১১/০৮/২০২১-রক্তক্ষরন

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

১১ 

 

শরীরের কোনো কাটাছেড়া, কোনো বাহ্যিক জখম চোখে দেখা যায়, ক্ষুধা হলে খাবারের অভাবে পেট গুর গুর করে, কিংবা জ্বর সর্দি, কাশি কিংবা মাথা ব্যথা হলে তার সিম্পটম অনায়াসেই বুঝা যায় কিন্তু অন্তরের জখম কি কখনো চোখে পড়ে? অন্তরে কি কখনো জখম হয় আদৌ? আর এই অন্তরটাই বা শরীরের কোন অংগ? এটা কি এমন কোনো জিনিষ যা মাংশ বা হাড় কিংবা এমন কিছু দিয়ে এর গঠন কাঠামো?

সমস্তটা হৃদপিণ্ড তার স্টকে থাকা রক্ত যখন শরীরের সর্বত্র তার নিয়মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় সেটাকে বলে সুস্থ্যতা। কিন্তু সেই একই রক্ত যখন তার নিয়মের বাইরে গিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে সেটাকে হয়তো বলে দূর্ঘটনা। কিন্তু একই ধমনী, একই শিরায় যখন সেই একই রক্ত একই নিয়মে প্রবাহ হয়, তারপরেও মনে হয় কোথায় যেনো একটা ক্ষরন হচ্ছে, তাহলে এটাকে কি বলে? হয়তো সাহিত্যিকরা বলবেন- এটাকে বলে কষ্ট, এটা হয়তো বেদনা কিংবা হয়তো কেউ বলবেন এটা একটা খারাপ অনুভুতি। তাহলে এই রক্তক্ষরন হয় কোথায়? শিরায়? ধমনীতে? শরীরের কোনো অংগে? আর এই ক্ষরণ হলে কি হয়? আসলে রক্তক্ষরনটা হয় অনুভুতির ভিতরে, ওই সেই অন্তরে যার উপস্থিতি আজো কেউ খুজে পায়নি, বা হাত দিয়ে ধরে দেখেনি। একেবারে ভিতরে, অদৃশ্য। অথচ অনুভুতির এই ভিতরটা কেউ দেখে না। বাইরের চোখে যা দেখা যায়, সেটা ভিতরের অবস্থা না। সত্যটা সবসময় থাকে ভিতরে। আর এই সত্যকে মানুষের কোনো অংগ, না তার হাত, না তার পা, না তার শরীর প্রকাশ করে। এই অদেখা রক্তক্ষরনে হাত অবশ হয়ে যায় না, পা নিস্তব্ধ হয়ে উঠেনা বা কান বধির হয় না। শুধু চোখ সেটাকে লুকাতে পারে না বলে অনবরত সেই নোনা জল দিয়েই হয়তো বলতে থাকে, কোথাও কিছু জ্বলছে, কোথাও কিছু পুড়ছে, কোথাও কিছু ক্ষরন হচ্ছে। না ঠান্দা জল, না কোনো বেদনানাশক ঔষধ না কোনো থেরাপি এই ক্ষরনকে থামাতে পারে। কিন্তু যার চোখ নাই, তারও কি এই ক্ষরন হয়? হ্যা, হয়। তারও এই রক্তক্ষরন হয়। হয়তো তার ভাষা একটু ভিন্ন, স্থিরচিত্তে ক্রয়াগত নীরবতা। তাহলে এই রক্তক্ষরনের সময়কালটা কত? বা কখন এর জন্ম আর কখন তার ইতি? বলা বড্ড মুষ্কিল।

যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা আরো বেশী করে দুশ্চিন্তায় ভোগায় যখন এটা জানা যায় যে, যে মানুষটি চলে গেছে সে সবদিক থেকে অশান্তিতেই ছিলো। এমন অবস্থায় এমনটাই বারবার মনে প্রশ্ন আসে, যে, জীবনের কাছে হেরে যাওয়া মানুষটি আবার মনের কষ্টে কোনো ভুল পদক্ষেপ না নিয়ে বসে। শুরু হয় রক্ত ক্ষরনের প্রক্রিয়া। এই ক্ষরণ অজানা আতংকের।

আবার যখন কোনো মানুষ সবার সামনে থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে চিরতরে ভিন্ন জগতে চলে যায়, তখন দুসচিন্তার প্রকারটা হয়তো অন্য রকমের কিন্তু তারপরেও রক্তক্ষরন হয়। আর সেই ক্ষরণ কখনো ভরষার অভাবের অনুভুতি কিংবা মাথার উপরে থাকা কোনো বট বৃক্ষের অথবা কখনো এটা হয় নিঃসঙ্গতার।

কিন্তু জেনে শুনে, প্রকাশ্যে সবার সামনে দিয়ে যখন বড় কোনো সাফল্যের উদ্দেশ্যে নিজের অতীব প্রিয়জন জীবন্ত চলে যায়, হাসিখুশির অন্তরালে তখন যেনো চলতে থাকে মেঘ-বৃষ্টির খেলা। চলতে থাকে দোদুল্যমান এক অনুভুতি। হাসিখুশি চোখের পাতায়ও তখন দেখা যায় সেই রক্তক্ষরনের এক বেদনাময় কষ্টের অনুভুতি। এই রক্তক্ষরনের প্রধান কারন হয়তো শুন্যতা। তখন যেদিকে তাকাবেন, দেখবেন, সব কিছু ঠিক আগের মতোই আছে, শুধু নাই সেখানে যে বিচরন করতো সেই মানুষটা। তার ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়, ওই তো মানুষতা গতকাল ও ওখানে বসেছিল, ওই যে কাপড় টা বাতাসে ঝুলছে, সেটা এখনো সেখানেই ঝুলছে, অথচ সেই মানুষতা আজ ঠিক ওইখানে নাই। আছে অন্য কোথাও, চোখের দৃষ্টির অনেক বাইরে। আর এই দোদুল্যমান অনুভুতি নিয়েই আমি বিদায় জানাতে এসেছি আমার অতীব আদরের ছোট মেয়েকে আজ। বুঝতে পারছি, কোথায় যেনো পূরছে আমার অন্তর, কোথায় যেনো জ্বলছে আমার অনুভুতির সমস্ত স্নায়ুগুলি।

আমি যুদ্ধ দেখেছি, যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছি, আগুনে পূড়ে যাওয়া নগরী দেখেছি, ঘনকালো নির্জন রাতে কোনো পাহাড়ি রাস্তা ধরে একা একা হেটে পার হয়েছি। ভয় আমাকে কাবু করেনি। অথচ আজকে আমি এই শান্ত সুষ্ঠ পরিবেশে নির্মল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে যখন আমার ছোট মেয়েকে সুদুর আমেরিকায় যাওয়ার প্রাক্কালে বিদায় জানাচ্ছি, তখন সারাক্ষন রক্তক্ষরনের পাশাপাশি একটা ভয়, একটা আতংক, একটা শুন্যতার অনুভুতিতে ভোগছি। কেনো জানি মনে হয়, আমার ভয় লাগছে। অথচ আমার শরীর সুস্থ্য, আমার ক্ষুধা নাই, তারপরেও কেনো জানি মনে হচ্ছে- কি যেনো আমি ভালো নাই।

আমার মেয়েটা চলে গেলো আজ। বায়না ধরেছিলো-আমেরিকা ছাড়া সে আর কোথাও পড়াশুনা করবে না। সন্তানরা যখন বায়না করে, জেদ ধরে, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মা বাবা সেটাকে পুর্ন করার জন্য দায়িত্ত পালন করেন। আমিও সেই বায়নাটা হয়তো পুরন করছি আজ। কিন্তু সেই জিদ বা বায়না আদৌ ঠিক কিনা বা বায়নাটা আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা অনেক ক্ষেত্রে আমরা মা বাবা সেটা বিচার করি না। সন্তান কষ্টে থাকুক বা দুঃখ নিয়ে বড় হোক অথবা তার নির্দিষ্ট পথ থেকে হারিয়ে যাক, তাতে মা বাবা এক মুহুর্ত পর্যন্তও শান্তিতে থাকে না। মা বাবা সবসময় তার সন্তানদেরকে সবচেয়ে ভালোটাই দেয়ার স্বপ্ন দেখে। আসলে সন্তান যতো বড়ই হোক আর বৃদ্ধ, মা বাবার ভুমিকা থেকে আজ অবধি কোনো মা বাবা অবসর গ্রহন করেন নাই। কিন্তু তাদেরও কিছু আশা থাকে, স্বপ্ন থাকে এই সন্তানদের কাছে। আমরা বাবা মায়েরা সন্তানদের কাধে শুধু স্কুল ব্যাগ নয়, বরং মা বাবার অনেক আশা ইচ্ছাও ঝুলিয়ে দেই। হয়তো এটাও সেই রকমের একটা বায়না থেকে আমার দায়িত্ব পালনের পর্ব যেখানে একটা সফল, উজ্জ্বল আর সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্য আমি অন্তরের রক্তক্ষরনের মতো বেদনাটাও ধারন করছি। আমি জানি, সব সাফল্যের একটা মুল্য থাকে যেটা কাছের মানুষকেই জোগাতে হয়। আর হয়তো এটা সেটাই।

তবে একটা কথা ঠিক যে, আজকের এই অদেখা কষ্টের রক্তক্ষরনের ইতি বা যবনিকা হয় তখন যখন যে মানুষটির জন্য রক্তক্ষরনের জন্ম, সে যখন জীবনের পাহাড় বেয়ে জয় করে সামনে দাঁড়ায়। তখন আজকের দিনের রক্তক্ষরনের সাথে মিশ্রিত হাসিটায় শুধু ভেসে থাকে হাসিটাই। যেমন পানি আর তেলের মিশ্রনে শুধু ভেসে থাকে পানির চেয়ে দামী সেই তেল। তখনো এই চোখ জলে ভিজে উঠে হয়তো কিন্তু তখন চোখ এটা জানান দেয় না, কোথায় যেনো কি পূরছে, কি যেনো জ্বলছে বরং প্রতিটি উচ্ছল হাসিতে ভরে উঠে আনন্দ ধারা।

আমি সেই প্রত্যাশা নিয়েই আজকের এই রক্তক্ষরনের অধ্যায় যাকে আমি যেই নামেই ডাকি না কেনো, বেদনা, শুন্যতা কিংবা আতংক তা শুধু নীরবে মেনে নিয়েই রক্ত ক্ষরনের সেই পোড়া যন্ত্রনাকে বরন করছি। তোমরা সব সময় ঈশ্বরকে মনে রেখো, নীতির পথে থেকে আর মানবতার থেকে বড় কোনো সম্পদ নাই এটা জেনে সর্বদা সেই মানবিক গুনেই যেনো থাকো, এই দোয়া রইলো।

শরতচন্দ্রের সেই বিখ্যাত উক্তিটাই আজ তোমাদেরকে বলি- ভালোবাসা শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। ‘যেতে নাহি দিবো’ মন বল্লেও বাধা দেয়ার কোনো শক্তি তখন থাকে না, না বাধা দিতে কোনো পথ আগলে রাখি, বরং মনের ভিতরের ‘যেতে নাহি দেবো জেনেও যাওয়ার সব পথ খুলে দেই সেই সাফল্যের জন্য, যা আমার চোখের মনির ভিতরে খেলা করে সারাক্ষন।

০৮/০৮/২০২১-সন্ধ্যা ৮ টা ৩২ মিনিট

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

খুব ভালো একটা খবর পেলাম আজ। আমার বন্ধু উইং কমান্ডার মাসুদকে বলেছিলাম, যেভাবেই হোক এয়ারপোর্টের জন্য আমাকে যেনো কয়েকটা ‘পাশ’ এর বন্দোবস্ত করে দেয়। কভিডের কারনে প্যাসেঞ্জার ছাড়া অন্য কোনো দর্শ্নার্থীকে এয়ারপোর্টের ভিতরে প্রবেশ করতেই দেয় না। কনিকার সাথে যাওয়ার জন্যে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ইউএস এম্বেসী সব ধরনের ভিসা (শুধু মাত্র স্টুডেন্ট ভিসা ছাড়া) বন্ধ রেখেছে, ফলে আমরা কনিকার সাথে যেতে পারছি না। এদিকে আবার কভিডের কারনে এয়ারপোর্টের ভিতরেও প্রবেশের সুযোগ নাই। যাক, শেষ পর্যন্ত আজকে আমার দোস্ত মাসুদ আমাকে ফোন করে জানালো যে, এভিয়েশনের সিকিউরিটি ডাইরেক্টর আরেক উইং কমান্ডার আজমকে বলা আছে সে আমাদের জন্য ‘পাশ’ এর ব্যবস্থা করবে। আজমের সাথে কথা বললাম, আজম খুব সমীহ করেই জানালো যে, আগামী ১০ তারিখের রাত ৯ টায় যেনো আমি ওকে ফোন দিয়ে একটা কন্ট্যাক্ট নাম্বার সংগ্রহ করি যে কিনা আমাদেরকে এয়ারপোর্টে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে। এই মুহুর্তে এর থেকে আর ভালো খবর আমার কাছে কিছুই নাই। খুব ভালো লাগলো যে, কনিকাকে আমি আর আমার স্ত্রী (উম্মিকাসহ) এয়ারপোর্টে সি-অফ করতে পারবো, ওর লাগেজ পত্রগুলি ঠিকমতো বুকিং করে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারবো। মেয়েটা আমেরিকায় চলে যাচ্ছে ৫ বছরের জন্য, পড়াশুনার খাতিরে। ইউএমবিসি (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড বাল্টিমোর কাউন্টি) তে যাচ্ছে।

আমার মনে পড়ছে যে, আজ থেকে প্রায় ৩৮ বছর আগেও আমার ভর্তি হয়েছিলো কার্স্কভাইল ইউনিভার্সিটিতে যেখানে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ চেয়েছিলেন আমি আমেরিকায় গিয়ে পড়াশুনা করি। কিন্তু যে কোনো কারনে হোক, আমার আর যাওয়া হয় নাই, আমি চলে গিয়েছিলাম আর্মিতে। আমার যে আমেরিকায় যাওয়া হয় নাই এটা বল্বো না, আমি তারপরে ১৯৯৫/৯৬ সালে হাইতির জাতিসঙ্ঘ মিশন থেকে একমাসের জন্য আমেরিকায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। তারপরে পর পর দুবার ভিসা পেয়েছিলাম মোট ৬ বছরের জন্য কিন্তু আমাকে আমেরিকা টানে নাই। আগামী ১১ তারিখে আমার ছোট মেয়ে চলে যাচ্ছে সেই সুদুর আমেরিকায়। একটু খারাপ লাগছে কিন্তু সন্তানদের সাফল্যের জন্য তাদেরকে ঘর থেকে ছেড়েই দিতে হয়, এটাই নিয়ম।

কনিকা যাতে কোনো প্রকারের আর্থিক সমস্যায় না থাকে সেজন্য আমি অগ্রিম ওর এক বছরে সমস্ত খরচ (বাড়ি ভাড়া, খাওয়া দাওয়ার খরচ, ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি, হাত খরচ, যাতায়ত খরচ, ইন্স্যুরেন্স খরচ ইত্যাদি মিলিয়ে ৩৫ হাজার ডলার দিয়ে দিলাম যাতে আমিও আর এই এক বছর ওকে নিয়ে চিন্তা করতে না হয়। সাথে সিটি ব্যাংকের একটা এমেক্স কার্ড ও দিয়ে দিচ্ছি ২ হাজার ডলারের মতো যাতে খুবই জরুরী সময়ে সে এটা খরচ করতে পারে। আগামীকাল কনিকার কভিড-১৯ টেষ্ট করাতে হবে। ফ্লাইটে উঠার ৪৮ ঘন্টা আগে কভিড টেষ্ট করে ফ্লাইটে উঠতে হয়। পজিটিভ এলে ফ্লাই করতে পারবে না। দোয়া করছি, আল্লাহ যেনো সব কিছু সহী সালামতে এটাও ইনশাল্লাহ নেগেটিভ করে দেন।

বড় মেয়েকেও ইন্সিস্ট করছি সে যেনো কনিকার মতো দেশের বাইরে (পারলে একই ইউনিভার্সিটি, ইউএমবিসি) আমেরিকায় চলে যায়। কিন্তু কোথায় যেনো উম্মিকার একটা পিছুটান অনুভব করছি। তার শখ লন্ডনে যাওয়া। যদি তাও হয়, তাতেও আমি রাজী। ওরা ভালো থাকুক, সেটাই আমি চাই।

আমি জানি একটা সময় আসবে, আমি আসলেই একা হয়ে যাবো। এমন কি আমি মিটুলকেও ধরে রাখতে পারবো কিনা জানি না। কারন যখন দুই মেয়ে দেশের বাইরে থাকবে, আমার ধারনা, মিতুলও প্রায়ই দেশের বাইরে থাকবে তার মেয়েদের সাথে। যদি দুইটা আলাদা আলাদা দেশ হয়, তাতে ওর বাইরে থাকার সময়টা বেড়ে যাবে, আর যদি একই দেশে হয়, তাহলে এক ছুটিতেই দুই মেয়ের সাথে হয়তো সময়টা কাটাবে। আমি ব্যবসা করি, আমাকে দেশেই থাকতে হবে, আর আমি দেশে থাকতেই বেশী পছন্দ করি।

বাকীটা আল্লাহ জানেন।  

স্পেসাল নোটঃ 

যে মানুষগুলি ১১ আগষ্ট ২০২১ তারিখে এয়ারপোর্টের ভিতরে আমাদেরকে এন্টারটেইনমেন্ট করেছে তারা হচ্ছেন- সার্জেন্ট জুলহাস এবং সার্জেন্ট রাসেল। আমরা সবাই ঢুকতে পেরেছিলাম আর ওরাই আমার মেয়ের জন্য সব ব্যবস্থা করে দিলো একেবারে প্লেন পর্যন্ত। রাসেল আর জুলহাসকে ধন্যবাদ দেয়ার মতো আমার ভাষা নাই। তাদের জন্য আমার এই পেজে ওদেরকে মনে রাখার জন্য ওদের কয়েকটা ছবি রেখে দিলাম। বড্ড ভালো লাগলো ওদের আথিথেয়তা। 

ওরা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অনেক সহায়তা করেছে। এয়ারপোর্টের গেট থেকে শুরু করে আমার মেয়ে কনিকাকে ইমিগ্রেশন করা এবং ওর সাথে প্লেন পর্যন্ত এগিয়ে দেয়ার পুরু কাজটাই করেছে। আমি আমার পরিবার এবং অন্যান্য সবাই অনেক কৃতজ্ঞ। দোয়া করি ওদের জন্যেও। 

০৮/০৮/২০২১-What If I were not Born

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

০৮

মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহন করার থেকে এতো সম্মান নাকি ঈশ্বর তার পাপমুক্ত ফেরেস্তাদেরকেও দেন নাই। সৃষ্টির সেরা জীবদের মধ্যে এই মানুষই নাকি সেরা। এই মানুষের জন্যই ঈশ্বর আকাশ তৈরী করেছেন, সেই আকাশ থেকে তিনি জল-বৃষ্টি বর্ষন করেন, জমির নির্মল গাছ গাছালীকে তিনি সবুজ সতেজ করে রাখেন। তিনি এই মানুষের জন্যই পাহাড় সৃষ্টি করেছেন, দিন আর রাতের তফাত করেছেন, ভালোবাসার মতো সংগী তৈরী করেছেন, অতঃপর তিনি জীবিনের বিভিন্ন স্তরে স্তরে নানাবিধ উপলব্দির জন্য সন্তান, নাতি নাতকোরের মতো মিষ্টি মিষ্টি ফুলের সংসারও তৈরী করেছেন। কি অদ্ভুত ঈশ্বরের সব সাজানো এই পরিকল্পনা। নীল আকাসের দিকে তাকিয়ে কখনো সাদা ফেনার মতো ভেসে যাওয়া মেঘ, কখনো উত্তাল মেঘের অবিরাম বৃষ্টিবরন, হেমন্তে বা শরতের দিনে বাহারী ফুলের সমাহার, পাখীদের কিচির মিচির, শিল্পির গানের মূর্ছনা, সবকিছু যেনো বিমোহিত করার মতো একটা সময়। অথচ এসব কিছু কোনো না কোনো একদিন ছেড়ে আমাদের সবাইকে চলেই যেতে হয়।

আবার অন্যদিকে যদি দেখি, দেখা যায়, এই বাহারী জীবনের সব সুখ আর আস্বাদন ছাড়াও আমাদের এই জীবনে ছেকে বসে দুঃখ বেদনা, হতাশা আর কষ্ট। জীবনের গাড়ি আমাদের জীবন-যানবহনের চাকার উপর টানতে টানতে এক সময় অনেকেই আমরা হাপিয়ে উঠি। বেদনায় ভরে উঠে কষ্টে, দুঃখে ভেসে যায় চোখের জল অথবা রাগে, অভিমানে একে অপরের হয়ে উঠি চরম থেকে চরম শত্রুতায় যেনো ভালোবাসা কোনোকালেই ছিলো না, হোক সেটা বিবাহ বন্ধনের মতো কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে, অথবা ব্যবসায়ীক কোনো অংশীদারিত্তে অথবা ক্ষমতার লড়াইয়ের কোনো যুদ্ধমাঠে।

অনেক সময় আমাদের মুখ দেখে এটা বুঝা যায় না কে সুখের বা কষ্টের কোন স্তরে আছি। ভিতরের সুখ কিংবা যন্ত্রনার উপলব্ধিকে আমরা একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করলেও সঠিক স্তরটা কখনোই প্রকাশ করা যায় না। পাখীদের বেলায় কিংবা অন্য কোনো প্রানীদের বেলায় এটা কতটুকু, সেটা আমরা না কখনো ভেবে দেখেছি, না কখনো উপলব্ধি করেছি। ওরা দিনের শুরুতে আহারের খোজে বেরিয়ে যায়, পেট ভরে গেলে কোনো এক গাছের ডালে বা পাহাড়ের কোনো এক ছোট সুড়ঙ্গে রাত কাটিয়ে দেয়। তাদের অট্টালিকার দরকার পড়ে না, ওরা ওরা কেউ কারো শত্রুতা করে না, কোন পর্বনে বিশেষ কোনো কিছুর আয়োজনেরও দরকার মনে করেনা। কবে ছুটির দিন, কবে ঈদের দিন কিংবা করে কোন মহাযুদ্ধ লেগেছিলো সে খবরেও ওদের কিছুই যায় আসে না। ওদেরও সন্তান হয়, ওরাও দলবেধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়, ওদের কোনো ভিসা বা ইমিগ্রেশনেরও দরকার পড়ে না। টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী ওদের জন্য কোনোদিন দরকার পড়ে নাই, আগামীতেও দরকার পড়বে না। ওরাও কষ্টে কিছুক্ষন হয়তো ঘেউ ঘেউ করে, কিংবা চিন্তিত হয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে চলে যায়, কিন্তু তাকে আকড়ে ধরে বসে থাকে না। ওদের সারাদিনের কর্মকান্ডের জন্য না কারো কাছে জবাব্দিহি করতে হয়, না কারো কাছে ধর্না দিতে হয়, এমনকি ওরা ঈশ্বরের কাছেও তাদের অপকর্মের কিংবা ভালোকর্মের কোনো জবাব্দিহিতা করতে হয় না। কোনো ট্যাক্স ফাইল নাই, কোনো ভ্যাট ফাইল নাই, না আছে কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স, না দরকার তাদের গাড়িঘোড়ার। তাহলে তো ওরাই আসলে শান্তিতে থাকে, মানুষের থেকে অধিক।

মানুষ ছাড়া অন্য সব প্রানীকুল প্রত্যেকেই নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস রাখে কিন্তু মানুষ তার নিজের একক ক্ষমতার উপর কখনোই সে বিশ্বাস রাখে না বা থাকে না। তার দল লাগে, তার অর্থনৈতিক মেরুদন্ড লাগে, তার আরো বিস্তর আয়োজন লাগে। এতো কিছুর উপরে তার আস্থা রাখতে গিয়ে মাঝে মাঝে সে নিজের উপরেও আস্থা হারিয়ে ফেলে। অথচ সে একা বাস করতে পারে না, না আবার সবাইকে নিয়েও বাস করতে চায়। অদ্ভুত এই মনুষ্যকূলের মধ্যে আমি জন্মে দেখেছি- এতো কিছুর বিনিময়ে অথচ কোনো কিছুই আমার না, এই শর্তে জন্ম নেয়াই যেনো একটা কষ্টের ব্যাপার। যদি কেউ এই পৃথিবীতেই না আসতো, তাহলে হয়তো বিধাতার কাছে এই ক্ষনিক সময়ে এতো কিছুর মাঝে পরিবেষ্ঠিত থেকে আবার চলে যাওয়া, কইফিয়ত দেয়া, ইত্যাদির দরকার হতো না, ক্ষমতার লড়াইয়ে হানাহানি, কারো বিয়োগে মন এতো উতালাও হতো না।

আজ থেকে বহু শতাব্দি আগে কিংবা অদুর অতীতে যারা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে, তারা আসলে আমাদেরই লোক ছিলো। তারা চলে গিয়েছে চিরতরে। কোথায় গেছেন, আর কি অবস্থায় আছেন সে সম্পর্কে আজো কেউ কোনো সম্যখ ধারনা কারো কাছেই নাই। অথচ যখন বেচে ছিলেন, প্রতিটি মুহুর্তে তারা ছিলেন সময়ের থেকেও অধিক ব্যস্ততায়। যখন তারা চলে যান, তারা আমাদের কাছে এমন কোনো ওয়াদাও করে যায়নি যে, তাদের ফেলে যাওয়া সব সম্পত্তির জন্য আবার ফিরে আসবেন, কিংবা এমনো নয় যে, তারা তা আর কখনো দাবী করবেন। এটা না হয় চিরতরে চলে যাওয়ার ব্যাপার হলো। কিন্তু এই জীবনে তো এমনো বিচ্ছেদ হয় যেখানে তারা আছেন কিন্তু আবার নাইও। জীবনের প্রয়োজনে ভউগুলিক বাউন্ডারীর অন্য প্রান্তে যখন কেউ অনেক দিনের জন্য চলে যান, আর তার ফিরে আসার ওয়াদা ভেংগে যায়, তখন আর তার উপরেও আস্থা রাখা যায়না। এমনি কষ্টে মানুষ ভোগের সমস্ত আয়োজনের উপরে থেকেও সেই আপনজনদের জন্য প্রতিনিয়ত হাহুতাশ করতে থাকেন। মনের কোথায় যেনো কি একটা সারাক্ষন খসখস করতেই থাকে। সেই যন্ত্রনায় তখন এমন মনে হয় যেনো- একটা দিনও ঠিকঠাক মতো কাটে না, এমন কি একটা রাতও না। তখন জেগে থাকে শুধু কিছু সদ্য জন্মানো কান্না। আর কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট। আর সেই কষ্টের কোনো নাম থাকে না, না থাকে তার কোনো বর্ননা বা রুপ। আর এই ভিতরের যন্ত্রনাটা কাউকেই দেখানো যায় না অথচ সত্যিটা থাকে এই ভিতরেই। আসলে পৃথিবীতে সম্পর্কের চেয়ে বড় কোনো সম্পত্তি নাই। এতো সুখের জীবনেও যখন এমন অনেক কষ্টের আর বেদনার নীল ছড়িয়েই থাকে, তাহলে কি দরকার জন্মের?

তারপরেও আমরা মানুষ হয়ে সৃষ্টির সেরা জীব হয়েই জন্ম নেই, নিয়েছি যেখানে অবারিত সবুজ ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ার দোলা আমাদের মুখে পরশ জোগায় আবার তেমনি কখনো বিচ্ছেদের মতো যন্ত্রনা, মৃত্যুর মতো বেদনা, আবার কখনো অনিশ্চিত যাত্রার মতো দুশ্চিন্তা নিয়েই আমাদেরকে বাচতে হয়। কেউ যখন চিরতরে জীবনের নিঃশ্বাসকে স্তব্ধ করে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন, তারজন্য যতোটা না দুশ্চিন্তা আমাদেরকে গ্রাস করে, তার থেকে যখন কোনো প্রিয়জন হটাত করে সেই চেনা পরিচিত আবাসস্থল থেকে কাউকে কিছু না বলে হারিয়ে যান আর ফিরে না আসেন, তারজন্য আরো বেশী দুশ্চিন্তা আর অমঙ্গল চিন্তা মাথা ভনভন করতে থাকে। কিন্তু এরই মতো যখন কোনো প্রিয়জন জেনেশুনে জীবনের প্রয়োজনে অথবা বড় সাফল্যের আশায় একে অপরের থেকে এমন একটা বিচ্ছেদে আপোষ করেন যেখানে টেরিটোরিয়াল বাউন্ডারী আমাদেরকে প্রায় স্থায়ী বিচ্ছেদের স্তরে নিয়ে যায়, তখন আমাদের হাসির অন্তরালে যে বেদনা লুকিয়ে থাকে, তা তুষের অনলের মতো সারাক্ষন তাপদাহে অন্তরে প্রজ্জলিত হতেই থাকে। আশা আর সাফল্যের মতো জল হয়তো সাময়ীকভাবে তা নিবারন করে কিন্তু এই ছোট ক্ষনস্থায়ী জীবনে বারবার এটাই মনে হয়- কি দরকার ছিলো এসবের? তাকে কি আটকানো যেতো না? নাকি আটকানো হয় নাই? আসলে কোনো কিছুই দরকার ছিলো না যদি না আমার জন্মই না হতো এই মানুষ হিসাবে। তখন না দরকার হতো এই বিচ্ছেদের, না প্রয়োজন হতো এই দিনরাতের কষ্টের অথবা না দরকার পড়তো অন্তর জালার তাপদাহের অনুভবতার। তখন কেনো জানি বারেবারেই মনে হয়- What If I were not born?  

করোনার প্রাদূর্ভাবে চেনা পরিচিত সব মানুষ যেনো ধীরে ধীরে চোখের সামনে থেকে একে একে যেনো বিনা নোটিশে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। এই সেদিন যার সাথে এক টেবিলে বসে হাসাহাসি, আড্ডা, কথা কাটাকাটি, অথবা দল বেধে গায়ের কোনো মেঠো পথে বাচ্চাদের মতো হাটাহাটি করেছি, তার কিছু মুহুর্তের পরই সংবাদ আসে, আর নেই। চলে গেছে। ব্যাংকের টাকা, বিশাল ব্যবসা, কিংবা গাড়ি বহরের সব যাত্রা কোনো কিছুই যেনো তার সামনে দাড়াতে পারছে না। অথচ তাকে না দেখা যায়, না ছোয়া যায়। কখন সে কার সাথে একান্তে বাস করা শুরু করে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আতংকে আছে মন, অসুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে শরীর, ভাবনায় ভরে যাচ্ছে সারাটা মাথা। অথচ দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর, মনের আনন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে পাখীরা, শুধু বন্দি হয়ে আছি আমি “মানুষ”। বারবার মনে হচ্ছে- কোথায় যেনো কি ঠিক নেই, কি যেনো কোথায় একটা গড়মিল হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে না। কেনো এমনটা হচ্ছে বারবার?

আসলে কোন কবি যেনো একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন- মানুষ হয়ে জন্মই যেনো আমার আজীবনের পাপ। তাই আমারো মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে- What If I were not even born!!

০৭/০৮/২০২১-কনিকার মাত্র ৩দিন বাকী

উচ্ছিষ্ট সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

৭ 

প্রায় সবগুলি কাজ শেষ। ভিসা আগেই হয়ে গিয়েছিলো, টিকেটও কেনা আছে, টিউশন ফি গতকাল পাঠিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। ভ্যাক্সিনেশন যা যা নেয়া দরকার ছিলো, সবই সম্পন্ন করা হয়েছে। ব্যাগপত্র, মালামাল সব কিছুই প্যাকড হয়ে গেছে, আগামী এক বছরের আর্থিক জোগানও শেষ, এখন বাকী শুধু করোনা টেষ্ট আর ফ্লাইটে উঠা। আগামী ১০ তারিখের দিবাগত রাত অর্থাৎ ১১ আগষ্ট এর ভোর বেলায় কনিকার ফ্লাইট। মাত্র তিনদিন বাকী। কনিকার চলে যাওয়ার শুন্যতাটা এখন মাঝে মাঝে অনুভব করছি, উম্মিকা রীতিমত প্রায় প্রতিদিনই কান্নাকাটি করছে কনিকা চলে যাবে বলে। কনিকা এখনো খুব একটা মন খারাপ করছেনা তবে বুঝা যায় সে একটা দুদোল্যমান অনুভুতিতে ভোগছে। কারন একদিকে কনিকা আমেরিকা যাওয়ার ব্যাপারে বেশ খুসী, অন্যদিকে বাড়ি ছাড়ার কষ্ট। মিটুলের অবস্থাটাও প্রায় ওই একই রকমের। আর আমার? আমার শুধু একটাই ভয়, ওরা যেনো ভালো থাকে যেখানেই থাকুক। মন তো খারাপ হচ্ছেই। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। আমি মেনে নিয়েছি বাস্তবতা।

 বাড়িটায় সারাক্ষন কনিকাই মাতিয়ে রাখতো, বাসায় যতো কথাবার্তা, যতো হইচই কনিকাই করতো। এই পরিবেশটা মিস করবো আমরা। অফিস থেকে আমি বাসায় আসার পর প্রথমেই আমি ঢোকি সাধারনত কনিকার রুমে আর তার সাথে উম্মিকার রুমে। ইদানিং উম্মিকা ডেল্টা মেডিক্যালে জব করে বলে, প্রায়ই আমি খবর নেই মেয়েটা লাঞ্চে খাবার খেয়েছে কিনা বা রাত সাড়ে আটটা বাজলেই মনে করিয়ে দেই, উম্মিকাকে আনতে গাড়ি গেছে কিনা।

আমি জানি, কনিকা যেদিন আমেরিকার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হবে ইনশাল্লাহ, সেদিন আমার ভিতরে কি কি ঘটবে কিন্তু মনকে শক্ত করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। যতোক্ষন না কনিকা তার ডেস্টিনেশনে গিয়ে পৌছায় ততোক্ষন আমি জানি ওর ফ্লাইট মনিটর করতে থাকবো। যখন আল্লাহর রহমতে কনিকা আমেরিকায় ওর ডেস্টিনেশনে পৌঁছাবে, হয়তো তখন একটু ভালো লাগবে যে, ওখানেও অনেক আত্তীয় স্বজনেরা আছেন যারা কনিকাকেও অনেক ভালোবাসে, তারা দেখভাল করবে।

কনিকা অনেক খুতখুতে। কিন্তু গোছালো। ওর কোনো কিছুই অগোছালো থাকে না। কোন একটা জিনিষ এদিক সেদিক হলেই ওর সেটা ভালো লাগে না। মেজাজ খারাপ করে। ফলে ভয় পাচ্ছি, নতুন পরিবেশে কতটা দ্রুত কনিকা এডজাষ্ট করতে পারে। ওখানে কনিকাকে সব কিছুই নিজের হাতে করতে হবে। পারবে কিনা জানি না। তবে প্রথম প্রথম কনিকা হোমসিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। এটা কাটিয়ে উঠতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।

আমি কনিকা যেনো আমেরিকায় অন্তত টাকা পয়সা নিয়ে কোনোরুপ সমস্যায় না পরে, সেইটা শতভাগ নিশ্চিত করেছি (আলহামদুলিল্লাহ)। আসলে আমি ইদানিং আমার জীবনের মুল পলিসিটাই বদল করে ফেলেছি। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। যাতে আমি না থাকলেও আমার সন্তানেরা কোথাও কোন সমস্যায় না পড়ে, বাকীটা আল্লাহ ভালো জানেন। আমার জমি জমা, টাকা পয়সার এসেটের থেকে বড় এসেট আমার মেয়েরা। এদের জন্য পয়সা খরচে আমার কোনো কার্পন্য নাই। যতোটুকু আমার সক্ষমতা আছে, আমি ওদেরকে ততোটাই দিতে চাই।

গতকাল রাতে প্রথম দেখলাম, উম্মিকা কনিকা দুজনেই বেশ ইমোশনাল ছিলো। ব্যাপারটা ঘটছে কারন সময়টা খুব কাছাকাছি কনিকার চলে যাওয়ার। ফলে উম্মিকাও অনেকটা খুব বেশী মন খারাপ করে আছে। চৈতী এসছে কনিকার যাওয়ার কারনে। ওরা সবাই খুব কাছাকাছি ছিলো সব সময়। ওদের বয়সের তারতম্য থাকলেও কনিকাই ছিলো যেনো ওদের সবার মধ্যে নেতা। ওর আবদার কেউই ফেলতো না।

বিমানবন্দর ঢোকার জন্য পাশ এর অবস্থা এখন খুব কড়াকড়ি। কোথাও থেকে কোনো পাশ পাচ্ছি না। ব্যাপারটা একটু হতাশার। অনেককেই বলেছি কিন্তু সব জায়গা থেকেই নেগেটিভ ফলাফল আসায় একটু আরো ভয়ে আছি। আমার দোস্ত উইং কমান্ডার মাসুদকে বলেছি যে, সিভিল এভিয়েশন আসোশিয়েসন অফ বাংলাদেশ থেকে অন্তত কয়েকটা পাশ জোগাড় করতে। ওই সংস্থার চেয়ারম্যান হচ্ছে এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান। সে আমাদের থেকে এক কোর্ষ সিনিয়ার কিন্তু আমার সাথে কখনো পরিচয় হয় নাই। যেহেতু মাসুদ এয়ার ফোর্সের, তাই একটা ভরষা মাসুদ দিয়েছে যে, সে পাশ জোগাড় করতে পারবে। কিন্তু ব্যাপারটা আমি এখনো সিউর হতে পারছি না আসলেই মাসুদ পাশ জোগাড় করতে পারবে কিনা।

কনিকা হয়তো ওর বাড়ি ছাড়ার অনুভুতিটা ঠিক এই মুহুর্তে ততোটা উপলব্ধি করতে পারছে না। কিন্তু যেদিন কনিকা স্টেপ আউট করবে, আমি জানি, ওর সবচেয়ে বেশী মন খারাপ থাকবে। যদি এমন হয় যে, পাশ একটাও পাওয়া গেলো না, তাহলে কনিকাকে একাই সব সামাল দিতে হবে। লাগেজ বুকিং, বোর্ডিং পাশ সংগ্রহ, চেক ইন, ইত্যাদি।  আর যদি একটা পাশও পাই তাহলে শুধুমাত্র আমি ভাবছি মিটুলকে দিয়ে দেবো যাতে মিটুল সবকিছু ম্যানেজ করে মেয়েকে যতোদূর পারে উঠিয়ে দিতে। তা না হলে প্রশ্নের আর ইঙ্কোয়ারীর প্রশ্নে জর্জরীত হতেই থাকবো। আর যদি দুটু পাই, তাহলে সাথে উম্মিকাকে দিয়ে দেবো। আর যদি বেশী ভাগ্যবান হই, আমিও পাই, তাহলে তো আল্লাহর রহমত, আমরা অকে সবাই এক সাথে বিমানে তুলে দিতে পারবো। কনিকা কাতার এয়ার ওয়েজে যাচ্ছে ইনশাল্লাহ।

আজ শুক্রবার। ভেবেছিলাম, বাইরে কোথাও যাবো। কিন্তু কনিকাকে এই মুহুর্তে বাইরে বের করতে চাই না। চারিদিকে করোনার প্রভাব খুব বেশী। কনিকার করোনা টেষ্ট করাতে হবে ফ্লাইটে উঠার ৪৮ ঘন্টা আগে। তাই খুব একটা বের করতে চাই না কনিকাকে। তাই সবাই চিন্তা করছি- আমাদের ছাদের উপরে ঘরোয়া একটা পার্টি করবো যেখানে শুধুমাত্র আমরাই থাকবো। জাষ্ট একটা আউটিং এর মতো আর কি।

একটা সময় আসবে যেদিন আজকের এই অনুভুতিটা হয়তো আমি আগামী ৪ বছর পর যখন পড়বো, তখন আমার অনুভুতি হয়তো হবে পুরুই ভিন্ন। সফলতার গল্পে আমি হয়তো অনেক গল্প করবো এই কনিকাকে নিয়ে। আমি সব সময় উম্মিকাকেও বলে যাচ্ছি, সেও চলে যাক আমেরিকায়। তাহলে দুইবোন এক সাথে থাকলে আমিও কিছুটা ভরষা পাই। কিন্তু উম্মিকার যাওয়ার ব্যাপারটা খুব ধীর। সে মনে হয় বাইরে মাইগ্রেশন করতে চায় না।

দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোথায় আমাদেরকে নিয়ে যায়। নিশ্চয় আল্লাহ আমাদেরকে ভালোবাসেন।

০৫/০৮/২০২১-অদ্ভুত একটা স্বপ্ন

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

আগষ্ট 

৫ 

সকালে ঘুম ভাংগার সাথে সাথে রাতের একটা স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। কি অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম যার মানেটা আমি বুঝার চেষ্টা করেছি বটে কিন্তু এর কোনো কুল কিনারা পাই নাই। মাঝে মাঝে আমি খুব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি- কিছু স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমি অনেক অনেক বছর পর মিলিয়ে দেখলে কিছুটা বাস্তবে মিল পাই, অধিকাংশ স্বপ্নের কথা আমার আর মনে থাকে না বটে কিন্তু মনের ভিতরে কিছু একটা খস খস করতে থাকে। আমি প্রায় ভোর রাতের দিকে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, তার কিছুক্ষন পরেই আমার ঘুম ভেংগে যায়। স্বপ্নটা ছিলো এ রকম-

আমার পার্টনারের মেয়ে আনিকা বিদেশ থাকে, সে কি কারনে অথবা কোনো উদ্দেশ্যে কাউকে সে খুন করে ফেলে। খবরটা আমার কাছে যখন আসে, তখন আমি খুব চমকে চাই যে, মেয়েটা খুবই শান্ত শিষ্ট যাকে দিয়ে এমন একটা কাজ কখনোই সম্ভব না। তারপরেও ব্যাপারটা ঘটেছে। সবচেয়ে অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে যে, আমার পার্টনার এই বিষয়টা নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন বলে মনে হলো না, না তার মেয়ে। সে দেশে ফিরে এসেছিলো ঘটনাটা ঘটার পর পরই। আমিও আর ওকে জিজ্ঞেস করি নাই, আসলে ঘটনাটা জানার পর ওর সাথে আমার আর দেখাও হয় নাই। এর মধ্যেই আমার ঘুম ভেংগে গিয়েছিলো। আমি একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছিলাম যে, ব্যাপারটা অন্য কারো সাথে ঘটেছে বলে আমিও যেনো একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম না এই ভেবে যে, এটা তো আমার পরিবারের বা আমার কোনো সমস্যা না। যাদের সমস্যা তারাই এটা নিয়ে সামাল দেবে।

আমার ঘুম ভাংগার পরেই আমি ব্যাপারটা নিয়ে বেশ অনেকক্ষন ভেবেছি যে, এমন একটা স্বপ্ন তো আমার দেখার কোনো কারনই নাই। তাহলে কেনো এমন একটা স্বপ্ন দেখলাম? বারবার মনে পড়ছিলো যে, আমার ছোট মেয়ে কনিকা আগামী ১১ তারিখে আমেরিকা যাচ্ছে। এমন কোনো সংকেত না তো যা আমাকে স্বপ্নের মধ্যে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হলো? আল্লাহর কাছে আমি প্রার্থনা করি যেনো এমন কোন খবর কাউকেই পেতে না হয়, হোক সেটা আমার বা আমার পরিচিত কোনো লোকের। আল্লাহ আমাদের সমস্ত বালা মুসিবত দূর করে দিক, এই দোয়া করছি।

কনিকার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি আমেরিকায় চলে যাওয়ার। ব্যাপারটা এখনো উপলব্ধিতে আসে নাই যে, সে অনেক বছরের জন্য আমেরিকায় চলে যাচ্ছে। আমি জানি, যেদিন সত্যি সত্যিই কনিকা চলে যাবে আমেরিকায়, সেদিন আমার স্ত্রী, উম্মিকা বা ওর সাথে যারা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত, তাদের সবার মন খারাপ হবে, কান্নাকাটি করবে। কনিকা নিজেও মন খারাপ করবে। আমার তো হবেই। আমি তো ওকে খুবই মিস করবো। কিন্তু নিয়তির এটা একটা চক্র যে, সন্তানেরা বড় হলে পৃথিবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সাথে পিতামাতার সম্পর্ক থাকে বৈ কি কিন্তু তারা তাদের কাছে খুব কমই থাকে। কনিকা যেখানেই থাকুক, বা উম্মিকা, তারা যেনো ভালো থাকে আমি সব সময় এই দোয়াই করি।

২১/০৭/২০২১-ঈদুল আজহা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২১ জুলাই 

 

 

আজ পালিত হলো ঈদুল আজহা।

এই দিনটা এলে সবচেয়ে আগে যার কথা আমার বেশী মনে পড়ে তিনি হচ্ছেন-আমার মা। মা বেচে থাকাকালীন আমি কখনো শহরে ঈদ করিনি কারন মাও ঈদের সময় গ্রাম ছাড়া ঈদ করতেন না। মা যেহেতু ঈদে গ্রামে থাকতেন, আমিও গ্রামেই ঈদ করতাম। আমি সব সময় ভাবতাম-একটা সময় আসবে, মাকে ছাড়াই আমার ঈদ করতে হবে জীবনে, তাই যে কতগুলি সুযোগ পাওয়া যায়, মায়ের সাথে ঈদ করাটা ছিলো আমার সুযোগের মতো। বাড়িতেই কুরবানী করতাম। ঈদের আগে আমি ইসমাইল ভাই অথবা রশীদ ভাইকে টাকা পাঠিয়ে দিতাম যাতে আগেই গরু কিনে রাখেন। ফাতেমার স্বামী সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু ভাইকে আমি কখনোই কুরবানীর গরু কেনার দায়িত্তটা আমি দিতাম না কারন তার উপরে আমার টাকা পয়সা নিয়ে আস্থা ছিলো না। কেনো তার উপরে আস্থা ছিলো না, সে কাহিনী বিস্তর, আজ না হয় এখানে নাইবা বললাম। গরু কেনার ব্যাপারে আমার একটা পলিসি ছিলো যে, মেহেরুন্নেসা (অর্থাৎ আমার ইমিডিয়েট বড় বোন সব সময় গরু পালতো। আমি ইচ্ছে করেই রশীদ ভাইকে বলতাম যাতে ওর গরুটাই আমার জন্যে রেখে দেয়। আমি কখনোই সেটার দাম করতাম না। এই কারনে করতাম না, মেহের যে কয় টাকায় বিক্রি করলে খুশী হয় সেটাই হোক আমার আরেকটা সাহাজ্য। মেহের খুব ভালো একটা মেয়ে।

আজ সেই কুরবানীর দিনটা চলে গেলো। শুনেছিলাম, একটা গরু মোট সাত জনের নামে কুরবানী দেয়া যায়। ফলে আমি সব সময় এই সু্যোগে যে কাজটা করি, তা হলো- এক ভাগ দেই আমি আমার প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মাদ (সঃ) এর নামে, আর বাকী ৬ ভাগ দেই-আমার, মিটুল, আমার ২ মেয়ে, আমার বাবা আর আমার মায়ের নামে। এটাই আমার কুরবানী দেয়ার পলিসি। আজো তাইই করলাম। গরু জবাই, মাংশ কাটাকাটি আর বিলানোর কাজটা আমি নিজ হাতে করি। ৩ টা ভাগ করি, একটা ভাগ নীচেই বিলিয়ে দেই, বাকী ২ ভাগের এক ভাগ আমি রাখি আলাদা করে সমস্ত আত্তীয় সজন আর পাড়া পড়শীর জন্য, আর এক ভাগ থাকে আমার পরিবারের জন্য।

এই কুরবানী এলে আমার আরো একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সেই ১৯৭৬-৭৭ সালের কথা। আমাদের তখন কুরবানী দেয়ার মতো পরিস্থিতি ছিলো না। আমি মাত্র ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ি, আমাদের বাড়িতে ৫ বোন আর মা আর আমি। আমার বড় ভাই তখন সবেমাত্র আমেরিকা গেছেন। আমাদের সব ভরন পোষনের দায়িত্ত আমার বড় ভাইই করেন। কিন্তু শেয়ারে কুরবানী দেয়া কিংবা আলাদা কুরবানী দেয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিলো না। ফলে এই কুরবানীর দিন আমার খুব অসস্থি হতো। অসস্থি হতো এই কারনে যে, আমরা না কারো কাছ থেকে মাংশ চেয়ে আনতে পারতাম, না আমাদের সামর্থ ছিলো কুরবানী দেয়ার। ফলে দিনের শেষে যখন সবাই যার যার বাড়িতে গরুর মাংশ পাকে ব্যস্ত, খাওয়ায় ব্যস্ত, আনন্দে ব্যস্ত, তখন হয়তো আমাদের বাড়িতে ঠিক তেমনটা নাও হতে পারে। আমি এই ঈদের দিনের দুপুরের পর আর কোথাও যেতাম না, কারন আমার কেম্ন জানি নিজের কাছে খুব ছোট মনে হতো। কুরবানী দেয়াটা ধর্মের দিক দিয়ে কি, আর কি না, সেটা আমার কাছে হয়তো অনেক বড় মাহাত্য ছিলো না, কিন্তু আমি যখন দেখতাম, আমার বন্ধুদের বাড়িতে সবাই কুরবানীর গরু নিয়ে কাটাকাটিতে ব্যস্ত, বিকালে মাংশ বিলানোতে ব্যস্ত, আমার তখন মনে হতো, আমিই ব্যস্ত না। গরীব হয়ে জন্ম নেয়াটা একটা অসস্থিকর ব্যাপার। তারপরেও অনেকেই আমাদের বাড়িতে কুরবানীর পর মাংশ পাঠাইতো। বিকালে বা সন্ধ্যায় দুদু ভাই, ইসমাইল ভাই, আমাদের খালাদের বাড়ি থেকে, কিংবা জলিল মামাদের বাড়ি থেকে অথবা পাশের কোনো বারি থেকে অনেকেই মাংশ পাঠাইতো যেটা আমার কাছে একটু খারাপ লাগলেও মা নিতেন। কুরবানী বলে কথা। সবাই মাংশ খাবে, আমাদের বাড়ির মানুষেরা একেবারেই কিছু খাবে না, মা হয়তো এটা ভেবেই মাংশ গুলি রাখতেন। দিনটা চলে যেতো, আমার অসস্থির ভাবটাও ধীরে ধীরে কেটে যেতো। আবার এক বছর পর হয়তো এই অসস্থিটা আসবে।

যেদিন আমার ক্ষমতা হলো কুরবানী দেয়ার, আমি সব সময় গ্রামেই কুরবানী দিয়েছি। আর সব সময়ই আমার সেই দিনগুলির কথা মনে করেছি। আমাদের দিন পাল্টেছে, আমাদের পজিসন পাল্টেছে। মা যখন জীবিত ছিলেন, এমনো হয়েছে মাঝে মাঝে আমি দুটু কুরবানীও করেছি একা।

আজ মা নাই, আমার গ্রামে যাওয়া হয় না। কুরবানী নিয়ে এখন আমার তেমন কোনো আগ্রহও নাই। তবে সবসময় ঢাকাতেই আমি কুরবানী দেই, একা। যদি আমি কখনো কুরবানী নাও দেই, কেউ আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করবে না কারন সবাই জানে আমার একটা না, অনেকগুলি কুরবানী দেয়ার সক্ষমতাও আছে। হয়তো কোনো কারনে আমি ইচ্ছে করেই কুরবানী হয়তো দেই নাই। কেউ এটা ভাববে না যে, আমার টাকা নাই তাই কুরবানী দেই নাই। “সময়” এমন জিনিষ। সব কিছু পালটে দেয়।

১৯/০৭/২০২১-ঈদুল আজহার ২দিন আগে

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

১৯ জুলাই 

এই কয়েকমাসে এতো বেশী অভিজ্ঞতা হলো যা আমার জীবনের অনেক প্রাক্টিস আর বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যাদেরকে আমি মনে করি সবাই আমার মতো। অথবা আর যার সাথে আমরা যাইই করি না কেনো, অন্তত আমরা আমাদের সাথে সেই একই প্রাক্টিস গুলি কখনো করতে পারি না। কিন্তু আমার এই ধারনা সমুলে আঘাত খেয়েছে অনেক গুলি কারনে। তাহলে একা একা বলিঃ

(১) মান্নানের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়েঃ মান্নান যে আমার সাথে লুকুচুড়ি করে সেটা আমি জানি। অনেক সময় ভাবি যে, হয়তো সে একটু ভালো থাকতে চায়, তাই একটু আধটু লুকুচুরি করে। আমার অনেক ক্ষতি না হলেও অর্থের দিক দিয়ে একটু তো লাগেই। কিন্তু যেহেতু আমি সামলে নিতে পারি, তাই অনেক সময় কিছু বলি না বা বলতে চাইও না।

আমি যখনই কোনো জমি কিনেছি, মান্নান সেখানে জমির দামটা এমন করে বাড়িয়ে বলতো যাতে আমার টাকা দিয়েই মান্নান ও কিছু জমি সেখান থেকে কিনতে পারে। আমি সেটা বুঝি কিন্তু কিছু হয়তো বলি না। এভাবে মান্নান অনেক জমি শুধু হয়তো আমার টাকা দিয়েই কিনেছে আর সেটা আমার ক্রয় করা জমির সাথেই। কিন্তু এবার যেটা করেছে সেটা মারাত্তক।

মুজিবুর রহমান খান নামে এক ভদ্রলোক আমাদের পলাসপুরের জমিটা কিনতে আগ্রহী হলে আমিও বিক্রি করতে তৈরী ছিলাম। আমার জমির সাথে আমার পার্টনার মুর্তুজা ভাইয়ের জমি আছে। ফলে আমার জমি আর মুর্তুজা ভাইয়ের জমি সহ একটা রফাদফা হয়েছিলো। এর মধ্যে মান্নান আমাকে জানালো যে, মুজিবুর রহমান খান সাহেবের আরো জমি দরকার যা সেলিম নামে এক জন লোকের জমি আমাদের জমির পাশেই আছে কিন্তু ওর জমিতে যাওয়ার রাস্তা না থাকায় যদি আমাদের জমির সাথে টাই আপ করে খান সাহেবের কাছে বিক্রি করি তাতে আমাদের লাভ হবে। কারন সেলিকমে জমির মুল্য দিতে হবে খান সাহেবের দেয়া জমির দামের অর্ধেক প্রায়। সেলিমদের মোট জমি ছিলো ৩২০ শতাংশ।

এর মধ্যে মান্নান আমাকে জানালো যে, আমরা সেলিমদের জমি থেকে পানি ব্যতিত মোট ১৫১ শতাংশ জমি খান সাহেবকে দিতে পারবো। বাকী ১৬৯ শতাংশ জমি আসলে নদীর পানির মধ্যে যদিও জমিটা রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত। আমি যখন সেলিমদের জমিটা বিনা পরীক্ষায়, বিনা নীরিক্ষায় খান সাহেবকে রেজিষ্ট্রি করে দিলাম, পরে জমি মাপ্তে গিয়ে দেখি যে, মাত্র ৯৮ শতাংশ জমি আছে যা নদীর মধ্যে না। অনেক রাগারাগি আর চাপাচাপির মধ্যে আমি যখন সেলিমদের ধরলাম, শুনলাম আরেক বিরাট ইতিহাস। মান্নান, সেলিম এবং সেলিমের এক চাচাতো ভাই মিলে মোট ৩২০ শতাংশ জমিই কিনে নিয়েছে সেলিমদের আত্তীয় স্বজনের কাছ থেকে অই টাকায় যে টাকা হয় ১৫১ শতাংশের দাম। খান সাহেবকে ১৫১ শতাংশ জমি দেয়ার পর বাকী ১৬৯ শতাংশ জমি ধান্দা করে মান্নানের নামে আর সেলিমের নামে একা পাওয়া অফ এটর্নী নিয়েছে। এর মানে হলো, আমি কোনো লাভ করি নি , লাভ করছিলো মান্নান। যদি অদুর ভবিষ্যতে পানি শুকিয়ে চর জাগে, তাহলে মান্নান এই জমি গুলি চড়া দামে বিক্রি করতে পারবে। অথচ টাকাগুলি খান সাহেবের এবং আমার। খান সাহেব যখন নদীর মধ্যে কোনো জমি নিতে নারাজ হলেন, তখন আমার চর গল্গলিয়া মৌজা থেকে এই বাকী ৫৩ শতাংশ জমি পুরা করে দিতে হবে যার দাম প্রায় তিন কোটি টাকা। এটা কোনোভাবেই আমার সম্ভব হচ্ছিলো না। আমি কেনো এতো গুলি জমি খান সাহেবকে লিখে দেবো যার দাম তিন কোটি টাকার উপরে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখেই দিতে হবে জেনে আমি পলাশপুরের আক্কাসকে ধরে মান্নান আর সেলিমের কাছ থেকে পরবর্তীতে ওই ১৬৯ শতাংশ জমি ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার নিজের নামে নিয়ে নিলাম। জানি আমার ক্ষতি পুরন হবে না যতোক্ষন পর্যন্ত ওই নদীর জমি শুকিয়ে আসল চেহারায় জমি ভেসে না উঠে। আমি মান্নানকে বারবার এই অ বিশ্বাসের কাজটা কেনো করেছে জিজ্ঞেস করলে তার একটাই উত্তর- ভুল হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই ভুল হতে পারে না। আমি কখনো ভচাবি নাই যে, মান্নান ও আমাকে এভাবে এতো ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।

পলাশপুরে আমার আরো একতা জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া ছিলো। আর যেহেতু ওই লিজটা আনতে হয় কোনো দুস্ত মানুষের নামে, তাই আমি মান্নানের ভাই নাসিরের নামেই ১০০ শতাংশ জমি আমার টাকায় লিজ নিয়ে এসেছিলাম। মান্নান আমাকে না জানিয়ে হালিম নামে এক লোকের কাছে ২০ লাখ টাকায় জমিটা গোপনে টাকা নিয়ে নিলো। এটা একটা অসম্ভব ঘটনা বলে আমার কাছে মনে হয়েছিলো। কিন্তু মান্নান কাজটা করেছে আমাকে একটু ও জানতে দেয় নাই। যখ ওরে আমি প্রশ্ন করেছি- মান্নানের একটাই উত্তর যে, আমার নাতির অসুখ ছিলো, টাকার দরকার ছিলো, তাই আমি বিক্রি করে দিয়েছি। আমাকে জানানোর কোনো বাধ্য বাধকতা মনে করলো না।

খান ভাই আমাদের পলাশ পুরের জমিটা কিনার সময়ে মোট ৬৩১ শতাংশ জমির বায়না করেছিলো যার মধ্যে মান্নানের ছিলো ৫১ শতাংশ। আমি খান ভাইকে বারবার বলেছিলাম, কখনো আমাকে ছাড়া টাকা পয়সার লেন দেন করবেন না। কিন্তু ওই যে বললাম, সবাই লাভ চায়!! খান সাহেব মান্নানকে মাঝে মাঝে আমাকে না জানিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হ্যান্ড ওভার করে। একদিন খান সাহেব আমাকে জানালো যে, মান্নান জমিটা কাগজে কলমে কোনো বায়নাও করছে না আবার টাকাও চায়। আমি যখন ব্যাপারটার ভিতরে প্রবেশ করলাম, দেখলাম, ওই খানে মান্নানের জমি আছে মাত্র ৪ শতাঙ্ঘস, আর ওর বোন আর ভাই মিলে আছে আরো ৫ শতাংশ, মোট ৯ শতাংশ। বাকী জায়গাটা আক্কাস নামে ওর এক আত্তিয়ের। কিন্তু আক্কাসকে মান্নান উক্ত ৩৫ লাখ টাকা থেকে কখনো ১ টাকাও দেয় নাই, না মান্নান ওনার কাছ থেকে কোনো পাওয়ার অফ এটর্নী কিংবা অগ্রিম কোনো বায়নাপত্র করেছে। আক্কাস সাহেব যখন জানলো যে, মান্নান ইতিমধ্যে ৩৫ লক্ষ টাকা নিয়ে ফেলেছে, সে তখন (৫১ মানাস ৯) ৪২ শতান্সগ জমির বায়না করে ফেল্লো উক্ত খান সাহেবের সাথে। অর্থাৎ মান্নান জানেই না যে, উক্ত জমি মান্নান আর কখনোই খান সাহেবের কাছে বিক্রি করতে পারবে না। আমি যখন আজকে মান্নানকে বললাম, খান সাহেবকে ৫১ শতাংশ জমি লিখে দিচ্ছিস না কেনো? তার অনেক উচা গলায় বল্লো, সে আগামীকালই জমিটা লিখে দিতে পারে। যখন বললাম যে, আক্কাস জমিটা অন্য খানে বিক্রি করে দিয়েছে- তখন দেখলাম ওর মুখের ভাব অনেক রক্তিম। কিন্তু লজ্জায় পড়লো কিনা জানি না। ওর আসলে এগুলিতে কোনো খারাপ লাগে না মনে হয়। টাকাটাই ওর কাছে সবচেয়ে বড় মনে হয়। ভাগ্যিস আমি এই ৫১ শতাংশের ব্যাপারে কাহ্নের সাথে কোনো প্রকার কথা বলি নাই। তাহলে এই ৫১ শতাংশ নিয়েও খান আমাকে চাপ দিতো।

মান্নানের এখন টাকা প্রাপ্তির প্রায় সব গুলি রাস্তাই বন্ধ। কোটি কোটি টাকা আমি ওর হাত দিয়ে খরচ করিয়েছি। বারবার বলেছি, অন্য কোনো একটা সোর্স কর যাতে বিপদের সময় একটা ইন কাম আসে। কখনো ব্যাপারটা আমলে নেয় নাই। এবার মনে হয় খুব হারে হারে টের পাচ্ছে যে, ওর টাকার সব গুলি সোর্স প্রায় একেবারেই বন্ধ। দেখা যাক কি করে। আমার কাছে অনেক গুলি কারন দেখিয়ে কিছু টাকা খসানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু এবার আমি অনেক টাইট হয়ে গেছি। কোনো কিছুতেই কোনোভাবেই আর টাকা দেয়া যাবে না। মান্নানের পিঠ প্রায় দেয়ালের মধ্যে ঠেকে যাচ্ছে। তবে এখান থেকে কিছুটা উত্তোরন হয়তো হবে যদি ধলেশ্বরী গ্রীন ভিলেজ প্রোজেক্ট শুরু হয়। কারন ওখানে আমি ওকে ইন করিয়েছি। কিন্তু ওটার ইন কাম বড্ড স্লো।

এবার আসি আমার পার্টনার মুর্তুজা ভাইয়ের কাছ থেকে আম্নার তিক্ত অভিজ্ঞতার ব্যাপারটাঃ

(To be cont...)

৯/৭/২০২১-কনিকার আগাম জন্মদিন এবং পার্টি

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

৯ জুলাই 

পড়াশুনার জন্য কনিকার বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি ধীরে ধীরে প্রায় সমাপ্তির দিকে। ভিসা হয়ে গেছে, টিকেট হয়ে গেছে, ইউএমবিসি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারে সব ফরমালিটিজ শেষ হয়ে ভর্তিও হয়ে গেছে, ওর জন্য এক বছরের আগাম টিউশন এর নিমিত্তে ১৪ হাজার ডলারের মধ্যে ১৩ হাজার ডলার ফিও আমি ছোট ভাই (মোস্তাক আহমেদ) এর কাছে রেখে দিয়েছি, ভ্যাকসিনেশনের সবকটা টীকাও প্রায় নেয়া শেষ। যাওয়ার সময় যে কতগুলি ডলার ওর হাতে দিয়ে দেবো সেটারও প্রায় ব্যবস্থা করে রেখেছি। এখন শুধু আগামী ১০ তারিখের দিবাগত রাত মানে ১১ অগাষ্ট ২০২১ তারিখে ভোর ৪টায় ওর কাতার এয়ার ওয়েজে উঠা বাকী ইনশাল্লাহ। একাই যাবে কারন এই করোনাকালীন সময়ে আমরা কেহই ভিসা পাচ্ছি না বিশেষ করে ভিজিটিং ভিসা। আবার ব্যবসায়ীক ভিসার জন্য যিনি আমাকে আমেরিকা থেকে ইনভাইটেশন পাঠাবেন, তাদের পক্ষেও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না বিধায় আমি ব্যবসায়ীক ভিসার জন্যেও এপ্লাই করতে পারছি না। ফলে কনিকাকে একাই যেতে হবে আমেরিকায়। একটু অসস্থিতে আছি বটে কিন্তু কনিকার উপর আমার ভরষা আছে যে, কনিকা একাই যেতে পারবে ইনশাল্লাহ। 

কনিকার জন্মদিন আসলে এই সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে হবার কথা। কিন্তু কনিকা তখন দেশেই থাকবে না। গতবার ওর জন্মদিনটা ভালোমতো কভিডের কারনে পালন করতে পারিনি। এটা নিয়ে ওর কোনো কষ্ট ও ছিলো না। কিন্তু এবার যেনো ওর মন খারাপ হচ্ছিলো যে, ইচ্ছে করলেও সে তার জন্মদিনটা ঢাকায় পালন ক্রতে পারবে না বলে। কনিকার আফসোস থাকবে যে, ওর এ বছরের জন্মদিনটা সে আমেরিকায় থাকায় সবার সাথে পালন করা সম্ভব না। মন খারাপ করবে, তাই আমরা ওর আগাম জন্মদিন এবং ওর বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে সবাইকে একবার দাওয়াত করে খাওয়ানোর জন্য যে অনুষ্ঠানটা করার প্ল্যান করেছিলাম, সেটা এক সাথেই করলাম আজ। প্রায় ৫০/৫৫ জন্য গেষ্ট এসেছিলো, আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার মুর্তজা ভাই এবং তার স্ত্রীও এসেছিলেন। সময়টা ভালোই কেটেছে।

চৈতীর কয়েকদিন আগে বিয়ে হয়েছিলো। তার জামাই সজীব, ননদ (সুচী), দেবর (সানিদ)ও এসেছিলো। মান্নাদেরকে আমি সব সময়ই আমাদের যে কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেই। এবারো তার ব্যতিক্রম হয় নাই। মান্নার জামাই বাবু খুব ভালো একটা ছেলে। আগে সিটি ব্যাংক এনএ তে চাকুরী করতো, কাল শুনলাম, হাবীব ব্যাংকে নতুন চাকুরী নিয়েছে। অত্যান্ত ম্যাচিউরড একটা ছেলে। ওর বিয়েটা আমিই দিয়েছিলাম মান্নার সাথে। ওর বিয়ে নিয়ে চমৎকার একটা উপাখ্যান তৈরী হয়েছিলো, সেটা আরেকদিন লিখবো।

সাজ্জাদ সোমা ওর বাচ্চারা আর সনি এবং তার জামাই সহ বাচ্চারা সব সময়ই আমাদের বাসায় আসতে পছন্দ করে, ওরাও বাদ যায় নাই। কনিকার জন্য ভালো একটা সময় কেটেছে আমাদের সবার। এমন ঘটা করে হয়তো আগামী ৫ বছর আর ওর জন্মদিন পালন করা হয়তো সম্ভব হবে কিনা জানি না।

কভিড-১৯ এর প্রভাব হটাত করে দেশে মহামারীর লক্ষন দেখা দিচ্ছে বলে সরকার কঠিন লক ডাউন দিয়েছে। যদিও আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য এটা বাধ্যতামূলক নয়, তারপরেও আমি ইচ্ছে করেই এই কয়দিন ফ্যাক্টরীতে যাচ্ছি না। বাসায় বসে ডায়েরী লিখি আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ব্যাপারে অনেক পড়াশুনা করছি। সাথে ইউটিউব থেকে সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভিডিও ফুটেজগুলিও দেখার চেষ্টা করে ঐ সময়টাকে বুঝবার চেষ্টা করছি। আনা ফ্রাংক এর ডায়েরীর উপর একটা মুভি হয়েছে, সেটাও দেখলাম। আইখম্যানের উপর প্রায় শতাধিক ট্রায়াল হয়েছে, সেগুলিও দেখলাম। খুব কঠিন সময় ছিলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়টা।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, কনিকার পর্ব। কনিকা তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে প্রায় লাখখানেক টাকার ক্যাশ গিফট পেয়েছে। আমি চাই নাই কেউ ওকে গিফট করুক কারন এসব গিফট আসলে কনিকার জন্য এখন আর খুব একটা প্রযোজ্য নয়, সে এগুলি বিদেশ নিতেও পারবে না আর আমরাও এগুলি আগামী সময়ে সংরক্ষন করতে পারবো না। তাই গেষ্ট যারা এসেছিলো, তারা সবাই কনিকাকে ক্যাশ টাকাই গিফট করেছে। আর এ কারনেই ওর গিফট এর টাকা এতো বেশী উঠেছিলো।

কনিকা খুব ফুরফুরা মেজাজে আছে। কারন ও যা যা চেয়েছে যেমন দেশের বাইরে ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার, সেটা সে একাই ম্যানেজ করেছে, কোনো কিছুতেই কোনো বাধার সৃষ্টি হয়নি, ওর জন্মদিনটাও ঘটা করে পালন করা হলো, আর আফসোস থাকবে না,  আবার বিদেশ যাওয়া উপলক্টাষে সবাইকে দাওয়াত করে খাওয়ানো হলো, ওর নিজের ও ভালো লেগেছে,  সব কিছু আল্লাহর রহমত, বাকীটা ভালোয় ভালোয় সব হলেই আলহামদুলিল্লাহ।

২৮/৬/২০২১-সফুরা খালা

 

এই মানুষগুলি একসময় আর কারো সামনেই থাকবে না। এদের জীবনেও প্রেম এসেছিলো, এরাও কারো না কারো চোখে রানীর মতো ছিলো। বাল্যকালে সাথী সংগীদের নিয়ে এরাও নদীর ঘাটে গিয়ে জিলকেলী করতে করতে সারাটা পরিবেশ মুখরীত করে রাখতো। নীল আকাশের মধ্যে জ্যোৎস্না রাতের তারার মতো তারাও রাত জেগে হয়তো কোনো এক প্রেমিক বরের অপেক্ষায় মনের ভিতর সুখের আস্বাদন করেছেন। এরা বড় বড় সংসারের হাল ধরেছেন, সমাজে এরাও অনেক অবদান রেখেছে। এদের গর্ভে জন্ম নেয়া অনেক সুপুত্র কিংবা সুন্দুরী কন্যারা হয়তো আজো দেশে বিদেশে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু আজ তারা এতো চুপচাপ জীবন যাপন করছেন যেখানে তিনি নিজে ছাড়া আর কেউ পাশে নাই। না তার রাজা আছে, না তিনি এখন রানী আছেন। সময় মানুষকে কত পরিবর্তন করে দেয়। এই সময়ের কাছে আজো কেউ স্বাধীনতা পায় নাই, না পেয়েছে কোনো ক্ষমতা সময়কে পরিবর্তন করার। আদি যুগ থেকে যতো মানুষ এই দুনিয়ায় এসেছে, সবাই কোনো না কোনো সময় নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এই পৃথিবীকে ত্যাগ করতে হয়েছে। আমরা যারা পিছনে পড়ে থাকি, তারা শুধু একটা মোহ, একটা স্মৃতি আর একটা কি যেনো নিয়ে শুধু অলীক ভাবনার জগতে অপেক্ষায় থাকি। একদিন আমিও এর থেকে পরিত্রান পাবো না। শুধু সময়টা পালটে যাবে এই রানীদের মতো। 

কিন্তু আমার মনের ভিতরে এই সব রানীরা আজীবন রানীদের কিংবা রাজাদের মাতাই হয়ে থাকবেন। আমি এদেরই বংশের একটি ধারা। আরো বেচে থাকো তোমরা অনেক কাল খালা। 

 

জীবন যেখানে যেমন। যে শিশুটি আজ জন্ম নিলো কেউ জানে না তার জন্য এই পৃথিবী কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা এই পৃথিবীকে সে কি দিয়ে যাবে। হতে পারে আজকে এই শিশুটি হয়তো এই পৃথিবীকে কোনো এক সময় নাড়িয়েও দিতে পারে বা এই পৃথিবী তাকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু এমন অনেক শিশুই এই পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয়,  না তারা কোনো ভূমিকা রাখে, না পৃথিবী তাদেরকে মনে রাখে। এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। যুগে যুগে তারপরেও অনেক শিশু প্রকাশ্যে বা গোপনে পৃথিবীতে আসে যারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় আর একদিন সব কিছু ফেলে সবার থেকে আলাদা হয়ে আবার কোথাও অদৃশ্য হয়ে যায়। মাঝখানের এই সময়টায় খুব গুটিকতক মানুষ হয়তো নিজের মতো করে কাউকে কাউকে মনে রাখে কিন্তু তাও একসময় মনের স্মৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। আমার সফুরা খালা, সামিদা খালা কিংবা আমার শায়েস্তা বুজি, বা সাফিয়া বুজিরা সম্ভবত এই রকমের কিছু মানুষ যারা সেই বহু বছর আগে শিশু হয়ে জন্ম নিলেও কোনো লাভ হয় নি কারো। তারা আজীবন যেনো এই দুনিয়ার বুকে একটা বোঝা হয়েই ছিলো। অথচ তারা হাজারো মানুষের থেকে অনেক ভালো মানুষ ছিলেন।

প্রায় দু বছর আগে আমি আমার পরিবার নিয়ে আমাদের গ্রাম থেকে বেশ দূরে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। বেশীক্ষন দেরী করি নাই কারন পরিবেশটা ঐ রকমের ছিলো না। কোনো রকমে আনুষ্টানিকতা শেষ করে ভাবলাম, যেহেতু গ্রামের পথেই আছি, যাই আমাদের গ্রামের বাড়িটা ঘুরেই যাই। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো, আলো বেশ কমে গিয়েছিলো। অনেকেই আমাকে চিনে না যদিও আমি এই গ্রামেরই একজন পুরানো বাসিন্দা। কিন্তু সময়ের সাথে আমার অনুপস্থিতি আমাকে আজ এই গ্রামে একজন নবাগত অতিথির মতোই মনে হচ্ছিলো। যারা আমার সমবয়সী ছিলো, তারাও অনেক বুড়ো হয়ে গেছে, অনেকেই চিনতেও ভুল করছিলো, আমি তো ওদের কাউকেই এখন চিনি না। ওদের চেহারা সুরুতে এমন বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে যে, জোয়ানকালে আমি যাদেরকে দেখেছি, তারা এখন দাদা নানার পর্যায়ে। না চেনারই কথা। তারপরেও কাউকে কাউকে আমি চিনতে পারছিলাম। গ্রামের বাড়িটা খা খা করছে, কেউ থাকে না এখানে। আগে মা থাকতেন, এখন থাকে আমার এক ভাগ্নে যে সারাদিন গাজা খায়।

ভাবলাম, আমার এক খালা ছিলো। নাম সফুরা বেগম। উনি কি জীবিত আছেন নাকি আর জীবিত নাই সেই খবরটাও আমার জানা নাই। তাঁকে খুব দেখতে মন চাইলো। মিটুলকে বললাম, চলো একটা বাড়িতে যাই। যদি উনি বেচে থাকেন, তাহলে মায়ের অভাবটা কিছুটা হয়তো পুরন হবে। আর যদি জীবিত না থাকেন, অন্তত জানতে পারবো, কবে থেকে আর তিনি এই পৃথিবীতে নাই। আলুকান্দা তার বাড়ি। অনেক খোজাখুজির পর শেষ অবধি সফুরা খালার বাসায় যেতে পারলাম। তিনি অসুস্থ্য। জর। একটা কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। চার পাঁচ দিন নাকি তিনি কিছুই খাচ্ছেন না। অনেক বয়স হয়ে গেছে। আমার মা যখন বেচে ছিলেন, তখন আমার এই খালা প্রায়ই আমার মায়ের সাথে দেখা করতেন, গল্প করতেন। আমাকে খুব আদরও করতেন। আসলে আমার মা, আমার সামিদা খালা আর এই সফুরা খালা এতোটাই ভালো আর নীরিহ মানুষ ছিলেন যে, তাদের ব্যাপারে আজ অবধি কেউ কোনো অভিযোগ করেছে সে ঘটনা ঘটে নাই। খালাকে ডাকা হলো। উনি ভালো মতো চোখে দেখেন না। এম্নিতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো, তারমধ্যে আবার আকাশ ছিলো খুব মেঘাচ্ছন্ন। বিদ্যুৎ ছিলো না। কোন রকমে খালাদের বাসায় যাওয়ার পর, আমি খালার বিছানায় গিয়ে বসলাম। খালাকে তার পুত্রবধুরা ডেকে তোলার চেষ্টা করলেন। আমাই যাওয়াতে সবাই অনেক খুশী হয়েছে। কি থেকে কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না।

খালাকে যখন আমি বললাম, আমি মেজর আখতার এসছি। খালা এম্নিতেই কানে কম শুনে মনে হয়, তার মধ্যে আমার নাম শুনে যেনো একটা অদ্ভুত মিথ্যা কথা শুনলেন এমন হলো। বল্লো-

কে? হামিদার ছেলে?

বললাম, হ্যা খালা।

উনার জর ছিলো প্রায় ১০৩ ডিগ্রী। আমার কথা শুনে তিনি বিছানা থেকে উঠে বসলেন। খালা প্রায় গত চার পাঁচ দিন বিছানায় উঠে বসতে পারেন না। কিন্তু আজ যেনো কোন অলৌকিক শক্তিতে তিনি একাই বিছানায় উঠে বসে পড়লেন। আমি খালাকে জড়িয়ে ধরলাম, খালাও আমাকে এমন করে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলেন যেনো এইমাত্র বাইরের মেঘাচ্ছন্ন আকাশটা ঘনকালো ঝপ ঝপ বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিলো সারাটা উঠান।

কতটা আদর? কিভাবে আদর করলে ভালোবাসা হয় মায়েদের? আমার সেটা জানা ছিলো। আমার মাও ঠিক এভাবেই আমাকে আদর করতেন।  আমার মুখে দুই হাত দিয়ে একদম চোখের কাছে আমার মুখটা নিয়ে পানভর্তি মুখে ভিজা ভিজা চোখে ফিক করে হেসে দিয়ে বলতেন, অনেক বড় হ বাবা। আমার দোয়া আর দোয়া রইলো। সফুরা খালার ভাষাও এক। কি অদ্ভুদ। আমি তাঁকে কতোক্ষন জড়িয়ে ধরেছিলাম, আমার জানা নাই। সারাটা শরীর হাড্ডি, মাংশ বলতে কিছুই নাই। গরীব ছেলেপেলেরা যতোটা পারে তাদের মায়ের যত্ন নেয় বটে কিন্তু অন্তরের ভালোবাসায় হয়তো অনেক ঘাটতি আছে। তারপরেও তিনি বেচে আছেন যেটুক পান সেটা নিয়েই।

আমার মায়ের বাবার নাম ছিলো কেরামত আলী। আমার মায়ের কোনো ভাই ছিলো না। মাত্র দুইবোন- হামিদা খাতুন আমার মা আর সামিদা খাতুন আমার আপন খালা। কিন্তু সফুরা খালার বাবার নাম ছিলো চেরাগ আলি। তারও কোনো ভাই অথবা কোনো বোন ছিলো না। তিনি একাই একমাত্র কন্যা সন্তান ছিলেন চেরাগ আলীর। এই চেরাগ আলি এবং কেরামত আলি (মানে আমার নানারা) ছিলেন চার ভাই। অন্যান্য আর দুই ভাই ছিলেন সাবেদ আলি এবং লষ্কর আলী। উম্মেদ আলী ছিলেন এই চার ভাইয়ের বাবা। অর্থাৎ আমার মা খালাদের নানা।

আজ তারা কেহই বেচে নাই। শুধুমাত্র আমার সফুরা খালাই বেচে আছেন কালের সাক্ষী হয়ে। খুব ভালোবাসি আমি তোমাদের।

১১/০৮/২০২১-কনিকার বিদেশ যাওয়ার সময় কিছু উপদেশ

নতুন জায়গায় নতুন দেশের নতুন নিয়মে তুমি সম্পুর্ন আলাদা পরিবেশে একটা নতুন জীবন ধারায় নতুন ক্যারিয়ার তৈরী করার জন্য দেশ ছেড়ে সুদূর আমেরিকায় যাচ্ছো। তুমি এদেশের কোন চাপ, কোনো বিরহ নিয়ে ওখানে বাস করবে না, না কোনো কারনে মন খারাপ করবে। একদম ফ্রেস মাইন্ডে যাবে আর ফ্রেস করে শুরু করবে সব। মন দিয়ে নিজের সপ্ন পুরু করার চেষ্টা করবে কিন্তু সব সময় শরীরের দিকে যত্ন নিতে হবে। আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ। গল্পটা তোমার, সপ্নটা তোমার। এই আজ থেকে তুমি একটা জার্নি শুরু করলে যার একমাত্র যাত্রী তুমি নিজে। জীবনের মজাটা হচ্ছে- কিছু কিছু জিনিষ এমন হয় যেটা অবিশ্বাস্য লাগে কিন্তু তুমি বুঝতে পার- হ্যা এটা হয়েছে। তখন নিজের থেকেই বিশ্বাস হয়ে যায়। 

নতুন কাজ, নতুন পরিবেশ, কিন্তু নিজেকে বদলে ফেলো না। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। তুমি চলে যাবার পর হয়তো আমাদের এখানে অনেক কিছুই পালটে যাবে। পালটে যাবে কোনো এক সন্ধ্যায় পিজা খাওয়ার কিছু আনন্দঘন মুহুর্ত, পালটে যাবে কোনো এক ছুটির দিনে দল্বেধে বাইরে গিয়ে খেতে যাওয়ার আসর কিংবা পালটে যেতে পারে আমাদের অনেক দইনিন্দিন কিছু কর্ম কান্ড ও। আমাদের এই পরিবর্তন কোনো নতুন কিছু হয়তো নয়, এটা একটা এডজাষ্টমেন্ট, যা তোমার অনুপস্থিতিতে আমাদের আনন্দের সাথে বেচে থাকার নিমিত্তে। কিন্তু তোমার বদলে যাওয়া অন্য রকম। তুমি বদলাবে সেটা যাতে তোমার ভালোটা হয়।

 আমি তোমাকে কোনো কিছুতেই কখনো আটকাই নাই, না কখনো আটকাবো। কিন্তু তুমি আমার নিজের মেয়ে, আমার বহু আদরের সন্তান। যদি এমন কখনো হয় যে, আমি তোমাদের কারনে দুশ্চিন্তায় থাকি, তখন হয়তো সমস্ত আবেগ, মায়া আর ভালোবাসা উপেক্ষা করেই হয়তো আমি তোমাকে আটকাবো। সেটা যেনো আমাকে করতে না হয়। প্রাইওরিটি ঠিক করতে হবে জীবনে। সব সময় আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবে। জীবনে ব্যস্ততা থাকবে কিন্তু এতোটা না যাতে ফ্যামিলি ডিপ্রাইভড হয়। তুমি যদি ভালো ফলাফল করতে না পারো, এর মানে এই নয় যে, আমার ভালোবাসা তোমার উপর কমে যাবে। তুমি যদি তোমার ডিজায়ার্ড রেজাল্ট না করতে পারো শত চেষ্টা করার পরেও, আমি তোমাকে কখনোই দোষারুপ করবো না। বরং আমি তোমাকে সারাক্ষন সাহস দেবো, সহযোগীতা করবো কিভাবে তুমি সবার থেকে ভালো ফলাফল করতে পারো। আর ওটাই তোমার বাবা।

একটা জিনিষ সারাজীবন মনে রাখবা যে, সোস্যাল মিডিয়া একটা মেনিপুলেটেড মিডিয়া। এর বেজ মোটেই সত্য নয়। বরং এটা সাজানো সত্যি। কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। এই সোস্যাল মিডিয়ায় সেটাই তারা জানাতে চায় যেটা তারা তোমাকে জানাতে চায় কিন্তু তোমার উচিত সেটা জানা যেটা আসল সত্যি। কারন অনেক বড় অপরাধের শিকর অনেক গভীরে থাকে। এই সোস্যাল মিডিয়ার ব্যক্তিত্তরা সবাই মেনিপুলেটেড চরিত্র। এরা ডিটেইল্ড মিথ্যা কাহিনী খুব নিখুতভবে বানায়। তাই কোনো কিছুর ফেস ভ্যালুতে না গিয়ে ডাবল ভেরিফিকেশন জরুরী। জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিজের চারিদিকে সবসময় চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এই কথাটা খুব জরুরী মনে রাখা যে, প্রকৃতির ইশারার প্রতি সর্বদা সেনসিটিভ থাকা। যেদিন সুনামী হয়, তার আগের দিন জংগলের সমস্ত প্রানিকুল সবাই জাত নির্বিশেসে উচু জায়গায় স্থান নিয়েছিলো, কারন তারা প্রকৃতির সেন্সটা বুঝতে পেরেছিলো। যা মানুষ বুঝতে পারে নাই। ফলে সুনামীতে বন্য প্রানীদের মধ্যে যতো না ক্ষতি হয়েছিলো তার থেকে শতগুন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো মানুষ। ঠিক এই কারনেই  সব সময় মনে রাখা দরকার যে, অপরাধের সুনামী একটা নয়, অনেক সংকেত দেয়, হওয়ার আগে এবং অপরাধ হওয়ার সময়। শুধু সেটা ধরতে হয়।

মানুষের শরীরে একটা জিনিষ থাকে যা পোষ্টমর্টেম করেও পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো সাফল্যে সব থেকে জরুরী হয় সেই জিনিষটার। সেটা “কনফিডেন্স”। এই কনফিডেন্স মানুষকে তৈরী যেমন করতে পারে, তেমনি ভেংগেও দিতে পারে। যখন এটা ভেংগে যায় বা হারিয়ে যায়, তারপরে আর কিছু কাজ করে না। তখন যেটা হয়, তুমি ঠিক করছো নাকি ভুল করছো কিছুই বুঝতে পারবে না। আর যখন কনফিডেন্স চলে যায় বা হারিয়ে যায়, সেই জায়গাটা দখল করে নেয় “কমপ্লেক্স”। এই কমপ্লেক্স যখন গেথে বসে যায় কারো জীবনে, তখন সিম্পল একটা ছবি তুলতেও খারাপ লাগে। কারন কে আপনাকে নিয়ে মজা করবে, কে লেগ পুলিং করবে এই সব ভেবে।

জিবনে এমন কোনো অধ্যায় তোমার থাকা উচিত নয় যা তুমি আর অন্য কেউ শুধু জানো অথচ আমরা জানি না। আমাদের মান, সম্মান, পজিশন, সমাজে মাথা উচু করে বেচে থাকার জন্য শুধু আমাদের গুনাবলীইই যথেষ্ঠ নয়, সেখানে তোমরাও আমাদের সেই জীবনের সাথে জড়িত। ফলে, যেটাই হোক সবকিছুতেই আমাদের কথা মাথায় রাখবে। বাবা মায়ের থেকে বড় ভরষা আর কিছু নাই। আমরা যদি আগে থেকেই জানতে পারতাম আমাদের কর্মফলে কি ফলাফল হয়, তবে কতই না ভালো হতো। কিন্তু সেটা আমাদের স্রিষ্টিকর্তা সুযোগ দেন নাই। তাই সতর্ক থাকাটা খুব দরকার। সতর্ক হওয়া মানে এই নয় যে আমরা শুধু মাত্র পরিনতির বিষয় ভাববো, সতর্ক থাকার অর্থ হলো সঠিক সময়ে নেয়া সেই পদক্ষেপ যা আগামী সমস্যাগুলিকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। বিশেষত এটা জানা সত্তেও যে আমাদের আগামী কর্মফল খারাপ।

মনে রাখবা এক বন্ধুই আরেক বন্ধুর ক্ষতি করে। তাতে তোমাকে সাহাজ্য করতে আমাদের অনেক অসুবিধা হবে। তুমি শুধু ফোকাস করবে তোমার ক্যারিয়ারে আর সপ্ন পুরনে। তোমাদেরকে নিয়ে আমার সারাটা জীবন অন্য রকমের একটা সপ্ন আছে। আরেকটা কথা মনে রাখবে- ভালোবাসায় অনেক শক্তি থাকে। যদি হতাতই মনের অনিয়ন্ত্রনের কারনে কাউকে ভালোই লেগে যায়, সেখানে নিজের সাথে নিজের বুঝাপড়া করো। সব ভালোবাসার রুপ এক নয়। কেউ ভালোবাসে তোমার শরীরকে, কেউ ভালোবাসে তোমার দূর্বলতাকে, কেউ ভালোবাসে তোমার মেধাকে, আবার কেউ ভালোবাসে তোমার তথা তোমার পরিবারের সম্পদ কিংবা তোমার অস্তিত্বকে। কে তোমাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোবাসলো, এই দৃষ্টিকোণ টা খুব ভালো করে বুঝা তোমার দায়িত্ব। কেউ যদি তোমাকে আসল রুপে ভালোবাসে, কখনো সে তোমাকে জোর করবে না কারন সে জানে যদি তুমি তার হও, তুমি যেভাবেই হোক সেটা বুজতে পারবে আর তুমি তার কাছে বিলম্ব হলেও ফিরে যাবে অথবা সে দেরী করে হলেও তোমার কাছেই ফিরে আসবে। যদি সে ফিরে আসে বা তুমি ফিরে যাও, তাহলে বুঝবে এটা সত্যি ছিলো। নতুবা কিছুই সত্য ছিলো না। যা ছিলো সেটা হলো একটা মোহ। মোহ আর ভালোবাসা এক নয়। একটা বাস্তব আর আরেকটা মিথ্যা। এই মিথ্যা ভালোবাসায় পতিত হয় হয়তো মনে অনেক কষ্ট জমা হতে পারে। কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সে সব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তর মানসিক কষ্টটা আর থাকে না। এটা অনেক জরুরী একটা ব্যাপার। সব কিছুরই প্রথমবার আছে। এটা যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রেও। যৌবন হলো অসহায় এবং শক্তির দ্বিতীয় নাম। অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার হয় কিন্তু যৌবনের ভালোবাসার প্রতারনায় নিজের অসহায়ত্তের বিচার নিজেকে করতে হয়। তখন নিজের বিরুদ্ধে রায় দেয়া সহজ হয় না। তাই আমি সব সময় একটা কথা বলি- টাইম হচ্ছে মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভিলেন। তার কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না। আবার এই টাইমই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বন্ধু। তুমি এই টাইমকে কিভাবে ব্যবহার করবে সেটা তোমার বিবেচনা। একবার মনে কালো দাগ পড়ে গেলে তা আজীবন নিজেকে কষ্ট দেয়। ব্ল্যাক কফি, ব্ল্যাক ফরেষ্ট কেক, ডার্ক চকোলেট, ঘন জংগল অন্ধকার রাত, সবই কালো কিন্তু সে কালো কোনো কষ্টের নয়। কিছু কালো জীবনের অভিশাপ। কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? বিশেষ করে সেই কালো যা জীবনের ধারাবাহিকতায় অভিশাপের মতো রুপ নিয়েছে? তাই, আমি প্রতি নিয়ত তোমাকে নিজের হাতের নিয়ন্ত্রনের বাইরে ছেড়ে দিতে ভয় করলেও তোমার উপর আমার আলাদা একটা ভরষা আছে- তুমি পারবে ঠিক সে রকম করে চলতে যা আমি তোমার জন্য করতে চেয়েছিলাম। এই ভরষায় আমি তোমাকে অনেক দূরে পাঠাতেও দ্বিধা করছি না।

আমার আশা, তোমার মায়ের সপ্ন আর আমাদের পরিবারের সব সম্মান তোমার হাতে দিয়ে এটাই বলতে চাই- আমরা তোমাদের পরিচয়ে সমাজে আরেকবার সম্মানীত হতে চাই। বাকীটা আল্লাহ মালিক জানেন।

রানার Character

১।       বিয়েটার উদ্যোগ আসলে কে নিয়েছিলো আগে এবং এর কারনটা কি ছিলো। রানা বলছে, ওর মা ওকে  বিয়ে করতে বলেছে তাই করেছে।  ওর ইচ্ছে ছিলো না।এখানে একটা বিরাট প্রশ্ন জাগে আমাদের মনেঃ আর তা হলো, রানা তখনো বিবি এ শেষ করে নাই, এম বি এ তো অনেক পরের ব্যাপার। তাঁর কোনো চাকুরীও ছিলো না। সে নিজে স্বাবলম্বী নয়। আমরা এনগেজমেন্ট করতে চেয়েছিলাম, উম্মিকাও সরাসরি বিয়েতে রাজী হচ্ছিলো না। আমরা সবাই জোর করেছি। আমরা ছেলের তখনকার ব্যবহারটা শুধু নজরে নিয়েছি, তাঁর পারিবারিক কোন কিছুই আমরা আমলে নেই নাই কারন উম্মিকার শসুরবাড়ির কোনো কিছুর উপরেই আমাদের লক্ষ্য ছিলো না।  লক্ষ্য ছিলো ভালো পরিবার এবং মার্জিত পরিবার কিনা।

২।   উম্মিকা রানার মাকে কি কি জিনিষ জানাতো রানার ব্যাপারে প্রতিনিয়ত। সেটা পরিস্কার করে জানা উচিত।

৪।  কেনো উম্মিকা বারবার রানার কাছ থেকে সরে যাচ্ছিলো? এমন কি বিয়ের আগেও ও বিয়ে করতে নারাজ ছিলো। এটা নিছক অন্য কোনো ছেলের প্রতি আশক্তি এটা নয়। তখন উম্মিকা আমাদেরকে কোনো কিছুই পরিস্কার করে বলে নাই। ও তখনো বলেছিলো যে, ঠিক আছে, রানার সাথেই বিয়ে হবে কিন্তু সময় নাও। ওকে দেখা দরকার। আসলে ও কি দেখতে চেয়েছিলো সেটা এখন কিন্তু আমরাও বুঝতেছি।

৫। রানা ওকে আদৌ কি ভালোবাসে কিনা। সেটা কোন লেভেলের ভালোবাসা, জানা দরকার। রানা কখনোই উম্মিকাকে ভালোবাসে নাই। রানা ভালো বেসেছে উম্মিকার বদৌলতে জীবন বদলানোর। সুবিধা ছিলো না। কিন্তু সেটা যেভাবে ও করতে চেয়েছে সেভাবে আমি কেনো কেউ মানবে না।

৬।  রানা স্ত্রী কি জিনিষ, বুঝতে পারে কিনা।

৭।  উম্মিকার ফ্রিডম যেমন ওর বন্ধবীদের সাথে, ক্লাসের বন্ধুদের সাথে, আত্মীয় স্বজনদের সাথেও  যোগাযোগ না রাখার মানসিক চাপ প্রয়োগ। এতো নীচু মেন্তালিটি নিয়ে বড় হচ্ছে কেনো ছেলেটা?

৮। অকথ্য ভাষায় সারাক্ষন গালিগালাজ, চরিত্রের উপর দোসারুপ, আলাদা বাসায় থাকলে নাকি আমার মেয়ে তাঁর বাসাকে খদ্দের দিয়া হোটেল বানিয়ে ফেলবে, বাবা মায়ের বিরুদ্ধে সারাক্ষন কথা, এবং তাদের উপর  তাঁর অত্যন্ত বাজে ধারনা পোষণ করা।

৯।  রানাকে দিয়ে আমরা চাকরের মতো যখন তখন কাজ করাই, ইত্যাদি। কি কাজ করিয়েছি রানাকে দিয়ে  যাতে ও মনে করছে আমরা ওকে চাকরের মতো কাজ করাচ্ছি?

১০। আইফোন, এসি, টিভি, গাড়ী, ফার্নিচার ইত্যাদির ব্যাপারে নিজ থেকে  স্ত্রীর মাধ্যমে কথা বলা। আমরা কি  কম দিতাম? চেয়ে নিতে হবে কেনো?

১১। স্ত্রীর গোপন কিছু ছবি ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি।

১২। যাচ্ছে তাই ব্যবহার, বিয়ের প্রোগ্রামে হাজির না হবার হুমকি,তারিখ ফিক্স করা নিয়ে মিথ্যা কথা বলা সাথে মাকেও  মিথ্যাবাদি বানানোর চেস্টা।

১৩। খাবার ফেরত দেওয়ার মতো বেয়াদবি। একবার যখন খাবারের মতো জিনিষ আপনাদের বাড়ি থেকে ফেরত   আসতে পারে, সেক্ষেত্রে আমরা আর কখনো আমাদেরকে ছোট করার জন্য কিছু পাঠাতে সাহস করি না। ঈদের পোশাক, কোর বানীর মাংশ, কিংবা গতবারের মতো খাসি কিনে দেওয়া ও যে ফেরত আসবে না,   সেটা আমি কিভাবে সিউর হই?

১৪। ফেসবুকের প্রোফাইল বদল করে ও কি মিন করেছে? আর ওইসব ছবি মেয়েদের সাথে এমন করে তোলা যেনো নিজের অত্যন্ত ঘনিস্ট পোজের কেউ। আমার মেয়ে যদি এমন কোনো ছেলের সাথে এই ধরনের পোজ দিতো, তাহলে তো রক্ষাই ছিলো না।

১৫। সোমা নাকি বলেছে যে, আমরা কেউ দাওয়াত দিলেও সে আসবে না। ইত্যাদি।

১৬। বগুড়া থেকে ঢাকায় উম্মি প্রায় ১৫ দিন থেকেছে। উম্মি ওকে বারবার ফোন করেছে কোথাও ওরা  নিড়িবিলিতে দেখা করার জন্য। রানা বারবার উম্মির সাথে আর কখনোই দেখা করবে না বলে শেষ পর্যন্ত   আর সে দেখাই করে নাই। তাহলে আমার মেয়েই বা ওর জন্য অপেক্ষা করবে কেনো? আজ যদি আমার  মেয়ে বলে যে, উম্মি আর রানাকে ভালোবাসে না, আমি তো তাকে জোর করে এই কথা বলতে পারবো না  যে, কেনো ভালোবাসবে না যে তোমার জন্য পাগল হয়ে অপেক্ষা করছে? রানা কি উম্মির জন্য পাগল হয়ে   আছে? কখনোই না।

১৭।  রানা একদিন আপনাদের সবার সামনে বলেছিলো যে, উম্মি যেহেতু রানাকে একটু অপছন্দ করে, সেক্ষেত্রে   উম্মি যদি এক পা আগায়, রানা আগাবে দুই পা। এই দুই পা আগানোর লক্ষন? প্রায় ১৫ দিন ঢাকায় উম্মি  অবস্থান করছে, উম্মি বারবার ওকে বাসায় না হোক, অন্য কোথাও দেখা করার তাগিদ দিচ্ছে, আর রানা  বারবার একটা কথাই বলে যাচ্ছিলো, আমি জানি না তুমি ঢাকার জন্য টিকেট কেটেছো আর তোমার বাবা  মা জানে। আমি কখনো তোমার সাথে দেখা করবো না। কি দায়িত্বটা পালন করেছে রানা স্বামী হিসাবে? ও  কেনো জানে না যে, উম্মি কখন কোথায় আসবে? খালি বিয়ে মানে কি এই যে, একটা মেয়ের বস হয়ে  যাওয়া? আর কোনো দায়িত্ব নাই? উম্মি আমাকে তার পরেও বলেছে যে, একটু ধৈর্য ধরো, আমি বগুড়ায়  যাই, দেখি রানা আমার প্রতি ওর টান আছে কিনা। কই, উম্মিকাকে মিস করে তো মনেরটানে রানা একবার  ও বগুড়ায় গিয়েও দেখা করে নাই? দেখাতো দুরের কথা, ফোন পর্যন্ত করে নাই।

১৮। আমি সবসময় উম্মিকাকে দোসারুপ করেছি কারন উম্মিকা আমাকে কখনো রানার ব্যবহার, রানার মেন্টালিটির কথা, রানার মেন্টাল প্রেসারের কথা আমাকে বলে নাই। এমন কি রানার মা বা রানার বোনের  নির্লিপ্ত তা নিয়ে কখনো আমাকে বলে নাই। রানা যে ওর সাথে এই রকম চরম  খারাপ ব্যবহার দিনের পর দিন করছে, সে সহ্যই করে যাচ্ছিলো। রানাকে সে ছোট করতে চায় নাই বলেই বারবার পুরু ব্যাপারটা চেপে যাচ্ছিলো। যেদিন সে আমাকে ধীরে ধীরে সব কথা বলা শুরু করলো, আমি বুঝতে   পারলাম, রানার মা কেনো বার বার উম্মিকাকে শান্ত হতে বলছে আর আমার মেয়ে নীরবে সব সহ্য করে থাকছে। এমন কি আমি যে ওকে কত টর্চার করছি তাতেও সে মুখ খুলছিলো না। আসলে রানা কখনোই উম্মিকাকে ভালোবাসে নাই। আপ্নারাও না।

১৯। মাইনাস বলতে কি বুঝায়? আমরা কি আপনাদের সাথে প্লাস হওয়ার জন্য এতো উদগ্রীব ছিলাম? আর  আমরা কি কারনে ওর কাছে পয়জনাস? কি গাড়ি দেই নাই বলে? শেয়ার লিখে দেই নাই বলে? অফিসে টাইম মতো আসার জন্য চাপ দিচ্ছি বলে? ঘুম থেকে উঠে যখন খুশী অফিসে আসবে, এই সুযোগ দেই নাই  বলে? পয়জনাস কথাটার মানে কি? আমরা আপনাদের পরিবারের কোন ইস্যুতে নাক গলিয়েছি? কোন ব্যাপারে কি ক্ষতি সাধন করেছি যে, আপনার ছেলের মনে হলো যে, আমরা আপনাদের পরিবারের জন্য বিষাক্ত? রানার ফেসবুকের সাথে আমার, উম্মিকার, আমার কলিগদের এবং অন্যান্য সবাই মোটামুটি ট্যাগ করা। ওর এই সব মন্তব্যে আমাকে এবং উম্মিকার মাকে অনেকেই ফোন করে জানতে চেয়েছে, কোনো অসুবিধা কিনা রানার সাথে আমাদের। আমাদেরকে সবাই চিনে। আমাদের মাধ্যমে এখন আমাদের পুরু সমাজ রানাকে চিনে। ওর এইসব মন্তব্যে কি রানা বা তাঁর পরিবারের সম্মান বাড়ছে নাকি ওদের  আসল চেহারাটা ফুটে উঠছে?

২১। আমার কাছে আরো একটা তথ্য জানার ইচ্ছে হয় যে, রানা কি শারীরিক ভাবে অক্ষম কিনা। আমাকে রানা এবং উম্মি দুজনেই বলেছে যে, ওরা বিয়ের ৬ মাস পরে শারীরিক সম্পর্ক করেছে। একই ঘরে থাকা একটা যুবতী মেয়ের সাথে ৬ মাস লাগবে শারীরিক সম্পর্ক করতে এটা ভাবা যায় না। তাছাড়া যখনি উম্মি ঢাকায়  আসতো, আমি রানাকে দেখি নাই পাগলের মতো বউয়ের কাছে ছুটে আসতে। দেখা গেছে, যেদিন উম্মি এসেছে, তাঁরও একদিন বা দুইদিন পর রানা হয়ত উম্মির সাথে দেখা করতে আসতো। আমার মনে হয়, হয় ও এখনো যথেষ্ট অপরিপক্ক অথবা শারীরিক ভাবে ও এখনো পুরুস হয়ে উঠে নাই।

২২। আরেকটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয় যে, ওর যে অস্থির মেজাজ, ও যে কোনো সময়ে রাগের বশে  উম্মিকাকে এমন কিছু করে ফেলতে পারে, যাতে ওর প্রাননাশও হতে পারে। ও অনেকটাই ইম্ব্যল্যান্স। যখন সে ঠাণ্ডা থাকে, ও এক রকম, আর যখন ও অস্থির থাকে, ওর কোনো হুশ থাকে না। যেমন ছিলো না ওর বাপের বেলায় মা ফ্যাক্টরীতে। যেটা ও করেছে, তা নজিরবিহীন একটা অপরাধ। মায়ের সামনে বাবাকে কেউ  ওই রকম করে অপমান করতে পারে না যদি মা ও তাঁর স্বামীকে সম্মান করতেন। এটা আপনাদের  পরিবারের সম্মান জড়িত ছিলো। সাথে হয়ত আমারো ছিলো কিন্তু আমাদের থেকে আপনাদের সম্মান অনেক বেশি ক্ষুন্ন হয়েছে। স্বীকার করুন আর নাই বা করুন।

অফিশিয়াল সমস্যাঃ

১।    টাইম মতো অফিসে না আসা। বেশির ভাগ সময় আইপিডিসিতে যেতে হবে, হক ব্রাদার্স এ যেতে হবে,  রুমানিয়ায় যেতে হবে এই ছুতায় সকাল ১১ পর্যন্ত খালি ঘুমেই থাক্তো রানা। আর যখন আইপিডিসিতে যেতো, তার কোনো ফিডব্যাক আজ পর্যন্ত সে আমাকে দেয় নাই যাতে আমি বুঝতে পারি সে আইপিডিসিতে গিয়ে কি কাজ করে। আর আইপিডিসিতে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই যদি প্রতিনিয়ত সে  বিলগুলি, ডিসবারজমেন্টগুলি এবং তাঁর পরিপ্রেক্ষিতে কত দিনের জন্য কত ইন্টারেস্ট হয় তা যদি অফিসে বসেই আপডেট করে। এতা আমি করতাম আগে, আমারতো কখনোই যেতে হয় নাই।

২।   বেশীর ভাগ সময়ে কাজগুলি সঠিকভাবে তদারকি না করা এবং সেটা আবার কাউকে করতে না দেওয়া। যেমন, গেটপাশ গুলি, স্টোরে মালামাল আনা এবং ইস্যু, কোন মাল কখন কিভাবে খরচ হচ্ছে, আদৌ কেনা হচ্ছে কিনা, বা কিনলেও বেশি দিয়ে কেনা হচ্ছে কিনা, তাঁর কোনো তদারকি নাই। যেমন, রুমানিয়ার ৪৮ নাম্বার বিলটা আজো পর্যন্ত রুমানিয়ার পাঠানোই হয় নাই অথচ ৪৯, ৫০ ইত্যাদি বিলগুলি সব চলে গেছে। ৪৮ নং বিলে আমাদের প্রায় দুই লাখ টাকার মাল আমরা ডেলিভারী দিয়েছি। তাহলে এই  টাকাটা কি আমাদের পাওয়া উচিত না?

৩।   অভার অল ফ্যাক্টরীর কোনো কাজে সামিল না হওয়া। মার্কেটিং করে রউফ, প্রোডাকশন ফলো আপ করে রউফ, কোন মাল কখন ডেলিভারি যাবে, সেটার প্ল্যান করে রউফ, এমন কি সর্বশেষ ফ্যাক্টরীতে কি  পরিমান আদেশ আছে, বা দরকার, বা পেন্ডিং কি আছে, তাঁর কোনো খোজ খবর তাঁর কাছে নাই। তাহলে কি কন্ট্রোল করবে ফ্যাক্টরী? আর ওদিকে ঘন্টার পর ঘন্টা ওই পিয়নের সাথে, গার্ডের সাথে রঙ্গ আলাপ। কোন মানে হয় এগুলোর? তাতে বরং আন্দার কমান্ডরা লাই পেয়ে বসে।

৪।   বারবার বলার পরেও মাসিক প্রতিবেদন, বিল সাবমিটের প্রতিবেদন, আমাদের লিমিটের অবস্থা, কোন চেক   কখন পাশ হচ্ছে কিংবা কোন চেক আদৌ পাশ কেনো হচ্ছে না, এই সবকিছুর মধ্যে একটা বিরাট সমন্নয়হীনতা। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, আমাদের চেক পাশ হবার কথা আজ, আইপিডিসি হয়ত  ভুলে গেছে, তারা আরো কয়েকদিন পর সেই চেক ডিপজিট করে তারপর টাকা নিয়েছে। আইপিডিসির তো সমস্যা নাই। তারা তো ইন্টারেস্ট কাটছেই। লস তো আমাদের। তাহলে এই গুলিতো ওর দেখার কথা।

৫।   মা ইন্ডাস্ট্রিজের ডাইরেক্টরশীপ উম্মিকার থেকে তাঁর নিজের নামে ট্র্যান্সফার করার আগ্রহ কেন? এর আগে  আমাকে রানাই বলেছিলো যে, রউফ সাহেব ডাইরেক্টর বিধায় আর সে ইডি বিধায় রউফ ওর সিনিয়র পদে আছে এবং রউফ সাহেবকে সে ধরতে পারে না। এটা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিলো ঠিক, তাতে আমি ওকে ডাইরেক্টরশীপ দিয়ে বেতন ১৫ হাজার থেকে এক লাফে ৫০ হাজার করে দিলাম। তাহলে  কি ওর দায়িত্ত বাড়লো না কমল? ডাইরেক্টর হয়ে তো দেখি আরো ডাট বেড়ে গেলো আর কাজের প্রতি  আগ্রহ কমে গেলো। কেনো?

৬।   রউফ সাহেবকে বলেছে (এবং আমাকেও সে মেইল দিয়েছে যে) রানার নামে মা ইন্ডাস্ট্রিজের সব একাউন্ট ট্র্যান্সফার করে দিলে ও নিজেই চালাতে পারবে এবং প্রতি মাসে মাসে সে লোন কম করে হলেও লাখখানেক করে লোন পরিশোধ করতে পারবে। কোন অধিকারে এই ধরনের আগ্রহ? আমি করতাম যদি দেখতাম  যে, সে এটাকে নিজের মতো করে ধরে রাখতে পারবে। আপনার কি মনে হয়, রানা ধরে রাখতে পারতো? যে কিনা জানেই না কি পরিমান আদেশ আছে, কখন কি আদেশ পাওয়া উচিত, কখন কি মাল বানানো উচিত, কিভাবে কাকে কন্ট্রোল করলে কি দাঁড়াবে, তাঁর তো কোনো কন্ট্রোল নাই। না কেউ ওকে কোনো সমস্যার কথা শেয়ার করে। তাহলে কি কন্ট্রোল করবে? কাকে কন্ট্রোল করবে?  

৭।   গাড়ি ইস্যু। গাড়ি কেনার জন্য এতো চাপ আমি কখনো ফিল করি নাই। আমি বারবার ওকে বুঝানোর চেস্টা করেছি যে, আমার উপর ছেড়ে দাও। আমি জানি কখন কি করতে হবে। আমি ওকে গাড়ি দিতে পারি নাই বিধায় প্রতি মাসে শুধুমাত্র কনভেন্সই দেওয়া হয় ওকে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অফিসে আসা যাওয়ার জন্য আজ পর্যন্ত কোনো অফিস কোনো স্টাফকে কনভেন্স দেয় এটার কোনো নজির নাই। তারপরেও আমি গাড়ি ভাড়া দিতাম। তাহলে গাড়ি লাগবে কেনো? আর এমন তো নয় যে, ছোটবেলা থেকেই সবসময় নিজেদের প্রাইভেট গাড়িতে করেই সে যাতায়ত করতো। অভ্যাস তো ছিলো পাবলিক ট্রান্সপোর্টে আসা যাওয়া করার। তাহলে হতাত করে এমন কি হলো যে, আমাদের কাভারড গাড়িতে চড়তে ওর লজ্জা লাগে, কিংবা এমন কি হলো যে, গাড়ি ছাড়া সে ঘর থেকেই বের হতে পারে না? ও বলেছে, ওর চুল নস্ট হয়ে যাবে, তাই গাড়ি লাগবে। অবাক না হয়ে তো আর পারি নাই।

৮।    ইউএফএল এর চেক পেন্ডিং প্রায় ৯৬০০০০/০০, হক লিমিটেডের ৪টি বিল ওরা দেখাচ্ছে পরিশোধ   করেছে কিন্তু আমরা কিংবা আইপিডিসি একজনও পাই নাই এমন বিলের এমাউন্ট ৯৭৯৯০০/০০, আরেকটা বিল যার এমাউন্ট ৭৩০০০/০০। এতে মোট প্রায় ২২০০০০০/০০ টাকার ঘাটতি হয়েছে   আমাদের। যা আইপিডিসি আমাদের নামে এই সব বিলগুলি ওভারডিউ দেখিয়ে ১০% এর জায়গায় ১৩% করে ইন্টারেস্ট কেটেছে। শুধু তাই নয়, এলপিসি হিসাবে আরো ১% বেশি কর্তন শুরু করেছে। অথচ   আমাদের টাকা ছিলো ওদের কাছেই।

৯।   ওভার ওজন প্রতিমাসে কত কেজি যাচ্ছে তাঁর একটা হিসাব নিয়ে অপারেটরদেরকে প্রতিনিয়ত ব্রিফ করা যেনো ওভার অজন লিমিটের মধ্যে রাখা যায়। কিন্তু মাসের পর মাস, এই সব কাজগুলি করা হচ্ছিলো না।

১০। পেটি ক্যাশ দেখে রানা। কিন্তু আমি না বলা পর্যন্ত রানা কোনো পেটি ক্যাশ চেক করে না। ফলে আমি যখন প্রায় দেড়মাস মা ইন্ডসাট্রিজে যেতে পারি নাই, তখন প্রায় দেড়মাসের অধিক কোনো পেটিক্যাশ এক  দিনের জন্যও চেক করা হয় নাই। তাতে অনেক বিল যেমন মিসইউজ হয়েছে, তেমনি পেটির কোনো হিসাবও রাখা যায় নাই।

১১।       আমি প্রতিদিনের প্রোডাকশন মিলিয়ে কত লস হচ্ছে আর কত লাভ হচ্ছে এমন একটা এক্সেল শীট প্রোগ্রাম বানিয়ে দিয়েছিলাম। তাতে শুধু প্রতিদিনের র মেটেরিয়ালস খরচ, তাঁর দাম, আর প্রতিদিনের ইন করালেই ব্রেক ইভেন পয়েন্টে আছি নাকি লসে আছি নাকি লাভে আছি তাঁর একটা  হিসাব বের হয়ে আসে। কখনো এই হিসাবটা আমি রানার কাছ থেকে পাই নাই।

১২।     দানার ব্যাপারে আমি বলেছিলাম যে, একটা দোকান থেকে দানা না কিনে, কয়েকটা দোকানের সাথে  লিয়াজো করার জন্য যাতে এক দোকানের সাথে সমস্যা হলে বা বাকি আনলে অন্য দোকানে আমাদের এক্সেস থাকে। আজ পর্যন্ত আমি রানাকে দানার ব্যাপারে ওই এক দোকান ছাড়া দ্বিতীয় কোনো দোকানের  সাথে লিয়াজো করাইতে পারি নাই।

১৩।     কোনো কিছু বললেই ব্যবসা আর সম্পর্ক এক করে ফেলে। জামাই হিসাবে তাকে কিছু বলা যাবে না, কোনো কিছু ধরা যাবে না, আবার কাজ দিলে কাজও করবে না। তাহলে ব্যবসাটা চলবে কিভাবে?

১৪।     প্রথম থেকেই রউফকে সে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা। রউফকে দিয়েই আমি আবার নতুন করে একটা প্ল্যান শুরু করেছি, রানাকে দিয়ে তো টেস্ট করতে হলে আমাকে বুঝতে হবে ও নিজে নিজে সামাল দিতে পারবে  কিনা। আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও একা একা পারবে কিনা। ও আমাকে বলেছে, ও পারবে না। তাহলে, ও কেনো রউফকে প্রতিদ্ধন্দি মনে করে? আমি তো কোটি কোটি টাকার একটা রিস্ক শুধু ওর  খামখেয়ালীর উপর নিতে পারি না।

১৫।     অফিশিয়াল কোনো কিছু হলেই ব্যাপারটা পরিবারের মধ্যে গোল পাকিয়ে একটা জটিল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। মেয়েকে দিয়ে সামাল দেওয়া, আমার বউকে দিয়ে সামাল দেওয়া, আর পরিবারের মধ্যে একটা ঝামেলার সৃষ্টি করা। এটা একটা মজার ব্যপার হয়ে দাড়িয়েছিলো তাঁর কাছে।

১৬।      রিভার সাইড নাকি ওকে সমীহ করে না বা দাম দেয় না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, রিভার সাইডের স্টাফরা ওকে কিভাবে ব্যবহার দেখালে ও মনে করবে যে, রিভার সাইড ওকে দাম দিচ্ছে। মুর্তজা ভাই ওকে ডেকে ডেকে আদর করে এইটা খাওয়ায়, ওইটা খাওয়ায়, কথা বলে ইত্যাদি। তাহলে কিভাবে ও বলে যে,  রিভার সাইড ওকে দাম দেয় না?

১৬।     উকিল বাপ হিসাবে মুর্তজা ভাইকে নিয়েও অনেক মন্তব্য করা হয়েছে বলে শুনেছি। সব খালি সবাই   আপনাদেরকে সমীহ করলে সে ভালো আর আপনাদের কারো কোন দায়িত্ব থাকবে না, এটা তো হতে পারে  না। কয়দিন মুর্তজা ভাইকে আপনার ছেলে ফোন করেছে? কয়দিন মুর্তজা ভাইয়ের ছেলেমেয়ের খোজ নিয়েছে ওরা কে কেমন আছে? ও নিজেই তো মিশতে জানে না। অনেক সময় এমন হয়েছে যে, আমি না  বলা পর্যন্ত রানা মুর্তজা ভাইয়ের সাথে রানা দেখা করার সৌজন্য বোধটাও নাই যখন সে ফ্যাক্টরীতে যেতো। চলে আসার সময় হ্যালো বলারও দরকার মনে করে না। এটা কি কোনো কালচার? এমনো হয়েছে যে,  আমি ওকে গেটে গিয়ে ডেকে এনেছি যেনো যাওয়ার সময় মুর্তজা ভাইকে হ্যালো বলে যায়। এটা কি ধরনের সভ্যতা?  

১৭।    মা ফ্যাক্টরীতে যে কান্ডটা রানা, জাহিদ কিংবা আপ্নারা যা করেছেন, তাতে কি রানার কিংবা আপনাদের পরিবারের মানসম্মানটুকু খুব বেড়েছে নাকি কমেছে? রানার আব্বাকে আশ্রয় দেওয়া তো আমার অন্যায়  কিছু হয় নাই, যেখানে ঊনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেরাচ্ছে। আমি কি ওনাকে ডেকে এনেছিলাম? আমি তো বারবার ঊনি আমার এখানে আছে এই মেসেজটা দয়ার চেস্টা করেছি কিন্তু ঊনার আপত্তির কারনেই   কিন্তু আমি মেসেজটা দিতে পারি নাই। দিলে কি হতো? সে হয়তো আমার এখান থেকে চলে যেতো। তাহলে কি খুব ভালো হতো?

১৮।     ফ্যাক্টরীতে আমি ওকে খেতে বললাম, অনুরোধের দাম দিলো না। পরে আবার নিজেই সবার খাওয়ার পরে জনিকে দিয়ে খাবার চেয়ে খাইলো কারন তখন আপনি তাকে খেতে বলেছেন, তাই খাইলো। নিজের কোনো বিবেচনা নাই নাকি?

১৯।       জাহিদ বলেছিলো যে, সে রানা এবং উম্মিকার দায়িত্ত নিয়েছে ওদেরকে আবার ঠিক করার জন্য। উম্মির  রেজাল্ট বের হলো, ভালো করলো, কই কেউ তো আপ্নারা ওকে এঙ্কারেজও করলেন না!! এমন কি  ফেসবুকে রানাও তো উম্মিকাকে একটা অভিনন্দন জানাইলো না? এগুলো হচ্ছে হিংসার বহিরপ্রকাশ। নিজের বউকে নিজেদের মনে না করা। জাহিদের সাথে তো উম্মিকার কোনো ঝগড়া হয় নাই। ঈদে উম্মি কোথায় আছে, সেটাও কি জাহিদ বড় ভাই হিসাবে জানার চেস্টা করেছে? আমার মেয়ের এডুকেসন কোয়ালিফিকেসন রানার থেকে কোনো অংশেই কম নয়। বরং বেশি।এই রকম বিবিএ বা এমবিএ পাশ ছেলেরা ভুরিভুরি অফিসের চাকুরীর জন্য ঘুরে বেরাচ্ছে। আমি তো ওকে একটা প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার চেস্টা  করেছিলাম। ডাইরেক্টরশীপ পাইতে  সারা জীবন পার হয়ে যায়, তারপরেও কেউ আদৌ পায় কিনা  সন্দেহ   আছে।

২০।     উম্মিকাকে তো আপ্নারা কেউ ফ্যামিলি মনে করেন না। রানা তো আরো করে না। তাহলে কেনো কি কারনে মেয়েটা আপনাদের কে আপন ভাব্বে?

২১।     জাহিদ বলেছে যে, নাভা জন্ম নেবার দেড় বছর পর্যন্ত নাকি সে নাভার মুখ দেখতেও যায় নাই। এটা কি খুব ভালো ক্রেডিট? মেয়েটা কার? কেউ যদি মনে করে যে, আমরা শুধু উম্মিকার সাথে রানার বিয়ে দিয়েই খুশী, আমাদের আর কিছুই দরকার নাই, তাহলে, সে বিয়ে আমাদের দরকার নাই। আমরা সমাজ নিয়ে চলি এবং সমাজে আমার মেয়ের একটা পজিসন আছে।

২২।     শশুরবাড়ি হিসাবে একটা স্ত্রীর কি কিছুই পাওনা নাই? ছুটিতে যাওয়ার সময় আপনার ছেলে ওকে নিতে  আসবে না, যাওয়ার সময় সে তাকে বগুড়ায় যাওয়ার জন্য সিঅফ করবে না। আপ্নারাও তাঁর জন্য কোনো  খোজখবর রাখবেন না, জিজ্ঞেসও করবেন না তাঁর কিছু লাগবে কিনা। আমি যদিও আপনাদেরকে কিছু  করতে দিতাম না, তারপরেও কিন্তু মহব্বত বুঝা যায়। আরেকটা কথা, কি কারনে আমার মেয়ে ওর জন্য টান অনুভব করবে? সে তো জানে, ওর জন্য স্পেসালি কেউ বাসের শেষ প্রান্তে কেউ অপেক্ষা করে নাই!!

২৩।     এমনসব কথাবার্তা যা শুনলেও চমক লাগেঃ

ক)     আমরা নাকি আপনাদের টাকায় সংসার চালাই। কারন রানার মা কিছু টাকা সুদে মা তে খাটিয়েছিলো, সেটার মাধ্যমেই আমরা সংসার চালাই।

 (খ)      আমার বউয়ের নাকি আচলই নাই।

 (গ)      আমাদের যা আছে, সবই নাকি মিথ্যা।

(ঘ)      বারবার উম্মিকাকে ডিভোর্স দিচ্ছো না কেনো, এই বলে বারবার তাকে ওই পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যাতে সে ডিভোর্সটা দিতেই বাধ্য হয়।

(ঙ)     আমার মেয়ের জন্য না তার শাশুড়ি, না তার স্বামী, না তার শশুড় অথবা তার বোন, কিংবা রানার  ভাই কেউ তাকে কখনোই পছন্দ করে নাই, এবং এখনো করে না এই কথাগুলি দিয়ে রানা কি মিন করতে চেয়েছে? তাহলে কি পছন্দ করে আপ্নারা একচুয়ালি আমাদের বাড়িতে মেয়েকে  বিয়ে করাইতে এনেছিলেন? আমার তো প্রশ্ন থাক্তেই পারে তাহলে। আর এই যে পছন্দ করে না,  এটার প্রমান তো আমরা স্বচক্ষেই দেখতে পেয়েছি। আমার মেয়ে এই কথাগুলি কখনোই বলে নাই।   কিন্তু সবকিছু বলেছে তার শাশুড়িকে। 

ওর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছেঃ

(১)      বেয়াদব।

(২)      অলস

(৩)     লোভী

(৪)      মিথ্যা কথা বলা

(৫)      ইনফেরিওর কমপ্লেক্সে ভোগা।

(৬)     খুব দুর্বল নেট ওয়ার্ক মেইন্টেইন করা।

(৭)     নিয়মানুবর্তিতা বলতে কিছুই নাই।

(৮)     কাজে ফাকি দেওয়া।

(৯)      নিজের সক্ষমতার বাইরে ডাট নেওয়া।

(১০)    ইমম্যাচিউরড এবং বাস্তব লাইফের সাথে এখনো পরিচিত না হওয়া বা পরিচিত হবার চেষ্টা না করা।

(১১)    কথায় কথায় বড়দের ব্যাপারে তুলনা বা মন্তব্য করা।

হেডামগিড়ি দেখাইবা তো আগে হেডাম নিজে তৈরী করো। তারপর হেডামগিরি দেখাও। আমরাও দেখতে চাই, হেডামগিরি করার যোগ্যতা কতটুকু।  

যেদিন প্রথম আমি জানলাম যে, উম্মিকা একটা ছেলেকে ভালোবাসে, আমি অবাক হই নাই। অথবা এমন নয় যে, আমি কোনো বাধা দিতে চেয়েছি। আমি সব সময় চেয়েছিলাম যে, আমার অনুপস্থিতিতে আমার এই ব্যবসা, আমার পরিবারের জন্য একজন দায়িত্তশীল মানুষ।

উত্তরসূরি নির্বাচন

জীবনের সব অধ্যায় এক রকম নয়। এটা আমার হয়ত বুঝতে দেরী হয়েছে কিন্তু এই সব তত্ত্বকথা মনিষীরা যুগে যুগে বলে গেছেন। মনিষীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক তত্ত্বকথাই বলে গেছেন বটে কিন্তু কেউ সে সব তত্ত্বকথা মানে না। হ্যা, মানে তখন যখন কারো জন্য সেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের জন্য প্রযোজ্য হয়। সেই সুবাদেই বলছি যে, আমি আপনি ততোক্ষন সবার কাছে যত্নশীল যতোক্ষন আপনি নিঃস্বার্থভাবে দিতে পারবেন কিন্তু পাওয়ার আশা না করবেন। আশা করলে আপনি হেরে যাবেন। এটা নিজের স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তান, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার বেলায় প্রযোজ্য। কেউ মানুক বা না মানুক, এটাই সত্য।

এর থেকে যে শিক্ষাগুলি নেওয়া দরকার তা হচ্ছে, যা কিছু করবেন জীবনে, নিজের জন্য করুন, নিজে সুখী সময় কাটানোর জন্য আয় করুন এবং তা দুইহাত ভরে খরচ করুন। আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তানগন কিভাবে চলবে কিংবা তারা কোথায় কিভাবে বাস করবে তা আপনার চিন্তা থাকতে পারে বটে কিন্তু তারজন্য অনেক কিছু আয় করে সঞ্চয় করে তাকে পঙ্গু করে রেখে যাওয়ার কোনো দরকার আমি মনে করি না। বরং তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিন, তাতেই সে এই পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে ঠাই করে নেবে। এই পৃথিবী পরিশ্রমী মানুষের জন্য সুখের আবাস্থল। অলসদের জন্য এখানে সব কিছুই নাগালের বাইরে। পূর্ববর্তি জেনারেশনের আহরিত সম্পত্তি উত্তরসূরিদের জন্য কিছুটা আরামদায়ক হলেও একটা সময় আসে, কোনো না কোনো উত্তরসুরীর মাধ্যমেই তা বিনাশ হয়। এই বিনাশটা হয়ত এক জেনারেশনের মধ্যে ঘটে না। কারো কারো বেলায় এক জেনারেশনেই শেষ হয়ে যায় আবার কারো কারো বেলায় এটা ক্ষয় হতে কয়েক জেনারেশন পার হয়। কিন্তু ক্ষয় হবেই। এর প্রধান কারন, যিনি সম্পদ করলেন, তার যে দরদ, আর যারা বিনা পরিশ্রমে পেলো তাদের যে দরদ তা কখনোই এক নয়।

আরেকটা কারনে নস্ট হয়। তারা হলেন যাদের বংশ ধরের মধ্যে ছেলে রি-প্রেজেন্টেটিভ নাই। ওইসব লোকের বেলায় তাদের কস্ট করা সম্পত্তি নিজের ছেলে সন্তানের পরিবর্তে চলে যায় অন্য বাড়ির আরেক ছেলের হাতে যিনি সম্পদের মালিকের নিছক মেয়ের স্বামী হবার কারনে। এরা দ্রুত সম্পদ হাত ছাড়া করে কারন তারা একদিকে এটাকে ফাও মনে করে, অন্যদিকে যতো দ্রুত সম্ভব সব সম্পত্তিকে নিজের নামে রুপান্তরিত করতে চান। এই মন্তব্য টা ঢালাও ভাবে করলে অনেক মেয়ের স্বামীরা হয়ত মনে আঘাত পেতে পারেন, কারন সবাই হয়ত এক নয়। তবে অভিজ্ঞতা আর পরীক্ষায় দেখা গেছে, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই রকমটা হয়েছে। তারা স্ত্রী কপালে ধন পাওয়া মনে করেন। তাদের বেলায় বিনাশ হতে সময় লাগে অতি অল্প সময়। এই সব ছেলেদের কাছে কোনো সম্পদ এমন কি স্ত্রীও তাদের কাছে নিরাপদ নয়। 

ফলে যেহেতু আপনি পরিশ্রম করছেন, সুখটা আপনিই করুন। যদি ভাবেন যে, আগে সঞ্চয় করে স্তূপ করি, বাড়ী গাড়ি করি, ব্যাংকে একটা মোটা টাকা সঞ্চয় হোক তাহলে আপনার হাতে একটু সময়ও নেই সকালের সূর্য দেখার অথবা রাতের জ্যোৎস্না দেখার। আপনার ভাগ্যে আছে শুধু বাদরের মতো এইস্থান থেকে অন্যস্থানে লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় ফল পাওয়া যায় তার সন্ধান করা, অথবা পালের বলদের মতো সারাজীবন হাল চাষের মতো চাষির হাল বেয়ে যাওয়া যাতে চাষিই শুধু লাভবান হয়, আর নিজে শুধু জাবর কাটবেন।

এ কথাগুলি কেনো বলছি?

আমার চোখে দেখা এই ছোট্ট জীবনে অনেক ঘটনা। কস্ট করে সম্পত্তি বা এসেট রেখে গেছেন, কিংবা ব্যবসা রেখে গেছেন, জাস্ট তার মরনের পর ওই সব সম্পত্তি কত তাড়াতাড়ি ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়া যায়, তার জন্য তর সয় না। অথচ ওই সব উত্তরসুরীরা একটিবারও আপনার রুহের মাগফিরাত বা ধর্মীয় কোনো উৎসবের মাধ্যমে একটুও পয়সা খরচ করবে না। তারা ঐ খরচ টাকেও অপচয় মনে করে নিজের জন্ময অ্রআনন্দ করবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারাও সেই একই ফাদে পা দিয়ে তাদের উত্তরসুরীদের জন্যই সঞ্চয় করে জমা করে যান এবং নিজেরা ভোগ করেন না।   

অপ্রিয় সত্যের মুখুমুখি দাঁড়ানো সাহসের প্রয়োজন

কখনো যদি তোমরা দেখো যে, তোমার অপ্রিয় সত্য কথায় কেউ কোনো উত্তর করছে না, কিন্তু তোমার অগোচরে মুখ ভেটকাচ্ছে, তাহলে বুঝবে যে, তোমার আশপাশ চাটুকারে ভরে গেছে। তুমি বিপদের মধ্যে আছো।  এ অবস্থায় তোমার যা করনীয়, তা হচ্ছে, তুমি একা চলার অভ্যাস করো। এই একা চলার মধ্যে যদি কাউকে রাখতে চাও সাথে, তাহলে এমন কিছু মানুষকে রাখো যারা প্রাইমারী স্কুলের দরিদ্র শিক্ষক। তারা নীতি থেকে বিচ্যুত হয় না আর হবেও না। তবে তাও নির্বাচন করার জন্য সময় নিও।

আর কোনো কিছুই যদি মনে হয় ঠিক নাই, তাহলে, নিজেই নিজের জন্য এমন কিছু করে যাও, যাতে তোমার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো ধাতব্য প্রতিষ্ঠান তোমার কাজগুলি তোমার ই আহরিত সম্পদের লভ্যাংশে করতে পারে। পরিচিত মানুষ গুলিই তোমার বিপদের কারন। সব সময় মনে রাখতে চেষ্টা করো যে, বেঈমান অপ্রিচিত লোক থেকে তৈরী হয় না, তারা সব পরিচিত মানুষের দল। 

আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না, আমরা মানুষের ভিতরের চরিত্রকে সরাসরি আয়নার মতো করে দেখতে পাই না। এমন কি আমরা নিজেরাও নিজেদের অনেক সময় চিনতে পারি না। আর এই কারনেই প্রতিবার আমরা প্রেডিকসন অর্থাৎ একটা স্যামপ্লিং এর উপর ভিত্তি করে বারবার সিদ্ধান্ত নেই। শতভাগ সাফল্য আসবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। আজকে যে বস্তুটি আপনার হাতে আসায় আপনি মনে করছেন, এটাই ঠিক যেটা আপনি চেয়েছেন, বা এটাই আপনি খুজছেন, সেটা সঠিক নাও হতে পারে।  আর যদি সঠিক না হয় তখন সংস্কার বা এজাস্টমেন্ট দরকার হয়ে পড়ে।  কখনো কখনো এই এডজাস্টমেন্ট এতো বড় যে, পুরু পরিকল্পনাটাই বদলাতে হয়। আর যারা এই পরিকল্পনাটা পাল্টানোর হিম্মত রাখেন, বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার হিম্মত রাখেন, তাদের জন্যই সুন্দর ভবিস্যত। সমাজ তারাই তৈরী করে, সমাজ তাদেরকেই কন্ডারী বলে। এডাপ্টেসন এর মুল থিউরী আসলে তাই। ডাইনোসোর এডাপ্টেসন করতে পারে নাই বলেই সে আজ পৃথিবীতে ইতিহাস কিন্তু তেলাপোকা সর্বত্র সব কিছুতেই এডজাস্ট করতে পারে বলেই এরা বেচে থাকে ৪৬ কোটি বছর। সম্ভবত এই তেলাপোকাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আয়ুধারী কোনো প্রানী। এরা ওদের বাল-বাচ্চা নিয়ে ওদের মতো করে বেচে থাকে। ভালোই থাকে।

আজকে আমি বা আপনাকে কেউ ভুল বুঝতেছি বলে যে অভিযোগ করে, এটা হয়ত ঠিক এই রকম নয়। হতে পারে এই রকম যে, এখন আমি বা আপনি ভুল বুঝতেছি না, সময়ের ব্যবধানে, স্যামপ্লিং ভুলের কারনে আগেরবার ভুল হয়েছিলো, কিন্তু অন্যান্য স্যামপ্লিং, চারিপাশের অবস্থা, বেশী ফ্যাক্টর সমন্নয়ে আমি বা আপনি বর্তমানটাই ঠিক বুঝতেছেন। ফলে যারা অভিযোগ করছে, তারা ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছেন না। আবার এমনো হতে পারে যিনি আমাকে বা আপনাকে "ভুল বুঝতেছি" বলে অভিযোগ করছেন, তার এক্সপেকটেশন অনুযায়ী সেও আমাকে বা আপনাকে আগেরবার ঠিক বুঝেছেন কিন্তু এখন তার এক্সপেক্টেসনের সাথে ক্যাল্কুলেসনে তারতম্যের কারনে আমরা বা আপ্নারা বদলে গেছি বা বদলে গেছেন এই চিন্তায় আমরা ভুল বুঝতেছি বলেই তাদের ডিডাক্সন তৈরী হচ্ছে।

কিন্তু যেটাই হোক, কে ভুল আর কে ঠিক, এই তর্ক, এই যুক্তি, এই ব্যাখ্যা করার সময় মানুষের হাতে খুব বেশি থাকে না। একটা সাব জেক্ট নিয়ে এতো গবেষণা করতে থাকলে, বাকী সাবজেক্ট এর জন্য তো সময় ই দেওয়া যাবে না। জীবনে সময় বড় সীমিত। হয় এডজাস্টমেন্ট করে বেচে যাবেন, নয় খপ্পর থেকে বেড়িয়ে যাবেন। দ্বিধার কোনো কারন থাকলে সবার প্রতিভা যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ক্ষতি হবে বিকাশের।

ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তে ভুল হলে যখনই মনে হবে এখনই সময় সিদ্ধান্ত পাল্টে জীবন সুন্দর করার, তাহলে "এখনি" সেটা। শুধু একটা জিনিষ মনে রাখা দরকার, ঈশ্বর সব ভুলের মধ্যে বড় সাফল্যের ফলাফল নির্ধারণ করেন। তিনি কারো সাথে মস্করা করেন না। তাঁর উপর ভরসা রাখুন। জয় আপনার। এটা দু পক্ষের জন্যই উপদেশ কারন, যার যার গন্ডি থেকে তাঁর তাঁর জন্য ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করেন। কেউ কারো সীমানা অতিক্রম করলেই এই বিপত্তি হবে। নদীর জলের মধ্যেও ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মিঠা পানি এবং নোনা পানিও তাদের সীমা অতিক্রম করে একে অপরের সাথে মিশার অনুমতি ঈশ্বর দেন নাই।

বদি ভাই-এখন তিনি ছবি

১৯৬৮ থেকে ২০১৮, মোট ৫০ বছর।

এই পঞ্চাশ বছরের আমাদের পারিবারিক ইতিহাসের মধ্যে যে ব্যক্তিটি আমাদের পরিবারের কেউ না হয়েও পরিবারে সবচেয়ে বেশি ভুমিকা পালন করতে এক্যটু ও দ্নিবিধা করেন নাই, তিনি হচ্ছেন বদ্রুদ্দিন তালুকদার ওরফে বদি ভাই। আমার বয়স তখন মাত্র ১০ কি বারো যখন আমি প্রকৃত পক্ষে এই বদি ভাইকে জ্ঞ্যানের মাধ্যমে চিনি। কিন্তু তার আগে থেকেই এই বদি ভাই আমাদের পরিবারের সাথে যুক্ত ছিলেন।

আমার বাবা কবে কিভাবে কি কারনে মারা গেলেন তা আমার কোনো ধারনা নাই। আমার বয়স তখনহয়ত ২ কি আড়াই হয়ত হবে। আমার বাবা ছিলেন অনেক ধনি মানুস, মাদবর মানুস। সমাজে তার গ্রহনযোগ্যতা ছিল অনেক অনেক বেশি। কিন্তু তার শত্রুও ছিল অনেক। বিশেষ করে আমাদের পরিবারের ভিতরেই অনেক শত্রু ছিল। আর তারা হচ্যাছেন আমার সতালু ভাই বোনেরা। বিশেষ করে তাজির আলি নামে যে ভাইটি ছিলেন, সে ছিলো চারিত্রিকভাবে একজন খারাপ মানুষ।  যাই হোক। বাবা মারা যাবার পর আমাদের যাবতিয় জমিজমার আধিপত্যতা এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে ক্যাশ টাকা না থাকায় আমাদের পরিবার অনেক সমস্যার মধ্যে পরে। আমার বড় ভাই সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভারসিটিতে ভরতি হয়েছেন। ঢাকায় থাকার কোনো জায়গা নাই, মাথার উপর কোনো অভিভাবক নাই এবং তার মধ্যে পাচ বোন এক ভাই এর বোঝা তার উপর। কিভাবে সংসার চালাবেন, কোথা থেকে টাকা আসবে কিংবা নিজেই কিভাবে চলবেন এই চিন্তাই আমার ভাইকে অতিস্ট করে তুল্লো। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ভাবছেন কি করা যায়, কিভাবে করা যায়।

এই সময় কোনো এক কাকতালিয় ভাবে দেখা হলো এই বদি ভাইয়ের সাথে। তার জীবনটাও এই একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কেটেছে অথবা কাটছে। ওনাকে আর পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করে বেশি বুঝাতে হয় নাই। বদি ভাই চাকুরি করেন ওয়াব্দা অফিসে মাত্র সেক্সন অফিসার হিসাবে। অল্প আয়, বিয়ে করেন নাই। তিনিও একইভাবে তার ভাই বোন মাকে সাপোর্ট করছেন। থাকেন তিনি ১২৪ নং আগাসাদেক রোড। ছোট্ট একটা রুম, তাতে ইতিমধ্যে তিনজন গাদাগদি করে কোনো রকমে থাকেন আর এক বুয়া প্রতিদিন দুপুর আর রাতের জন্য যত সামান্য বেতনে তাদের ভাত তরকারি পাক করে দেন। বদি ভাই হাবিব ভাইকে ওই ১২৪ নং আগাসাদেক রোডে নিয়ে এলেন। সবাই বদি ভাইকে ভাই বলেন না, সম্মানের সহিত তাকে সবাই স্যার বলেন।

যারা এই রুমে থাকেন, তারাসবাই গ্রাজুয়েট এবং জীবন যুদ্ধে লিপ্ত। একে অপরের জন্য যত টুকু দরকার সাপোর্ট করেন। সবার রোজগার যেনো কম্বাইন্ড রোজগার। একসাথে থাকে সব টাকা, যার যখন যত টুকু দরকার সে ততো টুকুই নেন। কিন্তু হিসাব থাকে। আমার মনে আছে ওই একটা ছোট রুম থেকে বদি ভাইয়ের তত্তাবধানে প্রায় ১০/১২ জন গ্রাজুয়েট বের হয়েছেন যারা পরবর্তী সময়ে দেশের শিরশ স্থানে বসেছিলেন। কেউ ইউনিভারসিটির অধ্যাপক, ডিন, কেউ আরো বড়। দেশে এবং বিদেশে।

এভাবেই বদি ভাই হয়ে উঠেন এক কিংবদন্তি স্যার। সব প্রোটেনশিয়াল মেধাবি হেল্পলেস মানুসগুলিকে বুদ্ধি, যতসামান্য চাকুরির পয়সা দিয়েই এইসব মানুসগুলিকে সাহাজ্য করেছেন। বদি ভাই তার চাকুরি জিবনে ডেপুটি ডাইরেক্টর পর্যন্ত উঠেছিলেন। ওয়াব্দায় চাকুরি করলে দুই নম্বরি করলে ছোট কেরানিও কোটিপতি হয়ে যায় কিন্তু বদি ভাই তার জিবনে দুই নম্বরিতো করেনই নাই, তার দ্বারা দুই নম্বরি হবে এটাও তিনি করতে দেন নাই। ফলে একটা সময় এইসব চোর বাটপারদের আমলে চাকুরির পদবির সামনে এগুতে পারেন নাই। অবসর নিয়ে বাসাতেই ছিলেন।

গ্রাজুয়েট মানুষগুলি তাদের যোগ্যতা অনুসারে ধীরে ধীরে সবাই বেশ ভালো ভালো জায়গায় সেটেল হয়ে গেছেন। সবার সাথেই বদি ভাইয়ের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু কাজের চাপেই হোক আর ব্যস্ততার কারনেই হোক ধীরে ধীরে এইসব যোগাযোগও কমে আসে। কিন্তু আমার ভাইয়ের সাথে অন্য একটি কারনে শেষ পর্যন্ত যোগাযোগটা ছিলই। আর সেটা হচ্ছে আমার মা। আমার ভাই যখন উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশ গেলেন, তখন আমার মাকে দেখভাল করার কোনো লোকই ছিলো না। আর এর ই মধ্যে আমারো ক্যাডেট কলেজের সুযোগ হ ওয়ায় আমার পক্ষেও মাকে কোন অবস্থায় ই কিছুই করার সুযোগ ছিলো না। আমার মাকে বদি ভাই খুব ই ভালো বাস্তেন। নিজের মায়ের মতো করেই দেখতেন। আমার মায়ের জন্য কোনো কাজ করতে বদি ভাইয়ের কখনো ক্লান্ত হন নাই। 

আমি ধীরে ধীরে ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে ফেললাম, আর্মিতে গেলাম, আমি মাক্যের দায়িত্ত নিলাম। এই সময় বদি ভাই একটু অবসর পেলেন। ফলে এই দীর্ঘ প্রায় দেড় যোগ বদি ভাইয়ের সাথে আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তার কাছ থেকে আলাদা হতে পারি নাই। এমন নয় যে বদি ভাইয়ের এখানে কোন স্বার্থ কাজ করেছে। হ্যা, একটা স্বার্থ কাজ করেছে অবশ্য ই। আর সেটা হচ্ছে, বদি ভাই ও তার ভাইদের থেকে অনেক আলাদা ছিলেন। তার পাশে কেউ আসলে ছিলো না। ঊনি ভাবতেন, আমি বা হাবিব ভাই বা আমরা ই তার আপন জন এবং আপদে বিপদে আমরাই তার পাশে আছি। কথাটা ঠিক। কিন্তু পরবর্তীতে যত টুকু আমাদের পাশে থাকার দরকার ছিলো, আমরা আসলে ততো টুকু পাশে থাকতে পারি নাই। এর কারনও হচ্ছে আমাদের বুঝাপড়ার তফাত। হয়ত এটাই এই স্বার্থপর পৃথিবীর নিষ্ঠুর নিয়মের একটি। 

বদি ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম মনোমালিন্য টা হয় আমার বিয়ে নিয়ে। এটা মানতে মানতে আমাদের মধ্যে একটা বিস্তর গ্যাপের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো। কখনো নরমাল, কখনো আধা নরমাল, আবার কখনো মনে হয়েছে সব ঠিকই আছে। আরেকটা কারন ছিলো যে, হাবীব ভাইয়ের প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল মানসিকতা। একবার এটা বলেন তো আরেকবার তার সিদ্ধান্ত বদলে অন্য আরেকটি বলা বা আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়া। এইরুপ একটা পরিস্থিতিতে বদি ভাইও আর হাবীব ভাইয়ের ইপর নির্ভর করতে পারছিলেন না। 

একটা সময় চলে এসেছিল যে, আমরা যে যার যার মতো করেই চলছিলাম। ব্যাপারটা এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, সাভাবিক অন্য দশ জনের সাথে আমরা যেভাবে চলি, ঠিক সেভাবেই চলছিলাম। সম্পর্ক খারাপ নয় কিন্তু আমরা খুব ঘনিস্ট কেউ আমরা। হাবীব ভাই বদি ভাইকে সব সময় ই শ্রদ্ধা করতেন এবং শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধাই করতেন। কিন্তু বদি ভাইয়ের জন্য হাবীব ভাইয়ের আরো অনেক কিছুই করার ছিলো। সেটা হয়ত হয় নাই। 

আজ বদি ভাইয়ের মৃত্যুতে একটা বড় অধ্যায় শেষ হলো। আমি তাকে মিস করবো সব সময়। যত কষ্টেই তিনি থাকতেন না কেনো, আমি যখন বদি ভাইয়ের কাছে যেতাম, আমি দেখতাম, তার মধ্যে একটা জীবনী শক্তি ফিরে আসতো। অনেক কথা বলতেন। অতীতের কথা, তার সাফল্যের কথা, তার দুঃখের কথা। আমিও শুনতাম। আজ আর তিনি নেই। তাকে আল্লাহ বেহেস্ত নসীব করুন। 

ভিন্ন প্রসঙ্গ–সবার জন্য 

একটা জিনিষ ইদানিং খুব বেশী করে অনুভুত হয় যে, জীবনের সব অধ্যায় এক রকম নয়।  এটা আমার হয়ত বুঝতে দেরী হয়েছে কিন্তু এই সব তত্ত্বকথা মনিষীরা যুগে যুগে বলে গেছেন। মনিষীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক তত্ত্বকথাই বলে গেছেন বটে কিন্তু কেউ সে সব তত্ত্বকথা মানে না। হ্যা, মানে তখন যখন কারো জন্য সেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের জন্য প্রযোজ্য হয়। সেই সুবাদেই বলছি যে, আমি আপনি ততোক্ষন সবার কাছে যত্নশীল যতোক্ষন আপনি নিঃস্বার্থভাবে দিতে পারবেন কিন্তু পাওয়ার আশা করবেন না। আশা করলে আপনি হেরে যাবেন। এটা নিজের স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তান, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার বেলায় প্রযোজ্য। কেউ মানুক বা না মানুক, এটাই সত্য।

এর থেকে যে শিক্ষাগুলি নেওয়া দরকার তা হচ্ছে,যা কিছু করবেন জীবনে, নিজের জন্য করুন, নিজে সুখী সময় কাটানোর জন্য আয় করুন এবং তা দুইহাত ভরে খরচ করুন। আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তানগন কিভাবে চলবে কিংবা তারা কোথায় কিভাবে বাস করবে তা আপনার চিন্তা থাকতে পারে বটে কিন্তু তারজন্য অনেক কিছু আয় করে সঞ্চয় করে তাকে পঙ্গু করে রেখে যাওয়ার কোনো দরকার আমি মনে করি না। বরং তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিন, তাতেই সে এই পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে ঠাই করে নেবে। এই পৃথিবী পরিশ্রমী মানুষের জন্য সুখের আবাস্থল। অলসদের জন্য এখানে সব কিছুই নাগালের বাইরে।  পূর্ব বর্তি জেনারেশনের আহরিত সম্পত্তি উত্তরসূরিদের জন্য কিছুটা আরামদায়ক হলেও একটা সময় আসে, কোনো না কোনো উত্তরসুরীর মাধ্যমেই তা বিনাশ হয়। এই বিনাশ টা হয়ত এক জেনারেশনের মধ্যে ঘটে না। কারো কারো বেলায় এক জেনারেশনেই শেষ হয়ে যায় আবার কারো কারো বেলায় এটা ক্ষয় হতে কয়েক জেনারেশন পার হয়। কিন্তু ক্ষয় হবেই। এর প্রধান কারন, যিনি সম্পদ করলেন, তার যে দরদ, আর যারা বিনা পরিশ্রমে পেলো তাদের দরদ এক নয়। আরেক টা কারনে নস্ট হয়। তারা হলেন যাদের বংশ ধরের মধ্যে ছেলে রি-প্রেজেন্টেটিভ নাই। ওই সব লোকের বেলায় তাদের কস্ট করা সম্পত্তি নিজের ছেলে সন্তানের পরিবর্তে চলে যায় অন্য বাড়ির আরেক ছেলের হাতে যিন সম্পদের মালিকের নিছক মেয়ের স্বামী। এরা দ্রুত সম্পদ হাত ছাড়া করে কারন তারা একদিকে এতাকে ফাও মনে করে, অন্যদিকে যতো দ্রুত সম্ভব সব সম্পত্তিকে নিজের নামে রুপান্তরিত করতে চায়।

যেহেতু আপনি পরিশ্রম করছেন, সুখটা আপনিই করুন। যদি ভাবেন যে, আগে সঞ্চয় করে স্তূপ করি, বাড়ী গাড়ি করি, ব্যাংকে একটা মোটা টাকা সঞ্চয় হোক তাহলে আপনার হাতে একটু সময়ও নেই সকালের সূর্য দেখার অথবা রাতের জ্যোৎস্না দেখার। আপনার ভাগ্যে আছে শুধু বাদরের মতো এই স্থান থেকে অন্য স্থানে লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় ফল পাওয়া যায় তার সন্ধান করা, অথবা পালের বলদের মতো সারাজীবন হাল চাষের মতো চাষির হাল বেয়ে যাওয়া যাতে চাষিই শুধু লাভবান হয়, আর নিজে শুধু জাবর কাটবেন।

এ কথাগুলি কেনো বলছি?

আমার চোখে দেখা এই ছোট্ট জীবনে অনেক ঘটনা। কস্ট করে সম্পত্তি বা এসেট রেখে গেছেন, কিংবা ব্যবসা রেখে গেছেন, জাস্ট তার মরনের পর ওই সব সম্পত্তি কত তাড়াতাড়ি ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়া যায়, তার জন্য তর সয় না। অথচ ওই সব উত্তরসুরীরা এক্টিবার ও তার রুহের মাগ ফিরাত বা ধর্মীয় কোনো উৎসবের একটু ও পয়সা খরচ করতে চায় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারাও সেই এক ই ফাদে পা দিয়ে তাদের উত্তরসুরীদের জন্য ই সঞ্চয় করে জমা করে যান এবং নিজেরা ভোগ করেন না।

   

অপ্রিয় সত্যের মুখুমুখি দাঁড়ানো সাহসের প্রয়োজন

কখনো যদি তোমরা দেখো যে, তোমার অপ্রিয় সত্য কথায় কেউ কোনো উত্তর করছে না, কিন্তু তোমার অগোচরে মুখ ভেটকাচ্ছে, তাহলে বুঝবে যে, তোমার আশপাশ চাটুকারে ভরে গেছে। তুমি বিপদের মধ্যে আছো।  এ অবস্থায় তোমার যা করনীয়, তা হচ্ছে, তুমি একা চলার অভ্যাস করো। এই একা চলার মধ্যে যদি কাউকে রাখতে চাও সাথে, তাহলে এমন কিছু মানুষকে রাখো যারা প্রাইমারী স্কুলের দরিদ্র শিক্ষক। তারা নীতি থেকে বিচ্যুত হয় না আর হবেও না। 

আমার খালা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১

তারিখ 

সামিদা খাতুন

স্বামীঃ আব্দুল গনি মাদবর

তিনি আমার একমাত্র আপন ফার্স্ট জেনারেশন খালা। আমার মায়ের একমাত্র আপন বোন যাকে আমার মা বোন মনে করেন নাই, করেছেন নিজের মায়ের মতো। আমার খালার সাথে কারো কোন বিবাদ হয়েছে এই রেকর্ড সারা গ্রামের মধ্যে নাই। তিনি অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী গনি মাদবরের স্ত্রী। এখানে বলা দরকার যে, গনি মাদবরকে ভয় পায় না এমন কন লক আমাদের গ্রামের মধ্যে ছিলো না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তিনি সন্ত্রাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যান্ত ন্যা পরায়ন একজন মাদবর। খুব বুদ্ধিমান। অত্যান্ত অহংকারী এবং একটা ইগো নিয়ে চলতেন। 

আমার খালা শেষ বয়সে কুজো হয়ে হাটতেন। যখন ই শুনেছেন যে, আমি শহর থেকে গ্রামে গিয়েছি, তখনি তিনি কস্ট হলেও খুব সকালে আমাকে দেখার জন্য আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন। আমার খালা ও কোন ছবি নাই কিন্তু কোন একদিন আমার ছোট ক্যামেরা দিয়ে একটি মাত্র ছবি তুলেছিলাম যা আমার কাছে একটা অমুল্য রতনের মতো মনে হয় এখন। 

আমার খালা যেদিন মারা যান, আমি এই খবরটা জানতেও পারি নাই। অনেকদিন পর যখন আমি গ্রামের বাড়িতে গেছি, খালার সম্পরকে জানতে চেয়েছি, শুনলাম যে, আমার খালা মারা গেছেন। আমার খুব আফসোস লেগেছিলো। 

আমার খালার ভাগ্য ভালো যে, ঊনি অনেক কস্টে পরার আগেই জান্নাতবাসী হয়েছেন। আমি মাঝে মাঝে খালাকে গোপনে কিছু টাকা দিতাম কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে কোনো কিছু কিনতে পারতেন না, ফলে ঊনি টাকা দিয়েও তার মনের মতো কোন কিছু কিনে খেতে পারতেন না। এর আগেই তার অন্যান্য নাতি পুতেরা তার হাতের টাকাগুলি কোনো না কোনো ভাবে ছিনিয়ে নিতেন। বড্ড নিরীহ মানুষ বলে কারো উপর তার কমপ্লেইনও ছিলো না। খুব নামাজি মানুষ ছিলেন আমার খালা। তার কোন ছেলেরাই তাকে ঠিক মতো ভরন পোষণ করার দায়িত্ত নেন নাই। এক সময়ের প্রতাপ্সহালি মাদবরের স্ত্রী শেষ জীবনে কস্টের মধ্যেই জীবন তা অতিবাহিত করছিলেন কিন্তু আমাদের কিছু সাহাজ্য আর তার নিজের স্বামীর যেটুকু আয় ছিলো তার উপর নির্ভর করেই শেষ জীবন তা অতিবাহিত করেছেন। 

কেরানীগঞ্জ মাইগ্রেশন-ষ্টাইল-৪

Categories

আমার বাবা যখন শতভাগ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, আমাদেরকে যে কোনো ভাবেই হোক, যতো দ্রুত আদি নিবাস মুনশিগঞ্জ, সিরাজদিখানের কয়রাখোলা থেকে কেরানিগঞ্জে স্থান্তান্তর করতেই হবে। আমার খালুর সাথে আমার বাবা অতি গোপনে বিস্তারীত ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এই স্থানান্তরের সবচেয়ে কঠিন বিষয়টা হচ্ছে গোপনীয়তা রক্ষা এবং কাজটা করতে হবে কেউ বুঝে উঠার আগেই। যদি ১ম পক্ষের কেউ বিন্দুমাত্র আভাষ পায়, তাহলে তাজির আলী, কিংবা অন্যান্যরা কিছুতেই আমাদেরকে কেরানিগঞ্জে আস্তে দিবে না, বাধা দিবে এবং এটা একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির স্রিষ্টি করবে যা ভাবাই যায় না।

আমার খালু ছিলেন কেরানিগঞ্জের বাক্তার চর এলাকার অনেক প্রতাপশালি একজন ধনাঢ্য মাদবর। আমার খালু (গনি মাদবর) এবং আমার বাবা হোসেন আলী মাদবর দুজনে একটা ব্যাপারে একমত হলেন যে, যেদিন তাজির আলী কয়রাখোলার বাইরে থাকবে, হোক সেটা কোনো এক রাতের জন্য বা দুই রাত, সেই সময়ে পুরু বাড়িটা না ভেংগে কয়েক শত লোক নিয়ে এক রাতের মধ্যে বাড়িটা কেরানীগঞ্জে শিফট করা। এদিকে খালু তার নিজের একটা জমিতে আমাদের কয়রাখোলার বাড়ির অবিকল মাপে মাপে সব কিছু খুড়ে রাখবেন যাতে এক রাতের মধ্যেই পুরু বারিটা স্থাপন করা সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্যা হলো কয়রাখোলা থেকে বাক্তার চরে আসার মাঝপথে একটা নদী আছে। সেই নদী এতো বড় আস্ত একটা বাড়ি কিভাবে পার করা সম্ভব? এটার ও একটা বিহীত হলো। পরিকল্পনা হলো যে, খালু ২/৩ শত কলা গাছ দিয়ে নদীর উপর ভেলা বানিয়ে রাখবেন যাতে ঘর সমেত লোকজন পার হতে পারে।

এবার শুধু অপেক্ষার পালা, কবে তাজির আলী অন্য কোথাও বেরাতে যায়। ব্যাপারটা বেশীদিন সময় নিলো না। সমস্ত লোকজন ঠিক করা ছিলো, ভেলার জন্য কলা গাছ ও রেডি করা ছিলো, শুধুমাত্র আদেশের অপেক্ষা। তাজির আলী তার শশুড় বাড়িতে তিন চারদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ার আওয়াজ শুনা গেলো। এদিকে বাবা এবং খালু সেই সময়তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

ঠিক যেদিন তাজির আলি তার শশুড় বাড়ি চলে গেলো, ওই দিন রাতেই একদিকে আমার বাবা তার দলবল নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়ি তুলে ফেলার ব্যবস্থা করলেন, খালূ নদীর উপর ভেলা সাজিয়ে ফেললেন, আর এদিকে আমার ভাই বাক্তার চরে পুরু বাড়িটা প্রতিস্থাপনের জন্যে দায়িত্তে থাকলেন।

মাত্র একটি রাত।

আর এই রাতের গহীন অন্ধকারেই আমার বাবা তার চার শতাধিক কর্মীবাহিনীকে নিয়ে, আমার খালু আরো দুই শতাধিক কর্মীবাহিনী নিয়ে আর অন্য দিকে আমার ভাই আরো প্রায় গোটা বিশেক পচিশেক লোক নিয়ে পুরু বাড়িটা ভোর হবার আগেই বাক্তার চরে সেট করে ফেললেন। গ্রামের মানুষ যখন ঘুম থেকে উঠলেন, তখন তারা একটা জিনিষ দেখলেন যে, কয়রাখোলায় আর বাড়ি নাই, অথচ বাক্তার চরে নতুন একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলো। এটা কোনো আলাদিনের দৈত্যের কাহিনীকেও হার মানিয়েছে।

আমরা নতুন ঠিকানায় চলে এলাম। অন্যদিকে যখন তাজির আলীরা এই সংবাদ পেলো, তারা অনেক হৈচৈ লরেছে বটে কিন্তু ততোক্ষনে সব কিছু ওদের হাতের বাইরে চলে গেছে। এই নতুন ঠিকানায় এসে সবচেয়ে বড় কষ্টে ছিলেন আমার বাবা। তার সাম্রাজ্য ছেড়ে এখন তিনি নতুন এলাকায় কোনো কিছুই না। ভাগ্যের কি পরিহাস। গতকালের রাজা আজ অন্য কোথাও আরেকজনের প্রজা।

এখানে আমার (মেজর আখতার) একটা কমেন্ট করার খুব ইচ্ছে হলোঃ

শুধুমাত্র একটা বাড়ি তুলে আনাই কি মাইগ্রেশন? আর বাড়িতা তুলে না এনে কেনো আমার বাবা তার অর্থ খরচ করে বাক্তার চরে আরেকটা বাড়ি করলেন না? একটা নতুন বাড়ি করার পরেই তো তিনি আমাদের সবাইকে বাক্তার চরে মাইগ্রেট করাইতে পারতেন। এই জায়গাটায় আমার সাথে আমার বাবার বা খালুর বুদ্ধির সাথে এক হলো না। নিশ্চয়ই এর ভিতরে আরো কোনো মাহাত্য ছিলো যা এই মুহুর্তে আমার জানা নাই।

সাময়ীক তিরোধ্যান-ষ্টাইল-৩

Categories

আমার বাবা যদিও অত্র কয়রাখোলা এলাকার খুবই নামীদামী এবং প্রতাপ শালী একজন মাদবর ছিলেন কিন্তু তিনি তার ঘরের মধ্যে একটা বিষয় নিয়ে খুবই অসফল লোক ছিলেন। আর সেটা হলো তারই নিজের ১ম পক্ষের ছেলে মোঃ তাজির আলীকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাজির আলী ছিলেন আমাদের স্টেপ ব্রাদারদের মধ্যে ২য় ভাই। প্রথম জনের নাম ছিলো নজর আলী, ২য় জনের নাম এই তাজির আলী এবং ৩য় ভাইয়ের নাম ছিলো মোহসীন আলী। তাজির আলী ভাইয়ের সবচেয়ে বেশী রাগ ছিলো আমার মায়ের উপর। কারন তিনি আমার মাকে কোনোভাবেই তার ২য় মা হিসাবে মেনেই নেন নাই। তার মধ্যে আমাদের এই পক্ষে আরো গোটা ৫ বোন আর ২ ভাই ইতিমধ্যে জন্ম গ্রহন করে ফেলেছি। আমার বাবার ছিলো অঢেল জমিজমা। আর বিশাল বাড়ি। তাজির আলী যখন বিয়ে করে, তখন থেকেই সে অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলো। এর কারন হলো তাজির আলীর শশুড় বারীও ছিলো একটা খারাপ বংশের মানুষ। তারা মানুষের কাছে ডাকাতের সমপর্যায়ের শ্রেনী হিসাবেই গন্য হতো। এমতাবস্থায় শশুড় বাড়ির আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে তাজির আলী এতোটাই উছ্রিখল হয়ে উঠেছিলো যে, এক সময়ে সে এটাই ভেবে নিলো যে, ২য় পক্ষের আমাদের সবাইকেই সে হত্যা করবে। যদি দরকার হয়, সে তার বাবা অর্থাৎ আমার বাবাকেও হত্যা করে সমস্ত সম্পত্তি তাদের নামে লিখে নেয়া। আমরা তখন খুবই ছোট ছোট। শুধুমাত্র আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ সবেমাত্র ইন্টার পাশ করছেন। হাবীব ভাইয়ের এই ইন্টার পাশ করাও যেনো তার অনেক হিংসা এবং রাগ। বাবা ব্যাপারটা কিছুতেই সামাল দিতে পারছিলেন না। আমার বাবা ছিলেন আসলেই খুব জ্ঞানী মানুষ। তিনি জানতেন, তাজির আলী যতোই হামকি ধামকি দিক, বাবার জিবদ্দশায় যে তাজির আলী কিছুই করতে পারবেন না সেটা তিনি নিসচিত। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তাজির আলীর কিংবা আমাদের অন্যান্য স্টেপ ব্রাদারদের কার কি ভুমিকা হবে এটা নিয়ে তার অনেক শংকা ছিলো। তাই তিনি দেখতে চাইলেন, তার অনুপস্থিতিতে কার কি ভুমিকা হয়। এতা তার একটা টেষ্ট করা দরকার।

বিশয়টা নিয়ে বাবা আমার ভাই হাবীবুল্লাহ্র সাথে বিস্তারীত আলাপ করলেন। আমার ভাইয়ের সাথে আমার বাবার ছিলো খুবই বন্ধুত্তের সম্পর্ক। ফলে, তারা দুজন মিলে একটা বুদ্ধি করলেন। বুদ্ধিটা এরকমের যে, হতাত বাবা উধাও হয়ে যাবেন। তখনকার দিনে তো আর মোবাইল ছিলো না, আবার ল্যান্ড লাইনের ফোন ও ছিলো প্রায় দুষ্কর, তাই বাবা যদি হটাত করে কোথাও কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যান, তাহলে সবাই ধরে নিবে যে, বাবা হয়তো কোথাও গিয়ে দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। এই সময়টায় কাদের কি কি ভুমিকা হয় সেটার আপডেট বাবা ভাইয়ার কাছ থেকে নিবেন। ব্যাপারটা জানবে শুধুমাত্র আমার ভাই আর বাবা। এমনকি আমার মাও জানবেন না। খুবই একটা গোপন বিষয়। আমার ভাই তখন সবেমাত্র ইন্তার পাশ করে জগন্নাথে ভর্তি হয়েছেন। বাবা ঢাকাতেই থাকবেন, কিন্তু কারো কাছেই প্রকাশ্যে আসবেন না। আমার ভাই মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে ব্যাপারতা কে কিভাবে নিচ্ছে সেটা অব্জার্ভ করবেন এবং বাবাকে ফিডব্যাক দিবেন।

প্ল্যান মোতাবেক, বাবা একদিন সুদুর চট্টগ্রামে যাবেন বিধায় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গ্রাম ছাড়লেন। কিন্তু আর তিনি ফিরে এলেন না। একদিন যায়, বাবা আসেন না, দুইদিন যায় বাবা আসেন না। এভাবে সবাই খুব দুসচিন্তা করতে লাগলো। বাবাকে খোজা শুরু হলো। কোথাও বাবাকে পাওয়া গেলো না। আসলে যিনি লোক চক্ষের আড়ালে পালিয়ে থাকতে চান, তাকে যেভাবেই খোজা হোক, তাকে তো প্রকাশ্যে পাওয়া যাবেই না। কিন্তু বাবা আছেন, সুস্থই আছেন। আর এ খবরটা জানেন শুধু আমার ভাই। তারা প্রতিদিন শ্যাম বাজার শরীর চর্চার ঘাটে দেখা করেন। ভাইয়া বাবাকে তার তরোধানের পর গ্রামের খবরাখবর দেন। বাবা সেই খবরের উপর ভিত্তি করে তিনি তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আটেন।

দিনের পর দিন দিন যখন বাবা আর গ্রামে ফিরে এলেন না, মা খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমার অন্যান্য ভাওবোনেরাও চিন্তা করতে লাগলেন। গ্রামের গনমান্য ব্যক্তিরাও কোনো কিছু আছ করতে না পেরে প্রায় মাস তিন চার পর ধরে নিলেন যে, বাবা হয়তো কোথাও দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। খবরতা এবার বেশ পাকাপোক্ত হয়ে গেলো। আর অরিজিনাল প্ল্যানের কার্যক্রমটা যেনো এখান থেকেই শুরু।

তাজির আলি ভাইয়ের দাপটের চোটে, তার সাথে আমার অন্যান্য স্টেপ ব্রাদার এবং বোনদের দাপট এতোটাই চরমে উঠলো যে, আমাদের ২য় পক্ষের সব ভাই বোনেরা এখন জীবন নিয়ে শংকিত। বাবা প্রতিদিন তার বাড়ির খবর পেতে থাকলেন এবং মনিটর করতে লাগলেন যেনো ব্যাপারটা কোনো অবস্থাতেই অনেক খারাপের দিকে না টার্ন নেয়।

তারপর......

তারপর একদিন বাবা সব বুঝে যাওয়ার পর ভাবলেন, ওনার যা বুঝার তিনি বুঝে গেছেন যে, তার মৃত্যুর পর আমাদের ২য় পক্ষের ভাইবোনদের কি অবস্থা হবে। তিনি হটাত করে গ্রামে এসে হাজির হলেন। সবাই তো অবাক। কোথায় ছিলো এতোদিন এই হোসেন আলী মাদবর? বাবা কাউকেই কিছু বললেন না, শুধু বললেন যে, সুদুর চট্টগ্রামে গিয়ে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন। যেহেতু কারো মাধ্যমেই খবর দেয়া সম্ভব হয় নাই, তাই আর বলা হয় নাই। কিন্তু তিনি মনে মনে জানেন কি হয়েছে আর এখন তাকে কি করতে হবে।

বাবা ভাবলেন, আমাদেরকে আর মুনশীগঞ্জে রাখাই যাবে না। আমাদেরকে মাইগ্রেট করে অন্যত্র নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে যে কোনো সময়ে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যাবে। বাবা আমার খালু গনি মাদবরের সাথে ব্যাপারটা বিস্তারীত আলাপ করলেন। আমার খালু গনি মিয়া ছিলেন আরেক মাদবর এবং খুবই প্রতাপ শালী মানুষ। যার অঢেল সম্পত্তিও ছিলো কিন্তু সবই কেরানীগঞ্জ। বাবা ভাবলেন আমাদেরকে খালুর দেশেই নিয়ে আসবেন।

কিন্তু বিপত্তি হবে যখন আমার স্টেপ ব্রাদার এবং বোনেরা জানবে যে, বাবা আমাদেরকে মুনশীগঞ্জ থেকে কেরানিগঞ্জে নিয়ে আসবেন তখন। তাতে মারামারি কাটাকাটিও হতে পারে। এই ব্যাপারটা নিয়েও বাবা ভাইয়ার সাথে আর খালুর সাথে আরেকটা বিস্তারীত পরিকল্পনা করলেন কিভাবে সব মারামারি, কাটাকাটি হানাহানি পরিত্যাগ করে নির্বিঘ্নে মুনশী গঞ্জ থেকে একদিনের মধ্যে কেরানীগঞ্জে আনা যায়। কিন্তু এইটা ঠিক যে, আমাদেরকে খালুর দেশে কেরানীগঞ্জে আনতেই হবে আমাদের নিরাপত্তার জন্য।

বাবার মাদবরী স্টাইল-২

Categories

আগেই বলেছিলাম যে, আলী হোসেন সরকার আর আমার বাবা কন টেম পোরারী সময়ে প্রায় একই পর্যায়ের মাদবর ছিলেন। কেউ কাউকে হেয় না করলেও তারা কখনোই এক সাথে কাধে কাধ লাগিয়ে চলতেন না। কে সুপেরিয়র আর কে সুপেরিয়র নন এটা বুঝানো যাবে না আবার কেউ কারো থেকেও কম না এটাই আসলে তাদের মধ্যে ছিলো একতা অলিখিত দন্ধ। আলী হসেন সরকারের বাড়িতে কোনো বড় অনুষ্ঠান হলে হোসেন আলী মাদবরে যেমন দাওয়াত থাকতো তেমনি হোসেন আলী মাদবরের বাড়িতেও কোনো অনুষ্ঠান হলে আলী হোসেন সরকারের ও দাওয়াত থাকতো। কিন্তু তারা কখনোই একে অপরের দাওয়াতে আসতেন না। এটাও এক রকমের গ্রাম্য রাজনীতর একটা বড় ঢং বলা যায়।

তো একবার আমার বাবা আসলেই চেয়েছিলেন যে, আলী হোসেন সরকার যেনো আমাদের বাড়িতে কোনো একটা অনুষ্ঠানে দাওয়াতে আসেন। আমার বাবা জানতেন যে, তথাকথিত দাওয়াতে আলী হোসেন সরকার না আসারই কথা। তাই বাবা যা করলেন তাতে আলী হোসেন সরকারের না এসেও পারেন নাই। বাবা তার ইগো ঠিক রাখার জন্যেও তিনি নিজে আলী হোসেন সরকারের বাড়িতে গিয়ে তাকে দাওয়াত দিলেন না। যদিও তিনি সেটা করতে পারতেন। যাই হোক, বাবা, তার নিজের হাতের লাঠিটা এক পত্রবাহককে দিয়ে তার সাথে একটা চিরকুট লিখলেন-

জনাব আলী হোসেন সরকার, আমার সালাম নিবেন। আমার বাড়িতে আপনার দাওয়াত ছিলো। আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করছি আপনি আজ আমার বাড়িতে দাওয়াতে আসবে। আমি আমার হাতের লাঠিটি পাঠালাম, সাথে এই পত্রটি। ধরে নিবেন, লাঠিটি আমি নিজে এবং পত্রটি আমার কথা। আপনি আসবেন।

আলী হোসেন সরকারও সেই লেবেলের বুদ্ধিমান লোক, তিনি বুঝলে এর মর্মার্থ। তিনি বাবার হাতের লাঠিটি পত্র বাহকের কাছ থেকে রেখে দিলেন, সাথে পত্রটিও। তিনি রীতিমত পরিপাটি সাজগোছ করলেন। তারপর ঠিক সময় মতো বাবার হাতের লাঠিটি সাথে নিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে র ওয়ানা হলেন। আলী হোসেন সরকার যখন প্রায় আমাদের বাড়ির ঘাটে, আমার বাবা হোসেন আলী মাদবর নিজে ঘাটের কাছে গিয়ে আলী হোসেন সরকারকে অভ্যর্থনা জানালেন আর আলী হোসেন সরকার ও তার সেই অভ্যর্থনায় কোলাকুলি করে একটা যুগান্তকারী ব্যাপার ঘটিয়ে দিলেন।

আসলে তাদের মধ্যে সব সময় বন্ধুত্বই ছিলো, কোনো রেষারেসি ছিলো না। তারা কারো সম্পদ হজম করতেন না, গ্রাম বাসী ও তাদেরকে যথেষ্ঠ সম্মান করতেন। তারা জানতেন এই সব মাদবরদের একটা ওজন আছে, তাদের কথার ভ্যালু আছে, তাদের নীতি আছে। হ্যা, একে অপরের সিদ্ধান্ত সব সময় মেনে নেবেন সেটা হয়তো ছিলো না কিন্তু গ্রাম একটা সঠিক নেত্রিত্তের মধ্যে ছিলো।

আজো তারা সবার মুখে মুখে আছেন। প্রায় ৫০ বছর পার হয়ে গেছে, তাদের কথা আজো গ্রাম বাসী মনে রেখেছেন। আমরা আজো তাদের হেরডিটি উপভোগ করি। যখন কেউ জানে যে, আমরা হোসেন আলী মাদবরের বংশধর, মানুষ এখনো অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেন আর বলেন তাদের সেই পুরানো ঐতিহ্যের কথা। ভালো লাগে।

বাবার মাদবরী স্টাইল-১

Categories

সিরাজদিখানে যতোগুলি মাদবর আমার বাবার আমলে প্রতাপ শালী ছিলেন, তার মধ্যে আমি প্রায়ই যার নাম শুনেছি তার নাম আলী হোসেন সরকার। আমার বাবার নাম ছিলো হোসেন আলী মাদবর, আর ওই ব্যক্তির নাম ছিলো আলী হোসেন সরকার। তারা সরকার বাড়ির লোক। ভাইয়ার কাছ থেকে শুনেছিলাম যে, সরকার বাড়ির মানুষেরা কোনো না কোনোভাবে আমাদের বংশেরই আওতাধীন ছিলো। যাই হোক সেটা এখন আর বড় ব্যাপার নয়।

এই আলী হোসেন সরকার আর আমার বাবা হোসেন আলী মাদবরের মধ্যে গ্রাম্য পলিটিক্সের বেড়াজালে একটা অলিখিত আক্রোশ ছিলো। কিন্তু সেই আক্রশ তা এমন নয় যে, কোনো জমি জমা নিয়ে, বা পারিবারিক কোনো কোন্দল নিয়ে। এটা ছিলো নিতান্তই পাওয়ার পলিটিক্স। যেখানে হোসেন আলী মাদবর কোনো শালিসীতে থাকতেন, সেখানে আলী হোসেন সরকার থাকতেন না। আবার যেখানে আলী হোসেন সরকার থাকতেন সেখানে হোসেন আলী মাদবর থাকতেন না। প্রকৃত পক্ষে ওনারা ওনাদের কোনো সিদ্ধান্তে কেউ বাধা হয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আক্রোশে সম্পর্কটাকে বিপদজনক করেন নাই।

এখানে মজার একটা ব্যাপার চলছিলো এই দুই পরিবারের মধ্যে। শুধুমাত্র আলী হোসেন সরকার আর হোসেন আলী মাদবরের মধ্যে যাইই থাকুক না কেনো, এই দুই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা খুব মিলেমিশেই থাকতেন। একজনের ভাতের হাড়ির কিছু অংশ যে আরেক জনের বাড়িতে যেতো না এমন নয়। এরা আবার আসলেই একে অপরের বন্ধুও ছিলো। কিন্তু সেটা প্রকাশ্যে নয়। কি রকমের একটা সম্পর্ক সেটা একটা উদাহরণ না দিলে ব্যাপারটা ঠিক বুঝা যাবে না।

আমার ভাই হাবীবুল্লাহ যখন লেখাপড়া করছিলেন, তখন আমার অন্য পক্ষের ভাইয়েরা এটাকে কোনোভাবেই ভালো লক্ষন হিসাবে নেন নাই। বিশেষ করে তাজির আলী ভাই। তার সব সময় টার্গেট ছিলো যে কোনো মুহুর্তে হাবীব ভাইয়াকে ক্ষতি করা, বিপদে ফেলা কিংবা মেরে ফেলা। এটা আমার বাবা খুব ভালো করে জানতেন। একদিন, আমার বাবা আলী হোসেন সরকারকে ব্যাপারটা শেয়ার করলেন যে, তিনি হাবীব ভাইয়ার জীবন নিয়ে তাজির আলির থেকে শংকিত। কি করা যায় পরামর্শ দরকার।

কি অদ্ভুত!!

হোসেন আলী সরকার কোনো কিছুই চিন্তা না করে আমার বাবাকে বললেন, শোনো হোসেন আলী মাদবর, তোমার ছেলে আর আমার ছেলের মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না এবং রাখীও না। আমার বাড়ি তোমার ছেলের জন্য ১০০% নিরাপদ। আগামীকাল থেকে তোমার ছেলেকে আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। এখানেই খাবে, এখানেই পড়বে, এখানেই ঘুমাবে। তোমার যখন দরকার তখন আসবা, ওর যখন যেখানে যাবে ওর সাথে আমার ছেলেরা থাকবে।

সেই থেকে আমার ভাই আলী হোসেন সরকারের বাড়িতে থেকেই  অনেক দিন পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। এরাই আসলে মাদবর, এরাই আসলে বুদ্ধিমান। এরা যখন কোথাও শালিসিতে যেতো সেদিন ওনারা কারো পক্ষের বাড়িতে পানিও খেতেন না, কারন কোনো পক্ষপাতিত্ত তারা করতেন না।

মন্তব্যঃ

আজকাল গ্রামের উঠতি মাদবরদের বয়স দেখলে মনে হয় ওদের এখনো মোছ দাড়িও গজায় নাই। কেউ আওয়ামীলীগের সভাপতি, কেউ ছাত্রনেতা, কেউ এটা কেউ সেটা। এরাই মাদবর। এরা না করে বড়দের সম্মান, না করে ছোটদের আদর। ওরা প্রতিনিয়ত ঘুষের টাকায় চলে, ঘুষের কারনে ওরা রায় বদলায়। এদেরকেও কেউ সম্মান করে না।

আমার বাবা।

Categories

আমি আমার বাবাকে কখনো দেখিনি এবং তার চেহাড়া কেমন ছিলো, খাটো নাকি লম্বা, যুবক না বৃদ্ধ, ফর্সা নাকি কালো কোনো কিছুই আমার জানা নাই। তবে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহর কাছে আমি আমার বাবার অনেক গল্প শুনাতেন যার থেকে আমি বাবার একটা কাল্পনিক চরিত্র মনে গেথে গেছে। আমার দাদার নাম ছিলো হিসাবদি মাদবর। আমরা মাদবর বংশের লোক।

বাবার সম্পর্কে আমি অনেক চমৎকার চমৎকার গল্প শুনেছি ভাইয়ার কাছে। তবে তার প্রাথমিক তথ্যের মধ্যে জরুরী তথ্য হলো যে, আমার বাবার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আমার মাকে বিয়ে করেন। বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ঘরে মোট তিন জন ছেলে সন্তান আর তিনজন কন্যা সন্তান ছিলো। এই মোট ছয় সন্তান থাকার পরে আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। তখন আমার মায়ের বয়স ছিলো বেশ কম। আগের সব সন্তানেরাই আমার মায়ের থেকে বয়সে বড় ছিলো। কেউ কেউ আবার ইতিমধ্যে বিয়েও করে ফেলেছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমার মা যেমন একটু অসুবিধায় ছিলেন, তেমনি আমার বাবাও বেশ অসুবিধায় ছিলেন।

কিভাবে আমার বাবা এই দুমুখী অসুবিধাগুলি তার জ্ঞানের দ্বারা সমাধান করেছিলেন, সেই গল্প গুলিও আমি হোসেন আলী মাদবরের পর্বসমুহে একে একে লিখবো।

হোসেন আলী মাদবর (ভুমিকা)

Categories

আমি আমার মাদবর বাড়ীর সব প্রকারের ঐতিজ্য নিয়ে সবসময় গর্ববোধ করি। একটা বাড়ি একটা সমাজ হতে পারে, মাদবর বাড়ি একটা তার প্রমান। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মাদবর বাড়ীর তথ্য, অজানা ইতিহাস ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে কে বা কারা এই পরিবারের সদস্য বা তারা কে কোথায় আছে, এর ইতিহাস আজনেকেই জানে না বিধয় মাদবর বাড়ীর সেই পুরানো বংশ আভিজাত্যের ধারা মুছে যেতে চলেছে।হয়ত একসময় এই মাদবর বাড়ি সদস্যগনই জানবে না তারা কে বা কারা। বাংলাদেশ  আমেরিকা নয় যে, কোনো এক ওবামা, বা কোন এক ট্র্যাম্প পৃথিবীর কোনো একস্থান থেকে উদয় হয়ে আমেরিকার মতো বিশাল এক রাজকীয় পরিবেশে উড়ে এসে জুড়ে বসে একেবারে টপ পজিশন ধরে প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন। সেটা আমেরিকায় হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সব পরিচয় জেনেও কাউকে যদি হেয় করতে মন চায়, তাহলে তার কোনো কিছুই জানার প্রয়োজন হয় না, সে শুধু তার ইচ্ছেটাই প্রকাশ করবে। কিন্তু যদি কেউ আপনার আমার বংশ পরিচয়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিয্য সব কিছু জানে, তাহলে যে যাই কিছু করুক বা বলুক, অন্তত এইটুকু নিশ্চিত বলা যায় যে, অহেতুক আপনাকে কেউ হয়রানী হয়ত করবে না। কোনো মৃত ব্যাক্তির কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই যায় আসে না, কিন্তু তারপরেও মানুষ ইতিহাস পড়ে আর ইতিহাস লিখে। একমাত্র ইতিহাসটাই সত্য। আর যতো আগামি, বর্তমান, কিংবা সব "যদি" কোনোটাই শতভাগ সত্য নয়। তাই নিজের ইতিহাস টুকু তো জানুন। মনে নাই? আলেক্স হ্যালির সেই রুটস কাহিনীটি? সেটাই ইতিহাস।

                                                               

আমাদের পরিবার “মাদবর” পরিবার হিসাবে পরিচিত। কিন্তু আমরা অনেকেই এই পদবীটা কেনো জানি নামের পাশে ব্যবহার করতে একটু দ্বিধা বোধ করছি। যেমন আমি নিজেও আমার নামের পাশে মাদবর পদবীটা উল্লেখ করি না। কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে, কেনো করছি না, আমার কাছে একটা যুক্তি তো অবশ্যই আছে। আর সেটা হচ্ছে-

আমি যখন গ্রামে থাকতাম, তখন দেখেছি যে, আমাদের গ্রামের অনেকেই অনেক প্রকারের মাদবর সেজে আছেন। কেউ বাচ্চু মাদবর, কেউ আজগর আলি মাদবর, কেউ আক্কাস আলি মাদবর ইত্যাদি। এই মাদবর গুলিকে দেখে আমার গা এক প্রকার রি রি করতো কারন তাদের না ছিলো কোনো ইথিক্স, না ছিলো কোনো গুনাগুন। অথচ শুনেছি, আমার বাবা যখন মাদবরি করতেন, তখন তিনি নাকি কারো বাড়িতে গিয়ে এক কাপ চাও খেতেন না। যদি কারো বিচারের বেলায় পক্ষপাতিত্ব হয়ে যায়, তাই! কিন্তু আমার বাবা, বা দাদা কি ধরনের মাদবর ছিলেন আর এখনকার মাদবরগন কি প্রকারের মাদবরি করছেন এই পার্থক্য টা আমার ঐ ছোট বয়সে যেমন বুঝবার ক্ষমতা ছিলো না, তাই আমার বংশের পদবীটা যে এতো মানসম্মানের, সেটা আমার আসলে বুঝার জ্ঞ্যানও ছিলো না। ফলে এই মাদবর উপাধিটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হইতো এবং কিছুটা নিম্নজাতীয় উপাধি বলিয়াও মনে হইতো, বিশেষ করিয়া শহুরে সমাজের কাছে। তাই আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই আমার সমস্ত স্কুল কলেজের সার্টিফিকেট সমুহের এই নামের পাশের মাদবর পদবীটা একেবারে রহিত করিয়া দিয়াছি।

আমার বড় ভাই জনাব ডঃ মহাম্মাদ হাবিবুল্লাহও কেনো যে এই পদবীটা নিলেন না সেটা আমার বোধ গম্য নয়।

যাক সে কথা।

এবার আসি আমাদের বংশের সংক্ষিপ্ত একটু ইতিহাস নিয়ে।

হিসাব্দি মাদবর ছিলেন আমার দাদা। এই দাদার থেকেই আমার ইতিহাস আমি শুরু করিবো। তিনি ছিলেন অনেক বিচক্ষন একজন ব্যক্তি। তার আমলে তিনি অনেক সম্পদ এবং বুদ্ধির মালিক ছিলেন। আমার দাদির নাম আমি জানি না। জানতে ইচ্ছে করে। হয়ত আমার বড় ভাই জানবেন।

১২/০৩/২০২১-ওরা চলে যাবার পর

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

মার্চ 

১২ 

বাচ্চারা যখন ছোট থাকে, তখন ওদেরকে কখনো হাতছাড়া করবো এটা মাথাতেই আসে নাই, কারো আসেও না। তখন সময়টা এক রকমের। হোক সেটা ছেলে বা মেয়ে।

যখন ওরা মাত্র বেবি, ওরা যখন কথা বলাও শুরু করে নাই, কিন্তু ঝড়ের গতিতে হাত পা নাড়তো, খুব মজা লাগতো দেখে, ওটাই ছিলো বেবিদের ভাষা। তখন তো মনে হতো, আহা, কি মিষ্টি বাচ্চারা। কথা নাই অথচ হাত পা নেড়েই যেনো সব কথা বলে। এই ভাষাতেই ওরা জানান দিতো, ওদের হাসি, আহলাদ, কিংবা কষ্টের ইংগিত।

ওরা যখন হাটতে শিখলো, তখন তো ওরা যেনো আরো সাধিন। যেখানে খুসী হাটা ধরে, যেনো সারা প্রিথিবী ওদের জন্য। ওরা হয়তো জানেই না কোনটা ওদের জন্য বিপদ আর কোনটা ওদের জন্য ফ্রেন্ডলী। আর এই পার্থক্যটা আমরা পেরেন্টসরা বুঝি বলে সারাক্ষন আমরা আমাদের বাচ্চাদের আগলে রাখি, ধমক দেই, শাসন করি।

ওরা অনেক সময় আমাদের এই শাসনের ভাষা হয়তো বুঝতে পারে না বলে মনের আবেগে চোখের পানি ফেলে, রাগ করে না খেয়ে থাকে, অভিমান করে কথা বলা বন্ধ করে, ডাকলেও শুনে না, আরো কতকি?

টাইম মতো ওরা না ঘুমালে আমরা ওদেরকে হয়তো বকা দেই, গোসল ঠিক মতো করেছে কিনা, ঠিক সময়ে খাবারটা খেলো কিনা, সব বিষয়েই আমরা সর্বদা সজাগ থাকি। জোর করে করাই আর ওরা হৈচৈ করে। অনেক সময় পুরু বাড়িটা হই চই এর মধ্যে রাখে, সরগোল আর চেচামেচিতে বাড়িটায় যেনো একটা শব্দদূশনে পরিনত হয়, চারিদিকে ছেড়া কাগজ, ঘরে বইপত্র অগোছালো করে দিশেহারা করে রাখতো। ওরা মাঝে মাঝে কত আবদার করতো, অনেক আবদার নিছক শখে কিংবা অনেক আবদার না বুঝেই। আর সেটাই হয়তো ওদের সারা রাতের খুসী অথবা কষ্টের কারনে ঘুম নষ্ট হতো। যদি পেতো, সারাটা রাত না ঘুমে আবার যদি না পেতো তাতেও সারা রাত না ঘুমে কাটিয়ে দিতো অভিমান করে।

এই বাচ্চারাই যখন আর ধীরে ধীরে সমাজের বিভিন্ন কর্মকান্ডে ঢোকে যায়, ঘর থেকে বেরিয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, আমরা এই ভাগ্যবান পিতামাতা অভাগার মতো একা হয়ে পড়ি। মন খারাপ হয়, স্মৃতি পাহাড়ের মতো স্তুপ হয়ে যায়। তখন, এই সব আদুরে বাচ্চাদের ফেলে যাওয়া খেলনা, পরিত্যক্ত হাতের লেখার খাতা, কিংবা তার ব্যবহৃত কোনো পোষাক দেখলেই আমাদের বুকে হটাত করে ধক করে উঠে ব্যথায়। তখন তাদের অতীতের পদচারনা আমাদের কানে ঝুমকোর মতো বাজে, ওদের অতীতের একগুয়েমী রাগ কিংবা আব্দারের কথা কিংবা অযথা রাগ অভিমানের স্মৃতির কথা মনে করে আমার চোখের কোন ভিজে উঠে। মনে হয় মাঝে মাঝে, আহা, ঘরটা একসময় কত ভর্তি ছিলো, আজ একেবারেই শুন্য। ঘরকে নোংরা করার জন্য কত বকা দিয়েছি, বাথরুমের সেন্ডেল পড়ে সারা ঘর ঘুরে বেড়ানোর জন্য কত বকা দিয়েছি। অযথা রাগ অভিমান করে খাবার না খাওয়ার জন্য রাগ করেছি, শাসন করেছি, অথচ আজ, আমার বাড়ির প্রতিটি ঘর শুন্য, একদম পরিপাটি যা সব সময় রাখতে চেয়েছিলাম ওরা যখন ছিলো। আজ আর কেউ বাথ রুমের সেন্ডেল পড়ে ঘুরে না, আজ আর কেউ আমার কাছে অনলাইনে শপিং করার জন্য একশত টাকা আবদার করে না, কিংবা হটাত করে পিজার অফার থাকলেও আর অফারের জন্য বায়না ধরে না। সব যেনো নীরব। আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যখন ওরা সাথে ছিলো? আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যেনো ঘরে সবাই শান্ত হয়ে থাকে? আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম যেনো ঘর নোংরা না করে সারাক্ষন পরিপাটি করে রাখুক? অথচ আজ ঠিক তেমনটাই তো আছে। কেউ ঘরে নাই, কেউ ঘর নোংরা করে না, কেউ হৈচৈ করে না। কিন্তু তারপরেও কেনো মনে শান্তি নাই? কেনো মনে হয়, ঘরটা নয়, অন্তরটা শুন্য? যেখানেই তাকাই সব ঠিক আছে, শুধু ঘরটাই খালী।

আজ কেনো জানি বারবার মনে হয়, ওরা আবার ফিরে আসুক, ওরা আবার আমার সাথে আবার ঝগড়া করুক, ওরা আবার আমার কাছে অহেতুক বায়না ধরুক, আমি আর কখনো ওদের বকা দেবো না, সব বায়না আমি মেনে নেবো। খুব মনে পড়ে আজ যে, যখন অফিস থেকে এসেই মেয়ের রুম খুলে বলতাম, কিরে মা, কি করিস? হয়তো তখন মেয়ে রুমেও নেই, হয়তো অন্যঘরে আছে বা রান্নাঘরে কিংবা বাথরুমে কিন্তু জানতাম বাসাতেই আছে। আজ যখন অফিস থেকে বাসায় এসে মেয়ের রুমে যাই, মুখ দিয়ে বলতে চাই, কি রে মা কোথায় তুই? কিন্তু ভিতর থেকে অন্তরের কষ্টে আর কথাটাই বের হয় না। জানি, মেয়েটা আর বাসায় নাই। ওর টেবিল, টেবিলের উপর সেই ঘড়িটা, ওর আলমারী, ওর চেয়ার, সবই তো আছে। কিন্তু মেয়েটাই নাই। প্রতিটা টেবিল, বই, খাতা, আল্মারী, সেই পুরানো ঘড়ি কিংবা বিছানার চাদরটায় হাত দিয়ে আমি অনুভব করি আমার সন্তানদের শরীরের সেই চেনা গন্ধ। খুব করে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে সব কিছু।

ভালোবাসি।

সব সময়।

সর্বদা।

চোখের পানির ফোয়ারা দিয়ে যে ভালোবাসা বেরিয়ে আসে, সেখানে রাগটাও হয়তো ছিলো আমার ভালোবাসার আরেক রুপ। হয়তো বকাটাও ছিলো আমার মায়ার আরেক রুপ। দম বন্ধ হয়ে আসে যেনো তোমাদের ছাড়া।

এখন প্রায়ই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে আবার বাবার কথা। হয়তো তারাও একদিন আমাকে খুব মিস করেছে, আমি বুঝি নাই। আর আজ আমি তাদেরকে মিস করি কিন্তু ওরা কেউ নেই এই মায়াবী পৃথিবীতে। আজ হয়তো আমিও আমার সন্তানদের মিস করছি। হয়তো কোন একদিন ওরাও আমাকে অনেক মিস করবে। সেদিন হয়তো পৃথিবীতে আরেকটা নতুন ক্যালেন্ডারের “সময়” চলছে।

“সময়” কারোই বন্ধু নয়, অথচ সে সবার সাথে আছে। কিন্তু সময়ের স্মৃতি মানুষকে সব সময় নষ্টালজিক করে রাখে। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে আমি তোমাদের সাথে আছি আর থাকবো।

উতসর্গঃ

(কনিকার ইউএমবিসিতে (ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি) ভর্তির চুড়ান্তে আমার কিছুটা নষ্টালজিকতা)

২৪/০২/২০২১-মিটুলের পোষ্টিং অর্ডার

Categories

মুদ্রার এক পিঠে যদি থাকে আফসোস, হতাশা, মানসিক যন্ত্রনা আর না পাওয়ার বেদনা, ঠিক তেমনি সেই একই মুদ্রার আরেক পিঠে থাকে সাফল্য, পাওয়ার আনন্দ আর খুশীর জোয়ার। মুদ্রার এক পিঠের দিকে তাকাইলে যেমন বুক ধড়ফড় করিয়া হার্টবিট বাড়াইয়া দেয়, নীল আকাশকেও মনে হয় ধূসর মেঘাচ্ছন্ন, তেমনি মুদ্রার আরেক পিঠে তাকাইলে মনে হয় মেঘলা আকাশও ভারী মিষ্টি। আশার জগত যখন নিরাশার বেড়াজাল কাটাইয়া প্রাপ্তির দ্বারপ্রান্তে আসিয়া এই কথা কানে কানে বলে-" আমি আসিয়াছি, যাহা আপনি অনেক দিন ধরিয়া খুজিতেছিলেন, এই সেই আমি"। এই কাঙ্ক্ষিত ঘটনা যখন নিজের চোখের সামনে দাড়াইয়া আলিঙ্গন করে, তখন ইহাকে তো অবশ্যই, যাহারা যাহারা এই কাঙ্ক্ষিত শুভসংবাদ কিংবা সাফল্যমন্ডিত করার পিছনে ভালোবাসায় শ্রম দিয়াছে, তাহাদেরকেও মনে হয় খুব করিয়া বলি- আমি আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ, সবাইকে আমার অন্তর হইতে হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধ্যা আর ভালোবাসা।

এমনি একটা কাঙ্ক্ষিত সংবাদ- আমার বউ এর পোষ্টিং। আজ আমার বউ এর পোষ্টিং হইলো, সরকারী বাঙলা কলেজ, অর্থনীতি বিভাগ, অধ্যাপক হিসাবে। অজস্র শুভাকাঙ্ক্ষী আমার জন্য আর আমার বউ এর জন্য দোয়া করেছেন, কেউ আবার সাহাজ্যও করেছেন, কেউ মনে প্রানে চেয়েছেন, আমাদের ইচ্ছাগুলি পুর্ন হোক। সেটাই অসীম দয়াময় আল্লাহতালাহ এমন একটা শুভ সংবাদ দিয়ে আমাদের সবার মনকে শান্ত আর সুখী করিলেন। (আলহামদুলিল্লাহ)

(মিটুলের পোষ্টিং অর্ডার বাহির হইবার কারনে "অধ্যাপিকা মিটুল চৌধুরী ওরফে আমার বউ" কে উতসর্গ করা।)

০২/০২/২০২১-কনিকার বাল্টিমোরে ভর্তি

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

ফেব্রুয়ারী 

০২

ইন্টার পরীক্ষার ফলাফলের আগে থেকেই কনিকা আসলে এদেশে পড়বেনা বলে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলো। কনিকার সমস্যা হচ্ছে, ও যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত আমি বদল করতে পারি না, মাঝে মাঝে বদল করতেও চাইনা আসলে। ইন্টার ফলাফল পাওয়ার পর দেখা গেলো কনিকা সবগুলি সাব্জেক্টেই এপ্লাস মানে গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে। এতে আরো সুবিধা হয়ে গেলো যে, ওর পরীক্ষার ফলাফলে যে কোনো ইউনিভার্সিটিতেই ভর্তি হবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলো। এর মধ্যে অনেকগুলি ইউনিভার্সিটিতে এপ্লিকেশন করেছে। কোনো ইউনিভার্সিটিই ওকে রিজেক্ট করে নাই বরং কনিকা ফাইনান্সিয়াল এইডের কারনে সে নিজেই বেশ কিছু ইউনিভার্সিটির এক্সেপ্টেন্স রিজেক্ট করেছে।

প্রথমে কনিকা সবগুলি ইউনিভার্সিটি চয়েজ করেছিলো বোষ্টন বেজড। কারন আমার বড় ভাই বোষ্টনে থাকেন। একটা সময় আমার মনে হলো যে, আসলে আমার বড় ভাইয়ের উপরে নির্ভর করে কনিকাকে এতোদূরে পাঠানো ঠিক হবে কিনা। তিনিও বুড়ো হয়ে গেছেন, অনেক কিছুই তার পক্ষে এখন সামাল দেয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় তিনি অনেক কিছু ভুলেও যান। প্রায়শ ক্ষেত্রেই আমি দেখেছি যে, আমার বড় ভাইয়ের উপর অনেক ব্যাপারে ভরষা করা যায় না। কোনো কিছুতেই আমার বড় ভাই না করেন  না বটে কিন্তু ঠিক শেষ মুহুর্তে এসে দেখা যাবে তিনি আর পারেন না অথবা তার অনেক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় বা করেন। বিশেষ করে যখন কোনো ফাইনান্সিয়াল কোনো ব্যাপার থাকে সেখানেই তার সব বিপত্তি। তাই ভাইয়ার উপরে আমার ভরষা আমার ছোট মেয়েকে পাঠানো উচিত হবেনা বলে আমার কাছে মনে হলো। দেখা গেলো যখন কনিকার কোনো প্রয়োজন হবে ঠিক তখন কনিকার জন্য সাহাজ্য আর আসছে না।

আমি মতামত চেঞ্জ করে কনিকাকে বললাম যে, তুমি শুধু বোষ্টনের জন্য এপ্লাই না করে আমাদের আরো আত্তীয়সজন যেখানে বেশী আছে, সেখানেও এপ্লাই করো। আমেরিকাতে বাল্টিমোরে থাকে লুসিরা, ছোটভাই, এবং আরো অনেকেই। ফলে আমি কনিকাকে বাল্টিমোরের জন্যেও এপ্লাই করতে বললাম। আজই উনিভারসিটি অফ ম্যারিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি (ইউএমবিসি) থেকে সরাসরি ওর ভর্তির ব্যাপারে চিঠি এসছে যে, ওরা কনিকাকে নিতে আগ্রহী এবং যত দ্রুত সম্ভব ওরা আই-২০ ফর্ম পাঠাতে চায়। শুনলাম, ওখানে লুসির ছেলেও আবেদন করেছে। লুসিরা খুব খুসি যে, কনিকা ওখানে পড়তে যাবে।

আপডেটঃ ১১ মার্চ ২০২১

আজ কনিকার আই-২০ ফর্ম এসছে ইউএমবিসি (ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, বাল্টমোর কাউন্টি) থেকে। ইউএমবিসি বাল্টিমোরের সবচেয়ে ভালো একটা ইউনিভার্সিটির মধ্যে একটি। আর সবচেয়ে এক্সপেন্সিভও বটে। আমি খুশী যে, কনিকা নিজে নিজেই সবগুলি কাজ করেছে এবং খুবই স্মার্টলী ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করেছে। এবার ওর দূতাবাসে দাড়ানোর পালা। যদি ইনশাল্লাহ সব কিছু ঠিক থাকে, তাহলে আগামী জুলাই মাসে কনিকা আমেরিকায় চলে যাবে। এটা যেমন একদিকে আমার জন্য ভালো খবর, অন্যদিকে একটু কষ্টও লাগছে যে, মেয়েটা অনেক দূর চলে যাবে। ইচ্ছা করলেই আর ওর সাথে রাত জেগে জেগে আলাপ করা যাবে না। বাচ্চারা এভাবেই কাছ থেকে দূরে বেরিয়ে যায়। 

২৯/০১/২০২১- নাফিজের বিয়ে

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব

জানুয়ারী 

২৯ 

নাফিজ হচ্ছে আমার এক বোনের মেয়ের ছেলে। আমার বোনের নাম শায়েস্তা খাতুন। সেই শায়েস্তা খাতুনের মেয়ে শেফালী। নাফিজ শেফালীর ছেলে। নাফিজের বাবার নাম নেওয়াজ আলী মোল্লা। সে গত ০২/০৯/২০২০ তারিখে মারা গেছে। নাফিজ জাপানে থাকে, ওখানেই কোনো রকমে কাজ করে যতোটুকু পারে পরিবার এবং নিজের ভবিষ্যত গরার চেষ্টা করছে। নাফিজ যখন বিদেশ যায়, তখন আমিই ওকে স্পন্সর করেছিলাম। প্রায় ৩/৪ বছর পর নাফিজ দেশে এসছে। কিন্তু কবে দেশে এসছে, আর কোথায় কিভাবে বিয়ে করছে সেটা নিয়ে সে আমার সাথে কোনো পরামর্শ যেমন করে নাই, তেমনি ও যে ঢাকায় এসছে সেটাও আমাকে জানায় নাই। এগুলি নিয়ে আমার তেমন কোনো মাথা ব্যথাও নাই। আজকে শুনলাম যে, আজ নাফিজের বিয়ে। এটা শুনলাম আমি মিটুলের কাছ থেকেই। ব্যাপারটা নিয়ে আমি একেবারেই সময় কিংবা মাথা খাটানোর চিন্তাও করি নাই কারন যার যার লাইফ তার তার। কে কিভাবে তাদের লাইফ উপভোগ করলো সেটা নিতান্তই তাদের ব্যাপার। আমি সাধারনত এ ব্যাপারে কারো জীবনেই হস্তক্ষেপ করি না কিংবা করতে পছন্দও করি না।

আমি ২০১৭ সাল থেকেই শেফালী মেয়েটাকে আর পছন্দ করি না। এই না পছন্দ করার পিছনে অনেক কারন আছে। সেটা আর এখানে বলছি না। শেফালী আর নাফিজ আজকে মিটুলকে নাকি ফোন করে বলেছে যে, নাফিজের বিয়েতে যেতে হবে। আমি মিটুলকে বললাম, নাফিজ ঢাকায় কবে এসছে? মিটুল নিজেও বলতে পারলো না। আমি বললাম, আমি জানি, নাফিজ প্রায় ১ মাস আগে ঢাকায় এসছে। বাক্তার চর থেকে ঢাকায় যেতে সব সময় আমার অফিস পার হয়েই তারপর ঢাকায় যেতে হয়, নাফিজ যদি আমাকে ইম্পর্ট্যান্ট মনে করতো যে, আমি ওদের বড় কেউ গার্জিয়ান, তাহলে ঢাকায় আসার পরেই হয় আমাকে একটা ফোন করতে পারতো অথবা আমার অফিসে এসে দেখা করতে পারতো। এর মধ্যে আবার ওর কোথায় বিয়ে ঠিক হচ্ছ্যে, কার কি সমস্যা ইত্যাদি নিয়েও সে আমাকে নক করে নাই কিন্তু আমি জানি ওর বিয়ে নিয়ে ওর এক্স গার্ল ফ্রেন্ডদের মধ্যে বিশাল একটা ঝামেলা চলছে। আমি সব খবর পাই কিন্তু যেহেতু আমাকে কেউ কিছু বলছে না, ফলে আমি উপজাজক হয়ে এদের মধ্যে ঢোকতেও চাই না।

আমার করোনা পজিটিভ থাকায় আমি এমনিতেও নাফিজের বিয়েতে যেতাম না, হয়তো আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে পাঠিয়ে দিতাম। কিন্তু আমি চাই না যে, আমি বা আমার পরিবারের কেউ ওর বিয়েতে যাক। আমি জানি আমি না গেলে কি পরিমান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে শেফালী এবং নাফিজকে। ওরা জানেই না যে, পায়ের তলার মাটি সরে গেলে নিজের শরীরের ওজনটাকেও ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এটা আমি ওদের বুঝিয়ে দিতে চেয়েছি এবার। শেফালীর বাবা ছিলো না, মা ছিলো না, শেফালির বোন নুরুন্নাহারের থেকে শুরু করে জমজ দুই ভাই লিয়াকত আর শওকাত এদেরকে সেই দুই মাস বয়স থেকে আমরাই লালন পালন করেছি। ওদের বাবার নাম ওরাও হয়তো ভালোভাবে বলতে পারবে না। গ্রামের মানুষ, আশেপাশের মানুষ ওদেরকে এই নামেই চিনে যে, ওরা মেজরের ভাইগ্না ভাগ্নি। আর এটাই ছিলো ওদের সবচেয়ে বড় শিল্ড। আর ওরাই কিনা আজকে আমাকে ইগনোর করার চেষ্টা করেছে।  আমার খারাপ লাগে নাই ততোটা কারন আমি বুঝে গেছি যে, ওরা আসলে নিমক হারামের জাত।

বিয়েতে গেলাম না। আমি না যাওয়াতে কি হলো সেটা আমি জানি। শেফালীকে হাজার প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়েছে কেনো মামা এলো না। আমাদের গ্রামের মানুষ অনেকেই আমাকে দেখে নাই কিন্তু নাম শুনেছে। আবার অনেক পুরানো দিনের মানুষেরা আমার সান্নিধ্যে আসতে চেয়েও আমার অফিস পর্যন্ত আসার স্কোপ না থাকায় দেখাও করতে পারে না। আবার আমার পজিশনাল ফ্যাক্টরের কারনে অনেকে ভয়েই আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা থাকলেও দেখা করতে পারে না। এমন একটা পরিস্থিতিতে যখন কেউ শুনে যে, আমার কোনো আত্তীয়ের কোনো অনুষ্ঠান, তারা ভাবে যে, এবার নিশ্চয়ই মেজরের সাথে দেখা হবে। ফলে কেউ দাওয়াতে আসে আমার সাথে দেখা হবে বলে, কেউ আবার অপেক্ষা করে আমার সাথে দেখা হবে বলে। কিন্তু যখন আমার আর ওখানে যাওয়া হয় না, তখন কেনো যাই নাই, কি কারনে যাই নাই এই প্রশ্নে জর্জরিত হতে হয় তার যার বাড়িতে অনুষ্ঠান।

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর যখন আমার সেই আত্তীয় দিতে পারে না, তখন এতোদিন যে নামের ক্ষমতায় সারা গ্রাম চষে বেড়িয়েছে, যে লোকটির ক্ষমতায় সারাটা গ্রামকে ভয়ের মধ্যে রেখেছে, অনেকেই শুধু এই নামটার জন্যই যখন তাদেরকে তোষামোদি করেছে, তারা তখন এই প্রশ্নটাই করে- কই এতোদিন যাদের জোরে এতো তাফালিং, তারা তো আপনাদের কোনো অনুষ্ঠানেই আসে না, তাহলে কিসের এতো বাহাদুরী?

ক্ষমতার রেশ ছুটে যাচ্ছে, অপমানে মুখ দেখানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই যে অসহায় একটা পরিস্থিতি, এটা কিন্তু আমি তৈরী করি নাই, করেছে ওরা নিজেরাই। ওদের আর কোনো মনোবল নাই আমার সামনে এসে কোনো দাবী নিয়ে জোর দিয়ে বলতে পারে, যে, আপনি অবশ্যই আসতে হবে আমাদের অনুষ্ঠানে। একদিকে আমাকে না নিতে পারার কষ্ট আর অন্যদিকে মানুষের কাছে হেয় হবার অপমান কোনোটাই কম না।

আজকে আমার বউ আমার কাছে এসে বল্লো, যে, সেফালি অনেক কান্নাকাটি করেছে যে, মামা যদি নাও আসতে পারে, অন্তত আপনি ১০ মিনিটের জন্য হলেও একবার গ্রামে নাফিজের বিয়েতে ঘুরে যান, অন্তত আমি মানুষকে বলতে পারবো যে, মামা অসুস্থ তাই মামী এসেছেন। তা না হলে আমার আর অপমানের শেষ নাই। আমি সবার কাছে যেমন ছোট হয়ে যাবো, তেমনি আমি পরিবেশ গতভাবেও অনেক দূর্বল হয়ে যাবো।

আমি শুধু মিটুলকে বললাম, যদি তুমি যেতে চাও, যাও, আমাকে কোনোভাবেই কনভিন্স করার চেষ্টা করো না যে, আমাকে নাফিজের বিয়েতে যেতে হবে। যে ছেলেটা একটা ফোন করেও আমাকে যেতে বলে নাই, তাদের আবার এতো অপমানের ভয় কিসের? তুমি যেতে চাও, যাও, দরকার হয় আমার যে কোনো গাড়ি নিয়েও তুমিযেতে পারো। 

আসলে আমি একটা পানিশমেন্ট দিতে চেয়েছি এই শেফালীকে। আসলে এটা পানিশ মেন্ট নয়, এটা একতা বাস্তবতাকে তুলে ধরার জন্য তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়া যে, কোথায় কোন জিনিষের উপর কতটুকু কদর করা উচিত সেটা বুঝা। আর এখন তারা সেই শাস্তিতাই পাচ্ছে। আমার ধারনা, সেফালী আরো বড় শাস্তির অপেক্ষায় আছে। তাহলে সেই শাস্তিটা কি? ব্যাপারটা হয়তো এভাবে ঘটবে- 

আমি নাফিজকে চিনি। অত্যান্ত দূর্বল চিত্তের একজন মানুষ, ইমোশনাল একটি ছেলে। শক্ত করে কোনো কিছুর প্রতিবাদ করার সাহসও এই ছেলেটার মধ্যে আমি দেখি নাই। সবসময়ই একটা ভাবুক উপলব্ধির মধ্যে থাকে। আজ যে বাড়িতে নাফিজ বিয়ে করছে, সেফালীর ধারনা যে, তার থেকে একটু উচ্চবিত্তের বাড়িতে সম্পর্ক করলে হয়তো বা সমাজে তাদের একটা আলাদা প্রতাপ বাড়বে কিংবা কোনো এক সমস্যায় হয়তো ওরা হাত বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু কুইনিন জ্বর সারালেও কুইনিন সারাবে কে এটা ওদের মাথায় নাই। অর্থাৎ যেদিন এই পরিবারটা নিজেই সেফালীর জন্য একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, তখন তাদেরকে প্রতিহত করার উপায় কি? লোহাকে লোহা দিয়ে পিটাতে হয়, কাঠ দিয়ে লোহাকে পিটিয়ে কোনো আকারে আনা যায় না। শুনেছি নাফিজের নবাগত স্ত্রী একজন ডাক্তার কিংবা নার্স বিষয়ক সাব্জেক্টে পরাশুনা করে।  ডাক্তার যে না এটা আমি সিউর কারন কোনো এমবিবিএস পড়ুয়া মেয়ে অন্তত নাফিজের মতো ছেলেকে বিয়ে করার রুচী বা পছন্দে আনতে পারে না। হয়তো নার্স হবে। সাধারনত যেটা হয় যে, গ্রাম্য এসব মেয়েগুলি একটু শিক্ষিত হলেই ভাবে যে, তারা অনেক ক্ষমতাশীল এবং ডিমান্ডেড। ফলে ওরা ওদের অনেক কিছুই চাহিদার বাইরে আব্দার বা দাবী করার প্রয়াশ পায়। আর এই কারনেই এই মেয়েটা একদিন ওর যা খুসী তাইই করার স্বাধীনতা রাখবে। ভাববে যে, সে তো নাফিজের থেকেও বেশী যোগ্য। তাই ওর যা দাবী সেটা তো নাফিজকে মানতেই হবে। নাফিজ তাকে তার অক্ষমতার কথা কিংবা দূর্দশার কথা কিংবা কোনো অন্যায় আব্দারের ব্যাপারে রাজী না হয়ে বাধা প্রদান করলে নাফিজের সব কথা সে নাও শুনতে পারে। আর যদি নাফিজ তাকে শাসন করতে যায়, তখন এই নবাগত স্ত্রী তার পরিবার মিলে নাফিজকেই শায়েস্তা করে ফেলবে। এমনো হতে পারে যে, অচিরেই নাফিজের স্ত্রী তার শাশুড়ির সাথে ধীরে ধীরে সম্পর্কটা অনেক দূরে নিয়ে যাবে, আর সেই দূরে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে শুধু সে নিজেই দূরে চলে যাবে না, সাথে নাফিজকেও দূরে নিয়ে যাবে। নাফিজের এতোটা মনোবল শক্ত নয় যে, নাফিজ বউকে ছেড়ে বা বউকে কড়া ভাষায় কথা শুনিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াবে। ফলে এমন একটা সময় আসবে যে, নাফিজের দেয়া মাসিক ভাতাটাও একদিন সেফালির জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। এই নাফিজের স্ত্রীই করাবে বন্ধ। এবার আসি সেফালীর আরেক ছেলের কথা। সেফালীর অপর ছেলে নাহিদকে দেখে আমার প্রতিবন্ধী মনে হয়। সারাদিন ঘর থেকে বের হয় না। কারো সাথেই সে কোনো কথাবার্তাও বলে না। শুধু রাতের বেলায় উঠোনে নাকি বের হয় আর রাতেই সে গোসল করে। এই এমন একটা ছেলের কাছ থেকেও সেফালির কিছু আশা করা উচিত না। নাহিদ একদিন নিজেকেই নিজে চালাতে পারবে না। যখন নাফিজের দেয়া ভাতা, বা টাকা সেফালীকে দেয়া কমে যাবে বা বন্ধ হয়ে যাবে, সেদিন এই নাহিদ এমনো হতে পারে নিজের জীবন নিজেই নিয়ে নিবে। কারন সে বেশীরভাগ সময়ে এই পৃথিবীর মানুষের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখে না। সমাজের মানুষ যেমন তাকে সচরাচর দেখে না, তেমনি সেও সমাজের সবাইকে ভালমতো চিনেও না। শুধু মুখ দেখে নাম বলতে পারাটাই চিনা নয়। যখন এই পরিস্থিতি আসবে, নিজেকে খুবই অসহায় মনে করবে নাহিদ আর ভাববে- ওর চলে যাওয়াই উচিত। আর থাকলো সেফালির মেয়ে। মেয়েরা যতোক্ষন পর্যন্ত নিজেরা নিজের পায়ে না দাড়ায়, ততোদিন সে না পারে নিজেকে সাহাজ্য করতে, না পারে তার আশেপাশের কাউকে সাহায্য করতে। ফলে ওর মেয়েরও একই অবস্থা হবার সম্ভাবনা আছে। হয়তো নিজের জীবন না নিলেও শুধুমাত্র বেচে থাকার তাগিদে কোনো এক ছেলেকে বিয়ে করে জীবনটা পার করে দেবে। সেখানে কিছুদিন হয়তো সেফালির ঠাই হবে কিন্তু স্থায়ী হবে না।

নাফিজের থেকে সেফালির দূরে চলে যাবার কারন হবে দুটু। (ক) নাফিজের স্ত্রীর সাথে সেফালির শাশুড়ি বনাম পুত্রবধুর সম্পর্কটা সেফালী নিজেই তৈরী করতে পারবে না বা পারার কথা নয়। সেফালীর যে চরিত্র সেটাই আমাকে এ কথা বলার কারন বলে মনে হয়েছে। আর এই শাসুড়ি বনাম পুত্রবধুর সম্পর্ক ভালো না হওয়ার কারনে সারাক্ষন নাফিজের স্ত্রী নাফিজের মার সম্পর্কে কটু কথা, কান কথা লাগাতেই থাকবে। আর সব শেষে গিয়ে নাফিজের স্ত্রী নাফিজকেই দায়ী করতে থাকবে সব কিছুর জন্য এবং একসময় নাফিজ তার মায়ের উপর এতোতাই বিরক্ত হবে যে, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা সেটা যাচাই করার আর কোনো মানসিকতা নাফিজের থাকবে না। ফলে যেতা হবে তা হচ্ছে- নাফিজ তার স্ত্রীর পক্ষ নিয়াই কথা বলবে। যেহেতু নাফিজ তার স্ত্রীকে কঠিন ভাষায় মায়ের পক্ষে ওকালতি করতে পারবে না, অথবা উচ্চবিত্ত শশুড়ের মুখের সামনেও দাড়াতে পারবে না, ফলে সে তার মাকেই সে ত্যাগ করবে। সেটাই নাফিজের জন্য সহজ পথ। সেফালি একদিন সত্যিই একা হয়ে যাবে আর সে একাকিত্তে নিজের জীবন নিজেই চালাতে গিয়ে ওর মা আজ থেকে ৪৫ বছর আগে যেভাবে জীবনযাপন করেছে, সেফালিকেও ঠিক সেভাবেই জীবনযাপন করতে হতে পারে। অর্থাৎ পরের ক্ষেতে ধান কাটার পর মাঠ ঝারু দিয়ে পরিত্যক্ত ধান কুড়িয়ে ধান আনা, কিংবা অন্যের ক্ষেতে বদলীগিরি করে, কিংবা এই জাতিয় কাজ করেই ওকে নিজের জীবন নিজেকে চালাতে হবে। (খ) আর দ্বিতীয় কারনটি হলো- লিয়াকত। যতোদিন লিয়াকত নিজের পায়ে দাড়াতে না পারবে, সে ততোদিন সেফালির ঘাড়ের উপরে বসেই জীবন বাচাতে হবে। কিন্তু লিয়াকতের বয়স এখন প্রায় ৩৮। সে লেখাপড়াও করেছে। কিন্তু জীবনমুখী নয়। ওর মতো বয়সের একটা ছেলে কোনো না কোনোভাবে নিজের জীবনসহ একটা সংসার চালাতে পারা সক্ষম হওয়া উচিত ছিলো। অনেকভাবে আমিও চেষ্টা করেছি, হাবীব ভাইও চেষ্টা করেছেন, এমন কি আমি ওকে গাজীপুরে একটা কম্পিউটার ট্রেনিং ইন্সটিটুটের মধ্যে লাগিয়েও দিয়েছিলাম, কিন্তু কোথাও সে এডজাষ্ট করতে পারে নাই। শেষতক আবার সেই সেফালির ঘাড়েই গিয়ে পড়েছে। যতোদিন নাফিজ বিয়ে করে নাই, ততোদিন লিয়াকতের হয়তো ততোটা সমস্যায় পড়তে হয় নাই। কিন্তু নাফিজের বিয়ের পর নাফিজের বউ সেফালির বাসায় থাকতে হচ্ছে, আবার অন্যদিকে নাফিজ দেশে নাই। অথচ লিয়াকত একই বাড়িতে থাকে। এটা কোনোভাবেই হয়তো নাফিজের স্ত্রী আরামবোধ করবে না। এই যে নাফিজের স্ত্রীর ভাষায় সে “আরাম বোধ করছি না” এর মানে একটাই- লিয়াকতকে সেফালির বাড়ি থেকে হটাও। সেফালির বাড়ি থেকে যখন লিয়াকত চলে যেতে বাধ্য হবে, তখন হয়তো সেফালি কিছুটা হলেও তার ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে চাইবে। আর এক কথা বলা চাওয়ার মধ্যেই সেই “দূরে” চলে যাওয়ার ব্যাপারটা লুকায়িত। তবে চুড়ান্ত কথা একটাই- যে কোনোভাবেই হোক, সেফালিকে শেষতক একাই থাকতে হবে, নিজের জীবনের জীবিকা তাকে একাই জোগাড় করতে হবে। এটাই হয়তো শেষের অধ্যায়।

এই যে সেফালিকে নাফিজের স্ত্রি ধীরে ধীরে পছন্দ করছে না এটা বুঝার কিছু উপায় আছে। দেখা যাবে যে, মাসের পর মাস নাফিজের স্ত্রী সেফালির বাসায় আসবে না। কারন দেখাবে যে, সে লিয়াকতের কারনে বিব্রত। সে ফ্রি না লিয়াকতের উপস্থিতিতে ইত্যাদি। ফলে লম্বা সময়ের জন্য সেফালির সাথে বিচ্ছেদ। কিংবা যদি সেফালি অসুস্থ্য হয়ে যায়, তখনো নাফিজের স্ত্রী সেফালিকে দেখভাল করতে আসবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। হয়তো কারন দেখাবে- করোনা কিংবা তার নিজের অসুস্থতা। যদি এমন কিছু ঘটতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে যে, প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এটার ভাঙ্গন শুরু। 

অন্যদিকে, যদি নাফিজ আমাকে গার্জিয়ান হিসাবে সামনে রেখে ও ওর বিয়ের সমস্ত তদারকি করাতো, আর যাইই হক, নাফিজের শশুর বাড়ির মানুষের যে বাগাম্বর ভাবটা এখন আছে উচ্চবিত্তের ধারনায়, সেটা আর থাকতো না। কারন সে আমার তুলনায় কিছুই না। আমার মতো এমন একটা গার্জিয়ানের সামনে না নাফিজের স্ত্রী, না নাফিজের শশুড়বাড়ির কোনো লোক মাথা উচু করে কথা বলতে পারতো। সেফালিও তার গলা উভয়ের সামনে ঠিক আগের মতোই ধরে রাখতে পারতো। আমি একদিক থেকে একটা ব্যাপার নিয়ে শান্তিতে আছি যে, আমাকে আর এসব উটকো ঝামেলা আর পোহাতে হবে না।

এখানে আরেকটা কথা না বললেই নয়। কোনো একদিন নাফিজের শশুরবাড়ির লোকেরাও আমাকে হারিকেন জালিয়ে হন্যে হয়ে খুজবে যখন নাফিজের সাথে, নাফিজের স্ত্রী, কিংবা সেফালির সাথে বড় ধরনের কোনো ঝামেলা তৈরী হবে। তখন তারা খুজবে কাকে ধরলে সমস্যা সমাধান হবে। আর সেই "কাকে ধরলে" খুজতে খুজতে ঠিক আমার আস্তানায় চলে আসবে এসব 'উচ্চবিত্তরা"। আমি আসলে সেদিনটার জন্য অপেক্ষা করছি। শাস্তিটা আমি তখন দেবো ঠিক এভাবে যে- Who are you people? Do I know you?

২৮/০১/২০২১-মিটুল চৌধুরী আসমা

মিটুল চৌধুরী আসমা তার নাম। তার মুল জন্মস্থান মানিকগঞ্জ। জন্ম ৩১সে ডিসেম্বর ১৯৬৮। মিটুলের বাবার নাম- আলাউদ্দিন চৌধুরী, মায়ের নাম- জেবুন্নেসা চৌধুরী। তারা আট বোন এবং তিনভাই। সে সবার ছোট ভাইবোনদের মধ্যে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে র্অথনীতিতে অনার্স পাশ করে মাস্টার্স করে পরবর্তীতে ১৪বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে জয়েন করেন। প্রথমে তিনি মাইমেন্সিং এর মোমেনুন্নেসা মহিলা কলেজে জয়েন করেন, অতঃপর ঘিউর সরকারী কলেজ, অতঃপর ঢাকা কমার্শিয়াল কলেজ থেকে রাজবাড়ি কলেজ , মাদারীপুর কলেজ ইত্যাদি হয়ে এনসিটিবি এবং তারপর সরকারী বাঙলা কলেজে চাকুরী করেছেন। তিনি বর্তমানে প্রোফেসর  এবং ডিপার্ট মেন্টাল হেড হিসাবে বাঙলা কলেজ, মীরপুরেই কর্মরত আছেন। 

দুই মেয়ের মা। বড় মেয়ে আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা বগুড়া (শহিদ জিয়া মেডিক্যাল কলেজে) মেডিক্যাল থেকে এম বি বি এস পাশ করেছে। ছোট মেয়ে সাঞ্জিদা তাবাসসুম কনিকা এবার শহীদ আনোয়ারা গার্লস কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ইউ এম বি সি (ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড, বাল্টিমোর কাউন্টি) তে ভর্তি হয়েছে, তার ক্লাশ আগামী আগষ্ট মাস ২০২১ থেকে শুরু হবে। মিটুলের স্বামী সেনাবাহিনীর অফিসার ছিলেন। মেজর হবার পর স্বইচ্ছায় অবসর নেন এবং নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন। তাদের দুটু এক্সপোর্ট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী (সুয়েটার্স ইউনিট) আছে, ওয়ান টাইমের একটা প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি আছে, আন-নূর কন্সট্রাকশন নামে একটি কন্সট্রাকশন কোম্পানী আছে। মানিকগঞ্জে আল-আব রার মেডিক্যাল ডায়গনোসিস সেন্টার নামে একটি মেডিক্যাল ইউনিটে পার্টনারশীপ ব্যবসা আছে।   

মিটুল চৌধুরী তার নিজস্ব বাড়ি মীরপুরে থাকেন। এ ছাড়া তাদের বাসাবোতেও কয়েকটি ফ্ল্যাট আছে। এই গত এক বছরে মিটুল চৌধুরী তার আরো দুই বোনের সাথে জয়েন্ট পার্টনারশীপে তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি মানিকগঞ্জে ৬ তালা একটি বিল্ডিং করেছে। আমি জানি সেটায় ওরা কেউ থাকবে না, তার পরেও বড় একটা ইনভেষ্টমেন্ট।

মিটুল চউধুরীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইতিহাসটা হচ্ছে তার বিয়ের ঘটনা। আর এই বিয়ের ঘটনাটা বিস্তারীত বর্ননা আছে Diary 2 March 2021 datewise.docx#৩০/০৫/১৯৮৮- বিবাহ

অধ্যায়ে।

(চলবে)  

২৮/০১/২০২১- উম্মিকা,আমার বড় মেয়ে

Categories

আনিকা তাবাসসুম উম্মিকা আমার বড়মেয়ে। জন্ম তার ১৬ জানুয়ারী ১৯৯৪ সাল।

তার জন্মের আগে আমার বড় ইচ্ছে ছিলো যে, আমার যেনো একটা মেয়ে হয়। আমি কখনোই ছেলে হোক চাই নাই। আল্লাহ আমার মনের আশা পুরন করেছেন উম্মিকাকে আমার ঘরে দিয়ে। সে খুব ভালো একটা মেয়ে। কিন্তু সে খুব সিম্পল। 

উম্মিকার জন্মের আগে (সম্ভবত ৪/৫ দিন আগে) আমি একটা সপ্ন দেখেছিলাম। তাহলে সপ্নটা বলিঃ

ঢাকা সেনানীবাসের মেস বি তে আমি একটা রুমে আছি। আমার পোষ্টিং ছিলো খাগড়াছড়িতে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অধীনে। মিটুল পোয়াতি অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। যে কোনো সময় আমার বাচ্চা হবে। আমি ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় এসেছি শুধু আমার অনাগত বাচ্চার আগমনের জন্যই। নামাজ পড়ি, খাই দাই, আর সারাদিন হাসপাতালে মিটুলের সাথে সময় কাটাই।

একদিন রাতে (ডেলিভারির ৪/৫ দিন আগে) আমি সপ্নে দেখলাম যে, আমি আমাদের গ্রামের কোনো একটা দোকানে বসে আছি। ওখানে আরো অনেক লোকজন ও আছে। হতাত করে সবুজ একটা সুতী কাপড় পড়ে একজন মহিলা কোনো একটা ঘরের ভিতর থেকে বাইরে এসে আমাকে বল্লো, আমাকে আপনি কি চিনেন? আমি তাকিয়ে তাকে বললাম, জী না আমি আপনাকে কখনো দেখি নাই। উত্তরে মহিলাটি আমাকে বললেন, যে, তিনি হযরত আছিয়া বেগম অর্থাৎ মুসা (আঃ) এর মা। আমি তো অবাক। কি বলে এই মহিয়সী মহিলা?

আমি ততক্ষনাত উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে তো আপনার কাছে আমাদের নবীজির অনেক চিঠি থাকার কথা! মহিলা বললেন, হ্যা আছে তো।

এই কথা বলে তিনি আবার ঘরের ভিতরে চলে গেলেন চিঠিগুলি আনার জন্য। আমার ঘুম ভেংগে গেলো। আমি তখন সময়টা দেখলাম, রাত প্রায় শেষের পথে কিন্তু তখনো ফজরের আজান পড়ে নাই।

পরদিন ছিলো শুক্রবার। আমি জুম্মা নামাজ পড়ে ইমামের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বললাম। তিনি প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবনা কিনা। আমি বললাম, আমরা খুব শিঘ্রই বাচ্চার আশা করছি। তিনি বললেন, আপনার মেয়ে হবে এবং খুব ভালো একজন মেয়ে পাবেন আপনি।

তার ৪/৫ দিন পর আমি আসর নামাজের পর কোর আন শরীফ পড়ছিলাম। এমন সময় আমার মেস ওয়েটার তড়িঘড়ি করে আমার রুমে নক করে বল্লো যে, স্যার আপনাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে বলেছে। আমি তখন যেখানে কোর আন আয়াত পড়ছিলাম, ঠিক সেখানেই মার্ক করে কোর আন বন্ধ কত্রে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। মিটুলকে ওটিতে নেয়া হচ্ছে, সিজারিয়ান করতে হবে।

প্রায় ঘন্টা খানেক পরে আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার মিষ্টি মেয়েটার জন্ম হলো এই পৃথিবীতে। কি নাম রাখবো সেটা আমি ঠিক করেছিলাম যে, আমি যেখানে কোর আন শরীফ টা পড়া বন্ধ করেছি, আর যে আয়াতে, আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ঠিক সেই আয়াত থেকেই কোনো একটা শব্দ দিয়ে নাম রাখবো। অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে- আমি ওই সময়ে হজরত মুসা (আঃ) এর উপরেই আয়াতগুলি পড়ছিলাম। সেখানে আয়াতে লিখা ছিলো- ইয়া হাইলা আলা উম্মিকা মুসা। অর্থাৎ হে মুসা, আমি তোমার মাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিলাম।

আমি ঠিক এই শব্দতটাই আমার মেয়ের নাম রাখার সিদ্ধান্ত নেই যে, ওর নাম হবে উম্মিকা। অর্থাৎ মা।

আমার সেই উম্মিকার প্রথম শিক্ষা শুরু হয় মীরপুর স্টাফ কলেজের টর্চ কিন্ডার গার্ডেনে। অতঃপর মেথোডিস্ট ইংলিশ মিডিয়াম, তারপর শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ এবং সেখান থেকে হলিক্রস। হলিক্রস থেকে উম্মিকা এইচএসসি পাশ করে ডাক্তারী পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে শহীদ জিয়া মেডিক্যালে আল্লাহর রহমতে ইন্টার্নী করে ২০২০ সালে ডাক্তারী পাশ করলো। এটা আমার একটা স্বপ্ন যে সে ডাক্তার হোক। আমার আরেকটা স্বপ্ন হচ্ছে, সে যেনো সেনাবাহিনীর ডাক্তার হয়। তাতে যে লাভটা হবে তা হচ্ছে, বাবার সেনাবাহিনীর জব ছিলো। রাজনীতির প্রতিহিংসায় সে ইচ্ছে করে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছিলেন, জেনারেল পর্যন্ত যেতে পারেন নাই। আমি চাই আমার মেয়ে সেটা হোক। আর ২য় কারন হচ্ছে, আজীবন কাল সে সেনাবাহিনীর সব বেনিফিট গুলি যেনো পায়। কিন্তু বাবাদের সব সপ্ন তো আর সার্থক হয় না। আমার মেয়ে চায় বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সে বেসামরীক লাইফেই থাকে।

২৮/০১/২০২১- কনিকা, আমার ছোট মেয়ে

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

জানুয়ারী 

২৮ 

সানজিদা তাবাসসুম কনিকা আমার ছোট মেয়ে। জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর ২০০০।

ভাবলাম, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাসায় আছি, সময়টা কাটছে না খুব একটা। সবার ব্যাপারে কিছু লিখতে থাকি।

কনিকার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমি জানতাম না যে, আমার আরেকটি মেয়ে হচ্ছে। আমি জানতেও চাই নাই। এটার পিছনে বেশ একটা কারন ছিলো। আর সেটা হচ্ছে যে, আমার শখ ছিলো আমার প্রথম সন্তান মেয়ে হোক। আল্লাহ সেটা আমার বড় মেয়ে উম্মিকাকে দিয়ে সেই শখ পুরা করেছেন। তারপরের সন্তান আমার ছেলে চাই না মেয়ে চাই এটা নিয়ে আমার কোনো কৈফিয়ত কিংবা কোনো প্রকারের হাহুতাশ ছিলো না। শুধু চেয়েছিলাম যেনো আমার সন্তান সুস্থ্য হয়।

মেয়ে হয়েছে, এই খবরটা দেয়ার আগে ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমার প্রথম সন্তান কি? আমি উত্তরে বললাম, যেটাই হোক, মেয়ে হলেও আমি কিছুতেই অখুসি নই। দুটুই আমার সন্তান। এবারো সিজারিয়ান বেবি। মিটুলের অনেক কষ্ট হয়েছে এবার। আমার মা ঢাকার বাসাতেই ছিলেন, আমার মেয়ে হয়েছে শুনে, আমার মায়ের খুব মন খারাপ। আমি হেসেই বাচি না। আমি প্রথমে ব্যাপারটা মজা মনে করে মাকে কিছুই বলি নাই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখলাম, আমার মা আমার ছোট মের‍্যেকে একেবারেই পছন্দ করেন না। বারবার শুধু একটা কথাই বলে- ওই ত্যুই ছেলে হইতে পারলি না?

আমার মেয়ে তো কিছুই বুঝে না। সে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে আর দাদির লগ্না হচ্ছে। কনিকার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমার বুকে একটা ধক করে উঠেছিলো। এতো অবিকল চেহারা হয়? একদম আমার মায়ের চেহারা। তার চোখ, মুখ, নাক , কান, মুখের আকৃতি সব কিছু আমার মায়ের চেহারা। আমি মনে মনে ভাবলাম, হে আল্লাহ, তুমি আবার এই ছোট মাকে আমার কোলে দিয়ে আমার বড় মাকে নিয়ে যেও না।

মাকে বললাম, মা , ছোট মেয়ে একেবারে তোমার অবিকল চেহারা পেয়েছে। তুমি যখন থাকবা না, এই মাইয়াটাই আমার কাছে তুমি হয়ে আজীবন বেচে থাকবা। অনেক দিন ছোট মেয়ের নাম রাখা হয় নাই। আমি মাকে দায়িত্ত দিয়েছি মা যেনো ছোত মেয়ের নাম রাখেন। যা খুশী সেতাই রাখুক। অবশেষে একদিন মা, ছোট মেয়ের নাম রাখলেন- কনিকা।

উম্মিকা ছোট অবস্থায় আমার সাথে থাকতে পারে নাই কারন আমি তখন বিভিন্ন সেনানীবাসে খালী পোষ্টিং আর মিশনের কাজে বিদেশ করে বেড়িয়েছি। কিন্তু কনিকার বেলায় বেশ লম্বা একতা সময় এক সাথে থাকার সুযোগ পেয়েছি।

তারপরেও বেশ অনেক গ্যাপ হয়েছে আমার ওদের সাথে থাকার। কনিকা বড় মেয়ের মতো সেও প্রথমে মেথোডিস্ট স্কুল মিডিয়ামে, তারপর মোহাম্মাদপুর প্রিপারেটরী এবং অতঃপর বিআইএস থেকে শহীদ আনোয়ারা গার্লস কলেজে পরাশুনা করে এস এস সি পাশ করেছে। সাংঘাতিক টেনসনবিহীন একটি মেয়ে। অল্পতেই খুব খুতখুতে কিন্তু খুব বুদ্ধিমতি। কনিকা উম্মিকার থেকেও একটু বেশি চালাক কিন্তু ধূর্ত নয়। আমার ইচ্ছে যে, কনিকা এডমিন ক্যাডারে চাকুরী করুক এবং সচীব হয়ে অবসর নিক। অথবা ব্যারিস্টার হোক। তাতে নিজের ব্যবসা নিজেই করতে পারবে, কারো সরনাপন্ন হতে হবে না। 

কিন্তু আমার ইচ্ছাটাই সব কিছু নয়। এই করোনা পেন্ডেমিকের সময় সরকার কর্তৃক অটোপাশের মাধ্যমে কনিকা ইন্টার পাশ করে ফেল্লো। কনিকার দেশে থাকার কোনো ইচ্ছা নাই। এই যে, সবাই আগামীতে কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, কোথায় ভর্তি হবে ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত আর কনিকা সারাদিন ইন্টারনেটে বিদেশের কোনো ইউনিভার্সিটিতে সে পড়বে সেটা খুজতে খুজতে ব্যস্ত। সে মনে প্রানে আর দেশে নাই। অনেক গুলি ইউনিভার্সিটিত থেকে কনিকা ইতিমধ্যে অফার লেটার পেয়েছে। আমি জানি আগামী বছরের মধ্যে কনিকা আর দেশে নাই। বাকী কি হয় কে জানে?

২৭/০১/২০২১-আমার+উম্মিকার করোনা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২৭ জানুয়ারী 

 

কোনো কিছুই কোনো কারন ছাড়া ঘটে না, এটাই সত্য। যে ঘটনাটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিলো কেনো গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেললাম বলে, আজ সেটা পরিষ্কার হলো। আমার করোনা টেষ্টে পজিটিভ এসেছে। আমার বড় মেয়েরও করোনা পজিটিভ। ছোট মেয়ের করোনা নেগেটিভ। উম্মিকার মার তো আগেই একবার করোবা ধরা পড়েছিলো, তাই আর করাইতে দেই নাই। এর মানে হলো, শুধু ছোট মেয়ে ছাড়া আমাদের বাসায় সবার করোনা ধরা পড়লো। আল্লাহ যা করেন নিশ্চয় মংগলের জন্যই করেন। করোনা ধরা পড়ায় একটা জিনিষ মনে হলো যে, আমাদের আর টিকা নেওয়ার দরকার পড়বে না হয়তো।

দেশে টিকা এসেছে, সবাই টিকা নিতে ভয়ও পাচ্ছে, আবার এই টিকা নিয়ে যে কত রাজনীতি হয় তাও দেখা যাবে। এদেশে প্রতিটি জিনিষ নিয়েই রাজনীতি হয়। টিকা নিয়েও লম্বা সময় ধরে রাজনীতি হবে, এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। যারা একবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এসছেন, হয়তো তারা আর টিকার ব্যাপারে কোনো মাথা ঘামাবে না, তারপরেও হয়তো টিকাটা নেয়া দরকার হতে পারে যেহেতু এটা একটা ভ্যাকসিন।

বাসায় আছি কদিন যাবত। করোনা হবার কারনে আমার শরীরে কোনো প্রকার আলাদা কোনো সিম্পটম নাই। সুস্থই আছি। বড় মেয়ের ঠান্ডাটা একটু বেশি। আমি প্রতিদিন ছাদে রোদে প্রায় ঘন্টা ২/৩ পুড়ি। ভালোই লাগে। কিন্তু বড় মেয়ে বি সি এস পরীক্ষার প্রিপারেশনে রাত জেগে পরাশুনা করে বলে দিনের অর্ধেক সময় পর্যন্ত ঘুমায়।

চারিদিকে বেশ ঠান্ডাও পড়েছে ইদানিং। এবারের ঠান্ডাটা একটু বেশী মাত্রায় পড়েছে বলে মনে হয়।

২৬/০১/২০২১- আমার করোনা +

গত ২৩/০১/২০২১ তারিখের সকাল ৮ টার সময় হটাত করে মনে হলো কোনো গন্ধই পাচ্ছি না। এর ২/৩ দিন আগে থেকে একটু একটু শরীর খারাপ ছিলো। দূর্বল লাগছিলো, ঘুম ঘুম ভাব ছিলো। একটু একটু ঠান্ডাও ছিলো। গন্ধ না থাকার কারনে ভাবলাম, করোনা কিনা। এর মধ্যে আবার জিহবায় একটা ছোট দাগ ছিলো যেটা আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো কোনো ঘা। ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম, উনি বললেন ভিটামিন সি খান। হয়তো ভিটামিন সি এর অভাব। ব্যাপারটা আমলে নিয়েছিলাম বটে কিন্তু গত কয়েক মাস আমি যেভাবে ভিতামিন সি খেয়েছি, তাতে আমার মনে হয়েছিলো আমার ভিটামিন সি সারপ্লাস হবার কথা। তারপরেও আরো বেশী করে লেবু প্লাস ভিটামিন সি ট্যাবলেট খাইতে থাকলাম। কিন্তু ঘা টার কোন কমার লখন দেখি নাই। এর মধ্যে হটাত করে গন্ধ না পাওয়ার কাহিনী। একটু ভয় তো পাইলামই কিন্তু শরীরে অন্য কোনো উপসর্গ নাই। যেমন, কোনো কাশি নাই, গলা ব্যথা নাই, জর নাই, অক্সিমিটারে অক্সিজেন লেবেল ৯৯% দেখায়। গায়ে কোনো ব্যথাও নাই। তারপরেও সেফ এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট, প্যারাসিটামল, আর ম্যাগ্নেশিয়াম ট্যাবলেট খাইলাম বেশ কয়েকদিন। অফিসেও গেলাম না। একই কাহিনী আমার বড় মেয়ের উম্মিকা। সেও কোনো গন্ধ পায় না কিন্তু রুচী আছে। অবশ্য ওর একটু ঠান্ডার ভাব আছে। সেটাও মারাত্তক না। তাই আমি , উম্মিকা আর কনিকার করোনার স্যাম্পল টেষ্টের জন্য প্রভা হেলথ কেয়ারকে বাসায় এনে স্যাম্পল দিলাম। এই তিন দিন যাবত ছাদে প্রায় ২/৩ ঘন্টা করে রোদ পোহালাম। রোদ পোহাইতে ভালোই লাগে।

একটু আগে ছাদ থেকে বাসায় এসে গোসল করলাম। আমি সাধারনত গোসলের পর পারফিউম দেই। হটাত খেয়াল করলাম, আমি পারফিউমের গন্ধটা পাচ্ছি। যেটা আগে একেবারেই পেতাম না। কি হলো?

কেদনোই বা গন্ধের সেন্সর আউট হয়ে গেলো আবার কেনোই বা গন্ধের সেন্সর আবার ফিরে এলো এটা আমার কাছে একটা গবেষনার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। যাই হোক, অন্তত খারাপ কিইছু সম্ভবত হয় নাই। বাকীটা আল্লাহ ভরসা।

০১/০১/২০২১-মেয়েরা বগুড়ায়

Categories

আজ থেকে প্রায় ৫৪ বছর আগে, আমার বাবা বুঝতে চেয়েছিলেন, তার অবর্তমানে তার পরিবার কিভাবে থাকবে, কে কিভাবে আচরন করবে, কার চেহারা কি হবে ইত্যাদি। আর এ কারনে তিনি একবার ৬ মাসের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। আমার মাও জানতেন না আমার বাবা কোথায় আছে কেমন আছে। শুধু জানতেন আমার বড় ভাই। আর বাবা আমার বড় ভাইয়ের আশেপাশেই ঢাকায় গোপনে ছিলেন। আমার ভাই প্রতিনিয়ত বাবাকে গ্রামের, বাড়ির, এবং অন্যান্য সদস্যদের আচার ব্যবহার আপডেট দিতেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, বাবা হয়তো কোথাও মারা গিয়েছেন, অথবা আর কখনোই ফিরে আসবেন না। তাতে যেটা হয়েছে সেটা হলো, সবাই তার নিজ নিজ চেহারায় আবর্ভুত হয়েছিলো। ফলে ৬ মাস পর যখন বাবা ফিরে এলেন তার গোপন আস্তানা থেকে, তখন তিনি বুঝলেন, কে আমাদের আপন, কে আমাদের পক্ষের আর কে আমাদের বিপক্ষের। শুধু তাইই নয়, আমাদের পরিবারের মধ্যেও তিনি বিভিন্ন সদস্যদের চরিত্র সম্পর্কে একটা নিখুত ধারনা পেয়েছিলেন। অন্তর্ধানের পরে আমার বাবা আরো বেশী বাস্তববাদী হয়ে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে আমাদের জন্য ছিলো যুগান্তকারী এবং পারফেক্ট।

এই ঘটনাটা এখানে বলার অন্য কোনো কারন নাই। নিছক একটা সমকালীন ভাবনার মতো। আমার ছোট মেয়ে মানসিকভাবে আসলে আর এদেশেই নাই। তার ভাবনা কবে কোথায় কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, তাও আবার আমেরিকার কোনো এক ইউনিভার্সিটিতে। সারাক্ষন তার এই একই চিন্তা, আর এই চিন্তার রেশ ধরে সারাক্ষন তার সেই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য এখানে এপ্লিকেশন, ওখানে এপ্লিকেশন, স্যাট পরীক্ষা, আইএলটিএস ইত্যাদি। আমরা ধরেই নিয়েছি, যে, আগামী বছরের শেষের দিকে আমরা আমার ছোট মেয়েকে আর পাচ্ছি না। সে বিদেশের মাটিতে পড়াশুনা করবে। এটা যেনো এক প্রকার মেনেই নিয়েছি। আর কনিকা তো শতভাগ সেভাবেই ভাবছে। বাকীটা আল্লাহর রহমত।

বড় মেয়েও বিসিএস পরীক্ষায় যদি চান্স না হয়, তারও পরিকল্পনা প্রায় একই রকমের। সেও সেই সুদূর আমেরিকার উদ্দেশ্যেই হয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাবে। এই যে, একটা ভ্যাকুয়াম, মানে দুই মেয়েই আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার একটা আভাষ, তখন আমাদের জীবন কি হবে, কেমন কাটবে, সেই ভাবনাটা যেনো আজ পেলাম। কারন আজকে দুই মেয়েই আমাদের ছেড়ে বগুড়ায় আছে। বাড়ি একেবারেই খালি। একদম ফাকা। এ যেনো সেই পরীক্ষাটা যখন ওরা কেউ আর আমাদের সাথে থাকবে না, তখন কেমন হবে আমাদের জীবনটা।

আজ বুঝলাম, কেমন হবে জীবনটা। সারাটা বাড়ি ফাকা। সবই আছে, চেয়ার টেবিল যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছে। উম্মিকার ঘরের কোনো কিছুই এদিক সেদিক হয় নাই, কনিকার ঘরেরও। ডাইনিং টেবিলে সব কিছু আগের মতোই আছে, ড্রইং রুমটাও তাই। খাবার টেবিলে সবসময় যে মেয়েরা আমার সাথে খেতে বসে, সেটাও না। কিন্তু তখন হয়তো ওরা ওদের রুমেই থাকতো। কিন্তু আজকে মনে হলো, ওরা বাসায় কেহই নাই মানে আমার খাবার টেবিলের খাবারের সাধটাও ভিন্ন। ওদের ঘরের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষগুলি এখানে বসতো, এখানে কম্পিউটারে কাজ করতো, ওইখানে ওরা পায়ে পায়ে হাটতো। ওদের মা কারনে অকারনে কখনো ডাকাডাকি, কখনো না খাওয়ার কারনে রাগারাগি, কখনো আবার একসাথে বসে হাসাহাসি করতো। আজকে কিন্তু ওরা আছে কিন্তু কাছে নাই। এতো ফাকা লাগছে কেনো?

ওদের বগুড়ায় যাওয়ার মাধ্যমে আমি যেনো ওদের আমেরিকা যাওয়ার একটা প্রক্সি অনুভব করলাম। এটাই হবে যখন ওরা সত্যি একদিন আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে থাকবে। আজকে একটা কথা প্রায়ই মনে পড়লো-

তাহলে আমার এতো বড় ব্যবসা, এতো বড় বানিজ্য, আমার এতো বড় বড় প্রোজেক্ট নিয়ে কি হবে যদি ওরাই আর এখানে না থাকে? কে দেখভাল করবে আমার অনুপস্থিতিতে এই বিশাল সাম্রাজ্য? কোথায় যেনো একটা খটকা লাগলো। দরকার আছে কি এতোসবের?

অনেক ভাবনার বিষয়।

২১/১০/২০২০-উম্মি-কনি আমার অফিসে

সারাদিন ওরা আমার অফিসেই ছিলো। আজ ওদের জন্য একটা বিশেষ দিন। আমি দুই বোনকে মোট ২৬ শতাংশ জমি বায়না রেজিষ্ট্রি করে দিলাম। টাকার শর্ট ছিলো, তাই সাব কবলা করা হলো না। কিন্তু যে কন সময় ওদেরকে আমি দিয়ে দিতে পারবো, আর যদি আমার মরন ও হয়, ওরা মাত্র ১ লাখ টাকা জমা করে কোর্টের মাধ্যমে জমিটা নিজেদের নামে লিখে নিতে পারবে সে ব্যবস্থাটা করে রাখলাম। এর মধ্যে সোহেল এবং লিয়াকত অফিসে এলো। আমি ওদেরকেও একটা ল্যাব করে দিয়েছি, কিন্তু আমার ধারনা হচ্ছে সোহেল এবং লিয়াকত ল্যাবটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না। সোহেলের মধ্যে আগে যেটা দেখি নি, সেটা এখন আমার মনের মধ্যে একটু একটু করে সন্দেহের বীজ উকি দিচ্ছে, ওকে ব্যবসায়িক পার্টনার করাটা সম্ভবত ভালো সিদ্ধান্ত হয় নাই।

২০/১০/২০২০-উম্মিকার বাড়ি আসা  

Categories

অনেকদিন পর আমার বড় মেয়ে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাসায় আসবে কাল ইনশাল্লাহ। তারপর ওকে নিয়ে আমরা সবাই কক্সবাজার যাবো বেড়াতে। অনেকবার গিয়েছি কক্সবাজারে, কিন্তু এবার যেনো কেনো একটু বেশী ভাল লাগছে যেতে। আসলে কক্সবাজার জায়গাটার মধ্যে কোনো মজা নাই, মজা হলো পুরু পরিবার একেবারে নিজের মতো করে এক সাথে হৈ হুল্লুর করা। সময়টা একেবারে নিজেদের মতো করে কাটে। এটা আসলে একটা ব্রেকটাইম।

প্রথমে উম্মিকার যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না, মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো আমাদের সবার। বারবারই মনে হচ্ছিলো যে, উম্মিকা যেতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু ওর ইন্টার্নীর ঝামেলায় উম্মিকার সম্ভব হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত উম্মিকা ম্যানেজ করেছে ছুটিটা। আর এই ছুটিতেই উম্মিকা আগামীকাল বাড়ি আসছে। ওর বাড়িতে ও আসছে, এতে যেনো বাড়িটাই আনন্দিত হয়ে উঠছে। ওর মা আজ ওর জন্য স্পেশাল বাজার করে আনলো, কনিকাও প্রস্তুতি নিচ্ছে কাল ওর আপু আসবে, তাই কি স্পেশাল খাওয়া যায়, তার একতা লিষ্ট ও করে ফেলছে। আগামী পরশু আমি উম্মিকা আর কনিকাকে ১৩ শতাংশ করে চমৎকার জায়গায় দুজনকেই এক খন্ড জমি লিখে দেবো, সেটাও একতা আনন্দ হচ্ছে। জমিটার দাম নিছক কম নয় প্রায়, ৭৫ লাখ টাকা করে উভয়ের, মানে প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি। তাই উম্মিকা আর কনিকাকে আমার ফ্যাক্টরীতে নিতে হবে আগামী পরশুদিন ইনশাল্লাহ।

প্রথমে উম্মিকার যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না, মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো আমাদের সবার। বারবারই মনে হচ্ছিলো যে, উম্মিকা যেতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু ওর ইন্টার্নীর ঝামেলায় উম্মিকার সম্ভব হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত উম্মিকা ম্যানেজ করেছে ছুটিটা। আর এই ছুটিতেই উম্মিকা আগামীকাল বাড়ি আসছে। ওর বাড়িতে ও আসছে, এতে যেনো বাড়িটাই আনন্দিত হয়ে উঠছে। ওর মা আজ ওর জন্য স্পেশাল বাজার করে আনলো, কনিকাও প্রস্তুতি নিচ্ছে কাল ওর আপু আসবে, তাই কি স্পেশাল খাওয়া যায়, তার একতা লিষ্ট ও করে ফেলছে। আগামী পরশু আমি উম্মিকা আর কনিকাকে ১৩ শতাংশ করে চমৎকার জায়গায় দুজনকেই এক খন্ড জমি লিখে দেবো, সেটাও একতা আনন্দ হচ্ছে। জমিটার দাম নিছক কম নয় প্রায়, ৭৫ লাখ টাকা করে উভয়ের, মানে প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি। তাই উম্মিকা আর কনিকাকে আমার ফ্যাক্টরীতে নিতে হবে আগামী পরশুদিন ইনশাল্লাহ।

৩০/০৯/২০২০-জীপগাড়ি-হাইলাক্স সার্ফ

                 

আমাদের বাসায় দুটু গাড়ি আছে। একটা এলিওন, আরেকটা নোহা। মানুষ আমরা মোট চারজন। বড় মেয়ে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্নী করছে ফলে ঢাকার বাসায় আমি, আমার স্ত্রী এবং ছোট মেয়ে কনিকাই থাকি। দুটু গাড়িতে আমাদের খুব ভালোভাবেই চলে যায়। কিন্তু খুব শীঘ্রই আমার বড় মেয়ে যখন ইন্টার্নী করে ঢাকায় চলে আসবে, নির্ঘাত আমাকে আরো একটা গাড়ি কিনতেই হবে ওর জন্য। আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার তার হাইলাক্স সার্ফ গাড়িটা বিক্রি করে তিনি আরো একটা গাড়ি কেনার পরিকল্পনা করেছেন। ব্যবসায়ীক পার্টনারের এই গাড়িটা আমরা ৭৩ লক্ষ টাকা দিয়ে ২০১০ সালে কিনেছিলাম আমাদের প্রয়াত আরেক বিদেশী পার্টনার প্রিয়ান্থার জন্য। প্রয়ান্থা মারা যাওয়ার পরে আমিই বলেছিলাম মুর্তজা ভাইকে যেনো উনিই এই গাড়িটা কিস্তিতে কিনে নেন। গাড়িটা সেকেন্ড হ্যান্ড ছিলো না। ফার্ষ্ট হ্যান্ড গাড়ি ছিলো।

গাড়িটা আমার কাছে খারাপ লাগে নাই। তাই রেখে দিলাম। এই রেখে দেওয়ার পিছনে দুটু কারন ছিলো। এক, আমাকে এখুনী কোনো টাকা পয়সা দিতে হবে না। দুই, কয়েকদিন পর আমাকে আরেকটা গাড়ি কিনতেই হবে। তাহলে এখন এটা রেখে দেয়াই ভালো। ড্রাইভার নিতে হবে না কারন মিটুল এলিওন গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করবে, বড় মেয়ে এবং ছোট মেয়ের জন্য নোহা গাড়িটা থাকবে আর আমার জন্য এই হাইলাক্স সার্ফ গাড়িটা রইলো। গ্যারেজের সল্পতা আছে। আমাদের বাসায় সর্বোচ্চ দুটু গাড়ি পার্ক করা যায়। তাই পাশের বাসার সাত্তার সাহেবের বাড়িতে একটা গ্যারেজ ভাড়া নিতে হলো। পাশাপাশি বাসা। কোনো অসুবিধা নাই।

আপডেটঃ (২১/০৬/২০২১) 

শেষ পর্যন্ত আমি মূর্তজা ভাইকে গাড়িরটার দাম এক কালীন পরিশোধ করে দিলাম। অংকটা বলছি না তবে যা দিয়েছি সেটার বিপরীতে মূর্তজা ভাই কোনো কথা বলেন নাই। গাড়িতা মধ্যে কোনো প্রকার সমস্যা নাই। মাত্র তিনটা ছোট ছোট সমস্যা যা যে কোনো গ্যারেজে নিলেই ঠিক করে দেয়ার কথা। মূর্তজা ভাই আসলে কখনোই নাভানা ছাড়া গাড়িটা অন্য কোনো গ্যারেজে দেখাতেন না এবং দেশীয় কোনো পার্টস ও ব্যবহার করতেন না যদি লাগতো। সরাসরি জাপান থেকে পার্টস আমদানী করতেন। ফলে গাড়িটা এতো বছর পরেও কোনো প্রকার খুত ছিলো না। ছোট সমস্যা গুলি ছিলো যে, একটা অয়াইপার ভাংগা, আরেকটা রিয়ার ভিউ মিরর ফাটা। আমি আমার পরিচিত গ্যারেজে গিয়ে এটা দেখাতেই তিনি অরিজিনাল সেম গাড়ির ওয়াইপার আর রিয়ার ভিউ মিরর এনে লাগিয়ে দিলেন। আরেকটা সমস্যা কয়েকদিন পর বুঝতে পারলাম যে, পিছনের ব্যাক ডালার ওজন প্রায় এক টন, কি আছে সেখানে আমি জানি না, ওটার যে সাপোর্টার, সেটা ধরে রাখতে পারছে না। ওটা প্রায় ১০ হাজার টাকায় অরিজিনাল পাওয়া গেলো। লাগিয়ে দেখলাম দারুন কাজ করছে।  আরো একটা জিনিষ চেঞ্জ করলাম, সেটা হলো টায়ার। পুরু ৪ টা টায়ারই এক সাথে পরিবর্তন করলাম। গাড়িটা ভীষন রকমের ভালো। 

১২/০৯/২০২০-মিতুলের করোনা পজিটিভ

Categories

যে ভয়টা পেয়েছিলাম, সেটাই হয়েছে। আজ রাত ১০টায় প্রভা হেলথ সেন্টার যারা গতকাল মিতুলের করোনার টেষ্টের জন্য স্যাম্পল নিয়ে গিয়েছিলো, তারা মেইল করে জানালো যে, মিতুলের করোনা ভাইরাস "পজিটিভ"। মিটুল প্রায় সপ্তাহখানেক যাবত এতোটাই দূর্বল আর অসুস্থ্য হয়ে গিয়েছিলো যে, এটা করোনা ছাড়া আর কোনো কিছুই না। অন্যকোনো কিছুই তার বেঠিক নয় অথচ ওর না আছে শরিরে শক্তি, না খেতে পারছে, না একটু নড়াচরা করতে পারছে। যাইহোক, আশার কথা হচ্ছে যে, মিতুলের "করোনা" আসলে আরো আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো। যা আমরা কেনো, কোনো ডাক্তার কিংবা হাসপাতালও বুঝে নাই। বারংবার বলার পরেও তারা মিতুলের "করোনা" টেষ্ট করানোর প্রয়োজন নাই বলেই তাকে অন্যান্য মেডিকেশন প্রেস্ক্রাইব করেছে। এই করোনা প্যান্ডেমিক পরিস্থিতিতে আমাদের সিএমএইচ অন্তত মিতুলের করোনা টেষ্টটা করানোর জন্য উপদেশ দিতে পারতো। আমরা শুধুমাত্র "করোনা" টেষ্ট করার ব্যাপারেও কথা বলেছিলাম কিন্তু তারা এটাকে "করোনা"র কোনো সিম্পটম নাই বলে আর উৎসাহ দেন নাই। মিতুলের সিম্পটমগুলি খুব ক্রিটিক্যাল। ওর জর নাই, কাশি নাই, অন্যান্য কোনো বাহ্যিক সিম্পটম নাই, অথচ ওর খাবার খেতে অনিহা, ঘ্রান পায় না। আর মাঝে মাঝে "আম আম" পায়খানা হয়। আজ জানলাম, এটা "করোনার" আরেক ক্রিটিক্যাল চেহাড়া। করোনার রোগীর সব সময় জর হতে হবে সেটাও না, আবার কাশি থাকতে হবে সেটাও না, করোনার অনেক চেহাড়া।

যাই হোক, মিতুল সম্ভবত ইতিমধ্যে করোনার যে শক্তিশালী থাবা, সেটা অতিক্রম করে ফেলেছে। এখন ধীরে ধীরে খাওয়ার চেষ্টা করছে। কোথাও ভর্তি করলাম না। বাসায় ট্রিটমেন্ট হচ্ছে। যেহেতু করোনার কোনো ট্রিটমেন্ট নাই, ফলে আমরা চেষ্টা করছি ওকে সাভাবিক খাবার দিতে, গরম পানি আর লেবুর চা, শরবত, সাথে কফের জন্য সুডুকফ নামের একটি সিরাপ, ম্যাগনেশিয়াম টেবলেট, ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট এবং প্যারাসিটামল খাওয়াচ্ছি রুটিন করে। আর তার সাথে স্যুপ, ফল,জুস এবং কিছু শক্ত খাবার বিশেষ করে জাউ,বার্লি, সাগু এবং নরম খিচুড়ি। মিটুল নিজেও চেষ্টা করছে যাতে শরীরে কিছুটা শক্তির সঞ্চার হয় এমন খাবার জোর করেই খেতে।

আমার ছোট মেয়েও কদিন আগে যখন মিটুল অসুস্থ্য হয়ে যায়, তখন কনিকার একটু একটু কাশি ছিলো, জরও ছিলো। ব্যাপারটা খুব আমলে নেই নাই। দুদিন পর দেখলাম, কনিকা আবার সুস্থ্য। ভাবলাম, হয়তো সিজনাল জর বা এসি চালিয়ে ঘুমায় বলে ঠান্ডা লেগেছে। আমার নিজেরও মাঝে একটু খারাপ এগেছিলো, এটাও আমি খুব একটা আমলে নেই নাই। আজ মনে হচ্ছে, করোনা আমাদেরকেও সম্ভবত টাচ করেছিলো, কিন্তু কনিকা বা আমাকে করোনা কাবু করতে পারে নাই।

আমরা এখন সবাই আরো চেষ্টা করছি যাতে অন্তত প্যান্ডেমিক আমাদেরকে আঘাত করতে না পারে। বাকিটা আল্লাহর দয়া।

১১/০৯/২০২০-মিতুলের শরীরটা ইদানিং

পরিবারের সবচেয়ে কর্মঠ মানুষটি যদি কোনো কারনে তার সচলতা কমে যায়, তার শরীর খারাপ হয়ে নিজেই বিছানায় পড়ে যায়, তার নিজের খাবারটুকুও যখন আর বানানোর শক্তি থাকে না, তখন যেটা হয় তা অবর্ননীয়। পরিবারের সবার সুখ নষ্ট হয়, বিরক্ত লাগে, কোনো কিছু যেনো হাতের কাছে পাওয়া যায় না, প্রতিদিনকার রুটিনে একটা বাধাগ্রস্থ হয়। এটা একটা পানির মেইন পাইপের মতো। ফ্লো বাধাগ্রস্ত হতে হতে সবার জীবনের মধ্যে একটা স্থবিরতা, ক্লান্তি নেমে আসে। আমার পরিবারে মিটুলের অসুস্থতা ঠিক তেমন একটা ব্যাপার দাড়িয়েছে। গত ১০/১২ দিন যাবত মিটুল অসুস্থ্য। কিন্তু কি তার রোগ এটাই যেনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। না ডাক্তার না আমি। পর পর তিনটা ইন্সটিটিউসন বদলামাম। প্রথমে ইবনে সিনা, তারপর এপোলো, অতঃপর সিএমএইচ। সবার রিপোর্ট আর ডায়াগনস্টিকে প্রায় একই কনফার্মেশন। এনোরেক্সিয়া, পটাশিয়ামের অভাব, ইলেক্ট্রোলাইট-কে এর অভাব সাথে ম্যাগনেশিয়াম। সবগুলি মেডিসিন এপ্লাই করছি কিন্তু খুব একটা ইম্প্রোভ করছে বলে মনে হয় না। সারাদিন মিটুল শুয়েই থাকে। আমি ওর জন্য অফিসে যেতে পারছি না প্রায় তিনদিন। আমিও চেষ্টা করছি যাতে মিটুল তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায় কিন্তু ব্যাপারটা আমার ইচ্ছার গতির সাথে ওর সুস্থতার গতিতে মিলছে না।

আজ সন্ধ্যায় ডাঃ নিখিলের সাথে কথা বললাম। তিনি আমাদের রিভার সাইড সুয়েটার্স এর ডাক্তার। তিনিও আজ ৪ দিন যাবত পিজিতে করোনার কারনে ভর্তি। মিটুলের যখনই কোনো অসুখ হয়, নিখিলদা ওভার ফোনেই সব প্রেসক্রিপশন করে থাকেন, আর তাতেই আল্লাহর রহমতে মিটুল ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এবারই প্রথম কেনো জানি কিছুতেই মিটুল দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে না।

একটু আগে প্রভা হেলথ কেয়ার-বনানীতে ফোন করে মিটুলের জন্য করোনার টেষ্ট করানোর জন্য হোম সার্ভিসে ফোন করলাম। ওরা আগামিকাল সকাল ১১টার দিকে বাসা থেকে স্যাম্পল নিয়ে যাবে। আমার ধারনা, মিটুলের করোনার হবার সম্ভাবনা আছে। যদিও খুব একটা সিম্পটম দিচ্ছে না। আজই প্রথম ওর জর হলো ১০১, কোনো সর্দি নাই, বুক ব্যথা নাই, কিন্তু সুষ্ক একটা কাশির ভাব আছে। আজকাল করোনাও চালাক হয়ে গেছে। বিভিন্ন মানুষের শরীরে সে বিভিন্ন রুপে আসে। হতে পারে মিটুলের ক্ষুধামন্দা আর একটু জরই হচ্ছে পিজিটিভ হবার লক্ষন। ঘ্রান পায় যদিও করোনার রোগীর ঘ্রান থাকে না। একটু একটু করে খেতে পারে যদিও কোনো টেষ্ট পায় না সে খাবারের মধ্যে। দেখা যাক, আল্লাহ ভরষা।

০২/০৯/২০২০-শেফালীর জামাইর ইন্তেকাল

প্রায় দু মাস হলো নেওয়াজ আলী কুয়েত থেকে একেবারে দেশে ফিরে এসেছে। প্রায় ৩২ বছর দেশের বাইরে ছিলো। নেওয়াজ আলি আমার ভাগ্নী শেফালির হাসবেন্ড। সংক্ষিপ্ত আকারে এই নেওয়াজ আলীর ইতিহাসতা না বললেই চলে না।

তখন ১৯৮৭ সাল। আমি সবেমাত্র সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট পদে চাকুরী করছি। মাঝে মাঝে গ্রামে যাই, আগের মতো না। এম্নিতেই গ্রামে এখন আর আগের মতো যাওয়া হয় না, আবার গেলেও আগের মতো বন্ধু বান্ধবরাও খুব একটা ধারে কাছে নাই বিধায় আড্ডাও জমে না। একদিন মা জানালেন যে, শেফালীর তো বিয়ে দেয়া দরকার। শেফালীর জন্য কুমড়া বারীর নেওয়াজ আলী বিয়ের কথা বলছে। ব্যাপারটা ভেবে দেখিস। কুমড়া বাড়ির নেওয়াজ আলীর বাবা জলিল মোল্লাকে আমি মামা বলে ডাকি। তারা কততা আমাদের কাছের বা রক্তের সে হিসাবটা আমি জানি না, আজো না। তবে জলিল মামার বাড়িতে আমাদের অনেকগুলি সম্পর্ক কেমন করে জানি পাচিয়ে গেছে। আমার তিন নাম্বার বোন লায়লার বিয়ে হয়েছে এই কুমড়া বাড়িতে ইসমাইল ভাইয়ের সাথে। আমার মুসল্মানীর সময় দোস্তি হয়েছে নেওয়াজ আলীর ছোট ভাই মোতালেব বা মূর্তুজ আলির সাথে, অন্যদিকে জলিল মোল্লাকে আমরা আবার ডাকি মামা বলে। এখন আবার বিয়ের সম্পর্ক করতে চায় নেওয়াজ আলী আমাদের ভাগ্নি শেফালীর সাথে। একেকটা সম্পর্ক একেকতার সাথে পরস্পর বিরোধি। যদি জলিল মামাকে মামা বলে কেন্দ্র ধরি, তাহলে লায়লার বিয়ের জন্য জলিল মামাকে বলতে হয় ভাই বা বিয়াই। আবার লায়লার বিয়ের সম্পর্ককে যদি কেন্দ্র ধরি, তাহলে জলিল মামাকে আর মামাই বলা যায় না। আবার জলিল মামার পোলা মোতালেবের সাথে আমার দোস্তি পাতার কারনে জলিল মামা হয়ে যায় আমার খালু বা আংকেল। এখন যদি শেফালিকে নেওয়াজ আলীর সাথে বিয়ে দেই, এতোদিন যেই নেওয়ায়জ আলিকে আমি ভাই বলতাম, তাকে এখন আমার বলতে হবে জামাই বাবু আর নেওয়াজ আলি আমাকে বলা শুরু করবে "মামু"। অন্যদিকে আরেকটা ঘটনা প্রায় ঘটেই যাচ্ছিলো, সেটা না হয় নাইবা বললাম। এতো সব প্যাচালো একটা সম্পর্কের মধ্যে আমাকে এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে শেফালির বিয়ের ব্যাপারটা নেওয়াজ আলীর সাথে।

এবার আসি শেফালীর ব্যাপারে কিছু কথা। শেফালির মা শায়েস্তা খাতুনের প্রথম পক্ষের মেয়ে শেফালী। শেফালীর জন্মের পর শেফালীর বাবা তার দেশে যাওয়ার নাম করে সে আর ফিরে আসে নাই। কেনো ফিরে আসে নাই, আদৌ বেচে আছে কিনা, বা তার একেবারে নিরুদ্দেশ হবার কল্প কাহিনী আজো আমরা কেউ জানি না। শেফালী আমাদের বাড়িতেই বড় হতে লাগলো। শেফালীর মায়ের অন্য আরেক জায়গায় বিয়ে হয়ে গেলো। সেখানে লিয়াকত, শওকাত আর ফারুকের সাথে এক মেয়ে নুরুন্নাহার এর জন্ম হয়।  শেফালী আমাদের বাড়িতেই বাপ মা বিহিন আমার মায়ের কাছে বড় হতে লাগলো। এই ধরনের বাচ্চাদের বেলায় বিয়ে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা মামারা যারা গ্রামের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছি, তাদের বেলায় এটা অনেকতা উপকারই হয়। তারা এইসব বাচ্চাদের বেলায় মামাদেরকেই আসল গার্জিয়ান ভেবে সম্পর্ক করতে আগ্রহী হয়।

নেওয়াজ আলীর ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন। খুবই সুন্দর একতা ছেলে। কিন্তু অশিক্ষিত। দেশে কাজের কিছু নাই। বেকার। বিদেশ যাওয়ার একতা হিরিক পড়েছে। কিন্তু নেওয়াজ আলীদের বা জলি মোল্লার সামর্থ নাই যে, ছেলেকে বিদেশ পাঠায়। তাই, বিয়ের মাধ্যমে যদি কনে পক্ষ থেকে কিছু ক্যাশ নেওয়া যায়, তাহলে বিদেশ যাওয়ার জন্য একটা আশার পথ খোলে। ফলে শেফালি চেহারায় অনেক কালো হলেও টাকার কাছে এটা কোনো বিশয়ই ছিলো না। তাদের দাবী- ২০ হাজার টাকা দিতে হবে ক্যাশ, নেওয়াজ দেশের বাইরে চলে যাবে বিয়ের পর। দেশের বাইরে যেতে মোট টাকা লাগবে ৩০ হাজার, বাকী ১০ হাজার জলিল মোল্লা জোগাড় করবে। শেফালীর ভুত-ভবিষ্যত অনেক কিছু চিন্তা করে শেষ নাগাদ আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, শেফালীকে আমরা নেওয়াজ আলীর সাথেই বিয়ে দেবো এবং হাজার বিশেক টাকা সহই দেবো। সেই থেকে শেফালির হাজবেন্ড নেওয়াজ আলি জুয়েতেই ছিলো, মাঝে মাঝে দেশে এসছে। এর মধ্যে শেফালির তিন সন্তানের মা, নাফিজ, নাহিদ আর একটা মেয়ে।

নেওয়াজ আলীর প্রায় ৩২ বছরের বিদেশ থাকা অবস্থায় ওর স্বাস্থ্যের অনেক ক্ষতি হবার পাশাপাশি যে, পরিবারের অনেক উন্নতি হয়েছে সেটাও না। অবশেসে নেওয়াজ আলি গত ২ মাস আগে চুরান্তভবে দেশে চলে আসে। এখন তার বয়স প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। ওর বড় ছেলে নাফিজ জাপানে থাকে, ছোট ছেলে নাহিদ মাত্র মেট্রিক দেবে, মেয়ে আরো ছোট। দেশে আসার পর আমার সাথে নেওয়াজ আলীর দেখা হয় নাই। মানে নেওয়াজ আলীর সাথে আমার দেখা হয় নাই প্রায় কয়েক যুগ।

যাই হোক, দুদিন আগে জানতে পারলাম, ৭ বছর আগে নেওয়াজ আলীর যে বাইপাশ সার্জারী হয়েছিলো কুয়েতে, সেই বাইপাস সার্জারীতে আবার নাকি ব্লক। তাকে পুনরায় অপারেশন করাতে হবে। ৩২ বছর বিদেশ চাকুরী করার পরেও তাদের যে খুব একটা সঞ্চয় আছে সে রকমের কিছু না। হয়তো সব মিলে লাখ পাচেক টাকার একটা ক্যাশ ব্যালেন্স থাকলেও থাকতে পারে। গতকাল নেওয়াজ আলি বুকের ব্যথায় উঠানে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো, তড়িঘড়ি করে আজগর আলী হাসপাতালে আনা হয়। তারা নেওয়াজ আলীর ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলো যে, সে ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছে। রাখতে চায় নাই। অগত্যা আবার গ্রামে। আসলে মাথার উপর যখন কেউ থাকে না, আর যে মাথা হিসাবে থাকে, যখন তারই কোন বিপদ হয়, তখন সে থাকে সবচেয়ে অসহায় পজিশনে। নেওয়াজ আলীর অবস্থা অনেকটা এ রকমের। অসুস্থ্য শরীর নিয়ে একবার হাসপাতাল, আরেকবার গ্রামে, এই করতে করতেই সে আরো অসুস্থ্য

আজ সকালে আবারো নেওয়াজ আলিকে হাসপাতালে "বারডেম হাসপাতাল" নিয়ে আসা হয়েছে। হার্টের পেসেন্ট, কেনো যে বারডেমে আনা হয়েছে সেটাও আমি জানি না। আর কেনো জানি ব্যাপারটায় আমি জানতেও মন চায় নাই। আর জানতে না চাওয়ার পিছনেও একটা কারন ছিলো, যা এখন আর বলছি না। একটু আগে লিয়াকত (শেফালীর ভাই) ফোনে জানালো যে, সম্ভবত নেওয়াজ আলি বাচবে না। তার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। খরটা আমার কাছে অন্য দশটা খবরের মতোই মনে হয়েছিলো। তাড়াহুরা ছিলো না। আমার স্ত্রী মিটুলের শরীরটা অনেক খারাপ, তাকে নিয়ে ইবনে সিনায় গিয়েছিলাম, সেখান থেকে গিয়েছিলাম সি এম এইচে। ফেরার পথে আনুমানিক ২ তার দিকে লিয়াকত ফোনে জানাল যে, নেওয়াজ আলি আর নাই, মারা গেছে।

গ্রামে লাশ দাফনের জন্য যাওয়ার দরকার ছিলো, এটা একটা প্রোটকলের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমারো কোমড়ে একটু ব্যথা ছিলো বলে যেতে চাই নাই। আর কোমড়ে ব্যথা না থাকলেও হয়তো যাওয়া হতো কিনা আমার সন্দেহ আছে। মন যেতে চায় নাই।

শেফালি সম্ভবত কাদছে, ওর ছেলেমেরা কাদছে, এই কান্নাটা শুরু হয়েছে। আমি দোয়া করি ওদের যেনো কাদতে না হয় কিন্তু আমি জানি কান্নার ভাষা। আমি তো সেই ছোটবেলা থেকেই বাবা ছাড়া দুর্দশা জীবন থেকেই আজ এখানে এসেছি। তবে একতা বিষয় স্পষ্ট যে, যাদের মাথার উপরের বৃষ্টি অন্যের ছাতায় নিবারন হয়, তাদের উচিত না ওই ছাতাওয়ালা মানুষতাকে কোনোভাবেই ছাটার নীচে থাকতেই হিট করা। তাতে যে ছাতার আবরনটা সরে যেতে পারে এটা যখন কেউ বুঝে না, তখন ছাতাটা যখন সরে যায়, তখন ওই ছাতার মাহাত্য টা হারে হারে টের পাওয়া যায়। আমি হয়তো ওদের জন্য ওই ছাতা ওয়ালাই ছিলাম।

১৭/৮/২০২০-বাস্তবাদী আমি

আমি খুবই বাস্তব বাদী একজন মানুষ, আর আমি অনেক সহজেই যে কোনো  কিছুতেই হার, বিশেষ করে সেসব ব্যাপারে যেগুলিতে হেরে গেলে শুধুমাত্র আর্থিক কিছু ক্ষতি হয়, মেনে খুব সহজে মনের জোরে একটা সাভাবিক লাইফ চালানোর খাপ খেয়ে নিতে পারি। আমি সব সময় মনে করি, যেটা হয়, তার মধ্যেও নিশ্চয় ভালো কিছু তো আছেই। সময় ভালো হোক আর না হোক, সময় কেটেই যায়। নতুন সময় সামনে আসে। সেটাও কেটে যায়, আবার আরেকটা সময় সামনে আসে। আর প্রতিটা সময় সবার জন্যই কিছু না কিছু রেখেই যায়। এই রেখে যাওয়া সময়ের সাক্ষি একদিন ইতিহাস হয়ে যায়, আবার কারো কারো সময়ের এই ইতিহাস এমন কিছু দিয়ে যায় যা সারা জগতময় চারিদিকে অনেক লম্বা সময় ধরে ভেসেই ভেড়ায়।

তোমাদের বেলায় আমার ধারনা একেবারেই সচ্ছ। কারন তোমাদেরকে আমিই তিলে তিলে বড় করছি। তোমাদের অনেক আইডিয়া আমার থেকে জন্ম নেয়। তোমাদের অনেক পছন্দ আমার থেকে উতপত্তি। তোমরা ইচ্ছে করলেই আমার এই বলয় থেকে ছুটে যেতে পারো বটে কিন্তু তোমরা বাকী জীবনের সবকিছু আমার তৈরী ডাইস দিয়েই লাইফ চালাবে বা চালাইতে হবে। বারবার মনে হবে, যদি বাবা এখন আমার পাশে থাকতো। যদি আকাশ আমার হাত ধরে বলতো, এটা না, ওটা করো। তুমি নির্ধিধায় সেটাই করবে বা করতে। কারন আমার উপর তোমাদের বিশ্বাস শতভাগ।

আমি তোমাদেরকে যতোটা ভালোবাসি, তার থেকে বেশি সম্ভবত মায়া করি। মায়া হচ্ছে একটা বাড়ির মতো। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ যতো সুন্দরই হোক, অথবা ফাইভ স্টার হোটেল যতো ভালই হোক, সেটা আমার নিজের ঘর নয়। তার উপর মায়া জরাতে নেই। তাতে শুধু কষ্টই বাড়ে। নিজের হয় না। তাই চেক আউটের সময় অর্থাৎ ওখান থেকে বের হবার সময় মন খারাপ করা মানে নিজেকে বোকা মনে করা। কিন্তু নিজের ঘর, নিজের মানুষ যতো অসুন্দরি হোক কিংবা গরীব, সেটা আমার নিজের। তার থেকে চেক আউট করার সময় চোখের পানি পড়া মানেই মায়া।

তোমরা আমার লাউঞ্জ না, না কোনো ফাইভ স্টার হোটেল। তোমরা আমার নিজের ঘর। আমি এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ পছন্দ করি, ওখানে খেতে পছন্দ করি কিন্তু মায়ায় জরাই না। তোমাদেরকেও আমি ঠিক তাই মনে করি যে, তোমরা আমার একটা মায়া। তোমাদের থেকে চেকআউট করা আমার চোখে জল ছাড়া আর কিছুই না। আর আমি আমার চোখের জলকে ভয় পাই। যে চোখের জলকে ভয় পায়, সে এমন কোনো কাজ করে না যে, জল পড়বে। আমি জল চাই না। তোমরা আমার অনেক কাছের একটা বাড়ি। ইট পাথর দিয়ে দাড় করিয়ে দেয়া চারটা দেওয়াল মানেই কিন্তু বাড়ি নয়। সেটা শুধুমাত্র ঘর। আর সেই ঘরকে বাড়ি বানায় তাতে বসবাস করা হাসি খুশী পরিবার। এমন একটা পরিবার যারা একে অপরকে ভালোবাসে। ভরষা করে। আর এই বাড়ির প্রধান ফটক টা হচ্ছি আমি নিজে যেখান দিয়ে কোন অশুভ শক্তি যেমন প্রবেশ হতে দেই না আবার তেমনি বাড়িত শান্তি বিনষ্ট কারী কোনো উপাদানকেও আমি বাড়ির চারপাশে রাখার কোনো অনুমতি দেই না। 

আমি কারারক্ষীর মতো সর্বদা সজাক, আর এটা শুধু তোমাদের জন্য। 

১০/০৬/২০২০-দুদু মিয়ার ইন্তেকাল

আমি অফিসে বসে ছিলাম। কাজের চাপ ছিলো বটে কিন্তু তারপরেও কাজের চাপ কমে এসেছিলো দুপুরের দিকে। ফ্যাক্টরীর সেলারী দিতে হবে, কাজ প্রায় সম্পন্ন। কফি পান করছিলাম। এমন সময় বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে মিটুল (আমার স্ত্রী) ফোন করলো। ফোন ধরলাম, তার কন্ঠ উৎকণ্ঠায় ভরপুর।

-শুনছো?

-কি শুনবো?

-আরে, ফাতেমা আপার জামাই দুদু ভাই মারা গেছেন।

-বললাম, কখন?

-এইমাত্র ওনার মেয়ে খালেদা জানালো যে, ওর বাবা মারা গেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

খারাপ লাগলো। কারন গতকালও আমি ওনার সাথে ফোনে কথা বলেছিলাম। বলেছিলো যে, ওনার শরীরটা বেশী ভালো নাই। অথচ আজকে ২৪ ঘন্টা পার হয় নাই, লোকটা আর এই প্রিথিবীতেই জীবন্ত নয়। এটাই জীবন। যার কোনো স্ট্যাবিলিটি নাই। কখন উনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সেতাও জানি না, আবার কেনো ভর্তি হয়েছিল সেতাও জানি না। দুদু ভাই হার্টের স্ট্রোকের কারনে মারা গেছেন বলে ডাক্তার জানিয়েছে।

দুদু ভাই আর ফাতেমার গল্পটা বলি।

১৯৭৬ সাল। আমি তখন গ্রামে। গ্রামের স্কুলেই লেখাপড়া করি। দেশের অবস্থা বেশ খারাপ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ, কোনো আইন শৃঙ্খলা নাই, তার মধ্যে কয়েকদিন আগে শেখ মুজিব, যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, তাকে সামরিক অভ্যুথানে খুন করা হয়েছে। গ্রামের অনেক লোক বেকার, যে যেভাবে পারে কোনো রকমে দিন চালাচ্ছে। আমরা ৫ বোন আর মা এবং আমি। আমাদের সংসার যার প্রধান মানুষ আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ। তিনিও সাবলম্বি নন, স্টুডেন্ট থেকে সবেমাত্র ঢাকা ইউনিব্ররসিটিতে লেকচারার হিসাবে যোগ দিয়েছেন। কোনো রকমে আমাদের সংসার চলে। বাড়িতে এতোগুলি বোন আর আমি তো সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ি, এরকম একটা থমথমে দেশের পরিবেশে ভাইয়ার উপর লোড কম নয়। একদিকে নিরাপত্তা, আরেকদিকে জীবন ধারনের যুদ্ধ। হাবীব ভাই নিজেও তার ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিদেশে যাবেন বলে পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু বোনদের বিয়ে না দেয়া পর্যন্ত তার এই পরিকল্পনায় অনেক কঠিন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছিলো।

এই সময় দুদু ভাই প্রেমে পড়লেন আমার ৪র্থ বোন ফাতেমার সাথে। গ্রামে ওই সময় প্রেম করা একটা যেমন জঘন্য ব্যাপার বলে মনে করা হতো, তেমনি যারা প্রেম করছেন, তারাও অনেক অসুবিধায় থাকতেন। মনের তীব্র ইচ্ছা দেখা করার কিন্তু না আছে সুযোগ না আছে কোনো অনুমতি। ফলে চিরকুট, চিঠি ইত্যাদি দিয়ে যতোটুকু রোমাঞ্চ করা যায় সেটাই ছিল একমাত্র ভরষা। আমার ৩য় বোন লায়লার বিয়ে হয়ে গেছে, ১ম বোন সাফিয়ার বিয়ে ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। তার প্রথম স্বামী গত হয়েছেন। আমার মা, ফাতেমা আর দুদু মিয়ার প্রেমের এই গল্পটা ভাইয়ার কাছে একেবারেই গোপন করে রাখলেন। মায়েরও অনেক চিন্তা ছিলো তার মেয়েরদের জন্য ভালো পাত্রের ব্যাপারে।

দুদু ভাই তখন ফুটন্ত যুবক। দেখতে খুবই সুদর্শন আর স্মার্ট। বেকার ছেলে কিন্তু তার বাবার একটা মনোহরী দোকান ছিলো। তিনি হাপানীতে ভোগেন প্রায়ই। ফলে সবসময় বাজারের দিনে তিনি ঠিকমতো বাজারে গিয়ে পসরা বসাতে পারেন না। এই সুযোগে দুদু ভাই তার বাবার ব্যবসাটা দেখভাল করেন।

সময়টা ছিলো বর্ষাকাল। আমাদের গ্রামে বর্ষাকালে হাটে বাজারে যাওয়ার জন্য প্রতিটি গ্রাম থেকে নৌকা বা কোষা লাগতোই কারন বর্ষাকালে গ্রামের একদম কিনার পর্যন্ত পানিতে ভরপুর থাকতো। আমাদের নিজস্ব কোনো নৌকা বা কোষা নাই। ফলে যখনই কোনো নৌকা বা কোষা আমাদের বাড়ির পাশ দিয়া বাজারে যেতো, আমি ওইসব নৌকা বা কোষায় অনুরোধের ভিত্তিতে উঠে যেতাম। দুদু ভাইদের যেহেতু দোকানের অনেক মাল নিয়ে হাটে, বাজারে যেতে হয় পসরা সাজানোর জন্য, ফলে তাদের একটা নিজস্ব নৌকা ছিলো। ঘোষকান্দা থেকে বিবির বাজারে যেতে হলে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতে হয়। ফলে দুদু ভাইদের নৌকা করেই আমি বেশীর ভাগ সময় হাটের দিন আমি হাটে যেতাম। আর দুদু ভাই যেহেতু ফাতেমার সাথে একটু ভাব আছে, তিনিও চাইতেন যেনো কোনো ছলেবলে তার নৌকা আমাদের ঘাটে ভিরুক। তাতে হয়তো কখনো কখনো ফাতেমার সাথে দুদু মিয়ার ক্ষনিকের জন্য হলেও চোখাচোখি হয়। এটাই প্রেম। এভাবে অনেকদিন চলে যায়।

মা একদিন হাবিব ভাইকে ব্যাপারটা খুলে বলেন। আমি ঠিক জানিনা কেনো বা কি কারনে হাবীব ভাই দুদু ভাইদের পরিবারটাকে পছন্দ করতেন না, সে রহস্য আজো আমার কাছে অজানা। হাবীব ভাই ফাতেমার সাথে দুদু মিয়ার বিয়েতে কিছুতেই রাজী ছিলেন না। কিন্তু মায়ের জোরাজোরিতে এবং ফাতেমার প্রবল ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত হাবীব ভাই এই বিয়েতে রাজী হলেন। আমার ধারনা, হাবীব ভাই আরেকটা কারনে তিনি রাজী হয়েছিলেন, আর সেটা হচ্ছে, যেহেতু হাবিব ভাই নিজেও ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে চান, এবং তার আগে সব বোনদের বিয়ের ব্যাপারটা নিসচিত করতে চান, ফলে যেমনই হোক, ফাতেমার একটা গতি হচ্ছে এটা ভেবেও দুদু মিয়ার সাথে বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশী বাড়াবাড়ি করেন নাই। কিন্তু তিনি যে নিমরাজী এটা ভালভাবেই হাবিব ভাই প্রকাশ করতে পেরেছিলেন।

অন্যদিকে দুদু মিয়ার খুব একটা মনোযোগ ছিলো না কোনো কাজেই। না বাবার ব্যবসা, না অন্য কিছুতে। ফলে দুদু মিয়ার বাবাও এই মুহুর্তে সে বিয়ে করুক এটাও রাজী ছিলেন না। আরো একটা কারন ছিলো দুদু মিয়ার বাবার এই বিয়েতে রাজী না হবার। আর সেটা হচ্ছে যে, আমাদেরর গ্রামে সব সময়ই ছেলেরা যখন বিয়ে করে, তখন তারা নির্লজ্জের মতো কনে পক্ষ থেকে মোটা দাগে একটা যৌতুক দাবী করে এবং পায়ও। দুদুর বাবাও এ রকমের একটা পন আদায়ের লক্ষে ছিলেন কিন্তু হাবিব ভাইয়ের এক কথা, কোনো যৌতুক দিয়ে আমরা বোনের বিয়ে দেবো না। ফলে দুদু ভাইয়ের বাবারও এই বিয়েতে মতামত ছিলো না। অথচ শেষ পর্যন্ত বিয়েতা হয়েছিলো। দুদু মিয়ার এক্ষেত্রে আমি একটা ধন্যবাদ দেই যে, সে তার বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েও অনড় ছিলো যে, যৌতুক বা পন বুঝি না, আমি ফাতেমাকেই বিয়ে করবো। গ্রামে এ ধরনের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্তের বড় অভাব। কিন্তু দুদুর মধ্যে এই সাহসটা ছিলো। ফলে ফাতেমার সাথে দুদুর বিয়ে হলো ঠিকই কিন্তু তার বাবা, বা মা, কিংবা অন্যান্য আত্তীয় সজনেরা এই বিয়েটায় তারা লস করেছে বলে ধরে নিয়েছে। আর এই লসের কারন ফাতেমা। এতে যা ঘটলো তা হচ্ছে, ফাতেমাকে শসুড়বাড়ির অনেক বিড়ম্বনার মুখুমুখি হতে হয়েছে। বিয়েটাকেই টিকিয়ে রাখা কষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো ফাতেমার। কিন্তু আমি আজ দুদু মিয়াকে অনেক ধন্যবাদ দেই যে, যদি দুদু মিয়া বলিষ্ঠ না হতো, তাহলে ফাতেমার পক্ষে ওই বাড়িতে টিকে থাকা সম্ভব হতো না। একটা সময় ছিলো যে, দুদু মিয়া শুধুমাত্র ফাতেমার কারনে তাকে তার পৈত্রিক বাড়ি থেকে উৎখাত হতে হয়েছিলো। আর তখন ফাতেমা আর দুদু মিয়া আমাদের গ্রামের বাড়িতেই থাকা শুরু করেছিলো। এই থাকা অবস্থায় ফাতেমার সব সন্তানদের জন্ম হয়।

দেশের ক্রমবর্তমান খারাপের কারনে দেশে কোনো কাজ নাই। এদিকে দুদুর বাবার ব্যবসাটাও আর তার হাতে নাই। আমাদের গ্রামে তখন দলে দলে লোকজন দেশের বাইরে যাবার হিরিক পড়েছে। কেউ সৌদি, কেউ কুয়েত, কেউ লিবিয়া, কেউ ইতালি আবার কেউ কেউ যেখানে পারে সেখানে। দুদু ভাইও সে লাইনে পড়ে গেলো। বেশ টাকার প্রয়োজন, অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। দুদু ভাই নিজের বাবাকে পটিয়ে, কিছু আমাদের থেকে আবার কিছু লোন নিয়ে শেষ অবধি সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলেন। পিছনে রেখে গেলো ফাতেমাকে, তার ছেলে ফরিদকে, মেয়ে সালেহা, খালেদা আর ছেলে কামাল এবং জামালকে।

কিন্তু যে লোক আরাম প্রিয়, ভারী কাজে অভ্যস্থ নয়, তার পক্ষে ওই সৌদি আরবের গরম বালুর জমিনে, গরু মহিষ চড়ানো কিছুতেই ভাল লাগার কথা নয়। তারমধ্যে এম্নিতেই সৌদি লোকজন ৩য় দেশের বিশেষ করে বাংলাদেশের শ্রমিকদেরকে মিসকিন হিসাবে ট্রিট করে। দুদু মিয়া স্বাধীনচেতা মানুষ, আরামপ্রিয় মানুষ, তার কত টাকা ক্ষতি হলো বা ক্ষতি হচ্ছে এসবের কোন বালাই ছিলো না। তিন মাস না যেতে যেতেই দুদু মিয়া পুনরায় বাংলাদেশে চলে এলেন। এই ঘটনায় দুদু মিয়ার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেলো। যেটুকু ভরশা তার বাবা তার উপর করেছিল এবং কিছু লাভের আশায় যে কয়টা টাকা দিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছিলো, পুরুটাই গচ্চা যাওয়ায় দুদু মিয়ার বাবা এবার তাকে মুটামুটি ত্যাজ্য করার মতো অবস্থায় চলে গেলো। দুদু মিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হলো, আর দুদু মিয়া কোথাও কোনো জায়গা না পাওয়ায় আমাদের গ্রামের বাড়িতেই স্থায়িভাবে উঠে গেলো।

আমাদের বাড়িটা বড়ই ছিলো। আর যেহেতু মা থাকেন, ফলে আমরা আপাতত মাকে দেখভাল করার জন্য যে একজন লোকের দরকার ছিলো সেটা অন্তত পেলাম। ফাতেমাই মার দেখভাল করেন। মার খাওয়া দাওয়ার খরচ আমরাই দেই কিন্তু ফাতেমা আমাদের বাড়িতে থাকায় মার কখন কি লাগবে, সেটায় ফাতেমাই টেককেয়ার করে। কিন্তু সংসার চালানোর জন্য তো ফাতেমার একটা স্থায়ী সোর্স থাকা দরকার। কখনো আমরা কিছু সাহাজ্য করি, কখনোও দুদু মিয়াও কোথা থেকে কিভাবে টাকা আনে আমরা জানিও না। শুনলাম, দুদু মিয়া একটা আদম ব্যবসা খুলেছে। মানে লোকজনকে বিদেশ পাঠানো। তার সাথে আমাদের গ্রামের একজন লোক পার্টনার হিসাবে আছে। প্রথম প্রথম মনে হলো ব্যবসাটা ভালোই চলছে। কিছু কিছু লোকজনকে তো দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে। আবার নতুন লোকের লাইন হচ্ছে, টাকা আসছে। কিন্তু সুখ তার বেশীদিন টিকে নাই। আদম ব্যবসা যারা করেছে, সব সময় এটায় কোনো না কোনো দুই নম্বরী কিছু ছিলোই। কেউ হয়তো সাফল্য পেয়ে তাদের মাধ্যমে বিদেশ চলে যেতে পারছে আবার কেউ মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও বিদেশ যেতে পারছিলো না অথচ টাকা পরিশোধ করা আছে। এ রকম করতে করতে প্রায় অনেক বছর কেটে গিয়েছিলো। পাওনাদাররা এসে ঝামেলা করে, থ্রেট দেয়, ফাতেমাকে পর্যন্ত শাসিয়ে যায়, মামলা করে, আবার কেমন করে যেনো এসব ঝামেলা থেকে দুদু মিয়া পারও পেয়ে যায়।

আমি তখন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। এ রকমের বহু কেস আমার কাছেও এসেছে। কিন্তু সমাধা করতে গিয়ে দেখেছি, দোষটা এই আদম ব্যবসা কোম্পানীর, সাথে দুদু ভাইদের। আমার পক্ষে আনইথিক্যাল করা কিছু সম্ভব হয় নাই বটে কিন্তু আমি সেনাবাহিনীতে আছি এই নাম ভাংগিয়ে দুদু ভাই এবং তার পার্টনার অনেক ফায়দা তো অবশ্যই নিয়েছেন। আমি কখনো এসব নিয়ে না মাথা ঘামিয়েছি না কেউ এলে আমি তার পক্ষে বিপক্ষে কোনো একসানে গিয়েছি।

দুদু ভাইয়ের সন্তানেরা ততোদিনে বড় হয়ে গেছে। বড় ছেলে ফরিদ খুব হিসেবি। নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করছে কিন্তু খুটিতে জোর না থাকলে সব সন্তানের ভাগ্য অতোটা বেড়ে উঠে না যতোটা তার প্রাপ্য। কিন্তু আমি ফরিদের উপর অনেক সহানুভুতিশীল ছিলাম। আমারো ওই রকম ইনকাম নাই যে, যা লাগে সাপোর্ট করতে পারি। ফরিদের গল্পটা পড়ে লিখবো।

দুদু ভাই যতোটা কামাই করে নিজের পরিবারকে সাহাজ্য করতে চান, দেখা গেলো, তার থেকে বেশী ঝামেলায় পড়ে আরো বেশী ক্ষতিপুরন দিতে হচ্ছে। হাত খোলা লোক। যখন টাকা আসে, মনে হয় কতোক্ষনে টাকাটা খরচ করবে। কিন্তু যখন থাকে না, তখন গোল্ডলিফ বা বেনসন সিগারেটের পরিবর্তে স্টার সিগারেটও তিনি খেতে পারেন। লোকটার কথায় আশ্বাস পাওয়া যায় কিন্তু সেই আশ্বাস কতোটা নির্ভরযোগ্য, সেটা অনেকবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে দেখা গেছে। ফলে, একটা সময়ে, তার সন্তানেরা, তার স্ত্রী ফাতেমা সাফ বলে দিয়েছিলো যে, তার কোনো রোজগারের দরকার নাই, শুধু ঝামেলার কোনো কাজে না গেলেই হলো। এভাবেই দুদু ভাই সংসার দেখে, ফরিদ বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়, আরো এক ছেলে কামালও কুয়েতে থাকে, সেও পাঠায়। তারা ভালোই ছিলো। হজ্জ করেছে, গ্রামে তার একটা পজিশন তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলো শেষ বয়সে হলেও।

আসলে, মানুষ যখন একা একা অনেক বড় প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে নিজেকে বাচাতে হয়, তখন অনেক সময় কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়, কোনটা করা উচিত আর কোনটা করা উচিত না, এই বিচারে আর যাই চলুক জীবন চলে না। কেউ নিজের থেকে খারাপ কিংবা বদনাম কুড়াতে চায় না। বেশীরভাগ মানুষ পরিস্থিতির শিকার। দুদু ভাই খারাপ লোক ছিলেন না। তার অন্তর বড় ছিলো, তার প্রতিভা ছিল। কিন্তু গরীবের ঘরে সবসময় প্রতিভা আলোকিত হয় না। এটা সেই ফুটন্ত ফুলের মতো, পরাগায়ন না হবার কারনে অকালেই ফল হয়ে না উঠে ঝরে যাওয়ার কাহিনী। এটা কার দোষ? দুদু ভাইয়ের নাকি তার পরিবারের নাকি আমাদের এই ভারসাম্যহীন সমাজের?

অনেক লম্বা একটা সময় দুদু ভাই ছিলো আমাদের সাথে। অনেক রাগ করেছি, বকা দিয়েছি, মাঝে মাঝে আবার ভালোবাসায় আগলেও রেখেছি। আজ প্রায় ৭০ বছর বয়সে এসে দুদু ভাই সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। উনার লাশটা যখন আমার ফ্যাক্টরীর সামনে এসে থামলো, একটা লাশবাহী গাড়িতে কাপড়ে মোড়ানো ছিল দুদু ভাই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাশ গ্রামে নিয়ে যাবার সময় আমি তার ছেলে জামাল এবং ভাতিজা আরশাদকে বলেছিলাম যেনো ফ্যাক্টরীর সামনে থামায়। কিছু খরচাপাতি ব্যাপার আছে, যাওয়ার সময় ওদের হাতে তুলে দেবো। কারন এই মুহুর্তে এটা খুব দরকার।

দুদু ভাই অনেকবার আমার এই ফ্যাক্টরিতে এসেছিলেন। খাওয়া দাওয়া করেছে আমার সাথে, হেটে হেটে ঘুরে ঘুরে দেখেছে আমার ফ্যাক্টরি। গত মার্চ মাসেও একবার আমার এই ফ্যাক্টরীতে এসেছিলো খালেদাকে নিয়ে, মিজান (খালেদার জামাই) ছিলো, মিজানের আব্বা, মিজানের চাচা এবং জেঠারা ছিলো। খালেদা ছিলো, জামাল ছিল। একসাথে খেয়েছি। অথচ আজ, দুদু ভাইয়ের কোনো ক্ষমতা নাই লাশবাহী গাড়ি থেকে নেমে আমার সাথে একবার দেখা করেন, তার কোনো শক্তি নাই আরো একবার আমার ফ্যাক্টরীর নতুন মেশিনগুলি হেটে হেটে ঘুরে ঘুরে দেখার। তার এই দুনিয়ার সাথে সমস্ত নেটওয়ার্ক ছিন্ন করা হয়েছে। এই পৃথিবীতে তারজন্য আর কোনো অক্সিজেন বরাদ্ধ নাই, তার পায়ের শক্তি রহিত করা হয়েছে, তিনি আর এই বাজ্যিক পৃথিবীর কেউ নন। উনাকে আমরাও আর আটকিয়ে রাখার কোনো ক্ষমতা নাই, রাখাও যাবে না। লাশবাহী গাড়িটার সামনে গিয়ে দাড়ালাম, দুদু ভাই সাদা একটা কাপড়ের ভিতর একটা জড়ো পদার্থের মতো শুয়ে আছেন গাড়ির সিটের নীচে। যে লোকের জীবন্ত অবস্থায় সিট বরাদ্ধ ছিলো, আজ তার স্থান গাড়ির সিটের নীচে। এটাই জীবন। লাশবাহী গাড়ি চলে গেলো গ্রামের পথে।

তার বড় ছেলে ফরিদের সাথে কথা হল। ফরিদ জাপানে থাকে। বর্তমানে করোনার মহামারী চলছে সারা দুনিয়াব্যাপি। জাপানের সাথে এই মুহুর্তে আমাদের দেশের বিমান চলাচল সাময়ীকভাবে বন্ধ আছে। কিন্তু যদি কেহ আসতে চায়, তাহলে ইন্ডিয়া হয়ে হয়তো আসা যাবে। ফরিদ তার বাবাকে দেখতে ঢাকায় আসতে চাচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হল, এটা ঠিক হবে না। কারন কোনো কারনে যদি ফরিদ ঢাকায় চলে আসতেও পারে, বলা যায় না, করোনার মহামারীর কারনে বাংলাদেশ সরকার বিদেশ ফেরত যাত্রী হিসাবে ফরিদকে ১৫ দিনের কোয়ারেন্টাইন করে ফেললে ফরিদের পক্ষে আরো ১৫ দিন গ্রামেই আসা হবে না। আর যদি লাশকে এখন আবার ঢাকায় কোনো হাসপাতালে মর্গে রাখতেও যায়, দেখা যাবে কোনো হাসপাতাল সেটা নাও রাখতে পারে। আবার যদি লাশ রাখাও যায়, ফরিদকে কোনোভাবে এয়ারপর্ট থেকে কোয়ারেন্টাইন ছারাও গ্রামে আনা যায়, তাহলে ফরিদের জাপানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারেও একটা করাকড়ি থাকতে পারে। আবার এই মুহুর্তে আগামী ৩ দিনের মধ্যে কোনো ফ্লাইটও নাই। সব মিলিয়ে আমি ফরিদকে ঢাকায় আসতে বারন করে দিলাম। ফরিদের না আসার সিদ্ধান্তটা যখন কনফার্ম করা হলো, আমি গ্রামের উদ্ধেশ্যে রওয়ানা হলাম দুদু ভাইকে কবর দেওয়ার জন্য। আমি যখন গ্রামে পৌঁছলাম, তখন রাত প্রায় পৌনে আটটা। গ্রামে ফাতেমাকে দেখলাম, ওর অন্যান্য সন্তানদের সাথে কথা বললাম। সবার মন খারাপ, কান্নাকাটি করছে। দুদু ভাইয়ের লাশ ঘিরে অনেক মানুষ উঠানে খাটিয়ার পাশে জড়ো হয়ে বসে আছে।

জন্ম আর মৃত্যুর মধ্যে একটা ভীষন মিল আছে। জন্মের সময়ে নতুন অতিথির চারিদিকে যেমন বাড়ির সবাই বসে হাসিমুখে বরন করে নেয়। এই নতুন অতিথির আগমনে যেমন সবাই বাড়িভর্তি মানুষের ভীড় লেগে যায়, ঠিক তেমনি মৃত্যুর সময়েও বাড়িভর্তি মানুষের ভীড় জমে যায়। কিন্তু এ সময়ে সবাই থাকে ভারাক্রান্ত আর শোক বিহব্বল।

আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন, রাত বেড়ে যাচ্ছে, কবর এখনো খোড়া শেষ হয় নাই। রাতে এশার নামাজের পর জানাজা হবে। এশার নামাজ হবে রাত নয়টায়। ফরিদের শ্বশুর মোল্লা কাকা বাকী সব সামলাচ্ছেন। গোসল, কাফন আর যাবতীয় সব। মাঝে মাঝেই কেউ কেউ উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করছে। কেউ কাদতেছে কাদতে হবে বলে। ফলে উচ্চস্বরেই সে তার সেই বিলাপ লোক সম্মুখে জাহির করার অভিনয়ে এটাই বুঝাতে চাইছে, দুদু মিয়ার শোকে সে এতোটাই বিহব্বল যে, তার বুক ফাটছে, তার অন্তর কাদছে ইত্যাদি। কিন্তু আমার চোখে এই মিথ্যা কান্নাটা ধরা পড়েছে। কিন্তু তারপরেও কাদুক। আবার কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলছে, তার এই কান্না অন্তরের ভিতর থেকে। নিঃশব্দ কান্নার কষ্ট হাহাকার করে কান্নার থেকেও অধিক কষ্টের।

ফাতেমা কাদছে নিঃশব্দে, আমাকে দেখে একটু উচ্চস্বরে কান্নার উপক্রম হয়েছিলো, বুঝলাম আবেগ। হবেই তো। নিজের লাইফ পার্টনার চলে গেছে। খারাপ হোক ভালো হোক, একজন লোকতো ছিল যার সাথে অভিমান করা যায়, যার কাছে অভিযোগ করা যায়। আজ সে চলে গেছে। প্রায় ৪৪ বছরের পার্টনারশীপ লাইফে কত কথাই না লুকিয়ে আছে ফাতেমার জীবনে। এই সংসার গুছাইতে কতই না সময় ব্যয় করেছে ওরা।

বললাম ফাতেমাকে- আজ তুমি একা কিন্তু একা নও। আমরা তো আজীবনই ছিলাম, এখনো আছি। নিজের উপর যত্ন নিও, আর কখনো ভেবো না যে, তুমি একা হয়ে গেছো। ভাই আর বোনের সাথে তো নাড়ির সম্পর্ক। তুমি ভাল থাকবা, মনের জোর রাখো আর দোয়া করো এইমাত্র চলে যাওয়া মানুষটার জন্য যার সাথে তুমি নির্দিধায় অন্ধকারেও হাতে হাত ধরে রাস্তা পার হতে পেরেছিলা। আজ তোমার দোয়া তার জন্যে সবচেয়ে বেশী দরকার। মনটা আমারো খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো ফাতেমার চোখের জল দেখে। আজ অনেকদিন পর সেই কথাটা মনে পড়লো-

যদি কখনো তোমার কাদতে ইচ্ছে করে, আমাকে ডেকো,

আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমাকে হাসাতে চেষ্টাও করবো না।

কিন্তু আমি তোমার সাথে কাদতে পারবো।

যদি কখনো তোমার কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, আমাকে ডেকো

আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমাকে একটুও বাধা দেবো না

কিন্তু আমি তো তোমার সাথে হারিয়ে যেতে পারবো।

যদি কখনো তোমার কারো কথাই শুনতে ইচ্ছে না করে, আমাকে ডেকো

আমি ওয়াদা করছি, আমি তোমার সাথে কোনো কথা বল্বো না, নিসচুপ থাকবো।

কিন্তু কখনো যদি তুমি আমাকে ডেকেছো কিন্তু আমার কাছ থেকে কোন সাড়া পাও নাই,

তুমি এসো                            

হয়তো সেদিন সত্যিই তোমাকে আমার প্রয়োজন।

ফিরে এলাম। জানাজায় শরীক হতে পারি নাই। অনেক রাত হয়ে যাবে। আর সারাটা বাড়িতে এতো বড় করোনার মহামারী সত্তেও কারো মুখে মাস্ক নাই। খুব অসস্থি বোধ করছিলাম।

গাড়িতে উঠে বারবার দুদু ভাইয়ের কথাই মনে পড়ছিল। আজ থেকে আমি ইচ্ছে করলেও তার মোবাইল নাম্বারে ফোন করে কথা বলতে পারবো না। ইচ্ছে করলেও কোনো কারনে বকাও দিতে পারবো না। তিনি আজ সব কিছুর উর্ধে।  

আমরা তার কাছেই ফিরে যাবো যার কাছ থেকে এসেছিলাম। আজ থেকে ৫০ বছর কিংবা ১০০ বছর পর হয়তো কেউ জানবেও না, দুদু নামে কোনো একজন আজ তিরোধান হলো। এই তিরোধানের প্রাকটিস যুগে যুগে সব সময় হয়ে এসেছে, হবেও। আমরা সময়ের স্রোতে একে একে হারিয়ে যাবো। কারন আজ থেকে শত বর্ষ আগেও এখানে এমন দুদু, এমন আখতার, এমন ফাতেমারা এসেছিলো। আজ তারা কেহই নাই। তাদের কোনো ইতিসাহও কোথাও লিখা নাই। আর যেখানে লিখা আছে, তা ঈশ্বরের কাছে। সেখানে আমাদের কোনো পদচারনা নাই।

আল্লাহ আপনার জন্য জান্নাত বরাদ্ধ করুন।

৮/৯/২০১৯-সারপ্রাইজটা অনেক বেশী

সারপ্রাইজটা অনেক বেশী হয়ে গেলো।কি সেই সারপ্রাইজ, আর  কিভাবে হলো সেটাই বলছি।

সকাল বেলায় নাস্তা করার সময় মেয়ে আর বউ দুজনেই বল্লো, হ্যাপি বার্থ ডে।

মনে পড়লো, ও আজ আমার বার্থডে।

আমি কখনো আমার নিজের বার্থ ডে ঘটা করে পালন করি নাই। আর করার মতো পরিবেশও আসলে ছিলো না। এই মেয়েরা শখ করে, ফলে কখনো কখনো মেয়েদের চাপে পড়েই ইদানিং জন্ম দিনটা পালন হয়। কখনো ঘরোয়া ভাবে, কখনো একেবারেই নিজেরা, আবার কখনো কখনো সবাই মিলে। ফলে আমার জন্মদিন নিয়া আমি খুব একটা উচ্ছসিত থাকি না। সম্রাট আকবরের কিংবা নেপোলিয়ানের জন্ম তারিখ পরীক্ষার খাতায় ভুল করলে সেটা শুধু নম্বরের উপর দিয়েই যাবে, ঘরে শান্তি নষ্ট হবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু আমি ভুলেও আমার মেয়েদের বা বউ এর জন্মদিন ভুলি না। বুদ্ধিমান স্বামীরা এইটা ভুল করার কথা না। করলেই অনেক কথা শুনার একটা রাস্তা তৈরী হয়ে যায়, অশান্তি আসার সম্ভাবনা থাকে। ওনাদের জন্মদিন পালন না করুন, অন্তত সকালে উঠে সবার আগে বলা চাই, বউ হলে হ্যাপি বার্থ ডে জানু,, আর মেয়েদের বেলায় "হ্যাপি বার্থ ডে মা" ইত্যাদি।

যাক, যা বলছিলাম।

ঘুম থেকে উঠেই আমি সাধারনত মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি রাতে কেউ ফোন দিলো কিনা, বা কেউ ফোনে না পেয়ে ম্যাসেজ দিলো কিনা। এটাও তাঁর কোনো ব্যত্যয় হলো না। আমার রোজকার অভ্যাস। আজকে মোবাইল হাতে নিতেই দেখি অনেকগুলি ম্যাসেজ। কিছু রোটারীর বড় বড় হোমড়া চোমড়াদের অত্যান্ত চমৎকার মেসেজ। কিছু আছে ব্যাংকের তরফ থেকে। আবার কিছু আছে সার্ভিস সেন্টার গুলি থেকে। প্রায় সব গুলিই কমার্শিয়াল। খুব একটা পুলকিত হবার মতো না এইসব মেসেজে। তারপরেও খারাপ লাগে না। গালি তো আর দেয় নাই। শুভেচ্ছা দিছে।

দেখলাম, প্রথম মেসেজটাই আমার বড় মেয়ের। রাত ১২০১ মিনিটে পাঠিয়েছে। আমাকে জন্মদিনের উইশ করে চমৎকার একটা ম্যাসেজ। "Happy Birth day, my Super Hero, Dad. You are the best example of a father and all the moments I have lived with you is unforgottenable. With each passing year, I wish your happiness become double. I wonder if you know how much I love you. I  may not tell you enough but I do love you from my heart to infinity and beyond. Happy birthday Abbu. এতো চমৎকার করে বলা, সেটা যেনো হৃদয় ছুয়ে যায়। মুচকি হেসে দিলাম। সকালতাই যেনো কেমন মিষ্টি মনে হলো।

এতো বছর পরে এসে এখন আমার যদিও আর সেই ছোট বেলার মতো জন্মদিন, কিংবা এই জাতীয় কোনো কিছু আর উচ্ছাসিত করে না। তারপরেও মেয়েদের এই রকম অন্তরস্পর্শী মেসেজ মনকে বড় উতালা করে তোলে। পরিবার তখন মনে হয় আমার সবচেয়ে আনন্দের একটি জায়গা। তখন দিনটাকে আর নিছক অন্যান্য দিনের মতো মনে হয় না। যদিও অনেক সময় মনে হয়, ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েরা এগুলা নিয়ে বেশ মজা পায়, সেলিব্রেট করে, একটা ফানডে করে, কিন্তু এটা সব সময় সত্য যে, আমাদের সারা বছরের ব্যস্ত দিন গুলির ফাক ফোকর দিয়ে এইসব ছোট খাট বিষয় নিয়ে পরিবারে একটা গেট টুগেদার তো হয়। একদিক দিয়ে খারাপ না। অনেকেই আবার ধর্মের দোহাই দিয়ে এইসব করা নাজায়েজ বলে কথাও বলেন। আমি ধর্মের বিষয়টা এখানে কোনোভাবেই আলোকপাত করতে চাই না। এতা যার যার ব্যাপার।

যাক যেটা বলছিলাম, আমার জন্মবার্ষিকির কথা।

বউ এর হ্যাপি বার্থ ডে বলার উপলক্ষে বউকে বললাম, আরে, এখন কি আর সেই চমক আছে যে, জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি করার? তাঁর মধ্যে বড় মেয়ে বগুড়ায়, ছোট মেয়ের সামনে পরীক্ষা। তোমার আবার কলেজ থাকে। সব মিলিয়ে সবাই তো ব্যস্তই থাকি। কি দরকার খামাখা আবার একটা ঝামেলা করার।

তারপরেও বউ বল্লো, আরে, চলে এসো একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে। রাতে বাইরে আমরা আমরাই কোথাও ঘুরতে যাবো, খেয়ে রাতে বাসায় ফিরবো। সময়টা হয়তো ভালই যাবে। একটা ব্যতিক্রম দিন যাবে। ভাবলাম, ঠিক আছে, এই উপলক্ষে না হয় একটু যাওয়া যেতেই পারে।

অফিসে এলাম, সকাল তখন প্রায় দশটা। আমি এসে স্টাফদের বললাম, কার কি কাজ আছে আমার সাথে, একটু গুছিয়ে নিয়ে আসো, আমি হয়ত আর্লি লাঞ্চ করে বের হয়ে যাবো। সবাই মুটামুটি দ্রুত গতিতেই আমার সাথে জড়িত যার যার কাজ গুছিয়ে নিয়ে এলো। প্রায় ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সেরে ফেল্লো সব কাজ। আমি নামাজ পড়ে, আর্লি লাঞ্চ করতে বসে গেলাম। এরই মধ্যে আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার (আসলে ব্যবসায়ীক পার্টনার বললে ভুল হবে, আমরা আসলে দুজনেই দুজনকে ফ্যামিলি হিসাবেই দেখি) মূর্তজা ভাই ফোন দিলেন। ব্যবসায়ীক কাজেই ফোন দিলেন। কথা শেষে আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনি আজকে অফিসে আসবে কিনা। জানলাম, আসতে উনার দেরী হচ্ছে, একটা অফিশিয়াল কাজেই আটকা পড়েছেন। ফলে, আমি যে আর্লি বের হয়ে যাচ্ছি সেটা ওনাকে জানাতে গিয়ে কোন ফাকে যে বলে ফেলেছি যে, আজ আমার জন্মদিনের উপলক্ষে বাসায় বউ পোলাপান আগে যেতে বলেছে। মুর্তজা ভাই, হাসলেন। আমিও হাসলাম। কিছু ফান ও করলাম এই জন্মদিনের অনেক কথা নিয়ে (সেগুলি এখানে বলছি না)।

যাক, আমি প্রায় দুটোর দিকে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলাম। রাস্তার যে অবস্থা, ট্রাফিক জ্যাম ক্রস করে করে বাসায় পৌছাতে পৌছাতে প্রায় ৪টা বেজে গেলো। এতো আগে সাধারনত আমি অফিস থেকে কখনো বাসায় আসি না। ফলে সন্ধ্যা হতে এখনো অনেক বাকী। আর আমরা তো প্ল্যান করেছি সন্ধার পরে বাইরে যাবো। এই অল্প সময়টুকুন কি করা যায় আমাকে আর ভাবতে হলো না। ছাদে আমার বাগান আছে, আমি নিজেই এর দেখাশুনা করি। ফলে ছাদে যেতে চাইলাম। বউ বল্লো, আরে, আজকে আর ছাদে যাওয়া লাগবে না। একটু রেষ্ট নাও। সন্ধ্যায় ঘুরতে গেলে ফ্রেস লাগবে।

কথাটা মন্দ লাগলো না। শুয়ে শুয়ে ক্রাইম পেট্রোল দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম। মাগরিবের আজান পড়ছে, ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বিছানা থেকে উঠে মনে হলো, আজ বহুদিন পর দিনে ঘুমিয়েছি। আশেপাশে কিছু পাখীর কিচির মিচির হচ্ছিলো। শব্দটা ভালই লাগছে। এদিকে দরজাতা বউ ডেংগুর ভয়ে সন্ধ্যার আগেই বন্ধ অরে রেখেছে। ডেংগু বড় খারাপ জিনিষ। আমরা অনেকেই সচেতন নই বিধায় মশারা আমাদের থেকে একটু চালাক। সন্ধ্যা হলেই কাম্রাইয়া কিছু রক্ত খেয়ে নেয় আর ডেংগুর জীবানু উপহার দিয়ে তারপরের ইতিহাস নাইবা বললাম। ভালো ঘুম হয়েছে, তবে ঘুমের রেওয়াজটা এখনো আছে বলেই মনে হচ্ছে। ভালই লাগলো ঘুমটা। নামাজ পড়ে বউকে বললাম, কোথায় যাবা প্ল্যান করেছো?

খুবই স্বাভাবিক স্বরে বউ জানালো, এখনো তো ঠিক করা হয় নাই কোথায় যাবো। তবে, চলো, খুজে বের করা যাবে। বের হলেই দেখা যাবে কোথায় যাওয়া যায়। আমি তাকে একটু সাজগোছ করতে দেখলাম। তাঁর এই সাজগোছে কিন্তু আমার কাছে একটা জিনিষ বারবার খুব অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিলো। আর সেটা হচ্ছে, বাইরে যাচ্ছি আমি, আমার ছোট মেয়ে আর আমার বউ। একেবারেই একটা ঘরোয়া ব্যাপার। কিন্তু তারা হটাত করে এতো সাজগোছ করছে কেনো?

বউকে জিজ্ঞেস করায় সে বল্লো, আরে তোমার জন্মদিনের একটা ছোটখাটো জিনিষ মনে করি নাকি আমরা? একটু ছবি টবি তুলবো, একটা রেষ্টুরেন্টে যাবো, সেজেগুজে যেতেই ভালো লাগছে। ওদিকে, আমার ছোট কন্যাকে কোথাও নিতে গেলে তাকে সাজবার জন্য কতবার যে তাগাদা দিতে হয়, তাঁর কোনো ইয়াত্তা নাই। কিন্তু আজ দেখলাম, বাহ, নিজেই ড্রেস পছন্দ করছে, সময় নিয়ে ড্রেস পড়ছে। ব্যাপারটা খুব নিঃশব্দে হচ্ছে। আমার কাছে একটু খটকা লাগছে বটে কিন্তু একেবারেই আবার অস্বাভাবিকও মনে হচ্ছে না। হতে পারে, আজ ওদের মন খুব ফুরফুরা।

যাই জিজ্ঞেস করি, তাতেই তারা হাসে। আমার রুমে গেলাম। আমার রুম মানে আমি যেখানে কম্পিউটার নিয়ে কাজ করি সে রুমে। একটু কফি খেলাম। ভাবতেছিলাম, ওরা কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছে? ওদের কি আমাকে কিছু সারপ্রাইজ দেওয়ার প্ল্যান করছে? ওরা কি কোনো গিফট বা এই জাতীয় কিছু আগে থেকেই কিনে রেখেছে যা রেষ্টুরেন্টে গেলে হয়ত বের করবে? ইত্যাদি। আমি হেটে হুটে ঘর ময় নীরবে একটু চেক ও করলাম, চোখে এই জাতীয় কোনো কিছু পড়ে কিনা। পেলাম না। ফলে ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়েই ফেলে দিলাম কারন কোনো ক্লু পাচ্ছিলাম না। মেয়ে মানুষেরা তো সময় অসময় সব সময়ই সাজ গোছ করতে পছন্দ করে। হয়ত এতা তারই একটা অংশ।  

তো, ওরা প্রায় রেডি হয়ে যাচ্ছে দেখে আমিও রেডি হবার জন্য আমাদের মেইন ঘরে গেলাম। ভাবলাম, আমরাই তো। একটা টি সার্ট অথবা গেঞ্জি পড়ি, সাথে সেন্ডেল সু পড়ি, আরাম লাগবে। হটাত করে আমার বউ বল্লো, আরে নাহ, শার্ট প্যান্ট পড়ো। আমরা যেহেতু সবাই একটু সাজ গোছ করছি, তুমি আবার গেঞ্জী, স্যান্ডেল সু পড়লে কেমন দেখায়। বললাম, আরে, এতে কি অসুবিধা। আর আমরা কোথায় যাচ্ছি আসলে খেতে?

বউ এর উত্তর, চলো যাই, একটা কোথাও গেলেই হবে। যাক, বউ যখন সেজেগুজে শাড়িটাড়ি পড়ছে, মেয়েও যখন তাঁর পছন্দের মতো করে সেজেছে, তাহলে আমি আবার গেঞ্জীগুঞ্জী পড়ে লাভ কি? আমিও না হয় শার্ট প্যান্টই পড়ি।

কিন্তু মনের ভিতরে একটা খটকা লেগেই থাকলো। আমার এক সময় মনে হলো, ওরা কি কোনো বড় সড় গিফট কিনেছে নাকি? কিংবা এমন কিছু যা আমি দেখছি না কিন্তু ওরা লুকাচ্ছে? আমি একটা টেকনিক খাটালাম।

আমি আমার মেয়ের রুমে গিয়ে বললাম, কিরে মা, আজকের জন্মদিনে আমার জন্য কোনো গিফট কিনলি না? মেয়ে হেসে দিয়ে বল্লো, না আব্বু, সময় পাই নাই। তাছাড়া আপু বগুড়া থেকে আসুক, তারপরে দুই বোনে গিয়ে তোমার জন্য গিফট কিনবো বলে আমরা ভেবেছি। তাই আর কেনা হয় নাই।  এই বলে ছোট মেয়েও একটু মুচকি হাসলো। আমার সন্দেহের খটকাটা দূর হচ্ছিলো না। কিছু তো একটা চলছিলো যা আমি আবিস্কার করতে পারছিলাম না। কি হতে পারে? কত কিছু ভাবলাম, কত ভাবে ভাবলাম, ব্যাপারটা আমার মাথায়ই আসছে না, কি হতে পারে?

সবাই বের হলাম। আমি একটু আগেই বের হলাম। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, তোর ম্যাডাম কিছু প্যাকেট দিছে নাকি? ড্রাইভার সহজ ভাবে বল্লো, না তো স্যার। কিছু দেওয়ার কথা নাকি? কই ম্যাডাম তো কিছু বল্লো না।

আমরা সবাই গাড়িতে বসে পড়লাম। গাড়ির ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো, স্যার কোথায় যাবো। আমি কিছু বলার আগেই আমার বউ বলে উঠলো, চলো, রেডিসনের আশেপাশে ভাল রেষ্টুরেন্ট আছে, ওখানেই চলো। আমি বললাম, আরে, বড় মেয়ে আসুক, তখন না  হয় ওকে নিয়েই একবারে যাওয়া যাইতো। বড় মেয়ে শুনলে ভাববে, দেখো, আমি ঢাকায় নাই, আব্বু আম্মু, আর কনিকা সবাই আব্বুর জন্মদিনে রেডিসনে পার্টি করছে। ওর হয়ত একটু মন খারাপ হতে পারে। কি দরকার। থাক না আজকে না হয় এই করিমুল্লা বা রহিমুল্লার কোনো নরম্যাল একটা রেষ্টুরেন্টে যাই, এম্নিতেই কিছু খাওয়া দাওয়া করে চলে আসি।

আমার বউ নাছোড়বান্দা। আমার বউকে আজকে মনে হচ্ছে, বেশ সার্থপর। বড় মেয়ের জন্যও তাঁর আজকে যেনো আফসোস নাই। বল্লো, আসুক মেয়ে, তারপর ওকে নিয়ে আরেকদিন যাবো। সব তো আর শেষ হয়ে গেলো না।  

গাড়ি যাচ্ছে, হটাত দেখি আমার বউ গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। আমি দেখলাম, একটু সন্দেহ হলো কেনো সে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে? কিন্তু আবার মনে হলো, হয়ত কোনো ভালো রেষ্টুরেন্টের খোজ মনে মনে নিয়ে রেখেছে যেটা সে  ভালোমত চিনে না। তাই গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। আমরা যাচ্ছি, যাচ্ছি, যেতে যেতে রেডিসন পার হয়ে গেলাম। সামনে কূর্মিটোলা গল্ফ ক্লাব। ভালো সাজিয়েছে মনে হচ্ছে। অনেক গাড়ি পার্ক করা। হয়তোবা কারো বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে, অথবা বড় কোনো পার্টি। শহরের ঝলমল আলতে কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবটা যেনো তাঁর নিজের আলতে আরো চকচক করছে। লাল নীলা, সবুজ আলো, অনেক প্রকারের স্টাইলে জ্বলছে আলগুলি। ভালই লাগছে। পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে হর্ন বাজিয়ে আবার ব্যস্ত শহরের গাড়ি ঘোরা ছুটে চলছে। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরাও সামনে এগুচ্ছি।

বললাম, চলো, কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে ঢোকি।

আমার বউ আজগুবি একটা কথা বল্লোযে, এখানে তো আমাদের আর্মির জায়গা। অনেকবারই এসেছি। চলো দেখি, আরো সামনে যাই, কি কি ভালো রেষ্টুরেন্ট আছে। সেখানেই যাই। বললাম, সামনে তো আছে রিগেন্সি, ম্যাপল লীফ, আরো অনেক কিছু। আসলে তোমরা কি প্ল্যান করেছো কোথায় যাবা?

বউ বল্লো, চলো না যাই। তুমি আর এখন ব্যস্ত না।

ঠিক আছে, দেখা যাক কোথায় নিয়ে যায় বউ।

গাড়ি আরো সামনে চলে যাচ্ছে। চলে এসেছি প্রায় রিগেন্সির কাছাকাছি। বললাম, চলো তাহলে রিগেন্সিতেই যাই। তাতেও আমার বউ খুব একটা সায় দিলো বলে মনে হলো না। বল্লো, আরে নাহ, এটাও খুব একটা ভালো মানের না। মনে হয় ১ বা ২ স্টারের মানের। এর থেকে আরো ভালোটায় যাই।

বললাম, তাহলে চলো, ম্যাপললীফে যাই। ওটায় আমি এর আগেও এসেছি। খারাপ না। এবার মনে হলো বউ রাজী। কিন্তু গাড়ি থামানোর কোনো প্রস্তাবনা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেলো না। ফলে গাড়ী ম্যাপললিফের জায়গা পার হয়ে চলে গেলো আরো দূরে। সামনে এবার লা মেরিডিয়ান।

আমার বউ বল্লো, চলো, এখানে তো তোমাদের নওরোজ ভাই চাকুরী করেন। এখানেই যাই।

বললাম, তাহলে চলো। দেখি, দোস্তরে পাই কিনা। পাইলে তো মন্দ হয় না। একটু আডদাও দেওয়া যাবে। যদিও আমি এখানে আরো কয়েকবার এসেছি। বললাম, তো তুমি তো আগে এখানে আসো নাই। খারাপ হবে না।

গাড়ি ঢোকে গেলো লা মেরিডিয়ানে। পার্ক করলাম। ড্রাইভারকে কিছু টাকা দিয়ে বললাম, যে, তুমি খেয়ে নিও কিছু। আমাদের আসতে আসতে একটু দেরী হবে।

আমার বউ আমার সামনে দিয়ে হেটে ঢোকে গেলো লা মেরিডিয়ানে। কঠিন চেক আপ। মনে হচ্ছে কোনো এয়ারপোর্টে ঢোকছি। হাত ব্যাগ, মোবাইল, পকেট, সব চেক টেক করে তারপর ঢোকতে দিলো। আমার বউ আর মেয়ের হ্যান্ড ব্যাগ টাও চেক করাতে হলো। চেকিং এর পর্ব শেষ। আমরা লবিং এ ঢোকে গেলাম।

আমি বললাম, চলো কয়েকটা ছবি তুলে দেই তোমাদের। মেয়ে আর বউ এক সাথি বলে উঠলো, আরে, চলো আগে খাওয়া দাওয়া করে নেই। পরে ছবি তোলার অনেক সময় পাওয়া যাবে। এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে। অবাক হলাম। আমার বউ ছবি তোলায় পাগল থাকে। হটাত তাঁর কি এমন তাড়া যে, ছবি তোলতেও এখন তাঁর ব্যস্ততা? সে কোনোদিকেই ভ্রুক্ষেপ না করে আমার সামনে দিয়ে এমনভাবে হেটে যাচ্ছিলো যেন সে এখানে প্রায়ই আসে, জায়গাটা তাঁর বেশ পরিচিত। একটু অবাক হচ্ছিলাম। আমি বললাম, তুমি কি চিনো কোথায় যেতে হবে?

সাথে সাথে উত্তর, হ্যা, ১৫ তালা।

একটু অবাক হচ্ছিলাম। কিন্তু যেহেতু কোনো কারন নাই তাই ব্যাপারটা আমিও বুঝতেছিলাম না আসলে কি হচ্ছে। আবার এটাও ভাবছিলাম, হয়তো ওর আগে থেকেই ইন্টারনেটে ঘেটেঘুটে জেনে নিয়েছে কোথায় কি আছে। হতেই পারে। আজকালকার যুগ। সবাই স্মার্ট। ইন্টারনেটে কোথায় লবি, কোথায় লিফট, কোথায় রেষ্টুরেন্ট, কয় তালায় রেষ্টুরেন্ট, আজকাল এক ক্লিকেই সব পাওয়া যায়।

লিফটে উঠে গেলাম ১৫ তালায়। ১৫ তালায় রেষ্টুরেন্টে ঢোকলাম। ঢোকেই দেখি-

ওরে বাবা, মুর্তুজা ভাই। একেবারে জাস্ট অবাক আমি। আমি থমকে গেলাম। ভাবলাম, হয়তো কোনো বায়ার নিয়ে এসছে, আমাকে বলার জন্য ভুলে গেছে। বললাম, কোনো বায়ার এসছে নাকি ভাই? আপনি এখানে যে?

হেসে দিয়ে বললেন, আজকে আপনার জন্মদিন না!! আমরাও এলাম আপনার জন্মদিনে। ভাবী, আনিকা, জিওন সবাই এসেছে। আমি তো রীতিমত অবাক। তাইতো বলি, আমি যাহাই বলি না কেনো, আমার বউ তাহলে এই সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই এতো গোপনীয়তা!! ছোট মেয়েও!! আমাকে সাহ্ররট গেঞ্জি না পরতে দেওয়া, গুগল ম্যাপ চালু করা, গলফ ক্লাবকে একঘেয়ে জায়গা বলা, রিগেন্সির মত ভালো মানে একটা রেস্টুরেন্ট কে ১ স্টারে নামিয়ে দেওয়া, ওদের সাজগোছ করা, সব কিছু এখন আমার কাছে লা মেরিডিয়ানের চকচকে আলোর কাছে পরিস্কার।

ভাবলাম, কে বলে, মেয়েরা পেটে কথা রাখতে পারে না? যে এটা বলেছে, সে ভুল বলেছে। 

মুর্তুজা ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন, একটা টেবিলে। ওমা, ওখানে গিয়ে দেখি আরো চমক!!

ভাবী, আনিকা, আর জিওন হাতে চমৎকার অনেকগুলি সাদা গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেওয়ার জন্য। কি অদ্ভুদ ভালবাসা। নিজেকে বড্ড সুখী এবং ভাগ্যবান মানুষের মধ্যে একজন মনে হলো। এরা সবাই আমার পরিবার। সবার হাসিখুশী মুখ, আর চাহনী দেখেই মনটা ভরে গেলো।

সত্যিই সারপ্রাইজড হয়েছি। খুবই সারপ্রাইজড। শুধু ফুল নিয়েই মুর্তুজা ভাই আসেন নাই। সাথে "কাপল ওয়াচ" মানে একটা পুরুষের ঘড়ি আর সাথে একই ডিজাইনের আরেকটা মহিলার ঘড়ি। আমাদের জন্য কিনেছেন একজোড়া আর ভাই ভাবীর জন্য ও কিনেছে এক জোড়া। অনেক দাম, ব্র্যান্ডের ঘড়ি। আমার তো চক্ষু চড়কগাছ। এতোক্ষনে বুঝলাম সেই বিকাল থেকে কি একটা গোপন জিনিষ আমার কাছে আমার বউ, আমার ছোট মেয়ে আর সবাই লুকিয়েছিল। আরো অবাক করার বিষয় হচ্ছে- আমার বড় মেয়ে নাকি জানতো জিনিষটা। সেই দুপুর থেকেই জানতো। আমি ওর সাথেও দুপুরে অনেক্ষন কথা বলেছি। কিন্তু ও নিজেও আমাকে কিছুই বলে নাই।

অজানা জিনিষের হটাত করে যখন চোখের সামনে সারপ্রাইজ হয়ে ধরা দেয়, আর সেটা যদি হয় একটা ভাল কিছু, মনের আনন্দের সাথে চোখের পাতাও সেই আনন্দে জলে ভিজে চিকচিক করে। বড্ড ভালো লাগলো সবার এ রকম একটা লুকোচুরি খেলা।

অত্যান্ত ঘরোয়া পরিবেশে আমার পরিবার আর মুর্তজা ভাইয়ের পরিবার অনেক্ষন সময় কাটালাম। ব্যবসার কোনো কথাবার্তা হলো না। পুরুটাই পরিবার নিয়ে, বাচ্চাদের নিয়ে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তাদের পছন্দ অপছন্দের জিনিষ নিয়ে। আমরা ওদের বলার চেষ্টা করেছি, আমরা এই বিশাল দুনিয়ায় এতো মানুষের ভীড়েও কখন কোথায় কিভাবে একা অনুভব করি। আর সেই একাকীত্তের একমাত্র ভরষার স্থানগুলি কোথায়। এটাই হচ্ছে পরিবার। কোনো কোনো অতীতের অনেক সময় কোনো ভবিষ্যৎ থাকে না। কিন্তু কিছু কিছু বর্তমানের জন্য এমন কিছু ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে, যা আজকের দিনের কোনো এক সুখদুক্ষের এমন ঘরোয়া পরিবেশেই তাঁর জন্ম হয়। এটা যেনো সেই রকম একটা ঘরোয়া পরিবেশ।

অনেক ধন্যবাদ মুর্তজা ভাইকে, অনেক ধন্যবাদ ভাবী, আনিকা এবং জিওনকে। ধন্যাবাদ আমার ছোট মেয়েকে। আর ধন্যবাদ আমার বউকে। ধন্যবাদ আমার বড় মেয়েকে যে আমাকে সব জেনেও কিছুই জানায় নাই অথচ এতো সুন্দর একটা মেসেজ রেখেছিলো সকালেই। ধন্যবাদ সবাইকে। এতো চমৎকার একটা পরিবেশ দেওয়ার জন্য।

মাঝে মাঝে অনেক কষ্টের পরিবেশে বাচতে বাচতে যখন হাপিয়ে উঠি, যখন ঞ্জেকে একা একা মনে হয়, তখন এই সব ছোট ছোট ঘরোয়া ভালবাসা আবারো মনে করিয়ে দেয়, আমরা পরিবারকে ভালোবাসি, আমরা পরিবারের জন্য বাচি। আর এই পরিবারতাই হচ্ছে আমাদের সব সুখের মুল উৎস।

১৪/০৮/২০১৯-বাসায় সবার দাওয়াত

Categories

ঈদ-উল আযহার পরের দিন আজ। অনেকদিন সবাইকে নিয়ে বিশেষ করে পরিবার পরিজন নিয়ে একসাথে খাওয়া দাওয়া হয় না। তাই ঈদের কদিন আগে মিটুলকে বললাম, সবাইকে দাওয়াত দাও যেনো ঈদেরপরের দিন সবাই আমাদের বাসায় আসে, একটা গেট টুগেদার করা যাক। উম্মিকাও আছে বাসায়। ওর যারা যারা বন্ধু বান্ধব আছে, ওদেরও আসতে বলো। কনিকার বন্ধু বান্ধব কয়েকদিন আগে দাওয়াত খেয়ে গেছে, তাই এতো শর্ট তাইমে আবার ওর বন্ধু বান্ধবদের দাওয়াতের দরকার নাই। মিটুল গ্রামের অনেককেই দাওয়াত করেছে আর ওদের ভাইওবোনদের তো আছেই। ওরাও আমার বাসায় আসার জন্য ব্যাকুল থাকে। ধরে নিয়েছিলাম প্রায় শখানেক হবে উপস্থিতি।

তাইই হলো, প্রায় শ খানেকের মতোই লোকজন এসে হাজির হলো।

ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো। ফলে আমার ছাদতায় ভাল করে আয়োজন করা যাচ্ছিলো না। তাই গ্যারেজই ভরষা। কাবাবের স্টল করা হলো মুবিনের নেতৃত্তে। মুরগীর আর গরুর কাবাব। মিটুলের রান্নার জুরি নাই, সবাই ওর খিচুরী, পোলাও এবং অন্যান্য আইটেম খুব মজা করে রান্না করে।

উম্মিকার ৬/৭ জন বন্ধু বান্ধব এসেছিলো। আমি ফাউন্ডেশনের এম ডি রানা, ওর বউ, সবাই এসেছিলো। খুব ভালো একটা সময় কেটে গেলো। এর সাথে নেভীর কমান্ডার মামুনও এসেছিলো দীপু আর ওর পরিবার নিয়ে। যদিও একটু একটু করে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো, তবুও সবাই একে একে বাগান দেখতে গেলো। বাগানে একটা ছাতা আছে, লাইটিং করানো। ছবি তোলার জন্য একটা মুক্ষম জায়গা।

১৩/০৮/২০১৯- ঈদের পরের দিন

Categories

কোরবানীর ঈদের পরদিন। আমার বাড়িতে ছোত বড় সবাই এক সাথে যেমন ঈদের দিন আসতে পছন্দ করে, তেমনি কাউকে দাওয়াত দিলে পারতপক্ষে কেউ মিস করতে চায় না এটা আমার সৌভাগ্য। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি সেই সকাল থেকেই। মিতুল (আমার স্ত্রী) তাদের ভাইর বোন সবাইকে দাওয়াতের পাশাপাশি আমাদের গ্রামের ভাই বোনদের কিছু ছেলেমেয়েরদেও আজকের দিনের দাওয়াতে হাজির হতে অনুরোধ করেছিলো। গুড়ু গুড়ি বৃষ্টির কারনে গ্রাম থেকে অনেকেই আসতে পারে নাই।

জাহাংগীর নগর ইউনিভার্সিটির মিতুলের বান্ধবী দীপু এবং ওর হাজবেন্ড কমোডর মামুন সহ ওদের পরিবারের সবাইকেও দাওয়াত করেছিলো মিতুল। দাওয়াত করেছিলো উম্মিকার কিছু বন্ধু বান্ধব্দের। আমিন ফাউন্ডেশন এর পরিবারদেরকেও মিতুল দাওয়াত করেছিলো, সবাই এসেছে। বেশ গমগম একটা পরিবেশ।

মুবীন দুপুর থেকেই কাবাব বানানোর সমস্ত আয়োজন করে রেখেছিলো। ইমন আবার রাতে কি আতশবাজী পুরানোর জন্য এক গাদা আতশবাজীও তার স্টকে রেখেছিলো। বৃষ্টি হওয়াতে ছাদে কাবাব বানানোর পরিকল্পনাতা ভেস্তে গেলো কিন্তু নীচে গ্যারেজ বনে গেলো রীতিমত একটা কাবাব ফ্যাক্টরির রান্নাঘর। চারিদিকে কাবাবের মনোরম গন্ধ, লোকজনের সমাবেশ, মন্দ লাগছিলো না।

অনেক লোক যখন এক জায়গায় সমাবেশ করে, এম্নিতেই জায়গাটা শোরগোলের মতো কিচির মিচিরে ভর্তি থাকে। তার মধ্যে আবার চৌধুরী বাড়ির মানুষ, তাদের গলার আওয়াজ সব সময়ই চ ওড়া। তারা আস্তে কথা বলতে পারে না। হয় তারা কানে কম শুনে বলে উচ্চস্বরে কথা বলে অথবা কে কার কথা শুনবে, সেটা সুপারসেড করার কারনে একে অন্যের থেকে চরা ভয়েসে কথা না বলে কোনো উপায়ও নাই। ফলে সেই দুপুর থেকে আমাদের বাসায় একটা অবিরত হট্টগোলের মধ্যে ছিলো। শব্দ দূষনে নিঃসন্দেহে আজকে আমার বাসা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবার কথা।

ঈদের দিন সাধারনত আমি ছোট বড় সবাইকে সালামী দেই। এতা আমার খুব ভালো লাগে। সালামী তা লোভনীয় করার জন্য আমি আগে থেকে ব্যাংক থেকে নতুন নতুন নোট নিয়ে রাখি। আর সালামীর পরিমানতাও আমি বাড়িয়ে দেই যাতে সবাই বিশেষ করে ছোটরা এই সালামির লোভেই সবাই আমার বাসায় সকাল সকাল চলে আসে। ছোটরা যখন বায়না ধরে, বড়রা তখন আসতে বাধ্য হয়। ফলে আমি খুব গোপনে এই সালামীর টোপ তা সব সময় দিয়ে রাখি।

সবাই লাইন ধরে দাঁড়ায়, একে একে সালাম করে। সালাম করাতা বা পাওয়া তা আম্র মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে, এই যে সালামীটা পাওয়ার জন্য বাচ্চারা অধীর আগ্রহে বসে থাকে। সবাইকে আমি সম পরিমান সালামি দেই। বড়দের বেলায় অবশ্য বেশী থাকে।

বেশ রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলে, আর অবিরত খাবারের, জুসের, আর মিষ্টির ব্যবস্থা থাকে। কখনো ফুস্কা, কখনো হালিম, কখনো অন্যান্য আইটেম তো আছেই। বয়স ভিত্তিক পোলাপান এক এক রুমে আড্ডা দেয়, কেউ কেউ আবার একই রুমে বসে নিজেরা নিজেরা সোস্যাল মিডিয়ায় এত ব্যস্ত থাকে যে, কাছে আছে তবুও যেনো সোস্যাল মিডিয়ায়র মাধ্যমেই হাই হ্যালো করতে পছন্দ করে।

দিনটা আমার বেশ ভালো কাটে এইসব কিচির মিচির করা বাচ্চা আর তাদের বড়দের নিয়ে। বয়স হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি একটা সময় আসবে, তখন হয়তো এটার ভাটা পড়বে। হয়তো অনুষ্ঠান তা হবে, আমার অনুপস্থিতিতে। হয়তো ওরা আমার এই সালামিটাই তখন সবচেয়ে বেশী মিস করবে। কিন্তু পৃথিবীর তাবত নিয়ম মেনেই যুগে যুগে এই রীতি চলতেই থাকবে সেই কফি হাউজের আড্ডাটার মতো।

৩০/০৭/২০১৯-কনিকা

মেয়েটা জন্মের দিনই আমার বুক কাপিয়ে দিয়েছিল। অবিকল আমার মায়ের চেহারা নিয়ে সে এই পৃথিবীতে পদার্পন করেছিল। আমি ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, সে আমার মায়ের রিপ্লেসমেন্ট কিনা ভেবে। আজ আমার মা বেচে নেই কিন্তু কনিকা আছে। কনিকার মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ায় আমার মা কনিকাকে একদম পছন্দ করে নাই। কিন্তু এতা তো আর আমার কনিকার দোষ নয়। আর আমিও কোনোদিন কেনো আমার বর মেয়ে হবার পর আবারো একটা মেয়েই হল, ছেলে কেনো হলো না, এ প্রশ্নতা আমার মাথায় কখনোই আসে নাই, এখনো না। ওরা দুজনেই আমার সন্তান আর আমার ভালো লাগার মানুষ।

কনিকা ছোত বেলায় যেমন বেশী অভিমানী ছিলো, আজ এতো বর হয়ে গেছে, তার সেই ভাবতা এখনো কমে নাই। বকা দিলে কান্না করে, বিশেষ করে আমি বকা দিলে তো ওর চোখের পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। ওর মা যখন সারাক্ষন এই পরা, ঐ রুম গোছানো, অই তাইম মতো না খাওয়া, ঐ ঠিক মতো গোসল না করা, তাইম মতো পড়তে না বসা ইত্যাদির কারনে বকতেই থাকে, এতা ওর কান দিয়ে আদৌ ঢোকে কিনা আমার মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে। নির্বিকারই তো থাকে। যেই আমি একটু বকা দিয়েছি- গেলো এদিনের মতো দিন বরবাদ। কেনো এমনতা হয় জানি না তবে আমি ওকে বকতেও পারি না।

মাঝে মাঝে কনিকা আমার কাছে চিঠি লিখে। চিথির বেশীর ভাগ মুল উপাদান, অর্থ নৈতিক আলাপ আলোচনা। এই যেমন, বড় আপিকে সে কিছু হোম ওয়ার্ক করে দিয়েছে, তার সাথে সেই হোম ওয়ার্কের মুজুরী হিসাবে একটা ডিল হয়েছে, তাই তাকা দিবে কে? বাবা। একজনের হোম ওয়ার্ক, আরেক জন করে দিবে, আর আরেক জন সেই তাকার মুজুরী দেবে, ফলে কত বার্গেনিং হবে এটা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কারন বাবা টাকা দিবে। সেই তাকা আবার কাজের পর পরই তাদের হাতে যেতে হবে, আর হাতে যাবার পরই সেতা আবার তার মায়ের কাছে জমা হবে। ওর মা অদের ব্যক্তিগত একাউন্টে জমা করে দেবে। অর্থ নীতির এই চক্রটা বেশ মজার।

আবার কোনো কোন সময় কনিকার কিছু কাজ তার বড় আপি করে দেবে, ফলে চক্রতা একই। শুধু মালিক পক্ষের মুজুরী পাওনা হবে বড় মেয়ে, তাকা দেবেন বাবা, কাজ হাসিল করবেন কনিকা। এই দুয়ের আবার একটা ভারসাম্য করে যার যার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ কে কত টাকার কাজ করিয়ে নিলো, আর কে কত পাবেন তার একটা কঠিন হিসাবের ডেবিত ক্রেডিট আমার কাছে লেখা ঐ চিঠিতে বিস্তারীত থাকে। তবে মজার বায়াপার হলো সেন্ট্রাল ব্যাংকের মানি ব্যাক থেকে সব তাকাই পরিশোধ যোগ্য।

আবার কিছু কিছু চিঠিতে এমন থাকে যে, অন লাইন অর্ডার করা হয়ে গেছে, আইটেমটা চলেই আসবে দু একদিনের মধ্যে, আমার সাথে কথা বলার হয়তো কোনো অবকাশ হচ্ছে না, তার কোচিং আর আমার অফিসের তাইমিং এর কারনে। কিন্তু ডেবিট নোটের মতো আমার ওয়ালেটে কনিকার একটা চিঠি পাওয়া যাবে তাতে কবে কত টাকা ডেবিট করে দিতে হবে তার বিস্তারীত বর্ননা থাকে।

এটা অবশ্য আমার বড় মেয়ে করে না। সে আবার তার মায়ের সাহাজ্য নেয়। ওর মা আমাকে ফোন করে, তখন আমার ওয়ালেটের উপর চাপ পড়ে। আমার দুই মেয়ের এই ব্যাংকিং হিসাব কে যে ওদের শেখালো আমার জানা নাই, তবে তাতে ব্যাপারতা অনেক সহজ ভাবেই এল সি এর মতো ট্রাঞ্জেক্সন হয়।

কিছু কিছু চিঠি আবার অভিযোগ পত্রের মতো। আর সেই অভিযোগ হয় তার মায়ের নামে না হয় তার আপির নামে। যেমন, তার উপর পরার চাপ পড়ে যাচ্ছে, তার বিনোদনের সময়টা কেড়ে নেয়া হচ্ছে, তার আই পড ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। তাতে তার মন ভালো নাই। সে আর এই বাড়িতাকে বসবাসের যোগ্য মনে করিতেছে না। এতার একটা সমাধান হোক।

এই রকমের হাজার হাজার না হলেও মাসে দু একটা অভিযোগ পত্র তো পাইই।

১৯/০৭/২০১৯-কনিকার বন্ধুদের দাওয়াত

ছোট মেয়ে কনিকা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়ে। মিটুলের বানানো টিফিন কনিকার কাছ থেকে ভাগ করে খেতে খেতে একদিন সব বন্ধু বান্ধবরা কনিকাকে ধরেই বসলো, আন্তির রান্না করা খাবার খাবো। আসলে বাচ্চারা আজকাল ফাষ্ট ফুড, পোলাও বিরিয়ানি ইত্যাদি খেতে এতো পছন্দ করে যে, কোনো না কোনো অজুহাত তো আছেই এই সব খাবারের আয়োজনের। কখনো কনিকার বাসায়, কখনো মনিকার বাসায়, কখনো আলভীর বাসায়, লাগাতার তাদের এই খাওয়া চলতেই থাকে। তবে ব্যাপারটা কিন্তু মজার আমাদের বড়দের জন্য। অন্তত আমাদের বাচ্চারা আনন্দের সাথেই সময়তা কাটায়।

আজ কনিকার প্রায় ১৬/১৭ জন কলেজ বান্ধবীরা আমাদের বাসায় খেতে আসবে। মিতুল রান্না করায় খুবই এক্সপার্ট। আর বাচ্চাদের খাওয়াতে সে খুব পছন্দ করে। কনিকার বান্ধবীরা বাসায় খেতে আসবে এই প্রোগ্রামের কারনে তার গত কয়েকদিন এই বাজার সেই বাজার, বাচ্চারা কি খেতে পছন্দ করে, আর কি করলে আরো মজা করবে, সেতার জন্য প্রায় দুই তিনদিন যাবত মহা ব্যস্ত।

কনিকা মাঝে মাঝে বাজার দেখে, সাথে সাথে ফেসবুকে একটা পোষ্ট ও মেরে দেয়। একটা খুবই ঘরোয়া দাওয়াত যে কততা ম্যাগনিচুড বারাতে পারে, এটা আজকালের পোলাপানেরা খুব ভালো করেই জানে। আজ সেই মেঘা অনুষ্ঠানের আয়োজন। সকাল থেকেই কনিকা, উম্মিকা ঘর গোছাচ্ছে, পর্দার কাপড় গুছাচ্ছে, বাড়ি ঘর কাজের বুয়ার দ্বারা এক রকম দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি চলছে। চেয়ার টেবিলের কভার পরিবর্তন, তাদের বিছানার চাদর পরিবর্তন, দেখলেই মনে হচ্ছে একটা যজ্ঞ। খারাপ না।

১২/০৩/২০১৯-উম্মিকার ডাক্তারী ফলাফল

গত ১২ মার্চ ২০১৯ তারিখে আমার বড় মেয়ের মেডিক্যাল ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো। খুব টেনশনে ছিলো মেয়ে পাশ করে কিনা। প্রায়ই তার মেজাজ মর্জি খারাপ থাকতো এই টেনশনের কারনে। অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়েছে সে এই পড়ার সময়। তার পরেও সে তার লক্ষ্য স্থির রেখেছে যেনো এক চান্সেই পড়াটা শেষ হয়। আল্লাহর অসীম রহমত যে, সে এক চান্সেই মেডিক্যাল পরীক্ষাটা পাশ করে এখন সে পূর্ন ডাক্তার হয়ে গেলো। আল্লাহর কাছে শুকরীয়ার শেষ নাই।

সেদিন আমি বাসায়ই ছিলাম। বেলা প্রায় একটার ও বেশী। বউ কলেজে ছিলো। আমরা বাসায় একত্রে খাবো বলে অপেক্ষা করছি। আমি কম্পিউটারে কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। দুই মেয়েও বাসায়। বড় মেয়ে উম্মিকা ড্রয়িং রুমে কিছু একটা করছিলো। হটাত করে “আব্বু” বলে বড় মেয়ে চিৎকার। আমি চমকে গেলাম, কি হলো মেয়ের। তাড়াতাড়ি কম্পিউটারের কাজ ফেলে ড্রয়িং রুমে যাচ্ছিলাম, দেখি মেয়েই এগিয়ে এসছে হাতে তার মোবাইল নিয়ে। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদতে কাদতে বলছে, “আব্বু, আমাদী মেডিক্যালের ফলাফল দিয়েছে। আমি পাশ করেছি আব্বু”।

আমি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় চুমু খেতে খেতে বললাম, “কাদছিস কেনো তাহলে?” মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে থর থর করে কাপছে আর আরো কাদছে। অনেক আদর করে বললাম, আল্লাহর কাছে হাজার শুকরীয়া যে, তুমি পাশ করে গেছো।

অনেক্ষন লাগলো আমার বড় মেয়ের স্থির হতে। ঠিক এমন সময় আমার বউ বাসায় ঢোকলো। আমার তখন মাথায় একটা দুস্টু বুদ্ধি এলো, ওর মাকে ভড়কে দেবার। বললাম, “দেখো, মেয়ের পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে, মেয়ে কান্নাকাটি করছে। মেয়েকে থামাও”। লক্ষ্য করলাম, আমার বউ এর মুখাবয়ব হটাত করে পরিবর্তন এবং টেনশনের ছায়া। হাতের ব্যাগটা কোনো রকমে টেবিলের উপর রেখেই মেয়েকে শান্তনা দেবার জন্য জড়িয়ে ধরলো আর বল্লো, কি রেজাল্ট মা? আমি হেসে দিয়ে বললাম, মেয়ে তো পাশ করেছে। যেই না বলেছি যে, পাশ করেছে, আর অমনি মা মেয়ের দুজনেই এখন কান্নার রোল। এতক্ষন তো ছিলো একজনের কান্না, এখন দেখি দুইজন। ঠেলা শামলাও এবার। বেশ মজা পাইলাম মা মেয়ের এই রকম একটা আবেগপুর্ন মুহূর্তের জন্য। সবই আল্লাহর ইচ্ছা এবং দয়া। আজ থেকে আমার বড় মেয়ের একটা ভালো আইডেন্টিটি হলো, “ডাক্তার” উম্মিকা।

ধন্যবাদ মা তোমাকে। আমি তোমার উজ্জল জীবনের জন্য দোয়া করি সবসময়। 

১৯/০৬/২০১৮-ক্যাডেট কলেজের কাহিনী

Categories

৪১ বছর আগের ঘটনা।

আজ হইতে প্রায় ৪১ বছর আগে এইদিনে আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার জন্য সকাল হইতেই প্রস্তুতি লইতেছিলাম। আজ আমার ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার দিন, অর্থাৎ আমি ১৯ শে জুন ১৯৭৭ সালে ক্যাডেট কলেজে পদার্পণ করিয়াছিলাম।  

অজ একটা পাড়াগ্রাম। স্বাভাবিক জীবন যাত্রার জন্য একটি জনপদের যে সব মৌলিক উপাদান কোন একটি জনগোষ্ঠীর প্রাপ্য সেইসব মৌলিক চাহিদা কোনো কিছুই এই অজ পাড়াগ্রামের কোথাও চোখে পড়ে না। বিদ্যুৎ নাই, রাস্তা ঘাট নাই, ভালো একটা মাধ্যমিক স্কুলও নাই। রাজধানী ঢাকা হইতে আমার গ্রাম এতো কাছের একটা জনপদ, তাহার পরেও কোনো পাকা রাস্তা নাই যাহাতে কেহ জরুরী ভিত্তিতেও রোগী লইয়া বা অন্য কোনো ইমারজেন্সি হইলে গাড়ি করিয়া সল্প সময়ে ঢাকার কোনো জায়গায় আসিতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ। মাত্র ৫/৬ বছর পার হইয়াছে ইহার স্বাধীনতার বয়স। মানুষ সবেমাত্র স্বাধীনতার স্বাদ পাইতে শুরু করিয়াছে, কিন্তু সবকিছুই নতুন। নতুন স্বাধীনতার একটা রুপ আছে। এই স্বাধীনতায় যে যেইভাবে পারে, সে সেইভাবেই তাহা উপভোগ করে। কেউ গায়ের জোরে, কেউ অস্ত্রের জোরে, কেউ সম্পত্তির জোরে, কেউ পারিবারিক প্রভাবের জোরে একজন আরেকজনের উপর, একগোত্র আরেক গোত্রের উপর কিংবা এক গ্রাম আরেক গ্রামের উপর প্রভাব খাটাইয়াই স্বাধীনতা উপভোগ করে। আর এই নব্য স্বাধীনতাই আমাদের প্রতিটি গ্রামে, গঞ্জে, আনাচে কানাচে পালিত হইতেছে। কেউ হটাত করিয়া বড়লোক হইয়া যাইতেছে, কেউ আবার সবকিছু হারাইয়া দেশান্তরী হইতেছে। মেলথাসের কোনো থিউরী, কিংবা নিউটনের ৫ম সুত্র কিংবা ডারউইনের নতুন কোনো সুত্র না হইলে যেনো আর রক্ষা নাই। কেউ নতুন সেটেলার হিসাবে নিজের পিতামহের আদি আবাসস্থল ছাড়িয়া অন্য কোনো নতুন জায়গায় তাহার আবাসস্থল গড়িয়া তোলার আপ্রান চেস্টা করিতেছে আবার কেহ কোথাও কোনো স্থান না পাইয়া এই ইহজগত হইতেই বিদায় লইতেছে। নিয়তি বলিয়া একটা কথা আছে, কেউ এটা মানুক আর নাই বা মানুক। সবাই নিয়তির দিকে তাকাইয়া সামনের দিকে চলিবার ভান করিতেছে। ঘরের পালিত পশু পাখিরাও যে কে কাহার, তাহারাও মাঝে মাঝে বিতর্কিত হইয়া কখনো এই মালিকের গোহালের থেকে অন্য মালিকের গোহালে স্থান পরিবর্তন করিতেছে। তাহারা তাহাদের মুখের ঘাস গুলিও চর্বণ করিবার সময় পাইতেছে না।  

আমরা গ্রামে থাকি। গ্রামের বাড়ী যেই রকম হয়, আমাদের গ্রামের বাড়ীটিও সেই রকমের। মাটির উঠোন, চারিদিকে গাছ পালার সমারোহ, কাচা পায়খানা, পাশেই ক্ষেত, হরেক রকমের ফসলের শোভা দেখা যায়। সন্ধ্যা হইলেই বাবুই পাখী, চড়ুই পাখী এবং তাহাদের আবাসস্থলে বেড়াইতে আসা অনেক নাম না জানা অতিথি পাখিরা মিলে হরেক পদের সুরে এবং শব্দে মুখরীত করিয়া তোলে এলাকাটি। তাহারা একে অন্যকেকে লইয়া ঝগড়া ঝাটি করে না। তাহাদের স্বাধীনতা আমাদের মতো নয়। তাহারা জমি লইয়া, বাড়ি বা বাসা লইয়া ভাগ বাটোয়ারা লইয়া মারামারি করে না। উহারা শরত কালে যেমন একে অপরের বন্ধু, বৃষ্টির দিনেও একে অপরকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না। পাখীরা সবাই মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার বলিলে ভুল হইবে। আমাদের উপার্জনক্ষম সদস্য বলিতে একমাত্র আমার বড় ভাই যিনি সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসাবে যোগদান করিয়াছেন। প্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয় এই ঢাকা ইউনিভার্সিটি। আমরা পাচ বোন আর দুই ভাই, সাথে আমার মা। সংসার ছোট নয়, কিন্তু সে তুলনায় আয়ের পরিমান আমাদের জন্য অনেক ছিলো না। এইটা তখনকার দিনের প্রায় অধিকাংশ পরিবারেরই হালচাল।

আমার বড় ভাইয়ের নিজস্ব একটা পরিকল্পনা ছিলো কিন্তু আমরা যাহারা ছোট ছোট ভাই বোন আছি, তাহাদের জন্য আমার ভাইয়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় অনেক ব্যঘাত ঘটিতেছিলো। আর ইহার প্রধান কারন হইলো, তিনিই আমাদের মা, তিনিই আমাদের বাবা, তিনিই আমাদের দেখভাল করার জন্য একমাত্র ব্যক্তি। তাহার নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিতে গিয়া তিনি আমাদেরকে ছাড়িয়া একা কোথাও যাইতে পারেন না। ফলে আমাদের একটা গতি না করিয়া তিনিই বা কিভাবে তাহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিবেন? আমি সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ি, আমার ইমিডিয়েট বড় বোন আমার সাথেই গ্রামে পড়াশুনা করে। আমার আরেক বোন আমার থেকে এক ক্লাস উপরে পড়ে আর তার বড়জন পড়ে মাত্র ক্লাস এইটে। সবার বড় দুই বোন এর মধ্যে একজন স্বামীর সাথে পৃথক হইয়া এখন আমাদের বাড়িতেই থাকেন। আমার দ্বিতীয় বড় বোনের তখনো বিয়েই হয় নাই। ফলে ধরিয়া নেওয়া যায়, পাচ বোনের কারোরই বিয়ে হয় নাই। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটেই সুস্থ নয়। মেয়েঘটিত অনেক প্রকারের অঘটন চারিদিকে ঘটিতেছে। আমরা আছি একটা বিপদের মধ্যে। আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নাই। দেশ স্বাধীন হইয়াছে বটে কিন্তু দেশের মানুষগুলি এখনো আতংকের মধ্যেই দিন কাটাইতেছে।

যাই হোক যাহা বলিতেছিলাম সেখানেই আসি। আমার ক্যাডেট কলেজের ভর্তির কথা।

আমার বড় ভাইয়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় যাহা ছিলো তাহা হইলো যে, আমাকে কোনো একটা ভালো আবাসিক স্কুল কিংবা কলেজে স্থায়ীভাবে ভর্তি করাইয়া দিতে পারিলে আমার ব্যাপারে তিনি দুশ্চিন্তা মুক্ত হন, আর আমার সবগুলি বোনকে বিয়া দিতে পারিলে পুরু পরিবারকে নিয়া তিনি শংকামুক্ত হন। আর এই শংকামুক্ত হইতে পারিলেই তিনি একান্ত নিশ্চিত হইয়া তাহার পিএইচডি করিবার লক্ষে বিদেশে স্কলারশীপ লইয়া বাইরে চলিয়া গিয়া নিজের ক্যারিয়ার তৈরী করিতে পারিবেন, অন্যথায় ব্যাপারটা সফল হইবে না। অনেক কঠিন কাজ এবং এই সবগুলি কাজে একের পর এক সাফল্য আসিলেই তিনি তাহার পরিকল্পনায় সার্থক হইবেন। কোনো একটা কাজে সাফল্য না আসিলে সেখানেই তাহার মহা পরিকল্পনা ভেস্তে যাইতে পারে এবং বড় ধরনের একটা হুমকী হইয়া দাড়াইবে।

ফলে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আমি। আমি গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করি। গ্রামের স্কুলের পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করিলেই যে কেউ খুব মেধাবী বলিয়া প্রমানিত হয়, তাহা কিন্তু মোটেও সত্য নয়। তবে আমি নাকি বেশ মেধাবী ছিলাম ইহা আমাদের স্যারেরা বলিতেন। আর এই মেধাবীত্ব প্রমানের লক্ষে মাঝে মাঝে আমার শিক্ষকগন আমাকে দিয়া আমার থেকে ছোট ক্লাসের তাহাদের ক্লাশ গুলি নেওইয়া লইতেন। তাহাতে স্যার দের দুইতী লাভ হইতো। অনায়াসেই স্যারেরা স্কুলে না আসয়া নিজের পরিবারের জন্য বাজারের দিন বাজার করিতে পারিতেন, কিংবা বৃষ্টির দিনে বাসায় বসিয়া ভুনা খিচুড়ি খাইতে পারিতেন।

একদিন ভাইয়া গ্রামে আসিয়া আমাকে কাছে টানিয়া বলিলেন, তোকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হইতে হইবে। আমার জীবনে এমনিতেই আমি আমার গ্রামের স্কুলের নাম ছাড়া অন্য কোনো স্কুল কলেজের নাম পর্যন্ত শুনি নাই, সেখানে ক্যাডেট কলেজ কি তাহাই তো জানি না। আমি আমার এই তথাকথিত মাথার অভ্যন্তরের সবগুলি প্রকোষ্ঠ খুজিয়া কোথাও ক্যাডেট কলেজের কোনো তথ্য আমার মাথার মধ্যে সন্ধান পাইলাম না। কি করিয়া জানিবো ক্যাডেট কলেজ জিনিসটা কি? আমরা সবাই ভাইয়াকে খুব ভয় পাইতাম, কিন্তু এই ভয়ের মাঝেও আমি একটু এরোগ্যান্ট ছিলাম বলিয়া বুঝিয়াই হোক আর না বুঝিয়াই হোক, একটু আধটু ঘাউরামীও করিতাম। আমার বড় ভাই আমার এই এরোগেন্সিটাকে কখনো বেশ করিয়া উপভোগ করিতেন আবার কখনো কখনো রাগে এমন শাসন করিতেন যে, গায়ে হাত দিতে একটুও কার্পণ্য করিতেন না। যেনো আমি তাহার নিজের কোনো সম্পদ, যখন যাহা খুশী তাহাই করিতে পারেন। কিন্তু অনেক পরে আমি বুঝিয়াছি, আমি শুধু তাহার সম্পদই ছিলাম না, আমি ছিলাম তাহার অন্তর। তাহার শাসনে আমি যতোটা না ব্যথা পাইতাম, আমার ভাই তাহা হইতে অধিক আঘাত পাইতেন বলিয়া আজ মনে হয়। আমি আমার বড় ভাইয়ের এই শাসনটা আজ খুব মিস করি। ভাইয়ার ক্যাডেট কলেজের ভর্তির কথায় আজ এরোগ্যান্ট হইবার কোনো কারন আমি দেখিলাম না। জিজ্ঞাসা করিলাম, ক্যাডেট কলেজ কি জিনিস ভাইয়া?

ভাইয়া বলিলেন, সমস্ত বাংলাদেশ হইতে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য ছেলেরা পরীক্ষা দেয়। হইতে পারে এক লাখ ক্যান্ডিডেট, হইতে পারে তাহার থেকেও বেশি, কিন্তু সবগুলি ক্যাডেট কলেজ মিলাইয়া ছাত্র ভর্তি করে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ জন প্রতি ক্যাডেট কলেজে। তখন দেশে মাত্র চারটি ক্যাডেট কলেজ ছিলো। মেয়েদের জন্য কোনো ক্যাডেট কলেজ ছিলো না। ৪০ বা ৫০ জন সাফল্যবান ছাত্র এক বা দুই লাখ ছাত্রের মধ্যে কত অনুপাত তাহা আমার জানা ছিলো না, কিংবা ইহা কতটা কঠিন কাজ তাহাও আমার বুদ্ধিতে নাই, ফলে ইহা লইয়া আমার কোনো মাথা ব্যথাও ছিলো না। ভাইয়ার একটা প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, আমি যদি ইচ্ছা করি, এবং নিজে চেস্টা করি তাহা হইলে যে কোন কাজ আমার দ্বারা সাফল্য আসিবে। আমার উপর ভাইয়ার এই আত্মবিশ্বাসটা অনেক গভীরে পোতা ছিলো যা আমি নিজেও কোনোদিন জানিতাম না। তবে এইটা বুঝিতাম যে, আমি পারবো ইনশাল্লাহ। আমার আত্মবিশ্বাস আমার থেকে আমার উপর আমার বড় ভাইয়ের বেশী ছিলো।

আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য আমাকে কি কি করিতে হইবে? ভাইয়া অতি আদরের সহিত আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলেন, ভর্তি পরীক্ষা হইবে, মেরিট লিস্ট অনুযায়ী ছাত্র ভর্তি করা হয়। যারা ভালো করিবে এবং পাশ করিবে এবং এই সীমিত সংখ্যক সিটের জন্য কোয়ালিফাই করিবে তাহারাই ভর্তি হইতে পারিবে। কোনো রিকুয়েস্ট বা তদবির চলে না এই ক্যাডেট কলেজ গুলিতে ভর্তি হবার জন্য।

আমি ভাইয়াকে কি ওয়াদা করিয়াছিলাম, আমার আজো স্পষ্ট মনে আছে। বলিয়াছিলাম, ভাইয়া, যদি পরীক্ষা দিয়া ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়া যায়, তাহা হইলে আমি ভর্তি হইতে পারিবো। ভাইয়া বলিলেন, ইনশাল্লাহ বল। আমি বলিলাম, ইনশাল্লাহ। আমি ছোট, ইনশাল্লাহ বলিলে কতটুকু সাফল্য আসে, তাহা আমার জানা নাই, তবে সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসেঅনেক কাজ তিনি সহজ করিয়া দেন, ইহাই আমার গুরুজনেরা আমাকে শিখাইয়া দিয়াছেন। 

আসলে আমি কি কারনে এতো জোর দিয়া সাফল্যের কথা বলিয়াছিলাম, আমি আজো জানি না কিন্তু আমার মনে হইয়াছিলো, এইটা কোনো ব্যাপারই না। ভাইয়া শুধু আমার কথাতে খুশীই হইলেন না, তিনি জানিতেন, আমি পারবো। এখন শুধু আমাকে পারার জন্য সুযোগ করিয়া দিতে হইবে।

ভাইয়া আরো বলিলেন, দেখ, ভর্তি পরীক্ষার সময় আছে আর মাত্র ৩৯ দিন। বিশাল সিলেবাস, কোথা থেকে কি আসিবে পরীক্ষায় কেউ জানে না, কিন্তু এরই মধ্যে পাশ করিতে হইবে। এখানে পাশ করিবার কোনো নম্বরের লিমিট নাই। প্রথম হইতে মাত্র ৪০/৫০ জন। মেধা তালিকার এই একটা অসুবিধা।  

আমার প্রস্তুতির মধ্যে প্রথম ধাপ শুরু হইলো আমার হাতের লেখার অনুশীলন দিয়া আর তাহার সাথে ক্লাস সিক্স, সেভেন এবং এইটের সব বই পড়িয়া ফেলা দিয়া। পৃথিবীর সব দেশের রাজধানীর নাম হইতে শুরু করিয়া রাস্ট্রপ্রধানদের নাম, মুদ্রার নাম, আরো অনেক কিছু। তাহার মানে সাধারন জ্ঞ্যান বলিতে যাহা বুঝায় তাহা আয়ত্ত করা। আমি আজো বুঝি না, এই বয়সে ঘিনির রাস্ট্রপ্রধান ইয়াসিন সাহেব না হইয়া আলিম সাহেব হইলেই বা কি আর লন্ডনের মুদ্রার নাম পাউন্ড না হইয়া টাকা হইলেই বা কি? তাহাতে ক্যাডেট কলেজের মেধার সহিত কি পার্থক্য হয়? তাহা হইতে যদি বলিতো, লও একটা ফুটবল, দেখি কত জোরে লাথি মারিয়া কত দূর নিয়া যাইতে পারো, অথবা একটা গাছে উঠিয়া চড়ুই পাখীর বাসা হইতে একটা আস্ত ডিম পারিয়া কত তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিতে পারো দেখাও দেখি? সেইটাই হোক তোমার পরীক্ষা। অথবা যদি বলিতো যে, দেখি দম বন্ধ করিয়া কে কতক্ষন থাকিতে পারো? কিংবা যদি বলিতো, বৃষ্টিতে কে কতোক্ষন ভিজিয়া চুপচাপ বসিয়া থাকিতে পারো, এইটাই তোমাদের পরীক্ষা। যাই হোক, ভর্তি পরীক্ষার গুরুজনগন আমাদের থেকে বেশি মেধাবি বলিয়া তাহারা ফুটবল খেলিতে পছন্দ করেন না, তাই ফুটবল ১০০ গজ গেলেই কি আর ৫০০ গজ গেলেই কি। অথবা তারা বয়স্ক হইয়া যাওয়াতে বৃষ্টিতে ভিজার নাম শুনিলেই তাহাদের যাহার কথা প্রথমে স্মরণ হয় তিনি হচ্ছেন ডাক্তার। অহেতুক এই মেধা পরীক্ষা লইতে গিয়া ডাক্তার বাবুদের টানিয়া আনা খুব সমিচীন বলিয়া মনে হয় না। ফলে এইসব বিষয় সিলেবাসে সংযোগ করিয়া নিজেদের ক্ষতি করিবার কোনো কারন তাহারা দেখেন না। যাক, সিলেবাসের মধ্যে এখানেই শেষ নয়। ইংরেজীতে কথা বলার অনুশীলন করা, ইহার সাথে প্রতিদিন সকালে শারীরিক ব্যায়াম করা এইগুলাও নাকি আছে। এতোসব তো আর গ্রামে বসিয়া করা সম্ভব নয়। তাই আমার ট্রান্সফার হইয়া গেলো গ্রাম হইতে শহরে, খোদ ঢাকা ইউনিভার্সিটির চত্তরে, শহিদুল্লাহ হলে। আমার ভাই শহিদুল্লাহ হলে থাকিতেন, সেখানে। ভাগ্যের কি পরিহাস, ক্যাডেট কলেজে পরীক্ষা দিতে গিয়া প্রথমেই ইউনিভার্সিটিতে পদার্পন।

আমি যেইখানে ভাইয়ার সাথে থাকিতাম, সেইখানে তখন আমার ভাইয়ের সব কলিগরা থাকিতেন। সেকুল ভাই (ঢাকা ইউনিভারসিটির এপ্লাইড ফিজিক্সের লেকচারার, আমি জানি না তিনি এখন কোথায় আছেন, আবু সুফিয়ান ভাই, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ম্যাথ লেকচারার সম্ভবত, তাহার সাথেও আর কখনো যোগাযোগ হয় নাই আমার, এবং আরো অনেকে)। পাশেই ফ্যামিলি কোয়ার্টারে থাকিতেন সেই বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন ভাই (রসায়নের লেকচারার) গুলতেকিন ভাবি সহ। সন্ধ্যা হইলেই এই ঢাকা ইউনিভার্সিটির কিছু শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রী (তাহাদের মধ্যে সুবর্ণ মুস্তফা, কেমিলিয়া মুস্তফা, আফজাল ভাই এবং আরো অনেকেই আসিতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কিভাবে করিবেন তাহা আলাপ করার জন্য, আড্ডা দেওয়ার জন্য। আমিই হইলাম গিয়ে একমাত্র অসম বয়সী এক কিশোর যাহাকে সবাই খুব আদর করিয়া কেউ পিচ্চি, কেউ বালক, কেউ আবার নিজের দেওয়া যে কোনো মিস্টি নাম, কেউ আবার আমার নাম ধরিয়াই ডাকিতেন। আমাকে যে কেউ যে নামেই ডাকিতেন, আমি তাহাতেই উত্তর করিয়া সময়টাকে প্রানবন্ত করিয়া রাখিতাম।   

আমার কোনো বন্ধু ছিলো না এই শহরে। আমি সকালে আলুর ভাজি দিয়া পরোটা খাই, তারপর পড়িতে বসি, আবার দুপুরের দিকে গোসল সারিয়া দুপুরের খাবার খাই, ঘুমাই, বিকালে সবার সাথে বোবা মানুষের মতো আড্ডা দেই, সন্ধ্যা হইলেই আবার পড়িতে বসি। এর মধ্যে বেগমের মা ই একমাত্র মহিলা যিনি সব লেকচারারদের জন্য তিন বেলা রান্না করিয়া দেয় আর আমার সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়। ঢাকা শহরের একমাত্র মহিলা যাহাকে আমি গ্রামের মানুষদের মতো করিয়া পাইয়াছিলাম। আরেকজন ছিলো মুন্সি নামে একজন পুরুষ যিনি চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী হইয়াও রাজনীতির অনেক খবর রাখিতেন এবং খুব ভালোভাবেই অংশ গ্রহন করিতেন। আজ এই মানুসগুলি কোথায় আছে আমার জানা নাই, কিন্তু মিস করি।

শহিদুল্লাহ হলে আমার পড়াশুনা খুব ভালোভাবে চলিতেছে। কিন্তু গ্রামের জন্য আমার খুব মন খারাপ হয়। বিছানায় শুইলেই আমি আমার সেই গ্রামের পথ দেখি, মায়ের জন্য মন খারাপ হয়, আমার বন্ধুদের জন্য মন খারাপ হয়, আর মনে হয় কাউকে না জানাইয়া গ্রামে পালাইয়া যাই। কিন্তু আমি এই শহরের কোনো রাস্তাঘাট আমি চিনি না, কাউকে চিনি না, হাতে কোনো টাকা তো দুরের কথা পয়সাও নাই। আর থাকিলেও কিভাবে কাকে কি বলিয়া আমাদের গ্রামে যাওয়া যায়, তাহার কোনো পথ লিঙ্ক আমার জানা নাই।

দিন যায়, রাত যায়, আমার আমার সব কাজ ঠিক ঠাক মতো চলছে। বিশেষ করে পড়াশুনা। শুধু পড়াশুনাই ভালোভাবে চলিতেছে বলিলে ভুল হইবে, পড়াশুনার পাশাপাশি সকাল হইলেই আমার বড় ভাই আমাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমে পাঠাইয়া দেন। সেখানে সব সিনিয়র সিনিয়র ভাইয়েরা শরিরচর্চা করেন। আমিই একমাত্র সবচেয়ে কনিষ্ঠ অনুশীলনকারি যে এই ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমে আসি। কেউ কিছু বলে না, মাঝে মাঝে কেউ কেউ আমার গালে হাত দিয়া আদর করিয়া দেয়। আবার কেউ কেউ খুব খুশি হয় এই ভাবিয়া যে, এই অল্প বয়সেও আমি এতো সাস্থ সচেতন!! যখন জানিতে পারে আমি ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য চেস্টা করিতেছি, আর এই জিমে আসার পিছনে আমার সাস্থ সচেতনার থেকে সিলেবাস পুরা করাই মুখ্য, তখন অনেকেই আরো মিস্টি মিস্টি করিয়া আমার পড়াশুনার কতটুকু হইতেছে তাহা জানিতে আগ্রহী হয়। কয়েকদিনের মধ্যে অনেকের সাথে আমার অসম বয়সী বন্ধত্ত হইয়া উঠে। এখন আর খারাপ লাগে না। অনেকেই আমার পরিচিত।

দিন ঘনাইয়া আসে পরীক্ষার। আমার মধ্যে যতোটা না টেনসন তাহার থেকে বেশী টেনসন দেখিতে পাই আমি আমার বড় ভাইয়ের চোখেমুখে। একটা সময় আসে, আমার সব সিলেবাস শেষ হইয়া যায়, সবকটি রচনা বইয়ের যে কয়টি রচনা লেখা রহিয়াছে তাহা তোতা পাখির মতো মুখস্ত হইয়া যায়, তিন ক্লাস মিলিয়া যতো অংক আছে তাহা আমার নখ দর্পণে। সুত্র আমি ভালো বুঝি, নিজে নিজেই অনেক সুত্র যেন আবিস্কার করিয়া ফেলিতে পারি এমন একটা অবস্থা। পৃথিবীর সব দেশের রাজধানীর নাম আমার জানা। কোনো এক দেশের কোনো ছোট বালক হয়ত তাহার দেশের রাজধানীর নাম বলিতে না পারিলেও আমি তাহার দেশের রাজধানীর নাম অনায়াসেই বলিয়া দিতে পারি। সুরিনামের রাজধানী প্যারামারিবো এইটা হয়তো আজো অনেকেই জানে না। আর এই প্যারা দিয়া কেনো রাজধানীর নামকরন হইলো সেইটা লইয়া আমার কোনো কৈফিয়তও নাই। সুরিনামের রাজধানী “প্যারামারিবো” বা “পারা মারিবো” না হইয়া যদি “গুতা মারিবো” কিংবা “ঘুসি মারিবো”ও হইতো তাহাতেও আমার কোনো অসুবিধা হইতো না, আমি সেইটাও মুখস্ত করিতাম।

দিন যায়, পরীক্ষার তারিখ ঘনাইয়া আসে, আর আমার সিলেবাস শেষ হইতে থাকে। একদিন ভাইয়াকে বলিলাম, ভাইয়া, আমার তো সব পড়া শেষ। আর কোনো রচনাও বাকী নাই কোন বইয়ের। তাহা হইলে আমি এখন কি করিবো? ভাইয়া বলিলেন, তাহা হইলে এক কাজ কর, প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর পরে যে স্বপ্ন দেখিস, সেইটা সকালে উঠিয়া রচনা আকারে লিখিয়া ফেল। এইটাই তোর সিলেবাস। কি ভয়ংকর কথা। ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিচারদের মাথায় এতো বুদ্ধি? এখন আবার স্বপ্ন মনে রাখিতে হইবে? কিন্তু আমি তো শুধু একটাই সপ্ন দেখি, আর তাহা হইতেছে ওই যে, গ্রামের মেঠো পথ, ডাংগুলি খেলা, আমার বন্ধুদের লইয়া হইচই করিয়া মাঠে ফুটবল খেলা, সারাদিন চরকির মতো ঘুরিয়া বেড়ানো। কিন্তু তাহাতেও আমার রচনা শেষ হয় না। কখনো আমি আমার মাকে দেখি, দেখি আমাদের উঠোনে বাড়িয়া উঠা বরই গাছে ছোট ছোট বরই এর কলি আসিয়াছে, দেখি আকাশের শেষ প্রান্তে লাল সূর্য এক সময় সন্ধ্যা নামাইয়া সারা গ্রামকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করিয়া দিতাছে। আর ইহার সাথে রাতের তারা আর গোলাকার চাক্টির মতো চাদনী রাত উপহার দিতাছে। আমার রচনায় আমার মন খারাপের একটা পরিস্কার আভাস ফুটিয়া উঠিতেছে বুঝিয়া আমার ভাই মাঝে মাঝে আমাকে লইয়া পাশেই দোকানের গরম জিলাপি খাওয়ানোর চেস্টা করেন। মিস্টি জিলাপী খাওয়ার সাথে মন ভালো হইবার একটা যোগ সুত্র নিশ্চয়ই আছে। তাহা না হইলে, অন্তত ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন মেধাবী লেকচারার এই কাজটি করিতেন না।  

সপ্ন হইতে রচনা লিখতে গেলে যেহেতু আমার মন খারাপের একটা আভাস তিনি পাইতেছিলেন, তাই এইবার আমার বড় ভাইয়ের মাথায় আরেক নতুন ফন্দি এলো। বিকালে যে সব বড় ভাইয়েরা আড্ডা দিতে আসেন, তাহাদের মধ্যে হুমায়ুন ভাই একজন উঠতি লেখক হিসাবে পরিচিত হইতেছিলেন। তিনি নন্দিত নরকের মতো একটা উপন্যাস ইতিমধ্যে লিখিয়া নাম করিয়া ফেলিয়াছেন। শঙ্খ নীল কারাগারও ইতিমধ্যে নাম করা হয়ে উঠিতেছে। ইহা আবার টিভিতে প্রচারিতও হইয়াছে। হুমায়ুন ভাই তাহার উপন্যাশের মুল কাহিনী লিখার আগে বা পরে তিনি তাহার লেখাগুলি এই আড্ডায় শেয়ার করিতেছেন। আমি ছোট একজন মানুষ এইসব বড় বড় মানুষদের কাছে বসিয়া শুধু হাই তুলিতেছি। আমি কি তাহাদের এই উপন্যাশের চরিত্রের বৈশিষ্ট খন্ডন করিয়া রচনা আকারে লিখিতে পারি? তাই, শহিদুল্লাহ হলের ডাইনিং হলের উপরের তালায় এক মাত্র সাদা কালো টিভির নাটক আর বিদেশি কিছু ইংরেজী সিরিয়াল দেখার অনুমতি আমার মিলিয়া গেলো। কিন্তু অসুবিধা হইলো আরেক জায়গায়। এতো ছাত্র এবং ছাত্রীরা এই সাদা কালো টিভির দর্শক ছিলেন, যে, তাহাদের গল্পের ডায়ালগ শুনিতে শুনিতে টিভির কোনো ডায়ালগই আমার কানে আসিত না।

এখানে আরো একটা কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। আমার হাতের লেখা অনুশীলন করিতে করিতে আমার হাতের লেখা মুক্তার মতো ঝকঝকে হইয়া গেলো। একেবারে কার্বন কপি আমার বড় ভাইয়ের হাতের লেখার সাথে। শুধু তাই নয়, আমি যে কোনো স্টাইলে হোক সেটা সোজা করিয়া, বাকা  করিয়া, তেরা করিয়া, সব স্টাইলেই আমার হাতের লেখা এ ওয়ান।

অবশেষ ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষা আগামিকাল। সিট পড়েছে ঢাকা কলেজে। কি বিশাল সেই কলেজ। আমার জীবনেও এতো বড় কলেজ দেখি নাই। কতগুলি বিল্ডিং, কতগুলি রাস্তা, মাথা খারাপ হয়ে যায়। পরীক্ষার উত্তর প্রশ্নপত্রেই লিখিতে হইবে, ফলে খুব সাবধানে না লিখিলে উত্তরের জন্য অতিরিক্ত কাগজ লইবার কোনো অপশন নাই। আমার অবশ্য তাহাতে কোনো সমস্যা নাই কারন আমি অতি ছোট অক্ষরেও অলপ বিস্তর জায়গায় অতি সুন্দর করিয়া কাটাকাটি না করিয়া অনেক বেশী কিছু বেশ লিখিতে পারি।  

প্রশ্নপত্র হাতে পেলাম। প্রথমেই কি রচনা আসিয়াছে সেইতা খোজ করিতে গিয়া আমার এতো হাসি পাইয়াছিলো যে, আজো আমার ঠোট হাসে। এত রচনা পড়িলাম, এতো রচনা স্বপ্ন দেখিয়া দেখিয়া নিজে রচনা তৈরী করিলাম, এতো বড় বড় সাহিত্যিকদের সাথে নাটক উপন্যাসের চরিত্র ব্যাখ্যা করিয়া আমি নিজেও একজন সেমি সাহিত্যিক হইয়া যাইবার উপক্রম হইলো, আর সেখানে কিনা রচনা আসিয়াছে “আমার জুতার ফিতা”, আর “আমার কলমের নিপ”? তাও আবার দশ লাইন। ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রকারীরা আসলে অন্য গ্রহে বাস করিতেন বলিয়া আমার বোধগম্য হইল, অথবা তাহার রচনা নির্বাচন করিবার জন্য হয়তো কিছু দুই বা তিন বছরের বাচ্চাদের লইয়া একটা বোর্ড গঠন করিয়াছিলেন, যাহারা জুতার ফিতা আর কলমের নিপ ছাড়া আর কিছুই তাহাদের জ্ঞ্যানে ছিলো না। যাক, আমি “কলমের নিপ” রচনাটাই লিখিলাম। আমিও কম চালাক নই। দশ লাইন লিখিতে হইবে, আমি দশ লাইন ই লিখিবো। লিখিলাম।

আমার একটি কলম আছে যাহার আগায় একটা নিপ আছে।

নিপটি শক্ত।

মনে হয় টিনের তৈরী।

নিপটি খোলা যায়।

আবার লাগানোও যায়।

মাঝে মাঝে নিপটি খুলিয়া ধুইতে হয়।

নিপ ভেংগে গেলে নতুন নিপ লাগানো যায়। ।

নিপের জন্য একটা ক্যাপও আছে।

নিপ কলমের মাথার মতো।

আমি নিপটিকে খুব ভালোবাসি।

আমি কখনো নিপটিকে এমন করিয়া ভালোবাসিয়াছি কিনা আজো জানি না। কিন্তু লিখিয়া তো দিয়াছি যে, আমি নিপটিকে ভালোবাসি। আসলে ভালোবাসার জন্য শুধু প্রান থাকিতে হইবে এমন বস্তুই নয়, প্রান নাই এমন সব বস্তুকেও আমরা অনেক ভালোবাসি। হয়ত এই নিপের জন্য কেউ এমন করিয়া এমন ভালোবাসা প্রদর্শন করিলো।

পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি একে একে সবগুলির উত্তর দিতে থাকিলাম। অংক, ইংরেজী আর সাধারন জ্ঞ্যান এর পরীক্ষা। বাংলা কি ছিলো কিনা এখন আর মনে করিতে পারিতেছি না। মনে হয় ছিলো না। আমি যখন পরীক্ষা দিতেছিলাম, লক্ষ্য করিলাম, একজন মোটা টিচার প্রায়ই আমার পাশে আসিয়া দারাইতেন। আর বলিতেন, তোমার হাতের লেখা তো খুব সুন্দর!! মাত্র এক ঘন্টার পরীক্ষা। এই এক ঘন্টায় নির্ধারিত হইয়া যাইবে কে বা কাহারা এইসব ক্যাডেট কলেজ গুলিতে ভর্তি হইবে। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় ক্যাডেট কলেজের ছেলেগুলি কি ভাগ্যবান নাকি ছেলেগুলি ক্যাডেট কলেজকে ভাগ্যবান করিয়াছে? হয়ত দুইটুই সত্য।

পরীক্ষা সেসের ঘন্টা বাজিয়া গেলো। আমার পরীক্ষা খুব ভালো হইয়াছে। জানামতে কোন ভুল করি নাই। আমি তৃপ্ত পরীক্ষা দিয়া। খাতা লইয়া যাইতেছেন টিচাররা। আমার খাতা নিতে আসিলেন ওই মোটা টিচার। আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, পরীক্ষা কেমন হইয়াছে? আমি স্যারকে বলিলাম, স্যার যদি একজন চান্স পায়, তাহা হইলে আমি পাবো। এবার আর ইনশাল্লাহ বলিতে ভুল করি নাই। স্যার নিজেও সম্ভবত আমার উত্তরগুলি লিখার সময় পড়িয়াছিলেন। তাই হয়তো বুঝিয়াছিলেন, আমার কথায় একটা সত্যতা আছে। তিনি আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলেন, ভাইভা পরীক্ষাটা ভালো করিয়া দিবা, দেখা হইবে কলেজে। পরে আমি কলেজে গিয়া এই স্যারের নাম জানিয়াছিলাম, মোহশীন স্যার, আমাদের বাইওলোজির টিচার।

লিখিত পরীক্ষা তো শেষ। এখন যাহারা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করিবে তাহাদের মধ্য হইতে আবার ভাইভা নেওয়া হইবে। ভাইবায় যাহারা মেধাবী হিসাবে প্রমান করিতে পারিবে, তাহারাই সেই গুটিকতক ভাগ্যবান যারা সপ্নের ক্যাডেট কলেজে পড়িতে যাইবে। বয়স মাত্র ১২, যেই সব পরীক্ষা দিতেছি, আমেরিকার প্রেসিডেন্টরাও মনে হয় এই বয়সে এমন পরীক্ষা দেয় নাই। এদিক হইতে আমরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হইতেও উত্তম।  

পরীক্ষার পর যেনো আমার আর কোনো কাজ রহিলো না। কিন্তু আমার না হয় কাজ নাই, কিন্তু যিনি কাজ জোগাড় করিয়া দেওয়ার লোক আমার সেই ইউনিভার্সিটির ভাই, তাহার হাতে তো আমার জন্য অনেক কাজ জমা হইয়াই ছিলো। ভাইয়া ভাবলেন, কি জানি যদি ক্যাডেট কলেজে না চান্স পাই তাহাহলে কি হবে? ফলে বিকল্প হিসাবে তিনি আরো একটি কলেজের জন্য আমাকে প্রস্তুতি নিতে বলিলেন। আর সেইটা হইতেছে ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল। ক্যাডেট কলেজের প্রস্তুতি আমার এমন ছিলো যে, ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের জন্য ইহাই ছিলো ঢের। ফলে খুব অনায়াসেই আমি ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের ভরতি পরীক্ষায় টিকে গেলাম।

দিন যায় মাস যায়, ভাইয়া আমার ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন আর আমি অপেক্ষায় থাকি কবে গ্রামে যাবো, আবার বৃষ্টিতে ভিজবো, গ্রামের বন্ধুদের লইয়া আমি কবে আবার সেই আগের দিনের মতো হই হুল্লুর করিবো। 

আমি রীতিমতো ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে ক্লাস শুরু করিয়া দিয়াছি। নতুন নতুন কিছু বন্ধু জুটিলো। ভালো লাগিতে শুরু করিলো আমার শহরের জীবন। আমি শহিদুল্লাহ হল হইতে হাটিয়া হাটিয়া সেই আজীম্পুর ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে যাই ক্লাস করিতে। ফিরিতে ফিরিতে বাজিয়া যায় প্রায় পাচটা।

হটাত একদিন সকাল বেলায় আমাকে আমার ভাই কাছে ডাকিলেন, পাশে বসাইলেন, আর আমার মাথায় হাত দিয়া বলিলেন, ‘তুই জানিস না তুই কি করেছিস। তুই ক্যাডেট কলেজের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছিস। কত যে আমি খুশী হয়েছি তোকে বুঝাতে পারবো না’। আমি পাশ করেছি এই উপল্বধিটা আমার মধ্যে কোনো কিছুই পরিবর্তন করিলো না কিন্তু ভাইয়ার খুশী দেখিয়া আমার অনেক আনন্দ হইয়াছিলো। আমাকে ভাইয়া ওইদিন সন্ধ্যায় কোথায় যেনো লইয়া বেশ মজার মজার খাবার খাওইয়াছিলেন। ঢাকা শহর ঘুরাইয়া ছিলেন। আমি ভাইয়ার হাত ধরে এক রিক্সায় বেড়াইয়াছি। খাওয়া দাওয়ার পর ভাইয়া হুমায়ুন স্যারের বাসায় এই সুখবরটা দিতে আমাকে লইয়া গেলেন। রাতে হুমায়ুন স্যারের বাসায়ই খাওয়া দাওয়া করিলাম। গুলতেকিন ভাবি খুব ভালো মহিলা ছিলেন, আমাকে আদর করিয়া বলিলেন, এই যে মেধাবী ছেলে, আসো তোমাকে মিস্টি খাইয়ে দেই। এই বলে তিনি আমাকে এক বাটি পুডিং ধরিয়ে দিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি পুডিং খুবই অপছন্দ করি। বলিলাম, পেটে একটু জায়গাও নাই যে খাই। তারপরেও খাইলাম। ভালোবাসায় যে যাই কিছুই দিক, তাহাতে ভালোবাসার সাথে যাহা থাকে তাহা হচ্ছে স্নেহ আর মায়া। এই মায়ার কারনেই কেউ এই পৃথিবীকে ছাড়িতে চাহে না।  

কিছুদিন পরই ভাইভার তারিখ পড়িয়া গেলো। আমি এই ভাইভাটাকে এতো ভয় পাই যে, মাঝে মাঝে আমি তোতলাতে থাকি যদি উত্তর না পারি। তারপরেও তো ভাইভা দিতে হইবে। আমার যেইদিন ভাইভা পরীক্ষা সেইদিন আমার সিরিয়াল পড়িলো একবারে শেষ ছাত্র হিসাবে। শেষ ছাত্রের ভাইভা দেওয়ার বিরম্বনার আর শেষ নাই। যেই পরীক্ষা দিয়া বের হয়, অমনি আমরা হুম্রী খাইয়া তাহাকে ঘিরিয়া প্রশ্ন করিতে থাকি, তাহাকে কি জিজ্ঞাসা করিয়াছে, আর সেইটার উত্তর কি দিয়াছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের প্রাননাশ। আর টেনসন তো আছেই। আমরা যাহারা তখনো পরীক্ষার সিরিয়ালে বসিয়া আছি, তাহারা ফাকে ফাকে অনেক প্রশ্ন নিয়ে আলাপ আলোচনাও আবার করিতেছি। একসময় (নাম বল্বো না আমার এক বন্ধু যে পরে আমার সাথেই ক্যাডেট কলেজে পড়েছে) এক ছাত্র আরেক ছাত্রকে প্রশ্ন করিলো, জানো, গাড়ি চলার সময় কয় চাক্কা সাম্নের দিকে ঘুরে? আমিও মনোযোগ সহকারে প্রশ্নটি শুনিলাম, কিন্তু যেহেতু কোনোদিন আমার পরিবার গাড়ির মালিক ছিলেন না, তাই আমি নিজেও জানি না আসলে কোন কোন চাক্কা গাড়ি চলার সময় সামনে যায় আর কোন চাক্কা পিছনের দিকে যায়। আমার প্রশ্নকারী বন্ধু খুব গম্ভীরভাবে উত্তর দিলো, গাড়ির সামনে চলার সময় তিন চাক্কা নাকি সামনে ঘুরে আর এক চাক্কা নাকি পিছনের দিকে ঘুরে। আমি বিশ্বাসও করিয়াছিলাম। হইতেও পারে, কারন ওরা তো গাড়িতেই ঘুড়াঘুড়ি করে। আমি এরপর অনেকবার পরিক্ষা করে দেখার চেস্টা করিয়াছি, আসলে কোন চাক্কাটা পিছনের দিকে ঘুরে? এইটা খুজিতে গিয়া বারবার আমার মাথাই খালি চক্কর দিয়াছে কিন্তু কোন চাক্কা পিছনে চক্কর দেয় সেটা আজো বুঝি নাই।

অবশেষে ভাইভার জন্য আমার ডাক পড়িলো। তখন প্রায় সন্ধ্যা। শেষ ছাত্রের ভাইভার যেমন সারাদিন টেনসনের জন্য মাথা খারাপ থাকে, আবার শেষ ছাত্র হইলে একটু লাভও আছে। টিচাররা তখন বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির থাকেন, মোটামুটি প্রশ্ন করিয়াই ছাড়িয়া দেন। বাড়ী যাওয়ার তাড়া। আমার বেলায়ও তাহাই হইলো।

চল্লিশোর্ধ্ব বিজ্ঞ পাচ ছয়জন ব্যক্তিবর্গ মাত্র বারো বছরের বালকের মেধা যাচাই করিবার লক্ষে চারিদিকে এমন করিয়া বসিয়া আছেন যেনো গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ হইতেছে। একজন আমাকে প্রশ্ন করিলেন, তুমি কেনো ক্যাডেট কলেজে ভরতি হইতে চাও? আমি বললাম, আমি পাশ করিয়াছি বলিয়া ক্যাডেট কলেজে ভরতি হইতে চাই স্যার। সবাই আমার এই উত্তরে কেমন জানি যেনো হচকচিয়া গেলেন। একি কথা !! আরেকজন বলিলেন, তুমি কি আর্মি হইতে চাও? আমি বললাম, স্যার আর্মি কি? এবার আরো অবাক স্যারেরা। কি জানি কি বলাবলি শুরু করিলো ওনারা। আমি ভয় পাইয়া গেলাম। এইবার একজন আইনস্টাইনের মতো বুড়োলোক আমাকে একটা সাদা পাতা হাতে দিয়া একটা অংক করিতে বলিলেন। সময় দিলেন দুই মিনিট। আমি কয়েকবার অংকটা করে দেখিলাম। এক্স এর মান নির্ণয় করিতে হইবে। ইহা আমার জন্য পান্তা ভাতের মতো। কিন্তু বারবার অংক তা করিবার পরও দেখিলাম, ব্যাপারটা মিলিতেছে না। আমি খুব ভয়ে ভয়ে বলিলাম, স্যার অংকটা মিলছে না, এক্স এর মান কি ভুল আছে?

এইবার তাহারা আর অবাক হইলেন না। একেবারে আমার পিঠে একজন চাপড় মারিয়া বলিলেন, হ্যারে বাবা, এইটাই তো উত্তর!! যাও, তোমার পরীক্ষা শেষ। আমি তো অবাক। অংক স্যারের ভুল দিয়াছেন, আমি নাকি সঠিক উত্তর দিয়াছি। ক্যাডেট কলেজের স্যারেরা সব মনে হয় পাগল। মেধাবী ছেলেদের পড়াইতে পড়াইতে স্যারেরাও আধা মেধাবী থেকে পুরুটাই পাগল হইয়া যাইতেছেন। শুনেছি, বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরা নাকি পাগল হয়।

ভাইয়াকে সব আদোপান্ত বলিলাম। ভাইয়া আমার কথাগুলি দাড়ি কমা সহকারের গলদ করন করিতেছিলেন। যেনো আমি কোনো ভুতুরে গল্প বলিতেছি। সব শুনিবার পর ভাইয়া একটু কেমন জানি করিলেন। বাতাশ ভর্তি বেলুন হতাত করিয়া মুখ খুলিলে যেমন নিমিসের মধ্যেই তাহা আর পেট ফোলা মাছের মতো মনে হয় না, তেমনি আমার ভাইয়ার চোখ মুখ দেখিয়া আমার বড় ভয় হইতে লাগিলো। অনেক্ষন পর এক্তা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়া বলিলেন, বোকার মতো কেনো বলিতে গিয়াছিস যে, আর্মি কি তা জানিস না বা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করেছি বলে ক্যাডেট কলেজে পড়তে চাই। বুদ্ধি করে অন্য কিছু বলতে পারলি না? বুঝলাম, আমি আসলে বোকাই।

যাই হোক, ভাইভা বোর্ডের সদস্যগন হয়ত আমাকে বোকা মনে করেন নাই, তাহারা হয়ত আমাকে বোকা না ভাবিয়া সহজ সরল ভাবিয়াছিলেন, তাই ফেল করাইয়া দেন নাই। আমি পাশ করিয়াছিলাম। সেই ৪১ বছর আগে সমস্ত পরীক্ষায় পাশ করার কারনে আজ ১৯ শে জুন এই দিনে কিছু অজানা মেধাবী ছেলেদের সাথে পড়াশুনা করিতে যাইতেছি আমি ক্যাডেট কলেজে। ঢাকা থেকে বহুদুর। সেই টাঙ্গাইল। ঢাকাই আমার কাছে সাত সমুদ্র তের নদীর পথ মনে হইতো আমার গ্রাম থেকে, আর আজ যাচ্ছি চৌদ্দ সমুদ্র ছাব্বিস নদীর দুরুত্তে।

সকাল সকাল ভাইয়া আমাকে কালো প্যান্ট আর সাদা ফুল শার্ট পড়াইয়া কোরবানীর গরুকে যেমন আদর করিয়া বাজারে দামী খদ্দেরের কাছে হাতছাড়া করিয়া দেন, ভাইয়াও আমাকে তেমনি সুদুর প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়া মির্জাপুরের কোনো এক বনবাসে ক্যাডেট কলেজ নামক বহুল আলোচিত এবং সপ্নের জগতে রাখিয়া আসিলেন। হাসের বাচ্চাদের মতো আমরা ৫৪ জন সমবয়সী কিশোর পিতামাতাহীন হইয়া মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে থাকিয়া গেলাম। প্রথম দিন একটা জেল খানা বলিয়া মনে হইল। আরো মনে হইলো যে, এতো কষ্ট করিয়া শেষ পর্যন্ত জেলে আসার জন্য ব্যতিব্যস্ত হইয়া ছিলাম?

মন খারাপ হইতেছিলো। এমন সময় পিছন হইতে কে জানি খুব আলতো করিয়া আমার ঘাড়ে হাত রাখিলো। তাকাইয়া দেখিলাম, ওই মোটা স্যার। খুব আপনজন মনে হইলো। আমার চোখ ছল ছল করিয়া উঠিলো। স্যার আমার চোখে চোখ রাখিয়া বলিলেন, মন খারাপ হইতেছে? আমরা আছি তো।

আজ এতো বছর পর মনে হইতেছে, হ্যা স্যার, আপ্নারা তো ছিলেন। আমার সেই প্রিয় ক্যাডেট কলেজ, বড় সুন্দর একটি স্থান আমার অন্তরে। আর সেই সব স্যার যাদেরকে আমি মিস করি নিঃশ্বাসের প্রতিটি ক্ষনে কারন তারা আমাদের শুধু স্যার ছিলেন না, ছিলেন কখনো ভাই, কখনো গুরুজন, কখনো পিতামাত আবার কখনো একেবারেই বন্ধু। আজো স্যার দের কে আমার পায়ে স্পর্শ করিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে ইচ্ছা করে, স্যার আমি আপনাদেরকে অনেক অনেক ভালোবাসি। আপ্নারা যে যেখানেই থাকুন, আমরা আপনাদের দোয়ায় বাচিয়া থাকিতে চাই।

১৪/০৫/২০১৮- মা

Categories

মাকে নিয়ে অনেক লেখা হয়, মাকে নিয়ে হাজার হাজার কাহিনী এবং ইতিহাস রচিত হয়। পৃথিবীর সারা বুকে বিভিন্ন ভাষায় কতভাবে যে রচিত হয়েছে এই মায়ের উপর কাহিনী বা সত্য ভাষণ, তার কোনো ইয়াত্তা নাই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিটি ফিলিংস বা অনুভুতি একেকটা মোউলিক রচনাই বটে।

পৃথিবীর সব ভাষায় সব বাচ্চারা প্রথম যে শব্দটি শিখে তা হচ্ছে “মা” বা এর প্রতিস্থাপক কোনো শব্দ। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, সব ভাষায় এই “মা” শব্দটি প্রায় কাছাকাছি তার উচ্চারন। কোথাও মা, কোথাও মাম্মি, কোথাও আম্মু, কোথাও মাম এই রকমের। গত পরশু ছিলো “মা” দিবস। এতা একটা রুপক দিন। “মা” দিবসের কোনো দিন হয় না তার পরেও বছরেরেক্টি দিন “মা” এর জন্য উৎসর্গ করা একটি দিন। প্রানীকুলের মধ্যে সব “মা”ই এক রকমের। সেটা কোনো সিং হীর ই হোক, অথবা কোনো হরিনের কিংবা মানুষের। কোনো তফাত দেখা যায় না। কিভাবে ঈশ্বর এই মাতৃত্ব বোধ কে ঈশ্বর প্রতিটি মায়ের বুকে ছাপ মারিয়া একেবারে খাটি মা বানাইয়া দিয়াছেন তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কারো কাছে নাই।

তিনি আমার মা। মাত্র ১১-১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় কিন্তু দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই এক ছেলের মা হয়ে বিধবা হন। খুব বড় লোকের মেয়ে নন বটে কিন্তু মাঝারী পরিবারের বনেদি ঘরের মহিলা। যেই সময়ের কথা বলছি, তখন ১৫ বছর অতিক্রম করলেই গ্রামের মধ্যে আই বুড়ি হয়ে আছে মেয়ে এই রকম একটা অপবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে যদি আবার নিয়তির কারনে কেউ এতো অল্প বয়সেই বিধবা হন, তার তো জীবনটাই যেনো কি রকম দুর্বিষহ হয়ে উঠে তা জানে শুধু যে সাফার করে সে আর জানে সেই পরিবার যেই পরিবারে এটা ঘটছে। 

আমার মা শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ। দেখতেও ছিলেন সুন্দরী। আমার মায়ের পরিবারের কাউকেই আমার মনে নাই। বরং বলতে পারেন, আমি কাউকেই দেখি নাই। আমার জন্মের আগেই সব চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমি না দেখেছি আমার দাদি, দাদা, নানা, বা নানি, কিংবা কোনো মামা, মামিকে। কি আজব, না? আসলেই আজব। এমন্তা কি কখনো হয়? কিন্তু হয়েছে। 

আমার মা কে আমি দেখেছি যে, তিনি তার বড় বোন যার নাম সামিদা খাতুন, তাকে তিনি কতটা ভালোবাস্তেন। আর ওই খালাও আমার মাকে তার নিজের মেয়ের মতোই দেখতেন। 

এতো ধৈর্য, এতো বুদ্ধিমতি আর এতো নিরহংকার মানুষ ছিলেন তিনি, যার কোন তুলনা হয় না। আমার মায়ের সারাটি জীবন কেটেছে কস্টের মধ্যে।যখন তিনি একটু সুখের মুখ দেখবেন বলে আশা করেছিলেন, তার আগেই তিনি ২০০২ সালে জান্নাত বাসি হয়েছেন। 

আমার মায়ের জীবনের গল্পটা তাহলে বলিঃ 

আমার বয়স যখন মাত্র দেড় কি দুই তখন আমার বাবা মারা যান। আমি আমার বাবাকে দেখি নাই, এমন কি আমাদের কারো কাছেই আমার বাবার কোনো ছবিও নাই। আমার মা যখন আমার বাবাকে বিয়ে করেন, তখন তার প্রথম পক্ষের ছেলে বিল্লাল হোসেন (ওরফে ডাঃ বেলায়েত হোসেন) কে আমাদেরই গ্রামের পাশের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে পালক দিয়ে দেন। আমার মা আমার বাবার এমন একটা সংসারে পদার্পণ করেন যেখানে আমার বাবার আগের পক্ষেরই সন্তান ছিলো গোটা আট জন। তাদের সবার বয়স আমার মায়ের থেকে অধিক। এই সন্তানেরা আমার মাকে কোনদিনই আপন করে ভাবতে পারেন নাই। 

আমার বাবা ছিলেন মাদবর যিনি সারাক্ষনই গ্রামের মাদবরি আর তার জমি জমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। (চলবে) 

০৭/০৫/২০১৮-কনিকার এসএসসি রেজাল্ট

গতকাল আমার ছোট মেয়ের এসএসসি এর পরীক্ষার রেজাল্ট বাহির হইয়াছে। তো গত পরশুরাতে ওর মা খুব টেনশানে ছিলো কি ফলাফল করে মেয়ে সেটা ভাবিয়া ভাবিয়া। কিছু কিছু মানুষের টেনশন তাহার চেহারার মধ্যে একদম ফুটিয়া উঠে। তাহার মুখের অবয়ব দেখিয়া বুঝা যায় যে, শরীরের হরমুন ঠিক মতো কাজ করিতেছে না বলিয়া মুখে একটা ছাপ পড়ে। খাবার দাবারে অনীহা আসে, কথাবার্তায় খিটখিটে মেজাজ ফুটিয়া উঠে। ফোনে অধিক অধিক কথা বলে, কেউ কেউ আবার ফোন থেকেই বিরত থাকে। এইসব আর কি। আমার বউ সুন্দরী বলিয়া তাহার চোখ মুখ দেখিয়া বুঝিবার উপায় নাই সে টায়ার্ড কিনা কিন্তু সে যে টেনশনে আছে ইহা বুঝা যায়।

জিজ্ঞাসা করিলাম, খুব টেনশনে আছো নাকি? উত্তরে যা শুনিবার তাই শুনিলাম, “তোমার আবার টেনশন আছে নাকি? তোমার মতোই তো মেয়েগুলি হয়েছে। না আছে কোনো টেনশন, না আছে কোন আগ্রহ। ঐ যে বাপের মতন সব। এমতাবস্থায় আমার কি আর কিছু বলিবার আছে? এক কথাতেই তো শেষ- বাপের মতো সব অভ্যাস হইয়াছে মেয়েদের।

ঈশ্বর এইদিক দিয়া বউগুলোকে একদম নিস্পাপ করিয়া রাখিয়াছেন, সব বাচ্চাদের দোষ তো বাপের দোষ। আরে বাবা, বাচ্চাগুলিতো তার মায়েদের মতোও হইতে পারিতো, নাহ? যাক, সংসারে সুখ চাই, ঝগড়া চাই না। তারমধ্যে এখন তাহার টেনশনের মাত্রা মনে হইতেছে একটু বেশি। হাতে তসবিহ, মুখে বিড় বিড় করিয়া কোন এক দোয়া হয়তো সে পড়িতেছে। জিজ্ঞেস করিতে ভয় পাই কোন দোয়াটা পড়িতেছে। ব্যাঘাত ঘটিলে ভেজাল আছে। শান্ত থাকাই ভালো। কে খামাখা নীরব পুকুরে খামাখা ঢিল ছুড়িয়া সাপের লেজে আঘাত করে!! পরে দেখা যাইবে, শক্ত পরোটা খাইতে হইবে। এই মুহূর্তে দাত ব্যথা আছে। আমি দাতকে বেশী কস্ট দিতে চাই না। পড়ুক সে যে দোয়া পড়িলে টেনশন কমে সেটাই পড়ুক। কোনো কথা না বলে বললাম, হ্যা মেয়েগুলার আর কাজ পাইলো না। সব বাপের গুনগুলি পাইয়া বাপের সর্বনাশ করলো আর কি।

এই কথা বলিয়াও যে আমি তাহাকে খুব একটা খুশী করিতে পারিলাম সেটাও ওর মুখ দেখিয়া বুঝা গেলো না। মনে হইলো এই বুঝি নীরব আকাশ হটাত করিয়া কোন মেঘবৃষ্টি ছাড়াই গর্জন করিয়া উঠিবে। ভাগ্যিস ঈশ্বর প্রসন্ন হইয়া এই যাত্রায় আমাকে কোনো রকমে বাচাইয়া দিলেন। খুব বেশি ঝড় উঠিলো না। শুধু ঘাড় ঘুরাইয়া এমন একটা ভাব করিয়া গিন্নি অন্যরুমে পরোতা বানানোর জন্য চলিয়া গেলো তাতে বুঝিলাম, আমার শেষ কথাটিকে তিনি ব্যাঙ্গ ভাবিয়া একটু হুম করিয়াই ছাড়িয়া দিলেন। ঈশ্বর বড় রসিক। সাংসারিক জীবনে কিছু কিছু ছোট ছোট তর্ক-বিতর্ক এমন করিয়া লাগাইয়া রাখেন তাতে না ঝড় শুরু হয়, না অশান্তি। একটু ঘূর্ণিপাক খাইয়াই আবার পরিবেশ ঠান্ডা করিয়া দেন। যাই হোক, আমি গর্বিত যে, বাচ্চারা আমার জিদ, আমার সভাব পেয়েছে। আলসেমীটাও পেয়েছে ঠিক আমার মতোই।

তো মেয়েকে জিজ্ঞেস করিলাম, মা, তোমারো কি ফলাফলের জন্য টেনশন হচ্ছে? মেয়ের উত্তর- বাবা, আমার তো কিছুই মনে হচ্ছে না। আর টেনসন করে এখন কি আর কিছু করতে পারবো? বললাম, তাতো ঠিকই কিন্তু পরীক্ষার আগেও তুমি টেনশনে ছিলা না, এমন কি পরীক্ষা চলাকালীন সময়েও তো আমি বুঝি নাই যে, তুমি একজন পরীক্ষার্থী। মেয়ে মুচকি হাসি দিয়া বলিলো, চলো, ক্রাইম পেট্রোল দেখি। ও জানে আমি ক্রাইম পেট্রোল দেখিতে খুব পছন্দ করি। এই হলো আজকের দিনের যেনারেসন। এই সময়ের জেনারেশন কতটা ইন্টেলেকচুয়াল যাহারা তাহাদের হ্যান্ডেল করেনা, তাহাদের কোনো আইডিয়া নাই। তাহাদের কাছে কোনো পরামর্শ চাইলে তাহার আপনাকে দুই যুগ আগের কোনো এক পুরানো পরামর্শ দিয়া আপনাকে এমন এক ফন্দি দিয়া বিপদের মধ্যে ফেলিবে, যে, তখন না  আপনি সমস্যা হইতে বাহির হইতে পারিবেন, না বুঝিতে পারিবেন আরো কোনো বিপদ ঘনাইয়া আসিলো কিনা। তাই যদি পরামর্শ নিতে হয়, আমার কাছ হইতে নিবেন। এই জাতীয় পরামর্শ আমি বিনা পয়সায় দিয়া থাকি। কাজ হইলে জানাইয়া দিবেন, কাজ না হইলে দিতিয়বার আর আসিবেন না।

যাক, ফলাফল দিলো। আমার বউই আমাকে প্রথম খবরটা দিলো যে, মেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। ফোনে তার কথার সুরেই বুঝিতে পারিলাম, সে এক প্রশান্তিতে আছে। এই সকালেও যিনি আবহাওয়ার ১০ নম্বর বিপদ সংকেতের মতো রুপ ধারন করিয়াছিলেন, কোনো রুপ তান্ডব ছাড়াই মনে হইলো, হ্যা, আকাশ বড় পরিস্কার। সমস্ত ঝড় আর কালোমেঘ সব কোথায় কোন অঞ্চলে উড়িয়া চলিয়া গিয়াছে বুঝিতেই পারিলাম না। আমার বউ বড় খুশী। বলিলাম, খুব খুশী মনে হইতেছে তোমায়? এবার তার আরো চমকপ্রদ উত্তরে আমি ফোনের এপ্রান্তে বসিয়া হাসি। “তোমার তো কোনো সাধ আহ্লাদই নাই, মেয়ে এতো ভালো ফলাফল করিলো , কই তুমি মেয়েটাকে একটা ধন্যবাদ দিবা, তা না করিয়া ফোনে বকর বকর করিতেছো। আরে বাবা, আমি আবার কখন ফোনে বকর বকর করিলাম? মাত্রতো ফোন শুরু হইল!! বুঝলাম, এবার আর বাপের মতো হইয়াছে মেয়েগুলি এইটা অন্তত শুনিতে হইবে না। তাহার প্রশান্ত হাসিতেই আমার মন ভালো হইয়া গেলো। হাতের পাশে বেনসন সিগারেটের প্যাকেট হইতে একটা আস্ত সিগারেট লইয়া তার মাথায় আগুন ধরাইয়া নাসিকা ভর্তি ধোয়া ছাড়িয়া বউকে বলিলাম, দাও , মেয়েকে দাও। একটু কথা বলি।

মেয়ে মোট নম্বর পেয়েছে ১৩০০ মধ্যে ১১৭৪। কম না কিন্তু? প্রায় গড় নম্বর ৯০.৩১%। এই নম্বরে আমাদের সময় বোর্ডে স্ট্যান্ড করতো ছাত্র-ছাত্রীরা। তখন বোর্ডে স্ট্যান্ড করা ছাত্রদেরকে পাড়ার লোকজন নিজেরাই মিষ্টি নিয়ে এসে গালে হাত বুলিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে যেতো। যারা পরবর্তী বছরের ছাত্রদের অভিভাবক, তারা হয়তো একটু বলেও যেতো, আমার বাচ্চাটাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেবো, একটু গাইড লাইন দিয়ে দিও কেমন করে ভালো ফলাফল করতে হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আজ আর এইসব নাই। আজকাল অভিভাবকগন খবর নেয়, কোথায় কোচিং করিয়েছেন, কোন স্যার কোচিং এ ভালো। কোচিং হয়ে গেছে এখন একটা লাভজনক ব্যবসা।

চলুন একটা কোচিং এর স্কুল দিয়া দুইটাই লাভ করি। নাম এবং অর্থ। কে বলিলো যে, এই দেশে ব্যবসা নাই? কোচিং এর থেকে ভালো ব্যবসা তাও আবার বিনা পুজিতে, আর একটাও নাই।

১৩/০২/২০১৮-কনিকার জন্মের আগে লিখা

আমার ছোট মেয়ের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে। একটা জিনিষ আমি লক্ষ করছি যে, কনিকা কোনো কিছুতেই টেনশানে থাকে না। সবাই যেখানে পরীক্ষার টেনশানে বিভোর, কনিকা এখনো পড়তে বসলে তার টেবিলের চারিদিকে পুতুল, ছোট ছোট খেলনা, কিংবা তার আইপড অথবা নেইল কাটারের সেট অথবা ছোট কোন এক সুন্দর বোতলের ক্যাপ ইত্যাদি সাজিয়েই বসে। মনোযোগ দিয়ে পড়ে কিনা তাও আমি জানি না। 

পরীক্ষার একদিন আগে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কাল থেকে তো তোর মেট্রিক পরীক্ষা। সে মুচকী হেসে দিয়ে বল্লো, হুম, কিন্তু ২২ তারিখে তো শেষ। কি অবাক। সে শেষ কবে সেটা নিয়ে খুশী। এটাই হচ্ছে কনিকা। অথচ আমার বড় মেয়ে উম্মিকা, তার পরীক্ষার আগে বা সপ্তাহে ঘুম হারাম, খাওয়া দাওয়াও কমে যায়। সে এখন ডাক্তারী পড়ছে। এখনো সে পরীক্ষার ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। মাশআল্লাহ সে ভালো করছে এটাই আমার প্রাপ্য। 

একচুয়ালী আমার মেয়েদের থেকে সবচেয়ে বেশি টেনসনে থাকে ওদের মা। সারাক্ষন নামাজে থাকে, দোয়াদরুদ পড়ে। এবার দেখলাম, এক হুজুরকে ডেকে সে আমার ছোট মেয়ের কলমে দোয়া পরিয়ে দিচ্ছে। সারাদিন টেনসনে থাকে, মনে হয় পরীক্ষাটা ওই দিচ্ছে। 

কনিকার জন্মের সময় আমি ওর ব্যাপারে একটা লেখা লিখেছিলাম আমার ডায়েরীতে। সেই মেয়েটা আজ পরীক্ষা দিচ্ছে এসএসসি। তাহলে, আজ আমি ওই ডায়েরীর পাতাটা এখানে যোগ করি কি লিখেছিলাম। 

০১/০২/২০১৮-কনিকার এসএসসি শুরু

আমার ছোট মেয়ে, সানজিদা তাবাসসুম কনিকা। দেখতে দেখতেই বড় হয়ে গেলো মাশাল্লাহ। আজ ওর এসএসসি পরিক্ষার ১ম দিন। পরিক্ষার ব্যাপারে ওর কখনোই কোনো টেনশন ছিল না। কিন্ত গতকাল রাতেই দেখলাম যে, সে একটু টেনশনে আছে।

বললাম, কাল থেকে তোমার পরিক্ষা শুরু। ও হাসতে হাসতে বল্লো, ২২ তারিখে তো সেস। এই হল তার ফিলিংস।

২৭/০১/২০১৮-বদি ভাই অসুস্থ্য

Categories

এইমাত্র মান্না, সাদি এবং মিটুলের কাছ থেকে ফোন পেলাম যে, বদি ভাই স্ট্রোক করেছেন এবং সবাই মিলে ওনাকে প্রথমে শ্যামলি ইবনে সিনায় নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু শ্যামলির ইবনে সিনা ওনাকে ওখান থেকে শিফট করে মোহাম্মাদপুর শাখায় নিতে বলেছে। বদি ভাইকে এখন আউ সি ইউ তে নেওয়া হচ্ছে। বদি ভাই বেশ অনেকদিন যাবত খুব অসুস্থ অবস্থায় আছেন। মাঝে মাঝে দেখতে গিয়েছি কিন্তু ঊনার শারিরীক অবস্থা উন্নত করার জন্য আমাদের কিছুই করার নাই। এক সময়কার খুব অনেস্ট সরকারি করমকরতা যিনি ইচ্ছে করলে অনেক কিছু করতে পারতেন কিন্তু কখনো তা তিনি করেন নাই। অবসরের পরে শুধুমাত্র বাড়িভাড়ার উপর যা পেতেন সেটা দিয়েই নিজের ঊসধ এবং সংসার চালানোর চেষ্টা করেছেন।। ছেলেগুলি শহরে থেকেও নিজেদেরকে যোগ্য করে তুলতে পারে নাই।।অথচ ইচ্ছে করলে অনেক কিছুই হতে পারতো। ছেলেগুলির অবস্থা এই রকম যে, তারা নিজেদের সংসার চালাইতেই হিমশিম খাচ্ছে, বাবা মাকে আধুনিক চিকিতসা দেওয়ার সামর্থ্য কই। আমি এখন বসিলার রাস্তায় আছি, বেশ জ্যাম। রাত বাজে নয়টা বিশ। ভাইয়াকে দেখতে যেতে হবে কিন্তু কখন গিয়ে পউছতে পারি বুঝতে পারছি না। এই মুহুরতে ঊনার জন্য ফাইনানশিয়াল সাহাজ্য ও লাগবে। অথচ আমাদের ফ্যাক্টরিগুলির অবস্থাও খুব ভাল নয়। বেশ বড় বড় বিপদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এই লাস্ট কয়েক মাস যাবত। আল্লাহ যে কিসের পরীক্ষা নিচ্ছেন বুঝতে পারছি না। আমরা আল্লাহর কোনো পরীক্ষায়ই পাশ করার ক্ষমতা রাখি না যদি না তিনি আমাদেরকে রহমত না করেন। আল্লাহ আমাদেরকে সাহাজ্য করো।

০১/০১/২০১৮-আজ বহুদিন পর মনে হইলো

Categories

পহেলা জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার, এমডি অফিস।

আজ বহুদিন পর মনে হইলো যে, আমি যাদের জন্য ভোর সকাল হইতে কস্ট করিয়া শারীরিক পরিশ্রম করিয়া প্রায় সারাদিন খাটিয়া রাতের অর্ধেক সময় পার করিয়া যখন বাসায় ফিরিয়া  আসি, তখন আসলে আমি কি করিলাম আর কি করা উচিত ছিল এই হিসাবটাই মিলাতে পারিনা। তখন মনে হয় – কি লাভ করিতেছি?

আসলে আমি নিজে কোনো কিছুই লাভ করিতেছি না। গত বছর হইতে এই বছরের প্রান্তিক হিসাব করিয়া আমি দেখিয়াছি, আমার ব্যবসায় উন্নতি হইয়াছে বটে কিন্তু আমার সাস্থ্য খারাপ হইয়াছে। যে অনুপাতে আমার ব্যবসা উন্নতি হইয়াছে তার অধিক অনুপাতে আমার শরীর খারাপ হইয়াছে। আমার চারিদিকে আমার অনেক পরিচিত বন্ধু বান্ধব, আমার আত্মীয়সজন কিংবা আমার পরিচিত মানুষ অনেকেই না ফেরার দেশে চলিয়া গিয়াছে। কাহারো কাহারো বয়স আমার থেকেও কম কিন্তু তাহারা চলিয়া গিয়াছেন সবাইকে ছেরে। তাহারা জীবীত অবস্থায় কতই না হায় হুতাশ, কিংবা টেনসন করিয়া রাতের ঘুম হারাম করিয়াছিলেন, তাহারা আজ কাহারো জন্যই হা হুতাশ করিতেছেন না। এমন কি অধীক গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত থাকা অবস্থায়ও তাহারা এখন আর কোনো কর্ণপাত করিতেছেন না। তাহা হইলে কিসের মায়া আর কিসের জন্য কি?

আমার জীবদ্দশায় আমি দেখিয়া গেলাম, অধিকাংশ লোকেরা এমন কি আমার মেয়ের স্বামীরাও আমাকে ভালোবাসে আমার সম্পত্তিকে, তারা আমাকে না যতোটা ভালবাসিয়াছে, তাহার থেকে অধিক নজর আমার সম্পত্তির উপর। এটা শুধু মেয়েদের স্বামীর নজরই নয়, আমি লক্ষ করেছি, এটা আমার মেয়েদের শাশুড়িদেরও নজর এই সম্পত্তির উপর। লোভ জিনিসটা মারাত্তক খারাপ। ইহাতে সম্পর্ক নস্ট হয়, আপদ বাড়ে আর আপনজনার লিস্ট থেকে ক্রমে ক্রমে বহি স্কার হয়।

নতুন বছর শুরু হইয়াছে আজ। গত ২০১৭ বছরটি ছিলো আমার জীবনের নতুন কিছু অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে যোগ হয়েছিলো নতুন কিছু মানুষের। আমার ক্যাল্কুলেসন সাধারনত ভুল হয় না। আর যদি ভুল হয়ও তা এমনভাবে নয় যে, আমাকে ধুলিস্যাত করে নাস্তানাবুদ করে ফেলে। কিন্তু এবার কিছু হায়েনাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল আর আমি তাদেরকে মানুষ ভেবেছিলাম। আমার জিবনের যতো বিশ্বাস, যতো কনফিডেন্স, যতো সাবলম্বি জোর একেবারে হতাত করে ছদ্দবেশি কিছু মানুষ এমনভাবে অভিনয় করে কাছে এসেছিলো যে, আমার সকল ইন্দ্রিয় অবশ হইয়া তাহাদেরকে নিতান্তই আপন মনে করিয়া বুকের এতো কাছে আশ্রয় দিয়াছিলাম যে, এক সময় মাকড়শার পরবর্তী জেনারেসনের মতো আমার হৃদপিণ্ড খাইয়া পরিশেষে বাহির হইল।

শুভ সংবাদ এইটাই যে, অবশেষে আমি বুঝিতে পারিয়াছিলাম তাহারা আমার সাথে লম্বা রাস্তা পাড়ি দেওয়া জন্য যোগ্য নহে। আর এই অযোগ্য হায়েনা টাইপের মানুস রুপী প্রানিগুলিকে নিজের বলয় থেকে অবমুক্ত করিতে পারিয়াছি, ইহাই আমার সুখ।  একটা সময় আসিবে যখন এই প্রানিগুলি তাদের নিজের বুক কিলাইয়া কিলাইয়া বিলাপ করিবে আর বলিবে কে আছো আমাকে উদ্ধার করো, আমি বড় ভুল করিয়াছি। তাহাদের কেউ কেউ কাদিবে উচ্চস্বরে আর কেউ কাদিবে গোপনে। কিন্তু কাদিবে। কাদিবে এই কারনে যে, ভাগ্যের কারনে যুগে যুগে ভগবান আমার মতো মানুষকে কারো কারো ভাগ্যে জোটায়, এটা আমার মন্তব্য নহে, ইহা তাহাদের মন্তব্য যাহারা আমার সান্নিধ্যে আসিয়াছে। হয়ত এই আপন করে নেওয়ার মানুষ গুলি বুঝতেই পারলো না, কি তাহার হারাইলো আর কি তাহারা পাইলো না।

মা কুল্পা মা কুল্পা, এটা কোনো এক দেশের বুলি যার অর্থ আমি ভুল করেছি আমি ভুল করেছি। এইটা তারা বলে আর বুক কিলায়।

০৮/০৯/২০১৬- শুভ জন্মদিন তোমায়

Categories

 

সকাল বেলায় অনেকগুলি এসএমএস দেখে নিজেই খুব মনে মনে হাসছিলাম। কোন এক পল্লিগ্রামে আজ থেকে প্রায় ৫১ বছর আগে আমি আমার এক গ্রাম্য মায়ের কোল জুড়ে নাকি মানিকসোনা হয়ে জন্ম নিয়ে সবার মনে হাসি ফুটিয়েছিলাম। আমি কত জোরে কেদেছিলাম, আর কে কত জোরে হেসেছিল, সেটা আমার কস্মিনকালেও মনে নাই, কিন্তু যারা তখন অনেক অনেক খুশীতে খুশিতে আটখানা হয়ে পুরু গ্রাম, সারা বাড়ি মাতিয়ে তুলেছিলেন, তাদের অনুভুতি আজ এতো বছর পরে এসে আমার বুঝতে একটুও বাকি নাই। ওই যে বিখ্যাত মানুষ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম সাহেব বলেছিলেন, “যেদিন তোমার জন্ম হয়েছিল, সেইদিনই নাকি তোমার মা তোমার কান্নায় শুধু হেসেছিলেন”। মায়েরা সন্তানের কান্নায় কখনো হাসেন না, কিন্তু সন্তানের জন্মেরদিন সন্তানের কান্নায় নাকি মায়েরা আনন্দে হাসেন। কি অদ্ভুদ কথা। তাদেরকে আমি আমার অন্তর থেকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাই। দোয়া করি যেনো তারা স্বর্গীয় হন। 

তাদের অনেকেই আজ এই মিস্টি পৃথিবীতে নাই, কিন্তু আমার সেইদিনের জন্ম নেওয়াক্ষনটিকে আমার উত্তর সুরীরা, আশে পাশের বন্ধুবান্ধবরা, আমার অনুজ, আমার সন্তান, বা সন্তান তুল্য মিস্টি মিস্টি দুষ্টু পোলাপান গ