২৩/০২/২০২৩-আমেরিকার ভিসা প্রাপ্তি

অনেকবার আমেরিকা যাওয়ার জন্য ভিসা পেয়েছিলাম কিন্তু যাওয়া হয়েছে মাত্র একবার। বাকী সম্ভবত আরো দুবার ভিসা ছিলো (দূটু মিলিয়ে প্রায় ৮ বছর মেয়াদিতে) কিন্তু যাওয়া হয় নাই। আমেরিকা আমাকে আসলেই টানে না। অনেকের কাছে এটাকে সর্গপুরী মনে করেন বটে কিন্তু আমার কাছে কোনো বিদেশই টানে না। আর সেটেল হবার তো কোনো প্রশ্নই জাগে না।

এবার আমেরিকার ভিসা পাওয়ার ব্যাপারে আমার বেশ সন্দিহান ছিলো। তারা আবার নাক উচা। ভিসা দিয়েছে কিন্তু যাইনি, তাতে ওরা ইন্সাল্ট ফিল করে। এমতাবস্থায় আমাকে ৪র্থ বার ভিসা দেয় কিনা সেটা নিয়ে আমার পুরুই সন্দেহ ছিলো। তারপরেও ছোট মেয়ে আমেরিকা থাকে, মেয়ের মায়ের ভিসা হয়ে গেছে, আমার হয় নাই, আমার যাওয়া হবে না ইত্যাদির চাপে শেষ পর্যন্ত ভিসার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু মনে একটা কঠিন প্রত্যয় ছিলো যে, ভিসা দিলেই যেতে হবে কিংবা সুযোগ না থাকায় যেতে পারি নি এটা পরবর্তী ভিসা না পাওয়ার জন্য একটা ডিস ক্রেডিট হতে পারে না। যদি আমাকে ভিদা রিজেক্ট করে, আমি অবশ্যই এর কৈফিয়ত চাইবো তাদের কাছ থেকে কেনো এবং কোন কারনে আমার ভিসা রিজেক্ট করছে। আর যেহেতু আমার খুব একটা টান নাই, ফলে আমার ভিসা পাইলেই কি আর না পাইলেই কি। মিটুলের তো অন্তত ভিসা আছে, তাতেই চলবে। কোনো কারনে যদি কনিকার কাছে যেতে হয়, মিটুল একাই সামলে নিতে পারবে।

যথারীতি আমি ইন্টারভিউ এর জন্য দাড়ালাম। অবাক করার ব্যাপার হলো, আমার কোনো কাগজ পত্র তারা চেক করার প্রয়োজন মনে করলো না। আমি আর্মিতে ছিলাম এটা নিয়েই তাদের অনেক প্রশ্ন ছিলো। প্রশ্নগুলি আমাকে ধরার জন্য নয় বরং যা দেখলাম তারা আর্মির যে কোনো লোককে খুবই মুল্যায়ন করে। আর্মিতে আমি কোথায় কোথায় চাকুরী করেছি, সেটা তাদের জানার খুব শখ হচ্ছিলো। বলেছি জাতীসংঘের সাথে প্রায় আড়াই বছরের উপর হাইতি আর জর্জিয়ায় মিশনে ছিলাম, তখনই একবার আমেরিকায় বেড়াতে গিয়েছিলাম।

আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো আমার মেয়ে তার পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরে আসবে কিনা। আমি বলেছি- সেটা আমি জানি না তবে আমার যে ব্যবসা আছে সেটায় সে হাল ধরলে আমি খুব খুশী হবো। কি ব্যবসা আমার যখন জিজ্ঞেস করলো, আমি বললাম রপ্তানীমুলক গার্মেন্টস। প্রায় ২ হাজার কর্মচারী আছে শুনে আরো খুশী হলো। বাৎসরিক টার্ন ওভার জিজ্ঞেসের পর অফিসার একটু যেনো হচকচিয়ে গেলেন কারন টার্ন ওভার টা ঝুব কম নয়- ২২৫ থেকে  আড়াইশো কোটির মতো।

খুব খুশী হয়েছে তারা পুরু ব্যাপারটা জেনে। অবশ্য আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কেনো আমি আগের ভিসা গুলিতে আমেরিকায় যাইনি। আমি খুব সাবলিল ভাবেই বলেছিলাম যে, আসলে সেটা ইচ্ছে করে না যাওয়ার কোনো কারন নাই। আমি আমার নতুন ব্যবসাটা গুছিয়ে উঠতে সময় দিতে পারছিলাম না। তাই আর যাওয়া হয় নাই। কিন্তু এবার তো যাওয়া হবেই কারন মাঝে মাঝে আমার মেয়ের জন্য তো আমার মন ছুটেই যায় তাকে দেখার জন্য।

কোনো দ্বিমত করলেন না অফিসার। শুধু একতা কথাই বল্ল০ ইউ আর এ গুড ফাদার। অফ কোর্ষ, ইউ নিড টু গো।

বলে ভিসা দিয়ে ধন্যবাদ জানালো। ভালো লাগলো অফিসারের ব্যবহার। ফেরার পথে একটা স্যালুট দিলাম, আর একটু হাসলাম। 

০৩/১২/২০২২-কোকো, আমাদের প্রথম জার্মান শেফার্ড

কুকুর পালার শখ আমার কখনোই ছিলো না। বরং মানুষ কেনো কুকুর পালে, সে ব্যাপারে আমার অনেক নেগেটিভ মতবাদ ছিলো। অথচ এখন আমি নিজেই কুকুর পালা শুরু করেছি। কেনো এমনটা হলো, সে ব্যাপারটাই এখন বলছি।

সম্ভবত গত বছরের প্রথম দিকে হটাত করে কোথা থেকে একটা কুকুর আমাদের বাসায় এসে হাজির। কথা নাই বার্তা নাই, সে আর কোথাও যেতেও চায় না। সারাদিন আমাদের বাসার সামনেই বসে থাকে, গেটে বসে থাকে, কোথাও যায় না। মাঝে মাঝে আমি বা আমার পরিবার ওকে কিছু খাবার দেয়া শুরু করে। খুব যে খায় তাও না। যতটুকু লাগে ততটুকুই খায়, আর কিছু খাবার রেখেও দেয়, পরবর্তী সময়ে আবার সেটা ক্ষুধা লাগলে খায়। ব্যাপারটা খুব অবাক লাগছিলো।

সারারাত বিশেষ করে রাত ১১ টার পর আমরা যখন মেইন গেট লাগিয়ে দেই, তাকে আমরা জোর করেই গ্যারেজের ভিতর থেকে বের করে দেই, কিন্তু খুব সকালে আবার এসে হাজির হয়। এভাবে প্রায় ৬/৭ মাস পার হবার পর একদিন শুনি ওর নাম রাখা হয়েছে ‘রকি”। সম্ভবত এই নামটা দেয়া হয়েছে আমার বড় মেয়ের দ্বারা। এখন সবাই ওকে ‘রকি’ নামেই ডাকে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, কুকুরটাও মনে করে আমরা ওর মালিক, আমাদের কথা শুনে, ডাকটাও সে রেস্পন্স করে। এখন ওকে আমরা সবাই একটা মায়ার মধ্যে বেধে ফেলেছি। অফিস থেকে বাসায় আসার পরই দেখি, আমার গাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ায়, সকালে গেট খুললেই মাথা দিয়ে গেট ধাক্কা দিতে শুরু করে কখন সে গ্যারেজে ঢোকবে।

এর মধ্যে আমার ফ্যাক্টরীর ছাদে হটাত দেখি জার্মান শেফার্ডের পাচটি বাচ্চা। পিচ্চি পিচ্ছি, চোখ ফুটে নাই। জরীফ নামে এক লোক যে আমাএ ফ্যাক্টরী বিল্ডিং এর ভাড়া নেয়। দেখে ভালো লেগেছে। মনে হলো, একটা বাচ্চা পালা যায়। সেই থেকে জার্মান শেফার্ড পালার শখ হয়েছে।

গত ১২ অক্টোবর ২০২২ থেকে আমি এই জার্মান শেফার্ডের বাচ্চাটা আমি নিয়ে এসেছি। ওর সেদিন বয়স হয়েছে একেবারে তিন মাস। আমি যখন ওকে গাড়িতে করে নিয়ে আসি, দেখেছিলাম, ওর শরীরের হাড্ডিগুলি পর্যন্ত দেখা যায়। আমি জানি না কিভাবে কুকুর পালতে হয়। কিন্তু অন লাইনে গিয়ে বা ইউটিউবে গিয়ে এ ব্যাপারে বেশ কিছু ধারনা পাওয়া গেলো।

পরেরদিন ওর একটা নাম দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম। আমার ছোট মেয়ে (যে আমেরিকায় থাকে) সে তো কুকুর পালবো এটা শুনেই আনন্দে আত্তহারা। বড় মেয়েও তাই। কিন্তু বউ একেবারে নারাজ। কিছুই যায় আসে না। কুকুরের জন্য ঘর বানিয়েছি ২টা। একটা গ্যারেজে আরেকটা ছাদে।

ওর নামটা দিলো আমার ছোট মেয়ে।

নাম কোকো।

এখন আমরা ওকে কোকো নামেই ডাকি। এই এক মাস হয় নাই, এর মধ্যে কোকোর ওজন বেড়েছে প্রায় ২ কেজি। প্রচুর খায়, মাশ আল্লাহ, খেলে, আমাদের ঘরে আসে। আমার কেয়ার টেকারের সাথে ওর বেশী শখ্যতা মনে হয়। কারন সারাদিন তো কোকো ওর সাথেই থাকে, খেলে, বেড়ায়।

আমাকে একটু ভয় পায় কারন মাঝখানে আমি ওকে কিছু কথা না শোনার কারনে লাঠি দিয়ে ভয় দেখিয়েছি। আমার মনে হয়েছে, কোকো কাউকে ভয় পাক এটাও দরকার আছে।

কোকোকে সব গুলি ভ্যাক্সিন দেয়া হয়েছে। ডি-ওয়ার্মিং করার জন্য একটা কৃমির ট্যাবলেট ও খাওয়ানো হয়েছে। আরেকটা খাওয়াতে হবে। আমি ওকে প্রতি শুক্রবারে সাবান শ্যাম্পু দিয়ে খুব ভালো করে গোসল করাই।

কুকুর পালা থেকেও অনেক কিছু শেখার আছে। একটা বোবা প্রানীকে বশ মানানো, কথা শোনানো সহজ ব্যাপার না। তবে কুকুর অত্যান্ত প্রভুভক্ত প্রানী। দেখা যাক কোকোর বেলায় কি হয়। এটাই কোকো।

২০/০২/২০২৩-পতেঙ্গা ভ্রমন

কথায় আছে, Defense Life is a man’s life and a soldier once is always a soldier. অন্য কারো বেলায় এটা কতটুকু সত্য সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু এই অকাট্য বাক্যটা আমার বেলায় শতভাগ প্রযোজ্য। ২০৪৪ সালে ভলান্টারিলি আর্মি থেকে অবসর নেয়ার পর থেকে আমি আজো মনে মনে শতভাগ যে ফৌজ সেটা আমি মনেপ্রানে উপলব্ধি করি। কোথাও কাউকে ইনুফর্ম পড়া দেখলে আজো আমি যেচে কথা বলি, ভালো লাগে। কেউ আমার এই আর্মি বা ডিফেন্স বাহিনীর ব্যাপারে কথা বললে এখনো আমার গায়ে লাগে। কেউ ভালো বললে আমি আজো এর কৃতিত্তের অংশটুকু যেনো নিজের সেটা উপলব্ধি করি।

প্রায় ৩০ বছর পর আমি আবারো আমাদের সেই ডিফেন্স ফোর্সের অধীন নৌ বাহিনীর বিভিন্ন স্থান সমুহে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আর এর পিছনে যার সবচেয়ে বেশী অবদান- সেটা হলো আমারই ছোট ভাই সমতুল্য রিয়ার এডমিরাল মামুন যে বর্তমানে ComChit (অর্থাৎ কমান্ডার চিটাগাং) হিসাবে দায়িত্বরত। মামুন সদ্য চট্টগ্রামে পোষ্টিং গিয়েছে, সম্ভবত মামুন ওখানে না থাকলে এবারো আমার যাওয়া হতো না। মামুনের আথিথেয়তার কোনো বর্ননা চলে না। ওর নিজের বাসায় আমার থাকার জায়গা করে দেয়া, অফিসার মেসে ভি আই পি রুমে আমাদের সবার জন্য ব্যবস্থা করা, সারাক্ষন গাড়ির ব্যবস্থা, বিভিন্ন নৌ জাহাজে আমাদেরকে অভিনন্দন দেয়া সব কিছু ছিল অত্যান্ত সাবলিল এবং চমৎকার।

খুবই অল্প একটা সময়ের জন্য ছিলাম, মাত্র এক রাত দুই দিন কিন্তু তারপরেও মনে হয়েছে অনেকদিন বেড়ালাম। একটা পরিপূর্ন ভ্রমন বলা যায়।

কাপ্তাইয়ে লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম ঘাটিতে চমৎকার একটা সময় কাটিয়েছি। লেঃ কমান্ডার ইফতেকার এবং তার টিমকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিএনএস বংগবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান এর লেঃ কমান্ডার রাসেল, লেঃ কমান্ডার সাহেদ, মামুনের এডিসি লেঃ ফকরুল সহ সবাইকে আমার আন্তরিক ভালোবাসা দেয়া ছাড়া আসলে আমার হাতে কিছু ছিলো না। আমার পরিবার এবং আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম গত ৩০ বছর পর আবারো এমন একটা পরিবেশে কিছুক্ষন সময় কাটানোর জন্য।

আমরা যারা ডেফিন্সে কাজ করি, করতাম, এবং করেছেন, তাদের অবদান অসামান্য যদিও এর মুল্যায়ন সব সময় আমাদের সাধারন জনগন হয়তো অতোটা জানেন ও না। আমাদের পরিবার বর্গ যে কি পরিমান তাদের পারিবারিক জীবনকে উতসর্গ করেন আমাদের এই জীবনকে সার্থক আর দেশের জন্য তা শুধু তারাই জানেন যারা এই সব অফিসার, জোয়ান আর কর্মের সাথে জড়িত। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তাদেরকে পরিবারের বাইরেই দেশের জন্য সময় ব্যয় করতে গিয়ে নিজের জন্য বা পরিবারকে দেয়ার জন্য অবশিষ্ঠ কোনো সময়ই হাতে থাকে না। তারপরেও এই সব অফিসাররা হাসিমুখে সব সময় অন্যের সাথে সময় দেন।

পরিশেষে, আবারো আমি রিয়ার এডমিরাল মামুন এবং তার সকল টিমকে আমার প্রানঢালা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানাই। 

০৯/০৭/২০২২-আপডেট (সাইফুল)

সাইফুলের বাসায় আমার যাওয়ার কথা ছিলো জুম্মা নামাজ পড়ে বাসা থেকে খাওয়া দাওয়া করে বিকেল ৪ টার মধ্যে। কিন্তু আমার স্ত্রীকে আমি নিয়ে যাবো (আমিই বলেছিলাম সে গেলে হয়তো ভাবীর পার্টটা জানার জন্য আমার সহায়ক হবে) বলে সেইই বল্লো যে, আমরা বিকেল ৫ টার পর রওয়ানা দিয়ে ওখানে গিয়ে মাগরেবের নামাজ পড়ে গল্প করতে পারবো। আর যেহেতু সাইফুলের বাসায় ডিনার করবো তাই সে মোতাবেক একটু দেরী করেই রওয়ানা হয়েছিলাম। মাগরেবের পর পরই আমরা সাইফুলের বাসায় গিয়ে হাজির হয়েছিলাম।

সাইফুল খুবই ভালো আছে আলহামদুলিল্লাহ। অনেক বছর পর ওর সাথে আমার আবার দেখা। সেই ক্যাডেট কলেজের পুরানো গল্প, আমি কিভাবে এক্ট্রোজেন হয়ে গেলাম সেই মজার মজার গল্প হলো। আমি আমার গল্প, আর সাইফুল সাইফুলের গল্পে সাথে ভাবীরা একেবারে দারুন একটা সন্ধ্যা কেটে গেলো আমাদের। কথার ফাক দিয়ে আমি আর সাইফুল আলাদা ওর নিজের রুমে বসে আরো কিছু ব্যক্তিগত কথা বললাম। সেখানে আসলে ওর চিকিতসা সংক্রান্ত বিশয়েই আলাপ হলো। যেহেতু সাইফুল এখনো সিগারেট খায় (যদিও খুব অল্প নিকোটিনযুক্ত) ফলে আমার কোনো অসুবিধা হয় নাই। আমাদের ব্যাচের প্রায় সবার খোজ খবর নিলো আমার কাছ থেকে। যতটুকু আমার কাছে ছিলো, সেটা ওর সাথে শেয়ার করেছি। মিজানের কথা, বাবলার কথা, কব্বর আলীর কথা, ফরিদ, ডন, বারী, লিংকন, সাগর, মাকসুদ, জুলু, ফিরোজ, সালু, জাহেদ, জাহিদ, এভাবে একে একে মুটামুটি ক্যাডেট নাম্বার ধরে ধরে সাইফুল সবার কথা জিজ্ঞেস করলো। মাহমুদের সাথে সাইফুলের প্রায়ই কথা হয় সেটাও জানালো। খুব ভালো একটা সময় কেটেছে। সাইফুল নিজেও সবাইকে মিস করছে বুঝতে পারলাম।

অনেক কথার মধ্যে আমার টার্গেট ছিলো সবসময় সাইফুলের সাস্থ্যগত ব্যাপারে গভীরভাবে জানা এবং সেটার ব্যাপারে ওর পরবর্তী পদক্ষেপগুলিকে পজিটিভভাবে উৎসাহ দেয়া। খুব ভালো লেগেছে যে, সাইফুল আগামী ঈদের পরে সে ইন্ডিয়া যেতে ইচ্ছুক (ইনশাল্লাহ)। আয়মানের স্কুলের সিডিউলটা জেনে হয়তো ঈদের পরে ইন্ডিয়ান এম্বেসী খুল্লেই সে ভিসার জন্য এপ্লাই করবে। আয়মানকে সাথে নিয়ে যাবে। আর যাবেন ভাবী। ক্লাস নাইনে পড়ুয়া আয়মান দারুন দায়িত্তশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। দেবী শেঠির কাছে সাইফুল ইনশাল্লাহ অপারেশন করাবে। আর এরজন্য সে মানসিকভাবে রাজী হয়েছে এবং প্রস্তুত হচ্ছে (আলহামদুলিল্লাহ)।

সংগত কারনেই সাইফুল মাঝে একটু বেশ মানসিকভাবে আপ্সেট ছিলো। এটা আমি হলেও হয়তো আপ্সেট থাকতাম। তাই ওকে বললাম, বন্ধুদের মাঝে থাকলে মন ভালো থাকে, সময়টা ভালো কাটে, আর এই বয়সে এসে বন্ধুরাই আসলে পরিবার। একটু ফান, একটু সিরিয়াস টক, সব কিছুই ভালো। ওকে যত দ্রুত সম্ভব এমসিসি ১৫ তে এড হতে বলেছি, সে রাজী হয়েছে। আমাদের এমসিসি ১৫ এর এডমিন কে বা কারা আমি জানি না। প্লিজ এড সাইফুল। আমিও ট্রাই করবো ওকে এড করতে। আমি সাইফুলকে সোস্যাল মিডিয়াতেও থাকতে বলেছি, কারন ফেসবুকে ওর একটা বিশাল ফেনগ্রুপ ছিলো, তারাও আমাকে অনেকবার নক করেছে সাইফুলের ব্যাপারে। তাই ওকে ফেসবুকেও আবার সাভাবিক থাকতে বলেছি। সাইফুল আবার আগের ফর্মে ব্যাক করবে ইনশাল্লাহ। সাইফুল অনেক ঝরঝরা আছে এখন মাশআল্লাহ। সাইফুল খুবই ভালো আছে এখন।

ওর সাথে সময়টা কাটাতে আমার যেমন ভালো লেগেছে, সাইফুলেরও অনেক ভালো একটা সময় কেটেছে। সাইফুল নিজের থেকেই ওর বাসায় দাওয়াত দিয়েছে সবাইকে। যে যখন পারো, সময় করে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে পারো, অথবা ওকে ফোনও দিতে পারো। ওর কাছে অনেকের ফোন নাম্বার এখন নাই। তাই হোয়াটসআপে এড করলে সাইফুল আবার সবার নাম্বারগুলি পেয়ে যাবে। তবে করোনা ওর জন্য বিপদজনক।  ফোনে ফোনে টাচে থাকাই এই মুহুর্তে নিরাপদ বলে আমি মনে করি।

ভাবী আমাদের জন্য চমৎকার চমৎকার রান্না করেছিলেন। আমরা সবাই একসাথে খেয়ে অনেক গল্প করেছি। ভাবীও খুব খুশী হয়েছেন। আমাদের এমসিসি বন্ধুরা ওর জন্য যে সবসময় দোয়া করছে এবং ওর ব্যাপারে জানার জন্য খোজ খবর নিচ্ছে, সে ব্যাপারে জানিয়েছি। বেশ অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিলাম। তাই আর আপডেট দিতে পারিনি।

সাইফুল, ভাবীর আর আয়মানের সাথে কয়েকটি ছবি দিলাম।

(বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ আমার যাওয়া উপলক্ষ্যে নাকি সাইফুল একেবারে ক্লীন সেভ করেছিলো, তাই ওর খোচা খোচা দাড়ি নাই ছবিতে। চুলও নাকি কালো করতে চেয়েছিলো, আমি বললাম সাইফুলকে, চুল কালো না করলেও কিংবা ক্লীন সেভ না করলেও এমসিসির বন্ধুরা আজীবন ১২ আর ১৮ এর মধ্যেই আমাদের বয়স থাকবে, দারুন হাসাহাসি হয়েছিল ভাবীদের মধ্যে এটা নিয়ে, এটা একটা ফান নোট)

বন্ধুরা, তোমাদের সবার জন্য ঈদ মোবারক রইলো, সবাই ভালো থাকো ইনশাল্লাহ। Love you always.

০২/০৫/২০২২-আজ রোজার শেষ দিন, কাল ঈদ

আজ এ বছরের রমজান মোবারক শেষ হয়ে যাবে। বয়স বাড়ছে, আর জীবনের উপর ভয়ও বাড়ছে, বাড়ছে দুসচিন্তা, কমছে শরীরের শক্তি, তার সাথে কমে যাচ্ছে নিজের উপর কনফিডেন্স। যেভাবেই হোক আর যখনই হোক, একটা সময় তো আসবেই যেদিন আমি আর থাকবো না। খুব মন খারাপ হয় যখন এটা ভাবি, অন্যের জন্য কতটা মন খারাপ হয় সেটা আমার জানা নাই, কিন্তু নিজের উপরেই বেশী মন খারাপ হয় যে, ইশ, এতো সুন্দর একটা দুনিয়া ছেড়ে শেষ অবধি আমাকে চলেই যেতে হবে এমন একটা গন্তব্যে যার আমি কিছুই জানি না, দেখি নাই, এবং পুরুই খালী হাতে!! আর সবচেয়ে মন খারাপের দিকটা হচ্ছে- কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি আর আমার এই পুরানো স্থানে একটি মুহুর্তের জন্য ও ফিরে আসতে পারবো না, কোনো কিছুই আর আমি কারো কাছে দাবীও করতে পারবো না, এমন কি আমার তৈরী করা অট্টালিকা, আমার রেখে যাওয়া ব্যাংক ব্যালেন্স, আমার নিজের সব কিছুর কিছুই না। যখন জীবিত ছিলাম, তখন এগুলির সত্তাধীকারী আমি ছিলাম, কিন্তু যে মুহুর্তে আমি চলে যাবো, এর কোন কিছুই আর আমারটাই আমার না। এমন একটা জীবন ঈশ্বর আমাকে কেন দিলেন? শুধু কি পরীক্ষার জন্যই? আমি তো তার এই পরীক্ষায় কোনোদিনই পাশ করতে পারবো না যদি তিনি সঠিক নিয়য়ে আমার দলিল পত্র দেখতে থাকে। যদি পুরুই হয় আমার পাশের নাম্বার তার অনুগ্রহের উপর, তাহলে তিনি আমাকে আরো লম্বা, আরো লম্বা, তার থেকেও লম্বা একটা জীবন দিলেন না কেনো?

কি জানি? হয়তো এই জীবনের পরে আরেক যে জীবন আমার ঈশ্বর বরাদ্ধ রেখেছেন, সেটা হয়তো আরেক অধ্যায় যা আমাদের কারোই জানা নাই। পরীক্ষার তো অনেক গুলি ধাপ থাকে। হয়তো এই জীবনের শেষ যেই মৃত্যু দিয়ে, হতে পারে সেখান থেকে আরো একটা ধাপ শুরু। কেউ তো আর এ যাবত সেই ধাপ থেকে ফিরে এসে বলে নাই, তার কার্যপ্রনালী কি, কি সেই ধাপের নমুনা।

যাই হোক, যেটা বলছিলাম, খুব সুস্থ্য ভাবে ৩০ টি রোজা করার শক্তি আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। আমি প্রতিবছর নিজের বাসায় দুইটা হাফেজ কে দিয়ে কোরান খতম তারাবি করি। কিন্তু গত দুই বছর করোনার কারনে সেটা পালন করা যায় নাই। আমি করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার স্ত্রী মিটুল তাতে বাধ সেধেছিলো ভয়ে। এবার আর কোনো কথা শুনতে চাইনি। হাফেজ ইসমাইল এবং হাফেজ মেহেদী নামে দুইটি বাচ্চা ছেলে আমাদের তারাবী লীড করেছিলো। ২০ রোজায় আমরা পুরু কোরান খতম করেছি (আলহামদুলিল্লাহ)

দোয়া কবুলের নমুনাঃ

আমার মাথায় আছে, আল্লাহ বলেছিলেন, আমি প্রতিদিন আমার রোজদার বান্দার ইফতারীর সমত যে কোনো ২ টি পজিটিভ ইচ্ছা বা দোয়া কবুল করতে প্রতিশ্রুত বদ্ধ। আমি এটা সব সময় মনে প্রানে বিশ্বাস করি এবং রোজার প্রথম দিন থেকেই আমি মোট ৬০ টি চাওয়া লিখে নেই। আমি জানি আমার জীবনে এই রকম ৬০ টি চাওয়া আসলে নাই। দেখা যায়, হয়তো ঘুরে ফিরে গোটা ১০ টি চাওয়াই থাকে। এ যাবত আমি আমার রবের কাছে কি কি চেয়েছিলাম, সেটা আর এখন বলছি না। তবে আমি স্পষ্ট দেখেছি, আমার প্রায় সব গুলি ইচ্ছা আল্লাহ পুরুন করেছেন। তিনি আমাকে চাকুরীর পর ব্যবসা করতে দিয়েছেন, কারো কাছেই আমার হাত পাততে হয় নাই, আমার সন্তানদেরকে তিনি সুস্থ্য রেখেছেন, মানুষের কাছে তিনি আমাকে সম্মানের সহিত রেখেছেন। অনেক কিছু করেছে আমার রব।  

গত বছর আমি খুব মনে প্রানে প্রায় প্রতিটি রোজায় আল্লাহর কাছে এই দোয়াটি করেছিলাম যেনো আমাকে তিনি ঋণ গ্রস্থ জীবন থেকে উদ্ধার করেন। কারন আমি আমার মা ইন্ডাস্ট্রিজে জন্য বেশ কিছু লোনে জর্জ্রীত হয়ে গিয়েছিলাম। এই বছরে রোজার আগেই আল্লাহ আমাকে সম্পুর্ন লোন থেকে মুক্ত করেছে। এবারই প্রথম আমি লোন মুক্ত জীবনে পা দিয়ে একটা বড় সঞ্চয়ের পথে আছি। আমার ছোট মেয়েকে আমি আগামী ২ বছরের অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছি আমেরিকায় পরার জন্য। বড় মেয়ের জন্যেও একটা সঞ্চয় আমি করতে পেরেছি। আমার নিজের জন্যেও করতে পেরেছি। এর থেকে আর কত সুখী রাখবেন আমার রব আমাকে? আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।

এবার রোজায় আমি শুধু আমার মৃত আত্তীয় স্বজনের জন্য, আমার মেয়েদের জন্য, আমার স্ত্রীদের জন্য, আর আমার ব্যবসার জন্য প্রতিদিন দোয়া করেছি। আর আমি মনে প্রানে চেয়েছি যে, আমি যেনো সম্পুর্ন হোম ওয়ার্ক করে তারপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। আমি আমার সেই হোম ওয়ার্কের মধ্যেই এখন আছি। আমি সেই হোম ওয়ার্কের সময়কাল ধরেছি আরো ৬ বছর। ৬৩ বছর আয়ুষ্কাল পর্যন্ত যেহেতু আমাদের নবী ৬৩ বছরের বেশী বেচে ছিলেন না, তাই আমিও ধরে নিয়েছি আমারো ৬৩ বছরের বেশী বেচে থাকার ইচ্ছা করা উচিত না।

গত ঈদে আমার ছোট মেয়ে আমাদের সাথে ছিলো, এবার সে আমাদের সাথে নাই। সে এখন আমেরিকায়। আগামিতে আবার কে কার সাথে থাকবে না, কে জানে? উম্মিকার একটা বিয়ে হওয়া দরকার। উম্মিকাকে নিয়ে একবার একটা মারাত্তক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বিয়েটা টিকে নাই। তাই এবার আর আমি ওর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই দিবো না। এতে যখন ওর বিয়ে হয় হোক। এবার আমি প্রদিন উম্মিকার জন্য ওর বিয়ের জন্য, একটা ভালো পাত্রের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি।

ACR

You are required to login to view this post or page.

23/02/2022-২০০৩ সালের কিয়েভে

আমি ২০০৩ সালে ইউক্রেনের কিয়েভে বেড়াতে গিয়েছিলাম একবার। তখন আমি জর্জিয়ায় জাতিসঙ্ঘ মিশনে কর্মরত ছিলাম। ইউক্রেনের এক মেজরের বাসায় উরুগুয়ের এক পাইলটকে সাথে নিয়ে তাঁর বাসায় বেড়াতে গিয়ে কিয়েভ সম্পর্কে আমার ধারনা একেবারে পালটে গিয়েছিলো। মানুষগুলি খুবই শান্তপ্রিয় আর শহরটাও মানুষগুলির মতো একেবারে শান্ত। কোনো কোলাহল নাই, সবাই ব্যস্ত আর খুবই মিশুক। মাত্র সপ্তাহখানেক ছিলাম।

উরুগুয়ের ওই পাইলটের সাথে এখনো আমার যোগাযোগ থাকলেও ইউক্রেনের সেই মেজরের সাথে আমার যোগাযোগ নাই। গতকাল সেই ইউক্রেনের উপর রাশিয়া আক্রমন করেছে শুনে খুব কষ্ট লাগলো মনে। ক্রেমলিন দেখার খুব শখ ছিলো। আমি ক্রেমলিনেও ভিজিট করতে গিয়েছিলাম। যেহেতু মিলিটারী অবজারভার হিসাবে কর্মরত ছিলাম, ফলে আমার সাথে কর্মরত একজন রাশিয়ান আর্মি অফিসারের সহায়তায় আমরা ক্রেমলিনের কিছুটা অংশ আমি সেখানে ভিজিট করতে পেরেছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, কতই না শক্তিশালী এসব ক্রেমলিন। আজ যেনো এটাই মনে আসলো দ্বিতীয়বার।

বিশ্ব রাজনীতির অভ্যন্তরে অনেক দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক এজেন্ডা লুকিয়ে থাকে বিধায় আমরা যা নগ্ন চোখে দেখি সেটা আসলে সেটা না যেটা দেখি। তাঁর ভিতরে হয়তো লুকিয়ে থাকে আরো ‘গভীর কিছু’। কিন্তু এই ‘গভীর কিছুর’ দ্বারা সংঘটিত কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা পুরু বিশ্বকে অগোছালো করে ফেলে যদিও এই ‘গভীর কিছু সংঘটিত’ বিষয়ে অনেকেই জড়িত থাকেন না। ছোট বা বড় কোনো দেশই এর থেকে পরিত্রান পায় না। ছোয়া লাগেই। ইউক্রেনকে আক্রমন করে রাশিয়া কতটুকু উপকৃত হবে বা ইউক্রেন কতটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু আমাদের মতো দেশ যারা এর আশেপাশেও নাই তাঁদের কি কি হতে পারে?

আমাদের দেশ অনেকটাই আমদানী-রপ্তানী নির্ভর একটি দেশ। আর এই আমদানী-রপ্তানী বেশীরভাগ হয় ইউরোপের অনেকগুলি দেশের মধ্যে। ইউরোপে মোট ২৮ টি দেশ আলাদা আলাদা হলেও বাস্তবিক হচ্ছে এরা একটা গুচ্ছগ্রামের মতো। ফলে ইউরোপের একটি দেশের ভিসা পেলেই আমরা অনায়াসে অন্য দেশগুলি ভ্রমনের সুবিধা পাই। কারেন্সীও একটা ‘ইউরো’ যদিও সবার আলাদা আলাদা কারেন্সী আছে। ইউরোপের এই দেশ গুলি কোনো কোনো ন্যাচারাল সম্পদে বেশ উন্নত। ফলে একটা দেশে যদি এ রকম গোলমাল চলতে থাকে, সাভাবিকভাবেই অন্য এলাকায় এর প্রভাব পড়েই। প্রভাব পড়বে জ্বালানীর দামে, গ্যাসের দামে, বেড়ে যাবে আমদানী রপ্তানী খরচ যা প্রকারান্তে সাধারন মানুষের উপরেই বর্তাবে। প্রভাব পড়বে উগ্র পন্থীদের যারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে আশেপাশের দেশ সমুহে। প্রভাব পড়বে ‘মুক্ত ও গনতান্ত্রিক বিশ্ব কন্সেপ্টে’ যদিও ‘মুক্ত ও গনতান্ত্রিক বিশ্ব কন্সেপ্ট’ এখন আছে বলে মনে হয় না। প্রভাব পড়বে সাইবার সিস্টেমে, শেয়ার মার্কেটে, ভোগ্য পন্যে, ইত্যাদি। এ ছাড়া প্রভাব পড়বে বন্দরগুলিতে। 

বাংলাদেশ যদিও এর অনেক দূরের একটি দেশ কিন্তু ইউরোপে রপ্তানী করা পোষাক শিল্প একটা ঝুকির মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা প্রচুর। আর যারা সরাসরি ইউক্রেনের সাথে আমদানী-রপ্তানীতে যুক্ত তাঁদের অবস্থা এখন খুবই আতংকের। আমাদের দেশ ইউক্রেন এবং রাশিয়া থেকে অনেক ভোগ্যপন্য আমদানী করে যেমন মটর, সোয়াবিন, গম,  ইত্যাদি, সেটা আরো উর্ধ গতি হতে পারে দামে। এ ছাড়াও আমাদের রপ্তানীকারক মালামাল যেমন প্লাষ্টিক, চামড়া, চামড়া জুতা, হিমায়িত খাবার, পাট বা পাটের দ্রব্য এসব রপ্তানীতে ঘটবে প্রচুর ব্যাঘাত। এমন একটা পরিস্থিতিতে আসলে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হবো তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

অন্যদিকে বড় বড় পরাশক্তি যতোই পিউনেটিভ একশন নিবে বলে যত প্রতিশ্রুতিই দেন না কেনো, যা ক্ষতি হবার তাঁর বেশীরভাগ ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। জাতিসঙ্ঘ, ন্যাটো, কিংবা অন্যান্য অক্সিলারী ফোর্স গ্রাউন্ডে যেতে যেতে রাশিয়ার উদ্দেশ্য হাসিল হয়েই যাবে। তারমধ্যে ইউক্রেন ন্যাটোর কোনো সদসই না।

ভবিষ্যৎ কি হবে এই মুহুর্তে বলা খুব দূরুহ।

20/02/2022- গেট টুগেদার এমসিসি

গত ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২২ তারিখে আমার আরেক বন্ধু প্রোফেসর শাহরিয়ার বহুদিন পরে ঢাকায় এসেছিলো কানাডা থেকে। কানাডাতেই সেটেল্ড সে। অনেকদিন দেখা হয় নাই ওর সাথে। তাই আমি আমার সব বন্ধুদেরকে শাহরিয়ারের আগমনে ওয়েষ্টিনে একটা দাওয়াত করেছিলাম। আমাদের মির্জাপুর ক্যাডেট ১৫ তম ব্যাচের ৫৩ জন ক্লাশমেটের মধ্যে ঢাকায় থাকে এমন ১৪ জন মিলিত হয়েছিলাম। জম্পেশ আড্ডা হয়েছিলো। উক্ত গেদারিং এ উপস্থিত ছিলাম- ফিরোজ মাহমুদ (মাইক্রোসফটের কান্ট্রি ডাইরেক্টর) , মেজর আখতারুজ্জামান (বিটিভির ইংরেজী খবর পাঠক), ব্রিগেডিয়ার জাহেদ (ওয়েষ্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং), মেজর আসাদ (বিখ্যাত লেখক), ডাঃ মনজুর মাহমুদ (প্রোফেসর পিজি), আব্দুল্লাহ হেল কাফি (মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এন্ড মেরিন ক্যাপ্টেন), আরেক মনজুরুল আলম (স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যংক), রিজওয়ানুল আলম (বিখ্যাত সাংবাদিক এবং প্রোফেসর অন জার্নালিজম), মোর্শেদ এনাম (ইঞ্জিনিয়ার এবং বিখ্যাত লেখক, দাবারু আবুল মনসুরে সাহেবের বড় নাতী) এবং আমার আরেক বন্ধু ফয়সাল। দারুন উপভোগ করেছি সবার সান্নিধ্য।

এদিন আরেকটা ভীষন ভালো একটা ব্যাপার ঘটে গেলো। সেটা একটা অনুবাদ।

তাঁর আগে একটা কথা বলে নেই যে, কোনো বিখ্যাত লেখকের বই অনুবাদ করতে গেলে প্রথমে যেটা প্রয়োজন সেটা হলো, অরিজিনাল লেখক কখন কোন শব্দ বা লাইন বা উক্তি দিয়ে কি বলতে চাইছেন সেটা লেখকের মতো করে বুঝতে শেখা এবং সে মোতাবেক হুবহু ভাষান্তর পাঠকের জন্য তা অনুবাদ করা। যদি এর মধ্যে কোনো ব্যত্যয় ঘটে তাহলে হয় অনুবাদকের নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয় অথবা অরিজিনাল লেখকের মুল বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়। শুধুমাত্র আক্ষরীক শব্দকে অন্য ভাষায় রুপান্তরীত করলেই অনুবাদক হওয়া যায় না। জনাব মাহমুদ (আমার মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের বন্ধু এবং খুব প্রিয় আমার একজন মানুষ) একটা কঠিন কাজ হাতে নিয়েছেন। ডঃ ইয়াসির কাদিরের ভিডিও বক্তব্য এবং তাঁর কিছু লিখিত সংস্করণের উপর ভিত্তি করে আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ (সঃ) উপর তিন খন্ডের মধ্যে ১ম খন্ডটি সমাপ্ত করেছেন। বইটির নাম "মহানবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর জীবন ও সময়" আমি অনেক অনুবাদ পড়েছি, অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত বই এর বাঙলা কিংবা ইংরেজী অনুবাদ পড়েছি, মাহমুদের এই বইটি একটি অসাধারন অনুবাদ হয়েছে। আমি অন লাইনে ডঃ ইয়াসির কাদির বক্তব্য শুনেছি এবং শুনি। আমার বন্ধু মাহমুদের এই উক্ত অনুবাদটি একদম ডঃ ইয়াসির যা যেভাবে বলতে চেয়েছেন, মাহমুদ সেটা পুনহখানুপুঙ্খ ভাবেই তুলে ধরেছেন।

আমি প্রচূর বই পড়ি, বই পড়া আমার একটা নেশার মতো। আমি মাহমুদের এই বইটার প্রায় ৩০% পড়ে ফেলেছি। নেশার মতো পড়ে যাচ্ছি। অতীব সাবলীলভাবে মাহমুদ অনুবাদটি করেছে। পড়তে খুব ভালো লাগছে।

অনেক ধন্যবাদ তোদের সবাইকে।

আপ্নারা যারা আমাদের মহানবী হজ রত মুহাম্মাদ (সঃ) এর জীবনী এবং তাঁর সময়কালটা আক্ষরীক অর্থে বোধ গম্য ভাষায় জানতে চান, কিনতে পারেন। এটা Worth Buying Good Book.

ধন্যবাদ মাহমুদ তোকে আর ধন্যবাদ শাহরিয়ারকে যার কারনে একটা চমৎকার গুড গেদারিং হয়েছে। আর ধন্যবাদ আমার সব বন্ধুদের যারা সময়টাকে নিয়ে গিয়েছিলো প্রায় ৪৪ বছর আগে। আর মাহমুদের বইটা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলো প্রায় ১৪০০ বছর আগে।

আমি তোদের সবাইকে খুব ভালোবাসি।

১৯/০২/২০২২-স্বাস্থ্যসচীব একদিন অফিসে

হটাত করে ফোন করলেন আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের স্বাস্থ্যসচীব লোকমান ভাই (Senior Secretary, at Ministry of Health & Family Welfare-MOHFW, Bangladesh)। অনেকবার দাওয়াত করার পরেও ভীষন ব্যস্ততার কারনে গত দুই বছরের মধ্যে আসতে পারেন নাই। সম্ভবত একবার এসেছিলেন ২০১৪ কিংবা ২০১৫ সালের মাঝামাঝি। আজ এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন কোনো এক কাজে। সুযোগটা মিস করেন নাই। ভীশন খুশী হয়েছি লোকমান ভাইকে অফিসে পেয়ে। তখন একটা মিটিং করছিলাম, কিন্তু লোকমান ভাইকে সময় দেয়াটা আমার কাছে প্রাইয়োরিটি মনে হচ্ছিলো। একসাথে লাঞ্চ করলাম, প্রায় দুই ঘন্টার মতো বেশ ভালো একটা সময় কাটিয়েছি।

২০১৯ সালে করোনার আগে উনি যখন খুলনার ডিভিশনাল কমিশানার ছিলেন, তখন ওই এলাকার প্রায় সবগুলি ডিষ্ট্রিক্ট আমি ভিজিট করেছিলাম উনার এডমিন সাপোর্টে। ময়মনসিংহ এ যখন ডিসি ছিলেন, তখনো বেড়াতে গিয়েছিলাম পরিবারসহ। অসম্ভব একজন মিশুক মানুষ।

লোকমান ভাইয়ের সবচেয়ে চমৎকার গুনের মধ্যে একটি হচ্ছে- He is the son of his soil of Gournodi. একজন মানুষ যখন আল্লাহর রহমতে উত্তোরোত্তর ভালো পজিশনে উঠে, তখন অনেকেই (সবাই না) আর সেই নাড়ির টান অনুভব করেন না কিন্তু লোকমান ভাই একজন সম্পুর্ন আলাদা মানুষ। তিনি তাঁর গ্রামকে ভুলে যান নাই, তাঁর সেই চেনা-অচেনা গ্রামের মানুষগুলিকে ভুলে থাকেন না, বিপদে আপদের সার্বোক্ষনিক পাশে থাকেন, সরকার সেই এলাকার উন্নতি তাঁর গতিতে করলেও লোকমান ভাই, তাঁর নিজের চেষ্টায় সবাইকে অকাতরে ন্যায়ের মধ্যে থেকে সাহাজ্য করেন। শীতে শীতার্ত কাপড়, বেকার ছেলেদের কর্মসংস্থান, গরীব পরিবারের সন্তানদের পড়াশুনার সাহাজ্য, কোনটায় তাঁর হাত পড়ে নাই? অত্যান্ত সৎ এবং সজ্জন ব্যক্তি এই লোকমান ভাই। তাঁর প্রোফেশনাল এফিসিয়েন্সীর কথা না হয় নাইই বললাম, বর্তমান সময়ে দেশের এতো টীকার প্রোকিউরমেন্ট কিংবা অক্সিজেন সাপ্লাইয়ের দিকে তাকালেই বুঝা যায়, তাঁর চমৎকার প্রোফেশনালিজম।

লোকমান ভাইয়ের সাথে উনার আরেক বন্ধু এসেছিলেন, তাঁর নাম জিন্নাত ভাই। খুব ভালো একটা সময় কাটালাম আমার অফিসে বহুদিন পর। ধন্যবাদ লোকমান ভাই।

২২/১১/২০২১-এসআইবিএল-২৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী

আমার ব্যবসার জন্মলগ্ন থেকেই একটি মাত্র ব্যাংকেই আমি সমস্ত ব্যবসায়ীক লেনদেন করে এসছি। আর সেটা হলো এসআইবিএল ব্যাংক। আমি অবশ্য এসআইবিএল এর প্রধান কার্যালয়ের সাথে ব্যবসায়ীক লেনদেন করলেও হাসনাবাদ সুপার মার্কেটের এসআইবিএল শাখার সাথে আমাদের ফ্যাক্টরীর সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার সাথে আত্মার মতো। ডোর টু ডোর প্রতিষ্ঠান। আমার প্রায় প্রতিটি ষ্টাফ এই ব্যাংকের গ্রাহক। আজ এই ব্যাংকের ২৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ছিলো। গতকালই আমার খুবই প্রিয় একজন মানুষ  ব্যাংকের ম্যানেজার নিজাম ভাই নিজে এসে আমাকে দাওয়াত করে গিয়েছিলেন যেনো আজকের দিনটায় অন্যান্য দিনের চেয়ে অফিসে একটু আগে এসে তাদের এই মহান দিনটির সাথে আমি শরীক হই। অনেক চমৎকার একটা বিশাল কেক কেটে এই মহান দিনটাকে এসআইবিএল ব্যাংক স্মরণ করেছে। আমি নিজেও গর্বিত এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যবসায়ীক কার্যক্রম পরিচালনা করায়।

ধন্যবাদ নিজাম ভাই, ধন্যবাদ সব কলিগ ভাইদের।

২১/০৭/২০২১-ঈদুল আজহা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২১ জুলাই 

 

 

আজ পালিত হলো ঈদুল আজহা।

এই দিনটা এলে সবচেয়ে আগে যার কথা আমার বেশী মনে পড়ে তিনি হচ্ছেন-আমার মা। মা বেচে থাকাকালীন আমি কখনো শহরে ঈদ করিনি কারন মাও ঈদের সময় গ্রাম ছাড়া ঈদ করতেন না। মা যেহেতু ঈদে গ্রামে থাকতেন, আমিও গ্রামেই ঈদ করতাম। আমি সব সময় ভাবতাম-একটা সময় আসবে, মাকে ছাড়াই আমার ঈদ করতে হবে জীবনে, তাই যে কতগুলি সুযোগ পাওয়া যায়, মায়ের সাথে ঈদ করাটা ছিলো আমার সুযোগের মতো। বাড়িতেই কুরবানী করতাম। ঈদের আগে আমি ইসমাইল ভাই অথবা রশীদ ভাইকে টাকা পাঠিয়ে দিতাম যাতে আগেই গরু কিনে রাখেন। ফাতেমার স্বামী সলিমুল্লাহ ওরফে দুদু ভাইকে আমি কখনোই কুরবানীর গরু কেনার দায়িত্তটা আমি দিতাম না কারন তার উপরে আমার টাকা পয়সা নিয়ে আস্থা ছিলো না। কেনো তার উপরে আস্থা ছিলো না, সে কাহিনী বিস্তর, আজ না হয় এখানে নাইবা বললাম। গরু কেনার ব্যাপারে আমার একটা পলিসি ছিলো যে, মেহেরুন্নেসা (অর্থাৎ আমার ইমিডিয়েট বড় বোন সব সময় গরু পালতো। আমি ইচ্ছে করেই রশীদ ভাইকে বলতাম যাতে ওর গরুটাই আমার জন্যে রেখে দেয়। আমি কখনোই সেটার দাম করতাম না। এই কারনে করতাম না, মেহের যে কয় টাকায় বিক্রি করলে খুশী হয় সেটাই হোক আমার আরেকটা সাহাজ্য। মেহের খুব ভালো একটা মেয়ে।

আজ সেই কুরবানীর দিনটা চলে গেলো। শুনেছিলাম, একটা গরু মোট সাত জনের নামে কুরবানী দেয়া যায়। ফলে আমি সব সময় এই সু্যোগে যে কাজটা করি, তা হলো- এক ভাগ দেই আমি আমার প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মাদ (সঃ) এর নামে, আর বাকী ৬ ভাগ দেই-আমার, মিটুল, আমার ২ মেয়ে, আমার বাবা আর আমার মায়ের নামে। এটাই আমার কুরবানী দেয়ার পলিসি। আজো তাইই করলাম। গরু জবাই, মাংশ কাটাকাটি আর বিলানোর কাজটা আমি নিজ হাতে করি। ৩ টা ভাগ করি, একটা ভাগ নীচেই বিলিয়ে দেই, বাকী ২ ভাগের এক ভাগ আমি রাখি আলাদা করে সমস্ত আত্তীয় সজন আর পাড়া পড়শীর জন্য, আর এক ভাগ থাকে আমার পরিবারের জন্য।

এই কুরবানী এলে আমার আরো একটা কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সেই ১৯৭৬-৭৭ সালের কথা। আমাদের তখন কুরবানী দেয়ার মতো পরিস্থিতি ছিলো না। আমি মাত্র ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ি, আমাদের বাড়িতে ৫ বোন আর মা আর আমি। আমার বড় ভাই তখন সবেমাত্র আমেরিকা গেছেন। আমাদের সব ভরন পোষনের দায়িত্ত আমার বড় ভাইই করেন। কিন্তু শেয়ারে কুরবানী দেয়া কিংবা আলাদা কুরবানী দেয়ার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিলো না। ফলে এই কুরবানীর দিন আমার খুব অসস্থি হতো। অসস্থি হতো এই কারনে যে, আমরা না কারো কাছ থেকে মাংশ চেয়ে আনতে পারতাম, না আমাদের সামর্থ ছিলো কুরবানী দেয়ার। ফলে দিনের শেষে যখন সবাই যার যার বাড়িতে গরুর মাংশ পাকে ব্যস্ত, খাওয়ায় ব্যস্ত, আনন্দে ব্যস্ত, তখন হয়তো আমাদের বাড়িতে ঠিক তেমনটা নাও হতে পারে। আমি এই ঈদের দিনের দুপুরের পর আর কোথাও যেতাম না, কারন আমার কেম্ন জানি নিজের কাছে খুব ছোট মনে হতো। কুরবানী দেয়াটা ধর্মের দিক দিয়ে কি, আর কি না, সেটা আমার কাছে হয়তো অনেক বড় মাহাত্য ছিলো না, কিন্তু আমি যখন দেখতাম, আমার বন্ধুদের বাড়িতে সবাই কুরবানীর গরু নিয়ে কাটাকাটিতে ব্যস্ত, বিকালে মাংশ বিলানোতে ব্যস্ত, আমার তখন মনে হতো, আমিই ব্যস্ত না। গরীব হয়ে জন্ম নেয়াটা একটা অসস্থিকর ব্যাপার। তারপরেও অনেকেই আমাদের বাড়িতে কুরবানীর পর মাংশ পাঠাইতো। বিকালে বা সন্ধ্যায় দুদু ভাই, ইসমাইল ভাই, আমাদের খালাদের বাড়ি থেকে, কিংবা জলিল মামাদের বাড়ি থেকে অথবা পাশের কোনো বারি থেকে অনেকেই মাংশ পাঠাইতো যেটা আমার কাছে একটু খারাপ লাগলেও মা নিতেন। কুরবানী বলে কথা। সবাই মাংশ খাবে, আমাদের বাড়ির মানুষেরা একেবারেই কিছু খাবে না, মা হয়তো এটা ভেবেই মাংশ গুলি রাখতেন। দিনটা চলে যেতো, আমার অসস্থির ভাবটাও ধীরে ধীরে কেটে যেতো। আবার এক বছর পর হয়তো এই অসস্থিটা আসবে।

যেদিন আমার ক্ষমতা হলো কুরবানী দেয়ার, আমি সব সময় গ্রামেই কুরবানী দিয়েছি। আর সব সময়ই আমার সেই দিনগুলির কথা মনে করেছি। আমাদের দিন পাল্টেছে, আমাদের পজিসন পাল্টেছে। মা যখন জীবিত ছিলেন, এমনো হয়েছে মাঝে মাঝে আমি দুটু কুরবানীও করেছি একা।

আজ মা নাই, আমার গ্রামে যাওয়া হয় না। কুরবানী নিয়ে এখন আমার তেমন কোনো আগ্রহও নাই। তবে সবসময় ঢাকাতেই আমি কুরবানী দেই, একা। যদি আমি কখনো কুরবানী নাও দেই, কেউ আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করবে না কারন সবাই জানে আমার একটা না, অনেকগুলি কুরবানী দেয়ার সক্ষমতাও আছে। হয়তো কোনো কারনে আমি ইচ্ছে করেই কুরবানী হয়তো দেই নাই। কেউ এটা ভাববে না যে, আমার টাকা নাই তাই কুরবানী দেই নাই। “সময়” এমন জিনিষ। সব কিছু পালটে দেয়।

৮/৭/২০২১-জীবনে হতাশ হওয়ার

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

৮ জুলাই 

জীবনে হতাশ হওয়ার কোনো কারন নাই। একদিন নিজেকে নিজেই বলেছিলাম যে, ভগবান মানুষের জন্য প্রতিটি দিন একই রকম করে কাটাতে দেন না। আজ যে রবিবার আপনি হাসছেন, আগামী রবিবার আপনি নাও হাসতে পারেন, হয়তো সেদিন আপনি হাসিতে আপনার প্রতিটি মুহুর্ত ভরে থাকবে। এই সপ্তাহটা হয়তো আপনার জন্য ভয়ানক অস্থির যাচ্ছে, কে জানে আগামী সপ্তাহটা হয়তো হবে একেবারেই সুন্দর। তাই হতাশ হবার কোনো কারন নাই। প্রতিটি ঝড় কিংবা বিপদের মাঝেও কিছু না কিছু সুসংবাদ থাকে, কিছু না কিছু ভালো জিনিষ আসে। একটা মৃত ঘড়ির দিকে তাকান, দেখবেন নষ্ট ঘড়িটাও দিনে দুবার একদম সঠিক সময় প্রকাশ করে। অপরিষ্কার জল খাবারের অনুপোযোগী হলেও সেটা আগুন নেভানোর কাজে লাগে। বোবা কিংবা বোকা বন্ধুও আপনার অন্ধ জীবনে রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারে।

তারপরেও একটা সময় আসে যখন শুধু নিজের জন্যেই নিজেকে বাচতে হয়। অন্য কারো জন্যে নয়। আমরা সামাজিক কিংবা পারিবারিক জীবনের কথা বলি। ওটা একটা শুধু কন্সেপ্ট যেখানে মানুষ একা থাকতে পারে না বলে সে এই দলবদ্ধ জীবন বা পারিবারিক জীবনটাতে থাকতে চায়। কিন্তু একটা সময়ে সবাই এই জীবনেও হাপিয়ে উঠে। সন্তান, স্ত্রী কিংবা আশেপাশের সবাই যেনো তখন এক ঘেয়েমীতে ভরে যায়। তখন কেউ কারো আদর্শ কিংবা অভিজ্ঞতাকে আর কাজে লাগাতেও চায় না, বরং যেটা নিজেরা ভাবে সেতাই যেনো পরিশুদ্ধ, আর সেটাই করতে চায় সবাই। সন্তানেরা যখন বড় হয়ে যায়, তখন তাদেরকে তাদের মতো করেই ছেড়ে দেয়া উচিত। তাদের চিন্তা ধারা, তাদের পছন্দ কিংবা আশা নিরাশা সবন কিছু তাদের মতো। তাই, আমরা যারা বড়রা তাদের জন্যে দুশ্চিন্তা করি, এটা হয়তো আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে ভাবি যে, ওরা ভুল করছে বা যা করছে সেটা ঠিক নয়। আর এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা আমাদের কিছু কন্সেপ্ট বা ধারনা বা উপদেশ ওদের উপর চালাতে চাই যা অহরহই ওরা মানতে চায় না। যখন এমন একটা কনফ্লিক্ট সামনে আসে, তখন আমাদের উচিত আর না এগোনো। সবাইকে যার যার পথে চলতে দিয়ে ঠিক ঐ জায়গাটায় দাড় করানো উচিত যাতে ওরা বুঝতে পারে, আমাদের উপদেশ ঠিক ছিলো কিংবা আমরাই ঠিক ছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ঐ সময় কোনো কিছুই আর পিছনে গিয়ে সঠিকটা করা যায় না বলে মনে কষ্ট লাগে বা খারাপ লাগে। কিন্তু ওটা ছাড়া তো আর কিছুই করার নাই। চেয়ে চেয়ে ধ্বংস দেখা ছাড়া যদিও কোনো উপায় নাই, তারপরেও সেটাই করতে দেয়া উচিত যাতে ওরা এটা বুঝতে পারে যে, বড়দের অভিজ্ঞতার দাম ছিলো, উপদেশ গ্রহন করা উচিত ছিলো। তাহলে হয়তো আজকের দিনের এই অধোপতন কিংবা ছেড়াবেড়া জীবনে পড়তে হতো না।

লাইফটায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছি আমি নিজেও। নিজের ঘরে যখন কেউ একাকিত্ত বোধ করে সেখানে সময় একেবারেই স্থবির। সেখানে যেটা চলে সেটা হচ্ছে- সময় মত খাওয়া, আর নিজেকে অন্য কিছুতে ব্যস্ত রাখা। এটা একটা সময়ে সবার জীবনেই আসে। আমি যদি বলি, এটা ইতিমধ্যে আমার জীবনেও শুরু হয়ে গেছে, ভুল বলা হবে না।

কেনো বললাম কথাটা। এর নিশ্চয় কোনো কারন তো আছে। আজকের যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা আমার কাছে কাম্য নয়। না আমি আশা করেছি। আমার সন্তানদের জন্য আমার থেকে বেশী কেউ ভাবে এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু সেই সন্তানেরা যদি কখনো বলে, যে, আমরা তাদের জন্য অভিশাপ,আমরা পশুর চেয়েও খারাপ ব্এযবহার করি, কিংবা আমরা প্ৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ বাবা মা ইত্যাদি, এর থেকে বড় পরাজয় আর কিছু হতে পারে না। তবে আমি জানি, জীবনে এ রকমের অনুভুতি সবারই আসে। যখন এই অনুভুতি ভুল প্রমানিত হয়, তখন বেলা এতোটাই বেড়ে যায় যে, কারো কারো জীবনের রাত শেষ হয়ে আরো গভীর রাতে অন্য কোনো জগতে সে চলে যায়।

১৯/০৭/২০২১-ঈদুল আজহার ২দিন আগে

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

১৯ জুলাই 

এই কয়েকমাসে এতো বেশী অভিজ্ঞতা হলো যা আমার জীবনের অনেক প্রাক্টিস আর বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যাদেরকে আমি মনে করি সবাই আমার মতো। অথবা আর যার সাথে আমরা যাইই করি না কেনো, অন্তত আমরা আমাদের সাথে সেই একই প্রাক্টিস গুলি কখনো করতে পারি না। কিন্তু আমার এই ধারনা সমুলে আঘাত খেয়েছে অনেক গুলি কারনে। তাহলে একা একা বলিঃ

(১) মান্নানের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়েঃ মান্নান যে আমার সাথে লুকুচুড়ি করে সেটা আমি জানি। অনেক সময় ভাবি যে, হয়তো সে একটু ভালো থাকতে চায়, তাই একটু আধটু লুকুচুরি করে। আমার অনেক ক্ষতি না হলেও অর্থের দিক দিয়ে একটু তো লাগেই। কিন্তু যেহেতু আমি সামলে নিতে পারি, তাই অনেক সময় কিছু বলি না বা বলতে চাইও না।

আমি যখনই কোনো জমি কিনেছি, মান্নান সেখানে জমির দামটা এমন করে বাড়িয়ে বলতো যাতে আমার টাকা দিয়েই মান্নান ও কিছু জমি সেখান থেকে কিনতে পারে। আমি সেটা বুঝি কিন্তু কিছু হয়তো বলি না। এভাবে মান্নান অনেক জমি শুধু হয়তো আমার টাকা দিয়েই কিনেছে আর সেটা আমার ক্রয় করা জমির সাথেই। কিন্তু এবার যেটা করেছে সেটা মারাত্তক।

মুজিবুর রহমান খান নামে এক ভদ্রলোক আমাদের পলাসপুরের জমিটা কিনতে আগ্রহী হলে আমিও বিক্রি করতে তৈরী ছিলাম। আমার জমির সাথে আমার পার্টনার মুর্তুজা ভাইয়ের জমি আছে। ফলে আমার জমি আর মুর্তুজা ভাইয়ের জমি সহ একটা রফাদফা হয়েছিলো। এর মধ্যে মান্নান আমাকে জানালো যে, মুজিবুর রহমান খান সাহেবের আরো জমি দরকার যা সেলিম নামে এক জন লোকের জমি আমাদের জমির পাশেই আছে কিন্তু ওর জমিতে যাওয়ার রাস্তা না থাকায় যদি আমাদের জমির সাথে টাই আপ করে খান সাহেবের কাছে বিক্রি করি তাতে আমাদের লাভ হবে। কারন সেলিকমে জমির মুল্য দিতে হবে খান সাহেবের দেয়া জমির দামের অর্ধেক প্রায়। সেলিমদের মোট জমি ছিলো ৩২০ শতাংশ।

এর মধ্যে মান্নান আমাকে জানালো যে, আমরা সেলিমদের জমি থেকে পানি ব্যতিত মোট ১৫১ শতাংশ জমি খান সাহেবকে দিতে পারবো। বাকী ১৬৯ শতাংশ জমি আসলে নদীর পানির মধ্যে যদিও জমিটা রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত। আমি যখন সেলিমদের জমিটা বিনা পরীক্ষায়, বিনা নীরিক্ষায় খান সাহেবকে রেজিষ্ট্রি করে দিলাম, পরে জমি মাপ্তে গিয়ে দেখি যে, মাত্র ৯৮ শতাংশ জমি আছে যা নদীর মধ্যে না। অনেক রাগারাগি আর চাপাচাপির মধ্যে আমি যখন সেলিমদের ধরলাম, শুনলাম আরেক বিরাট ইতিহাস। মান্নান, সেলিম এবং সেলিমের এক চাচাতো ভাই মিলে মোট ৩২০ শতাংশ জমিই কিনে নিয়েছে সেলিমদের আত্তীয় স্বজনের কাছ থেকে অই টাকায় যে টাকা হয় ১৫১ শতাংশের দাম। খান সাহেবকে ১৫১ শতাংশ জমি দেয়ার পর বাকী ১৬৯ শতাংশ জমি ধান্দা করে মান্নানের নামে আর সেলিমের নামে একা পাওয়া অফ এটর্নী নিয়েছে। এর মানে হলো, আমি কোনো লাভ করি নি , লাভ করছিলো মান্নান। যদি অদুর ভবিষ্যতে পানি শুকিয়ে চর জাগে, তাহলে মান্নান এই জমি গুলি চড়া দামে বিক্রি করতে পারবে। অথচ টাকাগুলি খান সাহেবের এবং আমার। খান সাহেব যখন নদীর মধ্যে কোনো জমি নিতে নারাজ হলেন, তখন আমার চর গল্গলিয়া মৌজা থেকে এই বাকী ৫৩ শতাংশ জমি পুরা করে দিতে হবে যার দাম প্রায় তিন কোটি টাকা। এটা কোনোভাবেই আমার সম্ভব হচ্ছিলো না। আমি কেনো এতো গুলি জমি খান সাহেবকে লিখে দেবো যার দাম তিন কোটি টাকার উপরে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখেই দিতে হবে জেনে আমি পলাশপুরের আক্কাসকে ধরে মান্নান আর সেলিমের কাছ থেকে পরবর্তীতে ওই ১৬৯ শতাংশ জমি ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার নিজের নামে নিয়ে নিলাম। জানি আমার ক্ষতি পুরন হবে না যতোক্ষন পর্যন্ত ওই নদীর জমি শুকিয়ে আসল চেহারায় জমি ভেসে না উঠে। আমি মান্নানকে বারবার এই অ বিশ্বাসের কাজটা কেনো করেছে জিজ্ঞেস করলে তার একটাই উত্তর- ভুল হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই ভুল হতে পারে না। আমি কখনো ভচাবি নাই যে, মান্নান ও আমাকে এভাবে এতো ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।

পলাশপুরে আমার আরো একতা জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া ছিলো। আর যেহেতু ওই লিজটা আনতে হয় কোনো দুস্ত মানুষের নামে, তাই আমি মান্নানের ভাই নাসিরের নামেই ১০০ শতাংশ জমি আমার টাকায় লিজ নিয়ে এসেছিলাম। মান্নান আমাকে না জানিয়ে হালিম নামে এক লোকের কাছে ২০ লাখ টাকায় জমিটা গোপনে টাকা নিয়ে নিলো। এটা একটা অসম্ভব ঘটনা বলে আমার কাছে মনে হয়েছিলো। কিন্তু মান্নান কাজটা করেছে আমাকে একটু ও জানতে দেয় নাই। যখ ওরে আমি প্রশ্ন করেছি- মান্নানের একটাই উত্তর যে, আমার নাতির অসুখ ছিলো, টাকার দরকার ছিলো, তাই আমি বিক্রি করে দিয়েছি। আমাকে জানানোর কোনো বাধ্য বাধকতা মনে করলো না।

খান ভাই আমাদের পলাশ পুরের জমিটা কিনার সময়ে মোট ৬৩১ শতাংশ জমির বায়না করেছিলো যার মধ্যে মান্নানের ছিলো ৫১ শতাংশ। আমি খান ভাইকে বারবার বলেছিলাম, কখনো আমাকে ছাড়া টাকা পয়সার লেন দেন করবেন না। কিন্তু ওই যে বললাম, সবাই লাভ চায়!! খান সাহেব মান্নানকে মাঝে মাঝে আমাকে না জানিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা হ্যান্ড ওভার করে। একদিন খান সাহেব আমাকে জানালো যে, মান্নান জমিটা কাগজে কলমে কোনো বায়নাও করছে না আবার টাকাও চায়। আমি যখন ব্যাপারটার ভিতরে প্রবেশ করলাম, দেখলাম, ওই খানে মান্নানের জমি আছে মাত্র ৪ শতাঙ্ঘস, আর ওর বোন আর ভাই মিলে আছে আরো ৫ শতাংশ, মোট ৯ শতাংশ। বাকী জায়গাটা আক্কাস নামে ওর এক আত্তিয়ের। কিন্তু আক্কাসকে মান্নান উক্ত ৩৫ লাখ টাকা থেকে কখনো ১ টাকাও দেয় নাই, না মান্নান ওনার কাছ থেকে কোনো পাওয়ার অফ এটর্নী কিংবা অগ্রিম কোনো বায়নাপত্র করেছে। আক্কাস সাহেব যখন জানলো যে, মান্নান ইতিমধ্যে ৩৫ লক্ষ টাকা নিয়ে ফেলেছে, সে তখন (৫১ মানাস ৯) ৪২ শতান্সগ জমির বায়না করে ফেল্লো উক্ত খান সাহেবের সাথে। অর্থাৎ মান্নান জানেই না যে, উক্ত জমি মান্নান আর কখনোই খান সাহেবের কাছে বিক্রি করতে পারবে না। আমি যখন আজকে মান্নানকে বললাম, খান সাহেবকে ৫১ শতাংশ জমি লিখে দিচ্ছিস না কেনো? তার অনেক উচা গলায় বল্লো, সে আগামীকালই জমিটা লিখে দিতে পারে। যখন বললাম যে, আক্কাস জমিটা অন্য খানে বিক্রি করে দিয়েছে- তখন দেখলাম ওর মুখের ভাব অনেক রক্তিম। কিন্তু লজ্জায় পড়লো কিনা জানি না। ওর আসলে এগুলিতে কোনো খারাপ লাগে না মনে হয়। টাকাটাই ওর কাছে সবচেয়ে বড় মনে হয়। ভাগ্যিস আমি এই ৫১ শতাংশের ব্যাপারে কাহ্নের সাথে কোনো প্রকার কথা বলি নাই। তাহলে এই ৫১ শতাংশ নিয়েও খান আমাকে চাপ দিতো।

মান্নানের এখন টাকা প্রাপ্তির প্রায় সব গুলি রাস্তাই বন্ধ। কোটি কোটি টাকা আমি ওর হাত দিয়ে খরচ করিয়েছি। বারবার বলেছি, অন্য কোনো একটা সোর্স কর যাতে বিপদের সময় একটা ইন কাম আসে। কখনো ব্যাপারটা আমলে নেয় নাই। এবার মনে হয় খুব হারে হারে টের পাচ্ছে যে, ওর টাকার সব গুলি সোর্স প্রায় একেবারেই বন্ধ। দেখা যাক কি করে। আমার কাছে অনেক গুলি কারন দেখিয়ে কিছু টাকা খসানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু এবার আমি অনেক টাইট হয়ে গেছি। কোনো কিছুতেই কোনোভাবেই আর টাকা দেয়া যাবে না। মান্নানের পিঠ প্রায় দেয়ালের মধ্যে ঠেকে যাচ্ছে। তবে এখান থেকে কিছুটা উত্তোরন হয়তো হবে যদি ধলেশ্বরী গ্রীন ভিলেজ প্রোজেক্ট শুরু হয়। কারন ওখানে আমি ওকে ইন করিয়েছি। কিন্তু ওটার ইন কাম বড্ড স্লো।

এবার আসি আমার পার্টনার মুর্তুজা ভাইয়ের কাছ থেকে আম্নার তিক্ত অভিজ্ঞতার ব্যাপারটাঃ

(To be cont...)

২০/০৭/২০২১***-ভরষা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২০ জুলাই 

ভরষা করা দোষের নয়। মানুষ যদি মানুষের উপর ভরষা না করে, তাহলে ধ্বংস বেশী দূরে নেই। কিন্তু কারো উপর ভরষা করার আগে সতর্ক থাকা খুবই জরুরী। ইচ্ছাকে ভালোবাসায়, আর ভালোবাসা থেকে সম্পর্ক তৈরী করার সময় এই সতর্ক থাকা ভীষনই প্রয়োজন। কিন্তু তুমি এসবের কোনো কিছুই না জেনে শুধু ইচ্ছাটাকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় তুমি সম্পরকটা করেছো যেখানে তুমি কোনো কিছুই ভাবো নাই। তুমি পরিশ্রমী, তুমি সাহসী যদি কেউ পাশে থাকে, তুমি সৎ সেটা নিজের কাছে এবং আর তোমার জীবনের হিসাব তুমি জানো। আর তোমার মনে যে সপ্ন ছিলো সেটা পুরন করার জন্যই তুমি একটা সমঝোতা করেছো নিজের সাথে নিজের। আর সেটা তুমি সততার সাথে পালনও করছো। তোমার জীবনে এই গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আসলে তোমার সামনে কেউ ছিলো না। আর থাকলেও কোনো লাভ হতো না সেটা তুমি হারে হারে জানো। কারন যারা থেকেও ছিলো, তারা আসলে কখনোই তোমাকে মুল্যায়ন করেনি, করতোও না। তুমি অথবা যার সাথে তুমি এমন একটা সম্পর্ক করেছো, তোমরা কখনোই এটাও ভুলে যেতে চাও নাই যে, এই সম্পর্কের সামাজিকভাবে আসলে কোনো স্বীকৃতিও নাই। কিন্তু তোমার চোখ বন্ধ করে ভরষা করার ফল আমি কখনোই সেটা বৃথা যেতে দিতে চাই না। কারন তুমি অন্তত তোমার সব কিছু দিয়েই আমাকে মেনে নিয়েছো। এখানে গাদ্দারী করার কোনো প্রকারের অবকাশ বা সাহস আমার ছিলোনা, নাই আর ভবিষ্যতে থাকবেও না। ভদ্রতার পিছনে আমার কোনো প্রকার মুখোস কিংবা শয়তানীও নাই। কারন আমি জানি, এই জগতে আমাকে ছাড়া তোমার আর কেউ নাই, হোক সেটা তোমার জন্মদাতা বাবা বা মা অথবা তোমার রক্তের কেউ। এই অবস্থায় আমি তোমাকে ফেলে গেলেও আমার চোখ বারবার ফিরে তাকাবে পিছনে যেখানে তুমি পড়ে আছো। আমি সেটা কখনোই করতে পারবো না। ভাবো তো একবার- আমি চলে যাচ্ছি, তুমি চেয়ে চেয়ে দেখছো আমার নিষ্ঠুরতা, আর তুমি ভাবছো, তোমার সারাটা দুনিয়া এখন অন্ধকার। তোমার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে, তুমি ভাষাহীন হয়ে যাবে, তখন তোমার চোখ শুধু কথা বলবে। আর চোখের ভাষা তো একটাই। জল। এই জল দেখার জন্যে আমি কখনো প্রস্তুত নই।

এই প্রিথিবীতে কে আছে তোমার, আর কে নাই তাদের সবার শক্তি, ভালোবাসা আর ভরষা যোগ করলেও সেই ভরষার সাথে একদিকে শুধু আমি, এটাই তোমার কাছে পৃথিবীর সর্বোত্তম শক্তি। আর তুমি এতাই প্রমান করেছো এই পারুর কেসে। সারাটা গ্রাম, আইন, থানা, টাকা পয়সা, নেতা, মাদবরী, সন্ত্রাসী, চোখ রাংগানি একদিকে আর তুমি একাই একদিকে ছিলে। আর সেই শক্তিটাই তুমি প্রতিনিয়ত পেয়েছো এই ভরষার মানুষটার কাছে। কারন তুমি জানো, আর সবাই পালিয়ে গেলেও আমি অন্তত পালাবো না।

কেনো তুমি অন্য কারো চোখে চোখ রাখতে পারো না, কেনো তোমার মনে অন্য কারো স্থান হয় না, কখনো কি এটা খুব মনোযোগ সহকারে নিজেকে প্রশ্ন করেছো? ধর্মের কথা আলাদা, আল্লাহর দোহাই আলাদা ব্যাপার। কিন্তু এর বাইরেও তো অনেক লজিক আছে। সেই লজিক দিয়েও কি কখনো ভেবেছো কেনো হয় না সেগুলি? এর উত্তর একটাই- টোটাল সারেন্ডার। মানে সম্পুর্ন আত্তসমর্পন। যখন কোনো মানুষ তার নিজের মন তৃপ্তিতে থাকে, যখন চোখ ভালো ঘুম পায়, যখন শরীরের চাহিদা পূর্ন হয়, তখন শরীর, দেহ, মন, কিংবা আত্তা কারো দিকে ছুটে যেতে চায় না। যেমন ছুটে যায় না চাঁদ পৃথিবীর বলয় থেকে, কিংবা প্রিথিবী সূর্যের বলয় থেকে। তাদের যতোটুকু শক্ত্র প্রয়োজন তাদের নিজ নিজ অক্ষে চলার, ঠিক ততোটাই তারা পায়। তাহলে আর অন্য কোনো গ্রহের কিংবা নক্ষত্রের দারস্থ হবার কি প্রয়োজন?

মানুষ তখনি ছুটে যায় এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে যখন সে তার সঠিক তরী খুজে না পায়। আর সঠিক ঘাটের সন্ধান যখন একবার কেউ পায়, তার আর অন্য ঘাটে যাওয়ার অর্থ ভুল ঘাটে চলে যাওয়া। ভুল ঘাট মানুষকে ভুল পথেই নিয়া যায়। আর কেউ যখন একবার ভুল পথে যাত্রা শুরু করে, সেখান থেকে ফিরে আসার অন্য কোনো বিকল্প রাস্তা হয়তো তার জানাই নাই। যদি সেই অচেনা রাস্তায় একবার কেউ পড়ে যায়, সেখানে প্রতিটি মানুষ তার অচেনা। অচেনা মানুষের কাছে চোখের জলের কোনো মুল্য থাকে না।

আর মুল্যহীন জীবনে সপ্ন তো দূরের কথা, বেচে থাকাই কষ্টের। কষ্টে ভরা জীবন যখন সামনে চলতে থাকে, তখন মানুষের এই জীবনের প্রতি মায়া হারিয়ে ফেলে, ভগবানের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। ঈশর আছে এটাই তখন আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। তারপরেও দূর্বল চিত্তের মানুষেরা যাদের কোনো কুল কিনারা আর থাকে না, যেমন লামিয়া বা শারমিন, তারা ওই অচেনা, অসুন্দর জীবনকেই মানিয়ে নিতে শুরু করে। সেখানে তখন আর ভগবানের কোনো অস্তিত্ত থাকে না বা তারা ভগবানকে মানেই না। ধর্ম পালন তো দুরের কথা।

তোমার দুষ্টুমি যেমন পাগলামী, আমার কাছে তোমার পাগলামীও তেমন মিষ্টি, তোমার কান্নাও আমার কাছে ঠিক ওই রকমের। তোমাকে ভালো রাখাই আমার কাজ। আর সেই ভালো থাকাটা নির্ভর করে তোমার আত্তার উপর তুমি কতোটা তৃপ্ত। এই প্রিথিবী থেকে চাঁদ যতো সুন্দর মনে হয়, নীল আকাসের সাথে চাদকে যেমন কোনো এক যুবতীর কপালের টীপ মনে হয়, অথবা অনেক দূরের কাশবন যখন সাদা মেঘের মতো হাওয়ায় দুলে দুলে মনকে দোলায়িত করে, যখন ওই চাদে গিয়ে পা রাখা যায়, কিংবা কাশবনের মাঝে হাজির হওয়া যায়, তখন তার আসল রুপ দেখে দম বন্ধ হয়ে আসে। সেই চাঁদ আর কাশবন কেনো জানি মনে হয় এটা একটা খারাপ সপ্ন ছিলো। আমরা সেখানে বসবাস করতে পারি না। আবার ছুটে আসতে চাই এই গাছ গাছালী ভর্তি নোনা সেঁতসেঁতে সোদা গন্ধের মাটিতে যেখানে বর্ষায় গাছের পাতা বেয়ে বেয়ে টিপ টিপ করে ফোটা ফোটা পানি আমাদের নাকের ডগা দিয়ে বুকের ভিতরে এসে অন্তর শীতল করে দেয়।

একটা মানুষের শান্তিতে আর সুখে বসবাসের জন্য এই পৃথিবীর অনেক কিছু লাগে না। প্রিন্সেস ডায়ানার একেকটা নেকলেসের দাম ছিলো কোটি কোটি টাকার। তার একেকটা ড্রেসের দাম ছিলো হাজার হাজার ডলার। সাথে ছিলো রাজ প্রাসাদ। কি ছিলো না তার। ছিলো সবুজ চোখের মনি, ঈশ্বর যেনো তাকে একাই রুপবতী করে পাঠিয়েছিলো। অথচ মনে তার কোনো শান্তিই ছিলো না। সেই শান্তির খোজে শেষতক রাজ প্রাসাদ ছাড়তে হয়েছে। অন্যের হাত ধরতে হয়েছে। আর মাত্র ৩২ বছর বয়সেই তাকে এই প্রিথিবী ছাড়তে হয়েছে। যদি বাড়ি, গাড়ি, জুয়েলারী, আর টাকা পয়সাই হতো সব সুখের মুল চাবিকাঠি, তাহলে ডায়নার থেকে সুখী মানুষ আর এই প্রিথিবীতে কেউ ছিলো না। কিন্তু সেটা কি আসলেই সুখী ছিলো?

একটা তরকারীতে নুন কম হতে পারে, একটা পরোটা পুড়ে যেতে পারে, তার স্বাদ কিংবা মজা হয়তো একটু হেরফের হতেই পারে কিন্তু সেটা হয়তো একদিন বা দুইদিন। কিন্তু ভালোবাসা আর মহব্বতে যখন নুনের কমতি হয়, পুড়ে যায়, তখন জীবনের মজাটাই শেষ হয়ে যায়। আর জীবনের মজা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন এসি রুমেও ভালো ঘুম হয় না। নীল আকাশ দেখেও কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে না। তখন যেটা মনে হয় তা হচ্ছে বিষাদময় রুচী। সেই রুচীতে আর যাই হোক পেট ভরে না। আর পেটে ক্ষুধা রেখে কোনোদিন কারো ভালো ঘুম হয়েছে তার কোনো প্রমান নাই।

আমি তোমার জীবনে সেই রকমের একটা অলিখিত ভরষা। এই ভরষার কোনো ডেফিনিশন নাই। এই ভরষার কোনো আইন গত দিক নাই বটে কিন্তু আমার নিজের অনেক দায়িত্তশীলতা আছে যেখানে আমিই আইনপ্রনেতা, আর আমিই সবচেয়ে বড় বিচারক। হয়তো সমাজকে আমি তুরি দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবো না, কিন্তু আমি সেটাই করততে পারি যাতে তুমি তুড়ি দিয়ে সবাইকে এটাই করতে পারো যে, তুমি নিজেও একটা শক্তি।

আজ তুমি সেই বিগত বছরগুলির দিকে তাকিয়ে দেখো? তুমি দেখতে পাবে যে, সেইসব বছরগুলিতে অনেক ঝং ধরা ছিলো। আগাছায় ভরা একটা কঠিন পথ ছিলো। কিন্তু আজ থেকে ৫ বছর পরেরদিন গুলি দেখো, সেখানে প্রতিদিন তোমার জীবন মোড় নিয়েছে। বাকেবাকে সমস্যা ছিলো কারন সমস্যা গুলি হয়তো আমার নজরে ছিলো না। কিন্তু আজ তোমার সেই বছরগুলির সাথে তুলনা করলে স্পষ্ট দেখতে পাবে, আকাশের মেঘ তোমার ঘরেই রংধনু হয়ে একটা বাগান তৈরী করেছে। সেই বাগানে তুমি যখন খুসী যেভাবে খুসী বিচরন করতে পারো। এই বাগানের একচ্ছত্র মালিকানা তোমার নিজের। এখানে একটা আম খেলেও শরীর চাংগা হয়ে উঠে, এখানে একটা ডিম খেলেও শতভাগ কাজ করে। অথচ আজ থেকে ৫ বছর আগে সেই একটি আম কিংবা একটি ডিম এমন করে খেলেও শতভাগ কাজ করতো না। কারন তখন ভরষার জায়গাটা ছিলো একেবারেই অনিশ্চিত। যা এখন পুরুটাই উলটা। আর এটাই খাটি ভরষা।

এখানে শুধু একটা ব্যাপারই চিন্তার বিষয় যে, যে মানুষটার কারনে কখনো নিজেদেরকে অসহায় মনে হয় নাই, কোনো দুশ্চিন্তা গ্রাস করে নাই, যখন সেই মানুষটা চলে যায়, তখন সেইই দিয়ে যায় যতো অসহায়ত্ব আর দুশ্চিন্তা। আর এটা আমার মাথায় সব সময় কাজ করে। এর জন্যে সমাধান একটাই- যা আমি অন্যদের বেলায় করেছি। সাবলম্বিতা। এবং দ্রুত। তোমাদের কাজ ভরষা করা আর আমার কাজ সেই ভরষার স্থানটা স্থায়ী করা।

যেদিন মনে হবে তুমি সাবলম্বি, তুমি নিজে নিজে একাই চলার ক্ষমতা রাখো, তোমার সমাজ তোমাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে দিধা বোধ করবে, সেদিন আসলে আমার দায়িত্ত প্রায় শেষ হয়েছে বলে আমি মনে করবো যেটা এখন প্রায়ই ভাবি আমার এই পক্ষের মানুষগুলির জন্য। তখন যেটা হবে- তুমি স্বাধীন পাখীর মতো এক ঢাল থেকে একাই উড়ে গিয়ে আরেক ঢালে বসতে পারবে। কিন্তু পাখীরা যখন একবার নিরাপদ গাছে বাসা বেধে ফেলে, যতোদিন ওই গাছটা থাকে, কেউ আর কেটে ফেলে না, কিংবা আচমকা কোনো ঝড়ে যখন গাছটা আর ভেংগে পড়ে না, ততোক্ষন অবধি সেই ভাষাহীন অবুঝ পাখীরাও তাদের নীড় পরিবর্তনে মনোযোগ দেয় না না। তারা সেখানে অভয়ারন্য তৈরী করে সেই জংগল সাম্রাজ্যের অধিকর্তা হিসাবেই জীবন পাড় করে দেয়।

ওই গাছটাই তখন তার ভরষা। ওই গাছ জায়গা দেয় বাসা করার, ওই গাছ ঢাল পেতে দেয় নিবিড় করে বসার। ওই পাখী চলে গেলেও গাছের না হয় কোনো ক্ষতি, না হয় তার ফলনে কোনো বিঘ্নতা। ঠিক সময়ে সেই গাছ ফুল দেয়, ফল দেয়, আর দেয় ছায়া। ঝড়ের দিনেও সে হয়তো অন্য আরো অনেক পাখীর জন্যে অভয়ারন্য স্রিষ্টি করে বটে কিন্তু সেই গাছ কোনোদিন অভিযোগ করে নাই, কেনো অন্য আর কিছু পাখী তার ঢাল ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলো। তবে যদি আবারো সে ফিরে আসে, গাছের কোনো অভিযোগ থাকে না। কিন্তু যদি কোনো ঢালই আর খালী না থাকে, সেটা তো আর গাছের দোষ নয়।

ভরষার স্থান কেউ ত্যাগ করলে গাছের কি দোষ!!

৯/৭/২০২১-কনিকার আগাম জন্মদিন এবং পার্টি

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

৯ জুলাই 

পড়াশুনার জন্য কনিকার বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি ধীরে ধীরে প্রায় সমাপ্তির দিকে। ভিসা হয়ে গেছে, টিকেট হয়ে গেছে, ইউএমবিসি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারে সব ফরমালিটিজ শেষ হয়ে ভর্তিও হয়ে গেছে, ওর জন্য এক বছরের আগাম টিউশন এর নিমিত্তে ১৪ হাজার ডলারের মধ্যে ১৩ হাজার ডলার ফিও আমি ছোট ভাই (মোস্তাক আহমেদ) এর কাছে রেখে দিয়েছি, ভ্যাকসিনেশনের সবকটা টীকাও প্রায় নেয়া শেষ। যাওয়ার সময় যে কতগুলি ডলার ওর হাতে দিয়ে দেবো সেটারও প্রায় ব্যবস্থা করে রেখেছি। এখন শুধু আগামী ১০ তারিখের দিবাগত রাত মানে ১১ অগাষ্ট ২০২১ তারিখে ভোর ৪টায় ওর কাতার এয়ার ওয়েজে উঠা বাকী ইনশাল্লাহ। একাই যাবে কারন এই করোনাকালীন সময়ে আমরা কেহই ভিসা পাচ্ছি না বিশেষ করে ভিজিটিং ভিসা। আবার ব্যবসায়ীক ভিসার জন্য যিনি আমাকে আমেরিকা থেকে ইনভাইটেশন পাঠাবেন, তাদের পক্ষেও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না বিধায় আমি ব্যবসায়ীক ভিসার জন্যেও এপ্লাই করতে পারছি না। ফলে কনিকাকে একাই যেতে হবে আমেরিকায়। একটু অসস্থিতে আছি বটে কিন্তু কনিকার উপর আমার ভরষা আছে যে, কনিকা একাই যেতে পারবে ইনশাল্লাহ। 

কনিকার জন্মদিন আসলে এই সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখে হবার কথা। কিন্তু কনিকা তখন দেশেই থাকবে না। গতবার ওর জন্মদিনটা ভালোমতো কভিডের কারনে পালন করতে পারিনি। এটা নিয়ে ওর কোনো কষ্ট ও ছিলো না। কিন্তু এবার যেনো ওর মন খারাপ হচ্ছিলো যে, ইচ্ছে করলেও সে তার জন্মদিনটা ঢাকায় পালন ক্রতে পারবে না বলে। কনিকার আফসোস থাকবে যে, ওর এ বছরের জন্মদিনটা সে আমেরিকায় থাকায় সবার সাথে পালন করা সম্ভব না। মন খারাপ করবে, তাই আমরা ওর আগাম জন্মদিন এবং ওর বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে সবাইকে একবার দাওয়াত করে খাওয়ানোর জন্য যে অনুষ্ঠানটা করার প্ল্যান করেছিলাম, সেটা এক সাথেই করলাম আজ। প্রায় ৫০/৫৫ জন্য গেষ্ট এসেছিলো, আমার ব্যবসায়ীক পার্টনার মুর্তজা ভাই এবং তার স্ত্রীও এসেছিলেন। সময়টা ভালোই কেটেছে।

চৈতীর কয়েকদিন আগে বিয়ে হয়েছিলো। তার জামাই সজীব, ননদ (সুচী), দেবর (সানিদ)ও এসেছিলো। মান্নাদেরকে আমি সব সময়ই আমাদের যে কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেই। এবারো তার ব্যতিক্রম হয় নাই। মান্নার জামাই বাবু খুব ভালো একটা ছেলে। আগে সিটি ব্যাংক এনএ তে চাকুরী করতো, কাল শুনলাম, হাবীব ব্যাংকে নতুন চাকুরী নিয়েছে। অত্যান্ত ম্যাচিউরড একটা ছেলে। ওর বিয়েটা আমিই দিয়েছিলাম মান্নার সাথে। ওর বিয়ে নিয়ে চমৎকার একটা উপাখ্যান তৈরী হয়েছিলো, সেটা আরেকদিন লিখবো।

সাজ্জাদ সোমা ওর বাচ্চারা আর সনি এবং তার জামাই সহ বাচ্চারা সব সময়ই আমাদের বাসায় আসতে পছন্দ করে, ওরাও বাদ যায় নাই। কনিকার জন্য ভালো একটা সময় কেটেছে আমাদের সবার। এমন ঘটা করে হয়তো আগামী ৫ বছর আর ওর জন্মদিন পালন করা হয়তো সম্ভব হবে কিনা জানি না।

কভিড-১৯ এর প্রভাব হটাত করে দেশে মহামারীর লক্ষন দেখা দিচ্ছে বলে সরকার কঠিন লক ডাউন দিয়েছে। যদিও আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য এটা বাধ্যতামূলক নয়, তারপরেও আমি ইচ্ছে করেই এই কয়দিন ফ্যাক্টরীতে যাচ্ছি না। বাসায় বসে ডায়েরী লিখি আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ব্যাপারে অনেক পড়াশুনা করছি। সাথে ইউটিউব থেকে সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভিডিও ফুটেজগুলিও দেখার চেষ্টা করে ঐ সময়টাকে বুঝবার চেষ্টা করছি। আনা ফ্রাংক এর ডায়েরীর উপর একটা মুভি হয়েছে, সেটাও দেখলাম। আইখম্যানের উপর প্রায় শতাধিক ট্রায়াল হয়েছে, সেগুলিও দেখলাম। খুব কঠিন সময় ছিলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়টা।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, কনিকার পর্ব। কনিকা তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে প্রায় লাখখানেক টাকার ক্যাশ গিফট পেয়েছে। আমি চাই নাই কেউ ওকে গিফট করুক কারন এসব গিফট আসলে কনিকার জন্য এখন আর খুব একটা প্রযোজ্য নয়, সে এগুলি বিদেশ নিতেও পারবে না আর আমরাও এগুলি আগামী সময়ে সংরক্ষন করতে পারবো না। তাই গেষ্ট যারা এসেছিলো, তারা সবাই কনিকাকে ক্যাশ টাকাই গিফট করেছে। আর এ কারনেই ওর গিফট এর টাকা এতো বেশী উঠেছিলো।

কনিকা খুব ফুরফুরা মেজাজে আছে। কারন ও যা যা চেয়েছে যেমন দেশের বাইরে ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার, সেটা সে একাই ম্যানেজ করেছে, কোনো কিছুতেই কোনো বাধার সৃষ্টি হয়নি, ওর জন্মদিনটাও ঘটা করে পালন করা হলো, আর আফসোস থাকবে না,  আবার বিদেশ যাওয়া উপলক্টাষে সবাইকে দাওয়াত করে খাওয়ানো হলো, ওর নিজের ও ভালো লেগেছে,  সব কিছু আল্লাহর রহমত, বাকীটা ভালোয় ভালোয় সব হলেই আলহামদুলিল্লাহ।

২৯/০৬/২০২১-আমার গ্রাম (১৯৭৭ সাল)

অফিসেই ছিলাম। কেনো জানি হটাত করে খুব গ্রামে যেতে ইচ্ছে করলো লায়লা আর সফুরা খালাকে দেখার জন্য। বহুদিন গ্রামে যাই না। প্রায় এক যুগ অথচ মাত্র ১৫ মিনিট লাগে গ্রামে যেতে। মা যখন বেচে ছিলেন, তখন গ্রাম আমাকে চুম্বকের মতো টানতো। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার হলেই আমি গ্রামে ছুটতাম মাকে দেখার জন্য যখন মা গ্রামে থাকতেন। কোনো ঈদই আমি শহরে করতাম না। মাকে দেখার সুবাদে আমার গ্রামের সেই পরিচিত মানুষগুলির সাথে আমার দেখা হতো। মানুষগুলি আমাকে বুক ভরা শ্রদ্ধ্যা আর মোহনীয় একটা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ করতো। আমি যখন গ্রামে যেতাম, মায়ের সাথে বসে গল্প করতাম, বাড়িটার অবস্থা কি সেটা ভালো করে পরীক্ষা করতাম যাতে ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে মায়ের কোনো ভয় না থাকে। মা ঝড়কে খুব ভয় পেতেন। আকাশে ঝড়ের আভাষ দেখলে প্রথমেই আমার মনে পড়তো মায়ের কথা। মা বোধ হয় এখন ভয় পাচ্ছে। সেই ২০০২ সালের কথা। এখন ২০২১ সাল। এর মাঝে দু একবার গ্রামে গিয়েছি নিতান্তই একটা অতিথির মতো। এখন গ্রামে গেলে লায়লার বাসা পর্যন্ত গিয়ে ওর সাথে কথাবার্তা বলেই মনে হয় আমার গ্রামের ভ্রমন শেষ। অনেকবারই একেবারে বাড়ির আস্তানা থেকে ফিরে এসেছি, হয়তো বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছেও হয় নাই। এখন বাড়িটাতে থাকে আমার এক অবিবাহিত ভাগ্নে যে সারাদিন শুধু গাজা খায়। গাজায় কি সুখ সেটা আমি জানি, তবে বেশীদিন গাজা খেলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সে তখন নিজেই গাজায় পরিনত হয়। যেতে ভালো লাগে না। চুরি ওর অভ্যাস, গাজা ওর খাবার আর মথ্যা কথা বলা ওর স্বভাব। ফলে ওখানে গেলে মনটা খারাপ হয়ে যায়, যেতে ইচ্ছে করে না।

আজ হটাত করেই আবার ইচ্ছে করে গ্রামে আসলাম। গ্রামটাকে আমি চিনতেই পারছিলাম না। অসংখ্য বাড়িঘর যত্রতত্র এখানে সেখানে উঠে গেছে। পায়ে চলার রাস্তাটাও আর আগের মতো নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই ১৯৭৮/৭৮ সালের আমার গ্রামের বিন্যাশ। গ্রামের একেবারে পুর্ব পাশে ছিলো দৌলত মেম্বারদের বাড়ি যেখানে একটা গুচ্ছ পরিবার থাকতো। তাদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই ছিলো ইয়াকুবদের বাড়ি। পরে শুনেছি এই ইয়াকুব নাকি মেম্বার হয়েছিলো তাই ওদের বাড়ির নাম এখন ইয়াকুব মেম্বারদের বাড়ি বললেই সবাই চিনে।  ইয়াকুবদের বাড়ি পার হয়ে আরো পশ্চিমে এলে পড়ে খালেক এবং সেকান্দরদের বাড়ি। সেকান্দরকে আমি মামু বলে ডাকতাম। এই সেকান্দর মামু এমন একজন মানুষ ছিলেন যে, সবার সাথেই তিনি মিশতে পারতেন। বেশ গরীব হলেও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না। প্রতিদিন আমরা স্কুলের মাঠে খেলতে গেলে, তাঁকে সেখানে পাওয়া যেতো। স্কুলের মাঠ ছিলো বড়দের তাশ খেলার আড্ডা আর ছোটদের বল খেলার প্রতিযোগিতা। সরগরম হয়ে উঠতো স্কুলের মাঠ। যারা খেলতেন না, তারাও কেউ কেউ হুক্কা বিড়ি নিয়ে মাঠের চারিদিকে খেলা দেখতো যেনো প্রতিদিনই ম্যারাডোনার আর মেসির খেলা হচ্ছে। এই ফুটবল খেলায় আমি আর মুসা একটা ট্রিক্স সবসময় করতাম যাতে আমি আর মুসা সব সময় একই টিমে থাকি। সেটা পরে বলি। যেই না মাগরেবের আজান পড়লো, সবাই যার যার বাড়িতে যাওয়া। অদ্ভুত একটা সময় পার হয়েছে তখন।

সেকান্দর মামুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো আরজুদের বাড়ি। আরজুদের পেশা ছিলো মাছ বিক্রি করা। আরজুরা আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। আমাদের গ্রামের বেশীরভাগ মানুষেরই পেশা ছিলো মাছ ধরা আর মাছ বিক্রি করা। কিন্তু কোনোভাবেই এটা জেলেপাড়ার মতো না। আরজুদের বাড়ির উঠোন ছিলো অনেক বড় আর এই উঠোনের চারিদিকে ছিলো ওদের অন্যান্য পারিবারিক বাড়িঘর। আরজু মাঝে মাঝে এমন করে মদ খেতো যে, বাড়ির বড়রা ওকে অনেক মারলেও আরজু বেহুশ অবস্থায় উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজতো। সবাই ভাবতো মদ খেয়ে বেহুস হলে উঠোনে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় মনে হয়। আরজু তখনো বিয়ে করে নাই। আরজুদের বাড়িকে পাশ কাটিয়ে দক্ষিন দিকে একটু এগুলেই নতুন একটা বাড়ি উঠেছিলো। ওরা আমাদের গ্রামের বাইরে থেকে মাইগ্রেট করে সবেমাত্র এই গ্রামে এসেছে। সে পেশায় ছিলো গ্রাম্য ডাক্তার, নাম নুরু ডাক্তার। বর্তমানে সেই নুরু ডাক্তারের বাসা রাজেন্দ্রপুর এবং তার এক ছেলে শাহীন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে রাজনীতি করে। যাই হোক, আরজুদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো ফুল্মতি আপারদের বাড়ি। ফুল্মতি আপা আমার খালাতো বোন। তাদের বাড়িটা ফজলুদের বাড়ি নামে পরিচিত ছিলো। ফজলুরা তিন ভাই ছিলো। এখন তারা আর কেউ বেচে নাই। তাদেরও পেশা ছিলো মাছ বিক্রি তবে কৃষি কাজও করতো ওরা। ফুলমতি আপার জামাই এর একটা নেশা ছিলো। মাঝে মাঝেই অন্য মাইয়া লোক নিয়া মসকরা করতো। খারাপ জায়গায়ও মনে হয় যেতো। সবাই ওকে একটু অন্য নজরেই দেখতো বলে আমার ধারনা। ফজলু ভাইদের বাড়ির পশ্চিমে বেশ কিছুটা জায়গা খালি ছিলো। হেটে হেটে এলে প্রথমেই পড়তো জামাল, শাখাওয়াতদের বাড়ি। জামালকে আমি খুব বেশী দেখি নাই। জামাল ১৯৭২ সালের পরে আমাদের গ্রামে আর দেখা যায় নাই। জামাল ছিলো আসল মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে জামাল যুদ্ধে গিয়েছিলো। সম্মুখ সমরে সে অংশ নিয়েছিলো। দেখতে খুব সুন্দর ছিলো জামাল। আর স্বাস্থ্য ছিলো একদম সঠিক যুবকের মতো। অনেকে বলে যে, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছে অথবা জামাল ইচ্ছে করেই আর এই গ্রামে ফিরতে চায় নাই। আমার ধারনা, জামালকে কেউ মেরে ফেলেছিলো কারন ১৯৭২ সালে তাঁকে এক পরদেশী মেয়ের সাথে একবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গিয়েছিলো। জামালের ভাই শাখাওয়াত, করিম (ডাক নাম বাছন), রুপচান এরা গ্রামেই থাকতো। বর্তমানে রুপচান বিদেশ থাকে, শাখাওয়াত মারা গেছে। করিম (বাছন)ও মারা গেছে। করিমকে সবাই বাছন বলেই ডাকতো। তিনি আমাদের থেকে অনেক বয়সে বড় ছিলো। বাছনকে আমি কাকা বলে ডাকতাম। আমি যখন আর্মিতে চাকুরী করি কমিশনড অফিসার হিসাবে, হটাত একদিন দেখলাম বাছন কাকা সোনালি ব্যাংক ক্যান্টনমেন্ট কর্পোরেট ব্রাঞ্চে সিকিউরিটির কাজ করেন। আমাকে দেখে উনি খুব খুশী হয়েছিলো যে, তারই এক পরিচিত মানুষ আর্মিতে অফিসার এবং সেই সেনানীবাসেই তার চাকুরী। খুবই সমীহ করতেন আমাকে। আমিও কাকা বলতাম, উনিও আমাকে কাকা বলতেন।

এই জামালদের বাড়ির উত্তর দিকে জরাজীর্ন একটা বাড়ি ছিলো জামালদেরই এক আত্তীয়ের, নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না এই মুহুর্তে। সম্ভবত শাখাওয়াতদের বাড়ি ছিলো ওটা। খুব গরীব ছিলো শাখাওয়াতরা। জামালদের বাড়ি আর ঐ শাখাওয়াতদের বাড়ির মাঝখান দিয়েই গ্রামের হেটে চলা রাস্তাটা পশ্চিম দিকে চলে গেছে। জামালদের বাড়ির পশ্চিমেই ছিলো রফিক মাষ্টারদের বাড়ি। রফিক মাষ্টারকে আমি ভাইও বলতাম আবার স্যারও বলতাম। কারন তিনি আমার বড় ভাইয়ের সমসাময়ীক আবার আমার প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একটু তোতলা ছিলেন কিন্তু খুব ভালো মানূশ ছিলেন। তার একটা ছেলে ছিলো নাম, কাজল, আর একটা মেয়ে ছিলো। রিফিক ভাইয়ের স্ত্রী খুব মিষ্টি চেহাড়ার ছিলেন। বর্তমানে কাজল একটা দূর্ঘটনায় পড়ে প্রায় প্যারালাইসিস। হামদর্দে চাকুরী করতো। রফিক ভাই চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। অনেক বয়ষ্ক মানুষ, আমার অফিসে প্রায়ই আসেন এবং গল্প হয়, ভালো লাগে। রফিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো আরদশ আলীদের বাড়ি। ওরা চার ভাই এবং কোনো বোন নাই ওদের। রফিক ভাইদের বাড়ি থেকে শুরু হয় “বড় বাড়ি”। এই আরদশ আলীর অন্যান্য ভাইয়েরা হলো সার্থক আলী, মোনজর আলী, সুন্দর আলী আর একজন, নামটা মনে পড়ছে না। এই বাড়ির সব বউরা প্রায় আসর নামাজের পর ধান বারা বানতো। ওরা বেশ সচ্ছল ছিলো। এদের বাড়ির দুই ধার দিয়া উত্তর দিকে যাওয়া যেতো। রফিক ভাইদের বাড়ি আর আরদশ আলীদের বাড়ির মাঝে দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেত আবার আরদশ আলীদের বাড়ির পশ্চিম ধার দিয়েও উত্তর দিকে নামা যেতো। এই দুই ধারের যে কোনো রাস্তা দিয়েই উত্তর দিকে প্রায় ২০০ গজ হেটে গেলে দুটু বাড়ি পড়তো। একটা আমাদের বাড়ি আর তার সাথে আম্বর আলী কাকাদের বাড়ি। এই দুটু বাড়ি আসলে গ্রাম থেকে একটু আলাদা থাকায় সবাই “টেক্কা বাড়ি” বলে জানতো। আমাদের বাড়ি থেকে গ্রামের দিকে তাকাইলে গ্রামের পুব পাশ থেকে শুরু করে পশ্চিম পাশের বাড়ি পর্যন্ত সব দেখা যেতো। যাই হোক, এই আরদশ আলিদের বাড়ির উঠোন ছিলো বেশ বড়। আমরা ওখানে “কুতকুত” খেলতাম। আর উঠোনের ঠিক দক্ষিনে একটা দোকান ছিলো। এই দোকানে কেউ চা খেতে বসতো, ক্রেউ বিড়ি খাইতো, আর আমি মাঝে মাঝে শুধু মানুষদেরকে লক্ষ্য করার জন্য বসে থাকতাম কারন কোন মানুষ কি কারনে বসে থাকে, বসে বসে কি কথা বলে, কেনো বলে, কার বাড়িতে কি সমস্যা, কার সাথে কার ঝগড়া, কার সাথে কে কি মজা মারতাছে, কোথায় কার কি পরিকল্পনা সব জানা যেত। আমি বেশ ছোট ছিলাম বলে আমাকে একটা বোকা বা আহাম্মক মনে করে আমার সামনেই সবাই সব কথা বলতে পারতো। আমি মনে মনে এসব ভাবতাম আর মানুষ গুলিকে বুঝবার চেষ্টা করতাম। এটা আমার এক প্রকারের নেশাই ছিলো বলা যায়।  দোকানটার লাগোয়াই হলো পায়ে চলা গ্রামের বাড়ির ভিতর দিয়ে চলা পথ। রফিক ভাইদের বাড়ির দক্ষিনে গেলে পড়তো বাহারউদ্দিনদের বাড়ি। বাহার উদ্দিন আমার ক্লাসে পড়তো। ওর বাবারা তিন ভাই ছিলো। আক্কেল আলী, বাহারের বাবা আর আলমাস। আক্কেল আলীর পেশা ছিলো “চুরি” করা, আলমাসের পেশা ছিলো “চুরি”র সাথে মাছ ধরাও। শুধু বাহারের বাবাই ছিলো ভালো মানুষ। শুনেছি আক্কেল আলীর সব ছেলেরাই নাকি এখন চুরিই করে। তার মধ্যে হাতিম আলি একজন। আলমাস, আক্কেল আলী এবং বাহারের বাবা কেউ এখন আর বেচে নাই। ওরা রফিক ভাইয়ের চাচাতো ভাই।

আরদস আলীদের বাড়ির পশ্চিম লাগোয়া যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ির দিকে সেই রাস্তার সাথে লাগোয়া ছিলো অরিজিনাল “বড় বাড়ি”। অর্থাৎ গনি মাদবরের বাড়ি। বেশ বড় পরিবার। গনি মাদবরেরাই আসলে গ্রামকে নিয়ন্ত্রন করতো। জমিদার স্টাইলে। গনি মাদবরেরা মোট চার ভাই ছিলো। গনি মাদবর, সিদ্দিকের বাবা (নামটা মনে নাই) হাকিমের বাবা (নামটা মনে নাই), সাত্তারের বাবা (নামটা মনে নাই), ল্যাংরা রফিকের বাবা আর কাদেরের বাবা আজিজ খালু। আজিজ খালু মসজিদে মাঝে মাঝে ইমামতি করতেন। কিন্তু তার ঘরেই সব ছিলো জালিমের মতো সন্তান। কাদের, ইনসান, কুতুব, আরো একজন (নাম মনে নাই) এরা ছিলো আজিজ খালুর পোলা। এই বড় বাড়িটা ছিলো জোয়ান ছেলে দিয়ে ভর্তি। এদের মধ্যে যিনি কাদের নামে পরিচিত ছিলো, সে ছিলো বেশ শ্যামলা কিন্তু ভীষন সুইট চেহারার লোক। সরাসরি ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ছিলো। আমি সাধীনতার পরেও দেখেছি তাঁকে হাতে অস্র নিয়ে ঘুরতে। খুবই সাহসী ছেলে ছিলো। এই কাদের ভাই, সামসু ভাই, রফিক (ল্যাংরা রফিক), মাষ্টার রফিক, এরা সবাই সমসাময়িক ছিলো। সাধীনতার ঠিক পর পরই কাদের ভাই একটা ডাকাতী দল গঠন করে ফেলেছিলো। ওরা প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় অস্র দিয়ে ডাকাতি করা শুরু করেছিলো। ওদের ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারতো না। আমার ভাই হাবীবুল্লাহ সব সময়ই ওদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতো এবং তিনি কখনো এসব কাজকে সাপোর্ট করতেন না। তখন দেশে একটা দূর্ভিক্ষ চলছিলো কিন্তু বড় বাড়ির কখনো দূর্ভিক্ষে সাফার করতে হয় নাই বরং ওদের কাছে সব কিছুই থাকতো সারপ্লাস। এই আজিজ খালু আবার বিয়ে করেছিলো গ্রামের পুর্ব প্রান্তে বসবাসকারী দৌলত মেম্বারের বোন। দৌলত মেম্বারের সাথে এই “বড় বাড়ির” সম্পর্ক সব সময়ই ছিলো সাপে নেউলের মতো। একটা শক্তি আরেকটা শক্তিকে কখনোই মূল্যায়ন করতো না বরং যখনই সুযোগ পায় তখনই এক পরিবার অন্য পরিবারকে আঘাত করার চেষ্টা করতো। এই রেষারেষির ফলে দৌলত মেম্বারের ইমিডিয়েট আপন ছোট ভাই অর্থাৎ মুসার বাবা আর মুসার ছোট ভাই মাসুদকে প্রান দিতে হয়েছিলো। মানে হত্যা। মুসার ভাই মাসুদ ছিলো আমার থেকে ২/৩ বছরের ছোট। একদিন কোনো এক বর্ষাকালে মাসুদকে কুকুরে কামড়ে দিয়েছিলো। ঐ সময় খুব নামকরা ডাক্তার ছিলো একজন হিন্দু লোক, যাকে সবাই “বগা” ডাক্তার নামে চিনতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে এই বগা ডাক্তারকে। প্রায়ই তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। কিন্তু উনি বাস করতেন বিবির বাজার এলাকায়। আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩/৪ কিলমিটার দূরে। তখন বিবির বাজার ছিলো এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। রবিবার আর বৃহস্পতিবার বসতো বাজার। মাসুদকে কুকুরে কামড়ানোর কারনে মাসুদের বাবা মাসুদকে নিয়ে বিবির বাজারের দিকে একটা ছোট কোষা নিয়ে যাচ্ছিলেন। ভরা বর্ষা। পথের মধ্যে হটাত করে বড় বাড়ির সামসু, কাদের আর ল্যাংরা রফিকের সাথে দেখা। ওরাও অন্য নৌকায় ছিলো। তখন সকাল প্রায় ১০ টা। প্রকাশ্য দিবালোক। এই প্রকাশ্য দিবালোকে হটাত করে নদীর মধ্যে সামুসু ভাই এর লিডারশীপে মাসুদের বাবাকে জবাই করা হয় আর মাসুদকে পানিতে আছাড় মারতে মারতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। গ্রামের মানুষ দ্রুত অন্য নৌকা দিয়ে ওদেরকে রক্ষা করতে গিয়েও আর পারে নাই। এর মধ্যেই এরা পালিয়ে যায়। এবার “বড় বাড়ি”র সাথে দৌলত মেম্বারদের বাড়িত শত্রুতাটা একেবারে প্রকাশ্য হয়ে তীব্র আকার ধারন করে। এর ফলশ্রুতিতে মামলা হয়, কেস হয়, বড়রা গ্রাম থেকে পালিয়ে দূরে বাস করতে শুরু করে, আরো অনেক প্রানহানী হয়, সেই সাথে কাদেরও খুন হয়। কাদেরের খুন এখনো একটা রহস্যজনক অবস্থায় আছে। কিভাবে কাদের খুন হলো সেটা পরে বল্বো। এই “বড় বাড়ী’তে তাদের নিজস্ব মসজিদ এবং নিজস্ব করবস্থান ছিলো যা এখন মসজিদটা আরো বড় হয়েছে বটে কিন্তু কবরস্থানটা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে প্রায় বিলীন। ঐ কবরস্থানেই শুয়ে আছেন আমার মা আর আমার খালা। এটা সিদ্দিকদের বাড়ির একেবারেই লাগোয়া আর আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০/৬০ গজ দূরে।

সিদ্দিক ভাইদের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশেই লাগোয়া ছিলো পিয়ার আলী নামে ওদের বাড়ি। লম্বা মানুষ, কোনোদিন শার্ট পরেছে কিনা আমার চোখে পড়ে না। মাছ বিক্রি করতো। গ্রামের মধ্যে যে কয়জন গরীব হালের মানুষ ছিলো, পিয়ার আলিরা তার মধ্যে অন্যতম। কোনো রকমে বেচে ছিলো। ঘরটাও খুব জরাজীর্ন ছিলো। কিন্তু মানুষ হিসাবে ছিলো অত্যান্ত ভালো। খুব সকালে দেখতাম পিয়ার আলী, মাথায় মাছের খাড়ি নিয়ে খালী গায়ে মাছ নিয়ে সদরঘাট বা শ্যামবাজারে যেতো। আমাদের গ্রামে আসলে যে কয়জন খুব সকালে দল বেধে মাছের খাড়ি নিয়ে হু হু করে খালী গায়ে ছুটতো শ্যমবাজারের দিকে তারা সবাই আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই যেতো। আম্বর আলী কাকা, পিয়ার আলী, আরজু, আরদস আলীর বড় ভাই, আরো অনেকে। ওরা ফিরে আসতো প্রায় দুপুরের দিকে। তারপর আর ওদের কোনো কাজ থাকতো না। ফলে এই দলটা মাঝে মাঝেই বাঙলা মদ খেতো।

এই পিয়ার আলীদের বাড়ির ঠিক পশ্চিমে ছিলো মংগল মাদবরের বাড়ি। খুব সুশ্রী একজন সুন্দর মানুষ। তার কোনো সন্তান ছিলো না। বড় বউ ছিলেন বাঞ্জা, তাই তিনি সন্তানের আশায় মংগল মাদবর আরেকবার বিয়ে করেন। দুটু বউই ছিলো অসধারান সুন্দুরী। দুই বউ ই পান খেতো। সুন্দুরী মেয়েরা পান খেলে আরো সুন্দর লাগে। গ্রামে যে কয়টা টিউব ওয়েল ছিলো গ্রামের মানুষের পানি নেয়ার জন্য, এই মংগল মাদবরের বাড়িতে ছিলো একটা। আমরা সবসময় এই বাড়ি থেকেই মাটির কলসীতে করে পানি আনতাম। বড় বউ তার সন্তান হবে না জানার পর একটি পালক ছেলে নিয়েছিলেন, যার নাম ছিলো শহীদ। শহীদ আমার ক্লাসেই পড়তো। মংগল মাদবর একবার মেম্বার পদে নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু তিনি পাশ করেন নাই। মংগল মাদবরের নির্বাচনী ক্যাম্পাসে আমরা শহিদ সহ স্লোগান দিতাম টিনের চোঙ্গায় করে। তখন শহীদ নিজেও বলতো- আমার ভাই তোমার ভাই, মংগল ভাই মংগল ভাই। আমরা শহীদকে বলতাম, ঐ মংগল মাদবর না তোর বাপ? ও বলতো, হ আমার বাপই তো। এতো বোকা একতা ছেলে ছিলো যে অনেক মায়া হয় এখন ওর জন্য। কার যে ছেলে ছিলো শহীদ আমরা জানতেই পারতাম না। যাইই হোক, মেম্বার পদে মংগল মাদবর পাশ করে নাই কিন্তু পাশ করেছিলো খুনের চরের লালচান ভাই যিনি পরে লালচান মেম্বার নামে পরিচিত ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। মংগল মাদবর নিজেও একজন সচেতন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক ধনী ছিলেন তিনি। ছোট বউ এর ঘরে পর পর চার জন মেয়ে হয়েছিলো, পরীর মতো সুন্দুরি মেয়েগুলি। তারমধ্যে নাজমা, সালমা অন্যতম। আজ ওরা কোথায় আমি জানি না। নাজমা আমার থেকে প্রায় ৩/৪ বছরের ছোট ছিলো। মংগল মাদবর আর বাহারের বাবা, রফিক মাষ্টার, আক্কেল আলী, আলমাস, বাছন, জামাল, এরা এক বংশের লোক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মংগল মাদবর ঐ সব লোকদের থেকে একটু দূরে বাড়ি বানিয়েছিলেন (প্রায় ২০/২৫টা বাড়ির পরে পশ্চিম দিকে)। ফলে বেশীরভাগ সময়ে তাদের বংশের সাথে মংগল মাদবরের অনেক কিছুই বনিবনা ছিলো না। শুনেছি, শহীদ মারা গিয়েছিলো হার্টের কারনে। সে বিয়ে করেছিলো কিনা আমার আজ মনে নাই। কারন আমি গ্রাম ছেড়েছিলাম সেই ১৯৭৭ সালে যখন আমি ক্যাডেটে ভর্তি হই। এর পরে অনেকের সাথেই আমার আর যোগাযোগ ছিলো না।

(চলবে)

০২/০৭/২০২১-বজলু আমার বাল্যবন্ধু

কম্পিউটার সার্ফ করছিলাম। হার্ড ডিস্ক ক্লিন করার সময় হটাত করে একটা অনেক পুরানো ছবির সন্ধান পেলাম। অনেকক্ষন তাকিয়ে ছিলাম ছবিটার দিকে। মনটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। একটা ছবি অনেক কথা বলে। একটা ছবি একটা সময়ের ইতিহাস বলে। একটা ছবি না বলা অনেক স্মৃতি মানষ্পটে জাগিয়ে তোলে। আজকের এই ছবিটাও তেমনি একটি ছবি।

আজ থেকে প্রায় ৪০/৪১ বছর আগের কথা আমি যখন গ্রামে ছিলাম সেদিনের কথাগুলি যেনো একে একে স্পষ্ট জেগে উঠতে থাকলো আমার স্মৃতির পাতায়। আমরা কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক ক্লিন করি, তারমধ্যে আবার নতুন কোনো তথ্য লোড করি, পুরানো তথ্যগুলি অনেক সময় আর খুজে পাওয়া যায় না। হয়তো বিশেষ কায়দায় কোনো ছায়া-মেমোরি থাকলেও থাকতে পারে যা থেকে হয়তো আবার সেই ডিলিটেড কোনো তথ্য বিশেষ কায়দায় ডিস্টর্টেড অবস্থায় কিছু পাওয়া গেলে যেতেও পারে কিন্তু আমাদের ব্রেনের মধ্যে সেই শিশুকাল থেকে যতো স্মৃতি এই মেঘা হার্ডডিস্কে লোড হয়েছে, সেটা কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে আবার জেগে উঠে অবিকল ঠিক সেই বিন্যাসে যা ক্রমান্নয়ে ঘটেছে বা ঘটেছিলো। এমনি একটা স্মৃতির পাতা আজ আমার মন আর ব্রেনের কোনে ঠিক জাগ্রত হয়ে জীবন্ত আমার দৃষ্টির মধ্যে চলে এলো- বজলু, আমার সেই ছোট বেলার অনেক প্রিয় একজন বন্ধু।

বজলু আমার খুব ভালো একজন বন্ধু ছিলো। আমাদের গ্রামের প্রায় শেষ পশ্চিম প্রান্তে ওদের বাড়ি। একই ক্লাসে পড়তাম, এক সাথে মাঠে খেলাধুলা করতাম। ওরা তিন ভাই ছিলো, বজলুই ছিলো সবার বড়। ওর বাবা ছিলো ধনী কৃষক। ওদের সামাজিক অবস্থা গ্রামের অন্যান্যদের থেকে বেশ ভালো। বজলুর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো যে, ও খুবই তোতলা ছিলো কিন্তু আমার কাছে এটা কোনো ব্যাপার ছিলো না। মজার ব্যাপার হলো, বজলু আমার সাথে যখন থাকতো, আর কথা বলতো, সে প্রায় তোতলামী করতোই না। কিন্তু যেই না অন্য কারো সাথে কথা বলতো, তার তোতলামীটা বেড়ে যেত। আমার সাথে বজলু স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতো। ও খুব ভালো গান গাইতো। লেখাপড়ার প্রতি টান থাকলেও কেনো জানি বেশী দূর এগুতে পারে নাই। এমন না যে টাকা পয়সা টানাটানির কারনে বা অভাবের সংসারে ওকে হাল ধরতে হয়েছিলো যার কারনে লেখাপড়া করতে পারে নাই। আমাদের গ্রামের মানুষগুলির বড় সমস্যা হচ্ছে-তারা সন্তানদের স্কুলে পাঠায়, কিন্তু খবর নেয় না তারা স্কুলে কি পড়ছে, কেমন করছে, কিংবা সন্তানদের কোনো গাইড লাইন দেয়ার দরকার আছে কিনা।

আমার মনে আছে যে, আমি আর বজলু ওদের বাসায় একসাথে পড়াশুনা করতাম। ওর মা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অনেক সময় দুপুরে খাওয়া দাওয়াও করাতেন। আসলে পৃথিবীর সব মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য সব কিছু করতে পারে। তারা সব সন্তানদেরকে একই রকম করে ভাবেন। আমি বজলুকে অংক শিখাতাম কারন বজলু অংকে আর ইংরেজীতে কাচা ছিলো। ১৯৭৭ সালে আমি ক্লাস সেভেন থেকেই গ্রাম ছাড়ি। তার কারন আমি ক্যাডেট কলেজে চান্স পেয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে বজলুর সাথে আর আমার স্কুলে পড়া হয় নাই। ক্যাডেট কলেজে বাধাধরা নিয়ম, মাঝে মাঝে ছুটি পাই, তখন বেশীরভাগ সময় আমি গ্রামেই কাটাতাম। বজলু তখনো স্কুলেই পড়ে। ছুটিতে আমার কোনো কাজ থাকতো না, কিন্তু বজলুর থাকতো। ক্ষেতে কাজ করতো, গরুগুলিকে নদীতে নিয়ে গোসল করাতে হতো। ওর বাবাকে সাহাজ্য করতে হতো, ক্ষেতে আলু কিংবা অন্যান্য শশ্য লাগাতে হতো। আমিও ওদের সাথে ওইখানে বসেই আড্ডা দিতাম। কারন গ্রামে আমার বন্ধুর সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিলো।

রাতেও আমি ওদের বাসায় অনেকদিন আড্ডা দিতাম। তোতলা হলেও গান গাওয়ার সময় বজলু কখনো তোতলামী করতো না। প্রচন্ড মায়া ছিলো ওর অন্তরে সবার জন্য। কারো সাথে ঝগড়া করেছে এমনটা দেখি নাই। পড়াশুনার চাপে আর ক্যাডেটে থাকার কারনে ধীরে ধীরে আমার এসব বন্ধুদের থেকে যোগাযোগটা আমার কমে গিয়েছিলো। প্রায় বছর তিনেক পরে আমি যখন একবার ঢাকা থেকে নারায়নগঞ্জ যাবো বলে গুলিস্তান থেকে একটা বাসে উঠেছি, হটাত কে যেনো আমার নাম ধরে ডাক দিলো। ড্রাইভার সিটে বসা একজন লোক। তাকিয়ে দেখি-বজলু। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম বজলুকে দেখে। বল্লাম-কিরে তুই ড্রাইভারি করিস নাকি?  বজলু আমার হাত টেনে ধরে বল্লো, আমার পাশে বস। নারায়নগঞ্জ যাবি? বল্লাম-হ্যা। খুব ভালোই হলো। তোর সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। আমার জীবনে এইই প্রথম আমার কোনো খুব কাছের মানুষ ড্রাইভার। খুব আপন মনে হচ্ছিলো। বজলু বলতে থাকলো-

তোরা সব চলে যাবার পর আমার আর পড়াশুনা হয় নাই। গ্রামে আসলে পড়াশুনার পরিবেশও নাই। বাড়ি থেকে বারবার চাপ আসছিলো কিছু একটা করার। গ্রামের বেশীরভাগ ছেলেরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছিলো। আমিও সেই লাইনেই ছিলাম। বিদেশ চলে যাবো। তাই ড্রাইভারি শিখতে হলো। লাইসেন্স পেয়েছি। ঘরে বসে না থেকে হাত পাকা করছি আবার কিছু পয়সাও কামাচ্ছি। পড়াশুনা তো আর হলোই না।

সম্ভবত সেটাই ছিলো বজলুর সাথে আমার সর্বশেষ একান্তে কথা বলা। পরে শুনেছি বজলু জাপান চলে গেছে। সেখানে অনেক বছর চাকুরী করে আবার গ্রামে এসেছিলো। আমাদের গ্রামে আমাদের সাথে পড়তো সুফিয়া নামে একটি মেয়ে ছিলো। ওর বোন সাহিদাকেই বজলু বিয়ে করেছে। তিনটা মেয়ে আছে ওর। আমার সাথে ওদের কারো কোনো যোগাযোগ ছিলো না। মাঝে মাঝে গ্রামে যেতাম ঠিকই কিন্তু ওরা দেশে না থাকায় কারো সাথেই আমার যোগাযোগ হতো না। মা যতোদিন বেচে ছিলেন, গ্রামে যাওয়া হতো কিন্তু মা ইন্তেকাল করার পর গ্রামে যাওয়াটা আমার প্রায় শুন্যের কোটায় পরিনত হয়।

২০১৮ সালে হটাত একদিন আমার ফোনে একটা ফোন এলো। আমি অপরিচিত নাম্বার সাধারনত ধরি না। কিন্তু কি কারনে হটাত করে আমি সেই ফোনটা ধরেছিলাম। অন্য প্রান্ত থেকে দেখি বজলুর কন্ঠ।

কিরে দোস্ত, কেমন আছিস? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-বজলু?

খুব ভালো লাগলো ওর কন্ঠ শুনে এতো বছর পর। বজলু বল্লো, সে দেশে এসেছে। বেশ কয়েকদিন থাকবে। তারপরেও বছর খানেক তো থাকবেই। বজলু ওর পরিবারের অনেক খবর দিলো। ওর স্ত্রী সাহিদা আমাদের প্রাইমারী স্কুলে মাষ্টারী করে। তিনটা মেয়ে, সম্ভবত মেয়েদের বিয়ের আয়োজন করছে। ওর শরীরটা নাকি ইদানিং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। অনেক কথা মনে পড়লো-

সেই প্রায় ৪০/৪১ বছর আগে এক সাথে মাঠে খেলা করতাম, এক সাথে নদীতে গোসল করতাম, বাজারে যেতাম, মাছ ধরতাম। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চলে যেতাম, রাত হলে কখনো স্কুলের মাঠেই জ্যোৎস্না রাতে আমরা অনেকে মিলে গান গাইতাম, বজলুই ছিলো প্রধান ভোকালিষ্ট। ওর একটা জাপানিজ গিটার ছিলো, একটা সিন্থেসাইজার ছিলো, জাপান থেকে এনেছিলো। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, আমিই ওদের বাড়িতে থেকে যেতাম ঘুমানোর জন্য। একটা ভীষন মিষ্টি সময় কেটেছে।

বজলু বল্লো- আমি আগামি কয়েকদিন পর তোর অফিসে আসবো। চুটিয়ে গল্প করবো। তোর সাথে খাবো। সারাদিন থাকবো আমি তোর অফিসে। এনামুল, ওয়ালী, মুসা সবাইকে নিয়ে আসবো। সেদিন আমরা সবাই তোর অফিসেই খাবো। খুব ভালো লাগলো ওর কথায়। আমি এখন বড় একটা ব্যবসায়ী, ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, আমার কোনো তাড়া নাই, কোনো চাপ নাই। ভালই হবে ওরা এলে। কিন্তু বজলু কোনো তারিখ দেয় নাই কবে আসবে।

বজলুর সাথে কথা বলার পর আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, বজলু আমার অফিসে আসবে কিন্তু কবে কিংবা কখন সেটা আমার মাথাতেই ছিলো না। মনে হয়েছিলো, আসবেই তো। আমি তো অফিসে প্রতিদিনই আসি। আর আমার গ্রাম কিংবা ওরা যেখানে থাকে সেখান থেকে আমার অফিসে আসতে লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। ওরা যে কোনো সময় নিজের সময়ে এলেই আমাকে পাবে।

এমনি এক অবস্থায় আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আমাকে কথায় কথায় ফোনে জানালো যে, বজলু নাকি অসুস্থ্য। হাসপাতালে ভর্তি। ছোট খাটো ব্যাপার মনে করতে আমিও আর ওকে দেখতে যাইনি। ভেবেছিলাম, কয়দিন পর তো দেখাই হবে। তখন জেনে নেবো ওর কি হয়েছিলো। কিন্তু তার ৩/৪ দিন পর আমার কাছে এমন একটা ব্রেকিং এবং হার্ট টাচিং নিউজ এলো যা আমি কল্পনাও করতে পারি নাই। বজলু নাকি মারা গেছে।

এই সংবাদটা আমাকে এতোটাই মর্মাহত করেছিলো যে, কেউ যেনো আমার দরজার একদম কাছে এসেও আমার সাথে দেখা করতে পারলো না। অথবা এমন একটা পীড়া যা আমাকে এমনভাবে নাড়া দিলো যা কিনা আমার নজরেই ছিলো না। বজলুকে আমি যেমন ভালোবাসতাম, তেমনি বজলু সর্বদা আমাকে মনে রাখতো। বন্ধুরা কেনো জানি ধিরে ধীরে সব হারিয়ে যাচ্ছে।

২৮/৬/২০২১-সফুরা খালা

 

এই মানুষগুলি একসময় আর কারো সামনেই থাকবে না। এদের জীবনেও প্রেম এসেছিলো, এরাও কারো না কারো চোখে রানীর মতো ছিলো। বাল্যকালে সাথী সংগীদের নিয়ে এরাও নদীর ঘাটে গিয়ে জিলকেলী করতে করতে সারাটা পরিবেশ মুখরীত করে রাখতো। নীল আকাশের মধ্যে জ্যোৎস্না রাতের তারার মতো তারাও রাত জেগে হয়তো কোনো এক প্রেমিক বরের অপেক্ষায় মনের ভিতর সুখের আস্বাদন করেছেন। এরা বড় বড় সংসারের হাল ধরেছেন, সমাজে এরাও অনেক অবদান রেখেছে। এদের গর্ভে জন্ম নেয়া অনেক সুপুত্র কিংবা সুন্দুরী কন্যারা হয়তো আজো দেশে বিদেশে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু আজ তারা এতো চুপচাপ জীবন যাপন করছেন যেখানে তিনি নিজে ছাড়া আর কেউ পাশে নাই। না তার রাজা আছে, না তিনি এখন রানী আছেন। সময় মানুষকে কত পরিবর্তন করে দেয়। এই সময়ের কাছে আজো কেউ স্বাধীনতা পায় নাই, না পেয়েছে কোনো ক্ষমতা সময়কে পরিবর্তন করার। আদি যুগ থেকে যতো মানুষ এই দুনিয়ায় এসেছে, সবাই কোনো না কোনো সময় নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এই পৃথিবীকে ত্যাগ করতে হয়েছে। আমরা যারা পিছনে পড়ে থাকি, তারা শুধু একটা মোহ, একটা স্মৃতি আর একটা কি যেনো নিয়ে শুধু অলীক ভাবনার জগতে অপেক্ষায় থাকি। একদিন আমিও এর থেকে পরিত্রান পাবো না। শুধু সময়টা পালটে যাবে এই রানীদের মতো। 

কিন্তু আমার মনের ভিতরে এই সব রানীরা আজীবন রানীদের কিংবা রাজাদের মাতাই হয়ে থাকবেন। আমি এদেরই বংশের একটি ধারা। আরো বেচে থাকো তোমরা অনেক কাল খালা। 

 

জীবন যেখানে যেমন। যে শিশুটি আজ জন্ম নিলো কেউ জানে না তার জন্য এই পৃথিবী কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিংবা এই পৃথিবীকে সে কি দিয়ে যাবে। হতে পারে আজকে এই শিশুটি হয়তো এই পৃথিবীকে কোনো এক সময় নাড়িয়েও দিতে পারে বা এই পৃথিবী তাকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু এমন অনেক শিশুই এই পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয়,  না তারা কোনো ভূমিকা রাখে, না পৃথিবী তাদেরকে মনে রাখে। এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। যুগে যুগে তারপরেও অনেক শিশু প্রকাশ্যে বা গোপনে পৃথিবীতে আসে যারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় আর একদিন সব কিছু ফেলে সবার থেকে আলাদা হয়ে আবার কোথাও অদৃশ্য হয়ে যায়। মাঝখানের এই সময়টায় খুব গুটিকতক মানুষ হয়তো নিজের মতো করে কাউকে কাউকে মনে রাখে কিন্তু তাও একসময় মনের স্মৃতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। আমার সফুরা খালা, সামিদা খালা কিংবা আমার শায়েস্তা বুজি, বা সাফিয়া বুজিরা সম্ভবত এই রকমের কিছু মানুষ যারা সেই বহু বছর আগে শিশু হয়ে জন্ম নিলেও কোনো লাভ হয় নি কারো। তারা আজীবন যেনো এই দুনিয়ার বুকে একটা বোঝা হয়েই ছিলো। অথচ তারা হাজারো মানুষের থেকে অনেক ভালো মানুষ ছিলেন।

প্রায় দু বছর আগে আমি আমার পরিবার নিয়ে আমাদের গ্রাম থেকে বেশ দূরে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। বেশীক্ষন দেরী করি নাই কারন পরিবেশটা ঐ রকমের ছিলো না। কোনো রকমে আনুষ্টানিকতা শেষ করে ভাবলাম, যেহেতু গ্রামের পথেই আছি, যাই আমাদের গ্রামের বাড়িটা ঘুরেই যাই। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো, আলো বেশ কমে গিয়েছিলো। অনেকেই আমাকে চিনে না যদিও আমি এই গ্রামেরই একজন পুরানো বাসিন্দা। কিন্তু সময়ের সাথে আমার অনুপস্থিতি আমাকে আজ এই গ্রামে একজন নবাগত অতিথির মতোই মনে হচ্ছিলো। যারা আমার সমবয়সী ছিলো, তারাও অনেক বুড়ো হয়ে গেছে, অনেকেই চিনতেও ভুল করছিলো, আমি তো ওদের কাউকেই এখন চিনি না। ওদের চেহারা সুরুতে এমন বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে যে, জোয়ানকালে আমি যাদেরকে দেখেছি, তারা এখন দাদা নানার পর্যায়ে। না চেনারই কথা। তারপরেও কাউকে কাউকে আমি চিনতে পারছিলাম। গ্রামের বাড়িটা খা খা করছে, কেউ থাকে না এখানে। আগে মা থাকতেন, এখন থাকে আমার এক ভাগ্নে যে সারাদিন গাজা খায়।

ভাবলাম, আমার এক খালা ছিলো। নাম সফুরা বেগম। উনি কি জীবিত আছেন নাকি আর জীবিত নাই সেই খবরটাও আমার জানা নাই। তাঁকে খুব দেখতে মন চাইলো। মিটুলকে বললাম, চলো একটা বাড়িতে যাই। যদি উনি বেচে থাকেন, তাহলে মায়ের অভাবটা কিছুটা হয়তো পুরন হবে। আর যদি জীবিত না থাকেন, অন্তত জানতে পারবো, কবে থেকে আর তিনি এই পৃথিবীতে নাই। আলুকান্দা তার বাড়ি। অনেক খোজাখুজির পর শেষ অবধি সফুরা খালার বাসায় যেতে পারলাম। তিনি অসুস্থ্য। জর। একটা কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। চার পাঁচ দিন নাকি তিনি কিছুই খাচ্ছেন না। অনেক বয়স হয়ে গেছে। আমার মা যখন বেচে ছিলেন, তখন আমার এই খালা প্রায়ই আমার মায়ের সাথে দেখা করতেন, গল্প করতেন। আমাকে খুব আদরও করতেন। আসলে আমার মা, আমার সামিদা খালা আর এই সফুরা খালা এতোটাই ভালো আর নীরিহ মানুষ ছিলেন যে, তাদের ব্যাপারে আজ অবধি কেউ কোনো অভিযোগ করেছে সে ঘটনা ঘটে নাই। খালাকে ডাকা হলো। উনি ভালো মতো চোখে দেখেন না। এম্নিতেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো, তারমধ্যে আবার আকাশ ছিলো খুব মেঘাচ্ছন্ন। বিদ্যুৎ ছিলো না। কোন রকমে খালাদের বাসায় যাওয়ার পর, আমি খালার বিছানায় গিয়ে বসলাম। খালাকে তার পুত্রবধুরা ডেকে তোলার চেষ্টা করলেন। আমাই যাওয়াতে সবাই অনেক খুশী হয়েছে। কি থেকে কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না।

খালাকে যখন আমি বললাম, আমি মেজর আখতার এসছি। খালা এম্নিতেই কানে কম শুনে মনে হয়, তার মধ্যে আমার নাম শুনে যেনো একটা অদ্ভুত মিথ্যা কথা শুনলেন এমন হলো। বল্লো-

কে? হামিদার ছেলে?

বললাম, হ্যা খালা।

উনার জর ছিলো প্রায় ১০৩ ডিগ্রী। আমার কথা শুনে তিনি বিছানা থেকে উঠে বসলেন। খালা প্রায় গত চার পাঁচ দিন বিছানায় উঠে বসতে পারেন না। কিন্তু আজ যেনো কোন অলৌকিক শক্তিতে তিনি একাই বিছানায় উঠে বসে পড়লেন। আমি খালাকে জড়িয়ে ধরলাম, খালাও আমাকে এমন করে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলেন যেনো এইমাত্র বাইরের মেঘাচ্ছন্ন আকাশটা ঘনকালো ঝপ ঝপ বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিলো সারাটা উঠান।

কতটা আদর? কিভাবে আদর করলে ভালোবাসা হয় মায়েদের? আমার সেটা জানা ছিলো। আমার মাও ঠিক এভাবেই আমাকে আদর করতেন।  আমার মুখে দুই হাত দিয়ে একদম চোখের কাছে আমার মুখটা নিয়ে পানভর্তি মুখে ভিজা ভিজা চোখে ফিক করে হেসে দিয়ে বলতেন, অনেক বড় হ বাবা। আমার দোয়া আর দোয়া রইলো। সফুরা খালার ভাষাও এক। কি অদ্ভুদ। আমি তাঁকে কতোক্ষন জড়িয়ে ধরেছিলাম, আমার জানা নাই। সারাটা শরীর হাড্ডি, মাংশ বলতে কিছুই নাই। গরীব ছেলেপেলেরা যতোটা পারে তাদের মায়ের যত্ন নেয় বটে কিন্তু অন্তরের ভালোবাসায় হয়তো অনেক ঘাটতি আছে। তারপরেও তিনি বেচে আছেন যেটুক পান সেটা নিয়েই।

আমার মায়ের বাবার নাম ছিলো কেরামত আলী। আমার মায়ের কোনো ভাই ছিলো না। মাত্র দুইবোন- হামিদা খাতুন আমার মা আর সামিদা খাতুন আমার আপন খালা। কিন্তু সফুরা খালার বাবার নাম ছিলো চেরাগ আলি। তারও কোনো ভাই অথবা কোনো বোন ছিলো না। তিনি একাই একমাত্র কন্যা সন্তান ছিলেন চেরাগ আলীর। এই চেরাগ আলি এবং কেরামত আলি (মানে আমার নানারা) ছিলেন চার ভাই। অন্যান্য আর দুই ভাই ছিলেন সাবেদ আলি এবং লষ্কর আলী। উম্মেদ আলী ছিলেন এই চার ভাইয়ের বাবা। অর্থাৎ আমার মা খালাদের নানা।

আজ তারা কেহই বেচে নাই। শুধুমাত্র আমার সফুরা খালাই বেচে আছেন কালের সাক্ষী হয়ে। খুব ভালোবাসি আমি তোমাদের।

২১/০৬/২০২১- মৃত্যু

মৃত্যুকে মানুষ আধারের সাথে তুলনা করে থাকে। কিন্তু এই আধার কোনো কালো রাত কিংবা অমাবশ্যার নিশি বা দিনের আলোর অভাবে নয়। যা চোখে দেখা যায় না, যার ব্যাপারে আমাদের মন এবং মস্তিষ্ক কোনো ধারনা করতে পারে না, আমাদের কাছে সেটাই একটা আধারের মতো। এই আধার কিন্তু অন্ধকার নয়, এটা এমন একটা আধার যার কোনো রং নাই, যার কোনো বর্ননা আজো কেউ দিতে পারে নাই। মানুষের হাজারো শখ থাকে। বেচে থাকার শখ, সম্পদশালী হবার শখ, অনেক ক্ষমতাধর হবার শখ, কিন্তু আজো পর্যন্ত কেউ এটা শখ করে নাই যে, সে মরতে চায়। যারা আত্তহত্যা করে, তারা ইমোশনাল, তারা শখের বশে মরনকে বরন করে না। মৃত্যু কোনো ইচ্ছে নয় যে, পুরন হবে কি হবে না, মৃত্যু তো একটা সত্য, একটা লক্ষ্য যেখানে সবাইকে যে কোনো মুল্যেই পৌছাতে হবে। আর ওখানকার সমন, গাড়ি অথবা বাহক কখন আসবে, সেটা তো কেহই বলতে পারে না। এই মৃত্যু অনেক সম্পর্ক ছেদ করে আবার এই মৃত্যুই অনেক নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। কখনো কখনো মৃত্যুটাই যেনো অনেক সমস্যার সমাধান নিয়ে আসে। যদিও যার বেলায় ঘটে সে সমস্যা ছিলো না।

মৃত্যুর কারনে এমনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যেখানে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয় অথবা মেনে নিতে শিখতে হয়। হোক সেটা ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। এটা আরো বেশী করে দুশ্চিন্তায় ভোগায় যখন এটা জানা যায় যে, যে মানুষটি চলে গেছে সে সব দিক থেকে অশান্তিতেই ছিলো।

কিন্তু কোনো মানুষ যখন কাউকে না বলে চিরতরে আমাদের জীবন থেকে চোখের সামনে মৃত্যুর থাবায় হারিয়ে যায়, আর আমরা তাকে চোখের জলে ভিজিয়ে বিদায় জ্ঞাপন করি, তখন হয়তো তার দ্বারা কোনো ভুল পদক্ষেপের দুশ্চিন্তা আমাদের গ্রাস করে না, কিন্তু তার চলে যাওয়ায় যারা বেচে থাকেন তাদের জীবনে আমুল পরিবর্তন নেমে আসে বলে মাঝে মাঝে মনে হয় রাস্তাটা অন্ধকার, জীবনটা ভয়ংকর এবং আমরা সর্বত্রই একা। তখন একটা দিনও যেনো আমাদের ঠিকঠাক কাটতে চায় না। এমন কি একটা রাতও না। এই সময়ে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। অন্যদিকে দিনের আলোতে এই পার্থিব জগতে বসে মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে কোনো ধারনাই করা সম্ভব হয় না আমাদের অথচ মৃত ব্যক্তির যাত্রার শুরু থেকে শেষ অবধি রাস্তাটা তার কাছে হয়তো আমাদের থেকেও ভয়ংকর আর বিভীষিকাময়আরো অন্ধকার। এটা যেনো তার কাছে ঠিক একটা অন্ধকার টানেল, যেখানে মাঝে মাঝে আলো আসে হয়তো কিন্তু সে আলোয় কোনো কাজ হয় কিনা জানা যায় নাই।

এমন অনেক মিথ্যে মৃত্যু আসে কারো কারো জীবনে যেখানে তারা এই পার্থিব জীবনের সাথে সাময়িক সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আরেক কোনো এক অচেনা জগতে বিচরন করতে থাকে। তখন তার আশেপাশে কি হচ্ছে, কারা কি করছে, কিছুই আর তার কাছে পৌছায় না অথচ তার দেহ, তার শরীর পুরুটাই রয়েছে এই পার্থিব জগতে। এই প্রকারের মৃত্যু থেকে ফিরে আসাকে হয়তো বলা যায় কোনো মতে বাচা, হয়তো বা বলা যেতে পারে জীবনের কাছে নিশ্চিত মৃত্যুর পরাজয়, অথবা বলা যেতে পারে যে, জীবনের বেচে থাকার সময়টা এখনো শেষ হয় নাই। যখন এমনটা হয় তখন আমরা কি বলতে পারি যে, সাক্ষাত ম্রতুকে আমরা দেখতে পেয়েছি? এমন অনেক প্রশ্ন থাকতেই পারে কিন্তু আসল মৃত্যু আর মিথ্যা মৃত্যুর মধ্যে নিশ্চয় এমন কোনো ব্যতিক্রম আছে যা প্রকারান্তে একটা মায়াজালের কিংবা মেঘলা আকাশের পিছনে আবছা নীল আকাসের মতো। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারে, যদি অন্তরের দৃষ্টি খুলে যায় তখন জীবিত অবস্থায় মৃত্যুকে দেখা যায়। এটা অনেক বড় স্তরের একটা ধ্যান কিংবা আরাধনা। যারা এটাকে লালন করতে পারেন, তারা স্বাভাবিক মানুষ নন। জীবনটা কিভাবে বাচবে সেটা আমাদের হাতে, আমরা জীবনটাকে দেখতে পাই, কিন্তু এটা কিভাবে দেখবো যে, মৃত্যু কখন আর কিভাবে আসবে? সেটা আজ অবধি কেউ বলতে পারে নাই।

অফিসে যাওয়ার সময় যে মানুষটার উপর নির্ভর করে আমার সকাল হতো, রাতে ঘুমানোর আগে যে মানুষগুলির উপর ভরষা করে আমার ভালো ঘুম হতো। কারনে অকারনে যখন তখন আমাদের মেজাজ কখনো ক্ষিপ্ত কিংবা বিক্ষিপ্ত অথবা উদবেলিত হতো, যখন সে আর কাছে থাকে না, তখন অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ে। অনেক মায়া লাগে। মনে হয়, সব কিছু থাকা সত্তেও যেনো কোনো কিছুই নাই। এই মায়া, এই ভরষা কিংবা এই বিক্ষিপ্ত চঞ্চলতার আর কোনো মুক্যই থাকে না সেই ব্যক্তির কাছে যে এই মাত্র সবার গোচরেই উধাও হয়ে গেলো চিরতরে। এই পরিবর্তনশীল সময়ে, অনেকেই হয়তো কথায় কথা বলে তারা ভালো আছেন, আমরা ভালো আছি কিন্তু তারা কিংবা আমরা জানিই না যে, আমাদের সময়টাই যে খারাপ যাচ্ছে। খুব মায়া হয় তখন। কিন্তু কেনো মায়া হয়, তার উত্তর আজো জানি না। যা হাতের মুঠোয় নাই, যা চিরতরে হারিয়ে যায়, অথচ একদিন হাতের কাছেই ছিলো, সেটার জন্য কেনো মায়া হয়, কেনো কষ্ট হয়, কেনো আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে হয়, তার ব্যাখ্যা নাই আমাদের কাছে। এর কিছু ব্যাখ্যা হয়তো দাড় করানো যায় যে, হয়তো পুরানো অভ্যাসে বন্দি মন বারবার আবার সেই পুরানো খাচায়ই ফিরে আসতে চায়।  অথবা এমনো হতে পারে যে, কেউ যখন আর কাছে থাকে না, তখন হয়তো এটা পরিষ্কার বুঝা যায় নিজের কতগুলি স্বকীয়তা, অভ্যাস আর পছন্দ কতো নিঃশব্দে সেই চলে যাওয়া মানুষটি নিয়ে অন্তর্ধান হয়ে গেলো, সাথে নিয়ে গেলো তার থেকে ধারে নিয়ে বেচে থাকার আমাদের অনেক পরনির্ভরশীলতার অভ্যাসগুলিও। আর সেটা যখন পরিষ্কার হয় তখন অভাবগুলির সংকট দেখা দেয়। আমরা বিচলিত হই, ভয় পাই, কষ্টে থাকি আর তখনই তার অভাবে আমরা তার উপর মায়ায় চোখ ভিজিয়ে দেই।

তবে আজীবন একটা সত্য বচন এই যে, জীবন মানেই যাত্রা, আর এই যাত্রার শেষ প্রান্তেই থাকে মৃত্যু। অর্থাৎ জীবনের অবসানেই মৃত্যুর যাত্রা শুরু। এই নতুন পর্বের যাত্রা কখন কার কোন সময় শুরু হবে, এটা কোনো বিজ্ঞান, কোনো ডাক্তার, কোনো ধর্ম পুস্তক কিংবা কোনো ধ্যান কখনোই বলতে পারে না।

১২/০৬/২০২১-রোস্তমের টাকা চুরি-১

Categories

আমার ড্রাইভার ছিলো রুস্তম। খুবই ভালো একজন ড্রাইভার। বিয়ে করেছিলো কিন্তু রোস্তমের অভ্যাসের কারনে ওর বউ ওকে ছেড়ে দেয় কিন্তু ইতিমধ্যে ওদের একটা পুত্র সন্তান হয়ে যায়। ছেলেকে রেখেই রোস্তমের বউ রোস্তমকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করে বিদেশে সেটেল্ড হয় যায়। রোস্তমের দোষ ছিলো রোস্তম প্রায়ই ডিউটি শেষে ওর বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে মদের আড্ডায় বসতো যা ওর বউ পছন্দ করতো না। বউ চলে যাবার পর ছেলেকে নানীর বাড়িতেই রেখে রোস্তম ছেলেকে পালতে শুরু করলেও মদের নেশাটা ছাড়তে পারলো না। বরং মদটা যেনো ওকে আরো পাইয়ে বসলো। আমি জানতাম না যে, রোস্তম মদ খায়। কারন আমার ডিউটি শেষ করার পর রোস্তম কোথায় গেলো আর কি করলো সেটা নিয়ে আমি মোটেই খবর রাখতাম না। 

এভাবেই রোস্তম আমার কাছে প্রায় ৫ বছর ড্রাইভার হিসাবে কাজ করছিলো। বিস্তস্থতা আর কোয়ালিটি ড্রাইভার হিসাবে রোস্তমের উপর আমার কোনো সন্দেহ ছিলো না। মাঝে মাঝে বেতনের বাইরেও আমি ওকে টাকা দেই, যেটা রোস্তম ও জানে যে ফেরত দিতে হবে না। আমিও চাইতাম না। রোস্তমের উপর আমার বিশ্বাস এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, মাঝে মাঝে ফ্যাক্টরীর কোটি কোটি টাকাও একা ব্যাংক থেকে আনা নেয়া করাতাম। ভালোই চলছিলো। একদিন রোস্তম বল্লো যে, রোস্তম আসলে একা থাকে বলে ওর খাওয়া দাওয়ায় বেশ সমস্যা হয়, কাপড় চোপড় ধোয়াতেও সমস্যা হয়। ও বিয়ে করতে চায়। আমি ব্যাপারটাইয় সায়ই দিলাম। ওর বিয়ের একটা বাজেট হলো, প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো। আমি বললাম, যে, আমিই ওর বিয়ের পুরু খরচটা দেবো। দিয়েও দিলাম। রোস্তম বিয়ে করে ফেল্লো। আমাদের বাসার পাশেই থাকে রোস্তম, সাথে ওর নতুন বউ। এবার একটা নতুন ঝামেলার সৃষ্টি হলো। নতুন বউ ও নাকি রোস্তমের সাথে এডজাষ্ট করতে পারছে না। জিজ্ঞেস করলাম আশেপাশের মানুষ গুলিকে। যে জিনিষটা আমার কখনোই ভালো করে জানা হয় নাই সেটা আমার নজরে এলো। রোস্তম ডিউটি করে এসেই সারারাত মদের আড্ডায় থাকে। ফলে ৫/৬ মাস যেতে না যেতেই রোস্তমের সাথে এই দ্বিতীয় বউ ও তাঁকে ছেড়ে দিতে মনস্থ করলো। কিন্তু রোস্তম যে বাসায় থাকে সেটা রোস্তমের নতুন বউ এর ভাড়া করা বাসা।ফলে ওর বউ রোস্তমকে বাসা থেকে বের করেই ছাড়লো। 

আমার দয়ার শরীর, তার উপরে রোস্তমকে ছাড়া আমি অচল। ভাবলাম যে, আমার বাসায় একটা গার্ডের রুম আছে, যেটায় কেউ থাকে না। এটাচড বাথ রুম। রোস্তমকে আমার বাসার ঐ গার্ড রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম। একদিন যায় দুইদিন যায়, হটাত এক রাতে আমি দেখলাম যে, রোস্তম আমার বাসায় বসেই মদ খাচ্ছে। অনেক রাগারাগি করলাম, নিষেধ করলাম এবং সতর্ক করে দিলাম যে, আর যদি কখনো আমি ওকে মদ খেতে দেখি তাহলে আমি ওকে বাসা থেকে শুধু নয়, আমার ড্রাইভার হিসাবেও ওকে বাদ দিয়ে দেবো। রোস্তম আমার কাছে এক প্রকার প্রতিজ্ঞাই করলো যে, সে আর কখনো মদ খাবে না। কিন্তু মদের যার নেশা, সে মদ ছাড়ে কিভাবে? রাত যখন গহীন হয়, রোস্তম তার মদের বোতলের মুখ খুলে মদ পান করতে থাকে। একদিন আমিও বেশ গহীন রাতে ওর রুমে হটাত করে এসে দেখি, রোস্তম মদ খাচ্ছে। মাথা আমার ঠিক ছিলো না। আমি রোস্তমকে ঐ রাতেই আমার বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলাম। কিন্তু চাকুরীটা বাদ করিনি। রোস্তম নরম্যালি আমার ড্রাইভার হিসাবে আবারো কাজ করতে থাকে। কোনো সমস্যা আছে বলে মনে হলো না। এভাবেই প্রায় মাস খানেক চলে গেলো। 

গাড়িতে থাকাকালীন আমি প্রায়ই রোস্তমের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এম্নিতেই কথা বলতাম।  একবার রুস্তম আমারে বল্লো যে, ওর কাছে যদি ৩ লাখ টাকা থাকে তাহলে ওর জীবন নাকি সে বদলাইয়া ফেলবে। খুব ভালো কথা। বললাম, ৩ লাখ টাকা যদি পাস, তাহলে কি করবি? রুস্তম বল্লো যে, সে ২টা পুরান সিএনজি কিনবে। একটা নিজে চালাবে আরেকটা ভাড়ায় চালাবে। তাতে প্রতিদিন সে পাবে ১২০০ টাকা। তারমানে মাসে ৩৬ হাজার টাকা। ওর খরচ লাগে মাসে ১৬ হাজার টাকা। তার মানে মাসে সে ২০ হাজার সেভ হবে। বছরে সেভ হবে আড়াই লাখ টাকা। সেই আড়াই লাখ টাকা দিয়া সে আরেকটা সিএনজি কিনবে। এভাবে ২/৩ বছর পর সে গাড়ি কিনবে। তাতে ওর প্রতি দিন লাভ হবে ২ হাজার টাকা। এভাবে সে হিসাব করে দেখলো যে, ৫ বছর পর তার হাতে আসবে প্রায় ২০ লাখ টাকা, ৩টা সিএনজি আর একটা গাড়ি।

আমি ব্যাপারটা খুব সাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম। আগে পিছে কিছুই ভাবি নাই। একদিন আমি রোস্তমকে নিয়ে আমার প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রিজের বেতনভাতা নিয়ে গেলাম ফ্যাক্টরীতে। আমার ব্যাগে তখন দুই জায়গায় মোট ৫ লাখ টাকা ছিলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে অফিসে বসার পর আমার অন্যান্য ডাইরেক্টরদেরকে বললাম, আমার ব্যাগে ৫ লাখ টাকা আছে, সেটা নিয়ে আসো। বেতন দিয়ে দাও শ্রমিকদেরকে। সবাই বেতনের জন্য অপেক্ষা করছে। আমার গাড়িটা আমার অফিসের একেবারেই দরজার সামনেই পার্ক করা থাকে। আমার ডাইরেক্টররা গাড়ির কাছে এসে রোস্তমকে খুজে না পেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, রোস্তম সম্ভবত গেটের দোকানে চা খেতে গিয়েছে। ওকে ফোন দিলাম, বল্লো, চা খেয়ে এখুনি আসবে। আসলে ব্যাপারটা ছিলো অন্য রকমের। রোস্তম আমার ব্যাগ থেকে এক পকেটে ৩ লাখ টাকা ছিলো, সেটা সে নিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে কিন্তু আমাকে জানিয়েছিলো যে সে চা খেতে গেছে যেটা সে প্রায়ই চা খাওয়ার জন্য গেটের দোকানে যায়। ওর আসতে দেরী হ ওয়াতে আমি বারবার ফোন করতে থাকি। কিন্তু এক সময় দেখলাম রোস্তমের ফোন বন্ধ। আমার সন্দেহ হলো। দোকানে লোক পাঠালাম, রোস্তম সেখানে চায়ের জন্য বসেই নাই। বুঝতে বেশী দেরী হলো না যে, সে আমার ব্যাগ থেকে ৩ লাখ টাকা চুরি করে পালিয়েছে। ফ্যাক্টরীর আশেপাশে সব খানে খোজাখুজি করার পরেও যখন আর পেলাম না, তখন মীরপুর বাসা থেকে ডুপ্লিকেট চাবী এনে আমার গাড়ি খুলতে হলো, ব্যাগ চেক করলাম, এক জায়গায় রাখা তিন লাখ টাকা নাই, অন্য পকেটে রাখা ৩ লাখ টাকা আছে। 

 

 

চুরি করার পর এক মাস পালাইয়া পালাইয়া থাকলো। কোনো সিএনজি, কিংবা কিছুই কিনলো না। প্রতিদিন মদ খাইতো রাতে। একদিন মদ খাওয়ার পর কিছু বন্ধু বান্ধব জেনে গেলো ওর কাছে বেশ কিছু টাকা আছে। এক রাতে মদ খাইয়া বেহুস। ওর সব বন্ধুরা টাকা গুলি নিয়া পালাইলো। রুস্তমের আর কিছুই নাই। খাওয়ার পয়সাও নাই। তারপর একদিন সে ভাবছে, আমার কাছে আবার ফিরে আসবে কিনা। কিন্তু আর সাহস পায় নাই। তারপর না খেয়ে খেয়ে পাগলের মতো অবস্থা। আবার এদিকে পুলিশের ভয়, আমার ভয়।

অতঃপর একদিন

একদিন একতা বিশাল চিঠি লিখলো আমাকে। পোষ্ট অফিসে গেলো চিঠি পোষ্ট করতে। চিঠি পোষ্ট করলো। ২২ পাতার একটা চিঠি।  চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিলো- যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা কইরা দিয়েন।  যেদিন আমি চিঠিটা পাই, তার প্রায় ৪ দিন আগে রুস্তম তারের কাটা গলায় দিয়ে ফাসি দিয়ে আত্তহত্যা করেছিলো। আমার প্রায়ই ওর কথা মনে পড়ে। আমি ভাবি যে, যদি রুস্তম সাহস করে আবার আমার কাছে আসতো, আমি ওকে আবার রাখতাম আমার ড্রাইভার হিসাবে। আমি ওরে ক্ষমা করে দিছি। আমিও ওকে ভালোবাসতাম। কিন্তু আমার ভালোবাসা ওকে ঠেকাতে পারে নাই। এটা আমার ব্যর্থতা। কিন্তু এটা ওরও ব্যর্থতা।

 এটা কেনো বললাম জানো?

কারন, যে যেই জীবন চায়, সে সেটাই পায়। কেউ জেনে শুনে পায়, কেউ না জেনেই পায়। তোমার লাইফ আমার কাছে যতোটা মুল্যবান, সেই জীবনটা তোমার কাছে কতটা মুল্যবান, তার উপর নির্ভর করবে তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ। আর এই পদক্ষেপ কেউ ঠেকাতে পারে না। যার জীবন, মাঝে মাঝে সেও ঠেকাতে পারে না। 

১১/০৬/২০২১-কালো

Categories

কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু এমন কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? আসলে কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। কিন্তু এই কালোই যখন কোনো মানুষের গায়ের রং হয় তখন এটা সবচেয়ে বিড়ম্বনার একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কালো মানুষের গল্পের কাহিনী যদি কেউ শোনেন, দেখা যাবে গায়ের রং এর কালো মানুষের গল্পটা সবার থেকে আলাদা বিশেষ করে সেই ব্যক্তিটি হয় কোনো মেয়ে মানুষের গল্প। কালো মেয়েদের অনেক কথা তাদের মনেই রয়ে যায়। কাউকে তারা বলতেও পারে না। কে শুনবে তাদের কথা? মেয়েরা কালো হলে সেই ছোট বেলা থেকেই সমাজের সবার আকার- ইংগিতের ভাষায় তারা এটাই মনে করতে থাকে যে, কালো মুখ একটা অপয়ার ছায়া যেনো। আর এই অপবাদ থেকেই তাদের মনে এবং মস্তিষ্কে হীন মন্যতা বাসা বাধে। তাদের নিজের উপর নিজেদের কনফিডেন্স কমতে থাকে। অথচ এই কালো হয়ে জন্মানোর পিছনে তাদের না আছে কোনো হাত, না আছে তাঁকে পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা। কালো রং, বা শ্যামলা রং যদি অভিশাপই হতো তাহলে “কৃষ্ণের” কালো রং কোনো অভিশাপ নয় কেনো? এই কালো ক্রিষনকে তো তার সমস্ত কালো রং নিয়েও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তাঁকে সম্মান করে, ভালোবাসে, পুজা করে। কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যাপার এটাই যে, কৃষ্ণ ছাড়া পৃথিবীর তাবদ মেয়ে মানুষকে এই কালো রং কে মানুষ তাদের ঘাটতি হিসাবেই দেখা হয়। ফলে নিজের কালো রং এর কারনে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে সমাজের সবার কাছেই তাচ্ছিল্যের একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এমনো ধারনা করা হয় যে, ফর্সা মানে সুন্দর আর কালো মানে কুৎসিত। ছেলে সে যতোই কুৎসিত হোক না কেনো তার ও ফর্সা মেয়ে চাই, আর যদি কোনো মেয়ের গায়ের রং হয় কালো, তার তো এম্নিতেই হাজার সমস্যা, তার আবার কালো আর ধলা ছেলে পাওয়ার কোনো স্প্রিহাই তো নাই।

কালো পোষাক পড়লে আমরা নিজেকে সুন্দর মনে করি, কালো টিপকে আমরা শুভ বলে মানি। কথায় আছে কালো টিপ কুনজর থেকে বাচায়। মুখের উপর কালো তিলে আমাদেরকে সুন্দর দেখায়। কিন্তু কোনো মানুষের গায়ের রং যদি কালো হয় তাহলে তাঁকে আমরা কুৎসিত বলতে দ্বিতীয়বার ভাবি না। খুবই আসচর্জ চিন্তাধারা।

সউন্দর্জ আসলে কোনো রং নয়। অথচ এই সউন্দর্জ যেনো সব নির্ভর করে কালো ছাড়া অন্য আর সব রং এর উপরে। কেনো? এর উত্তর একটাই- আমরা কালো আর সুন্দর্জের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না। যখন চোখ শরীর থেকে মনের ভিতরে যায়, তখন মানুষের মনের ভিতরের সউন্দর্য দেখা যায়। আমাদের এই ক্ষমতা সবার থাকে না কিভাবে আমাদের চোখ শরীর থেকে মনের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে। আমাদের নিজের এই গুনের অভাবেই আমরা কোনো কালো মেয়ের ভিতরের রুপ দেখতে পাই না আবার এটাও পাই না যে, কোনো ফর্সা মেয়ের মনের ভিতরে কতটা কুৎসিত চরিত্র রয়েছে। আর দেখতে পাই না বলেই কোনো কালো মেয়ে কারো জীবনে অন্ধকার মনে হয় আর কারো কাছে সে আলোর দুনিয়ার মতো একেবারে পরিষ্কার। আসলে গায়ের রং নয়, যার কর্মকান্ড কালো, সেইই কালো। কালো গায়ের রং কোনোভাবেই দুনিয়ায় অশুভ হতে পারে না।

এটা খুবই জরুরী যে, আমরা এই রং বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসি, নিজের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসি যাতে প্রকৃতির তৈরী সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি মানুষ তাঁকে দেখতে যেমনি হোক না কেনো তাঁকে সম্মান করি।

১১/০৮/২০২১-কনিকার যাওয়ার সময় উপদেশ

নতুন জায়গায় নতুন দেশের নতুন নিয়মে তুমি সম্পুর্ন আলাদা পরিবেশে একটা নতুন জীবন ধারায় নতুন ক্যারিয়ার তৈরী করার জন্য দেশ ছেড়ে সুদূর আমেরিকায় যাচ্ছো। তুমি এদেশের কোন চাপ, কোনো বিরহ নিয়ে ওখানে বাস করবে না, না কোনো কারনে মন খারাপ করবে। একদম ফ্রেস মাইন্ডে যাবে আর ফ্রেস করে শুরু করবে সব। মন দিয়ে নিজের সপ্ন পুরু করার চেষ্টা করবে কিন্তু সব সময় শরীরের দিকে যত্ন নিতে হবে। আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ। গল্পটা তোমার, সপ্নটা তোমার। এই আজ থেকে তুমি একটা জার্নি শুরু করলে যার একমাত্র যাত্রী তুমি নিজে। জীবনের মজাটা হচ্ছে- কিছু কিছু জিনিষ এমন হয় যেটা অবিশ্বাস্য লাগে কিন্তু তুমি বুঝতে পার- হ্যা এটা হয়েছে। তখন নিজের থেকেই বিশ্বাস হয়ে যায়। 

নতুন কাজ, নতুন পরিবেশ, কিন্তু নিজেকে বদলে ফেলো না। কেউ চলে যাবার পর হয়তো কিছু পরিবর্তন নজরে আসে। তুমি চলে যাবার পর হয়তো আমাদের এখানে অনেক কিছুই পালটে যাবে। পালটে যাবে কোনো এক সন্ধ্যায় পিজা খাওয়ার কিছু আনন্দঘন মুহুর্ত, পালটে যাবে কোনো এক ছুটির দিনে দল্বেধে বাইরে গিয়ে খেতে যাওয়ার আসর কিংবা পালটে যেতে পারে আমাদের অনেক দইনিন্দিন কিছু কর্ম কান্ড ও। আমাদের এই পরিবর্তন কোনো নতুন কিছু হয়তো নয়, এটা একটা এডজাষ্টমেন্ট, যা তোমার অনুপস্থিতিতে আমাদের আনন্দের সাথে বেচে থাকার নিমিত্তে। কিন্তু তোমার বদলে যাওয়া অন্য রকম। তুমি বদলাবে সেটা যাতে তোমার ভালোটা হয়।

 আমি তোমাকে কোনো কিছুতেই কখনো আটকাই নাই, না কখনো আটকাবো। কিন্তু তুমি আমার নিজের মেয়ে, আমার বহু আদরের সন্তান। যদি এমন কখনো হয় যে, আমি তোমাদের কারনে দুশ্চিন্তায় থাকি, তখন হয়তো সমস্ত আবেগ, মায়া আর ভালোবাসা উপেক্ষা করেই হয়তো আমি তোমাকে আটকাবো। সেটা যেনো আমাকে করতে না হয়। প্রাইওরিটি ঠিক করতে হবে জীবনে। সব সময় আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবে। জীবনে ব্যস্ততা থাকবে কিন্তু এতোটা না যাতে ফ্যামিলি ডিপ্রাইভড হয়। তুমি যদি ভালো ফলাফল করতে না পারো, এর মানে এই নয় যে, আমার ভালোবাসা তোমার উপর কমে যাবে। তুমি যদি তোমার ডিজায়ার্ড রেজাল্ট না করতে পারো শত চেষ্টা করার পরেও, আমি তোমাকে কখনোই দোষারুপ করবো না। বরং আমি তোমাকে সারাক্ষন সাহস দেবো, সহযোগীতা করবো কিভাবে তুমি সবার থেকে ভালো ফলাফল করতে পারো। আর ওটাই তোমার বাবা।

একটা জিনিষ সারাজীবন মনে রাখবা যে, সোস্যাল মিডিয়া একটা মেনিপুলেটেড মিডিয়া। এর বেজ মোটেই সত্য নয়। বরং এটা সাজানো সত্যি। কোনো জিনিষ সাদা বা কালো হয় না। সবটাই আলোর খেলা। এই সোস্যাল মিডিয়ায় সেটাই তারা জানাতে চায় যেটা তারা তোমাকে জানাতে চায় কিন্তু তোমার উচিত সেটা জানা যেটা আসল সত্যি। কারন অনেক বড় অপরাধের শিকর অনেক গভীরে থাকে। এই সোস্যাল মিডিয়ার ব্যক্তিত্তরা সবাই মেনিপুলেটেড চরিত্র। এরা ডিটেইল্ড মিথ্যা কাহিনী খুব নিখুতভবে বানায়। তাই কোনো কিছুর ফেস ভ্যালুতে না গিয়ে ডাবল ভেরিফিকেশন জরুরী। জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিজের চারিদিকে সবসময় চোখ কান খোলা রাখতে হবে। এই কথাটা খুব জরুরী মনে রাখা যে, প্রকৃতির ইশারার প্রতি সর্বদা সেনসিটিভ থাকা। যেদিন সুনামী হয়, তার আগের দিন জংগলের সমস্ত প্রানিকুল সবাই জাত নির্বিশেসে উচু জায়গায় স্থান নিয়েছিলো, কারন তারা প্রকৃতির সেন্সটা বুঝতে পেরেছিলো। যা মানুষ বুঝতে পারে নাই। ফলে সুনামীতে বন্য প্রানীদের মধ্যে যতো না ক্ষতি হয়েছিলো তার থেকে শতগুন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো মানুষ। ঠিক এই কারনেই  সব সময় মনে রাখা দরকার যে, অপরাধের সুনামী একটা নয়, অনেক সংকেত দেয়, হওয়ার আগে এবং অপরাধ হওয়ার সময়। শুধু সেটা ধরতে হয়।

মানুষের শরীরে একটা জিনিষ থাকে যা পোষ্টমর্টেম করেও পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো সাফল্যে সব থেকে জরুরী হয় সেই জিনিষটার। সেটা “কনফিডেন্স”। এই কনফিডেন্স মানুষকে তৈরী যেমন করতে পারে, তেমনি ভেংগেও দিতে পারে। যখন এটা ভেংগে যায় বা হারিয়ে যায়, তারপরে আর কিছু কাজ করে না। তখন যেটা হয়, তুমি ঠিক করছো নাকি ভুল করছো কিছুই বুঝতে পারবে না। আর যখন কনফিডেন্স চলে যায় বা হারিয়ে যায়, সেই জায়গাটা দখল করে নেয় “কমপ্লেক্স”। এই কমপ্লেক্স যখন গেথে বসে যায় কারো জীবনে, তখন সিম্পল একটা ছবি তুলতেও খারাপ লাগে। কারন কে আপনাকে নিয়ে মজা করবে, কে লেগ পুলিং করবে এই সব ভেবে।

জিবনে এমন কোনো অধ্যায় তোমার থাকা উচিত নয় যা তুমি আর অন্য কেউ শুধু জানো অথচ আমরা জানি না। আমাদের মান, সম্মান, পজিশন, সমাজে মাথা উচু করে বেচে থাকার জন্য শুধু আমাদের গুনাবলীইই যথেষ্ঠ নয়, সেখানে তোমরাও আমাদের সেই জীবনের সাথে জড়িত। ফলে, যেটাই হোক সবকিছুতেই আমাদের কথা মাথায় রাখবে। বাবা মায়ের থেকে বড় ভরষা আর কিছু নাই। আমরা যদি আগে থেকেই জানতে পারতাম আমাদের কর্মফলে কি ফলাফল হয়, তবে কতই না ভালো হতো। কিন্তু সেটা আমাদের স্রিষ্টিকর্তা সুযোগ দেন নাই। তাই সতর্ক থাকাটা খুব দরকার। সতর্ক হওয়া মানে এই নয় যে আমরা শুধু মাত্র পরিনতির বিষয় ভাববো, সতর্ক থাকার অর্থ হলো সঠিক সময়ে নেয়া সেই পদক্ষেপ যা আগামী সমস্যাগুলিকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। বিশেষত এটা জানা সত্তেও যে আমাদের আগামী কর্মফল খারাপ।

মনে রাখবা এক বন্ধুই আরেক বন্ধুর ক্ষতি করে। তাতে তোমাকে সাহাজ্য করতে আমাদের অনেক অসুবিধা হবে। তুমি শুধু ফোকাস করবে তোমার ক্যারিয়ারে আর সপ্ন পুরনে। তোমাদেরকে নিয়ে আমার সারাটা জীবন অন্য রকমের একটা সপ্ন আছে। আরেকটা কথা মনে রাখবে- ভালোবাসায় অনেক শক্তি থাকে। যদি হতাতই মনের অনিয়ন্ত্রনের কারনে কাউকে ভালোই লেগে যায়, সেখানে নিজের সাথে নিজের বুঝাপড়া করো। সব ভালোবাসার রুপ এক নয়। কেউ ভালোবাসে তোমার শরীরকে, কেউ ভালোবাসে তোমার দূর্বলতাকে, কেউ ভালোবাসে তোমার মেধাকে, আবার কেউ ভালোবাসে তোমার তথা তোমার পরিবারের সম্পদ কিংবা তোমার অস্তিত্বকে। কে তোমাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোবাসলো, এই দৃষ্টিকোণ টা খুব ভালো করে বুঝা তোমার দায়িত্ব। কেউ যদি তোমাকে আসল রুপে ভালোবাসে, কখনো সে তোমাকে জোর করবে না কারন সে জানে যদি তুমি তার হও, তুমি যেভাবেই হোক সেটা বুজতে পারবে আর তুমি তার কাছে বিলম্ব হলেও ফিরে যাবে অথবা সে দেরী করে হলেও তোমার কাছেই ফিরে আসবে। যদি সে ফিরে আসে বা তুমি ফিরে যাও, তাহলে বুঝবে এটা সত্যি ছিলো। নতুবা কিছুই সত্য ছিলো না। যা ছিলো সেটা হলো একটা মোহ। মোহ আর ভালোবাসা এক নয়। একটা বাস্তব আর আরেকটা মিথ্যা। এই মিথ্যা ভালোবাসায় পতিত হয় হয়তো মনে অনেক কষ্ট জমা হতে পারে। কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সে সব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তর মানসিক কষ্টটা আর থাকে না। এটা অনেক জরুরী একটা ব্যাপার। সব কিছুরই প্রথমবার আছে। এটা যেমন ভালোবাসার ক্ষেত্রে তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রেও। যৌবন হলো অসহায় এবং শক্তির দ্বিতীয় নাম। অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার হয় কিন্তু যৌবনের ভালোবাসার প্রতারনায় নিজের অসহায়ত্তের বিচার নিজেকে করতে হয়। তখন নিজের বিরুদ্ধে রায় দেয়া সহজ হয় না। তাই আমি সব সময় একটা কথা বলি- টাইম হচ্ছে মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভিলেন। তার কাছে পরাজিত হওয়া যাবে না। আবার এই টাইমই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বন্ধু। তুমি এই টাইমকে কিভাবে ব্যবহার করবে সেটা তোমার বিবেচনা। একবার মনে কালো দাগ পড়ে গেলে তা আজীবন নিজেকে কষ্ট দেয়। ব্ল্যাক কফি, ব্ল্যাক ফরেষ্ট কেক, ডার্ক চকোলেট, ঘন জংগল অন্ধকার রাত, সবই কালো কিন্তু সে কালো কোনো কষ্টের নয়। কিছু কালো জীবনের অভিশাপ। কালোর মতো কোনো রং নেই। কিন্তু কিছু কি আছে যা কালোকে সাদা করতে পারে? বিশেষ করে সেই কালো যা জীবনের ধারাবাহিকতায় অভিশাপের মতো রুপ নিয়েছে? তাই, আমি প্রতি নিয়ত তোমাকে নিজের হাতের নিয়ন্ত্রনের বাইরে ছেড়ে দিতে ভয় করলেও তোমার উপর আমার আলাদা একটা ভরষা আছে- তুমি পারবে ঠিক সে রকম করে চলতে যা আমি তোমার জন্য করতে চেয়েছিলাম। এই ভরষায় আমি তোমাকে অনেক দূরে পাঠাতেও দ্বিধা করছি না।

আমার আশা, তোমার মায়ের সপ্ন আর আমাদের পরিবারের সব সম্মান তোমার হাতে দিয়ে এটাই বলতে চাই- আমরা তোমাদের পরিচয়ে সমাজে আরেকবার সম্মানীত হতে চাই। বাকীটা আল্লাহ মালিক জানেন।

২৬/০৪/২০২১-কভিড-১৯, ২য় ডোজ

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২৬ এপ্রিল 

       

কভিড-১৯ মহামারী যদিও এই বিসশে প্রথম পদার্পন করে ডিসেম্বর ২০১৯ এ কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রথম সনাক্ত হয় ৮ মার্চ ২০২০। পৃথিবীর তাবদ মানুষ যেখানে এই কভিড-১৯ কে নিয়ে জল্পনা, কল্পনা আর হিমশিম খেতে খেতে শ্মশানে চলে যাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের পলিসি মেকাররা যেনো বড়ই উদাসীন। মুজিববর্ষ পালনে কোনো দিধা নেই, হাসপাতালের যতটুকু বেশী প্রয়োজনীয়তা তার থেকে সবার যেনো এর উছিলায় টাকা কামানোর ধান্দাই বেশী। এটা আগেও যেমন লক্ষ্য করা গেছে, এই মহামারিতে যেনো আরো কাড়াকাড়ি আর লুটের ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। সারাটা দুনিয়া যেখানে মৃত্যুর সাথে কিভাবে জয় হওয়া যায় সেই ভাবনায় মগ্ন আর সেখানে আমার দেশ কিভাবে রাজনীতিতে আরো শক্ত গিট বাধা যায় সেটা নিয়ে ব্যস্ত।

রাস্তায় পুলিশের দৌরাত্ব, অফিসে কর্মচারীদের থাবা, বাজারে ব্যবসায়ীদের মরন কামড়, কোথাও এই কভিডের জন্য কারো কোনো দুশ্চিন্তা নেই। আমরাও সেই তালের সাথে ড্রাম পিটিয়ে একাত্ততা ঘোষনা করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। আমি হয়তো জুলুম করছি না কিন্তু জুলুমের শিকার তো হচ্ছিই। এই এতো শত কষ্টের মাঝেও আজ আমি আর আমার স্ত্রী মিটুল চৌধুরী কভিডের জন্য ২য় ডোজের টিকাটা গ্রহন করতে সক্ষম হয়েছি। অফিসে চলে গিয়েছিলাম। মাত্র অফিসের কাজে মনোযোগ দিয়েছি, এমন সময় মিটুল আমাকে ফোন দিয়ে জানালো যে, তার মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা এসছে আজ সকালে যে, আজই আমাদেরকে টিকার ২য় ডোজ নিতে বলা হয়েছে। বাচতে কে না চায়?তাই অফিসের সব কাজ ফেলে আমি আবার রওয়ানা হয়ে গেলাম বাসার উদ্দেশ্যে। টীকা নিতে হবে। আমি সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার, তাই সিএমএইচ আমার জন্য ফ্রি এবং নির্ধারিত। সকাল ১২ টার দিকে আমাদের টীকা নেয়া শেষ হলো। আমার কোনো পার্শ প্রতিক্রিয়া আগেরবারও হয় নাই, এবারো হলো না। কিন্তু মিটুলের উভয়বারেই পার্শ প্রতিক্রিয়ায় ভুগছে।

কভিড মহামারী সব কিছুকে পালটে দিয়েছে। পালটে দিয়েছে পরিবারের ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা, আর পরিবর্তন করে দিয়েছে পুরু দুনিয়াকে যেখানে মানুষ শুধু একটা জিনিষ নিয়েই ভাবে- ধর্ম নিয়ে বারাবারি, কিংবা জাত অথবা ঈশ্বর, কোনোটাই স্থায়ী নয়। তাই যার যার চিন্তায় সে সে মশগুল।কভিড আমাদের দেশে এখনো অনেক হারে ছড়ায়নি বলে মানুষ ব্যাপারটা নিয়ে এখনো অনেক উদাসিন। কিন্তু কভিডের সংক্রমন গানিতিক হারে না হয়ে এটা জ্যামিতিক হারে বাড়বে কোনো একদিন। এক থেকে দুই, দুই থেকে চার, চার থেকে আট, আর আট থেকে ষোল এভাবেই বাড়তে বাড়তে কভিড সবার ঘরে ঘরে গিয়ে হাজির হবে একদিন। এর মধ্যে যখন সারা দুনিয়া উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে, আমরা তখন আষ্টেপিষ্টে ধরা খাবো। ব্যবসা বন্ধ হবে, আন্তর্জাতিক মহলে ব্ল্যাক লিষ্টেড হবে, পন্য কেউ কিনতে চাবে না। আমরা একঘরে হয়ে যাবো। আর এর জন্য দায়ী সব সময় সাধারন নাগরিককেই দেয়া যাবে না। একবার ভাবুন তো-যে দেশের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চুরী হয়, যেখানে দূর্নীতি চরম আকারে ধারন করেছে, যেখানে উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যক্তি পর্যায়ের মানুষের পকেটে চলে যাচ্ছে সেখানে সরকার যদি আমাদের এই ষোল কোটি মানুষকে এক মাসের জন্য শুধু খাবার আর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সমুহ নিশ্চিত করতে পারতো, ভিয়েত্নাম বা ভুটানের মতো দেহের অবস্থা আমরাও ভোগ করতে পারতাম অর্থাৎ কভিড ফ্রি দেশ। এই ষোল কোটি মানুষের এক মাসের জন্য শুধু ২০০ কোটি টাকার বাজেটই যথেষ্ট ছিলো। সরকার যে চেষ্টা করে নাই তা নয় কিন্তু তার অধিনে যতো কাউন্সেলর, কমিশনার কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্গরা রয়েছেন, সাধারন জনগনের নামে দেয়া এসব প্রনোদনা গেছে সব তাদের পকেটে। ফলে মানুষ করোনায় বেচে থাকার চেয়ে অথবা করোনায় মরে যাওয়ার চেয়ে না খেয়ে মরতে চায় নি, তাই তাদের গন্তব্য সব সময় ছিলো ঘরের বাইরের মুখী। আর এই বাহির মুখী মানুষের ঢল যতোদিন ঠেকানো না যায়, এদেশের করোনা পরিস্থিতি কোনোদিনই উন্নতি হবে না। একটা সময় আসবে যখন প্রতিটি ঘরে ঘরে, গ্রামে গঞ্জে, শহরে, বাড়িতে বাড়িতে করোনার উপস্থিতি থাকবে। পরিচিত মানুষের মৃত্যুয় সংবাদে ফেসবুক ভরে উঠবে, কান্নার আহাজারি শোনা যাবে চারিদিক থেকে।

এর থেকে আপাতত বাচার প্রথম শর্ত হচ্ছে সাস্থ্য সচেতনতা আর টীকা। সেই টীকার কর্মসূচীর আওতায় আজ আমরা দুজনেই টীকার প্রোগ্রাম শেষ করলাম। এখন বাকী শুধু সচেতনতা। যেটা শুধুই আমাদের হাতে।

উত্তরসূরি নির্বাচন

জীবনের সব অধ্যায় এক রকম নয়। এটা আমার হয়ত বুঝতে দেরী হয়েছে কিন্তু এই সব তত্ত্বকথা মনিষীরা যুগে যুগে বলে গেছেন। মনিষীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক তত্ত্বকথাই বলে গেছেন বটে কিন্তু কেউ সে সব তত্ত্বকথা মানে না। হ্যা, মানে তখন যখন কারো জন্য সেসব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের জন্য প্রযোজ্য হয়। সেই সুবাদেই বলছি যে, আমি আপনি ততোক্ষন সবার কাছে যত্নশীল যতোক্ষন আপনি নিঃস্বার্থভাবে দিতে পারবেন কিন্তু পাওয়ার আশা না করবেন। আশা করলে আপনি হেরে যাবেন। এটা নিজের স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তান, পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার বেলায় প্রযোজ্য। কেউ মানুক বা না মানুক, এটাই সত্য।

এর থেকে যে শিক্ষাগুলি নেওয়া দরকার তা হচ্ছে, যা কিছু করবেন জীবনে, নিজের জন্য করুন, নিজে সুখী সময় কাটানোর জন্য আয় করুন এবং তা দুইহাত ভরে খরচ করুন। আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তানগন কিভাবে চলবে কিংবা তারা কোথায় কিভাবে বাস করবে তা আপনার চিন্তা থাকতে পারে বটে কিন্তু তারজন্য অনেক কিছু আয় করে সঞ্চয় করে তাকে পঙ্গু করে রেখে যাওয়ার কোনো দরকার আমি মনে করি না। বরং তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিন, তাতেই সে এই পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে ঠাই করে নেবে। এই পৃথিবী পরিশ্রমী মানুষের জন্য সুখের আবাস্থল। অলসদের জন্য এখানে সব কিছুই নাগালের বাইরে। পূর্ববর্তি জেনারেশনের আহরিত সম্পত্তি উত্তরসূরিদের জন্য কিছুটা আরামদায়ক হলেও একটা সময় আসে, কোনো না কোনো উত্তরসুরীর মাধ্যমেই তা বিনাশ হয়। এই বিনাশটা হয়ত এক জেনারেশনের মধ্যে ঘটে না। কারো কারো বেলায় এক জেনারেশনেই শেষ হয়ে যায় আবার কারো কারো বেলায় এটা ক্ষয় হতে কয়েক জেনারেশন পার হয়। কিন্তু ক্ষয় হবেই। এর প্রধান কারন, যিনি সম্পদ করলেন, তার যে দরদ, আর যারা বিনা পরিশ্রমে পেলো তাদের যে দরদ তা কখনোই এক নয়।

আরেকটা কারনে নস্ট হয়। তারা হলেন যাদের বংশ ধরের মধ্যে ছেলে রি-প্রেজেন্টেটিভ নাই। ওইসব লোকের বেলায় তাদের কস্ট করা সম্পত্তি নিজের ছেলে সন্তানের পরিবর্তে চলে যায় অন্য বাড়ির আরেক ছেলের হাতে যিনি সম্পদের মালিকের নিছক মেয়ের স্বামী হবার কারনে। এরা দ্রুত সম্পদ হাত ছাড়া করে কারন তারা একদিকে এটাকে ফাও মনে করে, অন্যদিকে যতো দ্রুত সম্ভব সব সম্পত্তিকে নিজের নামে রুপান্তরিত করতে চান। এই মন্তব্য টা ঢালাও ভাবে করলে অনেক মেয়ের স্বামীরা হয়ত মনে আঘাত পেতে পারেন, কারন সবাই হয়ত এক নয়। তবে অভিজ্ঞতা আর পরীক্ষায় দেখা গেছে, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই রকমটা হয়েছে। তারা স্ত্রী কপালে ধন পাওয়া মনে করেন। তাদের বেলায় বিনাশ হতে সময় লাগে অতি অল্প সময়। এই সব ছেলেদের কাছে কোনো সম্পদ এমন কি স্ত্রীও তাদের কাছে নিরাপদ নয়। 

ফলে যেহেতু আপনি পরিশ্রম করছেন, সুখটা আপনিই করুন। যদি ভাবেন যে, আগে সঞ্চয় করে স্তূপ করি, বাড়ী গাড়ি করি, ব্যাংকে একটা মোটা টাকা সঞ্চয় হোক তাহলে আপনার হাতে একটু সময়ও নেই সকালের সূর্য দেখার অথবা রাতের জ্যোৎস্না দেখার। আপনার ভাগ্যে আছে শুধু বাদরের মতো এইস্থান থেকে অন্যস্থানে লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় ফল পাওয়া যায় তার সন্ধান করা, অথবা পালের বলদের মতো সারাজীবন হাল চাষের মতো চাষির হাল বেয়ে যাওয়া যাতে চাষিই শুধু লাভবান হয়, আর নিজে শুধু জাবর কাটবেন।

এ কথাগুলি কেনো বলছি?

আমার চোখে দেখা এই ছোট্ট জীবনে অনেক ঘটনা। কস্ট করে সম্পত্তি বা এসেট রেখে গেছেন, কিংবা ব্যবসা রেখে গেছেন, জাস্ট তার মরনের পর ওই সব সম্পত্তি কত তাড়াতাড়ি ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়া যায়, তার জন্য তর সয় না। অথচ ওই সব উত্তরসুরীরা একটিবারও আপনার রুহের মাগফিরাত বা ধর্মীয় কোনো উৎসবের মাধ্যমে একটুও পয়সা খরচ করবে না। তারা ঐ খরচ টাকেও অপচয় মনে করে নিজের জন্ময অ্রআনন্দ করবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারাও সেই একই ফাদে পা দিয়ে তাদের উত্তরসুরীদের জন্যই সঞ্চয় করে জমা করে যান এবং নিজেরা ভোগ করেন না।   

অপ্রিয় সত্যের মুখুমুখি দাঁড়ানো সাহসের প্রয়োজন

কখনো যদি তোমরা দেখো যে, তোমার অপ্রিয় সত্য কথায় কেউ কোনো উত্তর করছে না, কিন্তু তোমার অগোচরে মুখ ভেটকাচ্ছে, তাহলে বুঝবে যে, তোমার আশপাশ চাটুকারে ভরে গেছে। তুমি বিপদের মধ্যে আছো।  এ অবস্থায় তোমার যা করনীয়, তা হচ্ছে, তুমি একা চলার অভ্যাস করো। এই একা চলার মধ্যে যদি কাউকে রাখতে চাও সাথে, তাহলে এমন কিছু মানুষকে রাখো যারা প্রাইমারী স্কুলের দরিদ্র শিক্ষক। তারা নীতি থেকে বিচ্যুত হয় না আর হবেও না। তবে তাও নির্বাচন করার জন্য সময় নিও।

আর কোনো কিছুই যদি মনে হয় ঠিক নাই, তাহলে, নিজেই নিজের জন্য এমন কিছু করে যাও, যাতে তোমার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো ধাতব্য প্রতিষ্ঠান তোমার কাজগুলি তোমার ই আহরিত সম্পদের লভ্যাংশে করতে পারে। পরিচিত মানুষ গুলিই তোমার বিপদের কারন। সব সময় মনে রাখতে চেষ্টা করো যে, বেঈমান অপ্রিচিত লোক থেকে তৈরী হয় না, তারা সব পরিচিত মানুষের দল। 

আমরা ভবিষ্যৎ দেখতে পাই না, আমরা মানুষের ভিতরের চরিত্রকে সরাসরি আয়নার মতো করে দেখতে পাই না। এমন কি আমরা নিজেরাও নিজেদের অনেক সময় চিনতে পারি না। আর এই কারনেই প্রতিবার আমরা প্রেডিকসন অর্থাৎ একটা স্যামপ্লিং এর উপর ভিত্তি করে বারবার সিদ্ধান্ত নেই। শতভাগ সাফল্য আসবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। আজকে যে বস্তুটি আপনার হাতে আসায় আপনি মনে করছেন, এটাই ঠিক যেটা আপনি চেয়েছেন, বা এটাই আপনি খুজছেন, সেটা সঠিক নাও হতে পারে।  আর যদি সঠিক না হয় তখন সংস্কার বা এজাস্টমেন্ট দরকার হয়ে পড়ে।  কখনো কখনো এই এডজাস্টমেন্ট এতো বড় যে, পুরু পরিকল্পনাটাই বদলাতে হয়। আর যারা এই পরিকল্পনাটা পাল্টানোর হিম্মত রাখেন, বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার হিম্মত রাখেন, তাদের জন্যই সুন্দর ভবিস্যত। সমাজ তারাই তৈরী করে, সমাজ তাদেরকেই কন্ডারী বলে। এডাপ্টেসন এর মুল থিউরী আসলে তাই। ডাইনোসোর এডাপ্টেসন করতে পারে নাই বলেই সে আজ পৃথিবীতে ইতিহাস কিন্তু তেলাপোকা সর্বত্র সব কিছুতেই এডজাস্ট করতে পারে বলেই এরা বেচে থাকে ৪৬ কোটি বছর। সম্ভবত এই তেলাপোকাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আয়ুধারী কোনো প্রানী। এরা ওদের বাল-বাচ্চা নিয়ে ওদের মতো করে বেচে থাকে। ভালোই থাকে।

আজকে আমি বা আপনাকে কেউ ভুল বুঝতেছি বলে যে অভিযোগ করে, এটা হয়ত ঠিক এই রকম নয়। হতে পারে এই রকম যে, এখন আমি বা আপনি ভুল বুঝতেছি না, সময়ের ব্যবধানে, স্যামপ্লিং ভুলের কারনে আগেরবার ভুল হয়েছিলো, কিন্তু অন্যান্য স্যামপ্লিং, চারিপাশের অবস্থা, বেশী ফ্যাক্টর সমন্নয়ে আমি বা আপনি বর্তমানটাই ঠিক বুঝতেছেন। ফলে যারা অভিযোগ করছে, তারা ব্যাপারটা মেনে নিচ্ছেন না। আবার এমনো হতে পারে যিনি আমাকে বা আপনাকে "ভুল বুঝতেছি" বলে অভিযোগ করছেন, তার এক্সপেকটেশন অনুযায়ী সেও আমাকে বা আপনাকে আগেরবার ঠিক বুঝেছেন কিন্তু এখন তার এক্সপেক্টেসনের সাথে ক্যাল্কুলেসনে তারতম্যের কারনে আমরা বা আপ্নারা বদলে গেছি বা বদলে গেছেন এই চিন্তায় আমরা ভুল বুঝতেছি বলেই তাদের ডিডাক্সন তৈরী হচ্ছে।

কিন্তু যেটাই হোক, কে ভুল আর কে ঠিক, এই তর্ক, এই যুক্তি, এই ব্যাখ্যা করার সময় মানুষের হাতে খুব বেশি থাকে না। একটা সাব জেক্ট নিয়ে এতো গবেষণা করতে থাকলে, বাকী সাবজেক্ট এর জন্য তো সময় ই দেওয়া যাবে না। জীবনে সময় বড় সীমিত। হয় এডজাস্টমেন্ট করে বেচে যাবেন, নয় খপ্পর থেকে বেড়িয়ে যাবেন। দ্বিধার কোনো কারন থাকলে সবার প্রতিভা যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ক্ষতি হবে বিকাশের।

ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তে ভুল হলে যখনই মনে হবে এখনই সময় সিদ্ধান্ত পাল্টে জীবন সুন্দর করার, তাহলে "এখনি" সেটা। শুধু একটা জিনিষ মনে রাখা দরকার, ঈশ্বর সব ভুলের মধ্যে বড় সাফল্যের ফলাফল নির্ধারণ করেন। তিনি কারো সাথে মস্করা করেন না। তাঁর উপর ভরসা রাখুন। জয় আপনার। এটা দু পক্ষের জন্যই উপদেশ কারন, যার যার গন্ডি থেকে তাঁর তাঁর জন্য ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করেন। কেউ কারো সীমানা অতিক্রম করলেই এই বিপত্তি হবে। নদীর জলের মধ্যেও ঈশ্বর তাদের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মিঠা পানি এবং নোনা পানিও তাদের সীমা অতিক্রম করে একে অপরের সাথে মিশার অনুমতি ঈশ্বর দেন নাই।

শেষ বিদায়

আজকে সেই দিন যেদিন সবাই আমার কারনেই সবাই একত্রে মিলিত হয়েছে। মিলিত হয়েছে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে। কিন্তু এখন আমি সম্পূর্ণ স্থবির আর শান্ত। বাড়িঘর সব ভড়ে গেছে একের পর এক চেনা জানা এবং অচেনা অনেক লোকের ভীড়ে। উজ্জ্বল দিবালয়ে, অথবা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে অশান্ত হৃদয়ে কেহ কেহ লাল নীল জামা পড়ে মাথায় টুপি পড়ে, কেহ আবার হাতে তসবিহ নিয়ে মুখে দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে হাহুতাশ করছে, কেউ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে জ্ঞান হারাচ্ছে, কেউ আবার মনে মনে যার যার মিশ্র অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে। কেহ কেহ আমাকে কোথায় দাফন করবে, কে বা কারা সে দাফনের নিমিত্তে কোথায় আমার কবরখানা রচিত হবে এই ব্যস্ততায় এদিক সেদিক ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ আমাকে পেয়ে হারালো, আবার কেউ আমাকে না পেয়েই হারালো। কেউ কেউ আবার অধিকার নিয়ে মনে মনে ছক কষে অশান্ত রুপ ধরিয়া বিলাপ করবে, কেউ আবার অধিকার পুনরুদ্ধার হবে এই আশঙ্কায় প্রহর গুনবে। কারো জন্য আমার এই প্রস্থান হবে মর্মান্তিক আবার কারো জন্য হবে অতীব সুখের।

এদিনে সমস্ত সিডিউল মোতাবেক সব ঠিক থাকলেও আমার জন্য আর কেউ অপেক্ষা করবে না। প্রতিদিনের ব্যস্ততার ক্যালেন্ডারটি আর আগের মতো সরব হয়ে উঠবে না। ঘরির কাটায় কমবেশি হলেও তাতে কিছুই যাবে আসবে না আজ আমার, আজ আমার কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়াও থাকবে না। সারাবিশ্ব যেইভাবে চলতেছিলো ঠিক আগের মতোই এ জগতের সব কিছুই চলবে। এক মুহূর্তের জন্যও দিনের সময়কাল পরিবর্তিত হবে না, না চাঁদ তার উদিত হবার বা ডুবে যাবার কোনো ব্যতিক্রমী নিদর্শন প্রকাশ করবে। না নদীর জোয়ার ভাটার কোনো দিক বা গতি পরিবর্তন হবে। না সুর্য এক সেকেন্ড পরে বা আগে উত্থিত হবে। পাখিরা সময় মতোই নিজের নীড় হতে খাদ্যানেসে বের হয়ে যাবে, রাখালগন তাদের গরূ বাছুর নিয়ে ভাটিয়ালী গান গাইতে গাইতে কোনো এক মেঠো পথে হারিয়ে যাবে। এমনটিই তো হয়ে এসছে বরাবর প্রতিটি মানুষের জীবন সায়াহ্নে।

যে সম্পদ আমি আমার সারাজীবন ধরে আহরন করেছি, যা প্রতিনিয়ত রক্ষা করবার জন্য চারিপাশে সতর্ক দ্রিস্টি দিয়া পাহাড়া দিয়াছি, তা ওইদিন অন্য কারো হাতে চলে যাবে। সেটা নিয়ে বা কে নিলো, কেনো নিলো এই নিয়ে আমার কোনো কিছুই করবার থাকবে না। আমাকে যারা কখনোই ভালোবাসে নাই, যারা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্টে দেখার পায়তারা করত, তাদের উদ্ধত চাহনী কিংবা দ্রিস্টিভঙ্গি আমাকে আর কোনোভাবেই আজ আহত করবে না। না আমি তাদের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করবো। যে তর্কে জিতবার জন্য আমি খন্ড খন্ড যুক্তি প্রকাশ করে আত্মতৃপ্ত হয়ে হাসিমুখে চারিদিকে বীরের মতো চলমান থাকতাম, সেই তর্ক এখন আর আমার কোনো কিছুই আনন্দ দান করবে না। আমার প্রতিদিনের জরুরি মেইল কিংবা টেক্সট ম্যাসেজের প্রতি আমার আর কোনো তাড়াহুড়া থাকবে না। যাদের বিরুদ্ধে আমার কতইনা রিগ্রেটে ছিলো, জিদ ছিলো, প্রতিশোধের আগুনে যা আমি বহুকাল নিদ্রাবিহিন রাত কাটিয়ে দিয়েছি, সেটার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে না, না আমার মনের মধ্যে এইসবের কোন প্রভাব ফেলবে।

আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে, আমার ওজন বেড়ে যাবে এই ভেবে আমার রোজকার দিনের খাদ্যাভ্যাসে কোন পরিবর্তন কিংবা আমার সাদা চুলে কালো করবার বাসনা এসব কিছুর আর কোনো প্রয়োজন হবে না, না এসব আমাকে আর বিচলিত করবে। আমার ব্যবসা, আমার সম্মান, আমার প্রতিপত্তি যার জন্য আমি প্রতিনিয়ত ভাবিয়া ভাবিয়া, নিদ্রাবিহিন কষ্ট করেছি, কিংবা কিভাবে কি করলে আমার সব কলেবর বৃদ্ধি হবে ইত্যাদির জন্য প্রানপন চেষ্টায় লিপ্ত ছিলাম, সেই ব্যবসা, সম্মান কিংবা প্রতিপত্তি আজ হতে রহিত হয়ে তা অন্যের হাত ধরেই চলতে থাকবে। ছোট কিংবা বড় যতো বড়ই অনুশোচনা হোক না কেনো, ক্লান্তি কিংবা কষ্ট যাই হোক না কেন, তাহা আজ আর কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করবে না। না আমাকে আর রাত জাগাইয়া তা নিয়া ভাববার কোন অবকাশ দিবে। জীবনের রহস্যময়তা, কিংবা মৃত্যুর উদাসিনতা যা আমার মন বহুবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, তা আজ এক নিমিষের মধ্যেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। জীবন কি, মৃত্যু কি, জিবনের পরে মৃত্যুর কি গন্তব্য যা নিয়া আমি বহুবার তর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম, যুক্তি খুজেছিলাম, আজ সব কিছুর সঠিক তথ্য আমার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। ঈশ্বর কি, ঈশ্বর আদৌ আছেন কিনা, ধর্ম কি, এ জগত কি, কিসের উপর এই বিশ্ব ভ্রমান্ড দাঁড়িয়ে আছে, কি তার রহস্য, কি তার পরিচালক, আমার জীবনের মুল কি উদ্দেশ্য ছিলো যার জন্য এই প্রিথিবীতে আসা, আজ সব কিছু আমার কাছে দিনের আলোর মতো ফকফকা হয়ে যাবে।

আমার অনেক অসমাপ্ত কাজ যা করবার জন্য আমি জল্পনাকল্পনা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম, তা আজ সব কিছুর ইতি টানিয়া আমাকে নিয়ে যাবে কোনো এক সুদুর অজানা একস্থানে যা আমি এর আগে একবারের জন্যও বিচরন করি নাই।

আজ এই শান্ত শরীরে আমার চারিপাশের সবাইকে যেনো অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করতেছে কিন্তু আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়েছে, আমার কণ্ঠনালি রুদ্ধ হয়ে গেছে, আমার বাহু, আমার পা, আমার চোখ, আমার যাবতীয় ক্ষমতা আজ রহিত হয়ে একটি ছোট খাটিয়ায় আমি এমন করে পংগু বোবা হয়ে শুয়ে আছি যা অবশ্যই হবে বলে আমি একদা জানতাম কিন্তু ইহা যে আজই তা আমি কখনো মনে মনে কিংবা শারীরিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। অথচ আমার এই দিনের জন্য একবারের মতোও কি প্রস্তুতু নেয়া দরকার ছিল না? বা আমার কি কি করনীয় ছিলো সেই ব্যাপারে আমি কখনোই নিজেকে তৈরী করি নাই কেনো? যে সব সম্পত্তি, যশ, সম্পদ অথবা লোভ যাই বলি না কেনো, সেইসব  কারনে আজকের দিনের কোনো প্রুস্তুতি  আমার নেয়া হয় নাই, অথচ এইসব সম্পত্তি কিংবা সম্পদের বিনিময়েও আজ আমি এই পরিস্থিতি হইতে মুক্ত হতে পারছি না, পারবোও না।

যে ঘরটিতে একচ্ছত্র আমার অধিকার ছিলো, যার প্রতিটি কোনায় কোনায় আমার হাতের স্পর্শ, আমার পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছিলো, তার থেকে আজ আমাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে আমি জুতা মাড়িয়ে, সিগারেট ফুকে পায়ে দলিয়া পিছনে ফেলে ফেলকনি খাটে বসে আরাম করে বসতাম, আজ সেই ফেলকনি খাট আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে ওই জুতা মাড়ানো স্থানটিই আমার জন্য বরাদ্ধ হয়ে রয়েছে। আমি আমার নামটিও আজ হারিয়ে ফেলেছি। আমাকে আর কেহই আমার সেই প্রিয় নামটি ধরে, কিংবা আমার ছোট মেয়ের অতি আদরের ডাকটি ধরে আমাকে গলা জড়িয়ে সম্বোধন করবে না। আমি নিতান্তই একটি লাশের নামে পরিচিত হয়ে এই উজ্জ্বল নীলাকাশ সমৃদ্ধ প্রিথিবী হতে সবার আড়ালে চলে যাবো।

অফিসে যাবার প্রাক্কালে যে সুন্দরী বউটি বারবার জিজ্ঞাসা করত কখন আবার বাসায় ফিরবো, কিংবা আজ অফিস হতে ফিরতে দেরী হবে কিনা, অথবা বিদেশে যাত্রাকালে মেয়েদের এই আবদার, ওই আব্দারের লিস্ট সম্বলিত দাবীনামার মতো আজ আর কেহই আমাকে কিছুই জিজ্ঞেসা করবে না, কখন আবার বাসায় ফিরে আসবো, কিংবা কেহ আমার সাথে যাবার জন্যও বায়না ধরবে না। ইহা এমন এক যাত্রা যেথায় কেহই কাহারো সাথী হতে ইচ্ছুক নহে।

যারা আমাকে অনেক ভালোবেসেছে, আর যারা আমাকে ঘৃণা করেছে, তাদের উভয় পক্ষই আজ আমার এই শেষ যাত্রায় হয়ত শামিল হয়ে যার যার ভাবনায় লিপ্ত থাকবেন। পাড়া প্রতিবেশিরা অনেকেই বিলাপ করে, কেউ আবার ফিস ফিস করে কত অজানা তথ্য নিজ থেকে মনগড়া কাহিনী বলে আত্মতৃপ্তি পাবেন, যার প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমার আর থাকবে না। অনেক মনগড়া কাহিনী সুর আর তাল হয়ে বাতাসের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে আবার অনেক বীর বাহাদুরের মতো অনেক কল্পকাহিনীও তার সাথে মুখে মুখে প্রচারিত হবে, হয়ত তার কোনোটাই আমার প্রাপ্য নয়। মজার ব্যাপার হলো যে, দিনের আলো অন্যান্য দিনের মতোই সঠিক নিয়মে তার সিডিউল চলতে থাকবে, পাখিরা সন্ধ্যায় যার যার নীড়ে ফিরে আসবে, পথিক তার নিজ গন্তব্যে সঠিক সময়েই ঘরে ফিরে যাবে, শুধু আমার বেলায় আর কোনো কিছুই আগের মতো চলবে না। এক সময় সবাই আমাকে কাধে করে, ঈশ্বরের নাম জপতে জপতে কোনো একস্থানে মাটির তলে পুতে এসে চা চক্রে লিপ্ত হবেন। এক সময় রাত ঘনিয়ে আসবে, চাঁদ উঠবে, হয়ত বৃষ্টিও হতে পারে। আমি বৃষ্টির পানিতে গলিয়া যাওয়া মাটির সাথে মিশিয়া একাকার হয়ে যাবো। তখন হয়ত কেউ টিভির সামনে বসে কোনো এক আনন্দঘন সিরিয়াল দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়বেন। আর আমি একা অন্ধকার একটি মাটির গর্তে সারা জীবিনের জন্য ঘুমিয়ে থাকবো। সময়ের আবর্তে এক সময় আমি যে ছিলাম এই পৃথিবীতে সেটা সবার মন এবং মস্তিস্ক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এটাই যদি হয় জীবন, তাহলে কিসের নেশায় আমি এতো মসগুল? সব কিছুই ভুল এই পৃথিবীর। একাই এসেছি, একা যাওয়ার জন্যই এসেছি। মাঝে যাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, তারাও একাই এবং তারা আমার মতোই একদিন ভুলের ইতিহাসে বিলীন হয়ে যাবেন।  

আমি জানি আমি তোমাদেরকে আর কিছুই বলতে পারব না। যদি ইহাই হয়ে থাকে, তাহলে আজ আমার জীবনের শেষ বার্তাটুকু তোমাদের বলে যাই, আর ক্ষমা প্রার্থনা করি যে, যদি কারো মনে, অন্তরে, শরীরে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, স্বার্থের কারনে বা বিনা স্বার্থে আমার অগোচরে কোনদিন আঘাত করে থাকি, যদি আমার দ্বারা এমন কোনো কাজ হয়ে থাকে যা উচিত ছিলো না, যা অধিকার খর্ব হয়েছে বলে মনে হয়, কিংবা আমার দ্বারা জুলুম হয়েছে বলে মনে মনে অনেক অভিশাপ দিয়াছেন, আমাকে সবাই খাস হৃদয়ে অনুশোচনাপূর্বক ক্ষমা করে দিবেন। আমিও আপনাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। আমি আমার দায়িত্ত কতটুকু পালন করতে পেরেছি,, সেই বিশ্লেষণ আমার উত্তরসুরী, আমার পরিবার, আমার সমাজের উপর। আমার পরিবার, আমার সমাজ আমাকে কতটুকু দিয়াছিলো সেই বিশ্লেষণ আমার কাছে আর নাই তবে আমি আপনাদের সহিত ভালো একটা সময় কাটিয়ে গেলাম এটাই আমার জন্য অনেক ছিলো। 

যুগে যুগে এই প্রিথিবীতে আমার মতো সব উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, রাজা বাদশা, হুজুর কামেল কিংবা দস্যু সবাই খালি হাতেই কেউ ভালবাসায় সিক্ত হয়ে কেউ আবার করুনার জল নিয়েই এই অসীম নীলাকাশ, গভীর সমুদ্র কিংবা পাহারের ঘন শ্যামল সুন্দর ছবি বুকেই নিয়া একাই সব ছেড়ে চলে গেছেন। এই শ্যামল ভালোবাসা, সম্পদ, সম্মান, কিংবা যশের জন্য কোনো রাজা, সম্রাট কিংবা শাসক কখনোই আর ফিরে আসে নাই। আমিও আর তোমাদের এই সমাজে ফিরবো না। তবে জায়গাটা ছেড়ে যেতে আজ আমার বড্ড মায়া আর কষ্ট হচ্ছে। ভালো থেকো তোমরা।

এটা কি শুধুই কলম বন্ধু?

WAS IT ONLY A PEN FRIENDSHIP?

Mandy and Ali had been sitting face to face without any talk for a quite long time as if both of them are thinking something very deeply about themselves connecting together. They might be calculating something. What they are thinking? They may think so many things, days, or many moments, or so many stories...

Mindy broke the silence.

-How is your conjugal life passing Ali! It might be very enjoyable, romantic and very emotional! It has to be. Carla also used to tell me like that and she was very much greedy for it.

-What Carla used to tell more? Ali wanted to know very reluctantly, as if he knows everything what Carla used to think but it will be very interesting to know from someone other than Carla. Ali had been looking to Mindy with a far eye. He has gone back to somewhere beyond Mandy's visual distance.

-Whose picture is this, Habib?

-My younger brother. Very nice a boy.

-What does he do now?

-Just going to school like you go.

-Can I write to him?

- You may try, Habib replied back.

And I am writing you now Ali.

This was her first introduction in her first letter. Ali was recollecting his memories. He took a big breath. He was only class nine then. An unbounded life, listening none and doing whatever wishes. Whenever getting time, trying to play in the field. Replying to Carla's letter was not a big issue, Ali thought. He dropped it aside. But next day when Ali was standing in the House line, enjoying the beauty of the nature, got second letter. This time it seemed to be a very weightfull one. Might have been full of photographs. And it was.

Ali, after his lunch, opened the letter and found variety types of photographs. Carla wrote, she was counting the days when she would be getting his reply. Ali looked at the pictures for quite long time one after another. Ali was very considerated. But to tell you frankly no pictures could wave him. Ali was not impressed. She was not looking that pretty. May be his choice was more higher than what she was. Ali kept all the pictures under his mattress and tried to sleep. But Carla was some kind of special character who did not lay herself in the mass believed concept of society. Rather had been waiting to choose someone as a personal choice. She kept on writing to Ali till reply reached to her. She was not sure about anything. So why to be puzzled unnecessarily.  Ali got the third letter. It was a very interesting one!

-Don't you get my letters Ali? She wrote. If you get, please write me even informing you won't write.

Ali, this time, became a little bit serious. Ali decided to write that he would be very busy and would not be able to write her.

When he was preparing to write like this. He got the next letter. Ali now could not track the number of the letters. She wrote a very interesting story.

She had a cousin named John. He was disturbing her a lot, telling that he loved her. But she did not like the proposal. Everyday she was been criticized by her schoolmates except Mindy. Carla did not hide anything from Mindy. Mindy used to know all about Carla and her stories. Others used to criticize because everybody used to go out with their girlfriends and boyfriends. But Carla did not go. She used to wait for the reply of her letters. Yesterday John had stolen her fifty-dollar from her bag. She felt bad but again got pleasure thinking it happened because she loved Ali.

Ali deeply was thinking about the matter. Should it be told through his bother, Habib that he was not thinking about Carla? Nothing he could decide nor could stand on his decision. He could not write that he would be busy and could not write to her.

Ali mailed a new letter expressing, he was very happy receiving her letter.

Ali thought let he continued for some time and one-day when opportunity would come he would just write it. It is not the right time to say No, then she would get very big hurt.

Carla's next letter surprised Ali more. Everyday and everyday Ali was getting letters. Some day he was getting more than one letter. America became local place for Ali. At least in the case of mail. She wrote -

She read his reply more than sixty times. She could tell the contents of the letter as it was without opening. She expressed her feelings very boldly that she knew reply would come. Her belief could not be wrong. She was created for only Ali and so on...

 Ali felt more sympathy for Carla. What would he reply to her! Would he tell that he would not continue or he should respond? Both of the options were dangerous. Ali, thinking about Carla's determination, could not say No.

Ali replied,

He was also waiting for her letter. In addition to give her feelings, Ali wrote he was interested to know about her habits, liking disliking, boyfriends, etc.

It continued for long time. Ali was then in class twelve. Going out from the college very soon. Ali's all higher secondary examinations were over and their batch was given farewell from the college. Ali came back from the college campus to their village house directly. Everyone he met enroute gave him the message about his elder brother, Habib, who recently came back from America after six years. He was surprised that only Ali did not know anything about his elder brother's return from America. Habib was Ali's elder brother who was doing Ph.D. in USA. Carla's father was in the same university where Habib was doing this research works. With this connection Habib and Carla's family had easy go in each other's house. One day Carla came to Habib's apartment and

saw Ali's picture. That very day Carla asked Habib the first question-Whose picture was this?

Ali reached to his house in the afternoon. The day was about to set to the west. All his sisters and other relatives were giving a shining look and smiling face. Every body was happy on Habib's arrival. Today they have filled up their joy after Ali's arrival. It became then hundred percent presence of all family members. But Ali noticed some abnormalities amongst his relatives. It seemed everyone was hiding some interesting news from Ali. What was the story? Ali questioned himself. Ali could not find out the hidden story.

Ali met his brother at night when he returned home from outside. It was a very happy moment. Very less they could talk. They were extremely happy. There was no language between them. After a long time they could meet together. When Ali was in grade seven, Habib left the country. Ali now passed higher secondary examination. It was time for him to go for the university now. Quite a long time. Both of them had long talk. Habib narrated lot of story about America, its beauty and the cultures of the society. Sometimes Ali had been asking few questions. Sometimes he had been laughing like a small boy hearing his brother's experiences.  They woke upto midnight. Before finally going back to sleep, Habib told Ali that he had left something very expensive at Dhaka Teachers' Students Center (TSC). Next day early in the morning Ali should see once how it was without anybody's supervision. Ali should take the key and check it before the sun rose.

Ali got up from the bed early in the morning and started for Dhaka, TSC. When Ali reached at Dhaka, there were none in the street. A very few birds and crows were found around. There was hardly anyone walking in the main street. It seemed everyone was still sleeping. A few old guys having heart problem and needed short walk, only these kinds of people were found mostly. And its numbers were also very few. There were some young boys found passing by who wanted to be a professional foot baller going for practice in the far field. One-day his dream might come true. Ali found some smart girls too walking with very ugly looking guys. May be she needed some money for herself. She gave a company to the man at night. The earth does not give always a good look at all the morning.

Ali entered inside TSC and turned left. He had something to check in room number six. Ali brought out the key handed over by his elder brother, Habib. He tried to open the door of number sixth room.

But what is this! The key could open the room but it seemed someone was inside it. How it was possible? The room was locked from outside and someone was inside! He might

be doing mistake. He again locked the door and checked for the next door, seven then five. But that key could open none of the doors. Ali this time opened the sixth number room and started pushing inside. Very politely but anxiously asked whether anyone was inside the room or not. A lady voice replied back.

-Please hold for a minute dear, I am coming.

Ali was waiting with quick heartbeats. He was hearing the sound of her footsteps inside and opening sound of the first door.  The lady opened the last door too.

Ali was not only surprised but it deemed that he was falling on the ground. What was he seeing in front of him? Why Habib did not tell him anything about her! Was it preplanned to surprise him? He was guessing things quickly and story became very clear what everybody was hiding from him!

Carla was shouting with top of her voice.

-Oh Jesus! At last you have come! I was just waiting for you whole night!

Ali could not say anything. First reason Ali was not at all prepared to see Carla. And second reason, Ali was not fluent in English, as Carla was being American. Carla did not know Bengali. Ali kept standing for few moments. Carla again shouted and held Ali's hand. Pulling him inside the room.

Carla was putting on sleeping gown. Very transparent. Did Carla decided  that deliberately? Ali set down in the chair. He was feeling very shy. With very poor English Ali informed Carla that he was not good at English. He only could catch slow speedy conversation. Carla understood him very closely. Carla smiled very nicely and looked at Ali.

- I am very sorry dear. I was extremely happy when I have seen you. Carla replied.

She pulled another chair and set in front of Ali. Keeping her two hands in her chicks, she just keep on looking at Ali.

-What a beautiful morning today, is not it Ali?

How are you, Carla? Ali inquired. Giving no reply to Carla's question.

Carla leaned against Ali thighs. Her beautiful white body was emanating beautiful light, her breasts were visible partially but it was not looking ugly.

-I don't know how I am now, but there is none who is more happier than me at this moment. Carla whispered.

Ali touched Carla. Carla was whipping and her eyes were full of tears.

Carla was not looking like those pictures he saw in the photographs. She was much better looking and beautiful. Carla was exactly like what Ali was thinking for. Ali kissed her head and hairs. Both of them became normal.  The language of love is not either

Bengali or English. It is something beyond the sound. There was very little tension, anxiety and unknowingness  amongst them.

-What you ate last night Carla? Asked Ali..

-Just nothing but mango. Habib stored some dry food for me and some seasonal fruits.

-What you like to have in breakfast? Ali asked.

-You would be coming early in the morning and Habib told you would be deciding what we should take in lunch and dinner. I think you have also not eaten anything in the morning! Carla inquired him and got up to bring some grapes.

Ali was looking at Carla. Ali seemed to be very happy to get Carla. He really loved Carla Dorain Wilson.   They had lots of talk. They talked about love, exchanged lots of feeling for each other. Carla stayed here for next twenty-two days.

During this long stay, both of them had been visiting many places. People also became very surprised and inquisitive to see both of us together. One Bengali boy was roaming around with one white girl holding the hands together. Naturally it was a rare scenario.

There was a study excursion arranged from her school. It was scheduled for Australia. But Carla gave the option for Bangladesh. Habib was coming back to Bangladesh to meet his family and in the same time he would be looking for getting married. Carla wanted to join Habib to visit Bangladesh to meet Ali during her study excursion. Habib did not inform this message to Ali at all to make a big surprise for him, his younger brother. Ali was really surprised.

The first night's story was very romantic.

 Whole day Ali was waiting for his brother, if he comes. But he did not turn up. It was evening. Ali was thinking time and again  that there was only one bed in the room. All the items given in the room were for single man. If he goes back at night, how she will be staying here alone? Will she allow Ali to go back leaving her? If she does not allow, than where he will be sleeping? Moreover, Ali was not interested to leave the company of Carla.

Even though Ali informed Carla that he would be right back in the next morning.

Carla looked at him astonishingly and said-

-What are you talking? You will be going back tonight? No baby, we will stay here together. Don't you know that I had been waiting since long!

-But there is no bed for two men. Ali said.

-Nothing worries! We will be sharing it together. Otherwise we will be sharing our lives together for whole life! Carla was very determined. She hugged Ali warmly.

None could sleep that night. Carla could not sleep because the day-night system in Bangladesh was absolutely reverse than that of America. Night in Bangladesh is the day

for America. It was a problem for Carla. But Ali could not sleep because Carla was awaking. Whole night passed without sleep. But Ali was not feeling any tiredness at all too. They shared one pillow together, shared one bed cover together, and what else they shared? They shared their life, they made a basement of the building, two men dream. A single dream which was dreamt together.

-It was very nice night I had ever in my life. Ali thought.

Was it called wedding night? They did not had any sex, did not had any violation anytime. But every time Ali thinks now, seemed to him that it was a wedding night for him.

-Several times we hugged together, I felt her warm hearts, beautiful breasts. But never ever I felt it to be touched. It was very pious relation, sacred love. Ali was thinking.

Next early in the morning, they both entered into the wet room, washed their hands and mouths though it was not necessary. Carla was laughing and telling Ali,

-How beautiful people you are!

-Why? Ali asked.

-It can not be thought that an American adult boy stayed night with an adult American girl and there was no sex between them. I can feel very much safe in the hands of man

like you people. I did not do the mistake Ali! I always wanted someone who will love me and care me. Only physical sex should not be the basis of love. Love should be such so that even when I will be an old lady having hundred years' ages, still my husband will love me as he used to do from the beginning. Carla stated.

- Can I kiss you on your forehead Ali? Carla asked Ali through the mirror.

Ali extended his hand towards Carla and hugged her. Both of them were looking through the mirror. A beautiful pair submerging together.

Carla was very depressed for last few days. Everyday it passed everyday she used to tell- she does not want to go back to America. She would not feel comfortable in USA. Ali used to give her consolation only that one-day they would meet together forever. But Ali knew there could nothing be more attractive consolation than that of saying, please do not go and stay with me.  Ali was also not feeling comfortable as the days had been passing very fast.

Night before her departure, both could not sleep for a single moment. All Ali's relatives intentionally did not disturbed them. Most probably they also had wanted Ali to make permanent friendship with Carla. Besides they had tremendous trust on him about his dealings with Carla. But Ali could not keep his trust to them.

-Why should I deprive my lady from her rights? Is religion the main bondage between two human being? I did not believe. Ali was questioning himself.

-We were lying together. Carla kept her head on my chest and kept mum. I hold her head and brought more close to my eyes. She was crying. Her eyes were shining with tears. The lights helped her tears to be more pathetic. I kissed Carla, my beloved lady. I don't want to leave you, I want you to stay here, I want to share my everything with you. No secret no religion no law is bigger than the love. He held her tightly.

Ali peeled off her gown. God created woman with special attention. Ali imagined. The creation was not simple. The art of the body of the woman is not geometric rather it is artistic. The eyes tells about love, the nose, the lips, the breast all that a woman has tell the music of immortal love. Ali touched her breast with his wild lips. Carla holds Ali's head with her two beautiful hands tempting his hairs.

Ali lied over Carla.

Carla was just breaking with my kisses, with my movements and my every touch. Her tip of the nipple was very hard. Her eyes were closed, mouth was shut but making the noise of the image of love. Her legs were moving apart from each other.

Did we talk anything then? I can not remember what was the subject we discussed. Was it love? Was it anything like science or literature? We had been crossing the ocean of love, may be interchanging the waves of new generation. I opened my two eyes. I saw my Carla's full nude body. How beautiful breast a lady can possess? Is it more beautiful than that of Carla? How beautiful a design of figure God can create? Was it more flawless? I do not have any idea. I have seen only Carla. Carla was the best.

After a long time, Carla got up and sat down nude. Ali marked himself, was he greedy for her sex anytime?  Ali thought.

After that visit, Carla used to be more aggressive on expressing love. Ali understood it by her last letters. Ali also became more aggressive. In every moment they remember each other.

Carla was mentally preparing to leave America and settle down with Ali. She was doing some small job. She added all the salary and one day bought an air ticket for Bangladesh. She wrote one letter too to mail Ali informing about her plan. She kept all these in her table and forgot to hide from other members of the family. Her father saw these two things. He was terribly shocked and equally sad. He took away her passport including the air ticket. Father charged her for doing so. She was warned by her father not to think like that anymore. If she does so she will be sent to the hostel at her own cost.

Carla agreed to the last proposal. She left the house. Her mother was also not favoring her. She was driving the car. It was a very foggy and snowing day. Carla thought she

should immediately inform Ali what she did. She requested her brother, Roy, to mail the letter that she wrote before.

Roy went to the post box and Carla was waiting in the car on. All on a sudden, a big lorry hit the car from the back. Carla with her car went out of the road. Both of them had a fall of fifty feet with number of summersaults. Carla lost her senses, got number of injuries, she was almost dead. Roy and others took her in the hospital.

-Is Carla dying, doctor? Daisy, Carla's mother, asked doctor.

-We are not yet sure about her condition but it is critical no doubt. Doctor replied.

After few hours, Carla could say something but not readable.  Out of all talks, she could only tell twice "Ali". The doctors were not also very much confident what was to be done.  Neither they could find out the meaning of this word "Ali".

Carla's mother thinking nothing but ultimately made a phone call to Ali in Bangladesh.

- Ali, can you come to USA right now? Carla got accident and she is in comma. She wants to see you. She is only uttering your name. Please arrange to come as quickly as possible. I promise you, I will honor Carla, if she survive this time.

Ali could not say anything. Because Ali knows that he can not afford to go to USA right now because of lots of factors. Money was the acute problem for Ali now. Moreover his office will not permit him to go to USA for this reason. What a nation.  One man is taking farewell forever but the law does not permit other to see her. Ali took breath deeply.

Carla died after nine days. In between this she did not wake for a single time. How can she talk? She was busy with me here. No body knew. I gave her my last minutes. She uttered number of times-

-I wanted an Indian husband. I got it but I could not enjoy it. If I could enjoy it I could tell you how beautiful these Indian husband! You will have full freedom of power in the family. You may have different views but husband will not deprive you from love. They will never say, go out of my house.

Ali, after eighteen days, received the letter written by Carla, mailed by Roy. In that she wrote,

She will be coming to me in the next summer. I should be prepared myself for receiving her in the airport. She will be putting on red skirt matching with blue magenta color headgear. She will have a very beautiful rose in her hand.  She will mind if I do not kiss her in open mass. So what this is not in our Bengali tradition but I have to do it for her.  I had visited numbers of time the airport. But I never found this combination with anyone. Ali loved Carla so much. Ali promised if anytime he meets Carla, he would hug Carla in mass and had a kiss in public. No matter who thinks what. There is lot of time the earth has rotated the full rotations. Every time summer came but Carla did not come.

Today Ali has come to USA for a visit. Since the year Carla died in 1981 and today, there is seventeen years gap. Everything might have changed. Ali could not differentiate. If Carla would remain beside him, he could ask Carla about it. Ali does not get any attraction in USA because Ali knows without Carla in USA it will have no meaning.

Ali made a phone call to Mindy. His brother Habib gave Ali the phone number of Mindy's house.  Mindy was very happy.

Today, the X-MAS day we all family members always want to meet together. I considered Carla was my family member. You are that man to whom my one of the best friend used to love so much, should I not invite you in my house! Mindy stated to Ali.

Ali taking a long breath replied Mindy.

-Mindy.

-Continue. Mindy replied.

-How many days a man can wait? Ali questioned Mindy.

- As long as someone can pull on alone? Mindy replied, you did not do wrong by getting married someone. If I would be in your position I would do the similar action too.

-I might get marry someone but I did not forget Carla at all .My lady Arundhuty is just like Carla. What I wanted from Carla, I am now getting it from Arundhuty too. Everyday I remember Carla by loving Arundhuty. Ali answered back very nicely to Mindy.

Mindy was also sitting the same way Carla used to sit in the table.

Mindy stated, Carla and Arundhuty both of them are lucky. I had also same mentality like Carla. I also wanted an Indian husband. Look if I would had an Indian husband, he would not leave me like this! We might have temporary emotions but not permanent separation.

Ali felt Mindy very deeply. Mindy is alone. She wants love. But what he can do for her? Mindy does not know that everybody may be Indian but everybody is not Ali. There is a big difference between these two.

After one-month stay, when Ali was leaving USA, Mindy requested Ali to stay at her residence. Mindy directly ensured Ali, she knows the customs of Bangladesh. Ali kept her request and went to her house. Mindy dressed her with Shari and blouse, sat in front of the mirror.

She said,

-Can I give you a kiss on your forehead, Ali?

Ali told nothing.

Logan airport. A big gathering of people. Everybody was busy either for clearing his or her goods or saying good-byes to his or her beloved man. Ali was boarding the plane. It was early in very morning. Mindy came upto the last place from where we can see together. I took my seat and looking at Mindy. Mindy kept on looking till the plane took off in the sky. Ali left USA forever. Mindy was kept on looking in the sky till the plane became very blurred. Her eyes might be full of tears. Johan, her only son five years old, pulled her hand and might inquire,

-Mom, will uncle come back soon!

Mindy could not reply back to Johan. She just holds him in her lap and hugged very tightly. Mindy did not wan to cry but her eyes could not control the wave of the tears.

 What Ali could do? Ali could do three things. What Ali did, he did the right thing. Or he could take her in Bangladesh along with him. Or Ali could stay back in USA with Mindy. But what would be for Carla and Arundhuty?

The plane was above fifty thousand feet in the sky. The sky was full of white cloud, there are many passengers trying to sleep and Ali was kept on looking towards white clouds outside. So many things Ali was passing by but many of them were not visible to him. Some were not correctly identified. Ali might be thinking about Carla, Arundhuty and Mindy together.

There are so many things happened in this earth. Many of them remain untold, hidden and unseen. Very few lucky or unlucky people might meet them en-route but hardly anyone cares them. Those who cares they don’t get it’s head or tail nor the start or end. Even some one runs agter the blind zone but God is always mysterious and keeps some mystery always hidden to open. Only God knows what is the mystery lied here. Ali saw the old passenger, a man of seventy years old, sitting beside him sleeping like a small baby.

বোদার গল্প

আলমাসের উপর দায়িত্ব পড়েছে বোদার

১৯৯১-৯২ সাল।

আলমাসের উপর দায়িত্ব পড়েছে বোদার। আলমাস সহজ সরল ছেলে। এখনো মুছ-দারি ভালমত গজায় নাই, তাঁর উপর ব্যাচলর। কোন কিছুই করার নাই, বোদার কাজ আলমাসের। আলমাস প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফৌজ সামন্ত, গাড়ি সব কিছু নিয়া আলমাস রেডি হচ্ছে বোদার কাজে।

গরম মৌসুম, চারিদিকে গরম হাওয়া। বোদায় নাকি বাতাস কম, যাও আছে তাও আবার যথেষ্ট পরিমান অক্সিজেন নাই, একবার যদি কেউ বোদার বাতাস নাকে নেয়, তাঁর নাক নাকি বাতাসের আর অন্য কোন গন্ধ বুঝে না।

আলমাস বোদাটা দেখল, এর একটা ম্যাপও একে ফেলল। জায়গায় জায়গায় গর্ত, কোন জায়গা দিয়ে কি করা যায়, সারারাত আলমাস ঐ বোদাকে নিয়াই থাকল। সব জায়গা দিয়ে সব কিছু নিয়া ঢোকা যাবে না বলে আলমাস বোদার কোথাও কোথাও টিপে টিপে, কখন বা পায়ে চাপ দিয়ে দিয়ে পরিক্ষা করে দেখে নিল বোদার কোন জায়গাটা শক্ত আর কোন জায়গাটা নরম। নরম জায়গায় সৈনিকদেরকে যেতে নিষেধ করে দিলেন আলমাস সাহেব। নরম জায়গায় কাজ করার আগে আলমাস সাহেবকে আগে থেকেই জানাতে হবে বলে আলমাস তাঁর সুবেদারকে বলে দিলেন।

আলমাসের ওসি হচ্ছেন মেজর ইকবাল সাহেব। নিতান্তই ভদ্রলোক। তিনি বিবাহিত। তাঁর একজন মেয়ে আছে। ওনি সব সময় মুচকি মুচকি হাসেন। কথা কম বলেন, কিন্তু আলমাসের সঙ্গে খুব খাতির। আলমাস ওসি সাহেবকে নতুন বোদা দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। ওসি সাহেব এর আগেও বোদা দেখেছেন কিন্তু বোদা দেখা আর বোদা সার্ভে করা এক জিনিষ নয়। তাই ওসি সাহেব নতুন উদ্যমে বোদা সার্ভের কাজ আলমাস কেমন করে করবে তাঁর পরিকল্পনা দেখার জন্য তিনিও বোদায় এলেন।

ওনি যখন বোদায় পা রাখলেন, তখন ভরদুপুর। বোদার বাতাস খুব গরম, খরখরা বোদার আশপাশ। জঙ্গল খুব একটা নাই, মনে হয় কে বা কারা যেন বোদাকে একেবারে ক্লিন শেভের মত পরিস্কার করে রেখেছে। মাঝে মাঝে দু একটা খালের মত আঁকাবাঁকা শুকনা কিছু দেখা যায় কিন্তু বহুদিন কেউ ওখানে পানি দেয় নাই বলে মরা জঙ্গলগুলু হলদে বা তামাটে রঙ ধারন করে আছে। ঐ হলদে বা তামাটে জায়গায় বসলে পাছার চামড়ায় চুলকানি লাগে।

ওসি সাহেব আলমাসকে নিয়ে বোদার চারিদিক দেখলেন। আলমাসের আকা বোদার ম্যাপে ওসি সাহেব তাঁর নিজের মত করে লাল ওএইচপি মার্কার দিয়ে আরও কিছু একেঝুকে দিলেন। বোদা নিমিষেই লাল হয়ে গেল। আর অনেক কাটাকুটিতে বোদার ওরিজিনাল চেহারা পালটে কি যেন হয়ে গেল।

যাক, সন্ধ্যে হয়ে গেল। আলমাস আর ওসি সাহেব বাংলোয় ফিরে এলেন। বোদার বাইরের বাতাস আর বোদার বাংলোর বাতাসে অনেক তফাত। বাংলোর ভিতরে বোদা অনেক ঠাণ্ডা, বেশ গোছালো, আবার বেশ পরিস্কার। অনেক নামি দামি লোকেরা এই বোদা দেখতে আসে। আলমাস আর তাঁর ওসি নামিদামি মানুসের মধ্যেও একজন, তাই বোদার এডিসি সাহেব এই দুইজনকে বোদার সবচেয়ে সুন্দর স্থানে জায়গা দিয়ে বললেন, “স্যার, বোদা দেখতে হলে এই জায়াগায় থাকেন। এখানে বোদার আসল মজা পাবেন। বোদার এখানকার পানি মিস্টি কারন পাশে চিনির কল আছে, বোদার বাতাস এখানে খুব সুইট কারন ডিসি সাহেব এইখানে বোদার এস্পেসাল সুগন্ধি গাছ লাগিয়েছেন। নাক পরিস্কার হয়ে যাবে বোদার গন্ধে। এখানে একটা ফল আছে যার নাম একেবারে ভিন্ন। নামটা হচ্ছে “কন্যাকুমারি”। আসলে বোদার পুরান নাম কিন্তু এই “কন্যা কুমারি”। তাঁর মানে হচ্ছে “কন্যাকুমারী” বোদার ফল। একবার বোদার ফল খেলে আপনার জিহবা বার বার বোদার ফল খেতে মন চাইবে। ইচ্ছে করলে আপনি কিছু বোদার ফল সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন, বন্ধুবান্ধব্দের দেবেন। তারাও বোদাকে মনে রাখবে। বোদা আমার বড় প্রিয় স্যার।” এই বলে এডিসি সাহেব আলমাস আর ওর ওসিকে বোদার খাস জায়গায় রাত কাটানোর জন্য রেখে গেলেন।

ওসি সাহেব আলমাসকে জিজ্ঞেস করলেন, আলমাস , বোদা তোমার কেমন লাগে? আলমাস সহজ সরল ভাবে উত্তর দেয়, স্যার বোদা আমার কাছে ভাল লাগে। ওসি সাহেব, মুচকি মুচকি হাসেন। ওসি সাহেব খুব মজার লোক। আবারও আলমাস কে জিজ্ঞেস করেন, বোদার কোন জায়গাটা তোমার খুব পছন্দ? আলমাস নিতান্তই সহজ সরল ছেলে, উত্তর আসে, স্যার বোদার সব জায়গায় পানি পাওয়া যায় না, যেখানে একটু ভিজা ভিজা থাকে ঐ জায়গায় আমার থাকতে ভাল লাগে, শরির ঠাণ্ডা হয়, মনভরে যায়। ওসি সাহেব, আবার মুচকি মুচকি হাসেন।

ওসি সাহেব কয়েকদিন বোদার আনন্দ শেষ করে তিনি ফিরে যান তাঁর নিজের কর্মস্থলে। আর এদিকে আলমাস প্রতিদিন বোদার প্রতিটি স্থানে পায়ে পায়ে চলে, কখন স্পিড বেশী থাকে আবার কখন একেবারে থিতিয়ে যায়। যেদিন আলমাস বোদার ফলটা বেশী খায়, সেদিন আলমাসের স্পিড ভাল থাকে। আলমাস দিনের পর দিন বোদায় থাকে। আলমাস বড় ভাল লোক। ও কখন বোদার ক্ষতি করে নাই। বোদা আলমাসকে আজিবন মনে রাখবে।

আলমাসের ঐতিহাসিক ভাষণ

যে কয়টি ভাষণ পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছে, যেমন, আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবারগের স্পিচ, কিংবা মুজিবের ৭ই মার্চ এর ভাষণ কিংবা ঐ কালো লোকটির “আই হেভ এ ড্রিম” ইত্যাদি। আলমাসের এই ভাষণটাও বিখ্যাত হয়ে থাকতে পারত কিন্তু এটা মিডিয়ার পাল্লায় পড়ে নাই বিধায় জগতজুরে আলমাসের এই বিখ্যাত ভাষণটি আর বিখ্যাত হয়ে উঠে নাই। তবে আমার ধারনা, অন্তত টাচ ১৩ ফোরামে এই ভাষণটি বিখ্যাত হয়ে থাকবে। অনেকেই আলমাসের সেই বিখ্যাত ভাষণটি শুনে নাই কিন্তু আমি সরাসরি ঐ ভাষণ যখন ইতিহাস সৃষ্টি করছিল আমি সেখানে ছিলাম। আমি তোমাদের জন্য আলমাসের সে ভাষণটির অনুলিপি তোমাদের জ্ঞ্যাতারথে জানাব।

তারিখঃ
লিঙ্গপুর স্কুল

উপস্থিত সুধিজন, ভাই, বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীগন, আসসালামুয়ালাইকুম।

আপনারা জানেন যে, আমি প্রায় গত ছয় মাস যাবত আপনাদের বোদা নিয়া একাগ্র চিত্তে কাজ করেছি। চেষ্টা করেছি কিভাবে আপনাদের বোদার উন্নতি করা যায়। আমার বলতে দ্বিধা নাই আজ যে, আমি যেদিন প্রথম আপনাদের বোদাকে দেখি, তা ছিল সত্যি এক নোংরা, অপরিস্কার এবং দুরগন্ধময় এক বোদা। আপনাদের এই বোদার কোন ডিসিপ্লিন ছিল না, না এর রুপে, না এর গুনে। তারপরেও আমি দমে যাইনি। আমি আমার এই টিমকে নিয়ে রাত দিন আপনাদের বোদাকে নিয়া কাজ করার চেষ্টা করেছি।

আজ আপনারা নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, কি সুন্দর হয়েছে আপানাদের এই বোদার চেহারা। বোদার সব কিছু এখন পরিস্কার, কোথাও পানি জমে নাই, আর যেখানে পানি থাকার কথা সেখানেই পানি আছে, অহেতুক এর চারিধারে স্যাঁতস্যাঁত হয়ে থাকে না। বোদার এবড়ো থেবড়ো স্থানগুলো আমার সোনার ছেলেরা নিজের হাতে সেগুলো ঠিক করে দিয়েছে। বোদার যত ময়লা আবর্জনা ছিল, তা আমরা নিজ হাতে পরিস্কার করে দিয়েছি।
আমরা আজ চলে যাচ্ছি। এখন দাতিত্ত আপনাদের। আপনাদের বোদা আপনারা পরিস্কার রাখবেন। বোদার যে কোন জায়গায় থুথু ফেলবেন না। বোদার যত্ন নিবেন। ভবিষ্যতে এই বোদা থেকে অনেক সোনার ছেলেরা বের হবে, এদের সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার জন্যই বোদার যত্ন নেওয়া একান্ত কর্তব্য। বোদার যাকে তাকে বোদার ব্যাপারে মাথা ঘামাতে দেবেন না। বোদার ক্ষতি হয় এমন অনেক লোক আছে। যাকে তাকে বোদায় ঢোকাবেন না। বিশেষ করে রাতে বোদার ব্যাপারে আরও অধিক সতর্ক থাকবেন। প্রয়োজন হলে বোদার প্রবেশ পথে লাঠি রাখবেন যেন প্রয়োজনে লাঠি ব্যবহার করতে পারেন।

ভাইসব, আপনাদের বোদার কথা আমার মনে থাকবে। আজ আমি যে বোদা রেখে যাচ্ছি, আশা করি, আমার পরবর্তী বংশধররা যদি কখন এই বোদা দেখতে আসে, আমি যেন বলতে পারি, বোদা বড় সুন্দর।

মায়ের কাছে মেয়ের চিঠি

Dear Mom

Mama, in this strange world, I met multifarious categories and different types of people with different characteristics altogether. Many of the people seem to be similar and behave similarly. Their starts and endings look alike. Someone begins with charismatic start and ends with volatile situation; someone starts with confused situation and ends with futile consequences. That’s my experiences Mama in so far with such a little age to leave away in the past.

With my little experience, I don’t clearly understand a person instantly what he wants and what he runs ultimately for. But at times what my sixth sense tells me that many of the eyes speak distinct to its hunger ness and covetousness with lustful desire, many of those hearts don’t even speak anything but express many things in one look, and many souls are really so strong enough to be judged all over the time passed along with. Many factors get visible at times, the social amenities, social customs, human bondages, and others. Out of these what I understood one very distinct feature is the social amenities, which is only the clad of the these so called society but their dialects, customs and practices look alike to unholy ness, dirty, vile and despicable.  But Mama, there happens so many things in our area that cannot be even defined with the existing definitions also. I will tell you such an unveiling situation today and I need your guidance in literal voice.

Mama, I met a person, still unidentified, recently here in my world. She came all on a sudden from an unknown world and disarrayed my gardens, my thinking, and my pattern of behaviors that I settled it down with all my concentrations. Now it seems, I am influenced, I am affected seriously, and confused too in the order of the day.  She comes to me when I am alone, she appears to me when I am distressed, and she speaks to me with the same language the way I understand the ideas to be discussed. She exactly speaks the way you nourished me when I was a child, she looks very known person to me and it seems to me that I saw her somewhere sometimes. But Mama it frightens me also and it moved me from the point of impact. It always hunts me like a professional gun-man. Can you tell me Mama, what she wants from me, or who is she and what she looks from me? I don’t know it what is her demand and how to tackle her. This is the first instance that I am encountering a person like her. I am confused to look at her eyes, I am confused to look at her mortifications, and I am undone to her envious weal. She seems sometimes looking like a usual people around me, sometimes I find her some how different, a different person who has no agitations, has no demand but maximum time I feel I am judging her wrong. Her eyes do not speak vile, her eyes don’t show aggressiveness, and her eyes seem to be very cold indeed Mama. Can you tell me Mama, is there any place where people do not have any cohabitations, has no enamours? Is there anywhere humankind who do not exchange for his efforts? If there was none, then what this person wants to get from me? She might be the most venereal one whom people should worship her and have confident with devotion or she might be one of the most evil creatures that I never encountered before. But I don’t want to be surprised another time. If I would know things certainly what is in her, she could be one of the most ecstatically joyful event in your son’s life or I could make a decision to reject with violent forces and finish her forever. Your prayer for your son’s longevity would be successful but I am in a state of wearied, tired and exhausted stage Mama. I cannot take a chance at this time of my full moon night. The judgment I made against her in one moment proves to be a mistake in the next time and I again start afresh. But every time I am lost in the state of confusion.

Mama: she shows me the way of going alone in a serious turning points, she insists me to take an adventure along the road of the Caucasus mountain that I never travel, she wants me to experience a life with deity and humanity together. But how it can be possible Mama? How a person can be a God and a human in the same time? I cannot pull things alone anymore. My silence punishes me, my ignorance beats me up there, my affection takes me somewhere I can’t return it back again. What I should do Mama? It seems to me an ordeal test and I cannot be free from angularity anytime because it creates a dilemma between true and false, right and wrong all the time.  Someone must not be hurt without any reason, someone should not be rejected without any good cause and someone should not be punished for another person’s prediction too.

Mama, she tells the story that you told me once, he delineates the path that I wanted to follow, she exactly tells me to do things what nobody told me before that I cherished in my life, she creates an environment that I wanted to preserve in my memory but every time I am afraid because I don’t know how she came to know all these ? I don’t know how to honor her nether I know how to leave her. My past haunts me to take revenge for all those souls that went without any reason, I want to go alone and take the adventure of taking the risk of either victory or defeat alone, none and none to share it. I know that none will be able to agree with such a condition of leaving this beautiful world so early in a n encounter. Mama, you know those entire stories and you apprised me such feelings of those events mama.

Mama, This strange lady dements me in the moment of my leisure time, she intoxicates me when I am alone and she enrages me when I am with your heart totally. She seems to be a wild wind that excited me when I had calm and quite nights, she overwhelmed me in a critical position to decide either to leave or to be with her as one of the member of a family. But is it too easy to get a family member like you and me? A family has a different definition and identity Mama! It is not that I agree and it goes. Hi my mama, I know vilification and animadversion is a sin in my religion but don’t you think we all do so many vilifications all the time against a person who in fact doesn’t deserve such? How a person like this, should be treated Mom? Mama, you never told me a subject, called decision at confusion, which people suffer from indecision and confusion in the same time and in the same area. This lady is confusion in my life. I don’t understand her, I don’t understand the consequences of the events and I don’t know the conclusion of this relationship Mama. He is not navigable and seems a new appearance and revelation in my life. No body showed me the path of the light, no body told me about the consequences of the life and no body told me about my strength and weaknesses that I posses. She told me once. I want to discover her Mama. But how? In what way? In which capacity?

I know, this particular person might disappear when I would come to know that she was the right woman to whom I needed, I know the time will not wait for me and the deity will go away from me when I will be needing her much. She seems to be  an angle or a devil in both cases. Sometimes you need devil also in your life in different situation to be more experience and be stronger at the moment of the break-even-point. It seems, she loves me like a small boy at times with all apology, she loves me like an unbounded wild man whom she wants to sacrifice things on behalf of me and he respects me the way you taught me to respect a person. But I don’t know the result of such confidence on this unknown lady came from a different planet. Is she a human, a devil, a ghost, or a goddess!  She is a total confusion at the moment Mama.

Right at this moment, the logical fallacy seems to be un-ruled in my mind, a holy bed of logic seems to be undetermined in my life, a holy thread slung over the shoulder may be unnoticed within me but I am not atheistical Mama, thus the heavenly dome seems to be under a throb greatly, the sudden bustle of the heart looks like stopping in the middle of it‘s palpitation and trepidations.  I have no instruments to devise a plan to dismiss her unnecessarily, to in-contrive her illogically and finish her in stray.  Mama, will you tell me the ways that saves me from this ignorance?  You know your Babu and his mind in terms of spick and span. I need someone to guide me in the right directions and ways to follow, Mama. It has become a twisting, revered, and twirled circumstance in my world. I need your suggestions and advices. I am utterly harried into a motionless life. Let me not be a subject to the prey of the legacy of unsoundness, let me not be a subject to be referred as a culprit to be known by the people around me, and, Mama, let me not be the only person to be blamed who refused the deity that came alone the line of a humankind from the God as usual to your Babu’s life.

I tried to explain the strange lady within the religion also. The strange person seems to have no similar religion that I believe, but Mama, can you tell me what is called religion? A religion to her is a scuffle fight and has no effect on human bondage at all. But to me my religion is having a great influence over the total human life. The answers that I was looking for and rom a long time in my previous religion, I was unable to delve out, but here what I received is something untold and authentic. What your religion says about Beautification of woman body, Laws regarding menstruation, false menstruation, the laws But to me my religion is having a great influence over the total human life. The answers that I was looking for and from a long time in my previous religion, I was unable to delve out, but here what I received is something untold and authentic. What your religion says about Beautification of woman body, Laws regarding menstruation, false menstruation, the laws pertaining to woman’s dress and hejab, laws pertaining to marriage and divorce, and many laws pertaining to protect nobility and chastity of woman etc and many other questions I was looking for. Even the incident of birth of Jesus, what not!!!!  Now the most important things came into the barrier of my decision: RELIGION. Sometimes I want to feel, a dead man has no religion. But we are not dead. Don’t you believe that one? Mama, the insolence of Glory and the divinity is alone defined by people but not the God. God is for every body. No matter how he practices it. If some one has profound love and conjurors to God, HE understands the mind of his creatures. He or she does not need to explain the modalities of her actions to Him. He is not a fool and HE commands the whole universe without any difficulties.  HE commands my strange lady also. But at the end of all logics, still certain rituality has to be graved and performed in person. Those are not similar to us. My religion strictly prohibits me to go forward but allows with a condition to convert her too. It is not an impossibility but unwise unless it happens within own self. Then what would be the mixing factor into next generation Mama? So confusing at this moment mama. I am getting sick of the reality everyday…..

The strange lady calls me sometimes her family, sometimes as a glaring minion; sometimes she breaks to me like a small girl as if to her mother. Sometimes she hits me and hits very harder. I can return the hit but I can’t. Why I can’t? I have no relationship with her yet. Even though I keep silent. Because she cares me always. I noticed, my silence again makes her desperate. She seems to be a crazy person altogether. Mama, I always wanted to avoid such person but I am unable to avoid her. I am breaking every moment and everywhere. I am breaking faster than she breaks to me. But I am not putting them in public. When I find her in pensive, it pails me out, it strikes my heart. I cannot say to her. Neither I can accept her too. In which category I will carry her Mama. She is not my sister, she is not my mother, she is not my wife, nor she is my girl friend in truest sense of a girl friend. She is just a stranger, and I know I will miss her soon.  I have nothing to present her except my memory, except my loneliness and sadness………….The stranger will remain as stranger to me whole life I think, Mama. Because we have so much of barrier in religion, culture, environments, social and attitudes. A candle-blaze is needed when we require them but a blaze into a hut is not accepted by any one. One blaze facilitates our life and another takes our life. I am the second category may be mama. I will burn it always but alone…..

প্রিয় মা,

যতোক্ষন এই পৃথিবীতে মানুষ সবার মাঝে থাকে, ততোক্ষন তারা মনে করে সবাই হয়তো তাদের পাশেই আছে।  কিন্তু যখন কেউ কোনো সমস্যায় পড়ে, তখন যাদেরকে মানুষ কাছের মানুষ হিসাবে এতোদিন ভেবেছিলো, তাদের যখন কেউ পাশে থাকে না, তখন আসলেই প্রিথিকে বড় একাই মনে করে। এই ভাবনাটা যখন সত্যি প্রমানিত হয়, তখন নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়, চেনা মানুষগুলির মুখ তখন এতোটাই অচেনা মনে হয়, নিজের কাছে তখন অসহায় ভাবা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তখন সবচেয়ে যাদের কথা বেশী মনে পড়ে তারা হচ্ছেন বাবা আর মা। কিন্তু তোমার সেই দুইজনের মধ্যেও তোমার একজন নাই, আর সেতা হচ্ছে বাবা। যার জীবনের একটি হাত সারা জীবনের জন্য ভাংগা, সে দুই হাতের কাজ এক হাত দিয়ে কখনোই সম্পন্ন করতে পারবে না, এতাই বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতার সাথে তাল মিলাতে গেলে এক হাতের শক্তি নিয়ে যেভাবে জীবনের পরিকল্পনা করা উচিত তার পলিসি একেবারেই ভিন্ন। কারো একটা হাত নাই, এই অযুহাতে এই সমাজ কাউকে আলাদা সুযোগ দেয় না। ফলে যতো মায়া আর যতো পরিচিত মুখই তাদের আশেপাশে থাকুক না কেনো, তারা সব সময় অসহায়ই ছিলো এবং থাকে।

এই অদ্ভুদ বিশ্বে আমি অনেক মানুষের সাক্ষাত পেয়েছি, কখনো অদ্ভুদ সুন্দরের কিন্তু নোংরা মনের, কখনো নোংরা চেহারার কিন্তু অদ্ভুদ সুন্দর মনের, আবার কখনো এমন কিছু লোকের যাদের আমি চিনবার আগেই অচেনা হয়ে গেছে। সব মানুষের চেহারা এক না হলেও তারা দেখতে কেমন যেনো একই রকমের। ঈশ্বর তাদের এমন করে বানিয়েছেন, যাদের প্রত্যেকেরই আছে দুটু করে কান, দুটু করে চোখ আর অন্য সব যা দৃশমান। কিন্তু একটা জায়গায় ঈশ্বর কোনো কিছুই দৃশ্যমান করে দেন নাই যা থাকে বুকের পাজরের ভিতর, সত্তার আড়ালে যার নাম অন্তর। আর এই অন্তরের এক অসাধারন ক্ষমতায় কেউ কেউ এমন কিছু চাকচিক্য আর বর্নচোরার মতো রুপক কিছু সুর নিয়ে খেলা করে যা কিনা শুনতে ভালো লাগে বটে, নেশাও ধরায় তবে ধীরে ধীরে প্রাননাশের কারনও হয়ে দাড়ায় যার নাম হয়তো ভালোলাগা বা ভালোবাসা। কেউ এই ভালোলাগা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলে, আবার কেউ ভালোবাসার কথা বলে দূরে দাঁড়িয়ে ভালোলাগার কথা বলে। আমি মাঝে মাঝেই বিভ্রান্ত হয়ে এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্তে ছুটে যাই, কোনটার নাম ভালোলাগা আর কোনটার নাম ভালবাসা মা? আমি ভাসতে থাকি কখনো মেঘের ভেলায়, কখনো ঝরের তান্ডবে। আমার এই ছোট্ট জীবনের ছোট্ট বয়সে আমি মাঝে মাঝে বুঝতে পারিনা, কে কি চায়? কার কি অভাব? কোথায় তাদের দুঃখ আর কোথায় তাদের সুখ? তবে আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ঠিকই ইংগিত দেয়, কোথায় ঝোপ ঝাড়ের মতো হায়েনারা বসে আছে, আর কোথায় কোন কাপুরূশ তার নিজের বীরত্তকে প্রকাশ করার নব নব রুপে সজ্জিত হচ্ছে। সব কিছুই মাঝে মাঝে ভ্রম মনে হয়।

মা, আমার একজন অচেনা মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। আমি তার কিছুই জানি না, কিছুই বুঝি না, আমি তার চাহনীর ভাষা বুঝি না। আমি তার পৃথিবীকে চিনি না। কিন্তু হটাত করে আমার সাজানো বাগান যেনো সে অগোছালো করে দিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি নিঃশ্বাসে, মাঝে মাঝে আমার প্রতিটি বিশ্বাসেও । আমি বুঝে উঠতে পারছি না, আমি কি হেটে এগিয়ে যাব, নাকি দৌড়ে পালিয়ে যাবো, কিন্তু আমার শরীর আর মন একই দিকে ছুটছে না এটাই শুধু আমি বুঝতে পারি। মন যদি এগোয়, শরীর পিছোয়, আবার শরিড় যখন এগোয়, মন পিছিয়ে যায়। 

মা, সে আমার কাছে চুপি চুপি আসে, যখন আমি একা থাকি, চোখ বুঝলেই যেনো আমি তাকে দেখতে পাই কিন্তু যখনই চোখ খুলে তাকে স্পর্শ করতে যাই, সেই নীলিমার নীল আকাশের মতো হটাত আমার আকাশ মেঘলা হয়ে যায়। আমি তার ভাষা বুঝতে পারি না। কখনো কখনো মনে হয় আমার বুকে ব্যথা, আবার কখনো কখন মনে হয় সেই অচেনা মানুষটাই আমার বুকের ব্যথার কারন।

মাঝে মাঝে সে ঠিক আমার কথাগুলিই যেনো বলে যায়, আবার কখন কখন মনে হয় আমার সাথে তার যেনো কোথাও কোন মিল নাই। আমার কষ্টের সময়ে সে মাঝে মাঝে ঠিক আমার সামনে এসে হাজির হয়, মনে হয় যেনো সে আমার কথা শোনার জন্যই যেন বসে আছে। আমার দু চোখ বেয়ে যখন জল পড়ে, সে যেন আমার এই চোখের জল মুছতেই হাজির হয়। আবার কখনো কখনো এমন হয়, সে যেন আমাকে কিছুই বুঝে না। আমি যেনো তার কাছে এতই দূর্ভেদ্য যে, কোনো ভাষাই যেন বোধ গম্য নয়। মা, কে সে?

আমি জানি এখন আর আমি কিশোরী নই। আমি এটাও জানি যে, কিশোর বয়সে বা টিন এজের প্রেম হলো একটা মোহ অথবা একটা ইনফেচুয়েশন। অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সাত পাকের মুল্য অনেক সময় এইসব টিন এজারদের কাছে কোনো মুল্য থাকে না যখন তারা বাল্য প্রেমের মোহ থেকে মুক্তি না পায়। তারা মনে করে শুধু সাত পাকেই বিয়া হয় না, আসল বিয়ে হয় মনে মনে। এই মোহের শেষ পরিনতি হয় চিতা। কিন্তু আগুনে পূরে যাওয়া লাশের সাথে সেই চিতায় প্রেম পুড়ে ছারখার হয় না। কোনো না কোনোভাবে সেই প্রেমের আগুনের রেশ তার ফেলে যাওয়া পরিবারকে প্রতিদিন দংশন করতেই থাকে। “লাভার বেঞ্চ” বা “লাভার পার্ক” বলতে আসলে কিছু নাই। যেটা বাস্তব সেটা হচ্ছে বেচে থাকা। মা, আমি সেই প্রেমের মতো কথা বলছি না। আমি এটাও জানি, সত্যিকারের ভালোবাসার অনেকগুলি রুপ হয়। আমি সেই রুপ গুলির সাথে পরিচিত নই কিন্তু মন যা বলে সেটা তো আমার অন্তরও বলে। আমি আমার হৃদয়ের কথা শোনার আগে আমার বিবেকের কথাও শোনার চেষ্টা করছি কিন্তু আমি আজ একা এতোটাই কনফিউজড যে, কোনটা রেখে কোনটা ফেলবো সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না। কখনো এফেয়ার্সকে মনে হয় ভালোবাসা। কিন্তু এফেয়ার্সের একটা বীভৎস রুপও থাকে যা শেষ হয় শারীরিক মিলনে। ভালোবাসায় কি তাইই হয়? আমি জীবনকে একই রেলের উপর রাখতে চাই না যা জীবন আর মরনের উপর একই সাথে চলে। আমি মরনকে খুব ভয় পাই। আমি এমন কারো হাত ধরতে চাই মা, যার হাতের প্রতিটি ইশারা ভরষার। কারো হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু উন্নতির দিকে যাওয়া সেটা কিন্তু নয়। আগে আমি জানতে চাই, হাত ধরা মানুষটি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। সাফল্যের সপ্ন, জীবনের আশা আর পরিশ্রমের পথ যদি যাত্রার পথ একদিকে না হয়, তাহলে আর যাই হোক, সাফল্যকে হাতে পাওয়া যায় না। আমি আমার জীবনের সাফল্য চাই। যেখানে ভালোবাসায় পরিপূর্ন একটা বাগানের মতো আলোকিত হয়ে চারিদিকে সুবাসিত করবে। 

আমি সেই ভালোবাসাটা চাই, যেখানে আই লাভ ইউ বললেই শুধু ভালোবাসা হয় না। জেনেছি আমি, ভালোবাসার বহির্প্রকাশ তার কাজে আর বাস্তবে। অনেকে হয়তো আই লাভ ইউ বললেই ভাবে ভালোবাসা হয়ে গেলো, কিন্তু সেটা কি অন্তরের না শরীরে তা যাচাই করার কোনো দরকার মনে করে না। ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যা কাছে থাকলে এর প্রয়োজন অনুভব করা যায় না, মনে হয় আছেই তো। কিন্তু যখনই চোখের আড়ালে যায়, মন শুধু আনচান করে আর প্রতীক্ষায় থাকে, কখন কাছে আসবে। কেনো আমি বুঝতে পারছি না, এটাই কি সেটা মা? 

মা, অনেক সময় ঠিকানা ভুল হয় কিন্তু ওই ঠিকানায় যারা থাকে তারা হয়তো ঠিক লোক। এই অতিথি কি আমার সেই সঠিক লোক মা? 

বদি ভাই-এখন তিনি ছবি

১৯৬৮ থেকে ২০১৮, মোট ৫০ বছর।

এই পঞ্চাশ বছরের আমাদের পারিবারিক ইতিহাসের মধ্যে যে ব্যক্তিটি আমাদের পরিবারের কেউ না হয়েও পরিবারে সবচেয়ে বেশি ভুমিকা পালন করতে এক্যটু ও দ্নিবিধা করেন নাই, তিনি হচ্ছেন বদ্রুদ্দিন তালুকদার ওরফে বদি ভাই। আমার বয়স তখন মাত্র ১০ কি বারো যখন আমি প্রকৃত পক্ষে এই বদি ভাইকে জ্ঞ্যানের মাধ্যমে চিনি। কিন্তু তার আগে থেকেই এই বদি ভাই আমাদের পরিবারের সাথে যুক্ত ছিলেন।

আমার বাবা কবে কিভাবে কি কারনে মারা গেলেন তা আমার কোনো ধারনা নাই। আমার বয়স তখনহয়ত ২ কি আড়াই হয়ত হবে। আমার বাবা ছিলেন অনেক ধনি মানুস, মাদবর মানুস। সমাজে তার গ্রহনযোগ্যতা ছিল অনেক অনেক বেশি। কিন্তু তার শত্রুও ছিল অনেক। বিশেষ করে আমাদের পরিবারের ভিতরেই অনেক শত্রু ছিল। আর তারা হচ্যাছেন আমার সতালু ভাই বোনেরা। বিশেষ করে তাজির আলি নামে যে ভাইটি ছিলেন, সে ছিলো চারিত্রিকভাবে একজন খারাপ মানুষ।  যাই হোক। বাবা মারা যাবার পর আমাদের যাবতিয় জমিজমার আধিপত্যতা এক সপ্তাহের মধ্যেই হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে ক্যাশ টাকা না থাকায় আমাদের পরিবার অনেক সমস্যার মধ্যে পরে। আমার বড় ভাই সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভারসিটিতে ভরতি হয়েছেন। ঢাকায় থাকার কোনো জায়গা নাই, মাথার উপর কোনো অভিভাবক নাই এবং তার মধ্যে পাচ বোন এক ভাই এর বোঝা তার উপর। কিভাবে সংসার চালাবেন, কোথা থেকে টাকা আসবে কিংবা নিজেই কিভাবে চলবেন এই চিন্তাই আমার ভাইকে অতিস্ট করে তুল্লো। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ভাবছেন কি করা যায়, কিভাবে করা যায়।

এই সময় কোনো এক কাকতালিয় ভাবে দেখা হলো এই বদি ভাইয়ের সাথে। তার জীবনটাও এই একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কেটেছে অথবা কাটছে। ওনাকে আর পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করে বেশি বুঝাতে হয় নাই। বদি ভাই চাকুরি করেন ওয়াব্দা অফিসে মাত্র সেক্সন অফিসার হিসাবে। অল্প আয়, বিয়ে করেন নাই। তিনিও একইভাবে তার ভাই বোন মাকে সাপোর্ট করছেন। থাকেন তিনি ১২৪ নং আগাসাদেক রোড। ছোট্ট একটা রুম, তাতে ইতিমধ্যে তিনজন গাদাগদি করে কোনো রকমে থাকেন আর এক বুয়া প্রতিদিন দুপুর আর রাতের জন্য যত সামান্য বেতনে তাদের ভাত তরকারি পাক করে দেন। বদি ভাই হাবিব ভাইকে ওই ১২৪ নং আগাসাদেক রোডে নিয়ে এলেন। সবাই বদি ভাইকে ভাই বলেন না, সম্মানের সহিত তাকে সবাই স্যার বলেন।

যারা এই রুমে থাকেন, তারাসবাই গ্রাজুয়েট এবং জীবন যুদ্ধে লিপ্ত। একে অপরের জন্য যত টুকু দরকার সাপোর্ট করেন। সবার রোজগার যেনো কম্বাইন্ড রোজগার। একসাথে থাকে সব টাকা, যার যখন যত টুকু দরকার সে ততো টুকুই নেন। কিন্তু হিসাব থাকে। আমার মনে আছে ওই একটা ছোট রুম থেকে বদি ভাইয়ের তত্তাবধানে প্রায় ১০/১২ জন গ্রাজুয়েট বের হয়েছেন যারা পরবর্তী সময়ে দেশের শিরশ স্থানে বসেছিলেন। কেউ ইউনিভারসিটির অধ্যাপক, ডিন, কেউ আরো বড়। দেশে এবং বিদেশে।

এভাবেই বদি ভাই হয়ে উঠেন এক কিংবদন্তি স্যার। সব প্রোটেনশিয়াল মেধাবি হেল্পলেস মানুসগুলিকে বুদ্ধি, যতসামান্য চাকুরির পয়সা দিয়েই এইসব মানুসগুলিকে সাহাজ্য করেছেন। বদি ভাই তার চাকুরি জিবনে ডেপুটি ডাইরেক্টর পর্যন্ত উঠেছিলেন। ওয়াব্দায় চাকুরি করলে দুই নম্বরি করলে ছোট কেরানিও কোটিপতি হয়ে যায় কিন্তু বদি ভাই তার জিবনে দুই নম্বরিতো করেনই নাই, তার দ্বারা দুই নম্বরি হবে এটাও তিনি করতে দেন নাই। ফলে একটা সময় এইসব চোর বাটপারদের আমলে চাকুরির পদবির সামনে এগুতে পারেন নাই। অবসর নিয়ে বাসাতেই ছিলেন।

গ্রাজুয়েট মানুষগুলি তাদের যোগ্যতা অনুসারে ধীরে ধীরে সবাই বেশ ভালো ভালো জায়গায় সেটেল হয়ে গেছেন। সবার সাথেই বদি ভাইয়ের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু কাজের চাপেই হোক আর ব্যস্ততার কারনেই হোক ধীরে ধীরে এইসব যোগাযোগও কমে আসে। কিন্তু আমার ভাইয়ের সাথে অন্য একটি কারনে শেষ পর্যন্ত যোগাযোগটা ছিলই। আর সেটা হচ্ছে আমার মা। আমার ভাই যখন উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশ গেলেন, তখন আমার মাকে দেখভাল করার কোনো লোকই ছিলো না। আর এর ই মধ্যে আমারো ক্যাডেট কলেজের সুযোগ হ ওয়ায় আমার পক্ষেও মাকে কোন অবস্থায় ই কিছুই করার সুযোগ ছিলো না। আমার মাকে বদি ভাই খুব ই ভালো বাস্তেন। নিজের মায়ের মতো করেই দেখতেন। আমার মায়ের জন্য কোনো কাজ করতে বদি ভাইয়ের কখনো ক্লান্ত হন নাই। 

আমি ধীরে ধীরে ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে ফেললাম, আর্মিতে গেলাম, আমি মাক্যের দায়িত্ত নিলাম। এই সময় বদি ভাই একটু অবসর পেলেন। ফলে এই দীর্ঘ প্রায় দেড় যোগ বদি ভাইয়ের সাথে আমাদের প্রয়োজনেই আমরা তার কাছ থেকে আলাদা হতে পারি নাই। এমন নয় যে বদি ভাইয়ের এখানে কোন স্বার্থ কাজ করেছে। হ্যা, একটা স্বার্থ কাজ করেছে অবশ্য ই। আর সেটা হচ্ছে, বদি ভাই ও তার ভাইদের থেকে অনেক আলাদা ছিলেন। তার পাশে কেউ আসলে ছিলো না। ঊনি ভাবতেন, আমি বা হাবিব ভাই বা আমরা ই তার আপন জন এবং আপদে বিপদে আমরাই তার পাশে আছি। কথাটা ঠিক। কিন্তু পরবর্তীতে যত টুকু আমাদের পাশে থাকার দরকার ছিলো, আমরা আসলে ততো টুকু পাশে থাকতে পারি নাই। এর কারনও হচ্ছে আমাদের বুঝাপড়ার তফাত। হয়ত এটাই এই স্বার্থপর পৃথিবীর নিষ্ঠুর নিয়মের একটি। 

বদি ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম মনোমালিন্য টা হয় আমার বিয়ে নিয়ে। এটা মানতে মানতে আমাদের মধ্যে একটা বিস্তর গ্যাপের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো। কখনো নরমাল, কখনো আধা নরমাল, আবার কখনো মনে হয়েছে সব ঠিকই আছে। আরেকটা কারন ছিলো যে, হাবীব ভাইয়ের প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল মানসিকতা। একবার এটা বলেন তো আরেকবার তার সিদ্ধান্ত বদলে অন্য আরেকটি বলা বা আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়া। এইরুপ একটা পরিস্থিতিতে বদি ভাইও আর হাবীব ভাইয়ের ইপর নির্ভর করতে পারছিলেন না। 

একটা সময় চলে এসেছিল যে, আমরা যে যার যার মতো করেই চলছিলাম। ব্যাপারটা এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, সাভাবিক অন্য দশ জনের সাথে আমরা যেভাবে চলি, ঠিক সেভাবেই চলছিলাম। সম্পর্ক খারাপ নয় কিন্তু আমরা খুব ঘনিস্ট কেউ আমরা। হাবীব ভাই বদি ভাইকে সব সময় ই শ্রদ্ধা করতেন এবং শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধাই করতেন। কিন্তু বদি ভাইয়ের জন্য হাবীব ভাইয়ের আরো অনেক কিছুই করার ছিলো। সেটা হয়ত হয় নাই। 

আজ বদি ভাইয়ের মৃত্যুতে একটা বড় অধ্যায় শেষ হলো। আমি তাকে মিস করবো সব সময়। যত কষ্টেই তিনি থাকতেন না কেনো, আমি যখন বদি ভাইয়ের কাছে যেতাম, আমি দেখতাম, তার মধ্যে একটা জীবনী শক্তি ফিরে আসতো। অনেক কথা বলতেন। অতীতের কথা, তার সাফল্যের কথা, তার দুঃখের কথা। আমিও শুনতাম। আজ আর তিনি নেই। তাকে আল্লাহ বেহেস্ত নসীব করুন। 

আগামিকালটা কত দিনের?

অনেকেই বলেন, ঈশ্বর বড় উদাসীন। আসলেই কি তিনি উদাসিন? না, তিনি উদাসিন নন। তিনি তার কাজ ঠিক সময় মত করেন, তার কোন কিছুই ঊলট পালট নয়, ঊনি আমগাছে জাম ফল দেন না, কিংবা কাঁঠাল গাছে আনারস ফলান না। বৈশাখ মাসে তিনি কনকনে শীত প্রচলন করেন না, আবার কড়া ভর চৈত্র মাসে তিনি শীতের প্রবাহ করান না। তারপরেও আমরা তাকে অনেক সময় কোন কিছুই বিবেচনা না করে বলে থাকি, ঈশ্বর বড় উদাসিন, ওনি উদাসীন শুধু তাঁর বিশ্বকে নিয়ে। কিন্তু কখনো আমরা নিজেকে প্রশ্ন করি না, আমরা কি উদাসিন? আর আমরা উদাসীন আমাদের অতিত নিয়ে। কেউ অতিত নিয়ে ভাবতে চাইনা, ভাবি শুধু আগামিকালের কথা। কিন্তু এই আগামিকালটা কত দিনের?

গত সপ্তাহে আমি একটি পার্টিতে গিয়েছিলাম বেরাতে। অনেক নামিদামি মানুষজন এসেছিল। কেউ সচিব, কেউ পুলিশের বড় কর্মকর্তা, কেউ আবার ব্যবসায়ী, আবার কেউ সাধারন মানুসদের মধ্যে অনেকে। তাহলে এখন আবার প্রশ্ন করে বসবে, সাধারন মানুষ আর ঐ ক্লাসিফাইড ব্যক্তিগুলোর মধ্যে পার্থক্য কি? ব্যবসায়ী কি সাধারন মানুসের মধ্যে পরে না? কিংবা পুলিশের বড়কর্তা, সচিব ইত্যাদি মানুষগুলো কি সাধারন মানুষ নয়? আমার কাছে এর উত্তর একদম সহজ এবং সরল। না, ওরা সাধারন মানুসের মধ্যে পরে না। তাঁদের সমাজ আলাদা, কথাবার্তা আলাদা, লাইফ স্টাইল আলাদা। সাধারন মানুসের জীবন আর তাঁদের জীবন এক কাতারে পরে না। একজন সাধারন মানুষ তাঁর অপকর্মের কথা ফাস হয়ে গেলে তাঁর আর জীবনের মুল্য থাকে না। সে কোন অন্যায় কাজ করে ফেললে প্রতিনিয়ত তাঁর ভিতরে একটা অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে, সে নিজে নিজে একা একা দহিত হতে থাকে, লোক লজ্জার ভয়ে কেমন যেন নিজের মধ্যে সুপ্ত হয়ে থাকে, আর তাতেই সে অসুস্থ হয়ে জীবননাস হতে পারে। কিন্তু ঐ ক্লাসিফাইড লোকগুলো খুব স্পস্টবাদি, তারা তাঁদের অনেক অপকর্ম প্রকাশ্যে একে অন্যের সঙ্গে খুব সহজেই শেয়ার করে। মাঝে মাঝে ঐ অপকর্মগুলো একটা গুনের বহিরপ্রকাশ হিসাবেও নিজেদের অহংকার হিসাবে ধরে নেয়। এই যেমন, একজন আইনজ্ঞ সাহেব সেদিন পার্টিতে খুব ফলাও করে বলছিলেন, তিনি প্রতিদিন প্রায় লক্ষ টাকার উপর আয় করেন। আমি তাকে খুব ভাল করে চিনি না। আমার একবন্ধু তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বললেন, বন্ধু, ওনি হচ্ছেন ডিস্ট্রিক্ট জজ লুতফুল কবির। খুব মাই ডিয়ার লোক। অনেক পয়সার মালিক। ধান্মন্ডিতে দুটু বাড়ি আছে, সাভারে কয়েক একর জমি আছে, নিজের জন্য একটা গাড়ি, বউয়ের জন্য একখান গাড়ি। আশুলিয়ায় প্লট কিনেছেন দশটার উপরে। সব ক্যাশ টাকা দিয়ে। আল্লাহ তাকে তিনখান বাচ্চা দিয়েছেন। দুইজন তো খুব ভাল করছে পরাশুনায়। অনেক মানুষের উপকার করেন তিনি, সমাজে বেশ দান খয়রাত করেন, শুধু তাই নয়, তিনি আগামিতে এমপি ইলেকশনেও দাঁড়াবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝখানে ১/১১ তে খামাকা দুদক তাকে অনেক হয়রানি করেছিল। আয় বহির্ভূত নাকি অনেক আয়ের তিনি বৈধ না হওয়ায় প্রায় মাস খানেক এদিক সেদিক থাকতে হয়েছিল। আইনজীবী হয়েও আইনের পাল্লায় পরে গিয়েছিলেন। তবে ওটা বেশিদিন লুতফুল ভাই জিইয়ে রাখেন নাই। একেবারে মাল পানি ঢেলে বীজ উপড়ে ফেলেছেন। এখন একদম ক্লিন আমাদের এই লুতফুল ভাই।

শুনে আমার খুব ভাল লাগলো। পরিচয় হয়ে আমারও খুব ভাল লাগলো। তিনিও মনে হল আমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে প্রীত হলেন। একসময় কফি খেতে খেতে বললাম, আইন ব্যবসা ছাড়া আর কোন ব্যবসা করেন নাকি লুতফল ভাই? তিনি অত্যন্ত মৃদু ভাষায় বললেন, না ভাই, এই একটার জন্য সময় দিতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছি, আবার অন্য ব্যবসা কেমন করে করি? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করল, তাহলে আপনি প্রতিদিন কি এমন করেন যে, প্রায় এক লাখ টাকার আয় হয়?

লুতফুল সাহেব ভাল মানুষ। ওনি কথা বলেন সরাসরি। কোন রাখঢাক নাই। বললেন, আমার কোর্টে আমি কাউকে জামিন দেই না। সে যেই মামলাই হোক। “বেলএব্যাল” কেস হলেও আমি জনা প্রতি বিশ হাজার আর হেভি টার্গেট হলে তো কথাই নাই। খাসা পাঁচ লাখ। মাসে সব মিলিয়ে গরপরতা ত্রিশ পয়ত্রিশ লাখ টাকা থাকে। ভাই, নিবই যখন, তখন আর রাখঢাক করে লাভ কি? মাঝে মাঝে কিছু মিথ্যা কেস কেউ কেউ নিয়া আসে। আমি বুঝতে পারি। ঐ কেসগুলোর জন্য পয়সা বেশী পাওয়া যায়। সবসময় ওগুলো পাওয়া যায় না, তবে একবার পেলে সোনারখনি হাতে পাওয়ার মত। ঝুলিয়ে রাখবেন, আবার পয়সা নিবেন। পয়সা দিবে না? কোন অসুবিধা নাই। অপোজিট পার্টিকে  হাত করে ফেলার একটা হুমকি দিয়ে রাখবেন। জানেন ভাই, মানুসের একটা দুর্বল পয়েন্ট আছে, তারা হুজুরদেরকে বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করে আর করে এই আইনজীবী লোকদেরকে। ডাক্তারকেও তারা এতটা বিশ্বাস করে না। আর এই দুর্বলতার সুযোগটাই আমরা অনেকে নেই। এটা তো আমার কাজ, তাই না ভাই? ঘুস তো আর খাই না, আমি মুজুরি নেই। কাজের মুজুরি। এতে তো আর দোষের কিছু নাই।

ঠিক কথা বলেছেন লুতফুল সাহেব। নেবেনই যখন, তখন আর রাখঢাক করে লাভ কি? আর ওনি তো কাজের মুজুরি নিচ্ছেন। আর সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের জায়গা তো একটাই, আদালত। আর এই আদালতেই তো তিনি কাজ করেন। অন্যায় যে করে আর সত্যের পথে যে আছে, তাঁদের মধ্যে বিবাদ হলে তো দু পক্ষেরই আইনজীবী লাগবে। লুতফুল সাহেব কেসটা না নিলে তো আরেকজন নিবেই। তাহলে ওনার নিতে অসুবিধা কই?

অনেক কথা হল লুতফুল ভাইয়ের সঙ্গে। আমার মনে হল, লুতফুল ভাই যে মানসিকতায় বেড়ে উঠছেন, আর যে উপলব্ধি থেকে সমাজে তিনি আজ অনেক বড় একজন বিত্তশালি হয়ে উঠছেন, তাঁর অনেক গলদ রয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর চারিপাশের কোন বন্ধু, বা আত্মীয়সজন, কিংবা সহকর্মী কিংবা তাঁর খুব কাছে কোন লোক কেউ তাকে শুধরানোর পথ বলে দিচ্ছেন না। একটা সময় আসে, যখন পয়সা মানুসের জিবনে সৎ উপদেশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। তখন শুধু চাটুকারদের দল কাছে ভিরে তাকে আরও গভির থেকে গভিরে নিয়ে যায় যেখান থেকে ফিরবার আর কোন পথ থাকে না। লুতফুল সাহেবের অবস্থা দেখে আমার তাই মনে হল।

পার্টি প্রায় শেষ। আরেক কাপ কফি খাচ্ছি আমরা সবাই মিলে। আমি লুতফুল ভাইকে কফি খেতে খেতে বললাম, লুতফুল ভাই, একটা প্রশ্ন করি?

ওনি মাই ডিয়ার লোক, বললেন, আরে ভাই, করেন না, করেন। যদি বলেন কি রঙের আন্ডারওয়ার পরে এসছি, সেটাও বলে দেব। খালি জিজ্ঞেস করে দেখেন না…… বড় মজার লোক।

বললাম, লুতফুল ভাই, আজ থেকে ৫০০ বছর আগের আপনার বংশের কারো নাম জানেন?

প্রশ্ন শুনে ওনি এমন করে হেসে উঠলেন যে তাঁর হাতে থাকা কফি কাপটা প্রায় আমার উপর পরতে যাচ্ছিল আর কি। হাসতে হাসতেই বললেন, কি করে সম্ভব আখতার ভাই যে ৫০০ বছর আগের বংশের কারো নাম মনে রাখা? আপনি কি বলতে পারবেন ৫০০ বছর আগের কারো নাম?

বললাম, আমার প্রশ্নটা শেষ হয় নাই লুতফুল ভাই। ওনি আমার কথার আওয়াজ শুনে গম্ভির হয়ে গিয়ে আবার প্রশ্ন শুনতে চাইলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, থাক, ৫০০ বছর দরকার নাই, ৪০০ বছর আগের কেউ? বা ৩০০ বছরের আগের কেউ, অথবা ২০০ বছর আগের কেউ? কারো কথা কি আপনার মনে আছে?

এবার তিনি হাসলেন না। বললেন, না আখতার ভাই, ঐ অতো বছর আগের ফ্যামিলির কারো নামই আমি জানি না। তবে আমার দাদার বাবার নাম আমার জানা আছে। ওনি প্রায় আজ থেকে ৬০ বছর আগে মারা গেছেন।

আমি কফিতে চুমু দিতে দিতে বললাম, তাঁর মানে প্রায় ৬০ বছর আগের ইতিহাস। কিছুটা এখনো জেগে আছে। আচ্ছা লুতফুল ভাই, আজ থেকে ২০০ বছর পরে তাহলে কেউ কি আপনার কথা মনে রাখবে? বা ৩০০ বছর পর? অথবা ৪০০ বছর পর? আজ আমি আপনে এবং সবাই যে এমন একটা চাঁদনী রাতে কি মজা করে কফি খাচ্ছি, কত সুন্দর টাই-স্যুট পরে এখানে সমাবেশ করছি, এই কি বিশাল সুন্দর বিল্ডিং করেছি, এসি গাড়িতে চরছি, এর কোন কথাই কেউ জানবে না বা মনে রাখবে না আজ থেকে ১০০ বছর পরে। লুতফুল সাহেব খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথাগুলো শুনছিলেন বটে কিন্তু ওনার যে মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমি বুঝতে পারছিলাম।

আমি বলতে থাকলাম, “অথচ জানেন লুতফুল ভাই, আপনার আমার মরার ৫০০ বছর পরেও আমাদের রেখে যাওয়া এই সাভারের জমি, ধানমণ্ডির বাড়ি, আশুলিয়ার প্লট এইসব নিয়ে আমাদের সব পর্যায়ের জেনারেশনরা একে একে দাবিদার হয়ে মারামারিও করতে পারে। কিন্তু কেউ ঐ সম্পত্তি বিক্রি করে বা তাঁর একটা আয় থেকে কখনও আমাদের আত্তার মাগফেরাত কামনা করে একবেলা মিলাদ পরাবে কিনা সন্দেহ আছে। আয় করে যাবেন আপনি, এর সব দায়দায়িত্ব (ন্যায় পথে অথবা অন্যায় পথে আয় যাই হোক না কেন) আপনার, অথচ, আপনার কোন কাজেই তা লাগবে না। তাহলে এই সম্পত্তির কি ভ্যালু আছে? কার জন্যে রেখে যাচ্ছেন এই দায় দায়িত্ব?

লুতফুল ভাই এতক্ষন চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলেন। মনে হল তিনি এখন কিছুটা অসস্থিবোধ করছেন। ওনার হাতে ধরা কফির কাপটায় যে কফিগুলো এতক্ষন গরম একটা সুগন্ধি ছরাচ্ছিল, এখন তা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

আমি আমার কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম।

এই দেখেন লুতফুল ভাই, সামান্য এক কড়া শাসক নামে পরিচিত ১/১১ এর সরকার। তাঁর কাছেই আমরা আমাদের সম্পদের হিসাব সম্পূর্ণ তুলে ধরতে না পারার কারনে কতই না এদিক সেদিক পালিয়ে বেড়ানো। হয়ত ঘুষ পয়সা দিয়ে আপাতত ম্যানেজ করা গেছে। সামান্য এক কেয়ার টেকার সরকারের কাছেই আমরা আমাদের সত্যকারের হিসাবটা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। আর এই বিশাল জগতের যিনি মালিক, যার আওতার বাইরে যাওয়ার আমাদের কোন শক্তি নাই, যিনি কোন টাকা-পয়সা, ক্ষমতা বা এই জাতিয় কিছুই পরোয়া করেন না, তাঁর কাছ থেকে আমাদের এই অঢেল দুই নম্বরি সম্পত্তির হিসাব কিভাবে দেব? আর এই সম্পত্তির হিসাব শুধু আমাকে আপনাকেই দিতে হবে। এর জন্য আমার কোন উত্তরসুরি, আমার কোন প্রিয় মানুষ তাঁর উত্তরের জন্য বা জবাব্দিহিতার জন্য দায়ি নন। যদি তাইই হয়, তাহলে কি আমার আজকের এই বাহাদুরি করে করা সম্পদ আমার জন্য কোন সুখের বিষয়? আমি তো এগুলোর এক কানাকড়িও সঙ্গে নিতে পারব না!! প্লট পরে থাকবে আশুলিয়ায়, জমি পরে থাকবে সাভারে, ধান্মন্ডির বাসায় আমার লাশটা শুধু গ্যারেজের মধ্যে একদিন রেখেই পুতে দেওয়া হবে ঐ জঙ্গলটায় যেখানে আমি এখন ভুলেও পা রাখি না।

লুতফুল ভাই কোন কিছুই বললেন না। রাত অনেক হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে হবে। আমরা যার যার কাছে বলে কয়ে যার যার বাড়ি ফিরে এলাম। লুতফুল ভাই আমার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে আমার সাথে হাত মেলালেন। কোন কথা বললেন না। শুধু বললেন, আমার ছোট মেয়েটার জন্য দোয়া করবেন। ও ক্যান্সারে ভুগছে।

তাঁর এই ছোট মেয়ের ক্যান্সারের কথা তা আমি আগে জানতে পারিনি। আমার বন্ধুটিও বলে নাই। আর জানলেও হয়ত এটা নিয়ে আমি কোন কথা বলতাম না। কিন্তু, আমার কেন যেনো মনে হল লুতফুল ভাই যদি আজ সৎ মনে সৎ রোজগারে সৎ পথে ঈশ্বরকে ডেকে বলতে পারতেন, হে ঈশ্বর, আমি তো তোমার কোন আদেশ অমান্য করি না, আমি তো তোমার দেওয়া হালাল রিজিক খাই, আমি তো কোন অন্যায় পথে আমার রিজিক উপার্জন করি না, আমি তোমার সব আদেশ, নিষেধ যেভাবে পালন করতে বলেছ, সেভাবেই করছি, তাহলে তুমি আমার এই ছোট মেয়ের ক্যান্সার দিয়ে আমার মনকে এতটা উতলা করে দিলে কেন? কেন তুমি আমার নিস্পাপ এই ছোট আদরের মেয়েটিকে তুমি এমনভাবে কষ্ট দিচ্ছ যার ভার আমি বহন করতে পারছি না? তুমি তো সবচেয়ে বড় ইন্সাফ কর্তা, তুমি তো সবচেয়ে বেশী আছানদাতা, তাহলে তুমি আমাকে কেন এই রকম একটা কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছ?

কিন্তু আজ লুতফুল ভাই হয়ত সেই ঈশ্বরের কাছে কিছুই বলতে পারবেন না। কারন ঈশ্বর তাকে যা যা করতে বলেছেন, তাঁর অনেক ন্যায় কাজই লুতফুল সাহেব করেননি। ঈশ্বরের সাথে তর্ক করবার সাহস আজ লুতফুল সাহেব হারিয়েছেন। তারপরেও হয়ত আমি বলতে পারতাম, লুতফুল ভাই, হয়তোবা সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আপনি ঈশ্বরের কাছে দেখা করুন। তাঁর দেখা পাওয়ার রাস্তা তিনি বাতলে দিয়েছেন অনেক আগেই। লুতফুল সাহেবের জন্য সময় এখনো হাতে আছে যদি তিনি তাঁর ঈশ্বরের কাছে আবার নতজানু হয়ে সব অবৈধ সম্পদ ত্যাগ করে পুনরায় ঈশ্বরকে সাহায্য করতে বলেন, হয়তা তাঁর ঈশ্বর তাকে ক্ষমা করে দিয়ে সব শান্তির মত আরামদায়ক করে দেবেন। কতটা আরামদায়ক করবেন, সেটা নির্ভর করে এখন লুতফুল সাহেব কতটা আত্মসমর্পণ করেন ঈশ্বরের কাছে তাঁর উপর। ঈশ্বর খুবই দয়াশিল এবং ক্ষমাশিল। তিনি উদাসীন নন।

ভারত বর্ষের জনাব আগন্তক

আমি খুব খুশি হয়েছি যে, আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের কোন এক বাদশার পাশে আপনি এসে কিছুক্ষন দাড়িয়ে ছিলেন এবং আপনি আমাকে অনেক গুলো প্রশ্নও করে গেছেন। আমি জানি না কিভাবে আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর গুলো দেব কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন আপনার কাছে ছিল।

আমি কিভাবে দেশ চালিয়েছি সেটা আপনার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল বলে আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন। জনাব, আমি কি আপনাকে উল্টো একটা প্রশ্ন করতে পারি? এখন আপনাদের সময়ে দেশ কিভাবে চলে সেটা কি আপনি জানেন? আমাদের সময় গনতন্ত্র বলতে কিছু ছিল না, সংবিধান বলতে কিছু ছিল না সেটা আমি মানি। বরং আমি যা বলতাম তাই ছিল সংবিধান। হয়ত এটা ছিল অটক্রাটিক একটা সময়। সেটা তো ঐ সময়ের নীতিই ছিল এটা। তাই বলে কি আমরা একটুও মানবাধিকারের কোন কাজ করি নাই? আমার সময়ে রাজত্ব ছিল বিশাল, মোবাইল ফোন ছিল না। বিশ্বাস ঘাতকের দল ছিল আরও বেশি শক্তিশালি। যে কোন সময় যে কোন রাজা দেশের যে কোন অংশ দখল করে নিয়ে নিতে পারত। আমরা তো তার প্রতিরক্ষা দিয়েছি। কই তার পরেও তো আমাদের সময় ব্যবসায়িরা আপনাদের সময়ের মত এত অসৎ ছিল না। এখন এক জন ব্যবসায়ী নিজেই রাজ্য চালাতে চান পর্দার আড়াল থেকে। আমাদের সময় ক্ষমতা ছিল আমার হাতে, আর এখন? আপনাদের সময় তো ক্ষমতা কার হাতে তাও তো জানেন না। 

আমি খুব খুশি হয়েছি যে, আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের কোন এক বাদশার পাশে আপনি এসে কিছুক্ষন দাড়িয়ে ছিলেন এবং আপনি আমাকে অনেক গুলো প্রশ্নও করে গেছেন। আমি জানি না কিভাবে আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর গুলো দেব কিন্তু আমার কিছু প্রশ্ন আপনার কাছে ছিল।

আমি কিভাবে দেশ চালিয়েছি সেটা আপনার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল বলে আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন। জনাব, আমি কি আপনাকে উল্টো একটা প্রশ্ন করতে পারি? এখন আপনাদের সময়ে দেশ কিভাবে চলে সেটা কি আপনি জানেন? আমাদের সময় গনতন্ত্র বলতে কিছু ছিল না, সংবিধান বলতে কিছু ছিল না সেটা আমি মানি। বরং আমি যা বলতাম তাই ছিল সংবিধান। হয়ত এটা ছিল অটক্রাটিক একটা সময়। সেটা তো ঐ সময়ের নীতিই ছিল এটা। তাই বলে কি আমরা একটুও মানবাধিকারের কোন কাজ করি নাই? আমার সময়ে রাজত্ব ছিল বিশাল, মোবাইল ফোন ছিল না। বিশ্বাস ঘাতকের দল ছিল আরও বেশি শক্তিশালি। যে কোন সময় যে কোন রাজা দেশের যে কোন অংশ দখল করে নিয়ে নিতে পারত। আমরা তো তার প্রতিরক্ষা দিয়েছি। কই তার পরেও তো আমাদের সময় ব্যবসায়িরা আপনাদের সময়ের মত এত অসৎ ছিল না। এখন এক জন ব্যবসায়ী নিজেই রাজ্য চালাতে চান পর্দার আড়াল থেকে। আমাদের সময় ক্ষমতা ছিল আমার হাতে, আর এখন? আপনাদের সময় তো ক্ষমতা কার হাতে তাও তো জানেন না। 

আমার খালা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১

তারিখ 

সামিদা খাতুন

স্বামীঃ আব্দুল গনি মাদবর

তিনি আমার একমাত্র আপন ফার্স্ট জেনারেশন খালা। আমার মায়ের একমাত্র আপন বোন যাকে আমার মা বোন মনে করেন নাই, করেছেন নিজের মায়ের মতো। আমার খালার সাথে কারো কোন বিবাদ হয়েছে এই রেকর্ড সারা গ্রামের মধ্যে নাই। তিনি অত্যান্ত প্রতাপ্সহালী গনি মাদবরের স্ত্রী। এখানে বলা দরকার যে, গনি মাদবরকে ভয় পায় না এমন কন লক আমাদের গ্রামের মধ্যে ছিলো না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তিনি সন্ত্রাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যান্ত ন্যা পরায়ন একজন মাদবর। খুব বুদ্ধিমান। অত্যান্ত অহংকারী এবং একটা ইগো নিয়ে চলতেন। 

আমার খালা শেষ বয়সে কুজো হয়ে হাটতেন। যখন ই শুনেছেন যে, আমি শহর থেকে গ্রামে গিয়েছি, তখনি তিনি কস্ট হলেও খুব সকালে আমাকে দেখার জন্য আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন। আমার খালা ও কোন ছবি নাই কিন্তু কোন একদিন আমার ছোট ক্যামেরা দিয়ে একটি মাত্র ছবি তুলেছিলাম যা আমার কাছে একটা অমুল্য রতনের মতো মনে হয় এখন। 

আমার খালা যেদিন মারা যান, আমি এই খবরটা জানতেও পারি নাই। অনেকদিন পর যখন আমি গ্রামের বাড়িতে গেছি, খালার সম্পরকে জানতে চেয়েছি, শুনলাম যে, আমার খালা মারা গেছেন। আমার খুব আফসোস লেগেছিলো। 

আমার খালার ভাগ্য ভালো যে, ঊনি অনেক কস্টে পরার আগেই জান্নাতবাসী হয়েছেন। আমি মাঝে মাঝে খালাকে গোপনে কিছু টাকা দিতাম কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে কোনো কিছু কিনতে পারতেন না, ফলে ঊনি টাকা দিয়েও তার মনের মতো কোন কিছু কিনে খেতে পারতেন না। এর আগেই তার অন্যান্য নাতি পুতেরা তার হাতের টাকাগুলি কোনো না কোনো ভাবে ছিনিয়ে নিতেন। বড্ড নিরীহ মানুষ বলে কারো উপর তার কমপ্লেইনও ছিলো না। খুব নামাজি মানুষ ছিলেন আমার খালা। তার কোন ছেলেরাই তাকে ঠিক মতো ভরন পোষণ করার দায়িত্ত নেন নাই। এক সময়ের প্রতাপ্সহালি মাদবরের স্ত্রী শেষ জীবনে কস্টের মধ্যেই জীবন তা অতিবাহিত করছিলেন কিন্তু আমাদের কিছু সাহাজ্য আর তার নিজের স্বামীর যেটুকু আয় ছিলো তার উপর নির্ভর করেই শেষ জীবন তা অতিবাহিত করেছেন। 

সাদ্দাম হোসেনের ছেলে উদয় এর সত্যি কাহিনী

কয়েকদিন আগে নেট জিও তে একটা প্রোগ্রাম দেখছিলাম ইরাকের উপর, প্রোগ্রাম টার নাম হল Escape to Freedom.  এটা মুলত সাদ্দামের ছেলে উদয় সাদ্দামের কার্যকলাপের উপর। লোমহর্ষক। সাদ্দামের পতনের পিছনে অনেক কারনের মধ্যে ওর পরিবারের অনেক ভুমিকা ছিল। সাধারন মানুষের যখন আর কোথাও কোন বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, এবং চারিদিকে সর্বত্র যখন অবিচার আর জুলুমের রাজত্ত কায়েম হয়ে যায়, তখন আল্লাহ যে কোন বিধর্মীর মুনাজাতও কবুল করেন যদি তা সত্য হয়, তখন তাঁর আবদার হয়ে উঠে সৃষ্টিকর্তা আর সৃষ্ট জিবের। ওখানে তখন আর ধর্ম কোন বড় ইস্যু হয়ে উঠে না। ধর্ম মানছি  কি মানছি না এটা নিতান্তই ব্যক্তি এবং সৃষ্টিকর্তার মাঝে ফয়সালা। কিন্তু যখন সমাজকে গননা করা হবে তাঁর মধ্যে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন কালচার, ভিন্ন মতবাদ সব বিচার্য। সাদ্দামের ছেলে উদয় সাদ্দামের কাহিনি ঐ রকম একটা সমাজ বিরুদ্ধ। আমি শেষ পর্যন্ত প্রগ্রামটা দেখেছি এবং আমি উদয় সাদ্দমের শেষ পরিনতিটাও দেখলাম, আমার মধ্যে মনে হয়েছে ভগবান, আল্লাহ, ঈশ্বর বা রাম যাই বল না কেন, কেউ আছে।

১৯৮৭ সালে যখন ইরাক ইরান যুদ্ধ হচ্ছিল, তখন ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধে থাকা এক সৈনিকের কাছে সরাসরি চিঠি আসে, তাঁর নাম লতিফ। তাকে সাদ্দামের প্রাসাদে যেতে হবে, কেন যেতে হবে, কি কারনে যেতে হবে কেউ জানে না। লতিফ কিংবা যুদ্ধে থাকা কমান্ডার কিংবা লতিফের পরিবার কেউ আচ করতে পারছিল না কেন হটাত করে এই নিরিহ সৈনিকের কাছে সাদ্দাম হোসেন সরাসরি অফিসিয়ায়ল চিঠি পাঠিয়ে তাকে সাদ্দমের প্রাসাদে আসতে বলা হয়েছে।

সৈনিক ভয়ে ভয়ে প্রাসাদে গেলেন, সৈনিক লতিফ এর আগে কখন সাদ্দামের প্রাসাদ এত কাছে থেকে দেখার সুযোগ পায় নাই, অথচ আজ সৈনিক লতিফ সরাসরি সাদ্দামের প্রাসাদে ঢুকে, সাদ্দামের সাথে একত্রে বসে কথা বলবেন যেখানে সাদ্দাম ছাড়া আর কেউ নাই। ভীষণ ভয়ে আছে সৈনিক লতিফ। তাঁরপরেও তো সাদ্দামের তলব। না গেলে আগেই মরন, গেলে হয়ত মরলেও কিছুদিন পড়ে মরতে হবে। কি এক অজানা ভয়, গা শির শির করছে, কত বড় প্রাসাদ!!!! কি রঙিন কি সুন্দর, লতিফের কাছে এটা কোন বাড়ি, বা প্রাসাদ বা অন্য কিছু মনে হয় নাই, মনে হয়েছে এটা একটা স্বপ্ন যা ও কোনদিন ভাবে নাই, বা ভাবার শক্তিও রাখে নাই। এটা সাদ্দামের প্রাসাদ। চারিদিকে সুনশান, নিরাপত্তার বাহিনি, যেন মশারাও শঙ্কিত। গাছের পাতা বিবর্ণ হলে যেন গাছেরও শাস্তি হতে পারে এই ভয়ে কোন পাতাও তাঁর রং পরিবর্তন করে না। সবাই সাদ্দামকে মানে। এই মানার মধ্যে কোন আইন আছে তা কেউ জানে না, শুধু সবাই জানে ওরা আর কিছুদিন এই পৃথ্বীর চাঁদটা দেখতে চায়, সূর্য কখন কোথায় থাকে সেই দৃশ্যটা আরও কিছুদিন দেখতে চায়। সাদ্দাম বিশাল এক অবর্ণনীয় সুন্দর একটা সোনালী রঙের টেবিলে বসে আছে। তাঁর অবধি পৌছাতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ গজ মার্বেল খচিত ফ্লোর পারি দিতে হয়।

তিনি সাদ্দাম হোসেন, ঐ যে সাদ্দাম হোসেন বসে আছে। লতিফের মাথা ঠিক কাজ করছে কিনা বুঝা যাচ্ছে না, বিমোহিত, শঙ্কিত, আশ্চর্য এক অনুভূতি। লতিফ কি তাকে সালাম করবে? নাকি স্যালুট করবে, নাকি পায়ে পড়ে যাবে? কি করবে সে এখন? কি করলে লতিফ ঠিক কাজটা করবে এটাই সে বুঝে উঠতে পারছে না। তাঁরপরও সে হেটে যাচ্ছে সাদ্দামের দিকে। এখন লতিফ আর তাঁর বুকের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছে না। হয়ত একটু পড়ে আর কখনই সে তাঁর বুকের স্পন্দন শুন্তেই পারবে না। কি অসহনিয় এক মুহূর্ত।

সাদ্দাম ঘার বাকিয়ে লতিফের দিকে তাকালেন। লতিফ আর হাটতে পারলেন না, কি কারনে থেমে গেল তা সে বুঝে উঠতে পারল না। এবার সাদ্দাম হাটছে লতিফের দিকে.........

লতিফ, হতভাগা লতিফ এখন ঠিক সাদ্দামের সামনে দাড়িয়ে। চমৎকার গোঁফ, সুঠাম দেহ, পলিশড করা ইউনিফর্ম, বিশাল ঘরের মধ্যে বাতাসও প্রবেশ করে না, ঠাণ্ডা একটা শিতল আবহাওয়া, হয়তো নিঃশব্দ এসির পারফিউমড বাতাস। এই বাতাস ইরাক-ইরান যুদ্ধের খোলা বাতাসের মত নয়। বারুদের কোন গন্ধ নাই, মুহুর্মুহু আর্টিলারি শেলের বিকট শব্দ এর ভিতরে ঢুকে না। সাদ্দাম শান্ত পরিবেশে কাজ করতে পছন্দ করেন, দেশে যত অশান্ত পরিবেশই বিরাজ করুক না কেন। দেশের ইন্টারেস্ট আর সাদ্দামের ইন্টারেস্ট এক হতে হবে এই বিশ্বাস সাদ্দাম করবে কেন? সাদ্দাম কি একাই দেশ প্রেমিক হবেন? কেন পুরু ইরাক হবে না? তাই, দেশের লোককে প্রকৃত দেশ প্রেমিক বানানর জন্য তিনি ইরানের সঙ্গে এক কারনবিহীন যুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন যেখানে অধিকাংশ ইরাকি যানে না কেন তারা ফ্রন্ট লাইনে ইরানের সঙ্গে যুদ্দ করছে। যাক, সেটা দেশের নাগরিকরা বিবেচনা করবে। এখন লতিফের সামনে আমাদের সাদ্দাম দাড়িয়ে আছেন, এটাই বাস্তবতা।

সাদ্দাম তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তার বা হাত উচিয়ে লতিফের কাধে রাখলেন, সাদ্দামের চোখ লতিফের চোখে, লতিফ যেন সাদ্দামের নিঃশ্বাসের গন্ধও পাচ্ছিলেন।

"লতিফ, ঈশ্বর আমাকে দুটু ছেলে দিয়েছেন, আমি খুশি, আর তুমি এখন আমার তিন নম্বর ছেলে।" সাদ্দাম লতিফের কাধে হাত রেখে বললেন।

লতিফ বুঝে উঠতে পারছিল না কি তাঁর বলা উচিৎ। লতিফ কি খুশিতে হেসে দেবেন নাকি আত্মহারা হয়ে তাঁর নতুন বাবাকে জরিয়ে ধরবেন? লতিফ শুধু এক অজানা ভয়ে আরও সংকিত হয়ে কুচকে যেতে লাগলেন যেমন করে অনেক শক্তিশালি আগুনের কাছে একখন্ড প্লাস্টিক নিমিষেই গলে তাঁর অস্তিত্ব হারিয়ে শুধু এক তরল বর্জ্য পদার্থে পরিনত হয়।

'লতিফ, তুমি আজ থেকে আমার আরেক উদয়। উদয়ের প্রতিচ্ছবি। কারন তোমার সঙ্গে আমার উদয়ের চেহারা অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। আজ থেকে তুমি উদয়ের বিকল্প হবে।' সাদ্দাম বললেন।

লতিফ জানত, সারা ইরাকের মানুষ ভগবানকে ভয় না পেলেও উদয়কে ভয় পায় না এমন লোক তাঁর জানা নাই। উদয় যখন যাকে খুশি খুন করতে দ্বিধা করেন না। মদ আর নারীর মধ্যে তিনি কোন ভেদাভেদ করেন না। তিনি টাকার লোভী নন, তিনি শুধু যখন যা খুশি করতে ইচ্ছে করেন তাই করেন। এতে রাজ্য গেল নাকি কারো প্রান গেল, সেটা দেখা তাঁর দায়িত্ত নয়। তাঁর ইচ্ছা আর অনিচ্ছাই প্রধান। লতিফ এখন উদয় হয়ে যাবেন। পৃথিবীর সব চেয়ে ঘৃণিত ব্যাক্তির প্রতিচ্ছবি। তাও আবার জীবন্ত।

মুনায়েম উদয়ের পিএস। তিনি সাদ্দামের ঘরে ঢুকে লতিফকে নিয়ে গেলেন। নিয়ে গেলেন উদয়ের নিজ ঘরে। এ আরেক রাজ্য? এখানে দেয়ালগুলো হরেক কালারের। কোনটা উৎকট লাল, কোনটা গাড় সবুজ, উপরে ঝারবাতিগুলো কেমন যেন। বাহিরে যাবার পথ মাটির নিচ দিয়ে, কেন যে সরাসরি উপর দিয়ে না, এটা লতিফ বুঝে কিন্তু লতিফ উদয় হয়ে গেলে তাঁর জন্য অনেক পথ খোলা হয়ে যাবে, ঐ গোপন রাস্তাগুলো তাঁর নিজের হয়ে যাবে। এটা কি ভাগ্যবানের  লক্ষন না অশুভ তা লতিফ মেলাতে পারছিল না। কোন জনমে ওর পিতা মাতা বা পিতামহরা এত পুন্য করেছিল যে রাজকিয় রক্ত না বহন করেও আজ লতিফ রাজার ছেলে হয়ে গেল? অংকটা মেলান বড় কঠিন হয়ে গেল লতিফের জন্য। তাঁর পরেও বাস্তবতা হচ্ছে এখন লতিফ স্বয়ং সাদ্দামের ছেলে উদয়ের ঘরে বসে আছে। তাঁর গায়ে সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রের খসখসা ইউনিফর্ম। লতিফ এত শিতল ঘরেও একটু একটু করে ঘামছেন।

"হা হা হা" বিকট এক কর্কশ হাশি, হাসিও এত কর্কশ হয় তা লতিফের জানা ছিল না। ঘার ঘুরিয়ে লতিফ দেখল, উদয় একহাতে এক শক্ত লোহার বার এবং অন্য হাতে চুরুট নিয়ে বুকের তিনটা বুতাম খোলে হেলেদুলে তাঁর নিজের রুমে ঢুকছেন আর লতিফকে দেখে খুব মজা করে এই কর্কশ হাসিটা দিচ্ছেন। লতিফ এই প্রথম সাদ্দামের এত প্রতাপশালি ছেলে উদয়কে এত কাছে থেকে দেখলেন। লতিফের বুকে যেটুকু সাহস এতক্ষন ছিল তা নিমিষেই করপুরের মত উবে গেল।

লতিফ দেখল তাঁর সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতাপশালি রাজার এক যুবরাজ 'উদয়' তাঁর সামনে উদিয়মান। লতিফ নিজেও এখন যুবরাজ কিন্তু আসল যুবরাজ নন, তাতে কি? তাঁর দাতগুলোও তো আসল যুবরাজের মত, তাঁর হাত পা, তাঁর চুল, তাঁর মুখের অববয়বও তো এই আসল যুবরাজের মতই  ঠিক ছবিতে যেমন দেখেছেন তাকে ঠিক তাই। খোচা খোচা দাড়ি, ঠোটের নিচে একটা কাটা দাগ, অবশ্য লতিফের ঠোটের নিচে এই দাগটা নাই, হয় তো অচিরেই এটা তাঁর ঠোটে লাগিয়ে দেয়া হবে। কি অদ্ভুত না? লতিফ কিছুই ভাবতে পারছে না।

আহহহহহ......

শক্ত একটা লোহার দন্ডে তাঁর কাধটা যেন অবশ হয়ে গেল আর সম্বিত ফিরে এল লতিফের, উদয় তাঁর হাতে থাকা লোহার রডটি দিয়ে লতিফের ঘারে একটা বাড়ি দিয়ে বল্ল, "আজ থেকে তুমি হবে আমার জীবন্ত শিল্ড। হিউম্যান শিল্ড। মুনায়েম, লতিফকে শিখিয়ে দাও আমি কিভাবে হাটি, কিভাবে চুরুট টানি, কিভাবে মানুষের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ি, কিভাবে গাড়ি চালাই, কিভাবে গাড়িতে বসি, সব শিখিয়ে দাও।"

লতিফ তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে এবার প্রথম কথা বলার চেষ্টা করল। "স্যার আমি তো অভিনেতা নই, আমি আপনি হতে পারব না। আমার পরিবার আছে, আমার মা আছে, আমার বোন আছে, আমার বাবা আছেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি নিতান্তই একজন সাধারন মানুষ। আমি বাচতে চাই স্যার।"

মানুষ যখন অতল সমুদ্রে পড়ে হাবুডুবু খায়, তাঁর তখন হিতাহিত জ্ঞ্যান থাকে না। লতিফেরও ছিল না। কিন্তু তাঁরপরেও লতিফের যতটুকু জ্ঞ্যান অবশিষ্ট ছিল, হয়ত ঐ অবচেতন মনই লতিফকে এই দুঃসাহসী কথাগুলো উদয়ের কাছে বলতে পেরেছিল। কিন্তু উদয় তো আর যে সে যুবরাজ নয়। ৪০ বছর রাজত্ত করা এক রাজার ছেলে। যার জন্ম হয়েছে প্রাসাদে, যার প্রতিটি ক্ষন কেটেছে প্রাসাদের কৃত্তিম বাতাস আর চির ধরা ঠোটের মেকি হাসির পরিবেশে। সে কি করে বুঝবে পরিবার কি? সে কি করে বুঝবে ভাইয়ের কাছে একটা বোনের মর্যাদা কি? সে কি করে বুঝবে বাবার সাথে ছেলের কি কারনে ঝগড়াও হয় আবার কারনে অকারনে বাবা-পুত্র মিলে নিঃশব্দে কেদে বুকের জামা ভিজে যায়? উদয় শুধু জানে সুন্দর কিছু নারী মুখের পিছনে শুধু আছে নির্লজ্জ ধর্ষণ, আছে পরিত্যাক্ত ঘৃণার কিছু নোনা জল। আর আছে মদের নেশায় এক উন্মত্ত বর্বরতা। ওর কাছে ঐ নারীর চোখের ভাষার কোন দাম নাই, বোনের মমতার কোন মুল্য নাই, বাবা-মার আদর আর পরিবারের যে বন্ধন সেটা তাঁর জিবনে কোন ভগবানই রাখেন নাই।  হতভাগা যুবরাজ।

"নিয়ে যাও ওকে ওখানে যেখানে মানুষ তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে নত শিকার করে, নিয়ে যাও ওকে ঐখানে যেখানে কুকুর এবং মানুষের বসবাস একই দেয়ালের মধ্যে।" যুবরাজ উদয় মুমেনকে বলে দিলেন আর মনের সুখে আরও কয়েক প্যাগ মদ তাঁর উদরে ঢেলে দিলেন।

লতিফের স্থান হল ১ মিটার বাই ১ মিটার এক রুমে। পুরু দেয়ালটা উৎকট লালরঙ্গে রাঙা। চোখ ঝলসে আসে, মাথা ধরে যায়, কোন ভেন্টিলেটার নাই, বাতাস ঢুকবার কোন প্রবেশ পথ নাই। প্রতি ঘন্টায় শুধু ৫ মিনিটের জন্য ফ্রেশ বাতাস আসার ব্যাবস্থা করা হয়। লতিফ যুবরাজ না হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করায় এখন তাঁর মরার প্রস্তুতি চলছে। আর যদি এর মধ্যে লতিফ তাঁর শির নত না হয় তাহলে লতিফের বাবার প্রান যাবে, বোন ইজ্জত হারাবে, মাকে আর বাঁচানো যাবে না, লতিফ তো আর থাকবেই না। কে বলে ঈশ্বর আছে? লতিফ উচ্চস্বরে ঐ ১ বাই ১ মিটার রুমের মধ্যে গলা ফাটিয়েই তাঁর ঈশ্বরের কাছে বলতে থাকে, "কই তুমি হে ঈশ্বর? কে বলে তুমি আছ? কোথায় তুমি এখন তাহলে? আমার এ জনমের সব প্রার্থনা তাহলে কি সব মিথ্যা? তুমি কাকে ভয় পাও? তোমার কি চোখ নাই? আমার ঈশ্বর কি এতটাই অন্ধ যে সে ১ বাই ১ মিটারের রুম দেখতে পায় না? হে ঈশ্বর আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি তোমার সাহায্য চাই, তুমি আমাকে রক্ষা কর।" কিন্তু ঈশ্বর আসেন না। ঈশ্বর তাঁর কথার কোন উত্তর করেন না, শুধু লতিফের কথাগুলোই ঐ ছোট্ট ১ বাই ১ মিটার রুমের দেওয়ালে আঘাত খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার ফেরত আসে। সঙ্গে ফেরত আসে উদয়ের পিএস মুনায়েম।

লতিফ শেষমেশ রাজী হল সে উদয় হবে। লতিফ রাজী হয়েছে। এই সুখবরে উদয় আরও কয়েক জোড়া সুন্দরি রমনি নিয়ে মদের আড্ডায় বসে গেল আর দেখতে থাকল লতিফ কিভাবে উদয় হয়, কিভাবে লতিফ উদয় হবার প্রশিক্ষন নেয় তা দেখার জন্য। 

উদয়ের হাটার ভঙ্গি, চুরুট খাওয়ার স্টাইল, কারো সঙ্গে কথা বলার স্টাইল, মানুষদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ার স্টাইল ঘার বাকিয়ে কাউকে দেখার কৌশল, গাড়ি চালানোর কৌশল, ইত্যাদি সবই ভিডিও করা আছে, তা লতিফ শিখে নিচ্ছে আর কোথাও ব্যাতয় হলে প্র্যাক্টিকেল দেখিয়ে দিচ্ছে জনাব স্বয়ং আসল যুবরাজ উদয়। এই প্রশিক্ষন যতটা সহজ মনে হয়েছিল অতটা সহজ হয়নি। আসলে ট্রেইনিং কখন সহজ নয়। এর মধ্যে শাস্তি আছে, আছে চরম লাঞ্ছনা, আছে নিপীড়ন, আছে ভয় মৃত্যুর। লতিফের বেলায়ও এর কোন ব্যাতিক্রম হয় নাই। তবে এর মধ্যে যে কাজগুলো লতিফকে অত্যান্ত পীড়া দিয়েছিল তা হচ্ছে লতিফকে উদয় হতে গিয়ে তাঁর ঠোট কাটতে হয়েছে, তাঁর দাতগুলো চাঁচতে হয়েছে, তাঁর কানের কাছে ড্রিল মেশিন দিয়ে একটা কালো কালো ফুটু করতে হয়েছে। লতিফের এই সুন্দর অবয়বের প্রতি কোন মোহ ছিল না শুধু তাঁর কষ্ট হচ্ছিল এই সুন্দর অবয়ব করতে গিয়ে লতিফের শারিরিক কষ্টটা।

নয় মাস পেরিয়ে গেছে ট্রেনিং এর। লতিফ অনেকটা উদয় হয়ে গেছে। কিন্তু এক জায়গা ছাড়া। উদয় লতিফকে এক সুন্দরি মেয়ে ধরিয়ে দিয়ে বল্ল, যাও, তুমি এখন উদয়, ওকে নিয়ে ঐ ঘরে যাও। কিন্তু লতিফ তো লতিফ , সেতো আর উদয়ের মত রক্তে পরিবর্তন হয়ে যায় নাই। লতিফ পারেনি নিরিহ এক নিস্পাপ মেয়েকে নিয়ে ফস্টিনস্টি করতে। আসল যুবরাজ অত্যান্ত রাগ লতিফের উপর। আর এইটা কিভাবে করতে হয় তাঁর ডেমো দেখাতে গিয়ে আসল যুবরাজ উদয় তৎক্ষণাৎ পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া দুই দিনের এক দম্পতির মেয়েটিকে সবার সামনে বলাৎকার করলেন, পাশে লতিফ, উদয়ের বডিগার্ড, তাঁর পিএস, এবং মহামুল্যবান রাজপ্রসাদ। সবাই এর সাক্ষী। সাধারন মানুষ তো আর উদয়ের সাথে পেরে উঠবে না আর বিচারের কথা বললে তো হবে না। উদয় নিজে যা করে সেটাই বিচার। কিন্তু সাধারন মানুষের কাছে আরও একটা পথ খোলা ছিল। তা হচ্ছে বিচারবিহীন আত্মহত্যা। আর সেটাই করে গেল ঐ সাধারন দম্পতির অসহায় মেয়েটি। এতে উদয়ের কি আসে যায় আর রাজপ্রাসাদেরই বা কি আসে যায়। এমন কত নারী এখানে গলা ফাটিয়েছে, কত নিরিহ প্রান এখান থেকে পালানর জন্য আত্মাহুতি দিয়েছে। রাজপ্রাসাদের ইটের কোন ভাষা নেই, ওরা নিরব সাক্ষী থাকে, কথা বলার জন্য দরকার একজন লেখকের। উদয়ের প্রাসাদে কোন লেখক প্রবেশ করে না।

১৯৮৮ সাল। ইরাক ইরান যুদ্দ শেষ হয়ে গেছে। ইরাকে বিশাল এক ফুটবল খেলার সমাপ্তি ঘোষণা আজ। সঙ্গে পুরুস্কার বিতরণী। আর আজই হবে লতিফের প্রথম টেস্ট। আজ লতিফকে যুবরাজ উদয় সেজে জনসম্মুখে ফুটবল খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করতে হবে এবং নকল যুবরাজ আসল যুবরাজের হয়ে পুরুস্কার বিতরন করবে। যদি ভালোয় ভালোয় লতিফ পাশ করে যান, তো টিকে গেলেন আর যদি পাশ না করেন লতিফ তাঁর পুরু পরিবার নিয়ে সকাল আর সূর্যের মুখ দেখতে পারবেন না। ---------

অনুষ্ঠান শুরু হল, লতিফ রাজকিয় গাড়ি আর চৌকশ সিরিমনিয়াল প্যারেডের মধ্য দিয়ে উদয় সেজে ফুটবল সমাপ্তি অনুষ্ঠানে হাত নেড়ে, ঘার বাকিয়ে ডায়াসে আসলেন। মনে তাঁর অনেক দ্বিধা, অনেক চঞ্চলতা, সবচেয়ে শক্তিশাললি আসন অথচ সবচেয়ে দুর্বল মন নিয়ে লতিফ একে একে সবাইকে পুরুস্কার দিলেন, মনের আনন্দে নয় অধুম্পায়ি লতিফ ধুম্পায়ি উদয়ের চরিত্রে একের পর এক চুরুট টেনে যাচ্ছেন। অন্যদিকে লাইভ ক্যামেরায় আসল যুবরাজ পাশে কতক নবান্নের আউসের মত আধা পাকা কিছু লাজুক এবং ভীত সন্ত্রস্ত তরুনিকে নিয়ে অনেক দূরে এক প্রাসাদে বসে আসল যুবরাজ উদয় ভোগে লিপ্ত রয়েছেন আর লতিফের অভিনয় দেখছেন।

লতিফ পাশ করেছে।

দিন যায় মাস যায়। ১৯৯১ সাল। গালফ ওয়ার শুরু। সাদ্দাম হোসেন তাঁর ছেলে উদয়ের জীবননাসের আসংকা করছে ইরানিয়ান এবং আমেরিকান উভয়ের কাছ থেকেই। সিদ্দান্ত হল, আসল যুবরাজ উদয় সুইজারল্যান্ডে চলে যাবেন আর নকল যুবরাজ ইরান-ইরাক বর্ডারে গুলিতে মারা যাবে। এই সিদ্দান্তটা আসল যুবরাজ জানলেও নকল যুবরাজ জানলেন না।

আসল উদয় সুইজারল্যান্ডে যাবার আগে ও ওর মৃত্যু সংবাদ আন্তরজাতিক পত্রিকাগুলোতে দেখে তারপর সুইজারল্যান্ডে যেতে চান। তাই, প্রথমে নকল যুবরাজকে ইরান-ইরাক বর্ডারে  পাঠানো হল কিন্তু খবরটাও দেয়া হল যে উদয় দেশ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে বর্ডার পারি দিয়ে। সন্ধায় খবর এল, উদয় গুলি খেয়েছে কিন্তু মরেন নাই।

হাসপাতালে নকল যুবরাজ তাঁর একটা আঙ্গুল হারান, কিন্তু নকল যুবরাজকে আঙ্গুল হারালে যে আবার আসল যুবরাজেরও একটা আঙ্গুল কেটে ফেলতে হবে তাই আসল যুবরাজ ডাক্তারদেরকে জানালেন, ঐ আঙ্গুল না লাগান গেলে ডাক্তারদের কল্লা যাবে।

এইভাবে ২০০৩ পর্যন্ত লতিফ আসল যুবরাজের মুখুস পড়ে অনেক অত্যাচার আর নিপিরনের মধ্য দিয়ে নিজ পরিবার ছেড়ে কোন এক প্রাসাদে নিতান্তই জাজাবরের মত নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে লাগলেন যেখানে তাঁর কোন কিছুরই অভাব ছিল না, শুধু অভাব ছিল জিবনের নিরাপত্তা আর ছিল নিসসঙ্গতা।

সবশেষে ২০০৩ সালের কোন এক সময় আসল যুবরাজ আর নকল যুবরাজ মুখুমুখি দাড়িয়ে যান। দুজনের হাতেই সেম পিস্তল, দুজনেই উদয়, দু জনেই প্রাসাদে, কিন্তু একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।

 চলল গুলি, দুজনেই আহত, নকল উদয় আসল উদয়ের গাড়ি, চুরুট আর পিস্তল নিয়ে কোন রকমে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গিয়ে বর্ডার ক্রস করে পারি দিলেন তুরস্কে। আর আমাদের আসল যুবরাজ ইরানিয়ান/আমেরিকানদের হাতের পড়ে মারা যান।

পৃথিবী এক জঘন্য পিচাশকে হারাল। লতিফ এখন  ইউরপে তাঁর পরিবার নিয়ে ব্যবসা করছে। তিনি জীবিত আছেন,

           

আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী

Categories

আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী

তিনি আমার শ্বশুর।

আমি আমার শ্বশুর কেও জীবিত অবস্থায় দেখি নাই। আমার স্ত্রী যখন অষ্টম ক্লাসে পড়ে, তখন তার বাবা মারা যান। আমি যখন আমার স্ত্রীকে বিয়ে করি, তখন আমার স্ত্রী সবে মাত্র ইন্তারমিডিয়েট পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির তোড়জোর করছেন। ফলে আমার বিয়ে হবার প্রায় ৪/৫ বছর আগে আমার শ্বশুর মারা যান। আমার শ্বশুরের প্রাথমিক তথ্য গুলি এ রকমেরঃ

নামঃ আলাউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী

পিতাঃ সোনাম উদ্দিন চৌধুরী (সোনাম উদ্দিন চৌধুরীর পিতার নাম ছিল, ফাজেল আহম্মদ চৌধুরী)

স্ত্রীর নামঃ জেবুন্নেসা চৌধুরী

আমার শ্বশুরের ছিল আট কন্যা সন্তান এবং তিন পুত্র সন্তান।

আমার স্ত্রী ছিলো তাদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ।

তাদের ওয়ারিশ নামা যদি লিখি তাহলে দাঁড়ায় এ রকমেরঃ

০৯/০৪/২০২১-তুমি ছাড়া আমি

সকালটা আমার খারাপ ছিলো না। প্রতিদিনের মতোই আমার সকাল হয় অন্যসব দিনের মতো একই রুটিনে-ভোরে নামাজ, তারপর কোরআন তেলওয়াত অতঃপর কিছু নাস্তা। নাস্তার পর আমি দীর্ঘ একটা সময় অপেক্ষা করি অতি আখাংকিত এবং জীবনের চেয়েও প্রিয় একটা  ফোন কলের জন্য। আর সেটা প্রতিদিনই আসে, কখনো আধা ঘন্টা পর কিংবা কখনো আধা ঘন্টা আগে। কোনো ঋতুতেই এর কোনো ব্যত্যয় হয় নাই। শীতের সকালে আমি যখন একা গরম লেপের ভিতরে জেগে থাকি তখনো আসে, আবার চৈত্রের দাব্দাহনেও আসে। বর্ষার ঘন বৃষ্টিতেও আমার এই প্রিয় ফোন কলটা আসেই। মাঝে মাঝে এমনো হয় আমার সেই কাংগখিত ফোনটা হয়ত দিবসের মধ্যভাগেও আসে, কখনো অতি ভোরেও আসে, তবে আসেই। কোনো উত্তাপ নেই, নাই কোনো তারাহুড়া আমার। আজো সেভাবেই আমি অপেক্ষায় ছিলাম। জানি ফোন আসবে। কারন এটা কোনো মানুষের সাথে আমার দৈব পরিচয় নয় যে আমার জন্য ভাবে না, কিংবা এমন নয় যে, স্রোতে ভাসা কোনো প্রানহীন মাছ যার না আছে এই জগতের প্রতি টান বা কোনো হিসাব-কিতাব। এই ফোন কলটা সব সময় ‘ওয়ান ওয়ে ফোন”।

সে আমার জীবনের সব কিছু। প্রকাশ্য জীবনে তাঁকে আমি চিনি না, কখনো দেখি নাই, এটাই তার সাথে আমার চুক্তি। যখন সে আসে, সে আসে অন্য কোনো নামে বা অন্য কোনো পরিচয়ে। তারপরেও সে আমার দেবতার মতো এক অসীম শক্তি আর বল। আমি জানি এই জীবনে আমি তাঁকে কখনো আমার মতো করে পাবো না, না সে আমাকে স্পর্শ করতে পারে প্রকাশ্য রীতিতে অথচ সেই আমার প্রথম মানুষ যার স্পর্শে আমি হয়ে উঠেছি এক সুখী রমণী। একজন অন্য মানুষ, অন্য জগতের সংসারী। আমার সংসারে সব আছে কিন্তু আমার সমস্ত রমনীকুলের ক্ষমতা থাকা সত্তেও আমি একা, আমি মা নই। সেই আমার সন্তান, আমিই তার মা, আমিই তার মায়া, আমিই তার সহধর্মিনী অথবা আমিই তার এক মাত্র সৈনিক যে কমান্দারের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করে প্রতিটি নিসশাসে এবং ভালোবাসায়। আমার এই সংসারে সুখ আছে, আনন্দ আছে, আমার জীবনের নিশ্চয়তা আছে, তার সাথে আছে অদম্য এক মায়া।

কিছু সম্পর্ক আছে দেবতা তৈরী করেন, কিছু সম্পর্ক আছে সমাজ তৈরী করে আর কিছু সম্পর্ক আছে আমরা মানুষেরা অন্তরে অন্তরে তৈরী করি যার না আছে প্রকাশ্য কোনো স্বীকৃতি, না আছে সামাজিক কোনো গ্রহণযোগ্যতা। তারপরেও এই সম্পর্কের চেয়ে বড় কোনো সম্পর্ক হয় না। আমি একাই ঘুমাই, একাই জাগি, একাই খেলি, একাই কথা বলি শুধু তার সাথে। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ গুলি যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন আমি তার সাথে কথা বলি শত সহস্র দূর থেকে। তাঁকে আমি দেখতে পাই, কিন্তু ছুতে পারি না। তার সাথে আমি কথা বলি কিন্তু স্পর্শ করতে পারি না। তাঁকে আমি সারাক্ষন দেখতে পাই কিন্তু হাত দিয়ে তার হাত ধরে আমি অই রাস্তার পাশ দিয়ে হেটে যেতে পারি না। অথচ আমি সারাক্ষন তার সাথেই আছি।

আজ যেনো অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে আমার সেই ফোন কলটা আসার। মন একটু একটু অসহিষনু হচ্ছে, বুকের ভিতর কেমন যেনো ধরফড় করছে। বেলা পড়ে যাচ্ছে, খেতে ইচ্ছে করছে না, কখন গোসলের সময় পেরিয়ে গেছে মনেও নাই। রান্নাটা করা হয় নাই, বারবার ফোনের দিকে তাকিয়ে আছি-এই বুঝি ফোনটা এলো।

-হ্যা, ফোনটা বেজে উঠেছে। দৌড়ে ফোনটা হাতে নিতেই দেখি আমার মা। হ্যালো বলছি, মাকে ডাকছি, মা কোনো কথা বলেন না। মায়ের গলা বড্ড ভেজা।

-সে নাই। কিছুক্ষন আগে সে সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে। হু হু করে কাদতে কাদতে মা আমাকে এই সংবাদটাই জানালেন। এই প্রিথিবীতে এই এক মাত্র মানুষ যিনি জানেন আমার জীবনের সব কাহিনী আর আমার সুখের ভাণ্ডারের গোপন রহস্য।

আমি ধপ করে বসে গেলাম মাটিতে। কি হলো? আমার মনে হতে লাগলো আমার শরীর থেকে সমস্ত রক্ত বিন্ধু এক ফোটা এক ফোটা করে মাটিতে ঝরে পড়ছে, আমার নিসশাস এক টা একটা করে কমতে শুরু করেছে, ঘরটা যেনো চারিদিকে দুলছে, ফ্যানটা যেনো তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আবোল তাবোল শব্দ করছে, আমি বুঝতে পারছি আমার পায়ের নীচের সব কিছু ফস্কে যাচ্ছে, দ্রিষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, আমি জ্ঞান হারাইলাম।

কখন জ্ঞান ফিরেছে আমি জানি না, যখন চোখ খুলেছি, দেখেছি পাশে আমার মা বসে। (Cont....)

০৮/০৪/২০২১-তোমাকে ছাড়া আমি  

Categories

যেদিন প্রথম আমি তোমার সাথে জীবন বেঁধেছিলাম, সেদিন বুঝি নাই আমার কতটা নিয়ে গেলে তুমি। একাই এসেছিলাম যেমন কেউ পালিয়ে যায় তার সেই চেনা শিশুকাল, চেনা শৈশব, আর চেনা সব ভালোবাসার জগত ছেড়ে। আমার সেই নতুন জগতে তোমাকে জুড়েই আমার সময় পেরিয়ে গেছে দিনগুলি একটা একটা মুহুর্ত করে, পেরিয়ে গেছে মাস একটা একটা সপ্তাহ শেষে। এরপর বছর পেরিয়ে গেছে মাস শেষে, আর যুগ পেরিয়ে গেছে বছরান্তে। তোমাকে কেন্দ্র করেই আমার জীবনের অনেক অভ্যাস, অনেক শখ আমুল বদলে গেছে চিরতরে, আমি বুঝতেই পারিনি কখন কবে কোন ক্ষন থেকে আমার প্রিয় সবুজ রংটা থেকে তোমার প্রিয় নীল রংটা আমার প্রিয় হয়ে গেছে। এভাবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে আমার অনেক অভ্যাস যা কখনোই আমার ছিলো না, ছিলো শুধু তোমার নিজের। আমি দিনে ঘুমাতে পছন্দ করতাম, আমি ঝাল খেতে পছন্দ করতাম, আমি মিষ্টি একেবারেই খেতে চাইতাম না, অবিরত টেলিভিশনের সামনে আমার পছন্দের সিরিয়ালগুলি দেখতেই থাকতাম। অথচ সেই আমি কত বদলে গিয়েছিলাম তোমার সংসারে এসে। আমাকে আর সেই ঝাল আর নেশা ধরায় না, টিভির সেই সিরিয়ালগুলি আমাকে হয়তো খুব মিস করে, দিনের শখের ঘুমটা যে কবে বিদায় নিয়েছে তার দিনক্ষনও আমার আর আজ মনে না। কবে যে তোমার মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসটা আমার ঝাল খাওয়ার নেশাকে অতিক্রম করে আমাকেও মিষ্টি খাওয়ার নেশায় বদল করে ফেলেছে, আমি নিজেও জানি না। শীতের সকালে কাকডাকা ভোরে গরম আমেজের বিছানা ছেড়ে সেই কখন থেকে যে আমি অধীর আগ্রহে সেই পিঠাটাই বানাতে শুরু করেছিলাম যেটা তুমি খেতে ভালোবাসতে। আর এভাবেই পার হয়ে গেছে আমার সবকটি ঋতু। আমার সব আগ্রহ আর অভ্যাস যেনো গড়ে উঠেছিলো তোমাকে ঘিরেই।

আজ এতো বছর পর, আজ কেনো সব উলট পালট হয়ে গেলো? সূর্য ঠিক সময়মত উঠে আজও তো সকাল হয়েছে। মনেও পড়েছিলো তুমি অফিসে যাবে। কিন্তু আজ আমার কেনো তাড়া নাই তোমার জন্য নাস্তা বানানোর? সকালের হকার তো সেই আগের মতো পত্রিকাটাও দিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো তো পত্রিকার ভাজটা পর্যন্ত খোলা হলো না! চকলেটের সিরিয়ালটা তো টেবিলের উপরেই আছে, অথচ আমি কেনো ব্যস্ত হই নাই গরম দুধে তোমার খাবারের জন্য সিরিয়ালতা বানানোর জন্য? অফিসে যাওয়ার আগে হাত মুখ ধুতে যাবার আগে কতবার শুনেছি তোমার ওই কন্ঠটা- ওই, রেডি হচ্ছি, নাস্তাটা বানাও, কিংবা বলতে ‘ড্রাইভারকে বলো ব্যাগটা নিয়ে যেতে’। খুব ধাক্কা দেয় বুকে। তুমি ছাড়া সকালটা কত আলাদা। রুমভর্তি তোমার সিগারেটের গন্ধটাও আজ নাই। রান্নাঘরের দিকে যেতেই তোমার ঘরটা চোখে পড়ে, ইশ, ওই খানে তুমি বসে থাকতে, পেপারটা পড়তে, সিগারেট টানতে, খালী পেটে কফি খেতে। কি অবাক। সেই সোফাটা আজো আছে, এস্ট্রেটা আগের জায়গাতেই আছে, শুধু তুমি ওখানে নাই। তুমি আজ নাই। আমি তোমাকে আজ ইচ্ছা করলেই সেই আগের মতো স্পর্শ করতে পারছি না।

অফিস শেষে সন্ধ্যায় বা রাতে ঘরে ঢোকে আমাকে না দেখতে পেলে সারাটা বাড়িতে তুমি আমাকে খুজতে। আর মেয়েদের জিজ্ঞেস করতে-আরে তোর মা কই? যেনো আমি হারিয়ে গেছি। রান্নাঘরে কাজে থাকলে তুমি রান্নাঘর পর্যন্ত চলে যেতে। বলতে-কি করো? হয়তো এটুকুই। অথচ আজ তুমিই হারিয়ে গেলে। আজ আর আমাকে কেউ বলে না-আরে কোথায় গেলা বা কি করো? রান্নাঘরে তোমার পছন্দের খুব ছোট স্টীলের পাতিলটা আজ আর কফির পানির জন্য গরম করার দরকার হয় না, ছোট কাপটাও আজ একেবারেই শুষ্ক। ওগুলি হাতে নিলেই খুব ভারী মনে হয়, মাটিতে বসে যাই, বুকের ভিতর কি যেনো কঠিন একটা চাপা ব্যথা অনুভব হয়।  ছুটির দিনটা এতো লম্বা মনে হয় আজ। ছুটির দিনে তোমার পান্তা ভাত আর ডিম ভাজীর কথা মনে হলেই চোখ ভিজে আসে। তোমার বাগান আজ তোমাকে খুব মিস করে। বাগানের প্রতিটা গাছ যেনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে তোমার অপেক্ষায়। ওরা হয়তো কথা বলতে পারে না কিন্তু ওদের হেলে দুলে ভালোবাসার প্রকাশটা যেনো আজ আর নাই। কি অদ্ভুত নিরবতা চারিদিকে।

আমি জানতাম, জীবনের কোনো না কোনো সময় এমন একটা সময় আসবেই। একমাত্র সহমরন আর দূর্ভাগ্যক্রমে কোনো দূর্ঘটনা ছাড়া কেউ কেউ সেই ভাগ্যবান হয় যখন একসাথে পৃথিবী-বিচ্ছেদ হয়। কি অদ্ভুত একটা জীবন, তাই না? একা বেচে থাকা যেমন কষ্টের, আবার  তেমনি সাথী নিয়ে বেচে থাকার পর আবার একা হয়ে যাওয়া আরো অনেক বেদনাদায়ক। কেউ চলে যাবার পর বুঝা যায় সব কিছু আমার ছিলো না। এতোটা বছর ধরে একসাথে চলার মধ্যে কখনো একটু রাগ, একটু অভিমান, একটু গোস্যা আর বিস্তর জায়গা জুড়ে পরস্পরের নিঃশব্দে  ভালোবাসাটাই একসময় মায়ায় পরিনত হয়ে গিয়েছিলো আমাদের। তখন এই মায়াটাই ছিলো আমাদের পূর্ন ভালোবাসা। ভাবতেই পারি না, তোমার টয়লেট করে আসার পর যে গন্ধটা একদিন আমার কাছে দূর্গন্ধ মনে হতো, তোমার ঘামের গন্ধে ভরপুর যে গেঞ্জীটা একদিন নাকের কাছে নিলে একটা শুকনা বাজে গন্ধ বলে মনে হতো, একদিন সেই টয়লেটের গন্ধ, ঘামের দূর্গন্ধ আর দুর্গন্ধ তো মনে হয় নাই আমার, বরং বড্ড মায়ায় যেনো ঘামে ভিজা গন্ধতা আরো জড়িয়ে ধরতাম। খুব মায়া লাগতো, আহা, কত কষ্ট করো, ঘামে শরীর ভিজে যেতো, তার সেই সাক্ষী এই গন্ধওয়ালা গেঞ্জীটা। অনবরত মমতায় আমি সেটা ভালোবাসায় ধুয়ে দিতাম।

আমি জানি, আমার ঘুমের মধ্যে ডাকা নাকের শব্ধ যখন তোমার কাছে একদিন অসহ্য মনে হতো, বিরক্তিকর মনে হতো, চুলে আধাভেজা তেলের যে গন্ধ একদিন তোমার নাক বুঝে আসতো, সময়ের এতোটা পথ পেরিয়ে কোনো একদিন তুমিও সেই নাকডাকা, সেই তেলেভেজা চুলের সোদা গন্ধ তোমারও ভালোবাসার একটা অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছিলো। যেমন আমার অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছিলো তোমার রাগ, তোমার অভিমান। আজ এইক্ষনে তোমার সেইসব রাগ অভিমান আমাকে কাদায়, আজ কেনো জানি মনে হয়, খুব মিস করছি সেই রাগ, অভিমান, আর মমতা। বড্ড একা লাগে এখন। সবাই চারিপাশেই আছে অথচ কি ভয়ংকর শুন্যতায় আমি দিন কাটাই যেনো আমি শক্তিহীন এক নির্জীব প্রানী। সবাই তোমাকে মিস করে, কাদে, কষ্ট পায়, কিন্তু আমি আমার কষ্টটা কাউকে বুঝাতে পারি না। চোখের জলের রঙ এক হলেও এই জলে ভেসে থাকা  কষ্ট, ব্যাথা, বেদনা আর হাহাকারের রঙ হয়তো সবার এক নয়। আমার কষ্টের রঙ হয়তো আরো নীল।

আজ তোমা বিনে এই একটা কথাই বারবার মনে জাগে- তুমি ছিলে আমার ভরষা, ছিলে আমার নিরাপত্তা, আমার পরামর্শদাতা, বিপদে আপদে তুমিই আমার ডাক্তার কিংবা নার্স। তুমিই ছিলে আমার সব। ব্যস্ততম রাস্তায় যখন আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বুক কেপে উঠতো, তোমার হাত ধরলেই আমার সব কাপুনী বন্ধ হয়ে যেতো। তুমি আমার মায়ার সংসার। বুকের সব পাজরে পাজরে তুমি গেথে ছিলে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে আর চোখের প্রতিটি বিন্দুজলে। নীল আকাশের গাংচিলের মতো তুমি খেলা করতে আমার  অন্তরের এমন এক কোটরে যেখান থেকে তোমাকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা আমার ছিলো না। অথচ দেখো, সেই তুমি কি অবলীলায় কোনো কিছু না বলেই আমাকে একা ফেলে কোথায় চলে গেলে।

সেই কোনো এক সময় জেনেছিলাম, মানুষ ভালবেসে নাকি খিলখিল করে হাসে, মেঘলা আকাশ দেখে নীল আকাশের কথা ভাবে, কবিতা লিখে। আজ এই একা জীবনে এসে বুঝলাম, ভালোবাসায় অনেক বেদনাও থাকে, থাকে চাপা কান্না আর বিরহের অসহায়ত্ত। শরীর খারাপ হলে এখন বড্ড তোমার কথা মনে পড়ে, মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে গেলে তোমার কথা মনে পড়ে, সন্ধ্যা হলেই তোমার বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে। ছুটির দিনে কেমন যেনো পুরু ঘরটাই ফাকা লাগে। অদ্ভুত না জীবন? স্মৃতিগুলি আরো ভয়ংকর মনে হয় এখন।

আমি জানি, এ জীবনে আর কেউ আমাকে তোমার মতো আদর, ভালোবাসা, অভিমান কিংবা মমতা দিয়ে না মন ভরাতে পারবে, না ভরষা দিতে পারবে, না পারবে সেই যাদুকরী কথায় আমার অভিমানগুলি কোনো এক তপ্ত ললাশীর মতো হাস্যোজ্জল করাতে। আসলে যেদিন প্রথম আমি তোমার কাছে এসেছিলাম, তখন আমি ছিলাম একজন উচ্ছল মায়াবতী সবেমাত্র পা রাখা এক কুমারী আর তুমি ছিলে কিশোর থেকে পা দিয়ে সবেমাত্র যৌবনে পা রাখা টকবকে এক যুবক। সেই বয়সটা পার করে অর্ধ শত বছর পার করেও আমি যেনো সেই ষোড়শী যুবতীর মতই আর তুমি সেই টকবগে যুবকের মতোই সময়টা কাটিয়েছি। যেনো দিনগুলি শুধু রাত আর দিনের মধ্যেই পার হয়ে, মনের দিক থেকে নয়। আমি তো সারাটা জীবন তোমার সাথেই থাকতে এসেছিলাম। আমি কল্পনার কোনো রাজকুমারী ছিলাম না, তেমনি তুমিও আমার কাছে কোনো কল্পনার পুরুষ ছিলে না। যতোক্ষন অবধি একটা কাল্পনিক নাম অন্য কারো সাথে যুক্ত হয়, ততোক্ষন সেটা হয়তো হাওয়াই থাকে। কিন্তু তুমি আমার জীবনে কোনো কাল্পনিক নাম ছিলে না। আমি তোমাকে স্পর্শ করেছি, ভালোবেসেছি, সবই ছিলো প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য আর জাগতিক। অথচ আজ তুমি আমার সামনে দিয়ে এতো জোরে দৌড়ে চলে গেলে, আমি আর তোমাকে নাগালই পেলাম না। মনে হচ্ছে আজ, তুমি আমার কল্পনার কোনো সুপুরুষ আর আমি কল্পনার কোনো রাজমুকারী। জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা দেখে কখনো বুঝা যায় না বা মন বুঝতে চায় না কোনটা সত্যি আর কোনটা সত্যি নয়। আমাকে এই একা ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনাটা আমার কাছে যদি মিথ্যা হতো, যদি এটা নিছক একটা সপ্ন হতো! কিন্তু এটাই সত্যি যে, ঘটনাটা সত্যি। তুমি নাই এই মিথ্যার পর্দাটা যখন আমি খুলে দেই, তখন তুমি আছো এটাই সত্যি হয়ে চারিদিকে প্রকাশিত হও আমার রক্ত নালির প্রতিটি ফোটায়, আমার নিশ্বাসের প্রতিটি শ্বাসে, আমার বিশ্বাসের প্রতিটি বিন্দুকনায়। তুমি আজ আসলেই আমার সামনে আর নাই। কিন্তু অন্তর, আত্তা আর মনে কোথাও তোমার অনুপস্থিতি আমি দেখি না। তুমি ছিলে, তুমি আছো আর সারা জীবন থাকবে আমার। তুমি মুক্তি পেলেও আমি মুক্তি পাইনি। হয়তো আমি জামিনের মতো একটা মুক্ত জীবন ভোগ করছি যেখানে প্রতিনিয়ত আমাকে তাড়া করে তোমার সেই আদর আর মমতা। এখন আমাকে শুধু কিছু অভ্যাস পাল্টাতে হবে যা তুমি আমাকে দিয়েছিলে।

আসলে এটার নামই জীবন যার উপলব্ধি শুরু হয় মৃত্যুর মতো কোনো এক অফেরতযোগ্য বিচ্ছেদের শুরুতে। আর শেষ হয় নিজের বিচ্ছেদের মুহুর্তে। আমি এখন বেচে আছি সেই মুহুর্তটির জন্য যার নাম ‘জীবন-বিচ্ছেদ’। আর সেটা শুধুই আমার জন্য বিচ্ছেদ।  

৪/৪/২০২১-রিভার সাইডের ইতিকথা

সনটা ছিলো ২০০৪। 

তখন মীরপুর সেনানীবাসে ৪ ফিন্ড আর্টিলারিতে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কর্মরত আছি।  আমার প্রমোশন হবার কথা মেজর থেকে লেফটেনেন্ট কর্নেল পদে। কিন্তু মামুলি একটা কারন দেখিয়ে তারা আমাকে প্রমোশন দিলো না। স্টাফ কলেজ করেছি, গানারী স্টাফ করেছি, ডিভ লেভেলে জিএসও -২ (অপারেসন) হিসাবে কাজ করেছি, আর্মি হেড কোয়ার্টারে ও জি এস ও-২ হিসাবে কাজ করেছি। প্রমোশনের জন্য কোনো প্রকার কমতি আমার নাই। কিন্তু তারপরেও আমাকে প্রমোশন না দিয়ে আমার জুনিয়র ১৪ লং কোর্সের মেজর মজিস, যে কিনা ক্যাটেগরি-সি , স্টাফ কলেজ ও করে নাই, গানারী স্টাফ ও করে নাই, সে আমার বদলে প্রমোশন পেয়ে ৪ ফিল্ডে পোস্টিং এসেছে। এটা শুধু মাত্র সে খালেদা জিয়ার সাথে কোনো না কোন ভাবে পরিচিত। শোনা যায় যে, মজিদের বাবা খালেদা জিয়ার বাসায় নাকি মালীর কাজ করতো। আর সে সুবাদেই এই নেপোটিজম। এর কোনো মানে হয়? সিদ্ধান্ত নিলাম, এপেন্ডিক্স-জে (ইচ্ছেকৃতভাবে অবসর নেওয়া) দিয়ে আর্মি থেকে চলে যাবো।  সাথে সাথে এটাও ভাব লাম যে, বাইরে গিয়ে কোনো চাকুরী ও করবো না। কিন্তু কি ব্যবসা করবো সেটা তো কখনো শিখি নাই। একচুয়ালি, আর্মির অফিসার গন, সারাজীবন তাদের ডেডিকেসন থাকে আর্মির যাবতীয় কাজে, সে আর কোনো বিকল্প কাজ শিখেও না। ফলে আমারো তাই হয়েছে। অনেক ভাবছিলাম, কি করা যায়। কিন্তু কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না।

ঠিক এই সময় একটা ঘটনা ঘটে গেলো। কোনো এক কাকতালীয় ভাবে একদিন আমার সাথে  নাজিমুদ্দিনের পরিচয় হয় মীরপুর সেনানীবাসে। আমিই তাকে মীরপুর সেনানিবাসে দাওয়াত করেছিলাম কারন সে আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো। আমি কখনোই নাজিমুদ্দিনকে সামনাসামনি দেখিও নাই, কথাও বলি নাই যদিও সে আমাদেরই এলাকার লোক। নাজিমুদ্দিন এলাকায় একজন খুব প্রতাপশালী খারাপ মানুষের মধ্যে একজন ছিলো। ধর্মের কোনো বালাই ছিলো না, সারাদিন মদের উপর থাক্তো, আর নারী ছিলো তার প্রিয় ভোগের মধ্যে একটি। সিনেমার জগত থেকে শুরু করে, সঙ্গীত রাজ্যের সব নারীদের এবং সাধারন মেয়েরা কেউ তার হাত থেকে রেহাই পায় নাই। তার টাকা ছিলো, ফলে টাকার জন্য ই সব ক্লাসের অর্থলোভী মেয়েগুলি তাকে দিনে আর রাতে সঙ্গ দিতো। সে বসুন্ধরার প্রোজেক্ট সমুহে মাটি সাপ্লাই দেওয়ার বৃহৎ একচ্ছত্র সাপ্লাইয়ার ছিলো। জমি দখল, অবৈধ ভাবে মাটি কাটা, অন্য মানুষের জমি কম দামে ক্রয় করে বসুন্ধরাকে দেওয়া, এই ছিলো তার কাজ। কিন্তু তার একটি জায়গায় সে কখনো ই বুদ্ধিমান ছিলো না। সে সব সময় পাওয়ার অফ এটর্নি বা আম মোক্তার নিয়ে জমি ক্রয় করত। সেই রকম ভাবে আমাদের গার্মেন্টস বিল্ডিংটা যে জমির উপর অবস্থিত, সেটা জনাব আব্দুল বারেক এবং তার পরিবারের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলো। হয়ত কিছু টাকা বাকী থাকতে পারে। কিন্তু সে জমিটা রেজিস্ট্রি করে নেয় নাই। পরিবর্তে সে বারেক সাহেব এবং তার পরিবারের কাছ থেকে পাওয়ার অফ এটর্নি নিয়ে এখানে দশ তালা ফাউন্ডেসন দিয়ে হাসনাবাদ সুপার মার্কেট নামে আপাতত তিন তালা বিল্ডিং (সাথে একটি বেসমেন্ট) তৈরী করে। 

প্রাথমিকভাবে সে নিজেই একটা গার্মেন্টস দিয়েছিল এবং এর নাম রেখেছিলো "রিভার সাইড সুয়েটারস লিমিটেড", বেশ সুন্দর নাম। নাজিমুদ্দিন সাহেব গার্মেন্টস চালানোর জন্য যে জ্ঞ্যান, যে বিদ্যা থাকা দরকার সেটা তার কিছুই ছিলো না। কিন্তু তার অনেক টাকা ছিলো। ফলে গার্মেন্টস এর জন্য তিনি যাদেরকে অংশীদারী দিয়েছেন, তারা সবাই ছিলো নিজেদের আখের গোছানোর ধান্দায়। ফলে ধীরে ধীরে অত্র গার্মেন্টস শুধু লোক্সানের দিকেই যাচ্ছিলো। এই লোক্সান এক সময় নাজিমুদ্দিনের কাছে খুব বিরক্তিকর মনে হচ্ছিলো বটে কিন্তু সে অন্য দিকে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীটা রাখতেও চাচ্ছিলো। 

অনেক কথাবার্তার পর, নাজিমুদ্দিন আমাকে একটা অফার দিলো যে, যদি আমি চাই তাহলে আমি তার রিভার সাইড সুয়েতারস ফ্যাক্টরী টা চালাইতে পারি। তিনি আমাকে ৩০% শেয়ার দিবেন আর তিনি ৭০% শেয়ার নিজে রাখবেন। এদিকে আমি কোনো কিছুই বুঝি না কিভাবে কোথা থেকে গার্মেন্টস এর অর্ডার নিতে হয়, কিভাবে ব্যাংকিং করতে হয়, কোনো কিছুই না। কিন্তু সাহস ছিলো অনেক। পরের দিন আমি রিভার সাইড সুয়েতারস দেখতে গেলাম। প্রায় বন্ধ অবস্থায় আছে ফ্যাক্টরীটা। মাত্র ১৮ জন অপারেটর কাজ করছে। কারেন্ট লাইন বন্ধ কারন প্রায় ৪ মাসের অধিক কারেন্ট বিল বাকী আছে। গ্যাস লাইন ও বন্ধবিল পরিশোধ না করার কারনে। ব্যাংকে প্রায় তিন কোটি টাকা লোনা আছে। ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ না করার কারনে কোন এল সি করা যায় না, সি সি হাইপোর কোনো সুযোগ নাই। এর মানে ফ্যাক্টরীটা একেবারেই লোকসানের প্রোজেক্ট। ব্যাংক ম্যানেজার ছিলেন তখন মিস্তার তাহির সাহেব এবং সোস্যাল ইস লামী ব্যাংকের এম ডি ছিলেন তখন মিস্তার আসাদ সাহেব। ঊনারা দুজনেই একটা উপদেশ দিলেন যে, যদি আমি নিতে চাই, তাহলে ব্যাংক রি সিডিউলিং করতে হবে। ব্যাংক রিসিডিউলিং কি জিনিষ তাও আমি জানি না। যাই হোক, শেষ অবধি আমি রিস্ক নেওয়ার একটা প্ল্যান করলাম। 

ফ্যাক্টরীটা তখন চালাচ্ছিলো জনাব লুতফর রহমান নামে এক ভদ্রলোক। এরও স্বভাবের মধ্যে অনেক খারাপ কিছু ছিলো। সে রীতিমতো জুয়া এবং নারীঘটিত ব্যাপারে খুব আসক্ত ছিলো। সাবকন্ট্রাক্ট করে যে টাকা পেতো, সেটা শ্রমিকদের মুজুরী না দিয়ে জুয়ার আসরেই বসে হেরে আসতো। ফলে প্রতিনিয়ত শ্রমিকগন সবশেষে সেই আবারো নাজিমুদ্দিনের বাসার সামনে গিয়েই বেতনের জন্য আন্দোলন করা ছাড়া কখনো বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা থাক্নতো না। নাজিমুদ্দিন এতোটাই বিরক্ত ছিলো যে, কোনোভাবে এটা অন্য কারো হাতে দিতে পারলে সেও যেনো বেচে যায়।

ব্যাংক রিসিডিউলিং করার জন্য মোট ৪০ লাখ টাকার প্রয়োজন। আমার কাছে এতো টাকা ছিলোও না। ফলে আমি আমার পরিচিত কিছু সিনিয়র আর্মি অফিসারদের সাথেও কথা বললাম যারা খুব তাড়াতাড়ি আর্মির চাকুরী ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু সবাই লাভ চায়, আনসারটেনিটিতে কেউ ইনভেস্ট করতে চায় না। ফলে আমার পরিচিত আর্মি অফিসার গন ক্রমে ক্রমে পিছু হটে গেলেন।

কোন উপায়ন্তর না দেখে আমি আমার বড় ভাই হাবীবুল্লাহ যিনি আমেরিকায় থাকেন, তার কাছ থেকে তখন ৪০ লাখ টাকা ধার নিলাম এবং বাকী সব রি সিডিউলিং করে নিলাম। সাথে ৩০% শেয়ারের সমান টাকা আমি নাজিমুদ্দিন কেও দিয়ে দিলাম (কিছু জমি দিয়ে আর কিছু ক্যাশ দিয়ে)।

এতে আরেকটি সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিলো। আমি ছিলাম রিভার সাইড সুয়েতারস এর চেয়ারম্যান আর নাজিমুদ্দিন ৭০% নিয়ে থাক্লেন এম ডি হিসাবে। কিন্তু নাজিম ভাই অফিশিয়াল কোনো কাজেই ইনভল্ব হলেন না। তার দস্তখত লাগ্লেও তাকে কোথাও খুজেই পাওয়া যায় না। তাছাড়া রুগ্ন এই ফ্যাক্টরিতে অনেক প্রয়োজনেই টাকাও লাগতোকিন্তু নাজিমুদিইন ভাই তার কোন ভাগ ই নিতেন না। আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে সার্বক্ষণিক টাকা ধার করে করে চালাইতে শুরু করলাম বটে কিন্তু একটা সময় আমার পক্ষে আর চালানো সম্ভব হচ্ছিলো না।

উপান্তর না দেখে একদিন আমি নাজিমুদ্দিন ভাইকে বললাম যে, হয় আমার ৩০% শেয়ার আবার তিনি নিয়ে আমার ইনভেস্টমেন্ট ফেরত দিক অথবা বাকী ৭০% শেয়ার একেবারে আমার নামে ট্রান্সফার করে দিক যেনো আমি আমার মতো করে চালাইতে পারি। তখনো ব্যাংকে প্রায় তিন কোটি টাকার মতো বাকী। কিস্তি দিতে পারছি না। এল সি করতে পারছি না। শুধু নিজের পকেট থেকেই টাকা খরচ হচ্ছে। নাজিম ভাই চালাক মানুষ। তিনি সব লোন আমার নামে ট্রান্সফার করে আর কিছু টাকা ক্যাশ নিয়ে পুরু ৭০% শেয়ার বিক্রি করতে রাজী হয়ে গেলেন। ফ্যাক্টরীর এসেট, লায়াবিলিটিজ হিসাব কিতাব করে শেষ পর্যন্ত আমি বাকী ৭০% শেয়ার নিয়ে আরেকবার রিস্ক নেওয়ার সাহস করলাম। আমার সাথে নতুন লোক মিস্তার মোহসীন (যিনি এক সময় এই ফ্যাক্টরীর ডি এম ডি হিসাবে কাজ করতেন) যোগ হলেন। তাকে আমি খুজে বের করেছি এই কারনে যে, তিনি গার্মেন্টস লাইনে বেশ পাকা, বায়ার দের সাথে তার পরিচয় আছে, ব্যাংকিং বুঝে। আমি তাকে বিনে পয়সায় ৩০% শেয়ার লিখে দিয়ে তাকে চেয়ারম্যান করলাম আর আমি এম ডি হয়ে গেলাম।

নতুন করে আবার ইনভেস্টমেন্ট এর পালা। আমি আমার আত্মীয় জনাব মুস্তাক আহ মেদ (আমার স্ত্রীর ছোট ভাই, যিনি আমেরিকায় থাকে) কে গার্মেন্টস এর শেয়ার চায় কিনা জানালে তিনি ২৫% শেয়ার নেওয়ার একটা ইন্টারেস্ট দেখান এবং তিনি প্রায় ৪৫ লাখ টাকা যোগান দেন। এইভাবে আমি আরো অনেক স্থান থেকে ফান্ড যোগার করে করে ফ্যাক্টরীটি চালানোর চেষ্টা করছিলাম। প্রচুর সময় দিচ্ছি, রাত ফ্যাক্টরীতেই কাটাই প্রায়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, ফ্যাক্টরিটা ঘুরে দারাচ্ছিলো না। এক সময় আমার মনে হলো, মোহ সীন সাহেব নিজেই ফ্যাক্টরীর উন্নতির জন্য মন দিয়ে খাটছেন না। তিনি যেহেতু নিজে কোনো টাকা ইনভেস্ট করে নাই, ফলে তার সিন্সিয়ারিটি আমার কাছে একটা প্রশ্নের উদ্রেক করলো। সেলারীর সময় তিনি ট্যাব লিকে চলে যান, খুব কম রেটে অর্ডার নেন, কস্টিং প্রাইসের চেয়েও কম রেট। ফলে আমি লোনে ডুবে যাচ্ছিলাম। কিছুতেই আর সামাল দিতে পারছিলাম না। 

অবশেষে ২০০৭ এর শেষে আমি ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিলাম যে, যা লস হবার হয়ে গেছে, এবার আর লস দিতে চাই না। আমি ফ্যাক্টরী বিক্রি করে দেবো এবং ব্যাংকের টাকা শোধ করতে পারলেই হবে। কারন ব্যাংক লোন তো এখন আমার উপরেই একা। যদিও মোহসীন সাহেন ৩০% এর মালিক কিন্তু তার কোনো টাকা নাই এবং তিনি এই ব্যাপারে কোনো সংকিতও নন। আমি মোহসীন ভাইকে বললাম যে, আমি ফ্যাক্টরী বিক্রি করতে চাই। তিনি একজন গ্রাহক আনলেন, নাম মিস্টার মুরতুজা আর শ্রীলংকান এক ভদ্রলোক নাম প্রিয়ান্থা। ঊনারা এমন একটা প্রপোজাল দিলেন, আমি হিসেব করে দেখলাম যে, আমি লোন থেকে বেরিয়ে যেতে পারি।

মিস্টার মুরতুজা এবং মিস্টার প্রিয়ান্থা দুজনেই গার্মেন্টস লাইনে বেশ পাকা এবং তারা প্রফেসনাল। তারা নতুন করে ফ্যাক্টরীটা আবার তাদের মতো করে সাজিয়ে ব্যবসা করবেন এবং এটা সম্ভব।

মুর্তজা ভাই এবং মিস্টার প্রিয়ান্থা ধীরে ধীরে এলাকা সম্পর্কে জানতে জানতে একটা জিনিষ বুঝলেন যে, এই এলাকাটি সভ্য কোনো জায়গা নয় এবং এখানে ব্যবসা করতে গেলে লোকাল সাপোর্ট ছাড়া কোনোভাবেই ব্যবসা করা সম্ভব নয়। এই ফিডব্যাকটা তারা লোকাল এলাকা, বিভিন্ন বন্ধুবান্ধব, এবং স্টাফদের ছাড়াও ব্যাংক থেকে পেলেন যে, হয় মিস্টার নাজিমুদ্দিন অথবা মেজর আখতারকে সাথে না নিলে নিরাপদে এখানে ব্যবসা করা সম্ভব না। এই এলাকাটি আবার আমার নিজের। সবাই আমাকে চিনে। তারমধ্যে আমি একজন আর্মি অফিসার হওয়াতে সবাই আমাকে একটু ভয়েও থাকে।

হতাত করে একদিন মুরতুজা ভাই এবং প্রিয়ান্থা আমার মিরপুরের বাসায় রাত ১১ টায় এসে হাজির। তারা আমাকে এইমর্মে জানালেন যে, তারা ১০০% শেয়ার কিনবেন না। ৯০% শেয়ার কিনবেন এবং ১০% শেয়ার আমাকে রাখতেই হবে। আমি আমার সময়মতো ফ্যাক্টরীতে আসতে পারবো এবং আমি আমার এমডি পোস্টেই থাকবো। সম্মানি হিসাবে আমি তাদের সমান সম্মানিই পাবো। ব্যাপারটা আমি সবশেষে মেনেই গেলাম। অর্থাৎ আমি ১০%, মুরতুজা ভাই ৪৫% আর প্রিয়ান্থা ৪৫% শেয়ার নিয়ে আবার ফ্যাক্টরী রান করতে শুরু করলো। এবার এটা প্রান ফিরে পেলো।

২০১০ সালে প্রিয়ান্থা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৪১ বছর বয়সে মারা যান। ইতিমধ্যে মুরতুজা ভাই আমি কেমন লোক, কেমন চরিত্রের মানুষ, সেটা বুঝে গিয়েছিলেন। আমি আসলে মাত্র ১০% শেয়ার নিয়ে কোনো হস্তক্ষেপই করছিলাম না। কারন ঊনারা ৯০% এর মালিক, সেখানে আমার  মন্তব্য কিংবা আমার কোনো সাজেশন খুব একটা মুল্যায়ন করা হবে কি হবে না সেটা নিয়ে আমি একটু তো সন্দিহান ছিলামই। ফলে আমি জাস্ট নামেমাত্র এমডি হিসাবেই ছিলাম আর লোকাল কোনো সমস্যা হলে সেটা আমি সামাল দিতাম। কোথায় কোন বায়ারের অর্ডার, কিংবা কবে কোন শিপমেন্ট এগুলো নিয়ে আমি কখনো মাথা ঘামাইতাম না।

আমার যখন এই রকম এক্টা অবস্থা, আমি তখন নিজে নিজে কিছু করা যায় কিনা সেটাও ভাবছিলাম। ফলে ডেভেলপারের কাজেও একটা চেষ্টা করছিলাম, যার ফল হচ্ছে বাসাবোতে একটা প্রোজেক্ট। সেটার ইতিহাস অন্য রকম। এটা না হয় পরেই বলবো।

প্রিয়ান্থা মারা যাবার পর, মুরতুজা ভাই প্রিয়ান্থার ৪৫% শেয়ারের মধ্যে তিনি নিলেন ২০% আর আমি নিলাম ২৫%। এতে আমার শেয়ার দাড়ালো ৩৫% আর মুরতুজা ভাইয়ের শেয়ার দাড়ালো ৬৫%। ২৫% শেয়ার নেবার জন্য আমি মুরতুজা ভাইকে ৫৮ শতাংশ জমি লিখে দিতে হলো। এভাবেই বর্তমান পর্যন্ত চলছে। ফ্যাক্টরি ধীরে ধীরে বেশ উন্নত করতে লাগলো। কিন্তু আমার ভিতরে একটা আনসারটেনিটি সবসময় কাজ করতো যে, একটা সময় আসবে যে, মুরতুজা ভাই কোনো না কোনো সময় এর বিকল্প হিসাবে অন্যত্র বেরিয়ে যাবেনই। ফলে আমি নিজেও রিভার সাইড সুয়েটারস এর পাশাপাশি আরো কোনো ব্যবসা করা যায় কিনা আমি একটা বিকল্প খুজছিলাম। হয়ত তার ই একটা বিকল্প প্রোডাক্ট ব্যবসা হিসাবে মা ইন্ডাস্ট্রিজের  জন্ম। ওটাও আরেক ইতিহাস। এটাও পরে বলবো। 

গত ৮ জানুয়ারী মাসে সড়ক ও জনপথ আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীটির কিছু অংশ ভেঙ্গে দিয়ে যায় কারন আমাদের ফ্যাক্টরী বিল্ডিংটি বিল্ডিং এর মালিক জনাব নাজিমুদ্দিন সাহেব গায়ের জোরে সরকারী জায়গায় কিছুটা অংশ বাড়তি তৈরী করেছিলেন। বর্তমানে পদ্মা সেতু বানানোর কারনে সরকার তার নিজের জায়গা দখল করতে গিয়ে আমাদের বিল্ডিং ভেঙ্গে দিয়ে গেলো। তাতে আমাদের কোন সমস্যা ছিলো না। সমস্যাটা হয়েছে গার্মেন্টস বায়ারদের আসোসিয়েসন একরড আমাদের বিল্ডিংটা আন্সেফ করিয়ে দিলে আর কোনো বায়ার এখানে অর্ডার প্লেস করবেনা। তাতে আমাদের ব্যবসা লাটে উঠবে। আমরা এখানেই পথে নেমে যেতে হবে।

যেদিন সড়ক ও জনপথ আমাদের ফ্যাক্টরী বিল্ডিংটা ভেঙ্গে দিয়ে যায়, সেদিন ছিলো আমাদের জন্য একটা মারাত্মক বিপর্যয়। একদিকে উক্ত বিল্ডিং এবং জমির মালিকানা নিয়ে কয়েকটি দলের সাথে কোন্দল, মামলা, মারামারি এবং সন্ত্রাসী হুমকী ইত্যাদি, অন্যদিকে সড়ক ও জনপথের নিজস্ব জায়গাউদ্ধারের কারনে ভাঙ্গাভাঙ্গি, ফলে মাঝখানে আমরা যারা অনেক টাকা এই বিল্ডিং এ ব্যবসার কারনে ইনভেস্ট করে ফেলেছি সেটা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। 

যেদিন থেকে জনাব নাজিমুদ্দিন মারা গেলো, তার পরের থেকেই একের পর এক বাহিনী এই জমি এবং বিল্ডিং দখল করে ফেলার জন্য পায়তারা করছে। জনাব বারেক আমাকে উকিল নোটিশ দিয়েছে যেনো তাকে ভাড়া দেওয়া হয়, আবার নাজিমুদ্দিনের তিন বউ সরাসরি ভাড়া চায়, অন্যদিকে জরীফ নামে আরেক লোক পুরু জমি এবং বিল্ডিং এর মালিকানা দাবী করছে। আমার এইখানে এডভান্স দেওয়া আছে প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। ফলে আমার এই অগ্রিমের টাকাকে ফেরত দেবে তার কোনো দায়ভার কেউ নিতে চাইছে না। তাহলে আমার এতোগুলি টাকার কি হবে? আমি কাউকেই আর ভাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নই। আজ প্রায় ৩৮ মাস হয়ে গেছে আমি কোনো ভাড়া দিচ্ছি না। 

জমি এবং বিল্ডিং নিয়ে নাজিমুদ্দিনের তিন বউ আরেক বাহিনী জনাব বারেক সাহেবের সাথে কখনোই সমঝোতায় পৌছতে পারছিলো না। মিস্টার বারেক, নাজিমুদ্দিনের পরিবার কিংবা বারেকের অন্যান্য পরিবারের সদস্যরা ও আমাকে অফার করেছে যদি আমি কিছু টাকা দিয়ে উক্ত বিল্ডিং এবং জমি বারেক সাহেব্দের কাছ থেকে কিনে নেই কিংবা নাজিমুদ্দিনের পরিবার ও আমাকে এক ই ধরনের অফারকরেছিল।  কিন্তু আমি কোনো ভাবেই প্ররোচিত হইনাই। এর বদলে, আমি চেষ্টা করছিলাম যে, কোনোভাবে মিস্টার বারেক এবং নাজিমুদ্দিনের পরিবারের মধ্যেকোনো ভাবেই সমঝোতা করা যায় কিনা। কেউ ইসমঝোতার কাছাকাছি ছিলেন না। ফলে এটা এভাবেই স্ট্যাল্মেট অবস্থায় চলছিলো, আমিও কোন ভাড়া দিচ্ছিলাম না। কারন আমার অগ্রিম টাকা শোধ করতেই হবে। অনেক টাকা , প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। 

প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে এইওবস্থার। হতাত করে শুনলাম যে, সাইফুল ইসলাম নামে চাদপুরের কোনো এক ৬৯ বছরের মানুষ গত ২০০৭ সালে নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে এই জমি এবং এই বিল্ডিং কিনে নিয়েছিলো। এটা একটা অবাস্তব ঘটনা। কারন আমি গত ২০০৬ থেকে এই ফ্যাক্টরিতে আছি। কখনো বারেক সাহেব কিংবা ওই সাইফুল ইসলাম কখনো এখানে আসে নাই। আর আমার সাথে সর্বশেষ ফ্যাক্টরী চুক্তি হয়েছিলো ২০০৯ সালে। তাহলে নাজিমুদ্দিন কিভাবে ২০০৭ সালে বিক্রি করে? আর আমি তো ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ফ্যাক্টরীর ভাড়া দিয়ে আসছিলাম। তাহলে এতোদিন সাইফুল ইসলাম সাহেব কেনো  ভাড়া নিতে এলেন না? 

মামলা হয়েছে, বারেক সাহেব করেছে, আবার এদিকে সাইফুল ইসলাম সাহেবের দেওয়া পাওয়া অফ এটর্নি পেয়েছে সোহাগ গ্রুপের সাথে জড়িত মালিবাগের জাহাঙ্গীর হাসান মানিক। আর ঊনার প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছে এলাকার জরীফ নামে এক লোক। সে আমাদের প্রতিনিয়ত খুব ডিস্টার্ব করছিলো এই বলে যে, সে এবং জাহাঙ্গীর হাসান মানিক যেহেতু নতুন মালিক, ফলে তাকে ভাড়া দিতে হবে , তা না হলে এখানে খুবই অসুবিধা। আজকে পানির লাইন বন্ধ করে দেয় তো কাল কারেন্টের লাইন নিয়ে ঝামেলা করে। অথচ আমি জানি সত্যটা কি। কিচ্ছু করার নাই। আমার কোনো ইন্টারেস্ট নাই কে বা কারা মালিক এই বিল্ডিং বা জমির। আমার ইন্টারেস্ট হলো আমার ব্যবসা, আমার অগ্রিম টাকা এবং পিস্ফুল সমাধান। 

আমি এবং মুরতুজা ভাই মেন্টালি খুব ডিস্টারবড হচ্ছিলাম। কিছুতেই ভালো একটা সমাধান করতে পারছিলাম না। 

ঠিক এই সময় সড়ক ও জনপথের অফিসাররা পদ্মা সেতুর কারনে আমাদের ফ্যাক্টরীর প্রায় ১৫-২০ ফুট ভাঙ্গার জন্য বুল ডোজার নিয়ে হাজির। আমরা কেহই ফ্যাক্টরীতে ছিলাম না। আমি যখন এলাম, তখন ইতিমধ্যে প্রায় ৫ থেকে ৭ ফুট ভেঙ্গে ফেলেছে। খুবই ভয়ংকর একটা অবস্থা। আমাদের ফ্যাক্টরীটা একরড সারটিফায়েড। এখন যদি কোনো কারনে একরড জানতে পারে যে, আমাদের ফ্যাক্টরীতে ভাঙ্গা পড়েছে, কোনোভাবেই আমরা একরডের সারটিফিকেট রিটেইন করতে পারবো না। আর যদি সারটিফিকেট রিটেইন করতে না পারি, তাহলে কোনো অবস্থায়ই  আমাদের বায়াররা আমাদের অর্ডার প্লেস করবে না। 

সড়ক ও জনপথের অফিসারদেরকে অনুরোধ করা হলে তারা মালিকপক্ষ ছাড়া কোন কথাই বলবেন না বলে ভাংতেই থাক্লেন। বারেক সাহেবকে ফোনে জানালে ঊনি এমন একটা ভাব করলেন যে, ভাংতে থাকুক। যেটুকু থাকে সেটুকু নিয়েই ঊনি পরবর্তীতে জড়িফের সাথে ফাইট করবেন। জরীফের সাথে কথা বলা হলো, সে মালিকের পক্ষে যেভাবেই হোক একটা প্রক্সি দিলো। বারেক সাহেব অনেক পরে যদিও স্পটে এলেন কিন্তু তিনি জরীফের ভয়েই হোক আর তার অনিহার কারনেই হোক কারো সাথেই আলাপ করলেন না, আবার সড়ক ও জনপথের ম্যাজিস্ট্রেট এর সাথেও কোনো কথা বললেন না। 

আমি বুঝতে পারলাম, এখন ব্যবসা করতে গেলে আমাকে জরীফের লোকজনকেই মালিক বলে মেনে নেওয়া উচিত। মামলার ফলাফল দিবে আদালত। যদি জরীফ গং মামলায় জিতে আসে তাতে আমার কোনো সমস্যা নাই, আবার বারেক জিতে আসে তাতেও আমার কোনো সমস্যা নাই। আমি শেষ পর্যন্ত জরীফের দলের সাথে একটা চুক্তি করেই ফেললাম। অন্তত তারা আমার অগ্রিম টাকাটার একটা দায়িত্ত নিয়েছেন। যদিও পুরুটার নয়। আমার প্রায় ২৫/৩০ লাখ টাকার লস হবে। 

(চলবে)

সাময়ীক তিরোধ্যান-ষ্টাইল-৩

Categories

আমার বাবা যদিও অত্র কয়রাখোলা এলাকার খুবই নামীদামী এবং প্রতাপ শালী একজন মাদবর ছিলেন কিন্তু তিনি তার ঘরের মধ্যে একটা বিষয় নিয়ে খুবই অসফল লোক ছিলেন। আর সেটা হলো তারই নিজের ১ম পক্ষের ছেলে মোঃ তাজির আলীকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাজির আলী ছিলেন আমাদের স্টেপ ব্রাদারদের মধ্যে ২য় ভাই। প্রথম জনের নাম ছিলো নজর আলী, ২য় জনের নাম এই তাজির আলী এবং ৩য় ভাইয়ের নাম ছিলো মোহসীন আলী। তাজির আলী ভাইয়ের সবচেয়ে বেশী রাগ ছিলো আমার মায়ের উপর। কারন তিনি আমার মাকে কোনোভাবেই তার ২য় মা হিসাবে মেনেই নেন নাই। তার মধ্যে আমাদের এই পক্ষে আরো গোটা ৫ বোন আর ২ ভাই ইতিমধ্যে জন্ম গ্রহন করে ফেলেছি। আমার বাবার ছিলো অঢেল জমিজমা। আর বিশাল বাড়ি। তাজির আলী যখন বিয়ে করে, তখন থেকেই সে অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলো। এর কারন হলো তাজির আলীর শশুড় বারীও ছিলো একটা খারাপ বংশের মানুষ। তারা মানুষের কাছে ডাকাতের সমপর্যায়ের শ্রেনী হিসাবেই গন্য হতো। এমতাবস্থায় শশুড় বাড়ির আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে তাজির আলী এতোটাই উছ্রিখল হয়ে উঠেছিলো যে, এক সময়ে সে এটাই ভেবে নিলো যে, ২য় পক্ষের আমাদের সবাইকেই সে হত্যা করবে। যদি দরকার হয়, সে তার বাবা অর্থাৎ আমার বাবাকেও হত্যা করে সমস্ত সম্পত্তি তাদের নামে লিখে নেয়া। আমরা তখন খুবই ছোট ছোট। শুধুমাত্র আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহ সবেমাত্র ইন্টার পাশ করছেন। হাবীব ভাইয়ের এই ইন্টার পাশ করাও যেনো তার অনেক হিংসা এবং রাগ। বাবা ব্যাপারটা কিছুতেই সামাল দিতে পারছিলেন না। আমার বাবা ছিলেন আসলেই খুব জ্ঞানী মানুষ। তিনি জানতেন, তাজির আলী যতোই হামকি ধামকি দিক, বাবার জিবদ্দশায় যে তাজির আলী কিছুই করতে পারবেন না সেটা তিনি নিসচিত। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তাজির আলীর কিংবা আমাদের অন্যান্য স্টেপ ব্রাদারদের কার কি ভুমিকা হবে এটা নিয়ে তার অনেক শংকা ছিলো। তাই তিনি দেখতে চাইলেন, তার অনুপস্থিতিতে কার কি ভুমিকা হয়। এতা তার একটা টেষ্ট করা দরকার।

বিশয়টা নিয়ে বাবা আমার ভাই হাবীবুল্লাহ্র সাথে বিস্তারীত আলাপ করলেন। আমার ভাইয়ের সাথে আমার বাবার ছিলো খুবই বন্ধুত্তের সম্পর্ক। ফলে, তারা দুজন মিলে একটা বুদ্ধি করলেন। বুদ্ধিটা এরকমের যে, হতাত বাবা উধাও হয়ে যাবেন। তখনকার দিনে তো আর মোবাইল ছিলো না, আবার ল্যান্ড লাইনের ফোন ও ছিলো প্রায় দুষ্কর, তাই বাবা যদি হটাত করে কোথাও কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যান, তাহলে সবাই ধরে নিবে যে, বাবা হয়তো কোথাও গিয়ে দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। এই সময়টায় কাদের কি কি ভুমিকা হয় সেটার আপডেট বাবা ভাইয়ার কাছ থেকে নিবেন। ব্যাপারটা জানবে শুধুমাত্র আমার ভাই আর বাবা। এমনকি আমার মাও জানবেন না। খুবই একটা গোপন বিষয়। আমার ভাই তখন সবেমাত্র ইন্তার পাশ করে জগন্নাথে ভর্তি হয়েছেন। বাবা ঢাকাতেই থাকবেন, কিন্তু কারো কাছেই প্রকাশ্যে আসবেন না। আমার ভাই মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে ব্যাপারতা কে কিভাবে নিচ্ছে সেটা অব্জার্ভ করবেন এবং বাবাকে ফিডব্যাক দিবেন।

প্ল্যান মোতাবেক, বাবা একদিন সুদুর চট্টগ্রামে যাবেন বিধায় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গ্রাম ছাড়লেন। কিন্তু আর তিনি ফিরে এলেন না। একদিন যায়, বাবা আসেন না, দুইদিন যায় বাবা আসেন না। এভাবে সবাই খুব দুসচিন্তা করতে লাগলো। বাবাকে খোজা শুরু হলো। কোথাও বাবাকে পাওয়া গেলো না। আসলে যিনি লোক চক্ষের আড়ালে পালিয়ে থাকতে চান, তাকে যেভাবেই খোজা হোক, তাকে তো প্রকাশ্যে পাওয়া যাবেই না। কিন্তু বাবা আছেন, সুস্থই আছেন। আর এ খবরটা জানেন শুধু আমার ভাই। তারা প্রতিদিন শ্যাম বাজার শরীর চর্চার ঘাটে দেখা করেন। ভাইয়া বাবাকে তার তরোধানের পর গ্রামের খবরাখবর দেন। বাবা সেই খবরের উপর ভিত্তি করে তিনি তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আটেন।

দিনের পর দিন দিন যখন বাবা আর গ্রামে ফিরে এলেন না, মা খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমার অন্যান্য ভাওবোনেরাও চিন্তা করতে লাগলেন। গ্রামের গনমান্য ব্যক্তিরাও কোনো কিছু আছ করতে না পেরে প্রায় মাস তিন চার পর ধরে নিলেন যে, বাবা হয়তো কোথাও দূর্ঘটনায় মারা গেছেন। খবরতা এবার বেশ পাকাপোক্ত হয়ে গেলো। আর অরিজিনাল প্ল্যানের কার্যক্রমটা যেনো এখান থেকেই শুরু।

তাজির আলি ভাইয়ের দাপটের চোটে, তার সাথে আমার অন্যান্য স্টেপ ব্রাদার এবং বোনদের দাপট এতোটাই চরমে উঠলো যে, আমাদের ২য় পক্ষের সব ভাই বোনেরা এখন জীবন নিয়ে শংকিত। বাবা প্রতিদিন তার বাড়ির খবর পেতে থাকলেন এবং মনিটর করতে লাগলেন যেনো ব্যাপারটা কোনো অবস্থাতেই অনেক খারাপের দিকে না টার্ন নেয়।

তারপর......

তারপর একদিন বাবা সব বুঝে যাওয়ার পর ভাবলেন, ওনার যা বুঝার তিনি বুঝে গেছেন যে, তার মৃত্যুর পর আমাদের ২য় পক্ষের ভাইবোনদের কি অবস্থা হবে। তিনি হটাত করে গ্রামে এসে হাজির হলেন। সবাই তো অবাক। কোথায় ছিলো এতোদিন এই হোসেন আলী মাদবর? বাবা কাউকেই কিছু বললেন না, শুধু বললেন যে, সুদুর চট্টগ্রামে গিয়ে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন। যেহেতু কারো মাধ্যমেই খবর দেয়া সম্ভব হয় নাই, তাই আর বলা হয় নাই। কিন্তু তিনি মনে মনে জানেন কি হয়েছে আর এখন তাকে কি করতে হবে।

বাবা ভাবলেন, আমাদেরকে আর মুনশীগঞ্জে রাখাই যাবে না। আমাদেরকে মাইগ্রেট করে অন্যত্র নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে যে কোনো সময়ে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যাবে। বাবা আমার খালু গনি মাদবরের সাথে ব্যাপারটা বিস্তারীত আলাপ করলেন। আমার খালু গনি মিয়া ছিলেন আরেক মাদবর এবং খুবই প্রতাপ শালী মানুষ। যার অঢেল সম্পত্তিও ছিলো কিন্তু সবই কেরানীগঞ্জ। বাবা ভাবলেন আমাদেরকে খালুর দেশেই নিয়ে আসবেন।

কিন্তু বিপত্তি হবে যখন আমার স্টেপ ব্রাদার এবং বোনেরা জানবে যে, বাবা আমাদেরকে মুনশীগঞ্জ থেকে কেরানিগঞ্জে নিয়ে আসবেন তখন। তাতে মারামারি কাটাকাটিও হতে পারে। এই ব্যাপারটা নিয়েও বাবা ভাইয়ার সাথে আর খালুর সাথে আরেকটা বিস্তারীত পরিকল্পনা করলেন কিভাবে সব মারামারি, কাটাকাটি হানাহানি পরিত্যাগ করে নির্বিঘ্নে মুনশী গঞ্জ থেকে একদিনের মধ্যে কেরানীগঞ্জে আনা যায়। কিন্তু এইটা ঠিক যে, আমাদেরকে খালুর দেশে কেরানীগঞ্জে আনতেই হবে আমাদের নিরাপত্তার জন্য।

বাবার মাদবরী স্টাইল-২

Categories

আগেই বলেছিলাম যে, আলী হোসেন সরকার আর আমার বাবা কন টেম পোরারী সময়ে প্রায় একই পর্যায়ের মাদবর ছিলেন। কেউ কাউকে হেয় না করলেও তারা কখনোই এক সাথে কাধে কাধ লাগিয়ে চলতেন না। কে সুপেরিয়র আর কে সুপেরিয়র নন এটা বুঝানো যাবে না আবার কেউ কারো থেকেও কম না এটাই আসলে তাদের মধ্যে ছিলো একতা অলিখিত দন্ধ। আলী হসেন সরকারের বাড়িতে কোনো বড় অনুষ্ঠান হলে হোসেন আলী মাদবরে যেমন দাওয়াত থাকতো তেমনি হোসেন আলী মাদবরের বাড়িতেও কোনো অনুষ্ঠান হলে আলী হোসেন সরকারের ও দাওয়াত থাকতো। কিন্তু তারা কখনোই একে অপরের দাওয়াতে আসতেন না। এটাও এক রকমের গ্রাম্য রাজনীতর একটা বড় ঢং বলা যায়।

তো একবার আমার বাবা আসলেই চেয়েছিলেন যে, আলী হোসেন সরকার যেনো আমাদের বাড়িতে কোনো একটা অনুষ্ঠানে দাওয়াতে আসেন। আমার বাবা জানতেন যে, তথাকথিত দাওয়াতে আলী হোসেন সরকার না আসারই কথা। তাই বাবা যা করলেন তাতে আলী হোসেন সরকারের না এসেও পারেন নাই। বাবা তার ইগো ঠিক রাখার জন্যেও তিনি নিজে আলী হোসেন সরকারের বাড়িতে গিয়ে তাকে দাওয়াত দিলেন না। যদিও তিনি সেটা করতে পারতেন। যাই হোক, বাবা, তার নিজের হাতের লাঠিটা এক পত্রবাহককে দিয়ে তার সাথে একটা চিরকুট লিখলেন-

জনাব আলী হোসেন সরকার, আমার সালাম নিবেন। আমার বাড়িতে আপনার দাওয়াত ছিলো। আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করছি আপনি আজ আমার বাড়িতে দাওয়াতে আসবে। আমি আমার হাতের লাঠিটি পাঠালাম, সাথে এই পত্রটি। ধরে নিবেন, লাঠিটি আমি নিজে এবং পত্রটি আমার কথা। আপনি আসবেন।

আলী হোসেন সরকারও সেই লেবেলের বুদ্ধিমান লোক, তিনি বুঝলে এর মর্মার্থ। তিনি বাবার হাতের লাঠিটি পত্র বাহকের কাছ থেকে রেখে দিলেন, সাথে পত্রটিও। তিনি রীতিমত পরিপাটি সাজগোছ করলেন। তারপর ঠিক সময় মতো বাবার হাতের লাঠিটি সাথে নিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে র ওয়ানা হলেন। আলী হোসেন সরকার যখন প্রায় আমাদের বাড়ির ঘাটে, আমার বাবা হোসেন আলী মাদবর নিজে ঘাটের কাছে গিয়ে আলী হোসেন সরকারকে অভ্যর্থনা জানালেন আর আলী হোসেন সরকার ও তার সেই অভ্যর্থনায় কোলাকুলি করে একটা যুগান্তকারী ব্যাপার ঘটিয়ে দিলেন।

আসলে তাদের মধ্যে সব সময় বন্ধুত্বই ছিলো, কোনো রেষারেসি ছিলো না। তারা কারো সম্পদ হজম করতেন না, গ্রাম বাসী ও তাদেরকে যথেষ্ঠ সম্মান করতেন। তারা জানতেন এই সব মাদবরদের একটা ওজন আছে, তাদের কথার ভ্যালু আছে, তাদের নীতি আছে। হ্যা, একে অপরের সিদ্ধান্ত সব সময় মেনে নেবেন সেটা হয়তো ছিলো না কিন্তু গ্রাম একটা সঠিক নেত্রিত্তের মধ্যে ছিলো।

আজো তারা সবার মুখে মুখে আছেন। প্রায় ৫০ বছর পার হয়ে গেছে, তাদের কথা আজো গ্রাম বাসী মনে রেখেছেন। আমরা আজো তাদের হেরডিটি উপভোগ করি। যখন কেউ জানে যে, আমরা হোসেন আলী মাদবরের বংশধর, মানুষ এখনো অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেন আর বলেন তাদের সেই পুরানো ঐতিহ্যের কথা। ভালো লাগে।

আমার বাবা।

Categories

আমি আমার বাবাকে কখনো দেখিনি এবং তার চেহাড়া কেমন ছিলো, খাটো নাকি লম্বা, যুবক না বৃদ্ধ, ফর্সা নাকি কালো কোনো কিছুই আমার জানা নাই। তবে আমার বড় ভাই ডঃ হাবীবুল্লাহর কাছে আমি আমার বাবার অনেক গল্প শুনাতেন যার থেকে আমি বাবার একটা কাল্পনিক চরিত্র মনে গেথে গেছে। আমার দাদার নাম ছিলো হিসাবদি মাদবর। আমরা মাদবর বংশের লোক।

বাবার সম্পর্কে আমি অনেক চমৎকার চমৎকার গল্প শুনেছি ভাইয়ার কাছে। তবে তার প্রাথমিক তথ্যের মধ্যে জরুরী তথ্য হলো যে, আমার বাবার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আমার মাকে বিয়ে করেন। বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ঘরে মোট তিন জন ছেলে সন্তান আর তিনজন কন্যা সন্তান ছিলো। এই মোট ছয় সন্তান থাকার পরে আমার বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। তখন আমার মায়ের বয়স ছিলো বেশ কম। আগের সব সন্তানেরাই আমার মায়ের থেকে বয়সে বড় ছিলো। কেউ কেউ আবার ইতিমধ্যে বিয়েও করে ফেলেছিলেন। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমার মা যেমন একটু অসুবিধায় ছিলেন, তেমনি আমার বাবাও বেশ অসুবিধায় ছিলেন।

কিভাবে আমার বাবা এই দুমুখী অসুবিধাগুলি তার জ্ঞানের দ্বারা সমাধান করেছিলেন, সেই গল্প গুলিও আমি হোসেন আলী মাদবরের পর্বসমুহে একে একে লিখবো।

২৭/০৩/২০২১-সেনাপ্রধান আজিজের সাথে

Categories

 

যেদিন ষ্টাফ কলেজ করতে আসি সেই ১৯৯৭ সালে মীরপুরে, তখন আমরা প্রায় ৯০% অফিসারই মেজর পদবীর। সেনাবাহুনীর কিছু কিছু কোর্ষ আছে যেখানে জুনিয়ার আর সিনিয়ার মিলে কোর্ষ মেট হয়ে যায়। এই ষ্টাফ কলেজ সে রকমের একটা কোর্ষ। জেনারেল আজিজ আমাদের সাথে ২৩ ডি এস সি এস সি (ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড এন্ড ষ্টাফ কোর্ষ) করেন। খুবই সাদামাতা ক্যালিভারের একজন অফিসার। এটা বল্বো না যে, গননায় নেয়া যাবে না, কারন যারাই ষ্টাফ কলেজ করতে আসেন, তারা অনেক মেধার পরীক্ষা দিয়েই আসেন। কিন্তু এই মেধাবী অফিসারদের মধ্যে যখন তুলনা করা হয়, তখন সাদামাটা বলা চলে। আমরা একই সিন্ডিকেটে ছিলাম।

কালেভদ্রে আমরা যে কোনো কারনেই আর আর্মিতে থাকতে পারি নাই। এতার প্রধান কারন বাংলাদেশের রাজনীতি। এই অপরাজনীতি দেশের অনেক তুখুর মেধাবী ছেলেদেরকে দেশের অনেক কাজে লাগায় নি, লাগাতে দেয়া হয়নি। যারা বেশী তোষামোদি করতে পেরেছে, তারা হয়তো রয়ে গেছেন, আবার যারা মেনে নিতে পারেন নাই, তারা অকালেই সেচ্ছায় চলে গেছেন, আবার অনেকে বের হয়ে কি করবেন এই ভেবের যাতনাটা সহ্য করেই দাতে দাত লাগিয়ে রয়ে যায়।

২৭/০১/২০২১-আমার+উম্মিকার করোনা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২৭ জানুয়ারী 

 

কোনো কিছুই কোনো কারন ছাড়া ঘটে না, এটাই সত্য। যে ঘটনাটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিলো কেনো গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেললাম বলে, আজ সেটা পরিষ্কার হলো। আমার করোনা টেষ্টে পজিটিভ এসেছে। আমার বড় মেয়েরও করোনা পজিটিভ। ছোট মেয়ের করোনা নেগেটিভ। উম্মিকার মার তো আগেই একবার করোবা ধরা পড়েছিলো, তাই আর করাইতে দেই নাই। এর মানে হলো, শুধু ছোট মেয়ে ছাড়া আমাদের বাসায় সবার করোনা ধরা পড়লো। আল্লাহ যা করেন নিশ্চয় মংগলের জন্যই করেন। করোনা ধরা পড়ায় একটা জিনিষ মনে হলো যে, আমাদের আর টিকা নেওয়ার দরকার পড়বে না হয়তো।

দেশে টিকা এসেছে, সবাই টিকা নিতে ভয়ও পাচ্ছে, আবার এই টিকা নিয়ে যে কত রাজনীতি হয় তাও দেখা যাবে। এদেশে প্রতিটি জিনিষ নিয়েই রাজনীতি হয়। টিকা নিয়েও লম্বা সময় ধরে রাজনীতি হবে, এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। যারা একবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এসছেন, হয়তো তারা আর টিকার ব্যাপারে কোনো মাথা ঘামাবে না, তারপরেও হয়তো টিকাটা নেয়া দরকার হতে পারে যেহেতু এটা একটা ভ্যাকসিন।

বাসায় আছি কদিন যাবত। করোনা হবার কারনে আমার শরীরে কোনো প্রকার আলাদা কোনো সিম্পটম নাই। সুস্থই আছি। বড় মেয়ের ঠান্ডাটা একটু বেশি। আমি প্রতিদিন ছাদে রোদে প্রায় ঘন্টা ২/৩ পুড়ি। ভালোই লাগে। কিন্তু বড় মেয়ে বি সি এস পরীক্ষার প্রিপারেশনে রাত জেগে পরাশুনা করে বলে দিনের অর্ধেক সময় পর্যন্ত ঘুমায়।

চারিদিকে বেশ ঠান্ডাও পড়েছে ইদানিং। এবারের ঠান্ডাটা একটু বেশী মাত্রায় পড়েছে বলে মনে হয়।

১৯/০৬/২০১৮-ক্যাডেট কলেজের কাহিনী

Categories

৪১ বছর আগের ঘটনা।

আজ হইতে প্রায় ৪১ বছর আগে এইদিনে আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার জন্য সকাল হইতেই প্রস্তুতি লইতেছিলাম। আজ আমার ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার দিন, অর্থাৎ আমি ১৯ শে জুন ১৯৭৭ সালে ক্যাডেট কলেজে পদার্পণ করিয়াছিলাম।  

অজ একটা পাড়াগ্রাম। স্বাভাবিক জীবন যাত্রার জন্য একটি জনপদের যে সব মৌলিক উপাদান কোন একটি জনগোষ্ঠীর প্রাপ্য সেইসব মৌলিক চাহিদা কোনো কিছুই এই অজ পাড়াগ্রামের কোথাও চোখে পড়ে না। বিদ্যুৎ নাই, রাস্তা ঘাট নাই, ভালো একটা মাধ্যমিক স্কুলও নাই। রাজধানী ঢাকা হইতে আমার গ্রাম এতো কাছের একটা জনপদ, তাহার পরেও কোনো পাকা রাস্তা নাই যাহাতে কেহ জরুরী ভিত্তিতেও রোগী লইয়া বা অন্য কোনো ইমারজেন্সি হইলে গাড়ি করিয়া সল্প সময়ে ঢাকার কোনো জায়গায় আসিতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ। মাত্র ৫/৬ বছর পার হইয়াছে ইহার স্বাধীনতার বয়স। মানুষ সবেমাত্র স্বাধীনতার স্বাদ পাইতে শুরু করিয়াছে, কিন্তু সবকিছুই নতুন। নতুন স্বাধীনতার একটা রুপ আছে। এই স্বাধীনতায় যে যেইভাবে পারে, সে সেইভাবেই তাহা উপভোগ করে। কেউ গায়ের জোরে, কেউ অস্ত্রের জোরে, কেউ সম্পত্তির জোরে, কেউ পারিবারিক প্রভাবের জোরে একজন আরেকজনের উপর, একগোত্র আরেক গোত্রের উপর কিংবা এক গ্রাম আরেক গ্রামের উপর প্রভাব খাটাইয়াই স্বাধীনতা উপভোগ করে। আর এই নব্য স্বাধীনতাই আমাদের প্রতিটি গ্রামে, গঞ্জে, আনাচে কানাচে পালিত হইতেছে। কেউ হটাত করিয়া বড়লোক হইয়া যাইতেছে, কেউ আবার সবকিছু হারাইয়া দেশান্তরী হইতেছে। মেলথাসের কোনো থিউরী, কিংবা নিউটনের ৫ম সুত্র কিংবা ডারউইনের নতুন কোনো সুত্র না হইলে যেনো আর রক্ষা নাই। কেউ নতুন সেটেলার হিসাবে নিজের পিতামহের আদি আবাসস্থল ছাড়িয়া অন্য কোনো নতুন জায়গায় তাহার আবাসস্থল গড়িয়া তোলার আপ্রান চেস্টা করিতেছে আবার কেহ কোথাও কোনো স্থান না পাইয়া এই ইহজগত হইতেই বিদায় লইতেছে। নিয়তি বলিয়া একটা কথা আছে, কেউ এটা মানুক আর নাই বা মানুক। সবাই নিয়তির দিকে তাকাইয়া সামনের দিকে চলিবার ভান করিতেছে। ঘরের পালিত পশু পাখিরাও যে কে কাহার, তাহারাও মাঝে মাঝে বিতর্কিত হইয়া কখনো এই মালিকের গোহালের থেকে অন্য মালিকের গোহালে স্থান পরিবর্তন করিতেছে। তাহারা তাহাদের মুখের ঘাস গুলিও চর্বণ করিবার সময় পাইতেছে না।  

আমরা গ্রামে থাকি। গ্রামের বাড়ী যেই রকম হয়, আমাদের গ্রামের বাড়ীটিও সেই রকমের। মাটির উঠোন, চারিদিকে গাছ পালার সমারোহ, কাচা পায়খানা, পাশেই ক্ষেত, হরেক রকমের ফসলের শোভা দেখা যায়। সন্ধ্যা হইলেই বাবুই পাখী, চড়ুই পাখী এবং তাহাদের আবাসস্থলে বেড়াইতে আসা অনেক নাম না জানা অতিথি পাখিরা মিলে হরেক পদের সুরে এবং শব্দে মুখরীত করিয়া তোলে এলাকাটি। তাহারা একে অন্যকেকে লইয়া ঝগড়া ঝাটি করে না। তাহাদের স্বাধীনতা আমাদের মতো নয়। তাহারা জমি লইয়া, বাড়ি বা বাসা লইয়া ভাগ বাটোয়ারা লইয়া মারামারি করে না। উহারা শরত কালে যেমন একে অপরের বন্ধু, বৃষ্টির দিনেও একে অপরকে ছাড়িয়া চলিয়া যায় না। পাখীরা সবাই মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার বলিলে ভুল হইবে। আমাদের উপার্জনক্ষম সদস্য বলিতে একমাত্র আমার বড় ভাই যিনি সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসাবে যোগদান করিয়াছেন। প্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয় এই ঢাকা ইউনিভার্সিটি। আমরা পাচ বোন আর দুই ভাই, সাথে আমার মা। সংসার ছোট নয়, কিন্তু সে তুলনায় আয়ের পরিমান আমাদের জন্য অনেক ছিলো না। এইটা তখনকার দিনের প্রায় অধিকাংশ পরিবারেরই হালচাল।

আমার বড় ভাইয়ের নিজস্ব একটা পরিকল্পনা ছিলো কিন্তু আমরা যাহারা ছোট ছোট ভাই বোন আছি, তাহাদের জন্য আমার ভাইয়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় অনেক ব্যঘাত ঘটিতেছিলো। আর ইহার প্রধান কারন হইলো, তিনিই আমাদের মা, তিনিই আমাদের বাবা, তিনিই আমাদের দেখভাল করার জন্য একমাত্র ব্যক্তি। তাহার নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিতে গিয়া তিনি আমাদেরকে ছাড়িয়া একা কোথাও যাইতে পারেন না। ফলে আমাদের একটা গতি না করিয়া তিনিই বা কিভাবে তাহার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিবেন? আমি সবেমাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ি, আমার ইমিডিয়েট বড় বোন আমার সাথেই গ্রামে পড়াশুনা করে। আমার আরেক বোন আমার থেকে এক ক্লাস উপরে পড়ে আর তার বড়জন পড়ে মাত্র ক্লাস এইটে। সবার বড় দুই বোন এর মধ্যে একজন স্বামীর সাথে পৃথক হইয়া এখন আমাদের বাড়িতেই থাকেন। আমার দ্বিতীয় বড় বোনের তখনো বিয়েই হয় নাই। ফলে ধরিয়া নেওয়া যায়, পাচ বোনের কারোরই বিয়ে হয় নাই। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটেই সুস্থ নয়। মেয়েঘটিত অনেক প্রকারের অঘটন চারিদিকে ঘটিতেছে। আমরা আছি একটা বিপদের মধ্যে। আল্লাহর উপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নাই। দেশ স্বাধীন হইয়াছে বটে কিন্তু দেশের মানুষগুলি এখনো আতংকের মধ্যেই দিন কাটাইতেছে।

যাই হোক যাহা বলিতেছিলাম সেখানেই আসি। আমার ক্যাডেট কলেজের ভর্তির কথা।

আমার বড় ভাইয়ের নিজস্ব পরিকল্পনায় যাহা ছিলো তাহা হইলো যে, আমাকে কোনো একটা ভালো আবাসিক স্কুল কিংবা কলেজে স্থায়ীভাবে ভর্তি করাইয়া দিতে পারিলে আমার ব্যাপারে তিনি দুশ্চিন্তা মুক্ত হন, আর আমার সবগুলি বোনকে বিয়া দিতে পারিলে পুরু পরিবারকে নিয়া তিনি শংকামুক্ত হন। আর এই শংকামুক্ত হইতে পারিলেই তিনি একান্ত নিশ্চিত হইয়া তাহার পিএইচডি করিবার লক্ষে বিদেশে স্কলারশীপ লইয়া বাইরে চলিয়া গিয়া নিজের ক্যারিয়ার তৈরী করিতে পারিবেন, অন্যথায় ব্যাপারটা সফল হইবে না। অনেক কঠিন কাজ এবং এই সবগুলি কাজে একের পর এক সাফল্য আসিলেই তিনি তাহার পরিকল্পনায় সার্থক হইবেন। কোনো একটা কাজে সাফল্য না আসিলে সেখানেই তাহার মহা পরিকল্পনা ভেস্তে যাইতে পারে এবং বড় ধরনের একটা হুমকী হইয়া দাড়াইবে।

ফলে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আমি। আমি গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করি। গ্রামের স্কুলের পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করিলেই যে কেউ খুব মেধাবী বলিয়া প্রমানিত হয়, তাহা কিন্তু মোটেও সত্য নয়। তবে আমি নাকি বেশ মেধাবী ছিলাম ইহা আমাদের স্যারেরা বলিতেন। আর এই মেধাবীত্ব প্রমানের লক্ষে মাঝে মাঝে আমার শিক্ষকগন আমাকে দিয়া আমার থেকে ছোট ক্লাসের তাহাদের ক্লাশ গুলি নেওইয়া লইতেন। তাহাতে স্যার দের দুইতী লাভ হইতো। অনায়াসেই স্যারেরা স্কুলে না আসয়া নিজের পরিবারের জন্য বাজারের দিন বাজার করিতে পারিতেন, কিংবা বৃষ্টির দিনে বাসায় বসিয়া ভুনা খিচুড়ি খাইতে পারিতেন।

একদিন ভাইয়া গ্রামে আসিয়া আমাকে কাছে টানিয়া বলিলেন, তোকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হইতে হইবে। আমার জীবনে এমনিতেই আমি আমার গ্রামের স্কুলের নাম ছাড়া অন্য কোনো স্কুল কলেজের নাম পর্যন্ত শুনি নাই, সেখানে ক্যাডেট কলেজ কি তাহাই তো জানি না। আমি আমার এই তথাকথিত মাথার অভ্যন্তরের সবগুলি প্রকোষ্ঠ খুজিয়া কোথাও ক্যাডেট কলেজের কোনো তথ্য আমার মাথার মধ্যে সন্ধান পাইলাম না। কি করিয়া জানিবো ক্যাডেট কলেজ জিনিসটা কি? আমরা সবাই ভাইয়াকে খুব ভয় পাইতাম, কিন্তু এই ভয়ের মাঝেও আমি একটু এরোগ্যান্ট ছিলাম বলিয়া বুঝিয়াই হোক আর না বুঝিয়াই হোক, একটু আধটু ঘাউরামীও করিতাম। আমার বড় ভাই আমার এই এরোগেন্সিটাকে কখনো বেশ করিয়া উপভোগ করিতেন আবার কখনো কখনো রাগে এমন শাসন করিতেন যে, গায়ে হাত দিতে একটুও কার্পণ্য করিতেন না। যেনো আমি তাহার নিজের কোনো সম্পদ, যখন যাহা খুশী তাহাই করিতে পারেন। কিন্তু অনেক পরে আমি বুঝিয়াছি, আমি শুধু তাহার সম্পদই ছিলাম না, আমি ছিলাম তাহার অন্তর। তাহার শাসনে আমি যতোটা না ব্যথা পাইতাম, আমার ভাই তাহা হইতে অধিক আঘাত পাইতেন বলিয়া আজ মনে হয়। আমি আমার বড় ভাইয়ের এই শাসনটা আজ খুব মিস করি। ভাইয়ার ক্যাডেট কলেজের ভর্তির কথায় আজ এরোগ্যান্ট হইবার কোনো কারন আমি দেখিলাম না। জিজ্ঞাসা করিলাম, ক্যাডেট কলেজ কি জিনিস ভাইয়া?

ভাইয়া বলিলেন, সমস্ত বাংলাদেশ হইতে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য ছেলেরা পরীক্ষা দেয়। হইতে পারে এক লাখ ক্যান্ডিডেট, হইতে পারে তাহার থেকেও বেশি, কিন্তু সবগুলি ক্যাডেট কলেজ মিলাইয়া ছাত্র ভর্তি করে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ জন প্রতি ক্যাডেট কলেজে। তখন দেশে মাত্র চারটি ক্যাডেট কলেজ ছিলো। মেয়েদের জন্য কোনো ক্যাডেট কলেজ ছিলো না। ৪০ বা ৫০ জন সাফল্যবান ছাত্র এক বা দুই লাখ ছাত্রের মধ্যে কত অনুপাত তাহা আমার জানা ছিলো না, কিংবা ইহা কতটা কঠিন কাজ তাহাও আমার বুদ্ধিতে নাই, ফলে ইহা লইয়া আমার কোনো মাথা ব্যথাও ছিলো না। ভাইয়ার একটা প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, আমি যদি ইচ্ছা করি, এবং নিজে চেস্টা করি তাহা হইলে যে কোন কাজ আমার দ্বারা সাফল্য আসিবে। আমার উপর ভাইয়ার এই আত্মবিশ্বাসটা অনেক গভীরে পোতা ছিলো যা আমি নিজেও কোনোদিন জানিতাম না। তবে এইটা বুঝিতাম যে, আমি পারবো ইনশাল্লাহ। আমার আত্মবিশ্বাস আমার থেকে আমার উপর আমার বড় ভাইয়ের বেশী ছিলো।

আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য আমাকে কি কি করিতে হইবে? ভাইয়া অতি আদরের সহিত আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলেন, ভর্তি পরীক্ষা হইবে, মেরিট লিস্ট অনুযায়ী ছাত্র ভর্তি করা হয়। যারা ভালো করিবে এবং পাশ করিবে এবং এই সীমিত সংখ্যক সিটের জন্য কোয়ালিফাই করিবে তাহারাই ভর্তি হইতে পারিবে। কোনো রিকুয়েস্ট বা তদবির চলে না এই ক্যাডেট কলেজ গুলিতে ভর্তি হবার জন্য।

আমি ভাইয়াকে কি ওয়াদা করিয়াছিলাম, আমার আজো স্পষ্ট মনে আছে। বলিয়াছিলাম, ভাইয়া, যদি পরীক্ষা দিয়া ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়া যায়, তাহা হইলে আমি ভর্তি হইতে পারিবো। ভাইয়া বলিলেন, ইনশাল্লাহ বল। আমি বলিলাম, ইনশাল্লাহ। আমি ছোট, ইনশাল্লাহ বলিলে কতটুকু সাফল্য আসে, তাহা আমার জানা নাই, তবে সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসেঅনেক কাজ তিনি সহজ করিয়া দেন, ইহাই আমার গুরুজনেরা আমাকে শিখাইয়া দিয়াছেন। 

আসলে আমি কি কারনে এতো জোর দিয়া সাফল্যের কথা বলিয়াছিলাম, আমি আজো জানি না কিন্তু আমার মনে হইয়াছিলো, এইটা কোনো ব্যাপারই না। ভাইয়া শুধু আমার কথাতে খুশীই হইলেন না, তিনি জানিতেন, আমি পারবো। এখন শুধু আমাকে পারার জন্য সুযোগ করিয়া দিতে হইবে।

ভাইয়া আরো বলিলেন, দেখ, ভর্তি পরীক্ষার সময় আছে আর মাত্র ৩৯ দিন। বিশাল সিলেবাস, কোথা থেকে কি আসিবে পরীক্ষায় কেউ জানে না, কিন্তু এরই মধ্যে পাশ করিতে হইবে। এখানে পাশ করিবার কোনো নম্বরের লিমিট নাই। প্রথম হইতে মাত্র ৪০/৫০ জন। মেধা তালিকার এই একটা অসুবিধা।  

আমার প্রস্তুতির মধ্যে প্রথম ধাপ শুরু হইলো আমার হাতের লেখার অনুশীলন দিয়া আর তাহার সাথে ক্লাস সিক্স, সেভেন এবং এইটের সব বই পড়িয়া ফেলা দিয়া। পৃথিবীর সব দেশের রাজধানীর নাম হইতে শুরু করিয়া রাস্ট্রপ্রধানদের নাম, মুদ্রার নাম, আরো অনেক কিছু। তাহার মানে সাধারন জ্ঞ্যান বলিতে যাহা বুঝায় তাহা আয়ত্ত করা। আমি আজো বুঝি না, এই বয়সে ঘিনির রাস্ট্রপ্রধান ইয়াসিন সাহেব না হইয়া আলিম সাহেব হইলেই বা কি আর লন্ডনের মুদ্রার নাম পাউন্ড না হইয়া টাকা হইলেই বা কি? তাহাতে ক্যাডেট কলেজের মেধার সহিত কি পার্থক্য হয়? তাহা হইতে যদি বলিতো, লও একটা ফুটবল, দেখি কত জোরে লাথি মারিয়া কত দূর নিয়া যাইতে পারো, অথবা একটা গাছে উঠিয়া চড়ুই পাখীর বাসা হইতে একটা আস্ত ডিম পারিয়া কত তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিতে পারো দেখাও দেখি? সেইটাই হোক তোমার পরীক্ষা। অথবা যদি বলিতো যে, দেখি দম বন্ধ করিয়া কে কতক্ষন থাকিতে পারো? কিংবা যদি বলিতো, বৃষ্টিতে কে কতোক্ষন ভিজিয়া চুপচাপ বসিয়া থাকিতে পারো, এইটাই তোমাদের পরীক্ষা। যাই হোক, ভর্তি পরীক্ষার গুরুজনগন আমাদের থেকে বেশি মেধাবি বলিয়া তাহারা ফুটবল খেলিতে পছন্দ করেন না, তাই ফুটবল ১০০ গজ গেলেই কি আর ৫০০ গজ গেলেই কি। অথবা তারা বয়স্ক হইয়া যাওয়াতে বৃষ্টিতে ভিজার নাম শুনিলেই তাহাদের যাহার কথা প্রথমে স্মরণ হয় তিনি হচ্ছেন ডাক্তার। অহেতুক এই মেধা পরীক্ষা লইতে গিয়া ডাক্তার বাবুদের টানিয়া আনা খুব সমিচীন বলিয়া মনে হয় না। ফলে এইসব বিষয় সিলেবাসে সংযোগ করিয়া নিজেদের ক্ষতি করিবার কোনো কারন তাহারা দেখেন না। যাক, সিলেবাসের মধ্যে এখানেই শেষ নয়। ইংরেজীতে কথা বলার অনুশীলন করা, ইহার সাথে প্রতিদিন সকালে শারীরিক ব্যায়াম করা এইগুলাও নাকি আছে। এতোসব তো আর গ্রামে বসিয়া করা সম্ভব নয়। তাই আমার ট্রান্সফার হইয়া গেলো গ্রাম হইতে শহরে, খোদ ঢাকা ইউনিভার্সিটির চত্তরে, শহিদুল্লাহ হলে। আমার ভাই শহিদুল্লাহ হলে থাকিতেন, সেখানে। ভাগ্যের কি পরিহাস, ক্যাডেট কলেজে পরীক্ষা দিতে গিয়া প্রথমেই ইউনিভার্সিটিতে পদার্পন।

আমি যেইখানে ভাইয়ার সাথে থাকিতাম, সেইখানে তখন আমার ভাইয়ের সব কলিগরা থাকিতেন। সেকুল ভাই (ঢাকা ইউনিভারসিটির এপ্লাইড ফিজিক্সের লেকচারার, আমি জানি না তিনি এখন কোথায় আছেন, আবু সুফিয়ান ভাই, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ম্যাথ লেকচারার সম্ভবত, তাহার সাথেও আর কখনো যোগাযোগ হয় নাই আমার, এবং আরো অনেকে)। পাশেই ফ্যামিলি কোয়ার্টারে থাকিতেন সেই বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন ভাই (রসায়নের লেকচারার) গুলতেকিন ভাবি সহ। সন্ধ্যা হইলেই এই ঢাকা ইউনিভার্সিটির কিছু শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রী (তাহাদের মধ্যে সুবর্ণ মুস্তফা, কেমিলিয়া মুস্তফা, আফজাল ভাই এবং আরো অনেকেই আসিতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কিভাবে করিবেন তাহা আলাপ করার জন্য, আড্ডা দেওয়ার জন্য। আমিই হইলাম গিয়ে একমাত্র অসম বয়সী এক কিশোর যাহাকে সবাই খুব আদর করিয়া কেউ পিচ্চি, কেউ বালক, কেউ আবার নিজের দেওয়া যে কোনো মিস্টি নাম, কেউ আবার আমার নাম ধরিয়াই ডাকিতেন। আমাকে যে কেউ যে নামেই ডাকিতেন, আমি তাহাতেই উত্তর করিয়া সময়টাকে প্রানবন্ত করিয়া রাখিতাম।   

আমার কোনো বন্ধু ছিলো না এই শহরে। আমি সকালে আলুর ভাজি দিয়া পরোটা খাই, তারপর পড়িতে বসি, আবার দুপুরের দিকে গোসল সারিয়া দুপুরের খাবার খাই, ঘুমাই, বিকালে সবার সাথে বোবা মানুষের মতো আড্ডা দেই, সন্ধ্যা হইলেই আবার পড়িতে বসি। এর মধ্যে বেগমের মা ই একমাত্র মহিলা যিনি সব লেকচারারদের জন্য তিন বেলা রান্না করিয়া দেয় আর আমার সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়। ঢাকা শহরের একমাত্র মহিলা যাহাকে আমি গ্রামের মানুষদের মতো করিয়া পাইয়াছিলাম। আরেকজন ছিলো মুন্সি নামে একজন পুরুষ যিনি চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী হইয়াও রাজনীতির অনেক খবর রাখিতেন এবং খুব ভালোভাবেই অংশ গ্রহন করিতেন। আজ এই মানুসগুলি কোথায় আছে আমার জানা নাই, কিন্তু মিস করি।

শহিদুল্লাহ হলে আমার পড়াশুনা খুব ভালোভাবে চলিতেছে। কিন্তু গ্রামের জন্য আমার খুব মন খারাপ হয়। বিছানায় শুইলেই আমি আমার সেই গ্রামের পথ দেখি, মায়ের জন্য মন খারাপ হয়, আমার বন্ধুদের জন্য মন খারাপ হয়, আর মনে হয় কাউকে না জানাইয়া গ্রামে পালাইয়া যাই। কিন্তু আমি এই শহরের কোনো রাস্তাঘাট আমি চিনি না, কাউকে চিনি না, হাতে কোনো টাকা তো দুরের কথা পয়সাও নাই। আর থাকিলেও কিভাবে কাকে কি বলিয়া আমাদের গ্রামে যাওয়া যায়, তাহার কোনো পথ লিঙ্ক আমার জানা নাই।

দিন যায়, রাত যায়, আমার আমার সব কাজ ঠিক ঠাক মতো চলছে। বিশেষ করে পড়াশুনা। শুধু পড়াশুনাই ভালোভাবে চলিতেছে বলিলে ভুল হইবে, পড়াশুনার পাশাপাশি সকাল হইলেই আমার বড় ভাই আমাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমে পাঠাইয়া দেন। সেখানে সব সিনিয়র সিনিয়র ভাইয়েরা শরিরচর্চা করেন। আমিই একমাত্র সবচেয়ে কনিষ্ঠ অনুশীলনকারি যে এই ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিমে আসি। কেউ কিছু বলে না, মাঝে মাঝে কেউ কেউ আমার গালে হাত দিয়া আদর করিয়া দেয়। আবার কেউ কেউ খুব খুশি হয় এই ভাবিয়া যে, এই অল্প বয়সেও আমি এতো সাস্থ সচেতন!! যখন জানিতে পারে আমি ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য চেস্টা করিতেছি, আর এই জিমে আসার পিছনে আমার সাস্থ সচেতনার থেকে সিলেবাস পুরা করাই মুখ্য, তখন অনেকেই আরো মিস্টি মিস্টি করিয়া আমার পড়াশুনার কতটুকু হইতেছে তাহা জানিতে আগ্রহী হয়। কয়েকদিনের মধ্যে অনেকের সাথে আমার অসম বয়সী বন্ধত্ত হইয়া উঠে। এখন আর খারাপ লাগে না। অনেকেই আমার পরিচিত।

দিন ঘনাইয়া আসে পরীক্ষার। আমার মধ্যে যতোটা না টেনসন তাহার থেকে বেশী টেনসন দেখিতে পাই আমি আমার বড় ভাইয়ের চোখেমুখে। একটা সময় আসে, আমার সব সিলেবাস শেষ হইয়া যায়, সবকটি রচনা বইয়ের যে কয়টি রচনা লেখা রহিয়াছে তাহা তোতা পাখির মতো মুখস্ত হইয়া যায়, তিন ক্লাস মিলিয়া যতো অংক আছে তাহা আমার নখ দর্পণে। সুত্র আমি ভালো বুঝি, নিজে নিজেই অনেক সুত্র যেন আবিস্কার করিয়া ফেলিতে পারি এমন একটা অবস্থা। পৃথিবীর সব দেশের রাজধানীর নাম আমার জানা। কোনো এক দেশের কোনো ছোট বালক হয়ত তাহার দেশের রাজধানীর নাম বলিতে না পারিলেও আমি তাহার দেশের রাজধানীর নাম অনায়াসেই বলিয়া দিতে পারি। সুরিনামের রাজধানী প্যারামারিবো এইটা হয়তো আজো অনেকেই জানে না। আর এই প্যারা দিয়া কেনো রাজধানীর নামকরন হইলো সেইটা লইয়া আমার কোনো কৈফিয়তও নাই। সুরিনামের রাজধানী “প্যারামারিবো” বা “পারা মারিবো” না হইয়া যদি “গুতা মারিবো” কিংবা “ঘুসি মারিবো”ও হইতো তাহাতেও আমার কোনো অসুবিধা হইতো না, আমি সেইটাও মুখস্ত করিতাম।

দিন যায়, পরীক্ষার তারিখ ঘনাইয়া আসে, আর আমার সিলেবাস শেষ হইতে থাকে। একদিন ভাইয়াকে বলিলাম, ভাইয়া, আমার তো সব পড়া শেষ। আর কোনো রচনাও বাকী নাই কোন বইয়ের। তাহা হইলে আমি এখন কি করিবো? ভাইয়া বলিলেন, তাহা হইলে এক কাজ কর, প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর পরে যে স্বপ্ন দেখিস, সেইটা সকালে উঠিয়া রচনা আকারে লিখিয়া ফেল। এইটাই তোর সিলেবাস। কি ভয়ংকর কথা। ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিচারদের মাথায় এতো বুদ্ধি? এখন আবার স্বপ্ন মনে রাখিতে হইবে? কিন্তু আমি তো শুধু একটাই সপ্ন দেখি, আর তাহা হইতেছে ওই যে, গ্রামের মেঠো পথ, ডাংগুলি খেলা, আমার বন্ধুদের লইয়া হইচই করিয়া মাঠে ফুটবল খেলা, সারাদিন চরকির মতো ঘুরিয়া বেড়ানো। কিন্তু তাহাতেও আমার রচনা শেষ হয় না। কখনো আমি আমার মাকে দেখি, দেখি আমাদের উঠোনে বাড়িয়া উঠা বরই গাছে ছোট ছোট বরই এর কলি আসিয়াছে, দেখি আকাশের শেষ প্রান্তে লাল সূর্য এক সময় সন্ধ্যা নামাইয়া সারা গ্রামকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করিয়া দিতাছে। আর ইহার সাথে রাতের তারা আর গোলাকার চাক্টির মতো চাদনী রাত উপহার দিতাছে। আমার রচনায় আমার মন খারাপের একটা পরিস্কার আভাস ফুটিয়া উঠিতেছে বুঝিয়া আমার ভাই মাঝে মাঝে আমাকে লইয়া পাশেই দোকানের গরম জিলাপি খাওয়ানোর চেস্টা করেন। মিস্টি জিলাপী খাওয়ার সাথে মন ভালো হইবার একটা যোগ সুত্র নিশ্চয়ই আছে। তাহা না হইলে, অন্তত ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন মেধাবী লেকচারার এই কাজটি করিতেন না।  

সপ্ন হইতে রচনা লিখতে গেলে যেহেতু আমার মন খারাপের একটা আভাস তিনি পাইতেছিলেন, তাই এইবার আমার বড় ভাইয়ের মাথায় আরেক নতুন ফন্দি এলো। বিকালে যে সব বড় ভাইয়েরা আড্ডা দিতে আসেন, তাহাদের মধ্যে হুমায়ুন ভাই একজন উঠতি লেখক হিসাবে পরিচিত হইতেছিলেন। তিনি নন্দিত নরকের মতো একটা উপন্যাস ইতিমধ্যে লিখিয়া নাম করিয়া ফেলিয়াছেন। শঙ্খ নীল কারাগারও ইতিমধ্যে নাম করা হয়ে উঠিতেছে। ইহা আবার টিভিতে প্রচারিতও হইয়াছে। হুমায়ুন ভাই তাহার উপন্যাশের মুল কাহিনী লিখার আগে বা পরে তিনি তাহার লেখাগুলি এই আড্ডায় শেয়ার করিতেছেন। আমি ছোট একজন মানুষ এইসব বড় বড় মানুষদের কাছে বসিয়া শুধু হাই তুলিতেছি। আমি কি তাহাদের এই উপন্যাশের চরিত্রের বৈশিষ্ট খন্ডন করিয়া রচনা আকারে লিখিতে পারি? তাই, শহিদুল্লাহ হলের ডাইনিং হলের উপরের তালায় এক মাত্র সাদা কালো টিভির নাটক আর বিদেশি কিছু ইংরেজী সিরিয়াল দেখার অনুমতি আমার মিলিয়া গেলো। কিন্তু অসুবিধা হইলো আরেক জায়গায়। এতো ছাত্র এবং ছাত্রীরা এই সাদা কালো টিভির দর্শক ছিলেন, যে, তাহাদের গল্পের ডায়ালগ শুনিতে শুনিতে টিভির কোনো ডায়ালগই আমার কানে আসিত না।

এখানে আরো একটা কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। আমার হাতের লেখা অনুশীলন করিতে করিতে আমার হাতের লেখা মুক্তার মতো ঝকঝকে হইয়া গেলো। একেবারে কার্বন কপি আমার বড় ভাইয়ের হাতের লেখার সাথে। শুধু তাই নয়, আমি যে কোনো স্টাইলে হোক সেটা সোজা করিয়া, বাকা  করিয়া, তেরা করিয়া, সব স্টাইলেই আমার হাতের লেখা এ ওয়ান।

অবশেষ ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষা আগামিকাল। সিট পড়েছে ঢাকা কলেজে। কি বিশাল সেই কলেজ। আমার জীবনেও এতো বড় কলেজ দেখি নাই। কতগুলি বিল্ডিং, কতগুলি রাস্তা, মাথা খারাপ হয়ে যায়। পরীক্ষার উত্তর প্রশ্নপত্রেই লিখিতে হইবে, ফলে খুব সাবধানে না লিখিলে উত্তরের জন্য অতিরিক্ত কাগজ লইবার কোনো অপশন নাই। আমার অবশ্য তাহাতে কোনো সমস্যা নাই কারন আমি অতি ছোট অক্ষরেও অলপ বিস্তর জায়গায় অতি সুন্দর করিয়া কাটাকাটি না করিয়া অনেক বেশী কিছু বেশ লিখিতে পারি।  

প্রশ্নপত্র হাতে পেলাম। প্রথমেই কি রচনা আসিয়াছে সেইতা খোজ করিতে গিয়া আমার এতো হাসি পাইয়াছিলো যে, আজো আমার ঠোট হাসে। এত রচনা পড়িলাম, এতো রচনা স্বপ্ন দেখিয়া দেখিয়া নিজে রচনা তৈরী করিলাম, এতো বড় বড় সাহিত্যিকদের সাথে নাটক উপন্যাসের চরিত্র ব্যাখ্যা করিয়া আমি নিজেও একজন সেমি সাহিত্যিক হইয়া যাইবার উপক্রম হইলো, আর সেখানে কিনা রচনা আসিয়াছে “আমার জুতার ফিতা”, আর “আমার কলমের নিপ”? তাও আবার দশ লাইন। ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রকারীরা আসলে অন্য গ্রহে বাস করিতেন বলিয়া আমার বোধগম্য হইল, অথবা তাহার রচনা নির্বাচন করিবার জন্য হয়তো কিছু দুই বা তিন বছরের বাচ্চাদের লইয়া একটা বোর্ড গঠন করিয়াছিলেন, যাহারা জুতার ফিতা আর কলমের নিপ ছাড়া আর কিছুই তাহাদের জ্ঞ্যানে ছিলো না। যাক, আমি “কলমের নিপ” রচনাটাই লিখিলাম। আমিও কম চালাক নই। দশ লাইন লিখিতে হইবে, আমি দশ লাইন ই লিখিবো। লিখিলাম।

আমার একটি কলম আছে যাহার আগায় একটা নিপ আছে।

নিপটি শক্ত।

মনে হয় টিনের তৈরী।

নিপটি খোলা যায়।

আবার লাগানোও যায়।

মাঝে মাঝে নিপটি খুলিয়া ধুইতে হয়।

নিপ ভেংগে গেলে নতুন নিপ লাগানো যায়। ।

নিপের জন্য একটা ক্যাপও আছে।

নিপ কলমের মাথার মতো।

আমি নিপটিকে খুব ভালোবাসি।

আমি কখনো নিপটিকে এমন করিয়া ভালোবাসিয়াছি কিনা আজো জানি না। কিন্তু লিখিয়া তো দিয়াছি যে, আমি নিপটিকে ভালোবাসি। আসলে ভালোবাসার জন্য শুধু প্রান থাকিতে হইবে এমন বস্তুই নয়, প্রান নাই এমন সব বস্তুকেও আমরা অনেক ভালোবাসি। হয়ত এই নিপের জন্য কেউ এমন করিয়া এমন ভালোবাসা প্রদর্শন করিলো।

পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি একে একে সবগুলির উত্তর দিতে থাকিলাম। অংক, ইংরেজী আর সাধারন জ্ঞ্যান এর পরীক্ষা। বাংলা কি ছিলো কিনা এখন আর মনে করিতে পারিতেছি না। মনে হয় ছিলো না। আমি যখন পরীক্ষা দিতেছিলাম, লক্ষ্য করিলাম, একজন মোটা টিচার প্রায়ই আমার পাশে আসিয়া দারাইতেন। আর বলিতেন, তোমার হাতের লেখা তো খুব সুন্দর!! মাত্র এক ঘন্টার পরীক্ষা। এই এক ঘন্টায় নির্ধারিত হইয়া যাইবে কে বা কাহারা এইসব ক্যাডেট কলেজ গুলিতে ভর্তি হইবে। এখন মাঝে মাঝে মনে হয় ক্যাডেট কলেজের ছেলেগুলি কি ভাগ্যবান নাকি ছেলেগুলি ক্যাডেট কলেজকে ভাগ্যবান করিয়াছে? হয়ত দুইটুই সত্য।

পরীক্ষা সেসের ঘন্টা বাজিয়া গেলো। আমার পরীক্ষা খুব ভালো হইয়াছে। জানামতে কোন ভুল করি নাই। আমি তৃপ্ত পরীক্ষা দিয়া। খাতা লইয়া যাইতেছেন টিচাররা। আমার খাতা নিতে আসিলেন ওই মোটা টিচার। আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, পরীক্ষা কেমন হইয়াছে? আমি স্যারকে বলিলাম, স্যার যদি একজন চান্স পায়, তাহা হইলে আমি পাবো। এবার আর ইনশাল্লাহ বলিতে ভুল করি নাই। স্যার নিজেও সম্ভবত আমার উত্তরগুলি লিখার সময় পড়িয়াছিলেন। তাই হয়তো বুঝিয়াছিলেন, আমার কথায় একটা সত্যতা আছে। তিনি আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলেন, ভাইভা পরীক্ষাটা ভালো করিয়া দিবা, দেখা হইবে কলেজে। পরে আমি কলেজে গিয়া এই স্যারের নাম জানিয়াছিলাম, মোহশীন স্যার, আমাদের বাইওলোজির টিচার।

লিখিত পরীক্ষা তো শেষ। এখন যাহারা লিখিত পরীক্ষায় পাশ করিবে তাহাদের মধ্য হইতে আবার ভাইভা নেওয়া হইবে। ভাইবায় যাহারা মেধাবী হিসাবে প্রমান করিতে পারিবে, তাহারাই সেই গুটিকতক ভাগ্যবান যারা সপ্নের ক্যাডেট কলেজে পড়িতে যাইবে। বয়স মাত্র ১২, যেই সব পরীক্ষা দিতেছি, আমেরিকার প্রেসিডেন্টরাও মনে হয় এই বয়সে এমন পরীক্ষা দেয় নাই। এদিক হইতে আমরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হইতেও উত্তম।  

পরীক্ষার পর যেনো আমার আর কোনো কাজ রহিলো না। কিন্তু আমার না হয় কাজ নাই, কিন্তু যিনি কাজ জোগাড় করিয়া দেওয়ার লোক আমার সেই ইউনিভার্সিটির ভাই, তাহার হাতে তো আমার জন্য অনেক কাজ জমা হইয়াই ছিলো। ভাইয়া ভাবলেন, কি জানি যদি ক্যাডেট কলেজে না চান্স পাই তাহাহলে কি হবে? ফলে বিকল্প হিসাবে তিনি আরো একটি কলেজের জন্য আমাকে প্রস্তুতি নিতে বলিলেন। আর সেইটা হইতেছে ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল। ক্যাডেট কলেজের প্রস্তুতি আমার এমন ছিলো যে, ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের জন্য ইহাই ছিলো ঢের। ফলে খুব অনায়াসেই আমি ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের ভরতি পরীক্ষায় টিকে গেলাম।

দিন যায় মাস যায়, ভাইয়া আমার ক্যাডেট কলেজের পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন আর আমি অপেক্ষায় থাকি কবে গ্রামে যাবো, আবার বৃষ্টিতে ভিজবো, গ্রামের বন্ধুদের লইয়া আমি কবে আবার সেই আগের দিনের মতো হই হুল্লুর করিবো। 

আমি রীতিমতো ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে ক্লাস শুরু করিয়া দিয়াছি। নতুন নতুন কিছু বন্ধু জুটিলো। ভালো লাগিতে শুরু করিলো আমার শহরের জীবন। আমি শহিদুল্লাহ হল হইতে হাটিয়া হাটিয়া সেই আজীম্পুর ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে যাই ক্লাস করিতে। ফিরিতে ফিরিতে বাজিয়া যায় প্রায় পাচটা।

হটাত একদিন সকাল বেলায় আমাকে আমার ভাই কাছে ডাকিলেন, পাশে বসাইলেন, আর আমার মাথায় হাত দিয়া বলিলেন, ‘তুই জানিস না তুই কি করেছিস। তুই ক্যাডেট কলেজের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছিস। কত যে আমি খুশী হয়েছি তোকে বুঝাতে পারবো না’। আমি পাশ করেছি এই উপল্বধিটা আমার মধ্যে কোনো কিছুই পরিবর্তন করিলো না কিন্তু ভাইয়ার খুশী দেখিয়া আমার অনেক আনন্দ হইয়াছিলো। আমাকে ভাইয়া ওইদিন সন্ধ্যায় কোথায় যেনো লইয়া বেশ মজার মজার খাবার খাওইয়াছিলেন। ঢাকা শহর ঘুরাইয়া ছিলেন। আমি ভাইয়ার হাত ধরে এক রিক্সায় বেড়াইয়াছি। খাওয়া দাওয়ার পর ভাইয়া হুমায়ুন স্যারের বাসায় এই সুখবরটা দিতে আমাকে লইয়া গেলেন। রাতে হুমায়ুন স্যারের বাসায়ই খাওয়া দাওয়া করিলাম। গুলতেকিন ভাবি খুব ভালো মহিলা ছিলেন, আমাকে আদর করিয়া বলিলেন, এই যে মেধাবী ছেলে, আসো তোমাকে মিস্টি খাইয়ে দেই। এই বলে তিনি আমাকে এক বাটি পুডিং ধরিয়ে দিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি পুডিং খুবই অপছন্দ করি। বলিলাম, পেটে একটু জায়গাও নাই যে খাই। তারপরেও খাইলাম। ভালোবাসায় যে যাই কিছুই দিক, তাহাতে ভালোবাসার সাথে যাহা থাকে তাহা হচ্ছে স্নেহ আর মায়া। এই মায়ার কারনেই কেউ এই পৃথিবীকে ছাড়িতে চাহে না।  

কিছুদিন পরই ভাইভার তারিখ পড়িয়া গেলো। আমি এই ভাইভাটাকে এতো ভয় পাই যে, মাঝে মাঝে আমি তোতলাতে থাকি যদি উত্তর না পারি। তারপরেও তো ভাইভা দিতে হইবে। আমার যেইদিন ভাইভা পরীক্ষা সেইদিন আমার সিরিয়াল পড়িলো একবারে শেষ ছাত্র হিসাবে। শেষ ছাত্রের ভাইভা দেওয়ার বিরম্বনার আর শেষ নাই। যেই পরীক্ষা দিয়া বের হয়, অমনি আমরা হুম্রী খাইয়া তাহাকে ঘিরিয়া প্রশ্ন করিতে থাকি, তাহাকে কি জিজ্ঞাসা করিয়াছে, আর সেইটার উত্তর কি দিয়াছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের প্রাননাশ। আর টেনসন তো আছেই। আমরা যাহারা তখনো পরীক্ষার সিরিয়ালে বসিয়া আছি, তাহারা ফাকে ফাকে অনেক প্রশ্ন নিয়ে আলাপ আলোচনাও আবার করিতেছি। একসময় (নাম বল্বো না আমার এক বন্ধু যে পরে আমার সাথেই ক্যাডেট কলেজে পড়েছে) এক ছাত্র আরেক ছাত্রকে প্রশ্ন করিলো, জানো, গাড়ি চলার সময় কয় চাক্কা সাম্নের দিকে ঘুরে? আমিও মনোযোগ সহকারে প্রশ্নটি শুনিলাম, কিন্তু যেহেতু কোনোদিন আমার পরিবার গাড়ির মালিক ছিলেন না, তাই আমি নিজেও জানি না আসলে কোন কোন চাক্কা গাড়ি চলার সময় সামনে যায় আর কোন চাক্কা পিছনের দিকে যায়। আমার প্রশ্নকারী বন্ধু খুব গম্ভীরভাবে উত্তর দিলো, গাড়ির সামনে চলার সময় তিন চাক্কা নাকি সামনে ঘুরে আর এক চাক্কা নাকি পিছনের দিকে ঘুরে। আমি বিশ্বাসও করিয়াছিলাম। হইতেও পারে, কারন ওরা তো গাড়িতেই ঘুড়াঘুড়ি করে। আমি এরপর অনেকবার পরিক্ষা করে দেখার চেস্টা করিয়াছি, আসলে কোন চাক্কাটা পিছনের দিকে ঘুরে? এইটা খুজিতে গিয়া বারবার আমার মাথাই খালি চক্কর দিয়াছে কিন্তু কোন চাক্কা পিছনে চক্কর দেয় সেটা আজো বুঝি নাই।

অবশেষে ভাইভার জন্য আমার ডাক পড়িলো। তখন প্রায় সন্ধ্যা। শেষ ছাত্রের ভাইভার যেমন সারাদিন টেনসনের জন্য মাথা খারাপ থাকে, আবার শেষ ছাত্র হইলে একটু লাভও আছে। টিচাররা তখন বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির থাকেন, মোটামুটি প্রশ্ন করিয়াই ছাড়িয়া দেন। বাড়ী যাওয়ার তাড়া। আমার বেলায়ও তাহাই হইলো।

চল্লিশোর্ধ্ব বিজ্ঞ পাচ ছয়জন ব্যক্তিবর্গ মাত্র বারো বছরের বালকের মেধা যাচাই করিবার লক্ষে চারিদিকে এমন করিয়া বসিয়া আছেন যেনো গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ হইতেছে। একজন আমাকে প্রশ্ন করিলেন, তুমি কেনো ক্যাডেট কলেজে ভরতি হইতে চাও? আমি বললাম, আমি পাশ করিয়াছি বলিয়া ক্যাডেট কলেজে ভরতি হইতে চাই স্যার। সবাই আমার এই উত্তরে কেমন জানি যেনো হচকচিয়া গেলেন। একি কথা !! আরেকজন বলিলেন, তুমি কি আর্মি হইতে চাও? আমি বললাম, স্যার আর্মি কি? এবার আরো অবাক স্যারেরা। কি জানি কি বলাবলি শুরু করিলো ওনারা। আমি ভয় পাইয়া গেলাম। এইবার একজন আইনস্টাইনের মতো বুড়োলোক আমাকে একটা সাদা পাতা হাতে দিয়া একটা অংক করিতে বলিলেন। সময় দিলেন দুই মিনিট। আমি কয়েকবার অংকটা করে দেখিলাম। এক্স এর মান নির্ণয় করিতে হইবে। ইহা আমার জন্য পান্তা ভাতের মতো। কিন্তু বারবার অংক তা করিবার পরও দেখিলাম, ব্যাপারটা মিলিতেছে না। আমি খুব ভয়ে ভয়ে বলিলাম, স্যার অংকটা মিলছে না, এক্স এর মান কি ভুল আছে?

এইবার তাহারা আর অবাক হইলেন না। একেবারে আমার পিঠে একজন চাপড় মারিয়া বলিলেন, হ্যারে বাবা, এইটাই তো উত্তর!! যাও, তোমার পরীক্ষা শেষ। আমি তো অবাক। অংক স্যারের ভুল দিয়াছেন, আমি নাকি সঠিক উত্তর দিয়াছি। ক্যাডেট কলেজের স্যারেরা সব মনে হয় পাগল। মেধাবী ছেলেদের পড়াইতে পড়াইতে স্যারেরাও আধা মেধাবী থেকে পুরুটাই পাগল হইয়া যাইতেছেন। শুনেছি, বড় বড় বৈজ্ঞানিকেরা নাকি পাগল হয়।

ভাইয়াকে সব আদোপান্ত বলিলাম। ভাইয়া আমার কথাগুলি দাড়ি কমা সহকারের গলদ করন করিতেছিলেন। যেনো আমি কোনো ভুতুরে গল্প বলিতেছি। সব শুনিবার পর ভাইয়া একটু কেমন জানি করিলেন। বাতাশ ভর্তি বেলুন হতাত করিয়া মুখ খুলিলে যেমন নিমিসের মধ্যেই তাহা আর পেট ফোলা মাছের মতো মনে হয় না, তেমনি আমার ভাইয়ার চোখ মুখ দেখিয়া আমার বড় ভয় হইতে লাগিলো। অনেক্ষন পর এক্তা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়া বলিলেন, বোকার মতো কেনো বলিতে গিয়াছিস যে, আর্মি কি তা জানিস না বা ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করেছি বলে ক্যাডেট কলেজে পড়তে চাই। বুদ্ধি করে অন্য কিছু বলতে পারলি না? বুঝলাম, আমি আসলে বোকাই।

যাই হোক, ভাইভা বোর্ডের সদস্যগন হয়ত আমাকে বোকা মনে করেন নাই, তাহারা হয়ত আমাকে বোকা না ভাবিয়া সহজ সরল ভাবিয়াছিলেন, তাই ফেল করাইয়া দেন নাই। আমি পাশ করিয়াছিলাম। সেই ৪১ বছর আগে সমস্ত পরীক্ষায় পাশ করার কারনে আজ ১৯ শে জুন এই দিনে কিছু অজানা মেধাবী ছেলেদের সাথে পড়াশুনা করিতে যাইতেছি আমি ক্যাডেট কলেজে। ঢাকা থেকে বহুদুর। সেই টাঙ্গাইল। ঢাকাই আমার কাছে সাত সমুদ্র তের নদীর পথ মনে হইতো আমার গ্রাম থেকে, আর আজ যাচ্ছি চৌদ্দ সমুদ্র ছাব্বিস নদীর দুরুত্তে।

সকাল সকাল ভাইয়া আমাকে কালো প্যান্ট আর সাদা ফুল শার্ট পড়াইয়া কোরবানীর গরুকে যেমন আদর করিয়া বাজারে দামী খদ্দেরের কাছে হাতছাড়া করিয়া দেন, ভাইয়াও আমাকে তেমনি সুদুর প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়া মির্জাপুরের কোনো এক বনবাসে ক্যাডেট কলেজ নামক বহুল আলোচিত এবং সপ্নের জগতে রাখিয়া আসিলেন। হাসের বাচ্চাদের মতো আমরা ৫৪ জন সমবয়সী কিশোর পিতামাতাহীন হইয়া মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে থাকিয়া গেলাম। প্রথম দিন একটা জেল খানা বলিয়া মনে হইল। আরো মনে হইলো যে, এতো কষ্ট করিয়া শেষ পর্যন্ত জেলে আসার জন্য ব্যতিব্যস্ত হইয়া ছিলাম?

মন খারাপ হইতেছিলো। এমন সময় পিছন হইতে কে জানি খুব আলতো করিয়া আমার ঘাড়ে হাত রাখিলো। তাকাইয়া দেখিলাম, ওই মোটা স্যার। খুব আপনজন মনে হইলো। আমার চোখ ছল ছল করিয়া উঠিলো। স্যার আমার চোখে চোখ রাখিয়া বলিলেন, মন খারাপ হইতেছে? আমরা আছি তো।

আজ এতো বছর পর মনে হইতেছে, হ্যা স্যার, আপ্নারা তো ছিলেন। আমার সেই প্রিয় ক্যাডেট কলেজ, বড় সুন্দর একটি স্থান আমার অন্তরে। আর সেই সব স্যার যাদেরকে আমি মিস করি নিঃশ্বাসের প্রতিটি ক্ষনে কারন তারা আমাদের শুধু স্যার ছিলেন না, ছিলেন কখনো ভাই, কখনো গুরুজন, কখনো পিতামাত আবার কখনো একেবারেই বন্ধু। আজো স্যার দের কে আমার পায়ে স্পর্শ করিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে ইচ্ছা করে, স্যার আমি আপনাদেরকে অনেক অনেক ভালোবাসি। আপ্নারা যে যেখানেই থাকুন, আমরা আপনাদের দোয়ায় বাচিয়া থাকিতে চাই।

২০/০৪/২০০৯-বাসাবোতে ডেভেলোপার

রিভার সাইডে আমার বিলুপ্তির শেষের দিকে আমি যখন অন্য আরেকটি বিকল্পের কথা চিন্তা করছিলাম, তখন বাসাবোতে তারেক নামে এক ভদ্র লোকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো। আর সেটা মোহসীন সাহেবের মাধ্যমেই। তারেক সাহেব আমাদের ফ্যাক্টরিতে এক্সেসরিজ সাপ্লাই দিতেন। বরিশালের মানুষ, খুব চালাক। তার মাধ্যমে আমি বাসাবোতে আরাই কাঠার একটা প্লট বায়না করেছিলাম এবং যেভাবেই হোক, টাকাটাও এক প্রকার পরিশোধ করেই দিয়েছিলাম। পাটোয়ারী নামে এক লোকের জমি যিনি নিজেও গার্মেন্টস লাইনে ছিলেন। পাটোয়ারী সাহেবের স্ত্রীর নামেও আরো আড়াই কাঠা জমি ছিলো একই দাগে। ফলে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ডেভেলোপারের কাজের একটা বুদ্ধি করলেও পাটোয়ারী সাহেব থাকতে পারেন নাই। ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে কিস্তি কিস্তি করেই টাকা নিয়ে গার্মেন্টস চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। এক পর্যায়ে গিয়ে আমি পুরু ৫ কাঠা জমিই নিয়ে নেই আর সেখানে হাউজিং করার জন্য উদ্যোগ নেই।

এতো চড়াই উতড়াই যাচ্ছিলো আমার জীবনের উপর দিয়ে। তারপরেও কিভাবে যে আল্লাহ আমাকে এসব বীভৎস পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেছেন, ভাবলেও শরীর কেপে উঠে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি। আমার মাথায় একটা বিষয় সব সময় কাজ করতো যে, যে কোনো মুল্যে আমার পরিবার যেনো সাফার না করে। আমি ওদেরকে বুঝতেই দেই নাই আমার ভিতরে কি চলছে বা আমি কি অবস্থায় আছি।  

সারাক্ষন চিন্তায় থাকি, কিভাবে মানুষের লোন গুলি শোধ করবো, কিভাবে সম্মানের সাথে একটা ব্যবসায় টিকে থাকবো। যার কেউ নাই, আসলে তার মতো মানুষের অনেক বড় সপ্ন দেখা অপরাধ। কিন্তু আমার তো সামর্থ না থাকলেও যোগ্যতা ছিলো। আর সেই যোগ্যাটা গুলি আমি আমার সহজ সরল মনের কারনে হারিয়ে ফেলেছিলাম এই সিভিলিয়ানদের ভীড়ে। একটা সময় ভাবলাম, বাসাবোর ৫ কাঠার উপরে যদি বিল্ডিং বানাই আর সেই ফ্ল্যাট গুলি বিক্রি করি, তাতে হয়তো একটা সেক্টর খুলবে। তারেকের এক বন্ধু হারুন নামের এক ভদ্র লোক সামিল হলেন। ভালো মানুষ। বুদ্ধি দিলেন যে, তার এক পরিচিত ভাই আছে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশনে। লোন নিয়ে হয়তো কাজে হাত দেয়া যায়। হাউজ বিল্ডিং ফাইনেন্সে গিয়ে জানতে পারলাম, গ্রুপ লোনে বেশী টাকা পাওয়া যায়। ফলে আমার টাকায় কেনা ৫ কাঠা জমি আমি নির্ভয়ে মোট পাচ ভাগে সাক কবলা করে গ্রুপ লোন হসাবে ৬০ লাখ টাকা নিয়ে নিলাম। তাদের মধ্যে একজন লেঃ কর্নেল ফেরদৌস, আমার ভাতিজা মান্নান, আমার স্ত্রী মিটুল চৌধুরী, হারুন সাহেব আর আমি। মোট ৫ জন, ৫ কাঠা। এটাও একটা ভালো বুদ্ধি ছিলো না। কিন্তু আমাকে হয়তো আল্লাহ ভালোবাসেন, তাই মাথায় একটা বুদ্ধি এটে দিলো যে, সাব কবলা করার সাথে সাথে আমি সবার কাছ থেকে আম মোক্তার নিয়ে নিলাম যাতে কেউ আমার সাথে আবার ছল চাতুরী করতে না পারে।

০৫/০৪/২০০৮-প্রিয়ান্থা/মুর্তজার অংশীদারিত্ত

মোহসীন সাহেবের সাথে অনেক ভেবে চিনতে আমি পার্টনারশীপ করি নাই। ব্যবসায়ীক জগতে যেহেতু আমার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না, আর ২০ বছরের অধিক কাটিয়েছি সেনানীবাসে, ফলে খুব যে মানুষ চিনতে পারি সে রকমও নয়। সবাইকেই বিশ্বাস করি, সবাইকেই আপন মনে হয়। কিন্তু মানুষগুলি আমার এই সরলতা আর বিসশাসকে পুজি করে বারবার ঠকিয়েই যায়। ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই আমার যা হারাবার তা নিঃশেষ হয়ে যায়। রিভার সাইডের ব্যবসাটাও প্রায় এমনই মনে হলো। ডিপিএস, সঞ্চয়, অন্যদের কাছে লোন নিতে নিতে আমি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলাম। অন্যদিকে মোহসীন সাহেব যে খুব একটা সিরিয়াসভাবে ব্যবসাটা করছেন, তা মনে হলো না। একটা সময় এলো আমি বুঝতে পারলাম, মোহসীন সাহেবকে দিয়ে আমার এই গার্মেন্টস ব্যবসা হবে না। এরমধ্যে প্রায় কোটি টাকার উপর ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়েছি। ছোট ভাই (মোস্থাক ভাই) এর কাছে একাই লোন নিয়েছিলাম প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, ব্যবসাটা আর করবো না। এর থেকে বেরিয়ে যাওয়াই উত্তম।

ক্লায়েন্ট খুজতে থাকলাম যদি অন্য কারো কাছে রিভার সাইড হস্তান্তর করে অন্তত যেটুকু লোন আছে সেটুকু দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়, বিশেষ করে ব্যাংকের লোন। শ্রীলংকান অধিবাসি প্রিয়ান্থা আর তার বাংলাদেশী বন্ধু মুর্তজা ভাই আমাদের ফ্যাক্টরী ২ কোটি টাকার বিনিময়ে ১০০% কিনে নিতে আগ্রহী হলেও পরবর্তীতে এলাকার সিচুয়েসন এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তারা অন্তত ১০% শেয়ারের বিনিময়ে হলেও আমাকে রাখতে চান। প্রাথমিকভাবে আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু বের হয়ে যাচ্ছি, তাহলে আর থাকা কেনো? আমি অন্য অনেকগুলি সেক্টরে ব্যবসার লাইন খুজলেও টাকা পয়সার টানাটানিতে আসলে কোনোটাতেই প্রবেশ করতে পারছিলাম না। খুব রাগ হচ্ছিলো নিজের কাছে। ডেভেলোপারের কাজে হাত দিলাম। কুমা নামে একটা কোম্পানিও ফর্ম করলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, মুর্তজা ভাই আর প্রিয়ান্থা আসলে আমাকে পার্টনার হিসাবে নন, একটা নিরাপত্তার চাদর হিসাবে ব্যবহার করে তাদের ব্যবসাটা নির্বিঘ্নে চালাতে চাচ্ছিলেন। যার কেউ নাই, যার হাতে কিছু নাই, তার কোনো চয়েজ থাকে না। ভাবলাম, এই ১০% নিয়েও যদি আমি মাসিক একটা সেলারী পাই, আর একটা অফিস পাই, তাতেই বা কম কিসের? শেষ অবধি সিদ্ধান্তটা মেনে নিয়েছিলাম। কখনো আসি, কখনো আসি না। আসলে আমার আসা যাওয়া নিয়েও তাদেরও কোনো মাথা ব্যথা ছিলো না। তাদের শুধু একটাই চাওয়া ছিলো, আর সেটা লোকাল কোনো ঝামেলা না থাকা যেটা আমি পারি।

খুব চুপচাপ একটা লাইফ লিড করছি, পরিবারের কাউকেই বুঝতে দেই না আমি কোন অবস্থায় আছি। আমি শুধু এইটুকু নিশ্চিত করতে চাই যে, ওরা যেনো ভালো থাকে। মীরপুরে বাড়িটা সম্পন্ন হওয়াতে একটু স্বস্তি পাচ্ছিলাম যে, অন্তত বাড়ি ভাড়া লাগবে না। মিটুলের চাকুরী আছে, হয়তো না খেয়ে তো আর মরবো না। তদুপরি, ১০% শেয়ার নিয়ে হলেও তো আছি একটা ব্যবসায়, মন্দ কি? মুর্তজা ভাই, আর প্রিয়ান্থা যেনো এক বোটায় দুটি ফুল, একে অপরের উপর খুবই ডিপেন্ডেন্ট। কিন্তু আমার সাথে চলমান একটা সম্পর্ক রাখেন। আমিও তাদের ব্যবসায়িক কোনো কাজে নাক গলাই না। দরকারও মনে করি না। আমি জানি কি ভুমিকা নিয়ে আমি এই রিভার সাইডে আছি। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, তারাও আমাকে ছাড় দেন নাই। যতটুকু ব্যবসায়ীক ফায়দা লুটার বা দরকার পুরুটাই তারা আমার কাছ থেকে করে নিয়েছেন। তাতে আমার কত লস হলো বা কি কারনে আমি এমন একটা ফ্যাক্টরী দিয়ে দিলাম, সেটা তাদের কাছে বিবেচ্য ছিলো না বা থাকার কথাও না। ফ্যাক্টরীর অডিট, কাষ্টম ক্লিয়ারেন্স, অন্যান্য দেনা পাওনা, সবই তারা আমাকে ঐ ১০% এর শেয়ারের মুল্যের উপর আর কিছুটা আমার উপর লোন লিকঝে কাজগুলি সমাধা করে নিয়েছেন। কিছু বলার অবশ্য আমার ছিলো না।

মোহসীন সাহেবকে আমি বিনা পয়সায় শেয়ার দিলেও যখন শেয়ারটা ফেরত চাইলাম, দেখলাম, কেউ নিজের সার্থের উর্ধে নয়। তিনিও আমাকে এক প্রকার জিম্মির মতো করে ফেলেছিলেন শেয়ার ফেরত না দেয়ার কথা বলে। খুব কঠিন একটা পরিস্থিতিতে ছিলাম। কিন্তু যেভাবেই হোক, আমি শেষ পর্যন্ত ছলে বলে কৌশলে মোহসীন সাহেবের কাছ থেকে শেয়ারগুলি লিখিয়ে নিতে পেরেছিলাম।

১০/০৮/২০০৬-ভারতে ব্যবসায়ীক ভ্রমন

                                        

গত ২৮শে জুলাই দ্বিতীয় বারের জন্য ভারত যাচ্ছি। প্রথমবার গিয়েছিলাম ষ্টাফ কলেজ থেকে জাতীয় প্রোটোকলে ডিপ্লোমেটিক ভিসা নিয়ে। কিন্তু এবার যাচ্ছি বেসামরিক হয়ে এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে। আগেরবার ভিসা নিয়ে কোনো সমস্যা হয় নাই। কিন্তু এবার ইন্ডিয়ান ভিসা পেতে বেশ জটিলতায় পড়েছিলাম, খোদ ইন্ডিয়ান হাই কমিশনারের সাথে আমাকে ইনটারভিউ দিতে হয়েছিল। বিনা সিক্রী হাই কমিশনার হিসাবে আছেন বাংলাদেশে। ভিসা ইস্যু করার আগে আমাকে এম্বেসী অফিস থেকে জানানো হলো যে, আপনার ভিসা পেতে হাই কমিশনার এর সাথে ইন্টারভিউ দিতে হবে। ব্যাপারটা সাভাবিক না। তারিখ দেয়া হলো, আমি সময় মতো পৌঁছে গেলাম এম্বেসী অফিসে। কিন্তু উনি সরাসরি আমার ইন্টারভিউ নিতে পারেন নাই কারন যেদিন আমার তারিখ পড়েছিলো, সেদিন তিনি কোনো এক জরুরী কাজে হটাত অফিসের বাইরে ছিলেন। ফলে হাই কমিশনের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেব আমার ইন্টারভিউটা নিলেন। বেশ মজার একটা সাব্জেক্ট নিয়ে তার সাথে আলাপ হয়েছিলো।

বাংলাদেশে এখন গার্মেন্টস সেক্টরে বেশ আন্দোলন চলছে। শ্রমিকরা অযথাই ফ্যাক্টরীগুলিতে আন্দোলন করছে কিছু খুচরা কারন নিয়ে। যেমন, তাদের বেতন বাড়াতে হবে, কারো কারো দাবী, ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দিতে হবে, আবার কারো কারো সরাসরি দাবী যে, পিস রেট এর কাজ আগে থেকেই তাদের বলে দিতে হবে, যদি পছন্দ হয়, করবে আর যদি পছন্দ না হয়, করবে না। এই রকম আরো অনেক অযুক্তিক দাবীও তারা করছিলো। ধারনা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ এই সেক্টরে বেশ ভালো করায় পার্শবর্তী দেশগুলি বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে একটা গন্ডোগোল পাকানোর চেষ্টা করছে। এর আরেকটা প্রধান কারন আছে। সেটা হলো, বাংলাদেশ সব বায়ারদের জন্য জিএসপি (Generalized System of Preferences) ইস্যু করে। এই জিএসপিটা আসলে কি? যার জন্য বায়াররাও এদেশে কাজ করতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

জি এস পি টা একটু ব্যাখ্যা করিঃ

যারা রপ্তানীমুখী শিল্প চালান, তারা যে র মেটেরিয়াল বাইরে থেকে আমদানী করেন, সেটার উপর সরকার কোনো ট্যাক্স নেন না যদি সেই রপ্তানী শিল্প পুনরায় উক্ত র মেটেরিয়াল দিয়ে বানানো মাল আবারো রপ্তানী করেন বাইরের কোনো দেশে। তাতে রপ্তানী কৃত মালটির সর্বশেষ মুল্য বেশ কম থাকে। এই সুবিধা বিশেষ করে পান, যারা এদেশ থেকে মাল কিনেন তারা। একটা উদাহ রন দেই, ধরুন, আমি সুতা আনবো বাইরে থেকে। সুতা এনে আবার শার্ট বানিয়ে সেই শার্ট বাইরেই রপ্তানী করবো। তাহলে এই সুতার উপর কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না, আবার শার্ট রপ্তানিতেও আমাকে কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না। এর ফলে যারা বায়ার, তাদের তৈরী মুল্য কম হয়। ভারতে এই সুবিধাটা নাই। ফলে ট্যাক্স যখন যখন যোগ হয়, যে শার্ট টা আমি ১০০ টাকায় বায়ারকে দিতে পারবো, সেটা ইন্ডিয়া ট্যাক্সের কারনে হয়তো গিয়ে দাঁড়াবে ১২০ টাকা। এই যে ২০ টাকা বেশি দিতে হলো বায়ারকে, সে এটা বিক্রি করে লাভ করতে হলে কমপক্ষে ১২০ টাকার বেশী মুল্য ধরতে হবে যখন ইন্ডিয়া থেকে শার্টতা সে নেবে। কিন্তু এদেশ থেকে নিলে তাকে কম্পক্ষেব ১০০ টাকার মুল্য এর বেশী হলেই তার লাভ হবে। এ কারনে বহু দেশ জি এস পির সুবিধার কারনে আমাদের দেশকেই পছন্দ করে অর্ডার দিতে। আবার যে কেউ জি এস পি চালু করতে পারেন না। যে দেশে র মেটেরিয়াল আছে, অর্থাৎ লোকালী পাওয়া যায়, তারা জি এস পির প্রবর্তন করতে পারে না। ফলে ইন্ডিয়া ইচ্ছে করলেও জি এস পি সুবিধা দিতে পারে না। তাই যদি এই জি এস পি এর নীতি পরিবর্তন করা যায় বা বাংলাদেশ থেকে জি এস পি তুলে দেয়া যায়, তাতে অন্যান্য দেশ একই কাতারে চলে এলে বাংলাদেশ চলমান প্রতিযোগীতায় টিকে না থাক্রই কথা। হয়তো এতাই কারন হতে পারে যে, একটা আন রেষ্ট চালিয়ে এই খাতকে সমুলে ধংশ করে দেয়া যাতে বায়াররা আর এদেশে এই ঝুকির কারনে অর্ডার না প্লেস করেন।   

যাই হোক, আমি ইন্ডিয়ান এম্বেসিকে এসব ব্যাপারে খুব একতা বিশ্লেষনে গেলাম না। খালি ভাসা ভাসা কিছু হাই হ্যালোর মধ্যেই থেকে গেলাম। অবশেষে আমার ভিসা হয়ে গেলো।

এখানে একটা ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয় যে, কি কারনে আমি ইন্ডিয়ায় যাচ্ছি। আমি গার্মেন্টস করছি বিধায় আমাকে মিঃ মুরাদ নামের এক ভদ্রলোক ফ্যাক্টরীতে এসে দেখা করলেন। তাকে আমি আগে থেকে চিনি না। কিন্তু আমার পার্টনার মিঃ মোহসীন শাহিন তাকে চিনেন। আমার অফিসে তিনি এসে বললেন যে, ওয়ার্লড ব্যাংক থেকে বিনা সুদে বেশ একটা লোন পাওয়া যায়, যা আমার মতো একজন ব্যবসায়ী অনায়াসেই গ্রহন করতে পারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেনো ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আমাকে এই সুযোগটা দেবে? উত্তরে তিনি বললেন যে, ইন্ডিয়ার উড়িষ্যার যিনি কংগ্রেস (আই) এর মহাসচীব, তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিনিধি (তিনি একজন অবসর প্রাপ্ত কর্নেল)। তিনি মুজিব সরকারের সময়ে শেখ মুজিবের একজন খুব কাছের মানুষের একান্ত পরিচিত। এই পরিচিত মানুষটি কখনো কোনো সুবিধা নেন নাই কিন্তু তিনি এখন আর্থিক দিক দিয়ে খুব ভালো অবস্থানে নাই। তাকে উক্ত কংগ্রেস নেতা সাহাজ্য করতে চান। আমি বললাম, কিভাবে? তিনি বললেন, যে, যদি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক লোন পাশ করে, তাহলে এর একটা অংশ উনি নিবেন, আর বাকী অংশ আমাদেরকে ৮ বছরের কিস্তিতে শোধ করে দিলেই হবে। কোনো ইন্টারেষ্ট হবে না। বস্তুত ব্যাপারটা এই দাড়ায় যে, এই ৮ বছরে যে ইন্টারেষ্ট হবে তার তুলনায় মুজিব সরকারের সময়ের এই গুরুত্তপুর্ন ব্যক্তির (নামটা বলা ঠিক হবে কিনা জানি না, তবু বলি, তার নাম মুসা সাহেব) নিয়ে যাওয়া টাকাও অনেক অনেক কম। তা ছাড়া বেশ বড় অংকের টাকা আমরা লোন নিতে পারবো যার কোনো ইন্টারেষ্টই নাই। হিসাব করে দেখলাম, লাভ আছে। তাই ওখানে বিস্তারীত আলাপ হবে।

আসলে আমি বিস্তারীত অনেক কিছুই জানি না এই লোনটা কিভাবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আমাকে দিতে চায়। একটু রহস্য তো লাগছেই। আবার মজাও লাগছে। দেখি ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়। অন্তত ইন্ডিয়া তো বেড়ানো হলো, লোন হোক বা না হোক। আমি আর মুরাদ বাসে করে ইন্ডিয়ার জন্য রওয়ানা হয়ে গেলাম। মুরাদ বাংলাদেশে কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং এর উপর ছোট খাটো একটা ল্যাব চালায়। এ কয়দিনে মুরাদের সাথে আমার ঘন ঘন দেখা হওয়াতে অনেক বেশী ফ্রি হয়ে গিয়েছিলাম।

আমরা বেনাপোল বিডিআর ক্যাম্পে গিয়ে প্রথমে যখন থামলাম, তখন বেলা প্রায় ১১ টা। ওখান থেকেই আমাদের বর্ডার ক্রস করতে হবে। আমার বন্ধু মেজর মাহফুজ তখন বেনাপোল বিডিআর এর দায়িত্তে নিয়োজিত। আগেই ফোন করে রেখেছিলাম। আমি ওখানে যাওয়ার পর দেখলাম যে, বন্ধু মাহফুজ বেশ ভালো খাবার দাবারের আয়োজন করে রেখেছে কিন্তু ওর বিশেষ তাড়া থাকায় ক্যাম্পে থাকতে পারেনি। আমি বিডিআর ক্যাম্পে উঠে একটু ফ্রেস হয়ে নিলাম। সৈনিক সাত্তার এসে বল্লো যে, স্যার আপনাদের পাসপোর্টগুলি দেন, আমি ইমিগ্রেশন করিয়ে নিয়ে আসি, আর এরমধ্যে আপ্নারা একটু চা নাস্তা খেয়ে রেষ্ট করেন। প্রচুর লোকের ভীড়। আমার ধারনা ছিলো না যে, কত মানুষ বেনাপোল দিয়ে এভাবে ইন্ডিয়ায় যায়। প্রায় ঘন্টাখানেকের মধ্যে আমাদের ইমিগ্রেসন হয়ে গেলো। লাগেজ তেমন ছিলো না। তাই আমরা অনায়াসেই বর্ডার পার হয়ে ওপাড়ে চলে এলাম, অর্থাৎ ইন্ডিয়া।  আমরা শ্যামলী বাসে চড়েছিলাম। বাংলাদেশের থেকে যে বাসটি বেনাপোল পর্যন্ত ঢাকা থেকে গিয়েছিল, সেটা বেনাপোলে গিয়েই শেষ। ইমিগ্রেশনের পরে ইন্ডিয়ার পার্টে আবার নতুন শ্যামলী বাসে উঠতে হয়। ইমিগ্রশনের ঠিক পরেই যে জায়গায়টায় আমরা বাসে উঠলাম, তার নাম আসলে বিস্তরভাবে বললে পেট্রোপোল হিসাবে ধরা যায়। বাংলাদেশের এপাড়ের সাথে ওপাড়ের মানুষের বৈশিষ্ঠের কোনো তফাত নাই। যদি কেউ না বলে দেয় যে, এই পার্টটা ইন্ডিয়া আর ওই পার্টটা  বাংলাদেশ, কারো বুঝার সাধ্যি নাই। মানুষের যেনো হুরাহুড়ি, কে কার আগে বাসে উঠবে। তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখলাম। মনে মনে ভাবলাম, সবার জন্য কিন্তু সিট রিজার্ভ করা আছে, তারপরেও কেনো যে মানুষগুলি এ রকম তাড়াহুরা করে বাসে উঠছে আমার বোধগম্য হচ্ছিলো না। এরমধ্যে চায়ের হকার, পানের হকার, সিগারেটের হকার, কেউ কেউ আবার ঘাড় টিপাবেন কিনা, কান খোচাবেন কিনা এই জাতীয় হরেক হরেক পদের সার্ভিসদাতার কোনো অভাব নাই। মুরাদ বল্লো, স্যার, পকেট সাবধান। এখানে যতো না ভালো মানুষের দেখা পাবেন, তার মধ্যে অর্ধেক পাবেন চোর।

আমরা বাসে চলছি, আর মাঝে মাঝে কোন জায়গা ক্রস করছি সেটা পড়ছি। বেনাপোল থেকে কলিকাতা পর্যন্ত যে সব প্রমিনেন্ট জায়গার নাম মনে আছে তার মধ্যে হল- সুবাসনগর, গোলকনগর, মন্দালপাড়া, বকচড়া, গাইঘাটা, ধর্মপুর, হাবরা, বামনগাছি, দমদমের কিছু অংশ এবং শেষে কলিকাতা। পথিমধ্যে আমাদের বাস ধর্মপুরে আধা ঘন্টার জন্য একটা হল্ট দিয়েছিলো। কলিকাতা যখন পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় তিনটা বাজে। কি যে এক অবস্থা। পুরাই গুলিস্থান। মানুষের ভীড় আর দোকানপাটের এমন হযবরল, কোনো তফাত নাই আমাদের ঢাকা শহরের গুলিস্থান আর কলিকাতার মধ্যে। আমরা একটা হোটেলে উঠলাম। হোটেলে উঠে আমি আমার ব্যাগ একটা টেবিলে রেখে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হবো বিধায় লুংগি পড়ে বাথরুমে ঢোকলাম। মুরাদ রুমেই ছিলো। আমি বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে যখন বের হলাম, মুরাদের এক কথায় আমি হচকচিয়ে গেলাম।

মুরাদ বল্লো, আখতার স্যার, আমার মোবাইলটা পাচ্ছি না। আমি আমার মোবাইল চেক করতে গিয়ে দেখি, আমার মোবাইলটাও খুজে পেলাম না। কি তাজ্জব ব্যাপার!! বললাম, রুমে কি কেউ এসেছিলো?

মুরাদ বল্লো, হ্যা, একটা ক্লিনার বয় এসেছিলো।

সাথে সাথে ম্যানেজারকে জানালাম, কিন্তু ম্যানেজার আমাদের এমন কথা বললেন যে, আমরা একটা সহি পবিত্র হোটেলে উঠেছি, এখান থেকে কখনো কোনো কিছুই হারানোর রেকর্ড নাকি নাই। এর মানে হল আমরা অন্য কোথাও মোবাইল হারিয়ে এসেছি অথবা আমাদের কাছে কোনোকালেই কোনো মোবাইল ছিলো না। কিছুই বলার নাই। আমার সাধের ফোল্ডেড নকিয়া মোবাইল্টা হারিয়ে এখন সে অন্য কারো বাসর করছে। দুক্ষটা এখন অন্যটা। আমার সব কন্ট্যাক্ট নাম্বার গুলি হারিয়ে ফেললাম।

মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। কলিকাতায় আমাদের থাকা হবে না। আমরা আসলে যাবো, উড়িষ্যায়। তাই এক রাত থাকা হবে এই কলিকাতায়। আবার যাওয়ার সময় আমরা উড়িষ্যা থেকে পুনরায় কলিকাতায় আসতে হবে ঢাকার বাস ধরার জন্য। তখন আরেক রাত থাকা হবে।

আমি আর মুরাদ সন্ধ্যায় বের হলাম। একটা মোবাইল কিনতে হবে, সাথে ইন্ডিয়ার সিম। মুরাদ বহু বছর ইন্ডিয়ায় ছিলো, বাংগালুরে ওর শিক্ষা জীবন কাটিয়েছে। ফলে ও বেশ ভালো হিন্দি বলতে পারে এবং তার ইন্ডিয়া মানুষদের ব্যাপারে একটা ভালো ধারনাও আছে। শুধু তাইই নয়, ও ইন্ডিয়ার কোন শহর থেকে কোন শহরে কিভাবে কখন যেতে হয়, এ ব্যাপারে বেশ ভালো আইডিয়া আছে বলে আমি মুটামুটি আরামেই ছিলাম। মুরাদ জানালো যে, আগামীকাল সকাল ৮ টায় আমরা কলিকাতা থেকে ট্রেনে উড়িষ্যায় যাবো। ট্রেন স্টেসন এখান থেকে বেশি দুরেও নয়। সকালে সাতটায় বের হলেই নগদে টিকেট কেটে আমরা উড়িষ্যায় পৌছতে পারবো। কলিকাতা থেকে উড়িষ্যায় যেতে ট্রেনে প্রায় ৬/৭ ঘন্টা সময় লাগতে পারে। মানে আমরা হয়তো দুপুরের পরে গিয়ে হাজির হবো।

আমরা দুজনেই একেবারে সস্তায় দুটু মোবাইল কিনলাম। সাথে দুটু সিম। রাতে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ালাম। সম্ভবত কোনো পর্ব হচ্ছে এখানে। রাস্তাঘাট বেশ আলোকিত। রাতে ঢোষা আর সবজি খেয়ে ডিনার শেষ করলাম। যেহেতু ইন্ডিয়া, তারা হালাল হারাম বুঝে না, তাই সাধারনত আমি এসব দেশে কোনো মাংশ খেতে নারাজ। মাছ, ডিম, ডাল আর সব্জি দিয়েই আমি চালিয়ে নেই। এগুলিতে হারাম হালালের কোনো বালাই নাই। রাত ১০টার দিকে রুমে এসে ঢাকায় বাসায় কল করলাম, তারপর ঘুমিয়ে গেলাম।

পরেরদিন বেশ সকালেই ঘুম ভেংগে গিয়েছিলো। হাতমুখ ধুয়ে নামাজ পড়লাম। মুরাদ নামাজ পড়ে না সম্ভবত। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ধর্ম যার যার। ঈশ্বরের কাছে জবাব্দিহিতা যার যার তার তার। একটা জিনিষ খেয়াল করলাম যে, যদিও ইন্ডিয়ানরা মুসল্মানদেরকে পছন্দ করে না, কিন্তু ব্যবসার খাতিরে কিছু কিছু নর্ম মানতেই হয়। আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সেটা কোনো স্টারওয়ালা হোটেল না। তারপরেও দেখলাম, ছাদের এক কোনায় কোন দিকে কিবলা, সেটা মার্ক করা আছে। এরমানে হলো, এখানে বহু মুসলমান ব্যক্তিরা হয়তো আসে, আর তারা বারবার কিবলার দিক জানতে চায় বলে হোটেলওয়ালারা ব্যবসার সার্থে কিবলার দিকটা একটা এরো মার্ক দিয়ে ইন্ডিকেট করে রেখেছে। সাথে একটা জায়নামাজও রেখে দিয়েছে। অনুভুতিটা ভালো লাগলো।

আমি আর মুরাদ উড়িষ্যায় যাওয়ার জন্য সকালেই বের হয়ে গেলাম। ট্রেন স্টেসনে গিয়ে নাস্তা করলাম। এখানকার ট্রেন ষ্টেশনগুলি বাংলাদেশের ট্রেন ষ্টেসন গুলি থেকে অনেক পরিষ্কার এবং প্লাটফর্মটাও অনেক প্রশস্থ। তাছাড়া সকাল বেলা হওয়াতে হয়তো ক্লিনাররা পরিষ্কার করে গেছে, তাই আরো পরিষ্কার লাগছে। লোকজনের সমাগম খুব বেশী না। আমরা দ্রুতই টিকেট পেয়ে গেলাম। ট্রেন ছাড়বে সকাল সোয়া আটটায়। হাতে তখনো প্রায় ২০ মিনিট বাকী। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসেও নাই।

ঠিক সময়ে ট্রেন চলে এলো। আমরা ট্রেনে উঠে গেলাম। এবার লম্বা একটা জার্নি। উড়িষ্যায় আমি কখনো যাই নাই। ফলে ট্রেন জার্নিতে আমি যতোটুকু মজা করা যায়, সেটা উপভোগ করছিলাম। মানুষের হাবভাব দেখছিলাম, হকার এসব ট্রেনেও উঠে। চায়ের কেটলী নিয়ে চা ওয়ালাও উঠে। বাংলাদেশের ট্রেনগুলির মতোই। তবে একটা জিনিষ যে, এদের ট্রেনের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আমাদের দেশের ট্রেনের চেয়ে একটু ভালো। আমরা যখন উড়িষ্যায় পৌঁছলাম, তখন বেলা প্রায় ৩টা বাজে। ভুবনেশ্বর ট্রেন স্টেসনে নামতে হয় উড়িষ্যায় যেতে হলে। কলকাতা থেকে কেশবপুর- কসবা- নারায়নগড়-বালাসুর-ধর্মশালা-কুরুমিতা-ভুবনেশ্বর। একনাগাড়ে ছুটে চলল ট্রেন। মাঝে মাঝে কিছু কিছু বড় বড় ষ্টেসনে ট্রেন থামলো বটে কিন্তু খুব বেশী নেয় না। টাইম মেইন্টেইন করে বুঝা যায়। ভুবনেশ্বর থেকে মুরাদ একটা ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া করলো, কিভাবে কিভাবে কি বলল হিন্দিতে আমি সবটা বুঝতে না পারলেও বুঝলাম যে, আরো প্রায় ৩০/৪০ মিনিট লাগবে। ক্যাবওয়ালা আমাদেরকে ইনিয়ে বিনিয়ে হরেক রকম রাস্তা দিয়ে শেষতক সেই কর্নেল সাহেবের বাসায় নিয়ে হাজির।

বেশ বিশাল বাড়ি। এটা সরকারী বাড়ি, কংগ্রেসের উড়িষ্যার মহাসচীবের বাসা বলে কথা। আমরা যখন তার বাসায় পৌঁছলাম, তখন প্রায় ৪টা বাজে। মাঝে কোথাও খাওয়া হয় নাই। ভীষন ক্ষুধা লেগেছিলো। আমাদের আসার কথা দুপুরের মধ্যে। কিন্তু আমাদের কোনো গাফিলতি ছিলো না, তারপরেও প্রায় ঘন্টাদুয়েক দেরী হয়ে গেছে। কর্নেল বাসায়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমরা তার বাসার ড্রইংরুমে অপেক্ষায় আছি, তার সাথে দেখা হবে। প্রায় ২০ মিনিট পর কর্নেল আসলেন। এর মধ্যে কর্নেলের ওয়েটার আমাদেরকে একজগ পানি আর দুটু গ্লাস দিয়ে গেছেন। ইন্ডিয়ানদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ওরা বেশীর ভাগ মানুষ কিপটা। এক কাপ চা পাঠাবেন, সেই খরচটাও তারা ব্যয় মনে করেন। কিন্তু পানি তো পানিই। অসুবিধা নাই।

কর্নেল এলেন। তার সাথে প্রাথমিকভাবে আর্মি নিয়েই কথা হলো। তিনি আর্টিলারীর অফিসার, আমার মতো। অবসরের পর তিনি রাজনীতি বেছে নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি কংগ্রেস (আই) এর উড়িষ্যার মহাসচীব। অনেক বড় পোষ্ট এবং মর্যাদা। কিন্তু তার এই পোষ্টের মর্যাদা আমার কাছে একেবারেই ছোটলোক মনে হলো কারন আমরা সেই সুদুর বাংলাদেশ থেকে এসেছি তার সাথে দেখা করার জন্য, তাও আবার তারই দাওয়াতে। অথচ এককাপ চা অফার করার মতো সৌজন্যতাবোধ দেখতে পেলাম না। অবশেষে তার ওয়েটার গুনেগুনে ৪টা বিস্কুট নিয়ে এলেন। খুব হাসি পেলো। হায় রে আমার কর্নেল ভাই। যাই হোক, মেজাজ একটু খারাপ হচ্ছিল, আবার একটু অপমানবোধ করছিলাম।

কথায় আসি, বলে বললাম, স্যার, আমাদেরকে আপনি এখানে কিছু একটা ব্যাপার নিয়ে আলাপের জন্য দাওয়াত করেছিলেন। আমরা কি সে ব্যাপারে বিস্তারীত কথা বলতে পারি? উনি প্রথমে আমাকে বাংলাদেশে সিমেন্টের ব্যবসা করলে কি রকম লাভ হতে পারে, আমার কোনো সিমেন্ট ব্যবসায়ীর সাথে পরিচয় আছে কিনা ইত্যাদি নিয়েই প্রথমে আলাপ শুরু করলেন। আসল কথা ছেড়ে উনি আমাকে যা নিয়ে আলাপ করা শুরু করলেন, আমি তার আগা মাথা কিছুই বুঝতেছিলাম না। আমি বাংলায় মুরাদকে বললাম, মুরাদ, কি ব্যাপার নিয়ে আসলে আমরা এখানে এসেছি, উনি কি এটা জানে?

মুরাদ বল্লো, স্যার জানে তো। নিশ্চয়ই তিনি এ ব্যাপারে আলাপ তুলবেন। শেষ পর্যন্ত তুল্লেন। আলাপের সার্মর্মটা বলি-

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে তারা আমাকে ৭ মিলিয়ন ডলার লোন নিয়ে দিতে পারবেন। এটা একটা প্রনোদনা ফান্ড। যেহেতু তিনি উড়িষ্যার কংগ্রেস (আই ) এর মহাসচীব, ফলে তার পদমর্যাদায় তিনি ওয়ার্ল্ড ব্যংকের সাথে একটা ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং এ আছেন। তার কিছু প্রভাব রয়েছে। এই ৭ মিলিয়ন ডলার যদি আমরা নেওয়ার জন্য এপ্লাই করি, তাহলে এটা তিনি পাশ করিয়ে দিতে পারবেন। ইন্ডিয়ায় কেনো করছেন না তিনি এ প্রশ্নে জানালেন যে, এটা ইন্ডিয়ার কোনো ব্যবসায়ীর জন্য প্রযোজ্য হবে না, দিতে হবে ইন্ডিয়ার বাইরে যে কোনো মুসলিম দেশে। এই ফান্ডটা বেসিক্যালি কোনো আরব কান্ট্রি করছে এবং শর্ত হচ্ছে এটা কোনো মুস্লিম কান্ট্রিকে দিতে হবে। তো খুব ভালো কথা। আমি দুটু বিষয়ে কোয়ালিফাই করি। প্রথমত আমি ব্যবসায়ী এবং দ্বিতীয়ত আমি মুসলমান কান্ট্রি রিপ্রেযেন্টেটিভ করি। কথার দ্বিতীয় ভাগে উনি আমাকে মোটামুটি চমকে দিলেন। বললেন যে, এই ৭ মিলিয়ন ডলার যদি আমাকে তিনি পাইয়ে দেন, তাহলে ডলার পাওয়ার পর ২ মিলিয়ন ডলার উনি কেটে রাখবেন। আর বাকি ৫ মিলিয়ন ডলার আমি ইচ্ছে করলে মেরে দিতে পারবো। সে ব্যবস্থাও উনি করে দেবেন। এর মানে হলো নির্ঘাত চুরি। আমি এতোক্ষন খুব মনোযোগ সহকারে ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করছিলাম। উনি বললেন যে, এই যে ৫ মিলিয়ন ডলার আমি মেরে দেবো, এটা পুরাটাই আমার নয়। এর থেকে ২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে মুসা সাহেবকে যার থেকে মুরাদও কিছু পাবে আর বাকি ৩ মিলিয়ন আমার একার। আমি কর্নেল সাহেবকে একটা সিগারেট অফার করলাম। যে কোন দেশের যে কোন আর্মির এই একটা গুন আছে, জুনিয়র সিনিয়রের সামনেও সিগারেট ফুকতে পারে যদিও অনেক সময় সিনিয়রার সিগারেট খায় না। কিন্তু এই কর্নেল সাহেব সিগারেট খান, ফলে আমরা দুজনেই সিগারেট ফুকতে শুরু করলাম।

আমি বললাম, স্যার, আপনার অফারটা বেশ লোভনীয়। যে কেউ এটা লুফে নেওয়ায়র কথা। কিন্তু সম্ভবত আমি এই অফারটা নিতে পারবো না। আমি কোনো ডলার চুরীর মধ্যে নাই। আমি ভেবেছিলাম, এটা লোন, ব্যবসা করবো, লাভ করে আমি লোন ফেরত দেবো। কিন্তু এখন যা দেখছি যে, এটা আমার সেই স্বপ্নের পুর্বাভাষ যে, পানিটা পরিষ্কার কিন্তু এটা শোধন করা হয়েছে পায়খানার কোনো জলের ভান্ডার থেকে। আমি এভাবে কোনো ফায়দা চাই না। আপনি অন্য কোনো পার্টনার দেখতে পারেন। কর্নেল খুব মর্মাহত হলেন। বললেন, তিনি যদি এই অফার অন্য যে কোন মুসলিম কান্ট্রিতে যে কোনো ব্যবসায়ীকে অফার করতেন, নিঃসন্দেহে এটা তারা গ্রহন করতেন। আমার মতো তারা এভাবে প্রত্যাখান করতো না। আর যদি প্রত্যাখান করতোও তাহলে কিছুটা সময় নিতো ভাবার জন্য। আমি বললাম, আমি অন্য ১০ জনের মতো নই স্যার। এটা আমার কাছে অপরিষ্কার প্রপোজাল মনে হচ্ছে। এটা আমার কাছে হারাম মনে হচ্ছে। আমি হারাম খেতে চাই না।

আর বেশীক্ষন কথা বলার প্রয়োজন আমি মনে করিনি। প্রায় ৩০ মিনিট পর আমি আর মুরাদ বেরিয়ে গেলাম। আমি মুরাদকে বললাম, মুরাদ, আমি যদি জানতাম, ব্যাপারটা এ রকম, আমি তাহলে ঢাকা থেকেই এখানে আসতাম না। তোমার কি মন খারাপ আমার নেগেটিভ হওয়ায়? মুরাদ ভিতরে ভিতরে কি ভেবেছে জানি না, কিন্তু আমার কাছে এটা স্বীকার করলো যে, সেও এই রকম একটা প্রপোজাল সম্পর্কে জানতো না, আর জনলে মুরাদ আমাকে এখানে আনতো না।

আমাদের ক্যাব বাইরে দাড়িয়েই ছিলো। কথাশেষে আমরা পাশেই একটা হোটেলে একরাত থাকার জন্য একটা রুম বুকড করলাম। খুব শান্তি লাগছে যে, আমি একটা অপরাধ করলাম না। কার না কার টাকা, কার না কার হক, আমি এভাবে কিভাবে করবো? টাকাটাই সবচেয়ে বড় নয়। আমাকে এক সময় এসব টাকা পয়সা ছেড়েই দুনিয়া ত্যাগ করতে হবে। আমি অবৈধ কোনো কাজ করতে চাই না।

অতঃপর, উড়িষ্যায় এক রাত থাকার পর আবারো ফিরে এলাম কলিকাতায় তার পরেরদিন। এবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পালা।

এখানে কিছু কথা না বললেই নয়। দেশ বিদেশে অনেক রাগব বোয়াল আছে, যারা আসলেই কেউ আছে বলে কোনো অস্তিত্ব নাই, তারা অনেক সময় শধু একটা ছদ্ধনামেই বিচরন করে। আসলে এই মুখুশওয়ালা মুখেশ নামধারী মানুষগুলির আদৌ কোনো চরিত্রই নাই। অথচ এদের  দোউরাত্ত আছে, প্রভাব আছে। এরা দেশের ভিতরে এবং বাইরে এমনকি বহির্দেশেও এই মুখেশরা ততপর, এক্সটরশন, স্মাগ্লিং সবই চলে এই মুখেশদের নামে। এই কথাটা রক্ত দিয়ে লিখে দিলেও কিছু যায় আসে না। মুখেশ একটা ধোকা দেওয়ার নাম। মনগড়া একটা চরিত্র। মুখেশ একটা মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই না। মাঝে মাঝে ক্ষেত্র বিশেষে এই মুখেশরা চরিত্র খোজে। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি হচ্ছি সেই খুজে পাওয়া বা বানানো আরেক কোনো মুখুশওয়ালা চরিত্র। যা কাজের শেষে আমার নিজের কোনো অস্তিত্তই রবে না। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন জবাব্দিহিতার দরকার হয়। কিভাবে কখন জল মাথার উপর উঠে যায়, কেউ জানে না। হোক সেটা নিজের কাছে, হোক সেতা সমাজের কাছে কিংবা ঈশ্বর। ওই সময় কথা বা সত্য প্রকাশের নিমিত্তে উগলে নেওয়ার সময় হয়ে উঠে। হতে পারে আমি হয়তো একটা বলীর পাঠা। যখন কেউ বলির পাঠা হয়, তখন সে হয়ে উঠে বিষাক্ত খাবার। আর সেই খাবার যতো দামিই হোক, তা ফেলেই দিতে হয়। যদি তা গোড়া থেকে উপড়ে  ফেলে না দেওয়া যায়, তখন তার মুল্য শুধু বিপদের আশংকাই বাড়িয়ে দেয়। সব সময় বাজীতে জিতবেন, এটা কিন্তু ঠিক না। এখানে আরো একটা কথা থেকে যায়, কর্নেল সাহেব একটিভ রাজনীতিতে জড়িত। রাজনীতিতে কোনো কিছুই সারা জীবনের জন্য হয় না। না বন্দধুত্ত না শত্রুতা। যখন প্রয়োজন হয় তখন মিডিয়া আর পলিটিশিয়ান একে অপরের বন্ধু হয়ে যায়।

আমি যতোক্ষন এই কর্নেল সাহেবের মুল প্ল্যান জানতে পারি নাই, ততোক্ষন একটা স্বপ্নের মধ্যে ছিলাম। আমার ধারনা, মুরাদ বা মুসা সাহেব পুরু ব্যাপারটাই জানতেন। কিন্তু তারা আমাকে আগবাড়িয়ে কিছু বলেন নাই। একটা তাসের খেলার মতো কৌশল নিয়েছিলেন। ফলে কিছু তাস প্রকাশ্যে এসেছিলো, আর কিছু তাস তখনো আমার কিংবা তাদের জানা ছিলো না। ফলে এই খেলায় প্রত্যেকেই ভাবছিলো, হয়তো খেলাটার তুড়ুকের তাস তাদের কাছেই আছে। কিন্তু ধীরে ধীরে হলেও একেকটা তাস ভুল প্রমানীত হলো। তারপর হটাত করে সব তাস চারিদিকে প্রকাশ্য হয়ে চোখের সামনে চলে এল। ব্যাপারটা আর সাফল্যের মুখ দেখলো না। তাতে তাৎক্ষনিক কষ্ট পেলেন এই কর্নেল সাহেব। তার মধ্যে অনেক কিছুর অভাব ছিলো। রাজনীতিতে যদি মানবিকতা আর সচ্ছতা থাকতো তাহলে কেহই এই রাজনীতি করতে আসতো না। তিনি কোনো অবস্থাতেই আমার নজরে একজন ভালো, মানবিক এবং সচ্ছলোক ছিলেন না। কোনো কোনো সময় কিছু কিছু নাটক এমনভাবে বানানো হয় যাতে সাধারনের চোখে মনে হবে এটাই সব সত্যি কিন্তু এর পিছনের মুল উদ্দেশ্য অনেক গভীরে। শুধু ভরসার স্থান তৈরির জন্যই নাটক তৈরী করা হয়। আর এখানেও তাই ঘটেছিলো।

যাই হোক, হয়তো ঈশ্বর আমাকে দিয়ে এমন কোনো কাজ করাতে চান নাই, যা তিনি চান না।   

০৫/০৭/২০০৫-ইকবালের সাথে আলোচনা

আমি যখন প্রায় সব কিছু ফাইনালাইজ এর পথে, তখন একদিন আমার দোস্ত মাসুদ ইকবালের সাথে রিভার সাইড নিয়ে বিস্তারীত আলাপ আলোচনার জন্য ওর অফিসে গেলাম। আমি ওকে প্রথমে বললাম, যে, মাসুদ রিভার সাইডের নাম শুনেছে কিনা। রিভার সাইডের নাম শুনেই ইকবাল বলে দিলো যে, ওটা একটা খুব খারাপ ফ্যাক্টরী এবং ওটা না নেওয়াই উত্তম। ইকবাল এমনো বল্লো যে, নাজিম সাহেব যদি ইকবালকে রিভার সাইড সুয়েটার্স বিনে টাকাতেও দিতে চায়, তারপরেও ইকবাল এটার ব্যাপারে উতসাহী নয়। জিজ্ঞেস করলাম, এর কারন কি? উত্তরে ইকবাল বল্লো যে, এই ফ্যাক্টরীতে সাবকন্ট্রাক্ট কাজ দিলে ওরা সুতাও বিক্রি করে দেয়। মাল তো দেয়ই না, বরং লায়াবিলিটিজে পড়তে হয়। আমি ইকবালকে বললাম, আরে, এটা তো বর্তমান ম্যানেজমেন্টের সমস্যা। আমরা যদি চালাই, তাহলে আমরা তো আর সুতা বিক্রি করে দেওয়ার কোনো কারন নাই। এরপরেও ইকবাল এটার ব্যাপারে কোনো উতসাহ দেখালো না। একটু খারাপ লাগলো। বললাম, এমনো তো হতে পারে যে, আমরা ভালো করবো। যেহেতু ইকবাল অনেকদিন যাবত গার্মেন্টস লাইনে আছে, ওর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা এই ফ্যাক্টরী দাড় করাতে পারবো বলে আমার ধারনা। কিন্তু ইকবাল তাঁর সিদ্ধান্তে একেবারেই অনড়।

একটু খারাপ লাগলো ইকবালের কথায় কিন্তু আমি দমে যাই নাই। বাসায় এলাম। তারপর আমি কয়েকজন অফিসারের সাথে একে একে কথা বললাম। তাঁর মধ্যে একজন ফেরদৌস স্যার, তারপরে কথা বললাম কেএম সাফিউদ্দিন স্যারের সাথে। আর বেশ রাতে কথা বললাম ফারুক স্যারের সাথে। সবাই এখনো পজিটিভ মুডেই আছেন বলে মনে হলো। ওইদিন মোহসীন সাহেবের সাথে মিটিং করার পর আমি সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে একটু খোজ খবর নিতে গিয়েছিলাম তউহিদকে নিয়ে। ওখানে গিয়ে জানলাম যে, ব্যাংক রিসিডিউলিং করতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার দরকার। রিসিডিউলিং মানে হচ্ছে রিভার সাইডের লোনটাকে আবার রেগুলারাইজেশন করা। এখন কিস্তি না দেয়ার কারনে এটা একটা খারাপ লোনে পরিনত হয়েছে। খারাপ লোন হলে সেসব কারখানায় ব্যাংক সাপোর্ট পাওয়া যায় না, আবার কোনো এলসিও খোলা যায় না। কাজও করা যায় না।

এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি একটা আইডিয়া করলাম যে, আমাকে এই মুহুর্তে প্রায় লাখ ৫০ টাকার মতো নিয়ে মাঠে নামতে হবে। কিন্তু দূর্ভাগ্য হচ্ছে যে, আমার কিন্তু এতো টাকা নাই। আমি হয়তো পেন্সনের টাকা পেলে সর্বোচ্চ লাখ ২০ টাকা ইনভেস্টমেন্ট করতে পারবো। কিন্তু বাকীটা? ফলে আমি ধরে নিলাম, যদি ফেরদৌস স্যার, সাফি স্যার আর ফারুক স্যার জয়েন করেন, আমরা সবাই যদি ২০ লাখ করে টাকা ইনভেস্ট করি, তাতে টাকার সমস্যাটা আর থাকে না। আমি এই তথ্যটা উক্ত তিন অফিসারকে জানালাম। এবং আমাদের পরিকল্পনা হলো যে, আগামি বন্ধের দিন সবাই ফ্যাক্টরী দেখতে যাবো। তাঁর আগে কারো যদি কোনো অভিজ্ঞ গার্মেন্টস মালিক কিংবা কর্তার কাছে পরামর্শ নিতে হয়, আমরা নেবো।

খুব ভালো লাগছে এটা ভেবে যে, আমার সপ্নটা বাস্তবায়ন হচ্ছে ইনশাল্লাহ।

২২/১২/২০০৪-জাবেরের সাথে বৈঠক

আমি রীতিমত হন্যে হয়ে একটা ব্যবসার কথা চিন্তা করছি। রিভার সাইড সুয়েটার্স যদি শেষ পর্যন্ত না নেয়া হয়, সেক্ষেত্রে আমি আরো কিছু বিকল্প চিন্তা করছিলাম। এই চিন্তা থেকে আমার কোর্সমেট জাবেরের সাথে ফোনে কথা বলি। কারন জাবের নিজেও একটা ফ্যাক্টরী চালায়, নাম "ফা এপারেলস", সাভার। জাবের আমার ব্যবসার চিন্তাভাবনা শুনে বল্লো যে, আমি ওর সাথেও ফা এপারেলসে পার্টনারশীপ করতে পারি যদি চাই। ওখানে ইতিমধ্যে আমার আরেক কোর্সমেট মেজর বশীর আছে, আর তাছারা আরো বেশ অনেক গুলি কোর্সমেট ইতিমধ্যে বেশ কিছু বাজেট ইনভেষ্টমেন্ট করেছে। তাঁর মধ্যে আছে মেজর সালাম, মেজর জসীম, মেজর নওরোজ, আরো অনেকে। অনেকেই নাকি প্রায় প্রত্যেকেই কমপক্ষে ১০ লাখ করে টাকা ইনভেষ্ট করেছে। কেউ কেউ বেশীও করেছে। ফলে আমি যদি চাই, তাহলে আমিও ওখানে ওদের মতো ইনভেষ্ট করতে পারি। জাবের রাতে আমার বাসায় এলো। সাথে বশীর। মীরপুরের বাসায় আমরা সবাই প্রায় ঘন্টা দুয়েক আলাপ করলাম। কিন্তু আলাপের মধ্যে আমি কিছুটা বিভ্রমের গন্ধ পাচ্ছিলাম।

                                

বিভ্রমটা তাহলে কি? আমাকে জাবের আর বশীর প্রোপোজাল দিলো যে, লাভে টাকা খাটাইতে। যদি লাভ হয় তাহলে পার্সেন্টেজ অনুযায়ী আমাকে লাভ দেয়া হবে। আমি তখন জাবেরকে বললাম যে, যদি লাভ না হয় এবং লস হয় তখন কি হবে? জাবের আমাকে বল্লো যে, লসের ভাগিদার ওরা, কিন্তু লাভের ভাগিদার থাকবো আমরা। আর এভাবেই নাকি অন্যান্য কোর্সমেটরা টাকা খাটিয়েছে। ব্যাপারটা আমার কাছে বিশেষ সুবিধার মনে হলো না। আমি জাবেরকে বললাম, আমার ইনভেষ্টমেন্টের সমান পরিমান শেয়ার দিতে আপত্তি কি? কিন্তু সেটা তারা রাজী নয়। আমি ব্যবসা বুঝি না কিন্তু হালাল হারাম বুঝি। আমার কাছে মনে হলো, জিনিষটা হালাল নয় যে, শুধু লাভ নেবো, লস নেবো না। আবার আমি এক অর্থে পার্টনার কিন্তু আবার শেয়ার হোলডার না। কনফিউজিং একটা স্টেট।

আমি জাবেরকে রিভার সাইড সুয়েটার