২৩/১১/২০২৩-বদলে গিয়েছি কি?

আমার বয়স ইতিমধ্যে ৫৯ পার হয়ে গেলো। প্রায় ৫ যুগ। নেহায়েত কম নয়। অন্য কারো জীবনে কি ঘটছে, কি ঘটতে পারতো কিংবা কি কারনে কি ঘটেছে বা ঘটে নাই সে ব্যাপারে না জানলেও আমি আমার জীবনের পুরু ইতিহাসটাই জানি। কোথায় কি কারনে কিভাবে কেনো আমার জীবনে ক্ষনেক্ষনে কিংবা পরিকল্পিতভাবে কি বদল হয়েছে, সব আমি জানি। আমি আমার বাল্যকাল দেখেছি, কৈশোর দেখেছি, যুবককাল দেখেছি, আমি আমার হতাশা দেখেছি, আমার পিছলে পড়ার দৃশ্য দেখেছি, আবার সেই পিচ্ছল পথ থেকে ভাসতে ভাসতে আমার সাফল্যকেও দেখেছি। এই বিস্তর সময়ে আমি আমার আশেপাশে থাকা অনেক মানুষজনও দেখেছি। কেউ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, কেউ হাত উঠিয়ে নিয়েছে, কেউ পাশ কাটিয়ে চলে গেছে, কেউ বা আবার বিনা কারনেই পাশে দাড়িয়েছে। কখনো কারো উপরে খুব রাগ করেছি, কখনো কারো উপরে অনেক অভিমান করেছি, কাউকে কোন কারন ছাড়াই ভালোবেসেছি, কাউকে ভালোবাসতে গিয়েও ভালোবাসতে পারিনি, আবার কারো সাথে অযথাই রাগারাগি করেছি। কেউ আবার আমার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হলেও আমি তাকে অবহেলা করেছি, আবার কারো সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য আমি নিজেই হয়তো অনেক ব্যাকুল হয়েছি কিন্তু তার নাগাল হয়তো আমি পাইই নাই। অনেক বন্ধু পর হয়ে গেছে, অনেক অপরিচিত আবার বন্ধুও হয়েছে। কখনো আমার অজান্তে শত্রু তৈরী করে ফেলেছি, আবার কাউকে কিছু না করেও আমি তাদের কাছের বন্ধু হয়ে গেছি। এককালের সবচেয়ে ভালো কলিগ পরবর্তীতে সবচেয়ে অপ্রিয় হয়ে গেছে সেটাও দেখেছি, আবার যাকে কখনোই প্রিয় মনে করিনি, সেও এক সময় এতো কাছে চলে এসছে যা কখনো ভাবিও নাই।

জীবনের এমনসব অনেক কিছুই ঘটে গেছে আমার এই প্রায় ৫৯ বছরের সময়ে। আমি এখন সেই শৈশবের দুরন্তপনা বালকের মতো ক্ষিপ্র গতিতে দৌড়াই না, এডভেঞ্চারে এখন আর সাহস পাই না, বন্ধু আসরে এখন আর সেই আগের মতো উচ্চস্বরে চেচাই না। এখন কেনো যেনো শুধু নিজেকেই নিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কি ঘটে গেলো আমার আশেপাশে, কি করতে পারতাম কারো জন্য, এগুলি আর আমাকে টানে না।

পথে হাটতে হাটতে পথে দাঁড়িয়ে থাকা অনাথ কোনো ভিক্ষুককে এখন আর কটু মন্তব্য করিনা। শুধু ভাবি, আহা রে জীবন। হয়তো তারও কোনো ইতিহাস আছে। হয়তো তারও কোনো পরিবার ছিলো, আজ তার পাশে কেউ নাই। হয়তো বা সেইই সব ছেড়ে ছুড়ে একা বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও তার কোনো জায়গা নাই এই পথ ছাড়া। এখন তাকেও আর প্রশ্ন করিনা-কেনো সে ভিক্ষা করে, কেনো সে কোনো কাজ বেছে নেয় না।

বাজারে গিয়ে এখন আর কারো সাথে দাম নিয়ে তর্ক করিনা। দাম বেশী মনে হলে ভাবি-থাক না, আমার পোষায় না, আমি বেরিয়ে আসি। হয়তো দোকানদার একটা দাম বলার জন্য অনুরোধ করে, আমি মুচকী হেসে হয়তো বলি-নাহ, পছন্দ হয়নি। বলে বেরিয়ে যাই। ভাবি-কি দরকার তার সাথে আবার দাম নিয়ে ঘাটাঘাটি করা। আবার এমনো হয় যে,-সে হয়তো একটু বেশী দামই বলেছে, তাতে কি? যদি আমার কাছ থেকে পাওয়া একটু বেশী দামে তার নিজের পরিবার আরো একটু সুন্দর হয়, কিংবা তার উঠতি কোনো প্রয়োজন মিটেই যায়, ক্ষতি কি? হয়তো ইচ্ছে করেই মেনে নেই।

একটা সময় ছিলো, ১০ টাকার রিক্সা ভাড়া ১০ টাকা না পাওয়া অবধি হয়তো ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেছি, তাও ১০ টাকার বেশী দেবো না বলে পন করেছি। এক রিক্সা থেকে আরেক রিক্সার দামদর করেছি। এখন আমি আর কোনো দামদরও করি না। কি যায় আসে যদি ১০ টাকার ভাড়া সে আমার কাছ থেকে ২০ টাকাই নিলো? সেতো আর কটি টাকা চায় নাই। হতেও তো পারে তার এই অতিরিক্ত টাকাটা আসলেই দরকার। তার মেয়ের জন্য হয়তো একটা স্কুলব্যাগ কিনবে বা অন্য কিছু। আমি আন্দাজ করে একটু বেশিই দেই। যদি দেখি তার মুখে হাসি ফুটেছে, ভাবি-ঠকাইনি, কিন্তু যদি তার মুখে এমনভাব ফুটে উঠে যে, হয়তো আর একটু বেশী দিলে ভালো হতো, আমি দেরী করি না, আরো একটু বাড়িয়েই দেই। তার মুচকী হাসিটা আমার কাছে দরকার। হয়তো এই রিক্সাওয়ালার সাথে আমার দ্বিতীয়বার আর দেখা হবেওনা। না আমি ওর নাম জানি, না সে আমাকে চিনে। কিন্তু ক্ষনিকের এই ছোট মুচকী হাসিটা নেহায়েত কম নয়।

কারো সাথে এখন আমি আর তর্কও করি না।  কারো তর্কে আমি জিততেও চাই না। বুঝতে পারি ভুল তর্ক কিন্তু আমি আর আগের মতো সেই তর্কে সরব নই। কারন, কাউকে আমি শোধরিয়ে দিয়ে তার ইথিক্সকে আমি বদলাতে পারবো না। কেউ কারো জন্যই বদলায় না। সবাই নিজের জন্যই একসময় বদলায়। যেমন আমিও বদলে গেছি। তবে আমি আগে যেমন শুধু বক্তা ছিলাম, এখন আমি ভালো শ্রোতা হয়ে গেছি। বলুক না মানুষ তাদের কথা, আমি শুনি, হাসি, কখনো কখনো চুপ থাকি, কখনো কখনো আবার উসাদ মনে এটাও ভাবি- বলুক সে তার নিজের কথা, অন্তত আমার মতো একজন শ্রোতা তো আছে যে তার কথা শুনছে। তাদের গল্পগুলিতে হয়তো অনেক স্মৃতি আছে যা আমার কোনো কাজেই লাগবে না, তারপরেও তাদের একাকীত্ব জীবনের সেই পুরানো কিছু কথা না হয় আমিই শুনলাম। তার বুকটা তো কিছুটা হলেও হালকা হলো, কিছুক্ষন সময়ের জন্য হয়তো সে আবার ফিরে যায় তার সেই পুরানো কোন দিনে, পুরানো কোনো হাসি দুঃখ মাখা জীবনে।

কেউ আমাকে মুল্যায়ন করুক বা না করুক, এখন এগুলি নিয়ে আর বেশী মাথা ঘামাই না। অবজ্ঞা করলেও আমি সেখানে তাকে অবজ্ঞা করি না। আস্তে করে হয়তো চুপিসারে সরে যাই। কোনো কিছুই বা কারো কোন মুল্যায়নে বা অবমুল্যায়নে আমার কোনো কিছুই পরিবর্তন হবে না। ইগো থেকে বেড়িয়ে যাই। প্রানভরে সবার প্রসংসা করি। কাউকে প্রসংসা করলে আমার তো কোন ক্ষতি নাই। অন্তত তাকে আমি কষ্ট দেইনি এটা ভেবেই সেটা করি। হয়তো তাকে কেউ প্রসংসাও করেনি, আমি না হয় করলাম। কি ক্ষতি?

কাউকে আমি টাকা ধার দিয়েছি, আমি কাউকে সেটার জন্য প্রতিনিয়ত চাপে রাখি না। এটা তার দায়িত্ব আমাকে সেটা বুঝিয়ে দেয়া। যদি ভালো মানুষ হয়, যদি দায়িত্তশীল হয়, যদি উপকারের কথা মনে রাখে, সে ফিরে আসবে অতি বিনয়ের সাথে। কিন্তু আমি ধরে নেই-যা দিলাম, তা দিয়েই দিলাম। যদি কখনো তা ফিরে আসে, সেটা আমারই ছিলো। যদি ফিরে না আসে, অন্তত আমি বুঝলাম, উপকার করার লিমিট হয়তো সেখানেই শেষ। কিন্তু অপদস্ত করি না।

এই দুনিয়ায় কতো মানুষ যে আছে যারা একা থাকে, যারা ভালোবাসা দিতে গিয়েও দিতে পারেনি, তাদেরকে ভালোবাসা দিতে চেয়েও অনেকে তা দিতেও পারেনি। তার কাছে হয়তো অন্য কোনো কিছু আরো প্রিয়, আর বেশী দামী। কেউ কারো ভিতরের কথা জানে না। আজিবন বলে গেলেও তাদের ভিতরের কষ্ট, সুখ, আহলাদ কোন কিছুই অন্য কাউকে বুঝানো যায় না। হাসিটা ঠটে থাকলেও সুখের অনুভুতিটা থাকে অন্তর, দুঃখের, কষ্টের বেদনার পানিটা চোখের জলে দেখা গেলেও কষ্টের অনুভুতিটা থাকে মনের ভিতরে। সেগুলি দেখানো যায় না, সেগুলি কাউকে বুঝানোও যায় না। ভাষাই যদি হতো একমাত্র প্রকাশের মাধ্যম তাহলে বোবার কথা, প্রানিদের কথা কোনো মানুষ কখনোই বুঝতে পারতো না।  পরিবর্তনও একটা ভাষা।  

আমি আমার জন্যই বাচি, এক সময় আমি বাচতে চেয়েছি আমার পরিবারের জন্য, আমার সন্তানের জন্য, আমার সমাজের জন্য, আমার দেশের জন্য। কিন্তু এখন আমি আমুল পরিবর্তীত এক মানুষ। আমি আমার জন্যই বাচি। প্রতিটি দিনকে জীবনের শেষ দিন মনে করে বাঁচি।

হয়তো একদিন সেই দিনটা খুব কাছে যখন আমার জন্যেও আর বাচার দরকার হবে না। পৃথিবী বড্ড সুন্দর, এর গাছপালা সুন্দর, মেঘলা আকাশ সুন্দর, ঝড়ো হাওয়া সুন্দর, চাঁদ সুন্দর, শীত সুন্দর, পাখীদের কিচির মিচির শব্দ সুন্দর, এমন কি কাল বৈশাখী ঝড় ও সুন্দর। কিন্তু একদিন এই সব ছেড়ে আমাকে চলেই যেতে হবে। তাহলে কার সাথে আমি কি নিয়ে তর্ক, কি নিয়ে ইগো, কি নিয়ে এতো বাহাদুরী কিংবা অবজ্ঞা করবো?

আমি অনেক বদলে গেছি।

২১/১১/২০২৩-ক্যাবিনেট সচীব মাহবুব ভাইয়ের সাথে

২০১৯ সালের দিকে যখন মাহবুব ভাই শিক্ষা সচীব ছিলেন, তখন একবার মাহবুব ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা হয়েছিল বটে কিন্তু শশরীরে দেখা করার সুযোগ এবং সময় কোনোটাই হয়ে উঠেনি। অদেখা কোন মানুশের সাথে টেলিফোনে কথা বলে তার গলার স্বর শুনে শ্রোতা নিশ্চয়ই কাল্পনিক একটা চেহারা সাজিয়ে নেন, যেমন তিনি কি মোটা হবেন নাকি চিকন, নাকি একটু বয়ষ্ক নাকি অনেক ইয়াং টাইপের।  টেলিফোনে মাহবুব ভাইয়ের গলার স্বর শুনে মাহবুব ভাইকে আমার যতোতা ইয়াং মনে হয়েছিলো, বাস্তবে তিনি আরো বেশী ইয়াং। আজ সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর সেনাকুঞ্জের দাওয়াতে হটাত করেই মাহবুব ভাইয়ের সাথে দেখা। মাহবুব ভাই এখন আর শিক্ষা সচীব নন, তিনি গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কেবিনেট সচীব হিসাবে অনেক গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। অনেক ধন্যবাদ মাহবুব ভাই।

২২/১১/২০২৩-মানুষের জীবন মৃত্যু

মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত। যতোক্ষন জীবিত আছে, তাকে নিয়ে কেউ না কেউ সব সময়ই ব্যস্ত থাকে। হোক সে স্বনামধন্য কোনো ব্যক্তি বা সবার অগোচরে পালিয়ে বেড়ানো কোনো মানুষ। যারা এই সমাজের উঁচু স্তরে থাকেন, তাদের বেলায় সবার ব্যস্ততা একটু বড় পরিসরে আর যারা কোনো স্তরেই নাই, তারা হয়তো সীমাবদ্ধ শুধুমাত্র তার ঘরে বা পরিবারের মধ্যে। যখন কেউ আর এই দুনিয়ায় থাকেন না, সবার পরিনতি প্রায় একই রকমের, অর্থাৎ মুছে যাওয়া। তদুপরি সবার সব মুছে না গেলেও তাদের কিছু কিছু কৃতকর্মের জন্য মাঝে মাঝে আলোচনার বিষয়বস্তুতে চলেই আসেন।

এই কথাগুলি বলার কারন হচ্ছে-গতকাল ২১ নভেম্বর উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াতে সেনাকুঞ্জে গিয়েছিলাম। প্রতিবছরই যাই। সেখানে এবার দেখেছি, গত বছরে যারা অনেক হোমরা চোমড়া ব্যক্তিদের তালিকায় সচল ছিলেন, তারা আজ কারো না কারো দ্বারা রিপ্লেসড এবং তারাও প্রায় মৃত কোনো মানুষের মতোই। সেই আগের হাল হকিকত নাই, সেই দাপট নাই, সেই আচরনও নাই। অথচ সেই আগের মানুষটাই আছেন, আগের নামটাতেই আছেন শুধু নাই স্তরের পজিশনটা। এখন সেখানে প্রতিস্থাপিত হয়েছেন নতুন কোনো মুখ, নতুন কোনো চরিত্র, নতুন কোনো নাম।

কথা হচ্ছিলো এককালের মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সাথে। উনি মন্ত্রী ছিলেন, কথা হচ্ছিলো সাবেক তিন সেনাপ্রধানের সাথে-জেনারেল বেলাল, জেনারেল মুবীন এবং জেনারেল আজিজ। কথা হচ্ছিলো নেভীর সাবেক প্রধান শাহীন সাহেবের সাথে। এ ছাড়াও কথা হচ্ছিলো আরো কিছু জ্বলন্ত সাবেক ব্যুরুক্রেটদের সাথে। তারমধ্যে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী পরিষদের ক্যাবিনেট সচীব ইত্যাদি। ওনারা এর আগেও এই প্রোগ্রামে এসেছিলেন, আজকেও এসেছেন কিন্তু স্তয়াটাস এক নয়। এরই মধ্যে অনেকে আবার গত হয়েছেন যারা গত বছরে এসেছিলেন কিন্তু এবার আর আসার কোনো সুযোগই নাই। কারন তারা এ বছরের সশস্ত্র বাহিনী দিবস উদযাপনের হায়াত পান নাই। আবার অনেকেই ছিলো যারা ইচ্ছে করেই আজকের দিনের এমন একটা মহাগ্যাদারিং অনুষ্ঠানে ইচ্ছে করেই আসেন নাই কারন তারা আর এই অনুষ্ঠানে আসার মত পরিস্থিতিতে নাই। কারো নামে বদনাম, কারো নামে নিষেধাজ্ঞা, কারো নামে দূর্নিতির অভিযোগে তারা প্রায় সমাজে মুখ দেখাতেও ভয় পান।

এই যে একটা পরিস্থিতি, একটা পরিবর্তন এটা শুধু করতে পারে “সময়” নামক ফ্যাক্টর। “সময়” সবকিছু পালটে দেয়। পালটে দেয় নামের আগে পরের স্ট্যাটাস। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে গত বছরের ২১ নভেম্বরের ঘটনা। মনে পড়ে তার আগের অনেক ঘটনা যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা আজ জীবন্ত থেকেও অনেকের কাছে খুবই অ-জীবন্ত। তখন সময়টা ছিলো তাদের ঘিরে, আজ তারা একই স্থানে একই ব্যক্তি একই অনুষ্ঠান হওয়া সত্তেও আজ তারা ততটাই অবহেলিত হচ্ছেন যতোটা তারা অবহেলা করেছিলেন অন্যদেরকে সেই সময়ে যখন তাদের কাধ ভারী ছিলো ব্যাজে। যখন তাদের হাতে ছিলো চেয়ারের ক্ষমতা।

দেখলাম, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ এককোনে একটা চেয়ারে বসে আছেন। কেউ তার সাথে কথাও বলার সুযোগ নিচ্ছে না। দেখলাম রাশেদ খান মেননকে, এতিমের মতো একটা জায়গায় দাড়িয়ে কার সাথে যেনো কথা বলছেন। বুঝা যাচ্ছিলো যে, তিনি কথার ছলে সময়টা পার করছেন। দেখেছি আরো বড় বড় ব্যুরুক্রেটদেরকে। তাদের এই সাবেক হিসাবে আর আগের মতো কদর যেমন নাই, তেমনি কারো কারো ঘেন্নায় দাড়িয়ে আছেন সবার মাঝে। নিশ্চয় তাদের এখন খারাপ লাগে, নিশ্চয় ভাবেন তারা যে, কেনো আর আগের মতো মানুষ তাদেরকে সেই মুল্যায়নটা করছেন না? তিনি তো আর মরে যান নাই? মাত্র সাবেক হয়েছেন শুধু। আসলে, ক্ষমতা আর অবসর বড় অদ্ভুত জিনিষ। যখন কেউ ক্ষমতায় থাকেন, তারা যদি সেই সময়টায় সেই ক্ষমতাটা ইনভেষ্টমেন্ট করতেন মানুষের কাছে, আজ যখন আর ক্ষমতায় থাকেন না, এখন তিনিরা এই সময়টায় এসে দেখতে পেতেন, প্রচুর মানুষ এখনো তাদের পিছু ছাড়ছেন না।

আমার ঘুরে ঘুরে এসব দেখতে খুব ভাল লাগে। দেখি আর ভাবি, কত অদ্ভুত সব মানুষজন। মানুষ সবদিক থেকেই চরম সার্থপর। কেউ আজকে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে, কেউ কাউকে ঠকালে এর প্রতিদান আজ না হোক, আগামিকাল এর প্রভাব হারে হারে পাবেনই। আজকে যাদের নামে রাস্তায় রাস্তায় অলিতে গলিতে ব্যানারের মাধ্যমে বন্দনা দেখি, ঠিক তার প্রস্থানে আগামিকাল তার সব ব্যানার খুলে আরেকজনের নামে বন্দনা শুরু হয়। আগেরজন এই পৃথিবীতে ছিলো কিনা এটাই মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়। আমার এলাকায় গত ৪০ বছরে একের পর এক রাজনৈতিক এমপি, মিনিষ্টার দেখেছি যাদের নামে আর ছবিতে ব্যানারে ব্যানারে রাস্তার গাছপালাও ঢেকে গিয়েছিলো। কিন্তু তাদের মৃত্যুতে কিংবা ক্ষমতা থেকে চলে যাবার পর সেইসব রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আর কোথাও দেখা যায় নাই। আমজনতা ইন্সট্যান্টলি ভুলে যায় তাদের। তারা কোটি কোটি টাকা রেখে যায় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বটে কিন্তু সেই অবৈধ আয় তার নিজের কোনো কাজে লাগে না বরং এই অবৈধ টাকার জন্য ইহকালের শাস্তির একটা বড় বোঝা কিয়ামত পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হয়।   

২১/১১/২০২৩-সশস্ত্র বাহিনী দিবস

কিছু কিছু গেট টুগেদার আসলেই নতুন পুরান মুখগুলির সাথে অনেকদিন পর হলেও দেখা করিয়ে দেয়। অনেক অতীত তখন সামনে চলে আসে, অনেক সুখ-দুঃখের, কষ্টের কিংবা সফলতার কাহিনী সামনে আসে। নষ্টালজিক করে দেয় মন এবং অন্তর। আমরা যারা ডিফেন্স ফোর্সে ছিলাম, তাদের জন্য ২১ নভেম্বর শুধু একটা সশস্ত্র দিবসই না, এটা একটা মহামিলনের মতো যোগসুত্র। প্রায় ১৮/১৯ বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহন করলেও এই সময়টায় মনে হয় আবার ফিরে গেছি সেই সময়টায় যখন সময় চলমান ছিলো আমাদের। আজ তেমনি একটা দিন ছিলো। মাননীয়া প্রধান মন্ত্রীর দাওয়াতে আমরা সেনাকুঞ্জে সবাই মিলিত হয়েছিলাম। খুব ভালো লেগেছে পুরান সেই সিনিয়ার জুনিয়ার অফিসারগুলির সাথে মিলিত হতে পেরে। তাদের সাথে বেসামরিক অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তি বর্গের সাথেও দেখা হলো যারা আমার খুব প্রিয় মানুষগুলির মধ্যে অন্যতম। এইদিনের কিছু ছবি রেখে দিলাম টাইম লাইনে। হয়তো আবারো বেচে থাকলে বছর ঘুরে তাদের দেখা পাবো ইনশাল্লাহ।

 

০৫/১১/২০২৩-আমার প্রিম্যাচিউরড রিটায়ারমেন্ট

অনেকদিন পর আবারো আমার সেই পুরানো আর্মির কথা মনে পড়লো। যেনো ব্যাপারটা মাত্র সেদিনের ঘটনা। কিন্তু ঘটয়ান মাত্র সেদিনের নয়। ২০ বছর আগের সেই কথা।

প্রায় ২০ বছর সেনাবাহিনীতে চাকুরী করার পর যেদিন সেনাবাহিনী থেকে প্রিম্যাচিউড় বা অকালীন অবসর নিয়ে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসি, সেদিন কেউ আমাকে দেখুক বা না দেখুক, কেউ আমার ভিতরের কষ্টটা বুঝুক বা না বুঝুক, আমি বুঝেছিলাম কতটা বেদনা ভর্তি ছিলো আমার মনের ভিতরে। একনাগাড়ে যে ইউনিফর্মটা আমি সকালে উঠেই পড়তে খুব গর্ববোধ করতাম, যে অফিসটায় আমি বসে কত ধরনের মিলিটারী প্ল্যান, কাজকর্ম, কুশল বিনিময় করতাম, সেই ইউনিফর্মটা আমি নিজের ইচ্ছায় খুলে ফেলছি আজ। আমার আর কখনোই সেই অফিসে গিয়ে আমার চেয়ারটায় বসা হবে না। সেই কর্মস্থলটা আর আমার না। আমি এখন শুধু একজন রিটায়ার্ড সামরীক অফিসার। অথচ আমার আরো গোটা ১০/১২ বছর কাজ করার মতো সময় হাতে ছিলো।

নিজেকে অনেক প্রশ্ন করেছিলাম, আমার কি কোনো অন্যায় ছিলো? বা আমার কোনো গাফলতি? কিংবা আমি কি এমন কেউ যাকে আর এই সামরীক বাহিনির কোনো কাজে লাগবে না? আমি যতোগুলি মিলিটারি কোর্ষ একটা তুখুর আর্মি অফিসারের করা দরকার সবগুলি খুব ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলাম। যেসব কোর্ষগুলি কমপিটিটিভ অর্থাৎ পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ন হয়ে করার যোগ্যতা লাগে, যেমন আর্মি ষ্টাফ কলেজ, আর্মি গানারি ষ্টাফ কোর্ষ ইত্যাদি সেসব কোর্ষগুলিও আমার করা ছিলো। এসব কোর্ষের জন্য অফিসাররা আপ্রান চেষ্টা করে যেখানে সফল হয় না, আমি সেসব কোর্ষগুলিও করেছিলাম। যদি বলি নিয়োগের বেলায়? তাতেও তো আমার কোনো কমতি ছিলো না। আর্টিলারি অফিসার হয়েও আমি পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল স্টাফ অফিসার (অপারেশন) যাকে জিএসও-২ (অপ্স) বলা হয়, সেটার দায়িত্বও আমি খুব সফল্ভাবে পালন করেছি। শুধু তাইই নয়, আমি খোদ আর্মি হেডকোয়ার্টারেও জেনারেল ষ্টাফ অফিসার-২ (ট্রেনিং) হিসাবে কাজ করে অনেকগুলি আন্তর্জাতীকমানের ইভেন্ট সফল্ভাবে সম্পন্ন করেছিলাম। মাইনর ইউনিটের দায়িত্ব পালন করেছি, মেজর ইউনিটের উপঅধিনায়কের কাজ করেছি। কিন্তু সেগুলির কোন মুল্যায়ন আমার হয়নি। জাতীসংঘ মিশন করেছিলাম পরপর দুটু। একটি হাইতিতে এবং অন্যটি জর্জিয়া মিশনে। এসব মিশনে কাজ করার সময় লেটার অফ এপ্রিশিয়েশনেও ভুষিত হয়েছি স্বয়ং ফোর্স কমান্ডারদের কিংবা এসআরএসজি (স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ অফ সেক্রেটারী জেনারেল) কাছ থেকে।

কোনো কিছুতেই আমার কোনো কমতি ছিল না। আর্মিতে থাকতেই আমি মাস্টার্স অফ সায়েন্স (এমএসসি), মাষ্টার্স অফ বিজনেজ এডমিনিষ্ট্রেশন (এমবিএ), এবং মাষ্টার্স অফ ডিফেন্স স্টাডিস (এমডিএস) করেছি। অর্থাৎ সেনাবাহিনীতে থাকতেই আমি তিনটা মাষ্টার্স সম্পন্ন করেছি। জেনারেল অফিসার কমান্ডিং অর্থাৎ জিওসি এর কাছ থেকে আমি আউটস্ট্যন্ডিং এনুয়াল কনফেডেন্সিয়াল রিপোর্টও (এসিআর) পেয়েছি। এতো সব উপাধী, এতো সব শিক্ষা, এতো সব আউট স্ট্যান্ডিং পারফর্মেন্স ২০০৩/২০০৪ সালে আমার প্রোমোশনের সময় কোনো কাজেই লাগলো না? অবাক হয়েছিলাম। আমার কাছের যে সব সিনিয়ার অফিসারগন আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, যারা আমাকে চিনেন, তারাও আমার উপর এমন আচরনে হতাশ হয়েছিলেন। আমার জুনিয়ার অফিসাররা যারা আমাকে মডেল মনে করে আমার মত হতে চাইতো, তারাও এক প্রকার হতাশই হয়েছিলো। ইউনিটের সৈনিকগনের মধ্যে কেমন যেনো একটা বিষন্নভাব আমি দেখতে পেয়েছিলাম। তারাও আমার প্রোমোশন না হওয়াতে অনেক হতাশ ছিলো। কিন্তু এসবের কোনো মুল্যায়ন কিংবা যোগ্যতার জন্য আমার এসব কোন কিছুই যথেষ্ঠ ছিল না। পরবর্তীতে যেটা বুঝেছিলাম সেটা হলো, আমার দরকার ছিল একটা পলিটিক্যাল লিংকআপ যা আমি কখনোই তৈরী করার চেষ্টা করিনি। সেনাবাহিনির চাকুরিটা হচ্ছে একটা ভিন্ন প্রকৃতির জব। আমি সব সময় মনে প্রানে বিশ্বাস করেছি, এখানে শুধু আনুগত্য থাকবে আমার দেশের প্রতি, জনগনের প্রতি, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি থাকার কথা নয়। অথচ সেটাই কাল হয়ে দাড়িয়েছিল আমার জন্য।

এখানে আরো একটি অলিখিত ফ্যাক্টর আমাদের ১৩ বিএমএ লং কোর্ষের জন্য সামষ্টিক সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছিল। আর সে হচ্ছে আমার কোর্ষমেট মেজর (বর্তমানে লেঃ জেনারেল) ওয়াকার। শেখ ওয়াকারুজ্জামান। ওয়াকার বংশগতভাবেই শেখ বংশের মানুষ, তার উপরে সে বিয়ে করেছিল তদানিন্তন আর্মির চীফ জেনারেল মুস্তাফিজের মেয়েকে। জেনারেল মুস্তাফিজ ছিলেন আওয়ামিলিগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আপন ফুফা। ওয়াকার একদিকে শেখ বংশের লোক, অন্যদিকে শেখ হাসিনার আপন ফুফাতো বোনের স্বামী। একটা কোর্ষের মধ্যে আওয়ামিলিগের বংশোদ্ভত এমন একজন অফিসার থাকা মানে বিরোধী দলের রাজনীতিকরা তো পুরু কোর্ষকে আওয়ামিলিগ ব্রান্ড করতেই পারে। যদিও ঢালাওভাবে এমন ধারনা পোষন করা কোনো পলিটিক্যাল পার্টিররই থাকা উচিত না। কিন্তু তারপরেও সেটাই হয়ে উঠেছিল আমাদের জন্য একটা অভিশাপ। আমরা কেউ রাজনিতি করি বা না করি, যেহেতু ওয়াকার আওয়ামিলীগের ঘরানার, ফলে আমাদের পুরুকোর্ষ যেনো হয়ে উঠেছিল আওয়ামিলীগের কোর্ষ। এ সময়ে দেশের সরকার হচ্ছে বিএনপি। ফলে ১৩ বিএমএ লং কোর্ষের বেশিরভাগ পোটেনশিয়াল অফিসারগনই পরবর্তী পদে উন্নীত হলেন না। আমিও না।

আমার বেলায় ব্যাপারটা আওয়ামি ঘরানার বাইরেও আরেকটা ব্যাপার ছিলো। তাহলে ব্যাপারটা বলি।

আর্মি স্টাফ কোর্ষের ফলাফলের নিয়ম হলো-যিনি প্রথম হন, তাকে আমেরিকায়, যিনি দ্বিতীয় হন তাকে মালয়েশিয়া আর যিনি তৃতীয় হন তাকে লন্ডনে সেকেন্ড স্টাফ কোর্ষে পাঠানো হয়। সবগুলিই গ্রাটিস কোর্ষ অর্থাৎ এক্সচেঞ্জেবল কোর্ষ। আমাদের অফিসার যাবে সে দেশে, সেই দেশের অফিসাররাও আমাদের দেশে আসবেন। খরচ আদান প্রদান। ওয়াকার আর্মি ষ্টাফ কোর্ষে হয়েছিলো তৃতীয়। কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, সম্ভবত ঠিক এই সময়ে লন্ডনের সাথে আমাদের গ্রাটিস কোর্ষের আইনটা আর বহাল ছিল না। ফলে ওয়াকার লন্ডনে দ্বিতীয় ষ্টাফ কোর্ষ করতে যায় সম্পুর্ন বাংলাদেশ সরকারের ফান্ডে। এ সময় আর্মির চীফ ছিলেন জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান যিনি ওয়াকারের শশুর আর ক্ষমতায় ছিলো আওয়ামিলিগ। রাজনীতির পট পরিবর্তনের কারনে যখন বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং আর্মির চীফ হিসাবে মুস্তাফিজ সাহেবের পরিবর্তে জেনারেল হাসান মাসউদ স্থলাভিষিক্ত হন, তখন বাংলাদেশ আর্মি থেকে ওয়াকারের জন্য আর ফান্ড পাঠাচ্ছিল না। এটা বেসিক্যালী পলিটিক্যাল রিভেঞ্জের মতো। আমি তখন আর্মি হেডকোয়ার্টারে ট্রেনিং ডাইরেক্টরীতে কাজ করি। ব্যাপারটা আমি হ্যান্ডেল করছিলাম না। ওটা ফরেন কোর্ষের অধীনে মেজর শাহরিয়ার এবং মেজর তামিম দেখভাল করেন। আমাদের ডিএমটি (ডাইরেক্টর অফ মিলিটারী ট্রেনিং) ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুবীন (পরবর্তিতে তিনি আর্মির চীফ হন)। আমি মুবীন স্যারকে বললাম, ওয়াকারের এহেনো দূর্যগপুর্ন সময়ে লন্ডনে টাকা না পাঠালে ওয়াকার কোর্ষ শেষ করবে কিভাবে? এদিকে জিএসও-২ গনও চীফের নেগেটিভ মনোভাবের জন্য ওয়াকারের ফেভারে কোনো মিনিটস শিট লিখতে ভয় পাচ্ছেন। আমি মুবীন স্যারকে রিকুয়েস্ট করলাম, যেনো আমাকে ফরেন ট্রেনিং উইং এ পোস্টিং করেন। আমি সেখানে পোষ্টিং পেয়েই ওয়াকারকে টাকা পাঠানোর নিমিত্তে একটা মিনিটস শীট রেডি করি। অনেকবার চীফের অফিসে এ ব্যাপারে আমাকে তলব করা হয়েছিল যাতে আমি এ ব্যাপারে পজিটিভ কোনো সাযেশন না দেই। কিন্তু আমি সেটা করিনি। কোন রকমভাবে শেষপর্যন্ত ওয়াকার লন্ডনে কোর্ষ শেষ করে এসেছিল। কিন্তু ঢাকায় এসে ওয়াকার এতোটাই সমস্যায় পড়লো যে, ওর আর্মিতে টীকে থাকাই ওর জন্য দায়। আর্মি হেড কোয়ার্টারেও ওর প্রবেশ যেনো প্রায় নিষিদ্ধ ঘোষনার মত। ওয়াকারের পোস্টিং তখন কুমিল্লায়। যে কোনো কারনেই হোক, ওয়াকার ঢাকায় আর্মি হেডকোয়ার্টারে আসতে চেয়েছে বা এসেছে। আর্মি হেডকোয়ার্টারে ঢোকতে “পাশ” দিতে হয়। ওয়াকার আমাকে ওর জন্য একতা “পাশ” চাইলো। আমি ওয়াকারকে “পাশ” পাঠিয়ে দিলাম। ওয়াকার আমার রুমে এলো। তার ঠিক কিছুক্ষন পর ডাইরেক্টর অফ মিলিটারী ইন্টিলিজেন্স (ডিএমআই) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদ স্যার ইন্টারকমে আমাকে জানালেন, আমি কেনো ওয়াকারকে “পাশ” পাঠিয়ে আর্মি হেডকোয়ারর্টারে আসার অনুমতি দিলাম? ওয়াকার তখনো আমার রুমেই বসা। ওয়াকারকে আমি আমার রুমে বসিয়েই রেখে চলে গেলাম ডিএমআই এর অফিসে। গিয়ে আমি বললাম, স্যার, ওয়াকার কি পিএনজি? অর্থাৎ পার্সন্স নন গ্রাটা? বা নিষিদ্ধ? যদি ওকে পিএনজি ঘোষনা না করা হয়, তাহলে আমার “পাশ” দিতে আপত্তি কি? আর সেতো এখনো সার্ভিং আর্মিতে? আর সবচেয়ে বড় কথা, ওয়াকার আমার ব্যাচমেট, আমার কোর্ষমেট, সেতো অন্তত আমার অফিসে আমার সাথে দেখা করতে আসতেই পারে!! ব্রিগেডিয়ার মাহমুদ স্যার খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, দেখো আখতার, আমার তো কোনো সমস্যা নাই কিন্তু চীফের কানে গিয়েছে যে, ওয়াকার আর্মি হেডকোয়ার্টারে এসছে। তাকে আসতে দেয়া যাবে না আর। কোন কারন নাই, বারন নাই, অথচ এমন একটা অলিখিত আইনের মধ্যে ওয়াকারকে ফেলে দিলো গেরাকলে। আমি মাহমুদ স্যারের অফিস থেকে ফিরে এলাম। তখন প্রায় ছুটি (বেলা আড়াইটা) হয় হয় ভাব। আমি ওয়াকারকে নিয়ে আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে গেলাম। রাস্তায় যেতে যেতে শুধু আমি ওয়াকারকে একটা কথাই বলেছিলাম, “ওয়াকার, যত চাপই আসুক, চাকুরি থেকে নিজের ইচ্ছায় চলে যাবি না। ওরা চায় তুই চলে যা। এটা যেনো না হয়।“ ওয়াকার সবকিছুই বুঝতেছিল। আমাদের কোর্ষে ওয়াকারের মত এতো ভাল, ধার্মিক, সৎ এবং নীতিবান অফিসার খুব কম আছে। ওয়াকার সত্যিই একজন ভাল মানুষ এবং ভাল ছেলে। আমি ওয়াকারকে আর্মিতে আসার আগেই চিনতাম। সেটা আরেক ইতিহাস।

ভাগ্য যখন খারাপ থাকে, তখন অনেক কিছুই আর কাজে লাগে না। একদিকে আমাদের ১৩ বিএমএ লং কোর্ষ আওয়ামিলিগ ঘরানার হিসাবে গন্য, অন্যদিকে আমার ব্যাপারটা তখনো চীফ মাসউদ হাসানের মাথায় জ্যান্ত, সব মিলিয়ে খুব ভাল পজিটিভ সাইডে আমার ফাইল ফাইট করতে পারেনি। প্রথমবার সুপারসিডেড হয়ে গেলাম।

আমাকে পোষ্টিং করা হলো খোলাহাটি ৪ ফিল্ড রেজিমেন্টে। লেঃ কর্নেল ফেরদৌস আমার অধিনায়ক, আমি উপঅধিনায়ক। মিশন থেকে ফিরেছি বটে, কিন্তু খোলাহাটি আমার কাছে খুব বিরক্ত লাগছিল। তবে সুখের খরর ছিল যে, আমাদের ইউনিট খুব শীঘ্রই মীরপুর ট্রান্সফার হবে। আমার কেনো প্রোমোশন হলো না এটা আমি আমার তদানিন্তত রংপুরের জিওসি জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দারকে প্রশ্ন করেছিলাম। উনি খুব ডেশিং টাইপের মানুষ। আমার ইন্টারভিউতে জেনারেল শুধু একটা কথা জানালেন যে, আমার পক্ষে আমারই জাতি ভাইয়েরা বিশেষ করে আর্টিলারি জেনারেলরা খুব একটা সোচ্চার হয়নি। তার মধ্যে ছিলেন জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার (যিনি এখন অস্ত্র মামলায় ফাসির আসামি), জেনারেল মোহাম্মাদ আলি, জেনারেল সিকদার, জেনারেল আমিনুল করিম ইত্যাদি।

প্রথমবার প্রোমোশন না হওয়াতে আমি একটা জিনিষ বুঝে গিয়েছিলাম যে, খুব শিঘ্রই আমাকে এই আর্মির ট্র্যাক থেকে অন্য আরেকটা ট্র্যাকে পরিবর্তন করতে হতে পারে। আমার প্রিপারেশন নেয়া অতীব জরুরী।

মীরপুরে চলে এলাম। সুপারসিডেদ হলেও এখানকার ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোশাররফ আমাকে উপ অধিনায়কের মতো দেখেন না। সব সি অ দের জন্য যেখানে চেয়ার পাতা হয়, কমান্ডার আমার জন্যেও সেখানে চেয়ার রাখেন। আমি ব্রিগেডের প্রুচুর ডিভিশনাল লেবেল যেমন, ষ্টাডি পিরিয়ড, আম্পায়ারগিরি, ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্টের সহযোগি ইত্যাদি রাখেন। লেঃ কর্নেল ফেরদৌসও আমাকে খুব একটা ঝামেলা করেন না। ভদ্র মানুষ।

সময় ঘুরে গেলো, আবারো প্রোমোশন বোর্ড। এবারেও আমার প্রোমোশনটা হলো না। উপরন্ত লেঃ কর্নেল ফেরদৌসকে অধিনায়ক থেকে পোষ্টিং দিয়ে আমার জুনিয়ার ১৪ লং কোর্ষের মেজর মজিদকে প্রোমোশন দিয়ে আমার অধিনায়ক বানিয়ে দিলেন। একদিকে আমি সুপারসিডেড অন্যদিকে জুনিয়ারের অধীনে উপঅধিনায়ক। বুঝতেই পারছেন, মনের ভিতরের অবস্থাটা কি। কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। কিন্তু একটা কারনে সহ্য করতে হচ্ছিলো। আর সেটা হলো, আমার চাকুরীর বয়স যদি ন্যুনতম ১৮ না হয়, তাহলে সরকারী প্লট পাবো না। এতো কাছে এসে আমি আমার অন্তত এই সুযোগটা হারাতে চাই না।

মজিদ আমাকে অসম্মান করেনা কিন্তু যা হবার তো হয়েই গেছে। (চলবে……)

৫/১১/২০২৩-মাঝে মাঝেই দেখবেন কেনো যেন মনে হয়

মাঝে মাঝেই দেখবেন কেনো যেন মনে হয়-কোথায় যেনো কি ঠিক নাই, কোথায় যেন কোনো কারনবিহীন একটা অসস্থিবোধ করছেন অথচ বলতে পারছেন না ব্যাপারটা আসলে কি। মনের আনাচে কানাচে অনেক কিছু খতিয়ে দেখেও কিছু পাওয়া যায় না যে, কেনো মনে হচ্ছে, কি যেনো ঠিক নেই। খাচ্ছেন, ঘুরছেন, ঘুমাচ্ছেন, সবার সাথে মেলামেশাও করছেন কিন্তু মাঝে মাঝেই আবার সেই চিন্তাটা মাথায় আসছে, কেন জানি অসস্থিবোধ করছেন। অথচ আপনি সেটার কারন বুঝতে পারছেন না। কাউকে জানাবেন? কিন্তু কি জানাবেন? সেটাও নির্দিষ্ঠ করে বলতে পারছেন না।

এমনি কিছু কিছু পরিস্থিতিতে আমাদের সবার সাবধান হওয়া উচিত। আমরা অনেক কিছু বুঝে উঠার আগে আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সম্ভবত কিছু একটা আঁচ করতে পারে কিন্তু তার কাছে কংক্রিট কোনো তথ্য নাই বা প্রমান নাই। সে কিছুর একটা আভাষ দেয়। তাই একটা কথা সবসময় মনে রাখা উচিত যে, বিপদের আভাষ পাওয়া মানেই সবসময় এটা ভুল নয়। এটাও তো হতে পারে যে, আপনি কারো বিকৃত মানসিকতাকে অলৌকিকভাবে অনুভব করছেন? আর এটা কোনো সন্দেহ নয়। এটাও তো হতে পারে যে, সত্যিই আপনার বিপদের আশংকা আছে!!  যখন অবচেতন মন একটা অদ্ভুত কিছুর আশংকা করে, মনে হয় যেনো something is not right, বা Something is wrong somewhere, তাই এটা জরুরী যে, আপনি সবসময় সতর্ক থাকুন। তানা হলে বিপদ যখন একদম একদিন সত্যিই সামনে চলে আসবে তখন আর প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো সময় থাকে না। ভয়কে ম্যানেজ করা আমাদের জীবনে একটা গুরুত্তপুর্ন অংশ। যদি কোনো ছোট খাটো ভয় বারবার মনে আসে, তাহলে সেটাকেই বিশ্বাস করে একেবারে প্যানিক পর্যায়ে যাওয়া বুদ্ধিমত্তার কাজ নয় কিন্তু যদি সেই ভয়ের কারন আছে বলে মনে হয় তাহলে তাঁকে ভ্রম, বা হ্যালোসিনেসন কিংবা মায়াজাল মনে করে এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়।

০৪/১১/২০২৩-অবসেসন বা অন্য অর্থে কোনো কিছুর

অবসেসন বা অন্যঅর্থে কোনো কিছুর উপর কারো একাগ্রচিত্তের মতো একটা এক তরফা ভাবনা বা বাতিক। এই অবশেসন একটা শাখের করাতের মতো। যদি অবসেসন কোনো ভালো জিনিষের উপর হয় তাহলে সেটা মানুষকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেয়ার রাস্তা তৈরী করে দেয় কিন্তু নেগেটিভ অবসেসন ভীষন বিপদ। বিপদ যেমন তার আশেপাশের মানুষদের জন্যে, তেমনি বিপদ সমাজের জন্য। আর এই অবশেসন সবচেয়ে বেশী বিপদ সেই মানুষটির জন্য যে ভুল জিনিষ নিয়ে অবসেসিস হচ্ছেন।

অনেক কারনে মানুষ এই অবশেসনে ভোগে। কখনো প্রেমের কারনে, কখনো অর্থের কারনে, কখনো নিজের অপারগতায় অন্যের উপর হিংসার কারনে, কখনো আবার এমনি এমনি। শেষেরটা হতে পারে নিছক কোনো পারিবারিক বা পরিবেশগত কারনে। যারা অবশেসিসড, তারা কিন্তু অবুঝ নন, তারা অশিক্ষিতও নন, তারা যুক্তি মানেন, তারাও আশেপাশের সবার ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন। কিন্তু তারা অবসেসিসড হয়ে গেছেন, এটা তার আশেপাশের অনেকেই জানেন না। ফলে, এসব মানুষগুলি থেকে অন্যরা যে বিপদের আশংকা আছে, সেটা হয়তো বুঝেই উঠতে পারেন না। এই নেগেটিভ অবসেসিসড মানুষ গুলিই ক্রমাগত মস্তিষ্ক বিকাসের কারনে এক সময় হয়ে উঠে সিরিয়াল কিলার, কিংবা জাগ্রত অদৃশ্য ধ্বংসাত্মক কোনো শ্রেনীর প্রতিনিধি। ফলে যখন আপনি কাউকে এমন দেখবেন যে, কোনো একটা কাজে তার নাছোরবান্দার মতো এটিচিউড, বা যুক্তির বাইরে গিয়েও কন কিছু না মেনে এক তরফা তার পিছনে লেগেই রয়েছে, সাবধান হোন। হতে পারে, আপনিই তার প্রথম টার্গেট। আর যদি পজিটিভ মনোভাব ওয়ালা কোন অবসেসিড এর সাথে আপনার সাক্কাহত হয়, তাকে ধরে রাখতে পারেন, কিন্তু এটা সব সময় মনে রাখা দরকার, সে জেনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আপনাকে ব্যবহার না করে। তাহলে বুঝবেন, সেখানেও আপনি বলীর পাঠা।

তাই এরুপ কোন অবসেসিডের কাছ থেকে হোক সে নেগেতিভ বা পজিটিভ, একটু আলাদা থাকুন। হয়তো ফলাফল খারাপ হবে না।

০৪/১১/২০২৩-সময় সব সময় সবার কাছেই দামী।

সময় সব সময় সবার কাছেই দামী। কেউ সময়টাকে পয়সার সাথে তুলনা করে আর কেউ তুলনা করে সুখ দিয়ে। একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে-সবার কাছে কম বেশী পয়সা থাকেই। যে কোন কাজ করে না, যার কোনো সোর্স অফ ইনকাম নাই, তার কাছেও কিছু না কিছু পয়সা থাকে। পয়সা আসার এই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। কিভাবে আসে, কার কাছ থেকে কখন আসে, যার কাছে আসে, সেও মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না, কিভাবে এলো। কিন্তু আসে। দিন চলে যায়, আবার আরেকটা নতুন দিন আসে। এক সময় জীবনটাই চলে যায়, তখন আর পয়সার কোন প্রয়োজন পড়ে না। তখন মনে হয়, সময়টা থাকলেই হতো, আরো কিছুদিন এই পৃথিবীর আরো কিছু সুন্দর জিনিষ উপভোগ করা যেত।

মানুষের সবচেয়ে বড় দূর্ভাগ্য হচ্ছে-সে জানে না তার সময়ের লিমিটটা কথায়। এই লিমিটটা না জানার কারনে জীবনের শেষ দিনতক মানুষ শুধু এটার পিছনেই ঘুরে। একে একে পাহাড় সমান পয়সা জমা করে ফেলে, ভাবে এইতো আর কিছুদিন পর থেকে শুধু ভোগ করবো। অন্যদিকে, পয়সা উপার্জনের জন্য সে তার লিমিটেড সময়টাকে এমন প্রান্তে নিয়ে যায় যে, সঞ্চিত পয়সা ভোগ করার জন্য যে সময়টা দরকার, সেটা তার কাছে থাকেই না। জীবনের লিমিটেড সময়টাকে সে ভাবতেই চায় না যে, কখন কতটুকু পয়সার প্রয়োজন তার সেই লিমিটেড পয়সাটাকে ব্যবহারের জন্য। ফলে যে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে সেটা হচ্ছে, হাতে জমা অনেক পয়সা রেখেই মানুষ ছেড়ে যায় তার সব সাম্রাজ্য আর সঞ্চয় করা পয়সাগুলি। তখন এগুলি অন্য কেউ ভোগ করে যা করার সপ্ন ছিলো যিনি পয়সা উপার্জনের জন্য এতোটা সময় নষ্ট করেছেন। এই যে চক্রটা, এটা সবাই জানেন, সবাই মানেন, কিন্তু কেউ এটাকে ফলো করেন না, করতেও চান না।

অদ্ভুত না ব্যাপারটা?

কিন্তু এটা অন্য কোনো পশু পাখীদের বেলায় হয় না। অথচ তাদের জীবনের মধ্যেও ভালোবাসা আছে, কষ্ট আছে, দুঃখ আছে, আছে আরো অনেক কিছু।

০১/১১/২০২৩-প্যালেস্টাইনের মুক্তিকামী সংগ্রামের ইতিহাস

প্যালেস্টাইনের মুক্তিকামী সংগ্রামের ইতিহাস গত কয়েক সপ্তাহের নয়। কিভাবে প্যালেস্টাইন এই বর্তমান পরিস্থিতিতে পড়েছে সেটার ইতিহাস বলতে গেলে অনেক অনেক লম্বা ইতিহাস বলতে হবে। সেখানে আর গেলাম না। কারো কারো সেই ইতিহাসের সত্যতা বা তথ্য নিয়ে বিভাজন হয়তো আছে, কিন্তু প্যালেষ্টাইন হটাত করে তাদের এই জন্মভুমি রক্ষার অধিকারের লক্ষ্যে গত ৭৫ বছর যাবত যুদ্ধ করছে না। এটা তো ঠিক।

বিগত আট দশক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধাবস্থানের মধ্যে গত ৭ অক্টোবরের হামাস কর্তৃক ইসরাইলের ভূখন্ডে অতর্কিত হামলার জের ধরে হামাস নিধনের উছিলায় প্যালেষ্টাইনের আপামর জনসাধারনের উপর নির্বিচারে ইসরায়েল টেক্টস বুক ইথিনিক ক্লিজিং অপারেশনে নেমেছে। জাতীসংঘ, হিউম্যান রাইটস, কিংবা অন্যান্য বিশ্ব নেত্রিত্তের কোনো দোহাইতেই ইস্রায়েলকে উক্ত গনহত্যা থেকে কেউ সরিয়ে আনতে পারেনি এবং পারবে বলেও মনে হয় না।

এখন আমার চারটে প্রশ্ন জাগছে-(১) হামাস জানে তাদের লিমিটেড সামরিক শক্তি দিয়ে এক তরফা ইসরায়েলের উপর হামলা করে একই দিনে প্রায় হাজার খানেক ইহুদীকে হত্যা করে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল তো সফল হওয়া দুরের কথা, তারা নিজেরাই টিকবে কিনা সন্দেহ আছে। তাহলে কেনো হামাস এরুপ একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিলো? (২) দ্বিতীয় প্রশ্নটা হচ্ছে-হামাস এই আক্রমনের ফলাফল জেনেও যদি ইসরায়েলের উপর এই আক্রমনটা করেই থাকে, তাহলে হামাসের মুল উদ্দেশ্য কি? তারা কি প্যালেস্টাইনকে নির্মুল করতে চায়? বা তারা কি ইসরায়েলের পক্ষে বি-টীম হিসাবে কাজ করছে? (৩) তৃতীয় প্রশ্নটা হচ্ছে-হামাসের সাথে ইরানে অবস্থিত হিজবুল্লাহ্র একটা আন্তরীক সম্পর্ক রয়েছে। হিজবুল্লাহ্র সাথে সম্পর্ক রয়েছে ইরানের, লেবাননের। আর তাদের এই মুসলিম দেশসমুহের মাধ্যমে কোন না কোনোভাবে সংযোগ রয়েছে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলির সাথে। যদি হামাস ইসরায়েলের পক্ষে বি-টীম হিসাবেই কাজ করে থাকে, বা করে তাহলে এই সম্পর্কযুক্ত মুসলিক দেশগুলি কি এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুই জানে না? (৪) চতুর্থ প্রশ্নটা হচ্ছে- ইসরায়েলের এ রকমের একক টেক্সট বুক ইথনিক ক্লিঞ্জিং এর বিপক্ষে পাশ্চাত্য দেশসমুহ  সোচ্চার না হয়ে বরং তাকে অর্থ এবং সামরীক অস্ত্র দিয়ে সাপোর্ট করছে কেনো?

এবার আমি প্রথম প্রশ্নটার ব্যাপারে বলি। হামাসের আক্রমনের দিন ইসরায়েলের একেবারে বর্ডার সংলগ্ন এলাকায় একটা অনুষ্ঠান চলছিলো। ইসরায়েল তাদের কোন ভুখন্ডেই নিরাপত্তা ছাড়া কখনোই অরক্ষিত অবস্থায় রাখে না। কিন্তু সেদিন সেখানে কোন প্রকারের নিরাপত্তার ব্যবস্থায় ছিলো না কেনো? আর অনুষ্ঠানটা হচ্ছিলো একেবারেই হামাসের নাকের ডকায় যেনো ইসরায়েল চাচ্ছিলোই যেনো হামাস আক্রমনটা করুক, মানুষ হত্যা করুক, বিশ্ববাসি দেখুক হামাস কি করলো। অন্যদিকে, আক্রমনের পরপরই ইসরায়েল একটা কথা চাওড় করেছিলো যে, হামাসকে ঘুষ দেওয়ার পরেও তারা বিট্রে করেছে। এর মানে কি? এর মানে কি এটা হতে পারে যে, কিছু কথিত হামাস দিয়ে এই আক্রমনটা ইসরায়েল নিজেই করিয়েছে? হয়তো পরিকল্পনাটা আরো বিস্তর এবং সেটা ইরান পর্যন্ত? একটা ব্যাপার লক্ষনীয় যে, গত কয়েকমাস যাবত ইসরায়েল ক্রমাগত গাজা উপত্যকায় প্যালেস্টাইন অধিবাসিদের উচ্ছেদ করে ইসরায়েলের বসতি স্থাপনা করছিলো। তাতে অনেক প্যালেষ্টিনিয়ানরা গাজা থেকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। এই ক্রমাগত অধিগ্রহনের মধ্যে আমজনতার মধ্যে একটা ধারনা আসতেই পারে যে, প্যালেষ্টিনিয়ানদের পিঠ দেয়ালে থেকে যাওয়ায় হামাস এর বদলা নিচ্ছে। অতঃপর ইসরায়েলের সমস্ত আক্রমন এখন বৈধ। হামাস মরুক বা না মরুক, গাজা মুক্ত হচ্ছে এটাই হয়তো ইসরায়েল চেয়েছে যাতে গাজা ইসরায়েলের অংশ হিসাবে একদিকে লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানের স্থল অংশের কাছাকাছি নিরাপত্তা বাহিনি মোতায়েনের একটা বৈধ সুযোগ পায়।   

এবার আসি, হামাস কি ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করেছে কিনা। হামাসের মধ্যেও দ্বিধাবিভক্তি আছে। যারা সত্যিকারের মুক্তিকামী হামাস, তারা কখনই ইসরায়েলের পক্ষে তাদের বি-টীম হিসাবে কাজ করার কথা নয়। যদি হামাসের কোনো অংশ বি-টীম হিসাবে কাজ করে, তাহলে এটা প্রকাশিত হলো না কেনো? হয়তো ইসরায়েলই চায়নি এটা প্রকাশিত হোক। আর প্রকাশ করবে কে? কোন মিডিয়া? আপনি যদি শুধুমাত্র বিবিসি, সিএনএন, এবিসি নিউজ, ইএসপিএন, ফক্স নিউজ, নিউইয়র্ক টাইমস, নিউইয়র্ক পোষ্ট, ওয়াশিংস্টন পোষ্ট, ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল, এমন কি ফেসবুক থেকে সংবাদ আহরন করেন, এরা কেহই আপনাকে সত্য সংবাদটি প্রকাশ করবে না। কারন এই সবকটি মেইন স্ট্রীম মিডিয়া ইহুদিদের দ্বারা পরিচালিত এবং মালিকানাধিন। এসব মেইন স্ট্রীম মিডিয়ার সব খবর আগে তাদের দ্বারা ভেটিং হয়, অতঃপর ব্রডকাষ্ট। তাহলে আমি বা আপনি কিভাবে নিরপেক্ষ নিউজের আশা করতে পারি? হামাসের কিছু অংশ ইসরায়েলের বি-টিম হলেও এতা জানার কনো উপায় নাই।

তৃতীয় প্রশ্নটায় অনেক ফ্যাক্টর জড়িত। মুসলিম দেশগুলি কখনোই ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, আর পারবেও না। কারন তারা টোটালেরিয়ানিজমের শাসক। ওরাও কোন না কোনো পাশ্চাত্য শক্তি এবং সাপোর্টের উপর দাড়িয়ে। ফলে যার যা খুশি হোক না কেন, তারা বহাল তবিয়তে আছে কিনা সেটাই ওদের বিবেচ্য বিষয়। ওরা অনেক কিছু জানলেও মুখ খুলবে না, কোন একশনে যাবে না। এটাই ওআইসি দেশসমুহের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

চতুর্থ প্রশ্নটার ব্যাপারে যা জানা দরকার সেটা হল, ইসরায়েলের পক্ষে আমেরিকা, কানাডা, ইউকে কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কোনো দেশই ইসরায়েলের বিপক্ষে যাওয়ার সুযোগ নাই। কারন যদি এরা ইসরায়েলের যে কোনো কর্মকান্ডকে (হোক সেটা গনহত্যা, বা জোর করে বসতিস্থাপন ইত্যাদি)  সাফাই না গায় বা তাদের পক্ষে না থাকে, তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ একেবারেই অন্ধকার। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বলি-যদিও ইসরায়েলের লোক সংখ্যা মাত্র দেড় কোটি (সারা পৃথিবীর মাত্র ০.২%, ইস্রায়েলে বসবাস ৫০ লাখ, আমেরিকাতে ৭০ লাখ, কানাডায় প্রায় ৪ লাখ আর ইউকে তে প্রায় ৩ লাখ) কিন্তু তারা সারা বিশ্ব কন্ট্রোল করে। আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট জয়ী হতে পারবে না যদি ইহুদী কর্তৃক সাপোর্ট না পায়।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নির্বাচনী ফাণ্ড বা তহবিল সংগ্রহ হয়–AIPAC (America Israel Public Affairs Committee) থেকে। আমেরিকান রাজনীতিতে তাদের প্রভাব একচেটিয়া। আমেরিকার ১০০ জন সিনেটরের ১৩ জন ইসরায়েলী ইহুদী। আমেরিকার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসররা ইহুদী এবং তারা থিংক ট্যাংক হিসাবে আমেরিকার পলিসি মেকার। আমেরিকার এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলো ইহুদীদের দখলে। ফলে আমেরিকার কেউ চাইলেও এদের কিছু করতে পারবে না। বরং জুইশ কমিউনিটি বা ইহুদি সম্প্রদাকে হাতে না-রাখলে ক্ষমতায় টেকা যাবে না। এসব কারনেই যখন জাতিসংঘের মহাসচিব প্যালেস্টাইনের পক্ষে সবেমাত্র মুখ খুলেছেন, অমনি ইসরায়েল তার পদত্যাগ চেয়ে ইউএন এর সকল কর্মকর্তার ভিসা স্থগিত করে দিয়েছে। মহাসচীব তারপরের দিনই তার গলার সুর পালটে ফেলেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধকে ইউরোপের নিরাপত্তার সিম্বল হিসাবে দেখা হয় এবং পুটিনকে দেখা হয় ইউরোপের জন্য একটি ভয়ংকর ব্যক্তিত্ব। এরপরেও পাশ্চাত্য দেশসহ গোটা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এখন ইউক্রেনকে প্রায় ছেড়েই দিয়েছে শুধুমাত্র ইসরায়েলকে সাপোর্ট করার জন্য।

যারা এ যাবতকাল পুটিন ইউক্রেনকে খেয়ে ফেললো, মেরে ফেললো, পুতিন আগ্রাসি হিসাবে ইউক্রেনের ধংশযজ্ঞ চালালো বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললো, তারা কিন্তু এখন ইসরায়েলের এমন গনহত্যায় কোন রা পর্যন্ত করছেন না। রাশিয়া গত দেড় বছরে যে পরিমান বাড়ীঘর, লোকবল ক্ষতি করেছে তার থেকে কয়েকগুন বেশি ক্ষতি করেছে ইসরায়েল মাত্র দুই সপ্তাহে। খাবার, মেডিকেশন, শিশু হত্যা, নিরিহ জনগন নির্বিঘ্নে হত্যার প্রতিবাদে হিউম্যান রাইটস এর ডাইরেক্টর পর্যন্ত নিজে ইস্তফা দিলেন, তারপরেও কিন্তু কেউ মুখ খুললেন না।   

26/10/2023-Tbilisi and Daduna’s family

  About 20 years ago, I was serving in Georgia as part of a United Nations mission from the Bangladesh Army. I spent a lot of time with many domestic and foreign military, civilian officials, many senior officials of the United Nations. I have seen their culture and traditions. It was all a new experience. But I will never forget one of these families in Georgia. I still remember them and wished to see them again. Today I am going to tell you about one such family.

I have taken a long leave of 21 days from the mission. As usual, everyone else comes to the country on vacation, I also wanted to come to the country, but I once thought that as sooner I would go to the country a few days later, so how about I take a little trip to Georgia this holiday !! Who knows when I would be back again or would even never come next !!!. I visited Tbilisi, the capital of Georgia, very less and I did not visit the capital or the surrounding cities. So I thought, let's go for Tbilisi.

The quality of hotels in Tbilisi is not so good, while those that are high-quality, the cost is skyrocketing. Meanwhile, there is an interpreter in my sector, Sorena Gamchakhurdia, with whom I have to go on duty every day. She informed me that one of her aunts lives in Tbilisi, and I could stay with them for a few days if I wished to. They may not be rich, but they're good-hearted people. If I agree, she can tell them about it.

 

 

 

 

If it were our country, we would not normally give such an offer to anyone. I am a foreigner, and I do not know anyone in whose house I am going to live, nor do they know me at all. But since I've lived in Georgia for about 8/9 months, I already understood their ethos very well. They offer their best to their guests at all circumstances. I agreed, thinking that it would be better for me to stay with a family than to stay in an isolated hotel.

 

 

 

On the appointed day I reached the airport of Tbilisi. According to Shorena, someone will come to pick me up from the airport. So I was waiting at the lobby of the airport. Then, waiting a little bit, I walked out of the airport and thought, it would be better if I buy a few packs of cigarettes. Just then, someone called me from behind in excellent English - and said, are you Major Akhtar? Looking back, a young girl of 23/24 years, absolutely blue eyed, bob cutting blonde hair, and is standing behind me. I replied: yes, I am. No further introduction right then. I took my bags and boarded in the car. While on the car, we talked a while. She said, 'My name is Deduna Bukia.' I am a journalist and sister of Shorena.

It took about 40/50 minutes to get from the airport to their home. It’s a big Condominium and located on a high ground. Nice place. From the apartment complex you can see the thick city, the blue sky, far away the Caucasus Mountains. Really good looking scenarios all around.

We got out of the car and went to the elevator. Apartment is next to the elevator. It was a family house with three or four rooms. Adjacent to the living room is a large kitchen and dining area. The other rooms are side by side. The room they have for me is the best room in the house. A new mattress, a new bed cover, new sandals and new towel ets. They did everything they could do for me. Felt very nice. They live with three sisters (Deduna Bukia, Tamara, and Salomi) and an aunt (mother). They are Shoren's cousins. Aunty is probably involved in the work of an X-ray machine in a government hospital (I don't remember the name of the department at the moment).   

Deduna is engaged in journalism. On arrival at home, I met with everyone at house and talked to everyone. Believe me, I felt like I knew them long before. I became part of their family. It's an incredible family. They didn't do anything that can hurt me, rather they did everything to make me feel better. Later in the evening, some of their other relatives came to meet me as well. Daduna’s other cousin, Russo, was a doctor. She came the next day. They were all unmarried. 

Every day we used to visit new places like park, restaurant, historical place, the market, sometimes to the beach, surrounding villages, Museums, archaeological sites, gardens, zoos, and many other places. There is no sea beach in Georgia but there is a very big bay where many tourists and locals go there and enjoys like Beach. We all as well visited such places, swims, cuddled, and walked a long way, basking sun on the beach, and played. It's been an amazing time. I forgot totally that I was a guest here. There is a famous restaurant named 'Eagle', where we had candle light dinner for two consecutive nights. The Restaurant is named after a famous Singer Group EAGLE.

While staying at house, sometimes they would dance together at home with the rhythm of the karaoke broadcasted on TV. I've had an amazing time every day. Shorena joined us in Tbilisi four days later. After that, we all had a great time together. I will never forget their love, affection and respect shown to me. It cannot be forgotten.  

Deduna is now the mother of four children, Shorena is also the mother of two, and her other two sisters (Tamara and Salome) are also living very healthy life with their husband and children. I still keep in touch with them because of Facebook and it's great when I see them living happily and peacefully. I always remember them. Auntie may no longer be alive. And I miss her.   

When I returned home from the mission, I had no heart-throbs leaving the mission, but it hurt to think that I might never see this wonderful family again. The day I left Deduna's house, I was very upset, Auntie hugged me and said - if I have time, should I go to see her again. My eyes were wet, they had become like my family. It wasn't just my eyes wet in tears but it was their eyes too.  

Today, when I look at those old pictures, I can see the memories of those past days in front of my eyes. When my children sit next to me and my grandchildren look at the pictures, they ask -who all are these people?  

With tears in my eyes, I might say with a smile -these are some of the people I've had some wonderful times with. Many of them may no longer exist. Ironically, we call these as “Pictures of the life”. My heart skipped a beat when I thought of some people from the past.

Sorena, Tamara, Deduna, Russo, all the best for all of you and let the God bless you all and keep you safe, healthy and protected always. Love you guys.

১৪/১০/২০২৩-কেনো আবির-উম্মিকার বিয়েতে রাজী হইলাম

আমি যেদিন জানলাম যে, উম্মিকা একটা ছেলের সাথে এফেয়ার্সে জড়িয়েছে, আমি একেবারেই ব্যাপারটা নেগেটিভলী নেই নাই। কারন উম্মিকার বয়স হয়ে যাচ্ছে (প্রায় ৩০) আর যেখান থেকেই যতো ভালো ছেলে বা পরিবার থেকে উম্মিকার জন্য বিয়ের প্রোপোজাল আসুক না কেনো, উম্মিকা কোনোটাতেই সায় দিচ্ছিলো না। প্রথমবার আমি উম্মিকাকে মুটামুটি জোর করেই রানার সাথে বিয়েটা দিয়েছিলাম, যদিও সেই জোরের মধ্যে উম্মিকারও অনেক ভুল ছিলো। কিন্তু আলটিম্যাটলি যেটা হয়েছে, উম্মিকার তো জীবনে একটা দাগ লেগেই গিয়েছিলো। ভুল যারই হোক, সেটার আচ আমাদের পরিবার, উম্মিকার জীবনেও লেগেছে। তাই এবার আমি নিজ থেকে উম্মিকাকে বিয়ের জন্য কোনো জোর করতে চাইনি। পক্ষান্তরে আমি এটাও চেয়েছিলাম যেনো উম্মিকা ভালো থাকে, যার সাথেই তাঁর বিয়ে হোক। সেটা আমাদের চয়েজেই হোক বা উম্মিকার নিজের। তাতে আমার কোনো অসম্মতি ছিলো না।

উম্মিকা আবিরকে ভালোবাসে, আবিরও উম্মিকাকে ভালোবাসেই বলে উম্মিকা জানিয়েছে। ছেলেটি ডাক্তার। আমার খারাপ লাগার কথা ছিলো না। উম্মিকার জীবনে যেমন একটা স্কার আছে, ছেলেটার জীবনেও তেমনি একই প্রকার একটা স্কার আছে। অর্থাৎ ওদের প্রথম বিবাহ টিকে নাই। স্কার নিয়ে ভাবিনি, এগুলি আমার কাছে খুব বেশী নাড়া দেয়নি। তাই আমি ঘটনাটা জেনে তেমন নেগেটিভলি নেই নাই।

কিন্তু বাধ অথবা খটকা লেগেছে এক জায়গায়। আবিরের কিছু তথ্যে মারাত্মক ভুল ধরা পড়ায়। যেমন, প্রথম যেদিন উম্মিকার আম্মু অর্থাৎ আমার স্ত্রী আবিরকে রাতে ফোন করলো সেদিন। আমি পাশেই ডিনার করছিলাম, আমি শুধু ওদের কথাবার্তা শুনছিলাম, কোনো উত্তর বা প্রতিউত্তর আমি দেই নাই। আমি আসলে একজন ভালো লিসেনার। আগে শুনি, তারপর ভাবি, তারপর উত্তর দেই। আবিরের সাথে উম্মিকার আম্মুর কথোপথোনে যেটা বের হয়ে এসছিলো আর আবিরের দৃষ্টিতে উম্মিকার রিভিউ হলো-

  • উম্মিকা খুব অলস।
  • ওর ডিউটির জ্ঞান কম। আবিরই মাঝে মাঝে ওর বিভিন্ন হসপিটালে ডিউটি শেয়ার করে দিতে সাহাজ্য করে। মাঝে মাঝে যদি আলসেমীর কারনে ডিউটিতে যেতে না চায়, সেটাও আবির কোনো না কোনো ভাবে ম্যানেজ করে নেয় বা দেয়।
  • বড় লোকের মেয়ে বলে টেনশন কম, খায় দায়, ঘুমায় আর মোটা হচ্ছে।
  • উম্মিকা কোনো কিছুই দ্রুত বোল্ড সিদ্ধান্ত নিতে পারে না এবং কনফিউজড। ইত্যাদি ইত্যাদি

আবির মিথ্যা কথা বলে নাই। উম্মিকা প্রায় ওই রকমই। কিন্তু মায়ের কাছে মেয়ের এসব দোষ ত্রুটি বলাতে উম্মিকার মা ব্যাপারটাকে খুব একটা পজিটিভলী নেয় নাই, নেবার কথাও না। অতঃপর উম্মিকার মার পরবর্তী কথোপথোনে বেশ বিপরীত ভাষা লক্ষ্য করলাম। উম্মিকার আম্মু সরাসরি আবিরকে জিজ্ঞেস করলোঃ

  • “তুমি কি উম্মিকাকে ভালোবাসো? উত্তরে আবির পজিটিভলীই বল্লো যে, হ্যা আবির উম্মিকাকে ভালোবাসে।
  • উম্মিকার মা আবিরকে আবার জিজ্ঞেস করলো, তোমার আগের বউ (ওর আগের বউ এর নাম ছিলো ইতি) এর সাথে কবে ডিভোর্স হয়েছে? উত্তরে আবির জানালো যে, প্রায় বছর তিনেক আগে ওদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।
  • এবার উম্মিকার আম্মু সরাসরি আবিরকে প্রশ্ন রাখলো-তুমি কি উম্মিকাকে বিয়ে করতে চাও? আবির এখানে পুরুই অকৃতকার্য হলো। ভয়েই হোক, পরিস্থিতির কারনেই হোক, আবির উম্মিকার মাকে বল্লো-সে এই ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে নাই। অর্থাৎ উম্মিকাকে আবির ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু এটা বিয়ের লগন পর্যন্ত যাবে কিনা সেটা সে জানে না।

ফলাফল-আবিরের সাথে কথা বলার পর পুরু ব্যাপারটা উম্মিকার আম্মুর কাছে প্রায় নেগেটিভ হয়ে গেলো। আবিরকে সরাসরি উম্মিকার আম্মু জানিয়ে দিলো-সে যেনো আর কোনো অবস্থাতেই উম্মিকার সাথে যোগাযোগ না করে। উম্মিকাকেও বলা হলো উম্মিকা যেনো আবিরের সাথে আর কোনো যোগাযোগ না করে। ব্যাপারটা এখানেই উম্মিকার আম্মুর কাছে একটা সম্পর্কের নিহত হবার পরিনতি পেলো।

আমি তখনো ব্যাপারটা নিয়ে নেগেটিভ পর্যায়ে যাইনি। তবে আমিও উম্মিকার আম্মুর কথায় অনেকটা নেগেটিভ না হলেও খুব একটা পজিটিভ রইলাম না। একটু ভাটা পড়লো। কিন্তু পুরুপুরি নেগেটিভ হলাম না। তবে একটা খটকা থেকে গেলো একটা কারনে, আর সেটা হলো, আবিরের বাবার প্রোফেশন, আবিরদের পারিবারিক অবস্থান কিংবা ছেলের সামাজিক অবস্থানটা কোথায় সেটা সরাসরি জানা হলো না।

পরবর্তীতে জানা গেলো যে, আবিরের বাবা মুলত মাছের ব্যবসার সাথে জড়িত। একটা লোক মাছের ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে, তাদের পরিবার হচ্ছে জেলে পরিবার, আর তাদের সাথে আমাদের খাপ খায় না।

মিটুল যেহেতু পুরুপুরী নেগেটিভ হয়ে গিয়েছিলো, ফলে, মিটুল আমাকে বল্লো, তুমি আবিরের বাবাকে একবার ফোন দিয়ে তাদের সাথে আমাদের খাপ খাবে না এবং আবির যেনো আর উম্মিকার ব্যাপারে কোনো ইন্টারেস্ট না দেখায় সেটা বলে দাও। আমি মুলত আবিরের বাবাকে কোনো ফোন করতে চাইছিলাম না। কিন্তু মিটুলের অবিরত চাপে একদিন সত্যিই আমি আবিরের বাবাকে ফোন করলাম। ফোনে কি আলাপ হলো সেটা রেকর্ড করা আছে, তাই রেকর্ডটা থেকে লিখছিঃ

আমিঃ হ্যালো, আপনি কি রাকিবের বাবা বলছেন?

আনিছঃ হ্যালো, জী,

আমিঃ আমি মেজর আখতার বলতেছিলাম। ডাক্তার আনিকার আব্বু।

আনিছঃ কোথা থেকে?

আমিঃ ঢাকা থেকে। আমার মেয়ে হচ্ছে ডাক্তার আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা। সম্ভবত আপনি নামটা জানেন। রাইট?

আনিছঃ হ্যা, বলেন, বলেন।

আমিঃ আপনি কি করেন এমনি?

আনিছঃ আমি (গলা খেকারী দিয়ে), আমি ব্যবসা করি মাছের। ১-/১২ টা পুকুর আছে, হ্যাচারী আছে। ওগুলা করি আর মাছের যে রেনু আছে সেগুলি উতপন্ন করি। এগুলি সিজনাল ব্যবসা।

আমিঃ আচ্ছা। রাকিব কি আপনাকে আমাদের সম্পর্কে বা আমার সম্পর্কে কিছু বলছে আপ্নাদেরকে?

আনিছঃ বলছে অবশ্য আমাকে। হালকা পাতলা বলছে। বলছে, একদিন আপনার পরিবারের সাথে রাকিবের কথা হইয়েছিলো। এখন ঘটনা হলো কি ...

আমিঃ আমি যেটা প্রশ্ন করি সেটা বলেন। রাকিব আমার বা আমাদের সম্পর্কে কি বলছে?

আনিছঃ আসলে আপনাদের সম্পর্কে রাকিব কিছু বলে নাই, তবে ওই যে আপনার ওয়াইফের সম্পর্কে বল্লো যে, আনিকার মায়ের সাথে কথা হয়েছে আমার। বললাম, কি ধরনের কথা হইছে?

আমিঃ আচ্ছা, আমি আমার সম্পর্কে বলি।

আনিছঃ বলেন।

আমিঃ আমি কুমা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। আমার একটা প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি আছে, একটা হাউজিং আছে, যদিও প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিটা এই মুহুর্তে সচল না আর হাউজিং টা চলমান, কয়েকটা গার্মেন্টস আছে। আমার মেয়েটা একটা স্টুপিড। মানে আমাএ মেয়েটা বলদ। ও নিজের পজিশন এবং স্ট্যাটাস বুঝে না। ওর জন্ম থেকে গাড়ি ছাড়া পায়ে হাটে নাই। মানুষ আমরা তিনজন, গাড়ি আছে চারটা। আমার কথা হচ্ছে, এগুলি বলে আমি কাউকে আন্ডারমাইন্ড করি না বা করতে চাই না। যার যার সামর্থ অনুযায়ী সে তাঁর তাঁর সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। আমি আপনার ছেলেকেও দোষ দেবো না কারন আমার মেয়েরই দোষ। কেনো তাঁর সাথে এফেয়ার্স করতে গেলো এবং তাঁর সাথে সম্পর্ক করতে গেলো। কারন সব কিছুরই কিন্তু একটা লেবেল আছে।

আনিছঃ অবশ্যই, অবশ্তই।

আমিঃ হ্যা সব কিছুর। যখন সে এই লেবেল ক্রস করে, তখন সে আর সাধারন মানুষ থাকে না। সে হয় বোকা, না হয় পাগল না হয় এবনরম্যাল। আর কেউ যদি এই সবের জন্য সপ্নও দেখে সেও মুর্খ। আমি অত্যান্ত ধইর্যিশীল মানুষ।

আনিছঃ কথাগুলি আপনি খুব গুরুত্ব পুর্ন বলছে। মানে অনেক দামী কথা বলছেন, তা বলার মতন না কিন্তু আমি তো ...যদি মনে করেন ...

আমিঃ আপনার ছেলেকে বলবেন, সে যেনো সরে যায়। আমি ওর ক্ষতি করতে পারবো কিন্তু আমি ওটা করবো না। আমি ওকে দেখিও নাই, চিনিও না। সেও আমারই সন্তানের মতো। তবে বাংলাদেশে, এই পৃথিবীতে যাদের শক্তি আছে, যাদের ক্ষমতা আছে, টাকা পয়সা আছে, তারা অনেক কিছু করে। কিন্তু বিচার হয় না। তারা অনেক সময়েই ধীর গতির বিচারের ফাক দিয়ে বড় বড় অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। এগুলি খারাপ। এগুলিতে আমি বিশ্বাস করিনা। আমি এগুলি করতে ইচ্ছুক না। কিন্তু যখন কারো গায়ে হাত লেগে যায়, আচড় লেগে যায়, যখন কারো অস্তিত্তের মধ্যে টোকা পরে, যখন সম্মানের উপর কেউ আঘাত করে, ইজ্জতের উপর হামলা করে, তখন তাকে কিকব্যাক করতে হয়। এটা আমি হয়তো করে ফেলবো। রাকিবকে বলবেন, ও যেনো কোনো অবস্থাতেই ভুলে হোক কিংবা আমার মেয়ের প্ররোচনায় হোক সে যেনো আর আমার মেয়ের সাথে যোগাযোগ না করে। আমার মেয়েও যদি যোগাযোগ করে, তাহলে রাকিব যেনো আমার মেয়েকে স্টুপিডভাবে জবাব দেয় যে, তোমার বাপ আমাদের মেলামেশা চায় না। তোমার বাপ না করছে এবং তোমরা আমাদের সমকক্ষ না।  তুমি আমাকে আর বিরক্ত করো না। আমি এখনো বলি, সবার একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে, আমরা এই স্ট্যান্ডার্ডের নীচে নামতে পারবো না। আমি যদি এখন...আচ্ছা আপনার নামটা কি ভাইয়া?

আনিছঃ আমার নাম, আনিছুর রহমান।

আমিঃ আনিছুর রহমান ভাই, আপনি একবার চিন্তা করেন তো আমি যদি আপনার বাসার আজকে কিংবা কালকে বেড়াতে আসি, আপনাকে কিন্তু আমি আন্ডার মাইন্ড করছি না, আপনি অনেক কিছু করছেন, অনেক কিছু। একটা মানুষ তাঁর জীবনের সমস্ত চেষ্টা দিয়ে যতটুকু পারে ততটুকুই আগায়। আপ্নিও তাই করেছেন। কিন্তু সেই চেষতার মধ্যে যদি এমন একটা বস্তু মিক্সড করে ফেলেন যেখানে আপনার পক্ষে সামাল দেয়াই সম্ভব না এটা বোকামী। আজকে যদি আমার কিছু বন্ধু বান্ধব নিয়ে আসি, সেই স্ট্যাটাস কি আপনি দিতে পারবেন? আমি আপনাকে আন্ডার মাইন্ড করছি না আনিছ ভাই, কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি এই সপ্নটা এবং ধারনাটা ভুল আপনার ছেলের।

আনিছঃ আসলে আমাদের আগের ছেলের বউ......

আমিঃ আপনাদের ছেলের বউ কি করেছে, কি করা উচিত ছিলো, কি না করলে কি হতো সেগুলি এন্টায়ারলি আপনাদের নিজেদের ব্যাপার। সেগুলি আমার জানার কোনো আগ্রহ নাই। আমি আপনাকে ফোন দিতে চাইনি, এটা সত্যি কথা। আমি আপনাকে চিনি না, প্রয়োজন ও ছিলো না। আমি কেনো আপনাকে ফোন দেবো? কোনো প্রয়োজন নাই তো। আপনার সাথে আমার জমি নিয়ে কোনো বিরোধ নাই, আপনার সাথে আমার কন ব্যবসা নিয়ে বিরোধ নাই, তাহলে কেনো আপনাকে আমার ফোন দেয়ার দরকার?

প্রতি বছরে আমার পাঁচ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। সেখানে এই স্টাটাসের মধ্যে কেউ যখন আঘাত করবে, সেই আঘাতের প্রতিঘাত কিন্তু অনেক বেশী কড়া। সহ্য করার মতো কিন্তু হবে না। আমি আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করি, আমি দেখিনি আপনাকে, আমার বয়স ৫৮, আমি জানি না আপনার বয়স কত

আনিছঃ আমার বয়স ৫২

আমিঃ এ জন্যই বলি, আপ্নিও এডাল্ট। আপনি বুঝেন। আপ্নিও কারো বাবা

আনিছঃ শোনেন, আপনি যেহেতু কথা গুলি বললেন......সবারই ... সবারই একটা মান...।

আমিঃ না, আমি আপনার কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি আপনার স্ট্যাটাস নিয়ে কোনো কোয়েশ্চেন করবো না। আমার স্ট্যাটাস নিয়ে অবশ্যই কোয়েসচেন করবো।

আনিছঃ অবশ্যই, অবশ্যই, আমিও আপনার কথাই বলতেছি...যার যার স্টাটাসে তাঁর তাঁর থাকতে হবে...।।

আমিঃ এক্সাটলী আমিও সেটাই বলার চেষ্টা করছি আপনাকে। এর বাইরে না।

আনিছঃ আমার কথা কি, ছেলেমেয়ে তো ভুলবনা করে। এই ভুলবনা করার পরেই তো বাবা মার কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। এমন কষ্ট হয় যা মাইনা নেয়া যায় না। আমার ছেলে ভুল করতেছে, আপনার মেয়েও ভুল করতেছে, এমন ভুলবনা তো মাইন্যা নেয়া যায় না।

আমিঃ না, সম্ভব না।

আনিছঃ কারন আমিও তো অনেক কষ্ট করে আমার একটাই ছেলে প্রাইভেট মেডিক্যালে অনেক টাকা দিয়াই পড়াইছি। কষ্ট তো আমারো লাগে। আমারো তো একটা আশা ছিলো। আমার ছেলেটা তো আমারেও কষ্ট দিচ্ছে।

আমিঃ আপনার ছেলের উচিত ছিলো যে, যেই বাবা, যেই মা নিজেরা না খাইয়া, না আনন্দ কইরা ছেলেকে মানুষ করছে, তাদের জন্য কিছু করা। কিন্তু সে সেটা করে নাই। সে তো নিমকহারাম। আমি আমার স্ট্যাটাসের জন্য, সামর্থের জন্য গর্ব ও করি না, অহংকার ও করি না। আমি মানুষের উপকার করার মানসিকতা আছে, পারলে করি, না পারলে তাঁর কোনো ক্ষতি করি না। আপনি আপনার জায়গায় ভালো আছেন, আমি আমার জায়গায় ভালো আছি। আর কিছু না। তাই আমি আপনাকে ষ্পষ্ট ভাবে বলে দিলাম যে, আপনি রাকিবকে বলে দেবেন যে, রাকিব, উম্মিকার আব্বু ফোন দিয়েছিলো এবং বলেছে যে, তাদের পরিবারের সাথে কোনো যোগাযোগ না করতে। আমি রাকিবকে ফোন দেবো না। আমার দরকার ও নাই। এর পরে যোগাযোগ ওর জন্য মংগল বয়ে আনবে না। রাকিব আমার বাচ্চার মতোই। ওর ক্ষতি আমি চাই না। ধন্যবাদ আনিছ ভাই। ভালো থাকবেন।

ব্যাপারটা এখানেই আমি আসলে শেষ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছে সব সময়ই মনে হয়েছে, উম্মিকা ছেলের সাথে যোগাযোগ নিজের থেকেই রাখছে এবং রাখবে। কিন্তু আমার আরেকটা ধারনা ছিলো যে, সম্ভবত এবার ছেলেটাই সরে যাবে। অথবা আমার মতো সাহসী হলে সরাসরি আমার সাথে দেখা করে কথা বলবে।

বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। এরপর উম্মিকার আম্মু আমাকে জানালো যে, রাকিবের বাবা ওকে ফোন করছে বারবার এবং তাঁর ছেলের বউ এর ব্যাপারে অনেক কথা বলতে চায় বা বলছে। এর মধ্যে জানা গেলো, রাকিবের সাথে রাকিরের স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি আসলে ৩ বছর আগে হয়নি, হয়েছে মাত্র কয়েকদিন আগে। তো, এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম, উম্মিকার সাথে রাকিব এফেয়ার্সে জড়িয়েছে যখন রাকিবের বউ বর্তমান ছিলো। তাহলে তো বলাই যায় যে, এটা একটা এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার্স। এমনিতেই আমরা রাজী হচ্ছি না, এরমধ্যে আবার এসব গোলমালে ইনফর্মেশন। পরিবারটাকে খুব একটা ভালো মনে হচ্ছিলো না।

আমাদের পরিবার সচ্ছল, ব্যবসা বানিজ্য যা আছে, বিষয় সম্পত্তি যা আছে, এগুলি আসলে তো আমাদের মেয়েরাই পাওয়ার কথা। যেহেতু ছেলে নাই, ফলে মেয়ের মাধ্যমে মেয়েদের জামাইরাই ভোগ করবে। এটা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি কখনোই ছিলো না। কিন্তু আজকালের ছেলেরা নিজেরা কিছু করতে চায় না, তারা আরাম চায়, ভোগ বিলাস চায় কিন্তু সেটা হতে হবে শশুড়ের টাকায়। এই লোভ থেকেই রানা এসেছিলো, রানার পরিবার এসেছিলো। আরেকবার আমি আরেকটা রানা চাই না। আমি চেয়েছি এমন একটা ছেলে যে কিনা আমার মেয়েকে চায়, যে কিনা নিজের চেষতায় বড় হবে, কর্মশীল হবে, দায়িত্ববান হবে। যার উপরে আমিও ভরষা করতে পারি। এ ব্যাপারটা আমি রাকিবের মধ্যেও দেখতে পাচ্ছিলাম না, না ওদের পরিবারের মধ্যে। আমার বারবারই মনে হয়েছে-এখানে একটা লোভের কারন কাজ করছে। আর যদি এটা হয়, সেক্ষেত্রে আমি কখনোই কারো সাথে কোনো সম্পর্ক করবো না। আমার কাছে কেউ কিছু যৌতুক চাইলে বা লোভ করলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমি এগুলি ঘোর বিরুধী। যদি আমি নিজেই দেখি যে, আমার মেয়ের কিছু প্রয়োজন, সেটা তো আমি নিজেই দেবো, চাইতে হবে কেনো? রাকিবদেরকেও আমার সেরকম মনে হয়েছে।

কিন্তু আমরা যতোই নেগেটিভ হচ্ছি, উম্মিকা ততোই জিদ ধরছে যে, সে আবিরকেই বিয়ে করবে। আমি যখন কোনো উপায় দেখছিলাম না, তখন আমি উম্মিকাকেই বললাম যে, উম্মিকা আবিরকে বিয়ে করুক, তাতে আমার কোনো অসুবিধা নাই কিন্তু সেটা হতে হবে আমাদেরকে ছাড়া। অর্থাৎ আমরা উম্মিকার স্বামী বা তাঁর পরবর্তী বংশধরদের ব্যাপারে কোনো দায়ী তো নাইই, আমি আমার যতো ব্যবসা কিংবা এসেট আছে সব কিছু থেকে আমার জীবদ্দশায় ক্যাশ করে শুধুমাত্র কনিকা আর আমার জন্য ব্যবহার করবো। এটা এক ধরনের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তই নেয়া হচ্ছে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। উম্মিকাকে ঠেকানো যাচ্ছে না যেহেতু, ফলে তাঁর ইচ্ছায় সে যা কিছু করতে চায় করতে পারে। আমি উম্মিকার সাথে প্রায় কথা বলাই বন্ধ করে দিলাম।

উম্মিকা বাসায় খায় দায়, বাসায় থাকে, আমার সাথে ওর কোনো কথাবার্তাই হয় না। উম্মিকা নিজেও বাসায় খুব একটা যে কম্ফোরট্যাবল তা কিন্তু না। মাঝে মাঝে উম্মিকা নিজের থেকেই উপজাজক হয়ে কথা বলতে এলেও আমি হু হা করে উত্তর দেই। ধরা যায়, উম্মিকার সাথে আমার বিস্তর একটা গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে।

আমার এতোসব কঠিন ব্যবহারেও উম্মিকা তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে নারাজ। উম্মিকা আবিরের (রাকিব) সাথে যোগাযোগ রেখেই চলছে এবং চলমান। উম্মিকা অনেকবার আমার সাথে সহজেই মিশতে চেয়েছে কিন্তু আমার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার রিস্পন্স না পাওয়ায় উম্মিকা প্রায় একঘরেই হয়ে যাচ্ছে নিজের বাসায়। উম্মিকার আম্মু অনেকবার উম্মিকাকে বুঝানো চেষ্টা করলে খুব একটা লাভ হচ্ছিলো না। এভাবেই বেশ কয়েক মাস কেটে গেলো। আমি ধরেই নিয়েছি-উম্মিকা আর আমাদের মাঝে নেই। সে হয়তো আবিরকে (রাকিবকে) বিয়ে করবে, আর আমরা ওকে হারাচ্ছি, অর্থাৎ উম্মিকাও আমাদেরকে হারাচ্ছে।

আমি আরেকটা জিনিষ খুব ভালো করে বুঝে গেলাম যে, আমার অবর্তমানে আসলে আমার সম্পত্তি বিশেষ করে জায়গা জমিরাত, কিংবা অন্যান্য ব্যবসা কেউ চালাতে পারবে না। আমার মেয়ের জামাইরা এগুলি খুব অল্প সময়েই হয় বিক্রি করে দেবে, নতুবা ধংশ করবে। ফলে আমি এবার আরেকটা সিদ্ধান্তে অটল হয়ে গেলাম জে, আমার জীবদ্দশায় আমি আমার সব জমি জেরাত বিক্রি করে টাকায় ক্যাশ করে ফেলবো। শুধু রিভার সাইড গার্মেন্টস টা রাখবো। আমি হিসাব করে দেখলাম, আমার বৃদ্ধ বয়সে আসলে আমার দরকার টাকা যেখানে আমি প্রয়োজনে ৫/৬ টা কাজের লোক রেখে জীবনের সব শারীরিক কাজ গুলি সেরে নিতে পারবো। জমি জিরাত রেখে কোনো লাভ নাই। এর ফলে আমি ইতিমধ্যে চান্দের চরের জমিগুলি (যেখানে হাউজিং করার পরিকল্পনা করেছিলাম) বিক্রির খদ্দেরের সাথে পাকা করে ফেললাম। পলাশপুরের জমিগুলিও বিক্রি করা শুরু করলাম। আমি ধরে নিলাম, এই মুহুর্তে আমার শুধুমাত্র রিস্পন্সিবিলিটি হচ্ছে কনিকা আর আমার স্ত্রী। উম্মিকা আমার লিষ্ট থেকে বাদ হয়ে গেলো। আমি রাকিবের সাথে সম্পর্ক রাখার কারনে আমি উম্মিকার উপরে খুবই অসন্তুষ্ট এবং রাগ।

আমার আচরনে এবং ব্যবহারে আমার স্ত্রী মিটুল ও অনেকটা মন খারাপ করে থাকে। বুঝা যায়, সে প্রতিদিনই উম্মিকাকে মুটভেট করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমার সাথে কোনো প্রকার তথ্য শেয়ার করে না। এর মধ্যে আবিরের (রাকিবের) বাবা সম্ভবত আবারো মিটুলকে ফোন দিয়েছে যাতে অন্তত মিটুল তাঁর কথাগুলি শোনে। মিটুল কিছুতেই তাদের ব্যাপারে কোনো কথা শুনতে নারাজ, আবার অন্যদিকে উম্মিকাও তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে নারাজ।

তো এর মধ্যে রাকিবের বাবা আবার আমাকে ফোন দিলো। কিন্তু আমি প্রথমে ফোনটা ধরতে পারিনি, নামাজে ছিলাম। তাই নামাজ শেষে আমিই তাকে ফোন করলাম। ফোনের বিবরনটাও এখানে লিখিঃ

আমিঃ ভাই, আপনি কি আমাকে ফোন করেছিলেন?

আনিছঃ জী ভাই, আমি আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম। ভাই, সেদিন তো আপনি ফোন দিছিলেন কিন্তু আমি তো কোনো কথাই বলতে পারলাম না। যে কথা বললেন সেদিন, অন্যের কথা শুনে তো আর সব কিছু বিচার করা যায় না। আমার জায়গাতে তো আমি কষ্টেতে আছি, আমার ছেলে নিয়া, আমার ছেলের বউ নিয়া।

আমিঃ আপনার পয়েন্ট টা কি?

আনিছঃ আমার ছেলের বউ কি বল্লো আর কি না বল্লো......

আমিঃ না আমি তো আপনাকে সেদিন খারাপ কিছু বলিনি। আজকে আপনার পয়েন্ট টা কি? কি নিয়ে আপনি আমার সাথে আলাপ করতে চাচ্ছেন?

আনিছঃ না, এই যে আমার ছেলের প্রতি আপ্নারা যে বলতেছেন যে, আমার ছেলের দোষ, আমার...

আমিঃ আমি তো আপনার ছেলের কোনো দোষ দেই নাই। আমি তো বলছি যে, এটা আমার মেয়েরই দোষ। সে ভুল করেছে। এ জন্য আমি আপনাকে বলেছিলাম যে, আপনার ছেলেকে আমার মেয়ের থেকে বিরত থাকতে বলেন। কাহিনী শেষ। আবার কি বলতে চাচ্ছেন এখন আমাকে?

আনিছঃ আমি বলতে চাচ্ছি জে, ওই মেয়েটা যা যা বলছে...

আমিঃ কোন মেয়েটা?

আনিছঃ ওই যে আমার ছেলের বউ।

আমিঃ শোনের আনিস সাহেব, আপনার ছেলের বউ এর সাথে আমার কোনো কথা হয় নাই।

আনিছঃ আপনার সাথে হয় নাই, কিন্তু আপনার ওয়াইফের সাথে কথা হইছে, অনেক কিছু বলছে। তারপর আপনার ওয়াইফ আমাকে ফোন দিয়ে অনেক কথাই বল্লো। অনেক কথাই। বল্লো, আপনার ছেলের বউ থাকতে আপনার ছেলে আমার মেয়ের সাথে আবার সম্পর্ক গড়ছে......এতো বড় সাহস কোথায় পায়?

আমিঃ কি মনে হয় আপনার? আমার বউ কি কোনো কিছু ভুল বলছে? আপনার ছেলের একটা বউ থাকতে সে আবার আমার মেয়ের সাথে পরকীয়া করতেছে, এটা কি ঠিক হইছে?

আনিছঃ তা ঠিক আছে......

আমিঃ মানে? কি ঠিক আছে? কি ঠিক আছে? এটার মানে কি এটা যে, একটা বউ থাকবে, আরেকটা মেয়ের সাথে সে পরকীয়া করবে, এটা ঠিক আছে?

আনিছঃ না না সেটা ঠিক নাই। আমি তো বলতে চাচ্ছি যে, আমার ছেলেও ভুল করছে, আপনার মেয়েও ভুল করছে। আপনার মেয়েও জানে আমার ছেলের বউ বিদ্যমান।

আমিঃ না, উম্মিকা সেটা জানে না। আমাকে উম্মিকা সেটাই বলেছে যেটা সে জানে।

আনিছঃ না, জানে আপনার মেয়ে অবশ্যই জানে।

আমিঃ তাহলে এখন আপনি আমাকে কি বলতে চাচ্ছেন? আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে, এখন আপনার ছেলেকে দিয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করাইয়া দেই?

আনিছঃ না, সে রকম না।

আমিঃ তাহলে কেনো ফোন করেছেন আমাকে? বলেন না? কি চান আমার কাছ থেকে? আমি রাগ হচ্ছি এখন। কি চান আমার কাছ থেকে?

আনিছঃ আমি চাচ্ছি, আমার ছেলেকে যে হুমকি ধামকী দিচ্ছে আপনার ওয়াইফ। আমাকে বলে যে, আপনার ছেলে এই করেছে, সেই করেছে ......

আমিঃ শোনেন আনিছ সাহেব, আমি এবং আমার ওয়াইফ শুধু একটা কথা আপনার এবং আপনার ছেলেকে পরিষ্কার করে জানিয়েছি জে, আপনার ছেলে যেনো উম্মিকার সাথে কোনো যোগাযোগ না করে এবং আমার মেয়েও যদি আপনার ছেলের সাথে যোগাযোগ করতে চায়, সে যেনো আর না করে। তা না হলে...

আনিছঃ আমি আমার ছেলেকে আপনাদের কথাগুলি বলে দিয়েছি।

আমিঃ জী, সেটাই বলবেন। আমি কারো কোনো ক্ষতি করতে চাই না। কিন্তু যখন এটা আমার গায়ে আসবে, ডেফিনিটলী আমি একশান নেবো, কোনো সন্দেহ নাই। আপনার ছেলের এটা একটা অবাস্তব চিন্তাভাবনা।

আনিছঃ আমিও এটাই বলেছি আমার ছেলেকে।

আমিঃ আনিছ ভাই, আমাকে শুধু একটা কথা বলেন, হাউ মাচ ইউ হেভ ব্যাংক ব্যালেন্স? টেল মি? কতটুকু ব্যাংক ব্যালেন্স আছে আপনার?

আনিছঃ কার আমার?

আমিঃ আপনাদের।

আনিছঃ আমাদের আর কত আর ব্যাংক ব্যালেন্স আছে?

আমিঃ শোনেন। নাম্বার টু, একটা ছেলে কিভাবে সব জেনেশুনে আমাদের মতো একটা অসম পরিবারের সাথে একটা সম্পর্কে জড়াইতে চায় যেটা একটা অবাস্তব? কেউ যদি তাকে প্রলোভন ও দেয়, তাঁর খুব কেয়ারফুল হ ওয়া উচিত ছিলো। এটা শুধু এবসার্ড না, এটা ইম্পসিবল পার্ট। কি করে সম্ভব হয়? আপনি কি আপনার বর্তমান স্ট্যাটাস নিয়ে আমার সামনে চেয়ারে বসতে পারবেন? আপনি আমার বাড়িতে এসে আমার সামনে বসতে পারবেন? ঠিক আছে আনিছ ভাই, আমি আপনার সাথে এ ব্যাপারে অনেক কথা বলতে চাই না। ঠিক আছে, আই ডোন্ট মিক্স আপ উইথ পিপল হু ইস নট ইকুয়াল টু মি!! আই এম গুড টু গুড পিপল বুত আই এম অলসো ব্যাড ফর ব্যাড পিপল। জাষ্ট রিমেম্বার ইট। থ্যাংক ইউ।

এরপরে আমি আর তাঁর সাথে কোনো কথা বলি নাই। বলার দরকারও মনে করি নাই। অতঃপর ঠিক পরেরদিন রাকিব (আবির) আমাকে একটা হোয়াটস আপ ম্যাসেজ করে। এই ম্যাসেজটা আমাকে আরো ক্ষিপ্ত এবং রাকিবের ব্যাপারে আরো নেগেটিভ করে তোলে। ম্যাসেজটা ছিলো এ রকমঃ

১১/৬/২০২৩

Sorry apnake WhatsApp e  txt korar jonno. Amar Baba ke call diye onek kotha bolechen. Apni to educated person tahole kono Kichur judge korte hoile dui pokkher kotha sune proper information jene then right or wrong judge korte hoy aita to janen. Apni Jodi kichu bolte chan tahole age proper information gula right place theke niye then judge korben asha kori.  Power status esob er gorom  na dekhiye sob kichur sothik information niye then kotha bolle valo hoy. Ak hate tali baje na. Amake Amar Baba ke na jene bhuje mon gora dosh diye kotha bolben aita kono educated person er porichoy na. Age Amar name akta bad report ber kore then amake wrong judge korben.jodi kono akta single bad report ber Korte paren amar name jekono sasti diben Ami Mene nibo .

আমি বাসায় এসে উম্মিকাকে এবং উম্মিকার মাকেও ব্যাপারটা পড়ে শোনাই। আর বলি- আমার সাথে ওর বাপের কি কথা হইছে সেটা আমাকে সে চার্জ করেছে। আমাকে দেখলো না, কথা হইলো না, কত স্টুপিড যে, সে আমাকে এমন একটা ম্যাসেজ লিখে যেখানে আমার শিক্ষা, আমার পজিশন, আমার স্ট্যাটাস নিয়ে প্রশ্ন করে? এ তো রানার থেকেও খারাপ। রানা তো বিয়ে করার পর কিছুটা হলেও অধিকার পেয়ে আমাদেরকে উলটা পালটা ম্যাসেজ দিয়ে খুবই নোংরা কথা লিখতো। আর এই বেটা তো কোনো সম্পর্কই হয় নাই, তাতেই এখন এই অবস্থা। আর যদি সম্পর্ক হয়, তাহলে কোন লেবেলে যাবে? আমিও উম্মিকাকে আরো কঠিন করে শাসালাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো বলে মনে হলো না। আমি বারবার উম্মিকাকে এই ছেলে থেকে সরে আসতে বললাম। কিন্তু উম্মিকার আচরনে এই ছেলে থেকে সরে আসার কোনো লক্ষন দেখা গেলো না।

যাই হোক, রাকিবের ম্যাসেজের উত্তর আসলে আমি দিতে চাইনি। কিন্তু আমার মনে হলো, আমি তো ওর সাহে কোনো কথা বলি নি, অন্তত আমার মাইন্ড টা সে বুঝুক তাই একটা ম্যাসেজ দিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি ১৬/৬/২০২৩ তারিখে ওকে ম্যাসেজের উত্তর করেছিলামঃ

I wonder receiving such kinds of message again from your side where I clearly and explicitly told you that we are not interested about you even you are having 100% honesty, 100% best quality or even the BEST reputation at your end. I along with my family am not at all interested to know or search any kinds of information about you and your family on what was right and what was not. That belongs to yours and no way affects us anyway. What my daughter did was a childish move.  I wish, you would not dare enough again to communicate me with any kinds of such message in future as we have no connections in any way. Even, I would not expect you to reply me on this message. Hope you respect yourself and that's very important for a person's character. I don't block people as it entails bad gradings.  An advise to you as an elder, be attentive with your carrier, build it on your own, you will be better rest of your life. Thanks. (Major (Retd) Akhtar Hossain, PhD, MSc, MBA, MDS, psc, G+,

উম্মিকা কিছুতেই রাকিবের কাছ থেকে সরে আসছিলো না। তারপর মনে হয় উম্মিকাই রাকিবকে আবার সরি আকারে একটা ম্যাসেজ দিতে বলেছে আমাকে। এটা আমার ধারনা। সেই ম্যাসেজটা ছিলোঃ

Assalamu  Owalaikum Baba.

Kmn achen apni ?Kalke apnar office theke asar por khub druto duty te chole jaoay  apnake r call dite pareni .Kalke night duty theke onek patient er pressure chilo .ajkeo saradin onek pressure giyeche. Tobe nana kajer besto tar majhe onek bar apnar kotha mone hoyeche . Call diye hoyto onek kichuei bolte parbo na tay sms kore bolte iccha korlo . Apnar sathe dekha hoar purbe moner moddhe hajar ta voy r dridha donde last koekdin onek beshi mental stress e chilam . Thik vabe ghum khaoa daoa kono kichuei korte pare ni ato ta beshi stress e chilam. Tobe apnar sathe  kalke jetuku time kotha hoyeche . Apnar proti ta kotha apnar protita motivation family nijer jibon niye notun vabe amake bachte sikhate asha jagiyeche. Amar jibone er sotti porom souvaggo ami apnar moto akjon manusher mentorship e notun vabe nijeke niye beche thakar sopno khuje peyechi . Amar kache mone hoyeche Anika jemon amar jibone thik joto ta blessing hoye eseche ,thik Apnar moto akjon baba jar proper guideline pele sotti Jibone onek dur egiye jaoa somvob. Amar kache mone hoyeche apnar moto akjon baba paoa sotti amar moto akta cheler jonno onek vagger bepar . Allah r kache shudu aituku chay samner din gulote apnader doa niye jeno agami te valo kichu kore dekhate pari. apnader kache nijeke akjon Apnader joggo sontan hisebe proman korte pari . Apnar sathe kotha bolar por amar onek beshi valo legeche . Hoyto apnake samna samni bolar sahos ta hoyni  Tay sms kore apnake janalam Baba.

ম্যাসেজ পড়ে তো আমি আরো হতাশ। সে আমাকে সরাসরি “বাবা” বলে সম্বোধন করে লম্বা একটা আকুতির ম্যাসেজ পাঠালো। আমি আর এই ম্যাসেজের উত্তর দেইনি। কারন, উত্তরে আরো উত্তর, তাঁর উত্তরে আবারো উত্তর। তাই আমিই উত্তর দেয়া বন্ধ করলাম।

উম্মিকা বুঝে গিয়েছিলো, আমি ওর একক সিদ্ধান্তেও রাজী নই। যদি সে বিয়ে করতেই চায় রাকিবকে, সেটা ওর ব্যাপার। তবে আমি উম্মিকাকে এই মর্মে একটা সতর্ক বানী শোনালাম যে, যদি আমার সিদ্ধান্তের বাইরে উম্মিকা রাকিবকে বিয়ে করে তাহলে সে আমার কোনো সম্পত্তি পাবে না, তাঁর ছেলেমেয়ে কিংবা পরবর্তী বংশ ধরেরাও আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তবে আমার মেয়ে হিসাবে শুধুমাত্র উম্মিকার আসা যাওয়ার অনুমতি থাকবে, অন্য কারো নয়। আমি এর মধ্যে একটা ড্রাফট ও করে ফেলেছিলামঃ

আমি নিম্নবর্নীত স্থাবর-অস্থাবর জমিজমা, সম্পত্তি এবং অন্যান্য বিষয় সম্পত্তি সত্তবান ও মালিকানা বিদ্যমান দখলদার আছি। আমার দুই মেয়ে এক স্ত্রী বিদ্যমান। আমার এখন শারিরীক অবস্থা খুব ভালো না বিধায় আমি আমার নিম্নবর্নীত বিষয়াদি আমার ছোট মেয়েকে (সানজিদা তাবাসসুম কনিকা) একচ্ছত্র মালিকানা করিয়া এই উইল করিলাম। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ থাকে যে, আমার বড় মেয়ে আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা তার নিজের ব্যক্তিগত সার্থের কারনে, তার পছন্দমত একজন বিবাহিত পুরুষের সাথে পরকীয়া করার কারনে, আমাদের কোনো সৎ পরামর্শ না শোনার কারনে এবং উপর্যপরী তার একক সিদ্ধান্তে অটল থাকার কারনে আমি এইমর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমার সমস্ত স্থাবর অস্থাবর বিষয়-সম্পত্তি তার কিংবা তার পছন্দ করা পুরুষের কিংবা তার পরবর্তী বংশধর, আওলাদ (উভয় ছেলে এবং মেয়ে আওলাদ) এর হাতে নিরাপদ নয়। আমার বড় মেয়ে এমন কিছু খারাপ মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করে, এবং প্রায়ই সেই বন্ধুত্ব পরকীয়ায় রুপ নেয় যা আমাদের পরিবারের সাথে খাপ খায় না। তার মধ্যে পরিবারের ইজ্জত, মান সম্মান, কিংবা ঐতিহ্যের প্রতি কোনো প্রকার সম্মান নাই। ফলে দেখা যায় যে, আমার বড় মেয়ের এহেনো নীচ কাজের জন্য অনেক আজেবাজে লোভী পুরুষেরা তার সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে আমাদের এই সাজানো সংসার, আমাদের কষ্টার্জিত সম্পদের উপর লুলোপ দৃষ্টি দিয়ে আমার বড় মেয়েকে যে কোনোভাবে পটিয়ে তারা তাদের সার্থ হাসিল করতে চায়। অনেকবার আমার বড় মেয়েকে এ ব্যাপারে সাবধান করার পরেও সে বারবার একইরুপ ব্যবহার, আচরন প্রদর্শন করছে। সে নিজে একজন ডাক্তার কিন্তু তার মধ্যে এখনো পরিবার, পরিবারের মান সম্মান কিংবা আমাদের মান সম্মানের প্রতি কোনোরুপ তোয়াক্কা করেনা। আমার এই সম্পত্তি অনেক কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত বিধায় শুধুমাত্র আমার বড় মেয়ের খামখেয়ালীপনা, পরকীয়া এবং খারাপ মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করিয়া আমার ওয়ারিশ হওয়ার কারনে সে কিংবা তার পরকীয়া পুরুষ কিংবা তাদের ঔরসজাত সন্তানেরা, বংশধরেরা কিংবা তার ভবিষ্যৎ আওলাদ্গন আমার কোনো সম্পত্তির মালিক হইতে পারিবে না। আমি আমার এই উইলের মাধ্যমে এইমর্মে বিধান দিতেছি যে,

(ক)      আমি সজ্ঞানে, নিজের ইচ্ছায় এবং অন্যের কোনো প্রোরোচনা ব্যতিত আমি আমার বড় মেয়ে, তার স্বামী, তার বংশধর, তার আওলাদ (ছেলে কিংবা মেয়ে উভয়) এবং তার পরবর্তী যে কোনো বংশধর আমার সরবপ্রকার বিষয়াদি, স্থাবর-অস্থাবর, ব্যবসায়িক, ক্যাশ, জমিজমা, বাড়িঘর, কিংবা যে কোনো সামাজিক পজিশন থেকে বাতিল বলিয়া বিধান করিতেছি। অর্থাৎ আমার বড় মেয়ে আমার কোনো কিছুই প্রাপ্য হইবে না।

(খ)       আমার সাথে আমার বড় মেয়ের পিতৃত্ব, ওয়ারিশান কিংবা দেশের বা ধর্মের প্রচলিত যে কোনো আইনের ধারার বিনিময়ে সুযোগ নিয়ে আমার নিম্নবর্নীত জমি জমা, ঘর বাড়ি, বিষয়াদি, ব্যবসা বানিজ্যের কিংবা আমার পেনশনের অথবা যে কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে কোনো প্রকার ভাগ বা অংশীদার হবার কোনো সুযোগ নাই এবং রাখিলাম না। 

(গ)       এখানে আরো উল্লেখ থাকে যে, আমার ছোট মেয়ে আমার সমস্ত জমিজমা, ঘরবাড়ী, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে প্রাপ্য সম্পদের একচ্ছত্র মালিকানা হইবে।

(ঘ)       কোনো কারনে যদি আমার ছোট মেয়ে তার বড় বোনের উপর সদয় হইয়া আমার অনুপস্থিতিতে আমার বিষয়াদি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, কিংবা ব্যবসায়িক অংশ থেকে কোনো কিছু প্রদান করিতে চায়, সেটা আমার ছোট মেয়ে করতে পারবে না বলে আমি বিধান করিতেছি। এমনকি, আমার ছোট মেয়ে আমার কোনো সম্পত্তি কিংবা বাড়িঘর যে কোনো বিষয়াদি বিক্রি করিয়া সেই অর্থ তাহার (ছোট মেয়ের নামে) গচ্ছিত রাখিয়া উক্ত টাকা হইতে কোনো প্রকার অর্থ আমার ছোট মেয়ে আমার বড় মেয়েকে প্রদান করিতে পারিবে না। অর্থাৎ আমার যে কোনো সম্পত্তি হইতে পরোক্ষা বা প্রত্যক্ষভাবে আমার বড় মেয়ে কোনো কিছুই পাইবে না বলিয়া আমি বিধান করিতেছি। কোনো কারনে যদি আমার ছোট মেয়ে দয়া পরবশ হইয়া আমার সম্পত্তি, বাড়িঘর, জমি জমা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমার বড় মেয়েকে হস্তান্তর, দান, কিংবা সাহাজ্য করতে চায়, তাহলে আইনগতভাবে আমার ছোট মেয়েকে দোষী সাব্যস্থ্য করিয়া আমার এই বিধানের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে তাকেও শাস্তি প্রদান করিতে আমি ফার্স্ট ক্লাস মেজিষ্ট্রেট, এবং প্রশাশনকে ক্ষমতা প্রদান করিলাম।

(ঙ)      এই দলিলে উল্লেখা করা আমার জমাজমি, বাড়িঘর এবং স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি আমার ছোট মেয়ে, তার বংশধর, এবং পরবর্তী আওলাদেরা (উভয় ছেলে এবং মেয়ে) আজীবন ভোগ, বিক্রি কিংবা হেবা (আমার বড় মেয়েকে ব্যতিত), কট, মর্টগেজ করতে পারবে। তবে এখানে উল্লেখ থাকে যে, যে কোনো বিক্রি অবশ্যই ফার্স্ট ক্লাস মেজিষ্ট্রেটের অধীনে করতে হবে এবং কোন কারনে উক্ত জমিজমা, স্থাবর অস্থাবর বিক্রি কিংবা কট, মর্টগেজ করা হলো তার প্রকৃততথ্য এবং হিসাব দেয়ার পরেই শুধুমাত্র তা আমার ছোট মেয়ে, তার বংশধরেরা, আওলাদেরা তা করতে পারবে। কোনো অবস্থাতেই কোনো অংশ বা টাকা বা হেবা, দান কিংবা এই জাতীয় কোনো কর্ম আমার বড় মেয়ের জন্য বরাদ্ধ হইবে না এইমর্মে প্রশাসনকে হিসাব দিয়ে তারপর করতে পারবে বলে আমি বিধান করছি।

(চ)       এখানে উল্লেখ থাকে যে, আমি নিম্নবর্নীত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আমার জীবদ্দশায় যতটুকু সম্ভব বিক্রি করে অর্জিত টাকা আমি ক্যাশ ওয়াকফ করে যাওয়ার নিয়ত করিয়াছি। কোনো কারনে যদি আমার এই সপ্ন সফল হইবার আগেই আমার মৃত্যু হয়, সে কারনে আমার এই উইল করা। এখানে আরো উল্লেখ থাকে যে, আমার জীবদ্দশায় যতটুকু আমি বিক্রি করে শেষ করতে পারি, সেই টুকু আমার উইল থেকে বাদ যাবে এবং বাকী সম্পত্তিতে আমার পূর্বের সব শর্তাবলী নিবন্ধিত থাকবে।

(ছ)       এখানে আরো উল্লেখ থাকে যে, আমার বড় মেয়ে যদি তার ভুল বুঝে তা সংশোধন করে তার এসব খারাপ রুচীসম্মত কর্ম কান্ড থেকে বিরত থাকিয়া পুনরায় আমাদের পরিবারের মান সম্মান বজায় থাকে এমন কাজের বহির্প্রকাশ এবং তার চর্চা আমাকে দেখাইতে পারে, তাহলে আমি আমার জিবদ্ধশায় হয়তো পুনরায় এই উইল পরিবর্তন করতে পারি। কিন্তু আমার বড় মেয়ের এসব চারিত্রিক বৈশিষ্টের কোনো কিছুই পরিবর্তন না হয় এবং আমি তার উপর সন্তুষ্ট না হইয়া মৃত্যু বরন করি, তাহলে আমার এই উইলে যা যা শর্ত আমার বড় মেয়ে, তার ঔরসজাত সন্তান সন্তানাদি, আওলাদ (ছেলে বা মেয়ে) এর উপরে বয়ান করা হয়েছে, তা বলবত থাকবে।

এমন একটা পরিস্থিতিতে উম্মিকা আর রাকিব নিজেরাই এগিয়ে যাচ্ছিলো নিজেরা নিজেরা বিয়ে করে সংসার করার জন্য।

একদিন রাতে উম্মিকার মা, আমাকে খুব শান্ত গলায় কিছু কথা বলার চেষ্টা করলো। তাঁর কথার সারমর্ম এরুপ যে,

উম্মিকা আর রাকিব ডেল্টা মেডিক্যালের পাশেই বাসা ভাড়া নেয়ার চেষ্টা করছে। কিছু ফার্নিচার কিনেছে, আরো কিছু কিনবে। ওরা এই বছরের শেষের দিকে সম্ভবত নিজেরা নিজেরাই বিয়ে করবে। তাই বলছিলাম কি যে, একটা কাজ করো না, মেয়ে তো আমাদেরই, শেষ অবধি যদি ওরা বিয়েই করে ফেলে, তাহলে তো আমাদের কিছু করার থাকবে না। রাগারাগি হবে, মেয়ে বাসায় আসবে না্‌ আমরাও ওদেরকে মিস করবো। কেমন হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। তুমি একটু ভেবে দেখো না, হতেও তো পারে যে, ওরা আসলেই খারাপ না, ছেলেটা আসলেই লোভী না, বা আমরা যেমন ভাবছি হয়তো ওরা তেমন না।

কিছু বললাম না। কিন্তু কয়েকদিন সময় নিয়ে নিজে নিজেই ভাবলাম। কি করা যায়। আসলেই তো, উম্মিকা আর রাকিব যদি শেষ পর্যন্ত একা একাই বিয়ে করে, তাহলে আমাদের কি করার আছে? মেয়ে বড় হয়েছে, সিদ্ধান্ত নেবার যোগ্যতা হয়েছে। ভালো হোক আর খারাপ, শেষ পর্যন্ত যদি ওরা একা একাই বিয়ে করে, তাহলে আমাদের তো আসলেই কিছু করা যাবে না।

অতঃপর আমি উম্মিকার মাকে বললাম, উম্মিকাকে বলো, আমি রাকিবের বাবা মায়ের সাথে আমার অফিসে কথা বল্বো। সাথে আরো একটা সিডিউল দিয়ে দিলাম যে, ২৭ সেপ্টেম্বর আমি রাকিবের বাবা মায়ের সাথে একা অফিসে কথা বল্বো, ২৮ সেপ্টেম্বর উম্মিকা আর রাকিবের সাথে আমার অফিসে আমি একা কথা বল্বো, আর ২৯ সেপ্টেম্বর আমি মিটুল, উম্মিকা, রাকিব আর রাকিবের বাবা মাকে নিয়ে অফিসে কথা বল্বো। আমি এটাও বললাম যে, আমি রাকিবের মেডিক্যাল কলেজে ওর প্রাক্তন বন্ধুদের সাথে, ইতির পরিবারের সাথে, রাকিবের বর্তমান কর্মস্থলের কিছু বন্ধুদের সাথে কথা বল্বো।

এটা অবশ্যই একটা ব্রেকিং নিউজ সবার জন্য যে, আমি কথা বলতে রাজী হয়েছি। রাকিবের বাবা মা কিছুটা খুশী হলেও তারা খুব টেনশনে পড়ে গেলেন একটা অজানা ভয়ে, আমারকে ফেস করার ভয়ে। রাকিবও। কিন্তু রাকিবের বাবা মা বা রাকিব এটা ধরে নিলো যে, অন্তত তাদের কথাগুলি তো আমাকে ফেস টু ফেস বলতে পারবে। আমি সে মোতাবেক একটা হোমওয়ার্ক করি। কিছু পয়েন্ট নোট করি কি নিয়ে কোন পক্ষের সাথে আমি আলাপ করবো। পয়েন্টগুলি ছিলো এমনঃ

রাকিবের বাবা মা এর সাথে মিটিং  (২৭/০৯/২০২৩)

(১)        রাকিবের আগের বিয়ের ইতিহাস শোনা। কিভাবে বিয়েটা হয়েছিলো?

(ক)       কার কার সাথে রাকিব আর ইতিকে নিয়ে দেন দরবার করা হয়েছিলো?

(খ)        ইতির সাথে বিয়েটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো কিনা?

(গ)       ইতির বাবার ঠিকানা কি? ইতি কোথায় কাজ করে বা করতো?

(২)        উম্মিকার বিয়ের ঘটনা বলা

(ক)       কমিটমেন্ট উম্মিকাই করেছিলো, আমাকে কমিটমেন্ট করাইতে বাধ্য করেছিলো। আমি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরে আসা আমার চরিত্র নয়।

(৩)       উম্মিকার আগের শশুড়বাড়ির চেহাড়া এবং বিয়ের পরের চেহাড়ার একটা তুলনামুলক চিত্র দেয়া

(ক)       উম্মিকাকে ছোটখাটো গিফট করা, খাবার পাঠিয়ে দেয়া, মাঝে মাঝে ফোন করে তাকে ওদের কাছে টেনে নেয়া। এ সবই ছিলো বড় লোভের একটা ছোট অংশ।

(খ)        বিয়ের পরে এগুলির কোনো কিছুই আমি দেখিনি। 

(গ)       আমাদের বাড়িতে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকা কিংবা ওদের বাসার সামনেই আমাদের কর্তৃক একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে ওদের রাখা। এটা আমি মানতে পারিনি।

(৪)        রানার চরিত্র নিয়ে কথা বলাঃ 

(ক)       ভয়ানক লোভী ছিলোঃ শেয়ার চাওয়া, একাউন্ট হ্যান্ডিলিং এ সুযোগ দেয়া, গাড়ী চাওয়া, তাঁর টিউশন ফি চাও, বিজ্ঞাপনে টাকা চাওয়া, এসি, ল্যাপটপ, মোবাইল, ড্রেস, জুতা কিংবা ঘড়ি, ওদের বাড়িঘর রিনোভেশনে আমার খরচ দেয়া।

(খ)        উম্মিকার প্রতি দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা, কখনোই বগুড়ার না যাওয়া, বা ঢাকায় এলেও উম্মিকার সাথে যোগাযোগ না করা।

(গ)       কনিকার প্রতি হিংসা করা

(ঘ)        ফ্যাক্টরিতে সময় মতো না আসা। আসতে বললেই তাঁর মেজাজ চড়ে যাওয়া কিন্তু বেতনের বেলায় শতভাগ চেয়ে নেয়া।

(চ)        ওর মার কথামতো চলা এবং মা সব সময় ছেলেকে কুবুদ্ধি দিতো।

(ছ)        আমের ঘটনা।

(জ)       ষ্টাফদের সাথেই এমনভাবে মেলামেশা করা যে, ষ্টাফরাই চুরি করে আর সে সেটা সায় দেয়।

(ঝ)       উম্মিকাকে আমি যে টাকা দিতাম, সেটা দিয়েও রানা অনেক সময় ওর দাবীগুলি মেটাতো।

(ট)        কংকাল বিক্রি এবং টিভি কেনা।

(ঠ)        রানার ব্যবহার ছিলো পাশবিক। মেজাজ, আচরন কিংবা ভদ্রতা অস্বাভাবিক ছিলো। একেবারেই ম্যাচিউরড ছিলো না।

(৫)       আমার নিজের ভূমিকাঃ

(ক)       আমি নিজে ওদের ব্যাপারে কোনো খোজ খবর নেইনি। আমি নিজেও বুঝতে পারিনি যে, তারা আমাকে এই খোজখবর নেয়া থেকে খুব টেকনিক্যালি বিরত রেখেছিলোঃ যেমন, তারা কাউকে জানাতেই দিতে ইচ্ছুক ছিলো না যে, রানা বিয়ে করেছে।

তারা আমাকে ওদের অন্যান্য আত্মীয়সজনের সাথে দেখা করার জন্য কোনো প্রকার সাহাজ্যই করেনি। এক তরফা আমাকে ব্রেইনওয়াস করেছিলো।            

(খ)        আমি চেয়েছিলাম, একটা পরিবার। সেটা গরীব হোক আর অসচ্ছল তাতে আমার কোনো সমস্যা ছিলো না। কিন্তু আমি লোভী পরিবার চাইনি। তারা লোভী ছিলো। তারা চেয়েছিলো শুধু আমাকে আর আমার স্ত্রীকে। আমার সম্পদ, আমার স্ট্যাটাস, আমার ক্ষমতা ইত্যাদির ব্যবহার। কিন্তু ওরা না চেয়েছিলো আমার মেয়েকে, না ছোট মেয়েকে, না দায়িত্ব নিতে।

(গ)       জাহিদের পোষ্টিং (করাপশনের কারনে, ট্রাষ্ট ব্যংকের ঘটনা, জেনারেল মতির সাহাজ্য)

(ঘ)        ওদের জমি জমা নিয়ে বিরোধ মিটানো, অন্যান্য সহযোগীতা করা ইত্যাদি করেছি।

(৫)       বিয়ের পরে আমার মেয়েকে নিয়ে তাদের পরিকল্পনা কি?

(ক)       কোথায় থাকবে, কিভাবে থাকবে?

(খ)        আমাকে কি করতে হবে? কি চাওয়া আমার কাছে?        

(৬)       আমার চাওয়াঃ

(ক)       নিরাপদ সংসার

(খ)        নিরাপদ প্রোফেশন।

(গ)       কাবিনের মাধ্যমে একটা বাইন্ডিংস।

(ঘ)        যদিও সঠিক না, তবুও একটা চুক্তি।

২৭ সেপ্টেম্বর আমি আমার গাড়ি (জীপ) ওর বাবা মার জন্য রেখে এলাম, আমি আমার নুয়া গাড়ি নিয়ে অফিসে এলাম। এর একটা প্রধান কারন হলো- ওরা আমার নিমন্ত্রনে আমার অফিসে আসতেছে। আমার উচিত তাদেরকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে যেদিন রাকিবের বাবা মা আমার অফিসে আসলেন, সেদিন আমার পরিকল্পনা ছিলো যেনো আমি কোনো অবস্থাতেই তাদেরকে অসম্মান না করি, রাগারাগি না করি। তারা আমার গেষ্ট। আমি বিয়েতে রাজী কিনা বা অরাজী সেটা পরের ব্যাপার, কিন্তু কাউকে ডেকে এনে তাও আমার অফিসে, তাকে অসম্মান করার অভ্যাস আমার কখনো ছিলো না, এখনো নাই। কিন্তু যেদিন রাকিবের বাবা মা আমার অফিসে ঢোকেন, তারা এতোটাই ভয়ে জড়োসড়ো ছিলেন যে, এটা আমার জন্যই খারাপ লাগছিলো। আমি খুব হাসিমুখে তাদেরকে আমার অফিসে বসালাম। বারবার গ্রাম এবং রাকিবের কাছ থেকে ওর বাবার মোবাইলে ফোন আসতেছিলো। সবাই একটা আতংকের মধ্যেই ছিলো।  কিন্তু আমার অফিসে বসার ২ মিনিটের মধ্যে তারা এতোই শান্ত হয়ে গেলেন যে, যা ভেবেছেন আমাকে নিয়ে আমি সেটা না। রাকিবের মা ই প্রথম কথা বল্লো

ভাই, আমি গত চারদিন যাবত একেবারেই ঘুমাতে পারিনি কোনো একটা অজানা ভয়ে, চাপে। কখনো ঢাকায় আসিনি, গ্রামের মানুষ আমরা, আপনি ডেকেছেন, তাও আবার আপনার অফিসে, আমরা সবাই খুব ভয়ে ছিলাম। গ্রামে আর ফিরতে পারি কিনা সেটাও একটা ভয় ছিলো। কিন্তু এখন তো দেখছি- আপনি খারাপ মানুষ না। ভয়ংকর না। আমি তাদেরকে আরো সহজ করার জন্য খুব হাসি তামাশা করলাম। জুস খেলেন, চা খেলেন। ফলটল দেয়া ছিলো সবই খেলেন। অতঃপর আমি বলা শুরু করলাম আমার এজেন্ডা মোতাবেক আলোচনা।

আমি প্রথমে তাদের কথাগুলি শোনার চেষ্টা করলাম। তাদের ছেলের বউ এর সাথে কিভাবে বিয়ে হয়েছিলো, কেনো বিয়েটা ভেংগে গেলো, বিয়েটা রাখা যেত কিনা, সব। এখানে একটা নতুন বিষয় জানলাম যে, রাকিবের মা দুইজন। এটা নিয়েও কিছু হাসি তামাশা হলো। কিন্তু ব্যাপারটা আমি নেগেটিভলী নেই নাই। গ্রামে বড় ভাই বিয়ের অল্প সময়ের পর মারা গেলে অনেক সময় শশুড় বাড়ির লোকেরা মানবিক কারনেই তাঁর ছোট ছেলেকে দিয়ে বিধবা বড় ভাইয়ের বউকে আবার বিয়ে করিয়ে সেই বাড়িতেই রাখে। কিন্তু এখানে রাকিবের বাবার বউ থাকা সত্তেও রাকিবের দাদা রাকিবের বাবাকে তাঁর বড় ভাইয়ের বউকে বিয়ে করেছে। এটা হতেই পারে। রাকিবের মা নিতান্তই একজন সহজ সরল গ্রামের গৃহিণী, কোনো নালিশ নাই, কোনো অভিযোগ নাই। ভালোই আছে। শুধু মা হিসাবে ছেলের প্রতি সারাক্ষনই একটা টেনশন নিয়ে ঘুমায়। সব আলোচনা মিলে আমার কাছে ওদের খারাপ লাগেনি। আর খারাপ লাগলেও যেহেতু উম্মিকা রাকিবের সাথে ঘর সংসার করবেই, ফলে আমি এক প্রকার মেনেই নিয়েছিলাম ব্যাপারটা।

পরেরদিন আমি রাকিব আর উম্মিকাকে আমার অফিসে ডাকলাম। বাবার সামনে মেয়ের ইন্টারভিউ অনেক কঠিন। উম্মিকা নিজেও জানে তাঁর বাবা কতটা স্ট্রিট ফরোয়ার্ড এবং কঠিন। উম্মিকার সাথে রাকিব ও জানে এর মধ্যে যে, আমি একটু কঠিন মানুষ। দুজনেই ভয়ে ছিলো।

রাকিব এবং উম্মিকা সাথে আলোচনা করার আগে, আমি সেই একই টেকনিক রাকিবের বেলায় ব্যবহার করেছিলাম। যতোই হোক, কম বয়সী ছেলে। অন্তত আমাদের মতো মানুষদেরকে ফেস করা সহজ না। কিন্তু আমি রাকিবকে সহজ করে নিলাম। ওর ভয় বা টেনশন ভাংগার জন্য জা করতে হয় করলাম। রাকিব প্রায় আধা ঘন্টার পরে অনেকটা স্বাভাবিক হলো বলে মনে হলো।

এবার আমি ওদের সাথে প্রোফেশনাল ভাবে আলাপ করা শুরু করলাম। রাকিবকেই কথা বলতে দিলাম। আমি জানতে চেয়েছিলাম কিভাবে রাকিবের সাথে ইতির পরিচয়, প্রেম, বিয়ে এবং বিয়ে পরবর্তী সমস্যা। প্রায় একই রকমের তথ্য পেলাম জা গতকাল রাকিবের বাবা মা আমাকে বলেছিলো। খুব একটা হেরফের হয়নি।

অতঃপর আমি রাকিবকে বললাম, কখনো যদি কারো গায়ে দাগ লাগে সেটা যেমন কোনো মেডিক্যাল সার্জারী দিয়ে মুছা যায় না, তেমনি যখন কেউ সামাজিকভাবে অসম্মানীত হয়, এই লজ্জাও কোনো কাপড় দিয়ে ঢাকা যায় না। আমাদের দুই পরিবারেই এই দাগ এবং লজ্জার ঘটনা ঘটেছে। তাহলে আমি কি গ্যারান্টি পাবো যে, এই একই দাগ এবং লজ্জা আবারো দ্বিতীয়বার ঘটবে না? আমি শুধু সেই গ্যারান্টি চাই। আর এই গ্যারান্টি দিতে পারবা শুধু তোমরা দুইজন। দুইজনেই জানালো যে, তারা তো এই মুহুর্তে সে রকম গ্যারান্টি দেয়ার স্কোপ নাই কিন্তু আগামীতে তারা এটা প্রমান করবে যে, ওরা আমাদেরকে আর দাগ এবং লজ্জায় ফেলবে না।

আমি বললাম, আমি ওদের এই কথা আপাতত বিশ্বাস করলেও আগামী পাঁচ বছর অব্জার্ভ করবো। যদি আগামী ৫ বছরে কোনো সমস্যা না পাই, ধরে নেবো, ওরা ওদের কথা রেখেছে। আর এর জন্য যদি আমার কোনো সাহাজ্য লাগে, আমি দিতে তৈরী। কিন্তু লোভী মানুষদেরকে আমি ঘেন্না করি।

আমি রানার ব্যাপারে সব কিছু খোলা মেলা আলাপ করলাম, রাকিবকে উম্মিকা শুধু ওর সাথে ঘটা ঘটনার কিছু অংশ হয়তো বলেছে কিন্তু আমি রাকিবকে আদোপান্ত বলার পর রাকিব নিজেও বুঝেছে, আমাদের কি ভূমিকা ছিলো আর রানাদের কি অপরাধ ছিলো।

রাকিব তাঁর ১ম ম্যাসেজ নিয়ে অনেকবার দুঃখ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। আমি আসলে ওগুলি আর মনে রাখিনি।

পরবর্তী ২৯ সেপ্টেম্বরে আমরা আবার ৬ জন একত্রে বসেছিলাম। এখানে আমরা ৪ জন ছিলাম যেনো একটা গ্রুপ আর রাকিব উম্মিকা ছিলো আরেকটা গ্রুপ। অনেক বাধ্য বাদকতা ছিলো আমাদের কিছু শর্তের মধ্যে। যেমনঃ

আমি রাকিবকে এবং উম্মিকাকে বললাম, যেহেতু দুজনেই ক্লিনিক্যাল সাইডে উন্নতি করতে চায় এবং ধরে রাখতে চায়, তাতে উম্মিকার সাথে রাকিবের একটা দন্ধ তৈরী হবে। একটা মেয়েকে প্রোফেশনের বাইরে তাঁর সংসার, বাচ্চা কাচ্চা, স্বামী সব কিছু মেইন্টেইন করতে হয়। সেক্ষেত্রে উম্মিকার জন্য ক্লিনিক্যাল সাইডে থাকা বোকামী। অন্যদিকে রাকিব যদি ক্লিনিক্যাল সাইডেই থাকতে চায়, তাহলে উম্মিকাই বলবে, উম্মিকা দোষ করলো কি? এমন এক পরিস্থিতিতে প্রোফেশনাল ক্লেশ হওয়া কোনো ব্যাপার না। আবারো অশান্তি।

রাকিবই এর সমাধান দিলো যে, ক্লিনিক্যাল সাইডে থাকলে ভালো কিন্তু নাম করতে অনেক কাঠ খড় পোহাতে হয়। সময় অনেক বেশী লাগে। তাঁর থেকে যদি টাকা পয়সা কামাই আর পরিশ্রমের অনুপাত ধরা যায় দেখা যাবে ক্লিনিক্যালের থেকে অন্যান্য মেডিক্যালের সাইডে যাওয়া খারাপ না। ফলে, রাকিব এবং উম্মিকা দুজনেই নীতিগতভাবে আমাদেরকে জানালো, তারা ক্লিনিক্যাল সাইডে থাকবে না। তারা মেডিক্যালেরই অন্যান্য সেক্টরে তাদের ক্যারিয়ার পার্সু করবে। প্রয়োজনে তারা কানাডায় মাইগ্রেট করতেও অসুবিধা নাই।

বিস্তারীত আলাপ আলোচনায় সব পক্ষই এই বিয়েতে আমরা রাজী এটাই বেরিয়ে এলো। সন্ধ্যায় সবাই আমরা হাসিমুখে একসাথে ফ্যাক্টরী থেকে বেরিয়ে গেলাম।

এবার আসি, আমার কিছু ব্যক্তিগত মন্তব্যেঃ

(১)       আমার এজেন্ডায় আরো যেখানে যেখানে গিয়ে রাকিবদের পরিবার সম্পর্কে খোজ খবর নেয়ার কথা ছিলো, সেই সিডিউল বাদ দিলাম। কারন, আমি যদি খোজ খবর নিতে গিয়ে ওদের পরিবার সম্পর্কে ৯৯% নেগেটিভ কথাবার্তাও শুনি, তাতেও আমি রাকিব আর উম্মিকাকে এই বিয়ে থেকে বিরত রাখতে পারবো না। তাই, খোজ নেয়া আর না নেয়ার মধ্যে আমি কোনো তফাত দেখতে পেলাম না।

(২)       উম্মিকার ১ম বিয়েটা আমরা অনেকটা জোর করেই উম্মিকাকে রাজী করিয়েছিলাম রানার সাথে। উম্মিকা সে কারনে মাঝে মাঝেই আমাদের দোষারুপ করে। কিন্তু এইবার উম্মিকার নিজের চয়েজে রাকিবকে বিয়ের সিধান্ত নিয়েছে। ভালো মন্দ, সব উম্মিকার দায় দায়িত্তো। লাইফ উম্মিকার, ভালো থাকার ব্যাপারটা উম্মিকার। তাই, আমি উম্মিকাকে এবার জোর করে বিয়েতে না রাজী করার কোনো কারন দেখি না।

(৩)      আমরা প্রথম থেকে রাকিবদের উপরে জে মানসিক চাপের সৃষ্টি করেছি, বা যেভাবে জে কথাগুলি ওপেনলী বলেছি, তাতে অন্তত রাকিব এবং তাঁর পরিবার একটা জিনিষ খুব ভালো করে উপলব্ধি করেছে যে, আমাদের দ্বারা ওদের উপকার হবে যদি লোভ না করে, কিন্তু যদি লোভী হয়ে উলটা পালটা কিছু আশা করে সেটা আমি বা আমরা কিছুতেই পছন্দ করবো না। তাছাড়া, আমাদের এমন টাইট ব্যবহারে ওরাও অনেকটা সোজা হয়ে চলার কথা। রানার মায়ের মতো বা রানার বোনের বা ভাইয়ের মতো সার্থপরতার কোনো কাজ না করার কথা।

(৪)       উম্মিকার আগের স্বামী রানা ছিলো একটা স্টুডেন্ট বা বেকার। তাছাড়া ম্যাচিউরিটি ছিলো না। কিন্তু রাকিবের বেলায় তাঁর একটা আইডেন্টিটি আছে, ডাক্তার। যা বুঝেছি, দায়িত্তের সাথে কাজ করে এবং পরিবারকে সাপোর্ট করার জন্য আরো বেশী পরিশ্রম করে। রানাকে কোথাও পরিচয় করিয়ে দেবার মতো রানা কোনো যোগ্যতা অর্জনেও সক্ষম হয়নি।

(৫)      রাকিবের দুটূ বোন, যাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। রাকিবের আর কোনো ভাইও নাই। ফলে পরিবারটাকে আমার জটিল মনে হয় নাই। এ ছাড়া রাকিবের বাবার একটা ব্যবসা আছে যেটা রানার বাবার ছিলো না।

(৬)      রাকিবঅদের ঢাকায় কোনো থাকার জায়গা নাই, ফলে রাকিবের বাবা মা অনেকটাই আমাদের উপর নির্ভর করছে রাকিবের নিরাপত্তা, রাকিবের গার্জিয়ানশীপ ইত্যাদি। কিন্তু রানার ব্যাপারে রানার মা চেয়েছিলো ওরা আমাদেরকে কন্ট্রোল করুক। আর সেইটার টুলস হলো উম্মিকা। এখানে এই ব্যাপারটা আমি দেখি নাই।

(৭)       সবচেয়ে বড় পয়েন্ট হচ্ছে- যদি উম্মিকা আর রাকিব শেষ পর্যন্ত তারা একা একাই বিয়ে করে ফেলে, তাহলে আমি তো আমার মেয়েকেই হারিয়ে ফেলছি। হতে পারে ইনশাল্লাহ ওরা ভালই থাকবে বা থাকছে, তখন কিন্তু আমিই আবার ওদেরকে কাছে টেনে নিতে বাধ্য হবো। কারন আমি ওটাই চেয়েছিলাম যে, উম্মিকারা ভালো থাকুক। যদি পরে গিয়ে ওদের সুখী দাম্পত্যর ফলাফলে আমি কাছেই টেনে নেই, সেটা বিয়ের আগে নয় কেনো? তাতে লাভ অনেক গুলিঃ

(ক)      আমার সিদ্ধান্তেই বিয়েটা হলো।

(খ)       উম্মিকার আম্মুর খুব শখ ছিলো উম্মিকার বিয়েতে সে অনেক ধুমধাম করবে, সেটাও হলো।

(গ)       আমার একটু সাহাজ্যে যদি রাকিবদের পরিবারেও একটু উপকার হয়, তাতে আমিও খুশী রইলাম।

(ঘ)       যদি দেখি, রাকিবের বাবার ব্যবসাটা একটা লাভ জনক ব্যবসা, আর আমার সাহাজ্যে যদি তাঁর ব্যবসাটা আরো ভালো করে, প্রয়োজনে আমিও তাঁর সাথে ব্যবসায় শরীক হতে পারবো। রাকিবের বাবাই চালাবে কিন্তু আমার কিছু ফাইন্যান্সের কারনে আমারো একটা নতুন সেক্টর ওপেন হলো।

তাই, আগামী ৩ জানুয়ারী ২০২৩ তারিখে সেনাকুঞ্জে উম্মিকার অনুষ্ঠানের দিন ধার্য করা হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ এ ওর গায়ে হলুদ। এর মাঝে আমার ছোট মেয়ে কনিকা ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে ইনশাল্লাহ ঢাকায় ল্যান্ডিং।

১২/১০/২০২৩-লেঃ কর্নেল মজিদের ইন্তেকাল

সকালে ফেসবুক ব্রাউজ করতেই হটাত একটা পোষ্ট নজরে এলো। পোষ্টটা নিম্নরূপঃ

প্রশ্ন হচ্ছে এ রকম আরো অনেক অফিসারেরই তো মৃত্যু সংবাদ পেয়েছি, কিন্তু এবার শুধু মজিদের মৃত্যু সংবাদে আমাকে কেনো আমার ব্যক্তিগত ডায়েরীতে লিখতে হলো? এর একটা অতীত ইতিহাস আছে। সেটাই বলছি।

এটাই সে আর্মি অফিসার যার কারনে আমাকে সেনাবাহিনী থেকে অকালীন অবসর নিতে হয়েছিলো। আমি ১৩ লং কোর্ষের কিন্তু মজিদ ১৪ লং কোর্ষের। মেজর থেকে লেঃ কর্নেল প্রোমোশন বোর্ডে শুধুমাত্র মজিদকে আনুকল্য দেয়ার জন্য আমাকে প্রোমোশন থেকে বাদ দিয়ে এই অফিসারকে প্রোমোশন দেয়া হয়। পাশাপাশি যদি আমাদের দুইজনের কোয়ালিফিকেশনকে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবোঃ

  আখতার (আমি) মজিদ
কোর্ষ সমুহের গ্রেডিং আমার সব আর্মির কোর্ষ গ্রেডিং কমপক্ষে বি প্লাস আবার কখনো কখনো আ ছিলো। শুধু কয়েকটি বেসিক কোর্ষে বি ছিলো। মজিদের সব গুলিই বি ছিলো। তাঁর ক্যারিয়ারে এ বা বি প্লাস গ্রেডিং প্রায় ছিলোই না।
ষ্টাফ কলেজ ষ্টাফ কলেজে সম্পন্ন করেছি মজিদ ষ্টাফ কলেজ করেনি
পদাতিক ডিভিশন এবং আর্মি হেড কোয়ার্টারে নিয়োগ আমি পদাতিক ডিভিশন এবং সেনাসদরে জি এস ও-২ (অপারেশন) , জি এস ও-(ট্রেনিং) উভয়েই কাজ করেছি। মজিদ এরুপ কোনো পদে কখনো কাজ করেনি।
স্বাস্থ্যগত বিবরন আমি ক্যাটেগরি এ ভুক্ত ছিলাম মজিদ ক্যাটেগরি সি ভুক্ত ছিলো। এবং ডায়াবেটিসের রোগী।
অভিজ্ঞতা আমি মাইনর ইউনিটে উপ অধিনায়ক/ অধিনায়ক এবং ্মেজর ইউনিটে উপ অধিনায়কের দায়িত্ত পালন করেছি। মজিদের এরুপ কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না।
মিশন আমি পর পর দুইটা ইউ এন মিশন সম্পন্ন করেছিলাম। মজিদ সম্ভবত একটা ইউ এন মিশন করেছে। ক্যাটেগরি সি হ ওয়াতে নাও করতে পারে। এ ব্যাপারটা আমি নিশ্চিত নই।
শিক্ষাগত যোগ্যতা আমি শিক্ষাগত যোগ্যতায় মাষতার্স, এম বি এ, এম এস সি, এবং ততকালীন ডক্টরেট করতে নিয়োজিত ছিলাম। মজিদ এম বি এ করেছিলো।

মজিদের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট ছিলো ওর বাবা। ওর বাবা ছিলো আমাদের তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাসার মালি অতবা কর্মচারী। আর এই সুবাদেই খালেদা জিয়া মজিদের বাবার অনুরোধে তিনি মজিদকে তাঁর এ ডি সি করেন। সমস্ত আইন ভেংগে, আর্মির রুলস ভেংগে তিনি এ কাজটি করেন। যা সবার কাছে গ্রহনযোগ্য ছিলো না।

সেই মজিদের এখন প্রোমোশন দরকার। তাই প্রোমোশন বোর্ডের তিন দিনের ফলাফলে আমার নাম চুড়ান্ত হবার পরেও শেষ দিনে এসে হটাত করে মজিদ উড়ে এসে জুড়ে বসলো, আর আমি ঝড়ে পড়ে গেলাম। মজিদের প্রোমোশন হলো আর আমার হলো না। আমি কখনো কারো কাছে আমার ব্যাপারে তদবির করতে পছন্দ করিনি। এবারো করলাম না। আমি সিনিয়ার হ ওয়া সত্তেও মজিদ আমার ৭ ফিল্ডের সি ও (অধিনায়ক) হয়ে গেলো। জুনিয়ারের অধীনে সিনিয়ারের কাজ করা জে কত দূর্বিসহ, এটা যারা করেছে তারা জানে। যদিও মজিদ কখনো আমার ফ্রিডম নষ্ট করেনি, আমার কোনো কাজে বাধা দেয়নি, অথবা আমার প্রতি তাঁর কোনো খারাপ আচরন করেনি, তারপরেও আমার প্রতিটি দিন কেটেছে মনের কষ্টে। কেনো আমাকেই বলি হতে হলো?

আমি শেষ পর্যন্ত আর্মি থেকে অকালীন অবসর গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেই। আর ঠিক তারই ধারাবাহিকতায় আমি ২০০৪ সালের নভেম্বরে আমি আর্মি থেকে ভলান্টিয়ারিলি অবসরে চলে আসি।

আর্মিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা যদি তুলনা করি, দেখা যাবে, ৫০ টি অফিসারের মধ্যে হয়তো আমি ১০ এর মধ্যে আছি। আমার কাজের প্রশংসা সব জেনারেকরাই করতো কিন্তু শেষ অবধি খালেদা জিয়ার ইচ্ছায় মজিদেরই জয় হয়েছিলো। প্রধান মন্ত্রী হিসাবে খালেদা জিয়ার এটা করা উচিত হয় নাই।

সেই মজিদ খালেদা জিয়ার পলিটিক্যাল দল খমতাচ্যুত হবার পর নিজেও আর্মি থেকে অবসরে যায়, বলতে পাতেন তাকে চাকুরীচ্যুত করা হয়। পুনরায় মজিদ সেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধান্মন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথেই সে ছিলো। কেউ বলে বডি গার্ড, কেউ বলে এমনিতেই।

আজ মজিদের ম্রিত্যুর সংবাদ পেলাম। রাগ ছিলো, গোস্যা ছিলো, অপছন্দ করতাম, কিন্তু আজ আর মজিদের উপর আমার কোনো ক্ষোভ নাই, রাগ নাই। সে কি করে গেছে, কি করা উচিত ছিলো, এর ফলাফল এখন নির্ধারিত।

আমি ভালো আছি। আর্মি থেকে বের হয়ে আর কোনো চাকুরীর সন্ধান করিনি। সরাসরি একটা গার্মেন্টস ব্যবসার সাথে জড়িত হয়েছিলাম। প্রথমে সেই গার্মেন্টস ছিলো একটা মৃত প্রতিষ্ঠান, আজ সে গার্মেন্টস বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে একটা মডেল নাম। রিভার সাইড সুয়েটার্স। প্রায় ২ হাজার লোক কাজ করে, বছরে টার্ন অভার প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। আল্লাহ যা করেন সব ভালোর জন্যই করেন।

মজিদের জন্য, খালেদা জিয়ার জন্য এবং সেই সব দূর্নীতি পরায়ন চাটুকার জেনারেলদের জন্য ও আমি দোয়া করি কিন্তু তারা আজ কেহই ভালো নেই। কেউ কারাগারে, কেউ ফাসির রায়ে দন্ডিত, কেউ পালিয়ে আছে আবার কেউ কেউ এই দুনিয়া ত্যাগ করে চলেও গেছে।

০৮/১০/২০২৩-কোন দিকে যাচ্ছে অর্থনীতি

আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করে, আমাদের ব্যবসায়িক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা কি হতে যাচ্ছে। আমি কোনো অর্থনীতিবিদ নই। ফলে যেসব ফ্যাক্টর হিসাবের মধ্যে নিয়ে সার্বিক অর্থনীতির উপর মতামত দেয়া যেতে পারে তাঁর অনেক ফ্যাক্টরই আমার জানা নাই বা সেগুলি নিয়ে আমি কাজ করি না। কিন্তু দৃশ্যমান কিছু সিম্পটম বিবেচনা নিয়ে যে কোনো আমজনতাও অনেক কিছুর সঠিক একটা প্রেডিকশন দিতে পারে যা হয়তো খুব একটা অমুলিক নয়। সেই প্রেক্ষাপট থেকেই বলছি।

আমাদের অর্থনীতি মুলত কিছুটা কৃষিজ এবং অনেকাংশেই বৈদেশিক মুদ্রা (যেমন রেমিট্যান্স, রপ্তানী আয়, এফডিআই) ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল। এই কয়েকটা ফ্যাক্টর যদি মামুলীভাবে আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখবো যে, খুব বেশী একটা ভালো প্রত্যাশা করার কিছু নাই।

রেমিট্যান্স বহুলাংশে কমে গেছে কারন যারা এই বৈদেশিক মুদ্রা দেশে রেমিট করবেন, তারাই বিদেশে প্রায় হয় বেকার অথবা আগের তুলনায় অনেক কম বেতনে চাকুরী করছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে ইউরোপের শিল্পবানিজ্যে প্রায় ধ্বস নেমে যাচ্ছে। প্রচুর ইন্ডাস্ট্রি শুধুমাত্র এনার্জি সংকটের কারনে বন্ধ এবং অনেকগুলি বন্ধের পথে। ফলে সেখানে কর্মী ছাটাই বা বিদেশীদের প্রাধান্য প্রায় নীচের দিকে। আমাদের দেশের শ্রমিকেরা খুব একটা স্কীল নয় বিধায় তাদের ডিমান্ডও বেশ কমে যাচ্ছে। মাইগ্রেশন এখন ইউরোপের একটা চরম সংকট। তারা যে কোনো মাইগ্রেশনের বিপক্ষে এখন। ইউরোপের অবস্থা দিনের পর দিন এখন খারাপের দিকে যাওয়ায় সেখানকার নাগরিকগনও কৃচ্ছতা অবলম্বন করছেন। তাদের পারচেজ পাওয়ার কমে যাচ্ছে। লাক্সারী লাইফের কথা এখন তারা মাথা থেকেই বের করে দিচ্ছে। জীবনধারনের জন্য যতটুকু দরকার সেটাতেই এখন তারা অভ্যস্থ হবার চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় রেমিট্যান্স ধীরে ধীরে কমবে।

অন্যদিকে ইউরোপ কিংবা পশ্চিমা দেশগুলিতে যেহেতু এখন নাগরিকদের পারচেজ পাওয়ার কমে যাচ্ছে, ফলে আগে যেখানে একজন একের অধিক পন্য কিনতেন, সেখানে তারা পন্য কেনার পরিমান কমিয়ে দিয়ে বাজেটের মধ্যে চলার চেষ্টা করছেন। তাতে যেটা হচ্ছে-আমাদের দেশ কিংবা অন্যান্য রপ্তানীকারকের রপ্তানী আদেশের পরিমানও কমে যাবে। যখনই রপ্তানী আদেশের পরিমান কমে যাবে, আমাদের দেশেও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে তাঁর প্রভাব পড়বে। অনেক মেশিনারিজ বন্ধ থাকবে, এতে কর্মী ছাটাইয়ের আশংকা হবে। শুধু তাইই নয়, এনার্জি সংকটের কারনে কিংবা জালানী সংকটের কারনে পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুৎ খাতেও ব্যয় বাড়বে। প্রডাকশন খরচ বাড়ার কারনে এবং রপ্তানী আদেশের পরিমান কমার কারনে আমাদের দেশের ছোট ছোট ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান গুলি অস্তিত্ত টিকিয়ে রাখার হুমকিতে পড়বে।

এখানে আরো একটা বিপদ ঘটার সম্ভাবনা আছে। সেটা হচ্ছে-ইউনিপোলারিটি থেকে মাল্টিপোলার ওয়ার্ডে আমাদের দেশ একটা সংকটের মধ্যে আছে। এই মুহুর্তে ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশগুলির সাথে আমাদেরও কিছুটা টানপোড়েনের চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিধায় কোনো কারনে যদি পশ্চিমারা নাখোশ হয়, তাহলে একইসুত্রে গাথা ইউরোপের বাজার আমাদের জন্য ছোট হয়ে আসবে। সেক্ষেত্রেও আমাদের রপ্তানী আদেশে তুমুল একটা নেগেটিভ প্রভাব ফেলবে।

এখানে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে-যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর লোনের বোঝা আছে, তারা সময়মতো লোন পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংকগুলিও যেমন তারল্য সংকটে পড়বে, তেমনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের ঋণ পরিশোধে চাপের কারনে মালিকপক্ষ হিমসিম খাবে। যখন মালিকপক্ষ এই লোনের কারনে চাপের মধ্যে থাকবে, তখন তারাও ধীরে ধীরে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন। দেখা যাবে যে, ফ্যাক্টরী আছে, মেশিনারিজ আছে, কিন্তু কর্মি নাই, রপ্তানীর আদেশ নাই, এবং মেশিনারিজ অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

এবার যদি কৃষিজ প্রেক্ষাপটে আসি, সেখানেও একই চিত্র ফুটে উঠবে। সার সংকটের কারনে, কিংবা পানি সেচের জন্য প্রয়োজনীয় এনার্জি সাপ্লাইয়ের সংকটের কারনে এবং এমন কি বীজের সংকটেও কৃষিজ সেক্টরে এর নেগেটিভ প্রভাব পড়বে। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ, বিভিন্ন দেশের উপর নিষেধাজ্ঞার কারনে সময়মতো এসব সার, বীজ কিংবা আনুষঙ্গিক আইটেম পাওয়া যাবে না। শুধু তাইই নয়, এই যুদ্ধ আগামী কয়েক বছরের খাদ্য সংকটও তীব্র হতে পারে বলে আমার ধারনা।

আবার, সরকারকে রাষ্ট্রীয় খরচ যোগানের লক্ষ্যে তাঁর ঋণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হোক সেটা লোকাল ব্যংকা থেকে কিংবা বাইরের কোনো অর্থলগ্নি সংস্থা থেকে। ফলে, এমনো হতে পারে জে, ব্যাংকে জন সাধারনের গচ্ছিত টাকাও সময় মতো সাধারন জনগন উঠিয়ে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থায় লগ্নি করতে পারে কিনা সেটারও একটা অনিশ্চয়তা থেকে যায়।

আজ ঠিক এই মুহুর্তের পরিস্থিতি দেখে অনেকটাই বুঝার উপায় নাই, আগামি এক বছর পরের পরিস্থিতি কত ভয়ানক হতে পারে। আমেরিকাকে প্রতিদিন ২৭৫ বিলিয়ন ডলার লোন করতে হচ্ছে, ইউরোপের প্রায় সব কটি দেশে আগের তুলনায় ব্যাংক সুদ বেড়েছে প্রায় ১০ গুন। কমোডিটির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩ গুন। কিন্তু সে তুলনায় সাধারন জনগনের আয় বাড়েনি।

এ অবস্থায় কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, আগামি কি হতে যাচ্ছে- কি করে বলা সম্ভব? এ অবস্থায় আমাদের মতো আমজনতার কিংবা ব্যবসায়ীর জন্য কি করনীয় হতে পারে?

আমিও জানি না আসলে কি হতে যাচ্ছে আগামীতে। তবে, আমার একটা কথা আছে, আমি ছোট মানুষ, বুঝি কম, তাও যেটা বুঝি সেটা হলো-যাদের ব্যাংক লোন বিদ্যমান, তাদের উচিত সেটা যতোটুকু সম্ভব কমিয়ে ফেলা, কারন মুল ক্যাপিটাল পরিশোধ না করা পর্যন্ত এর যে সুদ সেটা পরিশোধ করতেই যখন হিমশিম খেতে হবে, মুল ক্যাপিটাল দেয়াই হবে তখন চরম অসুবিধা। যাদের হাতে এখনো কিছু অর্থ আছে সেটাকে যতটুকু সম্ভব যৌক্তিক সেক্টরে ব্যবহার করা যাতে অন্তত মুল ক্যাপিটাল নষ্ট না হয়, এবং যতটুকু না হলেই নয় তাঁর মধ্যে বসবাস করা।

বাকীটা শুধু বলতে পারবে “সময়”।

৩০/০৯/২০২৩- বন্ধুর বাহুবলে শত্রুকে আক্রমণ

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কিভাবে কোথায় শেষ হবে এর আসলে কোনো দিক নির্দেশনা দেয়া বা বুঝা কঠিন। কারন যুদ্ধটা একপক্ষ (রাশিয়া) করছে তাঁর নিজ শক্তিতে আর অন্যপক্ষ (ইউক্রেন) করছে অন্যের বাহুবলে। ফলে খুব ধীরে ধীরে এর অন্তর্নীহিত একটা মুখোশ বেরিয়ে আসছে কথায় এবং কাজে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউক্রেনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এন্ড ডিফেন্স কাউন্সিলর আলেক্সি ডেনিলভ প্রকাশ্যে কিছু মন্তব্য করেছেন, আমি তাঁর কথাগুলি হুবহু তুলে ধরিঃ  

তিনি বলেছেন, “কালেক্টিভ ওয়েষ্ট এবং ইউরোপিয়ান প্রতিনিধিগন বারবার একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন যে, যতোদিন ইউক্রেনের সাহাজ্যের প্রয়োজন, ততোদিনই তারা সেটা দিয়ে যাবেন কিন্তু কেউ এটা বলছে না যে, ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে জয়ী না হওয়া অবধি আমরা সাহাজ্য দিয়ে যাবো। তারা বলছেন, আমরা ইউক্রেনবাসীরা জয়-পরাজয়ের কিংবা যে কোনো সিদ্ধান্ত নেবো। তাই আমি জানতে চাচ্ছি আমাদের ওয়েষ্টার্ন সাপোর্টারদের কাছ থেকে যে, আপ্নারা কি আমরা বিজয়ী হওয়া অবধি সাপোর্ট দিয়ে যাবেন নাকি এটা কিছুদিন পর নিঃশেষ হয়ে যাবে? আমার এই কথা বলার পিছনে যুক্তি হচ্ছে যে, আমাদের অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে জানিয়েছেন কালেক্টিভ ওয়েষ্ট এবং ইউরোপিয়ান দেশসমুহ ইতিমধ্যে তাদের ট্যাক্স-পেয়ারের টাকা আমাদের আর দিতে চান না। শুধু তাইই নয়, যেখানে প্রতিমাসে আমাদের প্রয়োজন ৫ বিলিয়ন ডলার সেখানে প্রবাহ হচ্ছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলার। জেলেনেস্কীও মনে করছেন যে, প্রতিদিন তাদের এই সাহাজ্য কমছে এবং দেশে দেশে ইউক্রেনকে সাপোর্ট করার ব্যাপারটা নেতিয়ে পড়ছে বড় একটা জনগনের মধ্যে। শুধু তাইই নয়, আমেরিকার নির্বাচনে যদি বর্তমান সরকার না আসে, সেক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য আর কোনো সাপোর্ট অবশিষ্ট থাকবে বলে মনে হয় না। যদি সেটাই হয়, তাহলে মনে রাখবেন, আমাদের যেসব রিফুজি আপনাদের দেশে দেশে অবস্থান করছে, তারা অবশ্যই আপনাদের উপর অখুশী হবে এবং এই অখুশীর একটা প্রভাব তো আছেই”।

মোরালঃ

নিজের শক্তির উপর ভিত্তি করে শত্রুকে আক্রমন করবেন। পাশে থাকা বন্ধুর বাহুবলকে পুজি করে যদি আপনি আপনার শত্রুকে আঘাত করেন তাহলে সময়মতো পাশে থাকা বন্ধুর বাহুবলকে আপনি নাও পেতে পারেন। ফলে আপনি অসুবিধায় পড়বেন।

২৬/০৯/২০২৩-দলকানা আর দেশপ্রেম 

হলুদ আরো আরো আরো বেশি হলুদ হইলে যেই রকম কঠিন হলুদ হয়, ফেসবুককে মাঝে মাঝে আমার সেইরাম হলুদিয়া মিডিয়া মনে হয়। বিভিন্ন ইস্যুতে কারো কারো পোষ্টে এমন ধারনা হয় যে, এই বুঝি সেইটা যেইটা আমি চাইতাছি। ২য় আলো ৩য় আলোর সংবাদের মত। দেখবেন এই ২য় বা ৩য় আলোর খবর পড়লে মনে হবে ইউক্রেন রাশিয়ারে এমন নাচন নাচাইতাছে যে, পুতিন জেলেনেস্কির কাছে খালি করজোরে মাফ চাওয়া বাকি।

অথবা

ফেসবুকের কিছু কিছু লোকের পোষ্ট পড়লে মনে হবে দেশের ভিতরের সব খবর তাদের পেটে। যেমন, হেলিকপ্টার রেডি, উড়াল দিচ্ছে উগান্ডার শাশক, কিংবা অমুক তারিখ থেকে উগান্ডা চলবে বুগান্ডার আদেশে, কিংবা নিষেধাজ্ঞা এমন জায়গায় ভিড়ছে যে, ঘরে ঘরে "হায় হোসেন হায় হোসেন" এর মত মাতম। অথবা উগান্ডা এমন অর্থনীতির গ্যারাকলে পড়ছে যে, পাবলিক না খাইয়া না খাইয়া সব কংকাল হইয়া যাইতেছে। কিন্তু বাস্তবে কোনোটাই ঠিক তাদের প্রচারের মত না যতটা লিখেন। হেলিকপ্টার উড়েনা,বুগান্ডার আদেশ কার্যকরী হয় না, বাজারে ভীর কমে না, রাস্তায় গাড়ির জন্য জ্যাম কমে না, মলের ফুডকোর্ট গুলিতে বসার জায়গা মেলে না।

আবার কিছু লোক আছে,উগান্ডারে এমুন ভালোবাসে যা বলার না কিন্তু খায় দায় হাগে মুতে আরেমিকা বা কাডানায় বা ইলাতি অথবা ইউপোর। তারা আসলে লাইম লাইটে আসতে চায়। যোগ্যতার প্রশ্ন না, এটা একটু ভাইরাল হবার চেষ্টা।

আরে ভাইজানেরা, দেশপ্রেম আর দলকানা এক জিনিষ না। দেশপ্রেম দেখতে চান? নীরবে চলে যান সেইসব মানুষদের কবরে যেখানে শুয়ে আছে দেশের জন্য যুদ্ধ করা আপনার থেকেও কম বয়িসি যুবক যাদের বাবা মা ভাই বোন স্ত্রী পরিজন থাকা সত্তেও শুধু দেশকে ভালবেসে শহীদ হয়েছেন। বুকে হাত দিয়ে বলুন- আপনার পরিবারের কয়জন সেই শহিদদের মধ্যে আছে? আবার এইটা কইয়েন না যে, আপনার চাচার শালার বউয়ের বান্ধবীর খালাতো ভাই শহীদ, তাই সেও আপনার পরিবারের অংশ।

আর দলকানা দেখতে চান? তাহলে একটা আয়না নিন, ভিতরে যাকে দেখতে পাবেন, তারা।

২১/০৯/২০২৩-আমেরিকার ন্যাশনাল ডেট বা ঋণ

ইদানিং আন্তর্জাতিক খবরগুলির মধ্যে প্রায়ই একটা খবর চাউর হচ্ছে যে, আমেরিকার জাতীয় লোন প্রায় ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং এর অর্থনীতিতে এটা একটা আশনী সংকেত।

এর মানে কি? কার কাছে কিংবা কিভাবে এই লোন করলো আমেরিকা এবং এর প্রভাব কি?যে কোনো জাতীয় লোন বলতে বুঝায় যে, কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার যখন তাঁর খরচ পোষানোর জন্য আহরীত রেভিনিউর পর ঘাটতি অর্থ অন্য কারো কাছ থেকে লোন নেয় সেটা। অর্থাৎ খরচের বাজেট যখন আহরীত রেভিনিউয়ের থেকে বেশী হয়, তখন উক্ত ঘাটতি মেটাতে সরকারকে কোথাও না কোথাও থেকে লোন নিতে হয়। সেটাই আসলে জাতীয় ঋণ নামে অভিহিত হয়।সরকার তাহলে কার কাছ থেকে এই লোনগুলি নেয়? ব্যাপারটা খুব জটিল নয়।একটা দেশে কি পরিমান মুদ্রা বা কারেন্সী ছাপানো হবে সেটা নির্ভর করে তাঁর গোল্ড রিজার্ভের উপর। গোল্ডের বিপরীতে আসল কারেন্সী ছাপিয়েও সরকার অতিরিক্ত কিছু কাগজী নোট যেমন প্রাইজবন্ড, কিংবা মার্কেটেবল সিকিউরিটিজ বন্ড, ট্রেজারীবন্ড, বিলস, ফ্লোটিং রেট নোট, ট্রেজারী ইনফ্লেশন প্রোটেক্টেড সিকিউরিটিজ ইত্যাদি ছাপায়। আর এগুলির একটা ভ্যালু নির্ধারন করে দিয়ে তা জনগনের কাছে ছেড়ে দেয়। এটা টাকা না, কিন্তু আবার টাকাও। প্রাইজবন্ড দিয়ে বাজারে গিয়ে আমি আপনি চাল ডাল কিনতে পারবো না যদিও সেটার একটা কারেন্সী ভ্যালু আছে। এই প্রাইজবন্ড, ট্রেজারী বন্ড কিংবা সিকিউরিটিজ বন্ড ইত্যাদি গোল্ডের বিপরীতে ছাপাতে হয়না। তাই এটা কারেন্সী হিসাবে কাজ করেনা। এটা দিয়ে সরকার গোল্ডবিহীন জামানত ছাড়া একটা আলাদা পরিমান মুদ্রা সরবরাহ করে মাত্র যাতে জনগন কিনে জাতীয় আসল কারেন্সী সরকারকে দিয়ে দেয়। সরকার আসলে বুদ্ধি করে এর মাধ্যমে আসল কারেন্সী বাজার থেকে তুলে নেয়, নিজে বিভিন্ন কাজে লাগায়। জনগন লাভ পায় এর উপরে। এই কাগুজী নোটগুলি সরকার কর্তৃক গ্যারান্টেড। যেহেতু আসল কারেন্সী না কিন্তু গ্যারান্টেড, ফলে জানগনের কাছে সরকার এই সমপরিমান কাগুজী নোটের পরিমানে ঋণী হয়। এই ঋণ জনগনকে আসল কারেন্সী দিয়েই পেমেন্ট করতে হয় পরবর্তীতেআরেকটু সহজ করে বলি। এটা অনেকটা ব্যাংক থেকে ক্রেডিটকার্ড, মর্টগেজ কিংবা গাড়ীবাড়ি লোনের মতো। একটি পন্য আপনি কিনলেন, সেটার মুল্য আপনি শোধ করলেন ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কিংবা আপনি একটি কিছু মর্টগেজ রাখলেন, টাকা নিলেন কিন্তু পুরু টাকাটা আপনি পেমেন্ট করলেন না ব্যাংকে, মাস শেষে বা বছর শেষে আপনার নামে সুদসহ ঋণ হবে।

এটা গেলো একটা পদ্ধতি লোন নেবার। আরেকটা হলো সরকার অন্য দেশ থেকেও লং টার্ম সুদে লোন নেয়। সবই সরকারকে একটা মেয়াদে এসে লোন ব্যাক করার কথা।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, রেভিনিউ যতো কম আসবে, সরকারকে তাঁর বিভিন্ন খরচ, যেমন আমদানী, ডেভেলপমেন্ট খরচ, মেডিক্যাল, ডিফেন্স, পাবলিক সার্ভিস, ভর্তুকী ইত্যাদি মেটাতে ঋণ নিতে হয়। আর এই ঋণ দিনে দিনে বাড়তেই থাকে যদি প্রত্যাশিত রেভিনিউ সংগ্রহ না হয়।

এবার আসি আমেরিকার বেলায়। আমেরিকা সেই ১৭৯১ সাল থেকেই ঋণের বোঝা টেনে চলছে। প্রথমে ছিলো এর পরিমান ৭৫ মিলিয়ন ডলার। এরপর থেকে প্রায় আজ অবধি ৪০০০% বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে এর পরিমান দাড়িয়েছে ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

একটি সরকার কত পরিমান লোন নিতে পারবে এটার একটা লিমিট করে দেয়া থাকে পার্লামেন্ট থেকে। একটা উদাহরন দেই, আবার সেই ক্রেডিট কার্ড। ধরুন আপনি একটা ক্রেডিট কার্ড নিলেন, আপনার লিমিট ৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আপনি সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার বাইরে খরচ করতে পারবেন না। এই লিমিটটা ব্যাংক করে দেয়। যতোক্ষন আপনি এই লিমিট থেকে কোনো খরচ করবেন না, ততোক্ষন আপনি ঋণীও নন। কিন্তু ধরুন আপনি যদি ২ লাখ টাকা খরচ করেন আর ন্যনতম বিল হিসাবে ১ লাখ টাকা শোধ করেন, তাহলে আপনার লিমিট থাকবে আর মাত্র ৪ লাখ টাকা। কারন ইতিমধ্যে আপনি ১ লাখ টাকা ঋণে আছেন আর ভবিষ্যতে আরো ৪ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন। মোট ৫ লাখ। এভাবে যদি আপনি খরচ বাড়াতে থাকেন আর পুরু বিল শোধ না করেন, একসময় এসে আপনার ৫ লাখ টাকার লিমিট প্রায় শেষ হয়ে যাবে। আমি আপনি ইচ্ছে করলেই সেই লিমিটের বাইরে আর খরচ করতে পারবন না। যদি আবার পুরু টাকাটা আবার সুদসমেত দিয়ে দেন, আবারো আপনার লিমিট ৫ লাখই হয়ে যাবে। আপনি আপনার অব্যবহৃত লিমিট আবার ব্যবহার করতে পারবেন। যদি শোধ না করেন, একসময় এসে আপনি ঋণ খেলাপি হয়ে যাবেন।

আবার ঋণ খেলাপি হবেন না বা আপনি এই ৫ লাখ টাকার বেশিও খরচ করতে পারবেন যদি ব্যাংক আপনার এই ৫ লাখ টাকার লিমিট বাড়িয়ে ১০ লাখ করে দেয়। তখন হয়তো দেখা যাবে যে, আপনার লোন আছে ৫ লাখ আর অব্যবহৃত লিমিট আছে আরো ৫ লাখ। এভাবে যদি আবারো আপনি শুধু খরচ করতেই থাকেন, আবারো আপনার এই নতুন লিমিট ১০ লাখ শেষ হয়ে যাবে। আপনি ইচ্ছে করলেও আর কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন না এবং আপনাকে সুদসহ ১০ লাখ ফেরত দিতেই হবে ব্যাংককে।এখানে পার্লামেন্ট হচ্ছে ব্যাংক, ট্রেজারী ডিভিশন (যিনি খরচ করেন) হচ্ছে আমি, কার্ড হচ্ছে লোনের পরিমান। আমেরিকার এই লিমিট ছিলো ৩১ ট্রিলিয়ন ডলার যা গত কয়েক মাস আগে তাদের পার্লামেন্ট সেটা বাড়িয়ে ৩৩ ট্রিলিয়নে উত্তীর্ন করেছিলো। এটাও এখন শেষ। এখন আবার পার্লামেন্ট এই লিমিট যদি বাড়িয়ে দেয়, তাহলে ট্রেজারী ডিভিশন আবারো তাঁর পলিসি মোতাবেক বিভিন্ন নোটস, বন্ডের মাধ্যমে জনগন তথা বিদেশীদের কাছে ছেড়ে দিয়ে আবারো টাকা /ডলার সরবরাহ বাড়াতে পারবে। কিন্তু আবারো ঋণ আরো বেড়ে যাবে।

আমেরিকা এসব ট্রেজারী নোটস, মার্কেটেবল সিকিউরিটিজ বন্ড, ট্রেজারীবন্ড, বিলস, ফ্লোটিং রেট নোট, ট্রেজারী ইনফ্লেশন প্রোটেক্টেড সিকিউরিটিজ ইত্যাদি বিক্রি করে জাপান, চীন, ইউকে, বেলজিয়াম এবং লুক্সেম্বার্গ থেকে তহবিল সংগ্রহ করেছে। জাপানের কাছে ১.১ ট্রিলিয়ন ট্রেজারীবন্ড আছে, চীনের কাছে আছে ৯০০ বিলিয়ন সমপরিমান ডলারের, ইউকের কাছে ৭০০ বিলিয়ন, লুক্সেম্বার্গে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমান ট্রেজারী নোট রয়েছে। এসব এক সময় না এক সময় ডলারেই পে করতে হবে সুদসমেত। আর এগুলি গ্যারান্টেড। বাকী লোনগুলি হচ্ছে ইন্ট্রা-গভর্মেন্টাল সংস্থা যেমন ব্যাংক, ইনভেষ্টরস, লোকাল সরকার, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ফান্ডস, ইন্সুরেন্স কোম্পানি ইত্যাদি থেকে।

আজকে এই মুহুর্তে যদি চীন, ইউকে, জাপান, লুক্সেম্বার্গ, বেলজিয়াম, ইন্ট্রা-গভর্মেন্টাল সংস্থা তাদের বন্ডসমুহ ছেড়ে দিয়ে ক্যাশ ডলার নিয়ে নিতে চায়, তাহলে আমেরিকাকে অবশ্যই তা ক্যাশ ডলারে লাভসহ পেমেন্ট করতে হবে। আর যদি সেটা ঘটে তাহলে আমেরিকার অর্থনীতি খাড়া নীচের দিকে ধাবিত হবে।

এখন এখানে একটা বড় ধরনের প্রশ্ন জাগে, চীন, জাপান কিংবা অন্য দেশগুলি কেনো আমেরিকান সিকিউরিটিজ কিনে? এর কারন হলো, ডলার ডমিনেটেড সিউকিউরিটিজ কিনলে চীনের বা যারা কিনে তাদের দেশী মুদ্রার মানের চেয়ে ডলারের দাম বেড়ে যায়। তাতে চায়নীজ কিংবা যারা কিনে তাদের প্রোডাক্টের দাম কমে আসে এবং আমেরিকায় তাদের প্রোডাক্ট আকর্ষনীয় হয়। বিক্রি বাড়ে এবং চায়নার বা যারা কিনেছে তাদের অর্থনীতি আরো চাংগা হয়।

১১/০৯/২০২৩-২৫ জন সামরীক কর্মকর্তা বিএনপিতে যোগ

রাজনীতি আগের মতো আর কেউ আদর্শের কারনে করে না। দেশপ্রেম, জনগনের দুঃখলাঘব, বৈদেশিক সম্পর্ক আরো দৃঢ়করনে দেশকে উচ্চতর আসিনে বসানো ইত্যাদি এখন আর রাজনীতিবিদদের স্লোগান নয়। প্রতিটা দেশেই এই চিত্র। হোক সেটা আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা বা এশিয়া অঞ্চল। এটা হয়ে গেছে এখন মুলত ব্যবসায়ীক প্লাটফর্ম, কারো কারো জন্য ঝড়ের রাতে একপ্রকার একটা ঘাটের আশ্রয়ের মতো, আবার কারো কারোর জন্য এটা নিছক একটা আইডেন্টি থাকা দরকার তারজন্য। যারা ব্যবসায়ীক মুটিভেশন নিয়ে রাজনীতি করেন, তাদের অর্থবৈভব থাকায় তাদের অবস্থান এক, যারা ঝড়ের মধ্যে হাবুডুবু খেয়ে শুধুমাত্র বেচে থাকার তাগিদে একটা ঘাট হইলেই হয় ভেবে ঢোকেন, তাদের অবস্থা অন্য। আর যারা শুধুমাত্র একটা আইডেন্টি থাকার জন্য রাজনীতিতে আসেন তাদের অবস্থান তো আরো ব্যতিক্রম। তবে যেভাবেই বলি না কেনো, এটা অনেকটা দাবা খেলার গুটির মতো। যার অর্থ আছে, সে বসে রানীর পাশে, রাজার পাশে, মন্ত্রীর পাশে, অথবা থাকে মন্ত্রীর পাশে ঘোড়া, কিংবা হাতী ইত্যাদি হয়ে। তারা অনেক দূরের কোনো গুটিকে আক্রমন যেমন করতে পারে তেমনি তাদের সুরক্ষার জন্যেও ঢাল তলোয়ার থাকে। কারন তাদের ভ্যালু আলাদা।

আর যারা ঝড়ের মধ্যে হাবুডুবু খেয়ে শুধুমাত্র বেচে থাকার তাগিদে একটা ঘাট হইলেই হয় ভেবে ঢোকেন, এদের অবস্থাটা এ রকম যে, গরম কড়াই থেকে উনুনে পড়ার মতো। রাজনীতিতে ঢোকলেও অরক্ষিত আবার না ঢোকলেও অরক্ষিত। ফলে দলে তাদের অবস্থানটা সেই রানী, রাজা মহারাজারা কিংবা মন্ত্রী, হাতীরা সেভাবেই দেখেন যেভাবে তারা দেখেন একটা এতিমকে। কখনো তারা তাদের মাথায় হাত বুলান, আবার কখনো তারা তাকে সামনের সুনামীতে পাহাড়াদার করেন, আবার এমনো হয় তারা কখনো কখনো তাদের পরিচয়টাও ভুলে যান।

আর তৃতীয় সম্ভাব্য স্তরের কথা তো আরো ভয়াবহ। তারা শুধু একটা আইডেন্টিই পান, তার না থাকে রাজা-রানীর কাছে যাওয়ার ক্ষমতা, না পান তাদের কাছে কোনো আর্জি রাখার সরাসরি দরবার, না পারেন নিজের জন্য কিছু করতে। এই পক্ষটার সামনেই ঝুলে থাকে আরো দুটু শক্ত স্তরের দেয়াল। তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হয়না সেই প্রথম স্তরের মতো বিচরন করা বা সেই দেয়াল টপকিয়ে সামনে আসা। কারন এদের আবির্ভাবই হয়েছে শুধুমাত্র “আছি”র মতো একটা আইডেন্টি পাওয়ার জন্য। সেটা তো সে পেয়েছেই।

এই দুই পক্ষের যাদের অর্থবৈভব নাই, তারা হবেন প্রথম সারির সৈনিক। এই সৈনিকদেরকে হাতী খাবে, ঘোড়া খাবে, কিস্তিতে মাত করবে, আবার অপর পক্ষের সৈনিকেরাও এই আমজনতা সৈনিকদেরকে খাবে। এরা মরার জন্যই গুটির প্লেটে জন্ম নেয়। এদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা একপা এগুনোর, দুইপা হয়তো কখনো কখনো যেতে পারে কিন্তু সেটা খুবই কদাচিত। তবে কখনোই অনেক ঘর পেরিয়ে রানী-রাজার কাছে যেতে পারেন না।

রাজনীতির দোলাচলে যখন ক্ষমতার দন্দ বা পালাবদল হয়, তখন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় পরবর্তী দুই স্তরের বাহিনীর। তারা এবং তাদের সাথে তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন অনেক কিছু হারায়, বন্ধু হারায়, নাগরীক সুবিধা হারায়, সমাজও হারায়, বঞ্চিত হয় অনেক মৌলিক অধিকার থেকে। তারসাথে যেটা যোগ হয় সেটা আরো করুনতর। কারন কোনো কিছু না করেই দাড়াতে হয় কাঠগড়ায়। আর সেই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বুঝা যায় পৃথিবীতে কোনো আদালত আজ পর্যন্ত স্বাধীন হয় নাই। কন্ঠের সর্বোচ্চ চিৎকারেও কেউ শুনতে চায় না, দুঃখের করুন কাহিনী কিংবা অবিচারের কষ্ট। তখন অনেক সহৃদয় বন্ধু, কাছের কিছু মানুষেরাও তাঁর সাহাজ্যে আসতে চাইলেও আসতে পারেন না। কারন তখন আক্রান্ত মানুষটি একটি ব্রান্ড। ব্রান্ডের যেমন আলাদা মুল্যায়ন, তেমনি অবমুল্যায়নও হয়। ব্রান্ড হওয়া খুব বিপদজনক। 

মানুষের জীবনটা খুব ছোট। এই ছোট জীবনে প্রতিদিন আকাশ দেখলেও আকাশের মিষ্টি দৃশ্য দেখে শেষ করা সম্ভব না, বৃষ্টির দিনে ভিজলেও যে মজা সেই মজাটা এই ছোট জীবনেও উপলব্ধি করে শেষ করা যায় না। রাস্তার ধারে অবহেলিতভাবে যে লাল ফুলটা প্রস্ফুটিত হয়ে আছে, তাঁর রুপটাও কোনো এক শিশির ভেজা সকালে দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। এই ব্রান্ডেড রাজনীতির কারনে আমাদের ছোট এই জীবনের অনেকটা সময় ক্ষমতার দন্দে বা দোলাচলে এসব হয়তো অনেকের ভাগ্যেই আর জোটে না। তাদের পা দৌড়াতে দৌড়াতে যখন ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন দিনের শেষ আলোটা প্রায় নিভু নিভু।

৯/৯/২০২৩-সাদাচুল কালোকরন

আমার বউকে বললাম, কি এক অবস্থা আমার চুলের! সব সাদা হইয়া যাইতেছে। একমাস পরপর কালো কলপ দিয়া কালী কইরা আর কত? ভাবছি, এবার কালো কলপ না দিয়া সাদা স্নোসেম মাইরা পুরাই সাদা কইরা ফালাই। কি বলো?

বউ আয়নায় কি জানি রূপচর্চা করিতেছিল। আয়নার দিকে তাকাইয়াই আমার উদ্দেশ্যে বলিলো-করো, অসুবিধা নাই, ভুতের মতন দেহা যাইবো তোমারে। যেই না চিকার মতো চেহাড়া, আবার সাদা চুল। ভুতের মতোন লাগবো।“

মনে মনে ভাবলাম, হায়রে আজ থেকে ৩৬ বছর আগের সেই চেহাড়া কোথায় গেলিরে বাপ? তখন তো এই মহিলাই আমারে নায়ক শাহরুখ খান ভাবতো। তাই আমারে ছাড়া আর কাউরে বিয়া করবো না কইয়া তিনদিন না খাইয়া আছিলো। আমি নাকি সেই রাজপুত্তুর।  বিশ্বে আমার থেকে নাকি এতো সুন্দর যুবক আর তাঁর চোখে পড়ে নাই। আর আজ? কষ্টে কইলজার সাথে মাথার চুল পর্যন্ত পইড়া যায়যায় ভাব।

ঢেকুর তুলিয়া বলিলাম,

যাক, তাওতো ভালোই। সবাই তো ভুতেরেই ভয় পায়। রাস্তায় গাড়ির জ্যামে আমাকে দেখলেই সবাই ভয়ে রাস্তা ফাকা কইরা দিবো, জ্যাম শেষ। উগানাডার পুলিশও মনে হয় ভুতেরে ভয় পায়, পাওয়ার তো কথা। তারাও আর অযথা আমার গাড়ি চেকের ঝামেলা করবো না, যারা সুদটুদ খায়, তারাও নিশ্চয় আল্লাহরে ভয় না পাইলেও ভুতেরে তো অবশ্যই ভয় পায়। তারাও আর কেঊ টাকা পয়সা চাইবো না। ভুতের সাথে আর যাই হোক, লেনদেন করা বিপদজনক। অনেক বাটপার টাটপার আছে, টাকা ধার চায়, তারাও ভুতের চেহাড়ার কারনে কাছেটাছে আইবো না, আর ধারও চাইবো না, সবাই আমারে ডরাইবো। অস্ত্র ছাড়া, হুমকী ছাড়া, ঘুষ বানিজ্য দেয়া ছাড়া সবাই আমারে ভুত মনে কইরা ডরাইবো। মন্দ কি? এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করা কি আমার ঠিক হইবে?

জাতী জানতে চায়।

৯/৯/২০২৩-আমার জন্মদিন

গত ৮ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিন ছিলো। আমি আসলে ইদানিং আর জন্মদিন পালন করি না। ফলে মনেও ছিলো না।

প্রথম মনে করিয়ে দিলো আমার বউ। অবশ্য তিনিও মাঝে মাঝে আমার জন্মদিন মনে রাখতে পারেন না, কিন্তু যেভাবেই হোক, কষ্ট করে হলেও তিনি মনে রাখার চেষ্টা করেন, এবারো মনে রেখেছেন। তাঁর এই প্রথম সংবাদে বুঝলাম, ৮ সেপ্টেম্বর চলে এসছে। আমি অবশ্য আমার বউ এর জন্মদিন ভুলার সাহস করি না, কারন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, চুলা বন্ধ হয়ে বিছানাও আলাদা হয়ে যেতে পারে, তাই রিস্ক নেই না। মোবাইলে, কমপিউটারে, ফেসবুকে, সবখানে আগাম এলার্ম দিয়া রাখি যাতে আমি ভুলে না যাই। যেই মাত্র ওনারে “শুভ জন্মদিন কইয়া লাইছি, আবার এক বছর শান্তি”। মাঝে মাঝে ভুইল্যা যামু এই চিন্তায় সাতদিন আগেও কইয়া রাখি যে, শোনো আগামী অমুকদিন কিন্তু তোমার জন্মদিন, আবার ভুইল্যা যাইও না। আসলে আমি কিন্তু খুব গোপনে দায় সেরে ফেললাম। মহিলা মানুষ, পুরুষের চালাকী ধরতে পারেননা।

যাই হোক, এবারে যখন ফেসবুকের টাইমলাইন, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসআপ, মোবাইলের ম্যাসেজে শতশত “হ্যাপি বার্থ ডে” পাইলাম, তখন আরেকটা কথা আমার বুঝতে সুবিধা হইলো যে, আমার ফেসবুকে যারা মরার মতো কোনো কমেন্ট না কইরা আজিমপুর গোরস্থান মনে কইরা পইড়া থাকেন, আসলে তারা ওই রকম না। তারা পার্কে বসা একাকী দর্শকের মতো থাকেন, দেখেন, পড়েন, হাসেন, কাদেন কিন্তু কিছুই কন না। কিন্তু টাইম মতো আবার ঠিক সরব হন। যেমন আমার জন্মদিনে আমি এতো এতো হ্যাপি বার্থ ডে পাইছি, দোয়া পাইছি তাদের কাছ থেকেও যারা কোনোদিন আমার লেখায় কমেন্ট করে না, লাইক দেন না কিংবা সরব হন না। ভালোবাসাটা মনে হয় এ রকমই। দেখা যায় না, শুধু উপলব্ধি করা যায়। আমি এবার তাদের ভালোবাসাটা খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি। ধন্যবাদ আপ্নাদেরকে।

কিছু খুব আদরের ছেলেরা আমার অনেক বিরল ছবি দিয়েও আমার টাইম লাইনে আমার “হ্যাপি বার্থ ডে” পোষ্ট করেছে। তাদের এই ভালোবাসা আমাকে নষ্টালজিক করে তুলে ফেলেছিলো। সেই সব বিরল ছবি দেখে আমার সময় যেনো  পিছিয়ে গেছে সেই দিনে যখন ছবিটা তোলা হয়েছিলো। আবেগিত হয়েছি অনেক। এসব ভালোবাসার মুল্য দেবার আমার ক্ষমতা নাই।

আসলে ওই যে একটা লেখা লিখেছিলাম, ভালোবাসা কোনো দোকানে, কোনো শপিং মলে কিংবা কোনো পাহাড় পর্বতের চূড়ায় অথবা কোনো এক রাজপ্রাসাদেও কেজি দরে কিনতে পাওয়া যায় না। এসব ভালোবাসা থাকে মানুষের অন্তরে, হৃদয়ে আর মনের ভিতরে। আপনাদের এসব ভালোবাসার মুল্য আমাকে চোখের জলেও হয়তো পরিশোধ হবে না।

আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ আপনাদের এই প্রান ঢালা ভালোবাসায়। বয়স হয়ে যাচ্ছে, প্রতিটি জন্মদিন আমাকে আমার শেষ গন্তব্যের দিকে একটি একটি বছর করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো একদিন আর জন্মদিনের শুভেচ্ছার কোনো প্রয়োজন হবে না, তখন শুরু হবে আরেকটি পর্ব-মৃত্যু দিবসের দোয়া।

সবার কাছে দোয়া চাই, সবার কাছে ক্ষমা চাই যদি ভুল করে থাকি। আমিও সবার জন্য দোয়া করি। আর ক্ষমা? আমি কখনোই মনে করি না কেউ আমার কাছে কখনো ভুল করেছে।

সবাইকে ধন্যবাদ।

০৭/০৯/২০২৩-নিষেধাজ্ঞা-পূর্নিমার চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটি

আগের যে কোনো বছর থেকে ২০২২ সালের পরে ন্যাটো উল্লেখযোগ্যভাবে সবার নজরে এসছে এবং ন্যাটো নিয়ে অনেক আলোচনাও হচ্ছে। এই ন্যাটোটা আসলে কি?

ন্যাটো (NATO) মানে হচ্ছে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগ্যানাইজেশন।

এটি বর্তমানে ৩১টি দেশ (২৯ টি ইউরোপের এবং ২টি উত্তর আমেরিকান) নিয়ে গঠিত একটা আন্তঃসরকার  সামরীক জোট। বস্তুত স্নায়ুযুদ্ধের আগে তদানীন্তন সোভিয়েট ইউনিয়নের (USSR) ওয়ার্শো প্যাক্ট (Warsaw Pact) এর বিপরীতে USSR থেকে আগত যে কোনো আক্রমনাত্তক হুমকীকে মোকাবেলা করার জন্য এই ন্যাটো জোটের উদ্ভব। প্রথম মোট ১২টি দেশ (বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, ইতালী, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, পর্তুগাল, ব্রিটেন, এবং আমেরিকা) নিয়ে ন্যাটোর জন্ম। যদিও ন্যাটোর সম্প্রসারনের নিমিত্তে তদানিন্তত আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানীর রাষ্ট্র প্রধানদের মাধ্যমে এটাই কথা ছিলো যে, ভবিষ্যতে ন্যাটোর কোনো সম্প্রসারন হবে না এবং কাউকে আর সদস্য করাও হবে না।  কিন্তু পরবর্তীতে আরো ৯ বার এর সম্প্রসারন হয়েছে যা রাশিয়ার জন্য বিপদ সংকেত বলে রাশিয়া মনে করে। USSR এর অধীনে করা ওয়ারশো প্যাক্ট বাতিল হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু ন্যাটো রয়ে গেছে যা পরবর্তীতে USSR Bloc এর বাইরে বলকান, মধ্যপ্রাচ্যে, দক্ষিন এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যেমন কুয়েত, আফগানিস্থান, লিবিয়া, ইরাক, বসনিয়া-হার্জেগোবিনা, সিরিয়া, ইউগোস্লাব, কসোবো ইত্যাদি দেশে ন্যাটো মিলিটারী অপারেশন করেছে। ন্যাটোর প্রধান হেডকোয়ার্টার বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে এবং এর সামরিক সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩৫ লক্ষ (বস্তুত এই ৩১ দেশের সামরিক সদস্য যা, সেটাই ন্যাটোর সংখ্যা)। 

এ যাবতকাল রাশিয়া ন্যাটোর সম্প্রসারনের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আপত্তি তোলেনি। কিন্তু রাশিয়া সবসময় এটাই বলেছে যে, রাশিয়ার দোড়াগোড়ায় ন্যাটো তাঁর সামরিক জোট স্থাপনে সে কোনোভাবেই মেনে নেবে না মানে “রেড লাইন”। সর্বশেষ যখন ইউক্রেন ন্যাটোর সামরিক জোটে যোগদানের সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করে, রাশিয়া তাঁর বিপক্ষে অবস্থান গ্রহন করে। এ ব্যাপারে ন্যাটো এবং তাঁর নেতৃবৃন্দকে রাশিয়া একটা পিসপ্ল্যান দিয়েছিলো। যার মধ্যে রাশিয়াকেও ন্যাটোতে নেয়া হোক এটা ছিলো। কিন্তু ২০২১ সালে সেটা অগ্রহনযোগ্য বলে আমেরিকা তা প্রত্যাখ্যান করে। দেখি পুটিন কি বলেছিলো আর এর উত্তরে ন্যাটোর প্রধান কি বলেছিলোঃ

Putin asked U.S. president Joe Biden for legal guarantees that NATO would not expand eastward or put "weapons systems that threaten us in close vicinity to Russian territory."[134] NATO Secretary-General Jens Stoltenberg replied that "It's only Ukraine and 30 NATO allies that decide when Ukraine is ready to join NATO. Russia has no veto, Russia has no say, and Russia has no right to establish a sphere of influence to try to control their neighbors."[135][136]

গন্ডোগোলটা ঠিক এখানেই। ইউক্রেনকে ইউরোপিয়ান ব্লকে যোগদানে রাশিয়ার কোনো আপত্তি নাই, তাঁর আপত্তি শুধু সামরিক জোটের বিরুদ্ধে। ন্যাটোতে ইউক্রেন যোগ দিতে পারবে না এই অজুহাতেই রাশিয়া ইউক্রেনে স্পেশাল অপারেশন চালায়। সে ইতিহাসে আর গেলাম না।

এখন বড় প্রশ্নটা হচ্ছে-ইউক্রেনকে ন্যাটোর এই ৩১ টা দেশ একযোগে সামরিক, অর্থনইতিক এবং যাবতীয় মিলিটারী ইন্টিলিজেন্স দিয়ে সাহাজ্য করলেও সরাসরি তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অংশ গ্রহন করছে না কেনো? ব্যাপারটা জানা দরকার।

ন্যাটোর গঠনতন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শর্ত হচ্ছে-আর্টিক্যাল-৫। এর মাধ্যমে বলা হয় যে, ন্যাটোর যে কোনো একটি সদস্য দেশ যদি কারো দ্বারা মিলিটারিলি আক্রান্ত হয়, তাহলে ন্যাটোর অন্যান্য সমস্ত দেশ একযোগে তাঁর সাপোর্টে যুদ্ধ করবে। এই পরিচ্ছেদটা কাজে লাগিয়েই ৯/১১ এর পর আমেরিকা আফগানিস্থান আক্রমন করেছিলো। আর তাঁর ধারাবাহিকতায় লিবিয়া, সিরিয়াতে তাদের অপারেশন সম্প্রসারন করে। কিন্তু এবার ন্যাটো সেটা করতে পারছে না। কারন দুটু। (১) ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য নয়, তাকে কেউ আক্রমন করলেও ন্যাটোর সদস্যদেশ গুলি একযোগে ইউক্রেনের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ করতে পারবে না (২) রাশিয়া সর্বোচ্চ নিউকধারী একটি দেশ। রাশিয়ার এক্সিস্ট্যান্ট যদি রাশিয়া থ্রেট মনে করে, তারা যে কোনো সময়ে তাদের নিউক ব্যবহার করার সাংবিধানিক আদেশ রয়েছে। এতে ৩য় বিশ্ব যুদ্ধ একেবারেই হাতের ট্রিগারের মধ্যে। এটা কেউ শুরু করতে চায় না।

ইউক্রেনের একক সামরিক শক্তিতে ইউক্রেনে যুদ্ধটা এতোদিন চলমান থাকার কথা নয়। এটা এতো সময় দীর্ঘায়ু পাচ্ছে কারন ন্যাটো এবং কালেক্টিভ ওয়েষ্টের ছায়া যুদ্ধের কারনে যেখানে তারা সরাসরি অংশ গ্রহন না করেও যাবতীয় সামরিক, অর্থনইতিক, ইন্টিলিজেন্সের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তারপরেও ইউক্রেন তেমন সাফল্য পাচ্ছে না। তাহলে ন্যাটোর কিংবা পশ্চিমাদের এই প্রক্সিওয়ার কি ইঙ্গিত দেয়?

ইঙ্গিত দেয় যে, ন্যাটো সদস্য দেশগুলি তাদের সর্বাত্তক সাহাজ্য সহযোগীতা করেও যখন তেমন কোনো সফলতা পাচ্ছে না, তাহলে আর্টিক্যাল-৫ এর বিনিময়েও ন্যাটো তাঁর সদস্য দেশ সমুহকে সুরক্ষা দেয়ার ক্ষমতা রাখেনা। এটা একটা পেপার টাইগার। ন্যাটোর জন্য আলাদা কোনো পার্লামেন্ট নাই, ন্যাটোর জন্য আলাদা কোনো আইন নাই, কোনো এনফোর্সমেন্ট নাই, এবং সদস্যদেশ সমুহের নাগরীক বা সইনিকদেরকে পুরুষ্কার বা শাস্তির কোনো বিধানও নাই। এগুলি কন্ট্রোলড হয় প্রতিটি ন্যাটোভুক্ত দেশের তাদের নিজস্ব আইনের দ্বারা। পুরুটাই যার যার তাঁর তাঁর। রিসোর্স যার যার দেশের তাঁর তাঁর অধীনে থাকে, হোক সেটা মিলিটারী, জনবল কিংবা সামরিক সরঞ্জাম। অস্থায়ীভাবে কোনো একটা অপারেশনের আগে সেগুলি সদস্যভুক্ত দেশ সমুহের রিসোর্স ন্যাটোর অধীনে শুধুমাত্র অপারেশন অর্ডারের জন্য স্থাপিত হয় বটে আবার যে কোনো সময় সেই সদস্যদেশ যখন খুশী তুলেও নিতে পারে। এমন একটা খাপ ছাড়া স্ট্রাকচারের মধ্যে ন্যাটো কমান্ডারগনও সাফল্যের মুখ দেখা খুবই কঠিন।

এই ইউক্রেন যুদ্ধে সব ন্যাটোর সদস্যরা যেভাবে তাদের মিলিটারী স্টকপাইল নিঃশেষ করেছে, এরফলে সদস্য দেশসমুহের বর্তমান অবস্থা এমন যে, তারা নিজেরাই নিজেদের ডিফেন্স মেকানিজমকে দূর্বল করে ফেলেছে। ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশই এখন নিজ শক্তিতে তাদের নিজস্ব হুমকী মোকাবেলায় সমর্থবান নয়। কারো এমুনেশন স্টকপাইল শেষ, কারো মিসাইল সিস্টেম অর্ধেক হয়ে গেছে, কারো এয়ার ফোর্সের যুদ্ধ বিমান শেষ, কারো ট্যাংক শেষ, কারো আবার রিজার্ভও শেষ।

অন্যদিকে হুজুকের বশে পড়ে, কিংবা কাউকে খুশী করার নিমিত্তে রাশিয়ার উপর তেল, গ্যাস, খাদ্যশস্য, ইউরেনিয়াম, ফার্টিলাইজার, লোহা, ডায়মন্ড, এবং আরো কমোডিটি নিষেধাজ্ঞায় দেয়ায় এখন প্রতিটি ইউরোপিয়ান এবং ন্যাটো অন্তর্ভুক্ত দেশসমুহের আর্থিক মন্দায় এতোটাই জর্জরীত যে, তারা না নিজেরা তাদের ঘাটতি পুরনে সক্ষম, না ঘাটতি ডিফেন্সিভ মেটারিয়েলস পুনরায় রিপ্লেস করতে সক্ষম। রাশিয়ার উপর নির্ভরশীল এনার্জি সেক্টরের ঘাটতির কারনে ইউরোপের ইন্ডাস্ট্রিজগুলি প্রায় বন্ধের পথে (৪৫% ইন্ডাস্ট্রিজ এখন বন্দ শুধুমাত্র এনার্জি ঘাটতির কারনে)। আর যেগুলি চলমান তারাও বিশ্ব বাজারের কমপিটিশনে টিকতে পারছে না প্রোডাক্ট খরচ বাড়িতির কারনে। রাশিয়ার ফার্টিলাইজারের অভাবে কৃষিজ উৎপাদন প্রায় ঘাটতির দিকে ইত্যাদি। তাদের মুদ্রাস্ফিতি আকাশ চুম্বি, বেকারত্তের হার যে কোনো সময়ের থেকে প্রায় ২৫% বেশী।

এমন অবস্থায় প্রতিটি ইউরোপিয়ান কান্ট্রি (তথা ন্যাটোভুক্ত দেশসমুহ) এবার নিজেদের দেশের উপর ইন্ডিভিজুয়ালী নজর দিচ্ছে। তারা এই উপলব্দিতে আসা শুরু করেছে যে, রাশিয়ার সস্তা কমোডিটি ছাড়া, রাশিয়ার গ্যাস, তেল, ফার্টিলাইজার, লোহা, খাদ্যশস্য ছাড়া ইউরোপ অচল। তাদের রাশিয়াকে দরকার। ন্যাটোর চেয়ে আরো বেশী প্রয়োজন তাদের রাশিয়াকে। তাছাড়া রাশিয়া তো ইউরোপেরই একটা অংশ এবং প্রতিবেশী। তারা এবং তাদের জনগনেরা এটা বুঝা শুরু করেছে যে, রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা দিতে গিয়ে তারা নিজেরাই এখন শীতে কাবু, খাদ্যে ঘাটতি, বেকারত্তে জর্জরীত, এবং তারা অসহায় হয়ে পড়ছে।

ঠিক এই পরিস্থিতিতে সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্তেও সেই ইউরোপিয় ইউনিয়নের দেশগুলিই  যারা রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তারাই স্পেশাল অপারেশন শুরু আগে যে পরিমান আমদানী করতো, এখন সেটা বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০%।

এই কন্সেপ্ট থেকে আমার কাছে মনে হচ্ছে-ন্যাটো জোটের উপর ন্যাটোর দেশসমুহই দিনকে দিন কনফিডেন্স হারিয়ে ফেলছে, ধীরে ধীরে সাধারন জনগন ন্যাটোর বিরুদ্ধে এবং রাশিয়ার পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে। তাহলে কি এটা ভাবা খুব একটা অসমীচিন হবে যে, খুব দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই ন্যাটো কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সংঘবদ্ধ ক্লাব? অথবা থাকলেও রাশিয়ার সাথে এমন কোনো শর্তাবলীতে আসতে হবে যা ন্যাটোর প্রধান উদ্দেশ্য (রাশিয়াকে দমন) ব্যহত হবে।  

৬/৯/২০২৩-মনুষত্য যেখানে অমানবিক (ফারুক কাহিনী)

আজকের দিনটাকে ভেবে আগামীকালের দিনগুলি কেমন যাবে, ভালো না আরো ভালো নাকি খারাপ থেকে আরো খারাপ, সেটা বিচার করার বা উপলব্ধি করার কোনো বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা মানুষের কাছে নাই।  আজকের রবিবারে হয়তো আপনি খিল খিল করে হাসছেন, আগামী রবিবার হয়তো এমন হতে পারে আপনার চোখের পানি সংবরন করার ক্ষমতাও আপনার নাই। কিংবা আজকে শনিবার যতোটা আপনি পেরেসান হয়তো দেখা যাবে আগামী শনিবারটা আপান্র জন্য এতোই মধুর যা তাঁর আগের দিনেও ভাবেন নি। আর এ জন্য আমি একটা কথা সব সময় বিশ্বাস করি জে, ভগবান সব দিনেই আপনাকে হাসিতে যেমন রাখেন না, তেমনি সব দিনেই আপনি কষ্টেও রাখেন না। এটাই নিয়তির সাথে ভগবানের একটা অদৃশ্য খেলা।

মানুষের মাথার উপর যখন কেউ হাত রাখে, তখন সেই হাতটাকে অনেক বড় অবলম্বন মনে হয়। পাতুক বা না পারুক সমস্ত কিছুর সমাধান দিতে, তারপরেও মনে হবে কেউ তো আছে যার কাছে গিয়ে অন্তত চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষনের জন্যে হলেও কষ্টে কান্না করা যায়, অথবা মুচকী হাসা যায়। আর এই সেই ‘কেউ’ এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘কেউ’ হচ্ছে সন্তানের জন্য তাঁর পিতামাতা, স্ত্রীর জন্য দায়িত্বশীল তাঁর স্বামী কিংবা দায়িত্বশীল স্বামীর জন্য কোনো দায়িত্বশীল স্ত্রী কিংবা সন্তান সন্ততিরা।

আজকে এমনই একটা ঘটনার অবতারণা হলো আমার সামনে। ওর নাম ‘ফারুক’। আমারই আপন বোনের ছেলে।

ফারুকের মা আমার আপন বোন শায়েস্তা। বোনদের মধ্যে সে ছিলো দ্বিতীয়। ছোট বেলা থেকেই সে ছিলো খুব মেধাবী। গায়ের রঙ কালো আর খুব জিদ্ধি ছিলো এই শায়েস্তা। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের সংসারে বেশ টানাপোড়েন শুরু হয়। পাঁচ জন বোন, সাথে মা আর আমি এই সদস্যদের নিয়ে আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ মুটামুটি হিমশিম খাচ্ছে লালন পালনে। তাঁর অবদানের কথা আমরা কেহই অস্বীকার করতে পারবো না।

যাই হোক সেই অবস্থান টা এক সময় আমাদের পরিবর্তন হয়ে আবার কিছুটা থিতু হইলেও আমার বোন শায়েস্তার জীবনে নেমে আসে এক কালো অধ্যায়।

২৪/০৮/২০২৩-প্রিগোজিন সংবাদ-১

 

রাশিয়ার টিভিয়ার রিজিয়নে ভাগনার গ্রুপ প্রধান প্রিগোজিনের  প্রাইভেট জেট ১৩৫ বিজে লিগেসি ৬০০ মস্কো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গে যাওয়ার প্রাক্কালে ক্রাশ করে এবং অনবোর্ড সাতজন আরোহী এবং তিনজন ক্রু মোট ১০ জনই নিহত হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে। এই সাতজন আরোহীর মধ্যে ভাগনার গ্রুপ প্রধানের নাম লিষ্টেড ছিলো। খুব স্বাভাবিক চিন্তায় এটাই ভাবার কথা যে, ভাগনার গ্রুপ চীফ আর বেচে নেই। কিন্তু কোনো রাশিয়ান টিভি নিউজ, কিংবা গোয়েন্দা তথ্যে তাঁর মৃত্যুখবরের সত্যতা নিশ্চিত করছেনা। খবরে আরো প্রকাশ করেছে যে, প্রিগোজিনের দুটু জেট পরপর উড্ডয়ন করেছিলো যার একটির টেইল লেজ আরএ-০২৭৯৫ এবং অন্যটি আরএ-০২৮৭৮। প্রথমটিতেই ভাগনার চীফের নাম প্যাসেঞ্জার লিষ্টে ছিলো যেটা ক্রাশ করেছে কিন্তু ২য়টি সেফ ল্যান্ডিং করেছে। ইতিমধ্যে ১০ জন নিহতের মধ্যে ৮ জনের বডি পাওয়া গেছে আর দুইজনের পাওয়া যায়নি। এই আটজনের মধ্যে প্রিগোজিনের বডি নাই।

উপরের খবরগুলিই এ পর্যন্তই সবসুত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আমার কিছু এনালাইসিস আছে। যা নিম্নরূপঃ

(ক)       এমন একটা জেট ক্রাশিং এর জলন্ত অগ্নীর বিভিষিকায় কারোরই বডি কিছুটা হলেও অক্ষত থাকতে পারেনা। অন্তত মুখ দেখে তাদেরকে সনাক্ত করার উপায় থাকার কথা না। ডি এন এ টেষ্ট করার মতোও কোনো উপযোগী তথ্য পাওয়া যাওয়ার কথা না অথচ আটজনকে খুব সহজেই শনাক্ত করা গেলো। ব্যাপারটা খুব একটা কনভিন্সিং না আমার কাছে।

(খ)        আজকাল বডি ডাবল করা খুব কঠিন কাজ নয়। বডি ডাবল করে আজকাল বিখ্যাত লোকেরা যে কোনো নামীদামী হোটেলেও তাদের নামে হোটেল বুকিং করে দেখা যায় অন্যত্র অরিজিনাল ব্যক্তি অন্য কাজ করছে। আর এটা তো মাত্র একটা প্রাইভেট জেট, আর প্যাসেঞ্জার লিষ্টে নাম তোলাও খুব একটা আহামরি কিছু না। তাহলে কি এটা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় যে, প্রিগোজিন নিহত হবার ব্যাপারটা একটা নাটক বা ভিন্ন কৌশল? হয়তো বডি ডাবল? হতে পারে প্রিগোজিনের এই নাটক দিয়ে প্রিগোজিন আবার নিরাপদ জীবন যাপনে স্বাভাবিক লাইফ লিড করবেন কিনা।  

(গ)       প্রিগোজিনের জেট ক্রাশ করার সময় সিংগেল হ্যান্ডে ইউক্রেনের একটা আর্মারড ব্রিগেডকে ধংশকারী রাশিয়ার ট্যাংক সদস্যকে মেডাল পুরুষ্কার দিচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং এ যাবত সময় পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রিগোজিনের নিহত হবার ব্যাপারে বা অন্যান্য সদস্যদের নিহত হবার ব্যাপারে কোনো প্রকার মন্তব্য করেন নাই। তিনি পুরুই নীরব। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লাগছে।

(ঘ)        প্রিগোজিনের মৃত্যুর সংবাদ এর আগেও অনেকবার খবরের মধ্যে ব্রেকিং নিউজ হিসাবে এসেছিলো। ১ম বার এসেছিলো তাও আবার অফিশিয়ালভাবে ২০১৯ সালে আফ্রিকায়। অতঃপর সে জীবিত অবস্থায় ডনবাসের ফ্রন্টলাইনে আবার যুদ্ধ করেছে।

(ঙ)       যদি প্রিগোজিন আসলেই নিহত হয়ে থাকে যা এখনো কেউ নিশ্চিত করছেনা, তাহলে হতে পারে কি যে, প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রিগোজিনের তথাকথিত অভ্যুথানের কারনে পূর্বের সাধারন ক্ষমা ঘোষনায় লোক দেখানো একটা নাটক করেছিলো কিন্তু এই ক্রাশের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেয়াই ছিলো মুল পরিকল্পনার একটা গোপন পর্ব যাতে প্রেসিডেন্টের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন না হয়? কিন্তু এখানে আরো একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায় তখন, আর সেটা হলো নিষ্পত্তিমূলক একটা বিতর্কিত ভুল বুঝাবুঝির অবসানের পর প্রিগোজিনকে সরিয়ে দিয়ে পুতিনের লাভ কতটুকু। অথবা পুতিনের থেকেও কি অন্য কারো আরো বেশী লাভ হয়েছে প্রিগোজিনকে সরিয়ে দিয়ে? এখানে বলে রাখা ভালো যে, প্রিগোজিন সেই অভ্যুথানের পরে রাশিয়াকে গ্রেট এগেইন করার একটা প্রতিশ্রুতি এবং আফ্রিকাকে আরো মুক্ত করার ঘোষনা দিয়েছিলো।   পুতিনের থেকে তাহলে আর কাদের বেশী লাভ হতে পারে প্রিগীজিন নিহত হলে? প্রিগোজিন আফ্রিকার নিজারে কোনো প্রকার হস্থক্ষেপ করুক এটা পশ্চিমা বিশ্ব, ফ্রান্স, ব্রিটিশ এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কেউ চায়নি বরং তারা প্রিগোজিনের ব্যাপারে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। অন্যদিকে পোল্যান্ড বেলারুশে ভাগনার গ্রুপ এবং তাঁর চীফ প্রিগোজিন অবস্থান করবে এটা জেনে যথেষ্ঠ দুসচিন্তায় ছিলো এবং ইতিমধ্যে পোল্যান্ড সেখানে প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে। এটাও হতে পারে যে, রাশিয়া নয়, অন্য কেউ এই স্যাবোটাজ করেছে?

অনেক প্রশ্নের উত্তর আমরা এখুনি হয়তো জানতে পারবো না, হয়তো কখনোই জানতে পারবো না। “সময়” সব সময় এর সঠিক উত্তর জানে।

 

বিশ্ব শান্তিতে থাকুক, যুদ্ধ বন্ধ হোক, সাধারন মানুষের জীবনযাত্রা আরো নিরাপদ হোক, আসলে আমাদের মতো আম জনতা এটাই চায়।

২১/০৮/২০২৩-মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ উধাও

Metaverse Foreign Exchange Group – MTFE

মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ নাকি ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে উধাও। আর এর ৯০% গ্রাহক নাকি বাংলাদেশের। সিংগাপুর বা কানাডাভিত্তিক পরিচালিত।

খবরটা শুনে দেশের জন্য খারাপ লাগলেও গ্রাহকদের বেলায় আমার ন্যুনতম খারাপ লাগেনি। কেনো গ্রাহকদের জন্য খারাপ লাগেনি সেটা বলছি।

৬৫০০০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতিমাসে ২৪০০০ টাকা মুনাফা দেবে এই মেটাভার্স। এরমানে ৪৫০% হারে। আবারো বলছি- চার শত পঞ্চাস পারসেন্ট হারে। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কোনো ফর্মুলা? আমরা যারা ব্যবসা করি, তার ১০% প্রফিট পেলেই বলি, আলহামদুলিল্লাহ, অনেক প্রফিট। আর মেটাভার্স দিচ্ছে ৪৫০%? কোথায় কোন ব্যাংক, ফাইনান্সিয়াল ইন্সটিটিউট কিংবা শেয়ার মার্কেট কিংবা দাদন ব্যবসায়ী এত হারে প্রফিট দিয়েছে?

এদেশের মানুষকে কেউ বোকা ভাবার কোনো কারন নাই। মানুষ বোকা নয়। মানুষ আসলে লোভী, অলস এবং ভয়ানক চতুর। শর্টখাটে দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশ্রমবিহীন অনেক বড়লোক হতে চায়। তারা একবারও ভাবেনা যে, শর্টখাটে পরিশ্রমবিহীন কেউ বড়লোক হতে পারে না।

বড়, মাঝারী কিংবা ছোট ছোট সাকসেস পাওয়া কোম্পানি গুলির দিকে যদি তাকান, দেখবেন, তারা কি পরিমান পরিশ্রম করে এই পর্যায়ে এসছেন। অনেকটা যুদ্ধ করতে হয়েছে।

অথচ, এই যে মেটাভার্সের গ্রাহকরা তারা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে পরিশ্রম ছাড়া মাসে মাসে অনেক অনেক টাকা রোজগার করে ফেলবেন বলে। এই মেটাভার্সের কোনো অফিস এদেশে নাই, কোনো লিয়াজো অফিস নাই, নাই কোনো কর্মচারী। কিছু হায়ার করা খন্ডকালীন কিছু এজেন্ট আছে যাদের কোনো নিয়োগপত্রও নাই।

কাউকে পাচ হাজার টাকা ধার দিলেও তো মানুষ সেই টাকাটা ফেরত পাবে কিনা, আর পেলেও কতদিনে ফেরত পাবে এগুলি নিয়েও ভাবে। আর এই মেটাভার্সে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলো কেউ এর নিরাপত্তা নিয়ে একবারও ভাবলো না? গরু বেচবে,বাইক বেচবে, জমি বেঁচবে কারন মেটাভার্স ৬৫০০০ টাকায় মাসে ২৪০০০ টাকা লাভ দেবে। যখন মেটাভার্স উধাও, এই গ্রাহকেরা এবার জানেনও না, কার কাছে গিয়ে এই বিনিয়োগ ফেরতের কথা জানাবে।

"যুবক", ইউনিপেটু, ডেস্টিনি, ইভ্যালি এ রকম অনেক অনেকবার প্রতারিত হয়েও এসব মানুষের শিক্ষা হয়নি।

আমি অবাক হচ্ছি না যে, আগামিতেও এমন খবর যে পাবো না।

লোভী গ্রাহক, তুমি ঠকবাই, কারন তুমি কাজ করতে চাও না, তুমি অলস, তুমি সহজে বড়লোক হতে চাও, তুমি অনেক অনেক টাকার মালিক হতে চাও। আর তোমার ইচ্ছা ঠিক থাকলেও তোমার কর্মপন্থা একেবারেই ভুল। তুমি আজীবন ঠকতেই থাকবা।

খারাপ লাগে দেশের জন্য যে, তোমাদের মত লোভী কিছু মানুষের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়। সেদিক থেকে যদি বলি, তোমরা লোভীর সাথে সাথে রাষ্ট্রের জন্যেও ক্ষতিকারক।

(কোনো নির্দিষ্ট গ্রাহককে উদ্দেশ্য করে এই লেখা নয়। তবে যারা এমন কাজ ভেবেচিন্তে করেন না, তাদের এই খারাপ পরিনতির জন্য তারাই দায়ী, এটা বিশ্বাস করে ভবিষ্যতে আর পা দেয়ার কথা ভাববেন)

২০/০৮/২০২৩-প্রেডিকশন-২

গতবছর এপ্রিল মাসে আমার একটা লিখায় আমি মন্তব্য করেছিলাম যে, “একটা সময় আসবে যখন ইউক্রেনবাসী প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কীকে ইউক্রেনকে ধ্বংসের কারনে কাঠগড়ায় দাড় করাবে। যদি তাকে আর নাও পাওয়া যায়, চলমান সময়ের ইতিহাসের জন্য ইউক্রেন আজীবন আফসোস করবে যে, এতো সুন্দর সাজানো গোছানো একটা রিচ কান্ট্রি এভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিলো শুধুমাত্র একটি মানুষের কারনে। আর সেটা জেলেনেস্কী”। আমরা ইতিহাসকে যেভাবেই লিখি না কেনো, কেউ তো থাকবে যারা আজকের দিনের প্রতিটি প্রেক্ষাপট, ইভেন্ট, ঘটনা মুখেমুখে হলেও এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে স্থানান্তর করবে যেমন সর্বদাই দেখা যায়। সময়ের বিবর্তনে হয়তো কিছুটা ইতিহাস উলটা পাল্টাভবে প্রচারিত হয় বটে কিন্তু অলিখিত ইতিহাসের পাতাই বেশী থাকে লিখিত পাতার চেয়ে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হচ্ছে-কলোনিয়ালিজম কোনো না কোনো সময়ে শেষ হয়ই। আফগানিস্থান, ভিয়েতনাম, আফ্রিকার প্রায় সবদেশ, ভারতবর্ষ, আরো শতশত দেশের ইতিহাস এমনই। চুড়ান্ত ফলাফলে আধিপত্যবাহীরা শেষ পর্যন্ত অধিকৃত দেশ ছাড়তে সবসময়ই বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এই আধিপত্য নেয়া এবং ছেড়ে দেয়ার মধ্যে পার হয়ে যায় হয়তো কয়েক প্রজন্ম। ধ্বংস হয়ে যায় কালচার, কৃষ্টি, সমাজব্যবস্থা এবং সাথে দেশের অর্থনীতি।

ইউক্রেনের কোনো প্রয়োজন ছিলো না তাদের নিজের দেশের রাশিয়ান ভাষাভাষি মানুষগুলিকে এতো অত্যাচার করার, প্রয়োজন ছিলো না অযথা ইউরোপিয়ান হবার, প্রয়োজন ছিলো না ন্যাটোর মতো একটা জোটে যুক্ত হয়ে রাশিয়ার মতো একটা ভেটো অধিকারী, নিউক্লিয়ার সমৃদ্ধ দেশের বিরুদ্ধে পা ফেলার। যাদের শক্তিতে বলিয়ান হয়ে যুদ্ধের দামদা করা হলো সেই তারা কিন্তু বহুদূরের এক শক্তি। আর তারা নিজেরা কিছুতেই আক্রান্ত নয়। নিজের শশ্যক্ষেত জ্বালিয়ে কেউ হিরো হতে চায় না। আর যারা সেটা করে তারা বোকা। কেনো বললাম কথাগুলি জানেন?

কারন, ইউক্রেনের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টের এইডস অলেগ সসকিন তাঁর ইউটিউবে একটা বার্তা রেখেছেন ইউক্রেনবাসী এবং ইউক্রেনের এমপিদের উদ্দেশ্যে। আর সেটা হলো এমন, “প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কী একজন অতিশয় অপরিপক্ক (Inadequate) লিডার যে কিনা ইউক্রেনকে সম্পুর্ন ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই যুদ্ধে ইউক্রেনের কোনো খবরই সত্য নয় এবং রিটায়ার্ড কর্নেলদের কোনো এনালাইসিস বা তথ্য সঠিক তো নয়ই বরং পুরুই মিথ্যা। ইউক্রেনের জন্য রাশিয়া যতোটা না বিপদজনক, তাঁর থেকে অনেক বেশী বিপদজনক প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কী। ইউক্রেনের মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ নাই, দেশের অর্থনীতি শুধু তলানীতেই না বরং ঋণে জর্জরিত হয়ে আরো কয়েক শত বছর পিছিয়ে দিয়ে গেলো এই যুদ্ধ। ফলে এখনই সময় আপ্নারা যারা এমপি আছেন, তারা এবং ইউক্রেনের ভিতর বাহিরে যারা সচেতন জনগন আছেন, তাদের কিছু একটা করা দরকার যাতে অন্তত ইউক্রেন নামক দেশটি পৃথিবীর বুক থেকে একেবারে শেষ না হয়ে যায়”।

আজকে সসকিন এটা বলেছে, হয়তো আগামীকাল সাধারন জনগন নিজেরাই মাঠে নেমে পড়বেন, হয়তো পরশু নিজের দেশের ভিতরেই নিজেদের অপশক্তিকে রুখে দাড়াবার জন্য যুদ্ধে নেমে যেতে পারেন। ডনবাস, খেরশন, জাপোরিজজিয়া, খারকিভ, ওডেসায় তো ইউক্রেনের অধিবাসিই বাস করতো, হয়তো তারা রাশিয়ান ভাষাভাষি বলে ইউক্রেনের প্রশাসন তাদেরকে রিফুজির মতো ব্যবহার করতো। তাদেরকে খতম করে কি ইউক্রেন সে সব এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব যাদের বসবাদ সেখানে শত শত বছর ধরে? এখনো তো তাদের উপরেই আক্রমন হচ্ছে। তাহলে তারা যে ভাষাভাষিই হোক না কেনো, যারা তাদেরকে রক্ষা করতে আসবে তাদেরকেই তো তারা সাপোর্ট করবে। ইউক্রেনকে তো নয়। আর ঠিক এ কারনেই এসব শহরগুলি খুব দ্রুত চলে গেছে ইউক্রেনের হাতের বাইরে এবং রাশিয়ার পক্ষে।

প্রয়োজন ছিলো না এসব মানুষগুলিকে এক সাইড করে অতঃপর নিজেরাই ইউক্রেনবাসী হবার। তারাও জন্মগত কিংবা বাপ দাদার উত্তরসুরী হিসাবে ইউক্রেনেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো। কোনো এক সময় ইতিহাসবিদগন এটাই বলবে যে, প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কী সঠিকপথে ছিলো না। আজকে যে ইউরোপ তাঁর প্রতিবেশী রাশিয়াকে শত্রু মনে করছে, হয়তো খুব শীঘ্রই সেই একই ইউরোপ হয়তো রাশিয়ার দ্বারপ্রান্তে বসবাস করে তাদের ছাড়া চলবেই না। ফলে একটা সময় খুব বেশী দূরে নয় যে, এই ইউরোপ আবার রাশিয়ার সাথেই একাত্ত হবে, একাত্ত হতে বাধ্য হবে। প্রতিবেশীকে বেশিদিন একঘরে করে রাখা যায় না। তারমধ্যে যে প্রতিবেশী এতো ক্ষমতাবান। 

১৯/০৮/২০২৩-আগের কিছু প্রেডিকশনের বাস্তবতা

রাজনীতিতে যার যার সার্থ তাঁরতাঁর। এখানে সার্থ ভাগাভাগির কোনো গল্প থাকে না। শেষ অবধি প্রেডিকশনটাই ঠিক হলো। প্রেডিকশন করেছিলাম যে, একোয়াসের সামরীক বাহিনী যদি নিজারে ইন্টারভেনশন করে, তাহলে শুধুমাত্র নাইজেরিয়াই থাকবে সেই ফোর্সের মধ্যে, অন্য কেউ থাকার কথা না আর থাকলেও খুবই কম সদস্য দিয়ে একটা টোকেন পার্টিসিপেশন হবে। ২য় প্রেডিকশন ছিলো, আমেরিকা এবং ফ্রান্সের মধ্যে সম্পর্ক ফাটল দেখা যাবে। ৩য় প্রেডিকশন ছিলো-নিজারে একোয়াসের মিলিটারী ইন্টারভেনশন এর পরিবর্তে ডিপ্লোম্যাটিক সমাধান হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট বাজোমের ক্ষমতায় ফিরে আসা আর কখনোই হবে না।

এবার সর্বশেষ খবরগুলি দেখিঃ

(১) একোয়াসের স্ট্যান্ড বাই ফোর্সের মধ্যে ২৫ হাজার সামরিক সদস্যের মধ্যে নাইজেরিয়ার সাড়ে ২৪ হাজার প্লাস, আর সেনেগালের মাত্র কয়েকজন টোকেন পার্টিসিপেশন। অর্থাৎ নাইজেরিয়া একাই একোয়াস সম্মিলিত বাহিনীর হিসাবে রিপ্রেজেন্ট করে প্রয়োজনে নিজারে ইন্টারভেনশনের জন্য প্রস্তুত। যা নাইজেরিয়ার সাধারন জনগন এর বিপক্ষে। ফলে একোয়াস এখনই ইন্টারভেনশন নয়, আগে ডিপ্লোম্যাটিক সমাধান, তারপর ইন্টারভেনশন (যদি লাগে)

(২) আফ্রিকান ইউনিয়নের দেশগুলিতে খাদ্য, সার এবং অন্যান্য কমোডিটি সবচেয়ে বেশী সাহাজ্য হিসাবে দেয় রাশিয়া। রাশিয়া নিজারে কোনো সামরীক ইন্টারভেনশনের বিপক্ষে। ফলে আফ্রিকান ইউনিয়ন নিজারে যে কোনো সামরীক ইন্টারভেনশনের বিপক্ষে। আফ্রিকান ইউনিয়ন একোয়াস থেকে ডিসোসিয়েট করেছে।

(৩) আমেরিকার মিলিটারী বেজগুলি নিজারে বহাল রাখার নিমিত্তে নিজারের সামরীক ক্যু কে আমেরিকা এখনো ক্যু হিসাবে আখ্যায়িত করে নাই। প্রয়োজনে তারা মিলিটারী সরকারের সাথে কাজ করতে এবং বেজগুলি রি-লোকেশন করতে ইচ্ছুক।

(৪) ফ্রান্সের মিলিটারী বেজগুলি গুটিয়ে নেয়ার নির্দেশ নিজারের সামরিক সরকার আগেই দিয়েছে। তাই ফ্রান্স চায় একোয়াস নিজারে ইন্টারভেনশন করুক। কিন্তু আমেরিকার এহেনো এক তরফা নিজারের সামরিক সরকরকে সাপোর্ট করার মাধ্যমে ফ্রান্সের সাথে পশ্চিমাদের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল বা নাখোস। তাতে ইউক্রেন যুদ্ধে একটা বিরোপ প্রভাব ফেলবে যেহেতু ফ্রান্স ন্যাটো/ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থেকে আমেরিকার প্রক্সি ওয়ারে ফ্রান্স যথেষ্ট সাপোর্ট দিচ্ছিলো।

১৬/৮/২০২৩-বিশ্ব রাজনীতিতে একটা অসম সমঝোতা

নিজারের (Niger) অভ্যুথান বিশ্ব রাজনীতিতে একটা অসম সমঝোতার সৃষ্টি করছে বলে আমার ধারনা। ব্যাপারটা এমন যেনো কোনো এক সুতার বান্ডেলের মতো অগোছালোভাবে পেচিয়ে জট পাকিয়েছে। অনেক হিসাব কিতাব এখন আর সহজ সরলীকরনের মধ্যে থাকছে না। তাহলে একটু দেখিঃ

(ক)      নিজারে (Niger) ফ্রান্স এবং আমেরিকার সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিসহ তাদের বেশ কিছু মিলিটারী বেজ রয়েছে। আমেরিকার রয়েছে দুটূ (বেজ ১০১, এবং এয়ারবেজ ২০১)। বর্তমানে নিজার (Niger) ফ্রান্সের সমস্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ তাদের যাবতীয় মিলিটারী বেজকে অপসারনের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি অথবা তাদের সামরিক বেজগুলির ব্যাপারে নিজার (Niger) আপাতত কিছুই বলেনি। এখানে উল্লেখ্য যে, সামরিক উপস্থিতি বা সামরিক এই বেজগুলি প্রধানত ওয়েষ্ট আফ্রিকান দেশসমুহের সাথে মিলে ইউএস, ফ্রান্স, ইউএন এবং অন্যান্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশসমুহ সাহেল রিজিয়নে ইসলামিক এক্সট্রিমিষ্টদেরকে দমনের লক্ষ্যে গোয়েন্দা কার্যক্রম, সার্ভিলেন্স এবং রেকি মিশনসহ যাবতীয় মিলিটারী ট্রেনিং, সামরিক এয়ারক্রাফট লিফটিং এবং সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

(খ)       পার্শবর্তী দেশ চাঁদ, মালি, গিনিয়া, বারকিনো ফাসুতে মিলিটারী সরকার গঠনের পর সেখানে ফ্রান্স, আমেরিকা, ইউএন এবং অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশসমুহের সামরিক উপস্থিতি বাদ হয়ে যাওয়ায় এবার নিজারেও (Niger) সেই একই ধাচের সরকার আরম্ভ হওয়ায় ধরে নেয়া যাচ্ছে যে, সর্বশেষ দেশ, অর্থাৎ নিজার (Niger) থেকেও যদি তাদের এই সামরিক উপস্থিতি বা বেজগুলি গুটিয়ে আনতে হয়, তাহলে অত্র অঞ্চলে তাদের আর কোনো প্রভাব খাটানোর মত কোনো ফোর্স অবশিষ্ট রইলো না। এই অবস্থায় যদি আমেরিকা নিজারের (Niger) মিলিটারী অভ্যুথানকে অভ্যুথান হিসাবে স্বীকৃতি দেয় তাহলে পশ্চিমাদেরকেও উক্ত অঞ্চল থেকে সমস্ত বেজসহ সামরিক বাহিনীকে গুটিয়ে নিতে হবে। এতে ওয়েষ্ট আফ্রিকায় বা সাহেল রিজিয়নকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদের পরিচালিত অপারেশন গুলি আর করা সম্ভব হবে না। 

(গ)       ঠিক এই অবস্থায় আমেরিকা একটি কঠিন পরিস্থির সুম্মুক্ষিন হয়েছে বলে আমার ধারনা। যদি অভ্যুথানকে সমর্থন দেয়, তাহলে তাদের সাথে মিলিটারী টু মিলিটারী চুক্তিসমুহ বাতিল করতেই হবে এবং সর্বপ্রকার এইডস বা সাহাজ্য সহযোগিতা দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আর এই এইডস বা সাহাজ্য সহযোগীতা দেয়া থেকে বিরত থাকলেই নিজার (Niger) আর আমেরিকাকে আলাদা করে দেখার কোনো অবকাশ নাই, ফ্রান্সের মতোই তাদেরকেও নিজার (Niger) ছাড়তে নির্দেশনা দেয়া হতে পারে। আবার যদি অভ্যুথান কে অভ্যুথান হিসাবে স্বীকৃতি না দেয় তাহলে আমেরিকাকে এইডস বা সাহজ্য সহযোগীতা প্রবাহ চালিয়ে যেতে হবে যা কিনা আমেরিকার আইনের পরিপন্থি। অন্যদিকে আবার এই এইডস বা সাহাজ্য সহযোগীতা প্রবাহ বন্ধ না করলে আমেরিকার সাথে ফ্রান্স এবং অন্যান্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক খারাপের দিকে যাবে। তাতে ইউক্রেন যুদ্ধ একটা বেমালুম প্রহসনে পরিনত হবে। কারন রাশিয়াকে আটকাতে সবচেয়ে বেশী প্রক্সি ওয়ার পশ্চিমা দেশগুলিই চালাচ্ছে এবং সে মোতাবেক আমেরিকাই সবাইকে চাপের মধ্যে রেখেছে যেনো ইউক্রেনে সবাই পর্যাপ্ত পরিমানে সাপোর্ট দেয়। যদিও আমি কোনো যুদ্ধের পক্ষেই না। হোক সেটা নিজারে (Niger) বা ইউক্রেনে।

এখানে আরো একটা দুশ্চিন্তার কারন রয়েছে আমেরিকার। আর সেটা হলো, নিজার (Niger) আসলে ইসলামিক এক্সট্রিমিষ্টদের কোনো আখড়া নয় কিন্তু রাশিয়ার সমর্থনে ভাগনার গ্রুপ অবশ্যই একটা বড় ধরনের হুমকী যারা রাশিয়ার এজেন্ডা নিয়ে অপারেশন পরিচালনা করে। ভাগনার গ্রুপ অনেক আগে থেকেই মালি, বারকিনো ফুসু, চাঁদ, কিংবা সাধারনভাবে যদি বলি তারা ওয়েষ্ট আফ্রিকায় অপারেশন করে। ফলে রাশিয়ার প্রভাব এই এলাকায় দমনের জন্যে হলেও তাদের মিলিটারী বেজ, সামরিক উপস্থিতি এবং অন্যান্য মিলিটারী কার্যাবলীসহ অপারেশন চালিয়ে নেয়া দরকার।  

ঠিক এমন একটা পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষকে (একদিকে ফ্রান্স, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে হাতে রাখা, আবার অন্য দিকে নিজারের (Niger) মিলিটারী অভ্যুথানকেও সমর্থন করা) সামাল দেয়ার থেকে আগে এটা নিশ্চিত করতে চায় নিজা (Niger) আসলে কি চায় সেটা জানা। আর এই কারনেই সবার ইন্টারেস্টকে একদিকে সরিয়ে আমেরিকার নিজস্ব ইন্টারেষ্টকে প্রাধান্য দিয়ে আমেরিকা ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ডকে নিজারে (Niger) আলাপের জন্য পাঠিয়েছেন। সে নিজারের (Niger) জান্তাদের সাথে আলাপ করতে গেলেও কতটা সফল হয়েছে এ ব্যাপারে না ন্যুল্যান্ড না তাঁর প্রধান এন্টনী ব্লিংকেন কোনো মন্তব্য করেছেন। তবে তথাকথিত রীতি অনুযায়ী আপাতত নিজারে (Niger) আমেরিকার এইডসকে স্থগিত (বাতিল নয় কিন্তু) করেছে এবং ‘এটা একটা খন্ডকালীন সামরিক অপারেশন হিসাবে চালিয়ে দিয়েছেন কিন্তু অভ্যুথান হয়েছে বলেন নাই।

ফ্রান্স এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তাই খুবই ক্ষুদ্ধ। 

১৬/০৮/২০২৩-কিছু প্রেডিকশন (নিজার)

সবখানেই আমার মতো কিছু বোকা লোক আছে-আমি একা না। নিজার (Niger) অভ্যুথানের বিরুদ্ধে হয় বেশী আবেগে অথবা বোকার মতো অথবা কাউকে খুশী করার জন্য নিজারে (Niger) অভ্যথানের ৩য় দিনে একোয়াস (ECOWAS) এমন একটা হুমকী দিলো যে, হয় নিজারকে (Niger) পূর্ববর্তী সরকার প্রধান মোহাম্মাদ বাজোমকে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে, আর তা না হলে একোয়াস (ECOWAS) তাঁর মিলিটারী শক্তি প্রয়োগ করে হলেও বাজোমকে আবার গদিতে বসাবে। এই আবেগীয় হুমকী আমার কাছে কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য মনে হয়নি। কেনো হয়নি সেটাই বলছি।

একোয়াসের (ECOWAS) মধ্যে মোট দেশ ১৫টি। এরা হচ্ছে বেনিন, বারকিনো ফুসু, কাবোভার্ডে, আইভরি কোষ্ট, গাম্বিয়া, ঘানা, গিনিয়া, গিনিয়া বাস্যু, লাইবেরিয়া, মালি, নিজার , সেনেগাল, সিয়েরা লিয়ন এবং টোগো।

একোয়াসের (ECOWAS) এই ১৫ টি দেশের মোট সামরিক জনবল (প্যারা মিলিটারীসহ) হলো ৩৭৭২০০ জন। এর মধ্যে নাইজেরিয়া একাই হলো ২৩০০০০ জন। আর বাকী ১৪৭২০০ হচ্ছে বাকী ১৪ টি দেশের।

একোয়াসের (ECOWAS) ১৫টি দেশের মধ্যে মোট ৬টি দেশ নিজারের (Niger) অভ্যুথানকে সমর্থন করে। ফলে নিশ্চয় তারা একোয়াসের (ECOWAS) হয়ে নিজারে (Niger) মিলিটারী ইন্টারভেনশনে যাবে না। এই ৬টি দেশের সামরিক বাহিনীর জনবল হলো ৮৫০০০জন। এরমানে একোয়াসের (ECOWAS) মেম্বার নাইজেরিয়া ছাড়া মাত্র ৬২২০০ জন অংশগ্রহন করতে পারবে। আর নাইজেরিয়াসহ পারবে ২৯২০০০ জন। এই সংখাটা হচ্ছে যদি ১০০% লোক অংশ নেয়। কিন্তু কোনো মিলিটারী ইন্টারভেনশনে কোনো দেশের সমস্ত সামরিক বাহিনীকে জড়ায় না, মাত্র ৩০% থেকে ৩৫% হয়তো অংশ গ্রহন করবে। সেক্ষেত্রে নাইজেরিয়ার থেকে অংশ নিতে হবে প্রায় ৮৫০০০ আর বাকি ২০-২৫ হাজার অংশ নিবে বাকী দেশগুলি থেকে।

এখানে আরেকটা মজার কাহিনী হয়েছে যে, আফ্রিকান ইউনিয়ন কোনোভাবেই একোয়াসের (ECOWAS) এই মিলিটারী ইন্টারভেনশনে সম্মতি দিচ্ছে না। আফ্রিকা ইউনিয়নের মধ্যে আগের ৬টি দেশ (যারা অভ্যুথানকে সমর্থন করেছে) ছাড়া আছে আরো ৫টি দেশ যারা একোয়াসের (ECOWAS) মিলিটারী ইন্টারভেনশনে যোগ না দেয়ার কথা। তারা হচ্ছে-বেনিন, আইভরি কোষ্ট, সেনেগাল, সিয়েরা লিয়ন, এবং টোগো। অর্থাৎ ৬টি দেশ অভ্যুথানকে সমর্থন করেছে, এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের মেম্বার হিসাবে আরো ৫টি দেশ অংশ গ্রহনে সম্মতি দিচ্ছে না। সুতরাং একোয়াসের (ECOWAS) মধ্যে থাকছে মাত্র ৪টি দেশ, তাঁর মধ্যে নাইজেরিয়া অন্যতম। এরমানে শুধুমাত্র নাইজেরিয়াই একমাত্র দেশ যা নিজারের (Niger) বিরুদ্ধে ইন্টারভেনশন করতে হবে একোয়াসের (ECOWAS) পক্ষ থেকে। অন্য দেশগুলি হচ্ছে টোকেন পার্টিসিপেশনের মতো। War between Nigeria VS Niger+

এদিকে নাইজেরিয়ার সাধারন জনগন ইন্টারভেনশনের বিপক্ষে। তারা কিছুতেই নিজারের (Niger) বিরুদ্ধে নাইজেরিয়াকে ইন্টারভেনশনে যেতে দিতে চায় না। তাহলে একোয়াস (ECOWAS) চেয়ারম্যানের এমন একটা নন-ক্যালকুলেটিভ হুমকী দেয়া কি ঠিক হয়েছে? এখন একোয়াস (ECOWAS) চেয়ারম্যান কি করবে সেটাই বুঝতেছে না। খালি এববার এইটা কয়, আবার ওইটা কয়। গালে হাত দিয়া বসে থাকে আর ভাবে-কি করলাম? একোয়াস (ECOWAS) চেয়ারম্যানের বউও মনে ক্ষেপা এখন।

তাঁর উচিত ছিলো ডিপ্লোমেটিক সলিউশনের কথা আগে বলা।

সব জায়গাতেই কিছু আমার মতো বোকা পাবলিক থাকে, না বুইজ্জাই লাফায়। যেমন অনেকে কয়, ইউক্রেন নিয়া নাকি আমিও লাফাই। আপ্নারাও কন দেখি-ইউক্রেন কি আমার দাদার দেশ না আমি ওখানে জমি কিনে বাড়ী বানাইছি?

১৬/০৮/২০২৩-আমার গিন্নির সংক্ষিপ্ত কথা  

আমার গিন্নী শিক্ষক, তাও আবার যেনো তেনো শিক্ষক নন, পুরা অর্থনীতির ডিপার্ট্মেন্টাল হেড। এখন তিনি ভাইস প্রিন্সিপ্যাল।

কোথায় যেনো কোন এক মনিষী বলিয়াছিলেন, কর্মক্ষেত্র অনুপাতে নাকি মানুষের অনেক কিছু জীনগত বেশ পরিবর্তন আসে। যেমন সব ডাক্তাররাই ভাবেন তাদের আশেপাশের সবাই রোগী, সব উকিলরা কাউকে পেলেই কিছু উকালতি বুদ্ধি দিয়া দেন, আবার কেউ পুলিশে চাকুরী করিলে নাকি সবাইকে সন্দেহই করিতে থাকেন, হোক সেটা তাহাদের বউ কিংবা স্বামী অথবা পাড়াপ্রতিবেশী। তো শিক্ষক যাহারা তাহারাও ব্যতিক্রম নন। সবাইকে ছাত্রই মনে করেন। আমার বউ টিচার হিসাবে আমি ছাত্র হিসাবেই নিজেকে মনে করি। উপদেশ তিনি যাহাই আমাকে দেন, আমি শিরধার্য মনে কইরা শান্তশিষ্ট সুবোধ বালকের মতো তা পালনে চেষ্টা করি। এতে লাভ দুইটা। সংসারে অশান্তি হয় না আবার আমার মাথাও ঠান্ডা থাকে।

কিন্তু টিচারদের বড় সমস্যা হচ্ছে-উনারা সংক্ষিপ্ত কথা সংক্ষিপ্ত আকারে কইতে পারেন না। কথার মধ্যে ভূমিকা থাকিবে, যাহা বলিবেন তাহার ব্যাকগ্রাউন্ড ইতিহাস থাকিবে, তারপর মুলকথায় আসিলেও পথিমধ্যে আবার কোনো ইতিহাসের কথা আসিয়া পড়িলে সেইটাতেও ছাড় দিতে নারাজ। উদাহরণ দেই-

আমার গিন্নি কয়েকদিন আগে আমাকে বিমানের একটা টিকেট হোয়াটস আপে পাঠাইয়াছিলেন। পরে বিস্তারীত দেখিবো দেখিবো করিয়া আর সেইটা ভালোমত দেখা হয় নাই। তো গতকাল রাতে খাওয়ার সময় হটাত বলিয়া উঠিল-আমি তো পরশু যাচ্ছি, জানোতো?

আকাশ হইতে পড়িলাম, মুখে পড়োটা ছিলো, চিবাইতেছিলাম, তাহাও বন্ধ হইয়া গেলো, তাহার দিকে অসহায়ের মতো তাকাইয়া বলিলাম, কোথায় যাইতেছো?

তাহার মুখের অভিব্যক্তি দেখিয়া বুঝিলাম, কোথাও আমার এমন কোনো স্মৃতিশক্তি হারাইয়াছে যাহাতে এখুনি বুঝি ১৪ স্কেলের একটা ভূমিকম্প অথবা রুমকম্প হইবার সম্ভাবনা। বুঝিয়াই বলিলাম, উহ হ্যা, তো কিভাবে যাচ্ছো?

বুঝিলাম, তাহাতেও আমার ডজ করিবার উপায় ঠিক ছিলো না। বাহানা করিলেই আমি ধরা খাই, এটা আবারো প্রমানিত। যাক, ভূমিকম্প বা রুম কম্প কিছুই হইলো না।

তিনি বলিতে থাকিলেন, তোমাকে না আমি টিকেটের কপি পাঠাইছিলাম!!

বলিলাম, ওরে, ভুলেই তো গেছিলাম। পড়েছিলাম তো......

তারপর তিনি বলিতে লাগিলেন, তাহার এক কলিগের মেয়ে কিংবা ছেলের বিয়া, তাহাকে নেমন্তন্ন করিয়াছে, যেতে হইবে সেই সুদুর বগুড়া। বিমানে যাইবেন তিনি। তো আমি আবার জিজ্ঞেস করিলাম, কবে আসিবা?

গিন্নীর সোজা উত্তর-তোমাকে না টিকেট পাঠাইছিলাম, টিকেটে লেখা ছিলো না?

বললাম, হ্যা তাই তো। টিকেটে তো লেখাই ছিলো। কি যে অবস্থা, আজকাল সব ভুলে যাই।

তারপর আবার আমার গিন্নীর কথা শুরু হইলো। তিনি কিন্তু কবে আসিবেন, সেইটার উত্তর দিচ্ছেন।

এই ধরো আগামীকাল বিকালে আমাদের ফ্লাইট। তাই কলেজ থেকে একটু আগেই ফিরিবো। এরআগে কলেজের সবকাজ সমাপ্ত করিবো। অনেক কাপড় চোপড় নেবো না, বাসায় এসে গোটা কিছু কাপড় নেবো। ড্রাইভারকে আসতে বলেছি একটু আগেভাগে যেনো এয়ারপোর্টে যেতে আবার বিলম্ব না হয়। যেই জ্যাম আজকাল। কেনো যে এতো জ্যাম বুঝতে পারি না। মানুষগুলি নিজেরা নিজেরাই জ্যাম বাধায়। কোনো আক্কেল নাই। হটাত করিয়া এদিক থেকে রিক্সা, ওদিক থেকে “পাঠাও”, আবার কেউ কেউ সিরিয়াল ভেংগে ওভারটেক করতে গিয়া রাস্তার মুখেই জ্যাম বাধাইয়া দেয়। বাজে সব ড্রাইভারের দল। যাক গে, বাসা থেকে রওয়ানা হবো, আপাকেও বলে রেখেছি যেনো উনিও আগেভাগে রওয়ানা দেয়। তা না হলে ওনার জন্য আবার আমাদের সমস্যায় পড়তে হবে।

বললাম, আরে ফিরবা কবে?

গিন্নী বল্লো- এতো অধইর্য কেন? আগে তো যাইই। গেলামই তো না।

বললাম, তাই তো তুমি তো এখনো এয়ারপোর্টেই গেলা না। তারপর?

তারপর গিন্নী বল্লো-বিমানজার্নী প্রায় ১ ঘন্টা। সন্ধ্যার আগেই নেমে যাবো। নেমেই ওখানে আপার হাজবেন্ড গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবেন। তোমাকে তো বলাই হয় নাই, আপার হাজবেন্ড অমুক জায়গায় চাকুরী করতেন। ওরে বাবা, অনেক ভালো চাকুরী। তাঁর চাকুরীর সময় উনি অনেক মানুষের উপকার করেছেন। খুব অমায়িক মানুষ, আপার সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক। খুব সংসারী মানুষ। তাঁকে তাদের গ্রামের মানুষ অনেক শ্রধ্যা করে। এখোনো উনি এই সেই করেন (সংক্ষেপে বললাম আর কি)

বললাম, আরে ভাই, তুমি ফিরবা কবে সেটা তো বললে না।

উফ তোমার সাথে কথা বলতে গেলে এতো অধইর্য হইয়া যাও যে, আসল কথাই বলা হয় না।

বললাম- আরে আসল কথা তো জানতেই চাচ্ছি- ফিরবা কবে?

এদিকে হটাত করে তাঁর মোবাইলে কার যেনো কল বাজিয়া উঠিলো। তিনি কল ধরিলেন, সেই আপা যাহাদের বাসায় তাহার নেমন্তন্ন। এখন আপার সাথেই তিনি কথা বলছেন। আমি বসেই রইলাম কবে তিনি ফিরবেন সেটা জানার জন্য।

আমি টেলিভিশনে রাতের খবর দেখি, ফলে খবরের টাইম প্রায় ছুইছুই। আমি খবর দেখিলাম, রাতে ঘুমাইলাম, পরের দিন অফিস করিলাম, এইমাত্র বাসায় ফিরিলাম। আমার গিন্নী আগামীকাল বগুড়ায় যাইবেন। একদিন পার হয়ে গেলো, আমি এখনো অপেক্ষায় আছি তিনি কবে ফিরবেন সেটা এখনো জানিতে পারি নাই।

 

১৫/০৮/২০২৩-ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ফাটল

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ক্ষোভের বহির্প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তাঁর কিছু নমুনা যদি বলি-

(১)       রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়ার মুল কারন ছিলো যেনো রাশিয়ার তেল, গ্যাস, খাদ্য সামগ্রীসহ অন্যান্য মৌলিক উপাদান রপ্তানী থেকে আয় ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয়ের একটা সোর্স না হয়ে উঠে এবং আরেকটা কারন ছিলো যাতে রাশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেংগে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা বুমেরাং হয়েছে বলে এখন বিশ্বনেতাদের ধারনা। কারন কি? কারনটা দৃশ্যমান, রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল, গ্যাস, খাদ্য সামগ্রী আমদানী না করায় ইউরোপ নিজেই এখন ডি-ইন্ডাস্ট্রিলাইজেশন, ডি-ডলারাইজেশনের এর শিকার। প্রতিটি ইউরোপিয়ান দেশে এখন জীবনমাত্রা এতোটাই শোচনীয় যে, তারা আর আগের মতো লাইফ লিড করতে পারছে না। জনগন বিরক্ত তাদের শাসকদের উপর। প্রাথমিকভাবে যে আকারে এবং যে গতিতে ইউক্রেন উদ্ভাস্থদেরকে ইউরোপিয়ানরা গ্রহন করেছিলো থাকার জায়গা দিয়ে খাবারের খরচ, হাত খরচ, স্কুলিং ইত্যাদি দিয়ে, এখন তারা এটাকে একটা বোঝা মনে করছে। সেই আগের আবেগ কিংবা সহায়তার মনমানসিকতা তারা আর ধরে রাখতে পারছে না। তারা নিজেরাই এখন বিরক্ত ইউক্রেনের উদ্ভাস্তদের নিয়ে, শাসকদের কমিটমেন্ট নিয়ে।

(২)       ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিধর অর্থনৈতিক দেশ জার্মানীর প্রায় ৪৫% এর উপরে ইন্ডাস্ট্রিজসমুহ বন্ধ শুধুমাত্র গ্যাস এবং তেলের সংকটে। শুধু তাইই নয়, হিটিং ব্যবস্থার আমুল সংকটে দেশটি। দেশের এনার্জি মিনিষ্টার এবং বিরোধী দল এই মুহুর্তে যে বিষয়টির উপর সবচেয়ে বেশী জনমত তুলে ধরছেন তা হলো-পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে জার্মানি এখন তেল গ্যাসের অভাবে তাদের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ইন্ডাস্ট্রিজসমুহ যেমন ক্ষতিগ্রস্থ তেমনি সাধারন জনগনের অবস্থা চরম খারাপ। ঠিক এই মুহুর্তে অচীরেই রাশিয়ার উপর সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আবারো তাদের কাছ থেকে আগের মতো সব পন্য যেনো আমদানী করা হয় সেই দাবী উঠছে। এখানে বলে রাখা উত্তম যে, জার্মানী ৪০% নির্ভরশীল রাশিয়ার গ্যাস এবং তেলের উপর। জার্মানীর উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়েই উঠেছে রাশিয়ার সস্তা কমোডিটির উপরে। তারমধ্যে নর্ডস্ট্রিম-১, ২ উভয়ই এখন অকেজো হবার কারনে অদূর ভবিষ্যতেই রাশিয়া থেকে এতো সহজে আর আগের মতো তেল বা গ্যাস আমদানী করা সম্ভব না। জার্মানীর এহেনো খারাপ পরিনতির কারন হিসাবে সাধারন জনগন, বিরোধী দল, সরকারী আমলা এবং বেশ কিছু প্রতাপশালী মন্ত্রী মিনিষ্টার খোদ পশ্চিমাদের দায়ী করছেন যে, পশ্চিমারা এক ঢিলে দুই পাখী (জার্মানীর অর্থনীতিকে ধংশ এবং রাশিয়াকে পিউনিটিভ শাস্তি) মেরেছে। নর্ড স্ট্রীম নষ্টে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে জার্মানীর আর সবচেয়ে লাভ হয়েছে পশ্চিমাদের। জার্মানীর উলফ শলাজ নিজেও এখন চাচ্ছেন যে, ইউক্রেনের যুদ্ধ যেভাবে হোক বন্ধ হোক। দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা এখন জার্মানীর।

(৩)      এবার আসি ফ্রান্সের ব্যাপারে। নিজারে (Niger) ফ্রান্স এবং আমেরিকার উভয়ের প্রায় দুই হাজারের বেশী করে সামরিক বাহিনীর সদস্য আছে এবং বেশ অনেকগুলি সামরিক ঘাটিও আছে তাদের। মজার ব্যাপার হলো নিজার (Niger) শুধুমাত্র ফ্রান্সের বাহিনীকে সেখান থেকে তাড়ানোর বিক্ষোভ করছে, সাথে অভ্যুথান। আমেরিকানদের বিরুদ্ধে নয়। ফ্রান্স নিজার (Niger) থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলন করে তাঁর দেশের পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি সচল রাখতো। সবার সাথে তাল মিলিয়ে ফ্রান্স রাশিয়ার গ্যাস, তেল ইত্যাদি বয়কট করলেও তাদের বিকল্প ব্যবস্থা চালূ ছিলো এই ইউরেনিয়াম চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গুলি দিয়ে। এবার নিজার (Niger) সেই ইউরেনিয়াম এবং গোল্ড উত্তোলন এবং রপ্তানী পুরুপুরি বন্ধ করায় ফ্রান্সের বিদ্যুতায়ন এখন প্রশ্নের সম্মুক্ষে। ঠিক এই মুহুর্তে হয়তো যথেষ্ঠ পরিমান ইউরেনিয়াম মজুত আছে বলে ইম্প্যাক্টটা বুঝা যাচ্ছে না কিন্তু এটার প্রভাব হয়তো বছরখানেক পর অনুভুত হবে। ফ্রান্স তাঁর বেজগুলি এবং সামরিক উপস্থিতি ছাড়তে নারাজ। তাই তারা একোয়াসের (ECOWAS) সাথে সুর মিলিয়ে ক্যু সরকারকে মিলিটারিলি উৎখাত করার সিদ্ধান্তে অটল। একোয়াসও (ECOWAS) চেয়েছিলো নিজারে (NIGER) কাউন্টার অফেন্সিভের মাধ্যমে পূর্বর্তী প্রেসিডেন্ট বাজোমকে আবার স্থলাভিষিক্ত করে। কিন্তু একয়াসের (ECOWAS) সামনে দুটো বড় প্রশ্ন এসে হাজির হয়েছে

(ক) রাশিয়া নিজারে (Niger) কোনো প্রকার মিলিটারী অভিযানের পক্ষে না। আর রাশিয়ার এই অবস্থানে একোয়াস (ECOWAS) নিজেরাও ক্রান্তিলগ্নে। কারন আফ্রিকার দেশসমুহে রাশিয়া যে পরিমান অস্ত্র, খাদ্যশস্য এবং ইকোনোমিক্যাল সাপোর্ট দেয়, যদি রাশিয়ার কথার বাইরে কেউ যায়, সেটা রাশিয়া হয়তো বন্ধ করে দিতে পারে। আফ্রিকার দেশ গুলি এম্নিতেই গরীব, তারমধ্যে রাশিয়ার এই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে তাদেরকে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। রাশিয়াই একমাত্র দেশ যে আফ্রিকায় বিনামুল্যে এই যুদ্ধের মধ্যেও আফ্রিকার খাদ্য ঘাটতির কারনে ৯০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য সরবরাহ করেছে, ২৪ বিলিয়ন ডলার সমপরিমান ঋণ মওকুফ করে দিয়েছে এবং বিনামুল্যে আরো ৫০ মিলিয়ন টন সার দেয়ার কথা বলেছে। অন্যদিকে পশ্চিমারা বা ইউরোপ বা ফ্রান্স কিংবা তাদের মিত্র দেশগুলি সাহাজ্য তো দূরের কথা তারা মালি, গিনি, বারকুনো ফুসু, নিজার, চাঁদ, এবং আরো কিছু আফ্রিকান দেশসমুহে নিষেধাজ্ঞা আরোপন করেছে। ফলে আফ্রিকান দেশগুলি স্বাভাবিক কারনেই রাশিয়ার কথার বাইরে যেতে পারার কথা না। একোয়াসে আফ্রিকার মোট ১৫টি দেশ। এরমধ্যে কয়েকটিতে চলছে মিলিটারী শাসন। তারা হচ্ছে গিনি, নিজার, মালি, বারকিনো ফুসু, গিনিয়া বিসাও, লাইবেরিয়া সবেমাত্র বেরিয়ে গেছে। একোয়াসের মধ্যে বাকী যে কয়টা দেশ আছে, তাদের সামরিক ক্ষমতাও খুবই নগন্য। সক্ষমতার দিক দিয়ে একোয়াস মিলিটারী কোনো দেশের জন্যই কোনো হুমকী না।

(খ)       ফ্রান্স যেহেতু মনে প্রানে চাচ্ছে যে, একোয়াস (ECOWAS) মিলিটারী অপারেশন করুক নিজারে (Niger) কারন সেক্ষেত্রে ফ্রান্স একোয়াসের বাহানায় সেইই মিলিটারী অপারেশনটা করবে যাতে ফ্রান্সের দোষ না হয়, দোষ হয় একোয়াসের। কিন্তু একোয়াস অনেক ভেবেচিন্তে দেখছে এটা করা ওদের সমুচীন হবেনা। অন্যদিকে ফ্রান্স এটাও ভেবেছিলো যে, তাদের ইউরোপিয়ান মিত্র হিসাবে আমেরিকা অবশ্যই নিজারের ( Niger)ব্যাপারে জোরালো কিছু করবে। কিন্তু আমেরিকা সেটা না করে তারা যেটা করেছে সেটা হলোঃ আমেরিকা থেকে প্রতিনিধি হিসাবে ন্যুল্যান্ডকে নিজারে (Niger) পাঠিয়েছে অভ্যুথানের কমান্ডারদের সাথে এক মিটিং করার জন্য। তাঁর বক্তব্য ছিলো নিজার (Niger) যাতে ভাগনার নামক ভাড়াটে বাহিনীর কোনো সহায়তা না নেয় এবং প্রয়োজনে আমেরিকা অভ্যুথানকারীদের সাথে সমঝোতা করতেও ইচ্ছুক। অভ্যুথানের কমান্ডারদের সাথে ন্যুল্যান্ডের এমন বৈঠকে ফ্রান্স খুব ক্ষুদ্ধ এবং কিছুতেই খুশী না তারা। তারা মনে করছে-আমেরিকা ঠিক সেই কাজটাই করেছে যেটা ফ্রান্সের সার্থের বিপরীত। তারা অবশ্য এটাও বলেছে যে, আমেরিকার সামরিক বেজগুলি নিজারে (Niger) রাখার সার্থেই ন্যুল্যান্ডের এই ভিজিট।

তাহলে কি দাড়ালো? একদিকে জার্মানী নাখোশ, অন্যদিকে ফ্রান্স নাখোস। ইতালী তো আগে থেকেই নাখোস, তুরষ্কের ব্যাপারটা আমরা সবাই জানি। সে না ন্যাটোর ঘরে, না ন্যাটোর বাইরে, না সে ইউরোপে না সে এশিয়ায়। হাংগেরী তো বহু আগে থেকেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের গলার কাটা। পোল্যান্ড গত কয়েকমাস যাবত ইউক্রেনের উপর ভীষন ক্ষিপ্ত। কারন পোল্যান্ড তাঁর নিজের দেশের কৃষকদের বাচানোর জন্য ইউক্রেনের শস্য আমদানীতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় পোল্যান্ডের সাথে ইউক্রেনের সম্পর্ক এখন চরম খারাপ। একদিকে পোল্যান্ড বেলারুশকে নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে ভাগনার গ্রুপ যে কোনো মুহুর্তে পোল্যান্ডে প্রবেশ করার পায়তারা করছে। ফলে চরমপন্থি পোল্যান্ড এখন নিজের ঘর সামলাবে নাকি ইউরোপিয়ান জোটের সার্থে সে ইউক্রেনকে সাপোর্ট করবে নাকি পশ্চিমাদেরকে খুশি করবে, সেটা নিয়েই সন্দিহান। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আরেক শক্তিধর যুক্তরাজ্য তো আরো ক্ষেপা এই ইউক্রেনের উপরে যার প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেসের এক কথায় যে, ইউরোপ বা ন্যাটো কোনো আমাজন নয় যে ইউক্রেন যখন যা চাইবে তাকে তখনি সেটা দিতে হবে।

উপরের কয়েকটা বিশ্লেষণে যেটা খালী চোখেই ধরা পড়ে সেটা হচ্ছে যে, ন্যাটো বা ইউরোপিয়ান জোট ধীরে ধীরে নেতিয়ে যাচ্ছে এবং এদের সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাসের একটা ফাটলের সৃষ্টি হচ্ছে। আর এই ফাকে পুরু দুনিয়ায় একটা বিশাল পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে বেড়াচ্ছে- মাল্টিপোলারিটি, ডি-ডলারাইজেশন, ব্রিক্সের উত্থান এবং চীন-ভারত-রাশিয়ার সাথে ইরান-সৌদি-সিরিয়া- ব্রাজিল- সাউথ আফ্রিকা ইত্যাদি মিলে একটা ভিন্ন জোট।

আমার কাছে যেটা মনে হয়, একসময় এই পুরু ইউরোপিয়ান জোট তাদের নিজেদের সার্থেই আবার রাশিয়ার সাথে মিলতে বাধ্য হবে। আর যদি সেটাই হয়, তাহলে ন্যাটোর পরিবর্তে এমন আরেক জোট তৈরী হবে যেটা শুধুমাত্র নতুন ইউরোপের যেখানে আধিপত্য করবে চীন, রাশিয়া এবং আফ্রিকা যদিও চীন বা আফ্রিকা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কেউ না।
সময় হয়তো বলে দেবে।

১২/০৮/২০২৩-মিটুলের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল পোষ্টিং

আমার গিন্নী সরকারি বাঙলা কলেজ, মীরপুরে অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কর্মরত। গিন্নীরা চাকুরী করলে স্বামীদের কি হাল হয় সেটা যারা আমার মতো চাকুরীজীবি গিন্নীর স্বামী তারা বুঝতে পারবেন। মাঝে মাঝেই ব্যাচলর মনে হয় কারন ছুটির দিনের দুপুরের খাবারের সময়েও গিন্নীর কর্মস্থলের জরুরী কাজ নিয়ে তিনি মহাব্যস্ত থাকেন। একাই তখন খেতে হয়। আলসেমী করে সকালে একটু ঘুম থেকে দেরী করে উঠলে দেখবেন, গিন্নী নাই, অফিসে চলে গেছেন। আবার আমি অফিস থেকে একটু আগে এলেও দেখি গিন্নী তখনো কলেজের কাজেই ব্যস্ত। উপায় নাই। দেশের কল্যান বলে কথা। স্বামীর কল্যানের জন্য তো আর দেশের অমঙ্গল করা যাবেনা।

এরমধ্যে গিন্নী আবার বিভাগীয় প্রধানের কাজের বাইরে পর পর দুইবার বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক। কলিগরাও বে রশিক। স্বামীর কথা একবারো ভাবেন না। এতো ভোট দিয়ে তাকে জয়ী করাবেন তো স্বামীর কি হাল হয় সেটা কি একবারো ভাববে না? যাই হোক, পর পর দুইবারই তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদন্ধি থেকে ৪০% ভোটে এগিয়ে জয়ী হন। তো বুঝতেই পারেন, বেচারা স্বামীর কি অবস্থা। আমিও ভেবে নেই যে, জগত সংসারে স্বামীদের ছাড়াও এসব কালজয়ী গিন্নীদের আরো অনেক জরুরী কাজ আছে। সুতরাং হে স্বামীগণ, হয় নীরবে শুয়ে শুয়ে টিভি দেখো, অথবা কৃষকের মতো বাগানে কাজ করো না হয় যদি জার্মান শেফার্ড থাকে তাকে নিয়ে একটু ব্যস্ত থাকো। অভিযোগ কইরা কোনো ফায়দা নাই। নারীরা এখন অনেক প্রতাপ্সহালী। বহু দেশের রাষ্ট্র প্রধান এখন মহিলা।

আমার গিন্নী এবার আবার কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। এতো চাপা কষতের মধ্যে মনটা ভরে গেলো। সুখের খবর তো অবশ্যই। তবে এতে যে আমার আরো কিছু সময় ছাড় দিতে হবে সেটা তাই আর ধর্তব্যের মধ্যে নিচ্ছি না। আগে রাতের পরোটা খাইতাম ধরেন ৯ টায়, এখন না হয় খাবো ১০ টায়, এই তো। জীবনে ১ ঘন্টা আর কি আসে যায়। বিয়ের আগে তো এ রকম ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু তাহার চেহাড়া মোবারক দেখার জন্য রাস্তায়, ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণে অযথাই সময় নষ্ট করেছি। তাঁর তুলনায় এই প্রতিদিন এক ঘন্টা লস তো কোন ব্যালেন্স শীটেই পড়ে না। অবশ্য সম্পর্কটা এখন মাঝে মাঝে ভাই বোনের মতই হইয়া গেছে। স্বামী হিসাবে রাগ না কইরা ভাই হিসাবেই না হয় ক্ষমা কইরা দিলাম। কি বলেন?

যাক গে, যা বলছিলাম, গিন্নী বাঙলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল হিসাবে নিয়োগ পেয়েছে। খবরটা অনেক গর্বের যেমন, তেমনি আনন্দেরও। তাই সেই সুবাদে বাঙলা কলেজের বেশ কিছু গুনীজন, শিক্ষক এবং কলিগদের নিয়ে গত শুক্রবার একটা ট্রিট দিলেন আমার গিন্নী। (কানে কানে বলে রাখি-বিলটা আবার আমার কার্ডেই গেছে)। আমরাও তাঁর এই সাফল্যের জন্য অতি আনন্দের সাথে তাঁকে একটা সংবর্ধনা দেই। তারই কিছু বিশেষ মুহুর্তের ছবি।

ভালো থেকো আমার গিন্নী, তোমার সাফল্যে আমি সব সময় গর্বিত। তুমি নিশ্চয় আরো উন্নতি করবে এটাই আমার দোয়া।

১০/০৮/২০২৩-লোকাল এম পি মহোদয়ের বাসায়

আমি রাজনীতিবিমুখ একজন মানুষ। ফলে রাজনীতিবিদদের সাথে খুব একটা মেলামেশা হয়না বা করা হয়না। আমার অনেক রাজনীতিক বন্ধুদের বা কাছের মানুষকে আমি শুধুমাত্র বন্ধু, আত্তীয় কিংবা অভিভাবক ইত্যাদি হিসাবেই গন্য করি। আমার পাশেই আমাদের লোকাল এমপি মহোদয় জনাব বীর মুক্তিযীদ্ধা আগা খান মিন্টুও এমন একজন ব্যক্তিত্ব। থাকেন আমার বাসার অদূরেই। অত্যান্ত সজ্জন, মিশুক এবং সিম্পল একজন অভিভাবকসুলভ মানুষ। তিনি যতোটা না রাজনীতিক, তার থেকে অনেক বেশী ফাদারলি। তার আরেকটি পরিচয়- তিনি ছিলেন Active Freedom Fighter. ফলে অনেক না জানা ইতিহাসের তিনি এখনো চলমান বইয়ের মত।

কিছুদিন আগে মহোদয়ের সাথে চা খাওয়ার জন্য মহোদয়ের বাসায় দেখা করতে গেলে তার ফাদারলি এটিচুডের কারনেই তিনি অতিশয় আদর এবং সম্মানের সাথে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। আমি মহোদয়ের এমন আথিথেয়িতায় যারপর নাই কৃতজ্ঞ। দীর্ঘায়ু কামনা করি মহোদয়ের।

আমার সাথে ছিল আমারই বাল্যবন্ধু লোকাল কমিশনার মুজিব সারোয়ার মাসুম। আমার এই বাল্য বন্ধুটিও একজন ভাল মানুষ। সবার প্রতি আমার ভালোবাসা।

৯/৮/২০২৩-মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস এওয়ার্ড-২০২৩

আমার কথা 

কোনো কিছুই আমি জানি না, হটাত আমার অফিসে একটা রেজিষ্টার্ড চিঠি নিয়ে এলো কুরিয়ার সার্ভিস। সাধারনত যে কোনো চিঠি আমার অফিসে আমার HR Division Head তা রিসিভ করে। কিন্তু এই কুরিয়ার সার্ভিসের লোক কোনো অবস্থাতেই আমাকে ছাড়া উক্ত চিঠিটা আমার HR Division Head এর কাছে দিতে নারাজ। আর সেটা আমাকেই রিসিভ করতে হবে বলে জানালো।

অতঃপর চিঠিটা আমি নিজেই রিসিভ করলাম। চিঠিটি এসেছে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিল থেকে। বলা যায় আমার জন্য এটা অপ্রত্যাশিত একটা চিঠি যার বিষয়বস্তু হচ্ছে-“মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস এওয়ার্ড-২০২৩”। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানবসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিসরূপ উক্ত “মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস এওয়ার্ড-২০২৩” এ ভূষিত করার জন্য সংগঠনটি আমাকে মনোনীত করেছে।

অনুষ্ঠানটি ৯ জুন ২০২৩ তারিখে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কলিকাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি রথীন্দ্র মঞ্চে “ভারত-বাংলাদেশ রবীন্দ্র-নজরুল বঙ্গ উৎসবে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হবে এবং  চুড়ান্ত মনোনীত ব্যক্তিদের অথবা সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলে তাদের প্রতিনিধিকে তারা উক্ত পুরুষ্কারটি প্রদান করবেন। অনুষ্ঠানটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মাননীয় মন্ত্রী, বিধায়ক, এমএলএ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত শিল্পীবৃন্দ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিল্প সাহিত্য অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।

সংবাদটি আমাকে যারপর নাই বিস্মিত করে এবং আমি নিজে  যাচাই বাচাই করার জন্য ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশের অফিসে যোগাযোগ করি। জানতে পারলাম যে, এর আগেও বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন বিশিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গকে তারা এ পুরুষ্কারে ভূষিত করেছেন। শিক্ষা, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, শান্তি, সমাজ এবং মানব সেবা ইত্যাদি আরো অনেকগুলি সেক্টরে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিল থেকে এসব পুরুষ্কার দেয়া হয়। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানবসেবায় এবার তারা আমাকে নির্বাচন করেছেন। আমি তাদের বিস্তারিত সার্ভের পদ্ধতিটা জেনে খুবই অবাক হয়েছিলাম কিভাবে তারা এসব ব্যক্তিবর্গকে নির্বাচন করে।

আমি উক্ত ৯ জুন ২০২৩ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য অনুষ্ঠানে ব্যস্ততার কারনে উপস্থিত থাকতে পারিনি। ফলে বাংলাদেশ লোকাল অফিসের সম্পাদক শাহ আলম চুন্নু সাহেব আমার পুরুষ্কারটি গ্রহন করেন এবং গতকাল সেটা সার্টিফিকেট সহকারে পুরুষ্কারটি আমার অফিসে হস্তান্তর করেন।

আমাকে এহেনো সম্মানে ভূষিত করার জন্য ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিলের কার্য নির্বাহী পরিষদ, নির্বাহী পরিষদের সভাপতি শুভদীপ চক্রবর্তী (ভারত), ভারত-বাংলাদেশ রবীন্দ্র-নজরুল পরিষদের আহবাহক মোঃ আর কে রিপন, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিলের সম্পাদক (বাংলাদেশ) শাহ আলম চুন্নু ভাইকে আমার ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা জানাই।

সম্মাননা পুরুষ্কারটি হাতে পাওয়ার পর আমার সংস্থার কর্মকর্তা, কর্মচারীবৃন্দ আমাকে অভিনন্দন জানায়।

আজ ১১ আগস্ট ২০২৩ তারিখে সরকারি বাংলা কলেজের সম্মানীত শিক্ষক মন্ডলীর উপস্থিতিতে  কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল প্রফেসর মিটুল চৌধুরী এবং আমার বড় মেয়ে ডাঃ আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা এই সম্মাননা উদযাপনের মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণীয় করেন। আমি সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। 

সনদপত্র

বাঙলা কলেজের শিক্ষক পরিষদের সংবর্ধনা

বাঙলা কলেজের শিক্ষক পরিষদের সংবর্ধনা

মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস এওয়ার্ড পেলেন মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ)

‘মাহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীস অ্যাওয়ার্ড-২০২৩’ পেয়েছেন মেজর মো. আখতার হোসেন (অব.)। তিনি মা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রিভার সাইড সুয়েটার্স লিমিটেড, আন-নূর ফ্যাশন্স লিমিটেড, এম এ ট্রেডার্স, ধলেশ্বরী গ্রীনভিলেজ প্রমুখ ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। গত ৯ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কলিকাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি রথীন্দ্র মঞ্চে “ভারত-বাংলাদেশ রবীন্দ্র-নজরুল বঙ্গ উৎসবে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মেজর মো. আখতার হোসেন (অবঃ) কে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানটিতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মাননীয় মন্ত্রী, বিধায়ক, এমএলএ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত শিল্পীবৃন্দ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিল্প সাহিত্য অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মানবসেবায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিল মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) কে এই সম্মাননা প্রদান করেন।

ব্যবসায়ীক বিশেষ ব্যস্ততার কারনে উক্ত ৯ জুন ২০২৩ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য অনুষ্ঠানে মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) উপস্থিত থাকতে না পারায় তাঁরপক্ষে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিল (বাংলাদেশ) এর সম্পাদক জনাব শাহ আলম চুন্নু ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিলের কার্যনির্বাহী পরিষদ, নির্বাহী পরিষদের সভাপতি জনাব শুভদীপ চক্রবর্তী (ভারত) থেকে সার্টিফিকেট এবং সম্মাননাটি গ্রহন করেন এবং গত ৯ আগষ্ট ২০২৩ তারিখে উক্ত সার্টিফিকেটসহ সম্মাননাটি জনাব শাহ আলম চুন্নু মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) এর অফিসে হস্তান্তর করেন।

সার্টিফিকেট এবং সম্মাননাটি পেয়ে মেজর মোহাম্মাদ আখতার হোসেন (অবঃ) বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই বন্ধুপ্রতীম ভারতকে আমরা সবসময় পাশে পেয়েছি। আজ এই বিরল সম্মাননায় আমি মুগ্ধ এবং কৃতজ্ঞ। ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কালচারাল কাউন্সিলের মানব সেবার যে মুখ্য উদ্দেশ্য তা এই সম্মাননার প্রেক্ষিতে আমাকে ভবিষ্যতে আরো উজ্জীবিত এবং অনুপ্রেরনা জোগাবে।

সম্মাননার ক্রেষ্টটির ছবি নীচে দেয়া হলো। 

Alokito Bangladesh Paper Cutting 13 Aug 23

RSSL

Daily Bangladesh News Paper

Daily Alokito Bangladesh Ners Paper

০৪/০৮/২০২৩-মানুষ একাই ছিলো, একাই থাকবে

এক যুগের অধিক কোনো একটা স্থানেও যদি কেউ বসবাস করে, সেই জায়গার গাছপালা, রাস্তাঘাট, আশেপাশের চেনা পথচারী, বাড়িঘরকেও মানুষ ভালোবাসতে শুরু করে। হোক সেটা কোনো ভাড়াটে জায়গা বা কোনো বিদেশভূমি। আর কেউ যখন এক নাগাড়ে কারো সাথে যুগের অধিক মারামারি, কাটাকাটি করেও একসাথে এক ছাদের নীচে বসবাস করে, তাকে তো দূরে সরিয়ে দেয়া আরো সহজ হবার কথা নয়। আর যদি সেই যুগল বন্ধন হয়ে থাকে কোনো এক সময়ের উজ্জিবিত ভালোবাসার কারনে, তাহলে এই বিচ্ছেদে সেটাই হবার কথা যেনো নিজের অনিচ্ছায় নাড়ির ভিতর থেকে সমস্ত অনুভুতিকে টেনে হিচড়ে জীবন্ত কেটে ফেলার মতো। যদি এরুপ ঘটনা আপনার চোখের সামনে ঘটতে দেখেন, তাহলে বুঝতে হবে যে, হয় (ক) সম্পর্কটা কখনোই নিজের ছিলো না এবং এই সম্পর্কের মধ্যে পারষ্পরিক ভালোবাসা আর মহব্বতের পাশাপাশি এমন কোনো সার্থ ছিলো যা বৈষয়িক এবং অনেকটাই লোভের। সেই লোভ হতে পারে দৈহিক, হতে পারে কোনো সম্পদ বা সম্পত্তি, হতে পারে কোনো সিড়ি যা কিনা নিজের ব্যবহারের জন্য শুধু একটা অবলম্বন হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিলো। অথবা (খ) আরেকটা হতে পারে যে, সম্পর্কটাকে কেউ সম্মানই করেনি। তিলেতিলে গড়ে উঠা ছোট ছোট বিদ্বেষ, ছোট ছোট অবহেলা, কিংবা নির্যাতন পুরু সম্পর্কটাকে এমন স্থানে নিয়ে গেছে যেখানে কেউ কাছে আসার জন্য আর কেউ চেষ্টাই করে নাই। তারা সব সময় এক সাথে থেকেও আলাদাই ছিলো। অথবা আরেকটা হতে পারে (গ) এই সম্পর্কের মধ্যে এমন আরেকজন ঢোকে পড়েছে যা অতীতের সব মোহ, সব ভালোবাসা, সব আবেগকে মিথ্যা প্রমানিত করে বর্তমানের সাময়িক মোহ, অনুভুতি কিংবা তার পারিবারিক পরিস্থিতির উপর ভর করে বসেছে। সবচেয়ে করুন যেটা হতে পারে সেটা আমাদের কারো হাতের মধ্যে থাকে না। আর সেটা হলো (ঘ) সম্পর্কে জড়ানো কারো যদি হটাত অসময়ে ম্রিত্যুর মতো কোনো ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি বাদ দিয়ে অন্য যে কোনো পরিস্থিতির আলোকে বলছি- যদি এমন কোনো সম্পর্ক-বিচ্ছেদের মধ্যে কেউ আবর্তিত হয়েই যায়, মনে রাখা উচিত, নতুন সেই সম্পর্কটাও একদিন এমনভাবে ফিকে হয়ে যাবে, যা আজকের দিনের ফিকে হওয়ার চেয়েও খারাপ। তাই, একবার কখনো যদি কোনো সম্পর্কের মধ্যে কেউ ঘোলাজলের অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে, তাকে নতুন আরেকটা সম্পর্কে জড়ানোর আগে উভয়ের আদিপান্ত সব কিছু চুলচেরা বিশ্লেষন করে অতঃপর সম্পর্কে জড়ানো উচিত। বিশ্লেষন করা উচিত কিসের ভিত্তিতে আসলে নতুন এই সম্পর্কটা তৈরী হচ্ছে। সব সময় এর অন্তর্নিহীত কারন হয়তো বের করা সম্ভব হবে না কিন্তু যথেষ্ঠ পরিমানে সময় নিয়ে, আবেগের স্থানটুকু, মোহের কারনগুলি নিঃশেষ হতে দিন, তারপর নির্যাস টুকু বুঝার চেষ্টা করুন। হয়তো কিছুটা হলেও আচ করা সম্ভব। কেননা, উপরের যে তিনটা কারনের কথা বলছি, সেটা যে আপনার জীবনেও ঘটবে না, তা আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না। হতে পারে, আপনার থেকেও তার মতে উত্তম আরো কেউ চলে আসবে এই সম্পর্কের ভিতর যেখানে আপনি তার কাছে, তার মোহের কাছে, তার লোভের কাছে, তার ভাবনার কাছে কিছুই না। হয়তো বা নতুন মানুষটি তাকে আবারো কোনো এক নতুন সপ্ন দিয়ে হাতছানী দিচ্ছে। হতে পারে আপনার কাছ থেকে যতটুকু সে আশা করেছিলো তার হয় প্রাপ্তি শেষ অথবা আর কিছু পাবার সম্ভাবনা নাই বা হতে পারে সেই পুরানো অভ্যাস, অবহেলা, কুরুচী ইত্যাদি আবার তার মধ্যে জাগ্রত হয়েছে যা আপনি কখনো ভাবেনই নাই।

এটা শুধু মানুষের বেলাতেই ঘটে। এরুপ ঘটনার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে করতে মানুষ এক সময় এতোটাই অভিজ্ঞ হয়ে উঠে যে, তখন কাউকে শুধু উপদেশ দেয়া ছাড়া নিজের জন্য আর কোনো কিছুই করার থাকে না। মানুষ আবারো একাই হয়ে যায়।

মানুষ সবসময় একাই ছিলো। পারিপার্শিক দায়বদ্ধতার কারনে, নিজেদের একা থাকার বিপদজনক পরিস্থিতি থেকে রক্ষার কারনে আর কিছুটা মোহের কারনেই মানুষ দলবদ্ধ হয়, সংসারী হয়। পৃথিবীতে হাজার হাজার উদাহরন আছে যেখানে মানুষ লোকারন্যে থেকেও একাই জীবন যাপন করেছে এবং করছে। এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় এর সংখ্যা ধীরে ধীরে আরো বেড়ে যাবে, কেউ কারোই থাকবে না তখন।

২৪/০৭/২০২৩-পৃথিবীটা শুধু মানুষের না

মানুষ সম্ভবত তার বিলুপ্তির সীমায় পদার্পন করেছে ইতিমধ্যে। ভয়ংকর কথা বলে মনে হলেও এটা প্রাকৃতিক নিয়মের একটা চলমান অংশ। এর আগেও এই বিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছে, আর সেটা একাবার নয়, পরপর পাচবার।

বিজ্ঞানীরা বলেন আমাদের এই পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চার বিলিয়নের মতো। এই সাড়ে চার বিলিয়ন বছরে পৃথিবীর প্রায় ৭৫% প্রানী সমুহের বিলুপ্ত হয়েছে বেশ কয়েকবার যাকে বলা হয় “মাস এক্সিঙ্কশন”। মাস এক্সিঙ্কশন তাকেই বলে যখন কোনো স্থান থেকে ৭৫% প্রজাতী (গাছপালা, জীবজন্তু, কিংবা অদৃশ্য কোনো প্রানীসকলসহ অনেক অনুজীব) মাস এক্সিঙ্কশন হয়েছে আজ থেকে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে। যার মধ্যে রয়েছে ডাইনোসর এবং আরো অনেক প্রানী।

এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার যে, ন্যাচারাল প্রক্রিয়ায় সমস্ত জীবজন্তু, গাছপালা, জীবানু, অনুজীব সবাই একটা জীবন মরনের মধ্যে থাকে। কিছু বিলুপ্ত হয়, আবার কিছু নতুন জন্ম হয়। এভাবেই ন্যাচারাল ব্যালেন্স হয়। কিন্তু গত ৪০/৫০ বছর যাবত এই বিলুপ্তির ঘাটতি যেমন ম্যামাল, ব্যাক্টেরিয়া, প্ল্যান্টস, অনুজীব ইত্যাদি ন্যাচারাল প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না, হচ্ছে আর্টিফিশিয়ালভাবে, আর সেটা হচ্ছে প্রায় দশ হাজার গুন গতিতে।

তাহলে এর কারন কি?

এর একটাই কারন। মানুষ।

মানুষ মনে করে এই পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য, অন্য কারো জন্যে নয়। কিন্তু এটা শতভাগ ভুল। পৃথিবীর মাটির গভীরে যে ব্যাক্টেরিয়া আছে তার থেকে শুরু করে আকাশে যারা ভেসে বেড়ায়, সমুদ্রের তলদেশে যেসব নাম না জানা প্রানীকুল অনুজীব ইত্যাদি আছে, সবার জন্য এই পৃথিবী। কিন্তু মানুষ সেটা ভাবে না। ফলে এই মুহুর্তে মানুষ একা পৃথিবীর ৭০% ল্যান্ড এবং ব্যবহারযোগ্য পানী ব্যবহার করছে। বাকী ৩০% ল্যান্ড আর ৩০% ফ্রেস পানি বাকী যতো গাছপালা, উদ্ভিদ, অন্যান্য প্রানীসকলসহ ব্যাক্টেরিয়া, জীবানু, নাম না জানা প্রানীদের জন্য রয়েছে যা নিতান্ততই অপ্রতুল।

আর এই ঘটনাটা ঘটতে শুরু করেছে ১৯৭০ সালের পর থেকে। ১৯৭০ সাল কেনো বলছি? কারন

১৯৭০ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে যে, আমাদের পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা ছিলো প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন। ফলে এই সাড়ে তিন বিলিয়ন মানুষের জন্য যে বসবাস যোগ্য ল্যান্ড এবং ফ্রেস পানি দরকার ছিলো তা ১৯৭০ সালেই তার কোটা পরিপুর্ন হয়ে যায়। ফলে ১৯৭০ সালের পর যে হারে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে তাতে ইউজেবল ল্যান্ড এবং ফ্রেস পানির দখলও মানুষের বেড়েছে, বেড়েছে আর্বানাইজেশন, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেন ইত্যাদি। অর্থাৎ অন্যান্য প্রানী, জীববজন্তু, গাছপালা এদের জন্য পর্যাপ্ত ল্যান্ড বা ফ্রেস পানির ভাগ কমে যাচ্ছে এবং গেছে। এই পপুলেশন বোম্ব এখন ধীরে ধীরে আরো বেড়েই চলছে বিধায় মানুষ ছাড়া অন্যান্য জীবকুলের একটা বিলুপ্তি চোখে ধরা পড়ছে। উদাহরন দেই- 

আগে মানুষ ন্যাচারাল পরিবেশ ভোগ করতো, তাদের বাড়ির পাশে গাছপালা থাকতো, সেই গাছপালায় অনেক পাখীর বাসা থাকতো, বাড়ির পাশে ঝোপ জংগলে হয়তো পিপড়া, সাপ, কিংবা মাটির নীচে অনেক কেচো, শামুক, জীবানু ব্যাক্টেরিয়া, আরো ইত্যাদির থাকার ব্যাপারটা চোখে পড়ত যা এখন কংক্রিটের কারনে, মানুষের আর্বানাইজেশনের কারনে, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের কারনে ধীরে ধীরে এসব জীবজন্তুর আর থাকার কোনো জায়গা রইলো না। বাড়ির পাশে হয়তো ১০০ গজ দূরে যে সাপটা বাস করতো তার আর কোথাও থাকার জায়গা নাই, বংশবৃদ্ধির কোনো উপায় নাই, পাখীরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে এক সময় তারাও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, অনেক প্রজাতীকে এখন আর চোখেও দেখা যায় না। অনেক জলজ মাছের এখন শুধু নাম পাওয়া যায়, বাস্তবে তারা প্রায় উধাও হয়ে গেছে।

১৯৭০ সালে যেখানে মানুষ ছিলো সাড়ে তিন বিলিয়ন, এখন সেটা দাড়িয়েছে আট বিলিয়নে। অর্থাৎ প্রায় তিনগুন। হাজার হাজার বছরে যতোটা না এই বৃদ্ধির হার বেড়েছিলো, সেটা এই ১৯৭০ এর পর থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক গুন বেশী, প্রায় দশ হাজার গুনের থেকেও বেশী। এর ফলে যেমন বনের অনেক প্রকারের ভাল্লুক, সমুদ্রের স্যালমন ফিস, কিংবা ছোট ছোট প্রজাতী, বনের বহু প্রজাতীর গাছপালা এখন আর চোখে পড়ে না। তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুধুমাত্র একটা অঞ্চলের কথা বলি-ল্যাটিন আমেরিকার এমাজন ফরেষ্ট যাকে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয়, সেখানে এখন ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের কারনে হাজার হাজার বনাঞ্চল, নদীপথ সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাহলে এই অঞ্চলের প্রজাতিগুলি গেলো কই? জলজ প্রানীগুলি গেলো কই? সেটা এখন আর ফুসফুস হিসাবে কাজ করছে না।

সমদ্রের কথা যদি বলি-দেখবেন পৃথিবীর ডাম্পিং এরিয়া এখন সমুদ্র। এই ডাম্পিং এর কারনে সেখানকার জলজ প্রানীদেরকে আমরা প্রায় গলা টীপে মেরে ফেলছি, তাদের বাসস্থানকে এতোটাই অসহনীয় করে ফেলছি যে, তাদের নিজেরা যেমন বেচে থাকতে পারছে না, নতুন প্রজন্মও আর জন্ম নিচ্ছে না। আগে যেখানে এক লক্ষ জলজ প্রানী নতুন প্রজন্ম এর জন্ম দিতো সেখানে হয়তো এখন দশ হাজার জলজ প্রানীর বসবাস এবং তাদের দ্বারা জন্মদানের প্রজন্মও কমে যাচ্ছে সেই একই হারে। আর এই নতুন প্রজন্মও আবার খুব দ্রুত পরিবেশ বিপর্য্যের কারনে আরেক প্রজন্ম দেয়ার আগেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এবং এক সময় সবাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

অথচ পৃথিবীটা ওদেরও। শুধু মানুষের জন্য এই পৃথিবীটা না। এই পৃথিবী অনুজীব থেকে শুরু করে সমস্ত জীব জন্তু, গাছ পালা, সবার। খুব বেশী সময় দূরে নয় যেখানে আমরা সবাই আমাদের কারনেই বিলুপ্ত হবো যাকে আমরা মাস এক্সিঙ্কশন বলছি।

২৬/০৭/২০২৩-ফেসবুক একটা বিনোদনের জায়গা

ফেসবুক একটা শুধু বিনোদনের জায়গায়ই নয়, এখানে অনেক মানুষকে ব্যবসা না করেও ব্যবসায়িক নিটিগিটি না বুঝেও অনেক দারুন দারুন ব্যবসায়িক তত্ত্ব দিতে দেখি, অনেক ইন্টেলেকচুয়াল রাজনীতির মারপ্যাচ না বুঝেও বেশ ধারালো বক্তব্য দিতে দেখি, ফরেন পলিসির সাথে দেশীয় পলিসির যোগ সুত্র না বুঝেও বেশ এমন এমন যুক্তি দেন যেনো ওনাদেরকে যদি বলি একটা পলিসি দেন, তখন আবার দিতে নারাজ। যদি ব্যবসা করতে বলি, সেটাও করতে নারাজ, যদি রাজনীতিতে এসে হাল ধরতে বলি, সেখানেও নারাজ।

রিজার্ভ কি, এলসি কি, ব্যাক টু ব্যাক কি, অফসোর ব্যাংকিং কি, ইউপাস এলসি, এপিআর, এপিওয়াই, ক্রেডিট রেটিং কেনো কিভাবে করা হয়, জিএসপি কি ইত্যাদি যদি জিজ্ঞেস করি, কেমন জানি এড়িয়ে যান। খুব সহজ কিছু যদি জিজ্ঞেস করি যে, প্রাইম রেট, ফিক্সড রেট, পিরিয়ডিক রেট, ইন্টারেষ্ট রেট, ইন্ডেক্সড রেট এদের মধ্যে তফাত কি কিংবা  মুলস্ফিতি কি, কেনো হয়, ইম্পোর্টে ফরেন কারেন্সীর ভূমিকা কি, এক্সপোর্টে ব্যবসায়ীদের কি করনীয় কিংবা ইম্পোর্টারের সাথে এক্সপোর্টারের এলসির মধ্যে কি ধরনের ইফেক্ট করে ফরেন কারেন্সী, যখন এগুলি নিয়ে একটু আলাপ করতে চাই, তখন জানি কেমন কেমন করে।

কাউকে অসম্মান করছি না, যে কোনো বিশয়ে একটু জ্ঞান আহরন করে যদি কেউ এতোটুকু পার্টিসিপেট করতে পারেন, তাহলে অনেক মন্তব্য পড়েও আমরা কিছু শিখতে পারতাম। অবশ্য এগুলিও বিনোদন। আমি সেভাবেই নেই। ওনারা না থাকলে ফেসবুক এতো আনন্দময় হতো না।

২৫/০৭/২০২৩-২য় বিশ্বযুদ্ধ আসলে শুরু হয়েছিলো ১ম

২য় বিশ্বযুদ্ধ আসলে শুরু হয়েছিলো ১ম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে করা ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে। কেউ যদি নিউট্রালি নিজেকে প্রশ্ন করে যে, একটা বিশ্বযুদ্ধ জার্মানী করলো, সে অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হলো, আবার সে জেনেবুঝে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধে কেনো লিপ্ত হলো? এর উত্তর খুব সোজা-১ম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান তো প্রায় মৃতই হয়ে পড়েছিল এবং সে জীবিত থেকেও মরা। খাবার নাই, সামরিক বাহিনী নাই, তাদের অরিজিনাল ভুখন্ড নাই, সবার থেকে একঘরে, অন্যদিকে এতো পরিমান যুদ্ধ-ক্ষতির কিস্তি পরিশোধ, মিত্রবাহিনীর দ্বারা নিগৃহীত ইত্যাদির ফলে তারা আসলে বেচে ছিলো না। তাই হয় আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ করে বাচি, আর তানা হলে মরেই তো আছি। এটাই ছিলো সেই মনের ভিতরের ক্ষোভ যে কারনে জার্মানী আরেকটা যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছিলো। তাহলে এখন আসি, কিসের কারনে জার্মানীর ভিতরে এতো ক্ষোভ ছিলো। তাহলে কি ছিলো সেই ভার্সাই? চুক্তিতে কি ছিলো? চলুন একটু দেখি আসিঃ

(ক)      জার্মানীকে ১৩% ভুখন্ড ছাড় দিতে বাধ্য করা হয়েছে। আর সেগুলি হচ্ছেঃ

  • Alsace Lorraine (France)
  • Eupen and Malmedy (Belgium)
  • North Schleswig (Denmark)
  • Hulschin (Czechoslovakia)
  • West Prussia, Posen and Upper Silesia (Poland)
  • Saar, Danzig and Memel (League of Nations)
  • All gains from the Treaty of Brest Litovsk (Russia)
  • All colonies (League of Nations – given to France and Britain as ‘mandates’)

(খ)       যুদ্ধের ক্ষতি হিসাবে জার্মানীকে ৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপুরন দিতে বাধ্য করা হয়, যা ২০২১ সালের হিসাবে হবে ২৮৪ বিলিয়ন পাউন্ড। জার্মানীকে এই ক্ষতিপুরন দিতে মোট সময় লেগেছে ৯২ বছর।

(গ)       ৭টি ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন, তিনটি ক্যাভালরি ডিভিশন নিয়ে মাত্র অনুর্ধ ১ লক্ষের বেশি জনবল রাখার সীমিতকরন করা হয়। কোনো প্রকারের কনস্ক্রিপশন করা নিষিদ্ধ করা হয়। জার্মানীর সামরিক বাহিনিতে কোনো জেনারেল পদবীতে উন্নিত করা যাবে না। কোনো প্রকারের মিলিটারী ড্রিল, এক্সারসাইজ হোক সেটা প্রাক্টিক্যাল বা থিউরিটিক্যাল করা যাবে না।

 (ঘ)    নেভীর লোক সংখ্যা ১৫০০০ এর অধিক হতে পারবে না। ৬টি মাত্র ব্যাটলশীপ রেখে বাকী সব ব্যাটলশিপ হয় অন্য দেশের অধীনে রিজার্ভে রাখতে হবে অথবা সেগুলি শুধুমাত্র কমার্শিয়াল ব্যবহারের জন্য জার্মানী রাখতে পারবে।

(চ)      জার্মানীর বিমান বাহিনীকে পুরু নিষিদ্ধ ঘোষনা করে দেয়া হয় এবং জার্মানী কোনো প্রকার বিমান বাহিনী থাকবে না। কোনো প্রকার এয়ার ক্রাফট বা যুদ্ধ ম্যাটেরিয়াল নিজেরা তৈরী করতে পারবে না।

(ছ)       জার্মানীর কয়লারখনি সমৃদ্ধ এলাকা The Saar সেটা ফ্রান্সকে ১৫ বছরের জন্য হস্তান্তর করা হয়।

(জ)       রেইনল্যান্ড এবং এর আশেপাশে ৩১ মেইল পুর্বের দিকে নদী পর্যন্ত ডি-মিলিটারাইজড জোন হিসাবে ঘোষনা করা হয় এবং এই ডি-মিলিটারাইজড এলাকায় জার্মানীর কোনো প্রকার কনস্ট্রাক্সন নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু তাইই নয়, উক্ত অঞ্চলে এর পরের ১৫ বছর অবধি মিত্র বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।

(ঝ)       অষ্ট্রিয়ার সাথে একত্রিত হওয়া জার্মানীর নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছিলো।

(ট)       নবগঠিত লীগ অফ ন্যাশন্সের মধ্যে জার্মানীকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়।

 (ঠ)     জার্মানীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যুদ্ধের সব ব্লেইম নিতে বাধ্য করা হয় এবং জার্মানী এই যুদ্ধাপরাধির ব্লেইম একা নিতে নারাজ ছিলো।

১৯২৩ সালের অক্টোবরে এসে জার্মানীর অর্থনীতি এমন একটা স্তরে পৌঁছেছিলো যে, সারা জার্মানিতে দুর্ভিক্ষ এবং ইনফ্লেশনে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলো। নভেম্বর ১৯২৩ তে দেখা যায় যে, জার্মানীর ৪২ বিলিয়ন মার্কের দাম হয় মাত্র আমেরিকান ১ সেন্টের সমান। অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারনে গনমানুষের জন্য লঙ্গরখানা স্থাপন করে শুধুমাত্র গনখিচুরির মতো খাবার সার্ভ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিলো না। ভার্সাই চুক্তির এরুপ শর্তের কারনে পুরু জার্মান জাতী রাগান্নিত ছিলো এবং সেই কমন রাগ আর ক্ষোভ থেকে মানুষের মধ্যে একটা ইউনিটি তৈরী হয়েছিলো। আর ঠিক এই সময়ে হিটলার জার্মানীর চ্যান্সেলর হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করে।

হিটলার দায়িত্ব গ্রহন করার পরেই সে ভার্সাই চুক্তির এসব যুদ্ধের ক্ষতিপুরনের অর্থ দিতে অসম্মতি জানায় এবং বন্ধ করে দেয়। হিটলারের এমন আচরনে জার্মানবাসী যেনো সর্গের কোনো দেবতা হাজির হয়েছে এমন জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার এই জনপ্রিয়তায় এমন একটা পর্যায়ে হিটলারকে নিয়ে গিয়েছিলো যে, হিটলার যা চেয়েছে সেটাই তার জনগন সতস্ফুর্ত ভাবে আমল করেছে। হিটলার তার দেশবাশীকে এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলো যে, ভার্সাই চুক্তির কোনো কিছুই তারা মানে না এবং তার কোনো কিছুই তারা পে করবে না। এবং তার সাথে জার্মানী যেসব জায়গা, সম্পত্তি, হারিয়েছিলো, তা আবার পুনরোদ্ধার করা হবে। হিটলার জার্মানীকে রি-মিলিটারাইজড করা শুরু করে।

জার্মানীর প্রতিটি সর্বস্তরের মানুষ তাদের দুর্ভিক্ষ অর্থনৈতিক সংকট, মানবেতর জীবন এবং বিশ্ব দরবারে এরুপ মান হানীকর লজ্জার কারনে হিটলারের পিছনে সারিবদ্ধ হয়েছিলো পরবর্তী যুদ্ধের জন্য। আর সেটা ২য় বিশ্বযুদ্ধ। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের প্রাক্বালে জার্মানীর ভুমিতে দাঁড়িয়ে জার্মানীর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটা যুদ্ধকে সমর্থন না করা সম্ভব ছিলো নয়।

১৯/০৭/২০২৩-রাশিয়া কেনো ন্যাটোতে জয়েন করছে না?

অনেকেই প্রশ্ন করে আসলেই কি রাশিয়া বা সোভিয়েট ইউনিয়ন কখনো ন্যাটোতে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো? আর যদি তাইই হয়, তাহলে রাশিয়াকে ন্যাটোর সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হলো না কেনো? রাশিয়া যদি ন্যাটোর সদস্য হতো, তাহলে কিন্তু এরুপ কোল্ডওয়ার, ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা পশ্চিমাদের সাথে রাশিয়ার এমন বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করতো না। রাশিয়া ন্যাটোতে যোগ দিলে সারা  বিশ্বের কাছে ব্যাপারটা কিভাবে দেখা হতো, আমার আজকের লেখাটি এসব প্রশ্ন নিয়েই।

হ্যা, রাশিয়া একবার নয়, পরপর কয়েকবার ন্যাটোতে যোগ দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলো।

প্রথমবার রাশিয়া এপ্লাই করেছিলো ১৯৫৩ সালে স্ট্যালিন মারা যাওয়ার এক বছর পর এবং ১৯৫৫ সালে ওয়ার্শো প্যাক্ট তৈরী হবার পূর্বে। সেই প্রোপোজালের নাম ছিলো “Molotov’s Proposal and Memorundum-1954”। উক্ত প্রোপোজাল ন্যাটোতে পাঠানো হয় মার্চ ১৯৫৪ সালে। কিন্তু তখন আমেরিকা ক্রেমলিনের এই ইচ্ছাকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়ে এই ব্যাপারে কোনো আলাপ আলোচনাই করা চলে না বলে প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলো। মলোটোভ ম্যামোরান্ডামের ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো যে, ইউরোপের কালেক্টিভ নিরাপত্তা কিভাবে রক্ষা করা যায় সেটা। আর এই প্রস্তাবে রাশিয়া যেটা প্রস্তাব করেছিলো তা হলোঃ

(ক)      ওয়েষ্টার্নদের বিকল্প হিসাবে শুধুমাত্র ইউরোপের সবদেশ মিলে কিভাবে ইউরোপের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী করা যায় সেটা। আর সেটা মলোটোভা প্রস্তাবে নামকরন করা হয় “ইউরোপিয়ান ডিফেন্স কমিউনিটি”। ন্যাটো হয় বিলুপ্ত হবে অথবা তাদের কাজ হবে শুধুমাত্র ডিফেন্সীভ মানে টেররিজমের বিরুদ্ধে, কিংবা লোকাল পুলিশের ভূমিকায়।

(খ)       পশ্চিম জার্মানকে পুনরায় পুর্ব জার্মানীর সাথে কিভাবে একত্রিত করা যায় এবং জার্মানীকে আবারো রি-আর্মড করে তাকে ইউরোপের মধ্যে একটা শক্তিশালী দেশ হিসাবে গন্য করা যায়। 

(গ)       কোল্ড ওয়ার কিভাবে নিউট্রেলাইজ করা যায়।

(ঘ)       এই মলোটভা প্রোপোজালে রাশিয়া আমেরিকাকে ইউরোপের অংশ নয় বিধায় তাকে বাদ দিয়েছিলো এবং শুধুমাত্র ইউরোপের দেশ সমুহ মিলে “ইউরোপিয়ান ডিফেন্স কমিউনিটি” করার প্রস্তাব ছিলো এবং অন্যদিকে চীনকে রাখা হয়েছিলো অবজার্ভার স্ট্যাটাসে।

এই প্রস্তাবে আমেরিকা মনে করেছিলো যে, তারা ইউরোপ থেকে বহিষ্কার হয়ে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে ন্যাটোকে খর্ব করা হচ্ছে যেখানে ন্যাটোর সমস্ত ক্ষমতার চাবিকাঠি আমেরিকার কাছে। ফলে আমেরিকা চায় নাই, মলোটভা প্রোপজাল কিংবা ইউরোপিয়ান ডিফেন্স কমিউনিটি বাস্তব হোক এবং ন্যাটোর খবরদারী খর্ব হোক।

পরবর্তীতে মলোটোভা ম্যামোরান্ডামে সংশোধন আনা হয় এবং বলা হয় যে, ন্যাটোরর বিলুপ্তির দরকার নাই তবে ন্যাটো থাকবে ডিফেন্সীভ কাজের জন্য। কোনো মিলিটারী বা এগ্রেসিভ ভূমিকায় ন্যাটোকে ব্যবহার করা যাবে না। উপরন্ত, আগে আমেরিকাকে বাদ দেয়া হয়েছিলো, সংশোধিত ডকুমেন্টে এবার আমেরিকাকে রাখা হলো। সাথে রাশিয়াও পুর্নাজ্ঞ সদস্য পদে যোগ দেয়ার কথা বলা হলো।

On 10 March Gromyko presented Molotov a draft note for the Presidium proposing that the Soviet position on European collective security should be amended (a) to allow full US participation in the system and (b) the possibility of the USSR joining NATO.[1] 

এই নতুন ড্রাফট পুনরায় ২০ এবং ২৪ মার্চ ১০৫৪ সালে উত্থাপন করা হয়। অতঃপর উক্ত ড্রাফট অবিকল সেভাবেই ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং আমেরিকার কাছে পাঠানো হয় ৩১ মার্চ ১৯৫৪ তে। কিন্তু এবারো মে ১৯৫৪ তে পশ্চিমারা উক্ত প্রস্তাবকে রাশিয়াকে অগনতান্ত্রিক একটা দেশ হিসাবে চিহ্নিত করে ন্যাটোতে গ্রহন করা যাবে না এবং পশ্চিমাদের ডিফেন্সিভ মতবাদের সাথে রাশিয়ার ডিফেন্সিভ মতবাদ এক হবেনা বিধায় তারা মলোটোভা মেমোরান্ডাম রিজেক্ট করে এবং রাশিয়াকেও ন্যাটোতে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকে। এর বিরুদ্ধে ভেটো দেয় আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং কিছু পশ্চিম ইউরোপের দেশসমুহ। এর আসল ব্যাখ্যাটা অন্যরকমের।

আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের ধারনা ছিলো যে, রাশিয়াকে ন্যাটোতে নিলে রাশিয়া তাদেরকে কোনঠাসা করে ফেলতে পারে বিধায় তারা পশ্চিম ইউরোপের দেশসমুহগুলিকে ক্রমাগত আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড চাপ তথা প্রভাব খাটিয়ে রাশিয়ার সব প্রস্তাবে বাধা দেয়ার চেষ্টা করায়। শুধু তাইই নয়, যেহেতু রাশিয়া ইউরোপের মধ্যেই অবস্থান এবং রাশিয়া মানে ইউরোপ, এবং আমেরিকা বা ইংল্যান্ড ইউরোপের কোনো অবস্থানেই পড়ে না, ফলে একট সময় আসবে যখন আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড ইউরোপ থেকে রাশিয়ার কারনেই বিচ্যুত হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া মলোটভা মেমোরান্ডাম বা ইউরোপিয়ান ডিফেন্সিভ কমিউনিটির সৃষ্টি হলে যৌথ জার্মানীর পুনসংযোগে জার্মানিতে আমেরিকার মিলিটারী বেসগুলি ভবিষ্যতে আর না থাকার সম্ভাবনাও বেশী যা আমেরিকা কখনোই এই অঞ্চল ছাড়তে নারাজ।

আরেকটি কারন হলো-ন্যাটোকে ডিফেন্সীভ মুডে রাখা বা কোনো এক সময় ন্যাটোকে বিলুপ্ত করে ফেলা হতে পারে এই চিন্তায় পশ্চিমারা ইউডিসি (ইউরোপিয়ান ডিফেন্সীভ কমিউনিটি) কে ফর্ম করতে দিতে চায়নি। উপরন্ত চীনকে সরাসরি অব্জার্ভার হিসাবে চুক্তিতে রাখাও পশ্চিমারা পছন্দ করে নাই।

দ্বিতীয়বার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়েলতসিনের আমলে ন্যাটোকে যোগ দেবার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল কিন্তু সেবারেও ন্যাটোতে রাশিয়াকে নেয়া যাবে না বলে রিজেক্ট করা হয়।

তৃতীয়বার পুতিন ২০০০ সালে ক্লিটনের আমলে পুনরায় ন্যাটোতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব করে। ব্লুম্বার্গের এ ব্যাপারে ক্লিন্টনের একটা বক্তব্য তুলে ধরা যায়- "Berger suddenly found a fly on the window to be extremely intriguing. Albright looked straight ahead. Clinton glanced at his advisers and finally responded with a diplomatically phrased brush-off. It was something on the order of, If it were up to me, I would welcome that."

চতুর্থবার পুতিন আবারো ২০০৩ সালে ন্যাটোতে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে রিজেক্ট করা হয়।

পঞ্চমবার ২০০৮ সালে পুনরায় মেদ্ভেদেভ (যিনি ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল অবধি রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ছিলেন), তিনিও ন্যাটোতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব করেন। সেখানে মেদভেদেভ এটা উল্লেখ করেন যে, ন্যাটোতে রাশিয়াকে যোগ দেয়ার ঘোষণা দিলে ন্যাটোর ইষ্টার্ন এক্সপানশনের আর কোনো প্রয়োজন নাই, এবং ইউরোপের নিরাপত্তা বলয়কে সুরক্ষা দিতে নতুন ইউরোপিয়ান  সিউকিউরীটি আর্কিটেকচার’ নামে একটি চুক্তিও হতে পারে, পাশাপাশি ন্যাটো তো ডিফেন্সীভ মুডে থাকলোই। কিন্তু এতেও কোনোভাবেই রাশিয়াকে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্তিতে পশ্চিমারা রাজী হলো না।

প্রকৃত সত্যটা হলো- ন্যাটোর জন্মই হয়েছে রাশিয়াকে কন্টেইন করার জন্য, রাশিয়াকে মার্জিনালাইজড এবং আইসোলেট করার জন্য। ন্যাটো হচ্ছে আমেরিকার জিও পলিটিক্যাল একটা প্রোজেক্ট। রাশিয়া যদি ন্যাটোতেই যোগ দেয়, সেক্ষেত্রে ন্যাটোর থাকার তো অর্থ নাই। ন্যাটোর জন্মই হচ্ছে রাশিয়াকে থামিয়ে দেয়া। যদি শত্রুই না থাকে তাহলে ন্যাটোর আর থাকার দরকার কি? টেরোরিজমের বিরুদ্ধে ফাইট করা ন্যাটোর মতো অরগেনাইজেশনের কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। তাছাড়া রাশিয়ার মতো এতো বড় একটা শক্তিশালী জায়ান্টকে ন্যাটোতে নেয়া মানে একক ক্ষমতা খর্ব হবার সম্ভাবনা। যদি সেটাই হতো, তাহলে ওয়ার্শো প্যাক্ট বিলুপ্ত হবার পরেই তো ন্যাটোর পরিসমাপ্তি ঘটতে পারতো। কিন্তু সেটা হয় নাই। আর ঠিক এ কারনেই রাশিয়া যতোবারই ন্যাটোতে যোগ দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করুক না কেনো, তাতে কখনোই রাশিয়া সফল হবে না। এটাই বাস্তবতা।

রাশিয়া কেনো ন্যাটোতে যোগ দিতে চায়?

রাশিয়ার উদ্দেশ্য-ন্যাটোতে জয়েন করতে পারলে রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের মধ্যে একটা যোগবন্ধন তৈরী হবে, ইউরোপের সাথে আরো সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হবে, তাতে তার অর্থনীতিসহ অন্যান্য সেক্টরে আরো লাভবান হবে। এছাড়া ন্যাটোর সদস্য হলে রাশিয়া সদস্য হিসাবে ন্যাটোর অনেক রিফর্ম করা তার পক্ষে সম্ভব হবে। তাতে কোল্ড ওয়ার সিচুয়েশনটাও বন্ধ হবে ইত্যাদি। 

কি হতে পারে যদি রাশিয়া ন্যাটোতে জয়েন করে?

  • কোনো কারনে যদি রাশিয়া ন্যাটোতে জয়েন করে, এর সবচেয়ে বেশী ইফেক্ট করবে চীনকে। কারন বর্তমানে পশ্চিমারা যাকে প্রধান শত্রু মনে করে সেটা চীন, রাশিয়া নয়। রাশিয়ার সাথে শত্রুতা করে পশ্চিমারা ইউরোপে টিকে থাকা সম্ভব না। কারন রাশিয়া নিজেও ইউরোপের একটা বিশাল অংশ। কোনো না কোনো সময় ইউরোপ রাশিয়াকেই চাইবে, রাশিয়া ইউরোপকে না চাইলেও ইউরোপের বেশী প্রয়োজন রাশিয়াকে।
  • সেন্ট্রাল এশিয়ার পুরানো সোভিয়েট দেশগুলি তখন হয়ত তারাও ন্যাটোতে জয়েন করবে, অথবা চীনের সাথে মার্জ করবে।
  • দক্ষিন আমেরিকার দেশগুলি খুব সম্ভবত রাশিয়া ন্যাটোতে জয়েন করলে খুব একটা খুশী হবে না। কারন তারা আমেরিকার বিপক্ষে রাশিয়াকে একটা শক্তি মনে করে। যদি রাশিয়াই ন্যাটোতে জয়েন করে তাহলে তো আর কিছু থাকলো না।
  • নর্থ কোরিয়া একেবারেই এটা পছন্দ করবে না। কারন তাতে নর্থ কোরীয়া একটা পার্টনার হারালো বলে মনে করবে।
  • মধ্যপ্রাচ্য মিক্সড একটা রিসপন্স করবে। সৌদি, জর্দান, ইরাক এরা হয়তো নিরপেক্ষ ভুমিকায় থাকবে, অথবা তারা রাশিয়ার ন্যাটোতে জয়েন করাকে স্বাগত জানাতে পারে। অন্যদিকে ইজরায়েলকে প্রেডিক্ট করা মুষ্কিল, কিন্তু সিরিয়ায়, ইরান, ইয়েমেন অবশ্যই অখুশী হবে।
  • এশিয়া প্যাসিফিকের দেশসমুহ যেমন ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া, কিংবা নিউজিল্যান্ড এরা হয়তো খুশী মনে রাশিয়াকে বরন করবে। তারা চীনের শক্তি কমে যাবে ভেবেই খুশী হবে। জাপান, তাইওয়ান কিংবা দক্ষিন কোরিয়াও খুশী হবে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েত্নাম ভ্র্য কুচকাবে এই ভেবে- এটা রাশিয়া কি করলো?
  • ইন্ডিয়ার সাথে রাশিয়ার এবং পশ্চিমাদের উভয়ের সাথেই সম্পর্ক বেশ গ্রহনযোগ্যতায় আছে। তারা হয়তো খুশী হতেও পারে আবার নাও হতে পারে।
  • আফ্রিকান এবং নর্থ আফ্রিকান দেশসমুহের মধ্যে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে। লিবিয়া, আলজেরিয়া, মিশর, রাশিয়ার এহেনো ন্যাটোতে যোগ দিলে সন্দেহের চোখে দেখারই কথা যদিও তিউনেশিয়া অবশ্যই এটাকে সাধুবাদ জানাবে কোনো সন্দেহ নাই।

তবে এটা ঠিক যে, রাশিয়া ন্যাটোতে জয়েন করলে পৃথিবীতে ন্যাটোর আগ্রাসন ভুমিকা, পশ্চিমাদের রুল বেজড অর্ডার, একক হেজিমনি, যুদ্ধ, হানাহানি, কাটাকাটি অনেক কমে যাবে। রিসোর্সের সদব্যবহার হবে, ওয়ার্ল্ড অরগেনাইজেশনগুলির অনেক রিফর্ম হবার সম্ভাবনা থাকবে, ইচ্ছে করলেই কেউ যা খুশী করতে পারবে না।

তাহলে কি রাশিয়া কখনোই ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না?

এই প্রশ্নটা একটা আপেক্ষিকতা আছে। এই মুহুর্তে রাশিয়ার পক্ষে শতবার চেষ্টা করলেও রাশিয়া ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু একটা সময় আসবে যখন ইউরোপ বা পশ্চিমারা রাশিয়াকে নিজের থেকেই ন্যাটোতে যোগ দেয়ার প্রস্তাব পেশ করবে। আর সেটা তাহলে কিভাবে?

চীন এখনো ন্যাটোর বিরুদ্ধে কোনো হুমকীসরুপ বলে মনে হচ্ছে না ঠিকই কিন্তু এক বা দুই দশকের মধ্যে চীন ঠিক ন্যাটো বা পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে একটা কঠিন হুমকী হয়ে দাঁড়াবে। সেক্ষেত্রে রাশিয়ার জন্য পক্ষ দুটু (ক) ন্যাটো ভার্সাস পশ্চিমা (খ) চীন। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ঠিক এই মুহুর্তে রাশিয়া চীনের সাথে অনেক বেশী কাছে চলে এসছে। আর ন্যাটো বা পশ্চিমারাও চাইছে রাশিয়া যেনো কোনো অবস্থাতেই চীনের সাথে এতো ঘনিষ্ঠ না হয়। অন্যদিকে পশ্চিমারা চীনের সাথে এমন একটা সম্পর্ক তৈরী করে ফেলেছে যে, আগামীতে চীনের সাথে পশ্চিমাদের আর কোনো সদ্ভাব থাকবে কিনা সন্দেহ আছে। তারমধ্যে তাঈওয়ান উত্তেজনা তাদের এই সম্পর্ককে আরো তলানীতে নিয়ে গেছে। কিন্তু সময়টা খুব বেশী দূরে না যখন চীনকে মোকাবেলা করতেই ন্যাটো তথা পশ্চিমাদেরকে করতে রাশিয়াকে টানতে হবে।

১২/০৭/২০২৩-লিথুনিয়ার ন্যাটোর সম্মেলনে ইউক্রেন একা হয়ে গেলো

লিথুনিয়ার ভেলনিয়াসে ন্যাটোর সর্ববৃহৎ সম্মেলন শেষ হয়ে গেলো। এই সম্মেলনে ইউক্রেন চেয়েছিলো তাদেরকে যেনো একটা টাইমফ্রেম দেয়া হয় কবে নাগাদ তারা ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে। কিন্তু সম্মেলনের প্রথম দিনে ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারটার অফিশিয়াল ডকুমেন্ট যখন প্রকাশিত হয় তখন রাগে ক্ষোভে জেলেনেস্কী তার যাত্রার প্রাক্বালে টুইট করেছিলেন- “We value our allies, Ukraine also deserves respect. It’s unprecedented and absurd when time frame is not set, neither for the invitation nor for Ukraine’s membership. Uncertainty is weakness. And I will openly discuss this at the summit.”

আমার কাছে এটা মনে হয়েছে জেলেনেস্কীর রাগ এবং ক্ষোভ দুটুই ঠিক। কিন্তু তার এই রাগ কার উপরে? ক্ষোভটা কার উপরে? প্রশ্নটা সেখানে। আর এর উত্তরগুলি এসেছে স্বয়ং ন্যাটোতে যোগদানরত আমেরিকান ডেলিগেশনের রান্ড পল থেকে এভাবে-

“Audacious. There’s an old English adage he might need to become aware of: Never look a gift horse in the mouth, we’ve given them $100 billion and he has the audacity to be so brazen as to tell us we’d better speed it up? I’d say that’s audacious. I’d say it’s brazen, and that's not very grateful for the $100 billion that we’ve given him so far. As long as we continue to supply unlimited arms to Zelensky, I think he sees no reason to have any negotiations. So I think we’re putting off negotiations, but ultimately, the losers are the Ukrainian people.”

ঠিকই তো। যুদ্ধটা তো ইউক্রেনের। এটা না ন্যাটোর, না ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের, না আমেরিকার। যুদ্ধটা তো রাশিয়া বনাম ইউক্রেনের। অন্যের প্রোরোচনায় আর শক্তিতে কেনো একটা দেশ যুদ্ধের মতো সংঘাতে জড়াবে যেখানে পুরুটাই অন্যের বাহুর শক্তির উপর নির্ভরশীল? নেতা কেনো এই সিম্পল ইকুয়েশনটা মাথায় নিলো না?

কি প্রয়োজন ছিলো প্রতিবেশীর সাথে তাও আবার এমন প্রতিবেশী যাকে তারা সকাল হলেই দেখা হয়, একে অপরের ভাষা বুঝে, কালচার এক, ব্লাডও এক, এমন প্রতিবেশীর সাথে শত্রুতা করে এবং প্রতিবেশীর শত্রুর সাথে বন্ধুত্ব বজায় রেখে কি কখনো সুখে থাকা যায়? কোনোভাবেই উচিত হয়নি।

যাক সে কথা, অবশেষে ভিলনিয়াস সম্মেলনে ইউক্রেনকে কোনঠাসা করে বিবৃতি দেয়া হলো-ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদ পেতে হলে এলায়েন্সের সবার গ্রহণযোগ্যতা লাগবে, ইউক্রেনকে ন্যাটোর স্টান্ডার্ডে আসতে হবে এবং রাশিয়ার সাথে প্রয়োজনে নেগোশিয়েশন করতে হবে, নতুবা নয়। তবে ইউক্রেনকে অস্ত্র এবং সরঞ্জাম দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সহায়তা দেয়া হবে। কিন্তু সেটা কতটুকু?

কি দরকার ছিলো এসবের? তারা কি এতোই রাশিয়ার দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছিলো? নাকি ওরাই রাশিয়ান ভাষাভাষী মানুষগুলিকে ইথিনিক ক্লিঞ্জিং এর মাধ্যমে নিঃশেষ করার পায়তারা করছিলো? সেই ক্রিমিয়া, ডনবাস, খেরসন, এরা তো ইউক্রেনের মধ্যেই বসবাস করতো। তারা তো ইউক্রেনের নাগরিকই ছিলো। তাদেরকে নিয়ে কি একসাথে থাকা যেতো না? এখন তাহলে কি দাড়ালো? সেই ডনবাস, সেই জেপোরিজিয়া, সেই মারিউপোল, সেই খেরশন ইউক্রেন থেকে আলাদা হয়ে গেলো। ইউক্রেনের নিজের ঘরের ভিতরেই অথবা চৌকাঠের সীমানায় বিভীষণদের বসবাস। ন্যাটোতে গেলেও তো ইউক্রেনের ঠিক পাশেই এসব অঞ্চলের মানুষগুলির বসবাস চলমান থাকবে। প্রতিবেশী হিসাবে, ঘ্রিনা আর ক্ষোভ নিয়ে।

ভিলনিয়াসের ডিক্লেয়ারেশনের মাধ্যমে আমার কেবলই মনে হচ্ছে-ইউক্রেন এখন প্রায় একা হয়ে গেলো। যুদ্ধ চলবে যুদ্ধের মতো, অস্ত্র আসবে ব্যবসায়িক লাভের জন্য, মাঝখান দিয়ে নীরিহ জনগনগুলির দূর্ভোগের আর সীমা রইলো না। একটা ভুল সাইডে দাঁড়িয়ে জেলেনেস্কী তার দেশের মানুষের কাছে আজীবন ঘৃণার পাত্র হয়ে রইবে, রাশিয়া কখনোই আর ইউক্রেনকে বিশ্বাস করবে না, পশ্চিমারা যখন কাউকে আর দরকার নাই মনে করে তাকে একাই ছেড়ে দেয়। এই শিক্ষাটা কেউ নেয় না। ইরাক, আফগানিস্থান, লিবিয়া, কাতার, ইউগোস্লাভ, সিরিয়া কিংবা অন্য দেশের লেসন থেকেও কেউ শিক্ষা নিলো না।

ইতিহাস কখনোই কারো ইতিহাস মুছে ফেলে না। রাশিয়ার এই আগ্রাসন, জেলেনেস্কীর এই ভুল সাইডঃ নির্ধারন, পশ্চিমাদের এই রকম আচরন বংশ পরম্পরায় মানুষ ইতিহাস থেকে জানতেই থাকবে যেমন মানুষ এখনো ২য় মহাযুদ্ধের কথা, আনা ফ্রাংকের ডায়েরীর কথা, নরম্যান্ডি ল্যান্ডের কথা, হিটলারের নির্বুদ্ধিতার কথা, কিংবা মুসুলিনি এদের সবার কথা আজো আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গবেষনা করি এবং জানি কত হিংস্র সময় কাটিয়েছে সেই দিনের মানুষগুলি।

শান্তির কোনো বিকল্প নাই। যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। স্রষ্টা কোনো দেশকেই নিজ থেকে বাউন্ডারী ভাগ করে দেয় নি। না রিসোর্স কাউকে তিনি একাই সব দিয়েছেন কাউকে।

১১/০৭/২০২৩-যুদ্ধটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এটা শুধু বলতে পারবে “সময়”।

প্রথমদিকে যেভাবে পুরু ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ন্যাটো এবং পশ্চিমারা ইউক্রেনকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, রিফুজি একোমোডেশন এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে সাহাজ্য করেছিলো, সেটা অনেকাংশেই এখন ভাটা পড়েছে। যে কোনো টেনশন কিংবা এখানে যুদ্ধ নামক উত্তেজনাটা যদি ধরি, দেখা যাবে যে, প্রতিটি দেশ এখন তাদের নিজস্ব সার্থ নিয়ে ভাবছে। এটা কোনো দোষের না। লম্বা সময় ধরে কেউ নিজের দেশের সার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে অন্যকে এমনভাবে সহায়তা করে না যেখানে নিজেরাই নিঃস্ব হবার মতো অবস্থা। ফলে ইউরোপিয়ান দেশসমুহের একে অপরের মধ্যে সহায়তা না দেয়ার মনোভাবে একটা টক্কর লাগছে। উদাহরন-বুলগেরিয়া। সেতো সরাসরি বলেছে যে, তার রিজার্ভ নষ্ট হয়, ঝুকির মধ্যে পড়ে এমন সহায়তা সে কখনোই করবে না কারন যুদ্ধটা তার নয়, যুদ্ধটা ইউক্রেনের। ব্রাজিল বলেছে-১২০০ মেইল দূরের কোনো যুদ্ধ তাদেরকে কেনো প্রভাবিত করবে? প্রয়োজন নাই।

ঠিক এভাবেই যত সময় পার হচ্ছে- বিভিন্ন ইউরোপিয়ান এবং পশ্চিমা দেশের জনগনের কাছে ইউক্রেন যুদ্ধটা এখন যেনো গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। যেই ন্যাটোর স্বপ্ন ইউক্রেন দেখে আসছে ২০০৮ সাল থেকে, সেই ন্যাটোই এখন খোলাখুলি বলছে যে, যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ না হয়, আর যদি ইউক্রেন সভ্রেন কান্ট্রি হিসাবে এক্সিষ্ট করে, তাহলেই প্রয়োজনীয় রিফর্মের পরে ন্যাটো ইউক্রেনকে সদস্য করবে। এর আগে নয়।

প্রশ্ন এখানে ৩ টা (ক) যুদ্ধ শেষ হতে হবে (খ) যুদ্ধ শেষে যদি ইউক্রেন দেশ হিসাবে আদৌ টিকে থাকে (৩) অতঃপর ন্যাটো স্ট্যান্ডার্ড মোতাবেক ইউক্রেনকে কোয়ালিফাই করতে হবে। তিনটা অপশনই ইউক্রেনের জন্য যথেষ্ট কঠিন।

আমি রাশিয়া বা পুতিন প্রেমিক নই। কিন্তু একক দেশ হিসাবে সবচেয়ে বেশী (আমেরিকার থেকেও বেশী) নিউক্লিয়ার ধারী রাশিয়া যার রিসোর্সের কোনো কমতি নাই, (গ্যাস তেল, খাদ্য সামগ্রী, লোহা, গোল্ড, সার ইত্যাদি), সেই রাশিয়া এই যুদ্ধকে রীতিমত টেনে লম্বা করা কোনো ব্যাপারই না। তারমানে হচ্ছে- যুদ্ধটা এখনি শেষ হচ্ছে না। যুদ্ধটা যদি লম্বা সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে ইউক্রেনকে সহায়তাকারী দেশ সমুহের মধ্যে একটা ফেটিগ চলে আসবে। আর এই ফেটিগ থেকে ধীরে ধীরে যুদ্ধটাকে জনগন একটা বোঝা মনে করবে তেমনি সাহাজ্যের পরিমানও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, কমছেও। আর তাদের সাহাজ্যে ভাটা পড়া মানেই ইউক্রেন আরো বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। যুদ্ধটা না চালিয়ে নিতে পারবে, না হারানো টেরিটরী পুনরুদ্ধার করতে পারেবে, না নেগোশিয়েশনে বসতে পারবে।

২য় প্রশ্নে আসি। এই মুহুর্তে ন্যাটোতে ইউক্রেনকে সদস্য পদ দিবেই না। কারন সদস্য পদ দেয়া মানেই ন্যাটোর আর্টিক্যাল-৫ অনুযায়ী রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া। এটা কোনো পাগলেও এলাউ করবে না। ফলে ন্যাটর এই প্রক্সী ওয়ারে ন্যাটোর তথা ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত দেশ সমুহের সব যুদ্ধাস্ত্র ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে তারাও সার্বিক ঝুকির মধ্যে পড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এখন একটা ফাদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরু ইউরোপ বনাম ন্যাটো বনাম পশ্চিমাদের কাছে। না সরাসরি যুক্ত হতে পারছে, না ছেড়েও দিতে পারছে। যদি এমনই পরিস্থিতি চলতে থাকে যেখানে ন্যাট কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশ সমুহ অথবা পশ্চিমারা পর্যাপ্ত মিলিটারী, আর্থিক সহায়তা দিতে না পারে, তখন রাশিয়া ধীরে ধীরে ইউক্রেনকে এমন একটা রাষ্ট্রে পরিনত করতে সুযোগ পাবে যে, ইউক্রেনের স্বাধীন সার্বোভউম মর্যাদা রাষ্ট্র হিসাবে থাকবে কিনা সেটাই সন্দেহ। আর এটাই ন্যাটোর মহাসচীব তার শেষ বক্তব্যে বুঝানোর চেষ্টা করছেন। ন্যাটোর মহাসচীব স্টলটেন্ট গলা ফাটিয়ে সবাইকে এখন যে যা পারে, সাহাজ্য করতে বলেই যাচ্ছে কিন্তু সেই উচ্চস্বরের চিতকারের সমানুপাতিক সাহাজ্য এখন কোনো দেশই করছে না। শুধু আশ্বাস, শুধু কথা, শুধু স্বপ্ন দেখিয়ে দেখিয়ে কতদিন? তারপর?

তার আর পর নাই।

কিন্তু ইউক্রেনের দোষ কোথায়? ইউক্রেন যদি আসলেই ইউরোপের নিরাপত্তার দরজা হয়ে থাকে, তাহলে তাকে কেনো ২০০৮ সালেই ন্যাটোতে নেয়া হলো না? যদি তাকে ২০০৮ সালে ন্যাটোতে সদস্যপদ করা হতো, রাশিয়া কোনোদিনই ইউক্রেনকে আক্রমন করার সাহস পেতো না। অথচ এখন তারা তাকে ফুসললিয়ে ফুসলিয়ে এমন একটা মরনপন যুদ্ধে জড়িয়ে ফেল্লো যে, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ পুরুই অন্ধকারের মতো। ইউক্রেনের সাধারন মানুষগুলির কি অপরাধ ছিলো? তারা তো ভালোই ছিলো। এখন তারা বিভিন্ন দেশে রিফুজি, কেউ কেউ ধর্ষিতা, অনেকেই এতিম, আবার অনেকেই জানে না তাদের প্রিয়জন কোথায়।

যুগে যুগে কিছু নেতা আসে, যারা নেতার ভূমিকায় জনগনের কল্যানে না এসে জনগনকে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে নিজেরা পালিয়ে যায়। সাফার করে আমজনতা।

এসব জেলেনেস্কী, হিটলার, নীরু, মুসুলিনিরা এক সময় চলেই যায়, কিন্তু সাফার করে বংশ পরম্পরায় সেই সব নীরিহ মানুষ গুলি যারা রক্ত দেয়, যারা পরিবার হারায়, কিংবা যাদের সুন্দর ভবিষ্যত দেখার আর কোনো সুযোগ থাকে না।

একটা সবচেয়ে খারাপ শান্তি চুক্তিও একটা যুদ্ধের চেয়ে ভালো। যেদিন জেলেনেস্কী বুঝবে, সব শেষ হয়ে যাচ্ছে- হয় সেদিন সে গায়েব হয়ে যাবে, নতুবা কোনো এক নিরাপদ আশ্রয়ে জীবন জাপন করবে, অথবা এই দুনিয়াই তাকে ছাড়তে হবে। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিলো না।

তাই যুদ্ধটা বন্ধ হোক, আর এখুনী।

১০/০৭/২০২৩- রুপীতে বানিজ্য

বর্তমানে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ব্যবসা করে ডলার কারেন্সীর উপর। প্রথমে ডলার থেকে রুপীতে কনভার্ট করে অতঃপর এক্সপোর্টের ব্যয় বহন করা হয়। এতে বাংলাদেশকে দুটু কনভার্সনের মাধ্যমে যেতে হয় ৯ক) একটা টাকা থেকে ডলারে (খ) আবার ডলার থেকে রুপীতে। এই কনভার্সনে বাংলাদেশের বেশ কিছু সিস্টেম লসের মতো লস গুনতে হয়।

কিন্তু যদি সরাসরী বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া রুপীতে ব্যবসা করে, তাহলে বাংলাদেশকে শুধুমাত্র একটা কনভার্সনে যেতে হবে, আর সেটা হলো টাকা থেকে রুপীতে।

দুইদেশ এভাবে ডলারের বাইরে রুপীতে ব্যবসা করতেই পারে। আর পারলে ভালো। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে- বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া ২ বিলিয়ন সমপরিমান মালামাল আমদানী করে আর বাংলাদেশ প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের মালামাল আমদানী করে ইন্ডিয়া থেকে। ২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমান রুপিতে ব্যবসায় বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নাই কিন্তু বাকী ১২ বিলিয়ন ডলার কিভাবে ম্যানেজ করা হবে, সেটা।

যদি ইন্ডিয়া এই বাকী ১২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমান রুপী বাংলাদেশের কারেন্সী টাকাকে একটা ফিক্সড বা ন্যনুতম একচেঞ্জ রেটের মাধ্যমে রাজী হয়, তাহলে ব্যাপারটা আপাতত সহজ হবে। নতুবা বাংলাদেশ সেই ২ বিলিয়ন ডলারের বাইরে ইন্ডিয়ান রুপীতে বাকী ১২ বিলিয়ন ডলারের বিল সমন্নয় করতে পারবে না।

তবে একটা সার্ভের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে যে, সরকারী ডিক্লেয়ারেশনের মাধ্যমে শুধুমাত্র ২ বিলিয়ন ডলার সমপরিমান রপ্তানী হয় আমাদের দেশ থেকে কিন্তু আনডিক্লেয়ারড বা আনঅফিশিয়ালী রপ্তানীর পরিমান প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমান। যদি এই আনডিক্লেয়ারড বা আনঅফিশিয়াল রপ্তানীগুলি অফিশিয়াল্ভাবে করার সিস্টেম তৈরী করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া এই দুই দেশের মধ্যে রুপিতে ব্যবসা কোনো জটিল বিষয় নয়। কিন্তু আমাদের দেশের আইন করে এসব আনঅফিশিয়াল ডিক্লেয়ারেশন ব্যবসা থামানো সম্ভব কিনা সেটা কার্যকর করা খুবই জটিল এবং অসাধ্য ব্যাপার। 

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে, সবসময় ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং এ  “নস্ট্রো” একাউন্ট নামে একটা একাউন্ট খুলতে হয় যেখানে ট্রানজেক্টরী দেশের কারেন্সী সেখানে জমা হয় বা থাকে। যতোটুকু রিজার্ভ বা কারেন্সী সেখানে থাকবে, ততটুকুই দেশসমুহ ইন্টারচেঞ্জ করে ব্যবসা করতে পারে। ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝাতে পারলাম কিনা জানি না, The nostro account is an account that a bank holds with a foreign bank in the currency of the country where the funds are held. It is used to facilitate foreign exchange and international trade transactions involving foreign currencies.

ট্রেড ডেফিসিয়েট যদি অফিশিয়ালী এতো বিশাল ব্যবধান না হতো, তাহলে ব্যাপারটা কোনো জটিল ছিলো না। যে সব দেশে আমদানী এবং রপ্তানী প্রায় দুপক্ষের মধ্যে সমানে সমান, সেসব দেশে তাদের নিজস্ব কারেন্সীতে ব্যবসা করা একেবারেই সহজ।

তাই এখানে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ার ট্রেড ডেফিসিয়েন্ট অনেক বেশী বিধায় বিকল্প চুক্তি করা আবশ্যক যেখানে রুপি এবং টাকার মধ্যে একটা আন্তর্জাতিক সমঝোতা পত্র লাগতে পারে। তাতে বাংলাদেশ একটা ঝুকির মধ্যে পড়তে পারে।

০৬/০৭/২০২৩-সাকাশভিলি এবং জেলেনেস্কী

আমি UNOMIG (United Nations Observer Missions in Georgia) তে কাজ করার সময় জর্জিয়ায় কেনো শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন হইলো সেটা খুব কাছ থেকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছিলাম।

জর্জিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট শাকাসভিলি বর্তমানে জেলে আছেন। এর প্রধান কারন, তিনি তার প্রেসিডেন্সির মেয়াদে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং সেই অপব্যবহারের কারনে জর্জিয়াকে পর পর দুটু রিজিয়ন তার ভুখন্ড থেকে হারাতে হয়েছে-(ক) আবখাজিয়া (খ) সাউথ ওসেটিয়া। দুটুই জর্জিয়ার অংশ ছিল যা বর্তমানে স্বাধীন কিন্তু রাশিয়া অনুরাগী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-জর্জিয়ার অভ্যন্তরের এই দুটু রাজ্য কিভাবে হাতছাড়া হয়ে গেলো যেখানে ভুখন্ড এক, কন্সটিটিউশন এক এবং একই শাসকের অধীনে?

শাকাসভিলি পশ্চিমাদের অনুগত হয়ে সাউথ ওসেটিয়ায় স্নিক এটাক করে তার শাসনামলে সাউথ ওসেটিয়ার অটোনোমাস স্ট্যাটাস থেকে জর্জিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলো যদিও ওসেটিয়া জর্জিয়ারই একটা অংশ মনে করা হতো। তাইওয়ানের মতো। জর্জিয়া যখন সাউথ ওসেটিয়াতে আক্রমন করে, ঠিক তখন রাশিয়া ওসেটিয়ার পক্ষ নেয় এবং ৫ দিনের মধ্যে জর্জিয়া হেরে যায় এবং সাউথ ওসেটিয়া স্বায়ত্তশাসন থেকে পুরুপুরি সার্বোভোম রাজ্যে পরিনত হয়, ফলে জর্জিয়া সাউথ ওসেটিয়াকে হারায়। একইভাবে আবখাজিয়াও তাই। আবখাজিয়াও জর্জিয়ার সায়ত্তশাশন থেকে পুরুপুরি স্বাধীন রাজ্যে পরিনত হয়।   

পরবর্তীতে জর্জিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রেসিডেন্ট স্থলাভিষিক্ত হয় এবং শাকাসভিলি দেশ থেকে পালিয়ে ইউক্রেনে চলে যায়। ইউক্রেনে যাওয়ার পর, ইউক্রেন (পাশ্চাত্য আদেশে) ওডেশার গভর্নর নিয়োগ করে। ইউক্রেন যুদ্ধের ঠিক আগে শাকাসভিলি ওডেসা থেকে আবার জর্জিয়া ফেরত যায়। তার অথবা পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্য ছিলো ইউক্রেনের পাশাপাশি জর্জিয়াকেও অশান্ত করা। কিন্তু জর্জিয়ার শাসকগন কিছুতেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ভূমিকা পালন করতে নারাজ ছিলো। ফলে শাকাসভিলির মিশন ফেল করে এবং তাকে এরেষ্ট করে বিচারের সম্মুখীন করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট। এখনো সে জেলে আছে।

এবার আসি ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে।

বিশ্ব মহল মনে করছে যে, ইউক্রেনের যুদ্ধটা ঠিক একই ফরমেটে চলছে। আর সেটা কিভাবে? জেলেনেস্কী ক্ষমতায় আসার পর তার পেট্রোনদের অনুগত হয়ে ২০১৪ সাল থেকে একাধারে ডনবাসে স্নিক এটাক করেই যাচ্ছিলো। ডনবাস কিন্তু সাউথ ওসেটিয়ার মতো কোনো স্বায়ত্তশাসিত রিজিয়ন ছিলো না। এটা ছিলো ইউক্রেনের ভুখন্ডের অবিবেচ্ছদ্য অংশ কিন্তু বেশীর ভাগ রাশিয়ান ভাষাভাষী নাগরিক। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কীও যত দ্রুত ডনবাসকে পুরুপুরি ইউক্রেনীয় কালচারে, আইনে আনা যায় সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। কিন্তু রাশিয়ার স্পেসাল অপারেশন এখানে সেই সাউথ ওসেটিয়া কিংবা আবখাজিয়ার মতো রুপ নিলো। ডনবাস সহ আরো চারটি রিজিয়ন যারা ইউক্রেনের সাথে কোনো সংঘাতেই ছিলো না, ইতিমধ্যে সেগুলিও রাশিয়ার কাছে হাতছাড়া হয়েছে ইউক্রেনের, এবং শুধু তাইই নয় তারা রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে যুক্তও হয়েছে।  গত ১৬ মাস যাবত ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে এবং এটার কোনো সাফল্য ইউক্রেন এখনো হাতে পায়নি। আর পাবে কিনা সেটা এখনো কিছুই বলা যাচ্ছে না। এই স্পেশাল অপারেশনে ইউক্রেন জর্জিয়ার ওসেটিয়ার লক্ষন থেকেও খারাপ পর্যায়ে রয়েছে। যদি কোনো কারনে পশ্চিমারা এবং ন্যাটো তাদের সাপোর্ট ইউক্রেনে হ্রাস কিংবা বন্ধ করে দেয়, তাহলে ইউক্রেন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে তার কোনো অস্তিত্ব থাকবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। সাউথ ওসেটিয়ার যুদ্ধটাও পাশ্চাত্যের এবং ন্যাটো ফোর্সের জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটা প্রক্সি ওয়ার ছিলো।

বর্তমানে বলা হচ্ছে যে, ইউক্রেনের কাউন্টার অফেন্সিভে সাফল্য না পেলে ইউক্রেন, তাকে পরবর্তী সাপোর্ট পাশ্চাত্যরা দিবে কিনা আর দিলে কতটুকু সেই বিষয়ে এখন আলোকপাত হচ্ছে। এর মানে প্রক্সি ওয়ারটা প্রায় ধইর্যের শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে ইউক্রেন তার সিংহ ভাগ মিলিটারী জনবল, ইয়াং জেনারেশন, এবং অন্যান্য ফেসিলিটিজ হারিয়ে ফেলেছে। দেশটি এখন ধংস্তসুপের আখড়া। জেলেনেস্কী এবং তার মিলিটারী কমান্ড ইতিমধ্যে এটা বুঝে গেছে যে, অফেন্সিভ, বা কাউন্টার অফেন্সিভ যেটাই বলা হোক না কেনো, এর ফলাফল অনিশ্চিত। যার কারনে জেলেনেস্কী, কুলেভা, কিংবা তার পরিষদবর্গ সাথে Chair of the House Foreign Affairs Committee Michael McCaul এর মধ্যে এই যুদ্ধে হারার পিছনে ন্যাটো কিংবা পশ্চিমাদের দায়ী করছেন সরাসরি। জেলেনেস্কী নিজেও এটা বুঝতে পারছেন যে, সে ইউক্রেনকে নিয়ে না ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে, না সে এই স্পেশাল অপারেশনে কোনো সাফল্য দেখাতে পারবে। 

সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটা হচ্ছে যে, ইউক্রেনের যে চারটি রিজিয়ন রাশিয়া দলখল করে নিয়েছে, সেগুলিতে ইউক্রেনের সাথে কোনো সমস্যাই ছিলো না। এখন সেই রিজিয়নগুলিই উদ্ধার করা ইউক্রেনের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। আর এই নিরপেক্ষ রিজিয়নগুলি পুনরায় উদ্ধার করতে গিয়ে ইউক্রেন তার সবকিছু হারাচ্ছে। ইউক্রেন যদি মার্চ ২০২২ এ দিপাক্ষীয় চুক্তিটা করে ফেলতো তাতে অন্তত জ্যাপড়িজ্জিয়া এবং খেরসন রিজিয়ন দুটি ইউক্রেনের অধীনেই থাকতো। কিন্তু Anglo-American Axis sabotage spring 2022’s peace process এর কারনে ইউক্রেন সেই চুক্তি থেকে সরে আসে যা একেবারেই ওসেটিয়া এবং আবখাজিয়ার ফরমেট।

এই অবস্থায় ইউক্রেনে পাশ্চাত্যরা যদি এই প্রক্সি ওয়ারে হেরেই যায়, এর থেকে অপমানজনক আর কিছু হতে পারেনা, এটাই পাশ্চাত্যের বদ্ধমুল ধারনা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাটো কিংবা পাশ্চাত্যরা তাদের মানসম্মান একটু হলেও বাচানোর জন্য যেটা ওরা করে, সেটা হচ্ছে-পপুলার সাপোর্ট বিবেচনা করে রিজিম পরিবর্তন করে দেয়, যেমন করেছে জর্জিয়ায়, আফগানিস্থান, কিংবা ইরাক  বা অন্য দেশগুলিতে। এর অর্থ-জেলেনেস্কী আর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নাই। মান রক্ষার্থে হয় ইউক্রেনে একটা ইন্টারনাল রায়ট হবে এবং সেই রায়টে পরে একটা সাধারন নির্বাচন হবে এবং এই ইন্টারনাল আন্দোলন ঠেকাতে সামনে আসবে আর্মির কমান্ডার ইন চীফ ঝালুজনি অথবা গোয়েন্দা চীফ বুদানভ। এটাও সে জর্জিয়ার সেই শাকাসভিলি পরিনতির মতো।

শাকাসভিলির মতো জেলেনেস্কীকেও তার ক্ষমতা হারানোর পর ক্ষমতার অপব্যবহার করার কারনে, দেশে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি করে যুদ্ধ ঠেকানো যেতো এই মনে করে কিংবা তার বিরোধী দলকে সম্পুর্ন দমন করে শাসনভার চালানোর কারনে অপরাধী করা হবে। জেলেনেস্কী যদি ইউক্রেনেই থাকে তাহলে তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে, অথবা তাকে দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র নির্বাসনে চলে যেতে হবে।

পশ্চিমাদের কোনো এলি নাই, আছে শুধু ভেসেল যা তারা হয় শাকাসভিলি কিংবা জেলেনেস্কীর মতো শাসকদের দ্বারা বাস্তবায়িত করার কাজে লিপ্ত থাকে। কেনো বললাম যে, পাশ্চাত্যদের কোনো এলি নাই, কারন এলি রাজ্যগুলিকে পাশ্চাত্যরা তাদের লয়ালটির কারনে যে কোনো পর্যায়েই যাবতীয় সমস্ত কিছু দিয়ে, এমন কি তাদের নিজের দেশের মানুষের সার্থকে জলাঞ্জলী দিয়ে হলেও সাহাজ্য করে। এই ক্ষেত্রে বিশেষ করে জর্জিয়া, আফগানিস্থান কিংবা ইউক্রেনের ব্যাপারে তারা এদেরকে ভ্যাসেল মনে করে, এলি না। ইউক্রেন হচ্ছে সেই আরেকটা ভেসেল যেখানে ইউরোপ, ইউএস-ব্যাকড ন্যাটো কিংবা পাশ্চাত্য তাদের ইউনিপোলারিটি যাতে ম্রিয়মাণ না হয় সেটা রক্ষার্থে যতদিন সাপোর্ট করা যায় সেটা করবে। যেদিন ইউক্রেন যুদ্ধটা ফ্রোজেন হয়ে যাবে, কিংবা ইউক্রেন হেরে যাবে কিংবা যখন ইউনিপোলারিটি ধীরে ধীরে ম্রিয়মাণ হয়ে যাবে, কিংবা ধীরে ধীরে ডি-ডলারাইজেন আরো গভীর হবে, তখন জেলেনেস্কীর আর কোনো প্রয়োজনই হবে না তার পেট্রোনদের।

তখন একটা প্রশ্ন বাকী থাকবে-জেলেনেস্কী কি শাকাসভিলির মতো জেলে থাকবে নাকি ফ্রিম্যান হিসাবে রাজকীয় জীবন পরিচালনা করবে নাকি সে তার জীবন দিয়ে প্রমান করবে যে, ইচ্ছে করলেই পরিস্থিতি পালটে দিতে পারতো যেখানে সাধারন নাগরিকেরা অন্তত মারা যেতো না, দেশটার অখন্ডতা রক্ষা পেতো।

সময় বলে দিবে।  

০৩/০৭/২০২৩-মাধুরীর চিঠি-২

অনেক অনেক দিন পার হয়ে গেলো। না আমি আর তোমার সাথে কোনো যোগাযোগ করেছি, না তুমি। জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে এমনভাবে কোনো এক চক্রএর মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ায় সেটা বুঝা খুব সহজ না। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবন মানেই কি পিছলে পড়া পথে হাটু গেড়ে বসে পড়া? নাকি সেই পিচ্ছিল পথ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে কোনো এক পাহাড়ের পাদদেশে এসে পতিত হয়ে আবার সেখান থেকে নতুন করে বেড়ে উঠা? হয়তো দুটুই ঠিক। কেউ পাহাড়ের চূড়ায় উথে নামার ভয়ে হাহাকার করে, আবার কেউ পাহাড়ে উঠতে না পেড়ে হাহাকার করে। কেউ কারো অবস্থানে সুখী নয়।

যাই হোক, এসব কথা আর না বলি। তবে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কি এখনো খুব সহজে সব কিছু ভুলে যাও? কিংবা হাতের কাছে তোমার দরকারী কাগজটি না থাকলে কোথায় রেখেছো সেটার জন্য আমার নাম ধরে চেচামেচি করো? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। তখন হয়তো এরকমের চেচামেচি ভালো লাগতো না, কিন্তু আজকে মনে হয় তোমার সেই চেচামেচিকে আমি খুব মিস করি। মনে হয় খুজে খুজে তোমার ঠিকানাটা বের করে আরো একবার যদি তোমার সেই কন্ঠসরটা শুনতে পেতাম!! কিছু একটা খোজার বাহানা করে আমি সারাক্ষন মাঝে মাঝে আসলে হয়তো এখনো তোমাকেই এই আজব পৃথিবীর মানুষগুলির মধ্যে খুজি। আমি জানি না হটাত কখনো যদি তোমার সাথে আমার আবার দেখা হয়ে যায়, তখন আমি কি করবো। জড়িয়ে ধরবো? নাকি এড়িয়ে যাবো? নাকি দূর থেকে তোমার চলে যাওয়া দেখবো। আমি জানি, তুমি আমাকে ভুলে যেতে চেয়েছিলে, কিন্তু আমার জগতে তুমিই ছিলে একমাত্র মানুষ যাকে আমি কখনো ভুলতে চাই নি। আমি তোমাকে পাইনি বটে কিংবা তুমি আমাকে ছেড়েছো বটে কিন্তু পেরেছো কি? আমি পারিনি।

বৃষ্টি ভেজা রাতে নীরবে যখন আমি আমার বারান্দায় বসে অতীতের ভালো লাগা কোনো একটা গানের কলি শুনি, আমাকে নিয়ে যায় সেই রাতে যখন আমি তোমার হাতে হাত রেখে উচ্ছল ধরনীর শীতল মাটিতে নেচে বেড়াতাম। আমার ভেজা চুল বেয়ে বেয়ে জোনাকীর মতো পানির ফোটা ঝরে পড়তো, আর তুমি সেটা চিপে চিপে ধরে বলতে –আহা, কি সুন্দর, যেনো মুক্তার মত।  তোমার ছাদের কোনায় কি এখনো অই ছোট জবা ফুলের গাছটা আছে? আমি লাগিয়েছিলাম। তুমি কাটাজাতীয় ফুল পছন্দ করো না জেনেও আমি গাছটা লাগিয়েছিলাম। কতদিন জবা ফুল তুলতে গিয়ে হাতে কাটা বিধেছিলো আর তুমি বারবার আমার হাতে মলম লাগিয়ে বলতে কেনো কাটা গাছটাই রাখতে হবে ছাদে? অথচ তুমি গাছটা নিজেও কখনো কেটে ফেলোনি, বরং প্রতিদিন এর গোড়ায় পানি দিতে। কি আজব না? তোমার অপছন্দের একটা গাছ, তুমি কেটে দিলে না, পানি দাও, এটাকে বড় করো, যত্ন করো, অথচ তাকে তুমি পছন্দ করো না। আমাকে তুমি পছন্দ করতে, আদর করতে, আমার কষ্টে তোমার কষ্ট হতো, আমার আনন্দে তুমি আনন্দিত হতে, অথচ তুমি আমাকে চিরতরে কেটে দিলে। কাটতে পেরেছো? ওই জবা ফুলের গাছটার কাছে গেলে তোমার মন উদাসীন হয়ে উঠে না? হয়তো গাছটা আর নাই, অথবা আছেও। আমি তো আর জবা গাছ নই। আমার ভাষা ছিলো, অনুভুতি ছিলো, সব ছিলো, তাতেও তো আমি তোমাকে আমার ভিতরের অনুভুতি দিয়ে বুঝাতে পারিনি, কি ছিলে তুমি আমার। আর সেটা তো একটা ভাষাহীন জবা গাছ। সে তো তোমার কিছুই ছিলো না। আছে গাছটা? তাড়িয়ে দাও নি তো?

মাঝে মাঝে আমার খুব তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে। কেনো দেখতে ইচ্ছে করে, সেই সঠিক উত্তর আমার জানা নাই। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, চিৎকার করে হাউমাউ করে কাদি। যদিও জানি, আজকালকের মানুষগুলির আবেগ, অনুভুতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এখন মানুষেরা আর হাউমাউ করে কাদে না, মানুষ কি ভাববে বলে। প্রান খুলে হাসে না, লোকে বোকা ভাববে বলে। এই চাপা হাসি আর বোবা কান্না মানুষ গুলি এতো অসহায়। তাই মানুষগুলি একা একাই বেচে থাকার মধ্যে প্রান খুজে বেড়ায়। আসলে আমরা সবাই একাই। এই একা জীবনে আড্ডা দেয়া যায়, গল্প করা যায়, কিন্তু সে পর্যন্তই। এর মানে যে, নিঃসঙ্গতা যে কাজ করে না এমন নয়। এই নিঃসঙ্গ জীবনের ও একটা মাধুর্যতা আছে। সেখানে আমিই সব। এর মানে এই নয় যে, আমি রক্তমাংশে গড়া কোনো আপনজনের অভাব অনুভব করিনা।

আমি এখনো মাঝে মাঝে ভাবি- আমি কি অন্য দশজন মেয়ের মতো জীবন সংগী বেছে নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারতাম না? হয়তো পারতাম। কিন্তু আমি সেটা করতে পারিনি। কারন আমরা আমাদের জীবনসংগী বাছাই করি কথা শোনার জন্য, কথা বলার জন্য, যার সাথে কথা বলতে খুব ভালো লাগে, যার কথা শুনলে বছরের পর বছর সুখে দিন পার করা যায়। কিন্তু এটাও ঠিক যে, মাঝে মাঝে আমরা জীবনসাথী বাছাই করি তার রুপ, তার সউন্দর্য, তার অর্থবৈভব, তার সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি বিবেচনা করে। কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে এটা ভুলেই যাই, সেই জীবনসাথী যাকে আমরা বাছাই করলাম, তার সাথে কারনে অকারনে, সময়ে অসময়ে আমার মনের কথাগুলি তাকে বলতে পারবো কিনা কিংবা সে আমার সেই সব ছোট ছোট অনুভুতি গুলির মুল্যায়ন করবে কিনা। যদি এর কোনো পরিবর্তন হয়, আর ঠিক তখন দেখা যায় যে, আমার বাছাই করা সাথী আমার কথাগুলি শুনতেই তার বিরক্ত লাগছে, কথায় কথায় ঝগড়া লেগে যাচ্ছে, আর তখন সম্পর্কগুলিতে মরচে ধরা শুরু করে। এটা একটা অনিশ্চিত পরীক্ষা। যাকে চিনিনা, যাকে কখনো অন্তরে রাখিনি, যে আমাকে জীবনের ৩০ বছর কোথাও জায়গা দেয় নি, হটাত করে তার সেই অন্দর মহলে আমি ঢোকে কতটা স্থান দখল করতে পারবো? সেখানে তো আরো হাজার হাজার ভাবনা, হাজার হাজার বিক্ষিপ্ত অনুভুতি, কিংবা অনেকের বসবাস রয়েছে। আমি কি হটাত করে এসেই তার সেই সব ভাবনা, অনুভুতি, আর অন্য মানুষদের পদরেখা ধুয়ে মুছে আমার নিজের করে দখল নিতে পারবো? হয়তো এটা কখনোই সম্ভব না। তাই আর আমার কোথাও যাওয়াওই হলো না। 

একটা জিনিষ জানো? লেখকের কোনো লেখা পড়ে যতোটা পাঠক মুগ্ধ হয়, তার থেকে বেশী মুগ্ধ হয় পাঠক যখন তার সাথে সামনে বসে কথা বলে।

০১/০৭/২০২৩-হাতে খুব সেকেন্ড জমা নাই

এই তো গত ২৯ জুন ২০২৩ তারিখে কুরবানীর ঈদ চলে গেলো। ছুটির দিনে আমি বাসাতেই থাকি, কোথাও ঘুরতে যাওয়া ভালোও লাগে না। বাসায় আমার স্ত্রী তার নিজের পছন্দের মতো কাজ করে, শপিং করে, বাইরে যায়, আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করে, বেশ ভালোই তার সময় কাটে। আমারও সময় কাটে আমার মতো করে। ছোট মেয়ে আমেরিকায় থাকে, সেও ভালো আছে, বড় মেয়ে ডাক্তারী করে, সে ভালো নাই।

আমি আমার জীবনের অনেক হিসাব কিতাব করছি প্রতিদিন। প্রায় ৬০ বছর বয়স তো হয়েই যাচ্ছে। এর বয়সের অনেক চেনা পরিজন না ফেরার দেশে চলে গেছে, কেউ যাচ্ছে এবং কেউ কেউ অপেক্ষায় আছে কবে তার শেষদিন চলে আসবে। কেউ উদাসীন ভাবে এখনো মনে করছে, অনেক বছর হয়তো বাকী আছে জীবনের, কেউ কেউ আবার এগুলি ভাবার প্রয়োজন ও মনে করে না কারন এর উপরে কারো হাত নাই। আবার কেউ কেউ এমনো ভাবছে, কিছুই তো করা হলো না নিজের জন্য, পরিবারের জন্য কিংবা বাচ্চা কাচ্চাদের জন্য, তাহলে এখন কি করা?

এসবই নিয়ে সমাজে মানুষের জীবন। কেউ পেয়ে হতাশ, কেউ না পেয়ে হতাশ, কেউ আবার পেতে পেতে আরো না পাওয়ার জন্য আপ্রান চেষ্টায় আরো বেশী হতাশ। কেউ যেনো সুখী নয়। কোনো মানুষ আজ পর্যন্ত শতভাগ সুখী কিংবা খুশী নিয়ে মৃত্যু বরন করে নাই। কেউ তাদের চাহিদা পুরন হয়েছে এটা মনে করে আর কোনো কিছুই প্রয়োজন নাই এটা ভেবে তাদের প্রতিদিনের আফসোস থেকে বিরত হয় নাই। আর এই ট্রেন্ড আদিকাল থেকে শুরু হয়েছে, কিয়ামতের শেষদিন অবধি এই আফসোস মানুষের থেকেই যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, দেখা যাবে সেও তার সম্পদের উপর খুশী নয়, সে আরো চায়। হিসাব করে যদি দেখা যায় যে, তার জীবদ্ধসায় সে যা কামিয়েছে, সেই সব প্রতিদিন খরচ করলেও তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সম্পদে বা টাকা পয়সার কমতি হবে না, তারপরেও তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুসচিন্তাগ্রস্থ। সম্ভবত এটাই মানুষের বেসিক ইন্সটিংক্ট। কেউ সুখী না।

কতদিন বাচবো আমরা?

খুব বেশী হলে ৮০ কিংবা ১০০ বছর? কারো কারো ৬০ (যা আমার প্রায় সমাগত), কারো কারো ৭০, কিংবা ৭৫ অথবা বেশীজোর ৮০। যদি মিনিট সেকেন্ডের হিসাব করি, প্রতিটা সেকেন্ড পার হ ওয়া মানে প্রতিটি সেকেন্ড জীবন থেকে শেষ হয়ে যাওয়া। নতুন করে এও সেকেন্ড যোগ করার কোনো যন্ত্র, বা সিস্টেম তৈরী হয় নাই। এটা ফিক্সড। আর প্রতিটি সেকেন্ড পার হয়ে যাওয়া মানে আমরা সবাই জীবনের ফিনিশিং লাইনের কাছালাছি অগ্রসর হ ওয়া অথবা মৃত্যুর স্তার্টিং লাইনে পদার্পন করা। একটা সময় আসবে যখন সব সেকেন্ড শেষ হয়ে যাবে এবং আমরা আমাদের এই জীবনের যাত্রাপথ শেষ করে দেবো। কতটুকু আহরন করেছিলাম, কতটুকু রেখে গেলাম, কে আমার সেই আহরীত সম্পদ কিভাবে ভোগ করবে, কতজন প্রিয় মানুষ আমাদের জীবনে ছিলো কিংবা কতজনকে আমরা ঘেন্না করেছি, কে আমার শত্রু ছিলো, কে আমার মিত্র ছিলো, বা কাকে আমি প্রাধান্য দিয়েছি আর কাকে ঠকিয়েছি, এর সব কিছুর হিসাব সেদিন জমে থাকা সেকেন্ডের মান শুন্য হলে আর কোনো কিছুই আমার জন্য প্রযোজ্য নয়।  

হাজার বছর বাচতে পারলে না হয় হাতে থাকা সেকেন্ডকে অপচয় করার বদান্যতা থাকতো। সেটা তো আর নাই। তাহলে এতো অল্প সংখ্যক সেকেন্ডের ঝুড়ি নিয়ে মন খারাপ, মনে কষ্ট, কিংবা পচা ব্যাপার স্যাপের গুলিতে সময় নষ্ট করার কোনো সময় কি আসলেই আমাদের আছে? আর ঠিক ে কারনে আমি মাঝে মাঝে যেটা ভাবি-

সময় দিন সেসব ব্যাপারগুলিতে যেখানে আপনি সুখী থাকেন। সময় ব্যয় করুন সেসব কাজে যেখানে আপনার মন প্রফুল্ল থাকে। জানি একা চলতে পারা যায় না, তাই পরিবার, বন্ধু বান্ধবের জন্ম। যদি মনে হয় এগুলি আপনাকে উতফুল্ল রাখে, সেখানে সময় দিন। সবাই আপনাকে হয়তো বরন করে নেবে না, তাহলে সেগুলি ভুলে যান। প্রয়োজন নাই সেসব যেসব আপনাকে হতাশ করে। জীবন একটাই। অন্যের সুখী হাস্যমুখ দেখে আপনি এটা ভাববেন না যে, সে হয়তো অনেক খুসিতে আছে। তাদের মতো করে চল্বার আপনার কোনো প্রয়োজন নাই।

কেউ যদি আপনার পাশে না থাকে কিংবা যারা পাশে থাকার কথা তারা যদি আপনার কষ্টের কারন হয়ে থাকে, ভুলে যান তাদের। যেহেতু আপনার খাওয়া, থাকার কিংবা চিকিৎসার অর্থের অভাব নাই, ফলে দিনভরে আকাশ দেখুন, বৈ পড়ুন, টিভি দেখুন, ভোর বেলা সকালে শিশির ভেজা রাস্তায় ফসলের ক্ষেত দেখুন, বিকালে আকাশ দেখুন, মেঘলা বৃষ্টির বাতাস উপভোগ করুন, নদীর ঘাটে বসে নোউকার পাল তোলা মাঝির ভাটিয়ালী গান শুনুন, রাখালের কন্ঠ শুনুন, ভরা পুর্নিমাতে কিংবা পুর্ন অমাবশ্যায় তীব্র জোয়ারে ফুলে উঠা সাগরকে দেখুন, বেরিয়ে যান কোথাও একা কিংবা কাজের কোনো মানুষকে নিয়ে। যদি সাথী সেটা যেইই হোক, হোক স্ত্রী বা পরিবারের কেউ, তাকে নিয়ে বেরিয়ে যান। অবুঝ পশু, কুকুর, বিড়ালের সাথে সময় কাটান, যদি পারেন, অবুঝ শিশুর সাথে অনেক অনেক সময় কাটান। তাদের নিষ্পাপ মুখের হাসি আপনাকে উতফুল্ল করবে।

আর এসবের মাঝে কখনোই আপনার স্রষ্টাকে ভুলে যাবেন না। কারন সব শেষে আপনাকে তার কাছেই যেতে হবে। আপনি আস্তিক বা নাস্তিক যাইই হন না কেনো, সব শেষে কেউ না কেউ তো আপনার সমস্ত কাজের জবাব্দিহিতা করতেই হবে। যদি কোনো স্রষ্টা না থেকে থাকে, তাহলে তো বেচেই গেলেন, জীবন শেষ তো কোনো কৈফিয়ত নাই, কিন্তু যদি থেকে থাকে? আর সেই “যদি” ই আপনাকে আপনার ে জীবনের সন কৃত কর্মের জবাব্দিহিতায় আকড়ে ধরবে। তাই অপশন খোলা রাখুন, স্রষ্টাকে আপনার প্রাত্যাহিক সময়ে রাখুন। মন ভালো থাকবে, প্রশান্তিতে থাকবে।

আজ থেকে ১০০ বছর আগের যেমন কাউকে আপনি চিনেন না, নাম ও জানেন না, তাদের ব্যাপারে যেমন আপনার কোনো জানার আগ্রহ ও নাই, তেমনি আজ থেকে শতবছর পরে আপনার ব্যাপারেও কেউ জানার আগ্রহ প্রকাশ করবে না, আপনার নাম ও জানবে না। তাই সেই শত কিংবা সহস্র বছর পরে যদি সত্যিই কিছু আবার এই পৃথিবী থেকে পেতে চান, তাহলে দুহাতে দান করুন।

পৃথিবী সত্যিই সুন্দর যদি আপনি মনে করেন এটা সুন্দর। সমাজের কে কি ভাবলো, সন্তানদের মধ্যে কে আপনাকে কতটুকু মুল্যায়ন করলো, সেটা নিয়ে ভাবার কোনো সুযোগ নাই। পৃথিবীর শুরু থেকেই সমস্ত বাবা মায়েরা তাদের সন্তানের জন্য আপ্রান সব কিছু করে গেলেও সেইসব সন্তানেরা খুব অল্প সংখ্যক সন্তানেরাই তাদের বাবা মায়ের প্রতি ন্যায় বিচার করেছে।

তাই, নিজে আনন্দ করুন, নিজে পৃথিবীর সব কিছু আপনার সাধ্যের মধ্যে ভোগ করুন। হাতে খুব একটা সেকেন্ড জমা নাই।

২৭/০৬/২০২৩-প্রিগোজিন ক্যু নাকি ছদ্ধবেশ

বেশ কদিন যাবত আমি প্রিগোজিনের ক্যু এর চেষ্টা নিয়ে বিস্তর খবরাখবর পড়ছিলাম। অনেকগুলি প্রশ্নের উদয় হয়েছে। উত্তরগুলি জানা নাই তবে প্রশ্নগুলির মধ্যেই যেনো উত্তরগুলি লুকিয়ে আছে এটাই বারবার মনে হয়েছে। প্রশ্নটা হচ্ছে- প্রিগোজিন যা করেছে এটা কি ক্যু নাকি একটা গভীর ক্যামোফ্লাজের অংশ? এর কিছুটা উত্তর প্রিগোজিন নিজেই দিয়েছেন যে, সে রাশিয়ার সরকারকে উতখাত করতে এটা করেনি, মানে এটা ক্যু নয়। সে ন্যায় বিচারের আশায় মস্কোতে যেতে চেয়েছিলো যেখানে সেনাপ্রধান এবং ডিপুটি সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ।

যদি ক্যু না হয়ে থাকে, তাহলে এটা ছিলো একটা পরিকল্পিত নাটক যার পক্ষে বেশ কিছু জোরালো পয়েন্ট আছেঃ

(ক) ওয়েগনার গ্রুপ কিন্তু প্রিগোজিনের দ্বারা স্রিষ্টি নয়, না সে এর মালিক। ওয়েগনার গ্রুপ রাশিয়ান সরকারের অর্থে পরিচালিত হয়। প্রিগোজিন এর ম্যানেজারের মতো।

(খ) একটা জিনিষ খেয়াল করার মতো। প্রিগোজিন কয়েক মাস যাবত রাশিয়ান মিলিটারীর উর্ধতন কমান্ডারদের বিপক্ষে অনেক আজে বাজে মন্তব্য করার পরেও পুতিন প্রিগোজিনকে কোনো প্রকার ভতর্সনা করেন নাই, না তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এমন কি কোনো উর্ধতন কমান্ডারগনও তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার মুখ খুলেনি। এর কারন কি? সম্ভবত পরিকল্পনাটা অনেক আগে থেকেই সাজানো হচ্ছিলো। আর প্রিগোজিনের এসব উলটা পালটা মন্তব্য অনেকটা সাজানো কোনো মহাপরিকল্পনারই অংশ বলে মনে হয়। তারমানে প্রিগোজিনকে এই কাজ করতে কেউ উদ্বুদ্ধ করেছে। সেটা কে? এক কথায় যদি উত্তর দেই-এটা পুতিন।

(গ) প্রিগোজিন রোস্তভ-অন-ডন মিলিটারী হেড কোয়ার্টার, এয়ারবেস, এবং বেশ কিছু মিলিটারী স্থাপনা জাষ্ট এলো আর দখল করে নিলো। এটা কি বিশ্বাস করার মতো যে, এতোগুলি মিলিটারী স্থাপনা এতোই অরক্ষিত যে, কোনো বাধা ছাড়া কেউ দখল করে নিতে পারে? তারমানে যে, তাকে দখল করতে দেয়া হয়েছে। কোনো গুলাগুলি নাই, কোনো ক্যাজুয়ালিটি নাই, কোনো বাধাও নাই। রোস্তভ-অন-ডন এর মেইন গেটে বিশাল ট্যাংক ঢোকে গেলো। ছাদের উপরে ওয়েগনারের সৈনিক, অফিসের সামনে সৈনিকেরা এমনভাবে গোল চত্তরে অস্ত্র নিয়ে বসে আছে যেনো, কোনো লম্বা সফরের মধ্যে মাঝে একটা বিরতি। কেউ ভয়ে নাই। শুধু তাইই নয়-রাশিয়া সরকার প্রিগোজিনের বিরুদ্ধে প্রায় ১২ ঘন্টা কোনো প্রকার একশানেই যায়নি। আরো মজার ব্যাপার হলো, জনসাধারনের মাঝে কোনো প্রকার ভয়ের ছাপও দেখা যাচ্ছিলো না। সবাই যেনো স্বাভাবিক কাজকর্ম করছে, ওয়েগনার সদস্যদের সাথে ছবি তোলছে, হ্যান্ডসেক করছে, চা কফি পান করছে। একেবারেই সহজ ব্যাপার মনে হচ্ছিলো। অন্যদিকে প্রিগোজিন এবং তার দুই উর্ধতন কমান্ডার রোস্তভ-অন_ডন এর সামনে গাছের নীচে রিল্যাক্স ভংগিতে যেনো কোনো একটা পুরানো রম্য ঘটনা নিয়ে গল্পে মশগুল এমনভাবে একটা ভিডিও দেখা যাচ্ছে। তারমধ্যে কোনো প্রকার দুসচিন্তার ছাপ ছিলো না যে, সে এমন একটা রাষ্ট্রোদ্রোহী কাজে লিপ্ত হয়েছে। খুব সুক্ষভাবে চিন্তা করলে আরেকটা ব্যাপার চোখে পড়বে। ঘটনাটা ঘটেছে শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির জাষ্ট আগে। শনিবার, রবিবার বন্ধ। জনসাধারন হলিডে মুডে ছিলেন। অফিশিয়াল কোনো প্যারা নাই। আবার চকলেট দেয়ার মতো সরকার সোমবারকেও ছুটি ঘোষনা করেছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার।

(ঘ) প্রিগোজিন বক্তব্য দিয়েছে যে, সে তার বাহিনীকে নিয়ে মস্কোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে যা প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার দূরে। ওয়েগনারের মোট সদস্য প্রায় ২৫০০০। এর মধ্যে মাত্র হাজারখানেক সদস্য অংশ নিয়েছে। ওয়েগনারের আর বাকী সদস্যরা কোথায় ছিলো? এই এক হাজার সৈন্যের কিছু অংশ রোস্তভ-অন-ডনে, কিছু ভোরোনেজ এলাকায়, কিছু লিপিটস্কে মোতায়েন করে বাকী হাতে গোনা কিছুসংখ্যক সৈন্য আর গুটিকতক ট্যাংক তাও আবার পুরু খোলা ময়দানের মতো রাস্তা দিয়ে ১৩০০ কিলোমিটার দূরে ২০ ঘন্টা আল্টিমেটামে মস্কো দখল করার অভিপ্রায়। মস্কোতে প্রায় ১৫ মিলিয়ন লোক বাস করে, শত শত গ্যারিশন, মিলিটারী স্থাপনা, এইসবের কোনো ক্যালকুলেশন না করেই প্রিগোজিন রওয়ানা হয়ে যাবে মস্কোতে একটা ক্যু করার জন্য? অবিশ্বাস্য মনে হয় না এটা? তারমধ্যে ট্যাংক রিফুয়েলিং দরকার, কোনো এয়ার সাপোর্ট নাই, না আছে কোনো আর্টিলারী সাপোর্ট। প্রিগোজিন কি জানে না যে, রাশিয়ার একটা এয়ার সর্টিই যথেষ্ঠ প্রিগোজিনের ট্যাংক বহরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য। প্রিগোজিন একজন সমর অভিজ্ঞ মানুষ। তার দ্বারা এমন একটা পরিকল্পনা কি বাস্তবে যায়?

(ঙ) পুটিন তার ভাষনে বললেন-তিনি মাত্র একদিন আগে সমস্ত ডিভিশনাল কমান্ডারস, ইন্টিলিজেন্স হেড কোয়ার্টারস, ফিল্ড কমান্ডার্সদের সাথে একযোগে কথা বলেছেন (কারো কারোর সাথে সরাসরি ফেস টু ফেস, কারো সাথে ভিডিও লিংককে)। এই সময় কোনো সাংবাদিক হাজির ছিলেন না। তিনি আসলে কি কথা বলেছেন? রাশিয়ার ইন্টিলিজেন্স কি এতোটাই ঘুমন্ত যে, প্রিগোজিনের এমন একটা ক্যু তাদের কারোরই নজরে আসবে না, কোনো আগাম তথ্য থাকবে না? এটা কি হতে পারে? এখন যদি প্রশ্নটা অন্যভাবে করি যে, প্রিগোজিন নাটকটা করার জন্যই পুতিনের এই সিক্রেট দরবার করেছিলো যেখানে সব কমান্ডার্স, ওয়েগনার গ্রুপ, ইন্টিলিজেন্স ডিপার্ট্মেন্ট সবাইকে অনবোর্ড করা এবং প্রিগোজিন নিজেও একটা ভূমিকার অংশ!! এখানে মনে রাখা দরকার যে, প্রিগোজিন এবং পুতিন তারা বাল্যকালের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারমানে ধরে নেয়া যায়, এখানে পুতিন থেকে শুরু করে সবাই যার যার অংশে একটা রিয়েল অভিনয় করেছে। স্টেজ মেনেজমেন্ট এন্ড গুড রিহার্সড। প্রিগোজিন সেটাই করেছে যেটা পুতিন তাকে করতে বলেছে। নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুসারে প্রিগোজিনের বিরুদ্ধে ইমিডিয়েট ট্রিজনের মামলা দেয়া হলো। কিন্তু তাকে কিছুতেই এরেষ্ট করা হলো না। অতঃপর, দিনভর লোক দেখানো পর্দার আড়ালে বসে বেলারুশ প্রেসিডেন্টের একটা অনুরোধে প্রিগোজিন এমন একটা রাষ্ট্রোদ্রোহী কাজ থেকে হুট করে ব্যাক করলো, ওয়েগনার সদস্যদের ইমিডিয়েট সব জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়া হলো। একবার কি মনে আসে না যে, বেলারুশ যেটা কিনা রাশিয়ার ট্রাষ্টেড বন্ধু, সেখানে এসাইলাম নেয়া কি প্রিগোজিনির জন্য বোকামী নয় যদি আসলেই এটা স্টেজ মেনেজড না হয়? বেলারুশ প্রেসিডেন্ট হচ্ছে একটা মাস্ক কাম অপারেশনের বৃহৎ পরিকল্পনার আরেক চাপ্টার। একটা পয়েন্ট মনে রাখা দরকার যে, ওয়েগনার এবং প্রিগোজিন খাস রাশিয়ান এবং তাদের দেশপ্রেমিক মনোভাবে কারো কোনো মতৈক্য নাই। যাক সে কথা। একটা ক্যু হবে অথচ কোনো কিছুই ধংশ হবে না, এতে তো মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, সন্দেহ আসতে পারে। তাই এই নাটকে কয়েকটা হেলিকপ্টার এবং ট্যাংকও বিনাশ দেখানো হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কিন্তু কেউ কারা এই ক্রাসড হেলিকপ্টারে ছিলো সেটার নাম জানা যায় নাই। এরমানে এসব টার্গেটেড ট্যাংক এবং হেলিকপ্টার ছিলো রেডিও কন্ট্রোল্ড। এর ভিতরে কোনো পাইলট কিংবা ট্যাংকের লোকই ছিলো না। সোস্যাল মিডিয়া, কিংবা ফেক নিউজ সার্ভ করার মাধ্যমে এই নাটকটা আরো বাস্তব রুপ দেয়া হয়েছে।

(চ) এখানে আরো একটা পয়েন্ট না বললেই নয় যে, প্রিগোজিন যে কমান্ডারদের নামে অভিযোগ করতে এবং ন্যায় বিচার পেতে মস্কোতে যাচ্ছিলেন, তাদের ব্যাপারে আজো কোনো তদন্ত হচ্ছে না কেনো? অথবা তাদেরকে ইমিডিয়েট দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার তো করা উচিত। প্রিগোজিনের এমন একটা ক্যু প্লেনের কিছুই না জানার কারনে রাশিয়ার খোদ ইন্টিলিজেন্স বাহিনী প্রধানকে কোনো কৈফিয়ত চাওয়া হলো না?

(ছ) যখন প্রিগোজিন তার ভূমিকা পালন করছিলেন রোস্তভ-অন ডনে, ঠিক তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন মিনিষ্ট্রি অফ ডিফেন্সের ডিপুটি। কেনো? ধোয়াশা মনে হচ্ছে না? ক্যু হচ্ছে, অথচ মিনিষ্ট্রি অফ ডিফেন্সের ডেপুটি সেইখানে ক্যু লিডারের সাথে কফি পান করছেন। একেবারেই যায় না।

(জ) প্রিগোজিন এখন বেলারুশ যাবেন, তার মামলা তুলে নেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করা হলো, কিন্তু মামলা এখনো তুলে নেয়া হয় নাই। প্রিগোজিন কেনো এতো বিশ্বাস করছেন পুতিনকে যে, প্রিগোজিনের সব পরিকল্পনা বাতিল করলে মামলা না তোলা পর্যন্ত সে স্থান ত্যাগ করবে? কারন প্রিগোজিন জানেন, এগুলি কিছুই না।

প্রিগোজিনের এবারের এসাইন্মেন্ট বেলারুশিয়ান পিএমসিকে প্রশিক্ষন দেয়া। এটা প্রিগোজিনের জন্য কোনো নির্বাসনও নয়, ভেকেশনও নয়। একটা বিশাল দায়িত্ব। আর হয়তো পুতিন এটাই প্রিগোজিনের কাছ থেকে চাচ্ছেন। তার পরবর্তী টার্গেট হয়তো পোল্যান্ড এবং সার্বিয়া। প্রিগোজিন তো আগেই একবার ওয়াদা করেছিলো যে, সে পোল্যান্ড এবং ইউক্রেনের মধ্যে একটা ভাঙ্গনের রুপরেখা দিবেই। এবার হয়তো সেইটার পরিকল্পনা করা হলো তাকে বেলারুশ পাঠিয়ে। ওয়েগনার গ্রুপ পোল্যান্ডকে এমনভাবে এজিটেটেড করবে যাতে পোল্যান্ড বেলারুশকে অথবা ইউক্রেনকে আক্রমন করে। যদি বেলারুশকেই পোল্যান্ড আক্রমন করে, ইতিমধ্যে পুতিন বেলারুশে নিউক্লিয়ার ঘাটি স্থাপনা সম্পন্ন করে ফেলেছেন। পোল্যান্ডের জন্য কাজটা সহজ নয়। অংকটা মিলে যাচ্ছে প্রায়।

(ঝ) এখানে কয়েক মাস আগের রাশিয়ার একটা ক্যামোফ্লাজ মুভের উদাহরন টানা যেতে পারে। দক্ষিন ইউক্রেনে যখন ইউক্রেন অফেন্সিভ অপারেশনের পরিকল্পনা করছিলো, তখন রাশিয়া একটা ‘দাবার গুটি’ চেলেছিলো যে, রাশিয়া হটাত করে তার উত্তর সেক্টর থেকে তাদের ইউনিটসমুহ উইথড্র করে ইউক্রেনের আক্রমন ঠেকাবার জন্য রাশিয়ার দক্ষিন সেক্টরে মোতায়েনের জন্য সরে আনার ভান করে। যা কিনা ন্যাটো কিংবা ইউক্রেন ভাবতেই পারে নাই রাশিয়া এটা করবে। কিন্তু আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল ন্যাটো এবং ইউক্রেনের জন্য যে, রাশিয়া তার সেই উত্তর সেক্টরের ইউনিট সমুহকে দক্ষিনে যাচ্ছে বলে একটা ফেক মুভ দেখিয়ে পুনরায় উত্তরেই গতিপথ পালটে পুরু ইউক্রেন বাহিনীকে এন্সার্কেল করে ফেল্লো। কিন্তু ততক্ষনে ইউক্রেনের হাতে আর কোনো সময় ছিলো না। ইউক্রেন চরমভাবে পরাস্ত হয়ে ভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

(ঞ) ক্যু বা ট্রিজনের আবরনের প্রতিরক্ষা হিসাবে রাশিয়া তার বিশাল সামরিক বাহিনীকে ন্যাটোর অগোচরে উত্তরে, ভোরোনেজের পশ্চিমে এবং বেলগোরোদের উত্তরে মোতায়েন করে সব বাহিনীকেকে ডিস্পার্স করে বর্ডারে নিয়ে এলো। নতুন অক্ষে ফোর্স মোতায়েন করা হলো এবং ন্যাটোকে রাশিয়া এই পরিকল্পনা বুঝতেই দিলো না। এমনিতেই এই অঞ্চলে রাশিয়ার বিশাল সামরিক মুভমেন্ট ন্যাটো কিংবা পশ্চিমারা কোনোভাবেই সহজ করে নেবার কথা না। তারমানে কি এটা বলা যায় যে, এটা Cover a redeployment of Russian Troops?

(ট) এই নাটকে আরো একটা রেফারেন্স টানা হয়েছে-১৯১৭ সালের বলসেভিক মুভমেন্টের। প্রায় হাজার বছর আগের ইতিহাস এবং সেই জিওগ্রাফির রুপরেখা টানা। কেনো? আসলে এই মেসেজটা প্রিগোজিনির ট্রিজনের বা ক্যু এর মধ্যে পড়ে কি? এটা আসলে সেই বার্তা- যা ওডেসা রিজিয়ন, সাউথ অফ আর্ক, কিয়েভ, সুমি, এবং খারকিভকে উদ্দেশ্য করেই বলা। আপাতত খারকিভ তার টার্গেট। কে জানে বেলারুশে যাওয়ার প্রাক্কালে সেই আগের ‘দাবার গুটির’ চালের মতো বেলারুশ না গিয়ে হটাত ইউ-টার্ন নিয়ে ওয়েগনারের দল খারকিভ অপারেশনে নিমগ্ন থাকবে?

(ঠ) আরেকটি কথা শোনা যাচ্ছে যে, প্রিগোজোনি এই নাটকটা এমনভাবে অভিনয় করেছে যে, সম্ভবত সে এখান থেকে পশ্চিমাদের কাছ থেকে বড় অংকের একটা লাভ বা উৎকোচ গ্রহন করেছে। এটা প্রিগোজিনের পক্ষে করা সম্ভব। হয়তো এটা পুতিন নিজেও এলাউ করেছেন। এর পিছনের ব্যাখ্যা হচ্ছে-পশ্চিমারা দাবী করছে যে, তারা প্রিগোজিনির এই ক্যু সম্পর্কে অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকে জানতো। এর অর্থ, প্রিগোজিন পশ্চিমাদেরকেও ধোকা দিয়েছে হয়তো।

২১/০৬/২০২৩- কোকোকে ছেড়ে দিতে হবে

অনেক শখ করে একটা জার্মান শেফার্ড এনেছিলাম। ওর বয়স যখন ৩ মাস, তখন থেকে কোকো আমার বাসায়। বাচ্চা বয়সে যা খেতে দিয়েছি, সেটাই খেয়েছে, বিশেষ করে নরম ভাত আর মুরগীর মাংশ। সাথে পেট ফুডস থাকতো, একটু দই দিলে মনে হতো অমৃত খাচ্ছে। নাক ডুবিয়ে খেতো।

মিটুলের কারনে বাসায় কোকোর প্রবেশ নিষেধ, তাই ওকে আমার মতো করে কোনো ট্রেনিংই  দিতে পারিনি। কেয়ারটেকার শাহনুরের কাছেই সারাক্ষন থাকে, ফলে আমার থেকে শাহনুরের প্রতিই ওর আনুগত্য বেশী। কিন্তু যখনই অফিসে যাই কিংবা অফিস থেকে আসি, উচ্ছল ঢেউয়ের মতো আমার গাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে করতে অপেক্ষা করে কখন আমি গাড়ি থেকে বের হবো। যেই না গাড়ি থেকে বের হয়েছি, মনে হয় ছোট বাচ্চার মতো আমার কোলে, পিঠে আছড়ে পড়ে। কি শার্ট পড়েছি, কি জামা পড়েছি সেটা তো ওর কাছে কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়, ওরা কাপড় নোংরা করে বটে কিন্তু আনুগত্যের চরম শিখরে ওদের ভালোবাসা। যারা কুকুর পালে না, তারা হয়তো বুঝবেই না কুকুরের আনুগত্য কি জিনিষ। কোকোকে খাওয়ানোর জন্য আমার কোনো বাজেট নাই। তারপরেও ওর পিছনে মাসে প্রায় হাজার দশেক খরচ তো পরেই।

তাহলে কোকোকে কেনো ছাড়তে হচ্ছে?

মাঝে মাঝে কোকো এখন সব খাবার খেতে চায় না, মাংশ দিলেও খেতে চায় না, মুরগী কিংবা গরুর গোস্ত যেনো তার এখন আর ভালো লাগে না। নরম ভাত, কিংবা পেট ফুডস। একেবারেই খেতে চায় না। আবার সব খাবার খায়ও না। ফলে আমার চিন্তা হয় প্রানীটাকে কোনো কষ্ট দিছি কিনা। ওরা কথা বলতে পারেনা, কিন্তু ক্ষুধার সময় অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে যেনো কি বলতে চায়। প্রচুর দৌড়াতে পারে, কিন্তু আমার সময় হয় না কোকোকে নিয়ে বের হবার। হয়তো এটাও একটা ব্যাপার ওর না খাওয়ার পিছনে।

ওর এই না খাওয়ার কারনে ইদানিং কোকো একটু কাহিল হয়ে গেছে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। কোনো অসুবিধা পান নাই। তারপরেও কয়েকটা ভিটামিন দিয়েছে। খাইয়েছি। কিন্তু খুব একটা লাভ হয় নাই। খাবারের প্রতি ওর অরুচিটা রয়েই গেছে মনে হয়। তাই ওর অসুবিধার কথা চিন্তা করে আমার বন্ধু মহলে, ফেসবুকে একটা সংবাদ দিয়েছি যে, কোকোকে যারা নিজের হাতে আদর করে সময় দিয়ে ভালোভাবে রাখতে পারবে, আমি তাদেরকে দত্তক দিয়ে দেবো। অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে, অনেকেই পারেনা আজই নিয়ে যায় এমন। কিন্তু আমি জানি জার্মান শেফার্ড পালা খুব সহজ কাজ না। তারপরেও হয়তো অনেকে পালতেও পারেন। যাকেই দেবো, তার বাড়িঘর, আর্থিক সামর্থ দেখেই আমি কোকোকে দত্তক দেবো এটা সিউর। আর যদি দেখি, ওর আরো কষ্ট হবে, তাহলে হয়তো দেবোই না। অন্তত আমি তো ওকে কিছুটা হলেও সময় দিতে পারবো।

আমি কিংবা মিটুল যখন আমাদের ঘরে ক্যাচিগেট খুলি আর যদি কোকো গ্যারেজে ছাড়া থাকে, দুই লাফে গ্যারেজ থেকে আমাদের ঘরের দরজার সামনে এসে হাজির। কিংবা কাউকে আমি বা মিটুল নাম ধরে জোরে ডাকতে গেলে কোকো আমাদের কণ্ঠস্বর চিনে, যদি ছাড়া থাকে এসে যাবে, আর যদি ওর ঘরে বন্দি থাকে, উচ্চস্বরে ডাকাডাকি শুরু করবে।

আমি জানি যদি কোকোকে দিয়েই দিতে হয়, কোকো হয়তো অন্য মালিকের অধীনে গিয়ে আমাদের মিস করবে। হয়তো খুজবে আমাকে সেই হাচির মতো যে কিনা তার মনিবের জন্য গোটা ১০ বছর জাপানের সেই রেলওয়ের প্লাটফর্মে অপেক্ষা করেছে কখন তার মনিব আবার ফিরে আসবে। অবশেষে হাচি ১০ বছর পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। জাপান সরকার সেই হাচির স্মরণে তাকে সম্মান জানিয়ে সেই প্লাটফর্মেই একটা মনুমেন্ট তৈরী করেছে। হাচি নাই, কিন্তু আছে সবার মাঝে। এটাই কুকুর ভক্তি।

আমি নিশ্চিত দিয়ে বলতে পারি, একদিন কোকো নিজেও আমাকে মিস করবে। আমি তো মিস করবোই। এখন যে স্ত্রী কোকোকে রাখতে দিলো না, এক সময় হয়তো সেইই কোকোর মতো একটা জারমান শেফার্ড থাকলে হয়তো ভালো হতো এর অভাব সে বুঝবে।

পরিবারে আমি অশান্তি চাই না, তাই কোকোকে ছেড়ে দিলাম। বা দিচ্ছি।

কোকো ভালো থাকুক আমি চাই, কিন্তু সে কতটা ভালো থাকবে সেটা আমি জানি না। কোকো আমার বাগান মিস করবে, কোকো তার ঘর মিস করবে, কোকো তার পরিচিত পরিবেশ মিস করবে। কোকো শাহ্নুরকে মিস করবে।

কোকো হয়তো জানেই না যে, তাকে আমি ছেড়ে দিচ্ছি। একটা সন্তান ছেড়ে দেয়ার মতো একটা কষ্ট।   

 

২১/০৫/২০২৩-পরিবার থেকে নিজে বড়

কোনো মতবাদ কিংবা প্রচলিত প্রবাদের বাইরে গিয়েই বলছি- দেশের থেকে সম্ভবত সমাজ বড়, সমাজের থেকে পরিবার আর পরিবারের থেকে বড় নিজে। এটাই সত্য। যখন একাই এসেছি এই দুনিয়ায় তখন আমি দেশ নিয়ে আসিনি, আমি সমাজ নিয়ে আসিনি, না আমি পরিবার সাথে করে নিয়ে এসেছি। আমি সম্পুর্ন একা এবং কোনো কিছু ছাড়াই এই দুনিয়ায় এসেছি। এই দুনিয়ায় এসে আমি যা পেয়েছি- তা হলো, দেশ, সমাজ আর পরিবার। এটা সম্ভবত শুধু মানুষের বেলায়ই প্রযোজ্য।

তাকিয়ে দেখুন একটা বন্য প্রানীর দিকে। তার সমাজ থাকলেও সে সেই সমাজের কোনো আইনের মধ্যে নিবন্দিত নয়। যখন তার যা খুশী সেদিকেই তার বিচরন। ক্ষুধায় তাকে অন্য কোনো প্রানী খাদ্য জোগায় না, শীতে অন্য কোনো প্রানী তাকে গরমে আচ্ছাদিত করে না। সে মরে গেলেও কেউ আফসোস করে না। কিছু কিছু প্রানী হয়তো দল বেধে চলে বটে কিন্তু সেই দলের জন্য কেউ কোনো দায়িত্ত নিয়ে এটা করে না যে, সবাইকে বাচিয়ে নিজে বাচবো। তারা সবাই যার যার জীবন নিয়ে দলবদ্ধভাবে একাই চলে। তারা এটা করতে পারে কারন, তাদের চাহিদা শুধু খেয়ে বেচে থাকার। ওদের পেট ভরে গেলে অতিরিক্ত আর কিছুই সঞ্চয়ের চিন্তা থাকে না, তারা অট্টালিকা, গাড়ি বাড়ি ব্যাংক ব্যালেন্স কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কিছুই রেখে যায় না। এ জন্যই ওরা সর্বদা সুখী। ওরা কারো আক্রমন মনে রাখে না, কাউকে আক্রমন করলেও সেটা নিয়ে আর ভাবে না। ব্যাপারটা সেখানেই মিটে যায় যেখানে শুরু এবং শেষ হয়েছিলো।

আমরা প্রত্যেকেই একা, আর এই একাকীত্ব আমরা বুঝতে পারি বয়সের ভাড়ে যখন আমরা নেতিয়ে যাই। সারাজীবন পরিবারের জন্য আমরন কষ্ট করেও আমরা সেই মানুষ গুলির নাগাল পাই না যাদের জন্য আমরা আমাদের সব সুখ জলাঞ্জলী দিয়ে ভেবেছিলাম-“একদিন আমি সুখী হবো”/ একদিন আমি সুখী হবো-এই মিথ মানুষের জীবনে কখনোই আসে না। আসবেও না। তাহলে কেনো এই মিথ? এটা একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই না।

আমি আজকের দিনের সমাজের কাছে কিংবা পরিবারের কাছে আমার এই মিথ প্রকাশ করা মানে আমি সবার কাছেই একটা নেগেটিভ মাইন্ডেড মানুষের পরিচয় বহন করবো, এটাই এই সমাজের মিথ। কিন্তু একবার ভাবুন তো? আমি সারাজীবন কষ্ট করে আমি একটা সাম্রাজ্য তৈরী করবো, আর সেই সাম্রাজ্যে আমার কিছু পরিবারের সদস্য আমার সমস্ত মিথ ধুলোয় নষ্ট করে দিতে একটু সময় ও কার্পন্য করবে না, তাহলে কেনো আমাকে এই মিথ বিশ্বাস করতে হবে? তাই আমি সব সময় আমার পরিবারের সদস্যদের বলি- আমার মতো করে চলতে না পারলে আমাকে নিয়ে টানাহেচড়া করো না। তোমরা তোমাদের ভাগ্যকে বদলে দাও। আমার ভাগ্যের কোনো কিছুই তোমাদেরকে পাল্টাতে হবে না। না তোমরা আমার ইজ্জতকে বিনা কারনে এতোটুকু নীচে নামিয়ে আনো যেখানে আমি কখনো যেতে চাই না। তোমাদের এই সমাজে আমি যতটুকু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি, আমাকে সেই ততটুকুতেই থাকতে দাও। তোমাদেরকে সাথে নিতে গিয়ে আমাকে যেনো সেই অর্জিত ইজ্জতটুকু আমাকে ক্ষয় করতে না হয় শুধু এটুকু রহম করো। আর যদি সেটাও করতে না পারো- তাহলে তুমি বা তোমরা যেইই হও, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি একা এসেছি, একাই থাকতে অভ্যস্থ হয়েছি।একাই থাকতে পারবো।

২৮/০৪/২০২৩-Dollar Decline vs. Dollar Collapse

আগের পর্বে বলেছিলাম যে, Why a dollar decline is inevitable, and a collapse is unimaginable.

যখন অন্য দেশের লোকাল কারেন্সীর তুলনায় ডলারের মান বা ভ্যালু কমে যাবে তখন ডলার ডিক্লায়েন করছে বলা হবে। এর মানে হলো, অন্য কারেন্সী দিয়ে আগের তুলনায় বেশী ডলার কেনা যাবে অথবা আগের যেই ডলার দিয়ে কোনো একটি পন্য যে দামে কেনা যেত, এখন সেই পন্য তার থেকে কম দামে কিনতে পারবে মানুষ অথবা একই পন্যের দামের বেলায় ডলার বেশী পে করতে হবে আমেরিকান সরকারকে। এটা সব দেশের কারেন্সীর বেলাতেই প্রজোজ্য। আমরা এখানে শুধু ডলার নিয়ে আলাপ করছি বলে ডলারের ভ্যালুর কথা বললাম।

ডলারের মান কমে যাওয়া মানেই ইউএস ট্রেজারীর ভ্যালুও কমে যাওয়া। আগে যদি ইউএস ট্রেজারীতে ২ মিলিয়ন ডলার থাকতো, ডলার এর মান কমে যাওয়াতে সেই ২ মিলিয়ন ডলারের ভ্যালু হয়তো দারাবে পুর্বের দেড় মিলিয়নের মতো। আর এতে সুদের হার বাড়বে, মর্টগেজের পরিমান বাড়বে ইত্যাদি। অন্যভাবে বললে-যে পরিমান ডলার ইউএস ট্রেজারীতে আছে, তার ভ্যালু আর আগের মতো থাকবে না।

দূর্বল ডলারের মাধ্যমে কম বিদেশী গুডস পাওয়া যাবে। এতে আমদানীর দাম বেড়ে যাবে, আর আমদানীর দাম বেড়ে গেলেই মুদ্রাস্ফিতি হবে। বিপদ হলো-ডলারের মান কমতে থাকলেই ইনভেষ্টররা তাদের হাতে থাকা দীর্ঘ মেয়াদী ট্রেজারী বন্ডগুলি হাত থেকে ছেড়ে দিতে থাকে। স্টক মার্কেটের মতো। কোনো শেয়ারের দাম কমতে থাকলে যেমন প্লেয়াররা শেয়ার ছেড়ে দিতে থাকে যদি অনেক অলস মানি হাতে না থাকে। এটা প্রায় এ রকমের।

এ যাবতকাল তেল এবং অন্যান্য কমোডিটিজ শুধুমাত্র ডলারের মাধ্যমে হবে এটাই ছিলো কন্ট্রাক্ট। ফলে ডলার ভ্যালুর সাথে কমোডিটির প্রাইস ইনভার্স রিলেশনে আবর্তিত হয়। ডলারের দাম বাড়লে কমোডিটির দাম কমে, আর ডলারের দাম কমলে কমোডিটির দাম বেড়ে যায়।

আমদানী-রপ্তানীতে ডলারের এই ফ্লাকচুয়েশনে যারা রপ্তানী মুখী ব্যবসায়ী তাদের লাভ হয়। আর যারা আমদানী নির্ভর ব্যবসায়ী তাদের অনেক ক্ষতি হয়।

এবার আসি, কি কি কারনে ডলার ডিক্লায়েন করতে পারে বা করে

কোনো দেশের কারেন্সী পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে দুটি কারনে ডিক্লায়েন করেঃ

(১)        ধনী ব্যবসায়ীরা সরকারকে ট্যাক্স ফাকি দিয়ে

(২)       অনেক ব্যাংক ডলারে ট্রেডিং করেও ডলার নমিনেটেড এসেটসকে লুকিয়ে ট্যাক্স মওকুফ করে ক্লায়েন্টকে সুবিধা দেয় এবং নিজেরা লাভ করে। শুধু লস করে সরকার। তাতে ব্যাংক বা ক্লায়েন্ট কারো ক্ষতি হয় না।

আর এ কারনে ইউএস সরকার ২০১০ সালে ফরেন একাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স আইন জারী করে যাতে এই দুষ্টু কাজগুলি কোনো ব্যবসায়ী বা ব্যাংক না করতে পারে। আর এর কারনে আমেরিকান অনেক ব্যবসায়ীদেরকে ফরেন ব্যাংকগুলি ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে চায়। যদি এই রকমভাবে ফরেন ব্যাংকগুলি ইউএস কাষ্টোমারকে ছেড়ে দেয় তাহলে ডলার ডিক্লায়েন করবেই। কারন তখন ডলার রোলিং করবে না।

(৩)      ৩য় পয়েন্ট হচ্ছে-যখন ডলারের বিপরীতে অন্য আরেকটি কারেন্সী সমান্তরালভাবে ট্রেডিং কারেন্সী হিসাবে বাজারে চলমান হয়ে যায়, তখন একচ্ছত্র ডলারের আধিপত্য থাকবে না। এরমানে যখন ডলার ১০০% কারেন্সী ট্রেডিং হতো সেটা এখন ১০০% না হয়ে কম পার্সেন্টজী নেমে আসবে। মানে ডলার ডিক্লায়েন করছে। এই বিকল্প কারেন্সী যতো দ্রুত বিকাস ঘটবে ডলার ততো দ্রুত মার্কেট থেকে তার আধিপত্য হারাবে। এরমানে কিন্তু ডি-ডলারাইজেশন না, বা ডলার কলাপ্সড না। শুধু গ্লোবাল মার্কেটে এর আধিপত্য থাকবে না। এতাই এখন হতে যাচ্ছে।

এবার আসি বর্তমানে এই ডলারের অবস্থা কি

প্রায় ৭৯ বছর যাবত চলা গ্লোবাল কারেন্সী ডলার। অন্য কোনো বিকল্প কেউ তৈরী করতে পারে নাই, চেষ্টা করলেও সম্ভব হয় নাই। কিন্তু গত ২০ বছর যাবত আমেরিকা এই ডলারকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে প্রায় ২০টি দেশের রিজার্ভ ব্লক করে দিয়েছে। তাতে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশসমুহ এবং যারা নিষেধাজ্ঞায় পড়ে নাই, তারাও তাদের রিজার্ভ মুদ্রা নিয়ে সংকিত। রিজার্ভ নিয়ে বিভিন্ন দেশসমুহ আমেরিকার একচ্ছত্র ডলারের রিজার্ভ নিয়ে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

চীন বহু আগে থেকেই ডলার রিজার্ভের বিকল্প নিয়ে ভাবছিলো। যেমন চীন ২০১৩ সালে ব্রিটিশ ইনভেষ্টদেরকে ১৪ বিলিয়ব ডলার সমপরিমান তাদের মার্কেটে চীনা কারেন্সীতে ইনভেষ্ট করিয়েছে। চীন ক্রমাগত তার এই প্রকারের ইনভেষ্টমেন্ট বাড়িয়েই চলছে। এর পরিমান এখন প্রায় ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। মজার ব্যাপার হলো-এই ইনভেষ্টমেন্ট সে আরো বাড়াতে পারবে যখন সে ক্রমাগত ইউএস ডলার এর রিজার্ভ বাড়াতে থাকবে। কারন তার বিপরীতে তাদের লোকাল মুদ্রাকে অন্য দেশের ইনভেষ্টদেরকে আকৃষ্ট এবং নিশ্চয়তা বিধান করে করে চীনা মুদ্রায় আটকে ফেলবে। এটা এক দিনে বা ২ বছরে হয়তো হবে না কিন্তু একসময় চীনা মুদ্রা বিকল্প হিসাবে আংশিক হলেও দাঁড়িয়ে যাবে। আরেকটা মজার ব্যাপার হল, চীনাদের কাছেই আমেরিকার ফরেন লোন আছে প্রায় ৩১ ট্রিলিয়ন। আর ফরেন লোন কখনোই কোনো দেশ এমনকি আমেরিকাও গায়ের জোরে ডিফল্ট করতে পারবে না।  এটা পেমেন্ট করতেই হবে।

অনেক দেশই আমেরিকার এই রিজার্ভ আটকে দেয়াকে পছন্দ করছিলো না। এবার ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে রাশিয়া, ইন্ডিয়া, আফ্রিকা, চীন, মিডল ইষ্ট, ইরান, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা ইত্যাদি দেশসমুহ একটা জোট করেছে যে, তারা ডলারের বিপরীতে হয় তাদের লোকাল কারেন্সী অথবা কোন একটা পার্টিকুলার মুদ্রায় ট্রেডিং করতে পারে কিনা। আর সেটা এখন খুব জোড়েসোরে চলছে, যার নাম “ব্রিক্স কারেন্সী” আর সেটা চীনা মুদ্রায়।

একটা সময় আসবে যখন ডলার ছাড়া ৯৭% কোনো ট্রেডিং সম্ভব হতো না, সেখানে ডলারে ট্রেডিং হয়তো নেমে ৫০% এ। এভাবে এই ট্রেডিং এর পার্সেন্টেজ কমতে থাকলে একদিকে ডলার গ্লোবাল কারেন্সী হিসাবে যেমন ডিক্লায়েন করতে থাকবে অন্যদিকে ডলার যে একটা অস্ত্র এটা আর আমেরিকা ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু তাতে যেটা হবে, ডলার হেজিমোনি হারানোর কারনে আমেরিকার অর্থনিতির উপর একটা বড় প্রভাব পড়বে। ইচ্ছে করলেই আমেরিকা আর ফিয়াট কারেন্সীর দোহাই দিয়ে যতো খুশী ডলার প্রিন্ট করতে পারবে না। আর করলেই ডলার আরো ইনফ্লেশনে পড়তে বাধ্য। প্রকৃত সত্য হচ্ছে- বিভিন্ন দেশের রিজার্ভ কারেন্সীকে আমেরিকার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি।  

তাহলে এর প্রভাব ছোট দেশ গুলির উপর কি প্রভাব পড়বে?

ছোট ছোট দেশগুলি যেমন বাংলাদেশ, এদের বিপদ অনেক। তারা তাদের রিজার্ভ যেহেতু খুব স্টং না, ফলে যতোদিন একটা ভায়াবল বিকল্প কারেন্সীর তৈরী না হবে, তারা এই ডলারেই ট্রেডিং করতে হবে। কিন্তু যদি আমাদের মতো দেশগুলি আমেরিকার দ্বারা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কোনো দেশের সাথে ট্রেডিং করতে হয় যেখানে ওইসব দেশ ডলার থেকে বিকল্প কারেন্সীতে ঢোকে যাচ্ছে, তাদের সাথে ট্রেডিং একটা মহাঝামেলার সৃষ্টি হবে। ভায়া হয়ে হয় লোকাল কারেন্সীর মাধ্যমে করতে হবে না হয় সংরক্ষিত ডলারকে হাত ছাড়া করতে হবে। এর জন্য ছোট দেশ গুলির যা করা প্রয়োজনঃ

-উভয় কারেন্সীতেই (ডলার এবং ব্রিক্স) রিজার্ভ রাখা। পারলে ইউরো বা ইয়েন।

-বেশী গোল্ড কিনে রিজার্ভ করা।

-ডলার কারেন্সী ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলা

-দেশীয় পন্য বেশী ব্যবহার করে আমদানী কমিয়ে রপ্তানী বাড়ানো, আর রপ্তানী হতে হবে সেসব দেশে যেখানে বিকল্প কারেন্সী চলে।

-বড় বড় মেগা প্রোজেক্ট হাতে না নেয়া।

-দ্রুততার সাথে ফরেন লোন থেকে আউট হয়ে যাওয়া।

- আইএমএফ থেকে এ অবস্থায় কোনো লোন না নেয়া। কারন আই এম এফ ইউ ডলারড। যদি লোন নিয়েই হয়, সেক্ষেত্রে ইয়েন, রুবল, বা চীনা মুদ্রা যা বিকল্প ব্রিক্স কারেন্সীতে কনভার্টেবল।

এটা সব দেশের জন্য খুব সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশের জন্য। কারন আমাদের বেশীরভাগ মার্কেট হয় ইউরোপ, না হয় পশ্চিমা দেশের সাথে। তাই আমাদের দেশকে এখন এদের বাইরেও দ্রুত নতুন মার্কেট খুজতে হবে। নতুন মার্কেট বলতে ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা, চীন, রাশিয়া, বা এইসব দেশ যেখানে বিকল্প কারেন্সীর প্রচলন হতে যাচ্ছে।

ব্যক্তি পর্যায়ে ডলার ডিক্লায়েনের প্রভাব কিভাবে সামাল দেয়া যায়?

-নিজেদের হার্ড এসেটের পরিমান কমিয়ে লিকুইড এসেটে নিয়ে আসা যাতে দ্রুত এডজাষ্ট করা সম্ভব। কারন হার্ড এসেটকে লিকুইড এসেটে রুপান্তরীত করা অনেক সময়ের ব্যাপার।

-গোল্ড বা অন্য সিকিউরিটিজ যা গ্যারান্টেড সেগুলি কিনে রাখা।

নোটঃ

কেউ যদি এতা বিশ্বাস করে যে, ডলার ডিক্লায়েনের মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনীতি কলাপ্সড করবে সে ভুল ভাবছে। -কারন the dollar would only collapse under extreme economic circumstances. The U.S. economy would essentially have to collapse for the dollar to collapse. While the U.S. economy experiences crashes and recessions, it hasn't had a brush with a complete collapse in modern times. If the U.S. economy were to completely collapse, and the global economy were to restructure itself around a new reserve currency, then the dollar would collapse.

আর বিকল্প কারেন্সী তৈরী হলেও আমেরিকা সেই বিকল্প কারেন্সীতে কখনোই ট্রেডিং করবে না কারন-The United States is the world's best customer. It's the largest export market for many countries. Most of those countries have adopted the dollar as their own currency. Others peg their own currency to the dollar. As a result, they have zero incentive to switch to another currency.

২৭/০৪/২০২৩-ফরেন রিজার্ভ এবং ডি-ডলারাইজেনের মানে কি?

কোনো একটা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের দেশের কারেন্সী বাদে অন্য ফরেন কারেন্সীকে সঞ্চয়ী হিসাবে গচ্ছিত রাখাকেই ফরেন রিজার্ভ বা ফরেন কারেন্সী রিজার্ভ বলে। যেসব মুল কারনে এই ফরেন মুদ্রা তহবিলে রাখতে হয় তার মুল কারন হচ্ছে-দেশের লোকাল মুদ্রার ভ্যালুকে ফিক্সড রেটে রাখা, ক্রাইসিস সময়ে লিকুইডিটি হিসাবে ইনফ্লেশনকে কমানো, বিদেশী ইনভেষ্টরদের নিশ্চিত দান, বৈদেশিক লোন পরিশোধ, আমদানী পেমেন্ট, অপ্রত্যাশিত কোনো বড় বাজেট অন্য কোথাও কাজে লাগানো ইত্যাদি।

এই রিজার্ভ সাধারনত ব্যাংক নোট, ডিপোজিট, বন্ড, ট্রেজারী বিল এবং সরকারী অন্যান্য সিকিউরিটিজের মাধ্যমে রাখা হয়। বেশীর ভাগ রিজার্ভ সাধারনত ইউএস ডলারের মাধ্যমেই গচ্ছিত থাকে কারন বর্তমানে ইউএস ডলারই হচ্ছে সবচেয়ে বেশী গ্রহনযোগ্য গ্লোবাল কারেন্সী। চীনের সবচেয়ে বেশী রিজার্ভ আছে ইউএস ডলারে।

প্রধানত দেশের রপ্তানিকারকেরা এবং ২য়ত শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক রেমিট্যান্স ইত্যাদি  সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক উক্ত ফরেন কারেন্সী রপ্তানীকারক, শ্রমিক কিংবা যারাই ডলার দেশে আনেন তাদেরকে লোকাল কারেন্সীতে প্রদান করে, অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কিনে নেয়।  এভাবেই রিজার্ভ বেড়ে উঠে।

ন্যনুতম সাধারনত তিন থেকে ছয় মাসের আমদানী বিলের গড় এবং প্রায় এক বছরের বৈদেশিক লোন পরিশোধের পরিমান রিজার্ভ থাকলেই মুটামুটি একটা দেশে চলে। তবে যার যতো বেশী রিজার্ভ তাদের দেশের কারেন্সী ততো স্থির। (বর্তমানে চীনের এই রিজার্ভ পরিমান প্রায় ৩২০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যেখানে রাশিয়ার আছে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন) ।

যদি কোনো দেশের রিজার্ভ এতোটাই কমে যায়, বা না থাকে তাহলে সে দেশের অর্থনীতিতে একটা বড় ধরনের ধ্বস নামে। সে দেশে যদি অনেক গোল্ড কিংবা ন্যাচারাল রিসোর্সও থাকে কিন্তু লিকুইড রিজার্ভ সঞ্চয় হিসাবে না থাকে, তাহলেও সেই গোল্ড বা ন্যাচারাল রিসোর্স দিয়ে রিজার্ভের উদ্দেশ্য পুরন করা সম্ভব হয় না।

এবার আসি, ডলার কেনো রিজার্ভ কারেন্সী- নীতিগতভাবে যে কোনো দেশের লোকাল কারেন্সীই হতে পারে এই রিজার্ভের কারেন্সী। কিন্তু তা সম্ভব হয় না এই কারনে যে, সেই লোকাল কারেন্সীতে বিশ্ব ব্যাপি ট্রেড হয় না। গ্লোবাল কারেন্সি হতে হয় সেটা যেটায় সবচেয়ে বেশী ট্রেডিং হয়। বর্তমানে ডলার সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত একটা কারেন্সী বিধায় এটা গ্লোবাল কারেন্সী হিসাবে গন্য হয়, তারপর গন্য হয় ইউরো, এবং ৩য় স্থানে আছে জাপানের ইয়েন।

২০১৯ ৪র্থ কোয়াটারের আইএমএফ এর এক সুত্র অনুযায়ী ৬০% ইউ এস ডলার রিজার্ভ হিসাবে ছিলো।  এর পরেই ছিলো ইউরোর স্থান যা প্রায় ২০%। প্রায় ৯০% ফরেক্স ট্রেডিং ইউ এস ডলারের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। আন্তর্জাতিক ১৮৫ টি মুদ্রার মধ্যে ডলার হচ্ছে একটি। 

১৯৪৪ সালের আগে বেশীরভাগ দেশ গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের মাধ্যমে ট্রেডিং করতো। পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালে (তখনো যুদ্ধ চলছিলো), ৪৪ দেশের ৭৩০ জন ডেলিগেটস আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারর নিউ উডস এর হোটেল বিটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে মনিটরিং সিস্টেমে আনার জন্য মিটিং করে। সেখানে The Breton Woods system required countries to guarantee convertibility of their currencies into U.S. dollars to within 1% of fixed parity rates, with the dollar convertible to gold bullion for foreign governments and central banks at US$35 per troy ounce of fine gold (or 0.88867 gram fine gold per dollar). অর্থাৎ সব দেশের কারেন্সীর এক্সচেঞ্জ রেট গোল্ডে না হয়ে ডলারের উপর করা হবে। সে সময়ে সবচেয়ে বেশী গোল্ড রিজার্ভ ছিলো আমেরিকার। ১৯৭১ সালে এসে বিভিন্ন দেশ তখন গোল্ডের বিপরীতে রাখা ডলার আবার গোল্ড দাবী করলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন গোল্ড এবং ডলারকে আলাদা করে ডলারকে Fiat Currency হিসাবে ডিক্লেয়ার করেন যাতে ডলারকে আর গোল্ডের বিপরীতে ব্যাকিং করতে হবে না। কিন্তু ইতিমধ্যে এই ২৭ বছরে ডলার রিজার্ভ কারেন্সী হিসাবে প্রচলন হয়েই গেছে। (আমি Fiat কারেন্সীর ব্যাপারে এর আগে একবার লিখেছিলাম (Fiat Currency হচ্ছে সেই কারেন্সী যা কোনো কমোডিটি বা গোল্ড দ্বারা ব্যাকড নয়, বরং ইস্যুইং সরকার এটাকে লিগ্যাল টেন্ডারিং হিসাবে গ্যারান্টি দেয়)

যাই হোক যে কারনে এই লেখাটা।

আমরা ইদানিং প্রায়ই একটা কথা শুনে থাকি এবং বলেও থাকি। সেটা হলোঃ ডি-ডলারাইজেশন। এর মানে কি ডলারকে বের করে দেয়া? বা ডলারের দিন শেষ?

ব্যাপারটা এ রকম নয়। এটা যা বুঝায় তা হচ্ছে- ডলার ডিক্লায়েন। মানে ডলার কলাপ্স নয়। ডলারের ডিক্লাইনেশন ইতিমধ্যে শুরু অবশ্যই হয়েছে কিন্তু ডলার কখনোই কলাপ্সড করবে এটা ভাবাও উচিত না। আর সেটা কিভাবে?

২৭/০৪/২০২৩-অসুস্থ্য সমাজ

বয়স হয়ে গেছে প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। অনেক লম্বা সময়।

সেই শিশুকাল, কিশোর কিংবা যৌবনের সময়টা এখনো যেনো খুব পরিষ্কার মনে পড়ে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে স্কুল মাঠ থেকে ঘর্মাক্ত শরীরে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা, কাধের উপর থরে থরে সাজানো বই নিয়ে স্কুলে যাওয়া, বৈশাখী মেলায় হরেক রকমের বাশি বাজিয়ে বাজিয়ে হই হুল্লুর করা, বৃষ্টির দিনে দুরন্ত কিছু বাল্যবন্ধুকে নিয়ে মাঠে ফুটবল খেলা, স্কুলে শিক্ষকদের পড়া না পাড়ার কারনে শাসিত হওয়া, আরো কত কি!! সবকিছু পরিষ্কার মনে আছে।

এই লম্বা সময়ে পরিবারের অনেকের সাথে, পাড়া পড়শী কিংবা জানা অজানা কত বন্ধুবান্ধবদের সাথে অনেকগুলি সময় কাটিয়েছি, কেউ কেউ এর মধ্যে জীবনের সব লেনদেন শেষ করে একে একে ওপারে চলে গেছে, আর সাথে নতুন জীবন নিয়ে আরো অনেক নতুন মুখ আমাদের সাথে যোগ হয়েছে। আমরা যারা আজো বেচে আছি, তারা সেই চলে যাওয়া মানুষগুলির সাথে আর নতুন মানুষদের যোগ হবার মধ্যে একটা সেতু বন্ধন করে আছি। আমরা সেই চলে যাওয়া মানুষগুলির কথা নতুনদের মাঝে আদান প্রদান করলেও তাদের সময়ের চিত্র আজকের দিনের মানুষগুলিকে শতভাগ বুঝানো হয়তো যায় না। কিন্তু আমাদের স্মৃতির পাতায় সেগুলি এখনো উজ্জ্বল হয়ে রয়ে গেছে। আমরাও একদিন তাদের মতো চলে যাবো, আর আজকের নতুন যোগ দেয়া মানুষগুলিও সেই একই সেতু বন্ধনের মতো কাজ করে আগত নতুন মুখগুলির সাথে একটা ব্রীজ তৈরী করবে। এভাবে ক্রমাগত একটা সাইকেল চলবে।

এরমধ্যে যুগ পালটে যাচ্ছে, এই যুগের মানুষগুলির সাথে সেই যুগের মানুষগুলির মধ্যে অনেক ফারাক হয়ে গেছে। সন্ধায় এখন আর আড্ডা বসে না, মাঠে আর বড়রা গোল হয়ে বসে তাস খেলে না, ছোট ছোট পোলাপানেরা এখন আর ডাংগুলি খেলে না, মেয়েরা এখন আর দলবেধে কলশী কাখে নিয়ে নদী থেকে ভিজা কাপড়ে জল তুলে আনে না, রাখালেরা এখন আর সেই ভাটিয়ালী গান গেয়ে গেয়ে বাড়ি ফেরে না। এখন সবাই সবাইকে নিয়ে একা একাই সময় কাটাতে পছন্দ করে। ফোনের ভিতরে চলে গেছে আজকের দিনের মানুষগুলির জীবন। যে জরুরী খবরটা মাসীকে দেয়ার জন্য, কিংবা জরুরী কাজের নিমিত্তে কাউকে হাট বাজার থেকে ডেকে আনার জন্য রোদ পেড়িয়ে মাইলের পর মেইল হেটে গিয়ে কাজটা করতে হতো, সেটা আর এখন দরকার পড়ে না। শুধু একটা মিসকল দিলেই কিংবা মেসেজ ঠুকে দিলেই সব যেনো হয়ে যাচ্ছে। এতো কিছু থাকতেও আমরা আজকে জেনারেশন থেকে জেনারসনে ডিসকানেক্টেড হয়ে যাচ্ছি। অথচ আরো বেশী কানেক্টেড থাকার কথা ছিলো।

সবাই ক্লান্ত এখন। সবাই অসুস্থ্য বোধ করে এখন। বড়রা ক্লান্ত, ছোটরা ক্লান্ত, মালিকেরা ক্লান্ত, শ্রমিকেরা ক্লান্ত, রোগীরা ক্লান্ত, ডাক্তাররা ক্লান্ত, ছাত্ররা ক্লান্ত, শিক্ষকরাও ক্লান্ত। ঘরে স্ত্রী ক্লান্ত, স্বামীও ক্লান্ত, কাজের বুয়া শুধু আজো ক্লান্ত নয়। হয়তো সেও কয়েকদিন পর ক্লান্ত হয়ে যাবে। পোষ্টম্যান বেকার, পোষ্টমাষ্টার বেকার, অথচ তাদের কারোরই সময় নাই হাতে। সবাই ব্যস্ত।  ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত, বাবা মায়েরাও ব্যস্ত, আত্তীয় স্বজনেরা ব্যস্ত, বন্ধুবান্ধবেরাও ব্যস্ত অথচ সারাদিন কিংবা বেশীরভাগ সময় তারা একই জায়গায় থাকে। ছাত্ররা প্রচুর পড়াশুনা করে কিন্তু বই পড়ে না। প্রচুর লেখালেখি করে কিন্তু বই আকারে প্রকাশ হয় না। সমাজ নিয়ে অনেক গবেষনা করে কিন্তু কোনো আবিষ্কার হাতে আসে না।  

একটা অসুস্থ্য সমাজ গড়ে উঠছে প্রতিদিন। মায়া মহব্বতবিহীন, দায়িত্ববিহীন এবং একাকীত্ব জীবন সমৃদ্ধ একটা সমাজ গড়ে উঠছে দ্রুত। আর এই অসুস্থ্য সমাজের মধ্যে আমরাও নেতিয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত কম্প্রোমাইজ আর এডজাষ্টমেন্ট করতে করতে।

২৬/০৪/২০২৩-ইউরোপ অথবা রাশিয়া কি আবার একত্রে মিলিত হতে পারে?

প্রকৃত সত্যটা হলো যে, রাশিয়া সব সময়ই ইউরোপেরই একটি অংশ এবং সে একটি ইউরোপিয়ান কান্ট্রিই বটে। বিগত কয়েক বছর আগে ক্রিমিয়া আর ডোনবাসকে নিজের পরিসীমায় নিয়ে আসায় রাশিয়া ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বটে কিন্তু রাশিয়া কখনো নন-ইউরোপিয়ান কান্ট্রি ছিলো না। আমেরিকা সর্বদাই চেয়েছে যেনো রাশিয়াকে একঘরে করা যায় কিভাবে। ক্রিমিয়া বা ডোনবাসকে নিয়ে আমেরিকা ২০১৪ সালের রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যেনো একটা ভালো প্রতিশোধ নিতে পেরেছে।

যেভাবেই যে কেউ ভাবুক না কেনো, রাশিয়া এবং ইউরোপ এক সময় না এক সময় আবার রি-ইউনাইটেড হবেই। এটাই চিরসত্য কথা। কারন তারা একে অপরের প্রতিবেশী। ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং জীবন মাত্রার স্টাইল ঘাটলে দেখা যাবে যে, রাশিয়ানরা আসলে (বিশেষ করে অর্থোডোক্স এবং ইথনিক রাশিয়ান এমন কি মুসলিম সুন্নী টাটারস) তারা সবাই ইউরোপিয়ান। রাশিয়ান স্টুডেন্ট, সংস্ক্রিতিক ফিগার, আর্টিস্টস, বৈজ্ঞানিক, স্কলার্স, এমন কি অফিশিয়ালস সবার কাছেই ইউরোপের মডেল একটা পছন্দনীয় ব্যাপার। রাশিয়ান ভাষা ব্যবহার করে এমন অনেক রাশিয়ানরা ইউরোপে সেটেল্ড, মিক্সড ম্যারেজ, এমন কি বাই-কালচার সবচেয়ে বেশী দেখা যায় এদের ইউরোপে। সেন্ট্রাল এবং পূর্ব ইউরোপের মানুষদের সাথে রাশিয়ানদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না। সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায় যে, রাশিয়া আসলে ইউরোপের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা কোনো চয়েজ না, এটা ডেস্টিনি। ডেস্টিনিকে কেউ চয়েজ করে নিতে পারে না, এটা ঘটেই। অন্যদিকে যদি দেখি-রাশিয়ার অর্থনীতি আসলে ইউরোপিয়ান বেজড। ইউক্রেন যুদ্ধ এই প্যারামিটার পশ্চিমারা বর্তমানে বিধ্বস্ত করেছে বটে এবং এর ফলে রাশিয়া বিকল্প হিসাবে সে ইউরোপকে কিছুটা ছেড়ে দিলেও ইউরোপ রাশিয়াকে কোনোভাবেই ছাড়তে পারবে না। রাশিয়া ইউরোপের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং পাওয়ারফুল দেশ এটা দ্রুব সত্য। এটাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার পথ নাই। এমন একটা প্রতিবেশীকে বেশীদিন এড়িয়ে চলা সম্ভব না।পক্ষান্তরে, রাশিয়াকে ইউরোপের বেশী প্রয়োজন, যতোটা না ইউরোপকে রাশিয়ার প্রয়োজন। বর্তমানে রাশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে যে বৈরিতা, সেটার সিংহভাগ দায়ী আসলে ইউরোপ নিজে। এজন্য ইউরোপকে আরো বেশী সতর্ক থাকার দরকার ছিলো। কেউ এই ইউরোপকে তাদের ভেসেল হিসাবে ব্যবহার করার চেষতা করছে, এটা ইউরোপের অনেক লিডারগন এখনো বুঝতে অক্ষম। আজ থেকে ২০/৩০ বছর আগে তো ইউক্রেন যুদ্ধ ছিলো না, তাহলে তখনই রাশিয়াকে ইউরোপিয়ান ব্লকে আনা হয় নাই কেনো? রাশিয়া তো নিজেই ইউরোপের সাথে কিংবা ন্যাটোতে যোগ দিতে চেয়েছিলো। তাকে তখন নেয়া হয় নাই কেনো? তখন কোনো ব্রেক্সিট ছিলো না, ইউরোজোনেও কোনো মন্দা ছিলো না, ইউরোপে তখন রাইট উইং রাজনীতিও ছিলো না।  তাহলে রাশিয়াকে ন্যাটোতে কিংবা ইউরোপ ব্লকে নিতে এতো অসুবিধা ছিলো কোথায়? ইউরোপের সাথে মিলিতি হয়ে রাশিয়া গ্লোবাল পলিটিক্সে একটা পাওয়ারফুল একটর হতে পারতো। এর একটাই উত্তর- আমেরিকা চায় নি রাশিয়ার মতো একটা দেশ এই ব্লকে আসুক যেখানে আমেরিকা তখন একচ্ছত্র মোড়লগিড়ি করতে পারবে না। ইউরোপে থেকে ইউরোপকে ছাড়া রাশিয়া যেমন ওই অঞ্চলে একটা পাওয়ারফুল জায়ান্ট হতে পারবে না, তেমনি, রাশিয়াকে ছাড়াও ইউরোপ কখনোই ওই অঞ্চলে আর্থিক দিক দিয়ে উন্নতি তথা শক্তিশালী হতে পারবে না। ইউরোপের যে কয়টি দেশ নিউক্লিয়ার শক্তিধর, তাদের মধ্যে শুধু নয়, গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশী পারমানবিক শক্তিধর দেশ রাশিয়া। রাশিয়া একটি ভেটো পাওয়ারের অধিকারী, ইউএন এর স্থায়ী মেম্বার, তার অজস্র রিসোর্স, গ্যাস, কয়লা, তেল, লোহা, ফার্টিলাইজার, খাদিশস্য সবকিছুতেই রাশিয়া সবার থেকে উপরে। এমন একটা দেশকে এড়িয়ে চলা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়, অন্তত প্রতিবেশীদের। আমেরিকা এড়িয়ে চলতে পারবে, ইউকে পারবে, কানাডা পারবে কারন তারা অনেক দূরের দেশ এবং তাদের নিজ নিজ প্রাকৃতিক রিসোর্সও কম নাই। কিন্তু ইউরোপ সবসময় রাশিয়ার সস্তা রিসোর্সের উপর দাড়িয়েই তাদের অর্থনীতিকে চাংগা করেছে এবং করছে।

রাশিয়া বর্তমানে যতোই এশিয়া ঘেষা হোক, তারা কখনোই এশিয়ার সাথে এতোটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে নাই। সোভিয়েট আমলে কিছুটা কালচারাল দিক থেকে এশিয়ার সাথে কাছাকাছি এলেও অন্য সব কিছুতেই তারা এশিয়া থেকে অনেক দূরের প্রতিবেশীই ছিলো। আর বর্তমান জেনারেশন তো আরো বহুদূরে। এশিয়ান মানসিকতা একেবারেই নাই।

তাহলে এখন যে প্রশ্নটা আসে, সেটা হলো, ইউরোপ নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে কেনো? উত্তরটা একেবারেই কঠিন নয়। দুই তিন দশক আগের ইউরোপ আর আজকের সেই ইউরোপ, একেবারেই এক না। আর সেই ইউরোপকে আর ফিরিয়েও আনা যাবে না। ইউরোপের লিডারশীপে একটা বিশাল অপরিপক্কতার ছোয়া লেগে গেছে। বেশীরভাগ লিদাররা হয় ইয়াং মেয়ে এবং এদের পরিপক্কতাই এখনো আসে নাই। এরা এই বিংশ শতাব্দীতে বসে একবিংশ শতাব্দীর সমস্যা বুঝতে অক্ষম। তারা ইউরোপিয়ান স্টাইল থেকে বেরিয়ে গিয়ে পাশ্চাত্যের ধারায় ডুবে যেতে চাচ্ছে যা কোনোভাবেই ইউরোপিয়ান ভ্যালুতে যায় না। এদের অনেকেই ১ম কিংবা ২য় মহাযুদ্ধ দেখে নাই। যুদ্ধের পর ভংগুর অর্থনিতির পরিস্থিতিতে পড়ে নাই। ইউরোপের যে একটা স্তাইল আছে নিজস্ব, সেটা বর্তমান ইউরোপের নেতারাই তা জানেন না। তারা নিজেরাই ইউরোপকে বিশ্বাস করে না, তাহলে অন্য কেউ কেনো ইউরোপকে ব্যবহার করবে না?

এখন যে প্রশ্নটা মনে জাগে সেটা হলো, তাহলে রাশিয়া কিভাবে পুনরায় ইউরোপে কিংবা ইউরোপ কিভাবে রাশিয়ার কাছে ফিরে যাবে? এটাও কোনো কঠিন উত্তর নয়।

রাশিয়া এখন এশিয়ার নৌকায় উঠে যাচ্ছে যাকে বলা যেতে পারে স্প্রিংবোট। চীন, ইন্ডিয়া এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশ মিলে যখন রাশিয়া একটা গ্রেটার ইউরেশিয়ান জোট তৈরী করে ফেলতে পারবে, তখন রাশিয়া খুব সহজেই ব্রাসেলসের সাথে একটা নতুন বারগেনিং পজিশনে বসতে পারবে। ঐ সময়ে রাশিয়া নয়, ইউরোপ চাইবে যেনো সে আবার রাশিয়ার সাথে একত্রিত হতে পারে।

২৪/০৪/২০২৩-ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের সর্বশেষ ইমপ্যাক্ট কি কি হতে পারে

ডি-ডলারাইজেসন, ডি-ইন্ডাস্ট্রিলাইজেশন, এলায়েন্স, জোট, পোলারিটি, রুলস বেজড অর্ডার ইত্যাদির বাইরে আর কি কি ইমপ্যাক্ট হতে পারে?

(ক)       ওয়েষ্টার্ন ইউরোপ, বাল্টিক ন্যাশন এবং ইষ্ট ইউরোপিয়ান দেশ সমুহ ক্লিয়ার বুঝে গেছে যে, তারা তাদের নিজেদেরকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম। ফলে তারা ন্যাটো এবং আমেরিকার শরনাপন্ন ছাড়া কোনো গতি নাই। তাছাড়া ফ্রান্সের ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিলিটারী ক্যাপাবিলিটি এটাই প্রমান করে দিয়েছে যে তারা অসফল এবং ভবিষ্যতে সফলতা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। প্রতিটি দেশের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য তাদেরকেই ব্যবস্থা করতে হবে। ন্যাটো একটা জোট বটে কিন্তু তাদের ক্ষমতা এবং সমন্নয় যে খুব একটা শক্তিশালী মেকানিজম নয় সেটা এবার পরীক্ষিত।

(খ) জার্মানীর ডিফেন্স সিস্টেমও দূর্বল এবং তাদেরকেও তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরী করা খুবই দরকার। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের ডিফেন্স বাজেট যেভাবে এলোকেট করা হচ্ছে তাতে অনেক দীর্ঘ সময় লাগবে ভায়াবল ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তুলতে।

(ঘ)        রাশিয়ার মিলিটারী ক্ষমতারও একটা পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। কালেক্টিভ ওয়েষ্ট বা ন্যাটোর সম্মিলিত জোটের বিরুদ্ধে রাশিয়া একা অপারগ। ফলে তাকে অন্য এলি যেমন ইরান, চীন এর কাছে সাহাজ্য নিতেই হবে। এতে রাশিয়ার সাথে ইরান এবং চীন দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্দধুত্তের গন্ডিতে থাকতেই হবে।

(চ)        মধ্যপ্রাচ্যে যে বদলটা হচ্ছে তা ভাবার বিষয়। যেমন ইউক্রেনের যুদ্ধের কারনে রাশিয়ার সাথে ইরানের খুব সখ্যতা তৈরী হয়েছে বিশেষ করে ড্রোন সাপ্লাই নিয়ে। এক সময় রাশিয়া, চীন, আমেরিকা, ব্রিটেইন সবাই ইরানের পারমানবিক শক্তিধর দেশ হোক এটা কেউ চায় নাই। কিন্তু এই ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে ইরান সেই সুযোগ হাতছাড়া করবে না বরং সে রাশিয়ার কাছ থেকে পারমানবিক ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য যা সাহাজ্য লাগে তা গ্রহন করবে। মিশরের অবস্থাও তাই। সে পাশ্চাত্য থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার একটা ছুতা পাবে এবং রাশিয়ার দিকে কিছুটা ঝুকে যাবে।

(ছ)        এশিয়া যদিও ইউক্রেন থেকে অনেক দূরে অবস্থিত কিন্তু এই যুদ্ধ রাশিয়াকে এশিয়ার কাছাকাছি নিয়ে এসছে যেখানে চীন অনেকটা দৃঢ় ভাবে স্বীকার করছে যে, রাশিয়া থাকুক এশিয়ান পাওয়ার পলিটিক্সে। কারন চীন যে এশিয়ার একটা জায়ান্ট সেখানে রাশিয়া তার সহযোগী। অন্যদিকে জাপান, সাউথ কোরিয়া, ফিলিপাইন এবং অষ্ট্রলিয়াকে আমেরিকার আরো কাছাকাছি নিয়ে এসছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে-ইন্ডিয়া প্রায় ডুয়েল রোল প্লে করছে এই জন্য যে, সে কোয়াডেও আছে, ব্রিক্স এও আছে আবার রাশিয়ার সাথেও আছে।

(জ)       এবার আসি আমেরিকার ব্যাপারে। ইউক্রেন যুদ্ধটা আমেরিকার পলিটিক্সে বিশাল একটা বিভেদ তৈরী করেছে। রিপাব্লিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে একটা বাই-পার্টিজান তৈরী হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ আমেরিকার ফরেন পলিসিকে একটা অনিরপেক্ষ সেকশনে পরিনত করেছে এভাবে যে, ফরেন পলিসি এখন প্রায় বাইডেন-ব্লিংকেন-সুলিভান পলিসি মনে করা হয়। এটা দেশের জন্য কতটা প্রয়োজন সেটা আর বিবেচ্য মনে হয়না।  এই অবস্থায় আমেরিকা যদি শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের জন্য আর সাহাজ্যকারী না হয় তাহলে রাশিয়া ভেবেই নিবে যে, সে পারে। আর এই পারা থেকে রাশিয়া যদি জর্জিয়া, মলদোবা, ইস্তোনিয়া, অথবা লাটভিয়ায় মিলিটারী অপারেশন চালায় তাতে আসচশ্চর্য হবার কিছু নাই। রাশিয়া কারন একই দেখাবে যে, সে রাশিয়ার নিরাপত্তা নিসচিত করছে।

(ট)        সবেচেয়ে বড় ইমপ্যাক্ট-ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকার উদ্দেশ্য রাশিয়াকে দূর্বল করা বটে কিন্তু ইউরোপকে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল করে তোলা। এতে এই ম্যাসেজ দেয়া যে, আগামী ভবিষ্যত রাজনীতি শুধু দুটু দেশকে নিয়েই আবর্তিত হবে- (১) আমেরিকা (২) চীন। কারন এই যুদ্ধ এটাই প্রমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, রাশিয়া এবং ইউরোপ কোনোভাবেই সামরিক দিক থেকে দক্ষ এবং ক্যাপাবল নয়। ফলে ৩০ বছর পর এই বিশ্ব আবার মাল্টিপোলারিটিতে নয়, বাই-পোলারিটিতে ফিরে যেতে পারে। আর সেটা চীন এবং আমেরিকা।

(ঠ)        এর বিপরীতে আরেকটি সম্ভাবনা আছে যে, যখন ইউরোপ, রাশিয়া তাদের মাথায় এটা আসবে যে, তারাও উপেক্ষিত এবং কন্ট্রোল্ড, তখন ইউরোপ এবং রাশিয়া একত্রিত হয়ে যেতে পারে। তখন ন্যাটোর বিলুপ্তি ঠেকানো কঠিন। হয়তো তখনই ঘটবে মাল্টিপোলারিটি।

২৩/০৪/২০২৩-ইউক্রেন এক্সিট প্ল্যান

অনেকগুলি অপারেশন দেখলাম আমার এই ছোট্ট জীবনে। সামরিক বাহিনীতে চাকুরী করার সুবাদে কিছুটা মিলিটারী ট্যাক্টিক্স বুঝতে সুবিধা হয় বলে আমি প্রতিনিয়ত আশেপাশের যুদ্ধাবস্থার খবরাখবর রাখতে পছন্দ করি। কাউকেই আমি যুদ্ধের ব্যাপারে সাপোর্ট করিনা। যুদ্ধ একটা ধ্বংসাত্মক ব্যাপার, জানমালের বিনাসের ব্যাপার। তারপরেও সময়ে সময়ে অহরহ কেউ কেউ যুদ্ধ করেই যাচ্ছে। আর সমকালীন সময়ে সবচেয়ে বেশী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে আমেরিকা নিজে।

আমেরিকার যুদ্ধের মারাত্মক নেগেটিভ সাইড হচ্ছে-তারা যুদ্ধ শুরু করতে খুবই পারদর্শী কিন্তু এক্সিট প্ল্যানে নয়। অথবা তাদের এক্সিট প্ল্যান থাকে না। সেটাই আমরা দেখেছি, ভিয়েতনাম, আফগানিস্থান, ইরাক ইত্যাদির বেলায়। সেক্ষেত্রে আমার এখন আরেকটা প্রশ্ন জাগছে- ইউক্রেনের বেলায় কি আমেরিকার কোনো এক্সিট প্ল্যান আছে যদি করতেই হয়?

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রায় ১ বছরের বেশী পার হয়ে গেছে আর এটা এখনো সেমি-স্ট্যালমেটেড অবস্থায়। দুপক্ষই তাদের দাবীতে অনড়। ইউক্রেন এই যুদ্ধে পশ্চিমাদের থেকে প্রায় শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রের সাহাজ্যে তাদের দেশকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা এবং ইউরোপিয়ানদের সরাসরি সাহাজ্য ছাড়া ইউক্রেনের পক্ষে এই যুদ্ধ চালানো কিছুতেই সম্ভব না। এই অবস্থায় একটা বিরাট প্রশ্ন জাগছে- রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কি Forever War Territory তে পদার্পন করছে? ৯/১১ পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে বা আফগানিস্থানে যুগের পর যুগ আমেরিকা যুদ্ধ চালিয়ে গেছে, আর সেটার কারন অনেক। কখনো রিসোর্স, কখনো জিওপলিটিক্যাল, কখনো ওয়ার্ল্ড ডমিন্যান্স ইত্যাদি। কিন্তু ইউক্রেনের সাথে সেসব দেশের যুদ্ধের একটা পার্থক্য আছে-আর সেটা হলো-ইউক্রেনে আমেরিকার কোনো সৈন্য গ্রাউন্ডে নাই যা ইরাক বা আফগানিস্থানে ছিলো। 

প্রকৃত সত্য হচ্ছে- রাশিয়ার সাথে আমেরিকার জন্ম জন্মান্তরে শত্রুতা। এই শত্রুতার মাঝে ইউক্রেন হচ্ছে একটা ক্যাটালিস্ট। ফলে আমেরিকা যতো এগুবে, রাশিয়াও ততো এগুবে। এর শেষ হবার কথা নয়। ফলে ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির ঐতিহাসিক মিকাইল কিমাগের মতে- “This is going to be the mother of all forever wars, because of the nature of the adversary.”

৯/১১ পরবর্তীতে আল কায়েদার বিপরীতে যুদ্ধ ঘোষনা করে শেষ অবধি এটাকে ওয়ার অন টেরোরিজমে নিয়ে গিয়েছিলো আমেরিকা যা অদ্যাবধি চলছে। ইরাকেও তাই। প্রথমে ওইপন অফ মাস ডিস্ট্রাকশন, রিজিম চেঞ্জ, ন্যাশন বিল্ডিং, ইরানিয়ান ইনফ্লুয়েন্সকে কাউন্টার করা, অতঃপর আইএসআইএস এর বিপরীতে সৈন্য রাখা। এইম সব সময় বদলে গেছে শুধুমাত্র সামরিক উপস্থিতিকে জারী রাখার জন্য।

কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য কোথায় আমেরিকার? আমেরিকা না ইউরোপের কোনো দেশ, না সে এই অঞ্চলের কেউ। ফলে এখানে যেটা বলা হচ্ছে তা হচ্ছে- যুদ্ধটা গুড ভার্সাস ইভিল, ডেমোক্রেসি ভার্সাস অটোক্রেসি এই আইডলোজিতে।  টপ লেবেলের অফিশিয়ালগন একেকজন একেকবার একেক রকমের কারন দেখাচ্ছেন। বাইডেন প্রশাসন বলছেন-এটা এমন একটা কারন যাতে কেউ আর আগ্রাসি মনোভাবে অন্য কোনো দেশে মিলিটারী অপারেশন চালাতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা। ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ড বলেছেন- এটা করা হচ্ছে যাতে আমাদের সন্তানেরা এবং গ্রান্ড সন্তানেরা ইনহেরেন্ট করে এবং শিখে আমাদের কাছ থেকে। আর এভাবেই পাসচাত্যের এজেন্ডা একেকবার একেকদিকে শিফট হচ্ছে। এই রকম আইডলজিক্যাল শিফটের মধ্যে কোনো যুদ্ধ জয় করা সহজ নয়। ফলে যুদ্ধটা শেষ না হয়ে লম্বা সময়ের জন্য চলতেই থাকবে। প্রতিমাসে ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ লাগছে ইউক্রেন যুদ্ধে। আর এসব সরবরাহ করতে হচ্ছে ইউরোপিয়ান, আইএমএফ এবং আমেরিকাকে। রি-কন্সট্রাক্সন তো আরো অনেক খরচের ব্যাপার যদি যুদ্ধ থেমেও যায়। রাশিয়া এই যুদ্ধকে ইউক্রেন ভার্সেস রাশিয়া মনে করে না। সে মনে করে কালেক্টিভ ওয়েষ্ট, ন্যাটো ভার্সেস রাশিয়া। ফলে সে পিছুবে না। অন্যদিকে আমেরিকাও পিছু হটতে চাইবে না।

কিন্তু এর মধ্যে দুনিয়ার অনেক কিছু পালটে যাচ্ছে, পালটে যাচ্ছে জোট, পালটে যাচ্ছে ইকোনমি, পালটে যাচ্ছে কারেন্সী, পালটে যাচ্ছে শত্রু থেকে মিত্র আর মিত্র থেকে শত্রুতা। ইউরোপ ধীরে ধীরে ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনে পড়ে যাচ্ছে, ইকোনোমি দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। যখন আর পেরে উঠবে না, তখন হয়তো একসময় ইউরোপ নিজেই সস্তা গ্যাস আর তেলের জন্য পুনরায় প্রতিবেশী রাশিয়ার দারস্থ হতে হবে মনে হচ্ছে। আমেরিকার সাথে জোট ধীরে ধীরে লুজ হয়ে গেলে শেষ অবধি হয়তো কালেক্টিভ ওয়েষ্ট বাধ্যই হবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাবার।

সেক্ষেত্রে আমেরিকা কোন পদ্ধতিতে এই ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে এক্সিট করবে? সেটাই এখন দেখার ব্যাপার।

২৩/০৪/২০২৩-দুই ফ্রন্টে আমেরিকার যুদ্ধ কি সঠিক?

বর্তমানে ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার সাথে এবং তাইওয়ান ঘিরে চীনের সাথে আমেরিকা ভালো রকমের একটা কোন্দলে জড়িয়ে গেছে। চীন, রাশিয়া এবং আমেরিকা তিনটেই সুপার পাওয়ার এবং তিনটেই ভেটো ক্ষমতার অধিকারি, তিনটেই নিউক্লিয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ। রাশিয়া ইউরোপের জোনে, চীন এশিয়া প্যাসিফিক জোনে। আলাদা আলাদা জোন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-একই সময়ে, একই সাথে দুইটি ভিন্ন জোনে দুইটি সুপার পাওয়ারের সাথে আমেরিকার কি দুইটা ফ্রন্ট খোলা উচিত?
আমার মতে, দুই ফ্রন্টে আমেরিকা হয়তো একই সাথে রাশিয়া এবং চীনকে কন্টেইন করবে না, কিন্তু পরিস্থিতির কারনে এটা আবার ফেলেও দেয়া যায় না। স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে একচ্ছত্র ইউনিপোলারিটির কারনে আমেরিকা তার সাথে ইউকে এবং কানাডা সহযোগী হিসাবে মনে করে বিশ্বের তাবত দেশের গনতন্ত্র, সাইবার ক্যাপাবিলিটি, আন্তর্জাতিক সমুদ্র, আকাশ কিংবা মহাকাশ এমন কি প্রতিটি দেশের সার্বোভৌমত্ব রক্ষা তাদের দায়িত্ব। আর এ জন্য সে “রুলস বেজড অর্ডার” এর প্রচলন করেছে অর্থাৎ আমেরিকা পরিস্থিতি বিবেচনা করে রুলস দিয়ে দেবে আর অন্য সবাই সেই রুলস অনুসরন করে তাদের দেশের পলিসিসমুহ এডজাষ্ট করে ইন্টারনাল ফরেন পলিসি করে দেশের শাসনভার পরিচালনা করবে। সেই রুলস বেজড অর্ডারের কেউ বাইরে গেলে হয় সে আমেরিকার শত্রু অথবা সেখানে গনতন্ত্র অনুসরন করছে না এই কারনে আমেরিকা তাকে যা খুশি যেমন নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ, এমন কি আক্রমন পর্যন্ত করতে পারে। এটাই ছিলো এ যাবত কালের কৃষ্টি। আমেরিকার নিজস্ব রুলসের মাধ্যমে অন্য দেশসমুহকে এভাবেই তারা নিয়ন্ত্রন করেছে এবং করছে বলে বর্তমান বিভিন্ন দেশসমুহ বিবেচনা করছে।
যাই হোক যেটা বলছিলাম, দুই ফ্রন্টে দুই পরাশক্তিকে কন্টেইন করা। আমার মতে এটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এখানে আসলে বাহ্যিক দৃষ্টিতে দুটু ফ্রন্ট দেখা গেলেও এটা শুধু দুইটা ফ্রন্ট না, এখানে রাশিয়া এবং চীন সরাসরি দুইটা ফ্রন্ট দেখা যায়, আরো অনেক অদৃশ্য ফ্রন্ট রয়েছে, যেমন আফ্রিকান ফ্রন্ট, মিডল ইষ্ট ফ্রন্ট, নর্থ কোরিয়া, ইরান কিংবা ইন্ডিয়ান ফ্রন্ট। এই অদৃশ্য ফ্রন্টগুলি হয়তো সামরিক নয়, কিন্তু সেগুলি অবশ্যই ইকোনোমিক, বাই-লেটারেল এবং ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে মারাত্মক ভূমিকা রাখে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এরা সামষ্টিকভাবে আমেরিকার জন্য বিপদজনক হতে পারে।
সামরিক শক্তির বিন্যাস যদি আমরা একটু দেখি, তাহলে দেখবো যে,
আমেরিকার সামরিক শক্তি যেভাবে তারা বিন্যাস করেছে তাতে বিশ্বমোড়ল গিড়ির জন্য একচ্ছত্র সামরিক পেশী সে নয়। ন্যাটো দিয়ে হয়তো কিছুটা আম্ব্রেলা করা গেছে বটে কিন্তু গত ২০ বছরে আমেরিকা যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপের অন্যান্য দেশ কিংবা আফ্রিকান দেশসমুহে তাদের ফোর্সকে ব্যবহার করেছে, তাতে আমেরিকার সামরিক শক্তি অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে যেখানে রাশিয়া এবং চীন বিগত কয়েক দশকে তাদের বাজেটের একটা বেশ বড় অংশ ডিফেন্স বাজেটে ক্রমাগত যুক্ত তো করেছেই উপরন্ত তারা কোথাও নতুন কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তারা তাদের সামরিক সক্ষমতাকে লস করে নাই। আর এসব তারা প্রিজার্ভ করেছে শুধুমাত্র আমেরিকাকে মোকাবেলা করার জন্যই। এটা আমেরিকার জন্য বিরাট ভয়ের ব্যাপার।
চীন শীপ বিল্ডিং প্রোগ্রাম এমনভাবে চলমান রেখেছে যে, আমেরিকার নেভী শীপ থেকে চীনের সংখ্যা অনেক অনেক বেশী। চীনের হার্ডপাওয়ারের পরিসংখ্যানে আগামী দিনগুলিতে চীন মিলিটারী গ্লোবাল ব্যালেন্স শিফটিং এ লিড করতে পারে এমন ভাবেই সে তার ডিফেন্স ক্যাপাবিলিটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
যদি রাশিয়ার কথা বলি, আমেরিকার অনেক অস্ত্র রাশিয়ার অস্ত্রের থেকে বেশী কার্যকর বলে ধারনা করা হয়। কিন্তু রাশিয়ার অনেক কিছুতেই সিলেক্টিভ এডভান্টেজ রয়েছে আমেরিকার উপর। যেমন, আমেরিকার ৬০০০ ট্যাংক আছে কিন্তু রাশিয়ার আছে ১২০০০। রাশিয়ার ট্যাক্টিক্যাল নিউক্লিয়ার ক্যাপাবিলিটি আমেরিকার থেকে প্রায় কয়েকগুন বেশী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমেরিকার অস্ত্রশস্ত্রের কার্যকর ক্ষমতার এডভান্টেজ থাকলেও এদের সংখ্যাতাত্তিক ইনভেন্টরি এতোই কম যে, আমেরিকার পক্ষে কোনোভাবেই মাল্টিফ্রন্টে নিজেদেরকে এনগেজ করা সম্ভব না।
একটা উদাহরন দেই-আমেরিকাকে যদি রাশিয়াকে কন্টেইন করতে হয়, তাহলে ইষ্টার্ন ইউরোপিয়ান ফ্রন্টে তার মিলিটারী ইউকুইপমেন্ট এবং জনবল মোতায়েন করতে হবে। আর এটা করতে হলে আমেরিকাকে অন্য রিজিয়ন থেকে (যেমন ওয়েষ্ট প্যাসিফিক) এসব ফোর্সকে তুলে আনতে হবে। আর যদি ওয়েষ্ট প্যাসিফিক থেকে অস্ত্রশস্ত্র এবং জনবল অন্যত্র শিফট করতে হয় তাহলে চীনকে আর কন্টেইন করা সম্ভব না। যদি আমেরিকাকে আসলেই ২টা ফ্রন্টে একসাথে ২টা পরাশক্তিকে কন্টেইন করতে হয়, তাহলে বিমান বাহিনীর পাশাপাশি-
(ক) কমপক্ষে ৫০টি ব্রিগেড কম্বেট টিম লাগবে যা বর্তমানে ওদের আছে ৩১টি ব্রিগেড কম্বেট টিম।
(খ) অন্তত ৪০০ টি নেভী ব্যাটল শীপ দরকার যা বর্তমানে আছে ২৯৭ টি
(গ) এ ছাড়া অন্যান্য সুবিধাবাদী শত্রুদেরকেও আমেরিকাকে কন্টেইন করতে হবে-যেমন ইরান, নর্থ কোরিয়া ইত্যাদি। এর জন্যেও আলাদা করে আরো সামরিক শক্তি রিজার্ভ এবং মোতায়েন রাখতে হবে।
উপরের সবকিছু বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, খুব দ্রুতই আমেরিকার পক্ষে একের অধিক দুইটা ফ্রন্টে একই সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সম্ভব না বা উচিত না। মাল্টিফ্রন্টে যেতে হলে প্রতি বছর আমেরিকাকে তার বাজেটের ৪০% বাজেট আলাদা করে ডিফেন্স ফোর্সকে বন্টন আবশ্যিক। কিন্তু ৪০% বাজেট ডিফেন্স ফোর্সকে দিতে হলে যে পরিমান ট্যাক্স রেভিনিউ সংগ্রহের প্রয়োজন, তাতে সাধারন নাগরকদের উপর বাড়তি চাপ পড়বে, নিত্য নৈমিত্তিক পন্যের দাম বেড়ে যাবে, লিভিং কষ্ট বাড়বে। তাতে জনসাধারনের ক্ষোপ বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। একদিকে যুদ্ধের খরচ, অন্যদিকে যুদ্ধের জন্য উপযোগী হতে বাড়তি খরচ, সাথে জনসাধারনের বিরুপ প্রতিক্রিয়ায় দেশে নইরাজ্যকর একটা পরিস্থিতি বিরাজ করার সম্ভাবনা। এদিকে আরেকটা খারাপ সংবাদ হচ্ছে- ডি-ডলারাইজেশন। তাতে আমেরিকা মূল চালিকা শক্তিতে একটা ভাটা পড়বেই।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে- ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ না হতেই যদি চীন তাইওয়ানকে কোনো প্রকার আক্রমন করে বসে (সম্ভাবনা যদিও খুব কম, কিন্তু চীনকে বিশ্বাস করা কঠিন), তাহলে আমেরিকাকে সম্ভবত একাই দুটু ফ্রন্টে লিপ্ত হতে পারে। যদি চীন তাইওয়ানকে আক্রমন করেই বসে, তাহলে বুঝতে হবে যে, রাশিয়ার সাথে চীনের একটা বিশাল বোঝাপড়া হয়ে গেছে। এই ফ্রন্টে লিপ্ত হলে সম্ভবত ইউরোপ, জাপান কিংবা ইন্ডিয়া আমেরিকার পাশে থাকার কথা নয়। জাপান এবং ইন্ডিয়ারও নিজেদের এজেন্ডা রয়েছে এই জোনে। আর ইউরোপ মনে করে তাইওয়ান তাদের কোনো মাথা ব্যথার কারন হতে পারেনা। সেক্ষেত্রে চীনকে সমানে সমান কন্টেইন করতে গেলেই ইউক্রেনের উপর আমেরিকার নজর অনেকটাই থিতে হয়ে আসবে। আর এই থিতে হয়ে আসা মানেই রাশিয়া এগিয়ে যাবে।
সময়টা খুব খারাপ আসছে মনে হচ্ছে আগামীতে। কোনো কিছুই সঠিক প্রেডিক্ট করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে।

০৫/০৪/২০২৩-পেট্রো ডলার- A Game Changer

যে কোনো দেশের কারেন্সী সাধারনত সোনা বা হার্ড এসেটের মাধ্যমে ব্যাকিং করে সেই অনুপাতে তারা তাদের কারেন্সী প্রিন্ট করতে পারে। যদি হার্ড এসেট এর বাইরে কেউ তাদের কারেন্সী প্রিন্ট করেন, তাহলে সেই কারেন্সী অবমুল্যায়িত হয়ে মুদ্রাস্ফিতিতে পড়ে যায়। এক সময় ডলারও তার বিপরীতে হার্ড এসেটের মাধ্যমে কতটুকু ডলার প্রিন্ট করতে পারবে সেটা নির্ধারিত ছিলো।

কিন্তু ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং সৌদি আরবের প্রিন্স ফাহাদ আবুদুল আজিজ ৬ পাতার যে একটা এগ্রিমেন্ট করেন সেখানে এই দুই দেশ এইমর্মে রাজী হয় যে, তেল আমদানী রপ্তানিতে শুধুমাত্র ডলার ব্যবহার হবে, অর্থাৎ ডলার পেট্রো ডলারের স্বীকৃতি পেলো। এই ডলার যখনই পেট্রো ডলার হিসাবে স্বীকৃতি পেলো, তখন থেকে ডলার আর সোনা বা অন্য কোনো হার্ড এসেট এর বিনিময়ে ব্যাকিং করার দরকার পড়লো না বরং আমেরিকার অর্থনইতিক শক্তির উপরেই এটা হার্ড এসেট হিসাবে গন্য হবে বলে ধরে নেয়া হলো। ফলে আমেরিকার জন্য যেটা হলো যে, সে যতো খুশী ডলার ছাপালেও কিছু যায় আসে না, যেহেতু কোনো হার্ড এসেট লাগে না। এটা একটা আনলিমিটেড শক্তি। প্রায় ৪২% ট্রেড হচ্ছিলো এই ডলারে। এরমানে এই যে, শুধু কাগুজে ডলার দিয়েই আমেরিকা তেল সমৃদ্ধ দেশ ইরাক, ইরান, সৌদি আরব, মিডল ইষ্ট, ভেনিজুয়েলা ইত্যাদি দেশ থেকে তেল ক্রয় করতে পারে। এটার সর্বপ্রথম বিরোধিতা করেছিলো সাদ্দাম এবং পরে বিরোধিতা করেছিলো হূগু সাভেজ। এর ফলে তাদের পরিনতি কি হয়েছিলো সেটা আমরা সবাই জানি।

যাই হোক, ৪২% এর বাকী ট্রেডিং হচ্ছিলো নিজ নিজ দেশের কারেন্সীতে অন্যান্য পন্যে। কিন্তু আরেকটা মজার ব্যাপার ছিলো যে, ডলারকে একমাত্র রিজার্ভ কারেন্সী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া। ফলে অন্য দেশের কারেন্সীতে ট্রেড করলেও প্রতিটি দেশ তাদের নিজের কারেন্সীকে রুপান্তরীত করতে হতো ডলার। এরমানে প্রায় ১০০% ট্রেড এই ডলার কারেন্সীতেই। সব দেশ তাদের রিজার্ভ রাখতে হয় ডলারে আর সেটা আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে। এটাকে অন্যভাবে FIAT Currency ও বলা যায়। এই ফিয়াট কারেন্সি নিয়ে আরেকদিন বল্বো।

যেহেতু পলিসি মোতাবেক সব ট্রাঞ্জেক্সন হয় পেট্রো ডলার বা রিজার্ভ কারেন্সী (ডলার) এ করতে হয়, ফলে প্রায় সব দেশ আমেরিকার কাছে মুটামুটি জিম্মি। ফলে এই ডলার হচ্ছে আমেরিকার লাষ্ট সার্ভাইভিং সুপার পাওয়ার টুলস। এটার মাধ্যমে আমেরিকা যে কোনো দেশকে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারতো, রিজার্ভ আটকে দিতে পারতো। কোনো দেশ আমেরিকার পলিসির বাইরে গেলে বা তাদের সুবিধা মতো কাজ না করলেই আমেরিকা এই রিজার্ভ কারেন্সী আটকে দিয়ে সেটা তাদের নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারতো। এই জিম্মি দশা অনেক দেশ মনে প্রানে মেনে নিতে যেমন পারছিলো না, তেমনি এ থেকে সরে যাবার পথও খোলা ছিলো না। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সুইফট থেকে যখন বাদ দেয়া হলো, তখন রাশিয়া এটাকে ব্লেসিংস হিসাবে ধরে নিলো। বহু দেশ যেনো এই জিম্মি হওয়া ডলার থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো কারেন্সীতে পা রাখা যায় কিনা তার দিকে তাকিয়েই ছিলো। এর সুযোগ গ্রহন করছে চায়না। অর্থনীতির এই জায়ান্ট তার নিজস্ব কারেন্সী ইউয়ানকে ডলারের প্রতিস্থাপক হিসাবে দাড় করানোর চেষ্টায় রাশিয়ার সাথে এবং আমাদের পার্শবর্তী ইন্ডিয়াকে তাদের পাশে নেয়ার চেষ্টায় ব্রিক্স কারেন্সীর উদবোধনে সচেষ্ট হয়ে গেলো। এখন এই ডলার আউট হয়ে যাচ্ছে। রিজার্ভ কারেন্সী হিসাবে ইউয়ান এবং এর সাথে নিজস্ব কারেন্সীতে ট্রেড। নিজস্ব কারেন্সীতে ট্রেড করলে কোনো দেশেয় আর তাদের রিজার্ভ এর ঘাটতি হবে না। এটাই ধ্রুব সত্য।

তাহলে ডলার কিভাবে আউট হয়ে যাচ্ছে? সেটা একটা সংক্ষিপ্ত ভাবে না বললেই নয়।

রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরী কিসিঞ্জার এক সময় ভবিষ্যত বানী করেছিলো যে, যদি আমেরিকাকে তার ইউনিপোলার হেজিমনি ধরে রাখতে হয়, তাহলে সে যেনো সর্বদা রাশিয়া এবং চীনকে কখনোই একত্রে আসতে না দেয়। অন্য কথায় তারা এটা বুঝাতে চেয়েছে যে, রাশিয়া আমেরিকার শত্রু নয়, শত্রু হচ্ছে চীন। চীন এটা জানে এবং সবসময় সেটা মাথায় রাখে। চীন পৃথিবীর সবদেশ গুলির মধ্যে ইকোনোমিক জায়ান্ট। কিন্তু আমেরিকার গত কয়েক রিজিমে এই পলিসি থেকে আমেরিকা অনেক দূর সরে আসায় এখন চীন এবং রাশিয়া এতোটাই কাছাকাছি চলে এসছে যে, তারা বলছে তাদের বন্ধুত্ত সিমেন্টের থেকে শক্ত। তিনটাই সুপার পাওয়ার। দুইটা একদিকে আর আমেরিকা আরেকদিকে।

আমেরিকা গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশসমুহকে এমনভাবে যাতাকলে রেখেছে যে, ধীরে ধীরে সউদী আরব, ইরান, ইরাক, ভেনিজুয়েলা, এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা সবাই এর উপর ত্যাক্ত বিরক্ত। আর সবচেয়ে বিরক্তের ব্যাপার হলো এই যে, ”হয় তুমি আমার দলে, না হয় তুমি শ্ত্রুর দলে” এই কন্সেপ্টে কেউই নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও থাকতে পারছিলো না।

এখন যেহেতু ওপেক, বা ওপেক প্লাস তেল আমদানী-রপ্তানীতে হয় নিজস্ব কারেন্সী অথবা ইউয়ান ব্যবহার চালু করছে বা করতে যাচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশী লাভ হবে চীনের এবং তার সাথে অন্যান্য দেশেরও। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হবে আমেরিকার যারা এতোদিন বিশ্ব কারেন্সীর মোড়ল ছিলো। ডলারই ছিলো একটা মারাত্তক অস্ত্র। এই অস্ত্র এখন হাতছারা হয়ে চলে যাচ্ছে চীনের হাতে।

কিন্ত আমেরিকা এতা হতে দিতে চাইবে কেনো? আর ঠিক এ কারনে গত মার্চ মাসে আমেরিকা ডিক্লেয়ার করেছে যে, তারা ৪০% ডিফেন্স বাজেট বাড়াবে যাতে তারা সরাসরি চায়নাকে এটাক করতে পারে। তারা চায় চায়না যুদ্ধে আসুক। আর ইউয়ান কারেন্সি যেনো ট্রেড কারেন্সি না হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, চীন কখনো কোনো যুদ্ধে জড়ায় না।

বর্তমানে সৌদি আরব, ইরান, রাশিয়া, মিডল ইষ্ট, রাশিয়া, চীন, ইন্ডিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং অন্য বেশীর ভাগ দেশ সবাই এখন ডলারের পরিবর্তে চায়নার ইউয়ানে ট্রেড করতে আবদ্ধ হচ্ছে। এর অর্থ কি?

এটা হচ্ছে গেম চেঞ্জার।

২৪/০২/২০০৩-স্ট্যালিন ঢাছা

আবখাজিয়ার রিটসা লেকের ধারের সেই “স্ট্যালিন ঢাছা”- একটি মর্মান্তিক ইতিহাস

  আবখাজিয়ায় আমার নতুন পোষ্টিং বেশ মাস খানেক হলো। আসার পর অনেকবার যেতে চেয়েছিলাম “গোরি”তে যেখানে স্ট্যালিন জন্ম গ্রহন করেছে। এখন জায়গাটা আর আগের মতো নাই। এটা এখন মিউজিয়াম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। গিয়েছিলাম কয়েকদিন আগে। কিন্তু আরেকটা জায়গা দেখার খুব শখ হচ্ছিলো- স্ট্যালিন ঢাছা।

স্ট্যালিনের শিশু জীবন কেটেছে খুবই অনিরাপদ এবং গরীব এক পরিবারে। এই অনিরাপদ পরিবেশে তিন ভাই বোনের মধ্যে স্ট্যালিনই একমাত্র বেচেছিলো। তার পিতা ছিলো একজন জুতা মেরামতকারী কিন্তু প্রচন্ড মদ্যপানকারী বদরাগী মানুষ যে প্রতিদিন সে তার সন্তান স্ট্যালিনিকে কারনে অকারনে মারধোর করতেন। স্ট্যালিনের বয়স যখন ১০, তখন তার পিতা মারা যায়। তার মা ছিলো হাউজ ওয়াইফ। তার মা স্ট্যালিনের বুদ্ধিমত্তা দেখে তিনি তাকে এক সেমিনারীতে ভর্তি করে দেন এবং তিনি চেয়েছিলেন স্ট্যালিন প্রিস্ট হিসাবে বড় হোক।

স্ট্যালিন খুব মেধাবী ছাত্র ছিলো এবং প্রায় ৮ বছর পড়াশুনা করে স্ট্যালিন তার ভিন্ন মার্ক্সিজমের মতাদর্শের কারনে স্কুল তাকে বহিষ্কার করে দেয়। এরপর স্ট্যালিন একটি রেভুলুসনারী গ্রুপে তদানীন্তন জারের বিরুদ্ধে জয়েন করেন এবং রেভুলিউশনারী গ্রুপের হয়ে স্ট্যালিন নিজ হাতে তার মতের বাইরের লোকদেরকে একের পর এক হত্যা করতে শুরু করেন। এরপর বলসেভিক গ্রুপ। স্ট্যালিনের একচেটিয়া মনোভাব আর হত্যার মতো দুধর্ষ কাজের মাধ্যমে তিনি বলসেভিক গ্যাং এর খুব প্রতাপশালী নেতা হয়ে উঠেন। শুরু হয় ব্যাংক ডাকাতি, গ্রামে আগুন লাগানো, লোকদেরকে হত্যা করা ইত্যাদি।

যখন বলসেভিক ক্ষমতায় এলো, তখন  বলসেভিক পার্টির নেতা লিউনার্দো তাকে বলসেভিক পার্টির অন্যতম একজন নেতার পদ দেন। কিন্তু লিউনার্দো পরবর্তিতে তার মৃত্যুর আগে এটা বুঝে গিয়েছিলেন যে, স্ট্যালিনকে আর বেশী ক্ষমতা দেয়া যাবে না কারন সে ডেস্ট্রাকটিভ এবং অত্যান্ত উগ্রপন্থির মানুষ এবং এতোটাই যে, তাকে সর্বনয় ক্ষমতায় তিনি তাকে দেখতে চাননি। কিন্তু তারপরেও সেটা হয়েছিলো।

রাশিয়ান রেভুলিউশনের সময় “স্ট্যালিন” এই নামটি নিজেই গ্রহন করেন যার অর্থ স্টিলম্যান বা ম্যান অফ স্টিল। তার আসল নাম ছিলো ভিসারিউনভিচ। স্ট্যালিন চেয়েছিলো আল্টিম্যাট টোটালেরিয়ান ডিকটেটর হিসাবে পরিচিত হতে এবং সেটা কমিউনিজমের মাধ্যমে। তার ধারনা ছিলো কমিউনিজমের মাধ্যে সে তার দেশের সমস্ত মানুষকে ডিসিপ্লিন্ড, শক্তিশালী , ওবিডিয়েন্ট এবং সভ্য মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা আর তার আদেশ অন্ধভাবে পালন করা। এই প্রোজেক্ট সফল করার জন্য স্ট্যালিনকে যা যা করা দরকার সেটাই সে একচ্ছত্রভাবে এগিয়ে গিয়েছিলো যেখানে পুরানো সব ভিন্ন মতাদর্শকে সমুলে খতম এবং তার মতাদর্শকে আরোপ করা। সে মনে করতো তার এই প্রোজেক্ট সফল করার জন্য যদি দেশের অর্ধেক মানুষকেও হত্যা করতে হয়, তাতেও তার করতে হবে এটাই ছিলো তার একমাত্র সপ্ন। স্ট্যালিন এই প্রোসেসকে সফল করার জন্য প্রায় দেড় বছর এক নাগাড়ে নীরবে এবং গোপনে একটা ‘গ্রেট পার্জ’ নামে সায়েন্টিফিক এবং মেটিকুলাস মেথড ব্যবহার করেছেন। ‘গ্রেট পার্জ” এর জন্য তার প্রয়োজন ছিলো এমন একজন লোক যিনি স্ট্যালিনের সমস্ত আদেশ অন্ধভাবে বিসশাস করবে, পালন করবে এবং তা পালন হয়েছে কিনা নিশ্চিত করবে। আর এর জন্য তিনি বেছে নেন নিকোলাই ইয়েজভ নামে একজন তিন ক্লাশ পর্যন্ত পড়ুয়া মানুষকে। যাকে পরবর্তিতে মানুষ চিনতো “ব্লাডি ডয়ার্ফ” নামে। এই নিকোলাই ইয়েজভ ছিলো স্ট্যালিনের সিক্রেট পুলিশের চীফ। সে নিজে সাত লক্ষ সত্তুর হাজার নীরীহ এবং ভিন্ন মতালম্বী মানুষকে স্ট্যালিনের “গ্রেট পার্জ” এর আওতায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

জুলাই ১৯৩৭ থেকে নভেম্বর ১৯৩৮ এর মাঝখানে স্ট্যালিন প্রায় ৮ লক্ষ মানুষকে এভাবে হত্যা করেন। অর্থাৎ প্রতিদিন ১৫০০ মানুষ অথবা প্রতি ৫৭ সেকেন্ডে একজন। আর এভাবেই স্ট্যালিন নভেম্বর ১৯৩৮ এর শেষের দিকে মনে করেন তার আর কোনো কাল্পনিক বা দৃশ্যমান কোনো প্রতিদন্ধি থাকলো না এবং “এবসিউলুট পাওয়ার” এর অধিকারী হন স্ট্যালিন। আগেই বলেছিলাম, স্ট্যালিন ছিলো অত্যান্ত মেধাবী এবং হিসাবী। তিনি তার এই হত্যার কৃত কর্মের ভার কখনোই নিজের ঘাড়ে নিতে চান নাই। তার সেটাও পরিকল্পনায় ছিলো। এ ব্যাপারে একটু পরেই আমরা আলোচনা করবো।

স্ট্যালিনের ১ম স্ত্রী ছিলেন একাতেরিনা যিনি অসুস্থতার কারনেই যুবতী অবস্থায় মারা যান। তার ২য় স্ত্রী ছিলো নাদিয়া। ১৩ বছর স্ট্যালিনের সাথে সংসার করার পর ১৯৩২ সালে নাদিয়া নিজে আত্তহত্যা করেন। স্ট্যালিনের সাথে ১৩ বছর সংসার করার পর নাদিয়া একটা জিনিষ বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্ট্যালিন একজন স্বাভাবিক মানুষ নন যা তিনি বিয়ের সময় ভেবেছিলেন। কারন নাদিয়া দেখতে পাচ্ছিলো যে, স্ট্যালিন নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য নিজের আপন মানুষদেরকেও তার হত্যা করতে কোনো দিধাবোধ নাই। এরই ধারাবাহিকতায় নাদিয়া দেখছিলেন, তার সমস্ত আত্তীয়স্বজন, তার স্বামীর বাড়ির আত্তীয় স্বজনেরা একে একে কোথায় যেনো গুম হয়ে যাচ্ছে আর কেউ ফিরে আসছে না। নাদিয়ার বোন এভগেনিয়ার স্বামীকে স্ট্যালিন বিষপানে, এভগেনিয়াকে এবং তার আরেক বোন মারিয়াকে স্ট্যালিন সাইবেরিয়ার “গুলা” তে ডিপোর্টেশনে পাঠান। “গুলা”র তাপমাত্রা শীতকালে যা থাকে মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মতো। শুধু তাইই নয়, স্ট্যালিন নাদিয়ার ছোট ভাই পাভেলকে ২ নভেম্বর ১৯৩৮ সালে বিষপানে হত্যা করেন। এভগেনিয়ার মেয়ে “কিরা”, তার বড় বোন আনাকেও স্ট্যালিন “গুলা”তে নির্বাসনে পাঠান। এভাবেই ‘আনা’র স্বামী স্ট্যানিস্লাভ, ১ম স্ত্রীর ভাই আলেক্সজান্ডারকেও স্ট্যালিন গুলি করে হত্যা করেন। নাদিয়া এসবের চাপ আর নিতে পারছিলেন না। ফলে সে স্বামীর আনুগত্য হারিয়ে ফেলে। নাদিয়া তার গর্ভের তিন বাচ্চা, ছেলে ইয়াকভ, মেয়ে ভ্যাসিলি আর এসভেটলানাক পিছনে রেখে আত্তহত্যা করেন। আত্তহত্যার পুর্বে নাদিয়া তার এক ভাইকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলো যে, সে কেনো আত্তহত্যা করতে যাচ্ছে। কারন নাদিয়ার পালানোর কোনো জায়গা ছিলো না। নাদিয়া পালিয়ে অন্য কোথাও গেলেও স্ট্যালিন তাকে যেভাবেই হোক খুজে বের করে আনতে সক্ষম। আত্তহত্যাই ছিলো তার মুক্তির একমাত্র পথ। স্ট্যালিনকে বাইরে থেকে মানুষ যা দেখে চোখের অন্তরালে স্ট্যালিন আরেক মানুষ যা মানুষ দেখে না। তাই, নাদিয়া নিজে নিজে তার পথ বেছে নেয়।

নাদিয়ার মৃত্যুর পর স্ট্যালিন আরো নিষ্ঠুর হয়ে উঠে কিন্তু স্ট্যালিন সবার থেকে একেবারে আলাদা হয়ে যান। সবসময় সবার থেকে আলাদা হয়ে একা বসবাস করার পরিকল্পনা করেন। স্ট্যালিন দক্ষন মস্কোর কয়েক কিলোমিটার দূরে এক বিশাল গহীন জংগলের ভিতর রাজ প্রাসাদ বানান যার নাম দেন “স্ট্যালিন ডাচা”। এই স্ট্যালিন ডাচা সুরক্ষার জন্য এক কোম্পানী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং ৩০০ এর অধীক সৈনিক মোতায়েন থাকতো। ‘শট্যালিন ডাচা’য় স্ট্যালিনের নিজের অনুমতি ছাড়া অন্য কারো প্রবেশের অনুমতি ছিলো না। তিনি শুধু একাই সেখানে থাকতেন। আর থাকতো তার গভর্নেস “ভ্যেলেন্টিনা”। ভেলেন্টিনাই স্ট্যালিনের সমস্ত কাজ করতো, খাওয়া দাওয়া, দেখভাল, কুরিয়ারের কাজ এমন কি তার সাথে রাতের সংগী হিসাবে। ভেলেন্টিনাকে স্ট্যালিন সবচেয়ে বেশী বিশ্বাস করতেন। ভ্যালেন্টিনাই শুধু ক্রেমলিন থেকে আসা কাগজপত্রগুলি গ্রহন করতেন এবং ভোর বেলায় তা স্ট্যালিনকে হস্তান্তর করতেন। স্ট্যালিন সারা রাত কাজ করতেন এবং তার ঘুমের সময় হতো সকাল ৭ টা থেকে সকাল ১০ পর্যন্ত।

সারারাত স্ট্যালিন একটা কাজ একেবারে নিজের হাতে করতেন কারো কোনো পরামর্শ ছাড়া। আর সেটা হচ্ছে তার কাল্পনিক এবং দৃশ্যমান শত্রুদেরকে ডেথ সেন্টেন্স দেয়ার অনুমতি। তিনি সারারাত বাছাই করতেন কাকে কখন মারা হবে অথবা সাইবেরিয়ায় বা গুলাতে ডিপোর্টেশনে পাঠানো হবে। কাজটা খুব সহজ ছিলো না। কিন্তু স্ট্যালিন এই কাজটা খুব মনোযোগের সাথে করতেন এবং নামের পাশে একের পর এক টিক দিতেন কার ভাগ্যে মৃত্যু আর কার ভাগ্যে ডিপোর্টেশন। স্ট্যালিন যখন কোনো মানুষকে মেরে ফেলার জন্য আদেশ দিতেন, তখন তার সাথে তার গোটা পরিবারকেও তিনি খতম করে দিতেন।  ৬০ বছর বয়সে স্ট্যালিন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী হন যেখানে তার আর কোনো বিপক্ষের লোক ছিলো না। স্ট্যালিন মাঝে মাঝে ‘স্ট্যালিন ডাচা” থেকে বেরিয়ে এসে ক্রেমলিনেও অফিস করতেন যেখানে তার চার জন মহিলা সেক্রেটারী ছিলো। কিন্তু এই সেক্রেটারীদেরকেও স্ট্যালিন কখনো বিশ্বাস করতো না। শুধুমাত্র একজন সেক্রেটারী (একাতেরিনাও তার নাম) ছাড়া সবাই স্ট্যালিনের রোষানলে জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু স্ট্যালিন তার এই মহা হত্যার জজ্ঞ নিজের ঘাড়ে যেহেতু নিতে চান নাই আর তার কাজ প্রায় শেষের পথে। তাই তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৮ তারিখে তার সর্বশেষ নিধন লিষ্ট অনুমোদন দেন।

আজ সেই ঐতিহাসিক ২৪ ফেব্রুয়ারী আবারো ফিরে এসছে ১৯৩৮ থেকে ২০০৩ এ। এদিন অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৮ তারিখে স্ট্যালিন  তার “গ্রেট পার্জ” এ নিধন হত্যার সর্বশেষ লিষ্ট অনুমোদনে তার অন্যায় এমন এক লোকের উপর অর্পিত করেন, যার নাম “ব্লাডি ডয়ার্ফ” বা সিক্রেট পুলিশ চীফ নিকোলাই ইয়েজভ। এই নিকোলাই লুবিয়াংকা জেল খানায় সে নিজেই প্রায় লক্ষাধিক মানুষকে গন হত্যা করেছেন।

স্ট্যালিন সকাল সাড়ে সাতটায় নিকোলাইকে তার ‘স্ট্যালিন ডাচ’য় ডেকে পাঠান। আজকের দিনে স্ট্যালিন সেই তাকেই সবার কাছে কালার করে প্রচার করে দিলেন যে, সব গন হত্যার পিছনে ছিলো এই চীফ এবংতিনি জাপানিজ, ব্রিটিস এবং আমেরিকান স্পাই হিসাবেও কাজ করছেন। তাকে মরতেই হবে। আর নিকোলাই জানতেন এর থেকে কোনো পরিত্রান নাই। তার ভাগ্য ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। সে শুধু তার একমাত্র ১০ বছরের মেয়ের জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলেন যার নাম নাতালিয়া। নাতালিয়াকে স্ট্যালিন শেষ পর্যন্ত মারেননি একশর্তে যে নাতালিয়া আর কখনো তার বাবার নামের “ইয়েজভ” উপাধিটি ব্যবহার করতে পারবেন না। নিকোলাই ইতিহাসের পাতায় একজন ক্রিমিনাল হয়েই বেচে রইলেন।

নোটঃ ১লা মার্চ ১৯৫৩ তারিখে স্ট্যালিন সারাদিন কারো সাথেই কোনো কথা বলেন নাই, কোথাও বেরও হন নাই। আর তাকে কেঊ ডাকবে, কিংবা তিনি কি করছেন এটা দেখার মতো কারো সাহসও নাই। অবশেষে যখন ক্রেমলিন কুরিয়ার তার অফিসে ঢোকলেন, তখন দেখা গেলো স্ট্যালিন হার্ট স্ট্রোক করে মেঝেতে পড়ে আছেন। তখন তার বয়স ৭৫।

স্ট্যালিন যেভাবে রাজ্য পরিচালনা করতেন তিনি ঠিক সেভাবেই মারা গেলেন। ২০ মিলিয়ন মানুষকে তিনি তার শাসনামলে হত্যা করেছিলেন।  প্রায় ৩০ বছর এককভাবে রাজত্ত করেছেন স্ট্যালিন। স্ট্যালিন ৩০ বছর ইউএসএসআর পরিচালনা করেছেন যেখানে ১৫ টি ছিলো রিপাব্লিক। পৃথিবীর ৬ ভাগের এক ভাগ ছিলো এই ইউএসএস আর। সে সময়ে মোট ১১টি টাইম জোন ছিলো। Biggest Empire of all times.

০২/০৩/২০২৩-স্বাধীনতার নতুন ব্যাকরন

এত বছর পর অনেক শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা সেই স্বাধীনতার গুরুত্ব কি বুঝতে পারছি? আমাদের দেশের ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার লড়াইয়ের সেই বীরত্ব গাথা অধ্যায় হয়তো শুধু ইতিহাসের পাতায়ই থাকবে। কিন্তু এখন সম্ভবত আরেকটি সময় এসে গেছে নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন ইতিহাস লেখার। স্বাধীনতার নতুন ব্যকরন বুঝার। আর সেটা হচ্ছে- এটা বুঝা যে, আমাদের যতোটা বিপদ বাইরের শত্রুর ক্ষমতার থেকে তার থেকে অনেক বেশী বিপদ আমাদের ভিতরের ক্ষমতায়। আজকের স্বাধীনতা ইংরেজ বা পাকবাহিনীর শিকল থেকে মুক্তির জন্য হয়তো নয়, বরং সেই শিকল থেকে মুক্তি যা আমদের বাড়িতে, আমাদের ঘরে, সমাজে বেড়ে উঠছে আইডোলজিহীনভাবে অথবা আতঙ্ক ড্রপিং পয়েন্ট হিসাবে।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে-এই শিকল তাদের হাতে যাদের না আছে কোনো আইডিয়োলজি না আছে আতংক ছড়ানোর কারন। ওরা আমাদের বাড়ীর দিকে নজর দেয়, পর্যবেক্ষন করে আর বিশ্লেষন করে যাতে এমন কি কেউ আছে যাকে উষ্কানো যায়? আর তারপর কোনো এক সুযোগে আমাদের এই যুবসমাজকে তাদের কোনো দূর্বল ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে ব্রেন ওয়াশের মাধ্যমে এমন এক দুধর্ষ অভিযানে চালান দেয়া হয় যেখানে সাধীন নাগরকেরা এই যুব সমাজের মেধা, শক্তির শুভ কাজের বিনিময়ে সুফল তো দূরের কথা এর পরিবর্তে সামাজিক এবং দৈনন্দিন জীবনে জিম্মি হয়ে আতংকিত থাকে।

তাই নতুন প্রজন্মের জন্য সুশাসন, সুকর্ম ব্যবস্থা আর সুবিচার যতোক্ষন নিশ্চিত না করা হবে, এই প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার ব্যকরন অন্য রকমের অর্থই হয়ে থাকবে যেখানে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ই একমাত্র অস্ত্র। এখানে আর কোনো আইডোলোজি কাজ করেনা। এই যুদ্ধটা বাইরের শক্তিকে দমনের চেয়েও অধিক কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়।

২৩/০২/২০২৩-আমেরিকার ভিসা প্রাপ্তি

অনেকবার আমেরিকা যাওয়ার জন্য ভিসা পেয়েছিলাম কিন্তু যাওয়া হয়েছে মাত্র একবার। বাকী সম্ভবত আরো দুবার ভিসা ছিলো (দূটু মিলিয়ে প্রায় ৮ বছর মেয়াদিতে) কিন্তু যাওয়া হয় নাই। আমেরিকা আমাকে আসলেই টানে না। অনেকের কাছে এটাকে সর্গপুরী মনে করেন বটে কিন্তু আমার কাছে কোনো বিদেশই টানে না। আর সেটেল হবার তো কোনো প্রশ্নই জাগে না।

এবার আমেরিকার ভিসা পাওয়ার ব্যাপারে আমার বেশ সন্দিহান ছিলো। তারা আবার নাক উচা। ভিসা দিয়েছে কিন্তু যাইনি, তাতে ওরা ইন্সাল্ট ফিল করে। এমতাবস্থায় আমাকে ৪র্থ বার ভিসা দেয় কিনা সেটা নিয়ে আমার পুরুই সন্দেহ ছিলো। তারপরেও ছোট মেয়ে আমেরিকা থাকে, মেয়ের মায়ের ভিসা হয়ে গেছে, আমার হয় নাই, আমার যাওয়া হবে না ইত্যাদির চাপে শেষ পর্যন্ত ভিসার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু মনে একটা কঠিন প্রত্যয় ছিলো যে, ভিসা দিলেই যেতে হবে কিংবা সুযোগ না থাকায় যেতে পারি নি এটা পরবর্তী ভিসা না পাওয়ার জন্য একটা ডিস ক্রেডিট হতে পারে না। যদি আমাকে ভিদা রিজেক্ট করে, আমি অবশ্যই এর কৈফিয়ত চাইবো তাদের কাছ থেকে কেনো এবং কোন কারনে আমার ভিসা রিজেক্ট করছে। আর যেহেতু আমার খুব একটা টান নাই, ফলে আমার ভিসা পাইলেই কি আর না পাইলেই কি। মিটুলের তো অন্তত ভিসা আছে, তাতেই চলবে। কোনো কারনে যদি কনিকার কাছে যেতে হয়, মিটুল একাই সামলে নিতে পারবে।

যথারীতি আমি ইন্টারভিউ এর জন্য দাড়ালাম। অবাক করার ব্যাপার হলো, আমার কোনো কাগজ পত্র তারা চেক করার প্রয়োজন মনে করলো না। আমি আর্মিতে ছিলাম এটা নিয়েই তাদের অনেক প্রশ্ন ছিলো। প্রশ্নগুলি আমাকে ধরার জন্য নয় বরং যা দেখলাম তারা আর্মির যে কোনো লোককে খুবই মুল্যায়ন করে। আর্মিতে আমি কোথায় কোথায় চাকুরী করেছি, সেটা তাদের জানার খুব শখ হচ্ছিলো। বলেছি জাতীসংঘের সাথে প্রায় আড়াই বছরের উপর হাইতি আর জর্জিয়ায় মিশনে ছিলাম, তখনই একবার আমেরিকায় বেড়াতে গিয়েছিলাম।

আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আমার মেয়ে তার পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরে আসবে কিনা। আমি বলেছি- সেটা আমি জানি না তবে আমার যে ব্যবসা আছে সেটায় সে হাল ধরলে আমি খুব খুশী হবো। কি ব্যবসা আমার যখন জিজ্ঞেস করলো, আমি বললাম রপ্তানীমুলক গার্মেন্টস। প্রায় ২ হাজার কর্মচারী আছে শুনে আরো খুশী হলো। বাৎসরিক টার্ন ওভার জিজ্ঞেসের পর অফিসার একটু যেনো হচকচিয়ে গেলেন কারন টার্ন ওভার টা ঝুব কম নয়- ২২৫ থেকে  আড়াইশো কোটির মতো।

খুব খুশী হয়েছে তারা পুরু ব্যাপারটা জেনে। অবশ্য আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কেনো আমি আগের ভিসা গুলিতে আমেরিকায় যাইনি। আমি খুব সাবলিল ভাবেই বলেছিলাম যে, আসলে সেটা ইচ্ছে করে না যাওয়ার কোনো কারন নাই। আমি আমার নতুন ব্যবসাটা গুছিয়ে উঠতে সময় দিতে পারছিলাম না। তাই আর যাওয়া হয় নাই। কিন্তু এবার তো যাওয়া হবেই কারন মাঝে মাঝে আমার মেয়ের জন্য তো আমার মন ছুটেই যায় তাকে দেখার জন্য।

কোনো দ্বিমত করলেন না অফিসার। শুধু একতা কথাই বল্ল০ ইউ আর এ গুড ফাদার। অফ কোর্ষ, ইউ নিড টু গো।

বলে ভিসা দিয়ে ধন্যবাদ জানালো। ভালো লাগলো অফিসারের ব্যবহার। ফেরার পথে একটা স্যালুট দিলাম, আর একটু হাসলাম। 

২৪/০২/২০২৩-রুলস বেজড অর্ডার

গত কিছুদিন যাবত আমি রুলস বেজড অর্ডার নিয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে একটা ব্যাপার মুটামুটি পরিষ্কার হলো যে, এই "রুলস বেজড অর্ডার" আসলে কোথাও আইনের বই বা লিখিত কোনো দলিল নাই এবং এটা কারা অনুমোদন করেছে সেটাও কেউ জানে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে-বর্তমানে বড় বড় পলিটিশিয়ানরা কথায় কথায় ‘রুলস বেজড অর্ডার’ কথাটা উচ্চারন করেন। কিন্তু তাদেরও এই রুলস বেজড অর্ডার সম্পর্কে খুব একটা ভালো ধারনা আছে বলে আমার মনে হয় না। আর যদি পরিষ্কার ধারনা থেকে থাকে তাহলে আরেকটা জিনিষ খুব পরিষ্কার যে, সবাই যার যার সুবিধার জন্য এবং ফায়দা লুটার জন্য এই "রুলস বেজড অর্ডার" সমর্থন করেন। যেমন, চায়নার এবং আমেরিকা উভয়েরই তাইওয়ানের ব্যাপারে, আমেরিকার ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্থান, প্যালেস্টাইন কিংবা ইসরায়েলের ব্যাপারে, রাশিয়ার জর্জিয়া কিংবা মালদোভার ব্যাপারে, ফ্রান্স এর আফ্রিকান দেশগুলির ব্যাপারে এই "রুলস বেজড অর্ডার" মানতে খুব পছন্দ করে। আসলে এই "রুলস বেজড অর্ডার" আর কিছুই না, এটা যার যার সার্থে তারা নিজেদের মতো করে কিছু আইন বানিয়ে সেটা অন্যকে মানতে বাধ্য করে। সেটা যদি তাদের নিজের দেশের আইনের বিপক্ষেও যায়, তাতেও মানানোর চেষ্টা চলতে থাকে। যেসব দেশ নিজেরা সাবলম্বি নয়, যারা বিগ পাওয়ারের উপর, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের উপর, আইএমএফ এর উপর কিংবা বৈদেশিক লোন বা ডোনেশনের উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য ব্যাপারটা খুবই অসহনীয়। তারা না মানতে পারে, কারন না মানলে সাহাজ্য বন্ধ হয়ে যাবে আবার মানলে দেখা যায় যে, এটা নীতিবহির্ভুত হয়ে যায়। ফলে নিজেদের সার্থেই ছোট ছোট দেশগুলি চুপ থাকে। আর এই চুপ থাকার মানে এই নয় যে, তারা সাপোর্ট করছে, আবার এই চুপ থাকার কারনে যারা এগুলি প্রয়োগ করে তারা ভাবে, কেউ তো আমাকে বাধা দিচ্ছে না।

কিন্তু যখন এই "রুলস বেজড অর্ডার" বড় বড় বিগ পাওয়ারের মধ্যে সংঘাত ঘটে তখন হয় সমস্যা। যেমন এখন হচ্ছে, রাশিয়া-চীন-আমেরিকা-ইউরোপ ঘিরে। তাইওয়ানকে ঘিরে চীন মনে করছে ‘রুলস বেজড অর্ডার’ এর মাধ্যমে তাইওয়ানের উপর সে যা খুশী করতে পারে, আবার আমেরিকাও ভাবে সেই বা নিয়ন্ত্রন ছাড়বে কেনো। ইউএস এর লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্থানে নিজেদের ইচ্ছায় রিজিম পরিবর্তনে কিংবা প্যালেষ্টাইনকে ইসরাইলের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া অথবা ইউক্রেনে এক নাগাড়ে ৮ বছর এক তরফা গোলাগুলিতে প্রতিষ্টিত সরকারকে উতখাত করে নিজের পছন্দমত সরকার গড়ে তোলার মত যে কোনো অজুহাতে তাদেরকে কব্জা করার নিমিত্তে অথবা তথাকথিত ডেমোক্রেটিক ইস্যু বা নিরাপত্তার অজুহাতে তাদেরকে বশে আনা, জর্জিয়া, মালদোভা, কিংবা ইউক্রেনকে ধরে রাখার নামে তাদেরকে রাশিয়ার ডি-মেলিটারাইজড করা, আফ্রিকায় বিভিন্ন দেশ যেমন বারকিনু ফাসো, বা মালি কিংবা নাইজেরিয়ায় সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে ফ্রান্সের আধিপত্য বিস্তার করার সবচেয়ে ভালো আইনটা হচ্ছে এই অলিখিত এবং অন-অনুমোদিত এই “রুলস বেজড অর্ডার”।

এটা একটা “মিথ”।

সবাই কোনো না কোনো এরেনায় আল্টিমেট কন্ট্রোল চায়। যখনই একই এলাকায় একের অধিক কারো নিয়ন্ত্রন রাখার দাবী না চলে আসে, ততোক্ষন এই “রুলস বেজড অর্ডারে” অন্যজন হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু একের অধিক হলেই টক্কর। এটা সবচেয়ে বেশী কার্যকরী হয়েছে যখন মাল্টিপোলার সিস্টেম ভেংগে ১৯৯০ সালে ইউনিপোলার সিস্টেমে দুনিয়াটা জড়িয়ে গেছে। তখন ইউনিপোলার নেতাদেরকে বাধা দেয়ার মতো কোনো শক্তিই অবশিষ্ট ছিলো না। তারা মনে করে যে, সব আইনের উর্ধে তারা। তারা যা বলবে, যা ভাববে, যা করবে সেটাই “রুলস বেজড অর্ডার”। এই রুলস বেজড অর্ডারের মাধ্যমে ইউনিপোলার নেতারা আন্তর্জাতিক সব সিস্টেম (ওয়ার্ড ব্যাংক, আইএমএফ, ইউএন, রিজার্ভ ব্যাংক, ওএসসিই, কিংবা মানবাধিকার সংস্থা ইত্যাদি) যেনো সব তাদের। যাকে খুশী আক্রমন, যাকে খুশী নিষেধাজ্ঞা, যাকে খুশী একঘরে করে রাখা ইত্যাদি এই রুলস বেজড অর্ডারের মাধ্যমে করা যায়।

মজার ব্যাপার হলো, এই রুলস বেজড অর্ডার কোথাও বই আকারে লিপিবদ্ধ নাই। না এর অনুমোদন নেয়া লাগে। সিচুয়েশন বুঝে কংগ্রেস কিংবা প্রেসিডেনশিয়াল আদেশেই নতুন ‘রুলস বেজড অর্ডার’ জানিয়ে দিলেই কাজ শেষ। রুলস বেজড অর্ডারের মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল লিগ্যাল সিস্টেমকে বুড়ো আংগুল দেখানো খুব সোজা। এ পরিপ্রেক্ষিতে কিম পিটারসন (ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিষ্ট) নিউ এজ পত্রিকায় গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ এ তার লেখায় তিনি লিখেছেন-

...” ইউএস আইসিসি (ইন্টার ন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট) কে রিকগনাইজ করে না। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় ইসরায়েল করত্রিক সংঘটিত রেসিষ্ট কার্যকলাপ সমর্থন, নিকারাগোয়ায় ওয়াটার মাইনিং এর ব্যাপারে ওয়ার্ল্ড কোর্ট রুলিং এর আওতায় দোষি সাবস্থ্য হবার পরেও তা ইগনোর করা, এংলো ইউরোপিয়ান জাপানিজ সাউথ কোরিয়ান জোট বিভিন্ন ভায়োলেশনে জড়িত থাকার পরে আন্তর্জাতিক বিচারে দোষি হওয়া সত্তেও তাদেরকে এই রুলস বেজড অর্ডারের আওতায় পরিশুদ্ধ করা, সিরিয়া দখল, আন প্রভোকড ইরাক আক্রমন, ৭০ বছর যাবত কিউবাকে এক ঘরে করে রাখা ইত্যাদি সব এই রুলস বেজড অর্ডারের দ্বারা জায়েজ। “

অন্যদিকে ফ্রান্স, জার্মানী, ইউকে কিংবা ইউরোপিয়ান দেশগুলির এমন ভগ্ন দশা যে, তারা এককালের মোড়ল অথচ তাদের আর সেই শক্তি নাই যাতে নিজেরা না মানলেও অন্যকে বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাখতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য, আরব দেশগুলি কিংবা দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলিতে তো আজীবন সংঘাত লেগেই আছে, হয় বাইলেটারেল, না হয় জিওপলিটিক্যাল অথবা টোটালেটেরিয়ান সরকারের চর্চা। ফলে ক্ষমতা হারাতে পারে, কিংবা কোনো প্রয়োজনে এসব বিগ পাওয়ারের সাহাজ্য লাগতে পারে ভেবে এরাও এসব বিগ পাওয়ারের বিরুদ্ধে বা রুলস বেজড অর্ডারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। ফলে বাধা না দিয়ে “জি হুজুর” থাকলেই যেনো “কুলও রক্ষা পায় আবার মোড়ল গিড়িও থাকে” এমন একটা পরিস্থিতিতে তাদের বসবাস।

৩য় বিশ্বযুদ্ধ না লাগলে সম্ভবত এবার এই "রুলস বেজড অর্ডার", ইউনিপোলারিটি, নিউ কলোনিয়ালিজম কন্সেপ্ট ইত্যাদির ইতি হবার সম্ভাবনা।

পৃথিবী আবার শান্ত হবে। এটাই প্রত্যাশা।

২১/০২/২০২৩-পচা সামুকে পা কাটে

গ্লোবাল অর্ডার চোখের সামনে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। অথবা অন্য অর্থে যদি বলি- এটা পরিবর্তন হবারই কথা ছিলো। কিন্তু সে সময়টা কখন এবং কবে সংঘটিত হবার কথা ছিলো সেটা নির্ধারিত ছিলো না। বড় বড় ঘটনা হটাত করেই সংঘটিত হয়, আর হটাত করেই বিষ্ফোরন ঘটে।

যে কোনো বড় পরিবর্তনে সকল পক্ষেই কিছু হট, কোল্ড, চালাক এবং নির্বুদ্ধিওয়ালা নেতা থাকে। অথবা এসব গুনাবলীওয়ালা নেতাদের আবির্ভাব হয়। আর এটা হতে হয় একই সময়ে। সবাই চালাক হলে কিংবা সবাই নির্বুদ্ধিওয়ালা হলে বড় বড় ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়। ১ম মহাযুদ্ধের কথা বাদই দিলাম, ২য় মহাযুদ্ধ যদি আমরা বিশ্বনেতাদের পরিচয় দেখি, তাতে দেখবো, মুসুলিনি (ইতালী), হিটলার (জার্মান), চার্চিল (ইউকে), স্ট্যালিন (সোভিয়েত ইউনিয়ন), রুজভেল্ট (আমেরিকা), তোজো (জাপান), চার্লস ডি গুয়ালে (ফ্রান্স) এদের জন্ম হয়েছিলো। এদের একপক্ষ ছিলো সামরিক খাতে শক্তিশালী কিন্তু হট হেডেড। অন্য দিকে আরেক পক্ষ তাদেরও সামরিক খাত যৌথভাবে শক্তিশালী ছিলো কিন্তু সেসব নেতারা অন্য পক্ষের মতো এতো হট হেডেড ছিলো না। এক্সিস পাওয়রে ছিলো হিটলার, মুসুলিনি এবং তোজো। অন্যদিকে এলাইড পাওয়ারে ছিলো বাকী সব।

অসম্ভব ক্ষমতাধারী হট হেডেড হিটলারকে নিঃশর্ত সাপোর্ট করেছে মুসুলিনি এবং তোজো, কখনো বুঝে, কখনো না বুঝে। তারা এটাই মনে করেছে যে, হিটলার যা বলবে সেটাই ঠিক। তাই হিটলারের পরিকল্পনায় কেউ কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় নাই বরং নিসশর্তভাবে সাপোর্ট দিয়ে হিটলারকে আরো বেপরোয়া করে তুলেছিলো। আর এর কারনও ছিলো- তারা প্রাথমিকভাবে সব সমরক্ষেত্রে সাফল্যও পাচ্ছিলো। কিন্তু এই সাফল্য কতটুকু টেকসই ছিলো সেটা তারা ভাবতে ভুল করেছিলো। অন্যদিকে এলাইড পাওয়ারের মধ্যে ছিলো বেশ কিছু বুদ্ধিমান নেতা যারা কখন কোথায় কতটুকু ফোর্স নিয়ে কিভাবে কাকে আক্রমন করতে হবে এবং কার কতটুকু দায়িত্ব সেটা খাতা কলমে বেশ পরিকল্পনা মাফিক ছকে আকা ছিলো। ফলে, কিছুটা সময় পরে যুদ্ধের মোড় পুরুই ঘুরে গিয়েছিলো।

তখন যুদ্ধটা ছিলো শুধুই সামরিক অস্ত্র আর দক্ষ সৈন্যবলের কেরামতি। কিন্তু এবারে প্রক্সিওয়ার সে রকমের নয়। এখানে সবাই জড়িত, কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে আবার কেউ নীতিগতভাবে। এখানে শুধু সামরিক অস্ত্র আর দক্ষ সৈন্যবলই শেষ কথা নয়। এখানে জড়িয়ে আছে প্রতিটি দেশের অর্থনইতিক কর্মকান্ড, জিওপলিটিক্যাল ইনফ্লোয়েন্স, ইউনিপোলারিটি ভার্সেস মাল্টিপোলারিটির মতো হিসাব কিতাব আর আছে কলোনিয়ালিজমের বা দখলদারিত্তের মতো কিছু মোগলগিড়ির বিপক্ষে একটা ক্ষোভ। স্পেশাল অপারেশনটা যদি এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যেত, তাহলে এতো কিছুর হিসাব কিতাব হয়তো আসতো না। কোনো না কোনো কারনে এই স্পেশাল অপারেশনটা ইচ্ছে করেই যেনো কেউ দীর্ঘায়িত করছে। আর এর ফলে অনেক হিসাব সবার কাছে বেরিয়ে আসছে, কার কি ইন্টারেষ্ট। থলে যে এতো বিড়াল ছিলো আমরা সেটা এই যুদ্ধ শুরুর আগে বুঝতেও পারিনি। কোনোটা বুনু বিড়াল, কোনোটা বাঘা বিড়াল, কোনোটা মিচকে বিড়াল, কোনোটা আবার চাপাহুয়া বিড়াল।  

২য় মহাযুদ্ধের বিভীষিকা যুদ্ধের সময় সাধারন জনগন যতোটা না উপলব্ধি করেছে, তার থেকে বেশী উপলব্ধি করেছে যখন নুরেনবার্গ ট্রায়াল শুরু হয়। মানুষ এর গভীর ক্ষতের কথা, মানুষের সাফারিংস এর কথা, যুদ্ধের আসল মোটিভের কথা ইত্যাদি সাধারন মানুষ জানতে পেরেছিলো সেই নুরেনবার্গ ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে। আর এখন ইউক্রেনের এই স্পেশাল অপারেশনের সময়কাল দীর্ঘায়িত হবার কারনে আমরা আমজনতা ধীরে ধীরে এটা বুঝতে পারছি কে কার বিপক্ষে কি নিয়ে কথা বলছে আর সেভাবে কে কার সাথে জোট পাকাচ্ছে।

আফ্রিকা (যার কাছে আছে ৫৪টি ভোট ইউএন পরিষদে) এখন সবার মাথা ব্যথা হয়ে দাড়িয়েছে। কে আফ্রিকাকে কন্ট্রোল করবে, কতটুকু কন্ট্রোল করবে, আর কিভাবে কন্ট্রোল করবে। অথচ এই আফ্রিকাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, যুগের পর যুগ না খেয়ে মরতে হয়েছে, তাদের রিসোর্স চুরি হয়েছে, তাদেরকে অগ্রসর হবার কোনো পথই কেউ দেখায় নাই। সব কলোনিয়াল মোড়লেরা সব সময় একে ব্যবহার করেছে তাদের রিসোর্স লুন্ঠন করে করে। একসময় এই সেন্টার অফ ফোকাস ছিলো মধ্যপ্রাচ্য। সেই মধ্যপ্রাচ্য এখন সবার হাতের বাইরে। তারাও কলোনিয়ালিজমের গন্ডি থেকে বেরিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ভারতবর্ষ একসময় ইতিহাসের নির্মম শিকার হয়েছে, তার বুকচিড়ে পাশ্চাত্যরা যা পেরেছে লুন্ঠন করেছে, প্রায় ২০০ বছর নাগাদ নিজের দেশেই তারা ক্রীতদাসের মতো জীবন যাপন করেছে। সেই ভারতবর্ষ এবার যেনো তাদের ইতিহাসের প্রতিশোধ নিতে চায়। রুখে দাড়িয়েছে। সোভিয়েট সবসময়ই পাশ্চাত্যের দুষমন ছিলো, সেটা এখনো আছে। সোভিয়েট ভেংগে ১৫টি দেশে রুপান্তরীত হয়েছে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই। কষ্ট নাই এমন হতে পারেনা। চীন সবসময়ই চালাক ছিলো। তারা পারতপক্ষে কারো সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় না। তারা মনে করে, যুদ্ধে যে পরিমান অর্থ আর মানুষের ক্ষতি হয় সেটার বদলে সেই অর্থ আর জনবল দিয়ে অন্য দেশকে কন্ট্রোল করা সহজ। আর সেটা স্থায়ী। ফলে চীন একাধারে আফ্রিকা, দক্ষিন এশিয়া, ভারতবর্ষ, এবং রাশিয়ার সাথে কোলাবরেটর হিসাবে অন্যত্র সহযোগী হয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত। এখন চীন সবার জন্যই একটা মাথাব্যথার কারন।

যাক যেটা বলছিলাম, একই সময়ে কিছু কিছু নেতাদের আবির্ভাব ঘটে যেখানে একপক্ষ আরেক পক্ষ থেকে কম বুদ্ধিমান অথবা একদল হট হেডেড আর আরেক দল কোল্ড হেডেড। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাপারটা একেবারেই দৃশ্যমান। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অধিকাংশ নেতারা কোথায় যেনো কোনো এক পরাশক্তির কাছে সারেন্ডার করে আছে নিসশর্তভাবে যেমন করেছিলো তোজো, কিংবা মুসুলিনি হিটলারের কাছে। ফলে ক্রমাগত বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারনে যে শক্তির উপর আজকে এই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দাঁড়িয়ে সেটা যেনো ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। পেট্রোডলার মার খেয়ে যাচ্ছে, এনার্জি রিসোরসের ঘাটতির কারনে ইউরোপ প্রায় ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের মধ্যে পড়ে গেছে। অন্যদিকে ইউরোপের বাইরে প্রতিটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষোভের কারনে তারা এবার একসাথে এমন করে জোট পাকিয়ে যাচ্ছে যে, যারা এতোদিন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এদের সবাইকে ভয়ের মধ্যে রেখেছিলো তারাই সেই সব দেশের একীভুত হবার কারনে নিজেরা যেনো একা হয়ে যাচ্ছে, আর নিষেধাজ্ঞা পাওয়া দেশগুলিই এখন বড় সংঘটনে রুপ নিচ্ছে। এককালের ক্ষমতাধর দেশ ব্রিটেন নিজেই যেনো এখন ছোট একটা দ্বীপে রুপান্তরীত হচ্ছে, ইউরোপ শরনার্থির চাপে এবং উচ্চ ইনফ্লেশনের মুখে তথা এনার্জি ক্রাইসিসে ডি-ইন্ডাস্ট্রিলাইজেশনের মুখে বড় বড় বিলিওনারেরা দেউলিয়ার দিকে এগুচ্ছে। একচেটিয়া রিজার্ভ ধারনকারী দেশসমুহ তাদের ক্রেডিবিলিটি হারিয়ে এখন মাল্টি কারেন্সির স্রোতে ধরাশায়ী হয়ে পড়ছে। আর এর মধ্যে একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্তে যেনো আরো গভীর সমস্যায় পতিত হবার লক্ষন দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়- যারা নিজের সম্পদকে রক্ষার জন্য এসব দেশে জমা করতো তাদের সেই সব সম্পদ এখন পুরুটাই অনিশ্চয়তার পথে। ফলে ভবিষ্যতে আর কেউ অধীক নিশ্চয়তার লক্ষে কখনো তাদের সম্পত্তি এসব দেশে রাখবে কিনা সে ব্যাপারে শতভাগ সন্দেহ আছে।

আজকে ছোট ছোট দেশ যারা অন্য বিগ পাওয়ারের উপর নির্ভরশীল, তারা হয়তো মুখ সেটে বসে আছে, কিছু বলছে না কিন্তু ক্ষোভ তো ভিতরেই জমা হয়ে আছে। নিজের দুক্ষের কথা কাউকে বলতে পারছে না মানে এই নয় যে, তাদের কষ্ট নাই। তাদের এই কষ্টের কথা যারাই শুনবে, তাদের দলেই একদিন এরা ভিড়ে যাবে খুব গোপনে। তখন এদেরকেও আর পাশে পাওয়া যাবে না। কেউ তো আছে এদের কথা শুনবে।

আজকের দিনের এই ইতিহাস যেদিন মানুষেরা উপলব্ধি করবে, সেদিন হয়তো প্রিথিবী শান্ত হয়ে যাবে আর আমরা গবেষনাগারে বসে বসে এটাই বিশ্লেষন করবো কখন কে কোথায় কি ভুল করেছিলো। আর এভাবেই “সময়” নামক অপরিবর্তনশীল ফ্যাক্টরটি তার রাজত্ব চালিয়ে যায় যেখানে এক সময় রোম, এক সময় জার্মান, এক সময় ফ্রান্স, এক সময় ব্রিটিশ, কিংবা আমেরিকাকে লিডার হিসাবে বসিয়েছিলো।  আর সবাইকে সেই লিডারকে মানতে বাধ্য করেছিলো। কিন্তু সেই “সময়” নামক ফ্যাক্টরটি যে সব সময় সবার সাথে থাকে না, এটাই আমরা হট এবং কোল্ড হেডেড মানুষেরা বুঝতে অক্ষম। পচা সামুকে পা কাটে এটা আমরা অনেক পরে বুঝি যখন পা কেটে যায়।

সম্ভবত এখন “সময়” তার নিজের অভিযান চালিয়ে আবার পুনরায় বিশ্বকে ঢেলে সাজাচ্ছে। কে এখন পরবর্তী পথ প্রদর্ষক সেটা দেখার বিষয়।

২০/০২/২০২৩-পতেঙ্গা ভ্রমন

কথায় আছে, Defense Life is a man’s life and a soldier once is always a soldier. অন্য কারো বেলায় এটা কতটুকু সত্য সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু এই অকাট্য বাক্যটা আমার বেলায় শতভাগ প্রযোজ্য। ২০৪৪ সালে ভলান্টারিলি আর্মি থেকে অবসর নেয়ার পর থেকে আমি আজো মনে মনে শতভাগ যে ফৌজ সেটা আমি মনেপ্রানে উপলব্ধি করি। কোথাও কাউকে ইনুফর্ম পড়া দেখলে আজো আমি যেচে কথা বলি, ভালো লাগে। কেউ আমার এই আর্মি বা ডিফেন্স বাহিনীর ব্যাপারে কথা বললে এখনো আমার গায়ে লাগে। কেউ ভালো বললে আমি আজো এর কৃতিত্তের অংশটুকু যেনো নিজের সেটা উপলব্ধি করি।

প্রায় ৩০ বছর পর আমি আবারো আমাদের সেই ডিফেন্স ফোর্সের অধীন নৌ বাহিনীর বিভিন্ন স্থান সমুহে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আর এর পিছনে যার সবচেয়ে বেশী অবদান- সেটা হলো আমারই ছোট ভাই সমতুল্য রিয়ার এডমিরাল মামুন যে বর্তমানে ComChit (অর্থাৎ কমান্ডার চিটাগাং) হিসাবে দায়িত্বরত। মামুন সদ্য চট্টগ্রামে পোষ্টিং গিয়েছে, সম্ভবত মামুন ওখানে না থাকলে এবারো আমার যাওয়া হতো না। মামুনের আথিথেয়তার কোনো বর্ননা চলে না। ওর নিজের বাসায় আমার থাকার জায়গা করে দেয়া, অফিসার মেসে ভি আই পি রুমে আমাদের সবার জন্য ব্যবস্থা করা, সারাক্ষন গাড়ির ব্যবস্থা, বিভিন্ন নৌ জাহাজে আমাদেরকে অভিনন্দন দেয়া সব কিছু ছিল অত্যান্ত সাবলিল এবং চমৎকার।

খুবই অল্প একটা সময়ের জন্য ছিলাম, মাত্র এক রাত দুই দিন কিন্তু তারপরেও মনে হয়েছে অনেকদিন বেড়ালাম। একটা পরিপূর্ন ভ্রমন বলা যায়।

কাপ্তাইয়ে লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম ঘাটিতে চমৎকার একটা সময় কাটিয়েছি। লেঃ কমান্ডার ইফতেকার এবং তার টিমকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিএনএস বংগবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান এর লেঃ কমান্ডার রাসেল, লেঃ কমান্ডার সাহেদ, মামুনের এডিসি লেঃ ফকরুল সহ সবাইকে আমার আন্তরিক ভালোবাসা দেয়া ছাড়া আসলে আমার হাতে কিছু ছিলো না। আমার পরিবার এবং আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম গত ৩০ বছর পর আবারো এমন একটা পরিবেশে কিছুক্ষন সময় কাটানোর জন্য।

আমরা যারা ডেফিন্সে কাজ করি, করতাম, এবং করেছেন, তাদের অবদান অসামান্য যদিও এর মুল্যায়ন সব সময় আমাদের সাধারন জনগন হয়তো অতোটা জানেন ও না। আমাদের পরিবার বর্গ যে কি পরিমান তাদের পারিবারিক জীবনকে উতসর্গ করেন আমাদের এই জীবনকে সার্থক আর দেশের জন্য তা শুধু তারাই জানেন যারা এই সব অফিসার, জোয়ান আর কর্মের সাথে জড়িত। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তাদেরকে পরিবারের বাইরেই দেশের জন্য সময় ব্যয় করতে গিয়ে নিজের জন্য বা পরিবারকে দেয়ার জন্য অবশিষ্ঠ কোনো সময়ই হাতে থাকে না। তারপরেও এই সব অফিসাররা হাসিমুখে সব সময় অন্যের সাথে সময় দেন।

পরিশেষে, আবারো আমি রিয়ার এডমিরাল মামুন এবং তার সকল টিমকে আমার প্রানঢালা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাই। 

দ্বিমুখী জীবন (আপডেটেড অন 05 May 2023)

মুক্তার সাহেব ‘পরকীয়া’ করছেন। খবরটি চারিদিকে এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, সেটা নিয়েই সবাই মুখরোচক আলাপে মত্ত। চায়ের দোকানে, পাড়ার মহল্লায়, আশেপাশে মানুষের মুখে মুখে যেনো খবরটা একটা ব্রেকিং নিউজের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঝড়ো দমকা বাতাসে ছাই ঊড়ার মতো চারিদিকে রটিয়ে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটার সত্যতা নিয়ে কারো কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিলো না এ কারনে যে, মুক্তার সাহেবের স্ত্রী আসমানী বেগমই এর প্রথম নালিশদাতা। অতঃপর দিন গড়িয়ে সপ্তাহ আসার আগেই এ বিষয়ে আসমানী বেগমের ঘোর নালিশের কারনে শেষ পর্যন্ত পারিবারিক আইন ও সালিসি আদালতে ঘটনাটি বিচারের সাব্যস্থ হয়। আমি সে সময়ে পারিবারিক আইন ও সালিসি অধিদপ্তরে কাজ করছিলাম। মুক্তার সাহেবের পরকীয়ার ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্ত করার ব্যাপারে আমার উপরে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরকীয়ার ব্যাপার স্যাপার, তদন্ত করা খুব সহজ কাজ নয়। তারপরেও এমন একটা স্পর্শকাতর ব্যাপারে আভ্যন্তরীন তথ্যাদি উদঘাটনের জন্য কাজটি হাতে নিয়েছিলাম। তারই ধারাবাহিকতার জের ধরে ঘটনায় জড়িত মুক্তার সাহেব, সাবিত্রি এবং আসমানী বেগমের জবানবন্দীসমুহ লিপিবদ্ধ করি। তাদের সবার জবানবন্ধী লিপিবদ্ধ করে এর পুরু সারমর্ম পড়ে আমি নিজে কোনো শুদ্ধ রায়ে উপনীত হতে পারিনি। যদিও আমার রায় দেবার ইখতিয়ার ছিলো না। আমার কাজ ছিলো শুধু তাদের জবানবন্ধী নেয়া। তারপরেও যখন শালিশী বোর্ড আমাকে এক কথায় কার কি অপরাধ সংক্ষীপ্ত সারমর্ম দিতে বলেছিলেন, আমি সেটায় উপনীত হতে পারিনি। কারন এই জবানবন্ধী নিতে গিয়ে আমি একটা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি যে, অবহেলা যখন দীর্ঘ হয়, উদাসীনতা যখন মানুষের জীবনে একটা কাল হয়ে দাঁড়ায়, ফেরার পথটা তখন হয়তো বন্ধই হয়ে যায়। তখন যে সুরটা বেজে উঠে তা হলো বিচ্ছেদের সুর। বিচ্ছেদ সবসময় শুধু বেদনার হয় এটা সবসময় সত্য নয়, মাঝে মাঝে বিচ্ছেদের মধ্যে মানুষ মুক্তির স্বাদও পায়। সেই স্বাদের মধ্যে পরিপুর্ন শান্তি না থাকলেও কখনো কখনো কোনো এক একাকী সময় অতীতের সেই কিছু বেদনার স্মৃতি  বা রঙ মানুষের জীবনকে কষ্টের মাঝে একটু অন্য রকমের আবেগ হয়তো জীবনের অনেক কিছুই বদলে দেয়।

আমি আরো একটা অনুভুতি উপলব্ধি করেছি, আর সেটা হলো বস্তুবাদ।

এ যুগে এখন আর সেইদিন নেই যে দূরে বসেও মা তার সন্তানের গলার স্বর শুনে বলে দিতে পারেন সে ক্ষুধার্ত। কিংবা কোনো স্ত্রী যদি হেসেও দরজা খোলেন তখন স্বামী তার এই হাসির অন্তরালেও বুঝেন যাবেন তার ভিতরে কোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে। এখন আর সেটা হয় না। এখন ভাবনার জায়গা, আবেগের জায়গা সবকিছু বস্তুবাদ দখল করে নিয়েছে। আমরা একে অপরের সাথে একই জায়গায়, একই ছাদের তলে থাকি বটে কিন্তু বেচে থাকি একা। এই অবস্থা সবাইকে একে অপরের থেকে এত দূরে ঠেলে দেয় যে, সবাই একটা একাকীত্বের জগতে প্রবেশ করে যা হয়ত কেউ আন্দাজও করতে পারে না। ফলে শুরু হয় হতাশা আর মনোকষ্টের প্রবনতা। চোখের সামনে আমরা যা দেখি, কিংবা আমাদেরকে যা দেখানো হয়, বাস্তবে হয়তো তারসাথে অনেকাংশেই মিল নাই। এই দেখা আর না দেখার মাঝে যে আবেগী আর বস্তুবাদী জীবন, সে দ্বৈত জীবনটাই আসলে আমরা।

সত্যি কথা বলতে কি, বস্তবাদ শুধু মানুষকে হতাশার মধ্যে একাকিত্তেই ফেলে যায় না, এটা বড় শহরে বড় বড় মানুষের দুনিয়াকেও ছোট করে নিয়ে আসে যেখানে নিজের হাতের উপর, নিজের মাথার উপর কারো হাত থাকা সত্তেও হাত খালিই থেকে যায় বলে মনে হয়, ভরষার স্থান শুন্যই রয়ে যায় বলে মনে হয়। আমরা এখন সবাই কোনো না কোনোভাবে বস্তুবাদের নিয়ন্ত্রনে বাস করি। কিন্তু যারা এই বস্তুবাদ জীবনে নতুন করে প্রবেশ করছি, তাদের বেলায় বিষয়টি অনেক কঠিন। তারা না পারেন বস্তুবাদী হতে, না পারেন সেই আগের আবেগী জীবন থেকে বের হতে। এমনি এক ক্রান্তিলগ্নে কোথাও না কোথাও কেউ বিচারের সম্মুখীন হন, হোক সেটা নিজের কাছে, হোক সেটা সমাজের কাছে কিংবা আদালত। সেই বিচার হয়তো শেষ হয় কিন্তু সেটা ন্যায় পায় কিনা কিংবা সেই রায় কেউ নাড়াচাড়া করে কিনা সেটার আর বিচার হয় না।  আজকের গল্পটি তাদের সেই জবানবন্দীর অনুলিপি মাত্র।

মুক্তার সাহেব একজন নামকরা শিল্পপতি, মোটামুটি বেশ সবার কাছে তার সুনাম আছে। কখনো দানবীর, কখনো কঠিন শাসক, কখনো বা জনহিতকর কাজের নেতা ইত্যাদি নামেই পরিচিত। মুক্তার সাহেবের বিবাহিত স্ত্রী আসমানী বেগমও স্বনামধন্য একজন প্রতিষ্ঠিত নারী। তাকেও সমাজের অনেকেই চিনেন এবং ভালো পরিচিতি আছে তার নিজের। মুক্তার সাহেবের মাধ্যমে স্ত্রী হিসাবে পরিচিতির বাইরেও তিনি একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। অপরদিকে, সাবিত্রী, অল্প বয়সের একজন নারী যার না ছিলো কোনো নামধাম, না ছিলো কোনো সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা, একজন গ্রাম্য এলাকার মেয়ে যে মুক্তার সাহেবের থেকেও প্রায় ৩০ বছরের ছোট। এই সাবিত্রীর সাথে মুক্তার সাহেবের পরকীয়া চলছে বলে চারিদিকে শোনা যাচ্ছে। আজকের ঘটনাবলী তার উপরেই।

আমি কেনো এই তদন্তটা হাতে নিয়েছিলাম সেটারও একটা কারন ছিলো। প্রায় ৩৩ বছর ঘর করার পর, সুখে শান্তিতে একত্রে বসবাস করার পর, ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে যাওয়ার পরে কেনো এই পরিবারের মধ্যে এমন একটা রহস্য ঢোকে গেলো, সেটা আমার জানার খুবই শখ ছিলো। এই কারনেই আমি এই কেসটার ব্যাপারে উৎসাহী হয়েছিলাম। তবে একটা কথা সত্যি যে, মুক্তার সাহেবের সাথে সাবিত্রী নামের মেয়েটার মধ্যে আমাদের তথাকথিত রীতিতে সংজ্ঞায়িত করলে যাকে আমরা পরকীয়া বলি, সেটার সুষ্পষ্ট প্রমান ছিলো। আর এই প্রমানের জন্য কোনো গোয়েন্দা কাহিনীর প্রয়োজন ছিলো না। কারন এটা মুক্তার সাহেব নিজেও অকপটে স্বীকার করেছেন কোনো রাখঢাকা ছাড়াই। ব্যাপারটা যেনো এমন ছিলো যে, তিনিই যেনো চেয়েছেন সবাই এটা জানুক।

তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ৩৩ বছর একসাথে ঘর করার পর কি কারনে মুক্তার সাহেব আসমানী বেগমের অলক্ষ্যে একান্তে সময় কাটানোর জন্যে সাবিত্রীর সাথে গোপন প্রনয় শুরু করেন?  সেই ইতিহাস না জানলে মনে হবে, হয়তো মুক্তার সাহেব আসলেই একজন চরিত্রহীন এবং দায়িত্বহীন কোনো এক সামাজিক কিট। সমাজে মুক্তার সাহেবই প্রথম ব্যক্তি নন যিনি ঘরে ভালোবাসার সুন্দুরী আসমানিদের রেখেও তার থেকে অনধিক সুন্দুরী বা অনধিক শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী এই সাবিত্রীদের সাথে প্রনয় করেন। কিন্তু অন্য সবার ব্যাপারে এই জাতীয় ঘটনা খুব মুখরোচক না হলেও, মুক্তার সাহেবদের মতো বিখ্যাত মানুষদের এসব খবর যখন নড়েচড়ে উঠে, তখন অনেকে বাসীরুটিও গরম করে খান। সবসময় গরম গরম পরোটাই যে মজাদার তা কিন্তু নয়, মুক্তার সাহেবদের মতো মানুষদের এসব ঘটনা চারিদিকে যখন রটায় তখন গরম গরম পরোটার চেয়েও এ ধরনের বাসীরুটির কদর অনেকগুন বেড়ে যায়। যখন মুখরোচক খবরের ক্ষিদে পায়, তখন রুটি, পরোটা, লুচির মধ্যে আর কোনো তফাত করা যায় না। কিন্তু মুক্তার সাহেবরা তাদের এই ঘটনার জন্য নিজ থেকে কোনো সংবাদের শিকার হতেও চান না। কারন, একদিনের মুখরোচক সংবাদ হবার জন্য কিংবা এই নশ্বর পৃথিবীতে জোরালোভাবে নামডাক থাকুক, ইতিহাস হোক, অথবা বিখ্যাত হোক এ লোভে কেউ এসব কাহিনীর নায়ক হতে চান না। এটা তো ঠিক যে, এই ‘বিখ্যাত হবো’ ধরনের ক্ষুধার জন্য কেউ সারা জীবনের তৈরী করা শব্জীক্ষেত জালিয়ে দেয় না। পাশ্চাত্যের ব্যাপার স্যাপার আলাদা। আমাদের এই দেশে এটা মানানসই নয়। তারপরেও কারনে অকারনে কারো কারো শব্জী বাগান জ্বলে। আর সেটা ভুলেই হোক, আর ইচ্ছায়ই হোক, কিংবা অন্য কারো দ্বারাই হোক, জ্বলতেই থাকে। আর এর প্রধান কারন একটাই, আবর্জনা যেমন সবসময় সাদা কাপড়েই বেশী ফুটে উঠে, তেমনি কিছু কিছু অপবাদও এই মুক্তার সাহেবদের মতো সাদা কাপড়েই বেশী চোখে পড়ে।

হাওয়া যখন কারো নামে গরম হয়, তখন আমরা অনেকেই বলি, শনির দশা চলছে। কিন্তু শনি এমন এক হাওয়ার নাম, যে, এই হাওয়ায় কারো নাম ভাসতে থাকলে তার পিছনের কি ইতিহাস, কি আচরন, সত্য-মিথ্যার চকলেটে মোড়ানো বোরহানীর মতো ঝাল-মিষ্টি-টক সবকিছুই তখন একসাথে যেনো উড়ে বেড়ায়। যে যেটা পছন্দ করে, তখন সে সেটাই ব্রেকিং নিউজের মতো লুফে নিয়ে যতো দ্রুত সম্ভব বাতাসের সাথে মাটিও গরম করে দেয়। তখন চায়ের কাপে, বাজারের দোকানে, কিংবা নদীর ঘাটেও এর পরিব্যপ্তি আর বিস্তার কম হয়না। আর যে বলীর পাঠা হয়, তার যত নামডাকই থাকুক না কেনো, সে তখন হয়ে উঠে বিষাক্ত খাবার। বিষাক্ত খাবার যতো দামিই হোক, তা ফেলেই দিতে হয় হয়ত। কারন যদি তা গোড়া থেকে উপড়ে  ফেলে না দেওয়া যায়, তখন তার মুল্য শুধু বিপদের আশংকাই বাড়িয়ে দেয় তা নয়, সেটা সমাজে একটা আইনের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

কিন্তু মুক্তার সাহেবের মতো ব্যক্তিত্তকে বিষাক্ত খাবার মনে করে আসমানী বেগমেরা তাকে ফেলেও দিতে চান না। তারা চান, কিভাবে এই বিষাক্ত খাবার আবার সিদ্ধ করে পুনরায় ঝলমলে পরিপাটি খাবারের টেবিলে পরিবেশন করা যায়। কারন তাদের ভ্যাল্যু আলাদা, সাথে থাকলে সবারই লাভ। তাই হয়তো এমন গুরুতর অভিযোগের পরেও আসমানী বেগম চান যে, মুক্তার সাহেব ফিরে আসুক, আর সাবিত্রীরা ধংশ হোক। তাতেই হয়তো আসমানী বেগমেরা খুসি।

এসব পরকীয়ার কাহিনীর সাথে সাথে যেহেতু সে ব্যাক্তির পিছনের ইতিহাস, তার আচরন নিয়ে রমরমা পান্ডুলিপি এক হাত থেকে আরেক হাতে ছড়ায়ই, তাই এই মুক্তার সাহেবের অতীত ইতিহাস, কিংবা তার আচরন সম্পর্কে তার কাছ থেকেই জানা ভালো। এতে হয়তো কিছুটা রাখঢাক থাকতে পারে অথবা থাকতে পারে কিছু প্রচ্ছন্ন লুকানো তথ্য। সিংহভাগ তথ্য যখন একে একে সারিবদ্ধভাবে জোড়া লাগানো হয়, আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি কোথায় কোন জায়গায় মুক্তার সাহেব কিছু ছেড়ে গেলেন, আর কোথায় কোন তথ্য নতুন করে আমদানী করলেন। সঠিকতার বিচার পাঠকের উপর। যে যেভাবে পারেন, তিনি তারমতো করে সেসব গড়মিল জায়গাগুলি নিজের মতো তথ্য যোগ করে প্রতিস্থাপন করলেই পূর্নাজ্ঞ গল্পটি নিজের মানসপটে ফুটে উঠবে। সবার বিচারিক ক্ষমতা আলাদা, সবার গ্রহনযোগ্যতাও আলাদা। আমি এই ত্রিপক্ষীয় ত্রিভুজ প্রেমের মধ্যে কার যে কতটা দোষ বা কে যে কার ক্ষতি কতটা করছিলো, নির্ধারন করতে পারিনি। মনে হয়েছে-প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গায় সঠিক। তাহলে শুনি তার নিজের মুখে দেয়া বিচারকের কাছে দেয়া তাঁর পরকীয়ার জবানবন্দী। বিচারকের পক্ষে আমিই সেই ব্যক্তি যে মুক্তার সাহেবের জবানবন্দী রেকর্ড করেছিলাম।

মুক্তার সাহেবের জবান বন্দি-১ম পর্ব

আমি মুক্তার সাহেবের কাছে তার জবানবন্দি নেয়ার জন্য যেদিন যাই, সেদিন বুঝেছিলাম, মুক্তার সাহেবের মধ্যে আমাদের অন্য দশজনের মতোই জীবন। আলাদা কিছু ছিলো না। তারপরেও অনেক কিছু আলাদা ছিলো যা আমরা সাহসের সাথে বলি না, করি না, কিন্তু মুক্তার সাহেব সেটা অকপটে বলেন, করেন এবং স্বীকার করেন।

মুক্তার সাহেবকে আমি তার কিছু বক্তব্য জবানবন্দি আকারে লিখতে বলায় তিনি একটু হেসে দিয়ে বললেন-আপনার যা জানার বা বলার আমাকে অকপটে বলবেন, আমি সব বলে যাবো। আপনিই আমার জবানবন্দি লিখে নিন, আমি সেথায় নিজের দস্তখত করে দায়মুক্তি দিয়ে দেবো।

বললাম- অসুবিধা নাই। আপনি বলুন, আমি নিজেই নোট করে নেবো।

বাইরে একটু একটু গরম বাতাস বইছে। গ্রীষ্মকাল। মাঝে মাঝে আকাশ মেঘলা করে, আবার মাঝে মাঝে অদ্ভুদ আকারের কয়েক ফোটা ব্রিষ্টিও হয়, সাথে দিনের সুর্যকে কোনো প্রকার আড়াল না করে। আমরা গ্রামে ছোটবেলায় এটাকে বলতাম ঃশিয়াল ব্রিষ্ট”। কেনো একে আমরা শিয়াল ব্রিষ্টি বলতাম আজো আমি তার কোনো যৌক্তিক কারন খুজে পাই নাই। যাই হোক, এমন একটা দিনে আমি মুক্তার সাহেবের বাসায় বসে তারই জীবনের পরকীয়ার একটা অধ্যায় নিয়ে কথা বলতে বসেছি।

আমি চুপচাপ বসে আছি মুক্তার সাহেবের মুখ থেকে কথা শোনার জন্য।

মুক্তার সাহেব তার কথা বলার আগে তিনি শুধু বললেন, আমার পুরু জীবনের ঘটনা না জানলে আপনি এই জাবানবন্দির মধ্যে অনেক গড়মিল পাবেন। তাই অনেক আগ থেকেই শুরু করি। কি বলেন? আপনার সময় হবে তো?

বল্লাম-আচ্ছা।

-আমার বয়স তখন সবেমাত্র কুড়ি পেড়িয়েছে। টকবকে যুবক। স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায় ঠিক সে রকম। সব প্রকারের মানসিকতা নিয়েই আমি সমাজের প্রতিটি স্তরে অনায়াসেই যাতায়ত করতে পারি। সবার সাথেই ছিলো আমার বন্ধুত্ব। গাজার আসরে যেমন আমি ছিলাম মুক্তার মতো, তেমনি পড়াশুনায় ভালো করার কারনে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তদের কাছে ছিলাম মুক্তোর হারের মতো। আর নিম্নবিত্ত মানুষদের কাছে যতোটা না ছিলাম আদর্শগত মডেল তার থেকে বেশী ছিলাম গোপন হিংসার একটা অদেখা আলাপের বিষয়বস্তু। একটা জিনিষ কি কখনো জেনেছেন যে, কোনো এক সময়ের জমিদার বাড়ির সন্তান যখন নিম্নবিত্ত পরিবারের মতো বেড়ে উঠে, তখন তার প্রাচীন উদ্ধত্তভাবের সাথে দেমাগ আর জিদটা হয়তো বেচেই থাকে যদিও সামর্থ বলতে কিছুই থাকে না। আমার ছিলো সেরকমের একটা জিদ আর দেমাগ। পিতামাতার অঢেল সম্পত্তি থাকা সত্তেও সেগুলি কোনো কাজেই আসেনি আমাদের কারো জীবনে। আমাদের পূর্ব পুরুষদের জীবন বিলুপ্তির পরে সবই চলে গিয়েছিলো অন্যের দখলে। ফলে অর্ধাহারে, কিংবা অনাহারেও আমরা বেড়ে উঠেছি এই বৈষম্যমূলক সমাজে। আর সেটা আমাদের মতো করেই। অভিযোগ ছিলো কিন্তু সামর্থ ছিলো না তার প্রতিবাদের। যাই হোক, লেখাপড়ার প্রতি অনেক ঝোক ছিলো আমার, তাই, গ্রামের আর দশটা যুবকের থেকে আমি ছিলাম একেবারেই আলাদা। অদুর অতীতে কি ছিলো আর ওসব থাকলেও এখন কি হতে পারতাম, এই চিন্তাটা মাথায় একেবারেই ছিলো না, বা না ছিলো কোনো আফসোস যে, কেনো অন্যদের অনেক কিছু আছে আর আমাদের থেকেও নাই। কিন্তু আখাংকা ছিলো অনেক, যেভাবেই হোক নিজের পরিশ্রমে সৎপথে অনেক বড় কিছু হবার। শুনেছিলাম, সুন্দুরী অনেক যুবতীর সফলতা বড় লোকের বেডরুম দিয়ে আসলেও কোনো বেকার যুবকের সফলতা কোনো বড় লোকের ঘরজামাই থেকে আসে না। আর যাদের আসে, তারা হয় নেহায়েত ভাগ্যবান নয়তো তারা জীবনের জন্য আজীবন মৃৎপ্রায় লাশের মতো সব শর্তাবলী গলায় নিয়েই ভোগবিলাস করেন। আমার এই ধরনের না ছিলো কোনো মানসিকতা আর না ছিলো এর সুযোগের সন্ধান।

২১ বছর বয়সেই আমি, আমার মেধার কারনেই হোক আর শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাইয়েই হোক, দেশের একটি অত্যান্ত প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানজনক সেক্টরে অফিসার পদে চাকুরী পেয়ে যাই। যদিও আমার অন্যান্য সেক্টরে চাকুরী পাবার সম্ভাবনা ছিল আরো ঢের বেশী এবং সেসব সেক্টরেও প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হবার জন্য যে কোর্ষ এবং ডিগ্রী দরকার তার সিলেকসনেও আমি ছিলাম অনেকের থেকে অনেক উপরে। কিন্তু সেই সিলেকশনের পর কোর্ষ বা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাবার মতো মসলা বা জোগান হাতে ছিলো না যা বর্তমান সেক্টরে সরাসরি পাওয়া যায় বিধায় আমাকে অনেক সিদ্ধান্ত নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও পালটাতে হয়েছে। ফলে অন্যান্য সেক্টরের সপ্ন বাদ দিয়ে আমি বর্তমানকেই প্রাধান্য দিলাম যাতে আমি নিজেকে সাপোর্ট দিতে পারি এবং জীবন নিজের মতো করে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

-আমি মুক্ত্রা সাহেবের কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। একবার ভাবছিলাম, নোট করি, আবার ভাবলাম, নাহ থাক, নোটের হয়তো প্রয়োজন পড়বে না, আগে পুরু ইতিহাসটা শুনি।

মুক্তার সাহেব কথা চালিয়ে যেতে লাগলেন।

বললেন, একটা জিনিষ আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, মাথার উপর ছাদ না থাকলে,  যে দুফোটা বৃষ্টি আকাশ থেকে প্রথমেই ঝরে পড়বে, সেটা আমার মাথায়ই প্রথম পড়বে। আমার না ছিলো কোনো ব্যাকআপ সাপোর্ট, না ছিলো কোনো অবলম্বন। আমাকে সাহায্য করার আসলে কেহই ছিল না তখন। ভেবেছিলাম তখন যে, এখন না হয় আমি একা, পরিবার হয় নাই, বিয়েটাও করি নাই, ফলে দুশ্চিন্তা হয়তো একটু কম, কিন্তু কখনো যদি আমার পরিবার হয়, সন্তান হয়, তখনো আমি জানি, আমাকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার অসময়ে বা দুঃসময়ে সাহাজ্য করার কেউ নাই। এই কঠিন বাস্তবতাটা আমার মাথায় এমনভাবে গেথে গিয়েছিলো যে, আমার কখনো ভুল হয়নি এটা মনে রাখবার যে আমি একা। আমার বিকল্প আমিই, আর কেউ নয়। আর মজার ব্যাপারটা হলো- এ সত্যটা আজ অবধি সত্যই।

-এই অবস্থায় আমার সাথে দেখা হয় এই আজকের আসমানীর। কথা থেকে চিঠি, চিঠি থেকে আরো ঘনিষ্ঠতা, আর সেই ঘনিষ্ঠতা থেকে একসময় প্রনয়। আমার কিংবা আসমানীদের পরিবারের অনেকেই আমাদের এই ঘনিষ্টতা পছন্দ করে নাই। এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে, আমি কিন্তু এতিম ছিলাম না। আমারো মা ছিলো, ভাই ছিলো, বোনও ছিলো, ছিলো শুভাকাংখিও। কিন্তু তাদের অবস্থা এরকম নয় যে, আমার কোনো প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে কোনো আর্থিক সহায়তা করতে পারবেন, আমার পাশে দাড়াতে পারবেন বরং তারা তাদের আর্থিক দুরাবস্থার কারনে আমার দিকেই যেনো তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু এসব শুভাকাংখির একটা বড় সমস্যা হলো যে, নিজেরা কোনো কিছু সাহাজ্য করতে না পারলেও, তারা বিজ্ঞের মতো এমন কিছু মতামত, বা উপদেশ দেন যেনো ওরাই না জানি আমার অভিভাবক বা তাদের পরামর্শ না শুনলে আমার জন্য একটা বড় অপরাধ কিংবা ঘোরতর বিপদের আশংকা আছে। কিন্তু ওই যে বললাম, আমি বরাবর স্বাধীনচেতা মনের মানুষ, আর আমার চিন্তাধারার সাথে কারো চিন্তাধারা মিলুক বা না মিলুক সেটা আমার কাছে বড় কোনো বিবেচ্য বিষয় ছিলো না। আমি শুধু ভাবতাম, আমার সমস্ত কিছুর জন্য আমিই দায়ী। হোক সেটা উত্থানের বা পতনের। আমার উত্থানে হয়তো তখন তারা তাদের ভুল পরামর্শের কারনে চুপ থাকবেন, না হয় আমার পতনের কারনে তারা আরো কিছু শুনিয়ে দেবেন যে, তাদের পরামর্শ না শোনার কারনে আজ আমার এতো অধোপতন। কিন্তু এটাও জানি, সেই অধোপতন থেকে আবার আমাকে টেনে বের করে কোনো এক সঠিক রাস্তায় দাড় করিয়ে দেবার মতো তাদের না আছে সামর্থ বা না আছে কোনো মানষিকতা।

-যাই হোক, আসমানীর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হবার পর আমি নিজেও বুঝতে পারলাম, আমার অবস্থা থেকে আসমানীর অবস্থা আরো গুরুতর। আমি ছেলে মানুষ, কোনো না কোনোভাবে হয়তো অনেক কিছু থেকেই পার পেয়ে যাবো। কিন্তু আসমানী মেয়ে মানুষ, তার অবস্থা আরো শোচনীয় থাকায় তার অবস্থা আরো বিপদজনক। তারও না আছে তেমন শক্ত কোনো অভিভাবক, না আছে বাবা, না আছে এমন কেউ যাকে নির্ভর করে সে তার মেয়েলী জীবনের একটা সুখের স্বপ্নের কথা ভাবতে পারে। তার শুধু একটা ভরষাই ছিল। আর সেটা হলো আগত ভবিষ্যতে তার স্বামীর উপর। তার চাওয়া পাওয়া, আবদার, আর যতো অভিমান যেনো লুকায়িত আছে সেই অনাগত স্বামীকে ঘিরে। আসমানী এটাও জানতো যে, জীবনে এই আদর্শগত স্বামী পেতে হলে তাকেও একটা লেবেল পর্যন্ত যেতে হবে, বিশেষ করে পড়াশুনার দিক দিয়ে। তাই, আসমানীর লক্ষ্য যেমন ছিলো ভালো একটা জীবনের জন্য, তেমনি লক্ষ্যকে সফল করার জন্য তাকে এই সমাজ সংসারে এমন করে পরিশ্রম করতে হবে যেখানে সবচেয়ে কম খরচে সবচেয়ে ভালো কিছু করা যায়। সরকারী ইউনিভার্সিটি হলো সেই লক্ষ্যভেদের একটা সহজ কৌশল। আসমানি তার পূর্ন সদ্ব্যবহার করেছিলো। ফলে একদিকে আসমানী লেখাপড়া চালিয়ে যেতে লাগলো অন্যদিকে আমাকেও সে ধরে রাখলো।

-একটা সময় এলো যে, আমি আর আসমানী একা একাই জীবনসাথী হয়ে গেলাম। আমি আসমানীকে আমার জীবনের বাইরে কখনো ভাবি নাই। আর এই ভাবার মধ্যে ব্যাপারটা এমন ছিলো যে, আমার মতো আসমানীরও কেউ নাই। আমিই আসমানীর দেবতা, আমিই আসমানীর আত্তা, আমিই আসমানীর সর্বত্র। ওর রাগ অভিমান, চাওয়া পাওয়া, সুখ আহলাদ, হাসি কান্না, সবকিছুই আমি। আর আমার বেলায়ও আমি জানি কাউকে আমার কষ্টের কথা, ব্যাথার কথা, কিংবা পরিকল্পনার কথা আসমানিকে ছাড়া কারো সাথেই শেয়ার করা সম্ভব ছিলো না। আমরা আসলে আক্ষরীক অর্থেই অর্ধাংগিনি রুপে একে অপরের জন্য স্থির হয়ে গেলাম। ভাবলাম, একদিন আমাদের সব ঠিক হয়ে যাবে, আমরা সব কিছু আমাদের মতো করেই তৈরী করবো।

মুক্তার সাহেব কিছুক্ষনের জন্য থামলেন। একটা দীর্ঘশাস ছাড়লেন। কিছুক্ষন চুপ করেও রইলেন। আমি বুঝলাম, তিনি ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন। মুক্তার সাহেব সিগারেট খেতে পছন্দ করেন। একটা বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেটে আগুন ধরিয়ে তারপর আবার শুরু করলেন-

-একটা জিনিষ জানেন? আমরা সবাই সুখী হতে চাই। ভাবি, ‘একদিন’ আমরা সুখী হবোই। এই “একদিন”, অদ্ভুত একটা সময়। সবসময় আমরা ভাবি, ‘একদিন’ আমার সবকিছু আমার মতো করে হবে, ‘একদিন’ আমি সবকিছু নিজের মতো করে পাবো, ‘একদিন’ আমি সবকিছু ছেড়ে নিজের মতো করে এই পৃথিবীকে দেখবো, দেখবো এর বিশালত্ব, এর সৌন্দর্য, এর অপূর্ব রহস্যময়তা। কিন্তু আমি জানি না কবে সেই আমার ‘একদিন’। আমি জানিও না আমার সেই ‘একদিন’ আসলে কবে সেইদিন। আমি কিভাবে জানবো, সেই ‘একদিন’টা কবে আসবে আমার জীবনে? ছোট এই সমাজে যেখানে আমরা দৈনিন্দিন সবাইকে নিয়ে বসবাস করি, আমরা সেখানে চাইলেই সবকিছু করতে পারি না।  শিশুকাল থেকে কৈশোর পার করা অবধি আমরা সবাই ওই ‘একদিন’ এর অপেক্ষায়ই থাকি যেদিন আমার সব ইচ্ছা পূরন হবে, আমি মুক্ত পাখীর মতো এই বিশাল আকাশে হাওয়ায় উড়ে উড়ে মেঘ দেখবো, নীচের সবুজ গাছপালা দেখবো, সাগর দেখবো, পাহাড় দেখবো। কিন্তু ক্রমেই যতো একেকটা স্তর পার করে যখন আরেকটা স্তরে পা রাখি, ততোই সামনে চলে আসে কোনো না কোন দায়িত্ব, কোনো না কোনো নতুন আরেকটা চ্যালেঞ্জ। সেটাকে মোকাবেলা করতে করতেই জীবনের বেশ কয়েকটি স্তর, ধাপ পার হয়ে যায়। আমাদের কারোই সেই ‘একদিন’ সময়টা যেনো আর আসে না। আজ আমরা নিজের সংসারের জন্য বাচি, কাল আমরা স্বামী বা স্ত্রীর জন্য বাচি, তারপর হয়তো সন্তানের জন্য বাচি, আর এভাবেই সামাজিক, পারিবারিক ইত্যাদির দায়বদ্ধতা আর জীবনের তাগিদে আমরা ক্রমশই জীবন নামক নদীতে শুধু ক্লান্ত হয়ে ভাসতেই থাকি। আর ভাবী, নিশ্চয় ‘একদিন’ আমার সব চ্যালেঞ্জ, সব ক্লান্তি কিংবা সব ঝামেলা শেষ হবে, আর তারপর ‘একদিন’ আমার আর কোনো ঝামেলা, সমস্যা কিংবা আমার সুখের নিমিত্তে কোনো বাধা থাকবে না। সেই ‘একদিন’ নিশ্চয় আমি আমার মতো করে সারা দেশ ঘুরতে পারবো, পার্টিতে নাচতে পারবো, পাখীর মতো যেদিকে খুশী মনের আনন্দে উড়ে বেড়াতে পারবো। কিন্তু আমার সেই ‘একদিন” যেনো আর কখনোই আসে না। বারবার কোনো না কোনো বাধা এসেই দাঁড়ায়। আসলে কি জানেন? এই ‘একদিন’ কখনোই আমাদের জীবনে আসে না। কিন্তু যদি জীবনের সবসুত্র, সব মায়াজাল, সব জটিল সমীকরন ছিন্ন করে প্রকৃতির সাথে চলমান ধারাবাহিকতায় সার্থপরের মতো দেখি, তাহলে এটাই চোখে পড়বে যে, আসলে, ‘একদিন’ হচ্ছে আজকের এইদিন, আজই। এই আজকের দিনটাই আসলে আমার সেই ‘একদিন’। আজকের দিনটার জন্যই আমি বাচি। আজকের দিনের পর হয়তো আমার জীবনে আরো একটি দিন নাও আসতে পারে। তাহলে সেই আগামীর একদিনের জন্য আমি কেনো আজকের দিনটাকে বিসর্জন দেই? হয়তো আরো ‘একদিন’ আর কখনোই আমার জীবনে আসবে না। আমার কাছে শুধু ‘একদিন’ই বাকী-আর সেটা আজ। যদি আমার সারাটা ক্যালেন্ডারেকে একটা একটা করে দিন ভাগ করে সিডিউল বানাই, দেখা যাবে, আজকের দিনটাই আমার বাস্তবতা। আর এই আজকের দিনটাই সেই ‘একদিন’। আর বাকী দিনগুলি আমার হাতেও নাই, আর যেগুলি চলে গেছে তাদের আমি কখনো ফিরিয়েও আনতে পারবো না। যেটা আছে আমার কাছে, সেটা আজ- আর এটাই সেই ‘একদিন’। তাই আমি শুধু আজকের দিনটার জন্যই বাচতে চাই। হাসতে চাই, খেলতে চাই, আকাশটা দেখতে চাই, বৃষ্টিতে ভিজতে চাই, পৃথিবীর সব গাছপালা, সব পাহাড় পর্বত, নীল আকাশ, সবকিছু দেখে প্রানভরে বাচতে চাই। আমি শুধু আমার জন্যই আজ বাচতে চাই। কালটা থাকুক অন্য সবার জন্য। আর এটা বুঝতে বুঝতে আমার সময় পেরিয়ে গেছে অনেক অনেকগুলি বছর।

কথাগুলি বলার সময় মুক্তার সাহেব কেমন অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছিলেন। যে মুক্তার সাহেব তাঁর অফিসে এতো বড় একজন কর্তাবাবু, সবাই তাকে যেমন সমীহ করে, তেমনি তাকে সবাই খুব কঠিন মানুষও মনে করে। অথচ আমার সামনে যিনি বসে আছেন, তাকে দেখে একবারের জন্যও মনে হয় না তিনি ভিতরে এতো কঠিন একজন মানুষ। মানুষ কত বিচিত্র। মুক্তার সাহেবের এই ‘একদিন’ এর ভাবনাটা আমাকে যেনো আজ নতুন করে ভাবিয়ে তুললো। এটা কি আমারো নয়? আমিও কি ঠিক এটাই ভাবি না? আমিও তো ভাবি, একদিন আমি সব পাওয়ার শান্তিতে শুধু রেষ্ট করবো, ঘুরবো, বেড়াবো, আনন্দ করবো। কিন্তু আমিও তো সেই ‘একদিনের’ নাগাল পাইনা। আসলেই তো, তাহলে আমার সেই একদিনটা কবে? মুক্তার সাহেব ঠিকই বলেছে, হয়তো সেই দিনটা আজই। কিন্তু আমি কি পারি ‘আজ’ ঠিক এই মুহুর্তে সবকিছু ছেড়েছূড়ে কোথাও একা চলে যেতে? কিংবা সবকিছু ছেড়ে বেড়িয়ে যাই যতোদিন খুশি ততোদিনের জন্য? অভিনব অতৃপ্তির জীবনে এই ‘একদিন’ একটা মরিচিকা ছাড়া আর হয়তো কিছুই না। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত হয়তো আমরা এই ‘একদিন’ এর জন্যই বাচি কিন্তু সেই ‘একদিন’ কারো জীবনেই আসে না। হয়তো কারো কারো জিবনে আসে, কিন্তু সেটা আমরা উপ্লব্ধি করি না।

-মুক্তার সাহেব একটু দম নিয়ে বললেন, যাই হোক, একটু ইমোশনাল কথা বলে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না। যেটা বলছিলাম, আসমানীর কথা। মুক্তার সাহেব আরো একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর কথা বলতে লাগলেন।

-আমি আসমানীকে পেতে সবাইকেই ছেড়েছিলাম। আমি যে আমার পরিবারের সবাইকেই ছেড়েছিলাম তারা হয়তো কোনোদিন জানতেও পারে নাই কবে থেকে আমি তাদের মন থেকেই ছেড়ে পর করে দিয়েছি। এই ছেড়ে দেয়া আর পর করে দেয়াটা এমন ছিলো যে, না কারো সাথে আমার খারাপ সম্পর্ক, না কারো সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। কিন্তু সম্পর্কটা আছে। সম্পর্কটার চরিত্র এমন ছিলো যে, না আমি তাদের জন্য দায়িত্তশিল, না ওরা আমার জন্য। শুধুমাত্র আমার মা ছিলেন এই নির্বিকার সম্পর্কের বাইরে যিনি প্রকাশ্যেও আমাকে সাপোর্ট করেছিলেন এবং অপ্রকাশ্যেও। আসমানীর সাথে আমার সম্পর্ক স্থায়ী হবার পরে আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, নিজেদেরকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। আর এই প্রতিষ্ঠার একটা বৈশিষ্ট ছিলো। সেটা হলো যে, যদি কোনো কারনে আমার জীবনের হিসাবের সব হোমওয়ার্ক শেষ না হয় এবং তারপুর্বেই আমার মৃত্যুবরন হয়, তাহলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়বে আমার এই আসমানী। তাই যেভাবেই হোক, আমার বর্তমানকে কাজে লাগিয়ে আমার প্রথম দায়িত্ত হবে আসমানীকে সাবলম্বি করে তোলা। আমার পক্ষ থেকে যা যা করা দরকার সেটা আমার শক্তির পুরুটা দিয়ে এবং আসমানীর নিজের দক্ষতায় আমি সে চেষ্টায় ব্রত হয়েছিলাম। ওই যে আবারো সেই ‘একদিন’। ‘একদিন’ সব ঠিক হয়ে যাবের মতো। ফলে অনেকটা সময় আমার জীবনে সেই “একদিন” কখনোই আসেনি।

-আসমানী আমার একটা প্রোজেক্ট ছিলো।

আমি পরক্ষনেই জানতে চাইলাম, প্রোজেক্ট ছিলো মানে? এখন কি আর তাহলে সেই প্রোজেক্ট নাই?

মুক্তার সাহেব আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন-

-আগে সবটা শুনুন, তাহলে আপনি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।

-প্রোজেক্ট যেভাবে কেউ তার সর্বশক্তি দিয়ে আর সামর্থ দিয়ে সফল করে, আমি আসমানীকে ঠিক সেভাবেই তিলে তিলে গড়ে তুলছিলাম। কিন্তু আমার একার আর্থিক সচ্চলতার উচ্চতা এমন ছিলো না যে, অচিরেই পাহাড়ের মতো একটা সাবলম্বি পরিস্থিতি তৈরী করে ফেলি। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, আমি আসমানিকে তার নিজের যোগ্যতায় গড়ে তুলতে সক্ষম হই আর সেই সক্ষমতায় আসমানিও একটা সরকারী চাকুরীর সুবাদে প্ল্যাটফর্ম পেয়ে যায়। আসমানীর এই প্লাটফর্মে আরো একটা বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়েছিলো আমার অন্যান্য আত্তীয়সজনের সাথে। যদিও আমার পরিবারের কারো সাথেই আমার তেমন সম্পর্ক টেকসই ছিলো না, তারপরেও আসমানীর চাকুরীটাকে অনেকেই সহজ করে মেনে নিতে পারে নাই। সবসময় তাদের অভিযোগ ছিলো, কেনো আমি আসমানীকে মহিলা হয়েও চাকুরী করার অনুমতি দিলাম, বিশেষ করে এই ইগোতে যে, স্ত্রীর রোজগারের উপর আমার লোভ কিংবা ভরষা, স্ত্রীরা ঘরের বাইরে গেলে তাঁর চরিত্রস্খলনের সম্ভাবনা ইত্যাদি ইত্যাদি।

-আসমানীর উপর আমার শতভাগ আস্থা ছিলো। আজকালকার ছেলেমেয়েদের লাইফ ষ্টাইলের মতো আসমানীর লাইফ ষ্টাইল ছিলো না। আজকাল ছেলেমেয়েরা ওদের জীবনটাকে টাইম পাস মনে করে আর টাইম পাসকে জীবন মনে করে। কাল পর্যন্ত যে গার্লফ্রেন্ড ছিলো আজ সে বোন, আর আজ যে বোন সে কাল হয়ে যায় গার্লফ্রেন্ড। চোখের পলকে প্রেম হয়ে যায়, আবার চোখের পলকে প্রেম ভেঙ্গেও যায়। আসমানির চরিত্র কখনোই এমন ছিলো না। আর আসমানীর উপর আমার সেই আস্থা একদিনে গড়ে উঠে নাই। তার মানসিকতা, তার ভালোবাসার গভীরতা আমাকে কখনো এটা সন্দেহ করার অবকাশ দেয় নাই যে, আসমানী কোনো না কোনো অবস্থায় তার নিজ গন্তব্য আর ভালোবাসা থেকে ছিটকে পড়বে। আর সে ছিটকে পড়েও নাই কখনো। বরং ছিটকে পড়েছিলাম আমি।

-খুব ভালোভাবেই চলছিলো আমাদের। আমাদের সন্তান হলো, সংসারে খরচ বাড়লো বটে কিন্তু দুজনের মিলিত চেষ্টায় আমাদের অন্তত প্রাত্যাহিক জীবনধারনের নিমিত্তে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছিলো না। আমরা ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে শুরু করলাম। ওইযে বললাম, আমার মাথা থেকে কখনো এটা সরে যায় নাই যে, আমার অবর্তমানে আমার নিজস্ব পরিবার যেনো থাকে সুরক্ষিত এবং সাবলম্বি। সেই লক্ষ্যটা থেকে আমি কোনোদিন বিচ্যুত হয় নাই। আগে শুধু আসমানীকে নিয়ে ভাবনা ছিলো, এখন তাঁর সাথে যোগ হলো আমার সন্তানেরা। তাই তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বাড়ি, নিরাপদে চলার জন্য গাড়ি, কিছু স্থায়ী আর্থিক উৎস যা যা লাগে আমি সেটার ব্যবস্থা করছিলাম। সময়ের সাথে সাথে সেটা আসলেই একটা স্থায়ী রুপও নিয়েছিলো। আর এই লম্বা সময়টার দৈর্ঘ ছিলো প্রায় ২৫ বছর। এই ২৫ বছরে আমি চড়াও উতড়াই পার হয়েই এখানে এসেছি। কেউ আমাকে সাহাজ্য করে নাই। না আমি কারো সাহাজ্যের জন্য পথ চেয়েছিলাম। এখন আমার আসমানি জানে সে সাবলম্বি, আমিও জানি আমার আসমানি সাবলম্বি। সে নিজে নিজে চলতে পারবে। তার একটা স্থায়ী আর্থিক উৎস আছে। এই বিশাল অবস্থানটা করতে আমাকে আমার জীবনের বহু মুল্যবান সময় পার করতে হয়েছে বটে কিন্তু এরই মধ্যে আমি আমার যৌবন পেরিয়ে মধ্য বয়স্ক পুরুহীতে পরিনিত হয়ে গেছি। আমি অনেক খুসী। কিন্তু তারপর…।

এই পর্যায়ে এসে মুক্তার সাহেব আবারো একটা বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেট ধরালেন। জবানবন্দি নেবার সময় আমরা মুক্তার সাহেবকে সর্বপ্রকার সুযোগ দিয়েছিলাম যাতে তিনি সাবলীল্ভাবে তাঁর মনের কথা বলতে পারেন। তিনি তার কাজের বুয়া সেলীকে এককাপ করে কফি দিতে বললেন। কফির কাপে চুমু দিলেন। তারপর আমাকে তিনি প্রশ্ন করলেন-

-বলুন তো, একটা মানুষের জীবন সুখী হয় কি কি জিনিষ থাকলে?

আমি বললাম, টাকা থাকলে, সম্পদ থাকলে, সমাজে একটা ভালো পজিসন ইত্যাদি থাকলে আর যদি শরীর সুস্থ থাকে, তাহলে তো সে সুখী মানুষ বলেই গন্য হয়।

মুক্তার সাহেব একটু মুচকী হাসলেন। তারপর বললেন,

-তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন, রাস্তায় যে সব মানুষ ভিক্ষা করে, তারা কেউ সুখী নয়? কিংবা যাদের একফোটা সম্পদ নাই, তারা কি সুখী নয়? অথবা সমাজে যারা অনেক বড় বড় পজিশন নিয়ে বাস করেনা, তারা কি সুখী নয়? অথবা যদি বলি, বিছানায় অবশ হয়ে পড়ে থাকা সব মানুষই কি দুখী? তারা কি কোনো না কোনো স্তরে সুখী না? যদি এমন হতো যে, টাকা আছে, পয়সা আছে, অঢেল সম্পদ আছে, সমাজে মানসম্মান প্রতিপত্তি আছে আবার শারীরকভাবে সুস্থও আছে, তারা তাহলে কিসের নেশায় নিজের ঘরে থাকা সুন্দুরী স্ত্রীকে রেখে পুনরায় পরকীয়ায় মেতে উঠেন? সবাই কি পারভার্ট? নাকি যৌনতাই প্রধান? অথবা যদি বলি যে, ৯০ বছরের এক বৃদ্ধ যখন তার অঢেল টাকা পয়সা ব্যাংক ব্যালেন্স থাকার পরেও নিজের ৮৫ বছরের স্ত্রীর বিয়োগে আরেকটা বিয়ে করতে মানিসকভাবে প্রস্তুতি নেন, যখন তার যৌনতায়ও কোনো ক্ষমতা নাই, সে তাহলে এটা কিসের নেশায় করে? আমি অবিশ্বাস করছি না যে, সবক্ষেত্রেই আমার এই প্রশ্ন সঠিক বা সঠিক নয়, তবে এর অন্তরনিহিত গুররহস্য খুজতে গেলে দেখা যাবে, এসবের কোনটাই এর উত্তর  নয়। উত্তর লুকিয়ে আছে শুধুমাত্র না দেখা একটা অনুভুতিতে। আর সেটা হচ্ছে- একাকীত্ত বা নন একোম্প্যানিয়ন।

আমি কিছু বলতে চেয়েছিলাম, আরে, ব্যাপারটা তো এমন করে কখনো ভেবে দেখিনি? আমি কিছু একটা বলতে গিয়ে মুক্তার সাহেব তার হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে আবার বলতে লাগলেন-

-হ্যা, হয়তো আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, এই একাকীত্ত কি বা এই নন-একোম্প্যানিয়ন এর মর্মার্থ কি। এটা বুঝবার জন্য আপানাকে কিছু সুক্ষ জিনিষের ভিতরে ঢোকতে হবে। আর সেটা হচ্ছে-অনুভুতি, আবেগ, তার সাথে মানবিক চাহিদা। মানবিক চাহিদার সাথে শারীরিক চাহিদার একটা যোগসুত্র থাকতে পারে যা আমি পরে বল্বো। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি আপনাকে ছোট একটা উদাহরন দেই। কখনো কি উপলব্ধি করেছেন যে, A person can be lonely in a crowdy city? অথবা কখনো কি ভেবেছেন যে, an one-month infant baby who has no idea about the world or even does not know how to talk, does not understand our any of the language, but can be a good accompanist as well!! অর্থাৎ একটা কোলাহলপুর্ন জনসমুদ্রের মধ্যেও কেউ একা থাকে। আশেপাশে হাজার হাজার লোক ঘুরছে, ফিরছে, খাচ্ছে, তামাশা করছে, আনন্দ করছে অথচ কোনো একজন এই ভীড়ের মধ্যেও একা। এই উপলব্ধিটা কখনো ভেবেছেন? আবার অন্যদিকে দেখবেন, অনেক আপন লোকজন আপনার আশেপাশে আছে, কথা শুনার মতো লোকজনও আছে, কিন্তু তাদের থেকে আপনার কাছে মনে হবে একটা অবুঝ বাচ্চা যে কথাই বলতে শিখে নাই, যে আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝে না, তারসাথেও আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারছেন। আপনি তাঁর কাছে একা নন। সে যেনো আপনার একাকীত্তের একজন ভালো সাথী। তারসাথে আপনি বিজ্ঞান নিয়ে আলাপ করতে পারেন, মহাকাশ নিয়া আলাপ করতে পারেন। হয়তো সে এসবের কিছুই বুঝে না। আপনি একাই তাঁর সাথে অনর্গল কথা বলে সময় অতিবাহিত করতে পারবেন। সে হয়তো কখনো কোনো কারন ছাড়াই কেদে দেবে, কখনো সে চার হাত পা নেড়ে নেড়ে কি জানি ভাব প্রকাশ করবে যার সাথে আপনার বিষয়বস্তুর কোনো মিল নাই, অথচ আপনি খুব ভালো সময় কাটাচ্ছেন। এই নবজাতক এক মাসের বাচ্চাটাও আপনার খুব ভালো সংগি হয়তো। এই অনুভুতি কি বুঝেন? আর এখানেই মানুষের সুখ এবং সাথীর সাথে আপনার চিরবন্ধন। এই বন্ধন থেকে আপনি কখনোই টাকার বিনিময়ে, সম্পদের বিনিময়ে, কিংবা আপনার সামাজিক উচ্চতার মাপকাঠিতে মুক্ত হতে পারবেন না। যতো বিপদই আসুক, যতো খারাপ সময়ই আসুক, এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না।

কি অবাক করার মতো কথা মুক্তার সাহেবের। ফেলে দেয়া একেবারেই অসম্ভব। যদিও মুক্তার সাহেবের এই যুক্তি বুঝতে আমার বেশ অনেক সময় লেগেছিলো। কিন্তু তার উপলব্ধিটা তো ঠিক। হয়তো আমি আমার ছোট এই মস্তিষ্কে ব্যাপারটা তখনো ধারন করে উঠতে পারি নাই। কিন্তু যখন তিনি তার কাহিনিটার প্রায় শেষে, তখন আমার কাছে ব্যাপারটা কিছুটা যেনো ঝাপসার মধ্যে হালকা পরিষ্কার হয়েছিলো। কারন মুক্তার সাহেব খুব সুক্ষভাবে বলছিলেন-

-যখন কোনো মানুষের দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, অথবা থাকে ভিতরের কিছু কথা যা বলার জন্য মন ছটফট করে, তাহলে সে সবসময়ই চাইবে যে, সে অন্য কারো সাথে তার এই দুঃখটা, কষ্টটা, কিংবা অনুভুতিটা শেয়ার করতে। কেউ তো থাকবে যে, ওর কথা শুনবে। বুঝুক বা না বুঝুক সেটা আলাদা ব্যাপার, কষ্ট লাঘব করুক বা না করুক সেটাও আলাদা ব্যাপার। কিন্তু কারো সাথে তো তার এই ব্যাপারগুলি শেয়ার করা দরকার। যখন এই লোকগুলি তার কাছে বসে তাকে আর সময় না দেয়, কিংবা যদি এমন হয় যে, তার এই ব্যাপারগুলি সে কারো কাছে আর শেয়ার করতে পারলোই না, তখনই সে অনুভব করে, সে একা। আর এই একাকিত্ত মানুষটাকে ‘সময়’ নামক দানব বা বাহক ধীরে ধীরে সবার থেকে আলাদা করে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে খোজে কে আছে তার এই আবেগগুলি শোনার? আর যে শুনবে, তারই জিত, আর যারা শুনবে না, তারাই আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় এই মানুষটার গন্ডি থেকে। সে যেই হোক, হোক তার স্ত্রী, হোক তার প্রানের সন্তান অথবা প্রিয় বন্ধুবান্ধব। অন্যদিকে, আরেকদল, যারা এই সুযোগ লুফে নেয়, সে যতোই অশিক্ষিত হোক বা অসুন্দর, কিংবা তুলনামুলকভাবে নিম্নধাপের, তাতেও কিছুই যায় আসে না, তারাই হয়ে উঠে তার মনের মানুষ, কাছের মানুষ। আর তাই বারবার তার এই একাকিত্তে ভোগা মন ছুটে যায় তাদের কাছে যারা তাকে সময় দেয়, দেয় একটা কম্প্যানিয়ন। আর সেই কম্পেনিয়নের মানুষদের মধ্যে যদি জেন্ডারের পার্থক্য থাকে, তখনই সেটাকে আমরা তৃতীয় নয়নে বলি ‘পরকীয়া’। পরকীয়া মানে শুধু শারিরীক কিছু না। পরকীয়াতে আরো অনেক কিছু থাকে যা অনেক মুল্যবান কিন্তু আমরা একটা শব্দেই তাকে নোংরা করে ফেলি।

মুক্তার সাহেবের লজিক অত্যান্ত ধারালো। মানি বা না মানি, তাকে অগ্রাহ্য করার মতো উলটা লজিক আমার কাছে ছিলো না। তবুও আমি মুক্তার সাহেবকে প্রশ্ন করলাম, তাহলে কি এমন একাকিত্তে আপনি ভোগছিলেন যেখানে শেষ অবধি মনে হলো যে, এই ৩৩ বছর একসাথে থেকেও আপনি আসমানীর থেকে একা? অথবা কি এমন কারন ছিলো যা আপনাকে সবার থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়েছে এই সাজানো সংসার, পাতানো সুখী জীবন থেকে?

মুক্তার সাহেব আবারো মুচকী হেসে বললেন,

-কই নাতো? আমি তো এই সাজানো সংসার বা পাতানো জীবন থেকে সরে যাইনি। ওই যে আপনাকে আগেই বলেছিলাম যে, বলীর সব পাঠা সবসময় বিষাক্ত হয় না। আর যদি হয়ও, আর যদি পাঠাটাকে বলী দিতে গেলে অনেক বিপদের কিংবা অনেক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেই পাঠা বিষাক্ত হলেও তাকে কোনো না কোনোভাবে পুনরায় শুদ্ধ করে ঝলমলে পরিপাটি খাবারের টেবিলেই পরিবেশন করা হয়ই। আমিও ঠিক সেরকম ঝলমলে টেবিলেই এখনো আছি। তবে এই ‘আছি’র মধ্যে অনেক অংশ জুড়ে আছে  আসলেই ‘নাই’ আর অনেক অংশ জুড়ে আছে কিছু দায়িত্তবোধে। আমি ‘আছি’ আর আমি ‘দায়িত্তে আছি’ এই দুয়ের মধ্যে ফারাক বুঝেন? বিস্তর ফারাক। জেলখানায় বন্দি কয়েদির পাশে জেলখানায় বন্দি নয় এমন কোন এক মানুষ যখন বলে, ‘আমি আছি’ তোমার পাশে, এর মানে কি, সেটা তো আপনি নিশ্চয় বুঝেন। এর মানে, কখন তার কি করলে এই জেলখানা থেকে কয়েদির মুক্তি মিলবে তার একটা প্রতিশ্রুতি, অথবা অসুস্থ হলে দূরপাল্লা পথ অতিক্রম করে সে তখন চোখে জলভরা চাহনীতে আপনাকে দেখতে আসবে তার একটা নিশ্চয়তা, আপনার কষ্টে সে ব্যাথিত হবে, আপনাকে সে প্রতিনিয়ত মিস করবে ইত্যাদি। অথবা জেলখানায় বন্দি থাকা অবস্থায় সে আপনার একাকিত্তকে মিস করবে ইত্যাদি। কিন্তু সেই প্রহরী যে কয়েদির দায়িত্তে আছে, সেও কিন্তু কয়েদির পাশেই থাকে। কিন্তু তাঁর ভুমিকা নিশ্চয় এক নয়। কয়েদির দায়িত্তে থাকা প্রহরীর কাজ যেনো কোনোভাবেই এই বন্দিদশা থেকে কয়েদি পালাতে না পারেন, এটাই তার প্রথম দায়িত্ত।  কাছে থাকা আর দায়িত্তে থাকা কখনোই এক নয়। আমার কাজ যেনো সেই দায়িত্ত যাতে আমার এই সাজানো সংসার ভেংগে না যায়, আমার দায়িত্ত সেটা যাতে আমার অন্তত এই জীবদ্দশায় আমার আসমানীর জীবনে কোনো কষ্ট না আসে, আমার সন্তানের কোনো বিপর্জয় না আসে।

মুক্তার সাহেব আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা আগে দিলেন। তারপর তিনি শুরু করলেন আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর। আমি তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি বাক্য এতো তন্ময় হয়ে শুনছিলাম যে, মনে হচ্ছিলো আমি কোনো ফিলোসোফির ক্লাশে উচ্চমানের কোনো তত্তকথা শুনছি। বারবার মনে হচ্ছিলো, মুক্তার সাহেব জীবনকে যেভাবে দেখেন, আমরা হয়তো এর বাইরের প্রাঙ্গণ থেকে দেখি। আমরা যখন অন্দর মহলের আগরবাতির গন্ধটা আনন্দ করি, তখন মুক্তার সাহেব এই আগরের গন্ধের সাথে সাথে আগরের জ্বলে পড়ে ছাই হবার কষ্টটাও দেখেন। আমরা সাধারনভবে যাকে প্রকৃতি বা ন্যাচার বলি, মুক্তার সাহেব এটাকে শুধু ন্যাচার বলে ঘটনাপ্রবাহ এড়িয়ে যান না। তিনি এর অন্তরনিহিত কারনগুলি খোজেন। আর সেই কারনের মধ্যেই যেনো আসল রুপ আর ঘটনা ঘটার সবগুলি উপাদান খুজে পান।

বাইরে কিছুটা সূর্যের আলো কমে আসছিলো। বাতাসের গরম আবহাওয়াতা যেনো ধীরে ধীরে কমে এসছে। কাজের বুয়া আবারো একবার কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতে এলো। মুক্তার সাহেব, বিকালের নাস্তা দিতে বললেন। তারপর আবার তার কথায় ফিরে এলেন।

-জীবন একটাই। আজ থেকে শতবর্ষ আগে সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজের জন্য যখন তাজমহল তৈরী করেন, তার ওই তাজমহল কতটা ভালোবাসা প্রকাশ করেছে সেটা জানার চেয়ে আমরা কি কখনো এভাবে ভেবে দেখেছি যে, সম্রাট কতোটা কষ্ট থেকে এই তাজমহল বানিয়েছেন? তাজমহলের ইমারতে কি সেই কষ্ট আমরা দেখতে পাই? আমরা যা দেখি, তা হচ্ছে শাহজাহানের ভালোবাসার নিদর্সন। যা দেখতে পাই, তা হচ্ছে মুল্যবান রত্নে খচিত একটা দামী প্যালেস। কিন্তু আমি যদি বলি এটা সম্রাট শাহজাহানের ভালোবাসার মৃত্যুর নিদর্সন? তাহলে কি ভুল হবে? যদি বলি এটা ভালোবাসার কষ্ট থেকে নির্বাসিত একাকি এক রাজার মনের কষ্টের আকুতি বা অনুভুতি? তাহলে কি ভুল কিছু বলা হবে? হয়তো দুটুই ঠিক। এখন আমার অনেকগুলি প্রশ্ন জাগে, সম্রাট শাহজাহানের ২য় স্ত্রী ছিলেন এই আরজুমান্দ বানু বেগম ওরফে মমতাজ। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন কান্দাহারী বেগম। রানী মমতাজ ছাড়াও সম্রাটের জীবনে আরো আটজন রানী এসেছিলো। তাহলে সম্রাট শাহজাহান শুধুমাত্র মমতাজের জন্যই এতোবড় একটা বিশ্বনন্দিত মহল তৈরী করলেন কেনো? আর কারো জন্যে নয় কেনো? এর অন্তর্নিহিত অনুভুতি হয়তো শুধু জানেন শাহজাহান নিজে। আমার মাঝে মাঝে এরকম প্রশ্নও জাগে যে, এতো বড় বড় নাম যাদের, তারা কেনো একটিমাত্র নারীকে নিয়ে জীবনে সুখী হতে পারলেন না? শারীরিক চাহিদার কথা যদি বলি, তাহলে এক নারী কি দেয় না যা অন্য নারী দেয়? এর মানে হয়তো শারীরিক চাহিদাই সেখানে মুখ্য নয়। তাদের তো কোনো টাকা পয়সা, ধনদৌলত মান-ইজ্জত, প্রতিপত্তি, ক্ষমতার দাপট কোনো কমতি ছিলো না। তাহলে আবারো আমার ওই যে সেই আগের কথা ফিরে আসতে হয়। শুধু টাকা পয়সা, ধনদৌলত মান-ইজ্জর সম্মান প্রতিপত্তিই সুখী বা খুসী জীবনের একমাত্র ভিত্তিপ্রস্তর নয়। এর বাইরেও কিছু আছে যা যুগে যুগে কারো কারো ক্ষেত্রে প্রমানিত হয়েছে আর বেশীরভাগ মানুষের জীবনে তা প্রমানিত হয়ই নাই।

-আরেকটা ছোট তত্ত আমাদের সবার জানা থাকা দরকার যে, মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছুই মেনে যায়। আর সেই মেনে যাওয়া আর মেনে নেয়ার মধ্যেও একটা ফিলোসোফি থাকে। মানুষ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো কিছুর আশায় হয়তোবা অনেক কিছুই নিজের মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানিয়ে নেয়। কিন্তু যখন মানুষ সেই আশার সফলতা পেয়ে যায়, যখন সে নিরাপদ দুরুত্তে পৌঁছে যায়, তারমধ্যে তখন ‘আমিত্ত’ কাজ করে। তারমধ্যে তখন বৈতরনি পার হয়ে নিরাপদ জোনে চলে আসায় সে তখন  অনেক কিছুই আর আগের মতো অনুগত নাও থাকতে পারে। তখন ‘মেনে যাওয়া’ বা ‘মেনে নেয়ার’ বাধ্যবাধকতায় সে আর আটকে থাকে না। হয়তো ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটেছে আমার আসমানির মধ্যে। আমি বলছি না যে, সে সীমা অতিক্রান্ত করে আমাকে হেয় করছে অথবা সে আর আগের মতো নাই এমন না। কিন্তু একটা ব্যাপার তো সবার জীবনেই আসে, যার নাম ‘শ্লথ’। এই শ্লথ থেকে শুরু হয় নিয়মের মধ্যে নিয়ম ভাংগার সুক্ষ কিছু কর্ম। অর্থাৎ সময়ের সাথে পিছিয়ে যাওয়া, ডিমান্ডের সাথে ক্যাপাসিটির সমন্নয় না হওয়া। আমরা অনেকেই এটাকে বুঝি না। তখন যে কোনো পক্ষের কাছে এটা মনে হয়, মানুষটা যেনো আর আগের মতো নাই। ‘এই আগের মতো নাই’ ব্যাপারটাকে আমরা অনেকেই ভেবে থাকি তাচ্ছিলোতা। আর এটা যে আসমানীর মধ্যে ছিলো না সেটা ফেলে দেবার মতো নয়। আপনি আবার এটা ভাববেন না যে, আমি আসমানীর বিপক্ষে অভিযোগ তুলছি। না, এটা কখনোই হবে না। আসমানীও একজন মানুষ। তাঁর নিজের একটা জীবন আছে, সকীয়তা আছে, সে দাস নয়। আমি তাকে ক্রয় করে আনি নাই। তাহলে আমি আসলে কি বলতে চাচ্ছি?

-কোনো একদা যে আসমানীকে আমি যাই উপদেশ দিয়েছি, বিনা বাক্যে, বিনা দ্বিধায় সে সেটা বেদবাক্য মনে করে অন্ধবিশ্বাসে গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালন করেছে। কখনো কখনো আমি আসমানীকে নিয়ে ভরদুপুরে একই বিছানায় শুয়ে কার্টুন ছবি দেখেও খিলখিল করে হেসেছি। অনেক পয়সা ছিলো না, তারপরেও পাশের কোনো এক অখ্যাত রেষ্টুরেন্টে গিয়ে ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়েও তৃপ্তি পেয়েছি। গাড়ি ছিলো না, রিক্সায় ঘুরে বেড়িয়েছি ঘন্টার পর ঘন্টা। রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ পড়তে পড়তে কখন আমি অপূর্ব আর আসমানী লাবন্য হয়ে যেতো বুঝতেই পারতাম না। কিন্তু আজ হাতে প্রচুর পয়সা আছে, গাড়ি আছে, কিন্তু আমি সেই আসমানীকে খুজে পাই না। হয়তো আসমানীও সেই মুক্তার সাহেবকে খুজে পান না। এরমানে এইটা নয় যে, সে আমার কথা শুনে না বা শুনতে চায় না। কিন্তু তারমধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যখন আমাদের অনেক কিছু ছিল না, তখন একটা রিক্সায় করে মাইলকে মাইল ঘুরেও আমাদের আনন্দ হয়েছে যা এখন এসি গাড়িতেও পাওয়া যায় না। একটা সময় ছিল যখন আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা কি করলে কি হবে, কি করলে আরো ভাল হবে, সেটা নিয়ে কোনো তর্কবিহীন আলাপ আলোচনা শলাপরামর্শ হয়েছে। আজ যেটা করা তো দুরের কথা, আলোচনা করার জন্য পরিবেশও নাই। আমি বলতে চাইলেও তার হয়তো সময় নাই শোনার। এরমানে এই নয় যে, সে আমাকে অগ্রাহ্য করছে। আমি বলতে চাচ্ছি, এটা নিয়ে আর কোনো শলাপরামর্শ হয়না। একটা সময় ছিলো যখন, আমার প্রিয় খাবারগুলিই শুধু টেবিলে শোভা পেতো, যা এখন আমাকে বলেই দিতে হয় হয়ত এটা নয় ওটা খাইলেই মনে হয় ভালো লাগতো। কখনো কখনো ইচ্ছে না থাকলেও তাদের পছন্দের খাবারের তালিকাটাই এখন আমার খাবারের তালিকা করে নিতে হয়। এরমানে এই নয় যে, আমি বললে সেটা তৈরী করা হবে না। কিন্তু আগে এটা বলতে হয় নাই। পরিবর্তন সবখানেই আসে, আমাদের সম্পর্কের মধ্যেও এসছে। আর এটার জন্য অভিযোগ করা বোকামী। সমৃদ্ধ জীবনের চেয়ে অভাবী জীবনে অনেক বেশী প্রেম আর ভালোবাসা থাকে। যদিও সেখানে ঝগড়াও থাকে, তবে সেই ঝগড়াটাও একটা ভালোবাসার অন্য রকমের বহির্প্রকাশ।

আমি অবাক হয়ে মুক্তার সাহেবের কথা শুনছিলাম, তার প্রতিটি কথায় আমি যেনো শীতের প্রথম সকালের ঝির ঝির বাতাসের কেমন একটা কটু অনুভুতি অথবা একটা মিষ্টি  আস্বাদন অনুভব করছিলাম। পাশে পুষ্করিনী তীরের পাড়ে দম নেয়া একটা কোলা ব্যাং যেমন তার সমস্ত ধ্যান ধারনাকে একদিকে পাশ কাটিয়ে সেই আগত শীতের রোদের আস্বাদ নিয়ে চোখ বুঝে থাকে, ঠিক তেমন আমিও যেনো মুক্তার সাহেবের তাঁর অনাগত কাহিনীর মর্মটা আস্বাদন করার নিমিত্তে অনেকটা দম নিয়েই বসেছিলাম। আসলে সব চোখ সব কিছু দেখে না, সব আত্মা সবকিছুর আস্বাদন পায় না। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে আমাদের চাওয়া পাওয়ার সাথে সময়ে ব্যব্ধানে এমন অনেক কিছু এমন ধীরে ধীরে পালটে যায় যে, পরিবর্তনটা চোখেই পড়ে না অথচ প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক দিন অন্তরালে হয়তো আমাদের চোখে এই বিশাল পরিবর্তনটা যখন গুচরে আসে, তখন পিছনে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকে না। সেই পরিবর্তন তখন স্থায়ী রুপ ধারন করে ফেলেছে। এটাই হয়তো প্রকৃতির সবচেয়ে নির্দয় অভ্যাস।

 মুক্তার সাহেব তাঁর কথা বলতে থাকেন-

-জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন আপনি জানেন আপনাকে নিয়ে কেউ আর হৈচৈ করেনা, আগের মতো সর্বত্র আপনার সেই ভূমিকার প্রয়োজন নাই কিংবা আপনি যদি চানও সেখানে আপনার উপস্থিতি বা বক্তব্য আর আগের মতো তেমন জায়গা করে নেয় না তখন আপনার এটা মানতে অবশ্যই কষ্ট হয় যে, আপনার প্রয়োজন হয়তো তাদের কাছে ফুরিয়ে গেছে। আপনি যেনো আছেন শুধুমাত্র কারো কারো বিশেষ প্রয়োজন মিটানোর জন্য। আপনার কখন একটু ছাদে হাওয়া খেতে ভাল লাগবে, সেই হাওয়া খাওয়ার সময় আগে তো একজন আসমানীর সংগ পাওয়া যেতো কিন্তু এখন তার জগত অনেক বিশাল। এখানে আপনিই একমাত্র মানুষ নন যাকে ঘিরে তার দিনের সিংহভাগ সময় ব্যস্ততায় কাটবে। এরমানে আবার এই নয় যে, আসমানি অন্য কাউকে মন দিয়ে বসে আছে। আগে আপনার অনুপস্থিতি হয়তো তাকে একা করে দিতো বটে কিন্তু এখন সেটা সেরকম নয়। কেনো যেনো মনে হয় কি যেনো মিসিং। এখন সম্পর্কটা যেনো একটা ডকুমেন্টের মধ্যে নেমে গেছে। মানসিক টর্চারের মতো মনে হয় কিছু কিছু সময়। অল্পতেই যেনো সবকিছু ঘোলাটে হয়ে যায়। সবাই যেনো কেনো অনেক অস্থির। কাউকেই যেনো কেউ সহ্য করতে পারছেন না। সবার মতামত ভিন্ন, সবাই সঠিক, আপনি একাই সঠিক আর সবাই ঠিক নয় এটা আর এমন না। আর এর ফলে আমার কাছে এটাই মনে হয়েছে যে, দূর্বল সময়টা ওরা সবাই পেরিয়ে গেছে বলেই হয়তো এখন আর আগের মতো সব কিছুতেই বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে এমনটা না। ব্যাপারটা জানি কেমন, সব না মানলেও তো সমস্যা তেমন নাই। উত্তর আর প্রতি-উত্তরের জামানা মনে হয় এখন, যেটা আগে ছিলো না। কম্প্রোমাইজ আর সাইলেন্ট থাকাই যেনো এখন সময়। কিন্তু এটা তো আমি চাইনি? আর এখান থেকেই সম্ভবত শুরু হয়, ‘অনীহা’ নামক একটা অনুভুতি।

-একটা জিনিষ সবসময় কারো মনে রাখা উচিত যে, ভালোবাসার যেমন একটা শক্তি আছে, অনিহারও একটা বিপদ আছে। অনিহার অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইমোশন যখন ধীরে ধীরে বুদবুদের মতো অন্তরে জমা হতে থাকে, একসময় সেটা সারা অন্তর জুড়েই এমনভাবে বিচরন করে যেনো ভালোবাসার বুদবুদের আর কোনো স্থানই থাকে না। অথচ আপনি জানেন, আগের সে ভালোবাসার বুদবুদগুলি তখনো মরে যায় নাই, বেচেই আছে কিন্তু কোনঠাসা হয়ে। তখন এই কোনঠাসা ভালোবাসার অতৃপ্ত বুদবুদগুলি জলবিহিন মাছের মতো অতি অল্প পরিসরে ছটফট করতে করতে একসময় কোনো এক দূর্বল ছিদ্র দিয়ে মনের অজান্তেই বেরিয়ে আসে। যখন এই ভালোবাসার বুদবুদগুলি একসাথে ঝাকেঝাকে বেরিয়ে আসে, তখন সেটা খুজতে থাকে কিছু নিরাপদ আশ্রয়। তার তো কোথাও একটা জায়গা দরকার। আর সেই নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাড়ায় সাবিত্রীর মতো কিছু অসহায় মানুষ যারা একে স্থান দেয় সেই পূর্বেকার আসমানীদের মতো যখন আসমানীরা একসময় দূর্বল ছিলো, সাবলম্বি ছিলো না। সেই স্থানটা তখন দখল করে নেয় সাবিত্রীরা। তখনই ঘটে এক বিপ্লব। যে বিপ্লবের নাম, ওই যে বললাম, ‘আমি আছি’ আর  আমি দায়িত্তে আছি’র মতো বিপ্লবে। কেউ কেউ এসব সাবিত্রীদেরকে ডাকে-নোংরা মেয়ে মানুষ, আর যারা এই নোংরা মেয়ে মানুষদের সাথে সময় কাটায় তাকেই আমাদের সমাজ বলে ‘পরকীয়া’। এবার, আপনিই বলেন, এই অতৃপ্ত আত্তা, এই শুষ্ক হৃদয় কখন কোথায় ভিজে আবার উজ্জিবিত হয় সেটার নির্ধারন করে কে তাহলে?

মুক্তার সাহেবের এহেনো প্রশ্নে আমি যেনো রেডি ছিলাম না। একটু ইতস্তত হয়ে সময় নিয়ে বললাম, তাহলে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, এর জন্য শুধু আসমানীরাই দায়ী? তারা কি এটা জেনে শুনে করছে? নাকি তাদের মধ্যে এই সংশয় নাই বলে সুযোগটা আমরা যারা পুরুষ, তারাই গ্রহন করছি?

-না এটা হয়তো আসমানিদের দোষও নয়, না আমাদের মতো মুক্তার সাহেবদেরও। এটা সময়ের একটা চক্র যখন কোনো মরুভুমি আচমকা কোনো অঝর ধারায় বৃষ্টির জলে সবুজ ঘাসের মাঠে রুপান্তিত হয়। তপ্ত বালিকনায়ও তখন সবুজ ঘাসের জন্ম হয়। প্রকৃতি মনে হয় এরকমই। সাবিত্রীরা আসলে দূর সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ। আর সেই দ্বীপের চারিধারে যেমন নোনাজল থাকে, থাকে তাঁর সাথে সবুজ গাছরাজীরাও। শাখায় শাখায় পাখীরা কিচির মিচির করে, সন্ধ্যে বেলায় সব শান্ত হয়ে যে যার মতো ঘরে আসে। কখনো বাউল বাতাসে তাদের ঘর ভেংগে যায়, কখনো আচমকা ছিটকে পড়ে অথৈ নদীতে হাবুডুব খেতে থাকে। তখন কোনো এক ঘটনাচক্রে আমার মতো মুক্তার সাহেবেরাও সেই সাবিত্রীর কাছে এসে নির্ঝুপ শান্ত একরাতে চোখের অবশিষ্ট জল ফেলে হয়তো নিদ্রায় নিপতিত হয়। সুখ থাকে কিনা সেটা হয়তো মুখ্য ব্যাপার নয়, কিন্তু নিজকে আবিষ্কার করা যায়, আসলে আমরা কারা, আর কিসের নেশায় আমাদের ছুটে চলা। অথবা কোথায় আমরা কি পাই না।

মুক্তার সাহেব তাঁর চশমাটা খুলে একটু মুছে নিলেন, হয়তোবা তাঁর চোখের কোনে কিছু একটা ঝাপসা মনে হয়েছে। মুক্তার সাহেব অনেক শক্ত মানুষ, অল্পতেই তাঁর চোখ ভিজে আসে না হয়তো কিন্তু কষ্টটা তো কোথাও না কোথাও আছে। এতোক্ষন আমি মুক্তার সাহেবের কথাগুলি খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। কেনো জানি আমার কাছেও মনে হলো, মুক্তার সাহেব যেনো চোখে আংগুল দিয়ে আমাদের অনেকের জীবনের কথাগুলিই বলে যাচ্ছেন। আমিও তো মাঝে মাঝে খুব একা, মাঝে মাঝে তো আমারো মনে হয়, কি যেনো মিসিং! আমার গিন্নীর সাথে, আমার পরিবারের সাথে, আমার অন্য সব সম্পর্কগুলির সাথেও তো আমি এ রকম একটা অনুভুতি পেয়েছি যেখানে আমিও মনে করেছি, আমার প্রয়োজন হয়তো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে, আমি কারো কারো মনের বাসনা আর আগের মতো সফল করতে পারছি না। আমার হয়তো সাবিত্রি নাই, কিন্তু আমার তো কেহই নাই। কোথাও আমি মুক্তার সাহেবের অপরাধ হয়েছে বলে ধরতে পারছিনা। আবার এটাও মানা যায় না যে, কেনো এতো বছর পর আসমানিরা বদলে যায় কিংবা মুক্তার সাহেবেরা ছিটকে পড়ে যায় আরো একটা আসমানীর কাছে যাদের নাম সাবিত্রী। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। বিশ্বাস আর ভরষার যখন মৃত্যু হয়, তখন শারীরিক দুরুত্ত অনেকগুন বেড়ে যায়। আর এই দুরুত্ত বাড়ার সাথে সাথে তখন ‘সময়’ নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। এই সময় ইচ্ছা থাকুক আর নাইবা থাকুক, অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মুক্তার সাহেবদেরকে যখন শত ব্যর্থতার কারনেও আসমানীরা ছাড়তে চায় না, তখন হয়তো মেনে নেয় আসমানীরাও, আবার আসমানীরা আছে, এটা জেনেও মেনে নেয় সাবিত্রীরাও। মেনে নিতে শিখতে হয়। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ দুজন মানুষের মধ্যে যখন ভালোবাসার এই অপুর্নতার সৃষ্টি হয়, তখন কোনো একজন তার কাংখিত সুখ কিংবা একাকিত্ত কাটানোর জন্য সেই সম্পর্কের বাইরে যেতেই পারে। এটা কারো নিজের ইচ্ছায় যে সবসময় হয় তাও না। আর যখনই পা একবার বাইরে ছুটে, তখন, তাকে আর বিয়ে নামক অলিখিত বায়বীয় সম্পর্কটা শক্ত ভীত তৈরী করতে সক্ষম হয় না। প্রবল স্রোতে তীরভাংগা পাড়ের মতো প্রতিটা ক্ষনে এর ভাংগনের শব্দ পাওয়া যায়। আর যখন এই ভাংগা একবার শুরু হয় তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। হয় তাকে মুক্ত করে দিতে হয়, আর তা না হলে মেনেই নিতে হয়। কাউকে জোর করে কিছুক্ষনের জন্য হয়তো চুপ করিয়ে রাখা যেতে পারে কিন্তু সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। ফলে একদিকে যেমন আসমানীরা তাদের অধিকার ছেড়ে দিতে চায় না, আবার অন্যদিকে  মুক্তার সাহেবদের ধরেও রাখা যায় না। অগাধ সম্পত্তির বিবেচনায় একটা কথা ঠিক যে, পৃথিবীতে এমন কিছু সম্পর্ক আছে যা সব সম্পত্তির থেকেও বড়। আর সে সম্পর্কটা হচ্ছে অনুভুতির সম্পর্ক। আর মুক্তার সাহেবরা হচ্ছেন এমন এক সম্পর্কের নাম, যারা সাফল্যের সিড়ি বেয়ে বেয়ে উপরের তলায় স্থান করে নিয়েছেন। তাদের এই সাফল্যের একটা ফেসভ্যালু থাকায় তাদেরকে সবাই ছেড়েও যেতে চায় না। মুক্তার সাহেবের মতো বলতে গেলে বলতে হয়, সীমা লঙ্ঘন আর সীমা শেষ এক জিনিষ নয়। আসমানি, সাবিত্রী আর মুক্তার সাহেবদের এই ত্রিমাত্রার সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে সিমা লংগন হয়েছে কিন্তু সীমা শেষ হয়ে যায় নাই। তারা সবাই যেনো দুঃখের খাচায় বন্দি। আর এটাই সত্যি। সত্যিটা কখনো কল্পনা হয় না। আর কোনো  কল্পনাকেও সত্যি বলা যায় না। সত্যি কখনো কারো এজেন্ডা হতে পারে না। সত্যি সেটাই যেটা বাস্তব। আসমানী বেগম যেমন বাস্তব, সাবিত্রীও বাস্তব। আর এই দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন মুক্তার সাহেব। সেটাও বাস্তব।