বাচ্চা ছেলে আমাদের তারাবী লীড করেছিলো। ২০ রোজায় আমরা পুরু কোরান খতম করেছি (আলহামদুলিল্লাহ)

দোয়া কবুলের নমুনাঃ

আমার মাথায় আছে, আল্লাহ বলেছিলেন, আমি প্রতিদিন আমার রোজদার বান্দার ইফতারীর সমত যে কোনো ২ টি পজিটিভ ইচ্ছা বা দোয়া কবুল করতে প্রতিশ্রুত বদ্ধ। আমি এটা সব সময় মনে প্রানে বিশ্বাস করি এবং রোজার প্রথম দিন থেকেই আমি মোট ৬০ টি চাওয়া লিখে নেই। আমি জানি আমার জীবনে এই রকম ৬০ টি চাওয়া আসলে নাই। দেখা যায়, হয়তো ঘুরে ফিরে গোটা ১০ টি চাওয়াই থাকে। এ যাবত আমি আমার রবের কাছে কি কি চেয়েছিলাম, সেটা আর এখন বলছি না। তবে আমি স্পষ্ট দেখেছি, আমার প্রায় সব গুলি ইচ্ছা আল্লাহ পুরুন করেছেন। তিনি আমাকে চাকুরীর পর ব্যবসা করতে দিয়েছেন, কারো কাছেই আমার হাত পাততে হয় নাই, আমার সন্তানদেরকে তিনি সুস্থ্য রেখেছেন, মানুষের কাছে তিনি আমাকে সম্মানের সহিত রেখেছেন। অনেক কিছু করেছে আমার রব।  

গত বছর আমি খুব মনে প্রানে প্রায় প্রতিটি রোজায় আল্লাহর কাছে এই দোয়াটি করেছিলাম যেনো আমাকে তিনি ঋণ গ্রস্থ জীবন থেকে উদ্ধার করেন। কারন আমি আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজে জন্য বেশ কিছু লোনে জর্জ্রীত হয়ে গিয়েছিলাম। এই বছরে রোজার আগেই আল্লাহ আমাকে সম্পুর্ন লোন থেকে মুক্ত করেছে। এবারই প্রথম আমি লোন মুক্ত জীবনে পা দিয়ে একটা বড় সঞ্চয়ের পথে আছি। আমার ছোট মেয়েকে আমি আগামী ২ বছরের অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছি আমেরিকায় পরার জন্য। বড় মেয়ের জন্যেও একটা সঞ্চয় আমি করতে পেরেছি। আমার নিজের জন্যেও করতে পেরেছি। এর থেকে আর কত সুখী রাখবেন আমার রব আমাকে? আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।

এবার রোজায় আমি শুধু আমার মৃত আত্তীয় স্বজনের জন্য, আমার মেয়েদের জন্য, আমার স্ত্রীদের জন্য, আর আমার ব্যবসার জন্য প্রতিদিন দোয়া করেছি। আর আমি মনে প্রানে চেয়েছি যে, আমি যেনো সম্পুর্ন হোম ওয়ার্ক করে তারপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। আমি আমার সেই হোম ওয়ার্কের মধ্যেই এখন আছি। আমি সেই হোম ওয়ার্কের সময়কাল ধরেছি আরো ৬ বছর। ৬৩ বছর আয়ুষ্কাল পর্যন্ত যেহেতু আমাদের নবী ৬৩ বছরের বেশী বেচে ছিলেন না, তাই আমিও ধরে নিয়েছি আমারো ৬৩ বছরের বেশী বেচে থাকার ইচ্ছা করা উচিত না।

গত ঈদে আমার ছোট মেয়ে আমাদের সাথে ছিলো, এবার সে আমাদের সাথে নাই। সে এখন আমেরিকায়। আগামিতে আবার কে কার সাথে থাকবে না, কে জানে? উম্মিকার একটা বিয়ে হওয়া দরকার। উম্মিকাকে নিয়ে একবার একটা মারাত্তক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বিয়েটা টিকে নাই। তাই এবার আর আমি ওর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই দিবো না। এতে যখন ওর বিয়ে হয় হোক। এবার আমি প্রদিন উম্মিকার জন্য ওর বিয়ের জন্য, একটা ভালো পাত্রের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি।

২৮/০৩/২০২২-ন্যাচারাল প্রতিশোধ

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য শোনার জন্য কানাডা, আমেরিকা, ইউকে, পোল্যান্ড, ইজরায়েল, অষ্ট্রেলিয়া, জার্মান, ফ্রান্স ইত্যাদি পার্লামেন্টে বিশেষ অধিবেশন হয়েছে। সব এমপিগন, মিনিষ্টারগন স্ট্যান্ডিং ওভেশনে সম্মান দিয়ে একাত্ততা দেখিয়েছেন। এছাড়া জি-৭, জি-২০, স্কোয়াড, ব্রিক্সস, ব্রাসেলস মিটিং তো আছেই, তারপর ন্যাটোর পরপর অনেকবার মিটিং, ন্যাটো দেশসমুহের মধ্যে বারবার মিটিং/ বৈঠক, জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে বহুবার গুতেরিসের ভাষন, প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কীরও ভার্চুয়াল ভাষন, ইত্যাদি বহুবার সম্প্রচার করা হয়েছে। এ ছাড়া, বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিশেষ বিশেষভাবে কয়েকজন একত্রে মিলিত হয়ে বৈঠক করেও বিভিন্ন প্রস্তাব করেছেন। রাশিয়ার একনায়কতন্ত্র স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার নিষেধাজ্ঞাসহ রাশিয়ার কমার্শিয়াল, ইকোনোমিক্যাল নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে অন্যান্য দেশ সমুহকেও ন্যাটো এবং পশ্চিমারা বিভিন্ন দেশকে এমন এমন চাপের মধ্যে রেখেছে যে, হয় তাদেরকে ন্যাটো, ইইউ দেশসমুহ তথা পশ্চিমাদের কথা শুনতে হবে, অথবা তারাও তাঁদের নিষেধাজ্ঞায় পতীত হবেন এমন কথাও বলা হয়েছে। উপরন্তু, যেসব দেশকে আগেই এই পশ্চিমারা বিভিন্ন কারনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিলো, যেমন ইরান, ভেনিজুয়েলা ইত্যাদি তাদেরকে এখন আবার নিষেধাজ্ঞার বাইরে নিয়ে ওই সব দেশের তেল/ গ্যাস রপ্তানীর শর্তে যোগাযোগও করেছে। শুধু এখানেই শেষ নয়, হাজার হাজার মিলিয়ন, বিলিয়ন ডলারের সাহাজ্য, মাত্রাতিরিক্ত অস্ত্র সরবরাহ, এমনকি প্রানে মেরে ফেলার হুমকী দিতেও কোনো বাধা ছিলো না। একটা সুপার পাওয়ারের দেশের প্রেসিডেন্টকে আরেকটা সুপার পাওয়ারের দেশের প্রেসিডেন্ট তাঁর ক্ষমতা উতখাতের নিশ্চয়তা দিয়ে, রিজিম পরিবর্তনের হুমকীও দিয়েছে।

আমি মানি, রাশিয়া ইউক্রেনের মতো একটা স্বাধীন রাষ্ট্রকে এভাবে অতর্কিত হামলায় হাজার হাজার মানুষের ভোগান্তি কিংবা দেশ দখলের মতো কাজ করতে দেয়া উচিত না এবং তাঁর এই কাজকে কোনোদিনই সমর্থনযোগ্য নয়। সারা দুনিয়ার বিশেষ করে ন্যাটো, ইইউ, ব্রিক্স, পশ্চিমা দেশ, ফ্রান্স, জাপান, অষত্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা, জার্মান কিংবা এসব দেশ যে মানবতা দেখাচ্ছে, তা ঠিকই আছে। আমিও তাঁদের এসব কর্মকে সমর্থন করি।

কিন্তু ঠিক তারপরের যেটা আমার জানতে ইচ্ছে করে-

তারা কি এসব শুধু ইহুদী, খ্রিশটিয়ান, হোয়াইটস এর জন্যই প্রজোজ্য নাকি সব মানুষের জন্য? তারা কি আফগানিস্থান, সিরিয়া, প্যালেষ্টাইন, ইয়েমেন, তালেবান, ইরাক, ইত্যাদি দেশগুলির মানবেতর মানুষগুলির জন্যেও এটা করতে পারতেন না? এতো এতো পার্লামেন্টারী সেসন না হোক, অন্তত কিছুটা আওয়াজ, কিছুটা সাহস, কিছুটা আশসাস? এখানে এই কথা আবার কেউ বলবেন না যে, অন্যান্যদের উপর অত্যাচারের কারনে ইউক্রেনের সাধারন মানুষের ভোগান্তি কেনো সমর্থন করা হবে? ঠিকই তো। সেটাও সমর্থন যোগ্য নয়। কিন্তু প্রশ্নটা ইউক্রেনের সাধারন মানুষের ব্যাপারে নয় শুধু, প্রশ্নটা সেই ভোগান্তিগুলির মানুশ গুলির জন্যেও। কিন্তু অইসব ভোগান্যি গুলির জন্য দায়ী কারা? কে বা কারা করেছে সেসব? কাদের দ্বারা সেই সব ভোগান্তিগুলি হয়েছে বা হচ্ছে? এখনো তো হচ্ছে? এই ন্যাটো, এই পশ্চিমারা, এই ইহুদীরা, এই খ্রিষ্টানরা, এই হোয়াইটসরাই তো বিমান থেকে অতর্কিত হামলা, হাজার হাজার মানুষের রিফুজি হবার কান্নার সিনারীও, ধর্ষন, লুটপাট, জীবননাশ করেছে। হয়তো ফ্রান্স করে নাই কিন্তু আমেরিকা করেছে, তখন ফ্রান্স চুপ ছিলো। হয়তো আমেরিকা করে নাই ইউকে করেছিলো, তখন আমেরিকা, ফ্রান্স উভয়েই চুপ ছিলো, হয়তো রাশিয়া করেছে কিন্তু টার্গেট মুসলমান ছিলো বলে আমেরিকা, ফ্রান্স, কানাডা, জার্মান সবাই চুপ ছিলো। তখন কি ওই সব সন্ত্রাসী ক্ষমতাধরদেরকে অন্তত কথা দিয়ে ধমক দিয়ে প্রতিহত করার নৈতিক দায়িত্ব রাখতে পারতো না? সেসব দেশের মানুষেরাও তো অতীব সাধারন জনগনই ছিলো। তাঁদের বেলায় এতো কাভারেজ, এতো মিটিং, এতো সোচ্চার কেনো করলো না আজকের দিনের নেতারা? তখন কি তারা ওয়ার্ল্ড লিডার হিসাবে এই ওয়ার্ল্ডে ছিলেন না? তারা যদি সমন্নিতভাবে আবার বলছি সমন্নিতভাবে এক জোটে সেই সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতেন, তাহলে কি এই প্রিথিবিতে অন্য আরেক জুলুমবাজের তৈরী হতো?

এর মানেই এই, যারা আজ রাশিয়ার এই এগ্রেসিভ অন্যায়কে সমর্থন করে, তারা আসলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কথা বলছে না, কথা বলছে সেসব ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যারা ইউক্রেনের এই অবস্থায় মনে করছে যে, ইউক্রেনদের উপর আরেক জুলুমবাজ অন্যায় হচ্ছে বলে এতো ব্যাপক নরাচরা করছেন। এটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বলেই ভাবা হচ্ছে। ১৪ গোষ্টি নিয়া একজনের বিরুদ্ধে লড়াই করাই যায়। ১৪ গোষ্টির শক্তি নিয়া পাশের বাড়ির বস্তির মফিজও মাস্তানী করতে পারে একজনের বিপক্ষে। ওয়ান টু ওয়ান করুক না? দেখা যাক কি হয়? সব শিয়ালেরে একসাথে করে হুক্কা হুয়া দেয়া মানে একা সাহসী নয়। এই যে ৩ হাজার ইহুদী ইজরায়েলে গেলো ইউক্রেন থেকে, তাদেরকে বাসস্থান দেয়ার জন্যে অকোপাইড গাজায় শুরু হয়েছে আরেক ধংশযজ্ঞ। কই কেউ তো এই মুহুর্তে সেটার ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছে না? মিডিয়া কাভারেজও নাই, কিন্তু ওইসব নীরিহ মানুষগুলি তো বাস্তচ্যুত হচ্ছে। তাঁদের ব্যাপারে কেউ তো কিছু বলছে না?

ন্যাচার যখন প্রতিশোধ নেয়া শুরু করে, তখন শুরু হয় খুব ছোট কিছু থেকে। তখন সব জুলুমবাজদের সাথে যারা চুপ ছিলো, তারাও সেই ন্যাচারাল প্রতিশধের আওতায় এসে যায়। হতে পারে, সেই প্রক্রিয়টা শুরু হয়ে গেছে আর এটা খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে বলে আমার ধারনা। এই মুহুর্তে যতোটা ক্লিন দেখা যায় পরিস্থিতি, সেটা হয়তো ততোটা ক্লীন নয়। যার যার সার্থে আঘাত লাগলে কিছুদিন পর বুঝা যাবে, কে কার বা কার কে।

গ্রামে যখন দুই মোড়ল মারামারি করে, সেই গ্রামেই কেউ কেউ খুব মুচকী মুচকি হাসে এইজন্য যে, অন্তত এক মোড়ল আরেক মোড়লেরে ঘুষি তো মারছে!! যে ঘুষিটা আসলে অই মুচকি মুচকি হাসা নীরিহ পাবলিক মারতে চাইতো কিন্তু কখনো পারে নাই। এই দুই মোড়লকে আসলে কেহই পছন্দ করে না। তারা গাড্ডায় পড়লে অধিকাংশ লোকই অন্তরে একটু শান্তি পায়। মজা হলো-দুই মোড়লের অধোপতন সবাইই চায়। ভালোবাসা বা ক্রতজ্ঞতা যতোটুকু কেউ দেখায় সেটা জাষ্ট না পাইরা।

এই আর কি।

20/02/2022- গেট টুগেদার এমসিসি

গত ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২২ তারিখে আমার আরেক বন্ধু প্রোফেসর শাহরিয়ার বহুদিন পরে ঢাকায় এসেছিলো কানাডা থেকে। কানাডাতেই সেটেল্ড সে। অনেকদিন দেখা হয় নাই ওর সাথে। তাই আমি আমার সব বন্ধুদেরকে শাহরিয়ারের আগমনে ওয়েষ্টিনে একটা দাওয়াত করেছিলাম। আমাদের মির্জাপুর ক্যাডেট ১৫ তম ব্যাচের ৫৩ জন ক্লাশমেটের মধ্যে ঢাকায় থাকে এমন ১৪ জন মিলিত হয়েছিলাম। জম্পেশ আড্ডা হয়েছিলো। উক্ত গেদারিং এ উপস্থিত ছিলাম- ফিরোজ মাহমুদ (মাইক্রোসফটের কান্ট্রি ডাইরেক্টর) , মেজর আখতারুজ্জামান (বিটিভির ইংরেজী খবর পাঠক), ব্রিগেডিয়ার জাহেদ (ওয়েষ্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং), মেজর আসাদ (বিখ্যাত লেখক), ডাঃ মনজুর মাহমুদ (প্রোফেসর পিজি), আব্দুল্লাহ হেল কাফি (মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এন্ড মেরিন ক্যাপ্টেন), আরেক মনজুরুল আলম (স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যংক), রিজওয়ানুল আলম (বিখ্যাত সাংবাদিক এবং প্রোফেসর অন জার্নালিজম), মোর্শেদ এনাম (ইঞ্জিনিয়ার এবং বিখ্যাত লেখক, দাবারু আবুল মনসুরে সাহেবের বড় নাতী) এবং আমার আরেক বন্ধু ফয়সাল। দারুন উপভোগ করেছি সবার সান্নিধ্য।

এদিন আরেকটা ভীষন ভালো একটা ব্যাপার ঘটে গেলো। সেটা একটা অনুবাদ।

তাঁর আগে একটা কথা বলে নেই যে, কোনো বিখ্যাত লেখকের বই অনুবাদ করতে গেলে প্রথমে যেটা প্রয়োজন সেটা হলো, অরিজিনাল লেখক কখন কোন শব্দ বা লাইন বা উক্তি দিয়ে কি বলতে চাইছেন সেটা লেখকের মতো করে বুঝতে শেখা এবং সে মোতাবেক হুবহু ভাষান্তর পাঠকের জন্য তা অনুবাদ করা। যদি এর মধ্যে কোনো ব্যত্যয় ঘটে তাহলে হয় অনুবাদকের নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয় অথবা অরিজিনাল লেখকের মুল বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়। শুধুমাত্র আক্ষরীক শব্দকে অন্য ভাষায় রুপান্তরীত করলেই অনুবাদক হওয়া যায় না। জনাব মাহমুদ (আমার মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের বন্ধু এবং খুব প্রিয় আমার একজন মানুষ) একটা কঠিন কাজ হাতে নিয়েছেন। ডঃ ইয়াসির কাদিরের ভিডিও বক্তব্য এবং তাঁর কিছু লিখিত সংস্করণের উপর ভিত্তি করে আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ (সঃ) উপর তিন খন্ডের মধ্যে ১ম খন্ডটি সমাপ্ত করেছেন। বইটির নাম "মহানবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর জীবন ও সময়" আমি অনেক অনুবাদ পড়েছি, অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত বই এর বাঙলা কিংবা ইংরেজী অনুবাদ পড়েছি, মাহমুদের এই বইটি একটি অসাধারন অনুবাদ হয়েছে। আমি অন লাইনে ডঃ ইয়াসির কাদির বক্তব্য শুনেছি এবং শুনি। আমার বন্ধু মাহমুদের এই উক্ত অনুবাদটি একদম ডঃ ইয়াসির যা যেভাবে বলতে চেয়েছেন, মাহমুদ সেটা পুনহখানুপুঙ্খ ভাবেই তুলে ধরেছেন।

আমি প্রচূর বই পড়ি, বই পড়া আমার একটা নেশার মতো। আমি মাহমুদের এই বইটার প্রায় ৩০% পড়ে ফেলেছি। নেশার মতো পড়ে যাচ্ছি। অতীব সাবলীলভাবে মাহমুদ অনুবাদটি করেছে। পড়তে খুব ভালো লাগছে।

অনেক ধন্যবাদ তোদের সবাইকে।

আপ্নারা যারা আমাদের মহানবী হজ রত মুহাম্মাদ (সঃ) এর জীবনী এবং তাঁর সময়কালটা আক্ষরীক অর্থে বোধ গম্য ভাষায় জানতে চান, কিনতে পারেন। এটা Worth Buying Good Book.

ধন্যবাদ মাহমুদ তোকে আর ধন্যবাদ শাহরিয়ারকে যার কারনে একটা চমৎকার গুড গেদারিং হয়েছে। আর ধন্যবাদ আমার সব বন্ধুদের যারা সময়টাকে নিয়ে গিয়েছিলো প্রায় ৪৪ বছর আগে। আর মাহমুদের বইটা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলো প্রায় ১৪০০ বছর আগে।

আমি তোদের সবাইকে খুব ভালোবাসি।

১৯/০২/২০২২-স্বাস্থ্যসচীব লোকমান ভাই একদিন অফিসে

হটাত করে ফোন করলেন আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের স্বাস্থ্যসচীব লোকমান ভাই (Senior Secretary, at Ministry of Health & Family Welfare-MOHFW, Bangladesh)। অনেকবার দাওয়াত করার পরেও ভীষন ব্যস্ততার কারনে গত দুই বছরের মধ্যে আসতে পারেন নাই। সম্ভবত একবার এসেছিলেন ২০১৪ কিংবা ২০১৫ সালের মাঝামাঝি। আজ এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন কোনো এক কাজে। সুযোগটা মিস করেন নাই। ভীশন খুশী হয়েছি লোকমান ভাইকে অফিসে পেয়ে। তখন একটা মিটিং করছিলাম, কিন্তু লোকমান ভাইকে সময় দেয়াটা আমার কাছে প্রাইয়োরিটি মনে হচ্ছিলো। একসাথে লাঞ্চ করলাম, প্রায় দুই ঘন্টার মতো বেশ ভালো একটা সময় কাটিয়েছি।

২০১৯ সালে করোনার আগে উনি যখন খুলনার ডিভিশনাল কমিশানার ছিলেন, তখন ওই এলাকার প্রায় সবগুলি ডিষ্ট্রিক্ট আমি ভিজিট করেছিলাম উনার এডমিন সাপোর্টে। ময়মনসিংহ এ যখন ডিসি ছিলেন, তখনো বেড়াতে গিয়েছিলাম পরিবারসহ। অসম্ভব একজন মিশুক মানুষ।

লোকমান ভাইয়ের সবচেয়ে চমৎকার গুনের মধ্যে একটি হচ্ছে- He is the son of his soil of Gournodi. একজন মানুষ যখন আল্লাহর রহমতে উত্তোরোত্তর ভালো পজিশনে উঠে, তখন অনেকেই (সবাই না) আর সেই নাড়ির টান অনুভব করেন না কিন্তু লোকমান ভাই একজন সম্পুর্ন আলাদা মানুষ। তিনি তাঁর গ্রামকে ভুলে যান নাই, তাঁর সেই চেনা-অচেনা গ্রামের মানুষগুলিকে ভুলে থাকেন না, বিপদে আপদের সার্বোক্ষনিক পাশে থাকেন, সরকার সেই এলাকার উন্নতি তাঁর গতিতে করলেও লোকমান ভাই, তাঁর নিজের চেষ্টায় সবাইকে অকাতরে ন্যায়ের মধ্যে থেকে সাহাজ্য করেন। শীতে শীতার্ত কাপড়, বেকার ছেলেদের কর্মসংস্থান, গরীব পরিবারের সন্তানদের পড়াশুনার সাহাজ্য, কোনটায় তাঁর হাত পড়ে নাই? অত্যান্ত সৎ এবং সজ্জন ব্যক্তি এই লোকমান ভাই। তাঁর প্রোফেশনাল এফিসিয়েন্সীর কথা না হয় নাইই বললাম, বর্তমান সময়ে দেশের এতো টীকার প্রোকিউরমেন্ট কিংবা অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তাঁর চমৎকার প্রোফেশনালিজম।

লোকমান ভাইয়ের সাথে উনার আরেক বন্ধু এসেছিলেন, তাঁর নাম জিন্নাত ভাই। খুব ভালো একটা সময় কাটালাম আমার অফিসে বহুদিন পর। ধন্যবাদ লোকমান ভাই।

১৮/০২/২০২২- আমার বাগানের আলু

বাগান করিতে গিয়া একবার মিষ্টি আলুর কয়েকটা ডগা লাগাইয়াছিলাম। যত্ন করি নাই, পরিচর্যাও তেমন করা হয় নাই। ধীরে ধীরে কবে কখন চোখের আড়ালে মাটির নীচে তিনি এত বড় হইয়া উঠিয়াছে জানিতেও পারি নাই। বাগান আলু পাতায় ভরিয়া উঠিতেছে ভাবিয়া উহা সমুলে নির্মুল করিতে গিয়া এই আলুখানা চোখে পড়িলো। কখন কিভাবে যে এত অনাদরেও সবার অলক্ষ্যে সে এত বড় হইয়া উঠিয়াছে কেহই জানিতে পারে নাই। এখন তাহাদের বংশ সহ জীবন ধংসের মুখে। কেমন যেনো মনে হইতেছিলো। তখন মনে বড্ড কষ্ট হইতে লাগিলো এই ভাবিয়া যে, আহা এই ক্ষুদ্র বোবা উদ্ভিদ তৃনলতার মতো মেরুদন্ডহীন লতাটাকে বাগানে রাখিয়া দিলেও পারিতাম। কারন এরাও ফল দেয়, আর এই ফল মুল্যহীন নয়। বাগানে কেহই অনর্থক বা মুল্যহীন নয়।

চোখ বুজিয়া আমি যেনো আমাদের সমাজের বৃহত বাগানের চিত্রটি দেখিতে পাইলাম। অনেক কিছুই ফুটিয়া উঠিলো। এখানে সবাই কোনো না কোনো সময়ে নিজের আপন চেষ্টায়, গোপনে সবার অলক্ষ্যে বাচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সে যত অবহেলিতই হোক, কিংবা অনাদর। মালি কিংবা মালিক কারো কোনো পরিচর্যা ছাড়াও কোনো কোনো প্রজাতি এই ধরায় অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রান যুদ্ধ করেই পতবর্তী প্রজন্মের জন্য ফল দেয়। কেউ ফেলনা নয়। এটা হয়তো ফিলোসোফির একটা দিক বা মুদ্রার।

কেউ কেউ আবার এই বড় মিষ্টি আলুটির চেহাড়া সুরুত আর সাইজ দেখিয়া ইহাও বলিতে পারেন, এই বেটা একটা আলুই শুধু এতো মোটা আর বড় হইলো কেনো? অন্যগুলি না কেনো? সেই ফিলোসোফি যদি বলি- হতে পারে যে, এই একটা আলুই বাগানের যাবতিয় সুখ আর খাদ্য একাই খাইয়া এতো বড় হইয়াছে যাহার ফলে অন্য আলুগুলির ভাগ্য রোহিংগাদের মতো। এই বড় আলুটি শুধু নিজের কথাই ভাবিয়াছে আর ভাবিয়াছে, এই পৃথিবীতে কে কাহার? আগে নিজে বড় হই, তারপর দেখা যাবে। কিন্তু যখন কোনো গোত্রের মধ্যে বিপদ আসিয়া হাজির হয়, তখন কে কত বড় আর কে কত ছোট তাহা ভাবিয়া বিপদ আসে না। তখন ছোটবড় সবাই একত্রে মরিতে হয়। অথবা যিনি সবচেয়ে বড় তাহাকেই আগে কতল করা হয়।

তাই গোত্রের সবাইকে নিয়া একত্রে বড় হওয়া একটা নিরাপত্তার ব্যাপার থাকে। নতুবা এই ছোট আলুগুলির থেকে বেশী নজর থাকে সবার বড় আলুর দিকে। ইহাকেই আমরা আজ প্রথম সিদ্ধ করিবো। বাকিগুলি হয়তো আবার কোনো না কোনো বন-জংগলে ফেলিয়া দেবো, কারন তাহাদের প্রতি আমাদের মতো মালি বা মালিকের খুব বেশী ইন্টারেস্ট নাই। ফলে, এই কারনে কোনো একদিন তাহারাই আবার বংশ বিস্তার করিয়া তাহাদের অস্থিত্ত বজায় রাখিবে।

আরেক দল আবার ভিন্ন একখানা মতবাদ লইয়া এই আলুর উপর কিছু দোষ চাপাইয়া নিজেরা পার পাইতে চেষ্টা করেন। কারো কারো ব্যক্তিগত দোষের কারন কেনো বা কি মনে করিয়া এই নীরিহ বোবা একটা আলুকে দোষারুপ করেন তাহা আমি আজো বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। কিছু হইলেই মানুষ ‘আলুর দোষ’ বলিয়া চালাইয়া দেন। অথচ এই বোবা আলুটি সারাজীবন সবার অলক্ষ্যেই বসবাস করে। হইতে পারে, গোপনভাবে থাকার এই বইশিষ্ঠই মানুষের আলুর সাথে মিল থাকার সব দোষ এই নন্দ ঘোষের উপর পড়ে।

মোরাল অফ আলুঃ

একাই শুধু খাইয়া বড় হইয়েন না, বিপদ আছে তাহলে।

আলুর প্রতি এতো ঝুকে যাইয়েন না, তাহলেও বিপদ হইতে পারে।

আলুর যত্ন নিন। আলুকে ভালোবাসুন।

১৩/০১/২০২২-Meeting Fourth Generation

গল্পটা কাল্পনিক নয়। গল্পটা সত্যি। আর এখানে যাদের নামগুলি উল্লেখ করা হয়েছে, তারা তাদের নিজের নামেই রয়েছেন। অনেক অজানা কষ্ট আর বেদনা দিয়ে এই পৃথিবী এতোই ভরপুর যে, সবাই এক নাগাড়ে সবার কষ্টের কথা, বেদনার কথা, সাফল্য আর ব্যর্থতার কথা বলতে গেলে সারা পৃথিবীতে শুধু কান্নার রোলই পড়ে যাবে। তারপরেও মানুষ বেচে থাকে আশা নিয়ে, হতাশাকে দূর করে কিছু আনন্দ আর হাসি নিয়ে। এরই নাম জীবন। কেউ হেরে যায়, কেউ পড়ে যায়, কেউবা আবার পরতে পরতে দাঁড়িয়ে যায়। আজ থেকে অনেক জেনারেশন পর সেসব মানুষগুলি হয়তো জানবেই না, কি ছিলো তাদের সেই কষ্টে ভরা তাদের অতীতের পূর্বসুরীদের জীবন, কিংবা কিভাবে আজ তার এই পর্বে আসা। আজকে এই ঘটনার মানুষগুলিকে সেই চরাই উতরাই পার করে সেই সব পূর্বসুরীরা নতুন প্রজন্মের জন্য নব পরিস্থিতি তৈরী করে গেছে। আজকের গল্পের মানুষ গুলিকে এই পর্বে আসতে অন্তত চারটি জেনারেশন পার করতে হয়েছে। এর মধ্যে ১ম জেনারেশনের কেহই জীবিত নেই, ২য় জেনারেশনের অনেকেই গত হয়েছেন, কেউ কেউ এখনো জীবিত আছেন বটে কিন্তু বয়স অনেক হয়ে গেছে তাদের। ৩য় জেনারেশনের এখন পড়ন্ত বিকেলের মতোই। আর ৪র্থ জেনারেশন তারা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, আর সবেমাত্র তাদের মধ্যে একটা সমন্নয় হলো। এবার দেখার বিষয় পরের প্রজন্মের কাহিনী। হয়তো অন্য কেউ লিখবে তার পরের প্রজন্মের ইতিহাস, এমনো হতে পারে, থাক...। 

হামিদা খাতুন আমার মা, বিল্লাল ভাই (বেলায়েত ভাই ) আমার সেই ভাই। বহুদিন একই গ্রামের কাছাকাছি ছিলাম, মাঝে মাঝে এক সাথে দুজনে সিগারেট টানতাম। অতীতের অনেক গল্প শুনতাম। কখনো সেই গল্পে ছিলো হাসি, কখনো ভেজা চোখ আবার কখনো নিগুড় কালো রাতের মতো অন্ধকারের ভীতি সঞ্চারী অনুভুতি। বিল্লাল ভাই মারা গিয়েছেন অনেক বছর আগে। তার সন্তানদের সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো, এখনো আছে তবে খুব ঘন ঘন নয়। কারন তাদের অনেকেই দেশের বাইরে চলে গেছে। বিল্লাল ভাইয়ের স্ত্রী এখনো জীবিত আছেন। তিনিই বা কতটুকু গল্পগুলি জানেন তা আমার জানা নাই। তবে তিনিএখন সার্থক স্ত্রীর মতো সার্থক মাও। তার সন্তান সেলিম বর্তমানে নেভাদায় থাকে। আমার ছোট মেয়ে কনিকা আমেরিকায় যাওয়ার সুবাদে এই প্রথম সেলিমদের এবং তার সনাত্নদের সাথে প্রথম দেখা হলো। এরা ৪র্থ জেনারেশন। আমার ফার্ষ্ট নাতি ওরা। আমার মা আজ বেচে থাকলে আর আমার ভাই বিল্লাল ভাই বেচে থাকলে বড্ড খুশী হতেন। জীবন কত বিচিত্র। কোথাও না কোথাও গিয়ে এর রুট মিলিত হয়ই। 

“কিছু কথা আছে যা বলতে চাই নাই কিন্তু বলা হয়ে যায়, কিছু কথা ছিলো, বলতে চেয়েছি, অথচ বলা যায় নাই, কিছু সপ্ন ছিলো যা দেখতেই চাই নাই কিন্তু দেখতে হয়েছে আবার কিছু এমন সপ্ন ছিলো সব সময় দেখতে চেয়েছি কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় নাই এমন কিছু শখ ছিলো সারাজীবন লালন করেছি কিন্তু জীবনের শেষ তীরে এসেও সেটা ধরা দেয় নাই আবার এমন কিছু ভয় ছিলো যা একেবারেই কাম্য নয় অথচ তা আমি এড়িয়েই যেতে পারিনি কী কারনে আবার এই কিছু কথা না বলতে চেয়েও বলতে হয়েছে, কিছু সপ্ন আমাকে দেখতেই হয়েছিলো অথচ সেটা আমার কাম্য ছিলো না, আবার কিছু স্বপনের ধারে কাছেও আমি যেতে পারিনিএটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস আমি এই আফসোসের ব্যাপারটা নিয়ে বহুবার গবেষনা করেছি কিন্তু জীবনের কাছে রাখা সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। ফলে কোনোই আমি সেইসব প্রশ্নের উত্তর পাই নি, না আমার কাছে, না যাদের কাছ থেকে উত্তর পাওয়া দরকার ছিলো তাদের কাছ থেকে। আর উত্তর না পেতে পেতে একসময় আমি কোনো উত্তরের আর আশাও করিনি। কিন্তু একটা ব্যাপার আমার কাছে শতভাগ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, আমার এই অপারগতার কারন না আমি নিজে, না আমার সাথে যারা জড়িত ছিলো তারা না এটা আমার দোষ, না ছিলো তাদের আমি যদি আরো গভীরে গিয়ে এর আনুবীক্ষনিক পর্যালোচনা করি, তাহলে হয়তো আমার আরেকটা আফসোসের কথা প্রকাশ না করলেই নয় যে, আমার সেই অপারগতা কিংবা ঘাটতির কিছুটা হলেও কেউ না কেউ সহজেই হয়তো পুরন করতে পারতো, যা ‘সেই কেউ’রা হয়তো চেষ্টাই করে নাই

উপরের এই কথাগুলি আমার নয়, কথাগুলি একজন এমন মানুষের যাকে আমি আমার মতো করে চিনতে শুরু করেছিলাম আজ থেকে প্রায় ২৪ বছর আগে যখন আমার বয়স প্রায় ২২। কতটুকু আমি তাকে বুঝতে পেরেছিলাম, সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু কেনো জানি আমার খুব মায়া হতো, আর এই মায়ায় মাঝে মাঝে আমি নিজেকে তার ভূমিকায় প্রতিস্থাপিত করে দেখতাম কি হয় ভাবাবেগে অথবা মানসপটে। এই সময়টায় আমি খুব ভাবাগেবিত হয়ে যেতাম। ভাবাবেগিত হতাম এটা ভেবে যে, কি পরিমান চাপ কিংবা কষ্ট নিজের বুকের ভিতরে লুকিয়ে রাখা সম্ভব? তখন আরো বেশী মায়া হতো একজনের জন্য নয়, দুজন নিসংগ মানুষের জন্য যাদের উভয়ের বুকেই ছিলো সমান যন্ত্রনা আর ভাগ্যের আক্ষেপ। একজন যেনো পরাজিত, আর অন্যজন সেই পরাজয়ের কারন। এদের একজন আমার “মা” আর আরেকজন ‘বিল্লাল ভাই’ যাকে সবাই ডাঃ বেলায়েত নামেই চিনতো। আমি আজ সেই তাদের কথাই হয়তো বলবো।

আমার ‘মা’র সম্পর্কে আমি অনেকগুলি লেখা ইতিমধ্যে লিখলেও তার সবচেয়ে বড় দূর্বল বিষয়টি আমি কখনো আমার লেখায় আনিনি। আমি জানতাম এবং অনুভব করতাম আমার মায়ের সেই দূর্বলতা। আমার মায়ের এই দূর্বলতা তার নিজের সৃষ্টি যেমন নয়, আবার তিনি ইচ্ছে করলেও তার সেই অপারগতাকে তিনি অনায়াসেই দুহাত দিয়ে এক পাশে সরিয়ে দিতে পারতেন না। এই দূর্বলতা সমাজ সৃষ্টি করেছে, আর সেই সমাজ আজকের দিনের দুটি মানুষকে বিজন বিজন দূরে ঠেলে দিয়ে দুজনকেই অসুখী একটা বলয়ে জীবিত কবর দিয়েছিলো। আমার মায়ের সেই বড় দূর্বলতা ছিলো এই ‘বিল্লাল’ ভাই। পরবর্তিতে প্রায় তিন যুগ পরে যেদিন আমি আমার মায়ের সর্বশেষ ভিডিওটি করি, তখন অনেক প্রশ্নের উত্তর আমি জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু সে প্রশ্নগুলির উত্তর আমাকে আরো ব্যথিত করে দিয়েছিলো। সেই প্রশ্নের উত্তর আমাকে প্রতিটিবার চোখ ভিজিয়ে দিয়েছিলো, আমার অন্তরের কোথায় যেনো ছট ফট করছিলো কোনো এক অয়াশান্ত অনুভুতিতে। আর যিনি উত্তর দিচ্ছিলেন, আমার মা, তার দ্রিষ্টি কখনো সেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে নির্লিপ্ত হয়ে ভাষাহীন কিছু শব্দ তেই শেষ হচ্ছিলো যার সাহিত্যিক নাম- আহা, কিংবা উহু। এসব বেদনার রাজত্তে যিনি ছিলেন, সে আর কেউ নয়, বিল্লাল ভাই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কে এই বিল্লাল ভাই? যদি এর উত্তর খুজতে চাই, তাহলে ফিরে যেতে হবে আজ থেকে বহু বছর আগে যখন আমারও জন্ম হয় নাই। ফলে আমি যা জেনেছি, শুনেছি, তা পুরুই হয় আমার মার কাছ থেকে, কিংবা আমার অগ্রজ ডঃ হাবীবুল্লাহর কাছে বা স্বয়ং বিল্লাল ভাইয়ের কাছ থেকে জানা কিছু তথ্য। কিন্তু আমার কাছে সব ব্যাপারটাই যেনো মনে হয়েছে,  এটা ছিলো একটা ভাগ্য আর সময়ের খেলা।

কেনো ‘ভাগ্য’ আর ‘সময়’ বললাম তারও একটা ব্যাখ্যা আছে। অনেক সময় এমন দেখা যায় যে, “ভাগ্য” আর “সময়” দুটুই কারো জীবনে একসাথে আসে, কিন্তু “ভাগ্য” আর “সময়” ওরা কখনোই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ না। সঠিক ব্যবহারে ভাগ্য পালটাতে পারে বটে কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ভাগ্যও পালটে যায়। কিন্তু এই ‘সঠিক’ ব্যবহার আবার সবাই সবসময় হয়তো পায়ই না যাতে সেই সঠিক ব্যবহারে তার ভাগ্য পাল্টাতে পারে। কেউ কেউ পারে, আবার কেউ কেউ পারে না। আবার কারো কার ব্যাপারে সুযোগটাই আসেনা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কোনো ব্যক্তিত্ত সময়ের স্রোতে আবার বেশীদিন অসহায়ও থাকে না। একসময় না একসময় সে ঘুরে দাড়ায়ই যদি তার দৈবক্রম ভাগ্য আবার সেই ঈশ্বর কোনো এক যাদুর কাঠিতে হাল ঘুরিয়ে দেন। শুধু হাল ঘুরিয়ে দিলেই হয়তো তার সেই নির্যাতিত ভাগ্য দৈবক্রম ভাগ্য সঠিক নিশানায় পৌছায় না যদি তার চোখে না থাকে সপ্ন আর প্রবল একটা ইচ্ছাশক্তি। আজকের লেখার প্রধান চরিত্র এই ‘বিল্লাল’ ভাইয়ের ব্যাপারেও সেই দুটু শব্দ প্রায় একই সুরে খেটে যায়। ভাগ্য তাকে সুপ্রস্নন করে নাই, আবার করেছেও। ‘সময়’ তাকে একটা বলয় থেকে ছিটকে ফেলেছিলো বটে কিন্তু আবার সেই ‘সময়’টাই বদলে দিয়েছে তার সব জন্মগত বৈশিষ্ট।

বিল্লাল ভাইয়ের এই ইতিহাস নাতিদীর্ঘ নয়। এই ইতিহাস একটা পূর্ন জীবনের। আর সেই জীবনের বয়স কাল নেহায়েত কমও নয়, প্রায় ৫৫ বছর। এই ৫৫ বছরে পৃথিবী তার অক্ষে ৫৫ বার প্রদক্ষিন করে কত যে ঋতু আর কাল প্রশব করেছে তার কোনো হিসাব নাই। তাই বিল্লাল ভাইয়ের এই ইতিহাস বলার আগে সেই মানুষটির ইতিহাস বলা প্রয়োজন যার জন্য আরেক অধ্যা তৈরী হয়েছিলো বিল্লাল ভাইয়ের। আর তিনিই হচ্ছেন- আমার মা, আর জন্মধাত্রী বিল্লাল ভাইয়ের।

আমার মায়ের পুরু নাম ‘মোসাম্মাত হামিদা খাতুন’। নামটা আমি এভাবেই সবসময় লিখে এসেছি আমার ব্যক্তিগত তথ্যাবলীর মধ্যে। আমার মায়েরা ছিলেন দুই বোন এবং তার কোনো ভাই ছিলো না। আমার মায়ের আরেক বোনের নাম ছিলো ‘মোসাম্মাদ সামিদা খাতুন’। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গ্রাম্য ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ারিশান সার্টিফিকেটে তাদের দুজনের নামই লিখা হয় যথাক্রমে ‘হামিরন নেছা’ এবং ‘ছামিরন নেছা’। যাই হোক, নাম বিভ্রাটের কারনে আজকাল হয়তো ব্যংকে একাউন্ট করতে জটিলতা থাকতে পারে, কিংবা ক্রেডিট কার্ডে ঝামেলা হতে পারে, কিন্তু এই নামের বিভ্রাটের কারনে আমাদের মুল চরিত্রের মানুষ গুলির জীবনের ইতিহাসে কোনো প্রকার ব্যত্যয় হয় নাই। আর আমার এই লেখাতেও এটা অনেক বড় সমস্যা নয়। আমার নানা অর্থাৎ আমার মায়ের বাবার নাম ছিলো ‘কেরামত আলি’। আজকাল এই নাম গুলি আর কেউ রাখে না। হয়তো ভাবে যে, নাম গুলি আধুনিক নয়। কিন্তু এই নামের মানুষ গুলি ছিলে ভালোবাসার আর ভরষার ভান্ডার। যাই হোক, যদি আরেকটু আগের জেনারেশনে যাই, তাহলে আমরা সেই ‘কেরামত আলি’র বাবার নাম পাবো ‘উম্মেদ আলী মুন্সী’। এই উম্মেদ আলীর বাবা জনাব হাজী আসাদুল্লাহ (পিতা-আহাদুল) এর শাখা প্রশাখা বিশ্লেষন করলে এমন এমন কিছু বর্তমান আত্মীয় সজনের নাম চলে আসবে যা না আমরা অনেকেই মানতে চাইবো, না আমরা তা গ্রহন করবো। তার কারন একটাই-সমাজের স্তরভিত্তিক কেউ এমন জায়গায় আর কেউ এমন স্তরে যা না মিশে বংশে, না মিশ খায় পরিবারে। কিন্তু বাস্তবতাটাই যে অনেক কঠিন এটা মানা আর না মানাতে কিছুই যায় আসে না। না মানার মধ্যে হয়তো থাকতে পারে একটা বড় অহংকার বা সম্পর্ক ছিন্নকারীদের মধ্যে সামিল, কিন্তু বাস্তবতা পালটায় না তাতে। যাই হোক, সেই ৫/৬ জেনারেশন আগে না হয় নাইবা গেলাম।

আমার মায়ের বয়স যখন সবেমাত্র বারো কি তেরো, তখন সমাজের রীতি অনুযায়ী আমার নানা কেরামত আলি বিবাহযোগ্য মেয়ের বোঝায় চাপ অনুভব করে তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। আজ থেকে সেই প্রায় সত্তর বছর আগে যেটা হয়তো ছিলো সমাজের একটা রীতি, আজ তা বাল্যবিবাহের নামে সমাজ তাকে অপরাধের কারন বলে উল্লেখ করে। যেটাই হোক, সমাজের রীতি অনুযায়ী আমার মা, খালাদের বিয়ে ওই বারো তেরো বছর বয়সেই হয়েছিলো। আমার মায়ের সেই স্বামীর নাম ছিলো আব্দুল জলিল (সম্ভবত)। সম্ভবত বলছি এই কারনে যে, নামটা এই মুহূর্তে সঠিক লিখলাম কিনা সিউর হতে পারছি না। তবে সঠিক হবার সম্ভাবনা ৭৫%। ১২ বছরের একজন প্রায় নাবালিকা বিয়ের পর এখন অন্য বাড়ির বউ হয়ে গেলো। এই নববধূর পড়নের কাপড়টাই হয়তো তার থেকে প্রায় তিন গুন লম্বা, সবে মাত্র হায় প্যান্ট ত্যাগ করা বালিকাটি এখন নাকে নোলক, হাতে মেহেদী সমেত চূড়ি, কানে দূল, আর মাথায় লম্বা ঘোমটা দিয়ে কিছু বুঝে উঠার আগেই পরিচিত সব মানুষ গুলি থেকে আলাদা হয়ে অন্য এক সংসারে একটা আলাদা পরিচয় নিয়ে বাপের বাড়ি ছেড়ে গেলো। তার শখের পুতুল, ছেড়া বই কিংবা সখীদের অনেক গোপন কিছু মজার স্মৃতি সব ছেড়ে কেদে কেদে নিজের সেই খেলার আংগিনা, কাথা বালিশ আর বাড়ির উঠোনের মায়া ত্যাগ করে অন্য কোথাও যেতেই হলো। এ যেনো পালের একটা পোষাপ্রানী যে কিনা এখনো তার মায়ের দুগ্ধপানও ছাড়ে নাই। এই বয়সের একজন অপরিপক্ক নাবালিকা কি সংসার করছে বা করেছে সেটা আমি আজো বুঝে উঠতে পারিনা কিন্তু বিধাতার সিস্টেমে আমার মা গর্ভবতী হলেন। আর সেই গর্ভধারনের পরে সঠিক সময়ে তিনি সুস্থ্য একটি পুত্র সন্তানও দান করেন তার শ্বশুরালয়ে। এই পুত্রটির নামই হচ্ছে- বিল্লাল হোসেন বা বেলায়েত হোসেন। সবকিছুই ঠিকঠাক মতোই চলছিলো। স্বামী, সংসার, পুত্রযত্ন সবকিছু। নবাগত পুত্র সন্তানের আদরের কোনো কমতি নাই, নব নাম ধারী হামিদা এখন শুধু হামিদাই নয়, সে এখন ‘মা’ও বটে। তার নতুন নাম ’মা’। চারিদিকেই একটা নন্দ যেনো বাতাসের প্রবাহের মতো সারাটা বাড়ি দোলায়িত হচ্ছে, কেউ পুতুল নিয়ে দেখতে আসে, কেউ দোয়া দিতে আসে, কেউবা আবার আসে এম্নিতেই। সব কিছুই ঠিক যেভাবে চলার কথা সেভাবেই চলছিলো। কেরামত আলী তার মেয়ের জন্য গর্বিত, পাড়ার লোকেরাও। কিন্তু বিধাতার পরিকল্পনা মানুষের পরিকল্পনার থেকে অনেক বেশী যেমন রহস্যময়ী, তেমনি অনেক কঠিনও। তিনি কাকে কি দিয়ে সুখবর দিবেন আর কাকে কি দিয়ে দুঃখের অতল গভীরে নিয়ে যাবেন, তার হিসাব কিংবা ছক আমাদের কারোরই বুঝার কথা নয়। আর সে অধিকার ঈশ্বর কাউকে দেন ও নাই। তিনি একাই খেলেন, একাই গড়েন, আবার একাই ভাঙ্গেন। কেনো গড়েন, কেনো ভাজ্ঞেন এর ব্যাখ্যা চাওয়ারও আমাদের কোনো উপায় নাই। ফলে দেখা যায়, একই খবর কারো কাছে যেমন শুভ হয় আবার কারো কাছে তেমনি অশুভও হয়। একই জায়গায় মিলিত হওয়া মানুষের রাস্তা যেমন তিনি আলাদা আলাদা করে দেন, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন রাস্তায় চলাচলকারী অনেক মানুষের রাস্তাও তিনি এক জায়গায় এনে মিলন ঘটান। একই পরিস্থিতিতে যেমন একজন জীবনকে তিনি এগিয়ে নিয়ে যান, আবার সেই একই পরিস্থিতিতে তিনি আরেকজন জীবনকে অসহায় অবস্থার সাথে বোঝাপড়া করতে ব্যস্ত করে তোলেন। আমার মায়ের বেলাতেও ঠিক এমন একটা পরিস্থিতি হাজির করলেন বিধাতা। আমার মায়ের স্বামী আব্দুল জলিলকে তিনি এই নশ্বর পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন। যে নাটাইটায় একটা গুড়ি নিজের আনন্দে নীল আকাশের হাওয়ায় ভেসে একবার এদিক, আরেকবার ওদিক দোল খাচ্ছিলো, হটাত নাটাইটা বিচ্ছিন্ন করে দিলো ফানুশের মতো উরে থাকা রংগিন ঘুড়িটা। ছন্দে ভরা কতগুলি জীবন এক সাথে যেনো ছন্দ পতনের ধাক্কায় চারিদিক বেশামাল হয়ে গেলো। আমার মা হামিদা ভয়ে আতংগকে আর বিষন্নতায় বোবা হয়ে গেলেন, হামিদার বাবা কেরামত আলী মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনায় মুর্ছা যেতে লাগলেন। আর হামিদার সদ্য জন্মানো পুত্র বিল্লাল কিছুই না বুঝে মায়ের দুধের জন্য বিকট চিতকারে বাড়ি, ঘরময় যেনো আলোড়িত করে দিলো। মাত্র ১৪ বছর বয়সে আমার মা হামিদা খাতুন বিধবার তকমা গলায় পড়ে হাহাকার ঘরে যেনো নির্বাক হয়ে গেলেন।

কোনো নারীর অধিকার তার স্বামীর বাড়িতে স্বামীর বর্তমানে যেমন থাকে, সেই নারীর সেই অধিকার স্বামীর অবর্তমানে আর তেমন থাকে না। হামিদার স্বামীর ইন্তেকালের কয়েকদিন পর বাড়ির অন্যান্য সবাই যখন হামিদার স্বামীর শোকের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে থাকে, ততোই যেনো হামিদার উপর অন্যান্যদের খোটার ভার বাড়তে থাকে। এই বয়সে স্বামীকে বুঝার আগেই যখন কেউ স্বামী হারা হয়, তার নিজের মনের অবস্থার কথা কেউ তো ভাবেই না, বরং সব দোষ যেনো সেই অপয়া হামিদারই। পৃথিবীর কেউ এই নাবালিকা বিধবার মনের ভিতরের কষ্ট কিংবা বেদনার অনুভুতি না বুঝলেও হামিদার বাবা কেরামত আলী ঠিক বুঝতে পারছিলেন কি চলছিলো হামিদার ভিতরে। তিনি কোনো কিছুই চিন্তা না করে দুই অবুঝ, এক হামিদা এবং তার পুত্রকে নিয়ে চলে এলেন নিজের বাড়িতে। হামিদা এখন আবার তার পিত্রালয়ে সেই চেনা পরিবেশে ফিরে এলো। আজকের এই চেনা পরিবেশ যেনো আর আগের সেই পরিবেশ নাই, তার খেলার অনেক সাথীরাই অন্যের বধু। এখন আর দলবেধে কাউকে নিয়ে সেই চেনা পরিচিত নদীতে হৈ হুল্লুর করে জল্কেলীর কোনো সুযোগ নাই। কোথায় যেনো বীনার তার গুলি ছিড়ে গেছে। আর সাথে তো আছেই পুত্র বিল্লাল, যার কাছে দাদা বাড়িই কি, আর নানা বাড়িই কি কোনো কিছুরই কোনো পার্থক্য নাই। শুধু মনের অজান্তে চোখের পানি ঝরছে হামিদার আর তার সাথে অসহায় বিধবা কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা কেরামত আলির। জখম যেনো কিছুতেই ক্ষরন বন্ধের নয়।   

শরীরের কোনো কাটাছেড়া, কোনো বাহ্যিক জখম হয়তো চোখে দেখা যায়, ক্ষুধা হলে খাবারের অভাবে ক্ষুধায় হয়তো পেট গুরগুর করে, কিংবা জ্বর সর্দি, কাশি কিংবা মাথা ব্যথা হলে তার সিম্পটম অনায়াসেই বুঝা যায় কিন্তু অন্তরের জখম কি কখনো চোখে পড়ে? অন্তরে কি কখনো জখম হয় আদৌ? আর এই অন্তরটাই বা শরীরের কোন অংগ? এটা কি এমন কোনো জিনিষ যা মাংশ বা হাড় কিংবা এমন কিছু দিয়ে এর গঠন কাঠামো? অথচ এই জখম অনুভুত হয়, এই কষ্ট নিজেকে প্রতিটি ক্ষনে মনকে বিষন্ন করে দেয়। সেই অদেখা অন্তরে রক্তক্ষরন হয়। এই অন্তর্জালা, রক্তক্ষরন আর কষ্টে মাত্র ১৪/১৫ বছর বয়সের এই অবুঝ বালিকা আরেকটি সদ্যজাত নবাগতকে নিয়ে পৃথিবীর সব মানুষের চোখে যেনো একজন অপরাধি সেজে জীবিত অবস্থায় মৃত হয়ে রইলেন। স্বামীর ম্রিত্যু যেনো তারই অপরাধ। তার এই ঘটনার জন্য যেনো তিনিই দায়ী। একদিকে অবুঝ মন, অন্যদিকে সাথে আরেকটি অবুঝ সন্তান, সব মিলিয়ে চারিদিকে এক মহাশুন্যতা। মেয়ের এমন একটি দুঃসহ শুন্যতা নিজে পিতা হয়ে কেরামত আলী কি করবেন? দিন গড়ায়, রাত যায়, শুন্যতা আরো চেপে বসে হামিদার। তার যে বয়স, সে বয়সে তিনি হয়তো বিয়ের মাহাত্তটাই বুঝে উঠতে পারেন নাই, কিন্তু তাকে এখন বিধমার তকমাটাও বুঝতে হচ্ছে, বুঝতে হচ্ছে একজন অবুঝ সন্তানের মা হিসাবে তার অকাল পরিপক্ক দায়িত্ব।

যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, তাহলে সে সবসময়ই চাইবে যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুঃখটা, কষ্টটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাগব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই কষ্টের ব্যাপারগুলি শেয়ার করা দরকার। আর হামিদার এই কষ্টের ভাগীদার কিংবা শ্রোতা হয়ে রইলো শুধু একজন-সেই নাবালক পুত্র ‘বিল্লাল’। চোখ ভিজে আসে তার, মন ভেংগে আসে যন্ত্রনায়, আর মনে হয়-কেনো? কেনো বিধাতা তাকেই এর অংশ করলেন? অন্য কেউ নয় কেনো? সেই অবুঝ পুত্র বিল্লালের কাছে ‘হামিদা’র হয়তো শুধুই একটা জিজ্ঞাসা। নাবালক বিল্লাল হয়তো এর কিছুই বুঝে না, কোনো এক ভিনদেশী ভাষায় হয়তো কিছুক্ষন অদ্ভুত শব্দ করলেও মায়ের সেই কান্নায় ভীত হয়ে নিজের অজান্তেই কেদে দেয় বিকট এক শব্দে যা হয়তো বিধাতার কাছেই তার মায়ের কষ্টের ফরিয়াদ। হয়তো মা ছেলের এই অসহায় কান্নায় বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের চোখের জলে কাপা কাপা গলায় বলতে থাকেন- আমি তো আছি তোর পাশে। ভয় নাই। মা আছে। পৃথিবীর কেউ তোর পাশে থাকুক বা না থাকুক, আমি তো আছি। এভাবেই কাটতে থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এবং এক সময় কয়েক বছর।

জীবন যেখানে যেমন। যে শিশুটি আজ জন্ম নিলো কেউ জানে না তার জন্য এই পৃথিবী কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা এই প্রিথিবীকে সে কি দিয়ে যাবে। বিধাতা চাইলে যে কোনো কিছুই হতে পারে। হতে পারে আজকে এই শিশুটি হয়তো এই পৃথিবীকে কোনো একসময় কাপিয়েও যেমন দিতে পারে আবার এই পৃথিবী তাকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। এই বিশ্বভ্রমান্ডে এমন অনেক শিশুই জন্ম নেয় যারা অনেকেই অনেক ভুমিকা রাখে আবার কেউ কেউ কিছুই রাখে না, না পৃথিবীও তাদেরকে মনে রাখে। এমন মানুষের সংখ্যাই হয়তো নেহায়েত যেমন কম না, তেমনি ভুমিকা রাখে এমন শিশুও কম না। যুগে যুগে তারপরেও অনেক শিশু গোপনে পৃথিবীতে আসে, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় আর একদিন সবকিছু ফেলে সবার থেকে আলাদা হয়ে আবার কোথাও অদৃশ্য হয়ে যায়। মাঝখানের এই সময়টায় খুব গুটিকতক মানুষ হয়তো নিজের মতো করে কাউকে কাউকে মনে রাখে কিন্তু তাও একসময় মনের স্মৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। কিন্তু ‘বিল্লালের বেলাতে এটা ঘটে নাই। তিনি প্রকাশ্যে দিবালোকে এই সমাজে বৈধভাবে পদার্পন করেছিলেন, তার যোগ্য অভিভাবক ছিলো, তার পরিচয় ছিলো, আর ছিলো পাশে থাকা অনেক মানুষ যারা তাকে নিয়ে ভেবেছে, তার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করেছে। কিন্তু বিধাতা তো আর মানুষের মত নন। তার পরিকল্পনা, তার ইচ্ছা, তার কার্যকারিতা সবকিছুই তার মত। বিল্লালের যখন মাত্র দুই থেকে হয়তো একটু বেশী, তখন হামিদাকে ছাড়তে হলো তারই ঔরসে জন্ম নেয়া তার পুত্র বিল্লালকে। সমাজ বড্ড বেরসিক, সমাজের আইনকানুনগুলিও একপেশে। এই আইন মানতে গিয়ে কে কাকে ছেড়ে যাবে, আর কার জীবন কোন আইনের পদাঘাতে পিষ্ঠ হবে সেটা যেনো সমাজের কোনো দায়বদ্ধতা নাই। আর এর সবচেয়ে বেশী আহত হয় সমাজের নারীরা। নারী বা মহিলাদেরকে এই সমাজে সেই প্রাচীনকালের মতো আজো দেবীর সমান তুলনা করে থাকে কিন্তু আফসোস যে, এটা শুধু মন্দির আর পুজার ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। মহিলাদের সাথে আজো লাগাতার অন্যায়, নীপিড়ন, শোষন, অধিকারহীনতা আর অপরাধ ঘটে যাওয়া এটাই প্রমান করে যে, আমাদের সমাজে আমরা যে মহিলাদেরকে দেবী বলি তারা এখনো অনেক দানব দ্বারা ঘিরে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে নরক করে তুলেছে। আর এই দানবের প্রথম নাম ‘সমাজ’ আর তার আইন কিংবা ‘মনোভাব’। যে সমাজ ১৩/১৪ বছরের বালিকাকে বিধাতার ইচ্ছায় তারই সংগীকে বিচ্ছেদের কারনে একজন অপয়া কিংবা এই দোষে দোষারুপ করা হয়, সেই সমাজ প্রকৃত কোনো ভরষার স্থান হতে পারে না। সে সমাজে প্রকাশ্যে কোনো মহিলাকে পুড়িয়ে মারা, নির্যাতন করা কিংবা ধর্ষন করা হলেও আজো কেউ হয়তো এগিয়েই আসে না। হামিদা হয়তো সে রকমের একটা অদৃশ্য আগুনে প্রতিদিন পুড়ে অংগার হচ্ছিলেন।

সমাজের এই মনোবৃত্তি আর যাতনায় এবং কন্যাদায়গ্রস্থ কেরামত আলি শেষ পর্যন্ত ১৫ বছরের বিধবা হামিদাকে অন্যত্র বিয়ে দেয়ার আয়োজন শুরু করেন। হামিদার রুপের কোনো কমতি ছিলো না, আর সবে মাত্র সে কিশোরী। এক সন্তানের মা হলেও বুঝার কোনো উপায় নাই যে, তার অন্য কোথাও একবার বিয়ে হয়েছিলো। ফলে, খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হয় নাই কেরামত আলিকে। পুরুষ শাসিত সমাজে সব আইন পুরুষেরাই তাদের নিজের সুবিধার কারনে বানায়। এখানে ১৫ বছরের কিশোরীর সাথে ৪০ বছরের বৃদ্ধার বিয়েও কোনো দৃষ্টিকটু নয়। কিংবা কোনো এক প্রতাপশালি ধনী ব্যক্তির পক্ষেও একের অধিক কুমারী কিংবা বিধবা কিশোরীকে বিয়ে করাও কোনো দৃষ্টিকটু নয়। আর সেই প্রতাপ শালী কোন ধনী ব্যক্তি যদি সধবা হন, তাহলে তো তার যেনো বিয়ে করা একটা বৈধ লাইসেন্সের মতোই। হামিদার জীবনে এমনই এক সুপুরুষ-হোসেন আলী মাদবর প্রবেশ করলেন। এই হোসেন আলী মাদবর কোনো কাল বিলম্ব না করে অনেক ঘটা করে বিধবা হামিদাকে বধু হিসাবে নিয়ে আসে তারই সংসারে যেখানে রয়েছে হামিদার থেকেও বয়সে বড় আরো তিনটি পুত্র সন্তান আর চারটি কন্যা সন্তান। কেউ কেউ হামিদার থেকে বয়সে এতো বড় যে, কারো কারো আবার বিয়ে হয়ে তাদের ও সন্তান জন্ম নিয়েছে। তবে একটা ভালো সংবাদ হামিদার জন্য ছিলো যে, তাকে সতীনের ঘর করতে হয় নাই। কারন হোসেন আলি মাদবর ছিলেন সধবা। হোসেন আলী মাদবরের আগের স্ত্রী গত হয়েছেন প্রায় বছর খানেক আগে।

হামিদার যখন প্রথম বার বিয়ে হয়েছিলো, তখন সে পিছনে ফেলে গিয়েছিলো তার খেলার সাথী, খেলার পুতুল আর শৈশবের স্মৃতি। কিন্তু এবার হামিদা ফেলে গেলো একজন অবুঝ পুত্র যে জীবনের কোনো কিছুই বুঝে না। হয়তো সে মা কি জিনিষ তাইই বুঝে না আর বিচ্ছেদ কি জিনিষ সেটা তো তার বুঝবারই কথা নয়। বিল্লাল রয়ে গেলো কেরামত আলীর তত্তাবধানে। বিল্লালের বয়স সবেমাত্র তিনও পূর্ন হয় নাই।  এখন বিল্লাল পুরুই অনাথ, শুধু তার চারিপাশে রইলো কেরামত আলী, আর তার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু এই অনাথ ‘বিল্লাল’ নামক পুত্রের এখন কি হবে? সে তো আগেই তার পিতাকে হারিয়েছে, আর আজ হারালো তার মাকে, যদিও তার মা জীবিত। মায়ের নতুন সংসারে তার জায়গা নেই।

ওই যে বললাম, স্রিষ্টিকর্তা বড়ই রহস্যময়। হামিদার বাড়ির আলুকান্দার কাছেই ছিলো আরেক গ্রাম, তার নাম ঘোষকান্দা। সেখানেই স্রিষ্টিকর্তা আরেক ধনাঢ্য এক পরিবারকে রেখেছেন অতীব মানসিক কষ্টে। তাকে ঈশ্বর সম্পদের পাহাড় দিয়েছেন, তাকে সুসাস্থ্য দিয়েছেন, আর দিয়েছেন সমাজে প্রতিপত্তিদের মধ্যে সম্মান আর যোগ্যস্থান। কিন্তু তাকে ঈশ্বর যা দেন নাই সেটা হলো কোনো উত্তরাধীকারী। সন্তানহীনা অবস্থায় মানসিকভাবে এই দম্পতি এতোটাই কষ্টে ছিলেন যে, তাদের না আছে কোনো সন্তানসন্ততী, না আছে কোনো উত্তরসুরী। এই ধনাঢ্য পরিবারের হর্তাকর্তার নাম ‘ইদ্রিস আলী’। তিনি কিংবা তার স্ত্রী সন্তান জন্মদানে অক্ষম ছিলেন কিনা কেউ জানে না, কিন্তু ঈশ্বর হয়তো অন্য কোনো নেশায় তাদের এই ঘর পরিপূর্ন খালী রেখেছিলেন এমন একজন অসহায় মানবের জন্য যার বিপক্ষে দোষারুপ করার কোনো ওজরের কমতি ছিলো না। তাদের অন্তরে ঈশ্বর সব ভালোবাসা রচিত করেছিলেন ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য, লালিত করেছিলেন এক অদম্য স্পৃহা কিন্তু সেই ভালোবাসা আর স্পৃহা বারংবার শুন্য ঘরেই বাতাসের মধ্যে হারিয়ে যেত সকাল সন্ধ্যায় কিংবা অলস দুপুর কিংবা বর্ষার কোনো ঋতুতে। কষ্ট ছিলো, আখাংকা ছিলো কিন্তু সন্তান লাভ এমন নয় যে, বাজারে গেলেন, দোকান খুজলেন আর পছন্দমত একজন সন্তান কিনে এনে তাকে বড় করতে শুরু করলেন। ইতিহাসের পাতা ঘাটলে এটা দেখা যায় যে, কারো কাছে কোনো মানুষ হয়তো খুবই অপাংতেয়, বোঝা, উপদ্রব, কেউ হয়তো তার দিকে এক নজর নাও তাকাতে পারে। হতে পারে সেই মানুষটা এক পরিবারের জন্য বোঝা, কিন্তু পৃথিবীর অন্য কোথাও কেউ হয়তো ওই অপাংতেয় মানুষটির জন্যই অধীর চিত্তে অপেক্ষা করছে কখন তার আগমন ঘটবে। তাকে পাওয়াই যেনো সমস্ত সুখ আর শান্তির উৎস খুজে পাওয়া। ঈশ্বর এই দুটো ঘটনাই পাশাপাশি ঘটাচ্ছিলেন বিল্লালকে কেন্দ্র করে।

হামিদা চলে যাওয়ার পর হামিদা যেমন মনের ভিতরে সন্তান বিচ্ছেদে কাতর ছিলেন, তেমনি হামিদার বাবা কেরামত আলীও এই অবুঝ বালককে নিয়ে শেষ পর্যন্ত কি করা যায় সেই চিন্তায় কাতর ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কেরামত আলী তার ভায়রা গনি মাদবরের সাথে পরামর্শ করে বিল্লালকে পালক দেয়ার কথা চিন্তা করলেন। আর এতেই যেনো ইদ্রিস আলীর পরিবারে নেমে আসে সেই কাংখিত শুভ সংবাদ যিনি তাকে দত্তক নিতে আগ্রহী। কালক্ষেপন না করে ইদ্রিস আলীর পরিবার যেনো সর্গ থেকে নেমে আসা এক ফুটফুটে পুত্রসন্তান লাভ করে ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে করলেন আর নিয়ে গেলেন হামিদার বুকের সবচেয়ে আদরের ধন ‘বিল্লাল’কে। হামিদার দ্বিতীয় বিয়ের কারনে হামিদার পুত্র বিল্লালকে ইদ্রিস পরিবার যেনো অযাচিত এক ধনের সন্ধান পেলেন। নিজেদের বংশমর্যাদা আর পিতৃপরিচয়ে বিল্লালকে আগাগোড়া মুড়ে দিলেন ইদ্রিস আলী পরিবার। কোনো কিছুর কমতি রাখলেন না তারা তাদের এই হাতে পাওয়া সন্তানের জন্য। কিন্তু মা তো মা-ই। সমস্ত কাজের ফাকে, নিজের অবসর সময়ে বারবারই তো মনে পড়ে হামিদার সেই নাড়িছেড়া সন্তানের জন্য। কিন্তু কি ক্ষমতা আছে তার? না সে সমাজের বিপক্ষে কিছু করতে পারে, না সে সমাজের আইনকে থোরাই কেয়ার করতে পারে। হতাশাগ্রস্থ নেশাখোরের মত ক্ষনেক্ষনেই মা হামিদা নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়তেন বিল্লালের জন্য। কখনো একাই কাদেন, কখনো একাই ভাবেন, আবার কখনবো এইকথা মনে করে শান্তি পান যে, অন্তত তার নাড়িছেড়া ধন কারো জিম্মায় ভালো আছে যারা তার এখন পিতামাতা।

হামিদার নতুন সংসারে সময়ের রেষ ধরে আমাদের জন্ম হতে থাকে একের পর এক সন্তান। আগের স্ত্রীর ঔরসে জন্ম নেয়া পুত্র-কন্যাদের পাশাপাশি হামিদার ঔরসে ক্রমেক্রমে আরো পাচ কন্যা আর দুই পুত্রের আগমন হয়। কেরামত আলী হামিদার নতুন সংসারের যেমন খোজ রাখেন, তেমনি খোজ রাখেন ইদ্রিস আলির পরিবারে দত্তক নেয়া বিল্লালেরও। হামিদা যখন বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে, তখন হামিদার সৌভাগ্য হয় তার ছেলে বিল্লালকে চোখে দেখার। মা ছেলের এই মিলন বড় সুখের বটে কিন্তু বেদনারও। ফিরে যাওয়ার দিন হামিদার চুমু খাওয়া বিল্লাল হয়তো কিছুই বুঝতে পারে না কি কারনে এই মহিলার চোখে জল আসে। বুঝতে পারে না কেনো বিল্লালের মা কিংবা তার বাবা ইদ্রিস আলী এই মহিলার কাছে এতো ঋণী। শুধু এটুকু বুঝতে পারে মহিলাটা এমন কেউ যাকে পেলে বিল্লালও খুশী হয়। হামিদা বিল্লালকে নিজের হাতে ভাত মেখে খাইয়ে দেয়, গোসল করিয়ে সুন্দর জামা পড়িয়ে দেয়, আর খুব মিষ্টি করে মাথার চুল আচড়ে দিয়ে কখনো কখনো তার বুকে মাথা রাখতে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। হয়তো এই আদরগুলি বিল্লালকে বারবার মহিলার প্রতি বিল্লালের আকর্ষন বাড়িয়ে দেয়। যেদিন হামিদা আবার তার সংসারে চলে যায়, বিল্লালেরও খুব মন খারাপ হয়। (চলবে) 

৮/০১/২২- জাহাঙ্গীরের পেপার কাটিং

আমার কোর্ষমেট মেজর অবঃ প্রাপ্ত জাহাঙ্গীর এক সময় ইউএন এ জব করতো। হটাত করে সে কেমন যেনো রেডিক্যাল মুসলিমে পরিনত হয়ে গিয়েছিলো। ব্যাপারটা আমরা ওকে অনেক সময় ধরে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, আসলে সে যেটা ভাবছে সেটা একটা মেন্টাল ডিস অর্ডার। এই কনভিন্স করার পিছিনে সবচেয়ে কাছে ব্যক্তি ছিলো আমার আরেক কোর্ষমেট মেজর ইকবাল (নিপু)। শেষ পর্যন্ত জাহাংগীর ওর ভুলট বুঝতে পেরেছে এবং এখন নেপালে থাকে, খুব সাদাসিদা জীবন। 

জাহাঙ্গীর সেই সময়ে যে পাগলামিটা করেছিলো, তার পরিপ্রেক্ষিতে একটা নিউজ পেপার কাভারেজ হয়। সেটা এটাঃ 

০৭/০১/২০২২-দ্বৈত জীবন-৩

আমার জীবনেও এমন একটা অধ্যায় আছে, যেটা কেউ জানে না। আর আমি বেচে থাকাকালীন কেউ জানবে না। আমার মৃত্যুর পরেও কেউ সেটা জানতে পারবে না। এ রকমটাই আমি ভাবতাম। কখনো কখনো আমরা শুনি সেটা শুধু গল্পে হয়, বাস্তবে নয়। কখনো কখনো আমাদের চোখে যেটা দেখা যায় সেটা সব সময় সত্যি হয় না। এটাও হতে পারে সেটা সত্যি একটা প্রতিচ্ছবি। যখন নিঃসঙ্গতা কাউকে অনেক বেশী কুড়ে খায়, তখন দরকার হয় একজন সঙ্গীর। যখন ওই সঙ্গীর নেহায়েত প্রয়োজন হয় অথচ তাকে সংগী করা যায় না, তখন সে কিছু একটা তো করেই। আর সেটা যে কেউ শুনলেও কখনো বিশ্বাস করবে না, অথচ ব্যাপারটা সত্যি। আর যখন কেউ সেই সত্যিটা জেনেই যায়, তাহলেও আর সাফাই দেয়া উচিত নয়, অথবা তারপরেও যদি সাফাই দিতেই হয়, তাহলে সাফাইটা হবে ঠিক সেই ব্যক্তিদের মতো যারা পলিটিক্যাল কর্মী আর পলিটিক্যাল নেতার মতো। সবাই হয়তো জানেই না যে, পলিটিক্যাল কর্মী আর পলিটিশিয়ানের মধ্যে কত পার্থক্য থাকে। পলিটিক্যাল কর্মীরা স্রেফ কাজ করে থাকে, কিন্তু রাজনেতা রাজনীতি করে। যদি এর মধ্যে কেউ ফেসে যায়, তাহলে তারা যেনো কেউ কাউকে চিনেই না এমন একটা যোগ বিয়োগের খেলা চলে।

সবাই আসলে সব কিছু জানে না, জানার উপায়ও নাই। বেশীরভাগ সময়ে কোনো মানুষই তার নিজেকেও সে জানে না। তার ক্ষমতা, তার ব্যবহার, তার অন্যান্য বইশিষ্ঠ!! পরিস্থিতি আর সময় অনেক সময় সেটা এমন করে বদলে দেয় যে, যখন কোনো ঘটনা ঘটে যায়, তখন নিজেও বুঝতে পারে না এটা কি করে ঘটলো। কখন এর শুরু হয়েছিলো আর সেটা কিভাবে শেষ করতে হয়। এই পুরু পৃথিবীতে কেউ নিজেকে নিজেই সবটা জানে না। বিশেষ করে সেই মুহুর্ত গুলি যেখানে ঠিক আর বেঠিকের সীমানা, ন্যায় আর অন্যায়ের সীমানা, অথবা সত্য আর মিথ্যার সীমানা। মাঝে মধ্যে এই সীমান অতিক্রম করা হলো নাকি সীমার মধ্যেই আছে, সেটাই নির্ধারন করা সহজ হয় না। তাহলে অন্য কেউ জানবে কিভাবে? যখন শান্ত মনে অন্তর একদম শীতল থাকে, তখন শুধু এটাই মনে হয় যে, কি করছি, কি করছি না, কি করা উচিত আর কি করা উচিত না, এসব নিয়ে অনেক প্রশ্ন জীবনে হাজির হয়। যার সঠিক উত্তর মাঝে মাঝে পাওয়া যায় বটে কিন্তু পরক্ষনেই ওই যে আবার নিঃসঙ্গতা!! সেটা সব উলট পালট করে দেয়। তখন আর উত্তর গুলিকে আর নিজের মনে হয় না।

আমি মানুষকে বুঝতে পারি, কাউকে দেবী বা ডাইনী রুপে ভাবি না। সবচেয়ে কাছের মানুষেরাই নিজের মানুষকে ঠকায়। অপরিচিতরা কখনো ঠকাতে না পারে, না বেঈমানী করতে পারে। তারা হয়তো ক্ষনিকের জন্য কিছু সম্পদের লোভে প্রতারনা করতে পারে কিন্তু কাছের মানুষেরা করে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি যা না চোখে আগে থেকে দেখা যায়, না বুঝা যায়।

এই দ্বৈত জীবনের সবচেয়ে বড় গুন যে, ডান হাত জানে না বাম হাত কি করছে। একটা জীবনের দুটু আলাদা আলাদা অধ্যায়। একে অন্যের অপরিচিত এই অধ্যায় গুলি। এই দুটি জীবনের মধ্যে যখন একটা জীবন অতি দুঃখে কষ্টে ভরে উঠে, তখন এটা কখনোই সম্ভব নয় যে, অন্য জীবনের এর প্রভাব ফেলবে না।

এভাবেই চলে জীবনের সব ধারাগুলি।

৬/০১/২০২২-কনিকা এবং হাবীব ভাই

গত ১১ আগষ্ট ২০২১ তারিখে আমার ছোট মেয়ে কনিকা ইউ এম বি সি তে হায়ার এজুকেশনের জন্য আমেরিকায় গিয়েছে। আজ প্রায় ৫ মাসেরও বেশী পার হয়ে গেছে। একটা ব্যাপার আমি খুব করে ভাবি যে, শেষ মুহুর্তে কনিকার স্টেট সিলেকশনে আমি একটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলাম। প্রথমে আমি আমার বড় ভাই যেখানে থাকেন, বোষ্টন, সেখানকার সব গুলি ইউনিভার্সিটিতে কনিকাকে এপ্লাই করতে উপদেশ দিয়েছিলাম এই ভেবে যে, ওখানে আমার বড় ভাই থাকেন এবং তিনি নর্থ ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটির খুবই নামকরা টিচার এবং প্রফেসর। আমার ভাবনা ছিলো যে, ওখানে যেহেতু আমার বড় ভাই আছেন, ভাবী আছেন, সেক্ষেত্রে কনিকার কোনো সমস্যা হলে বা প্রয়োজনে সর্বদা কনিকা ওর চাচাকে পাবে। হতাত একদিন মিটুল, আমার স্ত্রী, বল্লো, আচ্ছা যদি এমন হয় যে, হাবীব ভাই এসব করতে না পারলো কিংবা কনিকা একটা উটকো ঝামেলায় পরিনত হয় ভাইয়ার কাছে, তখন তো একটা বিপদ হবে। ব্যাপারটা আমি মোটেই সহজ ভাবে নেই নাই বরং ব্যাপারটা নিয়ে আমি সিরিয়াসলি ভেবেছি। এর একটা কারন ছিলো। কারনটা হলো, হাবীব ভাই কোনো কিছুর মধ্যেই বেশীদিন স্থির থাকতে পারেন না। যখন কোনো বিষয় নিয়া উনি একবার মাতেন, সেটা প্রথম কয়েকদিন খুব ব্যস্ত থাকেন এবং এক সময় সেটায় তিনি আর ইন্টারেষ্ট পান না এবং সেটা অচিরেই পরিত্যাগ করেন। এতে কার কি হলো আর কি হলো না তাতে তার কিছুই যায় আসে না। ভরষা করার মতো লোক না তিনি।

আমি ততক্ষনাত কনিকাকে বললাম, বাল্টিমোর এরিয়ায় ইউনিভার্সিটি সিলেক্ট করো কারন ওখানে মিটুলের প্রায় শতাধিক মানুষ বাস করে। কেউ না কেউ কোনো না কোনো উপায়ে কনিকাকে কোনো কিছুর জন্যে সাহাজ্য করতেই পারবে। এটা যে কি একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আজ সেটা ভাবতেই ভালো লাগে।

এই পাচ মাসে হাবীব ভাই কনিকাকে একটা ফোন পর্যন্ত করেন নাই। যে লোক কনিকা কেমন আছে, কি করছে, কোনো অসুবিধা আছে কিনা এটা নিয়ে একবারো ভাবেন নাই বা ভাবার সময় পান নাই, সে কি করে আমার মেয়ে কনিকার দেখভাল করবেন বা করতেন? কনিকার গাড়ি কেনার সময় ছোট ভাই যে সাহাজ্যটা করেছেন, এটা হাবীব ভাই কোনোদিন করতেন কিনা আমি জানি না, যদিও আমিই টাকা দিতাম, তারপরেও করতেন কিনা আমার জানা নাই। আল্লাহ সব কিছুর নিয়ন্তা এবং মালিক।

অন্যদিকে, আমার আরেক ভাই, বেলায়েত হোসেন, যিনি আজ থেকে অনেক বছর আগে পরলোক গমন করেছেন, তার ছেলে সেলিম এবং সেলিমের মা বাই দি বাই জেনেছে যে, কনিকা আমেরিকায় গেছে। এটা শুনে অস্থির হয়ে গেছে কখন কনিকাকে তাদের বাসায় নিয়ে যাবে। আমিও কনিকাকে ওদের বাসায়, নেভাদা, তে যেতে বলেছি। কনিকা ১০ দিনের ছুটি কাটাবে সেলিমদের বাসায়। এখন কনিকা সেলিমদের বাসাতেই আছে।

হাবীব ভাই আজ পর্যন্ত যত গুলি মানুষের জন্য ট্রাই করেছেন, সব গুলি ট্রাই ছিলো ‘ফেক’। মানুষদেরকে লোভ দেখিয়েছেন, আশা দিয়েছেন, পরে আশাহত করেছেন। যাদেরকে তিনি আশা দেন, তারা এটাকে অমুল্য অফার হিসাবে নিলেও হাবীব ভাই জানেন ঠিক কোন সময়টায় তাকে ছেড়ে দিতে হবে। আর এটাই হয়েছে খালেদা, লিজা, লাকী, লিয়াকত, সালমা, এবং আরো কিছু মানুষের ভাগ্যে। উনি এমনটা কেনো করেন? আমি বহুবার এর উত্তর খোজার চেষ্টা করেছি। বার বার মনে হয়েছে আমার কাছে যে, এটা একটা নেশা। প্রথম প্রথম নেশাটা খুবই মাত্রাতিরিক্ত হয়, পরে ধীরে ধীরে সেই নেশা কেটে গেলে জাষ্ট পরিসমাপ্তি।

১৩/১২/২০২১-ইতিহাস থেকে যারা (ফেসবুক)

ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় না, তাদের পতন বারবার ইতিহাসের সেই একই ধারায় হয়। ঘসেটি বেগমের কারনে, কিংবা মীর জাফরের কারনে, অথবা সেই মায়মুনা কুটনীর কারনেই এই পৃথিবীর অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর জীবনমান অনেক কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে গিয়েছিলো। তাদের লোভ, তাদের লালসার জিব্বা এতো বড় ছিলো যে, তারা সারাটা দুনিয়া হা করে গিলে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু তাদের পেট এতো বড় ছিলো না যে, গোটা বিশ্ব সেই পেটে ধারন করে। ফলে অধিক ভূজনের রসাতলে ন্যয্যভাবে হাতে আসা সব সম্পদ, ক্ষমতা আয়েস করার আগেই তাদের এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে অকালেই প্রান দিতে হয়েছে, অথবা মানুষের হৃদয় থেকে। আর যারা বেচে থাকে তারা ওইসব হায়েনাদের কারো কারো নামের আগে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য যোগ করে দেয়, "নিমকহারামের দেউড়ি", কিংবা "কুটনা বুড়ী আস্তনা" অথবা "হারামখোরের আস্তানা"। আজো তারা এইসব নামেই পরিচিত। কখনো দেখবেন না যে, মীর বংশের কোন বাচ্চার নাম জাফর রাখা হয়েছে। যদিও জাফর বড্ড সুন্দর একটা নাম। কিন্তু মীরজাফর একটা কুলাংগারের নাম। ওর বংশধরেরা আজো তার নামে কলংকিত বোধ করে।

অথচ যুগে যুগে ভিন্ন রুপে এখনো মীরজাফরের থেকেও খারাপ মানুষ এই সমাজে আছে, ঘসেটি বেগমের থেকেও ষড়যন্ত্রকারিনী এখনো অনেক ঘরেই আছে, মায়মুনা কুটনীর মতো মোনাফেক এখনো আমাদের চারিধারে বিধ্যমান। ওদের চেনা কঠিন কারন এইসব মানুষেরা বর্নচোরার মতো আমাদের চারিদিকে একটা আবরন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ভাল মানুষের মতো। সুযোগ পেলেই ছোবল দেবে এবং দেয়, আর এদের এক ছোবলে ধংশ হয়ে যেতে পারে আমার আপনার বহুদিনের বন্ধন, বহুদিনের সম্পর্ক।

১৩/১২/২০২১-একই খবর কারো কাছে শুভ

একই খবর কারো কাছে শুভ আবার কারো কাছে অশুভ হতে পারে। একই জায়গায় মিলিত হওয়া মানুষের রাস্তা আলাদা আলাদা হতে পারে। একই পরিস্থিতিতে একজন জীবনে এগিয়ে চলে, আবার আরেকজন জীবনের অসহায় অবস্থার সাথে বোঝাপড়া করে। কেউ কেউ বিন্দু বিন্দু অর্থ সঞ্চয় করে নিজের সপ্ন পুরন করে, অন্যজন তার গড়া সপ্ন বিন্দু বিন্দু ভুলের কারনে নিরুপায় অবস্থায় জন্য তার সপ্ন ভাংতে শুরু করে।  

কোনো অপরাধই রাতারাতি জন্ম নেয় না। যখন কোনো অপরাধ হয়, তখন আমরা শুধু তার উপরের রুপটাই দেখতে পাই। কিন্তু তার শিকড় অন্য কোথাও অনেক গভীরে হয়। আর শিকড়ের সন্ধ্যান হয় পুলিশ করে অথবা কোনো সচেতন মানুষ। পুলিশ যখন তদন্ত করে তখন প্রতিটি মানুষকে সে যেভাবে দেখে তা হল, সবাই মুখোশ পড়া ক্রিমিনাল। আর তাই সে যখন আসল জিনিষ বের করতে চায়, সে কাউকেই কোনো প্রকার ছাড় দিতে নারাজ। আর এ কারনেই হয়তো অনেকেই বলে- বাঘে ছুলে ১৮ ঘা আর পুলিশ ছুলে ৭০ ঘা!!

বিদ্বেষ হিংসা ভালোবাসা আর ঘৃণা এগুলি এমন কিছু আবেগ যা প্রতিটি মানুষের মাঝে পাওয়া যায়। সুযোগ সন্ধানী হওয়াও একটা আবেগ। সুযোগ সন্ধানী হওয়া কোনো খারাপ বিষয় নয়, কিন্তু তার জন্য কিছু সীমা থাকে, কিছু নীতি থাকে। কারো ক্ষতি করে, কারো অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে মানুষ কখনো সামনের দিকে এগুতে পারে না। বাবলা গাছ লাগিয়ে যদি কেউ ভাবে তাতে ফুল ফুটবে, সেটা কোনো পাগলামোর থেকে কম নয়। অবৈধ কোনো শুরু থেকে কোনো সম্পর্ক কখনো বৈধ হতে পারে না, না পারে সেখানে কোনো বৈধ কোনো ফলাফলের আশা। খারাপ পরিস্থিতি, খারাপ মানুষ আর খারাপ ফল এগুলি থেকে পার্থক্য করা শিখতে হবে যে কোনটা আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় আর কোন বিশয়টা ব্যক্তিগত বিষয় থেকে আইনের দরজায় নিয়ে যেতে পারে। যখন কোনো মানুষের পরিস্থিতি ঠিক এটাই হয়, তখন অন্যান্য দিনের মতো সকালটা আর তেমন থাকে না যেমন ছিলো আগের কোনো সকালের মতো, না তার সন্ধ্যাটাও আগের মত পরিচিত মনে হয়। পুলিশের প্রথম কাজ হয় ‘এক শান রিপ্লে তৈরী করা’। যেখানে তারা একে একে ক্রিমিনালের সম্ভাব্য সব ক্রিমিনাল পলিসি বিরুদ্ধে পুলিশের করনীয়। ফলে পুলিশ খুব সহজেই ক্রিমিনাল প্লানের একটু এগিয়েই থাকে।

নিজেদের মধ্যে যখন কেউ হিংসা হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন আসলে সেটাই হয় যা রক্তের সাথে রক্তের পাল্লা। ক্ষতি হয় শুধু নিজেদের রক্তের। তাহলে এই খেলায় কে জিতে? কেউ না।

মহিলাদেরকে আমরা দেবীর সমান তুলনা করে থাকি কিন্তু আফসোস যে, এটা শুধু মন্দির আর পুজার ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। মহিলাদের সাথে লাগাতার অন্যায় আর অপরাধ ঘটে যাওয়া এটাই প্রমান করে যে, আমাদের সমাজে আমরা যে মহিলাদেরকে দেবী বলি তারা এমন অনেক দানব দ্বারা ঘিরে রয়েছে যারা তাদের জীবনকে নরক করে তুলেছে। প্রকাশ্যে কোনো মিহিলাকে পুড়িয়ে মারা হয়, নির্যাতন করা হয়, ধর্ষন করা হয় অথচ কেউ এগিয়ে আসে না।

আমাদের এ গ্রামে কতজন পুরুষ আর কতজন মহিলা আছে কিংবা কতজন ছেলে আর কতজন মেয়ে আছে এটা কি কোনো প্রশাসন বলতে পারবে? যদি ছেলে আর মেয়ের এই অনুপাত জানা যায়, তাহলে আমাদেরকে নজর দেয়া উচিত সেই জায়গায় যেখানে কতটুকু উন্নতি করা দরকার।

২/১২/২০২১-পায়ের নীচে পাথরহীন

জীবনের কাছে রাখা সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর যখন কারো জীবনের নাশ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেই উত্তরের শেষ পরিনতি সম্পর্কে উত্তারদাতার অনেক ভেবেচিন্তে দেয়া উচিত। আমার জীবনেও এমন একটা সময় এসেছিলো। আমার সব প্রশ্নের উত্তর হয়তোবা কারো জীবনের নাশ হবার সম্ভাবনাই ছিলো, ফলে উত্তরদাতা হিসাবে আমি কোনো উত্তরই দেওয়ার চেষ্টা করিনি। চুপ হয়ে থাকাই যেনো মনে হয়েছিলো-সর্বোত্তম উত্তর। আমি সেই “চুপ থাকা” উত্তরেই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে এমন পরিবেশটাই তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলাম যেনো “কিছুই না ব্যাপারটা”। কিন্তু “ব্যাপারটা” যতো না সত্য ছিলো তার থেকেও বেশী ছিলো “চাপ” আর এই “চাপ” তৈরী করার পিছনে যারা কাজ করেছিলো তারা আর কেহই নয়, আমার দ্বারা পালিত সেই সব মানুষগুলি যাদেরকে আমি ভেবেছিলাম, তারা আমার সব “ওয়েল উইশার্স”। কিন্তু আমার আরো কিছু মানুষ ছিলো যারা আমার জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে এমন করে জড়িয়েছিলো যারা আমার হাড় আর মাংশের মতো। আলাদা করা দুরুহ। সেই হাড় আর মাংশের মতো একত্রে মিলিত মানুষগুলি একটা সময়ে সেইসব তথাকথিত “ওয়েল উইশার্স”দের চক্রান্তে তাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে বিগড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের “সন্দেহ” টাই যেনো এক সময় তাদের অবচেতন মনে “বিশ্বাসে” পরিনত হয়। আর এই মিথ্যা “বিশ্বাসে” তাদের চারিপাশের শান্ত বাতাসগুলিও যেনো প্রচন্ড ঝড়ের চেহাড়া নিয়ে একটা কাল বৈশাখীতে রুপ নিয়েছিলো। কেউ বুঝতেই চাইতেছিলো না যে, এর শেষ পরিনতি বড়ই ভয়ংকর।

তবে আমি জানতাম সত্যিটা কি। কিন্তু ওইসব পরিস্থিতিতে আমার সব সত্য জানাটাই সঠিক এটা কাউকে যেমন বিসশাস করানো যায় নাই, তেমনি আমিও তাদেরকে বিশ্বাস করাতে চাইওনি। শুধু অপেক্ষা করেছিলাম-কখন ঝড় থামবে, কখন আকাশ পরিষ্কার হবে, আর দিবালোকের মতো সত্যটা বেরিয়ে আসবে। “সময়” পার হয়েছে, ধীরে ধীরে মেঘ কেটে গেছে, আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। গুছিয়েও ফেলেছি সেইসব ক্ষত বিক্ষত আচড়গুলি। কিন্তু আমি এই অযাচিত ঘটনায় একটা জিনিষ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম যে, মনুষ্য জীবনে আসলে কেউ কারোই নয়। আমরা বাস করি শুধু আমাদের জন্য। একা থাকা যায় না, তাই সমাজ, একা থাকা যায় না, তাই পরিবার। একা অনেক অনিরাপদ, তাই সংসার। কিন্তু এই সমাজ, এই সংসার কিংবা এই পরিবার কোনো না কোন সময় ছাড়তেই হয়, আর সেটা একাই। এই মিথ্যে সমাজ, পরিবার আর সংসারের নামে আমরা যা করি তা নিছক একটা নাটক। জংগলে বাস করলে একদিন সেই জংগল ছাড়তেও কষ্ট হয়। এরমানে এই নয়, আমি জংগলকেই ভালোবাসি। কথায় বলে-ভালোবাসা পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর অনুভুতি, আর এটা যদি বেচে থাকে তাহলে হিংসা, বিদ্বেষ থেকে মানুষ হয়তো মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যারা এই সমাজ নামে, পরিবার নামে, কিংবা সংসার নামে চিহ্নিত করে ভালোবাসার জাল বুনে থাকি সেটা আসলে কোনো ভালোবাসাই নয়। সেখানে থাকে প্রতিনিয়ত নিজের সার্থের সাথে অন্যের লড়াই। অন্যঅর্থে সেটা একটা পাগলামী, লালসা কিংবা একা বাচতে চাওয়ার অনিরাপদের একটা অধ্যায় মাত্র। অথচ আমরা প্রত্যেক মুহুর্তে আমাদের এই নিজের পরিবারকে নিরাপদে রাখার জন্য অনেক অপবাদ, অনেক ভয়ংকর বাধা আর মৃত্যুর মতো রিস্ককে বরন করে থাকি। এ সবই আসলে নিজের সার্থে।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, আমার সেই ফেলে আসা অভিজ্ঞতার আলোকে আমি ধীরে ধীরে সে সব “ওয়েল উইশার্স” দেরকে নিজের বেষ্টনী থেকে দূরে রাখার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছি। আমি একটা মুহুর্তেও সেই সব দিনের ক্ষত বিক্ষত হবার বেদনার কথা ভুলি নাই। যখনই সেই ব্যথার কথা মনে হয়েছে- আমি বারবার আরো শক্ত হয়েছি। আমি জানি কন এক সময় আবারো তাদের আমার প্রয়োজন হবে, আবারো তারা আমাকে আকড়ে ধরার চেষতা করবে, আবারো তারা তাদের মিথ্যা চোখের পানি ফেলে আমাকে আবেশিত করার চেষ্টা করবে। আমি ততোবার নিজেকে বারন করেছি-আর যেনো সেই একই ফাদে পা না বাড়াই। তাহলে সেটা হবে আমার জীবনের জন্য কালো আধ্যায়।

ওরাও হয়তো ভেবেছিলো- কোনো প্রয়োজন নাই আর আমাকে। আমি কোন দুঃখ পাইনি। শুধু ভেবেছি, খুব ভালো যে, তারাই গুটিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এই প্রিথিবীর সবচেয়ে বড় বিপত্তি এই যে, বড় বট বৃক্ষের প্রয়োজন কখনো কোনোদিন কোনো কালেই ফুরিয়ে যায় না। হোক সেটা হাজার বছরের পুরানো কোনো বৃক্ষ।

আজ সেই দিনটা এসেছে। অথচ আজ আমার সব দরজা এমন করে খিল দিয়ে আটকানো যে, না আমি খুলতে চাই, না খোলার প্রয়োজন মনে করি। পৃথিবীতে নিমক হারামের চেয়ে বড় পাপ অথবা বড় বিশ্বাসঘাতকরা আর নাই। যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কেউ আকাশ দেখে, সেই পাথকে যত্ন করে রাখতে হয়। যদি অযত্নে সেই পাথর কোথাও হারিয়ে যায় বা ব্যবহারের আর উপযোগি না হয়, তাহলে আকাশ যতো সুন্দরই হোক না কেনো, তাকে দেখার ভাগ্য আর হয় না। যদি কেউ আজিবন আকাসের জ্যোৎস্না, আকাসের তারা আর নীল আকাশের মধ্যে তারার মেলা দেখার ভাবনা থাকে, তাহলে সেই পাথকে অতোতাই যত্ন করা দরকার যতোটা মনে হবে তার মনের শখের দরকার। তা না হলে চোখের জলে বুক ভাসবে ঠিক কিন্তু কেউ তার নিজের পাথর দিয়ে তার আকাশ দেখা বন্ধ করে অন্যকে পাথর দিয়ে সাহাজ্য করে না। এতাই নিয়ম।

আজ তারা সেই পাথরটাকে হারিয়ে ফেলেছে বন্ধ দরজার অন্ধকার ঘরে। যেখানে না যায় দরজা খোলা, না যায় পাথরে পা রাখা। তোমাদের জন্য নতুন আরেক অধ্যায় শুরু। এবার এই দুনিয়াটাকে বড্ড অসহায় মনে হবে তোমাদের। তোমাদের প্রতিন মনে হবে- তোমরা কোথায় কি পরিমান ক্ষতি নিজেদের করেছো যার সমাধান কখনোই তোমাদের হাতে ছিলো না। তোমরা ভেবেছিলে- তোমাদের জন্য মায়ের চেয়ে মাসির দরদ সম্ভবত অনেক বেশী। কিন্তু এই দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত মায়ের চেয়ে মাসির দরদ কখনোই বেশী ছিল বলে এটা কেউ যেমন প্রমান করতে পারে নাই, আর এতা সত্যও নয়। যদি সেটাই তোমরা মনে করে থাকো- তাহলে আজ তোমাদের সেই মাসির কাছেই তোমাদের সমস্ত কিছু আবদার, চাহিদা, কিংবা সাহাজ্য চাওয়া উচিত যাকে তোমরা বিনাবাক্যে মনে করেছো, লিডার অফ দি রিং। দেখো, সেই লিডার অফ দি রিং তোমাদের জন্য কোনো সাহাজ্য পাঠায় কিনা। আমার দরজা তোমাদের জন্য আর কখনোই খোলা হবে না। আমি শুধু দেখতে চাই, আসলেই তোমরা কাকে চেয়েছিলে? কার উপরে তোমাদের এতো নির্ভরশীলতা ছিলো আর কার গলায় পা রেখে শ্বাস রোধ করেছিলে। আমি তো সেদিনই মরে গেছি যেদিন তোমরা আমাকে আমার অজান্তে পিছন

৫/১১/২০২১-প্যারাডাইম শিফট

যখন সাভাবিক কোনো চিন্তাচেতনা কিংবা কার্যক্রম অন্য কোনো নতুন নিয়ম বা চিন্তা চেতনা দ্বারা সম্পন্ন হতে দেখা যায়, তখন এই প্রতিস্থাপিত নতুন পরিবর্তিত চিন্তা চেতনাকেই প্যারাডাইম শিফট বলা যেতে পারে। অন্যঅর্থে যদি বলি- এটা হচ্ছে একটা মডেল, তত্ত্ব, বা দ্রিষ্টিভঙ্গি, ধারনা, কিংবা দৃষ্টান্ত যা প্রকৃত তত্ত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা মডেল থেকে আলাদা। প্যারাডাইমটা আসলেই আসল জিনিষ না, এটা একটা মানষিক ভাবনার সাথে প্রকৃত সত্যের একটা শুধু ছবি। কোনো একটা জিনিষের ব্যাপারে আমরা যা ভাবছি, বা দেখছি এর সাথে সেই জিনিষটার যে রকম প্রকৃত বৈশিষ্ট , এই দুয়ের মাঝেই থাকে প্যারাডাইম তত্তটি। এই প্যারাডাইম দিয়ে মানুষ কোনো একটা ধারনা, চিন্তা চেতনা, কিংবা কোনো একটি জিনিষের ব্যাপারে একটা ধারনা পায়।

কিন্তু প্যারাডাইম শিফট অনেক বড় জটিল। প্যারাডাইম শিফটের মাধ্যমে কোনো একটা তত্ত্ব, চিন্তাচেতনা বা দ্রিষ্টিভঙ্গি পুরুটাই পালটে যায়। একটা উদাহরণ দেই- ধরুন আপনি একটা লোকের চেহাড়া দেখে ভাবলেন যে, সে একটা নিশ্চয় ভয়ংকর সন্ত্রাসী। আপনার মন তাকে সেভাবেই ট্রিট করছে, সেভাবেই আপনি তাকে ওই খারাপ মানুষদের মধ্যে লিষ্ট করে ফেলেছেন। অনেকপরে যখন জানলেন যে, লোকটা ছিলো খুবই ভদ্র, ভালো ও খুবই অমায়িক এবং পরোপকারী। তখন আপনি অনেক মনোকষ্টে ভোগবেন। আফসোস হবে। এই যে নতুন ভাবনা আপনাকে আগের চিন্তাচেতনা থেকে হটাত করে ১৮০ ডিগ্রী উলটে গিয়ে আরেক নতুন প্যারাডাইমে নিয়ে আসছে, এটাই হলো প্যারাডাইম শিফট।

থমাস কুন তার বিখ্যাত-“দি স্রাইাকচার অফ সায়েন্টিক রেভ্যুলেশন” বই এ প্রথম প্যারাডাইম শিফট শব্দটি চালু করেন। প্যারাডাইম যার যতো বেশি নিখুত, তার প্যারাডাইম শিফট ততো কম। আর যাদের এই প্যারাডাইম কোনো কিছুর ব্যাপারে প্রায় কাছাকাছি থাকে, তারা আসলেই জ্ঞানী এবং বাস্তববাদী। বর্তমান জগতে মানুষের প্যারাডাইম অনেক অনেক সত্যের থেকে বেশী দূরে বিধায়, আমাদের সমাজে গন্ডোগোল বাড়ছে।

১৯/১০/২০২১-হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া প্রসংগে

আমি মর্মাহত, আমি আহত, আমি অসুস্থ্য। আমার কোনো ভাষা নাই কোনো মন্তব্য করার। শুধু মন খারাপ হচ্ছে, আর কষ্টে ভোগছি।  

গতকাল পেপারে দেখলাম, রংপুর পীরগঞ্জে হিন্দুদের একটি গ্রাম রাতের অন্ধকারে কে বা কারা পুড়িয়ে দিয়েছে। আমি এটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাই না যে, কে বা কারা এটা করেছে। সাম্প্রদায়িক হামলা কখনোই হটাত করে সংঘটিত হয়না। এরও একটা মাষ্টারমাইন্ড থাকে, একটা মাষ্টার প্ল্যান থাকে যা দিনের পর দিন কারো না কারো ছত্রছায়ায় সঠিক দিন তারিখ ধার্য করেই তার বাস্তবায়ন করা হয়। আমরা কি এতোটাই পিশাচ হয়ে গেছি যে, একই গ্রামে, একই এলাকায় পাশাপাশি হিন্দু মুসলিম যুগের পর যুগ একত্রে বসবাস করার পরেও শুধুমাত্র ভিন্ন মতালম্বি ধর্মের কারনে আমার সেই চেনা বন্ধু, আমার সন্তানের সেই চেনা খেলার সাথী, কিংবা যে ঠাকুরমা আমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে তার ঈশ্বরের কাছে আমার মংগলের জন্য দোয়া করেছেন, তাকে অতর্কিত হামলায় এক নিঃশ্বাসে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে পারি? একবারও অন্তরে দাগ কাটে না যে, এটা ধর্মের উপর নয়, এটা মানবতার উপর চরম আঘাত? এটা কিছু নীরিহ এবং অসহায় মানুষের উপর অত্যাচার?  

একবার ভাবুন তো, যে বাড়িগুলিতে আগুন দেয়া হয়েছে, সেখানেও আমার ছেলে-মেয়েদের মতো ছেলে-মেয়েরা রয়েছে, তাদের শখের অনেক কিছু সাজানো ছিলো, দিনের পর দিন সে তার জীবনকে সুন্দর করার জন্য কতই না সময় ব্যয় করেছে, তার স্বপ্ন বিছানো আছে সেখানে পড়তে পড়তে। ঐ বাড়িতে আমার বৃদ্ধ মায়ের মতো কিংবা আমার দাদার নানার মতো একজন মা কিংবা বাবা অথবা ঠাকুরমা রয়েছেন। কি দোষ করেছেন তারা? তারা শুধুমাত্র ভিন্ন ধর্মালম্বি বলেই কি অপরাধী? তাহলে প্যালেষ্টাইন পুড়ছে, সেটা দেখে আমাদের খারাপ লাগে কেনো? নিউজিল্যান্ডে বোমার আঘাতে মুসল্মান মরছে, সেটা দেখলে আমাদের খারাপ লাগে কেনো? তারাও তো একই অপরাধ করে যাচ্ছে। নীরিহ এবং অসহায় মুসলমানদের উপর অত্যাচার করছে। একবার ভাবুন তো, যদি ঐ বাড়িটা যারা আগুন দিয়েছে তাদের হতো, তাদের কেমন লাগতো? তার প্রিয় আদরের মেয়ে, বা ছেলে ভয়ে ধান ক্ষেতে সারারাত পালিয়ে দেখছে তাদের ঘর পুড়ছে, তাদের বই খাতা পুড়ছে, তাদের সবকিছু পুড়ে যাচ্ছে, আর তার সাথে সেও দেখছে যে বাড়িতে আগুন লাগার ধংসাত্তক পরিস্থিতি? একবারও কি তারা এসব ভেবেছে? কি নির্মম।

আমার ৫৫ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এদেশের হিন্দুরা রোজার দিনেও প্রকাশ্যে আমাদের রোজাকে সম্মান দেখিয়ে দিনের বেলায় কোনো খাবার খেতে চায় না। এদেশের হিন্দুরা অন্য দেশের হিন্দুদের মতো নয়। আমার অনেক অনেক হিন্দু বন্ধু আছে, খ্রিষ্টান বন্ধু আছে, আমার তো কখনো এটা মনে হয়নি যে, ওদের প্লেটে আমার খেতে খারাপ লাগে, না ওরা কখনো এটা ভেবেছে। আমার বাসার কোনো পারিবারিক দাওয়াতে তো কিছু মানুষ হলেও হিন্দুরা থাকেন যেমন আমি থাকি তাদের অনুষ্ঠানে। কখনো তো আমি এর কোনো ডিসক্রিমিনেশনে ভোগি নাই? আমার দূর যাত্রায় যখন কোনো হিন্দু বন্ধু বা ভাই সাথে থাকেন, আমি তো তাকেই দাড় করিয়ে কোথাও নামাজে রত হই কিংবা সেও কোনো এক মন্দিরে আমাকে পাশে দাড় করিয়ে একটু প্রনাম করে আসে। কখনো এটা আমার কাছে কোনো প্রশ্নের উদয় হয় নাই। সব ধর্মের মধ্যেই কেউ না কেউ উগ্র থাকে কিন্তু সেটা তো সামগ্রিক জনগোষ্ঠি দায়ী নয়।

আমার প্রানপ্রিয় সন্তান যখন কোথাও অসহায় অবস্থানে পড়ে যায়, আর সেই অপরিচিত স্থানে যখন সে তার পরিচিত কোনো হিন্দু মানুষের দেখা পায়, সে তো তার কাছেই ছুটে যাবে কোনো না কোনো সাহাজ্যের জন্য। সেখানে তো কোনো ধর্ম কাজ করে না? তাহলে আজ আমরা কি দেখছি? কারা তারা যারা আমারই সন্তানতুল্য বাচ্চাদের, ঠাকুরমার বয়সি মুরুব্বিদেরকে এবং তাদের আবাসস্থলে এভাবে আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দিলো। আর কি অপরাধে তাদের এই শাস্তি? কেউ যদি আমাকে আমার কোরআন ধরে শপথ করিয়েও এটা বিশ্বাস করাইতে চায় যে, শারদিয় পুজায় হিন্দুরা আমাদের পবিত্রগ্রন্থ কোরআনকে কোনো এক দেবীর পায়ের নীচে পদদলিল করেছে, আমি কস্মিঙ্কালেও এটা বিশ্বাস করতে চাই না। তারা এমন নয়। তারাও আমার পবিত্রগ্রন্থকে সম্মান করে। এসব একটা উগ্র মানুষের কাজ, আর সে কাজে অবশ্যই কেউ না কেউ মদদ দিয়েছিলো।

আমরা সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নিয়ে কথা বলি। এটাও একটা ভেদাভেদের মতো। এদেশ যেমন আমার, এদেশ তাদেরও। তারা সংখ্যায় কম এটা কোনো অপরাধ নয়। এই অপবাদ মারাত্তক অন্যায়ের যোগান দেয়। আমি অসুস্থ্য হলে তাহলে কেনো হিন্দু- মুসলমান ভেদাভেদে ডাক্তার বিবেচনা করি না? আমি স্কুল কলেজে শিক্ষা নেয়ার সময় তো হিন্দূ শিক্ষক আর মুসলমান শিক্ষকের কোনো ভেদাভেদ করি না? আমি আকাশ পথে ভ্রমনের সময় কেনো হিন্দু মুসলিম পাইলটের বিবেচনা করি না? আমি ব্যবসা করার সময় হিন্দু মুসলিম কেনো বিবেচনা করি না? আমি যখন যুদ্ধে যাই, তখন আমার পাশের হিন্দু সৈনিকের ব্যাপারে কেনো অপবাদ দেই না? আমি যখন একই নদীতে গোসলে যাই, তখন সেই নদীতে হিন্দু মুসলিমের গোসলে কেনো কোনো প্রকার অসস্থি বোধ করি না? অথচ যেই না ধর্মের কথা উঠলো, তারা সনাতন কিংবা আমার ধর্মের না, তাই তারা আমার বিপক্ষের মানুষ। এটা কোনো সুস্থ্য মানুষের চিন্তাধারা?

আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। আর সমবেদনা জানাই আমার সেসব ভাইদেরকে যাদের আমরা অনেক ক্ষতি করে ফেলেছি। তাদের এই অপুরনীয় ক্ষতি এবং ক্ষত আমরা কিছুতেই পুরন করতে পারবো না জানি, তবে আমার অনুরোধ যে, কেউ তাদের জন্য একটা তহবিল একাউন্ট খুলুন। সরকার যা পারবেন তাদেরকে সহায়তা করবেন জানি, এর সাথে আমরা যারা তাদের জন্য ক্ষত বিক্ষত হচ্ছি, আমরাও কিছুটা শরীক হতে চাই। কেউ এই উদ্যোগটা নিন আর সোস্যাল মিডিয়ায় জানান। আমরা অনেকেই আপনাদের পাশে আছি। উক্ত তহবিল দিয়ে আমরা আবার আপনাদের জীবনকে কিছুটা হলেও ক্ষত্মুক্ত করতে চাই। জানি পারবো না, তারপরেও একটা উদ্যোগ নিন কেউ।

পরিশেষে আমাদের মহানবী হযরত মোহাম্মাদ (সঃ) এর একটি হাদিস উল্লেখ করতে চাই- “সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকায় সংখ্যালঘু অমুসলিমরা আমানতের মত। যারা তাদের কষ্ট দিবে, কেয়ামতের দিন আমি তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে নালিশ করবো (আবু দাউদঃ ৩০৫২)।“  

০৯/০৯/২০২১-১০০ বছর পর আগামীকাল

আজ থেকে ১০০ বছর পর ঠিক এই সময়ে যারা বেচে আছি আমরা, তাদের প্রায় শতভাগ মানুষ আর এই পৃথিবীতেই থাকবো না। হয়তো খুবই নগন্য কিছু সৌভাগ্যবান অথবা অন্য অর্থে দূর্ভাগ্যবানও বলা যেতে পারে, তারা বার্ধক্যের বোঝা মাথায় নিয়ে ক্ষীনদৃষ্টি আর দূর্বল শরীর নিয়ে হয়তো এমন কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকবেন যা তিনি কখনো চান নাই। যার নাম ‘মৃত্যু’।

ক্যালেন্ডারের পাতা প্রতিদিন পালটে যাবে, তাঁর সাথে সাথে পালটে যাবে তারিখ, মাস, বছর এবং অতঃপর যুগ। কেউ এটাকে আমরা থামাতে পারি না, পারবোও না। আর কেউ পারেও নাই। হোক সে কোনো প্রতাপশালী সেনাপতি, হোক সে চৌকস কোনো রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনায়ক। শুধু তাই নয়, কোনো বিজ্ঞান কিংবা কোনো বিজ্ঞানিক, কোনো সর্বোচ্চ পদধারী ধার্মিক নেতা কিংবা দূধর্ষ সাহসী সন্ত্রাসী কেউ এই অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়মটাকে উপেক্ষা করে অগোচরেও পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা রাখে না।

আজ যারা পথে ঘাটে আমার পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে, তাদের কেউ হয়তো কোট টাই, কেউ হয়তো আধুনিক পোষাক আষাকে, কেউ আবার ফুটপাতে নোংরা চুলে আছেন, আমি তাদের অনেককেই হয়তো চিনিও না আবার হয়তো কাউকে কাউকে আমরা সর্বদাই দেখি, চিনি, এদের কেউও এই নিয়ম থেকে পরিত্রান পাবে না। মহাশ্মশানের সারিসারি পাথরে নাম লেখা কোনো এক নাম ফলকের মধ্যেই আমরা লুকিয়ে যাবো ঠিক সেইস্থানে যার কথা আমরা আজ ভাবতেও পারি না। সেখানে যেমন কোনো আধুনিক পোষাক বলতে কিছু থাকে না, আর না থাকে কোনো ধার্মিক ব্যক্তির আলখেল্লাটাও। অনেকের বেলায় হয়তো সেই নামফলকটাও থাকবে না। কোথায় আছেন তারা, কার জায়গায় আছেন তাঁরও কোনো হদিস হয়তো পাওয়া যাবে না। আজ যে শরীরটাকে প্রতিদিন নোংরা মনে করে দেশী বিদেশী সাবান শ্যাম্পু দিয়ে সুগন্ধী মাখছি, তখন এই শরীরের মধ্যে হাজারো পোকা মাকড়, কর্দমাক্ত মাটি, নোনা জল, অপরিষ্কার জলের সাথে ভেসে আসা দূর্গন্ধময় আবর্জনায় সারাটা শরীর ভেসে গেলেও তাকে আর সুগন্ধী কেনো, সরানোর মতোও আমাদের কোনো শক্তি থাকবে না। শরীরে মাংশ পচে গলে মিশে যাবে মাটির সাথে, হয়তো কোনো এক কুকুর কিংবা শিয়াল আমাদের শরীরের হাড্ডিটি নিয়ে দূরে কোথাও অবশিষ্ঠ মাংশটুকু খাওয়ার জন্য দৌড়ে চলে যাবে অন্যত্র। কার সেই কংকাল, কার সেই হাড্ডি, এই পৃথিবীর কোনো জীবন্ত মানুষের কাছে এর কোনো মুল্য নাই।

যে ঘরটায় আমি সারাদিনের ক্লান্তি শেষে অবসাদ শরীর নিয়ে মুলায়েম বিছানায় গা হেলিয়ে দিতাম, সেই ঘরটা হয়তো থাকবে অন্য কার দখলে। যে বাগানটায় আমি প্রায়ই পায়চারী করে করে আকাশ দেখতাম, গাছ গাছালীর মধ্যে উড়ে আসা ভ্রমর কিংবা পোকামাকড় দেখতাম, সেই বাগানের দখল হয়তো এখন কার দখলে কে জানে। বাগানের গাছ গাছালীর পরিচর্যার নামে যে পোকামাকড়গুলিকে আমি বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করতাম, আমি আজ তাদের দখলে।

যে বাচ্চাদের মুখরীত কোলাহলে আমার ঘর ভরে থাকতো, যাদের আগমনে আমার মন পুলকিত হতো, আজ সেখানে অন্য কেউ মুখরীত হচ্ছে। কতই না সাবধানতায় আগলে রেখেছি সেই ঘর, সেই লন, কিংবা আমার যতো আয়েশী জিনিষ, আজ সেগুলি আমার কিছুই নয়। আমার সুন্দুরী স্ত্রী যখন তাঁর লাল শাড়িটা পরার পর কিংবা আমিই যখন নতুন কোনো একটা ড্রেস পড়ে বারবার আয়নার সামনে গিয়ে কতবার না দেখতে চেয়েছি-কেমন লাগে আমাকে, অথচ আজ সেই আমি বা আমার সেই সুন্দুরী স্ত্রী তাঁর চেহাড়া কেমন দেখায় কাফনের সেই ধবল পোষাকে সেটা দেখার কোনো পায়তারা নাই। সেই বৃহৎ আয়নাটার আর কোনো মুল্য নাই আমার কাছে। হয়তো সেখানে অন্য কেউ এখন তাঁর চেহাড়া দেখছে, হয়তো লাল শাড়ির পরিবর্তে নীল বা টাই কোট পড়া পোষাকের বদলে একটা ভেষ্ট পড়া ব্যাকব্রাস চুলের মহড়া দিচ্ছে। যে গাড়িটা প্রতিদিন আমাকে মাইলকে মাইল ঠান্ডা কিংবা শীততাপ হাওয়ায় বসিয়ে, মিষ্টি মিষ্টি গান শুনিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে গেছে, সেটা আর আমার কোনো প্রয়োজন নাই। না সে আমাকে আর খোজে।

কখন কোথায় কাকে কাকে নিয়ে অথবা আমার নায়নাতকুর আত্তীয় স্বজন স্ত্রী পোলাপান নিয়ে কবে কোথায় কি আনন্দে মেতেছিলাম, সেই ইতিহাস আর কেউ কখনো মনে রাখবে না। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কতটা পথ হেটেছিলাম, আর সেই হাটা পথে আমি কতটুকু ঘাম ঝরিয়ে চূড়ায় উঠে কি তৃপ্তি পেয়ে কি আনন্দে কতটুকু আত্তহারা হয়েছিলাম, সেই তথ্য না কেউ জানবে, না কেউ জানার কোনো আগ্রহ দেখাবে। কার সাথে কি নিয়ে আমার মনোমালিন্য হয়েছিলো, বা কে আমাকে কতটুকু ভালোবেসে কি অবদান দিয়েছিলো অথবা কার কোন আগ্রহে আমি কোথায় কি করেছিলাম, কার কারনে আমার অন্তরে জালা উঠেছিলো আর কার কারনে আমার দিন আর রাত একহয়ে গিয়েছিলো, সেই ইতিহাসের কোনো মুল্য আজ বেচে থাকা মানুষগুলির কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। না তাদের যাদের জন্য এসব ঘটনা ঘটেছে। নতুন প্রজন্ম নতুন পরিবেশ, নতুন সব কাহিনীতে ভরে থাকবে বর্তমান আর আমাদের সেই পুরাতন প্রজন্ম, কিংবা সেই তাদের পুরাতন পরিবেশের কোনো স্থান থাকবে না আজকের এই পরিবর্তীত বন্ধুমহল পরিবেশে। হয়তো কোনো এক ছোট বালিকা আমাদের কথা শুনে, অথবা ভালোবেসে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে আমার সেই সমাধিতে দাঁড়িয়ে একটু অন্যমনষ্ক হয়ে দাঁড়িয়ে পুষ্প স্তবক দিয়ে চলে যাবে। হয়তো সবার বেলায় এটা নাও হতে পারে। কিংবা জন্ম জন্মান্তরের শেষে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শেষে আমি এমন করে বিলীন হয়ে যাবো যে, সেই অবুজ বালিকার পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো আর একটা বাশী ফুলও নিয়ে আমার সেই সমাধিতে দাঁড়াবে না। কারন আমি তাদের কোনো ইতিহাসের মধ্যেই নাই। চিরতরেই বিলীন।

আজ যে সেলফীটা কত যত্ন করে তোলা হয়েছে, হাসি মাখা মুখ, চুলের বাহার, পোষাকের পরিপাটিতা সব কিছু ধীরে ধীরে সেই শতবর্ষ পরে এমন করে মলিন হয়ে যাবে, হয়তো দেখা যাবে, সেই ছবি পরে আছে এমন এক কোনায় যেখানে থাকে পরিত্যাক্ত কোনো কাগজ বা ময়লার বাক্স। কোনো একদিন সেটা হয়তো অপ্রয়োজনীয় হয়েই বেরিয়ে যাবে আমার সেই শখের ঘরের দরজা পেরিয়ে।

যে অর্থের জন্য আমি প্রতিদিন সারাটা সময় শুধু পরিশ্রমই করে গেছি, সেই অর্থ আজ আমার কোনো কাজেই আসবে না। শতবছর পরে তো আমার অর্থে গড়া কোনো এক ইমারতের কোনো একটা ইটের মধ্যেও আমার কোনো নাম বা অস্তিত্ব থাকবে না। হোক সেটা আমার পরিশ্রমে গড়া কিংবা আমার নিজের। সেখানে হাত বদলে বদলে আমার অস্তিত্তের শেষ পেরেগটুকু মেরে সেখানে হয়তো কোনো এক লোকের নাম লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যেটা আজ আমার নামে পরিচিত, শত বছর পর সেটা আমার আর নাই, না সেটা আমার নামেও অহংকার করে।

কি অদ্ভুত না?

শত বছরের হিসাবে যেমন আমি আর নাই, হাজার বছরের হিসাবে তো আমি কখনো ছিলামই না। তারপরেও আজ আমি অনেক ব্যস্ততায় দিন কাটাই আগামিকালের জন্য। অথচ আগামিকালটাই আমার না। এই পৃথিবী আমাকে কখনোই মনে রাখবে না। কারন সে আমাকে ভালোই বাসে নাই। অথচ আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম আমার জীবনের থেকেও বেশী। আর এটাই এই পৃথিবী। এই পৃথিবীর কোনো বর্ষাই আমার না, কোনো শরতই আমার না। এর গাছ পালা, এর নীলাকাশ, এর সুগভীর সমুদ্র কিংবা ঘনসবুজ পাহাড় কোনো কিছুই আমার না। আমার ঘরটাও।

শতবছর পরে, আমি এক অচেনা, নামহীন, অস্তিত্বহীন মানুষ যে আজকের দিনে বহু ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটিয়ে কিছুটা সময় এই নীল আকাশ, ঘন সবুজ পাহাড় অথবা পাখীদের কিচির মিচির শুনেছিলাম।

১১/০৮/২০২১-রক্তক্ষরন

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

১১ 

 

শরীরের কোনো কাটাছেড়া, কোনো বাহ্যিক জখম চোখে দেখা যায়, ক্ষুধা হলে খাবারের অভাবে পেট গুর গুর করে, কিংবা জ্বর সর্দি, কাশি কিংবা মাথা ব্যথা হলে তার সিম্পটম অনায়াসেই বুঝা যায় কিন্তু অন্তরের জখম কি কখনো চোখে পড়ে? অন্তরে কি কখনো জখম হয় আদৌ? আর এই অন্তরটাই বা শরীরের কোন অংগ? এটা কি এমন কোনো জিনিষ যা মাংশ বা হাড় কিংবা এমন কিছু দিয়ে এর গঠন কাঠামো?

সমস্তটা হৃদপিণ্ড তার স্টকে থাকা রক্ত যখন শরীরের সর্বত্র তার নিয়মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় সেটাকে বলে সুস্থ্যতা। কিন্তু সেই একই রক্ত যখন তার নিয়মের বাইরে গিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে সেটাকে হয়তো বলে দূর্ঘটনা। কিন্তু একই ধমনী, একই শিরায় যখন সেই একই রক্ত একই নিয়মে প্রবাহ হয়, তারপরেও মনে হয় কোথায় যেনো একটা ক্ষরন হচ্ছে, তাহলে এটাকে কি বলে? হয়তো সাহিত্যিকরা বলবেন- এটাকে বলে কষ্ট, এটা হয়তো বেদনা কিংবা হয়তো কেউ বলবেন এটা একটা খারাপ অনুভুতি। তাহলে এই রক্তক্ষরন হয় কোথায়? শিরায়? ধমনীতে? শরীরের কোনো অংগে? আর এই ক্ষরণ হলে কি হয়? আসলে রক্তক্ষরনটা হয় অনুভুতির ভিতরে, ওই সেই অন্তরে যার উপস্থিতি আজো কেউ খুজে পায়নি, বা হাত দিয়ে ধরে দেখেনি। একেবারে ভিতরে, অদৃশ্য। অথচ অনুভুতির এই ভিতরটা কেউ দেখে না। বাইরের চোখে যা দেখা যায়, সেটা ভিতরের অবস্থা না। সত্যটা সবসময় থাকে ভিতরে। আর এই সত্যকে মানুষের কোনো অংগ, না তার হাত, না তার পা, না তার শরীর প্রকাশ করে। এই অদেখা রক্তক্ষরনে হাত অবশ হয়ে যায় না, পা নিস্তব্ধ হয়ে উঠেনা বা কান বধির হয় না। শুধু চোখ সেটাকে লুকাতে পারে না বলে অনবরত সেই নোনা জল দিয়েই হয়তো বলতে থাকে, কোথাও কিছু জ্বলছে, কোথাও কিছু পুড়ছে, কোথাও কিছু ক্ষরন হচ্ছে। না ঠান্দা জল, না কোনো বেদনানাশক ঔষধ না কোনো থেরাপি এই ক্ষরনকে থামাতে পারে। কিন্তু যার চোখ নাই, তারও কি এই ক্ষরন হয়? হ্যা, হয়। তারও এই রক্তক্ষরন হয়। হয়তো তার ভাষা একটু ভিন্ন, স্থিরচিত্তে ক্রয়াগত নীরবতা। তাহলে এই রক্তক্ষরনের সময়কালটা কত? বা কখন এর জন্ম আর কখন তার ইতি? বলা বড্ড মুষ্কিল।

যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা আরো বেশী করে দুশ্চিন্তায় ভোগায় যখন এটা জানা যায় যে, যে মানুষটি চলে গেছে সে সবদিক থেকে অশান্তিতেই ছিলো। এমন অবস্থায় এমনটাই বারবার মনে প্রশ্ন আসে, যে, জীবনের কাছে হেরে যাওয়া মানুষটি আবার মনের কষ্টে কোনো ভুল পদক্ষেপ না নিয়ে বসে। শুরু হয় রক্ত ক্ষরনের প্রক্রিয়া। এই ক্ষরণ অজানা আতংকের।

আবার যখন কোনো মানুষ সবার সামনে থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে চিরতরে ভিন্ন জগতে চলে যায়, তখন দুসচিন্তার প্রকারটা হয়তো অন্য রকমের কিন্তু তারপরেও রক্তক্ষরন হয়। আর সেই ক্ষরণ কখনো ভরষার অভাবের অনুভুতি কিংবা মাথার উপরে থাকা কোনো বট বৃক্ষের অথবা কখনো এটা হয় নিঃসঙ্গতার।

কিন্তু জেনে শুনে, প্রকাশ্যে সবার সামনে দিয়ে যখন বড় কোনো সাফল্যের উদ্দেশ্যে নিজের অতীব প্রিয়জন জীবন্ত চলে যায়, হাসিখুশির অন্তরালে তখন যেনো চলতে থাকে মেঘ-বৃষ্টির খেলা। চলতে থাকে দোদুল্যমান এক অনুভুতি। হাসিখুশি চোখের পাতায়ও তখন দেখা যায় সেই রক্তক্ষরনের এক বেদনাময় কষ্টের অনুভুতি। এই রক্তক্ষরনের প্রধান কারন হয়তো শুন্যতা। তখন যেদিকে তাকাবেন, দেখবেন, সব কিছু ঠিক আগের মতোই আছে, শুধু নাই সেখানে যে বিচরন করতো সেই মানুষটা। তার ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়, ওই তো মানুষতা গতকাল ও ওখানে বসেছিল, ওই যে কাপড় টা বাতাসে ঝুলছে, সেটা এখনো সেখানেই ঝুলছে, অথচ সেই মানুষতা আজ ঠিক ওইখানে নাই। আছে অন্য কোথাও, চোখের দৃষ্টির অনেক বাইরে। আর এই দোদুল্যমান অনুভুতি নিয়েই আমি বিদায় জানাতে এসেছি আমার অতীব আদরের ছোট মেয়েকে আজ। বুঝতে পারছি, কোথায় যেনো পূরছে আমার অন্তর, কোথায় যেনো জ্বলছে আমার অনুভুতির সমস্ত স্নায়ুগুলি।

আমি যুদ্ধ দেখেছি, যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছি, আগুনে পূড়ে যাওয়া নগরী দেখেছি, ঘনকালো নির্জন রাতে কোনো পাহাড়ি রাস্তা ধরে একা একা হেটে পার হয়েছি। ভয় আমাকে কাবু করেনি। অথচ আজকে আমি এই শান্ত সুষ্ঠ পরিবেশে নির্মল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে যখন আমার ছোট মেয়েকে সুদুর আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে বিদায় জানাচ্ছি, তখন সারাক্ষন রক্তক্ষরনের পাশাপাশি একটা ভয়, একটা আতংক, একটা শুন্যতার অনুভুতিতে ভোগছি। কেনো জানি মনে হয়, আমার ভয় লাগছে। অথচ আমার শরীর সুস্থ্য, আমার ক্ষুধা নাই, তারপরেও কেনো জানি মনে হচ্ছে- কি যেনো আমি ভালো নাই।

আমার মেয়েটা চলে গেলো আজ। বায়না ধরেছিলো-আমেরিকা ছাড়া সে আর কোথাও পড়াশুনা করবে না। সন্তানরা যখন বায়না করে, জেদ ধরে, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মা বাবা সেটাকে পুর্ন করার জন্য দায়িত্ত পালন করেন। আমিও সেই বায়নাটা হয়তো পুরন করছি আজ। কিন্তু সেই জিদ বা বায়না আদৌ ঠিক কিনা বা বায়নাটা আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা অনেক ক্ষেত্রে আমরা মা বাবা সেটা বিচার করি না। সন্তান কষ্টে থাকুক বা দুঃখ নিয়ে বড় হোক অথবা তার নির্দিষ্ট পথ থেকে হারিয়ে যাক, তাতে মা বাবা এক মুহুর্ত পর্যন্তও শান্তিতে থাকে না। মা বাবা সবসময় তার সন্তানদেরকে সবচেয়ে ভালোটাই দেয়ার স্বপ্ন দেখে। আসলে সন্তান যতো বড়ই হোক আর বৃদ্ধ, মা বাবার ভুমিকা থেকে আজ অবধি কোনো মা বাবা অবসর গ্রহন করেন নাই। কিন্তু তাদেরও কিছু আশা থাকে, স্বপ্ন থাকে এই সন্তানদের কাছে। আমরা বাবা মায়েরা সন্তানদের কাধে শুধু স্কুল ব্যাগ নয়, বরং মা বাবার অনেক আশা ইচ্ছাও ঝুলিয়ে দেই। হয়তো এটাও সেই রকমের একটা বায়না থেকে আমার দায়িত্ব পালনের পর্ব যেখানে একটা সফল, উজ্জ্বল আর সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্য আমি অন্তরের রক্তক্ষরনের মতো বেদনাটাও ধারন করছি। আমি জানি, সব সাফল্যের একটা মুল্য থাকে যেটা কাছের মানুষকেই জোগাতে হয়। আর হয়তো এটা সেটাই।

তবে একটা কথা ঠিক যে, আজকের এই অদেখা কষ্টের রক্তক্ষরনের ইতি বা যবনিকা হয় তখন যখন যে মানুষটির জন্য রক্তক্ষরনের জন্ম, সে যখন জীবনের পাহাড় বেয়ে জয় করে সামনে দাঁড়ায়। তখন আজকের দিনের রক্তক্ষরনের সাথে মিশ্রিত হাসিটায় শুধু ভেসে থাকে হাসিটাই। যেমন পানি আর তেলের মিশ্রনে শুধু ভেসে থাকে পানির চেয়ে দামী সেই তেল। তখনো এই চোখ জলে ভিজে উঠে হয়তো কিন্তু তখন চোখ এটা জানান দেয় না, কোথায় যেনো কি পূরছে, কি যেনো জ্বলছে বরং প্রতিটি উচ্ছল হাসিতে ভরে উঠে আনন্দ ধারা।

আমি সেই প্রত্যাশা নিয়েই আজকের এই রক্তক্ষরনের অধ্যায় যাকে আমি যেই নামেই ডাকি না কেনো, বেদনা, শুন্যতা কিংবা আতংক তা শুধু নীরবে মেনে নিয়েই রক্ত ক্ষরনের সেই পোড়া যন্ত্রনাকে বরন করছি। তোমরা সব সময় ঈশ্বরকে মনে রেখো, নীতির পথে থেকে আর মানবতার থেকে বড় কোনো সম্পদ নাই এটা জেনে সর্বদা সেই মানবিক গুনেই যেনো থাকো, এই দোয়া রইলো।

শরতচন্দ্রের সেই বিখ্যাত উক্তিটাই আজ তোমাদেরকে বলি- ভালোবাসা শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। ‘যেতে নাহি দিবো’ মন বল্লেও বাধা দেয়ার কোনো শক্তি তখন থাকে না, না বাধা দিতে কোনো পথ আগলে রাখি, বরং মনের ভিতরের ‘যেতে নাহি দেবো জেনেও যাওয়ার সব পথ খুলে দেই সেই সাফল্যের জন্য, যা আমার চোখের মনির ভিতরে খেলা করে সারাক্ষন।

০৮/০৮/২০২১-সন্ধ্যা ৮ টা ৩২ মিনিট

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

খুব ভালো একটা খবর পেলাম আজ। আমার বন্ধু উইং কমান্ডার মাসুদকে বলেছিলাম, যেভাবেই হোক এয়ারপোর্টের জন্য আমাকে যেনো কয়েকটা ‘পাশ’ এর বন্দোবস্ত করে দেয়। কভিডের কারনে প্যাসেঞ্জার ছাড়া অন্য কোনো দর্শ্নার্থীকে এয়ারপোর্টের ভিতরে প্রবেশ করতেই দেয় না। কনিকার সাথে যাওয়ার জন্যে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ইউএস এম্বেসী সব ধরনের ভিসা (শুধু মাত্র স্টুডেন্ট ভিসা ছাড়া) বন্ধ রেখেছে, ফলে আমরা কনিকার সাথে যেতে পারছি না। এদিকে আবার কভিডের কারনে এয়ারপোর্টের ভিতরেও প্রবেশের সুযোগ নাই। যাক, শেষ পর্যন্ত আজকে আমার দোস্ত মাসুদ আমাকে ফোন করে জানালো যে, এভিয়েশনের সিকিউরিটি ডাইরেক্টর আরেক উইং কমান্ডার আজমকে বলা আছে সে আমাদের জন্য ‘পাশ’ এর ব্যবস্থা করবে। আজমের সাথে কথা বললাম, আজম খুব সমীহ করেই জানালো যে, আগামী ১০ তারিখের রাত ৯ টায় যেনো আমি ওকে ফোন দিয়ে একটা কন্ট্যাক্ট নাম্বার সংগ্রহ করি যে কিনা আমাদেরকে এয়ারপোর্টে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে। এই মুহুর্তে এর থেকে আর ভালো খবর আমার কাছে কিছুই নাই। খুব ভালো লাগলো যে, কনিকাকে আমি আর আমার স্ত্রী (উম্মিকাসহ) এয়ারপোর্টে সি-অফ করতে পারবো, ওর লাগেজ পত্রগুলি ঠিকমতো বুকিং করে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারবো। মেয়েটা আমেরিকায় চলে যাচ্ছে ৫ বছরের জন্য, পড়াশুনার খাতিরে। ইউএমবিসি (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড বাল্টিমোর কাউন্টি) তে যাচ্ছে।

আমার মনে পড়ছে যে, আজ থেকে প্রায় ৩৮ বছর আগেও আমার ভর্তি হয়েছিলো কার্স্কভাইল ইউনিভার্সিটিতে যেখানে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ চেয়েছিলেন আমি আমেরিকায় গিয়ে পড়াশুনা করি। কিন্তু যে কোনো কারনে হোক, আমার আর যাওয়া হয় নাই, আমি চলে গিয়েছিলাম আর্মিতে। আমার যে আমেরিকায় যাওয়া হয় নাই এটা বল্বো না, আমি তারপরে ১৯৯৫/৯৬ সালে হাইতির জাতিসঙ্ঘ মিশন থেকে একমাসের জন্য আমেরিকায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। তারপরে পর পর দুবার ভিসা পেয়েছিলাম মোট ৬ বছরের জন্য কিন্তু আমাকে আমেরিকা টানে নাই। আগামী ১১ তারিখে আমার ছোট মেয়ে চলে যাচ্ছে সেই সুদুর আমেরিকায়। একটু খারাপ লাগছে কিন্তু সন্তানদের সাফল্যের জন্য তাদেরকে ঘর থেকে ছেড়েই দিতে হয়, এটাই নিয়ম।

কনিকা যাতে কোনো প্রকারের আর্থিক সমস্যায় না থাকে সেজন্য আমি অগ্রিম ওর এক বছরে সমস্ত খরচ (বাড়ি ভাড়া, খাওয়া দাওয়ার খরচ, ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি, হাত খরচ, যাতায়ত খরচ, ইন্স্যুরেন্স খরচ ইত্যাদি মিলিয়ে ৩৫ হাজার ডলার দিয়ে দিলাম যাতে আমিও আর এই এক বছর ওকে নিয়ে চিন্তা করতে না হয়। সাথে সিটি ব্যাংকের একটা এমেক্স কার্ড ও দিয়ে দিচ্ছি ২ হাজার ডলারের মতো যাতে খুবই জরুরী সময়ে সে এটা খরচ করতে পারে। আগামীকাল কনিকার কভিড-১৯ টেষ্ট করাতে হবে। ফ্লাইটে উঠার ৪৮ ঘন্টা আগে কভিড টেষ্ট করে ফ্লাইটে উঠতে হয়। পজিটিভ এলে ফ্লাই করতে পারবে না। দোয়া করছি, আল্লাহ যেনো সব কিছু সহী সালামতে এটাও ইনশাল্লাহ নেগেটিভ করে দেন।

বড় মেয়েকেও ইন্সিস্ট করছি সে যেনো কনিকার মতো দেশের বাইরে (পারলে একই ইউনিভার্সিটি, ইউএমবিসি) আমেরিকায় চলে যায়। কিন্তু কোথায় যেনো উম্মিকার একটা পিছুটান অনুভব করছি। তার শখ লন্ডনে যাওয়া। যদি তাও হয়, তাতেও আমি রাজী। ওরা ভালো থাকুক, সেটাই আমি চাই।

আমি জানি একটা সময় আসবে, আমি আসলেই একা হয়ে যাবো। এমন কি আমি মিটুলকেও ধরে রাখতে পারবো কিনা জানি না। কারন যখন দুই মেয়ে দেশের বাইরে থাকবে, আমার ধারনা, মিতুলও প্রায়ই দেশের বাইরে থাকবে তার মেয়েদের সাথে। যদি দুইটা আলাদা আলাদা দেশ হয়, তাতে ওর বাইরে থাকার সময়টা বেড়ে যাবে, আর যদি একই দেশে হয়, তাহলে এক ছুটিতেই দুই মেয়ের সাথে হয়তো সময়টা কাটাবে। আমি ব্যবসা করি, আমাকে দেশেই থাকতে হবে, আর আমি দেশে থাকতেই বেশী পছন্দ করি।

বাকীটা আল্লাহ জানেন।  

স্পেসাল নোটঃ 

যে মানুষগুলি ১১ আগষ্ট ২০২১ তারিখে এয়ারপোর্টের ভিতরে আমাদেরকে এন্টারটেইনমেন্ট করেছে তারা হচ্ছেন- সার্জেন্ট জুলহাস এবং সার্জেন্ট রাসেল। আমরা সবাই ঢুকতে পেরেছিলাম আর ওরাই আমার মেয়ের জন্য সব ব্যবস্থা করে দিলো একেবারে প্লেন পর্যন্ত। রাসেল আর জুলহাসকে ধন্যবাদ দেয়ার মতো আমার ভাষা নাই। তাদের জন্য আমার এই পেজে ওদেরকে মনে রাখার জন্য ওদের কয়েকটা ছবি রেখে দিলাম। বড্ড ভালো লাগলো ওদের আথিথেয়তা। 

ওরা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অনেক সহায়তা করেছে। এয়ারপোর্টের গেট থেকে শুরু করে আমার মেয়ে কনিকাকে ইমিগ্রেশন করা এবং ওর সাথে প্লেন পর্যন্ত এগিয়ে দেয়ার পুরু কাজটাই করেছে। আমি আমার পরিবার এবং অন্যান্য সবাই অনেক কৃতজ্ঞ। দোয়া করি ওদের জন্যেও। 

০৮/০৮/২০২১-What If I were not Born

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

০৮

মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহন করার থেকে এতো সম্মান নাকি ঈশ্বর তার পাপমুক্ত ফেরেস্তাদেরকেও দেন নাই। সৃষ্টির সেরা জীবদের মধ্যে এই মানুষই নাকি সেরা। এই মানুষের জন্যই ঈশ্বর আকাশ তৈরী করেছেন, সেই আকাশ থেকে তিনি জল-বৃষ্টি বর্ষন করেন, জমির নির্মল গাছ গাছালীকে তিনি সবুজ সতেজ করে রাখেন। তিনি এই মানুষের জন্যই পাহাড় সৃষ্টি করেছেন, দিন আর রাতের তফাত করেছেন, ভালোবাসার মতো সংগী তৈরী করেছেন, অতঃপর তিনি জীবিনের বিভিন্ন স্তরে স্তরে নানাবিধ উপলব্দির জন্য সন্তান, নাতি নাতকোরের মতো মিষ্টি মিষ্টি ফুলের সংসারও তৈরী করেছেন। কি অদ্ভুত ঈশ্বরের সব সাজানো এই পরিকল্পনা। নীল আকাসের দিকে তাকিয়ে কখনো সাদা ফেনার মতো ভেসে যাওয়া মেঘ, কখনো উত্তাল মেঘের অবিরাম বৃষ্টিবরন, হেমন্তে বা শরতের দিনে বাহারী ফুলের সমাহার, পাখীদের কিচির মিচির, শিল্পির গানের মূর্ছনা, সবকিছু যেনো বিমোহিত করার মতো একটা সময়। অথচ এসব কিছু কোনো না কোনো একদিন ছেড়ে আমাদের সবাইকে চলেই যেতে হয়।

আবার অন্যদিকে যদি দেখি, দেখা যায়, এই বাহারী জীবনের সব সুখ আর আস্বাদন ছাড়াও আমাদের এই জীবনে ছেকে বসে দুঃখ বেদনা, হতাশা আর কষ্ট। জীবনের গাড়ি আমাদের জীবন-যানবহনের চাকার উপর টানতে টানতে এক সময় অনেকেই আমরা হাপিয়ে উঠি। বেদনায় ভরে উঠে কষ্টে, দুঃখে ভেসে যায় চোখের জল অথবা রাগে, অভিমানে একে অপরের হয়ে উঠি চরম থেকে চরম শত্রুতায় যেনো ভালোবাসা কোনোকালেই ছিলো না, হোক সেটা বিবাহ বন্ধনের মতো কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে, অথবা ব্যবসায়ীক কোনো অংশীদারিত্তে অথবা ক্ষমতার লড়াইয়ের কোনো যুদ্ধমাঠে।

অনেক সময় আমাদের মুখ দেখে এটা বুঝা যায় না কে সুখের বা কষ্টের কোন স্তরে আছি। ভিতরের সুখ কিংবা যন্ত্রনার উপলব্ধিকে আমরা একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করলেও সঠিক স্তরটা কখনোই প্রকাশ করা যায় না। পাখীদের বেলায় কিংবা অন্য কোনো প্রানীদের বেলায় এটা কতটুকু, সেটা আমরা না কখনো ভেবে দেখেছি, না কখনো উপলব্ধি করেছি। ওরা দিনের শুরুতে আহারের খোজে বেরিয়ে যায়, পেট ভরে গেলে কোনো এক গাছের ডালে বা পাহাড়ের কোনো এক ছোট সুড়ঙ্গে রাত কাটিয়ে দেয়। তাদের অট্টালিকার দরকার পড়ে না, ওরা ওরা কেউ কারো শত্রুতা করে না, কোন পর্বনে বিশেষ কোনো কিছুর আয়োজনেরও দরকার মনে করেনা। কবে ছুটির দিন, কবে ঈদের দিন কিংবা করে কোন মহাযুদ্ধ লেগেছিলো সে খবরেও ওদের কিছুই যায় আসে না। ওদেরও সন্তান হয়, ওরাও দলবেধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়, ওদের কোনো ভিসা বা ইমিগ্রেশনেরও দরকার পড়ে না। টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী ওদের জন্য কোনোদিন দরকার পড়ে নাই, আগামীতেও দরকার পড়বে না। ওরাও কষ্টে কিছুক্ষন হয়তো ঘেউ ঘেউ করে, কিংবা চিন্তিত হয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে চলে যায়, কিন্তু তাকে আকড়ে ধরে বসে থাকে না। ওদের সারাদিনের কর্মকান্ডের জন্য না কারো কাছে জবাব্দিহি করতে হয়, না কারো কাছে ধর্না দিতে হয়, এমনকি ওরা ঈশ্বরের কাছেও তাদের অপকর্মের কিংবা ভালোকর্মের কোনো জবাব্দিহিতা করতে হয় না। কোনো ট্যাক্স ফাইল নাই, কোনো ভ্যাট ফাইল নাই, না আছে কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, না দরকার তাদের গাড়িঘোড়ার। তাহলে তো ওরাই আসলে শান্তিতে থাকে, মানুষের থেকে অধিক।

মানুষ ছাড়া অন্য সব প্রানীকুল প্রত্যেকেই নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস রাখে কিন্তু মানুষ তার নিজের একক ক্ষমতার উপর কখনোই সে বিশ্বাস রাখে না বা থাকে না। তার দল লাগে, তার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড লাগে, তার আরো বিস্তর আয়োজন লাগে। এতো কিছুর উপরে তার আস্থা রাখতে গিয়ে মাঝে মাঝে সে নিজের উপরেও আস্থা হারিয়ে ফেলে। অথচ সে একা বাস করতে পারে না, না আবার সবাইকে নিয়েও বাস করতে চায়। অদ্ভুত এই মনুষ্যকূলের মধ্যে আমি জন্মে দেখেছি- এতো কিছুর বিনিময়ে অথচ কোনো কিছুই আমার না, এই শর্তে জন্ম নেয়াই যেনো একটা কষ্টের ব্যাপার। যদি কেউ এই পৃথিবীতেই না আসতো, তাহলে হয়তো বিধাতার কাছে এই ক্ষনিক সময়ে এতো কিছুর মাঝে পরিবেষ্ঠিত থেকে আবার চলে যাওয়া, কইফিয়ত দেয়া, ইত্যাদির দরকার হতো না, ক্ষমতার লড়াইয়ে হানাহানি, কারো বিয়োগে মন এতো উতালাও হতো না।

আজ থেকে বহু শতাব্দি আগে কিংবা অদুর অতীতে যারা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে, তারা আসলে আমাদেরই লোক ছিলো। তারা চলে গিয়েছে চিরতরে। কোথায় গেছেন, আর কি অবস্থায় আছেন সে সম্পর্কে আজো কেউ কোনো সম্যখ ধারনা কারো কাছেই নাই। অথচ যখন বেচে ছিলেন, প্রতিটি মুহুর্তে তারা ছিলেন সময়ের থেকেও অধিক ব্যস্ততায়। যখন তারা চলে যান, তারা আমাদের কাছে এমন কোনো ওয়াদাও করে যায়নি যে, তাদের ফেলে যাওয়া সব সম্পত্তির জন্য আবার ফিরে আসবেন, কিংবা এমনো নয় যে, তারা তা আর কখনো দাবী করবেন। এটা না হয় চিরতরে চলে যাওয়ার ব্যাপার হলো। কিন্তু এই জীবনে তো এমনো বিচ্ছেদ হয় যেখানে তারা আছেন কিন্তু আবার নাইও। জীবনের প্রয়োজনে ভউগুলিক বাউন্ডারীর অন্য প্রান্তে যখন কেউ অনেক দিনের জন্য চলে যান, আর তার ফিরে আসার ওয়াদা ভেংগে যায়, তখন আর তার উপরেও আস্থা রাখা যায়না। এমনি কষ্টে মানুষ ভোগের সমস্ত আয়োজনের উপরে থেকেও সেই আপনজনদের জন্য প্রতিনিয়ত হাহুতাশ করতে থাকেন। মনের কোথায় যেনো কি একটা সারাক্ষন খসখস করতেই থাকে। সেই যন্ত্রনায় তখন এমন মনে হয় যেনো- একটা দিনও ঠিকঠাক মতো কাটে না, এমন কি একটা রাতও না। তখন জেগে থাকে শুধু কিছু সদ্য জন্মানো কান্না। আর কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট। আর সেই কষ্টের কোনো নাম থাকে না, না থাকে তার কোনো বর্ননা বা রুপ। আর এই ভিতরের যন্ত্রনাটা কাউকেই দেখানো যায় না অথচ সত্যিটা থাকে এই ভিতরেই। আসলে পৃথিবীতে সম্পর্কের চেয়ে বড় কোনো সম্পত্তি নাই। এতো সুখের জীবনেও যখন এমন অনেক কষ্টের আর বেদনার নীল ছড়িয়েই থাকে, তাহলে কি দরকার জন্মের?

তারপরেও আমরা মানুষ হয়ে সৃষ্টির সেরা জীব হয়েই জন্ম নেই, নিয়েছি যেখানে অবারিত সবুজ ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার দোলা আমাদের মুখে পরশ জোগায় আবার তেমনি কখনো বিচ্ছেদের মতো যন্ত্রনা, মৃত্যুর মতো বেদনা, আবার কখনো অনিশ্চিত যাত্রার মতো দুশ্চিন্তা নিয়েই আমাদেরকে বাচতে হয়। কেউ যখন চিরতরে জীবনের নিঃশ্বাসকে স্তব্ধ করে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন, তারজন্য যতোটা না দুশ্চিন্তা আমাদেরকে গ্রাস করে, তার থেকে যখন কোনো প্রিয়জন হটাত করে সেই চেনা পরিচিত আবাসস্থল থেকে কাউকে কিছু না বলে হারিয়ে যান আর ফিরে না আসেন, তারজন্য আরো বেশী দুশ্চিন্তা আর অমঙ্গল চিন্তা মাথা ভনভন করতে থাকে। কিন্তু এরই মতো যখন কোনো প্রিয়জন জেনেশুনে জীবনের প্রয়োজনে অথবা বড় সাফল্যের আশায় একে অপরের থেকে এমন একটা বিচ্ছেদে আপোষ করেন যেখানে টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী আমাদেরকে প্রায় স্থায়ী বিচ্ছেদের স্তরে নিয়ে যায়, তখন আমাদের হাসির অন্তরালে যে বেদনা লুকিয়ে থাকে, তা তুষের অনলের মতো সারাক্ষন তাপদাহে অন্তরে প্রজ্জলিত হতেই থাকে। আশা আর সাফল্যের মতো জল হয়তো সাময়ীকভাবে তা নিবারন করে কিন্তু এই ছোট ক্ষনস্থায়ী জীবনে বারবার এটাই মনে হয়- কি দরকার ছিলো এসবের? তাকে কি আটকানো যেতো না? নাকি আটকানো হয় নাই? আসলে কোনো কিছুই দরকার ছিলো না যদি না আমার জন্মই না হতো এই মানুষ হিসাবে। তখন না দরকার হতো এই বিচ্ছেদের, না প্রয়োজন হতো এই দিনরাতের কষ্টের অথবা না দরকার পড়তো অন্তর জালার তাপদাহের অনুভবতার। তখন কেনো জানি বারেবারেই মনে হয়- What If I were not born?  

করোনার প্রাদূর্ভাবে চেনা পরিচিত সব মানুষ যেনো ধীরে ধীরে চোখের সামনে থেকে একে একে যেনো বিনা নোটিশে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। এই সেদিন যার সাথে এক টেবিলে বসে হাসাহাসি, আড্ডা, কথা কাটাকাটি, অথবা দল বেধে গায়ের কোনো মেঠো পথে বাচ্চাদের মতো হাটাহাটি করেছি, তার কিছু মুহুর্তের পরই সংবাদ আসে, আর নেই। চলে গেছে। ব্যাংকের টাকা, বিশাল ব্যবসা, কিংবা গাড়ি বহরের সব যাত্রা কোনো কিছুই যেনো তার সামনে দাড়াতে পারছে না। অথচ তাকে না দেখা যায়, না ছোয়া যায়। কখন সে কার সাথে একান্তে বাস করা শুরু করে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আতংকে আছে মন, অসুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে শরীর, ভাবনায় ভরে যাচ্ছে সারাটা মাথা। অথচ দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, মনের আনন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে পাখীরা, শুধু বন্দি হয়ে আছি আমি “মানুষ”। বারবার মনে হচ্ছে- কোথায় যেনো কি ঠিক নেই, কি যেনো কোথায় একটা গড়মিল হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে না। কেনো এমনটা হচ্ছে বারবার?

আসলে কোন কবি যেনো একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন- মানুষ হয়ে জন্মই যেনো আমার আজীবনের পাপ। তাই আমারো মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে- What If I were not even born!!

০৭/০৮/২০২১-কনিকার মাত্র ৩দিন বাকী

উচ্ছিষ্ট সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

৭ 

প্রায় সবগুলি কাজ শেষ। ভিসা আগেই হয়ে গিয়েছিলো, টিকেটও কেনা আছে, টিউশন ফি গতকাল পাঠিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। ভ্যাক্সিনেশন যা যা নেয়া দরকার ছিলো, সবই সম্পন্ন করা হয়েছে। ব্যাগপত্র, মালামাল সব কিছুই প্যাকড হয়ে গেছে, আগামী এক বছরের আর্থিক জোগানও শেষ, এখন বাকী শুধু করোনা টেষ্ট আর ফ্লাইটে উঠা। আগামী ১০ তারিখের দিবাগত রাত অর্থাৎ ১১ আগষ্ট এর ভোর বেলায় কনিকার ফ্লাইট। মাত্র তিনদিন বাকী। কনিকার চলে যাওয়ার শুন্যতাটা এখন মাঝে মাঝে অনুভব করছি, উম্মিকা রীতিমত প্রায় প্রতিদিনই কান্নাকাটি করছে কনিকা চলে যাবে বলে। কনিকা এখনো খুব একটা মন খারাপ করছেনা তবে বুঝা যায় সে একটা দুদোল্যমান অনুভুতিতে ভোগছে। কারন একদিকে কনিকা আমেরিকা যাওয়ার ব্যাপারে বেশ খুসী, অন্যদিকে বাড়ি ছাড়ার কষ্ট। মিটুলের অবস্থাটাও প্রায় ওই একই রকমের। আর আমার? আমার শুধু একটাই ভয়, ওরা যেনো ভালো থাকে যেখানেই থাকুক। মন তো খারাপ হচ্ছেই। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। আমি মেনে নিয়েছি বাস্তবতা।

 বাড়িটায় সারাক্ষন কনিকাই মাতিয়ে রাখতো, বাসায় যতো কথাবার্তা, যতো হইচই কনিকাই করতো। এই পরিবেশটা মিস করবো আমরা। অফিস থেকে আমি বাসায় আসার পর প্রথমেই আমি ঢোকি সাধারনত কনিকার রুমে আর তার সাথে উম্মিকার রুমে। ইদানিং উম্মিকা ডেল্টা মেডিক্যালে জব করে বলে, প্রায়ই আমি খবর নেই মেয়েটা লাঞ্চে খাবার খেয়েছে কিনা বা রাত সাড়ে আটটা বাজলেই মনে করিয়ে দেই, উম্মিকাকে আনতে গাড়ি গেছে কিনা।

আমি জানি, কনিকা যেদিন আমেরিকার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হবে ইনশাল্লাহ, সেদিন আমার ভিতরে কি কি ঘটবে কিন্তু মনকে শক্ত করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। যতোক্ষন না কনিকা তার ডেস্টিনেশনে গিয়ে পৌছায় ততোক্ষন আমি জানি ওর ফ্লাইট মনিটর করতে থাকবো। যখন আল্লাহর রহমতে কনিকা আমেরিকায় ওর ডেস্টিনেশনে পৌঁছাবে, হয়তো তখন একটু ভালো লাগবে যে, ওখানেও অনেক আত্তীয় স্বজনেরা আছেন যারা কনিকাকেও অনেক ভালোবাসে, তারা দেখভাল করবে।

কনিকা অনেক খুতখুতে। কিন্তু গোছালো। ওর কোনো কিছুই অগোছালো থাকে না। কোন একটা জিনিষ এদিক সেদিক হলেই ওর সেটা ভালো লাগে না। মেজাজ খারাপ করে। ফলে ভয় পাচ্ছি, নতুন পরিবেশে কতটা দ্রুত কনিকা এডজাষ্ট করতে পারে। ওখানে কনিকাকে সব কিছুই নিজের হাতে করতে হবে। পারবে কিনা জানি না। তবে প্রথম প্রথম কনিকা হোমসিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। এটা কাটিয়ে উঠতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

আমি কনিকা যেনো আমেরিকায় অন্তত টাকা পয়সা নিয়ে কোনোরুপ সমস্যায় না পরে, সেইটা শতভাগ নিশ্চিত করেছি (আলহামদুলিল্লাহ)। আসলে আমি ইদানিং আমার জীবনের মুল পলিসিটাই বদল করে ফেলেছি। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। যাতে আমি না থাকলেও আমার সন্তানেরা কোথাও কোন সমস্যায় না পড়ে, বাকীটা আল্লাহ ভালো জানেন। আমার জমি জমা, টাকা পয়সার এসেটের থেকে বড় এসেট আমার মেয়েরা। এদের জন্য পয়সা খরচে আমার কোনো কার্পন্য নাই। যতোটুকু আমার সক্ষমতা আছে, আমি ওদেরকে ততোটাই দিতে চাই।

গতকাল রাতে প্রথম দেখলাম, উম্মিকা কনিকা দুজনেই বেশ ইমোশনাল ছিলো। ব্যাপারটা ঘটছে কারন সময়টা খুব কাছাকাছি কনিকার চলে যাওয়ার। ফলে উম্মিকাও অনেকটা খুব বেশী মন খারাপ করে আছে। চৈতী এসছে কনিকার যাওয়ার কারনে। ওরা সবাই খুব কাছাকাছি ছিলো সব সময়। ওদের বয়সের তারতম্য থাকলেও কনিকাই ছিলো যেনো ওদের সবার মধ্যে নেতা। ওর আবদার কেউই ফেলতো না।

বিমানবন্দর ঢোকার জন্য পাশ এর অবস্থা এখন খুব কড়াকড়ি। কোথাও থেকে কোনো পাশ পাচ্ছি না। ব্যাপারটা একটু হতাশার। অনেককেই বলেছি কিন্তু সব জায়গা থেকেই নেগেটিভ ফলাফল আসায় একটু আরো ভয়ে আছি। আমার দোস্ত উইং কমান্ডার মাসুদকে বলেছি যে, সিভিল এভিয়েশন আসোশিয়েসন অফ বাংলাদেশ থেকে অন্তত কয়েকটা পাশ জোগাড় করতে। ওই সংস্থার চেয়ারম্যান হচ্ছে এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান। সে আমাদের থেকে এক কোর্ষ সিনিয়ার কিন্তু আমার সাথে কখনো পরিচয় হয় নাই। যেহেতু মাসুদ এয়ার ফোর্সের, তাই একটা ভরষা মাসুদ দিয়েছে যে, সে পাশ জোগাড় করতে পারবে। কিন্তু ব্যাপারটা আমি এখনো সিউর হতে পারছি না আসলেই মাসুদ পাশ জোগাড় করতে পারবে কিনা।

কনিকা হয়তো ওর বাড়ি ছাড়ার অনুভুতিটা ঠিক এই মুহুর্তে ততোটা উপলব্ধি করতে পারছে না। কিন্তু যেদিন কনিকা স্টেপ আউট করবে, আমি জানি, ওর সবচেয়ে বেশী মন খারাপ থাকবে। যদি এমন হয় যে, পাশ একটাও পাওয়া গেলো না, তাহলে কনিকাকে একাই সব সামাল দিতে হবে। লাগেজ বুকিং, বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ, চেক ইন, ইত্যাদি।  আর যদি একটা পাশও পাই তাহলে শুধুমাত্র আমি ভাবছি মিটুলকে দিয়ে দেবো যাতে মিটুল সবকিছু ম্যানেজ করে মেয়েকে যতোদূর পারে উঠিয়ে দিতে। তা না হলে প্রশ্নের আর ইঙ্কোয়ারীর প্রশ্নে জর্জরীত হতেই থাকবো। আর যদি দুটু পাই, তাহলে সাথে উম্মিকাকে দিয়ে দেবো। আর যদি বেশী ভাগ্যবান হই, আমিও পাই, তাহলে তো আল্লাহর রহমত, আমরা অকে সবাই এক সাথে বিমানে তুলে দিতে পারবো। কনিকা কাতার এয়ার ওয়েজে যাচ্ছে ইনশাল্লাহ।

আজ শুক্রবার। ভেবেছিলাম, বাইরে কোথাও যাবো। কিন্তু কনিকাকে এই মুহুর্তে বাইরে বের করতে চাই না। চারিদিকে করোনার প্রভাব খুব বেশী। কনিকার করোনা টেষ্ট করাতে হবে ফ্লাইটে উঠার ৪৮ ঘন্টা আগে। তাই খুব একটা বের করতে চাই না কনিকাকে। তাই সবাই চিন্তা করছি- আমাদের ছাদের উপরে ঘরোয়া একটা পার্টি করবো যেখানে শুধুমাত্র আমরাই থাকবো। জাষ্ট একটা আউটিং এর মতো আর কি।

একটা সময় আসবে যেদিন আজকের এই অনুভুতিটা হয়তো আমি আগামী ৪ বছর পর যখন পড়বো, তখন আমার অনুভুতি হয়তো হবে পুরুই ভিন্ন। সফলতার গল্পে আমি হয়তো অনেক গল্প করবো এই কনিকাকে নিয়ে। আমি সব সময় উম্মিকাকেও বলে যাচ্ছি, সেও চলে যাক আমেরিকায়। তাহলে দুইবোন এক সাথে থাকলে আমিও কিছুটা ভরষা পাই। কিন্তু উম্মিকার যাওয়ার ব্যাপারটা খুব ধীর। সে মনে হয় বাইরে মাইগ্রেশন করতে চায় না।

দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোথায় আমাদেরকে নিয়ে যায়। নিশ্চয় আল্লাহ আমাদেরকে ভালোবাসেন।

০৫/০৮/২০২১-অদ্ভুত একটা স্বপ্ন

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

৫ 

সকালে ঘুম ভাংগার সাথে সাথে রাতের একটা স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। কি অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম যার মানেটা আমি বুঝার চেষ্টা করেছি বটে কিন্তু এর কোনো কুল কিনারা পাই নাই। মাঝে মাঝে আমি খুব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি- কিছু স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমি অনেক অনেক বছর পর মিলিয়ে দেখলে কিছুটা বাস্তবে মিল পাই, অধিকাংশ স্বপ্নের কথা আমার আর মনে থাকে না বটে কিন্তু মনের ভিতরে কিছু একটা খস খস করতে থাকে। আমি প্রায় ভোর রাতের দিকে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, তার কিছুক্ষন পরেই আমার ঘুম ভেংগে যায়। স্বপ্নটা ছিলো এ রকম-

আমার পার্টনারের মেয়ে আনিকা বিদেশ থাকে, সে কি কারনে অথবা কোনো উদ্দেশ্যে কাউকে সে খুন করে ফেলে। খবরটা আমার কাছে যখন আসে, তখন আমি খুব চমকে চাই যে, মেয়েটা খুবই শান্ত শিষ্ট যাকে দিয়ে এমন একটা কাজ কখনোই সম্ভব না। তারপরেও ব্যাপারটা ঘটেছে। সবচেয়ে অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে যে, আমার পার্টনার এই বিষয়টা নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন বলে মনে হলো না, না তার মেয়ে। সে দেশে ফিরে এসেছিলো ঘটনাটা ঘটার পর পরই। আমিও আর ওকে জিজ্ঞেস করি নাই, আসলে ঘটনাটা জানার পর ওর সাথে আমার আর দেখাও হয় নাই। এর মধ্যেই আমার ঘুম ভেংগে গিয়েছিলো। আমি একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছিলাম যে, ব্যাপারটা অন্য কারো সাথে ঘটেছে বলে আমিও যেনো একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম না এই ভেবে যে, এটা তো আমার পরিবারের বা আমার কোনো সমস্যা না। যাদের সমস্যা তারাই এটা নিয়ে সামাল দেবে।

আমার ঘুম ভাংগার পরেই আমি ব্যাপারটা নিয়ে বেশ অনেকক্ষন ভেবেছি যে, এমন একটা স্বপ্ন তো আমার দেখার কোনো কারনই নাই। তাহলে কেনো এমন একটা স্বপ্ন দেখলাম? বারবার মনে পড়ছিলো যে, আমার ছোট মেয়ে কনিকা আগামী ১১ তারিখে আমেরিকা যাচ্ছে। এমন কোনো সংকেত না তো যা আমাকে স্বপ্নের মধ্যে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হলো? আল্লাহর কাছে আমি প্রার্থনা করি যেনো এমন কোন খবর কাউকেই পেতে না হয়, হোক সেটা আমার বা আমার পরিচিত কোনো লোকের। আল্লাহ আমাদের সমস্ত বালা মুসিবত দূর করে দিক, এই দোয়া করছি।

কনিকার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি আমেরিকায় চলে যাওয়ার। ব্যাপারটা এখনো উপলব্ধিতে আসে নাই যে, সে অনেক বছরের জন্য আমেরিকায় চলে যাচ্ছে। আমি জানি, যেদিন সত্যি সত্যিই কনিকা চলে যাবে আমেরিকায়, সেদিন আমার স্ত্রী, উম্মিকা বা ওর সাথে যারা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত, তাদের সবার মন খারাপ হবে, কান্নাকাটি করবে। কনিকা নিজেও মন খারাপ করবে। আমার তো হবেই। আমি তো ওকে খুবই মিস করবো। কিন্তু নিয়তির এটা একটা চক্র যে, সন্তানেরা বড় হলে পৃথিবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সাথে পিতামাতার সম্পর্ক থাকে বৈ কি কিন্তু তারা তাদের কাছে খুব কমই থাকে। কনিকা যেখানেই থাকুক, বা উম্মিকা, তারা যেনো ভালো থাকে আমি সব সময় এই দোয়াই করি।

২১/০৭/২০২১-ঈদুল আজহা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২১ জুলাই 

 

 

আজ পালিত হলো ঈদুল আজহা।

এই দিনটা এলে সবচেয়ে আগে যার কথা আমার বেশী মনে পড়ে তিনি হচ্ছেন-আমার মা। মা বেচে থাকাকালীন আমি কখনো শহরে ঈদ করিনি কারন মাও ঈদের সময় গ্রাম ছাড়া ঈদ করতেন না। মা যেহেতু ঈদে গ্রামে থাকতেন, আমিও গ্রামেই ঈদ করতাম। আমি সব সময় ভাবতাম-একটা সময় আসবে, মাকে ছাড়াই আমার ঈদ করতে হবে জীবনে, তাই যে কতগুলি সুযোগ পাওয়া যায়, মায়ের সাথে ঈদ করাটা ছিলো আমার সুযোগের মতো। বাড়িতেই কুরবানী করতাম। ঈদের আগে আমি ইসমাইল ভাই অথবা রশীদ ভাইকে টাকা পাঠিয়ে দিতাম যাতে আগেই গরু কিনে রাখেন। ফাতেমার স্বামী সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু ভাইকে আমি কখনোই কুরবানীর গরু কেনার দায়িত্তটা আমি দিতাম না কারন তার উপরে আমার টাকা পয়সা নিয়ে আস্থা ছিলো না। কেনো তার উপরে আস্থা ছিলো না, সে কাহিনী বিস্তর, আজ না হয় এখানে নাইবা বললাম। গরু কেনার ব্যাপারে আমার একটা পলিসি ছিলো যে, মেহেরুন্নেসা (অর্থাৎ আমার ইমিডিয়েট বড় বোন সব সময় গরু পালতো। আমি ইচ্ছে করেই রশীদ ভাইকে বলতাম যাতে ওর গরুটাই আমার জন্যে রেখে দেয়। আমি কখনোই সেটার দাম করতাম না। এই কারনে করতাম না, মেহের যে কয় টাকায় বিক্রি করলে খুশী হয় সেটাই হোক আমার আরেকটা সাহাজ্য। মেহের খুব ভালো একটা মেয়ে।

আজ সেই কুরবানীর দিনটা চলে গেলো। শুনেছিলাম, একটা গরু মোট সাত জনের নামে কুরবানী দেয়া যায়। ফলে আমি সব সময় এই সু্যোগে যে কাজটা করি, তা হলো- এক ভাগ দেই আমি আমার প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মাদ (সঃ) এর নামে, আর বাকী ৬ ভাগ দেই-আমার, মিটুল, আমার ২ মেয়ে, আমার বাবা আর আমার মায়ের নামে। এটাই আমার কুরবানী দেয়ার পলিসি। আজো তাইই করলাম। গরু জবাই, মাংশ কাটাকাটি আর বিলানোর কাজটা আমি নিজ হাতে করি। ৩ টা ভাগ করি, একটা ভাগ নীচেই বিলিয়ে দেই, বাকী ২ ভাগের এক ভাগ আমি রাখি আলাদা করে সমস্ত আত্তীয় সজন আর পাড়া পড়শীর জন্য, আর এক ভাগ থাকে আমার পরিবারের জন্য।

এই কুরবানী এলে আমার আরো একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সেই ১৯৭৬-৭৭ সালের কথা। আমাদের তখন কুরবানী দেয়ার মতো পরিস্থিতি ছিলো না। আমি মাত্র ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ি, আমাদের বাড়িতে ৫ বোন আর মা আর আমি। আমার বড় ভাই তখন সবেমাত্র আমেরিকা গেছেন। আমাদের সব ভরন পোষনের দায়িত্ত আমার বড় ভাইই করেন। কিন্তু শেয়ারে কুরবানী দেয়া কিংবা আলাদা কুরবানী দেয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিলো না। ফলে এই কুরবানীর দিন আমার খুব অসস্থি হতো। অসস্থি হতো এই কারনে যে, আমরা না কারো কাছ থেকে মাংশ চেয়ে আনতে পারতাম, না আমাদের সামর্থ ছিলো কুরবানী দেয়ার। ফলে দিনের শেষে যখন সবাই যার যার বাড়িতে গরুর মাংশ পাকে ব্যস্ত, খাওয়ায় ব্যস্ত, আনন্দে ব্যস্ত, তখন হয়তো আমাদের বাড়িতে ঠিক তেমনটা নাও হতে পারে। আমি এই ঈদের দিনের দুপুরের পর আর কোথাও যেতাম না, কারন আমার কেম্ন জানি নিজের কাছে খুব ছোট মনে হতো। কুরবানী দেয়াটা ধর্মের দিক দিয়ে কি, আর কি না, সেটা আমার কাছে হয়তো অনেক বড় মাহাত্য ছিলো না, কিন্তু আমি যখন দেখতাম, আমার বন্ধুদের বাড়িতে সবাই কুরবানীর গরু নিয়ে কাটাকাটিতে ব্যস্ত, বিকালে মাংশ বিলানোতে ব্যস্ত, আমার তখন মনে হতো, আমিই ব্যস্ত না। গরীব হয়ে জন্ম নেয়াটা একটা অসস্থিকর ব্যাপার। তারপরেও অনেকেই আমাদের বাড়িতে কুরবানীর পর মাংশ পাঠাইতো। বিকালে বা সন্ধ্যায় দুদু ভাই, ইসমাইল ভাই, আমাদের খালাদের বাড়ি থেকে, কিংবা জলিল মামাদের বাড়ি থেকে অথবা পাশের কোনো বারি থেকে অনেকেই মাংশ পাঠাইতো যেটা আমার কাছে একটু খারাপ লাগলেও মা নিতেন। কুরবানী বলে কথা। সবাই মাংশ খাবে, আমাদের বাড়ির মানুষেরা একেবারেই কিছু খাবে না, মা হয়তো এটা ভেবেই মাংশ গুলি রাখতেন। দিনটা চলে যেতো, আমার অসস্থির ভাবটাও ধীরে ধীরে কেটে যেতো। আবার এক বছর পর হয়তো এই অসস্থিটা আসবে।

যেদিন আমার ক্ষমতা হলো কুরবানী দেয়ার, আমি সব সময় গ্রামেই কুরবানী দিয়েছি। আর সব সময়ই আমার সেই দিনগুলির কথা মনে করেছি। আমাদের দিন পাল্টেছে, আমাদের পজিসন পাল্টেছে। মা যখন জীবিত ছিলেন, এমনো হয়েছে মাঝে মাঝে আমি দুটু কুরবানীও করেছি একা।

আজ মা নাই, আমার গ্রামে যাওয়া হয় না। কুরবানী নিয়ে এখন আমার তেমন কোনো আগ্রহও নাই। তবে সবসময় ঢাকাতেই আমি কুরবানী দেই, একা। যদি আমি কখনো কুরবানী নাও দেই, কেউ আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করবে না কারন সবাই জানে আমার একটা না, অনেকগুলি কুরবানী দেয়ার সক্ষমতাও আছে। হয়তো কোনো কারনে আমি ইচ্ছে করেই কুরবানী হয়তো দেই নাই। কেউ এটা ভাববে না যে, আমার টাকা নাই তাই কুরবানী দেই নাই। “সময়” এমন জিনিষ। সব কিছু পালটে দেয়।

৮/৭/২০২১-জীবনে হতাশ হওয়ার

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

৮ জুলাই 

জীবনে হতাশ হওয়ার কোনো কারন নাই। একদিন নিজেকে নিজেই বলেছিলাম যে, ভগবান মানুষের জন্য প্রতিটি দিন একই রকম করে কাটাতে দেন না। আজ যে রবিবার আপনি হাসছেন, আগামী রবিবার আপনি নাও হাসতে পারেন, হয়তো সেদিন আপনি হাসিতে আপনার প্রতিটি মুহুর্ত ভরে থাকবে। এই সপ্তাহটা হয়তো আপনার জন্য ভয়ানক অস্থির যাচ্ছে, কে জানে আগামী সপ্তাহটা হয়তো হবে একেবারেই সুন্দর। তাই হতাশ হবার কোনো কারন নাই। প্রতিটি ঝড় কিংবা বিপদের মাঝেও কিছু না কিছু সুসংবাদ থাকে, কিছু না কিছু ভালো জিনিষ আসে। একটা মৃত ঘড়ির দিকে তাকান, দেখবেন নষ্ট ঘড়িটাও দিনে দুবার একদম সঠিক সময় প্রকাশ করে। অপরিষ্কার জল খাবারের অনুপোযোগী হলেও সেটা আগুন নেভানোর কাজে লাগে। বোবা কিংবা বোকা বন্ধুও আপনার অন্ধ জীবনে রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারে।

তারপরেও একটা সময় আসে যখন শুধু নিজের জন্যেই নিজেকে বাচতে হয়। অন্য কারো জন্যে নয়। আমরা সামাজিক কিংবা পারিবারিক জীবনের কথা বলি। ওটা একটা শুধু কন্সেপ্ট যেখানে মানুষ একা থাকতে পারে না বলে সে এই দলবদ্ধ জীবন বা পারিবারিক জীবনটাতে থাকতে চায়। কিন্তু একটা সময়ে সবাই এই জীবনেও হাপিয়ে উঠে। সন্তান, স্ত্রী কিংবা আশেপাশের সবাই যেনো তখন এক ঘেয়েমীতে ভরে যায়। তখন কেউ কারো আদর্শ কিংবা অভিজ্ঞতাকে আর কাজে লাগাতেও চায় না, বরং যেটা নিজেরা ভাবে সেতাই যেনো পরিশুদ্ধ, আর সেটাই করতে চায় সবাই। সন্তানেরা যখন বড় হয়ে যায়, তখন তাদেরকে তাদের মতো করেই ছেড়ে দেয়া উচিত। তাদের চিন্তা ধারা, তাদের পছন্দ কিংবা আশা নিরাশা সবন কিছু তাদের মতো। তাই, আমরা যারা বড়রা তাদের জন্যে দুশ্চিন্তা করি, এটা হয়তো আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে ভাবি যে, ওরা ভুল করছে বা যা করছে সেটা ঠিক নয়। আর এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা আমাদের কিছু কন্সেপ্ট বা ধারনা বা উপদেশ ওদের উপর চালাতে চাই যা অহরহই ওরা মানতে চায় না। যখন এমন একটা কনফ্লিক্ট সামনে আসে, তখন আমাদের উচিত আর না এগোনো। সবাইকে যার যার পথে চলতে দিয়ে ঠিক ঐ জায়গাটায় দাড় করানো উচিত যাতে ওরা বুঝতে পারে, আমাদের উপদেশ ঠিক ছিলো কিংবা আমরাই ঠিক ছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ঐ সময় কোনো কিছুই আর পিছনে গিয়ে সঠিকটা করা যায় না বলে মনে কষ্ট লাগে বা খারাপ লাগে। কিন্তু ওটা ছাড়া তো আর কিছুই করার নাই। চেয়ে চেয়ে ধ্বংস দেখা ছাড়া যদিও কোনো উপায় নাই, তারপরেও সেটাই করতে দেয়া উচিত যাতে ওরা এটা বুঝতে পারে যে, বড়দের অভিজ্ঞতার দাম ছিলো, উপদেশ গ্রহন করা উচিত ছিলো। তাহলে হয়তো আজকের দিনের এই অধোপতন কিংবা ছেড়াবেড়া জীবনে পড়তে হতো না।

লাইফটায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছি আমি নিজেও। নিজের ঘরে যখন কেউ একাকিত্ত বোধ করে সেখানে সময় একেবারেই স্থবির। সেখানে যেটা চলে সেটা হচ্ছে- সময় মত খাওয়া, আর নিজেকে অন্য কিছুতে ব্যস্ত রাখা। এটা একটা সময়ে সবার জীবনেই আসে। আমি যদি বলি, এটা ইতিমধ্যে আমার জীবনেও শুরু হয়ে গেছে, ভুল বলা হবে না।

কেনো বললাম কথাটা। এর নিশ্চয় কোনো কারন তো আছে। আজকের যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা আমার কাছে কাম্য নয়। না আমি আশা করেছি। আমার সন্তানদের জন্য আমার থেকে বেশী কেউ ভাবে এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু সেই সন্তানেরা যদি কখনো বলে, যে, আমরা তাদের জন্য অভিশাপ,আমরা পশুর চেয়েও খারাপ ব্এযবহার করি, কিংবা আমরা প্ৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ বাবা মা ইত্যাদি, এর থেকে বড় পরাজয় আর কিছু হতে পারে না। তবে আমি জানি, জীবনে এ রকমের অনুভুতি সবারই আসে। যখন এই অনুভুতি ভুল প্রমানিত হয়, তখন বেলা এতোটাই বেড়ে যায় যে, কারো কারো জীবনের রাত শেষ হয়ে আরো গভীর রাতে অন্য কোনো জগতে সে চলে যায়।

২০/০৭/২০২১***-ভরষা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২০ জুলাই 

ভরষা করা দোষের নয়। মানুষ যদি মানুষের উপর ভরষা না করে, তাহলে ধ্বংস বেশী দূরে নেই। কিন্তু কারো উপর ভরষা করার আগে সতর্ক থাকা খুবই জরুরী। ইচ্ছাকে ভালোবাসায়, আর ভালোবাসা থেকে সম্পর্ক তৈরী করার সময় এই সতর্ক থাকা ভীষনই প্রয়োজন। কিন্তু তুমি এসবের কোনো কিছুই না জেনে শুধু ইচ্ছাটাকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় তুমি সম্পরকটা করেছো যেখানে তুমি কোনো কিছুই ভাবো নাই। তুমি পরিশ্রমী, তুমি সাহসী যদি কেউ পাশে থাকে, তুমি সৎ সেটা নিজের কাছে এবং আর তোমার জীবনের হিসাব তুমি জানো। আর তোমার মনে যে সপ্ন ছিলো সেটা পুরন করার জন্যই তুমি একটা সমঝোতা করেছো নিজের সাথে নিজের। আর সেটা তুমি সততার সাথে পালনও করছো। তোমার জীবনে এই গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আসলে তোমার সামনে কেউ ছিলো না। আর থাকলেও কোনো লাভ হতো না সেটা তুমি হারে হারে জানো। কারন যারা থেকেও ছিলো, তারা আসলে কখনোই তোমাকে মুল্যায়ন করেনি, করতোও না। তুমি অথবা যার সাথে তুমি এমন একটা সম্পর্ক করেছো, তোমরা কখনোই এটাও ভুলে যেতে চাও নাই যে, এই সম্পর্কের সামাজিকভাবে আসলে কোনো স্বীকৃতিও নাই। কিন্তু তোমার চোখ বন্ধ করে ভরষা করার ফল আমি কখনোই সেটা বৃথা যেতে দিতে চাই না। কারন তুমি অন্তত তোমার সব কিছু দিয়েই আমাকে মেনে নিয়েছো। এখানে গাদ্দারী করার কোনো প্রকারের অবকাশ বা সাহস আমার ছিলোনা, নাই আর ভবিষ্যতে থাকবেও না। ভদ্রতার পিছনে আমার কোনো প্রকার মুখোস কিংবা শয়তানীও নাই। কারন আমি জানি, এই জগতে আমাকে ছাড়া তোমার আর কেউ নাই, হোক সেটা তোমার জন্মদাতা বাবা বা মা অথবা তোমার রক্তের কেউ। এই অবস্থায় আমি তোমাকে ফেলে গেলেও আমার চোখ বারবার ফিরে তাকাবে পিছনে যেখানে তুমি পড়ে আছো। আমি সেটা কখনোই করতে পারবো না। ভাবো তো একবার- আমি চলে যাচ্ছি, তুমি চেয়ে চেয়ে দেখছো আমার নিষ্ঠুরতা, আর তুমি ভাবছো, তোমার সারাটা দুনিয়া এখন অন্ধকার। তোমার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে, তুমি ভাষাহীন হয়ে যাবে, তখন তোমার চোখ শুধু কথা বলবে। আর চোখের ভাষা তো একটাই। জল। এই জল দেখার জন্যে আমি কখনো প্রস্তুত নই।

এই প্রিথিবীতে কে আছে তোমার, আর কে নাই তাদের সবার শক্তি, ভালোবাসা আর ভরষা যোগ করলেও সেই ভরষার সাথে একদিকে শুধু আমি, এটাই তোমার কাছে পৃথিবীর সর্বোত্তম শক্তি। আর তুমি এতাই প্রমান করেছো এই পারুর কেসে। সারাটা গ্রাম, আইন, থানা, টাকা পয়সা, নেতা, মাদবরী, সন্ত্রাসী, চোখ রাংগানি একদিকে আর তুমি একাই একদিকে ছিলে। আর সেই শক্তিটাই তুমি প্রতিনিয়ত পেয়েছো এই ভরষার মানুষটার কাছে। কারন তুমি জানো, আর সবাই পালিয়ে গেলেও আমি অন্তত পালাবো না।

কেনো তুমি অন্য কারো চোখে চোখ রাখতে পারো না, কেনো তোমার মনে অন্য কারো স্থান হয় না, কখনো কি এটা খুব মনোযোগ সহকারে নিজেকে প্রশ্ন করেছো? ধর্মের কথা আলাদা, আল্লাহর দোহাই আলাদা ব্যাপার। কিন্তু এর বাইরেও তো অনেক লজিক আছে। সেই লজিক দিয়েও কি কখনো ভেবেছো কেনো হয় না সেগুলি? এর উত্তর একটাই- টোটাল সারেন্ডার। মানে সম্পুর্ন আত্তসমর্পন। যখন কোনো মানুষ তার নিজের মন তৃপ্তিতে থাকে, যখন চোখ ভালো ঘুম পায়, যখন শরীরের চাহিদা পূর্ন হয়, তখন শরীর, দেহ, মন, কিংবা আত্তা কারো দিকে ছুটে যেতে চায় না। যেমন ছুটে যায় না চাঁদ পৃথিবীর বলয় থেকে, কিংবা প্রিথিবী সূর্যের বলয় থেকে। তাদের যতোটুকু শক্ত্র প্রয়োজন তাদের নিজ নিজ অক্ষে চলার, ঠিক ততোটাই তারা পায়। তাহলে আর অন্য কোনো গ্রহের কিংবা নক্ষত্রের দারস্থ হবার কি প্রয়োজন?

মানুষ তখনি ছুটে যায় এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে যখন সে তার সঠিক তরী খুজে না পায়। আর সঠিক ঘাটের সন্ধান যখন একবার কেউ পায়, তার আর অন্য ঘাটে যাওয়ার অর্থ ভুল ঘাটে চলে যাওয়া। ভুল ঘাট মানুষকে ভুল পথেই নিয়া যায়। আর কেউ যখন একবার ভুল পথে যাত্রা শুরু করে, সেখান থেকে ফিরে আসার অন্য কোনো বিকল্প রাস্তা হয়তো তার জানাই নাই। যদি সেই অচেনা রাস্তায় একবার কেউ পড়ে যায়, সেখানে প্রতিটি মানুষ তার অচেনা। অচেনা মানুষের কাছে চোখের জলের কোনো মুল্য থাকে না।

আর মুল্যহীন জীবনে সপ্ন তো দূরের কথা, বেচে থাকাই কষ্টের। কষ্টে ভরা জীবন যখন সামনে চলতে থাকে, তখন মানুষের এই জীবনের প্রতি মায়া হারিয়ে ফেলে, ভগবানের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। ঈশর আছে এটাই তখন আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। তারপরেও দূর্বল চিত্তের মানুষেরা যাদের কোনো কুল কিনারা আর থাকে না, যেমন লামিয়া বা শারমিন, তারা ওই অচেনা, অসুন্দর জীবনকেই মানিয়ে নিতে শুরু করে। সেখানে তখন আর ভগবানের কোনো অস্তিত্ত থাকে না বা তারা ভগবানকে মানেই না। ধর্ম পালন তো দুরের কথা।

তোমার দুষ্টুমি যেমন পাগলামী, আমার কাছে তোমার পাগলামীও তেমন মিষ্টি, তোমার কান্নাও আমার কাছে ঠিক ওই রকমের। তোমাকে ভালো রাখাই আমার কাজ। আর সেই ভালো থাকাটা নির্ভর করে তোমার আত্তার উপর তুমি কতোটা তৃপ্ত। এই প্রিথিবী থেকে চাঁদ যতো সুন্দর মনে হয়, নীল আকাসের সাথে চাদকে যেমন কোনো এক যুবতীর কপালের টীপ মনে হয়, অথবা অনেক দূরের কাশবন যখন সাদা মেঘের মতো হাওয়ায় দুলে দুলে মনকে দোলায়িত করে, যখন ওই চাদে গিয়ে পা রাখা যায়, কিংবা কাশবনের মাঝে হাজির হওয়া যায়, তখন তার আসল রুপ দেখে দম বন্ধ হয়ে আসে। সেই চাঁদ আর কাশবন কেনো জানি মনে হয় এটা একটা খারাপ সপ্ন ছিলো। আমরা সেখানে বসবাস করতে পারি না। আবার ছুটে আসতে চাই এই গাছ গাছালী ভর্তি নোনা সেঁতসেঁতে সোদা গন্ধের মাটিতে যেখানে বর্ষায় গাছের পাতা বেয়ে বেয়ে টিপ টিপ করে ফোটা ফোটা পানি আমাদের নাকের ডগা দিয়ে বুকের ভিতরে এসে অন্তর শীতল করে দেয়।

একটা মানুষের শান্তিতে আর সুখে বসবাসের জন্য এই পৃথিবীর অনেক কিছু লাগে না। প্রিন্সেস ডায়ানার একেকটা নেকলেসের দাম ছিলো কোটি কোটি টাকার। তার একেকটা ড্রেসের দাম ছিলো হাজার হাজার ডলার। সাথে ছিলো রাজ প্রাসাদ। কি ছিলো না তার। ছিলো সবুজ চোখের মনি, ঈশ্বর যেনো তাকে একাই রুপবতী করে পাঠিয়েছিলো। অথচ মনে তার কোনো শান্তিই ছিলো না। সেই শান্তির খোজে শেষতক রাজ প্রাসাদ ছাড়তে হয়েছে। অন্যের হাত ধরতে হয়েছে। আর মাত্র ৩২ বছর বয়সেই তাকে এই প্রিথিবী ছাড়তে হয়েছে। যদি বাড়ি, গাড়ি, জুয়েলারী, আর টাকা পয়সাই হতো সব সুখের মুল চাবিকাঠি, তাহলে ডায়নার থেকে সুখী মানুষ আর এই প্রিথিবীতে কেউ ছিলো না। কিন্তু সেটা কি আসলেই সুখী ছিলো?

একটা তরকারীতে নুন কম হতে পারে, একটা পরোটা পুড়ে যেতে পারে, তার স্বাদ কিংবা মজা হয়তো একটু হেরফের হতেই পারে কিন্তু সেটা হয়তো একদিন বা দুইদিন। কিন্তু ভালোবাসা আর মহব্বতে যখন নুনের কমতি হয়, পুড়ে যায়, তখন জীবনের মজাটাই শেষ হয়ে যায়। আর জীবনের মজা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন এসি রুমেও ভালো ঘুম হয় না। নীল আকাশ দেখেও কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে না। তখন যেটা মনে হয় তা হচ্ছে বিষাদময় রুচী। সেই রুচীতে আর যাই হোক পেট ভরে না। আর পেটে ক্ষুধা রেখে কোনোদিন কারো ভালো ঘুম হয়েছে তার কোনো প্রমান নাই।

আমি তোমার জীবনে সেই রকমের একটা অলিখিত ভরষা। এই ভরষার কোনো ডেফিনিশন নাই। এই ভরষার কোনো আইন গত দিক নাই বটে কিন্তু আমার নিজের অনেক দায়িত্তশীলতা আছে যেখানে আমিই আইনপ্রনেতা, আর আমিই সবচেয়ে বড় বিচারক। হয়তো সমাজকে আমি তুরি দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবো না, কিন্তু আমি সেটাই করততে পারি যাতে তুমি তুড়ি দিয়ে সবাইকে এটাই করতে পারো যে, তুমি নিজেও একটা শক্তি।

আজ তুমি সেই বিগত বছরগুলির দিকে তাকিয়ে দেখো? তুমি দেখতে পাবে যে, সেইসব বছরগুলিতে অনেক ঝং ধরা ছিলো। আগাছায় ভরা একটা কঠিন পথ ছিলো। কিন্তু আজ থেকে ৫ বছর পরেরদিন গুলি দেখো, সেখানে প্রতিদিন তোমার জীবন মোড় নিয়েছে। বাকেবাকে সমস্যা ছিলো কারন সমস্যা গুলি হয়তো আমার নজরে ছিলো না। কিন্তু আজ তোমার সেই বছরগুলির সাথে তুলনা করলে স্পষ্ট দেখতে পাবে, আকাশের মেঘ তোমার ঘরেই রংধনু হয়ে একটা বাগান তৈরী করেছে। সেই বাগানে তুমি যখন খুসী যেভাবে খুসী বিচরন করতে পারো। এই বাগানের একচ্ছত্র মালিকানা তোমার নিজের। এখানে একটা আম খেলেও শরীর চাংগা হয়ে উঠে, এখানে একটা ডিম খেলেও শতভাগ কাজ করে। অথচ আজ থেকে ৫ বছর আগে সেই একটি আম কিংবা একটি ডিম এমন করে খেলেও শতভাগ কাজ করতো না। কারন তখন ভরষার জায়গাটা ছিলো একেবারেই অনিশ্চিত। যা এখন পুরুটাই উলটা। আর এটাই খাটি ভরষা।

এখানে শুধু একটা ব্যাপারই চিন্তার বিষয় যে, যে মানুষটার কারনে কখনো নিজেদেরকে অসহায় মনে হয় নাই, কোনো দুশ্চিন্তা গ্রাস করে নাই, যখন সেই মানুষটা চলে যায়, তখন সেইই দিয়ে যায় যতো অসহায়ত্ব আর দুশ্চিন্তা। আর এটা আমার মাথায় সব সময় কাজ করে। এর জন্যে সমাধান একটাই- যা আমি অন্যদের বেলায় করেছি। সাবলম্বিতা। এবং দ্রুত। তোমাদের কাজ ভরষা করা আর আমার কাজ সেই ভরষার স্থানটা স্থায়ী করা।

যেদিন মনে হবে তুমি সাবলম্বি, তুমি নিজে নিজে একাই চলার ক্ষমতা রাখো, তোমার সমাজ তোমাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে দিধা বোধ করবে, সেদিন আসলে আমার দায়িত্ত প্রায় শেষ হয়েছে বলে আমি মনে করবো যেটা এখন প্রায়ই ভাবি আমার এই পক্ষের মানুষগুলির জন্য। তখন যেটা হবে- তুমি স্বাধীন পাখীর মতো এক ঢাল থেকে একাই উড়ে গিয়ে আরেক ঢালে বসতে পারবে। কিন্তু পাখীরা যখন একবার নিরাপদ গাছে বাসা বেধে ফেলে, যতোদিন ওই গাছটা থাকে, কেউ আর কেটে ফেলে না, কিংবা আচমকা কোনো ঝড়ে যখন গাছটা আর ভেংগে পড়ে না, ততোক্ষন অবধি সেই ভাষাহীন অবুঝ পাখীরাও তাদের নীড় পরিবর্তনে মনোযোগ দেয় না না। তারা সেখানে অভয়ারন্য তৈরী করে সেই জংগল সাম্রাজ্যের অধিকর্তা হিসাবেই জীবন পাড় করে দেয়।

ওই গাছটাই তখন তার ভরষা। ওই গাছ জায়গা দেয় বাসা করার, ওই গাছ ঢাল পেতে দেয় নিবিড় করে বসার। ওই পাখী চলে গেলেও গাছের না হয় কোনো ক্ষতি, না হয় তার ফলনে কোনো বিঘ্নতা। ঠিক সময়ে সেই গাছ ফুল দেয়, ফল দেয়, আর দেয় ছায়া। ঝড়ের দিনেও সে হয়তো অন্য আরো অনেক পাখীর জন্যে অভয়ারন্য স্রিষ্টি করে বটে কিন্তু সেই গাছ কোনোদিন অভিযোগ করে নাই, কেনো অন্য আর কিছু পাখী তার ঢাল ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলো। তবে যদি আবারো সে ফিরে আসে, গাছের কোনো অভিযোগ থাকে না। কিন্তু যদি কোনো ঢালই আর খালী না থাকে, সেটা তো আর গাছের দোষ নয়।

ভরষার স্থান কেউ ত্যাগ করলে গাছের কি দোষ!!

৬/৭/২০২১-কিছু আফসোস

কিছু কথা আছে যা বলতে চাই নাই কিন্তু বলা হয়ে যায়, কিছু কথা ছিলো, বলতে চেয়েছি, অথচ বলা যায় নাই, কিছু সপ্ন ছিলো যা দেখতেই চাই নাই কিন্তু দেখতে হয়েছে আবার কিছু এমন সপ্ন ছিলো সব সময় দেখতে চেয়েছি কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় নাই। এমন কিছু শখ ছিলো সারাজীবন লালন করেছি কিন্তু জীবনের শেষ তীরে এসেও সেটা ধরা দেয় নাই আবার এমন কিছু ভয় ছিলো যা একেবারেই কাম্য নয় অথচ তা আমি এড়িয়ে যেতেই পারিনি। এটা আমার দোষ নয়। না আমার অপারগতা। আমি এই আফসোসের ব্যাপারটা নিয়েও বহুবার গবেষনা করেছি কেনো, এবং কী কারনে আবার এই কিছু কথা বলা হয় নাই, কিছু কথা না বলতে চেয়েও বলতে হয়েছে, কিছু সপ্ন আমাকে দেখতেই হয়েছিলো অথচ সেটা আমার কাম্য ছিলো না, আবার কিছু স্বপনের ধারে কাছেও আমি যেতে পারিনি।

এই দুনিয়ায় অনেক পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ী, অনেক নামীদামী মানুষের জীবন কিংবা সার্থক কিছু মানুষের জীবনী আমি খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করেছি এজন্য যে, আমি যাদেরকে সুখী আর খুসী দেখছি, তাদের সব চাওয়া পাওয়া কি পূর্ন হয়েছে যা তারা আমার মতো ভেবেছেন এভাবে যে, যা তারা করতে চেয়েছেন সেটা তারা পেরেছেন, কিংবা যা তারা দেখতে চান নাই সেটা আসলেই তারা দেখেন নাই বা যেটা তাদের আজীবনের শখ ছিলো সেটা তারা পেয়েছেন?

না, এটা একেবারেই সত্যি নয়। তারাও পারেন নাই। কারো জীবনে কখনোই এটা হয় নাই, হবেও না। এর একটাই কারন। আর সেটা হচ্ছে সে তার মতো, আর এই পৃথিবীর অন্যান্য সবাই যার যার মতো। সবাই যার যার থেকে আলাদা। কিন্তু একটা জায়গায় সবার সবার সাথে মিল রয়েছে। আর সেটা হলো, সবাই একা। দলবদ্ধ সমাজই বলি, আর একক পরিবারই বলি, সারাটা জীবন প্রতিটি মানুষ একাই ছিলো আর একাই থাকবে। এই একাকীত্ততা মানুষের জীবনে একটা আফসোসের পাশাপাশি একটা সুখের অনুভুতিও নিয়ে আসে যখন সে ভাবে যে সে যা করতে চায় না, সে সেটা করেই না। আবার সে যেটা করতেই চায়, সে সেটাই করে। আর ঠিক এ কারনেই কেউ দলবদ্ধভাবে সুখীও নয় আবার এককভাবেও নয়। এভাবেই একটা চরম আফসোস নিয়ে মানুষ এই নীল আকাশের রুপ, এই নির্জন পাহারের মাদকতা কিংবা কনকনে শীত অথবা বর্ষার রিম ঝিম বৃষ্টির টুং টাং শব্দের মুরত্রছনা ছেড়েই বিদায় নেয় যাকে কেউ আর কখনোই মনে রাখে না।

কেউ সুখী না। আমিও না। আবার সবাই সুখী, সেখানে আমিও সুখী। এই মাত্রাটা সময়ের সাথে সাথে কখনো প্রখর হয় আবার কখনো বুঝাই যায় না কোন স্টেজে আমরা অবস্থান করছি। এর ফলে যেটা হয় যে, কখনো কখনো নিজের সন্তানকেও নিজেরা চিনতে পারি না, আবার কখনো কখনো আমাদের সন্তানেরাও আমাদের চিনতে পারে না। সবার স্বকীয়তা আলাদা, সবার চিন্তাধারা আলাদা, সবার পছন্দ আলাদা। এই আলাদা আলাদা স্বকীয়তা, চিন্তাধার আর পছন্দের ভীড়ে কারো সাথেই কারো কিছুই মিল নাই বিধায় কোনো না কোনো সময়ে এরা একটি বিন্দুতে এসে কনফ্লিক্ট তৈরী করে। এই কনফ্লিক্ট তৈরির বিন্দুতে যদি কেউ খুব সহজে অতিক্রম করে বেরিয়ে যেতে পারে, তারা সবার থেকে একটু বেশী আত্তত্যাগী আর সুখী। এর মানে সেক্রিফাইসের কোনো বিকল্প নাই। যতো বেশী ছাড়, ততো বেশী জীবন সহজ। কিন্তু এটা সব সময় পারা যায় না।

মজার ব্যাপার হলো-প্রতিটি মানুষের মূল্যায়ন তার জীবন শেষ হয়ে যাবার পর শুরু হয়। আর যাদের মূল্যায়ন তাদের জীবদ্দশায় হয়, তারা শুধু জানতে পারেন না যে, তাদেরকে চাটুকারীতা করা হচ্ছে। আর চাটুকারীতা হচ্ছে এটা না জানার কারনেই মনে মনে তারা একটা আলাদা জগতে আরামবোধ তথা গর্ব বোধ করেন বটে কিন্তু যখন তিনি আর থাকেন না, তখন কোনো পলিথিনের ভিতরে ঠেসে আটকানো একটা বহুদিনের পচা গলিত মাংশের টুকরার মতো ভিন্ন গন্ধ কিংবা বহুদিন যাবত আটকানো একটা আতরের শুন্য বোতলের মতো যে কোনোটাই ছরাতে পারে। কিন্তু তার তখন কিছুই যায় আসে না। তখন তার সব হিসাব কিতাব শুধু তার আর বিধাতার মধ্যে।

এ রকম একটা জীবনে আমি তাই আফসোসের ব্যাপারটা খুব মামুলী একটা ঘটনা বলেই চালিয়ে দেই। এতে একটা মজা আছে। আর সে মজাটা হলো এমন-

ধরুন আপনার এখন খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করলো, গিন্নীকে বললেন, গিন্নী একটা অজুহাত দেখিয়ে এখন খিচুড়ি খাওয়া যাবে না বলে পাশ কাটিয়ে গেলেন। আপ্নিও ধরে নিন, আপনার ভীষন ইচ্ছাটা খিচুড়ি খাওয়ার দিন আজ নয়। আজ আপনার খিচুড়ি খাওয়ার দরকারই নাই। কোনো আফসোস থাকবে না। অথবা আপনার সাথে আপনার সন্তানের কোনো একটা বিষয়ে মতের অমিল হলো যা আপনি মানতে চান না। কারন আপনি চান আপনার সনাত্ন আপানার কথামট কাজ করলে তার ভবিষ্যৎ ভালো হবে। কিন্তু সেটা সে মানতে নারাজ। ধরে নিন, আপনি আপনার কাজ করে ফেলেছেন তাঁকে গাইড করার মাধ্যমে। কিন্তু আপনি জানেন এটা হয়তো সময়পোযোগী না। কি আছে? সেটা তার জীবন। তাকেই সাফার করতে দিন। আপনি তো আর সেটা ভোগ করবেন না। অথবা ধরুন, আপনি চান বিশাল কিছু একটা আর্থিক অবলম্বন থাকুক যাতে আপনার অবর্তমানে আপনার আপনজনেরা ভালো থাকে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে এই “বর্তমান” সময়ে আপনি কারো কাছে কিপটা, কারো কাছে কঠিন ইত্যাদিতে ভূষিত হবেন। কি দরকার? ছেড়ে দিন তাদের ভবিষ্যৎ তাদের উপর। আপনি তো আর থাকবেনই না। তখন তারা কি করবে, আর কি করবে না সেটা তাদের ব্যাপার। ঐ যে বললাম, তখন আপনার মূল্যায়ন হবে এইভাবে যে, আহা, বাবা কিঙ্গাব স্বামী তো ঠিকই করতে চেয়েছিলেন। আপনি মুল্যায়িত হবেনই। আফসোসের কোনো প্রয়োজনই নাই।

আপনার আফসোস হবে তখন যখন আপনার সব কিছু থাকতেও আম্পনি আপনার নিজস্ব পছন্দকে মূল্যায়ন করেন নাই, আপনার আফসোস হবে তখন যখন আপনি যেটা করতে চেয়েছেন আর করতে পারতেন নিজে মনের সুখের জন্য কিংবা আনন্দের জন্য অথচ আপনি সেটা করেন নাই। সেই আফসোস এর দোষ আপনার।

আপনার ব্যবসায়ীক কোনো পার্টনারের সাথে কোথায় যেনো একটা অমিল হচ্ছে যার জন্য আপনি শান্তিতে নাই। ছেড়ে দিন ততোটুকুই যতোটুকুতে আপ্নার ব্যবসায়ী খুসি থাকে। আপনি শুধু মিলিয়ে নিন, আপনি অতটুকু ত্যাগে কতটুকু ক্ষতিতে পড়লেন। যদি সামলে নেয়া যায়, এটাই ভালো মনে করে শান্তিতে থাকুন। ভালো ঘুম হবে আর ভালো ঘুম একটা আরামের লক্ষন। আপনি তো সাথে করে কিছুই নিতে পারবেন না। যেহেতু নিতেই পারবেন না, তাহলে অযথা সেগুলিকে ধরে রাখার কি ফায়দা? সব তো অন্য কেউই ভোগ করবে!! যদি তাইই হয়, অতটুকুই আপনার দরকার যতটুকুতে আপনি ভালো থাকেন। বাকীটা অন্যের। আফসোসের কোনো কারন নাই।

বড় বড় মিনিষীরা, বড় বড় ব্যবসায়ীরা কিংবা আরো বড় বড় জ্ঞানীরা তাদের শেষ জীবনে এসেই এই আফসোসের সন্ধানটা পান। আর মৃত্যুর বিছানায় শুয়ে শুধু একটা কথাই বলে যান সবার উদ্দেশ্যে যে, জীবনে কি পেলাম? আমি কি কারো জন্যেই কিছু করি নাই? কিংবা আমি তাহলে সারাজীবন কাদের জন্য এতো পরিশ্রম করলাম যখন আমার এই মুমুর্ষ সময়ে কেউ পাশে নাই কিংবা আমি যা চাই সেটা আর পাই না?

এটাই মূল কথা। জীবনের শেষ সময়ে কেউ কারো কাছেই থাকে না কারন সবাই আলাদা। সবাই ব্যস্ত।

২৯/০৬/২০২১-আমার গ্রাম (১৯৭৭ সাল)

অফিসেই ছিলাম। কেনো জানি হটাত করে খুব গ্রামে যেতে ইচ্ছে করলো লায়লা আর সফুরা খালাকে দেখার জন্য। বহুদিন গ্রামে যাই না। প্রায় এক যুগ অথচ মাত্র ১৫ মিনিট লাগে গ্রামে যেতে। মা যখন বেচে ছিলেন, তখন গ্রাম আমাকে চুম্বকের মতো টানতো। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার হলেই আমি গ্রামে ছুটতাম মাকে দেখার জন্য যখন মা গ্রামে থাকতেন। কোনো ঈদই আমি শহরে করতাম না। মাকে দেখার সুবাদে আমার গ্রামের সেই পরিচিত মানুষগুলির সাথে আমার দেখা হতো। মানুষগুলি আমাকে বুক ভরা শ্রদ্ধ্যা আর মোহনীয় একটা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ করতো। আমি যখন গ্রামে যেতাম, মায়ের সাথে বসে গল্প করতাম, বাড়িটার অবস্থা কি সেটা ভালো করে পরীক্ষা করতাম যাতে ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে মায়ের কোনো ভয় না থাকে। মা ঝড়কে খুব ভয় পেতেন। আকাশে ঝড়ের আভাষ দেখলে প্রথমেই আমার মনে পড়তো মায়ের কথা। মা বোধ হয় এখন ভয় পাচ্ছে। সেই ২০০২ সালের কথা। এখন ২০২১ সাল। এর মাঝে দু একবার গ্রামে গিয়েছি নিতান্তই একটা অতিথির মতো। এখন গ্রামে গেলে লায়লার বাসা পর্যন্ত গিয়ে ওর সাথে কথাবার্তা বলেই মনে হয় আমার গ্রামের ভ্রমন শেষ। অনেকবারই একেবারে বাড়ির আস্তানা থেকে ফিরে এসেছি, হয়তো বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছেও হয় নাই। এখন বাড়িটাতে থাকে আমার এক অবিবাহিত ভাগ্নে যে সারাদিন শুধু গাজা খায়। গাজায় কি সুখ সেটা আমি জানি, তবে বেশীদিন গাজা খেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সে তখন নিজেই গাজায় পরিনত হয়। যেতে ভালো লাগে না। চুরি ওর অভ্যাস, গাজা ওর খাবার আর মথ্যা কথা বলা ওর স্বভাব। ফলে ওখানে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, যেতে ইচ্ছে করে না।

আজ হটাত করেই আবার ইচ্ছে করে গ্রামে আসলাম। গ্রামটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। অসংখ্য বাড়িঘর যত্রতত্র এখানে সেখানে উঠে গেছে। পায়ে চলার রাস্তাটাও আর আগের মতো নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই ১৯৭৮/৭৮ সালের আমার গ্রামের বিন্যাশ। গ্রামের একেবারে পুর্ব পাশে ছিলো দৌলত মেম্বারদের বাড়ি যেখানে একটা গুচ্ছ পরিবার থাকতো। তাদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই ছিলো ইয়াকুবদের বাড়ি। পরে শুনেছি এই ইয়াকুব নাকি মেম্বার হয়েছিলো তাই ওদের বাড়ির নাম এখন ইয়াকুব মেম্বারদের বাড়ি বললেই সবাই চিনে।  ইয়াকুবদের বাড়ি পার হয়ে আরো পশ্চিমে এলে পড়ে খালেক এবং সেকান্দরদের বাড়ি। সেকান্দরকে আমি মামু বলে ডাকতাম। এই সেকান্দর মামু এমন একজন মানুষ ছিলেন যে, সবার সাথেই তিনি মিশতে পারতেন। বেশ গরীব হলেও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না। প্রতিদিন আমরা স্কুলের মাঠে খেলতে গেলে, তাঁকে সেখানে পাওয়া যেতো। স্কুলের মাঠ ছিলো বড়দের তাশ খেলার আড্ডা আর ছোটদের বল খেলার প্রতিযোগিতা। সরগরম হয়ে উঠতো স্কুলের মাঠ। যারা খেলতেন না, তারাও কেউ কেউ হুক্কা বিড়ি নিয়ে মাঠের চারিদিকে খেলা দেখতো যেনো প্রতিদিনই ম্যারাডোনার আর মেসির খেলা হচ্ছে। এই ফুটবল খেলায় আমি আর মুসা একটা ট্রিক্স সবসময় করতাম যাতে আমি আর মুসা সব সময় একই টিমে থাকি। সেটা পরে বলি। যেই না মাগরেবের আজান পড়লো, সবাই যার যার বাড়িতে যাওয়া। অদ্ভুত একটা সময় পার হয়েছে তখন।

সেকান্দর মামুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো আরজুদের বাড়ি। আরজুদের পেশা ছিলো মাছ বিক্রি করা। আরজুরা আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। আমাদের গ্রামের বেশীরভাগ মানুষেরই পেশা ছিলো মাছ ধরা আর মাছ বিক্রি করা। কিন্তু কোনোভাবেই এটা জেলেপাড়ার মতো না। আরজুদের বাড়ির উঠোন ছিলো অনেক বড় আর এই উঠোনের চারিদিকে ছিলো ওদের অন্যান্য পারিবারিক বাড়িঘর। আরজু মাঝে মাঝে এমন করে মদ খেতো যে, বাড়ির বড়রা ওকে অনেক মারলেও আরজু বেহুশ অবস্থায় উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজতো। সবাই ভাবতো মদ খেয়ে বেহুস হলে উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় মনে হয়। আরজু তখনো বিয়ে করে নাই। আরজুদের বাড়িকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিন দিকে একটু এগুলেই নতুন একটা বাড়ি উঠেছিলো। ওরা আমাদের গ্রামের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সবেমাত্র এই গ্রামে এসেছে। সে পেশায় ছিলো গ্রাম্য ডাক্তার, নাম নুরু ডাক্তার। বর্তমানে সেই নুরু ডাক্তারের বাসা রাজেন্দ্রপুর এবং তার এক ছেলে শাহীন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে রাজনীতি করে। যাই হোক, আরজুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো ফুল্মতি আপারদের বাড়ি। ফুল্মতি আপা আমার খালাতো বোন। তাদের বাড়িটা ফজলুদের বাড়ি নামে পরিচিত ছিলো। ফজলুরা তিন ভাই ছিলো। এখন তারা আর কেউ বেচে নাই। তাদেরও পেশা ছিলো মাছ বিক্রি তবে কৃষি কাজও করতো ওরা। ফুলমতি আপার জামাই এর একটা নেশা ছিলো। মাঝে মাঝেই অন্য মাইয়া লোক নিয়া মসকরা করতো। খারাপ জায়গায়ও মনে হয় যেতো। সবাই ওকে একটু অন্য নজরেই দেখতো বলে আমার ধারনা। ফজলু ভাইদের বাড়ির পশ্চিমে বেশ কিছুটা জায়গা খালি ছিলো। হেটে হেটে এলে প্রথমেই পড়তো জামাল, শাখাওয়াতদের বাড়ি। জামালকে আমি খুব বেশী দেখি নাই। জামাল ১৯৭২ সালের পরে আমাদের গ্রামে আর দেখা যায় নাই। জামাল ছিলো আসল মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে জামাল যুদ্ধে গিয়েছিলো। সম্মুখ সমরে সে অংশ নিয়েছিলো। দেখতে খুব সুন্দর ছিলো জামাল। আর স্বাস্থ্য ছিলো একদম সঠিক যুবকের মতো। অনেকে বলে যে, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছে অথবা জামাল ইচ্ছে করেই আর এই গ্রামে ফিরতে চায় নাই। আমার ধারনা, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছিলো কারন ১৯৭২ সালে তাঁকে এক পরদেশী মেয়ের সাথে একবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গিয়েছিলো। জামালের ভাই শাখাওয়াত, করিম (ডাক নাম বাছন), রুপচান এরা গ্রামেই থাকতো। বর্তমানে রুপচান বিদেশ থাকে, শাখাওয়াত মারা গেছে। করিম (বাছন)ও মারা গেছে। করিমকে সবাই বাছন বলেই ডাকতো। তিনি আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। বাছনকে আমি কাকা বলে ডাকতাম। আমি যখন আর্মিতে চাকুরী করি কমিশনড অফিসার হিসাবে, হটাত একদিন দেখলাম বাছন কাকা সোনালি ব্যাংক ক্যান্টনমেন্ট কর্পোরেট ব্রাঞ্চে সিকিউরিটির কাজ করেন। আমাকে দেখে উনি খুব খুশী হয়েছিলো যে, তারই এক পরিচিত মানুষ আর্মিতে অফিসার এবং সেই সেনানীবাসেই তার চাকুরী। খুবই সমীহ করতেন আমাকে। আমিও কাকা বলতাম, উনিও আমাকে কাকা বলতেন।

এই জামালদের বাড়ির উত্তর দিকে জরাজীর্ন একটা বাড়ি ছিলো জামালদেরই এক আত্তীয়ের, নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে। সম্ভবত শাখাওয়াতদের বাড়ি ছিলো ওটা। খুব গরীব ছিলো শাখাওয়াতরা। জামালদের বাড়ি আর ঐ শাখাওয়াতদের বাড়ির মাঝখান দিয়েই গ্রামের হেটে চলা রাস্তাটা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। জামালদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো রফিক মাষ্টারদের বাড়ি। রফিক মাষ্টারকে আমি ভাইও বলতাম আবার স্যারও বলতাম। কারন তিনি আমার বড় ভাইয়ের সমসাময়ীক আবার আমার প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একটু তোতলা ছিলেন কিন্তু খুব ভালো মানূশ ছিলেন। তার একটা ছেলে ছিলো নাম, কাজল, আর একটা মেয়ে ছিলো। রিফিক ভাইয়ের স্ত্রী খুব মিষ্টি চেহাড়ার ছিলেন। বর্তমানে কাজল একটা দূর্ঘটনায় পড়ে প্রায় প্যারালাইসিস। হামদর্দে চাকুরী করতো। রফিক ভাই চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। অনেক বয়ষ্ক মানুষ, আমার অফিসে প্রায়ই আসেন এবং গল্প হয়, ভালো লাগে। রফিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো আরদশ আলীদের বাড়ি। ওরা চার ভাই এবং কোনো বোন নাই ওদের। রফিক ভাইদের বাড়ি থেকে শুরু হয় “বড় বাড়ি”। এই আরদশ আলীর অন্যান্য ভাইয়েরা হলো সার্থক আলী, মোনজর আলী, সুন্দর আলী আর একজন, নামটা মনে পড়ছে না। এই বাড়ির সব বউরা প্রায় আসর নামাজের পর ধান বারা বানতো। ওরা বেশ সচ্ছল ছিলো। এদের বাড়ির দুই ধার দিয়া উত্তর দিকে যাওয়া যেতো। রফিক ভাইদের বাড়ি আর আরদশ আলীদের বাড়ির মাঝে দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেত আবার আরদশ আলীদের বাড়ির পশ্চিম ধার দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেতো। এই দুই ধারের যে কোনো রাস্তা দিয়েই উত্তর দিকে প্রায় ২০০ গজ হেটে গেলে দুটু বাড়ি পড়তো। একটা আমাদের বাড়ি আর তার সাথে আম্বর আলী কাকাদের বাড়ি। এই দুটু বাড়ি আসলে গ্রাম থেকে একটু আলাদা থাকায় সবাই “টেক্কা বাড়ি” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে গ্রামের দিকে তাকাইলে গ্রামের পুব পাশ থেকে শুরু করে পশ্চিম পাশের বাড়ি পর্যন্ত সব দেখা যেতো। যাই হোক, এই আরদশ আলিদের বাড়ির উঠোন ছিলো বেশ বড়। আমরা ওখানে “কুতকুত” খেলতাম। আর উঠোনের ঠিক দক্ষিনে একটা দোকান ছিলো। এই দোকানে কেউ চা খেতে বসতো, ক্রেউ বিড়ি খাইতো, আর আমি মাঝে মাঝে শুধু মানুষদেরকে লক্ষ্য করার জন্য বসে থাকতাম কারন কোন মানুষ কি কারনে বসে থাকে, বসে বসে কি কথা বলে, কেনো বলে, কার বাড়িতে কি সমস্যা, কার সাথে কার ঝগড়া, কার সাথে কে কি মজা মারতাছে, কোথায় কার কি পরিকল্পনা সব জানা যেত। আমি বেশ ছোট ছিলাম বলে আমাকে একটা বোকা বা আহাম্মক মনে করে আমার সামনেই সবাই সব কথা বলতে পারতো। আমি মনে মনে এসব ভাবতাম আর মানুষ গুলিকে বুঝবার চেষ্টা করতাম। এটা আমার এক প্রকারের নেশাই ছিলো বলা যায়।  দোকানটার লাগোয়াই হলো পায়ে চলা গ্রামের বাড়ির ভিতর দিয়ে চলা পথ। রফিক ভাইদের বাড়ির দক্ষিনে গেলে পড়তো বাহারউদ্দিনদের বাড়ি। বাহার উদ্দিন আমার ক্লাসে পড়তো। ওর বাবারা তিন ভাই ছিলো। আক্কেল আলী, বাহারের বাবা আর আলমাস। আক্কেল আলীর পেশা ছিলো “চুরি” করা, আলমাসের পেশা ছিলো “চুরি”র সাথে মাছ ধরাও। শুধু বাহারের বাবাই ছিলো ভালো মানুষ। শুনেছি আক্কেল আলীর সব ছেলেরাই নাকি এখন চুরিই করে। তার মধ্যে হাতিম আলি একজন। আলমাস, আক্কেল আলী এবং বাহারের বাবা কেউ এখন আর বেচে নাই। ওরা রফিক ভাইয়ের চাচাতো ভাই।

আরদস আলীদের বাড়ির পশ্চিম লাগোয়া যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ির দিকে সেই রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো অরিজিনাল “বড় বাড়ি”। অর্থাৎ গনি মাদবরের বাড়ি। বেশ বড় পরিবার। গনি মাদবরেরাই আসলে গ্রামকে নিয়ন্ত্রন করতো। জমিদার স্টাইলে। গনি মাদবরেরা মোট চার ভাই ছিলো। গনি মাদবর, সিদ্দিকের বাবা (নামটা মনে নাই) হাকিমের বাবা (নামটা মনে নাই), সাত্তারের বাবা (নামটা মনে নাই), ল্যাংরা রফিকের বাবা আর কাদেরের বাবা আজিজ খালু। আজিজ খালু মসজিদে মাঝে মাঝে ইমামতি করতেন। কিন্তু তার ঘরেই সব ছিলো জালিমের মতো সন্তান। কাদের, ইনসান, কুতুব, আরো একজন (নাম মনে নাই) এরা ছিলো আজিজ খালুর পোলা। এই বড় বাড়িটা ছিলো জোয়ান ছেলে দিয়ে ভর্তি। এদের মধ্যে যিনি কাদের নামে পরিচিত ছিলো, সে ছিলো বেশ শ্যামলা কিন্তু ভীষন সুইট চেহারার লোক। সরাসরি ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ছিলো। আমি সাধীনতার পরেও দেখেছি তাঁকে হাতে অস্র নিয়ে ঘুরতে। খুবই সাহসী ছেলে ছিলো। এই কাদের ভাই, সামসু ভাই, রফিক (ল্যাংরা রফিক), মাষ্টার রফিক, এরা সবাই সমসাময়িক ছিলো। সাধীনতার ঠিক পর পরই কাদের ভাই একটা ডাকাতী দল গঠন করে ফেলেছিলো। ওরা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় অস্র দিয়ে ডাকাতি করা শুরু করেছিলো। ওদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারতো না। আমার ভাই হাবীবুল্লাহ সব সময়ই ওদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতো এবং তিনি কখনো এসব কাজকে সাপোর্ট করতেন না। তখন দেশে একটা দূর্ভিক্ষ চলছিলো কিন্তু বড় বাড়ির কখনো দূর্ভিক্ষে সাফার করতে হয় নাই বরং ওদের কাছে সব কিছুই থাকতো সারপ্লাস। এই আজিজ খালু আবার বিয়ে করেছিলো গ্রামের পুর্ব প্রান্তে বসবাসকারী দৌলত মেম্বারের বোন। দৌলত মেম্বারের সাথে এই “বড় বাড়ির” সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো সাপে নেউলের মতো। একটা শক্তি আরেকটা শক্তিকে কখনোই মূল্যায়ন করতো না বরং যখনই সুযোগ পায় তখনই এক পরিবার অন্য পরিবারকে আঘাত করার চেষ্টা করতো। এই রেষারেষির ফলে দৌলত মেম্বারের ইমিডিয়েট আপন ছোট ভাই অর্থাৎ মুসার বাবা আর মুসার ছোট ভাই মাসুদকে প্রান দিতে হয়েছিলো। মানে হত্যা। মুসার ভাই মাসুদ ছিলো আমার থেকে ২/৩ বছরের ছোট। একদিন কোনো এক বর্ষাকালে মাসুদকে কুকুরে কামড়ে দিয়েছিলো। ঐ সময় খুব নামকরা ডাক্তার ছিলো একজন হিন্দু লোক, যাকে সবাই “বগা” ডাক্তার নামে চিনতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে এই বগা ডাক্তারকে। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। কিন্তু উনি বাস করতেন বিবির বাজার এলাকায়। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩/৪ কিলমিটার দূরে। তখন বিবির বাজার ছিলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। রবিবার আর বৃহস্পতিবার বসতো বাজার। মাসুদকে কুকুরে কামড়ানোর কারনে মাসুদের বাবা মাসুদকে নিয়ে বিবির বাজারের দিকে একটা ছোট কোষা নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভরা বর্ষা। পথের মধ্যে হটাত করে বড় বাড়ির সামসু, কাদের আর ল্যাংরা রফিকের সাথে দেখা। ওরাও অন্য নৌকায় ছিলো। তখন সকাল প্রায় ১০ টা। প্রকাশ্য দিবালোক। এই প্রকাশ্য দিবালোকে হটাত করে নদীর মধ্যে সামুসু ভাই এর লিডারশীপে মাসুদের বাবাকে জবাই করা হয় আর মাসুদকে পানিতে আছাড় মারতে মারতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। গ্রামের মানুষ দ্রুত অন্য নৌকা দিয়ে ওদেরকে রক্ষা করতে গিয়েও আর পারে নাই। এর মধ্যেই এরা পালিয়ে যায়। এবার “বড় বাড়ি”র সাথে দৌলত মেম্বারদের বাড়িত শত্রুতাটা একেবারে প্রকাশ্য হয়ে তীব্র আকার ধারন করে। এর ফলশ্রুতিতে মামলা হয়, কেস হয়, বড়রা গ্রাম থেকে পালিয়ে দূরে বাস করতে শুরু করে, আরো অনেক প্রানহানী হয়, সেই সাথে কাদেরও খুন হয়। কাদেরের খুন এখনো একটা রহস্যজনক অবস্থায় আছে। কিভাবে কাদের খুন হলো সেটা পরে বল্বো। এই “বড় বাড়ী’তে তাদের নিজস্ব মসজিদ এবং নিজস্ব করবস্থান ছিলো যা এখন মসজিদটা আরো বড় হয়েছে বটে কিন্তু কবরস্থানটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে প্রায় বিলীন। ঐ কবরস্থানেই শুয়ে আছেন আমার মা আর আমার খালা। এটা সিদ্দিকদের বাড়ির একেবারেই লাগোয়া আর আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০/৬০ গজ দূরে।

সিদ্দিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই লাগোয়া ছিলো পিয়ার আলী নামে ওদের বাড়ি। লম্বা মানুষ, কোনোদিন শার্ট পরেছে কিনা আমার চোখে পড়ে না। মাছ বিক্রি করতো। গ্রামের মধ্যে যে কয়জন গরীব হালের মানুষ ছিলো, পিয়ার আলিরা তার মধ্যে অন্যতম। কোনো রকমে বেচে ছিলো। ঘরটাও খুব জরাজীর্ন ছিলো। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলো অত্যান্ত ভালো। খুব সকালে দেখতাম পিয়ার আলী, মাথায় মাছের খাড়ি নিয়ে খালী গায়ে মাছ নিয়ে সদরঘাট বা শ্যামবাজারে যেতো। আমাদের গ্রামে আসলে যে কয়জন খুব সকালে দল বেধে মাছের খাড়ি নিয়ে হু হু করে খালী গায়ে ছুটতো শ্যমবাজারের দিকে তারা সবাই আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতো। আম্বর আলী কাকা, পিয়ার আলী, আরজু, আরদস আলীর বড় ভাই, আরো অনেকে। ওরা ফিরে আসতো প্রায় দুপুরের দিকে। তারপর আর ওদের কোনো কাজ থাকতো না। ফলে এই দলটা মাঝে মাঝেই বাঙলা মদ খেতো।

এই পিয়ার আলীদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো মংগল মাদবরের বাড়ি। খুব সুশ্রী একজন সুন্দর মানুষ। তার কোনো সন্তান ছিলো না। বড় বউ ছিলেন বাঞ্জা, তাই তিনি সন্তানের আশায় মংগল মাদবর আরেকবার বিয়ে করেন। দুটু বউই ছিলো অসধারান সুন্দুরী। দুই বউ ই পান খেতো। সুন্দুরী মেয়েরা পান খেলে আরো সুন্দর লাগে। গ্রামে যে কয়টা টিউব ওয়েল ছিলো গ্রামের মানুষের পানি নেয়ার জন্য, এই মংগল মাদবরের বাড়িতে ছিলো একটা। আমরা সবসময় এই বাড়ি থেকেই মাটির কলসীতে করে পানি আনতাম। বড় বউ তার সন্তান হবে না জানার পর একটি পালক ছেলে নিয়েছিলেন, যার নাম ছিলো শহীদ। শহীদ আমার ক্লাসেই পড়তো। মংগল মাদবর একবার মেম্বার পদে নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু তিনি পাশ করেন নাই। মংগল মাদবরের নির্বাচনী ক্যাম্পাসে আমরা শহিদ সহ স্লোগান দিতাম টিনের চোঙ্গায় করে। তখন শহীদ নিজেও বলতো- আমার ভাই তোমার ভাই, মংগল ভাই মংগল ভাই। আমরা শহীদকে বলতাম, ঐ মংগল মাদবর না তোর বাপ? ও বলতো, হ আমার বাপই তো। এতো বোকা একতা ছেলে ছিলো যে অনেক মায়া হয় এখন ওর জন্য। কার যে ছেলে ছিলো শহীদ আমরা জানতেই পারতাম না। যাইই হোক, মেম্বার পদে মংগল মাদবর পাশ করে নাই কিন্তু পাশ করেছিলো খুনের চরের লালচান ভাই যিনি পরে লালচান মেম্বার নামে পরিচিত ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। মংগল মাদবর নিজেও একজন সচেতন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক ধনী ছিলেন তিনি। ছোট বউ এর ঘরে পর পর চার জন মেয়ে হয়েছিলো, পরীর মতো সুন্দুরি মেয়েগুলি। তারমধ্যে নাজমা, সালমা অন্যতম। আজ ওরা কোথায় আমি জানি না। নাজমা আমার থেকে প্রায় ৩/৪ বছরের ছোট ছিলো। মংগল মাদবর আর বাহারের বাবা, রফিক মাষ্টার, আক্কেল আলী, আলমাস, বাছন, জামাল, এরা এক বংশের লোক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মংগল মাদবর ঐ সব লোকদের থেকে একটু দূরে বাড়ি বানিয়েছিলেন (প্রায় ২০/২৫টা বাড়ির পরে পশ্চিম দিকে)। ফলে বেশীরভাগ সময়ে তাদের বংশের সাথে মংগল মাদবরের অনেক কিছুই বনিবনা ছিলো না। শুনেছি, শহীদ মারা গিয়েছিলো হার্টের কারনে। সে বিয়ে করেছিলো কিনা আমার আজ মনে নাই। কারন আমি গ্রাম ছেড়েছিলাম সেই ১৯৭৭ সালে যখন আমি ক্যাডেটে ভর্তি হই। এর পরে অনেকের সাথেই আমার আর যোগাযোগ ছিলো না।

(চলবে)

০২/০৭/২০২১-বজলু আমার বাল্যবন্ধু

কম্পিউটার সার্ফ করছিলাম। হার্ড ডিস্ক ক্লিন করার সময় হটাত করে একটা অনেক পুরানো ছবির সন্ধান পেলাম। অনেকক্ষন তাকিয়ে ছিলাম ছবিটার দিকে। মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। একটা ছবি অনেক কথা বলে। একটা ছবি একটা সময়ের ইতিহাস বলে। একটা ছবি না বলা অনেক স্মৃতি মানষ্পটে জাগিয়ে তোলে। আজকের এই ছবিটাও তেমনি একটি ছবি।

আজ থেকে প্রায় ৪০/৪১ বছর আগের কথা আমি যখন গ্রামে ছিলাম সেদিনের কথাগুলি যেনো একে একে স্পষ্ট জেগে উঠতে থাকলো আমার স্মৃতির পাতায়। আমরা কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক ক্লিন করি, তারমধ্যে আবার নতুন কোনো তথ্য লোড করি, পুরানো তথ্যগুলি অনেক সময় আর খুজে পাওয়া যায় না। হয়তো বিশেষ কায়দায় কোনো ছায়া-মেমোরি থাকলেও থাকতে পারে যা থেকে হয়তো আবার সেই ডিলিটেড কোনো তথ্য বিশেষ কায়দায় ডিস্টর্টেড অবস্থায় কিছু পাওয়া গেলে যেতেও পারে কিন্তু আমাদের ব্রেনের মধ্যে সেই শিশুকাল থেকে যতো স্মৃতি এই মেঘা হার্ডডিস্কে লোড হয়েছে, সেটা কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে আবার জেগে উঠে অবিকল ঠিক সেই বিন্যাসে যা ক্রমান্নয়ে ঘটেছে বা ঘটেছিলো। এমনি একটা স্মৃতির পাতা আজ আমার মন আর ব্রেনের কোনে ঠিক জাগ্রত হয়ে জীবন্ত আমার দৃষ্টির মধ্যে চলে এলো- বজলু, আমার সেই ছোট বেলার অনেক প্রিয় একজন বন্ধু।

বজলু আমার খুব ভালো একজন বন্ধু ছিলো। আমাদের গ্রামের প্রায় শেষ পশ্চিম প্রান্তে ওদের বাড়ি। একই ক্লাসে পড়তাম, এক সাথে মাঠে খেলাধুলা করতাম। ওরা তিন ভাই ছিলো, বজলুই ছিলো সবার বড়। ওর বাবা ছিলো ধনী কৃষক। ওদের সামাজিক অবস্থা গ্রামের অন্যান্যদের থেকে বেশ ভালো। বজলুর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো যে, ও খুবই তোতলা ছিলো কিন্তু আমার কাছে এটা কোনো ব্যাপার ছিলো না। মজার ব্যাপার হলো, বজলু আমার সাথে যখন থাকতো, আর কথা বলতো, সে প্রায় তোতলামী করতোই না। কিন্তু যেই না অন্য কারো সাথে কথা বলতো, তার তোতলামীটা বেড়ে যেত। আমার সাথে বজলু স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতো। ও খুব ভালো গান গাইতো। লেখাপড়ার প্রতি টান থাকলেও কেনো জানি বেশী দূর এগুতে পারে নাই। এমন না যে টাকা পয়সা টানাটানির কারনে বা অভাবের সংসারে ওকে হাল ধরতে হয়েছিলো যার কারনে লেখাপড়া করতে পারে নাই। আমাদের গ্রামের মানুষগুলির বড় সমস্যা হচ্ছে-তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠায়, কিন্তু খবর নেয় না তারা স্কুলে কি পড়ছে, কেমন করছে, কিংবা সন্তানদের কোনো গাইড লাইন দেয়ার দরকার আছে কিনা।

আমার মনে আছে যে, আমি আর বজলু ওদের বাসায় একসাথে পড়াশুনা করতাম। ওর মা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অনেক সময় দুপুরে খাওয়া দাওয়াও করাতেন। আসলে পৃথিবীর সব মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য সব কিছু করতে পারে। তারা সব সন্তানদেরকে একই রকম করে ভাবেন। আমি বজলুকে অংক শিখাতাম কারন বজলু অংকে আর ইংরেজীতে কাচা ছিলো। ১৯৭৭ সালে আমি ক্লাস সেভেন থেকেই গ্রাম ছাড়ি। তার কারন আমি ক্যাডেট কলেজে চান্স পেয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে বজলুর সাথে আর আমার স্কুলে পড়া হয় নাই। ক্যাডেট কলেজে বাধাধরা নিয়ম, মাঝে মাঝে ছুটি পাই, তখন বেশীরভাগ সময় আমি গ্রামেই কাটাতাম। বজলু তখনো স্কুলেই পড়ে। ছুটিতে আমার কোনো কাজ থাকতো না, কিন্তু বজলুর থাকতো। ক্ষেতে কাজ করতো, গরুগুলিকে নদীতে নিয়ে গোসল করাতে হতো। ওর বাবাকে সাহাজ্য করতে হতো, ক্ষেতে আলু কিংবা অন্যান্য শশ্য লাগাতে হতো। আমিও ওদের সাথে ওইখানে বসেই আড্ডা দিতাম। কারন গ্রামে আমার বন্ধুর সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিলো।

রাতেও আমি ওদের বাসায় অনেকদিন আড্ডা দিতাম। তোতলা হলেও গান গাওয়ার সময় বজলু কখনো তোতলামী করতো না। প্রচন্ড মায়া ছিলো ওর অন্তরে সবার জন্য। কারো সাথে ঝগড়া করেছে এমনটা দেখি নাই। পড়াশুনার চাপে আর ক্যাডেটে থাকার কারনে ধীরে ধীরে আমার এসব বন্ধুদের থেকে যোগাযোগটা আমার কমে গিয়েছিলো। প্রায় বছর তিনেক পরে আমি যখন একবার ঢাকা থেকে নারায়নগঞ্জ যাবো বলে গুলিস্তান থেকে একটা বাসে উঠেছি, হটাত কে যেনো আমার নাম ধরে ডাক দিলো। ড্রাইভার সিটে বসা একজন লোক। তাকিয়ে দেখি-বজলু। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম বজলুকে দেখে। বল্লাম-কিরে তুই ড্রাইভারি করিস নাকি?  বজলু আমার হাত টেনে ধরে বল্লো, আমার পাশে বস। নারায়নগঞ্জ যাবি? বল্লাম-হ্যা। খুব ভালোই হলো। তোর সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। আমার জীবনে এইই প্রথম আমার কোনো খুব কাছের মানুষ ড্রাইভার। খুব আপন মনে হচ্ছিলো। বজলু বলতে থাকলো-

তোরা সব চলে যাবার পর আমার আর পড়াশুনা হয় নাই। গ্রামে আসলে পড়াশুনার পরিবেশও নাই। বাড়ি থেকে বারবার চাপ আসছিলো কিছু একটা করার। গ্রামের বেশীরভাগ ছেলেরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছিলো। আমিও সেই লাইনেই ছিলাম। বিদেশ চলে যাবো। তাই ড্রাইভারি শিখতে হলো। লাইসেন্স পেয়েছি। ঘরে বসে না থেকে হাত পাকা করছি আবার কিছু পয়সাও কামাচ্ছি। পড়াশুনা তো আর হলোই না।

সম্ভবত সেটাই ছিলো বজলুর সাথে আমার সর্বশেষ একান্তে কথা বলা। পরে শুনেছি বজলু জাপান চলে গেছে। সেখানে অনেক বছর চাকুরী করে আবার গ্রামে এসেছিলো। আমাদের গ্রামে আমাদের সাথে পড়তো সুফিয়া নামে একটি মেয়ে ছিলো। ওর বোন সাহিদাকেই বজলু বিয়ে করেছে। তিনটা মেয়ে আছে ওর। আমার সাথে ওদের কারো কোনো যোগাযোগ ছিলো না। মাঝে মাঝে গ্রামে যেতাম ঠিকই কিন্তু ওরা দেশে না থাকায় কারো সাথেই আমার যোগাযোগ হতো না। মা যতোদিন বেচে ছিলেন, গ্রামে যাওয়া হতো কিন্তু মা ইন্তেকাল করার পর গ্রামে যাওয়াটা আমার প্রায় শুন্যের কোটায় পরিনত হয়।

২০১৮ সালে হটাত একদিন আমার ফোনে একটা ফোন এলো। আমি অপরিচিত নাম্বার সাধারনত ধরি না। কিন্তু কি কারনে হটাত করে আমি সেই ফোনটা ধরেছিলাম। অন্য প্রান্ত থেকে দেখি বজলুর কন্ঠ।

কিরে দোস্ত, কেমন আছিস? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-বজলু?

খুব ভালো লাগলো ওর কন্ঠ শুনে এতো বছর পর। বজলু বল্লো, সে দেশে এসেছে। বেশ কয়েকদিন থাকবে। তারপরেও বছর খানেক তো থাকবেই। বজলু ওর পরিবারের অনেক খবর দিলো। ওর স্ত্রী সাহিদা আমাদের প্রাইমারী স্কুলে মাষ্টারী করে। তিনটা মেয়ে, সম্ভবত মেয়েদের বিয়ের আয়োজন করছে। ওর শরীরটা নাকি ইদানিং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। অনেক কথা মনে পড়লো-

সেই প্রায় ৪০/৪১ বছর আগে এক সাথে মাঠে খেলা করতাম, এক সাথে নদীতে গোসল করতাম, বাজারে যেতাম, মাছ ধরতাম। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চলে যেতাম, রাত হলে কখনো স্কুলের মাঠেই জ্যোৎস্না রাতে আমরা অনেকে মিলে গান গাইতাম, বজলুই ছিলো প্রধান ভোকালিষ্ট। ওর একটা জাপানিজ গিটার ছিলো, একটা সিন্থেসাইজার ছিলো, জাপান থেকে এনেছিলো। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, আমিই ওদের বাড়িতে থেকে যেতাম ঘুমানোর জন্য। একটা ভীষন মিষ্টি সময় কেটেছে।

বজলু বল্লো- আমি আগামি কয়েকদিন পর তোর অফিসে আসবো। চুটিয়ে গল্প করবো। তোর সাথে খাবো। সারাদিন থাকবো আমি তোর অফিসে। এনামুল, ওয়ালী, মুসা সবাইকে নিয়ে আসবো। সেদিন আমরা সবাই তোর অফিসেই খাবো। খুব ভালো লাগলো ওর কথায়। আমি এখন বড় একটা ব্যবসায়ী, ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, আমার কোনো তাড়া নাই, কোনো চাপ নাই। ভালই হবে ওরা এলে। কিন্তু বজলু কোনো তারিখ দেয় নাই কবে আসবে।

বজলুর সাথে কথা বলার পর আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, বজলু আমার অফিসে আসবে কিন্তু কবে কিংবা কখন সেটা আমার মাথাতেই ছিলো না। মনে হয়েছিলো, আসবেই তো। আমি তো অফিসে প্রতিদিনই আসি। আর আমার গ্রাম কিংবা ওরা যেখানে থাকে সেখান থেকে আমার অফিসে আসতে লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। ওরা যে কোনো সময় নিজের সময়ে এলেই আমাকে পাবে।

এমনি এক অবস্থায় আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আমাকে কথায় কথায় ফোনে জানালো যে, বজলু নাকি অসুস্থ্য। হাসপাতালে ভর্তি। ছোট খাটো ব্যাপার মনে করতে আমিও আর ওকে দেখতে যাইনি। ভেবেছিলাম, কয়দিন পর তো দেখাই হবে। তখন জেনে নেবো ওর কি হয়েছিলো। কিন্তু তার ৩/৪ দিন পর আমার কাছে এমন একটা ব্রেকিং এবং হার্ট টাচিং নিউজ এলো যা আমি কল্পনাও করতে পারি নাই। বজলু নাকি মারা গেছে।

এই সংবাদটা আমাকে এতোটাই মর্মাহত করেছিলো যে, কেউ যেনো আমার দরজার একদম কাছে এসেও আমার সাথে দেখা করতে পারলো না। অথবা এমন একটা পীড়া যা আমাকে এমনভাবে নাড়া দিলো যা কিনা আমার নজরেই ছিলো না। বজলুকে আমি যেমন ভালোবাসতাম, তেমনি বজলু সর্বদা আমাকে মনে রাখতো। বন্ধুরা কেনো জানি ধিরে ধীরে সব হারিয়ে যাচ্ছে।

১১/০৮/২০২১-কনিকার বিদেশ যাওয়ার সময় কিছু উপদেশ

নতুন জায়গায় নতুন দেশের নতুন নিয়মে তুমি সম্পুর্ন আলাদা পরিবেশে একটা নতুন জীবন ধারায় নতুন ক্যারিয়ার তৈরী করার জন্য দেশ ছেড়ে সুদূর আমেরিকায় যাচ্ছো। তুমি এদেশের কোন চাপ, কোনো বিরহ নিয়ে ওখানে বাস করবে না, না কোনো কারনে মন খারাপ করবে। একদম ফ্রেস মাইন্ডে যাবে আর ফ্রেস করে শুরু করবে সব। মন দিয়ে নিজের সপ্ন পুরু করার চেষ্টা করবে কিন্তু সব সময় শরীরের দিকে যত্ন নিতে হবে। আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ। গল্পটা তোমার, সপ্নটা তোমার। এই আজ থেকে তুমি একটা জার্নি শুরু করলে যার একমাত্র যাত্রী তুমি নিজে। জীবনের মজাটা হচ্ছে- কিছু কিছু জিনিষ এমন হয় যেটা অবিশ্বাস্য লাগে কিন্তু তুমি বুঝতে পার- হ্যা এটা হয়েছে। তখন নিজের থেকেই বিশ্বাস হয়ে যায়। 

নতুন কাজ, নতুন পরিবেশ, কিন্তু নিজেকে বদলে ফেলো না। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। তুমি চলে যাবার পর হয়তো আমাদের এখানে অনেক কিছুই পালটে যাবে। পালটে যাবে কোনো এক সন্ধ্যায় পিজা খাওয়ার কিছু আনন্দঘন মুহুর্ত, পালটে যাবে কোনো এক ছুটির দিনে দল্বেধে বাইরে গিয়ে খেতে যাওয়ার আসর কিংবা পালটে যেতে পারে আমাদের অনেক দইনিন্দিন কিছু কর্ম কান্ড ও। আমাদের এই পরিবর্তন কোনো নতুন কিছু হয়তো নয়, এটা একটা এডজাষ্টমেন্ট, যা তোমার অনুপস্থিতিতে আমাদের আনন্দের সাথে বেচে থাকার নিমিত্তে। কিন্তু তোমার বদলে যাওয়া অন্য রকম। তুমি বদলাবে সেটা যাতে তোমার ভালোটা হয়।

 আমি তোমাকে কোনো কিছুতেই কখনো আটকাই নাই, না কখনো আটকাবো। কিন্তু তুমি আমার নিজের মেয়ে, আমার বহু আদরের সন্তান। যদি এমন কখনো হয় যে, আমি তোমাদের কারনে দুশ্চিন্তায় থাকি, তখন হয়তো সমস্ত আবেগ, মায়া আর ভালোবাসা উপেক্ষা করেই হয়তো আমি তোমাকে আটকাবো। সেটা যেনো আমাকে করতে না হয়। প্রাইওরিটি ঠিক করতে হবে জীবনে। সব সময় আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবে। জীবনে ব্যস্ততা থাকবে কিন্তু এতোটা না যাতে ফ্যামিলি ডিপ্রাইভড হয়। তুমি যদি ভালো ফলাফল করতে না পারো, এর মানে এই নয় যে, আমার ভালোবাসা তোমার উপর কমে যাবে। তুমি যদি তোমার ডিজায়ার্ড রেজাল্ট না করতে পারো শত চেষ্টা করার পরেও, আমি তোমাকে কখনোই দোষারুপ করবো না। বরং আমি তোমাকে সারাক্ষন সাহস দেবো, সহযোগীতা করবো কিভাবে তুমি সবার থেকে ভালো ফলাফল করতে পারো। আর ওটাই তোমার বাবা।

একটা জিনিষ সারাজীবন মনে রাখবা যে, সোস্যাল মিডিয়া একটা মেনিপুলেটেড মিডিয়া। এর বেজ মোটেই সত্য নয়। বরং এটা সাজানো সত্যি। কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। এই সোস্যাল মিডিয়ায় সেটাই তারা জানাতে চায় যেটা তারা তোমাকে জানাতে চায় কিন্তু তোমার উচিত সেটা জানা যেটা আসল সত্যি। কারন অনেক বড় অপরাধের শিকর অনেক গভীরে থাকে। এই সোস্যাল মিডিয়ার ব্যক্তিত্তরা সবাই মেনিপুলেটেড চরিত্র। এরা ডিটেইল্ড মিথ্যা কাহিনী খুব নিখুতভবে বানায়। তাই কোনো কিছুর ফেস ভ্যালুতে না গিয়ে ডাবল ভেরিফিকেশন জরুরী। জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিজের চারিদিকে সবসময় চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এই কথাটা খুব জরুরী মনে রাখা যে, প্রকৃতির ইশারার প্রতি সর্বদা সেনসিটিভ থাকা। যেদিন সুনামী হয়, তার আগের দিন জংগলের সমস্ত প্রানিকুল সবাই জাত নির্বিশেসে উচু জায়গায় স্থান নিয়েছিলো, কারন তারা প্রকৃতির সেন্সটা বুঝতে পেরেছিলো। যা মানুষ বুঝতে পারে নাই। ফলে সুনামীতে বন্য প্রানীদের মধ্যে যতো না ক্ষতি হয়েছিলো তার থেকে শতগুন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো মানুষ। ঠিক এই কারনেই  সব সময় মনে রাখা দরকার যে, অপরাধের সুনামী একটা নয়, অনেক সংকেত দেয়, হওয়ার আগে এবং অপরাধ হওয়ার সময়। শুধু সেটা ধরতে হয়।

মানুষের শরীরে একটা জিনিষ থাকে যা পোষ্টমর্টেম করেও পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো সাফল্যে সব থেকে জরুরী হয় সেই জিনিষটার। সেটা “কনফিডেন্স”। এই কনফিডেন্স মানুষকে তৈরী যেমন করতে পারে, তেমনি ভেংগেও দিতে পারে। যখন এটা ভেংগে যায় বা হারিয়ে যায়, তারপরে আর কিছু কাজ করে না। তখন যেটা হয়, তুমি ঠিক করছো নাকি ভুল করছো কিছুই বুঝতে পারবে না। আর যখন কনফিডেন্স চলে যায় বা হারিয়ে যায়, সেই জায়গাটা দখল করে নেয় “কমপ্লেক্স”। এই কমপ্লেক্স যখন গেথে বসে যায় কারো জীবনে, তখন সিম্পল একটা ছবি তুলতেও খারাপ লাগে। কারন কে আপনাকে নিয়ে মজা করবে, কে লেগ পুলিং করবে এই সব ভেবে।

জিবনে এমন কোনো অধ্যায় তোমার থাকা উচিত নয় যা তুমি আর অন্য কেউ শুধু জানো অথচ আমরা জানি না। আমাদের মান, সম্মান, পজিশন, সমাজে মাথা উচু করে বেচে থাকার জন্য শুধু আমাদের গুনাবলীইই যথেষ্ঠ নয়, সেখানে তোমরাও আমাদের সেই জীবনের সাথে জড়িত। ফলে, যেটাই হোক সবকিছুতেই আমাদের কথা মাথায় রাখবে। বাবা মায়ের থেকে বড় ভরষা আর কিছু নাই। আমরা যদি আগে থেকেই জানতে পারতাম আমাদের কর্মফলে কি ফলাফল হয়, তবে কতই না ভালো হতো। কিন্তু সেটা আমাদের স্রিষ্টিকর্তা সুযোগ দেন নাই। তাই সতর্ক থাকাটা খুব দরকার। সতর্ক হওয়া মানে এই নয় যে আমরা শুধু মাত্র পরিনতির বিষয় ভাববো, সতর্ক থাকার অর্থ হলো সঠিক সময়ে নেয়া সেই পদক্ষেপ যা আগামী সমস্যাগুলিকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। বিশেষত এটা জানা সত্তেও যে আমাদের আগামী কর্মফল খারাপ।

মনে রাখবা এক বন্ধুই আরেক বন্ধুর ক্ষতি করে। তাতে তোমাকে সাহাজ্য করতে আমাদের অনেক অসুবিধা হবে। তুমি শুধু ফোকাস করবে তোমার ক্যারিয়ারে আর সপ্ন পুরনে। তোমাদেরকে নিয়ে আমার সারাটা জীবন অন্য রকমের একটা সপ্ন আছে। আরেকটা কথা মনে রাখবে- ভালোবাসায় অনেক শক্তি থাকে। যদি হতাতই মনের অনিয়ন্ত্রনের কারনে কাউকে ভালোই লেগে যায়, সেখানে নিজের সাথে নিজের বুঝাপড়া করো। সব ভালোবাসার রুপ এক নয়। কেউ ভালোবাসে তোমার শরীরকে, কেউ ভালোবাসে তোমার দূর্বলতাকে, কেউ ভালোবাসে তোমার মেধাকে, আবার কেউ ভালোবাসে তোমার তথা তোমার পরিবারের সম্পদ কিংবা তোমার অস্তিত্বকে। কে তোমাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোবাসলো, এই দৃষ্টিকোণ টা খুব ভালো করে বুঝা তোমার দায়িত্ব। কেউ যদি তোমাকে আসল রুপে ভালোবাসে, কখনো সে তোমাকে জোর করবে না কারন সে জানে যদি তুমি তার হও, তুমি যেভাবেই হোক সেটা বুজতে পারবে আর তুমি তার কাছে বিলম্ব হলেও ফিরে যাবে অথবা সে দেরী করে হলেও তোমার কাছেই ফিরে আসবে। যদি সে ফিরে আসে বা তুমি ফিরে যাও, তাহলে বুঝবে এটা সত্যি ছিলো। নতুবা কিছুই সত্য ছিলো না। যা ছিলো সেটা হলো একটা মোহ। মোহ আর ভালোবাসা এক নয়। একটা বাস্তব আর আরেকটা মিথ্যা। এই মিথ্যা ভালোবাসায় পতিত হয় হয়তো মনে অনেক কষ্ট জমা হতে পারে। কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সে সব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তর মানসিক কষ্টটা আর থাকে না। এটা অনেক জরুরী একটা ব্যাপার। সব কিছুরই প্রথমবার আছে। এটা যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রেও। যৌবন হলো অসহায় এবং শক্তির দ্বিতীয় নাম। অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার হয় কিন্তু যৌবনের ভালোবাসার প্রতারনায় নিজের অসহায়ত্তের বিচার নিজেকে করতে হয়। তখন নিজের বিরুদ্ধে রায় দেয়া সহজ হয় না। তাই আমি সব সময় একটা কথা বলি- টাইম হচ্ছে মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভিলেন। তার কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না। আবার এই টাইমই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বন্ধু। তুমি এই টাইমকে কিভাবে ব্যবহার করবে সেটা তোমার বিবেচনা। একবার মনে কালো দাগ পড়ে গেলে তা আজীবন নিজেকে কষ্ট দেয়। ব্ল্যাক কফি, ব্ল্যাক ফরেষ্ট কেক, ডার্ক চকোলেট, ঘন জংগল অন্ধকার রাত, সবই কালো কিন্তু সে কালো কোনো কষ্টের নয়। কিছু কালো জীবনের অভিশাপ। কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? বিশেষ করে সেই কালো যা জীবনের ধারাবাহিকতায় অভিশাপের মতো রুপ নিয়েছে? তাই, আমি প্রতি নিয়ত তোমাকে নিজের হাতের নিয়ন্ত্রনের বাইরে ছেড়ে দিতে ভয় করলেও তোমার উপর আমার আলাদা একটা ভরষা আছে- তুমি পারবে ঠিক সে রকম করে চলতে যা আমি তোমার জন্য করতে চেয়েছিলাম। এই ভরষায় আমি তোমাকে অনেক দূরে পাঠাতেও দ্বিধা করছি না।

আমার আশা, তোমার মায়ের সপ্ন আর আমাদের পরিবারের সব সম্মান তোমার হাতে দিয়ে এটাই বলতে চাই- আমরা তোমাদের পরিচয়ে সমাজে আরেকবার সম্মানীত হতে চাই। বাকীটা আল্লাহ মালিক জানেন।

২৭/০৩/২০২১-সেনাপ্রধান আজিজের সাথে

Categories

 

যেদিন ষ্টাফ কলেজ করতে আসি সেই ১৯৯৭ সালে মীরপুরে, তখন আমরা প্রায় ৯০% অফিসারই মেজর পদবীর। সেনাবাহুনীর কিছু কিছু কোর্ষ আছে যেখানে জুনিয়ার আর সিনিয়ার মিলে কোর্ষ মেট হয়ে যায়। এই ষ্টাফ কলেজ সে রকমের একটা কোর্ষ। জেনারেল আজিজ আমাদের সাথে ২৩ ডি এস সি এস সি (ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কোর্ষ) করেন। খুবই সাদামাতা ক্যালিভারের একজন অফিসার। এটা বল্বো না যে, গননায় নেয়া যাবে না, কারন যারাই ষ্টাফ কলেজ করতে আসেন, তারা অনেক মেধার পরীক্ষা দিয়েই আসেন। কিন্তু এই মেধাবী অফিসারদের মধ্যে যখন তুলনা করা হয়, তখন সাদামাটা বলা চলে। আমরা একই সিন্ডিকেটে ছিলাম।

কালেভদ্রে আমরা যে কোনো কারনেই আর আর্মিতে থাকতে পারি নাই। এতার প্রধান কারন বাংলাদেশের রাজনীতি। এই অপরাজনীতি দেশের অনেক তুখুর মেধাবী ছেলেদেরকে দেশের অনেক কাজে লাগায় নি, লাগাতে দেয়া হয়নি। যারা বেশী তোষামোদি করতে পেরেছে, তারা হয়তো রয়ে গেছেন, আবার যারা মেনে নিতে পারেন নাই, তারা অকালেই সেচ্ছায় চলে গেছেন, আবার অনেকে বের হয়ে কি করবেন এই ভেবের যাতনাটা সহ্য করেই দাতে দাত লাগিয়ে রয়ে যায়।

১২/০৩/২০২১-ওরা চলে যাবার পর

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

মার্চ 

১২ 

বাচ্চারা যখন ছোট থাকে, তখন ওদেরকে কখনো হাতছাড়া করবো এটা মাথাতেই আসে নাই, কারো আসেও না। তখন সময়টা এক রকমের। হোক সেটা ছেলে বা মেয়ে।

যখন ওরা মাত্র বেবি, ওরা যখন কথা বলাও শুরু করে নাই, কিন্তু ঝড়ের গতিতে হাত পা নাড়তো, খুব মজা লাগতো দেখে, ওটাই ছিলো বেবিদের ভাষা। তখন তো মনে হতো, আহা, কি মিষ্টি বাচ্চারা। কথা নাই অথচ হাত পা নেড়েই যেনো সব কথা বলে। এই ভাষাতেই ওরা জানান দিতো, ওদের হাসি, আহলাদ, কিংবা কষ্টের ইংগিত।

ওরা যখন হাটতে শিখলো, তখন তো ওরা যেনো আরো সাধিন। যেখানে খুসী হাটা ধরে, যেনো সারা প্রিথিবী ওদের জন্য। ওরা হয়তো জানেই না কোনটা ওদের জন্য বিপদ আর কোনটা ওদের জন্য ফ্রেন্ডলী। আর এই পার্থক্যটা আমরা পেরেন্টসরা বুঝি বলে সারাক্ষন আমরা আমাদের বাচ্চাদের আগলে রাখি, ধমক দেই, শাসন করি।

ওরা অনেক সময় আমাদের এই শাসনের ভাষা হয়তো বুঝতে পারে না বলে মনের আবেগে চোখের পানি ফেলে, রাগ করে না খেয়ে থাকে, অভিমান করে কথা বলা বন্ধ করে, ডাকলেও শুনে না, আরো কতকি?

টাইম মতো ওরা না ঘুমালে আমরা ওদেরকে হয়তো বকা দেই, গোসল ঠিক মতো করেছে কিনা, ঠিক সময়ে খাবারটা খেলো কিনা, সব বিষয়েই আমরা সর্বদা সজাগ থাকি। জোর করে করাই আর ওরা হৈচৈ করে। অনেক সময় পুরু বাড়িটা হই চই এর মধ্যে রাখে, সরগোল আর চেচামেচিতে বাড়িটায় যেনো একটা শব্দদূশনে পরিনত হয়, চারিদিকে ছেড়া কাগজ, ঘরে বইপত্র অগোছালো করে দিশেহারা করে রাখতো। ওরা মাঝে মাঝে কত আবদার করতো, অনেক আবদার নিছক শখে কিংবা অনেক আবদার না বুঝেই। আর সেটাই হয়তো ওদের সারা রাতের খুসী অথবা কষ্টের কারনে ঘুম নষ্ট হতো। যদি পেতো, সারাটা রাত না ঘুমে আবার যদি না পেতো তাতেও সারা রাত না ঘুমে কাটিয়ে দিতো অভিমান করে।

এই বাচ্চারাই যখন আর ধীরে ধীরে সমাজের বিভিন্ন কর্মকান্ডে ঢোকে যায়, ঘর থেকে বেরিয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, আমরা এই ভাগ্যবান পিতামাতা অভাগার মতো একা হয়ে পড়ি। মন খারাপ হয়, স্মৃতি পাহাড়ের মতো স্তুপ হয়ে যায়। তখন, এই সব আদুরে বাচ্চাদের ফেলে যাওয়া খেলনা, পরিত্যক্ত হাতের লেখার খাতা, কিংবা তার ব্যবহৃত কোনো পোষাক দেখলেই আমাদের বুকে হটাত করে ধক করে উঠে ব্যথায়। তখন তাদের অতীতের পদচারনা আমাদের কানে ঝুমকোর মতো বাজে, ওদের অতীতের একগুয়েমী রাগ কিংবা আব্দারের কথা কিংবা অযথা রাগ অভিমানের স্মৃতির কথা মনে করে আমার চোখের কোন ভিজে উঠে। মনে হয় মাঝে মাঝে, আহা, ঘরটা একসময় কত ভর্তি ছিলো, আজ একেবারেই শুন্য। ঘরকে নোংরা করার জন্য কত বকা দিয়েছি, বাথরুমের সেন্ডেল পড়ে সারা ঘর ঘুরে বেড়ানোর জন্য কত বকা দিয়েছি। অযথা রাগ অভিমান করে খাবার না খাওয়ার জন্য রাগ করেছি, শাসন করেছি, অথচ আজ, আমার বাড়ির প্রতিটি ঘর শুন্য, একদম পরিপাটি যা সব সময় রাখতে চেয়েছিলাম ওরা যখন ছিলো। আজ আর কেউ বাথ রুমের সেন্ডেল পড়ে ঘুরে না, আজ আর কেউ আমার কাছে অনলাইনে শপিং করার জন্য একশত টাকা আবদার করে না, কিংবা হটাত করে পিজার অফার থাকলেও আর অফারের জন্য বায়না ধরে না। সব যেনো নীরব। আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যখন ওরা সাথে ছিলো? আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যেনো ঘরে সবাই শান্ত হয়ে থাকে? আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যেনো ঘর নোংরা না করে সারাক্ষন পরিপাটি করে রাখুক? অথচ আজ ঠিক তেমনটাই তো আছে। কেউ ঘরে নাই, কেউ ঘর নোংরা করে না, কেউ হৈচৈ করে না। কিন্তু তারপরেও কেনো মনে শান্তি নাই? কেনো মনে হয়, ঘরটা নয়, অন্তরটা শুন্য? যেখানেই তাকাই সব ঠিক আছে, শুধু ঘরটাই খালী।

আজ কেনো জানি বারবার মনে হয়, ওরা আবার ফিরে আসুক, ওরা আবার আমার সাথে আবার ঝগড়া করুক, ওরা আবার আমার কাছে অহেতুক বায়না ধরুক, আমি আর কখনো ওদের বকা দেবো না, সব বায়না আমি মেনে নেবো। খুব মনে পড়ে আজ যে, যখন অফিস থেকে এসেই মেয়ের রুম খুলে বলতাম, কিরে মা, কি করিস? হয়তো তখন মেয়ে রুমেও নেই, হয়তো অন্যঘরে আছে বা রান্নাঘরে কিংবা বাথরুমে কিন্তু জানতাম বাসাতেই আছে। আজ যখন অফিস থেকে বাসায় এসে মেয়ের রুমে যাই, মুখ দিয়ে বলতে চাই, কি রে মা কোথায় তুই? কিন্তু ভিতর থেকে অন্তরের কষ্টে আর কথাটাই বের হয় না। জানি, মেয়েটা আর বাসায় নাই। ওর টেবিল, টেবিলের উপর সেই ঘড়িটা, ওর আলমারী, ওর চেয়ার, সবই তো আছে। কিন্তু মেয়েটাই নাই। প্রতিটা টেবিল, বই, খাতা, আল্মারী, সেই পুরানো ঘড়ি কিংবা বিছানার চাদরটায় হাত দিয়ে আমি অনুভব করি আমার সন্তানদের শরীরের সেই চেনা গন্ধ। খুব করে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে সব কিছু।

ভালোবাসি।

সব সময়।

সর্বদা।

চোখের পানির ফোয়ারা দিয়ে যে ভালোবাসা বেরিয়ে আসে, সেখানে রাগটাও হয়তো ছিলো আমার ভালোবাসার আরেক রুপ। হয়তো বকাটাও ছিলো আমার মায়ার আরেক রুপ। দম বন্ধ হয়ে আসে যেনো তোমাদের ছাড়া।

এখন প্রায়ই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে আবার বাবার কথা। হয়তো তারাও একদিন আমাকে খুব মিস করেছে, আমি বুঝি নাই। আর আজ আমি তাদেরকে মিস করি কিন্তু ওরা কেউ নেই এই মায়াবী পৃথিবীতে। আজ হয়তো আমিও আমার সন্তানদের মিস করছি। হয়তো কোন একদিন ওরাও আমাকে অনেক মিস করবে। সেদিন হয়তো পৃথিবীতে আরেকটা নতুন ক্যালেন্ডারের “সময়” চলছে।

“সময়” কারোই বন্ধু নয়, অথচ সে সবার সাথে আছে। কিন্তু সময়ের স্মৃতি মানুষকে সব সময় নষ্টালজিক করে রাখে। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে আমি তোমাদের সাথে আছি আর থাকবো।

উতসর্গঃ

(কনিকার ইউএমবিসিতে (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি) ভর্তির চুড়ান্তে আমার কিছুটা নষ্টালজিকতা)

০২/০২/২০২১-কনিকার বাল্টিমোরে ভর্তি

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

ফেব্রুয়ারী 

০২

ইন্টার পরীক্ষার ফলাফলের আগে থেকেই কনিকা আসলে এদেশে পড়বেনা বলে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলো। কনিকার সমস্যা হচ্ছে, ও যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত আমি বদল করতে পারি না, মাঝে মাঝে বদল করতেও চাইনা আসলে। ইন্টার ফলাফল পাওয়ার পর দেখা গেলো কনিকা সবগুলি সাব্জেক্টেই এপ্লাস মানে গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে। এতে আরো সুবিধা হয়ে গেলো যে, ওর পরীক্ষার ফলাফলে যে কোনো ইউনিভার্সিটিতেই ভর্তি হবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলো। এর মধ্যে অনেকগুলি ইউনিভার্সিটিতে এপ্লিকেশন করেছে। কোনো ইউনিভার্সিটিই ওকে রিজেক্ট করে নাই বরং কনিকা ফাইনান্সিয়াল এইডের কারনে সে নিজেই বেশ কিছু ইউনিভার্সিটির এক্সেপ্টেন্স রিজেক্ট করেছে।

প্রথমে কনিকা সবগুলি ইউনিভার্সিটি চয়েজ করেছিলো বোষ্টন বেজড। কারন আমার বড় ভাই বোষ্টনে থাকেন। একটা সময় আমার মনে হলো যে, আসলে আমার বড় ভাইয়ের উপরে নির্ভর করে কনিকাকে এতোদূরে পাঠানো ঠিক হবে কিনা। তিনিও বুড়ো হয়ে গেছেন, অনেক কিছুই তার পক্ষে এখন সামাল দেয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় তিনি অনেক কিছু ভুলেও যান। প্রায়শ ক্ষেত্রেই আমি দেখেছি যে, আমার বড় ভাইয়ের উপর অনেক ব্যাপারে ভরষা করা যায় না। কোনো কিছুতেই আমার বড় ভাই না করেন  না বটে কিন্তু ঠিক শেষ মুহুর্তে এসে দেখা যাবে তিনি আর পারেন না অথবা তার অনেক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় বা করেন। বিশেষ করে যখন কোনো ফাইনান্সিয়াল কোনো ব্যাপার থাকে সেখানেই তার সব বিপত্তি। তাই ভাইয়ার উপরে আমার ভরষা আমার ছোট মেয়েকে পাঠানো উচিত হবেনা বলে আমার কাছে মনে হলো। দেখা গেলো যখন কনিকার কোনো প্রয়োজন হবে ঠিক তখন কনিকার জন্য সাহাজ্য আর আসছে না।

আমি মতামত চেঞ্জ করে কনিকাকে বললাম যে, তুমি শুধু বোষ্টনের জন্য এপ্লাই না করে আমাদের আরো আত্তীয়সজন যেখানে বেশী আছে, সেখানেও এপ্লাই করো। আমেরিকাতে বাল্টিমোরে থাকে লুসিরা, ছোটভাই, এবং আরো অনেকেই। ফলে আমি কনিকাকে বাল্টিমোরের জন্যেও এপ্লাই করতে বললাম। আজই উনিভারসিটি অফ ম্যারিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি (ইউএমবিসি) থেকে সরাসরি ওর ভর্তির ব্যাপারে চিঠি এসছে যে, ওরা কনিকাকে নিতে আগ্রহী এবং যত দ্রুত সম্ভব ওরা আই-২০ ফর্ম পাঠাতে চায়। শুনলাম, ওখানে লুসির ছেলেও আবেদন করেছে। লুসিরা খুব খুসি যে, কনিকা ওখানে পড়তে যাবে।

আপডেটঃ ১১ মার্চ ২০২১

আজ কনিকার আই-২০ ফর্ম এসছে ইউএমবিসি (ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, বাল্টমোর কাউন্টি) থেকে। ইউএমবিসি বাল্টিমোরের সবচেয়ে ভালো একটা ইউনিভার্সিটির মধ্যে একটি। আর সবচেয়ে এক্সপেন্সিভও বটে। আমি খুশী যে, কনিকা নিজে নিজেই সবগুলি কাজ করেছে এবং খুবই স্মার্টলী ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করেছে। এবার ওর দূতাবাসে দাড়ানোর পালা। যদি ইনশাল্লাহ সব কিছু ঠিক থাকে, তাহলে আগামী জুলাই মাসে কনিকা আমেরিকায় চলে যাবে। এটা যেমন একদিকে আমার জন্য ভালো খবর, অন্যদিকে একটু কষ্টও লাগছে যে, মেয়েটা অনেক দূর চলে যাবে। ইচ্ছা করলেই আর ওর সাথে রাত জেগে জেগে আলাপ করা যাবে না। বাচ্চারা এভাবেই কাছ থেকে দূরে বেরিয়ে যায়। 

২৯/০১/২০২১- নূরজাহান আপা

Categories

নুর জাহান আপা আমার জেঠস ছিলেন। অর্থাৎ আমার স্ত্রীর আপন বোন। তিনি একজন শিক্ষিকা ছিলেন, মীরপুরের সিদ্ধান্ত স্কুলের শিক্ষিকা। আমি নুরজাহান আপাকে চিনি আমারও বিয়ের প্রায় অনেক বছর আগ থেকে কারন আমরা গোলারটেকেই থাকতাম পাশাপাশি। আমি যেহেতু সবার সাথে খুব একটা মিশতাম না তাই বিয়ের আগে ঊনাদের সাথেও আমার খুব বেশি ঊঠানামা ছিল না। জাস্ট  চিনতাম, ঊনারাও আমাকে চিনতেন। তার স্বামীর নাম জয়নাল চৌধুরী, তিনি প্ল্যানিং কমিশনে চাকুরী করতেন এক সময়। বর্তমানে অবসর নিয়েছেন। ভালো মানুষ একজন।

নুর জাহান আপা অনেকদিন যাবত লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন। আপা নিজে খুব পহেজগার মহিলা ছিলেন। তার দুই মেয়ে, সোমা এবং সনি আর এক ছেলে, নাঈম আহমদ। দুইজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। আর ছেলে থাকে আমেরিকায়। সেও বিয়ে করেছে।

আপার শরীরটা আস্তে আস্তে খারাপ হবার সাথে সাথে তিনি প্রথমে ইন্ডিয়া যান চিকিতসা করাতে। ওখানকার ডাক্তাররা বলেছিলেন যে, তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করাতে হবে, তানা হলে তাকে আর বেশিদিন বাচানো যাবে না। ব্যাপারটা প্রায় ঠিকই ছিলো। ইন্ডিয়া থেকে আসার পর আপা দ্রুত খারাপের দিকে যেতে শুরু করলেন। শেষে তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করাবেন এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হলো। কিন্তু জটিল ইন্ডিয়ান সিস্টেমের কারনে ইন্ডিয়া গিয়েও তার লিভার ট্রান্সপ্লান্টেসন করা সম্ভব হয় নাই। 

অতঃপর আপা আবারো আমেরিকায় তার নিজের ছেলের কাছে গিয়ে আমেরিকার উন্নত মানের চিকিতসার জন্য। কিন্তু আমেরিকায় যাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। তার মৃত দেহ আমেরিকায় সতকার করা হয়। তার মানে নূরজাহান আপাকে আমরা দেশে কবর দিতে পারি নাই।

২৮/০১/২০২১- উম্মিকা,আমার বড় মেয়ে

Categories

আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা আমার বড়মেয়ে। জন্ম তার ১৬ জানুয়ারী ১৯৯৪ সাল।

তার জন্মের আগে আমার বড় ইচ্ছে ছিলো যে, আমার যেনো একটা মেয়ে হয়। আমি কখনোই ছেলে হোক চাই নাই। আল্লাহ আমার মনের আশা পুরন করেছেন উম্মিকাকে আমার ঘরে দিয়ে। সে খুব ভালো একটা মেয়ে। কিন্তু সে খুব সিম্পল। 

উম্মিকার জন্মের আগে (সম্ভবত ৪/৫ দিন আগে) আমি একটা সপ্ন দেখেছিলাম। তাহলে সপ্নটা বলিঃ

ঢাকা সেনানীবাসের মেস বি তে আমি একটা রুমে আছি। আমার পোষ্টিং ছিলো খাগড়াছড়িতে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অধীনে। মিটুল পোয়াতি অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। যে কোনো সময় আমার বাচ্চা হবে। আমি ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসেছি শুধু আমার অনাগত বাচ্চার আগমনের জন্যই। নামাজ পড়ি, খাই দাই, আর সারাদিন হাসপাতালে মিটুলের সাথে সময় কাটাই।

একদিন রাতে (ডেলিভারির ৪/৫ দিন আগে) আমি সপ্নে দেখলাম যে, আমি আমাদের গ্রামের কোনো একটা দোকানে বসে আছি। ওখানে আরো অনেক লোকজন ও আছে। হতাত করে সবুজ একটা সুতী কাপড় পড়ে একজন মহিলা কোনো একটা ঘরের ভিতর থেকে বাইরে এসে আমাকে বল্লো, আমাকে আপনি কি চিনেন? আমি তাকিয়ে তাকে বললাম, জী না আমি আপনাকে কখনো দেখি নাই। উত্তরে মহিলাটি আমাকে বললেন, যে, তিনি হযরত আছিয়া বেগম অর্থাৎ মুসা (আঃ) এর মা। আমি তো অবাক। কি বলে এই মহিয়সী মহিলা?

আমি ততক্ষনাত উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে তো আপনার কাছে আমাদের নবীজির অনেক চিঠি থাকার কথা! মহিলা বললেন, হ্যা আছে তো।

এই কথা বলে তিনি আবার ঘরের ভিতরে চলে গেলেন চিঠিগুলি আনার জন্য। আমার ঘুম ভেংগে গেলো। আমি তখন সময়টা দেখলাম, রাত প্রায় শেষের পথে কিন্তু তখনো ফজরের আজান পড়ে নাই।

পরদিন ছিলো শুক্রবার। আমি জুম্মা নামাজ পড়ে ইমামের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বললাম। তিনি প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবনা কিনা। আমি বললাম, আমরা খুব শিঘ্রই বাচ্চার আশা করছি। তিনি বললেন, আপনার মেয়ে হবে এবং খুব ভালো একজন মেয়ে পাবেন আপনি।

তার ৪/৫ দিন পর আমি আসর নামাজের পর কোর আন শরীফ পড়ছিলাম। এমন সময় আমার মেস ওয়েটার তড়িঘড়ি করে আমার রুমে নক করে বল্লো যে, স্যার আপনাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেছে। আমি তখন যেখানে কোর আন আয়াত পড়ছিলাম, ঠিক সেখানেই মার্ক করে কোর আন বন্ধ কত্রে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। মিটুলকে ওটিতে নেয়া হচ্ছে, সিজারিয়ান করতে হবে।

প্রায় ঘন্টা খানেক পরে আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার মিষ্টি মেয়েটার জন্ম হলো এই পৃথিবীতে। কি নাম রাখবো সেটা আমি ঠিক করেছিলাম যে, আমি যেখানে কোর আন শরীফ টা পড়া বন্ধ করেছি, আর যে আয়াতে, আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ঠিক সেই আয়াত থেকেই কোনো একটা শব্দ দিয়ে নাম রাখবো। অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে- আমি ওই সময়ে হজরত মুসা (আঃ) এর উপরেই আয়াতগুলি পড়ছিলাম। সেখানে আয়াতে লিখা ছিলো- ইয়া হাইলা আলা উম্মিকা মুসা। অর্থাৎ হে মুসা, আমি তোমার মাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিলাম।

আমি ঠিক এই শব্দতটাই আমার মেয়ের নাম রাখার সিদ্ধান্ত নেই যে, ওর নাম হবে উম্মিকা। অর্থাৎ মা।

আমার সেই উম্মিকার প্রথম শিক্ষা শুরু হয় মীরপুর স্টাফ কলেজের টর্চ কিন্ডার গার্ডেনে। অতঃপর মেথোডিস্ট ইংলিশ মিডিয়াম, তারপর শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ এবং সেখান থেকে হলিক্রস। হলিক্রস থেকে উম্মিকা এইচএসসি পাশ করে ডাক্তারী পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে শহীদ জিয়া মেডিক্যালে আল্লাহর রহমতে ইন্টার্নী করে ২০২০ সালে ডাক্তারী পাশ করলো। এটা আমার একটা স্বপ্ন যে সে ডাক্তার হোক। আমার আরেকটা স্বপ্ন হচ্ছে, সে যেনো সেনাবাহিনীর ডাক্তার হয়। তাতে যে লাভটা হবে তা হচ্ছে, বাবার সেনাবাহিনীর জব ছিলো। রাজনীতির প্রতিহিংসায় সে ইচ্ছে করে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছিলেন, জেনারেল পর্যন্ত যেতে পারেন নাই। আমি চাই আমার মেয়ে সেটা হোক। আর ২য় কারন হচ্ছে, আজীবন কাল সে সেনাবাহিনীর সব বেনিফিট গুলি যেনো পায়। কিন্তু বাবাদের সব সপ্ন তো আর সার্থক হয় না। আমার মেয়ে চায় বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সে বেসামরীক লাইফেই থাকে।

২৮/০১/২০২১- কনিকা, আমার ছোট মেয়ে

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

জানুয়ারী 

২৮ 

সানজিদা তাবাসসুম কনিকা আমার ছোট মেয়ে। জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর ২০০০।

ভাবলাম, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাসায় আছি, সময়টা কাটছে না খুব একটা। সবার ব্যাপারে কিছু লিখতে থাকি।

কনিকার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমি জানতাম না যে, আমার আরেকটি মেয়ে হচ্ছে। আমি জানতেও চাই নাই। এটার পিছনে বেশ একটা কারন ছিলো। আর সেটা হচ্ছে যে, আমার শখ ছিলো আমার প্রথম সন্তান মেয়ে হোক। আল্লাহ সেটা আমার বড় মেয়ে উম্মিকাকে দিয়ে সেই শখ পুরা করেছেন। তারপরের সন্তান আমার ছেলে চাই না মেয়ে চাই এটা নিয়ে আমার কোনো কৈফিয়ত কিংবা কোনো প্রকারের হাহুতাশ ছিলো না। শুধু চেয়েছিলাম যেনো আমার সন্তান সুস্থ্য হয়।

মেয়ে হয়েছে, এই খবরটা দেয়ার আগে ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমার প্রথম সন্তান কি? আমি উত্তরে বললাম, যেটাই হোক, মেয়ে হলেও আমি কিছুতেই অখুসি নই। দুটুই আমার সন্তান। এবারো সিজারিয়ান বেবি। মিটুলের অনেক কষ্ট হয়েছে এবার। আমার মা ঢাকার বাসাতেই ছিলেন, আমার মেয়ে হয়েছে শুনে, আমার মায়ের খুব মন খারাপ। আমি হেসেই বাচি না। আমি প্রথমে ব্যাপারটা মজা মনে করে মাকে কিছুই বলি নাই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখলাম, আমার মা আমার ছোট মের‍্যেকে একেবারেই পছন্দ করেন না। বারবার শুধু একটা কথাই বলে- ওই ত্যুই ছেলে হইতে পারলি না?

আমার মেয়ে তো কিছুই বুঝে না। সে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে আর দাদির লগ্না হচ্ছে। কনিকার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমার বুকে একটা ধক করে উঠেছিলো। এতো অবিকল চেহারা হয়? একদম আমার মায়ের চেহারা। তার চোখ, মুখ, নাক , কান, মুখের আকৃতি সব কিছু আমার মায়ের চেহারা। আমি মনে মনে ভাবলাম, হে আল্লাহ, তুমি আবার এই ছোট মাকে আমার কোলে দিয়ে আমার বড় মাকে নিয়ে যেও না।

মাকে বললাম, মা , ছোট মেয়ে একেবারে তোমার অবিকল চেহারা পেয়েছে। তুমি যখন থাকবা না, এই মাইয়াটাই আমার কাছে তুমি হয়ে আজীবন বেচে থাকবা। অনেক দিন ছোট মেয়ের নাম রাখা হয় নাই। আমি মাকে দায়িত্ত দিয়েছি মা যেনো ছোত মেয়ের নাম রাখেন। যা খুশী সেতাই রাখুক। অবশেষে একদিন মা, ছোট মেয়ের নাম রাখলেন- কনিকা।

উম্মিকা ছোট অবস্থায় আমার সাথে থাকতে পারে নাই কারন আমি তখন বিভিন্ন সেনানীবাসে খালী পোষ্টিং আর মিশনের কাজে বিদেশ করে বেড়িয়েছি। কিন্তু কনিকার বেলায় বেশ লম্বা একতা সময় এক সাথে থাকার সুযোগ পেয়েছি।

তারপরেও বেশ অনেক গ্যাপ হয়েছে আমার ওদের সাথে থাকার। কনিকা বড় মেয়ের মতো সেও প্রথমে মেথোডিস্ট স্কুল মিডিয়ামে, তারপর মোহাম্মাদপুর প্রিপারেটরী এবং অতঃপর বিআইএস থেকে শহীদ আনোয়ারা গার্লস কলেজে পরাশুনা করে এস এস সি পাশ করেছে। সাংঘাতিক টেনসনবিহীন একটি মেয়ে। অল্পতেই খুব খুতখুতে কিন্তু খুব বুদ্ধিমতি। কনিকা উম্মিকার থেকেও একটু বেশি চালাক কিন্তু ধূর্ত নয়। আমার ইচ্ছে যে, কনিকা এডমিন ক্যাডারে চাকুরী করুক এবং সচীব হয়ে অবসর নিক। অথবা ব্যারিস্টার হোক। তাতে নিজের ব্যবসা নিজেই করতে পারবে, কারো সরনাপন্ন হতে হবে না। 

কিন্তু আমার ইচ্ছাটাই সব কিছু নয়। এই করোনা পেন্ডেমিকের সময় সরকার কর্তৃক অটোপাশের মাধ্যমে কনিকা ইন্টার পাশ করে ফেল্লো। কনিকার দেশে থাকার কোনো ইচ্ছা নাই। এই যে, সবাই আগামীতে কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, কোথায় ভর্তি হবে ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত আর কনিকা সারাদিন ইন্টারনেটে বিদেশের কোনো ইউনিভার্সিটিতে সে পড়বে সেটা খুজতে খুজতে ব্যস্ত। সে মনে প্রানে আর দেশে নাই। অনেক গুলি ইউনিভার্সিটিত থেকে কনিকা ইতিমধ্যে অফার লেটার পেয়েছে। আমি জানি আগামী বছরের মধ্যে কনিকা আর দেশে নাই। বাকী কি হয় কে জানে?

২৭/০১/২০২১-আমার+উম্মিকার করোনা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২৭ জানুয়ারী 

 

কোনো কিছুই কোনো কারন ছাড়া ঘটে না, এটাই সত্য। যে ঘটনাটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিলো কেনো গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেললাম বলে, আজ সেটা পরিষ্কার হলো। আমার করোনা টেষ্টে পজিটিভ এসেছে। আমার বড় মেয়েরও করোনা পজিটিভ। ছোট মেয়ের করোনা নেগেটিভ। উম্মিকার মার তো আগেই একবার করোবা ধরা পড়েছিলো, তাই আর করাইতে দেই নাই। এর মানে হলো, শুধু ছোট মেয়ে ছাড়া আমাদের বাসায় সবার করোনা ধরা পড়লো। আল্লাহ যা করেন নিশ্চয় মংগলের জন্যই করেন। করোনা ধরা পড়ায় একটা জিনিষ মনে হলো যে, আমাদের আর টিকা নেওয়ার দরকার পড়বে না হয়তো।

দেশে টিকা এসেছে, সবাই টিকা নিতে ভয়ও পাচ্ছে, আবার এই টিকা নিয়ে যে কত রাজনীতি হয় তাও দেখা যাবে। এদেশে প্রতিটি জিনিষ নিয়েই রাজনীতি হয়। টিকা নিয়েও লম্বা সময় ধরে রাজনীতি হবে, এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। যারা একবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এসছেন, হয়তো তারা আর টিকার ব্যাপারে কোনো মাথা ঘামাবে না, তারপরেও হয়তো টিকাটা নেয়া দরকার হতে পারে যেহেতু এটা একটা ভ্যাকসিন।

বাসায় আছি কদিন যাবত। করোনা হবার কারনে আমার শরীরে কোনো প্রকার আলাদা কোনো সিম্পটম নাই। সুস্থই আছি। বড় মেয়ের ঠান্ডাটা একটু বেশি। আমি প্রতিদিন ছাদে রোদে প্রায় ঘন্টা ২/৩ পুড়ি। ভালোই লাগে। কিন্তু বড় মেয়ে বি সি এস পরীক্ষার প্রিপারেশনে রাত জেগে পরাশুনা করে বলে দিনের অর্ধেক সময় পর্যন্ত ঘুমায়।

চারিদিকে বেশ ঠান্ডাও পড়েছে ইদানিং। এবারের ঠান্ডাটা একটু বেশী মাত্রায় পড়েছে বলে মনে হয়।

২৭/০১/২০২১-ভাবীর দাফন সম্পন্ন

আমি গত কয়েকদিন যাবত করোনায় ভুগছি। সাথে আমার বড় মেয়েও। কিভাবে ঘটনাটা হলো তা আমার এখনো জানা নাই। সে ব্যাপারটা পরে আসছি। বড় ভাবী (অর্থাৎ লিখনের মা) গতকাল ইন্তেকাল করেছেন। আজ তাকে মানিকগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়েছে মানিকগঞ্জ গোরস্থানে দাফন করার জন্য। আমি যেতে চেয়েছিলাম কিনা জানিনা, যেহেতু করোনায় ভুগছি, তাই কেহ আমাকে যেতেও বলে নাই। আর আমি যাওয়ার কোনো কারনও দেখিনা।বড় ভাবীর মৃত্যুর ঘটনায় আমার বেশ কিছু অব্জারভেশন চোখে পড়েছেঃ

ক।      লিখন আমেরিকায় ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে আছে যে, লিখন ইচ্ছে করলে ওর মাকে দেখতে আসতে পারতো ঠিকই কিন্তু হয়তো আর আমেরিকায় ফিরে যেতে পারবে না। এই ভয়ে লিখন ওর মাকে আর দেখতেই এলো না। ওর মাকে দেখার চেয়ে হয়তো ওর আমেরিকায় থাকাটা জরুরী মনে হয়েছে বিধায় লিখন আর ওর মাকে শেষবারের মতো দেখতে আসে নাই। প্রথিবীটা অনেক ছোট, আর কে কখন কোথায় থাকবে এটার ফয়সালা আল্লাহর হাতে। আমেরিকাতেই থাকতে হবে আমি এটা বিশ্বাস করি না। এই বাংলাদেশেও অনেক বিখ্যাত মানুষেরা বাস করে এবং অনেক পয়সা ওয়ালারা বাস করে। আমেরিকা কোনো সর্গরাজ্য নয় যে ওখানেই সেটেল হতে হবে সব আত্তীয়সজন বাদ দিয়ে। এই যে, আজকে লিখন তার মাকে শেষবারের মতো ও দেখতে পারলো না, ওর মা লিখনের হাতের মাটিও পেলো না, এর কোনো মানে হয় না। আমি জানি না আমার মৃত্যুর সময় আমার বাচ্চারাও আমাকে দেখতে আস্তে পারবে কিনা কিংবা আমি ওদের হাতে মাটি পাবো কিনা, তবে আমি মনে করি এমন কোনো জটিল পরিস্থিতিতে যেনো আল্লাহ আমাকে বা আমার সন্তানকে না ফেলেন যে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় আমি আমার সন্তানদের কাছে না পাই।

খ।       বড় ভাবী যখন করোনায় আক্রান্ত, তখন দেশে তার সব ছেলেরা ছিলো। মারুফ ছিলো, তুহীন ছিলো, মুবীন ছিলো, ইমন ছিলো, সবাই ছিলো। একমাত্র মুবীন সারাক্ষন হাসপাতালে ওর মার জন্য ডিউটি করেছে। আর বাকী ছেলেরা খুব একটা দেখতেও যেত না আবার হাসপাতালেও ছিলো না। যেহেতু মায়ের করোনা, তাই সবাই দূরে দূরেই ছিলো। খুবই হতাশার কথা হচ্ছে, যখন বড় ভাবী মারা গেলেন, তখন মানিকগঞ্জে তার লাশের সাথে কে যাবে, বা কারা যাবে এটা নিয়েও একটা কনফিউশন ছিলো। ইমন, তুহীন কিংবা মারুফ তারা ওর মায়ের সাথে যাবে কি যাবে না তারা ভেবেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। লিখন দেশে থাকলে লিখন কি সিদ্ধান্ত নিতো সেটা আমি জানি না, তবে, খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতা হতো বলে আমার জানা নাই। বড্ড খারাপ লাগলো কথাতা শুনে যে, যে মা আজীবন ছেলেদের জন্য জীবন দিয়ে দিলো, যে মা এতোটা বছর ওদেরকে বুকে পিঠে মানুষ করলো সেই মাকে করোনায় মারা যাওয়ার কারনে মানিকগঞ্জে গোরস্থানে একমপ্যানি করবে কি করবে না সেটাই এখন সবচেয়ে যেনো বড় প্রশ্ন। আসলেই পৃথিবীটা খুবই সার্থপর একটা জায়গা। এখানে মানুষ নিজেকে ছাড়া আর কারো কথাই সে ভাবে না।

গ।       লিজি আপা যখন বিল্ডিং বা বাড়ি বানানোর জন্য তার বাবার সম্পত্তির উপর সবার কাছে অনুমতি চাইলেন, তখন সব ভাইবোনেরা রাজী থাকলেও শুধুমাত্র লিখনদের পরিবার লিজি আপাকে তার বাবার সম্পত্তি থেকে উতখাত করার জন্য একেবারে উঠেপড়ে লেগেছিলো। লিখনের সাথে একজোট হয়েছিলো ওর স্ত্রী শিল্পীও, যদিও শিল্পি লিজি আপার আপন বোনের মেয়ে। লিজি আপার এই বাড়ি বানানো নিয়ে লিখন এবং তার পরিবার (বড় ভাবী সহ) এমন একটা সিচুয়েশ তৈরী করে ফেলেছিলো যে, তুহীন বলেছিলো- যদি লিজি ওখানে বাড়ি বানায়, তাহলে লিজিকে সে খুন করে ফেলবে, মারুফ বলেছিলো যে, লিজিকে সে লাথি লাথিতে ওখান থেকে বের করে দেবে, আর অন্যান্রা বলেছিলো, তারা কখনোই আর মানিকগঞ্জে যাবে না। ইত্যাদি। আমি আর মিটুল সব সময় চেয়েছি যে, লিজি আপা যেনো ওখানে বাড়িটা করে। এর জন্য আমি নেপথ্যে থেকে যতো প্রকার সাহাজ্য করার দরকার, আমি সেটাই করেছি। আজ ঠিক এই মুহুর্তে মানিকগঞ্জে লিজি আপার ৬ তালা বিল্ডিং সায় দাঁড়িয়ে। বড় ভাবীর মৃত্যু দিয়ে আল্লাহ এমন সময় ওদেরকে মানিকগঞ্জে নিয়ে গেলেন যখন ওরা সবাই দেখল লিজি আপার ৬ তালা বাড়ি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, আজ সেই লিজি আপার বাড়িতেই সবার আশ্রয়। কি অদ্ভুদ না? আল্লাহ জুলুমকারীকে এবং অহংকারীকে কিছুতেই পছন্দ করেন না। সমস্ত দম্ভ ভেংগে দিয়ে আজ আল্লাহ এইসব সদস্যদেরকে একেবারে সেই লিজি আপার বাড়িতেই উঠাইলো। কিছু কি শিখতে পারলো ওরা?

ঘ।       মজার ব্যাপার হলো, যেদিন লিজি আপা মানিকগঞ্জে বিল্ডিং এর কাজে হাত দিলেন, ঠিক সেই সময়ে লিখন আমেরিকায় গিয়েছিলো রুটিন ভিজিটে। কি এক অদৃশ্য শক্তিতে আল্লাহ লিখনকে ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে দিলো যে, লিখন আর বাংলাদেশেই আসতে পারলো না। লিখন বলেছিলো যে, সে যদি দেশে থাকে তাহলে লিজি আপা কিভাবে বাড়ি বানায় সেটা সে দেখে নেবে। লিজি আপার পিতার ভিটা, তার নিজের হকের জমি, লিখনের জমিও না, অথচ লিখনের এই রকম দাম্ভিকতা আল্লাহ নিশ্চয় পছন্দ করেন নাই। কোনো না কোনো অজুহাতে আল্লাহ ঠিক তার ম্যাকানিজমে একেবারে সুদুর আমেরিকায় এমন করে বন্দি করে দিলো যে, ওর বাংলাদেশের চাকুরীটাও আর নাই, আর আমেরিকায় ৭/১১ দোকান গুলিতে খুবই সস্তায় একটা জব করতে বাধ্য হলো। এই ঘটনাটা আর যে কেউ যেভাবেই দেখুক, আমি দেখি আল্লাহর ন্যায় বিচারের নমুনা।

ঙ।       এখানে একটা কথা না বললেই না। মারুফের ছেলের বয়স মাত্র ৩ বছর। বড় ভাবী তার নায় নাতকুরের জন্য ছিলেন ডেডিকেটেড। সারাক্ষন তাদেরকে খাওয়ানো, পরানো, বাইরে নিয়ে গুরিয়ে আনা, কোথাও বেড়িয়ে আনা ইত্যাদি কাজগুলি খুব আদরের সাথে করতেন। আর তার নাতি নাতকুরেরাও বড় ভাবীর প্রতি খুবই ভক্ত ছিলো। কিন্তু যেদিন বড় ভাবীর করোনা ধরা পড়লো, ঠিক সেদিন থেকে মারুফের ৩ বছরের ছেলে মশারী তাংগীয়ে যে এক ঘরে বসে গেলো, ভুলেও সে আর তার দাদীর কাছে আসে নাই। সে বারবার বলতো যে, সে করোনায় ভয় পায় এবং সে তার দাদীর কাছে আসতে চায় না। বড় ভাবীর মরার আগ পর্যন্ত এই অবুঝ বাচ্চাটাও আর ভাবীর কাছে আসে নাই। কি নির্মম তাই না?

যাই হোক, আমি এই কথাগুলি বলে কাউকে ছোট করতে কিংবা আল্লাহ ওদেরকে শাস্তি দিয়েছেন এটা ভাবি না। শুধু ভাবী যে, মানুষের উচিত বান্দার হক সব সময় ফিরিয়ে দেয়া। এ জগতে কেউ থাকে না, থাকবেও না। কিন্তু আজ যে কর্মগুলি আমরা রেখে গেলাম, সেটার ফলাফল সে পাবেই।

এইমাত্র মিটুল বড় ভাবীর দাফনের পর বাসায় এলো। বেশ কিছু জানতে ইচ্ছে করল। যেমন, লিখন আমেরিকায় আছে, ওর মা মারা গেলেন, লিখন কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, ছটফট করেছে কিনা, না আসার কারনে, কিংবা অনেক মন খারাপ করে ওর মার জন্য কান্নাকাটি করছে কিনা ইত্যাদি। মিটুল জানালো যে, যখন ভাবীকে দাফনের নিমিত্তে কবরে নামানো হবে, তখন অনেকেই ভাবীকে দেখার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো। কেউ কেউ আবার ভিডিও ও করেছিলো। ওই সময় নাকি ইমন এবং মুবীন লিখনকে ফোন করে জানিয়েছিলো লিখন ভাবীর ভিডিও দেখতে চায় কিনা, কিংবা কিছু বলতে চায় কিনা। লিখন নাকি উত্তর দিয়েছিলো যে, সে কনো কিছুই দেখতেও চায় না, না ওর ছেলেমেদেরকে দেখতে দিতে চায়। এই ব্যবহারের অর্থ শুধু জানে লিখন। যাই হোক, ইতিহাস এটাই।

আজ থেকে হাসমত আরা (ভাবীর নাম) নামে কোনো মহিলার আনাগোনা এই দুনিয়া থাকলো না। কয়েকদিন সবাই তাকে নিয়ে হয়তো গল্প করবে, হাহুতাশ করবে, কেউ কেউ হয়তো তার অভাব ফিল করবে, কেউ আবার তার কথা ভুলেই যাবে। সময় তাকে আরো বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এক সময় হাস মত আরা নামে কোনো মহিলা এই দুনিয়ায় ছিলো এটাই কেউ জানবে না। মানিকগঞ্জের বাড়িই বা কি, সন্তানই বা কি কোনো কিছুই আর নাই।  এটাই জীবন। জীবন সব সময় মৃত্যুর কাছেই পরাজয় বরন করেছে, আর করবেও। বড় ভাবী এখন ৩ হাত মাটির নীচে অন্ধকার কবরে একা এবং তার সাথে আর কেহই নাই। না তার সাধের বিছানা, না নায় নাতকোর, না আমেরিকার কোন সুসংবাদের কাহিনী।

আমি সব সময় মৃত মানুষের জন্য দোয়া করি।  ভাবীর জন্যেও আমি দোয়া করি। তার উপরে আমার কোনো রাগ নাই।

২৬/০১/২০২১- আমার করোনা +

গত ২৩/০১/২০২১ তারিখের সকাল ৮ টার সময় হটাত করে মনে হলো কোনো গন্ধই পাচ্ছি না। এর ২/৩ দিন আগে থেকে একটু একটু শরীর খারাপ ছিলো। দূর্বল লাগছিলো, ঘুম ঘুম ভাব ছিলো। একটু একটু ঠান্ডাও ছিলো। গন্ধ না থাকার কারনে ভাবলাম, করোনা কিনা। এর মধ্যে আবার জিহবায় একটা ছোট দাগ ছিলো যেটা আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো ঘা। ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম, উনি বললেন ভিটামিন সি খান। হয়তো ভিটামিন সি এর অভাব। ব্যাপারটা আমলে নিয়েছিলাম বটে কিন্তু গত কয়েক মাস আমি যেভাবে ভিতামিন সি খেয়েছি, তাতে আমার মনে হয়েছিলো আমার ভিটামিন সি সারপ্লাস হবার কথা। তারপরেও আরো বেশী করে লেবু প্লাস ভিটামিন সি ট্যাবলেট খাইতে থাকলাম। কিন্তু ঘা টার কোন কমার লখন দেখি নাই। এর মধ্যে হটাত করে গন্ধ না পাওয়ার কাহিনী। একটু ভয় তো পাইলামই কিন্তু শরীরে অন্য কোনো উপসর্গ নাই। যেমন, কোনো কাশি নাই, গলা ব্যথা নাই, জর নাই, অক্সিমিটারে অক্সিজেন লেবেল ৯৯% দেখায়। গায়ে কোনো ব্যথাও নাই। তারপরেও সেফ এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট, প্যারাসিটামল, আর ম্যাগ্নেশিয়াম ট্যাবলেট খাইলাম বেশ কয়েকদিন। অফিসেও গেলাম না। একই কাহিনী আমার বড় মেয়ের উম্মিকা। সেও কোনো গন্ধ পায় না কিন্তু রুচী আছে। অবশ্য ওর একটু ঠান্ডার ভাব আছে। সেটাও মারাত্তক না। তাই আমি , উম্মিকা আর কনিকার করোনার স্যাম্পল টেষ্টের জন্য প্রভা হেলথ কেয়ারকে বাসায় এনে স্যাম্পল দিলাম। এই তিন দিন যাবত ছাদে প্রায় ২/৩ ঘন্টা করে রোদ পোহালাম। রোদ পোহাইতে ভালোই লাগে।

একটু আগে ছাদ থেকে বাসায় এসে গোসল করলাম। আমি সাধারনত গোসলের পর পারফিউম দেই। হটাত খেয়াল করলাম, আমি পারফিউমের গন্ধটা পাচ্ছি। যেটা আগে একেবারেই পেতাম না। কি হলো?

কেদনোই বা গন্ধের সেন্সর আউট হয়ে গেলো আবার কেনোই বা গন্ধের সেন্সর আবার ফিরে এলো এটা আমার কাছে একটা গবেষনার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। যাই হোক, অন্তত খারাপ কিইছু সম্ভবত হয় নাই। বাকীটা আল্লাহ ভরসা।

২৬/০১/২০২১-লিখনের মা মারা গেল

সারাদিন বাসাতেই ছিলাম। এ কদিন বাসাতেই ছিলাম আসলে কারন আমি কোনো কিছুতেই গন্ধ পাচ্ছিলাম না। দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিলো। ফলে অনেকেই ফোন করেছিলো বুঝতে পারি নি। এই মাত্র ১০ মিনিট আগে ঘুম থেকে উঠে কিছু নাস্তা করলাম। দেখলাম অনেকক্ষন যাবত মিটুল ওর ভাই বোনদের সাথে কথা বলছিলো। বিষয় ছিলো ‘বড় ভাবীর অসুস্থতা”। বড় ভাবী বেশ কয়েকদিন যাবত করোনার কারনে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। লাইফ সাপোর্টে ছিলো। হটাতই মিটুলের চিৎকার শুনলাম। বুঝলাম, ভালো খবর নাই।

কানতে কানতেই ড্রইং রুম থেকে আমার রুমে এসে বল্লো যে, “বড় ভাবী আর নাই”। ইন্না নিল্লাহে পড়ে বললাম, ভাবীর জন্য দোয়া করো, এ ছাড়া তো আর কারো কিছুই করার নাই।

মৃত মানুষের উপর কোনো রাগ রাখতে নাই। এই মুহুর্তে বড় ভাবীর উপরেও আমার কোনো রাগ নাই। তবে যতোদিন উনি জীবিত ছিলেন, তার উপর আমার একটা প্রচ্ছন্ন রাগ ছিলো। আর রাগটা নিতান্তই আমার কারনে নয়। মানুষ যখন জেনে শুনে ইনসাফ করে না, তার জন্য আমার রাগ হয়। বড় ভাবীর উপরেও আমার এই একটা কারনে বেশ রাগ ছিলো।

বড় ভাবীর ছেলে লিখন ভালো চাকুরী করে। কিন্তু তার চাকুরীর সমমর্যাদার মতো তার মধ্যে ইনসাফের অনুপাতটা একই রকম ছিলো না। লিজি আপা যিনি কিনা বাবার হক প্রাপ্য এবং লিজি আপাকে এই লিখন এবং তার পরিবার যে কোনো ভাবেই হোক, তার সেই বাবার হক থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে যতটুকু শক্তি প্রয়োগ করা যায়, সেটাই করার চেষ্টা করেছিলো। আমি এই অন্যায়টা যেনো না হয় তার ১০০% বিপরীতে দাড়িয়েছিলাম। শেষ অবধি লিজি আপারই জয় হয়েছিলো আল্লাহর রহমতে। কোনো একদিন আমি বড় ভাবীকে একটা কথা বলেছিলাম যে, যেদিন মারা যাবেন, সেদিন যেনো সবার হক সবাই পেয়েছে কিনা সেটা মন থেকে জেনে তারপর মারা যান। তানা হলে এর কৈফিয়ত দিতে দিতে আল্লাহর কাছে ঘেমে যাবেন। যদি লিখন কোনো অন্যায় করে থাকে, তাহলে মা হিসাবে লিখনকে বুঝানো দরকার যে, এটা অন্যায়। এটুকু বল্লেও আপনার পক্ষে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হয়, আপনি বেচে যাবেন।

আজ বড় ভাবীর সমস্ত ফাইল ক্লোজড। উনি মাত্র ১০ মিনিট আগে ইন্তেকাল করলেন। (রাত সাড়ে আটটায়)। লিখনকে কোনো প্রতিবাদ করেছিলেন কিনা জানি না। তারপরেও আমি তার জন্যে দোয়া করি তিনি যেনো জান্নাতবাসী হোন।

লিখন আমেরিকায় ভিসা জটিলতায় এমনভাবে আটকে আছে যে, না সে ঢাকায় আসতে পারতেছে, না ওখানেও ভালো কোনো জব করতে পারতেছে। ছেলেটার মধ্যে ভীষন রকমের খারাপ কিছু এটিচুড আছে যা ওর সাথে মানায় না। যাই হোক, যে যেভাবে চলে হয়তো ঈশ্বর তাকে তার পূর্ন প্রতিদান সেভাবেই দেন। কারো জন্য বদদোয়া আমি করি না। কিন্তু আমি সবার জন্য ইনসাফ করতে সর্বদা আগ্রহী।

আল্লাহ ভাবীকে জান্নাত বাসী করুন।

২৬/০১/২০২১-ভাবীর (লিখন) শেষ অনুষ্ঠান

গত ১/১২/২০১৯ তারিখে কোরবানীর পরপরই আমাদের বাসায় একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান ছিলো। সেদিনই ছিলো বড় ভাবীর জন্য তার জীবনে আমাদের বাসায় শেষ অনুষ্ঠান। আর আজ ২৬/০১/২০২১ তারিখ। এই দুইটি তারিখের মধ্যে মোট দিন ছিলো ৪২২ দিন অর্থাৎ ১ বছর ১ মাস ২৫ দিন।

আমরা প্রায়ই বলি, আমাদের আয়ুষ্কাল নাম্বারড। কিন্তু কোন তারিখ থেকে এই নাম্বারটা কাউন্ট ডাউন হচ্ছে সেটা আমাদের কারোরই জানা নাই। সেদিন ১/১২/২০১৯ তারিখে বড় ভাবীকে আমরা খুব স্বাভাবিক একজন সুস্থ্য মানুষ হিসাবেই আনন্দে মেতেছিলেন দেখেছিলাম। উনি আসলেন, সভাবসুলভভাবেই সবার সাথে কথা বললেন, দেখা করলেন, খাওয়া দাওয়া করলেন, সবার সাথে ছবি তুল্লেন, একসময় সবার সাথে বাসায়ও চলে গেলেন।

উনি কেমন মানুষ ছিলেন সেটার বিবেচনার ভার আজকের দিনের প্রতিটি মানুষের কাছে ভিন্ন। কারো কাছে তিনি দেবীর মতো, কারো কাছে তিনি অতি প্রিয়জন, কারো কাছে আবার অপ্রিয় মানুষের মতো কিংবা কারো কাছে হয়তো কিছুই না। আমি তাকে সব সময়ই পছন্দ করতাম। কিন্তু একটা জিনিষ আমার কাছে সারা জীবন ঈসশরের কাছে রহস্যের মতো প্রশ্ন থেকেই ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, কেনো ঈশ্বর কোনো অবলা মেয়ে মানুষকে তার সংগীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনেকদিন বাচিয়ে রাখেন? এর উল্টাটা তো হতে পারতো বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে? এসব মহিলাদের অনেক কষ্ট থাকে একা একা বেচে থাকার। কেনো বলছি এ কথাটা?

এর কারন, যখন কোনো অবলা নারী তার সংগীর বা স্বামীর অনেক পরে তার জীবন অবসান ঘটান, তাদের অনেক বেদনা থাকে, অনেক চাওয়া থাকে কিন্তু তার সেই বেদনার অংশীদার তিনি কাউকে না দিতে পারেন, না বলতে পারেন। নিজের মনের মধ্যেই সব চেপে রাখেন। তার সংগী যখন আর বেচে থাকে না, তখন তার অনেক ইচ্ছা অনিচ্ছার মুল্যায়ন আর প্রাধান্য থাকে না। আমি এই তথ্য কথাটা বড় ভাবীর ব্যাপারে বলছি না। আমি আমার মাকেও দেখেছি। আমার বাবার অনুপস্থিতিতে আমার মাকেও কারো না কারো উপরে এমনভাবে নির্ভরশীল হতে হয়েছিলো যেখানে নিজের বাক স্বাধীনতা কিংবা ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন না। তাই, একটা বিধবা মহিলার থেকে অসহায় আর কোনো মানুষ হয় না। এই অসহায়ত্ত খাবারের জন্য নয়, এই অসহায়ত্ত কোনো স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নয় যে, তিনি তার ইচ্ছেমতো যেখানে সেখানে ঘুরে ফিরতে পারেন না এমন। এই অসহায়ত্ত অন্য রকমের। অনেক কিছুই আর নিজের থাকে না যা এক সময় ছিলো। সংগীর অবর্তমানে যেনো সব কিছু হারিয়ে যায়। চাপিয়ে রাখে নিঃশ্বাস, দমন করে রাখেন আশ্বাস, কিংবা অন্ধ হয়ে থাকেন তার নিজের বিশ্বাস থেকে অথবা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধেও। কিন্তু সব কিছু তারা বুঝেন, জানেন, ভাবেন কিন্তু বলার শক্তি থাকে না।

যাক যা বলছিলাম, সেই ১/১২/২০১৯ থেকে ভাবী কি জানতেন যে, তার দিনগুলি ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে? তিনি যদি জানতেন যে, আজ এই ১৬/১/২০২১ তারিখের পর আর এই পৃথিবীর কোনো কিছুই তার থাকবে না, তাহলে হয়তো তিনি গুনতেন একটি একটি করে দিন, ক্ষন সেকেন্ড আর মুহূর্ত যে, তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন শেষ দিনটার জন্য। ঈশ্বর এই দুটু তারিখ মানুষের বা প্রানীর জীবন থেকে এমনভাবে লুকিয়ে রেখেছেন যে, আজ অবধি কারোরই, হোক সে ক্ষমতাধর কোনো সম্রাট, কিংবা অতি জাদরেল বিচারপতি কিংবা সম্পদের অঢেল মালিক, জানার কোনো উপায় নাই। ভাবীও জানতেন না যে, গত ১/১২/২০১৯ তারিখে যে, ভাবীর আর মাত্র ৪২২ দিন ব্যালেন্স ছিলো।

হয়তো এমনি একটা মুহুর্ত আমার জীবনেও আসবে যার ইতিহাস এবং আমার জীবনের নাম্বারটা আজ থেকে কত ব্যালেন্স আছে বা ছিলো সেটা হয়তো কেউ লিখবেন।

(বড় ভাবীর জন্য জান্নাত কামনায় তাকে উতসর্গ করা এই লেখা)

  

২৩/০১/২০২১-বাঁশ বাগানের তলা

Categories

হটাত করেই সকাল থেকে আমি কোনো কিছুরই গন্ধ পাচ্ছি না। চারিদিকে করোনার এতো উপদ্রব বেড়েছে, আর আমি ইদানিং এতো বেশী পাবলিকলী মেলামেশা করছি, তাতে যে কোনো সময়ে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে। তাই ভাবছি, আগামীকাল থেকে আমার অফিসে ভিজিটর আসা রেস্ট্রিক্ট করে দিতে হবে একেবারেই। যদি কাউকে ভিজিটে এলাউ করতে হয়, তাহলে এক মাত্র বোর্ড রুম ছাড়া অন্য কাউকে আমার অফিসে আসতে বারন করা হবে।

মহামারীর এই সময়ে আমার অনেক কাজ এখনো বাকী। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী জরুরী যার জন্য তার সাথে আজ আমার দেখা হলে সে অনেক ভয়ে আছে দেখলাম। আমিও চাই সব কিছু থেকে মানুষ গুলিকে নিরাপদ রাখতে। আমি জানি মনুষ্য সমাজে আমাকে ছাড়া ওরা এখনো অন্য কারো উপর নির্ভরশীল হতে পারে নাই। তাই আমার এই কাজগুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেনো আল্লাহ আমাকে না নিয়ে যান, এই প্রার্থনা করি।

আসলে ও খুব অসহায়। মায়া হয়, ভয়ও হয়। একটা জায়গায় না পৌঁছানো পর্যন্ত আমার দায়িত্ত শেষ হবে না জানি। আমাকে যেনো ঈশ্বর সে সুযোগটা দেন।

২১/০১/২১-তারিখটা চোখে পড়তেই

Categories

তারিখটা চোখে পড়তেই খুব একটা খটকা লাগল। ২০২১ সাল।

যখন এই তারিখটা এমন হবে ২১২০ সাল, তখন প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেছে। আমার বয়সের আর কারোরই সম্ভবত এই দুনিয়ায় বেচে থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নাই। আজকের দিনের এমডির চেয়ারটায় আর আমি বসে নাই, আজকের দিনে আমার ব্যবহৃত গাড়িটি হয়তো অন্য কেউ ব্যবহার করছে অথবা আর এটা কোনো রাস্তাতেই নাই, অনেক পুরানো বলে। আমার সাধের বাড়িটায় হয়তো অন্য কেউ তার মতো করে বাস করছে, কিংবা কোনো ভাড়াটিয়াও হতে পারে। যে যত্ন করে আমি আমার ছাদ বাগানটা প্রতিদিন যত্ন করি, পানি দেই, গাছগুলির পাতায় হাত বুলিয়ে দেই, সেখানে আর কোনো ছাদ বাগান আদৌ আর থাকবে কিনা কে জানে। ছাদের কোনায় যে পাখীটা বাসা বেধেছিলো, সেটা কবেই মরে গেছে, হয়তো অন্য কোনো পাখী এসে তার জায়গাটা দখল করেছে। অথবা সেখানে আর কোনো বাসাই নাই।

একশত বছর পর, সেই সময়ে চলমান আমার বংশধরেরা বেচে থাকবে, কিন্তু হয়তো আমি ওদের মধ্যে আর বেচে থাকবো না। যেমন বেচে নাই এখন আমার মধ্যে আমার সেই নাম না জানা পূর্বপুরুষেরাও। মাঝে মাঝে আমি তাদের কথা জানতে চাই, তাদের সবার নামও জানতে চাই, তাদের জীবনধারার ধরন জানতে চাই, নিশ্চয়ই তারাও অনেক ব্যস্ত ছিলো, নিশ্চয়ই তারাও প্রাত্যাহিক জীবনে অনেক গল্পগুজব করতো, বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা দিত, হয়তো কখনো জীবনের সমস্যায় জর্জরীত হয়ে মানসিক কষ্টে কিংবা জীবনের কোনো সাফল্যে আনন্দিত হয়ে হয়তো অতিশয় খুশীতে কোনো এক বিকালে গোল করে কোনো অনুষ্ঠান করতো। আর এটাই তো হবার কথা। যেমন হচ্ছে ঠিক আমার এই সময়টায়। খুব জানতে ইচ্ছে করে, কেমন ছিলো আমার দাদীর দাদীমা? অনেক সুন্দুরী? কিংবা অনেক মায়াবী? অথবা কেমন সুপুরুষ ছিলেন আরো একশত বছর আগের আমার দাদার দাদারা? কে কোন মাছ খেতে পছন্দ করতো? বা কার সপ্নের বাসনা কেমন ছিলো? খুব জানতে ইচ্ছে করে, কি ছিলো তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা যা পূর্ন হয় নাই অথচ শখ ছিলো?

সেই একশত বছর আগে হয়তো অনেক জনপদ ছিলো যা কালের বিবর্তনে সব কোথায় যেনো হারিয়ে নতুন জনপদ তৈরী হয়েছে। হতে পারে যে জায়গাটায় আমার পূর্বসুরী কোনো এক দাদা তার প্রেয়সীর টানে হয়তো কোনো এক রাস্তার ধারে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছিলো, আজ সেই জনপদ কোথাও নাই, হয়তো তলিয়ে গেছে কোনো এক নদীর ভাংগনে, অথবা সেই জনপদ বিলুপ্ত হয়ে হয়তো তৈরী হয়েছে আজকের কোনো অসাধারন অট্টালিকা। আজ যদি সেই সব মানুষ গুলিকে আবার ফিরিয়ে আনা যেত, হয়তো বলে উঠতো, ‘ওই যে দেখছিস ওই বড় বিল্ডিংটা, ওখানে ছিলো এক প্রকান্ড খাল, ওখানে আমরা সাতার কাটতাম। ওই যে দেখছিস বড় রাস্তাটা, ওটা ছিলো তখনকার প্রতাপ্সহালী সগীর মিয়ার হারিয়ে যাওয়া কোনো এক প্রাসাদ। আরো কত কি’।

তাদের কারো কথাই আজ কেউ মনে রাখে নাই। মনে রাখার দরকারও মনে করে না। আসলে সময় কাউকেই আজীবন মনে রাখতে দিতে চায় না। কত শতক প্রজন্মকে যেমন টপকে আমরা আজ এই শতকে নিজেদের নিয়ে মশগুল আছি, তেমনি আরো অনেক শতক প্রজন্মও আমাদেরকে টপকে তাদের সময়ে তারা তাদেরকে নিয়ে মশগুল থাকবে এটাই তো হবার কথা। অথচ আজ কতই না ব্যস্ত আমি, আমরা। কতই না প্রতিযোগীতা আমাদের মধ্যে। সম্পদের পাহাড় গড়েও যেনো শান্তি নাই। তারপর?

তার আর পর নাই। আসলেই আর কোনো পর নাই।

২১২০ সালে আমরা এই পৃথিবীর কোনো কিছুই আর দেখার সৌভাগ্য হবে না। অথচ তখনো সূর্য যেভাবে উঠার কথা সেভাবেই উঠবে, সেদিকে ডোবার কথা সেদিকেই ডববে। শুধু আমরা আর কোনো সুর্যদোয় কিংবা সুর্যাস্ত দেখতে পাবো না। পর্যন জায়গা গুলি অন্য কেউ উপভোগ করবে, শীতকালের আমেজ, কিংবা নতুন মহামারীও তাই।

জীবনটা আসলে মানুষের কল্পনার থেকেও ছোট।

০১/০১/২০২১- ঠিক এই সময়টায়

Categories

০০:০০ রাত

ঠিক এই সময়টায় পৃথিবীর কোনো না কোনো জায়গায় হয়তো এমন কেউ আছে যে বিগত বছরের কোনো এক অশান্তির জের অন্তরে নিয়ে আজকের বছরের প্রথম প্রহরে পা রাখছে, কেউ বা আবার এই কনকনে শীতে আর সব দিনরাত্রির মতো এই রাতেও নির্জীব রাস্তায় একা কোনো এক গাছের নীচে আশ্রয় নিয়ে ক্ষুধা পেটে বসে আছে, কেউ হয়তো হাস্পাতালের বিছানায় শুয়ে জীবনের শেষ সময়টা কখন ফুরিয়ে যাবে সেই শংকায় নিঃশ্বাস নিচ্ছে, হয়তোবা কেউ তার অতি প্রিয়জনকে হারিয়ে বিগত বছরের শেষ সেকেন্ড পার করে আজকের নতুন বছরের প্রথম সেকেন্ডে ভেজা চোখে ঠায় নীর্জীব আপন মানুষটির পাশে বসে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবছে। ঠিক এই মুহুর্তে হয়তো কোনো এক নাবিক মহা সমুদ্রের জলরাশীতে ঘোরপাক খেয়ে নিশানা হারিয়ে কোনো এক অচেনা গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে, কিংবা এমনো কেউ আছে হয়তো নতুন জীবনের প্রত্যাশায় যুগলবন্দী হচ্ছে। হয়তোবা কোথাও অঝর ধারায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে, আবার এমনো হতে পারে কোনো এক অজানা দেশে ঘর্মাক্ত গরমে মানুষেরা দিকবিদিক হয়ে কিছুটা পরশের আশায় কোনো এক ব্রিক্ষের নীচে গোল বেধে বসে আছে।

অথচ আমার এখানে অসীম দয়ালু স্রিষ্টিকর্তা আমাকে তোমাকে আর আমাদের সাথে থাকা পরিবারকে কতই না হাসিখুসীতে বছরের শেষ দিনের সাথে আগত বছরের প্রথম মুহুর্তে আনন্দের সাথে মিলন করাইলেন। কোনো কষ্ট নাই, কোনো দুসচিন্তা রাখেন নাই, কোনো আপদ কিংবা বিপদের মধ্যে রাখেন নাই। সুস্থতায় আর মনের পরম শান্তিতে সংযোগ করালেন আরো একটি বছরের সারিতে।

জানি, ঠিক এই মুহুর্তে আমি সবখানে নাই যাদের সাথে আমার থাকার দরকার। ঠিক এই মুহুর্তে আমি আছি কারো একান্তই কাছে, নিকটে। আবার কারো সাথে আছি আমি মনের মাঝে, কাউকে আমি চোখের সামনে রেখে দেখছি, আবার কাউকে আমি মনের চোখে দেখছি। শারীরিক উপস্থিতি যেমন সত্য, তেমনি মানসিক উপস্থিতিও সত্য। এই দুইয়ের মধ্যে তারাই উপলব্ধিটা করতে পারেন যারা এই সত্যতার মধ্যে বাস করেন। চোখ বুঝে যদি আপনি ওইসব মানুষের মুখ আপনার চোখের সামনে একেবারে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠে, তারাও আপনাকে ঠিক আপনার মতো করেই আপনাকে দেখতে পান, আর এই দেখা-অদেখার নামই হলো সত্য ভালোবাসা। আর এখানেই অনুপস্থিতির পরাজয় হয়। এখানেই পরাজয় হয় মৃত্যুর মতো কোনো এক চরম সত্য। চোখের আড়াল হলেও তারা থাকেন সবার মাঝে। আজ এই প্রথম প্রহরে যারা আমার সুম্মুখে নাই অথচ মনের ভিতরে আছেন, যতদূরেই তারা থাকেন না কেনো, তারা আমার সাথেই আছেন। আমি তাদের সবাইকে নিয়াই এই তাবত মানুষকে জানাই শুভ নববর্ষ। ২০২১ বর্ষ হোক সবার জন্য উম্মুক্ত সেই আনন্দের, যে আনন্দে মানুষের চোখ ভিজে আসে ভালোবাসায় আর খুশীতে।

০১/০১/২০২১-মেয়েরা বগুড়ায়

Categories

আজ থেকে প্রায় ৫৪ বছর আগে, আমার বাবা বুঝতে চেয়েছিলেন, তার অবর্তমানে তার পরিবার কিভাবে থাকবে, কে কিভাবে আচরন করবে, কার চেহারা কি হবে ইত্যাদি। আর এ কারনে তিনি একবার ৬ মাসের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। আমার মাও জানতেন না আমার বাবা কোথায় আছে কেমন আছে। শুধু জানতেন আমার বড় ভাই। আর বাবা আমার বড় ভাইয়ের আশেপাশেই ঢাকায় গোপনে ছিলেন। আমার ভাই প্রতিনিয়ত বাবাকে গ্রামের, বাড়ির, এবং অন্যান্য সদস্যদের আচার ব্যবহার আপডেট দিতেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, বাবা হয়তো কোথাও মারা গিয়েছেন, অথবা আর কখনোই ফিরে আসবেন না। তাতে যেটা হয়েছে সেটা হলো, সবাই তার নিজ নিজ চেহারায় আবর্ভুত হয়েছিলো। ফলে ৬ মাস পর যখন বাবা ফিরে এলেন তার গোপন আস্তানা থেকে, তখন তিনি বুঝলেন, কে আমাদের আপন, কে আমাদের পক্ষের আর কে আমাদের বিপক্ষের। শুধু তাইই নয়, আমাদের পরিবারের মধ্যেও তিনি বিভিন্ন সদস্যদের চরিত্র সম্পর্কে একটা নিখুত ধারনা পেয়েছিলেন। অন্তর্ধানের পরে আমার বাবা আরো বেশী বাস্তববাদী হয়ে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে আমাদের জন্য ছিলো যুগান্তকারী এবং পারফেক্ট।

এই ঘটনাটা এখানে বলার অন্য কোনো কারন নাই। নিছক একটা সমকালীন ভাবনার মতো। আমার ছোট মেয়ে মানসিকভাবে আসলে আর এদেশেই নাই। তার ভাবনা কবে কোথায় কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, তাও আবার আমেরিকার কোনো এক ইউনিভার্সিটিতে। সারাক্ষন তার এই একই চিন্তা, আর এই চিন্তার রেশ ধরে সারাক্ষন তার সেই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য এখানে এপ্লিকেশন, ওখানে এপ্লিকেশন, স্যাট পরীক্ষা, আইএলটিএস ইত্যাদি। আমরা ধরেই নিয়েছি, যে, আগামী বছরের শেষের দিকে আমরা আমার ছোট মেয়েকে আর পাচ্ছি না। সে বিদেশের মাটিতে পড়াশুনা করবে। এটা যেনো এক প্রকার মেনেই নিয়েছি। আর কনিকা তো শতভাগ সেভাবেই ভাবছে। বাকীটা আল্লাহর রহমত।

বড় মেয়েও বিসিএস পরীক্ষায় যদি চান্স না হয়, তারও পরিকল্পনা প্রায় একই রকমের। সেও সেই সুদূর আমেরিকার উদ্দেশ্যেই হয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাবে। এই যে, একটা ভ্যাকুয়াম, মানে দুই মেয়েই আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার একটা আভাষ, তখন আমাদের জীবন কি হবে, কেমন কাটবে, সেই ভাবনাটা যেনো আজ পেলাম। কারন আজকে দুই মেয়েই আমাদের ছেড়ে বগুড়ায় আছে। বাড়ি একেবারেই খালি। একদম ফাকা। এ যেনো সেই পরীক্ষাটা যখন ওরা কেউ আর আমাদের সাথে থাকবে না, তখন কেমন হবে আমাদের জীবনটা।

আজ বুঝলাম, কেমন হবে জীবনটা। সারাটা বাড়ি ফাকা। সবই আছে, চেয়ার টেবিল যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছে। উম্মিকার ঘরের কোনো কিছুই এদিক সেদিক হয় নাই, কনিকার ঘরেরও। ডাইনিং টেবিলে সব কিছু আগের মতোই আছে, ড্রইং রুমটাও তাই। খাবার টেবিলে সবসময় যে মেয়েরা আমার সাথে খেতে বসে, সেটাও না। কিন্তু তখন হয়তো ওরা ওদের রুমেই থাকতো। কিন্তু আজকে মনে হলো, ওরা বাসায় কেহই নাই মানে আমার খাবার টেবিলের খাবারের সাধটাও ভিন্ন। ওদের ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষগুলি এখানে বসতো, এখানে কম্পিউটারে কাজ করতো, ওইখানে ওরা পায়ে পায়ে হাটতো। ওদের মা কারনে অকারনে কখনো ডাকাডাকি, কখনো না খাওয়ার কারনে রাগারাগি, কখনো আবার একসাথে বসে হাসাহাসি করতো। আজকে কিন্তু ওরা আছে কিন্তু কাছে নাই। এতো ফাকা লাগছে কেনো?

ওদের বগুড়ায় যাওয়ার মাধ্যমে আমি যেনো ওদের আমেরিকা যাওয়ার একটা প্রক্সি অনুভব করলাম। এটাই হবে যখন ওরা সত্যি একদিন আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে থাকবে। আজকে একটা কথা প্রায়ই মনে পড়লো-

তাহলে আমার এতো বড় ব্যবসা, এতো বড় বানিজ্য, আমার এতো বড় বড় প্রোজেক্ট নিয়ে কি হবে যদি ওরাই আর এখানে না থাকে? কে দেখভাল করবে আমার অনুপস্থিতিতে এই বিশাল সাম্রাজ্য? কোথায় যেনো একটা খটকা লাগলো। দরকার আছে কি এতোসবের?

অনেক ভাবনার বিষয়।

৩১/১২/২০২০-জাহাঙ্গীরের জন্য

জাহাঙ্গীর, আমি তোমার আর বকসী ভাইয়ের চ্যাট গুলো পরছিলাম। তোমার দৈন্যদশার কথা তুমি অকপটে স্বীকার করেছ। এটা স্বীকার করতে হয়ত সবাই পারে না। আর বাস্তব তাকে মেনে স্বীকার করাটা হচ্ছে একটা সাংঘাতিক গুনের পরিচয়। আমি জানি না তোমার আয়ের উৎস কি বা তুমি এখনো ইউএন এর ভাতা পাও কিনা। একটা সময় ছিল আমি তোমার ব্যাপারে অনেক বেশি জানতে ইন্টারেস্টেড ছিলাম যখন তুমি ইসলামিক আদল থেকে ক্রমাগত একটা ভুল দর্শনের দিকে ধাবিত হচ্ছিলে। তোমার তিন খন্ডে ধারন করা একটা ভিডিও সিডি আমার কাছে এখনো আছে। হয়ত খুজলে পাওয়া যাবে আমার স্টকে।

তোমার উপরে আমার কিছু রাগও ছিল এই জন্য যে, আমি তোমার ট্যালেন্টের ভক্ত ছিলাম এবং এই ট্যালেন্টের কিছু কাজ আমি বাস্তবে হোক সেটা আমি সত্যই চেয়েছিলাম। আমার অনেক ফোরামে আর্মি অফিসারদের কে নিয়ে কথা উঠলে অথবা ট্যালেন্ট কি জিনিস তাঁর সম্পর্কে কথা উঠলে অথবা আমি অফিসারদের যোগ্যতা নিয়ে কথা উঠলে আমি তোমার রেফারেন্স টানতাম। কিন্তু ঐ আশাটা সম্ভবত তুমি ঠিক জায়গা থেকে পালন করতে পার নাই। একটা ট্যালেন্ট মানুষের দ্বারা সমাজের অনেক কিছু পরিবর্তন সম্ভব। আমার ধারনা ছিল যে, তুমি ইচ্ছে করলেই সমাজের বা সংস্থার কিছু কিছু ইস্যু এড্রেস করতে পারতে তোমার ট্যালেন্টের দ্বারা। তুমি কত টুকু করেছ বা করতে পারতে তা তুমি ভাল জান কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে তুমি পুরু জিনিষটাই সাংঘাতিকভাবে মিস হ্যান্ডেল্ড করে ফেলেছিলা। এ ব্যাপারেও এখন আর তোমার উপর আমার কোন রাগ বা গোস্যা নেই। যেটা হয়েছে, সেটা তুমি দেরি করে হলেও বুঝেছ যে, কিছু কিছু জায়গায় তোমার ভুল ছিল। এই যে ভুল ছিল এবং তুমি বুঝতে পেরেছ, এটা ছিল তোমার ভাল দিক এবং তুমি তা সংশোধন করে ঠিক জায়গায় থাকতে পেরেছ। তুমি জাহাঙ্গীরই আছ, শুধু পালটেছে তোমার মতবাদটা। ভুল থেকে সঠিক পথে। এই জায়গা থেকে তোমার একটা বিশাল শিক্ষণীয় ব্যাপার ছিল। যা তুমি করতে পারতে কিন্তু সব কিছু তুমি হ্যান্ডেল করার ক্ষমতা রাখতে পারনি। কারন তোমার ধৈর্যটা ছিল সরু পথের আইলের মত। গ্রামের সরু পথের আইল দিয়ে কখনো হেটেছ? দেখবা, আইল্টা সোজা কিন্তু হাটতে গেলে পা এদিক ওদিক সরে যাচ্ছে এবং দেখবে তুমি মাঝে মাঝে আইল থেকে ক্ষেতে পরে যাচ্ছ। এটা আইলের দোষ না, এটা তোমার পা কে তুমি ঠিক কন্ট্রোল করতে না পাড়া কারনে।

আমি তোমার ইনিসিয়াল লাইফ স্টাইলটা দেখেছি। আমি তোমার ১ম স্ত্রিকে খুব ভাল করে চিনতাম। তোমাকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন কম ছিল না। আমি জানি না সে এখন বিয়ে টিয়ে করেছে কিনা। সেই প্রসঙ্গে আমি যাব না। আমার কাছে একটা বিষয় খুব অবাক লাগে, সমাজের প্রতিটি ইস্যু আসলে প্রতিটি পরিবারের ইস্যুর সমষ্টিমাত্র। তাঁরমানে এই যে, যে ব্যাক্তি পরিবারের ইস্যুটাকে সঠিক ভাবে এড্রেস করতে পারছে, সে অন্য পরিবারগুলর ইস্যুও এড্রেস করার ক্ষমতা রাখে। একটা পরিবারে দাম্পত্য কলহ হতে পারে, একটা পরিবারে উছশৃঙ্খল সন্তান থাকতে পারে, একটা পরিবারে আর্থিক সমস্যা থাকতে পারে, আর এইসব সমস্যাগুলো কিন্তু বিগার পারস্পেক্টিভে একটা সমাজ। আমি অনেক অভিজ্ঞতা সমপন্ন লোক নই কিন্তু আমার ক্ষুদ্র জ্ঞ্যানে বলে যে, এই সমস্যাগুলো দুই ধরনের লোক দুইভাবে সমাধান করে। (১) সমস্যা হয়েছে, তো এটাকে ছেটে ফেল। এটা হচ্ছে স্মার্ট মুভ কিন্তু এরোগ্যান্ট মুভ। আরেকটা হচ্ছে (২) সমস্যার একদম রুটে গিয়ে রুট থেকে টেনে নিয়ে এসে তাকে রেইলে নিয়ে আসা। সেটা হচ্ছে লংটার্ম সলিউসন। এই দুই নম্বর পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি লাগে ধৈর্য। আবার লাভটাও বেশি। কারনটা হল, কোন সাব্জেক্টই তাঁর স্থান পরিবর্তন করে না কিন্তু চরিত্র পাল্টায়। পরিবার পরিবার হিসাবেই টিকে যায়, শুধু মানুষগুলো তাঁর ব্যবহার পাল্টায় সামস্টিক ভাবে।

আমি অনেক সময় বাজারে একটা শার্ট পছন্দ করতে গিয়ে দেখেছি, দোকানদার এমন কিছু শার্ট আমাকে দেখাচ্ছে, যেটার কালার আর ডিজাইন আমার কাছে অত্যন্ত অপ্রিয়। মনে হয়ছে এগুলো কি কেউ কখনো কিনে? কিন্তু তারপরেই আবার মনে হয়েছে, হয়ত ঐ শার্ট টাই বা ঐ কালার টাই আরেক জোন কিনার জন্য হন্যে হয়ে খুজছে। এটা দেখবার বিষয় আর ভাব বার বিষয়। পৃথিবীতে ঈশ্বর সব মানুষকে কোন না কোন ভাল গুন দিয়ে তাকে ইউনিক করে পাঠিয়েছেন। আমরা তাদের ঐ ইউনিক গুনগুলো আবিস্কার করতে মাঝে মাঝে ব্যর্থ হই বলে কখন কখন জাস্ট যেটা পেতে চেয়েছি সেটা পেয়েও হারিয়ে ফেলছি। রবিন্দ্র নাথের গল্প গুচ্ছের কোন এক ছোট গল্পের মতন যে, বংশে নতুন অথিতির আগমনের জন্য সাড়া গ্রাম শুদ্ধ বড় কর্তা যেফতখানা করছেন, কিন্তু তারই এক বংশ ধর বড়কর্তার না জানার কারনে সে অবহেলিত হয়ে যেফতখানার খাঁবারের থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। 

আজকে তোমার আগের স্ত্রীর প্রতি তোমার হয়ত খুব একটা এট্রাক্সন নাও থাকতে পারে কিন্তু প্রায় অনেক বছরের একত্রে বাস করার ফলে যে মিশ্রিত একটা সময় তোমরা নিজেরা বুনেছিলে, সেটা কি আদৌ কখনো জিরো করে দেয়া সম্ভব? তোমার সন্তানদের কাছে কিন্তু তোমাদের এই ভাগাভাগির ইতিহাস কোনভাবেই সুখের নয়। তোমার বেলায় যদি এটা তোমার পূর্বপুরুষেরা বিশেষ করে তোমার শ্রদ্ধেয় বাবা এই একই কাজটা করতেন তোমার মাকে নিয়ে বা তোমাকে নিয়ে, তোমার বর্তমান জগতের সঙ্গে কি কখনো এটা সাংঘরসিক (অন্তত একটু হলেও কি প্রভাব ফেলত না) হত না? কখনো কি ঐ পারস্পেক্টিভ থেকে দেখেছ? আমাদের পরিবারে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে ৪৫ বছর আগে। আমি যখন ছোট ছিলাম এবং এই ঘটনাটা জানতে পারলাম, সম্ভবত আমরাই প্রথম যারা এমন একটা সম্পর্ক কে অত্যন্ত সাভাবক ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এমন একটা পরিবার সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম যে, অবশেষে সে মেয়ে মানুষ বলে হয়ত ইমোশনাল অবস্থাটা তুমি দেখেছ তাঁর চোখের জল দিয়ে। কিন্তু আমিও হলফ করে বলতে পারি, তোমার চোখে জল না এলেও অন্তত ক্ষনিক সময়ের জন্য তোমার চিন্তায় কখন ব্যাঘাত হয়েছেই। আর তোমার ঐ ঘোরের সন্তানেরা এই ব্যাঘাত টাতে অভ্যস্থ হচ্ছে প্রতি নিয়ত। আর এই জায়গাটাই হচ্ছে আমার এত কথা বলার কারন। উপরে বলা (১) নং পদ্ধতিতে নতুন করে সব কিছুই শুরু করা যায় কিন্তু তাতে মানুষ শধু পিছিয়েই যায়। কারন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিনিশিং পয়েন্টে আসতে হলে ঐ একই সময় বরাদ্ধ নিয়ে বারবার নতুন করে কোন কিছু শুরু করা বারবারই বকামি। এতে টিমের সবার ক্ষতি হয়।

তখন টিম লিডার হিসাবে নিজকে বড় অসহায় মনে হওয়া ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আর একবার যদি টিম লিডারের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়, তখন ঐ টিম টা কোথায় কিভাবে যে ডি-রেইল্ড হওয়া শুরু করে, তাঁর রক্ষক শুদু সয়ং সৃষ্টি কর্তা। কথাগুলো তোমাকে বললাম বলে কি তুমি মাইন্ড করলা? এটা আমার জন্য ও প্রযোজ্য জাহাঙ্গীর, যদি আমি টিম লিডার হয়ে থাকি। তুমি বুদ্ধিমান, তোমার কথাগুলো বুজবার কথা।

৩১/১২/২০২০-বন্ধু সাকুদাকে চিঠি

সাকুদা

সাকিরের চিঠিটি পরে বেশ মজা তো পেলামই তার সঙ্গে আমারও যেন আজ হইতে বহু বছর আগের কোন এক উচ্ছল এবং অফলদায়ক কর্মদীপ্ত সময়কার কথা মনে পরিতেছিল। সেই ১৯৮৩ সালের কথা সম্ভবত।

পরিবারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে পরিক্ষা দিয়া ১২ লং কোর্সে সিলেক্ট হইয়া ২৭ শে জুলাই ১৯৮৩ তে সবার সঙ্গে বিএমএ তে যোগ না দিয়া বর্ষার ঝমঝম বৃষ্টির অসাধারণ একটি দিনে সবুজে ঘেরা এবং অগোছালো গাছপালার সাড়ির মধ্যে গরে উঠা ঢাকা ইউনিভার্সিটির শহিদুল্লাহ হলের সেই টিচার্স কোয়ার্টারে অত্যন্ত মন খারাপ করে একা রবি ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ বইটা নিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। কখনো কয়েক ফোটা এলোপাথাড়ি বৃষ্টির ছটা জানালা ভেদ করে আমার রবিঠাকুরের গল্পগুচ্ছ আবার কখনো আমার মুখের উপর আছড়ে পড়ছিল। আমার মন খারাপ কিনা কিংবা আমার ভিতরের কষ্টের শেষ অভিব্যাক্তি চোখের জলে বেরিয়ে যাইতেছিল কিনা তা নীরস বৃষ্টির ফোঁটার কারনে কারোরই বুঝবার অবকাশ হইতেছিল না। আজকের দিনের ডিজিটাল কোন যন্ত্রের কেরামতি থাকিলে হয়ত বুঝা যাইত যে, ঐ রোমান্টিক একটি বৃষ্টির দিনে কতটা অ-রমান্টিক পরিস্থিতি আমার ভিতরে খেলিয়া যাইতেছিল। আর আমার কষ্টের একটাই কারন ছিল যে, আমি সেনাবাহিনীতে আমার অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে ১২ লং কোর্সে যোগদান করিতে পারি নাই। কারন আমার পরিবার আমার জন্য স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় ইতিমধ্যে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করিবার জন্য কোন এক সনামধন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যবস্থা করিয়া ফেলিয়াছেন।

পরবর্তীতে পরিবারের উপর রাগ করিয়া আর কোন ভর্তি পরিক্ষা না দিয়াই আমি পরের কোর্স ১৩ বিএমএ তে যোগদানের গোপন কাগজখানা যোগাড় করিয়া ফেলিলাম। বলা যাইতে পারে সবার অজান্তে আমি যেন সেনাবাহিনীকে রেজিস্ট্রি মেরেজ করিয়া বসিলাম। কাউকেই আমার এই গোপন অভিসারের মত “সেনাবাহিনি-প্রেমের সাদির” কথা অথবা কাবিননামার মত “যোগদানের পত্রখানার” কথা কাউকেই বলিলাম না। শুধু দিন গুনিতেছিলাম কবে “শ্বশুর বাড়ীর মত” এক আস্তানা সেনাবাহিনির কোলে গিয়া নিশ্চিত হইব। কাউকেই কিছু বলছি না, ফুরফুরা মেজাজ আমার এখন, মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর কিছু নজরে আসিলে মনে হইত এইটা আমার, কিংবা মাঝে মাঝে আবার এও মনে হইত আমি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বিখ্যাত লোক কিংবা আকাশচুম্বী অনেক আষাঢ়ে গল্পের কাহিনির মত ইত্যাদি। কিন্তু সব কিছু চলছিল অতি গোপনীয়ভাবে। এই অভিসারের সময়ের মধ্যে আমি বেশ কিছু ব্যক্তির সঙ্গে (ব্যক্তি বলা ভুল হইবে কারন তখনও তারা ব্যক্তির পর্যায়ে পরে বলিয়া মনে হয় না, তারা সবাই ১৯ কি ২০ বছরের বালক)।  পরিচয় ঘটিল। আকবর (বর্তমানে মেজর জেনারেল আকবর), হুমায়ূন (মেজর জেনারেল), মুক্তার (ইঞ্জিনিয়ার) এবং আমাদের সাকুদা। কি কারনে বা কোন উপলক্ষে বা কার অন্বেষণে  তারা ঐ শহিদুল্লাহ হলের ভিতর দিয়া যাইতেছিল তা আজ হয়ত তাদের জিজ্ঞেস করিলেও তাহাদের মনে পরিবে কিনা আমার সন্দেহ আছে।

সাকুদার সঙ্গে আমার এই প্রথম পরিচয় কিন্তু ঘনিষ্ঠ পরিচয় বলা যাইবে না। তারপরের কাহিনী তো বিএমএর ভিতরের। ওটা যে শ্বশুরবারি নয় আদৌ, সেটা প্রথম দিনেই আমি বুঝিয়া ফেলিলাম। মনে হইল শত সতিনের সংসার, কেউ কাউকে ছাড়িয়া দিবার নহে। সে এক আরেক রাজপরিবারের মত বটে কিন্তু সেখানে গুটিকতক নারায়ণের বাস আর বাকি সবাই অ্যালেক্স হ্যালির কুন্টাকিন্তির মত।

সাকুদার সঙ্গে আমার অনেক জায়গায় অনেক পরিস্থিতিতে দেখা হইয়াছে, কখনো কোন এক সভায়, কখনো সেনাবাহিনীর কোর্স করার জন্য, কখনো বন্ধু ফোরামে, আবার কখনো হটাত অসময়ে।  আমি সাকুদা সম্পর্কে নতুন কিছু বলিতে চাই না কারন সাকির যা বলিয়াছে তা নিতান্তই বাড়াইয়া কিছু বলে নাই। বরং সাকুদা সম্পর্কে আরও অনেক কিছু বলার পরিধি আছে বৈকি। আমি আর সাকুদা একসঙ্গে একত্রে কখনো কোন গ্যারিসনে কাজ করিবার অবকাশ হয় নাই। তারপরেও আমি সাকুদার একজন ভক্ত। ভক্ত এই কারনে যে, সাকুদা যখন বালক ছিল তখন সে গ্রামে ছিল। আর সেটা এমন এক গ্রাম যা আমার গ্রামের মত মিষ্টি, বন্ধুসুলভ যেখানে বৃষ্টির দিনে ৮-১০ বছরের যুবক শিশুরাও  উলঙ্গ হয়ে বৃষ্টির জলে নাচিয়া বেড়ায়, পাশের বাড়ীর বিজয়া নিজের বোন না হইয়াও বোনের অধিকার হইতে কম যায় না, নিজের সহপাঠির সঙ্গে সারাদিন মারামারি করিয়াও পরের দিন তাহার সঙ্গে দেখা না হইলে মন খারাপ হইয়া যায়। সাকুদার জীবন বারিয়া উঠিয়াছে ঠিক এমন একটি গ্রামে। সাকুদার সঙ্গে এই খানে আমার অনেক মিল রহিয়াছে বৈ কি। সাকুদা যখন শৈশব পার করিয়া যুবক হইল, তখন সে রাষ্ট্রের অনেকের চেয়ে অনেক উপরে পদার্পণ করিল বটে কিন্তু সাকুদা হটাত করিয়া ভারসাম্যহীন হইয়া পরে নাই, কৌতূহল বারিয়াছে বটে কিন্তু সীমানা অতিক্রম করিয়া জলে ভাসিয়া যায় নাই। কিন্তু সাকুদা তাহার এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও পরিবর্তন হইতে পারিত। কিন্তু সাকুদা তার ঐ বালক বয়সের চরিত্রটুকুন ধরিয়া রাখিয়াছিল। রবি ঠাকুরের মত বলিলে বলিতে হয় যে, একেবারে পাকা আম্রের মধ্যেই যে পতঙ্গ জন্মলাভ করিয়াছে যাহাকে কোন কালে রস অন্বেষণ করিতে হয় নাই, অল্পে অল্পে রসাস্বাদ করিতে হয় নাই, তাহাকে একবার বসন্ত কালের বিকশিত পুস্পবনের মধ্যে ছাড়িয়া দেওয়া হউক দেখি- বিকচোন্নুখ গোলাপের আধখোলা মুখটির কাছে ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহার কি আগ্রহ।  সাকুদা যেন ঠিক এই জায়গায় একই ভাবে রহিয়াছে। এক যে ছিল রাজা, বলিয়া গল্প শুরু করিলে কোন দেশের রাজা আর কোন রাজা, সেটা সাকুদার জানার কোন কালেই আগ্রহ ছিল না এবং এখনও তাহার ঐ অনাবশ্যক খবরদারীতে আগ্রহ নাই। সাকুদা আগে যেমন ছিল, বয়সের তারতম্যে তাহার মধ্যে কোন ঘাটতি হইয়াছে বলিয়া আমার মনে হয় নাই। সেই হাসি, সেই অস্থিরতা, আবার সেই স্থিরতা কিংবা সে মায়াবিনী লক্ষি পেচার মত লক্ষ্মী বালকের চরিত্রে তার কোন পরিবর্তন হয় নাই। আর এটাই হচ্ছে সাকুদার সবচেয়ে বর একটা গুন যেখানে আমি তার চরম ভক্ত।

আজ সাকুদা সত্যি অর্থেই  অনেকের কাছে “দা”। তার মুখাবয়ব বয়সের ভারে আধাপাকা দাঁড়ি, চিন্তার ভারে মাথার চুল খালিপ্রায়, আর কর্ম পরিসরের কঠিন পরিশ্রমের পর তার এখন অবসরের সময়। তিনি গতকাল তার চিরাচরিত কর্মস্থল হইতে ছুটি পাইয়াছেন। হয়ত বা তাহার কিছুটা মন খারাপ হইয়া থাকিবে তার সেই চেনা পরিচিত টেবিলে আর কখনো আগের মত বসিতে পারিবেন না এই ভাবিয়া, কিংবা সকালে অফিসের ব্যস্ততা থাকিবে না এই ভাবিয়া। কিন্তু জগত সংসার এমনই এক পরিসর যেখানে বেকার মানুসেরা আরও অধিক ব্যস্ত, আর ব্যস্ত মানুসেরা আরও  বেশি অবসর কাটান। এ এক গোলক ধাঁধাঁর মত বৃত্ত।

আমি সাকুদাকে আমার অন্তর হইতে অভিনন্দন জানাই আমাদের এই গোলক ধাঁধাঁর মত বৃত্তে পুনরায় প্রবেশ করিবার জন্য। আবারো বলি, ১৯৮৩ সালে যেদিন রাগ করিয়া আমার নিজের পরিবারের সমস্ত সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করিয়া যেই সেনাবাহিনীতে আমার আশ্রয় করিয়া নিয়াছিলাম, আবার সেই আমি পুনরায় ২০০৪ সালে সেনাবাহিনীর উপর রাগ করিয়া আমি আমার পূর্বের জগতে ফিরিয়া আসিয়া দেখিয়াছি, যত তারাতারি নিজের ঘরে ফেরা যায় ততই মঙ্গল। এই জগত টা আমার, আমার পরিবারের এবং এই জগতটা আমার পূর্বসুরিদেরও ছিল। এই জগতে ভয়ের অনেক কিছু আছে কিন্তু সেই ভয়ংকর পরিবেশে যারা পাশে আছে তারা সবাই আমাদের কেউ বন্ধু, কেউ আত্মীয়, কেউ বা আবার কেউনা কিন্তু তারা অনেকেই আমাদের মঙ্গল কামনা করে। শুধু একটাই অনুরোধ, মগজ আর “দিল” এক সঙ্গে একই কাজে লাগাইতে হইবে, সাফল্য তাহলে নিজের।

আমরা তোমার পাশে আছি সাকুদা। পাশে আছি অনেক ভালবাসা নিয়া, পাশে আছি তোমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য যখন তোমার মন খারাপ হইবে, পাশে আছি যখন তুমি মনে করিবে তোমার কাউকে প্রয়োজন।

ভাল থাকিও

মেজর আখতার (অবঃ)

তোমার বন্ধু 

২১/১০/২০২০-উম্মি-কনি আমার অফিসে

সারাদিন ওরা আমার অফিসেই ছিলো। আজ ওদের জন্য একটা বিশেষ দিন। আমি দুই বোনকে মোট ২৬ শতাংশ জমি বায়না রেজিষ্ট্রি করে দিলাম। টাকার শর্ট ছিলো, তাই সাব কবলা করা হলো না। কিন্তু যে কন সময় ওদেরকে আমি দিয়ে দিতে পারবো, আর যদি আমার মরন ও হয়, ওরা মাত্র ১ লাখ টাকা জমা করে কোর্টের মাধ্যমে জমিটা নিজেদের নামে লিখে নিতে পারবে সে ব্যবস্থাটা করে রাখলাম। এর মধ্যে সোহেল এবং লিয়াকত অফিসে এলো। আমি ওদেরকেও একটা ল্যাব করে দিয়েছি, কিন্তু আমার ধারনা হচ্ছে সোহেল এবং লিয়াকত ল্যাবটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না। সোহেলের মধ্যে আগে যেটা দেখি নি, সেটা এখন আমার মনের মধ্যে একটু একটু করে সন্দেহের বীজ উকি দিচ্ছে, ওকে ব্যবসায়িক পার্টনার করাটা সম্ভবত ভালো সিদ্ধান্ত হয় নাই।

২০/১০/২০২০-উম্মিকার বাড়ি আসা  

Categories

অনেকদিন পর আমার বড় মেয়ে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাসায় আসবে কাল ইনশাল্লাহ। তারপর ওকে নিয়ে আমরা সবাই কক্সবাজার যাবো বেড়াতে। অনেকবার গিয়েছি কক্সবাজারে, কিন্তু এবার যেনো কেনো একটু বেশী ভাল লাগছে যেতে। আসলে কক্সবাজার জায়গাটার মধ্যে কোনো মজা নাই, মজা হলো পুরু পরিবার একেবারে নিজের মতো করে এক সাথে হৈ হুল্লুর করা। সময়টা একেবারে নিজেদের মতো করে কাটে। এটা আসলে একটা ব্রেকটাইম।

প্রথমে উম্মিকার যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না, মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো আমাদের সবার। বারবারই মনে হচ্ছিলো যে, উম্মিকা যেতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু ওর ইন্টার্নীর ঝামেলায় উম্মিকার সম্ভব হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত উম্মিকা ম্যানেজ করেছে ছুটিটা। আর এই ছুটিতেই উম্মিকা আগামীকাল বাড়ি আসছে। ওর বাড়িতে ও আসছে, এতে যেনো বাড়িটাই আনন্দিত হয়ে উঠছে। ওর মা আজ ওর জন্য স্পেশাল বাজার করে আনলো, কনিকাও প্রস্তুতি নিচ্ছে কাল ওর আপু আসবে, তাই কি স্পেশাল খাওয়া যায়, তার একতা লিষ্ট ও করে ফেলছে। আগামী পরশু আমি উম্মিকা আর কনিকাকে ১৩ শতাংশ করে চমৎকার জায়গায় দুজনকেই এক খন্ড জমি লিখে দেবো, সেটাও একতা আনন্দ হচ্ছে। জমিটার দাম নিছক কম নয় প্রায়, ৭৫ লাখ টাকা করে উভয়ের, মানে প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি। তাই উম্মিকা আর কনিকাকে আমার ফ্যাক্টরীতে নিতে হবে আগামী পরশুদিন ইনশাল্লাহ।

প্রথমে উম্মিকার যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না, মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো আমাদের সবার। বারবারই মনে হচ্ছিলো যে, উম্মিকা যেতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু ওর ইন্টার্নীর ঝামেলায় উম্মিকার সম্ভব হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত উম্মিকা ম্যানেজ করেছে ছুটিটা। আর এই ছুটিতেই উম্মিকা আগামীকাল বাড়ি আসছে। ওর বাড়িতে ও আসছে, এতে যেনো বাড়িটাই আনন্দিত হয়ে উঠছে। ওর মা আজ ওর জন্য স্পেশাল বাজার করে আনলো, কনিকাও প্রস্তুতি নিচ্ছে কাল ওর আপু আসবে, তাই কি স্পেশাল খাওয়া যায়, তার একতা লিষ্ট ও করে ফেলছে। আগামী পরশু আমি উম্মিকা আর কনিকাকে ১৩ শতাংশ করে চমৎকার জায়গায় দুজনকেই এক খন্ড জমি লিখে দেবো, সেটাও একতা আনন্দ হচ্ছে। জমিটার দাম নিছক কম নয় প্রায়, ৭৫ লাখ টাকা করে উভয়ের, মানে প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি। তাই উম্মিকা আর কনিকাকে আমার ফ্যাক্টরীতে নিতে হবে আগামী পরশুদিন ইনশাল্লাহ।

৩০/০৯/২০২০-জীপগাড়ি-হাইলাক্স সার্ফ

                 

আমাদের বাসায় দুটু গাড়ি আছে। একটা এলিওন, আরেকটা নোহা। মানুষ আমরা মোট চারজন। বড় মেয়ে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্নী করছে ফলে ঢাকার বাসায় আমি, আমার স্ত্রী এবং ছোট মেয়ে কনিকাই থাকি। দুটু গাড়িতে আমাদের খুব ভালোভাবেই চলে যায়। কিন্তু খুব শীঘ্রই আমার বড় মেয়ে যখন ইন্টার্নী করে ঢাকায় চলে আসবে, নির্ঘাত আমাকে আরো একটা গাড়ি কিনতেই হবে ওর জন্য। আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার তার হাইলাক্স সার্ফ গাড়িটা বিক্রি করে তিনি আরো একটা গাড়ি কেনার পরিকল্পনা করেছেন। ব্যবসায়ীক পার্টনারের এই গাড়িটা আমরা ৭৩ লক্ষ টাকা দিয়ে ২০১০ সালে কিনেছিলাম আমাদের প্রয়াত আরেক বিদেশী পার্টনার প্রিয়ান্থার জন্য। প্রয়ান্থা মারা যাওয়ার পরে আমিই বলেছিলাম মুর্তজা ভাইকে যেনো উনিই এই গাড়িটা কিস্তিতে কিনে নেন। গাড়িটা সেকেন্ড হ্যান্ড ছিলো না। ফার্ষ্ট হ্যান্ড গাড়ি ছিলো।

গাড়িটা আমার কাছে খারাপ লাগে নাই। তাই রেখে দিলাম। এই রেখে দেওয়ার পিছনে দুটু কারন ছিলো। এক, আমাকে এখুনী কোনো টাকা পয়সা দিতে হবে না। দুই, কয়েকদিন পর আমাকে আরেকটা গাড়ি কিনতেই হবে। তাহলে এখন এটা রেখে দেয়াই ভালো। ড্রাইভার নিতে হবে না কারন মিটুল এলিওন গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করবে, বড় মেয়ে এবং ছোট মেয়ের জন্য নোহা গাড়িটা থাকবে আর আমার জন্য এই হাইলাক্স সার্ফ গাড়িটা রইলো। গ্যারেজের সল্পতা আছে। আমাদের বাসায় সর্বোচ্চ দুটু গাড়ি পার্ক করা যায়। তাই পাশের বাসার সাত্তার সাহেবের বাড়িতে একটা গ্যারেজ ভাড়া নিতে হলো। পাশাপাশি বাসা। কোনো অসুবিধা নাই।

আপডেটঃ (২১/০৬/২০২১) 

শেষ পর্যন্ত আমি মূর্তজা ভাইকে গাড়িরটার দাম এক কালীন পরিশোধ করে দিলাম। অংকটা বলছি না তবে যা দিয়েছি সেটার বিপরীতে মূর্তজা ভাই কোনো কথা বলেন নাই। গাড়িতা মধ্যে কোনো প্রকার সমস্যা নাই। মাত্র তিনটা ছোট ছোট সমস্যা যা যে কোনো গ্যারেজে নিলেই ঠিক করে দেয়ার কথা। মূর্তজা ভাই আসলে কখনোই নাভানা ছাড়া গাড়িটা অন্য কোনো গ্যারেজে দেখাতেন না এবং দেশীয় কোনো পার্টস ও ব্যবহার করতেন না যদি লাগতো। সরাসরি জাপান থেকে পার্টস আমদানী করতেন। ফলে গাড়িটা এতো বছর পরেও কোনো প্রকার খুত ছিলো না। ছোট সমস্যা গুলি ছিলো যে, একটা অয়াইপার ভাংগা, আরেকটা রিয়ার ভিউ মিরর ফাটা। আমি আমার পরিচিত গ্যারেজে গিয়ে এটা দেখাতেই তিনি অরিজিনাল সেম গাড়ির ওয়াইপার আর রিয়ার ভিউ মিরর এনে লাগিয়ে দিলেন। আরেকটা সমস্যা কয়েকদিন পর বুঝতে পারলাম যে, পিছনের ব্যাক ডালার ওজন প্রায় এক টন, কি আছে সেখানে আমি জানি না, ওটার যে সাপোর্টার, সেটা ধরে রাখতে পারছে না। ওটা প্রায় ১০ হাজার টাকায় অরিজিনাল পাওয়া গেলো। লাগিয়ে দেখলাম দারুন কাজ করছে।  আরো একটা জিনিষ চেঞ্জ করলাম, সেটা হলো টায়ার। পুরু ৪ টা টায়ারই এক সাথে পরিবর্তন করলাম। গাড়িটা ভীষন রকমের ভালো। 

২৩/০৯/২০২০-সিনহা হত্যার আপডেট নাই

সিনহা হত্যা সবাই দেখেছে, সিনহার লাশ সবাই দেখেছে। সিনহা  বন্দুকের গুলিতে নিহত হয়েছে, এটা বাস্তব। এটা কোনো গাজার আসরে বসে কোনো মাতালের বয়ান নয়। এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসের বাইরে বা ভাবনার বাইরে নয় যে, সিনহাকে হত্যা করা হয় নাই। কারন এটা কোনো লেখকের কল্প কাহিনী নয়। কিন্তু... এরপর?

 

ক্ষমতা, ক্ষমতার পদাধীকার আর সেই ক্ষমতার প্রভাব এই সমাজে সেই কাজ করা যায় যা সাধারন মানুষ ভাবতেও পারে না, বুঝতেও পারে না। তাহলে  সাধারন মানুষ কি করতে পারে? "প্রশ্ন"- হ্যা, সাধারন মানুষ শুধু প্রশ্ন করতে পারে। আর যদি সেই প্রশ্নের উত্তরের জায়গায় তারা শুধু নীরবতাই পায়, তাহলে সাধারন মানুষ নীরব থেকে সেই নীরবতাকেই উত্তর মনে করে।

 

সিনহা হত্যা এখন এমন এক প্রশ্নের উদয় করেছে- আদৌ কি সিনহা নামের কোনো সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসার ছিলো যে কিনা কোনো এক রাতে একদল আইন শ্রিংখলা বাহিনীর পুলিশের দ্বারা নির্মমভাবে নিহত হয়েছে? হয়তো ছিলো, হয়তোবা ছিলই না। এমনো হতে পারে- এটা কোন লেখকের মনগড়া  কল্পনাপ্রসুত লোমহর্ষক এডভেঞ্চার কাহিনীর কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা যা শুধু লেখকই জানেন।

১২/০৯/২০২০-মিতুলের করোনা পজিটিভ

Categories

যে ভয়টা পেয়েছিলাম, সেটাই হয়েছে। আজ রাত ১০টায় প্রভা হেলথ সেন্টার যারা গতকাল মিতুলের করোনার টেষ্টের জন্য স্যাম্পল নিয়ে গিয়েছিলো, তারা মেইল করে জানালো যে, মিতুলের করোনা ভাইরাস "পজিটিভ"। মিটুল প্রায় সপ্তাহখানেক যাবত এতোটাই দূর্বল আর অসুস্থ্য হয়ে গিয়েছিলো যে, এটা করোনা ছাড়া আর কোনো কিছুই না। অন্যকোনো কিছুই তার বেঠিক নয় অথচ ওর না আছে শরিরে শক্তি, না খেতে পারছে, না একটু নড়াচরা করতে পারছে। যাইহোক, আশার কথা হচ্ছে যে, মিতুলের "করোনা" আসলে আরো আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো। যা আমরা কেনো, কোনো ডাক্তার কিংবা হাসপাতালও বুঝে নাই। বারংবার বলার পরেও তারা মিতুলের "করোনা" টেষ্ট করানোর প্রয়োজন নাই বলেই তাকে অন্যান্য মেডিকেশন প্রেস্ক্রাইব করেছে। এই করোনা প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিতে আমাদের সিএমএইচ অন্তত মিতুলের করোনা টেষ্টটা করানোর জন্য উপদেশ দিতে পারতো। আমরা শুধুমাত্র "করোনা" টেষ্ট করার ব্যাপারেও কথা বলেছিলাম কিন্তু তারা এটাকে "করোনা"র কোনো সিম্পটম নাই বলে আর উৎসাহ দেন নাই। মিতুলের সিম্পটমগুলি খুব ক্রিটিক্যাল। ওর জর নাই, কাশি নাই, অন্যান্য কোনো বাহ্যিক সিম্পটম নাই, অথচ ওর খাবার খেতে অনিহা, ঘ্রান পায় না। আর মাঝে মাঝে "আম আম" পায়খানা হয়। আজ জানলাম, এটা "করোনার" আরেক ক্রিটিক্যাল চেহাড়া। করোনার রোগীর সব সময় জর হতে হবে সেটাও না, আবার কাশি থাকতে হবে সেটাও না, করোনার অনেক চেহাড়া।

যাই হোক, মিতুল সম্ভবত ইতিমধ্যে করোনার যে শক্তিশালী থাবা, সেটা অতিক্রম করে ফেলেছে। এখন ধীরে ধীরে খাওয়ার চেষ্টা করছে। কোথাও ভর্তি করলাম না। বাসায় ট্রিটমেন্ট হচ্ছে। যেহেতু করোনার কোনো ট্রিটমেন্ট নাই, ফলে আমরা চেষ্টা করছি ওকে সাভাবিক খাবার দিতে, গরম পানি আর লেবুর চা, শরবত, সাথে কফের জন্য সুডুকফ নামের একটি সিরাপ, ম্যাগনেশিয়াম টেবলেট, ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট এবং প্যারাসিটামল খাওয়াচ্ছি রুটিন করে। আর তার সাথে স্যুপ, ফল,জুস এবং কিছু শক্ত খাবার বিশেষ করে জাউ,বার্লি, সাগু এবং নরম খিচুড়ি। মিটুল নিজেও চেষ্টা করছে যাতে শরীরে কিছুটা শক্তির সঞ্চার হয় এমন খাবার জোর করেই খেতে।

আমার ছোট মেয়েও কদিন আগে যখন মিটুল অসুস্থ্য হয়ে যায়, তখন কনিকার একটু একটু কাশি ছিলো, জরও ছিলো। ব্যাপারটা খুব আমলে নেই নাই। দুদিন পর দেখলাম, কনিকা আবার সুস্থ্য। ভাবলাম, হয়তো সিজনাল জর বা এসি চালিয়ে ঘুমায় বলে ঠান্ডা লেগেছে। আমার নিজেরও মাঝে একটু খারাপ এগেছিলো, এটাও আমি খুব একটা আমলে নেই নাই। আজ মনে হচ্ছে, করোনা আমাদেরকেও সম্ভবত টাচ করেছিলো, কিন্তু কনিকা বা আমাকে করোনা কাবু করতে পারে নাই।

আমরা এখন সবাই আরো চেষ্টা করছি যাতে অন্তত প্যান্ডেমিক আমাদেরকে আঘাত করতে না পারে। বাকিটা আল্লাহর দয়া।

১১/০৯/২০২০-মিতুলের শরীরটা ইদানিং

পরিবারের সবচেয়ে কর্মঠ মানুষটি যদি কোনো কারনে তার সচলতা কমে যায়, তার শরীর খারাপ হয়ে নিজেই বিছানায় পড়ে যায়, তার নিজের খাবারটুকুও যখন আর বানানোর শক্তি থাকে না, তখন যেটা হয় তা অবর্ননীয়। পরিবারের সবার সুখ নষ্ট হয়, বিরক্ত লাগে, কোনো কিছু যেনো হাতের কাছে পাওয়া যায় না, প্রতিদিনকার রুটিনে একটা বাধাগ্রস্থ হয়। এটা একটা পানির মেইন পাইপের মতো। ফ্লো বাধাগ্রস্ত হতে হতে সবার জীবনের মধ্যে একটা স্থবিরতা, ক্লান্তি নেমে আসে। আমার পরিবারে মিটুলের অসুস্থতা ঠিক তেমন একটা ব্যাপার দাড়িয়েছে। গত ১০/১২ দিন যাবত মিটুল অসুস্থ্য। কিন্তু কি তার রোগ এটাই যেনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। না ডাক্তার না আমি। পর পর তিনটা ইন্সটিটিউসন বদলামাম। প্রথমে ইবনে সিনা, তারপর এপোলো, অতঃপর সিএমএইচ। সবার রিপোর্ট আর ডায়াগনস্টিকে প্রায় একই কনফার্মেশন। এনোরেক্সিয়া, পটাশিয়ামের অভাব, ইলেক্ট্রোলাইট-কে এর অভাব সাথে ম্যাগনেশিয়াম। সবগুলি মেডিসিন এপ্লাই করছি কিন্তু খুব একটা ইম্প্রোভ করছে বলে মনে হয় না। সারাদিন মিটুল শুয়েই থাকে। আমি ওর জন্য অফিসে যেতে পারছি না প্রায় তিনদিন। আমিও চেষ্টা করছি যাতে মিটুল তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায় কিন্তু ব্যাপারটা আমার ইচ্ছার গতির সাথে ওর সুস্থতার গতিতে মিলছে না।

আজ সন্ধ্যায় ডাঃ নিখিলের সাথে কথা বললাম। তিনি আমাদের রিভার সাইড সুয়েটার্স এর ডাক্তার। তিনিও আজ ৪ দিন যাবত পিজিতে করোনার কারনে ভর্তি। মিটুলের যখনই কোনো অসুখ হয়, নিখিলদা ওভার ফোনেই সব প্রেসক্রিপশন করে থাকেন, আর তাতেই আল্লাহর রহমতে মিটুল ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এবারই প্রথম কেনো জানি কিছুতেই মিটুল দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে না।

একটু আগে প্রভা হেলথ কেয়ার-বনানীতে ফোন করে মিটুলের জন্য করোনার টেষ্ট করানোর জন্য হোম সার্ভিসে ফোন করলাম। ওরা আগামিকাল সকাল ১১টার দিকে বাসা থেকে স্যাম্পল নিয়ে যাবে। আমার ধারনা, মিটুলের করোনার হবার সম্ভাবনা আছে। যদিও খুব একটা সিম্পটম দিচ্ছে না। আজই প্রথম ওর জর হলো ১০১, কোনো সর্দি নাই, বুক ব্যথা নাই, কিন্তু সুষ্ক একটা কাশির ভাব আছে। আজকাল করোনাও চালাক হয়ে গেছে। বিভিন্ন মানুষের শরীরে সে বিভিন্ন রুপে আসে। হতে পারে মিটুলের ক্ষুধামন্দা আর একটু জরই হচ্ছে পিজিটিভ হবার লক্ষন। ঘ্রান পায় যদিও করোনার রোগীর ঘ্রান থাকে না। একটু একটু করে খেতে পারে যদিও কোনো টেষ্ট পায় না সে খাবারের মধ্যে। দেখা যাক, আল্লাহ ভরষা।

০২/০৯/২০২০-শেফালীর জামাইর ইন্তেকাল

প্রায় দু মাস হলো নেওয়াজ আলী কুয়েত থেকে একেবারে দেশে ফিরে এসেছে। প্রায় ৩২ বছর দেশের বাইরে ছিলো। নেওয়াজ আলি আমার ভাগ্নী শেফালির হাসবেন্ড। সংক্ষিপ্ত আকারে এই নেওয়াজ আলীর ইতিহাসতা না বললেই চলে না।

তখন ১৯৮৭ সাল। আমি সবেমাত্র সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট পদে চাকুরী করছি। মাঝে মাঝে গ্রামে যাই, আগের মতো না। এম্নিতেই গ্রামে এখন আর আগের মতো যাওয়া হয় না, আবার গেলেও আগের মতো বন্ধু বান্ধবরাও খুব একটা ধারে কাছে নাই বিধায় আড্ডাও জমে না। একদিন মা জানালেন যে, শেফালীর তো বিয়ে দেয়া দরকার। শেফালীর জন্য কুমড়া বারীর নেওয়াজ আলী বিয়ের কথা বলছে। ব্যাপারটা ভেবে দেখিস। কুমড়া বাড়ির নেওয়াজ আলীর বাবা জলিল মোল্লাকে আমি মামা বলে ডাকি। তারা কততা আমাদের কাছের বা রক্তের সে হিসাবটা আমি জানি না, আজো না। তবে জলিল মামার বাড়িতে আমাদের অনেকগুলি সম্পর্ক কেমন করে জানি পাচিয়ে গেছে। আমার তিন নাম্বার বোন লায়লার বিয়ে হয়েছে এই কুমড়া বাড়িতে ইসমাইল ভাইয়ের সাথে। আমার মুসল্মানীর সময় দোস্তি হয়েছে নেওয়াজ আলীর ছোট ভাই মোতালেব বা মূর্তুজ আলির সাথে, অন্যদিকে জলিল মোল্লাকে আমরা আবার ডাকি মামা বলে। এখন আবার বিয়ের সম্পর্ক করতে চায় নেওয়াজ আলী আমাদের ভাগ্নি শেফালীর সাথে। একেকটা সম্পর্ক একেকতার সাথে পরস্পর বিরোধি। যদি জলিল মামাকে মামা বলে কেন্দ্র ধরি, তাহলে লায়লার বিয়ের জন্য জলিল মামাকে বলতে হয় ভাই বা বিয়াই। আবার লায়লার বিয়ের সম্পর্ককে যদি কেন্দ্র ধরি, তাহলে জলিল মামাকে আর মামাই বলা যায় না। আবার জলিল মামার পোলা মোতালেবের সাথে আমার দোস্তি পাতার কারনে জলিল মামা হয়ে যায় আমার খালু বা আংকেল। এখন যদি শেফালিকে নেওয়াজ আলীর সাথে বিয়ে দেই, এতোদিন যেই নেওয়ায়জ আলিকে আমি ভাই বলতাম, তাকে এখন আমার বলতে হবে জামাই বাবু আর নেওয়াজ আলি আমাকে বলা শুরু করবে "মামু"। অন্যদিকে আরেকটা ঘটনা প্রায় ঘটেই যাচ্ছিলো, সেটা না হয় নাইবা বললাম। এতো সব প্যাচালো একটা সম্পর্কের মধ্যে আমাকে এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে শেফালির বিয়ের ব্যাপারটা নেওয়াজ আলীর সাথে।

এবার আসি শেফালীর ব্যাপারে কিছু কথা। শেফালির মা শায়েস্তা খাতুনের প্রথম পক্ষের মেয়ে শেফালী। শেফালীর জন্মের পর শেফালীর বাবা তার দেশে যাওয়ার নাম করে সে আর ফিরে আসে নাই। কেনো ফিরে আসে নাই, আদৌ বেচে আছে কিনা, বা তার একেবারে নিরুদ্দেশ হবার কল্প কাহিনী আজো আমরা কেউ জানি না। শেফালী আমাদের বাড়িতেই বড় হতে লাগলো। শেফালীর মায়ের অন্য আরেক জায়গায় বিয়ে হয়ে গেলো। সেখানে লিয়াকত, শওকাত আর ফারুকের সাথে এক মেয়ে নুরুন্নাহার এর জন্ম হয়।  শেফালী আমাদের বাড়িতেই বাপ মা বিহিন আমার মায়ের কাছে বড় হতে লাগলো। এই ধরনের বাচ্চাদের বেলায় বিয়ে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা মামারা যারা গ্রামের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছি, তাদের বেলায় এটা অনেকতা উপকারই হয়। তারা এইসব বাচ্চাদের বেলায় মামাদেরকেই আসল গার্জিয়ান ভেবে সম্পর্ক করতে আগ্রহী হয়।

নেওয়াজ আলীর ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন। খুবই সুন্দর একতা ছেলে। কিন্তু অশিক্ষিত। দেশে কাজের কিছু নাই। বেকার। বিদেশ যাওয়ার একতা হিরিক পড়েছে। কিন্তু নেওয়াজ আলীদের বা জলি মোল্লার সামর্থ নাই যে, ছেলেকে বিদেশ পাঠায়। তাই, বিয়ের মাধ্যমে যদি কনে পক্ষ থেকে কিছু ক্যাশ নেওয়া যায়, তাহলে বিদেশ যাওয়ার জন্য একটা আশার পথ খোলে। ফলে শেফালি চেহারায় অনেক কালো হলেও টাকার কাছে এটা কোনো বিশয়ই ছিলো না। তাদের দাবী- ২০ হাজার টাকা দিতে হবে ক্যাশ, নেওয়াজ দেশের বাইরে চলে যাবে বিয়ের পর। দেশের বাইরে যেতে মোট টাকা লাগবে ৩০ হাজার, বাকী ১০ হাজার জলিল মোল্লা জোগাড় করবে। শেফালীর ভুত-ভবিষ্যত অনেক কিছু চিন্তা করে শেষ নাগাদ আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, শেফালীকে আমরা নেওয়াজ আলীর সাথেই বিয়ে দেবো এবং হাজার বিশেক টাকা সহই দেবো। সেই থেকে শেফালির হাজবেন্ড নেওয়াজ আলি জুয়েতেই ছিলো, মাঝে মাঝে দেশে এসছে। এর মধ্যে শেফালির তিন সন্তানের মা, নাফিজ, নাহিদ আর একটা মেয়ে।

নেওয়াজ আলীর প্রায় ৩২ বছরের বিদেশ থাকা অবস্থায় ওর স্বাস্থ্যের অনেক ক্ষতি হবার পাশাপাশি যে, পরিবারের অনেক উন্নতি হয়েছে সেটাও না। অবশেসে নেওয়াজ আলি গত ২ মাস আগে চুরান্তভবে দেশে চলে আসে। এখন তার বয়স প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। ওর বড় ছেলে নাফিজ জাপানে থাকে, ছোট ছেলে নাহিদ মাত্র মেট্রিক দেবে, মেয়ে আরো ছোট। দেশে আসার পর আমার সাথে নেওয়াজ আলীর দেখা হয় নাই। মানে নেওয়াজ আলীর সাথে আমার দেখা হয় নাই প্রায় কয়েক যুগ।

যাই হোক, দুদিন আগে জানতে পারলাম, ৭ বছর আগে নেওয়াজ আলীর যে বাইপাশ সার্জারী হয়েছিলো কুয়েতে, সেই বাইপাস সার্জারীতে আবার নাকি ব্লক। তাকে পুনরায় অপারেশন করাতে হবে। ৩২ বছর বিদেশ চাকুরী করার পরেও তাদের যে খুব একটা সঞ্চয় আছে সে রকমের কিছু না। হয়তো সব মিলে লাখ পাচেক টাকার একটা ক্যাশ ব্যালেন্স থাকলেও থাকতে পারে। গতকাল নেওয়াজ আলি বুকের ব্যথায় উঠানে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো, তড়িঘড়ি করে আজগর আলী হাসপাতালে আনা হয়। তারা নেওয়াজ আলীর ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলো যে, সে ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছে। রাখতে চায় নাই। অগত্যা আবার গ্রামে। আসলে মাথার উপর যখন কেউ থাকে না, আর যে মাথা হিসাবে থাকে, যখন তারই কোন বিপদ হয়, তখন সে থাকে সবচেয়ে অসহায় পজিশনে। নেওয়াজ আলীর অবস্থা অনেকটা এ রকমের। অসুস্থ্য শরীর নিয়ে একবার হাসপাতাল, আরেকবার গ্রামে, এই করতে করতেই সে আরো অসুস্থ্য

আজ সকালে আবারো নেওয়াজ আলিকে হাসপাতালে "বারডেম হাসপাতাল" নিয়ে আসা হয়েছে। হার্টের পেসেন্ট, কেনো যে বারডেমে আনা হয়েছে সেটাও আমি জানি না। আর কেনো জানি ব্যাপারটায় আমি জানতেও মন চায় নাই। আর জানতে না চাওয়ার পিছনেও একটা কারন ছিলো, যা এখন আর বলছি না। একটু আগে লিয়াকত (শেফালীর ভাই) ফোনে জানালো যে, সম্ভবত নেওয়াজ আলি বাচবে না। তার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। খরটা আমার কাছে অন্য দশটা খবরের মতোই মনে হয়েছিলো। তাড়াহুরা ছিলো না। আমার স্ত্রী মিটুলের শরীরটা অনেক খারাপ, তাকে নিয়ে ইবনে সিনায় গিয়েছিলাম, সেখান থেকে গিয়েছিলাম সি এম এইচে। ফেরার পথে আনুমানিক ২ তার দিকে লিয়াকত ফোনে জানাল যে, নেওয়াজ আলি আর নাই, মারা গেছে।

গ্রামে লাশ দাফনের জন্য যাওয়ার দরকার ছিলো, এটা একটা প্রোটকলের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমারো কোমড়ে একটু ব্যথা ছিলো বলে যেতে চাই নাই। আর কোমড়ে ব্যথা না থাকলেও হয়তো যাওয়া হতো কিনা আমার সন্দেহ আছে। মন যেতে চায় নাই।

শেফালি সম্ভবত কাদছে, ওর ছেলেমেরা কাদছে, এই কান্নাটা শুরু হয়েছে। আমি দোয়া করি ওদের যেনো কাদতে না হয় কিন্তু আমি জানি কান্নার ভাষা। আমি তো সেই ছোটবেলা থেকেই বাবা ছাড়া দুর্দশা জীবন থেকেই আজ এখানে এসেছি। তবে একতা বিষয় স্পষ্ট যে, যাদের মাথার উপরের বৃষ্টি অন্যের ছাতায় নিবারন হয়, তাদের উচিত না ওই ছাতাওয়ালা মানুষতাকে কোনোভাবেই ছাটার নীচে থাকতেই হিট করা। তাতে যে ছাতার আবরনটা সরে যেতে পারে এটা যখন কেউ বুঝে না, তখন ছাতাটা যখন সরে যায়, তখন ওই ছাতার মাহাত্য টা হারে হারে টের পাওয়া যায়। আমি হয়তো ওদের জন্য ওই ছাতা ওয়ালাই ছিলাম।

১০/০৬/২০২০-দুদু মিয়ার ইন্তেকাল

আমি অফিসে বসে ছিলাম। কাজের চাপ ছিলো বটে কিন্তু তারপরেও কাজের চাপ কমে এসেছিলো দুপুরের দিকে। ফ্যাক্টরীর সেলারী দিতে হবে, কাজ প্রায় সম্পন্ন। কফি পান করছিলাম। এমন সময় বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে মিটুল (আমার স্ত্রী) ফোন করলো। ফোন ধরলাম, তার কন্ঠ উৎকণ্ঠায় ভরপুর।

-শুনছো?

-কি শুনবো?

-আরে, ফাতেমা আপার জামাই দুদু ভাই মারা গেছেন।

-বললাম, কখন?

-এইমাত্র ওনার মেয়ে খালেদা জানালো যে, ওর বাবা মারা গেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

খারাপ লাগলো। কারন গতকালও আমি ওনার সাথে ফোনে কথা বলেছিলাম। বলেছিলো যে, ওনার শরীরটা বেশী ভালো নাই। অথচ আজকে ২৪ ঘন্টা পার হয় নাই, লোকটা আর এই প্রিথিবীতেই জীবন্ত নয়। এটাই জীবন। যার কোনো স্ট্যাবিলিটি নাই। কখন উনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সেতাও জানি না, আবার কেনো ভর্তি হয়েছিল সেতাও জানি না। দুদু ভাই হার্টের স্ট্রোকের কারনে মারা গেছেন বলে ডাক্তার জানিয়েছে।

দুদু ভাই আর ফাতেমার গল্পটা বলি।

১৯৭৬ সাল। আমি তখন গ্রামে। গ্রামের স্কুলেই লেখাপড়া করি। দেশের অবস্থা বেশ খারাপ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ, কোনো আইন শৃঙ্খলা নাই, তার মধ্যে কয়েকদিন আগে শেখ মুজিব, যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, তাকে সামরিক অভ্যুথানে খুন করা হয়েছে। গ্রামের অনেক লোক বেকার, যে যেভাবে পারে কোনো রকমে দিন চালাচ্ছে। আমরা ৫ বোন আর মা এবং আমি। আমাদের সংসার যার প্রধান মানুষ আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ। তিনিও সাবলম্বি নন, স্টুডেন্ট থেকে সবেমাত্র ঢাকা ইউনিব্ররসিটিতে লেকচারার হিসাবে যোগ দিয়েছেন। কোনো রকমে আমাদের সংসার চলে। বাড়িতে এতোগুলি বোন আর আমি তো সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ি, এরকম একটা থমথমে দেশের পরিবেশে ভাইয়ার উপর লোড কম নয়। একদিকে নিরাপত্তা, আরেকদিকে জীবন ধারনের যুদ্ধ। হাবীব ভাই নিজেও তার ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিদেশে যাবেন বলে পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু বোনদের বিয়ে না দেয়া পর্যন্ত তার এই পরিকল্পনায় অনেক কঠিন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছিলো।

এই সময় দুদু ভাই প্রেমে পড়লেন আমার ৪র্থ বোন ফাতেমার সাথে। গ্রামে ওই সময় প্রেম করা একটা যেমন জঘন্য ব্যাপার বলে মনে করা হতো, তেমনি যারা প্রেম করছেন, তারাও অনেক অসুবিধায় থাকতেন। মনের তীব্র ইচ্ছা দেখা করার কিন্তু না আছে সুযোগ না আছে কোনো অনুমতি। ফলে চিরকুট, চিঠি ইত্যাদি দিয়ে যতোটুকু রোমাঞ্চ করা যায় সেটাই ছিল একমাত্র ভরষা। আমার ৩য় বোন লায়লার বিয়ে হয়ে গেছে, ১ম বোন সাফিয়ার বিয়ে ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। তার প্রথম স্বামী গত হয়েছেন। আমার মা, ফাতেমা আর দুদু মিয়ার প্রেমের এই গল্পটা ভাইয়ার কাছে একেবারেই গোপন করে রাখলেন। মায়েরও অনেক চিন্তা ছিলো তার মেয়েরদের জন্য ভালো পাত্রের ব্যাপারে।

দুদু ভাই তখন ফুটন্ত যুবক। দেখতে খুবই সুদর্শন আর স্মার্ট। বেকার ছেলে কিন্তু তার বাবার একটা মনোহরী দোকান ছিলো। তিনি হাপানীতে ভোগেন প্রায়ই। ফলে সবসময় বাজারের দিনে তিনি ঠিকমতো বাজারে গিয়ে পসরা বসাতে পারেন না। এই সুযোগে দুদু ভাই তার বাবার ব্যবসাটা দেখভাল করেন।

সময়টা ছিলো বর্ষাকাল। আমাদের গ্রামে বর্ষাকালে হাটে বাজারে যাওয়ার জন্য প্রতিটি গ্রাম থেকে নৌকা বা কোষা লাগতোই কারন বর্ষাকালে গ্রামের একদম কিনার পর্যন্ত পানিতে ভরপুর থাকতো। আমাদের নিজস্ব কোনো নৌকা বা কোষা নাই। ফলে যখনই কোনো নৌকা বা কোষা আমাদের বাড়ির পাশ দিয়া বাজারে যেতো, আমি ওইসব নৌকা বা কোষায় অনুরোধের ভিত্তিতে উঠে যেতাম। দুদু ভাইদের যেহেতু দোকানের অনেক মাল নিয়ে হাটে, বাজারে যেতে হয় পসরা সাজানোর জন্য, ফলে তাদের একটা নিজস্ব নৌকা ছিলো। ঘোষকান্দা থেকে বিবির বাজারে যেতে হলে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতে হয়। ফলে দুদু ভাইদের নৌকা করেই আমি বেশীর ভাগ সময় হাটের দিন আমি হাটে যেতাম। আর দুদু ভাই যেহেতু ফাতেমার সাথে একটু ভাব আছে, তিনিও চাইতেন যেনো কোনো ছলেবলে তার নৌকা আমাদের ঘাটে ভিরুক। তাতে হয়তো কখনো কখনো ফাতেমার সাথে দুদু মিয়ার ক্ষনিকের জন্য হলেও চোখাচোখি হয়। এটাই প্রেম। এভাবে অনেকদিন চলে যায়।

মা একদিন হাবিব ভাইকে ব্যাপারটা খুলে বলেন। আমি ঠিক জানিনা কেনো বা কি কারনে হাবীব ভাই দুদু ভাইদের পরিবারটাকে পছন্দ করতেন না, সে রহস্য আজো আমার কাছে অজানা। হাবীব ভাই ফাতেমার সাথে দুদু মিয়ার বিয়েতে কিছুতেই রাজী ছিলেন না। কিন্তু মায়ের জোরাজোরিতে এবং ফাতেমার প্রবল ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত হাবীব ভাই এই বিয়েতে রাজী হলেন। আমার ধারনা, হাবীব ভাই আরেকটা কারনে তিনি রাজী হয়েছিলেন, আর সেটা হচ্ছে, যেহেতু হাবিব ভাই নিজেও ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে চান, এবং তার আগে সব বোনদের বিয়ের ব্যাপারটা নিসচিত করতে চান, ফলে যেমনই হোক, ফাতেমার একটা গতি হচ্ছে এটা ভেবেও দুদু মিয়ার সাথে বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশী বাড়াবাড়ি করেন নাই। কিন্তু তিনি যে নিমরাজী এটা ভালভাবেই হাবিব ভাই প্রকাশ করতে পেরেছিলেন।

অন্যদিকে দুদু মিয়ার খুব একটা মনোযোগ ছিলো না কোনো কাজেই। না বাবার ব্যবসা, না অন্য কিছুতে। ফলে দুদু মিয়ার বাবাও এই মুহুর্তে সে বিয়ে করুক এটাও রাজী ছিলেন না। আরো একটা কারন ছিলো দুদু মিয়ার বাবার এই বিয়েতে রাজী না হবার। আর সেটা হচ্ছে যে, আমাদেরর গ্রামে সব সময়ই ছেলেরা যখন বিয়ে করে, তখন তারা নির্লজ্জের মতো কনে পক্ষ থেকে মোটা দাগে একটা যৌতুক দাবী করে এবং পায়ও। দুদুর বাবাও এ রকমের একটা পন আদায়ের লক্ষে ছিলেন কিন্তু হাবিব ভাইয়ের এক কথা, কোনো যৌতুক দিয়ে আমরা বোনের বিয়ে দেবো না। ফলে দুদু ভাইয়ের বাবারও এই বিয়েতে মতামত ছিলো না। অথচ শেষ পর্যন্ত বিয়েতা হয়েছিলো। দুদু মিয়ার এক্ষেত্রে আমি একটা ধন্যবাদ দেই যে, সে তার বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েও অনড় ছিলো যে, যৌতুক বা পন বুঝি না, আমি ফাতেমাকেই বিয়ে করবো। গ্রামে এ ধরনের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্তের বড় অভাব। কিন্তু দুদুর মধ্যে এই সাহসটা ছিলো। ফলে ফাতেমার সাথে দুদুর বিয়ে হলো ঠিকই কিন্তু তার বাবা, বা মা, কিংবা অন্যান্য আত্তীয় সজনেরা এই বিয়েটায় তারা লস করেছে বলে ধরে নিয়েছে। আর এই লসের কারন ফাতেমা। এতে যা ঘটলো তা হচ্ছে, ফাতেমাকে শসুড়বাড়ির অনেক বিড়ম্বনার মুখুমুখি হতে হয়েছে। বিয়েটাকেই টিকিয়ে রাখা কষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো ফাতেমার। কিন্তু আমি আজ দুদু মিয়াকে অনেক ধন্যবাদ দেই যে, যদি দুদু মিয়া বলিষ্ঠ না হতো, তাহলে ফাতেমার পক্ষে ওই বাড়িতে টিকে থাকা সম্ভব হতো না। একটা সময় ছিলো যে, দুদু মিয়া শুধুমাত্র ফাতেমার কারনে তাকে তার পৈত্রিক বাড়ি থেকে উৎখাত হতে হয়েছিলো। আর তখন ফাতেমা আর দুদু মিয়া আমাদের গ্রামের বাড়িতেই থাকা শুরু করেছিলো। এই থাকা অবস্থায় ফাতেমার সব সন্তানদের জন্ম হয়।

দেশের ক্রমবর্তমান খারাপের কারনে দেশে কোনো কাজ নাই। এদিকে দুদুর বাবার ব্যবসাটাও আর তার হাতে নাই। আমাদের গ্রামে তখন দলে দলে লোকজন দেশের বাইরে যাবার হিরিক পড়েছে। কেউ সৌদি, কেউ কুয়েত, কেউ লিবিয়া, কেউ ইতালি আবার কেউ কেউ যেখানে পারে সেখানে। দুদু ভাইও সে লাইনে পড়ে গেলো। বেশ টাকার প্রয়োজন, অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। দুদু ভাই নিজের বাবাকে পটিয়ে, কিছু আমাদের থেকে আবার কিছু লোন নিয়ে শেষ অবধি সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলেন। পিছনে রেখে গেলো ফাতেমাকে, তার ছেলে ফরিদকে, মেয়ে সালেহা, খালেদা আর ছেলে কামাল এবং জামালকে।

কিন্তু যে লোক আরাম প্রিয়, ভারী কাজে অভ্যস্থ নয়, তার পক্ষে ওই সৌদি আরবের গরম বালুর জমিনে, গরু মহিষ চড়ানো কিছুতেই ভাল লাগার কথা নয়। তারমধ্যে এম্নিতেই সৌদি লোকজন ৩য় দেশের বিশেষ করে বাংলাদেশের শ্রমিকদেরকে মিসকিন হিসাবে ট্রিট করে। দুদু মিয়া স্বাধীনচেতা মানুষ, আরামপ্রিয় মানুষ, তার কত টাকা ক্ষতি হলো বা ক্ষতি হচ্ছে এসবের কোন বালাই ছিলো না। তিন মাস না যেতে যেতেই দুদু মিয়া পুনরায় বাংলাদেশে চলে এলেন। এই ঘটনায় দুদু মিয়ার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেলো। যেটুকু ভরশা তার বাবা তার উপর করেছিল এবং কিছু লাভের আশায় যে কয়টা টাকা দিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছিলো, পুরুটাই গচ্চা যাওয়ায় দুদু মিয়ার বাবা এবার তাকে মুটামুটি ত্যাজ্য করার মতো অবস্থায় চলে গেলো। দুদু মিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হলো, আর দুদু মিয়া কোথাও কোনো জায়গা না পাওয়ায় আমাদের গ্রামের বাড়িতেই স্থায়িভাবে উঠে গেলো।

আমাদের বাড়িটা বড়ই ছিলো। আর যেহেতু মা থাকেন, ফলে আমরা আপাতত মাকে দেখভাল করার জন্য যে একজন লোকের দরকার ছিলো সেটা অন্তত পেলাম। ফাতেমাই মার দেখভাল করেন। মার খাওয়া দাওয়ার খরচ আমরাই দেই কিন্তু ফাতেমা আমাদের বাড়িতে থাকায় মার কখন কি লাগবে, সেটায় ফাতেমাই টেককেয়ার করে। কিন্তু সংসার চালানোর জন্য তো ফাতেমার একটা স্থায়ী সোর্স থাকা দরকার। কখনো আমরা কিছু সাহাজ্য করি, কখনোও দুদু মিয়াও কোথা থেকে কিভাবে টাকা আনে আমরা জানিও না। শুনলাম, দুদু মিয়া একটা আদম ব্যবসা খুলেছে। মানে লোকজনকে বিদেশ পাঠানো। তার সাথে আমাদের গ্রামের একজন লোক পার্টনার হিসাবে আছে। প্রথম প্রথম মনে হলো ব্যবসাটা ভালোই চলছে। কিছু কিছু লোকজনকে তো দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে। আবার নতুন লোকের লাইন হচ্ছে, টাকা আসছে। কিন্তু সুখ তার বেশীদিন টিকে নাই। আদম ব্যবসা যারা করেছে, সব সময় এটায় কোনো না কোনো দুই নম্বরী কিছু ছিলোই। কেউ হয়তো সাফল্য পেয়ে তাদের মাধ্যমে বিদেশ চলে যেতে পারছে আবার কেউ মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও বিদেশ যেতে পারছিলো না অথচ টাকা পরিশোধ করা আছে। এ রকম করতে করতে প্রায় অনেক বছর কেটে গিয়েছিলো। পাওনাদাররা এসে ঝামেলা করে, থ্রেট দেয়, ফাতেমাকে পর্যন্ত শাসিয়ে যায়, মামলা করে, আবার কেমন করে যেনো এসব ঝামেলা থেকে দুদু মিয়া পারও পেয়ে যায়।

আমি তখন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। এ রকমের বহু কেস আমার কাছেও এসেছে। কিন্তু সমাধা করতে গিয়ে দেখেছি, দোষটা এই আদম ব্যবসা কোম্পানীর, সাথে দুদু ভাইদের। আমার পক্ষে আনইথিক্যাল করা কিছু সম্ভব হয় নাই বটে কিন্তু আমি সেনাবাহিনীতে আছি এই নাম ভাংগিয়ে দুদু ভাই এবং তার পার্টনার অনেক ফায়দা তো অবশ্যই নিয়েছেন। আমি কখনো এসব নিয়ে না মাথা ঘামিয়েছি না কেউ এলে আমি তার পক্ষে বিপক্ষে কোনো একসানে গিয়েছি।

দুদু ভাইয়ের সন্তানেরা ততোদিনে বড় হয়ে গেছে। বড় ছেলে ফরিদ খুব হিসেবি। নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করছে কিন্তু খুটিতে জোর না থাকলে সব সন্তানের ভাগ্য অতোটা বেড়ে উঠে না যতোটা তার প্রাপ্য। কিন্তু আমি ফরিদের উপর অনেক সহানুভুতিশীল ছিলাম। আমারো ওই রকম ইনকাম নাই যে, যা লাগে সাপোর্ট করতে পারি। ফরিদের গল্পটা পড়ে লিখবো।

দুদু ভাই যতোটা কামাই করে নিজের পরিবারকে সাহাজ্য করতে চান, দেখা গেলো, তার থেকে বেশী ঝামেলায় পড়ে আরো বেশী ক্ষতিপুরন দিতে হচ্ছে। হাত খোলা লোক। যখন টাকা আসে, মনে হয় কতোক্ষনে টাকাটা খরচ করবে। কিন্তু যখন থাকে না, তখন গোল্ডলিফ বা বেনসন সিগারেটের পরিবর্তে স্টার সিগারেটও তিনি খেতে পারেন। লোকটার কথায় আশ্বাস পাওয়া যায় কিন্তু সেই আশ্বাস কতোটা নির্ভরযোগ্য, সেটা অনেকবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে দেখা গেছে। ফলে, একটা সময়ে, তার সন্তানেরা, তার স্ত্রী ফাতেমা সাফ বলে দিয়েছিলো যে, তার কোনো রোজগারের দরকার নাই, শুধু ঝামেলার কোনো কাজে না গেলেই হলো। এভাবেই দুদু ভাই সংসার দেখে, ফরিদ বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়, আরো এক ছেলে কামালও কুয়েতে থাকে, সেও পাঠায়। তারা ভালোই ছিলো। হজ্জ করেছে, গ্রামে তার একটা পজিশন তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলো শেষ বয়সে হলেও।

আসলে, মানুষ যখন একা একা অনেক বড় প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে নিজেকে বাচাতে হয়, তখন অনেক সময় কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়, কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত না, এই বিচারে আর যাই চলুক জীবন চলে না। কেউ নিজের থেকে খারাপ কিংবা বদনাম কুড়াতে চায় না। বেশীরভাগ মানুষ পরিস্থিতির শিকার। দুদু ভাই খারাপ লোক ছিলেন না। তার অন্তর বড় ছিলো, তার প্রতিভা ছিল। কিন্তু গরীবের ঘরে সবসময় প্রতিভা আলোকিত হয় না। এটা সেই ফুটন্ত ফুলের মতো, পরাগায়ন না হবার কারনে অকালেই ফল হয়ে না উঠে ঝরে যাওয়ার কাহিনী। এটা কার দোষ? দুদু ভাইয়ের নাকি তার পরিবারের নাকি আমাদের এই ভারসাম্যহীন সমাজের?

অনেক লম্বা একটা সময় দুদু ভাই ছিলো আমাদের সাথে। অনেক রাগ করেছি, বকা দিয়েছি, মাঝে মাঝে আবার ভালোবাসায় আগলেও রেখেছি। আজ প্রায় ৭০ বছর বয়সে এসে দুদু ভাই সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। উনার লাশটা যখন আমার ফ্যাক্টরীর সামনে এসে থামলো, একটা লাশবাহী গাড়িতে কাপড়ে মোড়ানো ছিল দুদু ভাই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রামে নিয়ে যাবার সময় আমি তার ছেলে জামাল এবং ভাতিজা আরশাদকে বলেছিলাম যেনো ফ্যাক্টরীর সামনে থামায়। কিছু খরচাপাতি ব্যাপার আছে, যাওয়ার সময় ওদের হাতে তুলে দেবো। কারন এই মুহুর্তে এটা খুব দরকার।

দুদু ভাই অনেকবার আমার এই ফ্যাক্টরিতে এসেছিলেন। খাওয়া দাওয়া করেছে আমার সাথে, হেটে হেটে ঘুরে ঘুরে দেখেছে আমার ফ্যাক্টরি। গত মার্চ মাসেও একবার আমার এই ফ্যাক্টরীতে এসেছিলো খালেদাকে নিয়ে, মিজান (খালেদার জামাই) ছিলো, মিজানের আব্বা, মিজানের চাচা এবং জেঠারা ছিলো। খালেদা ছিলো, জামাল ছিল। একসাথে খেয়েছি। অথচ আজ, দুদু ভাইয়ের কোনো ক্ষমতা নাই লাশবাহী গাড়ি থেকে নেমে আমার সাথে একবার দেখা করেন, তার কোনো শক্তি নাই আরো একবার আমার ফ্যাক্টরীর নতুন মেশিনগুলি হেটে হেটে ঘুরে ঘুরে দেখার। তার এই দুনিয়ার সাথে সমস্ত নেটওয়ার্ক ছিন্ন করা হয়েছে। এই পৃথিবীতে তারজন্য আর কোনো অক্সিজেন বরাদ্ধ নাই, তার পায়ের শক্তি রহিত করা হয়েছে, তিনি আর এই বাজ্যিক পৃথিবীর কেউ নন। উনাকে আমরাও আর আটকিয়ে রাখার কোনো ক্ষমতা নাই, রাখাও যাবে না। লাশবাহী গাড়িটার সামনে গিয়ে দাড়ালাম, দুদু ভাই সাদা একটা কাপড়ের ভিতর একটা জড়ো পদার্থের মতো শুয়ে আছেন গাড়ির সিটের নীচে। যে লোকের জীবন্ত অবস্থায় সিট বরাদ্ধ ছিলো, আজ তার স্থান গাড়ির সিটের নীচে। এটাই জীবন। লাশবাহী গাড়ি চলে গেলো গ্রামের পথে।

তার বড় ছেলে ফরিদের সাথে কথা হল। ফরিদ জাপানে থাকে। বর্তমানে করোনার মহামারী চলছে সারা দুনিয়াব্যাপি। জাপানের সাথে এই মুহুর্তে আমাদের দেশের বিমান চলাচল সাময়ীকভাবে বন্ধ আছে। কিন্তু যদি কেহ আসতে চায়, তাহলে ইন্ডিয়া হয়ে হয়তো আসা যাবে। ফরিদ তার বাবাকে দেখতে ঢাকায় আসতে চাচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হল, এটা ঠিক হবে না। কারন কোনো কারনে যদি ফরিদ ঢাকায় চলে আসতেও পারে, বলা যায় না, করোনার মহামারীর কারনে বাংলাদেশ সরকার বিদেশ ফেরত যাত্রী হিসাবে ফরিদকে ১৫ দিনের কোয়ারেন্টাইন করে ফেললে ফরিদের পক্ষে আরো ১৫ দিন গ্রামেই আসা হবে না। আর যদি লাশকে এখন আবার ঢাকায় কোনো হাসপাতালে মর্গে রাখতেও যায়, দেখা যাবে কোনো হাসপাতাল সেটা নাও রাখতে পারে। আবার যদি লাশ রাখাও যায়, ফরিদকে কোনোভাবে এয়ারপর্ট থেকে কোয়ারেন্টাইন ছারাও গ্রামে আনা যায়, তাহলে ফরিদের জাপানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারেও একটা করাকড়ি থাকতে পারে। আবার এই মুহুর্তে আগামী ৩ দিনের মধ্যে কোনো ফ্লাইটও নাই। সব মিলিয়ে আমি ফরিদকে ঢাকায় আসতে বারন করে দিলাম। ফরিদের না আসার সিদ্ধান্তটা যখন কনফার্ম করা হলো, আমি গ্রামের উদ্ধেশ্যে রওয়ানা হলাম দুদু ভাইকে কবর দেওয়ার জন্য। আমি যখন গ্রামে পৌঁছলাম, তখন রাত প্রায় পৌনে আটটা। গ্রামে ফাতেমাকে দেখলাম, ওর অন্যান্য সন্তানদের সাথে কথা বললাম। সবার মন খারাপ, কান্নাকাটি করছে। দুদু ভাইয়ের লাশ ঘিরে অনেক মানুষ উঠানে খাটিয়ার পাশে জড়ো হয়ে বসে আছে।

জন্ম আর মৃত্যুর মধ্যে একটা ভীষন মিল আছে। জন্মের সময়ে নতুন অতিথির চারিদিকে যেমন বাড়ির সবাই বসে হাসিমুখে বরন করে নেয়। এই নতুন অতিথির আগমনে যেমন সবাই বাড়িভর্তি মানুষের ভীড় লেগে যায়, ঠিক তেমনি মৃত্যুর সময়েও বাড়িভর্তি মানুষের ভীড় জমে যায়। কিন্তু এ সময়ে সবাই থাকে ভারাক্রান্ত আর শোক বিহব্বল।

আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন, রাত বেড়ে যাচ্ছে, কবর এখনো খোড়া শেষ হয় নাই। রাতে এশার নামাজের পর জানাজা হবে। এশার নামাজ হবে রাত নয়টায়। ফরিদের শ্বশুর মোল্লা কাকা বাকী সব সামলাচ্ছেন। গোসল, কাফন আর যাবতীয় সব। মাঝে মাঝেই কেউ কেউ উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করছে। কেউ কাদতেছে কাদতে হবে বলে। ফলে উচ্চস্বরেই সে তার সেই বিলাপ লোক সম্মুখে জাহির করার অভিনয়ে এটাই বুঝাতে চাইছে, দুদু মিয়ার শোকে সে এতোটাই বিহব্বল যে, তার বুক ফাটছে, তার অন্তর কাদছে ইত্যাদি। কিন্তু আমার চোখে এই মিথ্যা কান্নাটা ধরা পড়েছে। কিন্তু তারপরেও কাদুক। আবার কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলছে, তার এই কান্না অন্তরের ভিতর থেকে। নিঃশব্দ কান্নার কষ্ট হাহাকার করে কান্নার থেকেও অধিক কষ্টের।

ফাতেমা কাদছে নিঃশব্দে, আমাকে দেখে একটু উচ্চস্বরে কান্নার উপক্রম হয়েছিলো, বুঝলাম আবেগ। হবেই তো। নিজের লাইফ পার্টনার চলে গেছে। খারাপ হোক ভালো হোক, একজন লোকতো ছিল যার সাথে অভিমান করা যায়, যার কাছে অভিযোগ করা যায়। আজ সে চলে গেছে। প্রায় ৪৪ বছরের পার্টনারশীপ লাইফে কত কথাই না লুকিয়ে আছে ফাতেমার জীবনে। এই সংসার গুছাইতে কতই না সময় ব্যয় করেছে ওরা।

বললাম ফাতেমাকে- আজ তুমি একা কিন্তু একা নও। আমরা তো আজীবনই ছিলাম, এখনো আছি। নিজের উপর যত্ন নিও, আর কখনো ভেবো না যে, তুমি একা হয়ে গেছো। ভাই আর বোনের সাথে তো নাড়ির সম্পর্ক। তুমি ভাল থাকবা, মনের জোর রাখো আর দোয়া করো এইমাত্র চলে যাওয়া মানুষটার জন্য যার সাথে তুমি নির্দিধায় অন্ধকারেও হাতে হাত ধরে রাস্তা পার হতে পেরেছিলা। আজ তোমার দোয়া তার জন্যে সবচেয়ে বেশী দরকার। মনটা আমারো খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো ফাতেমার চোখের জল দেখে। আজ অনেকদিন পর সেই কথাটা মনে পড়লো-

যদি কখনো তোমার কাদতে ইচ্ছে করে, আমাকে ডেকো,

আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমাকে হাসাতে চেষ্টাও করবো না।

কিন্তু আমি তোমার সাথে কাদতে পারবো।

যদি কখনো তোমার কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, আমাকে ডেকো

আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমাকে একটুও বাধা দেবো না

কিন্তু আমি তো তোমার সাথে হারিয়ে যেতে পারবো।

যদি কখনো তোমার কারো কথাই শুনতে ইচ্ছে না করে, আমাকে ডেকো

আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমার সাথে কোনো কথা বল্বো না, নিসচুপ থাকবো।

কিন্তু কখনো যদি তুমি আমাকে ডেকেছো কিন্তু আমার কাছ থেকে কোন সাড়া পাও নাই,

তুমি এসো                            

হয়তো সেদিন সত্যিই তোমাকে আমার প্রয়োজন।

ফিরে এলাম। জানাজায় শরীক হতে পারি নাই। অনেক রাত হয়ে যাবে। আর সারাটা বাড়িতে এতো বড় করোনার মহামারী সত্তেও কারো মুখে মাস্ক নাই। খুব অসস্থি বোধ করছিলাম।

গাড়িতে উঠে বারবার দুদু ভাইয়ের কথাই মনে পড়ছিল। আজ থেকে আমি ইচ্ছে করলেও তার মোবাইল নাম্বারে ফোন করে কথা বলতে পারবো না। ইচ্ছে করলেও কোনো কারনে বকাও দিতে পারবো না। তিনি আজ সব কিছুর উর্ধে।  

আমরা তার কাছেই ফিরে যাবো যার কাছ থেকে এসেছিলাম। আজ থেকে ৫০ বছর কিংবা ১০০ বছর পর হয়তো কেউ জানবেও না, দুদু নামে কোনো একজন আজ তিরোধান হলো। এই তিরোধানের প্রাকটিস যুগে যুগে সব সময় হয়ে এসেছে, হবেও। আমরা সময়ের স্রোতে একে একে হারিয়ে যাবো। কারন আজ থেকে শত বর্ষ আগেও এখানে এমন দুদু, এমন আখতার, এমন ফাতেমারা এসেছিলো। আজ তারা কেহই নাই। তাদের কোনো ইতিসাহও কোথাও লিখা নাই। আর যেখানে লিখা আছে, তা ঈশ্বরের কাছে। সেখানে আমাদের কোনো পদচারনা নাই।

আল্লাহ আপনার জন্য জান্নাত বরাদ্ধ করুন।

১৪/০৪/২০২০- চৌরাস্তার বিড়ম্বনা 

Categories

দিন হোক আর রাত হোক, প্রাকৃতিক দূর্যোগ থাকুক আর নাইবা থাকুক, কোনো এক "লক্ষ্য"কে সফল করার জন্য যখন কেউ যাত্রা করে, আর যাত্রার পথে যখন সে কোন এক চৌরাস্তার মধ্যে এসে দাড়ায়, তখন লক্ষ্যের দিকে যেতে সে কোন রাস্তা বেছে নিবে সেটা নির্ভর করে রাস্তাটা সে চিনে কিনা বা তার ধারনা আছে কিনা। যদি জানা থাকে, তাহলে মুল লক্ষ্যে যেতে কোন অসুবিধা নাই, কিন্তু যদি সঠিক নিশানা জানা না থাকে, তাহলে তার ভুল রাস্তা বেছে নেবার কারনে তার মুল লক্ষ্য তো দূরের কথা ভুল রাস্তায় গিয়ে আরো কতই না বিড়ম্বনায় পরতে হয়, সেটা সে ঐ চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে কল্পনাও করতে পারে না। যে যাত্রার উদ্দেশ্য ছিলো মুল লক্ষ্যে পৌঁছানো, তখন আর তার সেই মুল জায়গায় পৌঁছানো হয়ত হয়ে উঠেই না, বরং এর পর থেকেই শুরু হয় প্রতিটি পদক্ষেপ ভুলে ভরা বিড়ম্বনা।  আর সেখানে পৌছতেই যদি না পারা যায়, তাহলে সেই সব যাত্রার কোন মুল্য নাই। তাই চৌরাস্তায় এসে কোনটা নিজের মুল গন্তব্যের রাস্তা তা জানা খুবই প্রয়োজন। নিজের এই চৌরাস্তার সঠিক দিক না জানার কারনে চলার পথে অনেকের কাছেই হয়তো আপনি সঠিক নিশানার দিক জানতে চাইতেই পারেন, কিন্তু সবাই যে আপনাকে সঠিক নিশানা দিতে পারবেন এটাও সঠিক না। হতে পারে কিছু আনাড়ি অপরিপক্ক আর অনভিজ্ঞ জ্ঞানহীন মানুষ সর্বজান্তার মতো মনে মনে আন্দাজ করে আর বুদ্ধিদীপ্ত কালো মুখোশ নিয়ে জ্ঞান গম্ভীর বিবেচনায় আপনাকে একটা ভুল রাস্তার দিকে প্রবেশ করিয়ে দিল। তার তো কোনো ক্ষতি হলো না, কিন্তু তাকে আপনি বিশ্বাস করে আপনি যে ক্ষতির মুখে পতিত হলেন, সেটার মাশুল অনেক বড়। আপনি না জানার কারনে ইচ্ছেমতো আন্দাজ করে যদি ভুল রাস্তায়ও যেতেন আর যতোটা ক্ষতিগ্রস্থ হতেন, এসব বিবেকহীন মানুষের কারনে আপনি একই রকম ক্ষতিগ্রস্থ হবেন সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। তাই, কোন পথটা সঠিক আর কোন পথটা সঠিক নয়, এটা জানা অতীব জরুরী মুল লক্ষে পৌঁছানোর জন্য। এখানে আরো একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, আপনার গন্তব্যস্থানের দিক সঠিকভাবে দেখিয়ে দেয়ার জন্য যে সবসময় বয়স্ক আর বুদ্ধিজিবী মানুষেরই দরকার তা কিন্তু নয়, হতে পারে একটা আনাড়ি বাচ্চাও আপনাকে সঠিক দিকটা দেখিয়ে দিতে পারে যা কোনো বয়স্ক ব্যক্তি যার ঐ রাস্তা গুলির সঠিক গন্তব্য দিক সম্পর্কে কোনো ধারানা নাই। তাই কোনো ক্রান্তিলগ্নে দিক নির্দেশনার জন্য এক তরফা বিবেচনা না নিয়ে বিভিন্ন শ্রেনীর মতামত নিন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন আপনি নিজে। যেহেতু আপনি চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, এবং আপনি জানেন না কোনটা আপনার রাস্তা, সেহেতু কারো উপর না কারো উপর আপনাকে নির্ভর করতেই হবে। তাই ভালো উপদেষ্টার সংগী হোন। বিপদে টাকার সাহাজ্যের চেয়ে একজন বুদ্ধিদাতার ভুমিকা অনেক বেশী গুরুত্ত পূর্ন।  

কথাগুলি কেনো বললাম, সেটা এবার বলি। করোনা ভাইরাসের কারনে সারা বিশ্ব এবার এক সাথে যুদ্ধ করছে। এই যুদ্ধটা এমন যেখানে মানবিকতা দেখাতে চাইলেও অনেকের পক্ষে তা দেখানো সম্ভব না। প্রতিটা ব্যক্তি পর্যায় থেকে আরম্ভ করে রাজ্য পর্যন্ত সবাই যার যার তার তার, এই চিন্তায় মশগুল। শুধুমাত্র সুস্থভাবে বেচে থাকাই যেনো একটা বাহাদুরি। খেয়ে দেয়ে সুস্থ হয়ে বেচে থাকলেই কেবল আপনি আগামীকালের সকালটা উপভোগ করতে পারবেন। তাই এ মুহুর্তে ব্যক্তি পর্যায়ের একক সিদ্ধান্তের চেয়ে রাজ্য পর্যায়ে সামিগ্রিক বুদ্ধিদীপ্ত সঠিক সিদ্ধান্ত অনেক বেশী কার্যকর উত্তোরনের জন্য।

আমরা এখন চৌরাস্তার বিড়ম্বনায় দাঁড়িয়ে। কোন রাস্তায় হাটলে আমি এবং আমার রাজ্য সঠিক গন্তব্যে গিয়ে পৌছতে পারবো এটা এখন সবচেয়ে বেশী দরকার। কেনো জানি মনে হচ্ছে- ঠিক রাস্তায় হাটছি না। একটা ভুল রাস্তায় প্রবেশ করে ফেলছি।

৮/৯/২০১৯-সারপ্রাইজটা অনেক বেশী

সারপ্রাইজটা অনেক বেশী হয়ে গেলো।কি সেই সারপ্রাইজ, আর  কিভাবে হলো সেটাই বলছি।

সকাল বেলায় নাস্তা করার সময় মেয়ে আর বউ দুজনেই বল্লো, হ্যাপি বার্থ ডে।

মনে পড়লো, ও আজ আমার বার্থডে।

আমি কখনো আমার নিজের বার্থ ডে ঘটা করে পালন করি নাই। আর করার মতো পরিবেশও আসলে ছিলো না। এই মেয়েরা শখ করে, ফলে কখনো কখনো মেয়েদের চাপে পড়েই ইদানিং জন্ম দিনটা পালন হয়। কখনো ঘরোয়া ভাবে, কখনো একেবারেই নিজেরা, আবার কখনো কখনো সবাই মিলে। ফলে আমার জন্মদিন নিয়া আমি খুব একটা উচ্ছসিত থাকি না। সম্রাট আকবরের কিংবা নেপোলিয়ানের জন্ম তারিখ পরীক্ষার খাতায় ভুল করলে সেটা শুধু নম্বরের উপর দিয়েই যাবে, ঘরে শান্তি নষ্ট হবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু আমি ভুলেও আমার মেয়েদের বা বউ এর জন্মদিন ভুলি না। বুদ্ধিমান স্বামীরা এইটা ভুল করার কথা না। করলেই অনেক কথা শুনার একটা রাস্তা তৈরী হয়ে যায়, অশান্তি আসার সম্ভাবনা থাকে। ওনাদের জন্মদিন পালন না করুন, অন্তত সকালে উঠে সবার আগে বলা চাই, বউ হলে হ্যাপি বার্থ ডে জানু,, আর মেয়েদের বেলায় "হ্যাপি বার্থ ডে মা" ইত্যাদি।

যাক, যা বলছিলাম।

ঘুম থেকে উঠেই আমি সাধারনত মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি রাতে কেউ ফোন দিলো কিনা, বা কেউ ফোনে না পেয়ে ম্যাসেজ দিলো কিনা। এটাও তাঁর কোনো ব্যত্যয় হলো না। আমার রোজকার অভ্যাস। আজকে মোবাইল হাতে নিতেই দেখি অনেকগুলি ম্যাসেজ। কিছু রোটারীর বড় বড় হোমড়া চোমড়াদের অত্যান্ত চমৎকার মেসেজ। কিছু আছে ব্যাংকের তরফ থেকে। আবার কিছু আছে সার্ভিস সেন্টার গুলি থেকে। প্রায় সব গুলিই কমার্শিয়াল। খুব একটা পুলকিত হবার মতো না এইসব মেসেজে। তারপরেও খারাপ লাগে না। গালি তো আর দেয় নাই। শুভেচ্ছা দিছে।

দেখলাম, প্রথম মেসেজটাই আমার বড় মেয়ের। রাত ১২০১ মিনিটে পাঠিয়েছে। আমাকে জন্মদিনের উইশ করে চমৎকার একটা ম্যাসেজ। "Happy Birth day, my Super Hero, Dad. You are the best example of a father and all the moments I have lived with you is unforgottenable. With each passing year, I wish your happiness become double. I wonder if you know how much I love you. I  may not tell you enough but I do love you from my heart to infinity and beyond. Happy birthday Abbu. এতো চমৎকার করে বলা, সেটা যেনো হৃদয় ছুয়ে যায়। মুচকি হেসে দিলাম। সকালতাই যেনো কেমন মিষ্টি মনে হলো।

এতো বছর পরে এসে এখন আমার যদিও আর সেই ছোট বেলার মতো জন্মদিন, কিংবা এই জাতীয় কোনো কিছু আর উচ্ছাসিত করে না। তারপরেও মেয়েদের এই রকম অন্তরস্পর্শী মেসেজ মনকে বড় উতালা করে তোলে। পরিবার তখন মনে হয় আমার সবচেয়ে আনন্দের একটি জায়গা। তখন দিনটাকে আর নিছক অন্যান্য দিনের মতো মনে হয় না। যদিও অনেক সময় মনে হয়, ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েরা এগুলা নিয়ে বেশ মজা পায়, সেলিব্রেট করে, একটা ফানডে করে, কিন্তু এটা সব সময় সত্য যে, আমাদের সারা বছরের ব্যস্ত দিন গুলির ফাক ফোকর দিয়ে এইসব ছোট খাট বিষয় নিয়ে পরিবারে একটা গেট টুগেদার তো হয়। একদিক দিয়ে খারাপ না। অনেকেই আবার ধর্মের দোহাই দিয়ে এইসব করা নাজায়েজ বলে কথাও বলেন। আমি ধর্মের বিষয়টা এখানে কোনোভাবেই আলোকপাত করতে চাই না। এতা যার যার ব্যাপার।

যাক যেটা বলছিলাম, আমার জন্মবার্ষিকির কথা।

বউ এর হ্যাপি বার্থ ডে বলার উপলক্ষে বউকে বললাম, আরে, এখন কি আর সেই চমক আছে যে, জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি করার? তাঁর মধ্যে বড় মেয়ে বগুড়ায়, ছোট মেয়ের সামনে পরীক্ষা। তোমার আবার কলেজ থাকে। সব মিলিয়ে সবাই তো ব্যস্তই থাকি। কি দরকার খামাখা আবার একটা ঝামেলা করার।

তারপরেও বউ বল্লো, আরে, চলে এসো একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে। রাতে বাইরে আমরা আমরাই কোথাও ঘুরতে যাবো, খেয়ে রাতে বাসায় ফিরবো। সময়টা হয়তো ভালই যাবে। একটা ব্যতিক্রম দিন যাবে। ভাবলাম, ঠিক আছে, এই উপলক্ষে না হয় একটু যাওয়া যেতেই পারে।

অফিসে এলাম, সকাল তখন প্রায় দশটা। আমি এসে স্টাফদের বললাম, কার কি কাজ আছে আমার সাথে, একটু গুছিয়ে নিয়ে আসো, আমি হয়ত আর্লি লাঞ্চ করে বের হয়ে যাবো। সবাই মুটামুটি দ্রুত গতিতেই আমার সাথে জড়িত যার যার কাজ গুছিয়ে নিয়ে এলো। প্রায় ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সেরে ফেল্লো সব কাজ। আমি নামাজ পড়ে, আর্লি লাঞ্চ করতে বসে গেলাম। এরই মধ্যে আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার (আসলে ব্যবসায়ীক পার্টনার বললে ভুল হবে, আমরা আসলে দুজনেই দুজনকে ফ্যামিলি হিসাবেই দেখি) মূর্তজা ভাই ফোন দিলেন। ব্যবসায়ীক কাজেই ফোন দিলেন। কথা শেষে আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনি আজকে অফিসে আসবে কিনা। জানলাম, আসতে উনার দেরী হচ্ছে, একটা অফিশিয়াল কাজেই আটকা পড়েছেন। ফলে, আমি যে আর্লি বের হয়ে যাচ্ছি সেটা ওনাকে জানাতে গিয়ে কোন ফাকে যে বলে ফেলেছি যে, আজ আমার জন্মদিনের উপলক্ষে বাসায় বউ পোলাপান আগে যেতে বলেছে। মুর্তজা ভাই, হাসলেন। আমিও হাসলাম। কিছু ফান ও করলাম এই জন্মদিনের অনেক কথা নিয়ে (সেগুলি এখানে বলছি না)।

যাক, আমি প্রায় দুটোর দিকে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। রাস্তার যে অবস্থা, ট্রাফিক জ্যাম ক্রস করে করে বাসায় পৌছাতে পৌছাতে প্রায় ৪টা বেজে গেলো। এতো আগে সাধারনত আমি অফিস থেকে কখনো বাসায় আসি না। ফলে সন্ধ্যা হতে এখনো অনেক বাকী। আর আমরা তো প্ল্যান করেছি সন্ধার পরে বাইরে যাবো। এই অল্প সময়টুকুন কি করা যায় আমাকে আর ভাবতে হলো না। ছাদে আমার বাগান আছে, আমি নিজেই এর দেখাশুনা করি। ফলে ছাদে যেতে চাইলাম। বউ বল্লো, আরে, আজকে আর ছাদে যাওয়া লাগবে না। একটু রেষ্ট নাও। সন্ধ্যায় ঘুরতে গেলে ফ্রেস লাগবে।

কথাটা মন্দ লাগলো না। শুয়ে শুয়ে ক্রাইম পেট্রোল দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম। মাগরিবের আজান পড়ছে, ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বিছানা থেকে উঠে মনে হলো, আজ বহুদিন পর দিনে ঘুমিয়েছি। আশেপাশে কিছু পাখীর কিচির মিচির হচ্ছিলো। শব্দটা ভালই লাগছে। এদিকে দরজাতা বউ ডেংগুর ভয়ে সন্ধ্যার আগেই বন্ধ অরে রেখেছে। ডেংগু বড় খারাপ জিনিষ। আমরা অনেকেই সচেতন নই বিধায় মশারা আমাদের থেকে একটু চালাক। সন্ধ্যা হলেই কাম্রাইয়া কিছু রক্ত খেয়ে নেয় আর ডেংগুর জীবানু উপহার দিয়ে তারপরের ইতিহাস নাইবা বললাম। ভালো ঘুম হয়েছে, তবে ঘুমের রেওয়াজটা এখনো আছে বলেই মনে হচ্ছে। ভালই লাগলো ঘুমটা। নামাজ পড়ে বউকে বললাম, কোথায় যাবা প্ল্যান করেছো?

খুবই স্বাভাবিক স্বরে বউ জানালো, এখনো তো ঠিক করা হয় নাই কোথায় যাবো। তবে, চলো, খুজে বের করা যাবে। বের হলেই দেখা যাবে কোথায় যাওয়া যায়। আমি তাকে একটু সাজগোছ করতে দেখলাম। তাঁর এই সাজগোছে কিন্তু আমার কাছে একটা জিনিষ বারবার খুব অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, বাইরে যাচ্ছি আমি, আমার ছোট মেয়ে আর আমার বউ। একেবারেই একটা ঘরোয়া ব্যাপার। কিন্তু তারা হটাত করে এতো সাজগোছ করছে কেনো?

বউকে জিজ্ঞেস করায় সে বল্লো, আরে তোমার জন্মদিনের একটা ছোটখাটো জিনিষ মনে করি নাকি আমরা? একটু ছবি টবি তুলবো, একটা রেষ্টুরেন্টে যাবো, সেজেগুজে যেতেই ভালো লাগছে। ওদিকে, আমার ছোট কন্যাকে কোথাও নিতে গেলে তাকে সাজবার জন্য কতবার যে তাগাদা দিতে হয়, তাঁর কোনো ইয়াত্তা নাই। কিন্তু আজ দেখলাম, বাহ, নিজেই ড্রেস পছন্দ করছে, সময় নিয়ে ড্রেস পড়ছে। ব্যাপারটা খুব নিঃশব্দে হচ্ছে। আমার কাছে একটু খটকা লাগছে বটে কিন্তু একেবারেই আবার অস্বাভাবিকও মনে হচ্ছে না। হতে পারে, আজ ওদের মন খুব ফুরফুরা।

যাই জিজ্ঞেস করি, তাতেই তারা হাসে। আমার রুমে গেলাম। আমার রুম মানে আমি যেখানে কম্পিউটার নিয়ে কাজ করি সে রুমে। একটু কফি খেলাম। ভাবতেছিলাম, ওরা কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছে? ওদের কি আমাকে কিছু সারপ্রাইজ দেওয়ার প্ল্যান করছে? ওরা কি কোনো গিফট বা এই জাতীয় কিছু আগে থেকেই কিনে রেখেছে যা রেষ্টুরেন্টে গেলে হয়ত বের করবে? ইত্যাদি। আমি হেটে হুটে ঘর ময় নীরবে একটু চেক ও করলাম, চোখে এই জাতীয় কোনো কিছু পড়ে কিনা। পেলাম না। ফলে ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়েই ফেলে দিলাম কারন কোনো ক্লু পাচ্ছিলাম না। মেয়ে মানুষেরা তো সময় অসময় সব সময়ই সাজ গোছ করতে পছন্দ করে। হয়ত এতা তারই একটা অংশ।  

তো, ওরা প্রায় রেডি হয়ে যাচ্ছে দেখে আমিও রেডি হবার জন্য আমাদের মেইন ঘরে গেলাম। ভাবলাম, আমরাই তো। একটা টি সার্ট অথবা গেঞ্জি পড়ি, সাথে সেন্ডেল সু পড়ি, আরাম লাগবে। হটাত করে আমার বউ বল্লো, আরে নাহ, শার্ট প্যান্ট পড়ো। আমরা যেহেতু সবাই একটু সাজ গোছ করছি, তুমি আবার গেঞ্জী, স্যান্ডেল সু পড়লে কেমন দেখায়। বললাম, আরে, এতে কি অসুবিধা। আর আমরা কোথায় যাচ্ছি আসলে খেতে?

বউ এর উত্তর, চলো যাই, একটা কোথাও গেলেই হবে। যাক, বউ যখন সেজেগুজে শাড়িটাড়ি পড়ছে, মেয়েও যখন তাঁর পছন্দের মতো করে সেজেছে, তাহলে আমি আবার গেঞ্জীগুঞ্জী পড়ে লাভ কি? আমিও না হয় শার্ট প্যান্টই পড়ি।

কিন্তু মনের ভিতরে একটা খটকা লেগেই থাকলো। আমার এক সময় মনে হলো, ওরা কি কোনো বড় সড় গিফট কিনেছে নাকি? কিংবা এমন কিছু যা আমি দেখছি না কিন্তু ওরা লুকাচ্ছে? আমি একটা টেকনিক খাটালাম।

আমি আমার মেয়ের রুমে গিয়ে বললাম, কিরে মা, আজকের জন্মদিনে আমার জন্য কোনো গিফট কিনলি না? মেয়ে হেসে দিয়ে বল্লো, না আব্বু, সময় পাই নাই। তাছাড়া আপু বগুড়া থেকে আসুক, তারপরে দুই বোনে গিয়ে তোমার জন্য গিফট কিনবো বলে আমরা ভেবেছি। তাই আর কেনা হয় নাই।  এই বলে ছোট মেয়েও একটু মুচকি হাসলো। আমার সন্দেহের খটকাটা দূর হচ্ছিলো না। কিছু তো একটা চলছিলো যা আমি আবিস্কার করতে পারছিলাম না। কি হতে পারে? কত কিছু ভাবলাম, কত ভাবে ভাবলাম, ব্যাপারটা আমার মাথায়ই আসছে না, কি হতে পারে?

সবাই বের হলাম। আমি একটু আগেই বের হলাম। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, তোর ম্যাডাম কিছু প্যাকেট দিছে নাকি? ড্রাইভার সহজ ভাবে বল্লো, না তো স্যার। কিছু দেওয়ার কথা নাকি? কই ম্যাডাম তো কিছু বল্লো না।

আমরা সবাই গাড়িতে বসে পড়লাম। গাড়ির ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো, স্যার কোথায় যাবো। আমি কিছু বলার আগেই আমার বউ বলে উঠলো, চলো, রেডিসনের আশেপাশে ভাল রেষ্টুরেন্ট আছে, ওখানেই চলো। আমি বললাম, আরে, বড় মেয়ে আসুক, তখন না  হয় ওকে নিয়েই একবারে যাওয়া যাইতো। বড় মেয়ে শুনলে ভাববে, দেখো, আমি ঢাকায় নাই, আব্বু আম্মু, আর কনিকা সবাই আব্বুর জন্মদিনে রেডিসনে পার্টি করছে। ওর হয়ত একটু মন খারাপ হতে পারে। কি দরকার। থাক না আজকে না হয় এই করিমুল্লা বা রহিমুল্লার কোনো নরম্যাল একটা রেষ্টুরেন্টে যাই, এম্নিতেই কিছু খাওয়া দাওয়া করে চলে আসি।

আমার বউ নাছোড়বান্দা। আমার বউকে আজকে মনে হচ্ছে, বেশ সার্থপর। বড় মেয়ের জন্যও তাঁর আজকে যেনো আফসোস নাই। বল্লো, আসুক মেয়ে, তারপর ওকে নিয়ে আরেকদিন যাবো। সব তো আর শেষ হয়ে গেলো না।  

গাড়ি যাচ্ছে, হটাত দেখি আমার বউ গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। আমি দেখলাম, একটু সন্দেহ হলো কেনো সে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে? কিন্তু আবার মনে হলো, হয়ত কোনো ভালো রেষ্টুরেন্টের খোজ মনে মনে নিয়ে রেখেছে যেটা সে  ভালোমত চিনে না। তাই গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। আমরা যাচ্ছি, যাচ্ছি, যেতে যেতে রেডিসন পার হয়ে গেলাম। সামনে কূর্মিটোলা গল্ফ ক্লাব। ভালো সাজিয়েছে মনে হচ্ছে। অনেক গাড়ি পার্ক করা। হয়তোবা কারো বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, অথবা বড় কোনো পার্টি। শহরের ঝলমল আলতে কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবটা যেনো তাঁর নিজের আলতে আরো চকচক করছে। লাল নীলা, সবুজ আলো, অনেক প্রকারের স্টাইলে জ্বলছে আলগুলি। ভালই লাগছে। পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে হর্ন বাজিয়ে আবার ব্যস্ত শহরের গাড়ি ঘোরা ছুটে চলছে। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরাও সামনে এগুচ্ছি।

বললাম, চলো, কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে ঢোকি।

আমার বউ আজগুবি একটা কথা বল্লোযে, এখানে তো আমাদের আর্মির জায়গা। অনেকবারই এসেছি। চলো দেখি, আরো সামনে যাই, কি কি ভালো রেষ্টুরেন্ট আছে। সেখানেই যাই। বললাম, সামনে তো আছে রিগেন্সি, ম্যাপল লীফ, আরো অনেক কিছু। আসলে তোমরা কি প্ল্যান করেছো কোথায় যাবা?

বউ বল্লো, চলো না যাই। তুমি আর এখন ব্যস্ত না।

ঠিক আছে, দেখা যাক কোথায় নিয়ে যায় বউ।

গাড়ি আরো সামনে চলে যাচ্ছে। চলে এসেছি প্রায় রিগেন্সির কাছাকাছি। বললাম, চলো তাহলে রিগেন্সিতেই যাই। তাতেও আমার বউ খুব একটা সায় দিলো বলে মনে হলো না। বল্লো, আরে নাহ, এটাও খুব একটা ভালো মানের না। মনে হয় ১ বা ২ স্টারের মানের। এর থেকে আরো ভালোটায় যাই।

বললাম, তাহলে চলো, ম্যাপললীফে যাই। ওটায় আমি এর আগেও এসেছি। খারাপ না। এবার মনে হলো বউ রাজী। কিন্তু গাড়ি থামানোর কোনো প্রস্তাবনা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেলো না। ফলে গাড়ী ম্যাপললিফের জায়গা পার হয়ে চলে গেলো আরো দূরে। সামনে এবার লা মেরিডিয়ান।

আমার বউ বল্লো, চলো, এখানে তো তোমাদের নওরোজ ভাই চাকুরী করেন। এখানেই যাই।

বললাম, তাহলে চলো। দেখি, দোস্তরে পাই কিনা। পাইলে তো মন্দ হয় না। একটু আডদাও দেওয়া যাবে। যদিও আমি এখানে আরো কয়েকবার এসেছি। বললাম, তো তুমি তো আগে এখানে আসো নাই। খারাপ হবে না।

গাড়ি ঢোকে গেলো লা মেরিডিয়ানে। পার্ক করলাম। ড্রাইভারকে কিছু টাকা দিয়ে বললাম, যে, তুমি খেয়ে নিও কিছু। আমাদের আসতে আসতে একটু দেরী হবে।

আমার বউ আমার সামনে দিয়ে হেটে ঢোকে গেলো লা মেরিডিয়ানে। কঠিন চেক আপ। মনে হচ্ছে কোনো এয়ারপোর্টে ঢোকছি। হাত ব্যাগ, মোবাইল, পকেট, সব চেক টেক করে তারপর ঢোকতে দিলো। আমার বউ আর মেয়ের হ্যান্ড ব্যাগ টাও চেক করাতে হলো। চেকিং এর পর্ব শেষ। আমরা লবিং এ ঢোকে গেলাম।

আমি বললাম, চলো কয়েকটা ছবি তুলে দেই তোমাদের। মেয়ে আর বউ এক সাথি বলে উঠলো, আরে, চলো আগে খাওয়া দাওয়া করে নেই। পরে ছবি তোলার অনেক সময় পাওয়া যাবে। এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে। অবাক হলাম। আমার বউ ছবি তোলায় পাগল থাকে। হটাত তাঁর কি এমন তাড়া যে, ছবি তোলতেও এখন তাঁর ব্যস্ততা? সে কোনোদিকেই ভ্রুক্ষেপ না করে আমার সামনে দিয়ে এমনভাবে হেটে যাচ্ছিলো যেন সে এখানে প্রায়ই আসে, জায়গাটা তাঁর বেশ পরিচিত। একটু অবাক হচ্ছিলাম। আমি বললাম, তুমি কি চিনো কোথায় যেতে হবে?

সাথে সাথে উত্তর, হ্যা, ১৫ তালা।

একটু অবাক হচ্ছিলাম। কিন্তু যেহেতু কোনো কারন নাই তাই ব্যাপারটা আমিও বুঝতেছিলাম না আসলে কি হচ্ছে। আবার এটাও ভাবছিলাম, হয়তো ওর আগে থেকেই ইন্টারনেটে ঘেটেঘুটে জেনে নিয়েছে কোথায় কি আছে। হতেই পারে। আজকালকার যুগ। সবাই স্মার্ট। ইন্টারনেটে কোথায় লবি, কোথায় লিফট, কোথায় রেষ্টুরেন্ট, কয় তালায় রেষ্টুরেন্ট, আজকাল এক ক্লিকেই সব পাওয়া যায়।

লিফটে উঠে গেলাম ১৫ তালায়। ১৫ তালায় রেষ্টুরেন্টে ঢোকলাম। ঢোকেই দেখি-

ওরে বাবা, মুর্তুজা ভাই। একেবারে জাস্ট অবাক আমি। আমি থমকে গেলাম। ভাবলাম, হয়তো কোনো বায়ার নিয়ে এসছে, আমাকে বলার জন্য ভুলে গেছে। বললাম, কোনো বায়ার এসছে নাকি ভাই? আপনি এখানে যে?

হেসে দিয়ে বললেন, আজকে আপনার জন্মদিন না!! আমরাও এলাম আপনার জন্মদিনে। ভাবী, আনিকা, জিওন সবাই এসেছে। আমি তো রীতিমত অবাক। তাইতো বলি, আমি যাহাই বলি না কেনো, আমার বউ তাহলে এই সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই এতো গোপনীয়তা!! ছোট মেয়েও!! আমাকে সাহ্ররট গেঞ্জি না পরতে দেওয়া, গুগল ম্যাপ চালু করা, গলফ ক্লাবকে একঘেয়ে জায়গা বলা, রিগেন্সির মত ভালো মানে একটা রেস্টুরেন্ট কে ১ স্টারে নামিয়ে দেওয়া, ওদের সাজগোছ করা, সব কিছু এখন আমার কাছে লা মেরিডিয়ানের চকচকে আলোর কাছে পরিস্কার।

ভাবলাম, কে বলে, মেয়েরা পেটে কথা রাখতে পারে না? যে এটা বলেছে, সে ভুল বলেছে। 

মুর্তুজা ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন, একটা টেবিলে। ওমা, ওখানে গিয়ে দেখি আরো চমক!!

ভাবী, আনিকা, আর জিওন হাতে চমৎকার অনেকগুলি সাদা গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেওয়ার জন্য। কি অদ্ভুদ ভালবাসা। নিজেকে বড্ড সুখী এবং ভাগ্যবান মানুষের মধ্যে একজন মনে হলো। এরা সবাই আমার পরিবার। সবার হাসিখুশী মুখ, আর চাহনী দেখেই মনটা ভরে গেলো।

সত্যিই সারপ্রাইজড হয়েছি। খুবই সারপ্রাইজড। শুধু ফুল নিয়েই মুর্তুজা ভাই আসেন নাই। সাথে "কাপল ওয়াচ" মানে একটা পুরুষের ঘড়ি আর সাথে একই ডিজাইনের আরেকটা মহিলার ঘড়ি। আমাদের জন্য কিনেছেন একজোড়া আর ভাই ভাবীর জন্য ও কিনেছে এক জোড়া। অনেক দাম, ব্র্যান্ডের ঘড়ি। আমার তো চক্ষু চড়কগাছ। এতোক্ষনে বুঝলাম সেই বিকাল থেকে কি একটা গোপন জিনিষ আমার কাছে আমার বউ, আমার ছোট মেয়ে আর সবাই লুকিয়েছিল। আরো অবাক করার বিষয় হচ্ছে- আমার বড় মেয়ে নাকি জানতো জিনিষটা। সেই দুপুর থেকেই জানতো। আমি ওর সাথেও দুপুরে অনেক্ষন কথা বলেছি। কিন্তু ও নিজেও আমাকে কিছুই বলে নাই।

অজানা জিনিষের হটাত করে যখন চোখের সামনে সারপ্রাইজ হয়ে ধরা দেয়, আর সেটা যদি হয় একটা ভাল কিছু, মনের আনন্দের সাথে চোখের পাতাও সেই আনন্দে জলে ভিজে চিকচিক করে। বড্ড ভালো লাগলো সবার এ রকম একটা লুকোচুরি খেলা।

অত্যান্ত ঘরোয়া পরিবেশে আমার পরিবার আর মুর্তজা ভাইয়ের পরিবার অনেক্ষন সময় কাটালাম। ব্যবসার কোনো কথাবার্তা হলো না। পুরুটাই পরিবার নিয়ে, বাচ্চাদের নিয়ে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তাদের পছন্দ অপছন্দের জিনিষ নিয়ে। আমরা ওদের বলার চেষ্টা করেছি, আমরা এই বিশাল দুনিয়ায় এতো মানুষের ভীড়েও কখন কোথায় কিভাবে একা অনুভব করি। আর সেই একাকীত্তের একমাত্র ভরষার স্থানগুলি কোথায়। এটাই হচ্ছে পরিবার। কোনো কোনো অতীতের অনেক সময় কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। কিন্তু কিছু কিছু বর্তমানের জন্য এমন কিছু ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে, যা আজকের দিনের কোনো এক সুখদুক্ষের এমন ঘরোয়া পরিবেশেই তাঁর জন্ম হয়। এটা যেনো সেই রকম একটা ঘরোয়া পরিবেশ।

অনেক ধন্যবাদ মুর্তজা ভাইকে, অনেক ধন্যবাদ ভাবী, আনিকা এবং জিওনকে। ধন্যাবাদ আমার ছোট মেয়েকে। আর ধন্যবাদ আমার বউকে। ধন্যবাদ আমার বড় মেয়েকে যে আমাকে সব জেনেও কিছুই জানায় নাই অথচ এতো সুন্দর একটা মেসেজ রেখেছিলো সকালেই। ধন্যবাদ সবাইকে। এতো চমৎকার একটা পরিবেশ দেওয়ার জন্য।

মাঝে মাঝে অনেক কষ্টের পরিবেশে বাচতে বাচতে যখন হাপিয়ে উঠি, যখন ঞ্জেকে একা একা মনে হয়, তখন এই সব ছোট ছোট ঘরোয়া ভালবাসা আবারো মনে করিয়ে দেয়, আমরা পরিবারকে ভালোবাসি, আমরা পরিবারের জন্য বাচি। আর এই পরিবারতাই হচ্ছে আমাদের সব সুখের মুল উৎস।

১৪/০৮/২০১৯-বাসায় সবার দাওয়াত

Categories

ঈদ-উল আযহার পরের দিন আজ। অনেকদিন সবাইকে নিয়ে বিশেষ করে পরিবার পরিজন নিয়ে একসাথে খাওয়া দাওয়া হয় না। তাই ঈদের কদিন আগে মিটুলকে বললাম, সবাইকে দাওয়াত দাও যেনো ঈদেরপরের দিন সবাই আমাদের বাসায় আসে, একটা গেট টুগেদার করা যাক। উম্মিকাও আছে বাসায়। ওর যারা যারা বন্ধু বান্ধব আছে, ওদেরও আসতে বলো। কনিকার বন্ধু বান্ধব কয়েকদিন আগে দাওয়াত খেয়ে গেছে, তাই এতো শর্ট তাইমে আবার ওর বন্ধু বান্ধবদের দাওয়াতের দরকার নাই। মিটুল গ্রামের অনেককেই দাওয়াত করেছে আর ওদের ভাইওবোনদের তো আছেই। ওরাও আমার বাসায় আসার জন্য ব্যাকুল থাকে। ধরে নিয়েছিলাম প্রায় শখানেক হবে উপস্থিতি।

তাইই হলো, প্রায় শ খানেকের মতোই লোকজন এসে হাজির হলো।

ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো। ফলে আমার ছাদতায় ভাল করে আয়োজন করা যাচ্ছিলো না। তাই গ্যারেজই ভরষা। কাবাবের স্টল করা হলো মুবিনের নেতৃত্তে। মুরগীর আর গরুর কাবাব। মিটুলের রান্নার জুরি নাই, সবাই ওর খিচুরী, পোলাও এবং অন্যান্য আইটেম খুব মজা করে রান্না করে।

উম্মিকার ৬/৭ জন বন্ধু বান্ধব এসেছিলো। আমি ফাউন্ডেশনের এম ডি রানা, ওর বউ, সবাই এসেছিলো। খুব ভালো একটা সময় কেটে গেলো। এর সাথে নেভীর কমান্ডার মামুনও এসেছিলো দীপু আর ওর পরিবার নিয়ে। যদিও একটু একটু করে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো, তবুও সবাই একে একে বাগান দেখতে গেলো। বাগানে একটা ছাতা আছে, লাইটিং করানো। ছবি তোলার জন্য একটা মুক্ষম জায়গা।

১৩/০৮/২০১৯- ঈদের পরের দিন

Categories

কোরবানীর ঈদের পরদিন। আমার বাড়িতে ছোত বড় সবাই এক সাথে যেমন ঈদের দিন আসতে পছন্দ করে, তেমনি কাউকে দাওয়াত দিলে পারতপক্ষে কেউ মিস করতে চায় না এটা আমার সৌভাগ্য। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি সেই সকাল থেকেই। মিতুল (আমার স্ত্রী) তাদের ভাইর বোন সবাইকে দাওয়াতের পাশাপাশি আমাদের গ্রামের ভাই বোনদের কিছু ছেলেমেয়েরদেও আজকের দিনের দাওয়াতে হাজির হতে অনুরোধ করেছিলো। গুড়ু গুড়ি বৃষ্টির কারনে গ্রাম থেকে অনেকেই আসতে পারে নাই।

জাহাংগীর নগর ইউনিভার্সিটির মিতুলের বান্ধবী দীপু এবং ওর হাজবেন্ড কমোডর মামুন সহ ওদের পরিবারের সবাইকেও দাওয়াত করেছিলো মিতুল। দাওয়াত করেছিলো উম্মিকার কিছু বন্ধু বান্ধব্দের। আমিন ফাউন্ডেশন এর পরিবারদেরকেও মিতুল দাওয়াত করেছিলো, সবাই এসেছে। বেশ গমগম একটা পরিবেশ।

মুবীন দুপুর থেকেই কাবাব বানানোর সমস্ত আয়োজন করে রেখেছিলো। ইমন আবার রাতে কি আতশবাজী পুরানোর জন্য এক গাদা আতশবাজীও তার স্টকে রেখেছিলো। বৃষ্টি হওয়াতে ছাদে কাবাব বানানোর পরিকল্পনাতা ভেস্তে গেলো কিন্তু নীচে গ্যারেজ বনে গেলো রীতিমত একটা কাবাব ফ্যাক্টরির রান্নাঘর। চারিদিকে কাবাবের মনোরম গন্ধ, লোকজনের সমাবেশ, মন্দ লাগছিলো না।

অনেক লোক যখন এক জায়গায় সমাবেশ করে, এম্নিতেই জায়গাটা শোরগোলের মতো কিচির মিচিরে ভর্তি থাকে। তার মধ্যে আবার চৌধুরী বাড়ির মানুষ, তাদের গলার আওয়াজ সব সময়ই চ ওড়া। তারা আস্তে কথা বলতে পারে না। হয় তারা কানে কম শুনে বলে উচ্চস্বরে কথা বলে অথবা কে কার কথা শুনবে, সেটা সুপারসেড করার কারনে একে অন্যের থেকে চরা ভয়েসে কথা না বলে কোনো উপায়ও নাই। ফলে সেই দুপুর থেকে আমাদের বাসায় একটা অবিরত হট্টগোলের মধ্যে ছিলো। শব্দ দূষনে নিঃসন্দেহে আজকে আমার বাসা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবার কথা।

ঈদের দিন সাধারনত আমি ছোট বড় সবাইকে সালামী দেই। এতা আমার খুব ভালো লাগে। সালামী তা লোভনীয় করার জন্য আমি আগে থেকে ব্যাংক থেকে নতুন নতুন নোট নিয়ে রাখি। আর সালামীর পরিমানতাও আমি বাড়িয়ে দেই যাতে সবাই বিশেষ করে ছোটরা এই সালামির লোভেই সবাই আমার বাসায় সকাল সকাল চলে আসে। ছোটরা যখন বায়না ধরে, বড়রা তখন আসতে বাধ্য হয়। ফলে আমি খুব গোপনে এই সালামীর টোপ তা সব সময় দিয়ে রাখি।

সবাই লাইন ধরে দাঁড়ায়, একে একে সালাম করে। সালাম করাতা বা পাওয়া তা আম্র মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে, এই যে সালামীটা পাওয়ার জন্য বাচ্চারা অধীর আগ্রহে বসে থাকে। সবাইকে আমি সম পরিমান সালামি দেই। বড়দের বেলায় অবশ্য বেশী থাকে।

বেশ রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলে, আর অবিরত খাবারের, জুসের, আর মিষ্টির ব্যবস্থা থাকে। কখনো ফুস্কা, কখনো হালিম, কখনো অন্যান্য আইটেম তো আছেই। বয়স ভিত্তিক পোলাপান এক এক রুমে আড্ডা দেয়, কেউ কেউ আবার একই রুমে বসে নিজেরা নিজেরা সোস্যাল মিডিয়ায় এত ব্যস্ত থাকে যে, কাছে আছে তবুও যেনো সোস্যাল মিডিয়ায়র মাধ্যমেই হাই হ্যালো করতে পছন্দ করে।

দিনটা আমার বেশ ভালো কাটে এইসব কিচির মিচির করা বাচ্চা আর তাদের বড়দের নিয়ে। বয়স হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি একটা সময় আসবে, তখন হয়তো এটার ভাটা পড়বে। হয়তো অনুষ্ঠান তা হবে, আমার অনুপস্থিতিতে। হয়তো ওরা আমার এই সালামিটাই তখন সবচেয়ে বেশী মিস করবে। কিন্তু পৃথিবীর তাবত নিয়ম মেনেই যুগে যুগে এই রীতি চলতেই থাকবে সেই কফি হাউজের আড্ডাটার মতো।

৩০/০৭/২০১৯-কনিকা

মেয়েটা জন্মের দিনই আমার বুক কাপিয়ে দিয়েছিল। অবিকল আমার মায়ের চেহারা নিয়ে সে এই পৃথিবীতে পদার্পন করেছিল। আমি ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, সে আমার মায়ের রিপ্লেসমেন্ট কিনা ভেবে। আজ আমার মা বেচে নেই কিন্তু কনিকা আছে। কনিকার মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ায় আমার মা কনিকাকে একদম পছন্দ করে নাই। কিন্তু এতা তো আর আমার কনিকার দোষ নয়। আর আমিও কোনোদিন কেনো আমার বর মেয়ে হবার পর আবারো একটা মেয়েই হল, ছেলে কেনো হলো না, এ প্রশ্নতা আমার মাথায় কখনোই আসে নাই, এখনো না। ওরা দুজনেই আমার সন্তান আর আমার ভালো লাগার মানুষ।

কনিকা ছোত বেলায় যেমন বেশী অভিমানী ছিলো, আজ এতো বর হয়ে গেছে, তার সেই ভাবতা এখনো কমে নাই। বকা দিলে কান্না করে, বিশেষ করে আমি বকা দিলে তো ওর চোখের পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। ওর মা যখন সারাক্ষন এই পরা, ঐ রুম গোছানো, অই তাইম মতো না খাওয়া, ঐ ঠিক মতো গোসল না করা, তাইম মতো পড়তে না বসা ইত্যাদির কারনে বকতেই থাকে, এতা ওর কান দিয়ে আদৌ ঢোকে কিনা আমার মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে। নির্বিকারই তো থাকে। যেই আমি একটু বকা দিয়েছি- গেলো এদিনের মতো দিন বরবাদ। কেনো এমনতা হয় জানি না তবে আমি ওকে বকতেও পারি না।

মাঝে মাঝে কনিকা আমার কাছে চিঠি লিখে। চিথির বেশীর ভাগ মুল উপাদান, অর্থ নৈতিক আলাপ আলোচনা। এই যেমন, বড় আপিকে সে কিছু হোম ওয়ার্ক করে দিয়েছে, তার সাথে সেই হোম ওয়ার্কের মুজুরী হিসাবে একটা ডিল হয়েছে, তাই তাকা দিবে কে? বাবা। একজনের হোম ওয়ার্ক, আরেক জন করে দিবে, আর আরেক জন সেই তাকার মুজুরী দেবে, ফলে কত বার্গেনিং হবে এটা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কারন বাবা টাকা দিবে। সেই তাকা আবার কাজের পর পরই তাদের হাতে যেতে হবে, আর হাতে যাবার পরই সেতা আবার তার মায়ের কাছে জমা হবে। ওর মা অদের ব্যক্তিগত একাউন্টে জমা করে দেবে। অর্থ নীতির এই চক্রটা বেশ মজার।

আবার কোনো কোন সময় কনিকার কিছু কাজ তার বড় আপি করে দেবে, ফলে চক্রতা একই। শুধু মালিক পক্ষের মুজুরী পাওনা হবে বড় মেয়ে, তাকা দেবেন বাবা, কাজ হাসিল করবেন কনিকা। এই দুয়ের আবার একটা ভারসাম্য করে যার যার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ কে কত টাকার কাজ করিয়ে নিলো, আর কে কত পাবেন তার একটা কঠিন হিসাবের ডেবিত ক্রেডিট আমার কাছে লেখা ঐ চিঠিতে বিস্তারীত থাকে। তবে মজার বায়াপার হলো সেন্ট্রাল ব্যাংকের মানি ব্যাক থেকে সব তাকাই পরিশোধ যোগ্য।

আবার কিছু কিছু চিঠিতে এমন থাকে যে, অন লাইন অর্ডার করা হয়ে গেছে, আইটেমটা চলেই আসবে দু একদিনের মধ্যে, আমার সাথে কথা বলার হয়তো কোনো অবকাশ হচ্ছে না, তার কোচিং আর আমার অফিসের তাইমিং এর কারনে। কিন্তু ডেবিট নোটের মতো আমার ওয়ালেটে কনিকার একটা চিঠি পাওয়া যাবে তাতে কবে কত টাকা ডেবিট করে দিতে হবে তার বিস্তারীত বর্ননা থাকে।

এটা অবশ্য আমার বড় মেয়ে করে না। সে আবার তার মায়ের সাহাজ্য নেয়। ওর মা আমাকে ফোন করে, তখন আমার ওয়ালেটের উপর চাপ পড়ে। আমার দুই মেয়ের এই ব্যাংকিং হিসাব কে যে ওদের শেখালো আমার জানা নাই, তবে তাতে ব্যাপারতা অনেক সহজ ভাবেই এল সি এর মতো ট্রাঞ্জেক্সন হয়।

কিছু কিছু চিঠি আবার অভিযোগ পত্রের মতো। আর সেই অভিযোগ হয় তার মায়ের নামে না হয় তার আপির নামে। যেমন, তার উপর পরার চাপ পড়ে যাচ্ছে, তার বিনোদনের সময়টা কেড়ে নেয়া হচ্ছে, তার আই পড ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। তাতে তার মন ভালো নাই। সে আর এই বাড়িতাকে বসবাসের যোগ্য মনে করিতেছে না। এতার একটা সমাধান হোক।

এই রকমের হাজার হাজার না হলেও মাসে দু একটা অভিযোগ পত্র তো পাইই।

১৯/০৭/২০১৯-কনিকার বন্ধুদের দাওয়াত

ছোট মেয়ে কনিকা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়ে। মিটুলের বানানো টিফিন কনিকার কাছ থেকে ভাগ করে খেতে খেতে একদিন সব বন্ধু বান্ধবরা কনিকাকে ধরেই বসলো, আন্তির রান্না করা খাবার খাবো। আসলে বাচ্চারা আজকাল ফাষ্ট ফুড, পোলাও বিরিয়ানি ইত্যাদি খেতে এতো পছন্দ করে যে, কোনো না কোনো অজুহাত তো আছেই এই সব খাবারের আয়োজনের। কখনো কনিকার বাসায়, কখনো মনিকার বাসায়, কখনো আলভীর বাসায়, লাগাতার তাদের এই খাওয়া চলতেই থাকে। তবে ব্যাপারটা কিন্তু মজার আমাদের বড়দের জন্য। অন্তত আমাদের বাচ্চারা আনন্দের সাথেই সময়তা কাটায়।

আজ কনিকার প্রায় ১৬/১৭ জন কলেজ বান্ধবীরা আমাদের বাসায় খেতে আসবে। মিতুল রান্না করায় খুবই এক্সপার্ট। আর বাচ্চাদের খাওয়াতে সে খুব পছন্দ করে। কনিকার বান্ধবীরা বাসায় খেতে আসবে এই প্রোগ্রামের কারনে তার গত কয়েকদিন এই বাজার সেই বাজার, বাচ্চারা কি খেতে পছন্দ করে, আর কি করলে আরো মজা করবে, সেতার জন্য প্রায় দুই তিনদিন যাবত মহা ব্যস্ত।

কনিকা মাঝে মাঝে বাজার দেখে, সাথে সাথে ফেসবুকে একটা পোষ্ট ও মেরে দেয়। একটা খুবই ঘরোয়া দাওয়াত যে কততা ম্যাগনিচুড বারাতে পারে, এটা আজকালের পোলাপানেরা খুব ভালো করেই জানে। আজ সেই মেঘা অনুষ্ঠানের আয়োজন। সকাল থেকেই কনিকা, উম্মিকা ঘর গোছাচ্ছে, পর্দার কাপড় গুছাচ্ছে, বাড়ি ঘর কাজের বুয়ার দ্বারা এক রকম দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি চলছে। চেয়ার টেবিলের কভার পরিবর্তন, তাদের বিছানার চাদর পরিবর্তন, দেখলেই মনে হচ্ছে একটা যজ্ঞ। খারাপ না।

২/৬/২০১৯ –কবুতর প্রেম  

আমি যে হোটেলটায় উঠেছি, তার করিডোরে একটা জায়গা আছে যেখানে ধুমপায়ীরা লবির নীচে না গিয়েও রুমের পাশে এই জায়গায়টায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে পারেন। দাড়ানোর একটু জায়গা, পাশে হাই ভোল্টেজ একটা ট্রান্সফর্মার। কাচের জানালাটা খোলা যায় না কিন্তু একটা একজষ্ট ফ্যান দেয়া আছে যার মাধ্যমে সিগারেটের ধোয়াগুলি সহজেই করিডোর থেকে বাইরে বেরিয়ে যায় এবং করিডোরে সিগারেটের কোনো গন্ধ আর থাকে না। হোটেলের মালিক নিশ্চয় সিগারেট খান। তাই সিগারেট পায়ীদের প্রতি তার একটা মায়া নিশ্চয়ই আছে।

ওখানে প্রথম দিন সিগারেট খেতে গিয়ে একটা মজার জিনিস চোখে পড়লো। একটা কবুতর চুপ করে বসে আছে। আমাকে সে আজই প্রথম দেখলো, তাই তার মধ্যে একটু অস্থিরতা কাজ করছিলো। পাখীরা যখন ঘুমায় তারা ঘন ঘন চোখ মেলে আবার চোখ খোলে। তাতে তাদের কতটা ভালো ঘুম হয় তা আমি জানি না। পর পর দুটু সিগারেট খাইলাম শুধু কবুতরটাকে ভালো করে দেখার জন্য। কোনো ডিস্টার্ব করলাম না কারন ডিস্টার্ব করলে কবুতরটা হয়তো কাল থেকে আর এখানে আসবে না।

মিটুলকে নিয়ে আমি আই এল বি এস হাসপাতালে চলে গিয়েছিলাম একটু পরে। প্রায় সারাদিনই ওখানে ছিলাম। কবুতরটার কথা আর মাথায় আসে নাই। যখন আবার হোতেলে ফিরলাম, সিগারেট খেতে গিয়ে দেখি ঐ জায়গায়টায় আর কবুতরটা নাই। একটু খটকা লাগলো। সকালে আমার আচরনে কি কবুতরটা কোনো অনিরাপদ ভাব দেখেছিলো আমার কোনো আচরনে?

তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। আবারো আমি ঐ একই জায়গায় সিগারেট খেতে এসে দেখলাম এবার একটা নয়, দুটু কবুতর। সম্ভবত ওরা স্বামী স্ত্রী জোড়া। পাখার নীচ দিয়ে বুঝা যাচ্ছে পেট পুড়ে খাওয়া হয়েছে ওদের। এখন ওদের আর কোনো চিন্তা নাই। এই প্রানীকুলের মধ্যে সম্ভবত এক মাত্র মানুষই এক মাত্র প্রজাতী যাদের জন্য বড় বট অট্টালিকা লাগে, বড় বড় হাসপাতাল লাগে, বড় বড় গাড়ি ঘোড়া লাগে, বিস্তর খাবারের সমারোহ লাগে। আর অন্যান্য প্রানীদের কিছুই প্রয়োজন হয় না। তারা সকালে বেরিয়ে যায় ডানায় ভর করে, কেউ নিজের পায়ে ভর করে, সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে নিজের মনের আনন্দে স্রিষ্টিকর্তার এই বিশাল ভুবনে পেট পুরে খেয়ে রাতে নিশ্চিত মনে ঘুমিয়ে পড়ে। তাদের বাচ্চাদের জন্যে ওরা কোনো কিছুই সঞ্চয় করার প্রয়োজন বোধ করে না, না প্রয়োজন বোধ করে কোনো বৃহৎ অট্টালিকা গড়ার। এদের রোগ হলে সেই বন জংগলের কোনো পাতা কিংবা খড় খেয়েই তাদের অসুখ সারিয়ে নেয়, ওদের জন্য কোনো মহামারী নাই, গায়ে ফেন্সি কোনো কাপড়ের দরকার নাই, রোধ বৃষ্টি ঝর যাইই থাকুক ওরা নিজেরাই নিজেদের মতো করে নিজকে বাচিয়ে রাখে। তারা একে অপরের সম্পত্তি দখলে যায় না, এরা এক গাছে থেকেও কারো উপর কারো শত্রুতা নাই।

আমার উপস্থিতি টের পেয়ে একটা কবুতর একটু নড়েচড়ে বস্লো, অন্যটা ঘুমের মধ্যেই যেনো পড়ে রইলো। বুঝলাম যেটা ঘুমের মধ্যে রইলো সেটা সকালে আমাকে দেখেছিলো। একটু হলেও সে হয়তো বুঝতে পেরেছিলো যে আমার থেকে ওদের কোনো অনিহা হবার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু নতুন কবুতরটা ঠিক এক ঠায়ে আমার দিকে চেয়ে থাক্লো। সে হয়তো ভাবছে, আমি কি করতে পারি কিংবা আমি কোনো ভয়ানক প্রানী কিনা।

আমি ইচ্ছে করলেও কবুতরটাকে হাত দিয়ে ধরতে পারবো না কারন আমি জানালার কাচের এ পাশে আর কবুতরগুলি জানালার কাছে ওপাশে, আর কাচটা ফিক্সড করে বন্ধ করা। আমার সিগারেট খাওয়া শেষ, তাই আবার রুমে চলে এলাম। অনেক রাতে আবার আমি যখন সিগারেট খেতে আসলাম, দেখলাম, খুব নিসচিন্তে মনে কবুতর দুটু ঘুমাচ্ছে। কিন্তু পাখীদের ৭ম ইন্দ্রিয় অনেক সেন্সেটিভ। আশেপাশে কে আছে বা কে যাচ্ছে তারা সেটা খুব সহজেই বুঝতে পারে। এবার দুটু কবুতরই একবার আড় চোখে আমাকে দেখলো বটে কিন্তু ভয়ের কোনো কারন নাই বিধায় আবার নড়ে চড়ে ঘুমিয়ে গেলো।

পরদিন বেশ সকালে সিগারেট খেতে এসে দেখি ওদের একটার ও কেউ নাই। পাখীরা আসলে আমাদের মতো নয় যে, আজ ছুটির দিন তো একটু বেশী বেলা করে ঘুমাবে বা আলসেমী করে গরাগড়ি যাবে। সকাল হলেই ওরা বেরিয়ে যায় নিয়মিত খাদ্যের খোজে, হোক সেটা শনিবার বা রবিবার। কিংবা শীত বা বর্ষা। এবার আমিও ওদেরকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় নাই, মনে মনে ভাবছিলাম যে, আমার সাথে ওদের একতা অলিখিত বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। আমি ওদের কেউ না কিন্তু আমিই ভাবছি ওরা আমার বেশ বন্ধুর মতো। পাখীদের সাথে এতো সহজে আসলে বন্ধুত্ব হয় না। এটা এমন না যে, একজন অপরিচিত মানুষকে যতটা তাড়াতাড়ি ফ্রেন্ড বানান যায়, ততোটা সহজ পাখীদের বেলায় হয় না। ওরা আসলে মানুষকে কখনো বন্ধু মনেই করে না। পোষা পাখীর বেলায় ব্যাপারটা অনেক আলাদা। তারা বশ্যতা মেনে নিয়েই মানুষের দাসত্ব করে।

সন্ধ্যায় আবার এলাম জায়গাটায়। দেখলাম, আবার তারা ফিরে এসেছে। ব্যাপারটা আমার কাছে এবার পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, এতা ওদের আস্তানা। সকালে বেরিয়ে যায় আর সন্ধ্যা হলেই আবার তারা তাদের বাসায় ফিরে আসে। এই কবুতর গুলি যেহেতু এখানেই থাকে, ফলে ওরাও হয়তো বুঝে গেছে আমি এই জায়গার স্থায়ী বাসিন্দা নই। হয়তো কয়েকদিন থাকবো আমি, তারপর তারা জানে যে, অন্যান্য অতিথির মতো কদিন পর আমিও আর এখানে থাকবো না।

এ কয়দিন এই কবুতরটা আমার সিগারেট খাওয়ার পরিমানটা বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্ভবত আমি এর প্রেমেই পড়ে গেছি। প্রতিদিন আমি সকালে ওদেরকে বাইরে যাওয়ার আগেই দেখতে আসি জানালাটার পাশে। সিগারেট খাই, আবার ইদানিং কফি নিয়েও আসি। যাতে বেশ কিছুক্ষন আমি কবুতরগুলির পাশে থাকতে পারি। বেশ ভালো সময় কাটছে আমার। মিটুলকে কবুতর গুলীর কথা বললাম। খুব একটা আহামরী খবর তার কাছে মনে হলো না। বল্লো, ভালই তো।

আজ রাতে যখন আমি আবার সিগারেট খেতে এলাম, ভাবলাম, ওদের ছবি নেই। খুব গোপনে মোবাইল ক্যামেরা বের করতেই মনে হলো কবুতর দুটু একটু ভয় পেয়েছে। একটা প্রায় উরাল দেয় দেয় ভাব, অন্যটা ও একটু নড়ে চড়ে বসলো। কিন্তু তার যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা মনে হলো না। ছবি তুললাম, কোন ফ্লেস ইউজ করলাম না কারন ফ্লেশ ইউজ করলে হয়তো ভয় পেতে পারে। আমি এখানে আর বেশীদিন থাকবো না, হয়তো আর মাত্র দুইদিন থাকবো। তারপর আমি আমার দেশে ফেরত যাবো। একটু মন খারাপ হচ্ছিলো যে, কবুতরগুলি আসলে আমার কেউ না কিন্তু কোথায় যেনো একতা মায়ায় ধরে গিয়েছিলো। যখন দেশে ফিরে যাবো, হয়তো আমি ইচ্ছে করলেও আর এই স্থানে এসে সিগারেট খাওয়ার বাহানা করে এই যুগল কবুতর গুলিকে দেখতে পাবো না।

কাল রাতে দেখলাম, কবুতরটা নাই। মনটা বড্ড খারাপ হয়ে গেলো। কেউ কি তাকে কোনো ভয় দেখিয়েছে কিনা। আজ রাতে আবার চেক করবো। রাতে আবার চেক করলাম, কবুতর গুলি আসে নাই। ভিতরে একতা কেমন যেনো কষ্টের মোচড় অনুভব করলাম। একটা সিগারেট ধরালাম, খুব ভালো করে দেখার চেষতা করলাম, আশেপাশে কোথাও কবুতরগুলি আছে কিনা। আমাদের বিল্ডিং এর পাশে আরো একটা উচু বিল্ডিনে অনেক গুলি কবুতর থাকে। তাহলে কি ওরা স্থান পরিবর্তন করেছে? কিন্তু কেনো? আগামিকাল সকাল ১২ তায় আমার হোতেল থেকে চেক আউটের সময়। বারবার কবুতর গুলির কথা মনে পড়ছিল। আমি সকালে আবার কবুতর গুলি ফিরে এসছে কিনা ওখানে গেলে দেখলাম, বাসাটা খালী কিন্তু দুটু পালক ওখানে পড়ে আছে। হাত দিয়ে ধরার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো পালক দুটিকে।

প্রেম বড় খারাপ জিনিস, হোক সেটা কোনো পাখীর সাথেই। মায়া হচ্ছে, গেলো কই কবুতরটা? কোনো বেজী কিংবা কোন শিকারী কি ওদের ধরে নিয়ে গেলো?

মন্টাই খারাপ হয়ে গেলো।

২৮/০৫/২০১৯-জেনারেল ওয়াকার ফোর্ট্রেস হার্ট ইন্সটিটিউট

 

ওয়াকারের স্ত্রী, শাশুড়ি আর মিটুল আমি এবং ওয়াকার মিটুল আর ওয়াকারের স্ত্রী ওয়াকার, মিটুল, ওর স্ত্রী এবং শাশুড়ি

 

হরিদ্বার থেকে ফেরার পথে আমার এক বন্ধু মেজর মহিউদ্দিন ফোনে জানিয়েছিলো যে, আমার আরেক বন্ধু মেজর জেনারেল ওয়াকার ভারতেই দিল্লীর হার্ট ইন্সটিটিউটে ওপেন হার্ট সার্জারী করে ভর্তি। এবার ওয়াকার সম্পর্কে একটু বলি-

আমি যখন ১৯৭৭ সালের প্রথম দিকে ঢাকায় আজিমপুরে থাকতাম তখন হাবীব ভাইয়ের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আমার এক বন্ধু নিউটনের ভাই। আমি ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে ওখানেই থাকতাম। শরীফ ছিলো, নিউটন ছিলো, জুয়েনা আপা ছিলো আরেকজন আপা ছিলো এই মুহুর্তে নামটা আমার মনে নাই। ঐ সময় এই ওয়াকারের সাথে আমার পরিচয়। আসলে ওয়াকার ছিলো এই নিউটনদের আত্মীয়। আমি ক্যাডেট কলেজে চলে যাওয়ার পরে আর কারো সাথেই যোগাযোগ ছিলো না। অতঃপর, ক্যাডেট থেকে আমি আর্মিতে চলে যাই।

বিএমএ তে ট্রেনিং এর সময় একদিন ফার্ষ্ট টার্মের শাস্তি খাওয়ার সময় কনকনে শীতে দাঁড়িয়ে ছিলাম ‘চির উন্নত মম শীর’ পাহাড়ের পাদদেশে। সবাই মুটামুটি খালী গা। যেনো আমরা সবাই বাহাদুর, শীতের কোনো পরোয়া নেই। আর অন্যদিকে সিনিয়ারদের ভয়ে কনকনে শীতের সময় খালী গায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শরীর যেনো বরফ হয়ে যাচ্ছে। ফার্ষ্ট টার্মের ক্যাডেট আমরা, ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানীর ক্যাডেটদেরকে এখনো ভালোমতো চিনিই না। আর সবার চেহারা তো গলা ছোলা মুরগের মতো। সবার চেহারা এক।

তো আমার পাশে একজন ক্যাডেট খুব ভদ্রভাবে শীতটাকে যেনো উপভোগ করছে, কোনো পরোয়া নাই, না আছে কোনো দুঃখ কিংবা রোমান্স। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই পাশের ঐ ক্যাডেটকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হালার ক্যান যে আইছিলাম মরতে এই বিএমএ তে। বাইরে ছিলাম, ভালোই তো ছিলাম। কথায় কথায় কই আমি থাকতাম, কোথায় বাড়ি, ইত্যাদি আলাপের একসময় পরিচয় হলো যে, সে নিউটনের ভাগ্নে, ওয়াকার। আমি বললাম, আরে, নিউটন তো আমার ছোট বেলার বন্ধু!! বলতেই ওয়াকার বল্লো, আমি তো তোমারে চিনছি। তোমার সাথে তো আমার দেখা হতো সেই ১৯৭৭ সালে আজিমপুর কলোনীতে। এই সেই ওয়াকার। খুব ভালো একটা ছেলে। নামাজী, ধীর এবং সৎ। ওয়াকার শেখ পরিবারের একজন। আর আমাদের প্রধান্মন্ত্রী শেখ হাসিনার আপন ফুফা জেনারেল মুস্তাফিজ সাহেবের মেয়ের জামাই। উভয় পক্ষ থেকেই ওয়াকার একেবারে খাটি শেখ পরিবারের একজন। আর এই কারনেই আমাদের কোর্ষ ১৩ বিএমএ লং কোর্ষ বিএনপি এর শাসনামলে কেহই মেজর থেকে লেঃ কর্নেল পদে প্রোমোশন পাই নাই। রাজনীতি নিয়ে এখানে আলাপ না করি তবে বিএনপি এর জন্য আরো ৩০ বছর খেসারত দিতে হতে পারে।

ওয়াকার যখন লন্ডনে ষ্টাফ কলেজ করতে গিয়েছিলো, আমি তখন ট্রেনিং ডাইরেক্টরেটে জিএসও-২ হিসাবে কাজ করি। ওকে অনেক জালিয়েছিলো আমাদের এই আর্মি কারন সে আওয়ামীলীগের লোক ছিলো আর তখন চলছিলো বিএনপির শাসন। ওয়াকারের জন্য লন্ডনে টাকা পাঠাচ্ছিলো না আর্মি থেকে, বাধ্য হয়ে ওয়াকার অনেক কষ্ট করে শেষ করেছিলো কোর্ষটা। আমি অনেক প্রতিবাদ করেছিলাম তদানীন্তন ডিএমটি ব্রিগেডিয়ার (পরবর্তীতে চীফ অফ আর্মি ষ্টাফ হয়েছিলেন তিনি) মুবিন এর সাথে। এমনো হয়েছিলো যে, ওয়াকার আর্মি হেডকোয়ার্টারে ঢোকতে পর্যন্ত ওকে বাধা দেয়া হচ্ছিলো। কিন্তু একদিন আমি ওয়াকারকে গেটপাশ দিয়ে যখন আমার অফিসে ঢোকালাম, আমাকে ডিএমআই মাহমুদ স্যার বললেন, এটা কেনো করেছি। খুব মেজাজা খারাপ হয়েছিলো তার এই প্রশ্নে- আমি বলেছিলাম, সে আমার কোর্ষম্যাট আর ওয়াকার এখনো সার্ভিং, আর না ওয়াকার পিএনজি। তাহলে আমি আমার বন্ধুকে আমার অফিসে আসতে দিতে পারবো না ক্যান? এটা নিয়ে অনেক অসুবিধায় পড়তে হয়েছিলো আমাকে। আমি অফিস থেকে ওয়াকারকে নিয়ে ছুটির পরে বের হয়ে হেটে হেটে আসতে আসতে শুধু একটা কথাই বলেছিলাম, যতো অসুবিধাই হোক, আমরা থাকি বা না থাকি, তুই কিন্তু আর্মি থেকে ভলান্টিয়ারী চাকুরী ছারবি না। এর শেষ দেখা দরকার।

আমার প্রোমোশন না হওয়াতে আমি আর্মি ছেড়েছিলাম, ওয়াকার রয়ে গেলো। আজ আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াকার মেজর জেনারেল। আমি খুশী। সেই ওয়াকার ইন্ডিয়ায় বেড়াতে এসে হেলথ চেক আপ করাতে গিয়ে হার্টে অনেকগুলি ব্লক ধরা পড়েছে। আর এই সুবাদে ওপেন হার্ট সার্জারী।

আমি আর আমার স্ত্রী মিটুল ফোর্টেস এসকর্ট হার্ট ইন্সটিটিউটে এসে পড়লাম বেলা ১২ টার দিকে। এখানে ইন্ডিয়ার ডিফেন্স এটাশে ওর সব দেখভাল করছে। আমি রিসেপ্সনে গিয়ে ওয়াকারের কথা বলতেই একজন অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাঁকে কিভাবে চিনি। বললাম, সে আমার ব্যাচম্যাট আর আমি ইন্ডিয়ায় এসেছি অন্য একটা কাজে, শুনলাম ওয়াকার এখানে ভর্তি তাই দেখতে এলাম। আমাকে আর আমার স্ত্রীকে খুব সম্মানের সহিত একজন অফিসার ওর রুমে নিয়ে গেলো। দেখলাম, ওয়াকার পেটে একটা পট্টি দিয়ে শুয়ে আছে। আমাদের দেখে ওয়াকার খুব খুসি হলো। ওখানে ওর স্ত্রী আর শাশুড়ি ছিলো। সবার সাথেই অনেকক্ষন থাকার পর আমি কানেকানে ওয়াকারকে জিজ্ঞেস করলাম, ওর কোনো ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট লাগবে কিনা। আমার বন্ধু আমার হাত ধরে খালী বল্লো- দোস্ত, আসলে আমি জানতাম না যে, আমার ওপেন হার্ট সার্জারী করাতে হবে। জাষ্ট হেলথ চেক আপ করাতে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকটা ব্লক। পরে আমাকে ডাক্তার বল্লো, ওপারেশন করাতে হবে, আমিও রাজী হয়ে গেলাম। ব্যাপারটা একদম আকষ্মিকভাবে ঘটে গেলো। হাতে যা টাকা ছিলো তা চলবে আর আমার শাশুড়ি ঢাকা থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসেছেন, আপাতত লাগবে না। আমি জানি ওয়াকার ঠিক কথাগুলিই বলছে। খুব সৎ একজন মানুষ।

বললাম, আমিও বেশীদিন এখানে থাকবো না। আমার স্ত্রীর মেডিক্যালের বাকী কাজগুলি শেষ হয়ে গেলে আমিও দেশে ফিরে যাবো। যদি এর মধ্যে আবার আসতে পারি আসবো, আর তা না হলে আজকে এখানেই। বলে আমি আবার আমাদের হোটেলে চলে এলাম। আমার আর ওর ওখানে যাওয়ার সময় হয়ে উঠে নাই।

২৫/৫/২০১৯-হৃষীকেশ এবং হরিদ্বার ভ্রমন

যদিও মিটুলের চিকিৎসার জন্য এই দিল্লীতে আসা কিন্তু ইন্ডিয়ায় ঘুরে বেড়ানোর অনেক জায়গা থাকায় এই লোভটা কখনোই সামলাইতে পারি না যে আশেপাশের কিছু বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান ভিজিট না করা। হোটেলের পাশেই অনেক গুলি ট্রাভেল এজেন্সী আছে। সন্ধ্যায় খবর নিলাম কোথায় কোথায় যাওয়া যায়। দেখলাম, আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে সবাই একটা জিনিষই সাজেশন দিচ্ছে যে, হিন্দুদের তীর্থ স্থান হৃষীকেশ এবং হরিদ্দারে যাওয়া।

শনিবার সকাল, খুব শান্ত সকাল। ছুটির দিন বলে হয়তো ভীড় একটু কম। কিন্তু আসলে এখানে এতো গরম পড়েছে যে, মানুষ বের হতেই চায় না। মুখে তাপ লাগে যখন গাড়ির কাচ খোলা হয়। আমরা একটা এসি গাড়ি ভাড়া করলাম, যাত্রী মোট ৫ জন। আমি মিটুল, সাবিহা আপা, সাবিহা আপার মেয়ে এবং তার জামাই নাঈম। খুব ভদ্র একটা ছেলে, দেখতেও সুন্দর। দিল্লীর হোটেল থেকে প্রায় ৪/৫ ঘন্টার জার্নী। পথে পথে অনেক বার থেমেছি অনেক গুলি জায়গায়।

পাজারগঞ্জ থেকে গাজিয়াবাদ হয়ে ফরিদ নগর- আমিনাগর- মনসুরপুর হয়ে মুজাফফর নগর দিয়ে যেতে হয়। হরিদ্দারের কাছাকাছি গেলে বাহাদারাবাদ হয়ে সেলি পুর হয়ে জালাপুর । জালাপুর থেকে খুব বেশী দূর নয় হরিদ্বার। হরিদ্দারের আশেপাশে প্রচুর পরিমানে মন্দির আছে আর আছে কয়েক শত পরিমান ছোট ছোট আবাসিক টাইপের হোটেল। সম্ভবত যারা এখানে আসে, পরিবার পরিজন নিয়েই আসেন, তাই কয়েকদিন থাকার জন্য আশেপাশের মানুষগুলি একটা আবাসিক হোটেলের মতো করে তাদের কিছু ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি ঘর ভাড়ায় দিয়ে থাকেন। লাল মন্দির, উম মন্দির, আর অনেক আশ্রম আছে এখানে।

আমরা যখন হরিদ্বার পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় সারে বারোটা। প্রচুর