31/04/2020-রহস্য। 

রহস্য। 

এমন একটা নাম, যে নিজেই সবার কাছে এক রহস্য। এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রানীর নিজস্ব একটা রহস্য থাকে। সে সেই রহস্য বুকে নিয়েই আজীবন প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সাথে উম্মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ায় যেনো আমরা যা দেখছি সেটাই সব, কিন্তু তার ভিতরে, অন্তরে, মনে বা মগজে হয়তো কিছু না কিছু রহস্যঘেরা জাল রয়েই যায়। এই রহস্যের কোনো কুল কিনারা নাই, না আছে সরল অভিব্যক্তি। এই রহস্য কখনো সত্যতায়, কখনো মিথ্যায় আবার কখনো দুঃখের ভারাক্রান্ত পিপায় কানায় কানায় ভরে থাকে। এটা খুব সহজ নয়, আছে কিনা বাস্তবে তাও সঠিক বুঝা যায় না কিন্তু নাই এটা বলা যাবে না। কোনো ভিক্ষুক আজীবন ভিক্ষে করে খেলেও দেখা যাবে সে আসলে কখনোই ভিক্ষুক ছিলো না, তার কাছে যা ছিলো তা দিয়ে হয়তো আর পাঁচ দশটা মধ্য ক্লাসের পরিবারকে আজীবন লালন করা যায়, অথচ রহস্য হচ্ছে সেই ভিক্ষুক সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে জরাজীর্ন কাপড় পড়ে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করাই ওর নেশা। এই রহস্য বুঝা মুষ্কিল। আবার দেখা যায়, সদাহাস্য যে মানুষটি আমার আর আপনার সামনে কখনো মন খারাপ করতে দেখা যায় না, হয়তো যখন সে নিতান্তই একা থাকে, অথবা গভীর রাতে যখন তার ঘুম ভাংগে, তখন হয়তো কোনো এক একাকীত্তের বেদনায় তার দুই চোখ জলে ভরে থাকে অথচ দিনের আলোয় তার ঠোটে সব সময়ই থাকে একটা মনকারা হাসি। কি সেই গোপন রহস্য?  অরু, শারমিন, মাধুরীর পরিচয়টা আমি ইতিমধ্যে দিয়েছি। কিন্তু এরা কি আসলেই কেউ ছিলো? সবার জীবনেই এমন কেউ থাকে যারা কোথাও না কোথাও অরু, বা শারমিন, মাধুরী, বা ঘষেটি বেগম অথবা মনিকা, বা পারু হয়ে বাচে। এরা মেরুদন্ডসম্পন্ন শক্তিহীন প্রানীর মতো ঠিকই কিন্তু যদি প্রয়োজনিয় পুষ্ঠির জোগান দেয়া যায়, মায়াবী ব্যবহাত্রে মমতায় গড়ে তোলা যায়, তারা লিকলিক করে বড় সুফলা গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারে কিন্তু বেশীর ভাগ সময়েই এরা থেকে যায় অপ্রকাশ্যে। রাস্তাঘাটে চলার সময়ে আমি এদের দিকে তাকাই, ভাবি আর আমার কল্পনায় ওরা জীবিত হয়ে উঠে এই ডায়েরীতে। অথচ আমি এদের কাউকেই চিনি না। তবে বড্ড মায়া হয় এদের জন্য। আমিও তো হতে পারতাম ওদের মতো কেঊ? 

এইসব ছিন্নমূল মানুষ গুলির জীবনের গল্প আলাদা। এদের কান্নায় ভরে থাকে ভালোবাসা, এদের ভালোবাসায় ভরে থাকে বেদনার মতো অনেক কাহিনী। এটা তো ঠিক যে, কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট যে কষ্টের কোনো নাম নাই, যে কষ্টের রুপ কাউকে দেখানো যায় না। এরা এমনই কিছু মানুষ "অন্য দুনিয়া"য় একাই থাকে। আমাদের মানুষের সবচেয়ে বড় অক্ষমতা হচ্ছে-আমরা ভিতরেরটা দেখি কম, কিন্তু সত্যিটা সব সময় মানুষের ভিতরেই থাকে।  এইসব ছিন্নমূল মানুষেরও শৈশব কাল ছিলো, যৌবন ছিলো, হয়তো সেইসব শৈশব কিংবা যৌবন আমাদের অনেকের থেকেই আলাদা। সময়ের সাথে সাথে যে কোনো ডকুমেন্ট পালটে দেয়া যায়, যে কোন ডকুমেন্ট নকল করা যায় হুবহু আসলের মতো কিন্তু কেউ কি কখনো তার অতীতের সেই শৈশব, যৌবন পালটে দিতে পেরেছে? কিন্তু এইসব ছিন্নমুল মানুষগুলির সেটাও পালটে যায়, তাদের মুখাবয়বও পালটে যায়। বাচার জন্য পালটে ফেলতে হয় তাদের সব। তাই এসব "অন্য দুনিয়ার" মানুষগুলির বাহ্যিক চেহারা আমরা দেখতে পাই বটে কিন্তু এদের ভিতরের কষ্টটা আমরা না দেখতে পাই, না বুঝতে পারি। বাচার তাগিদে এরা নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়েও কাজ করে। তারা তাদের জীবনের পাহাড় অতিক্রম করার জন্য আপ্রান চেষ্টায় সারাটি জীবন একাই যুদ্ধ করতে করতে এক সময় হয় অকুল সাগরে ভেসে যায় অথবা হয়তো কোনো কিনারে এসে থেমে যায়। তারপরেও মানবিক গুনাবলীর অংশ হিসাবে এরাও প্রেম করে, এরাও ভালো একটা জীবন পাওয়ার আশায় ঘর বাধার সপ্ন দেখে। কিন্তু বেশীরভাগ সময়েই যখন প্রেম নামক এই দুধটুকু পুড়ে শেষ হয়ে যায়, তখন মনে হয় ঘোড়া এসেছিলো, ঘোড়া জলও খেয়েছিলো, কিন্তু কেউ কোনোদিন ঐ ঘোড়াকে বাস্তবে দেখে না।

এ জগতে সবচেয়ে বড় রহস্য বিধাতা নিজে, আর সেই রহস্যময়ী বিধাতা মানুষের জন্য আরো কিছু রহস্য তৈরী করে জাল বুনে রাখেন। তারমধ্যে অন্যতম "সময়", "সম্পর্ক", "মন", "অন্তর", "মায়া", "ভালোবাসা", আর "চোখের জলের" সাথে "ঠোটের হাসি"। রাগ, গোস্যা, ঘেন্না কিংবা হানাহানি কোনো রহস্য নয়। কেনো নয়? এই রহস্যের কোনো ব্যাখ্যা নাই।  

২/১২/২০২১-পায়ের নীচে পাথরহীন

জীবনের কাছে রাখা সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর যখন কারো জীবনের নাশ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেই উত্তরের শেষ পরিনতি সম্পর্কে উত্তারদাতার অনেক ভেবেচিন্তে দেয়া উচিত। আমার জীবনেও এমন একটা সময় এসেছিলো। আমার সব প্রশ্নের উত্তর হয়তোবা কারো জীবনের নাশ হবার সম্ভাবনাই ছিলো, ফলে উত্তরদাতা হিসাবে আমি কোনো উত্তরই দেওয়ার চেষ্টা করিনি। চুপ হয়ে থাকাই যেনো মনে হয়েছিলো-সর্বোত্তম উত্তর। আমি সেই “চুপ থাকা” উত্তরেই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে এমন পরিবেশটাই তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলাম যেনো “কিছুই না ব্যাপারটা”। কিন্তু “ব্যাপারটা” যতো না সত্য ছিলো তার থেকেও বেশী ছিলো “চাপ” আর এই “চাপ” তৈরী করার পিছনে যারা কাজ করেছিলো তারা আর কেহই নয়, আমার দ্বারা পালিত সেই সব মানুষগুলি যাদেরকে আমি ভেবেছিলাম, তারা আমার সব “ওয়েল উইশার্স”। কিন্তু আমার আরো কিছু মানুষ ছিলো যারা আমার জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে এমন করে জড়িয়েছিলো যারা আমার হাড় আর মাংশের মতো। আলাদা করা দুরুহ। সেই হাড় আর মাংশের মতো একত্রে মিলিত মানুষগুলি একটা সময়ে সেইসব তথাকথিত “ওয়েল উইশার্স”দের চক্রান্তে তাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে বিগড়ে গিয়েছিলো যে, তাদের “সন্দেহ” টাই যেনো এক সময় তাদের অবচেতন মনে “বিশ্বাসে” পরিনত হয়। আর এই মিথ্যা “বিশ্বাসে” তাদের চারিপাশের শান্ত বাতাসগুলিও যেনো প্রচন্ড ঝড়ের চেহাড়া নিয়ে একটা কাল বৈশাখীতে রুপ নিয়েছিলো। কেউ বুঝতেই চাইতেছিলো না যে, এর শেষ পরিনতি বড়ই ভয়ংকর।

তবে আমি জানতাম সত্যিটা কি। কিন্তু ওইসব পরিস্থিতিতে আমার সব সত্য জানাটাই সঠিক এটা কাউকে যেমন বিসশাস করানো যায় নাই, তেমনি আমিও তাদেরকে বিশ্বাস করাতে চাইওনি। শুধু অপেক্ষা করেছিলাম-কখন ঝড় থামবে, কখন আকাশ পরিষ্কার হবে, আর দিবালোকের মতো সত্যটা বেরিয়ে আসবে। “সময়” পার হয়েছে, ধীরে ধীরে মেঘ কেটে গেছে, আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। গুছিয়েও ফেলেছি সেইসব ক্ষত বিক্ষত আচড়গুলি। কিন্তু আমি এই অযাচিত ঘটনায় একটা জিনিষ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম যে, মনুষ্য জীবনে আসলে কেউ কারোই নয়। আমরা বাস করি শুধু আমাদের জন্য। একা থাকা যায় না, তাই সমাজ, একা থাকা যায় না, তাই পরিবার। একা অনেক অনিরাপদ, তাই সংসার। কিন্তু এই সমাজ, এই সংসার কিংবা এই পরিবার কোনো না কোন সময় ছাড়তেই হয়, আর সেটা একাই। এই মিথ্যে সমাজ, পরিবার আর সংসারের নামে আমরা যা করি তা নিছক একটা নাটক। জংগলে বাস করলে একদিন সেই জংগল ছাড়তেও কষ্ট হয়। এরমানে এই নয়, আমি জংগলকেই ভালোবাসি। কথায় বলে-ভালোবাসা পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর অনুভুতি, আর এটা যদি বেচে থাকে তাহলে হিংসা, বিদ্বেষ থেকে মানুষ হয়তো মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যারা এই সমাজ নামে, পরিবার নামে, কিংবা সংসার নামে চিহ্নিত করে ভালোবাসার জাল বুনে থাকি সেটা আসলে কোনো ভালোবাসাই নয়। সেখানে থাকে প্রতিনিয়ত নিজের সার্থের সাথে অন্যের লড়াই। অন্যঅর্থে সেটা একটা পাগলামী, লালসা কিংবা একা বাচতে চাওয়ার অনিরাপদের একটা অধ্যায় মাত্র। অথচ আমরা প্রত্যেক মুহুর্তে আমাদের এই নিজের পরিবারকে নিরাপদে রাখার জন্য অনেক অপবাদ, অনেক ভয়ংকর বাধা আর মৃত্যুর মতো রিস্ককে বরন করে থাকি। এ সবই আসলে নিজের সার্থে।

যাই হোক যেটা বলছিলাম, আমার সেই ফেলে আসা অভিজ্ঞতার আলোকে আমি ধীরে ধীরে সে সব “ওয়েল উইশার্স” দেরকে নিজের বেষ্টনী থেকে দূরে রাখার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছি। আমি একটা মুহুর্তেও সেই সব দিনের ক্ষত বিক্ষত হবার বেদনার কথা ভুলি নাই। যখনই সেই ব্যথার কথা মনে হয়েছে- আমি বারবার আরো শক্ত হয়েছি। আমি জানি কন এক সময় আবারো তাদের আমার প্রয়োজন হবে, আবারো তারা আমাকে আকড়ে ধরার চেষতা করবে, আবারো তারা তাদের মিথ্যা চোখের পানি ফেলে আমাকে আবেশিত করার চেষ্টা করবে। আমি ততোবার নিজেকে বারন করেছি-আর যেনো সেই একই ফাদে পা না বাড়াই। তাহলে সেটা হবে আমার জীবনের জন্য কালো আধ্যায়।

ওরাও হয়তো ভেবেছিলো- কোনো প্রয়োজন নাই আর আমাকে। আমি কোন দুঃখ পাইনি। শুধু ভেবেছি, খুব ভালো যে, তারাই গুটিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু এই প্রিথিবীর সবচেয়ে বড় বিপত্তি এই যে, বড় বট বৃক্ষের প্রয়োজন কখনো কোনোদিন কোনো কালেই ফুরিয়ে যায় না। হোক সেটা হাজার বছরের পুরানো কোনো বৃক্ষ।

আজ সেই দিনটা এসেছে। অথচ আজ আমার সব দরজা এমন করে খিল দিয়ে আটকানো যে, না আমি খুলতে চাই, না খোলার প্রয়োজন মনে করি। পৃথিবীতে নিমক হারামের চেয়ে বড় পাপ অথবা বড় বিশ্বাসঘাতকরা আর নাই। যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কেউ আকাশ দেখে, সেই পাথকে যত্ন করে রাখতে হয়। যদি অযত্নে সেই পাথর কোথাও হারিয়ে যায় বা ব্যবহারের আর উপযোগি না হয়, তাহলে আকাশ যতো সুন্দরই হোক না কেনো, তাকে দেখার ভাগ্য আর হয় না। যদি কেউ আজিবন আকাসের জ্যোৎস্না, আকাসের তারা আর নীল আকাশের মধ্যে তারার মেলা দেখার ভাবনা থাকে, তাহলে সেই পাথকে অতোতাই যত্ন করা দরকার যতোটা মনে হবে তার মনের শখের দরকার। তা না হলে চোখের জলে বুক ভাসবে ঠিক কিন্তু কেউ তার নিজের পাথর দিয়ে তার আকাশ দেখা বন্ধ করে অন্যকে পাথর দিয়ে সাহাজ্য করে না। এতাই নিয়ম।

আজ তারা সেই পাথরটাকে হারিয়ে ফেলেছে বন্ধ দরজার অন্ধকার ঘরে। যেখানে না যায় দরজা খোলা, না যায় পাথরে পা রাখা। তোমাদের জন্য নতুন আরেক অধ্যায় শুরু। এবার এই দুনিয়াটাকে বড্ড অসহায় মনে হবে তোমাদের। তোমাদের প্রতিন মনে হবে- তোমরা কোথায় কি পরিমান ক্ষতি নিজেদের করেছো যার সমাধান কখনোই তোমাদের হাতে ছিলো না। তোমরা ভেবেছিলে- তোমাদের জন্য মায়ের চেয়ে মাসির দরদ সম্ভবত অনেক বেশী। কিন্তু এই দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত মায়ের চেয়ে মাসির দরদ কখনোই বেশী ছিল বলে এটা কেউ যেমন প্রমান করতে পারে নাই, আর এতা সত্যও নয়। যদি সেটাই তোমরা মনে করে থাকো- তাহলে আজ তোমাদের সেই মাসির কাছেই তোমাদের সমস্ত কিছু আবদার, চাহিদা, কিংবা সাহাজ্য চাওয়া উচিত যাকে তোমরা বিনাবাক্যে মনে করেছো, লিডার অফ দি রিং। দেখো, সেই লিডার অফ দি রিং তোমাদের জন্য কোনো সাহাজ্য পাঠায় কিনা। আমার দরজা তোমাদের জন্য আর কখনোই খোলা হবে না। আমি শুধু দেখতে চাই, আসলেই তোমরা কাকে চেয়েছিলে? কার উপরে তোমাদের এতো নির্ভরশীলতা ছিলো আর কার গলায় পা রেখে শ্বাস রোধ করেছিলে। আমি তো সেদিনই মরে গেছি যেদিন তোমরা আমাকে আমার অজান্তে পিছন

রুস্তমের চিঠি

আমার ড্রাইভার ছিলো রুস্তম। একবার রুস্তম আমারে বল্লো যে, ওর কাছে যদি ৩ লাখ টাকা থাকে তাহলে ওর জীবন নাকি সে বদলিয়ে ফেলবে। খুব ভালো কথা। বললাম, ৩ লাখ টাকা যদি পাস, তাহলে কি করবি? রুস্তম বল্লো যে, সে ২টা পুরানো সিএনজি কিনবে। একটা নিজে চালাবে আরেকটা ভাড়ায় চালাবে। তাতে প্রতিদিন সে পাবে ১২০০ টাকা। তারমানে মাসে ৩৬ হাজার টাকা। ওর খরচ লাগে মাসে ১৬ হাজার টাকা। তারমানে মাসে সে ২০ হাজার সেভ হবে। বছরে সেভ হবে আড়াই লাখ টাকা। সেই আড়াই লাখ টাকা দিয়া সে আরেকটা পুরানো সিএনজি কিনবে। এভাবে ২/৩ বছর পর সে গাড়ি কিনবে। যদি গাড়ি কিনে, তাহলে ওর প্রতিদিন লাভ হবে ২ হাজার টাকা। এভাবে সে হিসাব করে দেখলো যে, ৫ বছর পর তার হাতে আসবে প্রায় ২০ লাখ টাকা, ৩ টা সিএনজি আর একটা গাড়ি। হিসাবটা একদম ঠিকঠাক ছিলো। কিন্তু শুধু একটা জায়গায় হিসাবটা শুরু করা যাচ্ছিলো না। প্রাথমিক ৩ লাখ টাকা সে পাবে কোথায়?

রুস্তম আমার অনেক দিনের ড্রাইভার। প্রায় ৭ বছর। এই বছর গুলিতে আমি এমনো হয়েছে যে, ব্যবসার জন্য কোটি কোটি টাকাও ওকে দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠিয়েছি। ফ্যাক্টরীর সেলারী আনার সময় কিংবা সাব কন্ট্রাক্ট ফ্যাক্টরীতে ইমারজেন্সী ভাবে টাকা অয়াঠানোর জন্য। কোনোদিন রুস্তমের মধ্যে কোনো গড়বড় দেখি নাই। কিন্তু একদিন-সে আমার ব্যাগ থেকে ৩ লাখ টাকা চুরি করে পালালো।

চুরি করার পর এক মাস পালিয়ে পালিয়ে থাকলো। অনেক খুজাখুজি করেছি, ওর গ্রামের বাড়ি, ওর বর্তমান শশুর বাড়ি, কিংবা ওর প্রাক্তন শশুড় বাড়িতেও। কিন্তু রুস্তমের কোনো হদিস পাওয়া যায় নাই। অগত্যা মনের রাগ মিটানোর জন্য ওর নামে একটা চুরির মামলাও করেছিলাম। কোথাও না পেয়ে আমি ওকে খোজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম এই কারনে যে, রুস্তম যদি ঐ ৩ লাখ টাকা কাজে লাগিয়ে কিছু করতে পারে, তাহলে করুক। ব্যাপারটা নিয়ে আমি আর কোনো আক্ষেপ বা রাগ রাখতে চাই নাই। 

 অতঃপর প্রায় ৫ মাস পরে একদিন আমি একটা বিশাল চিঠি পেলাম। ২২ পাতার চিঠি। চিঠিটা আমি পড়তে চাইনি কিন্তু চিঠিটার প্রথম লাইনেই যে কথাটা লিখা ছিলো, তার জন্যই আমি পুরু চিঠিটা পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। আর সে লাইনটা ছিলো- “যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন”।

 যেদিন আমি চিঠিটা পাই, তার প্রায় ৪ দিন আগে রুস্তম তারের কাটা গলায় ফাসি দিয়ে আত্তহত্যা করেছিলো। আমার প্রায়ই ওর কথা মনে পড়ে। আমি ভাবি যে, যদি রুস্তম সাহস করে আবার আমার কাছে আসতো, আমি ওকে আবার রাখতাম আমার ড্রাইভার হিসাবে। আমি ওরে ক্ষমা করে দিছি। আমিও ওকে ভালোবাসতাম। কিন্তু আমার ভালোবাসা ওকে ঠেকাতে পারে নাই। এটা আমার ব্যর্থ তা নাকি ওর ভীরুতা আজো আমি বুঝতে পারি নাই। কিন্তু এটা ওরও ব্যর্থতা।

 রুস্তম মাঝে মাঝে খুব ভালো কবিতা লিখতো। আর ড্রাইভিং করার সময় আমাকে মুখস্ত ওর লেখা কবিতা শুনাতো। আমি অবাক হতাম, রুস্তম খুব ভালো কবিতা লিখে। প্রথম প্রথম ভাবতাম, সম্ভবত রুস্তম কারো কবিতা চুরি করে, কিন্তু পরে বুঝেছি- রুস্তম আসলেই লিখে।

 রুস্তমের লেখা ২২ পাতার চিঠির কিছু চুম্বক অংশ আমি তুলে ধরি।

 জীবনে সেসব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলে সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যারা আমাদের সুখের জীবনের জন্য নিসসার্থভাবে তাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলতে গিয়ে কিংবা তাহাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে কিংবা কোনো লোভে পড়ে নিজের অজান্তে ভুল করে ফেলে, হয়তো সেটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে সেটা হবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। যারা আমাকে ভালোবেসে, স্নেহ করে অথবা আমাদের দরিদ্র মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের পাশে এমনভাবে দাঁড়ান যা হয়তো তাদের দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়ান। তাহাদের সাথে এরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ আমাদের সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হয়ে দারায় যা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করে দেন, তারপরেও বিশ্বাসের যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন তাদের প্রতিনিয়ত মনে হবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি আমাদের পাশ থেকে নিঃশব্দে সরে যায়, তাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। এই সময় যা হয়, তা হচ্ছে, হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তাহার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুসচিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর নিজেকে ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে নিজে ঘৃণা করতে কেউ শুরু করে, তখন তার আর বেচে থাকার কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের কোনো মানুষকেই আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকে যায়। অথবা সে এমন পথ বেছে নেয়, যা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুতসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোন সময়ে তাদের সুযোগ এসেছিলো কিন্তু তারা না বুঝবার কারনে সে সুন্দর জীবন হাতছাড়া করেছে। পাপ কাজ করে কেউ কখনো বড় হতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাদের হয়তো টাকার পাহাড় থাকতে পারে কিন্তু তাদের জন্য সমাজ দুঃখবোধও করে না। তারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বেচে থাকে।

স্যার, আমি এই মুহুর্তে ঠিক সে রকম একটা কাল পার করছি। টাকাগুলি আমার কোনো কাজে লাগে নাই। মদ খেতে খেতে কখন বেহুস ছিলাম বুঝি নাই, যখন হুস হয়েছে, দেখলাম সবগুলি টাকা আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। কে নিয়েছে, কখন নিয়েছে সেই জ্ঞানটুকুও আমার ছিলো না। আমি আপনার থেকে এখন অনেক দূরে। পরিচিতজন মানুষের আশেপাশেও আমি নাই। ড্রাইভিং চাকুরী করতে পারতাম, কিন্তু করতে সাহস করি নাই। কখন আবার আমি আপনার সামনে পড়ে যাই, তাই। প্রতিটা ক্ষন আমি পালিয়ে পালিয়ে থেকেছি। কখনো ক্ষুধা পেটে কোনো এক পরিত্যাক্ত বিল্ডিং এর মশাদের সাথে, কখনো কোনো গাজার আসরে, কখনো একেবারে একা কোনো এক নদীর ধারে সময় কাটিয়েছি। এমন কোনো একটা মুহুর্ত আমার যায়নি, যখন আপনার কথা আমার মনে পড়ে নাই। বারবার ভেবেছি- কি দরকার ছিলো এমনটা করার? যখন যা চেয়েছি, আপনার কাছ থেকে আমি পাইনি এমন ছিলো না। তারপরেও আমার এমনটা করার কোনো দরকার ছিলো না।

চিঠিটা পড়তে পড়তে আমারো খুব খারাপ লাগছিলো। অনেক বড় চিঠি। সব কিছু এখানে হয়তো লিখা সম্ভব নয়। ১৯ পাতার কিছু অংশে এসে আমি একদম নিসচুপ হয়ে গেলাম। রুস্তম লিখেছে-

স্যার, এ কয়দিন বারবার শুধু একটা কথাই আমার মনে হয়েছে। যখন আপনি গাড়িতে উঠতেন, প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন, আমি খেয়েছি কিনা। আজ অবধি কেউ আমাকে এ কথাটা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই। আজ প্রায় ৩ দিনের উপরে পার হয়ে গেছে, আমি একটি দানাও খাই নাই। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোসলের কনো জায়গা নাই, এলোমেলো মাথার চুল, নোংরা আমার জামা। আমার সাথে রাস্তার পাগলের মধ্যে কোনো তফাত নাই। যখন আপনাকে বাসায় নামিয়ে দিতাম, বলতেন- বাসায় গিয়ে রেষ্ট করো, সকালে নাস্তা খেয়ে চলে এসো। আজ আমাকে কেউ বলে না- সকালে চলে এসো। অথচ মনের ভিতরে অদম্য ইচ্ছা, যদি আবার আপনার কাছে চলে আসতে পারতাম? কোথাও আমার কেউ নাই। সম্ভবত আপ্নিই ছিলেন আমার সবচেয়ে কাছের একজন মানুষ যাকে আমি ভালোবাসতাম, আবদার করতাম, জিদ করতাম কিন্তু খুব পছন্দও করতাম। আপনার মেয়েরাও আমাকে খুব সম্মান করতো। কখনো ওরা আমাকে ড্রাইভার হিসাবে দেখে নাই। কি লক্ষী মেয়েগুলি। আংগকেল ছাড়া কখনো ডাকতো না। আজ কেনো জানি মনে হচ্ছে- ইশ, যদি আবার ফিরে আসতে পারতাম!! কিন্তু আমার মনের সাহস নাই, শরীরে বল নাই, আর আপনার সামনে দাড়াবার আমার কোনো জায়গাও নাই। এ কয়দিন মাথায় শুধু একটা জিনিষ ঘুরপাক খাচ্ছে- কি লাভ এ জীবন রেখে? কিন্তু মরার জন্যেও কিছু উপকরন লাগে। ফাসি দিতে হলে দড়ি লাগে, বিষ পান করে মরতে হলে বিষ কিনতে হয়, কিন্তু আমার কাছে বিষ কেনার ও পয়সা নাই। আর সাতার জানা মানুষ নদীতে ঝাপ দিলেও মরে না।

আমি রুস্তমের চিঠিটা পড়ছি, আর খুব ভয় পাচ্ছিলাম। রুস্তম তার চিঠির ২১ পাতায় লিখেছে-

জীবনকে ভালোবাসবার অনেক নাম আছে। কখনো এর নাম চেলেঞ্জ, কখনো এর নাম সততা আবার কখনো এর নাম বিশ্বাস। স্যার,  সব হাসিই হাসি নয়। যেদিন আমি টাকাটা নিয়ে পালিয়েছিলাম, সেদিন আমি হেসেছিলাম আনন্দে। অথচ আজ আমি কাদতেছি কেনো আমি টাকাটা নিয়ে পালালাম। আসলে আমার এই কান্না কান্না নয়। এই কান্নার নাম হয়তো ভয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমে যায়, এক সময় দেহ দেহ মন দুটুই ভেংগে যায়। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না। খুব কষ্ট আর ব্যথা নিয়ে স্যার আমি চলে যাচ্ছি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। এর গাছ পালা, আকাশ, নদী, পাহাড় সব সুন্দর। সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন স্যার আপনি। আমি আপনাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভালোবাসবো। খুব বাচতে ইচ্ছে করছিলো স্যার কিন্তু যারা সাহসী নয়, তাদের বেচে থাকবার কোনো প্রয়োজন নাই এই পৃথিবীতে। আমি আসতে চেয়েছিলাম আবার আপনার কাছে কিন্তু সম্ভব হলো না। যদি কখনো পারেন- আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। যে তিন লাখ টাকায় আমার এতো হিসাব ছিলো, জীবন সুখের হবে, নিজের গাড়ি হবে, অনেক টাকা হবে, সেই তিন লাখ টাকাই আসলে আমার জীবন একেবারে পালটে দিলো। আপনার সাথে আমার জীবনটা তো ভালোই ছিলো। বিশ্বাস করেন স্যার, আজ ঠিক মৃত্যুর আগ মুহুর্তে দাঁড়িয়ে আমি একটা জিনিষ শিখে গেলাম, জীবনে সব মানুষের সাথে ছল চাতুড়ি করতে হয় না, এই দুনিয়ায় টাকাই সব নয়। আপনার মতো এমন একটা মানুষের পাশে শুধু থাকলেই হতো। বট বৃক্ষের মতো ছিলেন।

------------------------------------------------------------------------------------

চোখ দিয়ে কখন যে পানি পড়ছিলো, বুঝি নাই। আমিও রুস্তমকে স্নেহ করতাম, ভালোবাসতাম। কিন্তু ওকি একবার সাহস করে আবার ফিরে আসতে পারতো না? আমি ওর শেষ ঠিকানাটা জানলে হয়তো নিজেই ডেকে নিতাম। ভুল তো মানুষ করেই। কিন্তু সেটা জীবন দিয়ে মাশুল দেয়ার মতো শাস্তিতে নয়।

 

(আমি রুস্তমের চিঠিটা ছিড়ে ফেলিনি। আজ আমার সব পরিত্যাক্ত কাগজপত্র ড্রয়ার থেকে পরিষ্কার করতে গিয়ে রুস্তমের সেই ২২ পাতার চিঠিটাও পেলাম। সেটা আজ আমি ছিড়ে ফেললাম।)

 

২০/০৭/২০২১***-ভরষা

উচ্ছিষ্ঠ সময়ের রাজত্ব 

২০২১ 

২০ জুলাই 

ভরষা করা দোষের নয়। মানুষ যদি মানুষের উপর ভরষা না করে, তাহলে ধ্বংস বেশী দূরে নেই। কিন্তু কারো উপর ভরষা করার আগে সতর্ক থাকা খুবই জরুরী। ইচ্ছাকে ভালোবাসায়, আর ভালোবাসা থেকে সম্পর্ক তৈরী করার সময় এই সতর্ক থাকা ভীষনই প্রয়োজন। কিন্তু তুমি এসবের কোনো কিছুই না জেনে শুধু ইচ্ছাটাকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় তুমি সম্পরকটা করেছো যেখানে তুমি কোনো কিছুই ভাবো নাই। তুমি পরিশ্রমী, তুমি সাহসী যদি কেউ পাশে থাকে, তুমি সৎ সেটা নিজের কাছে এবং আর তোমার জীবনের হিসাব তুমি জানো। আর তোমার মনে যে সপ্ন ছিলো সেটা পুরন করার জন্যই তুমি একটা সমঝোতা করেছো নিজের সাথে নিজের। আর সেটা তুমি সততার সাথে পালনও করছো। তোমার জীবনে এই গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আসলে তোমার সামনে কেউ ছিলো না। আর থাকলেও কোনো লাভ হতো না সেটা তুমি হারে হারে জানো। কারন যারা থেকেও ছিলো, তারা আসলে কখনোই তোমাকে মুল্যায়ন করেনি, করতোও না। তুমি অথবা যার সাথে তুমি এমন একটা সম্পর্ক করেছো, তোমরা কখনোই এটাও ভুলে যেতে চাও নাই যে, এই সম্পর্কের সামাজিকভাবে আসলে কোনো স্বীকৃতিও নাই। কিন্তু তোমার চোখ বন্ধ করে ভরষা করার ফল আমি কখনোই সেটা বৃথা যেতে দিতে চাই না। কারন তুমি অন্তত তোমার সব কিছু দিয়েই আমাকে মেনে নিয়েছো। এখানে গাদ্দারী করার কোনো প্রকারের অবকাশ বা সাহস আমার ছিলোনা, নাই আর ভবিষ্যতে থাকবেও না। ভদ্রতার পিছনে আমার কোনো প্রকার মুখোস কিংবা শয়তানীও নাই। কারন আমি জানি, এই জগতে আমাকে ছাড়া তোমার আর কেউ নাই, হোক সেটা তোমার জন্মদাতা বাবা বা মা অথবা তোমার রক্তের কেউ। এই অবস্থায় আমি তোমাকে ফেলে গেলেও আমার চোখ বারবার ফিরে তাকাবে পিছনে যেখানে তুমি পড়ে আছো। আমি সেটা কখনোই করতে পারবো না। ভাবো তো একবার- আমি চলে যাচ্ছি, তুমি চেয়ে চেয়ে দেখছো আমার নিষ্ঠুরতা, আর তুমি ভাবছো, তোমার সারাটা দুনিয়া এখন অন্ধকার। তোমার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে, তুমি ভাষাহীন হয়ে যাবে, তখন তোমার চোখ শুধু কথা বলবে। আর চোখের ভাষা তো একটাই। জল। এই জল দেখার জন্যে আমি কখনো প্রস্তুত নই।

এই প্রিথিবীতে কে আছে তোমার, আর কে নাই তাদের সবার শক্তি, ভালোবাসা আর ভরষা যোগ করলেও সেই ভরষার সাথে একদিকে শুধু আমি, এটাই তোমার কাছে পৃথিবীর সর্বোত্তম শক্তি। আর তুমি এতাই প্রমান করেছো এই পারুর কেসে। সারাটা গ্রাম, আইন, থানা, টাকা পয়সা, নেতা, মাদবরী, সন্ত্রাসী, চোখ রাংগানি একদিকে আর তুমি একাই একদিকে ছিলে। আর সেই শক্তিটাই তুমি প্রতিনিয়ত পেয়েছো এই ভরষার মানুষটার কাছে। কারন তুমি জানো, আর সবাই পালিয়ে গেলেও আমি অন্তত পালাবো না।

কেনো তুমি অন্য কারো চোখে চোখ রাখতে পারো না, কেনো তোমার মনে অন্য কারো স্থান হয় না, কখনো কি এটা খুব মনোযোগ সহকারে নিজেকে প্রশ্ন করেছো? ধর্মের কথা আলাদা, আল্লাহর দোহাই আলাদা ব্যাপার। কিন্তু এর বাইরেও তো অনেক লজিক আছে। সেই লজিক দিয়েও কি কখনো ভেবেছো কেনো হয় না সেগুলি? এর উত্তর একটাই- টোটাল সারেন্ডার। মানে সম্পুর্ন আত্তসমর্পন। যখন কোনো মানুষ তার নিজের মন তৃপ্তিতে থাকে, যখন চোখ ভালো ঘুম পায়, যখন শরীরের চাহিদা পূর্ন হয়, তখন শরীর, দেহ, মন, কিংবা আত্তা কারো দিকে ছুটে যেতে চায় না। যেমন ছুটে যায় না চাঁদ পৃথিবীর বলয় থেকে, কিংবা প্রিথিবী সূর্যের বলয় থেকে। তাদের যতোটুকু শক্ত্র প্রয়োজন তাদের নিজ নিজ অক্ষে চলার, ঠিক ততোটাই তারা পায়। তাহলে আর অন্য কোনো গ্রহের কিংবা নক্ষত্রের দারস্থ হবার কি প্রয়োজন?

মানুষ তখনি ছুটে যায় এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে যখন সে তার সঠিক তরী খুজে না পায়। আর সঠিক ঘাটের সন্ধান যখন একবার কেউ পায়, তার আর অন্য ঘাটে যাওয়ার অর্থ ভুল ঘাটে চলে যাওয়া। ভুল ঘাট মানুষকে ভুল পথেই নিয়া যায়। আর কেউ যখন একবার ভুল পথে যাত্রা শুরু করে, সেখান থেকে ফিরে আসার অন্য কোনো বিকল্প রাস্তা হয়তো তার জানাই নাই। যদি সেই অচেনা রাস্তায় একবার কেউ পড়ে যায়, সেখানে প্রতিটি মানুষ তার অচেনা। অচেনা মানুষের কাছে চোখের জলের কোনো মুল্য থাকে না।

আর মুল্যহীন জীবনে সপ্ন তো দূরের কথা, বেচে থাকাই কষ্টের। কষ্টে ভরা জীবন যখন সামনে চলতে থাকে, তখন মানুষের এই জীবনের প্রতি মায়া হারিয়ে ফেলে, ভগবানের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। ঈশর আছে এটাই তখন আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। তারপরেও দূর্বল চিত্তের মানুষেরা যাদের কোনো কুল কিনারা আর থাকে না, যেমন লামিয়া বা শারমিন, তারা ওই অচেনা, অসুন্দর জীবনকেই মানিয়ে নিতে শুরু করে। সেখানে তখন আর ভগবানের কোনো অস্তিত্ত থাকে না বা তারা ভগবানকে মানেই না। ধর্ম পালন তো দুরের কথা।

তোমার দুষ্টুমি যেমন পাগলামী, আমার কাছে তোমার পাগলামীও তেমন মিষ্টি, তোমার কান্নাও আমার কাছে ঠিক ওই রকমের। তোমাকে ভালো রাখাই আমার কাজ। আর সেই ভালো থাকাটা নির্ভর করে তোমার আত্তার উপর তুমি কতোটা তৃপ্ত। এই প্রিথিবী থেকে চাঁদ যতো সুন্দর মনে হয়, নীল আকাসের সাথে চাদকে যেমন কোনো এক যুবতীর কপালের টীপ মনে হয়, অথবা অনেক দূরের কাশবন যখন সাদা মেঘের মতো হাওয়ায় দুলে দুলে মনকে দোলায়িত করে, যখন ওই চাদে গিয়ে পা রাখা যায়, কিংবা কাশবনের মাঝে হাজির হওয়া যায়, তখন তার আসল রুপ দেখে দম বন্ধ হয়ে আসে। সেই চাঁদ আর কাশবন কেনো জানি মনে হয় এটা একটা খারাপ সপ্ন ছিলো। আমরা সেখানে বসবাস করতে পারি না। আবার ছুটে আসতে চাই এই গাছ গাছালী ভর্তি নোনা সেঁতসেঁতে সোদা গন্ধের মাটিতে যেখানে বর্ষায় গাছের পাতা বেয়ে বেয়ে টিপ টিপ করে ফোটা ফোটা পানি আমাদের নাকের ডগা দিয়ে বুকের ভিতরে এসে অন্তর শীতল করে দেয়।

একটা মানুষের শান্তিতে আর সুখে বসবাসের জন্য এই পৃথিবীর অনেক কিছু লাগে না। প্রিন্সেস ডায়ানার একেকটা নেকলেসের দাম ছিলো কোটি কোটি টাকার। তার একেকটা ড্রেসের দাম ছিলো হাজার হাজার ডলার। সাথে ছিলো রাজ প্রাসাদ। কি ছিলো না তার। ছিলো সবুজ চোখের মনি, ঈশ্বর যেনো তাকে একাই রুপবতী করে পাঠিয়েছিলো। অথচ মনে তার কোনো শান্তিই ছিলো না। সেই শান্তির খোজে শেষতক রাজ প্রাসাদ ছাড়তে হয়েছে। অন্যের হাত ধরতে হয়েছে। আর মাত্র ৩২ বছর বয়সেই তাকে এই প্রিথিবী ছাড়তে হয়েছে। যদি বাড়ি, গাড়ি, জুয়েলারী, আর টাকা পয়সাই হতো সব সুখের মুল চাবিকাঠি, তাহলে ডায়নার থেকে সুখী মানুষ আর এই প্রিথিবীতে কেউ ছিলো না। কিন্তু সেটা কি আসলেই সুখী ছিলো?

একটা তরকারীতে নুন কম হতে পারে, একটা পরোটা পুড়ে যেতে পারে, তার স্বাদ কিংবা মজা হয়তো একটু হেরফের হতেই পারে কিন্তু সেটা হয়তো একদিন বা দুইদিন। কিন্তু ভালোবাসা আর মহব্বতে যখন নুনের কমতি হয়, পুড়ে যায়, তখন জীবনের মজাটাই শেষ হয়ে যায়। আর জীবনের মজা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন এসি রুমেও ভালো ঘুম হয় না। নীল আকাশ দেখেও কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে না। তখন যেটা মনে হয় তা হচ্ছে বিষাদময় রুচী। সেই রুচীতে আর যাই হোক পেট ভরে না। আর পেটে ক্ষুধা রেখে কোনোদিন কারো ভালো ঘুম হয়েছে তার কোনো প্রমান নাই।

আমি তোমার জীবনে সেই রকমের একটা অলিখিত ভরষা। এই ভরষার কোনো ডেফিনিশন নাই। এই ভরষার কোনো আইন গত দিক নাই বটে কিন্তু আমার নিজের অনেক দায়িত্তশীলতা আছে যেখানে আমিই আইনপ্রনেতা, আর আমিই সবচেয়ে বড় বিচারক। হয়তো সমাজকে আমি তুরি দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবো না, কিন্তু আমি সেটাই করততে পারি যাতে তুমি তুড়ি দিয়ে সবাইকে এটাই করতে পারো যে, তুমি নিজেও একটা শক্তি।

আজ তুমি সেই বিগত বছরগুলির দিকে তাকিয়ে দেখো? তুমি দেখতে পাবে যে, সেইসব বছরগুলিতে অনেক ঝং ধরা ছিলো। আগাছায় ভরা একটা কঠিন পথ ছিলো। কিন্তু আজ থেকে ৫ বছর পরেরদিন গুলি দেখো, সেখানে প্রতিদিন তোমার জীবন মোড় নিয়েছে। বাকেবাকে সমস্যা ছিলো কারন সমস্যা গুলি হয়তো আমার নজরে ছিলো না। কিন্তু আজ তোমার সেই বছরগুলির সাথে তুলনা করলে স্পষ্ট দেখতে পাবে, আকাশের মেঘ তোমার ঘরেই রংধনু হয়ে একটা বাগান তৈরী করেছে। সেই বাগানে তুমি যখন খুসী যেভাবে খুসী বিচরন করতে পারো। এই বাগানের একচ্ছত্র মালিকানা তোমার নিজের। এখানে একটা আম খেলেও শরীর চাংগা হয়ে উঠে, এখানে একটা ডিম খেলেও শতভাগ কাজ করে। অথচ আজ থেকে ৫ বছর আগে সেই একটি আম কিংবা একটি ডিম এমন করে খেলেও শতভাগ কাজ করতো না। কারন তখন ভরষার জায়গাটা ছিলো একেবারেই অনিশ্চিত। যা এখন পুরুটাই উলটা। আর এটাই খাটি ভরষা।

এখানে শুধু একটা ব্যাপারই চিন্তার বিষয় যে, যে মানুষটার কারনে কখনো নিজেদেরকে অসহায় মনে হয় নাই, কোনো দুশ্চিন্তা গ্রাস করে নাই, যখন সেই মানুষটা চলে যায়, তখন সেইই দিয়ে যায় যতো অসহায়ত্ব আর দুশ্চিন্তা। আর এটা আমার মাথায় সব সময় কাজ করে। এর জন্যে সমাধান একটাই- যা আমি অন্যদের বেলায় করেছি। সাবলম্বিতা। এবং দ্রুত। তোমাদের কাজ ভরষা করা আর আমার কাজ সেই ভরষার স্থানটা স্থায়ী করা।

যেদিন মনে হবে তুমি সাবলম্বি, তুমি নিজে নিজে একাই চলার ক্ষমতা রাখো, তোমার সমাজ তোমাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে দিধা বোধ করবে, সেদিন আসলে আমার দায়িত্ত প্রায় শেষ হয়েছে বলে আমি মনে করবো যেটা এখন প্রায়ই ভাবি আমার এই পক্ষের মানুষগুলির জন্য। তখন যেটা হবে- তুমি স্বাধীন পাখীর মতো এক ঢাল থেকে একাই উড়ে গিয়ে আরেক ঢালে বসতে পারবে। কিন্তু পাখীরা যখন একবার নিরাপদ গাছে বাসা বেধে ফেলে, যতোদিন ওই গাছটা থাকে, কেউ আর কেটে ফেলে না, কিংবা আচমকা কোনো ঝড়ে যখন গাছটা আর ভেংগে পড়ে না, ততোক্ষন অবধি সেই ভাষাহীন অবুঝ পাখীরাও তাদের নীড় পরিবর্তনে মনোযোগ দেয় না না। তারা সেখানে অভয়ারন্য তৈরী করে সেই জংগল সাম্রাজ্যের অধিকর্তা হিসাবেই জীবন পাড় করে দেয়।

ওই গাছটাই তখন তার ভরষা। ওই গাছ জায়গা দেয় বাসা করার, ওই গাছ ঢাল পেতে দেয় নিবিড় করে বসার। ওই পাখী চলে গেলেও গাছের না হয় কোনো ক্ষতি, না হয় তার ফলনে কোনো বিঘ্নতা। ঠিক সময়ে সেই গাছ ফুল দেয়, ফল দেয়, আর দেয় ছায়া। ঝড়ের দিনেও সে হয়তো অন্য আরো অনেক পাখীর জন্যে অভয়ারন্য স্রিষ্টি করে বটে কিন্তু সেই গাছ কোনোদিন অভিযোগ করে নাই, কেনো অন্য আর কিছু পাখী তার ঢাল ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলো। তবে যদি আবারো সে ফিরে আসে, গাছের কোনো অভিযোগ থাকে না। কিন্তু যদি কোনো ঢালই আর খালী না থাকে, সেটা তো আর গাছের দোষ নয়।

ভরষার স্থান কেউ ত্যাগ করলে গাছের কি দোষ!!

রোস্তমের টাকা চুরি

Categories

আমার ড্রাইভার ছিলো রুস্তম। খুবই ভালো একজন ড্রাইভার। বিয়ে করেছিলো কিন্তু রোস্তমের অভ্যাসের কারনে ওর বউ ওকে ছেড়ে দেয় কিন্তু ইতিমধ্যে ওদের একটা পুত্র সন্তান হয়ে যায়। ছেলেকে রেখেই রোস্তমের বউ রোস্তমকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করে বিদেশে সেটেল্ড হয় যায়। রোস্তমের দোষ ছিলো রোস্তম প্রায়ই ডিউটি শেষে ওর বন্ধু বান্ধব্দের নিয়ে মদের আড্ডায় বসতো যা ওর বউ পছন্দ করতো না। বউ চলে যাবার পর ছেলেকে নানীর বাড়িতেই রেখে রোস্তম ছেলেকে পালতে শুরু করলেও মদের নেশাটা ছাড়তে পারলো না। বরং মদটা যেনো ওকে আরো পাইয়ে বসলো। আমি জানতাম না যে, রোস্তম মদ খায়। কারন আমার ডিউটি শেষ করার পর রোস্তম কোথায় গেলো আর কি করলো সেটা নিয়ে আমি মোটেই খবর রাখতাম না। 

এভাবেই রোস্তম আমার কাছে প্রায় ৫ বছর ড্রাইভার হিসাবে কাজ করছিলো। বিস্তস্থতা আর কোয়ালিটি ড্রাইভার হিসাবে রোস্তমের উপর আমার কোনো সন্দেহ ছিলো না। মাঝে মাঝে বেতনের বাইরেও আমি ওকে টাকা দেই, যেটা রোস্তম ও জানে যে ফেরত দিতে হবে না। আমিও চাইতাম না। রোস্তমের উপর আমার বিশ্বাস এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, মাঝে মাঝে ফ্যাক্টরীর কোটি কোটি টাকাও একা ব্যাংক থেকে আনা নেয়া করাতাম। ভালোই চলছিলো। একদিন রোস্তম বল্লো যে, রোস্তম আসলে একা থাকে বলে ওর খাওয়া দাওয়ায় বেশ সমস্যা হয়, কাপড় চোপড় ধোয়াতেও সমস্যা হয়। ও বিয়ে করতে চায়। আমি ব্যাপারটাইয় সায়ই দিলাম। ওর বিয়ের একটা বাজেট হলো, প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো। আমি বললাম, যে, আমিই ওর বিয়ের পুরু খরচটা দেবো। দিয়েও দিলাম। রোস্তম বিয়ে করে ফেল্লো। আমাদের বাসার পাশেই থাকে রোস্তম, সাথে ওর নতুন বউ। এবার একটা নতুন ঝামেলার সৃষ্টি হলো। নতুন বউ ও নাকি রোস্তমের সাথে এডজাষ্ট করতে পারছে না। জিজ্ঞেস করলাম আশেপাশের মানুষ গুলিকে। যে জিনিষটা আমার কখনোই ভালো করে জানা হয় নাই সেটা আমার নজরে এলো। রোস্তম ডিউটি করে এসেই সারারাত মদের আড্ডায় থাকে। ফলে ৫/৬ মাস যেতে না যেতেই রোস্তমের সাথে এই দ্বিতীয় বউ ও তাঁকে ছেড়ে দিতে মনস্থ করলো। কিন্তু রোস্তম যে বাসায় থাকে সেটা রোস্তমের নতুন বউ এর ভাড়া করা বাসা।ফলে ওর বউ রোস্তমকে বাসা থেকে বের করেই ছাড়লো। 

আমার দয়ার শরীর, তার উপরে রোস্তমকে ছাড়া আমি অচল। ভাবলাম যে, আমার বাসায় একটা গার্ডের রুম আছে, যেটায় কেউ থাকে না। এটাচড বাথ রুম। রোস্তমকে আমার বাসার ঐ গার্ড রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম। একদিন যায় দুইদিন যায়, হটাত এক রাতে আমি দেখলাম যে, রোস্তম আমার বাসায় বসেই মদ খাচ্ছে। অনেক রাগারাগি করলাম, নিষেধ করলাম এবং সতর্ক করে দিলাম যে, আর যদি কখনো আমি ওকে মদ খেতে দেখি তাহলে আমি ওকে বাসা থেকে শুধু নয়, আমার ড্রাইভার হিসাবেও ওকে বাদ দিয়ে দেবো। রোস্তম আমার কাছে এক প্রকার প্রতিজ্ঞাই করলো যে, সে আর কখনো মদ খাবে না। কিন্তু মদের যার নেশা, সে মদ ছাড়ে কিভাবে? রাত যখন গহীন হয়, রোস্তম তার মদের বোতলের মুখ খুলে মদ পান করতে থাকে। একদিন আমিও বেশ গহীন রাতে ওর রুমে হটাত করে এসে দেখি, রোস্তম মদ খাচ্ছে। মাথা আমার ঠিক ছিলো না। আমি রোস্তমকে ঐ রাতেই আমার বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলাম। কিন্তু চাকুরীটা বাদ করিনি। রোস্তম নরম্যালি আমার ড্রাইভার হিসাবে আবারো কাজ করতে থাকে। কোনো সমস্যা আছে বলে মনে হলো না। এভাবেই প্রায় মাস খানেক চলে গেলো। 

গাড়িতে থাকাকালীন আমি প্রায়ই রোস্তমের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এম্নিতেই কথা বলতাম।  একবার রুস্তম আমারে বল্লো যে, ওর কাছে যদি ৩ লাখ টাকা থাকে তাহলে ওর জীবন নাকি সে বদলাইয়া ফেলবে। খুব ভালো কথা। বললাম, ৩ লাখ টাকা যদি পাস, তাহলে কি করবি? রুস্তম বল্লো যে, সে ২টা পুরান সিএনজি কিনবে। একটা নিজে চালাবে আরেকটা ভাড়ায় চালাবে। তাতে প্রতিদিন সে পাবে ১২০০ টাকা। তারমানে মাসে ৩৬ হাজার টাকা। ওর খরচ লাগে মাসে ১৬ হাজার টাকা। তার মানে মাসে সে ২০ হাজার সেভ হবে। বছরে সেভ হবে আড়াই লাখ টাকা। সেই আড়াই লাখ টাকা দিয়া সে আরেকটা সিএনজি কিনবে। এভাবে ২/৩ বছর পর সে গাড়ি কিনবে। তাতে ওর প্রতি দিন লাভ হবে ২ হাজার টাকা। এভাবে সে হিসাব করে দেখলো যে, ৫ বছর পর তার হাতে আসবে প্রায় ২০ লাখ টাকা, ৩টা সিএনজি আর একটা গাড়ি।

আমি ব্যাপারটা খুব সাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম। আগে পিছে কিছুই ভাবি নাই। একদিন আমি রোস্তমকে নিয়ে আমার প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রিজের বেতনভাতা নিয়ে গেলাম ফ্যাক্টরীতে। আমার ব্যাগে তখন দুই জায়গায় মোট ৫ লাখ টাকা ছিলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে অফিসে বসার পর আমার অন্যান্য ডাইরেক্টরদেরকে বললাম, আমার ব্যাগে ৫ লাখ টাকা আছে, সেটা নিয়ে আসো। বেতন দিয়ে দাও শ্রমিকদেরকে। সবাই বেতনের জন্য অপেক্ষা করছে। আমার গাড়িটা আমার অফিসের একেবারেই দরজার সামনেই পার্ক করা থাকে। আমার ডাইরেক্টররা গাড়ির কাছে এসে রোস্তমকে খুজে না পেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, রোস্তম সম্ভবত গেটের দোকানে চা খেতে গিয়েছে। ওকে ফোন দিলাম, বল্লো, চা খেয়ে এখুনি আসবে। আসলে ব্যাপারটা ছিলো অন্য রকমের। রোস্তম আমার ব্যাগ থেকে এক পকেটে ৩ লাখ টাকা ছিলো, সেটা সে নিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে কিন্তু আমাকে জানিয়েছিলো যে সে চা খেতে গেছে যেটা সে প্রায়ই চা খাওয়ার জন্য গেটের দোকানে যায়। ওর আসতে দেরী হ ওয়াতে আমি বারবার ফোন করতে থাকি। কিন্তু এক সময় দেখলাম রোস্তমের ফোন বন্ধ। আমার সন্দেহ হলো। দোকানে লোক পাঠালাম, রোস্তম সেখানে চায়ের জন্য বসেই নাই। বুঝতে বেশী দেরী হলো না যে, সে আমার ব্যাগ থেকে ৩ লাখ টাকা চুরি করে পালিয়েছে। ফ্যাক্টরীর আশেপাশে সব খানে খোজাখুজি করার পরেও যখন আর পেলাম না, তখন মীরপুর বাসা থেকে ডুপ্লিকেট চাবী এনে আমার গাড়ি খুলতে হলো, ব্যাগ চেক করলাম, এক জায়গায় রাখা তিন লাখ টাকা নাই, অন্য পকেটে রাখা ৩ লাখ টাকা আছে। 

 

 

চুরি করার পর এক মাস পালাইয়া পালাইয়া থাকলো। কোনো সিএনজি, কিংবা কিছুই কিনলো না। প্রতিদিন মদ খাইতো রাতে। একদিন মদ খাওয়ার পর কিছু বন্ধু বান্ধব জেনে গেলো ওর কাছে বেশ কিছু টাকা আছে। এক রাতে মদ খাইয়া বেহুস। ওর সব বন্ধুরা টাকা গুলি নিয়া পালাইলো। রুস্তমের আর কিছুই নাই। খাওয়ার পয়সাও নাই। তারপর একদিন সে ভাবছে, আমার কাছে আবার ফিরে আসবে কিনা। কিন্তু আর সাহস পায় নাই। তারপর না খেয়ে খেয়ে পাগলের মতো অবস্থা। আবার এদিকে পুলিশের ভয়, আমার ভয়।

অতঃপর একদিন

একদিন একতা বিশাল চিঠি লিখলো আমাকে। পোষ্ট অফিসে গেলো চিঠি পোষ্ট করতে। চিঠি পোষ্ট করলো। ২২ পাতার একটা চিঠি।  চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিলো- যেদিন আপনি চিঠিটা পাবেন, সেদিন হয়তো আমি আর বেচে নেই স্যার। কিন্তু একটা কথা বলে যাই, আপনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু আমার সাহস কম, তাই আর বাচতে পারলাম না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমাকে ক্ষমা কইরা দিয়েন।  যেদিন আমি চিঠিটা পাই, তার প্রায় ৪ দিন আগে রুস্তম তারের কাটা গলায় দিয়ে ফাসি দিয়ে আত্তহত্যা করেছিলো। আমার প্রায়ই ওর কথা মনে পড়ে। আমি ভাবি যে, যদি রুস্তম সাহস করে আবার আমার কাছে আসতো, আমি ওকে আবার রাখতাম আমার ড্রাইভার হিসাবে। আমি ওরে ক্ষমা করে দিছি। আমিও ওকে ভালোবাসতাম। কিন্তু আমার ভালোবাসা ওকে ঠেকাতে পারে নাই। এটা আমার ব্যর্থতা। কিন্তু এটা ওরও ব্যর্থতা।

 এটা কেনো বললাম জানো?

কারন, যে যেই জীবন চায়, সে সেটাই পায়। কেউ জেনে শুনে পায়, কেউ না জেনেই পায়। তোমার লাইফ আমার কাছে যতোটা মুল্যবান, সেই জীবনটা তোমার কাছে কতটা মুল্যবান, তার উপর নির্ভর করবে তোমার পরবর্তী পদক্ষেপ। আর এই পদক্ষেপ কেউ ঠেকাতে পারে না। যার জীবন, মাঝে মাঝে সেও ঠেকাতে পারে না। আমি তোমাকে ১০০% সাধীনতায় বাচিয়ে রাখতে চাই। তুমি জানো তুমি কতটা সাধীনতায় আছো। আর কতটা মনের জোরে আছো। আর কতটা কষ্টে আছো। এটা শুধু জানো তুমি। কিন্তু আমি জানি, আমি তোমার কতটা নিরাপত্তা চাই আর কতোটা কি করলে তোমার বেচে থাকতে ভালো লাগবে। বাকীটা তোমার মন আর অন্তর জানে। আমি তোমাকে মাঝে মাঝে ফান করে বলি যদিও যে, ভাইগা যাইবা কিনা। সেটা আসলেই ফান। কিন্তু কখনো যদি এই ফানটাই বাস্তব হয়, আমি কিন্তু তারপরেও খুসি থাকবো এই কারনে যে, অন্তত তুমি ভালো আছো। আর কিছু না। আর এই ফানটা বাস্তবে সম্ভব হলেও, যেদিন সম্ভব হবে, তার ঠিক এক মাস পরে তোমার মন, তোমার প্রান, তোমার সারাটা অন্তর ঠিক রুস্তম হয়ে যাবে। ফেরার কোনো পথ জানা থাকলেও আর ফেরা হবে না। কারন তখন পা আগাবে না, কিন্তু মন ধাক্কাবে ঠিকই, আবার অন্যদিকে মনের জোরের বিপরীতে কাজ করবে ভয়। ফলে একদিন-

একদিন মনে হবে, বেচে থাকার মুল্যটা আর নাই। হয় সারাজীবন কষ্টে বাচতে হবে নতুবা রুস্তমের মতো ২২ পাতার একটা চিঠি লিখে হয়তো শেষ লাইনে তুমিও লিখবা- বাবা আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু ফিরে আসতে পারলাম না।

রুস্তম আমার বাসা চিনতো, আমার অফিস চিনতো, আমার সব কিছু চিনতো। কিন্তু এই চেনা পথেও রুস্তম আর ফিরে আসতে পারে নাই। যেমন তুমিও চিনতা আজকের এই বাসাটা। ইচ্ছে করলেই আমাকে বলে ১ দিন পর আবার চলে আসতে পারতা। কিন্তু পারো নাই। আর এটাকেই বলে জীবনের কাছে পরাজয়। বড় বড় ঝড়ে মানুষ হয় দালান খোজে, আর যদি দালান না পায়, বড় বড় গাছ খোজে। বড় গাছের নীচে ঝড় কম। উদাহরন দেই, এই যে হ্যাপির ঘটনাটা, তোমাদের সমস্ত পরিবারে একটা ঝড় ছিলো। তছনছের আভাস কিন্তু পেয়েছি হ্যাপির যাওয়ার ২ দিন পর থেকেই। যেভাবে সবাই তোমাদেরকে আস্টেপিষ্টে ধরতেছিলো, কোনো অবস্থাতেই তোমরা আর ঐ গ্রামে থাকতে পারতা না। কিন্তু হয়তো আমি ছিলাম বলে রক্ষা পেয়ে গেছো আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু যদি না থাকতাম? আজ যতোটা শান্তিতে আর বুকের বল নিয়া ঘুরতে পারো, যদি না থাকতাম, তাহলে অতোটা নীচু হয়েই বাস করতে হতো বংশ পরম্পরায়। আর এই কষ্ট দেখটা নিজের চোখে। মাঝে মাঝে মনে হইতো, জীবনের পরাজয় মনে হয় এভাবেই হয়।

আমি এগুলি দেখেছি আমার এই ৫০ বছর বয়সেই। তাই, আমি কাউকে ঠকাই না, কিন্তু আমি ঠকার জন্য রেডি থাকি। কারন আমার ঠকার মতো ক্ষমতা আছে। এটা টাকার জন্য না। এটা একটা মনের বল। নিজের মনের শক্তি। আজমীও তো পালাইতে পারতো। কিন্তু ও নিজেও এখন আর পালাইতে চায় না। তাই আমি সব সময় মানুষকে বলি, পারলে পালিয়ে যাও। আমি ধরে রাখি না। এটা তোমার জন্যেও প্রজোজ্য।

খেয়াল করে দেখো- ঐ সময় ২ লাখ টাকা তোমার কাছে শত কোটির মতো মনে হয়েছে। সেই টাকাটা তোমার কাছে ছিলো একটা শক্তি। কিন্তু আজকে তোমার কাছে প্রায় ২০ লাখ টাকাও মনে হয় না যে, এটা শক্তি। কারন তোমার লাইফ স্টাইল বদলে গেছে। তুমি এখন ইচ্ছে করলেই বন্যার ছেলের জন্য বন্যা টাকা চাইলে না দিয়ে পারবা না। আর যদি না দাও, তুমিও বন্যার কাছে অনর্থক এক পাবলিক। একটা সময় আসবে, মাসে ১ লাখ টাকা কামাই করলেও মনে হবে এটা এনাফ না। তখন দরকার লাখ লাখ টাকা। কে দেবে তোমাকে সেই ভরসার? সব সময় টাকাই ভরসা না। একজন মানুষই কোটি টাকার ভরসা। পালিয়ে যাও, দেখো কার হাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশী নিরাপদ। কার কাছে গেলে ভালো ঘুম হয়। দুসচিন্তা না থাকে। সেই লোক পাওয়া বড় কঠিন। বন্যাকে তুমি হাজার হাজার টাকা দাও না। কিন্তু তুমি বন্যাদের কাছে লাখ টাকার ভরসা। অন্যদিকে সুমীর সেই ভরসাটাও আর নাই। অথচ তুমি একদম কাছেই আছো।

কথাগুলি কঠিন। কিন্তু এই কথাগুলি এতোটাই বাস্তব যে, আজমী এখন বুঝে এটা। সেফালী বুঝে, লিয়াকত বুঝে, খালেদা বুঝে, সুমী বুঝে। কিন্তু একটা সময় ছিলো, তখন বুঝে নাই। ঐ যে বললাম- “যদি আর একবার” এটা একটা অনুশোচনার নাম। হয়তো “যদি আর একবার” এই সুযোগটা কখনোই কারো জীবনে আসে না।

শারমিন কথা

মেয়েটির সাথে আমার পরিচয় প্রায় তিন বছর আগে। আর এই পরিচয়টা নিছক কোনো কাকতালীয়ভাবে নয়। নিছল প্রোফেশনাল প্রেক্ষাপট থেকেই তার সাথে আমার পরিচয়। ধীরে ধীরে সখ্যতা গড়ে উঠলেও প্রোফেশনাল বাউন্ডারি থেকে জীবনের সব কাহিনী সব সময় জানা হয়ে উঠে না। কিন্তু এই পরিচয়ের মধ্যে প্রোফেশনাল বাউন্ডারীর বাইরেও একটা আলাদা জগতের মধ্যে প্রবেশের পরিবেশ সৃষ্টি হয় যা নিছক ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক।

জীবনের সব কাহিনীর কিছু মোড় থাকে। এই মোড়ে মোড়ে আকাবাকা হয়ে কিছু অব্যক্ত কাহিনী থাকে যা থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। শারমিনের জীবনের ইতিহাসেও এই রকম বেশ কিছু বাক আছে। শারমিনের বিয়ে হয়েছে প্রায় অর্ধ যুগের উপর কিন্তু ঈশ্বর তাকে তিনি অনেক ভাগ্সেয আর আনন্ইদ থেকেই যেনো বিনা কারনে বঞ্চিত করে রেখেছন। কেনো এমন হয়? কেনো ঈশ্বর কাউকে থলে ভরা সম্পদ দেন, ঘর ভর্তি মানুষ দেন কিংবা দুহাত ভরে শান্তি দেন, আবার কারো কারো জন্য ঈশ্বর কিছুই দেন না। এর ব্যাখ্যা বড় জটিল। শারমিনের জীবন টাও যেনো সেই দলে যারা আজীবন শুধু বঞ্চিতই ছিলো। না জোগান দিলেন সি সাধের যেখানে কোনো হাটি হাটি পা পা করে ঘরময় ঘুরে বাড়াচ্ছে ক্ষুদ্র মানুষের পদধ্বনি, না ঝমকালো সম্পদের পাহাড়, অথবা সমাজের উচ্চবিত্তের কোনো অহংকার। ঈশ্বর কাকে কেনো এই সার্থকতা থেকে কি কারনে বঞ্চিত করেন, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। আপাত দৃষ্টিতে আমাদের কারো কারো সহানুভুতি থাকলেও একটা জিনিষ সঠিক যে, ঈশ্বর তার সৃষ্টির সাথে কখনো মশকরা করেন না। তিনি যার যার সামর্থের উপর, যোগ্যতার উপর তাকে পুরুস্কার করেন। যতোক্ষন না কেউ কোনো কিছুর জন্য মানসিক, এবং মানবিক দিক থেকে প্রস্তুত না হয়, অথবা তাকে প্রস্তুত না করেন, ততোক্ষন পর্যন্ত ঈশ্বর তাকে সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুস্কার কে তিনি তার হাতে তুলে দেন না। ঈশ্বর সবচেয়ে ভালো বিচারক। যে যতটুকুর ভার বহন করতে পারে, যে জিনিষের ভার বহন করতে পারবে, ঈশ্বর তাকে সেই জিনিষের ভারই তাকে দেন। অপাত্রে তিনি কোনো কিছুই দান করেন না। হোক তাকে তিনি যতো সুন্দর করেই সৃষ্টি করেন না কেনো।

ঈশ্বর এই জাতীয় মনুষ্য বাহিনীকে যুগে যুগে একটা রেফারেন্স দেওয়ার লক্ষ্যে, তাদেরকে উদারন হিসাবে রাখার জন্য হয়তো মনুষ্য সমাজে নিছক একটা লোভনীয় মুর্তি হিসাবে জাগিয়ে রাখেন।

২৩/০১/২০২১-বাঁশ বাগানের তলা

Categories

হটাত করেই সকাল থেকে আমি কোনো কিছুরই গন্ধ পাচ্ছি না। চারিদিকে করোনার এতো উপদ্রব বেড়েছে, আর আমি ইদানিং এতো বেশী পাবলিকলী মেলামেশা করছি, তাতে যে কোনো সময়ে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে। তাই ভাবছি, আগামীকাল থেকে আমার অফিসে ভিজিটর আসা রেস্ট্রিক্ট করে দিতে হবে একেবারেই। যদি কাউকে ভিজিটে এলাউ করতে হয়, তাহলে এক মাত্র বোর্ড রুম ছাড়া অন্য কাউকে আমার অফিসে আসতে বারন করা হবে।

মহামারীর এই সময়ে আমার অনেক কাজ এখনো বাকী। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী জরুরী যার জন্য তার সাথে আজ আমার দেখা হলে সে অনেক ভয়ে আছে দেখলাম। আমিও চাই সব কিছু থেকে মানুষ গুলিকে নিরাপদ রাখতে। আমি জানি মনুষ্য সমাজে আমাকে ছাড়া ওরা এখনো অন্য কারো উপর নির্ভরশীল হতে পারে নাই। তাই আমার এই কাজগুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেনো আল্লাহ আমাকে না নিয়ে যান, এই প্রার্থনা করি।

আসলে ও খুব অসহায়। মায়া হয়, ভয়ও হয়। একটা জায়গায় না পৌঁছানো পর্যন্ত আমার দায়িত্ত শেষ হবে না জানি। আমাকে যেনো ঈশ্বর সে সুযোগটা দেন।

৩০/০৯/২০২০-মাইন্ড গেম

একটা ফাদ পাতা হয়েছিলো। প্রথমে প্রেমের অভিনয়, তারপর তাকে অপহরন, তারপর তাকে শেষ করে দেয়া। কিন্তু ঘুনাক্ষরে অপরাধী টের পায় নাই এর শেষ পরিনতি কি। ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে সম্পর্ক জুড়তে যাওয়া একটা ভয়ংকর অপরাধের জন্ম দেয়। আর এখানে সেটাই এই অপরাধী ঘটিয়েছিলো। সোজা অপহরন। অন্যদিকে, যখন কোনো মানুষ কিছুই না বলে সে তার পরিবার থেকে হটাত করে উধাও হয়ে যায়, তখন ব্যাপারটা অনেক দুসচিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের সবার ঘুম নষ্ট হয়ে বিভ্রান্তের মতো দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে চৌহদ্দির বাইরে গিয়েও সর্বাত্তক চেষ্টা চলে হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে আবার ফিরিয়ে আনা। আর এই ভয়ংকর খোজাখুজির মধ্যে অনেক গোপন তাস প্রকাশ্যে আসে, প্রকাশ্যে আসে গোপন সন্ধি, গোপন লেনদেন, গোপন শর্তাবলি। তবে কিছু তাস সবাই জানলেও বেশীরভাগ তাসই অজানা অন্য সবার কাছে থেকে। এই অজানা তাসের মধ্যে কারো বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কিছু তাস আন্দাজ করা হয়,  কারো নির্বোধ রাজনীতির কারনে আরো কিছু তাস গোপনে বেরিয়ে আসে আবার কারো আইনের নির্ভিক প্রশাসনিক দক্ষতায় শেষ অবধি অপরাধীর মতো তুরুকের তাসটি একেবারেই হাতে চলে আসে। তবে মজার ব্যাপার হলো, সময়ের পথ চলায় কিন্তু সত্য বেশীদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। ধীরে ধীরে এর মুখোশ উম্মোচিত হয়ই। অনেকেই রাজনীতি করেন নিজের যোগ্যতায়, কেউ রাজনীতি করে বাপদাদার পৈত্রিক উত্তরাধীকার সুত্রে। কিন্তু জ্ঞান তো আর উত্তরাধীকার সুত্রে পাওয়া যায় না। এটা অর্জন করতে হয়। পৈত্রিকসুত্রে পাওয়া রাজনীতির পদাধিকারী হয়তো জানেনই না যে, রাজনিতিতে পূর্নিমা আর অমাবশ্যা একসাথে চলে। জোয়ারভাটা এক সাথে চলে, কিন্তু সেটা কখন কিভাবে, কোথায় তার জ্ঞান থাকা দরকার।

আমরা অসহায় ছিলাম, আমাদের না ছিলো পাওয়ার-পলিটিক্সের ক্ষমতা, না ছিলো কারিকারি অর্থ। কিন্তু আমাদের ছিলো অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা আর ছিলো দায়িত্তবোধ। কিছু কিছু দায়িত্তশীল মানুষের আশ্বাস, ভরষা আমাদেরকে ক্রমাগত একটা অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দিচ্ছিলো, আমরা হারিয়ে যাওয়া আমাদের পরিবারের মানুষটির অজানা ব্যথায় ব্যথিত হচ্ছিলাম বটে কিন্তু সব ঠিক হয়ে যাবে, সব ঠিক করে দেয়া হবে এরুপ ভরষায় আমাদের আতংক দিনে দিনে এতোটাই বেড়ে উঠছিলো যে, আমাদের প্রতিটি পরিবারের জীবন্ত সদস্যরা যেনো মৃত মানুষের মতো বেচেছিলো। বুঝতেছিলাম যে, ঠিকঠাক হওয়া আর ঠিকঠাক দেখানোর মধ্যে কত পার্থক্য, এটা যেনো সত্য আর মিথ্যার মতো। এই দুয়ে চোখ আর মন এক সাথে চলছিলো না। অবশেষে বুঝলাম, বহুদূর অবধি খুজেও যখন কোনো সুত্র পাওয়া না যায় তখন কাছে দেখতে হয়। বুঝেছিলাম যে, সেটা কাছেই চোখের আড়ালে লুকিয়েছিলো। আর সেটা হলো স্থানীয় রাজনিতিকদের মাথায়। প্রশাসনিক দপ্তরের পজিটিভ মনোভাবে হারানো মানুষটাকে পাওয়া গেলো বটে কিন্তু অপরাধী ধরাছোয়ার বাইরেই রয়ে গেলো।

সবাই আমাদেরকে নিয়ে মাইন্ড গেম খেলছিলো। রাজনীতিকসহ। মাইন্ড খেলা বিপদজনক নয় তবে যার জন্য খেলা হয় সে যদি জেনে যায় যে, তাকে নিয়ে কেউ মাইন্ড গেম খেলছে, তাহলে মাইন্ড গেম উলটা ফল দেয়। এটা তখন হয় বুমেরাং কেননা যার উপর মাইন্ড গেম খেলা হচ্ছে সে যখন বুঝেই যায় যে তার উপর মাইন্ড গেম এপ্লাই করা হচ্ছে, তখন সে জেনেশুনে ঐসব উপাত্তগুলিই দেয় যা আসলে মাইন্ড গেমারকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আর তাকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এসব উপাত্তগুলি দেয়া হয়। জেনেশুনেই দেয়া হয়। তখন যিনি ছিলেন গেমার, তিনি হয়ে যান সাবজেক্ট, আর যিনি ছিলেন সাব্জেক্ট, তিনি হয়ে যান গেমার। আর তখন আসল মাইন্ড গেমার নিজেই তখন আরেকজনের মাইন্ড গেমের বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। এটা বুঝতে একটু সময় লেগেছিলো আমাদের। মনের কষ্টে, বেদনায় আর হতাশায় যেখানে যেখানে ধর্না দিয়েছি, কোথাও যখন এর প্রতিকার হচ্ছিলো না, শেষ প্রতিকার ছিলো অর্থ। অর্থ যে কত বড় শক্তি, সেটা এবার বুঝলাম। মৃত মানুষও এই অর্থের জন্য হাত বাড়ায়। এদেশের ভাগ্য বড় খারাপ যে, দেশমাতা বেশীরভাগ রাজনীতিবিদদেরকে যেনো অপরাধী সন্তান হিসাবেই জন্ম দিয়েছে। সবাই নয়, তবে অধিকাংশ। দেশমাতা নিজেও এর বলীর শিকার। আমাদেরকে এবার তারা সেটাই করতে বললেন যেটা আমরা চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যাপারটা গোপন থাকার শর্তে। এই অতি ধূর্ত মানুষটি দুটু গেম খেলছিলেন দুই দিকে। একটা লুকানো, আরেকটা বিভ্রান্ত। লুকানো গেমে আমরা আর বিভ্রান্তের গেমে তার অনুসারীরা।

অতএব, অপরাধী এলো, তিনি এলেন না। কারন তিনি আসবেন না এটাই ছিলো বিভ্রান্তের মুল লক্ষ্য। শেষতক, যুবরাজ অপরাধী এলেন, ধরা পড়লেন, লালঘরে চলে গেলেন। আর পরদিন সবাইকে আবারো বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে আমাদেরকে এক তরফা শাসিয়ে দিলেন। এটাই রাজনীতি। রাজনীতিতে অনেক সময় অনেক বড় জিনিষ ছোট ভাবেও বলা যায়। এই রাজনীতির খেলায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাহিনী বলে কিন্তু সত্যটা থাকে অন্য কিছু। সময় হলো সবচেয়ে বড় ভিলেন। আর এই ভিলেনের সবচেয়ে বড় বন্ধু তারা যারা বারবার মাইন্ড গেম খেলেন এবং খেলান।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

২৮/০৬/২০২০- আমি ফিরে এসেছি আবার

Categories

ঈশ্বর নাই কে বলে? ঈশ্বর আছেন, তিনি অদৃশ্য বটে কিন্তু মানবের সব অন্তরের কথা তিনি শোনেন। রাতজাগা ক্লান্ত পাখীর মতো ভেজা চোখের ক্রন্দনের আরাধনা ঈশ্বর শুনেছেন। আমি ফিরে পেয়েছি আমার সেই পুরানো ঘর, পুরানো জানালা। সেই জানালা দিয়ে আজো সেই আগের বাতাসের গন্ধ আমি পাই। ঘরে যে টিকটিকিটা একদিন দেখেছিলাম, আজ আমার পদচারনায় সেও যেনো অনেক খুশী। ছোট সেই টিকটিকিটা আজ বেশ বড় হয়ে উঠেছে। কতদিন ছিলাম না? মাত্র তো ২৪ টা দিন। কোনো কিছুই তেমন পরিবর্তন হয় নাই, আবার অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমার মন পরিবর্তন হয়ে গেছে, আমার দেহ পরিবর্তন হয়ে গেছে, ছোট সেই টিকটিকিটাও বড় হয়ে গেছে। ঘরের কোনায় একটা মাকড়শা জাল বেধেছে। এটা আগে ছিলো না। বাথরুমের মেঝটা একটু ধুলায় কালো হয়ে গেছে। হয়তো অনেক ব্যকটেরিয়ারা তাদের মতো করে বাসা বেধে ফেলেছে। টেপটা ভালো মতো বন্ধ করা হয় নাই বিধায় অবিরত টপটপ করে ফোটায় ফোটায় পানি পড়ে জায়গাটা কালো হয়ে গেছে। রান্নাঘরের থালা ধোয়ার জায়গাটা শেওলা পড়ে সবুজ হয়ে গেছে। তারপরেও বড্ড আপন মনে হচ্ছে আমার সবকিছু। ঘরের দেয়ালে হাত দিয়ে আমি বুঝতে পারি ওরাও অনেক খুশি। আমি ফিরে এসেছি এই সেই ঘরে যেথায় আমি কতই না অভিমান করতাম, গুনগুন করে গান গাইতাম। ছোট ছোট পায়ে এঘর থেকে ওঘরে হাটাহাটি করতাম। কি শান্তি আর কি সুখ। আমার চোখ ভিজে যায় আনন্দে। আমার অন্তর বিকশিত হয়ে উঠে সুখে। কি অসাধারন আমার এই ছোট ঘরটি।

এই তো, এখানে বসেই তো আমি চুল আচড়িয়েছি কতদিন। এইতো এই টুলটায় বসে আমি কতদিন আকাশ দেখেছি। যেখানে তাকাই, সব আমার মনে হয় আজ। কত আপন মনে হচ্ছে আজ। যেদিন সকালে আমি এই ঘর থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলাম, বুকের ভিতরে একটা কষ্ট বেধেছিলো, চিনচিন করে ব্যথা লেগেছিলো। ঘর ছেড়ে বের হয়ে যাওয়া যে কত কষ্টের, যে ঘর ছাড়ে নাই, সে কখনো বুঝবে না পরিচিত ঘর কিভাবে নিঃশব্দে কাদে। সেই কান্না আমিও শুনেছিলাম সেদিন। কিন্তু অভিমানের পাল্লা এতো বেশী ছিলো যে, ঘরের নিঃশব্দ কান্না আমার অন্তরের অভিমানের কাছে হেরে গিয়েছিলো। আজ আমি ফিরে এসেছি। সমস্ত ঘরটা যেনো ফিকফিক করে হেসে উঠলো। এটা আমার ঘর। এই ঘরের প্রতিটি বাতাসে মিশে আছে আমার নিঃশ্বাস, মিশে আছে আমার আকাশের পায়ের ধুলো। ওর শরীরের গন্ধ। আমি চোখ বুঝে নিঃশ্বাস নিলেই যেনো ওর গায়ের গন্ধ পাই। কি অদ্ভুদ না?

ছলনার ফল ভালো হয় না। কিন্তু আমি তো ছলনা করি নাই।  যে আমার সাথে ছলনা করেছিলো, যে আমাকে ঘর ছাড়া করেছিলো, যে আমাকে আমার অতীব চেনা এই ঘর থেকে বের করেছিলো, আজ তার ঘর নাই। আজ সে নিজের ছলনায় নিজেই আটকে গেছে। স্ত্রী জাতীরাই আসলে স্ত্রীজাতীর চরম শত্রু। আর এ জন্যেই এক স্ত্রীর ঘর ভাংগে আরেক স্ত্রী জাতীর কারনে। পুরুষ সব সময়ই উদাসীন। তাকে ধরে রাখতে হয়। তার হাত ছাড়তে হয় না। আমি ওর হাত ছেড়ে বুঝেছিলাম, আরেকটা হাত আমার মনের মতো নাও হতে পারে। সেই হাত, সেই আংগুল, সেই হাতের ছোয়া আমার ফেলে যাওয়া হাতের মতো নাও হতে পারে। আমি এই উপলব্দিটা বুঝেছিলাম সেই রাতেই যেদিন আমি আমার আকাশ থেকে ছিটকে পড়েছিলাম। সেদিন বুঝেছি যেদিন রাতে আমি ঘন কালো আকাশ দেখে ভয় পেয়েছিলাম। আমি তো এই কালো আকাশকে চাই নাই। আমি চেয়েছিলাম জোস্নাভরা নীল আকাশ।

আজ আমার ঘরের সেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের ওই নীল আকাশটাকে দেখছি। ফুরফুরা বাতাস আমার জানালায় ঢোকছে আর আমাকে শীতল করে দিচ্ছে। কতদিন এই নির্মল বাতাস আমার এই ঘরে যে প্রবেশ করে নাই কে জানে। আজ বাতাসেরাও আনন্দিত। অফুরন্ত বাতাস। বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়ার মধ্যে কত যে আনন্দ। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে আমার আকাশের পানে ওর ভালোবাসার গন্ধ পাচ্ছি।

ঈশ্বর আমাকে আবারো ফিরিয়ে এনেছে আমার সেই পরিচিত ঘরে যেখান থেকে আমি একবার ঝরে পড়েছিলাম, আজ আবারো আমার বাগানে আমি মালী হিসাবেই ফিরে এসেছি। দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দেয়ালকে বললাম, জানো দেয়াল, আমি আমার এই দূর্বল শরীর তোমার গায়ে হেলান দিয়ে আবার দাড়াতে চাই, তুমি আমাকে ধরে রেখো। আমি সেই টপটপ করে ফোটায় ফোটায় পানি পরা টেপটাকে বললাম, আমি আবার ফিরে এসেছি, এবার আর তোমাকে ফোটা ফোটা অশ্রু বিসর্জনে কাদতে দেবো না। তুমি আমাকে গরমে শীতল করো আর আমাকে পরিশুদ্ধ করো। আমি আমার সেই পরিচিত রান্নাঘরের চুলাটার কাছে গিয়ে বললাম, যে আগুনে আমি এতোদিন পূরেছি, আজ বুঝতে পারি, তুমি কতোটা আগুনে পূড়ে আমাকে অন্ন দাও, সুমিষ্ট খাবার দাও। আমি আবারো তোমাকে আমার আদরের হাত দিয়ে দিয়ে ভরে দেবো। খাটের কোনায় বসে আমি ভাবী আর ভাবী, এই পুরু সংসারটা আমার। এই সংসারে আছে টিকটিকি, আছে বাতাস, আছে জানালা, আছে রাতের জ্যোৎস্না। আর আছে আমার ভালোবাসা আকাশের জন্য।

আমি আর কখনো আকাশকে ছেরে কোথাও যাবো না।

২৪-০৬-২০২০-কিভাবে থাকা সম্ভব একা?

Categories

দুটু মাত্র রুম। একটিতে আছে রান্না ঘর, আছে ফ্রিজ, আর একটা ছোট টেবিল যা ডাইনিং টেবিল বলা যায় তবে সেটা এখন আর ডাইনিং টেবিল হিসাবে ব্যবহৃত হয় বলে মনে হয় না। সেটা আসলে এখন পরিত্যক্ত হাড়ি পাতিল, গ্লাস কিংবা ভাতের গামলা রাখার কাজেই যেনো বেশী ব্যবহৃত হয়। আর এই রুমটায় আছে একটা রসুন পিয়াজ কিংবা মসল্লা জাতীয় জিনিষ রাখার একটা আলমারী। রুমটায় কোনো ফ্যান নাই, সাথে একটা বারান্দা আছে, অতীব ছোট, তবে ওখানে গিয়ে যে বসে বাইরের রুপ দেখার জন্য বসা যায়, এমন না। এটা নিতান্তই একটা দরজা খোলা রাখার জন্য হয়তো স্পেস হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

আরেকটা রুম যেখানে আছে একটা ড্রেসিং টেবিল, আছে একটা পড়ার টেবিল, উল্টাদিকে আছে একটা ওয়ার্ড্রব, ওয়ার্ড্রবের উপরে আছে একটা ছোট টিভি। মেঝের মাঝখানে একটা কারুকার্য করা পাটের কার্পেটের মতো একটা জিনিষ, খাটটা সুন্দর, এই রুমটার সাথে আছে এটাচড বাথ। এটাই হলো অরুর রুম।

থাকার মধ্যে একমাত্র অরুই হচ্ছে বাসিন্দা। একাই থাকে অরু। বাইরের কারোর সাথে অরুর কোন সম্পর্ক নাই, অন্তত এটাই আমি জানি। মাসের বাজার এককালীন করে নিয়ে আসে অরু নিজেই। একা মানুষের জন্য খুব বেশী কিছু লাগে না। তার সারাদিনের কাজের মধ্যে যা আমি বুঝতে পারি সেটা হলো, সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়। তারপর রান্না ঘরে গিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো যা খেতে চায়, সেটাই বানিয়ে কোনো রকমে খেয়ে নেয়। তারপর ঘরটা গুছায়, রান্নার জন্য কিছু আয়োজন করে। গোসল করে, কাপড় চোপড় ধুয়, তারপর কিছুক্ষন পড়াশুনা করে। আর কথা বলার জন্য একমাত্র আমার সাথেই বলে। তাও আবার আমি যদি অনলাইনে আসি, তাহলেই ব্যাপারটা ঘটে।

তার কিছু বান্ধবী আছে, তারাও মাঝে মাঝে অনলাইনে কথা বলে। এইটুকুই। সে কারো প্রতি হয়তো আসক্ত নয়, অর্থাৎ কোনো পুরুষের প্রতি বা অন্য কোনো ছেলের প্রতিও নয়। অন্তত এটাই আমি জানি। এই রকম একা একটা পরিবেশে দিনের পর দিন কি করে সম্ভব একজন মানুষের পক্ষে একটামাত্র ঘরে বসবাস করা?

আমি ওকে নিয়ে গবেষনা করি। আমার এতো বছরের অভিজ্ঞতায় এটা কিছুতেই মাথায় আসে না। মানুষ কি আসলেই এভাবে একা বাচতে পারে? অথচ আমি ওকে দেখি মন খারাপ করে না, হাসে, খায় দায়, ঘুমায়, ভালোই আছে। এর মধ্যে কি কোনো প্রকার বৈজ্ঞানিক রহস্য আছে? নাকি মানবীয় কোনো পরিকল্পনা? নাকি সময়ের সাথে নিজেকে কিছু সময়ের জন্য এডজাষ্টমেন্ট?

আমার এই ব্যাপারটা জানার খুব শখ। আমি এটাকে একটা এক্সপেরিমেন্টাল থিউরী হিসাবে এখন দেখছি যার উপাদান হচ্ছে সময়, তার সাথে নিশ্চিত ভবিষ্যতের একটা গ্যারান্টিসহ আরো কিছু। আমি দেখতে চাই, এর পিছনে আসলে কোন বস্তুটি আসলে কাজ করছে। এটা কি সময়কে কিছুকাল আটকে দেয়া যা হয়তো একটা কিছুর প্রাপ্তির শেষেই এর পরিসমাপ্তি? নাকি আসলেই এটা কোনো নতুন থিউরী যেখানে মানুষ কোটি লোকের ভীরেও একা যা আমি আগে কখনো দেখি নাই অথচ এটা ছিলো। নাকি নিছক একটা এডাপ্টেশন।

সময় বলে দেবে এর রহস্য। তখন পর্যন্ত এটা আমার কাছে নিছক একটা প্রশ্ন বটে। উত্তর আমার জানা নাই।

৩১/০৩/২০২০-যেদিন চলে আসবো-৩

যাই হোক, আমি আমার সংসার ছাড়ার সাথে সাথেই বুঝলাম, আমার সবকিছু মিথ্যা হয়ে গেছে। আমি আমার অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলেছি। অভিমান ছিলো কানায় কানায় ঠিকই কিন্তু এখন আমার অভিমানটা আলো আধারের ছায়ার মতো কষ্ট আর বিষন্নতায় পরিনত হলো। গতকাল সকালে যে একাকীত্ততা নিজের দম বন্ধ করে ফেলেছিলো বলে মনে হয়েছিলো, আজ মনে হল, আমার শ্বাস আর চলছেই না। কারন তুমিই ছিলে আমার অক্সিজেন, আমার শ্বাস। চারিদিকে শত হাজার মানুষের পরিচিত মুখগুলি যেন আমাকে ব্যাঙ্গ করে এটাই বলছিল, 'কি হারাইয়াছো জীবনে? আলো? নাকি কান্ডারী? কি ফেলিয়া আসিয়াছো, কোথায় ফেলিয়াছো?'

বড় একা মনে হচ্ছিলো আমার।

কোথাও আমার কোন শান্তি ছিল না। অথচ শান্তির জন্য বারবার আমি একই ভুল করছিলাম। আবারো আমি সেই অজানা কুচক্রিকেই শান্তনার আধার মনে করে তারসাথে বারবার যোগাযোগ করছিলাম। আর এই কুচক্রি ষড়যন্ত্রকারিনী আমার পিছ তখনো ছাড়ে নাই। আমাকে সর্পবিষ দিয়ে যতোক্ষন না ধংশ করা হচ্ছে, তার যেন নিস্তার নাই। আমার এই কষ্টের কথা, আমার এই দিনদূর্দশার কথা আমি এই গুরুসম সর্পিনী ছাড়া আর কাউকে তো শেয়ার করতেও পারছিলাম না। অথচ তখনো আমি বুঝতে পারি নাই, কি বিষে আমাকে ধংশন করছে। এর নাম, কুচক্রির লালসার বিশ, এর নাম ষড়যন্ত্রকারিনির হিংসার বিশ। আমি সেই লালসার বিষে জর্জড়িত হিংসার ঝড়। অথচ তার সাথে আমার না ছিলো কোনো কালে পরিচয়, না ছিলো তার সাথে আমার কোনো কিছু নিয়ে হিসাবের গড়মিল।

কতবার কেদেছি তার কাছে আমার এই অসহাত্তের চিত্র বর্ননা করে, কতবার কেদেছি এই বলে যে, কোনোভাবে আবার আমি আমার সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করে পুনরায় ফিরে যেতে পারি কিনা তোমার কাছে। কিন্তু আমার কুচক্রিকারিনীর এক ফোটা মনও গলে নাই। বারবার আমাকে সে এমন কিছু তথ্য আমার কানে চোখে ঢেলে দিতেছিল যা ছিলো তোমার কষ্টের মুহুর্তের কিছু অভিযোগ। কিন্তু তোমার কষ্টের আবদারগুলি কখনো আমাকে জানিয়ে এই কথাটা বলে নাই যে, আমার বিরহে তুমিও কাতর। আমার বিচ্ছেদে তুমিও শোকাবহুল একজন মৃতলাশ। এটা কখনো সে আমাকে জানতে দেয় নাই, তুমি আকুতি করছো, মিনতি করছো, আমি যেন আবার ফিরে আসি। বরং আমার প্রতি তোমার ঘেন্নার অভিব্যক্তিগুলিই বারবার জানিয়ে এটাই প্রমান করার চেষ্টা করেছে, তোমার জীবনে আমি কিছুই না, আমার সব প্রয়োজন তোমার কাছে ফুরিয়ে গেছে।

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার পৃথিবী থেমে গিয়েছিল। বারবার আমার মনে হয়েছে, আমি কি তোমাকে কখনই ভালবাসি নাই? আমি কি কখনো তোমার মনের ভিতরে এতটুকু স্থানও দখল করি নাই? যদি সেটাই হয়, তাহলে ওইদিন প্রত্যুষ্যে কেনো তুমি বলেছিলে, 'আমি আছি, ভয় পেয়ো না?'।

দিন যায়, রাত আসে আবার দিন আসে। সময় ঠিকই পেরিয়ে যায় সবার কিন্তু আমার সময় একেবারে স্থবির হয়ে দিন আর রাত এক হয়ে গেছে যেখানে না আছে নাওয়া, না আছে খাওয়া, না আছে কোনো সুখ। অবিরত অশ্রুপাতই যেনো আমার এই নয়নের একমাত্র কাজ।  গভীর রাত। কোনো ঘুম নাই আমার চোখে। সবাই ঘুমিয়ে গেছে। আমার বুকের পাজরগুলি যেনো ভেঙ্গেচুরে একাকার হয়ে একটা দলা পাকিয়ে আছে। যেখানেই হাত দেই, সেখানেই যেনো একটা চাপা ব্যথা অনুভব করি। আশেপাশের মানুষগুলি আমার কিছু তো একটা হয়েছেই এটা বুঝতে পারছে কিন্তু আমি যতোটা পারছি যেনো কিছুই হয় নাই এমন একটা অভিব্যক্তি মুখে প্রদর্শন করে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু তোমাকে আমি এক মুহুর্তের জন্যেও ভুলি নাই।

বারবার আমি এই কুচক্রিকারিনীর শরনাপন্ন হয়েছি, কোনো মেসেজ, কোনো আকুতি, কোনো মিনতি, কোনো সুখের খবর তোমার কাছ থেকে তার মাধ্যমে আমার জন্য এসেছে কিনা। আমি জানতাম, তুমি এই কুচক্রিকারিনীর সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছো। আমার কারনেই হয়তো রাখছো। ফলে এই সর্পসম ষড়যন্ত্রকারীনীই ছিলো আমার একমাত্র ভরষা যার থেকে কিছু হলেও আমি তোমার ব্যাপারে জানতে পারি। কিন্তু এই কুচক্রিকারিনী বারবার যা সত্য নয় সেটাই সত্য বলে আমাকে জানিয়েছে আর প্রকৃত সত্যটাকে সগোপনে লুকিয়ে আমার আর তোমার মাঝে বিস্তর একটা মরুভুমির অঞ্চল তৈরী করে ফেলেছে।

তুমি হয়তো জানো না, এর মাঝে কত কিছু ঘটে যাচ্ছিল। একদিকে আমার ফিরে যাবার প্রবল ইচ্ছা, অন্যদিকে তোমার না ফিরে আসার প্রবল অপমাননা আমাকে এক রকম দিশেহারা করে ফেলেছিলো। এরই মধ্যে আমার এই কুচক্রিচারিনী আমাকে আরেক পরিকল্পনায় সামিল করে দিলো। যেহেতু আমি তার কোনো পরিকল্পনাই প্রথম থেকে বুঝতে পারি নাই, ফলে ফিরে যাবার প্রবল মানসিকতায় আমি তার প্রতিটি পরিকল্পনাকে আমার জন্য মংগলময় এটা ভেবেই নির্বোধের মতো সায় দিয়ে যেতে থাকলাম। কিন্তু তুমি তো আর নির্বোধ ছিলে না। আমার বেলায় কুচক্রিকারিনী সফল হলেও তোমার বেলায় সে নুন্যতম হারেও সফল হতে পারে নাই। আমাকে নিয়ে তার দ্বিতীয় পর্বের পরিকল্পনা ছিল, কোনো না কোনোভাবে কুচক্রিকারিনী আমাকে তার আবাসস্থলের কাছেই রক্ষিতা সরুপ রেখে দেয়া। কিন্তু শর্ত ছিলো একটা ব্যবসার। আর সেই ব্যবসার মুলধন জোগাবে তুমি যদি তুমি তখনো আমাকে চাও। কি অদ্ভুত আমার ভাগ্য যে, এতোদিন যখন কোনোভাবেই আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না, হটাত করে একদিন তুমি আমাকে আমার এই ভার্চুয়াল লাইনে মেসেজ দিয়ে কত কথাই না বললে। চোখের জল আর ধরে রাখতে পারছিলাম না। কিন্তু আমি আর আগের মতো তোমাকে ভরষাও করতে পারছিলাম না কারন তুমি ইতিমধ্যে আমাকে আমার অভিযোগের এমন সব প্রমানাদি উপস্থাপন করতেছিলে যা আমি আমার রাগ, অভিমান থেকে তোমার নামে যা সত্য নয় সেটাও বলেছি, আবার যা সত্য সেটাও বলেছি। আমি বুঝতে পারছিলাম না, তুমি এসব মিথ্যা অভিযোগ আর মিথ্যা কল্ কাহিনীর মতো নালিশ শুনে তুমিই বা কতটুকু আর আমার ছিলে।

তুমি আমাকে আবারো ফিরে আসার কথা জানালে আমি একদিকে উড়ে চলে আসার জন্য মানসিকভাবে যেমন প্রস্তুত ছিলাম আবার অন্যদিকে মনে একটা ভয় ছিলো, আবারো দ্বিতীয়বারের মতো এমন কোন মারাত্মক ভুল করছি নাতো যেখানে আবার আমি চিরতরে তোমার রাগের শিকার হই? আমাকে আমার এই বন্ধুস অথচ কুচক্রিকারিনী শিখিয়ে দিয়েছিলো, নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে, আবার প্রত্যাখ্যাত হবার ভয়ে আমি যেনো তোমার কাছ থেকে পুর্বেই এমন কিছু শর্ত আরোপ করি যাতে তুমি যদি আমার সাথে পুনরায় প্রতারনা করেই ফেলো, আমি যেনো পথের মধ্যে আবার পড়ে না থাকি। আর সেটা হল, দশ লক্ষ টাকার একটা ব্যবসা। যার পরিচালনায় থাকবে আমার জ্ঞান দানকারী কুচক্রিকারিনি আর আমি থাকবো তার পাশে। তোমার যখন খুশি আসবে আমার কাছে কিন্তু দেহে দেহে আনন্দ হবে আমার কুচক্রিকারিনীর সাথে। আমাকে আমার জ্ঞান দানকারী কুচক্রীর প্রয়োজন এজন্য যে, সে একা নয়, তার স্বামী আছে। তার দরকার একজন উছিলার মতো মানুষ যেখানে সে নীরবে গোপনে অভিসার করে আবার নিরাপদ্র নিজ গৃহে ফিরে আসতে পারে। আর এক্ষেত্রে আমিই ছিলাম সেই নাটকের সবচেয়ে ভাল স্টেজ। এটাই ছিল তার পরিকল্পনা। আর অন্তরমুখী পরিকল্পনা ছিলো এই কুচক্রীর যে, দশ লাখ টাকা পাওয়ার পর দেখা যাবে আমরা দুইজন মিলে তোমাকে কতটুকু রাস্তায় নামাতে পারি।

তোমাকে রাস্তায় নামানোর এই মহাপরিকল্পনায় আরো অনেক জঘন্য জঘন্য মাষ্টার প্ল্যান ছিলো যা আমি কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না। আর এখানে বলতেও পারছি না। তবে কোন একদিন যদি আবার দেখা হয়, বিনোদনের জন্যে হলেও আমি তোমাকে বল্বো আর মুচকি মুচকি হাসবো। আমি জানি, তুমিও হাসবে। কারন যে মানুষটি এই কুচক্রিকারিনীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে সাহাজ্য করছে, ভবিষ্যতেও করবে বলে আশা দিয়ে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কিভাবে সে এরুপ পরিকল্পনা করতে পারে এটা আমার মাথাতেই আসছিলো না। কিন্তু তুমি তোমার অবস্থান কিভাবে সামাল দিবে সেটা তোমার ব্যাপার বলে আমি আসলেই গভীরভাবে এ ব্যাপারটা নিয়ে কখনো ভাবি নাই। কিন্তু একটা জিনিষ আমি অনেক পড়ে বুঝেছিলাম যে, তুমি বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক, এই কুচক্রীর অবস্থানটা ঠিক ধরতে পেরেছিলে। তুমি ধরতে পেরেছিলে, কে কিভাবে কোন খেলাটা খেলে যাচ্ছে, কিন্তু তোমার কাছে দরকার ছিলো অকাট্য প্রমানের।

যাই হোক, সম্ভবত সেটাই ছিল আমার আর তোমার মধ্যে সর্বশেষ কথাবার্তা যেখানে আমি বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক এই প্রথম তোমার কাছ থেকে দশ লাখ টাকার একটা ব্যবসা চেয়েছিলাম আমার ফিরে আসার শর্তসরুপ। কারন এভাবেই আমার কুচক্রিকারিনি আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল। তুমি সমস্ত কিছু বিচার বিবেচনা করে, আমার ভালো মন্দ বিচার করে, আমাকে যুক্তির সাথে এমন করে বুঝিয়ে দিলে যে, তুমি যদি আমাকে ব্যবসার জন্য দশ লাখ টাকা দিতেও চাও, সেটা হবে একটা ভুল পরিকল্পনা। না হবে ব্যবসা, না হবে জীবন গড়া, না হবে সমাজে সুস্থভাবে বেচে থাকা, আর না থাকবে এই মুলধন অবশিষ্ট। আসলে তুমিই ঠিক ছিলে, আমি ছিলাম একটা ভুলের মধ্যে, একটা অভিশপ্ত মানুষের দ্বারা পরিচালিত। কারন সেদিন তুমি আমাকে যেসব তথ্য আর উপাত্ত দিয়েছিলে, তা আমি শত চেষ্টা করেও আমার আপাত শুভাকাংখী কুচক্রির কাছ থেকে জানতে পারি নাই যদিও সেটা আমার জানার অধিকার ছিলো। বারবার সে আমাকে সব কিছু লুকিয়ে গিয়েছিলো যা সে পাচ্ছিল আর অন্যদিকে আমাকে দিয়ে আরো কিছু বেশি পাওয়া যায় কিনা তার চেষ্টা সে সর্বাত্তকভাবে পরিকল্পনায় লিপ্ত ছিলো। আমি তার কোনো কিছুই বুঝতে পারি নাই। তুমি আমাকে ব্যবসা দিতে রাজি হলে না। ব্যবসার পরিকল্পনা ভেস্তে গেলো, সম্ভবত আমিও এই প্রথমবার মনে হলো, তুমি কাজটা ঠিকই করেছো আমাকে ব্যবসাটা না দিয়ে। কারন ব্যবসার কোনো কিছুই আমি বুঝি না। তাও আবার অন্যের ঘাড়ে নির্ভর করে তোমার দেয়া আমার টাকার উপর অন্যের হাতে ব্যবসা।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়, হটাত একদিন আমার নতুন সম্পর্কের কথা আসে। ছেলে সুদুর বিদেশের মাটিতে সেটেল্ড। আমার প্রত্যাশার বাইরে এমন একটি সম্পর্ক। ছেলেটি অনেক উচ্চমানের পজিশনে থাকা স্বশিক্ষিত এবং ভদ্র সমাজে উপস্থাপন করার মতো একটি প্রপোজাল বটে। আমার বাবা, আমার মা অতিশয় যেনো খুশি। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না, কিভাবে এই সমন্ধটা একেবারে ঘরের কাছে নিজের চৌকাঠ পার হয়ে আমার অবধি নাগাল পেলো। আর কিভাবেই বা আমার পরিবার এই খরচ সংকুলান করবে যেখানে এক লাখ টাকা একত্রে বের করতেই আমার পরিবার হিমশিম খায়।

বুঝলাম, এবারেও আমার সেই তুমি। রাগ হয়েছিলো অনেক বটে যে, আর ফিরে যাওয়া হল না আমার। কিন্তু এবার ফিরে যাচ্ছি আরেক নতুন জীবনে। চোখের অন্তরালে চলে গেলেও তুমি থাকবে আমার চোখের মনিতে। এই তো আর বেশী দিন নাই। আমার যাওয়ার সময় হয়েই এলো। মিস করবো না কারন সারাক্ষন তুমি আমার আত্তার মধ্যেই আছো।

অনেক কিছুই আর আগের মতো নাই। কিন্তু বারবার মনে পড়ে সেই দিনগুলির কথা। খুব মনে পড়ে তোমাকে। মনে পড়ে অলস দুপুরে শুয়ে শুয়ে তোমাকে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় দেখা। মনে পড়ে বিড়ালের বাচ্চার মতো ঘুর ঘুর করে তোমার পিছন পিছন চলা। আমি জানি, আমি এখনো আছি তোমার সেই বিশাল প্রশস্থ বুকের কোনো এক গভীরে। আমি এটাও জানি, তুমি আজিবন থাকবে যেমন আমি আছি। হয়তো আমাদের শুধু জায়গাটা পরিবর্তন হয়েছে বটে কিন্তু এখন আমি আর সেই কুচক্রীর থাবানলের মধ্যে নাই যে চেয়েছিল তোমার ধংশ। আর এখন সে নিজেই ধংশ হয়েছে চিরতরে। হায়েনারা সব সময় অন্যের শিকারকেই খায়, নিজেরা কোনো শিকার করে না। এরা হায়েনা। তবে মানুষরুপী হায়েনারা আবার খাবারের তালিকায় যেমন মানুষ রাখে, তেমনি রাখে অন্যের সঞ্চয়পত্র, অন্যের গাড়ি, অন্যের টাকায় জন্মদিন পালন, অন্যের টাকায় গহনা বানানোর লোভ, অন্যের ফার্নিচার বিক্রির টাকায় লোভ, ছলেবলে কৌশলে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে ব্যবসা নেয়া কিংবা দশ বিশ ত্রিশ লাখ টাকার চাহিদা, আবার কখনো কখন আধুনিক কালের ডিজিটাল ব্যবসার মালিকানা থেকে শুরু করে পশু ছাগল ভেরার খামারেও এদের লোভ কম নয়। কিন্তু যতটুকু জানি, শেষ অবধি এদের ভাগ্যে কিছুই জোটে না, না স্বামী সুখ, না সংসারের সুখ, না মা হবার সুখ না সমাজে বাহাদুরী করার সুখ। এরা যুগে যুগে ঠকবেই কিন্তু কখনো বুঝবে না যে, এরা ঠকাতে গিয়েই ঠকে। এরা জীবনেও সুখি হয় না।

তবে এখনো হায়েনাটা মাঝে মাঝে কাছে ঘেষার চেষ্টা করে। আমি এবার তার সব বানানোর কথার অর্থ বুঝি। আমি এটাও বুঝি কোনটা সে সত্য বলছে আর কোনটা  মিথ্যা। যে কথাটি সে বলছে, আসলে সেটাই মিথ্যা। আর যেটা বলছে না, সেতাই সত্য কিন্তু গোপন করছে। কিন্তু আমি এবার সাবধান।    

৩০/০৩/২০২০-যেদিন চলে আসবো-২

যেদিন আমি চলে আসবো বলে মনোস্থির করেছিলাম, সেদিন শ্রাবনের রাত্রি ছিলো না। কিন্তু আমার দুই চোখে ছিলো থমথমে মেঘের আভা। আমি আকাশ দেখি নাই সেই রাতে কিন্তু বুঝেছিলাম, হয়তো আকাশে একটি তারাও নাই। প্রখর ইলেক্ট্রিক লাইটে আমার মনে হচ্ছিলো আমার শরীর-মন একটি অন্ধকার ঘরের মধ্যে বন্ধী। আমার চারিপাশে কোথাও কেউ নাই। শরীরের তাপমাত্রা জরের সমান কিন্তু জর ছিলো কিনা বুঝি নাই। আমি মৃত মানুষের মতো একপাশ হয়ে সারাটা রাত কাটিয়ে দিলাম। সকাল হলেই আমি চলে যাবো আমার এই চেনা পরিচিত ঘর থেকে। এই ঘরের প্রতিটি কনা, প্রতিটি আচর আমার চেনা। ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে, আগামিকাল থেকে আমি আর এই ঘরটিতে কখনো ফিরে আসবো না। ভাবতেই আমার হৃদস্পন্দন যেনো থেমে গেলো, চোখ মুদে গেলো। মনে হলো, আমার দুটি নয়ন সমস্ত রুদ্ধ প্রীতি তোমার প্রতি সিঞ্চন করে বারবার অশ্রুপাত করছে।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, জানি না। ভোর হতে না হতেই ঘরের বাইরে কে যেনো টোকা দিলো। এতো সকালে আজ পর্যন্ত কেউ আমার এই একা ঘরে টোকা দেয় নাই। শরীরটা বড্ড ভারী মনে হচ্ছিলো। প্রচন্ড এক আলস্য নিয়া দরজা খুলতে পৃথিবীর সমস্ত অবাক করার বিষয়ের মতো আমাকে তুমি হতবাক করে দিয়েছিলে। প্রকাশ্য দিবালোকে তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে। কোনো আগামবার্তা নাই, কোনো কথা নাই, কিছুই না। তুমি এতো সকালে এসে আমার ঘরের দরজায় হাজির।

এমনিতেই শরীরে বল ছিলো না, তারমধ্যে অকস্মাৎ তুমি। আমার সারাটা শরীর কেপে কেপে উঠেছিলো, কিছুটা ভয়ে, কিছুটা কষ্টে আর এতোটাই বেদনায় যে, আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে, আমি তোমার বুকে একদম মিশে গেলাম, আমার সেই চেনা পরিচিত প্রশস্থ ভালোবাসার বুক। আমি হারিয়ে ফেলবো হয়তো আর কিছুক্ষন পর। তুমি আমাকে কতো আদরের সাথে জড়িয়ে ধরে কতই না আদর করলে। আমার বুকভরা অভিমান, আমার চোখভরা অশ্রু আর দুর্বল শরীরের কাপুনিতে তুমি কিছুই বুঝতে পারলে না, আমি হারিয়ে যাচ্ছি। শুধু, বললে, 'আমি আছি তো, ভয় পেও না'। হ্যা, তুমিই ঠিক, তুমি আছো, আমার সারাটা জীবনেই তুমি আছো, অন্তর জুড়ে আছ, মন জুড়ে আছো, আমার ভাবনায় আছো, আমার রক্তের প্রতিটা শিরায় আছো। দেহের সাথে মিশে থাকার নামই শুধু ভালোবাসা নয়, হাতে হাত ধরে একসাথে রাস্তা পার হওয়াই এক সাথে নয়, আমার প্রতিটি কল্পনায় তুমি ছায়ার মতো আছো। যেখানে তাকাই, আমি সব জায়গায় তোমাকে দেখতে পাই। হ্যা, তুমি আছো, ছিলে আর থাকবেও। তুমি ছিলে আমার বাবার ভুমিকায়, ছিলে আমার ভাইয়ের ভুমিকায়, ছিলে আমার মায়ের ভুমিকায়, তুমি ছিলে আমার প্রেমিক আর নির্ভরতার সবচেয়ে কাছের মানুষটি। আজো তাইই আছো।

তুমি শেষবারের মতো আমাকে বুকে নিয়া, কপালে, মুখে, নাকে, চোখে, সব জায়গায় আদর দিয়ে কিছুক্ষন পর অবশেষে চলে গেলে। আমি যতদূর দেখা যায়, জানালা দিয়ে এই প্রথম তোমার যাওয়াটা দেখলাম। চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলাম না। আর হয়তো কখনো তোমার সাথে আমার দেখা হবে না। তুমি এই সত্যটা না জেনেই সমস্ত ভরষা আর ভালোবাস নিয়েই অন্য দিনের মতো চলে গেলে। তুমি জানলেই না , কি রয়ে গেলো আর কি নিয়ে গেলে আর আমিই বা কি করে এটা করলাম। সারাটা দিন আমি কেদেছিলাম। সেদিন আর আমার যাওয়া হলো না।

কিন্তু বুকভরা অভিমান নিয়ে আমি পরদিন কাউকে কিছু না বলে অতিভোরে আমার চেনা পরিচিত ঘরটি ছেড়ে শেষ পর্যন্ত বেরই হয়ে গেলাম। এ খবরটি জানলো শুধু আমার সেই কুচক্রীকারিনী বন্ধুটি আর জানেন আমার ঈশ্বর। কিসের নেশায় যে আমি এতোটা দিকহারা হয়ে গিয়েছিলাম, আজো আমি মনে মনে ভাবি। আমার কেনো একবারের জন্যেও মনে হয় নাই যে, এই কালো মুখোশধারী সর্পহরিনীর সাথে আমার বিস্তর একটা ফারাক ছিল। তার স্বামী ছিল্‌ তার সংসার ছিল। সে তো এসেছিল অভিসার করতে, সে তো এসেছিল গোপন মিশনে। তার তো হারাবার কিছু ছিল না। যদি তার মিশন সার্থক না হয়, সে তো ফিরেই যাবে তার সেই চেনাগৃহে যেখানে অপেক্ষা না করে থাকলেও সামাজিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে নিষ্পাপ অথবা আরেক অভিচারী ব্যভিচারক পুরুষ। তাদের মধ্যে ভালোবাসা থাকুক আর নাই বা থাকুক, সেটা কোন মাপকাঠি নয়। তাদের মাপকাঠি সামাজিক একটা বন্ধনে তারা আবদ্ধ। আর এই সামাজিক বন্ধনের কারনেই আমার কুচক্রীকারিনি আজ এই গোপন অভিসারে এসেও ফিরে যেতে পারে নিজ গৃহে। কিন্তু আমি তো ব্যভিচারী ছিলাম না!! আমি তো আমার জায়গাতেই ছিলাম! এই কুচক্রীকারিনী এসেছিলো সদাই করতে, যৌবনের সদাই, ভালোবাসার অভিনয়ের সদাই। আমি কেনো তার কুপরামর্শে আমার সংসার ছাড়লাম? কখনো কি তোমার এ কথাটা মনে হয় নাই যে, যে মহিলা-প্রজাতী তার নিজের স্বামীর অগোচরে নিজের দেহের সদাই করতে কোনো এক অপরিচিতের বাসায় নির্বিঘ্নে পর পুরুষের সাথে নির্ভয়ে আসতে পারে, তার কাছে আবার ভালবাসার মুল্য কি? তোমার কি কখনো মনে হয় নাই, যে, এটাই হয়তো তার প্রথম সদাই নয়? কি করে তুমি ভাবলে যে, সে এই সদাই করতে এসেছে শুধুমাত্র ভালোবাসার কারনে? সে না বুঝে ভালোবাসা, না বুঝে ভালোবাসার কষ্ট। সে শুধু বুঝে তার এই অমুল্য মেয়েলী সম্পদ শুধু লালসার কারনে ভোগ বিলাসের একটা যন্ত্র বিশেষ প্ন্য বটে। আর কিছু না। বেশ্যাদের জীবনের প্রয়োজনে হয়ত বেশ্যাগিরি করতে হয়, এটা অনেকেই করলেও মনে মনে ঘৃণা করে। তারপরেও জীবনের এটা ধরেই নেয়া যেতে পারে যে, সেটা যতোটা না পাপ, তার থেকে বেশি জীবনের প্রয়োজনে বেচে থাকার একটা পথ। কিন্তু এই কুচক্রিকারিনী তো জানতো যে, তাকে দেহ দান করতে হবে, তাকে সব কিছু উজার করে দিতে হবে, কিন্তু তার তো জিবিকার জন্য এইকাজ করার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। এর মানে একটাই, সে প্রফেশনাল। আমি এই প্রফেশনাল কুচক্রির কাছে প্রতিনিয়ত হেরে গিয়েছিলাম কিন্তু নষ্ট হয়ে যাইনি।

৩০/০৩/২০২০-যেদিন চলে আসবো-১

আজ আমার যাওয়ার দিন প্রায় হয়ে গেলো। আমি চলে যাচ্ছি চিরতরে অন্যখানে। সামনে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে আর কি আছে আমি জানিনা। আগে যেমন সন্ধ্যা হলেই অস্থির চিত্তে সন্ধ্যাতারা দেখতাম, পূর্নিমা এলে খোলা হাওয়ায় বসে পুর্ব দিগন্তে বিশাল চাকতির মতো চাদকে দেখতাম, শীতের সকালে শরীরে কাথা মুড়ি দিয়া অগোছালো সপ্নে বিভোর থাকতাম কিংবা বর্ষার রিমঝিম ব্রিষ্টিতে গুনগুন করে একা একাই গান গাইতাম। আজ হতে আর কয়েকদিনের মধ্যে এসব আর আমার হয়ে থাকবে কিনা আমি জানি না। হয়তো ব্যস্ত হয়ে যাবো সংসারের বৈষয়িক কাজে, স্বামীর সেবা শুস্রশায় আর নিজের কিছু একান্ত বেদনাবোধ নিয়ে। তাই আজ এই যাওয়ার সময় আমার বারবার একটা মুখ আমার মানসপটে ভেসে আসছে। আর মনের অজান্তেই দুমড়ে মুচড়ে আসছে একটা কষ্টের অভিজ্ঞতা। বড় কষ্ট হচ্ছে আজ আমার এই ভেবে যে, তোমাকে আমি কষ্ট দিয়েছি। তুমি হয়তো জানলেই না কি কষ্ট আমি নিয়ে আমিও চলে গেলাম, আর আমিও হয়তো শতভাগ জানতে পারলাম না, কি কষ্ট আমি তোমাকে দিয়ে গেলাম। অপমান আর অবসাদে অবনত হয়ে আজ যাওয়ার সময় আমি তোমাকে আমার কিছু অব্যক্ত কথা এই ভাসমান মন্ডলে, ভার্চুয়াল জগতে রেখে গেলাম। যদি কখনো তোমার গোচরে আসে, যদি কখনো আমার কথা ভেবে তোমার চোখ ভিজে আসে, যদি কখনো আমার জন্য আর এতটুকু ভালোবাসা, মহব্বত আর স্নেহ জেগে থাকে, তাহলে শুধু এটুকু অনুরোধ করবো, তুমি আমাকে ভুলে যেও না। আমি ছোট ছিলাম, আমার অভিমান ছিলো, তাই অধিকার নিয়েই না বুঝে সীমার বাইরে গিয়ে এতোটাই পাগলামী করেছিলাম যা আজ কষ্টে আর অভিমানে ভরে আছে সারাটা অন্তর। কিন্তু এর পিছনে না ছিলো আমার বড় ধরনের কোনো ফাকি, না ছিলো তোমার বড় ধরনের কোনো কুট কৌশলতা। বাস্তবিক পক্ষে আমাদের এই অভিমানকে কেউ তার লালসা দিয়ে পুজি করেছিল, যা আমিও বুঝি নাই, তুমিও না।

চারটি বছর আমি তোমার সাথে ছিলাম। আমি এই চারটি বছরের প্রতিটি মূহুর্তের সময়টুকু বিচার বিশ্লেষন করে দেখেছি, জলের সাথে মাছের যে সম্পর্ক, আমার সাথে তোমার ছিলো সে রকমের একটা সম্পর্ক। আমার প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি নিঃশ্বাস বলে দেয়, আমি ছিলাম তোমার প্রতিটি চিন্তায়, এমন কি অবচেতন মনেও। আমার কোনো কিছুর অভাব ছিলো না, তুমি কোনো কিছুর অভাব রাখোনি। কোনটা সম্পদ আর কোনটা সম্পত্তি, কোনটা আমার আর কোনটা তোমার এই তর্কে আমার কখনোই যাবার যেমন দরকার ছিলো না, তেমনি ছিলো না এসব ব্যাপারে আমার কোন আলাদা হিসাব। তুমি ছিলে আমার ব্যাপারে সদাচিন্তিত, কি করলে আমার ভালো হবে, কি না করলে আমার ক্ষতি হবে। আমার ব্যাপারে আমাকে আর আলাদা করে কখনো ভাবার প্রয়োজন ছিলো না আর থাকলেও আমি এসব নিয়া চিন্তা করলেও কোনো লাভ হতনা। আমি ছিলাম গভীর সুখের ছায়াতলে তোমার সুগভীর সহিষ্ণুতার আবরনে। ফলে, কোনোদিন শোনোনি আমি তোমার কাছে কখনো সম্পদ চেয়েছি, কিংবা আমি তোমার সম্পদের পাগল ছিলাম। আমাকে তুমি আদর দিয়েছো, ভালোবাসা দিয়েছো, আর যখন যা লাগে চাওয়ার আগেই তুমি তা দিয়েছো। আমি সুখি এবং খুসি ছিলাম। আমার কোনো কিছুতেই লোভ ছিলো না।

তুমি ছিলে আমার জীবনের রুপকার, আমি জানি, তোমার অন্তরের ভাষা। কিন্তু আমি সেদিন তোমার মুখের ভাষার যে রূপ দেখেছিলাম, তা আমার কখনো দেখা হয় নাই। তোমার রাগ, তোমার চাহনী আর তোমার অভিব্যক্তি আমাকে উদ্বেল করে দিয়েছিল। এই নতুন রূপ আমার আগে কখনো দেখা হয় নাই। তুমি বারবার আমাকে সম্পদ, সঞ্চয়পত্র, সোনার গহনা, ব্যবসা, চাকুরী ইত্যাদির কথা এমনভাবে প্রশ্ন করতেছিলে, যা না ছিলো আমার মনে, না ছিলো আমার মস্তিষ্কে। আমি সঞ্চয়পত্র কি, এর লাভ কি, এর দ্বারা কি করা যায়, আমার কিছুই জানা ছিলো না। তুমিই আমাকে প্রথম সঞ্চয়পত্রের ধারনা দিয়েছো। অথচ কোনো একদিন, আমারই হয়ে আমারই মোবাইল থেকে আমারই জন্যে আমি নাকি তোমাকে আমার অধিক নিরাপত্তার জন্য তোমার কাছে সঞ্চয়পত্র কেনার বায়না করেছি। তুমি একবার ভাবোতো, আমি কি এতোটাই মানসিক রোগী হয়ে গিয়েছিলাম যে, গুটিকতক নোটের জন্য আমি আমার সারা জীবনের নিরাপত্তা আর ভালোবাসার মানুষটিকে চিরতরে হারাবো? এটা ছিলো একটা মানুষের নিম্ন মানসিকতার সর্বোচ্চ উদাহরন যেখানে ষড়যন্ত্রকারীর দুষ্টু বুদ্ধির একটামাত্র বিষের ফল। তোমার এই ষড়যন্ত্রকারিনীর নাম তুমি হয়তো এখন জানো। সে ভালোবাসার অভিনয় করে ঘরে ঢোকেছিল, কিন্তু সে না নিজেকে ভালোবেসেছিলো, না আমার এই সম্পর্ককে। আর না সে তোমাকে ভালোবেসেছিলো। ধরে নাও, আমি তার নাম দিলাম 'কুচক্রকারিনী' অথবা 'ষড়যন্ত্রকারিনী'।

হ্যা, আজ একটা জিনিষ আমি বুঝতে পারছি যে, এই বিশাল সময়ের ব্যবধানে সবার যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিমান জমতে পারে, আবার কখনো কখনো সেই অভিমান সময়ের স্রোতে রাগেও পর্যবসিত হতে পারে। আমি বুঝতে পারিনি, এই ছোট হৃদয়ে আমার কখন যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিমানগুলি বিচ্ছিন্ন রাগে পরিনত হয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিলো নিতান্তই একটা সাময়িক। কিন্তু আমি বুঝিতেই পারিনি যে, 'সমুদ্রের পানিতে নামিয়া তীরের বনরাজীমালাকে যেমন রমনীয় চিত্রবত মনে হয়, সমুদ্র থেকে তীরে উঠিয়া তা আর আগের মতো মনে হয় না' ঠিক তেমনি, আমিও সেই ষড়যন্ত্রকারিণিকে কাছে পেয়ে ভেন্টিলেশনের একটা পথ খুজে পেয়েছি মনে করে যখন আমি আমার সমস্ত রাগ অভিমান ঐ পথ দিয়ে নিষ্কৃতি করলাম, তখন বুঝলাম, রাগের মাথায় আমি যা বলেছিলাম, আমার সেই অভিমান আমার সামনে অভিনয়কারী সেই ষড়যন্ত্রকারীনির কারনে এখন আমার বিপদ হয়েছে। আমি ঘর ছেড়েছি, আমি তোমাকে ছেড়েছি। এই ষড়যন্ত্রকারিনী আমাকে ঘর থেকে পথে নামিয়ে একেবারে খাদের প্রান্তে নিয়ে এসেছে। কিন্তু আমার যখন হুশ ফিরেছে, আমি যখন আবার ফিরতে চেয়েছি, তখন আর আমার ফিরে যাওয়ার উপায় ছিলো না। আমি ঘরহারা হয়ে রাস্তার দুইধার ধার দিয়া আমার সেই অগোছালো অপরিচ্ছন্ন পুরানো বাসভুমেই আবার ফিরে আসা ছাড়া কোনো পথ খোলা ছিলো না। যখন আমি আমার সেই অতি পরিচিত কিন্তু আবার অতি অপরিচিত আবাসভুমে ফিরে এলাম, তখন বুঝলাম, ষড়যন্ত্রকারিনী তার সার্থ সিদ্ধির যা যা করার তা তাই করে সার্থক হয়ে গেলো, আমি শুধু কোনো এক অচেনা খাদের মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।

আমি একা একা ধলেশ্বরী নদীর ধারে বসে সুর্যাস্তের সর্নছায়া দেখতে দেখতে, কখন যে আমার চোখ ভিজে আসতো, আমি বুঝতে পারতাম না। জনশুন্য ধলেশরীর তীরে দিগন্ত প্রসারিত ধুধু বালুকাময় তীর আমাকে ভয়ংকর পথের দিকে ইশারা দিতো। নিস্তব্দতা যখন নিবিড় হয়, তখন কেবল একটা সীমাহীন দিশাহীন শুভ্রতা এবং শুন্যতা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। আমার বেলায় যেনো এটা একেবারে বাস্তব হয়ে চোখের সামনে ধরা দিলো।

আজ একটা কথা বলি, এই প্রিথিবীতে যারা আপন হয়ে ঘরে ঢোকে, তারা সবসময় আপন হয়েই বের হয় না। কখনো কখনো তারা আপন হবার ভান করে কিন্তু হায়েনা হয়ে ঢোকে। তাদের সুপ্ত বাসনাই থাকে অন্যের ক্ষতি করা। আমার বেলায় এই "আপন" ভেবে যাকে বুকে নিয়েছিলাম, সেই আসলে ছিলো আমার মরনের খলনায়ক। কারন, আমার জানা ছিলো না যে, আমি যাকে আপন মনে করে আমার মনের যে কিছু ক্ষোভ ছিলো তাকে বলার পর সেই ক্ষোভ যে আবার আমাকেই দংশন করবে। আমি ছোট ছিলাম, আমার মনের কথাগুলি বলার কোন লোক ছিলো না, তাই, অতীব আপন মনে করে আমি এই সেই কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারিনিকে এমনভাবে শেয়ার করেছিলাম যাতে আমার মন কিছুটা হালকা হয়। আর এই সেই কুচক্রীকারিনী তোমার কাছে আমার মনের কষ্টগুলি এমনভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে উপস্থাপন করেছিলো যা তোমাকে আমার থেকে আর আমাকে তোমার থেকে যোজন দূরে এক ঝরের গতিতে ছিটকিয়ে ফেলেছিলো। ঈশ্বর বড় সহায় যে, তোমার অন্তর আর দশটি মানুষের মতো ছিলো না। তাই, অন্তত আমি আজ মাটিবিহীন নই। কোথাও না কোথাও আমাকে তিনি ঠাই করে দিচ্ছেন। আর তার রুপকার আবারো ছিলে সেই তুমি।  

আমার জীবনের সব কাহিনী তুমি জানতে। হয়তো সেই অবহেলার কাহিনী, সেই অনাদরের কাহিনী জেনেই তুমি আমাকে আরো বেশী করে আদর করতে, আমি তোমার আদর বুঝতাম। তারপরেও আমি তোমাকে কিছু কিছু জায়গায় হয়তো ভয় পেতাম। আর এটা কোনো অমুলক ভয় ছিলো না। তোমার মতো পাহাড় সমান ব্যক্তিত্তের কাছে আমি ছিলাম অতি নগন্য। আমার এই ছোট জীবনে কখনো তুমি কেনো, তোমার থেকে অর্ধেক ব্যক্তিত্ত সম্পন্ন লোকেরও কোনোদিন দেখা হয় নাই। একদিকে তোমার পজিশন, তোমার প্রতিপত্তি, তোমার ক্ষমতা আবার অন্যদিকে আমি তোমার সেই ছোট পুতুলের মতো একটা বিড়ালসম, ভয় তো হবেই। অনেক কিছুই হয়ত ভয়ে আমি তোমাকে খোলামেলা করে বলার সাহস পাই নাই। কিন্তু আমার কখনো তোমার উপর ঘেন্না হয় নাই, তবে অভিমান হয়েছে অনেক। এই অভিমানটাকেই আমার আপাত আপন কুচক্রী মানুষটি আমাকে সমুদ্রের তলদেশে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলো।

কুচক্রি মানুষ যখন কাউকে আকড়ে ধরে, তাকে সর্বোপ্রথম আক্রমন করে তার অন্তরে, তার হৃদয়ে, তার যুক্তিক ব্যবহারে তখন অনেক কিছুই অবাস্তব মনে হলেও যুক্তির মতো মনে হয়। এই কুচক্রীর কথায় আমি যেনো বারবার নিজেকে বোকাই মনে করেছিলাম। তার এই কথার যুক্তি ধরে আমারো এক সময় মনে হয়েছিল, আসলেই আমি কি পেয়েছি এ যাবত? সব কিছুই তো বিলিয়ে দিয়েছিলাম অকাতরে। তাহলে দেয়ার সাথে পাওয়ার কেমন যেনো একটা অসামঞ্জস্যই মনে হচ্ছিলো। শয়তান যখন ভর করে, তখন নীতি পালিয়ে যায়, আর দিধা ভর করে। হয়তো আমারো তাইই হয়েছিলো। শয়তান আমাকে অতি কাছ থেকে বারবার প্রলোভন দেখিয়ে আমার সমস্ত মনকে বিষিয়ে দিয়েছিলো। তখন আমাকে ভর করে এই কুচক্রিকারিনী একের পর এক তার হীনসার্থ চরিতার্থ করার জন্য কতই না পরিকল্পনা আটছিলো। লাখ লাখ টাকার সপ্নে সে ছিলো বিভোর। আর তার সাথে ছিলো একটা অভিনয়। একদিকে সে আমাকে কুড়েকুড়ে খাচ্ছিল আর আমাকে গুটির চালের মতো ব্যবহার করছিলো, অন্যদিকে সে তোমাকে একটা মিথ্যা ফেস প্রদর্শন করে এমনভাবে জালটা বিছিয়েছিলো যে, না তুমি ওকে বুঝতে পারছিলে, না আমি। অথচ আমাদের দুইজনের ভিতরে চলছিলো তখন মহাপ্রলয়ের মতো ঝড় আর কষ্ট। এই কুচক্রিকারিনী আমাকে একের পর এক তার বানানো পরিকল্পনা দিয়েই যাচ্ছে, আর সেই পরিকল্পনার অগ্রীম তথ্য তোমাকে দিয়ে সে আমাকে তোমার কাছে অমানুষের মতো চেহাড়াটা দেখিয়ে তোমার কাছে ভাল মনিষী সাজবার চেষ্টা করছে। অথচ সেই ছিলো পুরু পরিকল্পনার মাষ্টারমাইন্ড। অগ্রীম পরিকল্পনা একদিকে আভাষ, অন্যদিকে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখে তোমার এতাই মনে হ ওয়ার কথা, যে, কু চক্রী তোমাকে ভালো উপদেশ, বা তথ্য দুটুই দিচ্ছে। এহেনো পরিস্থিতিতে তার উপর তোমার ভরষা হবারই কথা। আর এর প্রধান উদ্দেশ্যই ছিলো তার, আমি চিরতরে তোমার কাছ থেকে বহিষ্কৃত হই আর সে আমার স্থানটা চিরতরে দখল করে বাকি জীবনটা আরাম আয়েশে কাটায়। ফলে সেই সঞ্চয়পত্র, সেই ২০ লাখ টাকা, সেই গাড়ির কাহিনি, সেই দোকান কেনার কাহিনী, সেই ফার্নিচার বিক্রির কাহিনী, আমার নতুন জব, খালা বুয়াদের কাছ থেকে আমার নিথ্যা আয়, আমার গোপন মিথ্যা প্রেমের উপখ্যান, ওর জন্মদিনের উপহার দেবার দাবী ইত্যাদি সবই ছিলো একটা জাল। একটা বড় পরিকল্পনার অংশ।

আমার ব্যাপারে তুমি নতুন কিছু তথ্য যা তোমাকে আমার জানানোর দরকার ছিলো বই কি কিন্তু আমার মনে হয় নাই যে, এইসব ছোট খাটো তথ্য যা আসলেই কোন কাজের তথ্য নয়, সেগুলি জানানোর দরকার। ফলে আমার এই ছোট খাটো তথ্য কুচক্রিকারিনী এমনভাবে তোমার কাছে উপস্থাপন করেছিলো যে, আমি আর তোমার বাধ্যগত ভালোবাসার মানুষটি যেনো আর নই। সব কিছু দেবার পরেও যখন তুমি জানতে পারলে যে, আমি তোমার অনুমতি ব্যতিত শুধুমাত্র টাকার লোভে অন্যত্র চাকুরী করি, কিংবা তোমা ব্যতিত আমার আরো অনেক ভালবাসার মানুষ আমার সদর দরজায় ভীড় করে, অথবা তোমার অজানা সত্তেও আমি আমার কাজের মেয়ের কাছ থেকে তার থাকা খাওয়ার খরচ হিসাবে বাড়তি পয়সা নেই যা তুমি বারন করেছিলে, এসব জানার পরে কার না মাথা খারাপ হবে? তোমারও তাই হয়েছিলো বলে সেদিন আমি তোমার রাগের যে চেহারাটা দেখেছিলাম, তা আজো আমি ভুলি নাই। তোমার রাগ হবার শতভাগ যুক্তি ছিলো, যেটা আজ আমি বুঝি। কিন্তু বিশ্বাস করো, এসবই ছিলো মিথ্যা একটা বানোয়াট কাহিনী। আমি কখনো টাকার জন্য কোথাও চাকুরী করি নাই, আমার জন্য বরাদ্ধ কাজের বুয়া থেকেও আমি তার খাওয়া থাকার ভাড়া হিসাবে কোনো টাকা পয়সা গ্রহন করি নাই, কিংবা আমার সতীত্তের দোহাই দিয়েই আজ আমি জোর গলায় বলতে পারি, তুমি ছাড়া আমার জীবনে আর কোনো দ্বিতীয় পুরুষের কখনো আগমন ছিলো না, আর হয়ও নাই। এ সবই ছিলো ঐ কুচক্রিকারিনীর বানানো সব বানোয়াট গল্পের একটা কল্পকাহিনী। সবচেয়ে বড় যে বানোয়াট কাহিনী তুমি জেনেছো, যে, আমি আমার সময়ে আমার যা করার কথা তা না করে সারাদিন উলটাপালটা কাজেই যেনো মনোনিবেশ করে থাকি। তুমি পুরুষ মানুষ, তোমার এহেন তথ্যে আমার উপর আস্থা হারানোই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি না পারছিলাম তোমাকে কিছু বুঝাতে, না পারছিলাম, আমাকে সামাল দিতে। জীবনের প্রতি আমার একটা সময় বিতৃষ্ণা চলে এসেছিলো। মনে হয়েছিলো, আমার আর একদন্ডও তোমার ভালবাসার কাছে কোন স্থান নাই। মানুষ যখন আস্থাহিনতায় ভোগে, তখন তার কোনো হিতাহীত জ্ঞান থাকে না। তখন দরকার হয় একজন মানুষের সাপোর্ট। অথচ আমার ভাগ্যটা এমন যে, কুচক্রিকারিনী কালনাগিনীকেই আমি আমার আস্থা দিয়ে বসেছিলাম। সেই কালনাগিনীকেই আমার মনে হয়েছিলো আমার আস্থার জায়গাটা। একদিকে তুমি আমার উপর প্রবল রেগেছিলে, অন্যদিকে তুমি আমার কোনো কথাই শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলে না। তাহলে আমার বিকল্প কি ছিলো? বিকল্প ছিলো একটা- কোথাও হারিয়ে যাওয়া চিরতরে। আর আমি এই কুচক্রীর উপদেশেই একদিন কিছুই না বলে সত্যি সত্যি হারিয়ে গেলাম। আমাকে বাসা বদলের পরিকল্পনা, যোগযোগের নিমিত্তে ফোন নাম্বার পরিবর্তন করার পরিকল্পনা এবং তোমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাষ্টারপ্ল্যান তো ছিলো এই কুচক্রীরই। আমি তোমার উপর রাগে অভিমানে জিদ ধরেছিলাম, আর সেই রাগ আর অভিমানকে পুজি করে এই মানুষরুপি শয়তান তোমার মন আরো বিষিয়ে তুলেছিলো। আর তুমিও আমার সেই সব সট পড়ে পড়ে যখন মন খারাপ করছিলে, আর তার প্রেক্ষাপটে খারাপ খারাপ মেসেজ করে তুমিও এই কুচক্রীকেই আপন মনে করে হয়তো কিছু রাগের কথা বলছিলে। আর এই শয়তান পুনরায় আমাকে তোমার প্রতিটি মেসেজের সট পাঠিয়ে আমারো মন আরো অস্থির করে তুলেছিলো। আমি তো তোমাকে চিনি। তোমার সারাটা শরীর জুড়ে থাকে কলিজা, সেই মানুষটির রাগ আমার উপর ভালোবাসার তুলনায় কিছুই না। আমি জানি তোমার অন্তর আর ভিতর। হয়তো শত ভালবাসার কথার ফাকে কোনো এক কষ্টের মাঝে বেরিয়ে আসা দু একটা রাগের কথা আসতেই পারে। আর সেই রাগের অবস্থানটাই এই কুচক্রী শয়তান আমাকে এবং তোমাকে বাস্তব দেখিয়ে ভালোবাসার মর্মস্পর্সী কথাগুলি গোপন করে আমাদের দুজনের মনকেই বিষিয়ে তুলেছিলো। কিন্তু তোমার মনের অস্থিরতার কান্নার মেসেজগুলি অথবা আমার মনের কষ্টের কথাগুলির মেসেজ আমাদের কাউকেই সে প্রদান করে নাই। আমার শরীর খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছিলো, অন্যদিকে আমার বিরহে তোমার শরীরও হয়তো আরো অবনতির দিকেই যাচ্ছিল। আর এটাই হবার কথা। আমি যদি জানতাম, তোমার শরীর এতোই খারাপ হয়ে গেছে, তুমি প্রায় মরেই যাচ্ছো, আমি কি পারতাম তোমার কাছে ছুটে না যেতে? আমিও এতো কষ্টে ছিলাম যে, শুধু আত্তহত্যাটাই করি নাই।

৩১/১২/২০১৯-অরু-৫

Categories

আজ অরুর বিয়ে।

মান অভিমানের সাথে পরাস্ত অরু আজ রংগীন সাযে সাজিবে। বর আসিবে, গান বাজিবে, ছোট ছোট বালক বালিকারা নৃত্য করিবে। সবাই আনন্দে উদ্বেলিত হইবে। অথচ আজ অরুর মধ্যে কোনো প্রকারের আনন্দ নাই, না আছে কোনো অশ্রুজল। সব জল যেনো এই কয়দিনে শুকাইয়া মরুভুমি হইয়া গেছে। যেদিকেই অরু তাকায়, সেদিকে সে তাহাকে দেখিতে পায় কিন্তু কোথাও সে নাই। মরিচিকার মতো অরু যেনো শুনতে পায় তাহার ডাক, আবার পরক্ষনে চাহিয়া দেখে, তাহা তাহার ডাক নয়, হয়ত পাশের বাড়ির কোনো এক বয়ো বৃদ্ধ অরুকে আদরের সহিত কাছে ডাকিতেছে। অরুর কিছুতেই বিশ্বাস হইতেছে না, আজ হইতে তাহার নতুন কিছু শুরু হইবে। এই দেহ, এই মন, এই প্রান আর তাহার থাকিবে না। থাকিবে না তাহার জন্যেও যাহাকে অরু একদিন শপথ করিয়া বলিয়াছিল, পৃথিবীর সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করিয়া আজ অরু যেখানে দাড়াইয়ায় আছে, তাহা হইতে অরুকে কখনো পৃথক করা যাইবে না। সেদিনের সেই শপথের কথা আজো অরুর মনে পড়ে, চাদের আলোকে সাক্ষি রাখিয়া অরু নীলের দিকে তাকাইয়া অরু বলিয়াছিলো, আমি আছি , আমি নাই, আর এই আমির মধ্যে শুধু তুমি ছাড়া আর কেউ নাই। কোথায় গেলো এতো শপথ? কোথায় গেলো এতো সব আয়োজনের?

রাত হইয়া গিয়াছে। বর পক্ষ আসিয়াছে বলিয়া চারিদিকে শোরগোল শুনা যাইতেছে। কেউ কেউ গেট রক্ষার তাগিদে আর উপঢোকন পাইবার লক্ষে ছোট ছোট ছেলেমেরা কেউ কঞ্চি, কেউ বা ররেক রকমের রং এর বাহার, আবার কেউ কেউ টাকা গুছানোর রুমাল বাহির করিয়া একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করিতেছে।

বর আসিলেন, যথারীতি বিবাহ শেষ হইয়া গেলো। অরু না দেখিল তাহার নব বরকে, না বর দেখিলো নব বধুকে। অরুর কোন কিছুতেই আর কিছু বলিবার ছিলো না। অরু শুধু আরেকবার চাহিয়াছিল অরুর সমস্ত অভিমানের কথাগুলি তাহাকে আরেকবার বলিয়া সবার কাছ হইতে চিরতরে বিদায় নেওয়া। কিন্তু ইহার কিছুই আর অবশিষ্ট নাই।

অরু চলিয়া যাইতেছে বরের সাথে। পাল্কিতে করে। রাত গভীর হইয়া আসিতেছে। পালকির বাহকদের হুম, হুম শব্দে অরুর কান্নার শব্ধ শুনা যাইতেছে না বটে কিন্তু এক ছোট পাল্কির ভিতরে বসিয়া অরু আরো কিছুক্ষ ভাবিতে লাগিল, আজ তাহার সাথের বন্ধুটি যেনো কোথায় হারাইয়া গেলো। যাওয়ার সময় একটু দেখাও হইলো না। জীবনের বাকী দিন আর কখনো তাহার সহিত দেখা হইবে কিনা তাহারও কোন সম্ভাবনা নাই। হয়তো কোন একদিন এই দুনিয়া ছেড়েই এভাবে চলিয়া যাইতে হইবে। নিশিত অন্ধকারের এই রজনীতে পাল্কিতে বসিয়া অরু শুধু একটা কথাই বুঝিল, জীবনের হিসাব বড় কঠিন।

অরু বরের বাড়ি চলিয়া আসিয়াছে। বাসর ঘরের এতো আলো দেখিয়া অরুর আরো মন খারাপ হইয়া উঠিল। কথা ছিলো, এই রকমের একটি আলো ঝলমলে ঘরে তাহার সহিত অরু সারারাত গল্প করিয়া কাটাইয়া দিবে। কত কথা জমা হইয়া ছিলো। সে বলিয়া ছিলো, এই বাসর রাতে সে সহস্র আরব্য রজনীর গল্প দিয়া তাহাদের বাসর শুরু করিবে। আজ আর সেই আরব্য রজনীর গল্প বলিবার মানুষটি চিরতরে হারাইয়া গিয়াছে। কোথায় গিয়াছে, কেনো গেলো, তার হিসাব আর করিবার কোনো প্রয়োজন নাই।

দরজা খোলার শব্দ হইলো। অরুরু নতুন বর। কিছুই না বলিয়া অরুর নতুন বর ঘরের সমস্ত আলো এক ঝটিকায় নিভাইয়া দিয়া তিনি অরুকে পিছন হইতে জরাইয়া ধরিয়া কানের কাছে আসিয়া বলিল, "অরু, আরব্য রজনীর গল্প দিয়া শুরু করি আজকের এই বাসরের গল্প?"

অরু অজ্ঞান হইবার উপক্রম, তাহার কানকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছিলো না। মানে রাগে অভিমানে দুক্ষে কষ্টে, ভালবাসায়, অরু তাহার দুই হাত বরের দিকে ঝাপ্তাইয়া ধরিয়া হুহু করিয়া অবিরাম শ্রাবনের ধারার মতো কাদিয়া তাহার সেই পুরানো বন্ধুর গলা ধরিয়া শুধু কাদিতেই লাগিলো।

অরুর এই কান্না এখন আনন্দের আর ভালবাসার। এতোক্ষন যে চাপা কষ্টটা অরুর বুকে জগদ্দল পাথরের মতো বসিয়া ছিল, এখন অরুর কাছে মনে হইলো, পৃথিবী বড় সুন্দর। বড় বাচতে ইচ্ছে হয় আজীবন।

আমি তোকে ভালোবাসি।  

৩১/১২/২০১৯-অরু-৪

Categories

বুক ভরা অভিমান লইয়া অরু কাউকে কিছু না বলিয়া গত কাল অতিভোরে বাহির হইয়া গিয়াছিলো বটে। কিন্তু এখনো দিন অতিবাহিত হয় নাই, কেবল সন্ধ্যা নামিয়াছে, তাহাতেই অরুর মনে হইতে লাগিল, তাহার যেনো সব কিছু মিথ্যা হইয়া গিয়াছে। যখন অরু ঘর হইতে বাহির হইয়াছিল, তখনো জানালার বাহিরে কাঠালি গাছটার মাথার উপর ভোরের একখন্ড আভা উকি দিয়াছিল, অভিমান ছিল কানায় কানায় পূর্ন কিন্তু এখন দিনের শেষে আকাশের আলো আধারের ছায়ায় অরুর যেন অভিমানটা একটা কষ্টে পরিনত হইয়াছিল। অরুর মনে কোনো সন্ধির বিন্দুমাত্র আভাষ ছিলো। কিন্তু তাহার বুকের ভিতরে অভিমানের স্তুপ শতগুনে বাড়িয়া একটা পাহাড়ের রুপ নিয়াছিল। বড় কষ্ট, আর যন্ত্রনার এক মিছিলে অরুরু দুই গাল বাহিয়া কেবলি অশ্রু আর অশ্রুধার বহিয়া চলতেছিল। যতোই ক্ষন পার হইতেছিলো, অরু বুঝিতে পারিতেছিল, শামুকের সঙ্গে খোলসের  যেমন সম্বন্ধ, অরুর সাথে যেনো ফেলে আসা সেই মানুষটির সম্বন্ধ। অরু যেনো দেহমনে তাহার সহিত আষ্টে পিষ্টে এটে গিয়াছিল। আজ তাহার থেকে অরু বন্ধন ছিন্ন করিয়া কি এক মুক্তির জন্য যেনো উদ্দেশ্যবিহীন কোনো এক গন্তব্যে বাহির হইয়া আসিয়াছিল। কিন্তু অরু কি আসলেই কোনো মুক্তি পাইয়াছে?

অরু বারবার নিজেকে এই প্রশ্নই করিতে লাগিলো। বড্ড একা, বড় অসহায় মনে হইতে লাগিলো চারিপাশ। বিপাশা খালের পাশে একা অরু বসিয়া শুধু তাহার জীবনের এতোগুলি সময়ের হিসাব কষিয়া কিছুই মিলাইতে পারিতেছিলো না। অরুর বারবার সেই সব দিনের কথা একে একে মনে পড়িতে লাগিলো যখন তাহার জন্য পথের পানে চাহিয়া থাকিতেও ভালো লাগিত তাহার অপেক্ষায়, কিংবা তাহার সহিত এক সাথে বসিয়া ইতিহাসের গল্প শুনা, অথবা তাহার বাহুতে বসিয়া কোনো এক অনাগত আবরারের সপ্নের কথা। অরু বাকরুদ্ধ। 

অরুর প্রতি নিয়ত মনে হইতে লাগিল, আমি কি তাহার জন্য কিছুই করি নাই? আমি কি তাহাকে কনো কালেই ভালবাসি নাই? আমি কি কখনোই তাহার মনের ভিতরে ছিলাম না? যদি তাহাই হয় নাই, তাহলে এতোদিন কি ছিলো? অরু আর কিছুই ভাবিতে পারে না। সমস্ত আকাশের সন্ধাকালীন লাল মেঘ মেলাকে অরুর বড় বিষণ্ণ বোধ হইতে লাগিল।

দিন চলিয়া গেলো। রাত নামিবার সাথে সাথেই যেনো অরুর আরো মন খারাপ হইতে লাগিলো। চিৎকার করিয়া কাদিতে মন চাইলো অরুর। কিন্তু অরু যাহার ঘরে এখন বসিয়া আছে, তাহাদের কথা ভাবিয়া আর নিজের অকস্মাৎ অন্তর ধানের খবর লজ্জায় লুকাইবার নিমিত্তে অরুর আর আর্তনাদ করিয়া কাদা হইল না। অরুর বুকের হাহাকার, অরুর চোখের জলের ধারা বারবার অরুকে জীবনের কি মুল্য এই হিসাবের নিকটবর্তী নিয়া আসিয়াছিলো। কিন্তু জীবন শেষ করিয়া দেওয়া কি এতোই সহজ?

অরুর আরো মন খারাপ হইতেছিলো এই ভাবিয়া, যাহাকে সে ছাড়িয়া আসিয়াছে, তাহার এখন মনের অবস্থা কি? তিনিও কি অরুর জন্য এমন করিয়া হাহাকার করিতেছে? তাহার ও অরুর জন্য মন কাদিতেছে? যদি কাদিয়াই থাকিবে, তাহলে আজ সকালে অরুকে কেনো আগলাইয়া ধরিয়া রাখিলো না? যেমন করিয়াই রাখিয়াছিলে, তেমন করিয়াই তো ছিলাম। দুঃখ যে আছে আমার, এ কথা তাহার কি কখনই মনে আসে নাই? মরনের কথা বার বার মনে আসিতেছিল। কিন্তু মরনের কথা মনে হইলেও কোনো এক বাধনের কারনে মরনকেও ভয় হইতেছিল। আমার জন্য না, অরু ভাবিলো, আমার মরন কি তাহাকে জীবিত রাখিতে পারিবে? হয়ত সে আমার থেকেও বেশি অশ্রু পাত করিতেছে।

রাত গভীর। অরুর চোখে ঘুমহীন রাত। সবাই ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু অরুর চোখে কোনো ঘুমের ছাপ মাত্র নাই। বুকের পাজর গুলি যেনো কুকড়ে গিয়ে আরো ছোত হয়ে গেছে। পেটে ক্ষুধা নাই, মনে শান্তি নাই। অরুর বারবার মনে হইতেছিল, অনাদর আর আদরের কথা। অরু তো তার সর্ব কিছু দিয়া তাহাকে আদর করিয়াছিলো। কিন্তু তাহার প্রতি এতো অনাদর হইলো কেন? অনাদর জিনিষ তাই একটা ছাইয়ের মতো। সে ছাই হয়তো আগুনকে ভিতরে ভিতরে  জমিয়ে রাখে কিন্তু বাইরে থেকে তার তাপটাকে বুঝতে দেয় না। তাহার কাছে অরুর যেনো সম্মান কমিয়া গিয়াছিলো। আত্ত সম্মান যখন কমে যায়, তখন অনাদরকে তো অন্যয্য বলে মনে হয় না। এক সময়ে তাহার আদরে আমার যে জীবন গড়িয়া উঠিয়াছিল আজ যেনো ঠিক সেইভাবেই অনাদরে আমার দুঃখের ব্যথাতা শতগুনে বাড়িয়া উঠিয়াছিল।

সব কিছুর পরেও অরুর বারবার মনে হইতেছিল, আমি কেনো তাহাকে ভুলিতে পারিতেছি না? সেও কি আমার মতো আমা বিহনে এইরুপ সকাল, সন্ধ্যা রাত ঘুমহীন ভাবে কাতাইতেছে। একবার ভাবিলাম, যাই ফিরে যাই। গিয়ে আবার জাপটে ধরে বলি, এই যে, আমি, অরু। তোমার অরু, আবার ফিরিয়া আসিয়াছি। আমি পারি নাই তোমাকে ছাড়িয়া একটি রাত অতিবাহিত করিতে। আমি পারি নাই তোমাকে একটি মুহুর্তে ভুলিয়া থাকিতে। আমি ফিরিয়া আসিয়াছি। আমি প্রতিটি মুহুর্ত বুঝিয়াছি, আমার সারাটা বিশ্ব জুড়িয়া চারিদিকে তুমি। আমি যেদিকে তাকাই, সেদিকেই শুধু তোমাকে পাই, হাত বারাই অথচ তুমি নাই। আমি জীবন্ত লাশ হইয়া চারিদিকে যেন পালাইতে নয়, তোমাকেই খুজিতেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমি ফিরিয়া আসিয়াছি।

পরক্ষনেই, সম্বিত ফিরিয়া আসিলে অরু দেখিলো তাহার কপোল গরাইয়া শুধু অশ্রু দিয়াই তাহার কামিজ ভিজিয়া গেছে, তাহার চোখ ফুলিয়া গেছে। অরুর মনে কোনো শান্তি নাই। অথচ কাইকে অরু কিছু বলিতেও পারিতেছে না, কি হইলো, কেন হইলো, আর এখন কি হইবে।

অরুর কত কিছুই না আজ এই একা বসিয়া মনে পড়িতেছে। এই অরু ছিলো তাহার রাতের সাথি, তাহার একাকিত্তের বন্ধু, এই অরুই ছিল তাহার মনের সব কল্পনার রঙ মাখানো বাতিঘর। অথচ আজ অরু কত দূরে বসিয়া একা। কোনো কিছুরই হিসাব মিলাইতে পারিতেছে না অরু। কোথায় গেলো সেই নেশা, কোথায় গেলো সেই গল্প বলার মানুশটা? তাহার চোখের পাতার কথা মনে পড়ে, তাহার হাত ধরার ভালবাসার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে আপলোক চোখে তাকিয়ে অরুর মুখ দেখিয়া অবাক হইবার সেই ভালোবাসার চিহ্ন।

বেদখল জমির মতো আজ অরু তাহার কাছে বেদখল হইয়া পড়িয়াছে। অরুর জীবনের যেনো আর কোনো মুল্য নাই অথচ একদিন ছিলো, অরু ছাড়া তাহার দিন শুরু হইত না, অরু ছাড়া তাহার রাত নামিতো না।

অরুর মনে হইতে লাগিলো, কতদিন যে তাহার সহিত কথা হয় না? কতকাল যেনো অরু তাহাকে দেখিতে পায় নাই? অরুর অন্তর আর কলিজার দুই পাশ ছিড়িয়া ফুলিয়া একাকার হইয়া যাইতেছিলো। 

এদিকে অরুর বিয়ের তোড়জোড় চলিতেছে চারিদিকে। অরুর এখন কি করা উচিত? ফিরিয়া যাইবে সেই তাহার কাছে? নাকি সমস্ত অভিমান আর কষ্ট লইয়াই অরু তাহার জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায় শুরু করিবে। অরু জানে না, কাল তাহার জন্য কি অপেক্ষা করিতেছে। অরু এইটাও জানে না, তাহাকে নিয়া বিধাতা কি খেলা খেলিতেছেন। অরু শুধু ওই নীল আকাশের দিকে তাকাইয়া বহু দূর দেখিতে পাইল একটা অস্পষ্ট আলো জালাইয়া কত সহস্র যাত্রী লইয়া আকাশ পথে একটা উড়ন্ত জাহাজ হারাইয়া যাইতেছে। একটু পর তাহার আর কোনো হদিস থাকিবে না।

২৯/১২/২০১৯ -অরু ডায়েরি-৩

Categories

অরু ভর্তি হয়ে গেলো ইউনিভার্সিটিতে। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ, নতুন নতুন সব বন্ধু। গ্রাম থেকে আসা একটি মেয়ে শহরের কতই না ধনাঢ্য পরিবারের ছেলেমেয়েদের সাথে এখন এক সারিতে উঠা বসা করতে হয়। কিন্তু অরুর কি আছে সেই সামর্থ ওই সব পরিবারের বাচ্চাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার? আমি ব্যাপারতা বুঝি। আমি বুঝি কিভাবে কোন স্তরের কোন বাচ্চারা কিভাবে চলে। আমি অরুকে ঠিক আমার সন্তানের মতো করেই চালানোর চেষ্টা করছি। অরু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খাপ খেয়ে গেলো সবার সাথে। ওর চলন বলন, ওর কথা বার্তা, ওর বেশ ভুষা সব কিছু উচ্চ বিত্ত সমাজের বাচ্চাদের মতোই আমি ব্যালেন্স করছিলাম। ওকে দেখে কোনো বুঝার উপায় নাই যে, ওর বাবা বা মা কেহ ওকে এক বিন্দু পরিমান সাহাজ্য করছে না। ও ভুলেই গেলো ওর আসল বাবা মাকে। এক সময় অরু আমাকে বাবা বলে ডাকতে শুরু করে দিলো।

আমি যাই, আমি দেখা করি, আমিই ওর সব কিছু দেখভাল করি। অরু তার ছোট একটা আলাদা বাসায় তার পড়ার টেবিল, সাজানো ঘর, বিছানা পত্র, ছোত একতা রান্না ঘর আর কাজের এক মায়াবতী সীমাকে নিয়ে ভালই সাজিয়েছে তার আপন গন্ডি, যেখানে আছে তার শুধু বাবা, আর বাবা।

দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে কয়েক বছর পার হয়ে যায়। অরু এক ইয়ার থেকে আরেক ইয়ারে, আরেক ইয়ার থেকে আরেক ইয়ারে পাশ দেয়। আমার বড্ড ভালো লাগে।

একদিন-

অল্প পরিচিত কোন এক অসচ্চল পরিবারের তার এক বান্ধবী, লুনা, তার নিজের প্রয়োজনেই আশ্রয় নেয় অরুর সাজানো এই ছোট সংসারে। উদ্দেশ্য আর কিছুই না, কয়েকদিনের আবাস। অরুর চালচলন, বেশভুষা, সাজানো সংসার আর চাকচিক্যে লুনার যেনো মন উদাস হয়ে যায়। লুনা তার জীবনের সাথে অরুর জিবনের এতো বড় ফারাক দেখে সারাক্ষনই তার মন উসদাসীন হয়ে থাকে। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার আর বিকালের আরাম আয়েসের সাথে যেনো এই লুনা কিছুতেই মিলাতে পারে না কি নাই ওদের আর কি আছে লুনাদের। ভিতরে ভিতরে লুনার শুরু হয় এক অজানা ক্ষভ আর জিদ। এই জিদ যেন কোন এক এদেখা ঈশ্বরের উপর, এই জিদ যেনো কোন এক সমাজের উপর, সাথে বাড়ে জিদ আমার সেই ছোট জননী অরুর উপর। লুনার সাথে কনো কিছুইই বুঝার আগে লুনা তার জীবনের চরম এক প্রিশোধের আগুনে জ্বলে উঠে। অরুর মতো একজন অসচ্চল গ্রামের চটপটে তরুনী যদি তার তথাকথিত বাবার আদরে এতো কিছু আয়েশী জীবন পায়, তাহলে লুনা কেনো তার জিবনে একই রুপে তা পাবে না, এতাই যেনো হয়ে উথে লুনার এক চরম হিংস্র মানসিকতা। লুনার এই হিংস্র মানসিকতার কিছুই না বুঝে কোনো এক বিকালে অরু হাত ধরে বেরিয়ে যায় বিকালের কোনো এক রাজপথে। হয়ত অরু তাকে নতুন শহর দেখাবে, হয়ত অরু তাকে শহরের সুন্দর বাতিঘর আর আলর রাস্তা দেখাতেই নিয়ে যায়।

রাত পেরিয়ে যায়, রাত গভীর হয়ে যায়, অরু আর ফিরে আসে না। কোথায় অরু?

২৮/১২/২০১৯ -অরু ডায়েরী-২

Categories

ছাত্রী হিসাবে অরু কি রকম ছিলো, ভালো না খারাপ নাকি অন্য রকম, তা আমার কিছুই জানা নাই কিন্তু আমার আশ্বাস আর ভরসায় অরু যেনো সীমাহীন কোনো এক নক্ষত্রের আলোর দিশারার কিনার দেখেছিলো। হয়তো সে নিজের যতটুকু যোগ্যতা ছিলো তার থেকেও আরো বেশী পরিশ্রম করেই এই কঠিনতম ভর্তি পরীক্ষার বৈতরণী পার হয়ে সত্যি সত্যি সরকারী ইউনিভার্সিটির কাঙ্ক্ষিত অর্থনীতি বিষয়েই ভর্তি হয়ে গেলো। এর মাঝে কয়েকমাস যে কেটে গিয়েছিলো আমার নিজেরও মনে নাই। মনে পড়লো সেদিন যেদিন আবার একদিন এই যুদ্ধের বিজয়ীর ফলাফল নিয়ে অরু আমার অফিসে এসে হাজির হলো। 

ভীষন খুশী হয়েছিলাম। কতটা খুশী হয়েছি তা বলতে পারবো না কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো, ছোট একটা বীজ থেকে যে বটবৃক্ষের জন্ম, আমি যেনো আজ সেই ছোট বীজটাই হাতে ধরে আছি। আমি এম্নিতেই শিক্ষানুরাগী, তার মধ্যে এমন একটা বীজ আমার হাতে এসে পড়েছে যাকে আমি ইচ্ছেমতো বিকশিত হবার সুযোগ করে দিতে পারি। এখন শুধু হয়তো আমার কিছুটা পানি, কিছুটা সার আর কিছুটা মালীর কাজ করতে হবে, এটাই আমার কাছে বারবার মনে হয়েছিল। ভালোবাসা আর মমতায় আমি অরুকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।

যে ভালোবাসা আর মমতায় আমি ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, আমার এই মমতা আর ভালোবাসার ছোয়ায় আমি ওর বুকের ভিতরের কোনো এক মৃগী রোগীর মতো কাপুনী আর ধকধক আওয়াজের ধনি শুনেছিলাম। ওকে আমার সেই ছোট্ট মেয়েটার মতোই মনে হলো, ও যেনো আমার আরেক মেয়ে যাকে আমি জন্ম দেই নি ঠিক, কিন্তু যেনো কত জনমের চেনা। এতো মমতা আর স্নেহে কি হয়েছিলো আমি জানি না, কিন্তু ওকে আদর করে আমার অফিসের চেয়ারে বসানোর পরেই বুঝলাম অরূ কাদছে, তার মাথা নীচু, আমি শুধু ওর কপাল আর কিছু চোখের জলের ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। দেখেছিলাম আমি ওর কপোলের ধার বেয়ে বেয়ে অবিরাম চোখের জল। ভাবলাম, হয়তো অতি আনন্দে মানুষ যেমন কাদে, অরুও হয়তো সে রকম এক পরিস্থির ভিতর দিয়েই যাচ্ছে। জল তো আর কারো আদেশের অপেক্ষা করে না। চোখের জলের উপর কারো কোনো আদেশ চলে না। চোখ তার জল দিয়ে খুসী আর আনন্দের অথবা বেদনার রঙ প্রয়াকশ করে। যার চোখ জলে ভর্তী হয়তো সেই জানে এই জলের উৎস কি আনন্দের না বেদনার। একটু পরেই আমার সেই চোখের জলের উৎস ধরা পরলো। ভুল ভাংলো। ভুলটা ভাংলো অরুর কাছে ওর জীবনের অনেক কাহিনী শুনে।

অরু যখন একটু সম্বিত ফিরে পেলো, গালে ঝরে পরা অশ্রু মুছে দিয়ে অরু প্রথম যে কথাটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বল্লো, তা হচ্ছে, "আজ অবধি কেউ আমাকে এই রকম করে স্নেহ আর মমতা দিয়ে বুকে টেনে নেয় নাই। কেউ আমাকে কখনো বলে নাই, মা, আমি তোকে ভালোবাসি। ভালোবাসা কি জিনিষ, আদর কি জিনিষ, স্নেহ কি জিনিষ তা আমি কখনো বুঝি নাই। কখন বড় হয়ে গেছি, কিভাবে বড় হয়ে গেছি, কেউ কোনো খবর রাখে নাই। অগোছালো জীবনের মতো, একতা আগাছার মতো লিকলিকে বড় হয়ে গেছি। সবাই শুধু একটা কথাই ভেবেছে, কবে আমাকে বিয়ে দিয়ে দেবে। কার সাথে দেবে, কাউকে আমার ভালো লাগলো কিনা, আমার বিয়ের বয়স হলো কিনা এটা কোনো গুরুত্তপূর্ন কারো কাছেই মনে হয় নাই। মেয়ে হয়ে জন্মেছি, এটাই যেনো আমার বড় অপরাধ। পর্ব যায়, বছর যায়, কিন্তু কোন পর্ব কেনো আসে, কেনো যায়, তা আমাদের মতো গ্রামের অসচ্চল পরিবেশে আমাদের সাধ আহলাদের কোনো মুল্য যেমন নাই, তেমনি আমাদের কথা কারো শোনার মতো কোনো অবকাশও নাই। কতবার গ্রাম ছেড়েছি, কতবার ঘর ছেড়েছি সেই দূর্বিসহ বিয়ের আসর থেকে, তা আমার মনে নাই। কতবার শুধু খালী পায়ে পাগলের মতো বন্দি বাড়ি থেকে দৌড়ে গেছি সেই কাঙ্ক্ষিত আমার পরীক্ষার হলে, আমার এখনো মনে আছে। বাড়ির কোন গপন কক্ষে কতক্ষন পালিয়ে বেচেছিলাম ওই সব বিবেক হীন মানুষ গুলির ভুল সিদ্ধান্ত থেকে বাচার জন্য, তার কোনো ইয়াত্তা নাই। আমার এই পিঠে খোজ করলে হয়ত আজো কোনো না কোন ক্ষতের দাগ হয়তো খুজে পাওয়া যাবে আমার অবিবেচক অভিভাবকের সিদ্ধন্তের বাইরে দারাবার জন্য। সবাই তাই আমাকে গ্রামের একজন অবাধ্য মেয়ে, ঘরের সবাই আমাকে অবাধ্য সন্তানই বলে ধারনা করে। কিন্তু আজ অবধি কেউ আমার পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো না, আমার মনে কি, আমার অন্তরে কি, আমার চাহিদা কি আর আমার সপ্নই কি। অনেক খুজেছি আমি আপনাকে আবারো। দৌড়ে ছুটে চলে এসেছি আমি আপনার অফিসের এই ঘরের দরজায়, কিন্তু আপনার কাছে পৌঁছে যাবার মতো না ছিলো আমার কোনো ক্ষমতা, না ছিলো আমার কোন অবকাশ। আমার পাশে দারাবার কেউ নাই। নিজের উপর বারবার রাগ, জিদ আর গোস্যা হয়েছিলো আমার। কিন্তু আমি হাল ছাড়ি নি। আমি একাই চেষ্টা করেছিলাম এটা ভেবে যে, আজ হোক কাল হোক কোনো একদিন আপনাকে কাছে পাবো আমার এই জীবন যুদ্ধে। আজ আমার সেই দিন। আমার চোখ তো জল ঝরাবেই।  

কতটা অবহেলায় আর অনাদরে অরু গ্রামে এতোটুকু বয়স পার করে ফেলেছে তার গভীর মর্মার্থটা যেনো নিমিষেই আমার চোখে ধরা পড়লো। কারন সেটা তো আমারই গ্রাম। আমার জীবনের কাহিনী তো এমনই ছিলো আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে যখন আমি দেখেছি সব হায়েনাদের ভীড়, দেখেছিলাম একটা পরিবার কিভাবে তিলে তিলে নিশপেসিত হয় কোনো ভুল করা ছাড়াই।

একটা ছেলে সন্তান মানুষ করার চেয়ে একটা মেয়ে সন্তান মানুষ করা অনেক বেশী কঠিন। একটা মেয়ে যখন বাল্যকালে পা রাখে, তাকে শিখাতে হয় কোন টা করা যাবে আর কোনটা করা যাবে না, তাকে শিখাতে হয় কে কে তার বন্ধু হতে পারে আর কে কে নয়। তাকে শিখাতে হয় সমাজের সবাই তার দিকে যেভাবেই তাকাক, সেই চাহনীর ভাষা কি। তাকে অন্ধকারে পথ চলতে শুধু হারিকেনের আলো হলেই হবে না, তার সাথে থাকতে হবে আলোর সাথে পাশে কেউ।  

(চলবে)

-----------------------------------------------------------------------------------------------

অরু চলে গেলো। আমি বুঝলাম, আমি হয়তো অরুকে আর কখনো ফিরে পাবো না। বড় আশ্চর্যই মনে হলো। অরু চলে যাবার ঘটনাট যেনো আমার দইনিন্দিন ঘটনার মত মনে হলো না। মনের মধ্যে কেমন যেনো একটা শুষ্ক অসাড়তার সঞ্চার হলো। মনে হলো, পৃথিবী তে ভালোবাসা আর মায়া একটা মিথ্যা এবং শুন্য জিনিষ। হেমন্তের সমস্ত অতীত, গ্রীষ্মের সমস্ত চিহ্ন, কিংবা শীতের সমস্ত সজীব ভালোবাসা আজ আমার কেবল মনে হতে লাগ্লো, অতায়ন্ত নীরস এবং কঠিন। মনে হলো, যে ভালোবাসা আর মায়াকে এতোখানি বলে মনে হত, যে আদর যে মোহ এতখানি গাড় মনে হতো,  যার তিলমাত্র বিচ্ছেদকে মনেও আসে নাই, কিংবা যার অবসান জন্মান্তরেও মল্পনা করা যায় নাই, সেই ভালোবাসা এই? সেই মমতা এই? কোন সার্থের কারনে কিংবা কোন আঘাতের কারনে এমন একটি অসীম ভালোবাসা নিমিষেই চূর্ন হয়ে এক মুষ্টি ধুলি হয়ে বাতাসের সাথে মিশে গেলো?

অরু একটু আগেও বলেছিলো, পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না, অথচ এখনো সেই দিনটাই শেষ হয় নাই, পাপিয়ারা এখনো ডালে বসিয়া গান করছে, দক্ষিনের বাতাস এখনো গাছে ঢাল পালাকে এদিক সেদিক দোলা দিতেছে, একটু পরেই হয়তো জ্যোৎস্না সুখ শ্রান্ত সুপ্ত সুন্দুরীর মতো বাতায়ন বর্তী পালঙ্গের এক প্রান্তে নিলীন হয়ে পড়ে থাকবে। সমস্তই মিথ্যা। ভালোবাসা আমার অপেক্ষাও মিথ্যাবাদি, মিথ্যাচারী।    

২৭/১২/২০১৯-অরু ডায়েরী-১

Categories

যেদিন সেই প্রথম অরু আমার অফিসে এসেছিলো, তখন অরু সবেমাত্র ইন্টার পাশ করেছে। সনটা ছিলো ২০১৬। আমি অরুকে সম্ভবত একবার দেখেছিলাম আমাদের গ্রামে। আমার ভালো করে মনেও নাই ওর চেহাড়া। কিন্তু যেদিন ও আমার অফিসে এলো, দেখলাম বেশ চটপট করে কথা বলে, গুছিয়ে কথা বলে। বুঝা যায় না যে, অরু গ্রামের এমন একটা অসচ্ছল পরিবেশ থেকে এসেছে। দূর থেকে ছবিতে গ্রাম যত ভাল লাগুক, আর যতো সবুজ শ্যামলাই মনে হোক, এই সুবুজ শ্যামলা বড় ছোট হরেক রকম ফল মুলাদির ফাক ফোকর দিয়েও অনেক সুন্দর সুন্দর জংলী ফুল অনেক অবহেলায় কখন যে বেড়ে উঠে তার যেমন কেউ হিসাব রাখে না, ঠিক তেমনি অরূকে দেখেও আমার মনে হইলো, এমনি একটি শিশির ভেজা অজানা ফুল বাতাসে হেলে দুলে বেচে আছে। সেই ফুলটি এখন আমার সামনেই যেনো কোনো এক শহরের ড্রয়িং রুমের মধ্যে সাজানো একটি গন্ধবিহিন ফুল। অথচ তার গন্ধ আছে মিষ্টি, চেখে দেখার মানুষ নাই।

অফিসে সারাক্ষনই কাজ থাকে, নিবিড় ভাবে এককালীন একটা অখন্ড সময় দিতে পারছিলাম না। অরু কালো একটা বোরকা পড়ে আপাদ মস্তক ঢেকেই সে আমার অফিসে এসেছিল। লম্বা একটি মেয়ে, ছিমছাম দেহ, গ্রামের বালিকাদের মতো একেবারে ওই রকম না। খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছিলো, তাই অরুকে নিয়ে আমার টেবিলে একসাথে দুপুরের খাওয়াটা সেরে নিলাম। প্রকৃত পক্ষে এই খাবারের সময়টাতেই আমি অরুকে বেশ একটা সময় দিতে পারলাম। অরু আমার ছোটবেলার বন্ধুর মেয়ে।

জিজ্ঞেস করলাম, কি কারনে সে আমার কাছে এসেছে। খুব আমতা আমতা করে আমার দিকে ভয়ে ভয়ে চোখ নিয়ে অরু বল্লো, কাকা, আপনার কি আমার কথা কিছু মনে আছে?

বললাম, খুব একতা বেশি মনে পড়ে না। কিন্তু এমন কিছু কি আছে যে মনে করার মতো?

অরু বল্লো, আজ থেকে প্রায় ৪ বছর আগে আমার বাবা আপনার কাছে এসেছিলো আমার বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শ নিতে। আপনি বাবাকে আমার বিয়ে দিতে না করেছিলেন। আবার আমারো বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে ছিলো না। আমি সবে মাত্র ক্লাশ নাইনে উঠেছি। আমার পরার খুব শখ ছিলো। বাবা আপনাকে অনেক সম্মান করেন আর সমীহ করেন। আপনার কথাটা বাবা রেখেছিলো। কিন্তু মাঝে মাঝেই যে আবার এই ভুতটা নড়েচরে উঠতো না তা নয় কিন্তু আমি বারবার আমার বিয়েটা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। আমি এবার ইন্টার পাশ করেছি, ইউনিভার্সিটিতে পরার খুব শখ।

কথাগুলি শুনে আমার খুব ভালো লাগলো যে, গ্রামের একটি মেয়ে তার পরাশুনাটা চালানোর জন্য কত আপ্রান চেষতা করছে। আমি অরুকে বললাম, অরু তুমি যতো পড়তে চাও, পড়ো, দরকার হয় আমি তোমাকে সাহাজ্য করবো।

খুব খুশী হলো অরু।

কিন্তু আমি অরুকে এই সাহাজ্যের জন্য একটা শর্ত আরোপ করে দিলাম। আর সেই শর্তটা ছিলো, তাকে যে করেই হোক অর্থনীতির মতো একতা বিষয় নিয়ে পড়তে হবে।

(চলবে)

২৬/১২/২০১৯- লিসা ফিরে গেছে

Categories

আজ থেকে সেই কয়েক বছর আগের কথাই বারবার আমার মনে পড়ছে। যা বুঝতেও পারি নাই, আমাকে বুঝতেও দেয় নাই। আমি বহুবার ভেবে দেখার চেষ্টা করেছিলাম, কেনো শেষ পর্যন্ত ওর সাথে সম্পর্কটা রইলোই না। খুব জোরালো কোনো যুক্তি খুজে পাই নাই বটে কিন্তু একটা ব্যাপার পরিষ্কার হচ্ছিলো। আর সেটা হচ্ছে নির্ভরতা। একজন বিদেশী, যা ছিল তার, তা হয়ত অনেক না, আবার আশেপাশের যারাই ওকে একটু ভরষা দিতে পারতো, তারাও তার গোত্রের মত কেউ না। একটা শুন্যতা, একটা শংকা, একটা ঘেন্না বোধ কাজ করেছিল ওর চাহিদার আর পাওয়ার মধ্যে। মানুষ তার নিজস্ব পথে তার হিসাব নিকাষ করে। হয়তবা সে চেক এন্ড ব্যালেন্স করে একটা হিসাবের খতিয়্যান বের করেছিল যে, জিবনে ভালভাবে বেচে থাকার জন্য শুধু ধর্ম, সংসার আর বর্তমান নিয়ে চলে না। নীতি আর পলিসি দিয়েও চলে না। তার জন্য দরকার একটা নিশ্চিত ভবিস্যতের গ্যারান্টি। এটা যেই দিক তাতে কিছু যায় আসেনা। এটা আমার জানা ছিলো না। কিন্তু কথা তো সত্য।

ক্ষুধা পেটে ভালো মানুষের সাথে ভালোবেসে রাস্তায় রাস্তায় বহুদুর যাওয়া যায় না। আবার নিজের যোগ্যতার চেয়ে শুধুমাত্র সংসার বা বন্ধনের নামে একজন অযোগ্য ব্যক্তির হাত ধরেও অনেক দূর যাওয়া যায় না। কারন সেখানে থাকে যোগ্যতা আর অযোগ্যতার প্রকান্ড এক বিভেদের দেয়াল যা যেমন যোগ্য ব্যক্তিও টপকাইতে পারেনা আবার  অযোগ্য ব্যক্তিও ব্যালেন্স করতে পারে না। কিন্তু ভরপেটে আরামদায়ক এসি গাড়িতে হাই স্পীডে প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে দেখতে কোনো এক অসম অসুন্দর বিত্তবানের সাথেও জীবন আনন্দময় হয়ে উঠে। সেটা হোক না যে কোন বিনিময়ের মাধ্যম। যা একজন এম্নিতেই ছিনিয়ে নেবে বিনা পয়সায়, তাই যদি কেউ ছিনিয়ে নয় আপোষেই নিয়ে এক আয়েসীর জীবন দেয়, তো ক্ষতি কি? ঈশ্বরের সাথে বুঝাপরা ভিন্ন। ওগুলি আজকাল আর কেউ আমলে নেয় না। আর আমলে নেবার জন্য কেউ বসেও নাই। যদি তাইই হতো, তাহলে পৃথিবীতে এতো সুন্দর সুন্দর রমনীরা দেহবৃত্তি করতো না। এতো এতো শিক্ষিত জনপদ এইসব সুন্দুরী মেয়েদের তাদের জীবন সাথী পাবার জন্য অনেক বেগ পেতে হয় না, কিন্তু তারপরেও তারা সুন্দর নর বা ভালো নরকে নয়, তারা চায় সুন্দর জীবনের প্রতিশ্রুতি।

লিসা ফিরে গেছে সম্ভবত তার সেই ভাবনা থেকেই। সে ফিরে গেছে তার সেই পুরানো জায়গায় যেখানে ওর জন্য প্রস্তুত রয়েছে অফুরন্ত আয়েশের উৎস, রয়েছে নিরাপত্তার গ্যারান্টি, আর তার সাথে আছে নিজ দেশের মাটির সাথে বন্ধন। জীবন একটাই। তাকে আনন্দময় করে কাটানোর অধিকার সবার আছে।

ঘৃণা কার নাই? সংসার জিবনে কি ঘ্রিন্না নাই? দম্পতিদের জীবনে কি ঘৃণা নাই? আছে। তারপরেও সবাই যার যার মতো করে ঘৃণাটুকু বাদ দিয়েই যেটা দরকার সেটা নিয়েই আনন্দে বাচে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই মানুষ তার গতিপথ বদলাতে পারে। আর এই গতিপথ বদলানোর জন্য যে ক্ষমতা দরকার, আগে সেটাই খুব দরকার যার নাম- যোগ্যতা আর অর্থের প্ল্যাটফর্ম। লিসাকে কোনোভাবেই এখন আর দোষ দেইনা। কি দিতে পারতাম? পারতাম কি তাকে ওই সেন্ট লুইসের একটা সুইটে নিয়ে গিয়ে জাপানিজ এক্সপার্টদের সাথে বসিয়ে এক কাপ চা খাওয়াতে? কিংবা পারতাম কি লিসাকে ওই দুবাইয়ের বুরুজ রেস্টুরেন্টে একদিনের জন্য বেড়াতে নিতে যার ব্যয় ৫ বছরের এক্ত্রিত সঞ্চয় এর সমান? লিসা ঠিক বুঝেছিলো যে, স্বামী, সংসার, আর নিঘাত একটা দৃশ্যমান ভালোবাসায় আর যাই হোক, জীবনের সব চাওয়া পাওয়ার সাধ মিটে না। হিসাব তার পরিস্কার। আর সেই হিসাবে লিসা তার দিক থেকে ঠিক কাজটাই করেছে। আগে ভুল হয়েছিল, বা সরি হয়েছি এইটুকুর ওজন অনেক। যে সময় মত এর আবেদন করতে পারে, সেইই আবার জিতে যায় পরাজিত জীবনের কাছে। তখন আবার নতুন করে জীবনের খাতা শুরু হয় সেই পুরানো ধাচেই আর তখন আবার সপ্নের সব অট্টালিকা থেকে দেখতে পাওয়া যায় ওই দূরের আকাশের রাতের ঝিকিমিকি তারা গুলি, যেখানে মাঝখানে ঝরের মতো হারিয়ে যাওয়া কিছু সময়ের মুল্য আর চোখেই পড়ে না।

লিসা ফিরে গেছে এটাই বাস্তবতা।

২৩/১২/২০১৯-অপেক্ষার প্রহর লম্বা

কিছু কিছু অপেক্ষার প্রহর অনেক লম্বা। এই প্রহরগুলি কাটতে চায় না। মন উতালা করে, মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। আবার এই মনই নিজেকে শান্তনা দেয়। অদ্ভুত না এই "মন" বিষয়ক ব্য্যাপারটা?? কখনো কখনো হাজার বছর এক সাথে থেকেও কেউ কেউ আপন হয় না। আবার কেউ কেউ ক্ষনিকের মধ্যেই কেনো যেনো মনে হয়, আরে এই তো সে, কই ছিলো? কিন্তু এটাও হয়তো সত্য নয়। আবার সত্যও হতে পারে। মানুষের বাচার জন্য চাই একজন সুরক্ষাকারী বটবৃক্ষ। আর দরকার সেই বটবৃক্ষের তলায় হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার মতো কেউ একজন।

অনেক সাধ আমাদের জীবনে, কিন্তু সাধ্য না থাকায় মাঝে মাঝে মনে হয়, এমন কি কেউ নাই যে আমাকে একটা পথ বাতলে দেয় যে, এখানে এইটা করো, তবেই না পাবে তুমি তোমার মনের ইচ্ছা পুরনের চাবিটা!! শুধু খেয়ে পড়ে বেচে থাকার নামই জীবন না। এর বাইরেও কিছু থাকে। নতুন নতুন জায়গায় অনুসন্ধান করে জীবন শুধু পিছিয়্যেই পড়ে, সামনে যেনো আগাইতেই চায় না। জীবনে সম্ভবত স্থিতি আসা খুব জরুরী। হোক সেটা কোনো এক মান্দাতার আমলের আদলেই। তাই হয়তো পরান জায়গাতেই আসল সুখের সন্ধান রয়েই যায় যা প্রথম চোখে পড়ে নাই। সব সময় পরিস্কার আকাশই মানুষকে উদ্বেলিত করে না, কোনো কোনো সময় মেঘলা আকাশও মানুষকে উদ্বেলিত করে। কিন্তু আমি সবসময়ই ঝড়ো আকাশকে ভয় পাই। ভয় পাই এই কারনে যে, থাক......

০৬/১২/২০১৯-সেদিনের কথা মনে পড়ে

সেদিনের কথা আজো আমার মনে পড়ে। কোনোদিন তোমাকে আমি দেখিনি। কোনোদিন চিনিও নাই। অদ্ভুদ পরিপাটি হয়ে তুমি নিকোলাসের সাথে আমার অফিসে এসেছিলে। কোনো কারন ছিলো না আমার তোমার উপরে চোখ রেখে পৃথিবী থেকে লক্ষ মাইল দূরের কোনো এক চাঁদকে দেখার। নিকোলাস ছিলো নিতান্তই একটা সাধারন লোক। তারপরেও আমি নিকোলাসকে সাদরে গ্রহন করেছিলাম। আর তার কারনটা ছিলে শুধু তুমি। কি এক মোহ নিয়ে যেনো আমার চারিদিক একটা মন্ত্রের মতো তুমি যাদুবন্দি করে রেখেছিলে, আমি বুঝতেও পারিনি। তুমি আমাকে চাঁদ দেখিয়েছিলে। আমি চাদের কলংক বুঝি নাই, চাদের অসমান পাথরও দেখি নাই, চাদে যে বাতাসও নাই, সেটাও বুঝি নাই। তারপরেও আমি এই শুকনা মাটি আর বাতাসবিহীন মৃত্যুসম পরিবেশকে উপেক্ষা করেই বন্ধু ভেবে সাদরে গ্রহন করেছিলাম আমার ভবিষ্যৎ পরাজয়কে। আমি শুধু দেখেছিলাম চাদের মতো আলো আর ভারসাম্যহীন চাদের বুড়ির চাহনী। কি যে মাদকতা আর নেশা ছিলো আমি বুঝি নাই, আমাকে নামিয়ে দিলে আমার আকাশ ছোয়ার স্বপ্ন থেকে। আমি বিভোর হয়েছিলাম।

ঠিক তার পরেই আমার মোহটা কেটে গিয়েছিলো কারন তুমি আর আমার আকাশে উদিত হও নাই। ডুবে যাওয়া চাদকে কেউ দেখতে চায় না। আমিও ভুলতে বসেছিলাম সেদিন দেখা এক চাদের রুপ আর তার আলো। অতঃপর আবার তুমি উদিত হলে আরো একদিন। এবার নিকোলাস নয়, তার স্ত্রী অর্থাৎ তোমার মা জেসিকা এলো তোমাকে নিয়ে। উদ্দেশ্য তো ছিলোই। তোমার উদ্দেশ্য ছিলো জীবনকে গড়ার আর আমার উদ্দেশ্য ছিলো তোমাকে আবিষ্কার করার। একে একে সব কিছু খুব কাছ থেকে ঘটে যেতে থাকলো অনেক ঘটনা।

কতগুলি বছর? অনেকগুলি। প্রতিটি প্রহর আমার কেটেছে এই চাদের বুড়ির নেশায়, আমার সমস্ত জীবনীশক্তি দিয়ে আমি বাচাতে চেয়েছিলাম এই চাদের বুড়িটাকে। কারন চাদের বুড়িটাই ছিলো আমার সমস্ত নেশার এক জগত। কোনো কিছুই আমি লুকাই নাই এই চাদের বুড়িটাকে বাচাবার জন্য। অথচ আমি জানতেও পারি নাই, এই চাদের বুড়িটা আমাকে নিজের চড়কাটায় কখনো বসার জন্য একটু স্থানও রাখে নাই। আমি ক্লান্ত ছিলাম না, আমি আমার সমস্ত আত্তা দিয়ে এই চাদের বুড়িটাকে কতটা আগলে রেখেছিলাম, আমার সাধের বুড়িটিও জানে নাই। একদিন এই চাদের বুড়িটি কোনো কিছুই না বলে সবার অগোচরে চলে গেলো? সে হারিয়ে যায় নাই, কিন্তু আমার কাছে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো। অথচ একটিবারও জানা হলো না আমার কি অপরাধ ছিলো। সে চলেই গেলে। দেশটাকে আর ভালো লাগছিলো না। এর গাছ পালা, এর বিরাট বিরাট অট্টালিকা, আর মুখরীত জনপদ আমার কাছে দম বন্ধ হয়ে আমাকে প্রতি নিয়ত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো। তারপরেও একটা ক্ষীন আশা ছিলো, হয়তো কোনো না কোনো মোহে তুমি ফিরে আসবেই। তারপরেও রয়ে গেলাম আরো অনেকগুলি মাস।

হটাত একদিন-

দেখা হলো ইউসিকারোস্কি ট্রেন ষ্টেশনের এক প্লাটফর্মের অপেক্ষাগারে। বিধ্বস্ত তোমার সেই কোমল মুখাবয়ব, এলোমেলো উস্কুখুস্কু চুল। আমিই প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম। খুব জানতে মন চেয়েছিল, তুমি কেমন আছো? কিন্তু আমার ট্রেন চলে আসায় আর তোমাকে ছোয়া হয়নি আমার। ছুয়ে বলা হয়্য নাই, আমি সেই আগের মানুষটাই আছি। ফিরে এসো আমার এই শুন্য বুকে। এটা এখনো শুন্য্যই আছে। আমি জানি, তুমি ভালো নাই, আমি জানি, তুমি আসলেই ভালো নাই। তারপরেও যদি কখনো দুচোখ জলে ভরে এসে একবার বলো, আমাকে তুমি ওই পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাও, ওই কল্পনার মানুষটার সাথে, আমি তাও করে দিতাম আর পিছনে না ফিরে নিজেকে শান্তনা দেবো এই ভেবে যে, অন্তত তুমি তো ভালো আছো!! এটাই আমার সবচেয়ে আনন্দের। আমিও আর তোমাকে খুজি নাই কিন্তু বারবার মনে হয়েছে, আমি কি তোমার জন্য কখনোই কিছু করি নাই?

মনে কষ্টটা ছিলই। কখনো কমে নাই। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। নিজের সাথে নিজের যুদ্ধে আমি আর পেরে উঠতে পারছিলাম না। তাই, একদিন সব ছেড়ে সেই নাড়ির টানে আবার পাড়ি দিলাম অসহায় নিজের পলিমাটির দেশে যেখানে আমার জন্য কোনো লিসা আর অপেক্ষায় নাই।

অনেক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই চকচকে এয়্যারপোর্টের লবিতে। এই বুঝি তুমি এলে। আমার ভালোবাসার টানেই হয়ত তুমি আসবে। এমনটাই আমার কল্পনায় ছিলো। অথচ তুমি এলে না। আর তুমি আসবেই বা কেনো? তুমি তো জানোই না যে, আজ তোমার এই অপরিকল্পিত সপ্ন পুরুষটি চিরতরে চলে যাচ্ছে। আমার ফ্লাইট প্রায় বিলম্ব হয়েই যাচ্ছিলো, ফিরে আসতে মন চায় নাই। কিন্তু আসতেই হয়েছে একরাশ না বলা কথা পিছনে ফেলে। যখন আমি শেষ পদদলিটা উঠিয়ে নিয়ে সেই বাহনের পিঠে চড়ে বসলাম, আমার মনে হয়্যেছিলো, গোটা ১৮ টি বছর এই শহরে থাকার পরেও শহরটা আমার হলো না। এই দেশটা আমার হলো না। চোখে এতো জল এতোদিন কোথায় ছিলো? প্লেনের ভিতরে উঠলাম। পাশে ৫ বছরের একটি বাচ্চা বসেছিলো তার মায়ের পাশে। অনেক কান্নাকাটি করছিলো। হয়তো তার কষ্টটা অন্য রকমের। ভাবলাম, আহা, যদি আমিও ওর মত এইরকম করে বুকফাটা কান্নায় কিছুক্ষন কাদতে পারতাম। বাচ্চাটার কান্নায় শব্দ ছিলো, চোখে জলও ছিলো। অথচ আমার চোখের জল ছিলো সাগরের থেকেও উত্তাল নিঃশব্দে।

আমি সহ্য করতে শিখছি, আমি অভ্য্যস্থ হতে শিখছি। এখনো সম্বিত ফিরে নাই, মোহটা আছে। কিন্তু ভালোবাসাটা এখনো কাচা। এই কাচা ক্ষতে বারবার মনে হয় হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার মতো ভালোবাসারও কি ট্রান্সপ্লান্ট করা যায়? যদি যায় তাহলে আমি আবারো একবার না দেখে, না বুঝে ভালোবাসতে চাই। তার আগে চাই আমার পায়ের তলার মাটি। আর সেই মাটি এবার আমি তৈরী করবো আমার দেশের দুব্বা ঘাসের উপর দিয়ে। অন্য কারো গোলামি করে আমি বেশীদিন বাচতেও চাই না। আমি চাই এমন একটা প্লাটফর্ম যা আমার নিজের হবে, যেখানে আমি হবো আমার স্বাধীনতার ধারক। আমি জানি আমার সময় লাগবে এই যুদ্ধে। কিন্তু আমি পারবো। আমি এটাও জানি, আমার এই যুদ্ধে পাশে কেউ নাই। তারপরেও আমি আমার জন্যই বাচবো। আমার এখন একটাই সংকল্প- নিজের পায়ে আবার ঘুরে দাড়াও আর যদি পারো কাউকে তোমার পাশে নাও। কিন্তু সেই পাশের মানুষের উপর হাত রেখে যুদ্ধের ক্ষমতা বাডানোর কোনো সংকল্প নয়। যদি সেও আমার মতো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বুক উচু করে সামনে এসে বলে, আমিও পারবো, তাহলেই হবে বিশ্বাসের আরেক স্তম্ভ। আর এবারের এই ভালোবাসার মানুষটি হবে আগুনে পোড়া সোনার মতো। কথার ফুলঝুরি নয়, দেখার তৃপ্তিতে নয়, এবার ভালোবাসাটা হবে সত্য কাহিনীর উপর নির্মিত সেই জাপানিজ ছবিটার মতো- She Never Saw Him but loved Till Death. তোমাকে আমি ভালোবাসতে চাই এই এমন একটা কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। দেখা নাই, সুম্মুখ কোনো কথা নাই, তবু হৃদয়ে ভালোবাসো জেগে থাকে কিনা। যদি এই রকমের অদৃশ্য বোবার মতো নিঃশব্দে আর গোপনে ভালোবাসো, তাহলে আমাকে না দেখেই মনের বিশ্বাসে ভালোবাসো। অন্তরের চোখ দিয়ে যদি ভালোবাসো, যদি বিশ্বাসের চোখ দিয়ে ভালবাসো, তাহলে ভালবাসো ঠিক সেভাবেই , আমাকে না জেনে, না দেখে, না কথা বলে। হয়তো এটাই হবে দুজনের জন্যই পরীক্ষার প্রথম ভাগ। কতকাল অপেক্ষা করতে পারবে এই না দেখা মানুষের জন্য? কতদিন শক্তি নিয়ে সমস্ত সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে উচ্চকন্ঠে বলতে পারবে-----আমি তাকে ভালোবাসি কিন্তু তাকে আমি চিনি না। সে আমাকে ভালোবাসে, সেও আমাকে দেখে নাই????? সেই জাপানিজ ছবির নায়িকার মতো কখনো কি বলতে পারবে-天国で会いましょう

(Tengoku de aimasho). যার মানে হলো, See youin heaven তোমার সাথে আমার দেখা হবে হেভেনে (বেহেশতে)।

যদি পারো, তাহলে মন তৈরী করো, প্ল্যাটফর্ম তৈরী করার জন্য হাত বাড়িয়ে দাও, দুজনে হাটি এক সাথে।  গন্তব্য হয়তো এক।

২৭/১১/২০১৯-সব মানুষের সাথে লুকুচুরী নয়

জীবনে সেই সব মানুষের সাথে কখনো লুকুচুরী, মিথ্যা কথা, ছলচাতুড়ি, কিংবা কল্পকাহিনী বলিয়া সাময়িকভাবে ভুল বুঝানো উচিত না যাহারা তোমার সুখের জীবনের জন্য নিসসার্থভাবে তাহাদের অনেক মুল্যবান সময়, পরিশ্রম আর অর্থ দিয়া সাহাজ্যের হাত বাড়ায়। যদি পথ চলিতে গিয়ে কিংবা তাহাদের নির্দেশনা মানিতে গিয়া নিজের অজান্তে ভুল করো, হয়তো সেইটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব কিন্তু যদি সেই ভুল হয় ইচ্ছাকৃত, তাহা হইলে সেইটা হইবে পাপ, অপরাধ এবং ক্ষমার অযোগ্য। তাহারা তোমাকে ভালোবাসিয়া, স্নেহ করিয়া অথবা তোমার বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করিয়া তোমার পাশে এমনভাবে দাঁড়াইয়াছেন যাহা হয়তো তাহার দাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন ছিলো না, তবুও দাড়াইয়াছেন। তাহাদের সাথে এইরূপ কোন ইচ্ছাকৃত অপরাধ তোমার সারা জীবনের জন্য এমন মারাত্তক হুমকী হইয়া দাঁড়াইবে যাহা কোনো কিছুর বিনিময়েও আর আগের অবস্থায় ফিরিয়া পাওয়া যাইবে না। এই মারাত্তক ইচ্ছাকৃত ভুলের জন্য যদি কেউ ক্ষমাও করিয়া দেয়, তাহার পরেও যে ক্ষত সৃষ্টি হইয়া যায় তাহা দগদগে ঘায়ের থেকেও বেশী। তখন প্রতিনিয়ত মনে হইবে, এই মানুষ উপকারের কথা বুঝে না অথবা সে নির্বোধ অথবা সে উপকারীর জন্য অনেক হুমকীস্বরূপ। এই বিবেচনায় কোনো হিতৈষী যদি তোমার পাশ হইতে নিঃশব্দে সরিয়া যায়, তাহাকে আর কোনো কিছুর শপথের মাধ্যমেও ফিরিয়া আনা যায় না। তখন যাহা দাঁড়ায় তাহা হইতেছে, নিজের উপর নিজের রাগ, অভিমান আর কৃতকর্মের জন্য অপরাধবোধ। কিন্তু তাহা দিয়াও আর জলের স্রোতকে পিছনে ফিরাইয়া আনা যায় না। এই সময় যাহা হয়, তাহা হইতেছে, হতাশা ক্রমশ বাড়িতেই থাকে, আর এই হতাশা যখন বাড়ে, তাহার সাথে বাড়ে দুশ্চিন্তা। দুসচিন্তা থেকে জন্ম নেয় নিজের উপর নিজেকে ঘৃণা। আর একবার যখন নিজেকে নিজে ঘৃণা করিতে শুরু করে কেহ, তখন তাহার বাচিয়া থাকিবার আর কোনো লোভ থাকে না। চারিপাশের মানুষকে আর ভালো লাগে না, নীল আকাশ ভালো লাগে না, রংগীন আলো ঝলমলের শহরকে তখন বড় অচেনা মনে হয়। মানুষ তখন আত্মহননের দিকে ঝুকিয়া যায়। অথবা সে এমন পথ বাছিয়া নেয় যাহা সমাজের চোখে বড়ই অসুন্দর আর কুৎসিত। সব কুতসিত জীবনের কাহিনী প্রায় একই। কোনো না কোন সময়ে তাহাদের সুযোগ আসিয়াছিলো যাহা তাহারা না বুঝিবার কারনে হাতছাড়া হইয়াছে। কেউ কখনো এইরুপে বড় হইতে পারে নাই, আর হয়ও না। তাহাদের জন্য সমাজ দুঃখবোধও করে না। তাহারা সারাজীবন সমাজের একটা কালো মানুষ হিসাবেই বাচিয়া থাকে। কেউ সমাজে দাগী হিসাবে বাচে আবার কেউ সনাক্ত না হইয়াই আড়ালে আবডালে বাচে। তাহারা সংখ্যায় নেহায়েত কম না অবশ্য সমাজে।

আমার মাঝে মাঝে এইসব মানুষগুলির জন্য খুব দুঃখ হয়, কেনো এই সুন্দর প্রিথিবীতে তাহারা জন্ম নেয়? কি প্রয়োজন ছিলো এইভাবে এই নির্মল পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়ার যখন সে নিজেই এই পৃথিবীর কোনো ভালো উপাদান সে হজম করিতে পারেনা? ইহাদের আয়ুষ্কাল অবশ্য বেশীদিন থাকেও না। তাহারা সমাজে আগাছার মতো বাড়িয়া উঠে, আবার কোনো এক ক্ষুরধার মালীর আঘাতে তাহারা বিকশিত হইবার আগেই শিকরচ্যুত হয়। তবে অতীত বর্তমান অভিজ্ঞতায় একটা বিশেষ লক্ষনে ইহাদেরকে শনাক্ত করা সহজ যাহা শুধুমাত্র অভিজ্ঞতাশীল ব্যক্তিবর্গরাই অতীব দ্রুত তাহাদের সনাক্ত করিতে পারেন। কোনো বই পুস্তকে ইহাদের ব্যাপারে সঠিক লক্ষন কোথাও লিপিবদ্ধ না থাকিলেও কিছু কিছু উপসর্গ প্রায় একই। যেমন, এই সব মানুষেরা সহজেই অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষনে পারদর্শী হয়, তাহাদের কথা বার্তা অনেক গুছাল হয়, তাহারা বিপরীত মানুষটির মনোভাব অতিব সহজেই নিজের ভিতরে আয়ত্তে নিয়া আসিয়া ঠিক তিনি যাহা চাহেন, সেইভাবেই উপস্থাপন করিতে সক্ষম হন। এই মানুষগুলির আরেকটি উপসর্গ হইলো যে, তাহারা অল্প তথ্যেই আগে পিছে আরো সামান্য কিছু কাল্পনিক তথ্য যোগ করিয়া একতা সম্পুর্নবিশ্বাস যোগ্য কাহিনী বানাইয়া ফেলিতে পারেন। তাহারা যাহা বলিতেছে বা উপস্থাপন করিতেছে, তাহা তাহারা নিজেরাও বিশ্বাস করে না যদিও এই সব কল্প কাহিনীর মধ্যেও অনেক জ্ঞান লুকায়িত থাকে। উক্ত জ্ঞান তাহাদের কর্ন কুহরে প্রবেশ করে না। ইহাদের সহিত মুনাফেকের একতা বিশেষ মিল দেখা যায়। ইহাদের লোভ আছে কিন্তু প্রকাশ করিতে চাহে না অথচ সেই লোভের লাভ পাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত পরিকল্পনা করিতেই থাকে। তাহারা কারো বন্ধু নহেন কিন্তু বন্ধু হইয়াছেন, এইরুপ ভাব সর্বদা করেন। তাহাদের মধ্যে ধর্মের কিছু বাহ্যিক উপকরন সর্বদা ব্যবহার করেন যাহাতে তাহাদেরকে অতি সহজেই মুনাফেক ভাবা না হয়। অথচ তাহারা ধর্ম কখনোই পালন করেন না। তাহাদের কাছে কনো মতামত চাহিলে যেই মতামতে আপনি খুশী হইবেন, তাহারা সেই মতামতটাই দিতে থাকিবেন যাহাতে আপনি আরো কিছু তথ্য তাহার কাছে আপনার অজান্তে বাহির করিয়া দেন।   

কথাগুলির অর্থ যদি তুমি না বুঝিয়া থাকো, বারবার পড়ো, বারবার। একসময় যখন চোখের জলে বুক ভাসিয়া যাইবে, তখন বুঝিবে তুমি হয়তো বুঝো নাই তবে তোমার অন্তর বুঝিয়াছে কিন্তু তোমার অন্তর তাহা প্রকাশ করিতে পারিতেছে না। যদি সেইটাই হয়, তখন তুমি একটা জিনিষ বুঝিবে যে, তুমি বাইরে এক, আর ভিতরে আরেক মানুষ। সেক্ষেত্রে আমার উপদেশ, অন্তরের মতো হও। বাইরে তোমাকে যা দেখা যায় সেটা তুমি নও, সেটা তোমার প্রেতাত্মা। আর প্রেতাত্মারা কখনোই মানুষের সমাজে স্বীকৃত নহে।

আমি তোমাকে সেই রকমের আদর আর ভালোবাসা দিয়ে পরিবর্তন করিতে চাহিয়াছিলাম। আমি দেখাইতে চাহিয়াছিলাম যে, যাহারা তোমাকে অবহেলা করিয়া সমাজের এক পাশে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়াছিলো, আসলে তুমি তাহা নও। আমার থেকে বেশী আর কেউ তোমাকে ভালোবাসিয়াছে কিনা আমার তাহা জানা নাই, আমার থেকে বেশী উদবিগ্ন ছিলো কেউ, সেটা আমার জানা নাই। কিন্তু আজ আমি একটা জিনিষ বুঝিয়াছি, তুমি আমার বিশ্বাস, আমার সততা আর আমার সরলতা নিয়ে এমন কিছু মানুষের জন্য নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিয়াছো যাহা তোমার জন্য হুমকিস্বরূপ। এতোবড় অনিরাপদ পরিস্থিতি সামনে রাখিয়া, এতো বড় আশংকার পৃথিবী জানিয়াও যখন কেহ নিজের আশংকার কথা ভাবে না, তাহাদের জন্য অন্ধকার প্রিথিবীটাই প্রযোজ্য।

জীবনকে ভালোবাসিবার আরেক নাম চেলেঞ্জ। জীবনকে ভালোবাসিবার আরেক নাম সততা। জীবনকে ভালোবাসিবার আরেক নাম বিশ্বাস। সব হাসিই হাসি নয়, আবার সব কান্নাই কান্না নয়। মানুষ অধিক আনন্দেও কাদে। আবার মানুষ অধীক দুঃখেও কাদে না। তবে মানুষ সব ভয়েই কাতর হয়। আর সব ভয়ের চেহারা এক। যার নাম- আতঙ্ক। এই আতংকে মানুষ অসুস্থ হয়, মানুষের রুচী কমিয়া যায়, এক সময় দেহ ভাঙ্গিয়া আসে। দেহ ভাঙ্গার সাথে সাথে মানুষ মানসিকভাবে দূর্বল হয়, এক সময় পানির অভাবে যেমন কচি গাছের মরন হয়, তেমনি এই আতংকগ্রস্থ মানুষগুলিও মৃত্যু বরন করে। তাহাদের জন্য কেউ আর পিছনে তাকায় না।

২৩/০১/২০১৯-সে আমার অলিখিত ভগবান।

এক বছর আগের আজকের এই দিনটা অর্থাৎ ২৩/০১/২০১৮ তারিখটা আমার জীবনে যেমন খুবই একটা স্পর্শকাতরের দিন, আবার অন্যদিকে আমার জীবনকে এই মানুষশাসিত নারীর প্রতি একতরফা ভারসাম্যহীন সমাজে টিকিয়ে রাখার জন্যেও আমার জীবন বলি দেয়ার একটা দিন। আবার যদি বলি, এটা এমনো একটা দিন ছিলো যা কিনা কখনোই আমি হয়তো চাইনি। অথচ আমাকে এই দিনে সেই কাজটাই করতে হয়েছিলো যা আমি নিজের ইচ্ছায় করতেই চাই নাই। কারন আমি ইতিমধ্যে এই সমাজের মুখোসের আড়ালে যে মুখাবয়ব দেখেছিলাম যা এক কথায় যদি বলি সেটা হচ্ছে- মেয়েরা আজো আমাদের এই সমাজে একটা অলিখিত বোঝা।

অনেকেকেই কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন তারা ভালো আছেন, কিন্তু তারা জানেন তাদের সময়টাই ভালো যাচ্ছে না। সত্যি কথাটা বলার জন্যে সাহস থাকলেও সেটা আসলে পুরুপুরি কাউকে যে বুঝাবেন, সেটা মুখের কথায় বুঝানো যায় না। আয়নায় চেহারা দেখা যায় কিন্তু কষ্ট দেখা যায় না। ভিতরটা কেউ দেখে না যদিও সত্যিটা ভিতরেই থাকে। সেই কষ্টে ভরা সুর শুধ্য নিজের কান থেকে নিজের অন্তরেই ঘুরাঘুরি করে প্রতিধ্বনি করতে থাকে। অন্য কারো অন্তর কিংবা হৃদয়ে সেটা কোনোভাবেই পুশ করা যায় না। আসলে একটা কথা আছে-কান্নার আহাজারীতে সুর থাকে না, থাকে বেদনা আর কষ্ট যে কষ্টের কোনো নাম নাই, যে কষ্টের রুপ কাউকে দেখানো যায় না।

আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে কোনো এক সিড়ি থেকে পিছলে পড়ে আমি এমন একটায় জায়গায় পতিত হয়েছিলাম যেখান থেকে না আমি নিজে বা না আমার পরিবার অথবা আমার কেউ সজ্জন টেনে আবার সেই রাস্তাটায় তুলে দিতে পারে। আর সেই সখমতা তাদের কারো ছিলোও না।  অনেক সময় কারো মুখ দেখে কারো ভিতরের যন্ত্রনাকে উপলব্দি হয়তো করা যায়। তখন কারো হয়তো মন চায় যে তার কাছে যেতে, তার মনের কথা জানতে, কিন্তু আমাদের সমাজটা এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে সচেতন মানুষের মন বলে উঠে “মাথা ঘামিও না, যদি কোনো সমস্যায় পড়তে হয়!! বিপদে জড়িয়ে পড়লে?” উপলব্ধি সবাই করে। সবার মনকেই ছুয়ে যায়। কেউ কেউ ঝাপিয়েও পড়ে। মনুষ্যত্তের অবনমন যেমন আছে, মনুষত্যের উত্তোরনও তেমন আছে। এমনটি হতেও পারে যে আপনি কোনো মানুষকে দেখে বুঝতে পারলেন সে সমস্যায় রয়েছে। তার মুখে লুকিয়ে থাকা কষ্টকে বুঝলেন আর জানতে পারলেন যে তার পিছনে অত্যাচারের এক ঘৃণ্য কাহিনী বা অন্য কোনো কাহিনী লুকিয়ে আছে। সন্দেহের বশে অসুবিধায় রয়েছে এমন মানুষকে দেখে কোনো প্রশ্ন করা মোটেই অহেতুক হস্তক্ষেপ নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই সব সচেতন মানুষ সামাজিক লাঞ্ছনার ভয়ে সেই কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাড়াতে ভয় পায়। আমার বেলাতেও ঠিক সে রকম একটা পরিস্থিতির স্রিষ্টি হয়েছিলো। আমার মুখ দেখে স্পষ্ট বুঝা হয়তো গিয়েছিলো, আমি ভালো নেই, কষ্টে আছি কিন্তু পর নির্ভর আমার এই পরিবারের কোনো সদস্যদের এইটুকু ক্ষমতা ছিলো না যে, তথাকথিত আমাদের এই সমাজের ভাবধারাকে এড়িয়ে কেউ আমার জীবনে এসে দাঁড়ায়। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমাদের অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে শিখতে হয়। আমিও সেটাই করতে বাধ্য হয়েছিলাম- আমার বিয়ে হয়ে গেলো এমন এক মানুষের সাথে যাকে আমি চিনতাম আমার জন্ম লগ্ন থেকেই। তার সাথে আমার কখনোই এমন কোনো সম্পর্ক ছিলো না যাকে আমরা বলি- ভালোবাসা বা নির্ভরতা। হয়তো তার উদারতা কিংবা আমার রুপের মুগ্ধতায় সে আমাকে বরন করতে চেয়েছিলো। কোনো অবস্থাতেই তার সাথে আমার যায় না, অন্তত বিয়ে করে সংসার করার মতো ব্যাপারে তো নাইই।

ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েই হোক আর সামাজিকতা রক্ষার জন্যই হোক, আমি তার সাথে শেষ পর্যন্ত বিয়ে নামক সম্পর্ককে মেনেই নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আর যাইই হোক, আমার এই মেনে নেয়ার সিদ্ধান্তে আমার পরিবার বেচে যাবে একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে, আমি বেচে যাবো একটা অপয়া অপবাদ থেকে, কারন আমি সমাজকে ভয় পাই। কিন্তু তখনো আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারি নাই যে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো সম্পর্ক জুড়তে যাওয়া একটা ভয়ংকর পরিবেশের জন্ম দেয়। অনেক সময় প্রতিবেশি বা সমাজের সম্মান বাচানোর জন্য অনেক সময় এই ইচ্ছের বিরুদ্ধে সম্পর্ক গড়ে তোলতে হয় বটে কিন্তু সময়ের পাল্লায় এই সম্পর্ক একটা বোঝা হয়েই দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে আজো এমন অনেক বিয়ে হয়ে থাকে যা শুধু পরিবারকে খুশি করার জন্য। যাকে অন্যের বাড়িতে পাঠানোর জন্য আমরা অনেক কিছু করতে পারি। আমরা তখন হাসিখুশী অববয়ব নিয়ে বিয়ের সব ফরমালিটিজ করে সুখী হবার ভান করি। কিন্তু আরো একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা উচিত যা আমি দেখেছি চাক্ষুষ নিজের বেলায়। বিয়ের সময় দেখানো খুসি আর ভালোবাসার অভিনয়ে এটা প্রমানিত হয় না যে, ভবিষ্যতে এই সুম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা বা ঘৃণা আসবে না। একসময় দেখা যায়, এই দেখানো ভালবাসা প্রকাশ্য ঘৃণার বিষে রুপান্তরীত হয়। এই বিষে যখন ঘৃণা ঢোকে পড়ে, তিক্ততার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যে এখন এই সম্পর্ককে শেষ করা উচিত। বুঝে শুনে বেরিয়ে আসা উচিত। যাতে তার আগে কোনো মারাত্তক অঘটন না ঘটে। কেননা প্রায়ই তিক্ত সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে বুদ্ধির জায়গায় হিংসা ঢোকে পড়ে, আর তখন কিসের সমাজ আর কিসের জীবন সেটার পরাজয় ঘটে। নিজেকে শেষ করে দেয়া বা নিজের ঘৃণার মানুষতাকে শেষ করে দেয়াই যেনো মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এমন অনেক কিছু হয় যে, সেই দম্পতি যে একদিন ভালোবেসে কিংবা উদার মন নিয়ে খুব কাছে এসেছিলো, তারাই সম্পর্কের তিক্ততায় একজন আরেকজনকে চাকু, বন্ধুক চালাতে পিছপা হয় না। আমি সেটা পর্যন্ত আমার এই অসম দাম্পত্য জীবন চালিয়ে নিতে চাই নাই। কিন্তু আমার বাবা মা কখনোই আমার এই মনের ভিতরের আবেগতা বুঝতে চায় নাই। একটা বাবা মা যখন সন্তানের জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ এটা বুঝতে না পারে, তাহলে সেই পরিবারে সেই সন্তান একটা অসুস্থ্য পরিবেশেই বড় হতে থাকে। আর অসুস্থ্য পরিবেশ শুধু সাস্থ্যইকেই ক্ষতি করে না, মনকেও। আমি আমার নিজের মনের আওয়াজ শুনোট পেয়েছিলাম। এই জীবনে শুধুমাত্র একটা থাকার জায়গা হলেই হয় না, জীবনে বাচার জন্য নিঃশ্বাস ফেলার একটা জায়গাও লাগে। ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কোনো ব্যক্তিত্ত বেশীদিন অসহায় থাকে না। আমার কাছেও সেতাই একদিন চরমভাবে মনে হয়েছিলো যে, কিছু জিনিষ যা প্রতিনিয়ত মনকে কষ্ট দেয়, মানসিক শান্তি নষ্ট করে, সে সব কাহিনী চিরতরে ভুলে যাওয়াই ভালো। তাতে অন্তর মানসিক কষ্টটা আর থাকে না। আমার জীবনের প্রতিটি দিন যেনো চলছিলো ঠিক এরকম যে, এক শিফটে উনুন, আর আরেক শিফটে বিছানাইয় কারো জন্যে অপেক্ষা করা যে কখনোই না আমার ছিলো, না আমি তার ছিলাম। এটাই কি গরিবের লাইফ। আমার এই যৌবনের দাম, আমার এই জীবনের দাম যদি শুধু শরীর দিয়েই হয়, তাহলে আমি কেনো এমন জীবন বেছে নেই না যেখানে আমি অন্তত আমার মতো করে বেচে যেতে পারি? আর সেই বাচায় যদি কেউ আমাকে নিঃশ্বাস ফেলার একতা অবকাশ ও করে দেয়? কে চায় না তার জীবন আরো ভালো থাকুক?

আমি বদ্ধপরিকরভাবে এক তরফা এবার নিজের জন্যেই নিজে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম- যে জীবনকে সমাজ প্রোটেকশন দেয় না, যে সমাজ ব্যবস্থা আমার মতো কোনো নারীর দায়ভার গ্রহন করে না, যে সমাজে আমি নারী হয়ে একটা বোঝা ছাড়া আর কিছুই না, সে সমাজের কোনো আইন কিংবা নীতি আমার জন্যে না। আমার জীবন আমারই। আমি যদি বেচে থাকি, তাহলে সমাজ আছে, যদি আষ্টেপিষ্ঠে আমি প্রতিনিয়ত আমার সমস্ত অধিকার থেকে নিপীড়িত মানুষের মতো একটা পাশবিক বন্ধি জীবনই এই সমাজের নিতীর কারনে মেনে নিয়ে সামনে এগুতে হয়, আমার সে জীবনের কোনো প্রয়োজন নাই, না সেটা আমার জীবন। আমার এ রকম সিদ্ধান্তের কারনে বারংবার বড় ছোট সবার কাছ থেকেই হরেক রকমের উপদেশ আর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়েছিলাম। কিন্তু সব উত্তর সবসময় তার প্রশ্নের ন্যায় বিচার করে না। বিশেষ করে প্রশ্নটা যখন এমন হয় যেটা মনকে প্রতিনিয়ত কুড়ে কুড়ে খায়, আর হৃদয়কে ছুড়ি দিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর যখন কারো জীবনের নাশ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেই উত্তরের শেষ পরিনতি সম্পর্কে উত্তারদাতার অনেক ভেবেচিন্তে দেয়া উচিত। আমি আমার এই সম্পর্কের শেষ পরিনতি ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছিলাম যে, সমাজের চাপের কারনে নেয়া আমার সেই সম্পর্ক একদিন আমাকে অনেক চড়া মুল্য দিয়ে পরিশোধ করতে হবে। তখনো এই সমাজ আমার পাশে দাঁড়াবে না। তাই সব কিছু আমি অনেক ভেবে চিন্তেই আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।

এমনিতেই প্রত্যেকটা মানুষ নিজের মতো করে বাচতে চায়। আর এই বাচার জন্য হয়তো অনেক আর্থিক ক্ষমতা না থাকলেও মানুষ যতটুকু ক্ষমতা আছে সেটার উপরেই ভরষা করে নিজের মতো করে নিজে বাচতে চায়। কিন্তু কিছু মানুষের মধ্যে কর্তৃত্ব করার প্রবনতা এমন বেশী থাকে যে, এই ধরনের প্রবৃত্তির কারনে অন্য কিছু মানুষ ধীরে ধীরে সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে থাকে। এক সময় তারা একাই হয়ে যায়। আমিও এক সময় মনে হলো- একাই আমি। আমি যদি আসলে একাই হই, তাহলে পরাজয়ের গ্লানী টানবো কেনো?

দুটু মানুষকে জুড়ে দিয়ে একটা নতুন জীবন দেয়ার এই প্রথার নাম বিয়ে। বিয়েও কিন্তু একটা কন্ট্রাক্ট, দায়িত্তের কন্ট্রাক্ট, সরকারী অনুমোদিত একটা কন্ট্রাক্ট। হতে পারে এই কন্ট্রাক্টের মাধ্যমেই দুটু পরিচিত বা অপরিচিত মানুষ একজন আরেকজনের হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শপথ করে। কিন্তু কারো হাত ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু উন্নতির দিকে যাওয়া সেটা কিন্তু নয়। আগে খুব জানা দরকার, হাত ধরা মানুষটি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। সাফল্যের সপ্ন, জীবনের আশা আর পরিশ্রমের পথ যিদি  যাত্রার পথ একদিকে না হয়, তাহলে আর যাই হোক, সাফল্যকে হাতে পাওয়া যায় না। আই লাভ ইউ বললেই শুধু ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসার বহির্প্রকাশ হয় তার কাজে আর বাস্তবে। অনেকে হয়তো আই লাভ ইউ বললেই ভাবে ভালোবাসা হয়ে গেলো, কিন্তু সেটা কি অন্তরের না শরীরে তা যাচাই করার কোনো দরকার মনে করে না। ভালোবাসা হচ্ছে সেটা যা কাছে থাকলে এর প্রয়োজন অনুভব করা যায় না, মনে হয় আছেই তো। কিন্তু যখনই চোখের আড়ালে যায়, মন শুধু আনচান করে আর প্রতীক্ষায় থাকে, কখন কাছে আসবে। ভালোবাসা, কোনো ড্রেস বা জুতা তো নয় যে ফিটিং হলো না আর শপিংমলে গিয়ে ফেরত দিয়ে আসবো। একটুখানি ময়লা হলো বা ফেটে গেলো তো আলমারীর ভিতর লুকিয়ে রাখলাম। কিন্তু ওই ড্রেস বা জুতু যদি ফিটই না হয় তো তাহলে আমরা কি করবো? আমরা তো সেটা পড়তেই পারবো না। আর যদি পড়তেই না পারি আবার ফেলতেও না পারি তাহলে তো আলমারী ছাড়া আর কোথায় রাখবো? তখন হয়ত অন্যদের মতো আমরা আরেকটা শার্ট বা ড্রেস কিনে পড়ে নেবো যা একদম ফিটিং। কিন্তু যেদিন আমি সমস্ত কিছু একপাশে রেখে ওর সাথে জীবন বেধেছিলাম, সেদিন থেকেই আমি পন করেছিলাম, যাইই হোক, আমি থাকবো। সেদিন থেকে আমি তো অন্য কারো কাছে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি নাই। কারো চোখে তাকানোর কথা ভাবতেই পারি নাই। অন্যের সাথে থাকা, অন্যের হাসি, অন্যের জন্য আমি তো কোনো সপ্নই দেখতে পারি নাই। কিন্তু পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে আমার ভাগিকে নিয়ে দাড় করিয়েছিলো যে, আমি হয়তো ওর হাতটা আজীবন ধরেই রাখতে পারতাম, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে, সেক্ষেত্রে আমার হাতটাই হয়তো কাটা যাবে।

আমি বারবার আমার সেই ফেলে আসা কয়েকটা বছরের প্রতিটি মুহুর্ত বিচার আর বিশ্লেষন করে দেখছিলাম। আমার সেই পুরানো বন্ধু যার কারনে আজ আমার এই সমাজে এতো নাজেহাল অবস্থা। কিন্তু সেই নাজেহাল হবার কারনটায় তার কোনো ভুমিকা ছিলো না। সে তো চেয়েইছিলো আমি কিভাবে ভালো থাকি। যা হয়েছে তা শুধু এক তরফা আমার ভুলের কারনে। আমি আজো সেই দিন গুলির কথা ভাবি আর মনকে এটা বুঝাতে সক্ষম হই, জীবন আমার, সমাজ আমার নয়, জীবনের সব দুঃখ আমার আর সেটা আমি সমাজ থেকে পেতে চাই না, জীবনের সুখ আমার আর সেই সুখ আমি নিজের জন্য তৈরী করবো, সমাজের কোনো নিয়মের মধ্যে নয়। কোনো এক ঝড়ের সময় আমার উপড়ে যাওয়া ঘর যখন ঝড়ের শেষে বিলীন হয়ে যায়, সমাজের প্রতিটি মানুষ পাশে এসে শুধু মুখে আর ঠোটেই আহাজারী করে, কিন্তু পুনরায় মেরামত করে যে, একটুখানী সহায়তা করবে সেটা আমার এই সমাজ নয়। বরং আমার সেই অসহায়ত্তকে কেন্দ্র করে আমাকে লুটে পুটে খাওয়ার একতা প্লট তৈরী করবে। যদি সেটাই হয়, তাহলে তো আমার সেটাই করা উচিত যা আমার সেই বন্ধুটি আমাকে সম্মানের সাথে বাচাতে চেয়েছিলো। প্রতিদান একটা মনুষত্যের ব্যাপার, আমার যা আছে তার বিনিময়ে সে যদি সত্যিকারভাবেই আমাকে সমাজের বাইরে গিয়ে এমন একটা জীবন দান করে যেখানে এই সমাজেই আমি একজন প্রগতিশীল মানুষ, শুধু নারীই নই, আমি একজন নীতিনির্ধারক ও বটে, অথবা এমন একটা জীবন যেখানে সমাজের সব আইন আর কানুন আমার পায়ের নীচে পদায়িত, তাহলে কেনো আমি শুকনো রুটি দিয়ে গলা ফাসাবো? আর জল চাই, আমার ভালো পরিবেশ চাই। জীবন তো একটাই। সেতো আমাকে এতাই বলেছিলো যে, “আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে পারি কিন্তু লড়াইটা তোমার, তোমাকেই লড়তে হবে। এটা বিজনেস নয়, এটা তোমার লাইফ।“ আমি যেনো সম্বিত ফিরে পেয়েছিলাম।

সময় নতুন সম্পর্ক তৈরী করে। আবার “সময়” পুরানো সম্পর্ককে নতুন করে সাজিয়েও দেয়। তখন ওই সম্পর্ক যে আকার আর যে রুপ নিয়ে ফিরে আসে, সেখানে থাকে আগের করা সব ভুল আর মানসিকতা বিবর্জিত। কষ্টের সময় যারা থাকে, তারাই তখন নিজের ফ্যামিলি হয়ে যায়। সে আমার প্রকৃত পরিবার ছিলো। আমি ফিরে তাকাতে চেয়েছিলাম এবার নতুন আংগিকে। যখন ফিরে তাকালাম, দেখলাম, গাছটা কেটে দিয়েছিলো কিন্তু শিকরটা কেউ কাটতে পারে নাই। সেই শিকর থেকে আবারো নতুন ঢাল পালা আর নতুন পাতার জন্ম নিচ্ছিলো। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া মানে জীবনটাই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। একটা রোমান্টিক সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া নাতো মানুষকে কাপুরষ বানিয়ে দেয়, আর না ছোট করে। একটা ব্রেক আপ শুধুমাত্র একটা ইংগিত যে, জীবনে রোমান্স ছাড়াও আরো অনেক সুন্দর উপহার আছে। যেগুলিকে আমাদের চিনতে হবে, খুলতে হবে, আর পুরু উপভোগ করতে হবে। আমার জীবনে সে ছিলো ঠিক সে রকমের একতা ব্যক্তিত্ত। আমি নারী, আমার মুল্য কারো কাছে হয়তো ঠিক ততোটা যতোটা আমি সক্ষম অবস্থায় দিতে পারবো। কিন্তু তার কাছে “নারী” ছিলো একটা দায়িত্ত, একটা অপরুপ মায়ার ভান্ডার। কতোটা আমি দিতে চাই, অথবা দিতে ইচ্ছুক সেটা তার কাছে জরুরী ছিলো না, তার কাছে জরুরী ছিলো সেটা যেতা আম্র দরকার। একটা সম্মানীত জীবন। সমাজের কাছে আমার মাথা উচু করে দারাবার সিড়ি। কিন্তু আমি জানি আমার কি দেবার ক্ষমতা ছিলো। আসলে আমার কাছে কিছুই দেবার ছিলো না তার জন্যে। যা দিতে পারি সেটা তার হাতের কাছেই সারাদিন গড়াগড়ি যায়।

জীবনে কাকে কতটা জায়গা দেবো সেটা ঠিক করে ফেলতে পারলে জীবনে আর কোনো সমস্যাই থাকে না। আর কার সাথে কি কমিটমেন্ট করা দরকার তার যদি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তখন জীবনের স্রোত সব সময় একই থাকে। পিছুটানের আর ভয় থাকে না। আর যখন পিছুটানের ভয় থাকে না, তার সামনে দ্রুত গতির শক্তিটাও ধীর গতি হয় না। যতোক্ষন যেটা ভালো লাগবে, ততোক্ষন সেটা চালিয়ে নাও। আর যদি কখনো তাতে কোনো উলতা স্রোতের আবাষ পাওয়া যায়, হয় তাকে সমাধান করতে হবে, নতুবা নিজের পায়ের শকিতে জোরদার করতে হবে। কখনো কখনো বিয়েটা শেষ হয়ে যায়, সম্পর্ক নয়। তখন বেচে থাকে একটা বন্ধুত্তের অভ্যাস, মায়া। তখন যেটা হয়, একজন আরেক জনের কষ্টে বা বিপদে অন্য জন ততোটাই কষ্ট আর বিপদে থাকে যতোতা সে থাকে। অনেক সময় ঠিকানা ভুল হয় কিন্তু ওই ঠিকানায় যারা থাকে তারা হয়তো ঠিক লোক। আর এটাই সেই ঠিকানা যেটা ভুল কিন্তু সেখানে যিনি আসেন বা থাকেন, তিনি আমার জীবনের জন্য সঠিক। ভুল ঠিকানায় আমার সমস্ত জীবনের সঠিক মানুষটি বাস করে।

সামাজিক রীতির মাধ্যমে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ আমরা দুজন মানুষের মধ্যে কোনো একদিন আমি তার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে আমি সমাজের রীতির বাইরে গিয়ে এমন এক সম্পর্কে নিজে চিরদিনের মতো আবদ্ধ হয়ে গেলাম, যেখানে আমি আছি আমার মতো করে। অতীত ভুলে যাওয়া যায় না বটে কিন্তু সেই অতীত আমাকে যেনো আর কখনো দুক্ষে ভারাক্রান্ত না করতে পারে সেই বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আজকের দিনের মানুষটি আমাকে সম্মানের সাথে গলায় পড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারপরেও অতীতের সেই তারিখটা যখন বারবার বছরান্তে ফিরে আসে, আমি হয়তো কখনো সেই মানুষটার জন্য দয়া অনুভব করি, কখনো ঘৃণা অনুভব করি, আর ভাবি, কতোটা পরাজয়ে মানুষ কতোটা ভালো থাকে। এখন শুধু তার সেই অযাচিত ব্যবহার, সমাজের অপনীতি আজ আমাকে শুধু মুচকী হাসিতে ভড়িয়ে দেয়। আমি সুখে আছি। আজ সমাজ আমাকে ঘিরে নিতির ব্যাপারে পরামর্শ করতে চাইলেও আমি এই সমাজকে পরিবর্তনের কোনো উপদেশ দেই না কারন এই সমাজ কারো কোনো উপদেশ শুনে না। আজ সেই তারিখটা আরো এক বছরের জন্য কালের গর্ভে হারিয়ে গেলো কিন্তু মনে করিয়ে দিয়ে গেলো আমার অতীতের অনেক কষ্টের কথা আর আজকের দিনের সুখের মাত্রাটা। অসহায় মানুষ একদিন কারো না কারো হাত ধরে ঘুরে দাড়ায়ই।

সে আমার অলিখিত ভগবান।

২০/০৩/২০১৭-একা থাকা

Categories

মাঝে মাঝে আমি যখন একা থাকি, তখন ভাবি, কিভাবে এতোবড় সাগরের মতো সমস্যাগুলি আমি সামাল দিচ্ছি? কোনো সমস্যাই কারো থেকে কম ছোটনা। কিন্তু কনো না কনভাবে আমি সামাল দিচ্ছি। কোনো সমস্যা বিশাল টাকার, কোনো সমস্যা বিশাল ভাবে রাজনীতির, কোনো সমস্যা আবার নিছক ব্যক্তিগত। এতো সমস্যায় জর্জরিত থেকেও আমি একটা জিনিষ বুঝতে পেরেছি, আমার পাশে আসলে কেউ নাই। যে যাই কিছু বলুক, আমি আসলে একা। আমার পরিবার আমার সাথে আছে কিন্তু তারা কি আমার সমস্যায় চোখের জল ফেলাছাড়া আর কিছু করতে পারবে? আমি তাই মাঝে মাঝে ভাবি, আমার অনুপস্থিতিতে ওরা ভালো থাকবেতো? আমার সব কিছুর উপরে আমার পরিবার। এই জায়গায় আমি চরম স্বার্থপর। এখানে আমি কোনো ছাড় দিতে ইচ্ছুক নই।

আমি যেভাবে এগুচ্ছি, তার বেশীর ভাগ সাহসিকতার কারন আমার ইচ্ছাশক্তি আমাকে আমার পরিবারের জন্য কাজ করে। কখনো ওরা আমাকে ভুল বুঝে কিন্তু আমি জানি ওদের ঐ ভুল বুঝাবুঝির কারনে আমি ছেলেমানুষিকরলে ওরা সময়ের স্রোতে ভালো থাকবেনা। তাই সব রাগ, ঝগড়া, বিবাদ নিমিষেই অবুঝ বালকদের বাচ্চামি মনে করে ঝেড়ে ফেলে দেই আর সামনের দিকে এগুনোর চেষ্টা করি। আমি সফল হচ্ছি কিনা আমি জানি না তবে আমার উপর থেকে ধীরে ধীরে যে বিশাল বিশাল বোঝা নেমে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারি। আর এখানেই আমার সার্থকতা।

১৬/০৭/২০১৬- মিস ক্যালকুলেশন?

Categories

 

আমার একটা জায়গায় কিছুতেই ক্যাল্কুলেসন মিলছে না। মনে হচ্ছে, কোথায় যেনো একটা ভুল হচ্ছে। তার আগে একটা গল্প বলি। বহুদিন আগে আমি একটা সিনেমা দেখেছিলাম, সম্ভবত পোলিশ সিনেমা। এটা প্রায় ৯০ দশকের দিকে। সিনেমাটার কাহিনি এই রকম যে,

সিনেমাটায় মোট ১২ জন লোক খুন হয়। ১২তম ব্যক্তি খুন হয় ১১তম ব্যক্তির দ্বারা, ১১তম ব্যাক্তি খুন হয় ১০তম ব্যক্তির দ্বারা, ১০তম ব্যক্তি খুন হয় ৯ম ব্যক্তির দ্বারা এবং এইভাবেই খুনগুলু চলতে থাকে এবং সর্বশেষ ২য় ব্যক্তিটি খুন হয় ১ম ব্যক্তির দ্বারা। অথচ এই ১২ জনই ছিলো একটা সংস্থার অধীনে এবং কেউ আড়াল থেকে এই ১২ জনকেই পৃথক পৃথক ভাবে নির্দেশনা দিত। মজার ব্যাপার হলো এই ১২ জনের মধ্যে কেউ কাউকে কখনোই চিনতো না। আর খুন গুলু হয়েছে বিভিন্ন বিভিন্ন কারনে। কোনো খুন কোণ খুনের কারনের সঙ্গে এক ছিলো না। যখন ১২ থেকে খুন হতে হতে ১ম ব্যক্তিটি খুন হয়ে যায় তখন স্ক্রিনটা একেবারে ব্ল্যাক হয়ে যায়। ভাবলাম, মনে হয় স্ক্রিনে কোনো সমস্যা হয়েছে বা সিনেমার রিলে কোন সমস্যা হয়েছে। কিন্তু না, একটু পরে দেখা গেলো, স্ক্রিনে একটা মেসেজ এসেছে, Cycle will continue and The End. জানা গেলো না, কে সেই অদৃশ্য নির্দেশনাকারী। ওরা অনেক বড় এবং অদের ব্যাপারে কেউ কখনো জানতেও পারবে না।

আজকে বিশ্ব ব্যাপি যে সমস্ত খুন, টেরোরিস্ট এটাক, কিংবা ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, কখনো কারন হিসাবে দেখছি ধর্ম, কখনো দেখছি পাওয়ার পলিটিক্স, কখনো দেখছি বিশ্বায়ন, কখনো দেখছি গনতন্ত্র, রাজতন্ত্র আরো অনেক বিষয়। আসলে হচ্ছেটা কি?  এটা যুদ্ধ নয় আবার যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি। পূর্বে একদেশ আরেকদেশ দখল করার জন্য সৈন্যসামন্ত, হাতি ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিমান বাহিনি, নৌ বাহিনি, স্থল বাহিনি সব নিয়ে একে অপরকে এটাক করতো, কিন্তু এই কয়েক বছর যাবত দেখছি, কোন দেশ নয়, কিছু ইন্ডিভিজুয়াল চরিত্র একা একাই পুরু পৃথিবীর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। যেমন লাদেন একাই যেনো একটা সংস্থা, কিংবা আইএস, ইত্যাদি। এখন কোনো ইন্সটিটিউশন দরকার পরছে না, জাস্ট নিছক ব্যক্তি পর্যায়ের মধ্যে যুদ্ধটা চলে এসেছে। একটা লোকই এনাফ একটা চরম আকারের কেওয়াস তৈরি করার জন্য। এইটাকে সামাল দেওয়া খুব সহজ বলে মনে হচ্ছে না। আজকে আমরা যখন আমাদের দেশে আক্রান্ত হচ্ছি, কেউ কেউ পাশের দেশকে ব্লেম করছি বা আমাদের প্রতিপক্ষকে ব্লেম করছি, আবার যখন পাশের দেশ আক্রান্ত হচ্ছে অথবা আমাদের প্রতিপক্ষ আক্রান্ত হচ্ছে, তখন তারা আরেক দেশকেবা তাদের প্রতিপক্ষকে ব্লেম করছে, আবার ওই দেশও যখন আক্রান্ত হচ্ছে, তারা তাদের পাশের কোন দেশ বা গোত্রকে ব্লেম করছে, ঠিক যেনো ওই সিনেমার মত। কিন্তু আসলে এইসব কিছুর নেপথ্যে কে বা কারা? খুব গভিরভাবে ভাবা দরকার। সবার শেষ কি ওই ব্ল্যাক স্ক্রিন যা আমরা কখনো জানতে পারবো না বা জানা সম্ভব না?

আরেকটা বিষয় চোখে পড়ছে। ইন্সট্রাকশনটা যেনো এমন নয় যে, Do or Die, ইন্সট্রাকশনটা যেনো এই রকম যে, Do and Die.

খুব আতংকের ব্যাপার আসলে।

১৩/০৬/২০১৬- সরল রেখার হিসাব

Categories

 

কোন একটা কারনে আমি আজ একটু মর্মাহত। মর্মাহত এই জন্য যে, আমি একটা সরলরেখার হিসাব বুঝতে পারি নাই। আমি বুঝতে পারি নাই যে, আমি একটা অবিভক্ত সরলরেখার অংশ যাকে ভাঙবার চেষ্টা চলছে। আমি বুঝতে পারি নাই যে, শত্রু বন্ধুর মত ব্যবহার করলেই সে বন্ধু হয়ে যায় না। বুঝতে পারি নাই যে, শত্রুর শত্রুরাও একসময় তাদের বড় শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য একজোটে বন্ধু হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি নাই যে, নিজের ইচ্ছাগুলো, শখগুলো রক্ষা করার জন্য কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ নয়। আমি এখন বিছানায় শুয়ে আছি আর ভাবছি। মনে হচ্ছে আমি কষ্টে আছি, যত না শারীরিক কষ্ট, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট মনের ভিতরে। নিজের কাছে নিজেকে খুব বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে এইজন্য যে, কেন আমি এতোটা অবুঝ ছিলাম, কেন আমি ঐ হায়েনাটাকে এতোটাই কাছের লোক বলে মনে করেছিলাম, কেন মনে হয় নাই, সে ওঁত পেতে আছে। নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে আজ, নিজের কাছে লজ্জাবোধও কম মনে হচ্ছে না। এই পৃথিবীতে আমি আজ অন্তত একটা মানুষরূপী হায়েনাকে তো চিনতে পারলাম যে আমারই আস্তানার কাছে ঘুপ্টি মেরে বাস করে, সাধু হয়ে চলাচল করে অথচ সে হায়েনার চরিত্র লুকিয়ে রাখে।   জীবনের মানে বুঝবার জন্য অনেক দূর যাওয়ার প্রয়োজন নাই। এই হায়েনাটাকে দেখলেই সব বুঝা যাবে। এই হায়েনারা বন্ধু হয়ে অন্তরের ভিতরে কোকিলের কণ্ঠের মত সুর নিয়ে প্রবেশ করে, সে আসলে সুর নিয়ে নয়, সে জহর নিয়ে প্রবেশ করে। এদেরকে বুঝবার জন্য একটু গভীরে যাওয়া দরকার। তা হলে জীবনের মানে কি তার হিসাব বুঝা যাবে। জন্মের পর যাদের আস্তানার কোন হিসাব ছিল না এবং এখনো নাই, কে বা কারা তার অভিভাবক কিংবা কি নিয়ে তারা পরিচিত হতে হবে এই জনসম্যখ পৃথিবীতে, তাই যখন তাদের নাই। বস্তির ঐ অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে যাদের শ্বাসপ্রশ্বাস চলে, জীবনের মুললক্ষ্য ঠিক করার জন্য অপরের সাহায্য লাগে, পেট পুরে খেতে না পেরে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে জীবন চলে, রাত নামলেই কোথায় একটু ঘুমানো যাবে সেই ভরসায় পরিচিত কারো বাড়ীর পরিত্যাক্ত ঘরে, বা বারান্দায়, কিংবা ঝুল বারান্দায় থাকতে পারলেই নিজেকে বড্ড সুখি মনে করে, তাদের আবার স্তর কি? ল্যাবেল কি? স্ট্যাটাস কি? তারা আর যাই হোক, কারো বন্ধু হতে পারে না। আর বন্ধু হলেও তাদের বন্ধু তাদের স্তরেরই। আমাদের স্তরের তো নয়ই। এদের প্রতিটি চিন্তায়, প্রতিটি অনুভবে, আর সমগ্র ভাবনায় থাকে কিভাবে কোথায় কি ফায়দা লুটা যায়। তাই তারা কখনো চোখের জলে মানুষকে দেখিয়ে একটা সহানুভুতি, কখনো অতি বন্ধুভাবাপন্ন চরিত্রের রূপধরে মনের খুব কাছাকাছি আসার আকুতি, আবার কখনো সাধু সন্নাসির মত গোবেচারা সেজে মানুষের মনের ভিতরে ঢোকার প্রাণান্ত চেষ্টা, এটাই এদের চিরাচরিত অভ্যাস। এরা ভিক্ষা করে না কিন্তু ভিক্ষার টাকায় চলে, যাকাতের টাকায় চলে, এরা পরিত্যাক্ত কিন্তু ভাবে ভাবে চলে, এরা নামহীন, বংশহীন, গোত্রহীন, কিন্তু এরা বড়বড় নামের লোকের দোহাই দিয়ে চলে, অথচ যাদের নামে ওরা চলে, সেই ওরা এই বংশহীন, নামহীন, গোত্রহীন উচ্ছিষ্ট মানুসগুলকে হয়ত চিনেই না। হয়ত বাপের নামটা পর্যন্তই এরা জানে তাদের আদি এবং শেষ পরিচয় হিসাবে। পিতৃকুলের না আছে কেউ, মাত্রিকুলের না আছে কেউ। এদের রূপ যাই হোক না কেন, এদের অন্তরের ভিতর থাকে সর্বদা জহর। এই জাতীয় মেরুদণ্ডহীন হায়েনারা রাগের চেয়ে হাস্যুজ্জল থাকার চেষ্টা করে থাকে বেশি, অপমানেও ওদের দাতকপাটি বন্ধ হয় না, অপমানিত বোধ না থাকায় নির্লজ্জ তোষামোদি লক্ষণীয়। আর অন্তরের ঐ জহরেই অন্যের সব কিছু নস্ট করে মানসিক শান্তিতে থাকতে চায় এই বিকৃতি মানুষগুলো।  

আমিও আজ এমনি একটা বন্ধুরুপে পাশে থাকা হায়েনার জহরসমেত দংশনের জর্জরিত ব্যথায় কাতরাচ্ছি। আমি বুঝতে পারি নাই আমার পাশে দাড়িয়ে থাকা এই হায়েনাকে। এরা সবাই হায়েনার বংশধর। ছেলে হোক মেয়ে হোক, হোক ওদের পরবর্তী বংশধর, সবাই মানুষের অববয়ব কিন্তু হায়েনার আদর্শ ছাড়া কিছুই নাই তাদের মধ্যে। এটা আমার জন্য একটা শিক্ষা হয়ে রইল। তবে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমি কেন আমার অবিভক্ত সরলরেখার ঐ প্রান্তে দাড়িয়ে থাকা আমার প্রানপ্রিয় শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে এই নিয়ে আলাপ করি নাই? আমি সেটাও বুঝতে পারি নাই। কি চক্রাকার বিপদের সঙ্গে আমি বসবাস করছিলাম। তবে শান্তিরবার্তা এই যে, কিছুটা রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিছুটা আঁচর তো লেগেছেই, কিন্তু আজ অন্তত কিছুটা হলেও জীবনের সাথে জীবনের কোথায় অমিল, সেটা বুঝতে পেরেছি। ফারা কেটে যাবে, আবার বর্ষা আসবে, আবার শরত আসবে, শুধু আসবে না হায়েনাদের জন্য সুজুগের সংবাদ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হিসাব থেকে আমি শিক্ষা নিয়েছি। আমাকে শিক্ষা নিতে হয়েছে, যদি শিক্ষা না নেই, তাহলে জীবনের আরও অনেক পর্ব আসবে, যেখানে মনে হবে ঐ পথ আরও কঠিন এবং উত্তরনযোগ্য নয়। পতন নির্ঘাত নিশ্চিত।  

আজ যারা আমার সঙ্গে অসঙ্গতিমুলক আচরন করেছে, তারা ভাল কি মন্দ এই বিচার হবে সময়ের পথ ধরে ভবিষ্যতে। আমি তৈরি হচ্ছি। আপনারাও তৈরি হউন। আর ঐ হায়েনাটাকে বলছি, তুমিও তৈরি হও। তুমি আর যাই কিছু করো না কেন, তোমার রক্তের পরিচয়, বংশ, সেটা আর নতুন করে গজিয়ে তুলতে পারবে না। তুমি এর চেয়ে ভাল কিছু করে দেখাতেও পারবে না তোমার পরবর্তী হায়েনাদের কাছে। হায়েনা হায়েনাই। আর তৈরি হও ঐদিনের জন্য, যেদিন তুমি তোমার চোখের জলের সব ভান্ডার ঢেলে দিয়েও আমার রোষানল থেকে বেচে যাবার কোন সম্ভাবনাই নাই, আর সমস্ত সুরালয়, কিংবা জরালয় দিয়েও প্রমান করতে পারবে না যে, তুমি হায়েনার বংশধর নও। তুমি আমার কাছে বিষধর সাপের চেয়েও খারাপ।

০১/০৬/২০১৬-গল্পটা যদি এমন হতো?

Categories

 

এক যে ছিল রাজকুমার, আর এক যে ছিল রাজকুমারি। রাজকুমার রাজকুমারিকে আর রাজকুমারি রাজকুমারকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু হটাত করে কোন এক দিন রাজকুমার হারিয়ে যায়। দিন যায়, রাত যায়, মাস যায় বছর আসে, বর্ষা যায় শিত আসে, রাজকুমারি পথ চেয়ে বসে থাকে। কিন্তু রাজকুমারের কোন হদিস মেলে না। চোখের সবগুলো স্বপ্ন নিয়ে আর অশ্রুভরা নেত্রে রাজকুমারি একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জস্না দেখে, চাদের পানে চেয়ে ঐ চাদের বুরির সঙ্গে একাই কথা বলে।  কত রাজ কুমার এলো গেলো। কিন্তু রাজকুমারীর কোন রাজকুমারের প্রেমেই পরতে পারলেন না। তার রাজ্য চাই না, জহরত চাই না, সোনার পালঙ্ক চাই না। তিনি শুধু রাজকুমারের জন্য পথ চেয়ে থাকেন।

একদিন হটাত কোন এক বসন্তের সকালে মাথা ভর্তি এলো মেলো চুল নিয়ে, উসুখুসু খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি নিয়ে রাজকুমার এসে হাজির। রাজকুমারি তার জীবনের সব আনন্দ আর ভালবাসা দিয়ে রাজকুমারকে জরিয়ে ধরে শুধু বললেন, আমাকে একা ফেলে তুমি কোথায় গিয়েছিলে রাজকুমার? আমি তো তোমার পথ চেয়েই এতটা দিন, এতটা সময় পার করে দিয়েছি, একবারও কি মনে পরে নাই আমায়? তুমি কি আমার ভালোবাসার স্নিগ্ধ ঘ্রান কখনোই পাও নাই রাজকুমার? এই বুকে কান পেতে দেখ, কি উত্তাপ আর কি যন্ত্রনা নিয়ে আমি এই এতগুল বছর তোমার প্রতিক্ষায় অপেক্ষা করে আছি! আমাকে তুমি তোমার বুকের ভিতরে একটু জায়গা দাও রাজকুমার। আমি বড় ক্লান্ত, আমি আজ অনেক অবসন্ন। আমাকে জোর করে ধরে রাখ এবার। আমি তোমাকে আর কখনো হারাতে চাই না কুমার।

রাজকুমার তার পকেট থেকে একটি ছোট ঘাস ফুল বের করে রাজকুমারির ঘন কালো চুলের খোঁপায় গুজে দিয়ে বললেন, এই হোক সাক্ষী আজ তোমার আর আমার প্রেমের আলিঙ্গনের। আমাদের সুতীব্র ভালোবাসার।

দিন যায়, রাত যায়, বড় ভাল জীবন কাটছিল রাজকুমারের আর রাজকুমারির। একদিন হটাত রাজকুমারের অন্তর্ধান হয়। রানী আবারো একা বসে থাকেন ঐ বেলকনির রেলিং ধরে। সন্ধায় চিল কাতুরের ডাকে তার মন ভারি হয়ে আসে। জোনাকির ডাকে তার সব অতিতের কথা মনে হয়। মনে হয় রাজকুমার তার পাশেই হাত ধরে বসে আছেন। কিন্তু না। সব আশা, আহ্লাদ, সব স্মৃতি মলিন করে দিয়ে তার গরভের অনাগত সন্তানের নড়াচড়ায় সম্বিত ফিরে আসে।

আজ নতুন রাজকুমার এসেছে তার জীবনে। হাটি হাটি পা পা করে ছোট রাজকুমার বড় হতে থাকে। একদিন সে কথা বলতে থাকে। ছোট রাজকুমার কে মা রাজকুমারি কতই ই না গল্প শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে দেন। কিন্তু রাজকুমারি সব সময় একই গল্প বলতে থাকে……… এক যে ছিল রাজা আর এক যে ছিল রানী। তাদের ছিল এক রাজপুত্তর। রাজপুত্রকে নিয়ে রাজা আর রানী বড় ভালবাসায় জীবন কাতাইতেছিলেন। একদিন হটাত করে রাজা হারিয়ে যান কোন এক গহিন জঙ্গলের ভিতর। রাজপুত্র ধীরে ধীরে বড় হয়। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে, মা আমার বাবা কই? রানী চোখের জল মুছে ছোট রাজপুত্রের কপোলে চুমি খেয়ে বলেন, তোমার বাবা একদিন ঘোড়ায় চরে টকবক করে ঐ গহিন জঙ্গল থেকে আমাদের নিতে আসবেন। তুমি বড় হও। রাজা ফিরে না এলে আমরাই তাঁকে খুজে আনবো। ছোট রাজপুত্র ঐ গহিন জঙ্গলের রহস্য বুজে উঠতে পারেন না। শুধু মাকে জরিয়ে ধরে থাকে আর বলে, মা আমি তোমায় খুব ভালবাসি।

৩১/০৫/২০১৬-যেদিন আকাশের মেঘমালা

Categories

 

যেদিন দেখবেন আকাশের মেঘ মালা আপনার জগতের কাছে শেষ বর্ষণ হয়ে আপনার পায়ের কাছে টাপুর টুপুর করে লাফিয়ে পরছে, যেদিন দেখবেন ঐ পাশের জঙ্গলের ভিতর অবহেলায় কোন এক রজনি গন্ধার সুবাস আপনার নাশারন্দ্রে ভেসে আসছে, যেদিন দেখবেন চারিদিকের মানুষ গুলো আপনাকে দেখে কোন কারন ছারাই আর আপনাকে সেই আগের মত করে দেখছে না কিন্তু মিটি মিটি করে হাসছে আপনার নতুন ভালোবাসার অববয়বে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীতে আরও অনেক বছর বাচতে ইচ্ছে করবে, যেদিন মনে হবে পৃথিবীর সব রঙ সুন্দর, যেদিন মনে হবে আপনার হাসতে ভাল লাগে, কাদতে ভাল লাগে, একাকী বসে জানালায় পাখি দেখতে ভাল লাগছে, অথবা যেদিন দেখবেন চোখের জলের মধ্যে অফুরন্ত কষ্টের মাঝেও মন বড় উতালা হয়ে আছে কোন এক অস্পৃশ্য মানুষের জন্য, যেদিন দেখবেন সোনালী রোদ আপনাকে উদ্ভাসিত করে, যেদিন দেখবেন জোড়া শালিক না দেখেও আপনার মনে হবে এই বুঝি আজকে ও আসবে, সেদিন আপনার এই অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে দেখবেন মাঘের পরে ঐ দিগন্তে দাড়িয়ে আছেন তিনি যাকে আপনি এতদিন ধরে খুজছেন। আপনার আর কোন কিছুর জন্যই কাউকে কিছুই বলার নাই। শুধু আপনি আর থাকবে বনলতা সেনের মত সেই মানুষটি, বলবেন তখন, ………এতদিন কোথায় ছিলেন? 

বলুন না কোথায় তাঁকে দেখেছেন প্রথমবার?

৩০/০৫/২০১৬-অপেক্ষার অনেক নাম

Categories

অপেক্ষার অনেক নাম। কখনো কষ্ট, কখনো সুখ, কখনো উদাসীনতা আবার কখনো শুধুই ভালবাসা। আজ আপনার এই অপেক্ষার নাম কি সুখ আর ভালবাসা? সার্থক হোক সে মিলন, আর সার্থক হোক আপনার চিত্ত। অহংকারীরা দেখুক আপনার দিবসের মুখদ্ধকর সীমাহীন আনন্দের চ্ছটা আর নিন্দুকেরা জ্বলে পুড়ে মরুক নিজ দাবগাহনে। আপনার ইচ্ছাই আপনাকে নিয়ে যাবে স্বর্গের ঐ নীল জানালায় যেখানে বসে আপনি রাতের কালো আকাশে ধ্রুবতারা দেখবেন আর নিজেকে অস্পৃশ্য কোন এক মানুষের পাশে ঠায় দাড়িয়ে অরুন্ধতী হয়ে কাল পুরুষকে ছারিয়ে সকালের লাল সূর্যের দিগন্ত রেখা ছুয়ে দেবেন। আমার সকল শুভ কামনা রইল আপনার জন্য। আপনার সবার জন্য।

২৯/০৫/২০১৬-এই নীলাকাশ ভেদ করে যেমন

Categories

 

এই নীলাকাশ ভেদ করে যেমন ভগবানকে পাওয়া যায় না, আবার সমুদ্রতল মেথুন করেও কোন দেবদেবির দেখা পাওয়া গেছে এর তেমন কোন হদিসও পাওয়া যায় না। ঠিক তেমনি অন্তরভেদ করে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলেও এক ফোঁটা ভালোবাসার আলামত পাওয়া যায় না। অথচ কেউ কষ্ট দিলে বুকে ব্যথা লাগে, আনন্দ দিলে অন্তরে সুখের আচ্ছাদন অনুমিত হয়। অনেকদিন ভালোবাসার মানুষকে না দেখলে বুক শুন্য শুন্য মনে হয়। তাহলে এই ভালোবাসার উৎসটা কি বা কোথায়?

“আমি তোমায় ভালবাসি” এর মানে অনেক ব্যাপক। আর এই ব্যাপক অর্থের কারনেই হয়তবা শতবর্ষী যুবকের চোখ অষ্টাদশী বৃদ্ধার জন্য কাদে, কাছে না থাকলে মনে হয় কি যেন নাই তার পাশে। শেষ বিকালে অথবা অষ্টাদশীর চাঁদনী রাতে কিংবা শীতের কোন এক কাকডাকা ভোরে পাশাপাশি বসে এক কাপ চা অথবা গরম গরম কোন ঝাল মিষ্টি টক খাওয়া, অমাবশ্যার রাতে কোন এক শ্মশানের পাশ দিয়ে হেটে যাওয়ার অজনা ভয়ে কুকড়ে থাকা হাত দিয়ে তাকে ধরে রাখার যে ভরসা। এই সবই ভালবাসা। একসময় এই ভালবাসা পরিনত হয় একটা অভ্যাসে। তখন অভ্যাসটাই ভালবাসা।

আজ যে শুধু তোমার মুখ দেখে ভালবাসল, তোমার রূপকে দেখে ভালবাসল, তোমার যৌবনকে দেখে শুধুমাত্র লোভের লালসায় ভালবেসে গেলো, সে আর যাই হোক তার সঙ্গে তোমার ভালোবাসার অভ্যাস হবেনা। কারন ভগবানকে ভালবাসা, একটা গাছকে ভালবাসা অথবা মাকে ভালবাসা আর সেই অপরিচিত মানুষটাকে মনের ভিতরে নিয়ে ভালবাসা এক নয়। তার সঙ্গে জরিয়ে থাকে নিঃশ্বাস, তার সঙ্গে জরিয়ে থাকে ভূতভবিষ্যৎ, তার সঙ্গে জরিয়ে থাকে জীবনের প্রতিটি সুখদুঃখের হাসিকান্নার সবগুলো অধ্যায়। 

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর তোমার অনুপস্থিতিতে যে তোমাকে মনে করে চোখের জল ফেলবে, আজ থেকে আরও শত বছর পর যে তার উত্তরসূরিদের কাছে তোমার নাম স্মরণ করে সেই অতীত জীবনের রোমান্সের কাহিনী শুনাবে, তোমার জীবদ্দশায় অসহায়ত্তের কারনে যে তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে না, যাকে দেখলে মনে হবে, সে তোমাকে নয় তোমার জীবনটাকে ভালবাসে, হোক তুমি পঙ্গু, হও তুমি বিরঙ্গনা অন্তঃসত্ত্বা, হও তুমি বোবা কিংবা বধির, সেটা তার কাছে ভাল না বাসার কোন কৈফিয়ত হতে পারে না। এখানে ভালবাসাটা শুধু শ্রদ্ধার, ভালবাসাটা অন্তরকে বুঝবার আর চারিদিকের হায়েনাদের থেকে ভালোবাসার মানুসটিকে নিরাপদে রাখার আপ্রান চেষ্টা। লম্বাপথ পারি দেওয়ার কোন সঙ্গি নাই তো কি হয়েছে, সে তোমার জন্য অপেক্ষা করবে, নৌকায় আর একজনেরও জায়গা আছে তোমার যাওয়ার জায়গা নাই, তো কি হয়েছে, সে তোমার জন্য নৌকা ছেড়ে পাশে এসে দারাবে, তোমাকে কেউ বিরঙ্গনা করেছে? তো কি হয়েছে? সে তোমার সবকষ্ট ধুয়ে মুছে নিজের ভালবাসা দিয়ে আদর দিয়ে কাছে টেনে নেবে। চিনেছ কি তাঁকে? যদি চিনে থাক, তাহলে নিশ্চিত জেনো, সে তোমাকে ভালবাসে। 

আমরা ভালোবাসার কথা বলি, আমরা স্নেহের কথা বলি, আমরা পারিবারিক বন্ধনের কথা বলি। কখনো কি দেখেছেন, আমাদের কাছ থেকে কে কিভাবে ভালবাসা চায়? আমাদের কাছে থেকে কিভাবে স্নেহ চায়? অথবা কখনো কি খুব কাছ থেকে ভেবেছেন, কেন অনেক আদরে গড়া সোনার সংসার কেন ভেঙ্গে যায়? তার সব গুলো কারন যদি যোগ করেন, দেখবেন, একটাই উত্তর, আমি যেমন ভালবাসা চাই তেমনি সবাই আমার কাছ থেকে ভালবাসা চায়। নিবেন অথচ দিতে জানবো না তাহলে তো একবার পাব আর সেটাও হারিয়ে যাবে ২য় বারের বেলায়। সোনালী, আপনি সুখি হবেন আমার ধারনা। ভাল বাসুন যাকে আপনি ভালবাসেন, ঐ দূর পাহারের প্রতিধ্বনির মত আপনার দেওয়া ভালবাসাও চারিদিকের পাহার থেকে শত গুনে আপনার কাছে বিভিন্ন সুরে, বিভিন্ন রঙে আপনার কাছে ফিরে আসবে।

২৮/০৫/২০১৬-আশ্বিন মাসের ভোরবেলায়

Categories

 

আশ্বিন মাসের ভোরবেলায় অতি ঈষৎ নবিন শীতল বাতাশে নিদ্রোত্থিত দেহে তরুপল্লব যেমন শিহরিত হয়, ভরা গঙ্গার উপর শরত প্রভাতের কাচা সোনা রোদ যেভাবে চাপা ফুলের মত ফুটে উঠে, আজ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার দুরন্ত যৌবন জোয়ারের জলের মধ্যে রাজ হাসের মত ভেসে উঠেছে। আপনি এতদিন হয়ত দিনের আলো কিংবা রাত্রির ছায়ায়তা  দেখতে পান নাই, কিন্তু আজিকার এই বর্ষণ আপনার পঞ্জরে পঞ্জরে ঘৃতকুমারি নৌকার মত চারিদিকে ঘুরপাক খেয়ে আপনার চারিগাছি মল অনবদ্য এক প্রেমের সুচনা করেছে। অপেক্ষা করুন সে আসবে, আর সে আপনার জন্যই আসবে। যখন সে আসবে, দেখবেন ঐ দুরের ঘাটে যে ফিঙেটি বাসা বেধেছে সে কোন এক ভোরে উসুখুসু করে জেগে মৎস্যপুচ্ছের ন্যায় তার জোড়াপুচ্ছ দুই চারিবার দ্রুত নাড়াইয়া শিস দিয়া আকাশে উড়িয়া যাইবে। অথবা পাশের বাসায় কোন এক কোকিল উচ্চস্বরে ডাকিয়া কুহু কুহু গানে কলরব করিবে। তখন আপনার এই ইচ্ছা, এই সাধ বৃষ্টিতে ভিজার জন্য আর অপূর্ণ থাকবে না। 

২৭/০৫/২০১৬- বিশ্ব রাজনিতিক এর সাথে

Categories

 

আমার একবার এক বিশ্ব রাজনিতিক এর সাথে খুব কাছ থেকে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তিনি এই বিশ্ব রাজনীতির সব সমস্যা, সব পলিসি, রাজনৈতিক লীলাখেলার সবগুলুর সঙ্গেই কোন না কোনভাবে জরিত থাকেনই। কোন এক অবসর মুহূর্তে আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কখনো কষ্টে থাকেন কিনা। আমার এই প্রশ্ন করার কারন ছিল। তার কোন কিছুর অভাব নাই, তার সম্পদের অভাব নাই, তার মানসম্মানের কোন কমতি নাই, তাকে অন্যান্য বিশ্ব রাজনীতিবিদরা কাছে পেলে তাদের নিজের জীবনও ধন্য হয়ে যায় এমন একটা ব্যাপার। তারজন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নামিদামী ডাক্তাররা সবসময় স্ট্যান্ডবাই থাকেন, এমনকি এয়ারফোর্স ওয়ানের মত বিমানও স্ট্যান্ডবাই থাকে। তারজন্য তো কোন কষ্ট থাকার কথা নয়।

তিনি বড্ড রসিকলোক কিন্তু খুব জ্ঞ্যানি লোকও বটে। অনেক্কখন ভেবে চিন্তে এক কাপ কফি নিজের হাতে বানিয়ে আর আরেক কাপ কফি আমার জন্য নিজেই বানিয়ে নিয়ে বললেন-তুমি কি কষ্টে আছো? বললাম, না, ওতটা কষ্টে নাই তবে আজকাল অনেক এই যুগের ছেলেমেয়েদের কথা শুনে মনে হয় তারা অনেক কষ্টে আছে। আপনি তো এই যুগেই এখন বাস করেন, আপনি কোন কারনে কষ্টে আছে কিনা।

একটু মুচকি হেসে বললেন, কয়টা যুদ্ধ দেখেছ জীবনে? আফগানিস্থান দেখেছ, ইরাক দেখেছ, কসভ দেখেছ, কিন্তু কখনো কি নিজের ঘরের পাশে ঐ বস্তির ছেরা কাপড় পড়া এতিম কোন বাচ্চার অথবা পিতামাতার বিচ্ছেদজনিত কারনে কোন শিশুর একাকীত্ব অথবা নিছক পয়সাকরির অভাবে সামাজিক দুর্বল কোন পরিবারে বেড়ে উঠা মানুষদের ভিতরের অনুভুতি দেখেছ? সেটা কোনো যুদ্ধের থেকে কম নয়।

আজ থেকে বহু বছর আগে আমি এই এমন একটা পরিস্থিতিতে তিলে তিলে বড় হয়েছি। কখনো মনে হয়েছে আমার কেউ নাই, কখনো মনে হয়েছে যারা আছে তারা আমাকে কিছুই বুঝে না। একবেলা খাবারের জন্য আমাকে যেমন নিজে উপার্জন করতে হয়েছে কখনো মুটে হয়ে, আবার কখনো পাশের বাড়ীর কোন ফরমায়েশ খেটে। আবার জীবনে বড় হতে হবে এই আখাংখায় আমি স্কুলেও অনুপস্থিত না থাকার চেষ্টা করেছি প্রতিনিয়ত। আমি যাদের সঙ্গে স্কুলে যেতাম, আমি তাদের সৌখিন কাপড় চোপর পড়া দেখে নিজেকে কখনো মনে হয়েছে, আমার এই জন্মের জন্য তো আমি দায়ি নই, অথবা আমার এই দৈন্যের জন্য তো আমি দায়ি নই। আমিও তো হতে পারতাম তাদের কোন এক ধনাঢ্য পিতার একমাত্র সন্তান। কিন্তু না, আমি কোন ধনাড্য বাবার সন্তান ও নই, আবার আমার কোন ধনি আত্মীয়ও নাই। আমাকে দেশ ছারতে হয়েছে কপাল ফেরানোর আশায়। আমি পরভূমে বড় হয়েছি অনেকের ছত্রছায়ায়। এমন কি আমি আমার ধর্মটাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে কোন এক উচু ধাপের সিরিতে উঠার আশায়।

প্রেম কি জিনিস, একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের যে প্রেমের অনমদনা তা যে আমার ছিল না তা নয় কিন্তু আমার সেই সাধ্য করার মত পরিস্থিতিও ছিল না। মনে হয়েছে সত্যি কষ্টে আছি।

আজ আমার সব হয়েছে। কোন কিছুর কমতি নেই আমার। আমি যা চাই না, তাও আমি পাই। এর থেকে বেশি কেউ পায় তা আমার জানা নাই। কিন্তু হ্যা, এই যে বললে, আমি কখনো কষ্টে থাকি কিনা? আমি যখন কোন এক পল্লিগ্রামে যাই, আমি যখন কোন এক এতিমখানার বস্তিতে যাই, আমি যখন কোন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় যাই, আমার তখন ঐ যে ফেলে আসা আমার অতীত জীবনের যে কষ্ট, যে অনুভুতি আমার এই সারা জীবনের স্মৃতির মধ্যে জমা হয়ে আছে, তারা আবার উঁকি দেয়, আমি তখন সত্য সত্যি কষ্টে থাকি। কিন্তু এ অনুভুতি আমার প্রকাশের কোন ভাষা নাই শুধু কিছু সাহায্যের হাত বারিয়ে দেয়া ছাড়া।

তোমরা এখন কষ্টে থাক এই কারনে যে, হয়ত কোন এক ছেলে কোন এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, হয়ত কষ্টে থাক পিতামাতার অনুশাসনের কারনে, হয়ত তোমরা কষ্টে আছো পরিশ্রম করতে না চাওয়ার ইচ্ছায় অথচ কোন পরিশ্রমের কষ্টের কারনে, হয়তবা কষ্টে আছো তোমরা বেশি ইমোশনাল ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারছ না বলে। তোমরা অভিমানি, তোমরা অভিমান করতে পার তাই কষ্টে আছো। স্বাধীনতা কি হয়ত তোমরা জানো না বলে আমি স্বাধীন নই এই মনে করে কষ্টে আছো। একটা গান তোমাদের কষ্টকে বারিয়ে দিতে পারে, একটা মুভি তোমাদের মনকে কয়েকদিন আবেগের বশে কষ্টে রাখতে পারে, একটা পরীক্ষার খারাপ ফলাফল তোমাদের মনকে কষ্টে রাখতে পারে। তোমার ছোটভাই কিংবা বোনের সাথে তোমার বনিবনা হচ্ছে ভেবেও তোমরা আজ অনেক কষ্টে আছো বলে মনে হতে পারে। এগুলু আসলে কোন কষ্টই না। তোমরা অবাধ স্বাধীনতার নামে নিজেদের সতীত্বকে অকালে বিসর্জন দিয়ে কষ্টে থাক, তোমরা সময়ের কাজ না করার কারনে তোমাদের পিতামাতারা তোমাদেরকে একঘরে করে রাখছে বলে কষ্টে আছো। তুমি অঢেল পয়সা খরচ করতে পারছ না বলে হয়ত কষ্টে আছো। তোমার পাশের বন্ধুর দামী জামা দেখে তোমার মন খারাপ হয় বলে তোমরা কষ্টে আছো। কখনো মেঘলা আকাশ দেখলে কষ্টে থাক, আবার ভরা পূর্ণিমায়ও তোমরা কষ্টে থাক। বন্ধুদের সঙ্গ না পেলে কষ্টে থাক আবার বন্ধুদের সঙ্গ পেলেও কষ্টে থাক। কাউকে ভালবেসে কষ্টে থাক আবার ভালবাসা না পেলেও কষ্টে থাক। কোন কিছুতেই তোমরা সুখি নও। সব কিছুতেই তোমরা কষ্টে আছো। কষ্টে আছো এতা বলতেই যেন তোমরা ভাল মনে করো। 

কিন্তু কখনো কি একবারও ভেবেছ যে, কি করা উচিৎ ছিল আর কি করা হচ্ছে? তাহলে এই কষ্টে থাকার জন্য তো তুমি অন্য কাউকেই দায়ি করতে পার না। তোমার এই কষ্ট একটা আধুনিক কালের হতাশা ছাড়া আর কিছুই না। অথচ জীবনে কষ্ট লাঘব করার জন্য তুমি কিছুই করছ না।

তোমার এই কষ্টের জন্য আমি একটুও অনুশোচনা করি না। শুধু আমার কষ্ট হয় তোমরা তোমাদের কষ্টের লাঘবের কোন প্রতিশ্রুতির কথা বল না বলে। আমি অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকলাম তার এই ভাবনার জন্য। কত উচুতে বসে তিনি কত নিচু স্তরের ভাবনার কথা গুলো বলছেন।

আমার আর কিছুই বলার ছিল না।

২৬/০৫/২০১৬-নাম না জানা মানুষ

Categories

 

আমি আপনার ভাল নাম জানি না। জানলেও যে খুব একটা লাভ হবে বা আমার চিন্তার মধ্যে কোন পরিবর্তন আসবে তাও না। আপনার নাম সোনালী না হয়ে রুপালী হলেও যা, পিংকি, সিন্থিয়া, কিংবা সাথী অথবা কবিতা হলেও তা। যাই হোক না কেন, আমি এখন আপনাকে ঐ সোনালীর আদবে একজন অপূর্ব সুন্দর,  বা সুন্দরী (যদি মেয়ে হয়ে থাকেন) লক্ষি, আর ভক্তের ন্যায়ই দেখব। আপনার সাথে আমার মনের মিল আছে কিনা আমি জানতেও চাইব না, আপনার কি রঙ পছন্দ, কি গান আপনি পছন্দ করেন কিংবা কিসে আপনার কষ্ট হয়, অথবা কিসে আপনার কস্ট লাঘব হয় তার কোন দায়দায়িত্বও আমি নিতে চাইব না। কারন আমি প্রকাশ্য কোন মানবের কাছে প্রকাশ্য হতে চাই না। তবে যেটুকু আমার কাছে মনে হয়েছে আপনি রবিঠাকুর এর লেখা পছন্দ করেন, আপনি বনলতাকে ভালবাসেন, আপনি সোনালী রোদ ভালবাসেন। গ্রীষ্মের উষ্ণতা আপনি ভালবাসেন কিনা আমি জানি না, শ্রাবনের ধারা আপনাকে শিহরিত করে কিনা আমি জানি না, অথবা গ্রামের সেই বুড়িমার আচল ধরে পায়ে পায়ে হেটে নদীর ধারে গোসলের আগে কচিকচি পাতা তুলে মিথ্যে মালা গাথতে পছন্দ করেন কিনা আমি জানি না। তবে যে অপূর্ব নামে ছেলেটির মৃন্ময়ীর ভালবাসায় আপ্লূত হয়ে মন্তব্য করতে পারে, যে নাটোরের বনলতাকে বরন করে নিজেকে বনলতার মত গুনগুন করে গান গাইতে পারে, সে আর যাই হোক শ্রাবন নিশ্চয় তার প্রিয় ঋতুর মধ্যে একটা, অথবা বসন্তের বিকালে পায়ে পায়ে না হোক, ছলছল নেত্রে বুড়িমাকে দেখতে যাওয়ার ছলে অস্পৃশ্য কিছুর দেখা হোক তা নিশ্চয় মন থেকে ফেলে দেওয়া যায় না।

অস্পৃশ্য কোন কিছুর দিকে কখনো হাত বারাবেন না। ঐ অস্পৃশ্য জিনিসে যে একবার হাত বাড়িয়েছে, তার নির্ঘাত হয় মৃত্যু হয়েছে প্রেমের দিশানলে, না হয় সে দেবদাসের পার্বতীর মত বাস করেছে রানী হয়ে কিন্তু মন পরে ছিল ঐ কৃষ্ণকুন্ড গ্রামের দেবদাসের ঘরে। আর যদি তার থেকেও আপনি এককাঠি শক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি নিস্চিত থাকুন, আপনার যোগ্য কোন প্রেমিক বা পেমিকা এখনো এই পৃথিবীতে জন্ম নেয় নাই। আপনাকে ঐ অস্পৃশ্য মানুষের আত্তাকে নিয়েই চিরকুমার বা চিরকুমারি হয়ে থাকতে হবে।

ভয় আপনার রয়েই গেলো। ভয় কি আসলেই রয়ে গেলো? ক্ষমা করে দিবেন যদি আমার এই লেখা আপনার চরিত্রের সাথে মিলে গিয়ে থাকে, আর মাফ করে দিবেন যদি আমার এই অনুভুতি আপনার চরিত্রের কথাও না মিল খায়। সবটাই কল্পনা। আর কল্পনার রাজ্য থেকে কারো কোনদিন ফাসি হয়েছে এই তথ্য কোন আদালতে প্রমান পাওয়া যায় নাই।

২৫/০৫/২০১৬- একটা কোয়ালিটি পূর্ণ সময়

Categories

 

একটা কোয়ালিটি পূর্ণ সময় অতি অল্প হলেও এর মুল্য অনেক বেশি। যেমন, আপনার মন খারাপ? বাইরের বারান্দায় খোলা হাওয়ায় নীল আকাশের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকুন, মন ভাল হয়ে যাবে। অথচ দিনের পর দিন আগুনের মত উষ্ণ চুলার পাশে বসে থাকলেও আপনার মন ভাল হবে না।

বড্ড মন খারাপ হচ্ছিল এ কয়দিন। লম্বা একটা বিরহের মত সময়টা কাটছিল, মনে হচ্ছিল আকাশের নীল আমার চোখে পড়ে না, প্রাকৃতিক গাড় সবুজের গাছগাছালি আমার নজরে পড়ে না, আশেপাশের ছোটছোট ছেলেমেয়েদের কলকাকলিও আমার কানে পৌঁছে না। ভরদুপুরকেও মনে হচ্ছিল মেঘলা আকাশের মত ধূসর।

অথচ আজ মাত্র এক ঘণ্টার একটা অস্পৃশ্য সোনালী মিলন আমার এতোদিনের সব অস্থিরতা, আমার সব অবসাদ, ক্লান্তি দূর করে দিল। প্রান ঠাণ্ডা হয়ে গেলো, মন সতেজ হয়ে গেলো। সোনালী রোদ্দুরের মত দিনটা একেবারে ফিক করে হেসে দিয়ে বল্ল, এখন খুশি তো?

২৫/০৫/২০১৬- জেগে থাকার অনেক নাম

Categories

 

জেগে থাকার আরও অনেক নাম আছে, কখনো এর নাম কষ্ট, কখনো এর নাম ভালবাসা, কখনো এর নাম আতংক, আবার কখনো এর নাম উদাসীনতা, আবার কখনো এর নাম শুধুই ভাললাগা। আপনি কোন সেই নামের কারনে জেগে আছেন? তবে আমি চাই না আপনার জীবনে ঐ কোন একটা নামের কারনে জেগে থাকেন যা মানুষকে আতংক গ্রস্থ করে তোলে, কিংবা কষ্টে রাখে। আর আমার প্রোফাইলের ছবির কথা বলছেন? এটা কোন কাল্পনিক ছবি নয়। এই ছবির মধ্যে আমার অস্পৃশ্য ছোঁয়া আছে, অস্পৃশ্য নান্দনিক কল্পনা আছে। আর ঐ লকেটের দুই ধারে যে চেইনটা দেখছেন, সেটা দিয়ে বাধা একটা হৃদয় যার দুইটা ধারের এক্তায় আমি আর আরেকটায় সে। ভাল থাকবেন

২৪/০৫/২০১৬-আকাশে বৃষ্টি একটু বাতাস

Categories

 

আকাশে বৃষ্টি, একটু একটু বাতাস, পাশে কফির কাপের কফি অনেক আগেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে তারপরও সিগারেটের সঙ্গে খেতে মন্দ লাগে না। মনটা এই বৃষ্টির দিনে একটু ভারিই ছিল কিন্তু কথা হল, মনটাও হাল্কা হল। কিন্তু তুমি একই করলে হটাত? তুমি এমন ঝড়ের গতিতে কি করে এতটা পথ পারি দিয়ে উথাল পাতাল মন নিয়ে একেবারে চলে এলে আমার দরজার একেবারে অন্তরের কাছে? কি করে জানলে আমি তয়াম্র জন্য কতদিন ধরে অপেক্ষায় আছি? ভগবান অন্তর্যামী, সে সব জানে, আর সব পারে।

আমি শুধু সারপ্রাইজডই হই নাই, হয়েছি অনেক অনেক খুশি। কিন্তু মনের এক কোনায় আমার বড় একটা প্রশ্ন জাগিয়ে দিয়ে গেলে আজ…… কেন ঐ চোখের কোনায় বৃষ্টির ফোঁটার মত পানি ঝরল? কোন ব্যাথা? কোন কষ্ট? কোন অপূর্ণ ইচ্ছা? কি সেটা আমার এখনো জানা হয় নাই? আমি কি দিতে চাই না তোমায়? তাহলে কি লুকিয়ে গেলে আজ আমার কাছে?

অমাবশ্যার রাতে আমি তোমার কাছে কোন চাঁদনী রাত দাবি করিনি, শীতের সকালে আমি তোমার কাছে শ্রাবনের ধারার একটা মূর্ছাও চাইনি, অথবা কোন এক চৈতালি দিনে আমি শীতের কুড়কুড়ে আমেজও চাই নাই । আমি শুধু চেয়েছি তুমি সুখি হও, তুমি আমার আদরে বড় হও। তাহলে কেন আজ আমি তোমার ঐ কাজল মাখা মায়াবি নয়নে কয়েক ফোঁটা জলের রেখা দেখলাম!

আমার এই অস্পৃশ্য হাত তোমাকে ছুয়ে দিল, তোমার নয়নে চুমু খেয়ে সব ক্লান্তি, সব দুঃখ, আর সব অবসাদ দূর করে দিল। শুধু শুধালাম, ভাল আছো তো এখন?

মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে ভিজা ভিজা নয়নে বললে আমায়, কতদিন দেখি নাই তোমায়!! তাই দুচোখে জল চলে এসেছিল। কোন কষ্টে নয়, কোন ব্যথায় নয়, কোন কিছু অপূর্ণতায় নয়, আজ এই হটাত পাগলের মত ছুটে না এলে হয়ত আমার সারাটা রাত শুধু শ্রাবনই হত, কিন্তু এইটুকু সময়ের জন্য হলেও এখন মনে হল, আনন্দের সবটুকু নিলিমা দিয়ে তোমার এই অস্পৃশ্য আদর আমার প্রতিটি গালে, প্রতিটি নয়নে, প্রতিটি রন্দ্রে রন্ধ্রে শিতল করে দিল।

মুচকি হেসে বললাম তারে, আমি কি কখনো তোমাকে বলেছি যে আমি তোমায় ভালবাসি?

হ্যা, জেনে রাখ, আমি তোমায় ভালবাসি।

২৪/০৫/২০১৬-ইচ্ছাবিহীন ভুল

Categories

 

ইচ্ছাবিহিন ভুলের কারনে অথবা নিছক একটা মজা করার কারনে আজ আমি তার সহিত অত্যন্ত কষ্টের একটা অনুভুতি উপহার দিয়েছি। এটাকে আমি উপহার বলব উপহাস হিসাবে। ভগবানের কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি কিন্তু মৃদু মৃদু হাসেন আর বলেন, আমি তোমাকে ভালবেসে সৃষ্টি করেছি বলেই তোমার সব অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিতে পারি আর তাই দিলাম। আমরা মানুষেরা ভগবান নই, তারপরেও অনেকে ভগবানের এই বৈশিষ্ট অনুকরন করে মহত্তের উদাহরন রাখেন। তুমিও কি পার এই এমন একটা উদাহরন তৈরি করে আমাকে তোমার বন্ধু বলে মেনে নিতে? আমি তোমার কাছে কখনোই এই আকুতি করতাম না যদি না আমি ঐ নিষ্পাপ অরুন্ধতীর মত সোনালীকে ভাল না বাসতাম, কিংবা কোন এক রোদ্দুরের আভায় আমি কোন সোনালী আকাশকে না দেখতাম। সেও কষ্টে আছে তোমার এই কঠিন এক সময়ের অনুভুতিকে ঘিরে। অস্পৃশ্য এই অনুভুতির জন্য অস্পৃশ্য স্নেহ ছাড়া আমার কাছে তোমাকে দেওয়ার কিছুই নাই।

১৫/০৫/২০১৬-রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে

Categories

 

রবিঠাকুর তার সমাপ্তি গল্পে মৃন্ময়ীর বাল্য আর যৌবনকাল কিভাবে দ্বিখণ্ডিত হইয়া গিয়াছিল তার চমৎকার একটা বর্ণনা করিয়াছিলেন ঠিক এইভাবে-” নিপুন অস্ত্রকার এমন সূক্ষ্ম তরবারি নির্মাণ করিতে পারে যে, তদ্বারা মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করিলেও সে জানিতে পারে না, অবশেষে নাড়া দিলে দুই অর্ধখন্ড ভিন্ন হইয়া যায়। বিধাতার তরবারি সেইরূপ সূক্ষ্ম, কখন তিনি মৃন্ময়ীর বাল্য ও যৌবনের মাঝখানে আঘাত করিয়াছিলেন সে জানিতে পারে নাই। আজ কেমন করিয়া নাড়া পাইয়া বাল্য- অংশ যৌবন হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িল এবং মৃন্ময়ী বিস্মিত হইয়া ব্যথিত হইয়া চাহিয়া রহিল।”

আমিও যেদিন এই অস্পৃশ্য পুরুষটাকে প্রথম আমার অন্তরদৃষ্টি দিয়া দেখিয়াছিলাম, তখন আমিও ব্যথিত হৃদয়ে বুঝিতে পারিলাম, আমার আর বাল্যকাল বলিয়া কিছুই অবশিষ্ট নাই। আমার বাল্যকাল আমার অজান্তেই আমা হইতে কবে বিদায় নিয়া চলিয়া গিয়াছে, আমি বর্ষার কিংবা শরতের অথবা শীতের কোন ঋতুতেই তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। যখন বুঝিতে পারিলাম, তখন আমার শুধু এইটুকু মনে হইল আম্র কাননের শুভিত কোন পুস্পের জন্য যখন মৌমাছিরা দূর দূরান্ত হইতে উড়িয়া আসে, আমিও তাই। কিন্তু আমার ভ্রম কাটিতে বেশি সময় লাগিল না। আমি যাহাকে পুস্প বলিয়া এতদূর উড়িয়া আসিয়াছি, উহা আসলে অন্য কাহারো বাগানের মৌমাছিমাত্র। সেই বাগানে পুস্প আছে, তাহার সহিত মৌমাছির সঙ্গে তাহার দলবলও আছে। বাগানের মালিও আছে, মালিকও আছে। আমি উহাতে বিচরন করিতে পারি কিন্তু উহা আমার নয়। আমি তাহাকে দূর হইতে আপন ভাবিতে পারি কিন্তু কাছে গিয়া বলিতে পারি না, ইহা আমার। আমি ইহাকে অনুভব করিতে পারি কিন্তু জড়াইয়া ধরিয়া গলা ফাটাইয়া বলিতে পারি না, এই পৃথিবীতে আমি আসিয়াছি শুধুমাত্র ইহার পাজর হইয়া।

আমি যাহা দেখিতে পাইতেছি জগতে তাহা হইতে আরও অধিক সৌন্দর্যের আর অধিক আকর্ষণীয় হয়ত কিছু আছে কিন্তু যাহাকে একবার মনে ধরিয়াছে, তাহা হইতে আরও কোন দামী, আকর্ষণীয় অথবা মূল্যবান হাতের কাছে আনিয়া দিলেও মনে হইবে, আমি উহা চাই নাই। আমি চাহিয়াছি শুধু উহা যাহা আমার কাছে এখন অস্পৃশ্যই। তারপরেও সে আমার। মনের ভিতরের যে জগত সেখানে তো আর এই বায্যিক পৃথিবীর কোন আইন বা আদালতের অস্তিত্ব নাই। তাই নীলিমার আকাশের দিকে তাকাইলেও আমি তাহাকে দেখি আবার ঘন বর্ষার বৃষ্টির ছায়াতলেও আমি তাহাকে দেখি। কখনো সে আমাকে জলের মত ভাসাইয়া লইয়া যায় অতল সমুদ্রের গহিনতলে আবার কখনো সে আমাকে জলের স্রোতে ভাসাইয়া দেয় আমার দুই নয়নের ধারা।    

১৪/০৫/২০১৬-বহুবছর আগে যখন

Categories

 

আজ থেকে বহু বছর আগে যখন তোমার এই পৃথিবীতে আগমন হইয়াছিল, তারও অনেককাল পরে আমি এই পৃথিবীর নীল আকাশ দেখিয়াছিলাম, লাল সূর্য দেখিয়াছিলাম, বাতাসের গন্ধ শুকিয়াছিলাম। কিন্তু তখন আমার কাছে ঐ নীল আকাশ শুধু নীলই ছিল, সূর্য তখন একটা জলন্ত অগ্নিপদার্থ হিসাবেই ছিল, বাতাসের গন্ধ আমি ভাল করে মনেও করিতে পারি নাই। কিন্তু যেদিন তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হইয়াছিল, আমি নীল আকাশের মাঝে নীলমেঘ দেখিয়াছিলাম, ঐ মেঘেরা কিভাবে একস্থান হইতে ভাসিয়া ভাসিয়া অন্যত্র চলিয়া যায় তাহা দেখিয়াছিলাম, ঐ প্রখর সূর্যের আলো আমার অপেক্ষার পালাকেও যন্ত্রনা দিতে পারে নাই, বাতাসের গন্ধের সঙ্গে আমি আরও একটা গন্ধ শুকিয়াছিলাম। আর সেটা তোমার গায়ের গন্ধ, তোমার সুগন্ধির গন্ধ, তোমার ক্লান্তির ঘর্মাক্ত শরীরে গন্ধ।

আজ অনেক বছর হইয়া গেলো, আমি এখনো সূর্যকে দেখি, আমি ঐ নীলাকাশ দেখি, ঐ নীলাকাশের নীল মেঘগুলি দেখি, দক্ষিনা বাতাসের গন্ধও শুকি। সবকিছু আগের মতই আছে বলিয়া মনে হয়। শুধু মনে হয় ঐ বাতাসের সাথে তোমার গায়ের গন্ধটা নাই, তোমার সুগন্ধির গন্ধটা নাই, তোমার গায়ের সেই ক্লান্তির ঘর্মাক্ত গায়ের গন্ধটাও নাই।

আমি অনেক খুজেছি তোমায়, ” শিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে…… “

আচ্ছা তুমি কি কোথাও নাই?

১৩/০৫/২০১৬- কোন একরাতে হটাত

Categories

 

কোন একরাতে হটাত যদি বাইরের আকাশের মুষলধারার বৃষ্টির শব্দে কখনো ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি আমার বেলকনিতে এসে দারাই। উম্মুক্ত সেই বেলকনি, বৃষ্টিরচ্ছটা আমার মুখের চারিদিকে এসে আমাকে ভিজিয়ে দেয়। চোখের চশমাটা ঝাপ্সা হয়ে আসে। আমি মুছতে চাইনা সেই কাচের চশমাটা। আকাশের বিদ্যুৎ ঝলকানিতে আমি অন্ধকারে গাছের ঢালগুলি দেখি, পাতাগুলি দেখি, ভিজে ওরা শিতল হচ্ছে ধরণির তটে। গাছের মগঢালে বাবুই পাখির বাসাগুলি অনবরত এদিক সেদিক হেলেদুলে ঢুলছে। পাখিরা নিশ্চিতে হয়ত জেগে আছে তাদের ছোট ছোট কচি কচি বাচ্চাদের নিয়ে। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হয়ত এখন বৃষ্টি নাই, আবার কোথাও না কোথাও হয়ত আরও অঝোর ধারায় ঘূর্ণিপাক হচ্ছে। আমি ঠায় দাড়িয়ে আছি আমার এই ছোট্ট বেলকনির একেবারে কার্নিশের কাছে। সব মানুষেরা এখন ঘুমিয়ে আছে। আমি জেগে আছি। মনে পরছে আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে কোন একদিন তোমার সঙ্গে আমিও এমন একরাতে ঘনকালো আকাশের এই বৃষ্টির ধারা দেখেছিলাম। তখন তুমি ছিলে আমার পাশে আমাকে জরিয়ে ধরে বলেছিলে, আমি সব সময় থাকবো ঠিক এমন করে এই জলের ধারার সঙ্গে।

আজ আমি কিন্তু একা।

…………… তুমি কি আছো এখানে?  

১১/০৫/২০১৬- কিছুক্ষন আগে আমি

Categories

 

কিছুক্ষন আগে আমি তোমার সাথে কথা বলে আমার মন খুব শান্তি পেল। শান্তি পেল এই কারনে যে, গতকালের সব ধারনাতা আমার ভুল। অন্তত এই মুহূর্তে আমি জানলাম যে, আমি যা সন্দেহ করে বার বার মন খারাপ করছি, তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নাই। যদি তার গলার স্বর ঠিক হয়ে থাকে, যদি তার কথার ভাষা ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আমি এটুকু নিশ্চিত যে সে আমাকে ঠকাচ্ছে না। আমি তার সাথে কথা বলার সময় বুঝতেছিলাম, তার গলা ধরে আসছে কষ্টে, তাকে আমি চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না কিন্তু মনে হচ্ছিল তার চোখের কোনা ভিজে আসছিল। আর বার বার সেই এক্টাই প্রতিজ্ঞা খুব জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছিল, যে, আমাকে পারতেই হবে। আমি তোমার আর কারো ই না। যদি তা না হত তাহলে আমি কেন ১ ঘণ্টার মধ্যে আমি আমার টেলিফোন পালটিয়ে ফেললাম? আমি তো আমার আগের নাম্বারটাই ব্যবহার করতে পারতাম। এই কারনে করেছি, আমি আমার জীবনটাই পাল্টিয়ে ফেললাম, আর সেটা তোমার কারনে।

কেন আমাকে এই একই কথা বলে কষ্ট দাও? কেন আমাকে নিয়ে তোমার এতো ভয়? আমি কি কোন ভয়ের কাজ করেছি? তুমি আর আমার মা যদি কখনো আমাকে আবার বিয়ের কথা বল, তাহলে আমি তোমাদের কাউকেই কখনো কিছু বলব না, শুধু কেদে কেদে এক সময় সবার কাছ থেকে হারিয়ে যাব। আমাকে আর তোমরা কোথাও খুজে পাবে না।

আমি তো সুখি, তাহলে কেন আমাকে বারবার এই কথাটা মনে করিয়ে দিচ্ছ যে, আমার এই সুখটা আসলে স্থায়ী নয়, হয়ত তোমরা আমার সঙ্গেই প্রতারনা করছ আমাকে আপাতত ভাবে খুশি এবং সুখি করার জন্য? আমি তো আমার জীবনের সব কথা গুলুই বলেছি, আমি কি বলি নাই? আমাকে আমি যা নিয়ে আছি, তা নিয়েই বাচতে দাও না প্লিজ। আমি আর কারো হতে পারবো না। আমি তো এক জনের হয়েই গেছি। আবার কেন আমাকে জোর করে কস্ট দিচ্ছ?

আমি বুঝতে পারলাম, আমার সব দ্বিধা র অবসান হয়েছে। আমি যা দেখছিলাম, যা ভাবছিলাম, তা আসলে সত্যি না। তুমি আমাএ আছো আর আমারই থাকবে। মহান ভগবান তোমার মঙ্গল করুক। আমি তোমাকে ভালবাসি। 

১১/০৫/২০১৬- খুব শান্তি পেল মন।

Categories

 

খুব শান্তি পেল মন। শান্তি পেল এই কারনে যে, কালের সব ধারনাতা আমার ভুল। অন্তত এই মুহূর্তে আমি জানলাম যে, আমি যা সন্দেহ করে বার বার মন খারাপ করছি, তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা নাই। যদি গলার স্বর ঠিক হয়ে থাকে, যদি কথার ভাষা ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে আমি এটুকু নিশ্চিত যে  কেউ আমাকে ঠকাচ্ছে না। কথা বলার সময় যখন কারো গলা ধরে আসে কষ্টে, তাকে আম্মিরা চোখে দেখতে পাই বা না পাই, তার চোখের কোনা ভিজে আসবেই। আর বার বার সেই এক্টাই প্রতিজ্ঞা খুব জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছিল, যে, আমাকে পারতেই হবে। আমি তোমাদের কারোরই না। আমি আমার জীবনটাই পাল্টিয়ে ফেললাম, আর সেটা তোমার কারনে নয়, আমার কারনে। কেন আমাকে এই একই কথা বলে কষ্ট দাও? কেন আমাকে নিয়ে তোমার এতো ভয়? আমি কি কোন ভয়ের কাজ করেছি?  

আমি তো সুখি, তাহলে কেন আমাকে বারবার এই কথাটা মনে করিয়ে দিচ্ছ যে, আমার এই সুখটা আসলে স্থায়ী নয়, হয়ত তোমরা আমার সঙ্গেই প্রতারনা করছ আমাকে আপাতত ভাবে খুশি এবং সুখি করার জন্য? আমি তো আমার জীবনের সব কথা গুলুই বলেছি, আমি কি বলি নাই? আমাকে আমি যা নিয়ে আছি, তা নিয়েই বাচতে দাও না প্লিজ। আমি আর কারো হতে পারবো না। আমি তো এক জনের হয়েই গেছি। আবার কেন আমাকে জোর করে কস্ট দিচ্ছ?

আমি বুঝতে পারলাম, আমার সব দ্বিধার অবসান হয়েছে। আমি যা দেখছিলাম, যা ভাবছিলাম, তা আসলে সত্যি না। তুমি আমায়  আছো আর আমারই থাকবে। মহান ভগবান তোমার মঙ্গল করুক। আমি তোমাকে ভালবাসি। ৩০ বছর নির্ভর করে শেষে না বাকী জীবন পরনির্ভরতায় কাটাতে হয়। আমি সেই ভয় টাই পাই এখন। বিশ্বাস ভেঙ্গে নদীর কুলের খরস্রোতা ঢেউ দেখতে যেও না। অসাবধানতায় হারিয়ে যেতে পারো।